কখনো মারাদোনা, কখনো মেসি
কখনো মারাদোনা, কখনো মেসি
ফুটবলের ক্রুশবিদ্ধ যিশু
পেলেকে ছেষট্টির বিশ্বকাপ জিততে দেয়নি ইউরোপীয় ডিফেন্ডারদের হিংস্র ট্যাকল।
মারাদোনার বিরাশির সম্ভাব্য বিজয়রথ থামিয়ে দেয় জেন্টিলের বন্যতা।
লিওনেল মেসির ইতিহাসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরে যাওয়ার নেপথ্যে তেমনই এক খলনায়ক গনজালো হিগুয়েন।
ব্রাজিল এবং চিলির ফাইনালে রানার আপের পদক ঝোলাবার পর এক রকম চোকারের স্তরেই পর্যবসিত হয়ে গিয়েছেন মেসি। এই ইউটিউবের যুগে কারও যেন মনেই পড়ছে না দু’টো ফাইনালেই তিনি যা বল সাজিয়ে দিয়েছিলেন হিগুয়েনের জন্য তার চেয়ে সহজ বল, বিশ্বপর্যায়ের ফাইনালে পাওয়া যায় না। নাপোলির হয়ে এর চেয়ে অনেক কঠিন অ্যাঙ্গেল থেকে গোল করে থাকেন হিগুয়েন। কিন্তু ফাইনালের যে নার্ভই নেই তাঁর। টাইব্রেকার জঘন্য মিসের চেয়েও আরও বড় সূচক তাঁর মারতে যাওয়ার আগের জড়তা।
ফাইনাল শুরু হওয়ার মিনিট দশেকের মধ্যে ফেসবুক পোস্ট দেখলাম; ‘চিলির ডিফেন্ডারগুলো কি আরাবুল আর অনুব্রতর কাছে ট্রেনিং নিয়ে এসেছে?’ বোঝা গেল ঘোর মেসিভক্ত। কিন্তু একমত হওয়া গেল না। বিশ্বপর্যায়ের ফাইনালে বিপক্ষ ফরোয়ার্ডকে কেন স্লো-পাউডার দিয়ে খাতির করা হবে? যতই হোন না তিনি আধুনিক ফুটবলের মহানায়ক।
কিন্তু তাতেও তো ঊননব্বই মিনিটে বুট ঢাকা কংক্রিটের জঙ্গল পেরিয়ে পরিচিত মুক্তির দৌড় মেরেছিলেন মেসি। ওই বলটা হিগুয়েন গোলে রাখতে পালে এত লেখালেখি, এত কাটাছেঁড়া কিছুই ঘটত না।
চিলি বলেছিল প্লে-স্টেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করবে মেসির উপর। কোনও কোনও সময় মনে হল হয়তো করেওছে। তাঁকে যত না গার্ড করা হয়েছে, তার চেয়ে বেশি যেন মাপা হয়েছে সঙ্গী যে খেলোয়াড়দের সঙ্গে তিনি ওয়ান টু খেলেন তাঁদের। কোপা ফাইনালের ভিডিয়ো চালালে পরিস্কার দেখা যাবে মেসির চেয়ে বেশি করে তাঁর সহযোগীদের আটকেছেন সামপাওলি। ওয়ান-টু খেলবেন কী। বল দিয়ে ফেরত পাননি মেসি। বা অফ দ্য বল মুভমেন্টে পাশে যেখানে থাকার কথা তাঁর সহযোগীদের, সেই জায়গাটা ব্লক করে দিয়েছে চিলি।
সাম্পাওলি নতুন অভিধান বার করলেন মনে করার কোনও কারণ নেই। বার্সার মেসিকেও এ ভাবেই আটকাবার চেষ্টা করেন বিপক্ষ কোচেরা। পারেন না যেহেতু বার্সার সাপোর্টিং প্লেয়াররা জায়গা নেওয়া এবং অনুমান ক্ষমতায় অনেক এগিয়ে। এই আর্জেন্টিনা টিমে ওই পর্যায়ের স্কিলসম্পন্ন একমাত্র ডি’মারিয়া। ইতিহাস বলবে, না মারাকানা, না এস্তাদিও ন্যাশনালে কোথাও ডি’মারিয়াকে ব্যবহারের সুযোগ হল না তাঁর। একটায় একেবারেই হল না। একটায় ২৩ মিনিট পর্যন্ত হল।
সান্তিয়াগোর ওই অপরূপ স্টেডিয়ামে যেন আরও আলো করে বসে ছিলেন চিলির সমর্থকরা। মনে হচ্ছিল আলিপুর হর্টিকালচার গার্ডেনে লাল গোলাপের ফ্লাওয়ার শো চলছে। নীল জার্সি পরা বিদেশি সমর্থকরা তার মধ্যে যেন ছোট ছোট ফুটকি। গোটা ফুটবল বিশ্ব ভেবেছিল ফুটকিগুলো ক্রমশ রঙিন হতে হতে লালের জৌলুসকে ম্লান করে দেবে। হল ঠিক উল্টো। ফুটকিগুলো ক্রমশ সরু হতে মাঠ থেকে মিলিয়ে গেল। আর কাপের সামনে নতমস্তকে দাঁড়িয়ে রইলেন লিওনেল মেসি।
বিশ্বের একনম্বর ফুটবলার তিনি। এ বছরে তিনটে টুর্নামেন্ট জিতেছেন। সেই বায়ার্ন টিমকে দুরমুশ করেছেন যারা মারাকানা ফাইনালে তাঁর ক্ষত্রিয়বোধে আঘাত দিয়েছিল। এত ঝুঁকি নিয়ে কোপায় আসার কোনও দরকারই ছিল না। এ বছরের ব্যালন ডি’ওর পাওয়া এমনিতেই নিশ্চিত হয়ে গেছে। তার পর আবার কোন মুর্খ একটা তুলনামূলক অনুন্নত টিমের সব দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে চায়?
আমাদের ভোররাতে ত্রস্ত পদক্ষেপে লিওনেল মেসি সরে যাচ্ছেন সান্তিয়াগোর কাপমঞ্চ থেকে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটের একাংশে শুরু হয়ে গিয়েছে নীল জার্সি গায়ে তাঁর উপযোগিতা নিয়ে। তখন মনে হচ্ছিল ফুটবলের ক্রশবিদ্ধ যিশুকে দেখছি। যাঁর কাহিনি মারাদোনার চেয়ে অনেক করুণ।
মেসি তাঁর সময়কার একমাত্র সুপারস্টার যিনি দেশের ফুটবল শক্তি অবনমিত জেনেও বরাবর দেশকে ট্রফি দেওয়ার অসম্ভব লক্ষ্যের কথা বলেছেন। আজকালকার দিনে যে ঝুঁকি কেউ নেয় না। অর্ধেক শীর্ষস্থানীয় টেনিস তারকা ডেভিস কাপ খেলেন না কেন? ঠিক এই কারণে তো। যে নিজের চাপ নিজে নিতে পারি। নিজে হারলে নিজেই হারব। কিন্তু দেশের বাটখারা চাপলেই অনেক জবাবদিহির ব্যাপার এসে যায়। কে নেবে সেই অনর্থক চাপ? কেনই বা নেবে?
গড়পড়তা তারকা প্লেয়ারের আন্তরিক বিশ্বাস যে, আর পাঁচজন পেশাদারের মতোই তার শ্রেষ্ঠত্বের পরীক্ষা দেশ নয়। সর্বোচ্চ সব পেশাদারের মধ্যে রক্ত হিম করে দেওয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মেডিসিনে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হওয়া ছাত্র যেমন ভাবে, দেশের বা প্রদেশের হয়ে এক নম্বর থাকাই যথেষ্ট নয়। চিকিৎসকের সেরা অধিষ্ঠান প্রথম বিশ্বে নিজেকে ফেলে মাপি—আধুনিক ফুটবলারেরও তাই।
সে জানে ক্লাব ফুটবল ছানবিন করে তার তল্লাটে নিয়ে আসে সারা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ প্রতিভাদের আর সেখানে একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয়। সেটাই বিশ্বস্বীকৃত মল্লযুদ্ধ। কারণ সেই মঞ্চে শ্রেষ্ঠ না হলে কোনও সুযোগ নেই। একমাত্র দেশে রয়েছে। দেশে টিম দূর্বল হলেও বাইরে থেকে গণহারে জায়গা ভর্তির সুযোগ নেই। নাগরিকত্ব সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
তাই বিশ্ব ক্লাব পরীক্ষায় সোনার মেডেল প্রাপ্তিতেই সাবধানী পেশাদারের গর্বের প্লে-স্টেশন শেষ হয়ে যায়। তার কামনার তো দু’টোই স্তর—অর্থ এবং পেশাদার প্রাপ্তি। দু’টোই ক্লাবে বেশি। পেশাদার সার্কিটে বেশি। সোভিয়েত ইউনিয়নে যেমন কমিউনিজমের স্বপ্ন ভেঙে ছত্রখান হয়ে গিয়েছে, প্রথম বিশ্বের ক্রীড়াবিদদের মধ্যে দেশকে অগ্রাধিকার তেমনই এক মৃত স্বপ্ন। বিগতযৌবনা সুন্দরীর মতো। দিনে দিনে যার চৌম্বকক্ষেত্র দূর্বল হচ্ছে।
এই যে ভারতীয় দলের বিদেশি কোচ পাওয়া যাচ্ছে না, তার মূলেও তো সেই একই সিনড্রোম। দেশ ছাপিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি পৃথিবীতে অগ্রাধিকার। পন্টিং, ফ্লেমিং, ভেত্তোরি—সবার বক্তব্য খুব পরিষ্কার, দু’মাসে ফ্র্যাঞ্চাইজি দুনিয়া থেকে এত ডলার রোজগার করি। ইন্ডিয়ার দায়িত্ব নেওয়া মানে বারো মাসের ঝড়ঝাপটা। এখানে যাও, ওখানে খাও। তার পর ওই অসম্ভব চাপ! কী দায় পড়েছে অমুক দেশের কোচিং করাচ্ছি বলে বিজয়গাথা লিখতে যাওয়ার? বহু বুঝিয়েও এঁদের দরখাস্ত অবধি দিতে রাজি করানো যায়নি।
ক্রিকেট তো তবু দশ-এগারো দেশ খেলে, উন্নত বিশ্ব নয় সেই অর্থে। তাতেই এই অবস্থা। তো বিশ্ব ক্লাব ফুটবলের রাজকীয় মঞ্চে কী বাড়তি জৌলুসের আকর্ষণ থাকতে পারে বোঝাই যায়। সেই দুনিয়ায় দাঁড়িয়েও কোনও এক মেসি যদি আজও দেশ হারার পর তেন্ডুলকরের মতো মর্মান্তিক বিষণ্ণতায় ডুবে যান, তবে আগে বোধ হয় সেই রোম্যান্টিক মনোভাবের জন্য তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত ফুটবল রসিকের। যে এই লোকটা সময়ের দাবির উপরে উঠতে চেয়েছে। আমি নয়, আমরা নিয়ে ভেবেছে। এ রকম একটা সোনার মরসুম কাটানোর পরেও নতুন করে ঝুঁকি নিয়েছে দেশের জন্য।
ফুটবলারের আরও সমস্যা, টিম গেম। ক্রিকেটে যা সমস্যাই নয়। ক্রিকেটে ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে সেরা পারফর্মার একটা ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারে। একজন ব্রায়ান লারা একা অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারিয়ে দিতে পারেন। ফুটবলে একজন মারাদোনাকে শ্রেষ্ঠ হওয়ার জন্য ভালদানোকেও গোল করতে হয়। গোয়কোচেয়াকে পেনাল্টি বাঁচাতে হয়। টমাস মুলারের জন্য একজন সোয়াইনস্টাইগার, একজন ম্যানুয়েল নয়্যারের দরকার পড়ে।
মেসিকে সরিয়ে নিন। কী আছে এই ফোঁপরা আর্জেন্টিনায়? কেবল মাসচারেনো আর ডি’মারিয়া। বাকিদের মধ্যে আগেরোর মতো যাঁরা ক্লাব ফুটবলে জ্বলেন, তাঁরা দেশের জার্সির চাপ এলেই ক্রমশ বামন হয়ে যান।
সান্তিয়াগোর ফুটবল গির্জার পাশে শবদেহ নিয়ে ফুটবল সম্রাটের অন্ত্যেষ্টি ক্রিয়া দেখে মনে পড়ে যাচ্ছিল তাঁকে তো স্বচক্ষে এক বছর আগে ঠিক এমনই আগুনে সোচ্চচার পুড়তে দেখেছি। যখন গোল্ডেন বুট আর বলের জন্য যথাক্রমে তাঁর এবং ম্যানুয়েল নয়্যারের নাম ঘোষিত হল এবং তাঁরা পাশাপাশি হেঁটে গেলেন। পুরস্কার প্রাপ্তির জন্য ওই রকম অবিশ্বাস্য বিষণ্ণতায় হাঁটতে বিশ্বের কোনও ক্রীড়াবিদকে কখনও দেখিনি। যেন গিলোটিনের দিকে শেষ যাত্রা এবং মুখের সমস্ত রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে এমন ভঙ্গিতে গেলেন আর এলেন অবিশ্রান্ত মেসি।
সে দিন মনে হয়েছিল। সান্তিয়াগোর ফাইনালের দিনেও মনে হল একটা মাঝারি মাপের দলকে ফাইনালে নিয়ে গিয়েছেন এটাই তো তাঁর রাজতিলক হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। বিশ্বের আর কেউ সঙ্গে প্লে-স্টেশন নিয়েও পারত কি? রোনাল্ডো পারেননি। নেইমার তো বিশ্বকাপ এবং কোপা দ্বিতীয়বার পারলেন না। তাঁদের নিয়ে তো কেউ বলছে না যে দেশের জার্সি গলালেই ব্যর্থ। তা হলে কি ফাইনাল অবধি যাওয়াই লিওনেল মেসির অপরাধ?
কোপা সেরার পুরস্কার নিতে না চাওয়াও তো কত রোম্যান্টিক। আমার দেশ জেতেনি, লাখ লাখ আর্জেন্টিনীয় রক্তাক্ত হয়ে কাঁদছে, তখন ওই ব্যক্তিগত পদকটা দিয়ে আমার কী হবে! নিয়ে বড়জোর চিলির সমুদ্রের ধারে ওটা ছুড়ে ফেলে দেওয়া যায়। এটা তার চেয়ে ভদ্রোচিত, আমি নিলামই না!
ট্রফি পেলে সংখ্যাতত্ত্বে মেসির গুরুত্ব আরও বাড়ত। কিন্তু ট্রফির গ্ল্যামারে চেপে যেত আরও কিছু। না পাওয়ার মৃত ভঙ্গি যেন আরও বড় এক চ্যাম্পিয়নকে চেনালো। যিনি সর্বকালীন যোদ্ধা! নির্দিষ্ট কোনও সময়ের নন। যাঁর জেতা আর ব্যর্থতা নেওয়ার ধরন একই রকম আকর্ষণীয়।
মারাকানায় সে দিন সামনে যাঁরা দেখেছিলেন তাঁদের যদি গা ছমছম করে থাকে দোষ দেওয়া যায় না। দৃশ্যপট এমনই ছিল যে লোকটা মারা গিয়েছে। পুরস্কার নিতে যাচ্ছে এক প্রেতমূর্তি। এটা কি দেশসেবক হতে চাওয়ার একমাত্র প্রাপ্য?
দৃশ্যটা কলকাতার এক ইংরেজি ক্রিকেট লিখিয়ে সম্পর্কে সুনীল গাওস্করের উত্তেজিত হওয়ার কথা মনে পড়িয়ে দিয়েছিল।
বহু বছর আগের কথা। তখন এই পেশাতেই আসিনি, কিন্তু পরে শুনেছি।
সাংবাদিক লিখেছিলেন মৃতপ্রায় শেষ দিনে বলার মতো ঘটনা গাওস্করের স্লিপে সহজ ক্যাচ মিস। গাওস্কর অতঃপর সাংবাদিকটিকে দৃপ্ত ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ”আপনি কত দূর ক্রিকেট খেলেছেন আমি জানি না। খেললে অবশ্যই আপনার বোঝা উচিত ছিল ওটা সেকেন্ড স্লিপের ক্যাচ ছিল। ফার্স্ট স্লিপ থেকে আমি ঝাঁপিয়ে একটা অসম্ভব চেষ্টা করেছিলাম। আপনার লেখা পড়ে মনে হল অসম্ভব ক্যাচ ধরতে যাওয়াটাই আমার অপরাধ হয়েছিল।” সাংবাদিক যখন আমতা আমতা করছেন তখন আরও উত্তেজিত গাওস্কর বলে চলেন, ”কী ক্ষতি করলেন জানেন? এর পর আমার টিমের তরুণ ক্রিকেটাররা এই সব ক্যাচে যেতে ভয় পাবে। ভাববে ক্যাপ্টেনকেই এ ভাবে লিখলে আমি তো কোন ছাড়। ভয় পাবে, ঝুঁকি নিলে এত সমালোচনা হয়। তার চেয়ে বাবা সেফ থাকা ভাল। দূরের ক্যাচে যাবই না।”
ঘটনাটা যত মনে পড়ছে তত ভাবছি হেরে যাওয়া বিষণ্ণ মেসির ছবি এই যে রোজ রোজ কাগজ, টিভি, সোশ্যাল মিডিয়া উপচে বেরোচ্ছে তাতে চাঁদ আর মঙ্গল গ্রহ ছাড়া মোটামুটি সবাই জেনে গিয়েছে যে বিশ্বের বৃহত্তম অপরাধ করে মেসি ফাইনাল হেরে গিয়েছেন। স্বয়ং মেসি-শরীরেই যদি সাফল্যের বর্ম ভেদ করে এত সহস্র ক্রুশ ঢোকে, সাধারণ ফুটবলারের কী হবে? তাকে ঝোলানোর অনেক আগেই তো সে শেষ। সে কেন খামখা উচ্চচাকাঙ্খী হবে দেশের হয়ে পদক জিততে? নিকুচি করেছে তার বেকার ঝুঁকি নিতে।
মেসিরা অবশ্য যুগে যুগে এমনই অকুতোভয় থেকে যাবেন। এঁদের ধর্মই এমন যে, চলিত ব্যাকরণে কোনও বিশ্বাস থাকে না। এঁরা সব সময় চান সাহসের নতুন ব্যাকরণ বই লিখতে। তা তার মধ্যে যতই ঝুঁকি থাক।
বিখ্যাত বলিউড নায়ক তাঁর আব্বার কাছে শোনা একটা শায়রি বারবার বলেন, ‘গিরতে হ্যয় শের শওয়ারি ময়দানি জং মে/ ও জিসম কেয়া গিরে জো ঘুটনে কি বল চলে।’
যারা ঘোড়া আর হাওয়ার পিঠে সওয়ার হয়, পড়ার সম্ভাবনা তাদেরই বেশি থাকে। যারা এমনিতেই হামাগুড়ি দিচ্ছে, তারা যদি পড়েও সেটা কি আর পড়া হল?
লিওনেল মেসিকে আধুনিক ফেসবুকের পাতা ব্যঙ্গবিদ্রূপে ভরিয়ে দিতে পারে। ভবিষ্যৎ ফুটবল ইতিহাস তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে দেশজ মানচিত্রে হল অব ফেম দেবে। বলবে এই লোকটা হাওয়ার গতিকে অগ্রাহ্য করে বিপরীতমুখী হাওয়ার সওয়ার হয়েছিল। এঁকে নিয়ে—এঁদের নিয়ে কেবল অভিভূতই থাকা যায়।
১০ জুলাই, ২০১৫ (চিলির কোপা আমেরিকা ফাইনালের পর লেখা)
মারাকানার বহিষ্কৃত রাজপুত্রের সিংহাসনে প্রত্যাবর্তন
দিনটা ছিল ব্রাজিলের ১৩ জুলাই মধ্য বিকেল।
দিনটা দাঁড়াল স্পেনের ৭ মে সন্ধ্যারাত।
একটা বিশ্বকাপ ফাইনাল। একটা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমি ফাইনাল। ঠাটেবাটে- রণসম্ভারে-ঐশ্বর্যে তুলনাই হয় না। একটা প্রতি বছর হয়। একটা চার বছর পর পর। তবু এ সব তো অঙ্কের হিসেব। হৃদয়ের হিসেবে লিওনেল মেসি দশ মাস সময় নিলেন ১-১ করতে!
