জোনাকির রঙ – ৫
(পঞ্চম অধ্যায়)
জঙ্গলের ভেতরে কিছুটা ঢুকে এসে থমকে দাঁড়ায় অপরেশ। একটা শক্ত কাঠের দরজা জঙ্গলের মধ্যে রেখে গেছে কেউ। ভারী অবাক হয়ে যায় সে। আশপাশে কোথাও কিছু নেই। কেবল একটা দরজা যেন কোন বাড়ি থেকে খুলে নিয়ে কেউ রেখে গেছে এখানে। জঙ্গলের পেছনের আকাশে সূর্য ডুবতে বসেছে। দরজাটা যেন সূর্যের গায়েই এঁকেছে কেউ…
দরজার উপরে নানারকম নকশা আঁকা। কাছে গিয়ে সেগুলো ভালো করে খুঁটিয়ে দেখার চেষ্টা করে অপরেশ। কোনও বাচ্চা ছেলের হাতে আঁকা ছবিগুলো। ইংরেজিতে কী সব যেন লেখাও আছে। ওর খুঁটিয়ে পড়ার ধৈর্য হয় না। মন বলে, দরজাটা দিয়ে কোথাও যাওয়া যায়, অন্য কোনও জগতে…
একবার পেছন ফিরে সে দ্যাখে কেউ আসছে কি না। তারপর দরজার ছিটকিনিটা খুলে পাল্লা ধরে একটা টান দেয়।
দরজার ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখতে পায়…
.
মিক্সার মেশিনের সামনে বসে ভলিউমটা বাড়িয়ে দেয় শতরূপ। কাচের উইন্ডোর ওদিক থেকে কিছু সিগন্যাল ভেসে এসেছে। হেডফোনে শোনা যাচ্ছে কনট্রোল রুম থেকে আরও কিছু সংকেত। কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করে নেয়। ও জানে, আপাতত এইসব শব্দকে ভুলে যেতে হবে।
একটু দূরে টেবিলের উপর পড়ে আছে ওর ফোনটা। একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন আসছে। সেটা কেটে দিয়ে আবার টেবিলের উপর শুইয়ে রাখে ফোনটাকে। হেডফোনে এতক্ষণে একটা জিঙ্গল শোনা যাচ্ছে। চড়া শব্দে কান ঝালাপালা হয়ে যায়। হেডফোনটা নামিয়ে রাখে। মাইক অফলাইন করে একটা ঘুসি মারে টেবিলের উপরে, “বালের গল্প শালা, জঙ্গলের মধ্যে অন্য জগতের দরজা…”
গলাটা ব্যথা হয়ে আছে। অনেকক্ষণ ধরে পড়ে চলেছে গল্পটা। স্ক্রিপ্টের লেখাগুলোও ছোট ছোট। কাগজটা রীতিমতো মুখের কাছে এনে পড়তে হচ্ছে।
সোজা হয়ে বসে আড়মোড়া ভাঙে শতরূপ। তিন মিনিটের অ্যাড ব্রেক। তার মধ্যেই কোনওমতে শিরদাঁড়া আর গলাটাকে সান্ত্বনা দিয়ে ভুলিয়ে রাখতে হবে।
নিচু হয়ে জলের বোতলটা তুলে নিতেই হেডফোনে একটা নতুন সংকেত আসে, ওপাশ থেকে মোহনবাবুর গলা শোনা যায়, “শতরূপ, একটা কল আছে তোমার। পিক ইট!”
শতরূপ বিরক্ত হয়, “কতবার বলেছি, অন এয়ার কল আমাকে দিয়ে হবে না। প্রোগ্রামের পরে করতে বলো…
“আধ ঘণ্টা ধরে জ্বালিয়ে যাচ্ছে, ভাই, ফ্যান বলছে তোমার। সালটে দাও প্লিজ… তা ছাড়া…”
“কী?”
“ওয়ান অব আওয়ার প্রাইম অ্যাডভার্টাইজারস।”
শতরূপের বিরক্তিটা আরও বেড়ে ওঠে, “আপনারা বড়লোকের পোঁদ চাটবেন বলে আমাকেও জিব ছুলে রাখতে হবে…”
বিরক্ত হয়েই আবার হেডফোনটা কানে পরে কলটা রিসিভ করে শতরূপ। ক্লান্ত গলায় “হ্যালো” বলে। ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনও শব্দ আসে না। বুঝতে পারে, সম্ভবত কথা গলায় আটকে যাচ্ছে মানুষটার। এ জিনিস নতুন কিছু নয়। গলা শোনার জন্য যারা কল করে, তাদের বেশির ভাগই প্রথমে কিছু বলে উঠতে পারে না। ও জানে, প্রথম বরফ কাটানোর জন্য কী বলতে হয়। গলায় মেকি হাসি এনে সে বলে, “আরে সাইলেন্সদা যে! কী খবর? অনেকদিন হল কথা হয় না!”
“আমি আসলে কয়েকটা চিঠি লিখেছি আপনাকে। অনেকদিন ধরে পড়ে আছে। আজ ভাবলাম…” ফিনফিনে সরু গলা, জড়তা আছে, কিন্তু ন্যাকামো নেই। মনে হয় যেন প্রতিটা শব্দ বহুক্ষণ ভেবে ভেবে পছন্দ করছে ওপারের মানুষটা।
“বেশ তো, ই-মেইল করে দিন-না….”
“উঁহু। কাগজে লেখা চিঠি… আমি টাইপ করতে পারি না…”
“কাগজে লেখা!” শতরূপ একটু অবাক হয়। আজকালকার যুগে কেউ কারও জন্য কাগজে চিঠি লিখতে পারে বলে তার জানা ছিল না।।
“নো প্রবলেম! আপনি আমার অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে দিতে পারেন।”
মেয়েটা একটা অদ্ভুত হাসি হাসে। গলায় কোনও উত্তাপ নেই তার। যেন এমন একটা ফোন কল আজ হবারই ছিল।
“আসলে চিঠিগুলো আমি আপনাকে পাঠাতে চাই না।”
“মানে! তাহলে লিখেছেন কেন?”
“সব চিঠি লিখলেই বুঝি পাঠাতে হয়?”
শতরূপ একটু থতোমতো খেয়ে যায়। মানুষকে কথা বলে ঘোল খাইয়ে দেওয়াই তার রুজিরুটি। এখন নিজেরই পেটের ভেতরটা খালি হয়ে যায়— “তাহলে আপনি ফোন করেছেন কেন আমাকে?”
“আপনাকে একটা কথা জানাতে।”
“কী কথা?”
“আপনার গলায় কিছু আছে, জানেন…”
শতরূপ সাধারণত খুশি হয় এ ধরনের প্রশংসায়। তবে ব্যাপারটা আর নতুন কিছু নয়, ইনবক্স ভরতি হয়ে যায় এই কয়েকটা শব্দে। কিন্তু এই মেয়েটার কথা শুনে মনে হল না সে আদৌ প্রশংসা করছে বলে। বরঞ্চ একটা প্রচ্ছন্ন অভিযোগের সুর আছে তাতে। শেখানো বুলির মতো মাখন-লাগা গলায় রহস্য করে শতরূপ, “তা-ই বুঝি?”
“না, আপনি যা ভাবছেন তা নয়। আপনার গলা আমাকে একটা জায়গায় নিয়ে যায়। যেখান থেকে আর আমার ফিরে আসতে ইচ্ছা করে না।”
“কোথায় নিয়ে যায়?”
“দূরে… আমি যেখানে যেতে চাই… আর কারও গলা শুনে এমন হয় না। যেখানে গেলে আমার খুব মরে যেতে ইচ্ছা করে… আজও করছে… এখন, তাই ফোন করলাম আপনাকে…”
“হোয়াট ডু ইউ মিন বাই দ্যাট?” বিরক্ত হয় শতরূপ। কাজের মধ্যে ফোন করে এমন অদ্ভুত কথা আগে বলেনি কেউ।
“মরে যাওয়ার ইচ্ছাটাও তো একটা ইচ্ছা, বলুন? খুব ভীষণ রকমের ইচ্ছা। এত বেশি করে কোনও কিছু করার ইচ্ছাটাও এক ধরনের বেঁচে থাকা, তা-ই না? আপনার শেষ কবে তেমন কিছু ইচ্ছা করেছে বলুন তো? কাউকে ভালোবাসতে, কাউকে জড়িয়ে ধরতে, কিংবা একটা ফোন কল….”
“দেখুন, আপনার যদি কোনও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা থাকে তাহলে আমাদের হেল্পলাইনে…”
“শাট আপ!” মেয়েটার গলা যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে, “অনেক, অনেকদিন পরে একদিন আপনার সঙ্গে দেখা হবে আমার। হয়তো অনেক বছর পরে। তখন আমি আপনাকে দেখাব সেই জায়গাটা। কেমন? আমার খুব ইচ্ছা করে দেখাতে….”
