ব্রাজিল ২০১৪ – ৫
আন্ডারডগদের চমকের দৌরাত্ম্যে কি এ বার ক্লাব ফুটবলের ছায়া
কোস্টারিকা। কলম্বিয়া। ক্রোয়েশিয়া। চিলি।
প্রত্যেকটা দেশের নাম ‘সি’ দিয়ে শুরু হওয়া ছাড়াও আরও একটা মিল—এরা মাত্র দশ দিনে পড়া ব্রাজিল বিশ্বকাপকে ইতিমধ্যেই শিহরিত করে দিয়েছে। আরও একটা মিল—টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এদের সম্ভাবনা গড়পড়তা ছিল ১৫০০-১। যে টিমটা সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে সেই কোস্টারিকার দর ছিল ২৫০০-১। মানে এদের সম্ভাবনার কোশেন্ট হল, এক টাকা লাগালে আড়াই হাজার টাকা পাওয়া যাবে। একেবারেই আশ্চর্য নয় যে মাত্র ন’দিন খেলা হতে না হতেই জুয়ার দর আবার রিভিশন হচ্ছে।
ইরানের নাম ‘সি’ দিয়ে শুরু না হলেও তারা একই আন্ডারডগ মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে যেন খেলল। এমনকী ষোলো নম্বর জার্সিধারী রেজা, যাঁকে গুচ্চি নামেই দেশের ফুটবলমহল ডাকে, তিনি আর একটু হলে ইরানকে এগিয়েই দিচ্ছিলেন। একটু পরেই আশকানের চমৎকার হেডার দু’বার বাঁচালেন সের্জিও রোমেরো। দু’টোই অব্যর্থ গোল! অর্থাৎ, আন্ডারডগ ইরান কি না তিন গোল করার অবস্থা তৈরি করে ফেলেছিল। লাতিন আমেরিকান শেষ প্রহরীর নৈপুণ্যে সেগুলো ঘটেনি এই যা!
শনিবার বেলো গ্যালারিতে বসে ম্যাচ দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, আন্তর্জাতিক ক্লাবের খেলা শেষে জাতীয় দলে ফেরার পর বিশ্বকাপ-পূর্ব সময়টা এমনিই কম। কোচেরা বোধহয় সুযোগই পান না, বোঝাপড়া আর কম্বিনেশনকে ক্লাব পর্যায়ের মতো নিখুঁত স্তরে নিয়ে যেতে। ইরান ডিফেন্স শক্তি বিচারে ফুটবলের সুপার পাওয়ারের চেয়ে যত ঠুনকো হোক, তারা একসঙ্গে অনুশীলন আর কম্বিনেশন তৈরির বাড়তি সময় পেয়েছে। সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর, শারীরিক দিক দিয়ে একেবারে তাগড়াই রয়েছে। লা লিগা ছিল না তাদের। কোনও বুন্দেশলিগাও না।
প্রথম শনিবারের ইরান বোধহয় আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল, ব্রাজিলের দশ দিনে আন্ডারডগদের সাফল্যের একটা বুনোট আছে। একটা মডেল আছে। একেবারেই ফ্লুক নয়। সেটা ভাঙতে হলে লিওনেল মেসির জিনিয়াস দরকার! যাদের মেসি নেই তারা আটকে যাবে। আটকাচ্ছেও।
অঘটন তো পুরনো সব বিশ্বকাপেও হয়েছে। কোনওটায় ক্যামেরুন। কোনটায় সেনেগাল। কোনওটায় আলজিরিয়া। কিন্তু এতগুলো আন্ডারডগ একই সঙ্গে প্রাক টুর্নামেন্ট হিসেব তছনছ করে দিচ্ছে, চুরাশি বছরের বিশ্বকাপ কখনও দেখেনি।
শনিবার বেলো হরাইজন্তে মিডিয়া সেন্টারে এনিয়ে বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের মধ্যে অঘোষিত আলোচনা সভা হতে দেখলাম। কেউ ইংরেজ। কেউ উরুগুয়ের। কেউ ব্রাজিলের, বেশির ভাগই আর্জেন্তিনার। এদের কারও কারও মনে হচ্ছে, ব্রাজিলের আবহাওয়ার সঙ্গে পূর্ব বা দক্ষিণ আমেরিকান দেশগুলো মানিয়ে নিতে পারছে বলে এটা ঘটছে। ঠান্ডার দেশগুলো মোটেও এত আপসেট ঘটাচ্ছে না। প্রেস ক্যান্টিন লাগোয়ায় দ্রুত লাঞ্চ সারতে সারতে সেই আড্ডায় কেউ কেউ এমনও বললেন, ”দু’তিনটে ঘটনা দেখে একটা প্যাটার্ন আন্দাজ করা ঠিক হবে না। আরও খেলা চলুক, তার পর না হয়।” শুধু ব্রিটিশ মিডিয়ার কেউ কেউ বলছিলেন, মনে হচ্ছে টপ প্লেয়ারদের ক্লাব ফুটবলের ক্লান্তি এখনও যায়নি। টুর্নামেন্টের সেকেন্ড হাফে ওরা মেজাজে ফিরবে। কিন্তু তত দিনে দেরি না হয়ে যায়।”
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোচেদের গোটাচারেক সাংবাদিক সম্মেলন এখানে কভার করা এবং নিজের চোখে দেখার পরিপ্রেক্ষিতে মনে হচ্ছে, ব্রিটিশ সাংবাদিকই ঠিক। দেশজ ফুটবলের মঞ্চে একটা বিশাল প্রভাব ফেলছে ইউরোপের ক্লাবগুলো! প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষে। আর সেটাই অলক্ষ্যে ঠিক করে দিচ্ছে বিশ্বকাপের প্যাটার্ন। অন্তত প্রাথমিক পর্বের তো বটেই।
ব্রাজিলের বত্রিশ দেশের যে ৭৩৬ ফুটবলার বিশ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ, তার শতকরা পঁচাশি ভাগ কোনও না কোনও ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত। এখানে খেলার আগে যখন দু’দেশের টিম লিস্ট দেওয়া হয়, সেখানে কোন প্লেয়ার কোন ক্লাবের হয়ে খেলেন সেটাও লেখা থাকে। এটা বেশ অবিশ্বাস্যই লাগে যে, আর্জেন্তিনা অধিনায়ক আর্জেন্তিনার হয়ে খেলছেন সেটাই তো টিম লিস্টে তাঁর প্রথম ও শেষ পরিচয়। দেশজ মঞ্চে আর কিছু গ্রাহ্য হবে কেন? কিন্তু মেসির নামের পাশে লেখা থাকে বার্সেলোনা এফসি। রোনাল্ডোর পাশে রিয়াল মাদ্রিদ। সুয়ারেজের পাশে লিভারপুল।
উরুগুয়ে কোচ সে দিন প্রকাশ্যেই বলেছেন, দেশের ক্যাম্পে কোচেরা যখন ফুটবলারদের পাচ্ছেন, তখন তারকা প্লেয়াররা হয় চোট পেয়ে বসে আছে। বা খেলে খেলে ক্লান্ত। বলেছেন, ক্লাব টুর্নামেন্ট শেষ আর বিশ্বকাপ শুরু—এর মধ্যে দিনের মেয়াদটা বাড়ানো উচিত। শুনলাম আর্জেন্টাইন ফিজিও বিরক্তি প্রকাশ করে বলেছেন, যাকে হাত দিচ্ছি বেসক্যাম্পে তারই কোনও না কোনও চোট। সারা বছর শ্রেষ্ঠ ফিজিওরা তা হলে ক্লাবে কী করে?
