Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    September 5, 2026

    ঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

    September 5, 2026

    উন্মাদ আশ্রম – ওবায়েদ হক

    September 5, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায় এক পাতা গল্প412 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    প্রভাসে দৈববশে

    পরদিন ভোর থেকে শত শত শকটের দীর্ঘ সারি চলল প্রভাস তীর্থের দিকে। দ্বারকাবাসীরা তাদের দু-একটি বস্ত্র পুঁটলি বেঁধে সঙ্গে এনেছে। শিশু বৃদ্ধ যুবক-যুবতী সবাই যে যার নির্ধারিত শকটে উঠেছে। যুবকেরা প্রত্যেকে সঙ্গে নিয়েছে মদের বোতল। প্রহরীরা দুটির বেশি বোতল দেখলেই বাজেয়াপ্ত করে নিচ্ছে। অনেক নারী ও শিশু সঙ্গে তাদের পোষ্য বিড়াল কিংবা খাঁচা শুদ্ধ পাখি নিয়ে চলেছে। কিন্তু প্রহরীরা একটির বেশি পোষ্য নিতে দিচ্ছে না। একটু সম্পন্ন ব্যক্তিরা নিজেদের রথে করে যাচ্ছেন। তাঁরা সঙ্গে প্রচুর মদ ও একাধিক পোষ্য তুলেছেন রথে। প্রহরীদের হাতে তারা স্বর্ণমুদ্রা গুঁজে দিচ্ছেন। তারা আর কিছু বলছে না।

    মেঘাচ্ছন্ন আকাশ। রোজকার মতো তেমনি দমকা বাতাস বইছে। সমুদ্রের ধার দিয়ে দ্বারকা থেকে প্রভাস যাবার বিস্তীর্ণ পথ। প্রতিদিন এই পথ ধরে তীর্থযাত্রীদের নিয়ে শত শত শকট চলে। আজ সেখানে উদ্বাস্তু দ্বারকাবাসীদের নিয়ে শত শত যান চলেছে। একপাশ দিয়ে চলেছে গজারোহীর দল। অশ্বারোহীরা তার পাশ দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

    নগরবাসীর চোখে-মুখে উদ্বেগ। তাদের প্রিয় আবাস, গাছপালা, গবাদি পশু, ধানের গোলা, স্বর্ণালংকার, মূল্যবান পরিধেয় বস্ত্রাদি সব ত্যাগ করে একবস্ত্রে গৃহত্যাগ করে যেতে হচ্ছে। দ্বারকায় কোনো আইন-শৃঙ্খলা নেই। বৃষ্ণি, অন্ধক, ভোজ ও কুকুরদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ঘৃণা প্রবলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। অন্ধকরা বলছে বৃষ্ণীরা কৃষ্ণবংশীয় বলে নিজেদের শ্রেষ্ঠ মনে করে অন্ধকদের দাবিয়ে রেখেছে। বৃষ্ণীরা বলছে কৃষ্ণ সব সময় অন্ধকপেষক। তিনি অন্ধক উগ্রসেনকে রাজপদে বসিয়েছেন বলে অন্ধকরা নিজেদের রাজার জাত বলে মনে করছে আর বৃষ্ণীদের উৎখাত করার চেষ্টা করছে। বৃষ্ণীরাই দ্বারকায় সংখ্যাধিক্য কিন্তু তারা অন্ধকদের অকারণ হিংসার শিকার। মাঝে মাঝেই অন্ধকদের আক্রমণে বৃষ্ণীদের মৃত্যু হচ্ছে। এর পিছনে অন্ধক উগ্রসেনের মদত আছে। কৃষ্ণ অন্ধ ও বধির হয়ে বসে আছেন। তিনি প্রশাসনে নাক গলাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন। তিনি ঐক্যবদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ যাদবদের কথা বলছেন। যাদবদের তিনি মঙ্গল চান। তিনি বুঝতে পেরেছেন দ্বারকার শেষদিন আসন্ন। তাই তিনি দ্বারকা থেকে প্রভাসে দ্বারকাবাসীদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যেতে চান।

    অবশেষে ত্রয়োদশীর সন্ধ্যায় সেই বিরাট উদ্বাস্তু স্রোত এসে প্রভাস তীর্থে থামল। সেখানে সারি সারি শিবির। উদ্বাস্তুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন ঘনান্ধকারে আকাশ ঢেকে যাচ্ছে। ত্রয়োদশীর দিন অমাবস্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। সৈকত শিবিরে হাজার হাজার মশাল জ্বলছে। অন্ধকারের মধ্যে দাঁড়িয়ে তাঁরা দেখলেন সমুদ্র গর্জনকে স্তিমিত করে আর এক গর্জনের আওয়াজ কানে আসছে। যে রথে করে তারা এসেছেন, সেই রথের ধ্বজ নিশান কে যেন আকাশে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

    কৃষ্ণ তাঁর রথে চেপে শরণার্থীদের জন্য নানা ঘোষণা করছিলেন। তাঁর সারথি দারুক দেখলেন তাঁর অগ্নিদত্ত বজ্রতুল্য চক্ররথ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারকাখচিত আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। বলদেবের তালধ্বজ ও বাসুদেবের গরুড়ধ্বজা রথ ভূমি থেকে বিচ্যুত হয়ে আকাশে উড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে।

    .

    যাদবরা পথশ্রমে ক্লান্ত। সারাদিন তারা অভুক্ত। রাতে সৈকত শিবিরে তাদের জন্য আহারের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু তারা কেউ আহারের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে রাজি হল না। তারা যে যার মদিরার বোতল ও পাত্র হাতে করে সমুদ্রের বেলাভূমিতে হাজির হয়ে বালুর ওপর বসে মদ্যপান শুরু করে দিল।

    অভিজাতদের একটি দল একটু নিভৃতে গিয়ে প্রাণভরে মদিরা পান করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ল। বলদেব ও কৃষ্ণ এসে সাত্যকি ও কৃতবর্মার খোঁজ করলেন। কৃতবর্মার ওপর নিষ্ক্রমণের দায়িত্ব। কৃতবর্মার দায়িত্ব ছিল সমস্ত শরণার্থী এসে যাওয়ার পর তাঁরা সবাই আশ্রয় পেয়েছেন কি না তা নিশ্চিত হওয়া। কৃষ্ণ-বলরাম কদিন আগে থেকে প্রভাসে এসে শরণার্থীদের জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছেন। এখন কৃতবর্মার দায়িত্ব হচ্ছে তাঁদের নৈশভোজ শেষ করে শিবিরে শয়নের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া।

    কৃষ্ণ দেখলেন, কৃতবর্মা এখনও এসে তাঁকে কোনো সংবাদ দিচ্ছেন না। তিনি বলরামের সঙ্গে কৃতবর্মার খোঁজে বার হলেন। গিয়ে যা দেখলেন তাতে তাঁর অবাক হবার পালা। সমস্ত শরণার্থী বিভিন্ন ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে মদ্যপান করছে। তাদের মধ্যে কৃতবর্মা, সাত্যকি, গদ কেউ নেই। খুঁজতে খুঁজতে একটু দূরে এসে অন্ধকারের মধ্যে বসে মদ্যপান করছেন সাত্যকি, গদ, বভ্রু আর কৃতবর্মা।

    কৃষ্ণ ও বলরাম তাঁদের সামনে দাঁড়াতে কৃতবর্মা অপ্রস্তুত না হয়ে কৃষ্ণ ও বলরামকে বললেন, এই যে আর্যপুত্র বলরাম ও বাসুদেব এসে গেছেন। আসুন, বসুন, একটু পান করুন। আপনিও আমাদের মতো ক্লান্ত নিশ্চয়ই। মদের মতো আর কোনো ব্যক্তি বা শক্তির সাধ্য নেই যে উদ্দীপনা এনে দেয়। মদিরা এক শক্তিবিধায়ক মহিমা। যে জাতি যত মদ্যপান করে তারা তত বেশি সভ্য। তত বেশি কৃষ্টিপরায়ণ।

    কৃষ্ণ বললেন, কৃতবর্মা, তোমার ওপর ভার ছিল তুমি আমাকে শরণার্থীদের আগমনের সমস্ত খুঁটিনাটি তথ্য জানাবে। আর কত মানুষ দ্বারকায় পড়ে আছেন তাদের তথ্য দেবে। কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে দেখা না করে রাজকার্য ফেলে মদ্যপানের আসর বসিয়েছ। সাত্যকি, তোমার ওপর কী দায়িত্ব দিয়েছিলাম? নাগরিকদের নৈশভোজ কি সম্পূর্ণ?

    সাত্যকি বলল, ওরা এখন নৈশাহারে বসতে চায় না। এখন পানাহার করতে চায়। ওরা বলছে গত কয়েক মাস ধরে ওরা পান করতে পারেনি। দ্বারকার মদ্যপান নিষিদ্ধ করে দেন আপনি। আজ প্রভাসে এসে ওরা মদ্যপানের আনন্দ উপভোগ করছে। বাসুদেব, ওরা বলছে মদ্যপানের অধিকার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার। তা থেকে বঞ্চিত করা মানে মানবাধিকার হরণ করা। তুমি আমার আবাল্য বন্ধু। তোমাকে আমি সৎ উপদেশ দিতে পারি। তুমিও আমাদের সঙ্গে বসে যাও।

    বলরাম নিমেষের মধ্যে প্রবল ক্রোধে সেই স্থান ত্যাগ করলেন। তিনি কৃষ্ণের হাত ধরে তাকে টেনে নিয়ে বললেন, এই গর্দভদের সামনে থেকে এখনই চলে এসো। এরা মদোন্মত্ত। এরা তোমায় আরও অপমান করতে পারে।

    কৃষ্ণ বললেন, তুমি বুঝতে পারছ না জ্যেষ্ঠ। আপৎকালে মানুষের বুদ্ধি নাশ হয়েছে। সে জন্য রাজার কর্তব্য আপৎকালে তার বিবেচনা-বুদ্ধি বিসর্জন না দেওয়া। দ্যূতাসক্তির বশে যুধিষ্ঠিরকে সর্বহারা হতে দেখেছি। দ্বারকাবাসীর অতিরিক্ত মদ্যাসক্তি তাদের ধ্বংসের কারণ।

    বলরাম বললেন, শুধু মদ্যাসক্তি নয়, তাদের আরামপ্রিয়তা, বিলাসিতা, কর্মবিমুখতা আর আত্মনির্মাণে সচেষ্ট না হওয়া, এসব কিছুর জন্য দায়ী কিন্তু আমরা। এটি আমাদের প্রশাসনের ব্যর্থতা। তুমি এক ধর্মরাজ্যপাশে সারা দেশকে বেঁধে রাখতে চেয়েছিলে। মহাভারত গড়ার জন্য তুমি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছ অথচ তোমার নিজের রাজ্যের দিকে তুমি দৃষ্টি দাওনি। তুমি পাণ্ডবদের উন্নতির প্রতি যত দৃষ্টি দিয়েছ, দ্বারকাবাসীর উন্নতির দিকে তত মন দাওনি।

    কৃষ্ণ বললেন, অগ্রজ, আজ সেকথা উঠছে কেন? আমি কি দ্বারকাকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করিনি? জরাসন্ধ ও শিশুপালকে ধ্বংস করিনি?

    —শুধু বহিঃশত্রু থেকে রক্ষা করলেই হয় না। সত্যকে স্বীকার করো বাসুদেব, তুমি দ্বারকাবাসীর প্রতিরক্ষা সুদৃঢ় করেছ কিন্তু তাদের আত্মরক্ষার বলয় সুদৃঢ় করতে পারোনি। যে নিষ্কাম কর্ম, জ্ঞান, ভক্তি, আসক্তি ত্যাগ করার কথা তুমি পাণ্ডবদের বলেছ তা তোমার নিজের রাজ্যে প্রয়োগ করোনি। জাতি গঠন করতে গেলে একজন কৃষ্ণ একজন বলরামকে দিয়ে হয় না, সমস্ত নাগরিকের মনে মূল্যবোধের বীজ অঙ্কুরিত হওয়া চাই। ভোগের মধ্য দিয়ে দ্বারকার শিশুরা মানুষ হয়েছে। তারা ত্যাগ শেখেনি, ধৈর্য শেখেনি, পরিশ্রম শেখেনি। সবই তুমি তাদের পাইয়ে দিয়েছ। তারা কিছু দিতে শেখেনি। সবাই তোমাকে সামনে রেখে তাদের ভোগের পথ পরিষ্কার করেছে।

    —সে আমি জানি অগ্রজ। সেজন্যই তো আমি বুঝতে পেরেছি দ্বারকার মহাপ্রলয় আসন্ন। পাপের ভারা পূর্ণ হলে প্রকৃতিই প্রতিশোধ নেয়। সেজন্য আমি প্রকৃতিকে প্রতিহত করিনি। দ্বারকাবাসীর প্রাণ বাঁচাবার জন্য তাদের প্রভাসে নিয়ে এসেছি। দ্বারকা প্লাবিত হয়ে যাক। এই মানুষেরা বুঝুক ধ্বংস কী। তারা নিজের চোখে দেখুক। দেখে তাদের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হোক।

    বলরাম বললেন, বাসুদেব, তুমি স্বয়ং ভগবান। তুমি অর্জুনকে অনুপ্রাণিত করেছ। হস্তিনাপুরে ধর্মরাজ্য স্থাপন করেছ। তুমি ভালো করেই জানো জ্ঞানচক্ষু কোনোদিনই সবার খোলে না। আর মৃত্যুর আগে জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হয়ে কী হবে? রাজা যতদিন না নিজে আসক্তিমুক্ত হবেন, প্রজ্ঞাবান না হবেন, অনুভূতিশীল না হবেন, তুমি নিজে যাকে যোগীপুরুষ বলো, রাজা নিজে সেই যোগী না হতে পারলে প্রজারা কোনোদিনই সৎ হতে পারবে না। পিতা-মাতা সৎ না হলে সন্তান সৎ হতে পারে না। রাজ অমাত্যরা দুর্নীতিপরায়ণ হলে ধর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।

    যুধিষ্ঠির ধর্মানুসারী, অনাসক্ত ছিলেন বলেই সেখানে প্রজারা শান্তিতে আছে। নীতির শাসনই প্রীতির শাসন। কঠোর প্রশাসনই একমাত্র দুর্নীতি ক্ষয় করতে পারে। তুমি মাতামহ উগ্রসেনকে রাজা করেছ। রাজা যেমন, তেমনই প্রজা হয়। পিতা-মাতার প্রকৃতিই সন্তানেরা উত্তরাধিকার সূত্রে পায়। উত্তম শাসন শুধু নয়, উত্তম শাসক চাই। তুমি নিজেকে নেপথ্যে রেখে উগ্রসেনকে শাসক করেছ। তুমি রাজা তৈরি করতে চাইছ, নিজে রাজা হতে চাওনি। কিন্তু রৌদ্র মানুষের ছায়াকে দীর্ঘতর করলেও ছায়া আসল মানুষ নয়। সে ছায়া, সে মায়া মাত্র।

    কৃষ্ণ বললেন, অগ্রজ, আমি সারা ভারতে ধর্ম সংস্থাপন করলাম কিন্তু আমার রাজ্যেই ব্যর্থ হলাম। আমার জ্ঞাতিদের হিতার্থেই আমি রাজপদ ত্যাগ করেছি, তাদের হিতের জন্য প্রাণপাত করেছি। ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম থেকে প্রবীণতম ব্যাসদেব আমাকে ঈশ্বর বলে মানেন, ভক্তি করেন। অর্জুনের মতো মহাধনুর্ধর আমার জন্য প্রাণ দিতে পারে অথচ অক্রূর কিংবা উদ্ধব আমার নিজের লোক হয়েও আড়ালে আমায় অবজ্ঞা করে। ওদের এত স্পর্ধা কী করে হয়, কর্তব্য পালন না করে মদ্যপানের আসর বসায়? তোমাকে ও আমাকেও ওরা মান্য করছে না। মদ্যাসক্তি ওদের নীতিবোধ হরণ করেছে।

    বলরাম বললেন, মদ্যপান কারণ নয়, গভীরতর অবক্ষয়ের প্রতিক্রিয়া মাত্র। সমাজ দেহে যখন পচন ধরে, তখন সেই পচন ধরা সমাজ থেকে আগে ধর্ম লোপ পায়। মানুষ অধর্মে মেতে ওঠে। খাদ্যের চেয়ে মদ্যই তখন প্রিয় হয়।

    কৃষ্ণ বললেন, অগ্রজ, এই পরিণতি কালের অনিবার্য গতি। একে মেনে নিতেই হবে। যদুবংশ ধ্বংস হবেই। দ্বারকা সমুদ্রগর্ভে ডুবে যাবে। শাম্ব যেদিন গুরু ও ঋষিদের উপহাস করল, তখনই আমি বুঝেছিলাম ধ্বংস সমাগত। কারণ সামাজিক অবক্ষয় গুরু ও সাধুজনের অবমাননা দিয়ে শুরু হয়। আমার প্রাণাধিক পুত্র শাম্ব মুনিদের অবমাননা করেছে। যা ক্ষমার অযোগ্য। ধ্বংস যে অনিবার্য তা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দ্বারকা যে ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে, আর্য সভ্যতা যে বিপর্যয়ের মুখে যাদব নেতারা কিন্তু তা নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। তাঁরা নিশ্চিন্তে মদ্যপান করে যাচ্ছে। পরস্পরকে দোষারোপ করছে। দুর্নীতি ও ভ্রষ্টাচারকে সমর্থন করছে।

    বলরাম বললেন, তুমি এখন কী চাও বাসুদেব? তুমি দ্বারকাবাসীকে প্রভাসে নিয়ে এসেছ কেন?

    কৃষ্ণ বললেন, আমি চেয়েছিলাম যারা পাপী তারা বিনষ্ট হোক। কিছু সৎ মানুষ, কষ্ট সহিষ্ণু মানুষ বেঁচে থাকুক। শরণার্থী জীবনে নানা কষ্টের মধ্যে বাস করে যারা ধৈর্য হারাবে না, নিজেদের অসীম তেজের জোরে বেঁচে থাকার শিক্ষা পাবে তাদের নিয়ে এই প্রভাসে গড়ে তুলব আমার সৎ মানুষ, সংগ্রামী মানুষের অভয়ারণ্য। কিন্তু এখানে এসে দেখছি কোনো দ্বারকাবাসীর মনে চৈতন্যের উদয় হয়নি। তারা নিশ্চিত্ত। অনায়াসে মদ্যপান করে চলেছে।

    বলরাম বললেন, চলো আমরা দুজন মিলে দেখে আসি দ্বারকাবাসীরা কী করছেন।

    ওঁরা অন্ধকারে ঢাকা শরণার্থী শিবিরের দিকে অগ্রসর হলেন। গিয়ে যা দেখলেন, তা দেখে অবাক হয়ে গেলেন। ওঁরা যখন শিবিরের দিকে যাচ্ছিলেন, তখন মনে হল সর্বাঙ্গ কালো চাদরে ঢাকা কে তাঁদের অনুসরণ করছে।

    বলরাম ‘কে কে’ বলে এগিয়ে যেতেই মূর্তিটি অদৃশ্য হয়ে গেল।

    বলরাম বললেন, রাক্ষস-পিশাচরা এখানেও চলে এসেছে। আমার মনে হচ্ছে একটি পিশাচ আমাদের অনুসরণ করছিল। আমি একটুখানির জন্য তার মুখ দেখলাম। দাড়ি-গোঁফে ঢাকা মুখ। শুধু তার চোখদুটি অন্ধকারেও হিংস্র শ্বাপদের মতো জ্বলছিল।

    বাসুদেব বললেন, অগ্রজ, ভীত হবেন না। এই পিশাচদের রোজই রাতের দিকে দ্বারকাবাসীরা দেখছেন। তারা দেখছি প্রভাস পর্যন্ত অনুসরণ করছে। কিন্তু যতক্ষণ আমার হাতে সুদর্শন চক্র আছে ততক্ষণ তারা কিছু করতে পারবে না। চলুন, আমরা দ্রুত এগিয়ে যাই।

    .

    প্রভাসে অশ্বত্থামা

    কৃতবর্মা অশ্বত্থামাকে তাঁর সঙ্গে রথে করে প্রভাসে নিয়ে তাঁকে একটি শিবিরে পাঠিয়ে দিয়ে বলেছেন, আপনি এই শিবিরে গিয়ে বিশ্রাম করুন। রাতে আপনার আহার খেয়ে নেবেন। শরণার্থী শিবিরে সবার জন্যই খাদ্যের ব্যবস্থা আছে।

    অশ্বত্থামা বললেন, কৃষ্ণ কোথায়? আমি যে তার সঙ্গে দেখা করতে চাই। তুমি বলেছিলে আজ রাতেই তুমি দেখা করিয়ে দেবে।

    কৃতবর্মা বললেন, আপনি এত উতলা হবেন না আচার্যপুত্র। কৃষ্ণ এই শিবির নগরী থেকে কোথাও যাবেন না। আমি একটু রাজকার্য করে নিই। সাত্যকি, বক্র, উদ্ধবের সঙ্গে আমার জরুরি আলোচনা আছে। আপনি রাতের আহার সেরে নিন। আমি আপনাকে শিবির থেকে ডেকে নিয়ে যাব। তখন কৃষ্ণ একটু মুক্ত থাকবেন।

    অশ্বত্থামা কিন্তু ধৈর্য রাখতে পারছেন না। তিনি শিবির থেকে নিজেই কৃষ্ণের সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। ফিকে জ্যোৎস্নায় সৈকতভূমি ঈযৎ আলোকিত হলেও ইতস্তত মশালের আলোয় সৈকতভূমির অনেকটা অংশ বেশ আলোকিত। চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে মানুষ। অধিকাংশ গোলাকৃতি হয়ে বসে মদ্যপান করছে। এই মদ্যপানে নারীরাও অংশ নিয়েছে। বহু নারী মাতাল হয়ে প্রলাপ বকছে। কেউ হাসছে, কেউ কাঁদছে। কেউ উন্মত্তের মতো আচরণ করছে।

    অশ্বত্থামা আরও দূরে নির্জন সৈকতে গিয়ে দেখলেন, সেখানে জোড়ায় জোড়ায় কামাসক্ত নর-নারী বসে। কোথাও পুরুষের ক্রোড়ে শায়িত নারী। কোথাও পুরুষ ও নারী কামকেলিতে রত। চুম্বন করছে। মর্দন করছে। বালুর ওপর পোশাক ছেড়ে নগ্ন নর-নারী সঙ্গমে রত। পাশ দিয়ে অশ্বত্থামা শ্লথ গতিতে হেঁটে যাচ্ছেন, কারও ভ্রুক্ষেপ নেই।

    অশ্বত্থামা ধীরে ধীরে বালুভূমি দিয়ে হেঁটে চলেছেন। এলাকাটি যত জনবিরল তত সেখানে কামার্ত দম্পতির ভিড়। কেউ অবিবাহিত তরুণ-তরুণী। কেউ বা স্বামী, শিশু, পুত্র শিবিরে ফেলে পুরুষের সঙ্গে বহুদূর হেঁটে বালুভূমিতে কামকেলিতে মত্ত। দমকা বাতাসের আক্রমণেও তাদের নগ্ন দেহ বেতস পাতার মতো কাঁপছে।

    অশ্বত্থামা একপলকে সেদিকে তাকিয়ে আবার ফিরে যেতে লাগলেন শিবিরের দিকে। কিছুদূর যেতেই শুনলেন উচ্চৈস্বরে কারা কলহ করছে। একটি কণ্ঠস্বর তাঁর চেনা। তিনি দাঁড়িয়ে পড়লেন। সাত্যকি আর কৃতবর্মার মধ্যে বাদানুবাদ চলছে। কুরুক্ষেত্রের দুই বৃদ্ধ সৈনিক, কৃষ্ণের সঙ্গে পাণ্ডবপক্ষে যোগ দিয়ে কৌরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন সাত্যকি। আর কৃতবর্মাও শ্রীকৃষ্ণ প্রেরিত নারায়ণী সেনার সেনাপতি ছিলেন। পাণ্ডব শিবিরে হানা দিয়ে পাণ্ডবপুত্রদের হত্যায় অংশগ্রহণকারী অশ্বত্থামার সহযোগী এই ভোজ কৃতবর্মা।

    সাত্যকি কৃতবর্মাকে বললেন, তুই এত বেশি মদ্যপান করেছিস, স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছিস না। এখন কী করে শিবির কার্য তদারক করবি? তোদের মতো সেনাপতিরাই কৃষ্ণের ভাবমূর্তিকে কলুষিত করছে। কৃষ্ণ এসে তোকে ভর্ৎসনা করে গেলেন, তোর কোনও সম্বিৎ ফিরল না। তুই পান করেই চলেছিস। তোদের মতো মদ্যপায়ী দুর্নীতিগ্রস্ত রাজকর্মচারীই কৃষ্ণের ভাবমূর্তিকে কলুষিত করছে।

    কৃতবর্মা এই কথায় অপমানিত বোধ করলেন। বললেন, সাত্যকি, মদ আমি একা খাই? তুই খাস না? স্বয়ং বলরামও মদ্যপান করেন। সারা দ্বারকাবাসী মদের আসর বসিয়েছে। আমি একটু শক্তি সঞ্চয়ের জন্য মদ্যপান করছি, তাতে তোর গাত্রদাহ হচ্ছে কেন? তুই তো কুরুক্ষেত্রে আপন জ্ঞাতি নারায়ণী সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিস। তুই তো আত্মীয় হন্তারক।

    সাত্যকি বললেন, আমি তো কৃষ্ণের সঙ্গে সঙ্গে ছিলাম। কৃষ্ণের বন্ধুদের হয়ে যুদ্ধ করেছি। সে যুদ্ধে জিতেছি। আমি জীবিত পাণ্ডব সৈন্যদের একজন।

    কৃতবর্মা বলল, আমিও কৌরবপক্ষের তিন জীবিতদের একজন।

    সাত্যকি বললেন, তোর বেঁচে থাকাটাই লজ্জাকর। তুই রাতের অন্ধকারে পাণ্ডব শিবিরে ঢুকে ঘুমন্ত শিশুদের ও ঘুমন্ত সৈনিকদের হত্যা করেছিস। তুই যোদ্ধা তস্কর? তুই অতি নীচ কাজ করেছিস। কৃষ্ণ ভালোমানুষ, তিনি অশ্বত্থামাকে অভিশাপ দিয়েছেন। সে কোথায় কোন অরণ্যে অভিশপ্ত জীবন বহন করে বেড়াচ্ছে, আর তুই এখন কৃষ্ণের কৃপায় উগ্রসেনের মহামাত্য হয়ে দ্বারকাবাসীর সর্বনাশের পথ প্রশস্ত করছিস।

    কৃতবর্মার পা টলছে, কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। তবু তিনি সাত্যকির কাছে গিয়ে তার গলাটা চেপে ধরলেন। বললেন, তুই এখন সাধু সাজছিস। কুরুক্ষেত্রে তুই কী করেছিলি? ভুরিশ্রবা ছিন্নবাহু হয়ে যখন প্রায়োপবেশন করছেন, সেই সময় তুই তার মুণ্ডচ্ছেদ করেছিলি। এটি কোন দেশি বীরত্ব? আমি যা করেছি তা আমার সেনাপতি অশ্বত্থামার নির্দেশে। সৈনিকের কর্তব্য সেনাপতির নির্দেশ পালন করা। তোর তুল্য নৃশংস আর কেউ নেই।

    সাত্যকি বললেন, তুই অক্রূরকে দিয়ে সত্রাজিৎকে হত্যা করে স্যমন্তক মণি এনে কৃষ্ণকে দিয়েছিলি। সত্রাজিতের দুহিতা কৃষ্ণমহিবী সত্যভামাকে আমি যখন তাঁর পিতৃহত্যার কথা বলি, তখন তিনি শোক সম্বরণ করতে পারেননি। আমি তাঁর কাছে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তাঁর পিতৃঘাতীদের হত্যা করব। আজ সত্যভামার কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমি পালন করলাম।

    এই বলে সাত্যকি তার কোষবদ্ধ তরবারি বার করে এক কোপে কৃতবর্মার মুণ্ডটা কেটে ধড় থেকে নামিয়ে দিলেন। আতঙ্কিত যাদবদের মধ্যে কৃতবর্মার রক্তাক্ত দেহটি বালুতটে লুটিয়ে পড়ল।

    অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সব কিছু প্রত্যক্ষ করছিলেন অশ্বত্থামা। কৃতবর্মার ছিন্নদেহ দেখে তিনি চোখে অন্ধকার দেখলেন। কৃতবর্মা নেই। তাঁকে কৃষ্ণের কাছে কে নিয়ে যাবে। তাঁর শেষ আশাও বিনষ্ট হল।

    কৃতবর্মার দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, কে কোথায় আছো, শোনো। বৃষ্ণীরা ভোজদের আক্রমণ করেছে। অন্ধক, কুক্কুরিরা তোমরা একজোট হও। বৃষ্ণীদের আক্রমণ থেকে যাদবদের রক্ষা করো।

    এই চিৎকারধ্বনি সৈকতে প্রতিধ্বনিত হয়ে মিলিয়ে যাবর আগেই কোথা থেকে একদল ব্যক্তি উন্মত্তের মতো তলোয়ার হাতে সেদিকে ছুটে এলো। তারা এসে সাত্যকিকে দেখে অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করল। কৃষ্ণের দুই পুত্র প্রদ্যুম্ন ও পৌত্র অনিরুদ্ধ এসে আক্রমণকারীদের প্রতিরোধ করলেন। মশালের আবছা আলোয় আক্রমণকারীরা চিনতে পারল অনিরুদ্ধ আর প্রদ্যুম্নকে। তারা বলল, বৃষ্ণিপুত্র, এইবার তোদের হাতের কাছে পেয়েছি। নরাধম বৃষ্ণীরা এতদিন অন্ধকদের শোষণ করে এসেছিস তোরা। আজ সেই প্রতিশোধ নেবার সময় এসেছে।

    কিছুক্ষণের মধ্যে আরও অন্ধক এসে হাজির হল। একদল ভোজ ‘ভোজরাজ কৃতবর্মার জয়’ বলতে বলতে ছুটে এল। বালুর ওপর কৃতবর্মার মুণ্ডহীন দেহ দেখে তারা আগ্নেয়গিরি থেকে উদ্গত লাভার মতো নির্গত হয়ে দ্রুত ঝাঁপিয়ে পড়ল প্রদ্যুম্ন আর অনিরুদ্ধের ওপর। তাদের হাতে ছিল তীক্ষ্ণ ছুরি, তারা সেই শাণিত ছুরি কৃষ্ণপুত্রের বুকে বসিয়ে দিল। প্রদ্যুম্নের মৃত্যুকে যেন মনে হল পূর্ণিমার পূর্ণচাদ আকাশচ্যুত হয়ে মাটির বুকে লুটিয়ে পড়ল। সাত্যকি এই দেখে ব্যথিত হয়ে তাঁর কৃপাণ ওঠালেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ থেকে পঞ্চপাণ্ডব ছাড়া আর মাত্র দুজন জীবিত পুরুষ এই প্রভাস সৈকতে উপস্থিত। তিনি কৃষ্ণ আর সাত্যকি। কিন্তু সেই অজেয় সাত্যকি ছিন্ন কদলি বৃক্ষের মতো লুটিয়ে পড়লেন অন্ধক-ভোজদের সমবেত আক্রমণে।

    অশ্বত্থামা দেখলেন, কৃতবর্মা, সাত্যকি, প্রদ্যুম্ন পুত্র অনিরুদ্ধের মৃতদেহ ফেলে আততায়ীরা চিৎকার করতে বেরিয়ে গেল। তাদের মুখে ‘বৃষ্ণীদের নিকেশ করো। রাম (বলরাম)-কৃষ্ণ নিপাত যাক।’

    অশ্বত্থামা দেখলেন, ঠিক সেই মুহূর্তে সেখানে কৃষ্ণ এসে দাঁড়ালেন। কৃষ্ণ তাঁর মৃত পুত্র ও পৌত্রের মৃতদেহকে একবার দেখলেন। ততক্ষণে সেখানে আর ভিড় নেই। কোলাহল ও আর্তচিৎকার আরও দূরে সরে গেছে। কৃষ্ণ দেখলেন মৃতদেহগুলির চারপাশে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য ভাঙা পাথরের সুরাপাত্র। এই পাত্রগুলিতেই মদ্য পরিবেশিত হচ্ছিল। সকলের হাতে অস্ত্র ছিল না। তারা এই ভাঙা পাথরের শাণিত টুকরোগুলিকেই অস্ত্র করে পরস্পরকে বিদ্ধ করেছে। নেশাগ্রস্ত মানুষগুলিকে বেশিক্ষণ যুদ্ধ করতে হয়নি। তারা ধরাশায়ী হয়েছে।

    তাদের মধ্যে কিছু বোধহয় এখনও জীবিত। তারা ক্ষীণ আর্তনাদ করছে। কিন্তু কৃষ্ণ কোনো কথা বললেন না। কারও দিকে তাকালেন না। এমনকী, প্রাণাধিক পুত্র ও পৌত্রের দিকেও না। অপরিণামদর্শী ইন্দ্রিয় সর্বস্ব, ভোগ সর্বস্ব যৌবন রাহুগ্রাসে বিবর্ণ তেজোদীপ্ত সূর্যের মতো। তাঁর মনে হল নিহতরা পড়ে রয়েছেন। তাঁর নিজের যৌবনের কথা মনে পড়ল। তিনিও সে সময় সবার শাসন-নাশন। প্রেমরসে সিক্ত কিন্তু প্রেম তাঁকে রিক্ত করেনি। প্রেমকে তিনি মনে করতেন প্রেরণা। নারীকে মনে করতেন পুরুষের এক হ্লাদিনী শক্তি। নন্দনের আশীর্বাদ। যা জীবনকে নান্দনিক সুষমায় ভরে দেয়। প্রেম ছাড়া যৌবন অসম্পূর্ণ। সেই প্রেম তাকে সমুখপানে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

    অগ্নি যেমন বাজিকে ঊর্ধ্ব আকাশের দিকে ঠেলে দেয়, শ্রীরাধার প্রেম তাঁকে মথুরায় নিয়ে গিয়ে অত্যাচারী কংসকে পরাভূত করে মথুরার রাজদণ্ড হাতে তুলে নিতে সাহায্য করেছিল। কিন্তু তার পুত্র শাম্ব তো ইন্দ্রিয়ের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়ল। তার ষোল হাজার রক্ষিত রমণী যাঁদের তিনি স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে রেখে দিয়েছেন, তাদের দিকেও কামাহত হয়েছে ওই ছেলে। তাঁর অভিশাপে সে আজ কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত।*

    কৃষ্ণ কারও জন্য চোখের জল ফেললেন না। মনে হল গান্ধারীর অভিশাপ ফলছে। নটরাজের প্রলয় নাচন শুরু হয়েছে। তার জটার বাঁধন খুলে গেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে কোলাহল, আর্তনাদ। জাতিদাঙ্গা শুরু হয়েছে। একটা সৃষ্টি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। একটি নির্মাণ ভেঙে পড়ছে।

    কৃষ্ণ ঘুরে ঘুরে প্রভাস সৈকতে সেই আত্মঘাতী যুদ্ধ নিরীক্ষণ করতে লাগলেন।[১] তিনি সবাইকে দেখছেন। কিন্তু কেউ তাঁকে দেখতে পাচ্ছে না। সারারাত্রি ধরে সৈকত এক বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। অন্ধকরা বৃষ্ণীদের হত্যা করছে। বৃষ্ণীরা ভোজদের হত্যা করছে। অন্ধকরা কুকুরদের নিধন করছে। নাগরিকরা কেউ অস্ত্র নিয়ে আসেননি। তারা মদিরা পাত্রকে অস্ত্র করছেন। শিবিরের দণ্ডকে, বন্ধনপাত্রকে এবং সব শেষে দেখলেন, সৈকত শেষ হয়ে পথের ধারে যে সব কুশ গাছ রয়েছে, সেগুলি এক একটি শক্ত মুষলে পরিণত হয়েছে। সেগুলি এক একটি অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। তার আঘাতে দিব্যি মারা যাচ্ছে মানুষ। দ্বারকার নাগরিকরা সেদিন মদের নেশার মতো হত্যার নেশায় মেতে উঠেছে। আক্রমণ থেকে নারীরা ও শিশুরা বাদ যাচ্ছে না। নারীর ক্রন্দন ও শিশুদের আর্তনাদে ভরে উঠছে সৈকতভূমি। অসংখ্য নারীকে হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হচ্ছে।[২]

    [১. মহাভারতে এই কাহিনি নেই। মুষলপর্বে আছে তিনিও জাতিদাঙ্গায় নিহত হন।

    ২. মহাভারতের মুঘল পর্বে ওই আত্মঘাতী জাতি দাঙ্গার বিবরণ পাবেন। সেখানে আছে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ একগুচ্ছ এরকা (তৃণ) হাতে নিতেই তা মুঘলে পরিণত হয়। সেই মুষল দিয়ে তিনি বহু যাদবকে হত্যা করেন।]

    কৃষ্ণ শ্মশানচারী প্রেতের মতো সেই বধ্যভূমি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যিনি প্রথম যৌবনে মধুর প্রেমলীলা দেখেছেন, শেষ জীবনে এসে মৃত্যুলীলা দেখছেন নিরাসক্ত, বীতস্পৃহ, স্থিতপ্রজ্ঞ পুরুষের মতো দুঃখে অনুদ্বিগ্গমন এক স্বচ্ছ হৃদয় নিয়ে।

    .

    সেই মৃত্যুপরীতে অশ্বত্থামা কৃষ্ণকে ছায়ার মতো অনুসরণ করছিলেন। তিনি একটু সুযোগ খুঁজছিলেন কৃষ্ণের মুখোমুখি দাঁড়াবার। তাঁকে তিনি শুধু বলবেন, আপনি তো লক্ষ লক্ষ মানুষকে মৃত্যু উপহার দিলেন ভগবন। আপনি শুধু আমাকে এই মৃত্যু উপহার দিন। আপনার কাছে করজোড়ে মিনতি আমার। আপনি ফিরিয়ে নিন তিন হাজার বছর বেঁচে থাকার অভিশাপ। জীবনমূল্য আয়ুতে নয়, পুণ্যাপ্লুত কর্মে। সদকর্মহীন এক মুহূর্তের জীবনও নিরর্থক। সূর্য-চন্দ্র মানুষ ও জীব-জগতকে আলোকিত করছেন বলেই তারা লক্ষ বর্যেও চিরনবীন থাকছেন। তাও তারা নিরন্তর নন। বিরামহীন নন। তাদেরও উদয়-অস্ত আছে। উদয়কালের সূর্য প্রতিদিনই নিত্যনবীন। আপনি নতুন করে গড়ার জন্য আপনার যদুবংশকে বিধ্বংস করতে চলেছেন তাকে পুনর্নির্মাণ করবেন বলে। হে প্ৰভু, আপনি আমায় বিনির্মাণ করুন। আমায় ধ্বংস করে যুগের মতো করে পুনর্নির্মাণ করুন। আমি বারবার জন্ম নিতে রাজি। নিজেকে আবিষ্কার করতে গেলে, আত্মনকে উপলব্ধি করতে গেলে একটি জন্ম যথেষ্ট নয়। তাকে বারবার জন্ম নিতে হয়। একটি জন্ম তো শুধু জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতেই চলে যায়। প্রভু, নতুন জন্মের জন্যই আমায় মৃত্যু দিন। নিজেই নিজের কথাগুলি বারবার আবৃত্তি করছিলেন অশ্বত্থামা। কিন্তু কৃষ্ণ তো কোথাও দাঁড়িয়ে নেই। তিনি এই মুহূর্তে এখানে, পরের মুহূর্তে আরও দূরে কোনো হত্যাপুরীর সামনে দাঁড়িয়ে। অশ্বত্থামা যেখানেই কৃষ্ণকে দেখছেন, সেখানেই ছুটে যাচ্ছেন।

    রাত্রি শেষ হতে চলল। হত্যালীলা প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। বেশিরভাগ মশালের আলো নিভে গেছে। আহতদের আর্তনাদ আর শোনা যায় না। তারা বোধহয় সবাই মৃত। দূরে কয়েকটি শিবির এখনও জ্বলছে। মাথার ওপর জ্বলজ্বল করছে শুকতারা। হঠাৎ অশ্বত্থামা দেখলেন, সামনেই কৃষ্ণ। তিনি রাত্রি জাগরণে ক্লান্ত, অবসন্ন। তিনি হেঁটে হেঁটে সমুদ্রের তীর ধরে অনেকখানি নেমে অঞ্জলি ভরে ঢেউয়ের জল নিয়ে তাঁর শুভ্র কেশের ওপর দিলেন। চোখে-মুখে লবণাক্ত জলের ঝাপটা দিলেন। তারপর সৈকতে উঠে আসতে লাগলেন।

    অশ্বত্থামা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন, এই হল শুভ মুহূর্ত। কৃষ্ণ উঠে আসা মাত্র তিনি এই কথাগুলি এবার তাঁকে বলবেন। অশ্বত্থামা ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগোতে লাগলেন। আর ঠিক সময় কোথা থেকে দুই অশ্বারোহী এসে সৈকতে কৃষ্ণের সামনে এসে থামল। কৃষ্ণ তাঁদের দেখে হাত নাড়তে নাড়তে সমুদ্র থেকে উঠতে উঠতে বললেন, সারথি দারুক, আমি তোমার প্রতীক্ষায় ছিলাম। তুমি ঠিক সময় এসে পড়েছ।

    দারুক বললেন, প্রভু, আমি নগরীর মধ্যে রথ রেখে সারারাত আপনার আগমন প্রতীক্ষায় ছিলাম। এদিকে নগর জুড়ে বিধ্বংসী গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। আপনি ফিরছেন না দেখে আমি আপনার খোঁজ করতে এলাম। এখানে এসে দেখি সৈকতভূমি শ্মশানে পরিণত। তারপর সৈকত ধরে আপনার সন্ধান করতে করতে আপনাকে পেয়ে গেলাম। আপনি অক্ষত তো?

    কৃষ্ণ বললেন, হ্যাঁ, আমি অক্ষত।

    দারুক বললেন, তাহলে চলুন প্রভু, আপনাকে এই মৃত্যুপুরী থেকে দ্বারকায় নিয়ে যাই। আপনার পিতা, মাতা ও পত্নীরা সেখানে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। আপনি দ্বারকায় এখনই ফিরে চলুন।

    দারুকের সঙ্গে এসেছেন বক্র। ইনি যাদববংশীয় বীর যোদ্ধা। কৃষ্ণের বিশ্বস্ত।

    বদ্রু বললেন, প্রভু, আমি তো সন্ধ্যা থেকেই প্রভাসে আছি। যাদবরা সবাই নিহত। একমাত্র আমিই জীবিত। আমার সঙ্গে আপনার সারথি দারুকের দেখা হল। আমি ওঁর সঙ্গে আপনার সন্ধানে এসেছি। ফিরে চলুন প্ৰভু।

    কৃষ্ণ বললেন, বক্র, আগুন নিভে গেলেও ভস্মের মধ্যেও অগ্নি ধিকিধিকি জ্বলে। তা সম্পূর্ণভাবে না নেভালে তা থেকেও অগ্নিকাণ্ড দেখা দিতে পারে। তুমি শিবিরগুলি খুঁজে দেখো, কোনও নারী জীবিত আছে কি না। জীবিত নারীদের তুমি উদ্ধার করে দ্বারকায় নিয়ে আসার ব্যবস্থা করো।

    দারুক, তুমি আজই হস্তিনাপুর রওয়ানা হয়ে যাও। অর্জুন কেন এলো না? তুমি আমার সখা অর্জুনের সঙ্গে দেখা করে তাকে আমার নাম করে বলো, সে যেন এই রথে করে দ্বারকায় চলে এসে দ্বারকার নারীদের উদ্ধার করে হস্তিনানগরে নিয়ে যায়। তার সৈন্য আনার দরকার নেই। সে আর তার গাণ্ডীবই যথেষ্ট। আমার আশঙ্কা দ্বারকা অরক্ষিত। এ সময় দস্যুরা আক্রমণ করে নারী হরণ, নারী নির্যাতন করতে পারে। যখনই দেশে কোনো বড় বিপর্যয় হয়, নারীর ওপরই সবচেয়ে আগে আঘাত আসে।

    দারুক বলল, আপনি এই মৃত্যুপুরীর মধ্যে থেকে কী করবেন। যাদবদের কেউ আর জীবিত নেই। কী আশ্চর্য ঘটনা। সৈকতের ধারে অসংখ্য কাশফুল ফুটে ছিল। যাদবরা তার একটি উৎপাটিত করে হাতে নিতেই তা মুষলে পরিণত হল। এই মুষলের আঘাতে তারা মারা গেছে।

    কৃষ্ণ বললেন, তুমি ও বক্র কীভাবে বাঁচলে?

    আহুক বলল, সৈকত নগরীতে পরস্পরের হানাহানি হচ্ছে দেখে আমি এখান থেকে রথ নিয়ে নিরাপদ স্থানে চলে গিয়েছিলাম। আপনার জন্য চিন্তা হচ্ছিল। রাতের অন্ধকারে আপনাকে খুঁজে পাইনি। আজ ভোর হতে আবার এসে দেখি আপনি একাকী এই সৈকতে।

    বভ্রু বলল, প্রভু, সত্যি কথা বলুন। যদুবংশ গৃহযুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে না আপনি তাকে ধ্বংস করেছেন? আপনি স্বয়ং উপস্থিত থাকতে যাদবেরা ধ্বংস হয়ে গেল। কেন প্ৰভু? মহাকাল কী এত নির্মম?

    কৃষ্ণ বললেন, কোনো সৃষ্টিই স্থায়ী নয়। কিন্তু তার বিনাশও নেই। সৃষ্টি একটি কালচক্র। এক সৃষ্টি শেষ হয়, শিশুদের শ্লেটের মতো তা মুছে গিয়ে তার ওপরে অন্য লেখা পড়ে। কিন্তু তা মুছে আবার অন্য বাণী লিখতে হয়। সৃষ্টির আধার এই শ্লেটটা। সেটি চিরন্তন। তেমনি আমাদের আত্মা এই শ্লেটের মতো। তার ওপর লেখা বারবার মুছে যেতে পারে। বারবার নতুন করে লিখতে হয়।

    বক্র বলল, অক্রূর, সাত্যকি, কৃতবর্মা, আপনার সব অনুচর মৃত প্রভু। বলতে গিয়ে আমি বিচলিত হচ্ছি, আপনার পুত্র অনিরুদ্ধ শাম্ব ও প্রদ্যুম্ন মৃত। যদুবংশে বাতি দেবার মতো একমাত্র পৌত্র বজ্র ছাড়া আর কেউ থাকল না।

    কৃষ্ণ শান্ত কণ্ঠে বললেন, জানি, গান্ধারীর অভিশাপ। আমি এই পরিণতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম বভ্রু।

    বক্র বলল, তাহলে এই নিধন যজ্ঞ কী আপনার অভিপ্রায় অনুসারেই হয়েছে?

    কৃষ্ণ আবার শান্ত কণ্ঠে বললেন, জীর্ণ, পুরাতন অট্টালিকার গহ্বরে সাপ আর অসংখ্য কীটের বাসা হয়। তাকে বিচূর্ণ না করতে পারলে বিনির্মাণ হয় না। তুমি চিন্তা কোরো না বভ্রু। পুরাতনকে না ভাঙলে নতুন গড়ে ওঠে না। সংহার মানেই নতুন সৃষ্টির অবতারণা।

    বদ্রু বলল, প্রভু, পুরাতন মানেই কী জীর্ণ? পরিত্যাগযোগ্য?

    কৃষ্ণ বললেন, না। কিন্তু যাদবরা পুরাতনের মধ্যে চিরন্তনকে চিনতে পারেনি। তারা ভোগবাদকে পরম প্রিয় বলে ভোগের অসারত্বকে গ্রহণ করেছিল। কামকেই প্রেমের আসনে বসিয়েছিল। জীবনের সমস্ত নেতিবাচক দিকগুলিকে সফল জীবনের চাবিকাঠি বলে গ্রহণ করেছিল। তারা প্রত্যেকেই নিজেদের গোষ্ঠীকেই শ্রেষ্ঠ বলে ভাবত। বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যই যে শ্রেষ্ঠ ঐক্য তা ভাবেনি। দেশকে ভালোবাসাই যে নিজেকে ভালোবাসার অঙ্গ তা মনে করেনি। তারা ব্যক্তি হিসাবে অহং-এ ভর্তি ছিল। অক্রুর, উদ্ধব, সাত্যকি, কৃতবর্মা—প্রত্যেকে নিজের অহং-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কেউ কাউকে সহ্য করতে পারত না। এইভাবে দেশ গড়া যায় না। আমি শুধু ফুটো পাত্রে জল ঢেলেছি। দেশ গড়তে গেলে একটি অখণ্ড চেতনা চাই।

    দারুক বলল, কিন্তু আপনি হস্তিনাপুরে একটা ধর্মরাজ্য তৈরি করে দিয়ে এলেন, অথচ নিজের রাজ্য আদর্শ গঠনে ব্যর্থ হলেন কেন প্ৰভু?