“দেখুন, আপনি মরতে চাইলেও আমার এত তাড়াতাড়ি মরার কোনও ইচ্ছা নেই।”
“একদিন দেখা হবে আমাদের। বলুন? নিশ্চয়ই দেখা হবে…”
“গো টু হেল…”
একরকম জোর করেই ফোন কেটে দেয় শতরূপ। তিন মিনিটের অ্যাড ব্রেক শেষ হয়েছে। হেডফোনে ‘কিউ’ ভেসে এসেছে। কান ঝালাপালা করা জিঙ্গল মিউজিকটা শুরু হয়েছে আবার।
মেয়েটা কি অন্তর্যামী? না হলে ফোন কলের ব্যাপারটা কেন বলল? ধুর, আন্দাজে বলেছে হয়তো। অ্যাটেনশনসিকার মেয়েটা।
“একদিন দেখা হবে… একদিন দেখা হবে আমাদের… হবে না, বলুন?” শতরূপের কানে বাজতে থাকে কথাগুলো।
নীহারিকা যখন চোখ মেলল, তখন আকাশ মেঘলা হয়ে এসেছে। ঘাসের উপর ওর হাতটা পড়ে আছে। তার উপর দিয়ে একটা পিঁপড়ে হেঁটে যাচ্ছে। ওর কুচকুচে কালো খোলা চুলগুলো ছড়িয়ে আছে ঘাসের উপর। মাথার উপরে খোলা আকাশ। সেখান থেকে কয়েক ফোঁটা ঠান্ডা জল এসে পড়ল ওর মুখে। আরামে চোখ বন্ধ হয়ে এল।
আবার যেন ঘুম পেল। চোখ বন্ধ করেই বাঁ পাশে তাকাল। কেউ শুয়ে আছে সেখানে? খুব মৃদুস্বরে কার নাম ধরে যেন ডাকল নীহারিকা। কেউ ওর নাম ধরে ডাকল না।
আজ থেকে পনেরো বছর আগের একটা বিকেলে ফিরে গেছে নীহারিকা। সেদিনও মন খারাপ হলে এমন ঘাসের উপর এসে শুয়ে পড়ত ও আর একটা ছেলে। সেই ছেলেটা, যাকে বহুদিন হল ভুলে গেছে। যার খোঁজ নেয়নি কতদিন কে জানে। কারণটা ওর এখন মনে নেই। কেবলই এটুকু বোঝে, আর সেদিকে ফিরে যেতে পারবে না কখনও।
“তোর আমার কথা মনে পড়ে, রূপ? আমার খুব মনে পড়ে তোর কথা, তোর দুঃখগুলোর কথা, তোর পাঁচ সিকের দুঃখগুলো… তোকে কানাইদা আটচল্লিশ রানে জোর করে আউট দিয়ে দিয়েছিল—সেই দুঃখ। তোর পোষা বেড়ালটাকে কুকুরে কামড়ে ছিন্নভিন্ন করে রেখে গিয়েছিল—সেই দুঃখ। তোর মায়ের মৃতদেহটা কাঁধে করে শ্মশানে নিয়ে যাওয়ার দুঃখ… তোর থেকে তোর দুঃখগুলোর কথা আমার বেশি মনে পড়ে, তোর মনে পড়ে রূপ, আমার কথা?”
কেউ উত্তর দেয় না।
পনেরো বছর আগের একটা ঝিমঝিমে সন্ধ্যা। সেদিন একরকম উঠতে-পড়তেই রূপের বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে উঠেছিল নীহারিকা। ঘরে ঢুকে রূপের মা-কে দেখতে পেয়ে আগে জোর গলায় জিজ্ঞেস করেছিল, “কাকিমা, রূপ কোথায়?”
“ওর ঘরেই তো আছে…. কেন? কী হয়েছে?”
“ওকে একটু বেরোতে বলবে গো? দরকার আছে…
সেদিন বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল যখন, আদৌ কোথাও যেতে হবে ভেবে বেরোয়নি ও। ঘরের ভেতর টিকছিল না মনটা। রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে কখন যেন রূপের বাড়ির দিকে চলে গিয়েছিল পা-টা, নীহারিকা খেয়াল করেনি। একটু পরেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল রূপ। নীহারিকার দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে বিস্ময়জড়িত গলায় বলেছিল, “কী রে, তুই এখানে! এই সময়!”
“আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছি, রূপ। আর বাড়ি ফিরব না…”
“বাড়ি ফিরবি না মানে? কী হয়েছে?”
“বাড়িতে কেউ আমায় ভালোবাসে না। আমার সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছে, রূপ…”
“কী শেষ হচ্ছে তোর?”
“সব কিছু, আমার পড়াশোনা, কেরিয়ার, প্রেম, আমার মা-বাবা, এমন আচমকা সব কিছু শেষ হয়ে যায় কেন বল তো?”
নীহারিকার কাঁধে হাত রেখে ওকে শান্ত করে রূপ, তারপর দুজনে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে চলে আসে। ছাদের একদিকের সিমেন্টের বেঞ্চে বসে রূপ জিজ্ঞেস করে, “ঠিক করে বল তো ভাই, হয়েছেটা কী?”
নীহারিকা কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল রূপকে। তবুও শব্দ দিয়ে সব কিছু প্রকাশ করতে পারেনি। একসময় শব্দের অপরিণতি উচ্ছ্বাসের মতো ঝাঁপিয়ে পড়েছিল ওর উপর। সেটা সামলাতেই ডুবন্ত নৌকার মতো রূপের জামা খামচে ধরেছিল নীহারিকা। তারপর লুটিয়ে পড়েছিল রূপের বুকের উপর। অনেকক্ষণ কেঁদেছিল, অনেকক্ষণ—যতক্ষণ কাঁদলে মানুষ শান্ত হয়ে যায়।
রূপ কিছু জিজ্ঞেস করেনি ওকে। থামানোর চেষ্টা করেনি। শুধু আলতো করে ওর মাথার উপরে রেখেছিল হাতটা। ছাদের মেঝেতেই বসেছিল দুজনে। উপরে তখন ঘন কালো আকাশ জেগে আছে, একটাও তারা ফুটে নেই তাতে। তা-ও রূপ সেদিকে চেয়ে কী যেন খোঁজার চেষ্টা করছিল সেদিন। নীহারিকার জলে ভেজা মুখটা এতটুকু গুরুত্ব পাচ্ছিল না সেই আকুল অনুসন্ধানের কাছে।
“কী খুঁজছিস বল তো তুই?” মুখ থেকে জল মুছতে মুছতে জিজ্ঞেস করেছিল নীহারিকা।
“একটা তারা, কিংবা জাস্ট একটা আলো… একটা হলেই চলবে…”
“কী হবে তাতে?”
“মনে হবে বাকিগুলোও নিশ্চয়ই আশপাশে কোথাও আছে… তারপর… কথা শেষ না করেই হঠাৎ নীহারিকার মুখের দিকে তাকায় রূপ, “আচ্ছা, তোর এমন কিছুতে কষ্ট হচ্ছে, যেটা তুই নিজে বুঝতে পারছিস না, বা আমাকে বলতে পারছিস না। তা-ই তো? ও আমারও হয়…”
উপরে-নীচে মাথা নাড়ায় নীহারিকা, অবাক হয়ে যায়। ওর এই বন্ধুটা কেমন যেন উঁচু ক্লাসের অঙ্কের ফর্মুলার মতো। ওকে দিয়ে অনেক কিছুর সমাধান করা যায় হয়তো, কিন্তু তার জন্য আগে ওর সংকেতগুলোর মানে বুঝতে হবে।
“একটা কাজ কর, তুই অন্য যে-কোনও একটা দুঃখের কথা বল আমাকে…..”
“তাতে কী হবে?”
“আমাদের মনের ভেতর দুঃখগুলো কমলালেবুর রোঁয়ার মতো আটকে থাকে, একটা ধরে টানতে শুরু করলে বাকিগুলোও বেরিয়ে আসে….”
নীহারিকা ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করে, তারপর বলে, “বাবা-মায়ের সঙ্গে কোনও একটা মেলায় গিয়েছিলাম, জানিস? ওই যে গোল গোল করে কাঠের ঘোড়ায় চড়ে না? আমার দেখে ভীষণ ইচ্ছা করেছিল ওঠার। বাবা টাকা দিয়ে টিকিটও কিনেছিল, কিন্তু একেবারে ঘোড়ায় ওঠার সময় আমার কেন জানি না ভয় লাগল। মনে হল, ঘুরতে ঘুরতে নীচে পড়ে যাব। বেঁকে বসলাম। মা অনেক বলে-কয়েও তুলতে পারল না। লোকটাও আর টাকাটা ফেরত দিতে চাইল না। বাবার টাকাটা নষ্ট হল। ওইটুকুনি টাকা, তাতেও আমার কষ্ট হল ভীষণ, আমার জন্যেই তো নষ্ট হল… বাবার হাতে তখন এত টাকা ছিল না… তারপর…”
“তারপর কী?”
