শুধু মায়া রহিয়া গেল
আমরা যাইনি মরে আজও, তবুও খালি দৃশ্যের জন্ম হয়। কোথাও স্মৃতির সমুদ্রতীরে মেলে রাখা জালে শুকোতে থাকে সামুদ্রিক মাছ। ওল্টানো জাহাজ। ইউক্যালিপটাসের বন পাতা ঝরিয়ে নিঃস্ব হতে থাকে। আর আমাদের গভীরের মায়া জন্ম দেয় পরের পর ছায়াছবি। সেই আমাদের নিজস্ব অন্তর্জলি যাত্রা। জীবনে সফল সুখী পুরুষ, তিক্ত বেকার, উন্মাদ কবি অথবা স্বপ্নভঙ্গের ছায়ার মধ্যে ছায়া হয়ে মিলিয়ে যেতে থাকা নির্জন কমরেডের সকলের নিজস্ব সেই ইউলিসিস আসলে এক আশ্চর্যভ্রমণ কারণ আমাদের সকলের মধ্যেই থেকে যায় এক অতলান্ত মনকেমন করা। এই ইউলিসিস নিয়ে আমরা বাঁচি। এই রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতেই সবার অজান্তে মরে যাই।
– আমার ইউলিসিস শুরু হয়েছিল এবং পথ হেঁটেছিল গোটা নব্বই জুড়ে। আমার নব্বই। আমার আট থেকে আঠেরো হবার নব্বই। সেই নয়ের দশকে সত্তরের রক্তক্ষরণ ছিল না। ভুল বিপ্লবের হ্যামলিন তার দূরতম ছায়াও মেলেনি সেখানে। ছিল না কোনও ঝড় না কোনও হতাশার ক্ষুধার্ত আক্রমণ – নাঃ, বরং গোপন আদরের মত ধীরে ধীরে আমায় বড় করে তুলেছিল। লালন করেছিল গোটা দশকদেহ। তা, সেই আদরের মধ্যেই নির্ভুলভাবে কোথাও যে গেঁথে দেয়নি সময়ের চারণচিহ্ন, তাই বা বলি কী করে? কিভাবেই বা নিশ্চিত থাকি যে আগামীর মনখারাপের সব মাস্তুলগুলো পোঁতা হয়ে যায়নি সেখানেই? আমার বেওয়াফা নব্বই নরম রোদে স্বেচ্ছাব্যথায় যে কখনও বেচমক আহত করে যায়নি, তেমনটিও নিশ্চিত হওয়া যাবে না ।
আমার নব্বই কেটেছে দক্ষিণ কলকাতার এক প্রায় শহরতলিতে। বড় পুকুর, কালী মন্দির,নারকোল গাছের সারি, বটতলা, নিঃঝুম রাস্তা, মরে যাওয়া বাসের খোল, বন্ধ কারখানার গেট, ধু ধু মাঠ, কুয়াশাজড়ানো গঙ্গার ধার, শ্মশানের পাশে ভূতুড়ে কুটির, হ্যাজাকের আলোয় সন্ধ্যের বাজার, তাসের আড্ডা, পাগলের চিৎকার কোনটা ছাড়ি যে আর! রোজ রাতে বিশাল পুকুর ঝপাং ঝপাং করে আওয়াজ হত, সাঁতার কাটত কারা যেন। জানি না কারা। কোনওদিন তাদের মুখ দেখিনি। তবুও সেই সাঁতারের শব্দ শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে থাকতাম রোজ রাতে। বাড়িতে কারেন্ট ছিল না বহুকাল। ঝুলপরা কেরোসিনের গন্ধে একটা পোড়া দুধের আভাস মিলত। তো, সেই গন্ধ গায়ে মাখতে মাখতে, আর দেওয়ালের গায়ে ক্রমশ বড় হয়ে ওঠা ছায়াগুলো দেখতে দেখতে আমি কুঁকড়ে যেতাম। বিছানা তোষক কাঁথার নিচ থেকে তখন ঠাকুমার ঘুমজড়ানো গলায় কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম, আর জানলার পাশে গাড়ল মাতালের ব্যারিটোন চিৎকারের ককটেলে বহু রাত কেটেছে আমার।
আমাদের পাড়াটায় নানা কিসিমের লোক ছিল। রেসিডেন্ট পাগল ছিল দুজন, যাদের একজন স্থানীয় ভাতের হোটেলে পেটচুক্তিতে কাজ করত। তার জীবনের একমাত্র নেশা ছিল নক্সা করা দশ পয়সা জমানো। আরেকজন কিছুই করত না, শুধু ঘুরে বেড়াত আর বিড়ি চেয়ে খেত। তারপরে সংখ্যাটা তিনে বাড়ল। পাগলী আসল। তার ঘর ছিল, বর ছিল, ছেলেও হয়ত, কিন্তু সে ছিল বদ্ধ কালা, আর উন্মাদ। দুপুর রোদে ঘুরে ঘুরে চিৎকার করে হাসত। বেড়ালের পেছনে লাগত। পোদ্দারজেঠু ছিল। কী করত কেউ জানে না। লোকে বলে নকশাল করত। আবার কেউ বলে পুলিশের স্পাই। সে সারাদিন খৈনি ডলতে ডলতে সারা পাড়া চক্কর কাটত আর মুখে মুখে ছড়া বলত। কালীমন্দিরের পুরুতের দুঃখ ছিল তার থালায় প্রণামী পড়ে না। সে সন্ধ্যে হলে একটাই গান ধরত, আর সেটাই সারাক্ষণ গেয়ে যেত, ‘আমার সাধ না মিটিল আশা না পুরিল সকলি ফুরায়ে যায় মা’। টারজান ছিল। তার গায়ের জোরের জন্য, যদিও পরে চোলাই খেয়ে খেয়ে হারিয়েছিল সবই, লোকে তাকে বলত টারজান। তার ঘর ছিল না। বালি স্টোনচিপের পাশে মাদুর পেতে শুয়ে থাকত। পরে একটা ঝুপড়ি বানিয়েছিল চেয়েচিন্তে। আমার বন্ধুদের বৃত্তটাও তথৈবচ। কেউ স্কুলে যায়৷ কেউ যায় না। কারোর বাপ অটো চালায়। আবার অনেকেরই বাবা হিসেবে কাউকে দেখার সৌভাগ্য ঘটেনি। তা সত্ত্বেও বেশ আনন্দেই ছিল তারা।
মানে, দুখানা ইঁটকে উইকেট করে আর প্লাস্টিক কাপড় গার্ডার দিয়ে পেঁচিয়ে পাকিয়ে বল বানিয়ে ক্রিকেটের মধ্যে যতটুকু আনন্দ থাকে আর কী! তখন রবার ডিউসের দাম প্রায় তিন টাকা। ক্যাম্বিস স্বপ্ন, এবং সবচেয়ে সস্তা রবারের বলে খেলা যেত না যেহেতু ফেটে যেত খুব তাড়াতাড়ি। তো, সেই বল খুব একটা লাফাত না। নির্ভর করত কতখানি শক্ত করে বাঁধা হচ্ছে তার ওপর। ব্যাট মানে বেশিরভাগ সময়েই কাঠের তক্তা কেটে বানিয়ে নেওয়া একটা খণ্ড। কেউ কেউ আবার একটু রোয়াব নিয়ে সন্ধ্যের সময় বলত “নাঃ বাড়ি যাই পড়তে বসব”। তুমুল বক দেখানো এবং “যা না দেখি, তুই পেছন ঘুরলেই প্যান্ট খুলে নেব” -টাইপের আওয়াজে সে আর সাহস করত না বিশেষ। মানে যতক্ষণ না তার রণচণ্ডী মা এসে “কী রে হারামজাদার বাচ্চা বাড়ি বলে কিছু নেই”? এই জাতীয় আদর না দিত। অবশ্য সেসব দেখার সৌভাগ্য আমার বিশেষ হত না। কারণ বাবার ভয়ে ঘড়ির একটা বিশেষ ঘণ্টার পরেই প্যান্ট হাতে করে বাড়িতে ঢোকার ঝুঁকি নিয়েও ফিরে আসতে হতই। সেই রোদ মরে যাওয়া বিকেলের ক্রিকেট বা শিরোধাস্যি, এই খেলাটা মনে হয় আর কেউ খেলে না, সেই সব কিছুর দিকে চাইতে চাইতে, নিঃশ্বাস গোপন করতে করতে।
আরেকটা খেলাও খেলতাম। ডাক্তারের বাগানে পেয়ারা চুরি। ডাক্তারের বাগানে কেউ গলায় দড়ি দিয়েছিল। তাই বিশেষ লোকজন ঘেঁষত না ওখানে। দুপুরে কিছু নেশাখোরদের আড্ডা বসত বিশাল বাগানের এখানে ওখানে। সারা জায়গাটা হিম হিম চুপ। রাজ্যের গাছগাছালি বুনো ঝোপ সাপের গর্ত – বাড়িতে জানলে চামড়া ছাড়িয়ে নেবে- তা এমনসব ঝুঁকি মাথায় নিয়েই যেতে হত কাঁচা প্রায় খাওয়ার অযোগ্য পেয়ারার আকর্ষণে। আর এরকম এক দুপুরে আমাদের দলটা একটা বড় ঝোপের পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাত থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। খিল খিল করে হাসির আওয়াজ,খচরমচর শব্দ। হঠাৎ হাসিটা থেমে গেল। তারপর খচমচ করে বেরিয়ে এল পাশের বাড়ির রেখাদি, জ্যালজ্যালে কামিজ পেটের ওপর নামাতে নামাতে চার বোনের বড়, আপাতত শাড়িতে ফলস পিকো করে কিছু রোজগার করে। বাবা মাতাল, এবং মা এরকম পরিবেশে যা হয় ঠিক ততখানিই দজ্জাল রেখাদির পেছনে একটা আধচেনা ছেলের মুখ। আমাদের দেখে রেখাদি হেবি রোয়াব নিল এখানে কেন এসেছি, বাড়িতে বলে দিলে কী হবে এসব। চিৎকার চেঁচামেচি করল যে বাড়িতে বলে দিয়ে সবকটার বেরনো বন্ধ করছে বিকেলে। আমরা হাতে পায়ে ধরে কোনওরকমে শান্ত করলাম। চুক্তি হল কেউ কারোর কথা বলবে না। অনেক পরে বুঝেছি আমাদের থেকে অনেক বেশি ভয় রেখাদি পেয়েছিল।
সেই রেখাদিও একদিন পালিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। এখনও তার কোনও খবর পাওয়া যায়নি। তার আশিকের সাথে না কিন্তু, একাই। সেই আশিক, সেলুনে কাজ করত, এক ভোর রাতে গলার কাছে হাঁ হয়ে থাকা এত্ত বড় কাটা নিয়ে, আর গ্যালগেলে রক্তের মাঝে, হয়ত দাপাতে দাপাতেই, মরে পড়ে থাকল এক ভোরবেলার হিম ফুটপাথের পাশে। কেন, কেউ জানে না আমরা তো ঐ বয়েসে আরওই জানতাম না।
তো, এমনি আরেক বিকেলে, আমি তখন মামারবাড়িতে সাদাকালো টিভিতে খুব মন দিয়ে পসেনজিত শতাব্দীর ছবি দেখছি, সেই সময় হঠাৎ বড়মামা ঘরে ঢুকে বলল, “সর্বনাশ হয়েছে বাবরি মসজিদ ভেঙে দিয়েছে। এক্ষুণি বাড়ি যা তোরা”। মা পড়িমড়ি করে ছুটল আমায় নিয়ে। সারা রাস্তা শুনশান। মোড়ে মোড়ে জটলা। বাস ফাসও চলছে না। আমার হেবি মজা, কারণ পরদিন স্কুল ছুটি ঘোষণা হয়ে গেছে। সারাদিন ধরে ক্রিকেট। বকারও কেউ নেই, কারণ সকলেই উত্তেজিত। মাঝে মাঝে পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে, আর আমরা পড়িমড়ি করে খেলা ফেলা ভেঙে ছুটে লুকিয়ে পড়ছি। মানে, আমাদের কেউ পাত্তাও দিত না। কিন্তু ঐ, পুলিশ ধরতে পারে, তাই পালাতে হবে। তখন ১৪৪ ধারা জারি, যদিও যা বলেছি আগেই, বাচ্চারা ক্রিকেট খেলবে তাতে কার কী, এই ভাবনাটাই সেই বয়েসেও যথেষ্ট শিহরণ জাগাত। সন্ধ্যে হলেই চারদিক ফাঁকা। মাঝে মাঝে নিয়ম করে সিপিএমের শান্তিরক্ষা কমিটির টহল চলছে। তাদের কেউ কেউ ঢং ঢং করে লাঠির বাড়ি মারছে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে। পরদিন সকালে দেখা গেল শনিমন্দিরের গায়ে কেউ একদলা পাঁক লাগিয়ে রেখেছে। হৈ হৈ কাণ্ড, উত্তেজিত জটলা, টহলদার বাহিনীকে খিস্তি চলছে তেড়ে কেন ভাল করে পাহারা দেওয়া হয়নি। শেষমেষ জানা গেল স্থানীয় পাগলটির কীর্তি, যার নেশা ছিল দশ পয়সা জমানো। কী বুঝেছিল, কে জানে! চারপাশের হৈহল্লা হিন্দু মুসলিম শুনেই বা কী যে ভেবেছিল, কেউ বলতে পারবে না। কেনই বা পাঁক মাখিয়ে এল মন্দিরের গায়ে, সেটাও কি জানি? শুধু জানি, এই ঘটনার দশদিন বাদে সেই পাগল পুকুরে ডুবে মরে যায়।
তিরানব্বই জানুয়ারি, মারাত্মক শীত, এবং আমার প্রথম ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখা। চিড়িয়াখানা থেকে বাবা মা আমি ঠাকুমা হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে বসলাম ভিক্টোরিয়ার সিটে। আমার পায়ে সদ্য কেনা কেডস, এবং বাগানের নুড়িগুলোকে ফুটবল ভেবে মহা আনন্দে লাগাচ্ছি। একসময়ে বাবা ডাকল। গেলাম না। বাবা এসে নিচু হয়ে কেডস দেখল, সামনেটা ফাটতে শুরু করেছে। চটাস করে থাপ্পড়, আর আমার আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে হাউমাউ ভ্যাঁ। সেই ভ্যাঁ তারপরেও অনেকদিন অনেক অজুহাতে ব্যবহার করব আমি, দরকারে বা মিথ্যে চাওয়ায়।
