ব্রাজিল ২০১৪ – ১
ব্রাজিলের বিচ্ছু
ব্রাজিল মানেই তো চেতনায় শিহরন!
ব্রাজিল মানে পেলে।
ব্রাজিল মানে সাম্বা।
ব্রাজিল মানে দুর্ধর্ষ সব সি-বিচ আর বিকিনিখ্যাত সুন্দরীর ঢল।
ব্রাজিল মানেই ওং শান্তি… ওং ভোগ… ওং এনজয়।
কে জানত ব্রাজিল মানে যে সত্যি সত্যি মন্দার বোস বর্ণিত ব্রাজিলের বিচ্ছু?
নেইমারের দেশে বিশ্বকাপ কভারেজে যাচ্ছেন এমন সব সাংবাদিককে স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে রয়টার্স গ্লোবাল সংস্থার প্রধান একটি ই-মেল পাঠিয়েছেন। এটা ৩১ মার্চ পাঠানো হলে না হয় অন্য রকম ভাবা যেত যে ‘এপ্রিল ফুল’ করতে। এখন ও সবের কোনও অ্যালাওয়েন্স নেই। মাইক কলেট নামক ফুটবল দুনিয়ায় অত্যন্ত প্রভাবশালী পদাধিকারী মেল-এ যা লিখেছেন, মোটামুটি তারই প্রতিবিম্ব বিলেতের ইংরেজি কাগজগুলোর বিশ্বকাপ পর্যটকদের জন্য দেওয়া টিপসে।
১) প্রকাশ্য দিবালোকে ছিনতাই হয়ে যেতে পারে আপনার ওয়ালেট, ফোন। অথবা ল্যাপটপ। খুব সাবধানে থাকুন।
২) আপনার সর্বস্ব কেড়ে নেওয়া হচ্ছে দেখলে টুঁ শব্দটি করবেন না। কোনও রকম বাধা দেবেন না। ওরা যা চাইছে, কথা না বলে ওদের হাতে তুলে দিন।
৩) বেশি দামি জামাকাপড় পরে ওদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন না। রাস্তায় ফোনে কথা বলতে বলতে হাঁটবেন না।
৪) রাস্তায় হেডফোনে গান শুনতে শুনতে হাঁটবেন না। ব্রাজিলের রাস্তা আর যা-ই হোক রিল্যাক্স করার জায়গা নয়।
৫) এটিএম মেশিন থেকে টাকা তোলার সময় খুব সতর্ক থাকবেন। ব্রাজিলে ডেবিট কার্ড জালিয়াতি ঘরে ঘরে। বিদেশিরা এয়ারপোর্ট এটিএমে টাকা তোলার সময় জানতেও পারবেন না, কার্ডটা যে তাঁদের অজান্তে কপি হচ্ছে।
৬) পাসপোর্ট নিয়ে রাস্তায় বেরোবেন না। একমাত্র প্রেস পাস সংগ্রহ করার দিন পাসপোর্ট আনবেন। তারপর ওটা যেন ব্যাঙ্কের লকারে থাকে।
৭) ক্রেডিট কার্ড সঙ্গে নিয়ে না ঘোরাই ভাল। ঠিক যত টাকা দরকার সেটা সঙ্গে রাখুন। সবচেয়ে ভাল হয় দু’টো ওয়ালেট ব্যবহার করতে পারলে। দু’টোতে টাকা যেন অল্প অল্প করে ভাগ করা থাকে।
৮) রাত্তিরে পারতপক্ষে একা বের হবেন না। বার-এ গেলেও বেশি মদ খাওয়ার দরকার নেই। কারণ, আপনাকে যে সব সময় সাবধান থাকতে হবে।
৯) প্রধান সড়ক ধরে চলুন। ব্রাজিল এমন অদ্ভুত দেশ, যেখানে আকাশচুম্বী ঐশ্বর্য আর অতলস্পর্শী দারিদ্র পাশাপাশি হাঁটে। একটা দারুণ অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকের পাশে লুকিয়ে থাকতে পারে সবচেয়ে সাংঘাতিক বস্তি। একটা ভুল মোড় ঘুরলেই কিন্তু সমস্যা।
১০) ট্যাক্সি যদি নিতেই হয় নিজের হোটেল বা ট্যাক্সি স্ট্যান্ড থেকে নিন। এয়ারপোর্টেও তাই।
১১) মেট্রো বা বাসে পকেটমারদের থেকে সাবধান।
১২) হোটেলে ঘরে নক হলেও উল্টো দিকে কে আছে ভাল করে না জেনে দরজা খুলবেন না।
১৩) কোনও বিচ বা পার্কে সন্ধের পর হাঁটাহাঁটি না করাই ভাল।
১৪) ট্যাক্সির পিছনে বসে ল্যাপটপ, আই ফোন বা আই প্যাডে কাজ করবেন না। মোটরবাইকে ছিনতাইবাজরা ঘোরে। আর ট্রাফিক জ্যামের অপেক্ষায় থাকে।
১৫) প্রেসবক্সে নিজের জিনিসের উপর সব সময় নজর রাখবেন। লাতিন আমেরিকায় স্টেডিয়ামের সংরক্ষিত এলাকা থেকে চুরি ব্যাপারটা খুব চালু। প্রেস রিপোর্টার হিসেবে কোনও দুষ্কৃতকারী ঢুকেছে কি না কী করে বুঝবেন। তাই সাবধানের মার নেই।
১৬) ব্রাজিলে রিওর মতো শহরে সন্ধে নামে খুব তাড়াতাড়ি ছ’টা বাজতে না বাজতেই। অন্ধকারে সতর্ক থাকুন।
এর পর অসাধারণ এই দেশে উপভোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে…কিন্তু এই ষোলো দফা পড়ার পর উপভোগ?
স্বাগত সাও পাওলো…স্বাগত বিশ্বকাপ। অস্বাগত ব্রাজিলের সব বিচ্ছুর দল।
দুগ্গা দুগ্গা!
সাও পাওলো, ৯ জুন
ব্রাজিলের কাছে পেলে আজ নতুন নিরো
নাহ। এমিরেটস এই বিশ্বকাপের অফিশিয়াল এয়ারলাইন হলে কী হবে,মেনুতে সেই আইটেমটা কোথাও খুঁজে পেলাম না। ব্রাজিলের কোনও কোনও শহরে যা নাকি এখন ঢালাও বিক্রি হচ্ছে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো স্যান্ডউইচ।
এককালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ পর্যটন বিভাগ বার্বেডোজগামী যে কোনও বিমানে লাইভ নাচের ব্যবস্থা রেখে যাত্রীদের তাক লাগিয়ে দিত। এখানে তেমন কোনও সাম্বা-বিলাসের ব্যবস্থা দেখা গেল না। দুবাই থেকে ‘মাত্র’ ষোলো ঘণ্টার যে ফ্লাইটটা আদ্দিস আবাবা, দার-এস-সালাম, চাঁদের পাহাড় সব পিছনে ফেলে অ্যাটল্যান্টিক অতিক্রম করে সাও পাওলো এসে নামল— তা বলতে গেলে বিশ্বকাপ চার্টার্ড-ই। অথচ কোথাও উপচে পড়া প্যাশন নেই। আছে প্রযুক্তি, প্রচার আর অনবরত কাপের খবর সম্পর্কে লাইভ স্ট্রিমিং।
সারাদিনটা প্লেনে কাটিয়েও আপনি দিব্যি জেনে যাবেন, ক্যামেরুন ফুটবলারদের সঙ্গে তাঁদের ফেডারেশনের বোনাস নিয়ে শেষ মুহূর্তে কী ঝামেলাই না লেগেছিল। বা দেল পিয়েরো যে বলেছেন, রুনিকে এত বেপাত্তা করে দেবেন না। আমার তো মনে হচ্ছে ওর হাতেই ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ লুকিয়ে আছে।
বিমানযাত্রার দীর্ঘ সময়টা বহু দিন পর ‘ধুম-২’ বা ‘ডে অব দ্য জ্যাকল’ দেখে কাটাবেন যদি ভেবে রেখে থাকেন, সেই ভাবনাকে হারিয়ে দিতে টাচ স্ক্রিনে বারবার ভেসে উঠছে বিশ্বকাপ। ভেসে উঠছে পেলে আর রোনাল্ডোর মুখ।
পাশে বসা যাত্রী ব্রাসিলিয়া-য় থাকেন। পেশায় আর্কিটেক্ট। টিভিতে পিট বুলদের অফিশিয়াল গানটা দেখাচ্ছে। মুখ কুঁচকে বললেন, ”কোনও গানই হয়নি। ব্রাজিলিয়ান মিউজিকের সেই হট-হট ব্যাপারটা কোথায়? এর চেয়ে আগের বার শাকিরার ওয়াকা ওয়াকা অনেক ভাল হয়েছিল।” তরুণ আর্কিটেক্টের নেশা হল ইউটিউব থেকে সারা পৃথিবীর দোলা দেওয়া সব গান সংগ্রহ করা। এ ভাবেই প্রথম শোনেন ‘কাজরা রে’। আজও তাতে মুগ্ধ। বললেন, ”ফিফা যা তা করছে। বরং ওই ভুলভাল গানটা তৈরির পর আনঅফিশিয়াল কিছু কাপ-সং হয়েছে। শুনে দেখতে পারেন।”
ডান দিকের আইল সিটটা প্রৌঢ় নিজে থেকেই পরিচয় দিলেন। ইনি মনোবিদ। সাও পাওলো শহরতলিতে প্র্যাকটিস করেন। পেলের চেয়ে ঠিক দু’বছরের ছোট। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে এর পর তিনি বিশ্বকাপের আসর বসানোর জন্য ফিফার মুণ্ডপাত শুরু করলেন। যোগ দিলেন তাঁর স্ত্রী। চারপাশে আরও কিছু মুখ। মাঝ আকাশেই মনে হতে লাগল, পেলের দেশে এখন গণভোট নেওয়া হলে ফিফা-র অবস্থা রাজ্য নির্বাচনে বুদ্ধ-বিমানদের মতো হবে।
পরে বুঝলাম, তখনও আসলে কিছুই শোনা হয়নি। পর্দায় পেলের অলৌকিক সব ড্রিবলগুলো দেখাচ্ছে। প্রৌঢ় ডাক্তার বলতে লাগলেন, ”আমরা একই সঙ্গে বেড়ে উঠেছি। তুমি আমায় পেশেন্ট অবধি পাঠিয়েছো। আমাদের দেশকে কোথায় নিয়ে গ্যাছো। তিয়াত্তর বছর বয়সে এটা কী করলে! সমস্ত সম্মান বিকিয়ে দিলে ফিফা থেকে কিছু ডলার পাবে আর এই সরকারের পা চাটবে বলে?”
ব্রাজিলীয়রা এর পর বলা শুরু করলেন, ”সর্বনাশ হয়ে যাবে টিমটা চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলে। নভেম্বরে ভোট আসছে। আমাদের মহিলা প্রেসিডেন্ট স্রেফ ওই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার তোড়ে আবার ক্ষমতায় এসে যাবেন। ধ্বংস হয়ে যাবে ব্রাজিল!”
আলোচনায় বিস্ফারিত লাগলেও মনে হচ্ছিল, এটা কখনও সমগ্র ব্রাজিলবাসীর মনোভাব হতে পারে না। মনে হচ্ছিল, সহযাত্রীরা নির্ঘাৎ সমাজের উপরতলার লোক! ব্রাজিলের যে জনতা খেলাটাকে এত বছর মহাকাব্যিক স্তরে তুলে রেখেছে, এটা সেই জনগণের আওয়াজ হতেই পারে না।
জাম্প কাট।
সাও পাওলোর ব্র্যান্ড নিউ এয়ারপোর্ট টার্মিনালে বরাবরের মতোই অব্যবস্থা। মালের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষায় পশ্চিমিরা উত্তেজিত হয়ে পড়েছেন। ভারতীয়রা মনে মনে এয়ার ইন্ডিয়ার সাবেক যুগে ফেরত। ফিফার গেঞ্জি গায়ে কিছু লোক ঘুরছে ঠিকই। কিন্তু ফিফার হেল্প-ডেস্ক যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। মনে হল, ব্রাজিলে তো এই সব হওয়ারই কথা। ব্রাজিলে আবার কবে অঙ্ক কাজ করেছে! এটা তো প্যাশনের দেশ।
সেই দেশের রাস্তার দু’ধারে শপিং মলগুলোয় চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট উঁচু উঁচু ব্রাজিলীয় জার্সি। চারদিক হলুদ রংয়ে ভরা। রাজপথে গাড়ির উপর হলুদ পতাকা।
কিন্তু মানুষের মনে হলুদ রং কোথায়? সেখানে তো ফেটে বেরোচ্ছে তীব্র বিদ্বেষ।
সাও পাওলোর অন্যতম অভিজাত এলাকা জার্ডিনসের পর্তুগিজ রেস্তোরাঁয় যে ছেলেটি পরিবেশন করছিল, তাকে দেখলেই মনে হয় কখনও ফুটবল খেলত! এ আদ্যন্ত ‘মাস’ না হয়ে যায় না। কিন্তু তার মুখেও তো একই কথা। ”ফুটবল আমাদের এত ভালবাসার জিনিস। তা বলে আমাদের জীবনের চেয়ে বড় নয়।” দেশে চাকরি নেই। টাকা নেই। ছাঁটাই চলছে। তার মধ্যে কোটি কোটি ডলার খরচা করে স্টেডিয়াম! স্টেডিয়াম কি খাওয়া যায়?” ছেলেটি ‘আনন্দের’ খবর দিল, সোমবার সপ্তাহের প্রথম দিনেও নাকি বিশ্বকাপ প্রতিবাদের অংশ হিসেবে মেট্রো স্ট্রাইক। মানে মানুষের দুর্ভোগ চরমে।
বোঝাই যাচ্ছে, বিরোধী রাজনৈতিক দল সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে এটা করাচ্ছে। কিন্তু ফুটবলপ্রেমী মানুষের তো উচিত এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো! তা হলেই তো রোম্যান্স আবার রোম্যান্সের জায়গায় ফেরত আসতে পারে! বাকি বিশ্বের কাছে ব্রাজিলের ভাবমূর্তিও বিপন্ন হয় না!
শুনে খেঁকিয়ে উঠলেন চার তারা হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্ক কর্মী। সাধারণত হোটেলে যারা কাজটাজ করেন, তাঁদের সম্পর্কে বলা হয়, চাকরিতে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে দু’টো জিনিস তাঁদের ছাড়তে হয়। উত্তেজিত হওয়া আর তীব্র ব্যক্তিগত মতামত দেওয়ার অধিকার। হোটেল কর্মীর রাগ থাকলে চলবে না। মতামতও নয়। এইচ বি হোটেলস নাইন্টিতে যার সঙ্গে কথা বলছি, তার হয় সেই ট্রেনিং হয়নি! বা মনে রাখা এখন প্রয়োজন বলে মনে করছে না।
টিভিতে পর্তুগিজ কিছু লেখা দেখাচ্ছে। তার তলায় ফুটবল। নিজেই তর্জমা করে দিল—ওয়েলকাম। আবার সেই ছবি—পেলে ড্রিবল করে যাচ্ছেন সত্তরের বিশ্বকাপে। তরুণ বলল, ”এই রকম খারাপ সময়ে কেউ বিশ্বকাপ আয়োজন করে? আমাদের প্রেসিডেন্ট মহিলা না-হয় উন্মাদ! কিন্তু পেলে? তিনি কী করে সায় দিচ্ছেন? নাকি রোম পুড়ছে আর সম্রাট নিরোর মতো উনিও বেহালা বাজানোটা উপভোগ করছেন!”
হোটেল থেকে চেক আউট করে বার হচ্ছেন ব্রাজিলীয় মহিলা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন থাকার সুবাদে ইংরেজিটা গড়গড় করে বলতে পারেন। পেলে নিয়ে আলোচনা শুনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তার পর বললেন, ”ফুটবলার পেলে হিসেবে পেলের সর্বত্র মূর্তি গড়া উচিত। আর গড়ার পর মানুষ হিসেবে ওঁর কাজকর্মের জন্য সেগুলো ভেঙে ফেলা উচিত।” দেশে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে। শিক্ষাখাতে টাকা নেই। মহিলারা রাতে রাস্তায় বের হতে নিরাপদ বোধ করে না। আর তুমি, দেশবরেণ্য পেলে, বিশ্বকাপের বিজ্ঞাপন করছ?
শুনে ফের স্তম্ভিত লাগল। পেলে যত না ব্রাজিলের, তার চেয়েও বেশি তো সাও পাওলোর। সাও পাওলো যদি কলকাতা হয়, পেলের স্যান্টোস হল শক্তিগড়। পৌনে দু’ঘণ্টার রাস্তা। সেখানে দাঁড়িয়ে কী শুনছি? ব্রাজিলীয়রা এ সব কী বলছে! আইটি-র যে লোকটিকে এর পর পাওয়া গেল, সে দু’টো ম্যাচের টিকিট জোগাড় করে বন্ধুমহলে তীব্র বিক্ষোভের সামনে পড়েছে। বন্ধুরা মনে করে, নীতিগত কারণে টিকিট দু’টো তার ছেড়ে দেওয়া উচিত। দেশ সবার আগে। এমনকী ফুটবলেরও।
পেলের দেশে গোটা একটা দিন কাটিয়ে ফেলার এই প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় মন সায় দিতে চাইছে না। নিশ্চয়ই এর ও-পিঠে বরাবরের মতো উদ্দাম সমর্থক বাহিনী হলুদ ঝড় নিয়ে অপেক্ষায় থাকবে। র্যান্ডম স্যাম্পলিংয়ে শেষমেশ নিশ্চয়ই দেখা যাবে—দেশ দ্রুত হেরে যাক, এমন উচ্চচাভিলাষীদের সংখ্যা অনেক কম ছিল!
কিন্তু বিদ্বেষের যে সব মুখ দেখলাম, তাকেই বা অগ্রাহ্য করি কী করে? স্যাম্পল হিসেবে যত ছোটই হোক, এটুকু তো দেখা যাচ্ছে যে, পালস রেটে অশান্তি আছে ব্যাপক। এক-এক সময় মনে হচ্ছে ফ্রেড, নেইমার বা অস্কারদের তা হলে বিপক্ষ ডিফেন্সের সঙ্গে ধারাবাহিক ভাবে আরও একটা ম্যাচ জিততে হবে। এমন দুর্ধর্ষ খেলে দেশবাসীর মন ভরিয়ে দিতে হবে, যাতে বিদ্বেষে বদলে যাওয়া পুরনো প্রেম আবার ফেরত আসে!
অর্থাৎ শুধু মেসি-রোনাল্ডোদের হারালেই চলবে না, আরও বড় ম্যাচে জয় চাই। ব্রাজিলীয় ফুটবল রোম্যান্সকে ফিরিয়ে দিতে হবে তার পুরনো বেদীতে।
১২ জুন থেকে ব্রাজিলে দু’টো বিশ্বকাপ শুরু হচ্ছে!
সাও পাওলো, ১০জুন
পূর্ণিমার ব্রাজিলে ফুটবল যেন ঝলসানো রুটি
না, বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টা আগেও এরিনা করিস্থিয়ানসের ভিতরটায় ঢোকা গেল না। ওয়ার্ল্ড মিডিয়াকে ঢুকতে দেওয়াই হল না!
অথচ মিডিয়া সেন্টারে যেতে মাঠের পাশ দিয়ে গিয়েই একপ্রস্থ নীচে নামতে হয়। সেটা আপাতত টিনের ফেন্সিং দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। পাশ দিয়ে সাংবাদিকদের অন্য অস্থায়ী রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। যেখান দিয়ে হেঁটে গেলে মাঠের ভিতর কী চলছে দেখতে পাওয়া বা ছবি তোলার কোনও সুযোগ নেই।
চোখ বা ক্যামেরার শাটার না-হয় বন্ধ করা গেল। কিন্তু কান? সারাক্ষণ ঠুকঠাক, ধুপধাপ, শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা— এ সব তো বোঝাই যাচ্ছে। বারবার মনে পড়ছে দিল্লির কমনওয়েলথ গেমস। শুরুর দু’দিন আগে গেমস ভিলেজে গিয়ে অবিকল এক অবস্থা দেখেছিলাম। তফাতের মধ্যে কলমডী কলঙ্কিত গেমসের সঙ্গে ভারতীয় জনগণের এমন উত্তেজিত আইডেন্টিফিকেশন ছিল না। তীব্র ঘৃণাই করুক বা রোম্যান্সে জড়িয়ে ধরুক, দেশের মাঠে বিশ্বকাপের সঙ্গে ব্রাজিলের নাড়ির টান।
স্টেডিয়ামের উত্তর দিকের কোনায় অনেক উঁচুতে কোনও বিক্ষোভকারী লিখে গিয়েছে, ফ… ওয়র্ল্ড কাপ। ইংরেজি চার বর্ণের সেই শব্দ, যা ব্যবহার করলে আজও অন্তত হাইস্কুল থেকে বিতাড়ন অবশ্যম্ভাবী।
আবার এরিনা করিস্থিয়ান্সের খুব কাছে পরপর বাড়িগুলোতে সযত্নে ঝুলছে হলুদ জার্সি। কোনও কোনও বাড়ি হলুদ টুকরো কাপড় দিয়ে লম্বা করে সাজিয়েছে। ধনী-দরিদ্র সেখানে মিলেমিশে একাকার। একটু পরপর পেট্রোল পাম্প। সেখানে উপর থেকে বল ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার উপর আলো পড়ে মনে হচ্ছে, গোটা সাও পাওলো শহর বুঝি হাসছে। এই যেন পার্টি আর সাম্বা শুরু হবে।
পরক্ষণেই ছন্দপতনের মতো দ্রুত হাজির হয়ে যাচ্ছে দেওয়াল লিখন। সাও পাওলোর বৈশিষ্ট্য হল, শহর জুড়ে গ্রাফিতি। সামনের দেওয়াল জুড়ে এই যে রোনাল্ডোর ছবি কালো করে দেওয়া, নিশ্চয়ই নিন্দাসূচক কিছু। ঠিক তাই—স্থানীয় ভলান্টিয়ার লজ্জিত ভাবে বোঝালেন, ”এটা রোনাল্ডোরই দোষ। ফুটবল মাঠেই ভাল। তার বাইরে মুখ্যু। সেটা তো নিজের বোঝা উচিত। নইলে কেউ বলে, জাতির জন্য হাসপাতালের চেয়ে বেশি দরকার স্টেডিয়াম? তার পর থেকেই না ওর পিছনে সবাই এত লেগেছে!”
প্রেস পাস তুলতে গিয়ে মঙ্গলবার দাঁড়িয়েছিলাম দেড় ঘণ্টা। সভ্য ইভেন্টে লাগা উচিত পাঁচ থেকে সাত মিনিট। কিন্তু কিছু করার নেই। সবার এক অবস্থা। দেশ-বিদেশের তাবড় তাবড় সাংবাদিক লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে সেই এক ব্যাখ্যা শুনে গেলেন, ”সরি, আজ মেট্রো স্ট্রাইকের জন্য আমাদের অর্ধেক ভলান্টিয়ার কাজে আসেনি।” আর যারা এসেছে, তাদের অর্ধেক ইংরেজি জানে না। মুকাভিনয় ছাড়া এদের সঙ্গে কোনও রাস্তা নেই। খেতে যাবেন, দরজা খুলবেন, বেরোবেন, খাবার অর্ডার দেবেন—সর্বত্র ভাষা সমস্যা। ‘প্লেন ওয়াটার’ বলাতে কাল রাত্তিরে বড় রেস্তোরাঁয় কাপে করে গরম জল এনে দিল। না, না এটা নয়। রুম টেম্পারেচার ওয়াটার। কর্মীটি একগাল হেসে মাথা নাড়াল। ফিরে এল বিয়ারের বোতল নিয়ে।
মাসখানেক আগে কলকাতা থেকে ফুটবল মার্কেটিংয়ের সঙ্গে যুক্ত একটা ছোট দল সাও পাওলো এসেছিল। যেহেতু এখানে সর্বত্র পর্তুগিজে মেনু লেখা, তাঁরা ‘চিকেন’ বলে ছেড়ে দিয়েছিলেন। খেয়ে কেমন অন্য রকম লাগল। পরের দিন ঠিক করলেন, আর কোনও ঝুঁকি নয়। মুরগির ছবি এঁকে দেবেন, যাতে কোনও সংশয় না থাকে। ছবি দেখে ওয়েটার মাথা ঝাঁকিয়ে চিকেন নিয়ে এল। সন্দিগ্ধ হয়ে কলকাতাবাসীরা ওয়েটারকে ডেকে বললেন, ”কাল যা খাইয়েছিলেন, তার ছবি আঁকো তো ভাই।” ওয়েটারটি সাপের ছবি এঁকে দিল, যা দেখা মাত্র বাঙালিরা কেউ কেউ আতঙ্কে-ঘেন্নায় বমি করে ফেললেন।
প্রশ্ন হল, এমন কোনও আতঙ্কের হাওয়া উদ্বোধনী ম্যাচ ঘিরে আছে কি? এমনিতে বিশ্বকাপের ব্রাজুকা বল মাঠে পড়ছে ভারতীয় সময় রাত দেড়টায়, টেকনিক্যালি ১৩ জুন শুরু হয়ে যাচ্ছে। এখানকার সময় তখন বিকেল পাঁচটা। তার আগে থাকছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। যেখানে ঠিক কী হবে মিডিয়ার কাছ থেকে এখনও আড়াল করে রাখা হয়েছে। ঠারেঠোরে শুধু বলা হচ্ছে, দুর্ধর্ষ রকমের চোখ ধাঁধানো কিছু হবে। ছ’শো নৃত্যশিল্পী নাকি রোজ অনুশীলন করছেন। আজ-কালের ভিতর তাঁদের ড্রেস রিহার্সাল।
কিন্তু ব্রাজিলীয় জনগণের এই মুহূর্তের যা মুড মিটার, চোখ ঝলসে দেওয়া উদ্বোধন অনুষ্ঠানেও রক্ষা পাওয়া যাবে না। ব্রাজিলকে জবরদস্ত জিততে হবে। সেই সত্তর সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপের তাদের প্রথম ম্যাচে দুইয়ের বেশি ব্যবধানে জেতেনি সেলেকাও-রা। ক্রোয়েশিয়া তাদের জন্য কী বাণী নিয়ে আসবে, কেউ জানে না।
হরেক রকম পূর্বাভাস চলছে ম্যাচ নিয়ে। কেউ বলছে ২-০। কেউ বলছে ব্রাজিল আরও বেশি। কেউ আবার বলছে ১-১ না হয়। জনপ্রিয় চাহিদা হল নেইমারের প্রথম গোল।
গত বছর কনফেডারেশনস কাপ উদ্বোধনীতেও প্রথম গোল করেছিলেন নেইমার। খেলার মাত্র তিন মিনিটে। জাপানকে স্তম্ভিত করে তাঁর পঁচিশ গজের অতর্কিত ভলি জালে জড়িয়ে যায়। নেইমারের গোল দিয়ে শুরু করতে চাওয়াটা আসলে একটা সংস্কার। ব্রাজিল যে অমন পরাক্রান্ত স্পেনকে ফাইনালে ৩-০ গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। নেইমার দ্য সিলভা-র প্রতিটি মুভমেন্ট তাই বিষ্যুদবার ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই সবাই চোখে চোখে রাখবে।
ভালভাবে জিতলে নিশ্চয়ই বারুদের এই স্তূপের উপর দিয়ে ফুর্তির তুফান বইবে। কিন্তু খারাপ কিছু ঘটলে? বিদেশ বিভুঁইয়ে বাঙালির সাপ খেয়ে ফেলার আতঙ্ককেও না তখন ছেলেখেলা মনে হয়!
সাও পাওলোর মেয়র কে জানি না। বিশ্বকাপ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে সব সময় দেশের ক্রীড়ামন্ত্রীকেই দেখা যায়। কিন্তু মেয়র যিনিই হোন না কেন, বিশ্বকাপ প্রোমোশনে দুর্দান্ত কাজ করেছেন। সাও পাওলো শহরটা এমনিতে ব্রাজিলের ফ্যাশন, আর্ট, কবিতা সব কিছুর লীলাভূমি। আকাশ ছোঁয়া সব বাড়ি আছে। পাহাড় আছে। দু’টো নদী আছে। নিজস্ব কোনও বিচ নেই বা লস অ্যাঞ্জেলেসের মতো পামগাছও নেই। কিন্তু রাস্তায় রাস্তায় আর্টিস্টরা বসে ছবি আঁকছেন। বিশাল সব আর্ট গ্যালারি। পৃথিবীর তাবড় সব ব্র্যান্ডের দোকানে লোকে হেসেখেলে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখলে অবাক লাগবে, তা হলে ক্রাইম রেট এত বেশি কী করে হয় এখানে? সবই তো স্বাভাবিক লাগছে।
আধুনিক ব্রাজিলের বোধ হয় এটাই সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। তার অন্তরঙ্গ আর বহিরঙ্গের স্ববিরোধ।
নাকি এই বিশ্বকাপেরও?
কালকেই টিভিতে দেখছিলাম, স্কোলারি বলছেন, ব্রাজিল খেলা শুরু করবে ঘণ্টায় একশো মাইল গতিতে। কোনও কোচের মুখে কখনও একটা নির্দিষ্ট গতিতে প্রথম মিনিট থেকে খেলা শুরুর কথা শুনিনি। চোখের সামনে যেন দেখছিলাম, ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে প্রথম পনেরো মিনিট হয়ে গিয়েছে। দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রসঙ্গীত— নীল দিগন্তে ওই ফুলের আগুন লাগল, বসন্তে সৌরভের শিখা জাগল… ব্রাজিলের ফুটবল মানেই তো কবিতা আর গান।
অথচ মঙ্গলবার সকালে ওঠা মাত্র হোটেলের রিসেপশনিস্ট বললেন, ”তাড়াতাড়ি বেরোবেন না আজ। শুনছি আজও মেট্রো স্ট্রাইক আর জায়গায় জায়গায় অবরোধ।”
হায়, ব্রাজিলেও পৃথিবীর এমন গদ্যময় হয়ে গেল যে তার এত বছরের পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি দেখছে।
সাও পাওলো, ১১ জুন
বাকিরা যা বলুক, নিজের মহল্লায় পেলেই বাদশা
স্যান্টোস ক্লাব মিউজিয়ামের ভেতরে কর্মীরা এখন এডিনহোকে নিয়ে প্রকাশ্য মস্করায় মেতেছেন। বিচের কাছেই একটা বাড়ি কিনে
দিয়েছিলেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত বাবা। সেখানে তাঁকে পাওয়ার অবশ্য কোনও উপায় নেই। মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অপরাধে ক’দিন আগেই তেত্রিশ বছরের জেল হয়েছে পেলে-পুত্রের।
তিয়াত্তর বছর বয়সে এসে এই প্রথম বার পেলে নিজেও যে বিশ্বকাপ-বিতর্কে আক্রান্ত। এরিনা করিন্থিয়ান্সের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ব্রাজিলীয় দর্শক বরাবরের মতো তাঁকে বরণ করে নেবে কি? নিশ্চিন্ত থাকার উপায় নেই।
কিন্তু নিজের ভিটেয়?
এডিসন আরান্তেস দ্য নাসিমেন্তাো আজও অফুরান। সাময়িক দুর্যোগের এই ঘনঘটাতেও নিজের পাড়া তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি। কোনও দিন ছাড়বে বলেও মনে হয় না। বুধবার সাও পাওলো থেকে একাশি কিলোমিটার দূরের এই বন্দর শহরে চক্কর দিয়ে মনে হল— বাকি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট যিনিই হোন না কেন, এই মহল্লায় পেলেই রাজা। এটা নিখাদ পেলে-সভ্যতা।
মিউজিয়ামকে এরা লেখে মেমোরিয়াল। সেই স্যান্টোস মেমোরিয়ালের ভিতর পনেরো বছরের কিশোরের দাঁত বার করা একটা ছবি আছে। সে বারই তার প্রথম স্যান্টোসে আসা। আর মাঠের ঠিক টঙে আর একটা দাঁত বার করা ছবি। তফাতের মধ্যে প্রথমটা স্যান্টোস জার্সিতে। দ্বিতীয়টা ক্রেডিট কার্ডের মডেল হয়ে।
পেলেকে পশ্চিমি প্রেস বলে থাকে, ‘ওয়াকিং বিল বোর্ড।’ খেলা ছাড়ার সাঁইত্রিশ বছর পরেও বিজ্ঞাপন জগতে তিনি অপ্রতিরোধ্য চুম্বক। পেলের নামে ঘড়ি আছে। পারফিউম আছে। অ্যাপস রয়েছে। সপ্তাহখানেক আগে শুধু তাঁর ছবি দিয়ে হাজার পাতার বেশি যে পর্তুগিজ বইটা বেরিয়েছে, সেটা স্যান্টোস লাইব্রেরিতে পড়ে থাকতে দেখলাম। কিন্তু পেলের লেটেস্ট বই হল, নিজের আরও একটা আত্মজীবনী। ‘হোয়াই সকার ম্যাটার্স’। সপ্তাহখানেক আগে নিউইয়র্কের বইয়ের দোকানে পেলে যখন সেটা সই করতে গিয়েছিলেন, শিয়ালদহ স্টেশনের অফিস টাইমের মতো অবস্থা হয়। লোকে চার ঘণ্টা ধরে লাইন দিয়ে ছিল। শেষমেশ যখন সামনে যেতে পেরেছে, কেউ নির্বাক হয়ে গিয়েছে। কেউ কেঁদে ফেলেছে। কেউ স্রেফ হাত ধরে বসে পড়েছে।
ভিলা বালমিরো-র টঙের বিজ্ঞাপনে পেলেকে অবশ্য বিজ্ঞাপনী মেজাজের বলে মনে হচ্ছে না। এটা যেন নিছকই অনেক উপর থেকে একটা অনুমোদন—এখানে যা কিছু ক্রেডিট সব আমি। যা কিছু ডেবিট সেটাও। এই মহল্লায় আমার আঙুল না হেললে কোনও কিছুই হেলবে না।
পৃথিবীর আর কোন মাঠে কোনও ক্রীড়াবিদের দু’-দু’টো ব্রোঞ্জ মূর্তি পাশাপাশি বসেছে? একটা কম বয়সের আবক্ষ। আর একটা ফুল লেংথ। গোলের পরে তাঁর উল্লাসের চেনা ভাবভঙ্গি সমেত। বিশ্বের আর কোনও অ্যাথলিট জীবিত বা মৃত অবস্থায় গ্যালারিতে নিজের জন্য সংরক্ষিত এনক্লোজারও পায়নি। যা স্যান্টোস ক্লাব দিয়েছে তার সম্পদকে।
আলাদা একটা সুপার ভিভিআইপি ব্লক ভিলা বালমিরোয় নির্দিষ্ট রয়েছে পেলের জন্য। যখনই খেলা দেখতে আসেন এনক্লোজার খুলে দেওয়া হয়। অন্য সময়? বুধবার কোস্টা রিকা প্র্যাকটিস করছিল স্যান্টোস মাঠে। গ্যালারিতে হাজারখানেক কোস্টারিকান সমর্থক দুলে দুলে গাইছে, ওলে, ওলে, ওলে। কিন্তু মাঝখানের ওই সম্ভ্রান্ত জায়গাটার কাছাকাছি যাওয়ার উপায় নেই। ওটা সম্রাটের এলাকা!
এরই মধ্যে কোস্টা রিকা কোচ ডেকে পাঠিয়েছেন এই এলাকার প্রাক্তন ব্রাজিলীয় তারকা ক্লডোয়াল্ডোকে। সত্তরের সেই ব্রাজিলীয় দলের অন্যতম সদস্য ক্লডোয়াল্ডো। ফাইনালে শেষ গোলটা ওভারল্যাপে আসা আলবার্তোকে দিয়ে করিয়েছিলেন পেলে। ইউটিউব খুললে দেখা যাবে, তার আগে চার জন ইতালীয়কে ড্রিবল করতে করতে বলটা বক্সে পাঠিয়েছিলেন ক্লডোয়াল্ডো।
এই মাঠে নেইমার দ্য সিলভাকেও নিয়মিত দেখেছেন ক্লডোয়াল্ডো। কী বলবেন? ”খুব ভাল। আশা করব ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ দিতে ওর বড় ভূমিকা থাকবে।” ছোট উত্তর। পর্তুগিজ থেকে তর্জমা করে দিলেন স্থানীয় তরুণ। আর পেলে? ঝিরঝিরে বৃষ্টির মধ্যেও চোখ জ্বলে উঠল ক্লডোয়াল্ডোর। ”সর্বকালের সবচেয়ে কমপ্লিট প্লেয়ার। স্যান্টোসে ওর সঙ্গে আট বছর খেলেছি। জাতীয় দলে দু’বছর। নিজেকে ধন্য মনে হয় সেই অভিজ্ঞতার জন্য!”
ভিলমা নামক এক মহিলা স্যান্টোস সমর্থকের দেখা পেলাম। অর্ধশতাব্দী ধরে স্যান্টোস টিমের সঙ্গে ঘুরছেন। নেইমার পরিবার এঁর খুব ঘনিষ্ঠ। মোবাইলে নেইমার সিনিয়র-জুনিয়রের সঙ্গে এক গাদা ছবিও দেখালেন। কথায় কথায় অনুযোগ বেরিয়ে এল, নেইমারের জন্য কিছু করেননি পেলে। কিন্তু স্মৃতিতে-ঔজ্জ্বল্যে-মননে পেলে বলতে অজ্ঞান। বিশ্বকাপ বিতর্কে অন্তত এই অঞ্চলে যে পেলের ভোটব্যাঙ্কে হাত পড়েনি, ভিলমার মুখের আভাটাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
দু’জন উৎসাহী তো বিস্ফোরক কথা বলে গেলেন যে, ”আমরা স্যান্টোসকে সমর্থন করি। ব্রাজিলকে নয়।” কেন? ”ব্রাজিল টিম দেশের হয়ে খেলার চেয়ে বিদেশি ক্লাবে কে কত টাকার চুক্তি করবে, তা নিয়েই মত্ত থাকে।” তা হলে আপনারা কার সমর্থক? দু’জনেই বললেন, ”আর্জেন্তিনার। ওরা পুরনো ব্রাজিলের মতো খেলে।”
অবিশ্বাস্য! নেইমার যতই বার্সিলোনা চলে যান, এ মাঠের তো আবিষ্কার। বিশ্বকাপের ভরা বাজার ভিলা বালমিরো-র তো তাঁকে নিয়ে আচ্ছন্ন থাকা উচিত। নেইমার থাকেনও স্যান্টোস থেকে মাত্র এক ঘণ্টা দূরত্বের এলাকায়। তখনই মনে হল, ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে দিলেও স্যান্টোস মুলুকে নেইমার সিংহাসনের দাবিদার হতে পারবেন না। হাজারের উপর গোল শুধু নয়। এখানে পেলের চৌম্বকক্ষেত্র আসলে আরও একটা জায়গায়—অবসর নেওয়া পর্যন্ত ক্লাবের প্রতি নিরঙ্কুশ আনুগত্য! ইউরোপীয় ক্লাব থেকে লক্ষ লক্ষ ডলারের অফার এসেছে। কিন্তু ব্রাজিলের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, ”পেলে হল জাতীয় সম্পদ। জাতীয় সম্পদ কখনও দেশের বাইরে যায় না।”
অবসর নিয়ে পেলে ক’বছর কসমসে খেলেছিলেন। ভিলা বালমিরোয় তাঁর শেষ ম্যাচ কলকাতায় সাতাত্তরের সেপ্টেম্বরে ইডেনে খেলে আসার মাত্র ক’মাসের মধ্যে সে দিন একটা অর্ধ খেলেছিলেন কসমসের হয়ে। একটা স্যান্টোসের।
অথচ মাঠটা সাইজে সিসিএফসির চেয়ে কিছু বড় হবে। পেলের আমলে হাজার দশেক লোক ধরত। এখন ভেতরটা অনেক বাড়িয়েও বিশাল কিছু নয়। বাইরে গাড়ি ঠেলে ভূট্টা বিক্রি হচ্ছে। উল্টো দিকের বাড়িগুলো কোনওটা মধ্যবিত্ত। কোনওটা নিম্নবিত্ত। অর্ধেক বাড়িতে ডিশ অ্যান্টেনা চোখে পড়ল না। কেবল সংযোগও হয়তো নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এখান থেকে বেশ কিছুটা দূরে এ রকমই রং চটে যাওয়া ট্রেস কোরাকাস শহরে জন্ম পেলের। স্যান্টোসে আসেন কয়েক বছর পর।
এ হেন মধ্যবিত্ত মহল্লায় মাঠের উল্টো দিকের দোকানটা কিন্তু বেশ ঝকঝকে। ওপরে লেখা ‘কেবল এরোরা দো পেলে।’ নীচের নেমপ্লেট—ডিডি। দোকানটা কি পেলে আর ডিডির সম্মানে! কিন্তু ডিডি তো স্যান্টোসে খেলতেন না!
দ্রুত আবিষ্কার করা গেল, ডিডি কোনও ফুটবলার নন। দোকানের মালিক। এটা সেলুন। পেলের নামাঙ্কিত। পঞ্চাশ বছর ধরে তিনি এই সেলুনে চুল কাটেন। গত মার্চে শেষ এসেছিলেন। সারা পৃথিবীতে পেলেকে নিয়ে যত গবেষণা আর লেখালিখি হয়, তার অনিবার্য অঙ্গ ডিডি-নাপিতের সাক্ষাৎকার।
এটাও রূপকথা। চারজন সিকিউরিটি যাঁর সঙ্গে সর্বত্র ঘোরে, যাঁর পৃথিবীর চারটে শহরে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে, তিনি পাড়ার খোলা সেলুনে এত বছর ধরে চুল কেটে আসছেন।
তা ডিডি কী ভাবছেন? এই যে পেলেকে দেশের লোক গালমন্দ করছে?
কিছু না। মাথা ঝাঁকালেন। দোভাষী বললেন, ”ও বলছে বলুক। কিছুতেই কিছু হবে না। পেলে পেলে হয়েই থাকবে।”
প্রথম স্যান্টোসে এসে পেলে যেখানে থাকতেন, সেই ইউরিডিস দ্য কুনহার বাড়িটা এখন অ্যাপার্টমেন্ট হয়ে গিয়েছে। ডিডি পথনির্দেশ দেওয়ার পরেও ভাষা সমস্যায় সেটা খুঁজে বার করা গেল না। শুধু এটা জানা গেল, এর কাছাকাছি খুব শিগগিরি পেলের আর একটা জাদুঘর বসছে। পেলে বরাবর বলার চেষ্টা করেছেন, ”এই তো দিব্যি বেঁচে আছি। চলছি ফিরছি। আমি মিউজিয়াম হতে চাই না।” কিন্তু তাঁর নিজের সভ্যতা তাঁর আদেশ অমান্য করতে যাচ্ছে।
এই শহরে আসতে একটা বিশাল সুড়ঙ্গ পড়ে। দৈর্ঘ্য শুনলাম তিন হাজার মিটার। স্যান্টোস ফেরত সেই সুড়ঙ্গে পৌঁছে আরও বেশি করে মনে হতে লাগল, পেলের জীবনটাও তো টানেলে শেষ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।
একটা মফস্বল শহরের ক্লাবে উত্থিত প্রতিভা। সে তো কতই হয়! প্রতিভা ওঠে, আবার নিজের নিয়মে ঝরে যায়। যারা ঝরে না, তারা অনিবার্যভাবে বের হয়ে আসে কাছের বড় শহরে। তবেই না জীবনে অন্ধকার থেকে আলোর ছিটে গায়ে পড়ে।
অস্ট্রেলিয়ার বাউরালে ব্র্যাডম্যানের গ্রামের বাড়ি এ রকমই বন্দিত। জার্মানির ব্রুলে স্টেফি গ্রাফের জন্য দেখে এসেছি এ রকম সমাদরের লাল কার্পেট। কিন্তু ব্র্যাডম্যান টিনএজেই আশ্রয় নিয়েছিলেন সিডনিতে। স্টেফি ফ্রাঙ্কফুর্টে।
পেলে কিন্তু জীবনের মহাযুদ্ধ জিতেছেন ভিটেমাটি আঁকড়ে থেকে। না গিয়েছেন ইউরোপ। না রিও। না সাও পাওলো। তৃতীয় বিশ্বের অজ পাড়াগাঁ, যেখানে স্টেডিয়ামের বাইরেটা রং না করায় অতীত দিনের মতোই সাদা-কালো থেকে গিয়েছে। সত্যিই তো ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট সময়। না ছিল মোবাইল। না ছিল ইন্টারনেট। না ছিল আজকের মতো বিমান ব্যবস্থা (স্যান্টোসকে একাধিক বার জাহাজে করেও খেলতে যেতে হয়েছে)। না ছিল আজকের মতো বাণিজ্য, বিমা আর স্পোর্টস মেডিসিনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ব্রাজিল দেশটাই তৃতীয় বিশ্ব। তার পুঁচকে বন্দর শহর থেকে উঠে আসা একটা ছেলে বছরের পর বছর প্রথম বিশ্বের যাবতীয় আম্ফালন আর প্রযুক্তি থামিয়ে দিয়েছে। উন্নত সভ্যতার চ্যালেঞ্জকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঊনিশ বছর রাজ করেছে! জাদুঘর কী বোঝাবে তার? জিন থেরাপিতে কী ব্যাখ্যা হবে?
পশ্চিমি সংবাদমাধ্যম লিখেছে, ‘চলমান বিলবোর্ড’। স্যান্টোসে তিন ঘণ্টা কাটিয়ে একটাই উপযুক্ত অভিব্যক্তি পাচ্ছি।
চলমান অশরীরী।
স্যান্টোস, ১২ জুন
ফুটবলের মক্কার ধর্মরক্ষায় আজ থেকে স্বয়ং ফুটবলই নামছে
এখন দুপুর একটা। এরিনা কোরিন্থিয়ান্সের বাইরে বেশ কিছু জটলা। অন্তত ছয়-সাতটা শাখা-উপশাখা গেটের মুখে দাঁড়িয়ে। কিন্তু কেউ জানে না তাদের নিয়ে কী করতে হবে?
মিডিয়া সেন্টার খুলেছে সকাল ন’টায়। এখনও সেখানে হেল্প ডেস্কে জনপ্রাণীর দেখা নেই। ইন-চার্জ বললেন, মনে হচ্ছে সবাই আটকে গিয়েছে। কিন্তু কেন আটকাবে? বুধবার তো ধর্মঘটীরা মেট্রোকে ছাড় দিয়েছে। অন্তত আজ তো স্টেডিয়ামে পৌঁছনোটা সমস্যা হওয়া উচিত নয়! এ বার ভদ্রলোকের কোনও উত্তর নেই।
গায়ক পিট বুলের সাংবাদিক সম্মেলন শুরু হওয়ার কথা ছিল সকাল সাড়ে দশটায়। তিনি আর জেনিফার লোপেজ কাল লাইভ গাইবেন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে। জো লো নিজেকে প্রথমে সরিয়ে নিয়েছিলেন উদ্বোধন থেকে। শর্ত নিয়ে বনিবনা হচ্ছিল না। ফিফা শেষ পর্যন্ত তাঁকে নাকি রাজি করিয়েছে। পিট বুলের সম্মেলনে তাই লেখার উপাদান পাওয়া যেতেই পারে। কিন্তু কোথায় কী! পঁয়তাল্লিশ মিনিট অপেক্ষার পর বেরিয়ে এলাম। বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে সব কিছু সেকেন্ড মেপে চলে। আর সেখানে কিনা দিনের প্রথম প্রেস ইন্টার্যাকশন পৌনে এক ঘণ্টা দেরিতে রান করছে।
স্টেডিয়ামে এখনও ঠুকঠাক আর শেষ মুহূর্তের রঙের টাচ চলছে। ব্রিটিশ মিডিয়া মানাউস মাঠ নিয়ে এত বিচলিত হয়ে পড়েছে যে, এক দিকের গোলপোস্টের চাপড়া হয়ে থাকা জায়গাটার ছবি ছাপিয়েছে বড় করে। বলেছে এ কী শুকনো, বালি ভরা মাঠ। স্টেডিয়ামে খোলা কেবল এখনও ঝুলছে। কে বলবে দেখে মাত্র তিন দিন বাদে ইংল্যান্ড-ইতালির মতো বড় ম্যাচ?
ব্রিটিশ প্রেস আমাজনের দিকটায় না থেকে সাও পাওলোয় আপাতত বসবাসকারী হলে আতঙ্কের এত কারণ খুঁজে পেত না। মাত্র চব্বিশ ঘণ্টা দূরে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ। তার জন্যই এখনও যথেষ্ট ব্যবস্থা নেওয়া হল না তো ১৮ জুনের মানাউস আগামী জন্মের ব্যাপার।
বিশ্বকাপের মতো একটা ইভেন্ট, যাকে বলা হয়ে থাকে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ, তার হিরের ঝলক কোথায় ব্রাজিল-ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ প্রাক্কালে? ভলান্টিয়াররাই এখনও যথেষ্ট গোছগাছ করতে পারেনি তো অতিথিদের কথা ভেবে কী লাভ? ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলেমা রুসো যদিও গতকাল আক্রমণাত্মক ভাষণে গোটা বিশ্বকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছেন, সব ঠিকঠাক হবে। বলেছেন, ”নেতিমূলক সব ভাবনাকে আমরা ইতিমধ্যে হারিয়ে দিয়েছি। আর দেশবাসীদের মধ্যে যারা বিভ্রান্ত, তাদের বলি বিদেশিরা এসে ওদের স্যুটকেস করে আমাদের পরিকাঠামো নিয়ে চলে যাবে না। ওগুলো বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হয়েছে। আর আমাদের দেশেই থাকবে।”
চৌষট্টি বছরের বিশ্বকাপে এ বারটা কুড়িতম। বিতর্ক কমবেশি অনেক বিশ্বকাপ বা অলিম্পিক ঘিরেই ঘটে। আথেন্স অলিম্পিক শুরুর আগেও তো কত কাণ্ড হয়েছিল। কিন্তু তার জেরে কোথাও ইভেন্ট শুরুর চব্বিশ ঘণ্টা আগে এ ভাবে দেশের রাষ্ট্রপ্রধানকে নেমে পড়তে হয়নি।
ফিফা ঝাঁপিয়ে পড়ে উদ্যোক্তা দেশকে বাঁচাবে কী, তার নিজের গোলপোস্টেই তো মুহুর্মুহু আক্রমণ হচ্ছে। ম্যাচ তো শুধু এরিনা কোরিন্থিয়ান্সেই হচ্ছে না। সাও পাওলো হিলটন হোটেলেও ঘটছে ফিফা কংগ্রেসে। ব্রিটিশ প্রেসকে গতকাল ‘বর্ণবৈষম্যবাদী’ বলে ফিফা মহাকর্তা সেপ ব্লাটার এমন নজিরবিহীন বিতর্কে নিজেকে ডুবিয়েছেন যে, তার আগুন এখন বহু দিন চলবে। ব্লাটারের বিরুদ্ধে কাতারকে ২০২২-এর বিশ্বকাপ দেওয়া নিয়ে যা কলঙ্কিত অভিযোগ, তার পাশে শ্রীনি-কাহিনি কিশোর সাহিত্য সিরিজ। ইউরোপীয় দেশগুলো এখন একজোট হয়ে গিয়েছে। কিছুতেই ব্লাটারকে আবার প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াতে দেবে না। ব্লাটার ঝানু রাজনীতিবিদ। তিনি এত সহজে গদি ছাড়ার পাত্রই নন। দু’চারটে হার্ড ট্যাকল হচ্ছে, হোক।
সব মিলিয়ে ব্রাজিলের গৃহযুদ্ধই কাঁটার মতো টুর্নামেন্টটাকে গত এক বছর ক্রমাগত কামড়াচ্ছিল। তার সঙ্গে যোগ হল ফিফার গৃহযুদ্ধ। বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর আগে কখনও এমন সাঁড়াশি আক্রমণের সামনে পড়েনি। ফিফা প্রাণপণ চেষ্টা করছে জমকালো উদ্বোধন করে ব্রাজিলীয় জনতার মন ফিরিয়ে নিতে। উদ্বোধনী পারফরম্যান্সের থিম হল ব্রাজিলের প্রকৃতি, মানুষ আর ফুটবল। অবশ্যই এরা গাইবে বিশ্বকাপের থিম সং—উই আর ওয়ান।
কিন্তু এ তো অলিম্পিক উদ্বোধন নয় যে, একটা দিনে পৃথিবীজোড়া কয়েকটা বিভিন্ন প্রজন্মের মন ভাল করে দিতে পারে। সাও পাওলোর উদ্বোধন যত জৌলুস ভরাই হোক, চলবে তো মাত্র আধ ঘণ্টা। কত আর বেশ থাকতে পারে। জনতার মনটাই তো কিছুটা নেগেটিভ দিকে চলে গিয়েছে ফুটবলের বাইরে। নইলে বিশ্বযুদ্ধ শুরুর আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে লুই ফিলিপ স্কোলারির ভাগ্নে পথ দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন জেনেও মিডিয়ায় তীব্র চাঞ্চল্য নেই কেন?
আসলে এমন অচিন্তনীয় পরিস্থিতি যে, ফুটবলের মক্কায় স্বয়ং ফুটবলই কিক-অফের আগে আন্ডারডগ!
স্যান্টোস বিচের ঠিক উল্টো দিকের দোকানগুলো নেইমার দ্য সিলভার ছবি আর ব্রাজিলের ফ্ল্যাগে ছয়লাপ।
সাও পাওলো-র রাজপথে একটু পরপর দিয়াগো সিলভার মুখ দেখাচ্ছে চৌকো আইল্যান্ড বিলবোর্ডে। হাতে একটা কিছু। হতে পারে কনফেডারেশনস কাপ। কিন্তু লোকে বিশ্বকাপই বুঝছে।
জার্ডিনস নামক এখানকার আলিপুরে শপিং মলের বাইরে তৈরি করা বিশাল ফুটবলের সামনে চুমু খাচ্ছে পুরুষ-নারী। ওটা এখন শহরে ফটো তোলার একটা জনপ্রিয় জায়গা।
গোটা সাও পাওলো ছেয়ে গিয়েছে বড় বড় লেখায়: কোপা দ্য মুন্ডো। বম ভিন্দো। অর্থাৎ, বিশ্বকাপে আপনাকে স্বাগত।
সবই আছে কিন্তু কোথাও কিছু যেন একটা নেই। প্রতিমার প্রাণপ্রতিষ্ঠা কিছুতেই হচ্ছে না।
সাও পাওলোয় এখন মাঝে মাঝেই ঠান্ডা। সকাল সাতটায় জ্যাকেট ছাড়া বেরোলে আর একটা বর্গীয় ‘জ’-কে বেছে নিতে হবে—জ্বর! কিন্তু শহরের জলহাওয়ায় ঠান্ডা থাকবে বলে টুর্নামেন্ট এত কাছে এসেও গরমাগরম আকার নেবে না কেন মাঠের বাষট্টি হাজার সিট কানায়-কানায় ভরে যাবে। কিন্তু ব্রাজিলে কবে সিট ভরে যাওয়াটা প্রথম ও শেষ কথা হয়েছে।
সিআর সেভেন সহ পর্তুগাল অবশ্য এসে গিয়েছে বুধবার সকালে। তাদের ঘাঁটি সাও পাওলো থেকে একশো কিলোমিটার দূরের ক্যাম্পিনাসে। সকালে এফএমে বারবার রোনাল্ডো-রোনাল্ডো শুনে অন্তত এটুকু বুঝলাম, এফএম চ্যানেলের আরজে নতুন অতিথি আগমনে যথেষ্ট উত্তেজিত। মেসিরাও সদলবলে এসে গিয়েছেন। কোপা দ্য মুন্ডো জমজমাটের জন্য কি ডিফেন্ডারের বুটের ওপর দিয়ে মেসির ড্রিবল করে যাওয়া? বা রোনাল্ডোর সশব্দ দাদাগিরির অপেক্ষা?
নাকি বিশ্বকাপ জীবন্ত করে দেবেন হিসেবের মধ্যে না ধরা ওয়েন রুনির মতো কেউ? রুনি সম্পর্কে নাগাড়ে চলতে থাকা সমালোচনায় এ দিন বেশ ক্ষিপ্ত মনোভাব দেখিয়েছেন ম্যান ইউ সহকারী কোচ ফিল নেভিল। ক্লাব কোচেরা চট করে বিশ্বকাপ বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন না। কিন্তু নেভিল থাকতে না পেরে বলেছেন, ”ওয়েনকে নিয়ে হচ্ছেটা কী! ও যে টিমের বেস্ট প্লেয়ার তা নিয়ে কারও কোনও সন্দেহ আছে নাকি?”
কে বলতে পারে রুনির ডান পা কোনও স্ফুলিঙ্গ তৈরি করে দেবে না কুড়িতম বিশ্বকাপে? বা সের্জিও আগেরো…বা টমাস মুলার…দিয়েগো গোডিন…চোট কাটিয়ে উঠে সুয়ারেজ…বা ম্যান সিটি খ্যাত ইয়াইয়া তোরে।
গোটা কয়েক মুহূর্ত চাই। যা শিল্প, পুরুষ আর পারফেকশনের টানে টুর্নামেন্টটার প্রকৃত কিক-অফ করিয়ে দেবে! একটা ফুলকি চাই…একটা এনার্জি চাই। বত্রিশটা দেশের সাড়ে সাতশোর কাছাকাছি ফুটবলার। একত্রিশ দিন হাতে। একাধিক স্ফুলিঙ্গ তৈরি হবে না বারোটা অনুষ্ঠান কেন্দ্রের কোথাও না কোথাও, হতে পারে কখনও? তখন কে ব্লাটার। কে বিক্ষোভকারী। কে ব্রাজিলের মহিলা প্রেসিডেন্ট।
যৌথ গৃহযুদ্ধে ফুটবল বিপন্ন তো কী, বিষ্যুদবার ভারতীয় সময়ে রাত দেড়টা থেকে স্বয়ং ফুটবলই তো নিজস্ব ধর্মউদ্ধারে নামছে।
সাও পাওলো, ১২ জুন
