পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.৫
৫
দেবেন্দ্রনাথের ডান হাত কেশব সেন।
চমৎকার চেহারা। সৌম্য, প্রশান্ত, ওজঃপূর্ণ। মুখশ্রীতে ঈশ্বরবিশ্বাসের লাবণ্য মাখানো। কণ্ঠস্বরে যেমন ভক্তির মধুরতা তেমনি প্রতিজ্ঞার তেজ। দার্ঢ্য আর দীপ্তির সমাহার। বাগ্বজ্রে বংশীধ্বনি।
চমৎকার বক্তৃতা দেয় কেশব। যেমন ইংরিজি তেমনি বাংলা। প্রথম প্রথম ইংরিজি, শেষ দিকে কেবল বাংলা। সে বক্তৃতার কী বর্ণচ্ছটা। কী বিন্যাসচাতুর্য। যে শোনে সেই তন্ময় হয়। সত্য পথের ধ্রুব জ্যোতিটি চোখের সামনে জ্বলতে দেখে।
দেশ তখন ভেসে যাচ্ছে। ভেসে যাচ্ছে মদে, খৃষ্টানিতে, ইংরিজিয়ানায়। উচ্ছন্নে যাবার জন্যে পাগল হয়ে ছুটোছুটি করছে চার দিকে। ছুটতে বা পারছে কই, নর্দমায় টলে পড়ছে।
কাঁচা নর্দমার পাঁকের মধ্যে সার-সার শুয়ে আছে মাতালেরা। ধাঙড়দের ঝোড়াগুলোকে মাথার বালিশ করেছে। যেন একেক জন কত বড় বাহাদুর। পাহারাওয়ালা এলে বলছে, ‘এ বাবা, নর্দমায়, মিউনিসিপ্যালিটিতে আছি, পুলিশ জুরিসডিকশানের বাইরে। টিকিটিও ধরতে পাবে না।’
“সধবার একাদশী”র নিমচাঁদ বলে, সেকালে ভূতে পেত, একালে আমাদের মদে পেয়েছে। ব্রান্ডির নাম বোতলচারুহাসিনী। আমি তাকে ছাড়তে পারি কিন্তু সে আমাকে ছাড়ে কই? যদি ‘রাইম’ করতে চাও তো মদ খাও।
সে যুগে মদ না খাওয়া, মানে শিক্ষিত বলে কল্কে না পাওয়া। যে-কলেজ থেকে বেরিয়েছে পাশ করে তার নাম ডোবানো। স্বনামধন্য রামগোপাল ঘোষের ভাগ্নে গ্রাজুয়েট হয়েছে কিন্তু মদ খায় না। ঘোষ মশায় দুঃখ করে তাকে বলছেন, তুই মদ খেতে শিখলি না, তোকে আমি সমাজে বার করি কি করে?”
প্যারীচরণ সরকার “সুরাপাননিবারণী সভা” স্থাপন করলেন। মদিরার স্রোত তবু বন্ধ হয় না। নিমে দত্ত বলছে, ও সভা যদি ত্বরায় না নিপাত হয় আমি নিপাত হব। বড়মানুষের ছেলে-ব্যাটারা এক-একটি করে সভ্য হবে আর আমি ধেনো খেয়ে মরব এ হতে দেব না। এক ব্যাটা বড়মানুষের ছেলে মদ ধরলে দ্বাদশটি মাতাল প্রতিপালন হয়-
গিরীশ ঘোষ মদ খায়। তা নইলে না কি তার নেশা হয় না।
ঠাকুর বলেন, ‘খা না—কত খাবি? কত দিন খাবি? শেষে যখন তোকে সে-নেশা ভগবৎ-নেশায় পেয়ে বসবে তখন মদ কোথায় পড়ে থাকবে টেরও পাবি না।’ সে-নেশা মদের চেয়েও দুর্মদ। সে-নেশাই সর্বনাশের নেশা।
তা ছাড়া, আরেক লক্ষণ, শিক্ষিত সমাজ সদলবলে সাহেবিয়ানার মোসাহেবি শুরু করে দিয়েছে। গায়ে বিলিতি খেলাত, মুখে বিলিতি বুকনি। যা কিছু ইংরেজি, যেমন কিছু সাহেবি তাই ওঠ-বোস মক্স করো। ইংরেজের পায়ে দেশ বিকিয়ে দিয়েছ, ভাব-ভাষাও বিলিয়ে দাও।
নিমে দত্ত বলছে, আই রীড ইংলিশ, রাইট ইংলিশ, টক ইংলিশ, স্পীচিফাই ইন ইংলিশ, থিঙ্ক ইন ইংলিশ, ড্রীম ইন ইংলিশ।
সেইখানে ঠাকুর এলেন খাঁটি দিশি বাংলার জয়ধ্বজা উড়িয়ে। বললেন, চার দিকে বড় গোলমাল। কিন্তু গোলমালেও মাল আছে। গোল ছেড়ে মালটি নেবে।”
ঠাকুর যেমন আপনি অকপট তেমনি ভাষাও অকপট।
বললেন, তিনটে “স” হয়েছে কেন বলতে পারিস? শ,ষ,স-এই তিন ‘স’ কেন? এই তিন ‘স’-র মানে হচ্ছে, স, স, স। মানে সহ্য কর, সহ্য কর, সহ্য কর। যে কোনো কাজে হাত দিস, বসিস যে কোনো সাধনায় সহ্য করতে হবে। সহ্য না করলে সিদ্ধি নেই। এই সওয়ার বা সহ্য করার উপরে জোর দেবার জন্যেই তিনটে ‘স’ হয়েছে।’ বলেই একটি ছন্দ গাঁথলেন, যে সয় সে রয়, যে না সয় সে নাশ হয়।’
আগে লোকে বলত, উপমা কালিদাসস্য, এখন দেখছে, উপমা রামকৃষ্ণস্য!
তার পর পোশাকটি দেখ।
এক দিকে চাঁদনির সাহেব আরেক দিকে বাগবাজারের বাবু।
বাবুর বর্ণনা দিচ্ছে নিমচাঁদ। ভোলাচাঁদকে দেখে বলছে, তুমি যে বাবু সেজে বাহার দিয়ে এসেছ। মাথার মাঝখানে সিঁতে, গায়ে নিনুর হাফচাপকান, গলায় বিলাতী ঢাকাই চাদর, বিদ্যাসাগরপেড়ে ধুতি পরা, গরমি কালে হোল্ মোজা পায়ে, তাতে আবার ফুল কাটা গার্টার, জুতোর ফিতের বদলে রূপার বগলস, হাতে হাড়ের হ্যান্ডেল বেতের ছড়ি, আঙ্গুলে দুটি আংটি–
ভোলাচাঁদ ইংরেজিতে বলছে, ‘ফাদার ইন-ল গিভ সার, ইউ মাই ফাদার ইন-ল সার—’
আর রামকৃষ্ণের পরনে লালপেড়ে ধুতি, গায়ে বড় জোর একটি মার্কিনের জামা, পায়ে কালোবার্নিশ করা চটি, বড় জোর কখনো ক্কচিৎ হাফ-মোজা।
মাস্টারকে বললেন, গোটা দুয়েক মার্কিনের জামা দিও। সকলের জামা তো পরি না! কাপ্তেনকে বলব মনে করেছিলাম, তা তুমিই দিও।’
মাস্টার বসে ছিল, উঠে দাঁড়াল। কৃতার্থের মত বললে, যে আজ্ঞে।’
কিন্তু ঠাকুর যখন ভদ্রলোক ছেড়ে ভাবলোকে আসেন তখন তিনি একেবারে দিগ্বল্কল! তখন তিনি মঙ্গলায়তন হরি। তখন তিনি সকলেশ্বর। তাঁর ললাটফলকে কস্তুরীতিলক, বক্ষস্থলে কৌস্তভ, নাসাগ্রে নবমৌক্তিক, করতলে বেণু, সর্বাঙ্গে হরিচন্দন। তিনি অহেতুক-দয়ানিধি।
তখনকার দিনের লোকেরা প্রণাম করে না। প্রণাম করাকে কুসংস্কার বলে। প্রণাম না করে বলে, গুড মর্নিং। বলবার সময় তর্জনীটা একবার একটু কপালে ঠেকায়। ঘাড়টা মোটা করে রাখে, কারু কাছে মাথা নোয়ায় না। মাথা নোয়ালেই যেন মানটি খোয়া যাবে।
ওরে, মাথা নত কর। যেখানে যেটকু গুণ দেখছিস সেখানেই তো ঈশ্বরকে দেখছিস। ঈশ্বর যে গুণগুরু। গুণাতীত হয়েও তিনি যে গুণবর্ধক। সে গুণের কাছে মাথা নোয়া। ঈশ্বরকে স্বীকার করলেই তো নিজেকে মান দিলি। যার এই মান সম্বন্ধে হুঁস আছে সেই তো মানুষ। যে বোঝে সে অনৃতের সন্তান নয়, অমৃতের সন্তান, সেই তো যথার্থ মানী।
দক্ষিণেশ্বরের মন্দির মানে প্রণাম শেখার পাঠশালা।
বাগবাজারে বোসপাড়া গলির মোড়ে বসে আছে গিরীশ ঘোষ, ঠাকুর গাড়ি করে যাচ্ছেন সেখান দিয়ে। গিরীশকে দেখেই ঠাকুর প্রথমে প্রণাম করলেন। প্রণাম ফিরিয়ে দিল গিরীশ। ঠাকুর আবার প্রণাম করলেন তক্ষুনি। যতবার গিরীশ প্রণাম ফেরায় ততবার ঠাকুর আগ বাড়িয়ে নতুন আরেকটা প্রণাম করে বসেন। কাঁহাতক চালানো যায় এই প্রণামের প্রতিযোগিতা? ক্ষান্ত হল গিরীশ ঘোষ। কিন্তু প্রণামে ঠাকুরের নিবৃত্তি নেই। গিরীশের থামবার পরেও আরেক বার প্রণাম করলেন ঠাকুর।
গিরীশ ঘোষ বললে, দক্ষিণেশ্বরের পাগলা বামুনটার সঙ্গে প্রণামে আর টক্কর দেওয়া চলে না। ওর ঘাড় ব্যথা হয় না কিছুতেই।
ঠাকুর জগন্মাতাকে প্রণাম করছেন আর বলছেন, ভাগবতভক্ত ভগবান, জ্ঞানীর চরণে প্রণাম, ভক্তের চরণে প্রণাম, সাকারবাদীদের চরণে প্রণাম, নিরাকারবাদীদের চরণে প্রণাম। সর্বতীর্থময় হরি।
সর্বভূতে, সর্বজীবে প্রণাম।
গিরীশ ঘোষ বলে, ‘রাম অবতারে ধনুর্বাণ নিয়ে জগৎজয় হয়েছিল, কৃষ্ণ অবতারে জগৎজয় হয়েছিল বংশীধ্বনিতে, আর রামকৃষ্ণ অবতারে জগৎজয় হবে প্রণাম-মন্ত্রে। নাম করো আর প্রণাম করো। প্রকৃষ্টরূপে নামই তো প্রণাম।
আরেক হাওয়া চলছিল সে যুগে খৃস্টানির হাওয়া। যেহেতু ইংরেজের ধর্ম, সেহেতু আর কথা নেই, মেতে যাও। হিন্দুধর্ম মানে পুতুল পূজো, স্রেফ ছেলেখেলা। শিক্ষার আলোতে এসে ও সব কুসংস্কার মানতে কেউ রাজী নয়।
গীতা-উপনিষদের কেউ নাম শোনেনি। চণ্ডী? সে আবার কি মাথামুন্ডু? চৈতন্যদেবের বাড়ি কোথায় তা কে জানে? ভাগবত? ও তো ‘কথকের কথা’। সে যুগে কথকের কথা মানে আষাঢ়ে গল্প। যদি কেউ কিছু আজগুবি কথা বলে, ভদ্রলোকেরা অমনি বলে বসে এ কথকের কথা। ভদ্রলোকেরা শোনে না কথকতা। তার চেয়ে গাঁজার দম দেওয়া ভালো।
তবে তোমরা পড় কি?
পাদরিরা বাড়ি-বাড়ি বাইবেল দিয়ে গেছে, তাই পড়ি এক-আধটু। ইংরেজিতে লেখা, বেশ বোঝা যায় সহজে।
দেশের কতগুলো মাতাল লোক খৃষ্টান হয়ে গেল। দেখাদেখি আরো অনেকে। যেন একটা হুজুগ পড়ে গেল। গা ভাসিয়ে দিল গড্ডালিকায়।
বাঙালী পাদরির দল বেরুলে গলির মোড়ে, হেদোর ধারে, কেষ্ট বন্দ্যোর গির্জের কোণে। কালাপাহাড় মুসলমান হয়েছিল, এরা হল শাদাপাহাড়। এদের ধর্মের মধ্যে কর্ম শুধু হিন্দু দেবদেবীকে গাল পাড়া। সব চেয়ে ঝাল বেশি কালী আর কৃষ্ণের উপর। কালী ন্যাংটা আর কৃষ্ণ ননীচোর।
শ্রোতার দল মেতে ওঠে। এক কথায় বাপ-পিতেমোর ধর্মকে নাকচ করে দেয়। হিন্দুধর্ম একটা কুসংস্কার। ছত্রিশ রকম জাত মানে। স্ত্রীলোক আর বাসনকোসনে তফাত রাখে না। পালকিতে বসিয়ে পালকি-শুদ্ধ জলে ডুবিয়ে গঙ্গাস্নান করায় মেয়েদের। যিনি অনন্ত তাকে কি না নিয়ে এসেছে ঘটে-পটে, মাটির ডেলায়। আর দেবতাও একটি-দুটি নয়, তেত্রিশ কোটি।
অত হিসেব সামলাতে পারব না। পাদরির কথাই ঠিক। ঈশ্বর এক আর নিরাকার। আর ঈশ্বরের অবতার যীশুখূষ্টই একমাত্র সমুদ্ধর্তা।
গির্জে’র খাতায় নাম লেখাতে লাগল দলে-দলে। যেহেতু খৃষ্টান হলাম সেহেতু সাহেব হয়ে গেলাম। তাই নিয়ে এসো মদ নিয়ে এসো নিষিদ্ধ মাংস। একেই বলেছে, ‘জাত মাল্লে পাদরি এসে, প্যাট
মাল্লে নীল বাঁদরে।’
এখন এর উপায় কি? সব যে যায়!
রামমোহন নিয়ে এলেন বেদান্তের বাণী, দেবেন ঠাকুর তাকে সংহত করলেন ব্রাহ্ম-ধর্মে। আর কেশৰ লেগে গেল প্রচারণায়। বক্তৃতা দিয়ে ফিরতে লাগল। শুধু বক্তৃতা নয়, বার করল একাধিক
পত্রিকা।
উন্মার্গগামীরা একটু থমকে দাঁড়াল।
খৃষ্টধর্ম আর হিন্দুধর্মের মধ্যে একটা আপোষ ঘটালো কেশব সেন। মূর্তি দূর করে দাও, নিয়ে থাকো ভক্তির ভাবটি। যীশুবিহীন যীশুর ধর্ম গ্রহণ করো। তুলে দাও জাতিভেদ আর যদি দেশের মুক্তি আত্মার মুক্তি চাও, মুক্তি দাও স্ত্রী-জাতিকে।
বেশ ভাব। ইংরেজের ধর্ম খৃষ্টানিও আছে, বাপ-পিতেমোর ধর্ম হিন্দুয়ানিও আছে। চলো ব্রাহ্মসমাজে গিয়েই নাম লেখাই।
কেনারাম ডেপুটিকে জিজ্ঞেস করছে নিমচাঁদ, ‘তুমি তো ব্রাহ্ম হয়েছ, হিন্দু শাস্ত্রের তেত্রিশ কোটি দেবতার সব ত্যাগ করেছ, না, দুটি-একটি রেখেছ, সাত দোহাই তোমার, যথার্থ করে বলো-‘
কেনারাম বললে, ‘আমি কেতাব না দেখে উত্তর দিতে পারি না। আপনি ভারি শক্ত প্রশ্ন করেছেন—’
‘দূর ব্যাটা ঘটিরাম’ নিমচাঁদ ঝাঁজিয়ে উঠল, ‘তুমি ব্রাহ্মধর্ম’ যত বুঝেছ তা এক আঁচড়ে জানা গিয়েছে। যখন ব্রাহ্মধর্মের শর্ত হচ্ছে একমেবাদ্বিতীয়ম, তখন তেত্রিশ কোটি দেবতার সব ত্যাগ করিচিস কি না, বলতে কতক্ষণ লাগে?”
কেনারাম চিন্তিত মুখে বললে, ‘একটি আধটি ঠাকুর হলে খপ করে বলা যায়, তেত্রিশ কোটির কথা ঝাঁ করে বলা যায় না—জানি কি, যদি দুটো-একটা রাখবার মত হয়!’
ব্রাহ্মধর্ম বুঝুক আর না বুঝুক, লোক তো আগে ফিরুক পাদরিদের খপ্পর থেকে। হুজুগটা তো বন্ধ হোক।
কেশবের বাগ্মিতায় আর ধর্মসাধনায় বিশ্বাস ফিরে এল উদ্ভ্রান্তদের। ঝাড়াই-বাছাই করে যদি দেশের মাঠেই পাই তবে কেন আর যাই বিদেশের মাটিতে। কিন্তু ব্রাহ্মসমাজে নাম লিখলেই তো শুধু চলবে না, নিতে হবে নীতি আর পবিত্রতার পাঠ, সত্যনিষ্ঠা আর পরোপকারের ব্রত। ‘ব্যান্ড অফ হোপ’ নামে এক দল খুল কেশব। মদ-তামাক খাব না। ছোঁব না নিষিদ্ধ মাংস।
নিমচাঁদকে শাসালো রামধন, ‘তুমি বসো, আমি তোমার শ্রাদ্ধের আয়োজন করে আসছি।’
নিমে বললে, ‘ব্রাহ্মমতে কোরো বাবা। অনেক বৃষ পার করেছি, এখন আর বৃষ উৎসর্গ ভালো লাগবে না।’
এর পর আবার আরেক দল উঠল যারা ঠাকুর-দেবতাও মানে না নিরাকার ব্রহ্মও বোঝে না। তারা নাস্তিক, সংশয়ে ছিন্নবিচ্ছিন্ন। কোনটা যে ধরবে ঠিক করতে পারছে না। হাল ছাড়া নৌকোর মতো দিশেহারা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরেক দল উঠল, যারা প্রত্যক্ষবাদী। ধর্ম-টর্ম’ ধার ধারে না, ইন্দ্রিয়ের বাইরে জানে না আর কোনো অনুভূতির অস্তিত্ব।
চার দিকে বিশৃঙ্খলা, অশান্তি, একটা ঝোড়ো হাওয়ার এলোমেলো ধূলো।
এমন সময় ঠাকুর এলেন। সনাতন ধর্মের শাশ্বত জ্যোতির স্নিগ্ধতা নিয়ে, বিশ্ববিস্তীর্ণ উদার উন্মুক্তি নিয়ে। হিন্দুধর্মের উজ্জ্বলন্ত প্রতীক হয়ে, নির্গলিত ভাষ্য হয়ে। নিয়ে এলেন শান্তি, সাম্য, সামঞ্জস্য। নিয়ে এলেন সঙ্গতি, সংহতি, সমন্বয়। খণ্ডের ঘরে ক্ষুদ্রের ঘরে রইলেন না, এলেন একেবারে ভুবনজোড়া আসন মেলে।
নিয়ে এলেন সত্য, শৌচ, দয়া, শান্তি, ত্যাগ, সন্তোষ আর আর্জব। শম দম তপ সাম্য তিতিক্ষা শ্রুত আর উপরতি। নিয়ে এলেন প্রেম। প্রেমের অমোঘ মহিমা।
ভগবান ভূতভাবন হিন্দু ধর্মের মন্ত্রাঙ্কিত পতাকা নিয়ে অবতীর্ণ হলেন দক্ষিনেশ্বরে। যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত—হতপ্রভ সূর্য উদ্দীপিত হল। ঠাকুর মৃতদেহে নিশ্বাস সঞ্চার করলেন। ক্রমে ক্রমে সঞ্চার করলেন আশ্বাস। তার পর সকলে বিশ্বাসের বটপত্রে ভেসে-ভেসে চলল। ভেসে চলল সেই অমৃতের সমুদ্রে।
দক্ষিণেশ্বরের দূর্গম অরণ্যে সরল একটি ফুল ফুটেছে। কিন্তু লোকে তার গন্ধটির খবর পায় কি করে? ফুল তো ফুটলেই চলে না, চাই গন্ধবহ সমীরণ। যে বলবে, দেখ, কেমন ফুল ফুটেছে, আর, শোনো, আমার সঙ্গ ধরো, দেখবে চলো, কোথায় ফুটেছে এ ফুল! আমি নিয়ে এসেছি সেই কাননের ঠিকানা। কেশব সেনই সেই গন্ধবহ সমীরণ।
৬
কেশব সেনকে রামকৃষ্ণ প্রথমে দেখে আদি সমাজে, সে অনেক আগে। মসজিদ ঘুরে, গির্জে ঘুরে গিয়েছিল এক দিন ব্রাহ্মসভায়। গিয়ে দেখে বেদীর উপর চার পাশে অনেক লোক, মাঝখানে কেশব। ধ্যান করছে চোখ বুজে।
জোড়াসাঁকোর দেবেন্দ্রের সমাজে গিয়ে দেখলাম, তাকের উপর ক’জন বসেছে, কেশব মাঝখানে। দেখলাম যেন কাষ্ঠবৎ। সেজবাবুকে বললাম, যত জন ধ্যান করছে তার মধ্যে ঐ কেশব ছোকরারই ফাত্না ডুবেছে। ও কি যে-সে ছেলে? লেখাপড়া নেই, বাপের ধার মেনে নিলে এক কথায়। অন্য ছেলে হলে মানত?”
কিন্তু চোখ বুজেই বা ধ্যান করতে হবে কেন? চোখ চেয়েও ধ্যান হয়। কথা কইছে তবু ধ্যান। যেমন ধরো দাঁতের ব্যথা। সব কাজ করছে কিন্তু মন রয়েছে দরদের দিকে। চোখ চেয়ে আছে, কথা কইছে, কাজ করছে, কিন্তু মন রয়েছে ভগবানে বিদ্ধ হয়ে। তিনিও আমাকে চান, আমিও তাঁকে চাই, তবু ধরতে পারছি না, মিলতে পারছি না-এ কি কম যন্ত্রণা?
এবার শুধু দূর থেকে দেখা নয়, কাছে এসে বসা, আলাপ করা, অন্তরের অঙ্গ হয়ে যাওয়া। তার আগে কেশবকে এক দিন স্বপ্নে দেখেছিল রামকৃষ্ণ। মা-ই দেখিয়েছিলেন। কেশব যেন পেখম মেলা ময়ূর, ময়ূরের মাথায় মুক্তো। মা-ই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। পেখম হচ্ছে কেশবের শিষ্যমণ্ডল আর মুক্তোটি হচ্ছে তার রাজসিকতার দীপ্তি।
সকাল বেলার দিকে কেশব তার শিষ্যবৃন্দ নিয়ে পুকুরের বাঁধাঘাটে বসে আছে, হৃদয় আস্তে-আস্তে কাছে এল। বললে, ‘আমার মামা আপনার সঙ্গে দেখা করতে চান।’
কে আপনার মামা?
ঐ দক্ষিণেশ্বরে থাকেন। হরিকথা শুনতে বড় ভালোবাসেন। সারা দিনরাত ডুবে আছেন এই হরিকথায়। যেখানে হরিনাম পান হরিভক্ত পান সেখানেই গিয়ে উপস্থিত হন। হরিগুণগান শুনে তাঁর ভাবসমাধি হয়। আপনি এখানে হরিনাম করতে এসেছেন জেনে আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।
“কোথায় তিনি?”
‘গাড়িতে বসে আছেন।
“নিয়ে আসুন নামিয়ে।’ কেশব ব্যস্ত হয়ে উঠল।
হৃদয় গিয়ে নামিয়ে নিয়ে এল রামকৃষ্ণকে। সবাই রামকৃষ্ণকে দেখবার জন্যে উদগ্রীব হয়ে রয়েছে। দেখে হতাশ হবার ভাব করল। ও! এই? এ তো এক জন সাধারণ লোক। আজেবাজে পাঁচ জনেরই এক জন।
রামকৃষ্ণ বুঝতে পেরেছেন কোন জন কেশব। বুকের ভিতরে তারে তারে সুর বেজে উঠল। কেশবের কাছে আসবার আগে নারায়ণ শাস্ত্রীকে পাঠিয়েছিল একবার রামকৃষ্ণ। বলেছিল, তুমি একবার যাও, গিয়ে দেখে এস তো কেমন লোক। নারায়ণ দেখে এসে বলেছিল লোকটা জপে সিদ্ধ।
রামকৃষ্ণ কেশবের কাছটিতে চলে এল। বললে, ‘বাবু, তোমাদের কাছে ঈশ্বরের কথা শুনতে এসেছি। তোমরা না কি দেখেছ ঈশ্বরকে? সে কেমনতরো দর্শন আমাকে একটু বলবে?
কেশব তন্ময়ের মত তাকিয়ে রইল রামকৃষ্ণের দিকে। এ সে কী দেখছে? কাকে দেখছে? বললে, ‘আপনি বলুন’–
আমি বলব? গলা ছেড়ে গান ধরল রামকৃষ্ণ।
কে জানে কালী কেমন,
ষড়দর্শনে না পায় দরশন,
মূলাধারে সহস্রারে,
সদা যোগী করে মনন।
ঘটে ঘটে বিরাজ করেন
ইচ্ছাময়ীর ইচ্ছা যেমন।
মায়ের উদরে ব্রহ্মান্ড-ভান্ড
প্রকান্ড তা জানো কেমন,
মহাকাল জেনেছেন কালীর মর্ম,
অন্য কেবা জানে তেমন।
প্রসাদ ভাষে লোকে হাসে,
সন্তরণে সিন্ধু তরণ॥’
গাইতে গাইতে রামকৃষ্ণের সমাধি হয়ে গেল। উপস্থিত সকলে ভাবলে এ বুঝি একটা ঢং, মস্তিষ্কের বিকার। কিংবা হয়তো লোকটার মৃগি আছে।
রামকৃষ্ণের কানে হৃদয় প্রণব মন্ত্র উচ্চারণ করতে লাগল। হরি ওঁ! হরি ওঁ! ধীরে-ধীরে রামকৃষ্ণের মুখ প্রসন্ন পবিত্র হাস্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। যে আস্বাদন করে এসেছে, অবগাহন করে এসেছে এ তার মুখ। এ মুখ উপলব্ধির, সমাপত্তির। জ্ঞানানন্দ, বোধানন্দ আর মিলনানন্দের সংমিশ্রণ।
এ মুখের বিভা দেখে অভিভূত হয়ে গেল সকলে।
অন্ধেরা হাতি দেখে এল ছুঁয়ে-ছুঁয়ে। এক জনের হাত পড়েছিল পায়ে, সে বললে, হাতি ঠিক থামের মতো। আরেক জনের হাত পড়েছিল পেটে, সে বললে, জলের জালার মতো। দূর, কুলোর মতো—কানে হাত রেখেছিল যে তৃতীয় জন, সে বললে।
‘ভাবলে ভাবের উদয় হয়।
যেমনি ভাব তেমনি লাভ মূল সে প্রত্যয়।’
গাছে এক গিরগিটি থাকে। এক জন তাকে দেখে এসে বললে, একটা সুন্দর লাল রঙের জানোয়ার দেখলাম। আরেক জন বললে, ভুল দেখেছিস, লাল নয় নীল। তোরা তো খুব জানিস! আমি স্বচক্ষে দেখে এসেছি আজ সকালে, বিলকুল হলদে। বললে তৃতীয় জন। কাকে যে তোরা কী রঙ বলিস কিছু ঠিক নেই। বিদ্রূপ করে হেসে উঠল চতুর্থ জন। স্রেফ সবুজ, একেবারে কচু পাতার রঙ। মহাবিরোধ উপস্থিত। সবাই মিলে চলল সেই গাছের নিচে। গিয়ে দেখে এক জন লোক বসে আছে সেখানে। তাকে সবাই ধরল। আপনি তো এখানকার বাসিন্দা, বলুন জানোয়ারটার কী রঙ? যে যেমন দেখ তেমনি। তোমাদের সকলের কথাই ঠিক, ও কখনো লাল কখনো নীল কখনো হলদে কখনো সবুজ। ওটা বহুরূপী। আবার কখনো-কখনো দেখা যাবে ওটার একদম রঙ নেই। ওটা বর্ণহীন, নির্গুণ।
সবাই তন্ময় হয়ে শুনতে লাগল রামকৃষ্ণকে।
ভক্ত যে রূপটি ভালোবাসে ভগবান সেই রূপটি ধরে দেখা দেন। এক জনের এক গামলা রঙ ছিল। অনেকে আসত তার কাছে কাপড় রঙ করবার জন্যে। যে যে-রঙ চায় তার কাপড় সেই রঙে ছুপিয়ে দিত। এক জন দেখছিল এই আশ্চর্য ব্যাপার। তাকে রঙওয়ালা জিজ্ঞেস করলে, তোমার কী রঙ চাই? সে বললে, ‘ভাই যে রঙে রঙেছ আমায় সেই রঙ দাও।’
কী গভীর কথা কেমন সরস করে বলছে রামকৃষ্ণ। স্নানাহারের বেলা হয়ে গেল তবু কারু ওঠবার নাম নেই।
নিরাকার জ্ঞানের সাধন, সাকার ভক্তির। ভক্তির কাছে নিরাকার এনো না, কিছু দেখতে না পেলে ধরতে না পেলে তার ভক্তির হানি হবে। সাকার থেকে চলে আসবে সে নিরাকারে। আগে হয়তো দশভুজা নিলে—সে মূর্তিতে বেশি ঐশ্বর্য। তার পর চতুর্ভুজ। তার পর দ্বিভুজ। তার পর গোপাল- বালগোপাল। ঐশ্বর্যের বালাই নেই, কেবল একটি কচি ছেলের মূর্তি। তার পরে আরো ছোট হয়ে গেল—একটি শিবলিঙ্গ বা শালগ্রাম। তার পর? আর দরকার নেই রূপে। প্রতীক তখন প্রত্যক্ষের বাইরে। তখন মহাব্যোমে একটি অখণ্ড জ্যোতি। সেই জ্যোতি দর্শন করেই লয়।
কিন্তু তার পর? ধ্যান যখন ভাঙবে? জ্ঞানের পর কোথায় এসে দাঁড়াবে? দাঁড়াবে এসে প্রেমে। তখন আবার সাকারে চলে আসবে। তখন দেখবে সমস্ত জীব ঈশ্বরের প্রতিভাস। জীবের আকারে ব্রহ্ম বিচরণ করছেন। তখন ব্রহ্মোপাসনা মানে জীবোপাসনা। আর জীবে যা প্রেম ঈশ্বরে তাই ভক্তি। আর, ভক্তির প্রগাঢ় পরিপক্ক অবস্থাই প্ৰেম৷
উপাসনার ঘণ্টা বাজল। এখন উঠতে হয় এই আড্ডা ছেড়ে।
কে ওঠে! কোথায় আবার উপাসনা! ভগবানের কাছটিতে বসাই তো উপাসনা। এ কি আমরা ভগবানের কাছটিতে বসে নেই?
বেদান্তের বিচারে ব্রহ্ম নির্গুণ। তাঁর কী স্বরূপ কেউ বলতে পারে না। কিন্তু যতক্ষণ তুমি সত্য ততক্ষণ জগৎও সত্য। ঈশ্বরের নানা রূপও সত্য। ঈশ্বরকে ব্যক্তিবোধও সত্য।
দুই-ই সত্য। নিরাকারও সত্য, সাকারও সত্য। কবীর বলত, নিরাকার আমার বাপ, সাকার আমার মা। তুমি কাকে ছেড়ে কাকে রাখবে?
নানা রকম পূজা তিনিই আয়োজন করেছেন, অধিকারী ভেদে। যার যেমন পেটে সয় তেমনিই তো পরিবেশন করবেন। বাড়িতে যদি বড় মাছ আসে, মা নানা রকম মাছের তরকারি রাঁধেন—যার যেটি মুখে রোচে। কার জন্যে মাছের টক, কার জন্যে মাছের চচ্চড়ি, কারু জন্যে মাছ ভাজা। যেটি যার ভালো লাগে, যেটি যার পেটে সয়। সর্বত্রই সেই মৎস্যস্বাদ।
আমাদের হলধারী দিনে সাকারে আর রাতে নিরাকারে থাকত। তা যে ভাবেই থাকো, ঠিক-ঠিক বিশ্বাস হলেই হল। বিশ্বাস, বিশ্বাস, বিশ্বাস। গুরু বলে দিয়েছে, রামই সব হয়েছেন—ওহি রাম ঘট ঘটমে লেটা।’ কুকুর এসে রুটি খেয়ে যাচ্ছে। ভক্ত বলছে, ‘রাম ! দাঁড়াও, দাঁড়াও, রুটিতে ঘি মেখে দিই।’ গুরুবাক্যে এমনি বিশ্বাস।
কিন্তু যাই বলো, সাকারই বলো নিরাকারই বলো, তিনি রয়েছেন এই খোলের মধ্যেই। হরিণের নাভিতে কস্তুরী হয়, তখন তার গন্ধে হরিণগুলো দিকে-দিকে ছুটে বেড়ায়, জানে না কোত্থেকে গন্ধ আসছে। তেমনি ভগবান এই মানুষের দেহের মধ্যেই রয়েছেন, মানুষ তাকে জানতে না পেরে ঘুরে-ঘুরে মরছে।
এ কি, আজ কি আর কোনো কাজ হবে না না কি? সবাই এমনি বসে থাকবে সারাক্ষণ? মন্ত্রমুগ্ধের মত বসে আছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে আছে। চার দিকে শুধু আনন্দের ঢেউ।
এ যেন গরুর পালে গরু এসেছে। ঝাঁকের কই মিশেছে ঝাঁকে এসে। তাই এত লহর পড়েছে চার দিকে।’
কেশব ভক্তিতে অভিভূত হয়ে পড়েছে। এমনটি তো সে কই ভাবেনি। এ যে একেবারে ‘আদিত্যবর্ণং তমসঃ পরস্তাৎ।’ ভূমার অখণ্ড অভ্যুদয়। প্রণামের রসে আপ্লুত হল কেশব। নিজেকে বালকের মতন মনে হল। চিনির পাহাড়ের কাছে ক্ষুদ্র এক পিপীলিকা।
“নিশ্চয়ই ঈশ্বর দেখেছে, পেয়েছে, হয়েছে। নইলে এমন সব কথা কয়। কথায় কথায় “এমন একটি ভাব আনে। এমন সব সহজ করে দেয় সহজে।
তর্কের জায়গা নেই, প্রশ্ন সব ঘুমিয়ে পড়েছে। সন্দেহ মাথা তুলতে পারছে না। চোখের সামনে বসে আছে যেন প্রত্যক্ষ প্রমাণ। সর্বশেষ উপলব্ধি।
উঠল রামকৃষ্ণ। যাবার আগে কেশবকে বললে, ‘তোমার ল্যাজ খসেছে।’
কেশব তো অবাক।
ব্যাঙাচির যদ্দিন ল্যাজ থাকে তদ্দিন জলেই থাকে, ডাঙায় উঠতে পারে না। কিন্তু ল্যাজ যখন খসে পড়ে তখন জলেও থাকতে পারে, ডাঙায়ও উঠতে পারে। তেমনি মানুষের যদ্দিন অবিদ্যার ল্যাজ থাকে তদ্দিন সে সংসার-জলেই থাকতে পারে, ব্রহ্মস্থলে উঠতে পারে না। ল্যাজ খসে পড়লেই সংসার ও সারাৎসার দুই জায়গায়ই সে থাকতে পারে। তুমি তেমনি সংসারেও আছ সচ্চিদানন্দেও আছে।
সংসারে থেকে যে তাঁকে ডাকে সে বীরভক্ত। যে সংসার ছেড়ে এসেছে সে তো ডাকবেই-ডাকবার জন্যেই এসেছে, তাতে তার বাহাদুরি কি। সংসারে থেকে যে ডাকে, সে বিশ মণ পাথর ঠেলে দেখতে চায়, সেই ধন্য, সেই বাহাদুর, সেই বীর-পুরুষ।
রামকৃষ্ণ চলে গেলে এ ওর মুখে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। এই সহজ সুন্দরটি কে? কে এই সদয়হৃদয়? কে এই মায়ামানুষবেশী?
চলো যাই সভা করে সবাইকে বলি গে। অখিল মধুরের যিনি অধিপতি তিনি এসেছেন দক্ষিণেশ্বরে।
তুমি কি তাঁকে চোখে দেখেছ? সবাই ঘিরে ধরে কেশবকে।
চোখে দেখেছি। দুই চোখে তাঁকে কুলোয় না। চল তোরাও দেখবি চল।
৭
দক্ষিণেশ্বরে চর পাঠিয়ে দিল কেশব। লক্ষ্য করবে রামকৃষ্ণকে। চোখে-চোখে রাখবে। রাত-দিন পাহারা দেবে। ঠিক-ঠিক খাঁটি কিনা, না, আছে কিছু বুজরকি।
হ্যাঁ, ভালো কথা, বাজিয়ে নাও, যাচাই করে নাও। পরের মুখের ঝাল খাবে কেন? কেন মেনে নেবে শোনা কথা? নিজে এসো, বসো, দেখ পরখ করে। তন্ন-তন্ন করে দেখ।
কিন্তু পরীক্ষার পর প্রমাণে যদি পরিতৃপ্ত হও, তখন কী হবে? কোন দিকে যাত্রা করবে?
তিন জন ব্রাহ্ম-ভক্ত এল দক্ষিণেশ্বরে। তাদের মধ্যে এক জন প্রসন্ন। পালা করে রাত-দিন দেখবে রামকৃষ্ণকে আর কেশব সেনকে রিপোর্ট দেবে। পোশাকী আর আটপৌরে এমন কিছু ভেদ আছে নাকি রামকৃষ্ণের। সে মনে-মুখে এক কি না। সে কি সত্যিই জিতাসন, জিতশ্বাস, জিতেন্দ্রিয়? সে কি সত্যিই পরিমুক্তসঙ্গ?
রামকৃষ্ণের ঘরের মধ্যে চলে এল সটান। বললে, ‘রাত্রে আমরা ও-ঘরে শোব।
বেশ তো, শোও না! ঢালাও নিমন্ত্রণ রামকৃষ্ণের।
কিন্তু শুবি তো চুপ করে শুয়ে থাক। তা না, কেবল ‘দয়াময়’, ‘দয়াময়’ করতে লাগল। নিরাকার কিনা, তাই ঈশ্বরের দয়া ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। তাঁর ঐশ্বর্যই তো দয়া। সূর্যের ঐশ্বর্যই যেমন আলো। সূর্যকে যদি ‘আলোময়’ ‘আলোময়’ বলা যায়, কিছুই বলা হয় না। নতুন কিছু বল। ডাকার মতন করে ডাক। যে-ডাকে শুধু দয়া দেখাতে আসবে না, ভালোবাসায় গলে জল হয়ে যাবে।
ব্রাহ্ম-ভক্তরা কেশবের স্তুতি আরম্ভ করল। বলল, ‘কেশববাবুকে ধরো, তা হলেই তোমার ভালো হবে।’
কিন্তু আমি যে সাকার মানি।’
আমি যে মা বলে ডাকি। মাকে যদি নিরাকার করি তবে অমন কোলটুকু পাব কি করে? কি করে দেখব তবে সেই সুখপ্রসন্ন বদনের স্নেহময় সুষমা?
মা কি আমার সামান্য? মা আমার অনন্তরূপিণী। মা আমার কালাভ্রশ্যামলাঙ্গী,বিগলিতচিকুরা,খড়্গমুন্ডাভিরামা। মহামেঘপ্রভা, শ্মশানালয়-বাসিনী।
বলতে চাও, এমন রূপটি আমি দেখব না নয়ন ভরে? দেখব না তো, আমার নয়ন হল কেন?
শোনো, কমলাকান্ত কি বলছে। দেখে, শুনতে শুনতে দেখো কিনা চোখের সামনে।
সমর আলো করে কার কামিনী।
সজল জলদ জিনিয়া কার
দশনে প্রকাশে দামিনী॥
এলায়ে চাঁচর চিকুর পাশ
সুরাসুর মাঝে না করে ত্রাস,
অট্টহাসে দানব নাশে
রণপ্রকাশে রঙ্গিণী॥
কিবা শোভা করে শ্রমজ বিন্দু
ঘন তনু ঘেরি কুমুদবন্ধু
অমিয় সিন্ধু হেরিয়ে ইন্দু
মলিন, এ কোন মোহিনী॥
এ কি অসম্ভব ভব-পরাভব
পদতলে শব সদৃশ নীরব
কমলাকান্ত কর অনুভব
কে বটে ও গজগামিনী।
এই রণরামা নীরদবরণীকে দেখব না আমি? আহা, দেখ, দেখ, শোণিত-সায়রে যেন নীল নলিনী ভাসছে!
তবুও ব্রাহ্ম-ভক্তরা কেবল ‘দয়াময়’ ‘দয়াময়’ করে। ঘুমুতে দেবে না রামকৃষ্ণকে।
তখন রামকৃষ্ণের ভাবাবস্থা হল। সেই অবস্থায় আরূঢ় থেকে বললে সেই ভক্তদের, ‘এ ঘর থেকে চলে যাও বলছি।’
যেন বজ্রঘোষের আদেশ। ভক্তরা তখন পালিয়ে যেতে পথ পায় না। ঘর ছেড়ে তখন বারান্দায় গিয়ে শুলো।
কাপ্তেনও এমনি পরীক্ষা করে নিয়েছিল। যেদিন দিনের বেলায় প্রথম দেখলে রামকৃষ্ণকে, ঠিক করলে রাতের বেলাও দেখে যেতে হবে। দেখে যেতে হবে রাতেও এ সূর্য সমপ্রভই থাকে কিনা। কোণটিতে চুপি-চুপি রইল চোখ মেলে। দেখল এ সূর্যের উদয়াচলই আছে, অস্তাচল নেই।
আমাকে শক্ত হাতে বাজিয়ে নিবি, যেমন করে শানের উপরে মহাজনে টাকা বাজায়। ব্যাপারী যেমন তীক্ষ্ণ চোখে দেখে নেয় মালের টূটা-ফুটা। ভক্ত হয়েছিস বলে বোকা হবি কেন? বুঝে-সুঝে দেখে-শুনে নিবি। সন্দেহই যদি রাখবি তবে সন্ধান জানবি কি করে?
নরেন্দ্র দক্ষিণেশ্বরে এসেছে। ঠাকুরের ঘরটিতে গিয়ে দেখে, ঠাকুর নেই। কোথায় তিনি? কলকাতায় গিয়েছেন। ফিরবেন কখন? এই এলেন বলে।
তা হোক, এই সোনার সময়। দেখা যাক কেমন তাঁর সোনার উপর বিতৃষ্ণা। ঘর ফাঁকা হতেই পকেট থেকে একটা টাকা বের করলে নরেন। ঠাকুরের বিছানার নিচে আলগোছে লুকিয়ে রাখলে। সে তল্লাটেই আর রইল না তার পর। সিধে চলে গেল পঞ্চবটী। কেউ যেন ঘুণাক্ষরে না টের পায়।
কতক্ষণ পরেই ফিরে এলেন ঠাকুর। দেখতে পেয়েই নরেন এগিয়ে এল তাড়াতাড়ি। এবার বোঝা যাবে কাঞ্চনত্যাগের মহিমা। ঘরের মধ্যে আগে-ভাগে ঢুকে ঠিক কোণটি বেছে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ।
যেমন নিত্য বসেন তেমনি বিছানায় এসে বসলেন ঠাকুর। কিন্তু গা ঠেকিয়েছেন কি না ঠেকিয়েছেন চীৎকার করে উঠলেন। যেন জ্বলন্ত অঙ্গারের উপর বসেছেন এমনি দগ্ধকর যন্ত্রণা। কী হল? ত্রস্তব্যস্ত হয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল সকলে। বিষাক্ত কিছু দংশন করল নাকি? কই, বিছানায় কিছু দেখা যাচ্ছে না তো!
ঠাকুর সরে দাঁড়ালেন খাটের থেকে। কাছাকাছি যারা ছিল সবল হাতে ঝাড়তে লাগল বিছানা। টং-টং করে হঠাৎ একটা আওয়াজ হল মেঝের উপর। ওটা কি? ওটা একটা টাকা দেখছি না? বিছানায় এল কি করে?
নরেন তাড়াতাড়ি চলে গেল ঘর ছেড়ে।
বুঝেছি, বুঝেছি। আনন্দে ঠাকুর বিহ্বল হয়ে উঠলেন। তুই আমাকে পরীক্ষা করছিস।
বেশ তো, নিবিই তো পরীক্ষা করে। কত পরীক্ষা করেছেন মথুরবাবু। ফাঁকা ঘরে মেয়েমানুষ ঢুকিয়ে দিয়েছেন, বলেছেন জমিদারির খানিকটা তোমাকে লিখে দি। তোদের যার যেমন মন চায় যাচাই করে নে। যা চাই তা পাব কিনা-এ জিজ্ঞাসায় যখন এসেছিস তখন যাচাই করা ছাড়বি কেন?
তোদের সকলের সন্দেহ নিরসন করে নে। চলে আয় সত্যের স্থিরতায়। সিদ্ধান্তের শান্তিতে।
দক্ষিণেশ্বরের জমিদার নবীন রায়চৌধুরীর ছেলে যোগীন। বিয়ে করেছে, তবু রোজ রাতে বাড়ি যায় না, প্রায়ই ঠাকুরের কাছটিতে পড়ে থাকে। যখন আর-আর ভক্তরা কাছে-ভিতে কেউ নেই, তখন ফাঁকতালে ঠাকুরের কোনো কাজে লেগে যেতে পারে কিনা, তারই আশায় জেগে থাকে।
সেদিন সন্ধ্যে হতে-না-হতেই ভক্তেরা বিদায় নিয়েছে। যোগীন বসে আছে একলাটি।
“কি রে, বাড়ি খাবি না?”
‘কেউ আজ নেই আপনার কাছে। ভাবছি, আমিই তবে থেকে যাই রাতখানা।”
ঠাকুর খুশি হলেন। রাত দশটা পর্যন্ত আলাপ করলেন একটানা। আলাপের বিষয়ও সেই একটানের বিষয়। অটনে-অনটনে সেই এই ঈশ্বরের টান।
রাত দশটায় জলযোগ করলেন ঠাকুর। যোগীনও খেয়ে নিল কালীঘরে। ঠাকুর শুয়ে পড়লেন তাঁর বড় খাটটিতে। সেই ঘরেই মেঝেতে বিছানা পাতল যোগীন। মাঝ রাত। ঠাকুরের একটিবার বাইরে যাবার দরকার হল। তিনি তাকালেন যোগীনের দিকে। অঘোরে ঘুমুচ্ছে ছেলেটা। কেমন মায়া হল ঠাকুরের, ডেকে ঘুম ভাঙালেন না। নিজেই দোর খুলে বেরিয়ে গেলেন। একা একা চলে গেলেন ঝাউতলা।
খানিক পরেই ঘুম ভেঙে গেল যোগীনের। এ কি, ঘরের দরজা খোলা কেন? ঠাকুর কোথায়? বিছানা শূন্য। এত রাত্রে কোথায় গেলেন তিনি একা-একা? গাড়ু-গামছা তো সব ঠিক-ঠিক জায়গায়ই আছে। আর, তাই যদি যাবেন, তবে তাকে দাঁড়িয়ে দিতে নিয়ে গেলেন না কেন সঙ্গে করে? তবে বোধ হয় চাঁদের আলোয় একটু বেড়িয়ে বেড়াচ্ছেন। গঙ্গায় ঝিরঝিরে হাওয়া দিয়েছে। কই, গঙ্গার কাছাকাছি কোথাও তিনি নেই তো! যোগীন বাইরে এসে উৎসুক চোখে দেখতে লাগল চার দিক। কোথাও সাড়াও নেই শব্দও নেই। হঠাৎ বুকের মধ্যে ধাক্কা খেল যোগীন। ঠাকুর লুকিয়ে তাঁর স্ত্রীর কাছে নহবৎখানায় যাননি তো? ভয় করতে লাগল যোগীনের। দিনের বেলা তিনি যা বলেন রাতের বেলা তিনি তা পালন করেন না? ডুবে-ডুবে জল খান?
না, এর একটা হেস্তনেস্ত দেখে যেতে হবে। নহবতখানার কাছাকাছি এগিয়ে গেল যোগীন। নিষ্পলক চোখে চেয়ে রইল দরজার দিকে। ব্যাপারটা অন্যায় হচ্ছে তবু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত মুক্তি নেই।
দরজা খুলে ঠাকুর বেরিয়ে এলেই দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে সোজা বাড়ি চলে যাবে যোগীন। পথ ভুলেও আসবে না এ তল্লাটে।
সমস্ত আকাশ বাতাস যেন নিশ্বাস রুদ্ধ করে আছে। একটি গাছের পাতাও নড়ছে না। উৎসুক একটা প্রতীক্ষা মুহুর্তের মালায় স্তব্ধতার মন্ত্র জপ করে চলেছে। যিনি অচ্যুত তিনি যেন এখুনি বিচ্যুত হয়ে পড়বেন!
চট-চট—চটি জুতোর আওয়াজ শোনা গেল। কে যেন আসছে পঞ্চবটীর ওদিক থেকে। কান খাড়া করল যোগীন। এ তো সেই পরিচিত পদশব্দ। সর্বাঙ্গে শিউরে উঠে তাকাল চন্দ্রালোকে। সত্যিই তো, ঠাকুরই তো আসছেন।
কে কাকে ধরে ফেলে। যোগীনের ইচ্ছে হল মাটির সঙ্গে মিশে যাই। যে মাটিতে তিনি পা রেখেছেন সেই পদস্পর্শনের মাটিতে।
‘কি রে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস যে?” কাছে এসে প্রশান্ত বয়ানে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।
অধোমুখে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল যোগীন।
অন্তরদর্শী বুঝেছেন এক পলকে। তবু অপরাধ নেবার নাম নেই। তবু আশ্বাসের স্নেহচ্ছত্র মেলে ধরলেন সচ্ছন্দে। বললেন, বেশ, বেশ, এই তো চাই। সাধুকে সহজে বিশ্বাস করবি নে। সাধুকে দিনে দেখবি, রাতে দেখবি, তবে বিশ্বাস করবি। নে চল, ঠিক করেছিস, এখন ঘরে আয়।’
ঠাকুরের পিছু-পিছু ঘরে ঢুকল যোগীন।
সারারাত আর ঘুম এলো না যোগীনের। মনে মনে বারংবার ক্ষমা চাইতে লাগল সেই ক্ষমাময়ের কাছে।
ভগবানকে ছোট করেছেন বলে ব্যাসদেব যেমন ক্ষমা চেয়েছিলেন। বলেছিলেন, হে জগদীশ্বর, তুমি রূপবর্জিত, অথচ আমি ধ্যানে তোমার রূপকল্পনা করেছি। তুমি অখিলগুরু, বাক্যের অতীত, অথচ আমি স্তবস্তুতি করে তোমার অনির্বচনীয়তা নষ্ট করেছি। তুমি সর্বব্যাপী, অথচ আমি তীর্থভ্রমণ করে তোমার সেই সর্বব্যাপিত্ব খন্ডন করেছি। আমি ঘোরতর অপরাধী। আমার এই বিকল্পতা-দোষত্রয় মার্জনা করো।
তেমনি করেই আকুল অনিদ্রায় ক্ষমা চাইতে লাগলো যোগীন। তুমি সংশয়-পরিলেশশূন্য। অথচ আমি আমার আবিল মনের কুটিল সন্দেহের ছায়া ফেললাম তোমার উপর। প্রভু আমাকে ক্ষমা করো। তোমার পরিচ্ছন্ন দৃষ্টিতে আমাদের ঘনচ্ছন্ন দৃষ্টি সংশোধন করে দাও।
‘কাকে সাধু বলে মশাই?’ এক প্রতিবেশী এসে জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণকে।
‘যার মন-প্রাণ-অন্তরাত্মা ঈশ্বরে নত হয়েছে তিনিই সাধু। যিনি কামকাঞ্চনত্যাগী। যিনি স্ত্রীলোককে মাতৃবৎ দেখেন, পূজো করেন। সর্বদা ঈশ্বর চিন্তা করেন, ঈশ্বরীর কথা বই কথা কন না। আর সর্বভূতে ঈশ্বর আছে জেনে আপামর সকলের সেবা করেন।”
সাধুর আশা নেই, আসক্তি নেই। সে সতত সন্তুষ্ট। সে বহির্নিশ্চেষ্ট। তার আরম্ভ-উদ্যোগ নেই। তার সর্বত্র সমবুদ্ধি। তার ফলেও যা অফলেও তাই। তার কাছে নিন্দা-নান্দী এক কথা। শত্রু-মিত্র এক জন। তার গতি চঞ্চল কিন্তু মতিটি স্থির। তার দ্বেষ-লেশ নেই। সে প্রহ্লাদ মূর্তি। হেতু নেই অথচ ভক্তি। অকারণে অধারণ ভক্তি। প্রহ্লাদকে যখন কৃষ্ণ বর দিতে চাইলেন, প্রহ্লাদ কী বললে? বললে, ‘যদি বর দেবেনই তবে এই বর দিন, আমায় যারা কষ্ট দিয়েছে, তাদের যেন অপরাধ না হয়। তারা যেন কষ্ট না পায়।’ যে সাধু সে প্রহ্লাদের মতই সর্বভুতে হিতকামী।
তেমনি এক জন সাধু এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। অক্ষতপুণ্যলেশ। অপঙ্কতোয় অচ্ছোদ সরোবর। তাঁর নাম রামকৃষ্ণ পরমহংস। অভয়প্রদ আশ্রয়কেতন। তাঁকে দেখবে চলো দলে-দলে।
ওজস্বিনী ভাষায় বক্তৃতা দিতে লাগল কেশব সেন। সাধারণ বক্তৃতামঞ্চ থেকে, এমন কি ব্রাহ্মসমাজের বেদীতে বসে স্বশান্তরূপ স্বরূপানন্দ রামকৃষ্ণ। একেবারে বালকস্বভাব। ঘরের কাছে এই অনন্ত ধনের খবর না নিয়ে যাবে তোমরা বিদেশের বিপণিতে?
শুধু রসনা নয়, তেজস্বিনী লেখনি চালালে কেশব। সুলভ সমাচার,সানডে মিরর আর থিইস্টিক কোয়াটার্লি রিভিউ-তে লিখতে লাগল।
ওরে আর কেউ নয়, কেশব সেন বলছে, কেশব সেন লিখছে। যেমন তপ্ত ভাষা, তেমনি দীপ্ত লেখা। এ কি ফেলা চলে? দেখছিস, বলতে-বলতে কেশবের গৌর আনন কেমন আরক্ত হয়ে উঠছে। একেই বুঝি বলে প্রত্য্যয়প্রতিভা। কি রে, কি বলছিস, যাবি একবার দক্ষিণেশ্বর? স্বচক্ষে দেখে আসবি?
আর, ওদিকে রামকৃষ্ণ ডাকছে আকুল কণ্ঠে, ওরে, তোরা কোথায়? তোদের ছাড়া আমি যে থাকতে পারছি না। আকাঠের মাঝে কোথায় তোরা সব চন্দন তরু? ধীরতার মাঝে বেগ, জড়তার মাঝে বল,ভীরুতার মাঝে বীর্য-কোথায় তোরা সব সৈনিক সন্ন্যাসী। চলে আয়। বন-জঙ্গল ভেদ করে নদীনালা সাঁতরে তীরবেগে বায়ুবেগে মনোবেগে চলে আয়। আমি তোদের জন্যে কত কথা কত ভাব কত ভালোবাসা নিয়ে বসে আছি। কত গান কত সুর কত নৃত্য। কত স্বাদ কত রুচি। চলে আয়, চলে আয়।
৮
কয়াপাটের হাটতলা। সারদাকে নিয়ে এসেছেন শ্যামাসুন্দরী। এসেছেন পিলে দাগাতে।
শিবমন্দিরের অঙ্গনে বহু লোকের ভিড়। জ্বরে জ্বরে সবাই সারা হয়ে গেল। পিলে-দাগানো লোকটিকে ঘিরে সবাইর কাতর ঔৎসুক্য। কার কখন ডাক পড়ে। সবাই পিলে দাগাবে।
খানিকটা আগুন, লোহার শিক আর একটা কি পাতা। এই শুধু সরঞ্জাম। এতেই পিলে পালাবে দেশ ছেড়ে। আর মাথা তুলতে পাবে না।
বেলা বেড়ে যাচ্ছে। আবার ফিরতে হবে বাড়ি। কত রাজ্যের পথ। শ্যামাসুন্দরী অসহিষ্ণু হয়ে উঠলেন।
মেয়েকে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে আছি বাবা। যদি একটু এদিক পানে হাত দাও।
মেয়ে আমার জ্বরে-জ্বরে ঝুর-ঝুর হল।’
এই যে যাচ্ছি মা। দেখছ তো গাহেকের ভিড়–
তোমার জন্যে একখানা নতুন কাপড় এনেছি। চান করে পরো। একটু জল খাও, তাও এনেছি তোমার জন্যে–
লোকটি বুঝি এতক্ষনে সজাগ হলো।
কিন্তু নতুন পাতায় নতুন আগুন নাও। মেয়ে আমার গঙ্গাজলের মতন শুচি।
তাই হল। পিলে দেগে দিল সারদার।
পিলে আরাম হলো বটে, কিন্তু সংসারের দারিদ্র আর যায় না। শ্যামাসুন্দরী বাঁড়ুয্যেদের ধান ভানেন। ষোলো কুড়িতে এক আড়া। এক আড়া ধান ভেনে চার কুড়ি ধান পায়। মায়ের সঙ্গে সারদাও হাত লাগায়।
গাঁয়ে কালীপুজো হবে। বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুজোর চাল যোগাড় হচ্ছে। তাদের বাড়ির বরাদ্দ চাল যোগাড় করে রেখেছেন শ্যামাসুন্দরী। কিন্তু গাঁয়ের মোড়ল নব মুখুজ্জে নিলে না সে চাল। কি নিয়ে আড়াআড়ি হয়েছে কে জানে, শ্যামাসুন্দরীর পুজোর চাল ফিরিয়ে দিলে। শ্যামাসুন্দরী সমস্ত রাত কাঁদলেন। বললেন, ‘কালীর জন্যে চাল করেছি, নিলে না, ফিরিয়ে দিলে? এখন এ চাল আমার কে খায়? কাকে দিই?
কাঁদতে-কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে মাটির উপর শুয়ে পড়েছেন। রাত হয়েছে। হঠাৎ চোখ চেয়ে দেখেন দোরগোড়ায় কে এক জন সুন্দরী স্ত্রী বসে আছে চুপচাপ। বসে আছে পায়ের উপর পা দিয়ে। মুখ-হাত-পা সব লাল। প্রথম সূর্য উঠলে যেমন হয়, তেমনি অরুণ বর্ণের ঝলস দিয়েছে চার দিকে।
স্ত্রীলোকটি কাছে এসে গা চাপড়ে চাপড়ে ওঠালেন শ্যামাসুন্দরীকে।
‘তুমি কাঁদছ কেন? তোমার কালীর চাল আমি খাব।’
শ্যামাসুন্দরী তো অবাক। মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে শুধোলেন, ‘তুমি কে?”’ঐ যে গো–এর পরেই যার পূজো হয়। সেই আমি।’
পরদিন সারদাকে জিজ্ঞেস করলেন শ্যামাসুন্দরী, ‘গায়ের রঙ লাল, পায়ের উপর পা দিয়ে বসে–ও কোন ঠাকুর রে সারদা?’
‘জগদ্ধাত্রী।’
‘আমি জগদ্ধাত্রীর পূজো করব।’
কিন্তু ওটুকু চালে হবে না। আরো চাল লাগবে। বিশ্বাসদের থেকে দু আড়া ধান আনালেন শ্যামাসুন্দরী। ধান আনালেন তো বৃষ্টি নামল অঝোরে। এক দিনও ফাঁক নেই, সুজ্জি গিয়েছে বনবাসে। চাটাই বিছিয়ে, ধান মেলে বসে আছি কবে থেকে। শ্যামাসুন্দরী হতাশার সুর ধরলেন, কি করে তবে আর তোমার পুজো হবে মা? ধানই শুকুতে পাল্লুম নি, তবে চাল করব কি করে? চার দিকে বৃষ্টি, শ্যামাসুন্দরী ধানের চাটাইয়ে রোদ। জগদ্ধাত্রীর আশীর্বাদ। কাঠের আগুনে সেঁকে মূর্তি শুকিয়ে রঙ দেওয়া হল। পুজোর পর প্রতিমা বিসর্জনের সময় শ্যামাসুন্দরী মূর্তির কানে বলে দিলেন, মা জগাই, আবার আর বছর এসো। আমি বছর ভোর তোমার সব যোগাড় করে রাখব।’
জগদ্ধাত্রীর পুজো করেই শ্রী ফিরল সংসারের।
মেয়েকে শ্যামাসুন্দরী বললেন, তুমি কিছু দিও, আমার জগাইয়ের পুজো হবে।”
সারদা থমকে গেল। বলেল, ‘আমি আবার কি দেব! ও সব ল্যাঠা আমি পারব নি। একবার পুজো তো হলো,আবার কেন?
রাত্রে স্বপ্ন দেখল সারদা। তিন জন কে-কে দাঁড়িয়েছে তার সামনে। বলছে,’আমরা কি তবে যাব?
কে তোমরা?
আমি জগদ্ধাত্রী—আর এরা জয়া-বিজয়া।
‘না মা, তোমাদের যেতে বলিনি, কোথা যাবে তোমরা? তোমরা থাকো, যেও না।’ গলায় আঁচল দিয়ে জগদ্ধাত্রীর পায়ে গড় করল সারদা।
সারদা আর কি দেবে। শ্রম দেবে, সেবা দেবে। অন্তরের নিষ্ঠা দেবে। জগদ্ধাত্রীর পুজোর সময় সারদা গিয়ে তাই বাসন মেজে দেয়।
‘সেই থেকে বরাবর জগদ্ধাত্রী পুজোতে জয়রামবাটি যাই–বাসন মাজতে হয় কিনা।’ বললেন শ্রীমা, ‘শেষকালে যোগীন সব কাঠের বাসন করে দিলে। বললে, মা, তোমাকে আর যেতে হবে না বাসন মাজতে।’
প্রতিমা বিসর্জনের সময় জগদ্ধাত্রীর কানের গয়না একটি খুলে রাখলে।
সেইটিই মনে করে মা আবার আসবেন পরের বছর।’ বললেন শ্রীমা।
মা আমাদের রাজরাজেশ্বরী।
তাঁর ফিরে আসতে আভরণের আকর্ষণ লাগে না। তিনি যে দীন-দরিদ্রের মা। শুধু একটি কাতর ‘মা’ ডাক শুনলেই তিনি চলে আসেন। ডাকও লাগে না, অন্তরে আকুলতা থাকলেই হল। প্রার্থনার চেয়েও বড় হচ্ছে আকুলতা। মুখরের চেয়েও মৌন। মুখে বললেই শুনবেন, আর মনে বললে শুনবেন না, মা কি আমাদের বধির?
মা আমাদের অমৃতভাষিণী অন্নপূর্ণা। ‘অচক্ষু সর্বত্র চান অকর্ণ শুনিতে পান। কোনো ভয় নেই। মা সর্বতন্ত্রেশ্বরী শ্রীশ্রী ভুবনেশ্বরী।
৯
তৃতীয়বার দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছে সারদা। যাচ্ছে পদব্রজে।
সঙ্গে ভূষণ মন্ডলের মা ও আরো ক’জন বর্ষীয়সী মহিলা। আর যাচ্ছে লক্ষী, আর তার ভাই শিবরাম।
কামারপুকুর থেকে আরামবাগ—আট মাইলের ধাক্কা। আরামবাগ পেরিয়েই তেলোভেলোর মাঠ। সে মাঠ পেরিয়ে তারকেশ্বর। তার পরে আবার আরেক মাঠ—কৈকলার মাঠ। কৈকলার মাঠ পেরিয়ে বৈদ্যবাটি। বৈদ্যবাটি থেকে গঙ্গা পেরিয়ে দক্ষিণেশ্বর।
তেলোভেলো আর কৈকলা এই দু মাঠে ডাকাতের আস্তানা। আর ঐ মাঠ ছাড়াও পথ নেই। পথচারীদের উপর কখন যে হামলা হবে তা ডাকাতে-কালীই বলতে পারেন। তেলো আর ভেলো, পাশাপাশি দুই গ্রাম, মাঝখানের মাঠে এক ভীমদর্শনা করালবদনা কালীমূর্তি। ঐ ডাকাতে-কালী। দস্যুদের আরাধনীয়া। ধান্যদা ধনদায়িনী। ডাক-নাম তেলোভেলোর ডাকাতে কালী। ভূতপ্রমথসেবিকা ঘোরচণ্ডী। রনরামা।
শুধু লুণ্ঠন নয়, চক্ষের পলকে খুন করে ফেলা, লাশ লোপাট করে দেওয়া। যাকে বলে গায়েবী খুন। ভাকাতের সে লাঠি বজ্রের চেয়েও নৃশংস। টাকা কড়ি যা আছে খুলে দিচ্ছি ঝুলি ঝেড়ে—এটুকু প্রস্তুত হবারও সময় দেয় না। আগে লাঠি, শেষে লুঠ। কাড়ো আর মারো নয়, মারো আর কাড়ো। এর থেকে একমাত্র উপায় হচ্ছে দল পাকিয়ে পথ হাঁটা। দল দেখে ডাকাতেরা যদি ভয় পায়। দল থাকলে পথচারীদের অন্তত সাহস বাড়ে।
সন্ধের বেশ আগেই পৌঁচেছে আরামবাগ। চলতে-চলতে সারদার পা দুখানি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। রাতটা আরামবাগে কোথাও বিশ্রাম করলে হয়। কিন্তু সঙ্গীরা নারাজ। তারা বলে, আঁধার লাগবার আগেই বেলাবেলি তেলোভেলোর মাঠ পেরিয়ে যাওয়াটাই বৃদ্ধিমানের কাজ। এখনো দিব্যি দিন আছে, সহজেই বেরিয়ে যেতে পারব। মিছিমিছি এক রাত নষ্ট করি কেন?
পথক্লান্তির কথা কাউকেও বললে না সারদা। তোমরা যখন চলেছ, আমিও চলি তোমাদের পিছে-পিছে।
কেবলই পিছিয়ে পড়ছে থেকে-থেকে। পা টেনে-টেনে তবু চলে এসেছে চার মাইল। কিন্তু তার সঙ্গীরা কোথায়?
সঙ্গীরা থেমে পড়ছে বারে বারে। থেমে পড়ছে যাতে পা চালিয়ে এসে সারদা তাদের সঙ্গ ধরতে পারে। কিছুতেই তাড়াতাড়ি চলতে পারছে না মেয়েটা। ‘কাঁহাতক তোমার জন্যে এমনি করে দাঁড়াই বলো তো! বিরক্তি জানায় সঙ্গীরা, বেলা ঢলে পড়ল, এখন একটু তাড়াতাড়ি পা চালাও।
সাধ্যমত পদক্ষেপ দ্রুত করে সারদা। কিন্তু তার সাধ্য কি, সঙ্গীদের সঙ্গে তাল রাখে। আবার সে পিছিয়ে পড়েছে। বিশ পঁচিশ হাত নয়, প্রায় সিকি মাইল। ‘এমনি করে চললে কি করে চলবে?” আবার ধমকে ওঠে সঙ্গীরা, তোমার জন্য কি সৰাই শেষকালে ডাকাতের হাতে মারা পড়ব? পশ্চিমের আকাশ-খানা একবার দেখেছ?”
সন্ধ্যার শেষ লালিমাটুকুও মিলিয়ে যায় বুঝি।
সত্যিই তো! তার একলার অক্ষমতার জন্যে সবাই কেন বিপন্ন হবে? ওদের কি দোষ! ওদের দেহে যখন শক্তি আছে তখন ওরা যাবেই তো আগ বাড়িয়ে।
নিজের সুবিধের জন্যে ওদের সে অসুবিধে ঘটাবে কেন?
তোমরা আমার জন্যে আর দাঁড়িও না—চলে যাও সোজাসুজি। সঙ্গশূন্যতার ভয়ে এতটুকু কাতর নয় সারদা। নেই এতটুকু অসহায়তার সুর। বললে, একেবারে তারকেশ্বরের চটিতে গিয়ে উঠো। আমি সেখানে গিয়েই ধরব তোমাদের। আমার শরীর আর বইছে না-আমি যাচ্ছি আস্তে-আস্তে।
যত শিগগির পারিস বেরিয়ে আয় তাড়াতাড়ি। চার দিক আঁধার হয়ে এল। মাঠের বড় দুর্নাম–
পিছনে ফিরে তাকিয়েও দেখল না। সারদাকে ফেলেই দ্রুতবেগে এগিয়ে গেল সঙ্গীরা। মিলিয়ে গেল চোখের বাইরে। জনমানবহীন বিস্তীর্ণ প্রান্তরে সারদা একা।
শরীরে আর দিচ্ছে না, তবু কষ্টে পা টেনে-টেনে চলেছে। অন্ধকারে পথ-ঘাটের ইশারা পাচ্ছে না। কোথায় যেতে কোথায় চলে আসছে কে জানে।
‘কে যায়!’ কে একজন বাঘের গলায় হমকে উঠল।
প্রকান্ড একটা কালো লোক চোখের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে। দৈত্যের মতন চেহারা। মাথায় ঝাঁকড়া চুল, হাতে রূপোর বালা, কাঁধে মস্ত লাঠি।
‘কে যায়!
তোমার মেয়ে গো-সারদা।’
নির্জন মাঠের মধ্যে, সন্ধ্যার অন্ধকারে, আমার মেয়ে! লোকটার কানে কেমন যেন অদ্ভূত শোনাল। এত বছর ধরে ডাকাতি করছি, কই, এমন কথা তো কখনো শুনিনি। সারদার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল ডাকাত। স্থির প্রতিমার মতই দাঁড়িয়ে রইল সারদা। প্রতিমার মতই স্থির নেত্রে।
কে তুমি? এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
‘বাবা, দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছিলাম। চলতে পারছিলাম না, তাই আমার সঙ্গীরা আমাকে ফেলে গিয়েছে। অন্ধকারে পথ হারিয়ে ফেলেছি।’
দক্ষিণেশ্বরে যাচ্ছ কেন?”
দক্ষিণেশ্বরে যে তোমার জামাই থাকে। রানি রাসমণির কালীবাড়ি আছে না? সেই কালীবাড়িতে তিনি থাকেন। তাঁর কাছেই আমি যাচ্ছি।’
কেমন যেন মধুময় লাগল কণ্ঠস্বর। বাগদি ডাকাতের বুকের ভিতরটা আনচান করে উঠল। শুধু ডাকাতের নয়, সেই কন্ঠস্বরের আমেজ এসে লাগল যেন আরো এক জনের কানে। কাছেই কোথায় ছিল, ছুটে এল সে ব্যাকুল পায়ে। সারদা তো অবাক, এ যে দেখি স্ত্রীলোক। দেখেই বুঝল, বাগদি ডাকাতের স্ত্রী।
তার হাত দুখানা চেপে ধরল সারদা। যেন অকূলে কূল পেল।
“তুমি কে গা?” ডাকাত-পত্নীর চোখে স্নেহকরুণ জিজ্ঞাসা।
তোমার মেয়ে সারদা। চিনতে পারছ না? যাচ্ছিলুম দক্ষিণেশ্বরে, তোমার জামাইয়ের কাছে। সঙ্গীরা পিছে ফেলে আগে-আগে পালিয়ে গিয়েছে। ফাঁকা নির্জন মাঠে অন্ধকারের মধ্যে কী বিপদেই পড়েছিলুম, মা। তোমাদের পেয়ে ধড়ে প্রাণ এলো। তোমাদের না পেলে কি সর্বনাশ যে হত, কে জানে।
প্রাণ জুড়িয়ে গেল। কঠিন পাথর ফেটে বেরুল সুধা-ধারা। দয়াহীন মরুভূমির আকাশে নম্র মেঘের মাধুর্য।
মেরে আমার নেতিয়ে পড়েছে যে গো। কিছু ওকে খেতে দাও আগে’ ডাকাত বউ বললে ডাকাতকে।
‘না, আমি এগোই। তারকেশ্বরে গিয়ে ধরব আমার সঙ্গীদের।’
অসম্ভব, পথের মাঝেই পড়বে টাল খেয়ে। বাপ হয়ে মেয়েকে কেউ পাঠাতে পারে না এ বিপদের মুখে। এ ঘোর অন্ধকারে, জনশূন্য মাঠের মধ্য দিয়ে। তার শরীরের এই অবসন্ন অবস্থায়। তার চেয়ে চলো, কাছে-পিঠে যে দোকান আছে, সেখানে তোমার থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করি। রাত ফুরুলে খোঁজা যাবে ফের পথের নিশানা। তোমার সঙ্গীদের উদ্দেশ।
তেলোভেলোর ছোট একটি মুদি-দোকান। সেখানেই নিয়ে গেল সারদাকে। নিজের হাতে শয্যা রচনা করল ডাকাত-বউ। ডাকাত নিজে গিয়ে মুড়ি-মুড়কি কিনে আনল। বাপের দেওয়া খাবার তৃপ্তি করে খেল সারদা। মায়ের করা বিছানায় শুলে আরাম করে। ছোট মেয়েকে মা যেমন করে ঘুম পাড়ায় তেমনি করে ডাকাত-বউ ঘুম পাড়াল সারদাকে। আর সারা রাত লাঠি-হাতে দুয়োর আগলে দাঁড়িয়ে রইল ডাকাত-বাবা।
কোথায় সব কিছু লুটপাট করে, চাই কি গুম খুন করে ফেলবে—তা নয়, নিদ্রাহীন দীর্ঘ রাত্রি দুয়ারে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে!
উপায় কি! এ যে তার মেয়ে। যে মেয়ে সেই আবার মা!
ভোরে ঘুম ভাঙতেই মেয়েকে নিয়ে এগোলো তারকেশ্বরের পথে। খেতে কড়াই-শুঁটি ফলেছে। তাই ছিঁড়ে ছিঁড়ে ডাকাত-বউ দিতে লাগল সারদাকে। বললে, ‘তোর খিদে পেয়েছে, খা।’ মুখ ধোয়া হয়নি, তবু ছোট মেয়ের মত তাই খেতে লাগল সারদা। স্বাদে অপূর্ব মাতৃস্নেহ।
চার দন্ড বেলা হয়েছে, পৌঁছুল তারকেশ্বর।
‘আমার মেয়ে কাল সারা রাত কিছু খায়নি। যাও, শিগগির-শিগগির বাবাকে পূজো দিয়ে বাজার করে নিয়ে এসো। মাছ-তরকারি দিয়ে মেয়েকে ভালো করে খাওয়াতে হবে।’ ডাকাত-বউ তাগিদ দিল স্বামীকে।
বাগদি-ডাকাত বাজার করতে ছুটল। তার মেয়ে শ্বশুর-ঘরে যাচ্ছে। যাবার আগে বাপের বাড়িতে আজ তার শেষ খাওয়া।
সঙ্গীদের সন্ধান পেল সারদা। ‘ওমা, তুই বেঁচে আছিস? আসতে পেরেছিল পথ চিনে? কোথার ছিলি তুই সারা রাত?
বাবা-মা’র কাছে ছিলাম। ছিলাম নির্ভয়ের আশ্রমে, নিশ্চিন্তের ক্রোড়নীড়ে। বাৎসল্যরসের সরসীতে।
খাওয়া-দাওয়ার পর বিদায়ের পালা এল। যাত্রীদল এবারে বৈদ্যবাটির পথ ধরবে। বাগদি বাপ-মা কাঁদতে লাগল অঝোরে। মেয়ে সারদাও নিজেকে সামলাতে পারল না। সেও কান্নায় ভেঙে পড়ল। এক রাতের পরিচয়ে এক জন্মের সম্পর্ক। কণ্ঠের একটি মাতৃ-সম্বোধনেই অনন্ত জীবনের বন্ধন।
এমন মেয়ের বিচ্ছেদ সয়ে কি করে বাঁচবে তারা? কাঁদতে-কাঁদতে অনেক দূর পর্যন্ত এগোল বাগদি-বাগদিনী। বাগদিনী কড়াইশুঁটি ছিঁড়ে মেয়ের আঁচলে বেঁধে দিল যত্ন করে। বললে, ‘মা সারু রাতে যখন মুড়ি খাবি, তখন এগুলো দিয়ে খাস।’ বলতে-বলতে নিজের আঁচলে চোখ চেপে ধরল।
বাগদি বললে, ‘যদি পায়ের বোঝা স্ত্রী না সঙ্গে থাকত, সোজা তোমাকে পৌঁছে দিয়ে আসতাম। দেখে আসতাম জামাইকে।’
‘কিন্তু বলো দক্ষিণেশ্বরে তুমি যাবে।’ সারদা পীড়াপীড়ি করতে লাগল। রাজী করাল ডাকাত-বাবাকে। মাঝে-মাঝে গিয়ে মেয়েকে না দেখে এসে কি সে থাকতে পারবে? মা কি মেয়েকে পাঠিয়ে দেবে না তার নিজের হাতে গড়া মোয়া-নাড়ু? পথ ছাড়াছাড়ি হয়ে গেল। ডান দিকের রাস্তায় বাবা আর মা চলে গেল, সারদা আর তার সঙ্গীরা চলল বাঁ দিকে। যত দূর দেখা যায় বাবা আর মা ফিরে-ফিরে তাকায় আর কাঁদে। সারদাও থেকে-থেকে তাকায় পিছন ফিরে আর আঁচলে চোখ মোছে।
ডাকাতের ছদ্মবেশে কে এরা বাগদি-বাগদিনী?
জানিস আমরা কী দেখলুম? গাঁয়ে ফিরে এসে বলতে লাগল বাগদি-দম্পতি। দেখলুম, স্বয়ং কালী এসে দাঁড়িয়েছেন। যে কালীর পুজো করি সেই কালী। ‘বলো কি গো? দেখলে? ঠিক তাই দেখলে!
সত্যি-সত্যিই দেখলুম। কিন্তু বেশিক্ষণ দেখি এমন সাধ্য কি। আমরা যে পাপী। আমরা পাপী বলে যে রূপ গোপন করে ফেললে। সারাক্ষণ দেখতে দিলে না। চকিতে যখন একবার দেখেছ তখন পলকেই পাপ চলে গিয়েছে। চকিতের দেখাই অনন্ত কালের দেখা। যা চকিত তাই চিরকালিক।
