Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    রাজপাট – তিলোত্তমা মজুমদার

    তিলোত্তমা মজুমদার এক পাতা গল্প1633 Mins Read0

    রাজপাট – ১৩

    ১৩

    কার্তিক মাসেতে আইব
    কার্তিক সমান বর।
    আশায় আশায় রহিল কন্যা
    জ্বলে গো অন্তর।।
    অন্তরের জ্বালা কত
    সহিবে কার্তিকে।
    কলঙ্ক রটিল কন্যার
    দশ দিকে দিকে।।

    নয়াঠাকুমা বলেছেন—লোকে অমন কত আকথা কুকথা কয়। ওতে কান দিতে নেই বোষ্টুমি। কথায় বলে, মেয়ে হল ফেলি, পরে নিলেও গেলি, যমে নিলেও গেলি। তা সেই ফেলা ধনে দাগ লাগানো সোজা। ওসব গায়ে মাখতে নেই।

    কিন্তু ময়না বৈষ্ণবীর মন মানে না আর। গোটা একটা দিন চাটুজ্যেবাড়ির একতলার ঘরে সে স্তব্ধ হয়ে রইল। নয়াঠাকুমার তাড়ায় নাইল খেল। কিন্তু গান যার গলার মালা সে টু শব্দটি করল না।

    সিদ্ধার্থকে সে বলেছিল— আমার আবার মান-অপমান কী!’ সে ছিল তঞ্চকতা একরকম। নিজেকে লুকনো। তার যে কেবল ওই জোরই ছিল, সম্মানের জোর, ওইটুকু নিয়েই যে সে নির্ভীক ঘোরাফেরা করত সর্বত্র, ঘনিষ্ঠ হত বিবিধ গৃহস্থালীর সঙ্গে, তা সে আগে এমন করে বোঝেনি। তার ভগবান ছিল প্রত্যক্ষভাবে। কিন্তু লুকনো গর্ব হয়ে ছিল ওই সম্মান।

    তার সম্মান কি গেল? কেউ যদি মিথ্যে করে কলঙ্ক রটায় তা হলেও কি সম্মান যায়? হায়, চরিত্রের সত্য আর মিথ্যা সে প্রমাণ করবে কার কাছে! সে ক্রমশ উপলব্ধি করছে, সম্মান শুধু নিজের কাছে নিজেরই নয়, এ যেন অপরের কাছে হাত পেতে নেওয়া একপ্রকার মাধুকরী। সুতরাং আপন সত্যের মুখোমুখি হয়েও তার হৃদয় তপ্ত হয়ে আছে। যে-মুখ এই আতপতাপে তাকে শান্তি দিতে পারত, সে আজ কাছে নেই। মর্মে লুকনো আছে তার স্পর্শ—যার দ্বারা এক পাগল-পাগল অস্থিরতাকে সে সামাল দিতে পারছে।

    সারাক্ষণ একটি কথাই তার মনে ঘুরছে—ভগবানের এ কেমন মার! জ্ঞানত স্বামী ছাড়া জীবনে দ্বিতীয় কোনও পুরুষকে সে প্রশ্রয় দেয়নি। তার জন্য তাকে কঠোর সংযম অভ্যাস করতে হয়েছে। কৃষ্ণভজনায় সে বইয়ে দিয়েছে সমস্ত আবেগ। তবু কেন এমন হল! এই কলঙ্ক রটনা তাকে ছাড়বে না আর সারাজীবন।

    কোনও কিছুই তার ভাল লাগল না। সে ইচ্ছা করল কিছু-বা কীর্তন গেয়ে হৃদয়কে শীতল করতে। কিন্তু কণ্ঠে সুর জাগে না। সে বড় বেদনায় কুঁকড়ে আছে। বলরাম বাবাজির নিষ্ঠুরতায় বিদ্ধ হয়ে সে কেবল ছটফট করে মরছে। লোকটা কি মানুষ, না সাপ! সে ভাবছে। না, সাপের সঙ্গে মানুষের তুলনা করা অন্যায়। সাপের পক্ষে অন্যায়। ময়না বৈষ্ণবী অনুভব করছে, মানুষের তুলনায় অন্যান্য প্রাণী অনেক বেশি অসহায়। অনেক নিরীহ।

    চাটুজ্যেবাড়ির একতলায় আধো অন্ধকার ঘরের দেওয়াল তাকে বহুবিধ লজ্জা ও অবমাননার কথা মনে করিয়ে দিতে থাকল নিরন্তর। নিত্য বসবাস নেই এ ঘরে, তাই ঘরের কোণে মাকড়সার জাল। সেই জাল ক্রমে বড় হতে থাকল, মোটা হতে থাকল তার তন্তুগুলি। ময়না বৈষ্ণবীকে তা ঘিরে ফেলল আপাদমস্তক। তার শরীর ছেয়ে গেল ক্লেদবোধে। মন ছেয়ে গেল আতঙ্কে। সে অস্থির-অস্থির হল। পাগল-পাগল হল। এতগুলি মানুষের সামনে ওই পাপকথা! ওই মন্তব্য! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! ঘাড় মটকে যাওয়া কপোতের মতো সে বেঁকেচুরে গেল যন্ত্রণায়!

    সে দু’চোখে হাত চাপা দিল। আর তার সামনে এসে দাঁড়াল সিদ্ধার্থ নামের মানুষটি। সিদ্ধার্থ, নাকি তার স্বামী! আঃ আঃ! সে ভাবতে থাকে—তুমি কী চাও, কোথায় আছ, কেন ওই ছোট ছেলেটাকে দেখে আমার মনেতে ঢেউ জাগল! আর জাগল যদি, তবে এ পাঁকের মধ্যে তার সঙ্গে দেখা হল কেন! সে কে? সে কি আমার স্বামী! সে কি তুমি গো? তুমি? কাল সে আমাকে স্পর্শ করেছিল। আমার মনে হল, সে তোমার হাত। কবে তুমি আমাকে ছেড়ে গেছ! তুমি কি, আমারই টানে, জন্ম নিয়েছ ফের? কিন্তু এ কলঙ্ক, হ্যাঁ গো, এ কলঙ্ক তুমি বিশ্বাস কোরো না। বিশ্বাস কোরো না।

    যাবার আগে সিদ্ধার্থ এসেছিল তার কাছে। বলেছিল— আপনি কিন্তু কোথাও যাবেন না। এ গ্রামের বাইরে যাবেন না। আপনাকে আমাদের দরকার।

    কোথায় আর যাবে সে! ঘুরে ঘুরে এখানেই আসবে আবার। সে ভেবেছে—একবার ফাঁকি দিয়েছ। এতগুলি বছর তোমায় ছাড়া। এবার যখন দেখা দিয়েছ ফের, আর ছাড়ছি না। শুধু তুমি ওই কলঙ্ক নিয়ো না সত্যি ভেবে! ওগো! এ বয়সে আমি তোমায় দেখব শুধু। দু’চোখ ভরে। আর কোনও কামনা নাই।

    অতএব ঘুরে ঘুরে আসবে। যেখানেই যাক ঘুরে ঘুরে আসবে। না হয় যাবে বহরমপুর। এ জগৎ অতি ছোট, অতি সামান্য। এই সামান্যের মধ্যে সে সামান্যতর। একটি তিলবিন্দুর মতোই ক্ষুদ্র। অপ্রয়োজনীয়। তাৎপর্যহীন। সে এ জগতে আছে এক থাকামাত্র হয়েই। কোনও কাজে লাগছে না। প্রভুর কৃপাধন্য হয়ে সে আছে। নইলে তার থাকা না-থাকায় কার কী এসে যায়। কিন্তু প্রভু তার প্রতি অকরুণ হয়েছেন। কেন, কোন পাপে, সে জানে না। সে ছিল, ছিল আপন শুদ্ধতার অহঙ্কারে আপনি মাতোয়ারা, সে যে কোনও বাবাজির নৈবেদ্য হয়ে শয্যা পাতেনি— এ এক অহংকার, সে নিবেদন করেছিল দেবতারই পায়ে! কিন্তু এ কী হল!

    তার ইচ্ছে করল সকল লোকের থেকে দূরে কিছুটা সময়, সকল কথার থেকে দূরে। এক দূরের বাঁশির ধ্বনি সে শুনতে পেল ফিকে ও মধুর। আর তার মনে পড়ল কালান্তরের বিল। হায়! সে তো গিয়েছে কতবার! এখন বরষা নেই। তবু সেই উদার একাকী বিস্তারের বাঁশি বাজে। সে দেখল, বেলা হয়ে গেছে। আজ আর যাওয়া যাবে না। সে তখন পরবর্তী ভোরের বেলা বেরিয়ে যাবার সংকল্প করে। নয়াঠাকুমার থেকে পাঁচটি টাকা চেয়ে নিলে ভোর ভোর সে ঘোড়ার গাড়ি ধরে চলে যেতে পারবে কালান্তর বিল। আবার বিকেল বিকেল না হয় ঘোড়ার গাড়ি ধরেই ফিরে আসবে এখানে। তবু তাকে যেতে হবে। যেতেই হবে। এই বদ্ধ ঘরে দম আটকে আসছে তার। মনে বেদনা জাগছে। মনকে শমে আনতে তার প্রয়োজন ওই উদারকে। ওই বিশালকে। কালান্তর টানছে তাকে। কতকাল সে যায়নি ওখানে। যাবে সে। যাবে। গিয়ে দাঁড়াবে ওই অনুর্বর কর্দমযুক্ত জলাভূমির কাছে। হতে পারে, সেখানেই সে মনের সব গ্লানি মুক্ত করে দেবে। সে যাবে। সে ভাবতে থাকল—যখন তুমি থাকো না, আমি প্রকৃতির কাছে চলে যাই। তুমি আর তোমার প্রকৃতি—এর বাইরে আমার আর কী আছে ঠাকুর!

    তখন সে শুনতে পেল—কেন, তোমার সম্মানের অহং আছে। তাকে তুমি ধরেছ আমাকে ধরার চেয়েও অধিক শক্ত করে।

    .

    পরদিন সূর্য ওঠার আগে জেগে উঠল সে। সারা বাড়িতে এইসময় জাগেন একমাত্র নয়াঠাকুমা। সে আগের রাত্রেই বলে রেখেছিল যাবে। চেয়ে নিয়েছিল পাঁচটি টাকা। নয়াঠাকুমা বলেছিলেন—যাবে কোথায়?

    —একটু ঘুরে আসব ঠাকরেন।

    —সিদ্ধার্থ তোমাকে কোথাও যেতে বারণ করে গেছে।

    —যাব আর আসব গো। ঘুরে বেড়ানো মানুষ আমি। ঘরে মন লাগছে না।

    ঝোলাঝুলি নেয়নি সে। ফিরে আসবে বেলাবেলি। তাই নেয়নি। এই কাকভোরে এই গ্রাম থেকে কোনও ঘোড়ার গাড়ি পাওয়া যাবে না। সে হাঁটছে তাই। হালকা চাদর জড়িয়েছে গায়ে কেন-না এই কার্তিকেই হিম পড়ছে প্রভাত জুড়ে। হেঁটে হেঁটেই সে পৌঁছে যাবে হরিহরপাড়া আর কালান্তর যাবার জন্য ঘোড়ার গাড়ি নেবে। ফিরে আসবে বেলাবেলি। ফিরে আসবে কেন না সিদ্ধার্থর তাকে দরকার। সে কাজে লাগবে। ভাল মানুষের ভাল কাজে লাগবে। আর তার জন্য হয়তো-বা, ভবিষ্যে, তার চরিত্র নিয়ে সাজানো আছে আরও আরও কটুভাষ্য।

    হরিহরপাড়ায় যখন পৌঁছল সে তখন প্রভাত পূর্ণ হয়েছে। পূর্ণ হয়েছে সূর্যোদয়। বাজারের দিকটায় যেতে যেতে শব্দ পেল সে। নাম সংকীর্তন করে নগর পরিক্রমায় বেরিয়েছে মঠের সব। সপ্তাহে তিনদিন তারা এ কাজটি করে। এক জায়গায় সে দলটির মুখোমুখি হল। কেশব বাবাজি, সাধন বাবাজি, শিবু বাবাজি, প্রমি ও কেতকী এই দলে আছে। সে দাঁড়াল এক মুহূর্ত। দল তার দিকে দৃকপাত করল না। সে দেখল, মুখগুলি তাকে দেখে হয়ে গেল শক্ত। বিবর্ণ। যেন ময়না বৈষ্ণবীর সঙ্গে এই সকালবেলায় দেখা হয়ে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত শুধু নয়, আসন্ন যুদ্ধের পূর্বাভাস। শত্রুপক্ষের মানুষকে হঠাৎ সামনে পেয়ে যাওয়া।

    এই পরিস্থিতি ময়না বৈষ্ণবীর পক্ষে সহন নয়। সে দু’হাত কপালে ঠেকিয়ে বলল— জয় রাধে।

    সংকীর্তন চলেছে। খোল, করতাল, হারমোনিয়াম থামেনি। তবু দল থেকে বেরিয়ে এল কেশব বাবাজি। বলল—জয় রাধে। কাল মঠে এসে ফিরে গেলে বোষ্টুমি। বলরাম বাবাজি দুঃখ করছিলেন। তা কাল রাত্রে ছিলে কোথায়? এত সকালেই বা কোথায় যাচ্ছ?

    ময়না বৈষ্ণবীর মনে হল, কাল রাত্রে সে কোথায় ছিল এ প্রশ্নের মধ্যে লুকনো আছে তার চরিত্রের প্রতি কটাক্ষ। সে জবাব দিল—বলরাম বাবাজিকে বোলো আমার জন্য দুঃখ করার দরকার নাই। আমার থাকার জায়গায় অভাব কী!

    —আরে বোষ্টুমি, অত চটো কেন? যাক, কোথায় চললে বলো।

    —কালান্তরের দিকে যাব।

    —কোন গ্রাম?

    —দেখি। যেদিকে দু’ চোখ যায়। গোমুন্ডির দিকে যেতে পারি।

    —জয় রাধে।

    —জয় রাধে।

    তারা দু’জনে দু’দিকে চলে গেল। কেশব বাবাজি এত কথা বলল, আর অন্যরা বলল না কেন! সে তো অন্যদের কোনও ক্ষতি করেনি! ভাবতে ভাবতে চলল সে। আর তার জন্য অপেক্ষা করে রইল কালান্তর।

    .

    জেলা মুর্শিদাবাদের দক্ষিণ-পূর্বে বাগড়ি অঞ্চলের ক্রমপ্রসারিত অংশই কালান্তর। ভাগীরথী একসময় কালান্তরের পথ ধরেই সাগরে গিয়ে পড়ত। পরে সে ক্রমে খাত পরিবর্তন করলে কালান্তর নিম্নভূমি বিলের রূপ নিল। বর্ষায় এই বিল এক ভয়ংকর। তার বিস্তার তখন সমুদ্রের মতো বিশাল। আতঙ্কসঞ্চারী। কালো কর্দমযুক্ত হওয়ায় এই বিলের রংও কালচে। অপলক তাকালে মনে হয়, এখানে পৃথিবীর শেষ। এখানেই জমে আছে একখণ্ড অমোঘ অন্ধকার। এই হেমন্তে কালান্তরের জল নেমে গেছে অনেকখানি। তবু সে যেন বুক চিতিয়ে পড়ে থাকা দৈত্যের চোখ। হরিহরপাড়ার শেষ প্রান্ত থেকে শুরু করে পলাশি পর্যন্ত ভৈরব ও ভাগীরথীর মধ্যবর্তী এই নিম্ন জলাভূমি। কালান্তর ছাড়াও এই গোটা জলাভূমিতে আছে আরও সব ছোট-বড় বিল। যেমন-পাট, ধান্দার, হর্মা, শালমারা, সইচান্দি, কমরি প্রভৃতি।

    স্বাস্থ্যকর নয়, আবাদযোগ্য নয়, তবু এইসব বিলের চারপাশে গড়ে উঠেছে গ্রাম। যেমন গোমুন্ডি, বাপান, কলাবিবি। আর কলাবিবির বন পেরিয়ে নদিয়া ও বর্ধমানের সীমান্তে আছে ধুলামাটি। দরিদ্র গ্রাম সব। এই কর্দমাক্ত জমিতেই শীতের আবাদ করে, গ্রীষ্মের আবাদ। বড় কষ্টসাধ্য সে কাজ। অনিশ্চিতও। ফসল যা মেলে তার থেকে সম্বৎসরের খরচ ওঠে না। বর্ষায় এই গ্রামগুলি থেকে শহরে ভিক্ষেয় যায় কেউ। কেউ হয় ফন্দিবাজ। গঞ্জের হাটে-বাটে চুরি-ছিনতাই করে। তবু বাঁচে। বেঁচে থাকে। ধুঁকতে ধুঁকতে বাঁচে। আধা বছর সৎ খায়। আধা বছর অসৎ। এইসব গ্রামের অন্ধিসন্ধি চেনে সে। শিরা-উপশিরা চেনে।

    ঘুরে ঘুরে কমরির ধারে গিয়ে দাঁড়াল ময়না রৈষ্ণবী। কমরির সঙ্গে কমলির নাম বড় মিলে যায়। কোথায় গেল ওই কমলি নামের মেয়েটা? সে কেমন আছে, সে জানে না কমলিকে নিয়ে এতখানি ভাবছে কেন সে। কমলি তার কে? কতখানি?

    কোনও কোনও বেদনা ও অপমান এক নারী ভাগ করে নেয় অপর এক নারীর সঙ্গে। এ কেবল তাদেরই উপলব্ধির বস্তু। পুরুষ তার তল পায় না। সেইসব বেদনায় এক নারীর অশ্রু অন্য নারীর চোখকে আর্দ্র করে। অনিবার্য সেই ভাগাভাগি। সেই সহমর্মিতা। ময়না বৈষ্ণবী প্রেমময়ী মানুষ, সে কমলির মতো মেয়েদের বেদনা বড় প্রাঞ্জল করে বুঝেছে। আর মানুষ মাত্রেরই চেতনায় রাখা থাকে যে-বিদ্রোহ, তার স্ফুরণ ঘটিয়েছে। সে যা করেছে, যতদূর, তার বেশি সে আর কীই-বা করতে পারত!

    সে আঁচলে মুখ মোছে। আঁচলের খুঁটে বাঁধা চারটে টাকা। ফেরার পথে কাজে লাগবে। এক টাকা দিয়ে সে এসেছে গোমুন্ডির নিকটবর্তী সড়ক অবধি। তারপর হাঁটা। হাঁটা তাকে ক্লান্ত করে না। তবু এক অবসাদ সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে আজ।

    জায়গায় জায়গায় কলাগাছের ঝোপ। কিছু বাবলা আর নাম না-জানা নানারকম বুনো গাছ। দূরে দূরে খণ্ড খণ্ড জমিতে মাথা তোলা সবুজ। ময়না বৈষ্ণবী জানে, আরও দূরে আছে ওই কলাবিবির বন। ঘন গাছপালা ও লতাগুল্মে ঢাকা জলাজমি পেরুলে গ্রাম ধুলামাটি। যমুনাবিলের অনুর্বর ভূমি আঁকড়ে পড়ে থাকা গ্রাম। কত দূর সে পথ! জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এক প্রাচীন শ্মশান ওই গ্রাম ঘেঁষে। যমুনা বিলের সখা যেন ওই শ্মশান। এমন ঘন বন সারা মুর্শিদাবাদ ছুঁড়লে আর পাওয়া যাবে না। সেখানে ঢুকলে গা ছমছম করে। শ্মশানের কাছে দাঁড়ালে স্তব্ধতায় দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। অনেককাল আগে ওই জঙ্গলে ছিল অঘোরপন্থী সাধুদের আস্তানা। অঘোরপন্থীরা নরমাংসভুক। আর ধুলামাটি এক ডাকাতিয়া গ্রাম। সাধারণ মানুষ আজও সেখানে যেতে চায় না। লোকে বলে সে গ্রাম আজ পাপে ভারী। দরিদ্রতম। কেউ বলে, ডাকাতির সম্পদে ধুলামাটির ঘরে ঘরে সোনারুপোর ছড়াছড়ি। ময়না বৈষ্ণবী জানে, এই সকল কথাই সত্যি-মিথ্যে মেশা। এক সামান্য তথ্যকে লোকে জল্পনার দ্বারা জটিল করে দেয়।

    আশেপাশে কোনও মানুষ নেই। এই সকালে মানুষের কাজ ঘর-গেরস্থালিতে। জমিজমায়। এই বিলের ধারে মানুষের কাজ নেই এখন। বড় নিশ্চুপ, বড় স্থির এই জায়গা। দু-একটি পাখি কেবল ডেকে যাচ্ছে একটানা।

    ময়না বৈষ্ণবী একটি বাবলা গাছের তলায় বসল। এখান থেকে একটি সরু পথরেখা নেমেছে বিল পর্যন্ত। হয়তো আশে-পাশের জমিতে যারা চাষ করে, তারা এসে হাতে-মুখে জল দিয়ে যায়। হয়তো ছিপ ফেলে বা খাপলার জাল ফেলে মাছ ধরতে নামে। মানুষের পায়ের চিহ্ন পড়ে বলেই এখানে আগাছা কম। সে তাকিয়ে থাকে জলের দিকে। কালো, জমাট জলের দিকে। জলে শুকনো পাতা পড়ে। হাওয়ায় মৃদু কম্পন জেগে রয়। বুড়বুড়ি তোলে মাছ ইত্যাদি জলচর। আর পতঙ্গ উড়ে উড়ে যায়। কিন্তু সে কেবল দেখে জল। কালো জল। আর ভাবে। তার বাবা-মায়ের কথা, ছোটবেলায় যেত বাউলের আখড়ায়, তার কথা। পঞ্চবুধুরি শ্রীপাটের কথা। স্বামীর কথা। এবং সিদ্ধার্থর কথা। হায়, কেন সিদ্ধার্থর সঙ্গে দেখা হল তার! কেন! যদি জন্ম নিল সে ফিরে, তবে কেন স্বামী হয়ে জন্ম নিল না! নাকি এ তার ভ্রম! কেবল ভুলবশত, বিকারগ্রস্ত সে ভুলে যাচ্ছে ঈশ্বর!

    প্রগাঢ় মানসিক ক্লান্তিতে তার ঘুম পায়। সে ঘাসপাতা, বুনোগাছের ওপর আঁচলের প্রান্ত বিছিয়ে শোয়। তার চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসে। চোখের তলায় রঙিন মাছের মতো ঘোরাফেরা করে নানা গ্রামের নানারকম মুখ। কত লোকের কত কষ্ট। কত বৃত্তান্ত। গাছপালার তাজা ঘ্রাণ তার নাকে লাগে। কালান্তর বিলের কালো কঠিন বিস্তার, বুনো গাছের সতেজ গন্ধ সব মিলেমিশে তার অন্তরে আলোড়ন গড়ে দেয়। সহসা তার নয়নজুড়ে স্বামীর অবয়ব। সে ঠাহর পায় না এ কে! তার স্বামী, না সে কৃষ্ণ, না সিদ্ধার্থ সে! শুধু তার মনে আনন্দ ফিরে আসতে থাকে। শক্তি ফিরে আসতে থাকে। নিজেকে আর অশুচি লাগে না। সে নিজে জানে সে কী! এক লোকের কথায় কী এসে যায়! এই জীবন নিয়ে একা একা বইয়ে দিল কতকাল। তার তো নিজের কাছে ছাড়া আর কোথাও কোনও কৈফিয়ত দেবার নেই। মহাপ্রভুর অগোচর কিছু নেই। তবু সে কেন এমন কাতর হয়ে উঠল! সে উপলব্ধি করল, তার কৃত কোনও কর্মের জন্য তার কোনও অনুশোচনা নেই। সে কেবল গান গাইবে। ঈশ্বরের ভজনা করবে। আর গান গাইতে গাইতে পেরিয়ে যাবে ইহকাল এবং সকল গুরুর মহাগুরু স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের পদতলে সংস্থাপিত হবে। সে বন্ধ করে চোখ, শিথিল করে দেহ, একাগ্র করে মন এবং গাইতে থাকে—

    জাগহু বৃষভানু নন্দিনী মোহন যুবরাজে।
    রতির আলিসে নিশি জাগরণে ঘুমাওল ব্রজরাজে।।
    অকরুণ পুন বাল অরুণ উদিত মুদিত কুমুদ বদন
    চমকি চুম্বি চঞ্চরি পদুমিনিক সদন সাজে।
    কি জানি সজনি রজনী থোর ঘুঘু ঘন ঘন ঘোষত ঘোর
    গতহি যামিনী জিতদামিনী কামিনী কুল লাজে ॥

    তখন তার গানের ভিতর দিয়ে ঘটে যায় কিছু নিঃশব্দ পদসঞ্চার। তবু বন্ধ চোখের পাতায় আলোছায়ার খেলায় গান বন্ধ করে সে নয়ন মেলে। নয়ন মেলে এবং দৃষ্টিপাত করে চমকে উঠে বসতে চায়। একটি সবল মানুষ এক লাফে তার বুকের ওপর চড়ে বসে তখন। হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে। বৈষ্ণবীর চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। ভয় আর বিস্ময় সেই চোখের মণিতে লেগে থাকে। অন্য একজন তার হাত দুটি বাঁধে। বস্ত্রখণ্ড দ্বারা বাঁধে তার মুখ। আর বন্ধনকালে সে পায় সেই হাতে লেগে থাকা চন্দনের গন্ধ। টান লেগে তার শ্রীকণ্ঠ জড়িয়ে থাকা তুলসীর মালা ছিন্ন হয়ে যায়। তার দু’চোখ এখন ত্রস্ত। সেই ত্রাসের ওপর পুরুষটির তুলসীর মালা দোলে। এবং পরমুহূর্তে যন্ত্রণাময় হয়ে যায় তার ভুবন। কেন-না লোকদুটি তাকে ছেঁড়ে। তৎপর বিবস্ত্র করে তাকে। সৎ দেহখানির বাঁকে বাঁকে ফুটে ওঠে দাঁত ও নখরের হিংস্র রাগ। সে অসহায় গাভীর মতো পা দাপায়। তখন একজন তার পা চেপে ধরে। অন্যজন বিদ্ধ করে তাকে এবং চরম উল্লাসে দাঁত দ্বারা তার স্তনবৃত্ত ছিঁড়ে নেয়। যন্ত্রণায় জ্ঞানাহত হয় ময়না বৈষ্ণবী। তার স্বেদচর্চিত দেহ থরথর করে কাঁপে। রক্তস্রোত নেমে এসে ঢেকে দিতে চায় খোলা বুক। আর মানুষটি ছেঁড়া বৃত্ত হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে। যেন এক অকিঞ্চিৎকর বস্তু। দেহ থেকে আলাদা করে নিলে এর আর কোনও মূল্য থাকে না। অন্যজন তাড়া দেয় তাকে। সরে যেতে আদেশ করে প্রায় এবং সে সরে যেতেই দ্বিতীয়জন ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিনা আয়াসে শরীরে ঢুকে যায়।

    নির্জনতায় নির্বিঘ্নে তারা নাশ করে ময়না বৈষ্ণবীকে। দু’হাতে তার নাক টিপে ধরে। কিছুক্ষণ। খোলা আকাশের নীচে ময়না বৈষ্ণবী পড়ে থাকে উলঙ্গ, একা, ধর্ষিত ও মৃত।

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56 57 58 59 60 61 62 63 64 65 66 67 68 69 70 71 72 73 74 75 76 77 78 79 80 81 82 83 84 85 86 87 88 89 90 91 92 93 94 95 96 97 98 99 100 101 102 103 104 105 106 107 108 109 110 111 112 113 114 115 116 117 118
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleকয়েদি – তিলোত্তমা মজুমদার
    Next Article বসুধারা – তিলোত্তমা মজুমদার

    Related Articles

    তিলোত্তমা মজুমদার

    শামুকখোল – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    অর্জুন ও চারকন্যা – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    ঝুমরা – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    নির্জন সরস্বতী – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    বসুধারা – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 25, 2025
    তিলোত্তমা মজুমদার

    কয়েদি – তিলোত্তমা মজুমদার

    August 23, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.