য়ুবারমেনশ – কৌশিক সামন্ত
সারি সারি লাশ!
গলা, পচা, বিকৃত বা সদ্যজাত টাটকা। কোনোটা থেকে চুইয়ে পড়ছে রক্ত, কোনোটা থেকে খসে পড়ছে মাংস-চামড়া। প্রতিন্ধময় সেই নরকে, লাশের স্তূপে সূর্য পর্যন্ত মুখ লুকিয়েছে লজ্জায়। এক অন্ধকারাচ্ছন্ন কালরাত্রি যেন গ্রাস করেছে গোটা সময়টাকে। কিন্তু সেই কালগ্রাসী অন্ধকারকে অস্বীকার করে একটা টর্চ-লাইট দেখা যাচ্ছে। সারি সারি লাশের মাঝে পা ফেলে এগিয়ে চলেছে সেই ব্যক্তি। সম্বল বলতে নিজের চোখ আর ওই টর্চ। কী যেন একটা খুঁজছে সে, অতি সন্তর্পণে। কিন্তু কেন? এই মৃত্যুপুরীতে কে আছে তাকে বাধা দেওয়ার মতো?
যত সময় যাচ্ছে, সেই টর্চের মালিক যেন তত অসহিষ্ণু হয়ে পড়ছে। রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত অজস্র হাতের মধ্যে সে কী করে খুঁজে পাবে সেই দু’টো হাত? যে হাত দু’টো তাকে একদিন চলতে শিখিয়েছে, এই অন্ধকারের বুকে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়া থেকে বাঁচিয়েছে, ক্ষতবিক্ষত হওয়ার হাত থেকে সযত্নে আগলে রেখেছে সেই হাত দুটোই। স্বার্থপরতার কাজলে ঢেকে যাওয়া তার এই চোখদু’টো কীভাবে খুঁজে বের করবে সেই মহৎ দু’টো হাতকে এই সারি সারি লাশের মধ্য থেকে?
‘ইয়া-সির কো-আখ!’
হিব্রুতে লেখা কটা শব্দ, যার মানে ‘তোমার শক্তি বৃদ্ধি হোক।’
টর্চের আলো ছিটকে আসে। কিছু একটায় প্রতিফলিত হয়েছে ওই দুর্বল আলোকশিখা। দৌড়ে যায় সে। এই আংটি সে চেনে, চেনে এই আংটির লেখা। ওই তো! তার পরম আকাঙ্ক্ষিত সেই হাত দু’টো।
***
“হের ডক্টর? আমি এরউইন, আপনার অ্যাসিস্ট্যান্ট। আপনি কি ল্যাবে আছেন?”
ল্যাবের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আব্রাহামের। রোজকার মতো আজকেও তিনি সেই স্বপ্নটাই দেখছিলেন। হা ঈশ্বর! কবে যে এর হাত থেকে তিনি মুক্তি পাবেন! ভাবতে ভাবতে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে যান আব্রাহাম।
.
দুই
“হের ডক্টর, আমি কি ভেতরে আসতে পারি?”
“এসেই তো গেছ, এরউইন। পারমিশনের খুব দরকার আছে কি?”
“মাফ করবেন ডক্টর। আমি ভাবছিলাম আপনি হয়তো বাইরে বেরিয়েছেন। তাই মেইন দরজার চাবি খুলে দেখতে এসেছিলাম।”
“হাসালে এরউইন। তুমি কি ভাব, আমি কিছুই বুঝতে পারি না? তোমার নাৎসি প্রভুরা কেন তোমাকে আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে, এটা কি আমু বুঝি না ভেবেছ?”
“আপনার এ ধারণা ভুল, স্যার। শুধুমাত্র বিজ্ঞানের সাধনায় নিজেকে উৎসর্গ করতে, জ্ঞানের পিপাসা মেটাতেই এখানে আসা। এই ব্যাপারে আপনার চেয়ে ভালো কেউ নেই। আপনিই পারেন আমাকে আলো দেখাতে। সেজন্যই নিরুপায় হয়ে আপনাকে বিরক্ত করতে হয়।”
“তোষামোদি ছাড় এরউইন। তোষামোদিতে কোনো ভালো কাজ আজ অবধি হয়নি, আর হবেও না। যাকগে বাদ দাও। আমার মেশিনটার কী খবর?”
“প্রস্তুত স্যার। আপনার অনুমতি পেলেই ভেতরে নিয়ে আসতে বলব গার্ডদের।”
“তবে তাই হোক। দেখি তোমরা আমার জ্ঞানকে কতটা মর্যাদা দিয়েছ!” এরউইন বেরিয়ে গেল, ঠিক যেভাবে এসেছিল। একটা চেয়ারে বসে পড়লেন আব্রাহাম। ছোকরার সঙ্গে এই রূঢ় ব্যাবহার করাটা কি ঠিক হচ্ছে? কে জানে!
তিনিও তো নিরুপায়। এই অনুদান, আধুনিকতম উপকরণ, সবরকম সুযোগ-সুবিধা সত্বেও তিনি ভুলতে পারেন না অতীতটা। ওই সাহায্যকারী বলশালী নাৎসি হাতগুলোই একদিন কেড়ে নিয়েছিল তাঁর সবথেকে প্রিয় মানুষটাকে, তাঁর বাবাকে। তাঁর একমাত্র অপরাধ ছিল তাঁর ইহুদি পরিচয়। কিন্তু আব্রাহাম নিজে ইহুদি হওয়া সত্বেও তাঁর স্থান বাবার পাশে ইহুদিদের লাশের স্তূপের মধ্যে হয়নি একটাই কারণে। মহানুভব হিটলার, আর তার অকাল্ট প্রীতি!
অনেকেই ভাবে, নাৎসি মতবাদ আর অকাল্টের মধ্যে যোগসূত্রটা শুধুই একটা কিংবদন্তি। অবশ্য লোককে দোষ দিয়ে লাভ নেই। হিটলার আর তার অনুগামীরা এরকমই একটা ভাবনার জন্ম দিয়েছিল বটে। তারা লোককে ভাবতে বাধ্য করেছিল, মাথায় কালো পর্দা আর মুখোশের আড়ালে থাকা লোকগুলোর চাপা স্বরে মন্ত্র পড়ার কথাগুলো শুধুই গল্প। কল্পনার বহিঃপ্রকাশ!
কিন্তু বাস্তব ছিল তার উল্টো। হিটলার চাইত আরও ক্ষমতা, আরও শক্তি। তাই শুধু বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে যদি কোনো অচেনা অজানা শক্তিকে কাজে লাগানো যায়, গুলি-বারুদ-কামানের পাশাপাশি আরও ভয়ঙ্কর কোনো শক্তিকে যদি শত্রুপক্ষের বিরুধে যুদ্ধের ময়দানে লেলিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সেটা হত হিটলারের পক্ষে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত জিনিস। তাই, প্রথাগত গবেষণার পাশাপাশি নাৎসিদের একটা শাখা অতি গোপনে কাজ করে চলছিল অকাল্ট নিয়ে। বিজ্ঞানের আলোর সঙ্গে অন্ধকারের প্রবাহকে মিশিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের এক মাত্র লক্ষ্য।
আর সেই থেকেই এসেছিল ‘য়ুবারমেনশ’ (ubermensch)’-এর ধারণা! বিয়ন্ড ম্যান বা সুপার-হিউম্যান, জার্মান ভাষায় এর আক্ষরিক অর্থ ছিল এটাই।
হিটলারের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল এমন এক জাতির নায়ক হওয়া, যারা হবে অপ্রতিরোধ্য। তাদের শরীরে থাকবে না রোগ। তাদের মধ্যে থাকবে না কোনো ভয়ডর। তারা হবে নেকড়ের মতো ক্ষিপ্ত, চিতার মতো গতিশীল আর সিংহের মতো শক্তিমান। যুদ্ধজয়ের ক্ষুধা ছাড়া অন্য কোনো ক্ষুধায় কাতর হবে না তারা। হৃদয় বলে কিছু থাকবে না তাদের। শত্রুর গলা কাটতে হাত কাঁপবে না, বরং তাদের রক্ত দেখে শান্ত হবে তারা। এমন এক অপরাজেয় বাহিনী, যাদের সামনে সারা বিশ্ব মাথা ঝোঁকাবে নিঃশর্তে, গড়তে চেয়েছিল হিটলার।
আর ঠিক সেজন্যই ইহুদি হওয়া সত্বেও ডক্টর আব্রাহাম বেঁচে গেছিলেন। হিটলারের কাছে কোনোভাবে খবর পৌঁছেছিল তাঁর ‘পারফেক্ট মানুষ’ তৈরির গোপন গবেষণা নিয়ে। ফলে জার্মান বৈজ্ঞানিক সমাজ থেকে বিতাড়িত, কার্যত অপবিজ্ঞানের সাধনা করা আব্রাহামকে খুঁজে বের করা হয়। কাসল রড্রিজ-এ তাঁর থাকা, এবং সেখানে সবরকম পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য ব্যবস্থা করে দেওয়াও হয় স্বয়ং ফুয়েরারের আদেশে!
.
