Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    July 13, 2026

    হায়নার গুহা – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    July 13, 2026

    কারামাজভ ভাইয়েরা – ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি (অসম্পূর্ণ)

    July 13, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    হামারটিয়া – শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য

    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য এক পাতা গল্প191 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    হামারটিয়া – ১৮

    ১৮

    অগাস্ট মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহের এক দুপুরে জাভেদ আর দীপক মিত্ৰ ইম্যানুয়েলের বাড়ি এসে দেখলেন, তাঁদের জন্য ইম্যানুয়েল রান্না করেছেন। টেবিলে তিনটে বাটি। একটায় সাদা গ্রেভির মধ্যে শ্রেডেড চিকেন। ইম্যানুয়েল জানালেন, এই হিব্রু ডিশের নাম আঞ্জুলি। তিনি মায়ের কাছে শিখেছেন। মাংসের সঙ্গে দুধ মেশানো কোশার নয়, তাই নারকেলের দুধ আর লেবু দিয়ে বানানো ডিশ। দ্বিতীয় বাটিতে ভাত। তৃতীয় বাটিতে আপাম— পাউরুটির পুডিং। দীপক ‘কিন্তু, কিন্তু’ করছিলেন, ইম্যানুয়েল অভয় দিলেন। কোনোটাই মশলাদার নয়। ‘রহস্য সমাধানের আগে পেট খালি রাখতে নেই। খিদের চোটে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়।’

    ‘বেরোব কখন?’ জিজ্ঞাসা করলেন জাভেদ।

    ‘সন্ধে ছ-টায় আমি সবাইকে জড়ো হবার কথা বলেছিলাম। তারা কি আসছে?’

    ‘প্রদীপ বটব্যাল আসতে পারবেন না। দোকান আছে। বাকিদের রাজি করাতে কম বেগ পেতে হয়নি। পারমিতা সান্যাল বেঁকে বসেছিলেন। এসবের ভেতর থাকতে চান না। শেষে বাধ্য হয়ে কিছুটা জোর করতে হল। শতদ্রু দত্তও খেপে আছেন। তাদের হ্যারাস করা হচ্ছে।’ জাভেদ সময় নিলেন পরের কথা বলার জন্য। ‘আমি সোর্স খাটিয়ে ভবানীপুর থানা থেকে একজন কনস্টেবলকে আনতে পেরেছি। পুলিশের উর্দি দেখে যদি সমঝে চলে। নাহলে একদম আনঅফিশিয়াল গ্যাদারিং হলে এদের মাইরি সামলানো মুশকিল হবে। ঘোড়েল লোকজন সব। আমরাও কাউকে থাকতে বাধ্য করতে পারব না।’

    লাঞ্চের পর ইম্যানুয়েল তাদের সমাধান বললেন বিস্তারে। ছায়া ঘন হল। আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আকাশে ছাই মেঘ, একটা কাটা ঘুড়ি উড়ে যাচ্ছে তার গা বেয়ে। পুরোটা শোনার পর অবিশ্বাসের চোখে জাভেদ জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তোমার ভুল হচ্ছে না কোথাও?’

    ‘সম্ভাবনা কম। তোমার কাছে বেটার অলটারনেটিভ থাকলে জানাও।’

    দীপক মিত্র বললেন, ‘একমাত্র এই সমাধানে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে যখন, এর থেকে ভালো সমাধান না-পেলে এটাকেই ধরতে হবে।

    ‘শোনো, কোনো সমাধানই সুখকর হবে না যারা আছে তাদের জন্য। তাই তোমাকেই বাছতে হবে, তুমি সুখকর সমাধান চাও, না, ঠিক সমাধান চাও।

    ‘তাহলে, ১৯৯৮ সালে আমরা ভুল ছিলাম, না, ঠিক ছিলাম? আমি কনফিউজড।’ ভুরু কুঁচকে নিজের মনে জাভেদ বললেন।

    ‘তোমরা প্রিকনসিভড নোশন নিয়ে এগিয়েছিলে যেহেতু ঘর বন্ধ ছিল। আর, আমি লকড রুম নিয়ে মাথাই ঘামাইনি। ওটা ম্যাজিক ট্রিকের মতো, অনেকভাবেই হতে পারে। তদন্তে এই টেকনিক্যালিটিগুলো লোয়েস্ট রাং-এ থাকা উচিত। আমার উদ্দেশ্য ছিল সবার বক্তব্য শুনে সেগুলো বিচার করা, এটা ধরে নিয়ে যে, ঘর খোলা ছিল। তারপর, যে মোস্ট প্রোব্যাবল অপরাধী, তাকে অকুস্থলে বসিয়ে দেখা যে, ঘর বন্ধ থাকলে সে অপারেট করতে পারবে কি না। এক্ষেত্রে, পেরেছে। আর একটা কথা, অনিরুদ্ধ একটা জায়গায় সততা দেখিয়েছেন। তিনি চাইলে পুলিশের কাছে বলতে পারতেন যে, খুন করেননি। কিন্তু, বলেননি। কারণ, তার সত্যিই স্মৃতিলোপ হয়েছিল।’

    ‘কিন্তু, শাস্তির কী হবে?’ জিজ্ঞাসা করলেন দীপক।

    ‘শাস্তি তো হয়ে গেছে। এক অপরাধে দু-বার শাস্তি হয় না।’ ইম্যানুয়েলের এই কথার উত্তরে দীপক ভুরু কুঁচকে প্রতিবাদ করতে গেলেন, তারপর সামলে নিলেন নিজেকে। ‘আমাদের বয়েস হয়েছে, ডাক্তারবাবু! আদর্শের আয়নায় সব কিছুকে না-দেখে কমন সেন্স ইউজ করা প্রেফারেবল।’ ইম্যানুয়েলের গলায় এমন কিছু ছিল যে, দীপক হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে হাত তুললেন। জাভেদ এসব কথায় পাত্তাই দিলেন না। তিনি জানালা দিয়ে খিদিরপুর দেখতে ব্যস্ত।

    ‘আমি জানতাম, পারলে একমাত্র তুমি পারবে। জাভেদকে বলেছিলাম সেকথা। তোমার সমাধানে আমি কনভিন্সড, কিন্তু সিদ্ধান্তে শিয়োর নই।’

    ইম্যানুয়েল তাঁর দাবার বোর্ডের দিকে তাকালেন। আলেখিন ডিফেন্সের ভ্যারিয়েশন। বরাবরের মতো এবারেও ড্র হবে। তিনি নিজেকে হারাতে পারেন না। দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ছবি ধূসর হয়েছে। বহুকাল ঝাড়পৌঁছ পড়ে না। মায়ের চোখে চোখ রেখে ইম্যানুয়েলের মনে পড়ল, মার্গারেট এলিয়াস বহু বছর আগে এক ইওম কিপুর উৎসবের সন্ধেবেলা তাঁকে বলেছিলেন, মহাবিশ্বের মতো টোরা-ও সারাক্ষণ এবং সবদিকে প্রসারিত হয়ে চলেছে। এই প্রসারণকে হিব্রুতে মিদ্রাস বলা হয় যার অর্থ অন্বেষণ। কীসের অন্বেষণ? মার্গারেট বলেছিলেন, সার্চ ফর মিনিং। জীবনের অর্থ। তারপর অদ্ভুত হাসি হেসেছিলেন তাঁর মা। জানিয়েছিলেন, টোরা একটা নয়। যতজন পাঠক, ততগুলো টোরা। কারণ, প্রত্যেক পাঠক টোরার টেক্সট থেকে নিজেদের মতো করে অর্থ বার করবে। তাই, সত্যের সন্ধান আসলে ব্যক্তিগত।

    সন্ধেবেলা মালিনী অধিকারীর বাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে ইম্যানুয়েল ভাবছিলেন, যতগুলো জীবন ততগুলোই সত্য, মায়ের এই ভাবনা কি তাহলে কেওসের জন্ম দেবে না? কারণ, এটা ন্যায়ের ধারণাকে অন্তর্ঘাত করে। ভাবনায় বাধা পড়ল। কারণ, জাভেদ তাঁর কাঁধে হাত রেখেছেন। ইম্যানুয়েল দেখলেন তাঁর সামনে বসে আছেন শতদ্রু দত্ত, পারমিতা মুখার্জি, অনুপ রুংতা, সুচন্দ্রা মাইতি। সাম্য একপাশে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। কোনায় আধো-অন্ধকারে নিজের ইজিচেয়ারে শুয়ে দেবারতি অধিকারী। জাভেদ আর দীপক মিত্র ইম্যানুয়েলের পেছনে বসে আছেন। দরজার বাইরে এক পুলিশ কনস্টেবল পাহারা দিচ্ছেন।

    ‘এই নাটকবাজি কখন শেষ হবে?’ শতদ্রু ধারালো গলায় বললেন। ‘আমার বেরোনো আছে।’

    ‘আজ কোথাও বেরোনো হবে না।’ উত্তর দিলেন জাভেদ।

    ‘মানে? মনে রাখবেন মশায়, আপনারা সিভিলিয়ান। কোনো অফিশিয়াল প্রসেস হচ্ছে না।’

    ‘আহ্, ছোড়িয়ে না সারজি।’ অনুপ রুংতা সিগারেটের প্যাকেট বার করে দেবারতির দিকে তাকিয়ে আবার পকেটে ঢোকালেন।

    ‘ধুর মশায়, কী ছাড়ব? আর, আপনি কে বলুন তো?’ তেরিয়া হয়ে তাকালেন শতদ্রু। ‘পুলিশের লোক?’

    ‘মালিনীর বন্ধু ছিলাম। কলিগ।’

    ‘কেমন বন্ধু?’ শতদ্রু বিস্মিত ভঙ্গিতে দেবারতিকে যেন সাক্ষী মানলেন। ‘এরা কারা? আপনার মেয়ে কাদের সঙ্গে মিশত?’

    ‘আমি জানি না। তুমিও না। আর, না-জেনে বেশি কথা বলা বুদ্ধিমানের লক্ষণ নয়। তোমার বোঝা উচিত।’ দেবারতির গলায় যেন চাবুক ছিল। কুঁকড়ে মিইয়ে গেলেন শতদ্রু। তো-তো করে ‘না, মানে, এসব আবার কী’ বলতে গেলে দেবারতি ক্লান্ত ভঙ্গিতে চোখ বুজলেন। ‘তুমি কি এখনও ক্লাসের সবথেকে কম বুঝে নিজেকে চালাক ভাবা স্টুডেন্টটাই থেকে যেতে চাও? এই ঘরের অ্যাভারেজ আইকিউ সিঙ্গল ডিজিটে নামিয়ে আনার প্রতিজ্ঞা যদি না-থাকে, তাহলে মুখ বন্ধ রাখো।’

    জোঁকের মুখে নুন পড়লে যেমন কুঁচকে যায়, সেভাবে শতদ্রু সোফায় মিশে যাবেন মনে হল। ইম্যানুয়েল অবাক হয়ে দেবারতির দিকে তাকালেন। জামাইয়ের সঙ্গে এভাবে কথা বলবেন দেবারতি, তিনি ভাবেননি। নাকি, এরকমই তাঁর বরাবরের অভ্যেস? সাম্য ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে মাটির দিকে চোখ নামিয়ে আছে। ইম্যানুয়েলের একবার মনে হল, সাম্যকে এখানে থাকতে দেবেন না। যে সত্যিগুলো বেরোবে, তাদের ও কেমনভাবে নেবে তিনি বুঝতে পারছেন না। ভেঙে পড়তে পারে, আবার ফিরে যেতে পারে নেশায়। তাহলে কি ওকে নিজের ঘরে পাঠিয়ে দেবেন? তারপর তাঁর মনে হল, দেবারতিই ঠিক। প্রথমদিন ইম্যানুয়েলের সামনে সাম্যকে বলেছিলেন যে, সে বড়ো হয়েছে, এবার বাস্তবকে হ্যান্ডল করতে শিখুক।

    ‘আপনারা বলুন।’ ইম্যানুয়েলকে বললেন দেবারতি।

    ‘আমি আসতে চাইনি।’ কঠিন গলায় পারমিতা বললেন। ‘কিছু এসে যায় না আমার।’ দেবারতির দিকে তাকালেন। ‘অনেক বছর আগে আপনার আমার সাক্ষাৎ ঘটেছিল। সেটা প্লিজান্ট ছিল না। বাধ্য হয়ে দেখা কে ছিলাম। আজকেরটাও বাধ্য হয়েই—’

