নৈশ প্রহরী – কৌশিক সামন্ত
ইসস, আজ অনেকটাই দেরি হয়ে গেল। অন্তত খুলি পাহাড়ের ধার ঘেঁষে নামতে থাকা লাল সূর্যটা তারই জানান দিচ্ছে, রাতের অন্ধকার নামতে আর বেশি দেরি নেই।
পশমের কোটের ছেঁড়া অংশগুলো দিয়ে ঢুকতে থাকা ঝোড়ো হিমেল হাওয়া গ্যাব্রিয়েলের শরীরে ধারালো আঁচড় কাটছিল। কিন্তু কিছু করার নেই গ্যাব্রিয়েলের। শরীর ঢাকতে এই পশমের ওভারকোর্ট মিলেছে, এটাই ভাগ্যি মা তো জন্ম দিয়েই মরে গেছে। ভবঘুরে বাপ যে সারাদিন বনে বাদাড়ে কোথায়-কোথায় ঘুরে বেড়ায়, কবে ন’মাস ছ’মাসে বাড়ি ফেরে, বা আদৌ বেঁচে আছে কি না, সে পরমপিতাই জানেন। মামারবাড়ির লোকেরা মা-মরা গ্যাব্রিয়েলকে দয়া করে যে ঠাঁই দিয়েছিলেন, তাই এই হিমপুরী-তে দু’টো খেয়ে-পরে সে এখনও বেঁচে আছে।
অবশ্য গ্যাব্রিয়েল বয়সে ছোটো হলেও মাথায় নয়। সে রীতিমতো গতর দিয়ে খেটে মামার অনুগ্রহের বোঝা ফিরিয়ে দেয়। তার সারাদিনের কাজ বলতে মামাবাড়ির ভেড়াগুলোকে রক্ষনাবেক্ষণ করা। সকাল হতেই দুটো রুটির ঢেলা আর এক বোতল জল বেঁধে সে বেরিয়ে পড়ে একপাল ভেড়া নিয়ে। তাদের সারাদিন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খাইয়ে দাইয়ে সে ফিরে আসে।
এ কাজে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি নেই তার। বরং গ্রামের অন্য বাচ্চারা যখন মুখ নীচু করে ধীর পায়ে স্কুলে যায়, সে তখন উদ্দাম গতিতে ছুট লাগায় ভেড়ার পালের পিছনে। বাকিরা যখন বইয়ের ফাঁকে সারা দিনটা কাটিয়ে ফেলে, সে তখন এ পাহাড় সে পাহাড় ঘোরে। কতো অজানা জঙ্গল, কতো অচেনা দৃশ্য, সদ্য তুষারপাতের ওম, সবটাই ও মেখে নেয় নিজের শরীরে। এই পাহাড়- জঙ্গল, নির্জন প্রান্তর, সবটাই তার বড্ডো চেনা। স্রেফ ঐ খুলি পাহাড়টা ছাড়া।
খুলি পাহাড়ের প্রসঙ্গ ফিরতেই চিন্তার জাল ছিন্ন হয় গ্যাব্রিয়েলের।
গ্রামের সবাই তাকে পই-পই করে বারণ করে খুলি পাহাড়ের এদিকে আসতে। সন্ধে তো দূরের কথা, অতি বড়ো সাহসীও দিনের বেলা এ-পথ মাড়ায় না। কত রহস্য, কত গল্প, কত আতঙ্ক যে ঘিরে আছে এই জায়গা ঘিরে, তার ইয়ত্তা নেই।
কিন্তু গ্যাব্রিয়েল কী করবে? খুলি পাহাড় পেরিয়ে গেলেই যে অদ্ভুত একটা জগৎ এসে হাজির হয় তার সামনে! সেখানে ঝর্নার জলে রামধনু খেলে যায়। পাখির ডাকে তার হারানো শৈশব কথা বলে। নাম না জানা ফুলের মধুতে মায়ের দুধের মিষ্টতা পায় সে…
নাহ্! আজ সে সত্যিই বড্ড দেরি করে ফেলেছে সে। নিভতে থাকা সূর্যের সঙ্গে গ্যাব্রিয়েলের বুকের সাহসটাও ক্রমশ নিভে যাচ্ছে যেন। কিন্তু কিছু করার নেই। বাড়ি ফেরার রাস্তা ধরতে গেলে সেই খুলি পাহাড়কে অতিক্রম করতেই হবে। একটাই ভরসা, যদি গ্যাব্রিয়েলের দেরি দেখে মামাবাড়ির কেউ এগিয়ে আসে।
যা হয় হোক! পরমপিতার নাম নিয়ে বিশৃঙ্খল ভেড়ার পালকে একত্রিত করতে থাকে গ্যাব্রিয়েল। ভেড়াগুলোও অন্যদিনের তুলনায় বড্ড অস্থির যেন। ওরাও কি কিছু টের পেয়েছে?
ভেড়াগুলোকে দ্রুত পায়ে তাড়িয়ে নিয়ে যেতে থাকে গ্যাব্রিয়েল।
তাড়াহুড়োর মাঝে সে খেয়াল করে না, দূর থেকে একজোড়া হিমশীতল চোখ তাকিয়ে আছে তার দিকে, নিষ্পলক, সবুজ!
.
দুই
যাক বাবা, এ যাত্রা সে বেঁচে গেছে, ঈশ্বরকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানায় গ্যাব্রিয়েল। খুলি পাহাড়ের যাত্রাপথ সে প্রায় অতিক্রম করেই ফেলেছে। সামনের ঢালটা নেমে গেলেই, ব্যস! আর কোনো ভয় নেই।
বোতলটা বের করে ঢকঢক করে একটানা জল খেয়ে নেয় সে। উফ্! কী ভয়ই না পেয়ে গেছিল সে!
হঠাৎ করে একটা চাপা ক্রুদ্ধ গর্জন কানে আসে গ্যাব্রিয়েলের। একটা বিশ্রী গন্ধে চারপাশটা ভরে যায়। গলায় জল আটকে যায় গ্যাব্রিয়েলের। তার গায়ের লোম খাড়া হয়ে ওঠে আতঙ্কে। এই পাহাড় উপত্যকার প্রতিটা মানুষ এই গন্ধ, এই গর্জন চেনে। ভেড়ার পালে চিৎকার পড়ে যায়, এদিক সেদিক ছুটতে থাকে তারা।
হতভম্ব গ্যাব্রিয়েল বুঝতে পারেনা, সে কী করবে, কী করেই বা উদ্ধার পাবে এই বিভীষিকার হাত থেকে। হাতের দুর্বল লাঠিটাকে শক্ত করে সামনের দিকে বাগিয়ে ধরে গ্যাব্রিয়েল। আজ পরমপিতাই ভরসা।
একটু-একটু করে তাদের চেহারা স্পষ্ট হতে থাকে। গ্যাব্রিয়েলের চোখে ধরা পড়ে আগুনে, ঘৃণাভরা চোখের ঝাঁক। তাদের চোয়ালের পাশ দিয়ে ঝরে পড়ছে আদিম ক্ষুধা, গলা থেকে বেরিয়ে আসছে গর্জন।
একপাল পাহাড়ি বুনো নেকড়ে!
নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য নিজেকে তৈরি করে গ্যাব্রিয়েল। আর তখনই ঝড়ের মতো কী যেন একটা ছুটে আসে তার দিকে! প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায় সে গ্যাব্রিয়েল আর সেই নেকড়ের পালের মাঝখানে।
একটা ধপধপে সাদা নেকড়ে!
সাধারণের তুলনায় বিশাল তার শরীর। খুলি পাহাড় কাঁপানো বিকট শব্দে সে হুংকার দেয় নেকড়ে পালের দিকে। তারপর সবুজ চোখে গ্যাব্রিয়েলের দিকে ফিরে তাকায় একবার! কিন্তু সে চোখে ঘৃণা নেই, নেই ক্ষুধা। আছে ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতা। বড্ড চেনা লাগে এই সবুজ চোখদুটো। অনেকদিন ধরে সে যেন তাদের দেখে আসছে, কিন্তু কোথায়… কিছুতেই মনে করতে পারে না গ্যাব্রিয়েল।
নেকড়ের পাল পিছু হটে না। মাত্র একজনের ভয়ে, সামনের এমন লোভনীয় খাদ্যবস্তু ছেড়ে পিছু হটবে কেন তারা?
মুহূর্তের মধ্যে একটা খণ্ডযুদ্ধ বেঁধে যায়। সাদা নেকড়েটা ঝাঁপিয়ে পড়ে নেকড়ের পালের ওপর। যদিও সে বিশাল শরীরের অধিকারী, তবু রক্তলোলুপ নেকড়েদের সংখ্যাও তো কম নয়।
গ্যাব্রিয়েলের মনে হয়, সে যেন আলো আর অন্ধকারের আদিম যুদ্ধের মাঝে আটকা পড়েছে। আঁচড়, কামড়, রক্তপাত, গর্জন…! ঘটনার ঘনঘটায় গ্যাব্রিয়েল যেন পাথর হয়ে যায়। নিজের সবটুকু শক্তি জড়ো করে এই মুহূর্তেই যে এই প্রান্তর ছেড়ে তার পালিয়ে যাওয়া উচিত, একথা সে ভাবে না। হঠাৎই সাদা নেকড়ের অভেদ্য রক্ষণী ভেদ করে সেই নেকড়ের পাল থেকে একটা নেকড়ে কীভাবে যেন এগিয়ে আসে গ্যাব্রিয়েলের দিকে।
হাতের সরু লাঠিগোছাটাকে শক্ত করে বাগিয়ে ধরে গ্যাব্রিয়েল সেই রক্তলোলুপ প্রাণীটার দিকে। কিন্তু গ্যাব্রিয়েল যে নেকড়েটার তুলনায় বড়োই দুর্বল! নিমেষে নেকড়েটা বুকের ওপর চেপে বসে গ্যাব্রিয়েলের। নিজের ছোটো হাতদুটো দিয়ে যে সাধ্যমতো চেষ্টা করে প্রাণীটার ধারালো দাঁতের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে। পূতিগন্ধ নিঃশ্বাসে জ্বলে যেতে থাকে গ্যাব্রিয়েলের সারা শরীর।
কিন্তু তার সব চেষ্টা ব্যর্থ করে নেকড়েটা গ্যাব্রিয়েলের গলায় কামড় বসিয়ে দেয়। আর্ত চিৎকার করে ওঠে গ্যাব্রিয়েল। বেরিয়ে আসা রক্তের স্রোত তার শরীর ভিজিয়ে দেয়।
একটু-একটু করে শরীর অবশ হয়ে আসে গ্যাব্রিয়েলের। ও বুঝতে পারে, চিরতরে ঘুমিয়ে পড়তে চলেছে ও। তবু, আধবোজা চোখেও ও দেখতে পায়, একটা সাদা ঝড় যেন ছুটে আসছে তার দিকে ।
সেই সাদা নেকড়েটা!
তার সাদা শরীরে আঁচড়, কামড়, রক্ত, যুদ্ধজয়ের চিহ্ন। খুনে নেকড়ের দল পিছু হঠেছে।
এক ধাক্কায় সে গ্যাব্রিয়েলের বুকে বসে থাকা নেকড়েটাকে দূরে ছিটকে ফেলে। তারপরে কামড়ে ধরে গ্যাব্রিয়েলের কবজি। যন্ত্রণায় আবার চিৎকার করে উঠতে গিয়েও থমকে যায় গ্যাব্রিয়েল। সে দেখে নেকড়েটার চোখে জল! সে যেন কাঁদছে, কিছু একটা বলতে চাইছে তাকে।
ঘুমের কোলে ঢলে পড়ার আগে সবুজ চোখদুটো এতোক্ষণে চিনতে পারে গ্যাব্রিয়েল, এ চোখদুটো সে চেনে, খুব ছোটো থেকেই চেনে।
এ চোখ তার ভবঘুরে হতভাগ্য বাপের!
.
তিন
।। বছর ৪০ পরের এক তুষারাবৃত সন্ধ্যা ।।
“কাজটা কি ঠিক হল স্যার?”
“কোন্ কাজটা?”
“এই যে! এই নির্জন প্রান্তরে এইভাবে একা-একা এত বড়ো ঝুঁকি নেওয়া।”
“এতদিন ধরে আমার সঙ্গে থেকেও তোমার ভয় আজও কাটল না জোনাথন।”
“তা নয় স্যার। সাহসের অভাব আমার নেই। আপনি চাইলে হাসতে- হাসতে যান দিয়ে দেব। কিন্তু কানাঘুষোয় যার কথা শুনি, তার সঙ্গে তো গুলি- বন্দুকে যুদ্ধ করা চলে না।”
“অত ভেব না জোনাথন। পরমপিতার নাম নাও আর এগিয়ে চলো। কিচ্ছু হবে না। তাছাড়া বেশি সময় আমাদের হাতে নেই।”
“কিন্তু স্যার, যা রটে তার কিছু তো সত্যি বটে!”
“জোনাথন! বাজে কথায় সময় নষ্ট কোরো না। যদি সে আসেও, জেনে রেখ, এই শেরিফ ম্যাকবুল কাউকে ডরায় না। স্বয়ং শয়তান সামনে এলেও তার আজ উদ্ধার নেই এই বন্দুকের রেঞ্জ থেকে!”