তিন
লোকচক্ষুর আড়ালে এক দুর্গম দুর্গ হল এই কাসল রড্রিজ। মুলদা নদীর তীরে, গিবসন পাহারের চূড়ায় বসে থাকা এই দুর্গ শুধু প্রাকৃতিক ভাবে দুর্ভেদ্য নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর একেই নাৎসিদের অন্ধকার বিজ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তোলা হয়েছিল। এর মোটা মোটা পাথরের দেওয়ালের আড়ালে প্রতিটা ঘরে কতরকম অনাচার যে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই। গিনিপিগ হওয়া কত ইহুদির আর্তনাদ যে এর অন্ধকার গলি আর মোটা দেওয়ালের গভীরে চিরতরে হারিয়ে গেছে, তার হিসেব নেই।
সব জেনেবুঝেও ডক্টর আব্রাহাম এই কাসলে নিজের বন্দিদশা মেনে নিয়েছেন। শুধু প্রাণের দায়ে নয়। আজন্মলালিত জ্ঞানপিপাসা মেটাতে এই জায়গার থেকে ভালো আর কিছুই হতে পারে না, এই উপলব্ধিটাই আব্রাহামকে বাধ্য করেছিল এই বন্দিদশাকে স্বেচ্ছায় মেনে নিতে। তাঁর পন্থাগুলো মেনে নেওয়া, বা বিশ্বযুদ্ধের বাজারেও তাঁর গবেষণার যাবতীয় দুর্লভ উপকরণ জোগাড় করে দেওয়া, একমাত্র হিটলারের পক্ষেই সম্ভব ছিল।
সবটাই মেনে নিয়েছিলেন আব্রাহাম, তাঁর য়ুবারমেনশের স্বার্থে। অন্য একটা ইচ্ছেও আছে তাঁর। সব ঠিকঠাক চললে সেই প্রতিশোধের আগুনে তিনি এখানকার প্রতিটি ইটও…
কাসেল রড্রিজের দেওয়ালেরও কান আছে। সামান্য নেমকহারামিও তারা ঠিক শুনতে পায়। তাই নিজের মনের জ্বলন্ত ভাবনাগুলোর ওপর ঠান্ডা জল ঢেলে দিলেন ডক্টর আব্রাহাম। এখন অন্য কিছুতে মন দেওয়া যাবে না। এখন একটাই প্রায়োরিটি~ য়ুবারমেনশ। এই গবেষণার জন্য বরাদ্দ সময় প্রায় শেষের পথে।
.
চার
“হেইল হিটলার!”
“হেইল হিটলার! কী ব্যাপার হেপম্যান? এত সকালে আমার চেম্বারে কেন?”
“স্যার, কাল রাতে আমরা কম্পাউন্ডের বাইরে জঙ্গলে পাহারায় ছিলাম।”
“কোনো চিন্তার ব্যাপার?”
“না স্যার। তবে রাতে সেই শব্দটা আবার শুনতে পাওয়া গেছে।”
“আর অন্য কিছু?”
“না স্যার। আমরা সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিলাম। কিন্তু নতুন কিছুই তেমন নজরে আসেনি। তবে…”
“তবে?”
“স্যার, রাতে সেই অচেনা সেই শব্দটা শুনেছিলাম। তার সঙ্গে আকাশে কিছু উড়ন্ত অস্থির আলোকবিন্দুও দেখেছিলাম। মাঠে বড়ো-বড়ো যে ক্রপ সার্কেলগুলো ইদানীং সকাল হলেই দেখতে পাওয়া যায়, এবারেও তাদের ব্যতিক্রম হয়নি।”
“হুঁ। বুঝতে পেরেছি সোলজার।”
“আমি ভাবলাম, আপনাকে ব্যাপারটা জানিয়ে রাখা দরকার।”
“সেটা তুমি ভালোই করেছো হেপম্যান। যদিও আমার সঠিক ধারণা নেই, তবে এই বিশ্বযুদ্ধে আমাদের হারাতে শত্রুপক্ষ নিশ্চয়ই কোনো গোপন অস্ত্র উদ্ভাবন করেছে। যাইহোক, তোমরা সতর্ক থাকো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কাসল রড্রিজের ভূমিকা কতোটা তা নিশ্চয়ই জানো, হেপম্যান!”
“অবশ্যই স্যার।”
“গুড জব হেপম্যান। তুমি এখন আসতে পার। আর হ্যাঁ, আজ রাতের কথা মনে আছে তো?”
“নিশ্চয়ই স্যার। আজ রাত দশটার পর আমাদের তিনজনকে ডাক্তার
আব্রাহামের চেম্বারে যেতে হবে।”
“একদম তাই। হেইল হিটলার।”
“হেইল হিটলার!”
হেপম্যান চলে গেল। ক্যাপ্টেন হোল্টেনবারনার চিন্তিত মুখে চেয়ার টেনে জানলার ধারে বসে পড়লেন। পাহাড়ের মাথায় থাকার একটা সুবিধা, জানলা দিয়ে দূর দিগন্ত অবধি দেখা যায়। ঘন বৃষ্টিতেও সবুজ প্রান্তরের মাঝে হঠাৎ পুড়ে যাওয়া ঘাসের মধ্যে বিভিন্ন প্যাটার্ন-এর ক্রপ সার্কেলগুলো সূর্যের আলো পড়ে ঝকঝক করছে যেন! তবে কি কানাঘুষো যেটা শোনা যায় সেটাই সত্যি? ওরা কি সত্যিই আসছে? চিন্তিত মুখে ভাবতে থাকেন
থাকেন ক্যাপ্টেন হোল্টেনবারনার। বহু যুদ্ধের পোড় খাওয়া প্রাজ্ঞ ক্যাপ্টেনের কপালেও অজানা আতঙ্কের চিন্তার ভাঁজ পড়তে দেখা যায়।
.
পাঁচ
নিজের সদ্য নির্মিত ল্যাবরেটরির দিকে তাকিয়ে থাকেন ডক্টর আব্রাহাম। গর্ব, বিস্ময় আর ভয় সবকটা অনুভূতিই নিজের অস্তিত্বে প্রবলভাবে অনুভব করলেন তিনি। কিছুটা আগেই এরউইন আর রক্ষীদের দল যন্ত্রটাকে রেখে গেছে ল্যাবে। হিটলার এ বিষয়ে কোনো কার্পণ্য করেনি। সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে তাদের কমিটমেন্ট। ঠিক যেমন চেয়েছিলেন তিনি, তেমনই হয়েছে জিনিসটা, যন্ত্রের ওপর থেকে আচ্ছাদন সরাতেপ-সরাতে ভাবছিলেন আব্রাহাম।
আট মিটার লম্বা একটা কাঁচের বাক্স, যার দেওয়ালগুলো পাঁচ মিটার পুরু। ওপরটা একটা দুর্ভেদ্য লোহার ঢাকনা দিয়ে ঢাকা। অসংখ্য ইনলেট আর আউটলেট পাইপ নিষ্কাশনের জায়গা
আব্রাহামের প্রতিটা স্পেসিফিকেশন নিখুঁতভাবে অনুসরণ করে বানানো হয়েছে যন্ত্রটা। আপাতত এটা ফাঁকা। কিন্তু ভবিষ্যতে এই জাদু-বাক্সই ধরে রাখবে আব্রাহামের য়ুবারমেনশকে। এই বাক্সেই তিনি সৃষ্টি করবেন সেই ভয়ঙ্কর কায়াকে, যার অস্তিত্ব এই পৃথিবীর স্রষ্টার অস্তিত্বকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেবে। উত্তেজনায় থর থর করে কাঁপছিলেন ড. আব্রাহাম। কিন্তু তিনি কি শেষ পর্যন্ত হিটলারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে পারবেন? প্রকৃতির বিরুদ্ধাচরণ করা কি একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব! ঈশ্বরের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এমন কিছু করা কি উচিত হবে?
নাহ্! এসব কী ভাবছেন তিনি? আক্রোশ আব্রাহামের চোখদু’টো মুহূর্তের জন্য ঝাপসা করে দেয়। ঈশ্বর? ঈশ্বর থাকলে কি তাঁদের এই হাল হত! ঈশ্বর নেই, কোনোদিন ছিলেন না। বরং শয়তান আছেন। এই নরকের রাজা তো সেই। সেজন্যই আব্রাহাম বিজ্ঞানের সঙ্গে মেশাতে চলেছেন সৃষ্টির আদিম অন্ধকারাচ্ছন্ন পন্থাগুলিকে। হ্যাঁ, এখনও অবধি বড়ো সাফল্য তিনি পাননি ঠিকই, তবে সফল তিনি হবেনই। মুশকিল শুধু একটাই।
তাঁর যে উপাদানটা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, তা হল সময়। কিন্তু সেটাই তাঁর কাছে নেই। সময় ফুরোলেই নাৎসিদের বরাভয়ের স্বস্তিকা খাঁড়া হয়ে নেমে আসবে তাঁর গলায়, একথা তিনি ভালোভাবেই জানেন। তবু, তাঁর চেষ্টা সত্বেও তীরে এসে বারবার তরী ডুবছে। কিন্তু কেন? কারণ বিশ্লেষণ করতে বসে আগের পরীক্ষাগুলোর কথা ভাবলেন আব্রাহাম।
য়ুবারমেনশ তৈরির প্রথম ধাপ ছিল মানুষের শরীরের অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো বাদ দেওয়া, যাতে অকারণ শক্তিক্ষয় রোধ করা যায়। শরীরের দ্বিতীয় কিডনি, হৃদয়ের চতুর্থ প্রকোষ্ঠ, স্প্লিন, এমনকি কয়েকফুট লম্বা অপ্রয়োজনীয় ইন্টেস্টাইনটাকেও যদি বাদ দিয়ে দেওয়া যায়, পারফেক্ট মানুষ পাওয়ার পথে অনেকদূর এগোনো যাবে। ইতিমধ্যেই বেশ কিছু টেস্ট সাবজেক্টে এই নীতি প্রয়োগ করেছেন ডক্টর আব্রাহাম।
প্রথমজন ফিজিক্যাল মডিফিকেশনের সময়ই অপারেশন টেবিলে পর্যাপ্ত অ্যানেস্থেটিকের অভাবে প্রাণত্যাগ করে।
দ্বিতীয়জন বেশ সাড়া দিয়েছিল। ১৫ দিন ধরে একটু-একটু করে তার শরীর বদলে ফেলেছিলেন আব্রাহাম রিকভারির জন্য যথেষ্ট সময় দিয়ে। কিন্তু ২০ দিনের মাথায় হঠাৎ কোমায় চলে যায় সাবজেক্ট। সেই অবস্থা থেকে সে আর ফিরে আসেনি।
এভাবেই তাঁর বহু গিনিপিগ প্রাণ হারিয়েছে। ব্যর্থতার চিহ্ন মুছে ফেলতে বেশি সময় নেননি আব্রাহাম। অপারেশন চেম্বারের তলাতেই গোপন সুড়ঙ্গের মুখে কাটা-ছেঁড়া লাশগুলো জলের স্রোতে ভাসিয়ে দিয়েছেন তিনি। লাশের স্তূপ নিয়ে আর ভাবেন না আব্রাহাম। কিন্তু নিজের থিওরির সত্যতা নিয়ে ভাবনা তাঁর মাথায় চলতেই থাকে।
এই পরীক্ষাগুলো চালিয়ে একটা জিনিস আব্রাহাম ভালোই বুঝতে পেরেছেন। এই মডিফিকেশন গুলো করা সম্ভব, কিন্তু সেগুলোকে শরীরে ধরে রাখা কোনো সাধারণ মানুষ বা একটা আধারের পক্ষে অসম্ভব। এর জন্য বিজ্ঞানের ক্ষমতার বাইরে, অন্য কিছুর সাহায্য লাগবে। আর তাই তার পরবর্তী এবং অন্তিম পদক্ষেপ ভেবে নিয়েছেন তিনি। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস, এবার তিনি সফল হবেনই। এখন শুধু এরউইনের অপেক্ষা। দেখা যাক, পরীক্ষার জন্য পর্যাপ্ত মালমশলা সে জোগাড় করতে পারে কি না।
.
