প্রথম অধ্যায় – সৃষ্টির রহস্যাবলী
এক : রাসূলুল্লাহর সৃষ্টি রহস্য
হাদীছের মর্মে জানা যায়-আল্লাহ পাক আসমানে ‘শাজারাতুল ইয়াক্বীন’ নামে চতুষ্কাণ্ড বিশিষ্ট একটি সুন্দর বৃক্ষ সৃষ্টি করিয়াছেন। আল্লাহ পাকের স্বীয় পবিত্র নূর হইতে রাসূলুল্লাহর (ছঃ) নূর সৃষ্টি করতঃ উহা বহু সংখ্যক শ্বেত মুক্তার দ্বারা অতি সাবধানতার সহিত বেষ্টন করিয়া ময়ূর পাখীর ন্যায় আকৃতি দানপূর্বক বহু শত বৎসর সেই বৃক্ষের উপর উপবিষ্ট রাখেন।
পাখীটি উক্ত বৃক্ষে অবস্থান করিয়া সত্তর হাজার বৎসর পর্যন্ত আল্লাহর গুণ-কীর্তন, তাসবীহ-তাহলীল, ইবাদত-বন্দেগী ইত্যাদিতে নিমগ্ন থাকেন। তৎপর আল্লাহ পাক অতি মনোরম একটি আয়না তৈরী করিয়া স্বীয় নূর-নির্মিত ময়ূর পাখীটির সম্মুকে ধরেন। পাখীটি আয়নার মধ্যে নিজ সৌন্দর্য রূপ ও শরীরের সুঠাম গঠন আকৃতি দেখিয়া আল্লাহ পাকের সম্মুখে কৃতজ্ঞতা স্বরূপ পাঁচটি সেজদাহ করেন। পরিণামে সে সেজদাহর কারণেই হজরতের উপর চিরদিনের জন্য পাঁচটি সেজদাহ ফরজ হইয়া যায়। একই কারণে আল্লাহ পাক রাসূলুল্লাহকে (ছঃ) ইহজগতে মানবজাতির জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করিবার পরে তাঁর উম্মতের উপর পাঞ্জেগানা (পাঁচ ওয়াক্তিয়া) নামাজ ফরজ করিয়া দেন।
ইহার কিছুকাল পরে উক্ত নূরে মোহাম্মদীর প্রতি আল্লাহ পাক মহব্বতের দৃষ্টি দান করিলেন। ইহাতে পাখীরূপ ‘নূরে মোহাম্মদী’ লজ্জায় জড়সড় হইল এবং তাঁর সর্বশরীর ঘর্মে প্লাবিত হইয়া গেল। আল্লাহ পাকের এই মহব্বতের দৃষ্টির ফলে নূরে মোহাম্মদী হইতে যে ঘর্ম নির্গত হইয়াছিল, তাহা হইতেই আল্লাহ পাক আঠার হাজার মাখলুকাত পয়দা করিয়াছেন। এ কারণেই রাসূলুল্লাহর এক নাম ‘উম্মী’ হইয়াছে। আরবী ভাষায় ‘উম্মুন’ শব্দের অর্থ- মূল। যেহেতু সৃষ্ট-জীব রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) নূর হইতে সৃষ্টি, সুতরাং তিনিই সকল সৃষ্টির মূল।
আল্লাহের নূরেতে পয়দা নূর মোস্তফার,
মোস্তফার নূরে পয়দা তামাম সংসার।
অতঃপর পাখীরূপ নূরে মোহাম্মদী বহু শত বৎসর উক্ত বৃক্ষে থাকিয়া আল্লাহ পাকের গুণ-কীর্তন, তাসবীহ-তাহলীল ও ইবাদত-বন্দেগীতে নিমগ্ন থাকেন। ইহার পরে আল্লাহ পাক উক্ত নূরে মোহাম্মদী হইতে সকল আম্বিয়া ও রাসূলগণের আত্মাসমূহ পয়দা করেন এবং সেই সকল আত্মাকে কালেমা ত্বাইয়্যেব লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ : ‘আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কোন উপাস্য নাই, মোহাম্মদ (ছাঃ) তাঁর প্রেরিত মহাপুরুষ-নবী পড়িবার হুকুম দেন।
আল্লাহ পাকের নির্দেশে সকল নবীর আত্মা উক্ত কালেমা পাঠ করত : মোহাম্মদ মোস্তফাকে (ছাঃ) নবী বলিয়া স্বীকার করিয়া লইলেন। এই কারণেই তাঁকে সাইয়্যেদুল মোরসালীন বা সকল নবী ও রাসূলগণের নেতা ও সরদার বলা হয়।
ইহা দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শুধু ‘খাতেমুল আম্বিয়া’ বা সৰ্বশেষ নবীই নহেন এবং তিনি ‘ফাতেহুল আম্বিয়া’ বা সর্বপ্রথম নবী নামেও আখ্যাপ্রাপ্ত। কারণ আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম নূর নবীর নূরকেই সৃষ্টি করিয়াছেন এবং সেই নূর হইতেই সকল কিছুর সৃষ্টি। এ সম্পর্কে আল্লাহর রাসূলের উক্তি :
‘আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূরকেই পয়দা করিয়াছেন।’
একই কারণে তাঁকে প্রথম সৃষ্টিও বলা হয়।
ইহার কিছুকাল পরে আবার আল্লাহ পাক অত্যাশ্চর্য সুন্দর একটি কিন্দীল (ঝাড়বাতি) নির্মাণ করতঃ উহার মধ্যে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আকৃতি পয়দা করিয়া অতি সাবধানতার সাথে সংরক্ষণ করেন।
রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) উক্ত সংরক্ষিত আত্মার চতুষ্পার্শ্বে সকল মানবাত্মা ঘুরিয়া ঘুরিয়া বহু শত বৎসর পর্যন্ত আল্লাহ পাকের তাছসীহ-তাহলীল, ইবাদত-বন্দেগী করিতেছিল। এমন সময় আল্লাহ তা’আলা সকল আত্মাকে নির্দেশ করিলেন-হে রূহ সকল! তোমরা সকলে আমার প্রিয় বান্দা মোহাম্মদের (ছঃ) নূরের দিকে একবার তাকাইয়া দেখ।’ সকল মানবাত্মা নূরে মোহাম্মদীর দিকে একবার চাহিয়া দেখিল। ফলে-
এই আত্মাসমূহের যাহারা রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) মস্তক দেখিয়াছে, তাহারা দুনিয়ায় খলিফা ও বাদশাহ হইয়াছে।
আর যাহারা কপাল দেখিতে পাইয়াছে, তাহারা নিঃস্বার্থ জননেতা হইতে পারিয়াছে, যাহারা হজরতের (ছঃ) চক্ষের ভ্রু দেখিতে পারিয়াছে, তাহারা হইয়াছে নাক্কাশ (শিল্পী)।
আর যাহারা কর্ণদ্বয়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিতে পারিয়াছে, তাহারা হইয়াছে ভাগ্যবান ও ধন-দৌলতের অধিকারী, যাহারা চক্ষুদ্বয় দেখিতে পাইয়াছে তাহারা হইয়াছে কোরআনের হাফেজ।
আর যাহারা রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) গালদ্বয় দেখিতে পাইয়াছে, তাহারা দুনিয়ায় জ্ঞানী ও দানশীল হইয়াছে। যাহাদের দৃষ্টি রাসূলূল্লাহর (ছাঃ) নাকের উপর পড়িয়াছে, তাহারা হেকিম ও সুগন্ধি বিক্রেতা হইয়াছে।
আর যাহারা ওষ্ঠ ও দন্ত মাড়ি দেখিতে পাইয়াছে, তাহারা দুনিয়ায় শান্ত-শিষ্ট ও দানশীল হইয়াছে; যাহারা রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) মুখ দেখিতে পাইয়াছে, তাহারা অত্যন্ত রোজাব্রতকারী হইতে পারিয়াছে।
আর যাহারা জিহ্বার প্রতি দৃষ্টি করিতে পারিয়াছে, তাহারা হইতে পারিয়াছে দুনিয়ার রাজা-বাদশাহগণের দূত। অনুরূপ যাহারা রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) গলদেশ দেখিয়াছে, তাহারা বিখ্যাত ওয়াজ-নসীহতকারী ও মোয়াজ্জিন হইয়াছে।
আর যাহারা রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) দাড়ি মোবারক দেখিয়াছে, তাহারা দুনিয়ার নামজাদা যোদ্ধা হইয়াছে, যাহারা গর্দান দেখিতে সুযোগ পাইয়াছে, তাহারা ব্যবসায়ী ও সওদাগর হইয়াছে।
আর যাহারা উভয় বাহু দেখিতে সমর্থ হইয়াছে, তাহারা দুনিয়ায় তরবারি ও তীর বর্ষণে পারদর্শী হইয়াছে। যাহারা শুধু দক্ষিণ বাহু দেখিয়াছে, তাহারা হাজ্জাম (নাপিত) হইয়াছে এবং যাহারা কেবল মাত্র বাহু দেখিয়াছে, তাহারা দুনিয়ার বাদশাহদের জল্লাদ (ঘাতক) হইয়াছে।
অনুরূপ, যাহারা দক্ষিণ হাতের তালু দেখিয়াছে, তাহারা মহাজন হইয়াছে এবং যাহারা বাম হাতের তালু দেখিয়াছে, তাহারা দুনিয়ার জিনিস ওজন করিবার কার্যে পটু হইয়াছে।
আর যাহারা উভয় হাতের তালু দেখিতে পাইয়াছে, তাহারা দানশীল এবং মাল-দৌলত উপার্জনকারী হইয়াছে। যাহারা উভয় হস্তের পৃষ্ঠ দেখিয়াছে, তাহারা হইয়াছে অত্যন্ত কৃপণ। আর যাহারা রাসূলূল্লাহর (ছাঃ) দক্ষিণ হস্তের অংগুলী দেখিয়াছে, তাহারা লেখক এবং যাহারা বাম অংগুলী দেখিয়াছে তাহারা হইয়াছে দরজী।
যাহারা রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) বক্ষ মোবারক দেখিতে পারিয়াছে, তাহারা প্রকৃত আলেম ও শরীয়াতের মুজতাহেদ হইতে পারিয়াছে। যাহারা রাসূলুল্লাহর সৃষ্টি রহস্যলূল্লাহর (ছাঃ) পৃষ্ঠদেশে দৃষ্টিপাত করিতে পারিয়াছে, তাহারা অত্যন্ত কোমল প্রাণ ও ধর্মানুযায়ী হইতে পারিয়াছে।
অনুরূপ যাহারা তাহার পার্শ্বদেশ দেখিয়াছে, তাহারা হইয়াছে, গাজী বা ধর্মযুদ্ধে বিজয়ী। যাহারা রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) পেট দেখিয়াছে তাহারা কমলোভী এবং পরহেজগার বা সংযমী হইয়াছে।
আর যাহারা রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) মোবারক হাঁটু দেখিতে সমর্থ হইয়াছে, তাহারা দুনিয়ায় কোমলতার মাধ্যম বিনীতভাবে রুকু-সেজদা করিতে শিখিয়াছে। যাহারা পদদ্বয় দর্শন করিতে পারিয়াছে, তাহারা দেশ- বিদেশ ভ্রমণ করিয়া শিকার কার্যে দক্ষতা অর্জন করিতে পারিয়াছে। অনুরূপ যাহারা পদদ্বয়ের নিম্নদেশ দেখিয়াছে, তাহারা অত্যন্ত ভ্রমণকারী হইয়াছে।
আর যাহাদের আত্মা ভাগ্যের বিপর্যয় হেতু রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) পবিত্র নূরানী শরীরের কোন অংশই দেখিতে সুযোগ পায় নাই, তাহারা হইয়াছে। ইয়াহুদি, খৃষ্টান, কাফের ও আল্লাহ-আল্লার রাসূলের দুশমন দলের অন্তর্গত।
মোটকথা, মানবজাতির ভাল-মন্দ, উন্নতি-অবনতি, বেহেশত-দোজখ সকলই একমাত্র রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) অছিলায় সংঘটিত হইয়াছে এবং হইবে। এই জন্যই আল্লাহ পাক বলিয়াছেন : (হাদীস কুদসী)
এ ধরায় না হইলে আপনার সৃজন,
করিতাম না পয়দা আকাশ ভূবন।
.
রাসূলুল্লাহর বেলাদত
দুনিয়া যখন ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন হইয়া পড়ে, তখন উহা ‘মাবুদে লা শরীকের’ নিকট নিজ বিপদ মুক্তির জন্য আকুল আবেদন জানায়। যেহেতু আল্লাহ অদ্বিতীয় লা-শরীক, তাই দুনিয়ার এই অন্ধকার এক আল্লাহর একই হুকুমে এবং একই সময়ে আলোকিত হইয়া থাকে।
অন্ধকার দুনিয়া দুনিয়াবাসীর অন্যতম বিপদ। এই বিপদ হইতে মুক্তিলাভের একমাত্র একটি উপায় ভিন্ন অন্য কিছু দ্বারা সম্ভবপর হইতে পারে না। তাহা হইল অদ্বিতীয় মা’বুদ আল্লাহ তা’আলার ইঙ্গিতে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একই সূর্যের কিরণ দান। যদিও চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্রপুঞ্জ পৃথিবীতে আলোদান করিয়া থাকে; কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে উহা তাহাদের স্বীয় আলো নহে, বরং সমস্ত আলোর উৎস একমাত্র সূর্য।
অনুরূপ, দুনিয়াবাসী যখন আল্লাহর নির্দেশিত রাস্তা হইতে পথভ্রষ্ট হইয়া অন্ধকারে পতিত হয় তখন তাহাদের হেদায়েত বা পথ প্রদর্শন কল্পে মা’বুদে লা-শরীক একই হেদায়েতের সূর্যের দ্বারা পথভ্রষ্ট লোকদিগকে হেদায়েত করিয়া থাকেন।
হযরত ঈসার (আঃ) যুগের কিছুকাল পরে যখন দুনিয়াবাসী বিশেষ করিয়া আরবজাতি, আল্লাহর নির্দেশিত পথ হইতে বহু দূরে পতিত হইয়া উদভ্রান্তের ন্যায় চতুর্দিক অন্ধকারাচ্ছন্ন দেখিতেছিল, এমন সময় আল্লাহ্ পাক সমস্ত দুনিয়াবাসীর হেদায়েতকল্পে এবং অন্ধকারে নিমজ্জিত মানব গোষ্ঠিকে আলোর সন্ধান
আলোর সন্ধান দেওয়ার উদ্দেশ্যে শেষ নবী মোহাম্মদ মোস্তফাকে (ছাঃ) তৃণ-লতাহীন মরুভূমির একপার্শ্বে আরব দেশে প্রেরণ করেন। কাজেই শেষ যুগের অন্ধকারের একমাত্র আলো হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (ছাঃ)। এই জন্য আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন রাসূলুল্লাহকে (ছাঃ) ‘সেরাজ’ সূর্য নামে আখ্যায়িত করিয়াছেন।
আল্লাহ্ বলেন-
: হে মুহাম্মদ! আপনাকে দুনিয়াবাসীর সম্মুখে আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষীরূপে, মানুষের ভালো-মন্দের সুসংবাদ বাহকরূপে, আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াতকারীরূপে এবং দুনিয়ার ফেসক ও কুফরীর অন্ধকারের প্রজ্জ্বল সূর্যালোকরূপে প্রেরণ করিয়াছি।’
অতএব, নিখিল বিশ্বের অন্ধকারকে আলোকিত করিবার জন্য একমাত্র রাসূলুল্লাহই (ছাঃ) আফতাবে হেদায়েত বা পথ প্রদর্শক- প্রদীপ। তাঁহার নির্দেশিত পথ হারাইলে মানব জাতির কোন ক্রমেই পরিত্রাণ হইতে পারে না। তিনি রাহমাতুল্লিল আলামীন-নিখিল বিশ্বের শান্তি, তিনিই মানব-জাতির ভাল-মন্দের আশার আলো-ভরসার স্থল।
যেহেতু রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) রাহমাতুল্লিল ‘আলামীন বা বিশ্ব শান্তিরূপে জগতে কদম রাখিয়াছেন; কাজেই তাঁহার ‘খোদার পথে আহ্বান, ব্যাপকভাবে বিশ্বের প্রত্যেক কোণায় কোণায় অবশ্যই পৌঁছিবে। তিনি কেবল নির্দিষ্ট কোন কওমের হেদায়েতকল্পে প্রেরিত হন নাই, বরং বিশ্বের সমগ্র মানব জাতির নাজাত বা মুক্তির উপলক্ষ করিয়াই তিনি প্রেরিত।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইহজগতে প্রেরিত হইয়া বলেন নাই, আমি শুধু বণী ইসরাঈলগণকে ফিরআউনের অত্যাচার ও দাসত্ব হইতে মুক্তি দিবার জন্য প্রেরিত হইয়াছি; বরং তিনি বলিয়াছেন- আমার প্রেরণের একমাত্র উদ্দেশ্য হইল, নিখিল বিশ্বে মানুব জাতিকে আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য মা’বুদ বা দেবদেবীর পূজা ও দাসত্ব হইতে মুক্তি দেওয়া।
অনুরূপ, তিনি শুধু ইসরাঈল বংশের পরিত্যক্ত আদর্শ ও গৌরব পুনঃ অর্জনের নিমিত্ত আসেন নাই, বরং তিনি সমস্ত পৃথিবীর এবং সকল গোত্রের পরিত্যক্ত আদর্শ ও গৌরব পুনঃ অর্জন এবং আল্লাহর পথে দাওয়াত দিয়া পুনঃ ইসলামের ও আল্লাহর একত্ববাদের ডঙ্কা বাজাইবার মানসেই প্রেরিত হইয়াছেন।
বিশ্বের বুকে আল্লাহর পথে দাওয়াতের ডঙ্কা যতজনেই বাজাইয়া থাকুক না কেন, দুনিয়া যদি তাহাদিগকে ভুলিয়া যায় তবে সমস্ত জগতের সেরূপ কোন ক্ষতি সাধিত হইবে না। শুধু কতিপয় বিশেষ কওমের ও দেশের ক্ষতি হইতে পারে। কেননা, তাঁহারা মাত্র নির্দিষ্ট কওম ও গোত্রের হেদায়েত কল্পে প্রেরিত হইয়াছিলেন। কিন্তু দুনিয়া যদি রবিউল আউয়াল মাসের অপূর্ব দানকে ভুলিয়া যায়, তবে গোটা পৃথিবীর মানব জাতি পথভ্রষ্ট হইয়া পড়িবে-যাহাদের কল্যাণ ও মুক্তির উপায় থাকিবে না। কেননা, রবিউল আউয়ালের অপূর্ব দান রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) শুধু কোন দেশ বা কওম বিশেষের নহে বরং সমগ্র বিশ্বের রহমত বা শান্তিরূপে প্রেরিত।
মোদের নবী, বিশ্বনবী নাই তুলনা তাঁর,
মোদের নবী শিক্ষা গুরু নিখিল দুনিয়ার।
মোদের নবীর শিক্ষা মাঝে শান্তি জাহানের,
তাঁর বাতান পন্থা মাঝে মুক্তি মানবের।
আরব তথা সারা বিশ্বের সম্মানিত কোরাইশ বংশের শ্রেষ্ঠ পরিবারের সর্দার আবদুল মোত্তালিবের পুত্র আবদুল্লাহর ঔরষে মতান্তরে ৫৭০ খৃষ্টাব্দে রাহমাতুল্লিল ‘আলামীন হযরত মুহাম্মদ (ছাঃ) জন্মগ্রহণ করেন। ৫৩ ব ৎসর বয়সে তিনি মক্কা হইতে মদীনা হিজরত করেন। এবং সারা বিশ্বে ইসলাম ধর্মের আহ্বান পৌঁছাইয়া ১০ম হিজরী ৬৩ বৎসর বয়সে ইহ- লোক ত্যাগ করেন।
দুই : হযরত আদম নবীর সৃষ্টি রহস্য
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) ফরমাইয়াছেন-’আল্লাহ্ তা’আলা হজরত আদমকে (আঃ) দুনিয়ার বিভিন্ন স্থানের মাটি দ্বারা পয়দা করিয়াছেন। মস্তক কা’বা শরীফের পবিত্র মাটি দ্বারা, বক্ষ দোহনা নামক স্থানের মাটি দ্বারা, পেট ও পিঠ ভারত উপ-মহাদেশের মাটি দ্বারা, হস্তদ্বয় ইউরোপের মাটি দ্বারা ও পদদ্বয় পাশ্চাত্যের মাটি দ্বারা পয়দা করিয়াছেন।’
অন্য হাদীসে বর্ণিত হইয়াছে যে, আদমের (আঃ) মস্তক বাইতুল মোকাদ্দাসের পবিত্র মাটি দ্বারা; মুখমণ্ডল বেহেশতের পবিত্র মাটি দ্বারা, দন্ত মোবারক ভারত উপ-মহাদেশের মাটি দ্বারাও হস্তদ্বয় কা’বা শরীফের পবিত্র মাটি দ্বারা এবং হাড়সমূহ পাহাড়ের কঠিন শিলাযুক্ত মাটি দ্বারা পয়দা করিয়াছেন।
