সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ২.১
২.১
সেই পোস্টকার্ড আসার কয়েক বছর পরে এক মেঘলা শীতের দিনে মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলের স্টেশনে টিকিট চেকারের হাতে বন্দি এক নারী ও এক সবুজ ফ্লানেলের কার্ডিগান-পরা শিশু। তাদের আর কয়েদখানায় যাওয়া হলো না। তার কারণ, অবশেষে টিকিট খুঁজে পাওয়া গেল চামড়ার খোপকাটা ব্যাগটার ছেঁড়া লাইনিং-এর ফাঁকে ঢুকে গিয়েছিল। মাতাপুত্র স্টেশন চত্বরে বেরিয়ে এসে দেখল, ট্রেনে আগত যাত্রীরা যে-যার মতো চলে গিয়েছে। বাইরে বড়ো বটগাছটার নীচে তিনটি ভাড়ার পালকি, তাদের বেহারারা পলকা রোদে পিঠ দিয়ে উবু হয়ে বসে বিড়ি খাচ্ছে।
ওদের মধ্যে একজন ডাক্তারবাবুর মেয়েকে চিনতে পেরে হাঁক দিল— ‘আদিরামবাটি!’
মি’লেডি, যে সময়ে কলকাতার রাজপথ থেকে দোতলা বাস হারিয়ে যেতে শুরু করেছে আর পাতাল রেলের মাটি খোঁড়ার পরিকল্পনা চলছে, তখনও মাত্র তিপান্ন কিলোমিটার দূরে সাতগাঁয়ে পালকি চলে। কিন্তু সেদিন ওদের তাড়া ছিল, প্রিয়জন অনন্তের পথে যাত্রা করার আগে বাড়িতে গিয়ে পৌঁছনোর কথা ছিল। ইতিমধ্যে স্টেশনে অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। শিউলি তাই পালকি বেহারার ডাকে সাড়া না দিয়ে বাপ্পার হাত ধরে খড়ের চালা-দেওয়া দোকানঘরের সারি পেরিয়ে উঠে এল রাস্তায়। সেখানে তখন একটিমাত্র ভাড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে। ছাইরঙা বেতো ঘোড়াটি চামড়ার সাজসজ্জার ভারে প্রায় নুয়ে পড়েছে। তারই সমবয়সী কোচোয়ানের মেহেন্দিরঞ্জিত দাড়ি, মাথায় রঙজ্বলা সবুজ ভেলভেটের টুপি।
‘আদিরামবাটি! জলদি!’ বলে শিউলি বাপ্পার দুই বাহুসন্ধির নীচে ধরে ওকে উঠতে সাহায্য করল, তারপর নিজে উঠে পড়ল।
কোচোয়ান ঘোড়ার বুলিতে বলল,— ‘হুরররর… হুস্! চ্চু চ্চুস্ক!’ হাতের ছপটি দিয়ে দুবার সশব্দে আঘাত করল কাঠের জোয়ালে, গাড়ি চলতে শুরু করে দিল। বাপ্পা মাথা তুলে শিউলির মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল মায়ের চোখদুটো ঘোড়ার ঘাড়ে লোমের ঝালরে নিবদ্ধ, ঠোঁট নিঃশব্দে নড়ছে। বোধহয় আদিরামের নাম জপ করছে।
সুরকির রাস্তাটা হুগলি ক্যানালের পাশাপাশি কিছুদূর গিয়ে পশ্চিমে পোড়ামাটির ফটকের ভেতর দিয়ে শহরে ঢুকেছে। পর্তুগিজ আমলের ফটক। কাঠের দরজা হারিয়ে গিয়েছে কবেই, ক্ষয়ে-যাওয়া পঙ্খের কারুকাজে এখনও ঢাল-তরোয়াল, ক্রুশ আর একজোড়া ডানাওয়ালা ড্রাগনের মোটিফ চিনতে পারা যায়। কটকের ঠিক আগে একটি পায়ে-চলা পথ বেঁকে গিয়েছে সরস্বতীর দিকে। সেখানে ওদেরই জন্য অপেক্ষা করছিল গামা। একটি গামছা মাথায় পাগড়ির মতো জড়ানো, আরেকটি কোমরে বাঁধা।
‘দেরি করে ফেললে গো, গামা বলল। ‘ঠাকুরনকে এইমাত্তর নে যাওয়া হলো ঘাটে। ভাটা পড়ে গিয়েছে, না নিয়ে উপায় ছিল না।’
বড়ো বড়ো শিমুল গাছের সারির নীচ দিয়ে মাটির পথ গিয়েছে নদীর দিকে। সেখানে কিছুক্ষণ আগে ছড়ানো খই খুঁটে খাচ্ছে দাঁড়কাক। সেই দৃশ্য দেখে দুহাতে মুখ ঢাকে শিউলি। আদিরাম ওর প্রার্থনা শুনলেন না।
‘বাপ্পাদাদাকে কি ঘাটে নিয়ে যাব?’ গামা বলে। শিউলি সম্মতিসূচক মাথা নাড়ে। চোখের জলে লেপটে যাওয়া রেলের ভূষোকালির ছোপ মুছে নেয় আঁচলে। গামা ওর পেশল শিরা-ওঠা হাত দুটো বাড়িয়ে বাপ্পাকে তুলে কাঁধের ওপর বসিয়ে নেয়। কোচোয়ান বলে— ‘হুঁঙঃ, ক্ষুস্থ!’ গাড়িটা চলে যায় শহরের দিকে।
আদিরামবাটির নারীরা কেবলমাত্র পুরুষের কাঁধে চেপে শ্মশানে যেতে পারে। কিন্তু পুরুষের ক্ষেত্রে, এমনকি পুরুষ শিশুর ক্ষেত্রেও, এই ব্যাপারে কোনো বাধা নেই।
ভাটা চলছিল। মুমূর্ষু নদীতে আর জাহাজ চলে না, কিন্তু বিদেহী আত্মা ভেসে যেতে পারে। ঘাটের সিঁড়ির শেষ ধাপের পর কিছুদুর নরম কাদা, তারপরে শীর্ণ জলধারা। সেখানে কোমর পর্যন্ত জলে ডোবা শায়িত দেহটার উপরিভাগ ধরে আছে দুজন, গামার কাঁধে বসে দেখতে পায় বাপ্পা। আরেকজন ছাতা খুলে ধরেছে মুখে স্রোতের ভেতর সাদা থানকাপড়ে ঢাকা পা দুটো দুলছে জলে বন্দি ধোঁয়ার মতো। পুরুষদের খালি গা, ধুতিতে কাদা লেগেছে। পাংশু রোদে চিকচিক করছে বিশুকার মাথার টাকটা। শাকম্ভরীর, যিনি সম্পর্কে তার মাসী হন, মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে হাতের তালু নেড়ে বাতাস করছে, মাঝে মাঝে আঙুলে জল তুলে ফোটা ফোটা ফেলছে বন্ধ ঠোঁটের ওপর, শ্বাসপ্রশ্বাস চলছে কী না পরখ করছে। বিশীর্ণ কব্জিটা তুলে নাড়ি ধরে আছেন রামপ্রাণ, বাপ্পার দাদু। একজন অচেনা লোক বৃদ্ধার কানের কাছে অনর্গল আউড়ে চলেছে—‘আদিরাম-আদিরাম-আদিরাম-আদিরাম- আদিরাম…’
আর তারপরেই ঘটনাটা ঘটল। জলে-ডোবা দুই পায়ের ফাঁকে কী যেন ভেসে উঠল। ঘাটে শোরগোল পড়ে গেল। ছাতা হাতে লোকটার মুখে রামনাম দ্রুত হলো। রামপ্রাণ ঘাটের সিঁড়িতে অপেক্ষমাণ শ্মশানযাত্রীদের দিকে ফিরে ঘোষণা করলেন—‘ও কিছু না, ফুলটা আবার বেরিয়ে এসেছে!’
অনেক পরে বাপ্পা জানবে, উনিশবার মৃত সন্তান প্রসব করার পর শাকম্ভরী দেবীর জরায়ু বহির্গম ছিল, চিকিৎসা শাস্ত্রের পরিভাষায় যাকে বলে প্রোল্যান্সড ইউটেরাস। শ্বশুরবাড়ির অমতে ওঁকে আদিরামবাটিতে ফিরিয়ে আনার পর গঙ্গারাম চক্রবর্তী কোয়ার্সভিলে সিস্টার্স দ্য ক্লুনি হাসপাতাল থেকে ফিরিঙ্গি নার্স আনিয়ে পেসারি পরানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু বয়স বাড়ার পর শাকম্ভরী সেসবের পরোয়া করতেন না, দুই পায়ের ফাঁকে পেন্ডুলামের মতো ঝুলন্ত জরায়ু নিয়ে চলাফেরা করতেন, কাজকর্ম করতেন। আদিরামবাটির ছেলেবুড়োরা আড়ালে বলত—‘বুড়ির ফুল’! কখনো সখনো তাঁর দুধছেলে পরাণ জোর করে তাঁকে শুইয়ে সেটি যথাস্থানে ফিরিয়ে দিতেন।
এবারেও তাই করলেন। বড়ো ছেলে বসন্তকে হাত নেড়ে ডেকে বললেন— ‘ঘিয়ের শিশিটা আন!’ বাপ্পার বসন্তমামা দশকর্মের তিল অগুরু চন্দন ইত্যাদি সাজানো বাঁশের চ্যাঙারিটা তুলে নিয়ে কাদা ভেঙে ছুটল জলের দিকে।
‘বিশল্যকরণী আনতে বললাম গন্ধমাদন এনে হাজির করেছে দেখ!’—বলে রামপ্রাণ চ্যাঙারি থেকে ঘিয়ের শিশিটি তুলে নিলেন। বাঁ হাতের আঙুলে মাখিয়ে নিয়ে নিপুণ দক্ষতায় স্বস্থানে ফিরে দিলেন বেলাগাম জরায়ুটিকে, দেহ থেকে প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাবার আগেই যেটি ভেসে যেতে চাইছিল অন্তর্জলীযাত্রায়।
বহুকাল পরে সেইসব শ্মশানযাত্রার স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে যে ব্যাপারটা বাপ্পাকে অবাক করবে, তা হলো এক বিচিত্র প্রফুল্ল, প্রায় উৎসবের মতো পরিবেশ। কোথাও শোক কিংবা বিষাদের চিহ্নমাত্র নেই। অনেকটা যেন কলুটোলা লেনের সেই রবিবারগুলোর মতো। একেই কি বলে শ্মশানবৈরাগ্য? এক উপনিষদীয় নির্লিপ্তি, যা শ্মশানের ছাইমাখা মাটির শ্বাসবাস্পের মতো উঠে এসে জন্মমৃত্যুর চক্রে ঘূর্ণমান জীবনটাকে জলের মধ্যে বন্দি ধোঁয়ার মতো অলীক করে তোলে? কোমর পর্যন্ত নিমজ্জিত গঙ্গাযাত্রীর শেষ নিশ্বাস বেরিয়ে যাবার জন্য অপেক্ষার মাঝেই নশ্বর দেহটিকে পঞ্চভূতে মিশিয়ে দেবার তোড়জোড় চলে। কেউ কাঠের বোঝা নিয়ে আসে (দেহের ভার অনুযায়ী নির্ধারিত ওজনের, এবং কাঁচা ও শুকনো কাঠের সঠিক অনুপাত, যাতে চিতাটি নির্দিষ্ট সময় ধরে জ্বলে), কেউ কেউ পারলৌকিক কর্মের আয়োজন করে, কেউ অন্ত্যেষ্টির উপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতে লেগে যায়। শ্মশানযাত্রীরা প্রায় সকলেই সাতগাঁর কনৌজী ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত আত্মীয় ও জ্ঞাতি
সম্পর্কের নৈকট্য অনুযায়ী কেউ দশ রাত্রির, কেউ আট কিংবা তিন ও পাঁচ রাত্রির সুতোয় বাঁধা; অর্থাৎ ওই নির্দিষ্ট কটি দিন তাদের অশৌচ পালনের কাল। শত শত বছর ধরে কয়েকটি পরিবারগোষ্ঠী একই স্থানে বাস করতে করতে, পালটি-ঘরে (পরিপূরক গোত্রে) পুত্রকন্যাদের বিবাহ দিতে দিতে, ধর্মতলার প্রাচীন বটগাছটার মতো ঝুরি নামিয়ে লতায় পাতার এমন জড়াজড়ি করে রয়েছে যে এই মৎস্যভূমির দুই ভিন্ন পরিবারে ব্রাহ্মণ বংশোদ্ভূত একাধিক সম্পর্কের জটিল প্রজন্মগত ধাঁধায় আবদ্ধ। এভাবেই কারোর খুড়দাদু হয়তো বয়সে তাঁর পুত্রের চেয়েও ঢের ছোটো, এবং পিসঠাকুমা সদ্য জন্মলাভ করেছেন।
সরস্বতীর তীরে এই শ্মশানভূমিতে এসে বয়স ও সম্পর্কের ভেদাভেদ ঘুচে যায়, সহমর্মিতা আর সখ্যের বাতাবরণ গড়ে ওঠে, জিহ্বা আলগা হয়ে আসে। রসপূর্ণ কিস্সা থেকে শুরু করে জীবনের গূঢ়ার্থ বিষয়ে দার্শনিক বিবাদের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয় অপেক্ষার প্রহর। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ওস্তাদ কথক। তারা ইতিহাসের সঙ্গে পুরাণকথা মিশিয়ে অনর্গল কাহিনি বুনতে পারে। তাদের শুধু চাই একদল উন্মুখ নিরুপায় শ্রোতা, একটি নদী, আর চিতার আগুন। সেই আগুন লক্ষ জিহ্বায় হাড় থেকে মাস চেটে নেয়, কাঁচা আমকাঠের বাষ্পের মরীচিকা ঘনিয়ে তোলে, করোটি ফাটিয়ে আগুনের ফুলকি ফনফনিয়ে ওঠে কালো আকাশে। দাউ দাউ চিতার টানে শোঁ শোঁ হাওয়া বয়, সরস্বতীতে ভাটা ঘুরে গিয়ে জোয়ার আসে, ঘাটের সিঁড়িতে জল উঠে ছলাৎ ছলাৎ শব্দে কথা বলে।
নদী আর হাওয়া এই মৎস্যভূমির গল্প বলে।
