প্রফেসর সোমের সঙ্গে প্রথম আলাপ – কৌশিক সামন্ত
“কত দেব ঠিকঠাক করে বলুন তো?”
“বাবু জিনিসটা তো দেখলেন, বলুন এমন কি বেশি চেয়েছি? খাসা জিনিস।”
“খাসা না ছাই, কে নেয় এরকম পুরোনো বাক্স? নেহাত কারুকাজটা চোখে লেগে গেছে।”
“ঠিক কয়েছেন কত্তা, এ জিনিস সবার চোখে ধরা দেয় না।”
“হয়েছে হয়েছে আর তেল না দিলেও চলবে, দুশোর এক পয়সাও বেশি দিতে পারব না। দিতে হলে দাও, না হলে যাও বাপু।”
“বেশ, তবে তাই দিন, অনেক লস হয়ে গেল গো বাবু।”
দরাদরি করে জিনিসটা শেষ অবধি বাগিয়েই ফেললাম। নাহ্ জিনিসটা কিন্তু মন্দ নয়, দামের তুলনায় বেশ ভালোই। মাথার কাছের দেওয়াল আলমারিটায় রেখে দিতে হবে, সবার চোখে পড়বে বেশ। তার আগে ভেতরে কীসব জঞ্জাল রয়েছে, ওগুলো পরিষ্কার করতে হবে। যাই কলিন আর একটা ন্যাকড়া নিয়ে আসি।
.
দুই
লম্বা একটা রাস্তা, দুপাশটা ধু-ধু করছে। অদ্ভুত ব্যপারটা হল, শুধু রাস্তাতেই আলো, আর বাকিটা অন্ধকার, আমি একাই হেঁটে চলেছি, রাস্তাতেও কোনো মানুষজন নেই।
ভয়-ডর আমার চিরকালই একটু কম, তাই প্রথমে পাত্তা দিইনি। কিন্তু হঠাৎ কীরকম একটা সোঁ সোঁ শব্দ ভেসে এল, আর তার সঙ্গে-সঙ্গে অদ্ভুত ভাবে চারপাশটা ক্রমশ ছোটো হয়ে আসতে লাগল, যেন একটা অন্তিম বিন্দুতে এসে মিশে যাবে সব। আমি পাগলের মত দৌড়োতে লাগলাম। রাস্তার শেষপ্রান্তে একটা ফটক দেখা যাচ্ছে, ওটা পেরিয়ে গেলেই বোধহয় সব শান্ত হয়ে যাবে। প্রায় পৌঁছে গেছি ফটকের দোরগোড়ায়। এমন সময় হঠাৎ পেছন দিক থেকে দুটো কালো রোমশ হাত এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি চিৎকার করে উঠলাম। আপ্রাণ চেষ্টা করছি, কিন্তু সেই হাত দুটোর থেকে যেন আর মুক্তি নেই, এদিকে পেছন দিকের অন্ধকারটা আরও এগিয়ে এসেছে, আর একটু হলেই যেন আমাকে গিলে নেবে… নাহহহহ!
“কীরে স্বপ্ন দেখছিস নাকি? সেই কখন থেকে ডেকে যাচ্ছি! আর কতক্ষণ ঘুমোবি? যা, বাজার যা।”
ধুত্তেরি, একে রবিবারের সকাল, তার ওপরে এরকম একটা বিচ্ছিরি স্বপ্ন, কোনো মানে হয়? মুডটাই নষ্ট করে দিল।
“যাচ্ছি, আগে এক কাপ কড়া করে কফি দাও তো মা।”
.
তিন
আজ রোদটা বেশ চড়া, বাইকের হাওয়ায় গা যেন ঝলসে যাচ্ছে। রাস্তা ফাঁকা, বেশ স্পিডেই চালাচ্ছিলাম, বাঁদিকের মোড় ঘুরলেই, বাড়ির গলি…
আরে! এ কী? এই রাস্তাটা কেমন অচেনা-অচেনা ঠেকছে। শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল। মনে পড়েছে! এটা সেই কালকের স্বপ্নে দেখা রাস্তাটা। ঠিক আগের মতই হঠাৎ করে চারপাশটা অন্ধকার হয়ে এল। এক অজানা আতঙ্কে দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে আরও জোরে অ্যাক্সিলেটর চেপে ধরলাম, গোঁ গোঁ করে বিকট আওয়াজ হতে থাকলো বাইকটায়….
“আরে গেল-গেল! ধর-ধর!”
ভাগ্যিস প্রফেসর সোম ঠিক টাইমে গাড়িতে ব্রেক মেরে দিয়েছিলেন, নাহলে যে কি হত।
আজকালকার ছেলে-ছোকরাগুলোও হয়েছে, বাইক হাতে পেল কী পেল না, নিজেকে হাওয়াই জাহাজ মনে করে।
চারপাশ থেকে ভেসে আশা টুকরোটাকরা উত্তপ্ত মন্তব্যে যখন হুঁশ ফিরল, খুব বেশি বুঝতে না পারলেও এইটুকু বুঝলাম, যে আমি কোনো প্রফেসর সোম নামক ব্যক্তির গাড়ির ওপর নিজের বাইকটা তুলে দিয়েছি। উনি আগে থেকে বুঝতে পেরে ব্রেকখানা না চাপলে আমার আজ ভবলীলা সাঙ্গ হত।
“তোমার বিশেষ লাগেনি তো? আরে ইয়ং ম্যান গাড়ির ক্ষতি নিয়ে ভেব না। ওটা আমার ওপর ছেড়ে দাও, তুমি নিজে হাঁটতে পারবে তো? নাকি ড্রাইভার-কে বলি পৌঁছে দিয়ে আসবে?”
এতটা সহানুভূতি আশা করিনি। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম ভদ্রলোকের মুখের দিকে। প্রায় ৬ ফুট লম্বা মধ্যবয়সি, ব্যাকব্রাশ করা কাঁচাপাকা চুল, আর মুখে অদ্ভুত শান্ত একটা হাসি।
“না-না! আমার একদমেই লাগেনি, মাঝখান দিয়ে আপনার গাড়িটার…”
“ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তোমাকে খুব ডিস্টার্বড লাগছে, বাড়ি যাও, রেস্ট নাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“এই গলির শেষ দোতলা বাড়িটাই আমার, প্লিজ আপনি একবার যাবেন কিন্তু।”
“বেশ, সে হবে ক্ষণ। তুমি এখন বাড়ি যাও, আর ডাক্তার দেখিয়ে নিও কিন্তু।”
বেরিয়ে যান ভদ্রলোক। আশেপাশের লোকেরা হতাশ হয়, এত সহজে সবকিছু মিটে যাবে, কেউ ভাবতে পারেনি। আমিও বাইকটা ঠেলতে-ঠেলতে বাড়ির দিকে রওনা দিলাম, জোর বেঁচে গেছি, বাইরে বুঝতে না দিলেও, ভেতরে বেশ ছড়ে গেছে চারপাশ, যন্ত্রণা করছে ভালোই।
.
চার
এই ভর সন্ধেবেলা বিছানায় শুয়ে থাকতে কার ভালো লাগে বলুন?
কিন্তু কী করা যাবে? তিনদিন টানা রেস্ট, এটা ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। দু’মাস ‘ওসব’ ছাইপাঁশ গেলা যাবে না, পেট গরম থেকে এইসব হ্যালুসিনেসন, এটা বাবার প্রেসক্রিপশন। আর সত্যনারায়ণ পূজা, এটা মায়ের সলিউশন… সব মিলিয়ে রীতিমতো অস্থির লাগছিল। কিন্তু এই সবের ওপরে যেটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে, ওই স্বপ্ন বলুন আর হ্যালুসিনেশন বলুন, কোনো কার্য-কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। কেউ বিশ্বাস না করলেও আমি নিজে জানি, রিসেন্ট কোনো অপদ্রব্য সেবন আমি করিনি। তবে?
“আসতে পারি?”