চাঁদের দিকে তাকালে নেশা হয়ে যায়। বরফের পুরু চাদর যেন স্বছ আয়না বলে মনে হয়। এর মধ্য দিয়েই একটা ঘোড়ার গাড়ি এগিয়ে চলেছে কোনো এক অজানা গন্তব্যে। টিমটিমে লণ্ঠনের আলোয় বোঝা যায়, গাড়ির পেছনে দুই অশ্বারোহী এগিয়ে চলেছে ধীরগতিতে। পোশাক-আশাক দেখে তাদের বেশ সম্ভ্রান্তবংশীয় বলেই মনে হয়। তবে তাদের দুজনের কাঁধেই দেখা যায় দুটো চকচকে বন্দুক, চাঁদের আলো ঠিকরাচ্ছে।
গাড়ির ভেতরে রয়েছে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে। মেয়েটা বোধহয় অসুস্থ, ছেলেটার কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।
গাড়ির সামনে বসে থাকা প্রাজ্ঞ কোচোয়ানের মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। সে অনবরত চেষ্টা করে চলছে ঘোড়াগুলোকে আরো গতিশীল করে তুলতে। কিন্তু চেষ্টাই সার। শীতের প্রবল কামড় বুঝি আজ ঘোড়াদের শ্লথ করে ফেলেছে।
হঠাৎ, একটা বিশ্রী গন্ধে চারপাশটা ভরে যায়। দুর্যোগের কালো মেঘ এসে ঢেকে দেয় চাঁদখানা।
ঘোড়াগুলো দাঁড়িয়ে পড়ে। কোচোয়ানের শত চাবুকের আঘাতও তাদের আর নড়াতে পারে না। অনাগত বিপদের আভাস যেন তাদের স্থবির করে দিয়েছে।
আসন্ন বিপদের আশঙ্কায় প্রাজ্ঞ কোচয়ান বুকে আঙ্গুল দিয়ে ক্রশ আঁকে। দুই অশ্বারোহী বন্দুক নিয়ে তৈরি হয়।
দূরে দেখা যায় একটা বিশাল কালো পাশব ছায়া। ওত পেতে দাঁড়িয়ে আছে সে মূর্তিমান মৃত্যু হয়ে। তার ঝকঝকে দাঁতের সারি, আর চোয়ালের ধার বেয়ে নামতে থাকা কষ বুঝিয়ে দিচ্ছে, সামনের মানুষদের সে কী চোখে দেখছে। তবে নিকষ কালো শরীরের মাঝেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে একজোড়া সবুজ চোখ!
.
চার
“লাইকানথ্রোপি সম্বন্ধে কী ধারণা তোমার?”
“আজ্ঞে?”
শনিবার সকাল সকাল পৌঁছে গেছি প্রফেসর সোমের বাড়ি। ব্রেকফাস্ট থেকে লাঞ্চ। সঙ্গে একটা জমাটি গল্প, থুড়ি প্রফেসর সোমের জীবনের একটা পরিচ্ছদ। সচরাচর আমার এই রুটিনে কোনো ছেদ পড়ে না, আজও পড়েনি। প্রফেসরের ওয়ান্ডার কুক প্রহ্লাদের বানানো লুচিতে সবে কামড় দিয়েছি, তখনই প্রফেসরের বিকট প্রশ্নবাণ উড়ে এল। অবশ্য ওঁর এ বদঅভ্যাসটা নতুন নয়।
“আজ্ঞে আমার ঠিক জানা নেই। আপনিই আলোকপাত করুন!” আমি আমতা আমতা করে বললাম।
“ওয়্যার উলফ, নেকড়ে মানুষ, লাইকান… এমন অনেক নাম আছে বটে। তবে এক কথায় এ হল মানুষ থেকে নেকড়েতে শেপশিফট করা নিয়ে মনের ব্যাধি। এই প্রক্রিয়াটা মেটামরফোসিস না মেটাফর, সেই নিয়ে আজও লোকের মনে দ্বিধা আছে।” প্রফেসর সোম মুচকি হাসলেন!
“গল্পের বই আর টোয়াইলাইট সিনেমার চক্করে যেটুকু আইডিয়া হয়েছে, তাতে তো একে বেশ উপকারী বলেই মনে হয়।”
“উপকারী!” অট্টহাস্য করে উঠলেন প্রফেসর, “ইতিহাস কিন্ত অন্য কথাই বলে কৌশিক।”
“কীরকম?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“এই উলফ ম্যান, বা লাইকানথ্রোপি, এসব কিংবদন্তির সূচনা মধ্যযুগেরও আগে। তবে ইউরোপীয় লোককথায় আবির্ভাব হলেও মধ্যযুগে এটা অন্যরকম চেহারা পায়। কলোনাইজেশানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দাবানলের মতো এই ধারণাটা, অনেকটা উইচ-হান্টের অনুষঙ্গ হিসাবেই ছড়িয়ে পড়ে।”
“কোনো ঐতিহাসিক রেফারেন্স?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“১৫৮৯ সালের রেকর্ডে পিটার স্টাম্প নামে একজনের কথা পাওয়া যায়। সে ছিল এক ধনী জার্মান কৃষক। ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ওয়্যারউলফ ট্রায়াল ছিল ওটা। পিটারকে যখন শাস্তি দেওয়া হয়, তখন তার নামে অভিযোগ ছিল, চোদ্দটি শিশুকে খুন করার, যাদের হৃৎপিন্ড উপড়ে নেওয়া হয়েছিল। সেই হতভাগ্যদের মধ্যে একটি আবার তার নিজের সন্তান ছিল! দু’জন প্রেগন্যান্ট মহিলার শরীর থেকে ভ্রূণ ছিঁড়ে নেওয়ার কথা উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ছিল অগুনতি জ্যান্ত ছাগল, ভেড়া, গরুর রক্ত-মাংস ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাওয়ার অভিযোগ!”
“কিন্তু অভিযোগ প্রমাণ হল কীভাবে? মানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তো দেখা যায় গ্রামবাসীদের কুসংস্কারের বলি হয়েছে কোনো নিরপরাধ মানুষ।”
“সত্য-মিথ্যা পরমপিতা জানেন। ইতিহাস বলে, ট্রায়ালের সময় পিটারের একটা হাত কাটা ছিল। আগের রাতে নাকি গ্রামবাসীদের হাতে নেকড়ের একটা থাবা কাটা পড়েছিল। সেই সূত্রেই ধরা পড়ে পিটার। পিটার স্টাম্প পরে এও বলেছিল যে সে ছোটো থেকেই শয়তানের উপাসক। শয়তানই নাকি খুশি হয়ে তাকে নেকড়ে হওয়ার শক্তি দিয়েছিল!। সে আরও একটা মারাত্মক কথা বলেছিল।”
“কী?”
“পিটার স্টাম্পের সঙ্গে ওর মেয়েকেও শাস্তি দেওয়া হয়।”
“কেন?”
“মেয়ের সঙ্গে তার নাকি অজাচারের সম্পর্ক ছিল। মরার আগে পিটার স্বীকার করে, বা বলে, স্বয়ং শয়তান নাকি এক সাকিউবাস (Succubus) কে তার নিজের মেয়ে করে পাঠিয়েছিল, তার কাজে সন্তুষ্ট হয়ে উপহার হিসাবে। বাপ-মেয়ের অস্বাভাবিক যৌন সম্পর্কের পরিণতি ছিল মৃত্যু।”
“বুঝলাম! তা প্রিলিউড তো কমপ্লিট, এবারে নিশ্চয়ই আপনার নিজের জীবনের একটা ঘটনা তুলে ধরবেন স্যার?” আমি মুচকি হাসলাম।
আবার অট্টহাস্য করে উঠলেন প্রফেসর। তারপর বললেন, “বলব- বলব, আগে প্ৰহ্লাদ চা দিয়ে যাক।”
.
ধূমায়িত চা সামনে নিয়ে প্রফেসর বলতে শুরু করলেন।
“তখন আমি সেন্ট অ্যান্ড্রুজে মেটাফিজিক্সের প্রফেসর হিসাবে কাজ করছি। হঠাৎ একদিন চার্চ থেকে খবর এল, কয়েকজন আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। সমস্যাটা কিঞ্চিত অদ্ভুত। ওঁদের বরফ- ঢাকা গ্রামে নাকি বহুকাল ধরেই এক উপকারী নেকড়েমানবের বাস। যুগ যুগ ধরে নাকি সে পাহাড়ী রক্তলোলুপ নেকড়ে, যাযাবর তুষারদস্যু, ইত্যাদির হাত থেকে নাকি গ্রামকে বাঁচিয়ে চলেছে। এরকম বেশ চলছিল, গ্রামবাসীরা তাই মাথাও ঘামায়নি, কিন্তু হঠাৎ কয়েকদিন আগে সে নাকি এক তুষাররাতে ওই গ্রামেরই শেরিফের ছেলের গাড়িতে আক্রমণ করে। শেরিফের ছেলে এবং তার সহকারী প্রাণ হারায় সে যাত্রায়, শুধু শেরিফ কপালজোরে বেঁচে যায়।
এখন আমাকে এই ‘অপকারী’ ওয়ারউলফ নিকেশ করতে হবে!
.
পাঁচ
প্রিয় রুদ্র,
তুমি আমাকে চিনবে না। কিন্তু তোমার কাজ সম্পর্কে আমার ভালোই
ধারণা আছে।
একটা অত্যন্ত বড়ো বিপদে পড়ে বাধ্য হয়েই তোমার শরনাপন্ন হতে হচ্ছে। শারীরিক অসুস্থতার জন্য আমি সশরীরে হাজির হতে পারলাম না। শেরিফ ম্যাকবুল আর আমার অনুচর হেস্টিংসকে পাঠাচ্ছি, ওঁদের কাছ থেকেই সবটা শুনতে পাবে তুমি। তোমার বুদ্ধি, সাহস আর সিদ্ধান্তের ওপর আমার সম্পূর্ণ ভরসা আছে। এরপর যা করার তা আমি তোমার ওপরেই ছেড়ে দিলাম। পরমপিতা তোমার মঙ্গল করুন।
ইতি
ফাদার জি. হেনরি
.
ভারি অদ্ভুত আর সংক্ষিপ্ত তো চিঠিটা, ভাবলেন প্রফেসর সোম।
সামনে বসে থাকা কৃষ্ণাঙ্গ যাজকটি এবার বলে উঠল, “গুড মর্নিং প্রফেসর সোম, আমার নাম জন হেস্টিংস। আমি ফাদার হেনরির অধীনে কাজ করি। আলাপ করিয়ে দিই…” পাশে বসে থাকা সাহেবটিকে দেখিয়ে বললেন হেস্টিংস, “ইনি আমাদের গ্রাম রোজওয়েল্ডের শেরিফ মিস্টার ম্যাকবুল হ্যারিস।”
“সুপ্রভাত। হ্যাঁ ফাদার হেনরির চিঠি তো পড়লাম, কিন্তু বিশেষ কিছু বুঝতে পারলাম না। আপনাদেরই ব্যাখ্যা করে বলতে হবে ঘটনাটা।” বললেন প্রফেসর সোম।
“আমি বলছি!” বলে উঠলেন শেরিফ ম্যাকবুল। ভদ্রলোকের গলায় বেশ একটা আভিজাত্যের অহং টের পেলেন প্রফেসর সোম।
“বেশ। আপনিই বলুন ম্যাকবুল।”
“এদের সেই উপকারী মসিহার জন্য আমি কয়েকদিন আগেই নিজের ছেলেকে হারিয়েছি প্রফেসর।”
“এত বছর ধরে বাকি গ্রামবাসীদের সঙ্গে তো আপনিও নেকড়ে মানবের উপকার নিয়েছেন শেরিফ। আজ নিজের একটা অ্যাক্সিডেন্টের জন্য আমাদের মসিহা আপনার কাছে শয়তান হয়ে উঠেছে!” বিড়বিড় করে বলে ওঠে হেস্টিংস।
“চুপ কর তুই শয়তান! আর একটা কথা বললে তোর জিভ আমি উপড়ে ছিঁড়ে নেব।” হুংকার দিয়ে ওঠেন ম্যাকবুল।
“আহ্! আপনারা কী শুরু করলেন? অন্তত শালীনতা বজায় রাখুন। নাহলে আমার পক্ষে কোনোরকম কোনো সাহায্য করা সম্ভব হবে না।” প্রফেসর সোম চেঁচিয়ে ওঠেন।
“মাফ করবেন প্রফেসর। জোয়ান ছেলের মৃত্যুশোক যে পেয়েছে, জোয়ান ছেলের লাশ যে নিজের কাঁধে বয়েছে, একমাত্র সেই বুঝতে পারবে আমার কষ্টটা। বিশ্বাস করুন আমি আগেও সমস্ত গ্রামবাসীকে সাবধান করেছি। বলেছি আগুন নিয়ে না খেলতে। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনত না! আমি দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি যে ওই আগুনে আমার ঘরই প্রথমে পুড়বে।” কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন শেরিফ ম্যাকবুল।
হেস্টিংস আর প্রফেসর সোম ওঁকে সান্ত্বনা দিতে থাকেন।
.
ছয়
“আশা করি হেস্টিংস-এর মুখে সবটাই তুমি শুনেছ সোম।” জানতে চাইলেন ফাদার হেনরি।
ফাদার হেনরির অফিসে বসেছিলেন প্রফেসর সোম। রোজওয়েল্ড গ্রামে এসে, প্রাথমিক কিছু কাজ সেরেই ফাদার হেনরির সঙ্গে দেখা করতে চলে এসেছিলেন তিনি।
সাড়ে ছ’ফুটের ওপর লম্বা মানুষটার মুখের কাঠিন্য ইস্পাতসম। কিন্তু তাঁর শরীরটা যে বয়স আর দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় ক্ষয়ে গেছে ভেতরে-ভেতরে, সেটা ভালোই বোঝা যাচ্ছে।
“হ্যাঁ ফাদার। ওঁদের মুখে আমি সবটাই শুনেছি, কিন্তু আপনার কাছে আমি কিছু জানতে চাই।” মৃদু হেসে বলে উঠলেন প্রফেসর সোম।
“বলো। যথাসাধ্য চেষ্টা করব তোমার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার।”
“হেস্টিংসের, এবং আরও কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে আমার এই ধারণাই হয়েছে যে এই রহস্যমান নেকড়েমানব বহুকাল ধরেই গ্রামের ভালো-মন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।”
“আছে, তবে ভালোর সঙ্গে। মন্দের সঙ্গে নয়।’
“এটা আপনি কীভাবে বলতে পারেন ফাদার? নিজে একজন আলোর দিশারী হয়ে অন্ধকারের কোনো কায়াকে এভাবে সমর্থন করেন কীভাবে?”
“সমর্থন তো আমি করিনি সোম।”
“এ সমস্যার সমাধানও তো আপনি করেননি ফাদার। হতে পারে এই নেকড়েমানুষ উপকারী, গ্রামের হিতের কথাই ভাবে। কিন্তু আগুন নিয়ে খেললে যে হাত একদিন জ্বলবেই ফাদার, সেটা তো আপনি জানতেন। শেরিফ ম্যাকবুলের পুত্রহারা হওয়ার ঘটনাটা সেটাকেই প্রমাণ করে, তাই না?”
“মানুষের জীবনে এমন একটা সময় আসে সোম, যে সে চাইলেও অনেক কিছু করতে পারে না। অনেক কিছু না চাইলেও তাকে মেনে নিতে হয়। আমি সেই পর্যায়ে এসে গেছি সোম।”
“তাহলে আপনি আমাকে কী করতে বলেন ফাদার হেনরি?” প্রফেসর সোম প্রশ্ন করেন।
“আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি সোম। তোমার যুক্তি, বুদ্ধি, সিদ্ধান্তের ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তুমি যেটা ভালো বুঝবে, সেটাই করবে। হেস্টিংসকে সব বলা আছে। তোমার এ অভিযানের জন্য যা-যা লাগবে, সবকিছুর ব্যবস্থা সে করে দেবে। আমি ফিজিক্যালি না থাকতে পারলেও চার্চের তরফ থেকে পূর্ণ সহায়তা পাবে তুমি।” এতগুলো কথা একসঙ্গে বলে হাঁফাতে লাগলেন ফাদার হেনরি।
“আপনি এখন বিশ্রাম নিন ফাদার। আমি আবার পরে আসব।” ফাদার হেনরির অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন প্রফেসর সোম।
.
সাত
রোজওয়েল্ডে বেশ ক’দিন কেটে গেছে প্রফেসরের। কিন্তু নেকড়েমানুষ তো দূর, সাধারণ কোনো নেকড়েও তাঁর নজরে আসেনি। অবশ্য হাল ছাড়েননি প্রফেসর। এ তো কোনো সাধারণ পশু নয় যে নিজে থেকে এসে ফাঁদে ধরা দেবে। হাল ছাড়েনি হেস্টিংস-ও। তাঁর বয়স এখনও তাঁকে ফাদার হেনরির মতো অন্তর্দ্বন্দ্ব আর জরার যৌথ আক্রমণে মন্থর করে দেয়নি।
অবশ্য এই শিকারের ব্যাপারে সবথেকে উৎসাহী শেরিফ ম্যাকবুল আর তার সাঙ্গোপাঙ্গ, একথা বলাই বাহুল্য। নিছক অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর লড়াইয়ের সৈনিক হয়ে নয়, ব্যক্তিগত প্রতিশোধই সেখানে মুখ্য, এটা বেশ বুঝতে পারেন প্রফেসর সোম। কিন্তু তিনি নিরুপায়, কারণ এই কটা মানুষ বাদের সারা রোজওয়েল্ডে একটাও লোক নেই যে তাঁকে সাহায্য করবে। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করতে গেলেই সে সামনে থেকে পালিয়ে যায়, মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়, গাল পাড়ে। কেউ-কেউ আবার নেকড়েমানুষের সেই ব্যক্তির উপরে করা উপকারের ফর্দ নিয়েই বসে পড়ে।
প্রাথমিক কয়েকটা নির্জন জায়গা বেছেছেন প্রফেসর সোম। যেমন, গ্রামের শেষপ্রান্তের ভাঙা কবরখানা, রোজওয়েল্ডে ঢোকার মুখেই যে লম্বা জঙ্গল পড়ে তার মাঝে একটা পরিত্যক্ত কুয়োঘর, বড়ো ঝর্না, খুলি পাহাড়ের নির্জন ঢাল ইত্যাদি।
সময় হিসাবে শুক্লপক্ষটাকেই বেছে নিয়েছেন প্রফেসর, কারণ পূর্ণচাঁদেই ওয়্যারউলফরা সব থেকে বেশি সক্রিয় থাকে।