    ‘আপনাদের সবাইকে আমি আসতে বলেছি, কারণ আপনারা সবাই সম্ভাব্য অপরাধী ছিলেন। সেদিন মালিনীর ঘরের দরজা যদি খোলা থাকত, তাহলে আপনাদের মোটিভ এবং অ্যালিবাই নিয়ে প্রশ্ন উঠতই। এবং, আপনারা সবাই, কিছু-না-কিছু মিথ্যে আমায় বলেছেন। কেউ নির্দোষ মিথ্যে, কারোর মিথ্যে অত নির্বিষ ছিল না। জবাব তো আপনাদের সবাইকেই দিতে হবে, মিস মুখার্জি।’ ইম্যানুয়েল কঠিন স্বরে বললেন। কেউ আশা করেনি তাঁর গলা দিয়ে এরকম আওয়াজ বেরোবে। সবাই চুপ করে গেলেন।

    কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে ইম্যানুয়েল শুরু করলেন। ‘মালিনী অধিকারী আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে এই বাড়িতে খুন হয়েছিলেন। সেই হত্যাকাণ্ডের বর্ণনাতে আমি ঢুকব না। অনেক আলোচনা সে-ব্যাপারে হয়ে গেছে। ফাইল পড়ে এবং অন্যান্যদের সঙ্গে কথা বলে আমার পাঁচটা প্রশ্ন জেগেছিল। প্রথম প্রশ্ন, বাইরের দরজা কেন খোলা ছিল? দ্বিতীয় প্রশ্ন, মালিনীর ঘুমের ওষুধের স্ট্রিপ কেন বাইরে পড়ে ছিল? তৃতীয় প্রশ্ন, মালিনীর শোবার পোজিশন ওভাবে হলে অনিরুদ্ধ কেন তাঁকে খাটে বসে খুন করলেন না? চতুর্থ প্রশ্ন, জানালা খোলা ছিল, না, বন্ধ ছিল? পঞ্চম প্রশ্ন, ঘরের ভেতর গুডনাইট জ্বলছিল কেন?

    ‘অনিরুদ্ধ সান্যাল যে খুন করতে পারেন, সেটা একটা সম্ভাবনা। তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন পুলিশের কাছে। কিন্তু, অনিরুদ্ধ সেটায় কনভিন্সড ছিলেন না। এই খটকাগুলোর কারণে আমরাও হতে পারছিলাম না। এমনকী, আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে ইনভেস্টিগেটর জাভেদ আহমেদও পুরোপুরি কনভিন্সড ছিলেন না যে, অনিরুদ্ধই অপরাধী। সেক্ষেত্রে, আমাদের বিকল্প সম্ভাবনাগুলো খুঁটিয়ে দেখতে হয়। সেগুলো যতই আপাত অবিশ্বাস্য হোক না কেন, সেগুলো কি লাইকলি? এরকম একটা ঘটনাকে কি সেগুলোর কোনো একটা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে? দু-ধরনের বিকল্প এখানে পড়ে থাকে। এক, আত্মহত্যা। দুই, অন্য হত্যাকারী। দুটো বিকল্পই আপাতভাবে অবিশ্বাস্য। বন্ধঘরের ভেতর অন্য হত্যাকারী থাকা অবিশ্বাস্য। আর, আত্মহত্যার ব্যাপারে টেকনিক্যাল সমস্যা থেকে যায়। কিন্তু, এগুলো কি ঘটতে পারে? পারে। যেমন ধরা যাক, হত্যাকারী ঘরের ভেতর ছিল না, বাইরে ছিল। এবং, জানালা খোলা ছিল। অথবা, ধরা যাক, মালিনী বাঁ-হাতি হলেও ডান হাত ব্যবহারে দক্ষ ছিলেন। তাহলে, এগুলো লাইকলি ইম্পসিবিলিটি। সেগুলো কি অনিরুদ্ধ সান্যালের হত্যাকারী হবার থেকে ভালো ব্যাখ্যা হতে পারে? এটা তদন্তে আমাদের মূল প্রশ্ন ছিল।’

    ‘আপনার বলা প্রবলেমগুলোর অনেক এক্সপ্ল্যানেশন হতে পারে।’ অনুপ রুংতা নড়েচড়ে বসলেন। ‘কিছু মাইন্ড করবেন না, আমি নিজের ইন্টারেস্টে এখানে এসেছি। হয়তো ফালতু সাজেশনও দিতে পারি। বাট ছুরিটা যদি খাটের ওপাশে টেবিলে থাকে যেটাকে আনতে গেলে সান্যালকে খাট থেকে নামতে হত, তাহলেই বডি পোজিশনের এক্সপ্ল্যানেশন পাওয়া যায়।’

    ‘মানে, বেডসাইড টেবিল না, অন্য টেবিলটা বলছেন তো? সেক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, অনিরুদ্ধ এবং মালিনী ছুরিটাকে ব্যবহার করেছিলেন তাঁদের অন্তরঙ্গ মুহূর্তের আনুষঙ্গিক হিসেবে। আরও কিছু জিনিস ছিল যেমন হ্যান্ডকাফ এবং ব্লাইন্ডফোল্ডের কাপড়। সেগুলো খাটেই ছিল। তাহলে শুধুমাত্র ছুরিটাকে অত দূরের টেবিলে কেন রাখা হবে?’ ইম্যানুয়েল লক্ষ করলেন, শতদ্রুর হাত মুঠো হচ্ছে। মুখ শক্ত। দেবারতি চোখ বুজে আধশোয়া। সাম্যর মাথা নীচুতে নামানো, মুখ দেখা যাচ্ছে না। পারমিতা সান্যাল নির্বিকার মুখে শুনছেন।

    অনুপ রুংতা বিড়বিড় করলেন, ‘পাতা নহি। আপেল কাটার কাজে ছুরিটা লেগেছিল হয়তো।’

    ‘আপেল কাটা হয়েছিল আপনি জানলেন কী করে?’ এবার প্রশ্ন করলেন জাভেদ, এবং অনুপ রুংতার মুখ ফ্যাকাশে হল।

    ‘মানে, কাগজেই তো বেরিয়েছিল—।’

    ‘না। এসব ডিটেল আমরা প্রেসকে দিইনি। কে কী খেয়েছিল, ড্রিঙ্ক করেছিল, সেসব বাইরের লোকের জানার কথা নয়।’ জাভেদ কড়া গলায় বললেন।

    অনুপ রুংতা ভীতু চোখে জিভ চাটলেন। ‘আমি, শুনেছিলাম যেন—।’

    ‘এত ছোটো ডিটেইল আপনার মনে আছে?’ ইম্যানুয়েলের প্রশ্নে প্রবল বেগে ঘাড় নাড়তে গেলেন অনুপ রুংতা, কিন্তু ইম্যানুয়েল বাধা দিলেন। ‘না। এখন থেকে আপনারা কেউ কোনো কথা বলবেন না। আমি বলব, আপনারা শুনবেন। আমি প্রশ্ন করলে উত্তর দেবেন, তার আগে নয়।’

    আত্মবিশ্বাসী অনুপ রুংতার আমুদে ভাব উধাও। শিকারি বেড়ালের মতো সতর্ক চোখে এদিক-ওদিক তাকালেন।

    ‘এক এক করে আমরা সবকটা প্রশ্নকে খুঁটিয়ে দেখব আর তাদের বিকল্প তাদের সম্ভাব্য সমাধানসমেত যাচাই করে দেখব। প্রথম প্রশ্ন, বাইরের দরজা কেন খোলা ছিল? মালিনী বা অনিরুদ্ধ দরজা খোলা রেখে ওপরে যাবেন না সেটা আমরা এস্টাব্লিশ করেছি। তাহলে দরজা খুলেছিল অন্য কেউ। এবং, সেই চাবি তার কাছে ছিল।’ দেবারতির দিকে ফিরে ইম্যানুয়েল বললেন, ‘এটা আপনার মিথ্যে। আপনি বলেছিলেন দু-সেট চাবির একসেট মালিনীর কাছে, আরেক সেট আপনার ব্যাগে ছিল। মালিনীর চাবি দিয়ে দরজা খুলতে হলে তাকে বাড়ির ভেতর থেকে খুলতে হবে। কারণ, চাবি ছিল মালিনীর কাছে। সেই চাবি পরে পুলিশ তাঁর ঘর থেকে সিজ করেছে। কিন্তু, বাড়ির ভেতর অনিরুদ্ধ এবং মালিনী, যাঁরা কেউ দরজা খুলবেন না সেই চাবি দিয়ে। তাহলে পড়ে থাকে অন্য সেট, মানে, আপনার চাবির সেট, যা দিয়ে দরজা খোলা হয়েছে। তাহলে চাবি আপনার ব্যাগে থাকতে পারে না। আপনি সে-চাবি অন্য কাউকে দিয়েছিলেন।’ দেবারতির মুখে বিকার নেই। চোখ বুজে আছেন। ইম্যানুয়েল নিজের মনে হাসলেন। দেবারতি বুঝতে পারছেন না, এই ট্র্যাপে পা দিয়ে ইম্যানুয়েল মেট হবেন কি না। তাই অপেক্ষা করছেন।

    ‘এই সিদ্ধান্তের একটাই ফ্যালাসি। সাম্য বলেছেন, আপনি বাইরে গেলে নিজের ঘরে তালা লাগিয়ে যেতেন। এবং, আপনি বলেছেন, সেদিন মালিনীর সিল করা ঘরের সামনে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে তারপর নিজের ঘরে আপনি ঢুকে যান। আপনার বক্তব্যকে নির্মলাদিও সমর্থন করেছিলেন। সাম্যকে সন্দেহের কারণ আমার ঘটেনি। এই গোটা কেসে হয়তো সবথেকে স্বচ্ছতা সাম্যই বজায় রেখেছেন। তাই তাঁর কথা আমি বিশ্বাস করছি। তাহলে, আপনি নিজের ঘরের তালা খুললেন কীভাবে, যদি চাবি অন্যের কাছে থাকে? তার থেকে চাবি নিয়ে? না, কারণ আপনি বারাসাত থেকে সোজা এই বাড়িতে ফিরেছেন, মাঝে অন্য কোথাও থামেননি। তার সাক্ষী আপনার ছাত্ররা, যারা আপনার সঙ্গে একই গাড়িতে ফিরেছিল। মালিনীর চাবি দিয়ে? সম্ভব নয়, কারণ সিজার লিস্ট থেকে জেনেছি মালিনীর চাবি তাঁর ঘরে ছিল, যে ঘর তখন সিলড এবং চাবি পুলিশের জিম্মায়। তাহলে একটা বিকল্প হতে পারে যে, আপনি বারাসাত থেকে এসে মেয়েকে হত্যা করে আবার বারাসাতে ফিরে গিয়েছেন। সকাল এগারোটা থেকে বিকেল পাঁচটা। আপনার অ্যালিবাই ছিল না। টাইম উইন্ডো টাইট, কিন্তু দ্রুতবেগে গাড়ি চালালে অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু, এই পালটা সিদ্ধান্তের ফ্যালাসি হল, আপনি মেয়েকে হত্যা করলে ফিরে যাবার সময়ে বাইরের দরজা লক করে যেতেন। দরজা খুলে রাখলে কারোর চোখে পড়বে, নির্মলাদির যেমন পড়েছিল। এবং, মালিনীর দেহ আবিষ্কার হবে। আর, আমার মতো কোনো ডিটেকটিভ অনিরুদ্ধর বদলে আপনাকে সন্দেহ করবে। তাই দরজা লক করে যাওয়া আপনার পক্ষে লজিক্যাল ছিল। তাহলে আমাদের দুটো সিদ্ধান্তই বাতিল করতে হয়। নিজের চাবি আপনি কাউকে দেননি। এবং, খুন আপনি করেননি। তবুও দরজা খোলা হয়েছিল। কীভাবে? এর উত্তর আপনি কী দেবেন?’

    দেবারতি চোখ মেললেন। সোজা দৃষ্টিতে তাকালেন ইম্যানুয়েলের দিকে। কিন্তু, নীরব।

    ‘এর ব্যাখ্যা হল, চাবি দুটো নয়, তিনসেট ছিল। আর, এটাই আপনার বলা মিথ্যে। তৃতীয় সেটের কথা আপনি অস্বীকার করে গিয়েছেন।

    ঘরের আবহাওয়া থমথমে। দুর্লভ এক মৃদুহাসি দেবারতির ঠোঁটে খেলা করছে। ‘আপনি বুদ্ধিমান। জানি, আপনি সব বুঝেছেন।’ ইম্যানুয়েল ঘাড় ঝোঁকালেন, এই কমপ্লিমেন্ট গ্রহণ করছেন তিনি।

    ‘দ্বিতীয় প্রশ্ন, মালিনী তো তাঁর সব ওষুধ চশমার খাপে রাখতেন। সেখান থেকে ওষুধ বার করে খেয়ে স্ট্রিপ আবার খাপে ঢোকাবেন, সেটাই স্বাভাবিক। অন্য ওষুধগুলো চশমার খাপেই ছিল। কিন্তু, ঘুমের ওষুধের স্ট্রিপ বাইরে পড়ে ছিল। কেন? তাহলে কি মালিনী ওষুধ ঢোকাতে ভুলে গিয়েছিলেন?’

    ‘পরের প্রশ্ন হল, মালিনীর ঘরে গুডনাইট জ্বলছিল কেন, যেখানে তাঁর গুডনাইটে শ্বাসকষ্ট হয়? তাহলে ধরে নিতে হবে, মালিনীকে হত্যার পর অনিরুদ্ধ গুডনাইট জ্বালিয়েছিলেন, কারণ বেঁচে থাকলে মালিনী বাধা দিতেন। গুডনাইট কেন জ্বালালেন? যাতে মশা না-আসে। তার মানে, অনিরুদ্ধর প্ল্যান ছিল এই ঘরে থাকা। সেটা অদ্ভুত নয়? মালিনীকে হত্যা করে তাঁর পালিয়ে যাবার কথা। তার বদলে তিনি এই ঘরে থাকতে যাবেন কেন? সেক্ষেত্রে কি গুডনাইট তিনি জ্বালাননি? জ্বালিয়েছিলেন অন্য কেউ?’

    এতক্ষণ সুচন্দ্রা মাইতি নীরব ছিলেন। এবার গলা খাঁকড়ালেন। ‘একটা কথা। অন্য কেউ কীভাবে খুন করবে? বাইরে থেকে? আপনি যেটার ইঙ্গিত দিলেন একটু আগে। কারণ, ঘর তো বন্ধ ছিল। যা শুনেছি, ছিটকিনি তুলে বেঁকিয়ে দেওয়া ছিল।’

    ‘বন্ধ ঘরের প্রসঙ্গে পরে আসব। আপাতত, একটা প্রশ্ন করি। অনিরুদ্ধর ওপর অত রাগ নেই, মানে, যতটা রাগ থাকলে তাঁকে খুন করা যায়, কিন্তু মালিনীর ওপর যাবতীয় আক্রোশ, এরকম এই ঘরে কে কে থাকতে পারেন?’ ইম্যানুয়েল

    দু-জনের দিকে তাকালেন। শতদ্রু দত্ত এবং পারমিতা মুখার্জি। শতদ্রুর ঠোঁট বেঁকে দাঁত বেরিয়ে পড়ল। গরগর করলেন, ‘আপনি কী মিন করছেন?’

    ‘সে-উত্তর আপনি দেবেন, কারণ, আপনারই দেবার কথা। কিন্তু, আপনার কাছে পরে আসছি। আপাতত, মিস মুখার্জি, আপনি বলুন তো, কার ওপর আপনার বেশি রাগ ছিল?’

    ‘অনিরুদ্ধ।’ না-ভেবে উত্তর দিলেন পারমিতা। ‘মালিনীকে আমি চিনি না। শি ওয়াজ আ মিয়ার হোমব্রেকার। বাট শি ডিড নট বিট্রে মি। সেটা অনিরুদ্ধ করেছে।’

    ‘সত্যি? মালিনীকে খুন করলে আপনার পথের কাঁটা দূর হত না?’

    পারমিতার চোখ সরু হল। ‘আমি এত লোলাইফ ছিলাম না, মিস্টার গুহ। আমার নিজের ডিগনিটি বেশি মূল্যবান।’

    ‘কিন্তু, আপনিও মিথ্যে বলেছেন। অনিরুদ্ধর রাগ প্রসঙ্গে বলেছেন, তিন পেগ জিনের পর আট ক্যান বিয়ার খেয়ে তিনি কেমন রিঅ্যাক্ট করতেন আপনি জানেন না। এত এগজ্যাক্ট ডিটেইল আপনি কোথা থেকে পেলেন? আমায় তো বলেছিলেন যে, কেস নিয়ে আগ্রহ ছিল না আপনার। কোর্টে যাননি। উকিলের সঙ্গেও কথা বলেননি। আপনি যদি বলতেন অনিরুদ্ধ মাতাল বা নেশাগ্রস্ত, আমার প্রশ্ন জাগত না। কারণ, সেটা কাগজেই বেরিয়েছিল। কিন্তু, নেশার পরিমাণ? সেসব তো কোথাও উল্লেখ হয়নি। তাহলে আপনি কী করে জানলেন? চাবির সেট বিষয়ে কোনো অবজেকশন শুনব না। ওটা জোগাড় করা সহজ। মালিনী একটা ডুপ্লিকেট সেট অনিরুদ্ধকে দিতে পারেন এবং সেটা থেকে আপনি আরেক সেট ডুপ্লিকেট বানিয়ে নিতেই পারেন।’

    কয়েক মুহূর্তের স্তব্ধতার পর পারমিতা মাথা নীচু করলেন। চশমা খুলে চোখ মুছলেন। মুখ তুলে ধরাগলায় বললেন, ‘যাকে ভালোবেসে সারাজীবন একসঙ্গে থাকার কথা ভাবা হয়েছে, তার বিট্রেয়াল মানুষকে তছনছ করে দেয়, মিস্টার গুহ। হ্যাঁ, আমি মিথ্যে বলেছিলাম। অনিরুদ্ধর সঙ্গে আমি যোগাযোগ করেছিলাম ওর গ্রেপ্তারির পাঁচদিন পর। ওর উকিলের সঙ্গে কথা বলে ওকে ফোন করেছিলাম। থানা কোঅপারেট করেছিল। ওই একবারই কথা হয়েছিল ওর সঙ্গে। আমি জানতে চেয়েছিলাম, ও অপরাধী কি না।’

    ‘কী বললেন?’

    ‘বলেছিল, ওর মনে নেই। কারণ, নেশা করে ছিল। সেই প্রসঙ্গে বিয়ার আর জিনের কথা এসেছিল। অনিরুদ্ধ কাঁদছিল, ক্ষমা চাইছিল বার বার। বলেছিল, ও আমাদের ভালোবাসে। তার আগে পর্যন্ত আমার শোক, রাগ ছিল। কিন্তু, ঘেন্না হয়নি। ওর কথা শুনে হয়েছিল প্রবল। আমি ফোন নামিয়ে রাখি। আর কোনোদিনও যোগাযোগ করিনি। আর, মালিনীকে আমি খুন করিনি। ওটা করার সাহস বা ইচ্ছে আমার ছিল না।’

    ‘আমায় বলেননি কেন?’

    ‘নিজের কাছেও স্বীকার করতে লজ্জা পেতাম। মেয়েদেরও কখনো বলিনি। নিজেকে বার বার বলে গেছি, ওই ফোনটা আমি করিনি। আমি এত নরম নই। অনিরুদ্ধ আমার জীবনের একটা ভুল।’ পারমিতার স্বর আবার কঠিন হয়েছে।

    ‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করছি।’ মৃদু গলায় বললেন ইম্যানুয়েল। ‘আপনার এটুকু কনফেশন দরকার ছিল। আপনি চাইলে এবার চলে যেতে পারেন।’

    ‘না। আমি থাকব।’ দৃঢ় গলায় বললেন পারমিতা। মাথা উঁচু করে সোজা চোখ রাখলেন ইম্যানুয়েলের চোখে। ‘আমিও শুনতে চাই, অনি নির্দোষ ছিল কি না। ফোন রাখার আগে ও বলেছিল, খুন করা ওর পক্ষে সম্ভব নয়। সেটা সত্যি কি না, জানতে চাই আমি। তার পরেও আমি ওর স্মৃতির প্রতি নরম হব না, বাট আই উইল প্রে ফর হিজ ড্যামড সোল।’

    ‘বেশ। এবার আসি পরের প্রশ্নে। এটা আমাদের তদন্তে সবথেকে জটিল জায়গা। অনিরুদ্ধ বলেছিলেন তিনি ‘শনিবারের বারবেলা’ শুনতে পাচ্ছিলেন পাশের বাড়ির রেডিয়োতে। ছাদে না-উঠলে বা জানালা খোলা না-থাকলে শোনা সম্ভব নয়। ছাদে অনিরুদ্ধ উঠবেন এমন সম্ভাবনা কম, কারণ তাঁদের গোপন সাক্ষাৎ ঘটেছিল। খোলামেলা জায়গায় তিনি যেতে চাইবেন না, তার ওপর দুপুর বেলা ঘুমের ভেতর হঠাৎ ছাদে চলে যাবেন সেটাও বিশ্বাসযোগ্য লাগছে না। তার মানে, জানালা খোলা ছিল। কিন্তু, অনিরুদ্ধ বয়ান দিয়েছিলেন যে, তাঁরা ঘুমোবার সময়ে জানালা বন্ধ ছিল। আবার, ঘরের দরজা ভেঙে ঢুকে দেখা গিয়েছিল যে, জানালা বন্ধ। তাহলে মাঝে জানালা খুলে আবার বন্ধ করল কে? অনিরুদ্ধ? অনিরুদ্ধ খুন করলেন, গুডনাইট জ্বালালেন, জানালা খুললেন, বন্ধ করলেন, এত কিছু করলেন, তবু সেই জায়গা ছেড়ে চলে গেলেন না। এই আচরণ সম্পূর্ণ ইললজিকাল।

    ‘এবার, এই ঘটনাক্রমকে ভাঙলে আমরা তিনটে আলাদা ক্রিয়া পাচ্ছি। গুডনাইট জ্বালানো। জানালা খোলা। জানালা বন্ধ করা। মালিনী গুডনাইট জ্বালাবেন না। আবার জানালা খোলা বা বন্ধ কিছুই করবেন না, কারণ ততক্ষণে তিনি ঘুমিয়ে পড়েছেন। আবার, যে ব্যক্তি জানালা খুলবেন, লজিক্যালি তিনি জানালা বন্ধ করবেন না, কারণ তাহলে ইন দ্য ফার্স্ট প্লেস খোলারই দরকার ছিল না।’

    ‘বদ্ধঘরে সাফোকেটিং লাগলে কিছুক্ষণের জন্য জানালা খুলে তারপর বন্ধ করবে না কেন কেউ?’ প্রশ্ন করলেন সুচন্দ্রা মাইতি।

    ‘ঠিক। সেক্ষেত্রে অনিরুদ্ধ খুলবেন। এবং, কিছু পর বন্ধ করবেন। তার মানে, মাঝের সময়টায় তিনি চেতনায় ছিলেন। সেক্ষেত্রে মালিনীকে খুন করে তিনি পালিয়ে গেলেন না কেন? তাহলে অনিরুদ্ধ দুটো কাজ একসঙ্গে করতে পারেন না। মালিনীও পারেন না। এর অর্থ হল, বাড়ির তৃতীয় সেট চাবি থেকে শুরু করে জানালার খোলা এবং বন্ধ হওয়া, এগুলো একটাই দিকে নির্দেশ করছে। ঘরে তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন, যাঁর কাছে বাড়ির চাবি ছিল এবং যিনি হত্যাকারী। তিনি ঘরের বাইরে থেকে হত্যা করেননি, করেছেন ঘরের ভেতর ঢুকে। হ্যাঁ, তাঁকে হত্যাকারী হতেই হবে, কারণ ঘরে ঢুকে জানালা খুলে বা বন্ধ করে, গুডনাইট জ্বালিয়ে অথবা না-জ্বালিয়ে, কিন্তু আর কিছুই না-করে তিনি চলে যাবেন না। এবং, মালিনীর হত্যার পর তিনি ঘরে ঢুকতে পারেন না, সেক্ষেত্রে তখনই চিৎকার, চেঁচামেচি করে লোক ডাকতেন। তার মানে, একটা ইম্পসিবিলিটি, কারণ বন্ধ ঘর। কিন্তু, অসম্ভাব্য হলেও লাইকলি, তার কারণ এতক্ষণ ধরে ব্যাখ্যা করলাম।’