নীহারিকার চোখ দুটো আকাশের দিকে হারিয়ে গেছে— “তারপর সারাজীবন ইচ্ছা করেছে, যদি আর-একবার ওই সময়ে ফিরে যেতে পারতাম, বাবার হাতে ঠিক ওই ক-টাই টাকা থাকত, মেলাওয়ালা ঠিক ওইভাবেই মাথা নেড়ে বলত, সে টাকা ফেরত দিতে পারবে না, বাবা সেইভাবেই তাকে অসহায়ভাবে অনুরোধ করত, আর আমি মাঝখান থেকে বলতাম, ‘না, আমার একটুও ভয় করছে না, আমি ঘোড়ায় উঠব…” সারাজীবন ওই চেষ্টাই করে গেছি, জানিস?”
“কী চেষ্টা?”
“একটা ঘুরন্ত ঘোড়ায় উঠে বাবার টাকা বাঁচানোর…” নীহারিকা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসে, তারপর ধীরে ধীরে বলে, “এখন মনে হয়, সেদিন উঠে পড়েছিলাম ঘোড়াটায়। একা আমি না, আমি, মা, বাবা, আমার সব বন্ধু সবাই মিলে আলাদা আলাদা ঘোড়ায় উঠে গোল গোল করে ঘুরছিলাম। ঘুরতে ঘুরতে একদিন বুঝতে পারলাম, এভাবে কোনওদিন আর আমরা কাছাকাছি আসতে পারব না, একে অন্যকে দেখতে পাব, চিৎকার করব, হাসব, কাঁদব, ভয় পাব, কিন্তু ছুঁতে পারব না, ওই ঘোড়াগুলো আমাদের একটা নির্দিষ্ট দূরত্বে রেখে আজন্মকাল দৌড়োবে… কিন্তু …” রূপের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চায় নীহারিকা— “বাবা-মা-ও কেন ঘোড়ায় উঠে পড়ল বল তো? ওরা তো দাঁড়িয়ে থাকতে পারত আমার জন্য… আমি ঘুরে এসে বারবার ওদের হাত ছুঁয়ে যেতাম… ভালো হত না বল?”
“ওরা না উঠলে তুই নিজেও উঠতে ভয় পেতিস। আসলে যেমন পেয়েছিলিস…”
আকাশ ছুঁয়ে একটা ধোঁয়াশা নামছে ছাদের উপরে। দূরে কোনও বাড়ির খোলা জানলা দিয়ে রেডিয়োর সুর ভেসে আসছে। ঝুপ করে একসময় আলো নিবে গেল চারদিকের। লোডশেডিং। নীচ থেকে গুঞ্জন ভেসে এল। আলো নেই বলে কয়েকটা বাড়ি থেকে অল্পবয়সি ছেলেপিলে রাস্তায় নেমে এল। তাদের হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে এখান থেকে।
নীহারিকা ছাদের পাঁচিলের দিকে সরে আসে, একদিকে ঠেস দিয়ে বসে বলে, “দেখ, তুই আকাশের দিকে চেয়ে আলো খুঁজছিলি, আমাদের চারপাশেই আলো নিবে গেল।”
“ছাদে আলো থাকলে তুই এতগুলো কথা আমাকে বলতে পারতিস না। সব সময় ক্যাটকেটে আলো জ্বলা ভালো নয়….”
“আমার খুব একা লাগে, জানিস…” হঠাৎই প্রসঙ্গটা পালটে ফ্যালে নীহারিকা। যেন সমস্ত আলো নিবে যাওয়াতে ওর বাইরের খোলসটা আচমকাই ফেটে গেছে।
“স্বাভাবিক…”
“ধুর, এমন করে বললি যেন বলেছি, পেটের অসুখ হয়েছে। কাল বাসি লুচি খেয়েছিলি, স্বাভাবিক…”
“বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একা লাগাটা এমন আহামরি কিছু না। তোর ওই ঘোড়াটা ছিল কাঠের। ছোটবেলায় তাতে একসঙ্গে দুজন বসা যায় কিন্তু বড় হতে হতে বুঝতে হয়, একজনকে নেমে যেতে হবে। সোজা হিসেব…”
“কিন্তু কী করি বল তো? মন খারাপ হয়… সব সময় তো আর এখানে ছুটে আসা যাবে না।”
রূপ শান্ত গলায় বলে, “আমার একটা প্রসেস আছে। সেটা কাজে লাগাতে পারিস।”
“কীরকম?”
উঠে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে চায় রূপ, এখনও কোনও তারা ফোটেনি সেখানে। তা-ও কী যেন দেখতে দেখতে বলে, “আকাশের বুকে একটা তারা খুঁজে নে। কোনও সিগনিফিকেন্ট স্টার না। অর্ডিনারি একটা তারা। অথচ চাইলেই সেটাকে খুঁজে নিতে পারবি। তারপর ভাব, তোর সব মন খারাপ ওই তারাটার কাছে জমা রাখা আছে… তারাটায় কেউ নেই, কলকাতার ট্রাফিক, টিভি সিরিয়াল, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, এলিয়েন, স্পেসশিপ, কিচ্ছু না। শুধু কয়েকটা একা পাহাড়, বিরাট বিরাট গর্ত আর তোর দুঃখগুলো…”
“তাতে কী লাভ?”
“লাভ মানে! কেউ কোনওদিন ছুঁতে পারবে না ওগুলো। তুই মরে যাওয়ার বহু বছর পরেও না। লোকে চাঁদের দিকে তাকাবে, মাঝে মাঝে আকাশে মঙ্গল গ্রহ আসলে দেখবে, শুকতারার দিকে তাকাবে, কিন্তু একটা ইনসিগনিফিকেন্ট তারাকে আলাদা করে কেউ দেখবে না? তোর দুঃখগুলো শুধু তোর হয়েই রয়ে যাবে…”
“কিন্তু তাতে দুঃখ কমবে কেন?”
“তুই পাগল নাকি? দুঃখ না থাকলে আর কী থাকবে আমাদের? শোন, দুঃখ খারাপ জিনিস নয়। কেবল দুঃখটা অন্য লোকের হাতে পড়ে গেলে কেমন খেলো হয়ে যায়। বিজ্ঞাপন হয়ে যায়, গল্প হয়ে যায়, সিনেমা, আর্ট হয়ে যায়। আর দুঃখ থাকে না…”
“বেশ, আমি না হয় চেষ্টা করে দেখব। কিন্তু আজ তো একটাও তারা দেখা যাচ্ছে না। আজ তোকেই বলি না হয়?”
“বল…”
রূপের মুখের দিকে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে কী যেন ভাবে নীহারিকা। ছেলেটাকে ভারী অদ্ভুত লাগে ওর। সারাক্ষণই কী যেন ভাবনায় ডুবে থাকে। সর্বক্ষণ কিছু একটা লুকিয়ে রেখে চলেছে। অথচ ওকে সব কথা বলে ফেলা যায়। কী একটা ম্যাজিক আছে ওর মধ্যে। অন্তত নীহারিকা সব বলে ফেলতে পারে। রূপ খুব একটা সান্ত্বনা দেয় না, গুরুত্বও দেয় না, তা-ও ওর স্থির চোখদুটো ভেতর থেকে সব কথা যেন টেনে বের করে আনে। নীহারিকার সব থেকে ভালো বন্ধু রূপ।
“আচ্ছা, কিন্তু একটা কথা…”
“কী?”
“যদি কেউ ওই তারাটার সন্ধান জেনে যায়? মানে ধর, ভুল করে তুই ঝোঁকের বশে বলে ফেললি কাউকে?”
রূপ হাসে— “আকাশে তো তারার অভাব নেই, বদলে ফেলতে হবে তারাটা…”
“আর যদি ইচ্ছা না করে? যদি ইচ্ছা করে দুজন মিলে একটা তারায় সব কিছু জমা রাখতে?”
রূপ কিছু একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল, তার আগেই থেমে যায়। আকাশের দিকে কী যেন একটা চোখে পড়েছে তার। আঙুল তুলে বলে, “ওই দেখ একটা তারা বেরিয়েছে।”
নীহারিকা চোখ তুলে দ্যাখে, সত্যি আকাশের এককোণে কেবলমাত্র একটা তারা জ্বলজ্বল করছে। টিমটিমে আলো দিয়ে যেন ভরিয়ে দিতে চাইছে আকাশটাকে।
“কে জানে, কে নিজের দুঃখ জমা রেখেছে ওতে….” নীহারিকা বিড়বিড় করে বলে।
রূপ ওর দিকে না তাকিয়েই বলে, “তোকে বলেছিলাম না, দুঃখ খারাপ কিছু নয়? দেখ, ওটা যারই দুঃখ হোক, আলো আসছে ওখান থেকে। কত লক্ষ মানুষের দুঃখ অন্ধকারের মধ্যেও জেগে থাকে। আমাদের দিকে চেয়ে বলে, “তোমরা কোনওদিন ছুঁতে পারবে না আমাদের। কেবল আমাদের আলো তোমাদের স্পর্শ করে যাবে….”