অত্র হাদীস দ্বারা আরও প্রমাণিত হয় যে, আদমের (আঃ) পৃষ্ঠদেশ ইরাক নামক স্থানের মাটি দ্বারা; আত্মা ফিরদাউস নামক সর্বোচ্চ বেহেশতের মাটি দ্বারা; জিহবা তায়েফ নামক স্থানের মাটি দ্বারা; চক্ষুদ্বয় হাউজে কাওছারের পবিত্র মাটি দ্বারা, মুখ বেহেশতের মাটি দ্বারা ও শরীরের জনেন্দ্রীয় কাবুল নামক স্থানের মাটি দ্বারা তৈয়ার করিয়াছেন।
আল্লাহতা’আলা বাইতুল মোকাদ্দাসের পবিত্র মাটি দ্বারা হজরত আদমের (আঃ) মস্তক তৈয়ার করিয়াছেন, তাই বাইতুল মোকাদ্দাস হইতে অধিকাংশ নবীর আবির্ভাব ঘটিয়াছে। তাঁহারা দুনিয়ার মানুষকে প্রকৃত জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষা-দীক্ষায় উদ্বুদ্ধ করিয়া উন্নতির পথে আগাইয়া দিয়াছেন। তাই বাইতুল মোকাদ্দাস আজিও দুনিয়ার অধিকাংশ মানুষের তীর্থ স্থান রূপে পরিগণিত হইয়া চলিয়াছে। বলা বাহুল্য- শিক্ষা, জ্ঞান ও বিজ্ঞান একমাত্র মস্তিষ্ক হইতেই প্রকাশ পাইয়া থাকে।
অনুরূপ, হজরত আদমের (আঃ) মুখ আল্লাহ্ বেহেশতের পবিত্র মাটি দ্বারা তৈয়ার করিয়াছেন। তাই আদম সন্তানের মুখ মানব দেহের অন্যতম সৌন্দর্যের স্থানরূপে পরিগণিত হইয়াছে। কারণ আল্লাহর যাবতীয় সৌন্দর্যময় স্থানের মধ্যে বেহেশতই শ্রেষ্ঠতম সৌন্দর্য-নিকেতন।
আবার হযরত আদমের (আঃ) চক্ষুদ্বয় হাউজে কাওসারের পবিত্র মাটি দ্বারা তৈয়ার করিয়াছেন। তাই আদম সন্তানের চক্ষুদ্বয় শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মধ্যে অন্যতম শান্তিদায়ক ও কোমল স্থানরূপে পরিগণিত হইয়াছে। কারণ, হাউজে কাওসার নামক স্থান অতীব শান্তিময় স্থান। আদম সন্তান কিয়ামতের দিবস পানির পিপাসায় যখন অস্থির হইয়া এদিক-ওদিক ছুটোছুটি করিতে থাকিবে, তখন আল্লাহর কৃপায় কেহ উক্ত হাউজ হইতে একবার পানি পান করিতে পারিলে সারা জীবন সে আর পানির তৃষ্ণা অনুভর করিবে না- প্রয়োজন হইবে না পানি পান করার।
আবার হযরত আদমের (আঃ) দন্তগুলি ভারত উপ-মহাদেশের সবুজ-শ্যামল সুশোভিত মাটি দ্বারা তৈয়ার করা হইয়াছে। তাই আদম সন্তানের দাঁতগুলি অনিন্দ সুন্দর রূপ ধারণ করিয়াছে। কারণ, ভারত উপ-মহাদেশ অন্যান্য দেশের তুলনায় শ্রেষ্ঠতম সৌন্দর্যের দেশ।
আবার আদমের (আঃ) হস্তদ্বয় পবিত্র কা’বা শরীফের মাটি দ্বারা সন্তানের হস্তদ্বয় সর্বদা তৈয়ার করা হইয়াছে। তাই প্রকৃতপক্ষে আদম দানশীলতার কার্যে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। কারণ কা’বা গৃহের জিয়ারতে যুগে যুগে অসংখ্য লোক গমন করিতেছে, কিন্তু কা’বা গৃহের জিয়ারত হইতে বাধা দিবার কাহারও অধিকার নাই। কা’বা গৃহের দ্বার যেইরূপ সকলের জন্য মুক্ত, তদ্রূপ উহার মাটি দ্বারা তৈরি হস্তও সকলের জন্য মুক্ত থাকিবে। অর্থাৎ সেই হস্ত মুক্তভাবে দান করিতে অভ্যস্ত থাকিবে।
আবার আল্লাহতা’আলা আদমের (আঃ) পৃষ্ঠদেশ ইরাক নামক স্থানের কঠিন মাটির দ্বারা তৈয়ার করিয়াছেন। তাই আদম সন্তানের পৃষ্ঠদেশ অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কঠিন ও মজবুত। কারণ, ইরাকের মাটি অন্যান্য দেশের মাটির তুলনায় কঠিন এবং ইরাকবাসীগণ অন্যান্য দেশের লোকের তুলনায় কঠিন প্রকৃতির লোক।
আবার হযরত আদমের (আঃ) শরীরের বিশিষ্ট অঙ্গ (জনেন্দ্রীয়) বাবুল নামক স্থানের মাটি দ্বারা তৈয়ার করা হইয়াছে বলিয়া আদম সন্তানের অই অঙ্গ যৌন তৃষ্ণাযুক্ত ও প্রেম উত্তেজনার কেন্দ্রভূমিতে পরিণত হইয়াছে।
আবার হযরত আদমের (আঃ) হাড়সমূহ কঠিন শিলাযুক্ত পাহাড়ের মাটি দ্বারা তৈয়ার করা হইয়াছে, তাই আদম সন্তানের হাড় শরীরের সকল অংশ হইতে কঠিনতম হইয়া থাকে।
আবার হযরত আদমের (আঃ) অন্তঃকরণ ফেরদাউস নামক সর্বোচ্চ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বেহেশতের পবিত্র মাটি দ্বারা তৈয়ার করা হইয়াছে বলিয়া আদম সন্তানের অন্তঃকরণে আল্লাহকে বিশ্বাস করিবার এবং তাঁহাকে চিনিবার শক্তি দান করা হইয়াছে। কেননা, কোন আদম সন্তান ফেরদাউস কেন, কোন বেহেশতেই প্রবেশ করিতে পারিবে না, যতক্ষণ না সে সরল অন্তঃকরণে আল্লাহর উপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করতঃ তাঁহার আদেশ ও নিষেধ পালন করিবে-ইবাদত-বন্দেগীতে কাল যাপন করিবে।
আবার আল্লাহতা’আলা হজরত আদমের (আঃ) জিহ্বা তায়েফ নামক স্থানের মাটি দ্বারা তৈয়ার করিয়াছেন। কাজেই সেই স্থান কলেমায়ে শাহাদৎ-
— এর স্থানে পরিগণিত হইয়াছে।
আদম-সৃষ্টি কৌশল : আল্লাহতা’লা হযরত আদমকে (আঃ) পঞ্চ ইন্দ্রিয় যথা-চক্ষু, কর্ণ, নাসিকা, জিহ্বা ও ত্বক দ্বারা পয়দা করিয়াছেন। আদম-ধড়ে রূহের প্রভাব বিস্তারের আগে ইহা ছিল নির্জীব মৃত্তিকা নির্মিত। আল্লাহপাক যখন এই মৃত্তিকা নির্মিত আদম মুর্তির মধ্যে রূহ বা তাহার আত্মাকে প্রবেশের জন্য আদেশ করিয়া বলিলেন-
‘হে আদম রূহ! তুমি এই আদম মূর্তির মুখ কিংবা মস্তিষ্কের ভিতরে প্রবেশ কর।’ আদম-আত্মা আদমের মৃত্তিকা নির্মিত মূর্তি দেখিয়া দুই শত বৎসর পর্যন্ত উহার চতুর্দিক ঘুরিতে লাগিল। অবশেষে রূহ আদম মুর্তির চক্ষুদ্বয়ের উপর পড়িল। রূহ চক্ষুদ্বয়ের উপর বসিবামাত্র আদমের চক্ষে দৃষ্টিশক্তি আসিল এবং আপন দেহ মৃত্তিকা নির্মিত দেখিল।
অতঃপর আদমের (আঃ) রূহ আবার কর্ণের উপর পড়িল। রূহ কর্ণের উপর পড়িবামাত্র হযরত আদম (আঃ) ফেরেশতাগণের তছবীহ ও জিকের শুনিতে পাইলেন। ইহার পরে আদমের রূহ তাঁহার নাকের ছিদ্রে প্রবেশ করিলে তিনি হাঁচি দিলেন।
আদম (আঃ) হাঁচি দেওয়ার প্রাক্কালেই আল্লাহ পাক তাঁহাকে হাঁচি অন্তর যে দোয়া ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়িতে হয়, তাহা শিক্ষা দিয়াছিলেন। তাই তিনি হাঁচি দেওয়া মাত্র- ‘আলহামদুলিল্লাহ’ পড়িলেন। আদম যখন হাঁচি দিয়া এই দোয়া পড়িলেন, তখনই আল্লাহ হাঁচির জবাবী দোয়া ‘ইয়ারহামুকা রাববুকা ইয়া আদম’-হে আদম! তোমার প্রভু তোমাকে দয়া করিয়াছেন, পড়িলেন।
অতঃপর আদম-রূহ যখন তাঁহার বক্ষে প্রবেশ করিল, তখনই হঠাৎ আদম (আঃ) উঠিয়া বসিতে চেষ্টা করিলেন, কিন্তু উঠিতে পারিলেন না। এই জন্যই আল্লাহপাক আদম সন্তানকে বলেন :
‘মানব জাতি অত্যন্ত ধৈর্যহীন ও চঞ্চল মতি।’
তৎপর আদম-আত্মা তাঁহার পেটে প্রবেশ করিল। আত্মা পেটে প্রবেশ করা মাত্র আদমের (আঃ) ক্ষুধার অনুভূতি আসিল। অবশেষে আদম-আত্মা তাঁহার সারা শরীরে ছড়াইয়া পড়িল এবং মাটির মূর্তিটি রক্ত-মাংসের শরীরে পরিণত হইয়া একটা অত্যাশ্চর্য সম্পূর্ণ মানব আকার ধারণ করিল।
আদি পিতা দুনিয়ার মানব প্রথম,
মাটির তৈয়ারী নূর হযরত আদম।
শরীর মাটির বটে রূহ নূর তার,
এই জমিনের বুকে খলীফা খোদার।
অতঃপর ‘আল্লাহতা’আলা হযরত আদমের (আঃ) আপাদমস্তক অপূর্ব সৌন্দর্যময় সাদা ধপধপে নখ জাতীয় পোশাক দ্বারা অলংকৃত করিলেন। ইহার সৌন্দর্য দৈনন্দিন বাড়িয়া চলিল। এমন কি, তাঁহার সম্পূর্ণ দেহটা একখণ্ড শ্বেত পাথরের মূর্তির ন্যায় দেখা যাইতে লাগিল। আক্ষেপের বিষয় এই যে, যখন তিনি বিতাড়িত শয়তানের চক্রান্তে পড়িয়া আল্লাহর আদেশ অবহেলা করিলেন, তখনই আল্লাহ্ তাঁহার সৌন্দর্যময় উক্ত পোশাক অপসারণ করিয়া তাঁহাকে দুনিয়ায় স্থানান্তরিত করিলেন। আজিও সেই সৌন্দর্যময় পোশাকের সামান্য নমুনা আদম সন্তানের হাত পায়ের অংগুলীতে ‘নখ’ রূপে শোভা পাইতেছে।
আল্লাহপাক হযরত আদমের (আঃ) দেহ তাঁহার ইচ্ছানুযায়ী তৈয়ার ‘নূরে করতঃ জীবন দান করিলেন এবং তাঁহার ললাট বা কপালে মোহাম্মদী’ স্থাপন করিলেন। ইহাতে তাঁহার ললাটখানি পূর্ণিমার পূর্ণচন্দ্র হইতেও অধিক আলোকে আলোকিত হইয়া উঠিল-বিকশিত হইল আলোকমালা।
পয়দা করে আদমের পেশানীতে তাঁর,
দান করিলেন নূর মুবারক নবী মোস্তফার।
আহা কিযে নূরের খুবী কিযে তাহার শান,
হাসল যেন ললাটখানি পূর্ণিমার চান।
অপতঃপর আল্লাহতা’আলা ফেরেশতাগণকে আদেশ করিলেন : হে ফেরেশতাগণ! তোমরা আদমকে বেহেশতের সবচেয়ে সুন্দর একখানা আসনে উপবেশন করাইয়া দুই শত বৎসর কাল উহাকে সপ্ত আসমান, বেহেশত-দোজখ, আরশ-কুরশী ইত্যাদির আশ্চর্যজনক দৃশ্যাবলীর অপরূপ কীর্তি এবং আমার একাত্ববাদের কীর্তি ও নিশান পরিদর্শন করাও।’
ফেরেশতাগণ আল্লাহর এই আদেশ প্রাপ্তিমাত্র কাল বিলম্ব না করিয়া আদমের নিকট ‘মায়মুনা’ নামক একটি বেহেশতী ঘোড়া হাজির করিল। উহার তামাম শরীর ছিল. খালেছ বিশুদ্ধ মেশকের সুগন্ধিযুক্ত এবং আরো ছিল উহার দেহ অপরূপ সৌন্দর্যময় মুক্তার দুইখানা ডানা। আদম (আঃ) আল্লাহর হুকুমে উক্ত ঘোড়ার উপর সওয়ার হইলেন। হযরত জিব্রাঈল (আঃ) ঘোড়ার লাগাম ধরিল এবং হযরত মিকাঈল ও ইস্রাফীল সোয়ারীর ডাইনে ও বামে দাঁড়াইয়া আদমকে (আঃ) আসমান, বেহেশত-দোজখ, আরশ-কুরসী ইত্যাদির সৌন্দর্য দেখাইতে রওয়ানা হইল। আদম (আঃ) যাইবার কালে পথিমধ্যে, ফেরেশতাগণকে ‘আচ্ছালামু আলাইকুম’ বলিতে বলিতে গমন করিতেছিলেন। ফেরেশতাগণও সালামের জবাবে ‘ওয়া আলাইকুমুচ্ছালাম’-বলিতেছিলেন। ইহা শুনিয়া আল্লাহ বলিলেন :
‘হে আদম! অদ্য হইতে কেয়ামত পর্যন্ত তোমার ঈমানদার সন্তানগণের মধ্যে এইরূপ সালামের নিয়ম প্রবর্তন করা হইল-ঈমানদার সন্তানগণ একে অন্যের সাথে সাক্ষাৎ কানে ঐরূপ যেন সালাম করে।’
.
আদম সৃষ্টির গোড়ার কথা
মানব জাতির সৃষ্টির পূর্বে আল্লাহতা’লা তাঁহার বান্দারূপে জ্বিন জাতিকেও সৃষ্টি করিয়াছিলেন। তাহারাও আমাদের মতই দুনিয়ায় বাস করিত। আমরা মাটি দ্বারা সৃষ্ট, জ্বিন জাতি মাটি দ্বারা সৃষ্টি নহে-তাহারা সৃষ্ট অগ্নি দ্বারা। আল্লাহ্ বলেন-
‘আর আমি পয়দা করিয়াছি জ্বিন সম্প্রায়কে উত্তপ্ত অগ্নি হইতে।’ আমাদের যেমন আহার-বিহার, নিদ্রা-শয়ন, জন্ম-মৃত্যু, ভোগ- বিলাস, সুখ-দুঃখ ও স্ত্রী-পুত্র আছে, জিন জাতিরও অনুরূপ আছে। জিন এবং মানব জাতির মধ্যে কোন পার্থক্য নাই। তবে মানব জাতি সকল সৃষ্ট জীবের দৃষ্টির গোচরে, কিন্তু জিন জাতি এই প্রকার নহে। আমরা তাহাদিগকে দেখিতে পাই না কিন্তু তাহারা আমাদিগকে দেখিতে পায়। কেয়ামতের দিবস আমাদের ন্যায় জিন জাতিরও পাপ-পুণ্যের হিসাব- নিকাশ হইবে এবং তাঁহার ফল ভোগ করিতে হইবে। তাহাদের জন্য বেহেশত-দোজখ নির্ধারিত আছে। আমরা যেরূপ আল্লাহর নির্দেশিত ইবাদত-বন্দেগী করিয়া থাকি, তাহাদেরও সেইরূপ করিতে হয়।
যেখানে আনুগত্য ও ইবাদতের কথা, সেখানেই আজাব ও ছাওয়াবের সাওয়াল। কারণ, আনুগত্যের বিপরীত অনানুগত্যতা প্রদর্শিত হইলেই সেখানে রোষ ও অসন্তোষের দাবাগ্নি প্রজ্জ্বলিত হয়। ফল দাঁড়ায় তাহাকে শাস্তি দেওয়া। অপরদিকে যেমন হুকুম তেমন কর্মসম্পাদন, তাহার উত্তম প্রতিফল তথা বেহেশতে অবশ্যই প্রাপ্ত হইবে। বিশ্বপালক এই ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কোরআনের ভাষায় এই কথাই উল্লেখ রহিয়াছে। আল্লাহ্ বলেন-
ফর্মান, জিন ও মানব এই দুনিয়ার পরে,
পয়দা করিয়াছি শুধু মম ইবাদত তরে।
বর্ণিত আয়াতে স্পষ্ট বুঝা যায়, মানব জাতির ন্যায় জিন জাতিকেও আল্লাহর নির্দেশিত সকল ইবাদত-বন্দেগী করিতে হয়-ইবাদাত- বন্দেগীর নির্দেশ তাহাদের উপরও রহিয়াছে। বলা বাহুল্য, তাহাদের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশিত কার্য পালনকারী অপেক্ষা নির্দেশ খেলাপকারীর সংখ্যা অধিকতর। সৎকার্য অপেক্ষা অসৎকার্যে তাহারা অধিক অনুরাগী।
কথিত আছে, আল্লাহ্ পাক জিন সম্প্রদায়কে সৃষ্টি করিয়া দুনিয়ায় বসবাসের নির্দেশ দিলেন। আর বলিলেন- তোমরা আমার ইবাদত-বন্দেগী করিবে’। এ নির্দেশ মত তাহারা কিছুদিন কালযাপন করিতে থাকিল। যেহেতু জিন জাতি অসৎ কাজেই অনুরাগী বেশী; তাই তাহারা আর বেশী দিন আল্লাহ পাকের সে নির্দেশ পালন করিতে পারিল না। ক্রমে তাহারা আল্লাহর হুকুমে খেলাপ করিতে আরম্ভ করিল এবং নিজেদের মধ্যে নিদারুণভাবে আত্মকলহে লিপ্ত হইয়া পড়িল। শুধু তাহাই নহে, তাহারা পরস্পর কাটাকাটি খুনাখুনি করিয়া মরিতে লাগিল। এক কথায়, তাহারা খোদাকে ভুলিয়া গেলো। রাব্বুল ‘আলামীন খোদা তাহাদের এই আত্মকলহ এবং পরস্পর গর্হিত কার্য দেখিয়া অসন্তুষ্ট হইলেন। বিশেষ করিয়া, তাহারা সকলে আল্লাহকে ভুলিয়া যাওয়ায় আল্লাহ পাক তাহাদের উপর চরম অসন্তুষ্ট হইলেন। আল্লাহর ইচ্ছা হইল এই পাপাচারী জিন জাতিকে ধ্বংস করিয়া দিতে। তিনি খোদায়ী সিপাহী ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলেন খোদাদ্রোহী পথভ্রষ্ট জিন জাতিকে ধ্বংস করিয়া দিবার জন্য।
ফেরেশতাদের বললেন খোদা জমিন মাঝে যাও,
অবাধ্য সব জিনের কওম খতম করে দাও।
ফেরেশতাগণ আল্লাহর এই নির্দেশ পাইয়া সকল জিন জাতিকে সমূলে উৎখাত করিয়া দিল। দুনিয়াকে পাপাচারী পথভ্রষ্ট জিন সম্প্রদায় হইতে মুক্ত করিল।
খোদায়ী সিপাহী ফেরেশতাগণ জিন সম্প্রদায়কে সমূলে উৎখাত ও ধ্বংস করিবার সময় একটি ছোট জিন-শিশু ইবলীসকে পাইয়া তাহারা তাহাকে খুন করিল না। নিষ্পাপ শিশু দেখিয়া উহার প্রতি তাহাদের দয়া হইল। ফেরেশতাগণ সকল জিন জাতিকে ধ্বংস করিয়া ইবলীসকে লইয়া তাহারা খোদার দরবারে হাজির হইল। খোদা গায়েবের মালিক-সকল বস্তুর ভেদ তিনি ভালরূপে জ্ঞাত। খোদা পাক ফেরেশতাগণকে নির্দেশ দিলেন-
‘তবে একে তোমাদের মধ্যেই রাখিয়া শিক্ষা দাও।’
দেখিতে দেখিতে ইবলীস শিক্ষায় পক্ক পণ্ডিত হইয়া উঠিল। এমনকি, ফেরেশতাদের চাইতেও সে বড় জ্ঞানী হইয়া দাঁড়াইল, সে খ্যাত হইয়া ‘মোয়াল্লেমুল মালায়েকাহ’–ফেরেশতাদের গেল : গুরুরূপে।
এই সময় হইতে ফেরেশতাগণ তাহাকে সম্মানের চক্ষে দেখিত। ইবলীস এত সম্মানের অধিকারী কেন হইয়াছিল, তাহা সর্বজ্ঞানী আল্লাহই ভাল জানেন।
যাহা হউক, জিন জাতি ধ্বংস করিবার পর আল্লাহ্ পাকের ইচ্ছা হইল মানব জাতি সৃষ্টি করিতে। মানব জাতির সৃষ্টির পিছনে কি রহস্য নিহিত তাহাও একমাত্র করুণাময় খোদাই ভাল জানেন। তিনি এক শুভ মুহূর্তে ফেরেশতাগণকে ডাকিয়া মানব সৃষ্টির মহৎ ইচ্ছা প্রকাশ করিয়া বলিলেন :
‘অবশ্যই আমি দুনিয়ায় বানাইব একজন প্রতিনিধি।
আল্লাহর এই ইচ্ছা বা অভিমতের বিরুদ্ধাচরণ করিবার শক্তি কাহারও নাই। বিশেষ করিয়া মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য একমাত্র তিনিই ভাল জানেন।
দ্বিতীয়ত, তিনি সর্বজ্ঞানী, তাঁহার পরামর্শের প্রয়োজনই-বা কোথায়? আল্লাহর জ্ঞানের নিকট ফেরেশতাদের জ্ঞান সামান্য, তবুও তাহাদের ঐ সামান্য জ্ঞানে জিন জাতির আগমন ও খোদাদ্রোহীতা অবাধ্যতার দুঃখজনক কথা মনে পড়ায় তাহারা খোদার দরবারে আরজ করিয়া বলিল-
‘হে খোদা! আপনি কি সৃষ্টি করিতে চাহেন পৃথিবীতে যাহারা করিবে তথায় ফাসাদ পরস্পর করিবে রক্তারক্তি? আমরাই তো আপনার গুণকীর্তন আর পবিত্রতা বর্ণনা করিতেছি।’
ফেরেশেতাগণ মানব সৃষ্টির গূঢ় রহস্য ও তথ্য বুঝিতে পারিল না। মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য কোথায়, তাহাও তাহারা বুঝিতে পারিল না। বুঝিতে পারিল না এই মহৎ সৃষ্টির উদ্দেশ্য কোথায়? কেনই বা তাহাদের কাছে পরামর্শ তলব করা হইল। এতদসত্ত্বেও তাহারা এইরূপ মন্তব্য করিলই- বা কেন? কোথায় তাহার রহস্য!
