দ্বিতীয় অধ্যায় – জান কবজের কথা
জান কবজের প্রণালী
পূর্বে বলা হইয়াছে, মউত আল্লাহর আদেশ মাত্র। সেই আদেশ বহনকারী আজরাঈল। এইজন্য আজরাঈলকে (আঃ) মালাকুল মউত বা মৃত্যুর অধিপতি বলা হয়। তিনি কি প্রকারে আদম সন্তানের জান কবজ করিবেন, এই সম্পর্কে মাকালিত ইবনে সুলাইমান নামক মোফাচ্ছের হইতে বর্ণিত আছে-
মালাকুল মউতের সপ্ত আসমানে নূরের তৈরী অত্যাশ্চর্য একখানা আসন আছে। আসনখানা নির্দিষ্ট স্থানে বহু হাজার পায়ার উপর দণ্ডায়মান। আজরাঈল বা মালাকুল মউত সর্বদা উক্ত আসনের উপর উপবিষ্ট থাকেন। হযরত আজরাঈলের (আঃ) ইহা ছাড়াও বিরাট বিরাট চারিখানা শক্তিশালী ডানা আছে। এতদ্ব্যতীত তাঁহার শরীরে যাবতীয় প্রাণীর সংখ্যা অনুপাতে হাত, পা, চক্ষু, নাসিকা ও মুখ রহিয়াছে। যখন যাহার অন্তিমকাল উপস্থিত হয়, তখন সেই নির্দিষ্ট চক্ষু, হাত ইত্যাদি দ্বারা তিনি মৃত্যুব- রণকারীকে দেখিতে পান এবং আল্লাহর আদেশ প্রাপ্তি মাত্র উক্ত ব্যক্তির জান কবজ করিয়া ফেলেন। যখন উক্ত ব্যক্তির জান কবজ হইয়া যায়, তখনই আজরাঈলের শরীর হইতে উক্ত নির্দিষ্ট চক্ষু, হাত, পা ইত্যাদি বিলুপ্ত হইয়া যায়। কথিত আছে, শেষ মুহূর্তে মালাকুল মউতের শরীরে সে সব চক্ষু কর্ণ, নাসিকা, হাত পা ইত্যাদির একটিও অবশিষ্ট থাকিবে না। ক্রমে ক্রমে সকলই তাঁহার শরীর হইতে বিলুপ্ত হইয়া যাইবে।
আজরাঈলের (আঃ) দেহের আকৃতি এতই বিশাল যে, তাঁহার এক পা দোজখ-শীর্ষে স্থাপিত পুলসেরাতের উপর, আর অপর পা বেহেশতের পবিত্র আসনের উপরে অবস্থিত। ইহাতে বুঝা যায় যে, মৃত নেককার হইলে তাহার আত্মা বেহেশত এবং বদকার হইলে তাহার আত্মা দোজখে নিক্ষেপ করিতে তাঁহার মোটেই অসুবিধা হইবে না। বরং নিমেষের মধ্যে নেককার ও বদকারের আত্মা যথাস্থানে রাখিতে পারিবেন।
পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, আজরাঈলের দেহের আকৃতি এত বিশাল যে যদি সমস্ত দরিয়ার পানি তাঁহার মস্তকে ঢালা হয়, তবু এক ফোঁটা পানি মাটিতে পড়িতে পারিবে না। সমস্ত পৃথিবীটা তাঁহার সম্মুখে একটা থালার সদৃশ মাত্র। উহার মধ্যে যেন যাবতীয় খাদ্য-খাদক মওজুদ, যখন যে খাদ্য ইচ্ছা খাইতে পারেন। মানে দুনিয়াটা বরতন স্বরূপ এবং তাহার মধ্যে যাবতীয় খাদ্য-খাদক যেমন সমস্ত প্রাণীর আত্মাসমূহ। যখন যাহার আত্মা ভক্ষণ (হরণ) করিতে ইচ্ছা করেন, করিতে পারেন। এমন কি, পৃথিবী ধ্বংস হইবার প্রাক্কালে তিনি আরশ বহনকারী চারিজন ফেরেশতা ও আজরাঈলসহ অন্য প্রধান চারি ফেরেশতা ব্যতীত অন্যান্য সকল প্রাণীর জান কবজ করিয়া ফেলিবেন। অন্য এক রেওয়ায়েতে আছে, কেয়ামত তথা পুনরুথানের পূর্বে একমাত্র অদ্বিতীয় আল্লাহতাআ’লা ছাড়া আর কেহ জিন্দা থাকিবেন না।
আজরাঈল সমস্ত প্রাণীর জীবন হরণ করিয়া অবশেষে নিজের জানও নিজে হরণ করিবেন। যখন তিনি সমস্ত জীব-জন্তু-জীন-ফেরেশতা ইত্যাদির জান কবজ করা শেষ করিবেন, তখন আল্লাহ বলিবেন-হে আজরাইল! এবার তোমার নিজের জান নিজেই কবজ কর।’
আল্লাহতাআ’লার এই আদেশ লংঘণ করিবার আজরাঈলের বিন্দুমাত্র শক্তি হইবে না। তাই তিনি নিজ আত্মা বাহির করিবার ভয়ে এইরূপ বিকট চিৎকার করিয়া উঠিবেন যে, সঙ্গে সঙ্গে তাঁহার জীবন লীলা সাঙ্গ হইবে। এক অদ্বিতীয় আল্লাহ্ ব্যতীত তখন আর কেহ জিন্দা থাকিবেন না।
সাধারণ লোকের জান কবজ : হযরত কা’য়াব হইতে বর্ণিত আছে- আল্লাহ্ পাক তাঁহার পবিত্র আরশের নিম্নে একটি বৃক্ষ সৃষ্টি করিয়াছেন। সেই বৃক্ষে জীবিত আদম-সন্তানদের সংখ্যা পরিমাণ পাতা-পত্র আছে। তাহার প্রত্যেকটিতে আদম সন্তানের নাম-ধাম লিখা রহিয়াছে। যখন কোন আদম-সন্তানের আয়ু শেষ প্রান্তে আসিয়া পৌঁছার মাত্র চল্লিশ দিবস বাকী থাকে, তখন সেই বৃক্ষ হইতে উক্ত ব্যক্তির নাম-ধাম খচিত নির্দিষ্ট পত্রটি হযরত আজরাঈলের (আঃ) কোলে পতিত হয়। উহা দেখিয়া আজরাঈল বা মালাকুল মউত তখনই বুঝিতে পারেন যে, অমুক আদম- সন্তানের আয়ুর মেয়াদ শেষপ্রান্তে পৌঁছিবার মাত্র চল্লিশ দিবস বাকী। তখন হইতে আজরাঈল তাহার আত্মা বাহির করিবার জন্য প্রস্তুতি নিতে আরম্ভ করেন।
কথিত আছে, এইরূপ ব্যক্তির মৃত্যুর চল্লিশ দিবস পূর্বেই আসমানে তাহার মৃত্যু সংবাদ প্রচার হইয়া পড়ে। যদি সে দুনিয়ায় তখনও নিশ্চিন্ত মনে আরামে কাল যাপন করিতে থাকে। আফসোস! আসন্ন মৃত্যুগামী তো দূরের কথা, দুর্নিয়ার কোন মানুষই জানিতে পারে না যে, সে আর কতদিন দুনিয়ায় আরাম করিবার সুযোগ পাইবে। এতদ্ব্যতীত এইরূপ ব্যক্তি এই চল্লিশ দিনে কত যে গোনাহর কার্য করিয়াছে, তাহার হিসাব কে রাখে- সে নিজেও জানে না যে, সে কি করিতেছে, কোথায় চলিয়াছে সে। হয়তো ইহার মধ্যে সে একটা হত্যাকাণ্ডই করিয়া বসিয়াছে।
কেতাবে আছে, যখন মানুষের মৃত্যু ঘনাইয়া আসে, তখন তাহার রক্ত পরিচালক ফেরেশতা হযরত আজরাঈলের (আঃ) সমীপে করজোেড় মিনতি করিয়া বলে, ‘হে মালাকুল মউত। আমি আল্লাহর আদেশে উক্ত ব্যক্তির রক্ত পরিচালনার কার্যে রত ছিলাম, কিন্তু অদ্য হইতে আল্লাহর আদেশে রক্ত পরিচালনার কার্য বন্ধ করিলাম। কাজেই এখন আপনার ইচ্ছানুযায়ী তাহার জান কবজ করিতে পারেন।’
এইরূপে তাহার সাথে সামান্য মাটি আনিয়া মিশ্রিত করিয়া দেয়।
জীবন অবসানে আদম-সন্তানের যে স্থানেই মৃত্যু হউক না কেন, তাহার গোর উক্ত নির্দিষ্ট স্থানে হইবে-যেখান হইতে মালাকুর রেহেম ফেরেশতা মাটি আনিয়া স্বামী-স্ত্রীর মিলিত বীর্যের সাথে মিশ্রিত করিয়া দিয়াছিল। এমন কি, সেই ব্যক্তির মৃত্যু উক্ত স্থান হইতে কোন দূরবর্তী স্থানেও ঘটিবার সম্ভাবনা দেখা দেয়, এরূপ অবস্থায় মৃত্যুর পূর্বক্ষণে আল্লাহর কুদরতে আদম-সন্তান সেই স্থানে পৌঁছিবেই এবং যথাস্থানে উপস্থিত হইয়া প্ৰাণত্যাগ করিবে। এই মর্মে কোরআন পাকে আছে-
‘হে মোহাম্মদ (ছাঃ)! আপনি মোনাফেকগণকে বলিয়া দেন যে, যদি তোমরা মৃত্যু ভয়ে ধর্ম-যুদ্ধ হইতে নিজ বাসস্থানে অবস্থান করিতে থাক, তবু আল্লাহর ইচ্ছা হইলে তোমাদের শয়ন কক্ষেও মৃত্যু আসিতে পারিবে।
এই আয়াতের সারমর্ম এই যে, যাহার যেখানে মৃত্যু লেখা আছে, ইচ্ছা না থাকিলেও তাহাকে অবশ্য সেখানে পৌঁছিয়া মরিতে হইবে। এই আয়াত যদিও আল্লাহ পাক মোনাফেকদের উদ্দেশ্যে নাজিল করিয়াছেন, তবু উহার মর্ম সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
তকদীরেতে লেখা আছে যেথায় মউত যার,
যেথাই থাকুক সেথাই পৌঁছতে হবে তার।
আদম-সন্তান যত দুরদেশেই থাকুক না কেন, মৃত্যুর প্রক্কালে তাহাকে কবরের নিকটবর্তী স্থানে অবশ্যই হাজির হইতে হইবে। যদি সেইস্থানে হাজির হওয়া মানব-শক্তির বাহিরেও হয়, তবুও যে কোন উপায়ে হউক, আল্লাহ তাহাকে সেই স্থানে পৌঁছাইবেনই। আর মালাকুল মউতের উপর সে সময় যে স্থানে যাহার জান কবজ করিবার আদেশ রহিয়াছে, সে যদি ঐ স্থান হইতে শত সহস্র মাইল দূরেও থাকে, তবু তিনি তাহাকে শেষ মুহূর্তে যথাস্থানে উপস্থিত পাইবেন। এই মর্মে একটি সুন্দর ঘটনা আছে-
পূর্বকালে আজরাঈল (আঃ) নিজ আকৃতি পরিবর্তন করতঃ মানব আকৃতি ধারণ করিয়া নবী ও রাসূলগণকে সাক্ষাত দান করিতেন। হজরত সুলাইমান নবীর কালে একদা আজরাঈল (আঃ) মানব আকৃতি ধারণ করিয়া তাঁহার নিকট হাজির হইয়াছিল এবং তাঁহার পার্শ্বে উপবিষ্ট একজন যুবকের প্রতি বারংবার তীক্ষ্ণদৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছিল। আর মনে মনে ভাবিতেছিল যে-’সুদুর চীন দেশে এই যুবকের জান কবজ করিবার জন্য আল্লাহ আমাকে আদেশ করিয়াছেন, কিন্ত কোন মানব-শক্তি নাই যে, এত অল্প সময়ের মধ্যে যথাসময়ে সেইস্থানে ইহাকে পৌঁছাইতে সক্ষম।’ এই ভাবিয়া আজরাঈল এস্তভাবে পুনঃ আল্লাহর দারগাহে গিয়া করজোড়ে মিনতি করিয়া বলিল-’হে রাব্বুল আ’লামীন! এই সময় আমাকে যে যুবকের জান কবজ করিতে যেস্থানে আদেশ করিয়াছেন সে এখন সেস্থান হইতে এত দূরে রহিয়াছে যে, এত অল্প সময়ের মধ্যে কোন মানব শক্তিই তাহাকে সেই স্থানে পৌঁছাইতে পারিবে না’। এতদশ্রবণে আল্লাহ পাক পুনঃ আদেশ করিলেন- যাও যুবককে যথাস্থানে পাইবে।’
এদিকে মালাকুল মউত যুবকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করায় তাহার প্রাণে অত্যন্ত অশান্তি ও কষ্ট বোধ হইতেছিল। তাই যুবক হজরত সুলাইমানের (আঃ) কাছে বলিল-’হুজুর! আমি আমার মনে-প্রাণে খুব অশান্তি বোধ করিতেছি, তাই দয়া করিয়া আপনার অনুগত বায়ুকে আদেশ করুন, যেন আমাকে বায়ু সুদূর চীন দেশে নিয়া যায়। হয়তো-বা সেখানে গেলে আমার মন ও প্রাণ শান্ত হইবে।’
হজরত সুলাইমান নবী তখনই বায়ুকে অনুরূপ আদেশ করিলেন। অমনি বায়ু নিমিষে যুবককে যথাস্থানে পৌঁছাইয়া দিল।
কিছু সময় পরে আজরাঈল খোদার পুনরাদেশ প্রাপ্ত হইয়া হজরত সুল-াইমানের (আঃ) নিকট উপস্থিত হইল। এবার
এবার সুলাইমান (আঃ) আজরাঈলকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘কি ভাই আজরাঈল! আপনি সে সময় আমার পার্শ্বে উপবিষ্ট যুবকের প্রতি বারবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করিতেছিলেন কেন? আজরাঈল উত্তর করিল, ‘আল্লাহর আদেশ হইয়াছে যে, উক্ত যুবকের জান সুদুর চীনদেশে কবজ করিতে হইবে। অথচ যুবককে এখানে দেখিয়া আশ্চর্য বোধ করিতেছিলাম যে, এত অল্প সময়ের মধ্যে সে যুবক কি করিয়া সেখানে উপস্থিত হইবে এবং আমিই- বা কি করিয়া তাহার জান যথাস্থানে কবজ করিব। এই জন্যই আমি আশ্চর্যান্বিত হইয়া যুবকটির প্রতি বারবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়াছিলাম।’ তখন হজরত সুলাইমান (আঃ) তাহাকে আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা শুনাইলেন। আজরাঈল (আঃ) বলিলেন-এক্ষণে আমি উক্ত স্থানে যাইতেছি।’ এই বলিয়া আজরাঈল রওয়ানা হইয়া গেলেন। আজরাঈল গিয়া উক্ত যুবককে যথাস্থানে হাজির পাইয়া সেখানেই তাহার জান কবজ করিলেন।
কথিত আছে, আজরাঈলের (আঃ) বহু সংখ্যক সাহায্যকারী ফেরেশতা আছে, তাহারা মালাকুল মউতের স্থলবর্তী হইয়া আদম সন্তানের রূহ কবজ করিয়া খাকে। এই মর্মে একটি সুন্দর ঘটনা আছে-
এক ব্যক্তি সর্বদা আল্লাহর দরগাহে দোয়া ও মাগফেরাত কামনা করিত—’হে খোদা! আমাকে এবং সূর্যচালক ফেরেশতাকে মাফ করিয়া দিন।’ উক্ত ব্যক্তি এইরূপে বহুদিন পর্যন্ত দোয়া ও মোনাজাত করিতেছিল। সূর্যচালক ফেরেশতা যখন উক্ত ব্যক্তির দোয়া ও মাগফেরাতের বিষয় জানিতে পারিল, তখন তাহার কোমল হৃদয় গলিয়া গেল। সে তাহার সাক্ষাতের জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িল। অতঃপর সূর্যচালক ফেরেশতা আল্লাহর দরগাহে উক্ত ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করিল, আল্লাহ পাক তাহাকে সাক্ষাতের জন্য অনুমতি করিলেন। সূর্যচালক ফেরেশতা তখনই উক্ত ব্যক্তির নিকট উপস্থিত হইয়া বলিল-’হে ভাই! তুমি আমার জন্য অনেকদিন যাবৎ আল্লাহর দরগাহে দোয়া মাগফেরাত কামনা করিতেছ, ইহার উদ্দেশ্য কি? কি চাও তুমি?’