    ‘এখান থেকে আমরা দুটো আলাদা সম্ভাবনা পাচ্ছি। একটা সম্ভাবনায়, গুডনাইট জ্বালিয়েছেন অনিরুদ্ধ এবং জানালা খুলেছেন। জানালা বন্ধ করেছেন তৃতীয় ব্যক্তি। এটায় সমস্যা হল, জানালা খুললে মশা আসে। মশাকে ভেতরে ঢুকতে দিয়ে গুডনাইট জ্বালানো লজিক্যাল নয়। তাহলে অন্য সম্ভাবনা বেশি গ্রহণযোগ্য— গুডনাইট জ্বালিয়েছেন অনিরুদ্ধ এবং জানালা বন্ধ করেছেন। সেক্ষেত্রে জানালা খুলেছেন তৃতীয় ব্যক্তি। তৃতীয় ব্যক্তি ঘরে এসে গুডনাইট জ্বালাবেন, এটা অবশ্যই আরেকটা সম্ভাবনা। তার গ্রহণযোগ্যতা আমরা একটু পরে যাচাই করে দেখব।’

    ‘আচ্ছা, মালিনী কেন জানালা বন্ধ করতে পারে না? হয়তো জেগে উঠেছিল। সেক্ষেত্রে তো তৃতীয় ব্যক্তির থাকার প্রশ্ন ওঠে না।’ সুচন্দ্রা আবার প্রশ্ন করলেন।

    ‘মালিনীর জেগে ওঠা সম্ভব, কিন্তু এখানে একটা ফ্যালাসি আছে। পাশের বাড়িতে রেডিয়ো চলেছে দুপুর আড়াইটেয়, পুলিশ চেক করেছে। তাহলে তখন জানালা খোলা ছিল। তারপর, কতটা পর আমরা জানি না, মালিনীকে জেগে উঠে জানালা বন্ধ করতে হয়েছে। জানালা কে খুলেছেন? অনিরুদ্ধ বাদে অন্য কেউ নন। তৃতীয় ব্যক্তি নন, কারণ তিনি ঘরে ঢুকে জানালা খুলে আর কিছু না-করে বেরিয়ে যাবেন, এটা হতে পারে না। তাহলে, অনিরুদ্ধ মালিনীর আগে একবার জেগেছিলেন। জানালা খুলে ঘুমোলেন এবং ঘুমের মধ্যে ‘শনিবারের বারবেলা’ শুনলেন। তারপর মালিনী জাগলেন, সেটা দুপুর আড়াইটের কিছুটা পর। মালিনী জানালা বন্ধ করে ঘুমোলেন। তখন অবশ্যই গুডনাইট জ্বলছিল না, জ্বললে মালিনী সেটা বন্ধ করতেন। তাহলে মালিনী ঘুমোবার পর তৃতীয় ব্যক্তি ঘরে ঢুকে গুডনাইট জ্বালালেন এবং মালিনীকে হত্যা করলেন। এবং, গাঢ় ঘুমের মধ্যে তিনি মারা গেছেন, ময়নাতদন্ত করেছেন যে ডাক্তার, তিনি একথা বলেছেন।’ ইম্যানুয়েলের কথায় সমর্থনসূচক মাথা নাড়লেন দীপক মিত্র। ‘এদিকে পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট অনুযায়ী মালিনীর মৃত্যুর সময় সোয়া একটা থেকে পৌনে তিনটের ভেতর এবং স্ট্যাব থেকে মৃত্যু হতে মিনিট পাঁচেক লেগেছে। তাহলে আড়াইটের সময়ে ‘শনিবারের বারবেলা’ শোনা, তারপর মালিনীর জাগা, জানালা বন্ধ করা, আবার গভীর ঘুমে তলিয়ে যাওয়া, হত্যাকারীর আসা এবং ছুরিকাঘাত, এই পুরোটা পরের দশ মিনিটে করতে হয়েছে। এত কম টাইম উইন্ডোতে এত কিছু ঘটেছে, বিশ্বাসযোগ্য? গাঢ় ঘুম আসতেও তো একটা ন্যূনতম সময় লাগে মানুষের।’

    সুচন্দ্রা মাথা নাড়লেন। অনিশ্চিত মুখে বিড়বিড় করলেন, ‘বন্ধ ঘরে আর কে থাকবে!’

    ‘আরেকটা জিনিস মাথায় রাখবেন, মালিনী জাগলে দরজা এবং জানালা দুটোই বন্ধ করবেন। সেটাই লজিক্যাল। ঠান্ডা হাওয়া, মশা, সব কিছু থেকে বাঁচতে মানুষ এটা করবে, তার ওপর যখন ঘরে সে নগ্ন অবস্থায় আছে। সেক্ষেত্রে অনিরুদ্ধ বাদে তাঁকে কেউ হত্যা করতে পারে না। এই সম্ভাবনায় আমরা অনেক কিছুর ব্যাখ্যা পাচ্ছি না, যে প্রশ্নগুলো শুরুতেই উল্লেখ করেছি। বিকল্প প্রস্তাবে, জানালা যদি অনিরুদ্ধ বন্ধ করেন? সেক্ষেত্রেও তিনি দরজা এবং জানালা দুটোই বন্ধ করবেন। সেটা মালিনীর মৃত্যুর আগে হলে তিনি বাদে অন্য কেউ হত্যাকারী নন। কিন্তু, সেক্ষেত্রে জানালা খুলতে হয়েছিল অনিরুদ্ধকে জানালা খুলে, আবার বন্ধ করে, মালিনীকে হত্যা করে তাঁর পালিয়ে না-যাওয়া যে ইললজিক্যাল, সেটাও আমরা আগে বলেছি। কাজেই, আমাদের তৃতীয় সম্ভাবনায় যেতে হবে। জানালা খোলা হয়েছিল মৃত্যুর আগে এবং দরজা ও জানালা বন্ধ করা হয়েছিল মৃত্যুর পর। জানালা খুলেছিল তৃতীয় ব্যক্তি, যে মালিনীকে হত্যা করেছে। তারপর জানালা এবং দরজা বন্ধ করেছেন অনিরুদ্ধ।’

    ‘তাহলে অনিরুদ্ধ পালিয়ে গেল না কেন?’ এবার পারমিতা প্রশ্ন করলেন।

    ‘আমার ভেজা ফ্রাই হয়ে যাচ্ছে, মশায়।’ অনুপ রুংতা বললেন। পুরোনো আত্মবিশ্বাসী ভাব একটু ফিরেছে। ‘ইতনা কচকচি না-করে স্ট্রেট বলুন না, মালিনীকে কে খুন করল?’

    ‘আপনিও করতে পারেন। পারেন না?’

    ‘আমার অ্যালিবাই ছিল। আগেই বলেছি।’

    ‘হ্যাঁ। এবং, মাঝের সময়টায় আপনি রিসর্টে থাকেননি। কেন?’

    ‘আপনারা জানেন তো। লোডশেডিং হয়েছিল।’

    ‘১৯ শে ডিসেম্বর প্রচণ্ড শীত পড়েছিল। শতদ্রুবাবু বলেছিলেন। আমিও পরে ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখেছি। লোডশেডিং হলে কীসের অসুবিধে ছিল আপনার? নিজেই বলেছেন আপনার টিভি, সিনেমার নেশা ছিল না। ফলে, টিভি না- চললেও অসুবিধে হবার কথা নয়। ওই ঠান্ডায় ফ্যানের তো প্রশ্নই আসে না। দুপুর বেলা আলো না জ্বললেও বা কী? তাহলে? কোথায় গিয়েছিলেন আপনি সেদিন? কী উদ্দেশ্যে?’

    তো-তো করে রুংতা বললেন, ‘ডায়মন্ড হারবার, আপ লোগ চেক করতে পারেন—’

    ‘ওহ্, কাট দিস ক্র্যাপ!’ অধৈর্য স্বরে বললেন জাভেদ। ‘উইটনেস ম্যানিপুলেশন নিয়ে আমাদের শেখাতে আসবেন না। সত্যিটা বলুন, নাহলে, আপনারা যেটাকে আনঅফিশিয়াল তদন্ত ভেবেছেন, কখন অফিশিয়াল হয়ে পুরোনো ফাইল খুলে যাবে ধরতেও পারবেন না। এসব কেস কখনো তামাদি হয় না। ঘরে আপেলের কথা আপনি জানলেন কী করে?’

    রুংতার কাঁধ ঝুলে গেল। খসখসে স্বরে বললেন, ‘আপনাদের ইয়াকিন হচ্ছে না, না? আমারও উকিল আছে।’

    ‘আনুন আপনার উকিল। তবে, তার আগে লালবাজার যেতে হবে।’ জাভেদ উঠে দাঁড়ালেন।

    শেষ ডিফেন্স খসে গেল। রুংতা হাল ছেড়ে দেবার ভঙ্গিতে দু-হাত তুললেন। ‘ওকে। আই কনফেস। উস দিন সত্যিই লোডশেডিং হয়েছিল। আমার তখন মনে হয়েছিল, যাই একবার মালিনীর বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।’

    ‘কেন?’

    ‘আগের সন্ধেবেলা আমি মালিনীর বাড়ি এসেছিলাম।’ মাথা নীচু করে অপরাধী স্বরে জবাব দিলেন রুংতা।

    ‘তখন অনিরুদ্ধবাবু ছিলেন?’

    ‘না। তখন সাড়ে সাতটা হবে। মালিনী জাস্ট অফিস থেকে ফিরেছে। আমায় ভদ্রতা করে বসাল। কিন্তু, আনমাইন্ডফুল ছিল। লাগতা থা কারোর আসার অপেক্ষা করছে। হুঁ-হাঁ করে কথা বলছিল। এভাবে আর কতক্ষণ থাকা যায়? আমি উঠে বেরিয়ে গেলাম।’

    ‘কেন গিয়েছিলেন?’

    ‘আপকো পতা হ্যায়, কেন। মালিনীকে বলতে আরেকবার, আমার সঙ্গে কি জোকায় যাবে পরের দিন?’

    ‘রাসকেল!’ হিসহিসিয়ে উঠলেন শতদ্রু। কিন্তু, ইম্যানুয়েল আঙুল তুললেন সাবধানসূচক। তাঁর দৃষ্টি দেখে শতদ্রু আবার চুপসে গেলেন।

    ‘মালিনী কী বললেন?’

    ‘সেই একই জবাব। আমি যেন এসব ভুলে যাই। আমি ওর থেকে বেটার কোম্পানি পাব। আমাদের সুট করে না। আমি চলে এলাম। কিন্তু, ওই যে,

    মর্দানা ঘমন্ড। পরদিন রিসর্টে পৌঁছে গুসসা হল। কার সঙ্গে আসার কথা আর কাকে নিয়ে এসেছি! মেয়েটাকে নিয়েই কলকাতায় চলে এলাম ড্রাইভ করে। ওকে হাজরার বারে বসিয়ে একটা বিয়ার খেতে বললাম। দেন মালিনীর বাড়ির সামনে গেলাম। কিন্তু, ঢুকিনি। বাইরে সান্যালের গাড়ি দাঁড় করানো ছিল।’ ম্লান হাসলেন রুংতা। ‘আপনাদের বলেছি, নাম্বারটা মনে রেখেছিলাম। ফির মনে হয়েছিল, ঠুকে দিই। তারপর ফ্রাস্ট্রেটেড লাগল। কী হবে আর করে!

    ‘এটা কখন?’

    ‘এতদিন পর এগজ্যাক্ট সময় আর মনে নেই। দুপুর বেলা।’

    ‘বাড়ির দরজা খোলা ছিল, না, বন্ধ?’

    ‘আমি খেয়াল করিনি। মা সন্তোষী কি কসম। বাড়ির ভেতর আমি ঢুকিনি।’

    ‘এগুলো পুলিশকে জানাননি কেন?’

    ‘পরদিন মালিনীর খবর পেয়ে ডর আয়া থা। সবাই জানে আমি ওকে ডিসটার্ব করেছি। এরপর যদি শোনে যে, আগের দিনই ওর বাড়ি গিয়েছিলাম, পরের দিনেও, আমি কি ছাড় পাব, সারজি?’

    ‘আমি আপনাকে বিশ্বাস করছি একটাই কারণে। মালিনীর বাড়ির চাবির সেট আপনার কাছে থাকা সম্ভব নয়। এবং, আপনি দরজা খোলা রেখে পালাবেন না।’ কয়েক মুহূর্ত থেমে ইম্যানুয়েল বললেন, ‘কাশ্মীরে দুটো বাগিচায় আপনাদের শেয়ার ছিল। আপেলের বাগিচাই হবে, তাই তো? শীতের আপেল মালিনীর জন্য নিয়ে এসেছিলেন। শুক্রবার, না, তার আগেই?’

    ‘ফ্রাইডে। উসকে পেহলে মালিনীর বাড়ির ভেতর আমি পা দিইনি। মা কসম।’

    রুংতার মুখ কাঁদো কাঁদো হল।

    জাভেদ বললেন, ‘আপনি চাইলে যেতে পারেন। এখানে থাকার দরকার নেই আর।’

    ঘর থেকে বেরোবার সময় রুংতা বললেন, ‘স্যার, আমি যে সত্যিই আগের ব্যবহারের জন্য শরমিন্দা, সেটা কি আপনারা ইয়াকিন করবেন? তখন বোকা ছিলাম, স্যার। টাকার গরম ছিল। এখন আমি উস আদমি নেই আর।’

    ‘তবু আপনি মিথ্যে বলেছেন এত বছর পরেও। নিজেকে বাঁচানোর তাগিদ আপনার কাছে এতই প্রবল ছিল।’ ঠান্ডা গলায় বললেন ইম্যানুয়েল। রুংতা মাথা নীচু করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    ‘আমার হিসেবমতে, পারমিতা মুখার্জি এবং অনুপ রুংতা অপরাধী নন। তাঁদের মিথ্যে, নির্বিষ না হলেও ক্ষতিকারক নয়।’ কয়েক সেকেন্ড থামলেন ইম্যানুয়েল। উপস্থিত সবার মুখের দিকে এক এক করে তাকালেন। ঘরের আবহাওয়া থমথমে। ‘মোটিভ ছিল আর দু-জনের। দেবারতি অধিকারী এবং শতদ্রু দত্ত। তার মধ্যে, দেবারতি অধিকারী বিষয়ে আগেই বলেছি। বাকি থাকেন একজন। শতদ্রু। অনিরুদ্ধ, নাকি, শতদ্রু, কে খুন করেছেন? কিন্তু, তার আগে একটা ব্যাপার ক্লিয়ার করতে হবে।’

    শতদ্রুর মুখ টকটকে লাল হল। দাঁত চিপে কিছু বলতে চাইছিলেন। গলার ভেতর থেকে গরগর আওয়াজ বেরোল। সাম্য শতদ্রুর পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর কাঁধে চাপ দিল। শতদ্রু ফিরে তাকালেন না।

    ‘জানালা বন্ধ, চাবির ডুপ্লিকেট, এই সমস্ত কিছুর পর আমি শুরুর পাঁচটা প্রশ্নের একটায় আবার ফিরে গেলাম। অনিরুদ্ধ কেন খাটের ওপাশে গেলেন খুন করতে? এই সমস্যা থাকে না, যদি খুন অন্য কেউ করে। যে ঘরের বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকেছে, খাটের পাশে দাঁড়িয়ে মালিনীকে খুন করে বেরিয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে অনিরুদ্ধকে খাট থেকে উঠতে হয় না। তিনি তখন ঘুমোচ্ছিলেন। মালিনী হাত-পা নাড়াতে পারেননি। চিৎকারও নয়। তাই অনিরুদ্ধর ঘুম ভাঙেনি। এটা আমার কাছে বেশি গ্রহণযোগ্য সমাধান, কারণ যে লোকটা চাবি খুলে বাড়ি ঢুকবে, সে তো একটা উদ্দেশ্যে এসেছে। কিছুই না-করে সে চলে যাবে না। ফলত, মালিনীকে সে হত্যা করেছে। অনিরুদ্ধ যদি না হন, তাহলে কি শতদ্রু দত্ত?’

    শতদ্রু উঠে দাঁড়াতে গেলেন কিন্তু বোঝেননি দীপক মিত্র ততক্ষণে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিনি শতদ্রুকে আবার বসিয়ে দিলেন সোফায়। সাম্য বাবার পাশে বসল।

    ‘মালিনীর ওপর শতদ্রুর রাগ থাকা স্বাভাবিক। এবং, সেদিন কলেজ থেকে তিনি বাড়ি না-ফিরে অন্য কোথাও গেলে কেউ জানতে পারবে না। প্রথমদিন তাঁর একটা কথায় আমার সন্দেহের শুরু। মালিনী নিহত হবার পর তাঁর

    ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন শতদ্রু। ঘরের বিবরণ দিচ্ছিলেন। মেঝেতে অনেক কিছু ছড়ানো-ছিটোনো, চকলেট, হাবিজাবি— এসব বলতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘স্লিপিং পিলের স্ট্রিপ’। মালিনীর ঘরের আয়তন বড়ো। দরজা থেকে দাঁড়িয়ে ঘরের মেঝেতে কিছু পড়ে থাকলে সেখানে কী ডিটেইল লেখা আছে, বোঝা সম্ভব নয়। মালিনীর ঘরে প্রথম ঢুকেছিলাম যেদিন, সাম্যর অজান্তে ঘরের ভেতর একটা পুরোনো বাজে কাগজ ফেলে দরজায় জাভেদকে দাঁড় করিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছিলাম। জাভেদ বুঝছিল না কী লেখা। তাহলে, অত দূর থেকে ওষুধের স্ট্রিপটা যে স্লিপিং পিলেরই, সেটা বোঝা তখনই সম্ভব যদি মালিনী একমাত্র ঘুমের ওষুধ খেতেন, অন্য ওষুধ না-খেতেন। কিন্তু, তাঁর আরও দু-তিনরকম ওষুধ চলত। কাজেই, ওই স্ট্রিপ যে স্লিপিং পিলের, সেটা বোঝার জন্য আগে সেই ঘরে ঢুকতে হয়।

    ‘এবং, গুডনাইটের সমাধানও হয়ে যায়। আমরা প্রথমদিন এই বাড়িতে আসার পর শতদ্রু ঘরে ঢুকেই গুডনাইট জ্বালিয়েছিলেন। তাঁর শরীর খারাপের বাতিক এবং মশার ভয় আছে। তাই মালিনীর ঘর, যেখানে এককালে তিনিও অনেক রাত কাটিয়েছেন, সেখানে ঢুকে অভ্যেসবশত গুডনাইট তিনি জ্বালাবেন সেটা প্রত্যাশিত।

    ‘এখান থেকে আমার আগের প্রশ্নে ফিরে যাই। মালিনী তাঁর ঘুমের ওষুধ কেন চশমার খাপে ঢোকাননি। এর কারণ, সেই ওষুধ ছিল খামের ভেতর, যে খাম খাপে ঢোকানো যায় না তার সাইজের জন্য। আর, সেই খামের ওপর শতদ্রুর নাম লেখা, তাঁর হাতের লেখায়। শতদ্রুর বরাবরের স্বভাব ওষুধের খামের ওপর কার কী ওষুধ সেটা লিখে রাখা। এর দিন দুয়েক আগে মালিনীদের বাড়ি শতদ্রু এসেছিলেন। হয়তো মনের ভুলে খাম ফেলে যান। মালিনীর ঘুমের ওষুধ শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে শতদ্রুর ওষুধ, খামসুদ্ধ, রেখে দেন নিজের কাছে। শতদ্রু দেখেছিলেন খামের ওপর তাঁর নাম লেখা। যেখানে তাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, সেখানে এই খাম দেখে পুলিশ তাঁকে জড়াতে পারে। তাই খামটা নিয়ে নিয়েছিলেন। কিন্তু, বুদ্ধি করে ওষুধটা নেননি। কারণ, মালিনী যদি ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমোন, তাহলে পুলিশ সেই ওষুধ সার্চ করবে। অন্তত স্ট্রিপটাও না-পেলে তাদের মনে সন্দেহ হবে যে ঘরে অন্য কেউ ছিল, অনিরুদ্ধ বাদেও।’

    ‘আপনার এসব কথার প্রমাণ কী?’ গর্জে উঠলেন শতদ্রু। ‘সব আপনার অনুমান। আমি মানহানির মামলা করতে পারি।’

    ‘আপনি যে কিছুই পারেন না, সেটা আমরা এতদিনে জেনে গেছি। কিন্তু, সে যাক। এই পুরো বয়ান, যেটা আমি বললাম, তাকে অস্বীকার করতে পারেন?’

    শতদ্রু কাপতে কাঁপতে দেবারতির দিকে তাকালেন। সুচন্দ্রা স্তম্ভিত হয়ে শতদ্রুকে দেখছেন। সাম্য কাঠের মতো দাঁড়িয়ে। দেবারতি চোখ বুজে উত্তর দিলেন, ‘কিন্তু, আপনি জানেন, মিস্টার ডিটেকটিভ, এটা ঠিক বয়ান নয়।

    হাসলেন ইম্যানুয়েল। ‘ঠিকই। আমি এতক্ষণ যা বললাম, তাকে প্রশ্ন করার দুটো রাস্তা আছে। এক, শতদ্রুর কাছে চাবি থাকতেই পারে। দেবারতি জামাইকে একসেট দিয়েছেন, সম্ভব। কিন্তু, দেবারতি অধিকারীর ক্ষেত্রে যা বলেছি সেটাই এখানে বলব আবার— শতদ্রু যদি খুন করেন, তাহলে তিনি দরজা খোলা রেখে পালাবেন কেন? এবং, যে শতদ্রু নিজের নাম লেখা ওষুধের খাম সরিয়ে ফেলতে এত সতর্ক, তিনি নিজের নাম লেখা চশমার খাপ সরালেন না কেন? দুটোই সরাতে পারতেন। একটা সরালেন, আরেকটায় হাত দিলেন না, এটার ব্যাখ্যা নেই। এবং, এই দুটো প্রশ্নকে কোনোমতেই অস্বীকার করা যাচ্ছে না। ফলত, আমার ব্যক্তিগত যা অভিপ্রায়ই থাকুক না কেন, শতদ্রু দত্ত যে হত্যা করেননি, সেটা মানতে আমি বাধ্য। আরেকটা কারণও আছে, সেটা ইনটুইটিভ। আপনার মতো মানুষেরা আসলে ভীতু হয়। ভীতু বলেই নিজের স্ত্রী-র ওপর গৃহকোণে খবরদারি ফলাতে যায়। আপনাদের পক্ষে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স সম্ভব। কিন্তু, ঠান্ডা মাথায় খুন? নাহ্, প্যাটার্নে মেলে না।’

    ‘আপনি, আমাকে অপমান করছেন?’ শতদ্রুর চোয়াল ঝুলে গেল।

    ‘আপনি বরং খুশি থাকুন যে, আপনাকে ইনডাইক্ট করা হয়নি।’ বললেন দীপক। শতদ্রু এর, ওর দিকে তাকিয়ে বিড়বিড়িয়ে কিছু বললেন। বোঝা গেল না।

    ‘তাহলে চারজন জীবিত সাসপেক্টের মধ্যে চারজনই বাতিল।’ মৃদুগলায় বললেন পারমিতা। ‘খুন তার মানে অনিরুদ্ধই করেছে।’

    ‘সেটাই তো আইনও মেনে নিয়েছে।’ হাত ওলটালেন ইম্যানুয়েল। ‘আমরা নতুন কোনো দিশা দেখাতে পারি কি?’

    পারমিতা উঠে দাঁড়ালেন। ‘জানা কথা আবার নতুন করে শোনার জন্য আমি এখানে আসিনি। দরজা, জানালা খোলা-বন্ধ করার ব্যাপারে এত কচকচি না- করলেও চলত। এভাবে আমার সময় নষ্ট করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।’

    ‘একটু বসুন, প্লিজ। অনিরুদ্ধ সান্যাল খুনি, এটা আমরা ধরে নিয়েই এগোচ্ছি। কিন্তু, তাতে যে অনেক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না, এটাও তো সত্যি। সেই প্রশ্নগুলোর কী হবে?’

    ‘আমি ইন্টারেস্টেড নই।

    ‘আমিও না। বাড়ি যাব।’ সুচন্দ্রাও উঠলেন।

    ‘বসুন। কলকাতায় বৃষ্টি নেমেছে। এখনই উঠবেন? আরও কিছুটা সময় কাটিয়ে গেলে, ব্রেইনস্টর্ম করলে হয়তো প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলবে। চারজনের যে কেউ হত্যাকারী হতে পারেন, সেগুলো পসিবিলিটি। কিন্তু, অনিরুদ্ধর মতো এগুলোতেও আমরা কনভিন্সড হতে পারছি না। তাহলে কি আমাদের লাইকলি ইম্পসিবলের দিকে যেতে হবে?’

    ‘এগুলো আপনাদের ইন্টেলেকচুয়াল এক্সারসাইজ হতে পারে, কিন্তু আমার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল। সরি, আমি অত ডিসপ্যাশনেট হতে পারলাম না।’ কাঠ কাঠ গলায় পারমিতা উত্তর দিলেন।

    ‘ঠিক আছে। আমাদের কথাও প্রায় শেষ। শুধু একটা প্রশ্ন, যেটা আমি উল্লেখ করিনি এতক্ষণ। সেটা হল, আপনারা ‘শোলে’ দেখেছেন?’

    ‘এই কথার কী মানে?’ বিরক্তস্বরে সুচন্দ্রা বললেন।

    ‘নিশ্চয় দেখেছেন। দেখলে জানবেন, বড়ো সিনেমা। দূরদর্শনে যে ভার্সনটা দেখায়, সেটাই প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টার। ১৯৯৮ সালে টিভিতে সিনেমার মাঝে অ্যাড ব্রেক চলে এসেছে, দূরদর্শনেও। তো, অ্যাড ব্রেক ধরলে তো পৌনে চার ঘণ্টা হবেই। তাই না?’

    ‘তা হবে। কিন্তু, কেন এই প্রশ্ন করছেন?’ পারমিতার মুখ দেখে মনে হল, তিনি কিছু আন্দাজ করছেন। আবার বসে পড়লেন।

    ‘মালিনী খুন হবার দিন টিভিতে ‘শোলে’ দিয়েছিল। চারটের সময় শেষ হয়েছিল, নির্মলাদির ছেলে জানিয়েছেন। তাহলে সিনেমা শুরু হবার কথা মোটামুটি সোয়া বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে। এবার, শতদ্রু বলেছিলেন যে, সাম্য দুপুর আড়াইটের সময়ে ড্রয়িং স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেছিল এবং তাঁরা দু-জনে বসে আধঘণ্টা ‘শোলে’ দেখেছেন। আর সাম্য বলেছেন, বাবার সঙ্গে

    বসে ‘ইয়ে দোস্তি হাম নেহি ছোড়েঙ্গে’ গানটা তিনি গাইছিলেন, যখন সেই দৃশ্য টিভিতে দেখানো হচ্ছিল। সমস্যা হল, এই দৃশ্যটা এসেছে সিনেমার শুরুতে, যা হিসেবমতো দুপুর একটার আশপাশে দেখানো হয়েছিল। একদম শেষদিকে আরেকবার গানটার কয়েক লাইন ক্ষীণ সুরে এসেছিল, কিন্তু সেটা সাড়ে তিনটের পর, যখন সাম্য ছবি আঁকছেন। এই কনফিউশনটার ব্যাখ্যা কি আপনি দেবেন, সাম্য?’ ইম্যানুয়েল শেষ বাক্যটা নরম স্বরে বললেন।

    সাম্যর চোখ মাটিতে ছিল। এবার মাথা তুলল। তার মুখে অপার্থিব হাসি। ইম্যানুয়েলের মনে হল, মালিনী হাসলেও এরকমই দেখাত। ‘আপনি এই ব্যাখ্যা জানেন। জানেন না?’

    ‘আমার কাছে প্রশ্ন আছে। এবং, অনেক প্রশ্নের উত্তরেই একটা কমন ইন্টারসেকশন পাচ্ছি। যেমন ধরুন, আপনার মা আপনার বাবার কাছে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ করেছিলেন। অন্যদের কাছেও করেছেন। আমরা ভেবেছি অনিরুদ্ধর জন্য। কারণ, অনিরুদ্ধ যে রেগে যেতেন দুমদাম, সেটা একাধিক মানুষ বলেছেন। কিন্তু, অনিরুদ্ধ রেগে গিয়ে কী করতেন? ফিজিক্যাল হার্ম? তার প্রমাণ আমরা পাইনি। পারমিতাও বলেননি। এবং, আরেকটা কথা। মালিনীর সঙ্গে শতদ্রুর যেমন সম্পর্ক, সেখানে প্রেমিকের জন্য ডাক্তারের খোঁজ কি তিনি শতদ্রুর কাছে চাইবেন? সম্ভাবনা কম। বরং, চাইতে পারেন এমন মানুষের জন্য, যারা শতদ্রুরও নিকটজন। দেবারতি, অথবা, আপনি। আবার, সুচন্দ্রা যখন মালিনীকে বলেছিলেন, অনিরুদ্ধর সঙ্গে আপনার আলাপ করিয়ে দেবার কথা, মালিনী বলেছিলেন, ‘আমি ওর রাগকে ভয় পাই।’ কার রাগ? আমরা ভেবেছি অনিরুদ্ধ, কিন্তু মালিনী তো স্পেসিফাই করেননি। তাহলে অনিরুদ্ধ, অথবা সাম্য, যে কেউ হতে পারে। আরেকটা ব্যাপার হল, শতদ্রু বলেছিলেন যে, প্লেস অফ অকারেন্সে অনেক চকলেট ছড়ানো-ছিটানো ছিল। চকলেট অ্যাফ্রোডিসিয়াক। শারীরিক সম্পর্কে উত্তেজনা বাড়াতে চকলেটের ব্যবহার আজকের নয়। কিন্তু, চকলেটের বিবরণ দিতে গিয়ে শতদ্রু ফাইভস্টার, ক্যাডবেরির সঙ্গে জেমসের উল্লেখও করেছিলেন। দু-জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ অন্তরঙ্গ সময়ে চকলেট ব্যবহার করতেই পারেন, কিন্তু জেমস? জেমস বাচ্চাদের খাবার না? মূলত এইটা শুনেই আমার প্রথম মনে হয়েছিল, এখানে কোনো শিশু কি জড়িত? এবং, শিশু বলতে, আপনি।’

    ঘরে পিনপতনের স্তব্ধতা। সবাই মনে হয় নিশ্বাস ফেলতে ভুলে গেছে। কিন্তু, সাম্য তখনও হাসছে।

    ‘আবার, জানালা খোলা থাকার সূত্রেও আপনার কথা মনে পড়েছিল। আপনি বদ্ধঘরে বেশিক্ষণ থাকতে পারেন না। ফলত, জানালা খোলার সম্ভাব্য ক্যান্ডিডেট আপনি, অনিরুদ্ধ বা শতদ্রু হতে পারেন। ফলত, আমরা কী দেখতে পাচ্ছি? সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ যার জন্য, যার রাগকে মালিনী ভয় পান, জেমস যে ব্যবহার করতে পারে, জানালা যে খুলতে পারে, এই সবক-টা কেসে সম্ভাব্য নামগুলোর ভেতর একটা নাম কমন। সাম্য। একমাত্র ইন্টারসেক্টিং পয়েন্ট।

    ‘আমি এবার একটা গল্প বলছি। এই সিকোয়েন্সটা আমি নিজের মতো করে বানিয়েছি। বাস্তব হয়তো আলাদা হবে কিছুটা। কিন্তু আমার ধারণা, বিস্তর তফাত হবে না। সাম্য ছে।টোবেলা থেকে ট্রাবলড চাইল্ড। সে বাবা-মায়ের কুৎসিত ঝগড়া দেখেছে। স্কুলে বন্ধুদের কাছে বুলিড হয়েছে। বাবা, অনুমান করছি, তার সামনেই তার মায়ের চরিত্র নিয়ে যা-ইচ্ছে-তাই বলেছেন। সুচন্দ্রা মাইতির বক্তব্যেও সেরকম ছিল যে, শতদ্রু বলেছেন, ‘জানুক পাপান, তার মায়ের কী চরিত্র।’ সাম্য দেখেছে তার সামনে বাবা তার মা-কে চরিত্র তুলে অপমান করছে এবং দিদা বাধা দিচ্ছে না। এগুলো একটা বাচ্চার কাছে ভয়াবহ ট্রমাটিক হয়। এসব ফ্যাক্টর বহুদিন ধরে তার ভেতর প্লে করতে করতে তাকে সাইকোলজিক্যালি নড়বড়ে বানিয়ে দিয়েছিল। সে তার রাগ কন্ট্রোল করতে পারত না। হয়তো রেগে গেলে হিংস্র আচরণ করত, যা ওই বয়েসের বাচ্চার ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নয়, তারা সেলফ-কন্ট্রোল তখনও শেখেনি। শতদ্রু দত্ত যেরকম মানুষ, তিনি এগুলোকে সাইকোলজিক্যাল ইসু হিসেবে পাত্তা দেবেন না। মনের রোগ তাঁর কাছে বড়োলোকি ব্যাপার। কিন্তু, মালিনী চিন্তিত হয়েছিলেন। তাই তিনি চেনাজানা লোকেদের কাছে ডাক্তারের খোঁজ করছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন এরকম টক্সিক পরিবেশ একটা বাচ্চার কতটা ক্ষতি করতে পারে। ডিভোর্সটাও, অনুমান করছি, অনিরুদ্ধর জন্য যতটা, ততটাই সাম্যর জন্যেও। তিনি হয়তো সাম্যকে নিয়ে এখান থেকে চলে যেতে চাইছিলেন। অন্যদের না-বললেও একবারই সুচন্দ্রার কাছে নাম না-করে বলে ফেলেছিলেন যে, সাম্যর রাগকে তিনি ভয় পান। হয়তো অনিরুদ্ধকে দেখলে সাম্যর রাগ আবার ফেটে বেরিয়ে আসবে, সেই ভয় তিনি পেয়েছিলেন।