ছয়
উপাদান, প্রণালী আর আধার। যেকোনো বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়াতেই এই তিনটে জিনিস নিয়ে ভাবতে হয়। আব্রাহাম সেগুলোকেই মনে-মনে আরও একবার আওড়াচ্ছিলেন। এতে কী-কী গোলমাল থাকছে?
একটা প্রাথমিক কারণ তো শুরুতেই ধরে ফেলা যায়। পর্যাপ্ত অ্যানাস্থেটিকের অভাব! বারবার চেয়েও ডক্টর আব্রাহাম এটা পাননি। অথচ এর অভাবেই টেস্ট সাবজেক্টরা অপারেশনের পরে এমন শকে চলে যাচ্ছে যে তাদের আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হচ্ছে না। অবশ্য এবার এরউইন তাঁকে কথা দিয়েছে, ওই বস্তুটি যথেষ্ট পরিমাণে সে জোগাড় করবেই।
উপকরণের পরে আসে প্রণালী। আব্রাহাম এটা বিলক্ষণ বুঝেছেন যে য়ুবারমেনশের শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে কোনো সাধারণ মানুষের শরীরে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তার জন্য এমন একটা আধার প্রয়োজন যাতে এই পরিবর্তনগুলো করা সম্ভব। তাই এবার আর অনাহারক্লিষ্ট মৃতপ্রায় টেস্ট সাবজেক্ট নয়। অনেক খুঁজে, অনেক ভেবে আর টানা পর্যবেক্ষণ করে আব্রাহাম নাৎসি বাহিনীর মধ্য থেকেই এমন তিনজন সৈন্যকে বেছে নিয়েছেন যারা এক কথায় পারফেক্ট। উঁহু একটু ভুল হল, যাদের এক একজনের এক একটা গুণ পারফেক্ট, এক একটা অঙ্গ পারফেক্ট।
হ্যান্স ফ্রেডরিক, কার্ট গুন্টার আর হেপম্যান হেনরিক এই তিনজন পারফেক্টকেই আধার হিসাবে বেছে নিয়েছেন ডক্টর আব্রাহাম।
হ্যান্স ফ্রেডরিক ছোটো থেকেই অসম্ভব জোরে দৌড়াতে পারে। স্কুল কলেজ লেভেলের ছোটোখাটো প্রাইজ পেরিয়ে দেশের হয়ে স্বর্ণপদক প্রাপ্ত দৌড়বিদ হিসাবে। পরে হিটলারের আদর্শে নাৎসি বাহিনীতে যোগদান। পা দু’টো যে অস্বাভাবিক লম্বা আর অত্যন্ত শক্তিশালী, সে কথা বলাই বাহুল্য।
কার্ট গুন্টার, ছোটো থেকেই বাজি ধরে পাঞ্জা লড়া অভ্যেস। পয়সা নিয়ে লোককে মারধর করা আর জেল যাওয়া নিত্য অভ্যেস। পরে নাৎসি বাহিনীতে যোগদান। অসম্ভব শক্তিশালী হাত দুটো, জেলে তো বটেই এমন কি নাৎসি বাহিনীতেও আজ পর্যন্ত পাঞ্জাতে কেউ তাকে হারাতে পারেনি।
হেপম্যান হেনরিক, ডক্টর আব্রাহামের শেষ ক্যান্ডিডেট। প্রথম দুজনের থেকে একেবারেই আলাদা। শারীরিক সক্ষমতায় বা আকারে এদের ধারে কাছে না গেলেও তার একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। সাঁতারে পারদর্শী এই সেনা দিনের পর দিন, রাতের পর রাত জলের মধ্যে লুকিয়ে থেকে অতর্কিতে শত্রুর উপর নিঃশব্দে আঘাত হানতে সক্ষম। জলের নীচে একটানা দম বন্ধ করে থাকতে পারে সে। দীর্ঘ সময়ে জলের নীচে কাটানোর ফলে হেনরিকের শরীরখানা অদ্ভুত একটা আকার ধারণ করেছে। তার বুক থেকে তলপেটখানা অস্বাভাবিক রকমের লম্বা।
“হের ডক্টর, আমি কি ভেতরে আসতে পারি?”
এরউইনের গলার আওয়াজে সম্বিৎ ফিরে পেলেন ডক্টর আব্রাহাম। কিন্তু তিনি কিছু উত্তর দেওয়ার আগেই এরউইনকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে অভদ্রের মতো ল্যাবের মধ্যে প্রবেশ করেন ক্যাপ্টেন হপম্যান হোল্টেনবারনার।
“হেইল হিটলার!” হিসহিসিয়ে বলে ওঠেন তিনি।
“হেইল হিটলার!” ডক্টর আব্রাহাম অভিবাদন জানান।
“আপনার প্রোগ্রেস কতদূর, ডক্টর? শত্রুপক্ষ কিন্তু ঘাড়ের উপর নিশ্বাস ফেলছে। আর আপনাকে দেওয়া সময়ও প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, একথা মনে আছে তো?”
“আমার সব মনে আছে, স্যার। মহামান্য হিটলারকে দেওয়া প্রতিটা কথা আমি রক্ত দিয়ে পালন করব।”
“তোমার রক্তের আমাদের কাছে কোনো দাম নেই আব্রাহাম। আমাদের চাই য়ুবারমেনশ, জার্মান সৈন্যের সীমাবদ্ধতা দূর করে যে জয়ের পথ দেখাবে।”
“অবশ্যই স্যার, কিন্তু পর্যাপ্ত উপকরণ না পেলে যে…”
“দুটো নাইট্রাস অক্সাইড ট্যাঙ্ক, একটা অক্সিজেন ট্যাঙ্ক আর এক বাক্স ভর্তি আনেস্থেটিক ড্রাগ। তুমি যা-যা চেয়েছিলে ডাক্তার, আর তার সঙ্গেই আমার তিন সেরা সৈন্য, সব তোমার ল্যাবে পৌঁছে যাবে সঠিক সময়ে।”
“অনেক-অনেক ধন্যবাদ স্যার।
“কিন্তু একটা কথা মনে রেখো ডাক্তার।”
ক্যাপ্টেন হোল্টেনবারনার, ডক্টর আব্রাহামের একদম কাছে সরে আসেন, তারপর ওঁর কানে কানে হিসহিসিয়ে বলে ওঠেন, “এবারেও যদি শেষ অবধি ওবারমেনচের জ্ঞান না ফেরে, তোমার লাশটা বাকি ইহুদিদের সঙ্গ দেবে ওই লাশের পাহাড়ে, কেমন? আমি চলি, হেইল হিটলার!”
“হেইল হিটলার!”
যেমন ঝড়ের মতো এসেছিলেন ঠিক তেমনি ভাবেই ঝড়ের মতো চলে গেলেন ক্যাপ্টেন হোল্টেনবারনার। স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন ডাক্তার আব্রাহাম আর তাঁর সহকারী এরউইন।
.
সাত
নিজেকে ঈশ্বর বলে মনে হচ্ছিল ডক্টর আব্রাহামের।
য়ুবারমেনশ! অপারেশান টেবিলের ওপর শুয়ে থাকা শরীরটা বোধহয় পৃথিবীর সুন্দরতম সৃষ্টি, যাকে তিল-তিল করে গড়ে তুলেছেন তিনি নিজের হাতে।
শরীরখানা হেপম্যান হেনরিকের, শক্ত পুরুষালী হাত দুটো কার্ট গুন্টারের আর পাথরের মতো পা দুটো হ্যান্স ফ্রেডরিকের!
তিনটি শরীর মিলিয়ে একটা নিখুঁত শরীর। একদম পারফেক্ট!
নিজের মনে হেসে উঠলেন আব্রাহাম। নিজের পিঠে নিজেই বাহবাসূচক তালি দিতে ইচ্ছে করল তাঁর I
এরউইনের নিয়ে আসা ওষুধপত্র এবারে ঠিকঠাক কাজ করেছে। অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো বাদ দিয়ে, মডিফিকেশানও কমপ্লিট। য়ুবারমেনশের শরীরে লাগানো যন্ত্রগুলো বলছে, তার শ্বাস-প্রশ্বাস, ব্লাডপ্রেশার, হার্টবিট, সবই ঠিকঠাক চলছে।
গত তিনদিন ধরে নাওয়া-খাওয়া ভুলেছেন আব্রাহাম। কাজটা মোটেই সহজ ছিল না। প্রাণের বাজি রেখে একটা অনিশ্চয়তার যুদ্ধে নেমেছিলেন তিনি, আজ সফলতা এসেছে। তবে যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। এবারই তো আসল খেলা। কাবালা (kabbalah)-র পাতা থেকে হিব্রুতে লেখা অন্ধকার সূত্রগুলোকে এবারে আলো দেখানোর পালা।
দরজায় একটা শব্দ হল, এরউইন এসেছে।
“সব কিছু পেয়েছো এরউইন?”
“হ্যাঁ, স্যার, অনেক কষ্ট করে সংগ্রহ করতে হল।”
“কষ্টের শেষেই তো ভোর আসবে এরউইন। এবার যেভাবে বলেছি সেভাবে প্রস্তুত করো সব।”
এরউইন তার কাজে লেগে গেল।
একটা বড়ো পাত্রে, এরউইন তার সঙ্গে করে আনা কালো মোরগগুলোর গলা চিরে রক্ত জমা করতে লাগল। অদ্ভুত মারণচিৎকার করছিল পাখিগুলো। তারপর ঐ গরম কালো রক্তের মধ্যে, কবরের মাটি, সালফার আর কালো মরিচ মিশিয়ে দেয় সে। তারপর ডাক্তার আব্রাহাম, পকেট থেকে কিছু প্রাচীন তামার মুদ্রা বের করে আনেন আর সেই পাত্রের মধ্যে ফেলে দেন।
নিজের পকেট ঘড়িটা বের করে সময় দেখেন আব্রাহাম। কাসলের জানলা দিয়ে বাইরের হলুদ চাঁদটাকে দেখেন তিনি। বাইরের পৃথিবী তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর রাত। চোখের ইশারায় তিনি এরউইনকে নির্দেশ দিলেন।
কবরের কফিন থেকে তুলে আনা জং ধরা একটা পেরেক দিয়ে য়ুবারমেনশের বুকের উপর একটা পেন্টাগন আঁকতে থাকে এরউইন। একটার পর একটা পেরেক তার শরীরে গাঁথা হয়। সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। পেন্টাগন কমপ্লিট হলে আব্রাহাম তার ঠিক মাঝখানে, য়ুবারমেনশের ওঠানামা করা বুকের ওপরেই একটা কালো মোমবাতি জ্বালিয়ে দেন।
“দুনিয়ার সেরা ভোজবাজিটা এবারে তুমি দেখতে পাবে এরউইন। এতক্ষণ বিজ্ঞানের খেলা দেখেছ। আলোর জয়যাত্রা দেখেছ। এবার দেখবে সেই আলোর বুকে অন্ধকারের সূত্রপাত।” হিসহিসিয়ে বলে উঠলেন আব্রাহাম।
রক্তভর্তি পাত্রটা তুলে নেন তিনি। সেটাকে সাবধানে বসিয়ে দেন য়ুবারমেনশের পেটের ওপরে। তারপর কোটের পকেট থেকে বের করে আনেন একটা ছুরি, চুবিয়ে দেন সেই রক্তের মধ্যে।
“অনেক শরীর, আর একটা প্রাণ, একটা বলিদান, একটা পারফেক্ট শক্তিশালী আধার, স্বয়ং শয়তান, ইয়েতজার হারা (Yetzer hara) নেমে আসবেন এই শরীরে।” আপনমনে বিড়বিড় করেন আব্রাহাম, “হিটলার কা ভেবেছিল? আমি তাকে সুপারহিউমান সেনার ফৌজ বানিয়ে দেব? বরং আমি এই য়ুবারমেনশকে দিয়েই তিন নম্বর রাইখকে নরকে পাঠাব। আমার বাবার উপর হওয়া অত্যাচারের বদলা নেব। প্রতিটি ইহুদির’ হিসেব বরাবর করব আমি!”
হাসতে থাকেন আব্রাহাম। ক্রূর, ধূর্ত হাসিটা ক্রমেই উন্মাদের অট্টহাসিতে পরিণত হয়।
হঠাৎ বাইরে প্রচন্ড চিৎকার শোনা যায়। গুলি-গোলার আওয়াজ ছাপিয়ে বহু মানুষের আর্তনাদ কানে আসে। বোঝা যায়, কোনো ভয়ংকর শক্তিশালী বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে ছিন্নভিন্ন হচ্ছে পরাক্রমশালী নাৎসিবাহিনী।
একটা জোরালো সবুজ আলো জানলা দিয়ে ছিটকে আসে। আব্রাহাম আর এরউইনের চোখ ঝলসে যায়।
দড়াম করে দরজাটা খুলে যায় তখনই। ছিটকে ভেতরে ঢুকে আসেন ক্যাপ্টেন হপম্যান হোল্টেনবারনার! রক্তাত্ত, ঘর্মাক্ত, শিহরিত, কুকুরের মতো হাফাচ্ছেন তিনি। কোনোরকমে দম নিয়ে তিনি চিৎকার করে ওঠেন, “তোমার কাজ কি এখনও শেষ ডাক্তার হয়নি ডাক্তার? ওরা কিন্তু এসে গেছে, আর সময় নেই!”
“ওরা?” কাঁপা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করেন আব্রাহাম, “কারা?”
“সবুজ মানুষেরা…” কথাটা শেষ করতে পারেননি ক্যাপ্টেন হপম্যান হোল্টেনবারনার। ধপ করে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েছিলেন তিনি।
আব্রাহাম আর এরউইন কিছুই বোঝেননি। তবে তাঁরা দেখেছিলেন, সবুজ আলোর দ্যূতি ক্রমশ বাড়ছে। আর কারা যেন এগিয়ে আসছে এদিকেই!
.
আট
হাইডেলবার্গ, জার্মানী ১৯৮০
১৩৮৬ সালে গড়ে ওঠা হাইডেলবার্গ শহর জার্মানদের শিল্প সচেতনতার অন্যতম উজ্বল নিদর্শন। নিকার নদীর ধারে গড়ে উঠেছে এই প্রাচীন জার্মান নগরী। একে বিজ্ঞান আর শিক্ষার কান্ডারীও বলা চলে। হোটেলে নিজের ঘরে বসে নিকার নদীর জলে সূর্যাস্ত দেখতে-দেখতে এই কথাগুলোই ভেবে চলেছিলেন প্রফেসর সোম।
বন্ধুবর ডাক্তার লিয়াম রডরিগেজের অনুরোধে জার্মানীর হাইডেলবার্গ শহরে মেটাফিজিকসের এক সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছিলেন প্রফেসর সোম। সংগঠকদের সৌজন্যে এত সুন্দর একটা জায়গায় থাকার সুযোগ তো হয়েইছে। আসল লাভটা হয়েছে অন্য জায়গায়।
সচরাচর এই সেশনগুলো রসকষহীন আলোচনা আর নিজেদের জ্ঞান জাহিরের জায়গা ছাড়া অন্য কোনো ভূমিকা পালন করে না। কিন্তু এবার ব্যাপারটা একটু অন্যরকম হল। চার্লস ডিভান নামের এক জার্মান মেটাফিজিসিস্ট, আলোচনার ফাঁকে কথায়-কথায় হিটলারের নাৎসি বাহিনীর সঙ্গে অকান্টের সম্পর্ক নিয়ে কিছু কথা বলেন। এমনিতে এগুলো আর পাঁচটা উড়ো গল্পের মতো করে অনেক জায়গায় শুনেছেন সোম। কিন্তু এবারের আলোচনাটা শুধু গপ্পো ছিল না। ছিল যুক্তি আর তক্কোও।
ডক্টর আব্রাহাম, কাসল রড্রিজ, ক্যাপ্টেন হপম্যান হোল্টেনবারনার, আর য়ুবারমেনশ, এই শব্দগুলো তাঁর কানে বারবার ভেসে উঠছিল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যপার, ওই বিশাল কর্মকান্ডের শেষটা দেখা গেল কেউই জানেন না।
চার্লস ডিভান জানান, কাসল রড্রিজের শেষটা নিয়ে অনেক দ্বিমত আছে। কেউ বলে ডক্টর আব্রাহামের পরীক্ষায় এমন কিছু রাসায়নিক ব্যবহৃত হয়েছিল যে সেগুলোর বিস্ফোরণে দুর্গটাই উড়ে যায়। কেউ আবার বলে, বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন নাৎসিবাহিনীর কোনো অজ্ঞাত শত্রু ছিল এই ধ্বংসলীলার পিছনে। কারণ যাই থাকুক, সময়ের কালস্রোতে কাসল রড্রিজ পুরো মুছে যায়। হারিয়ে যায় ডক্টর আব্রাহাম আর তাঁর য়ুবারমেনশ, চিরতরে।
তবে প্রফেসর সোমের এই বিষয়ের প্রতি আগ্রহ দেখে, চার্লস তার সংগ্রহে থাকা কিছু দুষ্প্রাপ্য বই আর থিসিস পেপার প্রফেসরকে দিয়েছেন। বন্ধুবর লিয়াম রডরিগেজ আগামী ক’দিন প্রফেসরকে জার্মানি ঘুরিয়ে দেখাবেন। সেই ফাঁকে তিনিও বইগুলো পড়ে ফেলবেন।
সন্ধের মুখে প্রার্থনা সেরে, কিঞ্চিত ওয়াইন আর জার্মান কেক নিয়ে প্রফেসর সোম বইগুলো পড়তে বসার উদ্যোগ করছিলেন। হঠাৎ হোটেলের কাঁচের জানলা দিয়ে একটা কালো ছায়া তার নজরে পড়ল।
নিকারের বুকে নির্জন ব্রিজের ধারে কে যেন দাঁড়িয়ে রয়েছে। অত্যন্ত বিপজ্জনক ভাবে নদীর জলের দিকে ঝুঁকে রয়েছে সে।
আরে! লোকটা তো নদীর বুকে লাফাতে চলেছে মনে হচ্ছে। একটানে দরজা খুলে ব্রিজের দিকে ছুটলেন প্রফেসর সোম।
.
নয়
ঠক-ঠক করে কাঁপছিল লোকটা। ইতিমধ্যে ভেজা জামা-কাপড়-জ্যাকেট সব খুলিয়ে দিয়েছেন প্রফেসর সোম। ফায়ার প্লেসের ধারে বসিয়ে দিয়েছেন লোকটাকে। অবশ্য নিকার নদীর হিমশীতল জল থেকে ছ’ফুট লম্বা মানুষটিকে তুলে আনতেও রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছে প্রফেসরকে। দু’জনেরই শরীরে তাপমাত্রা অনেকটা নেমে গেছে। আপাতত গরম কম্বল, এবং নিজের কিছু পোশাক পরিয়ে লোকটিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা করছেন প্রফেসর।
লোকটা কিন্তু ফায়ার প্লেসের ধারে সোফায় চুপচাপ বসে আছে সে। তার মুখ থেকে কিছু বের করতে পারেননি প্রফেসর।
“ড্রিংক দিয়েসে মিলচ। আপনি এই ব্র্যান্ডি মেশানো দুধটা খেয়ে নিন, গায়ে একটু জোর পাবেন।” ভাঙা জার্মান আর ইংলিশ মিশিয়ে বলার চেষ্টা করলেন প্রফেসর। গ্লাসটাও এগিয়ে দিলেন আগন্তুকের দিকে।
“আপনি আমাকে কেন বাঁচাতে গেলেন?” সুস্পষ্ট ইংরেজিতে বলে উঠলেন সেই আগন্তুক।
“আমি না থাকলেও, অন্য কেউ নিশ্চই বাঁচাত।” মুচকি হেসে বললেন প্রফেসর সোম।
“আপনি জানেন না, আমাকে বাঁচিয়ে নিজেকে ঠিক কী ধরনের বিপদের মুখে ফেলেছেন আপনি। আমার সম্বন্ধে কিছুই না জেনে এভাবে আমাকে বাঁচানো ঠিক হয়নি আপনার।”
“বিপন্ন মানুষের প্রাণ বাঁচানোটা আমার কর্তব্য।” মৃদু হেসে বললেন প্রফেসর, “আর বিপদ জিনিসটা আমার বেশ ভালোই লাগে। তাই নিশ্চিন্ত হোন। আমি জানি, আমি কী করেছি।”
“এ কী!” লোকটির চোখ বিস্ফারিত হয়, “এগুলো আপনার কাছে কীভাবে এল? আপনিও তাহলে ওদের দলের? হা ঈশ্বর! শেষে ওই শয়তানদের হাতেই আমাকে মরতে হবে!”
চিৎকার করে সোফা থেকে ঠিকরে গেল সেই আগন্তুক। তার দৃষ্টি আর উদ্যত আঙুল, দুইই নিবদ্ধ ছিল টেবিলে রাখা চার্লস ডিভানের বই আর থিসিসগুলোর দিকে। একেবারে ওপরের ফোল্ডারটার মলাটে জার্মান ভাষায় জ্বলজ্বল করছিল একটা নাম, ‘মিথোস ভন শ্লস রড্রিজ’, মিথ অফ কাসল রড্রিজ!
“আপনি ভুল করছেন। আমি আপনার শত্রু নই।” শান্ত গলায় বললেন প্রফেসর সোম।
“আমার ভুল হয়নি শয়তান।” আতঙ্ক আর রাগ আগন্তুকের গলা দিয়ে উপচে পড়ে, “তোমরা সবাই মিলে আমার মুখ বন্ধ করতে চাইছ। কিন্তু পারবে না। আমি সরে গেলেও কেউ না কেউ এই নারকীয় কাজ বন্ধ করতে আসবেই।”
“শান্ত হোন।” পেশাগত প্রশিক্ষণ কাজে লাগান প্রফেসর সোম, “এগুলো দেখে আপনার যা প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, আপনার সাহায্য দরকার। যদি আমাকে সুযোগ দেন, আমি একটু চেষ্টা করতে পারি।”
প্রফেসরের কথা, দাঁড়ানোর ভঙ্গি, সর্বোপরি নজর আগন্তুককে শান্ত করে। হু-হু করে কেঁদে ফেলেন মানুষটি।
“আপনি আর আমার জন্য কী করবেন? শয়তান আমার সব কেড়ে নিয়েছে।” প্রফেসর এগিয়ে আসেন তার দিকে, কাঁধে হাত রাখেন।
“আপনি আমাকে নির্ভয়ে সব কিছু বলতে পারেন। কে জানে, হয়তো পরমপিতার আশীর্বাদে আমিই আপনার কোনো কাজে লেগে যেতে পারি।”
.
দশ
“কিন্তু আপনার কাছে এসব কী করে এল?” নিজেকে একটু সামলে নিয়েই প্রশ্ন করেন আগন্তুক, “আপনাকে তো এদেশীয় বলে মনে হচ্ছে না।”
“আমি ভারতীয়। একটা সেমিনারে যোগ দিতে এখানে এসেছি। সেখানেই অন্য এক বক্তার কাছ থেকে এই বই আর থিসিস পেপারগুলো আমার হাতে আসে।” বলেন প্রফেসর সোম।
“বলেন কী! আপনার সেমিনারের কী এমন সাবজেক্ট ছিল যে এগুলো নিয়ে আপনাদের ঘুরতে হয়?”
“মাফ করবেন। ঘটনার ঘনঘটায় আমার পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি। আমার নাম রেভারেন্ড রুদ্র সোম। আমি মেটাফিজিক্সের একজন অধ্যাপক। এছাড়া চার্চের হয়ে আমি অকাল্ট ইনভেস্টিগেটার হিসাবেও কাজ করে থাকি।”
“আমাকে আমার ব্যবহারের জন্য ক্ষমা করবেন। আসলে আমি এমন এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যে নিজের মাথা ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। হয়তো আমি খুব শিগগিরি পাগলই হয়ে যাব।”
“মাথা ঠান্ডা করে বরং সেই কথাগুলোই বলুন, যদি আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। কে জানে, সমস্যা সমাধানের কোনো সূত্র সেখান থেকেও বেরিয়ে আসতে পারে।” বললেন প্রফেসর সোম।
“বেশ, যদি যেচে আমার বিপদে জড়িয়ে যেতে চান, তাহলে শুনুন আমার কাহিনি।
আমার নাম কার্ল হারবার্টজ। আমি একজন ব্যবসায়ী। আমার স্ত্রী উর্দুলা হারবার্টজ একজন ইতিহাসবিদ তথা গবেষক। মূলত হিটলার আর নাৎসিবাহিনীর ইতিহাস নিয়েই ও কাজ করে।
গত সপ্তাহে আমার স্ত্রীর কাছে একটা টেলিগ্রাম আসে। সেটা পেয়ে ও বেরিয়ে যায়। ও যখন ফিরে আসে, তখন ওকে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল। আমি অনেক প্রশ্ন করলেও ও কিছু বলতে চায়নি।”
“তারপর?” প্রফেসর সোম প্রশ্ন করেন।
“অনেক জোরাজুরির পর উর্মুলা একটা অদ্ভুত ঘটনা শোনায়। কলেজে ওর সহপাঠী ছিল স্যামথা জোন্স। সে এখন একটা নাম করা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক, জীববিজ্ঞানী। হঠাৎ করে সে নাকি পাগল হয়ে গেছে। উর্দুলা আর স্যামথা সেই কলেজ জীবন থেকেই প্রাণের বন্ধু। তাই উর্মুলার পক্ষে এরকম একটা খবর শুনে চুপচাপ বসে থাকা সম্ভব হয়নি। ক’দিন আগেই স্যামথা আমাদের বাড়ি এসেছিল। এমন একটি প্রাণচঞ্চল হাসিখুশি মেয়ে হঠাৎ করে পাগল হয়ে যাবে, এটা ও বিশ্বাসই করতে পারেনি।”
“স্যামথাকে দেখে আসার পর ওঁর, মানে আপনার স্ত্রীর কী মনে হয়েছিল?”
“উসুলা বলল, আপাতদৃষ্টিতে স্যামথাকে দেখে মানসিক বিকারগ্রস্ত বলে মনে হলেও, ব্যাপারটা অত সহজ নয়।”
“মানে?”
“বাড়িতেই একটা ঘরে পায়ে শিকল দিয়ে আটকে রাখা হয়েছিল ওকে। স্যামথা ওকে দেখে চিনতে পেরেছিল। উর্দুলা যখন তার কাছে গিয়ে গায়ে- মাথায় হাত বোলাতে চায়, তখন হঠাৎ করেই স্যামথা খেপে যায়। অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে-করতে ও উর্দুলার গলা টিপে ধরে। আশেপাশের সবার বেশ বেগ পেতে হয় ওদের ছাড়াতে। উর্মুলা ওখান থেকে চলে আসে।
“তারপর?”
“তারপরেই শুরু হয় সর্বনাশের খেলা। উর্দুলা ভারাক্রান্ত মনে বাড়ি এসে হঠাৎ খেয়াল করে, তার জ্যাকেটের পকেটে কে যেন একটা চিঠি রেখে দিয়েছে ওর অজান্তে।”
“কার চিঠি?”
“স্যামথা জোন্স।”
“কী ছিল সেই চিঠিতে?” প্রশ্ন করেন প্রফেসর।
কার্ল হারবার্টজ নিজের আধ-শুকনো পোশাক থেকে একটা দোমড়ানো- মোচড়ানো চিঠি বের করে প্রফেসর সোমের সামনে ধরেন।
.
এগারো
ডিয়ার উর্সুলা,
এই চিঠি তুমি যখন পাবে, তখন আমি হয়তো আর সুস্থ থাকব না। হয়তো আমি আর থাকবই না। এরা আমাকে থাকতে দেবে না। আমার হাতে আর সময় বেশি নেই, তাই যেটা বলছি শোনো। মুলদা নদীর তীরের গভীর জঙ্গলের খাদের মধ্যে ক’দিন আগে সাতটা মমি আবিষ্কারের কথা পেপারে পড়েছিলে নিশ্চয়। তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য আমাদের ইউনিভার্সিটিতে আনা হয়। সৌভাগ্যবশত আমাকেও সেই কাটাছেঁড়ার টিমে রাখা হয়। জার্মানিতে মমি কোথা থেকে এল এই নিয়ে চারদিকে তোলপাড় হয়ে যায়, তোমরা সবাই জান। তবে এটা তোমার পক্ষে জানা সম্ভব নয় যে ওখানে সাতটা নয়, টোটাল আটটা মমি পাওয়া গেছিল। ওই আট নম্বর মমির কথাটা বিশেষ কয়েকজন ছাড়া কেউ জানত না। সেটা সাধারণ মমির তুলনায় আকারে বিশাল ছিল। সরকারি কর্তাদের বক্তব্য ছিল, ওটার খবর বাইরে বেরোলে শুধু-শুধু হইচই শুরু হবে। মিডিয়া বাগড়া দেবে, তাতে কাজের কাজটাই হবে না। বরং পর্যবেক্ষণ আর বিশ্লেষণ করে তবেই জনসমক্ষে যাওয়া উচিত হবে। আমরা মেনে নিয়েছিলাম কথাটা।
একটি বিশেষ ঘরে আমাদের ডিপার্টমেন্টের হেড হের লুকাসের তত্ত্বাবধানে মমিটাকে রাখা হয়েছিল। ওখানে যাওয়ার অনুমতি আমাদেরও ছিল না। শুধু কয়েকজন সরকারি কর্তা, আর লুকাস ওখানে যেতেন। কিন্তু তুমি তো জানই আমার স্বভাবের কথা। ছোটো থেকেই কোথাও বাধা পেলে সেই কাজটাই করার ইচ্ছে আমার বেশি হয়। একদিন লুকাসের চেম্বার থেকে কাসল রড্রিজ, ডক্টর আব্রাহাম, য়ুবারমেনশ এই শব্দগুলো আমার কানে আসে। কাকে যেন ফোনে এসব বলছিলেন লুকাস।
এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছ, কেন সেদিন হঠাৎ করে তোমার কাছে এগুলো নিয়ে জানতে চেয়েছিলাম। আমার চেনাজানার মধ্যে খুব কম লোকই আছে যাদের নাৎসিদের এইসব কার্যকলাপ নিয়ে তোমার মতো এত পড়াশোনা আছে। তোমার কাছে সবটা জেনে আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। যাইহোক এক গভীর রাতে সবার চোখের আড়ালে পাহারাদারদের বেকুব বানিয়ে আমি সেই বিশাল মমির গোপন চেম্বারে ঢুকে পড়লাম। তখনই আমার সর্বনাশ হল।
পাহারাদাররা ফিরে আসার আগেই আমার যা দেখার দেখা হয়ে গেছিল। ওই বিশাল শরীরটা কোনো একটা মানুষের ছিল না। ওটা ছিল বিভিন্ন শরীর থেকে আনা অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সমন্বয়ে সৃষ্ট একটা শরীর। পরের দিন ইউনিভার্সিটি গিয়ে দেখি সেই মমি উধাও হয়েছে। আমি লুকাসকে গিয়ে জিজ্ঞেস করতে তিনি যেন আকাশ থেকে পড়েন। লুকাস দাবি করেন, ওরকম কোনো মমি নাকি ছিলই না কোনোদিন। আমি রেজিস্টার চেক করি, দেখি সেখানেও এন্ট্রি নেই। সব প্রমাণ ভোজবাজির মতো উবে গেছে! আমার টিমের লোকেদের ব্যাপারটা বলায় তাদেরও একই প্রতিক্রিয়া হয়। আমি নাকি ভুল দেখেছি! শুরু থেকে নাকি সাতটাই মমি ছিল। সেই শুরু, তারপর থেকেই ‘আমার স্নায়ুর ওপর চাপ পড়েছে, ‘আমার ক’দিন ছুটি নেওয়া দরকার’, ‘ভুলভাল দেখছি’ ইত্যাদি বলে আমাকে পাগল প্রতিপন্ন করা শুরু হয়। দু’টো কালোকোট পরা লোক আমাকে সারাদিন ফলো করতে থাকে।
বেশ বুঝতে পারছি উর্দুলা, এরা আবার কোনো ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে মেতেছে। আমি তারই মাঝে পড়ে গেছি। আমার পক্ষে আর এখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাই আমিও ঠিক করেছি, এর শেষ দেখেই ছাড়ব।
ডিয়ার উর্দুলা, এই চিঠি যখন তোমার হাতে গিয়ে পড়বে তখন আমি হয়তো আর থাকব না। বাকিটা তোমার আর পরমপিতার ওপরে ছেড়ে দিলাম।
ইতি
স্যামথা
“চিঠি পড়ে কী বুঝলেন প্রফেসর?” প্রশ্ন করলেন কার্ল হারবার্টস। “এখনই কিছু বলা মুশকিল।” মাথা নেড়ে বললেন প্রফেসর সোম, “আপনি একটু অপেক্ষা করুন।”
প্রফেসর সোম দু’কাপ হট চকোলেট নিয়ে ফিরলেন।
“এটা খান কার্ল, গায়ে জোর পাবেন। উর্মুলা চিঠিটা পেয়ে কী করলেন?”
“সে চিরকালই অসমসাহসী। আমার শত বারণ সত্ত্বেও পরের দিনই উর্দুলা বেরিয়ে যায় স্যামথার সঙ্গে দেখা করবে বলে। ও… ও আর ফিরে আসেনি।”
“মানে?”
“স্যামথার বাড়ি অবধি ও পৌঁছয়নি। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি।”
“আপনি কাউকে জানাননি?”
“হাসালেন প্রফেসর। থানা, পুলিশ, মেয়র, প্রাইভেট গোয়েন্দা, এমনকি অন্ধকার জগতের লোকেরা… কিছুই বাকি রাখিনি ওকে খুঁজতে। কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারেনি। কোনো সূত্র দিতে পারেনি।”
“হুঁ…” চিন্তিতভাবে মাথা নাড়েন প্রফেসর সোম।
“এই যে আমার উর্দুলা।” মানিব্যাগ থেকে একটা ছবি বের করে দেখান কার্ল, “ওকে আর আমি ফিরে পাব না, এ আমি বুঝে গেছি প্রফেসর। ওর দুশমনের দল ভয়ংকর শক্তিশালী। তারা সমাজের সর্বোচ্চ স্তরে বসে আছে। প্রতিমুহূর্তে তারা নজর রেখে চলেছে আমাদের ওপরে। তাই তো বলছিলাম প্রফেসর, আমাকে বাঁচিয়ে আপনি নিজের মাথায় বিরাট বিপদ টেনে নিয়েছেন!”
“আমি আপনাকে আগেও বলেছি কার্ল, বিপদের মুখোমুখি হওয়াটা আমার পেশা।” উঠে দাঁড়িয়ে বললেন সোম, “আপনাকে কথা দিতে পারছি না, কারণ এটা সরকারি আইনরক্ষকদের এলাকা। তবে কাকতালীয় ভাবে হলেও আমি এই ব্যাপারে জড়িয়ে গেছি। তাই তলিয়ে দেখতে হচ্ছেই। আপনি আজ ভালো। করে বিশ্রাম নিন, আমি কাল আপনার সঙ্গে আবার কথা বলব এই নিয়ে।”
কার্ল হারবার্টজকে শুভরাত্রি জানিয়ে পাশের ঘরে চলে যান প্রফেসর। তাঁর মন বলছিল, নিজের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সীমার অনেক বাইরের কিছুর সঙ্গে লড়তে চলেছেন তিনি। কিন্তু এখন তো আর পিছিয়ে আসা যাবে না। তাছাড়া তিনি ছাড়া এই লোকটির পাশে দাঁড়ানোর মতো আর কেউ আছে বলে মনে হচ্ছে না।
একটা প্রকাণ্ড হাই তোলেন তিনি। সেই অবস্থাতেও মনে-মনে ছকে নিতে চেষ্টা করেন পরের কাজগুলো। বন্ধুবর লিয়ামকে জানাতে হবে সবটা, কারণ এই অচেনা দেশে সেই একমাত্র ভরসা করার মতো মানুষ। আজ রাতে ই চার্লসের দেওয়া কাসল রড্রিজ আর য়ুবারমেনশ সংক্রান্ত বইগুলো একটু ঘেঁটে নিতে হবে। কিন্তু বড্ড ঘুম পাচ্ছে যে! অবাক হলেন প্রফেসর। রাত জেগে নিশাচরদের মোকাবিলা করায় অভ্যস্ত মানুষের তো এই ভর সন্ধেবেলা এত ঘুম পাওয়া উচিত নয়। অথচ চোখের পাতা দুটো অস্বাভাবিক ভারী হয়ে আসছে যেন…
.
বারো
“উইলকোমেন প্রফেসর সোম, উইলকোমেন! ওয়েলকাম টু আওয়ার লিটিল শ্লস অফ ডার্কনেস। এই অন্ধকারের দুর্গে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি!”
মাথায় একটা ভোঁতা যন্ত্রণা। চারপাশ আলোয় অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল। তবু সব অস্পষ্ট। যেন একটা কুয়াশার মধ্য দিয়ে সব দেখতে হচ্ছে!
ধীরে-ধীরে চোখের ঘোলাটে দৃষ্টিটা পরিষ্কার হয়ে আসে প্রফেসর সোমের। তিনি দেখেন, তাঁকে ঘিরে আছে একরাশ অজানা লোক। ধড়মড় করে উঠে বসতে যান তিনি, কিন্তু পারেন না। প্রফেসর বুঝে যান, তাঁকে একটা টেবিল জাতীয় কিছুর উপর শক্ত করে বেঁধে শুইয়ে রাখা হয়েছে। ওপরের উজ্জ্বল আলোর সারি এই ইংগিতই দিচ্ছে যে এই টেবিলটা সাধারণ জিনিস নয়, বরং অপারেশন টেবিল! বিস্মিত চোখে, মাথা তুলে ঘাড় ঘুরিয়ে যতটা দেখা যায় সবটা দেখেন প্রফেসর সোম। সভ্যতার শত যোজন দূরে এক আদিম অন্ধকারাচ্ছন্ন গুহাপ্রান্ত বলেই মনে হচ্ছে, তবে অত্যাধুনিক মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টে পরিপূর্ণ! চারপাশের কালো আলখাল্লায় মুখ ঢাকা লোকেদের মাঝ থেকে এক দীর্ঘাঙ্গ ছায়ামূর্তি কে তার টেবিলের দিকে এগিয়ে আসতে দেখেন প্রফেসর সোম।
“উইলকোমেন প্রফেসর সোম, উইলকোমেন।” মহিলা কণ্ঠস্বর সোমকে সজাগ করে তোলে আরও দ্রুত, “আশা করি আপনার খুব একটা কষ্ট হয়নি এখান অবধি পৌঁছতে।”
মুখ থেকে কালো কাপড় সরিয়ে ফেলেন মহিলা, “আমাকে চিনতে পারছেন সোম?”
আরে! এ কী? এ মুখ তো চেনেন তিনি! প্রফেসর সোমের সারা শরীর দিয়ে একটা হিমস্রোত বয়ে যায় যেন! বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান তিনি! কালো আলখাল্লার পরে যে মহিলা তাঁর দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গের হাসি হাসছে, তার ছবি গত দু’দিনে অন্তত একশো বার তিনি দেখেছেন কার্ল হারবার্টজের হাতে!
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লাস্যময়ী আর কেউ না, কার্লের স্ত্রী উর্দুলা হারবার্টজ! পেছন থেকে আলখাল্লা পরা আরেকজনকে নিঃশব্দে এগিয়ে আসতে দেখা যায় উসুলার দিকে! উর্দুলা তাকে খেয়াল করে না, সে হেসে চলেছে প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে। অতি সন্তর্পণে এগিয়ে আসা সেই ছায়ামূর্তির হাতে ধরা প্রকাণ্ড ছুরিটা দেখতে পান প্রফেসর। তিনি দমবন্ধ করে অপেক্ষায় থাকেন পরের ঘটনাটুকু দেখার জন্য।
হঠাৎ সেই আলখাল্লা পরা লোকটা এক ঝটকায় উর্দুলাকে পেছন থেকে জাপটে ধরে। তার গলায় সেই ছুরিখানা সজোরে চেপে ধরে লোকটা। অতর্কিত এই আক্রমণে উর্দুলা হতবাক হয়ে যায়। ছুরি ধরা সেই ব্যক্তির আলখাল্লা সরে যায়। তার মুখ দেখে প্রফেসরের প্রাণে কিছুটা হলেও আশার আলো জাগে, কার্ল হারবার্টজ!
কিন্তু তখনই কার্ল হারবার্টজের হাতের বাঁধন ধীরে-ধীরে আলগা হয়। ছুরি সরিয়ে সশব্দে সে চুমু খায় উর্দুলার ঠোঁটে! প্রফেসর সোমের আশার কফিনে শেষ পেরেক পুঁতে দিয়ে সে বলে ওঠে,
“সরি ফর দা ট্রাবল প্রফেসর। মিট মাই বিউটিফুল ওয়াইফ উসুলা হারবার্টজ!” তাদের হাসির প্রতিধ্বনিতে গুহার প্রতিটা দেওয়াল যেন কম্পিত হয় অজানা কোনো আগামী বিপদের আশঙ্কায়!
.
তেরো
“আপনি এক নতুন ইতিহাস রচনার সাক্ষী হতে চলেছেন প্রফেসর। ইউ শুড বি প্রাউড অফ ইয়র্সেলফ।” হিসহিসিয়ে কথাগুলো বলে উঠলো কার্ল।
“চারপাশটা ভালো করে দেখুন প্রফেসর। আপনি সব বুঝতে পারবেন।”
“চারপাশ দেখার মতো অবস্থায় তো আপনি আমাকে রাখেননি কার্ল।”
“হাহ্! আপনার সাহস আছে প্রফেসর। মৃত্যু সামনে জেনেও আপনি রসবোধ হারাননি। কী করব বলুন, আমি যে নিরুপায়। তবে হ্যাঁ, আপনিও জ্ঞানপিপাসু, আমরাও তাই। তাই সব শেষ হয়ে নতুন হওয়ার আগে আপনার সেই তৃষ্ণা আমরা মিটিয়ে দেব। কষ্ট করে একটু বাঁ দিকে দেখুন প্রফেসর। কী দেখতে পাচ্ছেন?”
অতি কষ্টে বাঁ দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন প্রফেসর সোম। তাঁর রক্ত হিম হয়ে গেল। যা শুনেছিলেন, যা পড়েছিলেন, তার সবটাই সত্যি? এখনও এই উন্মাদের দল পৃথিবীতে এই নারকীয় খেলা চালিয়ে যাচ্ছে!
আরেকটা অপারেশন টেবিল, তার উপর রাখা আছে আর একটা নিস্পন্দ শরীর। তবে তার আকৃতিটা মানুষের মতো হলেও সেটাকে মানুষ বলা চলে না। দৈত্যাকার একটা শরীর। তাতে অসংখ্য কাটাকুটি আর সেলাই-এর দাগ। বহুবার যে তার ওপর সার্জারি চালানো হয়েছে, সেটা ভালোই বোঝা যাচ্ছে। বিকট আকারের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে, সেটা কোনো একজন মানুষের হতে পারে না। বরং বহু মানুষের শরীর থেকে নিপুন দক্ষতায় সেগুলো উপড়ে এনে জোড়া হয়েছে শরীরে। ফলে অদ্ভুত একটা পৈশাচিক আকৃতি সৃষ্টি হয়েছে। মুখটা অবশ্য দেখা যাচ্ছে না, সেটা ঢাকা রয়েছে একটা কালো কাপড় দিয়ে। তাতে স্বস্তিক চিহ্ন দেওয়া। ·
“কী বুঝলেন প্রফেসর সোম?”
“য়ুবারমেনশ।”
“শাবাশ! আপনার জ্ঞানের পরিধির প্রশংসা করতেই হচ্ছে প্রফেসর। ঠিক ধরেছেন। এই হল দ্য পারফেক্ট ম্যান।”
“কিন্তু কেন কার্ল? আপনাদের আদর্শ তো অনেকদিন আগেই মারা গেছে। আবার নতুন করে প্রমাণ করার কী দরকার যে আপনারা কতটা ভুল ছিলেন?”
“আমরা ভুল ছিলাম? আমরা মৃত? মূর্খ! নাৎসি আদর্শের মৃত্যু হয়নি, আর কখনও হবেও না। এটা ওই কাল্পনিক পরমপিতার মতো নিছক ভাঁওতাবাজি নয়। এটা পরমসত্য।”
“কিন্তু কেন কার্ল? হোয়াই য়ুবারমানশ? আপনাদের হাতে যে প্রযুক্তি আর জ্ঞান আছে, তা দিয়ে চাইলেই আরও ভয়ঙ্কর কোনো অস্ত্র বানিয়ে নেওয়া যায়। তাহলে য়ুবারমেনশ কেন?”
“কেন নয়, প্রফেসর? আমরা নিজেদের মানুষ বলি বটে, কিন্তু মান আর হুঁশ কি সত্যিই আছে আমাদের? নিজেদের সভ্য বলে জাহির করা এই মানব সভ্যতা, স্বার্থের সামান্য বিচ্যূতিতে যে আদিম নগ্ন রূপ দেখিয়ে ফেলে, তাতে বুনো পশুরাও লজ্জা পাবে। ধর্মের নামে, জায়গার নামে, তেলের নামে, ছোট্ট- ছোট্ট এমন অসংখ্য জিনিসের নামে এরা যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে চলেছে। এর ফলে বিবর্তনের পথে আমাদের অস্তিত্বও লোপ পেতে চলেছে। অথচ এই নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই।”
“সেটার সমাধান কী? য়ুবারমেনশ?”
“এই পৃথিবীর একটা রিস্টার্ট দরকার, প্রফেসর। সব পুরোনো ক্ষত, ঘা, মুছে ফেলে আবার একটা সুন্দর পৃথিবী গড়তে হবে আমাদের। তার জন্য অনেকটা অন্ধকার রাস্তা পেরোতে হবে আমাদের। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ এটার উত্তর। একটা শেষ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম, ব্যাস। তারপর সব শেষ, সব শান্ত। শুধু টিকে থাকব আমরা আর আমাদের অনুগামীরা। সেই লড়াইয়ে য়ুবারমেনশ আমাদের মস্ত বড়ো ভরসা, আমাদের লক্ষ্যও বটে।”
“খুবই ভালো কথা, কার্ল। কিন্তু এখানে আমার ভূমিকাটা কী? মানে এত কাঠখড় পুড়িয়ে আমাকে কেন এই প্রক্রিয়ায় টেনে আনা?” মুচকি হেসে প্রশ্ন করলেন, প্রফেসর সোম।
“এতক্ষণে আপনি আসল প্রশ্নটা করেছেন প্রফেসর। আচ্ছা, সেন্ট মনটিয়াসের সেই ফাদার জোসেফের কথা আপনার মনে আছে, প্রফেসর সোম? যার ছুরির ধারে আপনি পাহাড়চূড়ার মৃত্যুদূত গ্রিম রিপারকেও হারিয়ে দিয়েছিলেন?”
সেন্ট মন্টিয়াস! ফাদার জোসেফ! গ্রিম রিপার!! এই নামগুলো কীভাবে ভুলবেন প্রফেসর সোম? বিস্ময়ের ধাক্কায় তিনি সাময়িকভাবে বাকরুদ্ধ হন।
“খুব অবাক হলেন নাকি, প্রফেসর?” কার্লের দু’চোখ ঝিকমিকিয়ে ওঠে কৌতুকে, “আপনি কি ভেবেছিলেন অন্ধকারের দেবতা আপনাকে এমনি ছেড়ে দেবেন? আপনি সত্যিই হতভাগ্য, নইলে উনি নিজে থেকে আপনার কাছে এলেও তাঁকে যথোচিত মর্যাদা না দিয়ে আপনি নিজের সামান্য দাবিদাওয়া মেটাচ্ছিলেন?
হ্যাঁ, এটা ঠিক যে য়ুবারমেনশের সঙ্গে আপনার কোনো ডিরেক্ট সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই এতটা অন্ধকারের রাস্তা আমাদের একার পক্ষে পার হওয়া সম্ভব ছিল না। তাই আমরা স্বয়ং অন্ধকারের রাজার শরণাপন্ন হয়েছিলাম। উনি আমাদের কথা রেখেছেন। কিন্তু ওঁর আবির্ভাবের জন্য একটা আধার প্রয়োজন। কোনো সাধারণ মানুষের শরীরের সীমাবদ্ধতায় ওঁর অসীম ব্যাপ্তিকে ধারণ করা অসম্ভব।”
“আর তাই য়ুবারমেনশ?” বিড়বিড় করে ওঠেন প্রফেসর সোম। নিজেকে বড্ড অসহায় লাগে তার।
“ঠিক তাই, প্রফেসর। য়ুবারমেনশের পারফেক্ট শরীরটাতেই স্বয়ং শয়তান আবির্ভূত হবেন, চালাবেন তার ধ্বংসলীলা। তিনিই গাইড করবেন আমাদের।”
“আপনারা আগেও ডিলিউশনাল ছিলেন। এত রক্তক্ষয়, এত হতাশার পরেও আজও আপনারা তেমনই রয়েছেন কার্ল।”
“হাঃ হাঃ! আপনি যা খুশি ভাবতে পারেন প্রফেসর। আপনার যে এই অবস্থাতেও দয়াভিক্ষা না করে এ-সব বলার মতো সাহস আছে, সেটা আমরা জানি। সেজন্যই তো অন্ধকারের সম্রাট একটাই জিনিস চেয়েছিলেন অর্ঘ্য হিসেবে, আপনার ওই দমদার, সাহসী হৃৎপিন্ডটা। ওটার অভাবেই এতদিন সম্পূর্ণ হতে পারেনি য়ুবারমেনশ। তবে এবার হবে। হবেই!”