তদুত্তরে উক্ত ব্যক্তি বলিল-হে সূর্যচালক ফেরেশতা! আমার কোন উদ্দেশ্য নাই; শুধু এতটুকু যে, তুমি আমাকে তোমার বাসস্থানে নিয়া যাইবে এবং দয়া করিয়া আমাকে মালাকুল মউতের সাথে দেখা করাইয়া দিবে। আমি তাহার কাছে জিজ্ঞাসা করিব যে, আমি আর কত দিন জীবিত থাকিব।’
তৎক্ষণাৎ উক্ত ফেরেশতা তাহাকে তাহার বাসস্থানে নিয়া গেল এবং ফেরেশতার নিজ আসনে বসাইয়া মালাকুল মউতের নিকট উপস্থিত হইয়া জিজ্ঞাসা করিল-
‘হে ভাই আজরাঈল! অমুক ব্যক্তি বহুদিন পর্যন্ত আমার জন্য খোদার দরবারে দোয়া ও মাগফেরাত কামনা করিয়া আসিতেছে। তার একমাত্র উদ্দেশ্য এই যে, সে জানিতে চায়, সে আর কতদিন বাঁচিবে। উদ্দেশ্য, তাহার জীবনের বাকী অংশটুকু যেন সে আল্লাহর ইবাদতে কাটাইতে পারে এবং আখেরাতের কিছু সম্বল অর্জন করিয়া তাঁহার দরবারে হাজির হইতে পারে। তাই, দয়া করিয়া তাহার আয়ুনামাখানা খুঁজিয়া দেখুন যে, সে আর কতদিন বাঁচিবে?’ তখন মালাকুল মউত উত্তর করিলেন, ‘তোমার সাথী তো মস্তবড় একটি প্রশ্ন করিয়াছে?’
অতঃপর হজরত আজরাঈল (আঃ) বলিলেন-’তোমার সাথী তোমার আসনে উপবেশন না করা পর্যন্ত তাহার জীবনের মুদ্দত। তোমার আসনে উপবেশন করা মাত্র তাহার জীবন লীলা সাঙ্গ হইবে।’ এই কথা শুনামাত্র সূর্যচালক ফেরেশতা চমকিয়া উঠিল-কি সর্বনাশ! এখন যে তাহাকে আমার আসনেই উপবেসন করাইয়া আসিয়াছি।’
হজরত আজরাঈল বা মালাকুল মউত বলিলেন-তাই যদি হইয়া থাকে, তবে জানিয়া রাখ, এতক্ষণ হয়তো আমার প্রতিনিধি জান কবজকারী ফেরেশতাগণ তার জান কবজ করিয়াছে-সে এখন জীবিত নাই।’
অতঃপর সূর্যচালক ফেরেশতা নিজ বাসস্থানে ফিরিয়া দেখিল, সত্যই তাহার বন্ধুর প্রাণ হরণ করা হইয়াছে।
হাদীছ শরীফে আছে- সকল প্রকার চতুষ্পদ জন্ত আল্লাহর জিকের আজকারে সর্বদা মশগুল আছে। যে সমস্ত চতুষ্পদ জন্ত যখনই আল্লাহর জিকের হইতে বিরত্ব হইবে, তখনই আল্লাহতা’আলা সেই সমস্ত চতুষ্পদ জন্তর প্রাণবধের আদেশ দান করিবেন।
পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, মৃত্যু আল্লাহর একটি আদেশ মাত্র। কাজেই সকল প্রানীর জান কবজ করিয়া থাকে একমাত্র আল্লাহর উক্ত আদেশ বহনকারী ফেরেশতা আজরাঈল। তাই, লোকে বলিয়া থাকে যে, আজরাঈল জান কবজ করিয়াছে অর্থাৎ জায়েদ তাহাকে বধ করিয়াছে। অথবা কোন পীড়া হইয়া মারা গেলে লোকে বলে, অমুক পীড়ায় লোকটি মরিয়াছে। পক্ষান্তরে আল্লাহ যে জান নিয়াছেন, সে কথা কেহই বলে না।
নবী ও রাসূলগণের জান কবজ
পূর্বের আলোচনায় সাধারণ লোকের জান কিরূপে কবজ করা হইয়া থাকে, সে বিষয় বর্ণনা করা হইয়াছে। এই আলোচ্য অংশে নবী ও রাসূলগণের জান কবজ কিরূপে করা হয়, তাহা বর্ণনা করা হইবে। হাদীছ শরীফে আছে, রাসূলগণের জান কবজ করিবার উদ্দেশ্যে আজরাঈল তাঁহাদের নিকট উপস্থিত হইলে তাঁহাদের রূহ বা আত্মা বলিয়া উঠে-
‘হে আজরাঈল! যতক্ষণ আমি আল্লাহর আদেশ প্রাপ্ত না হই, ততক্ষণ আমি তোমার বশ্যতা স্বীকার করিতে কখনই প্রস্তুত নহি।’ তদুত্তরে মালাকুল মউত বলিবে- ‘হে পবিত্র রূহ! আল্লাহর আদেশ প্রাপ্ত না হইলে আমার নিজ ক্ষমতা বলিতে কিছুই নাই। আমি এখন যে আসিয়াছি, তাহাও একমাত্র আল্লাহর আদেশেই আসিয়াছি। কাজেই দয়া করিয়া আমার সাথে চলুন, আল্লাহর আদেশ হইয়াছে।’ তখন আবার রূহ বজ্রকণ্ঠে বলিয়া উঠিবে-
‘হে আজরাঈল! আমি তোমাকে কখনও বিশ্বাস করি না, যতক্ষণ না তুমি আল্লাহর আদেশে আসিয়াছ, তাহার প্রমাণ স্বরূপ কোন কিছু হাজির কর।’ ইহা বলিয়াও রূহ ক্ষান্ত হইবে না বরং আরও বলিবে-
‘হে আজরাঈল! তুমি আমার বিষয় কি জান? আল্লাহ পাক আমাকে সৃষ্টি করিয়া এই পবিত্র দেহে প্রবেশ করিতে আদেশ করিয়াছিলেন,’ তখন কি তুমি সেখানে উপস্থিত ছিলে? আর এখন তুমি আমার কাছে কি চাও? যাও, আল্লাহর দরবারে চলিয়া যাও, এখানে তোমার কোন প্রয়োজন নাই।’ রূহের এরূপ কথা শুনিয়া আজরাঈল বিমুখ হইয়া খোদার দরবারে হাজির হইয়া বলিবেন-’আয় বারে খোদা! আপনার প্রিয় বন্ধু অমুক নবীর আত্মা কবজ করিতে আমাকে আদেশ দান করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার রূহ আমার বশ্যতা স্বীকার করিতে রাজী নহে। বরং বলে যে, আল্লাহ পাকের নিকট হইতে তজ্জন্য দলিল প্রমাণ নিয়া আইস।’ এতদশ্রবণে আল্লাহ পাক মৃদু হাসিয়া বলিবেন-’হে আাজরাঈল! আমার বন্ধুর রূহ ঠিকই বলিয়াছে, তুমি প্রথমে ভুল করিয়াছিলে।’
তৎপর আল্লাহ বলিবেন, ‘যাও, বেহেশত হইতে একটা ‘সেব’ অথবা আঙ্গুর নিয়া আমার বন্ধুর আত্মাকে দেখাও এবং বল-এই যে আল্লাহর আদেশের নিদর্শন নিয়া হাজির হইয়াছি।’
আজারাঈল (আঃ) তখনই বেহেশত হইতে অতীব সুন্দর একটি বেহেশতের মেওয়া (ফল) লইয়া পুনঃ উক্ত নবীর আত্মার নিকটি উপস্থিত হইবে। মেওয়ার উপর আরবীতে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখা আছে। যখন আজরাঈল পুনর্বার উপস্থিত হইয়া উক্ত মেওয়া নবীর আত্মাকে দেখাইবে, তখন আত্মা তাহার বশ্যতা স্বীকার করিবে এবং অতি সহজে হাসিতে হাসিতে পবিত্র দেহ হইতে বাহির হইয়া আসিবে।
অতঃপর আজরাঈল এবং তাহার সাথী অন্যান্য ফেরেশতাগণ সানন্দে মিছিল সহকারে উক্ত আত্মাকে লইয়া বেহেশতে প্রবেশ করিবে।
দুনিয়ার অন্য সব লোকের মতন, হয় নাক নবীদের মউত কখন।
হইলেই তাহাদের মৃত্যুর সময়, আজরাঈল ফেরেস্তা এসে হাজির হয়। ছালাম আরজ করে তাজীমের সাথ, জান কবজের লাগি চাহে এজাজত। খুশীতে করিলে তারা এজাজত দান, তখনই আজরাঈল নিয়ে নেয় জান।
উপরি উক্ত বর্ণনা দ্বারা আমরা স্পষ্ট বুঝিতে পারি যে, নবী রাসূলগণের আত্মা কবজ করিবার পূর্বে আজরাঈল বা মালাকুল মউতের ইজাজত লইতে হইবে যে, সে আজরাঈলের সঙ্গে খোদার দরবারে উপস্থিত হইতে রাজি আছে কি না। অন্যথায়, তাহাদের রূহ কখনই তাহার বশ্যতা স্বীকার করিবে না। এই মর্মে হজরত মুসা নবীর মৃত্যুকালীন চমৎকার একটি ঘটনা বর্ণিত আছে-
হজরত মুসা (আঃ) যখন মৃত্যুর দুয়ারে পা রাখিয়াছিলেন, তখন আজরাঈল (আঃ) আল্লাহর নির্দেশ লইয়া তাঁহার জান কবজ করিতে উপস্থিত হয়। আজরাঈল হজরত মুসা নবীর আত্মার নিকট এজাজাত না চাহিয়াই তাঁহার জান কবজ করিতে উদ্যত হয়। এতদ্দর্শনে মুসা (আঃ) রাগের মাথায় আজরাঈলের মুখমণ্ডলীতে চড় বসাইয়া দেন। চড়ের আঘাতে তাহার একটি চক্ষু কোটর হইতে বাহির হইয়া পড়িল। আজরাঈল চক্ষে হাত রাখিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে আল্লাহর দরগাহে গিয়া বলিল-
‘হে মাবুদ! আপনি আমাকে এমন একজন লোকের জান কবজ করিতে পাঠাইয়াছেন, যে ব্যক্তি আপনার আদেশ মান্য করে না, মরিতে চাহেন না। এই দেখুন, তাঁহার জান কবজ আরম্ভ করাতে আমার কি দুর্দশা ঘটাইয়াছে।’ —আমি যে আজরাঈল, আমাকেই অপর আজরাঈল পাইতে বসিয়াছে। ‘তদুত্তরে আল্লাহ পাক বলিলেন-
‘তুমি কি তাঁহার কাছে আত্মা কবজ করিবার ইজাজত চাহিয়াছিলে? আজরাঈল উত্তর করিলঃ ‘জ্বী না, তাতো করি নাই।’ আল্লাহ বলিলেন, তাইতো আমার প্রিয় বান্দা তোমাকে এই অবস্থা ঘটাইয়াছে।’
মো’মেনদের জান কবজ
অতঃপর আল্লাহ পাক তাঁহার কুদরতী হস্ত দ্বারা আজরাঈলের চক্ষু স্পর্শ করিলেন, অমনি তাহার চক্ষু পূর্বের ন্যায় ভাল হইয়া গেল। তৎপর আল্লাহ মালাকুল মউতকে পুনঃ আদেশ করিলেন, ‘এইবারে যাও, এবং তাহাকে আমার সালাম জানাইয়া বল যে, আপনি কি দুনিয়ায় থাকিতে চাহেন, না আপনার প্রিয় মা’বুদের মিলন কামনা করেন?’
আজরাঈল তাহাই করিল। হজরত মুসা (আঃ) তাহাতে উত্তর করিলেন-’যদি দুনিয়ায় থাকিতেই চাই তবে কি হইবে?’ আজরাঈল বলিল-’আল্লাহ বলিয়াছেন যে, আপনি একটি উষ্ট্রের পৃষ্ঠের উর আপনার হাত রাখিলে আপনার হাতের নিম্নে যতগুলি লোম পড়িবে, তত বৎসর আপনার আয়ু আল্লাহ বৃদ্ধি করিয়া দিবেন। মুসা নবী বলিলেন, ‘তাহার পরে কি হইবে?’ মালাকুল মউত বলিল, ‘তাহার পর মরিতে হইবে।’ মুসা নবী বলিলেন-মরিতেই যখন হইবে, তখন দুনিয়ায় আর থাকার সাধ আমরা নাই। ভাই আজরাঈল! আসুন, এখনই আমার জান কবজ করুন।’ মালাকুল মউত তখন তাঁহার জান কবজ করিল।
হাদীছ শরীফে আছে, যখন কোন মো’মেন আদম-সন্তানের আয়ু শেষ প্রান্তে আসিয়া উপনীত হয় এবং জান কবজ হইবার সময় একেবারেই ঘনাইয়া আসে, মালাকুল মউত আল্লাহর নির্দেশক্রমে সে ব্যক্তির জান কবজ করিবার জন্য তখনই তাহার নিকটে হাজির হয়। প্রথমতঃ যখন মালাকুল মউত উক্ত ব্যক্তির জান কবজ করিবার নিমিত্ত তাহার মুখের ভিতর দিয়া প্রবেশ করিতে চেষ্টা করে, তখন মুখ প্রহরীর ন্যায় চক্ষু রাঙ্গাইয়া তাহাকে রুখিয়া দাঁড়াইয়া বলিবে-
‘হে আমরা আত্মার যমদূত! তুমি এই রাস্তায় প্রবেশ করিতে পারিবে না, কেননা এই ব্যক্তি আমার দ্বারা আল্লাহর জিকের-আজকার, তাসবীহ তাহলীল ইত্যাদিতে দিবারাত্র মশগুল থাকিত। তাই প্রবেশার্থে অন্য রাস্তা অনুসন্ধান কর।’ মালাকুল মউত নিরাশ হইয়া হাতের দিক হইতে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিবে। অমনি হাত আবার মালাকুল মউতকে বাধা দিয়া বলিবে—
‘হে মালাকুল মউত! এই পথে প্রবেশ করিতে পারিবে না, কেননা এই হাত দ্বারা উক্ত ব্যক্তি ছদকা-খয়রাত, জাকাত ফিত্রা অকাতরে দান করিয়াছে, দীনহীন অনাথ-ইয়াতীমকে স্নেহে পুত্রতুল্য জ্ঞান করিয়া তাহাদের মাথায় হাত বুলাইয়া সহানুভূতি দেখাইয়াছে। আবার দ্বীন- ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য বিধর্মীদের বিরুদ্ধে তরবারি ধারণ করিয়াছে এবং এই হাত দ্বারাই সে কালামুল্লাহ (আল্লাহর বাণী) লিখিয়াছে। কাজেই তুমি অদ্য এই রাস্তায় প্রবেশ করিতে পরিবে না -অন্য পথ তালাশ কর। আজরাঈল এই রাস্তা হইতেও নিরুপায় হইয়া যখন পায়ের পথে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিবে, তখন পা-ও বলিয়া উঠিবে—
‘হে যমদূত! আমার আত্মা হরণ করিবার জন্য এই পথেও প্রবেশ করিতে পারিবে না। কেননা, এই পদদ্বয় দ্বারা উক্ত ব্যক্তি জামাতে নামাজ পড়ার জন্য, ঈদগাহে হাজির হইয়া অন্যান্য মুসলমানদের সহিত একত্রে ঈদের নামাজ পড়ার জন্য এবং হক্কানী আলেম বুজর্গানের ওয়াজ- নছীহত শ্রবণ করার জন্য চলাফিরা করিয়াছে। এতদ্ব্যতীত, এই পদদ্বয়ের দ্বারা সে আরও বহু নেক কাজ করিয়াছে। তাই, তুমি এই পথ দিয়াও আত্মা হরণ করিবার জন্য প্রবেশ করিতে পারিবে না।’ আজরাঈল পায়ের দ্বার হইতেও বিমুখ হইয়া আবার চক্ষুর পথে প্রবেশ করার জন্য চক্ষুর নিকটে উপস্থিত হইবে। চক্ষু আজরাঈলের মতলব বুঝিয়া বলিয়া উঠিবে—
‘হে আজরাঈল! তুমি কখনই এই পথে এই মো’মেন ব্যক্তির জান কবজ করার জন্য প্রবেশ করিতে পারিবে না! কেননা এই মো’মেন ব্যক্তি ঈমান ও ইয়াকীনের সাথে আল্লাহর উপর দৃঢ় বিশ্বাস আনিয়া আমার দ্বারা আল্লাহর বাণী (কোরআন), হাদীছ এবং অন্যান্য ধর্মীয় পুস্তাকাদি পাঠ করিয়াছে, তদনুযায়ী সে আমল করিয়াছে। কজেই ব্যর্থ চেষ্টা করিয়া কোন লাভ নাই; দরকার হয় অন্য উপায় তালাশ কর।’ এখান হইতেও আজরাঈল অনুপায় দেখিয়া শেষবারে কর্ণের দ্বার দিয়া প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিবে। কর্ণ তখনই আজরাঈলের সম্মুখে রুদ্ধ দ্বারের ন্যায় প্রতিবন্ধক সাজিয়া বলিবে—
‘হে আমরা আত্মার যমদুত! তোমার সমস্ত কুমতলব বুঝিতে পারিয়াছি। সাবধান! ব্যর্থ চেষ্টা করিও না। কখনই এই পথে প্রবেশ করিতে পারিবে না। তুমি জান না, এই মো’মেন বান্দা তাহার এই কর্ণ কুহর দ্বারা আল্লাহর পবিত্র বাণী, রসুলের হাদীছ শ্রবণ করিয়াছে এবং হক্কানী আলেম, পীর বুজর্গের মজলিসে গমন করিয়া তাহাদের পবিত্র ওয়াছ-নছীহত শ্রবণ করিয়াছে। তদনুযায়ী সে আমল করিয়াছে, তাই তুমি কোন শরমে এই পবিত্র দ্বার দ্বারা তাহার আত্মা হরণ করিতে প্রবেশ করিতে চাও?-আমরা কেহই তাহার নিমকহারামী করিতে পারিব না। যাও দয়াময় আল্লাহর দরবারে, যিনি তোমাকে ইহার আত্মা হরণ করিতে আদেশ করিয়াছেন। শুনিয়া আইস তিনি কি বলেন।’
আজরাঈল (আঃ) তখন চতুর্দিক অন্ধকার দেখিয়া মলিন মুখে আল্লাহর দরবারে হাজির হইয়া বলিবে-
‘হে দয়াময় খোদা! আমাকে এমন এক ব্যক্তির জান কবজ করিতে পাঠাইয়াছেন; যাহার হাত, পা, চক্ষু, কর্ণ এক কথায় সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ উক্ত ব্যক্তির আত্মার কাছে প্রবেশ করিতে বাধা দিতেছে। আমি বহু চেষ্টা ও অনুনয় বিনয় করিয়াও তাহার ভিতর প্রবেশ করিতে পারিলাম না। শেষবারে তাহারা বলিয়া দিয়াছে-’যাও, দয়াময় খোদার দরবারে, গিয়া দেখ, তিনি কি বলেন।’ হে খোদা! তাহারা উক্ত ব্যক্তির জান কবজ করিতে অনুমতি দিতেছে না-এখন আমি কি করিব?
আল্লাহ হাসিয়া উত্তর করিবেন- হে আজরাঈল! ঘাবড়াইও না। তাহাদের কর্তব্য তাহারা পালন করিয়াছে। তাহারা নিমকহারামী করিতে পারে না। এবারে যাও এবং আমার পবিত্র নাম তোমার হাতের তালুতে লিখিয়া আমার বন্ধু উক্ত মো’মেন ব্যক্তির আত্মাকে গিয়া দেখাও।’ আল্লাহর আদেশ পাইয়া মালাকুল মউত তখনই আল্লাহ পাকের পবিত্র নাম তাহার হাতের তালুতে লিখিয়া উক্ত ব্যক্তির সমীপে উপস্থিত হইবে এবং তাহার আত্মাকে বারবার উক্ত পবিত্র নাম দেখাইতে থাকিবে। তখনই মো’মেনের আত্মা আল্লাহর পবিত্র নামের মহরতে সহজে বাহির হইয়া আসিবে।
হাদীছ শরীফে আছে, মানুষের অন্তিমকালে যখন মালাকুল মউত আত্মা বাহির করিতে আরম্ভ করে, তখন গায়েবী আওয়াজ আসে- হে জান কবজকারী’ কিছুক্ষণের জন্য জান কবজ স্থগিত রাখ। আত্মাটাকে কিছু সময় আরাম করিতে দাও।’
তখন আজরাঈল (আঃ) আত্মাকে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম দিয়া আবার জান কবজ করিতে আরম্ভ করিবে। আত্মা যখন মরণ বরণকারীর বক্ষদেশ পর্যন্ত পৌঁছে, তখন আবার গায়েবী আওয়াজ আসে ‘হে মালাকুল মউত! একটু থাম, রূহটা বড়ই অস্থির হইয়া পড়িয়াছে! উহাকে কিছু সময়ের জন্য আরাম করিতে দাও।’ আজরাঈল (আঃ) তখন কিছু সময়ের জন্য জান কবজ বন্ধ রাখে। এইরূপে, মালাকুন-মউত মরণ বরণকারীর প্রত্যেক অংগ-প্রত্যংগে জান কবজ করিয়া পৌঁছলে নুতন নুতন গায়েবী আওয়াজ আসিতে থাকিবে।
অবশেষে যখন মালাকুল মউত জান কবজ করিতে করিতে মৃত্যূ বরণকারীর গতদেশ পর্যন্ত পৌঁছিবে, তখন গায়েব হইতে সর্বশেষ আওয়াজ আসিবে-’হে আজরাঈল! রূহকে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম দাও, রূহ শরীরের অন্যান্য অংগ-প্রত্যংগ হইতে চির বিদায় গ্রহণ করিয়া নিক।’
আজরাঈল ফেরেশতা এই অনুরোধ পাইয়া কিছু সময়ের জন্য বিশ্ৰাম দিবে। তৎপর এক হাত অন্য হাত হইতে, এক কর্ণ অন্য কর্ণ হইতে, এমনকি প্রত্যেক অংগ অপরাপর অংগ হইতে চির বিদায় গ্রহণ করিবে। শেষবারের মত তাহারা একে অন্যকে ‘আচ্ছালামু আলাইকুম ইলা ইয়াউমিল কিয়ামাতে-’কেয়ামত পর্যন্ত আমরা চির বিদায় গ্রহণ করিয়া চলিলাম।
মৃত্যু বরণকারীর সর্বাংগে একে অন্য হইতে চির বিদায় গ্রহণ করিলে আজরাঈল (আঃ) অতি আরামের সাথে তাহার জান কবজ করিবে। মা- তৃকোলে দুগ্ধপায়ী সন্তান যেরূপ মাতার স্নেহের জড়ান চাপে কষ্ট না পাইয়া আরামই পায়, ঈমানদারদের মৃত্যুকষ্ট ঠিক তেমনই শান্তি ও আরামের হইবে।
ঈমানদারের প্রতি খোদা বড়ই মেহেরবান,
খুব আছানীর সাথে তাদের কবজ হবে জান।
শিশু যেমন পায়গো আরাম স্নেহের চাপে মার,
ঠিক সেমত মরণের সুখ পায়গো ঈমানদার।
জান কবজের পর মৃত্যুবরণকারীর হাত পূর্বের ন্যায় আর থাকিবে না- কাষ্ঠ নির্মিত হস্তের ন্যায় উহা নির্জীব পড়িয়া থাকিবে। পা থাকিতেও হাঁটিতে পারিবে না-তাহাও আজ অবশ হইয়া গিয়াছে। চক্ষু দুইটির দৃষ্টি শক্তি রহিত হইয়া যাইবে, চক্ষু থাকা সত্ত্বেও দেখিবার শক্তি থাকিবে না। কর্ণ দুইটি বধির হইয়া যাইবে; কর্ণ তখন আর আজান ও কোরআন পাঠের সুমধুর ধ্বনি শুনিতে পাইবে না। মোটকথা, সর্ব শরীরটা একটা মাটির তৈয়ারী পুতুলের ন্যায় ধুলায় পড়িয়া থাকিবে।
এই সকল মৃত্যূ যন্ত্রণা সহ্য করা ও সর্বাংগ অবশ হইয়া যাওয়া অতি সহজ ব্যাপার। আল্লাহ এই জীবন বিহীন মুর্তিময় দেহ কিয়ামতের দিবস পুনঃ জীবিত করিবেন। সকল অংগ-প্রত্যংগ আবারও মিলিত হইবে। একে অন্যের সাক্ষাৎ পাইবে। কিন্তু আফসোস! যদি কেহ মৃত্যুকালে কালেমায়ে শাহাদৎ পড়িয়া বা শ্রবণ করিয়া মরিতে না পারে, তবে তাহার ছিল দুনিয়ায় আসাও যেমনি বৃথা, কেয়ামতের দিবস ইলাহির আদালতে দণ্ডায়মান হওয়াও হইবে তেমনি বৃথা। তাহার পরকাল- জীবনের সকল ক্ষেত্রেই দুঃখ আর দুঃখ। আশার স্বপন বলিতে সে আর কিছুই দেখিতে পাইবে না।
ঈমান নিয়ে মরণ নছীব হইবে নাক যার,
বৃথা তাহার মানব জীবন, আখের অন্ধকার।
সমুখে পথের কোথাও সুখ পাইবে না এক তিল,
দুঃখে ভরা হইবে তাহার সবগুলি মঞ্জিল।
আর যদি কেহ খোদার অসীম কৃপায় মৃত্যুকালে কালেমায়ে শাহাদাৎ ইয়াদ করিতে করিতে, মরিতে পারে, তবে মৃত্যুটা হইবে তাহার পক্ষে সোনায় সোহাগাতুল্য। তাহার ভবিষ্যৎ জীবনের শান্তির ময়দান হইবে উন্মুক্ত। দুঃখ বলিতে তাহার থাকিবে না কোন কিছুই। তাহার মৃত্যু যে দুঃখের দিনের অবসান-সুখের দিনের আগমন। ব্যাপারটি কবির ভাষায় শোনা যাক-
ঈমানের সাথে হল মউত যাঁহার,
বড়ই বুলন্দ হবে নছিব তাঁহার।
তাঁহার সমুখে নাই দুঃখ লজ্জা, ভয়,
অনন্ত জীবন হবে শুধু সুখময়।
ফেকাহ শাস্ত্রবিদ আলেমগণ বলিয়াছেন- মৃত্যুকালে ঈমান লইয়া মরণ বরণ করাটা বড়ই কটিন ব্যাপার। অনেকের ভাগ্যে তাহা জোটে না। তবে আল্লাহ যাহার মঙ্গল কামনা করেন, সে-ই শুধু ঈমান ইয়াকীনসহ প্রাণত্যাগ করিতে সমর্থ হন।
মৃত্যুকালে শয়তানের চক্রান্ত
হাদীছ শরীফে আছে, আদম সন্তানের অন্তিমকালে আত্মা বাহির করিবার সময় কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান মরণ বরণকারীর বাম পার্শ্বে উপস্থিত হইয়া বলিতে থাকিবে-
‘হে মরণ বরণকারী। তুমি যে ধর্মাবলম্বী ছিলে, তাহা এখনি ছাড়িয়া দাও। তুমি যে বিশ্বাস করিতে ‘আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়, তাঁহার কোন অংশীদার নাই এবং মোহাম্মদ (ছঃ) তাঁহার প্রেরিত পুরুষ ও শেষ নবী, ইহা কিছুতেই সত্য হইতে পারে না। কেননা এই বিশাল বিশ্ব-জগত একজনের পরিচালনাধীন হওয়া অত্যন্ত দুরহ ব্যাপার। নিশ্চয় ইহার প্রতিপালক একাধিক হইবে। হয়ত তাঁহাকে অন্যতম পরিচালক মনে করিতে পার। এতদ্ব্যতীত, মোহাম্মদও (ছঃ) শেষ নবী হইতে পারেন না। কেননা, তাঁহার পূর্বে আরও বহু নবী ও রসূল প্রেরিত হইয়াছিলেন। কাজেই মোহাম্মদের (ছঃ) পরে আরও বহু নবী আসিতে পারেন। এই বিশাল জগতের প্রত্যেক প্রাণীকে একবার মরিতে দেখিয়াছ এবং নিঃসন্দেহে সকল প্রাণী একবার মরিবেই; তাই জানিয়া রাখ, আল্লাহও একবার মরিবেন। মৃত্যুর হাত হইতে তিনিও রক্ষা পাইতে পারেন না- জীব মাত্রই যখন মরিতে হইবে, আল্লাহ কেন মরিবেন না? তাঁহাকেও মরণ সুরা পান করিতে হইবে।’
তোমাদের বিশ্বাস অনুযায়ী স্বর্গ ও নরক বলিতে কোন জিনিস নাই। দুনিয়াই স্বর্গ আর দুনিয়াই নরক। দেখনা, দুনিয়ায় কেহ শাহানশাহী হালে থাকে আর কেহ ফকীরের মত জীবনযাপন করে; কেহ খাইতে পায় না, আর কেহ খাইতে চায় না-ইহাই যে স্বর্গ নরক! বৈজ্ঞানিক যুগে বিশাল বিশ্ব ভূ-মণ্ডল ঘুরিয়া দেখিয়াছ; কোথাও কি স্বর্গ নরক বলিতে কিছু দেখিয়াছ! সকলই প্রবঞ্চনা মাত্র-স্বর্গ-নরক যে দুনিয়ায়।
‘মৃত্যুর পরেই সব কিছুর শেষ-ইহাই যে মানুষের শেষ মঞ্জিল। মৃত্যূর পরে আবার কি করিয়া জিন্দা হইবে? ইহাও কি হইতে পারে? কখনই না। এ পর্যন্ত কত মানুষকেই, না মরিতে দেখিয়াছ কাহাকেও কি কোন ডাক্তার বা বিজ্ঞ হেকীম জিন্দা করিয়াছে, তাহা দেখিতে পাইয়াছ? তাহারা যে অসাধ্য সাধন করিতে পারে; কিন্তু কেহ মরিয়া গেলে তো জিন্দা করিতে পারে না- সব কিছুই মিথ্যা।’
তাই, এখন হইতে আল্লাহরও অংশীদার আছে জ্ঞান কর। মোহাম্মাদ (ছঃ) শেষ নবী হইতে পারেন না। দুনিয়া ছাড়া স্বর্গ-নরক বলিতে কিছুই নাই। পুনর্জীবন মিথ্যা। ভাল চাও এখনও বলিতেছি শোন।’
কুমন্ত্রণাদাতা শয়তান এইরূপে আরও বহু যুক্তিতর্ক দ্বারা মৃত্যুকালে আদম-সন্তানকে ধোকা দিতে চেষ্টা করিবে। কোন সময় হয়তো বেহেশতের ভোগ-বিলাসিতার প্রলোভন দেখাইয়া বলিবেঃ
‘আল্লাহকে অংশী জ্ঞান করিলে এইরূপ বেহেশতে ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকিতে পারিবে। অন্যথায় দোজখের কঠিন আজাবের সম্মুখীন হইবে। মোটকথা, মরণকালে শয়তান আদম-সন্তানদের ঈমান ও ইয়াকীন নষ্ট করিতে চেষ্টার বিন্দুমাত্র অবহেলা করিবে না।
রাহের ছামান লও বাঁধিয়া হওগো হুঁশিয়ার,
মৃত্যু কালে আসবে ইবলিস ঈমান লুটিবার।
এমনি ফেরেব-কটিন ধোকা হইবে তাহার হায়,
সেই ধোকাতে ঈমান রাখা হইবে বড় দায়।
দাক্কায়েকুল-আখবারের লিখক ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলিয়াছেন, এইরূপ সঙ্কটময় মুহূর্তে অনেকের ঈমান বিনষ্ট হইবার পূর্ণ আশংকা রহিয়াছে। শয়তানের এইরূপ চক্রান্ত হইতে একমাত্র নবী ও রাসুলগণ ব্যতীত অন্য কাহারও রক্ষা পাওয়া বড়ই মুস্কিল। তাই ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) বলেন-বন্ধুগন, আপনারা সর্বদা দয়াময় আল্লাহর দরবারে মিনতি সহকারে রোনাজারী (কাঁদা-কাটি) করতঃ কামেল ঈমান লইয়া মরিবার জন্য দিবারাত্র দোয়া মাগফেরাত করিতে থাকুন। রাত্র জাগরণ করতঃ নফল ইবাদাত, নফল নামাজ (তাহাজ্জুদ ইত্যাদি) খুব বেশী করিয়া আদায় করিয়া কাঁন্নাকাটি করিতে থাকুন; দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ত্যাগ করুন! তাহা হইলেই আল্লাহর অসীম রহমত নাজিল হইবে এবং মৃত্যুর সঙ্কটময় মুহূর্তে শয়তানের লোভনীয় চক্রান্তে না ভুলিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিতে পারিবেন।’
এক ব্যক্তি ইমাম আজমের নিকট জিজ্ঞাসা করিল হুজুর! এমন কি কি গুনাহ আছে, যাহা দ্বারা ঈমান নষ্ট হইবার সম্ভাবনা থাকে?
তিনি উত্তর করিলেন-’বিশেষ তিনটি কারণে মৃত্যুকালে ঈমান নষ্ট হইবার পূর্ণ সম্ভাবনা থাকে।
(১) ঈমান গ্রহণ করিয়া তাহার কৃতজ্ঞতা অন্তঃকরণে আনয়ন না করা। কেননা, ঈমান মানুষের জীবনের প্রথম হইতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শান্তির পথ প্রদর্শক। কাজেই, যে কেহ এই শান্তি-দাতা ঈমানের কৃতজ্ঞতা পূর্ণরূপে আদায় না করিবে, ঈমান তাহার প্রতি নারাজ হইবে।
(২) দুনিয়ার মোহে আল্লাহর ভয়কে অন্তঃকরণ হইতে উঠাইয়া দেওয়া। কেননা-ঈমান আনয়ন করার মুখ্য উদ্দেশ্য হইল আল্লাহকে ভয় করা এবং তাঁহার দানরাশির প্রত্যাশী হওয়া। যদি ইহাই না থকিল তবে তাহার ঈমান কোথায় রহিল।!
(৩) আল্লাহর সৃষ্ট জীবের প্রতি অত্যাচার করা। যেহেতু জীবের ভালমন্দ কামনা একমাত্র খোদ আল্লাহ করিবেন; সে স্থলে মানুষের কি অধিকার থাকিতে পারে? হয়তো আল্লাহর সৃষ্ট জীবের প্রতি অত্যাচার করিলে তাহারা অত্যাচারীকে সর্বদা বদ্দোয়া (অভিশাপ) দেয়। এ কারণেই মৃত্যুকালে অত্যাচারী ব্যক্তির ঈমান হারাইবার পূর্ণ সম্ভাবনা থাকে।’
কথিত আছে, মরণকালে আদম-সন্তান পানির তৃষ্ণায় অত্যন্ত অস্থির হইয়া পড়ে। পানির তৃষ্ণায় বক্ষদেশ শুষ্ক হইয়া কলিজা জ্বলিতে আরম্ভ করে। মরণগামী পানির তৃষ্ণায় ছটফট করিয়া বিছানার এপাশে ওপাশে পানি খুঁজিতে থাকে। আদম-সন্তানের এরূপ পানি তৃষণায় অস্থির কালে বিতাড়িত শয়তান তাহার একজন আত্মিয়ের আকৃতি ধারণ করিয়া পনির নামে একটি সুন্দর পাত্র পেশাব ভরিয়া হাসিমুখে মরণ বরণকারীর মুখের কাছে ধরে। মরণ বরণকারী ইহা দেখিয়া অনুমান করিতে পারে না যে, শয়তান পানির পাত্র নিয়া হাজির হইয়াছে, না অন্য কেহ। তাই সে পানির পাত্র চাহিয়া বলে-’হে অমুক! পানির তৃষ্ণায় কলিজা শুকাইয়া গেল। তাড়াতাড়ি পানি দাও।’
গভীর চিন্তার বিষয়, পানির তৃষ্ণায় এহেন অস্থিরতার কালে কেহ যদি মুখের কাছে পানির পাত্র ধরিয়া যাহা কিছু স্বীকৃতি লইয়া পানি পান করাইতে চাহে; তাহাতে সে রাজী হয় কি না? নিশ্চয় হয়।
কুমন্ত্রণাদাতা আজাজিল শয়তান ইহা করিয়াই ক্ষান্ত হইবে না বরং আরও বলিবে-’হে তৃষ্ণাতুর। ইহা অতি পবিত্র পানি, ইহা আবে হায়াতের কূপ হইতে আনয়ন করা হইয়াছে। যে কেহ এই পানি একবার পান করিতে পরিবে, জীবনে তাহাকে এইরূপ যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যূ বরণ করিতে হইবে না। যদি এই পানি পান করিতে চাও, তবে তোমাকে অবশ্যই বলিতে হইবে-’এই নিখিল বিশ্বের স্রষ্টা বলিতে কেহই নাই। তবেই এই পবিত্র পানি পান করিতে পারিবে এবং চিরস্থায়ী ভাবে দুনিয়ায় বসবাস করিতে পারিবে।’
দুষ্টের মুখে এইরূপ তুষ্টিদায়ক গাল ভরা মিষ্টি কথা শুনিয়া অনেকেই ঠিক থকিতে পারে না। তাই যাহার কিসমত মন্দ হইয়া পড়ে, সে বাধ্য হইয়া এরূপ স্বীকৃতি প্রদান করিয়া পানির স্থলে শয়তনের পেশাব পান করিয়া ফেলে এবং পবিত্র ঈমান নষ্ট করিয়া নরকধামে গমন করে। আর আল্লাহ যাহার কিসমত ভাল চাহেন, তাহাকে শয়তান কোন অবস্থায়ই এইরূপ পানি পান করাইতে চাহিলে সে বলিয়া উঠিবে- দুর হ শয়তান, তোর চক্রান্তে আমি ভুলি না। তোর চক্রান্ত জাল ছিন্ন করিয়া আমি কি বলিতেছি কান পাতিয়া শোন-
‘আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু অ-আশহাদু আন্না মোহাম্মাদান আবদুহু অরাসুলুহ’ -আমি সাক্ষ্য দিতেছি যে, আল্লাহ এক, অদ্বিতীয় এবং মোহাম্মদ (ছঃ) তাঁহার প্রেরিত রাসূল।’
ইহা শুনা মাত্র বিতাড়িত শয়তান উক্ত পানপাত্র দুরে নিক্ষেপ করিয়া মৃত্যু বরণকারীর নিকট হইতে তাড়াতাড়ি পালাইয়া যাইবে।
এই মর্মে প্রখ্যাত অলি হজরত জাকারিয়ার (রহঃ) বিষয়ে সুন্দর বিখ্যাত একটি ঘটনা প্রচলিত আছে।
হজরত জাকারিয়া (রাঃ) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতেছিলেন, তখন তাঁহার পার্শ্ববর্তী বন্ধু-বান্ধবগণ বুঝিতে পারিল যে তিনি এই নশ্বর ধরাধাম হইতে এখনই হয়তো বিদায় গ্রহণ করিয়া অবিনশ্বর ধামে গমন করিতেছেন। তাই তাহারা তাঁহাকে কালেমায়ে শাহাদাত পড়িয়া স্মরণ করাইয়া দিতেছিল। এ দিকে কুমন্ত্রনাদাতা শয়তান একটা পানির পাত্রে কৃত্রিম পানিসহ হাজির হইয়া হজরত জাকারিয়া (রাঃ) নিকট বলিতে ছিল ‘হে জাকারিয়া। জীবনে বহু নেক কাজ করিয়াছ, শেষবারের মত একবার বলিয়া যাও—’লা-ইলাহা-অর্থাৎ কোন মা’বুদ বা সৃষ্টিকর্তা নাই’ হয়তো ভবিষ্যৎ জীবন তোমার আরও সমুজ্জ্বল হইবে।’
তিনি শয়তানের এই চক্রান্তের কথা বুঝিয়া দু’দু’বার বিষন্নভাবে তাহার মুখমণ্ডল, এদিকে সেদিকে ফিরাইতে ছিলেন। তৃতীয় বারে তিনি রুক্ষকণ্ঠে বলিয়া উঠিলেন-’দুর হ শয়তান! তোর কথায় আমি কখনই ‘লা ইলাহা’ বলিব না। সকলকে একরূপে ধারণা করিস না।’
শয়তানের এই চক্রান্তের কালে তাঁহার পার্শ্ববর্তী বন্ধু-বান্ধবগণ তাঁহাকে কালেমায়ে শাহাদাৎ পড়িয়া শুনাইতেছিল। শয়তানের চক্রান্তের জবাবে তিনি যে এদিক-ওদিক মুখমণ্ডল ফিরাইতেছিলেন এবং শেষবারে যখন তিনি বলিলেন,’ আমি ইহা বলিব না’ ইহা শুনিয়া তাঁহার বন্ধু- বান্ধবগণ খুবই ভীত হইয়া পড়িল এবং ভাবিল, হায়রে। না জানি জীবনের সকল পূণ্যকাজ এখন-ই পণ্ড হইয়া যায়। আমাদের কথায় (তালক্বীনের) বিপরীত বুঝিয়া হয়তে বেঈমান হইয়া প্রাণত্যাগ করিবে।
এমন সময় হঠাৎ জাকারিয়া (রাঃ) হুশ ফিরিয়া আসিল এবং তাঁহার মুদিত চক্ষুদ্বয় খুলিয়া তিনি শেষবারের জন্য একবার তাঁহার বন্ধুদিগের প্রতি তাকাইলেন। ইহাতে তাহাদের ভগ্ন হৃদয় খুশীতে নাচিয়া উঠিল। তাহরা বলিল-’হে জাকারিয়া! তুমি ঐরূপ করিতেছিলে কেন? জাকারিয়া উত্তর করিলেন-’ভাই, মরণকালে শয়তানের চক্রান্ত জাল হইতে রেহাই পাওয়া বড়ই মুশকিল।’
মৃত্যুকালে শয়তানের চক্রান্ত অতঃপর হজরত জাকারিয়া (রাঃ) তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিলেন- ‘তোমরা কি আমাকে কালেমায়ে শাহাদাৎ পড়িয়া শুনাইতে ছিলে?’ তাহারা বলিল-হ্যাঁ, আমরা তোমাকে বারবার কালেমা স্মরণ করাইতে-ি ছলাম আর তুমি তোমার মুখমণ্ডল এদিক সেদিক ঘুরাইতেছিলে। এমনকি শেষবারে বলিয়া ফেলিলে, ‘আমি উহা বলিব না’ শুনিয়া আমরা অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছি—’হায়রে! এইরূপ কেন বলিতেছে, তবে কি মরণকালে কালেমা পড়িয়া মরিতে পারবে না? এই ভাবিয়া আমরা দুঃখ করিতেছিলাম।
জাকারিয়া উত্তর করিলেন- ‘বন্ধুগণ! মূলে আমি তোমাদের কালেমা ‘স্মরণ করাইয়া দেওয়ায় ঐরূপ করি নাই; দুর্নীতিপরায়ণ বিতাড়িত শয়তান একটি পাত্রে পানি লইয়া আমাকে ‘লা-ইলাহা’ বলিতে শিক্ষা দিতেছিল, তাই তাহার কথার জবাবে আমি ঐরূপ করিয়াছি। শেষবারে যখন আমি বলিলাম, ‘দুর হু শয়তান, আমি উহা বলিব না’ শয়তান তখন তাহার হাতের কৃত্রিম পানির পাত্র অনতিদুরে ফেলিয়া চলিয়া গিয়াছে। তোমরা সাক্ষী থাক, এখনই তোমাদের স্মরণীয় কালেমায়ে শাহাদাৎ পড়িতেছি :
‘আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু অ-আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহূ অরাসূলুহ’
এই পবিত্র কালেমা শরীফ পাঠ করিতে করিতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করিলেন। বন্ধুরা তাঁহার মুখপানে তাকাইয়া রহিল এবং আল্লাহর লাখো শুকরিয়া আদায় করিল।
মানুষ যখন মরিয়া যায়, তখন তাহার মাল আসবাব, ধন-দৌলত উত্তরাধিকারীগণ বন্টন করিয়া নিয়া যায়; রূহ মালাকুল মউত বা আজরাঈল লইয়া যায়, হাড় মাটির সংগে মিলিয়া যায় এবং কিয়ামতের দিবস মৃতের পক্ষে ইলাহির আদালতে সাক্ষ্য দিবে এমন বস্তু (নামায়ে আ’মাল) ফেরেশতাদের হাতে গচ্ছিত থাকিয়া যায়- এই সকল অতি সহজ, পুনঃ প্রাপ্তির আশা আছে। কিন্তু মরণকালে কুমন্ত্রণাদাতা শয়তানের চক্রান্ত হইতে রেহাই পাইয়া ঈমান ও ইয়াকীনের সাথে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা বড়ই দুরূহ ব্যাপার। ইহা সকলের ভাগ্যে জোটে না। এই জীবন-মরণ মছীবত হইতে আল্লাহর পবিত্র দরবারে পানাহ চাওয়া ব্যতীত দ্বিতীয় কোন উপায় নাই। আয় আল্লাহ! আমাদেরকে শয়তানের এহেন চক্রান্ত হইতে পানাহ দাও এবং তোমার করুণার শীতল ছায়ায় আমাদিগে আশ্রয় দাও, আমীন!
দ্বীন ইসলামে খোদা মোদের কদম রেখ ঠিক,
ঈমান নিয়ে আসতে গোরে দাও খোদা তৌফিক।
মৃত্যুর পরে গাইবী আওয়াজ
হাদীছ শরীফের মর্মে জানা যায়, মোমেন ব্যক্তি যখন মরণমুখে পতিত হয়, তখন আসমান হইতে তিনটি গাইবী আওয়াজ আসে। প্রথম আওয়াজে বলা হয়—
হে আদম সন্তান! তুমি কি দুনিয়া ছাড়িয়া আসিয়াছ -না দুনিয়া তোমাকে ছাড়িয়াছে?’ দ্বিতীয় আওয়াজে বলিবে- হে অমুক! তুমি কি দুনিয়ার চক্রে ঘুরিয়া দুনিয়াকে রাজী রাখিয়াছ-না তোমার মত ও পথে দুনিয়াকে ঘুরাইয়া তাহার উপর সন্তুষ্ট রহিয়াছ! তৃতীয় আওয়াজে আবার বলিলে-’তুমি কি দুনিয়ার হাতে হাত মিলাইয়াছ-না দুনিয়াকে তোমার হাতে হাতে মিলাইতে বাধ্য করিয়াছ?’
আবার শবদেহকে ঘর হইতে গোসলের জন্য বাহির করা হইলে পুনঃ গাইব হইতে তিনটি আওয়াজ আসে। প্রথম আওয়াজে বলিবে-’হে আদম- সন্তান! জীবিতকালে তোমার যে শক্তি ছিল সে শক্তি কোথায়? দ্বিতীয় আওয়াজে বলিবে-’হে শবদেহ? পুর্বে যে রূপ কথা বলিতে, সেই মধুর মিষ্টকথা এখন তোমার কোথায় গেল?’ কে তোমাকে মুক (বোবা) করিল। এখন আর কথা বলিতেছ না কেন! পূর্বের কোকিলের ন্যায় কুহুতানে জগৎ মুখরিত গানের সেই মিষ্টি মধুর সুর তোমার কোথা গেল? কে তোমার সুর কাড়িয়া লইল?’ তৃতীয় আওয়াজে বলিবে-’পূর্বের তোমার বন্ধু-বান্ধব কোথায় গেল? কে তোমাকে তোমার বন্ধু-মিলন হইতে বিচ্ছেদ ঘটাইল এবং কে-ই বা তোমাকে সাথী ছাড়া করিল।’
আবার যখন শব দেহকে গোসল করাইয়া কাফন পরাইতে আরম্ভ করিবে, তখন আবার গাইব হইতে তিনটি-আওয়াজ আসিবে। প্রথম আওয়জে বলিবে-’হে পরলোক গমনকারী। তুমি নশ্বর দুনিয়া ছাড়িয়া অজানার পথে গমন করিতে আরম্ভ করিয়াছ, তোমার পথের সম্বল সংগ্রহ করিয়াছ কি, না খালি হাতেই রওয়ানা হইয়াছ? মনে রাখিও, নশ্বর দুনিয়ার ঘর-বাড়ি, দালান-কোঠা ও তখন ইমারত ছাড়িয়া রওয়ানা হইয়াছ; এদিক কিন্তু আর ফিরিতে পারিবে না! পথ ভোলার ন্যায় যাত্রা পথে শুধু চলিতে থাকিবে! এই পথের যে আর সীমা নাই, তোমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন কোথায়? এই তো তোমার চির- বিদায়, আর যে তাহাদিগকে দেখিতে পাইবে না। সকলই আজ তোমাকে তোমার ভয়াবহ যাত্রা পথে তাড়াতাড়ি আগাইয়া দিতেছে।’
আবার যখন জানাজা দিবার জন্য মুর্দারকে খাটে উঠান হয়, তখন আসমান হইতে পুনঃ গাইবী আওয়াজ আসিবে – ‘হে আদম সন্তান। তোমার জন্য সুসংবাদ, যদি তুমি তোমার কৃত গোনাহরাশি হইতে তওবা করিয়া মরিয়া থাক। তোমার জন্য আরো আনন্দের কারণ হইবে, যদি তোমার অমূল্য জীবন খোদার ইবাদত বন্দেগীতে কাটাইয়া অমরধামে গমন করিয়া থাক। কেননা, পরকালে অগ্নিবর্ষিত কেয়ামতের মাঠে এক- মাত্র আল্লাহর রহমত ছাড়া কাহারও নিস্তার নাই। আর যদি তোমার কৃতকার্য বদ লইয়া আখেরাতের পথে রওয়ানা হইয়া থাক বা তওবা না করিয়া মরিয়া থাক, তবে মনে রাখিবে, তোমার উপর নিশ্চয় আল্লাহর অভিপাত পতিত হইবে। এমনও হইতে পারে যে আল্লাহ তোমার উপর রাগান্বিত হইয়া তোমাকে দোজখে নিক্ষেপ করিবেন।
আবার শব দেহকে যখন জানাজার নামাজ পড়াইবার জন্য লোকজনের সম্মুখে রাখা হয়, তখন গাইবী আওয়াজ আসে- হে আদম সন্তান! তুমি দুনিয়ায় থাকিয়া পাপ পুণ্য যাহাই করিয়া থাক না কেন সকলই তোমার সাথী হইয়া অমরধামে গমন করিবে। যদি ভাল কাজ (পূণ্য) করিয়া থাক, তাহা হইলে ঐ পূণ্য তোমার কাজে আসিবে। আল্লাহ তোমার প্রতি সদয় হইবেন। অদুর ভবিষ্যতে তোমার জীবন আলোকিত হইবে। আর যদি কুকার্য (পাপ) করিয়া থাক, তবে ঐ পাপরাশি কেয়ামতের দিবস তোমার পক্ষে যমদুত আকার ধারণ করিবে। আল্লাহ তোমার উপর রাগান্বিত হইবেন।
মৃতদেহকে যখন তাহার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবগণ কবরে রাখিয়া তাড়িতাড়ি মাটি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়, তখন, মাটি হইতে একটি আওয়াজ আসিবে – ‘হে আমার বক্ষে শায়িত মৃতদেহ! তুমি জীবিতকালে আমার উপর দিয়া বিনা বিন্ধব কত বন্ধু-বান্দব, আত্মীয়- স্বজন লইয়া ধরাকে সরাজ্ঞান করিয়া ফূর্তি সহকারে চলাফেরা করিয়াছ এবং নিজের বীরত্ব দেখাইয়া অতীব দর্পভরে চলিয়াছ। মনে করিয়াছিলে বুঝি আর মরিতে হইবে না এবং মাটির সংকীর্ণ স্থানেও শুইতে হইবে না। তাই আজ দেখ, তোমার কি অবস্থা। কোথায় তোমার সেই বন্ধু- বান্ধবগণ? তোমাকে যে তাহারা এই সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে ফেলিয়া যাইতেছে। তুমি যে আজ এই ভয়াবহ স্থানে একা। তোমার যে কোন প্রহরী নাই। সবই যে দুনিয়ায় রাখিয়া এই মাটির বিছানায় শুইতে বাধ্য হইয়াছ। এখন যে তুমি তাহাদের বিয়োগে একা একা চিন্তাশীল হইয়াছ এবং মলিন মুখে কাঁদাকাটা করিতেছ। আজ যে তুমি নিজ কৃতকার্যের জন্য অনুতাপ করিতেছ। মনে করিয়াছিলে, বুঝি আর মরিতে হইবে না?’
‘মনে রাখিবে, যত বড় শক্তিশালী হও না কেন, আজ আর আমার খপপর হইতে উদ্ধার নাই। এমন এক চাপ দিব, যাহা কোন দিন শুন নাই, দেখা নাই, অনুভবও করিতে পার নাই। ভীষণ প্রচাপনে এক পার্শ্বের হাড্ডি অন্য পার্শ্বে লইয়া যাইব। চাপের চোটে হাড়, মাংস মিশিয়া একত্রিত হইয়া যাইব।’
ইহা শুনামাত্র মৃত ব্যক্তি ভয়ে থর থর করিয়া কাঁপিতে থাকিবে। কিন্তু তাহাতে কোন ফল দাঁড়াইবে না।
পক্ষান্তরে মৃত ব্যক্তি আল্লাহর নেক বান্দা হইয়া থাকিলে আল্লাহ এইরূপ সঙ্কটময় মুহূর্তে অনতিদুর হইতে সাদরে ডাকিয়া বলিবেন-
‘হে আমার চিন্তাযুক্ত বান্দা, তোমার কোন ভয় নাই, আজ হয়তো তোমার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন তোমাকে নির্দয়ভাবে একা এই সঙ্কীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে রাখিয়া গিয়াছে এবং তুমি এখানে একা সঙ্গিহীন হইয়াছ, তবু অদ্য আমিই তোমার অন্ধকার সঙ্কীর্ণ গোরের আলো, সঙ্গিহীন অবস্থায় সঙ্গী। কাজেই তোমার কোন ভয়ের কারণ নাই। আজ আমি তোমার প্রতি এত সহানুভূতি প্রদর্শন করিব যে, সমস্ত সৃষ্টজীব তাহা দেখিয়া আশ্চর্য হইবে। অদ্য তোমার প্রতি এত দয়ার্দ্র হইব যে, তোমার জীবিতকালে তোমার মাতা-পিতাও কোন দিন তোমার প্রতি ঐরূপ দয়ার্দ্র হয় নাই।’
হে মোর পেয়ারা বান্দা কি ভয় তোমার,
যদিও তোমার হেথা কেহ নাই আর।
ছাড়িয়া গিয়াছে সব ভাই বন্ধুগণ,
একেলা করিয়া আছ কবরে শয়ন!