টিভির পর্দা তখন কাঁপাচ্ছে হিন্দি সিরিয়াল ‘তালাশ’, ‘তেহকিকত’ এসব। রবিবারে হিন্দি সিনেমা,শনিবারে বাংলা। সিনেমার মাঝে কমার্শিয়াল ব্রেক আসেনি তখনও। সেখানেই সপ্তপদী, সাড়ে চুয়াত্তর, শত্রু, ঝিন্দের বন্দী, সোনার কেল্লা দেখা প্রথম। সত্যজিত রায় মরে যাওয়াতে অনেকগুলো সিনেমা পরপর দেখিয়েছিল। এছাড়া উত্তমকুমারের রেট্রোস্পেক্টিভে হারানো সুর,সাগরিকা। সুচিত্রার রেট্রোতে ফরিয়াদ, যেটা আমায় দেখতে দেওয়া হয়নি বড়দের সিনেমা বলে। কিছুদিন আগেও ‘সার্কাস’ নামে একটা সিরিয়াল হত। তার বাচ্চা বাচ্চা দেখতে নায়কটা, যে কানঢাকা চুল রেখেছিল বহুদিন, সে আস্তে আস্তে বড়পর্দায় আসছে। বাজিগর নামের একটা সিনেমা করেছে, যেটা আমাদের তখন দেখার অনুমতি ছিল না, কিন্তু বুধবারের চিত্রহার বেস্পতিবারের চিত্রমালাকে সরিয়ে দিয়ে সদ্য বাজারে আসা ‘সুপারহিট মুকাবিলা’র দৌলতে লুকিয়ে চুরিয়ে দেখছি কাজল শিল্পার অমোঘ যৌবন। এই সিনেমারই একটা গানে শিল্পা শেঠি নাচতে নাচতে হঠাত ক্লিভেজের কাছে একটু আলতো করে হাত বোলাবে, আর আমার সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠবে। কেন জানি না তখনও। পেটের কাছে একটা অস্বস্তি হবে, আমি ভাবব হিসি পেয়েছে। কিন্তু সেদিন সারারাত ধরে শিল্পা শেঠিকে স্বপ্নে দেখব। তখন একটু একটু বুঝতে শিখেছি মেয়েদের দিকে তাকানো বাজে। তাই ভয়ে কাউকে বলতেও পারব না সেকথা। শুধু স্কুলে যখন শুভময় বলবে “শিল্পার বুকটা দেখেছিস, – হিহি” – তখনও ঠিক বুঝব না কী বলছে, শুধু আগের রাতের কথা মনে করে একটু কেঁপে যাব ভেতরে ভেতরে।
সেবার পুজোয় হঠাত নির্মলা মিশ্রর চিরাচরিত ‘আমি যে তোমার চিরদিনের হাসি কান্নার সাথী’র বদলে একটা অন্য গান বেজে উঠল পাড়ার মাইকে। অন্য গলা, আর কথাগুলো কিরকম অদ্ভুত। কি চেনা চেনা সুখ দুঃখ, মন খারাপ করা বিকেল, দশফুট ঘর এসব। পোদ্দার জেঠু বসে বসে নিজের ঘরটায় খৈনি কাটছিল। হাত থেমে গেল। পুরো পাথরের মত। শুনে চলল ‘দশ ফুট বাই দশ ফুট’। গান শেষ হবার পরেও বহুক্ষণ নিস্পন্দ। যেন প্রাণ নেই। তারপর একটা নিঃশ্বাস ফেলে আমায় বলল “খোঁজ নিয়ে আয় তো, কার গান”। –
সেই ক্যাসেট পাল্টে দিল আমার কালীমন্দিরের সন্ধ্যেবেলা। এখন আর পুরুত মশাই পান্নালাল গায় না। সন্ধ্যে হলেই একটা আধভাঙা টেপরেকর্ডারে চালিয়ে দেয় ‘তোমাকে চাই’। তারপর বসে বসে ঝিমোয়। বিড়ি ধরিয়ে চেয়ে থাকে সামনের অন্ধকারের দিকে। সেই নির্জন মন্দিরের ঝোপঝাড় বটের চারা গজানো দেওয়াল, ম্লান সর ওঠা হলদে বালবের আলো, দালানময় পুরোনো রংচটা পাঁজি গুরুদেবের পায়ের ছাপ ভাঙা তোরঙ্গ বিষণ্ণ টিকটিকি ঘটাং ঘটাং ঘুরতে থাকা পাখা, অদূরে ভীষণ দেবী মুর্তি, আর তখন ক্যাসেটে বাজছে – সাপলুডো খেলছে বিধাতার সঙ্গে। আমি ঠাকুমার সাথে মন্দির যেতাম প্রায়ই। সুমনকে এই পোদ্দার জেঠু, পুরুত মশাই – এদের মধ্যে দিয়ে আমার প্রথম পাওয়া। তাই আমার সুমন আসলে বিদ্রোহের নয়, গোপন ভালবেসে কষ্ট পাওয়ার সুমন।
তো, এসবের মধ্যেই দুম করে একদিন দিব্যা ভারতী মরে গেল। আমাদের দুঃখ রাখার জায়গা নেই তখন। অনেকেই মনে মনে জানত বড় হয়ে দিব্যাকে বিয়ে করবে। তা কিছুর মধ্যে কিছু নেই, ধড়াম করে উনিশ তলার ওপর থেকে টালমাটাল স্লিপ? তারপর দুঃখ কোমর কষে তিনগুণ যখন জানলাম ওর একটা বরও ছিল। এরকম মেয়েরও বর হয়? আমি বাদে আর কেউ হতে পারে?
আমাদের তখন মোটামুটি ডায়াস জুড়ে নেতা, মাঠ জুড়ে শচিন আজহার, আর পর্দা জুড়ে শাহরুখ। সৌরভ গাঙ্গুলি নামের ওপাড়ার একটা ছেলের কথা মাঝে মাঝে শোনা যায় বটে – ভাল ব্যাটও করছে, তো ধুর, সে তো –
হেরো। বাদ পড়ে গেল আনকা। কে আর মাথা ঘামায় তখন! বরং হিরো কাপের সেমিফাইনালে শচিনের সেই ওভার। আমার বাবা খাট থেকে লাফিয়ে উঠে নাচানাচি করছে। বোম ফাটছে পাড়ার মোড়ে। আর সেই সপ্তাহেই আমাদের ক্লাসের কিরণময় সরখেল এক ঐতিহাসিক কাণ্ড ঘটাল। পেছনের বেঞ্চিতে বসে কমিক্স পড়ার জন্য স্যার কান ধরে টেনে সামনে দাঁড় করিয়ে নাম জিজ্ঞাসা করাতে উত্তর দিল “ক্কি ক্কি ক্কিরণ”। রথীনবাবু শুনে টুনে “খুব পাখনা গজিয়েছে না? খুব ডানা হয়েছে” এসব বলে উদুম ক্যাল দিলেন ঠিকই, কিন্তু সেই থেকে ক্কি ক্কি ক্কিরণ আমাদের হিরো হয়ে গেল। স্কুল ছাড়ার সময় পর্যন্ত শুধু আমরা নয়, সিনিয়ার জুনিয়ার মায় কিছু টিচার পর্যন্ত অন্যমনস্কভাবে তাকে ক্কি ক্কি ক্কিরণ বলে ডেকে উঠতেন।
এদিকে আমার বাবা মায়ের খুব চিন্তা, আমার ইংরিজি শেখা হচ্ছে না। সরকারি স্কুলে সিক্সের আগে ইংরিজি নেই। কিন্তু বাড়িতে শেখাবার সাধ্য নেই মায়ের। বাবা মাঝে মাঝে বসত, কিন্তু তার বিদ্যেও সেরকমই। তার ওপর অসাধারণ রকমের অধৈর্য। ‘আই’-এর পর ‘ইজ’ শুনলেই চুলের মুঠি ধরে মার। একদিন এরকম মারতে গেছে, আর আমি তেড়ে ছুটে বাইরে গিয়ে ‘ছেলেধরা ছেলেধরা’ বলে চেঁচাতে লাগলাম। বাবার পড়ানোর ওখানেই ইতি।