প্রতিরাতে গোটা গ্রাম যখন ঘুমিয়ে পড়ে, প্রফেসর সোম, হেস্টিংস, শেরিফ ম্যাকবুল আর তাঁর কয়েকজন সঙ্গী মিলে ঐ কটা জায়গা টার্গেট করে পায়ে হেঁটে ঘুরতে বেরোন। তবে দল বেঁধে না, একা। প্রত্যেকের সঙ্গেই থাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে আগ্নেয়াস্ত্র, প্রফেসরের আনা একটা করে সিলভার স্টিক, একটা বাঁশি, আর একটা মৃত পশু, যার থেকে চুইয়ে পড়ছে রক্ত। গোটা ব্যাপারটা নারকীয় হলেও কিচ্ছু করার নেই। বাতাসে কাঁচা রক্তের ঘ্রাণ ছড়িয়ে ওয়্যারউলফকে সাময়িকভাবে নেশাগ্রস্ত করে দেওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।
তবে হ্যাঁ, সবাই একা-একা ঘুরলেও তাদের বলে দেওয়া আছে, দু’জন- দু’জন করে মানুষ এমন দূরত্বের মাঝেই ঘোরাফেরা করবেন যাতে একজন বিপদ বুঝে বাঁশি বাজালে অন্য একজন শুনতে পাবে।
আজও সবাই বেরিয়ে পড়েছে। অন্যদিনের তুলনায় চাঁদটাও বেশ বড়ো, কাল পূর্ণিমা যে! ঠান্ডাটাও আজ অন্যদিনের তুলনায় বেশি ঠেকছে। অবশ্য খুলি পাহাড়ের দিকটা বেশি ফাঁকা থাকার কারণে এই ঠান্ডার প্রকোপটা বেশি, নিজের ওভারকোটের কলারটা উঁচু করতে করতে ভাবলেন প্রফেসর সোম।
হঠাৎ পাশের জঙ্গল থেকে একটা আওয়াজ এল, কেউ যেন পা টিপে হাঁটছে। শুকনো পাতায় তারই প্রতিধ্বনি।
কী করবেন? একাই গিয়ে দেখবেন? কিন্তু অচেনা জায়গায় খুব বেশি ঝুঁকি নেওয়া হয়ে যেতে পারে ব্যাপারটা। কোনো বুনো জন্তুও তো হতে পারে! বিপদ বাঁশিটা বাজিয়েই দিলেন প্রফেসর সোম।
অদ্ভুত রাতপাখির ডাকের মতো আওয়াজটা, কাছাকাছি কেউ থাকলে ঠিক শুনে চলে আসবে।
আরে ওই তো! এসেও গেছে কে যেন। কিন্তু… এ তো শেরিফ ম্যাকবুল বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু রাতপাহারার প্ল্যান অনুযায়ী কাছাকাছি তো হেস্টিংস-এর থাকার কথা।
“হ্যালো প্রফেসর! ‘
“হ্যালো শেরিফ। কিন্তু আপনি এখানে…”
কথাটা শেষ করতে পারলেন না প্রফেসর সোম। মাথার পিছনে একটা প্রচণ্ড আঘাত টের পেলেন তিনি। সংজ্ঞাবিহীন প্রফেসরের শরীরটা কাটা কলাগাছের মতো লুটিয়ে পড়ল মাটির ওপরে।
.
আট
“যাক অবশেষে জ্ঞান ফিরেছে প্রফেসরের। আমি তো ভাবলাম বন্দুকের বাড়িটা একটা বেশি জোরেই হয়ে গেছে বোধহয়!”
মাথায় অসহ্য একটা যন্ত্রণা, দপদপ করছে শিরাগুলো। মশালের ঘোলাটে আলো। ধোঁয়াটে অন্ধকার! তবু এ গলা আর হাসির শব্দগুলো চিনতে দেরি হল না প্রফেসর সোমের। শেরিফ ম্যাকবুল আর তার চার শাগরেদ!
সম্বিত ফিরতে প্রফেসর দেখলেন, একটা কাঠের থামের সঙ্গে হাতদুটো পিছমোড়া করে তাঁকে বেঁধে রাখা হয়েছে। এটা সেই জঙ্গলের পরিত্যক্ত কুয়োঘর!
“কী প্রফেসর, কিছুই বুঝতে পারছেন না, তাই না?” প্রফেসরের কানের কাছে মুখটা এনে, হিসহিসিয়ে প্রশ্ন করলেন শেরিফ ম্যাকবুল।
কোনো জবাব দিলেন না প্রফেসর।
“তাহলে খুলেই বলি আপনাকে ব্যাপারটা। আপনি তো পারলেন না নেকড়ে মানুষকে ধরতে। তাই আমি নিজেই ধরে নিয়ে এলাম। ওই দেখুন, আপনার পাশের থামে কাকে বেঁধে রেখেছি!”
“হা ঈশ্বর! এ তো হেস্টিংস!” আর্তনাদ করে উঠলেন প্রফেসর সোম। একটা থামের সঙ্গে পিছমোড়া করে বাঁধা হয়েছে হেস্টিংসকে। ছিন্নভিন্ন জামাকাপড়। অত্যাচারের চিহ্ন ফুটে উঠেছে শরীর জুড়ে।
“ইয়েস, হেস্টিংস। ব্লাডি নিগার, ওই মেরেছে আমার ছেলেকে! ওর পাপের শাস্তি ওকে পেতেই হবে।” হুংকার দিয়ে ওঠেন শেরিফ ম্যাকবুল।
“আপনি মূর্খের স্বর্গে বাস করেন শেরিফ!” চিৎকার করে ওঠেন সোম, “শেষে হেস্টিংসকে নেকড়েমানুষ ভাবলেন?”
“নেকড়েটাকে আপনি দেখেননি প্রফেসর। আমি দেখেছি। আপনাকে যেভাবে দেখছি, এতটাই কাছ থেকে দেখেছি তাকে। সাধারণ পাহাড়ী সাদা নেকড়ে নয়, সে নিকষ কালো বিভীষীকা! আমাদের এই সাদা চামড়ার গ্রামে এই একটাই কালো চামড়া। হেস্টিংস! একমাত্র ওই গ্রামের বাইরে থেকে এসেছে, অনাথ! আর স্বভাবেও উপকারী, লোকের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়ার বদঅভ্যাস!”
“আর তাই আপনি দুয়ে দুয়ে চার করে ফেললেন!”
“না প্রফেসর। আমি অতটা বোকা নই। তাহলে সবটা আমি খুলেই বলি।
আমার বাড়িতে একটা কাজের মেয়ে ছিল, লুসি। খুব ছোটো থেকেই সে আমাদের বাড়িতে থাকে। আমার মা শহর থেকে ওকে এনেছিল। সেই ছোট্ট লুসি যে কবে বড়ো হয়ে উঠেছে, আমি অন্তত খেয়ালও করিনি। একদিন আমি কাজে শহরে গেছিলাম বাড়ির সবাইকে নিয়ে। নাহ্! সবাই নয়। থেকে গেছিল আমার ছেলে, আর লুসি। আমারই ভুল। আগুন আর শুকনো খড় পাশাপাশি রাখলে যা হয় আর কি। নেশার ঘোরে ছেলেটা উন্মত্ত হয়ে অঘটন ঘটিয়েই ফেলে। বাড়ি ফিরে আমি দেখি, বিবস্ত্র লুসির রক্তাক্ত শরীরটা পড়ে আছে ঘরের এক কোণে। আমার ছেলেও অল্পবিস্তর রক্তাক্ত।
আমি এই রোজওয়েল্ডের শেরিফ। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস খুব কম লোকের আছে। সামনে বেরোলে সবাই সম্ভ্রমে রাস্তা ছেড়ে দেয়। আমার পক্ষে কি এই কলঙ্ক স্বীকার করে নেওয়া সম্ভব ছিল প্রফেসর? তাই রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম, যাতে কারো চোখে না পড়ে ব্যাপারটা। গভীর রাতে আমার ছেলে, লুসি, আর আমার খুব অনুগত একজনকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঘোড়ার গাড়ি চেপে। লুসির শরীরে তখনও প্রাণ ধুকপুক করছিল। আমার লক্ষ্য ছিল, শহরে নিয়ে গিয়ে যদি ওকে কোনোভাবে বাঁচানো যায়। হাজার হোক ছোটো থেকে মানুষ করেছি। বাঁচলে বাঁচত, নইলে কোনো অন্ধকার খাদে ওর লাশটা চিরতরে গুম করে দিতাম।”
“তাহলে নেকড়ে মানব সেদিনও কোনো ভুল করেনি শেরিফ সাহেব, তাই তো? গ্রামবাসীরা, ফাদার, সবাই ঠিকই বলে যে ঐ নেকড়ে কারো কোনদিন অপকার করতেই পারে না।” দাঁতে-দাঁত চেপে বলে ওঠেন প্রফেসর সোম।
“আমার ছেলের অপরাধের শাস্তি দেওয়ার অধিকার ওকে কে দিয়েছে? যদি দরকার হতো আমি নিজে ওকে শাস্তি দিতাম।’
“আপনি পারতেন না। পারলে এই দিন আপনার জীবনে কোনোদিন আসত না শেরিফ ম্যাকবুল।”
“মুখ সামলে প্রফেসর! অবশ্য এখন না হলেও, এমনিও একটু পরে আপনাকে মরতে হবেই। কারণ এত কিছু জেনে যাওয়ার পর আপনাকে তো আর বাঁচিয়ে রাখা যায় না।”
“কিন্তু হেস্টিংসের সঙ্গে এসবের কী সম্পর্ক?”
“আছে প্রফেসর, আছে। কারণ ঐ গভীর রাতে একজনই আমাদের গ্রাম ছাড়তে দেখেছিল। সেটা ওই হেস্টিংস। ফাদারের পেয়ারের এই পরোপকারী নিগ্রোই রাতপাহারা দেয় রোজওয়েল্ডে। তুষারঝঞ্জা, নেকড়ে, দস্যু কাউকেই রেয়াত করে না ও। ও আমাদের গ্রাম ছাড়তে দেখেছিল। তার কিছুক্ষণ পরেই খুলি পাহাড়ের কাছে আমরা নেকড়েমানবের কবলে পড়ি।
হেস্টিংসকে আমি গুলি করে মারতে পারতাম প্রফেসর। কিন্তু তাতে আমার সন্তানের আত্মা শান্তি পেত না। ওকে ওর আসল রূপে এনে মারলে তবে আমার প্রতিশোধ সম্পূর্ণ হবে। আপনাকে আনতে হল, কারণ নেকড়েমানুষের সামনে আমার অস্ত্রগুলো বিকল। সেখানে আপনার হাতিয়ারই চলে। আপনার সঙ্গে আমার বিশেষ লেনদেন বাকি নেই প্রফেসর। আপনার এই সিলভার বুলেটভরা বন্দুক, আর এই ছুরি পেয়ে গেছি, ব্যস! এবারে শুধু চাঁদ পুরো হওয়া, আর হেস্টিংস বদলে গিয়ে নেকড়ে হওয়ার অপেক্ষা। তারপর আপনারও ছুটি, আমারও।”
“একটু ভুল হয়ে গেল যে শেরিফ।” মুচকি হেসে বললেন প্রফেসর।
“কী ভুল?”
“আমার এতদিনের অভিজ্ঞতা বলছে, হেস্টিংস নেকড়েমানব নয়।”
“আহা, তেমন যদি নাও হয়, আপনাদের বাঁচাতে তো তাকে আজ এখানে আসতেই হবে। টোপ হিসেবেই না হয় রইলেন আপনারা।”
হঠাৎ বাইরে একটা বীভৎস চিৎকার শোনা যায়। একটা জান্তব হুংকার ভেসে আসে। তারপরেই একটা বিশ্রী গন্ধে চারপাশটা ভারী হয়ে ওঠে। আর্তনাদটা যে বাইরে পাহারায় থাকা শেরিফের কোনো অনুচরের, সেটা বুঝতে দেরি হয় না প্রফেসরের।
নেকড়েমানব এসে গেছে তাহলে!
“বাইরে যাও, আর ঝাঁঝরা করে দাও ওটাকে।” চিবিয়ে-চিবিয়ে বলেন শেরিফ ম্যাকবুল।
সবার নজর অন্য দিকে থাকায় প্রফেসর সোম এই সুযোগটা কাজে লাগান। ওভারকোটের হাতলের শেষপ্রান্তে লাগানো ধারালো ধাতব চাকতিটা দিয়ে একটু-একটু করে হাতের বাঁধন কেটে চলেছিলেন তিনি। মোটা দড়ি বলে সময় লাগছিল। তবু তিনি বুঝতে পারছিলেন, বাঁধন ছিঁড়তে আর বেশি দেরি নেই!
বেশিদূর যেতে পারেনি শেরিফের লোকেরা। অসংলগ্ন চিৎকার করতে- করতে ছোটাছুটি করে তারা। চাঁদনি রাতের ফুটফুটে আলোয় তাদের দেখে মনে হয়, শয়তান স্বয়ং পিছু নিয়েছে তাদের। ক্ষতবিক্ষত চেহারা ছাপিয়ে তাদের গলার ‘নেকড়েমানব’ কথাটাই বোধগম্য হয়।
“পয়সা দিয়ে আমি গাধার দল পুষেছি!” চিৎকার করেন শেরিফ ম্যাকবুল, “ওই নরকের কীটকে আমিই শেষ করব।”
দরজার দিকে ছুটে গিয়েও থমকে যান শেরিফ ম্যাকবুল। তার সামনে দরজা জুড়ে দাঁড়ায় একটা নিকষ কালো নেকড়ে!
সাধারণের তুলনায় বিশাল তার শরীর। চাপা গর্জনে যেন প্রলয়ের আভাস। কিন্তু তার সবুজ চোখদুটো অদ্ভুত শান্ত। ঝড় আসার আগের নীরবতা সেখানে জমে আছে।
গুড়ুম! শেরিফের হাতের বন্দুক গর্জে ওঠে।
ছিটকে পড়ে সেই নেকড়ে। প্রতি আক্রমণ করতে গিয়েও সে ক্ষান্ত হয়। পারে না উঠতে। থরথর করে কেঁপে ওঠে তার শরীর!
“কী ভেবেছিলি শয়তান? সেদিনের সবকটা গুলির মতো আজকেও সব হজম করে নিবি! আজ তুই…!”
ম্যাকবুলের হাসিটা পাগলাটে শোনায়। মশালের নড়বড়ে শিখায় তার বন্দুক ধরা হাতের ছায়াটা আরো ভয়ংকর দেখায়।
“যেখান থেকে এসেছিলি, সেই নরকে ফিরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হ শয়তান!”