মারাকানায় সেই দগ্ধ করে দেওয়া বিকেলে গোল্ডেন গ্লাভস আর সেরার পুরস্কার নেওয়ার জন্য পাশাপাশি হাঁটছিলেন ওরা দু’জন। জার্মানির নয়্যার আর আর্জেন্টিনার মেসি। প্রথম জনকে দেখে মনে হচ্ছিল রাজমুকুট মাথায় গলাতেই যাচ্ছেন। দ্বিতীয় জনের রক্তশূন্য মুখের পেশি বলছিল সোনার বল নিতে যাচ্ছেন যাতে কাঁটা ভর্তি। যে কাঁটা গলায় নিয়ে তাঁকে রাজত্ব ছেড়ে হেরোদের জন্য নির্ধারিত বনবাসে চলে যেতে হবে।
হেরে যাওয়ার পর অনেক বিশ্বখ্যাত ক্রীড়াবিদের চেহারা সামনে থেকে দেখেছি। মর্মভেদী যন্ত্রণায় হৃদয় এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে যাওয়া এক-একটা চেহারা। উইম্বলডনে দ্রুত হেরে যাওয়া ম্যাকেনরো। কাপ ফাইনাল হেরে যাওয়া জোহানেসবার্গের সচিন। জীবনের শেষ ইনিংসে চার রানে আউট হওয়া গাওস্করের টেলিফোনের গলা। কিন্তু মারাকানার মেসির মতো মর্মান্তিক কিছু দেখিনি। ফিফা প্রধানের কাছে পুরস্কার নেওয়ার জন্য যখন হেঁটে যাচ্ছেন মনে হচ্ছিল জীবন থেকে মৃত্যুর অলিন্দের দিকে এগোচ্ছেন। এমনই রক্তশূন্য আর বায়বীয় দেখাচ্ছিল তাঁকে।
এমন তো নয় যে জার্মানরা দাঁড় করিয়ে ফাইনালে হারিয়ে দিয়েছে। ঠিক উল্টো। আর্জেন্টিনা সুযোগ ওপেন করেছিল বেশি। মেসি নিজেই তো বাঁ পায়ে একটা চোদ্দো গজের শট বাইরে মারেন। খেলার অন্তিম মুহূর্তে যখন ল্যাটিন আমেরিকার সম্পন্ন বাড়ি থেকে ধারাভির বস্তি-সবাই তাঁর মারণ ফ্রি কিকে গোল শোধ হওয়ার স্বপ্ন দেখছে, তিনি মেসি বল উড়িয়ে দিয়েছেন ক্রস বারের ওপরে। হেরে যাওয়াটা বড় কথা নয়। খেলায় তো হারজিত থাকেই।
কিন্তু নিজের পেশায় চূড়ান্ত অসম্মানিত হয়ে এমন রক্তাক্ত হতে কে চায়।
তাই কাল মধ্যরাতে বার্সেলোনার দ্বিতীয় গোলের পর লিওনেল মেসির নিজের মাপে অপ্রকৃতিস্থ উচ্ছ্বাস পালনের বাংলা তর্জমা বহু দূরে বসেও যেন করতে পারছি। নিজের মধ্যে আবার নিজে জিতলাম। নিষ্ঠুর বনবাসের পর আবার ফিরে এলাম সেই ক্ষত্রিয় প্রধান হয়ে। নয়্যার বলেছিলেন মেসির মুখ বন্ধ করে দেবেন। তা দুটো অসামান্য গোলে তাঁর মুখ বাকি মরসুমের জন্য বন্ধ থাকা উচিত। আর ওই থিওরিটাও কপচানো যেন কমে—গোলকিপার করে দিচ্ছে সুইপার ব্যাকের কাজ।
ওসব রাঙামূলো প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য হয়। বেলজিয়াম। ইরান। দক্ষিণ কোরিয়া। বিপক্ষে নেইমার, মেসি আর সুয়ারেজ থাকলে কীসের সুইপার ব্যাক। বরঞ্চ অন্য একটা তত্ত্ব দানা বাঁধা উচিত, আর্জেন্টিনা টিমটা আর একটু ব্যালান্সন্ড হলে, সে দিন ডি মারিয়া খেললে কি মারাকানায় বিশেষ পুরস্কারটা পেতেন নয়্যার?
মেসির মারাকানা আততায়ীদের ছ’জন বায়ার্ন টিমে ছিলেন। প্রত্যেকেই ডাকসাইটে তারকা। নয়্যার, বোয়াতেং, মুলার, লাম, সোয়াইনস্টাইগার এবং মারাকানার নায়ক মারিও গোটজে। এঁরা চিত্রার্পিতের মতো দেখলেন বহিষ্কৃত সম্রাটের রাজ্যতে পুনরাভিষেক।
বহু বছর আগে ভিভ রিচার্ডসের একটা ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে তাঁকে প্রচণ্ড আবেগাচ্ছন্ন হয়ে পড়তে দেখেছিলাম। ভিভ এমনিতে ইমোশনাল। কিন্তু এতটা আবেগ কখনও দেখিনি যখন বলেছিলেন, ”বিশ্বকাপে যে চক্রান্ত করে আমার বাদ দেবে, আমায় এ ভাবে পেছন থেকে ছুরি মারবে স্বপ্নেও ভাবিনি। এরপর কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে যখন সবার নীচে থাকা গ্ল্যামোরগনকে চ্যাম্পিয়ন করলাম, তখন মাঠে হয়তো দর্শক বেশি ছিল না। কিন্তু ঈশ্বরের সঙ্গে কথা বলাটা তাতে আটকায়নি। আমি ওঁকে বললাম, ঈশ্বর তুমি জানতে আর আমি জানতাম এমনটাই হওয়ার কথা ছিল।”
জয়ের উৎসব চুকে যাওয়ার পর রাতে একা হয়ে যাওয়া মেসিও কি কথা বললেন তাঁর ঈশ্বরের সঙ্গে যে, মানুষ কখনও শুধু ম্যাচই জেতে না, নিজের কাছেও জেতে। আপনাকে ধন্যবাদ সেই মুহূর্তটা আমদানির জন্য। কিন্তু ঈশ্বর আপনি আর আমি দু’জনেই জানতাম, এমনটাই হওয়ার ছিল!
৮মে, ২০১৬ (চ্যাম্পিয়ন্স লিগ সেমিফাইনালে বার্সা হারানোর পর বায়ার্নকে)
অদৃষ্টের শেষবিচার পেলে
ধ্যাৎ আবেগের দিন মোটেও ছিল না। আবেগের আগ্নেয়গিরির লাভা নিষ্ক্রমণের দিন ছিল।
আর্জেন্টিনার দিনও ছিল না। ফিফার স্কোরবোর্ড যতই তাদের
কোপা চ্যাম্পিয়ন দেখাক। ছিল ফুটবলের ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অফ জাস্টিসে নির্যাতিত এক ব্যক্তির শেষ বিচার পাওয়ার দিন।
সুপার ক্ল্যাসিকো তো কী। সব ম্যাচ ল্যাপ টপে গর্জন তুলে হাজার হাজার শব্দ লিখে যেতে হবে নাকি? এটা তো ছিল মূর্তিমান ছবির দিন। আর্ট এক্সিবিশনের দিন। শ্বাসরোধকারী পরপর ফ্রেমগুলো আপনি দেখা দিয়েই যাচ্ছে। বাড়তি শব্দ উচ্চচারণে সেগুলোর পবিত্র নীরবতা ক্ষুণ্ণ করে কোন আহাম্মক?
কর্ণার্জুন যুদ্ধ যে হতে যাচ্ছে লিখেছিলাম—সেটাও তো ভুল প্রমাণিত। মারাকানার শনিবারের বিকেল ছিল সূতপুত্রের পাণ্ডবত্ব অর্জনের মাধ্যমে হস্তিনাপুর রাজ্যে অভিষিক্ত হওয়ার লগ্ন। বীর অর্জুনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের ধনুর্বিদ্যে থাকা বা না থাকা নিয়ে মাথা ঘামাবার অবকাশ কেউ দেখায়নি। সিনিয়র পাণ্ডব এসে গেলে সব কিছুতে তো তাঁর অগ্রাধিকার না?
আর হ্যাঁ ফুটবলের মহাপ্রহর আদৌ ছিল না। একে তো ইউরোর তুলনায় এখনকার কোপা কোনো স্টান্ডার্ডই না। এটা ফুটবলের ডিভিশন বেঞ্চের মর্ত্য শুনানির দিন ছিল। যারা অদৃশ্য কালো কোট পরে আবির্ভূত হয়ে ফিফাকে বলে গেলে যেদিন আমরা নিচে নামবো তোরা আজকের মতো গোলাম হয়ে থাকবি।
ম্যাচ ও পুরস্কার শেষে যখন ওই হ্রস্বতম ভিডিও ক্লিপটার খোঁজ পাওয়া গেল যে তিনি লিওনেল মেসি মাঠের মধ্যেই থেকে ভিডিও কলে স্ত্রীর্কেআবেগরুদ্ধভাবে পদক দেখাচ্ছেন আর অবিরাম উচ্ছাস প্রকাশ করে যাচ্ছেন। তখন মনে হল ধুর, ২২ মিনিটে ডি মারিয়ার জয়সূচক গোলটোল নয়, মুহূর্ত তো এটাই। সুপারমুহূর্ত। লোকটাকে এমন আবেগী হতে দেখা যাচ্ছে মানে এর বুকে কী পরিমান জগদ্দল পাথর জমা ছিল।
ছিল সবাই জানতো। কিন্তু তার পরিমাপ এই সাংঘাতিক মাত্রায় ছিল? এ-ও তো দেখা যাচ্ছে ভিন্ন পদবীধারী ‘ম্যান্ডেলা’। ফুটবলের রবেন আইল্যান্ডে বছর পনের কয়েদ ছিল।
কী অন্যায় কয়েদবাস না? দশটা লা লিগা খেতাব। চারটে ইউএফএ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। ছটা ব্যালন ডি’ওর। তারপরেও কিনা অপবাদের কুখ্যাত জেলে ঢুকিয়ে দেওয়া যে দেশকে ট্রফি দিতে পারোনি যখন কিসের বেস্ট ফুটবলার?
জিকো দেশকে বিশ্বকাপ দিতে ব্যর্থ। ক্রুয়েফ পারেননি। সক্রেটিস পারেননি। বেকহ্যাম পারেননি। কেউ আঙ্গুল তোলেনি। কিন্তু এই পরিমান প্রচার একমাত্র ধেয়ে আসবে তাঁর মেসির দিকে। এসে একটা পজ করে দেবে। বলবে যে এই অবধি পৌঁছে অপেক্ষা কর। গ্রেটেস্ট অফ অল টাইমে তোমার নমিনেশন নেওয়া গেল না। এখনও আমাদের চোখে তুমি ফুটবলের রাজবংশ না। বরঞ্চ মূর্তিমান অজ্ঞাতকুলশীল।
মারাকানায় যখন বাঁধনভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ছেন অবশেষে পান্ডবত্বে উত্তীর্ণ সুতপুত্র। তখন বারবার মনে হচ্ছিলো ভোরের টিভি চোখ ঝাপসা করে দেয়নি তো? এ মাঠেই তো সাত বছর আগে তাঁকে জলজ্যান্ত দেখেছি ফাইনাল-হার শোকে কী মৃতপ্রায়। যেমন ফ্যাকাশে মুখে পুরস্কার বিতরণের দিকে যাচ্ছিলেন তাকে এক কথায় বলা যায় ট্র্যাজেডি ওয়াক। যেন ফিফার লোকগুলো তাঁকে মৃত স্বপ্নের অস্থিভস্ম তুলে দেওয়ার জন্য ডাকছে। যেন হিমোগ্লোবিন পার্সেন্টেজ খেলার আগে ছিল ১২। এখন নেমে ৪। সেই তিনি গোটা কোপা ভালো খেললেও কাপ ফাইনালে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। আর ৮৮ মিনিটের যে গোল মিস করেছেন সেটা? না হিগুয়েনের ২০১৪ কাপ ফাইনালে মিস? কোনটা বেশি বিস্ময়জনক নির্ধারণে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা যায়। আর তার পরেও কিনা জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য ডাক দিচ্ছে।
ম্যাচ শেষে দিয়েগো সিলভা একটা বিদঘুটে কথা বলেছেন বিপক্ষ সম্পর্কে। বলেছেন, সেকেন্ড হাফে একটা টিমই ফুটবল খেলার চেষ্টা করছিলো। বডিলাইন সিরিজে একই অভিযোগ জার্ডিনের টিম সম্পর্কে এনেছিলেন উডফুল। লারউডের গোলা তাঁর কিপারের মাথায় আছড়ে পড়ার পর বলেছিলেন, ওখানে দুটো টিম আছে। একটা দলই নিয়ম মেনে ক্রিকেট খেলছে। বকলমে ব্রাজিলের আনা ডিফেন্সিভ এবং আনস্পোটিং খেলে সময় নষ্টের অপবাদ বাদ দিচ্ছি। ম্যাচের টিম স্ট্যাটসেও ব্রাজিল কত এগিয়ে। সেটা গোলে শট নেওয়া হোক। নিজেদের মধ্যে পাস খেলা হোক। বল পজেশন হোক।
তবু আর্জেন্টিনা জিতে বেরিয়ে গেলো। শুধু তো মজবুত ডিফেন্স নয়। শুধু নেইমারদের লেফট ব্যাক রেনান লোডি-কে দায়ী করেও লাভ নেই। অদৃশ্য দেওয়ালের লিখন তাদের গোলপোস্টের পেছনে এদিন ছিল যে ম্যাচ শেষের স্কোরবোর্ড দেখাবে—আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন্স। লিওনেল মেসি চ্যাম্পিয়ন। শচীন মনে পড়ে যাবে অবশ্যই। কাপ ফাইনালে ১৮ করার পরেও টিম চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় জীবনের সবচেয়ে কাঙ্খিত ন্যায়বিচার এসে উপস্থিত হয়। নামি স্পোর্টসমানদের জীবনে বোধহয় কোথাও আন্তর্জাতিক দায়রা আদালত থেকে শেষ বিচার পাওয়ার হক থাকে। নইলে হাসপাতালের জন্য খেলা চালিয়ে যাওয়া ইমরানের ক্যাচ কেন কাপ ফাইনালে ফেলবেন গুচ? কেন ভিভ রিচার্ডস বিশ্বকাপ থেকে বাদ দিয়ে গ্লামোরগন মঞ্চে খুঁজে পাবেন তাঁর শেষ বিচার? আর অমর সেই মন্তব্যটা করবেন, ঈশ্বর, একমাত্র তুমি জানতে আর আমি জানতাম এটাই হওয়ার ছিল।
মারাকানার সেই সাত বছর আগের মৃত্যুসম যন্ত্রণা থেকে মেসিকে উত্থিত দেখে মনে হচ্ছিল এতো ফুটবল নয়। বিজ্ঞান নয়। ভিডিও প্রযুক্তি নয়। মেসির শাপমোচন নিছকই অদৃষ্টের আদিদৈবিক কল নাড়ানাড়ি। ব্যাখ্যা নয়, বিশ্লেষণ নয়, এমন বিরল দিন একমাত্র উপভোগ করা যায়। আর তার সাক্ষী থাকা যায়। বীররসে নিষিক্ত নায়কের সিংহাসন আরোহনের কী আশ্চর্য দিন যখন অদৃষ্টের রূপান্তর দেখতে দেখতে মন পুতুলনাচের ইতিকথার মতো বলে জল, জল তোমার চোখে জল নাই গৌতম।
পুনশ্চ : ট্রফি জিতে দিনকয়েক বাদে বুয়েনেস আইরেস শহরতলির ওই বিশেষ এবং বিশ্বখ্যাত সমাধিতে শ্রদ্ধা জানাতে গেছেন মেসি। পরিচিত কণ্ঠস্বর তাঁকে বলল, ওব্রিগারডো। ধন্যবাদ, আমাদের ফুটবল সভ্যতাকে ফের জমকালো করার জন্য। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই জানো, বিশেষ আন্তর্জাতিক আদালতের মতো আর্জেন্টিনার দায়রা আদালতের একটা শুনানিও সেদিন চূড়ান্ত নিষ্পত্তির ছিল মারাকানায়। আমাদের থেকে কিছু কালো কোট গিয়েছিল সেখানে। আর তারা আমায় বলে গেল দিয়েগো, এদের কোপা জিততেই নাভিশ্বাস। তুমি একা আসলটা জিতিয়েছিলে। মেসি তাই প্রথম সিংহাসন পেয়েছে। তা বলে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সেরার আর্মব্যান্ডটা ওকে কোর্ট এখনও দিল না।
১২ জুলাই, ২০২১ (ব্রাজিলের বিরুদ্ধে কোপা আমেরিকা জিতে ওঠার পর)
এই গোলাপ! এই কাঁটা!
আর দশ মিনিটের মধ্যে সেই গভীরতম মুহূর্ত হাজির হতে যাচ্ছে।
দিয়েগো মারাদোনা বসতে যাচ্ছেন সামনের চেয়ারে। সাদা শার্ট, চওড়া কাঁধের এডু তাঁর দোভাষী। এডু পাশের চেয়ারে। দু’গজ দূরে আমার চেয়ার। এ ফোর সাইজের দুটো প্রিন্ট আউটে রাখা প্রশ্নগুলো শেষ বারের মতো ঝালিয়ে নিচ্ছি। প্রথমে টিভির এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ। ওটা শেষ করেই প্রিন্ট এক্সক্লুসিভ। মানে আমারটা শুরু। প্রিন্ট-টিভি মিলিয়ে সময় মোট পাওয়া যাবে পঁচিশ মিনিট। তার মানে লম্বা প্রশ্নের গল্প নেই। ফাস্ট ফরোয়ার্ড! শুরু থেকে ফাস্ট ফরোয়ার্ড।
ঠিক এই সময় মারাদোনার সঙ্গে হাল্কা কথা বলে ম্যানেজার সার্জিও সরে এলেন এ দিকে। তাঁর বয়ান এডুর মুখে উঠে এল : সাক্ষাৎকারের কথা আমরা জানতাম না। এখন মারাদোনার ইন্টারভিউ করতে গেলে ওয়ান মিলিয়ান ডলার লাগবে। সাড়ে ছ’কোটি টাকা।
বলছে কী লোকটা? মারাদোনা শুনেছি প্রায় পৌনে তিন কোটি টাকা নিয়ে আড়াই দিনের কলকাতা সফরে এসেছেন। তাঁর চুক্তিপত্রে তো এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউয়ের ক্লজ রয়েছে। সময়ও নির্দিষ্ট। তার পর আবার টাকা কীসের?
টেলিভিশন ইন্টারভিউটা যার শুরু করার কথা সেই বোরিয়া মজুমদার এ বার চমকপ্রদ ভঙ্গিতে বলল ”ইন্টারভিউ না করে আপনারা যেতে পারবেন না। এই শর্ত না মানলে দিয়েগোর বাকি অনুষ্ঠান আমরা ভণ্ডুল করে দেব। বেছে নিন কী করবেন?”
রাজারহাটের ফ্যান্যাটিক স্পোর্টস মিউজিয়ামের ভেতর তখন ঝকঝক করছে টিভি প্রোজেক্টরের আলো। ছোট জায়গার মধ্যে টিভির কেবল ছড়িয়ে থাকা এদিক-ওদিক। টেকনিশিয়ানরা ল্যাপেল লাগিয়ে ফেলেছে। গণ্যমান্য কিছু অতিথি দাঁড়িয়ে। কেউ সামান্যতম আঁচও পাচ্ছে না হিসহিসে গলায় শেষ মুহূর্তের কী ভয়ঙ্কর লেনদেন ঘটে চলেছে।
সার্জিও কঠিন মুখ করে এ বার বললেন, ”চুক্তিপত্র তো আমার সঙ্গে নেই। পরে দেখে নেব। এখনকার মতো জাস্ট তিনটে করে ছ’টা প্রশ্নের পারমিশন দিতে পারি।” মারাদোনা এ দিকটা তাকাচ্ছেনই না। যেন নিথর যন্ত্র। আর তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করছে কিছু যন্ত্রী।
সংক্ষিপ্ত ইন্টারভিউ শুরু হল। তার এক মিনিট আগে ছোট ঘটনা। পিছনে দশ নম্বর জার্সিধারী আর্জেন্তিনীয়র সেই বিখ্যাত কাট-আউট। মারাদোনা ইঙ্গিত করলেন, ইন্টারভিউয়ের সময় ওটা তাঁর ব্যাকড্রপ হিসেবে চাই। ক্যামেরাম্যান ইঙ্গিত করল ফ্রেমে অলরেডি রয়েছে। কিন্তু মারাদোনা কবে আর কারও আশ্বাসবাণীর তোয়াক্কা করেছেন? এক ঝটকায় কাট-আউটটা টেনে নিয়ে পাশে বসিয়ে দিলেন। ক্যামেরার লোক চিৎকার করল, ল্যাপেল খুলে গেল। ধুর ল্যাপেল খুলে গেল। মারাদোনা নির্বিকার।
কিন্তু নির্বিকার যে আদৌ নন ইন্টারভিউ নিতে গিয়ে বিলক্ষণ বুঝলাম। একটা করে প্রশ্ন হচ্ছে আর এডু গুনছেন আর বাকি রইল দুই, বাকি রইল এক। এটা তো মারাদোনার দুর্বোধ্য কোনও ভাষায় হচ্ছে না। আঙুলের মুঠ গোনা তো তিনি চোখের সামনে দেখতেই পাচ্ছেন।
আমি : দিয়েগো, পঁচিশে ডিসেম্বরের দিকে সারা পৃথিবীর মানুষ এখন আগ্রহে তাকিয়ে। অকৃত্রিম দিয়েগো অনুরাগীদের বাদ দিয়ে। তারা মনে করে ক্রিসমাস চলে গিয়েছে। তাদের কাছে ওটা ২৫ ডিসেম্বর নয়, ৩০ অক্টোবর। আপনার জন্মদিন। ভাবলে কেমন লাগে লোকে যে আপনাকে ফুটবলের যিশু বলে?
মারাদোনা : আমি জানি ওরা এটা বলে। আমি আর কী বলতে পারি? আমি একজন বিনয়ী মানুষ যে ভক্তদের এ সব কথা শুনলে খুব লজ্জার মধ্যে পড়ে যায়।
আমি : সারা পৃথিবীতে তো দিয়েগো মারাদোনা চার্চও ছড়িয়ে রয়েছে। সংখ্যায় প্রায় ৬০। আপনি কখনও সেখানে গিয়েছেন?
মারাদোনা : এক-আধটায় গিয়েছি বৈকি। ওই তো বললাম চূড়ান্ত অস্বস্তিতে পড়তে হয়।
(এডু দেখাতে শুরু করেছেন ওয়ান। ওনলি ওয়ান রিমেনিং)
আমি : ফিফার বিরুদ্ধে দিয়েগোর এত বছরের বিদ্রোহের কথা সবার জানা। হ্যাভেলাঞ্জ থেকে ব্লাটার। বিভিন্ন ফিফা কর্তা তাঁকে শোষণ করেছেন বলে দিয়েগোর বরাবরের ক্ষোভ। অথচ তিনি যে রাশিয়ার ওয়ার্ল্ড কাপ ড্র-তে দিব্যি ফিফার ডাকে মস্কো চলে গেলেন সেটা কি চূড়ান্ত বিস্ময়কর নয়? ফিফা তো আবার তাঁর খ্যাতি কাজে লাগিয়ে নির্দয়ের মতো ছুড়ে ফেলতে পারে?
মারাদোনা : ফিফার আগের বসগুলো ছিল জোচ্চোর। জালিয়াত। অন্যায় ভাবে লাখ লাখ টাকা করেছে। এখন যে লোকটা এসেছে (ইনফান্তিনো) সে ভাল। দিয়েগো তাকে বিশ্বাস করে। সে প্লেয়ারদের স্বার্থ দেখে।
তিনটে প্রশ্নের শেষ ঘণ্টি বেজে গিয়েছে। তাই পাল্টা জিজ্ঞেস করার সুযোগ নেই যে এই ইনফান্তিনো সম্পর্কেই তো আপনি জাস্ট গত বছর ছেপে বার হওয়া নিজের বইয়ে সম্পূর্ণ উল্টো কথা বলেছেন। লিখেছেন, প্লাতিনির মতো মালের অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে যে সাত বছর কাজ করেছে সে কেমন হবে বোঝাই যাচ্ছে। পেলে সম্পর্কে তাঁর বীতরাগ যেমন ফুটবলমহলে ওয়ার্স্ট কেপ্ট কমন সিক্রেট। গোপন অথচ সবাই জানে। এ বারও সংগঠক শতদ্রু দত্তকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন ম্যানেজার সার্জিও। ”দেখবেন ভুলেও যেন দিয়েগোর এলাকায় পেলের কোনও ছবি না থাকে।” অথচ হুইলচেয়ারে বসে থাকা সেই পেলেকেই তো মস্কোয় চুমু খেলেন? সারা পৃথিবী সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ল। ব্যাখ্যা কী? জানার উপায় নেই। সফরে যে আর কোনও সাংবাদিকের মুখও দেখবেন না পণ করেছেন।
ধাঁধা নম্বর দুই, মেসি সম্পর্কে আর কি এখন দরাজ? আপাতত বাকি বিশ্ব যা বলছে তিনিও তো তাই বলছেন; বিশ্বকাপ জেতাতে না পারলে মেসি দিয়েগোর জায়গায়টা পাবে না? মন্তব্যের মধ্যে সেই স্নেহশীলতা কোথায় যা এক সময় মেসির প্রতি দেখাতেন? এ তো সেই কট্টর সমালোচক যে মেসির বিপর্যয় দেখতে চাইছে।
টিভি ইন্টারভিউতে প্রশ্ন হল, রোনাল্ডো বলছেন তিনি গ্রেটেস্ট। শুনে তাঁর—মারাদোনার কি গা চিড়চিড় করছে না?
এডু ট্রান্সলেশন শেষ করামাত্র মারাদোনা হাসতে শুরু করলেন। অনবদ্য সেই হাসি। গোল করে তাঁর সেই বিখ্যাত চেস্ট থাম্পিং মনে করিয়ে দিল। এটাও তো অঘোষিত বুক চাপড়ানো যে কী বলছে শোন, রোনাল্ডো নাকি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী? হাসি থেকে উঠে যা বললেন তার ভাবানুবাদ : ওই রোনাল্ডো না কী, ও আগে মেসিকে হারাক। তার পর তো দিয়েগো-লোকে পৌঁছবে।
এর পর বলেই দিলেন, ”গ্রেটেস্ট কে আবার? ওই লোকটা।” দেখালেন পিছনের কাট-আউট। এর দু’মিনিটের মধ্যে আমার প্রশ্নের জবাবে মারাদোনা বলবেন তিনি কত বিনয়ী। কন্ট্রাডিকশন তাঁর মাঝের নাম, ব্রিটিশ মিডিয়ার বরাবরের প্রচার নিয়ে তখন ভাবছি না।
ভাবছিলাম ন’বছর আগে কলকাতাতেই মানুষটার সঙ্গে পঁচিশ মিনিট একান্তে কথা বলেছি। সিকিউরিটি অফিসার আর মাত্র একটা প্রশ্ন বলে ইন্টারভিউ শেষ করে দিতে চাইলে তিনি হাত দেখিয়েছেন থ্রি মোর বলে। সেই মানুষটা এ বার মিডিয়া সম্পর্কে এত বীতস্পৃহ কেন? ইভেন্ট প্রোমোটার যবে থেকে প্রথম তাঁর সঙ্গে বুয়েনস আইরেসের বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছে, সে দিন থেকে জানিয়ে দিয়েছেন কলকাতায় কোনও প্রেস কনফারেন্স করায় তীব্র আপত্তি রয়েছে। সেটা করবেন না। কন্ট্রাক্টে থাকা ইন্টারভিউয়ের পুরো সময় দেবেন না। তা হলে করবেনটা কী? স্পনসর্স মিট? যেটা না করলেই নয়?
আজ্ঞে না। ইকো স্পেসের ব্যাঙ্কোয়েটে জমকালো স্পনসর্স মিটের আয়োজন হয়েছিল। সেখানে গেলেন। আর একটু পরে হাওয়া। অথচ স্প্যানিশ গান দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হতে খুব মুডে দেখাচ্ছিল। গাইতে শুরু করলেন বিখ্যাত সেই কিউবান গান গুয়ান্তানামেরা। কাস্ত্রোর কিউবা মারাদোনার বরাবরের প্রিয়। তাঁর বাঁ কাঁধে কাস্ত্রোর ছবিও ট্যাটু করা। পার্টির সময়সীমা এক ঘণ্টার। মারাদোনা মাইক হাতে যেমন গাইছেন, আজ দেড় ঘণ্টা না পার করে দেন। অডিয়েন্সের প্রশ্নের সুযোগ রয়েছে। কর্ডলেস ঘুরছে নীচে। তারাও যথেষ্ট উত্তেজিত। আজ নিশ্চয়ই কলকাতার আকাশে এক অবিস্মরণীয় ফুটবল রাত!