একটা অদ্ভুত দর্শন ছুরি হাতে কার্ল এগিয়ে আসে প্রফেসর সোমের দিকে। এ ছুরি খুব ভালো করেই চেনেন প্রফেসর। সেই সেন্ট মন্টিয়াসের ফাদার জোসেফের ছুরি এটা।
“খুব একটা কষ্ট হবে না প্রফেসর। স্রেফ আপনার হৃদয়টা উপড়ে নেব, আর বসিয়ে দেব য়ুবারমেনশের শরীরে। ব্যস এটুকুই।” হাসতে হাসতে পজিশন নেয় কার্ল।
ঠিক তখনই বাইরে প্রচণ্ড একটা কোলাহল শোনা যায়। একটা প্রবল ঝড় যেন এগিয়ে আসছে গুহার ভেতরে। তার সঙ্গেই ক্রমে জোরালো হচ্ছে একটা সবুজ আলো। কাদের যেন পায়ের শব্দও শোনা যাচ্ছে! কার্ল আর তার অনুগামীদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি হয়। কীসের অজানা আশঙ্কায় তারা যেন উৎকণ্ঠিত হয়ে ওঠে। নীরবে সব লক্ষ্য করেন প্রফেসর, আর সুযোগের অপেক্ষা করেন।
“আমি জানতাম ওরা আসবে। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।” নিষ্ঠুর ধাতব গলায় বলে কার্ল, “কিন্তু ওরা জানে না যে ডক্টর আব্রাহামের সময়ের থেকে আমরা অনেকটা এগিয়ে গেছি। আসুক ওরা, আমরাও প্রস্তুত।”
.
চোদ্দ
“এই সবুজ আলোর ঝড় কীসের কার্ল?” প্রফেসর সোম প্রশ্ন করলেন।
“আহ্ প্রফেসর! আপনি বোধহয় ভাবেন যে এই দুনিয়ায় অবাক হওয়ার মতো বা করার মতো যা কিছু আছে তার সবই আপনি ইতিমধ্যে দেখে ফেলেছেন। কিন্তু আজ আপনাকে ভুল প্রমাণ করব প্রফেসর।” হিসহিসিয়ে বলে উঠল কার্ল হারবার্টজ, “দেখে যান শুধু।”
ইতিমধ্যে গুহার কালো দেওয়ালগুলো সবুজ হয়ে উঠেছে আলোয়, বাইরে থেকে ভেসে আসছে হাড়হিম করা আর্তনাদ। সেগুলো যে যে কার্লের প্রহরীবাহিনীর সে কথা বলাই বাহুল্য। কারা যেন সব প্রতিরোধ ছিন্ন করে একটু-একটু করে এদিকেই এগিয়ে আসছে।
“ভূত, প্রেত, ঘুল, নেকড়েমানুষ, গ্রিম রিপার, এমনকি স্বয়ং শয়তানের সঙ্গেও আপনার মোলাকাত হয়েছে, তাই না প্রফেসর?”
প্রফেসর সোম কোনো জবাব দেন না।
কার্ল বলে চলে…
“সেদিন ডক্টর আব্রাহাম কেন সফল হতে পারেনি জানেন? ওই… ওদের জন্য! ওদের সবসময় পৃথিবীর মানুষের ওপর নজর রাখে।”
“কারা?”
“ভগবান বলতে পারেন, বা ভিনগ্রহী। যা বলবেন। সবুজ মানুষও বলতে পারেন।”
“সবুজ মানুষ?” বিস্ময়ে হতবাক প্রফেসর প্রশ্ন করেন।
“হ্যাঁ। তবে এবার ওদের জারিজুরি খাটবে না। ওরা জানে না, আমাদের টেকনোলজিও কতটা এগিয়ে গেছে সময়ের হাত ধরে।” ঘরের অন্য দিকে মুখ করে চেঁচাল কার্ল, “ব্রিং দাস, মাচ এস!”
‘ওটাকে নিয়ে এসো। সব রেডি করো।’ মনে-মনে অনুবাদ করলেন প্রফেসর সোম।
কার্লের শাগরেদদের মধ্যে ব্যস্ততা তখন তুঙ্গে। কয়েকজনকে দেখা গেল কয়েকটা ধাতব তারজালি দিয়ে তাদের চারপাশে একটা বর্গাকার বাক্স রচনা করছে। প্রফেসর দেখলেন, কার্ল আর তার দলবল একটা ধাতব খাঁচার মধ্যে যেন স্বেচ্ছায় বন্দি হয়ে পড়ল। প্রফেসরের বিস্মিত দৃষ্টি দেখে বোধহয় কার্লেরও মায়া হল।
“ভাবছেন, আমরা কেন নিজেদের এই খাঁচার মধ্যে বন্দি করছি, তাই তো প্রফেসর?”
“হ্যাঁ। ঠিক তাই।”
“ফ্যারাডে কেজ কী জানেন?”
“ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ প্রিভেন্টার?”
“ইয়েস প্রফেসর! ইয়েস। দিস ইজ আ ফ্যারাডে কেজ। আমাদের ভিনগ্রহী বন্ধুরা এর ভেতরে আসতে পারবে না। ওদের জারিজুরি এর বাইরের দেওয়ালেই সীমাবদ্ধ হয়ে থাকবে। অসহায়ের মতো ওরা দেখবে, য়ুবারমেনশের আবির্ভাব।”
কার্ল-এর কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রফেসর দেখেন, ঘরের মধ্যে একটা সবুজ আলোর কুণ্ডলী তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে যেন অনেকগুলো অস্পস্ট শরীর মিশে আছে তাতে।
সেই তীব্র সবুজ আলোর দিকে তাকাতে কষ্ট হয় প্রফেসর সোমের। তবে এর মধ্যেও তিনি শুনতে পান, সেই কুণ্ডলী থেকে অদ্ভুত কিছু যান্ত্রিক শব্দ ভেসে আসছে। কিন্তু তারা যেন হঠাৎ করেই থমকে গেছে একটা জায়গায়। কীসে যেন বাধা পাচ্ছে।
“ফ্যারাডে কেজ ওয়ার্কড লাইক আ চার্ম।” কার্লের অট্টহাসি শুনতে পান প্রফেসর সোম, “সবুজ মানুষের দল! তোমরা ভুলে গেছিলে যে আমি সেই আদিম আমলের অসহায় ডক্টর আব্রাহাম নই। এবার তোমরাও দেখ, আমরা কীভাবে তোমাদের চোখের সামনেই অন্ধকারের জয়যাত্রা শুরু করি। হাইল হিটলার!”
হাইল হিটলার! হাইল হিটলার! অন্ধকার দীর্ঘজীবি হোক! কার্লের কথাগুলো সব আলখাল্লাদের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হতে থাকে।
প্রফেসর সোম বুঝতে পারেন, চরম বিপদ আসন্ন। খাঁচার বাইরে পরমশক্তিমান যে বা যারা আছে, তারা খাঁচার ভেতরে ঢুকতে পারছে না!
জলদি কিছু ভাবতে হবে, আর সময় নেই।
হঠাৎ করে প্রফেসর খেয়াল করলেন, দীর্ঘক্ষণ ধরে, কিছুটা অভ্যাসবশত পা নাড়িয়ে যাওয়ার কারণে তাঁর পায়ের বাঁধনটা কখন যেন আলগা হয়ে গেছে। কার্লের দল নিজেদের মধ্যেই মত্ত, কেউ এদিকে দেখছেও না। এটাই শেষ সুযোগ, ভাবলেন প্রফেসর।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে দেখলেন, য়ুবারমেনশকে যে টেবিলে রাখা হয়েছে তার তলায় চাকা লাগানো আছে। ব্যস! প্রফেসরের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। তিনি ডান পা-কে বাঁধন থেকে বের করে সজোরে ধাক্কা দিলেন ওই টেবিলটায়। সেটা সজোরে গিয়ে আঘাত করল ফ্যারডে কেজের একপ্রান্তে।
ঝনঝন শব্দে খুলে গেল একদিকের ধাতব প্রাচীর।
কার্লের দল সেটা দেখতে পেয়ে ছুটে এল প্রফেসরের দিকে। কিন্তু দেরি হয়ে গেছিল! মুহূর্তেই সবুজ আলোর কুণ্ডলীটা আকারে বাড়তে-বাড়তে সবাইকে গ্রাস করে নিল। আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। শুধু শোনা যাচ্ছিল মৃত্যুযন্ত্রণায় ফেটে পড়া একঝাঁক মানুষের চিৎকার! সেই সবুজ আলোর সামনে প্রফেসর সোমের চেতনাও লুপ্ত হল।
চিরপরিচিত অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙল প্রফেসরের। ধড়ফড় করে উঠে বসলেন তিনি হোটেলের বিছানায়। হা ঈশ্বর! তবে কি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি? নিজের হাত-পায়ে চোটের চিহ্ন খুঁজতে লাগলেন তিনি। কিন্তু নাহ্! কোথাও বিন্দুমাত্র আঘাত নেই, তাহলে কি গোটাটাই স্বপ্ন?
মাথা আঁকড়ে অতি কষ্টে উঠে দাঁড়ালেন প্রফেসর। মাথাটা বড্ড ভারী হয়ে আছে। কিন্তু চোখে মুখে জল দিতে উঠে সামনে তাকিয়েই তিনি স্তম্ভিত হলেন।
আরে! কী হল ব্যাপারটা?
চার্লস ডিভানের বই, কাগজ, ফোল্ডার… এসব কিচ্ছু নেই টেবিলে। বরং সেখানে রাখা আছে একটা চিঠি।
চিঠিটা তুলে নিলেন প্রফেসর সোম।
ঝরঝরে বাংলায় লেখা…
স্নেহের রুদ্র,
ঐ বইগুলোর প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়েছে। তাই সেগুলো আবার জায়গায় ফিরে গেছে। তোমার মনে অনেক প্রশ্ন ভিড় করে আসছে জানি, কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। শুধু এটা জেনে রেখ, সৃষ্টির আদি থেকে অন্ত অবধি পৃথিবীর সমস্তটাই আমাদের নজরে ছিল, আর ভবিষ্যতেও থাকবে। তোমাকে ধন্যবাদ, তবে তুমিও নজরে থাকবে আমাদের।
ভালো থেকো।
ইতি,
সবুজ মানুষ।
ধপ করে চেয়ারের ওপর বসে পড়লেন প্রফেসর সোম, চিঠিখানা হাতে নিয়ে!
***