তাইতো আল্লাহ্ পাক তাহাদের বুঝাইয়া বলিলেন :
‘মানব সৃষ্টির গূঢ় রহস্য ও তথ্যাবলী আমি যাহা জানি, তোমরা তাহা অবগত নহ।’
মোটকথা, মানবের আদি-পিতাকে আল্লাহ্ পাক মৃত্তিকা দ্বারা সৃষ্টি করিলেন। কিরূপে এবং কেমন করিয়া তাঁহাকে সৃষ্টি করিয়াছেন, সেই সম্পর্কে আদম সৃষ্টির রহস্যে বলা হইয়াছে। যাহ হউক, আল্লাহ্ মানবের আদি-পিতাকে সৃষ্টি করিয়া তাঁহার নামকরণ করিলেন ‘আদম’। অতঃপর তিনি হযরত আদমকে (আঃ) বেহেশতের যাবতীয় বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান দান করিলেন। তারপর ফেরেশতাদেরকে পরীক্ষা করিবার জন্য আল্লাহ্ পাক আদমকে তাহাদের সম্মুখে হাজির করিয়া সেই সব বস্তুর গুণাগুণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন। পরীক্ষা হইবে আদম ও ফেরেশতা-এই দুই কওমের মধ্যে কে সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। ফেরেশতাগণ সেই সব বস্তুর কোনটারই নামকরণ ও গুণাগুণ বর্ণনা করিতে পারিল না, তাই তাহারা ওজরখাহী হইয়া আল্লাহর দরবারে আরজ করিল :
‘হে খোদা! আপনি পরম পবিত্র, আপনি সর্বজ্ঞানী, আমাদের কোন জ্ঞান নাই; আপনি আমাদের যতটুকু শিক্ষা দিয়াছেন, তাহাই আমাদের জ্ঞানের শেষ সম্বল। আপনি সর্বজ্ঞানী এবং আপনার জ্ঞান অসীম।’
ইহার পরে আল্লাহ্ আদম নবীকে সেই বস্তুর নাম ও গুণাবলীর বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়া বলিলেন :
‘হে আদম! তুমি উহাদেরকে এইসব বস্তুর নাম ও গুণাবলীর বিষয় বলিয়া দাও।’ আল্লাহর এই নির্দেশ শোনামাত্র হযরত আদম (আঃ) তাহাদেরকে সেই সব বস্তুর নাম ও গুণাবলী ঝটপট বলিয়া দিলেন। ফেরেশতাগণ লজ্জিত হইল, তাহাদের মস্তক হইয়া আসিল অবনত। তাহারা বুঝিল, সত্যই আদম আমাদের চেয়ে বিজ্ঞতর। প্রমান হইয়া গেল, আদম নবী ও ফেরেশতা এই দুই জাতের মধ্যে আদম শ্রেষ্ঠ। আরও কারণ, প্রমাণিত হইল যে, আদম জিন জাতি হইতেও শ্রেষ্ঠ। ফেরেশতাগণ সৃষ্ট খোদার নূরে আর জিন জাতি (ইবলীস) সৃষ্ট অগ্নি হইতে। কাজেই ফেরেশতাগণ জিন জাতি হইতে অবশ্যই শ্রেষ্ঠ। বলা বাহুল্য, আদম তো ফেরেশতা কম হইতে শ্রেষ্ঠতর হওয়ারই কথা।
এখানে আদম সৃষ্টির গূঢ় রহস্য লক্ষ্য করিলেই আমরা সহজে বুঝিতে পারি, আদম সৃষ্টির রহস্য কোথায়, কেনই বা আদমকে সৃষ্টি করা হইল? আমরা অনায়াসে বুঝিতে পারি, আদম সৃষ্টির মূল উদ্দেশ্য ছিল সৃষ্ট জীবের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ একটি জাতি সৃষ্টি করা। যাঁহাকে খোদা তাঁহার নিজ প্রতিনিধিরূপে দুনিয়ায় প্রেরণ করিবেন। আর এইরূপ সৃষ্টি সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি হওয়াই ছিল বাঞ্ছনীয়। কেননা আল্লাহর এই প্রতিনিধিত্বের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব তিনি কিরূপে অন্যের হাতে অর্পণ করিতে পারেন? সেই গুরুত্বের মর্যাদা-ই-বা কে দিতে জানিত? মনে হয়, এই জন্যই আল্লাহ্ ইবলীসসহ সকল ফেরেশতাদের হযরত আদম নবীর সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে সেজদা করিতে বলিয়াছিলেন।
আল্লাহ্ তায়ালার গূঢ় রহস্য এই মহান নির্দেশ বাণী পাওয়া মাত্র সকল ফেরেশতাগণ আদমকে সম্মানের জন্য সেজদা করিল। কিন্তু আত্মগর্বিত ইবলীস অহংকারে ডুবিয়া তাঁহাকে সেজদা করিল না বরং বলিল : ‘কেন আদমকে সেজদা করিব? আমি তো আদম হইতে শ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত আমাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে আগুন হইতে আর আদমকে সৃষ্টি করা হইয়াছে নিকৃষ্ট মৃত্তিকা দ্বারা, আমিই তো উত্তম।’ আল্লাহ্ তা’আলা বলেন :
‘অইয কুলনা লিল মালায়িকাতিসজুদু লি-আদামা ফাসাজাদু হল্লা ইবলীসা, আবা অস্তাকবারা অ-কানা মিনাল কাফিরীন।
আর আদমকে যখন সেজদা করিতে আদেশ দিলাম সকল ফেরেশতাদের- সকলে সেজদা কর আদমকে। তখন সকলেই সেজদায় পতিত হইল ইবলীস ব্যতীত। সে নির্দেষ পালন করিল না, অহংকারে গর্বিত হইল। ফলে সে কাফের দলভুক্ত হইল হইয়া গেল অভিশপ্ত।’
আজাজিল না মানিয়া আল্লার ফরমান,
হয়ে গেল বিতাড়িত ইবলীস শয়তান।
একদা ছিল ইবলীস ফেরেশতাদের মধ্যে মহাজ্ঞানী পণ্ডিত- ‘মুয়াল্লিমুল মালায়েকা’ বা ফেরেশতাদের শিক্ষাগুরু। আর আজ সে অভিশপ্ত শয়তান। আত্মগৌরব ও অহংকার জাতিকে এমনতর সর্বনিকৃষ্ট জাতিতে পরিণত করে- জাতিকে টানিয়া আনে নিকৃষ্টস্তরে।
সে যাহা হউক- আল্লাহ্ আদমকে বেহেশতে থাকিতে স্থান দিলেন এবং বলিয়া দিলেন : ‘হে আদম! এই বেহেশত তোমার পানাহার এবং বসবাসের স্থান। এখানে যাহা ইচ্ছা খাওয়া-দাওয়া ও আচরণ-বিচরণ করিতে পার।’ অতঃপর একটি বৃক্ষ দেখাইয়া বলিলেন : সাবধান! ভুলেও ঐ বৃক্ষের ধারে যাইবে না; তবে কিন্তু তুমিও সীমা অতিক্রমকারীদের মধ্যে শামিল হইয়া পড়িবে।’ হযরত আদম আল্লাহ্ পাকের এইরূপ কড়া তাকীদা নির্দেশ পাইয়া সেই বৃক্ষের দিকে ভুলেও যাইতে চাহিতেন না; ফল খাওয়া তো দূরের কথা।
এইরূপ চলিল অনেক দিন। আদম একা বেহেশতের বাগানে। তাঁহার কোন সাথী নাই, সঙ্গী নাই। এইরূপ জীবন আর তাঁহার ভাল লাগিল না। তাই তিনি তাঁহার সঙ্গে বেহেশতে থাকার একজন সাথীর প্রার্থনা করিলেন আল্লাহর নিকটে। আল্লাহ্ তাঁহার প্রার্থনা মঞ্জুর করিলেন। আল্লাহ্ তাঁহার করুণা বলে হযরত আদমের বাম পাঁজরের কোন একটি হাড্ডি দ্বারা সৃষ্টি করিয়া দিলেন তাঁহার সাথীরূপে বিবি হাওয়াকে। আল্লাহর নির্দেশেই তিনি বিবি হাওয়াকে স্ত্রী-রূপে বরণ করিয়া লইলেন। এইবার মিয়া-বিবি দুই সাথী মিলিয়া মহাসুখে বেহেশত বাগানে বসবাস করিতে লাগিলেন।
বাম পাঁজরের হাড্ডি হইতে বাবা আদমের,
পয়দা হল আদি মাতা সকল মানবের।
সূরত-জামাল, রূপ-চেহারা দিব্য চমৎকার,
‘হাওয়া’ বলে নাম রাখিলেন আল্লা তালা তার।
মিলে দুজন আদম-হাওয়া নাইযে মিলের তুল,
স্বর্গ ধামে রইল হাসি-খুশীতে মশগুল।
তিন : শয়তানের সৃষ্টি রহস্য
পূর্বেই বলা হইয়াছে, শয়তানের সৃষ্টি কোথায়? তবু পাঠকের মন তৃপ্তির জন্য শয়তানের সৃষ্টি রহস্যের বিষয় বিস্তারিত আরও কিছু বলা প্রয়োজন মনে করিতেছি।
ফেরেশতাগণ হইলেন আল্লাহর স্বীয় নূরে সৃষ্টি। তাঁহাদের আহার- বিহার, রোগ-শোক, কাম-ক্রোধ বলিতে কিছুই নাই। তাঁহারা নিষ্পাপ।
সর্বদা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল। তাঁহাদের পাখা আছে। সেই পাখা দ্বারা তাঁহারা দুনিয়ার সর্বত্র পরিভ্রমণ করিয়া বেড়ান। মন্দ বা পাপের কাজ কাহাকে বলে, তাহা তাঁহারা জানেন না। ভাল কাজ ছাড়া মন্দ কাজ তাঁহারা করেনই না। ফেরেশতাগণ মানব চক্ষে অদৃশ্য।
জিন জাতি অগ্নি হইতে সৃষ্টি। মানব সৃষ্টি মাটি হইতে। মানব জাতি আর জিন জাতির মধ্যে বিশেষ কোন পার্থক্য নাই। মানুষ যেমন পানাহার করে, বিবাহ-শাদী করে, তাহাদের জন্ম-মৃত্যু আছে, অনুরূপ জিন জাতিরও আছে। তবে জিন জাতি মানব চক্ষে অদৃশ্য আর মানব জাতি দৃশ্য। এতদ্ব্যতীত, মানব জাতি খোদার ইবাদত-বন্দেগীতে অধিক অনুরুক্ত। কিন্তু জিন জাতি সেইরূপ নহে, বরং তাহারা পুণ্যের কাজ হইতে পাপের কাজের দিকে অনুরক্ত অত্যধিক। মানব জাতি আশরাফুল মাখলুকাত ‘সৃষ্টির সেরা’, কিন্তু জিন জাতি তাহা নহে। ইবলীস শয়তানও এই জিন জাতিরই অন্তর্ভুক্ত। কাজেই ইবলীস শয়তানও পাপ কার্যে অনুরাগী সর্বাধিক। ভাল কাজ সে জানে না বলিলেই চলে।
এই ইবলীস শয়তান ছিল এক সময়ে ফেরেশতাদের প্রধান, তাঁহাদের ওস্তাদ। আদমকে (আঃ) সম্মানের সেজদা করার নির্দেশ অমান্য করায় সে হইয়া গেল বিতাড়িত শয়তান। ফেরেশতাদের সঙ্গ হইতে তাহাকে করিয়া দেওয়া হইল বহিষ্কার। বেহেশতে তাহার আর স্থান রহিল না, সে পদে পদে লাঞ্ছিত, বিতাড়িত। আত্মগরিমা বা অহংকার শয়তানকে লাঞ্ছনার এমনিতর নিম্নস্তরে পৌঁছাইয়া দিল! শয়তানের দুঃখ ও ক্ষোভের সীমা রহিল না। কিন্তু শয়তানের করার তখন কিছু রহিল না।
অহংকার ও আত্মগরিমা এতই ভয়ংকর চরিত্র যে, যাহার মধ্যে এই ধ্বংসাত্মক কুৎসিত স্বভাব থাকিবে, তাহার দিন-দুনিয়ার উন্নতি বলিতে কিছুই হাছিল হইবে না। অহংকার একদিকে যেমন আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ ও খোদাদ্রোহী স্বভাব, অপর দিকে অহংকারী মানুষ মানব সমাজেও ধিকৃত। পরিণাম হয় তাহার অশুভ-দোজখ তাহার অবধারিত।
যাহা হউক, শয়তান আর কোন উপায় না দেখিয়া সে শত্রু হইয়া পড়িল হযরত আদম নবীর। যে আদমের (আঃ) উপলক্ষ করিয়া সে আজ শয়তান-বেহেশতে তাহার নাই স্থান; তাঁহার বিরুদ্ধে যাওয়া বা শত্রু হওয়া স্বাভাবিক। শয়তান ভাবিল-’যে আদমের (আঃ) জন্য আমি শয়তান হইলাম, বেহেশত হইতে আমাকে বাহির করিয়া দেওয়া হইল, সেই আদম কি প্রকারে বেহেশতে বসবাস করে তাহা দেখিয়া লইতে হইবে- আমিও থাকিব না, আর তাহাকেও থাকিতে দেওয়া হইবে না।
শয়তান উপায় খুঁজিতে লাগিল কি অপরাধে আদমকে বেহেশতের বাগান হইতে বাহিরে আনা যায়। শুধু তাহাই নহে, যুগ যুগ ধরিয়া আদম সন্তানকে/ কিরূপে বিপথগামী এবং আল্লাহর নির্দেশ বিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত করিয়া তাহার মত অন্যায়কারী রূপে সাজানো যায়; সেই দুশ্চিন্তাও সে করিতে লাগিল। এইজন্য বেশ সময়ের দরকার। এত স্বল্প সময়ে এত বড় কাজ সম্পাদন করা যে চারটিখানি কথা নয়- নয় ছেলে খেলা। তাই খোদার দরবারে সে তাহার কেয়ামত পর্যন্ত জীবন ভিক্ষা চাহিয়া বলিল :
হে খোদা! অবকাশ দিন আমায় কেয়ামত পর্যন্ত।’ উত্তরে আল্লাহ্ বলিলেন : ‘আচ্ছা, তোমাকে অবশ্য অবকাশ দেওয়া গেল।’
একেতো শয়তানের মনে আদম নবীর উপর ক্রোধ, তার উপর আরও অবকাশ পাইল সে কেয়ামত পর্যন্ত আয়ুর। কাজেই এতবড় দীর্ঘ সময়ের সুযোগ সে হেলায় হারাইতে রাজী নহে- ব্যবহার করিবে সে এই অমূল্য সুযোগ যথাযথ; একথা আল্লাহ্কে জানাইয়া শয়তান পুনঃ বলিল :
‘হে খোদা! অনন্তর আমি আক্রমণ চালাইব আদমের উপর, তাহার সন্তান গোষ্ঠির উপর, তাহাদের সম্মুখ ও পিছনের দিক দিয়া। শুধু তাহাই নহে, তাহাদের ডান বাম দিয়াও আমার এই আক্রমণ অভিযান অনবরত চলিতে থাকিবে। একদিন দেখিতে পাইবেন, অধিকাংশ আদমজাত আপনার অকৃতজ্ঞ।’ আদম সন্তানের উপর শয়তানের এইরূপ অভিযান চালাইবার কথাই বটে। কারণ, যাহার জন্য সে আজ অভিশপ্ত, এমনকি বেহেশত হইতে সে বিতাড়িত, লাঞ্ছিত, কেন সে আদম ও আদম সন্তানের প্রত্যেক পদে পদে লাগিয়া থাকিবে না?
