চতুর্থ অধ্যায় – হাশর ময়দান ও হিসাব-নিকাশ
কেয়ামত ও আখেরাত
এই বিশ্ব-জগত আমাদের বাসস্থান। আমরা জীবনে বহু লোক জন্ম নিতে দেখিয়াছি এবং বহু লোককে মরিতেও দেখিয়াছি। এই নশ্বর দুনিয়ায় একবার মহা প্রলয় আসিবে এ কথাও সত্য। সকল শ্রেণীর বৈজ্ঞানিকগণ পৃথিবীর গতি পর্যবেক্ষণ করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছে যে, নশ্বর ধরায় একবার মহা প্রলয় সংঘটিত হইবে এবং উহা অচিরেই ধ্বংস প্রাপ্ত ও লয় হইয়া যাইবে।
এতদ্ব্যতীত কোরআন ও হাদীছ পর্যালোচনা করিলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, নশ্বর বিশ্ব-জগতে একবার মহাপ্রলয় অবশ্যই সাধিত হইবে। উহাকেই বলে কেয়ামত। প্রাণীমাত্র মহাপ্রলয়ের পরে পুনরুথান হইয়া ইলাহীর আদালতে হিসাব-নিকাশের জন্য দণ্ডায়মান হইতে হইবে। ইহাকেই বলে কেয়ামত বা হাশর ময়দান।
আল্লাহ পাক বলেন-
‘ধর্মভীরুগণ কেয়ামতের প্রতি সম্পূর্ণ বিশ্বাস রাখে।’
কেয়ামতের দিবস আল্লাহ পাক মানব-দানবের নেকী-বদীর যাবতীয় কার্যের তন্নতন্ন হিসাব লইয়া সুষ্ঠু বিচার করিবেন। হিসাবান্তে প্রত্যেকের আমল অনুযায়ী শাস্তি ভোগ করিবে অথবা পুরস্কৃত হইবে।
মুসলমানগণের কেয়ামত ও পুনরুথানের উপর বিশ্বাস আনিবার একমাত্র উদ্দেশ্য এই যে, উহারা ভীতি অন্তরে আনয়ন করতঃ যাবতীয় গোনাহর কার্য বর্জন করা এবং নেক কার্যে উৎসাহিত হওয়া। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় এই যে, আমাদের চলা-ফেরা কার্যকলাপ তাহার একেবারে বিপরীত। মনে হয়, না জানি কেয়ামত হইবে না! নিঃসন্দেহে কেয়ামত সংঘটিত হইয়া রহিয়াছে। এমন কি, প্রকৃত পক্ষে কেয়ামতের দিবস এত ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক যে, উহার কথা মনে পড়িলে শরীর শিহরিয়া উঠে।
আল্লাহ পাক বলেন-
‘কেয়ামত দিবস ভূ-কম্পন বাস্তবিকই ভীষণ বিভীষিকাময়।’
মানব জাতির বিশেষ করিয়া মুসলমান নর-নারীর একান্ত কর্তব্য এই যে, কেয়ামতের প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও ভয় রাখিয়া গাফলতি বর্জন করতঃ নিজ আমলের প্রতি বিশেষ ভাবে সতর্ক ও সাবধান হওয়া।
মো’মেন মুসলমানদের সতর্কের জন্য আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে কেয়ামতের লক্ষণসমূহ জ্ঞাত করাইয়া দিয়াছেন, যেন মো’মেন মুসলমান- গণ পূর্বেই কেয়ামতের লক্ষণ দেখিয়া হুশিয়ার ও সাবধান হইতে পারে।
কেয়ামতের পূর্বে যে সকল লক্ষণসমূহ প্রতীয়মান হইবে তাহা দুই প্রকার; যথা-আলামতে ছোগরা বা সাধারণ লক্ষণ ও আলামতে কোবরা বা বিশেষ লক্ষণ।
রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) মৃত্যুর পরবর্তী সময় হইতে হজরত ইমাম মাহদীর আত্ম প্রকাশের পূর্ব পর্যন্ত যে সকল আলামত বা লক্ষণ প্রকাশিত হইবে, তাহাকে বলা হয় আলামতে ছোগরা।
আর হজরত ইমাম মাহদী (রাঃ) হইতে কেয়ামতের পূর্বে হজরত ইস্রাফীলের সিংগায় ফুৎকারের পূর্ব পর্যন্ত যে সকল আলামত পরিলক্ষিত হইবে, উহাকে বলা হয় আলামতের কোবরা।
আলামতে ছোগরা : হাদীছ শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফরমাই- য়াছেন (আলামতে ছোগরা সম্বন্ধে বলিয়াছেন, এই সকল আলামত পরিলক্ষিত হইবে) : (১) কেয়ামতের পূর্বে লোকেরা সমবায় জাতীয় সম্পদকে (জনসাধারণের ফাণ্ড) নিজস্ব সম্পত্তি মনে করিয়া অবাধে খরচ করিবে। (২) এই রূপে কেয়ামতের পূর্বে লোকেরা আনামত-গচ্ছিত মালকে গণীমতের মালের ন্যায় হালাল ধারণা করিয়া অপহরণ করিবে। (৩) জাকাত আদায় করাকে জরিমানার ন্যায় ঘৃণিত কষ্টকর মনে করিবে। (৪) দুনিয়ার স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করিবে। (৫) স্বামী তাহার স্ত্রীর বাধ্যগত হইবে। (৬) কিন্তু তাহার সহিত দুর্ব্যবহার করিবে। (৭) দূর সম্পর্কীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠভাবে বন্ধুত্ব করিবে। (৮) কিন্তু পিতার সহিত অপব্যবহার করিবে। (৯) মসজিদে দুনিয়াদারির বিষয় লইয়া অধিক পরিমাণে গোলযোগ হইবে। (১০) ফাসেকগণ সমাজের নেতা হইবে। (১১) এই রূপে দুশ্চরিত্রবান ও নীচু বংশের লোকগণ নেতৃস্থান অধিকার করিবে। (১২) শত্রুর শত্রুতার ভয়ে তাহাকে সম্মান প্রদর্শন করিবে। (১৩) অভিনেত্রী ও গায়িকা বৃদ্ধি পাইবে এবং গান বাজনার বিভিন্ন উপকরণ আবিষ্কৃত হইবে। (১৪) জন-সমাজে প্রকাশ্য মদ্যপান হইবে। (১৫) পূর্বের লোকদিগকে বর্তমান লোকেরা ঠাট্টা-বিদ্রূপ ও ভর্ৎসনা করিবে।
উপরি উক্ত হাদীছটি কবিতায়ও অনুবাদ করিয়া দেওয়া গেল। ইহাতে পাঠকবৃন্দ এবং ওয়ায়েজীন বন্ধুদের স্মরণ রাখিতে সুবিধা হইবে
রাসূল বলেন, মানুষেরা দুনিয়াতে যেই ক্ষণে,
আপনা ধন ও মালের মত গণবে ‘পরের’ ধনে;
আমানতের মাল ভাবিবে যেমন গণীমত,
জাতাক দেয়া করবে মনে জরিমানার মত;
শিখবেনাক ইলমে কালাম দ্বীনের লাগি আর,
শিখবে কেবল মর্যদা হাসিল করিতে দুনিয়ার;
খসম হবে নফর যেন-বিবির তাবেদার,
কবরে ছেলে বেয়াদবী নাফরমানী মা’র;
দোস্ত ইয়ার আপন হবে পিতা হবেন পর,
মসজিদেতে মাচাবে শোর-ধ্বনি উঁচুতর;
ফাছেক ফাজের মানুষ নেতা হইবে কওমের,
হীন লোকেরা পরিচালক হইবে সমাজের;
এই ভয়েতে করবে কারুর উজ্জত ও সম্মান,
নইলে কখন হারাতে হয় তাহার হাতে মান;
প্রকাশ পাবে যন্ত্র বহু বাদ্য ও বাজনার,
গান গাহিয়া বেড়াইবে জমাত গাহিকার;
চলবে জাগায় জাগায় সদা শরাব খোরী পাপ,
পরের মানুষ আগের লোকে দানবে অভিশাপ;
প্রকাশ পাবে যখন ধরায় এ সব আলামত,
কঠিন বিপদ আসবে তখন জানিও আলবত;
ভীষণ ঝড়ো হাওয়া তখন বহিবে শন শন,
ধ্বসবে জমীন হইবে শুরু মহা ভূ-কম্পন;
ছুরাত যাবে বদল হয়ে কতক মানুষের,
আকাশ হতে হইবে তখন বৃষ্টি পাথরের;
দানা যেমন ঝরতে থাকে ছিড়লে পলিতার,
আসবে তেমন বিপদ কেবল একের পরে আর;
হাদীছে আরও আছে-(১৬) অত্যাচার ও ব্যভিচার (জেনা) অত্যধিক বৃদ্ধি পাইবে। (১৭) স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলে রেশমী বস্ত্র পরিধান করিবে। (১৮) শরম-লজ্জা সমূলে উঠিয়া যাইবে। (১৯) পুংমৈথনের অশ্লীল অভ্যাস বৃদ্ধি পাইবে। (২০) মিথ্যাবাদীতা চতুরতা বলিয়া বিবেচিত হইবে! (২১) অত্যাচার অধিক/মাত্রায় বাড়িয়া যাইবে। (২২) বিধর্মীগণ মুসলমানের উপর প্রাধান্য লাভ করিবে।
এতদ্ব্যতীর হাদীছ হইতে আরও বহু লক্ষণ প্রমাণিত হয়, কিন্তু পুস্তকের কলেবর অতিমাত্রায় প্রবৃদ্ধির শংকায় উহা পাঠকের খেদমতে পেশ করা হইল না।
আলামতে কোবরা : হজরত ইমাম মাহদী (রাঃ) হইতে হজরত ইস্রাফীলের (আঃ) সিংগায় ফুৎকারের পূর্ব পর্যন্ত যে সকল লক্ষণ প্রকাশিত হইবে, উহাকে ‘আলামতে কোবরা’ বলা হয়। নিম্নে তাহার মোটামুটি বর্ণনা দেওয়া হইল :
কবিতাকারে দেওয়া হইল-
পৌঁছবে যখন নিকট এসে ভীষণ কিয়ামত,
প্রকাশ পাইবে তখন বিশেষ কয়টি আলামতঃ
জাহির হবেন মাহদী ইমাম-খলিফা আল্লার,
বাহির হবে সেই দাজ্জাল কাফের দুরাচার।
ঈছা নবী আকাশ হতে নাজিল হবেন ফের,
ফিতনা শুরু করবে কওম ইয়াজুজ মাজুজের।
ভূমিকম্প হইবে ভীষণ ধ্বসবে জমিন তায়,
পশ্চিম গগন হইতে রবি হইবেগো উদয়।
দাব্বাতুল আরদ নামক আজব জানোয়ার,
বাহির হবে সাফা ফেটে মধ্য হতে তার।
(১) হজরত ইমাম মাহদী (রাঃ) আত্মপ্রকাশ করিবেন। (২) অভিশপ্ত দাজ্জাল বাহির হইবে। (৩) হজরত ঈসা (আঃ) নাজিল হইবেন। (৪) ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় বাহির হইবে। (৫) ভূমিকম্প হইবে। (৬) সূর্য পশ্চিম দিকে উদিত হইবে। (৭) দাব্বাতুল আরদ আত্মপ্রকাশ করিবে।
আলামতে কোবরার বিবরণ
এক।। ইমাম মাহদী : ইমাম মাহদী রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) বংশধর এবং হজরত ফাতেমার (রাঃ) সন্তানের মধ্যে হইতে হইবেন। তাঁহার মাতা- পিতার নাম রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) মাতা-পিতার নাম অনুযায়ী আবদুল্লাহ ও আমিনা থাকিবে। তাঁহার স্বভাব চরিত্র রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) স্বভাব চরিত্রের দৃষ্টান্ত স্বরূপ। বিশ্বজগতে মহাপ্রলয়ের দেড় শতাব্দী পূর্বে যখন দেশময় অশান্তি ও মুসলমানদের দুরবস্থা ঘটিবে, তখন তিনি ইমামরূপে আত্ম- প্রকাশ করিবেন।
পৃথিবীর শেষ শতাব্দীর পূর্বে মুসলমান খৃষ্টানদের সহিত নিরাপত্তা চুক্তিতে আবদ্ধ হইয়া মুসলমানগণ তাহাদের সহিত একত্রিত শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাত্রা করিবে এবং যুদ্ধে উভয় দল জয়লাভ করতঃ নিরাপদে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করিবে। এ সময় একজন খৃষ্টান তাহাদের ধর্মের ‘সলীব’ (ক্রুশ) উত্তোলন করিয়া বলিবে ‘সলীব’ (খৃষ্টান ধর্মের) জয় হইয়াছে। ইহাতে একজন ধর্মপ্রাণ মুসলমান রাগের মাথায় তাহাদের ‘সলীব’ ভাঙ্গিয়া ফেলিবে। ফলে খৃষ্টানগণ মুসলমানদের সহিত পূর্বের নিরাপত্তা চুক্তি ভঙ্গ করিবে এবং উভয় দলের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইবে। এই যুদ্ধে অধিকাংশ মুসলমান শহীদ হইবেন। অবশিষ্ট মুসলমানগণ মদীনা শরীফে আশ্রয় লইয়া আত্মরক্ষা করিবেন। এই সময় খৃষ্টানদের রাজত্ব মদীনার নিকটবর্তী খায়বর প্রান্তর পর্যন্ত প্রশারিত হইয়া পড়িবে। ফলে মুসলমানগণ মদীনার চতুর্দেওয়ালের সীমায় আবদ্ধ হইয়া পড়িবে।
এই দুরবস্থার সময় মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী ইমাম মাহদীর (আঃ) তালাশে বাহির হইবে। এদিকে মুসল- মানদের খলীফার ইন্তিকাল হইলে ইমাম মাহদীর (রাঃ) উপর খেলাফতের মহান দায়িত্বভার অর্পিত হয় না-কি, এই ভাবিয়া তিনি মদীনা শরীফ ত্যাগ করিয়া মক্কা শরীফে গমন করিবেন। এতদসত্ত্বেও মক্কা শরীফের কিছু সংখ্যক মুসলমান তাঁহার সন্ধান পাইয়া অনিচ্ছাকৃত ভাবে তাঁহাকে খেলাফতের বয়াত করিতে বাধ্য করিবেন। মকামে ইব্রাহীম এবং রোকনে ইয়ামানীর মধ্যবর্তী স্থানে তাহারা তাঁহার হাতে সর্বপ্রথম বয়াত করিবেন। তখন গাইবী আওয়াজে বলা হইবে-
।। হাজা খলীফাতুল্লাহিল মাহদী। ফাসমাউ লাহ্ অ-আতীউ।।
‘এই ব্যক্তিই আল্লাহর মনোনীত খলীফা মাহদী; কাজেই তোমরা তাঁহার কথা শ্রবণ কর এবং তাঁহার নির্দেশানুযায়ী কাজ কর।’
এই মাহদী, ইনি হলেন খলিফা আল্লার,
অনুগত হওগো সবাই হুকুম মান তার।
এই ঘটনার প্রাক্কালে ঘটনাচক্রে রমজান মাসে চন্দ্র ও সূর্য গ্রহণ একই সাথে হইয়া পড়িবে।
ইমাম মাহদী আত্মপ্রকাশ করিয়াছেন এই সংবাদ দিকে দিকে ছড়াইয়া পড়িবে। ইমাম মাহদীর আত্মপ্রকাশের সংবাদ পাইয়া নানা দেশের মুসলমানগণ তাঁহার সহিত যোগদান করিতে শুরু করিবে। এমন কি, শাম ও ইরাকের আউলিয়া-উল্লাহ ও আব্দালগণও তাঁহার হাতে বয়াত হইতে আরম্ভ করিবেন। খৃষ্টানগণ ইমাম মাহদীর আবির্ভাবের সংবাদে ক্ষিপ্ত হইয়া তাঁহার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করিবে। তাহাদের সর্বমোট আট লক্ষ চল্লিশ হাজার সৈন্য সম্মিলিত ৭০টি ঝাণ্ডা থাকিবে। খৃষ্টানগণ এই অসংখ্য সশস্ত্র বাহিনী লইয়া বিপুল বেগে অগ্রসর হইতে থাকিবে।
ওদিকে হারেস নামে এক ব্যক্তি ‘মা-ওয়ারাই নহর’ হইতে বিপুল সেনাবাহিনী লইয়া ইমাম মাহদীর সাহায্যার্থে অগ্রসর হইতে থাকিবে। তাহারা পথিমধ্যে কাফেরদেরকে হত্যা করিতে করিতে বিদ্যুৎ বেগে অগ্রসর হইবে।
এদিকে ইমাম মাহদীও খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নিমিত্ত মক্কা শরীফ হইতে রওয়ানা হইয়া মদীনা শরীফে পৌঁছিবেন। তথায় তিনি রাসূলুল্লাহর (ছঃ) মাজার শরীফ জিয়ারত করতঃ সিরিয়ার (শাম) দিকে অগ্রসর হইতে থাকিবেন। দামেস্কের নিকটবর্তী স্থানে পুনরায় খৃষ্টানদের সহিত তাঁহার ভীষণ যুদ্ধ আরম্ভ হইবে। যুদ্ধের পর যুদ্ধ চলিতে থাকিবে। সর্বশেষে মুস- লমানদের বীরত্বের নিকট তাহারা শোচনীয় ভাবে পরাজিত হইয়া এদিক সেদিক পলায়ন করিবে। অতঃপর ইমাম মাহদী খৃষ্টানদের কর্তৃক বিশৃঙ্খলিত দেশসমূহে পুনঃ শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপনের কার্যে লিপ্ত হইয়া পড়িবেন। তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীকে দেশের নানা স্থানে পাঠাইয়া শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপন করিবেন।
দুই।। দাজ্জাল : ইমাম মাহদীর (আঃ) আবির্ভাবের অনুমান ছয় কি সাত বৎসর পরে অভিশপ্ত দাজ্জাল বাহির হইবে। হাদীছ শরীফের মতে বুঝা যায় যে, দাজ্জাল ইয়াহুদী বংশের অন্তর্ভুক্ত হইবে। দাজ্জ্বাল সাধারণ লোকের মধ্যে ‘মাসীহ’ নামে খ্যাতি লাভ করিবে। মহা প্রলয়ের পূর্বে দাজ্জালের উৎপীড়নের ন্যায় ভীষণ বিপদ আর একটিও হইবে না। তাহার এক চক্ষু অর্ধ কানা বা ফলি পড়া থাকিবে। মাথার কেশ অত্যন্ত কোঁকড়ান হইবে। তাহার কপালে অদৃশ্যমান ‘কাফ-ফা-রা’ অর্থাৎ কাফের লেখা থাকিবে। প্রকৃত মো’মেন মুসলমান ব্যতীত অন্য কেহ উক্ত লেখা দেখিয়া অনুমান করিতে পারিবে না।
এক চোখেতে আন্ধা আধেক দাজ্জাল বদকার, মাথার যে চুল হাবশী সম কোঁকড়া অতি তার। ‘কাফ-ফা-রা’ কাফের তাহার কপাল পরে লেখা, কেবল মুমিন লোকের চোখে যাইবে ইহা দেখা।
দাজ্জাল প্রথমতঃ ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে আবির্ভূত হইবে এবং সেখানে নবুয়তী দাবী করতঃ ভীষণ ধরণের ফেতনা ফাসাদ আরম্ভ করিবে। অতঃপর সেখান হইতে ইস্পাহান চলিয়া আসিবে। এখানে ইয়াহুদি সম্প্রদায় হইতে প্রায় সত্তর হাজার ইয়াহুদি তাহার দলভুক্ত হইবে। দাজ্জাল ইস্পাহান থাকিয়াই খোদায়ী দাবী করিয়া বসিবে। তৎপর পৃথিবী ব্যাপী তাহার ফেতনা ছড়াইয়া পড়িবে।
আল্লাহ পাক মানব জাতিকে পরীক্ষা করিবার জন্য তাহাকে এমন অলৌকিক শক্তি দান করিবেন যে, সে মূর্দাকে জিন্দা করিতে সমর্থ হইবে। সুলাইমান নবীর তখতের ন্যায় বিদ্যুৎ বেগে সে বায়ুমণ্ডল অতিক্রম করিয়া নিমিষের মধ্যে নানা দেশ ভ্রমণ করিতে সক্ষম হইবে।
এতদ্ব্যতীত তাহার সংগে একটি বিরাট অগ্নিকুণ্ড থাকিবে, সে উহাকে দোজখ বলিয়া আখ্যা দিবে এবং একটি অতীব সুন্দর ফুলের বাগানও থাকিবে, তাহাকে সে বেহেশত বলিয়া লোকদিগকে প্রবঞ্চনা দিবে। প্রকৃতপক্ষে তাহার অগ্নিকুণ্ড বেহেশতের শান্তির নমুনা হইবে এবং ফুল বাগিচা হইবে অগ্নির ন্যায় যন্ত্রণাদায়ক। তাহার কথা যে শিরোধার্য করিবে, তাহাকে উক্ত কথিত শান্তিদায়ক ফুল বাগিচার নামে অগ্নিময় যন্ত্রণায় নিক্ষেপ করিবে এবং তাহার কথা অমান্যকারীদের যন্ত্রণাদায়ক অগ্নিকুণ্ডের নামে বেহেশতময় শান্তিপূর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করিবে।
এক পাশে তার ফুলের বাগান শোভিবে সুন্দর,
আরেক ধারে অনল কুণ্ড জ্বলবে ভয়ঙ্কর।
ফুল বাগানে বলবে বেহেশত দাজ্জাল কাফের;
সেইযে বেহশত দান করিবে তাহার মুরিদদের।
কিন্তু মহান আল্লা পাকের কি কুদ্রতের ধারা,
এই বেহেস্তে দোজখ সম আজাব পাবে তারা।
এই অনল কুণ্ডে মুমিনদের ফেলবে কাফের হায়,
কিন্তু তারা জান্নাতী সুখ লাভ করিবে তায়।
দাজ্জালের সবচেয়ে বড় ফেতনা হইল-সে মাঝে-মাঝে মানুষের নিকট উপস্থিত হইবে-’আমি যদি তোমাদের মৃত জানোয়ার সমূহকে পুনঃ জিন্দা করিয়া দিতে পারি, তবে কি তোমারা আমাকে খোদা বলিয়া স্বীকার করিবে?’ তখন দুর্বল ঈমানদার মুসলমানগণ বলিয়া উঠিবে, ‘অবশ্যই’। তখনই তাহার অনুচর ভূত-প্রেত শয়তানেরা জানোয়ারের আকৃতি ধারণ করিয়া তাহাদের সম্মুখে হাজির হইবে।
অনুরূপ, দাজ্জাল কতক লোকের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিবে- তোমাদের মৃত মাতা-পিতাকে যদি জীবিত করিয়া দেখাইতে পারি, তবে আমাকে খোদা বলিয়া মানিবে তো?’ তখন তাহারা উত্তর করিবে, ‘আলবত’। দাজ্জালের অনুসরণকারী শয়তানেরা তখনই তাহাদের মাতা- পিতার আকৃতি ধারণ করিয়া তাহাদের নিকট উপস্থিত হইবে। দাজ্জালের এইরূপ দুষ্ট প্রকৃতির ক্রিয়া-কলাপ দেখিয়া অধিকাংশ দুর্বল ঈমানদারগণ তাহাদের পবিত্র ঈমান হারাইয়া ফেলিবে।
দাজ্জাল এই ভাবে নানা দেশ ঘুরিয়া ফিরিয়া ফেতনা ফাসাদ করিতে থাকিবে। অবশেষে মক্কা শরীফেও হানা দিতে আসিবে। কিন্তু মক্কা শরীফের রক্ষক ফেরেশতাগণ কর্তৃক বিতাড়িত হওয়ায় সেখান হইতে সে মদীনা শরীফের দিক রওয়ানা হইবে। মদীনা শরীফে যাইয়া তথায় প্রবেশ করিতে না পারিয়া মদীনার নিকটবর্তী ওহোদ পাহাড়ের পশ্চাৎ ভূমিতে অবতরণ করিবে। এই সংবাদ পাইয়া মদীনা শরীফের তৎকালীন একজন শ্রেষ্ঠ ঈমানদার ব্যক্তি দাজ্জালের নিকট উপস্থিত হইয়া বলিবেন : রাসূল- ল্লাহর (ছঃ) ভবিষ্যৎ ঘোষণা অনুযায়ী আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, তুমি সেই দুরাচার পাপী দাজ্জাল।
ইহা শুনা মাত্র দাজ্জাল তাহার অনুচরবৃন্দকে বলিবে-যদি আমি এই ব্যক্তিকে হত্যা করিয়া পুনঃ জিন্দা করিতে পারি, তবে কি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকিবে যে, আমি খোদা নই?’ তাহারা বলিবে-’নিশ্চয় না।’ তৎপর সে উক্ত ব্যক্তিকে হত্যা করতঃ পুনঃ জীবিত করিবে এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা করিবে- ‘বলতো, আমি খোদা কিনা?’ তখন মো’মেন ব্যক্তি বলিবেন-’কখনই না, তুমি যে দাজ্জাল ইহাতে আমার কোন সন্দেহ নাই।’ আবার দাজ্জাল তাহাকে হত্যা করিতে চেষ্টা করিবে, কিন্তু শত চেষ্টার পরও তাহাকে হত্যা করিতে পারিবে না। অতঃপর দাজ্জাল সিরিয়া দেশের অন্তর্গত দামেস্কের দিকে রওয়ানা হইবে।