    ‘১৯ ডিসেম্বর সাম্যর ড্রয়িং স্কুল তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গিয়েছিল। সে একটা জেমসের প্যাকেট কিনে খেতে খেতে বাবার বাড়ি না-গিয়ে কোনো খেয়ালবশত মায়ের বাড়ি চলে আসে, যেহেতু সবই কাছাকাছি। চাবি তার কাছেই ছিল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে ডাকাডাকি করে। সাড়া পায় না। ওপরে আসে। দেখে, মায়ের ঘরের দরজা আধভেজানো এবং ভেতরে অন্ধকার। সাম্য ভেতরে ঢুকে কয়েক বার ডাকে। কেউ উত্তর দেয় না। কিন্তু, সে দেখে গুডনাইট জ্বলছে। বদ্ধ ঘরে তার অস্বস্তি হচ্ছিল, আর সে জানত মায়েরও অ্যালার্জি আছে। সে প্রথমে চেষ্টা করে গুডনাইট বন্ধ করবার। কিন্তু, সুইচবোর্ড অনেকটা উঁচুতে ছিল। সাম্য হাত পাচ্ছিল না। সে বরাবরই উচ্চতায় খাটো। তখন সে জানালা খুলে দেয় যাতে তার এবং মায়ের দু-জনেরই সাফোকেশন না হয়। তারপর দেখে কম্বলে সর্বাঙ্গ মুড়ে কারা শুয়ে আছে। একটা কম্বল সরিয়ে সাম্য দেখে, মা নগ্ন। এবং, ওপাশে একজন অচেনা লোক। সাম্য হয়তো ভয় পেয়েছিল। হয়তো ট্রাবলড লেগেছিল, মা-কে ওই অবস্থায় আবিষ্কার করে। শিশু যখন বাবা, মা-কে এই অবস্থায় দেখে, তার ট্রমা হয় বলে মনোবিদরা বলেন। সাম্যরও ট্রিগার করেছিল। তার মাথায় আগুন জ্বলে যায়, জেমস পড়ে যায় তার হাত থেকে। তাহলে এই লোকটার জন্য এত অশান্তি? মা তাহলে এত খারাপ কাজ করছে, আর সেজন্য সে বাবা, মা-কে একসঙ্গে পাচ্ছে না? বাবা যেমন বলত, মা তাহলে নোংরা? হাতের কাছে ছুরিটা ছিল, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে সাম্য ছুরি বসিয়ে দেয় মায়ের গলায়। মালিনী সাড়াশব্দ করতে পারেননি। তারপর সাম্যর চেতনা ফেরে এবং সে বোঝে সর্বনাশ হয়েছে। খারাপ কাজ করেছে সে, অপরাধ করেছে। মায়ের মৃত মুখ দেখে তার মাথার ভেতর অস্থির লাগছিল, তাই সে মায়ের মুখ কম্বলে চাপা দিয়ে দেয়। যেন নিজের কৃতকর্ম সে দেখতে চায় না। এবার বোঝে তাকে পালাতে হবে। কিন্তু, পালাতে যাবার আগে সে দেখে টেবিলে বাবার নাম লেখা খাম। তার শিশুবুদ্ধিতে মনে হয়েছিল, বাবা বিপদে পড়বে। পুলিশ বাবাকে ধরবে। খামটা হ্যাঁচকা মেরে টানে সাম্য। ওষুধ মাটিতে পড়ে যায়। খাম হাতে সাম্য দৌড়ে পালায়। চশমার খাপের কথা তার মনে ছিল না অথবা গুরুত্ব দেয়নি, কারণ সে তো বরাবরই জানত মা ওই খাপ ব্যবহার করে। ছোট্ট সাম্য দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে বেরিয়ে যাবার সময় তার মনে ছিল না যে, মেইন দরজা খোলা।

    ‘প্রশ্ন উঠতে পারে, সাম্যর হাতেও তো রক্ত লেগে ছিল। রাস্তাঘাটে কারোর চোখে পড়ল না? প্রথমত ‘শোলে’ দেখার সময়ে দুপুর বেলা পাড়া নিস্তব্ধ ছিল। নব্বইয়ের দশকে ‘শোলে’ একটা ইভেন্ট ছিল, লোকজন ঘরে ঢুকে যেত। বাইরে বেরোত না। দ্বিতীয়ত, সাম্যর ছিল ঠান্ডা লাগার ধাত। তাই সে টুপি, ফুলহাতা সোয়েটার আর মাফলার পরেছিল। সোয়েটারটা লাল রঙের ছিল, তাই না, সাম্য? আমি কি ঠিক বলছি? সেই কারণেই রাস্তাঘাটে যে অল্প কয়েক জন ছিল তাদের আলাদা করে চোখ টানেনি। বাড়িতে পায়ের ছাপ পড়েনি, কারণ আপনি মোজা পরে ঘরে ঢুকেছিলেন, চটি বা জুতো বাইরে খুলে। ছুরির বাঁটেও আপনার হাতের ছাপ পাওয়া যায়নি, কারণ উলের গ্লাভস ছিল হাতে। আপনার মা নিউ মার্কেট থেকে এগুলোই তো যত্ন করে কিনে দিতেন প্রতি বছর, তাই না?’

    সাম্য হাসছিল। কিন্তু, তার চোখ দিয়ে দরদর করে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সুচন্দ্রা বিস্ফারিত চোখে সাম্যর দিকে তাকিয়ে। শতদ্রু দু-হাতে মুখ ঢেকে আছেন। দেবারতি চোখ বুজে শুয়ে। মুখ দেখে মনের ভাব বোঝা যায় না।

    ‘আপনার বাবা জানতেন। আপনি বাড়ি ঢোকার পর হাত, পায়ের রক্ত লুকোতে পারেননি। বাবার কাছে কনফেস করেছিলেন কি? খামটাও দেখিয়েছিলেন হয়তো। যে কারণে আপনার বাবা জানতেন যে, মালিনীর ঘরে স্লিপিং পিলের স্ট্রিপ মিলবে। আপনাকে বাঁচাবার জন্য তিনি মিথ্যে গল্প খাড়া করেছিলেন। শুধু তাই নয়, দেবারতির পরামর্শে আপনাকে কলকাতার বাইরে পাঠিয়ে দেন যাতে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে না-পারে।’

    দেবারতির দিকে ফিরলেন ইম্যানুয়েল। ‘আপনি বুঝেছিলেন। কারণ, সাম্যকে চাবিটা আপনি ছাড়া আর কে দেবে? সাম্য বলেছিলেন, ছোটোবেলায় তিনি হঠাৎ হঠাৎ বাড়ি ঢুকে আপনার পিঠের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন আর চমকে যেতেন আপনি। আমার প্রশ্ন জেগেছিল, বাবার বাড়ি থেকে এসে সাম্য ঢুকতেন কীভাবে? দরজা খোলা থাকলে একরকম। কিন্তু, সাধারণত বাড়ির মেইন গেট বা দরজা বন্ধ থাকে। হয়তো চাবি দেওয়া থাকে সবসময়। আমরা যে দু-বার এ বাড়িতে এর আগে এসেছিলাম, গেটের চাবি খুলে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাহলে সাম্যও চাবি খুলে ঢুকতেন। তাই, বাড়ির মেইন গেট খোলা ছিল শুনে আপনি বুঝেছিলেন যে, সাম্য ঢুকেছিলেন। সেই চাবিটার কী হল? আমি অনুমান করছি, সাম্য তালা খুলে চাবিটাকে আবার নিজের পকেটে রেখেছিলেন। পরে হয়তো সেটাকে আপনি বা শতদ্রু ডিসপোজ করে দেন। আপনি আমায় বলেছিলেন, ‘আমি ওকে বাঁচাবার চেষ্টা করেছিলাম।’ আমি প্রথমে ভেবেছিলাম মালিনীর কথা বলছেন। কিন্তু, আপনি বলেছিলেন সাম্যর কথা। ব্লাড ইজ থিকার দ্যান ওয়াটার, সেটা মালিনীর ক্ষেত্রে যেমন সত্যি, তাঁর ছেলের ক্ষেত্রেও— আপনার কাছে। কারণ, সে আপনারই আপনজন। মেয়ে চলে গেলে একমাত্র রক্তসম্পর্ক যে পড়ে থাকে, তাকে বাঁচাতেই হবে। আপনার স্ট্রোকের পেছনে মালিনী যেমন বড়ো কারণ, সাম্যও নয় কি?’

    পারমিতা বললেন, ‘কিন্তু, বেসিক জায়গাটা আমরা ভুলে যাচ্ছি। দরজা বন্ধ হল কী করে? আর, গুডনাইট জ্বলছিল কেন?’

    ‘অসম্ভব বাদ দিলে যে ব্যাখ্যা পড়ে থাকে, তা যত ইম্প্রোব্যাবল হোক না কেন, আমাদের সেটাই গ্রহণ করতে হবে। বাড়িতে জীবিত লোক একমাত্র অনিরুদ্ধ। তিনিই বন্ধ করেছেন। আর, গুডনাইট জ্বালাবার ক্যান্ডিডেট সাম্য আর অনিরুদ্ধ। কিন্তু, সাম্য সুইচবোর্ডে হাত পাবে না। ফলত, অনিরুদ্ধ জ্বালিয়েছিলেন।’

    ‘মানে?’ সুচন্দ্রার গলায় অবিশ্বাস

    ‘মালিনী ঘুমিয়ে পড়েছিলেন সারাশরীর এবং মুখ কম্বলে চাপা দিয়ে। অনিরুদ্ধ ঘুমের আগে দেখেছেন, মালিনী ততক্ষণে অতল ঘুমে এবং তাঁর মুখ ঢাকা। ফলত, এখন গুডনাইট জ্বালালে সমস্যা হবে না, ভেবেছিলেন অনিরুদ্ধ। কারণ, নির্মলাদি জানিয়েছিলেন যে, গুডনাইট জ্বালালেই মালিনী মুখে চাদর চাপা দিতেন। কলকাতায় শীতকালে মশা বাড়ে, এটা তো সত্যি! গুডনাইট জ্বালিয়ে অনিরুদ্ধ ঘুমিয়ে পড়েন। অতটা নেশা করেছেন, ক্লান্ত শরীর, ঘুমের ওষুধ—তাঁরও মাথা কাজ করছিল না। মালিনী যখন খুন হলেন, তিনি অঘোরে ঘুমোচ্ছেন। রক্ত ফিনকি দিয়ে বেরোলে তাঁর গায়ে পড়তে পারত, সেক্ষেত্রে কী হত বলা যায় না। অথবা, দু-জনে একটাই কম্বল শেয়ার করলে তিনি হয়তো বুঝতে পারতেন। কিন্তু, কিংসাইজের থেকে বড়ো, পুরোনো আমলের খাট, তার এক কোনায় আলাদা কম্বলের নীচে শুয়েছিলেন অনিরুদ্ধ, মালিনীর থেকে বেশ কিছুটা দূরত্বে। তাই তাঁর ঘুম ভাঙেনি। যাই হোক, আট ক্যান বিয়ার খেলে বাথরুমে যাবার দরকার পড়ে। ইউরিনেট করার প্রয়োজন তাঁর মস্তিষ্কে জানান দিচ্ছিল, পাতলা হচ্ছিল ঘুম। অনিরুদ্ধ আধোঘুমে পাশের বাড়ির রেডিয়ো থেকে ‘শনিবারের বারবেলা’ শুনতে পাচ্ছিলেন। তারপর তিনি উঠে বসেন। তন্দ্রার মধ্যে টয়লেটে যান। ফিরে এসে দেখেন দরজা, জানালা খোলা। বন্ধ করে আবার ঘুমিয়ে পড়েন। মালিনী তখন মৃত। কিন্তু, সর্বাঙ্গ কম্বলে ঢাকা। এবং, কম্বলের রংও সাম্যর সোয়েটারের মতো লাল ছিল। অনিরুদ্ধ খুঁটিয়ে দেখলে হয়তো কিছু অস্বাভাবিক তাঁর চোখে পড়ত। কিন্তু, তাঁর তখন সেই অবস্থা নয়। তিনি গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। এবং, এই ঘটনাটুকু তাঁর স্মৃতি থেকে লোপ পেয়ে গেছে। সেটা অস্বাভাবিক নয়। পুরোটাই তিনি নেশা, ওষুধ এবং ক্লান্তির প্রভাবে অনেকটা ট্রান্সের মধ্যে করেছেন। আমাদের অনেকের এমন অভিজ্ঞতা জীবনে কয়েক বার হয়েছে, ঘুমের মধ্যে উঠে বসেছি বা টয়লেটে গেছি, নিজেরই মনে নেই। অনিরুদ্ধর দুর্ভাগ্য, এমন দিনেই তাঁর স্মৃতিলোপ হল যেদিন মালিনী তাঁর পাশে খুন হলেন।’

    কয়েক মুহূর্ত থেমে ইম্যানুয়েল বললেন, ‘তার মানে, শুরুতে যা এক্সপেক্টেড ছিল, সেটাই ঘটেছিল। বাইরের দরজা বন্ধ এবং ঘরের দরজা খোলা। সাম্যর আগমন এবং অনিরুদ্ধর জেগে ওঠার কারণে ছবিটা বিপরীত হয়ে যায়। বাইরের দরজা খোলা এবং ভেতরের দরজা বন্ধ। ফলত, লকড রুম মার্ডারের ভ্যারিয়েশন ঘটে গিয়েছিল। অনিরুদ্ধর বাঁচার কোনো রাস্তাই খোলা ছিল না।’

    পারমিতা মাথা নাড়লেন। ‘আমার বিশ্বাস হচ্ছে না, ওইটুকু বাচ্চা-–’

    ‘টেক্সাসে আট বছরের বাচ্চা স্ট্যাব করে স্কুলের তিন বন্ধুকে মেরে ফেলেছে কিছুদিন আগে। কাগজে খবর বেরিয়েছিল। আমরা ভুলে যাই, বাচ্চারা স্বভাবগতভাবে হিংস্র হয়, কারণ ন্যায়-অন্যায় বোধ তাদের কম থাকে। তাই পশুদের ওপর অত্যাচার, কেন্নোকে মাটিতে দলে দেওয়া, লাল পিঁপড়েদের পিষে দেওয়া, বেড়ালকে খোঁচানো, এরকম অনেক ক্রুয়েলটি আমরা ছোটোবেলায় নিষ্পাপ মনেই করে ফেলি। আর, যে শিশুর অ্যাঙ্গার ম্যানেজমেন্টের ইসু আছে, প্রচণ্ড রাগ তার ভেতর সাডেন অ্যাড্রিনালিন রাশ এনে দেয়, যার ফলে অস্বাভাবিক শক্তি চলে আসতে পারে কয়েক মুহূর্তের জন্য। স্ট্যাব করা আট বছরের বাচ্চার জন্য অত কঠিন কাজও নয়, মিস মুখার্জি।’

    ‘আমি কনফেস করছি।’ হাসিমুখে সাম্য উঠে দাঁড়াল। চোখে জল চিকচিক করছে। ‘আপনি যা বলছেন, সব ঠিক। পঁচিশ বছর ধরে আমি তিলে তিলে ক্ষয়ে গিয়েছি, কেন জানেন, মিস্টার গুহ?’

    ‘জানি। এই কারণে নয়, যে, আপনি অপরাধ করেছিলেন।’ হাসলেন ইম্যানুয়েলও। ‘এই কারণে, যে, আপনি ছাড়া পেয়ে গিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, উপস্থিত এখানে সবার ভেতর আপনি সবথেকে বেশি স্বচ্ছতা বজায় রেখেছেন। সেটা আমি বিশ্বাস করি। আপনার দুঃখ, অনুশোচনা এবং নিজের যন্ত্রণার ভেতর কোনো খাদ নেই। ইট ওয়াজ নট দ্য ক্রাইম, বাট দ্য এসকেপ। সেটাই আপনাকে ধ্বংস করেছে।’

    ‘একদিন বাবা-মায়ের প্রচণ্ড ঝগড়া হচ্ছিল। আমি ছুটতে ছুটতে ওদের ঘরে ঢুকে দেওয়ালে পাগলের মতো মাথা ঠুকতে থাকি। মাথা থেকে রক্ত বেরিয়ে এসেছিল।’

    ‘থাক। আর বলতে হবে না।’ শতদ্রু চিৎকার করলেন, কিন্তু তাঁর স্বরের মধ্যে হাহাকার মিশে ছিল। সাম্য ফিরে তাকাল না।

    ‘মা ভয় পেয়েছিল। বাবাকে বলতে যায়। ‘ছেলে মায়ের থেকে নাটকবাজি শিখেছে’, এই বলে বাবা বেরিয়ে যায়। আমি রাগে কাঁপছিলাম, মুখ থেকে থুতু বেরোচ্ছিল ফেনার মতো। প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু, এটা একবার না। বার বার হয়েছে এমন। একবার স্কুল থেকে ফিরে শুনি— সেদিন মায়ের ছুটি থাকার কথা, কারণ আমায় নিয়ে সায়েন্স সিটি যাবে, আমি মামারবাড়ি চলে যাব বলে সব ঠিক ছিল- কিন্তু শুনি যে, মা অফিসের জরুরি কাজে ছুটি ক্যানসেল করেছে। এরকম আগেও হয়েছে। কিন্তু, সেদিন আমি একটা কাঁচি এনে নিজের মাথার চুল খাবলা খাবলা কেটে ফেলেছিলাম, এখানে-ওখানে চামড়া বেরিয়ে গেছিল। বাবা এসে দেখে আমায় থাপ্পড় মেরেছিল আর আমি কাঁচিটা হাতের তালুতে গিঁথে দিয়েছিলাম। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি বাবা-ই করে। তারপর সন্ধেবেলা মা-কে ফোন করে যাচ্ছেতাই বলে। মা আমাকে দিয়ে এগুলো করাচ্ছে যাতে বাবার ওপর শোধ নেওয়া যায়। স্কুল থেকে রিপোর্ট এসেছিল, আমি রেগে গেলে দেওয়ালে মাথা ঠুকতাম। একবার নাকি ক্লাস থ্রি-তে মা-কে বলেছিলাম, আমি আত্মহত্যা করব। ওই টার্মটা আমার মুখে শুনে মা স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল। তারপর থেকেই মা আমায় বলতে শুরু করেছিল, তোকে নিয়ে আমি দূরে কোথাও চলে যাব একদিন, দেখিস! আমি বিশ্বাস করতাম জানেন! মা সত্যিই যাবে। আমি বাবার কাছে থাকতে চাইতাম না।’

    ‘পাপান! আর লোক হাসিয়ো না।’ শতদ্রু আর্তনাদ করলেন।

    ‘আমি বার বার সেই মুহূর্তটার কাছে ফিরে গিয়ে অন্যভাবে বাঁচতে চেয়েছিলাম। সেই দুপুর বেলাটা। মা-কে কী দেখেছিলাম আমার মনে নেই। হয়তো নিজেকে জোর করে ভুলিয়ে দিয়েছি। শুধু মনে আছে, আমার চোখ অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। আর, কানে ঝিঁঝি। বমি পাচ্ছিল প্রবল। কিন্তু, সেদিন যদি না-রেগে যেতাম, যদি কিছু না-করে দৌড়ে পালিয়ে যেতাম, যদি বাড়িটাতেই সেদিন না- ঢুকতাম— আজ আমার জীবন অন্যরকম হত। মা তো কোনো দোষ করেনি। তবু, আমার কৃতকর্মের ভার নিয়ে চলে গেল। কেউ আমায় ধরতে পারল না। আমার বিচার হল না। জাস্ট এটুকু, জানেন—’ সাম্য হাসছিল এবং তার কথাগুলো কান্নায় জড়িয়ে গেল। ‘আমায় দশ মিনিট সময় দেবেন? রেডি হয়ে আসছি।’

    ‘কোথায় যাবেন?’

    ‘থানা। কনফেস করব, যাতে পুরোনো ফাইল ওপেন হয়।’

    ‘এক অপরাধে দু-বার শাস্তি হয় না, সাম্য। আপনি পঁচিশ বছর ধরে শাস্তি পেয়েছেন। অনিরুদ্ধর বলিদানের থেকে কম কিছু নয় আপনার শাস্তি।’

    ‘তা হয় না।’ সাম্য মাথা নাড়ল। ‘আমি অনেকবার ভেবেছি, কেউ যদি ধরতে পারেন, আমি কনফেস করব। নিজেও অনেকবার ভেবেছি কনফেস করব, কিন্তু সাহস হয়নি। বাবা, দিদা, কেউ কোনোদিন সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করত না আমার কাছে। যেন তারা জানেই না। আর, সেটাই একটা অসহনীয় ভার হয়ে চেপে বসেছিল এই বাড়িতে। আমাদের তিনজনের ওপর, দশ মন পাথরের বোঝা এর থেকে কম হয়। আজ আপনি সত্যিটা যখন জেনেই গিয়েছেন, আমায় নিজের কাজটা করতে হবে।’

    ‘সেটাই ন্যায় বলে মনে হয় আপনার? অন্যেরা কী বলেন?’ ইম্যানুয়েল বাকিদের দিকে তাকালেন।

    শতদ্রু ফ্যালফ্যাল করে সবার দিকে তাকালেন। তাঁর ঠোঁট নড়ছিল, কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছিল না। দু-বার ‘পাপান’ বলে মৃদুস্বরে ডাকলেন। কেউ পাত্তা দিল না। দেবারতি একইভাবে চোখ বুজে। জাভেদ গলা খাঁকড়ালেন, ‘বিচার হয়ে গেছে। কেঁচে গণ্ডূষ করতে পুলিশ আর উৎসাহী নয়।’

    দীপক মিত্র ইতস্তত করছিলেন। তারপর বললেন, ‘জাভেদের বক্তব্যে সমর্থন।’

    সুচন্দ্রার চোখ জলে ভেজা। সাম্যর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেভাবেই বললেন, ‘মালিনী আমার বন্ধু ছিল। আমার আত্মার অংশ।’ রুমালে চোখ মুছলেন। ‘মালিনীকে খুন করেছে অনিরুদ্ধ সান্যাল। এর বেশি আমি কিছু শুনিনি।’

    ইম্যানুয়েল তাকালেন পারমিতার দিকে। তাঁর মতামত সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর স্বামী নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও শাস্তি পেয়েছেন। পারমিতা মাথা নীচু করে ছিলেন। ইম্যানুয়েল ডাকলেন, ‘মিস মুখার্জি!’

    ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে মাথা তুললেন পারমিতা। মুখে বিকার নেই। চোখ শুকনো এবং, গলার স্বর উত্থানপতনহীন। ‘অনিরুদ্ধ ক্ষমাহীন অপরাধ করেছিল। সেটা ওর বিট্রেয়াল। অন্য কারোর অপরাধ বিষয়ে আমি ইন্টারেস্টেড নই। আমার কাছে অনিরুদ্ধ খুনি। ও আমার ভালোবাসা এবং আমাদের সংসারকে হত্যা করেছিল।’

    ‘আপনি কি অনিরুদ্ধর জন্য প্রে করবেন?’

    উত্তর না-দিয়ে পারমিতা উঠলেন। ঘরের বাইরে চলে গেলেন পিছু না-ফিরে।

    সাম্য শূন্যচোখে তাকিয়ে ছিল দেওয়ালের দিকে। ইম্যানুয়েল তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। ‘জীবন সবাইকে দ্বিতীয় সুযোগ দেয়। কিন্তু, থার্ড চান্স আর মেলে না। অনিরুদ্ধ সান্যাল তোমার মা-কে হত্যা করেছেন। এই সত্যির বাইরে অন্য কোনো সত্যিকে আমরা সজ্ঞানে বিসর্জন দিয়েছি। এই সুযোগটাকে নাও, সাম্য। লিভ ইয়োর লাইফ। এই বাড়ি ছেড়ে দূরে চলে গিয়ে নিজের মতো বাঁচো।’

    সাম্য ইম্যানুয়েলের চোখে চোখ রাখল। ‘জানেন, সেদিনের পর আমি একবারও রাগিনি। আমার সব রাগ মনে হয় ওদিন মা শুষে নিয়ে চলে গিয়েছিল।’

    সাম্যর কাঁধে চাপ দিয়ে ইম্যানুয়েল বেরোতে যাবেন, দেবারতি ডাকলেন, ‘শুনুন।’ পিছু ফিরে দেখলেন, দেবারতির চোখ খোলা।

    দেবারতির সামনে দাঁড়ালে তিনি অনেকটা সময় নিয়ে ইম্যানুয়েলের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর হাত বাড়িয়ে দিলেন। ইম্যানুয়েল ধরলেন সেই হাত। ঝুলঝুলে চামড়া। হাত থিরথির কাঁপছে। ইম্যানুয়েলের হাত মুঠোয় নিয়ে চাপ দিলেন দেবারতি। ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘আমাদের সম্মিলিত পাপ ছিল, তাই না?’

    ঘাড় নাড়লেন ইম্যানুয়েল। ‘অ্যারনের দুই পশু তাদের প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে। কিন্তু, বাকিদের পাপের কী শাস্তি হবে, আমার জানা নেই।’ তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleশব্দ পড়ে টাপুর টুপুর – নবনীতা দেবসেন
    Next Article কারামাজভ ভাইয়েরা – ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি (অসম্পূর্ণ)
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    July 13, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    July 13, 2026
    Our Picks

    অদ্ভুতুড়ে সিরিজ – শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

    July 13, 2026

    হায়নার গুহা – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

    July 13, 2026

    কারামাজভ ভাইয়েরা – ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি (অসম্পূর্ণ)

    July 13, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }