প্ৰশ্ন – কৌশিক সামন্ত
উফ এই সময়ই কারেন্টটা যেতে হল! যাওবা খুঁটির মাথায় দু-একটা বাল্ব তো জ্বলতো!
না না, নীহারবাবুর কোচিং থেকে এতটা রাত করে বেরনো একদম উচিত হয়নি নীরুর।
কি করবে সে? নাথতলার মোড় দিয়ে কি ঘুরে যাবে? কিন্তু ওখানে আবার সেই বাঁদর ছেলেগুলো তাস পেটাচ্ছে, সঙ্গে কেউ নেই দেখলেই বাঁদরগুলো ফেউ ডাকবে।
আবার এদিক দিয়ে গেলে তো বুড়ো বটতলা পড়বে।
বুড়ো বটতলা, উফ নামটা মনে পড়তেই, নীরুর গায়ের রোমগুলো খাড়া হয়ে যায়, ওখানেই তো মোটা ডালটায় ঝুলে ছিল রবীনের লাশটা, চোখ জিভ বেরিয়ে আসা শরীরটা যেন কিছু বলতে চাইছিল।
কি বলতে চাইছিল, একমাত্র নীরু সেটা জানে।
ধুর, এসব কি উল্টোপাল্টা সে ভাবছে, মানুষ মরে গেলে তার কি আর অস্তিত্ব থাকে? নাকি বুকে জমে থাকা কথাগুলো নতুন করে বলার ক্ষমতা?
“নীরু।”
কি? কে ডাকলো তার নাম ধরে? চমকে ওঠে নীরু, খেয়াল করে সে আনমনে কখন চলে এসেছে বুড়ো বটতলায়।
“নীরু, এই নীরু, আজও আমার প্রশ্নের উত্তর দিলি না তো?”
এ গলা নীরু চেনে, ভালো করেই চেনে সে, এ গলা সে কোনোদিনও ভুলতে পারবেনা, অন্তত পরশুদিনের পরে তো নয়ই। ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সে উপরের দিকে তাকায়।
ঐ তো মোটা ডালটায় ঝুলছে রবীনের লাশটা, ঠিক আগের মতই, ওর চোখগুলো যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে, কিছু বলতে চাইছে, কি বলঙে চাইছে সেটা একমাত্র নীরুই জানে।
*****
“দেখো কৌশিক, ডেমনিক পযেসানটা কিন্তু খুব কমন একটা ফেনোমেনোন, আই মীন প্রায় সব সভ্যতায়-ই এর নজির পাওয়া গেছে আর থ্যাঙ্কস টু হলিউড, বিগত শতকের বেশ কিছু ফেমাস ভূতে ধরার ঘটনা ঙে। লোকের প্রায় কন্ঠস্থ।”
শনিবার সকাল সকাল পৌঁছে গেছি, প্রফেসর সোমের বাড়িতে, যথারীতি নতুন গল্পের আশায়। আজ কথা হচ্ছিল, ডেমনিক পজেসান বা ভূতেধরা নিয়ে।
“যেমন? আমি প্রশ্ন করলাম।”
“যেমন ধরো এনেলিজ মাইকেল, যার উপরে অন্তত ৭০ বার এক্সোরসিজম করা হয়েছিল, যেটা নিয়ে পরবর্তীকালে ‘এক্সোরসিজম অফ এমিলি রোজ’ নামে বেশ একটা মুখরোচক সিনেমাও বানানো হয়েছিল। এরকম ভুরি ভুরি ঘটনা রয়েছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। তবে কি জানো কৌশিক, সব ক্ষেত্রেই কিন্তু এই ভূত ধরার ঘটনাগুলোর পেছনে কিন্তু কোনো ডার্ক এন্টিটি কাজ করেনা কিন্তু…”
“তবে?”
“বলবো, তবে তার আগে হরিপদকে দুটো কড়া করে কফি আনতে বলি, হরিপদ এই হরিপদ…”
“আজ্ঞে বাবু বলুন।”
“সে না হয় বলছি, কিন্তু তুই গেছিলি কোথায় বলতো? আর এই রবিবারের সুন্দর সকালে তোর মুখটা ওরকম বাংলা পাঁচের মত করে রেখেছিস কেন? শরীর খারাপ নাকি?”
“আজ্ঞে না বাবু, আসলে বাড়ি থেকে ফোন এসেছিল।”
“কি হয়েছে কারো শরীর-টরীর খারাপ করল নাকি রে?”
“না বাবু, আমার মেজ ভাইয়ের মেয়েটাকে কাল রাতে নাকি ভূতে ধরেছে, ভুলভাল বকছে, ভুলভাল কাজ করছে। গ্রামের লোককে তো চেনেন বাবু, কি না কি হয়েছে, ডাক্তার বদ্যি না করে, ওঝা রোজা করে বাচ্চা মেয়েটাকে হয়ত মেরেই ফেলবে, আপনি বাঁচান বাবু ভাইঝিটাকে।”
“কি বুঝলে কৌশিক?” আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসেন প্রফেসর সোম।
“কাক উড়িয়া গেল আর বেলটিও পড়ে গেল, এটাকেই বোধহয় বলে তাই না? তা যাবে নাকি ভায়া জীবনের প্রথম এক্সোরসিজম থুড়ি ভূত ছাড়ানো দেখতে?”
“আমি নিঃশব্দে মাথা নাড়লাম।”
“দশ মিনিটের মধ্যে বাড়ি গিয়ে মাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ম্যানেজ করে, প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস ব্যাগে ভরে সোজা প্রফেসরের কালো স্করপিওতে চেপে বসলাম, আমি প্রফেসর সোম আর হরিপদ, হরিপদর দেশের বাড়ির উদ্দেশ্যে, গাড়ি ছেড়ে দিল…
.
দুই
কোনা এক্সপ্রেসওয়ের পন্ডস সুলভ মসৃণ রাস্তা দিয়ে কখন যে এতোটা বেলা গড়িয়ে গেছিল খেয়াল করিনি, চোখটা লেগে গেছিল। হুঁশ এলো মোরাম রাস্তার ঝাঁকুনি খেয়ে, দেখলাম সামনে প্রফেসর সোমের হাসি আর পেছনে বিলীয়মান সূর্যটা, দুজনেই সমান তালে বিদ্রূপ করছে।
“আর কতদূর হে হরিপদ?”
“আর একটু বাবু” হরিপদ মাথা নাড়িয়ে জবাব দিল।
আমি গাড়ির কাঁচটা নামিয়ে, লালচে ধূলো মাখা গোধূলী লগ্নের রিয়েল রুরাল ইন্ডিয়া প্রত্যক্ষ করতে লাগলাম।
*****
রাত প্রায় আটটা, আমি একটা ঘরে বসে আছি।
ঘরের মধ্যে আমি আর প্রফেসরের ড্রাইভার অর্জুন বাদে আরও তিন- চারজন মহিলা রয়েছেন, কাউকেই চিনিনা।
সবার চোখ কিন্তু বিছানার দিকে।
ওখানে শোয়ানো রয়েছে, সেই মেয়েটাকে, নীরুকে। একদম বেহুঁশ, উস্কো খুশকো চুল, চোখের জল শুকিয়ে কালো হয়ে আছে, মুখের কষ দিয়ে লালা ঝরছে, ছেঁড়া ফাটা ফ্রকের মধ্যে দিয়ে তাজা মারের ক্ষত উঁকি মারছে, যেন একটা ঝড় বয়ে গেছে মেয়েটার ওপর দিয়ে।
আমি শুধু ভাবছি, প্রফেসর আমাকে একা ছেড়ে কোথায় যে চলে গেলেন দায়িত্ব দিয়ে, যদি দুম করে মেয়েটার জ্ঞান ফিরে আসে, তাহলে আমি কি করব? এসব অগুরু ব্যাপারে যে একদম নভিশ ব্যক্তি, বেশ অসহায় মনে হতে লাগল নিজেকে।
ইতিমধ্যে যে কটা ঘটনা মাঝে ঘটে গেছিল, সেটা ছোট্ট করে বলে দিই, নাহলে আপনাদের খানিকটা খেই হারিয়ে যাবে।
আমরা সন্ধে নাগাদ হরিপদর মেজভাইয়ের বাড়িতে পৌঁছাই, সেখানে গিয়ে দেখতে পাই প্রায় মেলা লেগে গেছে ভূত ছাড়ানো দেখার জন্য। আর গ্রাম বাংলায় যেমনটা চলে আসছে, ঠিক তাই এক গাছের গুঁড়ির সঙ্গে মেয়েটাকে বেঁধে ভূত ছাড়ানোর নামে অকথ্য অত্যাচার চালাচ্ছিল এক গ্রাম্য রোজা, গ্রামের বাকী লোকেরা তো বটেই, তাঁর নিজের বাড়ির লোকেরাও সেই দৃশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল যেন। তবে প্রফেসরের এক অদ্ভুত রূপ এইসময় দেখতে পেয়েছিলাম বটে, সদা হাস্যময় দীর্ঘদেহী মানুষটা আচমকা ইস্পাতসম হয়ে, প্রায় একা হাতে কিভাবে যে ঐ অবুঝ ভীড় থেকে, কত রকম বাধা- বিপত্তি হুমকি ধাক্কাধাক্কি এড়িয়ে মেয়েটাকে ছিনিয়ে বাড়ির ভিতরে নিয়ে গেছিলেন, সে না দেখলে কেউ বিশ্বাস করতে পারবেনা।
তা যাই হোক, ঘরে নিয়ে গিয়ে প্রফেসর মেয়েটাকে বিছানায় শুইয়ে দেন। “মেয়ের মা কাকীমারা বাদে বাকীরা ঘরের বাইরে যান, একটা এক্সট্রা লোক যেন ঘরে না থাকে, মেয়ের বাবা আমার সঙ্গে আসুন, মেয়ে যে ঘরে পড়াশোনা করত সেখানে নিয়ে চলুন আর লোকদের দিয়ে খবর পাঠান, মেয়ের খুব কাছের বন্ধু বান্ধবদের সঙ্গে আমি রাতেই কথা বলতে চাই। কি হল কথা কানে যাচ্ছেনা? এই হরিপদ বের কর সবকটাকে ঘর থেকে,” হুংকার ছাড়েন প্রফেসর।
ঘর ক্রমশ ফাঁকা হতে থাকে।
“কৌশিক তুমি আর অর্জুন থাকো এখানে, মেক শিউর যে আমি না আসা অবধি যেন কেউ মেয়েটার কাছে যেতে না পারে, আমি লোকাল ওসিকেও জানিয়েছি, ও আসছে টীম নিয়ে।”
সেই যে প্রফেসর হরিপদকে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন আর ফিরছেন না।
যদিও জানি অর্জুনের কোমরে একটা আগ্নেয়াস্ত্র গোঁজা রয়েছে, কিন্তু যত সময় যাচ্ছে, আসে পাশের নিঃশ্বাসের অস্থিরতাটাও কিন্তু বাড়ছে, কতক্ষণ যে এই অবুঝ গ্রাম্য ভিড়টাকে আটকে রাখতে পারব কেজানে…
“কিরে আবার কোলকেতার বাবুদের ধরে এনেছিস মেয়েকে সারাবি বলে? কেউ পারবিনা, আমি ওকে ছাড়বই না, ও আমার, শুধুই আমার, হা হা হা…
উফ কি বীভৎস সেই পুরুষালি গলার স্বর, হাড়ে কাঁপুনি ধরানো অট্টহাসি, দেখলাম বিছানার ওপর নীরু হঠাৎ উঠে বসেছে, আর পাগলের মতো হেসে চলেছে…
আমি নিজেই জ্ঞান হারাবো বোধহয়, উফ প্রফেসর যে কি বিপদেই না ফেলে দিয়ে গেলেন।
.
তিন
“ভালোবেসে কি কাউকে এতো কষ্ট দেওয়া যায়? গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন প্রফেসর সোম।”
“তুই তো অনেক কিছু জেনে গেছিস দেখছি, গ্রামের ওঝারা ফেল করে গেল বলে তোকে শহর থেকে ধরে আনলো নাকি বুড়ো?” হিসহিসিয়ে বলে উঠল নীরু।
“আমার প্রশ্নের উত্তর দে,” একমুঠো সাদা সাদা গুঁড়ো নীরুর উপর ছুঁড়ে দিয়ে হুংকার দিয়ে ওঠেন প্রফেসর সোম।
একটা আর্তচিৎকারে ঘরটা ভরে যায়, পুরো অন্ধকার ঘরে, মোমের কাঁপা কাঁপা শিখায় নীরুর ছটপট করতে থাকা শরীরটা আরো ভয়ংকর দেখাতে থাকে, আমি আর অর্জুন দুজনে দুপাশ থেকে ধরে রাখলেও, বিছানার ওপর নীরুকে শুইয়ে রাখা দায় হয়ে পড়ে, ঐটুকু বাচ্চা মেয়েটার শরীরে যেন অসুর ভর করেছে।
“ও আমাকে ভালোবাসতোনা একদম ভালোবাসতো না,” দাঁতে দাঁতে চেপে বিশ্রী পুরুষালী গলায় বলে ওঠে নীরু।
“কিন্তু তুই তো ভালোবাসতিস ওকে, তাহলে ভালোবাসার মানুষকে এভাবে কেন কষ্ট দিচ্ছিস?”
“ভালো আমাকে নাই বাসতে পারে, কিন্তু আমার দিনের পর দিন পাঠানো চিঠিগুলোর কি কোনো মূল্য ছিলনা ওর কাছে?”
“কে বলেছে নীরু তোর পাঠানো চিঠিগুলোর মূল্য দেয়নি, এই দেখ, তোর পাঠানো প্রতিটা চিঠি নীরু যত্ন করে তুলে রেখেছে,” এই বলে নীরুর মুখের ওপর একগাদা দলাপাকানো সাদা কাগজ প্রফেসর সোম ছুঁড়ে দেন।
“তুই মিথ্যে বলছিস, ও যদি সত্যিই আমার চিঠিগুলোর এতোটুকু মূল্য দিত, তাহলে আমার শেষ চিঠিটা পাওয়ার পর একবার অন্তত আমার সঙ্গে দেখা করত।”
“করতে চেয়েছিল” দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন প্রফেসর সোম, কিছুটা থেমে আবার বলতে শুরু করেন…
“কিন্তু ভালোবাসার মিথ্যে অভিমানে তুই এতোটাই পাগল হয়ে গেছিলিস যে তোর আর তর সয়নি।”
এই দেখ তোর সেই শেষ চিঠি রবীন, যাতে তুই নিজেকে শেষ করবার হুমকি দিয়েছিলি, ভালো করে দেখ তুই নীরুকে সাতদিন সময় দিয়েছিলিস, স্পষ্ট করে দেখ তোর নিজের হাতে লেখা তারিখটা আর এইদেখ সেই নীরুর নিজের হাতে লেখা তোর জন্য প্রথম চিঠি, যেটা তুই নিজেই শেষ চিঠি বানিয়ে ফেলেছিস।”
“তুই মিথ্যে বলছিস বুড়ো” চিৎকার করে ওঠে নীরু।
“নীরুর হাতের লেখা তো তোর অজানা নয়, নিজেই দেখে নে, সেই চিঠি,” নীরুর মুখের ওপর একটা চিঠি তুলে ধরেন প্রফেসর সোম।
“আর তার তারিখটাও মিলিয়ে নিস, নীরুকে সাতদিন সময় দিয়েও, তোর আর তর সইলোনা রবীন, দুদিনের মাথায় নিজেকে শেষ করে দিলি, অথচ দেখ নীরু কিন্তু তোকে চিঠিটা লিখেছিল পরেরদিনই, কিন্তু কোনো কারণবশত সেদিন আর দিতে পারেনি, আর পরের দিন তুই আর নীরুকে সে সুযোগও দিসনি, গাছের ডালে ঝুলতে থাকা তোর লাশটা দেখে সেদিন সব থেকে বেশি কেঁদেছিল কিন্তু নীরু নিজে।”
“আমার সব গুলিয়ে যাচ্ছে কিরকম, হাতে চিঠিটা নিয়ে কিরকম পাগলের মত করতে থাকে নীরু।”
“তুই নিজেই সব শেষ করেছিস, তোর পরিণতির জন্য নীরু নয়, দায়ী তুই নিজে।”
“সব ভুল আমার, সব শেষ করে দিয়েছি, আমি নীরুকে আর কষ্ট দেবনা, ওকে ছেড়ে আমি দূরে চলে যাবো।” ক্রুদ্ধ গর্জনটা ক্রমশ একটা দলা পাকানো কান্নায় পরিণত হয়, সেইসঙ্গে নীরুর শরীরটা অস্বাভাবিক হারে কাঁপতে থাকে….
.
চার
একটা পুকুর ধারে আরামকেদারায় বসে আছি আমি আর প্রফেসর সোম, জমিয়ে গ্রাম বাংলার সূর্যাস্ত এনজয় করছি, সঙ্গে রয়েছে, দু’কাপ কফি আর দুটো বড়ো বড়ো থালা ভর্তি মাছভাজা, আমাদের শত বারণ করা সত্ত্বেও, হরিপদর বাড়ির লোকেরা তাদের বাড়ির মেয়েকে প্রফেসর সুস্থ করে দিয়েছেন বলে যা আদর-আপ্যায়ন করছে, তাতে আমরা না আবার অসুস্থ হয়ে পড়ি।
“তাহলে কেমন লাগল কৌশিক ভায়া? তোমার ফার্স্ট এনকাউন্টার” মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন প্রফেসর সোম।
“আজ্ঞে লাগল তো ভালোই, তবে নিজেকে যতটা সাহসী বলে ভাবছিলাম ততোটা আর বিশ্বাস রইলনা নিজের ওপরে, মানে ঐ অন্ধকার ঘর, নীরুর ঐ ভয়ংকর গলা আর অমানুষিক জোর, আমার তো রীতিমত দাঁতকপাটি লেগে যাচ্ছিল।”
“তাহলে রিয়েল স্পিরিচুয়াল হান্টিং দেখলে তোমার কি হাল হবে ভায়া,” হো হো করে হেসে উঠলেন প্রফেসর।
“মানে? ওটা নীরুর শরীরে রবীনের প্রেতাত্মা ছিলোনা?”
“ধুস, ডেমন পসেসড হওয়া কি অতটাই তুচ্ছ ব্যাপার? আমি শুরুতেই দেখে নিয়েছিলাম, এখানে এক্সটারনাল কোনো এন্টিটির উপস্থিতি ছিলোনা।”
“তবে?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“পুরোটাই ইন্টারনাল, নীরুর মনের। রবীনের আত্মহত্যার পর দিন থেকেই ও নিজেকে নিজে অপরাধী বানিয়ে ফেলে, প্রতিনিয়ত রবীনকে নিয়ে, রবীনের লেখা চিঠিগুলো নিয়ে ভাবতে থাকে, আর নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে। সেদিন কোচিং থেকে রাতে ঐ গাছতলার দিয়ে ফিরতে গিয়ে মনে মনে হয়ত রবীনের ঝুলে থাকা লাশটা নীরু কল্পনা করে নেয় আর ব্যাস, ঐটাই অনুঘটকের কাজ করে, নীরুর পার্শোনালিটির ডিসওর্ডার ঘটে, নীরুর আপন সত্ত্বা মরে গিয়ে রবীনের সত্ত্বাটা জেগে ওঠে, পুরোটাই ঘটে মনের মধ্যে চেপে রাখা অপরাধবোধটা থেকে। রবীনের ব্যাপারটা আমি নীরুর বান্ধবীদের থেকে জানতে পারি আর তারপরে ওর ঘর সার্চ করে রবীনের চিঠিগুলো পাই, ব্যাস দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেলি।
আমি না এলেও, ভালো কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে গেলেও নীরু সুস্থ হয়ে উঠত, কিন্তু ঐ যে গ্রাম বাংলার লোক সেই টাইমটাই ওকে দিতনা, ওঝারাই হয়ত পিটিয়ে ওকে মেরে ফেলত। তবে হ্যাঁ, ব্যাপারটা সময়সাপেক্ষ ছিল, নীরুর সেরে ওঠাটা, কিন্ত আমি একটা রিস্ক নিয়েছিলাম।”
“কিরকম?”
“একটা ঝটকা দরকার ছিল, নীরুর মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা নীরুকে রবীনের অস্তিত্বের বাইরে বের করে আনাটা, কাজটা সোজা ছিলনা, বাট তুক্কাটা লেগে গেল।”
“কোনটা?”
“ঐ যে নীরুর লেখা চিঠিটা, ওটা আমিই লিখে দিয়েছিলাম।”
“কি সাংঘাতিক, রবীনরূপী নীরু যদি ওটা ধরে ফেলত?” আমি আঁতকে উঠলাম।
“এতো বছরের এক্সপিরিয়েন্স ভায়া, ও ঠিক কাজে লেগেই যায়,” হো হো
করে হাসতে থাকেন প্রফেসর সোম।
“তবে হ্যাঁ রবীন আজ ওকে ছেড়ে গেলেও, একদিন আবার ঘুরে আসতে পারে, অপরাধবোধ বড্ড ভারী জিনিস ভায়া, আমি মেয়েটাকে নিয়ে যাব, ওর নিয়মিত কিছুমাস কাউন্সেলিং দরকার, একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন প্রফেসর সোম, সূর্যের লালচে আভায় পুকুরে জল তখন ঘন লাল হয়ে উঠেছে।