তিন।। ঈসা নবীর নাজিল : পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, ইমাম মাহদী (আঃ) খৃষ্টান কর্তৃক বিশৃঙ্খলিত দেশসমূহে শান্তি-শৃঙ্খলার কার্যে ব্যাপৃত থাকিবেন। অভিশপ্ত দাজ্জাল মদীনা হইতে দামেস্কের দিকে রওয়ানা হইয়াছে এই সংবাদ শুনিয়া মাহদী কুস্তুন্তুনিয়া হইতে দামেস্কের পথে রওয়ানা হইবেন। মাহদী দাজ্জালের পূর্বেই দামেস্কে পৌঁছাইয়া তাহার সঙ্গে যুদ্ধের প্রস্তুতি আরম্ভ করিবেন।
একদা দামেস্কের বাইতুল মোকাদ্দাস মসজিদে আছরের আজান হইলে সকলে নামাজের জন্যে প্রস্তুত হইতে থাকিবে। এমনি এক সময়ে হজরত ঈসা নবী দুইজন ফেরেশতার কাঁধে ভর করিয়া দুইখানা জাফ্রানী রং-এর কাপড় পরিহিত অবস্থায় বাইতুল মোকাদ্দাস মসজিদের পূর্বদিকের মিনারায় নাজিল হইবেন।
ঈসা নবী নাজিল হইলে মাহদী (আঃ) তাঁহাকে আছরের নামাজের ইমামতীর জন্য অনুরোধ করিবেন। কিন্তু তিনি অস্বীকার করিয়া বলিবেন-
‘না, আল্লাহ পাক উম্মতে মোহাম্মদিয়াকে সকল উম্মতের উপর বিশেষ সম্মান দান করিয়াছেন, কাজেই আপনাদের মধ্য হইতেই একজন ইমাম হইবেন—আমি হইব তাহার মুক্তাদী।’
ঈসাকে ক’বেন মাহদী ইমাম হইবার,
নবী ঈসা এই ভাবেতে জবাব দিবেন তার :
আপনাদেরি হইতে কেহ ইমাম হতে যান,
সব উম্মতের শ্রেষ্ঠতম উম্মা’ মুসলমান।
হযরত ঈসা নবী মোক্তাদি হইয়া ইমাম মাহদীর পিছনে আসরের নামাজ আদায় করিবেন। নামাজান্তে ইমাম মাহদী তাঁহাকে মুসলিম- সেনার নেতৃত্ব গ্রহণের জন্য অনুরোধ জানাইবেন। এইবারেও তিনি অস্বীকার করিয়া বলিবেন- ‘আমি কেবল অভিশপ্ত দাজ্জালকে হত্যা করিতে নাজিল হইয়াছি, অন্য কোন উদ্দেশ্য নাই আমার।’
অতঃপর ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে মুসলিম সেনাবাহিনী এবং হযরত ঈসা নবী যুদ্ধের ময়দানে অবতরণ করিবেন। মুসলিম সেনাবাহিনী এবং হযরত ঈসা নবীর ভয়ে দাজ্জাল পলায়ন করিবে।
হযরত ঈসা নবীকে আল্লাহ্ পাক এত অলৌকিক ক্ষমতা দান করিবেন যে, চক্ষের দৃষ্টির সীমা পর্যন্ত তাঁহার নিঃশ্বাসের ঘ্রাণে সমস্ত কাফের নিঃশেষ হইয়া যাইবে। এইভাবে তিনি অধিকাংশ কাফেরকে ধ্বংস করিয়া ফেলিবেন, অবশিষ্ট কাফেররা ছত্রভঙ্গ হইয়া এদিক সেদিক পলায়ন করিবে।
তৎপর হযরত ঈসা নবী দাজ্জালের তালাশে বাহির হইবেন। তালাশ করিতে করিতে ‘লুদ্দ’ নামক স্থানে দাজ্জালকে পাইয়া তিনি তাহাকে হত্যা করিবেন।
রুহু উল্লা খোদার প্রিয় ঈসা পয়গাম্বর,
আল্লা তারে রাখছেন তুলে চৌথা আকাশ পর।
কিয়ামতের পূর্বে তিনি নাজিল হবেন ফের,
তার হাতেই খতম হবে জীবন দাজ্জালের।
দাজ্জালকে হত্যা করিয়া হযরত ঈসা নবী ও হযরত ইমাম মাহদী দাজ্জাল কর্তৃক লুণ্ঠিত ও বিশৃঙ্খলিত দেশসমূহ পরিভ্রমণ করিয়া দেশময় লোকদিগকে সান্ত্বনা ও আল্লাহর অনুগ্রহের দিকে আহ্বান করিবেন এবং সকল স্থানে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপনের ব্যবস্থা করিবেন।
হযরত ইমাম মাহদী চল্লিশ বৎসর বয়ঃক্রমে আত্মপ্রকাশ করিবেন এবং সাত কি নয় বৎসর সুষ্ঠুরূপে খেলাফত আঞ্জাম দিয়া অবশেষে সাতচল্লিশ কি উনপঞ্চাশ বৎসর বয়সে পরলোক গমন করিবেন। মাহদীর মৃত্যুর পরে হজরত ঈসা নবী সমস্ত মুসলমান জাহানের খেলাফতের মহান দায়িত্বভার গ্রহণ করিবেন এবং সুষ্ঠুরূপে রাজ্য পরিচালনা করিবেন।
চার।। ইয়াজুজ মাজুজ : ইমাম মাহদীর মৃত্যুর পর সমস্ত মুসলমান হযরত ঈসা নবীর নেতৃত্বাধীনে মহাসুখে কাল যাপন করিতে থাকিবে। এমন সময় ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় বাহির হইবে। উহারা হযরত নূহ নবীর পুত্র ইয়াফেসের বংশধর। তাহারা বর্তমানে সপ্ত মহাদেশের বাহিরে পৃথিবীর উত্তর-পূর্ব কোণে মহাসাগর ও চতুর্দিকে বেষ্টিত পর্বতমালার মধ্যে বসবাস করিতেছে। উক্ত পর্বতমালার মধ্যে দুইটি বিশাল পর্বত পশ্চিম ও পূর্বদিক হইতে প্রাচীরের ন্যায় দণ্ডায়মান। বহুকাল পূর্বে এই দুই পর্বতের মধ্যভাগে মাত্র দুইটি গিরিপথ ছিল। ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় সেই গিরিপথ দিয়া বাহিরে আসিত এবং নিকটস্থ লোকদের উপর ভীষণ অত্যাচার, মারপিট ও লুণ্ঠন করিয়া চলিয়া যাইত। তৎকালীন ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ ‘জুলকারনাইন’ যখন সমস্ত পৃথিবী জয় করিয়া সেই স্থানে গিয়া পৌঁছিলেন, তখন তিনি সেই দেশের অধিবাসীদের অনুরোধে উক্ত দুই পর্বতের মধ্যস্থ গিরিপথ পর্বতের চূড়া পর্যন্ত উচ্চ এবং ৬০ গজ প্রস্থাকার লৌহ নির্মিত প্রাচীর দ্বারা বন্ধ করিয়া দিলেন। সেই হইতে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় আর লোকালয়ে আসিয়া অত্যাচার ও উৎপীড়ন করিতে পারে না।
দাজ্জালকে হত্যা করার পর হযরত ঈসা নবী মানুষদিগকে লইয়া মহাসুখে কালাতিপাত করিতে থাকিবেন। এমন সময় আল্লাহ্ পাক হযরত ঈসা নবীর প্রতি অহী নাজিল করিবেন- ‘হে ঈসা! অমিতবিক্রম শক্তিশালী বিপুল সংখ্যার একটি সম্প্রদায়কে বাহির করিয়াছি। যাহাদিগকে বাধা দিবার শক্তি কোন মানুষের নাই; কাজেই তুর পাহাড়ের উচ্চশৃঙ্গে যাইয়া আশ্রয় গ্রহণ কর।
এতদশ্রবণে হযরত ঈসা নবী তাঁহার প্রজাবৃন্দ ও অনুচরসহ পাহাড়ে চলিয়া যাইবেন।
হিংস্রজাতি ইয়াজুজ-মাজুজ দুষ্ট অতিশয়,
ভেঙ্গে দেয়াল সিকান্দারের ঢুকবে লোকালয়।
লোকালয়ে ঢুকেই ভীষণ করবে জুলুম তারা,
সেই জুলুমে সকল মানুষ হইবে দিশেহারা।
এদিকে ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায় ভীষণবেগে পৃথিবীর চতুর্দিকে ছড়াইয়া পড়িবে এবং মানুষের উপর অত্যাচার করিতে আরম্ভ করিবে। এ সংকটময় মুহূর্তে হযরত ঈসা নবী তাঁহার অনুচরবৃন্দসহ বহুদিন পর্যন্ত উক্ত পাহাড়ে অবরুদ্ধভাবে অন্নকষ্টে কালযাপন করিতে থাকিবেন। অবশেষে নিরুপায় হইয়া আপন অনুচরসহ তিনি ইয়াজুজ-মাজুজের ধ্বংসের জন্যে খোদার দরবারে দোয়া ও মোনাজাত করিবেন। ইহাতে আল্লাহ্ পাকের হুকুমে ইয়াজুজ-মাজুজগণ ‘নগফ’ নামক এক প্রকার ভীষণ রোগে আক্রান্ত হইয়া একরাত্রির মধ্যেই কুকুর ছানার ন্যায় মরিয়া নির্মূল হইবে।
অতঃপর ঈসা নবী তাঁহার অনুচরসহ পাহাড় হইতে নিম্নে অবরণ করিবেন। কিন্তু ইয়াজুজ-মাজুজ সম্প্রদায়ের শবদেহের দুর্গন্ধে তাহাদের জীবন ধারণ অসম্ভব হইয়া দাঁড়াইবে। এইবারে তিনি পুনঃ আল্লাহর দরবারে দোয়া ও মোনাজাত করিবেন-’ইয়া ইলাহী! ইহাদের দুর্গন্ধে জীবনধারণ অসম্ভব।’ ইহাতে আল্লাহ্ পাকের হুকুমে এক প্রকার বড় বড় পাখী আসিয়া তাহাদের মৃতদেহ লইয়া যাইবে। অতঃপর চল্লিশ দিন যাবৎ মুষলধারে বৃষ্টি হইতে থাকিবে এবং সমস্ত স্থান পরিষ্কার হইয়া যাইবে। ইহার কিছুকাল পর পর্যন্ত দেশময় শস্য বাড়িয়া যাইবে। কষ্ট বলিতে আর কিছু থাকিবে না। ধন-সম্পত্তি এত বৃদ্ধি পাইবে যে, যাকাত, দান-ছদকা লওয়ার মত কাহাকেও খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। এসময় প্রজাগণও হইবে খুবই খোদাভীরু-সকলেই আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে থাকিবে মশগুল।
হযরত ঈসা নবী নাজিল হইয়া পূর্ণ চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত জীবিত থাকিবেন! এই সময় তিনি শাদী বিবাহ করিবেন এবং তাঁহার সন্তান- সন্ততিও পয়দা হইবে। অতঃপর তিনি ইন্তিকাল করিবেন। রাসূলুল্লাহর (সঃ) রওজা মোবারকে তাঁহার দাফন করা হইবে। হযরত ঈসা নবীর পর হইতে আবার লোকেরা বিলাসিতায় মগ্ন হইয়া পড়িবে। অবশ্য তাঁহার মৃত্যুর পরেও একজন ন্যায়পরায়ণ খলিফা হইবেন। উক্ত খলিফার মৃত্যুর পরে দেশময় পুনঃ শিরক বিদায়াৎ আরম্ভ হইয়া যাইবে।
পাঁচ।। ভূ-কম্পন : হযরত ঈসা নবীর মৃত্যুর পরে তাঁহার পরবর্তী মানুষগণ পুনঃ অত্যধিক পাপ কার্যে লিপ্ত হইয়া পড়িবে। ফলে আল্লাহর হুকুমে ভূ-কম্পনে প্রাচ্য পাশ্চাত্য এবং আরবদেশ এই তিনটি স্থান ধ্বসিয়া যাইবে। ইহাতে কাফের এবং আল্লাহর অস্তিত্বের অস্বীকার- কারীগণ ধ্বংস হইয়া যাইবে।
অতঃপর এক প্রকার দুর্গন্ধময় ধূয়া বাহির হইয়া চতুর্দিক অন্ধকারাচ্ছন্ন করিয়া ফেলিবে। এই ধূয়া চল্লিশ দিবস ব্যাপী স্থায়ী হইবে। ইহাতে মুসলমানগণ কেবল সর্দি-কাশি ইতাদি অনুভব করিবে, কিন্তু কাফেরগণ বেহুশ হইয়া জমীনে পড়িয়া থাকিবে। চল্লিশ দিবস পরে ধূয়া বিলীন হইয়া যাইবে।
ছয়।। পশ্চিমে সূর্যোদয় : ভূ-কম্পন শেষ হইতে না হইতেই আবার মানুষের উপর নূতন এক মুছীবত আসিয়া উপস্থিত হইবে। ইহাতে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলেই ব্যস্ত হইয়া পড়িবে। নাবালেগ শিশু-সন্তানের ক্রন্দনের রোলে চতুর্দিকে উঠিবে হাহাকার ধ্বনি। সকলেই ব্যস্ত হইয়া হায় হায় করিতে থাকিবে। এইরূপে ৪৮/৫০ ঘন্টা রাত্রি অবসানের পরে পশ্চিমাকাশ হইতে ক্ষীণ জ্যোতি লইয়া সূর্যোদয় ঘটিবে। সকলেই এই অবস্থা দেখিয়া আতঙ্কগ্রস্ত হইয়া তওবা করিতে চেষ্টা করিবে। কিন্তু আফসোস! তখন আর তওবা কবুল হইবার সময় থাকিবে না। তওবার দরজা ইতিপূর্বেই বন্ধ হইয়া যাইবে। অতঃপর আবার যথারীতি দিবারাত্র চলিতে থাকিবে।
পশ্চিম হইতে রবি উদিবে যখন,
তওবার দরজা বন্ধ হইবে তখন।
সাত।। দাব্বাতুল আরদ : পশ্চিম দিক হইতে সূর্যোদয়ের কিছুদিন পরে ভীষণ ধরনের ভূমিকম্প আরম্ভ হইবে। ইহাতে ‘সাফা’ নামক পাহাড় ফাটিয়া মাটি হইতে হঠাৎ ‘দাব্বাতুল আরদ’ নামক এক অদ্ভুত জন্তু আত্মপ্রকাশ করিবে। দাব্বাতুল আরদের অন্যান্য জন্তুর সাথে কোনরূপ একক সামঞ্জস্য থাকিবে না, উহার মুখমণ্ডল মানুষের ন্যায়, পদদ্বয় উটের ন্যায়, গ্রীবা ঘোড়ার ন্যায়, লেজ গরুর লেজের ন্যায়, পাছা এবং শিং হরিণের পাছা শিং-এর ন্যায় এবং হাত বানরের হাতের ন্যায় থাকিবে। এই অদ্ভূত জন্তুটি মানুষের ন্যায় কথাবার্তা বলিতে পারিবে। মানুষের সাথে মধুর ভাষায় কথা বলিবে। তাহার এক হাতে হযরত মূসা নবীর লাঠি এবং অন্য হাতে হযরত সুলাইমান নবীর আংটি থাকিবে। তাহার গতি হইবে অত্যন্ত দ্রুত। কেহ তাহাকে দৌড়াইয়াও অনুসরণ করিতে পারিবে না। আর কেহ তাহার হইতে পালাইতেও পারিবে না। সে ঈমানদার ব্যক্তিদিগের কপালে হযরত মূসা নবীর আছা দ্বারা রেখা টানিয়া যাইবে ফলে তাহাদের চেহারা অত্যন্ত উজ্জ্বল হইবে। অপরদিকে বেঈমানদের নাকে হযরত সুলাইমানের (আঃ) আংটি ছোয়াইয়া যাইবে, এতে তাহাদের চেহারা কাল বিবর্ণ হইয়া যাইবে। অতঃপর দাব্বাতুল আরব হইয়া যাইবে অদৃশ্য।
ভূমিকম্পে ফেটে গিয়ে সাফার পাহাড়,
বের হবে আবজ এক জানোয়ার।
হইল তাহার নাম দাব্বাতুল আরদ,
ফরক করিবে সেই নেক আর বদ।
ইহার পরে আল্লাহ পাক উত্তর পান্ত হইতে শান্তি শীতল মলয় হাওয় প্রবাহিত করিবেন। এই হাওয়া প্রবাহে মো’মেনদের কাঁধের নিম্নাংশে একপ্রকার বেদনার সৃষ্টি হইবে। তাহাতে তাহাদের মৃত্যু হইবে। মোমেনদিগের মৃত্যু হইলে কাফ্রী কাফেরদের প্রাধান্য হইবে। তখন সকলেই আল্লাহকে ভুলিয়া যাইবে। এমন কি, পৃথিবীতে ‘আল্লাহ্’ বলার মত একটি লোকও জিন্দা থাকিবে না। অতঃপর দক্ষিণ প্রান্ত হইতে একখণ্ড অগ্নি উত্তোলিত হইয়া মানুষদিগে তাড়াইতে থাকিবে। মানুষগণ অগ্নির ভয়ে সিরিয়া (শাম) দেশের দিকে পলায়ন করিতে থাকিবে। আগুন মানুষদিগকে শাম দেশে পৌঁছাইয়া বিলুপ্ত হইয়া যাইবে। ইহা কেয়ামতের পূর্বেকার সর্বশেষ আলামত।
পশ্চিম দিকে সূর্যোদয়ের পর হইতে আগুন উঠিবার পূর্ব পর্যন্ত মোট ১২০ বৎসর অতিবাহিত হইবে। ইহার তিন-চারি বৎসর পরে আল্লাহর হুকুমে ইস্রাফিল ফেরেশতা সিংগায় ফুৎকার দিবেন-পরকাল বা কেয়ামত অনুষ্ঠিত হইবে।
ইস্রাফীলের সিংগার ফুৎকার
পূর্বে বলা হইয়াছে, হজরত ইস্রাফীলের (আঃ) চারিখানা ডানা আছে। ডানা চারিখানা এত বড় যে, উহার একখানা পৃথিবীর পশ্চিম আর অপ- রখানা পূর্ব প্রান্ত জুড়িয়া বিস্তৃত; আর অন্য দুইখানার মধ্যে একখানা বিছাইয়া অপরখানার দ্বারা সমস্ত শরীর আবৃত করিয়া থাকেন। আল্লাহ্ পাক তাঁহাকে এত সম্মান ও শক্তির অধিকারী করিয়াছেন যে, তিনি সর্বদা আল্লাহ্ পাকের পবিত্র আরশ বহন করিয়া থাকেন। এতদসত্ত্বেও আল্লাহকে এত বেশী ভয় করেন যে, তাঁহার ভয়ে তিনি জড়সড় হইয়া একেবারে ক্ষুদ্র চড়ই পাখির ন্যায় হইয়া যান।
হজরত ইস্রাফীল (আঃ) আল্লাহর পবিত্র আরশের এত নিকটে অবস্থান করিয়া থাকেন যে, অন্য কোন ফেরেশতা আরশের এতটা নিকটবর্তী হইতে সাহস পান না; তাহা সত্তেও হজরত ইস্রাফীল ও আরশের মধ্যে সপ্ত পর্দা দ্বারা আবৃত। প্রত্যেকটি পর্দার মধ্যে আবার বহু শত মাইল রাস্তার ব্যবধান রহিয়াছে।
জিব্রাঈল ফেরেশতা আল্লাহর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। তিনিও হজরত ইস্রাফীলের (আঃ) ন্যায় আরশের এতটা টিকটবর্তী হইতে পারেন নাই। হজরত জিব্রাঈল (আঃ) এবং ইস্রাফীলের (আঃ) মধ্যে বহু সংখ্যক পর্দার দূরত্ব রহিয়াছে। ইহাতে স্পষ্ট বুঝা যায়, হজরত জিব্রাঈল (আঃ) আল্লাহ পাকের আরশ হইতে বহুদূরে অবস্থান করেন।
লাউহে মাহফুজ : লাউহে মাহফুজ নামে আল্লাহ পাকের একখানা তকদীর নামা’ (মানব জাতির অতীত’, বর্তমান ও ভবিষ্যতের যাবতীয় কার্য লিখিত বস্ত) আছে। লাউহে মাহফুজকে আল্লাহ পাক শ্বেত বর্ণের অমূল্য পরশমণি দ্বারা তৈয়ার করিয়াছেন। এই লাউহে মাহফুজ সপ্ত আসমান ও জমীন হইতেও বৃহৎ। উহা আল্লাহর পবিত্র আরশের সংগে ঝুলান রহিয়াছে। উহাতে পৃথিবীর সৃষ্টির পূর্ব হইতে শেষ বিচারের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহর সৃষ্ট জীবের যাবতীয় মঙ্গল কার্যাদি লিপিবদ্ধ রহিয়াছে।
সিংগা : মহররম চাঁদের দশই তারিখে শুক্রবার সকল মানুষ নিজ নিজ কার্যে ব্যস্ত থাকিবে, হঠাৎ আল্লাহর নির্দেশে ইস্রাফীল (আঃ) সিংগায় ফুক দিবেন। প্রথমতঃ সিংগার ফুৎকার মৃদুস্বরে বাজিয়া উঠিবে, কিন্ত এক সংগে সর্বস্থানের মানুষ তাহা শুনিতে পাইবে। তৎপর আস্তে আস্তে সিংগার ধ্বনি বজ ও বিকট রূপ ধারণ করিবে। এই সিংগার ফুৎকারে আসমান জমীন এক কথায় যাবতীয় মাখলুকাত ধ্বংস হইয়া যাইবে। আল্লাহ এই সিংগার ফুৎকারের অধিকার একমাত্র ইস্রাফীলকেই দান করিয়াছেন। তিনি নিজের দক্ষিণ উরুর উপর সিংগা রাখিয়া এবং সিংগার মুখে তাহার মুখ লাগাইয়া অবনত মস্তকে কান পাতিয়া সর্বদা অপেক্ষায় আছেন আল্লাহর আদেশ প্রাপ্তির প্রতীক্ষায়। যখনই আল্লাহর নির্দেশ আসিবে, তখই সিংগার ফুৎকারে সমস্ত সৃষ্ট-জীব ও যাবতীয় পদার্থ ধ্বংস করিয়া ফেলিবেন।
রাসূলুল্লাহ (ছঃ) ফরমাইয়াছেন- ‘আমি খোদার কসম করিয়া বলিতেছি, যে দিন ইস্রাফীল আল্লাহর নির্দেশ মতে সিংগার ফুৎকার হাঁকিবেন, সেই দিন নিঃসন্দেহে কেয়ামত অনুষ্ঠিত হইয়া যাইবে।’
ইহা এত তাড়াতাড়ি অনুষ্ঠিত হইবে যে, মানুষ আহারকালীন যে লোকমা মুখে পুড়িয়াছে, সেই লোকমা (গ্রাস) গিলিতে পর্যন্ত সময় পাইবে না। এমনি ভাবে কাপড় পরিধানকারী কাপড় পরিধান আরম্ভ করিলে তাহাও পরিধান করিতে সময় পাইবে না। শুধু কি তাই, পানি পান করার নিমিত্ত পানি মুখে লইয়া থাকিলেও তাহা পান করিতে সুযোগ পাইবে না।
হজরত ইস্রাফীল (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে তিনবার সিংগায় ফুৎকার দিবেন। প্রথম ফুৎকারকে ‘নাফখায়ে ফাজা’ দ্বিতীয় ফুৎকারকে ‘নাফখায়ে সায়েকা’ ও তৃতীয় ফুৎকারকে ‘নাফখায়ে বায়াস’ বলা হয়। যখন এই নশ্বর বিশ্ব-জগতের আয়ু শেষ সীমায় আসিয়া উপনীত হইবে, তখন হজরত আজাঈল (মালাকুল মউত) তাঁহার বিশাল হস্তদ্বয় সপ্ত আকাশ- ভূমিতে বিস্তৃত করিয়া যাবতীয় জীব-জন্তুর রূহ কবজ করিয়া ফেলিবেন। কিন্তু উক্ত সময়ের পূর্ব পর্যন্ত ইবলীস (শয়তান) এবং প্রধান চারিজন ফেরেশতার রূহ কবজ করিবেন না।
আল্লাহ পাক বলেন-
‘যেদিন সিংগায় ফুৎকার দেওয়া হইবে, সেদিন আসমান জমীনের কোন জীব-জন্তুর চৈতন্য থাকিবে না, তবে আল্লাহ যাহাদের চৈতন্য রাখিতে ইচ্ছা করেন।’
ছাহাবী আবু হুরাইরা বলেন, সিংগার মোট চারটি শাখা থাকিবে। তন্মধ্যে দুইটি শাখা পূর্ব ও পশ্চিমদিক জুড়িয়া বিস্তৃত। অন্য দুইটির মধ্যে একটি জমীনের নীচে এবং অপরটি সপ্ত আসমানের উপর রহিয়াছে। যাবতীয় আত্মার সংখ্যানুযায়ী সিংগার মধ্যে এক একটি ছিদ্র রহিয়াছে। এই সকল ছিদ্রের মধ্যে চারি শ্রেণীর আত্মা রাখিবার জন্য আবার চারটি স্তর আছে, একটি স্তর শুধু নবী ও রাসুলগণের আত্মা রাখিবার জন্য এবং অন্য তিনটির মধ্যে একটিতে মানুষের, একটিতে জিনের ও অপর একটিতে জানোয়ারের আত্মা রাখিবার জন্য নির্ধারিত রহিয়াছে।
নাফখা বা সিংগায় ফুৎকার
প্রথম।। নাফখায়ে ফাজা : দুনিয়ার আয়ু যেদিন শেষ হইয়া আসিবে এবং নাফখায়ে ফাজা বা সিংগা বাজিয়া উঠিবে, সেদিন আসমান জমীনের যাবতীয় সৃষ্ট জীবের মধ্য এক ভীষণ রকমের আতঙ্কের সৃষ্টি হইবে। সমস্ত শিলাযুক্ত পাহাড়-পর্বত ছিন্ন-বিছিন্ন হইয়া টুকরা টুকরা হইয়া ধুনিত তুলার ন্যায় বায়ুমণ্ডলে উড়িতে থাকিবে। সেদিন আসমান সমূহ ফাটিয়া পড়িতে আরম্ভ করিবে এবং পানির উপর নৌকা যেরূপ তরংগের আঘাতে দুলিতে থাকে, অনুরূপ মাটিরও সেই দিন কম্পন আরম্ভ হইবে। এভাবে গর্ভবতী স্ত্রীলোকের গর্ভের সন্তান মাটিতে পড়িয়া যাইবে এবং বন্য পশুরা ভয়ে আসিয়া মানুষের মধ্যে জড় হইবে। সেদিন চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ ও নক্ষত্রপুঞ্জ ঝরিয়া মাটিতে পরিতে আরম্ভ করিবে। প্রথম সিংগার ফুৎকার শুনিয়াই শয়তান পলায়ন করিবার নিমিত্ত চতুর্দিকে ছুটাছুটি করিতে আরম্ভ করিবে। চন্দ্র-সূর্য অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া যাইবে, উহাতে আলো বলিতে কিছুই থাকিবে না।
কেয়ামতের ভূ-কম্পন হৃদয় বিদায়ক,
হইয়া যাইবে সকল অস্থির ভয়ানক।
সিঙ্গা হাতে ইস্রাফিল আছেন অপেক্ষায়,
কোন সময়ে ফুকতে খোদা হুকুম দিবেন তায়।
সময় হইলেই হইবে তখন নির্দেশ আল্লাহর :
‘হে ইস্রাফিল, দাওগো এবার সিঙ্গাতে ফুৎকার!
আদেশ পেয়ে ফুৎকারিবেন সিঙ্গা ভয়ঙ্কর,
ক্রমেই ধ্বনি ভীষণ হতে হবে ভীষণতর।
সেই দাঁপটে ভাংবে আকাশ টুটবে তারা যত,
পাহাড়গুলো উড়বে তাতে ধুনা তুলার মত।
মানব-দানব, জীব-জানোয়ার কেউ রবেনা আর,
এ পৃথিবীর গ্রহ-রবি সব হবে মিছমার।
ধ্বংস হবে বিশ্ব জাহান সৃষ্টি হবে লয়,
রবেন শুধু একা খোদা অনন্ত অব্যয়।
নাফখায়ে ফাজা বা প্রথম সিংগার ফুৎকার দীর্ঘ ছয় মাস যাবৎ অবিরাম বাজিতে থাকিবে। প্রথম নাফখা শেষ হইলে পৃথিবীর অবস্থা এইরূপ চল্লিশ বৎসর থাকিবে। অতঃপর দ্বিতীয় নাফখা শুরু হইবে।
আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
‘হে মানুষ! তোমরা আপন রবকে ভয় কর। মনে রাখিও কেয়ামতের কম্পন বড়ই ভীষণতর ব্যাপার।
‘ওহে মানবজাত তোমাদের রবকে কর ভয়,
অবশ্যই রোজ কিয়ামত ভীষণ অতিশয়।
হাদীছে আছে, উপরিউক্ত আয়াত শরীফ পাঠ করিয়া হুজুর (ছাঃ) ফরমান- ‘হে ছাহাবাগণ! তোমরা কি জান যে, এইরূপ ভূ-কম্পন কখন, কোন দিন শুরু হইবে? ছাহাবাগণ উত্তর করিলেনঃ ‘আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূল ভালরূপে জানেন।’ হজরত (ছঃ) বলিলেন, ‘তবে জানিয়া রাখ, উহা ঐ দিন হইবে, যে দিন আল্লাহ পাক বলিলেনঃ হে আদম! তোমার সন্তানদিগকে দোজখে নিক্ষেপ কর।’ তখন আদম (আঃ) আল্লাহর সমীপে করজোড়ে মিনতি করিয়া বলিলেনঃ ‘হে মহান প্রতিপালক! আমার সন্তানদের মধ্য হইতে কতজনকে দোজখে নিক্ষেপ করিব?’ আল্লাহ উত্তর করিবেন, ‘তোমার এক হাজার সন্তানদের মধ্যে নয়শত নিরানব্বই জনকে দোজকে নিক্ষেপ কর এবং মাত্র একজনকে বেহেশতে পাঠাইয়া দাও।’ ছাহাবাগণ রাসূলে পাকের (ছঃ) এইরূপ ভয়াবহ কথা শুনিয়া ভয়ে ও আতঙ্কে সকলে একযোগে কাঁদিয়া উঠিল। ছাহাবাগণের এইরূপ ক্রন্দন দর্শনে রাসূলে খোদার দয়া হইল। তিনি বলিলেন-
‘হে ছাহাবাগণ তোমরা ভয় পাইও না। আমি আশা করি, সকল নবী ও রাসূলগণের উম্মতের মধ্যে যত লোক বেহেশতবাসী হইবে, তন্মধ্যে তোমরা এক তৃতীয়াংশ লোক বেহেশতী হইবে।’ অতঃপর রাসূলে পাক (ছঃ) ছাহাবাগণকে শান্ত্বনা দিয়া আরও বলিলেন-’হইতে পারে। তোমাদের মধ্যে অৰ্দ্ধাংশ লোক এবং অন্য সকল উম্মতের অর্দ্ধাংশ লোক বেহেশতে গমন করিবে।’ ছাহাবাগণ রাসূলুল্লাহর (ছঃ) এই শুভ ভবিষ্যদ্বাণী ঘোষণা শ্রবণ করতঃ সকলেই খোদার নিকটে শুকরিয়া আদায় করিলেন।
অতঃপর রাসূল (ছঃ) বলিলেন- ‘হে ছাহাবাগণ! তোমরা অন্যান্য নবীগণের উম্মতের তুলনায় এত অল্প সংখ্যক, যেমন মেষপালের তুলনায় উষ্ট্রের পাল। অর্থাৎ উষ্ট্রের পাল যেমন মেষ পালের তুলনায় অতি সামান্য সংখ্যক, তেমনি উম্মতে মোহাম্মদিয়াও অন্যান্য উম্মতের তুলনায় অতি সামান্য সংখ্যক।’ রাসূলুল্লাহ (ছঃ) আরও বলিলেন যে, তোমরা অন্যান্য উম্মতের মধ্যে সংখ্যায় একহাজারের মধ্যে মাত্র একজন।’
হজরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, আল্লাহ পাকের একশত রহমতের মধ্যে মাত্র একটি রহমত আঠার হাজার মাখলুকাতকে দান করিয়াছেন যাহার কারণে মানব-দানব, পশু-পক্ষী একে অন্যকে মহব্বত করিয়া থাকে। আর বাকী নিরানব্বই ভাগ রহমত কেয়ামতের দিবস তাঁহার নেক বান্দাগণের প্রতি, বিশেষ করিয়া উম্মতে মোহাম্মাদিয়ার প্রতি বর্ষণ করিবেন।
দ্বিতীয়।। নাফখায়ে ছায়েকা : হাদীছ শরীফে আছে, আল্লাহ তা’আলা যখন সমস্ত সৃষ্ট জীবকে পুনর্জীবন দান করিতে ইচ্ছা করিবেন, তখন তিনি সর্ব প্রথম প্রধান চারিজন ফেরেশতা জিব্রাঈল, মীকাঈল, ইস্রাফীল ও আজাঈলকে জিন্দা করিবেন। ইহাদের মধ্যে আবার সর্ব প্রথম জীবিত করিবেন ইস্রাফীলকে। ইস্রাফীল (আঃ) জীবিত হইয়া-আরশ হইতে সিংগা লইয়া বেহেশতে গমন করিবেন এবং বেহেশতের খাদেম ফেরেশতাগণকে বলিবেন- হে বেহেশতের খাদেমগণ। হজরত মোহাম্মদ মোস্তফার (ছাঃ) এবং তাঁহার উম্মতগণের জন্য তাড়াতাড়ি বেহেশত সাজাইয়া গুছাইয়া সুসজ্জিত কর।’
রাসূলুল্লাহকে (ছাঃ) অভিনন্দন করিয়া আনয়ন করিবার জন্য আল্লাহ পাক ইতিপূর্বেই তদীয় সওয়ারী ‘বোরাক’ পয়দা করিয়া রাখিবেন। হজরত ইস্রাফীল, জিব্রাঈল, মীকাঈল আজাঈল (আঃ) বেহেশতের পোশাক পরিচ্ছদ ও তাঁহাকে অভিনন্দনের বোরাক ও লেয়াউল হামদ’ নামের ঝান্ডা লইয়া রাসূলুল্লাহকে (ছাঃ) তাঁহার মারকাদ (কবর) মোবারক হইতে অভিনন্দনের নির্মিত্ত গমন করিবেন।
এই সময় জমীনের যাবতীয় পাহাড়-পর্বত, বন-বাদাড় ও উচু-নিচু স্থানসমুহ সমতল ভূমিতে পরিণত হইয়া থাকিবে, এজন্য তাহারা প্রথমে রাসূলুল্লাহর মারকাদ (কবর) শরীফ সহজে চিনিতে পারিবেন না। হঠাৎ তাঁহারা দেখিতে পাইবেন যে, রাসুলুল্লাহর (ছঃ) মারকাদ মোবারক হইতে অপূর্ব সৌন্দর্যময় জ্যোতিঃ (আলো) বড় এক খন্ড স্তম্ভের ন্যায় ধীরে ধীরে আসমানের দিকে উঠিতেছে—ইহাই বাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মারকাদ মোবারক বা কবর শরীফ।’
অতঃপর জিব্রাঈল (আঃ) ইস্রাফীলকে (আঃ) বলিবেন- হে ভাই ইস্রাফীল! হাশর-নশরের অধিকাংশ কার্যাদি আপনার উপর ন্যস্ত এবং সমস্ত সৃষ্টজীব একমাত্র আপনার সিংগার ফুৎকারেই হাশর প্রান্তরে ইল-াহীর আদালতে দন্ডায়মান হইবে, কাজেই এখন আপনিই রাসূলুল্লাহকে
(ছাঃ) তাঁহার শয়নগাহ হইতে গাত্রোত্থান করিতে আরজ করুন।’ হজরত ইস্রাফীল জিব্রাঈলের (আঃ) এই কথা শুনিয়া চুপ করিয়া থাকিবেন। অতঃপর হজরত ইস্রাফীল মীকাঈলকে (আঃ) বলিবেন- হে ভাই মীকা- ঈল! রাসূলুল্লাহকে (ছাঃ) তাঁহার মারকাদ মোবারক হইতে হাশর ময়দানে চলিতে আরজ করুন।
হজরত মীকাঈল (আঃ) ইহাতে সম্মত হইয়া প্রথমবারে নবী করীমের (ছাঃ) রূহ পাককে সালাম করিয়া বলিবেন- হে রূহে পাক! আপনি আপনার পবিত্র শরীরে প্রবেশ করুন।’ মীকাঈলের প্রথমবারে এইরূপ বলার পর কবরে পাক হইতে কোন প্রত্যুত্তর আসিবে না। অতঃপর তিনি আবার বলিবেন—’হে রূহে পাক। কেয়ামত কায়েম হইয়াছে; উঠুন, হাশরের ময়দানে ইলাহির আদালতে স্বীয় উম্মতের শাফায়াতের জন্য চলুন। তাহারা আপনার উপস্থিতির জন্য অসহায় ভাবে তাকাইয়া রহিয়াছে।’
হজরত মীকাঈলের এইরূপ সম্বোধনে হুজুর পাকের (ছঃ) আত্মা তাঁহার পবিত্র শরীরে পবেশ করিবে এবং কবর ফাটিয়া যাইবে। নবী করীমের- (ছঃ) মারকাদ মোবারক ফাটামাত্র তাঁহারা হজরতকে (ছঃ) দেখিতে পাইবেন যে, তিনি মস্তক হইতে ধুলা বালু ঝাড়িতেছেন।
অতঃপর জিব্রাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহকে (ছঃ) তাঁতার জন্য বেহেশ হইতে আনীত পরিধানীর বস্ত্র এবং বোরাক দান করিবেন। ইহার পর নবী করীম (ছঃ) হজরত জিব্রাঈলকে জিজ্ঞাসা করিবেন- হে জিব্রাঈল! ইহা কোন দিবস?’
ফেরেশতা জিব্রাঈল উত্তর করিলেন-’আল্লাহ পাক আপনার সাথে যে দিবসের ওয়াদা করিয়াছেন, ইহা সেই দিবস; এই দিবস পাপীদের জন্য দুঃখময় যন্ত্রণা ও লজ্জার দিবস; সন্তানগণ মাতা-পিতার পরিচয় দিবে না, ইহা সেই দিবস; ইহা হিসাব-নিকাশের পর বেহেশত বাসিগণ তাহাদের আত্মীয়-স্বজন ছাড়িয়া বেহেশতে চলিয়া যাইবে, ইহা সেই দিবস; আপনাকে আল্লাহ পাকের নির্দেশে বোরাক নামের আরোহী দ্বারা অভিনন্দন করিয়া হাশর ময়দানে তাহাদের দরগাহে উপস্থিত করিবেন, ইহা সেই দিবস!’
জিব্রাঈলে জিজ্ঞাসিবেন নবী আল-আমীন,
আমার কাছে দাও বলে ভাই আজ হল কোন দিন।
জবাব দিবেন জিব্রাঈল ফেরেশতা আল্লাহর,
এইতো নবী ভীষণ হাশর দিবস ওয়াদার!
লজ্জা-দুঃখ ভয়ের দিবস আজকে কাফিরের,
এইতো রোজে জাজা-দিবস হিসাব নিকাশের।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আবার বলিবে- ‘হে জিব্রাঈল! আমাকে কোন আনন্দের শুভ সংবাদ দাও।’ তদুত্তরে জিব্রাঈল বলিবেন-ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিবস ‘লেওয়াউল হামদ’ বা প্রশংসিত পতাকা নামে ঝাণ্ডা দ্বারা আপনাকে সম্মানিত করিবেন, সেই ঝাণ্ডা নিয়া আমরা উপস্থিত হইয়াছি! ইহা শুনিয়া রাসূলে খোদা (ছাঃ) বলিবেন- হে জিব্রাইল! আমি তাহা জিজ্ঞাসা করিতেছি না, বরং বলুন যে, আমার গোনাহগার উম্মতের কি সংবাদ? তাহাদিগকে কি পুলসেরাতের উপর রাখিয়া আসিয়াছেন?’
এতদশ্রবণে হজরত ইস্রাফীল (আঃ) উত্তর করিবেন-’হে উম্মত দরদী বন্ধু মোহাম্মদ। কোন চিন্তা করিবেন না, আমি এখন পর্যন্ত পুনরুত্থান এবং হিসাব-নিকাশের জন্য সিংগা বাজাই নাই। কেয়ামতের হিসাব-নিকাশ এখনও শুরু হয় নাই। চলুন! আপনি ইলাহির আদালতে উপস্থিত হইলেই হিসাব-নিকাশ আরম্ভ হইবে।’ এইবারে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলিলেন-হে সঙ্গিগণ। আমার অন্তঃকরণ এতক্ষণে সন্তুষ্ট হইল; চলুন। এই বলিয়া রাসূলে খোদা বেহেশেতী পোশাক এবং টুপি পরিধান করতঃ বোরাকে আরোহণ করিয়া ফেরেশতাগণের সঙ্গে হাশরের ময়দানে উম্মতের শাফায়াতের জন্য রওয়ানা হইবেন।
বোরাকেরে সৃষ্টি কৌশল : বোরাক আরবী শব্দের বাংলা বিদ্যুৎ বা বিজলি। বোরাককে বোরাক এজন্যই বলা হয়। উহা দ্রুতগামী চতুষ্পদ জন্তু বিশেষ যানবহন! আকৃতি পুরাপুরি জন্তুরও নহে, উহার সৃষ্টি রহস্য ভিন্ন আকার।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যে বোরাকে আরোহণ করিয়া আল্লাহর পবিত্র দর্শনে মে’রাজে গমন করিয়াছিলেন, সেই রোরাকেই তিনি আবার আরোহণ করিয়া রোজ হাশরে খোদার দরবারে হাজির হইবেন। উহার দুইখানা অতি শক্তিশালী ডানা আছে, যদ্দারা সে বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ডে উড়িয়া বেড়ায়। উহার মুখমণ্ডলী মানুষের মুখণ্ডলীর আকার এবং কপাল লাল পরশমণির। কর্ণদ্বয় পাতার ন্যায় পাতলা সবুজ রং-এর জমরূদ পাথরের নির্মিত এবং চক্ষুদ্বয় নক্ষত্ররাজির ন্যায় স্নিগ্ধ মধুর আলোয় ঝলমলো। লেজ গরুর লেজের ন্যায় স্বর্ণ নির্মিত; শরীরের গঠনাকৃতি উট পাখীর ন্যায়; আকারে গাধা হইতে কিছু নীচু এবং খচ্চর হইতে ছোট।
মুখের সুরাত আদম জাতের আছে দুখান ডানা,
পরশমণি সুনির্মিত রাঙ্গা কপাল খানা।
সবুজ বরণ জমরূদে তার গঠিত দুই কান,
নয়ন দুইটি তারার মত নূরেতে রৌশন।
চলন তাহার দ্রুত অতি বিজলী সম তেজ,
গরুর লেজের মত উজ্জ্বল স্বর্ণে গড়া লেজ।
নামটি ‘বোরাক’ রূপ ও গুণের নাই তুলনা তার,
খাছ বাহন এ খোদার প্রিয় নবী মোস্তফার।
খচ্চর হতে একটু ছোট নীচু গাধার থাকি
বানায়ে এ আজব বাহন দিছেন খোদা রাখি।
ফেরেশতা জিব্রাঈলের পরামর্শ অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখনই এই বোরাকে আরোহণ করিতে যাইবেন, অমনি বোরাক আতঙ্কিত ভাবে লাফাইয়া উঠিয়া বলিবে-’খোদার শপথ করিয়া বলিতেছি যে, আমার উপর হাশেমী বংশীর হাশর প্রান্তরে ঝাণ্ডাবাহি আবদুল্লাহ ইবনে মোহাম্মদ খাতেমুল আম্বিয়া ব্যতীত অন্য কেহই আরোহণ করিতে পারিবেন না। রাসূলুল্লাহ বলিবেন-’আমি হাশর প্রান্তরে ঝাণ্ডাবাহি খাতেমুল আম্বিয়া মোহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ হাশেমী কোরাইশী’ বলিয়া তিনি বোরাকে আরোহণ করিয়া বেহেশতে চলিয়া যাইবেন।
রাসূলুল্লাহ (ছঃ) বিদ্যুৎ গতি বাহন বোরাকে বেহেশতে প্রবেশ করা মাত্র গোনাহগার উম্মতের শাফায়াতের জন্য সেজদায় পড়িয়া যাইবেন। তখন আল্লাহ্ পাকের দরবার হইতে আওয়াজ আসিবে-
‘হে মোহাম্মদ! অদ্য মস্তক অবনত ও সেজদা করিবার দিবস নহে- হিসাব-নিকাশের দিবস। তাই বলিতেছি শুনুন, ‘আপনার কোন অভিপ্ৰায় থাকিলে চাহিতে পারেন। অদ্য আমি আপনার মনোবাঞ্ছা পূরণ করিব।’ ইহা শুনা মাত্র দয়াল নবী বলিয়া উঠিবেন; ‘হে দয়াময় খোদা! আমি একমাত্র আমার গোনাহগার উম্মতের পরিত্রাণ ব্যতীত আর কিছুই চাহি না।’ তখন আল্লাহ্ পাক হযরতকে (ছঃ) তাঁহার গোনাহগার উম্মতের শাফায়াতের জন্য আদেশ প্রদান করিবেন এবং আরও বলিবেন, ‘হে মোহাম্মদ। আপনি যাহাতে সন্তুষ্ট আছেন, আমিও অহাতে খুশী আছি। কেননা আমিই বলিয়াছি—
‘অচিরেই আপনার প্রভু আপনার মনোবাঞ্ছা পূরণ করিবেন।’
পুনরুত্থানের স্বরূপ :
রাসূলুল্লাহ (ছঃ) রোজ হাশরে আল্লাহর দরগাহে হাজির হইলে চল্লিশ দিবস মুষলধারে বারিপাত হইতে আরম্ভ হইবে। এইরূপে মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতে পড়িতে হাশর প্রান্তর একেবারে প্লাবিত হইয়া প্রায় বার গজ উঁচু পানি জমিয়া যাইবে। এই পানির ক্রিয়া বীর্যের ক্রিয়ার ন্যায়। ইহাতে প্রত্যেক সৃষ্টজীবের পুনর্বার শরীর গঠন হইয়া জীবিত হইয়া উঠিবে! অতঃপর আল্লাহ্ পাক পুনরায় আসমান জমীন সৃষ্টি করিবেন।
সৃষ্টজীব, আসমান ও জমীন পুনঃ সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে যখন শুধু একমাত্র অদ্বিতীয় আল্লাহ্ অবশিষ্ট থাকিবেন, তখন আল্লাহ্ পাক জলদগম্ভীর স্বরে বলিবেন-
।। লিমানিল মুলকুল ইয়াওম।।
‘অদ্যকার রাজত্ব ও বাদশাহীর মালিক দাবীদারগণ কোথায়?’ অদ্য এই নিখিল বিশ্ব-জগতের মালিক কে?’ ইহাতে কোন উত্তর না পাইয়া আল্লাহ্ নিজেই বলিবেন-
।। লিল্লা-হিল ওয়াহিদিল কাহহার।।
নিখিল বিশ্বের অধিপতি এবং বাদশাহীর মালিক একমাত্র আল্লাহই যিনি অদ্বিতীয় ও মহাপরাক্রমশালী। কবির ভাষায়-
সকল হইলে ধ্বংস বলবেন রব,
শক্তি মদে মত্ত যারা কোথায় তারা সব?
ক্ষমতার পূজারী যে যুবরাজগণ,
কেউতো নাহিক তারা কোথায় এখন?
আমার খাইয়া অন্যে পুজিত যাহারা,
আজিকার এই দিনে কোথায় তাহারা?