তারার দিক থেকে রূপের দিকে মুখ ফিরে যায় নীহারিকার। বিড়বিড় করে সে বলে, “ওটাই আমার তারা হবে, রূপ। আমি ওটা বদলে ফেলব না… কোনওদিন না…
আজও সেই তারাটার দিকে চেয়ে শুয়ে আছে নীহারিকা। আজও আকাশের বুক থেকে ঝরে পড়ছে নরম শিশির। যেন কাঁদছে তারাটা। একটু আগে ওর হাতের উপর দিয়ে হেঁটে-যাওয়া পিঁপডেটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
নিজের অ্যাপার্টমেন্টের রুফ গার্ডেনে শুয়ে ছিল নীহারিকা। ইদানীং রোজ রাতেই এসে শুয়ে থাকে এই জায়গাটায়। একটানা চেয়ে থাকে ওই তারাটার দিকে।
চটক ভাঙল মোবাইলের শব্দে। ফোনটা বাজছে। কোমরে ভর দিয়ে উঠে বসে সেদিকে চাইল নীহারিকা। রিসিভ করে কানে চেপে ধরে বলল, “হ্যাঁ সোমাদি, বলুন, আপনি তো ফোন করা ছেড়েই দিলেন। কেমন আছে এখন?”
“ঠিকই ছিল। কাল সুযোগ পেয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল, আবার ফিরিয়ে এনেছি। তবে আপনি বলেছিলেন, যা-ই ঘটুক, আপনাকে ফোন করে জানাতে….”
“হ্যাঁ, কী হয়েছে বিনির?”
ওপাশের লোকটার গলা চেপে আসে। সে বিড়বিড় করে বলে, “না না, বিনিদির নয়। কলকাতা থেকে যে লোকটার আসার কথা ছিল, সে এসেছে।”
“সে তো মিস্টার দত্ত বলেছেন আমাকে। তাতে হয়েছেটা কী?”
“সে বলল, তারও একটা ওরকম বন্ধু আছে। নাম ইলোরা। ইয়ে…. নামটা খুব কমন নয় তো, তাই ভাবলাম… তা ছাড়া…”
“সে নাম তো মিলে যেতেই পারে, আজকাল এসব ইংরিজি কায়দার নাম…”
“লোকটা মাথায় চোট পেয়ে ঘুমের ঘোরে কিছু অঙ্গভঙ্গি করছিল, তাতে মনে হচ্ছিল এই ইলোরার হাতে একটা জার আছে…”
“ইনটারেস্টিং!” নীহারিকার ভুরু কুঁচকে যায়। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে থেকে আবার বলে, “তুমি একটু কেয়ারফুলি নজর রাখো, কিছু আপডেট হলে জানিয়ো। ওর মেজাজ ঠিক আছে তো?”
আরও দু-একটা প্রশ্ন করে ফোনটা রেখে দেয় সে। কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে থাকে ঘাসের উপরে। আবার মেঘের দল এসে ঢেকে দিয়েছে তারাটাকে…।
*
ব্রেকফাস্ট করে পুকুরের ধারে একটু হাঁটতে বেরিয়েছিল রূপ। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে একটা নাম্বার ডায়াল করল। ওপাশ থেকে একটা স্বর ভেসে আসে। সেটা কানে যেতে আর কোনও সম্ভাষণের ধার ঘ্যাঁষে না রূপ— “আপনি আমার থেকে কথাটা গোপন করলেন কেন বলুন তো? আই মিন, আমি তো তেমন কিছু কারণ দেখছি না…
ওপাশ থেকে আশিস দত্তর হতবাক গলা শোনা যায়, “আমি কী গোপন করলাম আবার?
“ঐন্দ্রিলা আমায় আগে থেকে চিনত। আমার গল্প শুনত, আমাকে ফোনও করেছিল…”
কয়েক সেকেন্ড উত্তর আসে না, একটা থতোমতো গলা শোনা যায়, “কিন্তু তুমি এসব জানলে কী করে?”
“ওর একটা বইয়ের ভেতর আমাকে লেখা একটা চিঠি ছিল। ভাগ্যিস ওর নিজের হাতে পড়েনি। আমাকে যেদিন প্রথম ফোন করে, সেদিন খাতায় লিখে রেখেছিল, আজকের দিনটা কোনওদিন ভুলব না …
ওপাশ থেকে উত্তর আসতে সময় লাগে, একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে আসে কথাগুলো— “ও তোমার গল্প শুধু শুনত না। ও বেঁচে ছিল তোমার গল্পগুলো নিয়ে। ওর ঘরের দেওয়াল জুড়ে তোমার লেখা গল্পের লাইন লেখা ছিল। খাতায় খাতায় অসংখ্য ছবি এঁকেছিল তোমার গল্পের। তোমার রেডিয়োতে বলা সব ক-টা শব্দ মনে ছিল ওর। তুমি ওর জীবনের একটা বড় অংশ ছিলে, রূপ। জানি না কেন কিন্তু আর কোনও কিছু নিয়ে এতটা অবসেশন ছিল না ওর। লোকজন তো বিশেষ পছন্দ করত না, কেবল তোমাকে… ওর অ্যাক্সিডেন্টের পর থেকে বাড়ি আর কটেজ—দুটো ঘর থেকেই তোমার সব চিহ্ন সরিয়ে ফেলি আমরা…”
“সরিয়ে ফেলেন কেন?”
“যে কারণে ডায়েরিগুলো সরিয়ে ফেলেছি…”
“এই যে বললেন, গল্পগুলো শুনে ও খুশি থাকত…” শতরূপের মনে হয়, ওপাশের মানুষটা শব্দ না করেই একটা অদ্ভুত হাসি হাসে, তারপর কেটে কেটে বলে, “দু-দিন গেছে, এর মধ্যে বিনিকে ঠিকঠাক চিনতে পারোনি তুমি, তা-ই না?”
“সেটা সম্ভবও না।”
“তা-ও ঠিক… গল্পগুলো শুনে ও খুশি থাকত তা নয়। গল্পগুলো ওকে কোনওভাবে প্রভাবিত করত। ওর ভাবনাচিন্তায় কিছু একটা বদল আসত। সেটা পজিটিভ না নেগেটিভ তা আমরা জানি না। আমি আর রিস্ক নিতে চাইনি, ফলে ওগুলো একেবারেই সরিয়েই ফেলেছি।”
একটুক্ষণ চুপ করে থাকে শতরূপ, তারপর খানিকটা প্রসঙ্গ বদলেই বলে, “সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু আমাকে এসব না-জানানোর কারণ কী?”
ওপাশ থেকে কিছুক্ষণ কোনও শব্দ আসে না। তারপর ততোধিক সরু গলা শোনা যায়, “এসব জেনে তোমার আদৌ কোনও লাভ হত কি? উলটে মনে হত, এ কাজটা তোমাকে ছাড়া অন্য কাউকে দিয়ে করানো সম্ভব না…. বেশি পয়সাকড়ি চেয়ে বসতে হয়তো…
কপালের শিরাগুলো দপদপিয়ে ওঠে শতরূপের। রাগটা গলার মধ্যে লুকিয়েই বলে, “আমার থেকে আর কী কী লুকিয়েছেন আপনি? ভালো কথা, ওর বাবা-মা বিদেশে থাকে বলেছিলেন? তাদের সঙ্গে কথা বলা যায়?”
“সে উপায় নেই। আগেই বলেছি, ওঁরা এসবে জড়াতে চান না। দে ডোন্ট কেয়ার অ্যাবাউট বিনি, ওর সাইকায়ট্রিস্ট আছে, তিনি কথা বলেছেন অলরেডি। বাবা-মা-র ওর জীবনে তেমন কিছু অবদান নেই। যেটুকু জানার, সেটা ডায়েরিগুলো পড়লেই জেনে ফেলবে…”
“আজ্ঞে না। ছোটবেলার ডায়েরির কিছু জায়গার পাতা ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। ছেঁড়াটা দেখে মনে হচ্ছে, সম্ভবত ওর মা-বাবা বা বড় কেউ লেখাগুলো অন্য কারও হাতে যাতে না যায়, সেজন্যেই ছিঁড়ে নিয়েছে…”
কী যেন ভাবেন আশিস দত্ত। তারপর বলেন, “আচ্ছা, তুমি এত করে বলছ যখন, তখন আমি একবার কথা বলে দেখব। তবে ওকে নিজের মেয়ে বলে মানতে অস্বীকার করেন ওঁরা…. তোমার সঙ্গে কথা বলতে রাজি হবার কথা নয়…
“তার আগে একটা কথা জানাতে পারবেন আমাকে?”
“কী কথা?”
“ওর ছোটবেলার ডায়েরিগুলো পড়লে মনে হয়, ওকে ছোট থেকে কেউ ইনফ্লুয়েন্স করত। মাঝে মাঝে ভয়ংকর সব ছবি আঁকত বইখাতা জুড়ে। ‘পুনা’ নাকি ওকে শোনাত এগুলো। সে যদি ইম্যাজিনারি ফ্রেন্ড হয় তাহলে আসল সোর্সটা কে?”
“এত ডিটেলে তো আমি বলতে পারব না। দ্যাখো, ও মেইনলি লোকজনের কাছেই মানুষ হয়েছে। সেভাবে পেরেন্টস ফিগার হিসেবে কাউকে পায়নি। কোনও বই পড়ে যদি জেনে থাকে… তুমি কিছু বুঝতে পারছ না?”
“আপনারা সারাজীবন অবহেলা করেছেন মেয়েটাকে। ওর ছোট থেকে বড় হওয়া অবধি ওর ইমপাল্সগুলোর কোনও খেয়াল রাখেননি। আজ মেয়ে সুইসাইডাল হয়ে যেতে হঠাৎ টনক নড়েছে কেন বলুন তো?”
একটু অপরাধী গলাতেই বলেন আশিস দত্ত, “সেটা তুমি ভুল বলোনি ভাই। আসলে আমি ব্যাবসা সামলে… যাক গে, আর কী জানতে পারলে তুমি?”
“ডায়েরিগুলো আদৌ তেমন কাজে লাগছে না। ছোট থেকেই ডায়েরির পাতায় আর ঘরের নানা জায়গায় একটা কালচে ধরনের মুখ আঁকে ও। দেখে বোঝা যায় মুখটা আলাদা আলাদা নয়। একটাই মানুষ বা শয়তানের মুখ। এ মুখটা ও দেখল কোথায়?”
“বাচ্চা বয়সে মানুষ কত কিছু আঁকে খাতার পাতায়…
শতরূপ মৃদু হাসে— “আমার মতো আপনিও ঐন্দ্রিলাকে সম্যক চেনেন না দেখছি। যাক গে, আর-একটা প্রশ্ন!”
“কী?”
“এক সপ্তাহে যদি সব ঠিকঠাক হয়ে যায়, তারপর কী করবেন ওকে নিয়ে?”
“আপাতত ভেবে রেখেছি, কলকাতায় নিয়ে আসব। এখানে থেকে আবার পড়াশোনা করবে। ছোট থেকে ভায়োলিন শিখেছে। খুব ভালো বাজাতে পারে। আমার একটা স্কুল আছে এখানে, সেখানে বিনে পয়সায় বাচ্চাদের মিউজিক শেখাবে। তার মাঝে এই ক-দিনে অতীত মনে করানোর দায়িত্ব তোমার…”
“আর এক সপ্তাহ পরে যদি আমার খোঁজ করে?”
“তুমি ভুলে যাচ্ছ শতরূপ, ওর ইতিহাসটা তুমি নিজের মতো করে সাজাতে পারবে। এমনভাবেই সাজাবে, যাতে তোমার খোঁজ ওকে না করতে হয়।”
“তা কী করে সম্ভব!”
“কী করে সম্ভব আমার থেকে তুমি ভালো জানবে। গল্পটা আমি লিখছি না তুমি লিখছ?”
ফোনটা রেখে দিয়ে আবার কিছুক্ষণ পুকুরের ধারে পাক খায় শতরূপ। কাল রাতে ছেলেটাকে যেখানে ডুব দিতে দেখেছিল, সেই জায়গাটা ভালো করে খতিয়ে দ্যাখে। বিশেষ কিছু চোখে পড়ে না।
বাড়ির দিকে ফিরতে যাচ্ছিল। একটু দূরে বিনয়কে দেখতে পেল। একটা জলের পাইপ থেকে জল ছিটিয়ে দিয়ে গাড়িটাকে পরিষ্কার করছে। সেদিকে এগিয়ে গেল শতরূপ।
“এখানে কোনও বাচ্চা ছেলে-টেলে থাকে নাকি?”
“এ বাড়িতে! না তো! কেন?” অবাক হয়ে উত্তর দেয় বিনয়। “কাল একটা বাচ্চাকে দেখলাম মনে হল পুকুরের কাছে…” বিনয়ের ভুরু দুটো কুঁচকে যায় এবার— “এ বাড়ির চারপাশে তো জঙ্গল, দাদা। জনপ্রাণীর বাস নেই। বাচ্চা ছেলে আসবে কোথা থেকে?”
শতরূপ হাসে, তারপর আচমকা গম্ভীর হয়ে যায়, “তাহলে মনে হয় ভূত আছে…”
বিনয় গাড়ির উপর কাপড় ঘষতে ঘষতে বলে, “তা দু-একটা থাকা বিচিত্র নয়, যাবেন নাকি দেখতে?”
“কী? ভূত?”
“সেই যে বলেছিলাম, মহাকালদেবের মন্দির? সেটা নিয়ে অনেক গল্প আছে কিন্তু। আমি অবশ্য সব জানি না। বিনিদি জানে… গেছেও অনেকবার…”
চোখ তুলে দোতলার বারান্দার দিকে তাকায় শতরূপ। বারান্দায় ঝুলন্ত দোলনায় বসে অল্প অল্প দুলছে ঐন্দ্রিলা। তার চোখ দুটো বন্ধ। একমনে কী যেন ভাবছে সে।
“বেশ, আজ রাতে গাড়ি বের কর তাহলে… দেখি কেমন ভূত…”
“কাল রাতে!” বিনয় একটু ইতস্তত করে, “কাল রাতে তো ক্যাম্পফায়ার হবার কথা আছে।”
“সে কী! কে ঠিক করল?”
“স্যারই বলেছেন। মাথা ঠিক হয়ে গেলে বিনিদি তো কলকাতায় চলেই যাবেন, তার আগে এখানে…”
একটু ধন্দে পড়ে শতরূপ। মানে সত্যিই আশিস দত্ত বিনিকে কলকাতায় নিয়ে যেতে চান।
বিনয়ের দিকে ফেরে শতরূপ – “আচ্ছা বেশ, সেসব মিটে গেলে তুমি না হয় পরশু মন্দিরে নিয়ে যেয়ো।”
বিনয় একটু সরে আসে শতরূপের দিকে, চাপা গলায় বলে, “মন্দিরের আশপাশে ঘুরলে কোনও অসুবিধা নেই। শুধু গর্ভগৃহের ভেতরে ঢোকা মানা আছে…. বিশেষ করে বিনিদিদিকে নিয়ে….”
“কেন?”
“আমি ঠিক জানি না, জংলুদা বলেছিল, ছোটবেলায় বিনিদিদি নাকি ওই গর্ভগৃহের বন্দি হয়ে গিয়েছিল একবার। সারারাত আর ঘর থেকে বেরোতে পারেনি। সকালে ফিরে এসে বলেছিল, ওখানে কী একটা যেন আছে। কেউ যেন ওখানে না যায়…”
“গর্ভগৃহের ভেতরে কে আছে?” শতরূপ থমথমে গলায় জিজ্ঞেস করে। বিনয় উত্তর দেয় না। আবার বারান্দার দিকে তাকায় শতরূপ। বিনি একইভাবে বসে আছে ওর চেয়ারে। এখনও তাকিয়ে আছে শূন্যের দিকে। বিড়বিড় করে শতরূপ বলে, “যে ছিল, সে কি এখনও আছে?”
*
“তুই ঘুমের ঘোরে কী দেখিস বল তো?” প্রশ্নটা শুনে একটু চমকে ওঠে শতরূপ। ঘুমের সময় ওকে কি লক্ষ করেছে বিনি?
“তুই শুনলি কখন?”
“ওই যে গল্প বলতে বলতে মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়িস। আমার তখন ঘুম আসে না। শুয়ে শুয়ে শুনি, তুই কী বলছিস।” মা চরম ছিল
“কী মনে হয় শুনে? কী দেখি?”
“কয়েকটা দৈত্য তাড়া করে তোকে। তুই কার একটা দরজায় গিয়ে দরজা খটখট করিস, কিন্তু সে খোলে না।”
“দৈত্যগুলোর এক-একটা নাম আছে, বিষণ্ণতা, একাকিত্ব, হতাশা, বিফলতা….”
“আর ওই দরজাটা? যেটার দরজা খটখট করিস তুই?”
“আমার এক ছোটবেলার বন্ধু, ইলোরা…”
“খুব কাছের বন্ধু, তা-ই না?”
একটা দমকা হাওয়া বইছে ওদের ঘিরে। ওদের এই রাতগুলো কখন শেষ হয়ে যাই, ওরা নিজেরাও বুঝতে পারে না। এই বারান্দাটায় ঘড়ি নেই। সময়ের খেয়াল থাকে না। শুধু আলো আর অন্ধকারের পার্থক্য বোঝা যায়। শুধু সকাল আর রাত আছে। রাত হলে দুটো অন্য মানুষ হয়ে যায় ওরা। “আমি বড় হওয়ার পর কী হল?” একসময় জিজ্ঞেস করে বিনি।
“তেরো বছর বয়সে তোর মা-বাবা বিদেশে চলে যায়। তারপর থেকে তুই কাকার কাছেই মানুষ। ছোট থেকে তুই খুব ভালো ভায়োলিন বাজাতে পারিস, এই, ওটা ভুলে যাসনি তো?”
“উঁহু, পারি এখনও…”
“একদিন শোনাবি আমাকে?”
“এখানে রাতে ভায়োলিন বাজালে সবার ঘুম ভেঙে যাবে। সারাদিন পরিশ্রম করে ওরা…”
“তাহলে কোথায় শোনাবি?”
