কাঞ্চন-মূল্য – ১
১
স্বরূপ মণ্ডল বলল—“আপনি ব্রাহ্মণ দুজ্জন মনিষ্যি দা’ঠাকুর, ভরসা ক’রে কিছু বলতে পারিনে, কিন্তু বর-ক’নে না হলে বিয়ে হবে না, কৈ, এমন কথা শাস্তোর তো কোথাও ধ’রে দেয় নি।”
বললাম—“কেন স্বরূপ, ছেলের হাতে মেয়ের হাত রেখে সম্প্রদান করতে হবে, বলছে না শাস্ত্র এ কথা?”
স্বরূপ নাতির ছিপের জন্যে কাতা দিয়ে একটা বাঁখারি চাঁচছিল, হাতটা থামিয়ে বলল—“সে এখন উদিকে বরও রয়েচে, ইদিকে আপনার গিয়ে ক’নেও রয়েছে; কিন্তু যেখানে বর-ক’নের পাটই নেই, কিম্বা ধরুন বর আছে তো ক’নে নেই, ক’নে আছে তো বর নেই, সেখানে পুরুতঠাকুর কার হাতে কাকে সম্পোদান করবে আমায় বুঝিয়ে বলুন।”
অল্প হেসে উত্তরের প্রতীক্ষায় আমার মুখের পানে চেয়ে রইল। একটা বেশ জমাট কাহিনীর যেন খুঁট দেখা যাচ্ছে; আমি আর তর্ক না বাড়িয়ে বললাম—“হ্যাঁ, একেবারে এরকম অবস্থা দাঁড়ালে একটা সমস্যা বই কি।”
“সমিস্যে নয়? রাম সমিস্যে। তখন পুরুতঠাকুর তো ছেলের শাউড়ির হাতটা টেনে নিয়ে বলতে পারে না তাহলে একেই দ্যাও সম্পোদান ক’রে। কিম্বা ধরুন…”
তাড়াতাড়ি প্রশ্ন করলাম—“কিন্তু করবে কি? সমস্যা যদি হোল তো মেটাতে হবে তো।” মেটাতে হবে না? কতবার মিটলও যে দা’ঠাকুর, এই মসনেতেই। বর-কনে নাই রইল, বরকর্তা রয়েচে, কন্যাকর্তা রয়েচে, পুরুত রয়েচে, মন্তর রয়েচে, একটা ব্যবস্থা করে নিতে পারবে না তো এতগুনো সব রয়েচে কি করতে? কেন, আপনাকে বলিনি রায়চৌধুরীর মেয়ের বিয়ের কথা? সাতখানা গ্রামের লোক বিয়ে দেখে নেমন্তন্ন খেয়ে দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করতে করতে চলে গেল, চুলোয় যাক বর-কনে, তার সঙ্গে সম্বন্ধটা কি বলুন না কেন—তারা আচে কি না আচে একবার কেউ জিগ্যেস পজ্জন্ত করলে না। বলবেন—ওসব মাতালের কাণ্ড, বাদ দ্যাও। দিলুম। কিন্তু অনাদি ঠাকুর কোন্ মাতাল ছেল বলুন? আর যাকে সম্পোদান করা হোল, আমাদের ছিরু ঘোষাল? – বলবেন, কেন গাঁজাটা-আসটা তো খেত—তা মসনে গ্রামে ওটুকু ধরতে গেলে চলে না দা’ঠাকুর—অন্তত ত্যাখনকার দিনে চলত না, যাকে বলে ঠগ বাছতে গাঁ উজোড় হয়ে যেত…”
প্রশ্ন করলাম—“কেন, ছিরু ঘোষালের বিয়েতেও হয়েছিল নাকি কিছু? কৈ, শুনিনি তো এর আগে।”
স্বরূপ বিস্মিত হয়ে চাইল।
“আপনি যে অবাক করলেন দা’ঠাকুর, ‘কিছু’ আঁচ্মন-টাচমন করে বর হা-পিত্তোশ ক’রে মশান আগলে বসে আচে, উঠোনে একগাদা পাড়ার মেয়েছেলে, স্ত্রীআচার করবে, উদিকে বরপক্ষ, ইদিকে কন্যেপক্ষ, মাঝখানে শালগ্রামশিলে, পুরুতও টিকিতে একটা কলকে ফুল বেঁধে পুঁথি খুলে ব’সে আচে, কিন্তু বিয়ে যাকে করবে তারই নেই দেখা!…খোঁজ খোঁজ-বিয়ের ক’নে গেল কোথায় দেখ—সারা মসনে গ্রামখানা তোলপাড় হয়ে গেল, দা’ঠাকুর বলচেন—কিছু হয়েছিল নাকি?…নাঃ, কৈ আর কিছু হয়েছিল।”
প্রশ্ন করলাম—“তাহ’লে?…অন্য ক’নের সঙ্গে হোল বিয়ে?”
“ক’নে তো বাগানের ফলটা নয় দা’ঠাকুর যে আঁকশি দিয়ে একটা পেড়ে নিয়ে আসবে, পুকুরের চ্যাং-পুঁটিও নয় যে ছিপ ফেলে একটা টেনে তুললুম। তা ভিন্ন, সবাই তো আর অনাদি ঠাকুরের মতন নয়—আয় নেই, ঘরে সোমত্ত মেয়ে, কি করবে, গুলিখোর গেঁজেল যাই হোক একজনের হাতে সঁপে দিতে পারলে বাঁচে,—জেনেশুনে সজ্ঞানে ছিরু ঘোষালের হাতে কে মেয়ে দিতে যাবে বলুন?…তবে হ্যাঁ, অন্য ক’নের কথাও উঠেছিল; শুধু উঠেছিল বলি কেন, ছিরু ঘোষাল য্যাখন পিঁড়ে কামড়ে প’ড়ে রইল, বিয়ে না ক’রে কোন মতেই উঠবে না, উপস্থিত করাও হোল একটা ক’নেকে বিয়ের আসরে—কারুর মেয়েই যে হতে হবে এমন কথাও তো শাস্তোরে লেখা নেই—তখন সেই ক’নেই বললে—বলি, ঘাটের মড়ারা। এতগুনো একত্তর হয়েচ আর এইটুকু কারুর মাথায়’…”
বাধা দিয়ে বললাম—“না স্বরূপ, একটু গোড়া বেঁধে বলো, যেমন দেখছি ব্যাপারটা বেশ ঘোরালই হয়েছিল। কারুর মেয়ে নয় অথচ ক’নে এসে সবাইকে ডেকে বললে—‘ঘাটের মড়ারা!’…একটু গোড়া বেঁধে না বললে ঠিক যেন ধরতে পারচি না।”
“পারবেন না তো ধরতে। অনেক ব্যাপার যে রয়েছে এর মধ্যে। তাছাড়া এর টানে ও এসে পড়েছে, ওর টানে সে এসে পড়েছে, এই করে কাহিনীটাও কিঞ্চিৎ দীর্ঘ। তাহলে আর এক ছিলিম সেজে আনতে বলি, তাড়াহুড়ো নেই তো তেমন?”
গলা বাড়িয়ে নাতিকে আর এক ছিলিম তামাক সেজে দিয়ে যেতে বলে স্বরূপ আরম্ভ করল-
“তা’হলে অনাদি ঠাকুর থেকেই আরম্ভ করি দা’ঠাকুর। অনাদি ভচায্যি ছিলেন যাকে বলে একেবারে নিব্বিরুধী মানুষ। জাতব্যবসা পুরুতগিরিই করতেন, তবে নিব্বিরুধী মানুষের যেমন হয়-চলত না মোটেই। শুনেছি পণ্ডিত ছিলেন মস্ত বড়, সুবল তক্কোবাগীশের সন্তান তো, কিন্তু চলত না মোটেই। কথা হচ্চে, উকিল আর পুরুতের পুঁথিগত শুধু বিদ্যে হলেই হয় না দা’ঠাকুর, বরং বিদ্যে রইল কি না রইল হাঁকডাক থাকলেই যথেষ্ট। আর এও দেখেছি ও দুটো একসঙ্গে হয় না। যদি জিগ্যেস করেন হ’তে বাধা কি তো বলব-বিধাতাপুরুষ তো একচোখো নন, একজনকে বিদ্যেও দেবেন আবার হাঁকডাকও দেবেন আর একজনের ভাগ্যে লবডঙ্কা—তা’হলে সুবিচারটা হোল কোথায় বলুন না। মসনেয় তখন হাঁকডাক বোলবোলাও দেখতে হয় তো রিদয় ভচায্যির! ইয়া ভুঁড়ি, ইয়া বুকের ছাতি, পনখানেক নুচি আর তদনুরূপ সরঞ্জাম না হ’লে পারণ হোত না তানার। আপনি বলবেন পুরুতকে তো পালোয়ানি করতে হবে না, পেটে যদি এলেমই না রইল তো শুধু ভুঁড়ি আর বুকের ছাতি নিয়ে কি হবে? লেহ্য কথা, কিন্তু সেটা মুখ ফুটে বলবার লোক চাই তো। আর সব পুরুতেরা করে পুজো করবার জন্যে উপোস, শরীল পাকিয়ে পাকাটি হয়ে যায়, এনার ছেল পারণের জন্যে উপোস, ঐখানেই অনেক তফাত হয়ে গেল না? বলেও ফেলত, আবার সবরকম মনিষ্য আচে তো। অবিশ্যি মসনের কোনও পুরুতের তেমন বুকের পাটা ছেল না যে বলে, তবে বাইরে থেকেও তো আসত সব —বরযাত্রী নিয়ে, মন্তর সদ্যু কি অসুদ্যু এই নিয়ে মাঝে মাঝে বেধে যেত। ত্যাখনকার দিনে এসবের ফয়সলা টিকিতে গিয়া উঠত কিনা, এখনকার টেড়িকাটা ডেলিপ্যাসেঞ্জার পুরুত নয় তো দা’ঠাকুর—গোছা গোছা টিকি নিয়ে সব আসর জাঁকিয়ে বসত। তা রিদয় ভচায্যির টিকির নাগাল পাবে এমন পুরুত তো এযাবৎ জন্মায়নি, সবাইকে রেখেই যেতে হোত টিকি। য্যাখন গোটা আষ্টেক মাথা পস্কের হয়ে গেল, ইস্তক ভাটপাড়া সুদ্যু, তখন ইদিকে নদে-শান্তিপুর, গুপ্তিপাড়া, দাঁইহাট, কাটোয়া, উদিকে ভাটপাড়া পেনিটি—বরানগর, জনাই-তাবৎ জায়গার পুরুতমহলে সামাল-সামাল রব উঠে গেল। এর পরেও আসতে হোত সবাইকে—মসনে গ্রামখানা তো সোজা নয়, বিয়ে, ছেরাদ্দ, পাল-পাব্বন সারাটা বছর লেগেই রয়েছে সে সময়; আসত, তবে মন্তর সদ্যু হচ্চে কি অসুদ্যু হচ্চে এ নিয়ে আর কেউ মাথা ঘামাত না; বিয়ে দিয়ে, কি পণ্ডিত বিদেয় নিয়ে যে যার হকের টিকি মাথায় করে গুটি গুটি গ্রাম থেকে বেরিয়ে যেত।
কাজেই বুঝতেই পারছেন এ আসরে অনাদি ঠাকুরের মতন নিরীহ পুরুতের কতখানি পশার জমতে পারে। তানাকে এই ষষ্ঠীপুজো, মাকালপুজো, ইতু, মনসা—এই সব নিয়েই থাকতে হোত। এই সব ঠাকুর-দেবতাদের নিজের ভাগ্যেই বা কি জোটে যে পুরুত তাইতে ভালো করে ভাগ বসাবে বলুন? কলাটা মুলোটা যা পাওয়া যেত তাইতেই একরকম ক’রে দিন চলে যেত। বিয়ে-ছেরাদ্দ যদি কপালগুণে এক-আধটা জুটল বছরে, একটু কায়দা ক’রে ভেঁড়ে মুষে নে, সোজা আঙুলে তো ঘি বেরোয় না, তা সে-ক্ষ্যামতা তো ছিল না তানার। ফল কি হোত, না, যেখানে রিদয় ভচায্যি বসলে একজোড়া কাপড়, কি ননী পণ্ডিত বসলে একখানাই, সেখানে যদি অনাদি ঠাকুরকে ডাকলে তো মূল্য ধ’রে দুগণ্ডা পয়সাই দিলে ঠেকিয়ে—যেখানে একটা ঘড়া সেখানেও ঐ মূল্য—অবিশ্যি সে যা মূল্য তাতে একটা মাটির তিজেলও হয় না। দক্ষিণের কথাটা আর তুললুম না দা’ঠাকুর; কেউ দিলে হাত তুলে দুটো পয়সা, আবার যদি যেমন পাকা গিন্নি হোল তো বললে—ঐ মূল্য থেকেই কেটে নিও ঠাকুরমশাই, হাত একেবারে খালি এখন। ঘর কয়েক যজমানও ছেল, তা তাদেরও ঐ দেবার আগেই হাত খালি। আসল কথাটা হচ্ছে পেতে হ’লে নিতে জানতে হয়; এই আপনার গিয়ে চারকুড়ি বছর ধরে দেখছি তো দুনিয়াটার হালচাল, যদি নিতে জানেন তবেই পাবেন। এই দেখুন না, শিবঠাকুর তো সোজা ঠাকুর নন, দেবাদিদেব মহাদেব, তা দু’টো বিল্বিপত্র আর একঘটি জল ঢেলে দিয়েই খালাস আপনি; সে-হিসেবে মনসা তো কোথায় পড়ে আছেন?—কিন্তু দুধটুকু আর কলাটুকু বাদ দিন তো, আপনার বুকের পাটাখানা একবার দেখি!
অনাদি ঠাকুরের আয় বলতে এই। তবু যে কোনরকমে চলে যাচ্ছিল তার হেতু, পুষ্যি কম বাড়িতে; নিজে, পরিবার আর একটি মেয়ে, নিশ্চিন্দি। আমায় যদি ধরেন তো আমি ছিলুম একবেলার খদ্দের; ওনাদের একটা গোরু ছেল, সেটাকে মাঠে চরিয়ে আনতুম, দিনের বেলা একমুঠো পেসাদ পেতুম বামুন বাড়িতে। বয়স আমার এই ত্যাখন নয় কি দশ, এর বেশি নয়। তা যদি বললেন তো ঐ একমুঠোও কি গলা দিয়ে নামতে চাইত দা’ঠাকুর?—গোরুটাও কি ক’রে চিনে গেছল ঠাকুরমশাইকে, চেরকালটা সেবাই খেয়ে গেল, ভুলেও কখনও একটা এঁড়ে বাছুর দিয়েও উবগার করলে না।
তা না করুক, কষ্টে-ছিষ্টে একরকম ক’রে চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু শেষ পজ্জন্ত গিয়ে কাল হোল ওনার বিদ্যে।…আপনি চমকে উঠলেন—তা ওঠবারই কথা, কিন্তু যথার্থই বিদ্যেই হোল কাল। উনি যে আর সব শাস্তোর ছেড়ে ন্যায় নিয়েই পড়ে রইলেন কিনা, ঐ ন্যায়ই সারলে ওনার রফা। শাস্তোরটার কথা আপনি শুনেচেন কিনা জানিনে দা’ঠাকুর, আপনাদের এ-কালে আর আচেও কিনা জানিনে, তবে আমাদের কালে বেশ খানিকটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে গেচে। ন্যায় বলতে যতরকম অন্যায়, আর যতরকম অলবড্ডে কাণ্ড। কি যে শাস্তোরের মাথামুণ্ডু কিছুই বোঝা যেত না। যেমন ধরুন কাকতাল বলে একটা কথা বোঝাতেন ঠাকুরমশাই ছাত্তোরদের। অনেকদিনের কথা হোল তো দা’ঠাকুর—চারকুড়ি থেকে ঐ দশটা বছর বাদ দিন—ঠিক স্মরণ নেই, তবে জিনিসটে কতকটা যেন এই রকম, আবছা আবছা মনে পড়ছে, –ধরুন আপনি তালগাছের দিকে চেয়ে দাঁড়িয়ে আচেন, কোথাও কিছু নেই টুপ ক’রে একটি পাকা তাল মাটিতে পড়া। আপনাকে তখন ভাবতে হবে—এতক্ষণ তালটা ছেল কোথায়? তাহলে নিশ্চয় ঐ কাকটাই ডিম পেড়ে গেল। বুঝুন একবার শাস্তোর। লোকে তালগাছের দিকে হাঁ ক’রে দাঁড়িয়ে থাকবেই-বা কেন আর কাকটা মামুলী কাক না হয়ে দাঁড়কাকও হয় তো তার পেট থেকে অত বড় একটা…”