“আরে আপনি! আসুন-আসুন।”
“বিরক্ত করলাম না তো? ভাবলাম কেমন আছ, একবার খোঁজ নিয়ে আসি, যা জোরে ঠুকেছিলে।”
“আপনাকে যে কী বলে ধন্যবাদ দেব…! আপনার জায়গায় অন্য কেউ থাকলে, কেলিয়ে কাঁঠাল পাকিয়ে দিত।”
“আবার ওসব কথা কেন? আচ্ছা, তোমার মা-বাবার সঙ্গে আগেই আলাপ হয়ে গেছে, এবার তোমার সঙ্গেও পরিচয়টা সেরে ফেলি। আমি রুদ্র সোম। মেটাফিজিক্সের প্রফেসর ছিলাম। কর্মসূত্রে বাইরে থাকতাম, আপাতত অবসর জীবন এই কলকাতাতেই। তোমাদের গলির দু’টো গলি পরেই আমার বাড়ি। তা ভায়া, মুখ-চোখে ওরকম ভয় নিয়ে বাইক ছুটিয়েছিলে কেন? কেউ তাড়া করেছিল নাকি?”
“না। আসলে, কীভাবে যে বলব…! যাকেই বলছি সেই পেট গরম হয়েছে বলে হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে।”
“আমাকে নির্ভাবনায় বলতে পার ইয়ং ম্যান। আরে! ওটা কী? কী সর্বনাশ! এ জিনিস কোথা থেকে জোটালে?”
“এক ফেরিওয়ালা সস্তায় দিয়ে গেল। আমিও নিয়ে নিলাম। দেখতে বেশ ভালো, কী বলুন?”
“হ্যাঁ, ভালো তো বটেই। তা এটা খোলা-টোলা হয়েছে নাকি?”
“হ্যাঁ। পরিষ্কার করেছিলাম বটে একবার।”
“বুঝেছি। তা ভায়া এটা কী জিনিস জান?”
“সামান্য একটা কাঠের বাক্স। এটা ছাড়া তো কিছু বিশেষত্ব নজর পড়ে না।”
“হুঁ! বাইরে থেকে দেখে কিছু বোঝার উপায় নেই বটে। এটাকে বলে ডিবুক বাক্স। ইহুদিরা এটা ব্যবহার করত। সম্ভবত হলোকস্টের কোনো দুর্ভাগার অভিশাপ এটায় বেঁধে রাখা হয়েছিল, ফলে বাক্স যার হাতে পড়ত, মালিকের দুর্গতির সীমা থাকবে না। দুঃস্বপ্ন দিয়ে শুরু, আর মৃত্যু দিয়ে শেষ। কী? খুব গাঁজাখুরি বলে মনে হচ্ছে, তাই না? ভাবছ একজন অধ্যাপক এরকম কথা বলে কী করে? তা তোমরা তো ইন্টারনেট যুগের মানুষ, ডিবুক বক্স বলে একবার সার্চ মেরেই দেখই না কি বেরোয়!”
“না-না। আসলে মাথাটা এমন ঘুরে গেছিল।” শুকনো হাসি হেসে পরিবেশটাকে স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করলাম, কিন্তু কাল থেকে যা ঘটে চলেছে সত্যিই তো, কোনোটাই তো স্বাভাবিক নয়।
“আরে বাবা, তোমার জায়গায় আমি থাকলে, আমিও একই ভাবতাম। শুনে রাখো ভায়া, আজ যেটা অজানা অলীক, কাল জানা হয়ে গেলেই কিন্তু সেটা বিজ্ঞান, তাই না? যাকগে, অনেক সময় নষ্ট হয়ে গেছে, ব্যাপারটাকে আর বাড়তে দেওয়া ঠিক হবেনা, কিছু প্রসিডিওর আছে। তুমি ভেবো না। আর কিছু হবে না। আমি এটা নিয়ে গেলাম, তা আপত্তি নেই তো?”
উত্তর দেওয়ার মতো অবস্থায় আমি ঠিক ছিলাম না। মানা না মানার এক অদ্ভুত দোলাচলে দুলছিলাম। মাথা নেড়ে সায় দিলাম।
“তোমার মাকে বোলো, আর একদিন এসে কফি খেয়ে যাব। এটার ব্যবস্থা আগে করে আসি, কেমন? আরে চিয়ার আপ ইয়ং ম্যান! অত ভেব না। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার কার্ডটা রাখ, দরকার হলে যোগাযোগ করবে, এখন আসি কেমন।”
যেমন ধূমকেতুর মতো এসেছিলেন ভদ্রলোক, তেমন ভাবেই চলে গেলেন। আমি থ মেরে বসে রইলাম।
তিনদিন কেটে গেছে। না, আর কোনো দুঃস্বপ্ন বা দুর্ঘটনা ঘটেনি। সেটা সত্যনারায়ণের সিন্নির জোরেই হোক বা প্রফেসরের ডিবুক বাক্স বিদায়ের মধ্য দিয়েই হোক।
যাই হোক, ভদ্রতার খাতিরেই অন্তত একবার ফোন করা দরকার বলে মনে হল। মানুষটা নিজে এসে খোঁজ নিয়ে গেছিলেন। কার্ডটা হাতের কাছেই ছিল।
“প্রফেসর সোম? আমি কৌশিক বলছিলাম। নাহ্ আর কোনো ঘটনা ঘটেনি…। আচ্ছা, আগামী শনিবার যাচ্ছি তাহলে…? বেশ। রাখলাম তবে।”
ভদ্রলোক কি মন পড়তে পারেন নাকি? যাওয়ার ইচ্ছে একটা ছিলই, নিজে থেকেই নেমন্তন্ন করে দিলেন। ভালোই হল।
জটায়ুর ভাষায় বলতে গেলে, প্রফেসর সোম মানুষটা কিন্তু হাইলি সাসপিশাস! কালটিভেট করে দেখতে হবে। আর কিছু না হোক, আমার গল্পের অনেক মাল মশলা পাওয়া যাবে ওঁর কাছে আশা করি।
.
পাঁচ
শনিবার অবধি আর তর সইছিল না। বিকেল হতে না হতেই দৌড় দিলাম প্রফেসর সোমের বাড়ি। দোতলা ছিমছাম বাড়ি। কলিং বেল টিপলাম। এক কমবয়সি ছেলে এসে দরজা খুলে দিল।
“আসুন। ভেতরে এসে বসুন, বাবু আসছেন।”
গিয়ে বসলাম। নাহ্, ভদ্রলোকের স্টাডি রুমের প্রশংসা করতে হয়, রীতিমত একটা ছোটোখাটো লাইব্রেরি, তলার দিকের তাকগুলোতে সূর্যের আলো পৌঁছায় কিনা কে জানে।
“সরি, অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখলাম। আসলে সন্ধের দিকে একটু মেডিটেশনের বদঅভ্যাস আছে কিনা।”
“আরে না-না, আপনার বইয়ের কালেকশান দেখছিলাম। বিশাল তো!”
“হ্যাঁ, তা আছে বটে। তবে এদিক ওদিক নাড়াচাড়া করতে গিয়ে অনেক হারিয়ে গেছে। দাঁড়াও, একটু কফি-টফি বলে আসি।”
দেওয়ালে একটা বড়ো পেন্টিং ঝোলানো। কাছে গিয়ে দেখলাম, সেই ৮০- র দশকের রেট্রো মার্কা পোশাক পরা ১০-১২ জন যুবক-যুবতী। ছবির তলায় লেখা ‘ইন্ডিয়ান প্যারানর্মাল সোসাইটি ১৯৮০’, মাঝখানে দাঁড়ানো সেদিনের কমবয়সি প্রফেসর সোম কে চিনতে অসুবিধা হল না। কিন্তু ওঁর গলায় ওটা কী?
“হুঁ। ঠিকই ধরেছ। আমার পুরো নাম রেভারেন্ড রুদ্র সোম। ওই যে সংস্থাটি দেখলে, ওটার অন্যতম ফাউন্ডার আমিও। ওদের একখানা ওয়েবসাইটও আছে। তবে ওখানে ঢুকলে যা জানবে সে-সব নীরস তথ্য বই কিছু নয়। আচ্ছা ইয়ং ম্যান, তুমি বোর হচ্ছ না তো?”