গুড়ুম!
আবার একটা গুলি ছোটে। কিন্তু সেটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। নেকড়ের খুলির জায়গায় সেটা দেওয়ালে গিয়ে লাগে, কারণ শেষমুহূর্তে প্রফেসর সোম হাতের বাঁধন কেটে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন শেরিফের বন্দুক ধরা হাতের উপরে।
ছিটকে পড়েন শেরিফ আর প্রফেসর সোম দুজনেই।
ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায় নেকড়েটা। তারপর এগিয়ে আসতে থাকে শেরিফের দিকে।
যুযুধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে প্রফেসর আগে ছিটকে সরে যান। তিনি বোঝেন, নেকড়ে তাকিয়ে রয়েছে শেরিফের দিকেই।
ম্যাকবুল ভয় পান। সামনে স্বয়ং মৃত্যুকে দেখে তাঁর বুদ্ধিভ্রম হয়! বন্দুকের দিকে হাত না বাড়িয়ে, বরং বাইরের চাঁদনি রাতে হারিয়ে যাওয়াই তাঁর কাছে নিরাপদ বলে মনে হয়। পাগলের মতো তিনি দৌড় লাগান সেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, আর তার পিছু পিছু ছুটে যায় সেই বিশাল নেকড়েটাও।
ঠিক-বেঠিক, ন্যায়-অন্যায়ের সাময়িক বিহ্বলতা কাটিয়ে, বন্দুক নিয়ে প্রফেসরও বেরিয়ে পড়েন সেই অন্ধকার পথে।
গুড়ুম!
কিছুক্ষণ পর আবার একটা গুলির আওয়াজ শোনা যায়। আর একটা তীব্র আৰ্তনাদ!
.
নয়
সেই ভয়ানক কালো রাতের পর চারদিন কেটে গেছে। চার্চ আর স্থানীয় মানুষজনদের সহযোগিতায় সুস্থ হয়ে উঠেছেন প্রফেসর সোম। কিন্তু বেশিদিন তো একজায়গায় থাকা চলে না তাঁর, বিশেষত কাজ ফুরিয়েছে যেখানে।
অদ্ভুত গ্রাম এই রোজওয়েল্ড! সেই রাতের ব্যাপারে কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি। জান্তব চিৎকারে বিদীর্ণ হওয়া রাতের হঠাৎ নীরবতা নিয়ে কেউ কৌতূহল প্রকাশ করেনি। ব্যতিক্রম হল শেরিফ ম্যাকবুলের পরিবার। তারা শান্তভাবে সব হজম করেনি, স্বাভাবিকভাবেই। ফাদার আর হেস্টিংসই তাদের সামলেছেন।
আজ রোজওয়েল্ড ছেড়ে বিদায় নেওয়ার পালা। প্রফেসর সোম এসেছিলেন ফাদারের অফিসে। বাইরে গাড়িটার সামনে দাঁড়ানো ঘোড়াগুলো শহরের দিকে রওনা হওয়ার আগে পা ঠুকছে রাস্তায়।
“একটাই আফশোস থেকে গেল ফাদার।” আক্ষেপ করেন প্রফেসর সোম, “শেরিফ ম্যাকবুল তার প্রাপ্য শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গেল!”
“কোথায় মাই সান? খুলি পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে আটকে থাকা শেরিফের শরীর তো অন্য কথা বলছে।”
“সেই শাস্তিটা তো আইনের হাতে এল না ফাদার।”
“আইন সোম! লুসি কি ন্যায় পেয়েছিল আইনের হাতে?”
মৃদু হেসে মাথা নাড়েন প্রফেসর সোম। এ তর্কের শেষ নেই।
“আমি তো তোমাকে আগেই বলেছি সোম। তোমার ওপরেই আমি ভালো- মন্দের বিচার করার ভার ছেড়ে দিয়েছি। তুমি যা ভালো বুঝবে সেটাই করবে!”
“সেটাই তো করেছি ফাদার।” মাথা নাড়েন প্রফেসর সোম, “এনিওয়ে। আমার সঙ্গে শহরে চলুন না ফাদার। আপনার শরীর তো ভালো থাকেনা খুব একটা। একটা ভালো ডাক্তার দেখিয়ে আসবেন!”
“জ্ঞান হওয়া অবধি এই রোজওয়েল্ডই আমার পৃথিবী। বাবা আমাকে ছেড়ে গেছিল ছোটোবেলাতেই। তারপর থেকে এই গ্রামই আমার সব। এদের ছেড়ে আর আমার পক্ষে বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়!
“বেশ, ফাদার তবে তাহলে আমাকে আজ্ঞা দিন, আমি এবারে যাই!”
“এসো সোম, আশা করি রোজওয়েল্ড তোমাকে নিরাশ করেনি।” ফাদারের হাত ঝাঁকাতে গিয়ে থমকে যান প্রফেসর সোম। প্রশ্ন করেন, “আপনার হাতে এটা কীসের ব্যান্ডেজ ফাদার?”
“এটা? এটা… বেশ ক’দিন আগে একটু হাত কেটে গেছিল।” ফাদার হেনরিকে বেশ অপ্রস্তুত দেখাল।
“দেখে তো টাটকা আঘাত মনে হচ্ছে। আর সামান্য কাটার চিহ্নও তো এটা না।”
“তার মানে! তুমি কী বলতে চাইছ সোম?” ফাদারের গলাটা উষ্ণ হয়ে ওঠে
ফাদারের হাতটা ধরে তাঁর কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে বলে ওঠেন প্রফেসর সোম।
“আপনি বলেছিলেন, ন্যায়-অন্যায় বিচারের ভার আমার ওপরেই ছাড়লেন। আমি নিলাম সেই গুরুদায়িত্ব। কিন্তু আপনিও একটা কথা মাথায় রাখবেন ফাদার।”
“কী কথা সোম?”
“আমার নজর কিন্তু রোজওয়েল্ডের ওপর রইল। আলো অন্ধকারের এই সাম্যে যেদিন সামান্যতম বিচ্যূতিও আসবে, অন্ধকারের পাল্লাটা যেদিন সামান্যও ভারী হবে, সেদিন কিন্তু আমি আবার আসব। সেদিন সিলভার বুলেটটা আর লক্ষ্যভ্রষ্ট হবে না ফাদার হেনরি। ওটা নেকড়ের মাথায় লাগবে। হাতে নয়।”
“মুচকি হেসে বেরিয়ে যান, প্রফেসর সোম
স্তব্ধ হয়ে নিজের চেয়ারের ওপর ধপ করে বসে পড়েন ফাদার হেনরি, গ্যাব্রিয়েল হেনরি।