কিন্তু রাত পড়লে তো অবিস্মরণীয় হবে! মারাদোনা গোটা আষ্টেক স্পনসর স্টেজে উঠতেই হাত তুলে দিয়েছেন এ বার চলে যাবেন। ক্রুদ্ধ দৃষ্টি হানছেন ম্যানেজার সার্জিও। যেন কিছু মাদক চোরাচালানকারীর সঙ্গে নতুন করে মারাদোনার নাম যুক্ত হতে যাচ্ছে। ”নো মোর,” হাত দেখিয়ে মারাদোনা স্টেজ থেকে নেমে পড়লেন। বেরিয়েও গেলেন, ”গুড নাইট।” দর্শকাসন বিস্ফারিত। একশোর বেশি মানুষ তাঁর কথা শোনার জন্য ভিড় করে এসেছেন। তাঁদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগই হল না। এমন সব ঘটনা ষাট ঘণ্টার সফর জুড়ে ঘটতেই থাকল।
বারবার মনে হচ্ছিল আগের কলকাতা সফরে কি এতটাই স্বেচ্ছাচারী আর দায়িত্বজ্ঞানহীন দেখেছি? সে বারও মোহনবাগান মাঠ থেকে আচমকা বার হয়ে গেছিলেন সাদা টুপিকে দেখতে পাওয়ায়। সাদা টুপি সেই সময়ের ক্রীড়ামন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী। সুভাষই অদম্য উৎসাহে মারাদোনার প্রথম কলকাতা সফরে অফুরন্ত সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। অথচ হঠাৎ করে তাঁর উপরই দিয়েগোর অরুচি হয়ে যায়। কেন-র কোনও ব্যাখ্যা নেই।
এ বার সফরে আসার পর কাণ্ডকারখানা যেমন উদ্ভট। এই তাঁর জিনিয়াসের গন্ধে মাতাল করে দেওয়া গোলাপ! এই কুখ্যাত দিগভ্রষ্টতা দেখিয়ে কর্কশ-কাঁটা! একটা অ্যাপ জুড়ে বসতে না বসতেই যেন পরের অবাঞ্ছিত অ্যাপটা সিগন্যাল পেয়ে যাচ্ছে।
তাঁর পর্যায়ের কিংবদন্তিরা সব সময় সতর্ক থাকেন নতুন জায়গায় গিয়ে প্রথম ইম্প্রেশনটা ঠিকঠাক রাখার। বলা তো যায় না কোন মন্ত্রী-আমলা-বিশিষ্ট এয়ারপোর্টে রিসিভ করতে এল।
তিনি— মারাদোনা কী করলেন? এরোব্রিজ দিয়ে প্রথম পা রাখার সময় বিধায়ক সুজিত বসু আর আমি প্লেনের দু’দিকে দাঁড়িয়ে। সুজিতের হাতে ফুল। মারাদোনা টানছেন ছোট কিট ব্যাগ। নামলেন সবার আগে। চিৎকার করে গান গাইতে গাইতে। ফুল দেওয়া হবে কী, তাঁর ওই অবস্থা দেখে আমরা মুখ চাওয়াচায়ি করছি। এ তো টং হয়ে রয়েছে। শুনলাম প্লেনে বেশি ওয়াইন খেয়ে ফেলেছেন।
ইমিগ্রেশনের সামনে রীতিমতো বেসামাল। জোরে কথা বলছেন। হাসছেন। সবাই হাঁ করে দেখছে। তাঁর নতুন বান্ধবী বয়সে অনেক ছোট। তাই হয়তো জোরটা বেশি খাটাতে পারে। সেই রুশোয়া তাঁকে সবার সামনে ঝাঁকাল যে, হচ্ছেটা কী? এর পর সবার সামনেই মারাদোনার কাঁধে চাপড় মারল। মুখভঙ্গি দেখে যে কেউ বুঝে যাবে কী বলা হচ্ছে। ওহে দিয়েগো …. ফেরৎ এসো। মারাদোনা চুপ করে গেলেন। মনে হল তরুণ বান্ধবীকে ভয় পান।
ইমিগ্রেশন কাউন্টারে গিয়েও তীব্র ঝামেলা বাধালেন বারবার করে। তখন পেলের স্মৃতি সুপার ইম্পোজ হয়ে আসছে। দু’বছর আগে এখানেই পেলে এসেছেন মারাদোনার চেয়ে কম টাকা নিয়ে। তাঁরও তো একই রকম নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবেশ থেকে উত্থান। অথচ বিভিন্ন পরিবেশের সামনে পেলে তো একবারের জন্যও মেজাজ হারাননি। এত সহযোগিতা করেছিলেন যে, মিডিয়া স্পনসরের কাগজ না হয়েও লাঞ্চ খেতে খেতে আমার ইন্টারভিউ শেষ করেছেন, যা সচরাচর হয় না। খেতে খেতে কোনও ইন্টারন্যাশনাল সেলিব্রিটি সাক্ষাৎকার দেন না। চাওয়াও হয় না। ধরা হয় অসৌজন্য।
ইমিগ্রেশন কাউন্টারে দিয়েগোকে আঙুলের ছাপ দিতে বলা হল। বলা হল টুপি খুলে ছবি তুলতে। মারাদোনা তীব্র তোড়ফোড় শুরু করলেন। কিন্তু এ তো সারা পৃথিবীর নিয়ম। বছরে ছ’মাসেরও বেশি এখন যেখানে কাটান, সেই দুবাইয়ে তো আরও বেশি পরীক্ষার ব্যবস্থা। তা হলে কেন টেবল চাপড়ে বলতে শুরু করবেন, ইন্ডিয়া নো গুড দুবাই, দুবাই। মানে আমায় ফেরার প্লেনে তুলে দাও।
অকৃত্রিম মারাদোনা ভক্ত হিসেবে তখনও তাঁকে ছুটকারা দিয়ে চলেছি। যা ঘটছে পানীয়ের নেশায়। নীচে ডিউটি ফ্রি শপের সামনে তাঁর দিকে অটোগ্রাফ খাতা এগিয়ে দিল এক কিশোর। মুহূর্তে মারাদোনা চেঞ্জ। হাসিতে মুখ ভরে গেল।
তাঁর কলকাতা সফরে টানা ষাট ঘণ্টার অর্ধেকেরও বেশি একসঙ্গে কাটিয়ে যা বুঝলাম, এই ৫৭ বছরের মারাদোনা নিজের নেটওয়ার্কে কিছু ফেভারিট জোন নির্দিষ্ট করে ফেলেছেন। যে সব জায়গায় তাঁর সিগন্যাল আসবেই।
বাচ্চচারা : কচিকাঁচাদের প্রতি তাঁর বরাবরের স্নেহ। তাই বারাসতে আদিত্য স্কুল অফ স্পোর্টসের মাঠে কিশোরদের এত মন উজাড় করে সময় দিলেন।
ফুটবল মাঠ ও ফুটবল : এত মানসিক বিশৃঙ্খলার মধ্যেও যখন যেখানে ফুটবল পড়ে থাকতে দেখেছেন, মুখের চেহারাই বদলে গিয়েছে তাঁর। কী যত্নের সঙ্গে না বারাসতের মাঠে কিশোরদের কোচিং করাচ্ছিলেন। ওই সময়টুকু তাঁকে সত্যি ফুটবলের ঈশ্বর মনে হচ্ছিল।
ফুটবলার : প্রসূন-শ্যাম-বিশ্বজিৎ-দীপেন্দু-শিশিরদের চেনেন না। কোনও দিন দেখেননি। অথচ আলাপ করিয়ে দেওয়ামাত্র বুকে জড়িয়ে ধরলেন। সৌরভের সঙ্গে ব্যবহারেও কত উষ্ণতা। যদিও সৌরভের ব্যাপারে নাকি তাঁকে আগাম বলে রাখা হয়েছিল, ‘ও একদিন প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হবে আর তখন তোমায় ইন্ডিয়ান কোচ করে আনবে।’
মাদার টেরিজা ও ফিদেল কাস্ত্রো: মাদার সম্পর্কে বরাবরের মুগ্ধতা থেকে গিয়েছে। অন্য অনুষ্ঠান কাটছাঁট করেও মাদার হাউসে গিয়েছেন। ফিদেল কাস্ত্রো আর একটা নরম জায়গা আর কলকাতা সফরে মাথায় যে জংলা টুপিটা ছিল সেটা নাকি কিউবায় বসে তাঁকে কাস্ত্রোর দেওয়া।
অর্থ : জীবনের এই পর্যায়ে এসে কোথাও মনে হয় মেসি-রোনাল্ডোরা বোধহয় তাঁকে ইনসিকিওর করে দিয়েছেন। আগের বার মারাদোনাকে জুনিয়রদের ব্যাপারে যেন আরও দরাজ দেখেছি। ‘বোধহয়’ শব্দটা অবশ্য অর্থ চাহিদার ব্যাপারে নেই। স্ট্রেট লালসার পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে।
নেটওয়ার্ক এতটুকু। এর বাইরে যা-ই সামনে ফেলা হোক, নো সিগন্যাল। প্রথম রাতে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ স্পনসর্স নাইট থেকে বেরিয়ে গেলেন। দ্বিতীয় দিন দাদা বনাম দিয়েগো ম্যাচ খেলবেন বলে যখন সবাই জানে, হঠাৎ বাঁ কাঁধ দেখাতে শুরু করলেন। ওই কাঁধে এক মাস আগে অপারেশন হয়েছে। খেলবেন না বোঝা গেল। কিন্তু মাঠে থাকবেন না কেন? তাঁকে কেন্দ্র করে এত বড় মেলা বসেছে। সৌরভকে চূড়ান্ত বিস্মিত দেখাল, এ কী ওঁকে আর একবার ডাকা হোক। বাইরে বসেও ম্যাচটা দেখুন। কিন্তু দিয়েগোর কনভয় ততক্ষণে কলকাতা রওনা দিয়েছে।
এর ঘণ্টাদুয়েকের মধ্যে চেতলায় মন্ত্রী ববি হাকিমের পাড়ায় গিয়ে নামতে অস্বীকার করলেন। কেন? না চারদিকে প্রচুর ভিড়। ভিড় তো হবেই। তিনি মারাদোনা এত বড় ক্রাউড পুলার। বিশ্বে যেখানে যাবেন সেখানে লোকে গোল গোল চোখ করে তাকাবে। রাজারহাট থেকে চেতলা—এত দূর এলেন কেন যদি গাড়ি থেকেই না নামেন? সার্জিও তাঁর ম্যানেজার এসে বোঝাতে গিয়েছিলেন। মারাদোনা তাঁকে প্রকাশ্যে চড় মারলেন। পাশে রাখা পুলিশের গাড়িতে তীব্র উত্তেজিত ভাবে লাথিও মেরে দিলেন। ঘটনাগুলো এমন মারাদোনাপ্রেমী সম্প্রদায়ের মধ্যে বলে ছাড় পেলেন। নইলে অবধারিত পুলিশ কেস ছিল।
কলকাতায় থাকার কথা ছিল আড়াই দিন। বুধবার সন্ধের এমিরেটস ফ্লাইটে রিটার্ন টিকিট। মারাদোনা হঠাৎ গোঁ ধরলেন, তাঁকে আগে ফিরে যেতে হবে। শতদ্রু বহু বোঝাল, এতগুলো টিকিট এগোতে গেলে প্রচুর গচ্চচা। তা ছাড়া সে দিন দুপুরে তো তাঁর অন্য প্রোগ্রামও রয়েছে। কে শোনে কার কথা। চাপ দিয়ে সব টিকিট প্রিপোন করিয়ে নিলেন মারাদোনা। রাতের হল অফ ফেম অনুষ্ঠানে হাজির হলেন প্রচুর হুমকিটুমকির পর। দেখেটেখে মনে হল অ্যাপিয়ারেন্স ফি-টা নিয়েছেন জাস্ট কলকাতায় পা দেবেন বলে। কলকাতার কোনও ইভেন্টে অংশ নেবেন বলে নয়।
খুব হতাশ লাগল তাঁর ফিজিক্যাল কন্ডিশনিংয়ের অবস্থা দেখে। সত্তর ছুঁইছুঁই শ্যাম থাপা এখনও দৌড়চ্ছেন। ষাটোর্ধ্ব প্রসূন ড্রিবল করতে করতে তাঁর সেই বিখ্যাত টার্নিং দেখাচ্ছেন। তিনি— মারাদোনা ফুটবল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর একটা সাইড ভলিও মারতে পারছেন না! কিশোরদের তাই ভলি দেখানো হল না। মাত্র সাতান্ন বছরে যদি শরীরে এই ন্যুব্জ অবস্থা হয়, তা হলে আর্জেন্তিনাকে আবার কোচিং করাতে চাইছেন কেন? বিশ্বপর্যায়ের কোচিংয়ের জন্য তো অপর্যাপ্ত ফিটনেস দরকার। সেটা তাঁর কোথায়? চাউনিটাউনিগুলোও কেমন উদভ্রান্ত।
তাঁর কলকাতা সফরে কাছ থেকে দেখার সময় বারবার সেই মানুষটাকে খুঁজেছি যে ফুটবলের নতুন দ্বীপই শুধু তৃতীয় বিশ্বকে চেনায়নি। প্রতিষ্ঠানকে দাবিয়ে রেখে একক যুদ্ধের চির রোম্যান্টিক জয় দেখিয়েছিল। সে এক অর্থে ফুটবলের রবিন হুড। ফিফার যম, অবলা অপরিচিত খেলোয়াড়ের বন্ধু। শত বিতর্কের জলোচ্ছ্বাসেও তাই মারাদোনা ভালবাসার মাস্তুল হারায়নি বাঙালি ফুটবলপ্রেমিক। মারাদোনা মানে তো শুধু বাঁ পা আর বিদ্যুৎ ঝলসানো নয়। গোটা পৃথিবীর অধিকারকে হারিয়ে ওঠার অসীম একক পরিতৃপ্তিও। ফুটবল মাঠে গরিবের পোয়েটিক জাস্টিস দাতা। এই মানুষটা তো আদৌ নয়। এ বরঞ্চ নিজের সম্পর্কে অতীতের ইংরেজ লিখিয়েদের পর্যবেক্ষণ সত্যি প্রমাণ করে ছাড়ছে। ফুটবল মাঠের দেবদূত। মাঠের বাইরের শয়তান। এঞ্জেল অ্যান্ড দ্য ডেভিল।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ছিয়াশির সেই অমর গোলটা অবধি যাওয়ার দরকার নেই। যার পরে ইংরেজ কোচ ববি রবসন বলেছিলেন, ”আমাদের দিক থেকে কোনও ভুল হয়নি। ডিসিপ্লিন সব পারে। জিনিয়াসকে হারাতে পারে না।” ইউ-টিউবে নাপোলির হয়ে সেরা দশ গোল ভাবা যাক! যা দেখলে মনে হয় ফুটবল কোন অপার্থিব লোকে না উত্তীর্ণ হতে পারে! হতে পারেন বিশ্বকাপে পেলে আরও সফল। কিন্তু পেলের এর চেয়ে ভাল গোলের আর্ট এগজিবিশন কোথায়?
এ বার দেখে আরও মনে হল, মারাদোনার সমস্যা হল অতীতকে পিছনে ফেলে হাঁটতে না চাওয়া। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভরপুর সফল মানুষেরা জাবর কাটায় বিশ্বাসী নন। এঁরা সব সময় সামনে দেখতে চান। বা বর্তমানে আচ্ছন্ন থাকেন। অথচ মারাদোনা বর্তমানেও অগ্রসর হন তাঁর অতীতের ফুটবল মিনার পাশে রেখে। এই দ্যুতিটা তাঁর চাই। আর এই অতীতে ঝুঁকে থাকাই বোধহয় তাঁর মনের মধ্যে অহর্নিশি লালন করে চলে ভিলা ফ্লোরিটোর সেই বস্তি। ছয় বাই ছয় ফিটের সেই খোঁয়াড় আর মহল্লার সন্দেহজনক মানুষজন। যা তাঁর জন্মস্থান।
ডিলিট হয় না সেগুলো। সে জন্যই হয়তো মুহূর্তান্তরে তিনি এই গোলাপ! এই কাঁটা।
জিনিয়াস— দিগভ্রষ্ট!
নভেম্বর, ২০১৭
ঈশ্বর সমীপে ‘ঈশ্বর’
দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা এখন যেখানে যতদূরই পৌঁছে থাকুন, গ্যারি লিনেকারের শোকগাথা কানে গেলে দ্রুত চিড়বিড়িয়ে এই গ্রহে ফিরতেন।
গোটা বিশ্বকে স্তম্ভিত করে মাত্র ৬০ বছর বয়সে এ দিন বুয়েনস আইরেসে মারাদোনা শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার পরেও মনে হচ্ছে ইংরেজরা তাঁর সঙ্গে ‘ফকল্যান্ড যুদ্ধ’ চালিয়ে যাচ্ছে।
পৃথিবীর সর্বকালের শ্রেষ্ঠ তিনি কিনা সেই বিচার হয়তো আরও একশো-দুশো বছর চলবে। কিন্তু ফুটবল সাম্রাজ্যের সর্বকালের সবচেয়ে আলোচিত নক্ষত্রের মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার এবং হপ্তাখানেক বাদে আজ কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে মারা যাওয়ার পর গ্যারি লিনেকারের টুইট বিস্ময়কর। লিনেকার লিখছেন, ”তর্কযোগ্যভাবে দিয়েগো পৃথিবীর সর্বকালের সেরা ফুটবলার। আমার প্রজন্মের সেরা তো বটেই। আশীর্বাদধন্য অথচ গোলমালে ভরা ব্যক্তিগত জীবন কাটিয়ে আশা করি এখন ও ঈশ্বরের হাতে শান্তিতে থাকবে।” ‘হ্যান্ডস অব গড’ শব্দটা লিখেছেন লিনেকার ঈশ্বরের হাতে বোঝাতে গিয়ে।
অনেকের মনে হচ্ছে ফুটবল সমাজের তীব্র শোকযন্ত্রণার মধ্যেও এই ‘হ্যান্ড অব গড’ শব্দটা ব্যবহার করা ইচ্ছাকৃত এবং রুচিহীন ঠেস দেওয়া। মারাদোনা কলকাতা সফরে একান্ত ইন্টারভিউতে বলেছিলেন, ”ইংরেজদের মজাটা কী জানেন? ওরা ইতিহাস যখন-তখন প্রয়োজন মতো ভুলে যেতে পারে। ছেষট্টির বিশ্বকাপ ফাইনালে চুরি করে দেওয়া গোলে জার্মানিকে ওরা হারিয়েছিল। আজও ভিডিওতে দেখবেন বলটা গোললাইন ক্রস করেনি। কিন্তু নিজের দেশে গোল নিয়ে নিয়েছিল। ওদের বিচিত্র ইতিহাস। যেখানে হ্যান্ড অব গড আছে, ছেষট্টির চুরিটা নেই।”
কোভিডে মারা যাননি দিয়েগো। অতিরিক্ত মাদক সেবনের জন্যও নয়। মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার সার্জারি হয়েছিল। হাসপাতাল থেকে সুস্থ হয়ে ফেরার দু’সপ্তাহের মধ্যে অত্যন্ত ট্র্যাজিকভাবে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট এসে নিষ্ঠুরতম ট্যাকলে সরিয়ে দিল।
আর্জেন্টিনায় তিনদিন রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষিত। বিশ্বব্যাপী ফুটবল ভক্তদের গ্রহে অবশ্য অনির্দিষ্টকালীন রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা হয়ে গেল। মারাদোনা তো শুধু ফুটবলার ছিলেন না। ছিলেন রক্তমাংসের ইতিহাস। তাঁর মৃত্যুর পর আর্জেন্টিনা প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্ডেজ যেন সারা বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের হয়ে বক্তব্য রেখেছেন। বলেছেন, ”তুমিই সর্বকালের সেরা। আর এই পৃথিবীতে আমাদের সময় বাস করার জন্য তোমায় ধন্যবাদ।” বিশ্বের কোনও প্রান্তের কোনও ক্রীড়াবিদ তাঁর রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে এমন আবেগে রক্তমাখা শোকগাথা পেয়েছেন?
কিন্তু দিয়েগোর পৃথিবী তো বরাবর তাই। একবার লিনেকার পরমূহূর্তেই আলবার্তো। এই কেলেঙ্কারি। পরমুহূর্তেই গৌরব। আর্জেন্টিনার ভিলা ফ্লোরিতোর বস্তি থেকে উঠে আসা এক কিশোর গত চল্লিশ বছরে বিশ্বকে ঘুরপাক খাইয়ে দিয়েছে তাঁর শিল্পের আগুনে। কিন্তু এমনই আগুন যা অসামান্য আতশবাজির মতো জ্বলেও আকস্মিক আত্মবিস্ফোরণে নিজেকেই ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। যেমন নৈপুণ্যের সিংহাসনে ছিনিয়েছে। তেমনই নিজের ভুলে রিক্ত হয়ে চলে গিয়েছে।
ফুটবল ভক্তদের অবশ্য তাতে কিছু আসে যায়নি। তাদের মনে হয়েছে এই লোকটা তো কমিউনিজমের জীবন্ত দৃশ্যায়ন। এর জীবনের নায়ক যে ফিদেল কাস্ত্রো হবেন তাতে আর আশ্চর্য কী। বিশ্বব্যাপী ক্রীড়া মনোবিদরাও বহুবার মনে করেছেন মারাদোনা হলেন তাঁদের আদর্শ সাবজেক্ট। এই সাদা এই কালো। এখনই ফূর্তির ফানুসে সবার চোখমুখ উজ্জ্বল করে দিচ্ছেন। পরমুহূর্তেই এমন একটা কাণ্ড করে বসছেন যেটার জন্য সবচেয়ে বড় সমর্থকেরও লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যাচ্ছে। একা মারাদোনা বাংলা-সহ পৃথিবীর বিভিন্ন শহরে ব্রাজিলের ভোটব্যাঙ্ক কেড়ে নিয়েছেন। হলুদ জার্সির পাশে ডগমগিয়ে বসিয়ে দিয়েছেন নীল-সাদা আর্জেন্টিনীয় জার্সিকে। অথচ পরমুহূর্তে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো আচরণ করছেন যে, তাঁর কোনও আইনজীবী পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি তিন বছর আগে শেষ কলকাতায় এলেন। ইমিগ্রেশন কাউন্টার থেকে বিনা প্ররোচনায় ঝামেলা শুরু করে দিলেন। ম্যানেজারের মুখে জানা গেল যে দুবাই-কলকাতা ফ্লাইটে বেশি ওয়াইন খেয়ে আউট হয়ে গিয়েছেন। তখনই মনে হল ২০০৭ থেকে অ্যালকোহল রিহ্যাবে যে এত বছর কাটালেন, তার ফল কী হল?
এরপর দিয়েগো প্রচণ্ড জোরে কথা বলতে শুরু করলেন। ইমিপ্রেশন কাউন্টারে আঙুলের ছাপ দিতে রাজি হচ্ছেন না। বলছেন, ”ছবি তোলার জন্য টুপি খুলতে পারব না।” মারাদোনার সফরসঙ্গী বান্ধবী পিঠে তীব্র চাপড় মারলেন, ”চলো এখান থেকে।” ততক্ষণে সিন ক্রিয়েট হয়ে গিয়েছে। লোক গিয়েছে জমে। দিয়েগো এ বার চিৎকার শুরু করলেন, ”ইন্ডিয়া নো গুড। দুবাই দুবাই।” কোনওরকমে বুঝিয়েসুজিয়ে তাঁকে ভিতরে আনা হল।
এবার হঠাৎ এক কিশোর এসে দৌড়াতে দৌড়াতে অটোগ্রাফ খাতা এগিয়ে দিল। একে কি লাথিটাথি মারবেন? যা উগ্র মেজাজে আছেন। দিয়েগো কী করলেন? না, পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরলেন। আসলে বরাবরই এ রকম। এই তিনি ভিলা ফ্লোরিতোর বস্তি। পাঁচ বাই পাঁচ ঘরের আবর্জনা। পরমুহূর্তেই স্বপ্নালু টানে আল্পসের পর্বতমালা। এত বড় মাপের ক্রীড়াবিদ এই রকম কন্ট্রাডিকশন নিয়ে বিশ্বইতিহাসে জন্মেছে বলে মনে হয় না। মাত্র ৬০ বছরে মেসি-রোনাল্ডোদের সৌরজগৎ স্তব্ধ করে দিয়ে এভাবে চলে যাওয়ার সঙ্গে তুলনীয় কী হয়? হলিউডে মাইকেল জ্যাকসনের ৫১ বছর বয়সে চলে যাওয়া।
বিশ্বফুটবল ইতিহাস শুধু নয়। গোটা ক্রীড়াবিশ্বে একটা চিরন্তন কেস স্টাডি হয়ে থেকে যাবেন মারাদোনা। গরিবের জন্যে লড়েছেন। তৃতীয় বিশ্বকে সিংহাসনে বসিয়েছেন। ইংরেজদের অত্যাচারী প্রভুত্ব কখনও মেনে নেননি। এসব দিক দিয়ে তিনি মহম্মদ আলির সঙ্গে তুল্য। আবার যখনই মনে হয় তাঁর ড্রাগ কেলেঙ্কারির কথা। সাংবাদিকদের দিকে তাক করে এয়ারগান ছোড়া। বিশ্বকাপে ডোপিংয়ে ধরা পড়া। ইতালীয় মাফিয়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব বাধানো। কোন কুকর্মটা করেননি? পেলেকে কখনও এক নম্বর মানেননি। বলেছেন, ”ব্রাজিলের ওপিনিয়ন পোলেই ও জিততে পারে না তো আমাকে কী হারাবে।” তখন মনে হয়েছে অন্তত সফিসটিকেশনে পেলে তাঁর কয়েকশো মাইল আগে।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো নিজেকে বিশ্বসেরা বলেছেন সেই ব্যাপারে কলকাতা সফরে প্রতিক্রিয়া চাওয়ায় প্রবল হেসে বলেছিলেন, ”রোনাল্ডো আগে মেসিকে হারাক। তারপর আমার কাছে আসবে।” পরবর্তী সময়ে আবার উদোম গালাগাল করেছেন মেসিকে। ডেভিড বেকহ্যাম কত বড় ফুটবলার জিজ্ঞেস করায় বলেছেন, ”ওকে খুব সুন্দর দেখতে।”
মনোবিদরা তখন বলেছিলেন ইগো ম্যাচিওরিটির অভাবে এটা হচ্ছে। জিনিয়াস হয়েও তাই নিজের ভার বইতে পারেন না। থেকে যান ফ্লড জিনিয়াস।
মরণোত্তর এ সব শুনলেও মারাদোনার কিছু আসত-যেত বলে মনে হয় না। তিনি বরং বলতেন হাসপাতালে ব্রেন অপারেশনের পরও তাঁর অ্যাম্বুল্যান্সটা আগাগোড়া আর্জেন্তিনীয় মিডিয়া কীভাবে ফলো করেছিল। শেষ বিশ্বকাপ খেলেছেন ছাব্বিশ বছর আগে। তারপরও বিশ্বব্যাপী পাপারাৎজি-র প্রথম ও শেষ লক্ষ্য তিনি। তা হলে কোথায় মেসি? কোথায় রোনাল্ডো? কোথায় পেলে? লিনেকার ব্যঙ্গ করতে গিয়ে একটা ভুল করেছেন। ঈশ্বরের হাতে তিনি সমর্পিত নন।
নাহ, ফুটবলের ঈশ্বর স্বর্গে গিয়েছেন ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করতে। ঈশ্বর যে সাত তাড়াতাড়ি তাঁকেই বেছেছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের নয়।
২৬ নভেম্বর, ২০২০
সেই তো আবার কাছে এলে
ঠিক ৩০৮০ দিন। মারাকানার হাঁড়িকাঠে বলি থেকে লুসেইলে আকাঙ্খার সর্বোচ্চ শৃঙ্গ আরোহণের মাঝে।
আর্জেন্তিনা দেশে ফিরে যাওয়ার মাত্র ক’দিনের মধ্যে একটা
ছবি সকলের চোখে পড়ল। লিওনেল মেসির বালিশের পাশে পরম যত্নে শায়িত বিশ্বকাপ। কী অসামান্য ছবি যা যন্ত্রণার মুখে পড়ছে কাতারের কর্তাব্যক্তিদের পরিকল্পনা শুনে। লুসেইল স্টেডিয়াম নাকি অতঃপর কমিউনিটি সেন্টার হয়ে যাবে। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকবে স্টল, দোকান কাফে, খেলার ব্যবস্থা।
শুনে মনে হল ফুটবল রোম্যান্সের ওপর এত নারকীয় আঘাত কোয়ার্টার ফাইনালে ওই ডাচ ডিফেন্ডারগুলোও হানেনি।
মারাদোনা অকালে চলে গিয়ে পৃথিবীর কাছে আরও বেশি করে আপন। মারাদোনা ইন্টারভিউ জীবনের সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং স্মরণীয় অভিজ্ঞতা হয়ে রয়েছে। থাকবেও।
পেলে তো ব্র্যাডম্যান-সদৃশ। তাঁর চলে যাওয়াটাও কী মর্মস্পর্শী!
পেলে-ব্র্যাডম্যান- ম্যান্ডেলাদের একান্তে পাওয়া জীবনের সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। কিন্তু টানা আটবছর ধরে যে মেসিয়ানা প্রত্যক্ষ করলাম সেই আবেগের পাশে আর কিছুই নয়।
চাইব না পরের বিশ্বকাপে মেসিকে দেখতে। কিন্তু দূর থেকে তাঁর ফুটবল রোম্যান্সের তীর্থযাত্রায় অপ্রত্যক্ষ জড়িয়ে মনে হচ্ছে যা দেখলাম, তাকে সর্বোচ্চ মাপের হলিউডও ফুটিয়ে তুলতে পারত না।
একেই বলে জনারণ্যে রূপকথা। ফুটবল মাঠের ভাগাড়ে নির্বাসন থেকে সেই ফুটবল মাঠেরই মঞ্চ আরোহণের যুগান্তকারী কাহিনী। ফুটবল ছাড়িয়ে তা সাহিত্য। জীবন। আরও অনেক কিছু যার ব্যাখ্যা হয় না বুদ্ধিতে।
নিজের জীবনের জন্য খেলতে হলে এখনও বাছব পেলেকে।
একটা বিশেষ দিন প্রবল শক্তিধরকে গুতিয়ে জিততে হলে বাছব মারাদোনাকে।
কিন্তু কঠিনতম সময়ে রোম্যান্স এবং জয় দুটোতে মাখামাখি হতে গেলে বাছব মেসি।
সত্যি, একনিষ্ঠ ফুটবল পথিক হিসেবে এই বই লেখার সুযোগ পাওয়া ভাগ্যের!
সমাপ্ত