“আরে না-না! আপনার মত ব্যস্ত মানুষ যে আমাকে টাইম দিয়েছেন, এটাই অনেক।”
“ব্যস্ত ছিলাম আগে। এখন মানুষ এত পলিটিকালি অ্যাবনর্মাল, যে ওসব প্যারানর্মাল-ট্যারানর্মাল সব আণুবীক্ষণিক হয়ে স্রেফ খেজুড়ে গপ্পো হয়ে গেছে।” মাথা নেড়ে হালকা হেসে নীরব সম্মতি জানালাম।
“তা লেখালেখি কর নাকি ভায়া?”
“বড়ো কিছু না, ওই একটা ব্লগ মতো আছে।”
“বেশ তো। বিন্দু-বিন্দুতেই তো সিন্ধু হয় একদিন। তা বল, কী জানতে চাও?”
“কীভাবে এসব শুরু হল? মানে আপনি কীভাবে এই লাইনে এলেন? মাফ করবেন। লাইন কথাটা ব্যবহার করা উচিত হয়নি আমার।”
“আরে না-না। ঠিক আছে। যেচে কে আর এসবে আসতে চায় বল? আসলে সবাইকে এ-সব বলতে চাই না, বলা যায়ও না। কিন্তু তুমি অলরেডি কিছুটা হলেও এ স্বাদের ভাগ পেয়েছ। ওয়েট, কফিটা আসুক শুরু করছি।”
.
ছয়
“তখন কত বয়স হবে আর? গ্র্যাজুয়েশন করে বসে রয়েছি। চুটিয়ে টিউশনি করছি। গুলতানি আর বিন্দাস রোয়াকে বসে আড্ডা। বনেদি পরিবার, পারিবারিক ব্যবসা, চাকরি-বাকরি নিয়ে চাপ নেই। হঠাৎ একদিন আমার নামে চিঠি এল। অবাক হলাম, আমার মত বেকার লোককে কে আবার রেজিস্ট্রি করে চিঠি পাঠাবে?
খুলে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ছোটোকাকার চিঠি। সারমর্ম এটাই যে, এই চিঠি যখন আমি হাতে পাব, তখন উনি আর ইহজগতে নেই। আমি যেন গিয়ে ওঁর স্থাবর-অস্থাবরের দায়িত্ব নিই। এত লোক থাকতে আমাকেই বা কেন? কি? এই প্রশ্নটাই মাথায় আসছে, তাই তো?
তাহলে ছোটোকাকার ব্যপারে একটু বলতে হয়। বিশাল বড়ো ইতিহাস। অত গভীরে গিয়ে লাভ নেই, শুধু এটুকু জেনে রাখ, তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোটোকাকা ছিলেন সব থেকে ব্রিলিয়ান্ট। তাই সব বাড়িতে যা হয় আর কি! বাবা জ্যাঠারা দাদুর ব্যবসাতে ঢুকতে বাধ্য হলেও বাড়ির ছোটো ছেলের পূর্ণ স্বাধীনতা ছিল। কিন্তু ছাড়টা বোধহয় একটু বেশিই হয়ে গেছিল। বিদেশে গেছিলেন ডাক্তারি পড়তে। কতটা কী পড়েছিলেন জানি না। তবে বছর চারেক পরেই ফিরে পড়েছিলেন। সেও আবার একা নয়, এক মেমসাহেব-কে সঙ্গে নিয়ে। তখনকার সময়, গোঁড়া বনেদি পরিবার। ব্যাপারটা কীরকম দাঁড়াল বুঝতে পারছ তো? তখন আমি সদ্য কিশোর। বেশি কিছু না বুঝলেও এটুকু বুঝেছিলাম, বাবা-জ্যাঠারা দাদু আর কাকার মধ্যে একটা মিটমাট করানোর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ভবি ভোলার নয়। দাদু ছোটোকাকাকে ত্যজ্যপুত্র করে দিলেন। শুনেছিলাম উনি সস্ত্রীক বিদেশ ফিরে গেছিলেন। ওঁর সঙ্গে সেই থেকে আমাদের আর কোনো সম্পর্ক ছিল না।”
.
সাত
হাওড়া থেকে চেপে বসলাম ট্রেনে। খড়গপুর লাইনে গন্তব্য রাধামোহনপুর। বাড়ির বড়োরাও বললেন, হাজার হোক রক্তের সম্পর্ক, শেষ ইচ্ছের প্রতি সম্মানটুকু জানানো কর্তব্য।
এমনিতেও ছোটোকাকার প্রতি একটা দুর্বলতা আমার ছিলই। ব্ৰাম স্টোকার টু বার্নার্ড শ’, জুল ভের্ন টু জুলিয়াস সিজার, শরৎবাবু থেকে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ সবার সঙ্গে পরিচয় কাকার ঘরে জমানো গোপন বইয়ের ডাক থেকেই। তাই হয়তো কাকাও তাঁর শেষ ইচ্ছেটা… যাকগে! বাকি যাত্রাপথের কথা বলে, বা কীরকম জনহীন স্টেশনে নামলাম, তারপর কী ভয়ঙ্কর পরিশ্রম করে একখানা গরুর গাড়ি ধরে কী কষ্টে কাকার চিঠিতে বলা গ্রামে পৌঁছলাম, সে-সব বর্ণনা করে তোমাকে বোর করব না। শেষ অবধি পৌঁছলাম।
প্রত্যন্ত গ্রাম, অধিকাংশ চাষের মাঠ, আধঘন্টা ছাড়া-ছাড়া ৪/৫ বাড়ি মিলে এক একটা জনপদ। কাকা এরকম পাণ্ডববর্জিত জায়গায় এসে কেন বাড়ি করল মাথায় ঢুকছে না।
গরুর গাড়ি যেখানে নামাল সেটা একটা বটতলা। সন্ধ্যা নামছে। কিছু বয়স্ক মানুষের জটলা, প্রাত্যাহিক আড্ডা মনে হচ্ছে।
“ওটা কে বটে?”
“শহর থেকে এলেন বুঝি?”
“তা কাকে খুঁজছেন?”
একের পর এক অনুসন্ধিৎসু চোখের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে লাগলাম। সেটা স্বাভাবিকও। এই আদিম গ্রামে যেচে কেউ কেন আসতে চাইবে?
“আজ্ঞে আমার নামে রুদ্র সোম। আসছি কলকাতা থেকে। আমি স্বর্গত ডাক্তার বীরেন্দ্রনাথ সোমের ভাইপো।”
“ও, তুমি ডাগতার বাবুর ভাইপো! আহা আগে বলবে তো। এই কেউ মোড়া নিয়ে আয়। গেলাসে করে জল নিয়ে আয়। আহা, এখানে আসতে বাছার বড়ো কষ্ট হয়েছে গা। বড়ো ভালো মানুষ ছিলেন গো ডাগতার বাবু, আমাদের বড়ো ভালবাসতেন। কী থেকে যে কী হয়ে গেল! শেষ সময়ে উনি বলেছিলেন, তুমি আসবে। তা আজ রাতে তো সে বাড়ি যেতে পারবেনি। আমাদের ঘরেই একটু কষ্ট করে কাটিয়ে দাও বাবা।”
“আজ্ঞে মাফ করবেন। আমার হাতে বেশি সময় নেই, দু’দিনের মধ্যেই ফিরে যেতে হবে। চিঠিতে নবীন মাস্টারের বাড়িতে যাওয়ার কথা উনি লিখেছিলেন।”
“দাঁড়াও একটু মগজে ধোঁয়া দিয়ে নিই। অনেকদিনের পুরোনো স্মৃতি তো।” এই পর্যন্ত বলে থামলেন প্রফেসর সোম, গোল্ডফ্লেকের গন্ধে ঘরটা ভরে উঠল। আমাকেও অফার করলেন, ভদ্রতার খাতিরে না বললাম।
“সিগারেটের আবার ছোটো-বড়ো কী ভায়া! তা যাকগে, কোথায় ছিলাম যেন… নবীন মাস্টারের বাড়ি। ভদ্রলোকের দোতলা মাটির বাড়ি, আমাকে পেয়ে কী যে করবেন ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না।”
.
“বাবা, তোমাকে যে কী বলব…! আসলে বীরু যে আমার কী পরিমাণ কাছের বন্ধু ছিল, বলে বোঝাতে পারব না। মানুষজন খুবই কম এখানে। লোকজন ভালো হলেও সব চাষা-ভুসো। কথা বলার জন্যও তো একটা ঠিকঠাক লোকের দরকার। বীরু আর আমি সেই লোক ছিলাম। শালা আমাকে একা করে দিয়ে চলে গেল!
যাকগে। এই নাও বাবা তোমার দলিল-দস্তাবেজ। এবারে তুমিই সামলাও। বীরু তোমাকে দিতে বলে গেছিল। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। আজকের রাতটা কষ্ট করে হলেও তোমাকে এখানেই কাটাতে হবে বাবা। কাল সকালে তোমাকে লোক দিয়ে সে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব। তুমি তোমার মত করে সব দেখে নিও। আর হ্যাঁ, খাবার-দাবার নিয়ে একদম ভেব না। রোজ পৌঁছে দিয়ে আসবে আমার লোক।”
“এ বাবা! না-না মাস্টার মশাই। আপনি এত করছেন, আবার ওসব কেন? আমার অভ্যাস আছে রান্না করার। নিজেই দুটো ভাতে-ভাত ফুটিয়ে নিতে পারব।”
“বেশ। তুমি যখন কিন্তু-কিন্তু করছ, তখন না হয় পাঠাব না। তোমাকে রান্না করতে হবে না। আগে যে লোক তোমার কাকার কাছে কাজ করত, তাকেই খবর দিচ্ছি। লোক খুব ভালো, সব করে দেবে। তবে একটা কথা বাবা। রাতে কিন্তু কেউ থাকবে না। ওই একটাই সমস্যা ছিল তোমার কাকার সঙ্গে। এই দেখ দেখি! তোমাকে শুধু মুখে কতক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। দাঁড়াও দেখে আসি, গিন্নির রান্না কতদূর।” কিছু একটা যেন চেপে গেলেন ভদ্রলোক, আমিও আর তখনকার মতো ঘাঁটালাম না।
.
আট
‘মায়াকানন’ কাকার বাড়ির নাম। পেল্লাই দোতলা মার্বেল বাড়ি, চারপাশ উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। ভেতরে বাগান, বেশ রুচি আর পরিশ্রম দিয়ে সাজানো।
এই পাণ্ডববর্জিত জায়গায় কাকা কেন এরকম পেল্লাই বাড়ি ফাঁদতে গেলেন এটা মাথায় না ঢুকলেও, কেন রাতে কেউ আসতে চায় না সেটা ভালোই বুঝতে পারলাম। মূল গ্রাম থেকে হাঁটাপথে এখানে আসতে প্রায় ২৫ মিনিট লাগল। মাঝে আবার পুরোটাই জঙ্গল।
সঙ্গে যে লোকটি এসেছে তার নাম শম্ভু। সে কাকার আমলের লোক না হলেও, এ বাড়িতে আগে মাঝেসাঝে কাজ করেছে। পয়সা কড়ি-খাবার দাবারের চাহিদা খুব বেশি না থাকলেও তার দাবি একটাই…
“সন্ধের পর বাবু আর থাকবুনি। পর দিন ভোরে আবার আসুম!” আমিও জোর করিনি। সারাজীবন হোস্টেল আর মেসে কাটিয়েছি এখানে-ওখানে। রাতে এই নির্জনপুরীতে একা কাটাতে আমার খুব বেশি অসুবিধা হবে না, এমনই ভেবেছিলাম।
ঘরদোর এমনিতে পরিষ্কারই ছিল। তাও শম্ভু বেশ ঝেড়েঝুড়ে দিল চারপাশ। ভেতরের বর্ণনা আর কী দেব ভায়া? একজন একা মানুষের যে থাকার জন্য এত কিছু লাগতে পারে, তা না দেখলে জানতে পারতাম না। পুরো বাড়ি জুড়ে দামি আসবাবপত্র, ওয়াল পেন্টিং, শো পিস…! মানে মোটামুটি ধরে নাও ছোটোখাটো পুরোনো জমিদার বাড়ি যেমন হয় আর কি। কাকা শেষ জীবনটা বেশ রসে-বশেই কাটিয়ে ছিলেন বোঝা যায়, কিন্তু একা একা কীভাবে থাকতে পারতেন? যাকগে, সে পরে ভাবা যাবে। আপাতত শম্ভুর হাতের রান্না টেস্ট করে একটু গড়িয়ে নেওয়া যাক। পরে বাড়িটা আর চারপাশ ভালো করে দেখতে হবে।
সন্ধে তখন হয় হয়। শম্ভু চলে গেছে। আমিও দোতলার পূর্বদিকের একটা ঘরের বিছানায় গুছিয়ে বসেছি। হ্যাজাক জ্বলছে। দলিলপত্রগুলো একবার দেখা দরকার বলে নিয়ে বসেছি। আরে, ওটা কী? রীতিমতো গালা দিয়ে সিল করা মুখবন্ধ একটা খাম। কাকার চিঠি? দেখা যাক, এবারে উনি কী লিখে গেছেন।
স্নেহের রুদ্র,
এই চিঠি যখন তুমি পাবে তখন আমি আর থাকব না। তুমি জানো, আমাদের পরিবারের মধ্যে তুমিই আমার একমাত্র কাছের মানুষ ছিলে। তাই তোমার ওপরে এক গুরুদায়িত্ব আমি দিয়ে যেতে চাই। বাড়ি জমি জায়গা এসব নিয়ে আমি ভাবি না। ওগুলো তুমি যা ভালো বুঝবে করবে। আমার স্টাডিরুমের লাইব্রেরির একদম মাঝের তাকে একটা গোপন কুঠুরি আছে। ওটার মধ্যে কিছু ডায়েরি আর বই রয়েছে। ওগুলো তোমাকে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। হয়তো অবাক হচ্ছ, আমি কেন নিজেই করে ফেলিনি এতদিন। আসলে পারিনি। মায়াকাননে জড়িয়ে গেছিলাম। কিন্তু তোমাকে পারতে হবে বাবা। শুধু এইটুকু জেনে রেখ, এই কাজের সঙ্গে তোমার কাকার সম্মান জড়িয়ে আছে। আর হ্যাঁ, শেষ করার আগে আবার সাবধান করে দিলাম। তুমি ভুলেও ওগুলো যেন কোনোভাবেই পড়তে যেও না। এটা তোমার কাছে একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের শেষ অনুরোধ রইল। কাকা হিসেবে যদি এতটুকুও সম্মান করেছ, ভালবেসেছ, তাহলে ওগুলো পুড়িয়ে ফেলবে। আমি যে ভুল করেছি, তুমি সেটা করতে যেও না বাবা। মায়ার কাননে একবার জড়িয়ে পড়লে জেনে রেখ, আর মুক্তি নেই।’
এই পর্যন্ত বলে থামলেন প্রফেসর সোম। ঘরে এসি চলছে, তাও দরদর করে ঘামছিলেন ভদ্রলোক। রুমাল বের করে ঘামটা মুছে নিলেন উনি।
“কাকার শেষ ইচ্ছেকে সম্মান করা আমার উচিত ছিল। ডায়েরিটা পড়া আমার উচিত হয়নি। আসলে যৌবনের প্রাবল্য বুঝতেই পারছ। সেদিনের ক্ষণিকের গোঁয়ার্তুমির মূল্য চোকাতে হবে আমাকে সারাজীবন!” বিড়বিড় করে উঠলেন প্রফেসর।
হঠাৎ ওপরে কীসের চিৎকার শোনা গেল। কেউ যেন প্রবল আক্রোশে জিনিসপত্র ছুঁড়ে ফেলে দিল। হন্তদন্ত হয়ে উঠলেন প্রফেসর।
“এক্সকিউজ মি। তুমি একটু বস কৌশিক। আমি একটু ঘুরে আসছি।”
দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন উনি। আমি কীরকম একটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম।
.
নয়
“আমার বাড়ির লোক মেরিকে মেনে নিতে পারেনি। তাই দেশ থেকে ফিরে এসে, হয়তো সেজন্যই মেরি সবসময় মনমরা হয়ে থাকত। আসলে মেরি অনাথ। আমার বাড়ির মানুষদেরই সে আপন করে নিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদেরই বা দোষ দিই কীভাবে? আমার ওইরকম ভাবে, কোনো আগাম সংবাদ না দিয়ে মেরিকে নিয়ে বাড়ি যাওয়া উচিত হয়নি।
সে-সব দুঃখ আমরা মেনে নিয়েছিলাম। দু’জনে মিলে যথাসাধ্য আনন্দের সংসারও সাজিয়েছিলাম। ডাক্তার হিসাবে আমারও পসার বাড়ছিল। কিন্তু বিধাতার বোধহয় আমাদের এত সুখ সহ্য হল না। রাজরোগ মেরিকে গ্রাস করল। আমি ও আমার সিনিয়ররা প্রাণপণ লড়াই করলাম। কিন্তু মেরিকে বাঁচানো গেল না।
মেরি ছাড়া ইহজগতে আমার আর কেউ ছিল না। কিছুই ভালো লাগত না। ডাক্তারি ছেড়ে দিলাম। আমাদের বাড়িটাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার পাগলের মতো অবস্থা দেখে কেউ-কেউ নতুন করে বিয়ে করার পরামর্শ দিল। সে-সব কানে না তুলে আমি শহর থেকে দূরে একটা ছোট্ট ঘর নিলাম। সেখানেই বৃদ্ধ স্যামুয়েলের সঙ্গে আমার আলাপ হল। আমার অবস্থা দেখে বুড়োর করুণা হল। ও আমাকে এক জিপসি মহিলার কাছে নিয়ে গেল। মহিলাকে স্থানীয় লোকজন এড়িয়ে চলে। কিন্তু আমার তখন সে-সব ভাবার অবস্থা ছিল না। সব শুনে, অর্থের বিনিময়ে, সে আমাকে কিছু উপায়ের কথা বলে। সঙ্গে এই বলেও সাবধান করে দেয় যে প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরন করা দারুণ বিপজ্জনক। আমি সেই পদ্ধতিগুলো লিখে নিই।
মেরিকে হারিয়ে আমার মাথার ঠিক ছিল না। জিপসি-র সাবধানবাণী আমি শুনেছিলাম বটে, তবে কান দিইনি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে আমি কিছু বইপত্রের সন্ধান পাই। সেগুলো সেই জিপসি বুড়ির কথার স্বপক্ষে যায়। বুঝতে পারি, একটা উপায় আমার সামনে এসে গেছে। কিন্তু এখানে থেকে তার প্রয়োগ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন ফাঁকা, জনমানবহীন কোনো এলাকা।’
ডায়েরিটা পড়ে পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। কাকা কেন এত দূরে, এই পাণ্ডববর্জিত এলাকায় এই জমিদার বাড়ি কিনলেন, সেটা বুঝতে পারি। কিন্তু বাকি ডায়েরিটা জুড়ে শুধু কাকা আর মেরির আবার মিলিত হওয়ার কথা ছিল। সেগুলো পড়তে আমার প্রবল অস্বস্তি হচ্ছিল। শুধু গুরুজনের যৌনাচারের কথা বলে নয়, ওই বর্ণনার মধ্যে একটা অন্য কিছু ছিল!
“কিন্তু মেরিকে উনি ফিরে পেলেন কীভাবে?” আমি সবিস্ময়ে প্রশ্ন করি প্রফেসর সোমকে।
“একজ্যাক্টলি! এই এক প্রশ্ন আমার মনেও এসেছিল। চিরকাল যুক্তি-বুদ্ধি দিয়েই সবকিছু বিচার করে এসেছি আমি। এগুলো সবই একাকী আর শোকাচ্ছন্ন কাকার মনগড়া কল্পনা বলেই চালিয়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি! পারিনি, কারণ ওই অন্য বইগুলো। এত সুন্দরভাবে গুছিয়ে সব বর্ণনা করা ছিল সেখানে, যে কুসংস্কার বলে সবটা ওড়াতে পারিনি আমি। ল্যাটিনে লেখা ছিল বইগুলো। কিন্তু ও বিদ্যা আমার ছিল। তাই ভাবলাম, একবার প্রয়োগ করাই যাক না। জিপসি মহিলার সাবধানবাণী কাকা শোনেননি। আমিই বা কাকার কথা শুনব কেন? বয়সের দোষ বুঝলে কি না ভায়া! অদম্য কৌতূহল থাকে সেই বয়সে। আর তাতেই ঘটে গেল সেই সর্বনাশ।”
“কী সর্বনাশ?”
“বলব ভায়া, তবে ডিনার করতে-করতে। তুমি একটু বোসো। কই রমেন, ডিনারটা সার্ভ কর্। আমি একটু ওপর থেকে আসছি।”
উত্তেজনার ফানুসে চড়িয়ে, আবার চলে গেলেন প্রফেসর। কেন যে উনি বারবার দোতলায় চলে যান কে জানে!
.
দশ
“নাহ্। আপনার কুকের কিন্তু রান্নার হাতটি খাসা।”
“হা-হা! আমার সঙ্গে সারা দেশ ও ঘুরে বেড়িয়েছে ভায়া। হাত তো খুলবেই।”
“তারপরে বলুন, কী হল? কী একটা সর্বনাশের কথা আপনি বলছিলেন।”
“হ্যাঁ। কাকার ডায়েরি আর বইগুলো ঘেঁটে আমায় বেশ একটা অ্যাডভেঞ্চারের নেশা পেয়ে বসল। সবিস্তার বর্ণনায় যাচ্ছি না। তবে ডায়েরিতে লেখা পদ্ধতি বা বইগুলোতে বলা হয়েছে, মৃত প্রিয়জনকে আহ্বান করা সম্ভব। কিন্তু তাঁদের আবার নিজের রক্ত-মাংসের শরীরে পাওয়া সম্ভব নয়।”
“তবে?”
“রোসো-রোসো ভায়া। অত অস্থির হলে ঘটনার খেই হারিয়ে যায়। আমাদের হিন্দুদের অঘোরীতন্ত্রে যেমন ডাকিনী-যোগিনীদের নামে শুনেছ, বিভিন্ন স্তরের শক্তি এরা, তেমনি ওদের শাস্ত্রেও বিভিন্ন স্তরের ডেমনের কথা বলা হয়েছে। তেমনই নিম্নস্তরের এক ডেমন হল Succubus। ওদের তন্ত্রে এদের দেখানো হয়েছে সেক্স স্লেভ হিসেবে। অর্থাৎ বিভিন্ন উপচারে এদের আবদ্ধ করে, নিজের যৌন বাসনা-কামনা এদের দিয়ে পূর্ণ করা যায়। শুধু তাই নয়, যে চেহারায় এদের কামনা করা হয়, সেই চেহারাতেই এরা ধরা দেয়। তবে হ্যাঁ, এদের কন্ট্রোলে রাখতে হয়। নাহলেই ফল হয় মারাত্মক! কী? এবার কাকা আর মেরির পুনর্মিলনের কেসটা বোঝা যাচ্ছে?”
“তা বুঝতে পারছি, কিন্তু…”
“হ্যাঁ, ওই কিন্তুতেই আমিও আটকেছিলাম। এসব গাঁজাখুরি ব্যাপার বাস্তবে আদৌ সম্ভব নাকি? কিন্তু পরীক্ষা করে দেখতে অসুবিধা কোথায়, তাই না? প্রসিডিওরে এমন কিচ্ছু ভয়ংকর উপকরণের কথাও বলা নেই যা সহজলভ্য নয়। মাঝে কিছু কাজ সেরে রাখলাম। বাড়ি গেলাম। গিয়ে ভুজুংভাজুং দিলাম যে ওখানেই কাঠের ব্যবসা শুরু করব। আসলে সাত ভাইয়ের এক ভাই আমি, তাই বাড়ির লোক খুব বেশি চিন্তিত হয়নি। ফিরে এলাম সব জিনিসপত্র নিয়ে, যা-যা লাগবে। বাকি রইল দুটো জিনিস, যেগুলো একমাত্র শম্ভু জোগাড় করতে পারত, দেশি মুরগীর নখওয়ালা ঠ্যাঙ আর একটা শকুনের ডিম।”
“পেলেন?”
“হ্যাঁ পেলাম। বেশ কিছু পয়সা গচ্চা দিয়ে, অনেক বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করলাম শম্ভুকে।”
“তারপর?”
“তারপর আর কী? কাকার ডায়েরিতে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবেই, এক পূর্ণিমার রাতে ছাদে বসে, সব উপকরণ দিয়ে গোপনে সব প্রক্রিয়া সারলাম। সমস্যা হল একটা জায়গায়।
“কী সমস্যা?”
“কী আর বলব! তুমি আমার থেকে অনেক ছোটো। Succubus কে ডাকতে গেলে অনেক কারো মুখ স্মরণ করতে হয়। মানে যে রূপে Succubus-কে কাছে পেতে চাইছি, আর কি। অস্বীকার করব না, কলেজে পড়ার সময় একটি মেয়েকে বেশ পছন্দ ছিল। বেশ রাবীন্দ্রিক চেহারা, কণ্ঠ, হাবভাব… মানে খুবই ভালো লাগত তাকে। কিন্তু এখকার মত খুল্লমখুল্লা ব্যাপারটা তো ছিল না। তাই কথাও বলা হয়ে ওঠেনি কখনও। তাই ভাবলাম, তাকে কল্পনা করলে ক্ষতি কী?
সারারাত আর কিছুই হল না। পরদিন ঘুম ভেঙে মনে হল, সবই কাকার মনের ভুল। পুরোটাই ধাপ্পা। খটকা লাগল ধপধপে সাদা মার্বেলের মেঝেতে কাদা মাখা পায়ের ছাপ দেখে। হাঁক পাড়লাম শম্ভুকে। শম্ভু জানাল, সে এসেই বাগানে কাজ করতে লেগেছে। এ ঘরে সে আসেনি, আর কাদা পায়ে আসার সাহসও তার হবার নয়। কিন্তু এগুলো তো মানুষেরই পায়ের ছাপ। ও মিথ্যে বলছে না তো? নাকি চোর এসেছিল? কিন্তু কিছু তো চুরিও যায়নি!
যাকগে, সেই রাতেও আবার একবার কাকার লিখে যাওয়া পদ্ধতি মেনে সব প্রক্রিয়া করলাম। তখন রাত কটা বাজে খেয়াল নেই। ঘুমিয়ে আছি। হঠাৎ নাকে একটা তীব্র সুগন্ধ এল, অনেকটা আগেকার দিনে মা-বউয়েরা মাথায় একধরনের সুগন্ধি তেল মাখতেন, সেরকম। মাথার কাছে রাখা টর্চ জ্বালব কি না ভাবছি। কিন্তু তারপর যা হল, আর সাহস পেলাম না কিছু করার।”
“কী হয়েছিল?”
“খিলখিলিয়ে হাসির সঙ্গে একটা নারী কণ্ঠ ভেসে এল, “আমাকে তো এইভাবেই চেয়েছিলে। তবে আজ ভয় পাচ্ছ কেন?’ অন্ধকারে চোখ সইয়ে নিয়ে যা দেখলাম, তাতে আমার হাড় হিম হয়ে গেল। কাকা মিথ্যে বলে যাননি! চাঁদের আলোয় মুখটা স্পষ্ট বোঝা না গেলেও দেখলাম, একটা নারী শরীর দাঁড়িয়ে আছে আমার বিছানা থেকে একটু দূরেই। একটু-একটু করে সে এগিয়ে এল আমার দিকে। সেই মুখ, সেই ঠোঁটের কাছের তিল, কটিদেশের সেই ঢেউ, সেই সুউচ্চ বুক… সেই শরীর! আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। ভয়ঙ্কর অথচ চরম সুন্দর সেই চেহারা। তারপরে সারারাত কী হয়েছিল সেই বিস্তারে যাচ্ছি না। শুধু এটুকু বলতে পারি, একটা হিংস্র বাঘিনীর সঙ্গে যেন আমাকে খাঁচাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ভোরে ঘুম ভাঙল। পাশের দিকে তাকালাম। কই কেউ নেই তো সেখানে! তাহলে কি স্বপ্ন দেখলাম? আয়নার দিকে চোখ পড়তে কেঁপে উঠলাম। আমার সারা শরীর জুড়ে নখের দাগ, ভালোবাসার।”
“তারপরেও আপনি পড়ে রইলেন ওই বাড়িতে, পালিয়ে এলেন না?”
“ওই যে কাকা বলেছিলেন মায়াকানন! হাড়ে হাড়ে টের পেলাম কথার সত্যতা। অস্বীকার করতে লজ্জা নেই, আমার জীবনের মধুরতম রাতগুলো কেটেছিল ওখানে। ওর নাম আমি দিয়েছিলাম মায়া। সে রাতের আঁধারে আসত, ভোরের আগে চলে যেত। কথা কখনোই খুব বেশি হয়নি ওর সঙ্গে। বলার সুযোগও দিত না সে। রতিকলায় পারদর্শী ছিল সে। এভাবে কেটে গেল এক মাস। বাড়িতে চিঠি পাঠানো বন্ধ, নবীন মাস্টারের সঙ্গে আড্ডা বন্ধ, কাকার জমিগুলো সস্তায় বেচে দিতে থাকলাম। সারাদিন শুধু বসে থাকতাম তার অপেক্ষায়, কখন সে আসবে। হঠাৎ একদিন এক সকালে শম্ভু এসে বলল যে এক পাদ্রি আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়, কিন্তু সে বাড়িতে ঢুকবে না। বাজার মুখে গেলাম দেখা করতে। মাঝবয়সি পাদ্রিসাহেব কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, “বাবা, এখনও সময় আছে শয়তানকে হারিয়ে দেওয়ার। আমি তোমার কাকাকেও বলেছিলাম, কিন্তু উনি পারেননি। তোমার মধ্যে সে ক্ষমতা আছে। তুমি পার সেই নরকের কীটকে নরকে ফেরত পাঠাতে।’
দুম্ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল। যা-তা কথা শুনিয়ে বসলাম ওঁকে। আসলে বয়সটা তখন কম আর ওদিকে মায়ার আবেশে আমি আবিষ্ট। স্মিত হাসলেন পাদ্রিসাহেব, ‘আগুন নিয়ে খেলছ তুমি বাবা। তোমার আনন্দ কিন্তু অন্যের অভিশাপ হয়ে আসতে পারে। তোমার বাড়ির বাঁদিক দিয়ে যে রাস্তাটা গেছে, ওটা ধরে কিছুটা গেলেই আমার ঘর। যদি কোনোদিন বিপদ হয়, আসতে দ্বিধা কোরো না। ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন।’ চলে গেলেন উনি।
“সেই রাতে মায়া প্রথম অন্যধরনের কথা বলল, ‘কী করতে এসেছিল ঐ বুড়োটা?”
মায়াকে ভয় পাওয়া অনেকদিন আগেই ছেড়ে দিয়েছিলাম আমি। আমার কাছে সে ছিল এক রক্ত-মাংসের মানুষ, যাকে প্রতি রাতে আমি নিজের মতো করে পাই। তাকে ভয় পেতে যাব কেন? কিন্তু এই প্রথমবার পাদ্রিকে নিয়ে কথা বলার সময় মায়ার চোখ দেখে অস্বস্তি হল আমার।”
“তারপর?”
“উঁহু। ডিনার শেষ। তুমি হাত ধুয়ে ফেল, বাকিটা একটা কড়া করে ব্ল্যাক কফি খেতে-খেতে বলব।”
“আপনি নিশ্চয় আবার উপরে যাবেন? কেউ কি আছে উপরে?” আমি আর থাকতে না পেরে জিগ্যেস করেই ফেললাম।
“বলব। নিশ্চয় বলব, তবে ওই কফি আসার পরই।” স্মিত হেসে চলে গেলেন প্রফেসর সোম। আমিও হাত ধুয়ে স্টাডি রুমের সোফায় বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম, মনে অনেক প্রশ্নের ভিড় নিয়ে।
.
এগারো
“কিন্তু সব ভালো জিনিসেরই তো একটা শেষ থাকে। আর সেটা যদি অতিপ্রাকৃত হয়, তাহলে তার শেষটা মধুর হয় না।” একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন প্রফেসর সোম, “কই, কফিটা তুলে নাও। ঠান্ডা হয়ে যাবে যে।”
“হ্যাঁ, এই নিচ্ছি। তারপর কী হল?”
“বেশ চলছিল, বুঝলে। হঠাৎ একদিন সকালে একজনকে নিয়ে হাজির হল নবীন মাস্টার। দেখলাম, সে অবিনাশ।”
“অবিনাশ? সে কে?”
“অবিনাশ আমার স্কুলের বন্ধু। খুব ক্লোজ ছিলাম। আসলে বাপ-মা মরা ছেলে, মামাবাড়িতে লাথিঝ্যাঁটা খেয়ে পড়ে থাকত। তাই বড়োলোকের বাড়ির ছেলে হিসেবে বেশ মায়া পড়ে গেছিল ওর ওপরে। কলেজে পড়ার সময়েও অনেকবার গেছি ওর মামার মুদির দোকানে। ওখানেই ও কাজ করত। পরে আর যোগাযোগ থাকেনি।
এরকম হুট করে চলে আশায় বেশ বিরক্ত হলাম, তবে মুখে প্রকাশ করলাম না। কথায়-কথায় নবীন মাস্টার জানাল যে অবিনাশ কাল রাতেই এসেছে। কিন্তু আমার বন্ধু বলে সেই রাতের আতিথ্যটুকু গ্রহণ না করিয়ে উনি ছাড়েননি অবিনাশকে
চা-জলখাবার খাইয়ে বিদায় দিলাম নবীন মাস্টারকে। তারপর পড়লাম অবিনাশকে নিয়ে। ভেতরের রাগটা যথাসম্ভব চেপে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তা ভাই, হঠাৎ কী মনে করে? আসবার আগে একটা খবর তো দিতে হয়।’
খপ করে হাতদুটো চেপে ধরল অবিনাশ, ‘জানি ভাই, কাজটা খুব অন্যায় হয়ে গেছে, তুমি অনেকদিন আর মামার দোকানে আসছ না। তোমার বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারলাম তুমি এখানে, কী-সব নতুন ব্যবসা চালু করেছ। মা কালীর দিব্যি কেটে বলছি ভাই, মামার ওখানে আর পারছিলাম না। দুবেলা গাধার মতো খাটিয়েও যদি পেট ভরে খেতে না দেয়, কীভাবে থাকি বল তো। তোমার তো নতুন ব্যাবসা, অন্তত একটা চাকরের দরকার পড়বেই! আমাকে না হয় সেই কাজটাই দিও। টাকা-পয়সা লাগবে না। দুটি খেতে দিও, তা হলেই হবে। কিন্তু দোহাই তোমার, আমাকে আর তাড়িয়ে দিও না বন্ধু।’
খুব খারাপ লাগল। ছোটোবেলার বন্ধুর সঙ্গে কী ব্যবহারই করছি আমি! এতটা অধঃপতনই হয়েছে আমার! বললাম, ‘আরে, ছি-ছি! সে কথা আসছে কেন? আমি কি তোমাকে চলে যেতে বলেছি? নিজের বাড়ি মনে করেই থাক।’ মুখে বললাম বটে, তবে মনে মনে স্থির করলাম, দরকার পড়লে হাতে বেশ কিছু টাকা দিয়ে হলেও ওকে কিছুদিনের মধ্যেই বিদায় করতে হবে। মায়ার ব্যাপারে ও যেন কিছু জানতে না পারে।
‘তোমার ব্যবসার তো কিছু দেখছি না ভায়া, আপিস কি দূরে কোথাও?”
‘সব দেখবে। এই তো সবে এলে। একটু জিরিয়ে নাও, এই শম্ভু… দাদাকে নাইবার জল এনে দে, তারপরে জমিয়ে খাওয়া-দাওয়া সারা যাবে।’
.
বারো
সে রাতে মায়াকে কিছু বলার আগেই সে প্রশ্ন করল।
‘ও কে গো?’
‘কে?’
‘ন্যাকা! ওই যে নীচের তলার ঘরে যাকে ঠাই দিয়েছ।’
‘ও আমার বাল্যবন্ধু। তোমাকে বলতেই যাচ্ছিলাম। একটা অনুরোধ আছে তোমার কাছে।’
‘অনুরোধ কেন, আদেশ বল।’
‘তুমি কিন্তু ওই বেচারিকে ভয় দেখিও না। ওর কাছে যেও না।’
‘আমি কেন যাব? আমি তো শুধু তোমার!’ বলেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে মায়া, আমাকে আরও শক্ত করে জাপটে নেয় নিজের শরীরের সঙ্গে।
.
পরদিন সকালে অবিনাশের সঙ্গে জলখাবার খেতে বসে দেখা হল। কিছুটা অন্যমনস্ক দেখাচ্ছিল তাকে।
‘কী ব্যপার, মুখ-চোখ শুকনো কেন? নতুন জায়গায় কাল রাতে ঘুম হয়নি বুঝি?’
‘না। তা নয়। আসলে তোমাকে যে কীভাবে বলি বুঝতে পারছি না। ‘আরে নিঃসঙ্কোচে বল।
‘দেখ ভায়া, মানে… তুমি বড়োলোকের ছেলে। তোমার কিছু খেয়াল-খুশি থাকতেই পারে। কিন্তু আমি গরীব ব্রাক্ষ্মণ সন্তান। নিজের আত্মমর্যাদা ছাড়া আমার আর কিছু নেই। আমাকে তোমার এই খেলায় অনুগ্রহ করে অংশ নিতে বোলো না। ওঁকে বারণ করে দিও।’
বুঝলাম ঘটনাটা কোনদিকে গড়িয়েছে। মায়াকে এত বারণ করার পরেও সে অবিনাশের ঘরে গেছে। শুধু যায়ইনি, তাকে আবার রতিক্রীড়ায় আহ্বান জানিয়েছে! শরীরে এত খিদে তার? আজ উচিত শিক্ষা দিতে হবে তাকে। তবে মাথা ঠান্ডা করে এগোতে হবে। আসলে মায়া যে রক্ত মাংসের মানুষ নয়, সেটা বারবার ভুলে যাই আমি।
.
তেরো
মায়া শুয়ে আছে পাশে। আলো-আঁধারিতে তার শরীরের গোপন বিভাজিকাগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাসের গোপন উপত্যকা যেন এক- একটা।
‘আচ্ছা, আমি যে তোমাকে বারণ করলাম, তাও তুমি কেন গেলে অবিনাশের কাছে?’
‘কেন, আমি কাছে গেলে কি সে অপবিত্র হয়ে যাবে?”
‘তা নয় মায়া। কিন্তু সবার সব জিনিস নাও ভালো লাগতে পারে।’
হঠাৎ করে আমার দুটো হাত ধরে নিজের নরম বুকে টেনে নিল মায়া। হিসহিসিয়ে প্রশ্ন করল, ‘তুমি কি বলতে চাও, কোনো পুরুষমানুষের সাধ্য আছে এই শরীরটা অস্বীকার করার?’
‘অবিনাশ তো তোমায় ভালবাসেনি। বেসেছি আমি। তুমি কেন তাহলে যাবে তার কাছে?’
‘তুমি বড্ড সহজে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে দাও। কিন্তু সে রুখে দাঁড়ায়। শক্ত পুরুষ সে।’
ঝাঁ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল, আর ভুলটা করে বসলাম।
‘বেশ্যা মেয়েছেলে! তোর এত শরীরের খিদে? মনে রাখিস যে নরক থেকে তোকে তুলে এনেছিলাম, সেখানে এই মুহূর্তে ফেরত পাঠিয়ে দিতে পারি তোকে।”
যা সর্বনাশ হওয়ার হয়ে গেল। আগুন-চোখো দৃষ্টিতে সে নীরবে তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তেমন ভয়ংকর চোখ আমি এর আগে দেখিনি। সে যে মানুষ নয়, রক্তমাংসের শরীরে অন্য কিছু, এই প্রথমবার আমি বুঝতে পারলাম। আমি আর তাকিয়ে থাকতে পারলাম না, চোখ বুজে ফেললাম।
কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না। ওভাবেই পড়ে ছিলাম কুণ্ডলী পাকিয়ে। হঠাৎ এক তীব্র আর্তনাদে রাতের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে ভেঙে পড়ল।
খেয়াল হল, এ গলা অবিনাশের। ঘরে দেখলাম মায়া নেই। ছুটে গেলাম নীচের তলায় অবিনাশের ঘরের দিকে, কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ঘরের দরজা বন্ধ। ভেতর থেকে মায়ার ভয়ংকর হাসি আর অবিনাশের আর্তনাদ ভেসে আসছে। সে যেন এক ক্ষুধার্ত বাঘিনীর খাঁচায় বাঁধা পড়েছে!
দরজায় ধাক্কা দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, ‘অবিনাশ! অবিনাশ! মায়া, ওকে ছেড়ে দাও। তোমার বোঝাপড়া আমার সঙ্গে। আমি অপরাধের সাজা নিতে প্রস্তুত, ওকে ছেড়ে দাও।’
কিন্তু বৃথা চেষ্টা। আগেকার দিনের মোটা সেগুনের দরজা, ধাক্কা দিয়ে আমার কাঁধ ছড়ে গেল, কিন্তু পাল্লা এক চুলও নড়ল না। ভেতরের চিৎকারটা ক্রমশ গোঙানিতে পরিণত হল। আমি কী করতে পারি বুঝতে পারছিলাম না। এই জনমানবশূন্য অঞ্চলে কে এত রাতে আমাকে সাহায্য করতে আসবে?
‘তোমার আনন্দ অন্য লোকের অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে।’ পাদ্রিসাহেবের কথাটা আবার কানে বাজল। তখনই মনে হল, উনিই আমার শেষ সহায়। হ্যাজাকটা হাতে নিয়ে ছুট লাগালাম সেই জঙ্গলের পথ ধরে। এলোপাথাড়ি দৌড়ে গাছের ডাল-কাঁটা-পাথরে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল আমার শরীর। সেদিকে আমার খেয়াল ছিল না। মাথায় একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল, অবিনাশকে যে করে হোক মায়ার হাত থেকে বাঁচাতেই হবে!
দূর থেকে একটা চার্চ মতো দেখতে পেলাম যেন। পাগলের মতো এগিয়ে গেলাম। চার্চের পাশেই একটা ছোটো ঘর, তার দরজায় গিয়ে উন্মাদের মত আওয়াজ তুললাম। চিৎকার করতে থাকলাম, ‘ফাদার! ফাদার, আপনি কোথায়?”
দরজাটা একটু ফাঁক হল। আলো হাতে এক বৃদ্ধকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম মনে হয়। তবে আমি আর দেখতে পারছিলাম না। মাথা অনেকক্ষণ আগেই কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল, এবারে শরীরও বুঝি জবাব দিল।
‘আমার বন্ধুকে বাঁচান ফাদার। ও মায়াকাননে একা!’ চিৎকার করে ওখানেই পড়ে গেলাম আমি।”
“তারপর? তারপর কী হল? ফাদার একাই গেলেন মায়াকাননে? অবিনাশবাবুরই বা কী হল?”
“তারপর সে রাতে একজ্যাক্টলি কী হয়েছিল, আমি তা আজও জানি না। কিছু আবছা আবছা খণ্ডচিত্র মনে পড়ে। ফাদারের কাঁধে ভর দিয়ে আমি মায়াকাননে ফিরে এসেছিলাম। এখনও কানে বাজে ফাদারের সেই চিৎকার, ‘সোম, একমাত্র তুমিই পারবে ওকে নিজের জায়গায় ফিরিয়ে দিতে।’
শরীরের শেষ শক্তিবিন্দু দিয়ে আমি চিৎকার করে উঠেছিলাম, “মায়া! নরকের কীট! তোকে আমি আদেশ করছি। দরজা খোল্! অবিনাশকে ছেড়ে দে।’
সদর দরজাটা খুলে গেছিল। মায়া বেরিয়ে এসেছিল ধীরে-ধীরে, সম্পূর্ন উলঙ্গ শরীরে। তার যে অনন্য রূপে এতকাল মজে রয়েছিলাম, তা একটু একটু করে খসে পড়ছিল। সেখানে জায়গা নিচ্ছিল থাক থাক গলা-পচা মাংস। তার যে চোখে এতকাল সমুদ্রের নীল দেখতে পেতাম, সেইরাতে তাতে দেখেছিলাম শ্মশানের আগুন। তার যে বুকের গভীরে শান্তি খুঁজে পেতাম, সেখানে থেকে চুইয়ে-চুইয়ে নেমে আসছিল তাজা রক্তের ধারা। সে রক্ত কার তা বুঝতে আমার দেরি হয়নি। এ দৃশ্য আমি আর নিতে পারিনি। আমি ওখানেই জ্ঞান হারাই।
ব্যস্! সে রাতের জ্ঞান আমার এইটুকুই। এরপর কী হয়েছিল, ফাদার কীভাবে আমাকে উদ্ধার করেছিলেন, এইসব নিয়ে ফাদার আমাকে কোনোদিন কিছু বলেননি। আমিও জোর করিনি, কারণ সেই অভিশপ্ত রাতের কথা আমি আর মনেও করতে চাইনি। পরদিন যখন জ্ঞান ফিরেছিল, আমি নিজেকে অক্ষত শরীরে এক মিশনারি হাসপাতালের নরম বিছানায় খুঁজে পেয়েছিলাম। প্রতিমুহূর্তে নিজেকে অভিশাপ দিয়েছিলাম অবিনাশের পরিণতির জন্য। আত্মহত্যাও করতে গেছিলাম! কিন্তু বাধা দিয়েছিলেন ফাদার। বলেছিলেন, ‘আমি সেদিন ছিলাম বলে তোমাকে সাহায্য করেছিলাম। কিন্তু আমার বয়স হয়েছে। শয়তানের সঙ্গে লড়াইয়ের সৈনিকদের সংখ্যা সত্যিই খুব কম। তুমি আসবে আমাদের এ সংগ্রামে? অবিনাশের পরিণতির জন্য তুমি দায়ী, এ-কথা ঠিক। কিন্তু সেই আফসোস, সেই অভিশপ্ত স্মৃতিকে কাজে লাগিয়ে যদি আর পাঁচটা মানুষের উপকার করা যায়, তা কি তুমি করবে না?”
তাহলে উত্তর পেলে তো কৌশিক, কেন আমার এই ‘লাইনে’ আসা?” কফির কাপটা নামিয়ে স্মিত হাসলেন হাসলেন প্রফেসর।
হঠাৎ ওপর থেকে বাসনপত্র ছুঁড়ে ফেলার আওয়াজ এল।
“চলো আমার সঙ্গে ওপরে কৌশিক।
উপরে উঠে দেখলাম খাবারের বাসনপত্র চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আছে। সেগুলো গুছিয়ে তুলছে সেই অল্পবয়সী ছেলেটা, আর বিছানায় ওটা কে?
প্রায় বিছানায় মিশে যাওয়া একটা শরীর, অতি কষ্টে একটা হাত নেড়ে যেন কিছু বলতে চাইছে। এগিয়ে গেলেন প্রফেসর সোম, বললেন, “শরীরের বাঁ দিকটা পুরো প্যারালাইসিসে অবশ। কথা বলতে পারে না। তবু বাড়িতে লোক এলে ওঁকে আলাপ করাতে হবেই, না হলেই ভয়ংকর রেগে যান ভদ্রলোক। এস কৌশিক, আলাপ করিয়ে দিই। ইনি আমার বন্ধু অবিনাশ।”
