পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.১০
১০
কেশবের ডাকে ইয়ং-বেঙ্গলে সাড়া পড়ে গেল। পল্লব-প্রফুল্ল বসন্তের শিহরণ জাগল অরণ্যে। কিন্তু যার ডাকে এই অবস্থা, তার নিজের অবস্থা কি! জয়গোপল সেনের বাগানে রামকৃষ্ণ লালপেড়ে কাপড় পরে গিয়েছিল।
কেশব বললে, ‘আজ বড় যে রঙ। লালপাড়ের বাহার!’
রামকৃষ্ণ বললে, ‘কেশবের মন ভোলাতে হবে, তাই বাহার দিয়ে এসেছি।’
রঙ লাগল কেশবের মনে। রসে ডুবে ভাসতে লাগল ভাবের জোয়ারে। হয়ে দাঁড়াল সে রামকৃষ্ণের মনের মানুষ।
‘মনের মানুষ হয় যে জনা
ও তার নয়নেতে যায় গো চেনা ।
সে দু-এক জনা।
ভাবে ভাসে রসে ডোবে
ও তার উজান পথে আনাগোনা।’
কিন্তু গোড়ার দিকে রাজসিকতার ভাবটা একটু সজাগ ছিল কেশবের। কেশবের কলুটোলার বাড়িতে গিয়েছে রামকৃষ্ণ, সঙ্গে হৃদয়। টেবিলের কাছে চেয়ারে বসে কি সব লিখছে কেশব। যে ঘরে বসে লিখছে সেই ঘরে এনেই বসাল রামকৃষ্ণকে। কিন্তু কেশবের চেয়ার ছেড়ে ওঠবার নাম নেই। একমনে লিখেই চলেছে। অনেক পরে লেখা শেষ করে চেয়ার ছেড়ে নেমে বসল। নেমে বসল বটে, কিন্তু রামকৃষ্ণকে একটা নমস্কার পর্যন্ত করলে না।
নমস্কার না করাটাই বুঝি সে যুগের জ্ঞানী-গুণীদের শালীনতা।
কিন্তু কেশব যখন এসেছে দক্ষিণেশ্বরে, রামকৃষ্ণ তাকে আনত হয়ে প্রণাম করলে। একবার নয়, যতবার এসেছে ততবার। যখন যে দলবল নিয়ে এসেছে, সবাইকে। তখন তারা আর করে কি। ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করতে শিখলে।
কঠিনকে নম্র করে দিলে রামকৃষ্ণ। অভিজাতকে নিরভিমান। রামকৃষ্ণের সমস্ত সাধনাই এই সহজের সাধনা। নিকটের সাধনা। নিকটে পাবার সহজ সাধনা। বললে, ‘যাঁকে তোমরা ব্রহ্ম বলো তাঁকেই আমি মা বলি। মা বড় মধুর নাম।’ আমি ঈশ্বর বুঝি না। আমি আমার মাকে বুঝি, মাকে ডাকি। আর কে আছে না আছে কে জানে, আমি আছি আর আমার মা আছে। ঈশ্বরের ঐশ্বর্ষের আমি তত্ত্ব করি আমার সাধ্য কি, আমার মা আছে এই আমার পরম ঐশ্বর্য।
বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ব্রাহ্মসমাজের পদ্ধতি অনুসারে বেদীতে বসে উপাসনা করছে। কিন্তু ঈশ্বরকে ডাকছে ‘মা’ ‘মা’ বলে।
“তুমি তাঁকে “মা” “মা” বলে প্রার্থনা করছিলে। এ খুব ভালো। এ খুব ভালো।’ বিজয়কৃষ্ণকে বললে রামকৃষ্ণ। ‘কথায় বলে বাপের চেয়ে মায়ের টান বেশি। মায়ের উপর জোর চলে, বাপের উপর চলে না। ত্রৈলোক্যের মায়ের জমিদারি থেকে গাড়ি-গাড়ি ধন আসছিল, সঙ্গে কত লাল-পাগড়িওয়ালা লাঠি হাতে দারোয়ান। ত্রৈলোক্য রাস্তায় লোকজন নিয়ে দাঁড়িয়েছিল, জোর করে সব ধন কেড়ে নিলে। মায়ের ধনের উপর খুব জোর চলে। বলে নাকি ছেলের নামে মা’র তেমন নালিশ চলে না।’
‘জানাইব কেমন ছেলে
মোকদ্দমায় দাঁড়াইলে,
যখন গুরুদত্ত দস্তাবেজ
গুজরাইব মিছিলকালে।
মায়ে পোয়ে মোকদ্দমা,
ধুম হবে রামপ্রসাদ বলে।
আমি ক্ষান্ত হব যখন আমায়
শান্ত করে লবে কোলে ॥’
মা কতক্ষণ মামলা চালাবে? কতক্ষণ মুখ ভার করে থাকবে? কখন নিজেই এক সময় বাহু মেলে টেনে নেবে কোলের মধ্যে।
আমাদের শাস্ত্রে ঈশ্বরকে আমরা পিতা বলে কল্পনা করেছি। পিতা হচ্ছে সৃষ্টিকর্তা, লালনকর্তা, রক্ষণকর্তা। পিতার মধ্যে যে ভাবটি প্রকাশিত তা প্রতাপের ভাব, প্রভুত্বের ভাব। তিনি শুধু আমাদের পালন করেন না, চালনা করেন, পোষণ করেন না, শাসন করেন। তিনি জগৎসংসারের সর্বময় বিধাতা। একচ্ছত্র একাধিপতি।
বেদে বলেছে, পিতা নোহসি। তুমি আমাদের পিতা হয়ে আছ। বলেছে, পিতা নো বোধি। তুমি যে আমাদের পিতা এই বোধের আলোকে আমাদের দু-চোখ উদ্ভাসিত হোক। এই জানা আর অনুভব করার মধ্যে পিতার সর্বসাম্রাজ্যময় বিরাটত্বকেই কল্পনা করা হয়েছে। যখনই বলেছে, শৃন্যন্তু বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রাঃ, তখন আমরা যাঁর পুত্র সেই আদিত্যবর্ণ পুরুষকে দিব্যধামবাসী একনায়ক সম্রাট বলেই মেনে নিয়েছি। সমস্ত অন্ধকারের পরপারে সেই পিতা ভাস্বর ভাস্কর।
এ ভাবটির মধ্যে যতই মহিমা থাক, কিছুটা যেন ভয় আছে। সম্ভ্রম তো আছেই, হয়তো বা রয়েছে একটু নিষ্ঠুরতা। পিতা আমাদের যতই প্রিয় হোন, তাঁর সঙ্গে কোথায় যেন রয়েছে একটু ব্যবধান। কোথায় যেন একটু আড়াল বাঁচিয়ে চলছি। যেন তাঁর চোখে চোখ রেখে মুখোমুখি দাঁড়াতে পারি না, একটু পাশ কাটিয়ে পালিয়ে বেড়াই। যদি বা কখনো কাছে আসি সম্ভ্রমসূচক দূরত্ব বজায় রাখি। কখনো যদি অপরাধ করি, তবে তো আর কথাই নেই, ভয় পাই, শাসনে যেন উদ্যতবজ্র হয়ে আছেন।
কিন্তু মা-মা আমাদের কাঙালিনী। আমরা কাঙাল বলে মা-ও কাঙালিনী সেজেছেন। মা’র সঙ্গে আমাদের তন্তুমাত্র ব্যবধান নেই, নেই লেশমাত্র অন্তরাল। আমরা মা’র অঙ্গের অঙ্গ বলে তাঁর সঙ্গে আমাদের অন্তহীন অন্তরঙ্গতা। যতই অকিঞ্চন হই, আমরা মা’র অঞ্চলের নিধি। যতই ধূলো-মাটি মাখি, মা’র অঞ্চলে আমাদের জন্যে অবারিত মার্জনা। যদি অপরাধ করি, মা-ও নিজেকে অপরাধী মনে করেন। সন্তানের দুঃখে তাঁর দুঃখ।
কোনো কুণ্ঠা নেই, লজ্জা নেই, শুধু ক্ষমা শুধু স্নেহ। শুধু পুষ্টি দেন না তুষ্টি দেন, শুধু পিপাসা মেটান না, নিয়ে আসেন পরিতৃপ্তির আস্বাদ। মা আমাদের মূর্তিমতী সরলতা, মা আমাদের অভয়ময়ী। পুত্র যত বৃদ্ধই হোক, মা’র কাছে সে শিশু, অর্বাচীন অপোগণ্ড শিশু। আর মা যত বৃদ্ধই হোক, ছেলের কাছে সে সনাতনী মা। পিতার জন্যে আমাদের শ্রদ্ধা, সম্ভ্রম, আনুগত্য, কিন্তু মা’র জন্যে আমাদের ভালোবাসা, অবিরল অফুরন্ত ভালোবাসা। পিতার থেকে আমরা দূরে-দূরে থাকি, কিন্তু মা আমাদের একেবারে কোলের মধ্যে টেনে নেন। আর্ত হই বঞ্চিত হই পীড়িত হই পাপলিপ্ত হই, অকূলে মা’র কোল আছেই। পিতা আমাদের রাজচক্রবর্তী, মা আমাদের বিশ্বকল্যাণী।
দুর্গাচরণ নাগ ঠাকুরের নিদারুণ ভক্ত। অসুখের সময় আমলকী খাবার ইচ্ছে হয়েছিল ঠাকুরের। এমন সময় আমলকী কি কোথাও পাওয়া যায়? জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর। তখন শ্রাবণ মাস, আমলকীর পক্ষে অকাল। কিন্তু ঠাকুরের যখন ইচ্ছে হয়েছে, নিশ্চয়ই কোথাও পাওয়া যাবে আমলকী। দুর্গাচরণ বেরিয়ে পড়ল আমলকী খুঁজতে। বনে-বাগানে ঘুরে ঘুরে তিন দিন পরে ঠিক আমলকী নিয়ে এল। সেই দুর্গাচরণকে শ্রীশ্রীমা একখানি কাপড় দিয়েছেন। সেই কাপড় না পরে মাথায় বেঁধে রাখে দুর্গাচরণ। আর আনন্দে ধ্বনি করে, ‘বাপের চেয়ে মা দয়াল। বাপের চেয়ে মা দয়াল!’
শ্রীশ্রীমার তখন অসুখ। খুব যন্ত্রণা পাচ্ছেন। এক ভক্ত বললে, ‘মা, আপনি এত কষ্ট পাচ্ছেন, কষ্টটা আমায় দিন না!
মা চমকে উঠলেন। ‘বল কি ছেলে! মা কখনো ছেলেকে দিতে পারে? ছেলের কষ্ট হলে যে মা’র আরো বেশি কষ্ট।’
বিভূতি বলে একটি ছেলে আসত শ্রীমা’র কাছে। এলেই পেট ভরে খেয়ে যেত। এক দিন তার খাওয়া দেখে তার মা বললে, বিভূতি তো এখানে বেশ খায়। বাড়িতে মাত্র এত ক’টি খায়!’
অমনি শ্রীমা বললেন, ‘আমার ছেলেকে তুমি খুঁড়ো না। আমি ভিখারীর রমণী, আমার ছেলেদিকে আমি যা খেতে দি, ছেলেরা আমার তাই আদর করে খায়।’
চন্দ্র দত্ত উদ্বোধন-অফিসের কর্মচারী। এক দিন শ্রীমাকে বললে, ‘মা, আপনাকে কত দূর দেশ থেকে কত লোক দর্শন করতে আসে। আপনি তো ঘরের ঠাকুরমার মত পান সাজেন, সুপুরি কাটেন, কখনো বা ঘর ঝাঁট দেন। আপনাকে দেখে আমি তো কিছুই বুঝতে পারি না।’
মা বললেন, ‘চন্দ্র, তুমি বেশ আছ। আমাকে তোমার বোঝবার দরকার নেই।’
স্বভাবে সহজ, করুণায় কোমল, স্নেহে সীমাহীন—এই আমাদের মাতৃপ্রতিমা। মাকে আমাদের বোঝবার দরকার নেই, ডাকবার দরকার। ডাক শুনে মা যখন ছুটে এসে কোলে তুলে নেবেন তখন সেই স্পর্শেই বুঝতে পারব, মা এসেছে রে, ‘মা এসেছে।
যিনি অবাঙমানসগোচর, অগম্য অপার, সমস্ত রুদ্ধ অন্ধকারের ওপারে যাঁর বাসা, তাঁকে নিকটতম, নিবিড়তম করে পাবার সাধনায় রামকৃষ্ণ নতুন মন্ত্র আবিষ্কার করলেন। ওঁ-এর মত এ মন্ত্রও একাক্ষর মন্ত্র। এ মন্ত্রের কথা হচ্ছে—’মা’। এ মন্ত্রের আকর্ষণে যা অত্যন্ত দূর তা নিমেষে কাছে চলে এল, যা অত্যন্ত দুরূহ তা হয়ে দাঁড়াল জলের মত সোজা। যা ছিল পর্বতশৃঙ্গে তাই বিগলিতধারে নেমে এল নির্ঝরিণী হয়ে। যা ঐশ্বর্যশালিনী শক্তি, তাই দেখা দিল দয়ারূপে, ক্ষমারূপে, অমিয়ময়ী প্রশান্তিরূপে।
একেই বলে এক চালে মাৎ। এক বাণে জগজ্জয়। এক অক্ষরে পরা সিদ্ধি।
রামকৃষ্ণের সবই সহজ। তত্ত্ব সহজ, পদ্ধতিও সহজ। মানুষটি যেমন সহজ, মন্ত্রটিও তেমনি। একেই বলে তরঙ্গহীন স্বতঃসিদ্ধ স্বরূপসমূদ্র। কিংবা, সহজ করে বললে, সহজানন্দ।
বিজয়কৃষ্ণকে বলে রামকৃষ্ণ, ‘কারণের বোতল এক জন এনেছিল, আমি ছুঁতে গিয়ে আর পারলুম না।’
বিজয় বললে, ‘আহা!’
‘সহজানন্দ হলে অমনি নেশা হয়ে যায়। মদ খেতে হয় না। মা’র চরণামৃত দেখেই আমার নেশা হয়ে যায়। ঠিক যেমন পাঁচ বোতল মদ খেলে হয়।’
কেশবকেও তেমনি সহজ করে দিল রামকৃষ্ণ। কেশব ‘মা’ ধরল। ঈশ্বরকে ডাকতে লাগল ‘মা’ বলে। ঈশ্বরকে ‘মা’ বলে ডাকে আর কেশবের দুই নয়নে ধারা নামে।
১১
এ মাতৃসাধনার গোড়াপত্তন রামপ্রসাদে। তার পর তাতে সৌধ তুলল কমলাকান্ত। গরানহাটায় দূর্গাচরণ মিত্তিরের বাড়িতে রামপ্রসাদ মুহুরির কাজ করে আর হিসেবের খাতায় দুর্গানাম কালীনাম লেখে। সমস্ত হিসেব বেহিসেব হয়ে যায়। পদে-পদে ত্রুটির কাঁটা খোঁচা মারে।
নালিশ গেল মনিবের কাছে। মনিব খাতা তলব করলেন। দেখলেন আষ্টেপৃষ্ঠে অঙ্কের আঁচড় নেই, কেবল দুর্গানাম কালীনাম। কেবল মাতৃসঙ্গীত।
কি না-জানি আছে এই গানে! মনিব পড়তে লাগলেন। লোকটার আস্পর্ধা বটে। সামান্য মুহুরি হয়ে তবিলদারি চাইছে!
‘আমায় দাও মা তবিলদারি,
আমি নিমকহারাম নই শঙ্করী।
আমি বিনা মাহিনার চাকর,
কেবল চরণ-ধূলার অধিকারী ॥’
মনিব ছুটি দিয়ে দিলেন রামপ্রসাদকে, বললেন, ‘তুমি বাড়ি যাও। এখানে যেমনি ত্রিশ টাকা মাইনে পেতে তেমনি পাবে তুমি বাড়ি বসে। তুমি মা’র নামের গান গাও।’
ছাড়া পেয়ে গেল রামপ্রসাদ। কিন্তু মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ডেকে পাঠালেন, রাজসভায় চাকরি দেবেন। আবার চাকরি! চরণ-ধূলার জন্যে এই তো দিব্যি চাকর আছি বিনি-মাইনেয়। হলই বা না রাজসভা, মা’র শোভার কাছে আবার রাজসভা কি! মহারাজের অযাচিত দান প্রত্যাখ্যান করলে। এবার না কোপে পড়ে মহারাজার। মহারাজার কি মতি হল, রামপ্রসাদের বৈরাগ্য দেখে একশো বিঘে নিষ্কর জমি দান করে বসলেন৷
‘মন তুই কাঙালী কিসে।’ রামপ্রসাদ গান ধরল, ‘অনিত্য ধনের আশে, ভ্রমিতেছ দেশে-দেশে। ও তোর ঘরে চিন্তামণি নিধি, দেখিস রে তুই বসে-বসে।’ মাকে নিয়ে সাধনায় বসল রামপ্রসাদ। কারু সাধনা জ্ঞানে, রামপ্রসাদের গানে আর-সব সাধকেরা জ্ঞানানন্দ, রামপ্রসাদ গানানন্দ।
মাকে নিয়ে তার নানান খেলা, নানান লুকোচুরি। কত নালিশ-আপত্তি, কত অভিমান-অভিযোগ! কখনো ঝগড়া, কখনো মামলা-মোকদ্দমা, কখনো বা রফা-নিষ্পত্তি। কখনো রাগ, কখনো কান্না, কখনো অহঙ্কার, কখনো স্রেফ গায়ের জোর। সাধ্য নেই মা আর বসে থাকেন লুকিয়ে। কালী বটে, কিন্তু কালা তো নন। ডাকের মত ডাক হলে শুনতে পান ঠিকঠাক। কান্না শুনে না আসেন, আসবেন, ধমক খেয়ে। ভালো-মানুষের মত না আসেন, আসবেন ভয়ে ভয়ে।
‘এবার কালী তোমায় খাব।
গণ্ড যোগে জনমিলে,
সে হয় যে মা-খেকো ছেলে,
এবার তুমি খাও কি আমি খাই
দুটোর একটা করে যাব।
হাতে কালী মুখে কালী
সর্বাঙ্গে কালী মাখিব,
যখন আসবে শমন বাঁধবে কষে
সেই কালী তার মুখে দিব।’
মাকে লজ্জা দিতেও ছাড়ছে না রামপ্রসাদ। বিদ্রূপ করছে। অনুযোগ করছে।
‘কে বলে তোরে দয়াময়ী।
কারো দুগ্ধেতে বাতাসা
আর আমার এমনি দশা
শাকে অন্ন মেলে কই৷৷
কারো দিলে ধন-জন মা,
হস্তী অশ্ব রথচয়।
ওগো তারা কি তোর বাপের ঠাকুর
আমি কি তোর কেহ নই৷’
কিংবা-
‘বড়াই করো কিসে গো মা বড়াই করো কিসে।
আপনি ক্ষ্যাপা পতি ক্ষ্যাপা
থাকো ক্ষ্যাপা সহবাসে।
তোমার আদি মূল সকলি জানি
দাতা তুমি কোন পুরুষে
মাগী-মিনসে ঝগড়া করে
রইতে নার আপন বাসে।
মা গো তোমার ভাতার ভিক্ষা করে
ফেরে কেন দেশে দেশে৷৷’
আবার বলছে-
‘মা হওয়া কি মুখের কথা।
কেবল প্রসব করে হয় না মাতা।
যদি না বুঝে সন্তানের ব্যথা।
দশ মাস দশ দিন যাতনা পেয়েছেন মাতা
এখন ক্ষুধার বেলায় শুধালে না
এল পুত্র গেল কোথা৷৷’
শেষকালে অভিমানে ভেঙে পড়ছে রামপ্রসাদ-
‘ছিলেম গৃহবাসী, বানালে সন্ন্যাসী,
আর কি ক্ষমতা রাখো এলোকেশী।
দ্বারে দ্বারে যাব ভিক্ষা মাগি খাব
মা মলে কি তার সন্তান বাঁচে না।’
বাস্তুর পাশে ডোবা, ডোবার পাশে বাগান। সেই বাগানে রামপ্রসাদকে দেখা দিলেন অন্নদা। দেখা না দিয়ে আর উপায় কি। এত ভাবে ডাকলে কি করে আর সরে থাকা যায়? শেষকালে কন্যা হয়ে ঘরের বেড়া বাঁধতে বসলেন। এই মাতৃসাধনা চরম হল রামকৃষ্ণে।
মা, তুই রামপ্রসাদকে দেখা দিয়েছিস, কমলাকান্তকে দেখা দিয়েছিস, আমায় কেন দেখা দিবি নে?”
এ আকুলতা শুধু মাকে লক্ষ্য করেই জানানো যায়। এ দাবি এ আবদার মা ছাড়া আর কে পূরণ করবে?
দেখা দিবি নে? এই গলায় তবে ছুরি দেব।
কোন মা ঘুমিয়ে থাকবে?
আবার বলছে, ‘মা, আমি নরেন্দ্র ভবনাথ রাখাল কিছুই চাই না। কেবল তোমায় চাই। আমি মানুষ নিয়ে কি করব?”
‘মা, পূজা উঠিয়েছ, সব বাসনা যেন যায় না। মা, পরমহংস তো বালক–বালকের মা চাই না? তাই তো তুমি মা, আর আমি তোমার ছেলে। মা’র ছেলে মাকে ছেড়ে কেমন করে থাকে?”
সাধ্য কি, এমন ছেলেকে মা কোলে না নেয়!
রাত্রে একলা রাস্তায় কেঁদে-কেঁদে বেড়ায় রামকৃষ্ণ। আর বলে, ‘মা, বিচার-বুদ্ধিতে বজ্রাঘাত দাও।’
বিচার-বিতর্ক ভেসে গেল। রইল শুধু ভক্তি আর ভালোবাসা। মাকে ভালোবাসতে পারলে আর ভাবনা নেই। আর, ভালোই যদি বাসবি, মা’র মতন আর কে আছে ভালোবাসবার?
কার্তিক-গণেশকে বললেন ভগবতী, যে আগে ব্রহ্মাণ্ড প্রদক্ষিণ করে আসতে পারবে তাকে গলার এই রত্নহার দেব। কার্তিক তখুনি ময়ূরে চড়ে বেরিয়ে পড়ল। গণেশ শুধু মাকে একবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করলে। মা’র মধ্যেই তো ব্রহ্মাণ্ড। প্রসন্ন হয়ে গণেশকেই হার দিলেন ভগবতী। অনেক পরে ঘুরে এসে কার্তিকের তো চক্ষু স্থির। দাদা দিব্যি হার পরে বসে আছেন।
‘মা, আমি বলবো তবে তুমি করবে—এ কথাই নয়। আচ্ছা মা, যদি না-বলতাম, আমি খাবো, তা হলে কি যেমন খিদে তেমন খিদে থাকত না? তোমাকে বললেই তুমি শুনবে, আর ভিতরটা শুধু ব্যাকুল হলে তুমি শুনবে না-এ কখনো হতে পারে? তুমি যা আছ তাই আছ—তবে বলি কেন, প্রার্থনা করি কেন? ও! যেমন করাও তেমনি করি।’
এই সরলতা এই ব্যাকুলতা এই আন্তরিকতার কাছে মা কি ধরা না দিয়ে পারেন? মা-তে ওতপ্রোত হয়ে আছে রামকৃষ্ণ। মা ছাড়া আর কিছু নেই জীবজগতে। মা-ই আমাদের একমাত্র মাধুরী। যিনি মানসী তিনিই আবার মানুষী।
তাই যতক্ষণ গর্ভধারিণী মা আছেন ততদিন তাঁতেই জগজ্জননী আরোপ করতে হবে।
‘আমি মাকে ফুলচন্দন দিয়ে পূজা করতাম।’ বললে রামকৃষ্ণ, ‘সেই জগতের মা-ই মা হয়ে এসেছেন!’
কিন্তু যখন মা থাকবে না, কিংবা পূজো থাকবে না, তখন? তখন অন্য কথা। তখন মা’র মনোমূর্তি। তখন বিশ্বব্যাপিনী জগন্মাতা।
‘মা, পূজা গেল, জপ গেল, দেখো মা যেন জড় কোরো না। সেব্য-সেবকভাবে রেখো। মা, যেন কথা কইতে পারি, যেন তোমার নাম করতে পারি আর তোমার নামগুণে কীর্তন করব, গান করব মা। আর শরীরে একটু বল দাও, যেন আপনি একটু চলতে পারি। যেখানে তোমার কথা হচ্ছে, যেখানে তোমার ভক্তরা আছে, সেই সব জায়গায় যেতে পারি।’
শুধু গান নয়, নৃত্য করছে রামকৃষ্ণ। আমাদের নিত্যানন্দ ঠাকুর এখন নৃত্যানন্দ।
মাকে কখনো আদর করছে, শাসন করছে কখনো। কখনো বিলাপ করছে, কখনো বা মুখ ভার করে থাকছে। কখনো মিনতি করছে, কখনো বা জোর ফলাচ্ছে। কখনো বা রঙ্গরসের তরঙ্গ তুলছে।
‘কে মা এলি গো গিরে দাদার বেটি।
দোনো ছোকরা ভি সাথ
দোনো ছুকরি ভি সাথ
আর এক বেটা জ্বলপি-কাটা
বাঘটা কামড়ে নেছে টুঁটি৷
একবার নেমে দাঁড়া শ্যামা
ভাঙল বুড়োর পাঁজর-কটি।
শিব মলে অনাথ হবে
কার্তিক গণেশ ছেলে দুটি৷৷’
গালে হাত দিয়ে অবাকের ভাব করে নাচছে রামকৃষ্ণ।
‘আই মা কি লাজের কথা
মিনসের উপরে মাগী।
বেটির পদতলে পড়ে ভোলা
অপরূপ এক যোগী৷
নয়নে না দেখ চেয়ে
শিব আছেন শব হয়ে
আবার কে দেখেছে এমন মেয়ে
কুল-লজ্জা-ভয়-ত্যাগী॥’
আবার অন্য রকম তাল ধরছে:
“কোন হিসেবে হরহৃদে
দাঁড়িয়েছ মা পদ দিয়ে।
সাধ করে জিভ বাড়ায়েছ
যেন কত ন্যাকা মেয়ে৷
বল মা তোরে শুধাই তারা
এমনি কি তোর কাজের ধারা
তোর মা কি তোর বাপের বুকে
দাঁড়িয়েছিল অমনি করে?
রসো বৈ সঃ যে তিনি। নানা ভাবে তাঁর রস আস্বাদ করতে হবে, তবে তো হবে।’ বললেন রামকৃষ্ণ। নইলে কেশবদের মত খালি দয়াময়, প্রভু বললে কি রস হয়?’
রামকৃষ্ণে যেমন সর্বধর্ম সমন্বয় তেমনি সর্ব রসসমাশ্রয়।
মা-ও রামকৃষ্ণকে দেখা দিলেন নানান ভাবে। নানান রস-বেশে।
এক দিন মুসলমানের মেয়ে হয়ে চলে এলেন। ছ-সাত বছরের মেয়ে। মাথায় তিলক কিন্তু দিগম্বরী। রামকৃষ্ণের সঙ্গে বেড়াতে লাগল আর ফিচকেমি করতে লাগল। একবার চোখ নাচাল, অমনি নীল আকাশে গ্রহ-তারা সব দুলে উঠল একসঙ্গে।
কালো পেড়ে কাপড় পরনে শ্রীগৌরাঙ্গ হয়ে এক দিন দেখা দিলেন হৃদয়ের বাড়িতে।
তার পর, হলধারী যখন যন্ত্রণা দিচ্ছে আর বলছে রূপ-টুপ কিছু নেই, তখন এক দিন মা’র কাছে গিয়ে নালিশ করলে রামকৃষ্ণ। মা রতির মা’র বেশে দেখা দিলেন। বললেন, তুই ভাবেই থাক।
এক-একবার ও-কথা ভুলে যাই বলে কষ্ট হয়। ভাবে না থেকে দাঁত ভেঙে গেল। তাই দৈববাণী যতক্ষণ না শুনছি বা প্রত্যক্ষ যতক্ষণ না হচ্ছে ভাবেই ডুবে থাকব, থাকব ভক্তি নিয়ে।’
সেই সহজ কথাই কেশবকে শেখাতে বসল।
দুধ কেমন? না, ধোবো-ধোবো। দুধকে ছেড়ে দুধের ধবলত্ব ভাবা যায় না। আবার দুধের ধবলত্ব ছেড়ে দুধকে ভাবা যায় না। তাই ব্রহ্মকে ছেড়ে শক্তিকে, শক্তিকে ছেড়ে ব্রহ্মকে ভাবা যায় না। যিনি নিত্য তিনিই ব্রহ্ম, যিনি লীলা তিনিই কাল। কালীই ব্রহ্ম, ব্রহ্মই কালী।’
কালীতত্ত্ব জানবার জন্যে ধরে বসল কেশব। কালী অত কালো কেন?
কালী কি কালো? দূরে, তাই কালো, জানতে পারলে কালো নয়।’ বললে রামকৃষ্ণ। আকাশ দূর থেকে নীলবর্ণ। কাছে গিয়ে দেখ, কোনো রঙ নেই। সমুদ্রের জল দূর থেকে নীল, কাছে গিয়ে হাতে তুলে দেখ, কোনো রঙ নেই।’
ভাবে বিহ্বল হয়ে গান ধরল রামকৃষ্ণ।
‘মা কি আমার কালো রে? কালরূপ দিগম্বরী, হৃৎপদ্ম করে আলো রে।’
মা’র একান্ত কাছটিতে সরে এসেছে রামকৃষ্ণ। কাছে এসে আলোয় আলোময় দেখছে।
সরে আসতে-আসতে নিজেই মা-তে মিশে মা হয়ে গিয়েছে। শ্যামা পুরুষ না প্রকৃতি? এক জন ভক্ত পূজো করছিল। এক জন দর্শন করতে এসে দেখে মূর্তির গলায় পৈতে। তুমি মা’র গলায় পৈতে পরিয়েছ? দর্শক আপত্তি করলে। ভক্ত বললে, ভাই, তুমিই চিনেছ। আমি এখনো চিনতে পারিনি, তিনি পুরুষ কি প্রকৃতি। তাই পৈতে পরিয়েছি।’
তাকেই তো বলে যোগমায়া, অর্থাৎ পুরুষপ্রকৃতির যোগ। পুরুষ নিষ্ক্রিয় তাই শিব শব হয়ে আছেন। আর, পুরুষের যোগে প্রকৃতি সমস্ত কাজ করছে, হনন-পালন করছে। এক ছাড়া আর নেই। যা পুরুষ তাই প্রকৃতি। যা বিদ্যুৎ তাই বৈদ্যুত শক্তি। রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তিরও মানে ঐ। ঐ যোগের জন্যেই তো বঙ্কিম ভাব।
মনোমোহন মিত্তিরের বোনকে বিয়ে করেছে রাখাল। রাখালের বয়েস তখন আঠারো। বিয়ের পর ভগ্নীপতিকে নিয়ে দক্ষিণেশ্বরে এসেছে মনোমোহন।
এ কে? রাখালকে দেখে রামকৃষ্ণ তো অবাক।
ভাবমুখে থেকে মাকে এক দিন বলেছিল রামকৃষ্ণ, ‘মা গো, বিষয়ী-সংসারী লোকের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে জিভ জ্বলে গেল।’
মা বললেন, ‘ভয় নেই। শুদ্ধসত্ত্ব ত্যাগী ভক্তেরা আসছে একে-একে
‘এক জনকে সঙ্গী করে দাও আমার মত। আমার তো সন্তান হবে না, কিন্তু মা, ইচ্ছা করে, একটি শুদ্ধভক্ত ছেলে আমার সঙ্গে থাকে। সেইরূপ একটি ছেলে আমায় দাও।’
এর কিছু দিন পরে ভাবচক্ষে রামকৃষ্ণ দেখতে পেল, বটতলায় একটি ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। কেন, ও ওখানে কেন? এ কি কাণ্ড?
হৃদয়কে বললে সেই দর্শনের কথা। হৃদয় আনন্দ করে উঠল। বললে, ‘মামা, নিশ্চয়ই তোমার ছেলে হবে। তাই দেখেছ।’
‘সে কি রে?” চমকে উঠল রামকৃষ্ণ। ‘সে কি রে? আমার যে মাতৃযোনি। আমার ছেলে হবে কেমন করে?’
রামকৃষ্ণ এক দিন বসে আছে নিরালায়, হঠাৎ মা এসে তার কোলের মধ্যে একটি ছেলে ফেলে দিয়ে গেলেন। বললেন, ‘ছেলে চেয়েছিলে না? এই তোমার ছেলে।’ সে কি? আমার আবার ছেলে কি?
মা বুঝিয়ে দিলেন, শরীরের পুত্র নয়, মানস পুত্র।
রাখালের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল রামকৃষ্ণ। এ যে সেই ছেলে! ‘তোমার নামটি কি?’ তুষিত কর্ণে জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণ।
‘শ্রীরাখালচন্দ্র ঘোষ ।’
সমস্ত হৃদয় দুলে উঠল। সমস্ত সৃষ্টি ভরে গেল বাঁশির সূরে। নীল যমুনার জলে। ‘সেই নাম! রাখাল, ব্রজের রাখাল!’ ভাবে ডুবে গেল রামকৃষ্ণ। আর কোনো কথা নেই। আর শুধু একটি মাত্র স্নেহস্বর: ‘এখানে আবার এক দিন এস। আবার এক দিন।’
আর রাখাল কী দেখল? এ কে? দিব্যদীপ্তি অঙ্গে নিয়ে এ কে বসে আছে তার চোখের সামনে? রাখাল দেখল মা বসে আছে। মা, তার মা। জীবজগতের মা।
তার পর আরো ক’দিন পর কলেজের ছুটির শেষে এক দিন একা-একা চলে এসেছে রাখাল।
‘তোর এখানে আসতে এত দেরি হল কেন?” আকুল হয়ে ডাকল রামকৃষ্ণ: ‘আয় আয়, তুই আমার রাখাল, তুই আমার গোপাল, তুই আমার কৃষ্ণ।
রাখালের মনে হল সে যেন তিন-চার বছরের ছেলে। আর তার সামনে বিশ্রামশান্ত কোল পেতে তার মা বসে আছেন। মা কালী, মহাকালী। শ্যামশ্রীতে স্নেহশ্রী। রামকৃষ্ণের কোলের মধ্যে গিয়ে বসে পড়ল রাখাল। রামকৃষ্ণ সস্নেহে হাত বুলুতে লাগল সর্বাঙ্গে। আর রাখাল নিঃসঙ্কোচে রামকৃষ্ণের স্তনপান করতে লাগল।
রামকৃষ্ণই মা। রামকৃষ্ণই মাতৃসাধনার চরম।
তাই তো মা বলে ডাকি। মা বলে যখন ডাকি তখন তোমাকেই ডাকি। আমরা কি কালী চিনি না দূর্গা চিনি? আমরা শুধু তোমাকে চিনি। আমরা মা বলে ডাকলে আর কেউ সাড়া না দিক, তুমি দেবে। তোমার ডাক, তুমিই তো ভালো চেন। তুমিই তো সংসারের কানে দিয়ে গেছ এই ডাক। এই সংক্ষিপ্ত একাক্ষর মন্ত্র। তাই তোমার সাধ্য কি, তুমি থাকো নিশ্চল হয়ে।
তার পর এক দিন নিজের ডাকে যদি নিজে সাড়া দাও, প্রভু, তবে আর আমাদের কালীই বা কি, ব্রহ্মই বা কি।
১২
বিজয়কৃষ্ণকে লিখে পাঠাল কেশব সেন: বন্ধু একবার রামকৃষ্ণ পরমহংসকে দেখবে এস।
বন্ধু? তা ছাড়া আবার কি। হোক দলাদলি, হোক রেষারেষি, হোক বাদ-বিতণ্ডা, তারা সতীর্থ। তারা এক তীর্থের যাত্রী। যারা সমানতীর্থসেবী তারাই সতীর্থ। তারা এক গুরুর ছাত্র। এক পাঠশালার পড়ুয়া। তাদের দুজনের একই ঈশ্বর-সন্ধান।
তখন তাদের ঝগড়া চরমে উঠেছে। তবু লিখে পাঠাল কেশব: বন্ধু এমনটি তুমি আর দেখনি।
শান্তিপুরে প্রভু অদ্বৈতাচার্যের বংশে বিজয়কৃষ্ণের জন্ম। বাপের নাম আনন্দকিশোর গোস্বামী। নিত্যপূজার শালগ্রাম শিলা গলায় বেঁধে এক দিন হঠাৎ পুরীর দিকে যাত্রা করলেন আনন্দকিশোর। বাসনা জগন্নাথ দর্শন। যাত্রা করলেন পায়ে হেঁটে নয়, বুকে হেঁটে। গণ্ডি কেটে-কেটে। পুরী পৌঁছতে এক বছর লাগল। মাটির ঘষায় বুকে-পায়ে ঘা হয়ে গেছে তবু হটছেন না আনন্দকিশোর। ঘায়ের উপর ন্যাকড়া জড়িয়ে নিয়েছেন।
ভক্তের যদি ন্যাকড়াও না জোটে, তবু ভক্ত ন্যাকড়ার আগুন।
জগন্নাথ স্বপ্ন দিলেন। ‘তুই বাড়ি যা, আমি পুত্র হয়ে তোর ঘরে আসব।’
পুত্র? দু-দুবার বিয়ে করেছিলেন আনন্দকিশোর, দুই স্ত্রীই গত হয়েছেন নিঃসন্তান অবস্থায়। প্রায় পঞ্চাশ বছর বয়স হল, এখন আর তবে পুত্র কি! কিন্তু স্বপ্নবাক্য কি নিষ্ফল হবে?
তৃতীয় বার বিয়ে করলেন আনন্দকিশোর। বিয়ে করলেন নদীয়া জেলার গৌরী জোদ্দারের মেয়ে স্বর্ণময়ীকে।
সেদিন ঝুলন-পূর্ণিমার রাত। পূর্ণিমার চন্দ্র, কিন্তু সবাই বলে কৃষ্ণচন্দ্র।
কিন্তু গৌরীপ্রসাদের ঘরে সেদিন বিপদ উপস্থিত। পরের দুঃখে মন কাঁদে, কোন এক দেনদারের জামিন হয়েছিলেন গৌরীপ্রসাদ। সেই দেনদার হঠাৎ ফেরার হয়েছে। তাই জামিনদারের বিরুদ্ধে ক্রোকী পরোয়ানা বেরিয়েছে আদালত থেকে। অস্থাবর ধরবার পরোয়ানা, আদালতের পেয়াদা চড়াও হয়েছে বাড়িতে।
সে সব দিনে আদালতের পেয়াদা মানে কৃতান্তের অনুচর। বাড়ির মেয়েরা পেয়াদা দেখে যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। স্বর্ণময়ী পালাল বাড়ির পিছনে পিটুলি গাছের নিচে ঘন কচুবনের মধ্যে।
স্বর্ণময়ী আসন্নপ্রসবা।
ক্রোকের হাঙ্গামা চুকে গেল, বাড়ির মেয়েরা সব একে-একে ফিরল বাড়িতে। কিন্তু স্বর্ণময়ী কোথায়? স্বর্ণময়ী কোথায় গেল?
খুঁজতে-খুঁজতে পেল তাকে কচুবনে। এ কি! তার কোলে প্রসন্নহাস হিরন্ময়বপু শিশু।
বিপদ কোথায়! বিপদের দিনে বিপদভঞ্জন। বিপন্নপালক।
এই শিশুই বিজয়কৃষ্ণ।
নিম গাছের নিচে জন্মেছিলেন শ্রীচৈতন্য। পিটুলি গাছের নিচে জন্মালেন বিজয়কৃষ্ণ।
আর আমাদের প্রভু রামকৃষ্ণ জন্মালেন ঢেঁকিশালে। জন্মেই উনুনের ছাই মেখে বিভূতিভূষণ হলেন।
রামকৃষ্ণের রঘুবীর, বিজয়কৃষ্ণের শ্যামসুন্দর।
ভোর বেলা, মন্দিরের দরজা বন্ধ। পূজারী এসে দরজা খুলবে।
শিশু বিজয়কৃষ্ণ সেই দরজা ঠেলছে প্রাণপণে। কাঠের রঙিন বল নিয়ে সে খেলছিল, সে-বল সে খুঁজে পাচ্ছে না। খুঁজে পাচ্ছিস না তো এখানে কি!
এই শ্যামসুন্দরই আমার বল নিয়ে পালিয়ে এসেছে। ও-ও যে খেলছিল আমার সঙ্গে।’
কে শোনে কার কথা! দরজা যখন খুলতে পারছে না গায়ের জোরে, তখন কাকুতি-মিনতি করছে। দাও না আমার বল। কেন বসে আছ দোর এঁটে? বাইরে বেরিয়ে এস না।
দাঁড়াও। কতক্ষণ বন্ধ হয়ে থাকবে? শিশু বিজয়কৃষ্ণ এক লাঠি নিয়ে এসেছে। পূজারী এসে দরজা খুললেই দেখে নেব তোমাকে। কে তখন তোমাকে বাঁচায় দেখব।
দরজা খোলা হলেও মন্দিরে তাকে ঢুকতে দেওয়া হল না। তার যে এখনো পৈতে হয়নি।
সারা দিন উপোস করে রইল বিজয়। মা এসে কত সাধ্যসাধনা করলেন, নরম হল না এতটুকু। শ্যামসুন্দরের উপর প্রতিশোধ না নিয়ে অন্নজল গ্রহণ করবে না সে।
মা ঘরে ভাত রেখে শুয়ে পড়লেন। খিদের কাছেও যে হার মানে না সে কেমনতরো ছেলে!
মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেল স্বর্ণময়ীর। বিজয় যেন কথা কইছে কার সঙ্গে। ‘যাক, ঘাট মানলে। তাই ছেড়ে দিলাম। নইলে দেখাতাম একবার মজা।’ গলার স্বর বদলাল বিজয়।
‘আমি না হয় তোমার উপর রাগ করে খাইনি। কিন্তু তাই বলে তুমি কেন খেলে না?’
স্বর্ণময়ী তো বাক্যহীন।
‘বেশ, বেশ, দুজনে একসঙ্গে খাই এস।’
ঢাকা তুলে ভাত খেতে লাগল বিজয়। তার সঙ্গে আরো এক জন কে খাচ্ছে। শিকারপুরের পাঠশালায় ভর্তি হয়েছে বিজয়। ভীষণ কলেরা লেগেছে শান্তিপুরে। চক্ষের পলকে বহু লোক নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। তার মধ্যে অনেকগুলো বিজয়ের সহপাঠী।
বিজয়ের বেদনার চেয়ে বিস্ময় বেশি। যে মাদুরে তারা বসত সে মাদুর আছে, যে বই তারা পড়ত সেই বই আছে, যে জিনিস নিয়ে খেলাধুলো করত সেই জিনিসগুলো আছে। অথচ তারা নেই। এ কখনো হতে পারে? ঐটুকু শিশু মহা সমস্যায় পড়ে গেল। যা একবার থাকে তা কি আবার না-থাকে? যা একবার হয় তা কি আবার না-হয়?
চিন্তায় হাবুডুবু খাচ্ছে শিশু। কে তাকে মীমাংসা করে দেবে? কে তার সেই গুরুমশাই?
এক দিন ভারি মন নিয়ে চলেছে পাঠশালায়। হঠাৎ তার সেই মৃত সহপাঠীরা দর্শন দিলে তাকে, দিনের আলোয়, পথের মধ্যে। বলে উঠল সমস্বরে: বিজয়, আমরা আছি। আমরা আছি।’
আমরা আছি? আমরা যদি আছি, তবে নিশ্চয়ই তিনিও আছেন।
পাঠশালায় চলে এল একছুটে। পাঠশালার গুরু ভগবান সরকার, তাঁকে বললে সব বিজয়। ভূতের গল্প বলে হেসে উড়িয়ে দিলেন গুরুমশাই। বিজয় জেদ ধরল, আপনি একবার চলুন আমার সঙ্গে। সেই ঝোপের পাশে, পথের উপর। নেইআঁকড়ার পাল্লায় পড়েছেন গুরুমশাই। শেষে তিনি শক্ত হয়ে বললেন, ‘ঠিক বলছিস? তাদের কথা তুই শোনাতে পারবি?’
‘নিশ্চয়ই পারব।’
সেই চেনা জায়গায় নিয়ে এল গুরুমশাইকে। কিন্তু কোথায় সেই ছেলের দল? কোথায় তাদের সেই কচি গলার কলস্বর?
ওরে তোরা কোথায়? তোরা কথা ক। আমরা শুধু আমাদের কথা কইছি। তোরা তোদের কথা ক। তোদের কথাই তাঁর কথা।
চার দিকে শুধু মৌনময় মুখরতা। এ কি গুরুমশাইদের কানে ঢোকে? তারা ইন্দ্রিয়ের প্রমাণ চায়। বলে, দেখাতে পারো? শোনাতে পারো?
‘যত সব ফাজলামো—’ ভগবান সরকার মারতে উঠলেন বিজয়কে।
হঠাৎ একসঙ্গে কতগুলি ছেলে কলধ্বনি করে উঠল: ‘গুরুমশাই, মারবেন না বিজয়কে।
উদ্যত হাত অসাড় হয়ে গেল। ব্যাকুল চোখে চার দিকে তাকাতে লাগলেন ভগবান সরকার।
‘এই যে আমরা। এইখানে, এইখানে। সবখানে–
বিজয়কে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ভগবান সরকার। কে কার গুরু? যে দেখায় আর শোনায় সেই তো আচার্য।
সেই তো দ্রষ্টা, স্রষ্টা, শ্রোতা, ঘ্রাতা, রসয়িতা।
পুরন্দর পূজারী মরে ব্রহ্মদৈত্য হয়েছে। থাকে গাছের উপর। আগে শ্যামসুন্দরের পূজারী ছিল। পুজো করত আর জিনিস সরাত। ভোগ-নৈবেদ্য শুধু নয়, আরো কিছু মোটা জিনিস। তারই পাপে এই গতি।
কিন্তু বিজয়ের উপর ভারি টান। তার সর্বত্র অপদে গতায়াত, তাই আপদে-বিপদে সব সময়ে সে বিজয়কে রক্ষা করে। থাকে তার সঙ্গে সঙ্গে। কখনো দেখা দেয় কখনো বা দেয় না।
যাত্রা শুনতে-শুনতে ঘুমিয়ে পড়েছে বিজয়। আসর ভেঙে গিয়েছে। যে যার মনে কখন ফিরে গিয়েছে বাড়ি-ঘর। ফরাসের একধারে বিজয় শুধু একা ঘুমিয়ে। ঘুম ভেঙে চোখ চেয়ে তো তার চক্ষু স্থির। রাত ঝাঁ-ঝাঁ করছে, সঙ্গী-সাথী নেই কেউ ধারে-কাছে, এখন সে বাড়ি ফেরে কি করে?
খড়মের শব্দ শোনা গেল চটপট। হাতে লণ্ঠন আর লাঠি, কে এক জন কাছে এসে দাঁড়াল। বললে, ‘চল, পৌঁছে দিয়ে আসি।’
এমনি আরো কয়েক বার সে পৌঁছে দিয়ে এসেছে। বিপদে বা বিপথে পড়লেই লাঠি হাতে পুরন্দর এসে দেখা দেয়।
‘ঐ লোকটা কে রে?’ এক দিন জিজ্ঞেস করলেন স্বর্ণময়ী।
‘কোন লোক?’
‘যে তোকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়?”
‘বা, আমি তো জানি তুমিই পাঠিয়ে দাও ওকে। আমাকে ডেকে নিয়ে আসবার জন্যে বুঝি লোক রেখেছ। তবে–
শোন, ওর সঙ্গ করবি নে। ও ব্রহ্মদত্যি।’
হোক ব্রহ্মদৈত্য। দৈত্য থেকেই ক্রমে এক দিন ব্ৰহ্মে গিয়ে পৌঁছুব।
বিজয় না চাইলে কি হবে, পুরন্দর তাকে ছাড়ে না। বলে, আমি যতদিন আছি, ততদিন তোকে আগলে যাব।
‘কিন্তু মা বলেছে, গয়ায় যদি তোমার পিণ্ড দিই?”
ব্যস্, তা হলেই বন্ধন মুক্তি। তাহলেই ঊর্ধ্বযাত্রা। ক্রমোন্নয়ন।
‘কিন্তু, দেখো, তোমরা যেন গয়ায় মরে ভূত হয়ো না।’ হেসে উঠল পুরন্দর।
সেদিন গান শুনে বাড়ি ফিরতে বেজায় দেরি হয়ে গিয়েছে।
পুরন্দর বললে, ‘এই পোড়ো বাড়ির আঙিনার ভেতর দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি যাওয়া যাবে। গাছে বাঁদর আছে, ডালপালায় ঝুপঝাপ করলে ভয় পেয়ো না।’ অমনি গাছের উপর থেকে কে একজন বলে উঠল ব্যঙ্গ করে: ‘বেশ বলেছ যা হোক। গাছে যখন আছি তখন বাঁদর ছাড়া আর কি। কিন্তু ছেলেটার কাছে আসল কথাটা ফাঁস করে দেব না কি?’
তার মানে ছেলেটাকে ভয় দেখাবে। পুরন্দর তেড়ে এল। বললে, ‘ঐ যে বলেছে মরলেও স্বভাব যায় না তোদের হয়েছে তাই—’
ঝগড়া বাধে দেখে বৃক্ষস্থ আরেক জন মধ্যস্থতা করতে এল। গম্ভীর গলায় বললে, ‘পরলোক দেখ! পরলোক দেখ!
শুধু পরলোক নয়, পরম লোককে দেখব। যা প্রেত ও প্রস্থিত তাই এক দিন মহা-স্থিতের কাছে পৌঁছে দেবে। সেই তো আদি বাড়ি। সেখানেই তো আসল উপনয়ন।
ন বছর বয়সে উপনয়ন হল বিজয়ের। টোলে গিয়ে ঢুকল। এক বছরে মুগ্ধবোধ মুখস্ত করে ফেললে। তার পর নিয়ে পড়ল সাংখ্য আর বেদান্তদর্শন।
কিন্তু যতই পড়ো আর লড়ো, তার মখে শুধু এক বুলি। সে বুলির নাম ‘হরিবোল’। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী হরি-ভোলা সংসারে বাস করে না, বাস করে হরি-বোলা সংসারে ।
দক্ষিণেশ্বরে যখন আসে তখনই মুখে ধ্বনি করে: ‘হে শ্রীহরি—
এই শ্রীহরি ডাকটিই পর-পর তিন বার তিন রকম সুরে সে উচ্চারণ করে। এমন করুণ এমন আর্দ্র সেই স্বর যে তপ্ত চিত্ত শীতল হয়, তৃষিত চিত্ত তৃপ্তিতে ভরে ওঠে। মনে হয় সর্বতীর্থময় হরি যেন বাস করছেন এই দক্ষিণেশ্বর তীর্থে। নামাগ্নিতে দগ্ধীভূত হয়ে যাচ্ছে—বিজয়কৃষ্ণকে চিনতে পারল রামকৃষ্ণ। বিধৌত হয়ে যাচ্ছে পরমপাবনী ভক্তিতে। এসেছে সেই ক্ষমা, বৈরাগ্য আর মান-শূন্যতা। সেই আশাবদ্ধসমুৎকণ্ঠা, ভগবানকে পাবার জন্যে বেগবতী আশা আর না পাওয়ার জন্যে ঐকান্তিকী কাতরতা। সেই নামগানে সদারুচি। আসক্তিস্তৎগুণাখ্যানে, প্রীতিস্তৎবসতিস্থলে। বিজয়ের সর্বাঙ্গে সেই ভাবকদম্ব পরিস্ফুট।
ঠাকুরের তখন হাত ভেঙে গেছে, খুব কষ্ট পাচ্ছেন।
একজন ব্রাহ্ম ভক্ত বললে, ‘আপনি তো জীবন্মুক্ত, এই কষ্টটুকু ভুলতে পাচ্ছেন না?’
ঠাকুর বললেন, ‘তোদের সঙ্গে কথা বলে ভুলব? তোদের বিজয়কে আন। তাকে দেখলে আমি আপনাকে ভুলে যাই।’
১৩
কলকাতায় এসে সংস্কৃত কলেজে ভর্তি হল বিজয়কৃষ্ণ। রামচন্দ্র ভাদুড়ীর মেয়ে যোগমায়াকে বিয়ে করলে। বিজয়ের বয়স আঠারো আর যোগমায়ার ছয়।
বিজয়ের দুই বন্ধু রামময় আর কৃষ্ণময় খৃষ্টান হয়ে গেল।
বিরক্তিতে বিভ্রান্ত হল না বিজয়, বেদনায় ভাবতে বসল। হিন্দুধর্মের অনুষ্ঠানে তুলসী-বিল্বপত্রের সঙ্গে অনেক আগাছা এসে ভিড়েছে। তাই লোকে আস্থা হারাচ্ছে। রাস্তা হারাচ্ছে। উন্মার্গগামী হচ্ছে।
এখন উপায় কি।
রংপুরে শিষ্যবাড়ি গিয়েছিল, শিষ্য মন্ত্র আওড়ে পা-পুজো করলে। বললে, তুমি জ্ঞানবর্তিকা জ্বেলে অজ্ঞানের চক্ষুরুন্মীলন করেছ, তোমাকে প্রণাম।
ছাই করেছি। কিছু করিনি। আমার নিজের চোখ কে খুলে দেয় তার ঠিক নেই, আমি গেছি পরের চোখ খুলতে। একেই বলে গয়ায় মরে ভূত হওয়া। করব না আর কপটাচরণ।
যজমানগিরি ছেড়ে দিয়ে স্বাধীন ভাবে খেটে খাব কলকাতায়। পড়ব মেডিকেল কলেজে।
রংপুর থেকে বগুড়ায় এল বিজয়কৃষ্ণ। বগুড়ায় তিন জন ব্রাহ্ম ভক্তের সঙ্গে দেখা হল। এরা তো চমৎকার। যেমন শুনেছিলাম তেমন তো নয়। মদ-ও খায় না, স্বেচ্ছাচারও করে না। শুধু ঈশ্বরের কথা হয়। সেই তো ‘অমৃতস্য পরং সেতু’। বাক্যে তাঁর প্রকাশ হয় না অথচ বাক্যই তাঁর প্রকাশ।
কলকাতায় এসে ব্রাহ্মসমাজে হাজির হল এক দিন। সেদিন দেবেন ঠাকুর বক্তৃতা দিচ্ছেন। বক্তৃতার বিষয়—’পাপীর দুর্দশা ও ঈশ্বরের করুণা’। বক্তৃতা শুনে বিজয় অভিভূত, দ্রবীভূত হয়ে গেল। নিজেকে হঠাৎ মনে করল নিরাশ্রয় বলে। নির্জন, নিঃসহায় বলে। প্রার্থনা করতে বসল। ‘এইমাত্র শুনলাম তুমি অনাথের নাথ, তুমি দীন জনের বন্ধু। তবে আমাকে তুমি নাও, আমাকে তুমি রাখো। তোমাকে যে পায়নি তার মত আর দীন কে! তুমি আমার, এই নিকট অনুভূতি যার নেই সেই তো অনাথ। আমি আর কোথাও যাব না, আর কোথাও ঘুরব না, এই তোমার দুয়ার ধরে পড়ে রইলাম–
তাঁর দরজায় তিনি যে আমাকে পড়ে থাকতে দেবেন এই তো তাঁর অনেক দয়া। ভিখারীকে দোরগোড়ার স্থানটুকুই বা কে দেয়!
শুধু শরণাগতিতেই শান্তি। সর্বসাধনস্তম্ভরূপা শরণাগতি।
‘শান্তিরেব শান্তিঃ, সা মে শান্তিরেধি।’ যা আপনাতেই শান্তি সেই শান্তিই আমার হোক।
ঠাকুর বললেন, ‘কাঠ পোড়া শেষ হলে আর শব্দ থাকে না—উত্তাপও থাকে না। সব ঠাণ্ডা। শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।’
মেডিকেল কলেজের বাংলা বিভাগে পড়ছে বিজয়কৃষ্ণ। সাহেব অধ্যক্ষের সঙ্গে ছাত্রদের সংঘর্ষ বেধেছে। বিজয় সেই ছাত্রদলের পাণ্ডা।
ব্যাপার কি?
এক ছাত্রকে ওষুধচুরির অপবাদ দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করেছেন অধ্যক্ষ। শুধু তাই নয়, জাত তুলে বাঙালীদের গাল দিয়েছেন। আর যায় কোথা! বিজয়ের নেতৃত্বে ছাত্রেরা সব কলেজ ছেড়ে দিলে।
এই নিয়ে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা বিজয়কৃষ্ণের।
বিজয়কে দেখে বিদ্যাসাগরের আনন্দ ধরে না। দুই তেজস্বী চক্ষু সত্যের আলোতে জ্বলছে। দৃপ্ত ব্যক্তিত্বে অবক্র নির্ভীকতা। শুধু তাই নয়, সঙ্গে তীব্র ঈশ্বরানুরাগ।
বিজয় বললে, ‘আপনার বোধোদয়ে সবই তো লিখেছেন, কিন্তু সত্যিকার বোধোদয় হয় যাঁকে আশ্রয় করে, তাঁর কথাই কিছু নেই।’
কোনো উত্তর খুঁজে পেল না বিদ্যাসাগর। বিদ্যার সে সাগর বটে কিন্তু তার নামের প্রথমেই যে ঈশ্বর তার দিকেই ঝুঝি তার চোখ পড়েনি।
বোধোদয়ের পরের সংস্করণে ‘ঈশ্বর’ এল। নতুন পাঠ। কিন্তু নব-নবায়মান রস। পৈতে ফেলে দিয়ে ব্রাহ্ম হল বিজয়কৃষ্ণ। প্রেসিডেন্সি কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করতে লাগল। শুধু বক্তৃতা নয়, প্রচারণা। চাই ব্রহ্মবিদ্যা, পরা বিদ্যা। জড় ধর্ম থেকে মুক্ত হয়ে ভগবানকে লাভ করার সারমর্মই হচ্ছে ব্রাহ্মধর্ম।
এই সময় কেশব সেনের সঙ্গে আলাপ হল বিজয়ের। আলাপের সঙ্গে-সঙ্গেই গভীর বন্ধুতা। একে অন্যের দর্পণ হয়ে দাঁড়াল। এ দর্পণে পরস্পরের মুখ দেখে না, পরাবরের মুখ দেখে।
মেডিকেল কলেজের শেষ পরীক্ষা কাছে, বিজয় বললে, পরীক্ষা দেব না, ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করব। দেশে-দেশে দিকে-দিকে ঈশ্বরের নাম গেয়ে বেড়াব এই ব্যাকুলতাই আমার জীবনের আকর্ষণ। জীবিকার চেয়ে, জীবন বড়। জীবনের চেয়ে জীবনবল্লভ।
কিন্তু প্রচার মুখের কথা নয়। কেশব বললে, দস্তুরমতো পরীক্ষা দিয়ে পাশ করতে হবে।
‘তাই করব।’ পড়াশোনা করে পাশ করলে সহজেই। ধর্মের বৈজয়ন্তী নিয়ে বিজয় বেরুল দিগ্বিজয়ে।
‘এ যে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো।’ আপত্তি করল বন্ধুরা। ‘পেট চলবে কি করে?”
‘যিনি মরুভূমিতে ঘাস বাঁচিয়ে রাখেন, তিনিই রাখবেন।’
মহর্ষি বললেন, ‘নির্দিষ্ট কিছু বৃত্তি দেওয়া যাক তোমাকে।’
প্রবৃত্তির বৃত্তি করতে আসিনি। ঈশ্বরই আমার উদ্যম, ঈশ্বরই আমার উদ্দেশ্য। তাঁর উপরে যদি সত্যি আমার নির্ভর থাকে তা হলেই আমি অভীঃ।
সংসারে তার জায়গা হয়নি, তাই বলে সংসারকে ত্যাগ করেনি বিজয়কৃষ্ণ। শান্তিপুর তাকে তাড়িয়েছে কিন্তু বিজয় চলেছে আসল শান্তিপুরে।
তার গতি দুর্গবিঘাতিনী, তার বাণী অপরাঙ্মুখী।
কলকাতা ব্রাহ্মসমাজের উপাচার্য হল বিজয়।
বুধবার, উপাসনার দিন। প্রলয়ংকর ঝড়বৃষ্টি হচ্ছে। পথঘাট ডুবে গেছে, গাছ পড়েছে অনেক, গাড়ি-ঘোড়া জনমানবের চিহ্ন নেই। জলস্রোতে মৃতদেহ ভাসছে। ঘোর অন্ধকার। কার সাধ্য রাস্তায় বেরোয় এই দুঃসময়ে?
বিজয়ের সাধ্য। প্রথমে হাঁটুজল থেকে গলাজল। তার পরে সাঁতার। পথনদী পার হয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছল মন্দিরে। কিন্তু হা হতোহস্মি, এক জনও আসেনি, ব্যাকুলতার ঝড়ে ভক্তির নদী সাঁতরে। বিশ্বাসের ভেলায় ভেসে। অশ্রুজলের বর্ষণে।
মন্দিরের চাকরকে পাঠাল আচার্যের কাছে। আচার্য মানে দেবেন ঠাকুরের কাছে। তিনি লিখে পাঠালেন: প্রকৃতির আজ করালমূর্তি, আজ এর মধ্যেই পরমেশ্বরের লীলা দর্শন করো।
একাই উপাসনায় বসল বিজয়। বিজয় একাই একশো।
কতক্ষণ পরে কেশব এল পালকিতে করে। বসে পড়ল উপাসনায়। নীরন্ধ্র অন্ধকারে দুটি নিষ্কম্প দীপদ্যুতি—কেশব আর বিজয়। স্বস্থ, শান্ত, স্পন্দনবিরহিত। ব্রহ্মনিষ্পন্ন।
বিজয়ের দিন কাটছে অর্ধাশনে, কখনো অনশনে। চাঁদার খাতায় চার আনা আট আনা ভিক্ষে করে। কখনো বা দেড় পয়সার মুড়ি খেয়ে। বাড়ির প্রাঙ্গণে কাঁটানটে শাক ফলেছে অজস্র, তাই দিয়ে ভাত মাখে। তাও না জোটে তেঁতুলগোলা দিয়ে। তবু ঈশ্বরস্খলন নেই, নেই স্বভাবচ্যুতি।
কণ্ঠকূপে ক্ষুৎপিপাসা নিবৃত্তি—এই কাম্যকর্মত্রয় বিজয়ের। ‘অন্নচিন্তা চমৎকারা’- এ যেন বিজয়ের পক্ষে খাটে না। সে জানে তৃষ্ণাসূত্রে ছিন্ন না হওয়া পর্যন্ত জীবের সমস্তই দুঃখ, তৃষ্ণাচ্ছেদ থেকে যে কৈবল্য তাই একমাত্র আনন্দ। বিজয় আছে সেই বৃহদানন্দে, জগদানন্দে। যদি সে পৌত্তলিকতা বর্জন করে থাকে তবে সে সুখ-শান্তি অর্থ-আরাম যশ-মান—সমস্ত উপাধিই বর্জন করবে। উপাধিরই বিকার, উপাধিরই মৃত্যু, আত্মা স্থির, নির্বিচল।
আত্মা প্রকাশক, জড় প্রকাশ্য। কেবল উপাধির যোগেই ভাবি আত্মাই বুঝি কর্তা, আত্মাই বুঝি ভোক্তা। অবিদ্যার বশেই নিজেকে দেহবান মনে করি। মন মায়া, আভাস মাত্র। আমাদের আসল অধিষ্ঠান চৈতন্যে। ঈশ্বর মায়ার অতীত। ঈশ্বর চৈতন্যস্বরূপ।
বিজয় সেই চৈতন্যের দ্যোতনা।
কেশব আর বিজয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পারছে না পাদ্রিরা। খৃষ্টধর্মে আর আকৃষ্ট হচ্ছে না বাঙালী, ব্রাহ্মধর্মেই পাচ্ছে তাদের পিপাসার পানীয়।
এখন কি করা! পাদ্রিরা ঠিক করল তর্কসভায় ব্রাহ্ম-প্রচারকদের আহবান করা যাক। তাদের তর্কে পরাস্ত করতে পারলেই বিদ্বৎসমাজ কৃতনিশ্চয় হবে যে খৃষ্টধর্মই শ্রেষ্ঠধর্ম।
তখন কেশব বিজয় আর প্রতাপ এলাহাবাদে। উপাসনার পরে মন্দিরে এক দিন এসেছে এক পাদ্রি। মহাজ্ঞানী আর তর্কবীর বলে প্রখ্যাত। খোদ বিলেত থেকে এসেছে খৃষ্টান মিশনের প্রতিনিধি হয়ে। আগে পাদ্রি, পরে বেনে, শেষকালে সৈন্য। এই ইংরাজী কূটনীতি। আগে মিষ্টি বুলি, পরে টাকার টুং-টুং, শেষ-কালে অস্ত্রের ঝঞ্ঝনা। সাদরে অভ্যর্থনা করল কেশব।
‘তোমরা খৃষ্টধর্ম প্রচারে বাধা দিচ্ছ। সে বিষয়ে খোঁজ করতে এসেছি আমি। ধর্ম সম্বন্ধে আমি বিচার করতে চাই তোমাদের সঙ্গে। কি তোমাদের বক্তব্য, কি বা তার ভাব—’
চার দিকে তাকাল পাদ্রি। কার সঙ্গে কথা কইব? কে তোমাদের মধ্যে উপযুক্ত? যাকে ইচ্ছে তাকেই বেছে নাও। কিন্তু তোমাকে কে বাছল, তাই ভেবে পাচ্ছি না। ‘ঐ যে এক জন বসে আছে স্থির হয়ে, উপাসনা শেষ হয়ে যাবার পরেও যে নড়ছে না, ওর নাম কি?”
‘বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী।’
‘ওর সঙ্গেই আমি কথা কইব। ওকে বলো না, চেয়ারে এসে বসবে, ও ভাবে পা মুড়ে বসবার আমার অভ্যেস নেই।’
বিজয়ের ধ্যান ভাঙল। জানল সাহেবের অভিপ্রায়।
বললে, ‘সাহেব, পাণ্ডিত্য তো অগাধ সঞ্চয় করেছ। আমার পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর আগে দাও। প্রশ্ন থেকেই বুঝে নাও ভারতবর্ষের জিজ্ঞাসার গভীরতা। ধর্ম কি? তার উৎপত্তি কোথায়? আত্মা কাকে বলে আর তার স্বরূপ কি? সত্য কি জিনিস? কাকে মায়া বলে? পাপ কি, কেন?”
পাদ্রি সাহেব এ পাশ ও পাশ তাকাতে লাগল, বললে, ‘এ সব প্রশ্ন তো কই শুনিনি কোথাও। এ আবার কি কথা। আমরা তো শুধু বাইবেল জানি, বাইবেলই পড়েছি—’
‘সাহেব, এ দেশের নাম ভারতবর্ষ।’ কেশব বললে, ‘এ দেশ থেকেই ধর্ম আর সভ্যতা গ্রীস হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তোমাদের ইউরোপে। এ দেশকে জানো, বোঝো, তবে এসো এ দেশকে ধর্মে দীক্ষা দিতে। প্রশ্নের উত্তর তুমি যদি নিজে দিতে না পারো, তোমার দেশে ফিরে যাও, সেখান থেকে উত্তর নিয়ে এস।’
সৃষ্টির প্রথম প্রশ্নের ভারতবর্ষই শেষ উত্তর।
ভারতবর্ষ বৃক্ষ, আর সব ছায়া। একে সেবা করো, উচ্ছিন্ন কোরো না। আমাদের সেবা মঙ্গলরূপিণী। ‘সেবিতব্যঃ মহাবৃক্ষঃ’।
যখন তিনি দূরে তাঁকে আরাধনা করি আর যখন তিনি কাছে তখন তাঁকে সুখে সেবা করি। তিনি সুখসেব্য দূরারাধ্য। তিনি গুহ্যগভীরগহন হয়েও সহজ-সুন্দর। তুমি, সাহেব, বুঝবে না এ তত্ত্ব। আগে শ্রদ্ধা দিয়ে বুদ্ধিকে বিশুদ্ধ করো। পরে দেখ ভারতবর্ষকে।
আর বাক্যস্ফুট না করে চম্পট দিলে পাদ্রি সাহেব।
শুষ্ক জ্ঞানে মন ভরে না বিজয়ের। মন ভক্তি চায় প্রীতি চায়। প্রীতিই একমাত্র মাধুর্যবিষয়িণী। আর ভাগবতী প্রীতিই ভক্তি। ভক্তিতেই সমস্ত জ্ঞানের অবসান।
ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচার করতে-করতে বিজয় বৃন্দাবনে এসেছে। উপাসনার মধ্যে হঠাৎ কৃষ্ণের গোষ্ঠলীলার বর্ণনা শুরু করে দিলে। ব্রাহ্মরা যারা শুনেছিল তারা চঞ্চল হয়ে উঠল। এ কি পদস্খলন!
‘কে জানে! স্পষ্ট চোখের উপর দেখলাম কৃষ্ণ গোঠে গরু নিয়ে যাচ্ছে।’
শুধু তাই নয়, উপাসনায় বসে মাঝে-মাঝে ‘মা’ ‘মা’ করে ওঠে।
এ কী হচ্ছে! ক্ষুণ্ণ হয় ব্রাহ্মরা। এ কি ভগবতী না জগদ্ধাত্রীর আবাহন? কিন্তু সেই অধীর আর্তি স্পর্শ করে সবাইকে। এ তো বৈধী ভক্তি নয়, এ রাগানুগা ভক্তি। শাস্ত্রের শাসনে ঐশ্বর্যবানে যে ভক্তি তা বৈধী ভক্তি আর মাধুর্যময়ী স্বভাবরুচির ভক্তিই রাগানুগা ভক্তি। বৈধী ভক্তি পিতা, রাগানুগা ভক্তিই মা। ‘জয় জয় বিজয়ের জয়!’ কেশব চিঠি লিখছে বিজয়কে: ঈশ্বরকে একমাত্র নেতাজ্ঞানে উচ্চকণ্ঠে তাঁর নাম কীর্তন কর। বৈরাগী হয়ে পদানত কর সংসারকে। উৎসাহের উত্তাপ দিয়ে জাগাও প্রসুপ্তকে, এক প্রীতির বন্ধনে সবাইকে বেঁধে ফেল। যারা নিজেদের দরিদ্র বলে বোধ করছে, তাদের ভগবৎ-বিত্তে সম্রাটের চেয়েও ধনবান কর। দেশে-বিদেশে আমাদের রাজ্য বিস্তৃত হোক।
বাইরে প্রচার হচ্ছে আর এদিকে ঘরের মধ্যে চেঁচামেচি। বিধবা বিয়ে, অসবর্ণ বিয়ে, ব্রাহ্মমতে শ্রাদ্ধ–এই সব নিয়ে। তুমুল হট্টগোল। কেশবকে সবাই খৃষ্টান বলতে শুরু করে দিয়েছে। শুধু তাই নয় দিচ্ছে তাকে আরো অপকৃষ্ট অপবাদ। বইছে শুধু ঈর্ষার বিষবায়ু।
বিজয়ের মন বিমুখ হয়ে উঠল। আছি শ্রীপাদপদ্মবিষয়ণী ভক্তি নিয়ে, এ সব আবার কি সংস্কারের উৎপাত! যেন অধিষ্ঠানের চেয়ে অনুষ্ঠান বড়! বিজয় চলে এল কালনায়, ভগবান দাস বাবাজীর আশ্রমে।
জল খেতে চাইল বিজয়। বললে, আমি ব্রহ্মজ্ঞানী, আমাকে কিন্তু আলাদা পাত্রে জল দেবে। বাবাজী বললে, ‘যার জ্ঞান তারই তো ভক্তি। ভক্তি বাদ দিয়ে কি জ্ঞান সম্ভব? আমার পিপাসাও আজ চরিতার্থ করব। আমার কমণ্ডলুতেই জল খান। বাবাজীর পাত্রেই জল খেল বিজয়।
এক ঢোঁকে বাকি জল খেয়ে নিলেন বাবাজী। কমণ্ডলু মাথায় ঠেকালেন।
‘এ কি করলেন? ইনি যে ব্রাহ্ম।’ কে এক জন চেঁচিয়ে উঠল: ‘এঁর যে পৈতে নেই।’
‘আমার অদ্বৈতেরও ছিল না। ব্রাহ্মসমাজে গেছেন, কিন্তু সেখানেও আমার গোঁসাইই আচার্য।’
‘আহা, আচার্যের কি বাহার! গায়ে জামা, পায়ে জুতো, আহা ফিটফাট ফুলবাবুটি! ব্যঙ্গ করে উঠল সেই অভক্ত।
‘প্রভুকে আমার পরিপাটি করে সাজাও।’ ভগবান দাস উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন: ‘আমি দেখতে পাচ্ছি, আমার প্রভুর ললাটে তিলক, শিরে জটাজুট ও গলায় তুলসীর মালা। সর্বাঙ্গে বৈষ্ণব চিহ্ন। ‘
ব্রাহ্মমন্দিরে কীর্তন ঢোকাল বিজয়।
‘কর্ণের ভূষণ আমার সে নাম শ্রবণ,
নেত্রের ভূষণ আমার সে রূপ দর্শন,
বদনের ভূষণ আমার সে রূপ কথন,
হস্তের ভূষণ আমার সে পদ সেবন,
(ভূষণের কি আর বাকি আছে)
আমি কৃষ্ণচন্দ্রহার পরেছি গলে।’
কেশবকে কীর্তনে দীক্ষিত করলেন ঠাকুর। কেশব গলায় খোল ঝোলালো। মাঝখানে ঠাকুরকে রেখে সকলে নাচছে। কেশবও শুরু করলে নাচতে।
কেশব যেমন আসে তেমনি ঠাকুরও যান কেশবের বাড়িতে।
নিমাই সন্ন্যাস দেখতে কেশবের বাড়িতে গিয়েছেন ঠাকুর। কেশবের এক খোশামুদে শিষ্য কেশবকে বললে, ‘কলির চৈতন্য হচ্ছেন আপনি।’
কেশব ঠাকুরের দিকে তাকাল। হাসতে হাসতে বললে, ‘তাহলে ইনি কি হলেন?” ঠাকুর বললেন, ‘আমি তোমার দাসের দাস। রেণুর রেণু।’
কেশবকে বড় ভালোবাসে রামকৃষ্ণ। তার সঙ্গে তার অন্তরের মাখামাখি।
কিন্তু কাপ্তেন খড়্গহস্ত। সে বলে, কেশব ভ্রষ্টাচার, সাহেবের সঙ্গে খায়, ভিন্ন জাতে মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। ‘আমার সে সবে দরকার কি? কেশব হরিনাম করে, দেখতে যাই, শুনতে যাই। আমি কুলটি খাই, কাঁটায় আমার কি কাজ?”
কাপ্তেন ছাড়ে না তবু। ‘কেশব সেনের ওখানে যাও কেন তুমি?
‘আমি তো টাকার জন্যে যাই না। আমি হরিনাম শুনতে যাই। আর তুমি লাট সাহেবের বাড়িতে যাও কেমন করে? তারা তো ম্লেচ্ছ—’
তবে নিবৃত্ত হল কাপ্তেন।
কেশবকে লক্ষ্য করে রঙ্গরসের গান গায় রামকৃষ্ণ:
‘জানি ওহে জানি বঁধূ
তুমি কেমন রসিক সুজন,
বলি, আর কেন কর প্রাণ জ্বালাতন।
নেচে ঘুরে ঘুরে
অভিমানে মুখ ফিরায়ে
বঁধূ আর কেন কর প্রাণ জ্বালাতন৷
রমণীর মন ভুলাতে
নিতি হয় আসতে-যেতে
কেন এলে নিশি প্রভাতে
ওহে, মদনমোহন বংশীবদন৷৷’
বিজয়কে কবে গান শোনাবে রামকৃষ্ণ? কবে তাকে নাচতে শেখাবে? কবে দেখবে তার গৈরিকবাস সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী মূর্তি?
আর, বিজয়কৃষ্ণ কবে এসে রামকৃষ্ণের পদতলে পড়বে? বক্ষে ধারণ করবে সেই পাদপদ্ম?
আর, সেই তো পরং পদং, পরা কাষ্ঠা।
১৪
ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করছে বিজয়, আবার সেই সঙ্গে চিকিৎসাও করছে। চার দিকে এত রুগী, চুপ করে বসে থাকলে চলে কি করে? যেটুকু জ্ঞান ভাণ্ডারে আছে তা পরিবেশন না করে শান্তি কই?
দর্শনী ঠিক করল আট আনা। কিন্তু শুধু রোগ তো নয়, রোগের সঙ্গে নিষ্ঠুরতম রোগ—দারিদ্র্য। তাই গরিব রুগীদের ওষুধ আর পথ্য জোগাতে গিয়ে দর্শনী অদৃশ্য হয়ে গেল। দর্শনী নেই বটে কিন্তু হতে লাগল অপূর্ব দর্শন।
রাত্রে প্রায়ই স্বপ্ন দেখে বিজয়। দেশনেতা সুরেন বাঁড়ুয্যের বাপ দূর্গাচরণ বাঁড়ুয্যে নামজাদা ডাক্তার। তিনি গত হয়েছেন বটে, কিন্তু স্বপ্নে প্রায়ই দেখা দেন বিজয়কে। কঠিন সব রোগের ব্যবস্থাপত্র দিয়ে যান। বিজয় তাই বিছানায় কাগজ ও পেন্সিল নিয়ে ঘুমোয়। স্বপ্নে পাওয়া প্রেসকৃপশান ভোরে উঠেই টুকে রাখে। সে অন্ধকারে-ঢিল-ছোঁড়া ওষুধ নয়, সে একেবারে বিশল্যকরণী।
ডাক্তার হিসেবে বিজয়ের তাই জয়-জয়কার।
শুধু ডাক্তার হিসেবে?
শান্তিপুরের ওপারে গুপ্তিপাড়া। সেখানকার এক রুগী এসেছে বিজয়ের হাতে। সকালে একবার দেখে এসেছে, এখন আবার বিকেলে গিয়ে খোঁজ নেওয়া দরকার। শুধু খোঁজ নেওয়া নয়, নতুন আরেক দফা ওষুধ দিতে হবে। কিন্তু যায় কি করে? বর্ষাকাল, নিদারুণ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়েছে। খেয়া বন্ধ, পাটনী রাজী নয় নৌকো ছাড়তে। তবে, উপায়? উপায় জগৎপিতা। কাপড়ের পাগড়ি করে ওষুধের শিশি মাথায় বাঁধল বিজয়, বর্ষার ভরা নদী পার হয়ে গেল সাঁতরে।
রুগী চোখ চেয়ে দেখল, দুয়ারে ধন্বন্তরি দাঁড়িয়ে।
সেই দুর্গাচরণই শেষে আরেক দিন স্বপ্ন দেখালেন। বললেন, ‘তুমি কি শুধু দেহের চিকিৎসা করেই দিন কাটাবে? অন্তরের চিকিৎসা করবে না? তুমি শুধু আয়ুর্বেদী নও, তুমি ভবরোগবৈদ্য।
ডাক্তারি ছেড়ে দিল বিজয়। থাকে বন্ধু ব্রজসুন্দর মিত্রের বাড়িতে। তাকে উদ্দেশ্য করে চিঠি লিখল তক্ষুনি: ‘ভাই, আমার ভিখিরির ঘরে জন্ম, তাই আবার ভিক্ষের ঝুলি কাঁধে তুলে নিলাম। ব্যবসা করা আমার পোষাল না। তাই তোমার আশ্রম ছেড়ে চললাম আবার নিরুদ্দেশে। ঈশ্বরের পায়ে নিজেকে বহু দিন বেচে দিয়েছি, তাই তিনি আর আমাকে ত্যাগ করতে পারবেন না। ব্রাহ্মধর্মের জয় হোক। আমার শোণিত পোষণ করুক ব্রাহ্মধর্মকে। ব্রাহ্মধর্মই আচরণীয়। প্রচরণীয়।’
শান্তিপুরে নির্জনে এসে বাস করছে বিজয়। শুধু স্থানের নির্জনে নয়, গুহাশয়ী মনের নির্জনে। হঠাৎ এক দিন সেখানে দেখা দিল শ্যামসুন্দর। বিজয় তাকে ত্যাগ করেছে বটে, কিন্তু শ্যামসুন্দর যে ত্যাগীকেও ত্যাগ করে না। ছাড়তে শিখিয়েও যে ধরে থাকে। পথহারা করিয়েও যে পথ দেখায়!
তোকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এলাম, নিয়ে এলাম মন্দির থেকে মুক্ত প্রাঙ্গণে—’বললে শ্যামসুন্দর: ‘আবার তুই এসে সেই ঘরে ঢুকেছিস? ঢুকেছিস সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে? বেরিয়ে আয়, বেরিয়ে আয় আগল ভেঙে—’
কে শোনে কার কথা! বিজয় ভাবলে ছলনা। নিরংশ জ্ঞানের জগতে ভাবের কুজ্ঝটিকা।
আরেক দিন গভীর রাত্রে ব্রহ্মনাম সাধন করছে বিজয়, মনে হল রুদ্ধ দরজায় কে ঘা মারছে বাইরে থেকে। ভাবতন্দ্রা ঘুচে গেল বিজয়ের। প্রশ্ন করলে: ‘কে?’
কোনো উত্তর নেই। শুধু দ্রুত করশব্দ। মনে হল এক জন নয়, বহু লোকের সমাগম হয়েছে বাইরে।
খুলে দিল দরজা। এক দল জ্যোতির্ময় পুরুষ ঘরে ঢুকল একসঙ্গে। জ্যোতির প্লাবনে ভরে গেল গৃহাঙ্গন।
তাদের মধ্য থেকে এক জন এল এগিয়ে। বললে, ‘আমি অদ্বৈত আচার্য। আর চেয়ে দেখ, ইনি মহাপ্রভু, ইনি নিত্যানন্দ, ইনি শ্রীবাস —
প্রিয়তন্ময়তায় বিহ্বল হয়ে রইল বিজয়।
‘তোমার ব্রাহ্মসমাজের কাজ শেষ হয়েছে।’ বললে অদ্বৈত আচার্য: ‘এবার মহাপ্রভুর শরণাপন্ন হও। স্নান করে এসো চট করে। মহাপ্রভু দীক্ষা দেবেন তোমাকে। নাম দেবেন।’
কুয়োর ধারে চলে এল বিজয়। নিশীথ রাত্রে স্নান করলে। মহাপ্রভু তাকে দীক্ষা দিয়ে সদলবলে অন্তর্হিত হলেন।
পরদিন সকালে কুয়োতলায় ভিজে কাপড় দেখে যোগমায়া তো অবাক। স্বামীর দিকে জিজ্ঞাসু চোখ তুলতেই বললে সব বিজয়। শুধু স্ত্রীকেই নয়, কেশব সেনকেও বললে চুপিচুপি।
কেশব বললে, ‘কাউকে বোলো না আর এ-কথা। কেউ বিশ্বাস করবে না। তোমাকে পাগল বলবে।’
নিজেরই পাগল বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে স্বপ্নজাল। ব্রাহ্মধর্মে তার ভক্তি অচলা কি না তাই পরীক্ষা করবার ভৌতিক ষড়যন্ত্র। কতগুলি প্রেতলোকবাসী আত্মা এসেছিল হয়তো, তাকে একটু দেখে গেল বাজিয়ে। দেখে গেল মন টলে কি না। খাঁটি কি না সে তার ব্রহ্মৈক্যবাদে।
বিজয় আছে বজ্রবন্ধনে। তার ব্রাহ্মী স্থিতি নিশ্চল স্থিতি। সে টলবার পাত্র নয়।
ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে কাশীতে এসেছে বিজয়। এসে ত্রৈলঙ্গ স্বামীর সঙ্গে দেখা। শুধু দেখা নয়, সাহচর্য। সঙ্গে-সঙ্গে থাকে আর দেখে তার কাণ্ড-কারখানা। নৈকট্যের তাপ নেয়। নেয় যোগামৃতরসের স্বাদ।
তখনো স্বামীজী অজগরবৃত্তি নেননি, কিন্তু মৌনাবলম্বন করে রয়েছেন। সারা দিন ধরে ঘুরছে-ফিরছে দুজনে, খাওয়া নেই। এক সময় হঠাৎ ইশারায় জিজ্ঞেস করলেন স্বামীজী, কিছু খাবে? বিজয় হ্যাঁ করল। অমনি স্বামীজী ইশারা করলেন আরেক জনকে, বিজয়ের জন্যে কিছু খাবার নিয়ে এস। খাবার এসে গেল তক্ষুনি, কিন্তু পাঁচ-সাত জনের খাবার। বিজয় বললে, এত আমি খেতে পারব না। আপনি কিছু খাবেন?
খাব। স্বামীজী হাঁ করলেন। ইশারায় বললেন, মুখের মধ্যে ফেলে দাও।
আস্তে-আস্তে সমস্ত খাবারই নিঃশেষ হবার যোগাড়। গ্রাস আর রুদ্ধ হয় না কিছুতেই।
বিজয় দেখলে, সমূহ বিপদ। তার ভাগে আর থাকে না বুঝি এক মুঠ। তাড়াতাড়ি সে তার ভাগটা সরিয়ে রাখল চালাকি করে। ঠিক চোখে পড়েছে স্বামীজীর। স্বামীজী হাসলেন, লিখে দিলেন মাটিতে-বাচ্চা সাঁচ্চা হ্যায়।
এক দিন এক কালীমন্দিরে নিয়ে গেলেন বিজয়কে। প্রস্রাব করে কালীর গায়ে ছিটিয়ে দিতে লাগলেন। বিজয় তো হতভম্ব। জিজ্ঞেস করলে, এ কি?
মাটিতে লিখে দিলেন ত্রৈলঙ্গ স্বামী: ‘গঙ্গোদকং।’
‘কিন্তু গঙ্গাজল ছিটিয়ে দেবার মানে?”
‘পুজা-পুজা করছি।’
‘এ পুজার দক্ষিণা কি?”
দক্ষিণা? দক্ষিণা যমালয়।’
অর্থাৎ দক্ষিণ দিকে যমালয়৷
মন্দিরের পুরোত-পুজারীদের কাছে ব্যাপারটা প্রকাশ করে দিল বিজয়। তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হল না। বললে, ‘তা তো ঠিকই। এর প্রস্রাব তো গঙ্গোদকই। ইনি যে সাক্ষাৎ বিশ্বনাথ।’
এক দিন ত্রৈলঙ্গ স্বামী মৌনভঙ্গ করলেন। দশাশ্বমেধ ঘাটে এসে বললেন, ‘আস্নান করো।’
নিজের হাতে ধরে স্নান করালেন বিজয়কে। বললেন, ‘তোকে দীক্ষা দেব।’
বিজয় পরিহাস করে উঠল: ‘আর রাজ্যে লোক নেই, আপনার কাছ থেকে দীক্ষা! আপনার গঙ্গোদকের যে নমুনা তাতে ভক্তি উড়ে গেছে।’ পরে গম্ভীর হয়ে বললে, ‘আমি ব্রহ্মজ্ঞানী। গুরুবাদ মানি না। মাপ করুন, পারব না দীক্ষা নিতে।’
‘বাচ্চা সাঁচ্চা হ্যায়’—এবার মুখর হয়ে ঘোষণা করলেন স্বামীজী। পরে বললেন, শোন, তোর গুরু আমি নই—সে আসবে ঠিক সময়ে। আমি শুধু তোর শরীর শুদ্ধ করে দেব। আমার উপরে তাই ভগবানের আদেশ।
কানে মন্ত্র দিল বিজয়ের। বিজয় ভাবল একাকিনী গঙ্গা দিয়ে বুঝি হবে না। গঙ্গাকে এসে মিশতে হবে যমুনার সঙ্গে। জ্ঞানকে এসে মিলতে হবে ভক্তির নির্মল মুক্তিতে। জ্ঞান আত্মানন্দ, ভক্তি বিশ্বানন্দ। ভগবৎ-তত্ত্বের প্রকাশকারিণী শক্তির নামই ভক্তি। ভক্তই ভগবৎ-অস্তিত্বের প্রমাণ। ভক্তিই বিশ্বাত্মতা।
দেহ-গেহে ভক্তিই প্রীতি-প্রদীপ। ভক্তি ছাড়া সবই অন্ধকার।
লাহোরে এসেছে বিজয়, প্রচারের কাজে। হঠাৎ খবর পেল, তার মা, স্বর্ণময়ী পাগল হয়ে গেছেন। পাগল হয়ে কোন দিকে যে চলে গেছেন কেউ জানে না। তক্ষুনি বাড়ি ফিরল বিজয়। কিন্তু কোথায় মা! কে এক জন কাঠুরে বললে, ‘বাঘের গায়ে শিয়র দিয়ে ঘুমোচ্ছেন।’
বনগাঁয়ের কাছাকাছি দূর্ভেদ্য বন। মা’র খোঁজে সেখানেই ঢুকল বিজয়। এমন স্থান নেই যা বিজয়ের কাছে অজেয়।
ঠিকই বলেছে কাঠুরে। বাঘের গায়ে মাথা রেখে মা ঘুমোচ্ছেন। মা’র বসন নেই, বাঘের নেই হিংসে। মা’র চোখ বোজা, কিন্তু বাঘ চেয়ে আছে মা’র দিকে। বশ্যতার তৃপ্তিতে।
লোকজন জড়ো করল বিজয়। বাঘকে তাড়িয়ে মাকে সরিয়ে আনতে হয়! কিন্তু কে এগোয়—কী নিয়ে এগোয়!
গোলমালে তন্দ্রা ভেঙে গেছে স্বর্ণময়ীর।
বাঘকে জিজ্ঞেস করছেন, ‘বাঘ, তুই কার?”
দুই চোখে ভয়ঙ্কর স্থৈর্য নিয়ে স্তব্ধ হয়ে আছে বাঘ।
‘বল, সত্যি করে, তুই আমার? আমার যদি হোস, আমাকে তবে তোর পিঠে কর দিকিনি?”
নিশ্চল হয়ে বসে রইল বাঘ। একটা শুধু হাই তুলল।
‘বুঝেছি, তুই আমার নোস। কি করেই বা আমার হবি? আমি যে উলঙ্গ কালী। আমি তো দশভুজা নই। দশভুজা দূর্গা যদি হতাম, তুই তবে আমায় পিঠে চড়াতিস।’
বাঘ তেমনি প্রশান্তদৃষ্টি।
‘দাঁড়া, তোর জন্যে কিছু খাবার নিয়ে আসি।’ বলেই স্বর্ণময়ী বেরুলেন বন থেকে। ছুটলেন নক্ষত্রগতিতে। চক্ষের পলকে বিজয় তাঁর পায়ে পড়ল।
‘কে তুই?” থমকে দাঁড়ালেন স্বর্ণময়ী।
‘আমি আপনার দাস।’
‘দাস হওয়া কি মুখের কথা? কিন্তু দেখি তোর মুখখানি! কেমন যেন চেনা-চেনা মনে হচ্ছে।’
‘আপনি চিনবেন না? বিশ্বভুবনের সমস্ত আপনি চেনেন, আর আমাকে চিনবেন না?”
কে কাকে চেনে? কিন্তু তোকে কোথায় এর আগে দেখেছি বল তো? দেখেছি তো, আবার দেখিনি কেন? কোথায় ছিলি? সেখান থেকে আবার এলি কি করে এখানে?”
মাকে স্নান করাল বিজয়। পরিয়ে দিল নতুন কাপড়। বাড়িতে এনে তুলসী তলায় আসন পাতলে। সে আসনে মাকে বসিয়ে বললে, ‘মা, আহ্নিক করো।
‘আহ্নিক কাকে বলে?” স্বর্ণময়ী যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ‘সে কি কথা? আহ্নিক তোমার মনে নেই? আমি বলে দেব?’
মৃদু-মৃদু হাসলেন স্বর্ণময়ী। ‘বল তো—শুনি।
কোন বাল্যকালে মন্ত্র দিয়েছিলেন মা, তাই মা’র কানে উচ্চারণ করলে বিজয়। শোনামাত্রই স্বর্ণময়ীর চোখ অশ্রুতে আচ্ছন্ন হয়ে এল। ভক্তির অশ্রু, আনন্দের অশ্রু! বিজয় এখনো তা হলে ভোলেনি। মুক্তির পথে বেরুলেও এখনো তার মাকে মনে আছে! আর, ভক্তিই তো মুক্তির মা।
চিদবিলাসের সূচনাই ভক্তি সমাপ্তিই প্রেম। সেই ভক্তির আভাস কি এখনো জাগবে না বিজয়ে?
প্রতিমায় কি শুধু শিলা? মন্ত্রে কি শুধু অক্ষরযোজনা? শুদ্ধ চেতনার চেয়ে আবেগানুরাগ কি বড় নয়? শুষ্ক একটা বিদ্যমানতার বোধে বুক ভরে কই? সেই বোধের বস্তুতে নিয়তচিত্ত থাকবার জন্যে চাই আতীব্র অনুরাগ। সুখকর অনুসরণ। সেই ঈশ্বরপ্রীতি-প্রার্থনাই ভক্তি। ভক্তিই জাগতিক ক্ষুধানাশক।
‘না, বিজয় আছে নির্বিশেষ জ্ঞানের স্বরাজ্যে। ঈশ্বরের অগাধবোধে৷
তাই তার অসহ্য মনে হল যখন শুনল কেশব সেনকে ব্রাহ্মরা কেউ-কেউ অবতার বলে খাড়া করতে চাইছে। ঈশ্বরজ্ঞানে কেশবের পায়ের ধূলো নিচ্ছে; শুধু তাই নয়—জল দিয়ে পা ধুয়ে দিচ্ছে নিজের হাতে। এ কী পৌত্তলিক তামসিকতা! খেপে গেল বিজয়। সরাসরি গিয়ে পাকড়াও করল কেশবকে।
এ সব কি হচ্ছে? তুমি আর-সবাইর পুজো নিচ্ছ?”
‘তার আমি কি জানি!’ কেশব পাশ কাটাতে চাইল কথাটার। বললে, ‘লোকে কি করে না করে তাতে আমার কি যায় আসে! অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করার আমার অধিকার কোথায়?”
উত্তর মোটেই মনঃপুত হল না বিজয়ের। লোকে তোমাকে নিয়ে যদৃচ্ছা নাচবে, আর তুমি বলবে কি না স্বাধীনতা! বিজয় লেখনীতে কশাঘাত শুরু করলে। সংবাদপত্রের কালো কালি লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। কেশবের দলের লোকেরা বিজয়কে নাস্তিক বলে গাল দিলে। কেউ-কেউ বা মারের ভয় দেখালে। বিজয়ের দল নেই। কোনো বন্ধনে সে বন্দীভূত নয় ।
হতশ্রী কোলাহল শুরু হয়ে গেল চার দিকে। কেশবের নিজেরই কেমন খারাপ লাগতে লাগল। আতিশয্যের মাঝে আর দেখতে পেল না ঐশ্বর্য। সর্বত্র অভ্যাসের শুষ্কতা।
কে এক ভক্ত পায়ে ধরে কাঁদছে।
‘এখানে কি?’ ধমকে উঠল কেশব। ‘আমার কাছে কাঁদলে কি হবে? ঈশ্বরের কাছে গিয়ে কাঁদুন।’
আপনিই তো সেই ঈশ্বরের অবতার।’
মিথ্যে কথা। আমি এক জন সামান্য মানুষ।’
সামান্য মানুষ? ভক্তের দল চটে গেল। কেশবকে গাল পাড়তে শুরু করলে। বললে, ভণ্ড, মিথ্যেবাদী।
বিজয়ের সঙ্গে হাত মেলাল কেশব। আমরা কেউ কারু নিজের জয় চাই না। শুধু ঈশ্বরের জয় হোক। জয় হোক ব্রাহ্মধর্মের।
কিন্তু সে বারের ঝগড়া বুঝি আর মেটে না।
কেশবের আন্দোলনে ব্রাহ্মবিবাহ আইন পাশ হয়েছে। সে আইনে অন্যূন বয়স ধার্য হয়েছে, ছেলের পক্ষে আঠারো আর মেয়ের পক্ষে চৌদ্দ। বেদী থেকে ঘোষণা করল কেশব, এ বিধি কেবল রাজবিধি নয়, এ ঈশ্বরের বিধি। কিন্তু ঘটল বিধি-বিড়ম্বনা। কুচবিহারের রাজার সঙ্গে নিজের মেয়ের বিয়ে ঠিক করেছে কেশব। কিন্তু মেয়ের বয়স চৌদ্দ হয়নি এখনো। তাতে কি! রাজার সঙ্গেই মেয়ের বিয়ে দেবে। আইন লঙ্ঘন হয় হোক, কেশব মানবে না সে-আইন। আবার ঘোষণা করল কেশব, এ বিয়ে ঈশ্বরের আদেশ। ঈশ্বরের আদেশের কাছে আবার আইন কি!
এ হচ্ছে সংকীর্ণ সুবিধাবাদীর ব্যবস্থা। বিজয় খেপে গেল। ফুলের চেয়ে সে মৃদু হোক, সে আবার বজ্রের চেয়েও কঠোর। ক্ষমায় সে পৃথিবীর সমান হোক | কিন্তু তেজে সে কালানল।
তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল। শুধু লেখনীতে নয়, বক্তৃতায়। অন্যায় ও অসত্যের প্রতিবাদ না করা পাপ। আর নিজের যা স্খলন বা বিচ্যুতি তা ঈশ্বরের উপর আরোপ করা ঘোরতর দুষ্কৃতি।
তুমুল লড়াই শুরু হল। এ যদি মারে ঢিল ও ছোঁড়ে কাদা। শেষ পর্যন্ত বিজয়ের স্ত্রী যোগমায়াকে ভয় দেখিয়ে চিঠি। বিজয়কে ক্ষান্ত করুন, নইলে বিপদ অনিবার্য।
চিঠি পড়ে হাসল বিজয়। বললে, ‘কেশব কি আমার সৃষ্টিকর্তা না পালনকর্তা যে ও আমাকে বিপদে ফেলবে? আসুক বিপদ, তবু সত্যের অপমান আমি সইতে পারব না।’
মেয়ের বিয়ে শেষ পর্যন্ত হিন্দুমতেই দিতে হল কেশবকে। আহত ভুজঙ্গের মত সে ফুঁসতে লাগল। ‘নববিধান’ নাম দিয়ে সে নতুন ব্রাহ্মসমাজ চালু করলে। বিজয়ের দলে শিবনাথ শাস্ত্রী, আনন্দমোহন বসু আর দুর্গামোহন দাশ। তারা স্থাপন করলে ‘সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ।’
অসাধারণ ঝগড়া। আকাশ রইল আকাশের মনে, ঘট নিয়ে মারামারি।
কিন্তু কেশব যখন একবার রামকৃষ্ণের দেখা পেল তখন আর আবার ঝগড়া কি কিসের বিবাদ-বচসা, কিসের মতভেদ! মনের মালিন্য মুছে গেল এক মূহুর্তে, বইতে লাগল প্রসন্নতার মুক্তবায়ু। চোখের সামনে জ্বলছে মূর্তিমান ব্রহ্মজ্ঞানাগ্নি! এ আগুনের কাছে আবার শত্রু-মিত্র কি, মান-অপমান কি, নিন্দা-স্তুতি কি! শুধু নির্গলিত আনন্দ। অমৃতায়িত নির্মলতা।
এ আর কেউ নয়—জাজ্জ্বল্যদর্শন রামকৃষ্ণ। সর্বকামদ কল্পতরু। অহেতুক দয়ানিধি। এর খবর কি কেউ না দিয়ে থাকতে পারে? বিজয় গুরুর সন্ধানে বনে বনে ঘুরছে সে একবার দেখে যাক রামকৃষ্ণকে৷
তাই কেশব লিখে পাঠাল: বন্ধু একবারটি দেখবে এস। এমনটি তুমি আর দেখনি। বিজয় ছুটে এল খবর পেয়ে। এসে কী দেখল?
কি দেখল কে জানে! রামকৃষ্ণের দুই পা বুকের মধ্যে চেপে ধরল। স্পর্শাতীতের জগতের স্পর্শমণিকে খুঁজে পেয়েছে।
দেখল, সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর বসে আছে। সমস্ত প্রশ্নের সমাধান। সমস্ত তর্কের নিষ্পত্তি। সমস্ত জটিলতার মীমাংসা। সমস্ত যাত্রার উত্তরণ।
নরপূজার বিরদ্ধে এক দিন প্রতিবাদ করেছিল বিজয়। কিন্তু, এখন এ সব কি হচ্ছে?
নর কোথায়? এ যে নরাকারে নিরাকার!
পরমেশ্বর ইচ্ছাবশে মায়াময় রূপ ধরে অবতীর্ণ হয়েছেন সংসারে।
অতীন্দ্রিয় রাজ্যের সম্রাট হয়েও আছেন হৃদয়েশ্বর হয়ে। খেলার সাথী হয়ে, বিশ্রম্ভের সখা হয়ে। স্নেহে মাতা পালনে পিতা হয়ে। দশদিগন্তব্যাপী প্রেমের মহাসমুদ্র হয়ে।
বিজয়ের কণ্ঠে শুধু সেই শ্রবণলোভন আকূতি, ‘হে শ্রীহরি—’
