পাহাড় চূড়ার আতঙ্ক – কৌশিক সামন্ত
“আকাশের চাঁদটা আজ সত্যিই অপূর্ব, তাই না?”
“তোমার থেকে বোধহয় একটু কম।”
জোনাথনের বলিষ্ঠ আলিঙ্গনে, খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে লুসি।
“এখনও কি আমাকে পাওয়া নিয়ে তোমার কোনো সন্দেহ আছে জন? এই অতি প্রশংসাগুলো বিয়ের আগে অবধিই ঠিক ছিল কিন্তু।”
“প্রশংসা তো করিনি লুসি। আমি সত্যিটা বলেছি মাত্র। প্রথমে তোমাকে রাজি করানো, তারপর তোমার বাড়ির লোককে! ক্রমাগত ভালোবাসার অগ্নীপরীক্ষা দিতে দিতে এতদিনেও যে পুড়ে ছাই হয়ে যাইনি, এটা সত্যিই বিশ্বাস হতে চায় না।”
“আমাকে মাফ করো জন, আমি বড্ড অবুঝ ছিলাম। আজ বুঝি, তোমাকে, তোমার ভালোবাসাকে সঠিক মূল্য দিতে পারিনি।”
জোনাথনের বুক বেয়ে গরম জলের একটা হলকা নেমে আসে, লুসি কাঁদছে।
“আরে আমি তো ইয়ার্কি মারছিলাম পাগলি। আমি বোকা সেকথা মানছি, কিন্তু বিয়ের প্রথম রাতেই বউকে কাঁদাব, এতটাও বড়ো আহাম্মক আমি নই লুসি। প্লিজ, সব ভুলে যাও। সব ভুলে গিয়ে আমরা নতুন করে শুরু করি সব, এই আজকের রাতটাকে অমর করে রাখি। সেজন্যই তো পাহাড়চূড়ার এই পারিবারিক বাংলোটা পছন্দ করলাম আজকের বিশেষ দিনটার জন্য।”
“এটা কিন্তু তুমি ঠিক করনি জন।” অভিমান ভরা ঠোঁটে লুসি বলে ওঠে।
“কেন? এই নির্জন উন্মুক্ত প্রান্তর, হিমশীতল বাতাস, অজানা গাছের ছায়া দিয়ে ঢাকা বাড়িটা তোমার পছন্দ হয়নি লুসি? চোখ মেলে দেখো, কেউ কোত্থাও নেই। শুধু আছি তুমি আর আমি। সাক্ষী বলতে শুধু ওই চাঁদটা। এখানে লজ্জা নেই, ঘৃণা নেই, ভয় নেই, শুধু আছে ভালোবাসা।”
“আসলে জন… তোমাদের পরিবারের ওই অভিশাপের কথাটা ভুলতে পারছি না।”
“গুলি মারো অভিশাপকে লুসি। আজ শয়তান তো দূর, স্বয়ং পরমপিতাও আমাদের আর আলাদা করতে পারবেন না। তুমি এখানে কম্বলটা শক্ত করে জড়িয়ে বসো। আমি আর একটা ওয়াইনের বোতল নিয়ে আসছি।”
মৃদু হেসে লুসি সম্মতি জানায়, জোনাথন হাঁটতে থাকে বাংলোর দিকে।
বিয়ের প্রথম রাতের আবেশে তারা কেউই খেয়াল করে না, আকাশের চাঁদ ছাড়াও আরও একজোড়া চোখ তাদের দেখছে একদৃষ্টে। একটা লোক, পরনে তার বিশাল এক কালো জোব্বা, মুখটা ঢাকা রয়েছে একটা কাপড়ের ঢাকনা দিয়ে, হাতে ধরা এক অদ্ভুত বাঁকানো দন্ড।
পাথরের চাতালের ওপর একটা মখমলে বিছানা, তার ওপরে আদুল গায়ের এক নারী বসে আছে। চাঁদের আলোর কৃপণ ছটা সেই নারী শরীরের গোপন বিভাজিকাগুলোর রহস্যময়তাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে যেন। আর তার মুখ…! সেই মুখের সৌন্দর্য আর প্রশান্তি এমনই যে যুগ-যুগ ধরে শুধু সেদিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। তাকে ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। আপন করে নিতে ইচ্ছে করে। কিন্তু হা ঈশ্বর! তার কর্তব্য এতই নিষ্ঠুর, এতই নির্মম, যে ভাবলেও আতঙ্ক হয়।
যুগ যুগ ধরে সে একই কাজ করে চলেছে। তাহলে আজ কর্তব্য পালনে তার হাত কাঁপছে কেন প্রথমবার?
নাহ্! ইতিমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। কালচক্র বড়োই নিষ্ঠুর জিনিস। সামান্য মূহূর্তের হেরফেরও প্রলয় আনতে সক্ষম।
সামান্য মাথা নাড়ে সেই কালো জোব্বাওয়ালা লোকটা। মুখের পর্দাটা খানিকটা সরে যায়। মুখ দেখা না গেলেও চাঁদের আলোয় চোখদুটো দেখা যায়। প্রথমবারের জন্য যেন যন্ত্রণা চিকচিক করছে সেখানে।
অদ্ভুত একটা শিরশিরে আওয়াজ করে একটা র্যাটেল স্নেক সেই জোব্বা থেকে বেরিয়ে আসে। মূহূর্ত থমকে সে ফিরে তাকায় জোব্বাওয়ালার চোখের দিকে, যেন অনুমতি খোঁজে। পরমুহূর্তেই সে হিসহিসিয়ে এগিয়ে যায় পাথরের চাতালে শুয়ে থাকা সেই নগ্নদেহ মেয়েটার দিকে।
লুসির দিকে।
.
দুই
জন আসতে এতক্ষণ দেরি করছে কেন? বাইরের শান্ত আবহাওয়াটাও কেমন যেন অশান্ত হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, যেন ঝড় আসতে চলেছে।
সে কী করবে? উঠে কি তবে জোনাথনের কাছে যাবে? কিন্তু এভাবে? এই অবস্থায়? ভাবতে থাকে লুসি।
দূরে গাছের মাথায় বিকট শব্দে একটা বাজ এসে পড়ে। মুহূর্তের জন্য আলোকিত হয়ে ওঠে সে পাহাড় চূড়া, ভয়ে মুখ ঢেকে ফেলে লুসি। তাই সে দেখতে পায় না, একটা বিষাক্ত সাপ কীভাবে লকলকে জিভ বের করে তার উন্মুক্ত উরুর উপর আছড়ে পড়তে চলেছে, আর কীভাবেই বা একটা কালো রোমশ হাত শেষ মুহূর্তে গিয়ে সাপটাকে ধরে ফেলছে, আর অমানুষিক শক্তিতে পিষে ফেলছে সাপের হাঁ করা মুখটা।
গোটা ঘটনাটা একটা নিমেষে ঘটে যায়, এর বিন্দুমাত্র কিছু টের পায় না লুসি। শুধু তার মনে হয়, কে যেন তার ঘাড়ের কাছে নিঃশ্বাস ফেলল এইমাত্র। গায়ের কম্বলটাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে নেয় সে। নাহ্! এবার সত্যি সত্যিই তার ভয় করতে শুরু করেছে, হা ঈশ্বর, জোনাথন যে কেন এই শ্মশানপুরীতে আনতে গেল তাকে।
আবার একটা বিকট শব্দে বাজ এসে পড়ে।
ঝলসে ওঠে চারিদিক। সেই কালো জোব্বাওয়ালা ছাড়াও আরও এক অদ্ভুত পোষাকপরা মানুষকে দেখা যায় মুহূর্তের জন্য। তার দুটো চোখে যেন নরকের গনগনে আঁচ। তার ঢেউখেলানো চুলটা যেন মাথার দুপাশে দুটো শিঙের আঁকার ধারণ করেছে। তার পায়ের পাতা দুটো অদ্ভুতভাবে বাঁকানো। পৃথিবীর সব অন্ধকার যেন সেই রহস্যময় কায়ার মুখে এসে জড়ো হয়েছে।
রেড্ডেরে টিবি পেশাটা টুয়া!
তোমার অপরাধের শাস্তি তুমি পাবে পুত্র।
ল্যাটিন ভাষায় বিড়বিড় করে ওঠে সে আগুনচোখা। পরমূহূর্তেই সে বাতাসে মিলিয়ে যায়, তবে কালো জোব্বাওয়ালা কিন্তু ঠিক সেটা শুনতে পায়। কিন্তু তার আর কিছুই করার নেই তখন, বড্ড দেরি হয়ে গেছে যে।
সে মাথা নাড়তে নাড়তে ধীরপায়ে এগিয়ে যায় সেই বাংলোর দিকে। সেখানে জোনাথন এখনও চোরাকুঠুরির মধ্যে তার পরিবারের ওয়াইন-শেলফ থেকে খুঁজে চলেছে সবথেকে স্পেশাল, সবথেকে পুরোনো ওয়াইনের বোতলটা, তার জীবনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ, লুসির জন্য।
.
তিন
“পোলপেরো, কর্নওয়েল, ইংল্যান্ড থেকে পুলিশ কাল রাতে এক মানসিক ভারসাম্যহীন যুবককে গ্রেপ্তার করেছে। রোজ রাতে লোকটা বুড়োবুড়িদের জানলার সামনে একটা কালো জোব্বাওয়ালা পোশাক পরে দাঁড়িয়ে থাকত, ভয় দেখাত।”
“হুঁ, খবরটা আমিও পড়েছি।” বললেন প্রফেসর সোম।
প্রতি শনিবারের মতো আজকেও সকাল-সকাল প্রফেসরের বাড়িতে খাতা পেন নিয়ে হাজির হয়েছি নতুন প্লটের আশায়। বেশ কিছু বিদেশি খবরের কাগজের সাবস্ক্রিপশন করা আছে ভদ্রলোকের। চা খেতে-খেতে তাদেরই পাতা উল্টোতে গিয়ে খবরটা চোখে পড়ল।
“কিন্তু প্রফেসর, একটা কালো জোব্বাওয়ালা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভয় পাওয়ার কী আছে?” আমি প্রশ্ন করলাম।
“শুধু কালো জোব্বা পরার ব্যাপার এটা নয় কৌশিক। ওদের দেশে ওরকম অদ্ভুতদর্শন মূর্তিকে বলে গ্রিম রিপার। ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে বইকি।”
“একটু খুলে বলুন তো প্রফেসর।”
“বলব ভায়া।” হাসলেন প্রফেসর, “আগে কড়াইশুটির কচুরি আর আলুরদম আসুক, তারপর শুরু করছি।”
চায়ের কাপ নামিয়ে, গায়ে চাদর জড়িয়ে, একদম রেডি হয়ে রইলাম প্রফেসরের নতুন গপ্পো আর কচুরির আশায়।
.
চার
ওভারকোটের পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে একবার দেখে নিল ভিক্টর। ঠিক রাত দুটো। পারফেক্ট টাইমিং, মনে মনে ভাবল সে। পুরু বরফের চাদরে মোড়া রাস্তা। মানুষ তো দূর, একটা কুকুরকেও দেখা যাচ্ছে না আশেপাশে। একদম নির্জন চারিদিক। তবে ওভারকোটের পশম ভেদ করে আসা হিমশীতল বাতাসে অবশ্য হাড়ে যে সশব্দ কাঁপুনিটা ধরাচ্ছে, তাতে রাতের নির্জনতা বিঘ্ন হতে পারে বইকি। এইসময় সবাই ফায়ারপ্লেসের ধারে, নিদেনপক্ষে গোটাকয়েক লেপের তলায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আর সে কিনা হাইপোথার্মিয়ার সম্ভাবনা জেনেও এই তুষারপ্রান্তরে ঘুরে মরছে!
কিন্তু তার সত্যিই কিছু করার নেই। নিছক মজা হিসাবে শুরু করা একটা খেলা কীভাবে যে কখন একটা নেশায় পরিণত হয়ে গেল, সে উত্তর তারও অজানা। সেই উত্তর খুঁজে পেতে মাঝে-মাঝেই রাতের নির্জনতায় বেরিয়ে পড়তে হয় এভাবে।
সামনের মোড়টা পেরোলেই, বুড়ো ওক গাছের পাশে পড়বে এভারসন দম্পতির দোতলা বাড়িখানা।
চারপাশটা আরেকবার দেখে নিল ভিক্টর। তারপর কাঁধের ব্যাগ থেকে লোহার আঁকশি লাগানো দড়িটা বের করে নিল। এরপর এটার সাহায্যে দোতলার বারান্দায় উঠতে হবে। তারপর টুক করে ঘুমন্ত বৃদ্ধ এভারসন দম্পতির শোয়ার ঘরের জানলাটা খুলে ফেলতে হবে। ব্যস, কেল্লা ফতে।
এই কাজের প্রতিটা স্টেপ তার মুখস্থ হয়ে গেছে। হ্যাঁ, আগে ভয় করত, কিন্তু এখন বেশ মজাই লাগে। আসলে ঘুমন্ত বুড়ো মানুষগুলো হঠাৎ করে ঘুম ভেঙে চোখের সামনে মৃত্যুকে দেখে যেভাবে আর্ত চিৎকার করে ওঠে, সেটা বেশ তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করে ভিক্টর। ওই মুহূর্তে নিজেকে মৃত্যুর থেকেও বেশি শক্তিশালী মনে হয় তার।
ঝুল বারান্দায় উঠে আসে ভিক্টার, অভ্যাসমত ব্যাগ থেকে বের আনে কালো আলখাল্লা আর সেই বাঁকানো লাঠিটা। এবার হাতের আঁকশিটা দিয়ে জানলার তলায় একটা মোচড় মারলেই উঠে আসবে পাল্লাখানা। আর তারপরেই….
কিন্তু ও কী?
নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারে না ভিক্টর। ও কি ভুল দেখছে?
বিছানায় শয়ান এভারসান দম্পতির ঠিক মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে এক কালো ছায়া। তার গায়ে চাপানো আছে মাথা ঢাকা এক বিকট আলখাল্লা, হাতে ধরা আছে এক বাঁকানো দন্ড, ঠিক তার মতোই! তবে কি অন্য কেউও এই অসহায় বুড়োবুড়িকে ভয় দেখানোর মজার খেলায় নেমেছে? ভাবতে থাকে ভিক্টর।
জানলাটা খোলার সময় বোধহয় একটুখানি খুট করে আওয়াজ হয়ে গেছিল। সেই ছায়ামূর্তি এবারে ঘুরে তাকায় ভিক্টরের দিকে।
উফ্! কী ভয়ঙ্কর সেই চোখ দুটো। সময় যেন সেখানে থমকে গেছে। সে চোখে তারা নেই, নেই সাদা অংশ। সেখানে আছে শুধু শূন্যতা, নীরবতা, আর… মৃত্যু!
ভয়ে নিজের চোখদুটো ঢেকে ফেলে ভিক্টর। ওই দৃষ্টি সে আর সহ্য করতে পারে না।
.
পাঁচ
“পেপারে লিখেছে, পুলিশ যাকে ধরেছে সে নাকি বারবার বলে যাচ্ছে বুড়ো এভারসনের মৃত্যুর জন্য সে দায়ী নয়। কেউ নাকি আগে থেকেই তাদের ঘরে ছিল।”
“হুঁ, দেখেছি ব্যাপারটা।” গরম কচুরিতে কামড় দিতে দিতে বললেন প্রফেসর সোম, “ছোকরা গ্রিম রিপার সেজে ভয় দেখাতে গিয়ে শেষ অবধি তারই দেখা পেয়েছিল কি না, কে বলতে পারে! আর্টিকলটা বলছে, পুলিশ যখন ছেলেটাকে ধরে, তখন সে সম্পূর্ণ উন্মাদ। অথচ সেদিনের আগে তার মস্তিষ্কের সুস্থতা নিয়ে কারও মনে সংশয় ছিল না।”
“আচ্ছা, এই গ্রিম রিপার কে? বা কী?”
“ইংল্যান্ডে গ্রিম রিপার, সেলটিকে আনকউ, ইসলামে মালাক উল মউত, ক্যাথলিক ভাবনায় আর্চ এঞ্জেল, জুডাইজমে ম্যাওয়েথ, আমাদের হিন্দুইজমে যমদূত… এমনই বহু নাম আছে তার। এক কথায় বলতে গেলে, এরা সাক্ষাৎ মৃত্যুর দূত। এদের কাজ হল, কোনো প্রাণীর মৃত্যুর পর তার আত্মা বা স্পিরিটকে প্রাণহীন দেহ থেকে বের করে নরকে ফিরিয়ে আনা, যেখানে আত্মা তার ইহজন্মের কৃত কাজকর্মের ফলটল ভোগ করে আর কি। এককথায় ইহলোক আর পরলোকের ব্যালেন্স মেইনটেইন করে এরা। সাংঘাতিক পাওয়ারফুল, বলাই বাহুল্য। ওই হাতে ধরা বাঁকা দন্ড বা ল্যাসো দিয়ে প্রাণশক্তিকে টেনে বের করে তারা।”
“আপনি কোনোদিন এসবের পাল্লায় পড়েছিলেন নাকি?”
“পড়লে তোমার সামনে বসে উত্তর দিতে পারতাম আজ?” হো-হো করে হেসে উঠলেন প্রফেসর সোম।
“না, মানে আমি ঠিক ওইভাবে বলতে চাইনি।” অপ্রস্তুত হই আমি, “আমি জানতে চাইছিলাম, আপনার জীবনের কোনো ঘটনায় এদের সঙ্গে এনকাউন্টার হয়েছে নাকি?”
“গল্পের রশদ খুঁজছো? তা বেশ। বলি তাহলে। আমি তখন ছিলাম ইংল্যান্ডে। চার্চের একটা কাজে, আমাকে প্রিস্টলে বলে একটা গ্রামে যেতে বলা হয়েছিল সেখানে…”
.
ছয়
পাঁচ-ছ’টা সস্তার কাঠের চেয়ার-টেবিল। তাতে বসে আছে কয়েকজন স্থানীয় লোক। টিমটিমে বাল্বের আলো। আলো আঁধারে দু’টি বেয়ারা খাদ্য ও পানীয় পরিবেশন করছে। অর্থাৎ গ্রাম্য সরাইখানা যেরকম হয় আর কি….
দেওয়ালের এক কোণে ছোট্ট একটা টুলে বসে ঢুলছে সরাইখানার মালিক এডগার।
প্রায় প্রতি টেবিলেই একাধিক লোক বসে আছে। চাপা স্বরে তারা নিজেদের মধ্যে কী যেন আলোচনা করে যাচ্ছে। শুধু একটা টেবিল ব্যতিক্রম। সেখানে একটি মাত্র লোক বসে আছে। তার পরনের দামি পোশাক আর চুলের রঙ জানান দিচ্ছে, সে স্থানীয় নয়।
সরাইখানার দরজায় একটা আওয়াজ হয়।
সবাই আলোচনা থামিয়ে সেদিকে তাকায়, যেন অধীর আগ্রহে কারও জন্য অপেক্ষা করছে তারা। দরজা ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করে এক ব্যাক্তি। পরনে কালো ওভারকোট, মাথায় টুপি। বাকিরা বোধহয় কিছুটা নিরাশই হয়। তারা আবার নিজেদের আলোচনায় ফিরে যায়।
ধীরপায়ে আগন্তুক সরাইখানার মালিকের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
“বলুন?” কৌতূহলী চোখ তুলে এডগার প্রশ্ন করে।
“রাতে থাকার জন্য আমার একটি রুম চাই।”
“আপনাকে দেখে তো এদেশি বলে মনে হচ্ছে না। কোনো পরিচয়পত্র আছে?”
“চার্চের শংসাপত্র রয়েছে।” পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে আগন্তুক।
“রেভারেন্ড রুদ্র সোম? ভারতীয়? এখানে চার্চের কোনো কাজে এসেছিলেন বুঝি?”
“হ্যাঁ। তবে কাজটা এখানে নয়, এখান থেকে আরও একদিনের পথ। প্রিস্টলেতে, আজ রাতটা বিশ্রামের জন্য এখানে থাকতে চাই।”
“অবশ্যই রেভারেন্ড। আমি ব্যাবস্থা করে দিচ্ছি। এই, কে আছিস? সাত নম্বার ঘরে নিয়ে যা।”
সরাইখানার মালিককে ধন্যবাদ জানিয়ে একটা ছোটো ছেলের পিছু-পিছু দোতলার পথ ধরেন প্রফেসর সোম। সারা রাস্তায় খুব ধকল গিয়েছে। জামা কাপড় লাল ধুলোতে মলিন। রুমে ঢুকেই স্নান করে নিতে হবে, মনে মনে ভাবেন প্রফেসর সোম।
.
সাত
নাহ্! প্রফেসর সোম অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু এই ভর সন্ধেবেলায় ঘুমোনো সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। কাল সকাল-সকাল বেরিয়ে বাস ধরতে হবে বলে ভেবেছিলেন, আগেই ঘুমিয়ে নেবেন। সে আশা জলাঞ্জলি দিতেই হল। উঠে পড়লেন প্রফেসর সোম। কিঞ্চিৎ তরল আগুনের ব্যবস্থা করলে যদি ঘুম আসে…।
নীচে নেমে প্রফেসর সোম দেখলেন, মোটামুটি সব টেবিলই ভর্তি। শুধু একটা টেবিল একজন বসে আছেন। একা। ভদ্রলোক বোধহয় স্থানীয় নন, অন্তত বেশভূষা তো তাই বলছে।
“এক্সকিউজ মি, আমি কি এখানে বসতে পারি?”
“হুঁ? বসতেই পারেন। ইটস আ ফ্রি কান্ট্রি আই গেস, কিন্তু…”
“কিন্তু…?” প্রফেসর সোম চেয়ারে বসতে-বসতে জানতে চাইলেন।
“কিন্তু ওদের মতো প্রশ্ন করা চলবে না আমাকে। বা জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকা চলবে না আমার দিকে।”
“কাদের মতো? মাফ করবেন, আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“ওহ্, আপনি ওদের দলের নন তাহলে?”
“দেখুন, আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে। আমার নাম রুদ্র সোম। আমি একজন ভারতীয়, চার্চের সঙ্গে যুক্ত আছি। এখানেও ওই সূত্রেই আসা। একবারে প্রিস্টলে অবধি যেতে গেলে শরীরের ওপর ভয়ানক চাপ পড়ে যাবে। এই ভেবেই মাঝপথে সেন্ট মন্টিয়াসের এই ছোট্ট গ্রামের ছোট্ট সরাইখানায় আজ রাত্রিবাস আমার।”
“ওহো! দুঃখিত। আসলে গত কয়েকদিন ধরে আমার সঙ্গে ঘটে চলা কিছু ঘটনার ধাক্কায় আমি একটু অস্থির অবস্থায় আছি। এনিওয়ে, আমার নাম স্যামুয়েল জোন্স। আমি একটা বড়ো ল-ফার্মের অ্যাডভাইসার হিসেবে কাজ করি। শহুরে ক্লায়েন্টদের ব্যবসা বাড়ানোর জন্য গ্রামে-গঞ্জে ঠিকঠাক প্রপার্টি খুঁজে বেড়ানোই আমার কাজ। এই ক্ষেত্রে আমি, শুনতে গর্বের মতো শোনালেও কথাটা খাঁটি, ওয়ান অফ দ্য বেস্ট! সেই সূত্রেই সেন্ট মন্টিয়াসে আসা। কিন্তু তারপর…”
কথা বলতে বলতে কিছুটা অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন স্যামুয়েল।
“তারপর?” প্রফেসর প্রশ্ন করলেন।
“সেন্ট মন্টিয়াস আর আমাকে ছাড়ল না।” মৃদু হেসে বলে উঠলেন স্যামুয়েল।
“ঠিক বুঝলাম না মিস্টার স্যামুয়েল।”
“শুনবেন আমার গল্প মিস্টার সোম? বিশ্বাস করবেন তো? অবশ্য আপনারা চার্চের লোক। আশা করি ভালোই বুঝবেন এ-সব।”
“বলেই দেখুন না। বাকিটা পরমপিতার ওপর ছেড়ে দিন।”
“হাহা পরমপিতা! আলোর অধিকর্তা, ভালো বলেছেন নামটা। কিন্তু এখানে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু নেই। আমার গল্পটা আমি বলব। তার শর্ত একটাই। কাউন্টারে রাখা ফাইনেস্ট স্কচখানা আপনাকে আমাকে খাওয়াতে হবে কিন্তু।”
“এই ব্যাপার! বেশ তো, সেই কথাই রইল।”
চেয়ার থেকে ইশারা করলেন প্রফেসর সোম এক ওয়েটারের দিকে। ইতিমধ্যে একটা অদ্ভুত ব্যাপার খেয়াল করলেন তিনি। আশেপাশে সব টেবিলে বসা প্রতিটি লোক, কাউন্টারে বসে থাকা সরাইখানার মালিক এডগার, এমনকি সেই ওয়েটারও, প্রফেসরদের টেবিলের দিকে তাকিয়ে আছে, চোখে অপার কৌতূহল নিয়ে।
.
আট
“ইগনোর করুন ওদের। ওরা তাকিয়ে আছে আমার মূর্খামির কথা ভেবে। ওরা মুখিয়ে আছে আমার অন্তিম পরিণতির জন্য।” গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলে উঠলেন স্যামুয়েল।
“ভালো স্কচ হচ্ছে ভালো বন্ধুর মতো। যত বয়স বাড়বে, তত বন্ধুত্বের আমেজ আসবে। কী বলেন?” হেসে উঠলেন স্যামুয়েল।
“আজ্ঞে হ্যাঁ। তবে এই মুহূর্তে স্কচের চেয়েও আমি আপনার গল্পটা নিয়ে বেশি আগ্রহী।” মাথা নেড়ে বললেন রুদ্র সোম।
“বলছি-বলছি। জানেন, আজ থেকে ঠিক পাঁচদিন আগে যখন সেন্ট মন্টিয়াসে এসেছিলাম, স্বপ্নের মতো লেগেছিল চারদিকে ছোট্ট ছোট্ট টিলা-পাহাড় আর জঙ্গলে ঘেরা এই গ্রামটাকে। কিন্তু সেই স্বপ্নই যে কবে দুঃস্বপ্ন হয়ে গেল, বুঝতেও পারলাম না। আগেই বলেছি আমার কাজটা সম্বন্ধে। প্রপার্টি ডিলিঙ-এ আমার বেশ সুনাম আছে, তাই এই জায়গায় এসেই ডিল ফাইনাল করতে আমায় বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু…”
“কিন্তু?”
“ওই কিন্তুটাই যে কাল হল মিস্টার সোম। এই সরাইখানা থেকে বেরিয়ে বাঁ দিকে বেশ কিছুদূর যাওয়ার পর থেকে একটা ফার্মহাউস পড়ে। নিঃসন্তান মালিক বুড়ো রুথের পক্ষে আর তার বড়ো ফার্ম হাউস চালানো সম্ভব ছিল না। তাই সে শহরে গিয়ে আমাদের কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। সেই সূত্রেই আমার এখানে আসা।
বুড়ো রুথের ফার্মহাউস আমার বেশ ভালো লাগল। বিশাল এরিয়া জুড়ে বিস্তৃত ফার্ম। এখানে ঠিকঠাক দাঁড় করালে করলে ভালো রিটার্ন পাওয়া যাবে। অফিসিয়াল ডকুমেন্ট সইসাবুদ করে, রুথের বাড়িতে ছোটোখাটো একটা ভোজ সেরে আমি আর রুথ বাগানে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। অস্তগামী সূর্য, দূরে ছড়িয়ে থাকা জঙ্গলের মাথায় আলো আঁধারি, আর বুড়ো রথের নিজের ফার্মের বানানো ওয়াইন। আহ্! সময়টা যেন থমকে গেছিল। ঠিক তখনই…”
স্যামুয়েল কিছুটা থমকে গেলেন যেন।
“তখনই কী, মিস্টার স্যামুয়েল?” প্রফেসর সোম প্রশ্ন করলেন।
“ঠিক তখনই দূর পাহাড়ের ওপর একটা ছোট্ট কাঠের বাড়ির ওপর আমার নজর পড়ল, জানেন।”
.
নয়
“ওকথা ভুলেও ভাববেন না মিস্টার স্যামুয়েল। ওদিকে তাকালেও চরম অভিশাপ নেমে আসতে পারে আপনার ওপরে।” চাপা গলায় বলে উঠল বুড়ো রুথ।
“মানে?” অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলেন স্যামুয়েল, “অভিশাপ?”
“ওই পাহাড়ের ওপরের বাড়িটা। আপনি ওটাই দেখছেন, তাই না?”
“হ্যাঁ। আমি ওটাই দেখছিলাম।”
“ওটা শয়তানের বাড়ি। ওর দিকে তাকানো বা ওর সম্বন্ধে কথা বলাও পাপ।” মাথা নাড়ে বুড়ো রুথ।
যত্তসব গ্রাম্য কুসংস্কার! হেসে ওঠেন স্যামুয়েল।
“আপনারা শহরের মানুষ সায়েব। বিজলি বাতির উজ্জ্বল আলোতে অনেক অন্ধকার আপনাদের চোখ এড়িয়ে যায় বইকি। কিন্তু এখানের ব্যাপারটা আলাদা সাহেব। এখানে অন্ধকার নামতেই ওই কালো জঙ্গল, ওই প্রাণহীন ধূসর পাহাড়, এরা সবাই কথা বলতে শুরু করে।”
“ওইসব ছাইপাঁশ ভেবেই আপনারা এত পিছিয়ে আছেন, বুঝলেন! ওই টিলা-পাহড়ের ওপর কত সুন্দর একটা টুরিস্ট স্পট হতে পারে। সেই নিয়ে কোনো ধারণা আছে আপনার? আর সেটা হলে লোকের কাজ হবে, রুজিরোজগার হবে। তার বদলে শয়তান …!”
“আপনি কি ওই পাহাড়ের মাথায় যাওয়ার কথা ভাবছেন?”
“হ্যাঁ। এসেছি যখন, একটা বিজনেস ডিলের সঙ্গে আরেকটাও করে যাই। সেটা শয়তানের সঙ্গে হলেই বা মন্দ কী?” হেসে উঠলেন স্যামুয়েল।
“তাহলে শয়তানের আগে আমিই আপনাকে….!” বুড়ো রুথের শরীরে যেন অসুর ভর করল। দু’হাতে সে চেপে ধরল স্যামুয়েলের গলা। ঘটনার আকস্মিকতায় স্যামুয়েল হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না।
“আমার সব কেড়ে নিয়েছে ওই পাহাড়! আর কারোর কোলের সন্তান হারিয়ে যাক, এ আমি হতে দেব না। ওই শয়তানের হাত পৌঁছানোর আগে আমিই…”
বুড়ো হাড়ে যে এতো জোর থাকতে পারে, ধারণা করতে পারেননি স্যামুয়েল। হুঁশ ফিরে পেয়ে এক ঝটকায় বুড়ো রুথকে মাটিতে ফেলে, তাকে মাটিতে চেপে ধরেন তিনি।
“আমার সব কেড়ে নিয়েছে ওই খুনী পাহাড় সাহেব।” বুড়োর গলায় শরীরের নয়, বরং আরও গভীর কোনো উৎস থেকে উঠে আসা কষ্ট খুঁজে পান স্যামুয়েল, “আপনি যাবেন না ওদিকে। গেলে আপনিও ফিরে আসতে পারবেন না, আমার ছোট্ট ছেলেটার মতো। ওই শয়তান সবাইকে টেনে নেয় নিজের কাছে।”
হাউ হাউ করে কাঁদতে থাকে বুড়ো রুথ
মাথায় একরাশ চিন্তা নিয়ে সরাইখানায় ফিরে আসেন স্যামুয়েল। এর আগে ক্লায়েন্টদের জন্য নানা অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে অনেক অভিশপ্ত জায়গা, অনেক হানাবাড়িতে রাত কাটাতে হয়েছে স্যামুয়েলকে। কিন্তু এবারে অন্য একটা ব্যপার তাঁকে বেশি ভাবিয়ে তুলেছিল। এমন কাউকে তিনি পাচ্ছেন না যে কিছুটা হলেও তাঁকে জায়গাটা সম্বন্ধে কিছু তথ্য দিতে পারে, আলোর হদিশ দিতে পারে।
সরাইখানার মালিক এডগারকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে গিয়ে রীতিমত অপমানিত হতে হল স্যামুয়েলকে। এডগার পারলে তাকে গলাধাক্কা দিয়ে তক্ষুনিই সরাইখানা থেকে বেরই করে দিত। নেহাত অতিথির সম্মানার্থে সে থেমে গেছিল।
অবশেষে এক বুড়ো মাতালকে দিয়ে কাজ হল। ফ্রিতে পাওয়া মদের ঘোরে বুড়ো অবশেষে বলল সেই কাহিনি, যাকে ঘিরে পাহাড় চূড়ায় এই আতঙ্ক ছড়িয়েছে।
সেই জড়ানো গলার ততোধিক জড়ানো গল্পের সারমর্ম মোটামুটি এরকম।
.
বহুযুগ আগে সেন্ট মন্টিয়াসে খুব ধনী দুটো পরিবার ছিল। দুটো পরিবারই খুব প্রভাবশালী ছিল, তাই কিছু-না-কিছু নিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ লেগেই থাকত। অথচ বিধাতার পরিহাসে সেই পরিবারের দুই ছেলেমেয়ের মধ্যেই হয় দারুণ প্রেম! রোমিও-জুলিয়েটের মতো ট্র্যাজেডি হয়নি এক্ষেত্রে। বরং বহু বাধা-বিপদ হাসি-কান্না ঝগড়া-বিবাদ পেরিয়ে তারা নাকি শেষপর্যন্ত দুই পরিবারকে এক করে। তাদের বিয়েও হয়ে যায়।
কিন্তু এরপরেই নেমে আসে দুর্ভাগ্যের কালরাত্রি।
মধুচন্দ্রিমার জন্য নবযুগল তাদেরই এক পরিবারের বানানো ঐ পাহাড় চূড়ার কটেজে গেছিল। দু’দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরেও তারা নীচে নামছে না দেখে দু’তরফ থেকেই লোকজন খোঁজ নিতে সেখানে যায়। তারা কেউই ফিরে আসেনি! এমনকি স্থানীয় প্রশাসন থেকেও এই ব্যাপারে অনুসন্ধান চালানো হয়। স্থানীয় শেরিফ আর তার টিম গেছিল ওই পাহাড়ের মাথায়। কিন্তু তারাও উধাও হয়ে যায়!
সেই থেকে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। লোকে বলে, ওই পাহাড় শয়তানের পাহাড়। যে একবার ওই পাহাড়ের রাস্তা ধরবে, তাকে শয়তান টেনে নরকে নিয়ে যাবে… ইত্যাদি-ইত্যাদি। ফলে সেন্ট মন্টিয়াসের ওই পাহাড় নিয়ে আলোচনাও করতে চায় না কেউ।
.
দশ
ওই রকম একটা নির্জন পাহাড়ের ওপর একটা ছোট্ট হোটেল আর একটা ছোট্ট রেস্তোরা। উফ্! ক্লায়েন্টকে কী দুর্ধর্ষ একটা প্যাকেজ বিক্রি করা যাবে, ভেবেই আপ্লুত হলেন স্যামুয়েল।
কিন্তু তার জন্য আগে জানতে হবে, পাহাড়ের ওপর ওই বাড়িখানা কার? কার থেকে ওটা কিনতে হবে? সেন্ট মসিয়াসের লোকজনের যা ভাব দেখা গেল ঐ পাহাড়খানা নিয়ে, তাতে এদের কাছ থেকে অন্তত এ ব্যাপারে কিছু জানা যাবে বলে মনে হয় না। সেটা অবশ্য কোনো সমস্যাই নয়। শহরে ফিরে এই ইনফর্মেশান জমি দপ্তর থেকে জোগাড় করতে বেশি বেগ পেতে হবে না তাঁকে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল নিজের চোখে পাহাড়চূড়াটা দেখে আসা। তবেই না ক্লায়েন্টকে কনভিন্স করানো যাবে। শুধু প্রাকৃতিক বিশেষত্বই নয়, টিলাটা ঘিরে স্থানীয়দের যে ভয় আর রহস্যের মিথটা রয়েছে সেটাও ভাঙা প্রয়োজন। নইলে কাজকর্মের জন্য লোক পাওয়া যাবে কী করে?
কেউ জানতে পারলে আটকে দেবে। তাই ভোরবেলা কাউকে কিছু না জানিয়ে, ছোট্ট একটা ব্যাগে কিছু দরকারি জিনিস নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন স্যামুয়েল। গন্তব্য সেই রহস্যময় পাহাড়চূড়া। কালকেই পাহাড়ে ওঠার রাস্তাটা দেখে নিয়েছিলেন স্যামুয়েল।
‘মনটিয়াস এস, মালুম এসট’
কাঁটাতারের বেড়া টিলার শেষ আর সমতলের শুরুর মাঝে। সেখানেই লাগানো ছিল একটা জং ধরা টিনের বোর্ড। তাতে ল্যাটিন ভাষায় লেখা সাবধানবাণীটা চোখে পড়ল স্যামুয়েলের।
‘সামনে শয়তান, তোমাকে সতর্ক করা হচ্ছে’
যত্তসব গ্রাম্য কুসংস্কার, মনে মনে হাসলেন স্যামুয়েল। কাঁটাতারের বেড়া টপকাতে খুব বেশি বেগ পেতে হল না তাঁর। বেড়ার এপারে এসেই একটা অদ্ভুত জিনিস খেয়াল করলেন স্যামুয়েল। কাঁটাতারের এপাশ থেকেই গাছপালা কেমন যেন একটা বিবর্ণ, নিষ্প্রাণ চেহারা নিয়েছে।
একটা প্রায় অষ্পষ্ট হয়ে যাওয়া পায়ে হাঁটা পথ ওই চূড়া অবধি চলে গেছে। তবে সেই পথে যে বহুদিন কেউ হাঁটেনি সেটা রাস্তার ওপর জমে থাকা আগাছার সারি দেখেই বুঝতে পারলেন স্যামুয়েল। ব্যাগ থেকে লম্বা ছুরিখানা বের করে আনেন তিনি। মানুষজন না থাকুক, এসব জায়গায় বুনো জন্তুর ও ভয় থাকতেই পারে। চুপচাপ এগিয়ে চলেন স্যামুয়েল।
এবড়ো-খেবড়ো পাহাড়ি পথ। ঝোপঝাড়, কাঁটাগাছ এড়িয়ে চলাই দায়। মাথার ওপরে সূর্যও লম্বা-লম্বা গাছের আড়ালে ঢেকেছে। বুনো জন্তু তো দূরের কথা, একটা পাখির ডাকও কানে আসেনি তাঁর। গাছের শুকনো পাতা পড়ার আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না। প্রাণহীন লম্বা লম্বা গাছে ছাওয়া, আলোআধাঁরির কুয়াশায় ঢাকা এই নির্জন পাহাড় যেন বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন সাক্ষাৎ এক মৃত্যুপুরী। স্থানীয় লোকের ভয় পাওয়াটা খুব স্বাভাবিক, মনে মনে ভাবলেন স্যামুয়েল।
ধুপ!
কাছাকাছি কোথাও ভারী কিছু যেন একটা পড়ল। থমকে দাঁড়ালেন স্যামুয়েল, কান খাড়া করে রইলেন আবার কিছু শোনা যায় কি না। কানের পাশ দিয়ে দু’ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ল তার।
ধুপ!
ওই তো আবার শব্দটা হল! হাতের ছুরিটাকে শক্ত করে ধরলেন স্যামুয়েল। আওয়াজটা যেন এবারে কিছুটা কাছে হল। নাহ্, ব্যাপারটা এবারে সত্যিই গোলমেলে ঠেকছে। না এলেই বোধহয় ভালো হত। কী করবেন স্যামুয়েল? ফিরে যাবেন? অন্ধবিশ্বাস আর কুসংস্কারের কাছে হার মানবেন শেষ অবধি? কিন্তু তাহলে যে নিজের কাছেই নিজে ছোটো হয়ে যাবেন স্যামুয়েল।
‘এসেছি যখন, সবটা দেখেই যাব। তার জন্য যা মূল্য দিতে হয়, আমি দেব!’ মনে মনে বললেন স্যামুয়েল, হাঁটতে থাকলেন তিনি।
অনেকক্ষণ আর কোনো শব্দ আসেনি। তাহলে পাথর-টাথর কিছু গড়িয়ে পড়েছিল বোধহয়। ব্যাগ থেকে জল বের করে খেলেন স্যামুয়েল। নিজের নির্বুদ্ধিতায় হাসি পেল তার।
কিন্তু ওটা কী?
শিউরে উঠলেন স্যামুয়েল। গাছের মধ্যে ঝুলন্ত একটা লম্বা কংকাল! কোনো সরীসৃপের দেহাবশেষ কি? তাই তো। ধীরে-ধীরে বাকি গাছগুলোর দিকেও নজর গেল তাঁর। অনেক গাছেই কোনো না কোন প্রাণীর অবশেষ এমনভাবে গাছের সঙ্গে আটকে আছে যে মনে হচ্ছে যেন তাদের অজান্তেই কেউ তাদের চিরতরে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছে।
ধুপ! ধুপ্!
এবারে আওয়াজটা পেছন থেকেই এল। চমকে পিছনে ফিরে তাকালেন স্যামুয়েল।
একটা জমাট বাঁধা অন্ধকার যেন ছুটে আসছে তাঁর দিকে!
আর স্থির হয়ে থাকা সম্ভব হল না। দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়তে শুরু করলেন স্যামুয়েল। কাঁটা ঝোপে লেগে কত জায়গা যে ছড়ে গেল তার ইয়ত্তা নেই। পাথরে ঘষা খেয়ে কত রক্তবিন্দু যে ঝরে পড়ল, সেদিকেও হুঁশ ছিল না স্যামুয়েলের। যে করেই হোক, ওই অজানা বিভীষিকার হাত থেকে মুক্তি পেতে হবে তাকে। দৌড়তে-দৌড়তে কখন যে তিনি পাহাড়চূড়ায় পৌঁছে গেছেন, খেয়াল ছিল না স্যামুয়েলের। হঠাৎ দেখলেন, সামনেই সেই কাঠের বাড়িটা, যাকে ঘিরে এতো রহস্য।
কিছু একটায় হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়লেন স্যামুয়েল। উঠে দেখলেন, একটা নরকংকাল। না। একটা নয়, বরং অজস্র নরকংকাল ইতস্তত ছড়িয়ে আছে। তাদের দেহে লেগে থাকা পোশাকের জীর্ণ অবস্থা দেখেও তাতে কোনো হিংস্র পশুর আক্রমণের কথা মনে হয় না। বরং মনবে হয়, যেন হঠাৎ করেই মানুষগুলো খোলা আকাশের নীচে ঘুমিয়ে পড়েছে।
ধপ্!
এবারে আওয়াজটা একদম কাছ থেকে এল। ঘাড়ের কাছেও কেউ কি নিঃশ্বাস ফেলল? আর ভাবার সময় ছিল না স্যামুয়েলের। তিনি সোজা বাংলোর দিকে দৌড় লাগালেন।
অদ্ভুত ব্যাপার! এতদিনের পরিত্যক্ত বাড়ির ভেতরখানা এত সুন্দর রয়েছে কীভাবে? কেউ যেন রোজ যত্ন নিয়ে তাকে পরম মমতায় রক্ষণাবেক্ষন করে
চলেছে।
কিন্তু এসব ভাবার সময় এটা নয়, নিজেকে মনে-মনে দুষলেন স্যামুয়েল। বরং সামনের দরজায় যে বিপদ দাঁড়িয়ে রয়েছে, তাকে কোনোভাবে এই বাড়িতে আটকে ফেলে স্যামুয়েলকে ফিরতি পথ ধরতে হবে। কিন্তু ওই বিভীষিকাকে কি এই বাড়ির দুর্বল দেওয়ালগুলো আটকে রাখতে পারবে? বা এই বাড়িটাই যদি তার নিজের হয়?
উফ্! আর ভাবতে পারছেন না তিনি
বাড়িটার শেষ প্রান্তে পৌঁছে গেছেন স্যামুয়েল। আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে থাকা আসবাবপত্র দেখে সেটা রান্নাঘর বলেই মনে হচ্ছে। লুকোনোর জায়গা খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ তাঁর নজরে পড়ল বাঁদিকের দেওয়ালের মাঝ দিয়ে একটা চোরাকুঠুরির সিঁড়ি নেমে গেছে। অন্য কোনো সময় ওই অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নামতে দশবার ভাবতেন স্যামুয়েল। কিন্তু তখন তাঁর মাথায় ওসব ছিল না। বরং ডানহাতে ছুঁরিটা আরও শক্ত করে ধরলেন স্যামুয়েল। বুক ভরে একটা শ্বাস নিলেন, বাঁহাত দিয়ে পকেট থেকে টর্চটা বের করে আনলেন। তারপর চোরাকুঠুরির অন্ধকার সিঁড়ি ধরে নামতে শুরু করলেন। পেছনের পায়ের শব্দ তখন জানান দিচ্ছে, সে বিভীষিকা এগিয়ে আসছে ওদিকেই।
.
এগারো
“কী? সবটাই একেবারে গাঁজাখুরি শোনাল, তাই তো?” এক চুমুকে হাতের গ্লাসটা শেষ করে প্রশ্ন করলেন স্যামুয়েল।
“আজ্ঞে না। আপনি আমার কর্মক্ষেত্র সম্বন্ধে জানলে এ চিন্তা আপনার মাথায় আসত না। কিন্তু তারপর কী হল? সেই চোরাকুঠুরিতে নেমে আপনি কী দেখলেন?” প্রশ্ন করলেন প্রফেসর সোম।
“পুরোনো দিনের বাড়িতে মাটির নীচে ওয়াইন রাখার ব্যবস্থা থাকত। এটাও ছিল সেরকমই একটা সেলার। ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা ভাঙা ওয়াইনের বোতলগুলো সেটাই জানান দিচ্ছিল। তবে আরও একটা জিনিস ছিল সেখানে।”
“কী জিনিস?”
“একটা কফিন।”
“কফিন?”
“হুঁ। একটা কফিন। আর তাতে কী ছিল জানেন?”
“কী?”
“এক মহিলার মৃতদেহ।”
“মৃতদেহ বলতে মমি?”
“উঁহু। একদম ফ্রেশ একটা মৃতদেহ। শরীরের উত্তাপ বলছিল, সে কিছুক্ষণ আগেই মারা গেছে! এবার আর বিশ্বাস করতে পারছেন না, তাই তো?”
“আপনি বলতে থাকুন স্যামুয়েল।” প্রফেসর সোম মাথা নাড়লেন।
“ওই চরম বিপদের মুহূর্তেও জানেন, আমার কীভাবে যেন একটা ধারণা হয়ে গেছিল, যে ওই বিভীষিকার হাত থেকে কেউ যদি আমাকে লুকিয়ে রাখতে পারে তাহলে সেটা ওই কফিনই। আমি ঢুকে পড়লাম ওই কফিনের মধ্যে। ছোট্ট জায়গাটুকু ভাগ করে নিলাম সেই নীরব শরীরের সঙ্গে। বিশ্বাস করুন, এ ছাড়া আর কোনো বাঁচার উপায় আমি ভেবে উঠতে পারিনি।”
“তারপর?”
“তারপরের অংশটা শুধুই পালানোর। ক্ষত-বিক্ষত শরীর আর বিধ্বস্ত মন নিয়ে, ওই বিভীষিকার চোখ এড়িয়ে কীভাবে আমি সরাইখানায় ফিরে এলাম, তা নিজেই জানি না।”
“হুঁ।” মাথা নাড়লেন প্রফেসর সোম।
“ওই অবস্থায় আমাকে দেখে এই সরাইখানার মালিক এডগারের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল, জানেন?”
“কেমন ছিল?”
“এডগার বলেছিল, ‘স্যামুয়েল, তোমার মূর্খামির চরম মূল্য চোকাতে হবে তোমাকেই। সেন্ট মন্টিয়াস আর কিন্তু তোমাকে ছাড়বে না। আমি তোমাকে বারণ করেছিলাম, কিন্তু তুমি শুনলে না। এবার অপেক্ষা করো তোমার অন্তিম পরিণতির জন্য।”
“মানে? ঠিক বুঝলাম না।”
“আমিও সেদিন বুঝিনি। তবে আজ বুঝি।” মুচকি হাসেন স্যামুয়েল।
“হেঁয়ালি করে সময় নষ্ট করবেন না প্লিজ। যদি আপনি প্রকৃত সত্যটা বলেন, আমি হয়তো আপনার কিছুটা সাহায্য করতে পারি।” বিরক্ত কণ্ঠে বলেন রুদ্র সোম।
“আমার সাহায্য? না মহাশয়, স্বয়ং শয়তান ভিন্ন কেউ আমার আর সাহায্য করতে পারবে না। এমনকি আপনার পরমপিতাও নয়!” পাগলের মতো হেসে ওঠেন স্যামুয়েল।
“এডগার-রা সেদিন কী বলতে চেয়েছিল সেটা আমি ওই ঘটনার পরদিনই টের পেলাম। নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়েছিলাম। একটাই বাস যায় এখান থেকে শহরে, সেটা ধরে ফিরতে চেয়েছিলাম। কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
“বাসটা কিছুদূর যাওয়ার পরেই থেমে যায়, খবর আসে বাস আর যাবেনা আজকের মতো। সামনের মোড়ে নাকি উপর থেকে পাথর এসে পড়েছে, রাস্তা বন্ধ। হতোদ্যম হয়ে নেমে পড়ি, ফিরে আসি এই সরাইখানায় আবার। এডগার মুচকি হাসে। ওরা যেন জানত, এটাই হবে। সেদিনটা কোনোমতে কাটিয়ে আবার পরদিন ভোরের বাসে চেপে বসি। সেদিন বাসটা আর স্টার্টও নেয়নি।”
“কেন?” প্রফেসর সোম প্রশ্ন করেন।
“যান্ত্রিক গোলযোগ। আমি অবশ্য হাল ছাড়িনি। সেন্ট মন্টিয়াস যেভাবেই হোক আমাকে ছাড়তেই হত ওই বিভীষিকার হাত থেকে রক্ষা পেতে। পরদিন ভোরে আমি আবার ঐ বাসে চাপতে যাই। কিন্তু…”
“কিন্তু?”
“স্থানীয় বাসের যাত্রীরা আমাকে আর বাসে চাপতে দেয়নি সেদিন।”
“কেন?”
“কারণ ওরা জানে সেন্ট মন্টিয়াস আমাকে আর ছাড়বে না। আর আমি বাসে বসলে ওদের বাসও আর ছাড়বে না।” এই পর্যন্ত বলেই হো হো করে আগের মতই পাগলের মত হাসতে থাকেন স্যামুয়েল।
.
বারো
মদের ঘোরে প্রায় বেহুঁশ, স্যামুয়েলকে তার রুমে শুইয়ে দিয়ে এলেন প্রফেসর সোম। নিজের শোয়ার প্রস্তুতি নিতে গিয়েও তিনি বুঝলেন, স্যামুয়েলের ঘটনাটাই তাঁর মাথায় ঘুরছে। লোকটার মদ খাওয়ার বহর দেখে, পুরোপুরি তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে মনও চায় না। এদিকে সরাইখানার বাকি লোকেদের কনস্ট্যান্ট তাদের টেবিলের দিকে তাকিয়ে থাকা দেখে এটাও মনে হয় যে সেন্ট মন্টিয়াসে কিছু একটা গড়বড় আছে।
এটুকু প্রফেসর সোম বুঝেছেন, তিনি আসলে যে কাজেই আসুন না কেন, কোনো না কোনো অন্য সমস্যায় জড়িয়ে পড়বেনই। তাই ঝুঁকি নেননি তিনি। স্যামুয়েলের ঘরের জানলায় দরজায় বিছানার চারপাশে কালো লবণ ছড়িয়ে দিয়ে এসেছেন। বেহুঁশ স্যামুয়েলের গলায় ঝুলিয়েছেন দেশি রসুনের মালা।
এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখের পাতা জুড়িয়ে গেছিল প্রফেসর সোম বুঝতেও পারেননি। হঠাৎ একটা পাশবিক আর্তনাদে তাঁর ঘুমটা ভেঙে যায়। এক মুহূর্তের জন্য হতবুদ্ধি হলেও, কোত্থেকে এই আর্তনাদ আসছে সেটা বুঝতে দেরি হয়নি প্রফেসরের।
এক লাফে বিছানা উঠে পড়েন তিনি। ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস বের করেই ছুটে যান তিনতলায়, স্যামুয়েলের রুমের দিকে।
যেমনটা আন্দাজ করেছিলেন ঠিক তাই হয়েছে! তিনতলায় ওঠার সিঁড়ির মুখ ঘিরে রয়েছে সরাইখানার মালিক এডগার আর তার এক বেয়ারা।
প্রফেসরকে দেখেই রক্তচক্ষু নিয়ে তারা বাধা দিতে চাইল। কিন্তু স্থূলকায় স্লথগতি এডগার আর তার বেয়ারার পক্ষে বিদ্যুৎগতির প্রফেসরকে আটকানো সম্ভব ছিল না। তাদের প্রায় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে প্রফেসর তিনতলায় উঠে এলেন। তারপর ছুটে গেলেন স্যামুয়েলের ঘরের দিকে।
এক লাথিতে বন্ধ দরজাটা খুলে ফেললেন প্রফেসর। কিন্তু এর পরের দৃশ্যটার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না তিনি। তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল।
প্রফেসর দেখলেন স্যামুয়েল বিছানার ওপর শুয়ে কাটা মুরগির মতো ছটফট্ করে চলেছে। অসহ্য যন্ত্রণায় তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে আর্তনাদের পর আর্তনাদ। তার ওপর ঝুঁকে রয়েছে কালো আলখাল্লা পরা একজন, যার মুখ দেখা যাচ্ছে না।
“তুমি যেই হও, এই মুহূর্তে স্যামুয়েলের থেকে দূরে সরো!” দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলেন প্রফেসর। কিন্তু সেই মূর্তির মধ্যে কোনো ভাবান্তর লক্ষ্য করা গেল না। বরং স্যামুয়েলের চিৎকারের তীব্রতা আরো বেড়ে গেল।
“আরে! কী…?”
দারুণ আতঙ্কে গলার আওয়াজ হারিয়ে ফেললেন রুদ্র সোম। তিনি দেখলেন, স্যামুয়েলের শরীরে একটা আঙ্গুল ছুঁয়ে রয়েছে সেই আলখাল্লা পরা মানুষটি। স্যামুয়েলের শরীরটা নিমেষে বুড়িয়ে যাচ্ছে! চর্বি, মাংস, চামড়া নিমেষে হাড়ের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।
পকেট থেকে রিভলবারটা বের করে সেই মূর্তির দিকে বেশ কয়েকটা সিলভার বুলেট দেগে দিলেন প্রফেসর। বারুদের ধোঁয়ায় ঘরটা ভরে গেল। কিন্তু এক বিন্দুও নড়ল না সেই মূর্তি!
শেষ অস্ত্র হিসেবে পবিত্র জেরুজালেমের তেল-বালির মিশ্রনের বোতলটা তার দিকে ছুড়ে মারলেন প্রফেসর। বিকট একটা শব্দ করে বোতলটা তার গায়ে লেগে ভেঙে গেল। মিশ্রণটা ছড়িয়ে পড়ল তার সারা গায়ে। এবার সেই মূর্তিটা প্রফেসরের দিকে ফিরে তাকাল।
বীভৎস সেই দৃষ্টির সামনে একটু কুঁকড়ে গেলেন প্রফেসর।
কালো আলখাল্লার মোড়া শরীরটায় যেটুকু নজরে আসে, তাতে এক বিকৃত বিভীষিকাই দৃশ্যমান হয়। দীর্ঘদিন ধরে গলে পচে শুকিয়ে যাওয়ার পর কোনো লাশের যে অবস্থা হয়, ঠিক তেমনই চেহারা সে মূর্তির। শুধু তার চোখের দুটো কোটরে যেন নরকের ধিকধিকে আগুন জ্বলছে! সময় যেন থমকে গেছে সেখানে।
বিকট শব্দ করে সেই মূর্তি প্রফেসরের দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করল। জীবনে প্রথমবার, অসহায়ের মত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রফেসর সোম দেখতে থাকলেন, কীভাবে সেই বিভীষিকার স্পর্শে, স্যামুয়েলের তরতাজা শরীরটা একটু একটু করে দুমড়ে মুচড়ে একটা ছোট্ট একটা শুকনো ধূলোর পিন্ডে পরিণত হচ্ছে…।
.
তেরো
সে রাতে স্যামুয়েলের রুম থেকে কীভাবে নিজের রুমে ফিরে এসেছিলেন প্রফেসর সে কথা তার মনে পড়ে না। তাঁর শুধু এটুকু মনে পড়ে যে, সেই রাতের মতো অসহায় নিজেকে আগে কখনও লাগেনি। তাঁর জ্ঞান, বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা… সব যেন চিৎকার করে তাঁর উদ্দেশে ব্যঙ্গোক্তি উচ্চারণ করছিল।
নাহ্! এভাবে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। আজকের দিনটা সময় নিতে হবে। তার মধ্যেই দুটো কাজ করতে হবে প্রফেসরকে।
এক, চার্চকে পুরো ঘটনাটা জানিয়ে ইমিডিয়েটলি টেলিগ্রাম করতে হবে, যাতে বাকিটা তাঁরা এসে সামলান।
দ্বিতীয়টা হল, কাল রাতের সেই ঝড় বয়ে যাওয়ার পর প্রফেসরের কিছুটা সময় দরকার নিজেকে সামলে নিতে। নিজের স্নায়ুগুলোকে চাঙ্গা করে তবেই না আগামী যুদ্ধে ঝাঁপাতে পারবেন তিনি।
“ভেতরে আসতে পারি?” রুমের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হল। কি-হোলে চোখ রাখলেন প্রফেসর। এক বৃদ্ধ পাদ্রি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। দরজা খুলে দিলেন প্রফেসর, “আসুন।”
“ধন্যবাদ। এই সময়ে এসে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। তবে লোকমুখে আপনার কথা শুনে, আর কাল রাতের ঘটনা জেনে আমি আসতে বাধ্য হলাম। এমন ঘটনা এখানে নতুন নয়। তবে আপনি এখানে নতুন।”
“আপনি কি আমাকে চেনেন? কিন্তু আপনাকে তো ঠিক মনে পড়ছে না আমার।” প্রশ্ন করলেন প্রফেসর।
“দুঃখিত। আমি আমার নিজের পরিচয় দিতেই ভুলে গেছি। আমি ফাদার জোসেফ। লোকাল চার্চের দেখাশোনা করি আমি। তুমি আমার থেকে বয়সে অনেকটাই ছোটো হবে, তাই তুমি করেই বলছি। আমি চার্চের কাজে যখন শহরে যাই, মাঝে মাঝে তোমাদের কথা শুনি। বিশেষ করে তোমার নাম তো আমি অনেক শুনেছি। পরমপিতার আলোর যোদ্ধা হয়ে তুমি কত ভালো-ভালো কাজ করেছ! এই ক্রমবর্ধমান অন্ধকার মেটাতে তোমাদেরই তো দরকার।”
“কিন্তু ফাদার, কাল আমি যেভাবে পরাস্ত হয়েছি, তা আগে কখনও হয়নি। আমি জানি না, কীভাবে এরপরেও লড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছব।”
“দেখো বাবা, রাতের পরেই ভোর আসে। তুমি হাল ছেড়ে দিয়ে বসে থাকলে ওই গুমোট বাঁধা অন্ধকারগুলো তো আরও ছড়িয়ে পড়বে।”
“সেটা ঠিক ফাদার। নিজের প্রাণের মায়া আমি করি না। কিন্তু আমার কাছে আর এমন কোনো অস্ত্র অবশিষ্ট নেই যা দিয়ে আমি ঐ বিভীষিকাকে হারাতে, অন্তত ঠেকাতে পারব।”
“মানুষের সব থেকে বড়ো অস্ত্র কী? তার নলেজ, তার জ্ঞান। শোনো বাবা, জন্মাবধি আমি সেন্ট মন্টিয়াসে আছি। এমন অনেক কিছু আমি জানি বা দেখেছি, সেগুলো সাধারণের পক্ষে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। কিন্তু তুমি তো সাধারণ নও, তুমি পারবে।”
“ঠিক বুঝলাম না ফাদার।”
“আমার হাতে আর সময় বেশি নেই। থাকলে একদিন নিজেই ঐ পাহাড়ের মাথায় থাকা শয়তানের রাস্তায় পা বাড়াতাম। এই জরাজীর্ণ অশক্ত শরীর আমাকে তার অনুমতি দেয় না। কিন্তু তুমি নবীন প্রাণ, সাহসে আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর, তুমিই পারবে।”
“আমাকে কি করতে হবে?” প্রফেসর সোম প্রশ্ন করলেন।
“আমি তোমাকে একটা জিনিস দেব। শর্ত একটাই, কাজ শেষ না হওয়া অবধি কোনো প্রশ্ন তুমি করতে পারবে না। আর কাজের শেষে তুমি বিনা বাক্যবয়ে সেটা আমাকে ফেরত দেবে।”
“কী জিনিস ফাদার?”
বুড়ো ফাদার জোসেফ তাঁর গাউনের ভেতর থেকে অদ্ভুত আকারের একটা ছুরি বের করে আনলেন। জন্তুর শিঙের মতো কোনো বস্তু দিয়ে সেটা তৈরি। তার হাতলের জায়গায় আটকানো রয়েছে হাতির দাঁতের মতো একটা জিনিস। সারা ছুরিটায় এমনসব নকশা দিয়ে কারুকার্য করা, যাদের দিকে তাকালেই শরীর শিরশির করে।
“এই রইল তোমার ব্রহ্মাস্ত্র।” ছুরিখানা প্রফেসর সোমের মুখের ওপর নাচিয়ে মুচকি হাসলেন ফাদার জোসেফ, “এবার দেখাও তোমার জোর।”
.
চোদ্দ
ভোরের আলো এখনও ঠিক করে ফোটেনি। আলো-আধাঁরির খেলা চলছে চারদিকে। বাতাসে বেশ একটা শিরশিরানি ভাব।
বাইরের মুক্ত বাতাসে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন প্রফেসর সোম।
এডগার আর তার সঙ্গীরা যে কাল রাতের ঘটনার পর প্রফেসরের রুমের বাইরে তালা ঝুলিয়ে রাখবে, সেকথা তিনি আন্দাজ করেছিলেন। তাই পেছনের জানলার শিক আলগা করে সবার নজরের আড়ালে নিঃশব্দে বেরোনোর পথটা তিনি আগেই করে রেখেছিলেন। তবু ওই পথে নেমে আসাটা কিঞ্চিৎ কষ্টসাধ্য ছিল বইটি।
বুক ভরে একটা নি:শ্বাস নিয়ে নিলেন প্রফেসর, কারণ এর পরে এ সুযোগ মিলবে কিনা তিনি জানেন না। এতদিনে কম সুপারন্যাচারাল এন্টিটির সঙ্গে তাঁর মোলাকাত হয়নি। কিন্তু এই প্রথমবার নিজেকে বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে প্রফেসরের। কারণ যে এন্টিটির ওপর কালো লবণ, সিলভার বুলেট, এমনকি জেরুজালেমের পবিত্র বালি পর্যন্ত কাজ করেনা, তার সঙ্গে তিনি কীভাবে এই অসম যুদ্ধে জয়ী হবেন এ উত্তর তাঁর জানা নেই। এমনকি প্রফেসরের সব থেকে ধারালো অস্ত্র, জ্ঞান, সেটাও হার মেনেছে এই অজানা বিভীষিকার সামনে। তিনি বিন্দুমাত্র জানেন না, কী ধরনের এন্টিটির সঙ্গে লড়তে চলেছেন তিনি।
কিন্তু পেছনে ফিরবারও কোনো উপায় নেই। স্যামুয়েলের মুখ তিনি ভুলতে পারছেন আর না। তাঁর নিজের এতোদিনের শিক্ষা তাঁকে পিছু হটতে দিচ্ছে না।
টিলার রাস্তায় এগিয়ে চললেন প্রফেসর। চার্চকে টেলিগ্রাম তো করেই দিয়েছেন তিনি, যদি সত্যিই আজকের মধ্যে আর ফিরে আসতে না পারেন, তাহলে ওনারা এসেই করবে যা করার
*****
স্যামুয়েলের কথা মতোই, টিলার রাস্তায় ওঠার মুখেই, ওয়ার্নিং বোর্ডটা নজর এড়াল না প্রফেসর সোমের। সত্যিই, বেড়ার এপাশে টিলার এলাকা শুরু হওয়ার পর থেকেই আবহাওয়ায় একটা পরিবর্তন বেশ অনুভব করতে পারলেন তিনি। গাছপালা, ঝোপঝাড়ে কীরকম একটা বিষন্নতা যেন। নিঃশব্দ চারপাশ। যেন মৃত্যুর একটা কালো ছায়া বহির্জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে এই অঞ্চলটাকে।
কিন্ত সে-সবে মন দেওয়ার সময় প্রফেসরের কাছে ছিলনা। টিলার নির্জন পথ ধরে চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে এগিয়ে চললেন প্রফেসর।
বাঁকটা পার হতেই একটা তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ পেলেন প্রফেসর সোম। দূরে টিলার শিখরে তিনি দেখতে পেলেন সেই বাড়িটা, যাকে ঘিরে এত রহস্যের মায়াজাল ছড়িয়েছে। কী আশ্চর্য! বাড়িটার চারপাশে বুনো আগাছার আধিপত্য থাকলেও, বাড়িটাকে কিন্তু তারা স্পর্শ করতে পারেনি, কেউ যেন পরম মমতায় বাড়িটাকে বাইরের রুক্ষতা থেকে বুক পেতে আগলে রেখেছে।
হঠাৎ পায়ের তলায় একটা মড়াৎ করে শব্দ হওয়ায় নীচের দিকে তাকালেন প্রফেসর। শিউরে উঠলেন তিনি। নাহ্! স্যামুয়েল এখানেও বাড়িয়ে বলেনি। অজস্র হাড় ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে চারিদিকে। মুহূর্তের জন্য অন্যমনস্ক হয়ে গেছিলেন প্রফেসর। খেয়াল করেননি একটা মোটা গাছের গুঁড়ি তীব্র বেগে তার দিকে ধেয়ে আসছে।
.
পনেরো
মাথাটা অসম্ভব ভারী হয়ে আছে, বেশ ব্যথাও করছে। বুকের ওপর কী যেন একটা বসে আছে। নিঃশ্বাস নিতেও বেশ কষ্ট হচ্ছে। সম্বিত ফিরে এল প্রফেসরের। বুঝলেন একটা উঁচু পিলারের সঙ্গে তাকে উলটো করে পায়ে বেঁধে
ঝোলানো হয়েছে।
“অবশেষে হুঁশ এল তাহলে আলোর যোদ্ধার!”
একটা অপার্থিব গলা প্রফেসরের কানে এল। চোখ ঝাপসা হয়ে আছে, দৃষ্টি বেশি দূর যায় না। তবুও বাইরে থেকে আসা পড়ন্ত সূর্যের রেখা দেখে প্রফেসর সোম বুঝলেন, তাকে কোনো একটা ঘরের মধ্যে এনে রাখা হয়েছে।
“আমি জানতাম তুমি আসবে।”
আওয়াজের দিকে লক্ষ্য করে চোখ ঘোরানোর চেষ্টা করলেন প্রফেসর।
“সেদিন দেখেই বুঝেছিলাম, তুমি আসবে। তোমাদের মতো কিছু সবজান্তা, অন্ধকারের বিরুদ্ধে স্বঘোষিত যোদ্ধা সাজা লোকেদের সাহস প্রচুর! কিন্তু আজ তোমার সব স্পর্ধা, সব জ্ঞান-পিপাসা মিটিয়ে দিচ্ছি চিরতরে।”
ঘোলাটে দৃষ্টিতে প্রফেসর দেখলেন একটা জমাট বাঁধা অন্ধকার তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। কালো আলখাল্লায় মোড়া সেই মূর্তিটা, স্যামুয়েলের ঘরে যাকে দেখেছিলেন প্রফেসর! একদম গায়ের কাছ থেকে দেখলে আরো ভয়ঙ্কর লাগছে যেন। একটা বিশ্রী গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে প্রফেসরের।
“তোমার গায়ে এই উল্কিগুলো কে এঁকে দিয়েছে? তোমাদের পরমপিতার চ্যালারা নাকি?” খ্যাঁক খ্যাঁক করে হেসে ওঠে সেই মূর্তি।
“অবশ্য ভালোই হয়েছে। এগুলো না থাকলে স্যামুয়েলের মতো তোমার প্রাণশক্তিকেও এক নিমেষে শুষে নিতাম আমি। তাহলে তো এই খেলার মজাটাই চলে যেত, তাই না?
হ্যাঁ, আমি জানি অন্যদের মত তোমাকে স্পর্শ করে তোমার প্রাণ রস শুষে নিতে পারব না। তার বদলে একটা অন্য, আরও ভালো একটা ব্যবস্থা করেছি। এইভাবে উল্টে লটকে থেকে ধীরে-ধীরে তোমার প্রাণবায়ু তোমাকে ছেড়ে চলে যাবে। এই নির্জন মৃত্যুপুরীতে কেউ তোকে বাঁচাতে আসবেনা, না ভগবান আর না শয়তান, সাক্ষী থাকবো শুধু আমি নিজে, স্বয়ং তোর মৃত্যু,” পাগলের মত হাসতে থাকে সেই রহস্যময় কায়া।
“তুমি কে?” দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করেন প্রফেসর সোম।
“আমি?” কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় সেই কায়া। বাইরের পড়ন্ত সূর্যের দিকে একবার তাকায় সে, তারপর বলে চলে।
“তোমার হাতে এখনও অনেকটা সময় আছে বটে, শোনো তাহলে। অনেক-অনেক যুগ আগে এক রাজা ছিল। অন্ধকার ছিল তার রাজপাট। তার বিশ্বস্ত ক’জন প্রহরী মিলে সেই রাজ্য চালাত।
রাজার একটা সমস্যা ছিল। সে আলো একদম পছন্দ করত না। আলো দেখতে পেলেই সে তার প্রহরীদের হুকুম করত সেটা ছিনিয়ে নিয়ে আসার জন্য। একদিন সেই রাজা এক পাহাড়ের চূড়ায় একটা আলো দেখতে পেল। ব্যস, তার এক প্রহরীর ওপর হুকুম হল তক্ষুনি ওই আলোটাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসার। রাজা বলল, আলোটার নাকি সময় ঘনিয়েছে। সেই প্রহরীও অমনি আজ্ঞা পালনে ছুট দিল, কিন্তু…” ক্ষনিকের জন্য থেমে যায় সেই কায়া।
“কিন্তু?” অস্পষ্ট গলায় প্রশ্ন করেন প্রফেসর সোম।
“এখনও কৌতূহল?” হেসে ওঠে সেই কায়া, “ভালো। সত্যিকারের জ্ঞান- পিপাসাই আছে দেখছি তোমার। শোনো তবে।
অনন্তকাল ধরে সেই প্রহরী এ কাজ করে চলেছে। কর্তব্য পালনে কোনোদিন তার হাত কাঁপেনি। কিন্তু সেদিন প্রথমবার পাহাড়চূড়ার সেই আলো দেখে সে স্তব্ধ হয়ে যায়। তার এতদিনের শিক্ষা, অনুশাসন, অধ্যবসায়, সব হার মেনে যায় সেদিন।
আলোটা আসছিল একটা আদুল গায়ের মেয়ের থেকে। প্রকৃতি তার সব রূপ-রস-গন্ধ যেন উজাড় করে দিয়েছিল তার শরীরে। তার যৌবনচ্ছটার সেই দীপ্তিতে চোখ যেন ঝলসে যায়।
নিজের কর্তব্য ভুলে, সেই প্রহরীও মেতে ওঠে সেই আলোর খেলায়। হার মানে আদিম রিপুর কাছে। নিষ্পলক দৃষ্টিতে সে চেয়ে দেখতে থাকে সেই আদুল গায়ের মেয়েটাকে। কালের অনন্তসীমায় এই প্রথমবার বুঝি সে ভালোবেসে ফেলে।
কিন্তু কালের নিয়ম যে বড়ো নিষ্ঠুর। সাম্য বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত হলেও যে সর্বনাশ নেমে আসে। সময়ের দাঁড়িপাল্লায় যোগ-বিয়োগের হিসেব যে করেই হোক মেলাতে হবে, সে ভাবে। এতো বড়ো কালচক্রের মাঝে এই সামান্য বিচ্যূতি নিশ্চয় রাজার চোখে পড়বে না, এমনই ভেবেছিল সে। তাই ওই মেয়েটার আলোকে অব্যহতি দিয়ে, ওই পাহাড়চূড়ার অন্য একটা আলোর দিকে হাত বাড়ায় সেই প্রহরী, যেটা আসছিল একটা ছেলের গা থেকে।
কিন্তু সেই প্রহরী ভুলে গেছিল, মৃত্যুর রাজার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব। তাই না?”
আচমকা সেই কায়ার কথায় ছেদ পড়ে। মাথা তুলে সে দেখে, হঠাৎ কখন প্রফেসর সোম নিজের বাঁধন ছাড়িয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে আছেন।
“দম আছে বটে তোমার।” হিসহিসিয়ে বলে ওঠে সেই কায়া, “গল্পের আর তোমার শেষ একসঙ্গেই হোক তাহলে।”
“তারপরেই মৃত্যুর রাজা সেই প্রহরীকে অভিশাপ দেয়। তাই তো?” এতক্ষণে হিসেবটা মেলাতে পারেন প্রফেসর, “তার রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে সে ওই পাহাড় চূড়ায় আটকে পড়ে থাকবে অনন্তকাল ধরে।”
এক তীব্র চিৎকার করে সেই কায়া ছুটে এসে জাপটে ধরে প্রফেসরকে। তাঁকে ধরে ছুড়ে মারে দেওয়ালে! ছিটকে পড়েন প্রফেসর। তাঁর মাথা ফেটে যায়, ফিনকি দিয়ে রক্ত ছোটে। তবু প্রফেসর সোম দাঁতে দাঁত চেপে উঠে দাঁড়ান আর বলে চলেন,
“আর তখন থেকে সে অপেক্ষা করে চলে মৃত্যুর, কবে রাজা নিজে এসে তাকে কালচক্র থেকে মুক্ত করবে।”
পাশব চিৎকারে ঘরটা ভরে যায়। এক অমানুষিক ধাক্কায় পুতুলের মতো ছিটকে পড়েন প্রফেসর। চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসে। প্রফেসর বুঝতে পারেন, এই আক্রমণের সামনে তাঁর জীবনের আলো আর বেশিক্ষণ জ্বলবে না। তবু তিনি নিজেকে থামাতে পারেন না।
“অবশ্য সেদিন মৃত্যুর রাজা একা সেই প্রহরীকেই অভিশাপ দেননি। সেই জমাট আলো হয়ে থাকা মেয়েটাও রেহাই পায়নি তার হাত থেকে। প্রহরীর প্রিয়তমা সেই মেয়েটা এই বাড়ির নীচেই একটা কফিনে শুয়ে আছে জীবনৃত হয়ে অনন্তশয্যায়। ওহে প্রহরী, আমি ঠিক বললাম তো?”
“তুমি অনেক কিছু বুঝে ফেলেছ।” গুঙিয়ে ওঠে কায়া, “তবে আর না। তোমার সময় সত্যিই ফুরিয়েছে।”
তার জান্তব হাতদুটো দিয়ে প্রফেসরের গলা চেপে ধরে সে। কিন্তু এবারে প্রফেসর সোম প্রস্তুত ছিলেন। পকেট থেকে ফাদার জোসেফের দেওয়া ছুরিটা তিনি আমূল ঢুকিয়ে দেন সেই কায়ার শরীরে!
বাইরে বিকট শব্দে একটা বাজ পড়ে। শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস ধেয়ে আসে, মুহূর্তের মধ্যে যেন আবহাওয়া বদলে যায়। অস্পষ্ট দৃষ্টিতে প্রফেসর দেখতে পান, সেই কায়া দূরে ছিটকে পড়ে আছে, মুখে প্রচন্ড যন্ত্রণা নিয়েও সে হাসছে।
“এ ছুরি তুমি কোথায় পেলে?”
“ফাদার জোসেফ দিয়েছেন।”
“হা হা হা! ফাদার!?” যন্ত্রণার্ত গলাতেও ব্যঙ্গ চাপা থাকে না আর, “অসীম লীলা তোমার প্রভু, মানতে বাধ্য হলাম। আমার অপরাধের জন্য আমাকে ক্ষমা কোরো। শুধু একটাই দুঃখ রয়ে গেল। অন্তত শেষবারের জন্য আমাকে মুক্তি দিতেও তুমি নিজে যদি আসতে পারতে…!”
একটু-একটু করে মিলিয়ে যেতে থাকে সেই কায়া, অদ্ভুত ছুরিটার গা থেকে বেরিয়ে আসা আগুনে। মাংস, চামড়া, হাড়ের জায়গা নিতে থাকে স্তূপীকৃত ছাই। কাঁপা-কাঁপা পায়ে উঠে পড়েন প্রফেসর। তাঁর সামনে অনেক কাজ।
স্যামুয়েলের বর্ণনা দেওয়া পথে তিনি একটু-একটু করে এগোতে থাকেন। সেই চোরকুঠুরিতে নামার পরেই একটা সুসজ্জিত কফিন তাঁর নজরে আসে। কফিনের গায়ে ছোট্ট করে একটা নাম খোদাই করা আছে। ঝুঁকে পড়ে নামটা পড়ার চেষ্টা করলেন প্রফেসর সোম।
‘লুসি জোন্স’।
.
ষোলো
টিলা থেকে ফিরে আসার পরে মাঝে পাঁচ দিন কেটে গেছে।
সেই পাহাড়চূড়ার বিভীষিকার হাত থেকে ক্ষতবিক্ষত অশক্ত শরীরে বেঁচে ফিরেছিলেন প্রফেসর। কিন্তু মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় তাঁর প্রাণসংশয় হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে তাঁর পাঠানো টেলিগ্রাম ঠিক সময়ে চার্চের হাতে এসে পড়েছিল। সেখান থেকেই লোক পাঠানো হয়েছিল। জ্বরের ঘোরে বেঁহুশ প্রফেসরকে তারাই সরাইখানা থেকে উদ্ধার করে যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করে।
ডাক্তার আর নার্সরা সরাইখানার ওই ঘরটাকেই একটা মিনি হাসপাতালে পরিণত করে ফেলেন প্রায়। এতে অবশ্য বেশ বিব্রতই হয়েছিলেন প্রফেসর, কিন্তু কিছু করারও ছিল না।
সরাইখানার মালিক এডগার আর তার দলবল, এমনকি বেশ কিছু স্থানীয় লোক যে এই ঘটনাক্রমে বেশ ভড়কে গেছে এটা প্রফেসর বুঝতে পারতেন। প্রায়ই তারা প্রফেসরের রুমের আসেপাশে লুকিয়ে উঁকি-ঝুঁকি মারত। তবে তাদের কৌতূহল নিবৃত্ত করার কোনো চেষ্টা তিনি করেননি।
পরমপিতার আশীর্বাদে আর ডাক্তার ও নার্সদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় অবশেষে পুরোপুরি সেরে উঠলেন প্রফেসর।
চার্চের গাড়ি এসে গেছে, বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রফেসর ঠিক করেছেন, আজই তিনি ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পড়বেন। সেন্ট মন্টিয়াসের সফর আপাতত শেষ।
“ভেতরে আসতে পারি?” দরজার বাইরে থেকে একটা গলা এল।
এ গলা ভালো করেই চেনেন প্রফেসর। তিনি জানতেন সেন্ট মন্টিয়াস ছাড়ার আগে আবার দেখা হবেই। তবে তিনিও প্রস্তুত ছিলেন।
“আসুন ফাদার জোসেফ, আসুন। সেন্ট মন্টিয়াস ছেড়ে যাওয়ার আগে আপনার সঙ্গে আবার দেখা হবে এ আমি জানতাম।” হাসতে হাসতে দরজা খুলে দিলেন প্রফেসর সোম।
“বেশ-বেশ।” খিলখিলিয়ে হেসে ওঠেন ফাদার জোসেফ, “তাহলে এটাও
নিশ্চয় জান, কেন এসেছি আমি?”
আজ ফাদার জোসেফকে বেশ অন্যরকম লাগছে যেন।
“হুম সেটাও জানি ফাদার, কিন্তু…”
“কিন্তু কী?” হিসহিসিয়ে প্রশ্ন করলেন ফাদার জোসেফ।
“কিন্তু একটা জিনিসে আমার খটকা থেকে যাচ্ছে যে ফাদার। স্বয়ং মৃত্যুকে মেরে ফেলার মতো ভয়ংকর অস্ত্র এক সাধারণ ধর্মযাজকের কাছে কীভাবে এল?”
“হা হা হা!” অট্টহাস্য করে উঠলেন ফাদার জোসেফ। দমকা হাওয়ায় জানলাটা খুলে গেল বিকট শব্দ করে। ফাদারের ব্যাকব্রাশ করা সুবিন্যস্ত চুল সেই হাওয়ায় উড়তে লাগল। প্রফেসর সোমের মনে হল, যেন তাঁর মাথার দু’পাশে ঢেউখেলানো দুটো শিং গজিয়েছে।
“তুমি বোধহয় নিজের চুক্তির কথা ভুলে যাচ্ছ সোম। পাহাড়চূড়ার রহস্য শেষ করায় সাহায্য করা ছাড়া তোমার আর কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কথা কিন্তু ছিল না আমার।” জোসেফের গলা থেকে শ্লেষ ঝরে পড়ল।
“আমি কিছুই ভুলিনি ফাদার। আমি শুধু আমার হিসাবটা মিলিয়ে নিচ্ছি।” দাঁতে দাঁত চেপে বলে ওঠেন প্রফেসর সোম।
“তুমি বোধহয় আমার প্রকৃত পরিচয়টা এখনও ভালোভাবে বুঝতে পারনি সোম। আমার সঙ্গে করা চুক্তি যারা ভাঙে, তাদের কিন্তু খুব একটা ভালো পরিণতি হয় না।”
“মাফ করবেন। কিন্তু এই পথে যেদিন প্রথমবার নেমেছিলাম, সেদিনও পরিণতির কথা ভাবিনি, আজও ভাবি না। আলো আর অন্ধকারের এই প্রতিনিয়ত যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত হতে-হতে আমার পরিণতি যে খুব একটা ভালো হবে না, সেটা অন্তত আমি ভালো করেই জানি।”
“ওই ছুরিটা তোমাদের ওই রসুনের মালা বা সিলভার বুলেটের মত খেলনা নয় সোম। ওটা সাধারণ মানুষের হাতে পড়লে বিপর্যয় নেমে আসবে, সৃষ্টির সাম্য বিঘ্নিত হবে। আলোর একজন পূজারী হয়ে তুমি নিশ্চয় সেটা চাইবে না সোম, তাই না?”
“আমি তো কোনো চুক্তি ভাঙতে চাইছি না ফাদার। বরং নতুন করে একটা চুক্তি করতে চাইছি।”
“আমার সঙ্গে চুক্তি? আবার?”
বিকট শব্দে হেসে উঠলেন ফাদার জোসেফ।
প্রফেসর সোম খেয়াল করলেন, হঠাৎ করেই বাইরে আবহাওয়ার মধ্যে বেশ একটা পরিবর্তন এসে গেছে। এতক্ষণ ধরে নির্মেঘ থাকা আকাশ হঠাৎই কালো মেঘে ঢেকে গেছে। সোঁ সোঁ শব্দে হাওয়া বইছে, আগামী দুর্যোগের অপেক্ষায় চারদিক থম্ মেরে আছে যেন
কড়াৎ করে বাইরে একটা বাজ পড়ল। কেঁপে উঠলেন প্রফেসর সোম। “সামান্য ঝড়েই ভয় পেয়ে গেলে সোম?” হেসে বললেন ফাদার জোসেফ।
“ভয় আমার আছে ফাদার।” শান্ত গলায় বললেন প্রফেসর, “তবে আমার ভয়ের থেকে সাহসটা চিরকালই বেশি।”
“তোমার কি মনে হয়, তোমার ওই খেলনাগুলো দিয়ে তুমি আমাকে আটকাতে পারবে সোম? নাকি তোমার পরমপিতা তোমাকে এসে বাঁচাবেন এই মুহূর্তে?”
“নাহ্। তবে আপনি নিজেই একটা কথা বলেছিলেন আমাকে। জ্ঞানই আসল অস্ত্র। মনে পড়ে? আপনার মাথার ওপরে তাকান ফাদার।”
উপরের দিকে তাকালেন ফাদার জোসেফ। সেখানে লাল কালি দিয়ে একটা পেন্টাগন আঁকা।
“তোমাকে তো সমঝদার ভেবেছিলাম সোম। কিন্তু তুমিও এরকম একটা কাঁচা কাজ করলে? এই সামান্য একটা নকশা আমাকে আটকাতে পারবে বলে তোমার বলে মনে হয়?” মুচকি হাসেন ফাদার জোসেফ।
“সাম্য ফাদার। সাম্যের কিছু নিয়ম তো আপনিও মানতে বাধ্য, তাই না? এই সবকিছু তো শুধু সেই সাম্যের জন্যই।”
“বেশ। তাই হোক। নতুন করেই চুক্তি হোক। বলো, কী চাও তুমি ছুরির বিনিময়ে?” এবার কিছুটা হতাশ শোনাল ফাদারের গলাটা।
“লুসি যেন শুধু প্রাণ নয়, ওর ভালোবাসাও ফিরে পায় রক্তমাংসের শরীরেই।”
“মূর্খ! তুমি যা খুশি চাইতে পারতে নিজের জন্য। কিন্তু এমন একটা সস্তা রোমান্টিক ইচ্ছে?” ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বলেন জোসেফ, “তোমাদের বুঝতে সত্যিই কষ্ট হয় আমার সোম। যাইহোক, তোমার ইচ্ছে পূর্ণ হল। এবার আমার ছুরিটা ফেরত দাও।”
নিজের পকেট থেকে ছুরিটা বের করে ফাদারের দিকে ছুঁড়ে দিয়েই দৌড়তে শুরু করলেন প্রফেসর। আর পিছন ফিরে তাকাননি তিনি। তবু সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে নামার সময় ফাদার জোসেফের ব্যঙ্গ মাখা ধারালো গলাটা আরও একবার তাঁর কানে এল।
“চিন্তা কোরো না সোম। চলার পথে আমাদের আবার দেখা হবে। হবেই” দৌড়ে এসে গাড়িতে উঠে পড়েন প্রফেসর সোম।
একপাশে স্ট্রেচারে শোয়ানো আছে লুসির দেহটা, পাশে বসে আছেন এক তরুণ ডাক্তার।
“এইরকম কোমাটোজ আমি কাউকে দেখিনি।” হতাশ গলায় বলেন ডাক্তার, “এর তো শরীরের প্রাণের স্পন্দনই নেই। কিন্তু মৃত বলা যাচ্ছে না। শহরে নিয়ে গেলেও ওর কি কিছু হবে? কী ধরনের চিকিৎসা করা হবে ওর প্রফেসর সোম?”
মৃদু হেসে মাথা নাড়েন প্রফেসর।
“হবে ডাক্তার, লুসি নিশ্চয় সুস্থ হয়ে চোখ মেলে চাইবে। জানেন তো, আজকাল ভগবান কথার খেলাপ করলেও, শয়তান কিন্তু করে না। জীবন যে কখন কার জন্য কী নিয়ে আসে, কে বলতে পারে?”
মুচকি হাসেন প্রফেসর, গাড়িটা ছেড়ে দেয়।