    কৃষ্ণ বললেন, শুধু জমির উর্বরতার ওপর ফসল নির্ভর করে না দারুক। নির্ভর করে বীজের গুণমানের উপরে। পাণ্ডবরা পাঁচ ভাই, তারা সকলেই ধর্মপরায়ণ স্থিতধী। তারা সবাই সচেতন ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাছাড়া তাদের নেতা যুধিষ্ঠিরের প্রতি সকলেই শ্রদ্ধাশীল। সকলেই ভেদাভেদ ভুলে অনুগত। পাণ্ডব ভ্রাতারা কেউ কাউকে ছাড়িয়ে যেতে চায়নি। তারা ঐক্যবদ্ধ, তারা নির্লোভ, আসক্তিহীন। একমাত্র ঐক্যবদ্ধ, আদর্শপরায়ণ, সৎ নেতৃত্বই সফল রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে।

    —কিন্তু এ তো মানুষে মানুষে এই নেতৃত্বগুণের হেরফের হতে পারে। যুধিষ্ঠির তো চিরদিন থাকবেন না। তাঁদের উত্তরাধিকারী পরীক্ষিৎ এই পরম্পরা নাও বজায় রাখতে পারেন।

    কৃষ্ণ বললেন, হ্যাঁ, সে আশঙ্কা বরাবর থেকে যায়। সেজন্য যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন, তাঁদের একটি সুস্পষ্ট এবং নির্দিষ্ট আদর্শ থাকা দরকার। সে আদর্শ লিখিত নীতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠবে। একদল মানুষ চলে যাবে, আর একদল মানুষ আসবে। কিন্তু প্রত্যেকেরই সেই আদর্শের প্রতি নিষ্ঠা থাকবে। যে যার খুশি মতো চলবে না। শুধু ক্ষমতা লোভীদের দিয়ে রাষ্ট্র চলেনা।

    দারুক বলল, প্রভু, আপনি স্বয়ং ভগবান। আপনি যেমন বাহুবলী, তেমনি শাস্ত্রবলি। বেদ বেদান্ত আপনার আয়ত্ত। আপনার নিজস্ব জীবন দর্শন আছে। সে জীবন দর্শনে আপনি আপনার অনুগামীদের উদ্বুদ্ধ করতে পারলেন না কেন?

    —সত্যি কথা বলব? আমি কোনো শিক্ষিত মনের মানুষ পাইনি। সংবেদনশীল মানুষ পাইনি। আমার দর্শন বোঝার মতো একমাত্র অর্জুনকে পেয়েছিলাম। যুধিষ্ঠির স্থূলবুদ্ধি সম্পন্ন হলেও তিনি মুক্তমনা। বিনা দ্বিধায় সৎ আদর্শ গ্রহণ করার মতো তাঁর মন আছে। সবচেয়ে বড় কথা তিনি শ্রদ্ধাশীল। আমি অর্জুনকে বলেছিলাম, তুমি তোমার যা কিছু দুর্বলতা, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব তা আমায় সমর্পণ করে কাজ করে যাও। অর্জুন নিজেকে আমার কাছে সমর্পণ করেছিল। কিন্তু যাদবরা আমার কোনো অনুশাসন শোনেনি। অথচ মুখে সবসময় বলেছিল, আপনিই প্রভু, আপনার সঙ্গে আছি। তাদের অহংবোধ ঘোচাতে পারিনি। তারা একে একে দুর্নীতির পাঁকে ডুবে গেছে।

    আমার চেয়ে বড় স্ত্রী স্বাধীনতাকামী কে আছে? অথচ স্ত্রী স্বাধীনতার নামে এই সৈকতে এসেও যাদব বধূরা আকণ্ঠ মদ্যপান করেছে।

    ব বলল, কিন্তু আপনি তো আরও ধৈর্যশীল হতে পারতেন। আরও চেষ্টা করতে পারতেন। আপনি তো সর্বজয়ী। ভারতের শ্রেষ্ঠ বীরদের জয় করে আপনি কুরুক্ষেত্রে ধর্মরাজ্য স্থাপন করেছেন। আপনি অত্যাচারী কংস, নরকাসুর, বকাসুর নিধন করেছেন। কালীয় দমন করেছেন। আপনার পিসিমার সন্তান অশিষ্ট শিশুপালকেও বধ করেছেন। আর আপনি সামান্য দ্বারকার মানুষদের জয়ী করতে পারলেন না। দ্বারকার সাধারণ মানুষ কিন্তু আপনাকে ভক্তি করত।

    কৃষ্ণ বললেন, মৌখিক ভক্তি এক জিনিস, আর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে হাতে হাত ধরে কাজ করা আর এক জিনিস। জনতাকে বশীভূত করা, তাদের সমর্থন সংগ্রহ করা এক আর তাদের অনুপ্রাণিত করা আর এক। বড় কঠিন কাজ। সে কাজ একা হয় না। একগুচ্ছ বিশ্বস্ত আত্মসমর্পিত কর্মীর প্রয়োজন হয়।

    বভ্রু বলল, আমি আপনার প্রতি চিরকাল বিশ্বস্ত থেকেছি প্রভু।

    —তুমি বিশ্বস্ত থেকেছ বলেই হয়তো গতকালের আত্মঘাতী সংঘর্ষ থেকে বেঁচে গেছ। কিন্তু আমার কী অবস্থা হয়েছিল জানো? যাকে আমি বিশ্বাস করে কিছু দায়িত্বভার ন্যস্ত করতাম, অমনি অন্যেরা তাকে ঈর্ষা করে তার বিরুদ্ধে এসে আমার কাছে বলত। এজন্য পুরাতনকে ধ্বংস করে না ফেললে, নতুন মানুষ আনা যায় না। নতুন চিন্তার উদ্ভাবনও হয় না। সমাজ ক্রমশ মরা নদীর মতো মজে যেতে থাকে। কারণ তার স্রোত তো অবরুদ্ধ। কাল প্রবাহ একটি শ্লেটের মতো। শ্লেটটি একই থাকে, কিন্তু তার লিখন যুগে যুগে মুছে ফেলতে হয়।

    বক্তৃ বলল, কিন্তু লিখন বারবার মোছার দরকারটা কী প্রভু? চিরন্তন বাণীগুলি তো কোনোদিন মোছার দরকার হয় না। আপনি অর্জুনকে কুরুক্ষেত্রে যে সব দর্শনের কথা বলেছেন অথবা বেদের যে সব বাণী, তা মুছে নতুন করে লেখার কী প্রয়োজন আছে?

    কৃষ্ণ বললেন, কিন্তু যুগ তো বারবার বদলায়। যুগের চিন্তাধারাও বদলায়। তার সঙ্গে চিত্তন পদ্ধতি বদলায়। বদলায় চিন্তন বিষয়। নতুন নতুন বিষয় অর্থে উদ্ভট কোনো বিষয় নয়। আদিম ও মৌলকে অবলম্বন করেই তাকে নতুনভাবে দেখতে শেখা। বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষমতা বাড়ানো। একথা ঠিক যে, প্রকৃতি তোমাকে যা দিয়েছে তার বেশি নতুন কিছু নেই। কিন্তু সেই পুরাতন মৌলগুলিকে যুক্ত বা বিযুক্ত করে নতুন নতুন উদ্ভাবনই যুগের অবদান। সেজন্য নতুন মানুষের দরকার হয়। তারা নতুন করে ভাবতে পারে। নতুনভাবে যুগের মতো করে পুরাতনকে, চিরন্তনকে গ্রহণ করতে পারে। যাদবরা কতগুলি বস্তাপচা ধারণা নিয়ে একই চিন্তার চক্রপথে কলুর বলদের মতো ঘুরছিল। মদ্যপানকেই তারা সংস্কৃতি করে তুলেছিল। নর-নারীর পবিত্র সম্পর্ককে তারা দেহ মিলনের সম্পর্কে পরিণত করেছিল। দুর্নীতি হয়ে উঠেছিল রাজনীতি ও সমাজনীতির অঙ্গ। অর্থকেই তারা পরমার্থ করে তুলেছিল। পাপাচার এমন স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল যে সেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না।

    বভ্রু, শ্রদ্ধাহীন সম্পর্ক কলুষিত পানীয় জলের মতো। দুর্নীতি কেন্দ্রিক শাসন রাজযক্ষ্মার মতো। বাইরে থেকে বোঝা যায় না যে দেহ ক্ষয় হয়ে গেছে। দ্বারকাবাসী দুর্নীতিকে জীবনের অঙ্গ বলে মনে করেছিল। তারা যে কোনো ন্যায্য পাওনা পাওয়ার জন্যও রাজকর্মচারী ও অভিজাতদের উৎকোচ দেওয়াকে প্রথা বলে মনে করেছিল। আমি রাজকর্মচারী নিয়োগ করেছিলাম প্রাক্তন বীর যোদ্ধাদের, দেশপ্রেমীদের। তারা যে এত পাপাত্মা হয়ে উঠবে, তা ভাবিনি। জ্ঞাতিদের জন্য আমি কি না করেছি। কিন্তু তারা তাদের নিজের পাওনা-গণ্ডা বুঝে নিয়েছে। আমাকে বোঝেনি, আমার আদর্শ বোঝেনি।

    দারুক বলল, প্রভু, আমি এই রথে আপনাকে দ্বারকায় নামিয়ে দিয়ে আমি হস্তিনানগর চলে যাই।

    কৃষ্ণ বললেন, না। আমি আমার জ্যেষ্ঠভ্রাতা বলরামকে খুঁজব। কাল রাত্রিতে তাঁর থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি। তারপর আমি নিকটবর্তী কোনো বনে গমন করে ধ্যানে বসব। আমার সমস্ত পরিজন আজ মৃত। একমাত্র তোমরা দুজনই জীবিত। আমার পুত্রেরা নিহত হয়েছে। কোনো শোকে আমি কাতর নই। বিচলিতও নই। আমি আমার কর্তব্য পালন করতে পৃথিবীতে এসেছিলাম। আজ আমি বৃদ্ধ। শতবর্ষ অতিক্রম করেছি। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমি হস্তিনাপুরে ধর্মরাজ্য স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছি। কিন্তু আমি নিজের রাজ্য দ্বারকায় সফল হইনি। বভ্রু ঠিকই বলেছে। এ আমার কত বড় দুঃখ, তা অন্যকে কী করে বোঝাব? আমি তাই অরণ্যের নগ্ন নির্জনে যোগাসনে বসে আত্মশুদ্ধি করতে চাই। আমাকে তুমি এই নগরীর উত্তর প্রান্তের মহারণ্যে নামিয়ে দাও। আমি কিছুদিন অরণ্যবাস করব।

    বদ্রু চলে গেল মৃত্যুপুরী সৈকত শিবির পর্যবেক্ষণ করতে। শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে দারুকের রথ চলল উত্তরের অরণ্যের দিকে।

    একটি বালিয়াড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে অশ্বত্থামা সব শুনছিলেন। এবারও তাঁর কৃষ্ণের সঙ্গে কথা হল না। তবু হতাশায় নিমগ্ন না হয়ে তিনি ভোরের আলো ফোটার আগে নগরীর উত্তর প্রান্ত ধরে হাঁটতে শুরু করলেন। অশ্বত্থামা চরিত্রের বৈশিষ্ট্য হল তিনি বাস্তববাদী। তিনি জানেন, জীবনে ব্যর্থতা বলে কিছু নেই। সুযোগের অর্থ হল কতগুলি সম্ভাবনার একসঙ্গে সু-আগমন। তাদের সম্মিলিত একত্র মিলন। এর মধ্যে একটিও যদি সহযোগিতা না করে তাহলে ফলাফল অনুকূল হয় না। পরিস্থিতি আয়ত্তে আসে না। জীবন যেন বৈদিক গণিতের মতো, ফলাফল না মিললে আবার গোড়া থেকে তা শুরু করতে হয়।

    .

    শ্রীকৃষ্ণ রথের ওপর দাঁড়িয়ে পথের দুধার নিরীক্ষণ করতে করতে যাচ্ছিলেন। সমুদ্রের ধার দিয়ে মহাসড়ক অরণ্যের বুক চিরে চলে গেছে। অনেকদিন পরে সূর্য উঠেছে। সেই দমকা বাতাসও আজ নেই। জবাকুসুম রঙে রঞ্জিত কাশ্যপেয় সূর্যকে কৃষ্ণ করজোড়ে প্রণাম করলেন। মনে মনে বললেন, হে নতুন দিকের সূর্য, তোমাকে প্রণাম। তুমি সর্বপাপঘ্ন এই দ্বারকাভূমিতে তুমি প্রকৃত মানুষ সৃষ্টি করো। উজ্জ্বল দীপ্তিশীল করুণাঘন মানুষ। তুমি নতুন যুগের মানুষদের আলোকিত জীবনের দিশা দেখাও।

    অকস্মাৎ কৃষ্ণের নজরে পড়ে গেল সমুদ্র সৈকতে শায়িত এক পুরুষ-আর দেহ থেকে ধীরে ধীরে এক অতিকায় সাপ নির্গত হয়ে সমুদ্রের দিকে চলেছে। কৃষ্ণ চিৎকার করে বললেন, দারুক, রথ থামাও।

    দারুক রথ থামাতেই কৃষ্ণ ঊর্ধ্বশ্বাসে সৈকতের দিকে ছুটলেন। শায়িত পুরুষটি আর কেউ নয়—অগ্রজ বলরাম। তিনি যখন পৌঁছলেন তখন মুদিত চক্ষু বলরাম প্রাণহীন তাঁর উন্মুক্ত মুখ দিয়ে সর্পটি তখনও নির্গত হচ্ছে। সপটি শ্বেতবর্ণ। তার সহস্ৰ মুখ। প্রতিটি মুখ রক্তবর্ণ। সেই সহস্র মুখ সর্প ধীরে ধীরে সমুদ্রে প্রবেশ করছে। তখন সাগর, দিব্য নদী সমুদয়, জলাধিপতি বরুণ, মাতা বাসুকি, তক্ষক, হযুশ্রবা, বরুণ কুঞ্জর, শঙ্খ, কুমুদ, পুণ্ডরীক, ধৃতরাষ্ট্র স্বর্গ থেকে সৈকতে নেমে এসেছেন সেই সর্পকে পাদ্য অর্ঘ্য দিয়ে অৰ্চনা করতে।

    কৃষ্ণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ধরে সেই দৃশ্য দেখলেন। সহস্রশির সর্প ধীরে ধীরে সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেল। তারপর সমুদ্রের এক প্রবল ঢেউ এসে বলরামের দেহ ভাসিয়ে নিয়ে গেল গভীর সমুদ্রে। কৃষ্ণ ধীরে ধীরে তাঁর রথে ফিরে এলেন।

    .

    বলরামকে দ্বারকাবাসী সবাই রাম বলত। দীর্ঘদেহী এই মানুষটি ছিলেন বাস্তববাদী কিন্তু কতগুলি মূল্যবোধের প্রতি দৃঢ় আস্থাশীল। দুর্যোধনের সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব ছিল কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তিনি কোনো পক্ষ নেননি। তবে মনে মনে তিনি দুর্যোধনের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। কৃষিকেই তিনি সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তি বলে মনে করতেন। বলতেন, এ দেশের মাতা হলেন ধরিত্রী। তিনিই দেশবাসীর স্তন্যদায়িনী। কৃষিকর্মকেই মাতৃজ্ঞানে পূজা করতে হবে। মাতা বসুন্ধরাকে চোখের মণির মতো রক্ষা করতে হবে। তিনি কৃষ্ণের মতো গভীর ভাববাদী দর্শনের প্রবক্তা ছিলেন না। বহু বিষয়ে তাঁদের মত বিরোধ ছিল। কিন্তু কৃষ্ণ অগ্রজকে পিতার মতোই শ্রদ্ধা করতেন।

    অগ্রজ চলে গেলেন। কৃষ্ণ কোনো শোক করলেন না। যাবার সময় হলে সবাইকেই যেতে হবে। তিনি শুধু একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রথে ফিরে এলেন। তাঁর নিজেরও কি যাবার সময় হয়নি? কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর ৩৬ বছর কেটে গেল। এই ৩৬ বছরে তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি তৈরি করে যেতে পারলেন না। তিনি অভিমানে আপন সৃষ্টিকে ধ্বংস করলেন। কিন্তু গড়ার জন্য তো সময় চাই। আরও সময়। এখন তিনি ১০৭।* অর্জুন তাঁর চেয়ে ছ’মাসের ছোট। তাঁদের কারও হাতে আর সময় নেই। তিনি ধ্বংস করতে পারেন, নতুন সৃষ্টি করে দিয়ে যেতে পারেন অথবা প্রকৃতির নিয়ম অনুসারেই ধ্বংস হলেই আপনা-আপনি আবার সৃষ্টি হবে। কিন্তু সৃষ্টিকে রক্ষা করার জন্য দক্ষ রক্ষক চাই। সেই রক্ষক হবার মতো তাঁর আর বয়স নেই, তাঁর অপদার্থ ছেলেরাও মৃত। একমাত্র উত্তরাধিকারী নাতি বজ্ৰ। কিন্তু সে কি মহান উত্তরাধিকার বহন করতে পারবে? শুধু রাজা হলেই রাজ্য সুশাসন করা যায় না। ধর্ম ও যশ থেকে বিচ্ছিন্ন রাজা যদি স্বর্গের সাম্রাজ্যও লাভ করেন তাহলেও সেই স্বর্গও কলঙ্কিত হয়ে যায়। প্রজাদের সব বৈষয়িক বিষয়ে কিছু পাইয়ে দিলেই তারা সম্রাট মহানুভব বলে জয়গান করে। বন্দিরা জয়গান করার জন্য অর্থ পায়, পুরস্কার পায়, কিন্তু যে রাজা প্রজাদের যথার্থ হিতকারী তিনি সর্বাগ্রে নিজে ধার্মিক হবেন। মূল্যবোধের ধর্মকে প্রাণভোমরার মতো রক্ষা করবেন।

    [*অর্জুনের মৃত্যুর ৬ মাস আগে কৃষ্ণের মৃত্যু হয়। অর্জুনের মৃত্যু হয় ১০৭ বছর ৬ মাস বয়সে। কৃষ্ণের বয়স তখন ১০৭ বছর। মহাভারতের একশোটি দুর্লভ মুহূর্ত। বীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য। পৃ: ৬৬৪।]

    ধর্ম হল ন্যায্য প্রাপ্য ভোগ করা। অথবা কেউ সে প্রাপ্য থেকে তাকে বঞ্চিত করলে তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। এই ন্যায্য প্রাপ্তির জন্য, ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রামই ধর্মযুদ্ধ। যা পাণ্ডবেরা করেছিল। যা তিনি সমর্থন করেছিলেন।

    কিন্তু কুরুক্ষেত্রে যা পারলেন, স্বক্ষেত্রে তা পারলেন না কেন? কোথায় তাঁর ত্রুটি? কোথায় তাঁর অপরাধ? গান্ধারীর অভিশাপ কী এত তীব্র? তাঁর সদিচ্ছা, সদকর্ম, সৎ চিন্তা সর্বোপরি তাঁর নিজের ধর্ম, তাঁর স্থিত প্রজ্ঞা, ‘জ্ঞানং জ্ঞেয়ং’ জ্ঞানমাং যে হৃদয়, তা কী এত ভঙ্গুর?

    কৃষ্ণ রথে বসে মনে মনে ভাবছিলেন, প্রজাদের কাছে যশস্বী হওয়া কত সোজা। যাদবদের অবাধে মদ্যপান করতে দিয়ে, দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়ে যুবকদের যথেচ্ছাচার করতে দিয়ে উগ্রসেন যশলাভ করেছিল। প্রজারা সবাই তাঁর প্রশংসা করেন। কৃষ্ণ কিছু বললেই উগ্রসেন বলতেন, বৎস, জনসমর্থন সুদৃঢ় রাজ্যের ভিত্তি। আমি যে ঐক্যবদ্ধ যাদবদের সন্তানসম পালন করি, তাতেই যাদবরা খুশি। পিতাকে সন্তানদের খুশিতে রাখবার জন্য নানা আবদার মেটাতে হয়। সেজন্যই তারা পিতাকে ভালোবাসে।

    আমি তাদের অবাধ মদ্যপানে অধিকার দিয়েছিলাম এই কারণে যে এতে ভালো রাজস্ব আদায় হয়। ভালো উন্নয়ন হয়। আর প্রজারা মদ্যপানে আসক্ত হলে তারা রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে না। আপন নেশাতেই মত্ত থাকে। প্রজারা যত বিনোদনমুখী হবে, যত ক্রীড়া ও প্রমোদ নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তত বেশি রাজ্য নিরাপদ হবে। তারা শান্তিতে থাকবে। আমি দ্বারকার উন্নয়নে কোনো ঘাটতি রাখিনি। প্রভাস তীর্থকে সারা দেশের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছি। সারা ভারত থেকে তীর্থযাত্রী আসেন প্রভাস তীর্থে। প্রভাস পশ্চিমের দ্বিতীয় বারাণসী। আমি জনহিতের কোনো দরজা বন্ধ করিনি।

    কিন্তু সেই প্রভাস নিমেষের মধ্যে ধ্বংস হয়ে গেল। শুধু প্রজার পাপে? রাজার পাপ নেই? রাজার প্রকৃত হিতধর্মের বদলে প্রজা প্রীতধর্মই কী এর জন্য দায়ী? রাজা প্রজাকে শোষণ করবে না, প্রজাও রাজাকে তোষণ করবে না। এটাই কি নীতি?

    কৃষ্ণ মনে করেন, আদর্শ মানুষ সন্ন্যাসী হবে না। বিষয়ী হবে। কিন্তু তার বিষয়-বাসনাও হবে কর্মকেন্দ্রিক। সে ধর্মানুমোদিত কর্ম করেই উপার্জন করবে। আপন শক্তিকে সে বাড়িয়ে চলবে পরিশ্রমের দ্বারা, কাজের দ্বারা, ধর্মের দ্বারা।

    মাতামহ উগ্রসেনের গর্বোদ্ধত কথাগুলি বারবার মনে পড়ছিল শ্রীকৃষ্ণের। বৎস, তুমি আমার ওপর যে দায়িত্ব তুলে দিয়েছ, তুমি নিশ্চিন্তে নিদ্রা যেতে পারো। তুমি একজন দার্শনিক, মানবপ্রেমিক, ষড়গুণসম্পন্ন ঐশ্বর্যের অধিকারী। সাম-দান-দণ্ডভেদের এই রাজনীতি তুমি বুঝবে না। রাষ্ট্র পরিচালনা করতে গেলে রাজাকে সব রকম লোককেই সঙ্গে নিতে হয়। কারণ জনগণের সমর্থনই রাজার একমাত্র শক্তি। রাজধর্ম শুধু নীতি নয়, তা রাজনীতি।

    কৃষ্ণ ভাবছিলেন, ধর্ম সংস্থাপনের জন্য তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনি ধর্মরাজ্য মহাভারতের ভিত্তি তৈরি করে দিয়ে গেছেন। দ্বারকাকেও তিনি একদা আদর্শ রাজ্যে পরিণত করেছিলেন। কিন্তু একটি আদর্শকে প্রচার করা আর তাকে রাষ্ট্রসাধনার মধ্যে রূপায়িত করা দুটো স্বতন্ত্র কাজ। এর জন্য আদর্শবাদী দার্শনিক রাজা চাই। অন্তত নীতিধর্মে গভীরভাবে বিশ্বাসী রাজপুরুষ আর অনুপ্রাণিত জনগণ।

    আদর্শ বিশ্বাস ও নীতির একটি পরম্পরা চাই। তা একজন কৃষ্ণের দ্বারা, একজন যুধিষ্ঠিরের দ্বারা তা সম্ভব নয়। একজনের জীবন বড় ছোট। যোগ্য উত্তরাধিকারী না গড়তে পারলে সব কিছু ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। যুধিষ্ঠির, অর্জুন, ভীমসেন, নকুল, সহদেবের মতো যোগ্য মানুষদের ইতিহাসে বারবার আগমন ঘটা অসম্ভব। রাজাকে মহান হয়ে জন্মাতে হয়। চালাকির দ্বারা মহত্ত্ব অর্জন করতে চান সবাই। যেমন উগ্রসেন চেয়েছিলেন শ্রীকৃষ্ণের পর প্রদ্যুম্ন রাজা হোক। তারপর অনিরুদ্ধ রাজা হবেন বংশানুক্রমিক। পরম্পরা অনুযায়ী। তা হয় না। সেজন্য তিনি যদুবংশকে ধ্বংস করে দিলেন। অযোধ্যার নারীরা নিরাপদ আশ্রয় পেলেই তিনি দ্বারকাকে সমুদ্র গর্ভে বিসর্জন দেবেন। আবার একদিন সমুদ্র থেকে ধীরে ধীরে জেগে উঠবে নতুন দ্বারকা, নতুন মানুষ, নতুন চিন্তা। আদর্শের মৃত্যু নেই। আদর্শ চিরজীবী।

    চিরজীবী কথাটা মনে হতেই কৃষ্ণের হঠাৎ মনে পড়ল অশ্বত্থামার কথা। অশ্বত্থামা চিরজীবী হয়ে আজও বেঁচে আছে। কেমনভাবে বেঁচে আছে কে জানে?

    দীর্ঘজীবন আশীর্বাদ না অভিশাপ? তিনি ইচ্ছা করলে দীর্ঘজীবন পেতে পারতেন? সৃষ্টির পর সৃষ্টি করে যেতে পারতেন? কিন্তু কাকে নিয়ে বাঁচবেন? যদুবংশ তো ধ্বংস হয়ে গেল। পুত্রেরা বিনষ্ট। বন্ধুরাও বিনষ্ট। প্রাণাধিক বন্ধু অর্জুনও কত দূরে। অশ্বমেধ যজ্ঞের পর আর দেখা হয়নি। শুনছেন তাঁরাও দেহত্যাগ করার মানসে হিমালয়ে যাত্রা করবেন। একা বেঁচে থেকে তিনি কী করবেন? সংসারে একাকীত্বের যন্ত্রণার মতো আর কিছু নেই।

    —প্রভু, অন্ধক বন এসে গেছে। আপনাকে এখানে নামিয়ে দেব?

    কৃষ্ণ দেখলেন, মহাসড়কের দু’পাশে ঘন অরণ্য। দূরে পাহাড়ের প্রান্ত রেখা। তার পাশ দিয়ে অজগরের মতো এঁকে বেঁকে চলে গেছে মহাসড়ক। এই পথ দ্বারকার দিকে চলে গেছে সমুদ্র সৈকতের দিকে।

    কৃষ্ণ রিক্ত হাতে রথ থেকে নামলেন। দারুকের মুখ চোখের জলে ভিজে গেছে। সে আনত হয়ে প্রণাম করল।

    কৃষ্ণ বললেন, দারুক, তুমি আমার অতি প্রিয়জন। তুমি অর্জুনকে গিয়ে বলো, তোমার সখা কৃষ্ণ তোমাকে এখনই চলে আসতে বলেছেন। দ্বারকাপুরীর নারীদের রক্ষার ভার তোমার ওপর দিয়ে গেছেন। আমার পিতা-মাতা ও পৌত্র বজ্রকে অর্জুন যেন আশ্রয় দেয়। তুমিও তাদের সঙ্গে দ্বারকাপুরী ত্যাগ করবে। কারণ দ্বারকাপুরী সমুদ্রের গর্ভে তলিয়ে যাবে। তুমিও নিরাপদ স্থানে চলে যেও।

    দারুক কৃষ্ণের রথ নিয়ে চলে গেল। কৃষ্ণ অরণ্যের ভেতর প্রবেশ করতে লাগলেন। তার আগে তিনি তাঁর উত্তরীয় উষ্ণীষ পরিধেয় জুতা, তাঁর শেষ অস্ত্র একটি কৃপাণ অরণ্যের প্রবেশ মুখে পরিত্যাগ করে শুধু পরিধেয় বস্ত্র আর অঙ্গাভরণ সঙ্গে করে অরণ্যে প্রবেশ করলেন।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অঁতোয়ান দ্য সাঁত-এক্সুপেরি
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অনীশ দেব
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাসরুর আরেফিন
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    মোহিত কামাল
    রকিব হাসান
    রজতশুভ্র মজুমদার
    রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রশীদ করীম
    রাজর্ষি দাশ ভৌমিক
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রাফিক হারিরি
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শওকত আলী
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শহীদুল্লা কায়সার
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাহীন আখতার
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শৈবাল মিত্ৰ
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রীপারাবত
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্তোষকুমার ঘোষ
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সন্মাত্রানন্দ
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমীরণ গুহ
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সরোজকুমার রায়চৌধুরী
    সাগরময় ঘোষ
    সাদাত হোসাইন
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুপ্রতিম সরকার
    সুব্রত গুহ
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সেলিনা হোসেন
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৈয়দ শামসুল হক
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বপ্নময় চক্রবর্তী
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হরিশংকর জলদাস
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    September 5, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    September 5, 2026
    Our Picks

    অশ্বত্থামা হত – ড. পার্থ চট্টোপাধ্যায়

    September 5, 2026

    ঈশ্বরপুরের প্রেমকথা – দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য

    September 5, 2026

    উন্মাদ আশ্রম – ওবায়েদ হক

    September 5, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }