Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    কলিকাতায় নবকুমার – সমরেশ মজুমদার

    August 14, 2026

    ছাতিম – স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

    August 14, 2026

    স্মৃতিগন্ধা – সাদাত হোসাইন

    August 12, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    কলকাতা নুয়া – রাজর্ষি দাশ ভৌমিক

    রাজর্ষি দাশ ভৌমিক এক পাতা গল্প232 Mins Read0
    ⤷

    কালাপানির দিশা

    কিছুকাল হল গোয়েন্দা বিভাগের স্পেশাল সেলের সিনিয়র ইনস্পেকটার কানাইচরণ ক্লোজড হয়েছেন। নানারকম গোলমেলে কাজ করে বড়োকর্তাদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। কানাইচরণের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা আর সুখ্যাতির কথা ভেবে লালবাজার থেকে তাকে দূরে পাঠানো হয়নি, আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকতে বলা হয়েছে। কিন্তু কোনো কেসফাইল দেওয়া হচ্ছে না। তেমন গুরুতর কিছু ঘটলে ক্লোজড থেকে ওপেন হতেও যে বেশি সময় লাগবে না কানাইচরণ তা জানেন। কানাইচরণ তাই এই সবেতন ছুটি বেশ উপভোগ করছেন বলা চলে। সকালে, বাড়িতে এক গরাস খেয়ে লালবাজারে চলে আসছেন। লালবাজারের পেটের ভেতর তার ছোট্ট চেম্বার, কোনো জানলা নেই, দুইখানি দরজা—ওপারের করিডোর ক্রিমিনাল রেকর্ডস আর ডিসি-ক্রাইম এর ঘরের দিকে চলে গেছে। চেম্বারে দুটি টেবিল-চেয়ার, একটিতে কানাইচরণ বসেন; অন্যটিতে বসে সৌভিক—সে জুনিয়ার ইনস্পেকটার, ফোর্সে বেশিদিন হয়নি। কানাইচরণকে সৌভিক গুরু বলে ডাকে, সিগারেট-কফিটা নিজের পকেট কেটে খাইয়ে দেয়, আর যতদিন কানাই না পুনর্বহাল হচ্ছেন, সৌভিক বলেছে-কানাইদা, ডেকার্সে দুপুরের জলখাবারটা আমার খাতায় খাবেন। কানাই তাই দশটায় অফিস ঢুকে একটা সিগারেট শেষ করেই পুরোনো ফাইল খুলে বসছেন আর কেস রিপোর্ট শেষ হওয়ার আগেই নির্ভুলভাবে বলে দিচ্ছেন অপরাধীর নাম।

    ক্রিমিনাল রেকর্ডস সেকশানের রেজিস্ট্রার ভদ্রমহিলাটিকে কানাই-এর বেশ লাগে। পৃথুলা, গোল চশমা, কাঁধের কাছে সেফটিপিন আটকানো শাড়ি, কানাই ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে ভাবেন-নিজের বয়সটা যদি আটান্ন না হয়ে তিরিশ-বত্রিশ আর ভদ্রমহিলার পঁচিশ কী তিরিশ, বেশ একটা অফিস রোমান্স তৈরি হতে পারত। সাতসকালে কানাইকে দেখে ভদ্রমহিলা এমনভাবে হাসলেন—যেন অফিস খুলবার পর থেকেই আজ তিনি কানাইকে আশা করছিলেন। কানাই অনুযোগের সুরে বললেন—কী একঘেয়ে সব খুনের তামাদি ফাইল দিচ্ছেন দিদিমণি। একটা জম্পেশ কেস দিন না। বিকেলের জলখাবার অবধি যাতে কেসটা চলে।

    দিদিমণি বললেন—আজ একটা জম্পেশ ফাইলই আপনার জন্য রেখেছি, যাকে বলে আনসল্ভড মিস্ট্রি।

    কানাই হতাশ গলায় বললেন—লালবাজারে আনসল্ভড বলে কিছু তো নেই, দুটো প্যাঁদানি দিলেই সব সল্ভড। এই স্যরি, কিছু মনে করলেন না তো!

    দিদিমণি পাত্তা না দিয়ে বললেন—এটা তো মার্ডার কেস নয়, জাহাজ হারিয়ে যাওয়ার কেস। তাও খোদ বঙ্গোপসাগর থেকে। ব্রিটিশ রাজের নাকের ডগা দিয়ে।

    —বলেন কী! বঙ্গোপসাগর কবে থেকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল হয়ে গেল! দিন দিন, দেখি।

    রেজিস্ট্রার দিদি রদ্দি-ঝড়তি পড়তি একগাদা ফাইল হাতবদল করতে করতে বললেন—ভালো সময়ে ফাইলগুলো আপনার কাছে গেল, পরের মাসেই পুলিশ মিউজিয়ামে পাঠাতে হবে।

    কানাইচরণকে একগাদা ময়লা, হলুদ, প্রায় ঝুরো ফাইল নিয়ে চেম্বারে ঢুকতে দেখে সৌভিক তাড়াতাড়ি উঠে কানাই-এর টেবিলে এক প্যাকেট নেভিকাট রেখে দিল। এই সময় কানাইচরণ কথাবার্তা একদম পছন্দ করেন না, শুধু নেশার জিনিসের জোগানটা ঠিকমতো হলেই হল। জুনিয়র ইনস্পেকটারকে কানাই সবসময় বলেন—কেসফাইলগুলো ঠিকমতো পড়বি, ওগুলির ভেতরই সব কু আছে, যত ভোদাই সাব ইনস্পেকটার হোক না কেন, কেস ডায়ারিটা ঠিকমতো দিতে পারলেই কেল্লা ফতে। সৌভিক দেখল কানাইচরণ ফাইলের মধ্যে ডুবে গেছেন, যন্ত্রের মতো তার হাত এসে প্যাকেট থেকে সিগারেট নিয়ে মুখে উঠিয়ে দিচ্ছে। কানাইচরণ ভ্রূ কুঁচকাচ্ছেন, কাগজ হাতড়াচ্ছেন। আর বোধহয় তিনি কেসফাইলের মধ্যে থাকতে পারলেন না। এবার কোর্ট প্রসিডিংসও-এর কপিও খুলে ফেলেছেন। ঘড়ির কাঁটা বারোটার দিকে যাচ্ছে। কিন্তু কানাই একটা শব্দও করেননি, অন্যান্য দিন এতক্ষণে শুধুমাত্র কেসফাইল পড়ে, দুএকটা প্যাঁদানির নিদান দিয়েই কানাই কেস গুটিয়ে নেন। সৌভিক ঝটপট হাতের কাজগুলো করে ফেলে কানাইকে বলল—দাদা কি ডেকার্স-এর দিকে আজ যাবেন?

    কানাই চিন্তার অথই সমুদ্র থেকে উঠে এলেন। হেসে বললেন—তোকে এখনও ব্রিফ করিনি না? চল হাঁটতে হাঁটতে বলব।

    দুজনে ব্যস্ত বউবাজার স্ট্রিটে নেমে এলেন। কলকাতার জনস্রোতের মাঝে দুই গোয়েন্দা। কানাইচরণ নীচু গলায় ব্রিফিং শুরু করলেন। —সংক্ষেপে বিষয়টা এইরকম। ১৯১১ সালের ঘটনা। বাঙালির বিপ্লব প্রচেষ্টায় ব্রিটিশ থরথর করে কাঁপছে। মানিকতলা বোমা মামলা গুটিয়ে গেছে। অরবিন্দ ছাড়া পেয়ে গেছেন। কলকাতায় বিপ্লবীদের উপদ্রব অনেকটা শান্ত কিন্তু ঢাকায় অশান্তি তখনও চলছে। এই সময় কলকাতায় ধরা পড়ল এক স্পাই, নাম নৃপেন চট্টরাজ। যে-সে জায়গা থেকে নয়। খোদ লালবাজার থেকে নৃপেন ধরা পড়ল। সে ছিল লালবাজারের ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যুরোর অধস্তন কর্মচারী, ফিঙ্গার প্রিন্ট ব্যবস্থার আদিপুরুষ আজিজুল হক আর হেমচন্দ্র বোসের সাক্ষাৎশিষ্য। কিন্তু মনে প্রাণে নিখাদ দেশভক্ত, বিপ্লবীদের প্রতি নরমমনোভাবাপন্ন। অনুশীলন সমিতির বহু সদস্যের সঙ্গে ছিল গভীর সখ্য আর যোগাযোগ। সরাসরি বিপ্লব প্রচেষ্টায় অংশ না নিলেও নৃপেন বিপ্লবীদের পরোক্ষভাবে সাহায্য করা শুরু করে। লালবাজারে কাজ করার ফলে, পুলিশের নানা কার্যকলাপের খবর তার কানে আসত। নৃপেন সাংকেতিক চিঠি লিখে বিপ্লবীদের খবর পাচার করতে থাকে। বিপ্লবীদের ধরপাকড় শুরু হলে, নৃপেনের সঙ্গে বারীন ঘোষ বা হেম কানুনগোর প্রত্যক্ষ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়, কিন্তু পুলিশের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার উপায় নৃপেন খুঁজে নেয়। সাংকেতিক চিঠিগুলি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব থাকত নৃপেনের ঠিকে ঝি-এর ওপর। সে বেচারি ছিল নির্দোষ, সে কেবলমাত্র কর্তার আদেশ পালন করত, আর সে ভাবত – পুলিশে কাজ করায় কর্তা বুঝি কোনো সরকারি কাগজ দিয়ে থাকবে! এই ঝি-এর চরিত্র খুব একটা সুবিধার ছিল না। ঝি-এর ঘরে একবার এক নেটিভ পুলিশ অভিসারে আসে। সাংকেতিক চিঠিটি তার নজরে পড়ে। ঝি-কে গ্রেফতার করা হয়। সে বেটি বুক ঠুকে নৃপেনের নাম বলে দেয়। ঝি ভেবেছিল; নৃপেনের নাম শুনলেই পুলিশরা তাকে ছেড়ে দেবে। কিন্তু হিতে হল বিপরীত। চিঠির সংকেত উদ্ধার করা হলে দেখা গেল—চিঠিটি ঢাকার অনুশীলন সমিতির জনৈক সদস্য অমর চট্টোপাধ্যায়কে লেখা হয়েছে। লালবাজারের দুদে পুলিশকর্তা গডফ্রে দিনহ্যামের গতিবিধি জানানো হয়েছে চিঠিতে। নৃপেন গ্রেফতার হল। খোদ লালবাজারের ভেতর খোঁচড় ধরা পড়ায় বড়োকর্তাদের মহলে বেশ শোরগোল পড়েছিল আর কী! যদিও খবরের কাগজে হাফ কলামের বেশি জায়গা নেয়নি।

    আত্মপক্ষ সমর্থনে নৃপেন চিঠির কথা স্বীকার করে বলল, সে তার বিপথগামী বিপ্লবী বন্ধুদের পুলিশের ভয় দেখিয়ে নিরস্ত করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু আদালতে সেই দাবি ধোপে টিকল না। তার তো আর চিত্তরঞ্জন দাশ নেই। তার ওপর গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো ব্রিটিশরা রাজসাক্ষী করল নৃপেনেরই এক তুতো ভাইকে। সে স্বীকার করলে, দাদার টিকটিকিগিরির ভাগীদার সেও ছিল। আদালত তাকে রেহাই দিল আর নৃপেনের হল কালাপানি। আন্দামানের সেলুলার জেলে তখন অনুশীলন সমিতির সাজাপ্রাপ্ত সদস্যদের আগমন লেগে আছে। নৃপেন বোধহয় আশ্বস্তই হয়েছিলে যে তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হল না। ১৯১৩-এর সেপ্টেম্বরে খিদিরপুর থেকে নৃপেনকে নিয়ে জাহাজ ছাড়ে। নৃপেনকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল এক ইংরাজ অফিসার, উইলসন আর দুই দেশি হাবিলদার, রাম সিং আর নবীনকুমার হোতা। জাহাজের নাম ‘জর্জ দ্য সাভিওর’। দেড় দিনের মাথায় সে জাহাজের সাগরে পৌঁছোনোর বার্তা কলকাতা বন্দরে এল। এর পর সপ্তাহখানেক পর কলকাতামুখী একটি জাহাজ জর্জকে দেখতে পায়। জর্জ পালটা হর্ন বাজিয়ে বার্তা দেয়। সেটাই জর্জের শেষ খবর। এর পর থেকে জর্জ নিরুদ্দেশ। রিপোর্ট বলছে যে সমুদ্র তখন শান্ত ছিল। জাহাজে আগুন ধরার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আন্দামানে জাহাজ যে অন্তত পৌঁছোয়নি, সে বিষয়টা নিশ্চিত। কলকাতার কাগজগুলি লিখেছে-অতঃপর নৃপেনের আর কোনো খবর পাওয়া যায় নাই। লালবাজারের স্পেশাল ব্রাঞ্চের হাতে কেস আসে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ, যা হয় আর কী, প্রাইমারি ইনভেস্টিগেশান করে, ফাইনালি কিছুই জানতে না পেরে রিপোর্ট লিখে দেয় ড্রাউনড ইন দ্য স্যান্ড ডিউনস অফ সাগর, সাগরের বালুচরে গিয়ে ডুবেছে। রিপোর্টে তারা আরও যোগ করে—যে জাহাজটি সমুদ্রে জর্জকে দেখেছিল সেটি তাদের ভ্রম ছিল। সে সময় একটি মালয়ের জাহাজ কলকাতা থেকে সিঙ্গাপুর যাচ্ছিল, তাকেই জর্জ বলে ভুল করা হয়। জর্জ প্রকৃতপক্ষে সমুদ্রে যায়ইনি, মোহনার কাছেই চরে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জর্জ দা সাভিওরের সলিল সমাধি ঘটে। স্পেশাল ব্রাঞ্চের কর্তারা আশা করেছিল, নদীখাত বদলালে হয়তো, জর্জ-এর মাস্তুল দেখা যাবে। কিন্তু বিগত ১০০ বছরে হুগলি বহুবার বাঁক নিলেও জর্জ আর ভেসে ওঠেনি। এই হল গল্প। এবার তুই বল, কী সিদ্ধান্তে আসা যায়? কানাইচরণ সৌভিককে জিজ্ঞাসা করলেন।

    সৌভিক এগ চাউমিন-এর ডিম মুখে পুরতে যাচ্ছিল। বউবাজার থেকে ডেকাস অবধি হেঁটে আসতে আসতে ওর খিদেটা চা-পাউরুটি থেকে চাউমিন-বিরিয়ানি অবধি পৌঁছে যায়। এতক্ষণ বকবক করে ক্লান্ত কানাই ফিশ কবিরাজিতে মন দিলেন, কিন্তু কান খাড়া রইল। সৌভিক বলল—কেসটার তো আর কোনো সাক্ষী নেই। সব মরে ভূত। ধরে নিচ্ছি, জর্জের বাকি যাত্রীদেরও আর কেউ কোনোদিনও দেখেনি। তাহলে আমাদের কেসটা সাজাতে হবে সিনারিওর ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ কি না, কী ঘটতে পারত আর কী কী ঘটেনি। এই হিসেবটা করতে পারলেই, যা ঘটতে পারত সেটুকু পড়ে থাকবে। কি গুরু ঠিক বলছি তো?

    কানাই চায়ে চুমুক দিয়ে চোখ বুজে বললেন—কী কী ঘটে থাকতে পারে?

    —প্রথম সম্ভাবনা, সেপ্টেম্বরে জাহাজ ছেড়েছে। মানে সদ্য বর্ষার মরশুম শেষ হয়েছে। সমুদ্র শান্ত থাকার কথা। কিন্তু সমুদ্র তো আর হারুবাবুর বাগান না, বিশাল জায়গা, ক্ষণিকের ঘূর্ণি তৈরি হতে পারে। বা সুনামি, হয়তোবা সাইক্লোন। বিশাল সমুদ্রের কতটুকু জায়গার খবর আর আবহাওয়া দপ্তরের কাছে আসত।

    —হুঁ হতেই পারে। আজকাল নানা রকম টেস্ট করে হাজার দেড়হাজার বছর আগের আবহাওয়া মিলিয়ে দিচ্ছে বিজ্ঞানীরা। সমুদ্রের দিকটা আর

    একবার চেক করত হবে।

    সৌভিক বলল—দ্বিতীয় সম্ভাবনা। জর্জ হয়তো খিদিরপুর থেকে ছাড়েইনি। আর ছাড়লেও কত জন লোককে নিয়ে ছাড়ল? আর কারা কারা যাত্রী ছিল? এই দিকটা দেখা দরকার।

    —এটা বেশ কঠিন সম্ভাবনা। আমি রিপোর্টে দেখেছি—জাহাজে কাপ্তান- খালাসিদের বাদ দিয়ে দশ জন প্যাসেঞ্জার ছিল। সংখ্যাটা খুবই কম বলে আমার মনে হচ্ছে। একটা খটকা লাগছেই। কিন্তু জাহাজ খিদিরপুর থেকে ছাড়বেই না, এটা অতিকল্পনা, জাহাজঘাটায় পুলিশ থাকবে। আবগারির লোক থাকবে। রিপোর্টাররাও থাকতে পারে। আত্মীয়স্বজন ছিল হয়তো। এদের সকলের নজর এড়িয়ে জর্জ-এর লুকানো সম্ভব কিনা ভেবে দেখা দরকার। আর কোনো সম্ভাবনা?

    —লাস্টলি, জাহাজের সব লোকজনকে হত্যা করে, নৃপেনকে ছাড়াতে জাহাজ-এর মুখ ঘুরিয়ে মালয় বা পুদুচেরিতে নিয়ে যাওয়া হল। সেটা কি অসম্ভব?

    —বেশ অসম্ভব। জাহাজ তো আর উড়োজাহাজ নয়। স্টিমে চলে জাহাজ। খালাসি লাগে, মাল্লা লাগে। সেই লোকগুলো কোথা থেকে এল, সেইটা তবে ভাবা দরকার।

    সৌভিক মৃদু আপত্তি করে উঠল—ধরো, নৃপেন আর তার বিপ্লবী দলবল জাহাজের মাল্লা আর যাত্রীদের হত্যা করল। ইতিমধ্যে বিদেশি কোনো জাহাজ এসে সেখানে উপস্থিত হল। তাদের সঙ্গে এল অতিরিক্ত মাল্লা-সারেং। যারা জর্জকে ঠেলে সুন্দরবনের জঙ্গলে ঢুকিয়ে দিল।

    কানাইচরণ গ্লাসের জলে হাত ধুতে ধুতে বললেন—এইবার গল্পের গোরু গাছে উঠছে, ওকে নামা। এর নাম ব্রিটিশ জলসীমা ছোকরা। ব্রিটিশ পারমিশান ছাড়া বে ওফ বেঙ্গলে মাছিও নড়ত না। অতগুলো লোক ভরতি জাহাজ যাওয়া আসা করলে পোর্টের রিপোর্টে ঠিক তার সুলুক সন্ধান পাওয়া যাবে।

    —তাহলে অফিস ফিরে প্রথম ফোন কি পোর্টে করছ?

    কানাইচরণ আকণ্ঠ হেসে বললেন—প্রথম ফোনটা আলিপুরে, খিদিরপুরে না। আর করছিস তুই। আমি যে ক্লোজড, ভুলে গেলি!

    ডেকার্স থেকে হেঁটে লালবাজারে ফিরলে কানাইচরণের দুপুরের খাওয়া হজম হয়ে যায়। একটা সিগারেট শেষ করে কানাই ফের কেসের পাতাগুলো উলটাচ্ছিলেন ও চোখ বুজে ভাবছিলেন। নৃপেন বিপত্নীক, ছেলেপুলে হয়নি, বিয়ের অল্প কয় বছরের মধ্যে বউ দমদম ফিভারে টেশে যায়, সংসারে কাছের লোক বলতে প্রৌঢ়া মা। নৃপেনের কালাপানি হওয়ার পর মায়ের কী হল সেটা কোথাও লেখা নেই। কেস ডায়ারিতে বাজেয়াপ্ত হওয়া মাল-এর লিস্ট আছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা আর নৃপেনকে জেরার বিবরণ আছে। যেহেতু কেউ খুনজখম হয়নি তাই বর্ণনাগুলি ম্যাড়ম্যাড়ে। নৃপেন জেরায় জানিয়েছে যে সে কোনোদিনই মানিকতলায় যায়নি, ঢাকাতে পা অবধি রাখেনি। গোয়েন্দারাও তেমন কোনো সূত্র পায়নি। গোটা কেসটা তাই দাঁড়িয়ে আছে বাজেয়াপ্ত চিঠিগুলির ওপর আর ঠিকে ঝি ও তুতো ভাই-এর সাক্ষীতে। কোর্ট প্রসিডিং-এ পুলিশ অনেকগুলি মিথ্যে সাক্ষী সাজিয়ে এনেছিল। ঝানু জাস্টিসের তাদেরকে পালটে দিতে খুব মুশকিল হয়নি, খুব একটা গুরুত্বও দেওয়া হয়নি রায়ে। ঠিকে ঝি, নাম গঙ্গা-এজলাসে দাঁড়িয়ে বলেছে যে সে তার কর্তার চিঠি একাধিকবার নির্দিষ্ট স্থানে রেখে এসেছে। সেখান থেকে কে সেই চিঠি পেয়েছে সে কিছু জানে না। নৃপেন কখনও চিঠির কথা অস্বীকার করেনি; এজলাসে দাঁড়িয়ে সরকারি উকিলের প্রশ্নের উত্তরে সে বলেছে যে তার পথভ্রষ্ট বন্ধুদের ধর্মের দোহাই, মানবতার দোহাই, ব্রিটিশরাজের দোহাই আর পেনালকোডের দোহাই দিয়ে সশস্ত্র বিপ্লব প্রচেষ্টা থেকে সে তাদেরকে বিরত থাকতে বলত। কানাইচরণ ফাইলের ভেতর থেকে তামাদি হয়ে যাওয়া কয়েকটি চিঠি পড়ার চেষ্টা করলেন। চিঠিগুলি বিলক্ষণ সাংকেতিক ভাষায় লেখা, সঙ্গে সংকেত বিশেষজ্ঞের নোট জুড়ে দেওয়া হয়েছে। নৃপেন অতি ধূর্ত ছেলে। সে এমনভাবে চিঠিগুলি লিখেছে যার মানে হ্যাঁ-ও হতে পারে আবার না-ও হতে পারে। একজায়গায় লিখছে—গডফ্রে দিনহ্যামের থেকে সাবধান। পেনাল কোডের দোহাই, সে তোমাকে ছাড়বে না, ভাই অমর। তুমি প্রাতে চিতপুর লেন ধরলে সে তোমাকে সেখানেই হাতকড়া পরাবে। কানাই ভেবে দেখলেন—একদিকে অমর চ্যাটুজ্জেকে দিনহ্যামের ভয় দেখানোও হল আবার দিনহ্যামের যাতায়াতের রাস্তাও চতুর নৃপেন সুকৌশলে জানিয়ে দিয়েছে।

    কানাইচরণের দুপুরের তন্দ্রায় বিঘ্ন ঘটিয়ে সৌভিক বলল—দাদা, আলিপুর মেটিরিওলজির সঙ্গে ফোনে কথা হল। সেপ্টেম্বর জেনেরালি সাইক্লোন সিজন। মেটিরিওলজির সুচয়নবাবু জানালেন, বর্ষার পরপরই নাকি সাইক্লোন আসে, পোস্ট মনসুন সাইক্লোন। ১৯১৩-এর সেপ্টেম্বরে কয়েকটা ছোটোখাটো নিম্নচাপ তৈরি হয়েছিল বে অফ বেঙ্গলে, কিন্তু বড়ো ঝড় আসেনি।

    —তখনও তাহলে আলিপুর থেকে আবহাওয়ার প্রেডিকশান হত? কানাই খানিক তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন।

    —সুচয়নবাবু বলল, ১৮৫০ থেকে নাকি গোটা ইন্ডিয়ার ওয়েদার রিপোর্ট আছে। কিন্তু সমুদ্রের পর্যবেক্ষণগুলো অনেক পরের দিকে। ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারের আঁচ পেয়ে ব্রিটিশরা সমুদ্রের পর্যবেক্ষণ শুরু করে! মাইরি, মাঝে মাঝে ভাবি ব্রিটিশরা না এলে আমাদের কী হত! ঘূর্নিঝড় আসত, জানতেও পারতাম না।

    —তোর সুচয়নকে শালা দেখবি কোনদিন ভুলভাল ফোরকাস্টের জন্য লালবাজার ধরবে। এইবার মনসুন আসার ১২ দিন পরে মনসুন রিপোর্ট দিয়েছে। ডিসি বলছে বন্যাত্রাণের কম্বল কী মেটিরিওলজি সাপ্লাই দেবে। হাসতে হাসতে কানাই আর একটা সিগারেট ধরালেন।

    সৌভিক ক্রাইম কনফারেন্স অ্যাটেন্ড করতে গ্যালো, যাওয়ার আগে সে কানাইকে বলল—পোর্টকে প্রশ্নগুলো পাঠিয়েছি। দেখি কখন উত্তর দেয়!

    কানাই সিগারেটে টান দিয়ে ফের কোর্ট প্রসিডিংস ভাবা শুরু করলেন। নৃপেন হয়তো এযাত্রায় পার পেয়ে যেত, কিন্তু তুতো ভাই-এর সাক্ষীটা ভাইটাল হয়ে গেল। ঘরের শত্রু বিভীষণ। এরকমটা যদিও ব্রিটিশদের জন্য খুবই পরিচিত ছল। অনুশীলন সমিতিকে ভাঙার জন্য এই ছকটি ব্রিটিশ পুলিশ ব্যবহার করত। একজন অফিসার এসে ভয় দেখাত, আর একজন আসামির মাথায় হাত বুলাত। বাচ্চা ছেলে সব, বারীন ঘোষদের কথায় উজ্জীবিত হয়ে দেশকে স্বাধীন করবে বলে এসে পুলিশ-কেস খেয়ে বসে আছে। অত্যাচার হচ্ছে। ঘরের ভাত জুটছে না। খারাপ পুলিশ আর ভালো পুলিশের বৈপরীত্যে তাদের অসহ অবস্থা। এমন অবস্থায় ভালো পুলিশের কথা শুনে রাজসাক্ষী বনে যাওয়াটাই সহজ উপায়। কালাপানি পার হতে হবে না। ঘরের ছেলে ফের ঘরে ফিরে যাবে। স্রেফ যাওয়ার আগে সমিতির কোনো সেজো কী মেজো মাথার কীর্তিকলাপ বলে দিলেই হল। এই কৌশলে আইরিশ বিপ্লব প্রচেষ্টা ভেঙেছে ব্রিটিশরা, বাংলাতেও ভাইকে ভাই-এর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। ঘরের লোকের বিরুদ্ধ-সাক্ষী সবসময়ই আইন-এর চোখে গুরুত্বের। অনুশীলন সমিতির এ এক করুণ ইতিহাস। তুতো ভাইটিও, তার নাম মোহন বসু, এই পথে পা দিয়েছে। গীতায় হাত রেখে মোহন যখন বলেছে যে তার দাদা চরবৃত্তির সঙ্গে যুক্ত তখনও নৃপেন অস্বীকার করে গেছে। কানাই-এর করুণা হল নৃপেন-এর কথা ভেবে। ছেলেটি সত্যি নির্দোষ, নয়তো, সে হয়তো সত্যই বিপ্লবীদের সমাজের সশস্ত্র পথ থেকে নিরস্ত করতে চেয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না, সে সময়ে, ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতা করা মানে দেশদ্রোহিতা। তাই সশস্ত্র বিপ্লবের বিরোধিতাকেও কী খুব দোষ দেওয়া চলে! কানাইচরণ এই তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে আর প্রবেশ করতে চাইলেন না। তার কৌতূহল হল মোহন বসুর জীবনে, কত টাকা আর সামাজিক সুরক্ষা সে পেল ইংরাজের কাছে? যত বেশি টাকা হবে ততই নৃপেন-এর সম্ভাব্য চরবৃত্তিতে যোগ থাকার সম্ভাবনা কম!

    কানাই বেল টিপে বেয়ারাকে ডাকলেন। বেয়ারাটি নেহাত বাচ্চা ছেলে, বাপ মরায় চাকরি পেয়েছে। কানাই একটা স্লিপ দিলেন, তাতে লেখা—মোহন বসু, ১৯১৩। বেয়ারাকে বললেন—এই স্লিপটা নিয়ে অ্যাকাউন্টসে যা আর যতক্ষণ লাগুক, দাঁড়িয়ে কপি নিয়ে আয়। ছোকরা সেলাম ঠুকে চলে গেল। যদিও সেলাম ঠোকার কথা তার নয়। উর্দি নেই বেয়ারার।

    কানাই ইন্টারকমটা টেনে পুলিশ মিউজিয়ামের কিউরেটারের নাম্বারে একটা কল করলেন। পরিচয় দিয়ে বললেন—

    গডফ্রে দিনহ্যাম, এই ধরুন সেকেন্ড ডেকেড অফ টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি। নামটা কি চেনা চেনা লাগছে?

    কিউরেটার পুলিশের লোক নন, ভাগ্যিস। তিনি ইতিহাসবিদ, কানাই তাকে মিউজিয়াম উদ্‌বোধনের দিন দেখেছিলেন কমিশনারের পাশে। মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক, লালবাজারে মিউজিয়াম সামলাতে না এসে বোধহয় কলেজে পড়ালেই ভালো করতেন। কিউরেটার নিস্পৃহ গলায় বললেন -অবশ্যই, গডফ্রে দিনহ্যামকে ইতিহাস চেনে একজন অত্যাচারী পুলিশ অফিসার হিসেবে। অনুশীলন সমিতিকে প্রায় একার হাতে শেষ করেছে। যদিও পুরোটা পারেননি। ঢাকার অনুশীলন সমিতি বেঁচে গেছিল। পরে, মানিকতলার সমিতি ছেড়ে অনেকে বাঘা যতীনদের যুগান্তর সমিতিতে চলে যায়। খেয়াল রাখবেন, দিনহ্যামকে মারার প্রচেষ্টা করেছিল ঢাকা অনুশীলন সমিতির কিছু সদস্য। যদিও, আনফরচুনেটলি, দিনহ্যাম বেঁচে যায়। বিপ্লবীরা ভুল লোককে মেরেছিল, যেমনটা সেসময় অনেকবার হয়েছে, কমন ভুল।

    কানাইচরণ ফোন ছাড়া মাত্র দেখেন বেয়ারা পরদা ঠেলে ঘরে ঢুকছে। ছোকরার কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। কানাই রাগত স্বরে বললেন—তোকে বললাম না, কপি নিয়ে তবেই আসবি।

    বেয়ারাটি নীরবে একটি কম্পিউটার প্রিন্ট আউট কানাই-এর সামনে টেবিলে রাখল। কানাই যথেষ্ট অভিভূত হলেন। লালবাজারের ডিজিটালাইজেশানের ওপর এই প্রথমবার তার একটা আস্থা এল। ছোকরার ওপরও প্রীত হলেন। ভবিষ্যতে রেকমেন্ড করে দেবেন ভাবলেন। রিডিং গ্লাসটা চোখে এঁটে ১৩১৩-১৯৩০ সালের নোটসে চোখ রাখলেন। তাতে দেখা যাচ্ছে যে কেস চলাকালীন মোহন বসুকে জলখাবার আর যাতায়াত বাবদ রাহাখরচ দেওয়া হয়েছিল। কেস মিটে যাওয়ার পর ব্রিটিশরাজ মোহন বসুর ওপর দয়াপরবশ হয়ে দুই টাকা মাসোহারা ধার্য করে। প্রথম মাসে সেই মাসোহারা নিতে এসেছে মোহন বসুর নাবালক পুত্র পুলক বসু, অভিভাবক সহযোগে। নথিকর্তা নাবালক পুত্রের টিপসহি নিয়ে মাসোহারা দিয়েছে এবং ফুটনোটে লিখে রেখেছে যে পুত্রটি জানিয়েছে যে তার বাপ সেনাদলে নাম লিখিয়ে বিদেয় হয়েছে। নথিকর্তা আরও জানাচ্ছে যে এই বিষয়ে তিনি ওপরওয়ালাদের সঙ্গে আলোচনা করে পুত্রটিকে মাসোহারা দেওয়া নিশ্চয় করলেন যতদিন না মোহন বসু দেশের কাজ করে ফিরে আসে। অতঃপর এই বন্দোবস্ত বজায় থাকে ১৯৩০ অবধি। সেসময় নতুন নথিকর্তা জানিয়েছে যে সে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দুই বৎসর কাউকে মাসোহারা নিতে আসতে দেখেনি, মোহন বসু ক্রিমিয়ার যুদ্ধের বহুপূর্বে প্রাণ হারিয়ে থাকবেন। খুব সম্ভবত পূর্বের বড়োবাবু ও তার সহকর্মীরা বছরের পর বছর মাসোহারাটি আত্মসাৎ করেছিল। বর্তমান অ্যাডমিনিস্ট্রেশানের অর্থভাণ্ডারের কথা ভেবে এই মাসোহারা চালু রাখবার কোনো অর্থ নেই, অতএব ১৯৩০-এ মাসোহারা বন্ধ হল। কানাই রিপোর্টটিতে বেজায় মজা পেলেন। কেবল বিপ্লবীরাই নয়, বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা তাহলে হিসাবরক্ষকেরাও বুনেছিল। সৌভিক ক্রাইম কনফারেন্স থেকে ফেরার পর, কানাই এই কথাগুলিই বললেন।

    সৌভিক টেবিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে শুনল। কানাই প্রতিটা লোকের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক শুরু করেছেন। এই পরিস্থিতিতে এটাই করণীয়। সৌভিক জিজ্ঞাসা করল—আর যে সাহেব আর দুই হাবিলদার, রাম আর নবীন, জর্জ জাহাজে নৃপেনকে নিয়ে গেল তাদের ব্যাকগ্রাউন্ডটা চেক করবেন না?

    কানাই তখনও মজার রেশ ধরে রেখেছিলেন-তারা তো পুলিশ, লালবাজার আমার বাপ-মা, আমি তাই পুলিশকে কক্ষনো সন্দেহ করি না রে বাপ। তুই পোর্ট থেকে খবর পেলি?

    সৌভিক শ্রাগ করে বলল-পোর্টের লোকজনের থেকে খবর বের করা যে কী ঝক্কির কানাইদা। আপনি এই সাইডটা সামলালে বুঝতেন। ব্যাটারা সবেতেই কাটমানি খেতে চায়। ইউনিফর্মের কোনো রেসপেক্টই নেই। এদের পেট থেকে খবর বের করতে গিয়ে আমার আজকের গোটা দিনটা নষ্ট হল। যাই হোক। সোর্স ধরে খবর মিলেছে। ১৯১৩-এর ২২ সেপ্টেম্বর খিদিরপুর থেকে জর্জ দ্য সেভিয়র অবশ্যই ছেড়েছিল। যাত্রী ছিল সাকুল্যে নয় জন। খেয়াল করুন, পুলিশ রিপোর্ট কিন্তু বলেছে দশজন যাত্রী সওয়ার হয়েছিল—পয়েন্ট ওয়ান। জাহাজের ক্যাপটেনের নাম ওস্তাদ মাসুদ। বাকি যাত্রীদের নামধাম পোর্টের কাছে নেই। জাহাজের লাস্ট রিপোর্টিং ফ্রম সাগর। খিদিরপুর ছাড়ার দেড় দিন পর। তারপর লাপাতা। পয়েন্ট টু—পোর্টের নথিতে সমুদ্রে জর্জকে কলকাতামুখী জাহাজটা দেখেছিল এরকম কোনো খবর নেই।

    —জর্জকে সমুদ্রে দেখার রিপোর্টটা থাকবে না সেটাই আশা করেছিলাম। ১৯১৩-এর কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে তো আমাদের বংশধররাই ছিলেন, তারাও প্যাঁদানিবিদ্যেটাই ভালো জানত। ওরাই ওটাকে ক্লাসিফায়েড করেছে, তারপর মুছে দিয়েছে। কারণ সমুদ্রে জর্জকে দেখতে পাওয়ার নথিটা থাকলে কলকাতা পুলিশের থিয়োরিটা—যে জর্জ মোহনায় ডুবেছে, সেইটে দাঁড়াত না।

    সৌভিক ঘাড় নাড়ল—এগ্রিড। অন পয়েন্ট ওয়ান। পোর্টের থেকে যাত্রীদের নামধাম না পাওয়া গেলেও নামের একটা তালিকা ক্রসচেক করে পেয়েছি। সেকালে জাহাজ যাত্রার ঘোষণা নিউজপেপারে বিজ্ঞাপন দিয়ে করা হত। যাত্রীদের নামধামও অনেকসময় ছাপানোর চল ছিল। তাই অমৃতবাজার-যুগান্তরের ডাটাবেসটা একবার দেখতে ডিডি-র লাইব্রেরিকে বললাম। তারাও জানাচ্ছে নয় জন যাত্রী। যুগান্তর যাত্রীদের নাম আর পরিচয়ও ছেপেছে। উইলসন-এর নামটা আছে। দুইজন হাবিলদারের নাম আছে, হাবিলদারদের পরিচয়ে যদিও স্বদেশি বেওসায়ি লেখা রয়েছে। কিন্তু নৃপেন-এর নাম অবধি নেই।

    কানাই মন দিয়ে শুনছিলেন। সৌভিকের ক্রসচেক করার পদ্ধতিতে তিনি বেশ খুশি। কিন্তু জাহাজের যাত্রীসংখ্যা তার কাছে কোনো ক্লু নয়। সৌভিককে কানাই বললেন—দশ না নয় সেটা ব্যাপার না। নৃপেনের নাম ইচ্ছে করেই বাদ দেওয়া হয়েছে কলকাতা পুলিশের নির্দেশে। পুলিশ চাইবে না যে নৃপেন-এর সম্ভাব্য সহযোগীরা এই জাহাজযাত্রার দিনক্ষণ ও অন্যান্য খবর জানুক। তাতে জাহাজের বিপদের আশঙ্কা বাড়বে। বিপ্লবীরা মাঝগঙ্গায় বন্দিকে লুঠ করতে পারে। জাহাজে বন্দি যাচ্ছে বলে ঢাক পিটালে বাকি যাত্রী আর তাদের ফ্যামিলিরাও ভয় পাবে। তো ঠিকই আছে। উইলসন রাম আর নবীন যখন জর্জে আছে, তখন আপাতত ধরে নেওয়া যাক নৃপেন ও আছে। আর কারা কারা যাত্রী?

    সৌভিক পকেট থেকে মোবাইল বের করে বলল- মোবাইলে নোট করে নিয়েছি। হ্যাঁ, পেয়েছি, পুলিশদের বাদ দিয়ে, দুই ব্রিটিশ, দুইজন বাঙালি আর দুইজন তামিল। তামিলগুলো আন্দামান থেকে মাদ্রাজের জাহাজ ধরবে। দুই জন ব্রিটিশের পরিচয়ে লেখা এডুকেশানিস্ট, হাইলি ব্রিটিশ স্পাই, যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের বছর! তামিলগুলো বেওসায়ি, বাংলায় ব্যাংক খুলেছে। দুইজন বাঙালির একজন সার্ভেয়ার আর অপরজনের নাম জনৈক রাখহরি ঘোষাল। কিন্তু পয়েন্ট থ্রি–রাখহরির নামের পাশে ব্র্যাকেটে লেখা অলকটপন্থী। আর কোনো পরিচয় দেওয়া নেই। এই অলকট না ভজকট কেসটা কী?

    —থিয়োসফিস্ট। ভূতচর্চা বললে বোধহয় ভালো হয়। কিন্তু শুধুই ভূতচর্চা নয়। পরলোক, প্যারাসাইকো যত রকম উদ্ভট বিষয় এদের চর্চার বিষয় ছিল। নাইনটিস্থ সেঞ্চুরির শেষ দিক থেকে এদের বেশ রমরমা ছিল। কলকাতায় বোধহয় এখনও থিয়োসফিস্ট সোসাইটি আছে, কলেজ স্ট্রিটের দিকে! সে সময় যদিও থিয়োসফিস্টরা শুধুমাত্র উদ্ভটশাস্ত্রে নিজেদের আটকে রাখেনি। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনও এক থিয়োসফিস্টের হাত দিয়ে শুরু-তিনি আলান অক্টাভিয়ান হিউম, ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা। হিউম ছিলেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সিভিল সার্ভেন্ট। হিউম দাবি করেন, তার রহস্যময় ও তিব্বতবাসী গুরু মহাত্মার কথা শুনে তিনি কংগ্রেস-এর প্রথম অধিবেশন ডাকার পরিকল্পনা নেন। এই গল্পটা বরং আর একদিন। আপাতত শোন, এই থিয়োসফির আরেক পুরোধা হলেন কর্নেল অলকট। তিনি যদিও জাতীয় রাজনীতিতে মাথা ঘামাননি। জর্জ দ্য সাভিওরের যাত্রী রাখহরি ঘোষাল কর্নেল অলকটের অনুগামী। যদিও বিষয়টি নিঃসন্দেহে সন্দেহজনক। আমি স্পেশাল ব্রাঞ্চে সে সময় থাকলে রাখহরি ঘোষালের ফ্যামিলিকে ট্রেস করার চেষ্টা করতাম।

    সৌভিক মোবাইল ফোনটা কানাই-এর দিকে এগিয়ে দিল। আলান হিউম-এর উইকিপিডিয়া পেজ। দাঁড়িওলা, সম্ভ্রান্ত ও বয়স্ক ব্রিটিশ। সৌভিক বলল—এই যদি থিয়োসফিস্টদের চেহারা হয় তাহলে আমি নিশ্চিত রাখহরি ঘোষালই কালপ্রিট। কোনো স্বদেশি ছোকরা নিশ্চই দাড়ি বাগিয়ে জর্জে থিয়োসফিস্ট সেজে উঠেছিল। কংগ্রেসের সঙ্গে থিয়োসফিস্টদের তলে তলে যোগ থাকলে পরিচয়পত্র, প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র আর থিয়োসফির বইপত্তর জোগাড় করাটা কোন ব্যাপারই নয়।

    —রোসো ভাই রোসো। আমরা এখানে কালপ্রিটকে খুঁজছি না। কারণ, হতেই পারে কালপ্রিট কোনো অচেনা-অজানা দেশবোধে উদ্‌বুদ্ধ ছোকরা বা জলদস্যু। আমরা জাহাজ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাব্য কারণ খুঁজছি, সেটাই আমাদের কেস। অপরাধী না ধরা পড়লেও বড়োসাহেব এই কেসে বকবে না, জাহাজ খুঁজে দিলে মিডিয়া খুশি হয়ে যাবে। যদিও রাখহরি ঘোষালকে মাথায় রাখলাম।

    লাঞ্চের পর থেকে জানালাহীন চেম্বারে বসে কানাই হাঁপিয়ে উঠছিলেন। সৌভিককে নিয়ে তিনি লালবাজারের বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। সৌভিক পকেট থেকে মালবোরোর প্যাকেট বের করল, যা দেখে বেশ চমকালেন কানাই। সৌভিক আন্দাজ করে বলল—একটা কেস সেটল করে দিলাম আজকে। কানাই চুপচাপ একটা মালবোরো ধরালেন।

    —আজ বাড়ি যাওয়ার আগে কি কেসটা সল্ভড হবে?

    কানাই বললেন—আশা কম। কয়েকটা সম্ভাবনা মাথায় ঘুরছে, কিন্তু সিকোয়েন্সটা না বানানো গ্যালে কেসটা দাঁড়াবে না। আর কয়েকটা প্রশ্নও এখনও উত্তরহীন, যেমন—যদি ধরে নিই যে নৃপেনকে বিপ্লবীরা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে, কীভাবে ছিনিয়ে নিল সেইটে পরে ভাবব, তাহলে প্রশ্ন হল, হোয়াই নৃপেন! এত এত বিপ্লবী সব কালাপানি পার হল। তাদের তো ছিনিয়ে নেওয়া হল না।

    —অরবিন্দ ইংরেজের হাত গলে চন্দননগরে চলে গেছিলেন, পরে পুদুচেরি। সেটা কি শুধুই সি আর দাশ এর সওয়াল-জবাবে, লালবাজারের দেয়াল কানাকানি করে, সেখানে ফরাসিদের যথেষ্ট হাত ছিল। জাস্টিসদের ইনফ্লুয়েন্সড করা হয়েছিল। অরবিন্দর ক্ষমতা ফরাসিরা আন্দাজ করতে পেরেছিল বোধহয়।

    .

    কানাই ধোঁয়া ছেড়ে বললেন—তাহলে তেমন বিশেষ ক্ষমতাবান বিপ্লবী হলে বিদেশি শক্তি তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতেও পারে। গুড ডিডাকশান। নৃপেনও তো যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণই। সে লালবাজারের ফিঙ্গার প্রিন্ট ডিপার্টমেন্টে কাজ করেছে। আজিজুল হক আর রায় বাহাদুর হেম বসুর কাছে কাজ শিখেছে। ফিঙ্গার প্রিন্টে বিশেষজ্ঞ। ডাচ, ফরাসি, পোর্তোরা তো যুদ্ধের আগের বছর এমন লোককে ফোর্সে চাইবেই। ওই সময়, কোনো ফরাসি জাহাজ কি পুদুচেরি থেকে ছেড়েছিল? বা কোন জাহাজ পুদুচেরিতে এসেছিল? জর্জ ছাড়ছে ২২ সেপ্টেম্বর, তার সঙ্গে আরো ৫-৭ দিন-এর টাইম উইন্ডোতে ইনফরমেশানটা চাই। ক্যালকাটা পোর্টের আর্কাইভে শিওর থাকবে, পুদুচেরি পোর্টকে ক্লোজলি ওয়াচ করা হত। পোর্টে না পেলে, ওয়াচ ডিপার্টমেন্টের পুরোনো মালখানাটা একবার দেখিস। নাকের ডগায় থাকা ফরাসিদের এদেশের ব্রিটিশরা কোনোদিনই ভালো চোখে নেয়নি।

    সৌভিক মনে মনে বিরক্ত হলেও ওপরে বুঝতে দিল না। পোর্টের সঙ্গে কথা বলার ঝক্কিটা ইতিমধ্যে একবার তাকে পোহাতে হয়েছে। আধখাওয়া সিগারেট ডাস্টবিনে ফেলে, অলিন্দের থামের আড়ালে গিয়ে সৌভিক ফোন করতে ব্যস্ত হল। কানাইচরণও একটু দূরে সরে এসে নিজের অবশিষ্ট সিগারেটে মন দিলেন, আর ঝুঁকে পড়ে লালবাজারের চাতালে লোকজনের যাতায়াত দেখছিলেন। যত জুনিয়রই হোক, ফোর্সে এক অফিসারের সোর্সে অন্য অফিসারের উৎসাহ না দেখানোর অঘোষিত নিয়ম। কানাই-এর কানে সৌভিকের কাকুতিমিনতি কানে আসছিল। গোয়েন্দা বিভাগের স্পেশাল সেলের জাঁদরেল অফিসারের মামুলি ইনফরমেশান জোগাড় করতে কী নাজেহাল দশা ভেবে কানাই মজা পেলেন। সিগারেটের ফিলটার এসে গেছিল, কানাই ডাস্টবিনে সিগারেট ফেলতে গিয়ে দেখলেন সৌভিক কথা শেষ করে আর একটা সিগারেট ধরাচ্ছে।

    সৌভিক বলল—জোগাড় হল, আমার বাপের ভাগ্য, কোনোদিন ডিসি-পোর্টে গেলে শালাদের সেফহাউসে নিয়ে গিয়ে মজা বুঝিয়ে ছাড়ব। যাকগে, ক্যালকাটা পোর্ট এর আর্কাইভস বলছে একটি ছোটো জাহাজ, নাও-ই বলা ভালো পুদুচেরি থেকে চাঁটগা যাওয়ার জন্য ছেড়েছিল। নৌকা রং করার আলকাতরা নিয়ে চাঁটগা যাচ্ছিল। কিন্তু যান্ত্রিক গোলযোগের কারণে এক দিন পরে পুদুচেরিতেই ফিরে আসে। আর পুদুচেরিতে বন্দরে একটি যাত্রীজাহাজ এসেছিল করাচি থেকে। তাতে ৫০ জন যাত্রী ছিল, বেশিরভাগই ফরাসি, এডেন ঘুরে, করাচি হয়ে পুদুচেরিতে এসেছে। প্রচুর ওয়াইনও ছিল সেটা বোধহয় না বললেই হত। যুদ্ধের জন্য সেবার সমুদ্রে জাহাজের আনাগোনা বেশ কম ছিল। অবশ্য ঝড়ের আশঙ্কাও হতে পারে। মোটকথা নথিতে জর্জের ভিড়বার কোনো কথা নেই!

    —পুদুচেরিতে জর্জ ভিড়লে ব্রিটিশ গুপ্তচরদের কাছে ঠিকই খবর যেত। বলে কানাইচরণ নিজের মনে ডুব দিলেন। সৌভিক আর কথা বাড়াল না। দুজনে চেম্বারে ফিরে এলেন। সৌভিক হাতের জ্বলন্ত সিগারেট ফেলেনি।

    কানাই যেন কালাপানির মধ্যে পড়ে গেছেন, সেখানে অন্ধকার বেশি আর অল্প আলো, সেলুলার জেলের ঘুলঘুলি দিয়ে প্রবেশ করছে। কানাই ভাবছেন, সেই একফালি ঘুলঘুলি দিয়ে কি সূর্যকে দেখা সম্ভব। কিন্তু সেলে কি শুধুই ঘুলঘুলি থাকে, পাথরের দেয়ালে কি চিড় থাকে না! সেখান দিয়েই কি আলো প্রবেশ করে না! কানাই একটি তেমন চিড় দেখতে পেলেন।

    —আচ্ছা ওই জর্জ জাহাজের যে ক্যাপটেন, কী নাম তার, ওস্তাদ মাসুদ, সে কি চিটাগাঁ-এর লোক? সে সময় তো বেশির ভাগ মাল্লা চিটাগাঁ-এর লোক ছিল।

    —খোদ খিদিরপুরের। অনেকবছরের নাবিক, বংশানুক্রমে। পোর্টের নথিতে লেখা ছিল। সেটা জেনে আমি লোকাল থানার থেকে ছেলে পাঠিয়েছিলাম। ওস্তাদের বংশধররা আছে এখনও খিদিরপুরে। ওস্তাদ তাদের বাজানের দাদা। সমুদ্রে মারা যায়। সম্ভবত জর্জেই মারা যায়, বংশধররা এর বেশি কিছু জানে না।

    কানাই ফের চিন্তার কালাপানিতে ডুবে গেলেন। সৌভিক এদিক-সেদিক ফোন করে অধস্তনদের নির্দেশ দিচ্ছিল আর তার নিজের কাজ অন্যদের কাঁধে ঠেলবার চেষ্টা করছিল। কানাইদার পাল্লায় পড়ে তার নিজের সব কাজ আজকের মতো লাটে উঠবার জোগাড়। ক্রাইম কনফারেন্সে কমিশনারের নাতিদীর্ঘ স্পিচের মাঝে সৌভিক সোর্সদের সঙ্গে টেক্সট আদানপ্রদান করেছে। ডিসি-ক্রাইম দেখতে পেয়ে ইশারায় ধমক দিয়েছে। কসবা থানা একটা খুনের কেস রেফার করেছে। সৌভিক ফরেনসিকে পাঠানোর নির্দেশ দিল। কানাই ক্লোজড থাকায় তার কাঁধে এমনিতেই অনেকগুলো দায়িত্ব। সৌভিক জানে, যদি পেঁদিয়ে কথা বের করার কিছু কেস আসে তবেই এখন গোয়েন্দা বিভাগ সল্ভ করতে পারবে। সিরিয়াস কেস এলে এই মুহূর্তে ডিডি অচল, কানাইকে ফের অফিসিয়াল তলব দিতে হবে। কানাই সেই আশাতে সকাল থেকে দপ্তরে এসে বসে থাকে, এই বুঝি জয়েন্ট সিপি-এর ঘর থেকে ডাক এল। সপ্তাহ দুয়েক ঘুরতে চলল। কলকাতায় কী পেটি ক্রাইম ছাড়া আর কিছুই নেই রে বাপ!’ সৌভিক ফরেনসিককে ফোন করতে যাচ্ছিল-চেম্বারের পরদা ঠেলে এক পৃথুলা, বয়স্ক মহিলা প্রবেশ করলেন। সৌভিক এঁকে আগেও দেখেছে, লালবাজারেই, কিন্তু ঠিকঠাক মনে করতে পারল না।

    ভদ্রমহিলা পর্দা সরিয়ে বললেন—আসতে পারি?

    ভদ্রমহিলার গলা শুনে কানাই কালাপানির অতল থেকে যেন জেগে উঠলেন, ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—আরে কী ভাগ্যি, আসুন আসুন, প্লিজ বসুন।

    ভদ্রমহিলা প্রত্যাশিত আপ্যায়ন পেয়ে এক গাল হেসে বললেন—লাঞ্চ পেরিয়ে গেল, তবু কেস সল্ভ হল না দেখে নিজেই খোঁজ নিতে চলে এলাম।

    সৌভিক চিনতে পারল, ক্রিমিনাল রেকর্ডস এর রেজিস্ট্রার দিদিমণি, যিনি কানাইদাকে পুরোনো কেসের ফাইলপত্তর দিয়ে থাকেন।

    কানাইচরণ বললেন—এই কেসটা একটু বেশিই জটিল।

    দিদিমণি জিজ্ঞেস করলেন—নৃপেন চট্টরাজের কোনো হদিস পেলেন? কানাইচরণ আঙুল তুলে সৌভিককে দেখিয়ে বললেন—আমার এই তরুণ বন্ধুটি এখনও কয়েকটি সম্ভাবনা নিয়ে খেলা করছে। প্রথম দুটি সম্ভাবনা বাদ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, খিদিরপুর থেকে জাহাজ ছেড়েছিল, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। আর সমুদ্রও ছিল শান্ত, তাই জাহাজডুবিও সম্ভব নয়, জলদস্যু আক্রমণ করবে এমন আশঙ্কা পুলিশের রিপোর্টেও নেই। এখন হাতে রইল পড়ে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল, মানে জাহাজ যদি মাঝপথে ভ্যানিশ হয়ে যায়। সেটা কী সম্ভব!

    দিদিমণি চেয়ার টেনে বেশ জুত করে বসে পান মশালা চিবুতে চিবুতে বললেন—ওরকম জাহাজ ভ্যানিশ তো আমেরিকায় হয়টয় বলে শুনেছি। অনেকে বলে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে নাকি ভিনগ্রহীরা এসে জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। আচ্ছা আমাকে বলতে পারেন, ভিনগ্রহীরা কেন আমেরিকাতেই আসে, বঙ্গোপসাগরে ইউ এফ ও আসতে পারে না?

    কানাই হাসলেন।–-গরিব মানুষের বাড়িতে তো আর অতিথি আসে না; এলে বড়োলোকদের বাড়িতেই আসে।

    দিদিমণি হাত উলটে বললেন—তাহলে হাওয়ার কারসাজিই হবে হয়তো। জাহাজকে টেনে নিয়ে হয়তো শ্রীলঙ্কা বা সিঙ্গাপুরে নিয়ে গিয়ে ফেলেছে।

    সৌভিক পাশের টেবিল থেকে মুখ না তুলে বলল—আলিপুর জানিয়েছে, সে সময় কোন সাইক্লোন আসেনি বে-তে।

    —না না, আমি তেমন বড়ো ঝড়ের কথা বলছি না। আমি হাওয়ার কথা বলছি। কানাইবাবু, আপনি উত্তমাশা অন্তরীপের কথা শুনেছেন। ইউরোপীয় জাহাজ উত্তমাশা অন্তরীপ পেরোনোর পর এমন এক হাওয়া পেত, তাদের যাত্রার অনুকূলে বয়ে চলা হাওয়া, যা সোজা জাহাজগুলোকে ভারতীয় উপকূলে এনে ফেলত। দাঁড় বাইতেও হত না। পাল খাটিয়ে দিলেই নৌকা ভেসে চলত। তেমন কোনো হাওয়া কেন বঙ্গোপসাগরে বইবে না!

    কানাই-এর গলায় সংশয়—ভূগোলের জ্ঞানটা আমার স্কুল ফাইনাল লেভেল-এর, কিন্তু বঙ্গোপসাগরে হাওয়া তো দক্ষিণ থেকে উত্তরমুখী বয়। অর্থাৎ আন্দামানের দিক থেকে বাংলার উপকূলের দিকে। জাহাজকে যদি ভ্যানিশ হতে হয় হাওয়াকে বইতে হবে উত্তর থেকে দক্ষিণে—বাংলা থেকে আন্দামানের দিকে।

    দিদিমণি ভুল শুধরে দিলেন—উত্তরমুখী হাওয়া বয় বর্ষাকালে, যখন মৌসুমী বায়ু সমুদ্র থেকে জল নিয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করে। অথবা, সাইক্লোন তৈরি হলে, হাওয়া সমুদ্র থেকে বাংলায় ঢুকতে থাকে। কিন্তু বছরের সবসময় যে এমনটা হবেই তার মানে নেই, দক্ষিণমুখী হাওয়া তো থাকতেই পারে।

    কানাই চমৎকৃত হয়ে বললেন—আপনার জিওগ্রাফিটা তো দারুণ।

    দিদিমণি লজ্জা পেলেন – আমার হিস্ট্রি অর্নাস ছিল, কিন্তু পাসে জিও ছিল। কানাই দুবার ‘দারুণ’ বলে সৌভিক এর দিকে তাকালেন। সৌভিক ও দিদিমণির কথা শুনতে শুনতে ফরেনসিককে ফোন করতে ভুলে গেছে। কানাই নির্দেশ দিলেন আলিপুরকে আধঘণ্টার মধ্যে সব উইন্ড ম্যাপ সহ তুলে আন। দরকার হলে সামনে একটা এসকর্ট-কার লাগিয়ে দে।

    কানাই ঘড়ির দিকে তাকালেন, চারটের কাঁটা ছুঁয়েছে। —দিদি আজ একটু লেট হলে অসুবিধা হবে কি? সৌভিক আপনাকে অফিসের গাড়ি দিয়ে দেবে। দিদিমণি হাসলেন—থাকি তো রাজাবাজারে, কোনোই প্রবলেম নেই, হাতের কয়েকটা কাজ সেরে তবে আবার আসছি। বলে, উঠে চলে গেলেন।

    কানাইচরণ উত্তেজনায় আর একটা মালবোরো ধরিয়ে লালবাজারের অলিন্দে চলে এলেন। সৌভিক ঝটপট ফরেনসিককে ফোনটা সেরে নিল। জলদি পিক করার জন্য পেট্রল-কার পাঠানো হয়েছে আলিপুরে। কানাইচরণ ঘড়ি দেখলেন, আর হয়তো মিনিট কুড়ির মধ্যে ঢুকিয়ে দেবে। সিগারেটটা শেষ করে, দিনে প্রথমবার টয়লেটে গেলেন কানাইচরণ। নিজেকে উন্মুক্ত করে চেম্বারে ফিরে দেখেন দিদিমণিও তার দপ্তরের কাজ সেরে ব্যাগ কাঁধে ফিরে এসেছেন, কানাই-এর টেবিলের সামনের কাঠের চেয়ারে তিনি বসে আছেন। সৌভিক ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। চারটে পঁয়তাল্লিশে একজন সাব-ইনস্পেকটার এক তরুণ ও সুবেশ পুরুষকে নিয়ে কানাই-এর চেম্বারে এল। সাব ইনস্পেকটারটিকে কানাই বিদেয় দিলেন। তরুণটির দুই-হাত আর বগল ভরতি তাড়ি তাড়ি মোড়ানো কাগজ। কাগজগুলির ভেতর থেকে নানা ধরনের ম্যাপ উঁকি দিচ্ছে। তরুণটির গালে অল্প দাড়ি, ব্যাকব্রাশ চুল, পরনে জিন্‌স।

    সৌভিক তরুণটিকে বললেন—সুচয়নবাবু, প্লিজ, বসুন।

    সুচয়ন বললেন—আমি কিন্তু সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট-এর এর কর্মচারী, এভাবে বলা নেই কওয়া নেই, বড়োসাহেবরা কেউ জানে না, আপনারা আমাকে তুলে আনতে পারেন না!

    সৌভিক সুচয়নকে শান্ত করতে বললেন—আহা আপনার থেকে একটা জরুরি ফেভার চাই। নেক্সট টাইম আপনার যে-কোনো প্রবলেমে লালবাজারকে আপনি পাবেন।

    সুচয়ন ধাতস্থ হলেন। সৌভিক বেল টিপে বেয়ারাকে বলল সকলের জন্য কফি আনতে। কানাইচরণ সুচয়নের কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে বললেন—সুচয়নবাবু আপনাকে উইদাউট নোটিস তুলে আনার জন্য আমরা দুঃখিত। ওয়েদার সংক্রান্ত কয়েকটা ইনফরমেশান আপনার থেকে নিয়েই ছেড়ে দেব। যেখানে বলবেন ড্রপ করে দিয়ে আসব।

    সুচয়ন বললেন—ইটস ওকে, কিন্তু ইনফরমেশান আমাকে ফোনে জিজ্ঞেস করলেও দিয়ে দিতে পারতাম।

    কানাই বললেন—আমি নিজেও জানি না কী ধরনের ইনফরমেশান আমাদের প্রয়োজন। আচ্ছা, আপনি কি বঙ্গোপসাগরে কোনো দক্ষিণমুখী হাওয়ার কথা জানেন?

    —অনেক ধরনের উইন্ড সার্কুলেশান অর্থাৎ হাওয়ার চলাফেরা বে অফ বেঙ্গলে দেখা যায়, সমুদ্র তো একটা ছোটো জায়গা নয়। তাদের প্রকৃতি, বৈশিষ্ট্য আর নানা ধরনের বিষয়ের ওপর নির্ভর করে নাম দেওয়ারও রেওয়াজও আছে। সুচয়ন বললেন।

    কানাই বললেন—আমি নিজেও জানি না আপনাকে ঠিক কী প্রশ্ন করা উচিত, আচ্ছা, কোনো হাওয়া কি একটা জাহাজকে…মানে, টেনে…বলতে বলতে কানাই দিদিমণির দিকে অসহায় ভাবে তাকিয়ে বললেন…আপনি একটু হেল্প করুন না, আপনি তো জিয়োগ্রাফির।

    দিদিমণি সুচয়নকে বললেন—ভাই কাইন্ডলি উইন্ড ক্লাইমেটোলজির অ্যাটলাসটা খুলবেন, সেপ্টেম্বরেরটা বের করবেন।

    একতাড়া ম্যাপের মধ্যে সুচয়ন ক্লাইমেটলজির অ্যাটলাস খুঁজতে ব্যস্ত হলেন। কানাইচরণ আর সৌভিকের ভ্যাবাচ্যাকা অবস্থা দেখে দিদিমণি বললেন—ক্লাইমেটোলজি মানে হল পঞ্চাশ কী একশো বছরের জলবায়ু। ধরুন ১৯১০ সাল থেকে যদি সমুদ্রের বিভিন্ন স্থানে হাওয়ার গতিবেগ মাপা হয়ে থাকে, তাহলে ১৯১০ সাল থেকে ২০১৬ অবধি হাওয়ার গতিবেগ আর হাওয়ার দিকের গড় নেওয়া হবে। আমি সেপ্টেম্বরের ক্লাইমেটোলজি বের করতে বললাম। সেটা দেখলে, সেপ্টেম্বর মাসে সমুদ্রে হাওয়া কোন দিকে বয় আর কত গতিবেগে বয় সেটার একটা ধারণা পাওয়া যাবে।

    সুচয়ন একটি অপেক্ষাকৃত ঝকঝকে বঙ্গোপসাগরের ম্যাপ সৌভিকের টেবিলের ওপর মেলে দিলেন। বঙ্গোপসাগরকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশরা চলে গেছে। নীল সমুদ্র এখন সৌভিকের টেবিলের ওপর। ম্যাপের তিন কোনায় করমণ্ডল উপকূল, সুন্দরবন আর মায়ানমার-এর উপকূল উঁকি দিচ্ছে। নিচের দিকে ভারত মহাসাগরের অথই জলরাশি। কানাই ম্যাপের দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে আনলেন, বঙ্গোপসাগরের ওপর অসংখ্য ছোটো ছোটো তির চিহ্ন, তার একটির ওপর হাত রেখে কানাই জিজ্ঞেস করল, এই অ্যারোগুলি কীসের?

    সুচয়ন জানালেন—এগুলিই তো হাওয়ার দিকনির্দেশ করছে, তির চিহ্নগুলি কম্পাসের যেদিকে নির্দেশ করছে সেই সেদিকে সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণত হাওয়া বয়ে থাকে। ম্যাপের মধ্যে আধ ডিগ্রি অন্তর অন্তর তির চিহ্ন রয়েছে, অর্থাৎ প্রতি ৩০ কিলোমিটারে হাওয়া মাপা হয়েছে। আর হাওয়া যত জোরে বইবে তীর চিহ্ন তত লম্বা হবে, বলে সুচয়ন ম্যাপের বঙ্গোপসাগরের ওপর হাত রেখে বললেন—এই অঞ্চলটাকে আমরা সেন্ট্রাল বে বলি, এইখানেই যত সাইক্লোন তৈরি হয়, তাই এই জায়গাটা অপেক্ষাকৃত শান্ত। তাই দেখুন, এইখানে তির চিহ্নটি আকারে অন্যান্য তিরগুলির থেকে ছোটো আর অতি সামান্য উত্তরে দিকনির্দেশ করছে।

    কানাইচরণ হুগলি নদীর মোহনার কাছে আঙুল রাখলেন, তারপর আঙুল দক্ষিণ দিকে নামাতে থাকলেন, পারাদ্বীপের পূর্বে এসে থমকালেন, তারপর সোজা নীচের দিকে নামতে থাকলেন, আন্দামান পর্যন্ত গিয়ে থামলেন, তির চিহ্নগুলিও মূলত দক্ষিণমুখে নির্দেশ করছিল। এর পর কানাই-এর আঙুল ফের পারাদ্বীপ-এর কাছে উঠে এল। আঙুল কিছুক্ষণ ম্যাপের মধ্যে কিছু একটা খুঁজল, পারাদ্বীপের সামান্য নীচে নামতেই কানাই যা খুঁজছিলেন দেখতে পেলেন। লম্বা লম্বা তির, সংখ্যায় বেশি নয়, পাশাপাশি ধরলে দুটি কী তিনটে, অর্থাৎ দেড়শো দুশো কিলোমিটার জায়গা জুড়ে দক্ষিণমুখী তিরগুলির থেকে বাঁক নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে চলেছে। যেন বড়ো একটি রাস্তা থেকে একটি ছোটো রাস্তা বেরিয়ে গেছে। কানাইচরণের আঙুল হাওয়াদের রাস্তায় চলতে শুরু করল। কানাই সাবধানে আঙুল চালালেন কারণ দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী তির-এর সংখ্যা খুব অল্প। তাদের প্রতিবেশী তিরগুলি সবই দক্ষিণে চলেছে। সমুদ্রের মধ্যে দিয়ে কিছুক্ষণ চলার পর এক জায়গায় গিয়ে কানাই থামলেন। সেইখানে গিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমমুখী হাওয়া ফের দক্ষিণমুখী হয়েছে। কানাই-এর আঙুল তামিলনাড়ুর উপকূল থেকে এক ইঞ্চি পরিমাণ দূরে থেমেছে। কানাই সুচয়নের দিকে চাইলেন।

    সুচয়ন বললেন—আপনি এতক্ষণ যে সার্কুলেশানকে ফলো করলেন সেটা এক ধরনের এনোম্যালি অর্থাৎ বৈষম্য। সেপ্টেম্বরের সমুদ্রে হাওয়ার যে ধরনের দিক আর জোর থাকে তার থেকে বেশ আলাদা। এই হাওয়াটি পারাদ্বীপের দক্ষিণ থেকে তামিলনাড়ুর সামান্য পূর্বে গিয়ে শেষ হয়। এর জোরও শান্ত সামুদ্রিক হাওয়ার চেয়ে অনেক প্রবল কিন্তু ঘূর্ণাবর্ত বা সাইক্লোনের মতো অত জোরও নেই। ৬০ কিমির বেশি হাওয়ার বেগ হলে আমরা ঘূর্ণাবর্তকে সাইক্লোন বলি আর ৪০ কিমি ওপরে হলে বলা হয় গভীর নিম্নচাপ। কিন্তু এই বিষম হাওয়ার গতিবেগ ২০ থেকে ৪০ এর মধ্যে। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণ জলের কারণে এই বিষম হাওয়া তৈরি হয়, মানে সেটাই গবেষকেরা অনুমান করেছেন।

    ম্যাপের ওপর মাথা ঝুঁকিয়ে কানাই সুচয়নের কথা শুনছিলেন, ম্যাপের উপর চেপে থাকা তার তর্জনী নাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন-এই যে জায়গাটি, যেখানে এসে আপনার স্পেশাল হাওয়া বাকি হাওয়ার সঙ্গে মিশে গেল, এইটে পুদুচেরি থেকে কত দূরে? সুচয়ন ম্যাপের অক্ষাংশ দেখে বললেন—অনধিক ৬০ কিলোমিটার।

    কানাই সুচয়নের দিক থেকে মাথা ঘুরিয়ে সৌভিকের দিকে তাকালেন। সৌভিক ইশারা ধরতে পেরে নিজের মনে জমা প্রশ্ন করে ফেলল—যদি আমরা ম্যাপ দেখে এই বিশেষ হাওয়ার কথা জানতে পারি, যদি আলিপুর জানে এই হাওয়ার কথা, ব্রিটিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চ কেন জানতে পারল না?

    কানাই ছোটো একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ম্যাপ থেকে আঙুল তুলে নিলেন। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, বেতো কোমর টানটান করে বললেন—ভালো প্রশ্ন কিন্তু ব্রিটিশ পুলিশ কেন জানে না সেটা আমরা ইতিমধ্যেই জেনেছি। বরং প্রশ্নটা একটু ঘুরিয়ে করা উচিত ছিল। যাই হোক, আগে ব্রিটিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চের দক্ষতাটা দেখা যাক। সুচয়নবাবু আপনার কাছে ১৯১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসের সামুদ্রিক হাওয়ার অ্যাটলাস আছে?

    —থাকতে পারে, বলে সুচয়ন আবার ম্যাপের গাদার মধ্যে হামলে পড়ে একটি জরাজীর্ণ ম্যাপ তুলে আনলেন। সেই ম্যাপে বঙ্গোপসাগরের স্বচ্ছ নীল রং ধুসর হয়েছে, ম্যাপের কোনায় মায়ানমার, বাংলাদেশ, তামিলনাড়ু, পুদুচেরি মিলিয়ে একটাই দেশ, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া। সুচয়ন আগের ম্যাপের ওপর ১৯১৩ সালের ম্যাপটি মেলে দিলেন। সৌভিক ঝুঁকে পড়ে পারাদ্বীপের কাছে সেই বিশেষ হাওয়াটিকে খোঁজার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল।

    কানাই বললেন—তেমন কোনো হাওয়া নেই তো, আরও একটা জিনিস নেই, সেটা কী বলত?

    সৌভিক বলল—আগের ম্যাপে অনেক বেশি তিরচিহ্ন ছিল, এইখানে দেখছি অনেক দূরে দূরে একটা তির।

    —সমুদ্রের হাওয়া মাপার কাজ শুরু হয়েছিল ১৯১০-এর দিকে, তার আগে থেকেই যদিও স্থলভূমিতে বৃষ্টিপাত মাপার উদ্যোগ নেওয়া হয়, কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের আশঙ্কাতেই ব্রিটিশরা সমুদ্রের পর্যবেক্ষণও শুরু করে। তখন কতগুলি স্টেশন ছিল সুচয়নবাবু?

    —তখন আমাদের বে অফ বেঙ্গলে ১৮ টি পয়েন্টে হাওয়া, বৃষ্টিপাত, পারদ ইত্যাদি মাপার ব্যবস্থা ছিল।

    সৌভিক বলল—কিন্তু ম্যাপে তো ১৮টার অনেক বেশিই তির দেখতে পাচ্ছি।

    সুচয়ন বললেন—ওগুলো গাণিতিক হিসেব কষে বাড়ানো হয়েছে তাই সেসময় সমুদ্রের আসল অবস্থার সঙ্গে মেলবার সম্ভাবনা কম। ধরুন একটি পয়েন্টের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ জানতে পারলে আপনি তার থেকে ২০ কী ৩০ কিমি দূর অবধি বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অঙ্ক কষে বলে দিতে পারবেন, একে এক্সট্রাপোলেশান বলে। কিন্তু দূরত্ব যত বাড়বে, ভুলের সম্ভাবনাও তত বাড়বে।

    কানাই সুচয়নের কথায় সূত্র ধরে বললেন—আর যেহেতু সবে সমুদ্রে পর্যবেক্ষণ শুরু হয়েছে, তাই ১৯১৩ সালের মধ্যে ক্লাইমেটোলজির ম্যাপ পাওয়াও যাবে না, আর পাওয়া গেলেও তা নিখুঁত হবে না। ৩০ বছরের গড় আবহাওয়াকে জলবায়ু বলা হয়, কী তাইতো দিদিমণি!

    দিদিমণি সায় দিলেন —নির্ভুল।

    —এখন কটা পয়েন্টে আপনারা পরিমাপ করেন? সৌভিক সুচয়নের কাছে জানতে চাইল।

    —এখন তো আর শুধু স্টেশন নেই, এখন এয়ারবোন, স্যাটেলাইট, ভেসেল, ড্রোন কত রকম পদ্ধতি চলে এসেছে। এখনকার যা ম্যাপ দেখছেন সব নির্ভুল। তাই নিঁখুতভাবে বিষম হাওয়াকে আমরা বুঝতে পারছি।

    কানাই বললেন—রহস্যের একটা দিক এখন আমার কাছে পরিষ্কার। আমি এই বিষম হাওয়াকে পুদুচেরি-উইন্ড বলে ডাকব, যদি আপনার আপত্তি না থাকে। ১৯১৩-এর ম্যাপে যখন এই হাওয়া নেই, তখন ধরে নেওয়া গেল এই হাওয়ারও ১৯১৩ তে কোনো অস্তিত্বও নেই…

    সুচয়ন আপত্তি করলেন—তা কেন! ম্যাপে নেই মানে বাস্তবে নেই তা তো নয়। ম্যাপে তো এককালে আস্ত আমেরিকা মহাদেশেরই অস্তিত্ব ছিল না।

    —ওকে, এগ্রিড, ম্যাপে নেই মানে মানুষ জানে না, ব্রিটিশ গোয়েন্দারা জানে না। বিপ্লবীরা জানে না। মানুষের নলেজেই যদি না থাকে তাহলে জাহাজ চালাতে এই হাওয়ার সুবিধা তোলাও তো সম্ভব নয়। আপাতভাবে তাই তো মনে হচ্ছে।

    সৌভিক সায় দিল, ঠিক।

    —কিন্তু দিদিমণি, উত্তমাশা অন্তরীপে যে হাওয়ার কথা আপনি বললেন সেইটে কি ম্যাপে ছিল, বার্থোলোমিউ দিয়াজ উত্তমাশায় ফাঁসবার পরেও কি ম্যাপে উঠেছে? হয়তো হ্যাঁ, নির্দিষ্ট ভাবে নয় হয়তো, কিন্তু তবু একদল মানুষ এই হাওয়ার অস্তিত্ব জানেই, তারা না জানলে চলে না, কি সুচয়নবাবু, ঠিক বলছি? কানাই জিজ্ঞেস করল।

    —অবশ্যই। সমুদ্রের সব খুঁটিনাটি সেলার’স হ্যান্ডবুকে থাকে।

    —নাবিক মাল্লারা যুগ যুগান্ত ধরে সমুদ্রকে পড়ে আসছে। বিজ্ঞানী-আবহাওয়াবিদরা উদয় হওয়ার বহু আগে থেকে, প্রাচীনকাল থেকে সমুদ্রকে পড়ার চেষ্টা করছে মাঝিমাল্লারা। তাদের অর্জিত জ্ঞান কোনো ম্যাপে লেখা নেই। বংশানুক্রমে ছড়িয়ে আছে। কেউ কেউ নোটবুকে, ডায়ারিতে লিখে রেখেছে। সমুদ্রের প্রতিটি হাওয়াকে তারা কররেখার মতো চেনে।

    সৌভিক বলল—কানাইদা জর্জ-এর নাবিক ছিল ওস্তাদ মাসুদ, আমি নিজে তার খিদিরপুরের বাসায় লোক পাঠিয়েছি। সে জেনুইন নাবিক, সে বিপ্লবী নয়। সে জর্জ-এর দিশা পালটে আপনার পুদুচেরির হাওয়ায় গিয়ে পড়বে না।

    কানাই অস্বীকার করলেন—আমি তো বলিনি জর্জের দিশা পালটানোর জন্য নাবিক প্রয়োজন। যেটা প্রয়োজন সেটা হল নাবিকি জ্ঞান, সেটুকু থাকলেই হল। বাকি কাজ তো করবে পুদুচেরি-উইন্ড। আর এই জাহাজ-নিখোঁজ-এর কেসে নাবিকি জ্ঞান, ওস্তাদ মাসুদ ছাড়াও আর একজনের থাকা সম্ভব ছিল।

    রেজিস্ট্রার দিদিমণি উত্তেজিত হয়ে কানাই-এর টেবিলের ওপরে রাখা কিং-এম্পেয়ারার ভার্সাস নৃপেন চট্টরাজের এন্ড আদারস’ কোর্ট প্রসেডিংস-এর ফাইলটা তুলে ধরলেন।

    কানাই হা হা করে হেসে উঠল। –কেস দাঁড়িয়ে গেছে, সব টুকরোগুলো জোড়া দিতে সেসিল বারে যাওয়া যাক। সুচয়নবাবু, আপনাকে ড্রপ করে দেওয়ার ব্যবস্থা করছি, অনেক ধন্যবাদ

    পুলিশি কেসের মধ্যে বেশি না ঢোকাই ভালো—ভেবে সুচয়ন কানাই-এর চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলেন। কানাই, সৌভিক আর রেজিস্ট্রার দিদিমণি লালবাজারের বাড়ি থেকে বিকেলের বউবাজার স্ট্রিটে নেমে এলেন। দুই পা হাঁটতেই বিখ্যাত পানশালাটি, কানাইচরণের প্রত্যহ বিকেলের আড্ডা। পানশালার কোণের দিকে একটি টেবিল পছন্দ করে তিনজনে বসলেন, কানাই আর সৌভিক এসি ব্ল্যাক অর্ডার দিল। দিদিমণি বললেন—ভদকা উইথ লাইম কর্ডিয়াল। সঙ্গে এল মিক্সড পকোড়া – পানশালাটির বিখ্যাত অনুপান। এক সিপ হুইস্কি মেরে কানাইচরণ কথা বলা শুরু করলেন।

    —ব্রিটিশ পুলিশের কেস ডায়ারি পড়ে প্রথম আমার যেটা মনে হয়েছিল নৃপেন-এর বিরুদ্ধে চরবৃত্তির কেস-এর খুব বেশি একটা মেরিট নেই। প্রধান সাক্ষী বলতে একজন—ঠিকে ঝি গঙ্গা আর তার নাগর, যে নিজে পুলিশ! আজকের দিনে এমন কেস হলে, বটতলার উকিলও নৃপেনকে ছাড়িয়ে আনতে পারত। পরাধীন দেশের কথা ভাবলে, এইরকম কেসে পাঁচ কী সাত বছরের জেল যথেষ্ট। অনুশীলন সমিতির ছোকরা বিপ্লবীদের তাই হয়েছে, অনেকের কালাপানি হলেও বেশি বছরের নয়, আজীবন তো নয়ই। মাথাদের কথা অবশ্য আলাদা। নৃপেনেরও হয়তো কয়েক বছর কারাবাস হত। নৃপেন সাজা কেটে বেরিয়ে আসত। কিন্তু তবু, ব্রিটিশরা নৃপেন-এর বিরুদ্ধে একটা সত্যি কী মিথ্যে রাজসাক্ষী দাঁড় করাল, এক তুতো ভাইকে।

    এই প্রথম আমার সন্দেহ হল যে নৃপেন-এর একটা গুরুত্ব আছে। স্বদেশিদের কাছে গুরুত্ব থাকতে পারে কি? আর পাঁচটা উৎসাহী স্বদেশি সে নয়। সে হয়তো বোমা বাঁধেনি কিন্তু মূল্যবান তথ্য পাচার করেছে সে। মূলত তার পাচার করা তথ্যের ভিত্তিতেই পরে গডফ্রে দিনহ্যাম-এর ওপর হামলার চেষ্টা হয়। একবার জেল থেকে ছাড়া পেলে নৃপেন তো আর চরবৃত্তি করে উঠতে পারবে না, কারণ তখন সে দাগি। তাই কারামুক্তির পর স্বদেশিদের কাছে নৃপেন-এর কতখানি গুরুত্ব অবশিষ্ট ছিল, আমার সন্দেহ আছে। কলকাতা অনুশীলন সমিতিও ততদিনে ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে। একবার সাজা কেটে বেরিয়ে এলে নৃপেন ব্রিটিশের জন্যও ক্ষতিকর কিছু হয়ে উঠবে না। সে বারীন ঘোষ নয়, বাঘা যতীনও নয়। ব্রিটিশরা তা সত্ত্বেও নৃপেনকে উচিত শিক্ষা দিয়ে ক্ষান্ত হল না, কালাপানির ব্যবস্থা করল। লঘুপাপে গুরু দণ্ড, তাহলে কি ব্রিটিশরা আসলে নৃপেনকে পাকাপাকি ভাবে দূরে সরাতে চাইছিল? যাতে নৃপেন জেল থেকে কোনোমতেই বেরোতে না পারে। কার থেকে দূরে সরাতে চাইছিল? সৌভিককে প্রশ্ন করে উত্তর পেলাম—হয়তো কোনো বিদেশি শক্তির থেকে। এক্ষেত্রে নৃপেনের চরবৃত্তি-র কেসটা বড়ো নয়, নৃপেন লালবাজারের ফিঙ্গার প্রিন্ট এক্সপার্ট। ফিঙ্গারপ্রিন্ট-এর দুই আবিষ্কর্তা আজিজুল হক আর হেম বসুর সাক্ষাৎ শিষ্য। লালবাজারে নৃপেনের বিকল্পের অভাব নেই। কিন্তু অন্যান্য রাজশক্তির নৃপেনকে প্রয়োজন হতে পারে। যুদ্ধের আশু সম্ভাবনার মাঝে নিজের বাতিল অস্ত্রও কী অন্য রাজশক্তির হাতে তুলে দিতে আছে! ডাচ, ফরাসি বা পোর্তোদের নৃপেন-এর ওপর নজর থাকাটা একেবারেই অসম্ভব নয়। তাই নৃপেনের একটা গুরুত্ব ছিলই।

    ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ফরাসিদের দিকেই আমার নজর গেল। তারা নৃপেনকে পেতে চাইবেই। তাদের জন্য এটা নতুন কিছু না। ঋষি অরবিন্দ ফরাসডাঙা হয়ে পুদুচেরিতে গেছেন। নলিনী সেনগুপ্ত গেছেন। অনুশীলন সমিতির অনেক সদস্যের সঙ্গে পুদুচেরির নিবিড় যোগ থেকেছে। একে স্বদেশি, দুই ফিঙ্গারপ্রিন্ট এক্সপার্ট নৃপেনকে ফরাসিরা পেতে চায়। কিন্তু সরাসরি ব্রিটিশ জলসীমায় তারা হামলা চালাবে না। তাই তারা ঘুরপথ নিল। নিজেদের এক চরকে জর্জ দ্য সাভিওর-এ যাত্রী সাজিয়ে উঠিয়ে দিল, তার নাম রাখহরি ঘোষাল। তার পরিচয়ে যুগান্তর পত্রিকা বলছে যে তিনি একজন অলকটবাদী থিয়োসফিস্ট! সে সময় থিয়োসফিস্টদের সঙ্গে ন্যাশনালিস্ট নেতাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। রাখহরি ঘোষাল তার ফরাসি আর অরবিন্দ ঘোষদের প্রভাব খাটিয়ে থিয়োসফিস্টদের কাগজপত্র জোগাড় করে থাকবেন। জাহাজে তাকে কেউ সন্দেহ করেনি। থিয়োসফিস্ট দোহাই দিয়ে দাড়ি-পাগড়ির বিচিত্র সাজই বাকি যাত্রীদের সন্দেহ উদ্রেক করবে না। এমনিতেই বর্ষা শেষের সমুদ্র, ঝড়ের আশঙ্কায় জাহাজে বেশি লোক হয়নি। রাখহরি ঘোষাল তক্কে তক্কে রইল, জাহাজ সাগর পার হল। কলকাতামুখী জাহাজটির সঙ্গে মোলাকাত হল। তারপর পারাদ্বীপের পূর্বে আসতেই রাখহরি ঘোষাল জাহাজের দখল নিল। সম্ভবত নৃপেন বাদে জাহাজের বাকি সকলকেই সে হত্যা করে। এমনকি ক্যাপটেন ওস্তাদ মাসুদকেও সে হত্যা করে। রাখহরি ঘোষাল জাহাজ চালাতে জানেন না, বা জানলেও তাতে কাজ হবে না কারণ জাহাজের মাঝিমাল্লা সকলেই মৃত—বয়লার রুমে কেউ নেই। তাতে সমস্যাও নেই কারণ-

    সৌভিক কানাইচরণের কথার খেই ধরে বলল—ততক্ষণে জাহাজ পুদুচেরি উইন্ডের পাল্লায় এসে গেছে। জাহাজে স্রেফ পাল খাটিয়ে দিতে পারলেই জাহাজ তরতর করে পুদুচেরির কাছে পৌঁছে যাবে।

    —কারেক্ট, পুদুচেরির কাছে পৌঁছে যাবে কিন্তু পুদুচেরি অবধি পৌঁছোবে না। ষাট-সত্তর কিমি আগেই থেমে যাবে। আর রাখহরি ঘোষাল চাইবেও না জাহাজ নিয়ে পুদুচেরি বন্দর অবধি পৌঁছোতে, কারণ বন্দরে ইংরেজ গুপ্তচর থাকার সম্ভাবনা আছে। তাই জাহাজ, জর্জ দ্য সাভিওর এখন পুদুচেরি থেকে মাইল ষাটেক দূরে থেমে আছে। অপেক্ষা করছে একটি ফরাসি নাও-এর। যেটি কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে উপস্থিত হবে রাখহরি ঘোষাল ও নৃপেন চট্টরাজকে উদ্ধার করতে। এই একটিমাত্র নাও জর্জ-এর যাত্রাকালে পুদুচেরি বন্দর থেকে রওনা দিয়েছিল। আলকাতরা বোঝাই নাও! আগুন লাগানোর জন্য ভারি উপযুক্ত জিনিস। একটি পিপে উপড় করলেই জর্জকে যথেষ্ট ঝলসে দেওয়া সম্ভব। ফরাসি নাওটি যান্ত্রিক গোলযোগের অজুহাত নিয়ে পুদুচেরিতে ফিরে আসে। এই নাওতেই লুকিয়ে আছে নৃপেন ও রাখহরি। আর নাও-এ একটি কি দুটি আলকাতরার পিপে ফাঁকা। সম্ভবত বন্দরে প্রবেশের মুখে নৃপেন আর রাখহরি ফরাসি নাওটি ত্যাগ করে বাকি পথ সাঁতরে নেয়।

    সৌভিক বলল—এই পর্যন্ত মেনে নিতে আমারও আপত্তি নেই। কিন্তু দুটো প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। ব্রিটিশরা সমুদ্রে তল্লাশি চালালে কি জর্জ-এর পোড়া কাঠ খুঁজে পেত না?

    —জর্জে মোটে দশ জন যাত্রী ছিল, তিনজন সাদা চামড়া মোটে। ব্রিটিশরা খুব বেশি তল্লাশিতে জোর দেয়নি। জর্জ-এর অবশিষ্টাংশও দক্ষিণমুখী ঢেউ-এ ভেসে ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত অংশে চলে গিয়ে থাকতে পারে।

    —তাহলে দ্বিতীয় ও মোক্ষম প্রশ্নটি এই যে, পুদুচেরি হাওয়ার কথা অ্যাটলাসে নেই, ব্রিটিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চ জানে না, শুধুমাত্র কিছু নাবিক জেনে থাকতে পারে, সেটা এই মিস্টিরিয়াস রাখহরি ঘোষাল কী করে জানল? সে কি পেশায় প্রকৃতপক্ষে নাবিক? সৌভিক জানতে চাইল।

    —তা কেন, তার সঙ্গে নাবিকদের ইয়ারদোস্তি থাকতে পারে। নাবিকদের সঙ্গে ভাব জমালে অনেক খবরই জানা যায়। দিদিমণি জাহাজের খবর কি শুধু নাবিকরাই রাখে? কানাইচরণ রেজিস্ট্রার দিদিমণির কাছে জানতে চাইলেন। তার গ্লাসের ভদকা উইথ লাইম কর্ডিয়াল আর এক ফোঁটাও নেই। দিদিমণি জবাব দিলেন—কেন! আদার ব্যাপারীরাও জাহাজের খবর রাখতে পারে।

    —দেখ সৌভিক, সেটা হাতে নিয়ে ভেবেছিলাম, কেবলমাত্র জাহাজ হারিয়ে যাওয়ার মিস্ট্রিটা সল্ভ করলেই যথেষ্ট। সেটা সল্ভ করতে গিয়ে বুঝলাম এটা জাহাজ মিস্ট্রির কেস নয়। এটা আসলে বাঘের ঘরে ঘোগের বাসা আর ঘোগের ঘরে ফেউ-এর বাসার কেস।

    সৌভিক মদের নেশায় মাথা ঝাঁকিয়ে বলল—দুজনে মিলে কি যে হেঁয়ালি করছ, কোথায় বাঘ কীসের যোগ আর আদার ব্যপারীই বা কী করে এল।

    কানাই হুইস্কির দ্বিতীয় পেগটি একঢোকে খেয়ে বললেন—যেমনটা দিদি বললেন না আদার ব্যাপারীরাও জাহাজের খবর রাখে, সমুদ্রের হালহকিকত জানে। আর এই কেসে একজন আদার ব্যাপারী আছে। সে হল নৃপেন চট্টরাজের তুতো ভাই মোহন বসু।

    দিদিমণি বললেন—কোর্ট প্রসিডিংসে আছে যে মোহন বসু ডিফেন্সের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছে খিদিরপুরে তার ঘড়ি সারাই-এর দোকান।

    সৌভিক উত্তেজনায় অস্ফুটে কিছু শব্দ করে উঠল।

    —ইয়েস, মোহন বসুই আসলে রাখহরি ঘোষাল। সে ইংরেজের রাজসাক্ষী হতে পারে কিন্তু সে আসলে মোক্ষম ডবল এজেন্ট। সে স্বদেশি বা ইংরেজ রাজসাক্ষী নয়, সে আসলে ফরাসি চর। সে স্বদেশিদের বিশ্বাসঘাতকতা করে ইংরেজ সাক্ষী বনেছে আর ইংরেজদের বিশ্বাসঘাতকতা করে ফরাসি সরকারের চর বনেছে। ইংরেজরা রাজসাক্ষী বানিয়ে নৃপেনকে ফাঁসাতে চাইবে বুঝে মোহন বসু প্রথমে ইংরেজের হাতে ধরা দেয়। তারপর ইংরেজের দমননীতিকে ধুলো দিয়ে রাজসাক্ষীর প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। কিন্তু তার রাজসাক্ষী হওয়ার পেছনে আসল উদ্দেশ্য ছিল অন্য। মোহন বসু ইংরেজ অফিসারদের ঘনিষ্ঠ হতে চেয়েছিল।

    সৌভিক কানাই-এর কথার সূত্র ধরে বলল- তা না হলে সে নৃপেনের যাত্রার খবর পেতে পারত না। কারণ পোর্টের কোনো নথিতে নৃপেনের নাম নেই। যুগান্তরের বিজ্ঞাপনে যাত্রী হিসেবে নৃপেন-এর নাম নেই। নিশ্চয়ই বাছাই করা লালবাজারের কিছু অফিসার এই জাহাজযাত্রার খবর জানত। রাজসাক্ষী হয়ে মোহনও গোপন খবরটি জেনে যায়।

    —এর পর আর কী! মোহন বসুকে রাজসাক্ষী বানাতে পেরে ইংরেজরাও খুব খুশি হল। নৃপেনকে কালাপানির সাজা দেওয়া গেল। অন্যান্য রাজশক্তির থেকে নৃপেনকে দূরে রাখা যাবে। মোহন বসুর নামে মাসোহারা ধার্য হল। এদিকে নৃপেনকে মামুলি কারাবাস থেকে কালাপানি অবধি টেনে নিয়ে যেতে পেরে মোহন বসুও নিজেও মোক্ষম চাল দিল। বাঘের ঘরে ঘোগ, আর ঘোগের ঘরে ফেউ। এইবার মোহন বসু তার আসল খেল দেখাবে। খিদিরপুরে ঘড়ির দোকানের সূত্রে সে পুদুচেরি উইন্ড সম্পর্কে অবহিত ছিল, ওস্তাদ মাসুদকেও সে চিনে থাকবে। সুতরাং সে রাখহরি ঘোষাল নামে জর্জ দ্য সাভিওয়র-এর টিকিট কেটে ফেলল আর বাকিটা তো ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছি। সৌভিক তুই আরও নিশ্চিন্ত হতে চাইলে ১৯৩০-এর পরে পুদুচেরির আশ্রমে ঋষির শিষ্যদের তালিকাটা একটু দেখে নিস। আমার ধারণা ফরাসি সার্ভিস থেকে অবসর নিয়ে নৃপেন আর মোহন আশ্রমেই পাকাপাকিভাবে আশ্রয় নেয়।

    সৌভিক হাত তুলে বলল—লাস্ট কমেন্ট, এর পরই বিল মিটিয়ে উঠব, দিদিমণিকে ড্রপ করতে হবে। ব্রিটিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চ এই কেসটা সভ করতে পারল না!

    কানাই প্লেটের লাস্ট পকোড়াটা মুখে পুরে হাসলেন—একশো বছরের মধ্যে লালবাজারে শুধুই কি ডিজিটালাইজেশান, লাইব্রেরি আর মিউজিয়াম হয়েছে! কো অর্ডিনেশানটাও কি বেটার হয়নি। বলে দিদিমণির দিকে তাকিয়ে সিনিয়র ইনস্পেকটার কানাইচরণ তার সহকর্মী সৌভিককে বললেন—তুই বরং আর একটা পেগ মার, দিদিমণিকে আজকে আমিই ড্রপ করে আসছি।

    ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleগা-ছমছমে ভৌতিক অলৌকিক – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    Next Article রাজপুত নন্দিনী – শ্রীপারাবত
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অঁতোয়ান দ্য সাঁত-এক্সুপেরি
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অনীশ দেব
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাসরুর আরেফিন
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    মোহিত কামাল
    রকিব হাসান
    রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রশীদ করীম
    রাজর্ষি দাশ ভৌমিক
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রাফিক হারিরি
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শওকত আলী
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শহীদুল্লা কায়সার
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাহীন আখতার
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শৈবাল মিত্ৰ
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রীপারাবত
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্তোষকুমার ঘোষ
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সন্মাত্রানন্দ
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমীরণ গুহ
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সরোজকুমার রায়চৌধুরী
    সাগরময় ঘোষ
    সাদাত হোসাইন
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুপ্রতিম সরকার
    সুব্রত গুহ
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সেলিনা হোসেন
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৈয়দ শামসুল হক
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বপ্নময় চক্রবর্তী
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হরিশংকর জলদাস
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    কলিকাতায় নবকুমার – সমরেশ মজুমদার

    August 14, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    কলিকাতায় নবকুমার – সমরেশ মজুমদার

    August 14, 2026
    Our Picks

    কলিকাতায় নবকুমার – সমরেশ মজুমদার

    August 14, 2026

    ছাতিম – স্মরণজিৎ চক্রবর্তী

    August 14, 2026

    স্মৃতিগন্ধা – সাদাত হোসাইন

    August 12, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }