পঞ্চম অধ্যায় – বেহেশত ও দোজখ
এক।। দোজখের বিবরণ
মহান আল্লাহ পাকের আনুগত্য ও দাসত্ব পরিত্যাগ করিয়া শয়তান ও কুপ্রবৃত্তির দাস সাজিয়া যে সকল জিন, ইনসান নিজেদের চালনা করে; আল্লাহ ও তাঁহার প্রেরিত মহাপুরুষ বা নবী ও রাসূলগণের সত্যতা অস্বীকার করিয়া শিরক বা অংশিবাদিতায় লিপ্ত হয়—তাঁহাদের হুকুম অমান্য করে, কিংবা তাঁহাদের নিষেধাজ্ঞার সামান্যতম তোয়াক্কা করে না।; মৃত্যুর পরে অনন্ত অসীম দীর্ঘ দিনের দুঃখ-দুর্দশার কথা এতটুকুও মনে না করিয়া ক্ষণিকের এ দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত হইয়া নিজেদের তাহাতে ভাসাইয়া দেয়, –দুষ্কৃতকারী অবাধ্য এ সকল জিন ইনসানের জন্য আল্লাহ তা’আলা ভীষণ শাস্তির ব্যবস্থা রাখিয়াছেন-আজাব দিবেন তিনি তাহাদেরকে সেখানে। এই জঘন্য আজাবের কোন পরিসমাপ্তি নাই-নাই কোনরূপ বিরাম। পবিত্র কোরআনের ভাষায় এ স্থানকেই বলা হয়- জাহান্নাম বা দোজখ।
এই জাহান্নাম বা দোজখে পাপীদের জন্য অনন্তকাল পর্যন্ত বিরামহীন ভাবে আজাব ও যাতনা চলিতে থাকিবে। ক্ষণিকের জন্যও সেখানে শান্তি নাই, সুখ নাই- আছে শুধু দুঃখ আর দুঃখ। চারিদিকে শুধু আত্ম- চীৎকার, হাহাকার, বিভৎস আর্তনাদ এবং হায় মাতমের ভয়ঙ্কর ধ্বনি। কোথাও বা যমকালো প্রজ্জ্বলিত অগ্নিসমূহ দাউ দাউ করিয়া জ্বলিতেছে। কোথাও বা উত্তপ্ত লূ হাওয়া শাঁ শাঁ করিয়া বহিতেছে, কোথাও আগ্নেয়গিরির মত প্রবল বেগে অগ্নিশিখাসমূহ উত্থিত হইতেছে। কোথাও প্রচন্ত শীতে জাহান্নামীদের আপাদমস্তক অবশ হইয়া আসিতেছে। কখনও শাস্তির অবতার যমকালো দৈত্যের মত ফেরেশতার তর্জন গর্জনে সমগ্র জাহান্নাম থর থর করিয়া কাঁপিয়া উঠিতেছে। কোথাও ক্ষতস্থান বিগলিত পূঁজ ও পচা রক্তের বন্যা বহিয়া যাইতেছে। কোথাও ফেরেশতাদের লাঠি ও গুর্জের আঘাতে জাহান্নামীদের অস্থি-মাংস চুরমার হইয়া উড়িয়া যাইতেছে। কোথাও পুঁজ রক্তের সমুদ্রে পাপীগণ হাবুডুবু খাইতেছে। কোথাও অগ্নির কাঁচি দ্বারা জিহবা কাটা হইতেছে।
কোথাও উট খচ্চরের মত বৃহদাকার সর্প ও বিচ্ছুসমূহ ফণা বিস্তার করিয়া ফোঁস ফোঁস করিতেছে, আর উহাদের দংশনে অভিশপ্ত পাপীগণ ভীষণ জ্বালা যন্ত্রণায় ছটফট করিতেছে। কোথাও উত্তপ্ত পানি পাপীদেরকে পান করানো হইতেছে, কাহারও বা মাথায় ঢালিয়া দেওয়া হইতেছে। ফলে উহাদের নাড়ী ভূড়ী আর মুখের মাংসসমূহ খসিয়া পড়িতেছে। কোথাও বিষাক্ত জাক্কুমের কড়াকাড়ি, কিংবা অগ্নিসমূহ কন্টকময় ঝাঁর ভক্ষণে জাহান্নামীদের গড়াগড়ি। সেখানে ফেরেশতাগণ নির্মম কঠোর-দয়া নাই, দাক্ষিণ্য নাই, নাই মায়া, নাই মমতা। আছে শুধু হাতে ডান্ডা, আগুনের ছড়ি, লোহার শৃঙ্খল হাতুড়ি, তর্জন গর্জন আর ঠাট্টা-বিদ্রূপ!
এইরূপ হাজার হাজার কিসিমের আজাব ও গজবে লিপ্ত হইয়া দোজখবাসীগণের চীৎকার আর্তনাদে
আকাশ-বাতাস জাহান্নামের প্রকম্পিত হইয়া উঠিবে। তদুপরি ফেরেশতাদের গর্জন ও জাহান্নামের ভীষণ হুঙ্কারে এমন এক কর্ণ বিদারক মহা হুলস্থুলপূর্ণ আওয়াজ উত্থিত হইবে যে, সুদীর্ঘ ৫০০ বৎসরের দূরত্ব হইতেও তাহা শ্রবণ করিলে কান ফাটিয়া যাইবার উপক্রম হইবে।
দোজখের স্তর ও সংখ্যা
পবিত্র কোরআন ও হাদীছ শরীফে দোজখের বহু সংখ্যক নাম পাওয়া যায়। তন্মধ্যে প্রধান সাতটির নাম :
প্রথম ছায়ীর : এই দোজখে যাহারা আল্লাহ তা’আলার বাণীসমূহ ও নিদর্শনসমূহকে অস্বীকার করিয়াছে, তাহারা শাস্তি ভোগ করিবে।
দ্বিতীয় লাজা : যাহারা যাকাত আদায় করে নাই, তাহারা উক্ত দোজখে শাস্তি পাইবে।
তৃতীয় ছাক্কার : যাহারা নামাজ আদায় করে নাই ও গরীব দুঃখীদিগকে অন্নদান করে নাই, তাহারা তথায় শাস্তি ভোগ করিবে।
চতুর্থ জাহীম : যাহারা আল্লাহর রাস্তা হইতে ঘাড় ফিরাইয়াছে ও ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার জিন্দেগীর লোভে জীবন উৎসর্গ করিয়াছে, তাহারা উক্ত দোজখে প্রবেশ করিবে।
পঞ্চম জাহান্নাম : যাহারা ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর কোন বান্দাকে হত্যা করিয়াছে, তাহারা তথায় শাস্তি পাইবে।
ষষ্ঠ হাবিয়া : বিভিন্ন প্রকার পাপে লিপ্ত হইয়া যাহারা বদ আমলের পাল্লাকে ভারী করিয়াছে, তাহাদের তথায় হইবে বাসস্থান।
সপ্তম হোতামা : যাহারা চোগলখুরী করিয়াছে, তাহারা উক্ত দোজখে শাস্তি ভোগ করিবে।
উপরি উক্ত সাতটি জাহান্নামেই দোজখীদের আজাব ও নির্যাতন হইতে থাকিবে। এছাড়া অন্যান্য প্রকার জাহান্নামও আছে। কোরআন পাকের ভাষায় এই গুলিকে দোজখের দরজা বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে। কোন স্থানে এইগুলিকে ‘স্তবক বা তবক’ও বলা হইয়াছে।
যেমন আল্লাহ বলেন-
দোজখ সাতটি দরজা বিশিষ্ট। প্রত্যেক দরজাতেই উক্ত পাপীদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন প্রবেশ পথ রহিয়াছে।’
হাদীছ শরীফে আছে, হজরত নবী করীম (ছঃ) ফরমাইয়াছেন : দোজখের সাতটি দরজা আছে। উহাদের মধ্যে একটি সেই সমস্ত লোকদের জন্য নির্দিষ্ট যাহারা অন্যায়ভাবে আমার উম্মতের উপর অস্ত্র ধারণ করিয়াছে।
জাহান্নামের সপ্ত তলা একের তলে আর,
ভোগবে কঠিন শাস্তি একেক কিছিম গুনাগার।
উপরি উল্লেখিত আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে, দোজখের সাতটি দরজা রহিয়াছে। সাত দরজা অর্থ সাতটি তবক (স্তর)। প্রত্যেক স্তরেই পাপ অনুসারে ভিন্ন ভিন্ন রকমের আজাবের ব্যবস্থা রহিয়াছে। কোন কোন তাফসীরকারগণের মতে সাতটি দরজাই বটে, তবে দোজখবাসীদের সংখ্যাধিক্যের দরুন একটি দরজা যথেষ্ট নহে বলিয়া ৭টি দরজার ব্যবস্থা করা হইয়াছে। আল্লামা ইবনে কাছীর হজরত আলী হইতে রেওয়ায়েত করিয়াছেন যে, তিনি হাতের ইশারায় বলিয়াছেন : দোজখের উপর নীচে ৭টি স্তর হইবে। প্রত্যেক স্তরেই বিভিন্ন দরজা হইবে।
এই সম্পর্কে আল্লাহ পাকের এরশাদ হইতেছে-
: নিঃসন্দেহে মোনাফেকগণ (কপটগণ) দোজখের একেবারে তলদেশে প্রবেশ করিবে।
লোক দেখান ঈমান—ওয়ালা-কপট মুনাফিক,
জায়গা এদের জাহান্নামের সবচে’ নীচে ঠিক।
এ উক্তি হইতে স্পষ্ট প্রমাণ হয়, দোজখের দরজাগুলি ছাড়াও উহার স্তর বা ‘তবক’ রহিয়াছে। এই স্তরগুলির একটি হইতে অপরটি ভয়ঙ্কর।
দোজখের গভীরতা ও প্রাচীর : হজরত রসূলে করীম (ছাঃ) ফর- মাইয়াছেন : দোজখ চারিটি বৃহৎ প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত রহিয়াছে। উহার প্রত্যেকটি প্রাচীরের বিরাট পুরত্ব-অতিক্রম করিতে ৪০ বৎসর সময় লাগিবে।
পোলসেরাত দোর্জখের উপর প্রতিষ্ঠিত-একথা পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহর হাদীছ হইতে ইহাই প্রমাণিত। তিনি দোজখের গভীরতা সম্বন্ধে ফরমাইয়াছেন : যদি একটি পাথর পোলসেরাত হইতে জাহান্নামের মধ্যে নিক্ষেপ করা হয়, তাহা হইলে উক্ত পাথর দোজখের তলদেশে পৌঁছিতে ৭০ বৎসর সময় লাগিবে।
হজরত আবু হোরাইয়া (রাঃ) বলিয়াছেন, আমরা একদিন হুজুরের খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। এমতাবস্থায় আমরা কোন একটি জিনিস পতিত হইবার বিকট শব্দ শুনিতে পাইলাম। তখন হজরত (ছাঃ) আমাদের প্রতি লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, তোমরা কি জান, ইহা কিসের শব্দ? আমরা উত্তর করিলাম, আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলই সবচেয়ে ভাল জানেন। তখন হুজুর উত্তর করিলেন, ‘আল্লাহতাআ’লা একটি পাথর দোজখের মুখ হইতে নীচের দিকে ছাড়িয়াছিলেন, অতঃপর উহা ক্রমাগত ৭০ বৎসর যাবৎ নীচের দিকে ধাবিত হওয়ার পর দোজখের তলদেশে পৌঁছে। ইহা জাহান্নামের তলদেশে ধাক্কা খাওয়া সেই পাথরের শব্দ।
দোজখের আগুন : দোজখীদের আজাবের অন্যতম উপকরণ আগুন। দুনিয়ার আগুনের সাথে এর কোন তুলনা হয় না। যদিও দুনিয়ার বা সাধা- রণ আগুনের দাহ্য বা পোড়ানো ক্ষমতা যথেষ্ট আছে এবং তা সম্পূর্ণ দাহ্য ক্ষমতা সম্পন্ন; তবুও দোজখের আগুনের তুলনায় তা সামান্যই। কারণ মহান আল্লাহতা’আলা উহার তীব্রতা বহুগুণে বৃদ্ধি করিয়া রাখিয়াছেন। আর তা এজন্যই যে, দোজখীদের পোড়ানোর ব্যাপারে তা যেন সফলতার সাথে কাজ করিতে পারে।
আল্লাহর রাসূল বলেন-
: দোজখের অগ্নিকে হাজার বৎসর উত্তপ্ত করার পর উহা লোহিত বর্ণ ধারণ করে দেখিতে উহা কটা লাল বর্ণের হয়। অতঃপর উক্ত অগ্নিকে আরও তীব্রতর অধিক দাহিকা ক্ষমতা সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে উক্ত আগুনকে আরও এক হাজার বৎসর কাল উত্তপ্ত করা হয়। ফলে তা অধিক তীব্রতর হইয়া শ্বেত-বর্ণ ধারণ করে। অতঃপর এই তীব্র দাহিকা সম্পন্ন আগুনকে সর্বাধিক তীব্র করার উদ্দেশ্যে পুনঃ এক হাজার বৎসর কাল তেজ করা হয়, ফলে উহা ঘোর কৃষ্ণ বর্ণ ধারণ করে এবং সর্বাধিক তেজোদীপ্ত দাহিকা স্বভাব সম্পন্ন হয়। বর্তমানে দোজখের আগুনের রং ঘোর কৃষ্ণ বর্ণের এবং দোজখও ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন কূপের ন্যায় রহিয়াছে। রাসূলে করীম (ছাঃ) অন্যত্র ইরশাদ করেন-
: ছাহাবাগণ! তোমাদের এ দুনিয়ার আগুন হইতে দোজখের আগুন সত্তর গুণ অধিক দাহিকা ক্ষমতা সম্পন্ন। ছাহাবাগণ হুজুরের পবিত্র জবানে ইহা শুনিয়া বলিলেন : ইহা রাসূলাল্লাহ! আমাদের এ দুনিয়ার আগুনই তো পোড়ানোর জন্য যথেষ্ট—এই দাহিকা সম্পন্ন আগুনইতো পোড়াইয়া ছারখার করিয়া দিতে পারে।’ উত্তরে হজরত রাসূলে করীম (ছাঃ) বলিলেন : বটে! তবুও দোজখীদের চরম আজাব দেওয়ার উদ্দেশ্যে উহাকে দুনিয়ার আগুন হইতে ঊনসত্তর গুণ অধিক ক্ষমতা সম্পন্ন করিয়া রাখা হইয়াছে।
দুনিয়ার আগুন ও দোজখের আগুনের দাহিকা ক্ষমতার তুলনা করিতে গিয়া রাসূলে করীম (ছাঃ) অন্যত্র ইরশাদ করিয়াছেন :
দুনিয়ার আগুন দোজখের আগুনের তুলনায় এতই শীতল ও আরামদায়ক যে, দোজখীদের যদি দুনিয়ার আগুনে নিক্ষেপ করা হয়, তবে তাহাদের নিদ্রা আসিবে।’
এতেই স্পষ্ট বুঝা যায় যে, দুনিয়ার আগুন দোজখের আগুনের তুলনায় কত নিম্নমানের দাহিকা সম্পন্ন। দুনিয়ার সাধারণ আগুনের সাথে দোজখের আগুনের তাই কোন তুলনাই হয় না।
তুলনামূলক দোজখীদের সবচাইতে নিম্নতর আজাবের একটি দৃষ্টান্ত দেখাইয়া নবী করীম (ছাঃ) বলেন-
: সবচাইতে কম আজাব সে ব্যক্তির হইবে যাহাকে একজোড়া অগ্নির জুতা পরানো হইবে। উহার ফিতাও হইবে আগুনের তৈরী। এই অগ্নি জুতার উত্তপ্ত দাহিকায় সে ব্যক্তির মস্তক টগবগ করিয়া ফুটিতে থাকিবে এবং চতুর্দিক দিয়া উহা বাহিয়া পতিত হইতে থাকিবে। সে ব্যক্তি যদিও মনে করিবে, ইহাই তাহাকে সর্বাধিক শাস্তি প্রদান করা হইয়াছে। কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে ইহাই তাহার সবচাইতে নগণ্য ও সামান্য আজাব।
দোজখের সর্প : দোজখবাসীদের আজাবের অপর উপকরণ হিসাবে সেখানে রাখা হইয়াছে অসংখ্য অগ্নি-সর্প। উহাদের আকৃতি বড় আকারের উটের ন্যায়। এই সকল সর্প একবার কোন দোজখীকে দংশন করিলে তার বিষক্রিয়া থাকিবে বহুদিন, বহু বৎসর এবং ক্ষতস্থান হইতে রক্ত প্রবাহিত হইতে থাকিবে দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর। জ্বালা-যন্ত্রণায় প্রাণ হইবে ওষ্ঠাগত। অনুরূপ বিরাট বিরাট বিচ্ছুও দোজখে থাকিবে ভরপুর। উহাদের আকৃতি খচ্চরের ন্যায় বিরাট। উহারাও একবার দংশন করিলে তার বিষক্রিয়া চল্লিশ বৎসর স্থায়ী হইবে।
আজাবের দৃষ্টাস্ত : দোজখের আজাবের দৃষ্টান্ত বুঝাইতে গিয়া রাসূলে করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেন-কেয়ামতের দিবস একজন দোজখের উপযোগী ব্যক্তিকে যে দুনিয়ায় সবচাইতে আরাম-বিলাসীতা ও সুখ- শান্তির জীবন অতিবাহিত করিয়াছিল এমন একজনকে একবার মাত্র দোজখের অগ্নিতে ডুবাইয়া আনা হইবে।
অতঃপর তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, হে আদম সন্তান! তুমি কি কখনও সুখ ও শান্তি বলিতে কিছু দেখিয়াছ? উত্তরে সে বলিবে : হে প্ৰভু, আমি কসম করিয়া বলিতেছি, সুখ বলিতে আমি কোন জিনিষ জীবনে কখনও দেখিতে পাই নাই বা অনুভব করি নাই।
অনুরূপ, একজন বেহেশতের উপযোগী ব্যক্তিকে যিনি দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে বেশী দুঃখি ব্যক্তি ছিল, তাহাকে বেহেশতের বাগিচা একবার মাত্র দেখাইয়া আনা হইবে। অতঃপর তাহাকে জিজ্ঞাসা করা হইবে, তুমি কি কখনও দুঃখ বা মুছীবত দেখিয়াছ? তদুত্তরে সে ব্যক্তি বলিবে : হে প্রভু, তোমার কসম খাইয়া বলিতেছি, আমি দুঃখ বা মুছীবত বলিতে কোন জিনিস জীবনে দেখি নাই।
এই সম্পর্কে রাসূলে করীম (ছাঃ) অন্যত্র ইরশাদ করিয়াছেন-’হে মানুষ সকল! তোমরা আপন গুনাহকে স্মরণ করিয়া কাঁদ। যদি তোমাদের কান্না না আসে তাহা হইলে কাঁদিবার ভান করিয়া কাঁদিতে থাক। কেননা দোজখীগণ দোজখের মধ্যে এতই কাঁদা কাঁদিবে, কাঁদিতে কাঁদিতে চক্ষের পানিতে বুক ভাসিয়া ঝরণার মত প্রবাহিত হইতে থাকিবে। এমন কি, তাহাদের চক্ষের পানি যখন শেষ হইয়া যাইবে তখন তাহারা রক্তের কান্না কাঁদিতে থাকিবে-চক্ষুতে ঘা হইয়া যাইবে। এমনকি চক্ষে রক্তের স্রোত এমনি প্রবাহিত হইবে যে, উহাতে কিস্তিও ভাসাইয়া দিলে ভাসিয়া বেড়াইবে।
দোজখী মানুষ আল্লাহ পাকের অভিশপ্ত মানুষ। তাদের আজাব যেমনি জঘন্য, অবস্থাও তাহাদের হইবে তেমনি কুৎসীত। এ বিষয়ে নবী করীম (ছাঃ) দৃষ্টান্ত দিয়া বলেন : যদি দোজখীদের ঘায়ের পুঁজ বা রক্ত একফোটা পরিমাণ দুনিয়ায় দেওয়া হইত, তবে তাহার দুর্গন্ধে সমস্ত বস্তু নষ্ট হইয়া যাইত।
দুনিয়ার গরম-ঠাণ্ডা দোজখের ক্রিয়া : শীত ও গ্রীষ্মকালের এই দুইটি পরিবর্তন আমরা এ দুনিয়ায় স্পষ্ট দেখিতে পাই; শীতকালে অনুভব করি তীব্র ঠাণ্ডা এবং গ্রীষ্মকালে অস্থির হই প্রচণ্ড গরমে। শীত ও গ্রীষ্মকালের এই যে পরিবর্তন, ইহাও দোজখের প্রভাবেই সম্পন্ন হইয়া থাকে। এর কারণ হিসাবে নবীয়ে করীমের একটি হাদীছ লক্ষণীয়। তিনি ইরশাদ করেন : ‘তোমরা গ্রীষ্মকালে জোহরের নামাজ সামান্য দেরী করিয়া পড়িবে, কারণ দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড গরম দোজখের গরমের প্রশ্বাস বিশেষ।
রাসূলের এ উক্তি হইতে প্রমাণ হয়, দুনিয়ার প্রচণ্ড গরম দোজখ হইতে আগত। হাদীছের ভাষায় একে দোজখের প্রশ্বাস বলা হয়। এ সম্পর্কে রাসূলে খোদা তাঁর সাহাবীদের লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন : দোজখের তেজ অত্যধিক বৃদ্ধি পাওয়ায় দোজখ আল্লাহর দরাবারে আরজ করিয়া বলিবে-
প্রভু হে, আমার দাহিকা ক্ষমতা এতই বৃদ্ধি পাইয়া গিয়াছে যে, এখন .আমার একাংশ বিগলিত হইয়া অপর অংশের সাথে মিশ্রিত হইবার উপক্রম হইয়াছে- একাংশ অন্য অংশকে গ্রাস করিয়া ফেলিতেছে; এখন আমি কি করিতে পারি? আমার কিছু স্বাভাবিক হইবার অনুমতি প্রদান করুন।
ইহাতে মহান আল্লাহ তাআ’লা দোজখকে বৎসরে দুইবার শ্বাস বা ভাপ ছাড়িবার অনুমতি প্রদান করেন। ফলে শীতকালে একবার, গ্রীষ্মকালে একবার, এই দুইবার শ্বাস বা ভাপ ছাড়িয়া থাকে। দোজখ গরমের দিনে যে শ্বাসি ছাড়িয়া থাকে উহা দোজখের গরম অংশের তাপেরই প্রতিক্রিয়া এবং শীতের দিনে যে শ্বাস ছাড়ে, তা দোজখের শীতল অংশের ভাপের প্রতিক্রিয়া।
বর্ণিত আলোচনায় আরেকটি বিষয় স্পষ্ট হইল যে, দোজখীদের আজাব ও যন্ত্রণা প্রদান কল্পে আগুন তথা গরম যে প্রকার উপকরণ, অনুরূপ শীতলও দোজখীদের আজাব প্রদানের বিশিষ্ট উপকরণ। আর এ জাতীয় আজাবের উপকরণ আগুনের দাহিকা উপকরণ হইতে কোন ক্রমেই নিম্ন মানের হইবে না।
জ্বিন ও মানব জাতির দুবৃত্ত পাপাচারিদের জন্য নির্দিষ্ট রহিয়াছে জাহান্নাম বা দোজখ। মানুষের সৃষ্টির মৌল উপকরণ মাটি। আর জ্বিন জাতের সৃষ্টির মৌল উপকরণ অগ্নি। সাধারণ কথা—সমজাতীয় বস্তুদ্বারা সমজাতীয় বস্তুকে আজাব বা কষ্ট দেওয়া দুরূহ—দিব্য দৃষ্টিতে তা প্রমাণও হয় না। যেহেতু জ্বিন জাতি আগুন বা গরম পদার্থ দ্বারা সৃষ্ট, তাই দোজখে উহাদের আজাব তার বিপরীত জাতীয় পদার্থ তথা ঠাণ্ডা বা শীতল জাতীয় জিনিসে হওয়া স্বাভাবিক ও যুক্তি সঙ্গত।
এ কারণেই কোন কোন বুজর্গ ব্যক্তিবর্গ বলিয়াছেন—জ্বিনদের ভীষণ ঠাণ্ডা জাতীয় বস্তু দ্বারা দোজখে আজাব দেওয়া হইবে। একই কারণে তাহারা এ কথাও বলেন যে, দুনিয়াতেও তাই উহারা শীতল স্থানে বসবাস করিতে পারে না এবং শীতল আবহাওয়াও তাদের অসহ্য। এ শ্রেণীর বুজুর্গবর্গ একই কারণে হত্যাকারীদের আজাবও জ্বিন সম্প্রদায়ের ন্যায় শীতল উপকরণ দ্বারাই দেওয়া হইবে বলিয়া অভিমত প্রকাশ করেন। কারণ, হত্যাকারীরাও অগ্নির ন্যায় উত্তেজিত হওয়া ব্যতীত অন্যকে হত্যা করিতে পারে নাই।
দোজখের জ্বালানী : আল্লাহর কুদরতেই সব কিছু সম্ভব। আর তা হইয়াও থাকে। দোজখ প্রজ্জ্বলনের জন্যও তাই কোন প্রকার জ্বালানীর প্রয়োজন হয় না; তবুও আল্লাহ পাক দোজখীদের সাবধান করিবার উদ্দেশ্যে দোজখের জ্বালানীর অন্যতম উপকরণ মানুষ ও পাথরের কথা কোরআন শরীফে উল্লেখ করিয়াছেন।
আল্লাহ পাক বলেন—
‘অকূদুহান্নাসু আল হিজারাহ’– মানুষও পাথর হইল দোজখের ইন্ধন জ্বালানী।
হিজর অর্থাৎ পাথর। পবিত্র আয়াতে বর্ণিত পাথর এখানে দুই প্রকার অর্থে ব্যবহৃত হইতে পারে। প্রথম অর্থ, যাহা বিখ্যাত ভাষ্যকার আবদুল্লাহ ইবনে মাছউদের বর্ণনা। তিনি বলিয়াছেন যে, পাথর দোজখের লাকড়ি ইন্ধন হইবে, উহা গন্ধকের তৈয়ারী পাথর। যেদিন আল্লাহতা’আলা আসমান-জমীন সৃষ্টি করিয়াছেন, সে দিন হইতেই উক্ত পাথর প্রথম আসমানে রক্ষিত হইয়াছে, উহা একমাত্র কাফেরদের শাস্তির জন্যই তৈয়ারী হইয়াছে। দ্বিতীয়তঃ অপর একটি বর্ণনায় বোঝা যায়, কাফেরগণ যে সকল পাথরের মূর্তি পূজা করিত, সেই সকল পাথর-মূর্তি দোজখের ইন্ধনরূপে ব্যবহার হইবে! আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
‘হে মোশরেকগণ! নিশ্চয় তোমরা এবং তোমাদের উপাস্য মা’বুদ সকল জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হইবে।’
হজরত ইবনে মাছউদ হইতে বর্ণিত আছে, হুজুর আকরাম (ছাঃ) বলিয়াছেন : হাশরের দিন দোজখকে সত্তর হাজার শৃঙ্খল দ্বারা টানিয়া আনা হইবে! প্রত্যেক শৃঙ্খলকে ৭০ হাজার ফেরেশতা ধরিয়া থাকিবে। হজরত ইবনে আব্বাস বলিয়াছেন—খোদা না করুক, যদি দোজখের শিকলসমূহ ফেরেশতাদের হাত হইতে ছুটিয়া যায়, তাহা হইলে ভালমন্দ নির্বিচারে সমস্ত লোককে সে গ্রাস করিয়া ফেলিবে, কেহই তার হাত হইতে রেহাই পাইবে না।
হাদীছ শরীফে আছে, কেয়ামতের দিবস দোজখের একটি বিশেষ ধরনের ঘাড় বাহির হইয়া আসিবে, যাহার দুইটি চক্ষু হইবে, যদ্বারা সে দেখিতে পাইবে এবং তাহার দুইটি কর্ণ হইবে, যদ্বারা সে শুনিতে পাইবে। এবং একটি মুখ হইবে যাহা দ্বারা সে বিভিন্ন কিসিমের কথাবার্তা বলিতে পারিবে।
দোজখের আজাবের ফেরেশতার সংখ্যা : দোজখীদের আজাবের জন্য নির্দিষ্ট রহিয়াছে উনিশজন ফেরেশতা। তাহারা ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর পাপীদের বিভিন্ন প্রকার আজাবের দায়িত্বে নিয়োজিত। অন্যথায়, দোজখীদের আজাবের জন্য একজন মাত্র ফেরেশতাই যথেষ্ট। কারণ তাহারা প্রত্যেকেই এতবড় মজবুত ও শক্তিশালী যে, মানব দানবের শক্তি তাহাদের কাছে কিছুই নহে।
কোরআন শরীফে বর্ণিত আছে—
‘আলাইহা তিসআতু আশারা’—দোজখে উনিশ জন ফেরেশতা নিযুক্ত রহিয়াছে।’
অন্যত্র আল্লাহ পাক বলেন—
‘তথায় শক্তিশালী ও মজবুত ফেরেশতাগণ নিযুক্ত রহিয়াছে। যাহারা আল্লাহর আদেশের বিন্দুমাত্রও অন্যথা করেনা বরং যাহা করিবার জন্য আদেশ করা হয়, তাহাই করিয়া থাকে।’
এ সম্পর্কে নবী করিম (ছাঃ) ইরশাদ করেন—দোজখের একজন মাত্র ফেরেশতার শরীরে সারা জাহানের জ্বিন এবং ইনসানের সমতুল্য শক্তি ও ক্ষমতা রহিয়াছে।
পাপীদের দোজখের আহ্বান : দোজখীদের তথায় নিক্ষিপ্ত হইবার পূর্বেই দোজখের বিকট হুঙ্কার তাহারা শুনিতে পাইবে। মনে হইবে, দোজখ তাহাদের উপর ভীষণ ক্ষেপিয়া আছে। আল্লাহ পাক এ সম্পর্কে হুশিয়ার করিয়া বলেন—
‘যাহারা আপন প্রভুকে অস্বীকার করে, তাহাদের জন্য জাহান্নামের কঠিন শাস্তি রহিয়াছে এবং উহা খুবই নিকৃষ্ট স্থান। যখন তাহারা উক্ত দোজখে নিক্ষিপ্ত হইবে, তখন তাহারা উহার ভীষণ হুঙ্কার শুনিতে পাইবে এবং উহা এ রকম টগ বগ করিতে থাকিবে যেন শীঘ্রই ভীষণ রাগে ফাটিয়া পড়িবে।
তফসীরে বয়ানুল কোরআনে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, হয়ত আল্লাহ তা’আলা দোজখের ভিতর রাগান্বিত হইবার এক অনুভূতি পয়দা করিয়া দিবেন, না হয় দৃষ্টান্ত স্বরূপ বলা হইয়াছে যে, দোজখের অবস্থা দৃষ্টে মনে হইবে যেন উহা ভীষণ রাগান্বিত হইয়াছে।
দোজখের হুঙ্কার দোজখীরা শুনিতে পাইবে দূর হইতে। যেমন বাজারের নিকটে পৌঁছিলে বাজারের শোরগোল শোনা যায়। কিন্তু দোজখীরা বন্ধন অবস্থায় অদূরে থাকিতেই দোজখের আহবান শ্রুত হইবে এবং তখন তাহারা মৃত্যুকে স্মরণ করা ব্যতীত আর কোন উপায় থাকিবে না।
এ সম্পর্কে আল্লাহপাক বলেন—
: যখন উক্ত দোজখ দূর হইতে জাহান্নামীদিগকে দেখিতে পাইবে, তখন তাহারা উহার বিকট শব্দ ও হুঙ্কার শুনিতে পাইবে। অতঃপর যখন তাহাদিগেকে বন্ধনাবস্থায় দোজখের কোন সঙ্কীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হইবে, তখন তাহারা শুধু মৃত্যুকে আহবান করিতে থাকিবে।’
দুনিয়ার বুকে মানুষ কোন বিপদগ্রস্ত হইলে যে রকম শুধু বলিতে থাকে, হায় মরিয়া গেলাম! হায় মরিয়া গেলাম! তদ্রুপ দোজখবাসীগণ ও বলিতে থাকিবে। কিন্তু তাহাদের চীৎকার ও আর্তনাদ কোন কাজেই আসিবে না। কেহই তাহাতে সাড়া দিবে না বা কর্ণপাত করিবে না। যদিও দোজখ প্রশস্ত স্থান, তবুও শাস্তির জন্য পাপীদিগকে মাঝে মাঝে সংকীর্ণ স্থানে রাখা হইবে।
ছুরায়ে মায়ারেজে আছে, আল্লাহ বলেন—
: দোজখ ঐ সমস্ত লোকদিগকে নিজের দিকে আহবান করিবে যাহারা হক রাস্তা হইতে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করিয়াছে এবং আল্লাহ তাআ’লার গোলামী হইতে মুখ ফিরাইয়াছে এবং অবৈধভাবে ধন সম্পদকে জমা করিয়া সংরক্ষিত করিয়াছে।’
দোজখীদের পরিসংখ্যান
পৃথিবীতে যত লোকের আগমন ঘটিয়াছে এবং ঘটিবে, তাহাদের মধ্যে এক হাজার লোকের মধ্যে নয়শত নিরানব্বই জন লোকই হইবে দোজখী। বাকী মাত্র এক জন যাইবে বেহেশতে। এ সম্পর্কে রাসূলে করীমের (ছাঃ) একখানা নাতিদীর্ঘ হাদীছ আছে, তিনি ইরশাদ করেন—
: দ্বিতীয়বার যখন হজরত ইস্রাফীল (আঃ) সিঙ্গায় ফুঁক দিবেন, তখন সমস্ত লোক হঠাৎ নিজ নিজ কবর হইতে উঠিয়া দাঁড়াইবে। অতঃপর তাহাদিগকে বলা হইবে যে, আপন প্রভুর সম্মুখে চল। ফেরেশতাদের প্রতি ফরমানে এলাহী জারী হইবে যে উহাদিগকে দাঁড় করাও, কারণ উহারা নিজ নিজ কৃত কর্মের বিষয় জিজ্ঞাসিত হইবেন। তখন আবার আল্লাহতাআ’লার আদেশ জারী হইবে যে, পাপীদিগকে পৃথক করিয়া ফেল। ইহাতে ফেরেশতাগণ বলিবেন, ‘ওহে পরওয়ারদেগার, কত জন মানুষ হইতে কত জন দোজখী বাহির করা হইবে?’ ইরশাদ হইবে : প্রতি হাজারে নয়শত নিরানব্বই জন দোজখীকে বাহির কর।’
অপর এক হাদীছে জীনা যায়, গরীব মুসলমান ও নারীর সংখ্যাই দোজখী হইবে অধিক। এ বিষয়ে হজরত (ছাঃ) বলেন—
: আমি দোজখের মধ্যে অভাবগ্রস্ত গরীব মুসলমানদের সংখ্যাই বেশী দেখিয়াছি। এ ছাড়া দোজখের মধ্যে নারীদের সংখ্যা দেখিয়াছি সৰ্বাধিক পরিমাণ।
দোজখীদের ছুরত ও আকৃতি : অধিক আজাব ভোগ করার জন্য বিরাট আকৃতি বিশিষ্ট হওয়া যুক্তিসংগত। কারণ আজাব হাড়ে হাড়ে পৌঁছানোর জন্য বিশাল দেহ হওয়া প্রয়োজন। দোজখীদের তাই দেহাকৃতি হইবে যেমনি বিশাল, ছুরতও হইবে তেমনি কুৎসিত। দেখিলে যে কেহর অভক্তি হইবে, ভীত হইবে দেখিলে তাহাদের বিরাটকায় আকৃতি। এ বিষয় হাদীছে বলা হইয়াছে—
হজরত নবী করীম (ছঃ) বলিয়াছেন : জাহান্নামী কাফেরদের এক বাহু হইতে অপর বাহুর দুরত্ব হইবে তিন দিনের পথ, যদিও তার উপর দিয়া কোন দ্রুতগামী ঘোড়া চলিয়া যায়। কাফেরদের সামনের দাঁত হইবে অহুদ পাহাড়ের মত বিরাট এবং তাহাদের শরীরের চামড়া তিন দিনের পথ বরাবর পুরু হইবে।’ অন্য একটি রেওয়ায়েতে দোজখীদের শরীরের চামড়া ৪২ গজ পুরু হইবে বলিয়া উল্লেখ আছে।
দোজখীদের ছুরত কেমন কুৎসিত ও কদাকার হইবে, এ সম্পর্কে কোরআন মজিদে স্পষ্ট বর্ণনা আছে, আল্লাহ বলেন-
: আর যাহারা পাপকার্যসমূহে লিপ্ত হইয়াছে, তাহাদের অপরাধের শাস্তি অপরাধ পরিমাণ হইতে থাকিবে এবং তাহাদিগকে এই ভাবে বেইজ্জত ও পর্যুদস্ত করা হইবে যে, আল্লাহর আজাব হইতে তাহাদেরকে রক্ষাকারী আর কেহই থাকিবে না। তাহারা এত বদছুরত হইবে যেন অন্ধকার রাত্রির তীব্র অন্ধকার তাহাদের মুখমণ্ডলকে ছাইয়া ফেলিয়াছে।’
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলিয়াছেন, যদি দোজখীদের মধ্য হইতে কোন ব্যক্তিকে দুনিয়াতে পাঠাইয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে তাহার ভয়ঙ্কর ছুরত ও দুর্গন্ধে দুনিয়ার সকল জীব জন্তু মরিয়া যাইবে। অতঃপর হজরত আবদুল্লাহ অনেকক্ষণ কাঁদিতে থাকেন।
এক সম্পর্কে কোরআন মজিদেও ব্যাখ্যা দেওয়া আছে। আল্লাহ তাআ’লা ইরশাদ করেন—
: অগ্নি তাহাদের মুখমণ্ডলকে এমনিভাবে জ্বালাইয়া দিবে যে, উহা সম্পূর্ণ বিকৃত হইয়া যাইবে।
নবীয়ে করীম (ছাঃ) অত্র আয়াতের ব্যাখ্যা প্রসংগে উল্লেখ করেন যে, দোজখীদের আগুনে এমনিতর জ্বালাই বিকৃত করিবে যে, তাহাদের উপরের ঠোঁঠ বিকৃত হইয়া মাথা পর্যন্ত উঠিয়া যাইবে।
এমনকি দোজখীদের জিহবা এত বড় হইবে এবং উহা টানিয়া বাহির করা হইবে, যাহার উপর দিয়া লোক হাটিয়া যাইতে সমর্থ হইবে। ইহার ব্যাখ্যা দিতে গিয়া রাসূলে করীম (ছাঃ) বলিয়াছেন—
: কাফেরগণ নিজ নিজ জিহবাকে একক্রোশ পর্যন্ত টানিয়া বাহির করিয়া ফেলিবে, যার উপর দিয়া মানুষ হাটিয়া যাইবে।
বিভিন্ন পাপে ভিন্ন ভিন্ন আজাব
রিয়াকারদের আজাব : ইবাদত পুণ্যের হইলেও যদি ইহার উদ্দেশ্যে লোক দেখানো হয়, তবে উহাকেই বলে রিয়া। ইহা এ ধরনের শিরক— মহা গুনাহের কাজ।
হুজুর আকরাম (ছঃ) বলিয়াছেন : ‘জুরুল হুজন’ অর্থাৎ চিন্তার কুপ হইতে তোমরা আল্লাহর দরবারে পরিত্রাণ চাও। ছাহাবারা জিজ্ঞাসা করিলেন, হুজুর! ‘জুরুল হুজন কি জিনিস? হুজুর উত্তর করিলেন, উহা দোজখের মধ্যে একটি গর্ত যাহা হইতে স্বয়ং দোজখই দৈনিক চারিশত বা আল্লাহর দরবারে পানাহা চাহিতেছে।’ ছাহাবারা বলিলেন, তাথায় কাহারা শাস্তি পাইবে? হুজুর উত্তর করিলেন, সেইসব ইবাদতকারী তথায় গমন করিবে, যাহারা লোকদের দেখানোর নিমিত্ত ইবাদত করিয়াছে।
মদখোরের আজাব : বুদ্ধিশূন্যতা মানবতা বিরোধী, মানবতা ও বিবেকশূন্য মানুষ সমাজে ঘৃণিত এবং আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে তাহার খেয়াল থাকে না আদৌ। মদের নেশায় মানুষ নির্লজ্জ ভাবে সব কিছুই করিতে পারে, এজন্যই ইহা পান করা মহা পাপ। এ প্রকার পাপের শাস্তি সম্পর্কে হুজুর আকরাম (ছাঃ) বলিয়াছেন : আল্লাহতাআ’লা আপন ইজ্জতের কসম খাইয়া ওয়াদা করিয়াছেন, আমার বান্দাগণের মধ্যে যে ব্যক্তি এক গ্লাস মদও পান করিবে আমি তাহাকে সেই পরিমাণ পুঁজ পান করাইব এবং যে ব্যক্তি আমার ভয়ে শরাব পান ত্যাগ করিয়াছে, আমি তাহাকে পবিত্র হাউজে কাউছার হইতে পান করাইব।’ হজরত আরও বলিয়াছেন, যে ব্যক্তি নিশার দ্রব্য পান করিবে, আল্লাহ তাআলা ওয়াদা করিয়াছেন যে, তাহাকে রোজ কেয়ামতে তীনাতুল খেয়াল পান করান হইবে। ছাহাবারা জিজ্ঞাসা করিলেন, হুজুর, তীনাতুল খেয়াল আবার কি জিনিস? হুজুর পাক উত্তর করিলেন— উহা দোজখবাসীদের ঘাম ও নিংড়ানো পুঁজ রক্ত।
হজরত আবু মূসা আশ’আরী হইতে বর্ণিত আছে, হুজুর (ছাঃ) বলিয়াছেন : যে ব্যক্তি শরাব পান করে ও সে অবস্থাই মৃত্যু মুখে পতিত হয়, আল্লাহ তাআ’লা তাহাকে নহরুল গোতা হইতে পান করাইবেন। ছাহাবারা উহার তথ্য জানিতে চাহিলে হুজুর উত্তর করিলেন : ‘উহা এমন একটি নহর যাহা ব্যভিচারী নারীদের লজ্জা স্থান হইতে প্রবাহিত কুৎসীত পদার্থ।
আমলহীন বক্তার আজাব : ‘যে ব্যাপার তোমার আমল নাই, তার নচীহত অন্যদের করিও না’ -আল্লাহর এ বাণীর বিরুদ্ধে গিয়া যারা মানুষকে উপদেশ খয়রাত করে, তাহাদের সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফর্মান : যে রাত্রে আমি মেরাজ গমন করি, সেই রাত্রে আমি কতগুলি লোককে দেখিয়াছি যে, তাহাদের ঠোঁট আগুনের কাঁচি দ্বারা কাটা হইতেছে। আমি জিজ্ঞাসা করিলাম, ভাই জিব্রাঈল, উহারা কাহারা? তিনি উত্তর করিলেন, উহারা আপনার ঐ সমস্ত উম্মত, যাহারা লোকদিগকে সৎকাজের আদেশ করিত অথচ নিজেরা তাহার প্রতি আমল করিত না এবং আল্লাহর কিতাব পড়িত অথচ তদরূপ আমল করিত না।
এ সম্পর্কে রাসূলে করীমের (ছাঃ) অন্য একটি হাদীছে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেখা যায়,, হাদীছটি সংগ্রহ করিয়াছেন ইমাম বোখারী ও মুসলিম। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ইরশাদ করেন— কেয়ামতের দিবস এক ব্যক্তিকে হাজির করার পর দোজখে নিক্ষেপ করা হইবে। সঙ্গে সঙ্গে তাহার পেটের ভিতরের নাড়ী ভূঁড়ি সব বাহির হইয়া পড়িবে এবং সেই ব্যক্তি উহার চারিদিকে এ রকম চক্কর দিতে থাকিবে, যে রকম গাধা ঘাণির চারিদিকে চক্কর দিতে থাকে। তাহার অবস্থা দেখিয়া অন্যান্য দোজখীরা তাহার চারি পার্শ্বে ভীড় জমাইতে থাকিবে এবং বলিতে থাকিবে—
ওহে হতভাগ্য। তোমার কি হইয়াছে, তুমি দুনিয়াতে ভাল কাজের জন্য আদেশ করিতে এবং মানুষকে মন্দ কাজ হইতে বিরত রাখিতে। তখন সে উত্তর করিবে, হাঁ, আমি তোমাদিগকে নেক কাজের আদেশ করিতাম অথচ নিজে উহার আমল করিতাম না। আর অন্যায় কাজ হইতে মানুষকে ফিরাইয়া রাখিতাম অথচ নিজে সেই অন্যায় আমল করিতাম।
অনুরূপ, ইলেম গোপনকারী আলেমের জিহবায় ও মুখে আগুনের লেগাম লাগানো হইবে। এ সম্পর্কে হজরত (ছাঃ) বলিয়াছেন : যাহার নিকট কোন মাছায়েল জিজ্ঞাসা করা হইয়াছে, অথচ সেই ব্যক্তি নিজের ইলেমকে গোপন রাখিয়া জানা সত্ত্বেও উত্তর দেয় নাই। কেয়ামতের দিবস তাহার মুখে আগুনের লেগাম পরান হইবে।
আত্মহত্যার আজাব : আত্মহত্যা মহা পাপ। কারণ ইহাতে আল্লাহর কাজে নাখোশ থাকার শামিল। এ সম্পর্কে রাসূলে করীম বলেন— যে ব্যক্তি পর্বত শৃঙ্গ হইতে পড়িয়া আত্মহত্যা করিয়াছে, সে দোজখের অগ্নির পর্বত হইতেও পড়িতে থাকিবে, ইহাতে তাহার কোন বিরাম হইবে না। আর যে ব্যক্তি বিষ পানে আত্মহত্যা হইয়াছে, সে দোজখের অগ্নিতে উক্ত বিষ সর্বদা পান করিতে থাকিবে। আর যে ব্যক্তি লৌহের কোন অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা হইয়াছে, সে উক্ত লৌহ অস্ত্র দোজখের অগ্নিতে নিজের পেটে বিদ্ধ করিতে থাকিবে।
অহংকারীর সাজা : অহঙ্কার শয়তানের স্বভাব! এই শয়তানী স্বভাব মানুষের দীন দুনিয়ার সুখ নষ্ট করে। দুনিয়ায় কোন ব্যাপারে তার শান্তি থাকিবে না। পরকালে আজাব সম্পর্কে হুজুর আকরাম (ছাঃ) ইরশাদ করেন— যাহারা অহঙ্কার ও গর্ব করিয়াছে, তাহারা পিপীলিকার মত ক্ষুদ্র শরীর নিয়া কেয়ামতের মাঠে উঠিবে।’ অবশ্য আকৃতি তাহাদের মানুষের আকৃতিই হইবে। অতঃপর হুজুর বলেন, চুতুর্দিক হইতে তাহারা বেইজ্জত হইতে থাকিবে, অবশেষে দোজখের জেলখানার দিকে চালিত হইতে থাকিবে, যাহার নাম বুলেছ। উক্ত বুলেছ নামীয় জেলখানায় এত কঠিন আগুনের ব্যবস্থা রহিয়াছে যে, যাহা অন্যান্য আগুনকে আগুনকে খাইয়া ফেলিয়ে পারে এবং তাহাদিগকে তীনাতুল খেয়াল— অর্থাৎ দোজখীদের নিংড়ান রক্ত, পুঁজ ও চর্বি ইত্যাদি খাওয়ান হইবে।’
অন্য একটি হাদিছে আছে—
দোজখে একটি ময়দানের নাম হাব-হাব। গর্বিত ও অহঙ্কারী ব্যক্তিগণকে তথায় শাস্তি দেওয়া হইবে।
দোজখীদের খাদ্য ও পানীয়
দোজখ যাতনা ও পাপীদের আজাবের ঘৃণিত স্থান। এখানে যাহা কিছু করা হইবে সবই যাতনা, দুঃখ ও আজাবের। তাদের পানাহারের বস্তু হইবে সেখানে আজাব। মর্মান্তিক যাতনার হইবে খাদ্য-পানীয়। নিম্নে উহার বর্ণনা দেওয়া গেল।
গরম পানীয় ও দ্বারী খাদ্য : দোজখীররা যখন ক্ষুৎ-পিপাসার জ্বালায় অস্থির হইবে, তখন তাহদের জন্য উত্তপ্ত পানি ও কন্টকময় খাদ্যের ব্যবস্থা করা হইবে। কোরআনের ভাষায় এই কন্টকময় খাদ্যকে ‘দ্বারী’ বলা হইয়াছে। দ্বারী নামক এই খাদ্য খাইলে ক্ষুধা নিবৃত্ত দুরের কথা কাটার যাতনায় ভক্ষণকারী হইবে দিগ্বিদিক জ্ঞান শূন্য।
আল্লাহ পাক বলেন—
: পান করানো হইবে দোজখীদের উত্তপ্ত নহরের পানি, খাওয়ানো হইবে দ্বারী জাতীয় অগ্নি কন্টক খাদ্য। এতে না আছে কোন প্রকার প্রাণ শক্তি, না হইবে ক্ষুৎ-পিপাসা নিবারণ।’
হেজাজে ‘দ্বারী’ নামীয় এক প্রকার কন্টকময় বৃক্ষ আছে, সেই বৃক্ষ এত কন্টকাকীর্ণ ও দুর্গন্ধযুক্ত যে, চতুষ্পদ জন্তু জানোয়ার উহার ধারে কাছেও যায় না। কারণ সেই গাছ ভক্ষণ করিলে জানোয়ার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়। এই আয়াত শরীফে ‘দ্বারীউন শব্দ দ্বারা আগুনের কন্টককে বুঝান হইয়াছে, যাহা উক্ত বৃক্ষ হইতেও তিক্ত ও বিষাক্ত এবং মৃত পশু হইতে অধিক দুর্গন্ধযুক্ত আর আগুন হইতে উত্তপ্ত, যাহা অধিক পরিমাণ ভক্ষণ করিলেও না পাইবে তাতে কোন প্রাণ-শক্তি, না নিবৃত্ত হইবে ক্ষুধা।
মায়ে হামীম : হাদীছের উক্তি হইতে জানা যায়, দোজখে ‘মায়ে হামীম’ বা উষ্ণ পানির একটি নহর আছে। উক্ত নহরের পানি এতই গরম যে, দোজখীরা পানির পিপাসায় অস্থির হইয়া আল্লাহর কাছে পানি পান করিতে আবেদন নিবেদন করিলে তিনি উক্ত উষ্ণ নহর হইতে পানি পান করিতে আদেশ করিবেন। দোজখীরা উক্ত পানি পান করিলে উষ্ণতার তীব্রতা হেতু তাহাদের উপেেরর ওষ্ঠ কর্ণ ও নাক পর্যন্ত উঠিয়া যাইবে। এবং নিম্নের ওষ্ঠ পেট ও নাভী পর্যন্ত ঝুলিয়া পড়িবে। শুধু কি তাই, ইহাতে দোজখীর নাড়ী ভুড়ী বিগলিত হইয়া গুহ্যদ্বার দিয়া বাহির হইতে থাকিবে। ওদিকে আওয়াজ আসিবে, ‘নিস্তার নাই, নাই নিস্তার।’
কবির জবানীতে শোনা যাক—
দোজখের এক কুপ তাহাকে মায়ে হামীম’ কয়,
সেই ভায়ানক কুপের পানি গরম অতিশয়।
দোজখবাসী কাতর হয়ে দারুণ পিপাসায়,
পানি পানি বলে যখন করিবে হায় হায়।
সেই যে কুপের পানি তখন তাদের এনে দিবে,
দোজখীরা পরম খুশীর সঙ্গে তাহা নিবে।
অথচ সে কুয়ার পানির এমনি গরম চোট,
উলটে যাবে কান বরাবর তাতে উপর ঠোঁট।
নিম্ন অধর পড়বে ঝুলে নাভির বরাবব,
নাড়ি ভুড়ি গলে গলে পড়বে অতঃপর।
আল্লাহ পাক বলেন—
: কাজেই অদ্য তাহার কোন অন্তরঙ্গ বন্ধু থাকিবে না, এবং ক্ষতস্থান হইতে গলিত পুঁজ, রক্ত ব্যতীত অন্যকোন খাদ্যও হইবে না যাহা একমাত্র পাপীষ্ঠগণ ভক্ষণ করিবে।’
জাক্কুম বিস্বাদ ফল : দোজখীদের আরেক শ্রেণীর খাদ্য হইল আরব দেশীয় জাক্কুম নামীয় কন্টকপূর্ণ বিস্বাদ ফল।
এ সম্পর্কে কোরআন মজিদে আছে, আল্লাহ পাক বলেন—
‘ইন্না শাজারাতাজ্জাক্কুম …………
: নিশ্চয় গোনাহগারদের খাদ্য হইবে গলিত তাম্রের ন্যায় জাক্কুম বৃক্ষ, যাহা পেটের ভিতর উত্তপ্ত পানির মত টগবগ করিতে থাকিবে।
জাক্কুমের পরিচয় দিয়া আল্লাহ আরও বলেন-
‘অতঃপর হে অবিশ্বাসী বিপথগামীগণ! নিশ্চয় তোমরা জাক্কুম বৃক্ষ হইতে খাদ্য গ্রহণ করিবে, যা দ্বারা তোমার আপন পেট ভর্তি করিয়া লইবে। শুধু কি তাই, উত্তপ্ত গরম পানিও পান করিতে থাকিবে, যেমন পিপাসিত ও তৃষ্ণার্ত উট পান করে। কেয়ামতের দিবস ইহাই হইবে তাহাদের মেহমানদারীর সামগ্রী।
জাক্কুম বৃক্ষ কেমন এবং চরিত্রই বা কি এবং উহার উৎপত্তি কোথা হইতে, দেখায় কেমন—ইহার বর্ণনা দিতে গিয়া আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন—
: নিশ্চয় উক্ত জাককুম এমন একটি বৃক্ষ যাহার উৎপত্তি দোজখের তলদেশ হইতে আর ইহার উপরিভাগ ঠিক যেন সর্পের ফনা।’
জাক্কুমের আরব দেশে এক বিখ্যাত তিক্ত-বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয়। এখানে উক্ত বৃক্ষের নাম শুধু বোঝান হইয়াছে। প্রকৃত পক্ষে জাহান্নামের সহিত উহার কোন তুলনাই হয় না। কারণ জাহান্নামের জাক্কুম দুনিয়ার জাক্কুম হইতে শত সহস্র গুণ বেশী তিক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত, উহা দেখিতেও কত বিশ্রি, দোজখবাসীগণ সেই বিষাক্ত বৃক্ষই ভক্ষণ করিবে। তদুপরি অত্যন্ত উষ্ণ পানিও পান করিবে। তাহাও আবার দুই এক ফোটা বা বিন্দুমাত্র নহে বরং পিপাসিত উষ্ট্রের ন্যায় ঘোঁত ঘোঁত করিয়া পান করিতে থাকিবে।
জাক্কুম ফলের বিশদ ব্যাখ্যা রাসূলে করীমের বিভিন্ন হাদীছ হইতে জানা যায়। একটি হাদীছে দেখা যায়—হুজুর আকরাম (ছাঃ) ফরমাইয়াছেন : জাককুমের একটি মাত্র ফোটা যদি দুনিয়াতে পতিত হয়, তাহা হইলে নিশ্চয় উহা তামাম দুনিয়াবাসীর সমুদয় খাদ্যকে বিষাক্ত করিয়া দিবে। এখন চিন্তার বিষয় এই যে, ঐ ব্যাক্তির কি অবস্থা হইবে যাহার খাদ্য হইবে একমাত্র জাক্কুম।
গাচ্ছাক বিস্বাদ খাদ্য : গাচ্ছাক অর্থাৎ দোজখীদের পঁচা দুর্গন্ধ পূজ এবং তাহাদের শরীরের জখম হইতে নির্গত রক্ত ও প্রবাহিত পঁচা পানি তাহাদের পানীয় দ্রব্যরূপে ব্যবহৃত হইবে, উহাই তাহাদের পান করিতে দিবে। আরো পান করিতে দিবে বিষাক্ত ঠাণ্ডা পানি।
আল্লাহ পাক বলেন— লা ইয়াজুকুনা ফীহা রারদাউ অলা শরাবা…… : তাহারা উক্ত দোজখসমূহের ভীষণ গরম পানি এবং গাচ্ছাক ব্যতীত কোন প্রকার ঠান্ড জিনিস অথবা পানীয় দ্রব্য পান করিতে পারিবে না।
গাচ্ছাক পানীয় এতই গরম যে, উহা দুনিয়ার গরম পানির সাথে কোনই তুলনা হয়না। এ সম্পর্কে নবীয়ে করীম (ছাঃ) বলেন—যদি এক বালতি পরিমাণ গাচ্ছাক দুনিয়ার বুকে ফেলিয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে সমুদয় দুনিয়াবাসী গলিয়া যাইবে।
ছুরায়ে মোজাম্মেলে আল্লাহ তাআ’লা ইরশাদ করেন :
: নিশ্চয় ঐ সমস্ত কাফেরদের জন্য আমার নিকট শিকলসমূহ এবং অগ্নির স্তুপ ও গলায় বিদ্ধ হইয়া যাইবার মত খাদ্য রহিয়াছে এবং আরো রহিয়াছে কঠিন আজাবের ব্যবস্থা।
ক্ষুৎ-পিপাসার দ্বারা আজাব : দোজখ দোজখীর আজাবের জন্যই নির্দিষ্ট। দোজখের বিভিন্ন আজাবের উপকরণের মধ্যে দোজখীদের তীব্র ক্ষু ৎ-পিপাসার জ্বালা-যন্ত্রণা একটি বিরাট আজাব। তাহাদের এতই তীব্র ক্ষু ৎ-পিপাসা লাগিবে যে, তাহার দরুন যা কিছু তাহারা খাবার জন্য সম্মুখে পাইবে, অখাদ্য হউক, কি কুখাদ্য সেদিকে তাহাদের অনুভুতি থাকিবে না, তাহাই খাইবে।
এ সম্পর্কে নাতিদীর্ঘ একটি হাদীছে নবী করীম (ছাঃ) বলিয়াছেন : ‘দোজখবাসীদের এত অধিক ক্ষুধা পাইবে যে, অন্যান্য আজাবের সমতুল্য তাহাও এক বিরাট আজাব হইয়া দাঁড়াইবে। ক্ষুধার জ্বালায় অস্থির হইয়া তাহারা যখন আল্লাহর দরবারে খাদ্যের জন্য ফরিয়াদ করিবে, তখন তাগাদিগকে অগ্নির কাঁটা দেওয়া হইবে, যাহা ভক্ষণ করিলে প্রাণ-শক্তি পাইবে না, মোটা-তাজাও হইবে না এবং ক্ষুধার জ্বালাও নিবারণ হইবে না। অতঃপর তাহারা ক্ষুধার যাতনায় অসহ্য হইয়া ছটফট করিতে ও খাদ্যের জন্য কাকুতি মিনতি করিতে থাকিবে।
পুনরায় তাহাদিগকে গলার ভিতর আটিয়া অনুরূপই কন্টকময় খাদ্য দেওয়া হইবে, যাহা যাইবে, উহাকে বাহির করিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করিবে, কিন্তু কিছুতেই কোন কাজ হইবে না বরং সেসব গলার ভিতর আরও শক্ত ভাবে আটকাইয়া যাইবে।
খাদ্য গলায় আটকাইয়া পড়িলে পানি পান করিলে যে উহা পেটে চলিয়া যাইত, দুনিয়ার এ রীতির কথা স্মরণ হইলে দোজখীরা তাহাদের গলায় বিদ্ধ খাদ্য পেট্রের ভিতরে প্রবেশ করানোর জন্য পুনঃ পানি, পানি বলিয়া চীৎকার করিতে থাকিবে। সুতরাং তাহাদিগকে লোহার পাত্রে উত্তপ্ত পানি দেওয়া হইবে। এই উত্তপ্ত লোহার পাত্রের পানি যখনই দোজখীদের সম্মুখে হাজির করা হইবে, তখনই তাহাদের মুখমন্ডলের সমস্ত মাংস খসিয়া পড়িবে। অপর দিকে পানি পেটের ভিতর প্রবেশ করা মাত্র পেটের যাবতীয় নাড়ী-ভুড়ী ও কলিজা গুর্দা টুকরা টুকরা হইয়া গুহ্যদ্বার দিয়া বিগলিত হইয়া বাহির হইয়া পড়িবে।
অখাদ্য ও কুখাদ্য দোজখীদের প্রধান খাদ্য। কিছু খাইতে চাহিলে তাহাদের উক্ত খাদ্য খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে হাজির করা হইবে। দেখিয়া শুনিয়া তাহারা তা খাইতে না চাহিলেও বলপূর্বক তা তাহাদের খাওয়ানো হইবে। এ হইতে ফিরিয়া থাকিবার দোজখীদের কোন উপায় থাকিবে না। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় তাহাদের উহা ভক্ষণ করিতে হইবে। ফলে তাহাদের ক্ষু ৎ-পিপাসা দূর হওয়াতো দুরের কথা, শুরু হইয়া যাইবে তাহাদের ভীষণ যন্ত্রণা ও অকথ্য আজাব।
এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
: সেই দোজখবাসীকে পুঁজ বিগলিত পানি পান করান হইবে যাহা সে ঘোঁত ঘোঁত করিয়া পান করিতে থাকিবে এবং ভীষণ কষ্টেই তাহা পেটের ভিতর প্রবেশ করিবে। আর চতুর্দিক হইতে মৃত্যুর বিভীষিকা তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিবে অথচ তাহার কোন মৃত্যূ হইবে না।’
হজরত আবু ওমামার সূত্রে জানা যায়, রাসূলে করীম (ছঃ) বর্ণিত আয়াতের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলিয়াছেন : পুঁজ বিগলিত বিষাক্ত পানি যখন জাহান্নামীদের সন্নিকটে রাখা হইবে, তখন তাহারা উহাকে ঘৃণিত বস্তু হিসাবে উপেক্ষা করিবে। অতঃপর যখন উহাকে আরও নিকটবর্তী করা হইবে, তখন তাহাদের মুখমন্ডল জ্বলিয়া ভস্ম হইয়া যাইবে এবং মাথার চামড়া খুলিয়া খসিয়া পড়িবে। অতঃপর যখন তাহা পান করিবে, তখন পেটের যাবতীয় বস্তু টুকরা টুকরা হইয়া পায়খানার রাস্তা দিয়া বাহির হইয়া পড়িবে।
আল্লাহ পাক বলেন—
: ‘তাহাদেরকে এইরূপ উত্তপ্ত পানি পান করান হইবে যাহা তাহাদের নাড়ীসমুহকে খন্ড বিখন্ড করিয়া দিবে।’
আল্লাহ আরো বলেন—
: দোজখীরা পানির জন্য আর্তনাদ করিতে থাকিলে তাহাদের তৈলের গাদের ন্যায় গাঢ় অথচ দুর্গন্ধ যুক্ত পানি দেওয়া হইবে, যাহাতে তাহাদের মুখমন্ডল জ্বলিয়া যাইবে। আহাঃ কতইনা নিকৃষ্ট পানীয়।’
আজাবের বিভিন্ন দিক
দোজখ কাফেরদের দুঃখ ও আজাবের স্থান, এ আজাব তাহাদের চলিবে অনন্তকাল—এতটুকু বিরাম হইবে না এ হইতে কোন দোজখীর। খাদ্য খাদকের বেলায় যেমনি আজাব হইবে, তেমনি আজাব হইতে থাকিবে বিভিন্ন আজাবের বস্তু দ্বারা।
যখন তাহারা তুষ্ণায় অস্থির হইয়া ছটফট করিবে ও পানির জন্য আর্তনাদ করিতে থাকিবে তখন তাহাদেরকে এ রকম পানি দেওয়া হইবে যাহা তৈলের গাদের মত বিশ্রী হইবে ও মুখমন্ডলকে জ্বালাইয়া ভন্ম করিয়া দিবে। উহ! উহা কত নিকৃষ্ট পানীয়।
এখানে কি কি রূপে এবং কিসের দ্বারা কি ভাবে আজাব করিবে তাহার মোটামুটি বর্ণনা দেওয়া যাইতেছে।
আগুনের পাহাড় : দোজখীদের আজাবের উপকরণের মধ্যে আগুনের পাহাড় একটি। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন—’অতি সত্বর, আমি তাহাকে সাউদ নামক পাহাড়ে উঠাইব।
এই আয়াতের সাউদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়া নবী করীম (সাঃ) বলেন— অগ্নির একটি পাহাড়ের নাম ‘সাউদ’। দোজখীদিগকে উহার উপর অনবরত ৭০ বৎসর যাবত উঠান হইবে। অতঃপর সেখান হইতে তাহাকে ফেলিয়া দেওয়া হইবে এবং পুনরায় ৭০ বৎসর যাবত নীচের দিকে পড়িতেই থাকিবে। এই ভাবে অনন্তকাল পর্যন্ত শাস্তি পাইতে থাকিবে।
দোজখের শিকল : দুনিয়ার কয়েদীদের যে প্রকার শিকল বা জিঞ্জির দ্বারা জেলখানায় আটক করে, তেমনি দোজখীদের আগুনের শিকল কড়া দিয়া বাঁধিয়া দোজখে নিক্ষেপ করা হইবে। উক্ত শিকল বহু শত গজ লম্বা। কোরআনের ভাষায় উহাকে সত্তর গজ লম্বা বলা হইয়াছে—
: ফেরেস্তাদের প্রতি আদেশ হইবে, তাহাকে গ্রেফতার কর এবং পরাইয়া দাও তাহাকে কয়েদির শৃঙ্খল। অতঃপর তাহাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ কর। আর উহাকে এইরূপ এক জিঞ্জিরে আবদ্ধ কর যাহা ৭০ গজ লম্বা হইবে।
তিরমিজি শরীফের একটি হাদীছে আছে, হজরত রাসুলে করীম (সাঃ) ইরশাদ করেন—
যদি রাং-এর একটি টুকরা প্রথম আসমান হইতে দুনিয়ার প্রতি ফেলিয়া দেওয়া হয়, তাহা হইলে উক্ত টুকরা সন্ধ্যা হইবার পূর্বে জমীনের বুকে পতিত হইবে। অথচ ইহা পাঁচশত বৎসরের রাস্তা। আর সেই রাং-এর টুকরা যদি দোজখের জিঞ্জিরের এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্তের দিকে ছাড়িয়া দেওয়া হয় তা হইলে পূর্ণ জিঞ্জিরের দূরত্ব অতিক্রম করিতে উহার দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর অতিবাহিত হইবে।
পঙ্গপাল উত্তপ্ত অগ্নিতে কাবাব করার উদ্দেশ্যে লোহার দন্ডে ভরিয়া যেভাবে কাবাব করা হয়, অনুরূপভাবে দোজখীদের গুহ্যদ্বার দিয়া জিঞ্জির ভরিয়া দিয়া আজাব দেওয়া হইবে।
এ কথার ব্যাখ্যা পাই আল্লাহ পাকের পবিত্র বাণী কোরআন মজিদের আয়াতে।
আল্লাহ পাক বলেন—
: নিশ্চয় আমি কাফেরদের জন্য শৃঙ্খলসমূহ ও জ্বলন্ত অগ্নি তৈয়ার করিয়া রাখিয়াছি।
দোজখীদের গুহ্যদ্বারে এ প্রকার জ্বলন্ত শিকল যে বিদ্ধ করা হইবে, তাহাও কোরআন মজিদে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া আছে।
আল্লাহ পাক সূরায়ে মু’মেনুনে ইরশাদ করেন-
: ক্ষণকাল পরেই তাহারা জানিতে পারিবে, যখন তাহাদের ঘাড়ে বেড়ী লাগাইয়া শৃঙ্খল দ্বারা ফেরেস্তাগণ সজোরে টানিতে টানিতে অগ্নি সমতুল্য তপ্ত পানির মধ্যে নিয়া যাইবে এবং পুনরায় সেই প্রজ্জলিত অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করিবে।
বিভিন্ন হাদীছের তথ্যে জানা যায়—দোজখবাসীগণ কোন একদিকে ঘোর কালো বর্ণ মেঘের আনা গোনা দেখিতে পাইবে, ফেরেস্তাগণ জিজ্ঞাসা করিবে, তোমাদের কি অভিপ্রায় আছে তাহা প্রকাশ কর। তখন তাহারা দুনিয়ার উপর কেয়াছ করিয়া বলিতে থাকিবে, আমাদের ইচ্ছা হইল এই মেঘমালা আমাদের উপর বর্ষিত হউক। সঙ্গে সঙ্গেই সে মেঘরাশি গর্জন সহকারে তাহাদের উপর বর্ষণ আরম্ভ করিবে। আর তথা হইতে বেড়ী, শৃঙ্খল এবং অগ্নি স্ফুলিঙ্গসমুহ নিক্ষিপ্ত হইতে থাকিবে। যা দ্বারা তাহারা জ্বলিয়া ছারখার হইয়া যাইবে এবং তাহাদের দুঃখ ও মুছিবত আরও অধিক পরিমাণে বাড়িয়া যাইবে।
এ বিষয় আরও জানা যায়, ভীষণ গরম পানিতে যখন দোজখবাসীদের গর্দান ধরিয়া ডুবাইয়া উঠান হইবে, তখন তাহাদের শরীরের সমস্ত মাংস খসিয়া পড়িবে এবং সারা অঙ্গের কঙ্কাল ও দুইটি চক্ষু ব্যতীত আর কিছুই থাকিবে না। অবশ্য পরে আবার মাংস ফিরিয়া পাইবে।
যেমন কোরআন মজিদে আছে, আল্লাহ বলেন—
: দোজখীদের চামড়া জ্বলিয়া খশিয়া পড়া মাত্র নূতন চামড়ার আবর্তন হইবে। কারণ এতেই নূতন নূতন আজাবের স্বাদ অনুভব হইবে।
এ সম্পর্কে হাদীছের তথ্যে জানা যায়, জাহান্নামীদের দৈনিক সত্তর বার পোড়ান হইবে এবং প্রত্যেকবার নূতন চামড়া পরানো হইবে। অন্য সূত্রে জানা যায়, সত্তর হাজার বার এ প্রকার করা হইবে। মোটকথা, বহুবারই তাদের চামড়া পোরানো হইবে এবং নূতন চামড়ার সৃষ্টি হইবে।
শুধু কি তাই, অগ্নি ফুটানো ভীষণ গরম পানি দ্বারাও দোজখীদের শাস্তি দেওয়া হইবে।
আল্লাহ পাক বলেন—
: তাহাদের মাথার উপর ভীষণ উত্তপ্ত পানি ঢালিয়া দেওয়া হইবে, যাহার দরুণ উহাদের পেটের ভিতরের যাবতীয় পদার্থ এবং শরীরের চর্মসমূহ গলিয়া যাইবে।
বিরাট বিরাট গুর্জ দ্বারাও দোজখীদের চরম শাস্তি দেওয়া হইবে। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—
: আর জাহান্নামীদিগকে শাস্তি দিবার জন্য লোহার গুর্জসমূহ রহিয়াছে। যখন তাহারা সেই কঠিন আজাব হইতে বাহির হইবার চেষ্টা করিবে, ফেরেশতাগণ তাহাদেরকে ধাক্কা দিয়া পুনরায় আজাবে লিপ্ত করাইয়া দিবে এবং উপহাস করিয়া বলিতে থাকিবে, জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের স্বাদ গ্রহণ করিতে থাক।
গুর্জ কত ভারী ও ভয়ানক তাহার দৃষ্টান্ত দিয়া নবী করীম (ছাঃ); ব্যাখ্যা করেন : জাহান্নামের একটি লৌহ গুর্জ যদি জমীনের বুকে রাখা হয়, তাহা হইলে দুনিয়ার সমুদয় জ্বিন ও ইনছান মিলিয়াও উহাকে উঠাইতে পারিবে না। অন্য একটি রেওয়ায়েতে আছে, জাহান্নামের একটি গুজ পাহাড়ের উপর মারিলে উহা ভষ্মে পরিণত হইয়া যাইবে।
দোজখীদের কত ধরণের শাস্তি দেওয়া হইবে তাহার কোন ইয়ত্তা নাই। সে সকল শাস্তির কথা মনে উঠিলে দুনিয়ার যাবতীয় সুখ-শান্তির কথা ভুলিয়া যাইতে হয়। কিন্তু বড়ই পরিতাপের বিষয়, কয়জনে সেদিকে খেয়াল করে। মানুষ যদি এদিকে সামান্য খেয়াল করিত, তবে এত পাপ পাঙ্কিল রাস্তায় গমন করিতে সাহস পাইত না। যা কিছু পাইত তাও আবার মানুষের গোপন দুশমন অভিশপ্ত শয়তান ও কুপ্রবৃত্তি বা নফছে শয়তানের প্রলোভনে তা মানুষ ভুলিয়া যাইতে বাধ্য হয়। এজন্য সর্বদা আল্লাহর দরবারে নিজের কৃত পাপের জন্য তওবা করা উচিত।
আজাব এতই করুণ হইবে যে, আজাবের জ্বালায় অস্থির হইয়া তাহারা গাধার মত আর্তচীৎকার করিতে থাকিবে।
কোরআন মজিদে আছে, আল্লাহ বলেন
: পাপীরা জাহান্নামে গাধার মত চীৎকার করিতে থাকিবে।
শয়তানের উপদেশ
দোজখীগণ দোজখে নিক্ষিপ্ত হইয়া নানা উপকরণীয় আজাবের বস্তুদ্বারা নিদারুণভাবে নির্যাতিত হইতে থাকিবে। এদিকে কাফেরদের (দোজখীদের) প্রধান গুরু শয়তান অগ্নি মঞ্চে উপবিষ্ট হইয়া তাহাদিগকে উচ্চৈঃস্বরে তাহার নিকট আহ্বান করিবে—’হে দোজখীগণ! তোমরা সকলেই আমার নিকট সমবেত হও, শেষবারের মত আমি তোমাদের দু’টি কথা বলিয়া যাই। ‘ দোজখীগণ শয়তানের এইরূপ আহ্বান শ্রবণ করিয়া ভাবিবে, হয়ত শয়তান আমাদের ত্রাণকল্পে কোন ফন্দি আঁটিয়াছে; না জানি শয়তান আমাদিগকে এই ভীষণ আজাব ও যন্ত্রণা হইতে মুক্তিদান করিতে পারে। এই ভাবিয়া দোজখবাসীগণ তাহার নিকট উপস্থিত হইবে। অমনি শয়তান গলায় খেকর দিয়া উপদেশ প্রদান করিতে আরম্ভ করিবে—
‘বন্ধুগণ। জানিয়া রাখ, আল্লাহ পাকই তোমাদের প্রকৃত বন্ধু ও মুক্তিদাতা। যুগে যুগে নবী রাসূলগণের দ্বারা তিনি তোমাদিগকে যে সকল প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন তাহাই সত্য। আর আমি তোমাদিগকে যাহা বলিয়াছিলাম তাহা মিথ্যা, চক্রান্ত বৈ অন্য কিছু ছিল না। সত্য বলিতে কি! প্রকৃতপক্ষে আমিই ছিলাম তোমাদের একান্ত শত্রু।’
আল্লাহ পাক তোমাদিগকে তাঁহার নির্দেশ অমান্য হেতু যে সব ভয় প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা তোমরা অদ্য হাড়ে হাড়ে অনুভব করিতেছ। কিন্তু আমি তোমাদিগকে যে সকল কার্যে অনুপ্রাণিত করিয়া কতগুলি মিথ্যা প্রবঞ্চনা দিয়াছিলাম, তাহা অদ্য পূরণ করার শক্তি আমার নাই। আমি নিজেই আজ তোমাদের পথের পথিক।’
‘হে দোজখবাসীগণ! তোমরা অদ্য বিপদে নিপতিত হইয়া আমাকে কোনরূপ দোষারূপ করিতে পার না। কেননা, আমি শুধু তোমাদিগকে অন্যায় পথ প্রদর্শন করিয়াছি, কিন্তু তোমরা স্বীয় ইচ্ছায়ই সেই পথে গমন করিয়াছ, ক্ষমতা প্রয়োগ করিয়া তোমাদেরকে সেই পথে ধাবিত করি নাই। তাই তোমরা নিজেদের বিপদ নিজেরাই টানিয়া আনিয়াছ, আমাকে দোষারোপ করিয়া কি লাভ? কাজেই স্বীয় আত্মার উপরই অনুতপ্ত হও।’
‘মনে রাখিবে, অদ্যকার এই শোচনীয় বিপদ হইতে তোমাদিগকে সাহায্য করার মত শক্তি আমার নাই, আর তোমরাও আমাকে আমার এই বিপদ হইতে কোনরূপ সাহায্য করিতে সক্ষম হইবে না। নিজ নিজ কর্ম- ফল আজ অবনত মস্তকে মানিয়া লইতে হইবে। অদ্য আর এখানে কোন প্রকার চক্রান্ত খাটিবে না।’
দোজখীগণ কুমন্ত্রণাদাতা শয়তানের এই নৈরাশ্যজনক উপদেশ শ্রবণ করিয়া একেবারে, হতভম্ভ হইয়া পড়িবে। তাহাদের সকল আশা ভরসা দিনের অবসানের পর রাত্রির অন্ধকারের ন্যায় হইয়া যাইবে।
অতঃপর দোজখীদের চিরদিনের জন্য দোজখের দুঃখ-কষ্ট ও যাতনা ভোগ করিতে হইবে। দোজখ হইতে বাহিরে আসিবার সামান্য কুমতলবটুকুও মন হইতে ধুইয়া যাইবে।
আল্লাহ পাক বলেন—
: আল্লাহর সাথে অংশীবাদিতার বিশ্বাসীদের জন্য আল্লাহ বেহেশত হারাম করিয়া দিয়াছেন তাহারা নিক্ষিপ্ত হইবে ভীষণ অনলকুণ্ডে। জালেমদের নাই কোন সাহায্যকারী।
কবির ভাষায়—
অদ্বিতীয় খোদার সাথে শরীক যারা করে,
সুখের বেহেশত তাদের লাগি হারাম চিরতরে।
চির দুঃখে দুঃখের জাহান্নামে হবে তাদের ঠাঁই,
অত্যাচারির জন্য কোন মদদকারী নাই।
গোমরাকারীদের প্রতি দোজখীদের অনিহা
এদিকে শয়তান মানুষকে আল্লাহ তা’আলার নির্দেশিত কাজ করা হইতে দূরে সরাইয়া দোজখের মহাবিপদে ফেলিয়া উক্ত প্রকার উক্তি করায় তারা বিক্ষুব্ধ হইল। অপর দিকে মানুষরূপী পথ ভ্রষ্টকারীদের প্রতিও দোজখীদের ক্ষোভের সীমা থাকিবে না। কারণ তাহারা তাহাদের অজ্ঞতা
ও মূর্খতার সুযোগ লইয়া বিপথগামী করিয়াছে। উহাদের এই ক্ষোভ ও দুঃখমূলক উক্তি কোরআন পাকে এ প্রকার উক্ত হইয়াছে, আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন—
: নিশ্চয় আমরা তোমাদের অনুসরণকারী ছিলাম। অদ্য কি তোমরা আমাদের থেকে আল্লাহ তাআ’লার কঠিন আজাবের বিন্দুমাত্রও লাঘব করিতে সক্ষম নহ?’
দোজখীদের এ প্রকার দুঃখ ক্ষোভের উক্তি শুনিয়া তাহাদের দোজখেই প্রবিষ্ট দোসর পথ প্রদর্শকরা উত্তর করিবে—
: তোমাদিগকে আমরা কি রক্ষা করিব। আজ আমাদেরও নিস্তার নাই, যদি আল্লাহ তাআ’লা আমাদিগকে হেদায়েত করিতেন আমরাও তোমাদিগকে সরল পথে চালিত করিতাম। আজ আমরা ধৈর্যাবলম্বন করি বা অধৈর্য হইয়া ছটফট করিতে থাকি, সবই আমাদের পক্ষে সমান। কারণ আমাদের কোন রক্ষা নাই।
নৈরাশ্যজনক এ উক্তি শুনিয়া জাহান্নামীরা অত্যধিক রাগান্বিত হইবে এবং তখনই গোমরাহকারীদের বিরুদ্ধে আল্লাহর দরবারে আরজ করিবে—
: হে আমাদের প্রভু! জিন ও ইনসানের মধ্যে যাহারা আমাদিগকে বিপথগামী করিয়াছে, তাহাদিগকে দেখাইয়া দাও যেন আমরা তাহাদিগকে পদদলিত করিয়া নিষ্পোষিত করিয়া ফেলিতে পারি। তবেইত তাহারা যথেষ্ট বেইজ্জত ও পর্যুদস্ত হইবে।
মালেক ফিরেশতার প্রতি নিবেদন
দোজখীরা বিভিন্ন আজাব ও যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হইয়া প্রথমতঃ দোজখ রক্ষী দারোগা ফেরেশতাদের নিকট তাহাদের দুঃখ-দুর্দশা, আজাব ও যন্ত্রণার কথা সবিনয় অবগত করিবে এবং তাহাদের প্রতি আল্লাহর দয়া প্রদর্শনের নিমিত্ত সোপারেশ ধরিবে, কিন্তু তাহাতে কোনই ফল হইবে না। কোরআনের ভাষায় তাহাই উল্লেখ রহিয়াছে, আল্লাহ বলেন—
: ‘হে দোজখের খাজেনগণ! আপনাদের প্রভুর নিকট আবেদন করুন, তিনি একদিনের জন্য হইলেও যেন আমাদের শাস্তিকে হালকা করিয়া দেন।
এ শ্রেণীর ফেরেশতা কেন, দোজখীদের কোন সোপারেশই আল্লাহর কাছে কেউ করিতে পারিবে না। তা গ্রহণযোগ্যও নহে।
এ কারণেই ফেরেশতাগণ উত্তর করিবে—
: তোমাদের নিকট আল্লাহ তাআ’লার প্রেরিত পয়গাম্বরগণ অকাট্য প্রমাণাদি নিয়া আসেন নাই? তাঁহারা কি তোমাদিগকে জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি পাইবার পথ দেখাইয়া দেন নাই?
জাহান্নামীরা উত্তর করিবে, ‘হাঁ, নিশ্চয়ই আনিয়াছে, কিন্তু আমরা তাহাদের কথায় কর্ণপাত করি নাই।’
দোজখের খাজেন বা রক্ষী ফেশেতাগণ তখন তাহাদের স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়া দিবেন—
: কাজেই আমরা তোমাদের জন্য কোন আবেদনই করিতে পারিব না বরং তোমরা স্বয়ং খোদার দরবারে প্রার্থনা কর। কিন্তু জানিয়া রাখিবে, নাফরমানদের আবেদন ও নিবেদন কোন কাজেই আসিবে না।’
দোজখীরা দোজখ-রক্ষী ফেরেশতাদের নিকট কোন প্রকার সাহায্যের আশা না পাইয়া অবশেষে দোজখের কর্তা ‘মালেক’ ফেরেশতার নিকট আবেদন জানাইবে এবং আরজি পেশ করিয়া বলিবে—
: হে মালেক ফেরেশতা! আপনি প্রভুর দরবারে প্রার্থনা করুন, তিনি মৃত্যু দিয়া যেন আমাদের শান্তির অবসান করিয়া দেন।
মালেক ফেরেশতার নিকট দোজখীরা এ আবেদনের জবাব সত্বর পাইবে না। এক হাজার বছর পরে যা-ও-বা পাইবে, তাও অত্যন্ত করুণ—দুঃখজনক।
এতে মালেক ফেরেশতা বলিবেন—
: তোমরা অনন্ত কালের জন্য এ অবস্থায়ই শাস্তি ভোগ করিতে থাকিবে। এখান হইতে বাহির হইবে না, মৃত্যুতেও পাইবে না।
দোজখীদের খোদার দরগাহে শেষ নিবেদন
দোজখীরা কাহারও কাছে কোন সাহায্য বা অনুরোধ করিয়া কোন ফল না পাইয়া অবশেষে তাহারা মহান দয়াময় আল্লাহ পাকের দরগাহে শেষ নিবেদন করার জন্য প্রস্তুত হইবে। এ উদ্দেশ্যে তাহারা পরস্পর পরামর্শ করিয়া সরাসরি আল্লাহর দরগাহে ফরিয়াদ করিবে। তাহারা এখন বুঝিতে পারিয়াছে, তাহাদের এই ভীষণ বিপদকালে মুক্তি দেওয়ার একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেহই নাই, ফরিযাদ শ্রবণ করিবার কেহই নাই। তাই তাহারা ফরিয়াদ করিবে—
: ‘হে আমাদের পরয়ারদেহার! যথাযথই আমাদের দুর্ভাগ্য ও বদনছীব আমাদিগকে ঘিরিয়া ফেলিয়াছিল এবং আমরা পথভ্রষ্ট ছিলাম! হে প্রভু! আপনি মেহেরবানী করিয়া আমাদিগকে এই দোজখের ভীষণ অগ্নি হইতে বাহির করুন। অতঃপর যদি কখনও আমরা ঐ রূপ গর্হিত কাজ করি তাহা হইলে নিশ্চয়ই আমরা জালেম ও অত্যাচারী সব্যস্ত হইবে।’
আল্লাহতাআ’লার তরফ হইতে উত্তর আসিবে –
‘দোজখে এ প্রকারই তোমাদের আজাব চলিতে থাকিবে, কথার অব তরণা করিবেন না।
অনন্তকাল তোমাদের সাজা হবে এই মত,
করিবনা কোন দয়া করিস না কোন বাত।
আল্লাহতাআ’লার এই বাণী শুনিবামাত্র জাহান্নামীরা তাহাদের প্রতি যে কোন প্রকারের ক্ষমা বা দয়ার ব্যবহার হইতে চির দিনের জন্য নিরাশ হইয়া যাইবে এবং অনন্তকাল পর্যন্ত আফছুছ ও হাহাকার করিতে থাকিবে, আর শুধু চীৎকার দিতে থাকিবে গাধার মত।
করবে কত কাঁদাকাটি জাহান্নামীগণ,
কত রকম করবে বিনয় আকুল নিবেদন।
কিন্তু কিছু কাজ না হবে সব হবে নিষ্ফল,
অনন্ত কাল আজাব ভোগবে পাপীর দল।
দুই : বেহেশতের পরিচয়
জান্নাতকে ফারসী ভাষায় বলে বেহেশত। বাংলা ভাষায় বেহেশত মানে উদ্যান বা বাগান। আমাদের সাধারণ জ্ঞানে মনোরম ও সুদর্শন একখানা বাগান তৈরি করিতে কতই না জিনিসের সমাবেশ করি। নিজের জ্ঞানে না কুলাইলে সাহায্য নেই অন্যের, প্রত্যক্ষ করি অন্যের তৈরি বাগানের নিপুণতা ও কারুকার্য।
আল্লাহ অসীম জ্ঞানী ও কর্ম-নিপুণ। তাঁর কর্ম নিপুণতা ও জ্ঞানের কাছে আমাদের জ্ঞান নেহাত তুচ্ছ, নাই বলিলেই হয়। এমন কর্ম কৌশল ও জ্ঞানের অধিকারী আল্লাহ যে বাগান বাড়ি বা বেহেশত তাঁহার বন্ধুদের মনোরঞ্জন ও অভ্যর্থনার নিমিত্ত তৈরি করিয়াছেন, তা কতইনা সুন্দর ও মনোহর হইতে পারে তা যে কোন শ্রেণীর বিবেকবানেরও অনুভব করা অসম্ভব। জ্ঞানের অনেক উর্ধে তার অনুধাবন করা।
এই অপূর্ব সৌন্দর্য বাগান বাড়ি বা বেহেশত মহান আল্লাহ পাক তাদের নিমিত্তই সৃষ্টি করিয়াছেন, যাহারা আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁহার প্রিয় রাসূল হজরত মুহাম্মদের (ছাঃ) উপর বিশ্বাস স্থাপন করিয়া কোরআন ও হাদীছের নির্দেশ মোতাবেক জীবন গড়িয়া তোলে এবং নিজের নফস ও কুচক্রি শয়তানের চক্রান্ত হইতে বাঁচিয়া থাকিবার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে, সেই সমস্ত ধার্মিক লোকদের জন্য পরম করুণাময় আল্লাহতাআ’লা পারলৌকিক জীবনে চির সুখময় ও পরম আনন্দদায়ক এক বাসস্থানের ব্যবস্থা করিয়া রাখিয়াছেন।
এই বেহেশতের রং-রূপ ও সৌন্দর্যের বর্ণনা করা মানুষের পক্ষে সাধ্যাতীত। তথায় অনন্ত মহাকালের চির বসন্ত বিরাজিত। চতুর্দিকে প্রশান্তি আর শান্তির ঢেউ খেলিতেছে। দুঃখ-সৈন্য ও অভাব-অনটন বা শাস্তির লেশ মাত্রও তথায় খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ভোগ- বিলাসের যাবতীয় সামগ্রী পর্যাপ্ত ও প্রচুর পরিমাণে তথায় বিদ্যমান রহিয়াছে। অতি মাত্রায় ভোগ করার পরেও যাহার কোন ইতি নাই, অন্তও নাই। কোথায় হাজার হাজার পাখীর মন মাতানো গানে স্বর্গের আকাশ বাতাস মুখরিত। কোথাও শত সহস্র প্রকার প্রস্ফুটিত ফুলের সুগন্ধি ও সৌরভে দিক দিগন্ত উদ্ভাসিত। আবার কোথাও প্রস্ফুটিত গোলাপের সুরভি সৌরভে আকুল হইয়া দলে দলে ভ্রমণগুলি গুনগুন রবে প্রেম ভিক্ষার আহলাদিত। কোথাও সুশীতল ও স্নিগ্ধ সুমধুর সমীরণ প্রবাহে জান্নাতবাসীদের মন প্রাণ আনন্দে পুলকিত। কোথাও সুমিষ্ট পানি ও শুভ্র দুগ্ধের ঝরণা।
কোথাও দাড়িম্ব সদৃশ উচ্চ বক্ষ ও কালকৃষ্ণ ডাগর চক্ষু বিশিষ্ট জোলায়খার মত প্রেম উন্মাদিনী হুরবালাগণের আপন আপপন স্বামীর প্রতি বাঁকা চাহনী। আর সেই চিরকুমারী মৃগ নয়না হুরগণের যৌবনের উত্তাল তরঙ্গে ভাসিয়া বেহেশতীদের অপরূপ দৃশ্য অথবা পালঙ্কোপরি উপবিষ্ট যুবক যুবতী স্বর্গোদ্যানের অপূর্ব শোভা সন্দর্শনে নিমগ্ন।
আবার কোন দিকে বিচিত্র পুষ্প-পতাকার ও মনমুগ্ধকর বেশ ভুষায় সজ্জিত হইয়া হুরবালাগণের ইতস্ততঃ বিচরণ; আবার কোন স্থানে দেখা যাইবে, গোল টেবিল বৈঠক আর বন্ধু-বান্ধবদের সাথে শরাবের মজলিস আর তাহাদের চতুষ্পার্শ্বে হাজার হাজার খাদেম ও গেলমান পেয়ালা এবং রেকাবী হস্তে দণ্ডায়মান। আবার কেহ কেহ বালাখানার জানালা দিয়া টি.ভি. সাক্ষাৎকারের মত কোটি কোটি মাইল দুরবর্তী জাহান্নামীদের জ্বালা-যন্ত্রণাময় জীবনের দৃশ্য অবলোকন করিতেছে। আবার কেহ কেহ স্বর্ণ, রৌপ্য ও ইয়াকুত নির্মিত পালঙ্কের উপর গির্দা তাকিয়া হেলান দিয়া শাহী হালতে আমোদ-আহলাদে মত্ত। অথবা অফুরন্ত খাদ্য সামগ্রী ও ফলমূল ভক্ষণে রীতিমত ব্যস্ত। আবার কোথাও চির আকাঙ্খিত আল্লাহর দর্শন লাভে বেহেশতীগণ বেহেশতের যাবতীয় হুর গেলমানের কথা ভুলিয়া এক মহা তৃপ্তিতে অভিভূত।
মোটকথা, বেহেশতের সেই অপরূপ সৌন্দর্য ও সুগন্ধির বাহার সুদীর্ঘ এক হাজার বৎসর দূরত্ব হইতেও অনুভূত হইবে এবং উক্ত স্থানে গমণের জন্য আল্লাহর মাহবুব বান্দাগণ প্রফুল্ল চিত্তে ব্যাকুল হইয়া পড়িবে। সেই অতুলনীয় সুখ সম্ভারে ভর্তি চিরসুখময় স্বর্গীয় বার্তা শুনিবার জন্য রাজা, প্রজা, ধনী-নির্ধন, দীন-দুঃখী এমন কি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানব গোষ্ঠিও যুগের পপর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী প্রবল উত্সুক হইয়া থাকে বেং উহার বর্ণনা শ্রবণ করিয়া কমজোর দুর্বল দেহে এক নববল পাইয়া ধর্মের প্রবল শ্রোতে আপনাকে ভাসাইয়া দেয় এবং স্বর্গীয় আনন্দে আনন্দিত হইয়া ধর্ম-কর্মে জীবনটাকে উৎসর্গ করে।
সেই মহাশান্তির ঘর পবিত্র বেহেশতের কিছুটা বর্ণনা হাদীছে কুদসীতে দেখা যায় :
আল্লাহ্ পাক বলেন—
: বেহেশতের মধ্যে আমি আমার নেককার বান্দাদের জন্য এইরূপ নেয়ামতসমূহ তৈয়ার করিয়া রাখিয়াছি যাহা কেহ কোন দিন চক্ষে দর্শন করে নাই বা কর্ণে শ্রবণ করে নাই অথবা কাহারও কল্পনায় তাহা আসে নাই।’
বেহেশতের সংখ্যা ও দরজা : বেহেশত সর্বমোট আটটি এবং বেহেশতের দরজাও আটটি, যথা :
প্রথম বেহেশত ‘দারুল জানান’ –এ বেহেশতটি শুভ্র মরওরীদ পাথরের তৈয়ারী।
দ্বিতীয় বেহেশত ‘দারুছ ছালাম’—উহা লাল ইয়াকুতের তৈয়ারী। তৃতীয় বেহেশত ‘জান্নাতুল মাওয়া’—উহা সবুজ জবরজ্বদ পাথরের তৈরী।
চতুর্থ বেহেশত ‘জান্নাতুল খোলদ’– উহা হলুদ রং মারজান পাথরের তৈয়ারী।
পঞ্চম বেহেশত ‘জান্নাতুল নাঈম’—উহা বিশুদ্ধ রৌপ্যের তৈয়ারী। ষষ্ঠ ‘জান্নাতুল ফেরদাউস’— উহার একটি ইট রৌপ্যের, একটি ইয়াকুতের, একটি জরজ্বদের এবং গারা মেশকের হইবে।
সপ্তম ‘জান্নাতে আদন’– উহা শুভ্র মূর্তির দ্বারা তৈরী। এই বেহেশত খানা সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বত্তোম। অন্যান্য বেহেশত হইতে ইহাই মনোরম। উহাতে আসমান ও জমিনের মধ্যভাগের সমতুল্য স্বর্যের বিরাট একটি দরজা আছে। উহার একটি ইট স্বর্ণের, একটি রৌপ্যের, মাটি আম্বরের। গারা মেশকের। এই বেহেশত হইতে উৎপন্ন নহরসমূহ অন্য সব বেহেশতের তলদেশ দিয়াই প্রবাহিত হইয়া গিয়াছে। উক্ত নহরসমূহের পানি বরফ হইতে ঠাণ্ডা, মধু হইতে মিষ্টি। উহাতে রাসূলুল্লাহর নহরে কাওছারও রহিয়াছে। আরও রহিয়াছে উহাতে নহরে কাফুর, নহরে তাসনীম, নহরে সালসাবীল, নহরে রাহীক, দুধের নহর ও মধুর নহর।
অষ্টম ‘জান্নাতুল ফিজা’। এ জান্নাত বা বেহেশত উদ্যানটি বেহেশতীদের বসবাসের জন্য নহে, ইহা জান্নাতীদের মিলন-বাগান। এখানেই মু’মেনদের সাথে আল্লাহর দীদার নছীব হইবে। ইহার অপর নাম ইল্লীয়ন।
বেহেশতের আটটি দরজা : হযরত ইবনে আব্বাস হইতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন—নিশ্চয় বেহেশতে প্রবেশ করিবার আটটি দরজা রহিয়াছে, যাহা রং-বেরং-এর মণি-মুক্ত, হিরা জোহরাত দ্বারা খচিত স্বর্ণের তৈয়ারী।
প্রথম দরজার মধ্যে লেখা রহিয়াছে, কালেমায়ে তাইয়্যেবা। উক্ত দরজা দিয়া নবী ও রাসূলগণ এবং শহীদ ও দাতা ব্যক্তিগণ প্রবেশ করিবেন।
দ্বিতীয় দরজা ঐ সমস্ত নামাজীদের জন্য, যাহারা আল্লাহ্ ও রাসূলের হুকুম মত নামাজ আদায় ও অজু পরিপূর্ণভাবে করিয়াছেন।
তৃতীয় দরজা জাকাত আদায়কারীদের জন্য, যাহারা আপন সম্পত্তির জাকাত হিসাব করিয়া আদায় করিয়াছেন।
চতুর্থ দরজা দিয়া ঐ সকল লোক প্রবেশ করিবে যাহারা লোকদিগকে সৎকাজের আদেশ দান করিত এবং অসৎ কাজ হইতে বিরত রাখিত।
পঞ্চম দরজা ঐ সকল লোকদের জন্য যাহারা আপন প্রভুর উদ্দেশ্যে আত্মার কামনা-বাসনা পরিত্যাগ করিয়াছেন।
ষষ্ঠ দরজা হজ্জ-ওমরা আদায়কারীদের জন্য।
সপ্তম দরজা ঐ সমস্ত লোকদের জন্য যাহারা আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করিয়াছেন।
অষ্টম দরজা দ্বারা ঐ সকল লোক প্রবেশ করিবে, যাহারা আপন চক্ষুকে নিষিদ্ধ বস্তুসমূহ হইতে বিরত রাখিয়াছেন এবং মাতাপিতার প্রতি সদ্ব্যহার করিয়াছেন, আপন আত্মীয় স্বজনের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রাখিয়াছেন এবং বিভিন্ন প্রকারের নেক আমল করিয়াছেন।
বেহেশতের পরিধি : বেহেশত যে কত বড়, কত বিশাল তাহা মানব জ্ঞানে উপলব্ধি করা অতিশয় দুরূহ। এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক যা বলিয়াছেন, তাহা হইতে আমরা কিছুটা অনুমান করিতে পারি।
আল্লাহ্ পাক বলেন :
: হে আমার বান্দাগণ! আপন প্রভুর নিকট ক্ষমা চাহিবার ও বেহেশত পাইবার জন্য দৌড়াইতে থাক, যাহার প্রস্থ হইবে আসমান ও জমীদের প্রস্থের সমতুল্য।
এই আয়াত পাকের মধ্যে পবিত্র বেহেশতের শুধু প্রস্থেরই বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে, দৈর্ঘ্যের কোন উল্লেখ নাই। ছাহাবাদের মধ্যে প্রখ্যাত মোফাচ্ছের হযরত ইবনে আব্বাস উক্ত আয়াতের অর্থ এইরূপপ করিয়াছেন যে, সপ্ত আসমান যদি একত্রে পাশাপাশি রাখা হয়, তাহা হইলে যতটুকু প্রস্থ হইবে, পবিত্র বেহেশতেরও ততটুকু প্রস্থ রহিয়াছে। এ সম্পর্কে প্রখ্যাত মুফাচ্ছের তাবারী আরও স্পষ্ট বলিয়াছেন— ‘আল্লাহ তাআ’লা জান্নাতকে সৃষ্টি করিয়া তখন আদেশ করেন যে, হে জান্নাত, তুমি দীর্ঘ হইয়া যাও।’ জান্নাত জিজ্ঞাসা করিল, ‘হে পরওয়ারদেগার, কতটুকু দীর্ঘ হইব।?’ উত্তর আসিল, এক লক্ষ্য বৎসরের দূরত্ব পরিমাণ দীর্ঘ হইয়া যাও।’ পুনরায় হুকুম হইল, ‘হে জান্নাত! তুমি লম্বা হইতে থাক।’ জান্নাত বলিল, কি পরিমাণ লম্বা হইব? আল্লাহ্ তা’আলা বলিলেন, আমার রহমত যেরূপ অনন্ত ও অসীম তুমিও তদ্রূপ অনন্ত ও অসীম হইয়া যাও। তারপর হইতে অনন্তকাল ধরিয়া বেহেশত ক্রমাগত লম্বাই হইতে থাকিবে। অতএব আল্লাহর রহমতের মত বেহেশতের কোন সীমারেখা নাই।
আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ প্রমাণ করিয়াছেন যে, সমগ্র সৌরজগতের দূরত্ব এক লক্ষ্য আলোক বৎসর। আলোর গতি প্রতি সেকেণ্ডে ১ লক্ষ ৮৬ হাজার মাইল। এরূপ দ্রুত গতিতে আলো দৌড়াইতে থাকিলে এক লক্ষ্য বৎসরে যতদূর পথ অতিক্রম করিবে, সমগ্র সৌরজগতের পরিধি ও ততটুকু। ইমাম তাবারীর প্রথম রেওয়ায়েত অনুসারে বুঝা যায়, বেহেশতের প্রশস্থতাও এক লক্ষ (আলোক) বৎসর। বৈজ্ঞানিকগণ ও আল্লামা তাবারীর মতের বেশ কিছুটা সামঞ্জস্য দেখা যায়।
এখন, আল্লাহ্ পাক বেহেশতের পরিধি সম্পর্কে বলেন—বেহেশতের প্রস্থ আকাশ ভূমির সমতুল্য। অথচ নব্য বৈজ্ঞানিকগণ মনে করেন যে, আকাশের অস্তিত্ব বলিতে কিছুই নাই। কিন্তু তাহাদের মনে করা উচিত যে, অনন্ত মহাশূন্য সৌরজগত বলিতে তাহারা যাহা কিছু উপলব্ধি করেন, কোরআন, হাদীস ও ইসলামী মাতানুসারে সেই মহাশূন্যের সাতটি স্তরের অপর নাম সপ্ত আকাশ। কাজেই এখন প্রমাণিত হইল যে, প্রকৃতপক্ষে তাহাদের মতে ও আমাদের বিশ্বাসে বিশেষ কোন পার্থক্য নাই।
বেহেশতীগণের আকৃতি প্রকৃতি : বেহেশবাসীগণের রূপ লাবণ্য কেমন, তাহাদের আকৃতি-প্রকৃতিই বা কি? পবিত্র কোরআন ও হাদীসের তথ্যে আমরা যাহা পাই, তাহাই নিম্নে বর্ণনা দেওয়া হইল। হাদীস শরীফে আছে, নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করেন—
: যদি বেহেশতের কোন লোক উকি মারিয়া বাহিরের দিকে দৃষ্টিপাত করিত এবং তাহার কোন অলঙ্কারের সৌন্দর্য বিকশিত হইয়া পড়িত তাহা হইলে সুর্যের আলোক এইভাবে বিলীন হইয়া যাইত, যেভাবে সূর্যের আলোকে সমগ্র আকাশের গ্রহ নক্ষত্রসমূহ বিলীন হইয়া যায়।
এ সম্পর্কে নবী করীম (ছাঃ) ইরশাদ করিয়াছেন, তিনি বলেন—
: নিশ্চয়ই বেহেশতবাসীগণের শরীরে কোন লোম হইবে না এবং দাঁড়ি গোফবিহীন, কাজল বর্ণ চক্ষু বিশিষ্ট, তেত্রিশ বৎসর বয়স্ক যুবক। তাহাদের যৌবনের কোন পরিবর্তন আসিবে না এবং তাহাদের পরিধানের বস্তুসমূহে কোন প্রকার জীর্ণতা আসিবে না।
বেহেশতের সমস্ত পুরুষও সম বয়স্ক হইবে; অর্থাৎ হযরত ঈসা (আঃ)-এর মত তেত্রিশ বৎসর বয়স্ক হইবে এবং শরীরের উচ্চতা হযরত আদম (আঃ)-এর মত তাঁহারই হাতের পরিমাণ ষাট হাত লম্বা হইবে।’ হযরত ইউসুফ নবীর মত অপরূপ সুন্দরের অধিকারী হইবে। তাহাদের জ্যোতির্ময় চেহারার সম্মুখে চতুর্দশীর পূর্ণচন্দ্রও হার মানিয়া যাইবে। হযরত মোহাম্মদ মোস্তফার (ছাঃ) মত চরিত্রবান হইবে। সকলের অন্তর একই অন্তরের সমতুল্য হইবে। কাহারও অন্তরে হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা, অহঙ্কার অপবিত্রতা কিছুই থাকিবে না। তাহাদের কণ্ঠস্বর হইবে দাউদ নবীর মত মনতামানো ও চিত্ত হরণকারী সুমধুর। মুখে কোন দাঁড়ি গোঁফ হইবে না। নাকে ও বগলে কোন ময়লা জমিবে না।
বেহেশতীদের পরিসংখ্যান
উম্মতে মোহাম্মদীর সংখ্যাই বেহেশতে হইবে সর্বাধিক। একটি হাদীসে আছে, হুজুর (সঃ) বলেন—
: জান্নাতবাসীদের সর্বমোট একশত বিশ কাতার হইবে। তন্মধ্যে একমাত্র উম্মতে মোহাম্মদীর আশি কাতার হইবে। বাকী চল্লিখ কাতার অন্যান্য নবীদের উম্মত্ব দ্বারা গঠিত হইবে।
বেহেশতে প্রত্যেকের জায়গার পরিমাণ : পবিত্র বেহেশতে বেহেশতীগণ কে কতটুকু স্থান পাইবে, তা অনুমান করা মানব জ্ঞানের বাহিরে। হাদীসের তথ্যে জানা যায়, সর্বনিম্ন মর্যাদার বেহেশতী এ দুনিয়ার দশটির সমান স্থান লাভ করিবে।
এই হাদীসের উপর সন্দেহ করিবার অবকাশ নাই—করিলে সে বেঈমান হইয়া যাইতে পারে। উক্ত হাদীসের সত্যতা সম্বন্ধে বিজ্ঞান সম্মত একটি অকাট্য যুক্তিও রহিয়াছে। যুক্তিটি এই যে, বৈজ্ঞানিকগণ প্রমাণ করিয়াছেন, সূর্য পৃথিবী হইতে তের লক্ষ গুণ বড় অথচ বিশাল আকাশ- মণ্ডলীতে উহাকে একটা থালার মত দেখায়। এখন দেখা যায় যে, সূর্যের সমপরিমাণ বেহেশত, প্রত্যেককে দশটি দুনিয়ার পরিমাণ দেওয়া হইলে এক লক্ষ তিরিশ হাজারেরও অধিক লোককে দেওয়া চলে। আর এই প্রকার কোটি কোটি সূর্যকে একত্র করিলেও বোধ হয় সপ্ত আকাশের সমতুল্য হইবে না। কাজেই যে বেহেশতের প্রস্থই হইল সপ্ত আসমান ও জমীদের সমতুল্য সে ক্ষেত্রে সৃষ্টির শুরু হইতে শেষ পর্যন্ত যত লোক জন্মলাভ করিয়াছে ও করিবে, তাহাদের সকলকে যদি ঐ পরিমাণ বেহেশত বন্টন করিয়া দেওয়া হয়, তবুও বেহেশতের স্থান শেষ হইবে না। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন-
সুবিশাল রাজ্য মহা মহিম সমরাট,
যে দিকে তাকিবে দেখিবে দিগন্ত বিরাট।
এখানে আল্লাহ্ তা’আলা স্বয়ং বেহেশতকে বিশাল বলিয়া আখ্যা দিয়াছেন, উহা কতই না বিশাল হইবে তাহা তিনি ব্যতীত কেহই উপলব্ধি করিতে পারিবে না।
বেহেশতে প্রবেশের আগে
হিসাব নিকাশান্তে সকল মানুষ পোলসেরাত পার হইবার নির্দেশ পাইবে। পোলসেরাতের নিম্নে দোজখ আর তাহার অপর পারে বেহেশত। বেহেশতীগণ এই পোলসেরাত পার হইয়া কি দেখিবে এবং সেখানে কি- বা আছে, সে সম্পর্কে নবী করীমের (ছাঃ) বাণী হইতে যাহা কিছু জানা যায় তাহা হইল—
: . পোলসেরাতের অপর পার্শ্বে বিরাট বৃক্ষ ও বিশাল বিস্তীর্ণ ময়দান রহিয়াছে। এই বিরাট বৃক্ষের তলদেশ হইতে দুইটি করিয়া নহর প্রবাহিত হইয়া বৃক্ষের ডান ও বাম দিকে বহুদূর চলিয়া গিয়াছে। আল্লাহর আদেশে মো’মেন ব্যক্তিগণ এলাহীর আদালত হইতে আগমন করিয়া ভীষণ তৃষ্ণাতুর হইবে। বিশেষতঃ কেয়ামত ময়দানে সূর্যের অগ্নি রচিত গরমে তৃষ্ণার্ত হইয়া উক্ত নহরদ্বয়ের যে কোন একটি নহর হইতে সুস্বাদু পানি পান করিবে। পানি যখন তাহাদের বক্ষ পর্যন্ত পৌঁছিবে, তখনই আল্লাহ্ পাক এই পানির বদৌলতে তাঁহাদের যাবতীয় কালিমা দূর করতঃ অন্তঃকরণ পবিত্র ও উজ্জ্বল করিয়া দিবেন। উক্ত পানি যখন তাঁহাদের পাকস্থলী পর্যন্ত পৌঁছিবে, তখন তাঁহাদের শরীরের রক্ত, মল-মূত্র দূরীভূত হইয়া একজন বেহেশতী স্বভাবের লোকে পরিগণিত হইবে। কেননা, বেহেশী লোকের শরীরে দুনিয়ার মানুষের ন্যায় অপবিত্র রক্ত ও মূল- মূত্রের অস্তিত্ব থাকিবে না আদৌ।
অতঃপর তাহারা অপর নহরটির পানি দ্বারা গোসল করিবে, ইহাতে তাহাদের চেহারা পূর্ণ চন্দ্রের ন্যায় উজ্জ্বল, হালকা ও নরম এবং সমস্ত শরীর মেশকের মত সুগন্ধি যুক্ত হইয়া যাইবে।
পানি দ্বারা করলে গোলস সে পাক নহরের,
দীপ্ত কোমল চন্দ্ৰ বদন হইবে তাহাদের।
শরীর হবে সবল সুঠাম ঝলমলিবে নূর;
করবে তাহা মৃগনাভীর সুগন্ধে ভরপুর।
ইহার পর তাহারা আর দুনিয়ার মানুষের ন্যায় স্বভাব চরিত্রে পশুর স্বভাবের থাকিবে না—দেখাইবে না দুনিয়ার মানুষের ন্যায় কুৎসীত। তৎপর তাহারা বেহেশতের নিকটবর্তী হইয়া বেহেশতের দরজা খটখটাইতে আরম্ভ করিবে, অমনি বেহেশত হইতে অপূর্ব সুন্দরী ও রূপবতী হুরগণ তাহাদিগকে অভ্যর্থনা করিবার জন্য বেহেশতে দরজার নিকট উপস্থিত হইবে। বেহেশতের হুর গেলমানগণ তাহাদিগকে দেখিয়া অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইবে এবং তাহারা তাহাদের নিজ নিজ স্বামীগণের গলায় গলা লাগাইয়া ও মুখে মুখ লাগাইয়া বলিতে থাকিবে—
বেহেস্তেরী তোরণ দ্বারে হুরবালারা এসে,
জানাইবে সুস্বাগত মধুর হাসি হেসে।
গলায় গলা মিলাইয়া গালের সাথে গাল,
বলবে তোমার এন্তোজারে ছিলাম এত কাল
এস এস প্রিয় সখা এস মোদের সনে,
রাখব সদা বেঁধে তোমায় মধুর আলিঙ্গনে।
‘হে আমাদের প্রিয়সাথী! এতদিন আমরা আপনাদের অপেক্ষায় চাতকের ন্যায় তাকাইয়া ছিলাম! মনে রাখুন—আমরা আপনাদের চিরসাথী বন্ধু, আমরা কখনই আপনাদের ব্যবহারে অতীষ্ঠ হইব না। চলুন— আপনাদের আগমনের অপেক্ষায় বহুদিন পূর্বেই আপনাদের জন্য খাট পালংকে ফুলবিছানা সাজাইয়া রাখিয়াছি।’ এই বলিয়া হুর গেলমানগণ তাহাদিগকে আপন শয়নগৃহে নিয়া যাইবে। এই শয়নগৃহ অপূর্ব সৌন্দর্য। উহার মধ্যে বহু সংখ্যক সুন্দর খাট-পালংক ফুলবিছানার দ্বারা সুসজ্জিত রহিয়াছে। প্রত্যেকটি খাট-পালংকের উপর আবার এক একজন রূপবতী সুন্দরী যুবতী; তাহারা কোমর পর্যন্ত চুল ঝুলাইয়া নানা রকম সুন্দর সুন্দর মূল্যবান গহনা ও পোশাক পরিচ্ছদ পরিধান করতঃ বেহেশতবাসীগণের ভোগ বিলাসের জন্য অপেক্ষায় বসিয়া থাকিবে। এই সকল হুর গেলমানদের রূপের এত বাহার যে, তাহারা স্তরে স্তরে পোশাক পরা সত্ত্বেও শরীরে হাড়-মাংস ভেদ করিয়া হাড়ের মগজ পর্যন্ত দৃষ্টমান হইবে। যেমন ভাল্ব কাঁচ ভেদ করিয়া নির্দিষ্ট স্থান আলোকিত করে। ইহা ছাড়া তাহাদের একগাছি চুল এত উজ্জ্বলময় যে, যদি অমাবস্যার রাত্রেও তাহাদের একগাছি চুল জমীনে ফেলা হয়, তবে সমস্ত পৃথিবী দিনের ন্যায় আলোকিত হইয়া যাইবে। মোটকথা, তাহাদের একগাছি লোমের কিরণ সূর্যের রশ্মির হইতেও অধিক আলোকময়।
এতদ্ব্যতীত আল্লাহ্ পাক এই সকল হুরগণের চক্ষু হরিণের চক্ষুর ন্যায় ইয়াকুত ও মারজান নামক সৌন্দর্যযুক্ত পাথরের দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন। হুরগণ তাহাদের এই সকল চক্ষু দ্বারা দুনিয়ায় একবার তাকাইলে দুনিয়ার সমস্ত মানব-দানব তাহাদের প্রেমে পাগল হইয়া যাইত। কিন্তু তাহারা এইরূপ অকৃত্রিম প্রেমাসক্ত নহে। এমন কি, বেহেশতে থাকিয়াও তাহাদের নির্দিষ্ট স্বামীগণ ব্যতীত অন্য কাহারও দিকে দৃষ্টিপাত করিবে না। আর তাহাদের জন্য আল্লাহ্ পাক যে সকল স্বামী নির্ধারিত করিয়াছেন, উহারা ব্যতীত তাহাদিগকে ইতিপূর্বে কোন মানব-দানব স্পর্শ করিতে পারে নাই। তাহাদের স্বামীগণ যখন ফুল শয্যায় মধুর মিলন হইতে অবসর গ্রহণ করিবে, তখনই তাহারা নূতন স্পর্শহীনা নবউত্থানকারিণী যুবতীর ন্যায় হইয়া যাইবে।
হুরীরা সব রূপেরাণী, অনন্ত যৌবন,
কুসুম কোমল অঙ্গে তাদের রইবে অনুক্ষণ।
বদন যেন চন্দ্র, না না, চন্দ্রিমা কোন ছার,
বিশ্ব মাঝে নাই তুলনা সে রূপ চেহারার।
মৃগ-নয়ন দৃষ্টি তাহার মাদকতায় ভরা
গ্রীবাখানি মরাল সম পরান আকুল করা।
বিজলী সম মুখের হাসি চিকন কটিদেশ,
অপূর্ব এক শোভায় ভরা মাথার দীঘল কেশ।
বক্ষখানা রূপের খনি চকমকে দর্পণ,
বেহেস্তীরা করবে তাতে চেহারা দর্শন।
অঙ্গ জুড়ে নামছে তাদের রূপ লাবণীর ঢল,
পাহাড়িয়া ঝর্ণা সম সর্বদা চঞ্চল।
মায়ায় ভরা আবেগ আকুল মিষ্টি মুখের ভাষা,
হৃদয় ভরা পাগল করা প্রণয় ভালবাসা।
এমনি সেরূপ কোনই মিছাল নাইক সে রূপের,
নাই তাহার এক শতাংশ রূপ ধরার মানুষের।
পড়ত যদি ধরায় তাদের একগাছি কেশ খসি,
মলিন হত তাহার শোভায় ধরার রবি শশী।
একটু থুথু যদি তারা ফেলত ধরার পরে,
সারা জগত মৃগনাভীর গন্ধে যেত ভরে,
একটি নজর চক্ষু তুলে চাইলে ধরার পানে,
পাগল হত সকল মানুষ সেইযে রূপের টানে।
যাহার লাগি তৈরী যেজন তাহার আগে কেহ,
সৃষ্টি কুলের মধ্যে কভু ছোয়নি তাদের দেহ।
বেহেস্তীরা হইবে যেমন এদের অনুরাগী,
তারা তেমন ব্যাকুল সদা তাদের মিলন লাগি।
হোকনা যত মিলন কিম্বা কাটুক না কাল যত,
সর্বদাই থাকবে এরা নব বধুর মত।
বেহেশতের সাতটি গোলাকার দেয়াল বা প্রাচীর আছে। তন্মধ্যে প্রথমটি শধু রৌপ্য দ্বারা নির্মিত এবং দ্বিতীয়টি রৌপ্য ও স্বর্ণ-মিশ্রিত পদার্থ দ্বারা ও তৃতীয়টি শুধু স্বর্ণ দ্বারা নির্মাণ করা হইয়াছে। এইরূপে চতুর্থ পঞ্চম ও ষষ্ঠ, দেয়াল জমরূদ নামক অমূল্য পদার্থ দ্বারা তৈয়ার করা হইয়াছে। বেহেশতের নিকটতম সমস্ত প্রাচীর নূর দ্বারা তৈয়ার করা হইয়াছে যেন বেহশতীগণ স্বীয় স্থানে থাকিয়া আনন্দিত মনে কাল যাপন করিতে পারে। এই সমস্ত প্রাচীরের প্রত্যেকটির দুরত্ব পরস্পর বহুশত ব ৎসরের রাস্তা। ইহাতে মানসপটে কিছুটা অনুভতি আসিতে পারে, আল্লাহ বেহেশতকে কত বিশাল আকারে তৈয়ার করিয়াছেন।
বেহেশতী লোকদের চক্ষের ভূ, পিছি ও মাথার কেশ ভিন্ন সমস্ত শরীরে কোন প্রকার লোম থাকিবে না। কিন্তু পুরুষগণের সামান্য ধরনের গোঁফের নমুনা থাকিবে, যেরূপ -অল্প বয়স্ক ছেলেদের যৌবনের প্রারম্ভে সামান্য মাত্র গোঁফের রেখা পড়িয়া থাকে। বেহেশতের হুরগণের শরীর এত পরিষ্কার হইবে যে, বেহেশতী পুরুষগণ দর্পণের পরিবর্তে তাহাদেরকে দর্পণ হিসাবে ব্যবহার করিবেন।
দুনিয়ার মানুষ যেরূপ চল্লিশ বৎসরের পরে বার্ধক্যে উপনীত হয়; বেহেশতবাসীগণ বেহেশতে থাকিয়া দৈনন্দিন রূপে-গুণে সৌন্দর্যশালী যুবক হইয়া উঠিবেন; এমন কি দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যকিদের ন্যায় শত শত, লোকের শক্তি এক একজন বেহেশতী লোকের হইয়া উঠিবে। তাহারা শুধু শক্তিতে যুবক হইয়া উঠিবে তাহাই নহে, বরং পানাহারে, স্ত্রী সহবাসে ইত্যাদিতেও তাহারা অতিমাত্রায় শক্তিশালী হইয়া উঠিবে।
সেথায় সদা কবরে বিরাজ অনন্ত যৌবন,
অসুখ বিসুখ ‘বুড়াপায়ী’ আসবেনা কখন।
সেই খানেতে বর্ষা কিংবা নাইক গরম-শীত,
বসন্তকাল চিরটিকাল সেথা উপস্থিত।
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করিয়াছেন— যখন বেহেশতবাসীগণ ফলমূলাদি খাইয়া পরতুষ্ট হইবেন, তখন তাঁহারা পুনঃ খাইতে ইচ্ছা করিবেন। অমনি বেহেশতের খাদেমগণ ও গেলমানেরা মুক্তা-জহরত, স্বর্ণ-রৌপ্য এবং বিভিন্ন কিমতি অংখ্য খানচা ও পাত্রাদি ভর্তি করিয়া নানা কিসেমের ও রূপ রঙ্গের স্বাদ ও গন্ধের ফলমূলাদি, খাদ্য-সামগ্রী এবং নানা ধরনের পানীয় বস্তু লইয়া হাজির হইবে।
আল্লাহ্ পাক বলেন—
‘বেহেশতের খাদেমগণ বেহেশতীগণের সম্মুখ দিয়া স্বর্ণ রৌপ্য নির্মিত বর্তন ও পেয়ালার মধ্যে নানা রকমের খাদ্যাদি লইয়া তাঁহাদের চতুষ্পার্শ্বে ঘুরিবে, যাহার মধ্যে তাঁহাদের অভিপ্রায় ও চক্ষু শীতলকারী খাদ্যাদি মওজুদ থাকিবে!
সাথে নিয়ে সোনা-রূপার পেয়ালা ঝিকমিক,
গোলাম সকল বেহেশতীদের ঘুরবে চারিদিক।
থাকবে তাতে মনের মত চোখ জুড়ান খানা,
(খাইবে তাহা বেহেশতীরা করবে আমিরানা)।
এই সকল পেয়ালা ও বরতনে নানা রকমের যেসব সুস্বাদু খাদ্যাদি মওজুদ থাকিবে, তাহা কোন বাবুর্চি নিজের হাতে রান্না করে নাই, বরং আল্লাহর আদেশ মতে প্রস্তুত হইয়াছে। বেহেশতের খাদেমগণ এই সকল অভিনব খাদ্যাদি লইয়া উপস্থিত হইয়া বলিবে, ‘হে আল্লাহর বান্দাগণ! এই সকল খাদ্যাদি হইতে আপনাদের যাহা ইচ্ছা পানাহার করিতে পারেন। বেহেশতবাসীগণ ইহা শুনা মাত্র তাহাদের চির-সংগিণীগণকে লইয়া আহার করিতে বসিবেন।
এই সকল তৃপ্তিদায়ক খাদ্য খাদক আহার করিয়া বেহেশতীগণ যখন তৃপ্তি লাভ করিবেন, তখন আবার এক প্রকারের পাখী তাহাদের চুতম্পার্শ্বে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বলিতে থাকিবে- ‘আমরা অমুক সৌন্দর্যময় ময়দানে চড়িয়াছি, অমুক সুমিষ্ট কূপের পানি পান করিয়াছি, তাই আমরাও ভক্ষণ করিতে অত্যন্ত সুস্বাদু।’ বেহেশতীগণ ইহা শুনা মাত্র পুনঃ উহা খাইতে ইচ্ছা করিবে। অমনি ঐ সকল পাখী ভূনা গোশতে পরিণত হইয়া খাঞ্চায় আসিয়া পড়িবে। বেহেশতবাসীগণ উহাকেও অতি আনন্দ সহকারে খাইতে থাকিবে।
হাদীস শরীফে আছে, বেহেশতবাসীগণ যত ইচ্ছা ফলমল খাইবে, কিন্তু তাহাতে তাহাদের মল-মূত্র ত্যাগ করিতে হইবে না বরং খাদ্যাদির ত্যাজ্য জিনিগুলি সুগন্ধি ঘর্ম এবং ঢেকুর দ্বারা নিঃশেষিত হইয়া যাইবে।
যত খুশী খাইবে সেথায় নানা রকম খানা,
হইবেনাক কভু তাতে পেশাব ও পায়খান।
উঠবে ঢেকর, বাহর হবে ঘর্ম সুবাসিত,
এতেই আবির ক্ষুধা তাদের পাইবে আগের মত।
মোটকথা, আল্লাহ্ পাক তাঁহার মোমেন বান্দার সুখ ভোগের জন্য বেহেশতে যে সকল নেয়ামত প্রস্তুত রাখিয়াছেন, তাহা কোন মানব উপলব্ধি করিতে পারে না এবং কলম দ্বারা প্রকাশ করা সম্ভবপর নহে! তবে আল্লাহর বাণী কোরআন শরীফের সামান্য এক টুকরা আয়াত এবং একটি হাদীসে কুদসী হইতে আমরা বুঝিতে পারি যে, বেহেশতের নেয়ামতসমূহ সকল নেয়ামত হইতে শতগুণ পার্থক্য রহিয়াছে।
মোটকথা, আল্লাহ্ পাক তাঁহার মো’মেন বান্দার সুখ ভোগের জন্য বেহেশতে যে সকল নেয়ামত প্রস্তুত রাখিয়াছেন, তাহা কোন মানব উপলব্ধি করিতে পারে না এবং কলম দ্বারা প্রকাশ করা সম্ভবপর নহে! তবে আল্লাহর বাণী কোরআন শরীফের সামান্য এক টুকরা আয়াত এবং একটি হাদীসে কুদসী হইতে আমরা বুঝেতে পারি যে, বেহেশতের নেয়ামতসমূহ সকল নেয়ামত হইতে শতগুণ পার্থক্য রহিয়াছে।
আল্লাহ্ পাক বলেন—
: আল্লাহ্ পাক মো’মেনদের জন্য বেহেশতে কি যে চক্ষু শীতকারী নেয়ামত প্রস্তুত রাখিয়াছেন, তাহা আল্লাহ্ পাকই অবগত।
চোখ জুড়ান কত নে’মাত সেথায় আছে তার,
আল্লা ছাড়া হিসাব নিকাশ কেউ জানেনা আর।
আল্লাহ্ পাক আরও বলেন-
: আমার প্রিয় নেককার বান্দাদের জন্য বেহেশতে যে সব নেয়ামত প্রস্তুত রাখিয়াছি, তাহা কোন মানব চক্ষে দেখে নাই, কানে শোনে নাই, এমনকি তাহার উপলব্ধি পর্যন্ত কোন মানুষ করিতে পারে নাই।
(হাদীসে কুদসী)।
কবির ভাষায় শোনা যাক—
নেক বান্দাদের তরে বেহেশত মাঝার,
যত নেয়ামত আমি করেছি তৈয়ার।
কোন আঁখি সে সকল কভু দেখে নাই,
তাহার বান কোন কান শোনে নাই।
এমন কি মানুষের খেয়ালেও তাই,
আসিতে পারেনা, আর কভু আসে নাই।
বেহেশতের সৃষ্টি কৌশল ও নেয়ামত
বেহেশত সৃষ্টির কৌশল অপূর্ব। তার নেয়ামতও অবিস্মরণীয়। ইহার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা চেষ্টা করা বিশাল সাগরে হাবুডুবু খাওয়া ন্যায়ই। তুবও কিঞ্চিত বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করিব।
এ সম্পর্কে বিখ্যাত মুহাদ্দেস ও মুফাচ্ছের আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন—
বেহেশতের স্বর্ণ-নির্মিত সর্বমোট আটটি দরজা। এই দরজার প্রথমটিতে কলেমা তাইয়্যেবা-
‘লা-ইলাহা ইল্লাহল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ লিখা রহিয়াছে। এই দরজা হইয়া নবী, ‘রাসূল, শহীদ ও দানশীলগণ বেহেশতে প্রবেশ করিবেন। দ্বিতীয় দরজা দ্বারা যে সকল লোক উত্তমরূপে অজু করিয়া অতি মিনতিভাবে ও নিয়মানুযায়ী নামাজ পড়িয়াছেন, তাঁহারা বেহেশতে প্রবেশ করিবেন। তৃতীয় দরজা দিয়া যে সকল লোক সন্তুষ্ট চিত্তে জাকাম আদায় করিয়াছেন, তাঁহারা বেহেশতে প্রবেশ করিবেন। চতুর্থ দরজা দিয়া যাঁরা মানুষদিগকে আল্লাহর নির্দেশিত পথ প্রদর্শন করিয়াছেন এবং নিষিদ্ধ পথ হইতে ফিরাইয়া রাখিয়াছেন, তাহারা বেহেশতে প্রবেশ করিবেন। পঞ্চম দরজা, যাঁহারা অন্যকে অন্যায়ভাবে অত্যাচার হইতে এবং নিজেকে কাম রিপু হইতে বিরহ রাখিয়াছে তাঁহাদের কর্তৃক উক্ত দরজা বেহেশতে প্রবেশ করিবার জন্য ব্যবহৃত হইবে। ষষ্ঠ দরজা দিয়া যাঁহারা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করিবার জন্য হজ্জ্ব করিয়াছেন, তাঁহারা বেহেশতে প্রবেশ করিবেন। সপ্তম দরজা- যাঁহারা দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য নিঃস্বার্থভাবে জেহাদ করিয়াছেন, তাঁহারা অন্যায় কার্য (হারাম) হইতে নিজ আত্মাকে বিরত রাখিয়াছেন এবং মাতা-পিতার সহিত সদ্ব্যবহার করছেন; তাঁহারা উক্ত দরজা দিয়া বেহেশতে প্রবেশ করিবেন।’
বেহেশত মোট আটটি, তন্মধ্যে বেহেশতবাসীগণের আবাস গৃহরূপে. সাতটি যথা দারুল জানান, দারুচ্ছাল্লা, জান্নাতুল মাওয়া, জান্নাতুল খোলদ, জান্নাতুন নাঈম, জান্নাতুল ফিরদাউস জান্নাতুল আদন। অষ্টম বেহেশত ইল্লিয়্যুন : ইহা বেহেশতীদের বিচরণ ও পরিভ্রমণ বাগান বা পার্ক। ইহা সকল বেহেশতের সৌন্দর্য প্রদর্শনের নিমিত্ত তৈরী করা হইয়াছে।
বেহেশতের প্রস্তুত কৌশল অত্যাশ্চর্য ও সৌন্দর্যময়। উহার নির্মাণ কৌশলের মধ্যে সৌন্দর্য এই যে, স্বর্ণ নির্মিত একটি ইটের পরে আর একটি রৌপ্য নির্মিত ইট সাজাইয়া গাঁথা হইয়াছে। অর্থাৎ এক ইট পরিমাণ স্থান লাল বর্ণ এবং আর এক ইট পরিমাণ স্থান শ্বেত বর্ণের এই প্রকারে একটির পর একটি ইট গাঁথিয়া (স্বর্ণের ও রৌপ্যের) ইমারতটির নির্মান কার্য শেষ করা হইয়াছে। ইহাতেই বুঝা যায় যে, বেহেশত দেখিতে কত মনোরম। এতদ্ব্যতীয়ত ইট গাঁথুনীর বস্তু মেশক এবং জাফ্রান দ্বারা প্রস্তুত করা হইয়াছে।
এক খানা ইট সোনার এবং রজতের একখান,
মশল্লা তার আতর গোলাব মেশক ও জাফরান!
বেহেশতে বিরাট বিরাট গম্বুজ আছে, এই সকল গম্বুজ যথাক্রমে মুক্তা ও জমরূদ নামক পাথর দ্বারা নির্মাণ করা হইয়াছে।
বেহেশতের নিম্ন দিয়া অনেকগুলি নহর ( ছোট নদী) প্রবাহিত আছে। এই সমস্ত নহরের পার্শ্ব শ্বেত বর্ণের মুক্তা দ্বারা বাঁধান। দেখিতে উহা অতি মনোরম। নহরগুলির মধ্যে নহরে রহমত সুদীর্ঘ, উহা সকল বেহেশতে প্রবাহিত হইয়া অনেক দূর পর্যন্ত গিয়াছে। নহরে রহমত ছোট ছোট মুক্তার দ্বারা উত্তমরূপে বাঁধান আছে। উহার পানি বরফ হইতে শীতল এবং মধূ হইতে মিষ্টি। বেহেশতবাসীগণ উহার পানি একবার পান করিলে পরিতৃপ্ত হইয়া যাইবেন, দ্বিতীয়বার পান করিবার মত ইচ্ছা তাহাগের আর থাকিবে না।
আর একটি নহরের নাম ‘নহরে কাওসার’। এই নহরটি আমাদের শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফার জন্য আল্লাহ্ বিশেষ ভাবে নির্দিষ্ট করিয়া রাখিয়াছেন। কেয়ামতের দিবস যখন উম্মতে মোহাম্মদিয়া পানির তৃষ্ণায় ব্যস্ত হইয়া পড়িবে, তখন হযরত মোহাম্মদ (সঃ) তাঁহার উম্মতকে উহার পানি পান করাইবেন। উক্ত নহর হইতে যে ব্যক্তি একবার পানি পান করিবে, চিরদিন তাহার আর পানির তৃষ্ণা হইবে না। উহার মধ্যে অসংখ্য স্বর্ণ নির্মিত তারকার ন্যায় সমুজ্জল পান-পাত্র ভাসিতেছে। বেহেশতবাসীগণ যখনই ইচ্ছা করিবেন উক্ত সৌন্দর্যের পাত্র দ্বারা পানি পান করিতে পারিবেন।
নবীজীকে দেয়া খাছ তোহফা আল্লাহ্
অমীয় ধারায় পূর্ণ কাওছার নহর।
সুরভিত পানি তার এত মজাদার,
হয়না কিছর সাথে তুলনা তাহার।
কনক নির্মিত দীপ্ত তারকার ন্যায়,
উজ্জ্বল পিয়ালা তাতে বাসিয়া বেড়ায়।
সেই পানি যদি পান করে একবার,
জীবনে পিপাসা কভু লাগিবেনা আর।
বেহেশতে আরও অনেক নহর আছে, তন্মধ্যে- নহরে সালসাবীল, নহরে রাহীকুম মাখতুম ইত্যাদি। এই সবের পানিও অতি সুস্বাদু। বেহেশতবাসীগণ যখন যে নহরের পানি পান করিতে ইচ্ছা করিবেন, তখনই সেই নহরের পানি পান করিতে পারিবেন। হাদীছ শরীফে আছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলিয়াছেন, মে’রাজের রাত্রে জিব্রঈল আমাকে সকল বেহেশত পরিদর্শন করাইয়াছেন। আমি বেহেশতের মধ্যে চরি প্রকার নহর দেখিয়াছি। তন্মধ্যে একটির পানি বিশুদ্ধ পানির স্বাদ ও পরিষ্কার, আর অপরগুলিতে যথাক্রমে দুধ, পবিত্র শরাব ও বিশুদ্ধ মধু আছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেন—
: বেহেশতের নহরসমূহের মধ্যে এক শ্রেণীর নহরে স্বচ্ছ পানি থাকিবে, আর এক শ্রেণীর নহরে এমন খাঁটি দুধ থাকিবে স্বাদ কখনই পরিবর্তন হইবে না; অন্য এক ধরণের নহর থাকিবে যাহা এমন পবিত্র শরাব দ্বারা পরিপূর্ণ যে, তাহা পানকারীদের নিকট অতিশয় সুস্বাদু বলিয়া মনে হইবে এবং আর এক প্রকার নহর আছে, যাহা অত্যন্ত পরিষ্কৃত মধু দ্বারা পরিপূর্ণ।
বেহেশত মাঝে নানা রকম নহর আছে জারী,
তাহার কতগুলির মাঝে স্বচ্ছ-শীতল বারী।
কতগুলি দুধের নহর ঝির ঝিরিয়ে বয়,
যেই দুধেরই স্বাদ কখন বদল নাহি হয়।
কতক নহর, শরাব বোঝাই গন্ধে স্বাদে ভরা,
কতক নহর খালেছ মধুর পরান আকুল করা।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এই সকল নহর দেখিয়া জিব্রাইলকে (আঃ) জিজ্ঞাসা করিলেন— ‘হে ভাই জিব্রাইল। এই সকল নহর কোথায় নহর কোথা হইতে প্রবাহিত হইয়াছে এবং কোথায় গিয়া পড়িয়াছে?’ হজরত জিব্রাঈল (আঃ) উত্তর করিলেন, ‘কোথা হইতে যে এই সকল নহর প্রবাহিত হইয়াছে তাহা আমিও জানি না। তবে সকল নহরই ‘কাওসার’ নামাক নহরে পড়িয়াছে।’ ইহার পর হজরত জিব্রাঈল (আঃ) রাসূলুল্লাহকে (ছাঃ) বলিলেন— ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি আল্লাহর নিকট ইহার গোপন তথ্য জানার জন্য আবেদন করুন।’ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তাহাই করিলেন। অমনি আল্লাহর আদেশে একজন ফেরেশতা উপস্থিত হইয়া সালাম করিয়া বলি- লেন— ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি চক্ষু বন্ধ করুন।’ রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলি- লেন, আমি একস্থানে আসিয়া পৌঁছিয়াছি, যাহার দরজা শ্বেত বর্ণের মোতির, দরজার কড়া অত্যন্ত মূল্যবান ইয়াকুত পাথর দ্বারা নির্মিত এবং তাহা অতি বড় একটা স্বর্ণ নির্মিত তালা দ্বারা বন্ধ করা রাহিয়াছে।
অতঃপর আমি ফেরেশতার আদেশ মতে তাহার নিকটবর্তী হইয়া ‘বিস মিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ পড়িলাম। অমনি তালা খুলিয়া গেল। আমি উত্ত ঘরে প্রবেশ করিলাম; ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখি উহার মধ্যে বড় বড় চারিটি স্তম্ভ। প্রত্যেকটি স্তম্ভের গায়ে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখিত রহিয়াছে।
এতদ্ব্যতীত আরও দেখিলাম যে, বেহেশতের পানির নহর ‘বিসমি’- এর (মীম) হইতে, দুধের নহর ‘আল্লাহ’ দুধের নহর ‘আল্লাহ’ এর (হা) হইতে; শরাবের নহর ‘আরাহমান’ রে (মীম) হইতে এবং মধুর আর রাহীমের’ এর (মীম) হইতে প্রবাহিত হইয়াছে।
ইহার পর আল্লাহ পাক আমাকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, ‘হে মোহাম্মদ। তোমার উম্মতের যে কেহ আমার নাম নিয়া ডাকিবে এবং অন্তঃকরণে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ বলিবে, তাহাকে আমি এই চারটি নহর হইতে- পানি, দুধ, শরাব ও মধু পান করাইয়া পরিতুষ্ট করাইব।
বেহেশতে ‘তুয়া’ নামে একটি অতীব সুন্দর বৃক্ষ আছে। তুয়া বৃক্ষের মূল বা শিকড় মোতি নির্মিত মাটির নিম্ন দিয়া বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হইয়াছে। ইহার শাখা সমূহ যমরূদ এবচং পাতা বহু মুল্যের সুনদুস নামক পদার্থ দ্বারা তৈয়ার করা হইয়াছে। এই বৃক্ষের শাখা-প্রশাখাগুলি এত প্রসারিত হইয়াছে যে, বেহেশতের এমন কোন কামরা নাই যেখানে তাহার শীতল ছায়া পতিত হয় নাই যেমন সূর্য বহু কোটি বৎসর দূরের রাস্তায় থাকিয়াও আমাদের প্রত্যেহ বাড়ি-ঘরে আলো প্রদান করিয়া থাকে।
হজরত আলী (রাযিঃ) বর্ণনা করিয়াছেন-বেহেশতের যাবতীয় ফলমূ— লের গাছপালা স্বর্ণ নির্মিত হইবে। দুনিয়ার গাছ-পালার শিকড় যেরূপ নহে বরং উহার কান্ডসমূহ উপরের দিকে থাকে, বেহেশতের গাছপালা সেইরূপ নহে বরং উহার কান্ড নিম্নের দিকে ঝুলান এবং শিকড় বা মূল উপরের দিকে থাকিবে। তাহার একমাত্র কারণ এই যে, বেহেশতবাসীদের মেওয়া ফল আহরণ করিতে যেন কষ্ট না হয়।
আল্লাহ পাক বলেন— ‘কুকুফুহা দানিয়া’
কবির ভাষায় ইহার অর্থ শোনা যাক—
এমন আজব বৃক্ষরাজি বেহেশত মাঝে ভাই,
এই যে গাছের কোন নজীর এই দুনিয়ায় নাই
নীচের দিকে ডালপালা সব উপর দিকে মূল।
সহজেই হাত্রে কাছে পার যাতে ফল-মূল।
হজরত আলী (রাযিঃ) হইতে বর্ণিত আছে- রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ফর্মান, বেহেশতের মধ্যে একটি বৃক্ষ আছে, সেই বৃক্ষ হইতে সুন্দর গহনা বেহেশতীগণের জন্যে নিয়ে পতিত হইয়া থাকে এবং উহার নিম্নদেশ হইতে, মোতি ও ইয়াকুত নামে মূল্যবান পদার্থের তৈয়ারী এক প্রকার ডানা ওয়ালা ঘোড়া বাহির হইয়া থাকে। এই সমস্ত ঘোড়ার শরীর পালক দ্বারা আবৃত এবং ঘোড়ার তাঁহার আওলিয়াউল্লাহ বা আল্লাহর বন্ধুগণকে বেহেশতের নানা সৌন্দর্য তাঁহার কীর্তি পরিদর্শন করে দান করিবেন। তাই তাহারা উহার উপর আরোহণ করতঃ বেহেশতের বাগানে ভ্রমণ করিয়া নানা রকম আমোদ রকম আমোদ প্রমোদ উপভোগে মগ্ন থাকিবেন।
অন্যান্য বেহেশতী, লোকগণের এ প্রকার সম্মানিত সোয়ারী মিলিবে না। ইহাতে উহাদের মনে সামান্য দুঃখ অনুভূত হইবে। এ কারণ আল্লাহর দরবারে তাঁহারা আরজ করিবেন- ‘ইয়া এলাহী! উহাদিগকে আপনি এইরূপ ঘোড়া দান করিয়া সম্মানিত করিলেন, এমন কি আমলের দরুণ উহারা প্রাপ্ত হইল? আল্লাহ উত্তর করিবেন-
‘হে লোক সকল! তোমরা রাত্রে গভীর নিদ্রায় বিভোর থাকিতে, আর উহারা আমার সন্তুষ্টির জন্য রাত্রে নিদ্রা হইতে উঠিয়া নামাজ পড়িত; উহারা এইরূপে তোমরা দিনের বেলা পান ও আহার করিতে আর অধিকাংশ সময় রোজা রাখিত। আর তোমরা ইসালামের জন্য যুদ্ধ করার ভয়ে ঘরের একপার্শ্বে বসিয়া থাকিতে, কিন্তু উহারা নিজেদের জীবনের ভয় তোমরা নিজের আত্মার উপর কুটিলতা করিয়া দান-ছদকা করিতে পার নাই, কিন্তু উহারা নিজে সুখ ভোগ না করিয়াও সর্বদা আমার রাস্তায় মাল দৌলত খরচ করিত। তাই আমি তাহাদের প্রতি অতিরিক্ত সন্তুষ্ট হইয়া উহাদিগকে অদ্য এইরূপ সম্মানিত করিয়াছি।
বেহেশতের আবহাওয়া আমাদের নশ্বর দুনিয়া বসন্ত কালের আবহাওয়ার সাথে কিছুটা মিল আছে— অতি মাত্রায় গরম নয় আর অতি শীতলও নয়। এক কথায় নাতিশীতোষ্ণ। অনুরূপ, বেহেশতে অতি প্রখর রৌদ্রও নয় আর মেঘাচ্ছন্ন দিনের ন্যায় অন্ধকার নয়। বেহেশতের প্রকৃত অবস্থা মানসপটে উপলদ্ধি করা অতি কঠিন কাজ। ইহা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত আর কেহই জানেন না।
নাই সেখানে বর্ষা কিম্বা নাইক গরম শীত,
বসস্তকাল বেহেশত মাঝ সদা উপস্থিত।
সেথায় নাহি সুতীব্র কিংবা মেঘের ভার,
প্রখর আলো নাইক সেথায় অথাবা আধার।
মাঝামাঝি সকল কিছু স্নিদ্ধ মনোরম,
বুঝাইতে সে খুবীর কথা লিখনী অক্ষম।
বেহেশতরে হুর গেলমান
হাদীছ শরীফে আছে, আল্লাহতাআ’লা শ্বেত, সবুজ, হলুদ ও লাল এই চরি প্রকার রং-এর মিশ্রণে বেহেশতের হুরগণকে সৃষ্টি করিয়াছেন। তাহাদের পা হইতে হাঁটু পর্যন্ত সৌন্দর্যময় জাফ্রান রং এ রঞ্জিত এবং হাঁটু হইতে মাথা পর্যন্ত কর্পূর, মেশক ও আঘরের মিশ্রণে সুবাসিত ও সৌন্দর্য যুক্ত। বেঞেশতের হুরগণের মাথার কেশ লম্বা সুবাসিত ‘কারণ’ নামক এক প্রকার আরব কোঁকড়ান তৃণ বৃক্ষের ন্যায়। উহা দেখিতে অত্যন্ত মনোরম।
শুভ্র, সবুজ, হলদে ও লাল মিশিয়ে রং চার,
রূপের রাণী হুর বালাদের করছে তৈয়ার।
পা হইতে হাঁটু তাদের জাফ্রানেরি রংয়ে,
শোভার বাঁহার করে খোদা গড়ছে আজব ঢংয়ে।
সুরভিত কাফুর এবং মেশক ও আম্বর,
জানু হতে শির এ তিনে গঠিত সুন্দর।
ঢেউ খেলান কৃষ্ণ কোমল কোকড়ান কুন্তল,
কোকড়া যেমন সুবাসিত তৃণ করণ ফল।
আল্লাহ পাক আদি মানব হজরত আদম কে যেরূপ কাদা-মাটি দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন, তেমনি বেঞেশতের হুরগণকেও মাটি দ্বারা সৃষ্টি করিয়াছেন। কিন্তু উহাদের গঠন আকৃতি এবং সৌন্দর্যের সাথে অন্যান্য সকল সৃষ্ট জীবের কোন তুলনা চলে ন। সকল সৌন্দর্যই যেন আল্লাহ তাহাদের মধ্যে ঢালিয়া দিয়াছেন।
এতদ্ব্যতীত হুরগণের শরীরে আল্লাহ পাক এত সুগন্ধি দান করিয়াছেন, যদি উহারা নশ্বর দুনিয়ায় একবার থু থু ফেলে, তবে গোটা দুনিয়া মেশখ আম্বরের গন্ধে সুবাসিত হইয়া যাইবে। উহাদের প্রত্যেকের বক্ষে আল্লাহ পাকের যে বেহেশতী বন্ধুর জন্য তাহারা পয়দা হইয়াছে, তাহর নাম-ধাম লেখা থাকিবে। তাহাদের প্রত্যেকের নিকট এক একটি মনোরম মূর্তি ও স্বর্ণ নির্মিত চিরুণী আছে, যদ্বারা উহারা মাথার কেশ আচড়াইয়া পরিপক্ক করিয়া থাকে।
আবদুল্লাহ ইবেন আব্বাস (য়াঃ) হইতে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফরমাইয়াছেন— লো’মান নামে বেহেশতে একজন অপরূপ সুন্দরী রমণী (হুর) আছে। উহাকে আল্লাহতাআ’লা মিশখ কুপের পানির সংমিশ্রণে পয়দা করিয়াছেন। আল্লাহ উহার মধ্যে বিশেষ গুণ ইহাই দিয়াছেন যে, যদি সে সপ্ত সমুদ্রে পানিতেও সামান্য মাত্র থু থু নিক্ষেপ করে তবে সমুদ্রের সমস্ত পানি মধুর ন্যায় সুস্বাদু হইয়া যাইবে। ইহা ব্যতীত উহার গ্রীবা দেশের পিছন ভাগে লিখিত আছেঃ যে আমার ন্যায় অপরূপ সুন্দরী রমণীর মিলন কামনা করে, সে যেন সর্বদা খোদার ইবাদতে মশগুল থাকে।
সাগর নীরে ফেললে থুথু ধরার সাগর যত,
পানি তাহার হয়ে যেত মিষ্টি মধুর মত।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলিয়ছেন— আল্লাহ পাক ‘জান্নাতে আদন’ তৈয়ার করার পর জিব্রাঈলকে (আঃ) নির্দেশ প্রদান করিয়া বলিয়াছেন— হে জিব্রাঈল! যাও জান্নাতের চতুষ্পার্শ্বে ভ্রমণ করিয়া আমার সৃষ্টি কৌশল দেখিয়া আইস। জিব্রাঈল আল্লাহর পাকের নির্দেশ মতে ‘জান্নাতুল আদন পরিভ্রমণ করিতেছিলেন। অকস্মাৎ তিনি দেখিতে পাইলেন যে, একজন অপরূপ অসামান্য সুন্দরী (হঃ) বেহেশতের কোন কামরা হইতে ধীর পদক্ষেপ বাহিরে আসিতেছে। রমণী বাহিরে আসিয়াই তাঁহার সম্মুখীন হইল এবং পাতলা রঙ্গীন অধর দুইটি যৎকিঞ্চিত প্রসারিত করিয়া ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দন্ত সমূহ সামান্য বাহির করিয়া মুচকি হাসিল। রমণীর এহেন হােিসতে বেহেশতময় আলোকিত হইয়া গেল। এতদ্দর্শনে জিব্রাঈল ক্ষণিকের মত মুর্ছিত হইয়া জমীনে পড়িয়া রহিলেন এবং ভাবিলেন-’হয়তো ইহা আল্লাহ পাকের স্বীয় নুরের জ্যোতিই হইবে।
অতঃপর গাইব নির্দেশ আসিল— ‘হে জিব্রাঈল? ভয় পাইও না, তুমি যাহা ভাবিয়াছ তাহা নহে,মস্তক উঠাও এবং উহার সাথে আলাপ কর।’ এ নির্দেশমত জিব্রাঈল (আঃ) উহার প্রতিবিম্বের দিকে তাকাইয়া বলিলেন-
সুবহানাল্লাজী খালাক্বাকী-’তোমার ন্যায় অপরূপ রূপসির সৃজনকর্তার গুণ-কীর্তন বর্ণনা করিতেছি।
সুন্দরী ইহার উত্তরে বলিল— ‘হে আমীনুল্লাহ! তুমি কি জান,আল্লাহ আমাকে কাহার জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন?’ তিনি উত্তর করিলেন, ‘না, জানি না। ‘সুন্দরী বলিল— ‘আমাকে আল্লাহ ঐব্যক্তির জন্য পয়দা করিয়াছেন, যিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিমিত্ত স্বীয় স্বার্থ জলাঞ্জলী করিয়া থাকেন। অর্থাৎ আত্মার বিরুদ্ধাচরণ করিয়া একমাত্র আল্লাহর নির্দেশ পালনপূর্বক তাঁহাকে রাজী রাখিতে ব্রতী থাকেন।
বান্দা যখন করতে থাকে খোদার ইবাদত,
বেহেস্ত মাঝে হয় তখনে তৈরী ইমারত।
আবার যখন বন্দেগীতে গাফিল হয়ে থাকে,
ফেরেস্তা কার্য তখন বন্ধ করে রাখে।
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) ফরমাইয়াছেন— ‘আমি মে’রাজের রাত্রে বেহেশতে ফেরেশতাগণকে নানাবিধ ইমারত করিতে দেখিয়াছি। আমি তাহাদিগকে উহার কারণ জিজ্ঞাসা করিলাম। তাহারা উত্তর করিল— ‘আমরা খোদার নির্দেশে যাহাদের জন্য এই ইমারত নির্মাণ করিতেছি, তাহারা যখন আল্লাহর ইবাদত-নামাজ, রোজা, জিকের-আজকার, তসবীহ-তাহলীল ও স্মরণ ইত্যাদিতে মশগুল থাকে, তখনই আমরা উহাদের জন্য এইরূপ ইমারত নির্মাণ কার্যে ব্যস্ত থাকি। আর তখন উহারা আল্লাগর ইবাদত হইতে গাফেল হইয়া পড়ে তখনই উহার কার্য স্থগিত রাখি।’
দুনিয়াটা কয়েদ খানা মমিন মানুষের,
ঠিক বিপরীত ইহা হল বেস্ত কাফিরের।
দীদারে ইলাহী : আল্লাহর সন্দর্শন
দীদারে ইলাহী বা মহা মহিম আল্লাতাআলার পবিত্র বেহেশতে সন্দর্শণ বেহেশতীদের যাবতীয় নেয়ামত ও তাঁদের দানের চাইতে সর্বশ্রেষ্ঠ সুখ ও আনন্দের বিষয়। বেহেশতে যে সব নাজ নেয়ামত রাখা হইয়াছে, তাহা দীদারে ইলাহীর সম্মুখে সম্পুর্ণ অসাড় -মূল্যহীন।
এই জন্য বুর্জগানে দ্বীন বলেন, দুনিয়ার এক প্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত যত প্রকারের উন্নতমানের খাদ্য সমামগ্রী রহিয়াছে, সেসব খাদ্য সামগ্রী ও ফল মুলের যাবতীয় মজা ও স্বাদ যদি একত্রিত করা হয়, তবুও আল্লাহর দীদারের স্বাদের তুলনায় তাহা কোনই মূল্য রাখে না। অনুরূপ দুনিয়ায় যত সুগন্ধি দ্রব্য-আতর, গোলাপ,মেশক, আম্বর, কস্তুরী, সেন্ট ও ফুল ইত্যাদি আছে, সে সমুদয সুগন্ধিকে যদিও একত্রিত করা যায়, তাহা হইলে খোদার দীদারের যে সুগন্ধি লাভ হইবে, তাহার কোটি ভাগের এক ভাগও হইবে না। আর দুনিয়ার যাবতীয় ভোগ বিলাস ও সুখ স্বাচ্ছন্দ্য এর্ব সমুদয় আনন্দ ও তৃপ্তিকে যদিও একত্রে সমাবেশ করাযায় তাহা হইলেও একমাত্র মুহূর্তকাল খোদাতাআ,লার দর্শনলাভে বেহেশতীদের যে আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ হইবে, তাহার কোটি ভাগও দীদার ইলাহীর কাছে কিছু নহে।
আল্লাহ তাআ’লার দীদার ও দর্শন লাভ বেহেশতবাসীগণ চারি পর্যায়ে হাছিল করিবে। প্রথম বৎসরে একবার শুক্রবার;দ্বিতীয়-সকালে বেলা একবার; তৃতীয় -বিকাল বেলা একবার; চতুর্থ-আর কে শ্রেণীর ভাগ্যবান বেহেশতী আছে, যাহার খাদেম ও গলমানের ন্যায় সর্বক্ষণ আল্লাহর দরবারে পড়িয়া থাকিবে ও দীদার ইলাহীর ইজ্জত হাছিল করিতে থাকিবে।
হাদীছ শরীফে বর্ণিত আছে, কেয়ামতের দিবস যখন বেহেশতবাসীগণ বেহেশত ও জাহান্নামীরা জাহান্নামে আশ্রয় গ্রহণ করিবে, তখন আল্লাহ পাক হজরত জিব্রাঈলকে সম্বোধন করিয়া বলিলেনঃ হে জিব্রাঈল! আমার বেহেশতী বন্ধুগণকে ‘মাক’আদে ছিদক’ আর্থাৎ মহা সত্যের আসনে হাজির কর।’ তখন হজরত জিবাঈল জান্নাতবাসীগণকে আহবান করিয়া জানাইবেন, ‘ওহে সৌভাগ্যবানগণ, চুলুন, আপনাদের চির আকাঙ্খিত বন্ধুর দীদার পানে চলুন।’ জিব্রাঈলের ডাকে তাঁহারা ‘মাক’আদে ছিদকে সমবেত হইবে। তখন আল্লাহতাআলা তাহাদিগকে লক্ষ্য করিয়া জিজ্ঞাসা করিবেন, ‘হে আমার প্রিয় দোস্তগণ। তোমা আমার নিকট কি পার্থনা কর?’ তাহারা উত্তর করিবে, ‘হে দয়াময়। পাক কালামে আপনি আমাদের সঙ্গ ওয়াদা করিয়াছিলেন যে, আপন দর্শন লাভ করইয়া আমাদের বেহেশতে আগমনকে স্বার্থক করিবেন।’ তখন আল্লাহতাআলা ইরশাদ করিবেন, ‘ওহে বন্ধুগণ! যখনই আমার দীদার লাভ করিবে তৎক্ষণাৎ সবাই মিলিয়া সেজদায় পড়িয়া যাইবে।’
এই সেজদার অবস্থায়ই প্রথমতঃ মহামহিম প্রভুর চির আকাংখিত দীদারের সাহায্যে জান্নাতবাসীগণকে সম্মানিত করা হইবে। পরে খোদার হুকুমে যখন সেজদা হইতে মাথা উত্তোলন করিবে, তখন তাহাদের জন্য বিভিন্ন স্বাদ ও রং-বেরং এ খাদ্য সামগ্রী আসিয়া, হাজির হইবে ও চুতম্পার্শ্বে মুক্তার মত উজ্জ্বল চেহারার অগণিত গেলমান বেষ্টন করিয়া থাকিবে। এই অবসরে বেহেশতীদের মধ্যে হইতে সম্ভবতঃ হজরত আলী উঠিয়া আরজ করিবেন- ‘হে আমাদের মাওলা! পবিত্র কালামে পাকে আপনি অঙ্গীকার করিয়াছেন— যে, বেহেশতীদের আপনি নিজ হস্তে ‘শরাবে তহুর’ পান করাইবেন—
ওয়াদা দিয়াছে মোমেনে দয়াল গফুর,
নিজ হাতে করাবে পান শরাবে তহুর।
আল্লাহতাআ’লা প্রতুত্তরে বলিবেন, ‘আমার বন্ধু ঠিকই বলিয়াছে। ‘ তারপর আরশে মোআ’লার পাদদেশ হইতে অসংখ্য পেয়ালা আল্লাহর প্রিয় বন্ধুদের মুখের সামনে হাজির হইবে ও তাহারা আনন্দে বিভোর হইয়া পান করিতে থাকিবে। অতঃপর আল্লাহতাআ’লা জান্নাতীদের বলিবেন, ‘আমার সদনে আর কিসের আশংকা কর?
বেহেশতীগন জানিত, নবীবর হজরত দাউদের সুর ছিল ভুবন বিখ্যাত। তাহার সুললিত কণ্ঠে জবুর’ পাঠ শুনিয়া আকাশ বাতাস সত স্তম্ভিত হইত-দরিয়ার মাছ আসিত কিনারায়। তাই আল্লাহর সদনে তাহারা জানাইবে,- আমরা দাউদ নবীর (আঃ) কন্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শুনিতে চাই। তখন পাক পরওয়ারদেগার হজরত দাউদকে একটি আয়াত তেলাওয়াত করিবার নির্দেশ দিবেন। তিনি সুমিষ্ট সুরে তেলাওয়াত শুরু করিবেন-ইন্নালমুত্তাকীনা ফী মাকামিন আমীনিন।
:যাহার আল্লাহতা’আলাকে ভয করিয়াছে, তাহারা নিরাপদ স্থানে বেহেশতের উদ্যানও নহরসমুহে অবশ্যই আশ্রয় গ্রহণ করিবে, তাহারা মহামূল্যবান মসৃণ রেশমী পোশাক পরিধান করিয়া সকলেই মুখোমুখি হইয়া বসিবে।
উক্ত আয়াত হজরত দাউদের কন্ঠে এত সুমধুর স্বরে শ্রুত হইবে যে, উহা শুনিবামাত্র. সকলে আনন্দে বিভোর হইয়া নিজ নিজ আসনে বসিয়া হেলিতে আরম্ভ করিবে। হাদীছের অন্য একটি সূত্রো জানা যায়, আনন্দে আত্মহারা হইয়া তাহারা দুইশত বৎসর পর্যন্ত উড়িতে থাকিবে।
আল্লাহতাআ’লা পুনঃ ইরশাদ ফরমাইবেন, ‘তোমরা কি আমার কাল-াম আমার নিজ মুখে শুনিতে বাসনা রাখ।’ সবাই তখন এক বাক্যে হাঁ বলিয়া উত্তর করিবে।’ পরওয়ারেদোরে আলম জলদ গম্ভীর অথচ সুল- লিত কণ্ঠে পাঠ আরম্ভ করিবেন-
আনার রাহমানুর রাহীম। আররাহমানু আল্লামালকুরআন।
আমি সে দয়ালু রহমান রহমি,
শিখাইছি তব কোরআন করীম।
আল্লাহ পাকের খোদ জাবানীতে তাঁহারই অমর বাণী শ্রবণ করিয়া বেহেশতীগণ আনন্দে বিভোর হইয়া পড়িবে এবং সহস্র বৎসর যাবত আলমে মালকুতের ভিতর মত্ত ও বিভোর হইয়া থাকিবে।
আরেক পর্যায়ে দীদারঃ বেহেশতের মধ্যে আরেকটি স্থানের নাম হইবে ‘খতিরাতুল কুদছ’। আল্লাহতাআ’লা আপন দীদার প্রদর্শনের জন্য জান্নাতবাসীগণকে তথায় নিমন্ত্রণ করিবেন। যথা সময়ে তাহারা তথায় হাজির হইবে এবং আল্লাহরা দীদার লাভ করিয়া পরম আনন্দ উপভোগ করিতে থাকিবে। ইহাতে বেহেশতের যাবতীয় নাজ-নেয়ামত, হুর- গেলমানসমূহের কথা একেবারেই তাহারা ভুলিয়া যাইবে।
ইতমধ্যে বেহেশতীদের দীর্ঘকাল অতিবাহিত হইয়া যাওয়ার দরুন জান্নাতে অপেক্ষামান হুরগণ খোদার দরবারে ফরিয়াদ করিতে রহিবে, ‘হে পরওয়ারদেগার! কতকাল যাবত আমরা স্বামীদের সাক্ষাৎ হইতে বঞ্চিত রহিয়াছি। মেহেরবানী করিয়া আপনি তাহাদিগকে আমাদের সঙ্গে পুনরায় মিলাইয়া দিন।
তাহাদের সবিনয় নিবেদন যখন খোদার দরবারে মঞ্জুরী লাভ করিবে তখন হঠাৎ আলহতাআ’লা আপন নূরানী চেহারার সামনে পর্দা পতন করিবেন। দর্শনকারীদের চৈতন্য হইবে এবং তখন দীদারের স্বাদ হইতে বঞ্চিম হওয়ার দরুন হায় হায় করিতে আরম্ভ করিবে আর বেহেশতের মাটিতে গড়াগড়ি খাইয়া ছটফট করিবে। তাহারা সকলেই আল্লাহর দরবারে আরজ করিবে—
‘ওহে দয়ামায় প্রভূ! ক্ষণিকের তরে সাক্ষাত দান করিয়া আবার কেন লুকাইয়া গেলে? আবার দেখা দাও প্রভূ! প্রাণ ভরিয়া তোমার নূরানী জ্যোতির্ময় চেহারাকে আবার দেখিতে দাও মাওলা।
মহাপ্রভূ আল্লাহভাআলা তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিবেন, ‘হে আমার প্রিয় বন্দগণ? তোমরা কত কাল পর্যন্ত আমার দীদার লাভ করিয়াছ?’ তাহারা একবাক্যে উত্তর করিবেন সামান্য এক দুই ঘন্টার অধিকতো তোমাকে দেখিতে পাই নাই। আল্লাহতাআ’লা তখন আপন বন্ধুগণকে সান্ত্বনা দিয়া বলিবেন, ‘আমরা ইজ্জত ও বুজুর্গীর কসম খাইয়া বলিতেছি, দীর্ঘ আট লক্ষ্য বৎসর যাবৎ তোমার আমার পবিত্র দীদারের স্বাদ হাছিল করিয়াছ। কবির ভাষায় শোনা যাক-
পূণ্যবানেরা পাইবে সুখের সরগ,
পাপীকুলে হবে ভর্তি ভীষণ নরক।
সরগ নরক নয়হে কামনা আমার,
শুধু পাইতে চাই প্রভু তব দীদার।
দীদারে ইলাহী ও বেহেশতের বাজারঃ হাদীছের তথ্য হইতে জানা যায়, সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যে একদা ছাহাবী আবু হোরাইাবার সাথে মদীনার কোন বাজারে সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন। হজরত আবু হোরাইরা সাঈদ হাহাবীরে দোয়া করিলেন— ‘আল্লাহ যেন তোমার আমার সাক্ষা ৎকার বেহেশতের বাজারে, করান। তখন হজরত সাঈদ বলিলেন, বেহেশতের মধ্যে কি আবার কোন রাজার হইবে? তিরিন উত্তর করিলেন, নবী (ছাঃ) আমাকে বলিয়াছেন, বেহেমতবাসীগণ আপন না আমল অনরুসারে তাহাদের জন্য নির্ধারিত বাসস্থানসমূহে আশ্রয় গ্রহণ করিবে এবং বসবাস করিতে থাকিবে আপন আপন স্থানে।
অতঃপর প্রতি শুক্রবার পরওয়ারদেগারের সাক্ষাতের নিমিত্ত তাহাদিগকে নিমন্ত্রণ করা হইবে। তাহারা বাহির হইয়া আসিবে, তখন খোদার আরশ তাহাদের সম্মুখে হাজির হইবে। আল্লাহতাআ’লা বেহেশতের একটি ইদ্যানে তাহাদের সঙ্গেসাক্ষাৎ দান করবেন। বান্দাদের জন্য তথায় নূরের মণিমুক্তা, ইয়াকুত, জমরুদ ও স্বর্ণ রৌপ্যের অর্থাৎ বিভিন্ন স্তরের লোকদের জন্য বিভিন্ন প্রকারের উচচ্চাসন সজ্জিত করা হইবে। অপেক্ষাকৃত যাহারা নিম্নস্তরের বেহেশতী হইবে, তাহাদের জন্য মেশক ও কাফুরের আসন সাজ্জত করা হইবে। আশ্চর্য, যাহারা শেষোক্ত আসনের অধিকারী হইবে, তাহারাও মিম্বারে উপবিষ্ট লোকদিগকে নিজেদের চেয়ে বেশী সন্মানিত মনে করিবেন না।
হজরত আবু হোরাইয়া বলিলেন, আমি হুজুরকে (ছঃ) প্রশ্ন করিলাম, ‘আমরা কি আল্লাহতা’লাকে সেদিন স্বচক্ষে দর্শন করিব?’ হুজুর উত্তর করিলেন, নিশ্চয় করিবে। তোমরা কি চতুর্দশীর পূর্ণিমা চন্দ্রকে দেখিতে কোন সন্দেহ পোষণ কর? আমরা জবাব দিলাম, ‘নিশ্চয় না’ অতঃপর হুজুর বলিলেন.
আপন প্রভুকে দেখার মাঝেও সেরূপ তোমাদের কোন সন্দেহের অবকাশ থাকিবে না। উক্ত মাহফিলের প্রত্যেকের সঙ্গে আল্লাহ পাক প্রত্যক্ষভাবে আলাপ আলোচনা করিবেন ও আপন পরদা উঠাইয়া দিবেন। বেহেশতবাসীগণ যখন উক্ত মজলিসে আল্লাহর দীদর রাভ করিয়া এ অস-াধারণ তৃপ্তি লাভ করিতে থাকিবে, হঠাৎ এক খন্ড মেঘ আসিয়া তাহাদের উপর এইরূপ খুশবুও সুগন্ধি দ্রব্য বর্ষণ করিতে থাকিবে, যাহা ইতিপূর্বে কখনও লাভ করে নাই।
তারপর আল্লাহতাআলা সবাইকে সম্বোধন করিয়া বলিবেন- ‘তোমাদের জন্য যে সমস্ত সন্মানিত বস্তুর ব্যবস্থা করিয়াছি; সেগুলি আপন পছন্দ মাফিক গ্রহণ করিতে অগ্রসর হও।’ তখন আমরা উক্ত বাজারে আসিয়া হাজির হইবে এবং দেখিব যে, অগণিত ফেরেস্তা উহাকে বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে। আমরা তথায় এমন সব জিনিস দেখিতে পাইাব, যাহা ইতপূর্বে কোন চক্ষু দর্শন করে নাই। সেই মহামূল্যবান অফুরন্ত বস্ত্রসমূহ,অলঙ্কারাদী ও সুগন্ধি এবং রঙ্গিন প্রসাধনী দ্রব্যসমুহ ইচ্ছানুযায়ী আমাদিগকে দেওয়া হইবে। যাহা না বিক্রিগ করা হইবে, না খরিদ করা যাইবে। সকলেই আপন আপন পছন্দসই উপঢৌকনসমূহ বিবিগণ ও হুর- গণকে সাজাইবার জন্য বোঝাই করিয়া নিয়া যাইবে।
সেই বিখ্যাত বাজারে বেহেশতবাসীগণ আপন আপন বন্ধুদের সাথে মিলিত হইবে। যাহারা নীচ শ্রেণীর স্বর্গবাসী হইবে, তাহারা উচ্চশ্রেণীর পোশাক-পরিচ্ছদ ও আড়ম্বরপূর্ন জাঁকজমক দেখিয়া প্রথমতঃ স্তম্ভিত হইয়া যাইবে। কিন্তু উক্ত বন্ধুর সহিত একটি কথা শেষ হইতে না হই-ে তই হঠাৎ তাহার পোশাক-পরিচ্ছদও একই রূপ শান-শওকতপূর্ন হইয়া উঠিবে। ইহা এই জন্যই করা হইবে যে, বেহেশতের মধ্যে আল্লাহ পাক কোন বান্দাকেই মনঃক্ষুন্ন হইতে দিবেন না—চাহেনও না তিনি তাহা।
অতঃপর আমরা যখন নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন কবির, তখন আমাদের বিবিগণও সাদরে সম্ভাষণ জানাইয়া মারহাবা বলিতে বলিতে আমাদিগকে অভ্যর্থনা জানাইতে আসিবে আর বলিবে, ‘নিশ্চয় তোমরা বিদায়কালীন রং-রূপ হইতে বহুগুণে রূপসজ্জা নিয়া ফিরিয়াছ।’ আমরা উত্তর করিব, ‘যেহেতু আমরা আজ আপন মাহবুবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়া আসিয়াছি, তাইতো এত অধিক সৌন্দর্যের অধিকারী হইয়াছি।’
বেহেশত হাছিলের মূল উপাদান এতক্ষণ বেহেশতের বিভিন্ন বিষয় সংক্ষেপে আলোচনা করা হইল। রূপরেখা—সৌন্দর্য, বেহেশতে মোমেনদের জন্য সংগৃহীত খোদায়ী নেয়ামত এবং হুর-গেলমান, মোটকথা সবকিছুই ছোট খাটভাবে আলোচিত হইয়াছে। এখন প্রশ্ন উঠিতে পারে, সত্যিকারে এ চিরসুখের- আকর, অতুল সৌন্দর্যের লীলা নিকেতন বেহেশতের অধিকারী হইবেন কাহারা-কাহারা এ সৌভাগ্যের অধিকারী হইয়া চিরসুখী হইবেন?
বেহেশত হাছিলের মূল উপাদান
এ প্রশ্নের উত্তর সোজা। আল্লাহতাআ’লা মহান করুণাময় ও দয়াশীল। তাঁহার বান্দাদের অর্থাৎ মোমেনদের জন্য তিনি বিগলিত প্রাণ। বান্দা যদি আল্লাহর খুশির উদ্দেশ্য সম্মুখে রাখিয়া জন্ম হইতে মৃত্যু পর্যন্ত যাবতীয় অনুষ্ঠান ও কর্ম পালন করিয়া যায়, তব তিনি তাহাদেরকে পরকালে সেই বেহেশতেই স্থান দিবেন। এ কথা বিশ্বাস রাখা এবং উহার উপর দৃঢ় থাকাও বান্দার অন্যতম দায়িত্ব ও কর্তব্য।
কিন্তু সাথে সাথে এ বিষয়ও স্মরণ রাখিতে হইবে-ভুলিলে চলিবে না যে, বান্দা আপন দৃষ্টিতে যতই ভাল কাজ করুন এবং মন্দ ও অন্যায়ের কাজ হইতে বিরত থাকুন, আল্লাহর অনিচ্ছায় কোন কিছুই হইতে পারিবে না। অর্থাৎ আমল যতই সুন্দর করুন না কেন-এই আমলের দাবীতে কোন বান্দাই বেহেশতে যাইতে পারিবে না-কখনই পারিবে না। বেহেশত লাভ এবং সেখানের একজন নাগরিক হওয়ার সৌভাগ্য লাভের জন্য আল্লাহর করুণা ও মেহেরবানীই একমাত্র সম্বল ও উপাদান। আর ঐ উপাদানই হইল মূল। গৌণ উপাদান যে কিছু নাই, তাও নয়। তাহা না হইলে ভাল মন্দের কারণ হইবে কি করিয়া? কি করিয়াই বা প্রমাণ হইবে এ লোকই আল্লাহর প্রকৃত বান্দা বা আল্লাহর হুকুমের আজ্ঞাবাহী, আর এ লোকটি অকৃতজ্ঞ ও আল্লাহর হুকুমের খেলাপকারী নষ্ট লোক।
এ জন্য তাহাকে বাহ্যিকও কিছু অনুষ্ঠান পালন করিতে হইবে। এই অনুষ্ঠান দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। প্রথম, মনের অনুষ্ঠান; দ্বিতীয়, কর্মানুষ্ঠান। মনের অনুষ্ঠানঃ আল্লাহকে এক-অদ্বিতীয় লা শরীক মনে করা এবং সে সাথে সাথে নিজের কর্মে তা প্রকাশ করা। অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত কোন শক্তির আশ্রয় না লওয়া-কোন দেব-দেবীর অর্চনা না করা।
ইহাকে এক কথায় ‘ঈমান বিল গাইব’ বা অদৃশ্য জাতের উপর বিশ্বাস স্থাপন বলে। আর তিনি যা বলিয়াছেন এবং যাকে যেরূপ ভাবিতে নির্দেশ দিয়াছেন, সেভাবে মানা ও বিশ্বাস করা। অর্থাৎ আল্লাহর আহকাম বা সংবিধান লইয়া যিনি মানব-কুলের কাছে আগমন করিয়াছেন, তাঁহাকে সত্য বলিয়া বিশ্বাস করা এবং তাঁহার নির্দেশ আল্লাহরই নির্দেশ মনে করিয়া সেমত নিজের জীবন গঠন করা।
এ গেল বিশ্বাসের মোটামুটি ধারণা। এরপর আসিবে কর্মানুষ্ঠান। আল্লাহ মানুষকে লাগামহীন ভাবে ছাড়িয়া দিতে রাজি নহেন। আল্লাহকে মানে, বিশ্বাস করে এবং মেতে নিজের জীবন পরিচালনা করে, এ জন্য তিনি বান্দার প্রতি কিছু কর্মানুষ্ঠানের দায়িত্ব চাপাইয়া দিয়াছেন। সেগুলি হইল-নামাজ, রোজা, মালদারের জন্য জাকাত দেওয়া এবং সামর্থ্যবানের জন্য জীবনে একবার হজব্রত পালন করা।
কর্মানুষ্ঠানের এ বিধানগুলিকে আল্লাহর পথে জিহাদ, মানে শ্রম-লব্ধ কর্ম বলিয়া আখ্যা দিয়াছেন। যদিও শত্রুর সাথে মোকাবেলা করাও এক শ্রেণীর জিহাদ। কিন্তু প্রবৃত্তির সাথে ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ বা জিহাদই জিহাদে আকবর বা মহা সংগ্রাম।
এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন-
ইয়া আইয়্যুহাল্লাজীনা আমানু হাল আদুল্লুকুম আলা তিজারাতিন তুনজীকুম মিন আজাবিন আলীম।
মোমেনদের উদ্দেশ্য করিয়া আল্লাহ বলেন, তোমরা তোমাদের প্রভু আল্লাহ তা’আলার সাথে ব্যবসায়ে যদি পরকালে লাভবান হইতে চাও, এবং কঠিন দোজখের আজাব হএত বাঁচিয়া থাকিয়া অপূর্ব সুখের আস্তানা বেহেশত বাগীচার চিরকল্যাণ কামনা কর, তবে শোন- তোমাদের পরি- ত্রাণের পথ বাতাইয়া দিতেছিঃ তোমরা প্রথমতঃ আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন কর এবং নিজের কু প্রবৃত্তির প্ররোচনা নির্মূল করার উদ্দ্যেশ্য প্রচেষ্টা চালাও, আল্লাহর বিধান ও নিদের্শ মোতাবেক জীবন যাপন কর। এ কারণে তোমাদের জীবন ও সম্পদ যদিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবুও পিছপা হইও না। জ্ঞানীজনের ইশারাই যথেষ্ট। তাই তোমরা বুদ্ধিমানের মত বিবেক চালনা করিয়া কাজ করিও।’
খোদার সাথে কারবারে হতে চাও লাভবান,
জিহাদ কর খোদা রাসূলের পরে নিয়ে ঈমান
আসল ব্যবসা ইহা জান হে মোমেন বেরাদার,
পরকালে যাইবে বেহেশতে-সুখের আকর।
আল্লাহ ও রাসূলের উপর বিশ্বাস স্থাপন এবং কুপ্রবৃত্তির সাথে জিহাদ করিয়া যদি বিজয়ী হইতে পার,- শয়তানকে পরাভূত করিতে পার, তবেই খোদা তোমাদের অপরাধ ও গোনাহ মার্জনা করিয়া দিবেন এবং অপূর্ব সৌন্দর্যের বেহেশতে প্রবেশ করাইবেন। এই যদি করিতে পারিলে, তবে এ হইতে বিরাট বিজয় আর কিছু নাই। ইহাই অপূর্ব সফলতা।’
এ সম্পর্কে আল্লাহ পাক অন্যত্র ইরশাদ করেন-
‘যাহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলের উপর ঈমান আনিয়াছ এবং সুন্দর ও নেক কর্ম করিয়াছে, তাহাদেরকেই আল্লাহ স্বর্গোদ্যান দান করিবেন। সেটাই হইবে তাহাদের চির বাসস্থান।’
কিভাবে শয়তানী অছওয়াছা তথা কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব মুক্ত হইবে এবং কেমন করিয়া আল্লাহর খুশী হাছিল করিয়া বেহেশতে প্রবেশ করিতে পারিবে, তাহার একটি সুন্দর বর্ণনা দিয়াছেন মহান আল্লাহ তাআ’লা নিজের কালাম শরীফে।
সূরা মুমেনুনে আল্লাহ ইরশাদ করেন-
আল্লাহর মোমেন বান্দাদের তাহারাই প্রকৃত অর্থে সিদ্ধি লাভ করিতে সমর্থ হইয়াছে-দোজখ ও আল্লাহর গজব হইতে মুক্তি পাইয়া জান্নাতের অধিকারী হইয়াছে, যাহারা ভীত সন্ত্রস্ত হৃদয়ে নামাজ আদায় করে, বাহুল্য কথা হইতে বিরত থাকেঃ স্বউপার্জিত সম্পদের সদ্ব্যবহার অর্থাৎ যথারীতি জাকাত আদায় করে, ক্রীতদাসী ও আপন স্ত্রীদের ব্যতীত অন্যত্র হইতে নিজের লজ্জাস্থানকে সাবধানে হেফাজত করে। আল্লাহর মনোনীত ধর্মীয় বিধান ব্যতীত অন্য পথে আদৌ চলে না।
এতদ্ব্যতীত সে সব লোক আমানতের মালকে নিজস্ব কিছু মনে না করিয়া তাহার সংরক্ষণ করে; ওয়াদা ভঙ্গ করে না- প্রকৃত পক্ষে নামাজের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখে, উহারাই ফেরদাউস নামক বেহেশতের অধিকারী।
পেতে চাও যদি তুমি জান্নাতুল ফেরদাউস,
চলিও খোদার মনোনীত দ্বীনে করিয়া হুশ।
— খতম শোধ-