“এমন কোথাও যেখানে চারপাশে কেউ নেই। অনেকটা খোলা জায়গা থাকবে…”
শতরূপ হাসে— “এখানে ওরকম জায়গার অভাব নেই। বিনয় বলছিল নাকি ক্যাম্পফায়ার হবে কাল….”
হঠাৎ করেই ভুরু কুঁচকে যায় বিনির— “এই রূপ, আমার মনে পড়েছে।”
“কী মনে পড়েছে? ক্যাম্পফায়ারের কথা?”
“উঁহু, ওই মেয়েটার নাম। ইলোরা। শুনে থেকেই মনে হচ্ছিল, নামটা আগে কোথাও শুনেছি।”
“কোথায় শুনেছিস?”
“ওই নামে আমারও একটা বন্ধু ছিল, যদ্দূর মনে পড়ছে। তুই জানিস না? মৃণালিনীর কথা তো জানতিস, এর কথা…”
শতরূপ একটু থতোমতো খায়, “আমি ঠিক…”
হঠাৎই বিনির মুখ থেকে উত্তেজনার রেখাগুলো মুছে যায়, “ভুলে গেছিস হয়তো… ভুলে গেছিস….”
জোনাকির রঙ – ৬
(ষষ্ঠ অধ্যায়)
For you – I’ve waited all these years
For you I’d wait ‘til kingdom come
Until my day- my day is done
And say you’ll come and set me free
Just say you’ll wait – you’ll wait for me
চারপাশে বনজঙ্গল ঘিরে রেখেছে ওদের। মাঝখানে গাছপালার ফাঁকে একটুখানি ফাঁকা জায়গা। সেই জায়গাটা একটু পরিষ্কার করে কাঠকুটো জড়ো করে ক্যাম্পফায়ার করা হয়েছে। তার উপর মাংস ঝলসানো হচ্ছে। ক্যাম্পফায়ারকে ঘিরে বিছিয়ে আছে কয়েকটা পাথর। সেই পাথরগুলোর উপরেই বসেছে ওরা।
এই শীতের রাতে আগুনের উত্তাপে বেশ আরাম হচ্ছে গায়ে। গিটারটা আজ সকালে বিনয়ই জোগাড় করে এনেছিল কোথাও থেকে। সেটা নিয়েই এতক্ষণ গান গাইছিল শতরূপ। এবার গান থামিয়ে গিটারটা পাশে নামিয়ে রেখে বিয়ারের বোতলটা হাতে তুলে নিল। গলাটা একেবারে শুকিয়ে গেছে। শতরূপ আর ঐন্দ্রিলার হাতেই কেবল বিয়ারের বোতল। বাকিরা অন্য কী একটা পান করছে। তাতে নেশাটা আরও চড়া হয়। জিনিসটার গন্ধ একেবারে পছন্দ হয়নি শতরূপের। মা
ঐন্দ্রিলা এতক্ষণ ওর পাশেই বসে ছিল। গান থামতে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “কী সুন্দর রে গানটা!”
“হ্যাঁ, আমি যখন রেডিয়োতে কাজ করতাম, তখন মাঝেমধ্যে এই গানটার রিকোয়েস্ট আসত। তার আগে শুনিনি, ওখান থেকেই শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল…”
গোটা তিনেক বিয়ারের বোতল শেষ করে ফেলেছে ঐন্দ্রিলা। ক্যাম্প থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে ওদের গাড়িটা। গাড়ির সামনেই বসে আছে কয়েকটা স্থানীয় উপজাতি মেয়ে। সামান্য কিছু টাকাপয়সা দিলে ছোটখাটো অনুষ্ঠানে নাচ দেখায় ওরা। আজ এখানে আসার আগে জংলুই নিয়ে এসেছে ওদের।
এতগুলো মানুষ এক জায়গায় হয়ে একটা ছোটখাটো গুঞ্জন শুরু হয়েছে। কখনও নিজেদের মধ্যে গল্প করছে ওরা, কখনও আবার শুরু হচ্ছে গান। এতক্ষণে অনুরোধ আসে বিনির কাছে। ভায়োলিন বাজিয়ে শোনাতে হবে। বিনি একটু হেসে পাথর থেকে উঠে ভায়োলিনটা নিয়ে এগিয়ে যায় পাশের ন্যাড়া পাথরটার দিকে। ও হ্যালান দিয়ে বাজাতে পছন্দ করে না।
ক্যাম্পফায়ারের ঠিক পাশে বসে একটা পা ভাজ করে রাখে পাথরের চাতালটার উপর। তারপর ভায়োলিন কাঁধে তুলে নেয়।
বিনি উঠে যাওয়ায় বিনয় একা পড়ে গিয়েছিল। সে এসে শতরূপের পাশের পাথরটায় বসে পড়ে। হাতের গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে রূপের দিকে চেয়ে বলে, “আপনি এর আগে এদিকটায় আসেননি, তা-ই না?”
“না, নর্থ বেঙ্গলে আগে আসিনি।”
“বিনিদিও কলকাতায় যায়নি কখনও। অথচ মনে হয়, আপনাকে করে থেকে চেনে।”
“চেনে তো বটেই, রেডিয়োতে শুনত যখন….”
“না না, সেটা বলছি না। তারও আগে থেকে….”
“তার আগে থেকে বলতে?”
“মানে ছোটবেলা থেকে। স্যারের কাছে এসে থাকার আগে থেকে…”
“সেটা কী করে সম্ভব? আমি রেডিয়ো জয়েন করেছি না হলেও দু-হাজার ষোলোর দিকে। বিনি ওখানে থাকতে শুরু করেছে তার বছর চারেক আগে…”
বিনয়ের বদলে একবার জংলু উত্তর দেয়, “সম্ভব নয়, সেইজন্যই তো অবাক লাগে। আপনাকে প্রথমবার দেখে তো আমি চমকে গিয়েছিলাম। বিনিদি খাতায় প্রচুর ছবি আঁকত। তার অনেকগুলোর সঙ্গে আপনার মুখের প্রচুর মিল।”
কথাগুলোতে অকারণেই অস্বস্তি হয় শতরূপের। প্রসঙ্গ ঘোরাতে বলে, “তুমি এখানে এতদিন ধরে আছ, বাড়ি যেতে ইচ্ছা করে না?”
“আমার বাড়ি এখানেই ছিল, স্যার। এখন আর কেউ থাকে না সেখানে। স্যারের দাদা, মানে বিনিদির বাবার কাছে আমার বাবা চাকরি করতেন। ওখানেই থাকতাম আমরা…”
“মানে ভদ্রলোককে তুমি চিনতে?”
জংলু একটু চাপা গলাতেই বলে, “চিনতাম, তবে ঠিক পছন্দ করতাম না।”
“কেন?”
“লোকটা হেবি রগচটা ছিল। কেন যেন সব সময় খুব রেগে থাকত। একটু এদিক-ওদিক হলেই সর্বনাশ! চড়থাপ্পড় মেরে দিত কখনও কখনও, গালিগালাজ করত…”
“তার মানে তুমি বিনিকে ছোট থেকে দেখেছ?”
“দেখেছি বললে ভুল হবে। আসলে আমি তো এই কটেজটাই দেখাশোনা করতাম। তখন এখানে তো বিনিদিদি থাকত না। ন-মাস, ছ-মাসে আসত। কখনও পাঁচ-ছ-দিন, আবার কখনও দু-তিন দিন থেকেই চলে যেত।”
“তোমার সঙ্গে তখন কথাবার্তা হত না?”
“আমিই বলতাম না। কেমন যেন ভয়-ভয় লাগত।”
“ভয়! কীসের?”
“সব সময় চোখের তলায় কালি, চুল উশকোখুশকো, অত বড়লোকের মেয়ে কিন্তু সব সময় কেমন মন খারাপ করে রয়েছে। নিজের মনে কী যেন ভেবে চলেছে সারাদিন…”
ভায়োলিনের উপর ছড় টানতে শুরু করেছে ঐন্দ্রিলা। করুণ সুর নয়, যেন নাচের তালে তালে হাওয়ার ভেসে এগিয়ে যাচ্ছে একঝাঁক কিশোরী মেয়ে। সেই সুরের তালে তালে ওরা হাততালি দিতে শুরু করেছে। একটু দূরেই ক্যাম্পফায়ারের আগুন থেকে চিড়বিড় করে কাঠ ফাটার শব্দ শোনা যাচ্ছে।
ঐন্দ্রিলার চোখ দুটো বন্ধ। একটানা বাজিয়ে চলেছে। রূপ নির্বাক হয়ে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কী আশ্চর্য একটা ম্যাজিক আছে যেন মেয়েটার ভায়োলিনের তারগুলোর মতোই ছড় দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করছে। কোনও এক মধ্যে! মনে হয়, সে হয়তো আশপাশের সব ক-টা মানুষকে ওই বিশেষ সুর তুলতে চাইছে বাদ্যযন্ত্রে। সেই সুর বিষাদের, নাকি আনন্দের, নাকি অন্য কোনও অনাবিষ্কৃত অনুভূতির, তা বোঝা যায় না।
একসময় ভায়োলিন থামিয়ে উঠে পড়ে ঐন্দ্রিলা। ওরা একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠেছে সবাই। পাশের গ্রাম থেকে আসা স্থানীয় মেয়েদের সবাইকে এবার ডেকে নেয় ঐন্দ্রিলা। ফাঁকা জায়গাটায় ওদের নাচ শুরু হয়। সবাই মিলে উঠে দাঁড়ায়।
পানীয়ের গন্ধে ভরে আছে জায়গাটা। সবারই নেশা জমে উঠেছে ধীরে ধীরে। রাত বাড়ছে। লোকসংগীতের সুরে দুলতে থাকে ওদের কোমর। কেউ কারও দিকে খেয়াল রাখে না আর।
শতরূপের এত সহজে নেশা হয় না। ও বিয়ারের বোতলটা হাতে ধরে জঙ্গলের একটা গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একমনে তাকিয়ে দেখছিল স্থানীয় মেয়েগুলোর নাচের দিকে। হঠাৎ করে পেছন থেকে টোকা। কে যেন ডেকে ওঠে ওকে। পেছন ফিরে ঐন্দ্রিলাকে দেখতে পায়। ওর হাতেও বিয়ারের বোতল। ঠোঁট ভিজে….
“এই, জঙ্গলে হাঁটতে যাবি?”
“এত রাতের জঙ্গলে হাঁটব! মানে কেন?”
‘কেন মানে আবার কী? রাত্রির জঙ্গল দেখতে ইচ্ছা করছে আমার। তোর করছে না?”
শতরূপ ব্যঙ্গের হাসি হাসে, “তোর নেশা হয়ে গেছে। ওরা একটু পরেই খেতে বসবে, খুঁজবে আমাদের…”
“খুঁজুক না হয়…” বিনির কথা জড়িয়ে যাচ্ছে।
“আর জঙ্গলে হারিয়ে গেলে?”
“এত বড় ক্যাম্পফায়ার হচ্ছে, আগুনের আলো দেখে আর শব্দ শুনে ফিরে এলেই হল…” ওর হাত ধরে আবার টান দেয় ঐন্দ্রিলা— “এত ঘাবড়ানোর কী আছে? চলে আয়…”
ঐন্দ্রিলার পা টলে যাচ্ছে। শতরূপ হেসে বলে, “এইটুকু বিয়ারে নেশা হয়ে গেছে তোর?”
“আমার তো খাওয়ার অভ্যাস নেই….”
“নেশার ঘোরে রাস্তা চিনতে না পারলে কী হবে?”
“তোর নেশা হয়েছে?”
“না।”
“তাহলে তুই চিনিয়ে দিবি…..
অনিচ্ছাসত্ত্বেও ঐন্দ্রিলার হাতের টানের কাছে নতিস্বীকার করে শতরূপ। দুজন মিলে ঢুকে আসে জঙ্গলের পথে। শুকনো পাতার উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই ঐন্দ্রিলার দিকে লক্ষ রাখে রূপ। মেয়েটা যেভাবে টলছে, তাতে যে-কোনও সময় পড়ে যেতে পারে।
“তুই সব কিছু ভুলে গেলি, তা-ও এত ভালো ভায়োলিন কী করে বাজাতে পারিস বল তো?” শতরূপই প্রশ্ন করে প্রথম।
বোতল মুখে ঠেকায় ঐন্দ্রিলা— “এগুলো মাল মেমোরির ব্যাপার। মনে থেকে যায়। ভালো কথা, আর কী কী পারি আমি?”
শতরূপ মনে করার চেষ্টা করে, “তুই ভালো ছবি আঁকতে পারতিস। তবে যেগুলো আঁকতিস, তার বেশির ভাগই কেমন পিকিউলিয়ার টাইপের। যেমন একটা ছবির কথা আমার মনে আছে।”
“কীরকম ছবি?”
“ধর একটা বিরাট বড় জঙ্গলের ভেতর দিয়ে সরু একফালি রাস্তা। সেই রাস্তার একেবারে শেষ প্রান্তে সূর্য ডুবছে। তবে নর্মাল সূর্য নয়। সূর্যের ভেতরে একটা দরজা দেখা যাচ্ছে।”
“যাঃ শালা! সূর্যের মধ্যে দরজা!”
“ছবিটা খুব সুন্দর ছিল। কিন্তু কেন এঁকেছিলি, বুঝতে পারিনি।”
“আমারও তো মনে পড়ছে না। যাক গে… আর কী এঁকেছিলাম?”
“একটা মনস্টার!”
“মনস্টার! কীরকম?”
“মানে মনস্টার যেরকম দেখতে হয় আর কী… কুচকুচে কালো… মুখটা বীভৎস …”
ভুরু কুঁচকে কী যেন ভাবে ঐন্দ্রিলা। তারপর বলে, “শালা কোনও কিছুর কথাই মনে পড়ে না। এই দাঁড়া দাঁড়া…” কথাটা বলে একটা হাত দিয়ে শতরূপকে থামিয়ে দেয় সে। তারপর ওর জামা টেনে বলে, “আমার না একটা গল্পের কথা মনে পড়ছে…”
“কীসের গল্প?”
“সেই যে একটা লোক গিটার বাজাত। তারপর তার বউকে খুঁজতে কোথায় একটা গিয়েছিল, পেছন ফিরে তাকানো বারণ ছিল… ধুর বাল, পুরোটা মনে পড়ছে না…” ওর জামাটা ছেড়ে দেয় ঐন্দ্রিলা।
বোতলে আর-একটা চুমুক দেয় শতরূপ— “গিটার নয়, হার্প বাজাত আর গান গাইত। অর্ফিয়াস আর ইউরিডাইসের গল্প, আমার মনে আছে…”
“বেশ, শোনা আমাকে…”
বিনির কাঁধে একটা হাত রাখে শতরূপ। ক্যাম্পফায়ার থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছে ওরা। গানের সুর আর শোনা যাচ্ছে না এখান থেকে।
“গ্রিস দেশের উপকথা। অর্ফিয়াস ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গায়ক। তার গান শুনে মোহিত হত না এমন মানুষ তো ছার, এমন কোনও দেবতাও ছিল না। তো এই অর্ফিয়াসের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল সুন্দরী ইউরিডাইসের সঙ্গে। ইউরিডাইসকে ভীষণ ভালোবাসত ছেলেটা। কিন্তু বেচারার কপাল খারাপ। বিয়ের দিন ইউরিডাইসকে এসে কামড়াল একটা বিষধর সাপ। বিয়ে হওয়ার আগেই ইউরিডাইস অফিয়াসের কোলেই মারা গেল।
“গায়ক অর্ফিয়াস স্ত্রী-র মৃত্যু কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। সে ঠিক করল, নরকের দেবতাদের কাছে দরবার করে ফিরিয়ে আনবে ইউরিডাইসকে। শুরু হল তার অভিযান। নরকের দরজা অবধি হেঁটে গেল সে। হাতে কেবল সেই হার্প। নরকের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে এক তিনমাথা হিংস্র কুকুর সার্বেরাস। সে আক্রমণ করবে কী? অর্ফিয়াসের মিষ্টি গান শুনে ব্যাটা ঘুমিয়েই পড়ল। মৃত আত্মাদের নরকের নদী ‘স্টিক্স’ পারাপার করায় যে ক্যারন, সে-ও গান শুনে অর্ফিয়াসকে আটকাল না। এমন করে গান গাইতে গাইতে শেষে সে উপস্থিত হল নরকের দেবতা হেদিসের কাছে। “হেদিস অর্ফিয়াসের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত ইউরিডাইসকে মুক্তি দিতে রাজি হল। কিন্তু একটা শর্তে… অর্ফিয়াস যখন নরক থেকে বেরোবে, তখন ইউরিডাইসের আত্মা ওকে অনুসরণ করে আবার জীবিত মানুষের জগতে ফিরে যাবে। কিন্তু এই যাবার পথটুকুতে কিছুতেই অর্ফিয়াস পেছন ফিরে তাকাতে পারবে না। তাকালেই ওর হবু বউয়ের আত্মা চিরকালের মতো ফিরে যাবে নরকে….
“শর্তে রাজি হয়ে আবার নিজের জগতের পথে হাঁটা দিল অর্ফিয়াস। কিন্তু যতই এগোয়, ততই সন্দেহ হতে থাকে ওর। সত্যি ওর পেছন পেছন আসছে তো ইউরিডাইস? পায়ের আওয়াজ নেই কেন? নিশ্বাসের আওয়াজ নেই কেন? ওকে ডাকছে না কেন? কিছুতেই নিজেকে আর সামলাতে পারল না অর্ফিয়াস। মাত্র একবারের জন্য, একটা পলকের জন্য পেছন ফিরে চাইল…. আর সঙ্গে সঙ্গে ওকে অনুসরণ-করা ইউরিডাইসের আত্মা ডুবে গেল নরকের অন্ধকারে। দুই প্রণয়ীর চিরবিচ্ছেদ ঘটল…..
“অর্ফিয়াস নিজের জগতে ফিরে এল, কিন্তু সে আর আগের মানুষটি রইল না। সে ঠিক করল, আর কোনওদিন কাউকে ভালোবাসবে না সে। একটা পাথরের উপর বসে সে কেবল পৃথিবীর সব ব্যর্থ প্রেমের গান গাইতে থাকল। তার গান শুনে পৃথিবীর মানুষ কেঁদে কেঁদে আকুল হয়ে গেল, কিন্তু ইউরিডাইস আর কিছুতেই ফিরল না ওর কাছে…
“তো এই সময়ে অর্ফিয়াসের উপরে নজর পড়ল একঝাঁক শয়তান ডাইনির। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করল, কী এমন ছিল ইউরিডাইসের মধ্যে, যে অর্ফিয়াস আর কাউকে ভালোবাসবে না? তারা একে একে অর্ফিয়াসের মন জয় করার চেষ্টা করল কিন্তু ব্যর্থ হয়ে একসময় হিংস্র নখের আঁচড়ে অর্ফিয়াসকে মেরে ফেলল…”
গলা শুকিয়ে গিয়েছিল শতরূপের। মদের বোতলে বড় করে একটা চুমুক দিল সে।
“তারপর কী হল?”
“কী আবার হবে? যা হবার ছিল। মরার পর আবার ইউরিডাইসের সঙ্গে দেখা হল অর্ফিয়াসের। তবে পৃথিবীতে নয়, মৃত্যু-পরবর্তী জগতে। শোনা যায়, এখন নাকি সেই অবিনশ্বর জগতে দুজনে একসঙ্গে হাত ধরে হেঁটে বেড়ায়। মাঝে মাঝে অর্ফিয়াস ইউরিডাইসকে ফেলে একটু এগিয়ে যায়, তারপর একটু পেছন ঘুরে প্রাণ ভরে দ্যাখে ইউরিডাইসকে। আর কোনও ভয় নেই ওদের…”
গল্পের মধ্যে যেন হারিয়ে গিয়েছিল ঐন্দ্রিলা। হঠাৎই বেশ কয়েক পা পিছিয়ে যায় ও। শতরূপ অবাক হয়ে পেছন ফেরে— “তুই পিছিয়ে গেলি কেন?”
“আমি ইউরিডাইস! তুই পেছন ফিরে তাকালি, আমি চললুম…” বলেই জঙ্গলের ভেতরের দিকে দৌড় দেয় ঐন্দ্রিলা। শতরূপ হন্তদন্ত হয়ে ছুট দেয় তার পেছনে। মেয়েটা যেভাবে মাতাল অবস্থায় আছে, তাতে একবার রাস্তা হারিয়ে ফেললে একটা বিপদ ঘটে যেতে সময় লাগবে না।
একটা গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে ঐন্দ্রিলা, শতরূপ কাছে যেতেই আবার সরে যায় অন্য একটা গাছের কাছে।
“অদ্ভুত তো, এই মাতালকে জঙ্গলে আনাই ভুল হয়েছে…” চিৎকার করে বলে রূপ।
এখন আর ঐন্দ্রিলাকে দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারের মধ্যে হারিয়ে গেছে সে। কোথা থেকে যেন প্রশ্ন ভেসে আসে, “তোর কী মনে হয়, কেন পেছন ফিরে তাকিয়েছিল অর্ফিয়াস?”
“বউকে দেখেনি অনেকদিন, মন খারাপ করছিল…”
আবার অন্য জায়গা থেকে উত্তর আসে, “উঁহু, দেখতে চাইছিল সত্যি বউ আছে না অন্য কেউ?”
“অন্য কেউ আসবে কেন?”
“নরক থেকে আসছে যখন, কোনও ভূতপ্রেত বউয়ের বেশ ধরে পিছু নিতে পারে, ক্ষতি কী?”
“ব্যাস, সন্দেহ করে লাভ কী হল? বউ, ভূত যা-ই হোক, গেল তো…”
“এখন ধর, অন্ধকারের ভেতর থেকে একটা ঐন্দ্রিলা বেরিয়ে এল, তুই বুঝবি কী করে সেটাই সত্যি ঐন্দ্রিলা? হতে পারে, এই জঙ্গলের ভেতরে এমন কেউ আছে যে রূপ ধরতে পারে….”
আওয়াজটা শুনে শুনে কোনওরকমে ফলো করছে শতরূপ। এতক্ষণ ওর মাথাটাও গুলিয়ে যেতে শুরু করেছে। সত্যি কি হারিয়ে গেল জঙ্গলের মধ্যে?
“কী রে? বললি না তো, আমাকে খুঁজে পাবি কী করে? আমার মতো দেখতে আর-একটা মানুষ সামনে এসে দাঁড়ালে?”
ঐন্দ্রিলা হঠাৎ অনুভব করতে পারে, যে গাছটার আড়ালে ও লুকিয়ে আছে, ঠিক সেই গাছটার অন্যদিকে এসে দাঁড়িয়েছে একটা মানুষ। চেয়ে আছে ওর দিকে। ওর ঘাড়ের উপরে তার নিশ্বাস এসে পড়ছে, সেই সঙ্গে ভেসে আসে কয়েকটা শব্দ, “চোখ বন্ধ করে। যে মানুষটা সামনে এসে দাঁড়ালে সব কোলাহল স্তব্ধ হয়ে যায়, যে সামনে থাকলে মায়ের গর্ভের মতো নিরাপত্তা আগলে রাখে, পৃথিবীর সব আলো নিবে গিয়ে চোখে এক অদ্ভুত আরাম দিয়ে যায় মনের ভেতর, তাকে কেবল চোখ বন্ধ করে চিনে নিতে হয়…”
ঐন্দ্রিলা পেছন ফিরতে যেতেই শতরূপের বুকে জড়িয়ে যায় ওর মাথাটা। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে ওর। শতরূপ সরে আসতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই ঐন্দ্রিলা দুটো হাতে ওর কোমর জড়িয়ে ধরেছে। আলতো করে ওর বুকে আশ্রয় নিয়েছে বিনির মাথাটা। কী যেন খুঁজতে থাকে কিছুক্ষণ, তারপর ওইভাবেই স্থির হয়ে যায় মেয়েটা।
ঢিমে তালে জঙ্গলের ভেতরে বাতাস বইতে থাকে। আবার কানে আসতে থাকে স্থানীয় গানের সুর। কিন্তু মানুষের কোলাহল কোথায় যেন ডুবে যায়। জঙ্গলের ঠিক এই জায়গাটায় হয়তো বহু বছর কারও পা পড়েনি। কেউ চোখ মেলে তাকায়নি এই আকাশছোঁয়া গাছগুলোর কাণ্ডের দিকে। তারা যেন এই মুহূর্তটার জন্যেই অপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে ছিল এতগুলো বছর। এই ফাঁকটুকুকে অন্ধকারে ঢেকে দেয় তারা। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে যায় কোন মহাশূন্যে।
“যদি এভাবেই থেকে যাই সব সময়? নরক হোক, পৃাথবা হোক, কিংবা কোনও জঙ্গল হোক, থাকতে দিবি না?”
“আমি আসলে…” ইতস্তত করে শতরূপ।
“তুই আসলে হারিয়ে গেছিস এই জঙ্গলের ভেতর। তোকে আর কেউ খুঁজে পাবে না কোনওদিন, তা-ই না?”
“হ্যাঁ, কিন্তু বাইরে ওরা হয়তো খুঁজবে আমাদের।”
“কেউ খুঁজছে না আমাদের। কেবল আমি তোকে খুঁজে চলেছি বহুকাল ধরে…”
এই ঐন্দ্রিলাকে আগে কখনও দেখেনি শতরূপ। দূর থেকে একটা ডাক শোনা যায়। বিনির নাম ধরে ডাকছে কেউ। হঠাৎ ওদের খেয়াল হয়েছে অনেকক্ষণ ধরে দুজন ক্যাম্পফায়ারের আশপাশে নেই। ঐন্দ্রিলা শক্ত হাতে ধরে আছে ওকে। কিছুতেই ছাড়তে চাইছে না। মাথার উপরে আকাশটাও ঢাকা পড়ে গেছে অন্ধকারে। সমস্ত চরাচর ডুবে গেছে। শুধু ওই ছাড়তে না-চাওয়া হাতটা আগলে রেখেছে ওকে।
এভাবে কি সহজে ধরতে পারে কেউ? ও নিজে কি কখনও ধরেছে * কাউকে? নাকি ঐন্দ্রিলার আরও কোনও গল্প আছে, যা ও জানে না? সে গল্পটা জানলে ও নিজেও এভাবেই জাপটে ধরতে পারবে ওকে… হঠাৎ একটু আগে নিজের গাওয়া গানটা মনে পড়ে যায় ওর… কী যেন একটা মানে আছে গানটার…
For you I’d wait ‘til kingdom come
Until my days- my days are done
And say you’ll come and set me free
Just say you’ll wait – you’ll wait for me