কিন্তু ইংরিজি শিখতেই হবে। পাড়ায় তখন নতুন এসেছেন দেবুদা, দেবব্রত ভট্চাজ। একসময়ের নকশাল। অনন্ত সিংদের দলে ছিলেন। যাদুগোড়া থেকে গ্রেপ্তার হয়ে ‘৬৯ থেকে ‘৭৯ জেলে কাটান। তখন চাকরি করছিলেন বাউলমনে, আর টিউশন। সাব্যস্ত হল আমায় ওখানেই দেওয়া হবে। তো, সেই শুরু আমার পাল্টানোর। দেবুদা আমায় গল্প করত রাশিয়ান বিপ্লবের চে গুয়েভারার। আমার ক্লাস ফাইভ সিক্স সেসব কতটা বুঝত জানি না৷ তবে না বুঝেও হাঁ করে গিলত সব। প্রথম ইংরিজি বই দেবুদার কাছেই পড়া, ব্ল্যাক বিউটি। ঐ বই পড়ার পক্ষে বয়েস তখন বেশিই। কিন্তু শুরুটাই তো দেরিতে হল। প্রথম যেদিন সব কটা বাক্যের মানে বুঝতে পারলাম, আমার আনন্দ দেখে কে! মাকে গিয়ে সগর্বে বললাম, আমার আজকাল বাংলা বইয়ের থেকে ইংরিজি পড়তেই বেশি ভাল্লাগে। এদিকে পড়ার মধ্যে সাকুল্যে ঐ ব্ল্যাক বিউটি। মা মনে হয় মুখ টিপে হেসেছিল। অথবা, কে জানে, নিঃশ্বাস লুকিয়েছিল কিনা, নিজের অসমাপ্ত স্কুল জীবনের কথা দেবুদা ক্লাস এইটের আমার হাতে তুলে দিয়েছিল সমীর রায়ের কবিতা, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতা। আস্তে আস্তে একটা অন্য জানালার সন্ধান পাচ্ছিলাম। গোগ্রাসে পড়তাম যা পেতাম হাতের কাছে। এদিকে বাইরে তখন তুমুল হট্টগোল। সিপিএমের কাছে সরকার গড়ার প্রস্তাব এসেছে এবং পার্টি প্রত্যাখ্যান করেছে। আর জ্যোতি বসু কিছুদিন বাদে বলে দিলেন ঐতিহাসিক ভুল। বাবারা রাগে ফুঁসছে। পাড়ার চায়ের দোকানে জটলা, “বাঙালি কে চক্রান্ত করে আটকে দিল শালারা”। আমরা অত শত বুঝতাম না। তবে স্কুলে দেখি স্যারেরাও ক্লাসে এসে ভাটাচ্ছে এসব নিয়ে। এ কী রে বাবা! কে এমন হনু জ্যোতি বোস? যাগ্গে, আমরা তখন পিকনিক, বিকেলের রোদ, সন্ধ্যের জনি সোকো ফ্লাইং রোবট আর লুকিয়ে চুরিয়ে জুহি চাওলাকে পেয়েই খুশি। কে প্রধানমন্ত্রী হল নাকি হল না, কী এসে যায় ঐ ঝামরে পড়া দিনগুলোতে?
আমি বড় হচ্ছিলাম। যেসব মেয়েদের সাথে এককালে খেলতাম, তাদের বুকের দিকে তাকালে নিজের কেমন একটা লাগে। তাদেরও খুব একটা স্বস্তি হয় না মনে হয়। এক বিকেলে এরকম একটা সময়ে পেয়ারা গাছের নিচে জাপটে ধরলাম আমার এক বান্ধবীকে। সুশীলা। হিন্দুস্তানিদের মেয়ে। মা মনে হয় লোকের বাড়ি কাজ করত। ওর বুকে আমার হাত ঘষে দিয়ে বললাম “আই লাভ ইউ সু সু সুশীলা”। সুশীলা লজ্জা পেয়ে মুখ চোখ লাল করে বসে পড়ল মাটিতে। আমি ততক্ষণে ভয়ে কাঠ। কী হয়েছে বুঝতে পারছি। বললাম “এই, বাড়িতে বলিস না, প্লিজ”। সুশীলা কোনও উত্তর না দিয়ে বসে রইল চুপচাপ। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম কাঠের পুতুলের মত। এক একটা সেকেন্ড যেন এক একটা যুগ। অনেক অনেকগুলো মুহূর্তের পর সুশীলা মুখ তুলে ফিক করে একটু হেসে দিল। তারপর দৌড়ে পালাল। না, কাউকে বলেনি ঠিকই, কিন্তু আর খেলতে আসেনি কোনওদিন।
মেয়ে বলে জিনিসটার প্রতি উদ্দাম আকর্ষণ বাড়ছে। দৈবাৎ বেরিয়ে পড়া কোনও ব্রায়ের স্ট্র্যাপ, তখনও কিন্তু প্রেম ব্যাপারটাও ঠিক বুঝতাম না, বা হঠাৎ মিষ্টি সেন্ট মাখা কোনও অনাবৃত বাহু, সিরসিরানি ধরিয়ে দিচ্ছে ভেবে!
গায়ে। মায়া মেমসাব সেকেন্ড টাইম রিলিজ করেছে। আর আমার বেশ কিছু বন্ধুর দেখা হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এদিকে আমি তখনও মাস্টারবেশন কাকে বলে জানি না। একদিন দেখলাম, বাড়িতে একটা পুরনো আনন্দলোক। ছবি দেখে শিরশিরানি বাড়ল। তাও জানি না কী করে করতে হয়। স্কুলে সোমশুভ্রকে ভয়ে ভয়ে একদিন জিগালাম “হ্যাঁ রে, খেঁচে কী করে”?সোমশুভ্র প্রথমে প্রচুর আওয়াজ দিল। তারপর বলল। চাইছিল কোনও একটা ফাঁকা ঘরে গিয়ে আমি যেন এক্সপেরিমেন্ট করে ওর সামনেই দেখাই। কিন্তু আমি খুব একটা ভরসা পেলাম না।
– বাড়িতে রাত্রিবেলা আনন্দলোক নিয়ে বসলাম। ছবিগুলো দেখছি, আর বার্মুডার ভেতর ঢুকিয়ে হাত বোলাচ্ছি। বেশ ভাল্লাগছে। এক সময়ে অজান্তেই হাত বোলানো বেড়ে গেল। ছবির পাতায় তখন মমতা কুলকাৰ্ণি৷ আমি প্রচন্ড ভাবে হাত নাড়াচ্ছি। মমতা ভেজা শরীরে একটা সি-থ্রু গেঞ্জি পরে হাত মাথার ওপর তুলে বসে আছে আমার মনে হচ্ছে ঝাঁপিয়ে পড়ছে আমার ওপর। আমি পাগলের মত হাত ঝাঁকাচ্ছি। হঠাৎ কিছুর মধ্যে কিছু নেই, একটা রাতপাখি অস্বাভাবিক তীব্র শব্দে,হয়ত কিছুই না কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতায় ওটাই মারাত্মক হয়েছিল তখন, ক্যাঁ ক্যাঁ করে ডেকে উঠল এবং আমি ভয়ানক চমকে, জানি একটা পাপ কাজ করছি তার ওপর লুকিয়ে আনন্দলোক, হাত থেকে বইটা ছুঁড়ে ফেলে দিলাম আর দেখলাম দুধের মত সাদা তরল পিচকিরির বেগে বেরিয়ে এসে আমার উরু ভিজিয়ে দিচ্ছে। হ্যাঁ, আমার নিজের হাতে কৌমার্য ভাঙল মমতা কুলকার্ণির মাধ্যমেই। আর সেটাও হতচকিত অবস্থায়। বেওয়াফা নব্বই আমায় জীবনের প্রথম পরম আনন্দটাও দিল সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত করে।
ধীরে ধীরে নব্বই বুড়ো হচ্ছিল। আমরাও টিনকাল সাঁতরিয়ে যাচ্ছিলাম। কলকাতার দিকে একা একা যাই। ট্রায়াংগুলার পার্কে বসে আড্ডা মারি। মাঝে মাঝে একটু সাহস করে বিবেকানন্দ পার্ক বা লেকের ধার জাপটাজাপটি যুগল দেখে হাঁ চোখ সরাতে পারছি না। মনে মনে ভাবছি কবে আসবে আমাদের দিন। দু একবার সিটি মেরে পালিয়ে গেছি, তারপর নিজেকে কীরম বোকা বোকা লেগেছে। ধুস, আমি পাইনি বলে আওয়াজ দিচ্ছি! স্কুল কেটে প্রদীপ দুই একবার। তবে বড্ড নোংরা, পোষায়নি। লেকের ধার অনেক ভাল। একটা মাসি আসত, চানাচুর ঝাল মটর এসব বিক্রি করত। নেব না বললে চোখ পাকিয়ে “নেবে না মানে? নাও নাও তাড়াতাড়ি দামটা চুকিয়ে দাও আমার হাতে টাইম নেই” বলে ধমক ছাড়ত সেই মাসিকেই আবার দেখতাম প্রেমিক প্রেমিকাদের বলে দিতে “এবার উঠে যাও। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, পুলিশ আসতে পারে”। ম্যাডক্স স্কোয়ারের দুর্গাপুজোর আলো তখন লাখ রোশনাই হয়ে ছটা জ্বালাচ্ছে আমাদের চোখে মুখে।
এই ট্রায়াংগুলার পার্কেই আমার প্রথম শরীরের স্বাদ – এক উত্তাল নব্বই এর রোদ মরে যাওয়া ঘুমিয়ে পড়া বিকেলে, আচমকা ঠোঁটে ঠোঁট…
আর এরকমই এক রোদ মরে আসা বিকেলে দুম করে আমি রাজনীতিতে জড়িয়ে গেলাম। আজকাল মনে হয়, এটাও ঐ নব্বইয়ের চক্রান্ত। ওরকম মনোরম মনোটনাস ম্যাজিক মোমেন্ট পরের দশকে আর আসেনি। স্কুল কেটে কলেজ স্ট্রিট গিয়েছিলাম আমি আর আমার এক বন্ধু। দেখি মাধ্যমিকের খাতা রিভিউ করার দাবিতে অবস্থান চলছে। ব্যাপারটা অল্পস্বল্প জানতাম। পাড়ার এক দাদা বলেছিল। সে যেতেও বলেছিল। স্বভাবজাত কৌতুহলে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। দেখি, অনেক উজ্জ্বল মুখ। হাসছে, গান গাইছে, খোরাক করছে একে অন্যকে। আন্দোলন না হট্টমেলা? হঠাত দেখি এক হাল্কা দাড়ি সুদর্শন, খয়েরী পাঞ্জাবি আর জিনস, গিটার হাতে বসে পড়ল। তারপর উদাত্ত কন্ঠে গান “কীসের ভয় সাহসী মন লাল ফৌজের, লাফিয়ে হই পার”। অনেকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে, একসাথে গলা মেলাচ্ছে। জীবনে ঐ প্রথম প্রতুল শোনা, কেঁপে গেলাম ভেতরে ভেতরে। তার ওপর ঐ হালকা দাড়ির গিটার জাস্ট কিচ্ছুটি না বুঝেই, শুধু এগুলোকে ভালবেসে দড়াম করে পড়ে গেলাম ৷ –
সেই শেষ নব্বইতেই কোনও এক ছাত্র সংগঠনের ম্যাগাজিনে কোনও এক ভুলে যাওয়া অনামী মিত্রর লেখা সেই কবিতা, যা আমার সমস্ত বিষণ্ণতা, মনখারাপের খুঁটি ধরে নাড়িয়ে দিয়ে আমুল চারিয়ে এল ভেতরে ভেতরে। ‘নৈঋতে মেঘ জড়তা ভাঙলে/ মৌসুমী বায়ু বৃষ্টি আনলে/ আনমনা হয় সেই যে বালক, দেখেছিস তার বিষণ্ন চোখ? / চোখ বলে দেবে চোখ বলে দেয় মানসিক চলাচল / কার চোখে ক্ষোভ, কার মনে ভয়, কার বুকে দোলাচল?/ ঝড় কেন ওঠে, ঝড় কেন বয়?/মৌসুমী বায়ু? আর কিছু নয়?/ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর দিতে কি পারবি? জানা আছে তোর?/ পারবি না তুই পারবে না কেউ/ ভাসায়নি তোকে দুরন্ত ঢেউ, বালকটি জানে/ বালকটি জানে কাছে আসা মানে / প্রথম আষাঢ় ধারাবর্ষণে অহেতুক নয় সকল ইচ্ছেই/ বৃষ্টি যখন জানান দিচ্ছে বিষন্নতা … #
নব্বই তখন রাজনীতি শেখাচ্ছে। কট্টর সিপিএম বাপের সাথে আগমার্কা নকশাল ছেলের বেফিকর ঝগড়া শেখাচ্ছে। প্রেম শেখাচ্ছে। লিটল ম্যাগ শেখাচ্ছে। কবিতা শেখাচ্ছে। সেই সূত্র ধরে ধীমান আমায় বলছে “নতুন একটা ব্যান্ডের গান এসেছে, শুনবি নাকি”? আমি শুনছি, প্রথম গান ‘বন্ধু তোমায় এ গান শোনাব বিকেলবেলায়’ – আর শব্দগুলো প্রজাপতি হয়ে মাথার ভেতর গেঁথে বসছে। উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। পাগলের মতন শুনে যাচ্ছি ‘যদি বলো আড়ি, তোমাকেও ছেড়ে যেতে পারি’, ‘অকারণ নুড়িঘর, এল হরিণের মাস’, এবং উত্তর-নব্বইয়ের শ্রেষ্ঠ রোমান্টিক গান ‘ভেসে যায় আদরের নৌকো’। আজকাল মনে হয়, আমাদের আর্বান সদ্য তরুণ বোধে প্রেম জিনিসটা শিখিয়েছিল সুমন না, চন্দ্রবিন্দু। সুমন আরেকটু বয়স্কদের জন্য, যাঁরা পশ্চিমের বদলে পূর্বের দিকে তাকিয়ে রাত্রির তপস্যা দেখেন। আর আমাদের ঐ এলোমেলো উত্তাল দিনগুলোর এবড়ো খেবড়ো রং, থাক, শুধুই থাক বরং।
তো, এখানেই গল্পটা শেষ না হলে ভাল হত। কিন্তু মাত্র এক দশকে আর কত কী-ই বা লিখতে পারে একটা সময়? তাও তো অনেক কিছুই থাকে, যেগুলো লিখতে ভাল লাগে না। ধু ধু রংকলের মাঠে ফ্ল্যাট উঠে যায়। কালী মন্দিরের পুরুত চাকরি ছেড়ে দিয়ে দেশে চলে যায়, তার ভাঙা টেপরেকর্ডার নিয়েই। অপারেশন সানশাইনের এক অসহনীয় রাত ভেঙে দিয়ে যায় টারজানের ঝুপড়ি। সকালবেলা দুধ আনতে গিয়ে দেখি টারজান বসে আছে। চারপাশে অবিন্যস্ত ছড়ানো ছিটানো হাঁড়ি কুঁড়ি, মাদুর, কাপড়চোপড়। টারজান আমার দিকে শূন্য চোখে চেয়ে বলে “এই সব, সব ..” ।হাত দিয়ে চারপাশ দেখায়। আমি বলি “সব ভেঙে দিল? সব? কিচ্ছুটি বল্লে না”? টারজান বোবা তাকায়, তাকিয়ে থাকে, তাকিয়েই থাকে। আমি পালিয়ে আসি। শনিমন্দিরের পাশে চোলাই আর সাট্টার ঠেক গজিয়ে ওঠে। কুয়াশাজড়ানো আদি গঙ্গা দিয়ে ভেসে যায় মরা লাশ। দুধারের বৌ ঝিরা মুখে কাপড় চাপা দিয়ে বলে “আহা রে, কে গো”? সেই লাশের নাম কী? কে জানে! পোদ্দার হয়ত! শ্মশানে গজিয়ে ওঠে ইলেকট্রিক চুল্লি।
রমরমিয়ে বাড়ে ফুল বেলপাতা আর গোপনে খাট জামা কাপড় সাপ্লাই বিজনেস – নাঃ এসব লিখতে ইচ্ছে করে না আর।
তবুও, আমাদের একান্ত ব্যক্তিগত রানওয়ে জুড়ে পড়ে থাকে কেউ নেই শুধু শূন্যতা। কখনও লুকিয়ে ফেলা ইউলিসিসের দুই একটা ছেঁড়া খোঁড়া পাতা উড়ে যায় সেই প্রান্তর দিয়ে। আর এই স্বপ্ন, এই গন্তব্যের মধ্যে মরে যেতে যেতে আমরা বুঝি যে আমাদের নব্বই আসলে বেনেডিক্ট আন্ডারসনের সেই ইমাজিন্ড কমিউনিটি, যা বাস্তবে কখনও ছিল না। ছিল, হয়ে আছে আমাদের ভালবাসা, বেদনায়, মনখারাপের রাতে। তার কোনও দায় নেই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করার। তবুও মায়া থেকেই যায়। মায়া থেকে যায় অনামী সেই মিত্রর কবিতায়, তার রাজনীতি ছেড়ে দিলেও, পাঁক জমতে থাকা মজা পুকুরের কোণে কোণে, ট্রায়াংগুলার পার্কের সিঁড়িতে, ঢাকুরিয়া ব্রিজের গায়ে,যাদবপুর ইউনির মাঠে, ফুটপাতের গায়ে অবহেলায় লটকে থাকা লাল ফেস্টুনে, ভুলে যাওয়া ঋষি কাপুরের গানের সুরে। আর এই সব মায়া নিয়েই আমরা গড়ে তুলতে থাকি আমাদের নব্বই,আমাদের নিজেদের কল্পনার চারণভূমি। হয়ত সেই চারণভূমির মধ্যে বাঁচতে বাঁচতেই মরেও যাই কখনও কখনও, বা হয়ত .. হয়ত বা শোক ও শস্যের ওয়াগন
চলো কাকা, আরেকবার মেঘ দেখো আজ। কলকাতার এই ভিড়ে আর আকাশ দেখা অসম্ভব, বাঘ তো পাবেই না। বরং দেখো কিভাবে মেঘেদের দেহ থেকে ঝরে পড়ছে ধ্বংসের ছাই। এমনটাই কি হবার কথা ছিল? আমাদের অবিরল আড্ডার সন্ধ্যেগুলোর শেষে এমনভাবেই কি হারিয়ে যাবে রবারের বল কাঁটাঝোপে? নাকি তুমি যেই লিখতে বসবে নব্বইয়ের অবিরল ম্যানিফেস্টো, সময় ধরা দেবে কিয়ের্কেগার্ডের সেই ক্লাউন হয়ে, যে অনবরত হুঁশিয়ারি জানিয়ে যাবে “আসছে খুনিদের জমানা”? যার ক্লাউনীয় কলিটুপি-ল্যাজ দেখে হাততালি সিটির খোয়াইশ ছুঁড়ে দেব আমরা বেওয়াফা নব্বই? তুমি জানতে না এ আসলে নব্বইয়ের আড্ডার মেমেন্টো ম্যাজিক না। বরং দেখেও দেখোনি যে আমাদের ঢাকুরিয়ার অনন্ত লেকের জলেও চাঁদ পড়ে থাকে। ছিল। নেই।
মনে আছে গুরু, আমাদের প্রথম আড্ডা? নব্বইয়ের আড্ডা, আড্ডার নব্বই? স্কুল থেকে বেরিয়ে টিউশন, ল্যান্সডাউন থেকে সেলিমপুর। মাথার ওপর ছায়া ঘনাইছে বনে বনে, আর আমাদের স্কুলবালকের দল হেঁটে হেঁটে, হেঁটে হেঁটে, সেই অন্ধকার গলিঘুঁজির রাস্তা ধরে, সোজাপথে না গিয়ে এই উঠোন ঐ গলি দেশপ্রিয় পার্ক বিবেকানন্দ পার্ক ঢাকুরিয়া লেক, তোমার আমার প্রথম লেক দর্শন। প্যাচপেচে কাদা, নিভে যাওয়া বাজারের শেষ হ্যাজাক, আঁচলে সন্ধ্যে মুছে একা বাড়ি ফেরা, আমরা কজন, সকলের ঠোঁটে লুকিয়ে রাখা সিগারেট আর সারা কলকাতা তখন আমাদের প্রজা। মধ্যবর্ষার কলকাতা শাসন করেছিল সেই একঝাঁক শিশু, কেউ পনেরো কেউ ষোলো। মাঝরাস্তায় সম্রাট মড়াকান্না জুড়ল “সঞ্চিতা আমায় পাত্তা দিল না রে-এ-এ-এ-এ” এবং তুমি সান্ত্বনার হাত তার পিঠে রেখে বললে “ভাবিস না, আমায় দেবে”।
সেই শুরু আরেক নব্বই, যখন সারাদিন সারাসন্ধ্যে স্কুল কেটে ম্যাডক্স স্কোয়ারের অনুপম হাতছানি। বাবা মায়ের রক্তচোখ হ্যা হ্যা খোরাকে পেঁজা তুলো উড়িয়ে মিশন ঢাকুরিয়া লেক। আমাদের উঠোন বাড়ি যার অনন্ত জলে চাঁদ পড়ে থাকে, ভেসে ওঠে। ভিখিরির আর্তস্বর, ভেজা মাটির কামার্ত ঘ্রাণ, বেশ্যার শীৎকার, ফুলবাবুর ওডিকোলন, ফুলঝুড়ি ঝরে গেল অবিরল ককটেলে আর আমরা কজন সেই শব্দ গন্ধ মাখতে মাখতে বড় হয়ে উঠলাম। তুমি ম্যানিফেস্টো লিখতে বসে থিওরি কপচাবে কাকা, এদিকে তোমার মনেও নেই কী নিয়ে আড্ডা হত! মেয়ে?এক্সাম? গাঁজা? পানু? সিনেমা? কেরিয়ার? নাহ্ ধুস ওটা একদমই না তাইলে কি কিস্যু না? আসলে কিস্যু না? শুধু এক ঝাঁক কথা, যার কোনও লক্ষ্য নেই, কোনও ধারাবাহিকতা নেই? কেউ হয়ত শুরু করল সারফারোশের সোনালি। সেখান থেকে ডজ মেরে দক্ষিণাপণের ফুচকা। সেখান থেকে সাম্প্রাস আরে না না ওতেই শেষ না বরং আরোই আসবে কৃশানু দে নীলাঞ্জনা ঐতিহাসিক ভুল ভৌগোলিক ঠিক। গুড লিফের পঞ্চাশ পয়সার বড় সিগারেট মুখে দিলে মনে হয় হাই ফাইভ ফিফটি ফাইভ আসলে আমাদের ধারণায় তামাক পোতা পোরা আর প্রিয় বন্ধু অঞ্জন দত্ত সব মায়া হয়ে যায় ডুবে অগাধ হৃদয়জলে। এ কলকাতা ভূমণ্ডলে এ কিশোরপ্রাণ সামান্য ছত্রাক। আমরা ভাসতে থাকি। বয়েস কেঁপে আসা ঝড়ের প্রাকলগ্নেও কেউ ছাড়িনি। ছেড়ে যাইনি কেউ কাউকে। স্লেট রং বিকেলের ওপর ঘন ছায়া আসার সময় আমরা তখন কুপি হাতে একটা একটা করে তারা লিখে যাচ্ছি আকাশের গায়ে ।
প্রেম আসেনি কি? এসেছিল তো, সশব্দ চরণে। এক আড্ডায় জানা গেল সঞ্চিতা টিউশন সেরে এই লেক দিয়ে শর্টকাট মারে ওদের মুদিয়ালির বাড়ি ফেরার সময়। সেইমত আমরা কয়জন ঘাপটি অন্ধকার ঝোপের আড়ালে। সম্রাট টেনশনে একের পর এক গুড লিফ। আর অন্য কিছু কেনার পয়সা ছিল না তো, ফলত ওটাই ভাগাভাগি করে আর আমরা ক্রমাগত খিস্তি যে শেয়ারের সিগারেট শেষ হয়ে যাচ্ছে।
তারপর, যেই গম্ভীর বটের ছায়া ঢেকে দিল চরাচর এবং বেশ্যা আর পুলিশের চ্যাপলিনেস্ক চপলতা এবার শুরু হবার মুখে, হঠাৎ দেখা গেল দূর থেকে হেঁটে আসছে নীল স্কার্ট দু-বেনুনি গোল চশমা পাক্কা স্কুল ড্রেস। আমরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছি কী হয় কী হয়। সম্রাট সাহস করে এগিয়ে গেল ধুকপুক বুকে। নীল স্কার্ট থমকে দাঁড়াল। সম্রাট বলল “আমি আজ টিউশন যাইনি, এখানে তোর জন্য দাঁড়িয়ে আছি”। এটা পাতি ঢপ কারণ টিউশন আমরা এমনিতেই যেতাম না অনেকদিন। চশমার আড়ালে ফর্সা সুন্দর মুখটা একটু অবাক। ভুরু কুঁচকে গেল কি? আর্চিস গ্যালারি থেকে কেনা শস্তা কার্ড আর একটা ক্যাডবেরি ওর হাতে তুলে দিয়ে সম্রাট বলল “বাড়ি গিয়ে পড়িস, কার্ডের ভেতর লেখা আছে”।
আই ঝাপ, মাল যে কার্ড কিনেছে জানতাম না তো? পুনে ওদিকে ঝোপের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসেই খচেমচে একশা। “কী হারামখোর দেখলি? বোকাচোদা আমার কাছ থেকে কাল টাকা ধার করল জিওমেট্রি বক্স কিনবে বলে। বলল সকলকে রোল খাওয়াবে। আর সেই টাকায় এই ক্যাওড়ামো?”
নীল স্কার্ট হাওয়ায় দুলিয়ে প্রশ্ন উড়ে এল “কেন কার্ডটা এখানে পড়তে কী হয়েছে?” বলে সম্রাটের হাত ধরে লেকের ধারের ল্যাম্পপোস্টের নিচে গিয়ে কার্ড বার করল। আমরা ততক্ষণে হিচকক মুভির শেষ পাঁচ মিনিটের দর্শক। কার্ডটা যতক্ষণ ধরে পড়ল সম্রাট দাঁড়িয়ে রইল বলির পাঁঠার মত,প্রায় হাত জোড় করে। এবং একটু দূরত্বে। যাতে থাপ্পড় ফাপ্পড় মারতে আসলেই পালাতে পারে। পড়া হলে সঞ্চিতা মুখ তুলে তাকাল। একটু ফিক করে হেসে বলল “মুখে বলতে পারিসনি, কাওয়ার্ড কোথাকার”। সম্রাটের তখন হাসবে না কাঁদবে নাকি হঠাৎ পড়ে পাওয়া আঠেরো আনা হাঁ করে ক্যাবলা হয়ে দাঁড়িয়ে -তারপর দুজনে মিলে হাঁটতে হাঁটতে চলে গেল কোথায়।
বেশ অনেক্ষণ পর তুমি ঝোপের আড়ালে একটা নিঃশ্বাস ছেড়ে বললে “গুরু তার মানে কি হয়ে গেল?” পুনে উত্তর দিল, “হ্যাঁ”। ক্যালানে প্রণব জিজ্ঞাসা করল “কী হল?” পুনে উদাসভাবে আকাশের দিকে মুখ তুলে বলল “কী আর হবে! ঐ, দু একখানা বাচ্চাকাচ্চা!”
সে প্রেম ভেঙেওছিল এবং সঞ্চিতাকে তার নতুন বয়ফ্রেন্ডের সাথে হাঁটতে দেখলাম সেই লেকের ধারেই আরেক বয়স্ক বিকেলবেলা। কিন্তু ততদিনে আমরা সকলে মিলে পেরিয়ে এসেছি সে দিবারাত্রির কাব্যের অনেকগুলো চেরিশড চ্যাপটার।
কিন্তু শুধুই কি ঢাকুরিয়া লেক? তাহলে কে লিখবে কুয়াশামাখানো আদি গঙ্গার এলিজি আখ্যান যেখানে আরেক প্রস্থ বন্ধু আরেক আড্ডার তুমুল ভাঙচুর? সাইকেল নিয়ে পুঁটিয়ারির গঙ্গা, আদি অশ্বথ, পোড়া শিবমন্দির, বিবর্ণ গলি, সিমেন্টের ফুটপাতে ঝরে যায় কাঞ্চন, মনখারাপ নোনাধরা বাড়ি নিস্প্রভ আলো আর সন্ধ্যে হলেই সেখান থেকে ভেসে আসা নাচের ক্লাসের ধুপধুপ রেডিওর আকাশবাণী, ঘ্যাসঘেসে রোজা জানেমন, পাঁক মজা গঙ্গার গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে আমাদের তবু তার পাশেই গুমটি দোকানে আলুর চপ ফুলুরি। সন্ধ্যের আজানের সঙ্গে মিশে যেত কাঁচা পেঁয়াজ মুড়ি চায়ের পোড়াদুধ গন্ধ। কত কত সন্ধ্যেবেলা এই আড্ডায় গড়িয়ে গেছি, কাকা, আমি আর তুমি। সেই মিটমিটে চায়ের দোকানে আমরা থাকতে থাকতেই হুকিং করে কারেন্ট আনা হল। তাও একটা মোটে বাল্ব। অল্প। পটকাদার দোকান, মেটালবক্সের কেরানি সব হারিয়ে সবেধন।
সেই শেষ সন্ধ্যেবেলা পটকাদাকে ঘিরে ধরে হাটুরে মানুষ। দোকানদার কম মাইনের কেরানি রোজের মিস্ত্রি গ্রামে ফেরার আগে রাতের খাবার খাওয়ার জন্য আসা কাজের মাসি অটোওয়ালা চোর বেশ্যা আরও কত! কেউ খায় শুধু চপ কেউ আবার মুড়ি দিয়ে পেঁয়াজ আর লঙ্কা মেখে সঙ্গে চপটাকে ভেঙে মিশিয়ে ফেলে একটু একটু করে খায় যাতে তাড়াতাড়ি শেষ না হয়ে যায়। মুখে নিয়ে চিবোয় পরম তৃপ্তিতে। জিভ দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে টেনে বার করে আনে চপের টুকরো।সেটাকে নিয়ে মুখের ভেতর খেলায়। কারও কাছে এটাই হয়ত তার রাতের খাবার। রঙওঠা খালি মানিব্যাগের এককোণায় অতি যত্নে, অতি গোপনে লুকিয়ে রেখে দেওয়া ময়লা তিন টাকার নোটের পুরোটাই শেষ করে দিয়েছে খাবারে। তারপর ম্লান মুখে আবিষ্কার করেছে আর টাকা নেই। কিন্তু হয়তো খিদে মেটেনি। সে ঠোঙাটা নিয়ে অনেকক্ষণ নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখে। যদি কোনও মুড়ির বা ভাঙা চপের টুকরো পাওয়া যায় হঠাৎ, এল ডোরাডো খুঁজে পাওয়ার আনন্দে সেটাকে চালান দেয় মুখের ভেতর। আর ঠিক সেই মুহূর্তে, চপের ঝুড়িতে পড়ে থাকা ভাজা বেসনের টুকরোগুলো মুড়ির সঙ্গে মিশিয়ে একটুকরো কাঁচা পেঁয়াজ দিয়ে পটকাদা কিছুটা ঢেলে দেয় সেই অর্ধভুক্তের ঠোঙায়। সঙ্কুচিত হয়ে টাকার কথা বলতে গেলে গম্ভীরভাবে বলে “লাগবে না”। সেই সময়টাতে আমরা সব আড্ডাবাজরা একটা আলো দেখেছি ওর চোখে। নিভে আসা বাজারের শেষ হ্যাজাক? কে জানে! বড় মায়াময়, বড় হা-ক্লান্ত সেই আলো।
গঙ্গার ওপাশে ততদিনে ফুটবল খেলার মাঠ দখল করে নিচ্ছে মেট্রো সম্প্রসারণের জোশজটিলতা। ঝুপড়িগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। গাঁজার ঠেক। চোলাইয়ের নিষিদ্ধ আস্তানা। সেই গাঁজা মজা গঙ্গা সাঁতরে এখন এপাড়ে। আবছা অন্ধকারে ঝোপঝাড়, কুকুরের গু, পাঁক জমেছে, ফেলে দেওয়া কন্ডোম, দুধের প্লাস্টিক আর বাসি ফুলের মালার মধ্যে ইতস্তত আগুনের ফুলকি। এখানে ওখানে গাঁজার টান ছড়িয়ে যাচ্ছে গোটা পুঁটিয়ারি। প্রাণের মদ ফুরোলে মানুষ হাটের মদের খোঁজ নেয়। এমনকি এ বিশ্বের প্রথম মানবতাবাদী পুরুষকে ক্রুশকাঠে ঝোলানোর সময় তিনি যখন অসহ্য তেষ্টাতেও প্রাণপণ উটগলা সরিয়ে নিচ্ছেন শরাবস্রোত থেকে, সেদিন থেকেই নাকি আমাদের প্রাণের মদ প্রথম ফুরনো শুরু, এমনও বলেছিলেন কেউ কেউ। তো, আমরা নব্বইজাতকেরা প্রাণের মদের খোঁজ পেয়েছিলাম কিনা জানি না, তবে হাটের মদের দুর্নিবার আকর্ষণেই প্রথম সুখটান দেওয়া গাঁজাভর্তি সিগারেটে। আর তারপর আমরা সকলে আমি তুমি বাপি সোনাই অনিরুদ্ধ বাপ্পা অভি সক্কলে মিলে ভেসে গেলাম আদিগঙ্গার বুকে। ভাসিয়ে দিলাম নিজেদের।
কিন্তু কাকা, গল্পটা তো এখানেই শেষ হয়ে যাবার নয়। এত তাড়াতাড়ি তোমায় ছেড়ে বুড়ো হবে তোমার সুজন ম্যানিফেস্টো? গল্ফগ্রিনের কবরখানার কথা কে বলবে তাহলে? তখনও পাঁচিল ওঠেনি চারধারে। যে কেউ ঢুকতে পারত। আর অন্ধকার গল্ফগ্রিনের বুকে সারারাত জেগে থাকত সাদা সাদা ক্রশ। সে এক মোহময় জাদুগর ছিল সেই মেহফিল। আচ্ছা, আমাদের সব জলসাই কেন সন্ধ্যেবেলা হত? এমন সময়ে, যখন কেউ দেখতে পেত না কারোর মুখ? আমরা মনে হয় অন্ধকারের প্রেমিক ছিলাম, তাই না? নব্বইয়ের সমস্ত অনুপম তিমিরবিলাস নিয়েই বেড়ে ওঠা আমাদের। সেজন্যই গল্ফগ্রিনের ঐ অন্ধকার কবরখানা অত প্রিয় ছিল। কোনও রাতে নতুন কবরের সোঁদা মাটির গন্ধ সারা শরীরে মাখতে মাখতে সদ্যমৃতের পাশে বসে রাত্রির রঁদেভু। জমে উঠেছে হাসি উল্লাসের কার্নিভাল। কখনও মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে কেউ প্রিয়জনকে স্মরণকরে, আর আমরা অপঠিত তুষার রায়কে জাস্ট ফুৎকার খোরাক করেই সেই মোমবাতি থেকে জ্বালিয়ে নিচ্ছি সিগারেট। গল্প করতে করতে গা এলিয়ে দিচ্ছি মৃতবাচ্চার কবরের ওপর।চুল রাখছি অ্যাংলো ভিখিরির কফিনে। ঘুমিয়ে পড়ছি কাশতে কাশতে নীল হয়ে মরে যাওয়া দুঃখী তরুণীর সাদা স্ল্যাবে। শুভ আমার কানের কাছে মুখ এনে বলে যাচ্ছে ওর প্রেমিকাকে লেখা কবিতা ‘কিছু সুখ খাবে মা ও মেয়েতে কিছু সুখ খাবে বয়েসের হাই’ আর সেই সুখ সেই দুঃখ প্রেম ভেঙে যাওয়া পরীক্ষা ফেল বাবার মার বাড়ির অভাব সবকিছু দুহাতে ঠেলতে ঠেলতে আমরা নব্বইজাতকেরা ঘুমিয়ে পড়ছি সেই কবরখানার কার্নিভালের মাঝে। শেষ হবার আগেই। না, আমাদের নব্বইয়ের ওয়াগনে শোক ছিল কি না জানি না। কিন্তু সোনালি উজ্জ্বল শস্য উপচে পড়েছিল।
এ জিনিসের থিওরি হয় না। সব ম্যানিফেস্টো কি খুঁজে পায় তার আঁদ্রে ব্রেতোঁকে? আমাদের বেজম্মা আড্ডা, কেরিয়ার মার্কস সফল প্রেম জয়েন্টের র্যাংক এই সব সব কিছুকে পোষা টেরিয়ারের মত কখনও পায়ে পায়ে আদর কখনও দুদ্দুর তাড়া করে বেঁচে থাকে ঢাকুরিয়া লেক, পটকাদার চায়ের দোকান, গণিকার গান, কবরখানার মালি, নির্জন বাসরুট, আধবুড়ো অটো, বিজয়গড়ের মাথা নুইয়ে জ্বালজেলে টিকে থাকা হোমিওপ্যাথির দোকান, বন্ধ আর্চ কম্পানির ঘোলাটে চোখ, হারিয়ে যাওয়া বুড়ো সন্ধ্যের পাগল, আমাদের বেজম্মা আড্ডা। আমাদের দিল পুড়ে যায় সারফারোশি জগজিতীয় দাহ্য গজলীতে। সিকান্দারের হেরো সাইকেল টায়ার ফেঁসে অবহেলায় পড়ে থাকে আড্ডাখানার পাশে। আমরা গড়িয়ে যাই নিজের মাফিক। কলকাতা হাই স্পিডে ছুটে চলে আমাদের নিয়ে। ক্রমশ ২০০০ এসে পড়ে। আমরা তারুণ্যের দিকে হাঁটি। শুকিয়ে যায় মানুষের সাজানো বাগান। তবু জেগে থাকে নব্বই। জেগে থাকে তার রাতভোর আড্ডা নিয়ে,বন্ধুতার লোনলি লগ্ন নিয়ে। কার্নিভালের রাত তো ফুরোয়। অজগরের মাথায় মণির মত ভোরও জ্বলে। জ্বলতেই থাকে। কিন্তু সব ক্লান্ত বীরই কি আর ফেরার ঘরের ঠিকানা খুঁজে পায়?