কোন শক্তি আর আর বাকী নাহি আছে,
পরাজিত, পর্যুদস্ত সব মম কাছে।
অতঃপর আল্লাহ্ আরো বলিবেন-
কোথায় গেল সেই শক্তির প্রসংশাকারী যুবরাজগণ? কোথায় গেল আমার খাদ্য খাইয়া অপরের প্রশংসা ও ইবাদতকারীগণ! কোন শক্তি অদ্য আর বাকী নাই, সকল শক্তিই অদ্য মহাশক্তিশালী আল্লাহর নিকট পরাজিত হইয়াছে।
অতঃপর আল্লাহ্ পাক পাহাড়-পর্বতসমূহের বিশাল বিশাল উচ্চ- শৃঙ্গগুলি চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া সমতল ভূমিতে পরিণত করিবেন এবং যেস্থানে অতিমাত্রায় গোনাহের কার্য হইত, সে স্থানে আল্লাহর নির্দেশে দোজখ কায়েম করা হইবে। আর যে স্থানে তাঁহার ইবাদত-বন্দেগী বেশী মাত্রায় হইত সে স্থানে মাটি সুবাসিত শ্বেত বর্ণের রৌপ্য দ্বারা তৈয়ার হইবে এবং সে স্থানে কায়েম হইবে বেহেশত।
হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলিয়াছেন, আমি একদা রাসলুল্লাহকে (সঃ) জিজ্ঞাসা করিলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! যখন আল্লাহ্ পাক মাটি পরিবর্তন করিবেন, তখন লোকজন কোথায় অবস্থান করিবে? রাসূলুল্লাহ (সঃ) উত্তর করিলেন, ‘হে আয়েশা! তুমি ইহা অত্যন্ত জরুরী কথা জিজ্ঞাসা করিয়াছ, তবে ভালভাবে শোন-সে সময় লোকগণ পোলসেরাতের উপর দণ্ডায়মান থাকিবে।’
তৃতীয়।। নাফখায়ে বায়াস : বায়াস মানে পুনরুত্থান বা পুনর্জীবন। সৃষ্ট জীব ধ্বংস হইয়া গেলে এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাঁর কবর হইতে উঠিয়া বোরাকে আরোহণপূর্বক বেহেশতে গমন করিলে আল্লাহ্ পাক হযরত ইস্রাফীলকে (আঃ) তৃতীয়বারের মত সমস্ত প্রাণী পুনর্জীবন প্রাপ্ত হইয়া হাশর প্রান্তরে হিসাব-নিকাশের জন্য উপস্থিত হওয়ার জন্য সিংগা বাজাইতে বলিবেন।
আল্লাহ্ পাক বলেন-
‘আমি যে রূপে / প্রথমবারে সৃষ্টি করিয়াছিলাম, অনরূপ নূতনভাবে আবার পুনর্জীবিত করিব।’
ইহাকেই বলে ‘নাফখায়ে বায়াস।’
আল্লাহ্ পাক হযরত ইস্রাফীলকে (আঃ) লক্ষ্য করিয়া বলিবেন, ‘হে ইস্রাফীল! উঠ এবং সমস্ত মুর্দারকে জীবন প্রাপ্ত হইয়া হাশরের ময়দানের হাজির হইবার জন্য সিংগা বাজাও।
ইস্রাফীল আল্লাহর নির্দেশ পাওয়া মাত্র সিংগায় ফুৎকার দিবেন এবং উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলিতে থাকিবেন-
‘হে শরীর হইতে বহিষ্কৃত আত্মা! হে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হাড়-মাংস! হে’ দেহ হইতে খসিয়া মাটিতে পড়া গলিত চামড়া! হে শরীর হইতে বিচ্ছিন্ন লোমসমূহ! আল্লাহর হুকুমে একত্রিত হও এবং কেয়ামতের ময়দানে ইলাহীর আদালতে হিসাবের জন্য হাজির হইয়া যাও।
হযরত ইস্রাফীলের এইরূপ নির্দেশ শুনিয়া খোদার হুজুরে সকল সৃষ্ট জীবের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন অংগ-প্রত্যংগ একত্রিত হইয়া দিব্বি সুষ্ঠু শরীর গঠন হইয়া উলঙ্গভাবে হাশরের ময়দানে হাজির হইবে। সকল সৃষ্ট-জীব হাশরের ময়দানে উঠিয়া আসমানকে খণ্ড-বিখণ্ড, চন্দ্র-সূর্য অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং নক্ষত্ররাজিকে ভূ-তলে পতিত দেখিতে পাইবে। মানুষ আরও দেখিতে পাইবে : পূর্বের মাটি এখন আর সেইরূপ নাই। সপ্ত সমুদ্রের পানি শুকাইয়া গিয়াছে। সপ্ত দোজখ হইতে আজাব ও নির্যাতনের ভয়ঙ্কর গর্জন শুনা যাইতে থাকিবে।
অন্যদিকে আবার তারা দেখিতে পাইবে যে, ফেরেশতাগণ মীজান আমল ওজন করিবার নিমিত্ত ব্যস্তভাবে প্রস্তুত করিতেছে। ইহা দেখিয়া তারা নিঃসহায় ভাবে সেদিকে তাকাইয়া থাকিবে। আরও দেখিতে পাইবে, সকল বেহেশত বেহেশতীদের সুখ ভোগের জন্য নানা রকম ফলফলাদি, হুর-গেলমান দ্বারা সুসজ্জিত করিতেছে। ইহা দেখিয়া তারা দুঃখ ভরে নয়ন মুদিত করিয়া বলিবে-
‘হায়রে! কে আমাদিগকে এই সুখ-স্বপন নিদ্রা হইতে জাগ্রত করিল? হায়। যদি আমরা এইভাবে চিরকাল নিদ্রিত থাকিতে পারিতাম? সামান্য সময়ের জন্যও আমাদের চেতনা ফিরিয়া না আসিত।
এতদশ্রবণে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন অনতিদূর হইতে নির্দেশ বাণী জারী করিবেন-
‘ইহা সেই দিবস যেই দিবসের কথা আল্লাহ্ পাক পূর্বে অঙ্গীকার করিয়াছিলেন এবং তাঁর পয়গাম্বরগণ সঠিক সংবাদ দিয়াছিলেন।
কেয়ামতের ময়দানে বারটি ঝাণ্ডা
হাদীছ শরীফে আছে, ছাহাবাগণ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সমীপে নিম্নের এই আয়াতের অর্থ জিজ্ঞাসা করিয়াছিলেন——
: ইয়াওমা ইউনফাখু ফিচ্ছুরে—–
‘যেদিন ইস্রাফীল কর্তৃক সিংগায় ফুৎকার দেওয়া হইবে; সেদিন লোক দলে দলে হাশর প্রান্তরে হাজির হইতে থাকিবে।
ছাহাবাগণ যখন উক্ত আয়াতের অর্থ জিজ্ঞাসা করিলেন, তখন রাসূলু- ল্লাহ (ছাঃ) কাঁদিতে কাঁদিতে অশ্রুনীরে প্লাবিত করিয়া দিলেন। তাঁর রুমাল অশ্রুধারায় সিক্ত হইয়া গেল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাজিরীনদের বলিলেন—
‘হে ছাহাবাগণ। তোমরা অদ্য আমার নিকট এক কঠিন বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়াছ। জানিয়া রাখ, কেয়ামতের দিবস আমার উম্মতগণ ১২টি ঝাণ্ডার নীচে দণ্ডায়মান হইবে।
১। একদল লোক যারা একের কথা অন্যের নিকট মিথ্যা রটাইয়া পরস্পরের মধ্যে বিবাদ-বিসংবাদের সৃষ্টি করিত এবং তাদের ভিতর সংঘর্ষ বাঁধাইয়া দিত।
ইহাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
‘বিবাদ-বিশৃংখলা সৃষ্টি করা হত্যাকাণ্ড হইতে মারাত্মক।’
হত্যায় যেরূপ পাপ, দুই দলের মধ্যে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করাও অনুরূপ মহাপাপ।
২। আর এক সম্প্রদায়ের লোক যারা সর্বদা সুদ-ঘুষ খাইয়া থাকিত, কেয়ামতের দিবস হাশরের ময়দানে তারা শূকরের চেহারার আকৃতি রূপ লইয়া উঠিবে।
৩। আর একদল লোক যারা বাদশা কর্তৃক কাজী ও বিচারক বা মুফতী ও ফতোয়া দানকারী নির্বাচিত হইয়া ন্যায় বিচারের পরিবর্তে মুফতী বিপরীত ফতোয়া দিয়া এবং কাজী অন্যায় বিচারের রায় জারী করিয়া পার্থিব স্বার্থ সিদ্ধি করিয়াছে; কেয়ামতের দিবস আল্লাহ পাক এই প্রকার কাজী ও মুফতিগণকে অন্ধ করিয়া তাঁর পবিত্র দরবারে উপস্থিত করিবেন।
কোরআন শরীফে আছে—
‘তোমরা সমাজের বিচারপতি নিযুক্ত হইলে তাদের প্রতি ন্যায় বিচার করিবে।’
নির্বাচিত হইবে যখন তোমরা বিচারপতি, করবে তখন সূক্ষ্ম বিচার সঠিকভাবে অতি।
৪। আর যে সকল লোক আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করিয়া নিজেকে অতি বড় সম্মানিত ও গৌরবান্বিত মনে করিবে এবং আরও মনে করিবে যে, আল্লাহর দরবারে তাদের ন্যায় নিকটবর্তী দ্বিতীয় আর কেহই নাই। আল্লাহ পাক এইরূপ লোকদিগকে কেয়ামতের দিবস হাশর প্রান্তরে মূক বা বোবা করিয়া উঠাইবেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
‘নিশ্চয় আল্লাহ পাক আত্ম-গৌরবী লোকদিগকে ভালবাসেন না।’
৫। আর যে সকল আলেম, পীর ও মুরশিদ নামে মাত্র লোকদিগকে সৎপথ দেখাইয়া নেক কার্য করিতে আদেশ এবং বদকাজ হইতে বিরত থাকিতে উপদেশ প্রদান করে অথচ নিজেদের বেলায় সম্পূর্ণ বিপরীত; আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিবস এই শ্রেণীর ভেল্কিবাজ পীর-পাট্টাদিগের অবস্থা এইরূপ করিবেন যে, তারা নিজেদের জিহ্বা টানিয়া বাহির করিয়া নিজেরাই অগ্নি নির্মিত কাঁচি দ্বারা উহা কাটিতে থাকিবে। তাদের মুখ হইতে দুর্গন্ধময় পুঁজ-রক্ত গড়াইয়া পড়িতে থাকিবে।
কোরআন শরীফে আছে, আল্লাহ বলেন :
‘তোমরা লোকদিগকে সৎকার্যের প্রেরণা দাও অথচ নিজেদের বেলায় তা ভুলিয়া থাক?
৬। আর এক ধরণের লোক যারা দেখিয়া বা না দেখিয়া সর্বদা মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়া বেড়ায়, কেয়ামতের দিবস আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাগণকে এইরূপ লোকদিগকে অগ্নির কোড়া দ্বারা প্রহার করিতে নিৰ্দেশ প্রদান করিবেন।
আল্লাহ পাক বলেন—
‘অলা তাকফু মা লাইসা লাকা বিহী ইলম—যে বিষয়ে তোমার জানা নাই সে বিষয়ে নীরব থাকিও।’
৭। আর একদল লোক যারা সর্বদা আত্মার তাড়নায় সুখ-শান্তি, ভোগ- বিলাস ও আরাম-আয়েশে নিমগ্ন থাকে এবং সদা-সর্বদা আল্লাহর ইবাদত ও নেককার্য হইতে নিজেকে এড়াইয়া আত্মাকে শান্তিতে রাখিতে চেষ্টা করে; আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিবস এই শ্রেণীর লোকদিগের শরীর দুর্গন্ধযুক্ত ও হস্ত-পদ জিঞ্জিরাবদ্ধভাবে উঠাইবেন।
আল্লাহ পাক বলেন—
‘এই সকল লোক আখেরাতের (পরকালের) বিনিময়ে ক্ষণিকের বিলাস ক্রয় করিয়া থাকে।’
৮। আর এক শ্রেণীর লোক যারা নিজেদের মান-ইজ্জত ও গৌরবার্জনের নিমিত্ত মাল-দৌলত খরচ করিয়া থাকে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা মাল-দৌলতের হক আদায় করার নামও লয় না; এই শ্রেণীর লোকদিগকে আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিবস এইরূপে উঠাইবেন যে, যখন তারা দাঁড়াইতে চেষ্টা করিবে, তখনই মদ্য-মাতাল লোকদের ন্যায় ডানে বামে হেলিয়া দুলিয়া পড়িতে থাকিবে।
কোরআন শরীফে আছে, আল্লাহ বলেন—
‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের উপার্জিত মাল-দৌলত হইতে পবিত্ৰ মাল আল্লাহর রাস্তায় খরচ কর।
৯। আর একদল লোক যারা একে অন্যের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে কলুষ বিষয় মন্তব্য (গীবৎ) করিয়া থাকিত, আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিবস এইরূপ লোকদিগকে দুর্গন্ধময় কাপড় পরিধান করাইবেন। তারা যখন উক্ত কাপড় পরিধান করিয়া চলিতে থাকিবে তখন তাদের শরীর হইতে এত দুর্গন্ধ চতুর্দিকে ছড়াইতে থাকিবে যে, মানুষ তাদের নিকটবর্তী হইতে ঘৃণা বোধ করিবে।
আল্লাহ পাক বলেন –
‘তোমরা একে অন্যের সম্পর্কে নিন্দা বা খারাপ মন্তব্য করিও না।’
১০। আর এক সম্প্রদায়ের লোক যারা সকল সময় একের কথা অন্যের নিকট মিথ্যা প্রবঞ্চনা করিয়া তাদের মধ্যে কলহ-বিবাদ সৃষ্টি করিয়া থাকে। এই প্রকার লোকদের জিহ্বা আল্লাহ কেয়ামতের দিবস তার মস্তক-পৃষ্ঠের গ্রীবাদেশ হইতে বাহির করিবেন।
১১। আর এক শ্রেণীর লোক যারা মসজিদে ইবাদতের পরিবর্তে কেবল দুনিয়ারী কথাবার্তা বলিয়া থাকে, আল্লাহ পাক এই শ্রেণীর লোকদিগকে পিছনের দিক হইতে হেঁচড়াইতে হেঁচড়াইতে হাশরের ময়দানে উপস্থিত করাইবেন।
আল্লাহ তা’আলা বলেন—
‘মসজিদ একান্তই আল্লাহর ইবাদত গৃহ, অতএব সেখানে তোমরা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাকেও ডাকিও না।’
১২। আর যে সকল লোক দুনিয়ায় থাকিয়া সুদের ব্যবসা করিত এবং সর্বদা সুদ গ্রহণ করিয়া থাকিত; আল্লাহ পাক এই শ্রেণীর লোকের বিষয় কেয়ামতের দিবস ফেরেশতাদিগকে বলিবেন – হে ফেরেশতাগণ! তোমরা উহার মাথা নীচে ও পা উপরের দিকে রাখিয়া মুর্দাটানার মত টানিতে থাক।’ ফেরেশতাগণ সেরূপ টানিতে থাকিবে। অবশেষে উহাদিগকে ঐ অবস্থায় দোজখে নিক্ষেপ করা হইরে। :
হাশর ময়দানে বার সারি
অপর একখানা হাদীছে জানা যায়—হজরত মায়াজ ইবনে জাবাল (রাঃ)—বর্ণনা করয়াছেন—রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফরমাইয়াছেন, কেয়ামতের দিবস অত্যন্ত দুঃখ ও লজ্জার মধ্য দিয়া আমার উম্মতকে আল্লাহ পাক ১২ (বার) দলে বিভক্ত করিয়া ১২ সারিতে দাঁড় করাইবেন। যথা—
১। এক সারির লোক এইরূপ হইবে যে ইস্রাফীল (আঃ) সিংগায় ফুল কারের পর তাদের হাত-পা কর্তিত অবস্থায় কবর হইতে উঠিয়া হাশর প্রান্তরে দণ্ডায়মান হইবে। তখন আল্লাহর নির্দেশে তাঁর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলিবেন—’এই সকল লোক সর্বদা তাদের প্রতিবেশীকে কষ্ট দিতে লিপ্ত থাকিত এবং এই অবস্থায় তারা তওবা না করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। তাই ওদেরকে ‘অদ্য কেয়ামতের ময়দানে এইরূপ দুরবস্থায় উঠান হইয়াছে। ইলাহীর আদালতে হিসাব-নিকাশের পরে ওদিগকে দোজখের ভীষণ অগ্নিতে নিক্ষেপ করা হইবে।
পড়শীদের কষ্ট যারা দেয়গো দুনিয়ায়, উঠবে তারা হাশর মাঠে ‘মোছলা’ অবস্থায়। হাত-পা যাদের কর্তিত হয় মোছলা তার নাম, বিচার শেষে এদের হবে কঠিন জাহান্নাম।
২। আরও এক সারির লোক এইরূপ হইবে, যারা কবর হইতে জানোয়ার (পশুর) আকৃতি ধারণ করিয়া হাশর প্রান্তরে উপস্থিত হইবে। তখন আবার খোদার নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া ‘ এই প্রকার বলিবে :
‘এই সকল লোক দুনিয়ায় থাকিয়া নামাজ পড়িবার কালে অলসতার সহিত নামাজ আদায় করিত। নামাজ পড়িবার কালে যথারীতি রুকু, সেজদা, কেয়াম ইত্যাদি করিত না এবং মৃত্যুর পূর্বে এইরূপ গোনাহ হইতে তওবা করিয়াও মরে নাই, তাই অদ্য ওদিগকে জানোয়ারের আকৃতি প্রদান করিয়া কবর হইতে উঠান হইয়াছে। হিসাব-নিকাশের পরে ওদিগকেও দোজখে নিক্ষেপ করা হইবে।
আল্লাহ পাক বলেন—
‘অলসতার আশ্রয়ে যে মুছল্লিরা নামাজ আদায় করে, তাদের জন্যে শত দুঃখ ও ধিক!’
অলসতার সাথে নামাজ আদায় করে যারা,
হাজির হবে জানোয়ারের সুরাত ধরে তারা।
৩। আর এক সারির লোক এইরূপ হইবে যে, যারা কবর হইতে পাহাড়-পর্বতের ন্যায় প্রকাণ্ড দেহসহ কেয়ামতের ময়দানে ইলাহীর আদালতে উপস্থিত হইবে। তাদের শরীর সর্প ও বিচ্ছু ইত্যাদিতে দংশন করিতে করিতে জর্জরিত করিয়া ফেলিবে। এইরূপ লোকদিগকে লক্ষ্য করিয়া আল্লাহর দরবার হইতে নির্দেশ আসিবে : ‘ঐ সকল লোক দুনিয়ায় থাকিয়া অজস্র ধন-দৌলত উপার্জন করিয়াছিল, কিন্তু তাদের মালের জাকাত কখনো আদায় করে নাই। জাকাতের কথা শুনিলেই তাদের গাত্রদাহ শুরু হইত। ওরা মৃত্যুকালে এইরূপ গোনাহ হইতে তওবা করিয়াও মরে নাই।
তাই তাদের অদ্য এই দুরবস্থা ঘটিয়াছে। হিসাবান্তে আবার তারা অগ্নিকুণ্ডে প্রজ্জ্বলিত হইবে। তাদের সঞ্চিত টাকা-পয়সা, আশ্রাফী গরম করিয়া, তা দ্বারা তাদের কপালে দাগ দেওয়া হইবে।
করছে কামাই দুনিয়াতে বিত্ত বেশুমার,
কিন্তু নাহি করিয়াছে যাকাত আদায় তার।
শরীর হবে বিশাল তাদের উঁচু পাহাড় মত,
সেই দেহকে বিচ্ছু ও সাপ কাটবে অবিরত।
এই হালতে পৌঁছবে তারা হাশর মাঠের পরে,
বিচার শেষে ফেলবে তাদের জাহান্নামে ধরে।
তাতাইয়া ‘মোহর দেরেম দোজখী অগ্নিতে,
দিয়ে দিবে ছাপ তা দিয়ে পাঁজর পেশানীতে।
ওদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
অল্লাজীনা ইয়াকনিযুনাজ্জাহবা অল-ফিদ্বদ্বাতা—
যে সকল লোক স্বর্ণ ও রৌপ্য সঞ্চয় করিয়া আল্লাহর রাস্তায় জাকাত বা ছদকা আদায় না করে; হে মোহাম্মদ। আপনি তাদিগকে ভীষণ আজাবের দুঃসংবাদ দিন। তাদের আজাব এই যে, যেদিন তাদের প্রতি দোজখের অগ্নি প্রজ্জ্বলিত করা হইবে, সেদিন তাদের মুণ্ড, পার্শ্বদেশ ও পিঠ পুড়িয়া ভন্ম করিয়া দেওয়া হইবে।
৪। আর এক সারির লোক এমন হইবে যে, যাদের মুখ হইতে দুর্গন্ধময় রক্ত নির্গত অবস্থায় কবর হইতে উঠিবে এবং তাদের নাড়িভুড়ি সমূহ পৃষ্ঠদেশ হইতে বাহির করা থাকিবে। উহার কষ্ট ও যন্ত্রণায় তারা মাটিতে লুটাইয়া গড়াগড়ি করিবে। আল্লাহ পাকের নিকটতম ফেরেশতাগণ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলিবে, ‘অই সকল লোক ধোকাবাজ ব্যবসায়ী। এরা ঐরূপ ধোকাবাজী করিয়া সমস্ত জীবন কাটাইয়া দিয়াছেন মৃত্যুর পূর্বে তারা গোনাহ্ হইতে তওবা করে নাই। তাই অদ্য হাশরের ময়দানে এইরূপ কষ্টভোগ করিতেছে। বিচারের পর আবার ভীষণ দোজখের অগ্নিতে জ্বলিতে হইবে।
৫। আর এক সারির লোক কবর হইতে এইরূপ অবস্থায় উঠিবে যে, তাদের শরীর পচা মৃতদেহের ন্যায় দুর্গন্ধযুক্ত হইবে। তাদের সংস্পর্শ হইতে লোকজন দূরে থাকিতে চেষ্টা করিবে। ফেরেশতাগণ এই শ্রেণীর লোকদের সম্পর্কে ডাকিয়া বলিবে : ‘ওরা সে সব লোক যারা লোকের অদৃশ্যে চুপে চুপে গোনাহর কার্য করিত। তাদের অন্তরে আল্লাহর ভয় বলিতে কিছু ছিল না, মৃত্যুর আগে তারা এইরূপ গোপন পাপ হইতে তওবা করে নাই এবং সেই অবস্থায়ই তাদের মৃত্যু ঘটিয়াছে। কাজেই অদ্য তাদিগকে এরূপ ঘৃণিত দুর্গন্ধময় দেহে হাশরের ময়দানে উঠান হইয়াছে। এই আজাবই তাদের শেষ নহে বরং হিসাব-নিকাশের পর পুনঃ দোজখে নিক্ষেপ করা হইবে।’
৬। আর এক সারির লোক কবর হইতে তাদের গলদেশে বিষধর সাপ ঝুলন্ত অবস্থায় কবর হইতে উঠিবে। এই সকল সাপ তাদের গলায় ভীষণভাবে দংশন করিতে থাকিবে। ফেরেশতাগণ তাদের সম্পর্কে ডাকিয়া বলিবে, ‘ঐ সকল লোক সত্য গোপন করিয়া মিথ্যা সাক্ষ্য প্রদান করতঃ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধি করিয়াছিল। তাই তাদের অদ্য এই দুরবস্থা ঘটিয়াছে। শুধু ইহাই তাদের শেষ নহে বরং পরিশেষে তাদিগকে দোজখে যাইতে হইবে।
৭। আর এক সারির লোক এমন হইবে, যারা কবর হইতে জিহ্বাবিহীন হইয়া হাশরের ময়দানে ইলাহীর আদালতে হাজির হইবে। ওদের মুখগহ্বর হইতে সর্বদা পুঁজ-রক্ত নির্গত হইতে থাকিবে। আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ আওয়াজ দিয়া বলিবে : এই সকল লোক সত্য সাক্ষ্য গোপন করিয়া থাকিত স্বার্থসিদ্ধির তাড়নায় তখন দর্শনীয় সত্যকেও প্রকাশ পাইতে দিত না। ওরা সমস্ত জীবন এইরূপ কুকার্য করিয়াই জীবন কাটাইয়াছে, মৃত্যুকালে তওবা করিয়াও মরে নাই। তাই অদ্য হাশরের ময়দানে তাদেরকে এইরূপ আজাব ভোগ করিতে হইতেছে। পরিশেষে পুনঃ দোজখে নিক্ষিপ্ত হইবে।
আল্লাহ পাক বলেন—
‘তোমরা সত্য সাক্ষ্য গোপন করিও না, যে ব্যক্তি সত্য গোপন করিল নিশ্চয় সে নিজের আত্মাকে গোনাহে লিপ্ত করিল।’
৮। আবার অন্য এক সারির লোক এরূপ হইবে, যাদিগকে আল্লাহ পাক কেয়ামতের ময়দানে তাদের মস্তক নীচু এবং পা ঊর্ধ্ব অবস্থায় উঠাইবেন। এই অবস্থায় ফেরেশতাগণ তাদিগকে হেঁচড়াইতে থাকিবে এবং তাদের লজ্জাস্থান হইতে পুঁজ-রক্ত নির্গত হইতে থাকিবে। এমন সময় আল্লাহ পাকের নিকটতম ফেরেশতাগণ ডাকিয়া বলিবে : ‘ঐ সকল লোক দুনিয়ায় সর্বদা জেনার কার্যে লিপ্ত থাকিত। অথচ মরিবার কালেও তারা তওবা করিয়া মরে নাই। তাই অদ্য তাদিগকে এই দুঃখ-কষ্ট ভোগ করিতে হইতেছে। শেষ পর্যন্ত আবার ওরা দোজখের আগুনে প্রজ্জ্বলিত হইবে।’
হাশর মাঠে হাজির হবে কতক গুনাগার,
‘কদম তাদের’ উপর দিকে নীচের দিকে ‘ছার’।
হেঁচড়াইয়া টানবে তাদের ‘মালাইকার’ দল,
পুঁজ ঝরিবে লজ্জার স্থান হইতে অবিরল।
ফেরেশতারা বলবে এরা করছে জিনার কাম,
বিচার শেষে এদের হবে কঠিন জাহান্নাম।
কোরআন শরীফে আছে, আল্লাহ বলেন-
‘তোমরা জেনার কাছেও যাইও না, জেনা জঘন্য গুনাহ।’
৯। আর এক সারির লোক কাল কুৎসতি বিবর্ণ চেহারা লইয়া কবর হইতে উঠিবে। তাদের চক্ষুদ্বয় নীল বর্ণ এবং পাকস্থলী দোজখে প্রজ্জ্বলিত কাঠের টুকরায় পরিপূর্ণ থাকিবে। এই সকল লোকদের সম্পর্কে ফেরেশতাগণ উচ্চৈঃস্বরে ডাকিয়া বলিবে : ‘এ সকল লোক দুনিয়ায় থাকিয়া নাবালেগ এয়াতীম শিশু-সন্তানের ধন-সম্পত্তি লুটিয়া খাইয়াছে এবং মৃত্যু পর্যন্ত এই দুরাচার তাদের নিকট হইতে দাবী না ছাড়াইয়া তওবাবিহীন অবস্থায় মরিয়াছে। তাই অদ্য তাদের এইরূপ শাস্তি হইতেছে। ইহাই শেষ নহে, বরং শেষ পর্যন্ত তারা জ্বলন্ত দোজখের ভীষণ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হইবে।
ইহাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেন—
‘তারা ইয়াতীমের ধন-সম্পত্তি লুটিয়া খাইল না যেন তাদের পেটে অগ্নিশিখা ধারণ করিল।’
দুনিয়াতে খাইল যারা বিত্ত ইয়াতীমের,
জ্বলবে তাদের পেটের মাঝে অগ্নি দোজখের।
১০। আর এক সারির লোক হাত, পা লেংড়া অবস্থায় কবর হইতে উঠিবে। ঐ সকল লোকের সম্পর্কে আল্লাহ পাকের নিকটতম ফেরেশতাগণ ডাকিয়া বলিলঃ ঐ সকল পাপীষ্ঠরা সর্বদা মাতা-পিতাকে দুঃখ-কষ্ট দিয়া থাকিত এবং এই পাপের বোঝা লইয়া ওরা মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে। তাই অদ্য হাশরের ময়দানে ইলাহীর আদালতে ওদের এই দুর্দশা ঘটিয়াছে। বিচারান্তে দোজখে নিক্ষেপ করা হইবে।
দুঃখ-ক্লেশ পিতা-মাতায় দানে যে সন্তান,
লেংড়া পৌঁছিবে সে হাশর ময়দান।
আল্লাহ পাক বলেন—
‘তোমরা মাতা-পিতার সহিত সদ্ব্যবহার কর।’
১১। আর একদল লোক অন্ধ হইয়া হাশরের ময়দানে ইলাহীর আদালতে হাজির হইবে। তাদের দন্ত এবং ওষ্ঠ এত বড় হইবে যে, প্রত্যেকটি দন্ত একটা গরুর শিং-এর ন্যায় হইবে এবং ওষ্ঠদ্বয় তাদের পেট পর্যন্ত ঝুলিয়া পড়িবে। ওরা এইরূপ ভয়াবহ দুরাকৃতি অবস্থায় হাশরের ময়দানে উপস্থিত হইলে আল্লাহর নিকটতম ফেরেশতাগণ চীৎ- কার করিয়া বলিবে : ‘ঐ সকল দুরাকৃতি পাপীষ্ঠেরা দুনিয়ায় থাকিয়া সর্বদা মদ্য পানে লিপ্ত থাকিত এবং বন্ধু-বান্ধবগণকেও সেই পাপে লিপ্ত করাইত। তাই অদ্য তাদের এইরূপ দুরাকৃতি ভাবে হাশরের ময়দানে হাজির হইতে হইয়াছে। এতেই তাদের সাজা শেষ হইবে না; বরং শেষ বিচারের পর আল্লাহ পাকের নির্দেশে ওদিগকে অগ্নির জিঞ্জিরাবদ্ধ করিয়া অধঃমুখে দোজখের ভীষণ অগ্নির মধ্যে ধাক্কা দিয়া ফেলিয়া দেওয়া হইবে।’
আল্লাহ পাক বলেন—
‘ইন্নামাল খামরু অর মাইসিরু–
দুনিয়াতে যে সব পাপী করল সুরা পান,
অন্ধ হয়ে উঠবে তারা হাশর ময়দান।
দন্ত হবে গো-শিং সম বিকট অতিশয়,
পেট অবধি পড়বে ঝুলে তাহাদের অধরদ্বয়।
অগ্নিশিকল দিয়ে বেঁধে কইরা অধঃমুখ,
ফেলবে ভীষণ দোজখে, ভোগবে তথায় দুঃখ।
১২। আর এক শ্রেণীর লোক অতি সমাদরের সহিত কবর হইতে উঠিবে। যাদের চেহারা পূর্ণিমার পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় আলোকিত হইবে এবং বিজলীর ন্যায় নিমিষের মধ্যে পুলসিরাত পার হইয়া অতি সম্মানের সহিত বেহেশতে প্রবেশ করিবে। আল্লাহ পাকের নির্দেশে উহাদের সম্পর্কে চতুর্দিকে হইতে দলে দলে ফেরেশতাগণ এককণ্ঠে চীৎকার করিয়া বলিতে থাকিবে—
‘উহারা ঐ সকল লোক যারা আল্লাহর ভয়ে সকল সময় তাঁর নির্দেশিত কার্যাবলী সুষ্ঠুরূপে পালন করিয়াছে এবং অন্যকে পালন করিতে প্রেরণা ও উৎসাহ দিয়াছে; লোকদিগকে আল্লাহর ভয় দেখাইয়া গোনাহর কার্য হইতে বিরত রাখিয়াছে। শুধু তাই নহে, বরং তারা দিবারাত্রে অধিকাংশ সময় অতি মিনতির সহিত নামাজ আদায় করিত, ফরজ নামাজ জামাতে পড়িত ইত্যাদি। মোটকথা, আল্লাহ আদেশ-নিষেধের প্রতি সর্বদা সচেতন থাকিত। এমনকি মৃত্যুকালে তওবা করিয়া অতি পবিত্রতার সহিত আল্লাহর দরবারে হাজির হইতেও পারিয়াছে। তাই অদ্য আল্লাহ পাক তাদিগকে এইরূপ নেয়ামত দান করিয়াছেন। আল্লাহ তাদের উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট আছেন এবং থাকিবেন। তাদের চির বাসস্থান জান্নাতুল ফিরদাউস। সেখানে তারা হইবে চিরসুখী। দুঃখ বলিতে তাদের কিছু থাকিবে না।
এই দুনিয়ার মাঝে যে সব খাঁটি ঈমানদার,
ভয় করিয়া চলেন খোদার হুকুম মানেন তাঁর।
আপনি চলেন অপরকেও চালান খোদার পথে,
ফিরিয়ে রাখেন লোকদিগকে পাপের রাহা হতে।
নামাজ রোজা সব ইবাদাত সঠিক ভাবে করে,
মউত কালে ঈমান সহ পৌঁছিল কবর ঘরে।
‘আল্লাহ পাকের এসব প্রিয় বান্দা আখেরাতে
কবর হতে উঠবে মহা ইজ্জতেরি সাথে।
চারিদিকে থাকবে তাদের জমাত ফেরেশতার,
বদন হবে উজ্জ্বল যেন চন্দ্র পূর্ণিমার।
এদের প্রতি মহা খুশী আল্লাহ পাক জাত,
এদের তিনি দিবেন সুখের অনন্ত জান্নাত।
পুনরুত্থান : কবর হইতে উঠা
কথিত আছে, হযরত ইস্রাফীলের (আঃ) সিংগার ফুৎকার সমস্ত সৃষ্টজীব নিজ নিজ কবর হইতে উঠিয়া যথাস্থানে চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত অন-াহারে দাঁড়াইয়া থাকিবে। তাদের সবার শক্তি থাকা সত্ত্বেও বসিতে পারিবে না। বাকশক্তি তথা কথা বলার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কথোপকথন করিতে পারিবে না।
হাদীছ শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) নিকট কেহ জিজ্ঞাসা করিয়াছিল, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ। কেয়ামতের দিবস আপনার উম্মতদিগকে কি চিহ্ন দ্বারা চিনিতে পারিবেন?’
তদুত্তরে রাসূলুল্লাহ (ছঃ) বলিলেন, ‘গায়রে মোহাজ্জ্বিলীন’ চিহ্ন দ্বারা অতি সহজে আমার উম্মতগণকে চিনতে পারিব। অর্থাৎ আমার উম্মতে মোহাম্মদিয়া অজু করিবার সময় যে সকল অঙ্গ-প্রত্যংগ ধৌত করিয়াছিল, সেই সকল স্থান কেয়ামতের দিবস পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় স্নিগ্ধ আলোকে উদ্ভাসিত হইবে। তিনি সেই আলোক চিহ্ন দেখিয়া তাঁর উম্মত বলিয়া চিনিতে পারিবেন।
কবির ভাষায়——
কিয়ামতে মুমিনগণের অজুর জাগা যত,
নূরে উজ্জ্বল হইবে সে সব দীপ্ত চাঁদের মত।
অন্য এক হাদীছে আছে, সমস্ত মানব জাতি যখন নিজ নিজ কবর হইতে উঠিয়া হাশরের ময়দানে ইলাহীর আদালতে দণ্ডায়মান হইবে, তখন ফেরেশতাগণ অতি সমাদরে মোমেন ব্যক্তিদের নিকটবর্তী হইয়া তাদের শরীর হইতে ধূলা-মাটি ঝাড়িতে থাকিবে। অবশ্য ফেরেশতাগণ তাদের শরীর হইতে ধূলা-মাটি ঝাড়িয়া পরিষ্কার করিতে পারিবে না। অতঃপর আরও কতেক ফেরেশতা একত্রিত হইয়া উহা ঝাড়িতে মুছিতে শুরু করিলেও ব্যর্থ হইবে। ফলতঃ উহা মুছিতে সম্পূর্ণ অপারগ হইবে।
এতদ্দর্শনে আল্লাহ পাক ফেরেশতাগণকে সাদরে ডাকিয়া বলিবেন— ‘হে ফেরেশতাগণ! তোমরা ঐ ধূলা-মাটি যতবার যত ফন্দি করিয়াই ঝাড় না কেন, প্রত্যেক বারই বিফল মনোরথ হইবে। কেননা উহা প্রকৃত মাটি নহে, বরং উহা যে মসজিদ এবং মসজিদের মেহরাবের মাটি। তোমরা ঐ মাটি যথাভাবে রাখিয়া দাও যেন উহারা পুলসিরাত পার হইয়া জান্নাতুল ফিরদাউসে প্রবেশ করিলে পর অন্যান্য লোকগণ দেখিয়া বুঝিতে পারে যে, উহারা আমার একান্ত অনুগত বান্দা বা গোলাম!
নামাজির নামাজকালে যে সকল অংগ মাটিতে স্পর্শ করে, সেই সকল অংগকে সেজদার স্থান বলা হয় এই সকল স্থান সাতটি; যথা— হস্তদ্বয়ের তালু, কপাল, হাঁটুদ্বয় ও পায়ের অঙ্গুলীসমূহ। কেহ কেহ নাককেও সেজদার স্থানের মধ্যে গণ্য করেন।
জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণনা করিয়াছেন—আল্লাহ কেয়ামতের দিবস যখন কবর হইতে সকল মুর্দারকে উঠাইবেন তখন তিনি বেহেশতের খা- দেম তথা বেহেশতের দ্বার রক্ষক ফেরেশতাকে সংবাদ পাঠাইয়া বাণী দিবেন—
‘ওহে বেহেশতের দ্বারক্ষক ফেরেশতা! আমার বান্দাগণের মধ্যে রোজাদার বান্দাগণ অনাহার ও তৃষ্ণাতুর হইয়া কবর হইতে উঠিয়াছে, তাই তাদের পানাহারের নিমিত্ত প্রয়োজনীয় খাদ্য-সামগ্রী প্রস্তুত করিয়া রাখ।’
বেহেশতের দ্বার রক্ষক ফেরেশতা আল্লাহ পাকের নির্দেশ পাওয়া মাত্র বেহেশতের খাদেম হুর-গেলমান দিগকে ডাকিয়া বলিবেন— ‘আল্লাহ পাকের নির্দেশ হইয়াছে, তাঁর প্রিয় রোজাদার বান্দাগণের জন্যে পানাহারীর সামগ্রী প্রস্তুত রাখিতে। তাই তোমরা তাড়াতাড়ি তাদের জন্য বেহেশতের খাদ্য-খাদক লইয়া আমার নিকট উপস্থিত হও।’
অমনি বেহেশতের হুর-গোলমানেরা নানা রকমের বেহেশতের ফলম- লাদি, সুন্দর সুস্বাদু খাদ্য ও সুমধুর তৃষ্ণা নিবারণশীল্ শরবৎ বিভিন্ন ধরনের সৌন্দর্যময় খাঞ্চা পরিপূর্ণ করিয়া বেহেশতের দ্বাররক্ষক ফেরেশতার নিকট উপস্থিত হইবে।
ইত্যবসরে রোজাদার মো’মেন বান্দাগণ বেহেশতের দ্বার পর্যন্ত পৌঁছিয়া যাইবেন। এদিকে হুর-গেলমানেরাও সমস্ত খাদ্য-খাদক লইয়া বেহেশতের দ্বারে অপেক্ষা করিতে থাকিবে। রোজাদারগণ বেহেশতের দরজায় পৌঁছা মাত্র তাহারা তাহাদের সম্মুখে উক্ত খাদ্যাদি উপস্থিত করিয়া বলিবে—
কবির কথায়—
খোদার লাগি তোমরা ধরায় ছাড়ছ পানাহার,
যত খুশী আজ তোমরা খাও বিনিময়ে তার।
‘দুনিয়ায় থাকিয়া নির্ধারিত কিছুদিন পানাহার না করার পরিবর্তে অদ্য এই সকল খাঞ্চা হইতে যাহা ইচ্ছা পানাহার করুন।
রোজাদারগণ বেহেশতে প্রবেশ করিবার পূর্বেই এইরূপ সুস্বাদু খাদ্য খাদক খাইয়া দিব্বি আরামে বেহেশতে প্রবেশকালে হুর-গেলমানেরা এই বলিয়া অভিনন্দন জানাইবে—
কবির কথায়—
আমরা সুখের অনন্ত ধাম বেহেশত উদ্যান,
প্রবেশ কর ইহার মাঝে দিন কর গুজরান।
‘আসুন। বেহেশত আপনাদের জন্য অতি শান্তিময় স্থান, ইহার মধ্যে চিরস্থায়ী ভাবে প্রবেশ করুন।’
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলিয়াছেন, মানবজাতি যখন কবর হইতে উঠিয়া হাশর প্রান্তরে উপস্থিত হইবে, তখন ফেরেশতাগণ তিন শ্রেণীর লোকের সঙ্গে করমর্দন করতঃ সাদর স্বাগতম জানাইবেন, তারা হইলেন—
১। যাঁহারা ধর্ম যুদ্ধে শহীদ (নিহত) হইয়াছেন,
২। রমজান মাসে যাঁহারা রোজাব্রত পালন করিয়াছেন এবং
৩। যে সকল লোক হজ্জের মৌসুমে আরফার দিবস রোজা রাখিয়াছেন।
হজরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলিয়াছেন—’আল্লাহ পাকের নিকট সকল দিনের শ্রেষ্ঠ এবং অতি পবিত্র দিন—জুমুআ ও হজ্জের মৌসুমে আরফার দিন। আল্লাহতা’য়ালা—এই দুই দিন তাঁহার প্রিয় বান্দাগণের প্রতি রহমতের বন্যা বহাইয়া থাকেন। অপর দিকে ইবলীস শয়তানের নিকট এই দুই দিন অত্যন্ত দুঃখ ও কষ্টকর। অতঃপর হজরত (ছাঃ) আয়েশাকে (রাযিঃ) লক্ষ্য করিয়া বলিলেন— হে আয়েশা। যে ব্যক্তি আরাফার দিবস রোজা রাখে তাহার জন্য আল্লাহ পাক তাঁহার শান্তি ও রহমতের ত্রিশটি দরজা খুলিয়া দেন এবং ত্রিশটি দুঃখ ও কষ্টের দরজা বন্ধ করিয়া থাকেন।
আর যদি কোন ব্যক্তি আরফার দিবস রোজা রাখিয়া সন্ধ্যার পর পানিদ্বারা ইফতার করে তবে উক্ত ব্যক্তির জন্য শরীরের যাবতীয় শিরা- উপশিরা তাহার মাগফেরাতের জন্য আল্লাহর দরবারে ভোর পর্যন্ত করজোড়ে মিনতি করিয়া বলিতে থাকিবে : ‘হে খোদা। এই ব্যক্তির জন্য তোমার রহমতের দরজা খুলিয়া দাও এবং উহাকে কবুল কর।’
হাদীছ শরীফে আছে, রোজাদারগণ যখন তাহাদের কবর হইতে উঠিবে, তখন ফেরেশতাগণ তাহাদের পানাহারের জন্য উত্তম সুস্বাদু খাদ্যাদি লইয়া উপস্থিত হইয়া বলিবে—’হে রোজাদারগণ! দুনিয়ায় থাকিয়া আল্লাহর ভয়ে অতি কষ্ট স্বীকার করিয়া রোজা রাখিয়াছেন, তাই অদ্য আপনারা তৃপ্ত হইয়া পানাহার করুন।’ রোজাদারগণ অতি আনন্দের সহিত পানাহার করিতে থাকিবে। এদিক অন্যান্য লোক ইলাহীর আদালতে কৃত কর্মের জবাবদিহিতে ব্যস্ত থাকিবে। তাহারা দুঃখ করিয়া বলিবে, হায়রে! দুনিয়ায় থাকিতে সামান্য কষ্টভোগ করিয়া কেন রোজা রাখিলাম না।
অন্য একটি হাদীছে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফরমাইয়াছেন, মানুষ মাতৃগর্ভ হইতে যে রূপ উলংগ এবং নগ্ন পদে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে, অনুরূপ কেয়ামতের দিবসও সকল মানুষ উলংগ এবং নগ্ন পদে হাশর প্রান্তরে উপস্থিত হইবে। হাশর প্রান্তরে আল্লাহর সমীপে হিসাব-নিকাশ দেওয়ার জন্য মানুষের অন্তরে এত ভীতির সৃষ্টি হইবে যে, সর্বদা তাহারা আল্লাহর কৃপাপানে আসমানের দিকে তাকাইয়া থাকিবে : কোন সময় কাহার উপর কি হুকুম আসিয়া পড়ে। এইভাবে সমস্ত মানুষ অনাহারে চল্লিশ দিবস ব্যাপী দাঁড়াইয়া থাকিবে।
হাশরের ময়দানে সূর্য এত নিকটবর্তী হইবে যে, প্রত্যেকের মস্তক হইতে সূর্য মাত্র অর্ধ হাত উপরে থাকিবে। সূর্য এত নিকটবর্তী হওয়ার দরুণ কাহারও মাথার মস্তক গলিয়া ঘর্মের আকারে কর্মফল অনুযায়ী হাঁটু, কোমার ইত্যাদি পর্যন্ত ডুবিয়া যাইবে। এই ভয়াবহ সূর্যের তাপের সময় দয়াময় আল্লাহ তাঁহার প্রকৃত মো’মেন ব্যক্তিগণকে স্বীয় অসীম রহমতের ছয়াতলে স্থান দিবেন।
ঐ যে রবি আজকে যাহা অনেক দূরে আছে,
হাশর মাঠে পৌঁছবে তাহা আধ হাত কাছে।
এত নিকট পৌঁছবে বলে লাগবে ভীষণ তাপ,
পাইবে সাজা সেই তাপেতে যাহার যেমন পাপ।
গুনাগারের মাথার মগজ পড়বে গলে গলে,
কারুর হাঁটু কারুর মাজা ডুববে ঘামের জলে।
হাবুডুবু খাইবে ঘামে ডুববে কারুর কায়া,
কিন্তু মু’মিন বান্দা পাবে ‘আরশ’ তলে ছায়া।
হজরত আয়েশা (রাযিঃ) একদা হজরতের (ছঃ) সমীপে আরজ করেন——ইহা রাসূলাল্লাহ (ছঃ)! কেয়ামতের দিবস আল্লাহর কোন শ্রেণীর / বান্দা সোয়ার হইয়া কি হাশর প্রান্তরে হাজির হইবে?’ রাসূলুল্লাহ হাসিয়া উত্তর করিলেন—, সকল নবী ও তাঁহাদের আহলে বায়েতগণ হাশর প্রান্তরে সোয়ার হইয়া আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হইবে।’ তিনি আরও বলিলেন— ‘অন্য এক শ্রেণীর লোকও হাশরের ময়দানে সোয়ার হইয়া উঠিবে, যাহারা রজব, শা’বান ও রমজান
শা’বান ও রমজান এই তিন মাস একাধারে রোজাব্রত পালন করিয়াছে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছঃ) আরও বলিলেন— হাশরের ময়দানে সকল মানুষই অনাহারে কাতর হইয়া দণ্ডায়মান থাকিবে। কিন্তু নবী ও তাঁহাদের আহলে বায়েত এবং যে সকল লোক রজব, শাবান ও রমজান এই তিন মাস একাধারে রোজা রাখিত, তাহাদিগকে আল্লাহ পাক আপন অসীম রহমতে পানাহার করাইবেন।
হাশর ময়দান
হাশর আরবী শব্দের অর্থ একত্রিত হওয়া; অর্থাৎ কবর হইতে তামাম মুর্দেগান বিভিন্ন স্থান হইতে বিভিন্ন মর্যাদায় উঠিয়া হিসাব-নিকাশের জন্য একস্থানে জামায়েত হওয়া।
এ সম্পর্কে হাদীছের মর্মে জানা যায়, কেয়ামতের ময়দানে ইলাহীর আদালতে সকল মানুষকে মোট একশত বিশ সারিতে দাঁড় করানো হইবে। প্রত্যেক সারিতে অসংখ্য মানুষ দণ্ডায়মান থাকিবে। এই একশত বিশ সারির মধ্যে তিন সারি সকল নবীর উম্মতের মো’মেন মুসলমানগ ণের হইবে। আর বাকী একশত সত্তর সারি কাফেরগণের হইবে।’ অন্য এক হাদীছে আছে, কিয়ামতের ময়দানে উম্মতে মোহাম্মদিই মোট একশত বিশ সারিতে দণ্ডায়মান হইবে।
হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলেন, কেয়ামতের ময়দানে একশত বিশ সারি উম্মতে মোহাম্মদীয়ার হইবে। এই মতই সর্ববিদিত। ইমাম ছায়ুতী (রহঃ) বলেন, হাশরের ময়দানে সকল বেহশতবাসীদের মোট একশত সারি হইবে, তন্মধ্যে আশি সারি উম্মতে মোহম্মদিয়ার এবং বাকী চল্লিশ সারি অন্যান্য নবীগণের উম্মতের হইবে। মোটকথা, উম্মতে মোহাম্মদিয়াই বেশী সংখ্যক বেহেশতবাসী হইবে।
সকল নবীর উম্মা’ সকল মানব জাতি জুড়ি,
হাশর মাঠে কাতার হবে একশত এক কুড়ি।
ইহার মাঝে মোদের প্রিয় নবী মোস্তফার,
আশি কাতার উম্মা’ হবে রহমতে আল্লাহর।
হাশর প্রান্তরে মানুষ তিন দলে বিভক্ত
হাদীছ শরীফে আছে-কেয়ামতের দিবস সূর্য যখন মানুষের মাথা হইতে অর্ধ হাত উপরে থাকিবে এবং সূর্যের উত্তাপ অত্যন্ত প্রখর হইয়া উঠিবে, তখন অগ্নির একখণ্ড মেঘ আসিয়া হাশরবাসী মানুষগণের মাথার উপর দাঁড়াইয়া তাহাদিগকে ছায়া ধরিবে। অতঃপর উপর হইতে একটি নির্দেশ আসিবে-’হে হাবাসীগণ! তোমরা উক্ত ছায়াতলে চল।’ এই নির্দেশ শুনামাত্র সকল মানুষ তিন দলে বিভক্ত হইয়া উক্ত অগ্নি নির্মিত মেঘের ছায়ার দিকে রওয়ানা হইবে। এক দলে মো’মেন মুসলমানগণ থাকিবে। অন্যদলে থাকিবে মোনাফেকগণ আর এক দলে থাকিবে কাট্টা কাফেরগণ।
উক্ত তিন দল যখন মেঘের ছায়াতলে গিয়া দাঁড়াইবে তখনই মেঘখণ্ড তিন অংশে বিভক্ত হইয়া যাইবে। মেঘের এক অংশ অধিক মাত্রায় গরম, দ্বিতীয়াংশ ধুয়ার ন্যায় অন্ধকার এবং তৃতীয়াংশ শান্তিদায়ক আলোকের ন্যায় হইয়া যাইবে।
এই মর্মে আল্লাহ পাক বলেন-
‘তোমরা তিনগুণ বিশিষ্ট ছায়ার দিকে চল।’
মোনাফেকগণ মেঘের যে অংশে পৌঁছিবে, সেই অংশ অত্যধিক গরম হইবে। কেননা, তাহারা দুনিয়ায় থাকিয়া এইরূপ গরম হইতে নিজেদের আত্মাকে যুদ্ধ হইতে বাঁচাইয়া রাখিত এবং বলিত, আমরা সূর্যের তাপের দরুণ রাসূলুল্লাহর সাথে ধর্ম যুদ্ধে যোগদান করিতে পারি নাই। আল্লাহ পাক তাহাদের এই চক্রান্তের দরুণ তাহাদিগকে হাশরের ময়দানে শাস্তি প্রদান করিবেন।
আল্লাহ পাক বলেন-
‘বলুন, জাহান্নামের অগ্নি উহা হইতেও সমধিক গরম।’
কাফেরগণ মেঘের যে অংশে পৌঁছিবে, সেই অংশ ধুঁয়ার ন্যায় অন্ধকার হইবে! কেননা কাফেরগণ দুনিয়ায় থাকিয়া ইসলামের জ্যোতি হইতে অন্ধ ছিল, তাহারা আল্লাহর আয়াত (নিদর্শন) ও জগত সৃষ্টির রহস্য অনুধাবন করিয়া ইসলাম গ্রহণ করিতে পারে নাই। তাই আল্লাহ পাক তাহাদিগকে হাশর প্রান্তরে এইরূপ অন্ধকারাচ্ছন্ন মুছীবতের ঘোর অন্ধকারে স্থান দিবেন।
কোরআন শরীফে আছে, আল্লাহ বলেন-
‘কাফেরদের বন্ধু শয়তান; শয়তান তাহাদিগকে ইসলামের আলো হইতে অন্ধকারের দিকে ধাবিত করিয়া থাকে।’
যাহারা খোদার শত্রু বে-দ্বীন কাফের।
শয়তান লায়ীন হল ইয়ার তাদের।
তাদের সে আলোকিত সত্য পথ হতে
নিয়ে যায় গোম্রাহির অন্ধকার পথে।
আর প্রকৃত মো’মেন মুসলমানগণ দুনিয়ায় থাকিয়া ইসলামের জ্যোতিতে জ্যোতিষ্মান ছিল, তাই আল্লাহ পাক তাহাদিগকে কেয়ামতের ময়দানে ইলাহীর আদালতে আলোযুক্ত মেঘখণ্ডের মধ্যে স্থান দিবেন। তাহারা উক্ত স্থানে থাকিয়া কেয়ামতের বিভীষিকা বলিতে কিছুই অনুমান করিতে পারিবে না।
আল্লাহ পাক ফৰ্মান-
‘যাহারা আল্লাহর উপর একান্ত বিশ্বাসী, আল্লাহতাআ’লা তাহাদের ভাল-মন্দের বন্ধু; তিনি তাহাদিগকে অন্ধকার হইতে আলোকের দিকে পথ প্রদর্শন করান।’
আল্লাহপাক চির বন্ধু মু’মিন গণের,
নিয়ে যান দয়া করে তিনি তাহাদের।
লা-দ্বীনির গোম্রাহীর অন্ধকার হতে,
দ্বীনের মঙ্গলময় আলোকিত পথে।
সাত শ্রেণী আরশের ছায়ায়
হাদীছ শরীফে আছে-কেয়ামতের ময়দানে যে দিন সূর্যের ভীষণ উত্তাপ ব্যতীত দাঁড়াইয়া ছায়া লইবার মত স্থান থাকিবে না, সেদিন আল্লাহপাক তাঁহার অসীম রহমতে সাত শ্রেণীর লোককে তাঁহার আরশের ছায়াতলে স্থান দিবেন :
১। ন্যায় বিচারক বাদশাহ, যে বিচারের বেলায় ধনী, গরীব, ছোট, বড়, আত্মীয়-স্বজন সকলকে অপরাধানুযায়ী একই বিচার করেন- স্বার্থপরতা তাহার নিকট স্থান পায় নাই।
২। যে ব্যক্তি যৌবনে পদার্পণের পর হইতে জীবনের শেষ মুহূর্তে পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে রত থাকিত।
৩। যাহারা শুধু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্ত একে অপরকে ভালবাসিয়া থাকে।
৪। এমন এক ব্যক্তি যাহাকে একজন ধনী ও ঐশ্বর্যশালিনী অপূর্ব রূপবতী ও পরমা সুন্দরী রমণী প্রেমাবদ্ধে আকৃষ্ট করিতে চেষ্টা করিয়াছে এবং নিজ যৌবন তৃষ্ণার উপর আহ্বান জানাইয়াছে, তা সত্ত্বেও সে একমাত্র আল্লাহর ভয়ে তাহার কুপ্রবৃত্তি হইতে নিজেকে বাঁচাইয়াছে। ৫। যাহারা আল্লাহ পাকের মহব্বতে নির্জনে রোদন করিয়াছে। ৬। যাহারা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীর নিমিত্ত তাহাদের অন্তর সর্বদা মসজিদের দিকে আকৃষ্ট রাখিয়াছে।
৭। যারা মানুষের অজ্ঞাতে দান করে।
রাছুল বলেন, সেই ভয়ানক কিয়ামতের দিন,
সেদিন নাহি থাকবে ছায়া খোদার ছায়াহীন।
সাত কিছিমের লোকের তরে আল্লা মেহেরবান,
তাঁহার আপন আরশতলে করবে ছায়া দান।
যেই বাদশাহ সঠিক বিচার করল দুনিয়াতে,
যে নওজোয়ান যৌবনেই আসল খোদার পথে।
খোদার ঘরের প্রতি যাহার সর্বদা সর্বক্ষণ,
রহে গভীর ভালবাসা প্রবল আকর্ষণ।
যারা একে অন্যে কেবল খোদার খুশীর তরে,
ভালবাসা কিংবা পীরিত ভাঙ্গে না পরস্পরে।
যৌবনা এক শরীফজাদী রূপসী, সুন্দরী,
নিজের কাছে কুমতলবে ডাকল পেয়ার করি।
সেই সিরাজীর তীব্র লোভকে করে জয়
রইল ফিরে যেই বিজয়ী মহান খোদার ভয়।
গোপন দানের সেই দাতা যার এমনি সাখাওয়াত,
এক হাতে কি দান করিল জানে না আর হাত।
একা একা বসে যে জন নিঝুম নিরালায়,
খোদার ভয় মুহব্বতে কেঁদে বুক ভাসায়।
এ ছাড়াও আল্লাহ আরও অনেক সম্প্রদায়কে তাঁহার বিভিন্ন নেক কাজের উপর সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহার পবিত্র আরশের নীচে ছায়া দিবেন।
বিচার আদেশ
হাদীছ শরীফে আছে,- কেয়ামতের দিবস হাশরের ময়দানে যখন মানুষের অত্যন্ত কষ্ট ও যন্ত্রণা আরম্ভ হইবে, তখন দয়াময় আল্লাহ তা’য়ালা হজরত জিব্রাঈলকে (আঃ) সংবাদ পাঠাইয়া বলিবেন- হে জিব্রাঈল। যাও, মোহাম্মদকে (ছঃ) গিয়া সংবাদ দাও যে, যদি তাঁহার উম্মতগণ এই নিদারুণ বিভীষিকাময় হাশর প্রান্তরে দুঃখ-কষ্ট হইতে পরিত্রাণ পাইতে চাহে, তবে দুনিয়ায় তাহারা কষ্ট-মুছীবতে পড়িয়া আমাকে যে নাম নিয়া স্মরণ করিত সেই নাম নিয়া এখনও যেন আমায় স্মরণ করে।’ এ শুনিয়া হুজুর সকল উম্মতকে বলিবেন-
‘হে আমার উম্মতগণ! তোমরা সকলে এক কণ্ঠে সাময়িক দুঃখ-কষ্ট হইতে রক্ষা পাইবার জন্য বিসমিল্লা-হির রহমানির রাহীম-’দয়াময় খোদার নামে আরম্ভ করিতেছি যিনি অতি দয়ালু ও মেহেরবান’ কলেমা পড়িতে থাক। উম্মতে মোহাম্মদিয়া যখন আল্লাহর নির্দেশিত উক্ত কলেমা পড়িয়া পড়িয়া তাঁহাকে ডাকিতে থাকিবে, তখনই আল্লাহর দয়ার সাগরে বান ডাকিবে। তিনি দয়া করিয়া সকল উম্মতের হিসাব-নিকাশ শুরু করিবেন! অতঃপর আল্লাহ পাক অন্যান্য উম্মতগণকে ডাকিয়া বলিবেন- ‘হে লোক সকল! জানিয়া রাখ, যদি আমি উম্মতে মোহাম্মদিয়ার উপর সন্তুষ্ট হইয়া দয়া না করিতাম, তবে তোমাদের হিসাব-নিকাশ আরও এক হাজার বৎসর পরে আরম্ভ করিতাম।
মানব জাতির মধ্যে যাহাদের নেকী-বদী সমান হইবে তাহারা বেহেশত ও দোজখে কোন স্থান পাইবে না। আর যে সকল লোকের নিকট কোন নবী না আসার কারণে ভাল-মন্দ কোন আমলই করিতে সক্ষম হয় নাই এবং যাহারা জ্ঞানহীনতা ও উম্মত্ততার দরুন নেকী-বদীর বিবেচনা করিতে পারে নাই; আল্লাহ পাক এই সমস্ত লোককে প্রথমতঃ ‘আ’রাফ নামক স্থানে স্থান দিবেন। উহারা আ’রাফে পঞ্চাশ হাজার বৎসর অবস্থান করার পর আল্লাহপাক তাহাদিগকে বেহেশতবাসীদের খাদেমরূপে বেহেশতে প্রবেশ করাইবেন।
মানব জাতির ন্যায় জিন জাতিরও হিসাব-নিকাশ হইবে। উহাদের মধ্যে যারা আল্লাহর উপর বিশ্বাস করিয়া নেক আমল করিয়াছে, তাহাদিগে আল্লাহ পাক বেহেশতে স্থান দিবেন। আর যাহারা কুফর ও ফেসক- ফুজুরিতে লিপ্ত ছিল, তাহারা চিরস্থায়ী অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হইবে।
মানব দানব ব্যতীত আল্লাহ পাক অন্যান্য পশুপক্ষী, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদিগেও হিসাব-নিকাশের জন্য হাশরের ময়দানে ইলাহীর আদালতে দণ্ডায়মান করাইবেন। কিন্তু উহাদের বিচার মানব-দানবের বিচারের ন্যায় হইবে না বরং দুনিয়ায় যে সকল পশু-পক্ষী শক্তিশালী ও অত্যাচারী ছিল তাহাদিগকে দুর্বল নিঃশক্তিমান করা হইবে এবং অত্যাচারিত দুর্বল পশু- পক্ষীদিগকে সবল ও শক্তিশালী করা হইবে। অতঃপর আল্লাহর নির্দেশে অত্যাচারিতেরা অত্যাচারী পশু-পাক্ষীদের নিকট হইতে পূর্ব প্রতিশোধ নিতে থাকিবে। ইহার পরে উহাদিগকে মাটির সহিত মিশাইয়া মাটি করিয়া দেওয়া হইবে। কিন্তু নিম্নলিখিত আটটি জিনিষকে বিশেষ কারণ বশতঃ মাটিতে মিশাইয়া দেওয়া হইবে না। (১) হজরত ইসমাঈলের (আঃ) দুম্বা, (২) হজরত সালেহ নবীর উট, (৩) আছহাবে কাহাবের কুকুর, (৪) ওস্তুনে হান্নানা- কাষ্ঠের খাষা, যাহার সাথে রাসূলে করীম (ছঃ) মসজিদে নবুবীতে মিম্বর তৈয়ার হওযার পুর্বে ভর করিয়া খোতবা পাঠ করিতেন, (৫) কা’বা গৃহ, (৬) তুর পাহাড়, (৭) বাইতুল মোকাদ্দাসে ঝুলান পাথর ও (৮) রাসূলে পাকের রওজা মোবারক, মসজিদে নবুবী ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান।
আল্লাহ পাক এই সকল বস্তুর যথোপযুক্ত আকৃতি দান করিয়া বেহেশতে স্থান নিবেন।
কথিত আছে, আল্লাহর ভয়ে যে চক্ষু দ্বারা ক্রন্দন করিয়াছে, আল্লাহ পাক সেই চক্ষু দ্বারা কাহাকেও দোজখ দর্শন করাইবেন না। কেতাব হইতে ইহাও জানা যায় যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে সমান্য মাত্র ক্রন্দন করিয়া একগাছি লোম পরিমাণ স্থানও ভিজাইয়া থাকিবে, আল্লাহ তা’আলা তাহার সমস্ত গোনাহ মাফ করিয়া দিবেন। কেয়ামতের দিবস আল্লাহ পাক এই প্রকার ক্রন্দনকারীকেও বেহেশতের দিকে পাঠাইয়া তাহাকে সম্বোধন করিয়া বলিবেন, ‘এই ব্যক্তি আমার ভয়ে সামান্য ক্রন্দন করিলেও করিয়াছে, তাই অদ্য আমি উহার প্রতি দয়াশীল হইয়া উহার সমস্ত গোনাহ মাফ করিয়া দিলাম।
খোদার ভয়ে চোখ হইতে আঁসুর ধারা ঝরে,
জাহান্নামের অগ্নি হারাম সেই যে চোখের তরে।
শেষ বিচার
হাশর প্রান্তরে সূর্য মানুষ হইতে এত নিকটবর্তী হইয়া পড়িবে যে, মানুষের মাথার উপর মাত্র এক মাইলের মধ্যে সূর্য অবস্থান করিবে। মানুষ সূর্যের প্রখর উত্তাপে পাগলবৎ হইয়া যাইবে। তদুপরি হাশর প্রান্তরে সমস্ত মাটি তাম্র নির্মিত থাকিবে। মাথার অনতিদূরে প্রখর সুর্যের উত্তাপ এবং পায়ের নীচে তাম্র নির্মিত মাটি এই দুইয়ের সংমিশ্রণে মানুষ মর্মান্তিক অবস্থায় দিনের পর দিন কাটাইতে থাকিবে। সূর্যের স্থির কিরণে ও প্রচণ্ড প্রখর তীব্র উত্তাপে মানুষের দেহ হইতে অধিক ঘর্ম প্লাবিত হইতে থাকিবে। মানুষের কৃত কর্মের ফল অনুযায়ী তাহাদের ঘর্ম বাহির হইয়া কাহারও বক্ষদেশ, কহারও বা কোমর, কাহারও হাটু, কাহারও বা পায়ের গোড়ালী পর্যন্ত ডুবিয়া যাইবে। কাফেরদের এত ঘর্ম প্রবাহিত হইবে যে, তাহারা ঘর্মের কথিত নদীতে হাবুডুবু খাইতে থাকিবে।
ইসফীলের সিংগার ফুৎকারে কেহ হাত পা কর্তন অবস্থায় হাশর প্ররে উপস্থিত হইবে। কেহ বা পশুর আকৃতিরূপ, কেহ বা দংশনকারী সর্প গলায় পরিহিত অবস্থায় উঠিবে। কাহারও নাড়ি ভুড়ি পৃষ্ঠদেশ হইতে বহিষ্কৃত অবস্থায় জিহ্বাহীনভাবে উঠিবে। এইরূপে হাশরের ময়দানে কাহারও পা উপরে এবং মাথা নীচের দিকে ঝুলান থাকিবে। কাহারও পাকস্থলী অগ্নিতে পরিপূর্ণ থাকিবে। কেহ বা হাত পা লেংড়া, কর্ণ বধির এবং অন্ধ হইয়া হাশর প্রান্তরে অসহ্য কষ্ট ভোগ করিতে থাকিবে। এতদ্ব্যতীত তাহারা এক সময় এমন বিভীষিকাময় অন্ধকারের মধ্যে পতিত হইবে যে, মানব জ্ঞানে তাহা উপলব্ধি করাও অতি দুরূহ ব্যাপার। তাহারা অন্ধের ন্যায় হইয়া পড়িবে-অর্ধ হাত দূরের বস্তুও দেখিতে সমর্থ হইবে না। এইরূপ প্রতিকুল অবস্থা হইতে একমাত্র আল্লাহ পাকের প্রিয় বান্দাগণ ব্যতীত আর কেহই রেহাই পাইবে না। সকলেই এই বিভীষিকাময় ভয়াবহ অন্ধকারে দিক ভুলার মত দিশাহারা হইয়া পড়িবে।
বিচার অনুষ্ঠানের জন্য রাসূলল্লাহর সুপারিশঃ হাশর প্রান্তরে এইরূপ পিবদসঙ্কুল অবস্থায় মানুষ যখন চতুর্দিক অন্ধকার দেখিতে থাকিবে, তখন তাহারা এই ভীষণ বিপদ হইতে উদ্ধার পাইবার জন্য সোপারেশকারীর অন্বেষণে বাহির হইবে।
হাদীছ শরীফে আছে—মানুষেরা যখন হাশর প্রান্তরে মহা সঙ্কটে নিপতিত হইবে, তখন তাহাদের পরিত্রাণ ও সোপারেশের জন্য সর্ব প্রথম তাহারা মানবের আদি-পিতা হজরত আদমের (আঃ) নিকট উপস্থিত হইয়া বলিবে : ‘হে মানব জাতির আদি-পিতা! আমরা হাশর প্রান্তরে ভয়ংকর বিপদের সম্মুখীন। সর্বপ্রথম আল্লাহপাক আপনাকে অতি আদর করিয়া সৃষ্টি করতঃ সৃষ্টির সার্থকতা দেখাইয়াছেন- বেহেশতে বসবাসের হুকুম দিয়াছেন। ফেরেশতাগণ কর্তৃক সেজদা করাইয়াছেন। সর্বাগ্রে আপনাকেই আল্লাহ আসমান জমীনের যাবতীয় বিদ্যায় পারদর্শী করিয়াছেন। জানি, আপনি তাঁহার নিকট অত্যন্ত প্রিয়পাত্র, তাই অদ্য আমাদের শেষ বিচার অনুষ্ঠানের জন্য আল্লাহতা’লার নিকট সোপারেশ করুন-এই বিপদ হইতে আমাদিকে রক্ষাকরুন।’
এতদশ্রবণে হজরত আদম নবী (আঃ) তাহাদিগকে বুঝাইয়া বলিবেন- অদ্য আল্লাহ পাক অত্যন্ত ক্রোধান্বিত আছেন, তিনি এইরূপ ক্রোধান্বিত কোনদিন হন নাই-হইবেনও না। এতদ্ব্যতীত গন্দম ভক্ষণ করিবার নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও শয়তানের চক্রান্তে গন্দম ভক্ষণ করিয়াছিলাম, তজ্জন্য অদ্য আমি নিজেই অত্যন্ত ভীত ও লজ্জিত। না জানি, আল্লাহ তা’আলা জিজ্ঞাস করিয়া বসেন-’হে আদম, তুমি না আমার হুকুম অমান্য করিয়া নিষিদ্ধ গন্দম ভক্ষণ করিয়াছিলে?’ তখন আমি কি জবাব দিব। সুতরাং তোমাদের জন্য সুপারিশ করা আমার পক্ষে সম্ভব হইবে না! তবে তোমরা হজরত নূহ নবীর কাছে যাও।’
অতঃপর তাহারা সকলে হজরত নূহের (আঃ) সমীপে হাজির হইয়া তাহাদের জন্য খোদার দরবারে সুপারিশের আবেদন জানাইবে! এতদ শ্রবণে হজরত নূহ (আঃ) অক্ষমতা প্রকাশ করিয়া বলিবে-’আমার ছেলে কেনান কাফের হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ পাকের আদবের প্রতি খেয়াল না করিয়া মহা প্লাবন হইতে রক্ষা পাইবার জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া ও মাগফেরাত চাহিয়াছিলাম। এই জন্য আমি নিজেই অত্যন্ত লজ্জিত। তবে তোমরা হজরত ইব্রাহীম নবীর কাছে যাও।’
তৎপর সকলে হজরত ইব্রাহীমের (আঃ) সমীপে উক্তরূপে আবেদন লইয়া উপস্থিত হইবে। ইহাতে হজরত ইব্রাহীমও (আঃ) অক্ষমতা প্রকাশ করতঃ বলিবেন-দুনিয়ায় থাকিয়া আমার তিনটি পদস্খলন হইয়াছিল, তজ্জন্য আমি নিজেই অদ্য আল্লাহর নিকট লজিত ও ভীত। সুতরাং আমার পক্ষে তোমাদের জন্য ইলাহীর আদালতে সুপারেশ করা সম্ভব নহে। তবে তোমরা মুসা নবীর কাছে যাও।
সকলেই হজরত মুসা (আঃ) নিকট হাজির হইয়া করজোড়ে উত্তরূপে আবেদন জানাইবে। তিনিও তাহার অক্ষমতা প্রকাশ করিয়া বলিবেন- দুনিয়ায় থাকিয়া অসাবধানতা হেতু অপরাধী কিবতী কওমের এক ব্যক্তিকে হত্যা করিয়াছিলাম, কাজেই অদ্য আমি স্বীয় কর্ম-ফলের দরুন নিজেই শঙ্কিত আছি। কি প্রকারে আবার তোমাদের সুপারেশ নিয়া আল্লাহর দরবারে যাইব? তোমরা রূহুল্লাহ বা ঈসা নবীর কাছে যাও।’
অতঃপর তাহারা সকলে হজরত ঈসার (আঃ) সমীপে গিয়া তাহাদের আকুল আবেদন জানাইবে। তিনি অস্বীকার করিয়া বলিবেন-হে বিপদের সম্মুখীন লোক সকল! তোমাদের হাশর প্রান্তরে মুক্তির কাণ্ডারী এক মাত্র শেষ নবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (ছঃ)। তাই তোমরা তোমাদের শেষ আবেদন তাঁহার সমীপে গিয়া জানাও। নিশ্চয় তিনি তোমাদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করিবেন।’
সব নবীই ‘নফছী নফছী’ বলবে হাশর দিন,
ইয়া উম্মতি বলবে কেবল নবী আল-আমীন। এইভাবে হাশর প্রান্তরে সকল লোক আদম, নূহ, ইব্রাহীম, মুসা ও ঈসার (আঃ) নিকট হইতে নিরাশ হইয়া সর্বশেষে আমাদের শেষ নবী হজরত মোহাম্মদের (ছঃ) নিকট তাহাদের আকুল আবেদন লইয়া উপস্থিত হইবে। দয়াল নবী হাশরবাসিগণের দুর্বিসহ দুরবস্থা দেখিয়া তাহাদের দয়ায় দ্রবীভূত হইয়া যাইবেন। অমনি তিনি বোরাকে আরোহণ করতঃ ‘মাক্কাম-ই মাহমুদে’ উপস্থিত হইবেন।
আল্লাহ পাক বলেন-
‘আসা আইয়াব আছাকা রাব্বুকা মাকামাম মাহমুদা।’
‘ওহে মোহাম্মদ! অচিরেই আপনার প্রতিপালক আপনাকে ‘মাকাম ই মাহমুদে’ পৌঁছাইবেন।
হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (ছাঃ) উক্ত ‘মাকাম-ই-মাহমুদে’- পৌঁছামাত্র আল্লাহ পাকের অপূর্ব তাজাল্লী (জ্যোতিঃ) দর্শনে তিনি সাত দিন যাবৎ সেজদায় পড়িয়া থাকিবেন; পরে আল্লাহর দরবার হইতে নির্দেশ আসিবে; ‘হে মোহাম্মদ! মস্তক উঠাও, অদ্য তুমি যাহা আবেদন করিবে তাহাই পুরণ করিব আর যাহা বুলিবে তাহাই শ্রবণ করিব। তুমি যে জন্য সুপারেশ করিবে অদ্য আমি তাহাই কবুল করিব। বল, কি বলার আছে তোমার?-
মাকামে মাহমুদা গিয়া আল্লার দরগায়,
সপ্ত দিবস রবেন নবী পড়িয়া ছিজদায়।
আল্লাতা’লা বলবে তখন ওঠ হে মোর নবী,
তোমার যত আরজু পুরণ করব আমি সবি।
অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাঁহার মাথা সেজদাহ হইতে উত্তোলন করিয়া আল্লাহ পাকের পবিত্রতা ও প্রশংসা বর্ণনা করিয়া আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করিবেন : হে বিচার দিনের স্বামী। আপনি আপনার একান্ত বাধ্যগত ও নির্ভরযোগ্য প্রিয় দূত জিব্রাঈলের দ্বারা আমাকে জানাইয়াছেন যে, অদ্য আমি যে বিষয়ে আবেদন করিব তাহাই আপনি কবুল করিবেন। অদ্য আমি আপনার অসীম দয়ার প্রার্থী’।
এতদশ্রবণে আল্লাহ পাক বলিবেন : ‘হে মোহাম্মদ! আমার একান্ত অনুগত ও নির্ভরযোগ্য সংবাদবাহক দূত জিব্রাঈল আপনাকে যাহা জানাইয়াছে তাহা একান্তই সত্য, তাহা অদ্যই সংঘটিত হইয়া থাকিবে। নিঃসন্দেহে অদ্য আপনাকে খুশী করিব এবং আপনার শাফায়াত কবুল করিব। আপনি এখনই জমীনে চলিয়া যান, আমি অবিলম্বে জমীনে পদার্পণ করিতেছি। এখনই সকল মানুষের কৃতকর্মের ফলাফলের হিসাব নিকাশ লইয়া প্রত্যেককে তাহাদের আমল অনুযায়ী ন্যায়ানুগ প্রতিফল দান করিব। ইহার পর রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জমীনে চলিয়া আসিবেন এবং সকল মানুষকে তাঁহার সুপারিশের সুসংবাদ জানাইবেন।
রাসূলুল্লাহ (ছঃ) জমীনে অবতরণ করিতে না করিতেই আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাঁহার আসমানের অসংখ্য ফেরেশতাগণসহ অপূর্ব শান- শওকাতের সহিত জমীনে ‘পদক্ষেপ করিবেন। আল্লাহ পাকের জমীনে অবতরণের ফলে জমীন ধন্য হইবে, আকাশ-বাতাস ক্ষণিকের জন্য স্তম্ভিত হইয়া দাঁড়াইয়া থাকিবে, যুগের আলো-বাতাশ পুলকে নাচিয়া উঠিবে।
আল্লাহ পাক জমীনে অবতরণ করামাত্র তাঁহার সূক্ষ্ম ন্যায় বিচারের এজলাসে আরোহণ পূর্বক সকল মানুষকে লক্ষ্য করিয়া বলিবেনঃ ‘হে আমার বান্দাগণ! তোমরা জানিয়া রাখ, কেয়ামাতের পূর্ব পর্যন্ত যে যাহা করিয়াছ তাহা আমার সম্পূর্ণ জানা আছে। বিশেষ করিয়া আমার নির্ভরযোগ্য ফেরেশতাগণ তাহা তিলে তিলে হিসাব লিখিয়া রাখিয়াছে। অদ্য তোমাদের প্রতি সামান্য মাত্র জুলুম বা অবিচার হইবে না। এখনই তোমাদের কৃতকর্মের ফল তোমাদের সম্মুখে উপস্থিত করা হইবে এবং প্রত্যেককে তদনুযায়ী ফল ভোগ করিতে হইবে।’
বিনা হিসাবে একদলকে বেহেশতের নির্দেশ : সর্ব প্রথম আল্লাহ রাববুল আলামীন এজলাসে উপবেশন করা মাত্র তাঁহার প্রিয় বান্দাগণের মধ্যে এক সম্প্রদায়কে হিসাব-নিকাশের পূর্বেই বেহেশতে গমন করিতে হুকুম দিবেন।
এই মর্মে হাদীছ শরীফে আছে-আল্লাহ পাক যখন কেয়ামতের ময়দানে তাঁহার আদালতে সকল মানুষকে একত্রিত করিবেন, তখন আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ সাদরে ডাকিয়া বলিবেন-’আল্লাহতাআ’লার নিকট প্রিয় ও সম্মানী লোক কাহারা আছেন? আল্লাহর দরবার হইতে তাঁহাদের জন্য নির্দেশ হইয়াছে, তাঁহারা এখনই বেহেশতে গমন করুন।’ এ ঘোষণা শোনামাত্র আল্লাহর একদল প্রিয় বান্দা উঠিয়া বেহেশতের দিকে রওয়ানা হইবেন।
বেহেশতে গমনের পথে তাঁহাদের সাথে একদল ফেরেশতার সাক্ষাৎ হইবে। তাহারা বেহেশতে গমনকারীদের নিকট জিজ্ঞাসা করিবে, আপনারা কাহারা? কি আমলের বদৌলত এত তাড়াতাড়ি পাপ-পুণ্যের হিসাব নিকাশের পূর্বেই বেহেশতে গমন করিতেছেন? তাঁহারা উত্তর করিবেন, ‘দুনিয়ায় বহু লোক আমাদের উপর জুলুম ও অত্যাচার করিয়াছিল, কিন্তু . আমরা জুলুমের পরিবর্তে ধৈর্য ধারণ করিয়া তাহাদের সাথে সদ্ব্যবহার করিয়াছি; আমাদের প্রতি কেহ অপব্যবহার করিলে আমরা তাহাদিগকে সরল প্রাণে মাফ করিতাম।’ এতদশ্রবণে ফেরেশতাগণ বেহেশতের পথ দেখাইয়া বলিবে-’এই দিকে সোজা বেহেশতে চলিয়া যান।’
ইহার পর আবার আল্লাহর নিকটবর্তী ফেরেশতাগণ ডাকিয়া বলিবে- ‘হে ধৈর্যশীলগণ! আপনারা কে কোথায় আছেন? উঠুন : আল্লার তরফ হইতে হুকুম হইয়াছে, আপনারা হিসাব-নিকাশের পূর্বেই বেহেশতে গমন করুন! তখন তাঁহারা আনন্দের সহিত বেহেশতের পথ ধরিবে। পথিমধ্যে আবার তাঁহাদের সাথেও একদল ফেরেশতার মোলাকত হইবে। উহারা তাঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিবে, আপনারা কাহারা? হিসাব-নিকাশের পূর্বেই যে বেহেশতে গমন করিতেছেন?’ তদুত্তরে ধৈর্যশীলগণ বলিবেন- আমরা দুনিয়ায় থাকিয়া সকল বিপদ-আপদ পদদলিত করিয়া সর্বদা আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে কালযাপন করিতায়। তাই বুঝি অদ্য দয়ালু খোদার অসীম কৃপায় বিনা হিসাব-নিকাশেই আমাদেরকে বেহেশতে গমনের আদেশ দান করিয়াছেন।’ তৎপর ফেরেশতাগণ বলিবে, শুকরিয়া খোদার রহমতে বেহেশতে চলিয়া যান।’
ইহার পর আবার যাহারা দুনিয়ায় পরস্পর একে অন্যের সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্ত বন্ধুত্ব স্থাপন করিয়াছিল, উহাদিগকে আল্লাহর আদালতের ফেরেশতাগণ ডাকিয়া বলিবে; ‘এমন কাহারা আছেন, যাহারা দুনিয়ায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরস্পর বন্ধুত্ব করিয়াছেন!’ ফেরেশতাদের এইরূপ উচ্চঃকন্ঠের আহ্বানে একদল লোক আল্লাহ পাকের ন্যায় বিচারের আদালতে হাজির হইবেন। আল্লাহ তাঁহাদের উপর সন্তুষ্ট হইয়া তুলাদণ্ড হিসাব হইতে রেহাই দিয়া বেহেশতে গমনের হুকুম দিবন, অমনি তাঁহারা বেহেশতের দিকে রওয়ানা হইবেন। পথিমধ্যে তাঁহাদের সঙ্গেও আবার একদল ফেরেশতার দেখা হইবে। ফেরেশতাগণ তাহাদিগকে দেখিয়া খুশীতে সাদরে জিজ্ঞাসা করিবে-
‘ভাইসব! আপনারা কাহারা? ইলাহীর আদালত হইতে পাপ-পুণ্যের হিসাব হওয়ার পূর্বেই যে বেহেশতে গমন করিতেছেন?, তাঁহারা উত্তর করিবেন-’আমরা দুনিয়ায় থাকিয়া নিজ স্বার্থ বিসর্জন দিয়া পরস্পর একে অন্যের সাথে খোদার সন্তুষ্টির নিমিত্ত বন্ধুত্ব সূত্রে আবদ্ধ হইয়াছিলাম। আমরা পরস্পর পরস্পরের দুঃখে দুঃখিত এবং সুখে আনন্দিত ছিলাম। তাই বুঝি আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন অদ্য আমাদের উপর এতটা দয়াবান হইয়াছেন, হিসাব-নিকাশের পুর্বেই বেহেশতে যাওয়ার হুকুম দিয়াছেন।
মুখ বুজিয়া সইল যারা জুলুম অবিচার,
করল বরং সদ্ব্যবহার দাদ না দিয়ে তার।
বিপদ-আপদ, দুঃখ মুছিবত আসল দুনিয়ার,
রইল যারা ধৈর্য ধরে সবর করে তায়।
দুইটি মানুষ পরস্পরে করল ভালবাসা,
নাই তাতে স্বার্থ কেবল খোদার খুশী আশা।
হিসাব ছাড়া এ-তিন কিছিম মানুষ আখেরাতে,
হাশর হতে সরাসরি পৌঁছিবে জান্নাতে।
কথিত আছে-যখন উক্ত তিন সম্প্রদায় বিনা হিসাবে বেহেশতে গমন করিবেন, তখন আল্লাহর আদেশে পাপ-পুণ্য ওজন করিবার জন্য তুলাদণ্ড মীজান (পাল্লা) আনয়ন করা হইবে।
কাফেরের বিচার : আল্লাহ পাক জমীনে অবতরণের পরই ফেরেশতাগণকে বেহেশত ও দোজখ আনয়নের হুকুম দিবেন যেন হাশরবাসীগণ প্রত্যক্ষ ভাবে তাহা দেখিয়া তাহাদের ভবিষ্যতের যথার্থ অবস্থা অনুধাবন করিতে পারে। বেহেশত ও দোজখ জমীনে আনায়ন করা হইলে দোজখবাসীরা দোজখের ভয়াবহ বিভীষিকাময় আজাব ও দুরবস্থা দর্শনে ভয়ে কম্পিত হইয়া উঠিবে। বেহেশতবাসীগণ বেহেশতের সৌন্দর্য, ভোগ-বিলাস, সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও আরাম আয়েশ দেখিয়া খুশীতে বিভোর হইয়া যাইবে এবং দুনিয়ার যাবতীয় কষ্ট ক্লেশ ভুলিয়া ভবিষ্যতে সুখের প্রতীক্ষা করিতে থাকিবে।
অতঃপর আল্লাহ মানুষের যাবতীয় কৃত-কর্মের ভাল আমল-নামাজ, রোজা, হজ্জ, যাকাৎ, জেকের-আজকার, কোরআন ইত্যাদির আকৃতি দান করতঃ পৃথক পৃথক সারিতে শ্রেণীবদ্ধভাবে দাঁড় করাইবেন। এই সময় তাওহীদ উপস্থিত হইয়া বলিবে-’হে খোদা। আপনি ‘সালাম’ (শান্তি বর্ষণকারী) আর আমি ইসলাম শান্তি।’ এতদশ্রবণে আল্লাহতাআ’লা বলিবেন : ‘হে কলেমা। আমার নিকটবর্তী হও, যেহেতু অদ্যকার তোমার দরুন এক সম্প্রদায় লোক পুরষ্কৃত এবং আর এক সম্প্রদায় অভিশপ্ত হইয়া ভীষণ শাস্তির উপযোগী হইবে।
অতঃপর আল্লাহতাআ’লা ফেরেশতাগণকে সকলের আমল পৌঁছাইয়া দেওয়ার নিমিত্ত নির্দেশ করিবেন।
মো’মেনদের আমল-নামা তাঁহাদের সম্মুখ দিক দিয়া তাঁহাদের ডান হাতে দেওয়া হইবে। ফলে তাঁহারা উক্ত আমল-নামা দেখিয়া সন্তুষ্ট হইবেন এবং আল্লাহ পাকের কৃপার শুকরিয়া আদায় করিবেন। কাফেরদে আমলনামা পিছনের দিক দিয়া তাহাদের বাম হাতে দেওয়া হইবে। কাফের:.. উক্ত আমালানায় তাহাদের কৃত যাবতীয় কার্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দেখিয়া ভয়ে কম্পিত হইয়া পড়িবে। কিন্তু ইহাতে তাহাদের কোন ফল হইবে না।
আল্লাহ উভয়দল সম্পর্কে বলেন-
‘শেষ বিচারের বিদস যাহারা আমলনামা দক্ষিণ হস্তে পাইবে তাহারা খুশী হইয়া একে অন্যকে বলিবে : আমার আমলনামা পড়িয়া দেখতো?
ডাহিন হাতে আমলনামা লাভ করিবে যারা,
কঠিন হাশর ময়দানেতে চরম সফল তারা।
খুশীর সাথে বলবে তারা এক দোছরার কাছে,
দেখতো ভাই ইহার মাঝে কি সব লেখা আছে!
অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন-
‘আর আমলনামা যাহারা বাম হাতে পাইবে, তাহারা দুঃখ করিয়া বলিবে- ‘হায়রে। আমাদের যদি এ আমলনামা দেওয়া না হইত!’
বাম হাতেতে আমলনামা লাভ করিবে যারা,
দারুণ ভয়ে তারা সবাই হইবে দিশেহারা।
বদন পরে বিষাদ-রেখা দিবে তাদের দেখা,
বলবে ক্ষেদে হায় যদি আজ না পেতাম এই লেখা।
অতঃপর আল্লাহ পাক কাফেরদিগকে তাঁহার সম্মুখে ডাকিয়া বিচার আরম্ভ করিবেন। সর্ব প্রথম আল্লাহ পাক তাহাদের অংশীবাদিতার বিষয় জিজ্ঞাসা করিবেন। তখন তাহারা অস্বীকার, করিয়া বলিবে-
‘হে খোদা! আমরা কখনই তোমার সাথে কাহাকেও অংশীজ্ঞানকারী ছিলাম না।’
ইহাতে আল্লাহ পাক তাহারা যে স্থানে যে সময় শের্ক করিয়াছিল সেই স্থান ও সময়ের নিকট হইতে তাহাদের শের্কের সাক্ষ্য গ্রহণ করিবেন। এতদ্ব্যতীত হজরত আদমের (আঃ) নিকট যে সকল আদম সন্তানের আমল নামা পেশ করা হইত, তাঁহার নিকট হইতে এবং যে সকল ফেরেশতা আদম সন্তানের আমল লিপিবদ্ধ করিয়া রাখিত, তাহাদের নিকট হইতেও সাক্ষ্য গ্রহণ করিবেন। কিন্তু ইহাতেও কাফেরগণ অস্বীকার করিয়া বলিতে থাকিবেঃ ‘আমরা কখনই তোমার সাথে কাহাকেও অংশীদার (শেক) জ্ঞান করি নাই।’ অতঃপর আল্লাহ পাক তাহাদের চক্ষু, কর্ণ, হাত, পা, এক কথায় সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হইতে তাহাদের শের্কের সাক্ষ্য তলব করিবেন। ইহাতে তাহাদের সর্বাঙ্গ সাক্ষ্য দিয়া বলিবে : ‘হাঁ, হে খোদা! এই ব্যক্তি আপনার সাথে অংশীজ্ঞান (শের্ক) করিয়াছে।’
আল্লাহ পাক বলেন-
‘যখন কাফেরগণ ইলাহীর আদালতে পৌঁছিবে, তখন তাহাদের চক্ষু, কর্ণ, ত্বক ইত্যাদি তাহাদের কৃতকর্মের সাক্ষ্য প্রদান করিবে।
মোশরেকেরা কিয়ামতে বলবে খোদার ঠাঁই,
আমরা কভু তোমার সাথে শরীক করি নাই।
সাক্ষ্য চা’বেন তখন খোদা অঙ্গসমূহের,
তখন এরা সাক্ষ্য দিবে খেলাফ তাহাদের।
চোখ-কান ও ত্বক জবান খুলে বলবে খোদার কাছে,
করছে এরা ঠিক যা লিখা আমলনামায় আছে।
এইবারে কাফেরগণ উপায়ান্ত না দেখিয়া তাহারা স্বীয় গোনাহর কথা আল্লাহ পাকের সমীপে স্বীকার করিতে বাধ্য হইবে।
আল্লাহ পাক বলেন-
‘অবশেষে তাহারা তাহাদের গোনাহর কথা স্বীকার করিবে।’
এই সময় কাফেরগণ করজোড়ে মিনতি করিয়া বলিবে : ‘হে খোদা! আমরা শয়তানের চক্রে পড়িয়া এরূপ গোনাহর কার্য করিয়াছি। হে খোদা! আমাদিগকে একটু অবসর দিয়া পুনঃ দুনিয়ায় পাঠাইয়া দিন। আমরা দুনিয়ায় গিয়া কখনও আর ঐরূপ গোনাহর কার্য করিব না-একান্ত আপনার অনুগত বান্দার ন্যায় যাবতীয় নেক কার্য করিব।
এতদশ্রবণে আল্লাহ পাক রাগের সহিত বলিয়া উঠিবেন :- ‘তাহা কখনই হইতে পারে না; দুনিয়ায় তোমাদিগকে দীর্ঘজীবি করিয়াছিলাম, ভালমন্দ জ্ঞান দান করিয়াছিলাম তোমরা ইচ্ছা করিলে আমার একত্ববাদিতা স্বীকার করিয়া নেক কাজ করিয়া আসিতে পারিতে। কিন্তু তোমরা তাহার কিছুই কর নাই।
এতদ্ব্যতীত যুগে যুগে আমার নবী ও রাসূলগেণকে প্রেরণ করিয়া তোমাদিগকে আমার সতর্কবাণী শুনাইয়াছি। কিন্তু তোমরা সেই দিকেও লক্ষ্য না করিয়া হাসিয়া উড়াইয়া দিয়াছ। ইহা ছাড়া, আমার সতর্কবাণী বাহক নবী ও রাসূলগণকে পাগল বলিয়া ধিক্কার দিয়াছ; কাজেই এখন বাধ্য হইয়া স্বীয় কর্মফল ভোগ করিতে হইবে। জানিয়া রাখ, আমার আদালতে পাপীদের পক্ষে সাহায্যকারী বা সুপারেশকারী বলিতে কেহই থাকিবে না।’
অতঃপর আল্লাহ পাক হজরত আদমকে (আঃ) ডাকিয়া বলিবেন, ‘হে আদম! তোমার সন্তানগণের মধ্য হইতে দোজখীদের বাছিয়া বাহির কর।’ এতদশ্রবণে আদম (আঃ) খোদার দরবারে আরজ করিয়া বলিবেন, ‘হে খোদা! কতজনে কর্তজন বাহির করিব? উত্তরে আল্লাহ বলিবেন-
‘প্রত্যেক হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন বাহির কর।’ এই কথা শুনা মাত্র হাশর প্রান্তরে বিষাদের কালিমা রেখা ছড়াইয়া পড়িবে। সকল মানুষ ভয়ে আতঙ্কিত হইয়া পাগলের ন্যায় ছুটাছুটি আরম্ভ করিবে। তৎপর কাফেরদিগকে অধঃমুখে ধাক্কা দিয়া দোজখে নিক্ষেপ করা হইবে।
সাধারণ মুসলমানদের বিচার : আল্লাহ পাক কাফেরদের বিচার শেষ করিলে সমস্ত কাফের দোজখে নিক্ষিপ্ত হইবে। তখন হাশর প্রান্তরে বিভিন্ন নবীর মোনাফেক উম্মত এবং মুসলমান ব্যতীত আর কেহ থাকিবে না। এই সময় আল্লাহতা’আলা হঠাৎ হাশর প্রান্তরে আপন আত্মপ্রকাশ করিয়া মো’মেনদের সাক্ষাৎ দিবেন। আল্লাহ পাকের অপূর্ব তাজাল্লী (নূর) দেখিয়া তাহারা সেজদায় পড়িয়া যাইবে। মোনাফেকগণ মুসলমানদের দেখাদেখি সেজদা করিতে চেষ্টা করিবে। কিন্তু যখনই মোনাফেকগণ সেজদা করিতে চেষ্টা করিবে, তখনই তাহারা চিৎ হইয়া ভূ-তলে পড়িয়া যাইবে। সকলেই বুঝিতে পারিবে, ওরাই মোনাফেক।
হাশর মাঠে যখন খোদা দিবেন দরশন,
সাথে সাথে ছিজদা তাঁরে কবরে মুমিনগণ!
কিন্তু নাহি ছিজদা দিতে পারবে মুনাফিক,
এতেই তারা পড়বে ধরা সবাই পারে ঠিক।
তৎপর আল্লাহ হাকিম মুসলমানদের নেকী ও বদী ওজন করিবার নিমিত্ত ফেশেতাগণকে তুলাদণ্ড মীজান (পাল্লা) উপস্থিত করিতে নিৰ্দেশ দিবেন। অতঃপর তুলাদণ্ড মীজানে সকল মুসলমানের নেকী ও বদীর যাবতীয় ছোট-বড় আমল সুক্ষ্মভাবে ওজন করা হইবে।
আল্লাহ পাক বলেন-
‘বিচার দিবসে ন্যায় বিচারের সূক্ষ্ম তুলাদণ্ড স্থাপন করা হইবে।’
জীব-জন্তুর বিচার : মানব-দানব ব্যতীত পশু-পক্ষী, কীট-পতঙ্গ ইত্যাদিগকেও হিসাব-নিকাশের জন্য হাশর ময়দানে ইলাহীর আদালতে হাজির করা হইবে। কিন্তু উহাদের বিচার মানব-দানবের বিচারের ন্যায় হইবে না। দুনিয়ায় থাকিয়া যদি কোন শক্তিশালী জানোয়ার নিঃশক্তিমান জানোয়ারের উপর অন্যায়ভাবে জুলুম করিয়া থাকে তবে বিচার কালে আল্লাহ দুনিয়ার নিঃশক্তিমান জানোয়ারকে শক্তি দান করিবেন। অতঃপর আল্লাহর হুকুমে অত্যাচারীতেরা অত্যাচারিদের নিকট হইতে পরস্পর একে অন্যের জুলুমের প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে। পরে আল্লাহর আদেশে উহাদিগকে মাটির সঙ্গে মিশ্রিত করিয়া দেওয়া হইবে। কিন্তু নিম্নের জানোয়ার ও বস্তুগুলিকে মাটির সঙ্গে মিশ্রিত করিয়া দেওয়া হইবে না। আল্লাহ পাক উহার যথোপযুক্ত আকৃতি দান করিয়া বেহেশতে রাখিতে নির্দেশ দিবেন।
জীব ও বস্তসমূহ এই-
১। হজরত ইসমাঈল নবীর দুম্বা,
২। হজরত ছালেহ নবীর উট,
৩। আছহাবে কাহাফের (গুহাবাসীদের) কুকুর,
৪। উসতোয়ানায়ে হান্নানা-কাঠের ঐ খাম্বা যাহার উপর রাসূলুল্লাহ (ছঃ) মসজিদে নবুবীর মিম্বর তৈয়ার হওয়ার পূর্বে ভর দিয়া খুত্বা দিতেন।
৫। বাইতুল্লাহ বা কা’বা গৃহ, স্থান।
৬। তুর পাহাড়,
৭। বাইতুল মোকাদ্দাসে ঝুলান পাথর এবং
৮। রাসুল্লাহর (ছঃ) রওজা মোবারক ও মসজিদে নবুবীর মধ্যবর্তী স্থান।
হাদীছ শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন-
‘আমার কবর ও মিম্বরের মধ্যবর্তী স্থান বেহেশতের বাগিচার মধ্যে একটি বাগিচা।’
মধ্য টুকু মিম্বর এবং আমার কবরের,
একটি বাগান বেহেশতেরই বাগান সমুহের।
হাশর প্রান্তরে রাসুলুল্লাহর ঝান্ডা : পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্ পাক যখন সমস্ত প্রাণীকে পুনরুজ্জীবিত করিতে ইচ্ছা করিবেন, তখন সর্ব প্রথম নেতৃস্থানীয় প্রধান চারিজন ফেরেশতাকে জিন্দা করতঃ রাসূলুল্লাহকে (ছঃ) তাঁহার মারকাদ (কবর) মোবারক হইতে অভিনন্দন করিয়া আনয়নের জন্য আদেশ প্রদান করিবেন। অমনি উহারা বেহেশত হইতে ‘বোরাক’ এবং ‘লিওয়াউল হামদ’ নামক ঝাণ্ডা সঙ্গে লইয়া রসূলুল্লাহকে অভিবাদন করিয়া আনয়নের জন্য রওয়ানা হইবেন। এই ‘লিওয়াউল হামদ’ রাসূলুল্লাহর নির্দিষ্ট ঝাণ্ডা, কেয়ামতের ময়দানে তিনি এই ঝাণ্ডা লইয়া হাজির হইবেন। সেই দিন উম্মতে মোহাম্মদীয়া রাসূলুল্লাহর এই নির্দিষ্ট চিহ্নিত ঝাণ্ডা দেখিয়া দলে দলে তথায় সমবেত হইতে থাকিবে।
‘লেওয়াউল হামদ ঝাণ্ডা হাশরের দিন,
পাইবেন আমাদের রসূল আমীন।
এই সুবিশাল পাক নিশানের তল,
মিলিত হবে তাঁর উম্মতের দল।
ওহে আল্লা, সেই মহা হাশর ময়দান,
সেই নিশানের তলে পাই যেন স্থান।
হাদীস শরীফে আছে, ‘লিওয়াউল হামদ’ এতবড় বিরাট যাহার এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত একজন লোক বহু শত বৎসর গমন করিলেও তাহার শেষ সীমা পাইতে সক্ষম হইবে না। লিয়াউল হামদের প্রস্থ আসমান জমীনের প্রস্থের ন্যায় বিশাল। আল্লাহ্ পাক এই ঝাণ্ডাকে লাল ইয়াকুত এবং সবুজ জমরুদ নামক অত্যধিক মূল্যবান পাথর দ্বারা সৌন্দর্য দান করিয়াছেন। এই ঝাণ্ডায় আল্লাহ্ তা’আলার আদেশে তিনটি বাক্য লেখা হইয়াছে।
তন্মধ্যে প্রথম লাইনে লেখা আছে-
‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’-’দয়াময় আল্লাহর নামে আরম্ভ করিতেছি, তিনি অতি মহান দয়ালু।
দ্বিতীয় লাইনে লেখা আছে-
‘আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামীন’- সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি বিশ্ব জগতের প্রতিপালক।’
তৃতীয় লাইনে লেখা আছে-
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’-’আল্লাহ্ ছাড়া ‘কোন মা’বুদ বা উপাস্য নাই, মোহাম্মদ মোস্তফা তাঁহার প্রেরিত মহাপুরুষ বা রাসূল।’
রাসূলুল্লাহর (ছঃ) এই লিওয়াউল হামদ নামক ঝাণ্ডার চতুষ্পার্শ্বে সত্তর হাজার তীর ধনুক পোতা রহিয়াছে। প্রত্যেকটি তীর ধনুকের নিম্নে আবার সত্তর হাজার ফেরেশতা সারিবদ্ধ রহিয়াছে। প্রত্যেকটি সারিতে আবার পাঁচ লক্ষাধিক ফেরেশতা রহিয়াছে। তাহারা সর্বদা আল্লাহর ইবাদত ও গুণ-কীর্তন করিতেছে। কেয়ামতের দিবস রাসূলুল্লাহর এই প্রশংসিত ঝাণ্ডার নিম্নে তাঁহার মো’মেন উম্মতগণ একত্রিত হইবে এবং শাফায়াতের অপেক্ষায় সকলে মিনতির দৃষ্টিতে তাকাইয়া থাকিবে।
এতদ্ব্যতীত রাসূলুল্লাহর (ছাঃ) ছাহাবিগণের সম্মানার্থে আরও কতগুলি তীর ধনুক লিওয়াউল হামদের নীচে পোঁতা হইবে। তন্মধ্যে সততার তীর ছিদ্দীকে আকবর হযরত আবুবকরের (রাঃ) সম্মানার্থে পোঁতা হইবে। সকল সত্যবাদীগণ সেই তীরের নিকটে সমবেত হইবেন।
ন্যায় বিচারের তীর হযরত ওমন ফারুকের (রাঃ) সম্মানার্থে পোঁতা হইবে। সকল শ্রেণীর ন্যায় বিচারক, কাজী ও বাদশাহগণ সেই তীরের নীচে সমবেত হইবেন।
দানশীলতার তীর হযরত ওসমান গণীর সম্মানার্থে পোঁতা হইবে। সকল প্রকার দানশীলগণ এই তীরের নিকটে সমবেত হইবেন।
শাহাদাতের তীর হযরত আলী কাররামুল্লাহু আজহাহুর সম্মানে পোঁতা হইবে। সকল শ্রেণীর শহীদগণ সেই তীরের নীচে সমবেত হইবেন। এইভাবে দুঃখী কাঙ্গাল – গরীবের তীর আবুদ্দারদার (রাঃ) সম্মানার্থে পোঁতা হইবে। সকল শ্রেণীর গরীব দুঃখীগণ সেই তীরের নীচে একত্রিত হইবেন।
বৈরাগ্যতার তীর হযরত আবুজার গিফারীর (রাঃ) সম্মানার্থে পোঁতা হইবে। সকল প্রকার দুনিয়া ত্যাগী খোদাভীরুগণ সেই তীরের নীচে সমবেত হইবেন।
কোরআন শুদ্ধরূপে পাঠক ও পাঠদানকারীগণের তীর হযরত উবাই প্রকার ইবনে কাআবের (রাঃ) সম্মানার্থে পোঁতা হইবে; সকল কোরআনের কারীগণ সেই তীরের নীচে সমবেত হইবেন।
এইরূপে অত্যাচারিত ব্যক্তির তীর হযরত ইমাম হুসাইনের (রাঃ) সম্মানার্থে পোঁতা হইবে। সকল প্রকার অত্যাচারিত লোকগণ যাহারা অন্যায়ভাবে নিহত হইয়াছে তাহারা সেই তীরের নীচে সমবেত হইবেন।
আল্লাহ্ পাক বলেন-
কেয়ামতের দিবস আমি সকল সম্প্রদায়কে তাহাদের পথ প্রদর্শক ইমামগণের সহিত ডাকিব।’
ডাকা হবে সকল দলে দিন কেয়ামত,
নিজ নিজ অনুসরক ইমামের সাথ।
পোলসেরাত
মুসলমানগণের যাবতীয় ভাল-মন্দ আমল ওজন করা হইলে পর আল্লাহ্ পাক তাহাদিগকে. নিজ নিজ নবীগণের সঙ্গী হইয়া পোলসেরাত পার হইয়া বেহেশতে গমনের আদেশ দিবেন। পোলাসেরাত চুল হইতে অতি সূক্ষ্ম এবং তরবারি হইতে অধিক ধারাল। ইহা দোজখের উপর স্থাপিত থাকিবে। হাদীস মতে বুঝা যায়, উহার দৈর্ঘ্য সাধারণ লোকের মধ্যম ধরনের গতির পনের হাজার বৎসরের রাস্তার সমান।
চুলের চেয়ে চিকন অতি অসির চেয়ে ধার,
জাহান্নামের ভীষণ অনল জ্বলবে নীচে তার।
চার দিকেতে মহা আধার একটু আলো নাই,
এ পুলসিরাত পার হইয়া যাইতে হবে ভাই।
সকল নবীর উম্মতগণ তাহাদের নিজ নিজ নবীর সঙ্গী হইয়া পোলসেরাত পার হইয়া বেহেশতে গমনের উদ্দেশ্যে পোলসেরাতের দিকে রওয়ানা হইবেন। ইতঃপূর্বেই হাশর প্রান্তর এত ভীষণ অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া পড়িবে যে, কেহ কাহাকেও দেখিতে পাইবে না। এই ভীষণ বিভিষীকাময় মুহূর্তে মুসলমানগণ তাহাদের আমলের মর্যাদানুযায়ী কেহ একটি, কেহ দুইটি নূরের (আলো) বাতি লাভ করিবেন। আবার কেহ বা সামান্য মাত্র নূরের মশাল পাইবে যাহাতে শুধু মাত্র তাহাদের পদদ্বয়ের পার্শ্ববর্তী স্থান আলোকিত হইবে। মুসলমানদের মধ্যে আমলের মর্যাদানুযায়ী সৰ্বনীচু স্তরের মুসলমানগণ মাত্র প্রদীপের ন্যায় আলোর অধিকারী হইবে। কিন্তু মোনাফেকগণ এই ভীষণ অন্ধকারে বিপদে পতিত হইয়া এইরূপ নূর হইতে বঞ্চিত থাকিবে।
এ সম্পর্কে আল্লাহ্ বলেন-
‘ইয়াসআ নূরুহুম বাইনা আইদীহিম অবি আইমানিহিম’- ঈমানদারদের ডানে বামে অনুসরণকারী নূরের মশাল হইবে।
ইমানদারের সামনে পিছে হবে উজ্জ্বল নূর,
সাথে সাথে চলবে এ নূর হবে নাক দূর।
যখন সকল নবীর উম্মতগণের মধ্যে মো’মেন ব্যক্তিগণ পোলসেরাত পর্যন্ত পৌঁছিবে, তখন তাহাদিগকে নিজ নিজ মর্যাদানুযায়ী কেহ বিদ্যুৎ গতি, কেহ বায়ুর মত দ্রুত গতি কেহ বা উটের সামান্য গতির ন্যায় পোলসেরাত দ্রুত অতিক্রম করিতে থাকিবে। এইরূপে সকল শ্রেণীর মো’মেনগণ পোলসেরাত পার হইতে থাকিবে। এই সময় দোজখ হইতে অগ্নির বড় বড় লেলীহান শিখা বাহির হইয়া কিছু সংখ্যক লোককে দংশন করিবে এবং কতককে চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণ করিয়া দোজখের অতল গর্ভে টানিয়া লইয়া যাইবে। এই প্রকার ভীষণ বিপদ সঙ্কট মুহূর্তে লোকদের নেক আমল-নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত ইত্যাদি তাহাদের সাহায্যকারী হইবে।
মুসলমানগণ যখন তাহাদের নূরের মশালের সাহায্যে পোলসেরাত পার হইতে থাকিবে, তখন মোনাফেকগণ তাহাদের পিছন হইতে ঈমানদার- গণকে লক্ষ্য করিয়া বলিবে : ‘হে ভাই মো’মোমেনগণ! আমাদের জন্য একটু অপেক্ষা করুন, যেন আমরা আপনাদের আলোর সাহায্যে পোলসেরাত পার হইতে পারি।’ মো’মেনগণ তখন উত্তর করিবেন : ‘তোমরা একটু পিছনে হটিয়া আমরা যে স্থান হইতে আলো লইয়া আসিয়াছি, সেখান হইতে তোমরাও আলো নিয়া আইস।’
এক ভীষণ মোনাফেকগণ একটু পিছনে হটিলেই তাহারা বিভীষিকাময় অন্ধকারাচ্ছন্নে পতিত হইবে। মোনাফেকগণ নিরূপায় দেখিয়া পুনঃ তাহাদের পিছনে ছুটিবে, কিন্তু তাহারা আর মো’মেনদের সঙ্গী হইতে পারিবে না। এই সময় দোজখ হইতে প্রজ্জ্বলিত অগ্নি শিখা বাহির হইয়া আসিবে এবং মোনাফেকদিগকে এক সঙ্গে দোজখের সর্ব নিম্নস্তরে টানিয়া লইয়া যাইবে।
দুরাচার এই মোনাফেকদের সম্পর্কে স্পষ্ট ভাষায় আল্লাহ্ বলেন- ‘মোনাফেরকদের চির আবাস স্থল দুঃখময় দোজখের সর্বনিম্ন স্তর।’
জাহান্নামের অতল তলে মুনাফেকের স্থান,
ভণ্ড ওরা মনটা কাফির বাহির মুসলমান।
দোজখবাসী মুসলমানদের শাফায়াত
পূর্বেই বলা হইয়াছে, পোলসেরাত দোজখের উপর স্থাপিত। ইহা পার হইবার কালে ঈমানদার তাহাদের মর্যাদানুযায়ী কেহ বিজলীর ন্যায়, কেহ মধ্যম ধরনের গতিতে অতিক্রম করিয়া যাইবে। আবার কাহাকেও বা দোজখ হইতে উত্থিত অগ্নি নির্মিত অঙ্কুর চুম্বকের ন্যায় দোজখের মধ্যে টানিয়া লইয়া যাইবে। ইহারাই ফাসেক – গোনাহগার মুসলমান। এই পোলসেরাত পার হইবার কালেই বে-দীন লোকগণ (কাফের) পোলসেরাত হইতে কর্তিত অবস্থায় দোজখের অতল গহ্বরে নিপতিত হইবে।
ঈমানদারগণ যখন পোলসেরাত অতিক্রম করিয়া বেহেশতের সন্নিকট হইবেন, তখন রাসূলুল্লাহ (ছঃ) স্বীয় হস্ত মোবারক দ্বারা বেহেশের তালা খুলিয়া তাঁহাদের অবস্থান গৃহে প্রবেশ করাইয়া দিবেন। এই সময় রাসূল- ল্লাহর উম্মত বেহেশতিগণের মধ্যে মাত্র এক-চতুর্থাংশ হইবে।
রাসূলে পাক (ছঃ) স্বীয় বেহেশতী উম্মতগণের পর্যবেক্ষণ ও সংবাদ সংগ্রহ করিতে ব্যস্ত হইয়া যাইবেন। তিনি যখন উত্তমরূপে অবগত হইতে পারিবেন যে এখন পর্যন্ত তাঁহার শত সহস্র উম্মত দোজখের নিদারুন আজাব ও যন্ত্রনা ভোগ করিতেছে-নির্যাতিত হইতেছে, তখন আপন উম্মতের পরিত্রাণের জন্য তাঁহার কোমল হৃদয় কাঁদিয়া উঠিবে। তিনি উম্মতের শাফায়াতের জন্য উদ্বিঘ্ন হইয়া পড়িবেন। উম্মত দরদী নবী কাল বিলম্ব না করিয়া তাহাদের ত্রাণকল্পে সেজদায় পড়িয়া আল্লাহর দরবারে বিনীতভাবে দরখাস্ত করিবেন। এই ভাবে তিনি সাত দিন পর্যন্ত সেজদায় থাকিয়া আল্লাহ পাকের অসীম প্রশংসা ও গুণকীর্তন করিতে থাকিবেন এবং বলিতে থাকিবেন :
‘হে খোদা! এখনও আমার শত সহস্র উম্মত দোজখে থাকিয়া সীম-াহীন নির্যাতন ভোগ করিতেছে; হে খোদা! উহাদিগকে মাফ কর।’
এতশ্রবণে আল্লাহ্ পাক আদেশ করিবেন : হে উম্মত দরদী বন্ধু! যাও, তোমার দোজখবাসী উম্মতগণের মধ্যে যাহাদের অন্তরে মাত্র একটি জবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে, উহাদিগকে দোজখ হইতে বাহির করিয়া আন।
মহান আল্লাহর এ প্রকার উক্তি শুনিয়া অন্যান্য নবী-রাসূলগণও নিজ নিজ উম্মতের শাফায়াতের জন্য আল্লাহ্ পাকের দরবারে আরজ করিবেন। আল্লাহ পাক তাঁহাদিগকেও স্বীয় উম্মতগণের শাফায়েতের জন্য নির্দেশ প্রদান করিবেন। তাঁহারাও আপন আপন উম্মতের শাফায়াত কল্পে দোজখের দ্বারে উপস্থিত হইবেন।
এতদ্ব্যতীত উম্মতে মুহাম্মদিয়ার প্রত্যেক শহীদ সত্তর জন এবং প্রত্যেক হাফেজ দশ জন দোজখী মুসলমানকে শাফায়াত করিতে পারিবেন। এইরূপে প্রত্যেক আলেম তাঁহার মর্যাদানুযায়ী দোজখবাসী মুস- লমানকে শাফায়াত করিবার অনুমতি প্রাপ্ত হইবেন। রাসুলুল্লাহ (ছঃ) সকল শাফায়াতকৃত মুসলমানগণকে লইয়া বেহেশতে প্রবেশ করিবেন। এই সময় তাঁহার উম্মতগণ বেহেশতবাসীগণের মধ্যে সংখ্যায় এক তৃতীয়াংশে পরিণত হইবে।
তৎপর রাসূলুল্লাহ (ছঃ) পূনর্বার উম্মতের অবস্থা পরিদর্শন করিয়া জ্ঞাত হইবেন যে, এখনও তাঁহার বহু সংখ্যক উম্মত দোজখে পড়িয়া আছে। তিনি পূর্বের ন্যায় আবার দোজখবাসী উম্মতগণের মুক্তির জন্য আল্লাহ্ পাকের দরবারে সেজদায় পড়িয়া যাইবেন। এতদ্দর্শনে আল্লাহ্ পুনরাদেশ করিবেন :
‘হে মোহাম্মাদ! তোমার দোজখী উম্মতগণের যাহাদের অন্তরে সরিয়ার ন্যায় বিন্দুমাত্র ঈমান আছে, তাহাদিগকে উদ্ধার করিয়া আন- আমি সবই কবুল করিলাম।’
রাসূলুল্লাহ (ছঃ) আল্লাহ্ পাকের এইরূপ নির্দেশ প্রাপ্ত হইয়া স্বীয় উম্মতের আলেম-ওলামা, পীর-বুজুর্গানও শহীদানগণকে লইয়া দোজখের কিনারায় থাকিয়া তাঁহার দোজখী উম্মতগণকে ডাকিবেন এবং যাহাদের অন্তরে সরিষা পরিমাণ বিন্দুমাত্র ঈমান আছে, উহাদিগকে দোজখ হইতে বাহির করিয়া আনিবেন। এই সময়ে উম্মতে মোহাম্মদিয়া বেহেশতীদের মধ্যে সংখ্যায় অর্ধাংশে পরিগণিত হইবে।
যার কলবে ঈমান কেবল সরষে বরাবর,
খোদার নিকট সেও ক্ষমা পাইবে অতঃপর।
সর্বশেষ দলের শাফায়াত
অতঃপর হুজুর আবার নিজ উম্মতগণের অত্ত্ব-তালাশ লইয়া জানিতে পারিবেন যে, এখনও তাঁহার বহু সংখ্যক উম্মত দোজখে ভীষণ আজাবে নির্যাতিত হইতেছে। উম্মত দরদী বিগলিত প্রাণ নবী পুনঃ উম্মতের মুক্তির জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িবেন এবং আল্লাহর দরবারে সেজদায় পড়িয়া করজোড়ে মিনতি করিয়া বলিবেন-
‘হে খোদা! এখনও আমার বহু সংখ্যক উম্মত দোজখের আজাবে যন্ত্রনা ভোগ করিতেছে। হে খোদা! তুমি উহাদিগকে মাফ কর।’ আল্লাহ্ পাক অনতিদূর হইতে নির্দেশ প্রদান করিবেন- ‘যাহাদের অন্তরে অর্দ্ধবিন্দু ঈমান আছে উহাদিগকে দোজখ হইতে বাহির করিয়া আন- তাহাদিগকে আমি মাফ করিলাম।
এতদশ্রবণে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এস্তভাবে দোজখের শিরদেশে উপস্থিত হইয়া তাঁহার সমস্ত দোজখী উম্মতগণকে ডাকিবেন এবং যাহাদের অন্তরে অর্দ্ধবিন্দু ঈমান থাকিবে, তাহাদিগকে দোজখ হইতে শাফায়াত করিয়া নিয়া আসিবেন। এই সময়ে উম্মতে মোহাম্মদিয়া বেহেশতীদের মধ্যে সংখ্যায় দ্বিগুণে পরিগণিত হইবে।
ওহে খোদা রাসূলের পেয়ে শাফায়াত,
লাভ করি যেন তব সুখের জান্নাত।
অতঃপর দোজখে উম্মতে মোহাম্মদিয়া বলিতে আর কেহই অবশিষ্ট থাকিবে না।
সর্বশেষ আল্লাহ্ পাক ‘মোওয়াহহেদীন’-যাহারা শুধু এক মাত্র আল্লাহর একত্ববাদের বিশ্বাসী ছিল, তাহাদিগকে দোজখের আজাব হইতে মুক্তিদান করিবেন। মোটকথা, আল্লাহ্ পাকের একত্ববাদের বিশ্বাসী বলিতে কেহই দোজখে থাকিবে না। চির দিনের জন্য আজাব ও নির্যাতন ভোগ করিবে শুধু কাফের ও মুশরিক-অংশীবাদিগণ।
মৃত্যুর হত্যা
দোজখীগণ পোলসেরাত হইতে কর্তন অবস্থায় দোজখে পতিত হইলে এবং মুসলমানগণ পোলসেরাত পার হইয়া বেহেশতে গমন করিলে, উভয় সম্প্রদায়ের জন্য স্বীয় অবস্থান চিরস্থায়ীভাবে নির্ধারিত হইয়া যাইবে। অতঃপর এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থান হইতে গাইবী নির্দেশ আসিবে –
‘হে বেহেশতীগণ! তোমরা অনতিবিলম্বে বেহেশতের কিনারায় সমবেত হও। আর হে দোজখীগণ! তোমরাও কালবিলম্ব না করিয়া দোজখের কিনারায় হাজির হও।’
এতদশ্রবণে উভয় দল খুশীতে স্বীয় বাসস্থানের (বেহেশত ও দোজখ পার্শ্বদেশে উপস্থিত হইবে। দোজখীগণ ভাবিবে, না জানি আল্লাহ গাফুরুর রাহীম আমাদের প্রতি কি মহান দয়া প্রদর্শন করেন! বেহেশতীগণ ভাবিবেন, হয়তো আল্লাহ্ পাক আমাদের উপর সন্তুষ্ট হইয়া আমাদের দর্শন দান করিবেন।
আল্লাহ পাকের এই নির্দেশানুযায়ী যখন বেহেশতীগণ বেহেশতের কিনারায় এবং দোজখীগণ দোজখের কিনারায় হাজির হইবে, তখন এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে শ্বেত ও কৃষ্ণ রং মিশ্রিত একটি মেষ আকৃতিরূপ মৃত্যুকে দণ্ডায়মান করা হইবে। অতঃপর বেহেশত ও দোজখবাসী উভয় সম্প্রদায়কে জিজ্ঞাসা করা হইবে-
‘তোমরা কি এই মেষটিকে চিন?’ উভয় সম্প্রদায় এক বাক্যে বলিবে, জ্বি হাঁ, আমরা সকলেই উহাকে চিনি-উহা মেষ আকৃতিরূপ মৃত্যু।’
অতঃপর আল্লাহ পাকের হুকুমে সকলের সম্মুখে মেষ আকৃতিরূপ মৃত্যুকে হত্যা করা হইবে এবং প্রচার করিয়া দেওয়া হইবে-’হে বেহেশত ও দোজখবাসীগণ! তোমরা জানিয়া রাখ, অদ্য হইতে আর কাহারও মরণ-সুরা পান করিতে হইবে না। তোমরা নিজ নিজ বাসস্থানে চিরস্থায়ী ভাবে বসবাস করিতে থাক। হে বেহেশতিগণ! তোমরা চিরদিনের জন্য তোমাদের চিরশান্তির স্থানে (বেহেশতে) মহা সুখ-ভোগে কালযাপন করিতে থাক। আর হে দোজখবাসিগণ! তোমরা চিরদিনের জন্য তোমাদের এ দুঃখ ও যন্ত্রণার স্থানে (দোজখে) নির্যাতন ভোগ করিতে থাক।
হত্যা করে মরণেরে হবে এলান এই,
এখন হতে সবাই অমর মরণ-কার নেই।
বেহেশত বাসী লভ অনন্তকাল সুখ,
দোজখবাসী তোমরা ভোগ চিরজীবন দুঃখ।
এতদশ্রবণে বেহেশতীগণ আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া যাইবে এবং মনে মনে শান্তি অনুভব করিবে-’বড়ই আনন্দের হইয়াছে। অকস্মাৎ মৃত্যু আসিয়া আর আমাদের ঘাড় মটকাইতে পারিবে না এবং আমাদের এই মহা সুখশান্তি ভোগ হইতেও বঞ্চিত করিতে পারিবে না।’
বলাবাহুল্য, দোজখবাষীগণ ইহা শুনামাত্র মাথায় দ্বিগুণভাবে করাঘাত করিয়া বলিতে থাকিবে, সর্বনাশ! হয়তো ইহার পরে হঠাৎ একদিন মৃত্যু আসিয়া আমাদের এই দুঃখ-দুর্দশা হইতে পরিত্রাণ করিত। তাহাও ত আর হইবার মত নয়, তবে কি এইরূপ মহা শাস্তি ও নির্যাতন চিরদিনের মতই ভোগ করিতে হইবে?’ এই ভাবিয়া তাহারা অত্যন্ত অস্থির ও দুঃখিত মনে মাথার চুল ছিড়িতে থাকিবে।
তৎপর দাজখের দ্বারসমূহ শিরদেশ হইতে কঠিনভাবে শক্ত করিয়া রুদ্ধ করিয়া দেওয়া হইবে। দোজখীদের দোজখ হইতে বাহির হইবার সামান্য দুশ্চিন্তাটুকু যেন অন্তর হইতে দূরীভূত হইয়া যায়।
অনুরূপ ভাবে বেহেশতের দ্বারসমূহও বন্ধ করিয়া দেওয়া হইবে। বেহেশতীগণের যেন এ আশংকা মনে অদৌ উঁকি মারিতে সুযোগ না পায়-’না জানি এখান হইতে বাহির হইয়া অন্যত্র গমন করিতে হয় এ প্রকার উদভ্রান্ত শংকা করার জন্য।
থাক সুখে চির দিন বেহেশত বাগান,
শুকুর কর খোদার রহীম রহমান।
