পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১.১
১
তোকে কলকাতায় নিয়ে এলাম। দেখছিস?
মস্ত শহর কলকাতা। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। না দেখে উপায় কি?
এ কি আমাদের কামারপুকুরের মত নিঝ্ঝুম? নিরিবিলি?
রামকুমার চিন্তিত মুখে বললেন, ‘কলকাতায় এসে টোল খুললাম—’
তাও দেখতে পাচ্ছি বৈকি। তা ছাড়া ঝামাপুকুরে কার কার বাড়িতে দাদা তো পুরোতগিরিও করছেন। সব পেরে উঠছেন না। সময় কই? টোলে টোল খেতে খেতেই দিন যায়।
‘তাই তোকে নিয়ে এলাম এখানে।’ বললেন রামকুমার, ‘এবার একটু লেখাপড়া কর,
লেখাপড়া? গদাধর সরল বিশাল চোখ তুলে তাকিয়ে রইল দাদার দিকে।
‘হ্যাঁ, এবার বাড়ি গিয়ে দেখলাম লেখাপড়ায় তোর একেবারে মন নেই। পাড়ার ছোঁড়াদের সঙ্গে গাঁ-ময় ঘুরে বেড়াস, নয়তো যাত্রা দলে গিয়ে শিব সাজিস। ও সবে পেট ভরবে না—’ রামকুমারের কণ্ঠস্বরে একটু ঝাঁজ ফুটল।
তবে কি করতে হবে?
মন দিয়ে লেখাপড়া করতে হবে। ষোলো-সতেরো বছর বয়স হলো তোর। ছিটে- ফোঁটা বিদ্যেও তোর পেটে নেই। আমার আয় দেখতে পাচ্ছিস তো? ডাইনে আনতে বাঁয়ে কুলোয় না-
তা আর অজানা নেই। কিন্তু শিখতে হবে কি?
‘শাস্ত্র—ব্যাকরণ—’গম্ভীর হলেন রামকুমার ‘একটু মন লাগা। মা’র কাছছাড়া করে নিয়ে এসেছি তোকে। মা’র মুখ প্রসন্ন কর্।’
মা’র মুখ প্রসন্ন কর্। মা’র বিষণ্ণ মুখখানি মনেমনে ধ্যান করল গদাধর। সে কি শুধু চন্দ্রমণির মুখ?
সে মুখে অভয়প্রদা প্রসন্নতা। ‘সব্য হস্তে মুক্ত খড়্গা দক্ষিণে অভয়।’
‘দাদা, চাল-কলা-বাঁধা বিদ্যে শিখে আমার কি হবে? তা দিয়ে আমি কি করব?’ তার মানে? বিরক্ত হলেন রামকুমার।
তার মানে অর্থকরী বিদ্যে আমি চাই না। ঘর-সাজানো বিদ্যে।
‘তবে তুই কি চাস?’
‘আমি চাই জ্ঞান।’
এ আবার কোন দিশি কথা? কোন দিশি জ্ঞান? এ জ্ঞানের অর্থ কি?
এ জ্ঞানের অর্থ নেতি। নেতি-নেতি করে-করে এক্কেবারে শেষকালে যা বাকি থাকে তাই। সেই এক জানাই জ্ঞান, আর অনেক জানা অজ্ঞান।
বুঝতে পারলেন না রামকুমার। কি করেই বা বুঝবেন? সংসারের সুখভোগকে তুচ্ছ করে কেউ স্বপ্নবিলাসে মত্ত থাকতে পারে এ তাঁর কল্পনার অতীত। দরিদ্রের পক্ষে অভাবমোচনের চেষ্টার বাইরে আবার ব্যাকুলতা কী!
ছোট ভাইকে বকতে লাগলেন রামকুমার। কিন্তু গদাধর চুপ। অবিচল। যখন সত্যিকারের জ্ঞান হয় তখন স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়। সত্যিকারের জ্ঞান মানেই ব্রহ্মজ্ঞান। যেমন ধরো, একটি মেয়ের স্বামী এসেছে, সঙ্গে এসেছে তার সমবয়স্ক বন্ধুরা। সবাই বাইরের ঘরে বসে গুলতানি করছে। এদিকে ঐ মেয়েটি আর তার সমবয়সী সখীরা জানলার ফাঁক দিয়ে উঁকিঝুঁকি মারছে। মেয়েটির স্বামীকে চেনে না সখীরা। একজনকে দেখিয়ে জিগগেস করছে, ঐটি তোর বর? মেয়েটি অল্প হেসে বলছে, না। ঐটি? উঁহু। ঐটি? তাও না। এমনি চলছে নেতি- নেতি। শেষকালে ঠিক-ঠিক যখন স্বামীকে দেখিয়ে দিয়ে বললে, তবে ঐটিই তোর বর? তখন সে মেয়ে হাঁ-ও করে না, না-ও করে না, শুধু একটু ফিক করে হেসে চুপ করে থাকে। সখীরাও তখন বুঝতে পারে, কে বর। তেমনি যেখানেই ব্রহ্মজ্ঞান সেখানেই মৌন৷
এ মৌনের ভুল মানে করলেন রামকুমার। ভাবলেন ছেলেটার মাথা বোধ হয় বিগড়েছে।
লেখাপড়া যখন শিখবে না তখন যা হয় একটু কিছু কাজ করুক। অন্তত দেব-সেবার কাজ। বাড়িতে রঘুবীর আছেন, সেবা-পূজার কাজ তো সে জানে। তাই সেদিকে মন দিক। কিছু দক্ষিণার সাশ্রয় হোক।
ঝামাপুকুরে দিগম্বর মিত্রের বাড়িতে গৃহদেবতার নিত্যপূজা। সেখানে গদাধরকে ঢুকিয়ে দিলেন রামকুমার।
গদাধর মহাখুশি। মনের মতন কাজ মিলেছে তার। যেন মনের মানুষ চলে এসেছে তার হাতের নাগালের মধ্যে৷
যেমন দেখতে মনোহর তেমনি কণ্ঠস্বরে মধুঢালা। ভজন গায় গদাধর। যে দেখে যে শোনে সেই তদ্গত হয়ে যায়। মনে হয় কোথাকার কবেকার কে আপন লোক যেন পথ ভুলে চলে এসেছে। অভিজাত বাড়ির মেয়েদের পর্যন্ত বিন্দুমাত্র কুণ্ঠা নেই। সুর্যকে মুখ দেখাতে সংকোচ, কিন্তু এ যেন অন্ধকার ঘরের অন্তরঙ্গ আলো। সকলের বস্ত্রাঞ্চলের নিধি। উদাসীন অথচ আনন্দময়। দেবতার সামনে যখন বসে সবাই চমকে ওঠে, দেবতাই এসে বসেছেন না কি সামনে? কিন্তু এদিকে যার যখন দরকার ফুট-ফরমাজ খেটে দিচ্ছে গদাধর। আড্ডা দিচ্ছে অন্দরে-বাইরে। ছেলে-ছোকরার দল পাকিয়ে হৈ-হল্লা করছে। লেখাপড়ার নামে ঠনঠন।
কি হবে ও সব অবিদ্যায়?
অমৃত-সাগরে যাবার পথ খুঁজছি। যেমন করে হোক সাগরে গিয়ে পৌঁছুতে পারলেই হলো। শুধু, পৌঁছুলে চলবে না, ডুবতে হবে। কেউ তোমাকে ধাক্কা মেরে ফেলেই দিক বা নিজেই ঝাঁপ দিয়ে পড়। ডুবতে হবে। যা ডোবায় না ভাসিয়ে রাখে, তা দিয়ে আমি কি করব?
ব্রহ্মবাদিনী মৈত্রেয়ীও এ কথা বলেছিলেন। ধনধারিনী বসুন্ধরার যত সম্পদ হতে পারে সব এনে তাকে উপহার দিলেন যাজ্ঞবল্ক্য। মৈত্রেয়ী মমতাশূন্যের মত বললেন, ‘যা দিয়ে আমি অমৃত হতে পারব না তা নিয়ে আমি কি করব? য়েনাহং নামৄতো স্যাম কিমহং তেন কুর্যাম?’
শুধু পুঁথি পড়লে কি চৈতন্য হবে? চৈতন্য কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে দেহের মধ্যে। তাকে জাগানো চাই। কি করে জাগাবে? যোগে ব’সে। যোগ কি? যোগ মানে যুক্ত হয়ে থাকা। দীপশিখা দেখেছ? হাওয়া নেই যেখানে, সেই নিষ্কম্প দীপশিখা? সেই স্থির স্থিতি? তারই নাম যোগ। ঊর্ধ্বের সঙ্গে সংস্পর্শ। তারই প্রথম আসন এই দিগম্বর মিত্রের বাড়িতে।
রামকুমার কি করেন? কার সাহায্যে স্বচ্ছল হবে তাঁর সংসার? কে তাঁর পাশে এসে দাঁড়াবে?
‘তুমি যা করো—’রঘুবীরকে স্মরণ করলেন রামকুমার। শ্যামল-শান্ত রঘুবীর।
২
রঘুবীর আছেন দেরে গ্রামে মানিকরাম চাটুজ্জের বাড়িতে। যে গ্রামের জমিদার প্রতাপপ্রবল রামানন্দ রায়। দৌরাত্ম্যই যার একমাত্র মাহাত্ম্য।
ক্ষুদিরাম মানিকরামের বড় ছেলে। বাপের মৃত্যুর পর বিষয়-সম্পত্তি দেখেন আর রঘুবীরের সেবা করেন। প্রথম পক্ষের স্ত্রী মারা যান অল্প বয়সেই। দ্বিতীয় বার বিয়ে করেছেন চন্দ্রমণিকে। যখন চন্দ্রমণির বয়স আট আর তাঁর নিজের বয়স পঁচিশ। বিয়ের ছ’ বছর পরে জন্ম হল রামকুমারের। আর তার পাঁচ বছর পরে প্রথম মেয়ে কাত্যায়নীর।
‘আপনাকে রাজা ডেকেছেন—’ক্ষুদিরামের ঘরের দরজায় জমিদারের পেয়াদা। কি আর্জি হুজুরের? চোখ তুলে চাইলেন ক্ষুদিরাম।
আর্জি নয়, হুকুম। রাজার তরফ থেকে একনম্বর মামলা রুজু আছে আদালতে। আপনাকে সাক্ষী দিতে হবে। আপনি একজন ধার্মিক লোক।
আপনার জবানবন্দির দাম আছে।
ব্যাপারটা শুনলেন বিশদ করে। বুঝলেন, মামলাটি মিথ্যে, তঞ্চকী।
‘মিথ্যে মামলায় সাক্ষী হতে পারব না।’ একবাক্যে না করলেন ক্ষুদিরাম।
পেয়াদা তো অবাক। ভাবতেও পারে না এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করা যায়। এর পরিণাম কি হবে তা কি চাটুজ্জে মশায় জানেন না?
জানেন। কোপে পড়বেন জমিদারের। কিন্তু জমিদারের প্রশ্রয়ের চাইতে সত্যের আশ্রয়ে বেশি শান্তি।
অন্তরের মধ্যে একবার দেখলেন তাঁর রঘুবীরকে। সত্যে আর ন্যায়ে যিনি প্রতিষ্ঠিত সেই করুণাঘন রামচন্দ্ৰকে।
যা হবার তাই হল।
রামানন্দ রায় উলটে ক্ষুদিরামের বিরুদ্ধেই মিথ্যে নালিশ করলেন। যার পক্ষে আমলা তার পক্ষেই মামলা। ডিক্রি পেয়ে গেলেন রামানন্দ। জারিতে ক্ষুদিরামের স্থাবর-অস্থাবর সব নিলেম হয়ে গেল। স্ত্রী-পুত্র-কন্যার হাত ধরে পথে এসে দাঁড়ালেন।
দেড়শো বিঘে মতন জমি ছিল। সব একটা রঙচঙে তামাশার মত শূন্যে মিলিয়ে গেল। কিছুই কি রইল না আর পৃথিবীতে?
আছেন, রঘুবীর আছেন৷ অভয় আশ্রয়ের স্নিগ্ধ আতপচ্ছদ মেলে ধরেছেন আকাশে। যার কেউ নেই কিছু নেই তারও অনন্তে স্থান আছে, অন্তরে স্থান আছে।
ক্ষুদিরাম দেখলেন হঠাৎ এক জন বন্ধু এসে উপস্থিত।
‘আমি কামারপুকুরের সুখলাল গোস্বামী। চিনতে পার?’ ‘তোমায় চিনি না? তুমি আমার কত কালের বন্ধু।
তুমি চলো কামারপুকুর। আমার বাড়ির একটেরে তুমি থাকবে। দিচ্ছি বিঘেটাক। কাটা ঘুড়ির সুতো ধরো আবার।
তোমার জমি কামারপুকুরে গোস্বামীদের লাখেরাজী স্বত্ব। হৃদয়ও তেমনি নিষ্কর। নিষ্কণ্টক। সপরিবারে ক্ষুদিরাম চলে এলেন কামারপুকুর। গোস্বামীদের বাড়ির একাংশে কয়েকখানি চালাঘরে বাস করতে লাগলেন। লক্ষ্মীজলায় ধানী জমি পেলেন এক বিঘে দশ ছটাক। চিরকালের অর্পণ।
বর্তে গেলেন ক্ষুদিরাম। যিনি নেন তিনিই আবার ফিরিয়ে দেন। এক দোর দিয়ে যান হাজার দোর দিয়ে আসেন। নিত্যেও তিনি লীলায়ও তিনি।
মনে পড়ে, একদিন নিরূপায় কণ্ঠে বলেছিলেন চন্দ্রমণি ‘ঘরে আজ চাল নেই—’তবু বিচলিত হননি ক্ষুদিরাম। বলেছিলেন, ‘তাতে কি? রঘুবীর যদি উপোস করেন আমরাও উপোস করব।’
সৌম্যোজ্জল চোখে হাসলেন রঘুবীর। বা, উপোস করব কেন? –
লক্ষ্মীজলার মাঠে ধানী জমি সোনার ধানে ঝলমল করে উঠল। ক্ষুন্নিবৃত্তির তৃপ্তিতে যেন প্রসন্ন হাসি হাসছেন দেবতা।
দুপুর বেলা। গ্রামান্তরে গিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম। ফেরবার সময় গাছের তলায় বিশ্রাম করতে বসেছেন। হঠাৎ কেমন যেন তন্দ্রার ঘোর লাগল। এলিয়ে পড়লেন।
স্বপ্ন দেখলেন শ্রীরামচন্দ্র বালকের বেশে দাঁড়িয়ে আছেন সামনে। চন্দ্রের মত রমণীয় বলেই তো রামচন্দ্র। নবদূর্বাদলের মতই শ্যামল-স্নেহল। কিন্তু মুখখানি ম্লান কেন?
‘আমি বড় অযত্নে আছি। অনেক দিন কিছু খাইনি।’ বললে বালক, ‘তোমার বাড়িতে আমাকে নিয়ে চলো। বড় সাধ তোমার হাতের একটু সেবা পাই।’ অস্থির হয়ে উঠলেন ক্ষুদিরাম। বললেন, ‘আমি অধম, আমার সাধ্য কি তোমার সেবা করি?’
‘কোনো ভয় নেই। নিয়ে চল আমাক । যার হৃদয়ে ভক্তি আছে তার আমি এটি ধরি না।’
ঘুম ভেঙে গেল ক্ষুদিরামের। চার পাশে তাকিয়ে দেখলেন কেউ নেই। কিন্তু স্বপ্নে যে ধানখেত দেখেছিলেন ঐ তো সেই ধানখেত। নিশ্চয়ই ঐখানে লুকিয়েছেন৷ এগোলেন ক্ষুদিরাম। দেখলেন এক টুকরো পাথরের উপর এক বিষধর সাপ ফণা মেলে আছে। ঠাহর করে দেখলেন সামান্য পাথর নয়, শালগ্রাম শিলা। মনে হল স্বপ্ন মিথ্যা নয়, ঐ শিলাই তাঁর রামচন্দ্র, নইলে সাপ সহসা অন্তর্হিত হবে কেন? কিন্তু সাপ তো একেবারে হাওয়া হয়ে যায়নি, পাথরের মুখে যে গর্ত তারই মধ্যে গিয়ে লুকিয়েছে। পাথর তুলে আনবার সময় হাতে যদি দংশন করে! ইতস্তত করতে লাগলেন ক্ষুদিরাম। কিন্তু যিনি রাম তিনি কি বিষহরণ নন? ‘জয় রঘুবীর’ বলে ত্বরিতভঙ্গিতে তুলে নিলেন শিলা। সাপ কোথায় তা কে জানে।
লক্ষণ থেকে বুঝলেন এ ‘রঘুবীর’ শিলা।
তবে, আর সন্দেহ কি, এই শিলাই তাঁর জাগ্রত গৃহদেবতা। শুধু জাগ্রত নয়, স্বয়মাগত৷
একদিন পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন মেদিনীপুর, কামারপুকুর থেকে কম-সে-কম চল্লিশ মাইল দূরে। অনুদরে বেরিয়েছেন, হেঁটেছেন প্রায় দশটা পর্যন্ত। হঠাৎ দেখলেন রাস্তার ধারে এক বেলগাছ। ফাল্গুনের রাশি-রাশি নতুন পাতায় সারা গাছ ঝলমল করছে। দেখে ক্ষুদিরামের মন ঐ কচি পাতার মতই নেচে উঠল। পাশের গাঁয়ে ঢুকে একটা ঝুড়ি আর গামছা কিনলেন তাড়াতাড়ি। সামনের পুকুরের জলে ধুয়ে নিলেন বেশ করে। পাতা ছিঁড়ে-ছিঁড়ে ঝুড়ি বোঝাই করলেন। ভিজে গামছাখানি চাপিয়ে দিলেন উপরে। মেদিনীপুর পড়ে রইল, পাতা নিয়ে বিকেল তিনটের সময় বাড়ি পৌঁছলেন।
চন্দ্রমণি তো অবাক।
‘অনেক—অনেক বেলপাতা পেয়েছি আজ। নতুন বেলপাতা। আজ প্রাণভরে শিবপুজো করব।’
‘মেদিনীপুর? মেদিনীপুরে গেলে না?’
‘বেলপাতা দেখে সব ভুল হয়ে গেল। আবার যাব না-হয় একদিন মেদিনীপুর। কিন্তু এমন বেলপাতা পাব কোথায়?’
এই ক্ষুদিরাম!
এবার চলেছেন—মেদিনীপুরে নয়— সেতুবন্ধ-রামেশ্বর। চলেছেন তেমনি পায়ে হেঁটে। পদব্ৰজে না হলে তীর্থ কি! ক্লেশ না করলে ক্লেশমোচনের স্পর্শ পাব কি করে?
ফিরলেন পরের বছর। সঙ্গে নিয়ে এলেন বাণলিঙ্গ শিব। বসালেন রঘুবীরের পাশে। হরির পাশে হর। সীতাপতির পাশে উমাপতি।
প্রায় ষোলো বছর পরে ফের ছেলে হল চন্দ্রমণির। দ্বিতীয় ছেলে। ক্ষুদিরাম তার নাম রাখলেন রামেশ্বর।
রামকুমার তখন বেশ বড়ো হয়ে উঠেছে, পুজো-আচ্চা করছে যজমান-বাড়িতে। লক্ষ্মীপুজোর রাত। দিন থাকতে ভুরসুবো গিয়েছে, মাঝ রাতেও ফেরবার নাম নেই। ছেলের জন্যে চন্দ্রমণি ঘর-বার করছেন। মন বড় উচাটন। এখনো ফিরছে না কেন রামকুমার?
ফটফট করছে জ্যোৎস্না।
পথের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছেন চন্দ্রমণি। অনেকক্ষণ পর দেখলেন কে একজন যেন মাঠ পেরিয়ে ভুরসুবোর দিক থেকে আসছে। রামকুমারই বোধ হয়—দু’ পা এগিয়ে গেলেন চন্দ্ৰমণি। কিন্তু, ছেলে কোথায়, এ তো একজন মেয়ে!
আশ্চর্য রূপ সেই মেয়ের।
কি দরকার?
এক গা গয়না।
‘কোত্থেকে আসছ মা তুমি?’ চন্দ্রমণি গায়ে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন। ‘ভুরসুবো থেকে।’
‘আমার ছেলে রামকুমারের কোনো খবর জানো?’
জিজ্ঞেস করেই লজ্জিত হলেন চন্দ্রমণি। অজানা ভদ্রঘরের মেয়ে, কোনো বিশেষ কারণেই না-হয় বাইরে বেরিয়েছে—তাঁর ছেলের খবর সে পাবে কোথায়? ছেলের জন্যে ব্যাকুল হয়েছেন বলেই বোধ হয় তাঁর আর বোধজ্ঞান নেই।
‘যে বাড়িতে তোমার ছেলে পূজো করতে গিয়েছে আমি সেই বাড়ি থেকেই আসছি।’ মেয়েটি বললে চোখ তুলে ‘ভয় নেই এখনি ফিরবে।
কেমন যেন বিশ্বাস হল চন্দ্রমণির। বুকের ভার নেমে গেল।
জিজ্ঞেস করলেন, ‘এত রাত্রে এত গয়না-গাটি পরে কোথায় যাচ্ছ তুমি মা?’মেয়েটি হাসল। বললে, ‘অনেক দূর।’
‘তোমার কানে ও কি গয়না?’
‘ওর নাম কুণ্ডল-’
মা তোমার বয়স অল্প। এই অসময়ে এত গয়না-টয়না পরে তোমার একা-একা যাওয়া ঠিক হবে না।’ চন্দ্রমণির কণ্ঠে আকুলতা ঝরে পড়ল ‘তুমি আমাদের ঘরে এস। রাতটা বিশ্রাম করে কাল ভোর হতে চলে যেও।’
‘না মা, আমায় এখনি যেতে হবে। বলে মেয়েটি চলে গেল।
আরেক সময় আসব তোমাদের বাড়িতে।’
চলে গেল কিন্তু রাস্তা বা মাঠ দিয়ে নয়। ভারি আশ্চর্য তো! তাঁদের বাড়ির পাশেই নতুন জমিদার লাহাবাবুদের সার সার ধানের মরাই। যেন সেদিক পানে চলে গেল। ওদিকে পথ কোথায়? বিদেশী মেয়ে পথ হারালো না কি?
চন্দ্রমণি বাইরে বেরিয়ে এলেন। এদিক-ওদিক খুঁজতে লাগলেন চঞ্চল হয়ে কোথায় গেল সে চঞ্চলা?
এ আমি তবে কাকে দেখলাম? কোজাগরী রাত্রিকে জিজ্ঞেস করলেন চন্দ্রমণি। স্বামীকে গিয়ে তুললেন। বলো, এ আমি কাকে দেখলাম?
সর্বাবয়বানবদ্যা নানালঙ্কারভূষিতা এ কে?
সব শুনলেন ক্ষুদিরাম। বললেন, ‘শ্রীশ্রীলক্ষ্মীদেবীকে দেখেছ চন্দ্ৰমণি!
পিতৃদেব আর মাতৃদেবী। দুই-ই দিব্যভাবের ভাবুক।
৩
এমন বাপ-মা না হলে এমন ছেলে জন্মাবে কি করে?
কাত্যায়নীর বড় অসুখ। আনাড়ে তার শ্বশুর-বাড়িতে তাকে দেখতে গিয়েছেন ক্ষুদিরাম। মেয়ের হাবভাব কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হল। মনে হল ভূতাবেশ হয়েছে।
চিত্ত সমাহিত করে দেহে দিব্যযোনিকে আহবান করলেন ক্ষুদিরাম। প্রেতযোনিকে সম্বোধন করে বললেন, ‘কেন আমার মেয়েকে অকারণে কষ্ট দিচ্ছ? চলে যাও বলছি।’
কাত্যায়নীর জবানিতে বললে সেই প্রেতাত্মা ‘চলে যাব যদি আমার একটা কথা রাখো।’
‘কি কথা?’
‘যদি গয়া গিয়ে আমাকে পিণ্ড দিতে রাজি হও। আমার বড় কষ্ট,
ক্ষুদিরাম তিলমাত্র দ্বিধা করলেন না। বললেন, ‘দেব পিণ্ড। কিন্তু তাতেই কি তুমি উদ্ধার পাবে?’
‘পাব।’
‘তার প্রমাণ কি?’
তার প্রমাণ আমি এখুনি দিয়ে যাচ্ছি। যাবার সময় সামনের ঐ নিম গাছের বড় ডালটা আমি ভেঙে দেব।’
মূহূর্তে নিম গাছের বড় ডালটা ভেঙে পড়ল।
আর কাত্যায়নীর অসুখও মিলিয়ে গেল বাতাসে।
ক্ষুদিরাম গয়া রওনা হলেন। সেটা শীতকাল, ১২৪১ সাল। পৌঁছলেন চৈত্রের শরতে। মধ্যমাসেই পিণ্ডদান প্রশস্ত।
বিষ্ণুপদে পিণ্ড দিলেন ক্ষুদিরাম। রাতে বিচিত্র স্বপ্ন দেখলেন।
যেন তাঁর সামনে গদাধর এসে দাঁড়িয়েছেন। বলছেন, ‘তোমার পুত্র হয়ে তোমার বাড়িতে গিয়ে জন্মাব। সেবা নেব তোমার হাতে।’
ক্ষুদিরাম কাঁদতে লাগলেন। বললেন, ‘আমি গরিব, আমার সাধ্য কি তোমার সেবা করি?’
‘ভয় নেই।’
বললেন গদাধর, ‘যা জুটবে তাই খাওয়াবে আমাকে। আমি উপাচার চাই না, ভক্তি চাই।’
একমাস পরে বাড়ি ফিরলেন ক্ষুদিরাম। স্বপ্নের কথা পুষে রাখলেন মনে-মনে।
এদিকে চন্দ্রমণি কী দেখছেন?
দেখছেন, রাতে তাঁর বিছানায় তাঁরই পাশে কে একজন শুয়ে আছে। স্বামী বিদেশে, অথচ এ কী অভাবনীয়! তা ছাড়া, কই, মানুষ তো এত সুন্দর হয় না। ধড়মড় করে উঠে বসলেন চন্দ্রমণি। প্রদীপ জ্বালালেন। কই, কেউ কোথাও নেই। দরজার খিল তেমনি অটুট আছে। কৌশলে খিল খুলে কেউ ঘরে ঢুকে তেমনি কৌশলে আবার পালিয়ে গেল না কি? এত স্পষ্ট যে স্বপ্ন বলে বিশ্বাস হয় না। ভোর হতেই ধনী কামারনীকে ডেকে পাঠালেন। বললেন, ‘হ্যাঁ লো, কাল রাতে কেউ আমার ঘরে ঢুকেছিল বলতে পারিস?’
সব কথা শুনে ধনী হেসেই অস্থির। বললে, ‘মর মাগী, লোকে শুনলে অপবাদ দেবে যে! বুড়ো বয়সে আর ঢলাসনি! স্বপ্ন দেখেছিস লো, স্বপ্ন দেখেছিস।’ স্বপ্নই হবে হয়তো। তাই মনে-মনে মেনে নিলেন চন্দ্রমণি। কিন্তু, আশ্চর্য, রাত কি কখনো দিনের মত স্পষ্ট হয়? আরেক দিন।
যুগীদের শিবমন্দিরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন চন্দ্রমণি, দেখতে পেলেন মহাদেবের গা থেকে একটা আলো বেরিয়ে এসে ঘুরতে লাগল হাওয়ার মতো। ঘুরতে-ঘুরতে ছেয়ে ফেলল চন্দ্রমণিকে, তাঁর শরীরের মধ্যে ঢুকতে লাগল প্রবল স্রোতে। টলে পড়ে যাচ্ছিলেন, কাছেই ধনী ছিল, ধরে ফেললে। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ধনীকে সব বললেন চন্দ্রমণি। ধনী বললে, ‘তোর বায়ুরোগ হয়েছে।’
গয়া থেকে ফিরে এসে শুনলেন সব ক্ষুদিরাম।
‘আমার পেটে যেন কেউ এসেছে—এমনি মনে হচ্ছে সত্যি— ‘চন্দ্রমণি বললেন স্বামীকে।
‘গদাধর আসছেন-’
এবারের গর্ভধারণে চন্দ্রমণির রূপ যেন আর বাঁধ মানছে না। যেন লাবণ্যবারিধি উদ্বেলিত হয়ে উঠেছে। সে-রূপ বুঝি সূর্যোদয়ের আগেকার আরক্তিম আকাশের রূপ।
‘বুড়ো বয়সে গর্ভ হয়ে রূপ যেন ফেটে পড়ছে—’বলাবলি করে পড়শিনিরা।
কেউ বলে, ‘পেটে ওর ব্রহ্মদত্যি ঢুকেছে—বাঁচলে হয় এবার।’
নানা রকম দিব্যদর্শন হচ্ছে চন্দ্রমণির।কখনো ত্রাস, কখনো উল্লাস, কখনো বা ঔদাসীন্য। কখনো বলেন, আমার এ গর্ভ পতিস্পর্শে ঘটেনি; কখনো বলেন, আমার মধ্যে পুরুষোত্তম এসেছেন। কখনো বা নিতান্ত অসহায়ের মত বলেন, ‘আমাকে বুঝি গোঁসাইয়ে পেল।’
গোঁসাইয়ে পাওয়া মানে ভূতে পাওয়া৷ সুখলাল গোস্বামী মারা যাবার পর নানা রকম দৈব উৎপাত দেখা দিয়েছিল গ্রামের মধ্যে। লোকের বিশ্বাস হয়েছিল সুখলাল গোঁসাই মরে ভূত হয়েছে, আর আছে তাদের বাড়ির সামনেকার বকুল গাছের মগ ডালে। সেই থেকে কাউকে কখনো ভাবে পেলে লোকে বলত, গোঁসাইয়ে পেয়েছে।
কিন্তু ক্ষুদিরাম তাঁর মন খাঁটি করে রেখেছেন, তাঁর ঘরে পুত্ররূপে নারায়ণ আসছেন।
ঘরের দরজা বন্ধ করে বাইরে দোরগোড়ায় শুয়ে আছেন চন্দ্রমণি, হঠাৎ শুনতে পেলেন কোথায় যেন নূপুর বাজছে। কান খাড়া করলেন, আওয়াজ তো তাঁর বন্ধ ঘরের মধ্যে। ঘর শূন্য দেখে বন্ধ করেছি দরজা, কেউ অগোচরে ঢুকে পড়ল না কি? ঢুকে পড়ল তো নূপু্র পেল কোথায়? ত্রস্ত হাতে বন্ধ দরজা খুলে ফেললেন চন্দ্ৰমণি। কেউ কোথাও নেই। যেমনি শূন্য ছিল তেমনি আছে। কি আশ্চর্য, চোখের মত কানও কি ভুল করবে? স্বামীকে বললেন এই নূপুর-গুঞ্জনের কথা। ক্ষুদিরাম বললেন, ‘গোকুলচন্দ্ৰ আসছেন।’
একদিন মনে হল চন্দনের গাঢ় গন্ধ পাচ্ছেন চারদিকে। ঘরের মধ্যে যেন বিদ্যুতের খেলা দেখছেন। বুকের উপর উঠে কে এক শিশু, গলা জড়িয়ে ধরবার চেষ্টা করছে, আর পিছলে পড়ে যাচ্ছে গড়িয়ে, দু’বাহু দিয়ে চেপে ধরে রাখতে পারছেন না।
রঘুবীরের ভোগ রাঁধছেন চন্দ্রমণি, হঠাৎ যেন প্রসব-বেদনা টের পেলেন। বললেন, ‘উপায়? এখন যদি হয়, ঠাকুরের সেবা হবে কি করে?’
‘যিনি আসছেন তিনি রঘুবীরের সেবায় ব্যাঘাত ঘটাতে আসবেন না।’ বললেন ক্ষুদিরাম, ‘তুমি স্থির থাক। যাঁর পূজো তিনিই তার ব্যবস্থা করবেন। ঠাকুরের মধ্যাহ্ন-ভোগ আর শীতল শেষ হল নির্বিঘ্নে। রাতও প্রায় যায় যায়। ধনী এসে শুয়েছে চন্দ্রমণির কাছে। বাড়িতে থাকবার মত দু’খানি চালা ঘর – তা ছাড়া রান্না-ঘর, ঠাকুর-ঘর, আর ঢেঁকি-ঘর। ঢেঁকি-ঘরেই আঁতুড় পড়বে বলে ঠিক হয়েছে। ঘরে এক দিকে ধান ভানবার একটা ঢেঁকি আর ধান সিদ্ধ করবার একটা উনুন।
রাত ফুরুতে তখনো আধদণ্ড বাকি, চন্দ্রমণির ব্যথা উঠল। ধনী তাঁকে নিয়ে এল ঢেঁকসেলে, শুইয়ে দিলে মাটির উপর। দেখতে দেখতে প্রসব হয়ে গেল। যা অনুমান করা গিয়েছিল, পুত্র, নরবেশে পরম পুরুষই এসেছেন। প্রতিশ্রুত প্রতিমূর্তি।
এসেছেন? দেখেছিস তুই?
হ্যাঁ লো, দেখেছি। তুই চুপ কর। ঠাণ্ডা হ। দেখবি, তুইও দেখবি। এখন তোকেই আগে দেখা দরকার।
ধনী সাহায্য করতে গেল প্রসূতিকে৷
কিন্তু এ কী সর্বনাশ, ছেলে কই? কই সেই নব-কলেবর?
চকা-হরিণের মত ছটফট করে উঠল ধনী।
কাঁপা হাতে বাতির সলতে বাড়িয়ে দিলে। ছেলে কই? দেখা দিয়েই অন্তর্হিত হয়ে গেল না কি?
ও মা, দেখেছ? পিছল মাটিতে হড়কে হড়কে ধানসেদ্ধর উনুনের মধ্যে গিয়ে ঢুকেছে। উনুনে আগুন নেই এখন, কিন্তু ছাই আছে গাদি করা।
আলগোছে ধনী ছেলেকে টেনে নিলে কোলে। ছাই-মাখা ছেলে। ভাস্বর ভস্মভূষণ।
‘ও মা, কত বড় ছেলে! প্রায় ছ’মাসের ছেলের মত! ধনী নাড়ে-চাড়ে আর ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখে। খালি গা, অথচ মনে হয় যেন কত মণি-রত্ন পরে আছে। দ্বিতীয়া তিথি কিন্তু মনে হয় যেন অদ্বিতীয় চাঁদ।
বাংলা ১২৪২ সালের ছয়ই ফাল্গুন – ইংরিজি ১৮৩৬ খৃষ্টাব্দের সতেরোই ফেব্রুয়ারি। শুক্লপক্ষ, বুধবার। ব্রাহ্ম মূহুর্ত।
ছেলে কোলে নিয়ে বসে একদিন রোদ পোয়াচ্ছেন চন্দ্রমণি। হঠাৎ মনে হল কোল জুড়ে যেন তাঁর পাথর পড়ে আছে। ভার যেন বইতে পারছেন না। এ কী হলো বলো দেখি?
কী আবার হবে। বিশ্বম্ভরের ভর হয়েছে ছেলের উপর।
অসহ্য! কোল থেকে ছেলে নামিয়ে নিয়ে কুলোর উপর শুইয়ে দিলেন চন্দ্রমণি। শিশুর ভারে কুলো চড়চড় করে উঠল। কুলো ভেঙে যাবে না কি? ব্যকুল হাতে চন্দ্রমণি ছেলেকে আবার কোলে তুলতে গেলেন। এমন শক্তি নেই যে টেনে তোলেন। ছেলে নিশ্চল—পাষাণ। দু হাতে এমন শক্তি নেই যে টেনে তোলেন। যিনি গিরি ধরেছিলেন তিনিই যে শুয়ে আছেন কুলোর উপর তা কে জানে। চন্দ্রমণি কাঁদতে লাগলেন। যে যেখানে ছিল ছুটে এল।
কি হলো? হলো কি?
‘ছেলেকে কোলে তুলতে পারছি না—’
‘কেন?’
‘নিশ্চয়ই ওই নিম গাছের ব্রহ্মদত্যি ভর করেছে বাছার উপর—
‘কি যে বলিস তার ঠিক নেই। দাঁড়া, গা ঝেড়ে দিচ্ছি—’ধনী কামারনী কুলোর কাছে বসে মন্ত্র পড়তে লাগল।
নিমেষে শিশু হালকা হয়ে গেল। যেমন-কে-তেমন। তেমনি নবীন ও নিরীহ।
আরো একদিন।
সংসারের কাজে গৃহান্তরে গিয়েছেন চন্দ্রমণি। মশারি ফেলা, পাঁচ মাসের শিশু ঘুমোচ্ছে বিছানায়। ঘরে ফিরে এসে দেখেন ছেলে নেই। তার বদলে মশারি-প্রমাণ কে-এক দীর্ঘকায় মানুষ শুয়ে আছে। নবোদ্গত গাছের বদলে বিরাট বনস্পতি।
চেঁচিয়ে উঠলেন চন্দ্রমণি ‘ওগো দেখে যাও, বিছানায় ছেলে নেই—’
‘কি বলছ?’ ত্রস্ত পায়ে ছুটে এলেন ক্ষুদিরাম।
‘দেখ এসে। বিছানায় বাছার বদলে কে শুয়ে আছে।’
দু’জনেই তাকালেন মশারির দিকে। কই, তাঁদের সেই শিশুই তো শান্তিতে শুয়ে আছে।
হাত-পা নেড়ে খেলা করছে আপন-মনে৷ এ কী খেলা! এই যে দেখলাম মহাকায় মানুষ।
আবার এই দুধের ছেলে। সব শুনে গম্ভীর হলেন ক্ষুদিরাম। বললেন, ‘কাউকে কিছু বোলো না।’ ছ’মাসে পা দিল শিশু।
ছেলের মুখে-ভাতের যোগাড় করতে হয় এবার। বেশি জাঁক-জমক করবার অবস্থা কই? কোনো রকমে রঘুবীরের প্রসাদী ভাত মুখে দিয়েই নিয়মরক্ষা করতে হবে।
কিন্তু পাড়ার লোকেরা নাছোড়বান্দা।
এমন রাজ্যেশ্বর ছেলে, ভোজ দাও।
কারবারী ধর্মদাস লাহা ক্ষুদিরামের বন্ধু। এক পাড়ার বাসিন্দে। তাঁকে গিয়ে ধরলেন ক্ষুদিরাম। বললেন, ‘বন্ধু, এখন উপায়?’
ঈশ্বরই উপায়, আবার ঈশ্বরই উপেয়। যা তাঁর কৃপা তাই তাঁর শক্তি।
‘ভয় কি, লাগিয়ে দাও। রঘুবীর উদ্ধার করে দেবেন।’ বললেন ধর্মদাস। ধর্মদাসই ব্যবস্থা করলেন সব। তাঁর টাকার থলের মুখ খুলে দিলেন। পাড়ার লোককে তিনিই প্ররোচনা দিয়েছিলেন ক্ষুদিরামের থেকে নেমন্তন্ন আদায় করার জন্যে। আবার তিনিই সব জোটপাট করলেন। এ-পাড়া ও-পাড়া কাকে ছেড়ে কাকে বলবেন—গাঁ-কে-গাঁ ষোলো আনারই আসন পড়ল। জীবের মধ্যে যে শিব আছে, নিঃস-নির্ধনের মধ্যে যে নারায়ণ, সেও তো আরাধনীয়।
সেব্য-পূজ্য।
কি নাম রাখবে শিশুর?
এ আবার জিজ্ঞাসা কর কেন? গয়াধামে গিয়ে গদাধর পেলাম। এ সেই গদাধর।
গয়াবিষ্ণু।
ডাক-নাম?
আদর করে গদাই বলে ডাকেন বাপ-মা। ডাকে ধনী কামারনী।
দিনে-দিনে বাড়ছে গদাধর। বড়-সড় হয়ে উঠছে। চন্দ্রমণি তাকে মাঝে-মাঝে ধুতি পরিয়ে দিচ্ছেন।
লাহাবাবুদের অতিথিশালায় সাধু-সন্ন্যাসীর নানান আনাগোনা। গদাধরের মন পড়ে আছে সেই সন্নেসীদের মাঝখানে। শুধু প্রসাদের লোভে নয়, হয়তো বা আর কিছুর আকর্ষণে। হয়তো বা কোনো জ্ঞাতিত্বের প্রতিশ্রুতিতে।
ভোলা শিশুর মাঝে বাসা বেধেছেন শিশু-ভোলানাথ।
মা নতুন বস্ত্র পরিয়ে দিয়েছেন গদাধরকে।
কতক্ষণ পরেই এ তার কি পরিণতি! ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলেছে গদাধর। এক ফালা নিয়ে দিব্যি ডোরকপনি করে পরেছে!
‘ও মা, এ কি? এ তুই কী হয়েছিস?’ ‘অতিথি হয়েছি।’
‘অতিথি? সে আবার কী?’
বুঝিয়ে দিল গদাধর। লাহাবাবুদের অতিথিশালায় যারা আসে তাদের অতিথি বলে না?
তারা তো সব সন্ন্যাসী। সেই সন্ন্যাসীর বেশই তুই পছন্দ করলি? মা’র মন হু-হু করে উঠল। আস্ত কাপড় দিলাম, তা ছিঁড়ে তুই কৌপীন বানালি? গদাধর হাসল। অখণ্ড ব্রহ্মাণ্ডেশ্বর বুঝি এইটুকু একটু খণ্ড নিয়েই খুশি। ছোট-ছোট তিনখানি খোড়ো ঘর, তার মধ্যে একখানি আবার ঢেঁকিশাল। আশে-পাশে গাছপালা, ঝোপ-জঙ্গল। দেখলেই মনে হয় গরিবের সামান্য কুটির। তবু কে জানে কেন, ছবিতে এমন একটি ভাব, চোখ ফিরিয়ে নিতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় কী যেন এখানে আছে! কত না জানি শান্তি! কত না জানি দয়া! কত না জানি আশ্রয়!
পথ দিয়ে যেতে-যেতেও দাঁড়িয়ে যায় লোকেরা। ভাবে, কেন ভাবে কে বলবে, ঐখানে গেলে যেন তৃষ্ণার জল মিলবে, মিলবে যেন সমস্ত অসুখের আরোগ্য! ঐখানে আছে কে? ও কার বাড়ি? ও কি কোনো মুনি-ঋষির আশ্রম?
৪
এখানে লাহাবাবুদের বাড়ির সামনে ঢালাও নাটমন্দিরে পাঠশালা।
পাঁচ বছরের ছেলে তখন গদাধর, পাততাড়ি বগলে করে ঢুকল এসে সে পাঠশালায়। সকালে-বিকেলে দু’বার করে পড়া হয়। সকালে দু’তিন ঘণ্টা পড়ে স্নানাহারের ছুটি, বিকেলে এসে আবার সন্ধে পর্যন্ত। ইস্কুলের আর কিছুই ভালো লাগে না গদাধরের, শুধু আর কতগুলো ছেলে এসে যে জমেছে এইটেই মস্ত মজা। খুব করে খেলা করা যাবে। যেখানে যত বেশি প্রাণ সেখানেই তত বেশি লীলা। যদি ঐ শঙ্করীটা না থাকত! ও দেখলেই কেমন ধাঁধা লেগে যায় গদাধরের। কষ্টে-সৃষ্টে যোগ যদি বা হল, বিয়োগ আর কিছু তেই আয়ত্ত করতে পারল না। কি করেই বা পারবে? যোগে আছে সর্বক্ষণ, তাই যোগ করায়ত্ত। কিন্তু বিয়োগ আবার কি! কোথাও লয়-ক্ষয় নেই, বিয়োগ-বিচ্ছেদ নেই। পূর্ণ থেকে পূর্ণ গেলেও থেকে যায় পূর্ণ।
পড়া বলতে বললেই মুশকিল। তার চেয়ে স্তোত্র-প্রণাম দাও মুখস্থ বলে দিচ্ছে। বর্ণ-পরিচয় করে পড়তে যাওয়াটাই ঠিক, কিন্তু গদাধরের উলটো—তার পড়তে পড়তে বর্ণ-পরিচয়। অঙ্ক দিলেই আতঙ্ক। অঙ্ক ফেলে তালপাতায় ঠাকুরের নাম লেখা অনেক আরামের। যা রাম তাই নাম। পাঠশালের ছুটির পর মধু যুগীর বাড়িতে গদাধর প্রহ্লাদ-চরিত পড়ছে। ভিড় জমেছে চার পাশে। এমন শিশুর মুখে এমন মনোহরণ পড়া কেউ আর শোনেনি কোনো দিন। কাছাকাছি আমগাছের ডালে বসে এক হনুমানও শুনছে সেই পড়া, সেই স্বরলহরী। হঠাৎ সে হনুমান এক লাফে নেমে এল গাছ থেকে, শিশুর কাছাকাছি এসে তার পা ধরে বসে পড়ল। গদাধর বিন্দুমাত্র ভয় পেল না, বরং হনুমানের মাথায় দিব্যি হাত ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করলে। হনুমান যেন চিনতে পেরেছে রামচন্দ্রকে। এক লাফে আবার নিজের জায়গায় চলে গেল।
তেমনি গোচারণের মাঠে গিয়ে গদাধর ব্রজের রাখাল হয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে জুটেছে সব সেথোরা। কেউ হচ্ছে সুবল কেউ শ্রীদাম কেউ কেউ বা দাম-বসুদাম। আর যে গদাধর সেই তো বংশীধর। চরে চরে কাছে আসে গোধনু আপন হাতে ঘাস ছিড়ে ছিড়ে খাওয়ায়। কখনো বা লাফিয়ে লাফিয়ে দোল খায় গাছের ডালে। কখনো বা পাড়ে কাপড় ছেড়ে রেখে ঝাঁপিয়ে পড়ে পুকুরে। কোঁচড়ে করে মুড়ি খায়। খেতে খেতে নাচে। হাসে।
একদিন তেমনি বাঁড়ুয্যে-বাগানের মাঠে গরু চরাচ্ছে সকলে।
বললে, ‘আয় সবাই মিলে আজ মাথুর গান গাই। গাইবি?’
সবাই একবাক্যে রাজি।
গাছের তলায় যাত্রা আরম্ভ হয়ে গেল।
আজ কৃষ্ণ নেই। আজ রাধিকা। আজ কৃষ্ণকান্ত-বিরহিণী। কৃষ্ণ দেখেছিস এত দিন, আজ দেখ রাই-কমলিনীকে।
মাথুর-বিরহের গান ধরল গদাধর। সৃষ্টির মহামৌনের মাঝে যে শাশ্বত কান্না প্রচ্ছন্ন হয়ে আছে, আপন হৃদয় নিঙড়ে তা উৎসারিত করে দিল। কোথায়—কোথায় তুমি কৃষ্ণ, কোথায় হে তুমি পরমতম আকর্ষণীয়! কবে আমার এই ক্ষুদ্র স্ফুলিঙ্গ মিলবে গিয়ে তোমার নির্বিকল্প নির্বাণহীনতায়?
গাইতে গাইতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল গদাধর। বাহ্যচৈতন্য রইল না। সেথোরা অস্থির হয়ে পড়ল, ‘ওরে গদাই, কি হল তোর? কেন এমন করছিস? চোখ চা।’ কেউ গায়ে ঠেলা দেয়, কেউ চোখে-মুখে জল ছিটোয়, কেউ বা কি করবে বুঝতে না পেরে কাঁদে।
কে একজন হঠাৎ কানের কাছে মুখ এনে বলে ‘কৃষ্ণ কৃষ্ণ। হরেকৃষ্ণ’।
যে নামে অজ্ঞান সেই নামেই আবার জ্ঞান। যে নামে বৈরাগ্য সেই নামেই আবার প্রেম। প্রাণকর কৃষ্ণ নাম শুনে উঠে বসল গদাধর। কোথায় কৃষ্ণ? চার পাশে সব বালক-বন্ধুর দল। এই তো! তোরাই কৃষ্ণ, তোরাই কৃষ্ণ। সমস্ত সংসারই কৃষ্ণময়। এই সব খেলা-ধুলোতেই গদাধরের কেরামতি। লেখাপড়ায় মন যেন থা পাতে না, আর অঙ্ক তো ডাঙোশ উচিয়ে আছে। তার চেয়ে গাঁয়ের কুমোররা যেমন মাটির তাল ছেনে মূর্তি গড়ছে, তাদের সঙ্গে ভিড়িয়ে দাও, গদাধর পয়লা নম্বরের কারিগর। যদি বলো তো পট এঁকে দিতে পারে ওস্তাদ পটুয়ার মত। বেশ, ছবি-টবি চাও না, তবে গান শুনবে? কী গান গাইব? হরিনাম ছাড়া আবার গান আছে না কি? ভক্তি ছাড়া আর কিছু আস্বাদন আছে? পূজোয় বসেছেন ক্ষুদিরাম। সামনে শান্ত-সৌম্য রঘুবীরের মূর্তি। পাশে নানান রকম উপকরণ—তার মধ্যে একগাছি ফুলের মালা। ঠাকুরকে স্নান করিয়ে রেখে চোখ বুজে তাঁর ধ্যান করছেন ক্ষুদিরাম। সেই স্নাত অঙ্গের পুণ্য স্পর্শের স্বাদ কল্পনা করছেন, ধ্যানে ক্রমশই অতলায়িত হয়ে যাচ্ছেন। সাড়া নেই স্পন্দন নেই। সে এক সীমাহীন সমাধি।
গদাধরের বড় সাধ ঐ চিকণ-গাঁথন ফুলের মালাটি গলায় পরে। অমনি তুলে নিয়ে গলায় দিয়ে পালিয়ে গেলে চলবে না। নয়নরোচন রঘুবীর সাজতে হবে। শিলামূর্তির পাশে বসে পড়ল গদাধর। চন্দনের বাটি থেকে চন্দন নিয়ে মাখলে সারা গায়। থালার থেকে মালা তুলে নিয়ে নিজের গলায় দুলিয়ে দিলে। বললে বাবাকে উদ্দেশ করে ‘চোখ মেল। রঘুবীরকে দেখ। দেখ কেমন সেজেছে আজ রঘুবীর-
ধ্যান ভেঙে গেল ক্ষুদিরামের। চোখ মেলে দেখলেন, সামনে গদাধর বসে।
সেই দিন কি পুত্রবন্দনা করেছিলেন ক্ষুদিরাম? শিশুপুত্রের মাঝে কি লুকিয়ে আছে বালগোপাল?
রামশীলা দেবী ক্ষুদিরামের ছোট বোন। কামারপুকুরের কাছে ছিলিমপুরে তাঁর শ্বশুরবাড়ি। তিনি শীতলা দেবীর ভক্ত। মাঝে মাঝে তাঁর উপরে শীতলা দেবীর আবেশ হত। তখন তিনি একেবারে অন্য রকম হয়ে যেতেন। একদিন ভাইয়ের বাড়িতে এসেছেন রামশীলা। এসেই আবার অমনি শীতলা দেবীর আবেশ হয়েছে। সবাই ভয়ে তটস্থ, কি করে কি হবে কিছু বুঝতে পাচ্ছেন না। কিন্তু গদাধরের একরত্তি ভয় নেই। খুঁটে খুঁটে দেখছে পিসিমার ভাব, যাকে এঁরা বলছেন, ভাবান্তর। চমৎকার অবস্থা তো—যেন অন্য কোথাও দেশ বেড়াতে যাওয়া। কে যেন দিব্যি ঘাড়ে ধরে তিন ভুবন ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। সবাই ত্রস্ত-ব্যস্ত, কিন্তু গদাধর প্রসন্নমুখে বলছে, ‘পিসিমার ঘাড়ে যে আছে সে যদি আমার ঘাড়ে চাপে তো বেশ হয়—’
সেদিন কি সেই তবে প্রথম ঘাড়ে চাপল গদাধরের?
ছ’বছরের ছেলে ধান খেতের সরু আল ধরে-ধরে চলেছে নিরুদ্দেশের মত। কোঁচড়ে মুড়ি, তাই তুলে তুলে চিবাচ্ছে থেকে থেকে। হঠাৎ কী মনে হল, আকাশের দিকে তাকাল একবার গদাধর। আকাশ তো আকাশই, শুধু তাকানোর মাঝেই তাৎপর্য। গদাধর দেখল এক বিশালকায় কালো মেঘ আকাশে ছড়িয়ে পড়ছে, ছড়িয়ে পড়ছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত। কি দিব্য মহিমা এই মেঘমণ্ডিত আকাশে। চোখ আর ফেরে না গদাধরের। হঠাৎ এক ঝাঁক শাদা বক সেই কালো মেঘের গা ঘেষে উড়ে গেল দূরান্তরে।
গদাধরের সারা গায়ে শিহরণ লাগল। এই অপূর্ব, অনির্বাচ্য সৌন্দর্য কে পরিবেশন করল? কৃষ্ণিমার সঙ্গে এই শুভ্রতার যোগাযোগ? এই দিব্য কাব্য কার রচনা? হঠাৎ তার প্রতি গদাধরের প্রাণ-মন উড়ে চলল পাখা মেলে। দেহ-পিঞ্জর লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। চোখ মেলে চেয়ে দেখল বাড়িতে শুয়ে আছে।
কে তাকে কখন কুড়িয়ে নিয়ে এসেছে মাঠ থেকে কে জানে?