বিশ্বকাপ শুরুর আগে চোটের তালিকায় প্রচুর তারকা ছিলেন। এখনও আছেন। সুয়ারেজ। রোনাল্ডো। ফালকাও। সোয়াইনস্টাইগার। জাভি। শুধু তো শারীরিক চোট নয়, তুমুল মানসিক অ্যাডজাস্টমেন্টের ব্যাপার থাকে। ক্লাব থেকে দেশ! সেটা রাতারাতি হয় না। এক ব্রাজিল ফুটবলারের ভাষায়, ”দুটো সিম কার্ড রাখতে হয় আধুনিক ফুটবলারকে। একটা ক্লাবের। একটা দেশের। কিন্তু প্রতি বার যখন ক্লাব থেকে দেশে আসি, দেশের সিমে নেটওয়ার্ক ধরতে একটু সময় লাগে। পরিস্থিতিটাই পুরো আলাদা।”
কালকের জয়সূচক গোলে যিনি সান হোসে-তে রাস্তার নাচানাচিতে কোস্টারিকান প্রেসিডেন্টকে অবধি নামিয়ে দিয়েছেন, সেই ব্রায়ান রুইজ ইংল্যান্ডের অন্যতম ওঁচা দল ফুলহ্যামেও পুরো জায়গা পাননি। তাঁকে তারা ধার দেয় পিএসভি আইন্দোভেনকে। সেখানেও খুব বেশি ম্যাচ খেলানো হয়নি তাঁকে। মেক্সিকান গোলকিপার বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা যুগল সেভ করে থাকতে পারেন। কিন্তু তাঁকে তো এ বছর ক্লাব ফুটবলের ধকল নিতেই হয়নি। তিনি ফ্রি প্লেয়ার এবং অবশ্যই ক্লাব প্রত্যাখ্যাত হয়ে।
কলম্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, চিলি বা মেক্সিকোয় অনেক অনামী প্লেয়ার আছেন যাঁরা ক্লাবে খেললেও তাঁদের হয় সব ম্যাচ খেলানো হয় না। বা ট্রফি জেতার পাগলের মতো চাপ নেই। বিশ্বকাপে তাঁরা যখন আসেন, শারীরিক ভাবে টগবগে হয়ে আসেন। প্লাস একটা খিদে কাজ করে, এখানে চমক দিয়ে ইউরোপের বড় প্লেয়ার এজেন্টের নজরে পড়ব!
এই বেলো হরাইজন্তেতেই গত বছর একটা ম্যাচে ব্রাজিল ২-২ ড্র করে চিলির সঙ্গে। তার পর গ্যালারি থেকে নেইমারকে এত গালাগাল দেওয়া হতে থাকে যে, দিয়াগো সিলভা সমর্থকদের কাছে পরের দিন আবেদন করতে বাধ্য হন, এ ভাবে ওর মনোবল নষ্ট করে দেবেন না। নেইমার নাকি ঘনিষ্ঠ মহলে ক্ষোভ দেখিয়েছিলেন, ক্লাব ফুটবল ক্ষমাহীন। পরের দিন দেশের হয়ে খেলতে হলে সেখানকার দর্শকও ক্ষমাহীন। তা হলে একটা প্লেয়ার পারফর্ম করবে কী করে?
চিলির অবশ্যই সেই ড্র-য়ে কিছু আসে যায়নি। আন্ডারডগ সুপারপাওয়ারের সঙ্গে ড্র করেছে এটাই তো সাফল্য। তা ছাড়া চিলির ক’জন প্লেয়ারকে আর লোকে চেনে। যাঁদের চেনে তাঁদের ওপরও তো সিআর সেভেনের মতো এমন মারাত্মক স্পটলাইট নেই যে, কেউ সাবধান করে দেবে, ওহে দেশের হয়ে এত ঝুঁকি নিয়ে চললে কিন্তু রিয়ালে তোমার ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর একবার ভেবে দ্যাখো।
যেটা দাঁড়াচ্ছে, যে টিমের যত বেশি ক্লাব লিগের চ্যাম্পিয়ন প্লেয়ার, তারা বিশ্বকাপের প্রাথমিক পর্বে তত বিপন্ন। কারণ সেই মরসুমে যৌবনের সেরাটা ক্লাবে দিয়ে তার পনেরো দিনের মধ্যেই যখন হুড়ুমধুড়ুম করে দেশের হয়ে খেলতে চলে আসছে, সেটাকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও করে ফেলছে বৃদ্ধাশ্রম।
নমুনা? কেন স্পেন!
নমুনা? হতে পারেন লিওনেল মেসি। বার্সা ফাইনাল-টাইনাল যেতে না পারায় কম খেলেছেন। আর্জেন্তিনা ক্যাম্পে তাই যৌবন থাকার কথা। বৃদ্ধাশ্রম নয়!
বেলো হরাইজন্তে, ২৩ জুন
জনতা চায় আবেগ, জয়ের কৌশল খুঁজছে টিম ব্রাজিল
নেইমারের ব্রাজিল গ্রুপ শীর্ষে যাওয়ার সব রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েও নিজের দেশে অপ্রত্যাশিত শরশয্যায়।
টিম মাত্র ক’দিন আগে এত বন্দিত হচ্ছিল সম্ভাব্য বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হিসেবে। বলা হচ্ছিল, মারাকানার ফাইনালে ঐতিহাসিক বদলা নেবে ব্রাজিল। সে বিপক্ষেই উরুগুয়েই পড়ুক বা অন্য কেউ! হঠাৎ গত ক’দিনে আন্ডারডগদের ক্রমাগত ওলট-পালট করে দিতে থাকা মেসির উপর্যুপরি গোল। দুইয়ের মিলিত প্রভাবে স্কোলারির ব্রাজিল পেনাল্টি বক্সে অদ্ভুত সব আক্রমণ। কে জানত কাপের মাত্র এগারো দিন যেতে না যেতেই সাম্বার সুর মৃদুমন্দ হয়ে যাবে!
নিজেদের রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় সোমবার গ্রুপের দুর্বলতম দলকে পাচ্ছে ব্রাজিল। অন্তর্দ্বন্দ্ব আর যাচ্ছেতাই ডিফেন্স জর্জরিত ক্যামেরুন। এই হল সেই প্রকৃষ্ট লগ্ন, যখন গোলের মালা পরিয়ে গ্রুপ শীর্ষে চলে যাওয়ার সুযোগ। দ্বিতীয় রাউন্ডে নেদারল্যান্ডসকে এড়াতে পারবে। আবার নিজেদের। কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষাও সেরে নেওয়া যাবে!
কিন্তু ক্যামেরুন খেলবে কী, ম্যাচের আগে তো ব্রাজিল উত্যক্ত হয়ে যাচ্ছে প্রাক্তন ফুটবলার আর নিজের দেশের ভক্তদের সামলাতে। তাঁদের চাহিদা মেটাতে। টিমের ওপর এমন চাপ বাড়ছে যে সমালোচনার উত্তর দিতে গিয়ে মাথা গরম করে ফেলছেন ফুটবলাররা। দানি আলভেজ যেমন বেস ক্যাম্পে বসে দেওয়া মিডিয়া সেশনে অ্যালান শিয়ারারকে ‘মূর্খ’ বলে দিলেন। বলেন, ”ফুটবলার হিসেবে ওর লজ্জা হওয়া উচিত এত বাজে বকার জন্য।” বিবিসি টিভিতে শিয়ারার বলেছিলেন, ”ব্রাজিল কেন ফ্রেডকে খেলিয়ে চলছে মাথায় ঢুকছে না। ও স্লো। আক্রমণে যেতে পারছে না। এখনই ওকে বসানো উচিত।”
এটা তো সমালোচনা হতেই পারে। অনবরত সব টিমে হয়ে থাকে। কিন্তু জাতীয় দল থেকে তার এমন রূঢ় প্রতিক্রিয়া দেখে ফুটবলমহল স্তম্ভিত। অনেকেরই মনে হচ্ছে টিম যে মানসিক চাপের সুড়ঙ্গে ঢুকে গিয়েছে এটা তার অব্যর্থ প্রমাণ!
আর সমালোচনা তো শুধু বিবিসি বক্স থেকে উঠে আসছে না। বারো বছর আগের ব্রাজিলের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন টিমের অন্যতম সদস্য এডমিলসনও লিখেছেন, ‘এখনই ফ্রেডকে বসানো হোক। ক্যামেরুনের সঙ্গে পরীক্ষা করা হোক উইলিয়ানকে খেলিয়ে।’ নেইমারকেও ভুল জায়গায় খেলানো হচ্ছে বলে মনে করছেন এডমিলসন। তাঁর মতে, জার্মানি যে ভাবে টমাস মুলারকে একটা গুপ্ত জায়গা থেকে ব্যবহার করছে— অ্যাটাকিং মিডফিল্ডারের পিছনে রাখছে, নেইমারকেও তাই করা হোক।
ফ্রেডকে নিয়ে এত সমালোচনা বিস্মিত করার মতো। কারণ বরাবরই তিনি একটু নিঃসাড়ে খেলেন। অ-ব্রাজিলীয় খেলার ভঙ্গি বলেই তাঁকে ‘নিঃশব্দ ঘাতক’ বলা হয়। গত বছর কনফেড কাপ তো ফ্রেড দারুণ খেলেছেন। এই প্রসঙ্গ উঠতে যে ট্যাক্সি চালক এই সাংবাদিককে স্টেডিয়াম নিয়ে আসছিল, সে ঘোষণা করল, ঠিক কথা। কিন্তু এই ফ্রেডের গত বছরের ফিটনেস নেই।
ব্রাজিলের কোচ একমাত্র স্কোলারি মনে করলে ডাহা ভুল করা হবে। ট্যাক্সিচালক থেকে লন্ড্রিওয়ালা প্রত্যেকের জাতীয় দল সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট বক্তব্য রয়েছে।
আর সেই ব্রাজিলীয় জনমানসের নির্ঘোষ হল, ব্রাজিল টিম ঘুম থেকে ওঠো। ফুটবলটা সে ভাবেই খেলো যে ভাবে আমাদের দেশ খেলে এসেছে।
জিকো— যাঁর কি না দুর্দান্ত একটা মূর্তি, মারাকানার ভেতরে, তিনিও নেমে পড়েছেন টিমের বিরুদ্ধে জনজোয়ারে। মূর্তি হল, জিকো সাইডভলি মারছেন। স্কোলারির টিমের বিরুদ্ধে তাঁর টাটকা রবিবাসরীয় সাইডভলি হল পওলিনহো সম্পর্কিত। লিখেছেন, স্কোলারি ভুল দল খেলিয়েছেন মেক্সিকোর বিরুদ্ধে। পওলিনহো কী করে পুরো নব্বই মিনিট মাঠে থাকে, ও যে খেলাটা খেলত বক্স টু বক্স—সেটার আজ ছায়া হয়ে গিয়েছে।
জিকো বিশ্বকাপ না জিততে পারুন, এ দেশে খুব সম্মানীয় ফুটবল ব্যক্তিত্ব। তাঁর সমালোচনার প্রভাব তো আছেই। আমজনতাও নিজেদের মতো করে বিরক্তি জানাচ্ছে। ব্রাসিলিয়ার এই স্টেডিয়ামের নামকরণ হয়েছে মানে গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়াম। এ দিন কাগজে এক ফুটবলপ্রেমী চিঠি লিখেছে গ্যারিঞ্চার স্মৃতিতে অন্তত আবেগ দিয়ে খেলো।
জনতা গজগজ করছে, তোমাদের খেলায় না পাওয়া যাচ্ছে গোল। না দেখছি পুরনো লাবণ্য। তা হলে তো আমরা মুখ খুলবই।
কোথাও বোধহয় সমর্থকদের একটা ভীতি কাজ করছে, এ বারের বিশ্বকাপে যে কোনও টিম যেমন যে কাউকে রুখে দিচ্ছে, হারাচ্ছে, তাতে ব্রাজিল এখনই উন্নতি না করলে পরে গিয়ে না সর্ষেফুল দ্যাখে। এই ভীতি থেকেই বোধহয় হাহাকারটা আরও বেশি হচ্ছে যেটা এই পর্যায়ে কখনও ওঠে না।
নেইমার টিমের হয়ে দাঁড়িয়েছেন। কাউকে গালাগাল না দিয়ে বলেছেন, ”আপনারা ধৈর্য ধরুন। এখনই উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু হয়নি। তা ছাড়া বোঝার চেষ্টা করুন, এখন আমাদের টিম অঙ্ক-নির্ভর একটু শুকনো ফুটবলই খেলে। এই ভাবেই আমরা জিতছি।”
নেইমার এই মুহূর্তে দেশের জনপ্রিয়তম। কিন্তু ব্রাজিলীয় ফুটবল-দর্শন তারা নেইমারের থেকেও শিখতে রাজি নয়।
গোল করো, অ্যাটাক করো, সৃষ্টিশীলতা দেখাও—ব্রাজিল ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে টিমের প্রতি এমন চাপ যে দানি আলভেজ হতাশ ভাবে বলেছেন, ”সমর্থকেরা চান প্রতি ম্যাচে পাঁচ গোল। দশ গোল। যখনই সেটা ঘটে না, ওঁদের আবেগধর্মী বহিঃপ্রকাশ হয়।”
বিশ্বকাপ প্রথমার্ধের খেলা শেষ হতে না হতেই ব্রাজিলীয় জনতার চাহিদা আর টিমের মডেলের মধ্যে একটা পরিষ্কার কন্ট্র্যাডিকশন হাজির হয়েছে। ব্রাজিল বড় স্কোরে জিতলে সেই স্ব-বিরোধিতা ক্যামোফ্লাজ হয়ে যাবে। কিন্তু না জিতলেই সেটা বার হয়ে পড়বে।
ক্যামেরুন কী ভাবে ব্রাজিল ম্যাচ নেয় সেটাই এখন দেখার। আন্ডারডগদের চমকপ্রদ সব সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে আফ্রিকান সিংহ কি প্রতিযোগিতায় অন্তত একবারের জন্য কেশর দোলাবে? নাকি হারার আগেই হেরে বসে থাকবে?
লাস ভেগাসের যে জুয়াড়ি আর্জেন্তিনার গোলে কোটি টাকার বাজি জিতলেন, তিনি একমাত্র লোক এবারের বিশ্বকাপ নিয়ে পূর্বাভাস যাঁর মিলেছে। লাস ভেগাসে তাঁকে যোগাযোগ করে দেখলে কেমন হয়?
বেলো হরাইজন্তে, ২৩ জুন
মাঠের মধ্যে সম্মোহনী মেসি, মাঠের বাইরে মারাদোনা
বিশ্বকাপের হলটা কী! ফিফা র্যাঙ্কিয়ে তেতাল্লিশ নম্বরে থাকা ইরান প্রবল মহিমান্বিত আর্জেন্তিনার কাছে শেষ মুহূর্তের গোলে হেরে এমন বিষণ্ণ যে, গোলকিপার কেঁদেই চলেছেন।
বিশ্বকাপের হলটা কী! জার্মানির সঙ্গে ২-২ হওয়ার পর ফিফার সাঁইত্রিশ নম্বর ঘানা উৎসব করবে কী, শোকার্ত এক ডিফেন্ডারকে মাঠ থেকে বার করে আনা যাচ্ছে না।
বিশ্বকাপের হলটা কী? শনিবার নিওনেল মেসি এস্তাদিও মিনেইরো ছাড়ার সময় আর্জেন্টাইন টিম-বাসের বাইরে ভিড় থেকে অনেকে তাঁর উদ্দেশে উচ্ছ্বাসে হলুদ পতাকাও যে ওড়ালেন।
বিশ্বকাপের হলটা কী। ব্রাজিলীয় রবিবাসরীয় দৈনিকে স্কোলারির দল-টল নিয়ে আলোচনা ছেড়ে প্রথম পাতায় শিরোনাম দিচ্ছে, ‘না সেলেকাও দো পাপা কুয়েম ফাজ মিলাগ্রে ই মেসি’। গুগুল ট্রান্সলেটর মানে বলছে, মেসির ঘটানো এই মিরাকল একমাত্র পোপই করতে পারতেন। আর একটা কাগজের প্রথম পাতার সবিস্তার দশটা কারণ। কেন মেসিকে আপনার না দেখলেই নয়?
বিশ্বকাপের হলটা কী! তেহরান থেকে জনাচল্লিশেক ইরান সমর্থক খেলা দেখতে বেলোতে এসেছিলেন। কাল সান্ত্বনা জানাতে তাঁরা টিমের সঙ্গে দেখা করতে যান। বলতে গিয়েছিলেন শুধু ইরান নয়, গোটা এশিয়ার নাম তোমরা উজ্জ্বল করে দিয়েছ। কিন্তু টিম দেখা করেনি। ন্যায্য পেনাল্টি পাইনি। জেতা ম্যাচ হেরে ফিরেছি। এখন কারও সঙ্গে দেখা করার মুড নেই— এই কথা শুনে নাকি প্রত্যাখ্যাত হয়ে তাঁরা ফিরে এসেছেন বলে রোববার জানালেন।
বিশ্বকাপ প্রথম দশ দিন ছাড়িয়ে যাওয়ার মধ্যেই যে পরিমাণ রঙ্গ, বিহ্বলতা আর নতুন সব নজির তৈরি করছে, তার সঙ্গে একমাত্র যেতে পারে কলকাতায় বহুল প্রচারিত সেই বিজ্ঞাপনী ক্যাম্পেন ট্যাগলাইন— উল্টে দেখুন, পাল্টে গেছে!
লিওনেল মেসি যেমন। শনিবার ভারতীয় সময় মাঝরাত্তিরে যখন সাংবাদিক সম্মেলন করতে এলেন, তাঁকে দু’ধরনের প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হতে হল।
এটা জিনিয়াস মেসি। যাঁর ছবি তুলতে, হাত মেলাতে সাংবাদিকেরা ক্ষুধার্ত ফ্যানের মতো ছুটলেন।
একটা আর্জেন্তিনা অধিনায়ক মেসি। যাঁকে অনেক টিম-সমালোচনা এবং বাঁকা-বাঁকা কথা শুনতে হল! যাঁকে পরিষ্কার বলা হল, যে দিন আপনার জিনিয়াস আর্জেন্তিনাকে বাঁচাবে না, সে দিন তাকে রক্ষা করবে কে?
প্রেস কনফারেন্সে যে মেসি এসেছিলেন, তিনি আসলে জিনিয়াস বা ক্যাপ্টেন কোনও সত্তাই ততটা নন। প্রচণ্ডতম ব্যক্তিগত আক্রমণকে ক্রীড়া-নৈপুণ্যে এই মাত্র জয় করে ওঠা এক পরিতৃপ্ত মহাতারকা! শরীরী ভাষাটাই কত পজিটিভ। সামনে এগিয়ে, সবার চোখে চোখ রেখে। বাঁকা প্রশ্নতেও মুখের হাসি না হারানো। ওঠার আগে দলের তরফে অধিনায়ক মেসি কথা দিয়ে গেলেন, পরবর্তী পর্বে তাঁর দলের আরও উন্নতি ঘটবে। কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তে তিনি দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠার অসাধারণ মুহূর্তটাই মনে রাখতে চান।
নেটে দেখছিলাম লাস ভেগাসের এক জুয়াড়ি মেসির শেষ মুহূর্তের গোলে প্রায় সর্বস্বান্ত হওয়া থেকে বেঁচেছেন। আর্জেন্তিনার জেতার ওপর তিনি ২৪৫ কোটি টাকা বাজি ধরেছিলেন। মেসির নিজেরও তো পাশার দান উল্টো দিকেই চলে যাচ্ছিল। ইরান ম্যাচ জিতেও যা শুনতে হচ্ছে। ড্র করলে বা হারলে বিশ্বফুটবলের শকুনি মামারা তাঁকে ছেড়ে দিতেন নাকি?
ঝলসে ওঠা বাঁ পায়ের জন্য আর্জেন্তিনার অন্য দশ নম্বরকেই লোকে বিশ্বকাপে চিনতে অভ্যস্ত। মেসি যেন সেই পরম্পরাই বহন করে গেলেন ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলের আঠাশতম বার্ষিকীর ঠিক এক দিন আগে! এমনই রোমাঞ্চিত করে দিয়েছেন তিনি গোটা ব্রাজিলকে যে, গ্রুপ লিগের গুরুত্বপূর্ণ ক্যামেরুন ম্যাচের আগের দিন প্রথম পাতায় কোথায় নেইমার থাকবেন, তা নয়। পাতা জুড়ে মেসি।
যে ভাবে পশ্চিমি দেশগুলোয় বিজ্ঞাপন দেয়, মৃত্যুর আগে কোন পঞ্চাশটা বই আপনার পড়ে নেওয়া উচিত! সে ভাবেই ব্রাজিলীয় দৈনিক তার পাঠকদের বলেছে, কেন মেসিকে দু’চোখ ভরে দেখে না নিলেই নয়!
১. বিশ্বের যে কোনেও খেলাতেই এক নম্বরকে দেখার সুযোগ ছাড়তে নেই।
২. এমন সুযোগ বারবার আসবে না। কবে আবার এ দেশে পাওয়া যাবে, আদৌ যাবে কি না, কেউ জানে না।
৩. ম্যাচের রাজা বস্তুটা কী, সেটা চোখে দেখা দরকার।
৪. ইরানের সঙ্গে গোলটা যেমন মনে একটা বিনা পয়সার অ্যালবাম তুলে ফেলা, তেমন আরও স্মৃতি তৈরির সুযোগ।
৫. আক্রমণ শানানো বলতে কী, সেটা প্রত্যক্ষ করা।
৬. ফুটবল মাঠের তীক্ষ্ন অ্যান্টিসিপিশন শিক্ষা।
৭। ব্রাজিলের তথাকথিত শত্রু দেশের প্লেয়ার কত সম্মানিত হতে পারে, হাতেকলমে দেখা।
৮। রেকর্ডের চাপ নেওয়ার শিক্ষা।
৯. দেখা, পৃথিবীব্যাপী অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে কী ভাবে লড়তে হয়।
১০. একটা এক্স ফ্যাক্টর প্রত্যক্ষ করা, যার কোনও ব্যাখ্যা হয় না।
পেলে-রোনাল্ডিনহো-রোনাল্ডোর দেশের কাগজ এটা, ভাবাই যায় না। ব্রাজিলীয়দের যিনি নাচিয়ে দিয়েছেন, তিনি তো আর্জেন্টাইন হৃদয়ের এক নম্বর হবেনই। আর এই জায়গাতেই একটা মোচড় আছে। রোববারও প্রায় ফাঁকা বেলো মাঠের বাইরে যে আর্জেন্টাইন গ্রুপকে হুল্লোড়ে মত্ত দেখলাম, তারা মেসিকে এক নম্বরে বসিয়েও দিয়েগোকে তাঁর ওপরে রাখে। তাঁর— দিয়েগো মারাদোনার আসলে কোনও নম্বর নেই। কেউ তাঁকে দেশের প্রেসিডেন্ট দেখতে চেয়ে অনবরত ব্রাজিলেও প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঘুরছে। কেউ তাঁকে সরাসরি বলছে ঈশ্বর! জানতাম না যে বুয়েনস আইরেস থেকে দুশো কিলোমিটার দূরে রোজারিওতে মারাদোনাইয়ান চার্চ রয়েছে। যেখানে ভক্তরা দশ নম্বর জার্সি পরে। যেখানে বাইবেলকে সরিয়ে পড়ানো হয় মারাদোনার আত্মজীবনী। সারা বিশ্বে আশি হাজার ভক্তসংখ্যা এই চার্চের। যাঁরা প্রতিষ্ঠাতা, তাঁদের এক জন বলেছেন, ক্যাথলিকদের আপসেট হওয়ার কিছু নেই। ফুটবল তো একটা ধর্ম। আর আমরা সেই ধর্মের ঈশ্বরের উপাসনা করছি মাত্র। এর ট্রাস্টি বোর্ডে রয়েছেন আর্জেন্তিনার প্রাক্তন ফুটবলার আলেজান্দ্রো ভেরন। তা ভেরন গত বার ২৯ অক্টোবর মাঝরাতে একটা ফোন পান। ট্রাস্টি বোর্ডের এক সদস্যই তাঁকে ফোন করে বলেন, মেরি এক্স-মাস। ভেরন বলেন, ”মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি তোমার? আজ তো সবে ৩০ অক্টোবরে পড়লাম।”
ফোনকারী অবিচলিত, ”ঠিক তাই। আমাদের যিশু তো ৩০ অক্টোবরই জন্মেছেন।”
আর্জেন্টাইন জনতার হৃদয়ের যিশু কাল মেসির গোলটা দেখেছেন কি না, এটা কিছুতেই কনফার্ম করতে পারলাম না? আর্জেন্টাইন সাংবাদিকদের অনেকেই বললেন, ঠিক ওই সময়টাই নাকি ম্যাচ ড্র হচ্ছে ধরে নিয়ে চার দেহরক্ষী ও ব্যক্তিগত ম্যানেজার সমেত মারাদোনা বেরিয়ে যান। কেউ আবার বললেন, সিঁড়ির তলায় যখন তিনি, তখনই গোলটা!
যে ব্যাখ্যাই ঠিক হোক, মাঠের বাইরে টিভি উপস্থাপক হিসেবেও এ ক’দিনে যে তিনি ঝড় তুলে দিয়েছেন, কোনও সন্দেহ নেই। ভেনেজুয়েলান টিভি নেটওয়ার্কের হয়ে ব্রাজিল জুড়ে তিনি শো করে বেড়াচ্ছেন। ভেনেজুয়েলা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মারাদোনার বিশাল দোস্তি। তিনি বামপন্থী এবং পুঁজিবাদ-বিরোধী। আর মারাদোনা তো বরাবরই তথাকথিত ফুটবল-পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে।
এই পর্যন্ত বিশ্বকাপে তিনি যা বলেছেন, সারসংক্ষেপ এ রকম—
ফিফা: কোটি কোটি টাকার ব্যবসায়ী। ফুটবলের উন্নতির মধ্যে শুধু নেই। আর সব করে। আমাকে এ বার ওরা বসনিয়া ম্যাচে মারাকানায় ঢুকতে দেয়নি (ফিফা অভিযোগ অস্বীকার করেছে)। আমাকে টিভি শো-য় দেখলেও বাথরুমে লুকিয়ে পড়া উচিত ব্লাটারের।
পেলে: আমি এ দেশে যে অভ্যর্থনা পেলাম, পেলে তা পায়নি। বেচারা কী করবে—নিজের মিউজিয়ামে ঢুকে বসে থাক।
স্কোলারির ব্রাজিল: রেফারি পুষে দিন চলছে। নেইমার ছাড়া বাকিরা আক্রমণ করতেই জানে না।
অমোঘ সম্মোহন। মারাদোনার টিভি শো-র রেটিং তাই লাতিন আমেরিকায় দুরন্ত ভাবে বাড়ছে।
মাঠের মধ্যে মেসি। মাঠের বাইরে মারাদোনা। আর্জেন্তিনীয়দের এ বার যৌথ ম্যাজিক। হোক না দেশের নাম ব্রাজিল।
বেলো হরাইজন্তে, ২৪ জুন
যৌবনের নগরীতেই বিশ্বসেরা প্রবীণের শেষ গাথা
ব্রাসিলিয়া এয়ারপোর্টটা অসাধারণ। বাইরে বেরোলেই পরের পর ঝাঁ-চকচকে অত্যাধুনিক স্থাপত্য। মনে হবে না প্রকৃতিগতভাবে তৃতীয় বিশ্বের এক দেশের রাজধানীতে পা দিলাম! ব্রাজিল তো দিনের শেষে তৃতীয় বিশ্বই।! রাষ্ট্রপুঞ্জে পাত্তা পায় না। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য নয়। তার জিডিপি-ও বড় মুখ করে বলার মতো নয়।
আসলে ব্রাজিলের রাজধানী বয়সেও উদ্ভিন্নযৌবনা। সবে চুয়ান্নতে পড়ল। একটা শহরের পক্ষে চুয়ান্ন কোনও বয়সই নয়। তার শুধু সামনে তাকানোর সময় এখন।
কী ট্র্যাজিক বৈপরীত্য দেখুন। বিশ্বসেরা ফুটলারের কাছে কিন্তু ঊনত্রিশটাই হয়ে যায় বিশ্বকাপের বিদায়ী বেলা। কেবলই পিছন ফিরে নুড়ি কুড়োনোর সময়।
ব্রাজিলের এই নবীন নগরীতে আগামী বিষ্যুদবার সাঙ্গ হয়ে যাওয়া উচিত ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ-গাথা। আমাজন তীরবর্তী মানাউস আজ রাত্তিরে তাঁকে ভেন্টিলেটরে আচ্ছন্ন অবস্থায় দক্ষিণ ব্রাজিলে ফিরিয়ে দিচ্ছে। অবস্থা বিচারে ভেন্টিলেটরই বটে। কারণ পর্তুগাল মাত্র এক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে আছে। শেষ ম্যাচে সেই ভয়ঙ্কর ওঝা-বিশিষ্ট ঘানার টিমকে তাদের বড় ব্যবধানে হারাতেই হবে। আবার ঠিক একই সময় রেকিফের ম্যাচে মার্কিনদের হারতে হবে জার্মানির কাছে। মার্কিনরা ড্র করে ফেললেই শেষ। ঘানাকে হারাতে পারলেও শেষ।
ব্রাসিলিয়া মিডিয়া সেন্টারে ব্রাজিলের ম্যাচ টিকিট তুলতে গিয়ে পর্তুগালের এক সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, যিনি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় রোনাল্ডোর বিশ্বকাপ অভিযান শেষ পড়তে পড়তে তিতিবিরক্ত। ”এবার হবে না ধরে নিলাম। কিন্তু শেষ কেন, আমাকে বলতে পারেন? ক্লোজে ছত্রিশ বছর বয়সে গোল করে যাচ্ছে। ইনিয়েস্তা তিরিশোর্দ্ধ হয়েও এ বার খেলল। তা হলে রোনাল্ডো রাশিয়ায় খেলবে না কেন? ওর তো তখন বয়স হবে তেত্রিশ!”
যুক্তি হিসেবে পেশ করাই যায় এবং আসলে যায় না! প্রথমত, ক্লোজে আর রোনাল্ডোকে গড়িয়াহাটের মাছের বাজারে সবচেয়ে চোর দাঁড়িপাল্লাতেও সমান দেখানো সম্ভব নয়। দু’জনের উপর চাহিদার বহরটাই আলাদা। ক্লোজে হলেন অনেকের মধ্যে এক জন। টিমে খুব প্রয়োজনীয়, কিন্তু টিম ছাপিয়ে নয়। জার্মান টিম যবে পৌঁছেছে, ধরে নেওয়া যায় তারই এক অদৃশ্য মুখ হিসেবে ক্লোজেও ব্রাজিল পৌঁছেছেন। রোনাল্ডোর ব্যাপারটা একেবারে আলাদা। তিনি দেশের ফুটবল ফেডারেশনের অনুমতি নিয়ে নিজস্ব চাটার্ড বিমানে এসেছেন। সঙ্গে গোটা পরিবার। দু’শোর মতো সাংবাদিক। আর সেই বিমানে করেই ঘুরপাক খাচ্ছেন ব্রাজিল। ক্লোজে-র জন্য জীবিত বা মৃত কেউ জার্মান টিম হোটেলে দাঁড়িয়েছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু ঠিক এগারো দিন আগে রোনাল্ডো যখন ক্যাম্পিনোসের রয়্যাল পাম হোটেলে পৌঁছেন, সেখানে তাঁকে বরণের জন্য অপেক্ষায় ছিল হাজারের ওপর দর্শক। ডোনাল্ড ডাক সেজে দাঁড়ানো এক যুবক আর বক্ষদেশ উন্মুক্ত করে দাঁড়ানো এক ব্রাজিলীয় মডেল। তরুণীর নাম মিস বামবাম। তাঁর দাবি— সিআর সেভেনের সঙ্গে নাকি এককালে প্রেমের সম্পর্ক হয়েছিল। এর পর পর্তুগাল প্র্যাকটিসে গিয়ে মিস বামবাম ঢুকে পড়তে চাইলে নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে সরিয়ে দেন। আপাতত তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে রোনাল্ডোর পিছু ধাওয়া না করতে।
কাহিনির সারমর্ম: রোনাল্ডো মানেই গণ-হিস্টিরিয়া আর তার লেজুড় হিসেবে উচ্চচাকাঙ্খী সব ফুটবল চাহিদা।
ক্লাব ফুটবলের কেড়ে নেওয়ার পরিমাপটাও রোনাল্ডোর ক্ষেত্রে অনেক বেশি। আগামী চার বছর ধরে রিয়াল তাঁকে পিষবে। যদি অন্য কোথাও চলে যান, তারাও ক্লাব ফুটবলের বৃহত্তম সাফল্যের যন্ত্র হিসেবেই ঘানি টানাবে। তার পর আর কোথায় রাশিয়া। কোথায় ২০১৮!
সুতরাং বিশ্বকাপে যদি কিছু দাগ রাখতে হয়, এ বারই! এই ভেন্টিলেটরে থাকা আবস্থাতেই! বেলো হরাইজন্তে থেকে ব্রাসিলিয়া আসার সময় পাশের সিটে এক ব্রাজিলীয় টিনএজারকে পেলাম যে ফুটবল ক্লিনিকের ছাত্র । ব্রাজিল-ক্যামেরুন ম্যাচ দেখতে বাবার সঙ্গে হলুদ জার্সিতেই প্লেনে এসেছে। কিন্তু তার হৃদয়ের রং লাল। অকৃত্রিম রোনাল্ডো ভক্ত।
বলল, ক্লিনিকের স্পেশ্যাল ফ্রি-কিক সেকশন রয়েছে। যেখানে আলাদা করে রোনাল্ডোর ফ্রি-কিক টিউশন দেওয়া হয়। বিস্ময়কর শুধু নয়, অতীব বিস্ময়কর। যে ব্রাজিল এত ভাল ভাল সব ফ্রি-কিক-মারিয়ে দেখেছে। জিকো। সক্রেটিস। রোনাল্ডিনহো। তারা নিজেদের তারকা ছেড়ে ফুটবল সিলেবাসে রোনাল্ডো পড়াচ্ছে কেন? কারণ রোনাল্ডোর ওই বিশেষ ফ্রি-কিক নেওয়ার দক্ষতা। গোটা বিশ্ব যাকে নাকল-বল ফ্রি-কিক বলে জানে।
ছেলেটির মুখে শুনলাম, ক্লিনিকের ফুটবল শিক্ষকেরা শরীর ও পায়ের পজিশনিং কেটে কেটে নাকল-বল মারা শেখান। ডান পায়ে মারলে ডান পা-টা একটু ব্যাঁকা করে আসবে। চেটোটা সাইড করে বলের তলার দিকে মারলে এমন একটা ব্যাক-স্পিন পাবে যে, বলটা রিভার্স সুইংয়ের মতো উল্টো দিকে চলে যাবে।
গোলকিপার কেবল জাল থেকে বলটা এর পর কুড়িয়ে আনবে।
বিমান থেকে নামতে নামতে সন্ধে সাতটা। পর্তুগাল-যুক্তরাষ্ট্র এই শুরু হল। ব্রাসিলিয়া বিমানবন্দরের ভেতরের কফিশপটায় একমাত্র টিভি লাগানো। সবাই ভিড় করে সেখানে ম্যাচ দেখছে। ছেলেটিকেও দেখলাম বাবার সঙ্গে খেলা দেখছে। শুরুতেই তিন মার্কিন ডিফেন্ডারকে টলিয়ে রোনাল্ডো বেরোলেন। কিন্তু সেটা সেন্টার সার্কলের কাছে একেবারেই নিরামিষ আক্রমণ। পর্তুগাল ফ্রি-কিকও পেল। জার্মানির দিন যেমন মেরেছিলেন রোনাল্ডো, অতগুলো না হলেও এক-আধটা মারলেন। কিন্তু নাকল-বল কোথায়? চোট তো বাঁ পায়ে! তার জন্য ডান পায়ে পঁচিশ গজের ফ্রি-কিকও মারা যাবে না কেন? ভারেলাকে দিয়ে শেষ মুহূর্তের গোল শোধ তো ডান পায়ের লম্বা ক্রসেই।
আসলে ব্রাজিল বিশ্বকাপের রোনাল্ডোকে দেখে মনে হচ্ছে, ফুটবল জীবনের নজিরবিহীন প্রত্যাশার চাপ ম্যানেজ করতে পারছেন না। কোথাও পরিচিত মস্তানিটা হারিয়ে ফেলছেন। যেটা তাঁর চরিত্রের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী। ব্রাজিল নেমে প্রথম সাংবাদিক সম্মেলনেই তো বলেছিলেন, ”আমার কাউকে কিছু প্রমাণ করার নেই। আমার সিভি দেখে নিন। সব আছে।”
সেই সাংবাদিক সম্মেলন দেখে ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ফুটবল সাংবাদিক তাঁর কলামে লেখেন, ‘রোনাল্ডোটা যাচ্ছেতাই। পর্তুগালের সেরা জাদুর যে গুণই থাক, বিনয় তার মধ্যে পড়ে না।’
কাল একেবারে ফাঁকায় একা গোলকিপারকে পেয়ে গিয়েছিলেন রোনাল্ডো। পরে রেফারি অফসাইড দেন। কিন্তু আত্মবিশ্বাস এমনই ভঙ্গুর অবস্থায় যে, সেটাও গোলে মারতে পারেননি। যা দ্রুতই সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিহিত হয়ে গিয়েছে, ‘রোনাল্ডোর ব্রাজিল কমেডি’ হিসেবে।
তাঁর প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী খেলা শেষের তিরিশ সেকেন্ড আগে গোল করে পোপ-সম অভ্যর্থনা পাচ্ছেন ব্রাজিলীয় কাগজে।
আর তিরিশ সেকেন্ড আগে গোল করিয়েও মন কাড়তে ব্যর্থ রোনাল্ডো। ইন্টারনেটে যেমন এই গোল করানোর পরেও রোনাল্ডো জোকস অব্যাহত। অথচ এই সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি বরাবরের ফুটবল সম্রাট। মেসিরও আগে। জার্মানি ম্যাচের পর সেখানেই কিনা লিখেছিল, বান্ধবী ইরিনা শায়েক বলছেন, ঘুম থেকে ওঠো। আর রোনাল্ডো ধড়ফড়িয়ে উঠে বলেছেন, আচ্ছা মুলার কি আরও কয়েকটা গোল দিয়ে ফেলেছে?
যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচের পর বেরিয়েছে, এক বিচারক মা-বাবার ঝগড়ায় যন্ত্রণাকাতর ছেলেকে জিজ্ঞেস করছেন, তুমি কার কাছে থাকবে? মা?
না, মা মারে।
বাবার কাছে থাকবে?
না, বাবাও মারে।
তা হলে?
আমি ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর কাছে থাকতে চাই। ওর কাউকে মারার শক্তি নেই।
নবীন এই শহর যদি বৃহস্পতিবার তাঁর অবকল্পনীয় উত্থান দেখে তো এক রকম। শোকগাথা তখন লোকগাথায় পরিণত হবে। কিন্তু গতিপ্রকৃতি যে ভাবে দাঁড় বাইছে, তাতে বিশ্বকাপে এটা রোনাল্ডোর অন্তিম ম্যাচ না হয়ে দাঁড়ায়।
তখন ভবিষ্যৎ কী ভাবে মাপবে তাঁকে? বেকহ্যামের মতো দূরছাই করে দিয়ে বলবে, বিজ্ঞাপনী হাইপ শুধু বড় প্লেয়ার বানিয়ে দিয়েছিল? যা মস্তানি, সব ক্লাব ফুটবলে। স্বদেশীয় ফিগোই তো বলে দিয়েছেন, পর্তুগালে অমর হতে গেলে রোনাল্ডোকে ওয়ার্ল্ড কাপে ভাল খেলতে হবে। রবার্তো কার্লোস বলছেন, ”বিশ্বসেরা ও ছিল? না মেসি? যখন তিরিশ বছর পর মূল্যায়ন হবে, তখন ব্রাজিল বিশ্বকাপটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর ধরা হবে।”
প্রাক্তনদের করা এ সব ফুটবলীয় বিষয়সম্পত্তির হিসেবেও ক্রমশ অনগ্রসর হয়ে পড়ছেন রোনাল্ডো। তাঁর হয়ে এটুকু বলারও কেউ নেই যে, চোট নিয়েও দ্যাখো রোনাল্ডো পালিয়ে যাচ্ছে না। পর্তুগালের প্রতি কমিটমেন্টের জন্য রিয়ালের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে পারে জেনেও পুরো বিশ্বকাপ খেলে দিচ্ছে। অনেকে তো মাঠেই নামত না এই প্রচণ্ড চাপের মুখে।
ব্রাজিলে পা দেওয়ার মাত্র বারো দিনের মধ্যেই পাকেচক্রে যা দাঁড়াল, রোনাল্ডোর ফুটবল-প্রতিভা বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ব্রাসিলিয়ার গারদে আটক।
মানে গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামের নামকরণ যাঁর স্মৃতিতে, ভাগ্য কি সে পথেই চালিত করছে রোনাল্ডোকে? যে, ন্যায়বিচার পাবেন খেলা ছাড়ারও অনেক পরে?
আবার কি তাঁকে সম্মানে ভরিয়ে দেবে আজ থেকে বছর কুড়ি-তিরিশ বাদের কোনও ফুটবল-গবেষক। যে হয়তো লিখবে, ২০১৪-য় পৌঁছে বিশ্বকাপ নিতান্ত একটা সমাজবাদী চেতনায় পরিণত হয়েছিল। সেখানকার শ্রেষ্ঠ মানে তীক্ষ্ন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, কঠোর পুঁজিবাদী সমাজের গ্রহণযোগ্য শ্রেষ্ঠ নয়।
ওটা পর্তুগাল নয়, রিয়াল দিতে পারে। একাধিক বার তো রোনাল্ডোকে দিয়েওছে!
কিন্তু যত দিন না সেই মূল্যায়ন হচ্ছে, শোকগাথা আর ইন্টারনেট জোকস তৈরি চলবেই। কারই বা মনে থাকবে ব্রাজিলে নাকল-বল টিউশনের কথা!
ব্রাসিলিয়া, ২৪ জুন
নেইমার লাইটিং
ব্রাজিল খেললে স্টেডিয়ামে একটা অপরূপ আলোকবর্তিকা তৈরি হয়। এমনিতেই ব্রাজিলের খেলা থাকা মানে সে দিন নাগরিক জীবনেও সবাই হলুদ জার্সি পরবে। তা মাঠে আসুক বা না আসুক! হোটেলের রিসেপশনিস্টরা হলুদ। আবার এগজিকিউটিভও হলুদ পরে অফিস যাচ্ছে। না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না একটা হলুদ রঙের জার্সি কী ভাবে গোটা দেশকে এক মন্ত্রে দীক্ষিত করে রাখতে পারে।
মানে গ্যারিঞ্চা স্টেডিয়ামে যেন হলুদের দিওয়ালি পালিত হচ্ছিল। লাল সব গ্যালারি আসনগুলো তার ওপর হলুদ পড়ে মনে হচ্ছে একসঙ্গে পঞ্চাশ হাজার ইস্টবেঙ্গল জার্সি। পর মুহূর্তেই ওই চিল-চিৎকার আর টানা চলতে থাকা গানে বোঝা যাচ্ছে এটা আর যাই হোক, কলকাতা ময়দান নয়। টিম নামতে না নামতেই গ্যালারি গত ক’দিনের অভিমান ভুলে হলুদ আবেগের ঢল নামিয়ে দিল মাঠে। আর সেই হলুদ-বিস্ফোরণেই যেন উড়ে গেল ক্যামেরুন। সময়-সময় স্কোলারির ব্রাজিল যে সব ঝলক দেখাল, তা একদা তাঁর সোনার টিমের কাছে পাওয়া যেত!
কিন্তু হলুদ যদি ব্রাজিলিয়ান জয়োচ্ছ্বাসের রং হয়, দুর্ভাবনার রং তবে কী? কালচে? সেটাও টুকরোটাকরা এমন বেরিয়ে পড়ল যে, শনিবারের বিপক্ষ চিলি টিভিতে খেলা দেখতে দেখতে অবধারিত ছকে নিয়েছে।
বিস্তীর্ণ এই হলুদ সাম্রাজ্যের সম্রাট হিসেবে সোমবার আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মপ্রকাশ করলেন নেইমার দ্য সিলভা। ক্যাপ্টেনের আর্মব্যান্ড কে পরে রয়েছে তার নিকুচি করেছে। ব্রাজিল টিমের পুতাগ্নি হিসেবে বরাবর পেলের আমল থেকে যা বিবেচিত হয়ে এসেছে, সে দশ নম্বর জার্সি আগেই তাঁকে দেওয়া হয়েছিল। গ্রুপ লিগের শেষ ম্যাচে এসে পেলেন জনতার গর্জন, যা এতই দুর্লভ যে ভারতীয় ক্রিকেটের এত বছরের ইতিহাসেও মাত্র একজনের জন্যই বরাদ্দ ছিল। নে-ই-মা-র, নে-ই-মা-র। এই যা চিৎকার ব্রাসিলিয়া তুলে দিল তার রেশ নির্ঘাত বিশ্বকাপ জুড়ে ব্রাজিল থাকাকালীন স্টেডিয়ামগুলোয় চলবে।
সাংবাদিক সম্মেলনে ক্যামেরুন কোচকে জিজ্ঞেস করা হল ব্রাজিল ৪-১ জিতলেও তারা কি বড্ড বেশি নেইমার মুখাপেক্ষী নয়? জার্মান কোচ বললেন, ”এই উত্তর আমার পক্ষে দেওয়া ঠিক হবে না।” সবাই বুঝল তিনি কী বলতে চাইছেন এবং সেটাই অমোঘ।
আর্জেন্তিনা মানে যদি লিওনেল মেসি এবং দশ জন হয়।
ব্রাজিল হল নেইমার, দাভিদ লুইজ এবং বাকি নয় জন।
আর ব্রাজিলকে জেতাতে হলে একা নেইমার। নক আউট পর্বে এসে গিয়ে এখন আর প্রশ্নটা এমন নয় যে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিততে পারবে কি না?
প্রশ্নটা হল নেইমার ব্রাজিলকে কাপ দিতে পারবেন কি না? সত্যিই তাঁকে আটান্ন-র পেলের ছায়া মনে হচ্ছে। অসম্ভব খাটছেন। এত জায়গা বদলাচ্ছেন যে তাঁকে মার্ক করা সম্ভব নয়। বডি ফেইন্টিং অসম্ভব ভাল। ড্রিবলের কাজ ভাল। শরীরের মোচড়ে ভারসাম্য যখন-তখন যে দিকে নিয়ে যেতে পারেন। আর এত ফিট লাগছে যে বার্সিলোনায় কেন মরসুমটা ভাল যায়নি সময় সময় রহস্য মনে হবে। নাকি তিনি দেশের জার্সিতে প্রথম বিশ্বকাপ বলে অনেক বেশি অনুপ্রেরণা অনুভব করছেন? ক্যামেরুন তাঁর প্রথম গোল শোধ দেওয়ার পর যে আধিদৈবিক-নীরবতা স্টেডিয়ামে তৈরি হয়েছিল, নেইমার দ্রুতই সেই অসাড় ভাবটা সারিয়ে দিলেন দ্বিতীয় গোলটা করে।
১৯৫৮-র সঙ্গে ২০১৪-র একটাই গরমিল! পেলের পাশে ডিডি, ভাভা, গ্যারিঞ্চা, জালমা সান্তাোসরা ছিলেন। স্যান্টোসের সতেরো বছরের একটা ছেলেকে তাঁরা পরিচর্যায় রেখে প্রস্ফুটিত হতে দিয়েছিলেন। আধুনিক স্যান্টোসের এই ছেলেটিও সংসারের সর্বকনিষ্ঠ। আবার তাঁকেই কি না একা পরিবার টানতে হচ্ছে! পেলের ছিল গ্যারিঞ্চা। নেইমারের আছে ফ্রেড। যাঁকে ফুলবাবু বললেও কম বলা হল।
নেইমার-সর্বস্বতা ভবিষ্যৎ আতঙ্কের কারণ হতে পারে কি না জিজ্ঞেস করায় স্কোলারি যেন রুষ্টই হলেন। বললেন, ”আর্জেন্তিনাও তো একই ভাবে মেসির ওপর নির্ভরশীল। বড় প্লেয়াররা যে কোনও টিমেই আলাদা তফাত করতে জানে।” তা বলে তারা তো আর একা খেলে না। ডিফেন্স খারাপ খেলেছেও কিছুতেই মানবেন না। ব্রাজিলীয় কোচ। ঘটনা হল তাঁর রক্ষণের ডান দিকটা প্রায়ই কাজ করছে না। ক্রোয়েশিয়া দানি আলভেজের দিক দিয়েই গোলটা পেয়েছিল। সোমবার ক্যামেরুন একটা সময় মুহুর্মুহু আক্রমণ তুলল ওই দানি আলভেজের দিক থেকেই। তা-ও তো স্যামুয়েল এটোকে চোটের জন্য এক মিনিটও খেলাতে পারেনি ক্যামেরুন। চিলি টিমে কিন্তু এমন অপরিহার্য একজন কেউ নেই। অনেকেই দ্রুত আক্রমণ তৈরি করতে পারে।
সেই শহরেই ব্রাজিল-চিলি সাক্ষাৎ হচ্ছে যেখানে মাত্র এক বছর আগে একই প্রতিপক্ষকে হারাতে না পেরে দিয়াগো সিলভারা প্রচুর ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের শিকার হয়েছিলেন। সে দিন অবশ্য বেলোর জনতা সবচেয়ে রুষ্ট ছিল নেইমারের উপর।
এই বাজারে সেটা হবে না। গ্যারিঞ্চাও তো নিজের স্টেডিয়ামে বসে দেখে নিলেন, নেইমার ছাড়া টিমটার কোনও গতি নেই। হারালে নেইমার। জেতালেও নেইমার। নেইমার এখন ব্রাজিলের মেসি!
ব্রাসিলিয়া, ২৫ জুন