হাদীস শরীফে আছে, শয়তান মানুষের শিরা-উপশিরা প্রত্যেক স্থানে তাহার অভিযান চালাইতে সক্ষম। এমন কি মানুষের অন্তরেও তাহার স্থান। এইসব শয়তানী অভিযানের ফল আমরা প্রত্যক্ষ দেখিতে পাই। আমরা যে অন্যায় কাজ করিয়া থাকি, তাহার প্রেরণা আমাদের অন্তরে কে যোগায়? কে ইহার ওস্তাদ? সমস্তই সেই গুরু ইবলীস শয়তানের প্রেরণা ও উপদেশ ক্রমে সংঘটিত হইয়া থাকে। আমরা অবুঝ শিশুটির মত নীরবে তাহা সম্পাদন করিয়া যাই। ঘুণাক্ষরেও আমরা বুঝিয়া উঠিতে পারি না, ইহা আমাদের চির দুশমন শয়তানের ক্রিয়া-কাণ্ড।
খোদা আদম সন্তানকে শয়তানের অভিযান হইতে সাবধান থাকিবার জন্য নির্দেশ করিলেন। ইহাতে যে অবহেলা করিবে তাহার এবং শয়তানেরই-বা পরপারে কি দশা হইবে, তাহা উচ্চারণ করিয়া আল্লাহ্ পাক শয়তানকে শুনাইয়া দিলেন—
‘মনে রাখ শয়তান। নিশ্চয় আমি দোজখ পরিপূর্ণ করিব তোমার এবং তোমার অনুগামীদের দ্বারা।
শয়তান সে শয়তান।’ আল্লাহর এই হুশিয়ার বাণী সে শুনিবে কেন? আরও পাইয়াছে সে চিরদিনের জীবন- মরিবে না সে কেয়ামত পর্যন্ত দীর্ঘদিন।
শয়তানের প্রথম অভিযান চলিল, কিরূপে আদমকে বাহির করা যায় বেহেশতের বাগান হইতে। মনে পড়িল তাহার সেই কথা- আল্লাহর সেই নিষেধ বাণী- ‘হে আদম! বেহেশতে বসবাস কর, যেখানে ইচ্ছা সেখানে যাও, যাহা ইচ্ছা তাহাই খাও। কিন্তু ঐ বৃক্ষের ধারে-কাছেও যাইও না।’ শয়তান উপায় খুঁজিতে লাগিল, কিরূপে আদমকে সে বৃক্ষের ফল খাওয়ানো যায় এবং অপরাধীরূপে বেহেশত হইতে বাহিরে আনা যায়। অনেক চেষ্টা-চরিত্রের পরে একদা সে আদম নবী ও তাহার সঙ্গিনী বিবি হাওয়াকে সেই বৃক্ষের ফল খাওয়াইয়া ফেলিল। শয়তানের তো আর খুশীর সীমা নাই। তাহার প্রবঞ্চনা আদম নবি ও হাওয়ার উপর জয়লাভ করিল। দুর্বৃত্ত শয়তান আদম-হাওয়াকে বিপদে ফেলিয়া সেখান হইতে সরিয়া পড়িল।
আদম ও হাওয়া অপরাধীরূপে খোদার দরবারে হাজির হইলেন। আল্লাহ্ আদম ও হাওয়াকে এবং তাঁহার সন্তান-সন্ততিকে আরও পরীক্ষা করিবেন। তাই তিনি তাঁহাদেরকে পরীক্ষার জন্য দুনিয়ায় প্রেরণের ইচ্ছা করিলেন। আদমকে আল্লাহ্ পাক এত তাড়াতাড়ি ক্ষমা করিবেনই বা কেন? প্রথম পরীক্ষায়ই যখন তাঁহারা উত্তীর্ণ হইতে পারেন নাই, তখন এত তাড়াতাড়ি ছাড়িবেন বা কি করিয়া। তাই আল্লাহ্ পাক আদমকে বলিলেন :
‘সপরিবারে নীচে চলিয়া যাও, দুনিয়ায় গিয়া এখন বসবাস কর। মনে রাখিবে, তোমরা পরস্পর একে অন্যের শত্রু থাকিবে। কাজেই হুশিয়ার হইয়া সেখানে বসবাস করিবে। ভূ-পৃষ্ঠেই তোমাদের স্থান-পরীক্ষা কেন্দ্র। সেইখানে থাকিয়া এক নির্দিষ্ট সময় লাভবান হইতে থাক।’
না বুঝিয়া আদম হাওয়া ইবলিসী শয়তানী,
ধোকায় পড়ে সে ফল খেয়ে করল নাফরমানী।
বেজায় হলেন আল্লা তালা হুকুম দিলেন তাই,
যাও জমীনে তোমাদিগের স্বর্গে নাই ঠাঁই।
খোদা আরও বলিয়া দিলেন : ‘দুনিয়ায়ই তোমাদের জীবন-যাপন করিতে হইবে। আর সর্বশেষে কেয়ামতের পূর্বে আবার সেখান হইতেই পুনর্জীবন প্রাপ্ত হইয়া হাশরের ময়দানে হাজির হইতে হইবে।’
যাহা হউক, আদম নবী বেহেশত হইতে দুনিয়ায় চলিয়া আসিলেন। দুনিয়ায় আসিয়া নেহায়েত লজ্জা-শরমে কালযাপন করিতে লাগিলেন। এদিকে শয়তান তো তাঁহার পিছনে লাগিয়াই আছে, কোন সময় আদমকে বিপথগামী করা যায়। কিন্তু তাহা আর কি হয়! চক্রান্ত ও চালবাজী আর কতবার চলিতে পারে। তবে এই কাজ করিয়াই শয়তানের খেদ মিটিল না, যুগে যুগে আদম সন্তানকেও বিপথগামী করিবার উদ্দেশ্যে আদা-পানি খাইয়া সে লাগিয়া আছে এবং থাকিবে।
খোদাগো, মোদের এই বিনীত প্রার্থনা,
অভিশপ্ত শয়তান হইতে চাই পানা।
.
চার : মানব সৃষ্টি রহস্য
এবারে আমাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হইল-মানব সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে। মানুষকে আল্লাহ্ সবচাইতে সুন্দর কায়া বিশিষ্ট পয়দা করিয়াছেন। এ মানুষ কোথা থেকে, কিভাবে আসিল, এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক সূরা মুমিনের ১২শ আয়াতে বলেন-
: মাটির পিণ্ড হইলে আমি মানব সৃষ্টি করিয়াছি।
আল্লাহ্ মানবকে সৃষ্টি করিয়া যখন পৃথিবীতে প্রেরণের ইচ্ছা করেন, তখন তিনি তাঁর সৃষ্টির ব্যবস্থা এভাবে করেন যেন এক এক হইতে ক্রমান্বয়ে বংশধারা পয়দা হয়। তাই পুরুষ আর নারী এ দু শ্রেণীতে মানুষ সৃষ্টি করা হইল। আর তাদের মধ্যে আল্লাহ্ সৃষ্টি করিয়া দিলেন পারস্পরিক ভালবাসা ও আকর্ষণ। সে আকর্ষণ একে অন্যের অন্তরে এমনভাবে বদ্ধমূল করিয়া দিলেন যে, তারা পরস্পরে গভীর আকর্ষণে মত্ত হইল। তাদের মধ্যে সৃষ্টি করিয়া দিলেন পারস্পরিক কামনা, যাতে দাম্পত্য জীবন পরস্পর একত্রে বসবাস করিতে পারে।
নর-দেহের একটি নির্দিষ্ট অঙ্গে যাকে সাধারণ কথায় ‘সন্তান উৎ- পাদক যন্ত্র’ বলে, সৃষ্টি করিয়াছেন, যার সাহায্যে নারীগর্ভে বীর্য নিক্ষেপ করিতে পারে। সেখানে বীর্য স্থির হইয়া ক্ৰমান্বয়ে মানবদেহে রূপান্তরিত হয়।
মানবদেহ গঠিত হইতে কয়েকটি স্তর অতিক্রম করিতে হয়। অর্থাৎ বীর্য হইতে জমাট রক্ত, জমাট রক্ত হইতে মাংসপিণ্ড, তারপর অস্থি, তার উপরে গোশতের আবরণ আবার তাকে শিরা উপশিরার জাল দ্বারা বেষ্টন করতঃ মানব দেহের আকারে রূপান্তরিত করা হয়। তারপর কান, চোখ, ও দেহের অন্যান্য অংশগুলি সৃষ্টি হয়। পরে এতে শক্তির সঞ্চার হয়।
চক্ষের দৃষ্টিশক্তি এমন এক বিশ্বয়কর যার ব্যাখ্যা দেওয়া দুঃসাধ্য। চক্ষু সাত স্তরে গঠিত। তার প্রত্যেক স্তরের কাজ ভিন্ন এবং তার আকারও বিভিন্ন। যদি তার একটি স্তরও নষ্ট হইয়া যায়, তবে চক্ষের দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়। চক্ষের চতুর্দিকে সূক্ষ্ম পলকগুলির প্রতি লক্ষ্য করিলে বুঝিতে অসুবিধা হইবে না যে, চক্ষের ন্যায় নাজুক অঙ্গের হেফাজতের জন্য এগুলি সৃষ্ট করা হইয়াছে। একে আল্লাহ্ দ্রুত উঠানামার শক্তি দিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন-চোখের দিকে ক্ষুদ্র কোন কিছু আসিতে দেখা মাত্র পলকগুলি দ্রুত, সক্রিয় হইয়া উঠে আর বিপদাংকা থেকে চক্ষুকে রক্ষা করে। বায়ুতে উড়ন্ত ধূলা-বালি থেকে চক্ষুকে বাঁচায়, পলক দুটি যেন চোখের দুখানি কপাট, প্রয়োজনে খোলে আবার প্রয়োজন মত বন্ধ হইয়া চোখকে আপদ বিপদ হইতে প্রতিরক্ষা করে।
চোখের হেফাজত ছাড়াও পলক সৃষ্টির মধ্যে চেহারার এবং চোখের সৌন্দর্য নিহিত রহিয়াছে। এ কারণে পলকের পশমগুলি সৃষ্টি করা হইয়াছে পরিমাণ মত, যদি খুব লম্বা হইত তা হইলে চোখের পক্ষে পীড়াদায়ক আর যদি খুব ছোট হইত, চোখের পক্ষে তা হইত ক্ষতিকর। চোখের পানিকে আল্লাহ্ লবণাক্ত করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন, যাতে চোখের ভিতরের ময়লা পরিষ্কার হইয়া যায়। পলকের উভয় পার্শ্ব কিছুটা নিম্নমুখী ঝুকানো, যাতে চোখের পানি চোখের কোন হইয়া অশ্রুরূপে বহিয়া যাইতে পারে। চোখের ভূগুলি যেমন চোখকে হেফাজত করে তেমনি চেহারার সৌন্দর্যও বৃদ্ধি করে। ঝালয়ের ন্যায় সজ্জিত পশমগুলি চেহারাকে অপরূপ শোভায় শোভিত করে।
মস্তক এবং দাড়ির কেশগুচ্ছ আল্লাহ্ এভাবে সৃষ্টি করিয়াছেন, যা একটি নির্দিষ্ট নিয়মে বর্ধিত হয়। মানুষ তা কাটিয়া-চাটিয়া চেহারা ও আকৃতির সৌন্দর্য বৃদ্ধি করিতে পারে। মুখ আর জিহ্বা আল্লাহর সুনিপুণ কারিগরীর দুটি নিদর্শন। মুখ বন্ধ করার জন্য কবাট স্বরূপ দু’খানা ওষ্ঠ সৃষ্টি করা হইয়াছে, যা প্রয়োজনের সময় খোলা যায় আর যখন প্রয়োজন থাকে না তখন তা বন্ধ রাখিয়া ক্ষতিকর দ্রব্য মুখে প্রবেশ করা হইতে রক্ষা করা যায়। তা ছাড়া, দাঁত আর মাড়ির হেফাজতও ওষ্ঠের দ্বারা হইয়া থাকে। ওষ্ঠ না হইলে মুখ দেখিতে বিশ্রী আর তার হেফাজতও হইত না। কথা বলার সময় ওষ্ঠের সাহায্য অপরিহার্য। ওষ্ঠের সঞ্চালনের বর্ণ উচ্চারণ করা হয়। বর্ণের সাহায্যে শব্দের সৃষ্টি হয়; আর এ দ্বারা মানুষ মনের ভাব প্রকাশ করে। আবার ওষ্ঠের সাহায্যে পানাহারে সুবিধা হয়। মুখের মধ্যে খাদ্য নাড়াচাড়া করার বেলায় ওষ্ঠের সাহায্য প্রয়োজন।
দন্তপাটি আল্লাহ্ কিভাবে গঠন করিয়াছেন। দাঁতগুলি বত্রিশ খণ্ডে আলাদা আলাদা বিভক্ত রহিয়াছেন। সবগুলি খণ্ড একখানা হাড় করিয়া তৈরী করা হয় নাই। তা হইলে তা হইত ভারি অসুবিধাজনক। দাঁতগুলি যেভাবে আল্লাহ্ সৃষ্টি করিয়াছেন তাতে দু’একটি দাঁত নষ্ট হইলে বাকীগুলি ব্যবহার করা যায়। যদি দাঁত একখানা অভিন্ন হাড় হইত তবে তা সম্ভব হইত না। মুখের শ্রী সৌন্দর্য ছাড়াও আমরা দাঁত দ্বারা অনেক কাজ করিয়া থাকি। দাঁত ছাড়া আহার করাই কঠিন হইত। কোন শক্ত দ্রব্য খাওয়া চলিত না। দাঁত এমন মজবুত ভাবে গড়া যে, কঠিন ও শক্ত হাড়গুলি দাঁতের সাহায্যে চুরমার করা যায়। এ কারণে মাড়ীর গোশত বিশেষ ভাবে শক্ত করিয়া তৈরী করা হইয়াছে। নরম হইলে দাঁতগুলি সুদৃঢ় আর কাজের উপযুক্ত হইত না। খাদ্য উত্তমরূপে চর্বিত হওয়ার প্রয়োজন এই যে, খাদ্য-দ্রব্য পেটে পৌঁছিয়া তা সহজে হজম হইয়া শরীরে পুষ্টির সৃষ্টি করে। আর দেহকে কর্মক্ষম ও শক্তিশালী করিয়া তোলে।
দেহ-বিজ্ঞানীদের মতে খাদ্য পরিপাকের কয়েকটি স্তর আছে। তার প্রথম স্তর হইল মুখ। যাকে প্রথম পরিপাক যন্ত্র বলে। দাঁতের দুই পার্শ্বে শক্ত মাড়ি আছে, এর সাহায্যে শক্ত দ্রব্য চর্বণ করা যায়। ইহারা সুদৃঢ় মূল বিশিষ্ট মোতির মালার ন্যায় পরস্পর সন্নিহিত। মুখের মধ্যে দু’পাটি দাঁত মূলত দেখিতে বড়ই সুন্দর।
মুখের গহ্বরে আল্লাহ্ তরল লালা এমনভবে গুপ্ত রাখিয়াছেন, যা খাদ্যদ্রব্য চর্বণের সময় নির্গত হয়। আর তা খাদ্যের সাথে মিশিয়া হজম ক্রিয়ার সহায়তা করে। তা যদি অন্য সময়ে মুখ ভরিয়া থাকিত, তবে কথা-বার্তা বলা হইত ভারী অসুবিধা আর মুখ খোলাই হইত কঠিন। কেননা, মুখ খুলিতেই তা বাহির হইয়া পড়িত। সুতরাং তা খাদ্য চর্বণের সময় বাহির হইয়া হজমের সহায়তা করে। খাবার পরে লালা নির্গত হওয়া বন্ধ হইয়া যায়। এতে আল্লাহর অশেষ নৈপুণ্যের পরিচয় বিদ্যমান। অবশ্য পরে এতটা লালা থাকিয়া যায় যা কণ্ঠনালী সিক্ত রাখে, যদি কণ্ঠনালী শুকাইয়া যাইত, তবে কথা বলা হইত দুঃসাধ্য। এমনকি, কণ্ঠনালী শুকাইয়া যাওয়ার ফলে শ্বাসগ্রহণ করা হইয়া পড়িত অসম্ভব, ফলে প্রাণনাশ হইত অনিবার্য।
জিহ্বা : আল্লাহ্ মানুষের আহার করার জন্য জিহ্বায় স্বাদ গ্রহণের শক্তি দান করিয়াছেন। যাতে সে রুচিকর খাদ্য গ্রহণ করে অরুচিকর ও বিস্বাদ খাদ্য বর্জন করে। স্বাদের কারণে খাদ্য হয় আরামদায়ক আর সুখকর, অপরদিকে সুস্বাদু খাদ্য অতি সহজে হজম হয়।
খাদ্য-দ্রব্য তাজা, বাসি, ঠাণ্ডা, গরম সব কিছু জিহ্বাই যাচাই করে। আমাদের উপরি উক্ত বর্ণনার সমর্থ পাই আমরা আল্লাহর কালামে। সূরা বালাদে আল্লাহ্ বলেন-
: আমি কি তার জন্য দুই চোখ, জিহ্বা আর ওষ্ঠ দেই নাই?’