ভয় নাই আমি আল্লা, আছি নেগাবান,
সকল বিপদ তব হইবে আছান।
মৃত্যুর আগে জমীন ও কবরের আওয়াজ
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ)-এর একটি হাদীছের বর্ণনায় জানা যায়, জমীন প্রত্যহ আদম সন্তানকে বলে-’হে আদম সন্তান। তুমি আমার পৃষ্ঠের উপর স্বাধীনভাবে ও স্বাধীন মনে চলা-ফেরা করিতেছ। মনে রাখিও, তোমার মরণের পরে যখন সকলে তোমাকে আমার উদরের সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে পুঁতিয়া একা রাখিয়া চলিয়া যাইবে, তখন তোমার কি দুর্দশা হইবে? তখন তোমার পূর্বের সেই স্বাধীন মনোভাব আর থাকিবে না। আমি তোমার মৃত্তিকা শয়নগৃহ এত সংকীর্ণ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন করিয়া দিব যে, একদিক ফিরিলে আর অন্যদিক ফিরিবার ইচ্ছা করিবে না। ভয়ে জড়সড় হইয়া কাঁদিতে থাকিবে।
আরও বলিবে-’হে মানুষ! তুমি আমার পিঠের উপর থাকিয়া অসদুপায়ে ধন-সম্পত্তি, টাকা-পয়সা উপার্জন করিয়া তদ্বারা হারাম খাদ্য খাইয়া তোমার দেহকে মোটা-তাজা করিয়াছ, এই মোটা-তাজা সুখের শরীর আর আদৌ থাকিবে না। মনে রাখিও, মরণের পর তোমার সাধের মোটা-তাজা শরীর আর মোটা-তাজা থাকিবে না, কীট-পতংগের আহার্য বস্তু হইয়া যাইবে -সবই কীট-পতংগে খাইয়া শেষ করিবে।’
মাটি আরও বলিবে হে মানুষ! তুমি আমার আমার পিঠের উপর থাকিয়া কত যে গোনাহর কার্য করিয়াছ এবং অপরকেও গোনাহর কার্যে প্রেরণা দান করিয়াছ, মরণের পরে কবরে তাহার প্রকৃত সাজা পাইবে। এমন করিয়া আমার পিঠের উপর হাসি-তামাসা, আমোদ-প্রমোদও উল্লাস করিয়া বেড়াইতেছ এবং অযথা সময় নষ্ট করিতেছ, তাই উহার প্রতিফল একদিন অন্ধকারময় কবরে ভোগ করিতে হইবে। সেদিন দুঃখে মথায় করাঘাত করিয়া কাঁদিলেও কোন ফল হইবে না। আজ আমার পিঠের উপর থাকিয়া আনন্দে দিন কাটাইতেছ। মরণের পরে আমার মধ্যে আসিয়া তাহার প্রতিফল হাড়ে হাড়ে ভোগ করিতে হইবে।’
এইরূপে মাটি আরও বলিবে-’হে আদম সন্তান! আমার এই উন্মুক্ত পিঠে আলোকময় খোলা ময়দানে বিচারণ করিতেছ; কিন্তু মরণের পরে এমন সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে বাস করিতে হইবে, যেখানে মুক্ত বায়ু বহিবে না-আলো বলিতে কিছুই সেখানে দেখিতে পাইবে না।’
পুনঃ আবার বলিবে-’হে আদম সন্তান! নশ্বর দুনিয়ায় বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন লইয়া মহা আনন্দে প্রসস্ত ময়দানে ও খোলা বায়ুতে ভ্রমণ করিতেছ কিন্তু মরণের পরে সংগীহীন কবরে একা বসবাস করিতে হইবে- বন্ধু-বান্ধাব, আত্মীয়-স্বজন বলিতে সেখানে কেহ থাকিবে না।
হাদীছ শরীফে আছে- কবর আদম-সন্তানকে প্রত্যহ তিনবার আহ্বান করিয়া থাকে—’হে মানুষ! আমি অত্যন্ত ভয়াবহ সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থান এমন কোন সাহসী লোক নাই, যে আমার মধ্যে আসিলে ভয়ে তাহার কলিজা শুকাইয়া না যাইবে। আমি অত্যন্ত সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থান। আমার মধ্যে অসংখ্য কীট-পতংগ রহিয়াছে। তাই আমার সেই অন্ধকারের আলোরূপে এবং কীট-পতংগের ধ্বংসকারী হিসাবে এমন কিছু জিনিষ কি সঞ্চায় করিয়া লইয়াছ!’
আরও জানিয়া রাখ, আমার উদর বন্ধু-বান্ধব ও সাথীহীন স্থান। তাই সর্বদা কোরআন শরীফ পাঠাভ্যাস রাখিয়া আমার ভিতরকার সাথীহীন নির্জন স্থানে সাথীর বন্দোবস্ত কর-কারণ আমার অভ্যন্তর অত্যন্ত ভয়াবহ অন্ধকার, কাজেই সময় থাকিতে রাত্রি জাগরণ করিয়া নফল নামাজ, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি ইবাদত করিয়া আমাকে আলোকিত কর। আমার মধ্যে তোমার বিছানার জন্য শুধু মাটি আর ধুলা রাখা হইয়াছে; দুনিয়ায় যেরূপ খাট পালংকে আরাম করিয়া শুইতে, সেরূপ খাট-পালংক আমার মধ্যে নাই। তাই সময় থাকিতে নেক কার্য করিয়া খাট-পালংকের ন্যায় মহা আরামের শয্যা তৈরার কর।
মনে রাখিবে- আমার মধ্যে তোমাদের দংশনকারী বড় বড় ভয়ানক বিষাক্ত অজগর রাখা হইয়াছে। সে অজগর তোমাদিগকে দংশন করিবে। কাজেই মরিবার পূর্বে সময় করিয়া বিসমিল্লাহির রাহমামির রাহীম-এই পবিত্র আয়াতাংশ পড়িয়া এবং নফল নামাজাদি যাতারীতি আদায় করিয়া উক্ত ধংশনকারী অজগর হইতে রক্ষা পাইতে চেষ্টা কর।
জানিয়া রাখ, ‘হে আদম সন্তান! তোমার মৃত্যু হইয়া গেলে তোমার আত্মীয়-স্বজনগণ তোমাকে মৃত্তিকা গর্ভে একটি নির্জন কক্ষে পুঁথিয়া রাখিয়া আসিলেই কিছু পরে মুনকার ও নকীর নামক দুই ফেরেশতা অতি ভয়ানক আকৃতি ধারণ করিয়া তোমার সম্মুখে উপস্থিত হইবে ও তোমার জীবনের কৃত যাবতীয় পাপ-পুণ্যের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নিকাশ চাহিবে, তখন তাহাদিগকে কি উত্তর দান করিবে। কাজেই সময় থাকিতে তাহাদের প্রশ্নের জবাব দিবার জন্য দিবা-রাত্র আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাক এবং সকাল-বিকাল বেশী পরিমাণে কলেমায়ে ত্বাইয়্যেব ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ একগ্র চিত্তে পাঠ করিতে থাক। এই কলেমার বরকত ও বদৌলতে তাহাদের প্রশ্নের উত্তর যথাযথ দিতে সমর্থ হইবে।’
পাঠক। উপর উল্লিখিত মর্মে আমার কয়েকটি আরবী শে’র বা কবিতা মনে পড়িল।
জনৈক আরবী কবি বলেন’ (অনুবাদ)
কবর বলে শোন আমি ঘুটঘুটে অন্ধকার
হৃদয় নুরে কর আমায় নুরানী-গোলজার।
আমার পেটে বোঝাই বহু সর্প বিষধর,
চোখের নীরে প্রতিষেধক অষুধ বানাও তার।
মৃতদেহের আজাব ও যন্ত্রণা
উম্মুল মো’মেনীন হজরত আয়েশা ছিদ্দীকা বলেন, একদা আমার ঘরে বসিয়াছিলাম, এমন সময় রাসূল (ছাঃ) আমার ঘরে তাশরীফ আনিলেন। আমি তাঁহাকে দেখিয়া সালাম করিলাম। আর আমার অভ্যাস অনুযায়ী তা’জীমের জন্য দাঁড়াইতেছিলাম। ইহাতে হুজুর (ছাঃ) বলিলেন—
‘হে আয়েশা! যথাস্থানে বসিয়া থাক।’ আমি তাই করিলাম। তখন রাসূলে পাক (ছাঃ) আসিয়া আমার উরুর উপর তাঁহার মস্তক মোবারক রাখিয়া শুইয়া পড়িলেন। আমি তাঁহার দাড়ি মোবারক হইতে বাছিয়া একে একে উনিশটি সাদা দাড়ি বাহির করিলাম। ইহা দেখিয়া আমার অন্তঃকরণে অত্যন্ত দুঃখ ও ভীতির সঞ্চার হইল। ভাবিলাম, হুজুর বুঝি আর বেশী দিন দুনিয়ায় অবস্থান করিবেন না। হয়তো তিনি অল্প দিনের মধ্যেই সমস্ত উম্মতকে ইয়াতীম করিয়া চলিয়া যাইবেন। এইরূপ দুঃখে আমার চক্ষু হইতে অশ্রুধারা প্রবাহিত হইল। এমন কি কয়েক ফোঁটা অশ্রু হুজুরে পাকের (ছাঃ) মুখমণ্ডলের উপর পতিত হইল। হুজুর অমনি চমকিয়া উঠিয়া বলিলেন :
‘হে আয়শা, তোমার কি হইয়াছে! তোমার এই অবস্থা কেন? তখন আমি মিনতি সহকারে বলিলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ (ছাঃ)! আমার জীবন আপনার কদম মোবারকে উৎসর্গ করিতেছি। বলুন যে, মর্দারের উপর মরণকালে সবচেয়ে কোন অবস্থা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।’
তিনি উত্তর করিলেন : ‘মুর্দারের ঐ যন্ত্রণাই সবচেয়ে বেশী কঠিন, যখন মুর্দারকে তাহার আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবগণ ঘর হইতে বাহির করে এবং তাহার বিয়োগে উচ্চৈঃস্বরে কাঁদাকাটি করিতে থাকে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছঃ) আবার ইরশাদ করিলেনঃ
‘হে আয়েশা, ইহা হইতেও মুর্দারের উপর অত্যন্ত কষ্ট ও যন্ত্রণা ঐ সময় হয়, যে সময় তাহার আত্মীয়বর্গ, লোকজন নির্দয়ভাবে নিবিড় বনের ক্ষুদ্রাকার মূর্ত্তিকা গর্ভে তাহাকে পুঁতিয়া আসে।’ ইহার পর হুজুর (ছঃ) আরও বলিলেন :
‘হে আয়েশা। জানিয়া রাখ, মৃত ব্যক্তির শরীর হইতে যখন তাহার যাবতীয় পোষাক-পরিচ্ছদ, কাপড়-চোপড় খোলা হয়, তখন মৃত ব্যক্তির আত্মা উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া বলে— ‘হে উলঙ্গকারিগণ! আমার দেহ এত তাড়াতাড়ি উলংগ করিও না, বড়ই লজ্জা হইতেছে।’
মোর্দায় মিনতি করে, বলেগো তখন,
হে মোর ইয়ার বন্ধু আত্মীয় স্বজন।
কি কর কি কর বড় লজ্জা হয় মোর,
খুল না খুল না মম অঙ্গের কাপড়।
তাহার এইরূপ চীৎকার মানব-দানব ব্যতীত আর সব সৃষ্টজীবই শুনিতে পাইবে।
এইভাবে যখন আবার মৃতদেহকে গোসল করাইবার জন্য তাহার শরীরের কাপড়-চোপড় খোলা আরম্ভ করা হয়, তখন আবার আত্মা চী ৎকার করিয়া বলে হে অমুক! আমার দেহ হইতে কাপড়-চোপড় ধীরে ধীরে খুলিতে থাক। কেননা, এইমাত্র আমি মরণের কবল হইতে রক্ষা পাইয়াছি। মরণ আমার দেহকে একেবারে শাকসিদ্ধের মত নরম করিয়া ছাড়িয়াছে। আমার শরীরে এখন ফুলের আঘাত পর্যন্তও সহ্য হইতেছে না। কাজেই কাপড়-চোপড় আস্তে আস্তে খোল।’
ধীরে ধীরে খোল ভাই বসন আমার,
ফুলের আঘাতও আমি নারি সহিবার।
মৌতের কষ্ট ভাই এমন ভীষণ,
শরীর হয়েছে সিদ্ধ শাকের মতন।
আবার যখন মৃত ব্যক্তিকে গোসল করাইবার জন্য তাহার শরীরে পানি দেওয়া আরম্ভ করে, তখন মৃতদেহের আত্মা বলে ‘হে গোসলদানকারী! আমার শরীরে অতিরিক্ত গরম বা শীতল পানি দিও না, তাহাতে আমার শরীর অত্যন্ত কষ্ট হয়। কোননা, মালাকুল মউত এইমাত্র আমার শরীরকে ছাড়িল। আমার শরীরকে যে একেবারে পিষিয়া তুলার মত নরম ও ক্ষীণ করিয়া ফেলিয়াছে। তাই গরম বা শীতল পানি যাহাই দিতে থাক, তাতেই আমার কষ্ট-কোনটাই আমি বরদাস্ত করিতে পারিব না।’
অতি উষ্ণ কিংবা ভাই অতি ঠাণ্ডা বারী,
ঢেল না শরীরে মোর সহিতে না পারি।
আজরাঈল হরিয়াছে জীবন যখন,
শরীর করিছে ধূনা তুলার মতন।
আবার যখন সমস্ত শরীর উত্তমরূপে পানি দ্বারা মাজিয়া ঘসিয়া ধৌত করিয়া পরিষ্কার করিতে আরম্ভ করে, তখন বলে : ‘হে অমুক! তোমার কি আমার জন্য মোটেই দরদ নাই! এত নির্দয়ভাবে মাজিয়া-ঘষিয়া ধৌত করিতেছ? তুমি কি জান না যে, এইমাত্র আমি মউতের কবল হইতে রক্ষা পাইলাম। মউত যে আমার শরীরকে একেবারে ক্ষতবিক্ষত করিয়া ফেলিয়াছে। কাজেই শক্তভাবে আমার শরীর স্পর্শ করিও না। ধীরে ধীরে মাজিয়া পরিষ্কার কর। মরণের যে কি যাতনা তাহা অনুভব করিতে পার নাই বলিয়াই এরূপভাবে করিতেছ, অন্যথা এ প্রকার নির্দয়ভাবে করিতে না!
ধীরে ধীরে তনু কর পরিষ্কার,
বড়ই বেদনা ভাই শরীরে আমার।
মৃতদেহকে গোসল দেওয়া হইলে যখন কাফন পরান আরম্ভ করে এবং কাফন পরাইয়া দুই পায়ের নিকট কাফন একত্র করিয়া বাঁধিতে আরম্ভ করে ও মস্তকে কাপড় বাঁধিবার জন্য মস্তকের কাছে যায়, তখন মৃতদেহ আরও উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া বলে-’হে কাফন প্রদানকারী, তোমাকে খোদার কসম দিয়া বলিতেছি, আমার মুখমণ্ডল এত তাড়াতাড়ি বাঁধিও না। এই যে আমার শেষ বিদায়। শেষবারের মত আমার আত্মীয়- স্বজন, ভাই-বন্ধু ও স্ত্রী-পুত্রগণকে একবার দেখিয়া লইতে দাও। এই যে আমার চির বিদায়। তাহারা যে কেয়ামতাবধি আমার চেহারা আর দেখিতে পাইবে না এবং আমি যে আর তাহাদেরকে স্নেহ ও ভালবাসা দান করিতে পারিব না।
বাঁধিও না বাঁধিও না এত তাড়াতাড়ি,
আমিতো চলেছি আজি এ দুনিয়া ছাড়ি।
ক্ষণিক পরেই হব গোরে উপস্থিত,
হবে নাত দেখা আর কাহার সহিত।
ভাই-বন্ধু, স্ত্রী-পুত্র আত্মীয়-স্বজন,
সবিত যাইব ছাড়ি জন্মের মতন।
হাশরের পূর্বে হায় আর কারো সাথ,
হবে না কোন দিন কভু মোলাকাত।
একটু সবুর তাই কর ওহে ভাই,
চির জনমের মত সবে দেখে যাই।
যখন মুর্দারকে কবরস্থানে নেওয়ার জন্য ঘর হইতে বাহির করা হইবে, তখন আবার মৃতদেহের আত্মা বলিয়া উঠিবে- ‘হে বন্ধুগণ। তোমাদিগকে খোদার কসম দিয়া বলিতেছি, তোমরা আমাকে আস্তে আস্তে ঘর হইতে বাহির কর। অদ্যই আমি নশ্বর দুনিয়া হইতে চির বিদায় নিয়া এমন স্থানে যাইতেছি, যেখানে কোনদিন যুগের হাওয়া প্রবাহিত হইবে না, কোলাহল বলিতে কিছু থাকিবে না সেখানে। তাই শেষ বারের মত একবার আমার চির জীবনের সাধনার ঘর-বাড়ি, দালান-কোঠা উত্যাদি দেখিয়া লইতে দাও পুত্র-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন হইতে শেষ বারের মত বিদায়। কপালে করাঘাত করিলেও যে তাহারা আমি হতভাগাকে আর দেখিতে পাইবে না।’
খোদার কছম দিয়া বলি তোমাদের,
ঘর হতে ধীরে ধীরে করগো বাহের।
চির জনমের মত লইয়া বিদায়,
যাইতেছি আমি আজি এমন জায়গায়।
যেথায় বিরাজ সদা সীমাহীন ঘুম,
সাড়া নাই, শব্দ নাই, নীরব নিঝুম।
থামিয়া গিয়াছে যেথা গতি জামানার,
যেথায় আজিকে হবে বসতি আমার।
ধীরে তাই ঘর হতে নিকাল আমায়,
সবার হইতে দাও লইতে বিদায়।
আরও বলিবে-’হে বন্ধুগণ! অদ্য আমি আমার স্ত্রীকে বিধবা করিয়া চিরসঙ্কটময় স্থানে গম করিতেছি এবং আমার ছোট শিশু-সন্তানগণকে ইয়াতিম করিয়া চির বিদায় লইতেছি। কাজেই তোমরা আল্লাহর দিকে চাহিয়া উহাদের উপর সদয় হইও, – করিও উহাদের রক্ষণাবেক্ষণ। উহারা যেন আমাকে হারাইয়া বিয়োগ বেদনায় কোনরূপ কষ্ট না পায়; আর তোমরাও তাহাদিগকে যাতনা দিতে চেষ্টা করিও না। হায়রে, আমার পুত্র-পরিজন। আমার বিয়োগে কে তাহাদেরকে সান্ত্বনা দিবে, কেই-বা তাহাদিগকে পিতৃবৎ স্নেহ করিবে।’
সবারে যাইগো রাখি জন্মের মতন,
ওদের করিও সবে আদর যতন।
আবার যখন মৃতদেহকে মুর্দারের খাটে তুলিয়া কবরস্থানের দিকে নেওয়ার জ্য প্রস্তুত করা হয়, তখন আত্মা বলিয়া উঠে-’হে লোক সকল! তোমারা আমাকে এত তাগাতাড়ি লইয়া যাইও না। আজ আমি এই নশ্বর দুনিয়া হইতে চির বিদায় লইয়া যাইতেছি। শেষ বারের মত আমার আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধব খেশ – আকাবেরগণকে একবার দেখিয়া লই। তাহাদিগকে যে আর কেয়ামত পর্যন্ত দেখিতে পাইব না। তাহাদের একটু কণ্ঠস্বর শুনিতে দাও।’
আবার যখন লোকজন শবদেহকে মুর্দারের খাটে তুলিয়া কবর স্থানের দিকে লইয়া রওয়ানা হয়, তখন মর্দারের আত্মা খোদার শপথ দিয়া বলে-’হে আমার বন্ধুগণ! হে আমার ভাইগণ! হে আমার সন্তান-সন্তুতিগণ! তোমরা দুনিয়ার সৌন্দর্য দেখিয়া তাহার চক্রে পড়িও না। এই দুনিয়া নশ্বর ও ক্ষণস্থায়ী। এইখানে ভোগ-বিলাস, টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত সকলই ক্ষণ-স্থায়ী। তাই তোমরা এই দুনিয়ার মোহে পতিত হইয়া আমার ন্যায় পথভ্রষ্ট হইও না। দুনিয়ার মোহে যতই পতিত হইবে, ততই আল্লাহ দূরে সরিয়া পড়িবেন। এখন বুঝিতেছি, কি অন্যায় করিয়াছি, অমূল্য জীবনকে কিভাবে মাটি করিয়াছি। এখন যে কি কষ্ট হইতেছে, তাহা আমি বুঝি। হায় অফসোস। কেন যে আল্লাহর আদেশ অবহেলা করিয়া দুনিয়ার ভোগ- বিলাসে মত্ত হইয়াছিলাম, কেনই বা ধন-দৌলত সঞ্চয় করিবার জন্য এত ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম?’
দেখ, হে আমার ধন-সম্পত্তির উত্তরাধিকারীগণ! আমার মরণে তোমরা আমার যাবতীয় ধন সম্পত্তি, মাল-দৌলত কড়ার গণ্ডায় হিসাব করিয়া বণন করিয়া নিয়াছ, তাহাতে আমার কি উপকার হইল! তোমরা কেহ তো আমার এক তিল গোনাহর ভাগীও হইলে না? সবই যে আজ আমার জীবনে ধ্বংসাত্মত হইয়া দাঁড়াইল। জীবনে শুধু নানা উপায়ে ধন-দৌলত উপার্জন করিয়াছি, কিন্তু তাহা হইতে এক কপর্দকও দান-ছদকা করি নাই। আজ যে এই সঙ্কটময় মুহূর্তে নেকীর কার্য বলিয়া কিছুই দেখিতে পাইতেছি না। শেষবারের মত তোমাদিগকে বলিয়া যাই, আল্লাহর আদেশ অবহেলা করিয়া কোনরূপ ধন-দৌলত উপার্জন করিতে চেষ্টা করিও না।
মোর্দার কাঁদিয়া বলে কছম খোদার
অতি ক্ষণস্থায়ী শোন এই যে সংসার।
অস্থায়ী ইহার সুখ টাকা কড়ি ধন,
এর লাগি মুহব্বত বৃথা অকারণ।
পড়িয়া ইহার মোহে ভীষণ ধোকায়,
বরবাদ করেছি সব হায়, হায়, হায়।
আখের ভুলিনু যেই ধনের লাগিয়া,
সেই ধন যাইতে না যাইতে ছাড়িয়া।
ভাগ করে নিল সবে কড়া গণ্ডা তার,
কেহত নিল না ভাগ আমার গুনার।
তাই এই ধন লোভে পড়িয়া কখন,
আখের ক’র না নষ্ট আমার মতন।
এই দুনিয়ায় সব অনিত্য অসার,
তোমরা ইহার ফাঁদে পড়িও না আর।
এতদ্ব্যতীত শেষবারের মত তোমাদিগকে অনুরোধ করিয়া যাইতেছি- দয়া করিয়া আমার পরিত্যক্ত ধন-দৌলত হইতে মাঝে-মধ্যে আমার জন্য কিছু কিছু ছদকা করিয়া আমার রূহের মাগফেরাত করিও।
আবার যখন মৃত ব্যক্তির জানাজার নামাজ পড়া শেষ করিয়া দু’ একজন লোক এদিক সেদিক চলিয়া যাইতে আরম্ভ করে, তখন মৃতদে- হের আত্মা সকলকে অনুরোধ করিয়া বলে- বন্ধুগণ! সদ্য মৃত ব্যক্তিকে কিছুদিন পরে তাহার বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজনগণ ভুলিয়া থাকে, কিন্তু তোমাদের কাছে আজ মিনতি সহকারে অনুরোধ করিয়া বলিতেছি, তোমরা কেহ আমাকে কবরে না রাখিয়া যাইও না।
যা কিছু আমার ছিল সব আজি ছাড়ি,
অজানার দেশে আমি জমাইনু পাড়ি।
তোমরা করিও ভোগ টাকা-কড়ি ধন,
কিন্তু দয়া করে রেখ আমায় স্মরণ।
হে বন্ধুগণ। মরণের পূর্বে আমি তোমাদের নিকট অমূল্য রতন ছিলাম। বুঝি, এখন আমি তোমাদের কাধের বোঝা হইয়া দাঁড়াইয়াছি। তাহা সত্ত্বেও আজ তোমাদের নিকট অনুরোধ, দুনিয়ায় নানা উপায়ে বহু ধন- সম্পত্তি, মাল-দৌলত উপার্জন করিয়া তোমাদেরই জন্য রাখিয়া যাইতেছি। তাই দয়া করিয়া আমার জন্য মাঝে মাঝে দান ছদকা করিয়া কিছু পুণ্য (নেক) দিতে ভুলিও না।
আমি জীবিত থাকাকালীন তোমাদিগকে কোরআন পাঠ শিক্ষা দিয়াছিলাম; তোমরা আমাকে সুদুর অজানা পথে ছাড়িয়া ভুলিয়া যাইও না। মাঝে মাঝে সকাল বিকাল কোরআন শরীফ পাঠ করিয়া আমার রূহের কল্যাণের জন্য বখশিয়া দিও। দুনিয়া হইতে আখেরাতের পথে কোন সম্বল লইয়া যাইতে পারিলাম না। তবে পরকালে সুখ-শান্তি অনেকটা তোমাদের উপর নির্ভর করিতেছি ভুলিয়া যাইও না। আমার মত অসহায় একদিন তোমাদেরও হইতে হইবে, ভুলিলে চলিবে না।’
পাঠ করিয়া দোয়া দরূদ পবিত্র কুরআন,
কিংবা টাকা-পয়সা করে খোদার রাহে দান!
মুর্দেগানে করিলে সে ছোয়াব রেছানি,
সেই নেকীতে হয়গো তাদের কবর নুরানী।
মৃত ব্যক্তির জন্য কোর আন শরীফ তেলাওয়াত করিয়া তাহার আত্মার শান্তির জন্য ছওয়াব রেসানী বা দোয়া করিলে তাহাতে মৃত ব্যক্তির অন্ধকারময় কবর আলোকিত হয়।
এই মর্মে ইবনে কলাবা (রাঃ) সুন্দর একটি ঘটনা বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি বলেন : ‘আমি একদা রাত্রিকালে স্বপ্ন যোগে একটি কবরস্থান দেখিতে পাইলাম, কবস্থানের সকল কবরগুলি ভাংগিয়া গিয়াছে এবং প্রত্যেকটি কবর হইতে মুর্দার বাহির হইয়া কবরের উপর উঠিয়া বসিয়াছে। আরও দেখিলাম যে, আমার একজন মৃত প্রতিবেশী ব্যক্তির সম্মুখ ব্যতীত সকল মুর্দারের সম্মুখে এক একটি উজ্জ্বল আলো দেখা যাইতেছে। এতদ্দর্শনে আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম-
‘ভাই! সকল মুর্দারের সম্মুখে আলো আছে, কিন্তু তোমার সম্মুখে আলো নাই-এর কারণ কি?’
আমার প্রতিবেশী উক্ত মুর্দার ব্যক্তি দুঃখ করিয়া উত্তর করিলঃ উহার কারণ এই যে, এই সকল মুর্দারের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, ছেলে- মেয়ে, পুত্র-পরিজনেরা কোরআন শরীফ পাঠ করতঃ তাহাদের জন্য দোয়া করিতেছে এবং দান-ছদকা করিয়া তাহাদের মঙ্গল কামনা করিতেছে; এই জন্য তাহাদের সম্মুখে আল্লাহ পাক এমন সুন্দর আলো দান করিয়াছেন।’ অতঃপর আবার আমার মৃত প্রতিবেশী আরও দুঃখ করিয়া বলিল : আফসোস! আমার ছেলে গোনাহগার। সে আমার আত্মার শান্তির জন্য কোরআন শরীফ পাঠ তো দুরের কথা, দু’একটি পয়সা দান- ছদকা করিয়াও আমার রূহের মাগফেরাত কামনা করে না। এইজন্য আমি আলোহীন অন্ধকারময় স্থানে থাকিয়া অন্যান্য মুর্দারের কাছে লজ্জিল আছি।’
ইবনে কালাবা (রাঃ) বলেন,–এই ঘটনার পরে আমি নিদ্রা হইতে জাগ্রত হইলাম। ইহার পরের দিবস অতি প্রত্যুষে উক্ত ব্যক্তির ছেলেকে ডাকাইয়া আমার স্বপ্ন তাহাকে খুলিয়া বলিলাম। আমার স্বপ্ন বৃত্তান্ত শুনিয়া সে ভয়ে আতঙ্কিত হইয়া পড়িল। অতঃপর সে আমার কাছে যাবতীয় গোনাহর কার্য হইতে বিরত থাকিবে বলিয়া প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইল-তওবা করিল এবং বলিল : ‘আজ হইতে সকাল-বিকাল আমার পিতার জন্য যথারীতি কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করিব এবং দান ছদকা করতঃ তাঁহার রূহের মাগফেরাত কামনা করিব।’
ইবনে কাবালা বলেন- ইহার পরে আর এক রাত্রে স্বপ্নযোগে উক্ত কবরস্থান এবং উক্ত মুর্দারদিগে অনুরূপ দেখিতে পাইলাম। কি আশ্চর্য! ইহার পূর্বে যেরূপ দেখিয়াছিলাম অদ্য তাহার বিপরীত দেখিতে পাইলাম। দেখিলাম, উক্ত প্রতিবেশীর সম্মুখে সূর্যের ন্যায় অপূর্ব জ্যেতির্ময় একটি নূর (আলো) তাহার চতুস্পার্শ্বে আলোকিত করিয়াছ। আমাকে দেখিয়া সে হাসিয়া বলিল :
আল্লাহ আপনার দীন-দুনিয়া মঙ্গল করুন; সুখে ও আল্লাহর করুণার ছায়াতলে আপনার জীবন অতিবাহিত হউক। আল্লাহর অপার করুণা এবং আপনার ন্যায় খোদাভক্ত একজন বান্দার বদৌলতে অদ্য আমি ভয়াবহ অন্ধকার এবং আমার অন্যান্য প্রতিবেশী মুর্দাদের কাছে লজ্জা হইতে পরিত্রাণ পাইলাম।’
দোয়া ও কোরআন তেলাওয়াত করিয়া মুর্দার প্রতি বখশিয়া দিলে যেমনি কবরে হাশরে তার উপকার হয়, অনুরূপ উপকার হয় বিসমিল্লা’র বরকতেও। এই সম্পর্কে হাদীছের একটি ঘটনা এখানে উল্লেখযোগ্য :
কোন এক শহরে এক ব্যক্তির মৃত্যু উপস্থিত হইলে মালাকুল মউত তাহার আত্মা কবজ করিবার জন্য তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন। উক্ত ব্যক্তি মালাকুল মউতের ভীষণ আকৃতি দেখিয়া বলিল- ‘আপনি কে? তদুত্তরে তিনি বলিলেন- ‘আমি মালাকুল মউত। আল্লাহর আদেশে এখনই তোমার আত্মা হরণ করিতে আসিয়াছি।’ এতদশ্রবণে উক্ত ব্যক্তি কাঁপিতে লাগিল। মালাকুল মউত বলিলেন-’এইরূপ কাঁপিতেছ কেন, দোজখের ভীষণ আজাবের ভয় পাইয়াছ না কি?’ সে বলিল-হ্যাঁ হুজুর, জীবনে কোন নেক কাজ করিতে পারি নাই। না জানি মৃত্যুর পরে কি অবস্থা ঘটে।’ মালাকুল মউত তখন বলিলেন-ভয়ের কোন কারণ নাই। আমি তোমাকে এমন এক টুকরা কালাম লিখিয়া দিব, যাহার কারণে তুমি দোজখের ভীষণ আজাব হইতে রক্ষা পাইবে।’ এই কথা শুনিয়া উক্ত ব্যক্তি সবিনয়ে বলিল— দয়া করিয়া আমাকে সে কালাম টুকরা লিখিয়া দিন। মালাকুল- মউত তখন এক টুকরা কাগজে আরবীতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম লিখিয়া দিয়া বলিলেন- যাও, এ কলেমার বরকতে আল্লাহ পাক তোমাকে দোজখের ভয়াবহ আজাব হইতে রক্ষা করিবেন।
মৃতের প্রতি বিলাপ করিয়া কাঁদা
হাদীছ শরীফে আছে-যে ব্যক্তি বিপদে অধৈর্য হইয়া বস্ত্র ছিন্ন করে এবং বক্ষে করাঘাত করে, সে যেন আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করিল।
অন্য একটি (হাদীছে আছে-যে ব্যক্তি মছীবতে পড়িয়া দরজায় বিষাদময় কাল রেখা অঙ্কিত করে বা কাল কাপড় পরিধান করে অথবা ঘড়-বাড়ি বিরাণ করিয়া ফেলে কিংবা বৃক্ষ-লতাদি ধ্বংস করে, তাহার জন্য আল্লাহ পাক দোজখে ভীষণ অগ্নি কাননে অসংখ্য ঘর-বাড়ি তৈয়ার করিয়া রাখিবেন। আর সে এত বড় পাপীরূপে গণ্য হইবে যে, সে যেন সত্তর জন নবীর হত্যাকাণ্ডের গোনাহে যোগদান করিয়াছে।
যে ব্যক্তি এইরূপ শরীয়ত বিরোধী কার্য-কলাপ করিয়াছে, যতদিন না সে উহা হইতে তওবা করিবে এবং নিজের আত্মার মাগফেরাত কামনা করিবে, ততদিন পর্যন্ত তাহার ইবাদত-বন্দেগী আল্লাহর দরবারে কিছুই কবুল হইবে না। আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিবস এই সকল লোকদের তন্নতন্ন করিয়া হিসাব লইবেন। আর উহারা কেয়ামতের দিবস বস্ত্রহীন ও নগ্নপদে হাজির হইবে। তাহাদের আমলামায় অসংখ্য গোনাহ-রাশি লেখা হইবে এবং আকাশ ও জমীনের যাবতীয় ফেরেশতাগণ তাহাদের প্রতি অভিশাপ প্রদান করিতে থাকিবে।
হাদীছ শরীফে আছে-যে ব্যক্তি মছীবতে পতিত হইয়া বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া ফেলে, মৃতের প্রতি বিলাপ করিয়া কাঁদা-কাটা করে, মালাকুল- মউত এইরূপ ব্যক্তির দরজায় হাজির হইয়া বলে-’হে অমুক! তুমি এইরূপ করিতেছ কেন। কাহার উপর রাগ করিয়া বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া কাঁদিতেছ? তোমার আপনজনের আত্মা হরণ করায় আমার উপর রাগ হইয়াছ কি? তাই যদি হয়, তবে তুমি একান্ত ভুল করিতেছ। কেননা আমি আল্লাহর আদেশ পালন করিয়াছি মাত্র। আল্লাহ যখন তোমার আত্মীয়ের আত্মা হরণ করিতে আদেশ করিয়াছেন, তখনই তাহার আত্মা হরণ করিয়াছি। আল্লাহর আদেশ ছাড়া এক মিনিট পূর্বে কাহারও জীবন বিনাশ করার অধিকার আমার নাই। কাজেই আমার উপর রাগ করিয়া কি লাভ? আর যদি একান্তই আল্লাহর উপর রাগ করিয়া তকদীরের বিরুদ্ধাচারণ করিয়া থাক, তবে মনে রাখিবে, তুমি ভীষণ অন্যায় করিলে এবং কাফের হইলে। পরকালে দোজখের অগ্নিকুণ্ডে তোমাকে জ্বলিতে হইবে।’ মালাকুল মউত আরও বলিবেন- ‘হে অমুক! জানিয়া রাখ, কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত আমি বার বার আসিয়া আল্লাহর আদেশে তোমাদের জান কবজ করিব-প্রত্যেককেই তাহাদের আত্মীয়-স্বজন ছাড়া করিব।
বিজ্ঞ ফিকাহ শাস্ত্রবিদ আলেম আবুল লাইছ (রহঃ) বলিয়াছেন-বিলাপ করিয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদা হারাম, তবে কেহ প্রাণের কষ্টে অধীর হইয়া অশ্রুধারা বহাইয়া কাঁদিতে পারে। কিন্তু এইরূপও না করিয়া আত্মাকে সান্তনা দেওয়াই উত্তম। আল্লাহ ফর্মান-
: মছীবতে ধৈর্য ধারণকারীগণ অসংখ্য নেকীর অধীকারী হইবে।
বিপদে ছবর করে রহে যেই জন,
অবশ্য অশেষ নেকী লভে সেইজন।
কথিত আছে হজরত হুসাইনের (রাযিঃ) পুত্র আলির (রামিঃ) মৃত্যুর পরে তাঁহার স্ত্রী বহুদিন যাবৎ তাঁহার মাজারের নিকট ‘খীমা’ গাড়িয়া সেখানে অবস্থান করিতেছিলেন। অনেক দিন পরে যখনই তাঁহার স্ত্রী খীমা তুলিয়া রওয়ানা করিল তখন গাইবী আওয়াজ আসিল-’হে অমুক। তুমি এতদিন যাহার প্রতীক্ষায় ছিলে, তাহাকে কি পাইয়াছ?’
মৃত লোকদের জন্য কেবল অশ্রু নির্গত করিয়া কাঁদা জায়েজ আছে এই মর্মে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হইতে বর্ণিত আছে, যখন তাঁহার নাবালেগ ছোট শিশু ইব্রাহীম ইবনে মোহাম্মদের (ছাঃ) ইন্তেকাল হয়, তখন হুজুর দুঃখে অশ্রু নির্গত করিয়া কাঁদিতেছিলেন, এমন সময় আবদুর রহমান ইবনে আউফ বলিয়া উঠিলেন-
‘ইহা রাসূলুল্লাহ! আপনি কি আমাদিগকে মুছীমতে অধৈর্য হইয়া কাঁদিতে নিষেধ করেন নাই? তদুত্তরে হজুর বলেন- বক্ষ বিদীর্ণ করতঃ বিলাপ করিয়া কাঁদিতে নিষেধ করিয়াছি- এইরূপ কাঁদা হারাম। তবে মহব্বতে অধীর হইয়া অশ্রু নির্গত করিয়া কাঁদার বিধান আছে।
মুছীবতে ধৈর্যধারণ
রাসূল পাক (ছঃ) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি ফরমাইয়াছেন, ‘লাওহি মাহফুজে’ আল্লাহ পাক সর্বপ্রথম বিশেষ বিশেষ কয়েকটি বিষয় লিখিতে আদেশ করিয়াছেন। তন্মধ্যে প্রথম লিখিতে বলিয়াছেন- ‘আমি এমন সর্বশ্রেষ্ঠ আল্লাহ বা মা’বুদ, যাঁহার দ্বিতীয় নাই। আমার ব্যতীত অন্যের জন্য ইবাদত-বন্দেগী গ্রহণযোগ্য বা কবুল হইবে না। মোহাম্মদ মোস্তফা আমার প্রিয় বান্দা ও প্রেরিত মহাপুরুষ বা রসূল। আমার আদেশের বিপরীত কাহারও আদেশ থাকিতে পারে না। সমস্ত সৃষ্ট জীবের মত ও পথ আমার নির্দেশিত পথের অনুসারী হইবে। যে ব্যক্তি আমার আদেশ অবনত মস্তকে শিরোধার্য করিবে; পরীক্ষামূলক ভাবে অবতীর্ণ বালা-মুছীবতে ধৈর্য্য ধারণ করিবে, আর যে আমার বিশাল দানরাশির কৃতজ্ঞতা স্বীকার করিবে, আমি তাহাদের নাম, ‘লাওহি মাহফুজে’ সত্যবাদী রূপে অঙ্কিত করিব। আর উহাদিগকে কিয়ামতের দিবস সত্যবাদী দলের অন্তর্ভুক্ত করিয়া আমার আদালতে হাজির করিব।
দুনিয়ার বুকে যেই আদম সন্তান,
হামেশা মানিয়া চলে খোদার ফর্মান।
বালা-মুছীবতে রহে করিয়া সবর,
আর করে আল্লাহর দানে শোকর
ছাদেক হিসাবে নাম নেক বান্দার,
লিখে রাখা হয় লোহে মা’ফুজে খোদার
আর দয়াময় খোদা তাহাকে হাশরে,
উঠাবেন ছাদেকীন দল ভুক্ত করে।
‘যে ব্যক্তি আমার আদেশ অমান্য করিবে অথবা অবহেলা করিবে, আমার পরীক্ষামূলক বালা-মছীবতে অধৈর্য হইয়া শরীয়ত বিরোধী কার্য কলাপে লিপ্ত হইবে, মস্তকে করাঘাত করিবে, ঘরে কাল রেখা আঁকিবে ও কাল বস্ত্র পরিধান করিবে এবং যে ব্যক্তি আমার বিশাল দানরাশির অকৃতজ্ঞ হইবে, সে যেন আমার বিশাল ভূমণ্ডল হইতে বাহির হইয়া যায়। আর আমার ভাল-মন্দ আদেশ ও কার্যাদি তাহার মনঃপুত না হয়, তবে যেন সে তাহার ইচ্ছানুযায়ী অন্য একজন (প্রতিপালক) খুঁজিয়া লয়।’
হযরত আলী (রাঃ) বলিয়াছেন, ধৈর্যধারণ তিন প্রকার। যথা- (১) ইবাদত-বন্দেগীতে ধৈর্যধারণ করা, অর্থাৎ সর্বদা আল্লাহর ইবাদত- বন্দেগীতে মশগুল থাকা এবং আল্লাহর ধ্যানে কোন সময় বীতশ্রদ্ধ না হওয়া। (২) গোনাহর কাজ হইতে ধৈর্যধারণ করা, অর্থাৎ সর্বদা নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গোনাহর কার্য হইতে এবং অসৎ প্রবৃত্তি হইতে বিরত রাখা। (৩) কষ্ট-মুছীবতে ধৈর্যধারণ করা।
