পরিশিষ্টাংশ – গোনাহের কার্যাবলী
আল্লাহ পাক তাঁহার সৃষ্ট জীবের মধ্যে মানব জাতিকেই সর্বশ্রেষ্ঠ জাতিরূপে নশ্বর ধরাধামে প্রেরণ করিয়াছেন। তন্মধ্যে আমাদিগকে (উম্মতে মোহাম্মাদিয়া) সকল উম্মত হইতে সর্বশ্রেষ্ঠ, সর্ব সম্মানিত করিয়াছেন। আমাদের হেদায়েত ও পথ-প্রদর্শন কল্পে শেষ নবী হজরত মোহাম্মদ মোস্তফাকে (ছাঃ) আল্লাহর বানী কোরআনসহ প্রেরণ করিয়াছেন। তিনি আমাদিগকে কোরআনের বাণী হইতে ভাল কার্যের নির্দেশ এবং গোনাহের কার্যের নিষেধ করিয়াছেন। তাই আমরা যেন তাঁর আদেশ পালানও নিষিদ্ধ কাজ হইতে বিরত থাকিয়া কেয়ামতের দিবস ইলাহীর আদালতে সসম্মানে দণ্ডায়মান হইতে পারি, এই আমাদের কামনা।
পুস্তকের কলেবর বৃদ্ধি পাইবে বলিয়া নেক কার্য সমূহের আলোচনা এখানে হইল না। অতএব, সাধারণতঃ আমরা যে সকল গোনাহে লিপ্ত হইয়া পড়ি, তাহারই যৎকিঞ্চিত আলোচনা এখানে করা হইল। মো’মেন মোসলমান ভাই-বোনেরা যেন এইরূপ গোনাহর কার্য হইতে বিরত থাকিয়া তাহাদের ভবিষৎ জীবন উজ্জল ও শান্তিময় এবং জয়যুক্ত করিতে পারেন। বিশেষ করিয়া আমাদের এই বিরাট উপ-মহাদেশে বিশেষ একটি সমস্যার উদ্ভব হইয়া পড়িয়াছে যে, আমাদের পূর্ব-পুরুষগণ যাহা করিয়া গিয়াছেন, তাহা আমাদেরও একান্ত পালন করিতেই হইবে, ইহারাই যেন আমাদের ভবিষ্যাৎ উজ্জল তারকা। প্রকৃত পক্ষে ইসলাম তাহা সমর্থন করে না বরং উহা পালনে আমাদের ভবিষৎ অন্ধকার ও আজাবের আশংকাও রহিয়াছে। কিয়ামতের দিবস স্বীয় কৃত কার্যের জবাবদিহি নিজেরই করিতে হইবে, তখন আর পূর্বপুরুষগণ জবাব দিতে আসিবে না। যার যার পাপের বোঝা তাহাকেই বহন করিতে হইবে।
.
যেসব কারণে দোজখী হওয়ার সম্ভাবনা
দোজখ আল্লাহ্ পাকের সৃষ্টির জঘন্য ও গজবের স্থান। ইহা আল্লাহর অভিশপ্ত লোকদের চিরদুঃখ ও লজ্জাকর বাসস্থান। যেসব কাজে আল্লাহর অখুশী, অসন্তোষের কারণ রহিয়াছে, দোজখে প্রবিষ্ট হইবার উহাই একমাত্র উপকরণ। কোন কাজে আল্লাহ খুশী আর কোনটিতে নারাজ ও নাখোশ তাহা তিনি পবিত্র কোরআন ও রাসূলের হাদীছ মারফত তাঁহার বান্দাদের অবগত করাইয়াছেন। বান্দা তাহার বিপরীত কিছু করিলেই আল্লাহ তাহার উপর নারাজ ও অসন্তোষ হন।
যে সব কাজ বান্ধা তাহার সৃষ্টিকর্তা প্রভুর নির্দেশের বিপরীত করিলে দোজখে নিক্ষিপ্ত হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে, তাহার মোটামুটি বিবরণ দেওয়া গেল।
শেরক :-শেরক একটি মহাপাপ, যাহা মানুষ দ্বারা সৃষ্টি হইলে তাহাকে অবশ্যই দোজখে যাইতে হইবে।
আল্লাহ পাক কোরআনে ইরশাদ করেন-
‘ইন্নাশশিরকা লাজুমুন আজীম-অংশীবাদিতা জঘন্যতম গুনাহের কাজ।
শিরকে জলী বা প্রকাশ্য শিরক এবং শিরকে খফি বা অন্তর্নিহিত শিরক। শিরক এই দুই ভাগে বিভক্ত।
শিরকে জলী-আল্লাহতাআলার সঙ্গে অংশী স্থাপন করা। অর্থাৎ জিন, ইনসান বা ফেরেশতা, আথবা চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, লক্ষত্র, অগ্নি বা যে কোন দেবদেবী, গাছপালা অথবা মর্তিকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করা বা খোদার প্রিয়তম কিংবা তাঁহার নৈকট্য লাভকারী মনে করিয়া উহাদের কাহারও পুজা-অর্চনা বা উপাসনা করা অথবা উহাদের নামে জীব- জন্তু, ছেলে মেয়েকে উৎসর্গ করা, তাহাদের নামে কোন জিনিসের মানত করাকে শিরকে জলী বা প্রকাশ্য শিরক বলা হয়।
যাহারা শিরকে জলী কার্যে লিপ্ত তাহারা নিশ্চিত ভাবে কাফের। মৃত্যুর পূর্বে তওবা করিয়া ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত না হইলে তাহাদের কোন ক্ষমা নাই। অনন্তকালের জন্য তাহারা দোজখের সর্বোচ্চ শাস্তি ভোগ করিতে থাকিতে। আল্লাহতাআলার পবিত্র বেহেশত তাহাদের জন্য হারাম করা হইয়াছে।
শিরকে খফী অর্থাৎ গোপন ও অন্তর্নিহিত শিরক। উক্ত শিরক আমাদের মুসলমানদের মধ্যেও প্রচুর পাওয়া যায়। যেমন কোন ব্যক্তি কাহাকেও এ জাতীয় কথা বলিয়া সম্বোধন করা, ‘আগে আল্লাহ, পাছে তুমি; তোমার উপর এই কাজ সোপর্দ করিলাম কিংবা কোন পীর- মোর্শেদ, অলি, দরবেশ বা দরগা দায়েরার নামে কোন গরু, ছাগল কিংবা হাঁস মুরগী ইত্যাদি জানোয়ারকে ছাড়িয়া দেওয়া বা উৎসর্গ করা কিংবা উহাদের নামে কোন জিনিসের মানত করা।’
হাদীছের মর্মে বুঝা যায় রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদতও শিরকে খফির মধ্যে শামিল। যেমন আল্লাহর রাসূল বলেন- যে ব্যক্তি মানুষকে দেখাইবার উদ্দেশ্যে নামাজ, রোজা ও দান খয়রাত করে, সে ব্যক্তি মোশরেকদের অন্তর্ভূক্ত।
মাতা-পিতার নাফরমানী করা : হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে, জনাব রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলিয়াছেনঃ তিন প্রকারের লোকের জন্য আল্লাহ তাআ’লা বেহেশত হারাম করিয়া রাখিয়াছেন। তন্মধ্যে এক প্রকারের লোক হইল মাতা-পিতার অবাধ্যচরণ করা- অবাধ্য হওয়া। নবী করীম (ছাঃ) অন্যত্র বলিয়াছেনঃ কবীরা গুনাহসমূহের মধ্যে সবচাইতে মারাত্মক গুনাহ হইল আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা ও মাতাপিতার নাফরমানী করা’
নামাজ না পড়া বা নামাজ অবহেলা করা : কোরআন শরীফে বহু স্থানে বেনামাজীর জন্য ভীষণ আজাবের ভয় দেখানো হইয়াছে। আল্লাহ পাক পবিত্র কালাম পাকের মধ্যে নামাজের জন্য যতটুকু তাকিদ করিয়াছেন, অপর কোন ইবাদতের জন্য ততটুকু তাকিদ করেন নাই। কোরআন শরীফে বিরাশি স্থানে প্রত্যক্ষভাবে নামাজের নির্দেশ আসিয়াছে এবং পরোক্ষভাবে তাকিদ করা হইয়াছে বহু স্থানে। অথচ যে কাজের জন্য আল্লাহ পাক একবার মাত্র নির্দেশ দান করেন, উহাই বান্দার উপর ফরজ হইয়া যায়। যেমন-রোজা সম্বন্ধে কোরআন শরীফে একটি মাত্র আয়াত অবতীর্ণ হইয়াছে, যদ্দারা কেয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের উপর উহা ফরজ হইয়া রহিয়াছে। বস্তুতঃ নামাজ এমন একটি ইবাদত যাহার হাকীকত ও গুণাবলীর প্রতি লক্ষ্য করিলে সমস্ত ইবাদতের মধ্যে একমাত্র নামাজই শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী।
জাকাত আদায় না করা : আল্লাহতাআলা পবিত্র কালামে পাকে বর্ণনা করিয়াছেন, ‘যাহারা স্বর্ণ রৌপ্য জমা করিয়াছে অথচ তাহার জাকাত আদায় করে নাই, তাহাদের পিঠ, কপাল ও পার্শ্বদেশে দাগ দেওয়া হইবে।’
হজরত আবু হোরাইরা হইতে বর্ণিত আছে, নবী করীম (ছাঃ) বলিয়াছেনঃ যে ব্যক্তি স্বর্ণ রৌপ্যের জাকাত আদায় করে না, বিচারের দিনে ঐ সব স্বর্ণ রৌপ্যের তক্তী দ্বারা তাহার কপাল ও পার্শ্বদেশে দাগ দেওয়া হইবে। অতঃপর যখন তক্তীগুলি ঠাণ্ডা হইয়া যাইবে, তখন পুনরায় গরম করা হইবে এবং কেয়ামতের পঞ্চাশ হাজার বৎসর সমতুল্য দিনের সর্বক্ষণ এ আজাব চলিতে থাকিবে।
রোজাব্রত পালন না করাঃ রোজাব্রত পালন করা ইসলাম ধর্মের একটি বুনিয়াদি ফরজ। কোরআন পাকে সুস্পষ্ট ঘোষণা রহিয়াছে, হে আমার বিশ্বাসী বান্দাগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হইল, যেরূপ তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণের উপরও ফরজ ছিল। নিশ্চয় তোমরা উহার সাহায্যে খোদাভীরুতা অর্জন করিবে।’
প্রকৃত পক্ষে রমজান মোবারকের রোজা আমাদের ইহলৌকিক ও পার-লৌকিক জীবনের একটি কল্যাণকর ইবাদত। দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত ছিয়ামের কৃচ্ছ সাধনার দ্বারা আমাদের শারীরিক সুস্থতা ব্যতীত আত্মার শুদ্ধি লাভ হয়। দিনের বেলায় ভোগ বিলাসের যাবতীয় সামগ্রী, সন্তোষ ও কামনা ত্যাগ করার দরুণ মানুষের অন্তরে আল্লাহর প্রেম-প্রীতি ভালবাসা পয়দা হয়। তদুপরি একমাস যাবত উপবাস ব্রত পালন করার দরুণ মানুষের অন্তরে গরীব দুঃখীদের দুঃখ দৈন্য ও ক্ষুধা তৃষ্ণাময় জীবনের প্রতি আসে এক মমত্ববোধ, দরদ ও সহানুভূতি।
হাদীছের উক্তিমতে আমরা স্পষ্ট জানিতে পারি যে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত এই তিনটি বিষয়বস্তুর কোন কটি কেহ যদি বাদ দেয় কিংবা বাদ দেওয়াকে বৈধ বা হালালভাবে, তবে সে ব্যক্তি কাফেরের মধ্যে পরিগণিত হইবে। সুতরাং উক্ত ব্যক্তির জীবন সম্পদ সম্পূর্ণ মূল্যহীন বা হারাম হইবে- (১) আল্লাহর একত্ববাদের সাক্ষ্য দেওয়া। (২) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা। (৩) রমজান মাসের রোজা রাখা
ফরজ হওয়া অন্তেও হজ্ব আদায় না করা : হজরত আলী (কাঃ) হইতে রেওয়াত আছে, হুজুর আকরাম (ছাঃ) বলিয়াছেনঃ যে ব্যক্তি হজ্জে গমনের ব্যয়ভার বহন করিতে সামর্থবান, তথাপি যদি সে হজ্জ পালন না করে, তবে সে ইহুদী হইয়া মরুক কিংবা খৃষ্টান অবস্থায় তাহার মৃত্যু আসুক, তাহাতে কোন কিছু আসে যায় না।
সুদ খোরী করা : আল্লাহতাআ’লা পবিত্র কালামে মজীদে সুদ- খোরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করিয়াছেন। হাদীছ শরীফে হজরত সামুরা বিনা জুন্দুব হইতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলিয়াছেনঃ মেরাজের রাত্রে দেখিয়াছি প্রবাহিত একটি রক্তের নদী। তাহার মধ্যে একব্যক্তি সাঁতরাইতেছে এবং হাবুডুবু খাইতেছে। লোকটি মাঝে মাঝে সাঁতরাইয়া তীরে আসিতেছিল, কিন্তু তীরে দণ্ডায়মান জনৈক ব্যক্তি তাহার প্রতি প্রস্তর নিক্ষেপ করিয়া তাহাকে পুনরায় নদীর মধ্য দিকে তাড়াইয়া দিতেছিল। ক্রমাগত এ অবস্থা চলিতে দেখিয়া আমি জিব্রাঈলকে (আঃ) জিজ্ঞাসা করিলামঃ এই ব্যক্তি কে? জিব্রাঈল (আঃ) উত্তর করিলেন, এই ব্যক্তি আপনার সুদখোর উম্মত।
এতীমের মাল ভক্ষণ করা : কোরআন শরীফে আল্লাহতাআ’লা ফরমাইয়াছেন-’যাহারা জোর পূর্বক এতীমের মাল ভোগ করে, তাহারা যেন আপনার পেটে আগুনই ভর্তি করে।’
হজরত আবু হোরাইরা (রাঃ) বর্ণনা করেন, নবী করীম বলিয়াছেনঃ মেরাজের রাত্রে আমি কতক লোককে প্রস্তর ভক্ষণ করিতে দেখিলাম। প্রস্তর খাওয়া মাত্র উহা তাহাদের গুহাদ্বার দিয়া নীচে পড়িয়া যাইতেছিল। আমি জিব্রাঈলকে (আঃ) জিজ্ঞাসা করিলাম, উহারা কাহারা? তিনি জবাব দিলেনঃ উহারা ঐ সমস্ত লোক যাহারা জোর পূর্বক এতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করিয়াছে-ভক্ষণ করিয়াছে তাহাদের সম্পদ।
জিনা বা ব্যভিচার করা : হজরত আনাস (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলে করীম (ছাঃ) ফরমাইয়ছেনঃ গুপ্তস্থান ও জিহ্বার গুনাহই মানুষকে সর্বাধিক দোজখের দিকে নিয়া যাইবে।
উল্লেখিত কবীরা গুনাহসমূহ ব্যতীতও কোরআন ও হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত শত শত ছগীরা ও কবীরা গুনাহ রহিয়াছে, যেগুলির উপর আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সম্পূর্ণ অসন্তুষ্ট রহিয়াছেন। বস্তুতঃ ঐগুলির মধ্যে লিপ্ত হইয়া পড়িলে কঠিন শাস্তি বা ভীষণ আজাবের কথা বলা আছে।
এখানে আল্লাহর অসন্তুষ্টির কার্যাবলী বা গোনাহসমূহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হইল।
(১) আল্লাহর সাথে অংশী স্বীকার করা অর্থাৎ আল্লাহর ন্যায় অন্য কাহাকেও শক্তিশালী ও জ্ঞানী মনে করা। ২। কষ্টে পতিত হইয়া কিংবা উদ্দেশ্য সাধনে জন্য আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহাকেও নজর মানত মানা। ৩। বিপদে পড়িয়া আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাহারও কাছে সাহায্য বা বিপদ উদ্ধারের জন্য প্রার্থনা করা। ৪। অন্যায়ভাবে কাহাকেও হত্যা করা। (৫) মাদক জাতীয় দ্রব্যাদি যেমন মদ, গাজা, আফিম ইত্যাদি পানাহার করা বা অপরকে করান (৬) বিবাহ ব্যতীত শরীয়ত সমর্থিত ক্রীতদাস ছাড়া অন্য কোন স্ত্রীলোকের সাথে জেনা করা। (৭) নিজ স্ত্রীর সাথে কামতৃপ্তি প্রয়োগীয় স্থান ব্যতীত অন্যত্র উপগত হওয়া। (৮) অন্যের সতী সাধ্বী স্ত্রীকে অন্যায়ভাবে জেনার মিথ্যা অপবাদ দেওয়া (৯) অবিবাহিতা সতী যুবতীকে জেনার তোহমত দেওয়া। (১০) বিধর্মী শত্রুর দ্বিগুণ শক্তির মোকাবেলা হইতে পলায়ন করা। (১১) কাহাকেও যাদু বা সেহর করা এবং অপরের দ্বারা কারান। (১২) পিতৃহীন সন্তানের মাল দৌলত অন্যায়ভাবে হরণ ও ভক্ষণ করা (১৩) মাতাপিতাকে অনর্থক দুঃখ-কষ্ট দেওয়া। (১৪) মক্কা শরীফের হেরেমের মধ্যে নিষিদ্ধ কার্যে লিপ্ত হওয়া। (১৫) সুদ গ্রহণ করা। (১৬) চুরি করা। (১৭) শূকরের মাংস ভক্ষণ করা। (১৮) অন্যায়ভাবে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। (১৯) বিনা কারণে সত্য গোপণ করা। (২০) শরীয়ত সমর্থিত ওজর ব্যতীত রমজান মাসের রোজা ভঙ্গ করা। (২১) ইচ্ছা করিয়া নামাজ তরক করা কিংবা নামাজের ওয়াক্ত গোনাহের কার্যাবলী চলিয়া যাওয়ার পর নামাজ পড়া। (২২) জাকাত পরিমাণ মালের জাকাত না দেওয়া। (২৩) হজ্জ্ব ফরজ হওয়া সত্ত্বেও হজ্জ না করা। (২৪) মিথ্যা শপথ করা। (২৫) ঘনিষ্ট আত্মীয়ের আত্মীয়তা সম্পর্ক কর্তন করা। (২৬) ক্রয় বিক্রয়ের কালে ওজনে কম দেওয়া। (২৭) এক মোসলমান অন্য মোসলমানের সাথে অন্যাভাবে যুদ্ধ করা। (২৮) আল্লাহ, তাঁহার রাসূল, রাসূলের বংশধরগণ ও তাঁহার ছাহাবাগণকে হেয় জ্ঞান করা, ভর্ৎসনা করা, অভিশাপ দেওয়া ও অন্যায়কারী ভাবা। (২৯) ঘুষ দেওয়া ও গ্রহণ করা। (৩০) অপনিন্দাকারীকে বিচারপতি নিযুক্ত করা। (৩১) শক্তি থাকা সত্ত্বেও সত্যের আহবান এবং মিথ্যার অবসান না ফরা। (৩২) বিনা প্রয়োজনে শরীয়ত অনুমোদিত মিথ্যা (সময় সাপেক্ষে যে মিথ্যা, বলা জায়েজ আছে) বলা। (৩৩) শক্তি থাকা সত্তেও প্রতিশ্রুতি পালন না করা। (৩৪)পবিত্র কোরআন মজীদ হেফজ করিয়া পুনঃ ভুলিয়া যাওয়া + (৩৫) জীবন্ত প্রাণীকে অগ্নিতে পোড়াইয়া হত্যা করা। (৩৬) স্ত্রী নিজ স্বামীর অবাধ্য হওয়া এবং স্বামী স্ত্রীর উপরে অন্যায়ভাবে অত্যাচার করা। (৩৭) স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি করা। (৩৮) বিশেষজ্ঞ হাক্কানী আলেমকে প্রবঞ্চনামূলক মিথ্যাবাদী প্রমাণ কর। হাক্কানী আলেম উহাকে বলে -যে ব্যক্তি এলমে দীন শিক্ষা করিয়া তদনুযায়ী নিজে আমল করে ও অন্যকে আমল করিতে উৎসাহ দেয়। আর ঐ ব্যক্তি প্রকৃত আলেম নহে, যে ব্যক্তি গাদায় গাদায় কেতাব পড়ে কিন্তু অন্যকে শিক্ষা দেয় না এবং তদনুযায়ী নিজেও আমল করে না। এক কথায়, দীন ইসলামের খেদমত তাহার দ্বারা হয় না। (৩৯) আল্লাহ দান হইতে নিরাশ হওয়া এবং তাহার আজাবকে ভয় না করা। (৪০) জুয়া খেলা। (৪১) আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্যের নামে গো-মহিষ জবেহ করা। (৪২) আল্লাহর সান্নিধ্য অর্জন অথবা তাহার সম্মানকে পুণ্য মনে করিয়া তাহার নামে পশু বধ করা। (৪৩) নিজেকে সর্বোচ্চ জ্ঞানী ভাবিয়া গৌরবান্বিত হওয়া এবং মনে মনে নিজ আত্মার উপর প্রশংসা করা। (৪৪) ধোকাবাজী ও শঠতামী করা। (৪৫) অন্যের ধন-সম্পত্তি অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা। (৪৬) মারামারি, লাঠালাঠি করা। (৪৭) কাফের, ফাসেক ও অন্যায়কারীদের সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করা (৪৮) অন্যের প্রতি হাসাদ (শত্রুতা), বোগজ (দুশমনী) ও কীনা (হিংসা) রাখা। (৪৯) শরীয়ত কর্তৃক নির্দেশিত হুকুম; যেমন-নামাজ, রোজা হজ্ব ও জাকাত ইত্যাদি পালনের প্রতি বিরক্ত ভাব রাখা এবং ঐ সকল আদেশ পালন না করে। (৫০) হালাল বস্তুকে হারাম এবং হারাম বস্তুকে হালাল জ্ঞান করা। (৫১) ধর্মের কার্যে বাধা চক্রান্ত করা। (৫২) অপরের গচ্ছিত মাল-দৌলত অপহরণ করা। (৫৩) মহারেমের (যাহাদিগকে বিবাহ করা বৈধ নহে) তাহাদের সাথে অবৈধভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। (৫৬) কাফের, ফাসেক ও বে-দ্বীনগণ কর্তৃক ভয়ের কারণ না থাকা সত্তেও তাহাদিগকে শ্রদ্ধা ও তোষামদ করা। (৫৭) মাসলা-মাসায়েলের জ্ঞান না থাকা সত্তেও ফতুয়া দেওয়া। (৫৮) অনভিজ্ঞতা সত্ত্বেও চিকিৎসা করা। (৫৯) নিজ ইচ্ছানুয়ায়ী কোরআন শরীফের তফসীর-ব্যাখ্যা করা। (৬০) সম্মানি লোকের সম্মান হানি করা। (৬১) কাহারও উপস্থিতি বা অনুপস্থিতিতে মিথ্যা প্রচার ও দোষ বর্ণনা করা। (৬২) মো’মেন মোসলমানদের প্রতি খারাপ ধারণা রাখা। (৬৩) আল্লাহর নাম ব্যতীত অন্য কাউর উপর শপথ করা। (৬৪) কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করার মজলিসে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত শ্রবণ ব্যতীত অন্য কাজে ব্যস্ত থাকা। (৬৫) অন্যের অপনিন্দা ও অপবাদ করা এবং শ্রবণ করা। (৬৬) জ্যোতিষের বর্তমান, ভবিষ্যৎ কথার পর বিশ্বাস স্থাপন করা। (৬৭) আল্লাহ ব্যতীত অন্যের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জ্ঞানের উপর বিশ্বাস রাখা (৬৮) নবীগণ, আল্লাহর কেতাব, বেহেশত, দোজখ, মিজান, পোলসেরাত, কবর আজাব এবং যে সকল বিষয়ে আল্লাহ এবং তাঁহার রাসূলগণ নির্দেশ দিয়াছেন ও কেয়ামত বিষয়ক অবস্থার উপর অবিশ্বাস করা। (৬৯) হাদীছ অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ বাণী; ইজমা কেয়াস ইত্যাদি অমান্য করা। (৭০) দাড়ি কামান ও গোফ লম্বা রাখা (৭১) স্বর্ণ রৌপ্যের পাত্রে পানাহার করা (৭২) পুরুষের পক্ষে স্বর্ণ ও রৌপের অলঙ্কার এবং রেশমী কাপড় পরিধান করা। (৭৩) অনুরূপে, পুরুষের পক্ষে হাতে পায়ে মেহেন্দী এবং সৌন্দর্যের নিমিত্ত দন্তের মাড়ীতে কাল রং লাগান (৭৪) ঢোল, বাদ্য, বেহালা ইত্যাদি বাজান এবং ইচ্ছাকৃত শ্রবণ করা। (৭৫) আকৃষ্ট মনে যুবতীর নাচ দেখা এবং তাহাদিগকে টাকা পয়সা দ্বারা সাহায্য করা। (৭৬) যুবতীর নাচের ভঙ্গির প্রশংসা করা। (৭৭) শরীয়ত অসমর্থিত ধেলা-ধুলা; যেমন পাশা, জুয়া ইত্যাদি খেলা-করা। (৭৮) হারাম কাজের পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা। (৭৯) মিথ্যা কথার উপরে আল্লাহকে সাক্ষী রাখা। (৮০) ইসলাম ধর্মের উপর অন্য ধর্মের প্রাধান্য দেওয়া (৮১) বেদ্বীন সম্প্রদায়ের সাথে মিলিত হইয়া কাজ করা। (৮২) কাফেরদের পূজা পর্বের বস্তু গ্রহণ ও ভক্ষণ করা। (৮৩) পীর, পরগম্বর, ধর্মের ইমাম, শহীদগণের নামে মাথার ঝোট ও চুল বড় রাখা। (৮৪) দাস দাসীকে নিকৃষ্ট জ্ঞান করা এবং তাদের দ্বারা সাধ্যাতীত কাজ করান। (৮৫) এক মুসলমান অন্য মুসলমানের বিপদ-আপদে উদ্ধার না করা। (৮৬) এক অন্যকে অপ্রীতিকর নামে সম্বোধন করা। (৮৭) সর্বদা মনকে খারাপ ও গুনাহের কার্যে লিপ্ত রাখা। (৮৮) দিবা রাত্র ভাল খাওয়া-পরার চিন্তায় নিমগ্ন থাকা। (৮৯) শক্তি থাকা সত্ত্বেও মাতাপিতা ও সম্মানিতজনের সম্মান প্রদর্শন ও খেদমত না করা। (৯০) ওস্তাদ, পীর-বুজর্গ এবং বড়দের সাথে বেয়াদবী করা। (৯১) চক্রান্ত পূর্বক নিজেকে অসাধ্য প্রমাণ করিয়া শরীয়তের আদেশ, যথা- নামাজ, রোজা, হজ্জ ও জাকাত ইত্যাদি হইতে বিরত থাকা। (৯২) আল্লাহর দানকৃত মাল-দৌলত হইতে দান-ছদকা, জাকাত আদায় করিতে কৃপণতা করা। (৯৩) ঋতু ও নেফাসকালীন স্ত্রীর সহিত সহবাস করা। (৯৪) নিজ স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সম্মুখে গমনের সুযোগ দেওয়া। (৯৫) স্ত্রীর অনিচ্ছামতে শরীয়ত বিরোধী কাজ করান। (৯৬) অকারণে স্বীয় স্ত্রীকে বেপর্দায় এদিক ওদিক ঘুরাফেরা করার সুযোগ দেওয়া। (৯৭) শক্তি থাকা সত্ত্বেও সন্তান সন্ততি স্ত্রী পুত্র পরিজনকে পানাহারে কষ্ট ও অনাহারে রাখা। (৯৮) অন্যের স্ত্রীর দিকে লোলুপ দৃষ্টি করা। (৯৯) একাধিক স্ত্রীর মধ্যে সমতা রক্ষা না করা। (১০০) স্ত্রী-পুত্রের সন্তুষ্টির জন্য খোদা ও রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করা। (১০১) স্ত্রী নিজের স্বামীর অবাধ্য হওয়া। (১০২) স্বামীর ডাকে স্ত্রীর নিমিষে হাজির না হওয়া। (১০৩) স্ত্রী স্বামীর দেওয়া পোশাক, পরিচ্ছদ ও পানাহারে সর্বদা অকৃতজ্ঞ থাকা (১০৪) স্ত্রী তাহার স্বামীর আদেশ ব্যতীত মাতা-পিতার বাড়ী ছাড়া অন্যের বাড়ী গমণ করা। (১০৫) অনুরূপ স্ত্রী স্বামীর আদেশ ব্যতীত অন্য পুরুষের সম্মুখীন হওয়া। (১০৬) স্ত্রী স্বামীর শক্তির বাহিরে খাওয়া পড়ার তাড়া করা। (১০৭) কথায় কথায় স্ত্রী তাহার স্বামীকে কষ্ট দেওয়া। (১০৮) স্ত্রী স্বামীর সংসারের প্রতি লক্ষ্য ও তাহার মালের রক্ষণাবেক্ষণ না করা। (১০৯) স্ত্রীলোকের মাথার চুল কামান। (১১০) স্ত্রীলোক পুরুষের আকৃতি এবং পুরুষ স্ত্রীল্পেকের ধারণ করা। (১১১) শরীয়তের বিধান ব্যতিরেকে অন্য উপায়ে কবর জেয়ারত করা। (১১২) অন্যের ঘরে বিনা আদেশে প্রবেশ করা। (১১৩) ওয়াজ নছীহতকারীর ওয়াজ নছীহত না করা। (১১৪) লোক দেখান ইবাদত-বন্দেগী করা এবং নিজের ইবাদত বন্দেগী ও পরহেজ- গারীর উপর মনে মনে প্রশংসিত হওয়া। (১১৫) মূল্য বৃদ্ধির জন্য খাদ্য শষ্য গুদামজাত রাখা এবং কালবাজরী করা। (১১৬) কবর জিয়ারতকালে কবরে সেজদা এবং কবরের চতুষ্পার্শ্বে ঘুরিয়া তাওয়াফ করা। (১১৭) জীব-জন্তুর ফটো তোলা এবং সৌন্দর্যের জন্য ঘরে টানাইয়া রাখা। (১১৮) অসদুপায়ে টাকা উপার্জন করিয়া তদ্দারা মসজিদ, ঈদগাহ ইত্যাদি তৈয়ার করিয়া ছওয়াবের আশা রাখা। (১১৯) ঈদগাহ মসজিদ ইত্যাদির নামে পশু বধ করা। (১২০) যে স্থানে মানুষের কবর নাই সেখানে কবর জ্ঞানে সালাম ও জিয়ারত করা। (১২১) মৃত ব্যক্তির জন্য উচ্চৈঃস্বরে বিলাপ করিয়া কাঁদা, জামা-কাপড় ফফাড়িয়া ফেলা এবং বুকে আঘাত করা। (১২২) বিধার্মীগণের বিশ্বাস মতে কথা বলা; যেমন যাত্রা পথে খালি কলস দেখিলে যাত্রা ভঙ্গ, অন্য স্থানে স্থানান্তুরিত হইবার পূর্বে উক্ত স্থানে কলসী ভরিয়া পানি রাখিয়া যাওয়া, নূতন বধু ঘরে উঠাইবার কালে কাদা ছড়ান ইত্যাদি। (১২৩) পুরুষের পক্ষে পরিধানের কাপড় ইচ্ছা করিয়া পায়ের গিয়ার নীচে ঝুলান। (১২৪) নিজের লজ্জাস্থান অন্যকে দেখান এবং অন্যের লজ্জাস্থান নিজে দেখা। (১২৫) অপবিত্র অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করা। (১২৬) বিনা অজুতে কোরআন শরীফ স্পর্শ করা, নামাজ পড়া, কা’বা শরীফ তাওয়াফ করা। (১২৭) শরীর ক্ষত করতঃ দাগ লাগান এবং অন্যকে দাগ দেওয়া। (১২৮) স্ত্রীলোকের এমন পাতল কাপড় পরিধান করা যাহাতে অন্যে শরীর দেখিতে পায়। (১২৯) মোক্তাদিগণের ইমামের পূর্বে নামাজের ক্রিয়া আদায় করা। (১৩০) মদ, শরাব ইত্যাদির ব্যবসা করা। (১৩১) স্বাধীন স্ত্রী বা পুরুষকে খরিদ করিয়া ক্রীতদাস বানান। (১৩২) জুমুআর দিবস ক্রয়-বিক্রয়ের কার্যে লিপ্ত থাকিয়া নামাজ তরক করা। (১৩৩) জুমুআ’ এবং জানাজাতে হাজির হইতে গাফলতি করা। (১৩৪) আল্লাহর হুকুম ও শরীয়তের নির্দেশিত বিচার হইতে রেহাই দেওয়া এবং সোপারেশ করা। (১৩৫) জানিয়া শুনিয়া কোরআন শরীফ ভুল পড়া। (১৩৬) সালামের উত্তর না দেওয়া (১৩৭) ইচ্ছাকৃত বিষ পান কিংবা নদীতে ঝাপ দেওয়া অথবা আত্মহত্যা করা। (১৩৮) পাড়া-প্রতিবেশীকে দুঃখ কষ্ট দেওয়া। (১৩৯) কাফের ও বধর্মীগণের পোষাক পরিচ্ছদের অনুকরণ করা। (১৪০) শরীয়তের কার্যে হাসিঠাট্টা করা। (১৪১) নিজ বংশ হইতে বাহির হইয়া অন্য বংশের পরিচয় দেওয়া। (১৪২) জনসাধারণের চলার রাস্তা বন্ধ করা। (১৪৩) শরীয়ত সমর্থিত কার্যে সংস্থান থাকিতে টাকা-পয়সা দ্বারা সাহায্য না করা। (১৪৪) কাফেরের ভয় ব্যতীত মোসলমান বলিয়া পরিচয় না দেওয়া। (১৪৫) টাকা-পয়সার অপব্যয় করা। (১৪৬) দাসদাসীকে স্নেহ ও ভালবাসা না দেখান। (১৪৭) খাদ্যদ্রব্য যেমন – নিমক, তৈল, চিনি ইত্যাদিতে এমন ভেজাল দেওয়া যে, যদি খরিদ্দার জানে-তবে নির্ধারিত দামে উহা খরিদ করিতে চাহেনা এইরূপ ভেজাল
দেওয়া। (১৪৮) এক মোসলমান অন্য মোসলমানের অপরাধ বা দোষ অন্বেষণ করা। তবে সংশোধনের নিয়তে ফাসেক এবং গোনাহগারের অন্যায় তালাশ করা বৈধ। (১৪৯) এক মোসলমান অন্য মোসলমানকে দোজখী বলা- ইত্যাদি।
এতদ্ব্যতীত আরও গোনাহের কার্য আছে, তাহা ভাল আলেমের কাছে জানিয়া লইতে হইবে।
.
প্রসংগ কথা
প্রতিটি মানুষ তার ফিতরাত বা তার পূর্ব-স্বীকৃত বিশ্বাসের ভিত্তিতেই জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে। পরবর্তী সময় তার পিতা-মাতা, সমাজ ও ধম- ‘হীন পরিবেশ তাকে অধর্ম ও খোদার বিধানের বিপরীত লইয়া যায়—ভ্রান্ত
এহুদী ও খৃষ্টানের পরিণত করে। -আল-হাদীছ
নবী করিমের (ছাঃ) এ বাণীর মর্মকথা হইতে বুঝিতে অসুবিধা হয় না যে, হুজুর তাঁর বাণীর মাধ্যমে এ কথাই মানুষকে অবহিত করিতে চাহিয়াছেন যে, আরওয়াহ বা রূহ ও মানবাত্মা সৃষ্টি করিবার পর মহান আল্লাহ সকল আত্মাকে সম্বোধন করিয়া বলিয়াছিলেন- ‘আমি কি তোমাদের রব ও প্রভু প্রতিপালক নহি?’ এ জিজ্ঞাসার জবাবে সকল মানবাত্মাই স্বীকার করিয়া লইয়াছিল-হাঁ, আপনিই আমাদের রব ও প্রতিপালক।
ফলে মানুষ মাত্রই জন্মগ্রহণকালীন এই পূর্ব-স্বীকৃত বিশ্বাস বা ঈমান লইয়া জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে। কিন্তু, পরবর্তীকালে দূষণ-পরিবেশের সাথে মিস্ত্রিত ও প্রভাবিত হইয়া অধর্ম ও খোদার বিরোধী বিধানের দিকে ধাবিত হইয়া পড়ে।
এ গর্হিত ও আল্লাহর বিধান পরিপন্থী কাজ হইতে মানুষকে সরল- সঠিক পথ তথা আল্লাহর সত্য-বিধানের প্রতি মানুষকে ফিরাইয়া আনার জন্য যুগে যুগে মানুষের শিক্ষাগুরু হিসাবে মানুষেরই মধ্য হইতে মানুষ নবী-রাসূল প্রেরণ করিয়া থাকেন। তাঁরা আলাহর বাণী বহন করিয়া আনেন এবং সে মতে মানুষকে দীক্ষা দিয়া থাকেন।
এ উদ্দেশ্যে সম্মুখে রাখিয়াই আল্লাহ পাক হজরত আদম নবী হইতে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ এবং নবীগণের নেতা হজরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ পর্যন্ত মতান্তরে দু’লাখ চব্বিশ হাজার কিংবা এক লাখ চব্বিশ হাজার নবী- রাসূল দুনিয়ার মানুষের কাছে প্রেরণ করিয়াছেন। তাঁরা দুনিয়ায় আগমন করিয়া মানুষকে ধর্মকর্ম শিক্ষা দিয়াছেন-মানুষকে আল্লাহর পথে আহবান করিয়াছেন।
শেষ জমানায় আমাদের হেদায়াতের জন্য আল্লাহ প্রেরণ করিয়াছেন আখেরী বা সর্বশেষে নবী হজরত মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে অসাল্লামকে। তাঁর পরে আর কোন নবী-রাসূলের আবির্ভাব কখনো ঘটিবে না, তাঁর দেওয়া ও প্রচারিত সত্য- সনাতন ধর্ম তথা ইস- লামই প্রবর্তিত থাকিবে কেয়ামত পর্যন্ত।
এই সম্পর্কে মহান আল্লাহ পাক উম্মতে মুহাম্মদীকে সম্বোধন করিয়া ইরশাদ করেন-
‘রাসূল যা তোমাদিগে শিক্ষা দেয় তা গ্রহণ কর এবং যা হইতে বিরত থাকার উপদেশ দেয়, তা হইতে দূরে থাক-বর্জন কর।’- আল কুরআন।
মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর এ বাণী হইতে আমাদিগে জানাইয়া দিতেছেন- তোমাদের ধর্ম ও দীনের একমাত্র শিক্ষাগুরু মুহাম্মাদ (ছাঃ)। তিনি তোমাদিগে যে শিক্ষা দেন সে শিক্ষাই তোমাদের পরকাল মুক্তির জন্য যথেষ্ট এবং একমাত্র সুখ ও শান্তির আগার বিহেশত লাভের একমাত্র উছিলা ও উপকরণ। এর বিপরীত কিছু হইলে দুঃখের সীমা থাকিবে না-অনন্ত দুঃখের জঘন্য স্থান দোজখ হইবে তোমাদের চির আবাসস্থল।
আর এ বাণী সমুহের সর্ব প্রথম ও শ্রেষ্ঠ বাণী হইল-পবিত্র কলেমা- লা-ইলা-হা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।’ -আল্লাহ ছাড়া ইবাদত ও আনুগত্যের দ্বিতীয় কেহ নাই, আর আল্লাহর বাণী বাহক তথা রাসূল হই- লেন মুহাম্মাদ (ছঃ)।
এ কলেমাটিই হইল তাওহীদ বা আল্লাহর একত্ববাদের একমাত্র বাণী। অর্থাৎ আল্লাহই সব কিছুর উপরে, আল্লাহ ব্যতীত কারো কোন ক্ষমতা নাই, শক্তি নাই, ভাল-মন্দের সমাধান ক্ষেত্রে তিনি ব্যতীত দ্বিতীয় কেহ নাই। ইবাদত-বন্দেগী ও আনুগত্য তাঁর জন্যই সীমাদ্ধ। অতএব, মাখলুকের বা সৃষ্টির ধর্ণা কোন অবস্থায়ই ধরা চলিবে না-। এ শ্রেণীর মনোভাব সৃষ্টি হওয়া অধর্ম এবং কর্ম করা শিরক বা অংশীবাদিতা ও একত্ববাদের বরখেলাপ চিন্তাধারা। আর এ শিরক সম্পর্কেই আল্লাহ বলেন- সকল শ্রেণীর পাপ ও গর্হিত বা আল্লাহ বিরোধী কাজের মধ্যে শিরক কর্মই শ্রেষ্ঠ অপরাধ। সকল শ্রেণীর পাপই তিনি ইচ্ছা করিলে মোচন করিয়া দিতে পারেন কিন্তু শিরকজনিত পাপ তিনি কোন অবস্থায় ক্ষমা করিবেন না, এজন্য দোজখ তার একমাত্র আবাস স্থল।
শিক্ষক, গুরু, উপদেশদাতার মর্যাদা সর্বজন স্বীকৃত। এজন্য তাঁকে বহু গুণে ভূষিত হইতে হইবে। তার মধ্যে অন্যতম হইল চরিত্রগুণ। যে শিক্ষকের মধ্যে পূর্ণাংগ চরিত্রগুণ অনুপস্থিত, সে প্রকৃত শিক্ষক হইতে পারেন না। ধর্মগুরুর ব্যাপার তো আরো উর্ধে। কারণ ধর্ম শিক্ষকের উপরে যদি ছাত্রদের তথা উম্মতের পূর্ণাংগ আস্থা ও বিশ্বাস না থাকে, তবে তার উপদেশ বড় একটা কাজে না আসারই কথা। এজন্য ধর্মগুরু তথা রাসূলকে সর্ব প্রথম হইতে হইবে সত্যবাদি বলিয়া সর্বজন স্বীকৃত, থাকিতে হইবে তাঁর মধ্যে চরিত্রের অপূর্ব মাধুর্য।
আল্লাহ পাক যতজন নবী-রাসূল মানবকুলে তাঁর বাণী শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রেরণ করিয়াছেন পূর্বাহ্নেই তিনি তাঁদিগে তাঁদিগে শিক্ষকের যাবতীয় গুণাবলীতে ভূষিত করিয়া দিয়াছেন।
এ সম্পর্কে হযরত রাসূলে পাককে (ছাঃ) উদ্দেশ্য করিয়া আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন-
‘তোমাদের শিক্ষার জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যেই রহিয়াছে উত্তম চরিত্রগুণ। তাঁর আদর্শ ও চরিত্রগুণ গ্রহণ করিতে পারিলেই তোমাদের মুক্তি অবধারিত।
।। পরিশিষ্টাংশ শেষ।।