আল্লাহ্ মানুষকে দুটি কান দিয়াছেন। কানের অভ্যন্তরে এক প্রকার তরল দ্রব্য আছে যা শ্রবণ শক্তিকে সংরক্ষণ করে আর কীট প্রভৃতি অনিষ্টকর প্রাণী যাতে কানে প্রবেশ না করে। কানের ছিদ্রের উপরে এক একটি ঝিনুকাকৃতি পাখা সৃষ্টি করা হইয়াছে, যা শব্দকে সংযত করে এবং কানের ছিদ্রে প্রবেশ করিতে সাহায্য করে। কানের পাখায় আল্লাহর এমন তীব্র অনুভূতি দান করিয়াছেন যে, কোন ক্ষতিকর প্রাণী বা কোন কিছু কান স্পর্শ করা মাত্রই টের পায়। কানের ছিদ্রকে বক্র এবং পেচানো রূপে সৃষ্টি করা হইয়াছে, যাতে শব্দ দীর্ঘ হুইয়া ভিতরে প্রবেশ করে আর কোন কীট পোকা প্রভৃতি সহসা কানের ভিতরে প্রবেশ করিতে না পারে। পেঁচানো পথে ভিতরে যাইতে বিলম্ব হয়। আর তা বাহির করা বা ধ্বংস করা হয় সম্ভব।
নাক : আল্লাহ্ পাকের মানুষের মুখমণ্ডলের মধ্যখানে উন্নত নাসিকাটি কি সৌন্দর্য সৃষ্টি। তার দুটি ছিদ্রে ঘ্রাণের অনুভূতি শক্তি সংরক্ষিত করা হইয়াছে, যদ্বারা খাদ্য ও পানীয় দ্রব্যের ঘ্রাণ অনুভব করা যায়। ইহার সাহায্যে লাভ করা যায় খোশবুর আনন্দ আর নাক বন্ধ করিয়া রক্ষা পাওয়া যায় বদবু হইতে।
নাসিকার সাহায্যেই নির্মল বায়ু সেবন করিয়া প্রাণকে সজীব করা সম্ভব হয়। আর দেহের আভ্যন্তরীণ তাপও এর ফলে বৃদ্ধি পায়। এই নাসারন্ধ মানুষের বহু প্রয়োজনে আসে। শব্দ নির্গমনে জিহ্বার সাহায্যে স্বর উচ্চারণ, শ্বাস-প্রশ্বাস চলাচল এসব ব্যাপারে নাসারন্ধ কাজে আসে। কোন কোন লোকের নাসারন্ধ খুব সরু, আবার কারো কারো খুব বড়, কোনটি দীর্ঘ, কোনটি বা হ্রস্ব। এসব বিভিন্নতার কারণেই স্বরের তারতম্য হয়। এ কারণে দু’জনের স্বর কখনও এক রকম হয় না। যেমন দু’জনের আকৃতি কখনও এক হয় না, তেমনি দু’জনের স্বর কখনও এক রকম না। স্বর শুনিয়া লোক চেনা যায়। যেমন চেনা যায় একজনের চেহারা দেখিয়া। এই বিভিন্নতার মধ্যে আছে আল্লাহর সুনিপুণ কারিগরীর নিদর্শন। এই বিভিন্নতা আল্লাহ্ সৃষ্টির আদি হইতেই করিয়া রাখিয়াছেন। হযরত আদম আর হাওয়ার আকৃতির মধ্যেও ছিল বিভিন্নতা, সেই বিভিন্নতা তাদের আওলাদের মধ্যেও ক্রমাগত আসিয়াছে। আল্লাহ্ সুনিপুণ কুদরতের পরিচয় আছে এই বিভিন্নতার মধ্যে। এই পার্থক্যের কারণে আমরা রক্ষা পাই অনেক মুশকিল হইতে।
আল্লাহ্ মানুষকে দু’খানা হাত দিয়াছেন, যার প্রয়োজনীয়তা শুমার ‘ করা কঠিন। হাত দু’খানা দ্বারা মানুষ করে উপার্জন আর প্রতিরোধ করে দুশমন। চওড়া পাঞ্জা, পাঁচটি আঙ্গুল এক সারিতে তৈরী করিয়াছেন। পঞ্চম বা বৃদ্ধাঙ্গুলি কিঞ্চিত দূরে, যাতে প্রত্যেকটি আঙ্গুলি সাথে যোগাযোগ রক্ষা করিতে পারে। হাতের এই গঠন নৈপুণ্যের বিপরীত দুনিয়ার সকল লোক একত্রিত হইয়া যদি হাতকে অন্য গঠনে তৈরী করার পরিকল্পনা করে, তা এর চাইতে উত্তম ও কার্যকর রূপ দেওয়া কখনো সম্ভব হইবে না। হাতের এই গঠনের সাহায্যে মানুষ যা ইচ্ছা ধারণ করিতে, উঠাইতে, নামাইতে ও দিতে-নিতে পারে। হাতের তালু বিস্তার করিলে হাত একখানা থালার ন্যায় বানাইয়া নেওয়া যায়।, আবার মুষ্ঠিবদ্ধ করিয়া শত্রুকে আঘাত করা যায় কিংবা ভয় দেখানো যায়। আবার অঞ্জলী বানাইয়া পানি পান করার কাজে ব্যবহার করা চলে। চলে তার দ্বারা চামচের কাজ। হাত দ্বারা ঝাড়-মোছার কাজও করা যায়।
অঙ্গুলির মাথায় সৃষ্টি করা হইয়াছে নখ। এতে যেমন বাড়িয়াছে অঙ্গুলির সৌন্দর্য, তেমনি তা দ্বারা হেফাজত হয় অঙ্গুলিগুলি। আবার কোন জিনিস হাতে তোলার ব্যাপারে নখের সাহায্য দরকার; নখ ব্যতীত মাটি থেকে ক্ষুদ্র জিনিসগুলি তোলা সম্ভব নয়। শরীর চুলকাইতে নখের সাহায্য নেওয়া হইয়া থাকে।
নখ শরীরের কত ক্ষুদ্র অংশ এবং তা খুবই নিকৃষ্ট বলিয়া গণ্য করা হয়, তারও বহু উপকারিতা আছে। অঙ্গুলির মাথায় যদি নখ না থাকে আর শরীরে যদি খুব চুলকানী হয় তবে তার কি-ইনা হয় নাজেহাল অবস্থা। নখের কার্যকারিতা কত ব্যাপক ও সুন্দর।
নখকে আল্লাহ্ না হাড়ের ন্যায় শক্ত, না গোশতের ন্যায় নরম করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন। নখ বর্ধনশীল, ভাঙে পুনঃ জন্মে, অধিক বাড়িলে কাটিয়া ফেলা হয়। নিদ্রায়, জাগরণে চুলকাইতে হাত আপনা থেকে সেখানে যায়, আল্লাহ্ একে এই কার্যকারিতা দিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন।
আল্লাহ্ মানব দেহে দু’টি রান আর দু’খানি নলা সৃষ্টি করিয়াছেন। সেগুলি প্রসারিত করা যায়। তার সাথে সৃষ্টি করিয়াছেন দু’খানি পা। তার উপর ভর করিয়া দাঁড়ান যায়, তার সাহায্যেই চলাফেরা করিতে হয় আর দৌড়ানোর সময় দৌড়ানো যায়। পায়ের অঙ্গুলিতেও নখ রহিয়াছে, যার ফলে অঙ্গুলির শোভা বর্ধন হইয়াছে। আর এতে হেফাজতের কাজও হইয়া থাকে।
এসবই আল্লাহ্ মানবদেহের নাপাক বীর্য দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন। শরীরের অস্থিগুলিও আল্লাহর সেই অপবিত্র বীর্যের তৈরী। অস্থিগুলি দেহের খুঁটি স্বরূপ। তার উপর সারা দেহটি নির্ভরশীল। অস্থিগুলির গঠন ও আকৃতির প্রতি লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে, তা কত রকমের বাঁকা, সোজা, লম্বা, গোলাকৃতি, নিরেট ফাঁপা, চওড়া, সরু, হালকা, আর ভারী প্রভৃতি নানা গঠনের অস্থি রহিয়াছে মানব দেহে। হাড়গুলির সন্ধিস্থলে রহিয়াছে এক প্রকার তরল লালার ন্যায় পদার্থ, যাতে করিয়া অস্থিগুলি রক্ষা পায় আর উঠা নামা ও বাঁকা সোজা করা সহজ হয়। তাছাড়া, সেগুলির রহিয়াছে আরো বহু উপকারিতা।
মানুষের জীবনের তাকিদে এবং নানা প্রয়োজনে তার দেহের মুখাপেক্ষী। তার দেহকে নানাভাবে সঞ্চালিত করিতে হয়। আল্লাহ্ তার প্রয়োজনের দিকে লক্ষ্য করিয়া অস্থিগুলি পৃথক পৃথক বহু খণ্ডে বিভক্ত করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন, যেন আবশ্যক মত অনায়াসে শরীর নড়া চড়া করা যায়। এসব অস্থিগুলি খণ্ড খণ্ড না হইয়া যদি সারা দেহে অখণ্ড একখানা অস্থি হইত তবে ওঠা-বসা, চলা-ফেরা কিংবা বাঁকা হওয়া বা সোজা হওয়া বা সোজা হওয়া হইত অসম্ভব। অস্থিগুলি পরস্পর সংযুক্ত করার জন্য শিরা ও উপশিরা মাংশের ছাউনী দেওয়া হইয়াছে। অস্থিগুলি পরস্পর জোরইযা রাখার ন্য উভটির প্রান্তদেশ মেলান ও যুক্ত করা হইয়াছে যাতে একটির সাথে উত্তমরূপে জুড়িয়া থাকিতে পারে।
মোটকথা, আল্লাহ্ এই অস্থিগুলিকে এমন নৈপুণ্য ও কৌশলে সংযোজিত ও সংগঠিত করিয়াছেন যে, মানুষ দরকার মাত্রই তার দেহকে যেমন ইচ্ছা সঞ্চালিত করিয়া নিজ কাজ সামাধা করিতে পারে।
মানবদেহের প্রধান অঙ্গ মস্তক। এ মস্তক সর্বমোট ১৫৫ খানা হাড়ের সমন্বয়ে গঠিত। অস্থিগুলি পরস্পর বিভিন্ন আকৃতির। আল্লাহ তাঁর অসীম কুদরতে এগুলি এমনভাবে জুড়িয়া দিয়াছেন, যাতে গোটা মস্তকটি তৈরী হইয়াছে। মাথা খুপড়ির অংশে ছয়খানী হাড় রহিয়াছে। উপরের অংশে ১২৪ খানা আর দু’খানা নীচের জোড়ায়; বাকী দাঁতগুলি রহিয়াছে যদ্বারা খাদ্য-দ্রব্য পেষণ করা হয়।
ঘাড়কে আল্লাহ্ মস্তকের দণ্ড হিসাবে তৈরী করিয়াছেন। যা সাতখানা গোল ফাঁপা হাড় দ্বারা সৃষ্টি। সেগুলি একটির উপর অপরটি রক্ষিত। এতে যে হেকমত আর কারিগরী আছে তা বর্ণনা করিতে গেলে অনেক দীর্ঘ হইবে। ঘাড়ের নিম্ন প্রান্ত পিঠের মেরুদণ্ডের উপর সংস্থাপিত। সেগুলি হচ্ছে ৩৪ খানি হাড়। যেগুলি একের পর এক কোমর পর্যন্ত প্রলম্বিত। কোমরে তিনখানা অস্থি রহিয়াছে। পিঠের অস্থি নীচের দিকে লেজ বিশিষ্ট হাড়ের সাথে যুক্ত। সেখানেও তিনটি অস্থি খণ্ডে গঠিত। পৃষ্ঠদেশের হাড়গুলি পাঁজর, বক্ষ, কাঁধ, হাত পা ও নিতম্বের সাথে অতি নিপূণতার সাথে সংযোজিত। মানব দেহে মোট ২৪৮ খানা অস্থি আছে। অবশ্য ফাঁকা স্থান পূর্ণ করার জন্য যে ক্ষুদ্রাকৃতির হাড়গুলি রহিয়াছে তা এ হিসাব হইতে স্বতন্ত্র।
আল্লাহ্ কি অপার কুদরত যিনি বীর্যের ন্যায় অপবিত্র পদার্থের দ্বারা এসব সৃষ্টি করিয়াছেন। এতে আছে আল্লাহর অপার মহিমা আর অসীম কুদরতের নিদর্শন। আল্লাহ্ যে নৈপুণ্য আর কৌশল দ্বারা মানব দেহ গঠন করিয়াছেন, তাতে কোন হ্রাস বৃদ্ধির অবকাশ নাই। যদি তা হইত তবে তা হইত মানুষের পক্ষে কঠিন সমস্যা।’ চিন্তাশীলদের জন্য এতে আছে মহাশক্তি ও আল্লাহর নিদর্শন।
দেহের অভ্যন্তর ভাগের গঠন নৈপূণ্য আর শৃংখলার প্রতি মনোনিবেশ করিলে দেখা যাইবে, দেহের অস্থিগুলি যাতে প্রয়োজনের সময় নড়া-চড়া ও উঠা-নামা করিতে পারে, বাঁকা সোজা হইতে পারে আর এজন্য কতগুলি জিনিষ সৃষ্টি করা আছে, এগুলির সংখ্যা মোট ৫২৯। এগুলি মাংসপেশী ও ঝিল্লী দ্বারা গঠিত। এগুলির কোনটা ছোট, কোনটা চওড়া আবর প্রয়োজনানুযায়ী কোনটা সরু। এর সবটি চোখের পলক সঞ্চালন বিভিন্ন কাজে লাগে। যদি এর একটিও কম হইত তবে চোখের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি হইত এবং দৃষ্টি শক্তি অকেজো হইয়া পড়িত।
এমনি প্রত্যেক অঙ্গের জন্য বিভিন্ন অংশ রহিয়াছে। প্রয়োজন মত কোনটি ছোট আর কোনটি বড়। তারপর শিরা, উপশিরা, পেশী, ঝিল্লী, প্রভৃতির সৃষ্টি, সেগুলির স্থান এবং তার ব্যাখ্যা আরো অধিক বিস্ময়কর। সেগুলির প্রকৃতির গুণাগুণ এবং কার্যকারিতা যা রহিয়াছে তা আমাদের জ্ঞানের অতীত।
সৃষ্টির বৈশিষ্ট্য : এবার দেখা যাক মানব সৃষ্টির কৌশল আর অন্যান্য প্রাণীর সৃষ্টির কৌশল বৈশিষ্ট্য কোথায়? আল্লাহ্ মানুষের কঙ্কাল সোজা ও সরল গঠনের সৃষ্টি করিয়াছেন, যেন বসার সময়ও তার উত্তম গঠন ও আকৃতি বহাল থাকে। এ অবস্থায় সে দু’হাতে অনায়াসে কাজ করিতে পারে। অন্যান্য প্রাণীর ন্যায় উপুড়মুখী করিয়া আল্লাহ্ মানুষকে সৃষ্টি করেন নাই। যদি অন্যান্য প্রাণী ন্যায় উপুড়মুখী করিয়া সৃষ্টি করিতেন, তবে তার পক্ষে অনেক কাজই করা সম্ভব হইত না।
মানব সৃষ্টির ভিতর বাহিরের প্রতি সার্বিকভাবে নজর করিয়া দেখা যাক। আল্লাহ্ কুদরতের বিস্ময়কর নিদর্শন রহিয়াছে তার গঠন নৈপুণ্যের মধ্যে। মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি কেমন নিখুঁত আর স্বয়ংসম্পূর্ণ। এক নির্দিষ্ট পরিমাণ আহারে তাহার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি শক্তি সঞ্চয় করে; আল্লাহ্ মানব দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি এক নির্দিষ্ট আকারে নিয়ন্ত্রিত করিয়াছেন। খাদ্যের প্রাচুর্য ও আধিক্যের কারণে যদি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি অস্বাভাবিক- ভাবে লম্বা, স্থুল আর ভারী হইত তবে চলা-ফেরা এবং কাজকর্ম করা তার পক্ষে সম্ভব হইত না। এটা আল্লাহর অসীম দয়া আর অপার করুণা যে, তিনি মানুষের প্রত্যেকটি জিনিষকে পরিমিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখিয়াছেন। অন্যথা, তার জন্য ঘর বাড়ি পোষাক পরিচ্ছেদ আর পানাহার সর্বক্ষেত্রেই সৃষ্টি হইত অচলাবস্থার। মানব দেহের প্রতি লক্ষ্য করিলে আর তার গঠন নৈপুণ্যের কথা চিন্তা করিলে দেখা যাইবে, মানব দেহে আল্লাহর কুদরতের কত কারিগরী লুক্কায়িত রহিয়াছে।
কুতরতের সাক্ষ্য : পৃথিবীর সকল মানব দানব একত্রিত হইয়াও এবং তাদের যাবতীয় শক্তি ও বল ব্যয় করিয়া হইলেও, তাদের দ্বারা আদৌ সম্ভব হইবে না-বীর্য দ্বারা জীবন, শ্রবণ শক্তি ও দর্শন শক্তি সৃষ্টি করার। আর দান করিয়াছেন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলির পরিমিত রূপ। দেহের বাহির ভিতরের পুষ্টি সাধন ও বর্ধনের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা এবং তা সু- কৌশলে উদরে প্রবেশের জন্য রাস্তা সৃষ্টি করিয়াছেন। সৃষ্টি করিয়াছেন দেহের অভ্যন্তরে কিভাবে হৃদপিণ্ড, কলিজা, প্লীহা, জরায়ু, মুত্রাশয় আঁত প্রভৃতি। এগুলি আবার নির্দিষ্ট আকার ও অবরবে যথাস্থানে সংরক্ষিত করিয়াছেন। সেগুলির প্রত্যেকটি নিজ নিজ কাজ করিয়া যাইতেছে। ফলে দেহ শক্তি লাভ করতঃ টিকিয়া থাকে।
খাদ্য পরিপাকের জন্য পাকস্থলীকে উত্তম উপাদানে তৈরী করা হইয়াছে, পাকস্থলীতে খাদ্য-দ্রব্য সহজে পরিপাক হওয়ার জন্য তাকে দন্তের সাহায্যে মিহিন করিয়া উদরে প্রেরণের ব্যবস্থা করা হইয়াছে, যাতে পরিপাক করিতে পাকস্থলীর উপর খুব বেশী চাপ না পড়ে। খাদ্যের সারাংশ দ্বারা রক্ত উৎপাদনের জন্য কলিজা কাজ করিয়া থাকে আর প্রত্যেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পৌঁছায়। প্লীহা আর গুর্দা কলিজার কাজের সহায়ক। প্লীহার কাজ হইল রক্তে খাবার অংশ সংগ্রহ করা আর পীতকে রক্ত হইতে পৃথক করিয়া ফেলা। গুর্দা খাদ্যের জলীয় অংশ সংগ্রহ করে এবং প্রস্রাবের রাস্তা দ্বারা বাহির করিয়া দেয়। কলিজা সারা দেহে রক্ত পৌঁছাইয়া দিতে সাহায্য করে। রক্তের সারাংশ যা মাংসের সারবস্তু হইতে সূক্ষ্ম আর নির্মলতা হৃৎপিণ্ডে সঞ্চিত থাকে, ঠিক যেন একটি পাত্রের ন্যায়, যাতে রক্তের সারাংশ সঞ্চিত থাকে আর প্রয়োজন মত দেহের বিভিন্ন অংশে তা বেষ্টিত হয়। এসবই আল্লাহর অপার কুদরতের লীলা- খেলা যা চিন্তা করিলে বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
গর্ভাশয় সৃষ্টি, তার মধ্যে সন্তান সৃষ্টি ও বৃদ্ধি, প্রয়োজন মত সেখানে তার খাদ্য পৌঁছানো সবই আল্লাহর অসীম কুদরতের নিদর্শন। তারপর সন্তানের জন্য মায়ের প্রাণে ভালবাসা সৃষ্টি; যার কারণে সে সন্তান বুকে নিয়ে প্রতিপালন করে। আর এই ভালবাসার কারণেই মা সন্তানের প্রতি সহস্র প্রাণ কোরবান করিতে এবং কষ্ট স্বীকার করিতে রাজী। যদি আল্লাহ্ মায়ের প্রাণে সন্তানের জন্য এহেন মমতা সৃষ্টি না করিতেন, তবে মা এত কষ্ট স্বীকার করিতেন না বরং কষ্টের কারণে মার সন্তানের প্রতি বিরক্তি ও বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হইত। সন্তান যখন বড় হয়, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সবল ও শক্তিমান হয়, তখন আল্লাহ্ তার মুখে দাঁত গজাইয়া দেন। তখন সে দুখ ছেড়ে অন্য খাদ্য খেতে শুরু করে। কেননা, দাঁত অন্য খাদ্য গ্রহণে তাকে সাহায্য করিয়া থাকে। এভাবে সন্তানের মধ্যে ধীরে ধীরে বুদ্ধি ও চেতনা জাগ্রত হয়। এভাবে ক্রমাগত তার জ্ঞান-বুদ্ধির পূর্ণতা লাভ করে।
স্পষ্টতঃ আমরা দেখিতে পাইতেছি, মানুষ যখন পয়দা হয় তখন সে থাকে একেবারেই অবোধ ও অজ্ঞ। না থকে তার জ্ঞান, না হুশ, না ভালমন্দ বিবেচনার শক্তি। যদি জন্মের সাথে সাথে তার জ্ঞান হইত তবে দুনিয়ার এসব নূতন নূতন জিনিস দেখিয়া সে তাজ্জব হইয়া যাইত। তারপর সে তার নিজের প্রতি লক্ষ্য করিতঃ কিভাবে তাকে নেকড়ায় করিয়া কোলে তোলা হয়, কিভাবে দোলনা রাখিয়া প্রতিপালন করা হয়। অবশ্য তার দেহ কোমল আর নাজুক হওয়ার কারণে এসব তার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু সাথে সাথে যদি শিশুর জ্ঞানোদয় হইত তবে সে বহু বিষয়েই বিরোধ করিত, অবাধ্য হইত এবং করিত কলহ। ফলে তার প্রতি মায়ের স্নেহ-মমতা হ্রাস পাইত। এমনকি, তাকে যথারীতি প্রতিপালন করাই হইত দুঃসাধ্য।
সুতরাং আল্লাহর হেকমতের বিধান এই যে, মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। আর ক্রমান্বয়ে সে দুনিয়ার সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে আর হয় সচেতন। শিক্ষা করে প্রত্যেকটি জিনিসের আবশ্যকতা ও ব্যবহার। ধীরে ধীরে তার মধ্যে যৌন চেতনার উন্মেষ ঘটে, যা বংশ বৃদ্ধির কারণ। বালকের মুখমণ্ডলে কেশ গজায় যাতে পুরুষ আর নারীর মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়- বিকশিত হয় তার অঙ্গে যৌবনের রূপ-লাবণ্য! পরিশেষে বার্ধক্যে পৌঁছিলে চেহারার রূপ-লাবণ্য হইয়া যায় বিলীন।
বালিকার চেহারাকে আল্লাহ্ করিয়াছেন কেশমুক্ত। যাতে তার মুখমণ্ডলে যৌবনের কান্তি বিকাশ পেতে পারে আর পুরুষের জন্য তা হয় আকর্ষণীয়। এর ভিতরই নিহিত ভবিষ্যৎ বংশ রক্ষার রহস্য।
সৃষ্টির এই শৃঙ্খলা আর কুদরতের মহিমা কি শুধুই বৃথা আর উদ্দেশ্যহীন? জ্ঞান কি একথা স্বীকার করে যে, আল্লাহ্ যা তার অপার মহিমা আর কুশলতায় সৃষ্টি করিয়াছেন তা এমনিই নিরর্থক সৃষ্টি? তা আদৌ হইতে পারে না। অবশ্যই এর পশ্চাতে মহান উদ্দেশ্য নিহিত, যা তার সৃষ্টি রহস্যের মধ্যে প্রচ্ছন্ন।
যখন মাতৃগর্ভে সন্তান স্থিত হয়, তখন যদি সে রক্তের সারাংশ খাদ্য হিসাবে না পাইত তবে সে কি গর্ভে শুকাইয়া মরিত না? যেমন পানির অভাবে তরু-লতা শুকাইয়া যায়।
গর্ভে সন্তান পূর্ণতা লাভের পর যদি প্রসূতি প্রসব বেদনায় অস্থির না হইত আর যথাসময়ে সন্তান না হইত ভূমিষ্ঠ, মা ও সন্তান উভয়েই তবে মৃত্যু মুখে পতিত হইত। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর যদি শিশু প্রয়োজনীয় খাদ্য দুধ ইত্যাদি না পায়, তবে শিশু কি ক্ষুধ-পিপাসায় মারা যাইবে না? যদি যথা সময়ে শিশুর দাঁত না গজায় আর শক্ত দ্রব্য গিলিয়া খাইতে শুরু করে, তবে তা হজম করিতে না পারিয়া রোগে আক্রান্ত হইয়া পড়িবে না? যদি ছেলের মুখে যথাসময়ে কেশ না গজায় তবে তা দেখিতে হইত মেয়েন ন্যায় আর বালকের সদৃশ। দাড়ি না হইলে চেহারার সৌন্দর্য, সৌম্যতা আর গাম্ভীর্য ফুটিয়া উঠিত না। এসবই মহীয়ান আল্লাহর অশেষ দান আর অনুগ্রহ ব্যতীত আর কিছুই নয়।
চিন্তা করার বিষয়, মানুষের যৌন চেতনা কিভাবে সৃষ্টি হয়? পুরুষাঙ্গ কিভাবে জরায়ুতে বীর্য নিক্ষেপ করে এবং সেই উত্তেজনা যাহা ধমনী হইতে বীর্য নিঃসরণ করার জন্য সৃষ্টি হয়।
অনুরূপভাবে ইহার বিপরীত বা স্ত্রী-যোনী এবং উহার কার্যকারিতা লক্ষ্য করিলে, এভাবে মানব দেহের প্রতিটি কাজের প্রতি লক্ষ্য করিলে বুঝা যাইবে যে, আল্লাহ্ মানব দেহের প্রতিটি অঙ্গ কি কাজের উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিয়াছেন এবং সেগুলি কিভাবে যথারীতি কাজ করিয়া যাইতেছে এবং সে কাজের উদ্দেশা, তার গঠন ও আকৃতি দান করিয়াছেন। চক্ষু দেখার জন্য, হাতকে স্পর্শ করার ও ধারণ করার জন্য, পা চলাফেরার ও দৌড়ানোর জন্য, পাকস্থলী খাদ্য পরিপাক করার জন্য, কলিজা উদরের পরিপাক করা ও খাদ্যের পরিত্যক্ত অংশ ছাঁকার জন্য এবং প্রয়োজন মত তা বন্টন করার জন্য; মুখ আহার করার এবং কথা বলার জন্য। মোট কথা, দেহের প্রতিটি বিষয় চিন্তা করিলে বুঝা যাইবে যে, ইহা আল্লাহর অসীম কুদরতেরই লিলাখেলা।
চিন্তা করার বিষয়-ভুক্তদ্রব্য পাকস্থলীতে পৌঁছার পর কিছাবে উহা পরিপাক হয়। খাদ্যের সারাংশ হৃৎপিণ্ডে পৌঁছাইয়া দেয়। উহা সূক্ষ্ম তন্ত্রীর সাহায্যে হৃৎপিণ্ডে গিয়া উপস্থিত হয়। আবার স্নায়ুতন্ত্রীগুলিকে সূক্ষ্ম সৃষ্টি করা হইয়াছে যেন খাদ্যের নির্দোষ পদার্থ ব্যতীত কোন দুষিত পদার্থ হৃৎপিণ্ডে গিয়া না পৌঁছে যা দেহের ক্ষতিকর হইতে পারে। এই সূক্ষ্ম তন্ত্রীগুলি প্রায় ঝিল্লির স্থলবর্তী। এগুলি পরিপাক খাদ্যদ্রব্য ছাঁকিয়া প্রয়োজনীয় ও বিশুদ্ধ অংশ হৃৎপিণ্ডে পৌঁছাইয়া দিতে পারে। হৃৎপিণ্ড একে রক্তে পরিণত করে। আল্লাহর হেকমতে খাদ্যদ্রব্য এভাবেই রক্তে পরিণত হয়।
এখান থেকে রক্ত সূক্ষ্মতন্ত্রীর সাহায্যে সর্বাঙ্গে সরবরাহ হয়। খাদ্যের সারাংশ এভাবে উৎপন্ন হওয়ার পর অবশিষ্ট যে নিকৃষ্ট পদার্থ থাকিয়া যায়, তা যে যে অঙ্গের সেগুলি সেখানে পৌঁছিয়া বাকী মল-মূত্ররূপে যথাস্থানে সঞ্চিত হয়। হৃৎপিণ্ড যেন দেহের সেরা পাত্র, সেখানে দেহের জন্য উৎকৃষ্ট খাদ্য সঞ্চিত হয় আর প্রয়োজনমত তা সর্বত্র সরবরাহ হইয়া থাকে।
অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রয়োজনীয়তা : মানুষের দেহে এমন একটি অঙ্গ- প্রত্যঙ্গও দেখা যায় না, যা অনাবশ্যক বা যার সৃষ্টি অর্থহীন।
চক্ষু : আল্লাহ্ চক্ষু তৈরী করিয়াছেন দেখার জন্য আর প্রত্যেকটি জিনিস চেনার জন্য। রূপ-রং এর পার্থক্য, ছোট-বড়, উঁচু-নীচুর ব্যবধান চক্ষু না হইলে করা আদৌ সম্ভব হইত না। এই যে আলো, যদি চোখের দৃষ্টিশক্তি না থাকিত তবে কি কাজে আসিত এ আলো? আলো থাকিলেই তবে চোখের কাজ। কারণ আলোর সাহায্যে চোখ দেখিতে পায়। বিভিন্ন রং-এর সমাহারে চোখ বিভিন্ন রং এর পার্থক্য অনুভব করিতে পারে।
কান : কান আল্লাহ্ এজন্য পয়দা করিয়াছেন যে, তার সাহায্যে শব্দ শুনা যায়। যদি শব্দ হইত আর কান তা শ্রবণ করিতে না পারিত বা কানই আদৌ না হইত তবে শব্দের উপকারিতা কি ছিল?
এমনি প্রত্যেকটি ইন্দ্রিয়ের প্রয়োজনীয়তা। ইন্দ্রিয় আর অনুভূতির মধ্যে এমন সম্পর্ক যে, ইন্দ্রিয় ব্যতীত অনুভূতি অর্থহীন। আলো আর বায়ুরও ঠিক সেই একই অবস্থা। যদি আলো না থাকিত তবে দর্শনেন্দ্ৰিয় অকেজো হইয়া পড়িত, বায়ু না থাকিলে কানে শব্দই পৌঁছিত না।
অন্ধ আর বধিরের অসুবিধা চিন্তা করা যাইতে পারে। আল্লাহর এ দু’টো নেয়ামত থেকে বঞ্চিত থাকার কারণে তাদেরকে কি সব মুছীবতে ভুগিতে হয়। অন্ধ যখন পা পা করিয়া চলিতে থাকে, তখন সে জানে না কোথায় তার পা পড়িবে। সে বিপজ্জনক গর্তেই পা ফেলিতেছে, না কোন অনিষ্টকর প্রাণীর উপর। কিংবা তার সম্মুখে কি রহিয়াছে সে তার কিছুই জানে না। সম্মুখ থেকে যদি কোন মহা আপদ-বিপদও আসিতে থাকে, তাও তার দেখার উপায় নাই। মাখলুকের বহু দান-অবদান থেকে হইত সে বঞ্চিত। এই রূপ-রং-এর দুনিয়াও তার কাছে সম্পূর্ণ অর্থহীন। কালো, সাদা, লাল, হলুদ তার কাছে সবই সমান।
বধির বা শ্রবণ শক্তি হইতে বঞ্চিত বেচারা তো কথার মাধূর্যই অনুভব করিতে পারে না। শব্দে যে একটা মাধুর্য আর আকর্ষণ রহিয়াছে তা সে উপভোগ করিতে অক্ষম। হৃদয়গ্রাহী শব্দ অথবা কর্কশ ও অপ্রিয় শব্দের মধ্যে পার্থক্য করার সাধ্যও তার থাকে না। কানে শব্দ প্রবেশ করিলেও তার তারতম্য কল্পনা করিতে পারে না। কোন লোক সভায় বসা থাক বা কেহ তাকে লক্ষ্য করিয়া কিছু বলুক সবই সমান। সে মজলিসে উপস্থিত থাকিয়াও যেন অনুপস্থিত, জীবিত থাকিয়াও সে মৃততুল্য।
আবার যে ব্যক্তি আল্লাহর নেয়ামত জ্ঞান থেকে বঞ্চিত—অর্থাৎ উন্মাদ, পাগল তার অবস্থা তো পশু থেকেও অধম। পশু তো ভালমন্দ কতকটা পার্থক্য করিতে পারে, কিন্তু পাগল তাও পারে না, কেননা সে জ্ঞান থেকে সম্পূর্ণই বঞ্চিত।
সামগ্রিক অঙ্গ-দর্শন : আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলির প্রতি সামগ্রিকভাবে নজর করিলে দেখা যাইবে- মানুষের শ্রবণ, দর্শন, স্পর্শ, স্বাদগ্রহণ প্রভৃতি শক্তিগুলির যাদের সাহায্যে সে জীবনের যাবতীয় প্রয়োজন মিটায়, যদি এসব শক্তির একটিরও অভাব হইত, তবে তার কাজ-কর্মে হইত দারুণ বাধা বরং তা হইত তার জন্য একটা বিরাট দুর্ঘটনা।
আল্লাহ্ যাকে তার কোন একটি অঙ্গ হইতে বঞ্চিত করিয়াছেন, সে অবশ্যই নিদারুণ পরীক্ষার মধ্যে নিক্ষিপ্ত। এসব নেয়ামতের কি মূল্য তা সে এ অভাবের কারণে উপলব্ধি করিতে অক্ষম। অতঃপর তার ধৈর্য অবলম্বন করা ব্যতীত আর করার কি থাকে? এসব কারণে তার জীবনের যে সব বিপদ আর মুছীবত দেখা দিবে তা ধৈর্যের সাথে সহ্য করিতে হইবে যাতে সে আখেরাতে তার বিনিময়ে আল্লাহর কাছে প্রতিদান হাসিল করিতে পারে।
আল্লাহ্ সর্বাবস্থায় তাঁর বান্দার প্রতি দয়ালু। দান করার ক্ষেত্রে বান্দার কৃতজ্ঞতার জন্য আর বঞ্চিত করার বেলায় সবুরের জন্য আল্লাহ্ পুরস্কৃত করিবেন। মানবাঙ্গের প্রতি লক্ষ্য করিলে বুঝিতে অসুবিধা হইবেনা- কোন অঙ্গ একটি মাত্র আর কোন অঙ্গ দু’টি। সে গুলির কার্যকারিতার প্রতি লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে কিভাবে সেগুলি নিজ নিজ কাজ ও দায়িত্ব পালন করিতেছে। মস্তক : তা মাত্র একটি। কিন্তু কত কাজ আর দায়িত্ব তার প্রতি ন্যস্ত। এগুলি ছাড়া যদি মস্তকের উপর অতিরিক্ত কোন চাপ পড়ে, তবে তার প্রতি তা খুবই ভারি হইয়া পড়ে। মাথা যদি একটির পরিবর্তে দুটি হইত, তবে একটি কথা বলার সময় অপরটি নিষ্ক্রীয় থাকিত। যদি উভয়ে মিলে একটি কথা বলিত তবুও একটি বেকার থাকিত। আর যদি এক মস্তক এক কথা, অন্যটি অন্য কথা বলিত তবে বিষম সমস্যা উদ্ভব হইত। কোনটি আসল কথা, কোনটি নকল, তা বুঝা হইত দুঃসাধ্য।
হাত কিন্তু অন্যরূপ। আল্লাহ্ দিয়াছেন মানুষকে দু’খানা হাত। হাত যদি একখানি মাত্র হইত তবে কাজ করিতে ভারি অসুবিধা দেখা দিত। বস্তুত হাত দু’খানা হওয়াই অপরিহার্য। যার এক হাত পঙ্গু বা বেকার তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেই বুঝা যায় তার কাজ করিতে কি অসুবিধা। এক হাতওয়ালা কোন অবস্থায়ই দু’হাত ওয়ালার মত কাজ করিতে পারে না। অসুবিধার কথা তো বাদই।
এমনি দু’পা হওয়ারও যৌক্তিকতা অনস্বীকার্য। তা না হইলে মানুষের চলতশক্তি হইত রহিত।
শব্দ সৃষ্টির অঙ্গটির গঠন নৈপুণের প্রতি দেখা যাক। জিহ্বা, ওষ্ঠদ্বয় ও দাঁত-বর্ণ এবং শব্দকে বর্ণে ও কথায় পরিণত করার কাজে সাহায্য করিয়া থাকে। মুখে যদি এগুলো না থাকিত তবে শব্দ অর্থহীন-অকেজো হইয়া যাবার দরুণ কথা বলার কেমন অসুবিধা আর বিপর্যয় সৃষ্টি হইত? শ্বাসনালী শব্দ বাহির করা ছাড়াও বায়ু ফুসফুস পর্যন্ত লইয়া যায়। তাতে হৃৎপিণ্ডেরও আরাম হয়। যদি এই নালীর ব্যবস্থা না থাকিত কিংবা কিছু সময় তা বন্ধ করিয়া রাখা হইত তবে হৃৎপিণ্ড অস্থির হইয়া পড়িত।
জিহ্বা দ্বারা খাদ্য গ্রহণে সাহায্য হয়। দাঁত দ্বারা খাদ্য চর্বন ও পেষণে সাহায্য হয়। ওষ্ঠদ্বয় দ্বারা খাওয়া আর পান করার সহায়তা হইয়া থাকে। আর মুখের জন্য ওষ্ঠ দু’টি কবাটের কাজ সম্পন্ন করিয়া থাকে।
এসব বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত হইল যে, মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলি অসংখ্য কাজের। যদি এতে কিছু মাত্র কমবেশী হইত, তবে তার কাজে বিঘ্ন হইত আর অসম্ভব হইয়া পড়িত অনেক কাজ। সুতরাং আল্লাহ্ প্রতিটি অঙ্গ চূড়ান্ত নৈপুণ্য আর জ্ঞানের ভিত্তিতে পয়দা করিয়াছেন।
মগজ : মগজের প্রতি লক্ষ্য করিলে দেখা যাইবে- তা যদি খুলিয়া ফেলা হয়, তবে দেখা যাইবে যে, উহা পরস্পর নিবিড় ভাবে সন্নিহিত। যাতে হঠাৎ কোন আঘাত পাইলে তা থেকে রক্ষা পায়। এর উপরে আছে খুপড়ির ঢাকনা, তা আবার কেশ দ্বারা আচ্ছাদিত যাতে পাইতেছে মস্তকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি। আর শীত গ্রীষ্ম থেকেও বাঁচিয়া থাকা যায়। আল্লাহ্ কোমল নাজুক মগজের হেফাজতের জন্য কি-ইনা ব্যবস্থা করিয়াছেন। আর যা সকল অনুভূতির মূল। মস্তিক ছাড়া সকল অনুভূতিই অকেজো।
হৃৎপিণ্ড : হৃৎপিণ্ড বুকের বদ্ধ খাঁচায় কিভাবে সংরক্ষিত। তার রহিয়াছে উপরে ঝিল্লির পর্দা, আর তার চুতর্দিক গোশত আর শিরা উপশিরা দ্বারা সংরক্ষিত করা হইয়াছে। দেহের মধ্যে এটিই সর্বপ্রধান অংশ। এটি দেহ রাজ্যের বাদশাহ। একই কারণে একে এমনি সুরক্ষিত রাখার প্রয়োজন।
হলক অর্থাৎ—গলনালী। তাতে দুটি রাস্তা আছে। একটি শব্দ বাহির হইবার, যাকে শ্বাসনালী বলে। এটি ফুসফুস পর্যন্ত এবং দ্বিতীয়টি খাদ্য- নালী, এটি পাকস্থলী পর্যন্ত প্রলম্বিত। গলায় একটি পর্দা আছে, যাতে খাদ্য ফুসফুসে প্রবেশ করিতে না পারে। ফুসফুস পাখার ন্যায় তৈরী যা হৃৎ- পিওকে বায়ু দ্বারা সজীব রাখে আর উত্তাপ ও বন্ধতার জন্য তার কাজে প্রতিবন্ধক না হয়। আর বায়ুর অভাবে হৃৎপিণ্ড বিষক্রীয় হইয়া মানুষের জীবন নাশের কারণ না হয়। এ কারণে ফুসফুসের ভিতরে ফাঁফা স্থান বায়ুপূর্ণ থাকে যাতে হৃৎপিণ্ড সর্বদা বায়ু লাভ করিতে সমর্থ হয়।
পেশাব পায়খানার রাস্তা : আল্লাহ্ এ দু’টিকে কি কৌশলে আর নিপুর্ণতার সাথে তৈরী করিয়াছেন। তা কেবল প্রয়োজনের সময় কাজ করে অর্থাৎ প্রস্রাব পায়াখানার বেগ হইলে তখনই তার কাজ, অন্য সময় তা হইতে কিছু বাহির হয় না। সর্বাবস্থায় তা থেকে মলমূত্র নির্গত হইতে থাকিলে জীবন দুর্বিসহ হইয়া উঠিত আর মানুষ কখনও পাক পবিত্র থাকিতে পারিত না।
রানদ্বয় ও নিতম্ব : আল্লাহ্ মানুষের রানদ্বয় ও নিতম্বদেশ কি সুন্দর তৈরী করিয়াছেন। এতে স্থুল সুপুষ্ট মাংসপেশী রহিয়াছে যাতে বসার বেলায় লোকে অসুবিধা না হয়। স্বল্প মাংশ, ক্ষীণ ও শীর্ণ মানুষের বসার কত কষ্ট। এ কারণেই এ দু’টি নরম গদীর ন্যায়, কোন প্রকার কষ্ট না হয়। মাংসবিহীন শীর্ণ ও ক্ষীণ মানুষের বসায় কষ্ট হয়। তাই এ’দুটি নরম গদীর ন্যায়।
মানব-লিঙ্গ : লজ্জার কথা নহে, এটাও আল্লাহ্ বিশেষ উদ্দেশ্যে তৈরী করিয়াছেন। যদি তা সর্বক্ষণ শিথিল আর ঠিলা থাকিত তবে মানুষের পক্ষে গর্ভাশয়ে বীর্য ক্ষেপণ করা আদৌ সম্ভব হইত না। আর যদি সর্বাবস্থায় তা উত্তেজিত থাকিত তবে তা হইত অসুবিধাজনক। এজন্য আল্লাহ্ তাকে এভাবে তৈরী করিয়াছেন যে, যথাসময়ে তা দৃঢ় ও উত্তেজিত হয়, অন্য সময় নিঃসাড় শিথিল থাকে।
কেশ আর নখ : যদিও সেগুলি বর্জনশীল। সেগুলি কাটিয়া ফেলার মধ্যেও আছে যুক্তি আর কল্যান। আল্লাহ্ নখ আর কেশ অনুভূতিহীন করিয়াছেন, যাতে তা কর্তন করার সময় কষ্ট না হয়। তাতে অনুভূতি থাকিলে হয়তো বেদনা বা কষ্টের ভয়ে তা কাটা হইত না। ফলে, তা অনেক বড় হইয়া দেখিতে বন্য জন্তুর ন্যায় হইত। কেশ গজানো লক্ষণীয়। যদি চোখের ভিতরেও কেশ গজাইত তাতে মানুষ হইয়া যাইত অন্ধ। কেননা, চোখের নায় নাজুক আর সূক্ষ্ম অঙ্গ সহ্য করিতে পারিত না। অনুরূপ, মুখের ভিতরে হইলে পানাহারে হইত নিদারুণ অসুবিধা আর স্বাদ যাইত বরবাদ হইয়া। এমনি যদি হাতের তালুতে লোম হইত তবে স্পর্শ করা, ধরা প্রভৃতির আরাম হইতে মানুষ হইত বঞ্চিত। এতে বিঘ্ন হইত অনেক কাজে। এমনি যদি নারীর যৌনাঙ্গের অভ্যন্তরে লোম হইলে স্ত্রী সম্ভোগ-সুখ হইতে নর হইত বঞ্চিত।
মানব-বৈশিষ্ট্য : আলোচ্য বিষয় বস্তুর প্রতি আল্লাহর কুদরতের প্রতি লক্ষ্য করার বিষয়। তিনি প্রত্যেকটি জিনিষ যথাস্থানে তৈরী করিয়া মানুে ষর শান্তির ব্যবস্থা করিয়াছেন। কোন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বা জিনিষ এমনভাবে সৃষ্টি করেন নাই, যাতে মানুষের অশান্তির আর কাজে বিঘ্ন হইতে পারে। আল্লাহ মানবদেহে পানাহার, নিদ্রা আর সহবাসের প্রয়োজনীয়তা এবং সেগুলির চাহিদা আর অনুভূতি দিয়াছেন। আহার পানিয়ের চাহিদায় সময় তৃষ্ণা পায়। পানাহার মানুষের জীবন ধারণের জন্য অত্যাবশ্যক।
নিদ্রাও মানুষের জন্য প্রাকৃতিক দাবী। নিদ্রা ব্যতীত মানুষের দেহমনে শান্তি হয়না এবং শরীরে নূতন শক্তি ও কার্যোৎসাহ পয়দা হয়না। দিবা রাত্রির মধ্যে কিছুক্ষণ নিদ্রা ভোগ করার পর তার দেহমনে আরাম, স্বস্তি আর নূতন কর্মশক্তি প্রত্যাবর্তন করে।
সহবাসের জন্য আসক্তি ও কামোদ্দীপনা আমন্ত্রণ আর আহ্বান স্বরূপ। বংশধারা রক্ষার জন্য যা অপরিহার্য। যদি কামাশক্তির উদ্রেক না হইত তবে মানুষ থাকিত অন্য কাজে লিপ্ত আর বংশ রক্ষার প্রয়োজনীয়তা কষ্টে তার মন এতই নিমগ্ন থাকিত যে, জীবনের প্রতিই সে বিমুখ হইয়া পড়িত। জালেমের অত্যাচার, হিংসুকের হিংসা ও দুর্ব্যবহার প্রভৃতি সর্বদা তার হৃদয়ে জাগরিত থাকিয়া জীবনকে করিয়া রাখত দুর্বিসহ। তাই আল্লাহর স্মৃতি আর বিস্মৃতি দুইটি পরস্পর বিরোধী গুণ মানুষের মধ্যে দান করিয়াছেন। এ দু’টির মধ্যে রহিয়াছে অশেষ কল্যাণ আর রহস্য।
মানব-বৈশিষ্ট্য : মহান আল্লাহ্ মানব চরিত্রে এমন কতগুলি গুণ দান করিয়াছেন যে গুলির সমারোহ নাই অন্য প্রাণীর মধ্যে। এর মধ্যে অন্যতম একটি হইল লজ্জা বা শরম। সে লজ্জা আর শরম আল্লাহ একমাত্র মানুষকেই দান করিয়াছেন। যদি মানুষের মধ্যে লজ্জা ও কুণ্ঠা না থাকিত তবে সে গুনাহর কাজ থেকে কখনও বিরত হইত না। কর্তব্য কাজ করিত না, অতিথি মেহমানের কদর করিত না, ভাল কাজে আগ্রহী হইত না, থাকিত না মন্দ কাজ থেকে দূরে। কেননা, অনেক কাজই লোক শরমের ভয়ে করিয়া থাকে। আমানত আদায় করিয়া দেয়, পিতামাতার সেবা করে, লজ্জাজনক কাজ থেকে ফিরিয়া থাকে। এসব কাজ বহু সময় লোক লজ্জার খাতিরে করে।
মানব চরিত্রের অন্যান্য দিকও এভাবে ভাবিয়া দেখা যাইতে পারে। বাকশক্তি সম্পর্কে চিন্তা করিলে দেখা যাইবে বাকশক্তির কারণে মানুষ সকল প্রাণীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। বাকশক্তির সাহায্যে সে তাহার মনের ভাব প্রকাশ করিতে সক্ষম হয় আর তা অন্যকে বুঝাইতে পারে। এমনি অন্যের মনের কথাও বুঝিতে পারে। যদি আল্লাহ মানুষকে এসব গুণ না দিতেন তবে পরস্পর ভাবের আদান-প্রদান কিছুতেই সম্ভব হইত না।
এমনি লিখন শক্তির বিষয়ে চিন্তা করিলে দেখা যাইবে, লিখন শক্তির সাহায্যে আজ আমরা হাজার হাজার বৎসর পূর্বের ইতিহাস ও জ্ঞান- বিজ্ঞানের কথা জানিতে পারি। আবার সহস্র সহস্র বৎসর পরে লোক আমাদের কথা জানিতে পারিবে এই লেখার সাহায্যে। সাহিত্য, ইতিহাস, গণিত প্রভৃতি শাস্ত্র সংরক্ষিত হইয়া আসিতেছে। ভুলিয়া যাওয়া জ্ঞান আমরা পুস্তকের সাহায্যে শিখিয়া নেই, পুনঃ ইয়াদ করি। যদি আল্লাহ আমাদের লেখার কৌশল শিক্ষা না দিতেন তবে আমরা পূর্ববর্তীদের জ্ঞান, বিদ্যা কিছুই হাছিল করিতে পারিতাম না, আর যা কিছু জ্ঞান-বিজ্ঞান সব ধ্বংস হইয়া যাইত। এমনকি, মূর্খ-বর্বর জীবনই আমাদের যাপন করিতে হইত। ফলে সমাজ, রাষ্ট্র প্রভৃতির ক্ষেত্রে সৃষ্টি হইত বিরাট সঙ্কট।
ক্রোধ : আল্লাহ মানুষকে ক্রোধ দান করিয়াছেন। যদ্বারা সে শত্রু, আর অনিষ্টকর দ্রব্য থেকে নিজেকে রক্ষা করিতে সক্রীয় হয়। আর হিংসা বৃত্তির দ্বারা নিজ স্বার্থ অর্জন করে। তবে এই ক্রোধ আর হিংসাবৃত্তিকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ব্যবহার করার প্রতি আল্লাহর নির্দেশ রহিয়াছে। কারণ ক্রোধের ন্যায় স্বভাব যদি সীমা অতিক্রম করে তবে হইবে নিশ্চিতভাবে শয়তানী স্বভাব। ফলে সে আল্লাহ থেকে হইয়া পড়িবে দূরে। ক্রোধের বশবর্তী হইয়া যখন সে কোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজ করিতে অগ্রসর হইবে তখন তাকে খুব সতর্ক হইয়া কাজ করিতে হইবে। তবে, হিংসাবৃত্তিকে দমন করিয়া ঈর্ষা করিতে পারে। কেননা হিংসায় হইল অন্যের ক্ষতি সাধন আর নিজের স্বার্থ কামনা। আর ঈর্ষার বেলায় অন্যের ক্ষতির কামনা হয় না বরং তার সমকক্ষতা বা তদপেক্ষা ভাল হওয়ার প্রেরণার অনুভব করে।
কামনা-বাসনা : আল্লাহ মানুষের মধ্যে কামনা-বাসনা দান করিয়াছেন। যার ফলে সংসার আবাদ রহিয়াছে আর বংশধারা বৃদ্ধি পাইতেছে। এরই কারণে অপেক্ষাকৃত দুর্বল ও গরীব লোকেরা শক্তিমান আর সম্পদশালী লোক থেকে স্বার্থ লাভ করিয়া থাকে। শক্তিমান লোক দুনিয়াকে আবাদ করিয়াছে শহর-নগরী, রাজ্য প্রতিষ্ঠা করিয়াছে আর এসব কাজে দরিদ্র শ্রেণীর লোকেরা পরোক্ষভাবে অসংখ্য স্বার্থ হাছিল করিয়াছে।
মানবকে প্রকৃতিগতভাবে দুর্বল করিয়া পয়দা করা হইয়াছে। যদি পূর্ব পুরুষ কর্তৃক নির্মিত বাড়ি-ঘর, দালান-কোঠা ও শিল্প দ্রব্যাদি না দেখিত তবে তাদের ঘর-বাড়ি তৈরী করা হইত না বা তাদের কাছে এমন কোন কিছুই ছিল না যা দ্বারা তাদের প্রয়োজন মিটাইতে পারিত। সুতরাং তাদের আশা আকাংখা হইতেছে তাদের কর্মেরই পটভূমি। এসব দেখিয়া শুনিয়া তাদের কর্মের উৎসাহ উদ্দীপনা জন্ম নেয়। আবার পরবর্তী লোক তাদের বংশধরদের জন্য এসব রাখিয়া যাইবে যার দ্বারা তারা জীবনের অসংখ্য উপকার লাভ করিবে। আবহমান কাল ধরিয়া এই ধারা অব্যাহত ভাবে চলিতে থাকিবে। এসব মানুষের ভিতরে জন্মগত আশারই সুফল।
জীবন-মৃত্যু : জীবন মৃত্যু বা আয়ু ও মৃত্যুর ন্যায় কতগুলি বিষয় আল্লাহ মানুষের অগোচর ও অজ্ঞাত রাখিয়াছেন। যেমন তার আয়ু আর মৃত্যুর সংবাদ। যদি মানুষ তার আয়ুর খবর জানিত আর তা হইত সংক্ষিপ্ত তবে তার জীবনের স্বাদ ও আশা বিস্বাদে ভরিয়া যাইত আর দুনিয়ার কোন কাজ কর্মেই তার মন উঠিত ন। এমনকি বংশ রক্ষা অথবা ঘর-দোর নির্মাণের ব্যাপারে তার মোটেই কোন আগ্রাহ উৎসাহ থাকিত না। অপর দিকে যদি তার আয়ু কাল খুব দীর্ঘ হইত আর সে তা জানিত, তবে সে হইয়া পড়িত প্রবৃত্তের দাস। আর খোদার নির্ধারিত সীমা লংঘন করিত, লিপ্ত হইয়া পড়িত নানা দুষ্কর্মে। কেননা মনে করিত তার মৃত্যূতো অনেক দূরে। ফলে সে ভুলিয়া যাইত তার মৃত্যুর কথা সুতরাং আল্লাহ এই বিষয়টি মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখিয়াছেন, যাতে সবর্দা তার মনে মৃত্যুর আশংকা লাগিয়া থাকে। আর কুপথে অগ্রসর হইলে যাতে খোদার ভয় অন্তরে জাগরিত হয় আর মৃত্যুর পূর্বে সৎকাজ করার সুন্দর ধারণা তার পয়দা হয়।
শেষ কথা : আল্লাহ্ মানব জাতিকে দান করিয়াছেন সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান আর মর্যাদা। অন্য কোন প্রাণীকে তা দেন নাই। সূরা বনী ইস্রাঈলের ৭০ নং আয়াতে আল্লাহ্ পাক বলেন :
: আর আমি আদম সন্তানকে দিয়াছি সম্মান আর দিয়াছি স্থলে ও জলে চলার যানবাহন আর পবিত্র খাদ্য। বিশেষতঃ বহু জিনিসের উপর তাদের বৈশিষ্ট্য দান করিয়াছি।
মানুষের এই সম্মান, বৈশিষ্ট্য আর মর্যাদার মূলে রহিয়াছে তার জ্ঞান। এই জ্ঞানের ফলেই সে আল্লাহর নৈকট্যের অধিকারী, এই জ্ঞানের সাহায্যে সে সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা গবেষণা করিয়া স্রষ্টাকে চিনিতে পারে; সে নিজের অস্তিত্বের বিষয় চিন্তা করিয়া আল্লাহর পরিচয় ভাল করিতে পারে। আল্লাহ ফর্মান-
: তোমার নিজের মধ্যেই রহিয়াছে আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন। তুমি কি তা দেখ না?
সুতরাং লক্ষ্য করা প্রয়োজন, আল্লাহ মানুষের মধ্যে কি কি গুণাবলী তৈরী করিয়াছেন। পাত্রের মূল্য নির্ণিত হয় পাত্রের মধ্যস্থ জিনিস দ্বারা আর গৃহের মর্যাদা গৃহে অবস্থানকারীর দ্বারা হইয়া থাকে। আল্লাহ মানুষের কলবকে তার মারেফতের গৃহ বলিয়া আখ্যা দিয়াছেন। এতে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি পাইয়াছে পুরোপুরিভাবে।
আল্লাহ্ মানুষের প্রত্যাবর্তন আর গন্তব্য স্থান হিসাবে অন্য একটি গৃহ নির্দিষ্ট রাখিয়াছেন, যাকে বলে আখেরাত বা পরোকাল। যে গৃহের অবস্থা আর পরিচয় মানবের কাছ থেকে সম্পূর্ণ গোপন রাখিয়াছেন। সে গৃহের খবরের জন্য আল্লাহ্ রিসালত সৃষ্টি করিয়াছেন। সে নূরের আলোকে মানুে ষর প্রতি আখেরাতের অবস্থা প্রকাশ পায়। এ কারণে আল্লাহ্ দুনিয়াতে নবী আর রসূল প্রেরণ করিয়াছেন। তাঁদের দুটি কাজ : আল্লাহ্ অনুগত বান্দাদের জন্য বাশীর বা সুসংবাদ দানকারী, আর নাফরমান বান্দার জন্য নাজীর ভীতি প্রদর্শনকারী। ওহীর দ্বারা আল্লাহ নবীগণের সাহায্য করিয়াছেণ। ওহী ধারণ আর সংরক্ষণ ক্ষমতা আল্লাহ্ নবীগণকে দান করিয়াছেন।
নবীগণ পার্থিব ব্যাপারে জ্ঞান ও হিকমত শিক্ষা দিয়াছেন। আর আখেরাতের বিষয়ও যা কল্যাণকর আর জ্ঞান গবেষণা রহিয়াছে তাও তাঁরা অবহিত করিয়াছেন। এই খোদাতত্ব দর্শন যা নবী আর রসূলগণের সাহায্য অর্জিত হইয়াছে, তা জ্ঞানের আলোক দ্বারা কখনো অর্জিত হওয়া সম্ভব হইত না। পয়গম্বরগণকে আল্লাহ্ এমন সব সুস্পষ্ট প্রমাণ আর প্রকাশ্য নিদর্শনসহ প্রেরণ করিয়াছেন যার প্রতি মানুষের ঈমান আনা অপরিহার্য হইয়া পড়িয়াছে। এভাবে আল্লাহ্ মানুষের প্রতি তার দান পূর্ণ করিয়াছেন। আর প্রমাণও চূড়ান্ত হইয়াছে। দ্বীন-দুনিয়ার উভয় রাস্তাই তাঁরা দেখাইয়া গিয়াছেন। মুক্তি আর সর্বনাশের উভয় রাস্তাই সুস্পষ্টভাবে মানুষের কাছে তুলিয়া ধরা হইয়াছে।
আল্লাহ্ মানুষকে কতই না সম্মান, মর্যাদা দান করিয়াছেন! মানব বংশাবলীকে করিয়াছেন সম্মানিত। তাদের বংশধারা থেকে মহান, কত সম্মানিত ব্যক্তি জন্মগ্রহণ করিয়াছেন। তাদের কেউ লাভ করিয়াছেন নবুয়ত আর বেলায়েতের মর্যাদা আর কেউ লাভ করিয়াছেন নূরের প্রতিবিম্ব। সুতরাং যে ভাগ্যবান সে ঈমান আনিয়া আল্লাহর নেয়ামতের প্রকাশক আর দান ও অবদানের অধিকারী হইয়াছে, আর দুর্ভাগা সে নবুয়ত ও বেলায়েতকে অস্বীকার করিয়া চির দুঃখ আর দুর্ভাগ্য খরিদ করিয়াছে। সে শুধু পার্থিব জীবনের জন্য আখেরাত বরবাদ করিয়া দিয়াছে- বিক্রি ও বরবাদ করিয়া দিয়াছে।
পাঁচ : ফেরেশতাগণের সৃষ্টি রহস্য
রাসূলে পাকের (সাঃ) ‘নূর মোবারক’ সৃষ্টি হওয়ার পরে তদীয় নূর দ্বারা আল্লাহ্ পাক সর্বপ্রথম হযরত ইসরাফীল, তৎপর মীকাঈল, জিব্রাঈল ও আজরাঈল এই নেতৃস্থানীয় প্রধান চারিজন ফেরেশতাকে পয়দা করেন। আল্লাহতা’লা নিখিল বিশ্বের যাবতীয় কাজ পরিচালনার ভার এই চারিজন ফেরেশতার উপরই অর্পণ করেন।
তন্মধ্যে হযরত জিব্রাঈলকে (আঃ) যুগে যুগে প্রেরিত নবী- রাসূলগণের নিকট আল্লাহর ঐশীবার্তা বা ওহী পৌঁছানোর ভার অর্পণ করেন।
হযরত মীকাঈল (আঃ) নিখিল বিশ্বে আল্লাহর আদেশে বৃষ্টি বর্ষণের কাজ পরিচালনার জন্য ও খাদ্য-শস্যের সুবন্দোবস্ত করিবার নিমিত্ত মনোনীত হইয়াছেন।
হযরত আজরাঈলকে (আঃ) সকল প্রকার জীব-জন্তুর জীবনের উপর অধিকার দান করিয়াছেন। তিনি আল্লাহর হুকুমে সকলের রূহ বা জান কবজ করিয়া থাকেন।
হযরত ইসরাফীলকে (আঃ) আল্লাহ্ পাক সিংগার ফুৎকারে বিশ্ব জগৎ ধ্বংস করিবার নিমিত্ত প্রস্তুত রাখিয়াছেন। তিনি সকল সময় সিংগা মুখে নিয়া খোদার আদেশ প্রাপ্তির অপেক্ষা করিতেছেন। যখন আল্লাহর আদেশ হইবে, তখনই তিনি সিংগার ফুৎকারে ত্রিভূবন লয় করিয়া দিবেন।
এই চারিজন ফেরেশতার মধ্যে সর্বপ্রথম আল্লাহতা’আলা হযরত ইসরাফীলকে (আঃ) পয়দা করিয়াছেন।
এই মর্মে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলিয়াছেন, হযরত ইসরাফীল (আঃ) আল্লাহর সমীপে সপ্তম আসমান ও জমীনের শক্তি প্রার্থনা করিয়াছিলেন। তাই খোদা তা’আলা তাঁহাকে সপ্তম আসমান জমীনের শক্তি দান করিয়াছেন। ইহা চাহিয়াই তিনি ক্ষান্ত হন নাই বরং দুনিয়ার যাবতীয় জীবের অর্থাৎ, মানব-দানব, জিন ফেরেশতা, আগুন বাতাস ইত্যাদি যাবতীয় বস্তুর সমপরিমাণ শক্তি ও ক্ষমতা-অর্থাৎ, শক্তি ও বাহাদুরীর সকল প্রভুত্ব চাহিয়াছিলেন। তাই আল্লাহতা’আলা তাঁহাকে যাবতীয় মাখলুকের উপর শক্তির প্রভুত্ব দান করিয়াছেন।
হযরত ইসরাফীলকে (আঃ) আল্লাহতা’লা যে অপূর্ব ও ভয়াবহ দেহাকৃতি দান করিয়াছেন, তাহা মানবজ্ঞানে উপলদ্ধি করা কষ্টকর। তাঁহার দেহের গঠন-আকৃতি এত বড় যে, সমস্ত দুনিয়ার নদ-নদী, খাল-বিল, সাগর-দরিয়ার পানি যদি একত্রিত করিয়া তাঁহার মস্তকে ঢালা হয়, তবুও বিন্দুমাত্র পানি জমীনে পড়িবে না। ইহাতেই মানবজ্ঞানে কিছুমাত্র অনুভূতি আসিতে পারে যে, তাঁহার দেহাকৃতি কত বিশাল।
এতদ্ব্যতীত, তাঁহার মাথা হইতে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর জাফ্রানী লোম দ্বারা সুনিপুণভাবে আবৃত। এই সব লোমের প্রত্যেকটির বহু সংখ্যক মুখ রহিয়াছে। সেই মুখের প্রত্যেকটিতে আবার দশ লক্ষাধিক বার খোদার জিকির-আজকার ও তাসবীহ-তাহলীল পড়িতেছে। আর তাঁহার প্রত্যেক শ্বাস-প্রশ্বাসে এক একজন আল্লাহর অতীব নিকটতম ফেরেশতা পয়দা হয়। উহারাই আল্লাহর পবিত্র আরশ বহন করিয়া থাকে। উহারা কেয়ামত পর্যন্ত সর্বদা তাঁহার জিকির-আজকারে মশগুল থাকিবে।
হযরত ইসরাফীলের (আঃ) শ্বাস-প্রশ্বাসে যে সব ফেরেশতা পয়দা হয়, তাঁহারা দেখিতে ইসরাফীলের ন্যায়। এমন কি, সম্মানিত কেরামুন- কাতেবীন নামক ফেরেশতাদ্বয়ও তাঁহারই আকৃতি বিশিষ্ট বলিয়া কথিত আছে।
হযরত মীকাইল (আঃ) হযরত ইসরাইফীলের (আঃ) পাঁচশত বৎসর পরে পয়দা হইয়াছেন। তাঁহারও দেহের গঠন আকৃতি অত্যন্ত ভয়াবহ। হযরত মীকাঈলেরও আপাদমস্তক জাফ্রানী রংগের লোমে আবৃতি।
এতদ্ব্যতীত তাঁহার মূল্যবান জবজাত নামক পাথরের তৈরী দুইখানা অত্যাধিক শক্তিশালী ডানাও আছে। যাহার দ্বারা আল্লাহর আদেশ মতে নিমিষে তিনি ত্রিভূবন ঘুরিয়া বেড়ান।
হযরত মীকাঈলের (আঃ) শরীরে অসংখ্য লোম আছে। প্রত্যেকটি লোমের দশ হাজার মুখ ও চক্ষু রহিয়াছে। তিনি এই সকল চক্ষু হইতে মোমেন ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহর দরবারে রহমত ও মাগফেরাত কামনার্থে ক্রন্দন করিতে করিতে অশ্রুধারা বহাইয়া দেন। যাহার ফলে প্রত্যেকটি অশ্রুর ফোঁটা হইতে মীকাঈলের (আঃ) আকৃতিরূপ এক একজন ফেরেশতা পয়দা হয়। উহারা কেয়ামত অবধি খোদার জিকের-আজকার, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদিতে রত থাকে। এই সকল ফেরেশতাকে হযরত মীকাঈলের (আঃ) ভারপ্রাপ্ত কার্যের সাহায্যকারী বা মুয়ীন ফেরেশতা বলা হয়। উহারা মীকাঈলের (আঃ) নির্দেশিত কার্যের সহায়তাকল্পে সর্বদা নিযুক্ত ও প্রস্তুত রহিয়াছে।
কথিত আছে, দুনিয়ার বুকে এমন কোন পানির বিন্দু বা ফোঁটা নাই যাহার সাথে মীকাঈলের এক একজন সাহায্যকারী নাই। এমন কি, বৃষ্টির প্রত্যেকটি ফোঁটার সাথে মীকাঈলের কার্যে সাহায্যকারী একজন ফেরেশতা জমীনে অবতীর্ণ হয়। এইরূপে ফল-মূল, জিরাত-শস্য, দানা- পানি এক কথায় খাদ্য দ্রব্যের প্রত্যেকটির সহিত হযরত মীকাঈলের নির্দেশিত কার্যের সাহায্যকারী একজন না একজন ফেরেশতা অবশ্যই নিয়োজিত আছে।
হযরত জিবরাঈল (আঃ) হযরত মীকাঈলের (আঃ) পাঁচশত বৎসর পরে পয়দা হইয়াছেন। হযরত জিবরাঈলের (আঃ) দেহের আকৃতি অত্যন্ত ভয়াবহ। যদি তিনি তাঁহার প্রকৃত দেহাকৃতি লইয়া একবার দৃশ্যমান হন, তাহা হইলে এমন কোন প্রাণী নাই তাহা দেখিয়া স্থির থাকিতে পারে। জিবরাঈলের মাথা হইতে পা পর্যন্ত সমস্ত শরীর জাফ্রানী রংগের লোমে আবৃত। প্রত্যেকটি লোম যেন চন্দ্র-তারকার ন্যায় সমুজ্জল। তাঁহার অপূর্ব জ্যোতিষ্মান দুইটি চক্ষু ও এক হাজার দুইশত খানা ডানা আছে। তাঁহার চক্ষুর অভ্যন্তরে সূর্যের ন্যায় জ্যেতিষ্মান আলো বিদ্যমান। যদি তিনি তাঁহার জ্যোতিষ্মান চক্ষু দ্বারা কোন বস্তুর উপর প্রগাঢ় দৃষ্টি নিক্ষেপ করেন, তবে সেই বস্তু দগ্ধিভূত হইয়া ভষ্ম হইতে আরম্ভ করিবে।
হযরত জিবরাঈল (আঃ) সৌন্দর্যে সকল ফেরেশতার অন্যতম। কেননা, তিনি আল্লাহ্ পাকের আদেশে প্রত্যহ তিনশত সাতবার খোদার নূর বা জ্যোতির দরিয়ায় আসন পাতিয়া বসিয়া থাকেন। ইহাতে বুঝা যায়, যাঁহাকে আল্লাহ্ পাক স্বীয় নূরের দরিয়ায় বসিবার ইজ্জত দান করিয়াছেন, তাঁহার সৌন্দর্য কতখানি হইতে পারে। জিবরাঈল (আঃ) যখন উক্ত নূরের সমুদ্র হইতে গাত্রোত্থান করেন, তখন তাঁহার পবিত্র শরীরে মিশ্রিত হইয়া বহুসংখ্যক নূরের কণা উঠিয়া পড়ে। সেই সকল নূরের কণা হইতে জিবরাঈলের (আঃ) আকৃতিরূপ অসংখ্য ফেরেশতা পয়দা হয়, উহাদিগকে আত্মজ ফেরেশতা বলা হয়। উহারা কিয়ামত অবধি আল্লাহ্ তা’আলার জিকের-আজকার ও তাসবীহ-তাহলীল করিতে থাকিবে এবং মোমেন বান্দাদের জন্য ইলাহির দরবারে দোয়া ও মাগফেরাত কামনা করিতে থাকিবে।
আজরাঈল তথা মালাকুল মউত প্রধান চরিজন ফেরেশতার মধ্যে সর্বশেষে পয়দা হইয়াছেন মালাকুল মউত হযরত ইসরাফীলের আকৃতি বিশিষ্ট এবং দেখিতে প্রায় হযরত ইসরাফীলেরই (আঃ) ন্যায়। তাঁহাকে আল্লাহ্ পাক সকল সৃষ্ট জীবের আত্মা বা রূহ কবজ করিবার ভার প্রদান করিয়াছেন এবং আত্মার উপর তাঁহাকে অপরাজেয় শক্তি দান করিয়াছেন। তাই তিনি মানব-দানব, জিন-ফেরেশতা, পশু-পাখী অর্থাৎ খোদার সৃষ্ট তামাম জীব বা মাখলুকাতের আত্মা কবজ করিয়া থাকেন। এমন কি সর্বশেষে তিনি নিজের আত্মা নিজেই কবজ করিবেন।
তৈরি নূরে ফেরেশতা সব নূরে নূর বদন,
করেন তারা খোদার হুকুম পালন অনুক্ষণ।
হর হামেশা বাধ্য তারা অবাধ্যতা নাই,
যখন যা হয় হুকুম তাঁহার করেন তারা তাই।
ছয় : মৃত্যুর সৃষ্টি রহস্য
আকৃতিহীন বস্তু-মৃত্যুকে আল্লাহ্ পাক কোন সময়ে পয়দা করিয়াছেন, সঠিকভাবে তাহা জানা যায় না। তবে কাহারও মতে বুঝা যায় যে, আদম নবীকে পয়দা করিবার পূর্বেই তিনি মৃত্যুকে পয়দা করিয়াছেন। এই মর্মে কোরআন শরীফে স্পষ্ট দেখা যায় : ‘খালাকাল মাউত অল হায়াতা-’আল্লাহ্ পাক জীবন ও মরণ নামে দুইটি বস্তু পয়দা করিয়াছেন।’
যাহার শুরু আছে, তাহার শেষও আছে, তাই প্রাণী মাত্রের অবশ্যই মরণসুরা পান করিতে হইবে-কেহ উহা হইতে বাদ পড়িবে না।
আল্লাহ পাক মৃত্যুকে কিরূপে পয়দা করিয়াছেন, রাসূলে পাকের হাদীছের মর্মে এই সম্পর্কে জানিতে পারা যায়- ‘আল্লাহতা’আলা মৃত্যুকে জমীন ও আসমানের যাবতীয় বস্তুর মধ্যে সর্বাধিক শক্তিশালী ও শ্রেষ্ঠ করিয়া পয়দা করিয়াছেন। এমন কি, জমীন ও আসমান হইতেও উহা অধিকতর শক্তিশালী।
আল্লাহ্ পাক মৃত্যুকে পয়দা করিয়া বহুসংখ্যক মজবুত জিঞ্জির দ্বারা বাঁধিয়া এমন এক সুরক্ষিত গোপন স্থানে লুকাইয়া রাখিয়াছেন যে, তাহার অতীব নিকটবর্তী ফেরেশতাগণও মৃত্যুর তথ্য উদ্ধার করিতে সমর্থ হয় নাই। সন্ধান তো দূরের কথা, মৃত্যু নামের একটা ভয়াবহ বস্তু আল্লাহ পয়দা করিয়াছেন, সেই বিষয়ও তাহারা অবগত হইতে পারে নাই। তবে, কোথাও হইতে মৃত্যুর ত্রিভূবন বিদীর্ণকরণ বিকট গর্জন তাহারা শুনিতে পাইত। যখন আল্লাহ্ পাক হযরত আদমকে (আঃ) পয়দা করেন, তখন হইতে ফেরেশতাগণ কেবল মৃত্যুর সন্ধান পাইয়াছিল এবং জানিতে পারিয়াছিল, মৃত্যু নামেও আল্লাহ্ একটি ভয়াবহ বস্তু পয়দা করিয়াছেন।
আল্লাহতা’আলার ইচ্ছায় যখন ফেরেশতাগণ মৃত্যুর সৃষ্টি রহস্য জানিতে পারিল, তখন তিনি মালাকুল মউতকে (আজরাঈল) বলিলেন- ‘হে মালাকুল মউত! আমি অদ্য হইতে তোমাকে মৃত্যুর উপর সম্পূর্ণ অধিকার শক্তি প্রদান করিলাম।’
মালাকুল মউত ইহা শুনামাত্র বলিয়া উঠিলেন-’হে রাববুল আলামীন। মউত আবার কি জিনিস? তখন আল্লাহ্ পাক মউতের চতুষ্পার্শ্বের অসংখ্য পর্দা তুলিয়া বলিলেন, ‘এই দেখ মউত, ইহার উপর তোমার অধিকার দান করিয়াছি।’ অতঃপর আল্লাহ্ পাক সকল ফেরেশতাদেরকে ডাকিয়া মউতকে দেখাইয়া বলিবেন- হে ফেরেশতা। তোমরা সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়াইয়া যাও এবং মউতকে ভালরূপে দেখিয়া লও।’ আল্লাহর নির্দেশ মোতাবেক তাহারা দাঁড়াইয়া গেল এবং মউতকে দেখার উদ্দেশ্যে অপেক্ষা করিতে লাগিল।
এই সময় আল্লাহ্ মউতকে আদেশ করিলেন-’হে মউত! তোমার মুদিত চক্ষুসমূহ খোল এবং তোমার শক্তিশালী ডানাদ্বয়ের দ্বারা আকাশ ও ভূবন ভ্রমণ করিয়া সকল ফেরেশতাগণকে তোমার বিশাল আকৃতি প্রদর্শন কর।’ মউত আল্লাহর এই আদেশ শ্রবণ মাত্র তাহার মুদিত চক্ষুসমূহ খু লিল এবং তাহার অতীব শক্তিশালী ডানাদ্বয়ের সাহায্যে আকাশ ও ভূবন ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করিল। ফেরেশতাগণ মউতের এইরূপ ভয়াবহ বিশাল আকৃতি দর্শন করামাত্র বেহুশ হইয়া মাটিতে লুটাইয়া পড়িল। এই অবস্থায় তাহারা এক হাজার বৎসর মাটিতে গড়াগড়িখাইতে লাগিল। অবশেষে তাহারা আল্লাহর আদেশে চেতনা পাইল।
ফেরেশতাগণ তাহাদের চেতনাশক্তি পুনঃ প্রাপ্তিমাত্র আল্লাহ পাকের মসীপে করজোড়ে মিনতি করিয়া বলিল, ‘হে দয়াময়। আপনি কি ইহা হইতে দ্বিতীয় আর কোন ভয়াবহ ও বিশাল আকৃতির বস্তু পয়দা করিয়াছেন?’ তদুত্তরে আল্লাহ পাক বলিলেন, ‘হে ফেরেশতাগণ! তোমরা মনে রাখিবে যে, আমি সকলের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্মানিত। আমি মউতকে এই জন্যই পয়দা করিয়াছি যে, আমার প্রত্যেক সৃষ্ট জীবকে একবার না একবার ইহার করতলগত অবশ্য হইতে হইবে। এমন কি, তোমাদেরও ইহার হাত হইতে রেহাই নাই।
অতঃপর আল্লাহতা’আলা হযরত আজরাঈলকে (আঃ) লক্ষ্য করিয়া বলিলেন-’হে আজরাইল! তোমাকে উহার উপর সম্পূর্ণ কর্তৃত্ব ও অধিকার দান করিলাম। আজরাঈল ইহা শুনিয়া বলিলেন- ‘হে খোদা! আপনি মউতকে বিরাট শক্তিশালীরূপে পয়দা করিয়াছেন, উহাকে আমি 1. কি প্রাকারে অধীন করিব?’ আল্লাহ্ বলিলেন- ‘হে আজরাঈল। তুমি মউতকে দেখিয়া ভয় পাইও না। আমি এখনই তাহার উপর তোমার প্রভুত্ব প্রদান করিতেছি- তুমি ইহার উপর ক্ষমতাবান হইবে।’
এই বলিয়া আল্লাহ্ পাক তাহাকে মউতের শক্তির উপর প্রভুত্ব দান করিলেন। আজরাঈল মউতকে তখনই তাহার অধীনতা স্বীকার করাইয়া লইলেন। মউত হযরত আজরাঈলের বশ্যতা স্বীকার করিল।
ইহার পরে মউত আল্লাহ্ পাকের দরবারে আরজ করিল-’ইয়া বারে এলাহী। আমাকে আদেশ দান করুন আমি সমস্ত আসমান ও জমীন ভ্রমণ করিয়া সকল জীবন্ত বস্তুকে আমার শক্তি ও কার্যের বিষয় অবগত করাইয়া আসি। আল্লাহ সম্মত হইয়া তাহাকে আদেশ দান করিলেন। মউত তখন সমস্ত আসমান জমীন পরিভ্রমণ করিয়া বিজলীর ন্যায় গম্ভীর স্বরে গর্জন করিয়া বলিতে লাগিল : ‘হে সৃষ্টজীব! আমি এমন বস্তু যে, সকল বন্ধুকে তাহার বন্ধুর মিলন হইতে বিচ্ছেদ ঘটাইব; এমনিভাবে স্বামীকে তাহার স্ত্রীর এবং স্ত্রীকে তাহার স্বামীর সম্মুখ হইতে জীবন টানিয়া বাহির করিয়া লইব।’
মউত আরও বলিল-’আমি এমনি ভয়াবহ বস্তু যে, পিতার সম্মুখ হইতে ছেলের জান কবজ করিয়া পিতাকে পুত্রহীন এবং ছেলের সম্মুখ হইতে পিতার জান কবজ করিয়া পুত্রকে ইয়াতীম করিব। এমনিভাবে ভাইগণের জান তাহাদের ভাই-বোনদের সম্মুখ হইতে নির্দয়ভাবে টানিয়া বাহির করিয়া ভাই-বোনদিগকে সাথীবিহীন করিব। আমার আকস্মিক হামলায় সকল আদম-সন্তানের শক্তি চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যাইবে, সকল শক্তি সেই দিন আমার নিকট হইবে পদদলিত। আবার আমার হঠাৎ আক্রমণে প্রত্যেক ঘড়-বাড়ী, শহর-বন্দর, পথ-ঘাট ইত্যাদি জনশূন্য স্থানে পরিণত হইবে-বিরাণ হইবে সকল কিছু।’
খোদার বিকট সৃষ্টি আমি, মউত আমার নাম,
ভবের লীলা সাঙ্গ করা হইল আমার কাম।
পিতা-মাতা হরণ করে ইয়াতীম করি ছাও,
তাওলাদে হরণ করে কাঁদাই বাবা মাও।
ভাইকে নিয়ে কাঁদাই বহিন, বহিন নিয়ে ভাই,
আমার ভীষণ ছোবল হতে রক্ষা কারুর নাই।
স্বামী হরে কাঁদাই বিবি, বিবি হরে স্বামী,
সময় হলে তোমার কাছে হাজির হব আমি।
‘হে মানুষ! তোমরা জানিয়া রাখ, আমি এত বড় শক্তিশালী যে, আমার হাতে প্রত্যেইটি আদম সন্তান অবশ্যই একবার নিষ্পেষিত হইবে। যত বড় শক্তির অধিকারই হউক না কেন, আমার আক্রমণ হইতে রেহাই পাইবে না কেহই।
‘আমি এত বড় শাক্তিশালী যে, প্রাণী বলিতে আমার হাত হইতে কেউ রেহাই পাইবে না। দুনিয়ার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি যথাভাবে থাকিয়া সকল জীবের জান কবজ করিব। শুধু কি তাই, এতবড় শক্তির বাহাদুর জিবরাঈল, মীকাঈল, ইসরাফীল এবং আজরাঈল ও একদিন আমার হাত হইতে রক্ষা পাইবে না। তাহাদের জানও আমার হাতে কবজ হইবে। এতদ্ব্যতীত আমি এতবড় নির্দয় ও ভয়ংকর যে, দুনিয়ার সর্বশেষ মুহূর্তে আমার নিজের প্রাণ আমি নিজেই কবজ করিব।’
উপরিউক্ত আলোচনায় স্পষ্ট বুঝা যায় যে, মউত একটি আত্মাবিশিষ্ট দেহযুক্ত প্রাণী। কিন্তু সত্যিকারে তাহা নহে, বরং মউত আল্লাহর আদেশ মাত্র। আর আজরাঈল (আঃ) সেই আদেশ বহনকারী। তাই যে মউত সে- ই আজরাঈল বলিলেও ভুল হইবে না। দুনিয়ার শেষ মুহূর্তে আজরাঈল তাহার নিজের জান নিজেই কবজ করিবেন।’
মৃত্যুর কার্যক্রম : কথিত আছে, মানব জীবনের অন্তিমকালে যখন মৃত্যু আদম-সন্তানের নিকট উপস্থিত হয়, তখন তাহার ভয়াবহ বিকট আকৃতি পরিবর্তন করিয়া আদম-সন্তানের দেহের নিকট উপস্থিত হয়। ইহা দেখিয়া মানবাত্মা মৃত্যুকে জিজ্ঞাসা করে-
‘তুমি কে? এখানে কি চাও?’ তদুত্তরে মউত গম্ভীর স্বরে বলিয়া উঠিবে, ‘আমি তোমার আত্মার যমদূত! আমি তোমাকে এই ক্ষণস্থায়ী ভোগ-বিলাসের দুনিয়া ত্যাগ করাইয়া অমরধামে ডাকিবার জন্য যমদূত সাজিয়া আসিয়াছি। আজ তোমার জান কবজ করিয়া তোমার স্ত্রীগণকে বিধবা করিব। আর তোমার সেই সকল ধন-সম্পত্তি যাহা তুমি কখনই কাহাকেও দান-ছদকা করিতে প্রস্তুত ছিলো না-অদ্য সেই সকল ধন- সম্পত্তি তোমার উত্তরাধিকারগণের মধ্যে বন্টন করিতে আসিয়াছি।’
ইহার পরে মৃত্য বলিবে- ‘হে মরণশীল? আফসোস, তুমি তোমার এই অমূল্য জীবনাবধি অমরধামে গমনের কোন পাথেয় সংগ্রহ করিলে না।’ শুনিয়া মৃত্যুবরণকারী তাহার মুখমণ্ডল অন্যদিকে ফিরাইয়া লইবে। তখনই আবার মৃত্যু ঘুরিয়া তাহার সম্মুখে গিয়া বলিবে-
‘হে হতভাগা, হে মৃত্যুর পথের অভিযাত্রী! দেখত, তুমি কি আমাকে চিনিতে পার নাকি? আমি যে তোমার সেই যমদূত, তোমার মাতা- পিতার আত্মা যে তোমার সম্মুখ হইতে কাড়িয়া লইয়াছিল; তুমি যখন তাহাদের কাছে দাঁড়ানো ছিলে, তখন তুমি অনুভব করিতে পার নাই যে, মৃত্যু আবার কি জিনিস? কি করিয়া বা জান কবজ হয়। তাই অদ্য আল্লাহর হুকুমে তোমার জানও কবজ করিতে আসিয়াছি। এখন হাড়ে হাড়ে অনুভব করিয়া লও, মৃত্যু কি জিনিস এবং কিই-বা কষ্ট আছে ইহাতে। অদ্য আবার তোমার সন্তানগণও তোমার মৃত্যুর পার্শ্বে দণ্ডায়মান থাকিবে। কিন্তু তোমার মত উহারাও অনুভব করিতে পারিবে না যে, তাহাদের পিতার জানটা কিরূপে বাহির করিয়া লওয়া হইয়াছে। আবার এমন একদিন উহাদেরও আসিবে। ‘হে মৃত্যগামী। ভয় পাইও না, আমি সেই বস্তু যাহার হাতে তোমার পূর্বের মহা শক্তিশালী সম্প্রদায়ও ধ্বংস প্রাপ্ত হইয়াছে।
কেতাবে আছে, মৃত্যু মানুষের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিবার পূর্বে জিজ্ঞাসা করিবে-’হে অমুক! তুমি দুনিয়াটিকে কিরূপ দেখিয়াছ?’ তদুত্তরে সে বলিবে-’আমি দুনিয়াটিকে অত্যন্ত কুমন্ত্রণাকারী, অসচ্চরিত্র, বিশ্বাসহন্তা রূপে পাইয়াছি।’ পরপার গমনকারী ইহা বলা মাত্র দুনিয়ার আকৃতি আল্লাহর আদেশে তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া বলিবে—
হে পাপীষ্ঠ। এইরূপ কথা বলিতে কি লজ্জা হয় না? তুমি দুনিয়ায় আসিয়া নিজেকে দুশ্চরিত্রতা হইতে দূরে রাখ নাই, হালাল-হারামের পার্থক্য কর নাই, আর এখন কি না বলিতেছ, দুনিয়াটি অত্যন্ত কুমন্ত্রণাকারী অসচ্চরিত্র ইত্যাদি। তুমি বুঝিয়াছিলে, দুনিয়া হইতে বুঝি আর যাইতে হইবে না। এখন তাহার পরিণাম ভোগ কর।’ দুনিয়া আরও বলিবে-হে অমরধামে গমনকারী! অদ্য হইতে তোমার কৃত যাবতীয় পাপকার্যের উপর আমি অসন্তুষ্ট রহিলাম। এই সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না।’ এই বলিয়া দুনিয়ার আকৃতি চলিয়া যাইবে।
তৎক্ষণাৎ আবার মৃত্যুগামীর সঞ্চিত ধন-দৌলত হাজির হইয়া বলিবে-
‘হে পাপীষ্ঠ! তুমি আমাকে অসদুপায়ে উপার্জন করিয়াছিলে। কিন্তু আমার হক্ক, দান-ছদকা, যাকাত-ফেত্রা ইত্যাদি যথারীতি আদায় কর নাই। অসহায় গরীবকে বঞ্চিত করিয়া তাহাদিগকে এক কপর্দক দান কর নাই, দান-খয়রাত করিতে পর্বত সমান কষ্ট অনুভব করিতে। সমস্তই ধন-দৌলত ছেলে-মেয়ে, পুত্র-পরিজনের জন্য পুঞ্জিভূত করিয়াছিল। কিন্তু অদ্য আমি অপরের হাতে চলিয়া যাইতেছি। তুমি তো আমাকে দান- ছদকা করিতে ভুলিয়া গিয়াছিলে, অথচ তোমার জানা নাই যে, কেয়ামত দিবস মাল-দৌলত, পুত্র-পরিজন কোনই উপকারে আসিবে না। এই মালই তোমার যন্ত্রণার কারণ হইয়া দাঁড়াইবে। আল্লাহ পাক ফৰ্মান-
: মাল-দৌলত, পুত্র-স্বজন সেদিন কোন উপকারেই আসিবে না- উপকারে আসিবে শুধু সরল হৃদয়।’
এই বলিয়া ধন-দৌলত প্রস্থান করিবে। অতঃপর মউত তাহার গলদেশ টিপিয়া ধরিবে।
মৃত্যুগামীর কৃতকর্ম ভাল হইলে অতি আরামেই তাহার আত্মা বাহির করা হইবে। আর যদি সে মোনাফেক বা পাপী হইয়া থাকে, তাহা হইলে অতিশয় কঠিন ভাবে তাহার আত্মা বাহির করা হইবে।
