তৃতীয় অধ্যায় – মৃত্যু ও কবর আজাব
মৃত্যুকালীন অবস্থা
হাদীস শরীফে আছে-যখন মানুষের অন্তিমকাল উপস্থিত হয় এবং আত্মা বাহির হইবার সময় ঘনাইয়া আসে, তখন চারিজন ফেরেশতা তাহার নিকট উপস্থিত হয়। সর্বপ্রথম একজন ফেরেশতা উপস্থিত হইয়া বলে-আচ্ছালামু আলাইকুম’ হে অমুক! আমি তোমার খাদ্য-খাদকের সুব্যবস্থা করার নিমিত্ত আদিষ্ট ছিলাম; কিন্তু আফসোস! অদ্য পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, ও দক্ষিণ; মোটকথা, সমস্ত ভূ-ভাগ তন্নতন্ন করিয়া খুঁজিয়া দেখিলাম, কিন্তু তোমার কিসমতের একটি দানাপানি পাইলাম না। কাজেই বুঝিলাম, অদ্য তোমার মৃত্যু ঘনাইয়া আসিয়াছে, হয়ত এখনই মরণ-সুরা পান করিতে হইবে, দুনিয়ায় আর বেশীক্ষণ থাকিবে না।
‘আবার অন্য একজন ফেরেশতা প্রথম ফেরেশতার ন্যায় আসিয়া সালাম করিয়া বলিবে-’হে অমুক! আমি সর্বদা তোমার পানি সরবরাহের কার্যে নিযুক্ত ছিলাম; কিন্তু অদ্য ত্রিভূবন খুঁজিয়াও তোমার জন্য এক ফোটা পানির ব্যবস্থা করিতে পারিলাম না; তাই বুঝিতে পারিলাম, মৃত্যুদূত তোমার পার্শ্বেই হাজির, এখনই হয়ত গলদেশ টিপিয়া ধরিবে।’
তৎপর আর একজন ফেরেশতা উক্ত ফেরেশতাদ্বয়ের ন্যায় সালাম করিয়া বলিবে-’হে অমুক! আমি তোমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ আঞ্জামের জন্য নির্দিষ্ট ছিলাম, কিন্তু অদ্য দুনিয়ার এমন কোন স্থান খুঁজিয়া পাইলাম না সেখানে গিয়া এক পলক শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করিতে পারি।’
অনুরূপ চতুর্থ ফেরেশতা আসিয়া সালাম করিয়া বলিবে-’হে আদম সন্তান। আমি তোমার সময় কার্যের সুবন্দোবস্ত করার নিমিত্ত নিয়োজিত ছিলাম। অদ্য সমস্ত ভূ-মণ্ডল ঘুরিয়াও তোমার একটি সেকেণ্ড সময় ও কোন কার্য তালাশ করিয়া পাইলাম না। তাই নিঃসন্দেহে বুঝিতে পারিল-াম যে, আর তুমি জিন্দা থাকিয়া নশ্বর ধরা সুখ-শান্তি ভোগ করিতে পরিবে না। অদ্যই তোমাকে মরিতে হইবে।’
এই চারিজন ফেরেশতার পরে কেরামন ও কাতেবীন নামক দুইজন ফেরেশতা আচ্ছালামু আলাইকুম বলিয়া উপস্থিত হইয়া বলিবে- ‘হে আদম সন্তান? তোমাদের ভালমন্দ যাবতীয় কার্যাবলী লিখার জন্য আমরা আদিষ্ট ছিলাম। অদ্য আমাদের ভালমন্দ কার্যাবলী লেখা রহিত হইয়া গেল।’
এই বলিয়া ফেরেশতাদ্বয় এক টুকরা কাল লিপি বাহির করিয়া দিবে ও বলিবে, ‘এই তোমার কার্যের ফলাফল, ইহা পড়িয়া দেখ।’ আদম সন্তান. উক্ত লিপি দেখা মাত্র ভয়ে অস্থির হইয়া ঘর্মাক্ত হইয়া উঠিবে এবং উহা পাঠ করিবার ভয়ে মুখমণ্ডল এদিক ওদিক ঘুরাইতে থাকিবে। কিন্তু উপায় কি! সময় যে শেষ, আর যে বেশী সময় বাঁচিয়া থাকিতে পারিবে না।
একে একে সব ফেরেশতা যাবে বিদায় হয়ে,
হাজির হবেন আজরাঈল মরণ সমন লয়ে।
অতঃপর ডানে বামে দুইজন সহচর ফেরেশতাসহ যমদূত ফেরেশতা উক্ত ব্যক্তির জান কবজ করিবার জন্য উপস্থিত হইবে। ডানে যে ফেরেশতা থাকিবে তাহাকে বলা হয় রহমতের ফেরেশতা। আর বামে যে ফেরেশতা থাকিবে, তাহাকে বলা হয় আজাবের ফেরেশতা। যদি মৃত্যুবরণকারী নেককার হইয়া থাকে, তবে তাহার আত্মা অতি সহজে দুগ্ধপায়ী শিশুর মাতার স্নেহ-প্রচাপণ যন্ত্রণার ন্যায় আরামে বাহির করিবে। অন্যথা অত্যন্ত করুণ অবস্থায় আত্মা বাহির করা হইবে। মৃত্যুবরণকারীর আত্মা যখন গলদেশ পর্যন্ত পৌঁছিবে, তখনই মৃত্যুদূত আজরাঈল তাহার গলা টিপিয়া আত্মা বাহির করিয়া লইবে।
আত্মা বাহির করা হইলে মৃত্যুবরণকারী যদি নেককার হইয়া থাকে তবে আজরাঈল রহমতের ফেরেশতার নিকট তাহার আত্মা সোপর্দ করিয়া বলিবেন-’যাও, উহাকে নিয়া আসমানের পবিত্র শান্তিময় স্থানে রাখ।’
আর যদি মৃত্যুবরণকারী বদকার হইয়া থাকে, তবে তাহার আত্মা আজাবের ফেরেশতার নিকট দিয়া বলিবেন—’যাও, উহাকে আসমানের অশান্তিময় স্থানে নিয়া রাখ।’
নেককার মো’মেন ব্যক্তির আত্মা নিয়া রহমতের ফেরেশতা আস- মানে উঠিলেই আল্লাহ্ পাকের দরবার হইতে আওয়াজ আসিবে-’হে ফেরেশতাগণ! তোমরা উহাকে তাহার মৃতদেহের নিকট অবস্থা পর্যবেক্ষণের নিমিত্ত লইয়া যাও।’ তখন ফেরেশতাগণ আত্মাকে নিয়া মৃত- দেহের ঘরের মধ্যে রাখিয়া দিবে। আত্মা ঘরের মধ্যে থাকিয়া তাহার জন্য কে-কি করিতেছে সমস্ত দেখিতে থাকিবে এমন কি মৃতদেহের জানাজার নামাজ পড়িয়া যখন কবরের দিকে লইয়া যাইবে, তখনও আত্মা মৃত- দেহের পিছনে পিছনে কবর পর্যন্ত অনুসরণ করিতে থাকে।
কবরে সাওয়াল : মৃতদেহকে যখন তাহার আত্মীয়-স্বজন দাফন করিয়া চলিয়া আসে, তখনই তাহার রূহকে প্রশ্ন করার সময় উপস্থিত হয়।
গোর বা কবরে সাওয়ালের স্বরূপ বিভিন্নরূপ। কাহারও মতে মৃত ব্যক্তি দুনিয়ায় যেরূপ জীবিত ছিল, কবরে পুনর্বার অনুরূপ জীবন দান করিয়া মৃতদেহের রূহের নিকট মনকির নকীর নামে দুই ফেরেশতা প্ৰশ্ন করিবে। আবার কেহ কেহ বলেন, দুনিয়ার ন্যায় জীবন দান করা হইবে না, বরং রূহকে দেহের বক্ষ পর্যন্ত প্রবেশ করাইবে। অতঃপর রূহের নিকট প্রশ্ন করা হইবে। কেহ কেহ ইহাও বলেন, রূহকে মৃতদেহের মধ্যে প্রবেশ করান হইবে না বরং রূহকে মৃতদেহ ও কাফনের কাপড়ের মধ্যবর্তী স্থানে রাখা হইবে। অতঃপর মুনকির নকীর রূহকে প্রশ্ন করিবে। অতএব, সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস রাখিতে হইবে যে, প্রত্যেক মৃতদেহের প্রতি কবর আজাব অবশ্যই হইবে। ইহার অবিশ্বাসী প্রকৃত মো’মেনরূপে গণ্য হইতে পারিবে না।
ফিকাহ শাস্ত্রের পণ্ডিত আবুল লাইস (রহঃ) বলিয়াছেন-’যে ব্যক্তি কবরের ভীষণ আজাব হইতে রক্ষা পাইতে চাহে, তাহাকে সর্বদা চারিটি নেক কাজ করিতে হইবে এবং চারিটি গোনাহর কার্য হইতে বিরত থাকিতে হইবে। নেক কাজগুলি যথা-(১) যথারীতি নামাজ আদায় করা, যেন কোন সময়ই নামাজ তরক না হয়। (২) খালেছ নিয়তে দান-ছদকা করা। (৩) সর্বদা ‘সোবহানাল্লাহ’ বেশী পরিমাণে পড়া। (৪) সর্বদা কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করা। এই চারি প্রকার নেক কার্য করিতে থাকিলে আশা করা যায় তাহার কবরের আজাব হইবে না। শুধু তাই নহে, আল্লাহ পাক তাহার পবিত্র নূর দ্বারা উক্ত ব্যক্তির অন্ধকার কবরকে আলোকিত করিয়া দিবেন।
যে চারিটি গোনাহর কাজ হইতে বিরত থাকিতে হইবে, তাহা এই যে- (১) মিথ্যা বলা ও মিথ্যা প্রবঞ্চনা হইতে সম্পূর্নরূপে বিরত থাকা। (২) কাহারও গচ্ছিত মাল আত্মসাৎ না করা। (৩) দস্যুবৃত্তি না করা। (৪) পেশাব ও পায়খানার পর টিলা-কুলুক ব্যবহার করিয়া উত্তমরূপে পবিত্র হওয়া। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফরমাইয়াছেন-’তোমরা পেশাব হইতে পরিস্কার থাক, কেননা কবরের অধিকাংশ আজাব পেশাব হইতে পবিত্র না থাকার দরুন হইয়া থাকে।’ কবির ভাষায় শুনুন-
মোর্দাকে কবরে রেখে আত্মীয় স্বজন,
চল্লিশ কদম দূরে যায়গো যখন।
মুনকার নকীর দুই ফেরেশতা আল্লার,
তখনি হাজির হয় কবর মাঝার।
কবরে পুছিয়া তারা কাছেতে মুর্দার,
তিনটি ছোয়াল করে চাহেন উত্তর।
দাফনকারীগণ মৃতদেহ কবরে রাখিয়া কিছু দুর আসা মাত্র মুনকার ও নকীর নামক দুই ফেরেশতা অসামান্য শক্তি দেখাইয়া আভ্যন্তরীণ ভূ-ভাগ বিদীর্ণ করিতে করিতে কবরের মধ্যে প্রবেশ করিবে। তাহারা কবরে প্রবেশ করিয়াই মৃতদেহকে বসাইয়া তিনটি প্রশ্ন করিবে। প্রথমবারে জিজ্ঞাসা করিবে-’তোমার রব্ব (প্রতিপালক) কে?’ দ্বিতীয়বারে প্রশ্ন করিবে-’তোমার নবী কে? তুমি কোন নবীর উম্মত?’ তৃতীয়বারে প্রশ্ন করিবে-’তোমার ধর্ম কি? তুমি কোন ধর্মাবলম্বী ছিলে?’
যদি মৃতব্যক্তি নেককার হইয়া থাকে, তবে প্রশ্নের জবাব সঙ্গে সঙ্গে দিয়া ফেলিবে-’আমার প্রতিপালক আল্লাহ; যাঁহার কোন শরীক বা অংশীদার নাই।’ তৎপর বলিবে-’আমার নবী সায়্যেদুল মোরসালীন খা-ে তমুল আম্বিয়া হজরত মোহাম্মদ (ছঃ)। আমি তাঁহারই একান্ত বিশ্বাসী, উম্মত।’ তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে বলিবে-’আল্লাহর মনোনিত সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম, আমি সেই ধর্মে একান্ত বিশ্বাসী।’
মৃতদেহের রূহ যখন মুনকীর ও নকীরের প্রশ্নের জবাব সঠিকভাবে দিয়া দিবে, তখন আল্লাহ পাক অনতিদুর হইতে ফেরেশতাদ্বয়কে নির্দেশ দিবেন-’হে ফেরেশতাদ্বয়। উহাকে তোমাদের আর কিছু জিজ্ঞাসা করিতে হইবে না। আমি উহার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি। তোমরা উহাকে নুতন বরের ফুলশয্যা বিছাইয়া তাহার উপরে অতি সমাদর ও সম্মানের সহিত শোয়াইয়া রাখ আর উহার কবর হইতে বেহেশত পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ করিয়া দাও, যেন সে যথাস্থানে শুইয়া বেহেশতের সুগন্ধি অনুভব করিতে পারে। আল্লাহ পাকের এই আদেশ পাওয়া মাত্র ফেরেশতাদ্বয় তাহার কবর হইতে বেহেশত পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গ করিয়া দিবে। শেষ বিচারের আগে কেয়ামতের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত উক্ত ব্যক্তি যথাস্থানে শুইয়া বেহশেতের শান্তি পাইতে থাকিবে।
অতঃপর ফেরেশতাদ্বয় তাহার আত্মাকে লইয়া আসমানে চলিয়া যাইবে। এবং আল্লাহ পাকের পবিত্র আরশের নিম্নে ঝাড়বাতির ন্যায় একরূপ নূরের দ্বারা তৈরী বাতির মধ্যে রাখিয়া দিবে। উক্ত পবিত্র আত্মা বা রূহ কিয়ামত পর্যন্ত উক্ত নূরের বাতির মধ্যে অবস্থান করিতে থাকিবে।
হজরত আবু হোরাইরা (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন- রাসূলুল্লাহ (ছঃ) ফরমাইয়াছেন-(আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন) ‘ আমি যদি কোন বান্দাকে রহমত ও মাগফেরাত করিতে ইচ্ছা করি তবে তাহাকে শারীরিক পীড়া, দারিদ্র্যতা অথবা পারিবারিক বিষয়ে চিন্তাযুক্ত রাখি। উহাতে যদি তাহার গোনাহর ক্ষতিপূরণ না হয় তবে মৃত্যুকালে অতীব কষ্টে তাহার রূহ বাহির করিয়া থাকি, যেন গোনাহ হইতে সম্পূর্ণ পুত পবিত্র হইয়া আমার সাথে মুলাকাত করিতে পারে।
আর যদি আমি কোন বান্দাকে ক্ষমা করিতে ইচ্ছা না করি, তবে তাহাকে দুনিয়ার ভোগ-বিলাস ও আরাম আয়েশে মশগুল রাখি এবং তাহার সামান্য নেকের বিনিময় অজস্র টাকা-পয়সা, ধন-দৌলত দান করিয়া নশ্বর দুনিয়ার মোহে তাহাকে ঘুরাইয়া থাকি। যদি উহাতেও তাহার সামান্য নেকীর প্রতিদান না হয়, তবে মৃত্যুকালে তাহার রূহ অতি সহজে বাহির করিয়া দুনিয়াতেই তাহার সামান্য নেকের বদলা দিয়া আমার সমীপে নেকহীন জাহান্নামীরূপে হাজির করি।’
হাদীছ শরীফে আছে, ‘যদি কোন মো’মেন ব্যক্তির পদযুগলে কিম্বা অনত্র কোথাও একটি কাঁটাও বিদ্ধ হইয়া থাকে, তবে আল্লাহ পাক উক্ত মো’মেন ব্যক্তির এই সামান্য কষ্টের বিনিময়ে তাহার আমলনামা হইতে একটি গোনাহ মিটাইয়া তদস্থলে একটি নেকী লিখিয়া দিবেন। কাজেই কোন কোন বুযুর্গ আলেম বলেন-’যাহার শারীরিক কোন পীড়া বা অন্য কোন অশান্তি নাই, তাহার ভবিষ্যৎ তত ভাল হইতে পারে না।
এক।। মোমেনের অবস্থা : হাদীছ শরীফে আছে, যখন কোন মো’মেন ব্যক্তির মৃত্যু অতি সন্নিকট হয়, তখন একদল স্বর্গীয় ফেরেশতা আসমান হইতে সূর্যের ন্যায় আলোকদীপ্ত চেহারা লইয়া জমীনে অবতীর্ণ হন। এ ছাড়া তাঁহার বেহেশতে সুঘ্রাণযুক্ত কাফনের কাপড়ও নিয়া আসেন। উহারাই আজরাঈল এবং তাঁহার অনুচরবৃন্দ।
তৎপর মালাকুল মউত (আজরাঈল) মৃত্যুবরণকারীর মস্তকের কাছে উপস্থিত হইয়া বলেন- হে পবিত্র রূহ! তোমাকে খোশ-খবরী দিতেছি, চল, আল্লাহর অসীম রহমত ও দয়ার নিকটে, তিনি তোমাকে সাদরে গ্রহণ করিবেন। তোমার জন্য তিনি অপেক্ষা করিতেছেন।’ মালাকুল- মউতের এই কথা শুনামাত্র রূহ নীরবে নশ্বর দেহ হইতে বাহির হইয়া আসিবে। রূহ বাহির হওয়া মাত্র মালাকুল মউত উহাকে লইয়া উর্ধ্বাকাশে উঠিয়া যাইবেন। তিনি রূহ লইয়া প্রথম আসমান শেষ করিয়া দ্বিতীয় আসমানে উঠিতে না উঠিতেই তাহাদের আগমন অশেক্ষায় সপ্তম আসমানের দরজা খুলিয়া রাখা হইবে। বস্তুত, উক্ত মো’মেন ব্যক্তির নাম ইল্লিয়ীন নামক পবিত্র স্থানে ইতি পুর্বেই লেখা হইয়া থাকিবে। অতঃপর আজরাঈল তাহার রূহ লইয়া খোদার দরবারে হাজির হইবেন। আল্লাহ পাক তখনই আদেশ করিবেন-’হে আজরাঈল? মৃত ব্যক্তির রূহ মাটির নিম্নে রক্ষিত তাহার দেহের নিকট লইয়া যাও। কেননা আমি উহাদিগকে মাটি হইতে পয়দা করিয়াছি, আবার মাটি হইতে উঠাইয়া লইব।’ এ মর্মে আল্লাহ বলেন-
‘আমি তোমাদিগকে এই মাটি দ্বারাই পয়দা করিয়াছি, দ্বিতীয়বার এই মাটিতেই প্রত্যাবর্তন করাইব এবং সর্বশেষ এই মাটি হইতে পুনরুথান করিয়া হাশরের ময়দানে দণ্ডায়মান করিব।’
বান্দাহে, এই মাটির দ্বারা গড়ছি কায়া তোর,
এই মাটিতেই মরণ পরে হইবে তব গোর
এইনা মাটি হইতে পুনঃ করিয়া উত্থান,
হাজির আমি কবর তোমায় হাশর ময়দান।
আল্লাহ পাকের এই আদেশ প্রাপ্তি মাত্র আজারাঈল উক্ত ব্যক্তির রূহ লইয়া পুনঃ কবরে প্রত্যাবর্তন করিবেন। তৎপরে মুনকার ও নকীর নামে দুই ফেরেশতা আসিয়া তাহার রূহের নিকট প্রশ্ন করিতে আরম্ভ করিবে। রূহ যখন ফেরেশতাদ্বয়কে সরল-সঠিক জবাবে সন্তুষ্ট করিয়া দিবেন তখন আল্লাহ পাক অনতিদুর হইতে আওয়াজ দিয়া বলিবেন :
‘হে ফেরেশতাদ্বয়। আমার প্রিয় বান্দা ঠিকই বলিয়াছে, উহাকে আর কোন প্রশ্ন করিতে হইবে না। তোমরা বেহেশত হইতে বিছানা আনিয়া আমার বান্দার কবরে বিছাইয়া দাও, যেন তাহাকে কবরে থাকিয়া কোন প্রকার কষ্ট পোহাইতে না হয়। আর বেহেশত হইতে অতি উত্তম পরিধানীর বস্ত্র আনিয়া তাহাকে পরাইয়া দাও এবং তাহার কবর হইতে বেহেশত পর্যন্ত একটা দরজা খুলিয়া দাও যেন আমার বান্দা কবরে থাকিয়া বেহেশতের খোশবু প্রাপ্ত হইয়া বেহেশতী অনুপম সুখ অনুভব করিতে পারে।
ঈমানদারের কবর যেন টুকরা বেহেশতের,
আরাম ছাড়া সেথায় কোন লেশ নাহি দুঃখের।
খোদার নূরে সেই যে কবর হবে গো রৌশন,
জান্নাতেরি সঙ্গে তাহার হবে সুড়ঙ্গ তোরণ।
জান্নাতেরি ফরাশ বিছান দিবে সেথায় পাতি,
রইবে মুমিন সেই খানেতে মন হরষে মাতি।
আল্লাহ পাক ফেরেশতাগণকে আরও হুকুম করিবেন- হে ফেরেশতা- গণ! আমি আমার বান্দার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়াছি, কাজেই আমার বান্দার সীমার চতুর্দিক পর্যন্ত তাহার কবরকে প্রশস্ত করিয়া দাও যেন সে কবরে কোনরূপ কষ্ট অনুভব না করে।’
ফেরেশতাগণ উক্ত মো’মেন ব্যক্তির যাবতীয় সুখ-শান্তির জন্য এই সকল কাজ করিয়া শেষ করিলে ইত্যবসরে একজন অপূর্ব লাবণ্যময়ী চেহারার আকৃতি বিশিষ্ট শ্বেতবর্ণের সুগন্ধিযুক্ত পোষাক পরিধান করিয়া উক্ত মো’মেন ব্যক্তিকে সুসংবাদ প্রদান করিয়া তাহার নিকট উপস্থিত হইবে। মৃত মো’মেন ব্যক্তি এইরূপ অপূর্ব সন্দর চেহারাযুক্ত লোকটিকে দেখিয়া বলিবে-’আপনি কে? আপনার ন্যায় এইরূপ অপূর্ব সৌন্দর্যময় শ্রীমান জীবনে আর একজনও ত দেখি নাই। বলুন, আপনি কে?’ তদুত্তরে উক্ত ব্যক্তি বলিবে-’আমি আপনার নেক আমল।’
দুই।। কাফেরের অবস্থা : মৃত্যুবরণকারী কাফের বা পাপী হইলে তাহার মৃত্যুর পূর্বক্ষণে আসমান হইতে একদল ফেরেশতা আজাবজনিত বস্ত্রাদি লইয়া জমীনে অবতীর্ণ হইবে এবং উক্ত পাপী মৃত্যু বরণকারীকে উহা পরিধান করাইবে, ফলে মৃত্যুবরণকারীর মৃত্যু যন্ত্রণা ইহাতে অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাইবে। অতঃপর মালাকুল মউত উক্ত ব্যক্তির মস্তকের নিকট বসিয়া কলে ইক্ষু পিষিবার ন্যায় অসহনীয় কষ্ট সহকারে তাহার রূহ বাহির করিবে। রূহ বাহির করিবার সময় উক্ত ব্যক্তি এরূপ নির্মম আর্তনাদ আরম্ভ করিবে যে, তাহা মানব-দানব ব্যতীত অন্যান্য সকল সৃষ্টজীব শুনিতে পাইবে। এতদ্ব্যতীত তাহার রূহ বাহির করা হইলে আল্লাহ এবং তাঁহার যাবতীয় সৃষ্টজীব তাহার প্রতি লা’নত বা অভিসম্পাত বর্ষণ করিতে থাকিবে। এমন কি, ফেরেশতাগণ তাহার রূহ লইয়া আসমানে পৌঁছিবার পূর্বে আল্লাহ্ প্রত্যাদেশ করিবেন-
‘হে ফেরেশতাগণ। উক্ত পাপীর অপবিত্র রূহ লইয়া আসমানে আসিও না বরং উহাকে কবরে তাহার মৃতদেহের কাছে নিয়া রাখ।’
ফেরেশতাগণ তখন উক্ত ব্যক্তির রূহ কবরে তাহার মৃতদেহের নিকট পৌঁছাইয়া দিবে। অতঃপর মুনকার-নকীর দুই ফেরেশতা মেঘের ন্যায় তীব্র গর্জন সহকারে সূর্যের ন্যায় দীপ্ত চক্ষুদ্বয় রাঙ্গাইতে রাঙ্গাইতে ভয়াবহ আকৃতি ধারণ করিয়া উক্ত ব্যক্তির সম্মুখে হাজির হইবে। মুনকার নকীর দুই ফেরেশতা ঐ ভয়ঙ্কর আকৃতিতে উক্ত ব্যক্তিকে বসাইয়া দাঁত কাটিতে কাটিতে জিজ্ঞাসা করিবে-’তোমার রবব (প্রভু) কে? তদত্তরে উক্ত ব্যক্তি বলিবে-’আমি জানি না।’ এইরূপ উত্তরে ফেরেশতাদ্বয় রাগান্বিত হইয়া মস্ত বড় একটা গুরুজ দ্বারা তাহাকে এমন জোরে আঘাত করিবে যে, আঘাতে ফলে চূর্ণ হইয়া তাহার এক পাশের হাড় অন্য পাশে চলিয়া যাইবে।
ইহার পরে নাক ফ্যাটা, সরু গ্রীবা, হাড়ির ন্যায় বড় পেট ও কঞ্চির ন্যায় সরু হাঁটু বিশিষ্ট একজন কুশ্রী ব্যক্তি তাহার নিকট উপস্থিত হইয়া কাঁপিতে কাঁপিতে মুখ ভ্যাংচাইয়া বলিবে ‘আল্লাহ তোমার অমঙ্গল করুন’। তুমি আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করিতে অত্যন্ত অসল ও ভীরু ছিলে, কিন্তু গোনাহর কার্য করিতে ছিলে অত্যন্ত চালাক ও পটু। একটা করিতে গিয়া আরও একটা বেশি করিয়া ফেলিতে। দেখ, আজ হইতে তোমার কি দুরবস্থা ঘটে! পাপী মৃত্যুবরণকারী ইহা শুনামাত্র বলিবে-’ভাই, তুমি কে?’ জীবনে তোমার ন্যায় এমনতর কুশ্রী মানুষত আর একটিও দেখি নাই, একবার বল তুমি কে?’ তদুত্তরে উক্ত ব্যক্তি বলিবে-’হে পাপীষ্ঠ। শুনিয়া আর লাভ কি? আমি যে তোমার কৃত পাপ কার্য-বদ আমল’।
অতঃপর ফেরেশতাগণ আল্লাহ পাকের আদেশ মত উক্ত পাপী ব্যক্তির কবর হইতে দোজখের দ্বার পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ করিয়া দিবে। পাপী মৃত ব্যক্তি তাহার সংকীর্ণ অন্ধকারময় কবরে থাকিয়া দোজখ দর্শন করিতে থাকিবে এবং সেখানে থাকিয়া দোজখের আজাব কেয়ামত পর্যন্ত অনুভব করিতে থাকিবে।
হাদীছ শরীফে আছে-যদি কোন ব্যক্তি শুক্রবার কিংবা বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রে ইন্তিকাল করে তবে আল্লাহ পাক তাহাকে কবরের ফেনা আজাব হইতে রক্ষা করিবেন।
ইমাম বাহিলী (রাঃ) হইতে বর্ণিত আছে-যখন মৃত পাপী ব্যক্তিকে কবরে রাখিয়া লোকজন কিছু দূর অগ্রসর হইয়া পড়ে, তখন একজন আজাবের ফেরেশতা উক্ত ব্যক্তির মাথার দিক হইতে এমন জোরে গুরজ মারিবে যে, তাহাতে তাহার সমস্ত অন্ত-প্রত্যঙ্গ টুকরা টুকরা হইয়া খসিয়া পড়িবে। অতঃপর তাহার কবরের মধ্যে অগ্নি প্রজ্বলিত করিয়া বলিবে-হে অমুক! আল্লাহর আদেশে উঠিয়া বস।’ মৃত ব্যক্তি ভয়ে কম্পিত হইয়া উঠিয়া বসিবে ও ফেরেশতার অদ্ভুত আকৃতি এবং আজাবের প্রস্তুতি দেখিয়া উচ্চৈস্বরে চীৎকার করিতে থাকিবে। মৃত ব্যক্তির এইরূপ চীৎকার মানব- দানব ব্যতীত আর সমস্ত সৃষ্টজীব নিঃসন্দেহে শুনিতে পাইবে।
ফেরেশতার এইরূপ আজাব দেখিয়া উক্ত ব্যক্তি বলিবে-’হে ভাই ফেরেশতা! আপনি আমাকে কেন এইরূপ কষ্ট ও আজাব প্রদান করিতেছেন? আমি দুনিয়ায় থাকিয়া আল্লাহর আদেশানুযায়ী যথারীতি নামাজ আদায় করিয়াছি, যাকাত দিয়াছি ও রমজান মাসে ত্রিশটি রোজা রাখিয়াছি, কেন তবু আমার উপর এইরূপ নির্মম ব্যবহার করিতেছেন?’ ফেরেশতা তদুত্তরে বলিবে-’রে পাপীষ্ঠ। তোমার কি মনে নাই যে, একদা একজন মজলুম বা অত্যাচারিত অসহায় ব্যক্তি তোমার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিল, কিন্তু সাহায্যে শক্তি থাকা সত্তেও তুমি তাহাকে সাহায্য কর নাই। আর তুমি নামাজ পড়িতে সত্য কিন্তু অমুক নামাজ পড়িবার পূর্বে পেশাব হইতে উত্তমরূপে পরিষ্কার না হইয়াই নামাজ পড়িয়াছিলে। তাই অদ্য তোমার উপর এই শাস্তি হইতেছে।’
হাদীছ শরীফে আছে-যদি কোন ব্যক্তি কোন মজলুম অসহায়কে শক্তি থাকা সত্তেও সাহায্য না করে তবে কবরের মধ্যে তাহাকে অগ্নি নির্মিত কোড়া দ্বারা প্রহার করা হইবে।’ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর বর্ণনা করিয়াছেন-চারি শ্রেণীর লোককে আল্লাহ পাক তাঁহার অসীম রহমতের ছায়াতলে স্থান দিবেন এবং অতি সৌন্দর্যময় নূরের আসনে উপবেশন করাইবেন। ছাহাবাগণ হজরতের সমীপে আরজ করিলেন-’ইহা রাসূলাল্লাহ! উহারা কোন লোক?’ হজরত (ছঃ) উত্তর করিলেন-’যাহারা ক্ষুধার্তকে অন্নদান করিয়াছে, মোজাহিদগণে (ইসলাম প্রতিষ্ঠাকারী যোদ্ধাগণে ) সম্মানের চক্ষে দেখিয়াছে, অসহায় গরীব লোককে সাহায্য করিয়াছে ও যাহারা মজলুমদের সাহায্যার্থে প্রাণপণ চেষ্টা করিয়াছে, উহারাই এইরূপ সম্মানের অধিকারী হইবে।’
হজরত আনাস ইবনে মালিকের বর্ণিত হাদীছ মারফত জানা যায়, কোন পাপী মৃত ব্যক্তিকে তাহার আত্মীয়-স্বজন মাটি দিয়া কিছু দূর চলিয়া আসার সাথে সাথে আজাবের ফেরেশতা তাহাকে আজাব দিতে আরম্ভ করে। আর যদি তাহার আত্মীয়-স্বজনগণ বিলাপ করিয়া এইরূপ কাঁদাকাটি করে-’হায়! আমাদের সর্ব সম্মানিত শ্রেষ্ঠ লোক; হায়! আমাদের শরীফ ব্যক্তি’ তখন আজাবের ফেরেশতা তাহাকে কোড়ার দ্বারা দ্বিগুণ প্রহার করিতে থাকিবে এবং বলিবে— ‘হে পাপীষ্ঠ’ উহারা কি বলিতেছে? তুমি নাকি তাদের মধ্যে শরীফ (সম্মানিত) ব্যক্তি ছিলে?’ উত্তরে সে ব্যক্তি করজোড়ে মিনতি করিয়া বলিবে, ‘হে ভাই ফেরেশতা- আমি তাহাদের মধ্যে কখনই শরীফ ছিলাম না বরং উহারা আমাকে শরীফ বলিয়া ডাকিত।’ আজাবের ফেরেশতা অতঃপর অত্যধিক কঠিনভাবে আজাব দিতে আরম্ভ করিবে-আজাবের মাত্রা দ্বিগুণ-ত্রিগুণ বৃদ্ধি করিয়া দিবে এবং বলিতে থাকিবে, দেখ, আজাবের মজা কেমন নির্মম।’ ইহাতে সে পাপী ব্যক্তি উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিবে- ‘হায় আফসোস। কিভাবে হাড্ডি ভাঙ্গিয়া টুকরা টুকরা করিতেছে; হায় দুঃখ! ইহা কিরূপ দুঃখ-কষ্টের স্থান; হায় সর্বনাশ! কিভাবে কঠিন প্রশ্ন করিতেছে?
হাদীছ শরীফে আছে-যে ব্যক্তি রজব চান্দের প্রথম বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জাগ্রত থাকিয়া ইবাদত- বন্দেগী করিবে, আল্লাহ পাক এইরূপ ব্যক্তির পক্ষে ফেরেশতাগণকে আওয়াজ দিয়া বলিবেন- ‘হে ফেরেশতাগণ! তোমরা সাক্ষ্য থাক, আমি ঐ লোকের ছোট বড় সকল প্রকার গোনহ মাফ করিয়া দিলাম।’
মুনকার-নকীরের আগে একজন ফেরেশতার কবরে প্রবেশ
ছাহাবী আবদুল্লাহ ইবনে সালামকে একদা রাসূলে পাক (ছাঃ) সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলেন-’হে ইবনে সালাম! মুনকার-নকীরের পূর্বে ‘রুমাত’ নামে সূর্যের ন্যায় দীপ্ত আলোকময় চেহারা বিশিষ্ট একজন ফেরেশতা মুর্দারের নিকট কবরে প্রবেশ করিবে। উক্ত ফেরেশতা কবরে প্রবেশ করিবামাত্র শবদেহকে বসাইয়া বলিবে-’তোমার কৃত পাপ-পুণ্যের যাবতীয় কার্যাবলী লিপিবদ্ধ কর।’ মুর্দার তখন বলিবে- ‘আমার নিকট কাগজ-কলম-কালি বলিতে কিছুই নাই; কিরূপে লিখিব?’ ফেরেশতা বলিবে-’তোমার মুখের থু থু দ্বারা কালি, অঙ্গুলী দ্বারা কলম এবং কাফনের কাপড় দ্বারা কাগজ বানাইয়া তদ্বারা লিখ।
ফেরেশতার আদেশে উক্ত মৃত ব্যক্তি তাহার কৃত যাবতীয় আমল লিখিতে আরম্ভ করিবে। লিখিতে লিখিতে যখন তাহার পুণ্যের যাবতীয় কার্যাবলী লিখিয়া শেষ করিবে, তখন আর কিছু লিখতে অগ্রসর হইবে না। ফেরেশতা তখন বলিবে-’তোমার কৃত পাপ কার্যাবলীও লিপিবদ্ধ কর! ইহাতে উক্ত ব্যক্তি খুব লজ্জিত হইবে। ফেরেশতা পুনরায় বলিবে-’দুনিয়ায় থাকিয়া আল্লাহ পাকের সমীপে গোনাহের কাজ করিতে মোটেও লজ্জা পাও নাই, এখন লিখিতে লজ্জা কর কেন?’ ইহা বলিয়াই ফেরেশতা একটি প্রকাণ্ড গুরজু উঠাইয়া তাহার প্রতি আঘাত করিতে থাকিবে। বাধ্য হইয়া উক্ত মুর্দার তাহার কৃত যাবতীয় পাপ কার্যাদিও লিখিয়া দিবে।
অতঃপর সেই ফেরেশতা বলিবে ‘হে পাপীষ্ঠ। তোমার লিখিত লিপি- খানা উত্তমরূপে গুটাইয়া উহাতে তোমার নিজ নখের দ্বারা সীলমোহর কর।’ ফেরেশতার আদেশ মতে সে তাহাই করিবে। তৎপর ফেরেশতা সিলমোহরকৃত লিপিকার তাবিজখানা সেই লোকের গলায় লটকাইয়া চলিয়া যাইবে এবং শেষ বিচারের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত ঐরূপ অবস্থায় ঝুলানো থাকিবে। ইহার প্রমাণ কোরআন শরীফে আছে। আল্লাহ পাক বলেন : ‘সমস্ত মানুষের গলায় আমি তাহার কিসমৎ ঝুলাইয়া দিয়াছি।’ রুমাত ফেরেশতা মুর্দার লিখিত আমলনামা কবজ করিয়া তাহার গলায় ঝুলাইয়া যাওয়ার কিছু পরেই মুনকার-নকীর নামে দুই ফেরেশতা কবরে প্রবেশ করিবে।
আল্লাহ পাক কেয়ামতের দিবস এই শ্রেণীর লোককে বলিবে-’হে অমুখ! অদ্য তোমার আমলনামাখানা পড়িয়া শুনাও।’ অমনি বান্দা তাহার যাবতীয় নেক আমলসমূহ পড়িয়া শুনাইতে আরম্ভ করিবে। কিন্তু যখন সে তাহার বদ আমলের নিকট আসিবে, তখনই পড়া বন্ধ করিয়া চুপ করিবে। আল্লাহ বলিবেন-’হে অমুক। এখন পড়িতেছ না কেন!’ বান্দা উত্তর করিবে-’হে রাব্বুল আ’লামীন। অশ্লিল বাক্য আপনার সমীপে উচ্চারণ করিতে বড়ই লজ্জা হয়।’ আল্লাহ বলিবেন- হে পাপীষ্ঠ। দুনিয়ায় থাকিয়া আমার সমীপে ঐরূপ অশ্লিল কার্য করিতে লজ্জা ও ভয় পাও নাই, অদ্য লজ্জার কারণ কি?’ বান্দা তখন লজ্জায় জড়ষড় হইয়া পড়িবে, কিন্তু তাহাতে কোন ফল দাঁড়াইবে না। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা বলিবেন-
‘ওহে ফেরেশতারা! তোমরা উহাকে ধর এবং উহার গ্রীবায় বেড়ি পড়াইয়া দোজখে নিক্ষেপ কর।’
মুনকার-নকীরের কথা
রুমাত ফেরেশতা তাহার দায়িত্বে অর্পিত কাজ শেষ করিয়া মুর্দার নিকট হইতে চলিয়া যাইবার পর পরই কবরে মুনকার-নকীর নামক ফেরেশতার আগমন হইবে। এই সম্পর্কে হাদীছের তথ্যে জানা যায়, ‘মো’মেন মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখিয়া লোকজন চলিয়া যাওয়ার সাথে সাথে দুইজন ফেরেশতা অদ্ভুত আকার ধারণ করিয়া কবরের মধ্যে প্রবেশ করিবে। তাহাদের গর্জন মেঘের গর্জনের ন্যায় বিকট এবং চক্ষুদ্বয় দেখিতে নীল বর্ণ। উহাদিগকে বলা হয় মুনকার-নকীর ফেরেশতা ফেরেশতাদ্বয় ভয়াবহ আকৃতি ধারণ করিয়া ভীষণ গর্জন করিতে করিতে মৃতদেহের শিয়রের দ্বার দিয়া কবরে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিবে। নামাজ তখনই রুদ্ধদ্বারের ন্যায় প্রতিবন্ধকরূপে আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিবে-’হে ফেরেশতাদ্বয়। তোমরা কখনও এই পবিত্র মস্তকের দিক হইতে কবরে প্রবেশ করিয়া রূহকে প্রশ্ন করিতে পারিবে না। যেহেতু এই মো’মেন ব্যক্তি দুনিয়ায় থাকিয়া এইরূপ কঠিন প্রশ্নের ভয় ও ভয়ঙ্কর সময়ের যন্ত্রণা হইতে রক্ষা পাইবার জন্য কষ্টকে কষ্ট মনে না করিয়া দিবারাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনীত সেজদায় পড়িয়া থাকিত। কাজেই তোমরা এই দিক হইতে কখনই প্রবেশ করিতে পারিবে না।
ফেরেশতাদ্বয় উপায় না দেখিয়া দক্ষিণ হস্তের দিক হইতে কবরে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিবে। এইবারে মৃত ব্যক্তি জীবিতকালে যে সকল দান-ছদকা করিয়াছিল, সেই দান-ছদকা প্রহরীর ন্যায় দাঁড়াইয়া রুক্ষ্ম- কণ্ঠে বলিয়া উঠিবে-’হে ফেরেশতাদ্বয়! তোমাদের মতলব বুঝিতে পারিয়াছি, হুশিয়ার! এদিক হইতেও কবরে প্রবেশ করিতে পারিবে না। যেহেতু মো’মেন ব্যক্তি এইরূপ ভয়াবহ সঙ্কীর্ণ অন্ধকারময় কবরের আজাব হইতে মুক্তি পাইবার জন্য সর্বদা মুক্ত-হস্তে দান-ছদকা করিত! কাজেই উহাকে প্রশ্ন করিতে এই পথে কোনক্রমেই প্রবেশ করিতে দিব না। দরকার হয় অন্য উপায় তালাশ কর।’
তৎপর মুনকার-নকীর ফেরেশতাদ্বয় আবার মুর্দারের বাম হাতের দিক হইতে কবরে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিবে। রোজা তখন তাহাদের সম্মুখে প্রতিবন্ধকরূপে দণ্ডায়মান হইয়া বলিবে-’রে মুনকার-নকীর। এদিক হইতেও আসিতে পারিবে না। যেহেতু এই ব্যক্তি জীবিতকালে আল্লাহর এবং কবরের আজাবের ভয়ে অস্থির হইয়া কাঠফাঁটা রৌদ্রে সারাদিন রোজা রাখিয়া পানাহার করিতে না পারায় একেবারে জীর্ণ হইয়া গিয়াছিল, তাই অদ্য তোমাকে এই রাস্তা দিয়া কখনই কবরে প্রবেশ করিতে দেওয়া হইবে না।’
ফেরেশতাদ্বয় এইরূপে ডান ও বাম দিক হইতে বিমুখ হইয়া শেষ বারের মত মুর্দারের পদদ্বয়ের দিক হইতে তাহাকে প্রশ্ন করিবার উদ্দেশ্যে কবরে প্রবেশ করিতে চেষ্টা করিবে। এইবারও জুমুআর নামাজ তাহাদেরকে বাধা দিয়া বলিবে-’এই পথ দিয়াও তোমরা প্রশ্ন করিবার জন্য কবরে প্রবেশ করিতে পারিবে না। যেহেতু এই মো’মেন ব্যক্তি এইরূপ সংকীর্ণ অন্ধকারময় কবরের আজাবের ভয়ে এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করিবার উদ্দেশ্যে পদব্রজে জুমুআর নামাজ পড়িবার জন্য যাতায়াত করিত। কাজেই এই পথ দিয়াও কবরে প্রবেশ করিতে পারিবে না।’
সর্বশেষে মুনকার-নকীর ফেরেশতাদ্বয় বিফল হইয়া গোরবাসী মো’মেন ব্যক্তির নেক আমলসমূহ-নামাজ, দান-ছদকা, রোজা ও জুমাঅ ইত্যাদির কাছে করজোড়ে মিনতি করিয়া বলিবে- ‘হে শবদেহ রক্ষীগণ! আমরাও উহার প্রতি অত্যন্ত সদয় ও দয়াশীল। আমরা আল্লাহর আদেশে সরল ও সামান্য কয়েকটি প্রশ্ন করিয়া চলিয়া যাইব।’ ফেরেশতাদ্বয়ের এই প্রকার অনুরোধে জুমুআ শবদেহের পদদ্বয়ের দিক হইতে কবরে প্রবেশ করিবার জন্য স্থান ছাড়িয়া দিবে। তাহারা মো’মেন ব্যক্তির কবরে প্রবেশ করিবামাত্র মৃতদেহের রূহকে জিজ্ঞাসা করিবে-’আপনি জীবিতকালে আল্লাহ ও হজরত মোহাম্মদের (ছঃ) প্রতি কিরূপ মনোভাব রাখিতেন?’ তদুত্তরে মো’মেন শবদেহ রূহ বলিয়া উঠিবে—
‘আশহাদু আল্লা-ইলাহা ইল্লাল্লা-হু অআশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু অরাসূলহ’-
‘আমি সাক্ষ্য প্রদান করিতেছি যে, আল্লাহ ছাড়া দ্বিতীয় মা’বুদ কেহ নাই; আর নিঃসন্দেহে হজরত মোহাম্মদ মোস্তফা (ছঃ) আল্লাহর অনুগত বান্দা ও তাঁহার রাসূল।’
ফেরেশতাদ্বয় উক্ত ব্যক্তির এই প্রকার প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব পাইয়া তাহাকে সসম্মানে অতিশয় আদরের সহিত ফুল বিছানার শোয়াইয়া চলিয়া যাইবে।
তথ্য-কথা :
মুনকার-নকীরের প্রশ্নের রহস্য সম্পর্কে বিজ্ঞ আলেমগণ বলেন যে – আল্লাহ পাক আদমকে (আঃ) সৃষ্টির পূর্বে ফেরেশতাগণকে একত্রিত করিয়া আদম সৃষ্টির অভিপ্রায় জ্ঞাত করিয়াছিলেন। ফেরেশতাগণ আদম সৃষ্টির রহস্য অনুধাবন করিতে না পারিয়া আল্লাহর দরগাহে আরজ করিয়াছিল-’হে মা’বুদ! কেন আবার এইরূপ রক্ত-মাংস বিশিষ্ট আহার গ্রহণকারী জীব সৃষ্টি করিতে চাহেন? আমরাই তো সর্বদা আপনার গুণকীর্তন, তাসবীহ-তাহলীলে মশগুল থাকি।’ আল্লাহ পাক ফেরেশতা- গণকে বুঝাইয়া বলিলেন—
‘আমি আদম সৃষ্টির রহস্য যাহা জানি, তাহা তোমরা জান না।’— তোমাদের তা জানারও কথা নয়।
আল্লাহ পাক আদম সন্তানের মরণের পর মুনকার-নকীর নামে দুইজন ফেরেশতাকে তাহাদের কলেমা এবং ঈমানের আদর্শসমূহ শ্রবণ করতঃ অন্যান্য ফেরেশতাগণের নিকট সাক্ষ্য প্রদান করিবার নিমিত্ত কবরে প্রেরণ করিয়া থাকেন। আল্লাহ পাকের দুইজন ফেরেশতাকে একত্রে কবরে প্রেরণের কারণ হিসাবে ধরা যাইতে পারে যে, ইসলামী বিধানানুযায়ী দুইজনের সাক্ষ্য ব্যতীত সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হয় না। মোটকথা, ফেরেশতাদ্বয় মৃত মো’মেন ব্যক্তির প্রশ্নের সঠিক জবাব পাইয়া সন্তুষ্ট চিত্তে আসিয়া তাহার ঈমানের দৃঢ়তা এবং আল্লাহ ও রাসূলের নির্দেশিত পথে অটল বিশ্বাসী বলিয়া আল্লাহ পাকের নিকট সাক্ষ্য প্রদান করিবেন।
ইহাতে আল্লাহ পাক আদম সৃষ্টির গৌরব বর্ধনকল্পে ফেরেশতাগণকে সাদরে ডাকিয়া বলিলেন—
‘হে ফেরেশতাগণ! আমি আমার প্রিয় বান্দাকে মৃত্যু সুরা পান করাইয়া তাহার সমস্ত ধন-সম্পত্তি অন্যের মধ্যে বিতরণ করিয়াছি, তাহার স্ত্রীকে বিধ্বা করিয়াছি, শিশু-সন্তানকে ইয়াতীম করিয়াছি এবং তাহার দাস- দাসীকে হস্তান্তর করিয়াছি। এমন কি, কবরের সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানেও অত্যধিক যাতনা ও ক্লেশে রাখিয়াছি; তাহা সত্তেও আমার বান্দা আমাকে ভুলে নাই। শুধু কি তাই। মুনকার-নকীরের কঠিন প্রশ্নের কালেও আমার প্রিয় বান্দা, করুণ কণ্ঠে আমারই নাম স্মরণ করিয়াছে এবং আমার একত্ববাদ কলেমা তাহাদিগকে শুনাইয়া দিয়াছে। তাই বলি, হে ফেরেশতাগণ। এখন চিন্তা কর, কেন আদমকে সৃষ্টি করিয়াছিলাম এবং কেনই বা বলিয়াছিলাম-’আমি যাহা জানি, তোমরা তাহা জান না।’
ফেরেশতাগণ তখন লজ্জায় সংকীর্ণ হইয়া যাইবে-অবনত মস্তকে দাঁড়াইয়া থাকিবে এবং তাহাদের ভ্রান্ত উক্তির স্মরণ করিবে।
কিরামন—কাতিবীনের কথা
হাদীছ শরীফে আছে-মানুষের সাথে সর্বদা দুইজন ফেরেশতা বিদ্যমান আছে। তাহাদের মধ্যে একজন মানুষের ডান পার্শ্বে অবস্থান করিয়া মানুে ষর কৃত যাবতীয় নেক কার্যাদি সাক্ষ্যহীন লিপিবদ্ধ করিতে থাকে। আর অন্য একজন বাম পার্শ্বে অবস্থান করিয়া ডান পার্শ্বের ফেরেশতাকে সাক্ষী রাখিয়া বান্দার কৃত যাবতীয় পাপ কার্যাদি লিপিবদ্ধ করিয়া থাকে। এই দুই ফেরেশতাকেই বলা হয় কিরামান কাতিবীন।
কেরামন, কাতেবীন ফেরেশতা দু’জন,
মানুষের সঙ্গে রহে সদা সর্বক্ষণ।
পাপ-পূর্ণ ভাল-মন্দ যা করে বান্দায়,
সবি লিখে রাখে তারা আমলনামায়।
যখন মানুষ অনড় উপবেষ্ট অবস্থায় বিদ্যমান থাকে, তখন কিরামন কাতেবীন ফেরেশতাদ্বয় মানুষের ডান ও বাম পার্শ্বে অবস্থান করে; আর যখন যাতায়াত ও চলাফেরা করিতে থাকে, তখন ফেরেশতাদ্বয় সামনে ও পিছনে অবস্থান করিয়া থাকে। আর যখন মানুষ নিদ্রিত অবস্থায় থাকে, তখন তাহাদের একজন নিদ্রিত ব্যক্তির মস্তকের নিকটে, অপরজন পায়ের নিকটে অবস্থান করিয়া তাহাকে রক্ষাণাবেক্ষণ করিয়া থাকে।
অন্য এক হাদীছে আছে-দিবা-রাত্রি ২৪ ঘন্টা মানুষের দেহরক্ষী পাঁচজন ফেরেশতা মওজুদ আছে, তন্মধ্যে দুইজন দিবাভাগে, রাত্রে দুই জন এবং একজন দিবারাত্র সকল সময় অবস্থান করিয়া থাকে। এই মর্মে আল্লাহ পাক বলেন-
‘মানুষের সম্মুখে এবং পশ্চাতে আল্লাহ পাকের কতক ফেরেশতা আছে, উহারা মানুষকে তাহাদের ধ্বংসকারী শত্রু-জিন-শয়তান ও মানুষ হইতে আল্লাহর হুকুমে রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া থাকে।
আল্লাহর রাসূল বলেন-মানুষের ডান পার্শ্বে যে ফেরেশতা অবস্থান করিয়া থাকে, মানুষ যখন কোন নেক কার্য করিতে দৃঢ় সংকল্প করে, তখনই উক্ত ফেরেশতা একটি নেক কার্যের পরিবর্তে এক বা একাধিক ছওয়াব তাহার আমল নামায় লিপিবদ্ধ করিয়া থাকে। আর যখন মানুষ গোনাহর কার্য করিয়া, বসে, তখন বাম পার্শ্বের ফেরেশতা তাহার আমলনামায় উক্ত গোনাহর কার্য লিখিবার জন্য উদ্যত হয়। এতদ্দর্শনে ডান পার্শ্বের ফেরেশতা বাধা দিয়া বলে-একটু অপেক্ষা করুন, দেখুন উক্ত ব্যক্তির স্বীয় পাপমোচন কল্পে তওবা করে কি না। বাম পার্শ্বের ফেরেশতা উক্ত ব্যক্তির তওবার প্রতিক্ষায় ৭ ঘন্টা অপেক্ষা করিতে থাকে। বান্দা এই সময়ের মধ্যে পাপমোচন কল্পে তওবা করিলে তাহার আমলনামায় আর গোনাহ লিখে না। অন্যথায় একটি গোনাহের পরিবর্তে মাত্র একটি গোনাহ তাহার আমলনামায় লিপিবদ্ধ করিয়া থাকে।
মানুষ যখন তাহার আয়ুর শেষ প্রান্তে উপনীত হইয়া মৃত্যু মুখে পতিত হয় এবং লোক জন মৃতদেহ কবরে রাখিয়া চলিয়া আসে, তখন উক্ত কিরামান কাতিবীন নামক ফেরেশতাদ্বয় আল্লাহ পাকের সমীপে করজোর মিনতি করিয়া বলে-’হে রাববুল আ’লামীন! আপনি আমাদিগকে উক্ত ব্যক্তির পাপ পুণ্যের আমল লিখিবার জন্য নিযুক্ত রাখিয়াছিলেন, অদ্য তাঁহার মৃত্যু হইয়াছে; কাজেই আমরা তাহার নিকট থাকিয়া আর কি করিব? আজ হইতে তাহার আমল লেখার কার্য শেষ হইয়াছে এখন আমাদিগকে আসমানে উঠিতে আদেশ করুন।’
এদতশ্রবণে আল্লাহ পাক উত্তর করিবেন-’না, এখনও তোমাদের কার্য শেষ হয় নাই। আসমানে আসিয়া কি করিবে? তোমাদের থাকার মত স্থান আসমানে নাই, আসমান ফেরেশতায় একেবারে পরিপূর্ণ, তাহারা সর্বদা আমার জিকের-আজকার, তাসবীহ-তাহলীলে মশগুল আছে। তোমরা বরং আমার প্রিয় বান্দার নিকট অবস্থান কর, যতদিন না আমার বান্দাকে রোজ হাশরে হিসাব-নিকাশের জন্য উঠাই। তথায় তোমরা অবস্থান করিয়া তাহাদের মাগফেরাতের জন্য আমার নিকট সবর্দা তাসবীহ তাহলীল ইত্যাদি পড়িতে থাক এবং আমার বান্দার জন্য মাগফেরাত কামনা করিতে থাক।’
কিরামান কাতিবীন আল্লাহর এই নিৰ্দেশ প্রাপ্ত হইয়া কিয়ামত পর্যন্ত সর্বদা উক্ত ব্যক্তির জন্য দোয়া মাগফেরাত করিতে থাকে।
কিরামান-কাতিবীন ফেরেশতাদ্বয়কে এজন্য কিরামান-কতিবীন বলা হয়, বান্দা যখন নেকীর কার্য করে তখন উক্ত ফেরেশতাদ্বয় আল্লাহর দরবারে বান্দার নেক কার্যের খোশখবরী বহন করিয়া সানন্দে উপস্থিত হয় এবং বান্দার নেক কার্যের স্বপক্ষে সাক্ষ্য প্রদান করে। আর যখর বান্দা ভুলক্রমে গোনাহর কার্য করিয়া বসে, তখন তাহারা অতিশয় দুঃখিত ও অনুতপ্ত ভাবে আল্লাহর দরবারে মুখ মলিন করিয়া হাজির হয়। আল্লাহ ফেরেশতাদ্বয়কে জিজ্ঞাসা করেন, ‘হে কিরামন কাতিবীন’ তোমাদের এইরূপ মলিন মুখ কেন? আমার বান্দা কি কোন গোনাহের কার্য করিয়াছে? তখন তাহারা কোন প্রকার উত্তর না করিয়া ইলাহির দরবারে অধঃমুখে দাঁড়াইয়া থাকে।
এই প্রকারে আল্লাহ পাক তাহাদিগকে একবার দুইবার জিজ্ঞাসা করেন, কিন্তু তাহারা কোন প্রকার উত্তর না করিয়া মলিনমুখে কাঠের পুতুলের ন্যায় দাঁড়াইয়া থাকে। আল্লাহ পাক যখন তৃতীয়বার জিজ্ঞাসা করেন-’হে ফেরেশতাদ্বয়! তোমাদের কি হইয়াছে? কেন এইরূপ মলিন মুখে চুপ-চাপ দাঁড়াইয়া রহিয়াছ?’ তখন ফেরেশতাদ্বয় করুণ কণ্ঠে উত্তর করে-’হে খোদা! আপনার এক নাম সাত্তার বা অন্যায় গোপনকারী, আপনি আপনার বান্দাদিগকে নির্দেশ করিয়াছেন একের অন্যায় ও অপরাধ অন্যের নিকট গোপন করিতে, তাই আমারও আজ উক্ত বান্দার অন্যায় প্রকাশ করিতে শরম বোধ করিতেছি।’
‘এতদ্ব্যতীত উহারা প্রত্যহ তোমার বাণী কোরআন মজিদ পাঠ করিয়া আমাদের প্রশংসা করিতেছে এবং আমাদের কিরামন কাতিবীন বলিয়া সম্বোধন করিতেছে; তাই আমরা কামনা করি, আপনার বান্দার গোনাহ কার্যসমুহ গোপন করিয়া রাখুন। যেহেতু আপনিই একমাত্র বর্তমান ও ভবিষ্যতের সর্বময় শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী। আপনি নিজেই বলিয়াছেন-
‘অইন্না আলাইকুম লাহা-ফিজীনা কিরামান কিরামান কাতেবীন’-আমি কিরামন কাতেবীন দুই ফেরেশতা তোমাদের হিফাজতের জন্য নির্দিষ্ট রাখিয়াছি।’
মানুষের দুঃখ দুদর্শা আছে যতেক মুছীবত,
কেরামান কাতেবীন ফেরেশতা করে হেফাজত।
রূহের নিজ বাড়ি ও কবরে প্রত্যাবর্তন
হাদীছ শরীফে অ্যাছে মানুষের মরণের তিন দিন পরে তাহার রূহ আল্লাহর সমীপে আরজ করে-’হে খোদা! আমার মৃতদেহকে পর্যবেক্ষণ করিতে ইজাজত দিন!’ দয়াময় খোদা তাহাকে তাহার মৃতদেহ দৰ্শন করিবার জন্য ইজাজত করিবেন। আত্মা এইরূপ ইজাজত পাইয়া কবর মৃতদেহের নিকট প্রবেশ করিয়া দেখিবে : তাহার নাকের ছিদ্র ও মুখ হইতে রক্ত-মাংস পঁচা পানি প্রবাহিত হইয়া মাটিতে গড়াইয়া পড়িতেছে। ইহাতে রূহ উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিবে :
হে আমার বাসস্থান শরীর! হে আমার প্রিয় বন্ধু শরীর! এইরূপ ভয়ংকর অন্ধকারময় মছীবতের ঘরে থাকিয়া, চিন্তা দুঃখের ঘরে বসবাস করিয়া, এইরূপ লজ্জাকর তাকলীফের ঘরে আবদ্ধ থাকিয়া; তোমার কি সেই দুনিয়ার সুখ-শান্তি, ভোগ-বিলাস ও আরাম আয়েশের কালযাপনের কথা মনে পড়ে না? হায়! কেন আজ তোমার এ দুর্দশা?’ আত্মা এইভাবে কয়েকবার বিলাপ করিয়া নিজ স্থানে চলিয়া যাইবে।
আবার আত্মা মৃত্যুর পঞ্চম দিবসে আল্লাহ নিকট হইতে আদেশ লইয়া কবর হইতে অনতিদুরে দাঁড়াইয়া মৃতদেহের অবস্থা দেখিবে : তাহার নাকের ছিদ্র, মুখ কানের রাস্তা হইতে রক্ত-মাংস পঁচিয়া গলিয়া মাটিতে গড়াইয়া পড়িতেছে এবং মৃতদেহের শরীর এখন আর পূর্বের শরীর নাই- শরীর ফাটিয়া গিয়াছে। রূহ দূর হইতে এই দুরবস্থা দেখিয়া উচ্চৈঃস্বরে কাঁদিতে কাঁদিতে বলিবে-
‘হে আমার বাসস্থান শরীর। এই দুঃখ-কষ্ট, চিন্তা-তাকলীফ ও সংকীর্ণ অন্ধকারময় স্থানে থাকিয়া, দংশনকারী পোকা ও বিচ্ছুর ঘরে থাকিয়া তোমার কি দুনিয়ার সেই আরাম-আয়েশ ও সুখভোগের কথা মনে পড়ে না? আজ যে তোমার সেই সুন্দর কান্তিময় শরীর কীট- পতংগের আহার্য দ্রব্যরূপে পরিণত হইয়াছে? আজ তোমার দেহের সুন্দর লাবণ্যময় চামড়া ফাটিয়া রক্ত-পূজ গড়াইয়া মাটিতে পড়িতেছে। আজ যে তোমার সেই সুন্দর সুন্দর অঙ্গসমূহ মাটিতে পড়িতেছে।’ অতঃপর রূহ মাথায় করাঘাত করিয়া বলিবে, ‘হায়রে আমার সোনার শরীর। হায়! হায়! আমার সুন্দর দিব্বির কান্তিময় শরীর’-এই বলিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে রূহ নিজ বাসস্থানে প্রস্থান করিবে।
আবার রূহ সপ্তম দিবসে আল্লাহর নিকট ইজাজত চাহিয়া মৃতদেহকে দর্শন করিতে আসিবে। অদ্য রূহ কবরের নিকট আর আসিবে না, বহু দুর হইতে দেখিবে যে, মৃতদেহে পোকা পড়িয়াছে এবং দেহ পোকায় খাইয়া প্রায় শেষ করিয়াছে। উহা দেখিয়া রূহ ফোঁপাইয়া ফোঁপাইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে বলিবে-
‘হে আমার প্রিয় শরীর। তোমার কি দুনিয়ায় সেই সুখ ভোগের কথা মনে পড়ে না? তোমার সেই আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব, স্ত্রী-পুত্র ইত্যাদিগণের কথা কি মনে পড়ে না? তোমার কি সেই বিশাল ধন- সম্পত্তি, টাকা-পয়সা, মাল-দৌলত ইত্যাদির কথা মনে পড়ে না? কোথায় গেল তোমার সেই ভাই-বন্ধু, কোথায় গেল তোমার সেই আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধব, কোথায় গেল তোমার পাড়া-প্রতিবেশী, কোথায় গেল তোমার সাধের সেই ধন-দৌলত, সকলই যে তুমি হারাইয়াছ, এখন তোমার কি দুরবস্থা? কে তোমার এই দুঃখ মোচনের জন্য আত্মোৎসর্গ হইবে? সবই যে কালে ধ্বংস করিয়া ফেলিয়াছে।’ রূহ এইরূপ বিলাপ করিতে করিতে চিরদিনের মত চলিয়া যাইবে-কেয়ামত পর্যন্ত আর আসিবে না।
ছাহাবী আবু হুরাইরা ফরমান-যখন কোন মো’মেন ব্যক্তি পরলোক গমন করে, তখন তাহার রূহ একমাস যাবৎ তাহার ঘরের চতুপাশ্বে ঘুরাফিরা করে এবং দেখিয়া বেড়ায় যে, মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত মাল- দৌলত তাহার উত্তরাধিকারীগণ কিরূপ বন্টন করিয়া নেয় আর দেখিয়া বেড়ায় যে, তাহার কর্জাদি কিরূপে পরিশোধ করে।
এই প্রকার আত্মা প্রায় একমাস পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির ঘরের চতুষ্পার্শ্বে ঘুরাফিরা করিয়া অবশেষে রূহ আবার মৃত ব্যক্তির কবরের চতুষ্পার্শ্বে ঘুরাফিরা করিয়া দেখিতে থাকে যে মৃত ব্যক্তির আত্মীয়-স্বজন, ভাই- বন্ধুরা কে তাহার মাগফেরাতের জন্য আল্লাহর নিকট দোয়া করে এবং কে তাহার বিয়োগে ভগ্ন হৃদয়ে তাহার মঙ্গল কামনা করে।
রূহ এ প্রকার এক বছর মৃতদেহের পর্যবেক্ষণ শেষ করিলে ফেরেশতারা উহাকে সমস্ত রূহ রাখিবার স্থানে লইয়া যাইবে। শেষ বিচারের পূর্বে সিংগার ফুৎকারের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করিতে থাকিবে।
আত্মা বা রূহের অবস্থান
মৃত্যুর পরে আল্লাহ পাক মানবাত্মা কোথায় রাখিবেন, সে সম্পর্কে বিজ্ঞ আলেমগণ বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করিয়াছেন। কেহ কেহ বলেন : প্রাণীমাত্র মানব-দানব, পশুপক্ষী (যাবতীয় জীবের) আত্মাই ইস্রাফীলের (আঃ) সিংগার মধ্যে থাকিবে। আল্লাহতা’আলা এই বিশ্বজগতে যত প্রাণী পয়দা করিয়াছেন বা করিবেন, উহাদের প্রত্যেকটির রূহের সংখ্যায় সিংগার মধ্যে এক একটি ছিদ্র তৈয়ার করিয়া রাখিয়াছেন; কাজেই এক সম্প্রদায়ের আলেমগণ বলেন যে, মৃত্যুর পরে পাপী-তাপী সকলের আত্মাই সিংগার নির্দিষ্ট ছিদ্রের মধ্যে রাখা হইবে।
আর একদল আলেম বলেন : ‘যদি মৃত ব্যক্তি মো’মেন মুসলমান হইয়া থাকে, তবে তাহার রূহ আল্লাহ পাক সবুজ পাখীর আকৃতি রূপ পয়দা করিয়া ফেরেশতাগণকে বেহেশতের ইল্লিয়ীন নামক শান্তিময় পবিত্র স্থানে রাখিতে আদেশ করিবেন। সেখানে থাকিয়া সবুজ পাখীরূপ আত্মা এদিক ওদিক মহানন্দে উড়িয়া বেড়াইতে থাকিবে।’
আর মৃত ব্যক্তি যদি কাফের (বেদীন) হইয়া থাকে, তবে তাহার রূহ দোজখের মধ্যে সিজ্জীন নামক যন্ত্রণাদায়ক অপবিত্র স্থানে রাখিতে আদেশ করিবেন। রূহ সেখানে থাকিয়া দোজখের ভীষণ আজাব ও যন্ত্রণা ভোগ করিতে থাকিবে।’
কথিত আছে, মোমে’ন ব্যক্তির রূহ যখন কবজ করা হয়, তখন রহমতের ফেরেশতাগণ আত্মা লইয়া অতি সম্মানের সহিত মিছিল সহসারে আসমানে গমন করে। এমন সময় আল্লাহতা’আলা অনতিদূর হইতে ফেরেশতাগণকে নির্দেশ করিবেন : ‘হে ফেরেশতাগণ। উহার আত্মা বেহেশতের ইল্লিয়ীন নামক শান্তিময় স্থানে নিয়া যাও এবং তথা হইতে পুনঃ আমার প্রিয় বান্দার শবদেহের নিকট কবরের মধ্যে নিয়া রাখ। আর আমার বান্দার কবর হইতে বেহেশত পর্যন্ত একটি সুরঙ্গ পথ খুলিয়া দাও যেন আমার বান্দা সেখানে থাকিয়া বেহেশতের শান্তি উপভোগ করিতে পারে।’
আর যদি কোন কাফের বা বেদীনের মৃত্যু হয়, তবে আজাবের ফেরেশতাগণ তাহার আত্মা লইয়া আসমানে উঠিতে চেষ্টা করিবে। কিন্তু কিছু দূর যাইতেই দেখিতে পাইবে আসমানে সমস্ত দ্বার রুদ্ধ! অপর দিকে অনতিদূর হইতে আল্লাহ পাক প্রত্যাদেশ করিবেন- হে ফেরেশতাগণ! উহার অপবিত্র আত্মার স্থান এখানে নাই, ইহা অতি পবিত্র স্থান; যাও উহার আত্মা কবরের মধ্যে শবদেহের নিকট নিয়া রাখ। ফেরেশতাগণ তাহাই করিবে। অতঃপর তাহারা আল্লাহ পাকের নির্দেশ মত উক্ত কাফের বা বেদীন ব্যক্তির কবর অতিশয় সংকীর্ণ করিয়া দিবেন এবং উহার কবর হইতে দোজখ পর্যন্ত একটা সুড়ঙ্গ পথ খুলিয়া দিবেন যেন কবরে থাকিয়া সে দোজখের ভীষণ আজাব ও যন্ত্রণা অনুভব করিতে থাকে।
ইহাতে বুঝা যায় যে, মানুষের মৃত্যুর পরে আত্মা কবরেই রাখা হইবে। এই মর্মে হাদীছ শরীফে আছে-মৃত ব্যক্তিরা কবরে থাকিয়া জুতার ধীর-পদক্ষেপের শব্দও শুনিয়া থাকে।’ বহু বিজ্ঞ আলেম বলেন যে, যে সকল লোক ধর্মীয় যুদ্ধে শহীদ (প্রাণত্যাগ করিয়াছেন) হইয়াছেন আল্লাহ পাক তাহাদের আত্মা ফেরদাউস নামক সর্বোচ্চ বেহেশতে সবুজ বর্ণের পাখীর ন্যায় আকার বিশিষ্ট করিয়া রাখেন। সেই সকল পাখী বেহেশতে যথা ইচ্ছা উড়িয়া বেড়ায় এবং বেহেশতের নানারূপ ফল-মূল আহার করিয়া থাকে। আর যখন বিশ্রাম নিতে ইচ্ছা করে, তখন আরশের নিম্নে ঝুলানো ‘বাসীরুল ইয়াত’ নামক কিনদীল বা ঝাড়বাতির মধ্যে বিশ্রাম নিয়া থাকে।
খোদার রাহে শহীদ যারা উচ্চ তাদের শান,
মহান খোদা করেন তাদের বিশেষ জীবন দান।
আত্মা তাদের বানাইয়া সবুজ বরণ পাখী,
জান্নাতুল ফিরদৌস মাঝে দেন যতনে রাখি।
সেথায় থাকি খায় তাহারা জান্নাতী ফল মূল,
উড়ে বেড়ায়, রয় হামেশা আনন্দে মশগুল।
নাবালেগ বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক মানুষ নিষ্পাপ। এই কারণে তাহাদের উপর ধর্মীয় বিধান তখনো আরোপিত হয় না। এই শ্রেণীর শিশু বা কিশোর মারা গেলে তাহাদের আত্মা কোথায় রাখা হইবে, এ নিয়া আলেমদের মধ্যে বিতর্ক রহিয়াছে! অনেকের মতেই মুসলমানের নাবালেগ সন্তানের রূহ বা আত্মা কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত চড়ুই পাখীর রূপ ধারণ করিয়া বেহেশের এদিক সেদিকে উড়িয়া বেড়াইবে।
পক্ষান্তের কাফেরদের শিশু সন্তান মারা গেলে উহাদের আত্মা বেহেশতের চতুস্পার্শ্বের ঘুরিতে থাকিবে। বেহেশতে তাহাদের কোন স্থান হইবে না। শেষ বিচারের পরে আল্লাহ পাক তাহাদিগকে বেহেশতীদের খাদেম (চাকর) সাজাইয়া বেহেশতে প্রবেশ করাইবেন।
আর যে সকল মোমেন মুসলমান ঋণী হইয়া কিংবা অপরের ন্যায়সঙ্গত দাবী পরিশোধ না করিয়া মৃত্যুমুখে পতিত হইয়াছে, তাহাদের আত্মা জমীন ও আসমানের মধ্যভাগে শূন্যে ঝুলিয়া থাকিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত কেহ মৃত ব্যক্তির পক্ষ হইতে তাহার ঋণ বা অপরের ন্যায়সঙ্গত দাবী পরিশোধ না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত ফেরেশতাগণ তাহাদের আত্মা লইয়া জমীনেও থাকে না এবং আসমানেও যাইতে পারে না বরং জমীন ও আসমানের মধ্য ভাগে অবস্থান করিতে থাকে।
আর ফাসেক মুসলমানের (গোনাগার) মৃত্যু হইলে তাহার আত্মা কবরে থাকিয়া দোজখের আজাব ভোগ করিতে থাকে। কাফের (বেদীন) ও মোনাফেকদের মৃত্যু হইলে তাহাদের আত্মা দোজখের সিজ্জীন নামক কষ্টপূর্ণ স্থানে রাখা হয়। সেখানে থাকিয়া আত্মা কেয়ামত পর্যন্ত দোজখের আজাব ভোগ করিয়া থাকে।
