পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.১৫
১৫
শুধু বিজয়কে নয়, আরো অনেককেই কেশব ডেকে নিয়ে গেল একে-একে। কেশব শুধু নিমিত্ত। যিনি অন্তরে বসে ডাক দেবার তিনিই ডাক দিলেন। এগারো নম্বর মধু রায় লেনে থাকে রামচন্দ্র দত্ত—সে গেল সকলের আগে। ক্যাম্বেল মেডিকেল ইস্কুল থেকে ডাক্তারি পাশ করে বেরিয়েছে—ঘোরতর নাস্তিক। নাস্তিক হলেও রামকৃষ্ণের প্রতি অশ্রদ্ধাবান নয়। যখন কেশব বললে, যীশু খৃষ্টের মত ‘রামকৃষ্ণেরও ‘ট্রান্স’ হয়, তখন রাম দত্ত ভাবল, মৃগী রোগ নিশ্চয়ই।
‘না হে, হাত-পা খেঁচাখেঁচি করে না। ধীর-স্থির শান্ত হয়ে থাকে। আপনা-আপনি ভালো হয়। ডাক্তার লাগে না কখনো।’
কি জানি বা! এমনতরো কই পড়িনি বইয়ে।
প্রগতিবাদী ছেলে-ছোকরারা ব্যঙ্গ করে পরমহংসকে। বলে, গ্রেট গূস।
পানিহাটিতে বৈষ্ণবদের উৎসব হচ্ছে। যাকে বলে হরিনামের হাটবাজার। ভক্তদের নিয়ে ঠাকুর যাচ্ছেন সে উৎসবে। ভক্তদের মধ্যে স্ত্রী-পুরুষ দুইই আছে। চার-চারটে পানসি ভাড়া করা হয়েছে।
শ্রীমা যাবেন কি না—এক জন স্ত্রী-ভক্ত এসে জিজ্ঞেস করলে ঠাকুরকে। “তোমরা তো সবাই যাচ্ছ—’ বললেন ঠাকুর, ‘ওর যদি ইচ্ছা হয় তো চলুক—’ ইচ্ছা হয় তো চলুক—নিশ্চয়ই মন খুলে মত দিচ্ছেন না। প্রচ্ছন্ন সুরটি ঠিক ধরতে পেরেছেন শ্রীমা। যদি মন খুলে সম্মতি দিতেন, তা হলে প্রফুল্ল স্বরে বলে উঠতেন, হ্যাঁ, যাবে বৈ কি। তার বদলে, ইচ্ছা হয় তো চলুক। একটু যেন কুণ্ঠার কুয়াশা আছে কোথাও৷
শ্রীমা গেলেন না। বললেন, ‘অত ভিড়ে আমি যাব না। তোমরা যাও।’
উৎসবশেষে ঠাকুর ফিরেছেন দক্ষিণেশ্বরে। ঠাকুর বলছেন, ‘সাধে কি আর ও যায়নি, ও মহাবুদ্ধিমতী। ওর নাম সারদা।’
স্ত্রী-ভক্তরা ঠাকুরের দিকে তাকিয়ে রইল উৎসুক হয়ে।
‘ওখানে আমার ভাবসমাধি হচ্ছিল, তাই দেখে কেউ-কেউ রঙ্গ করছিল আমাকে নিয়ে।’ ঠাকুর বললেন ক্ষমাময় স্নিগ্ধ হাস্যে: ‘ওকে সঙ্গে দেখলে নিশ্চয়ই বলত ঠাট্টা করে—হংস-হংসী এসেছে!’
তুমি যদি মানসসরোবর, আমরা মানসযাত্রী হংস। আমাদের সমস্ত প্রাণ তোমার দিকে উড়ে চলুক পাখা মেলে। দৈনিক জীবনযাত্রার মধ্যে আমাদের সমাপ্তি নেই, আমরা তাই যাত্রা করেছি তোমার দিকে। পরিপূর্ণের দিকে। অপর্যাপ্তের দিকে।
কলকাতা মেডিকেল কলেজের সহকারী রসায়ন-পরীক্ষক হয়েছে রাম দত্ত। কুরচি গাছের ছাল থেকে রক্তামাশায়ের ওষুধ বের করেছে। বিজ্ঞানের আওতায় এসে নাস্তিকতার নেশায় পেয়েছে। ঈশ্বর আছেন তার প্রমাণ কি? তাঁকে কি দেখা যায়?
ব্রাহ্মসমাজে ঘোরে রাম দত্ত। তারা তো ঈশ্বরকে নিরাকার বলেই কাজ সেরেছে দেখবার আর দায় রাখেনি।
পর-পর এক মেয়ে আর দুই ভাগ্নী মারা গেল কলেরায়। বিজ্ঞানে কুলোল না ডাক্তারি। ডাক্তারকে উপহাস করলে। অস্থির হয়ে পড়ল রাম দত্ত। দগ্ধ মনে শান্তির ওষুধ দেবে এখন কোন ডাক্তার?
হঠাৎ এক দিন দক্ষিণেশ্বরের দিকে রওনা হল। সঙ্গে দুই মিত্তির—মনোমোহন আর গোপালচন্দ্র। দেখি রামকৃষ্ণ কি বলে!
গিয়ে দেখে, দরজা বন্ধ। ভিতরে নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু কি বলে তাকে ডাকে। দ্বিধা করতে লাগল রাম দত্ত। রামকৃষ্ণ মনের কথা টের পেয়েছে। অমনি খুলে দিল দরজা। ‘নারায়ণ’ বলে নমস্কার করলে।
আমাদের মনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে নারায়ণ। জেনে-শুনেও খুলি না দরজা। অর্গল এঁটে মনের অন্ধকারে বসে কাঁদি।
‘বোসো।’
বসল তিন জন। রাম দত্তের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘হ্যাঁ গা, তুমি না কি ডাক্তার। আমার হাতটা একবার দেখ না।’
রাম দত্ত তো অবাক। কি করে জানলে?
এক মুহূর্তে ফুটে উঠল অন্তরঙ্গতার আবহাওয়া। একে যেন সব কিছু বলা যায়, এ একেবারে ঘরের মানুষ। জিজ্ঞেস করল রামচন্দ্র: ঈশ্বর কি আছেন?” ‘দিনের বেলায় তো একটি তারাও দেখা যায় না। তাই বলে কি বলবে তা নেই?” বললে রামকৃষ্ণ। ‘দুধে মাখন আছে কিন্তু দুধ দেখলে কি তা ঠাহর হয় যদি মাখন দেখতে চাও, দুধকে আগে দধি করো। তার পর সূর্যোদয়ের আগে মন্থন করো সে দধিকে। তখন দেখতে পাবে মাখন।’
কিন্তু কি করে তাঁকে দেখা যায়?
বড় পুষ্করিণীতে মাছ ধরতে চাইলে কি করো? আগে খোঁজ নাও। যারা সে পুকুরে মাছ ধরেছে তাদের থেকে খোঁজ নাও। কি মাছ আছে, কি টোপ খায়, কি চার লাগে। শেষে সেই পরামর্শানুসারে কাজ করো। ধরো সেই মনোনীত মাছ।’ একটু থামল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘কিন্তু ছিপ ফেলামাত্রই কি মাছ ধরা পড়ে? স্থির হয়ে অপেক্ষা করতে হয়। তবেই আস্তে আস্তে “ঘাই” আর “ফুট” দেখা যায়। তখন বিশ্বাস হয়, পুকুরে মাছ আছে—আর বসে থাকতে-থাকতে আমিও এক দিন ধরে ফেলব।’
ঈশ্বর সম্বন্ধেও তাই। গুরুর কাছে তত্ত্ব করো। ভক্তি-চার ফেল। মনকে ছিপ করো। প্রাণকে কাঁটা। নামকে টোপ। তার পরে টোপ ফেল সরোবরে। ঈশ্বরের ভাব-রূপ ‘ফুট’ আর ‘ঘাই’ জানান দেবে। বসে থাকো তন্নিষ্ঠ হয়ে। টোপ গিলবে মাছ। খেলিয়ে-খেলিয়ে ডাঙায়, মানে সংসারে তুলে নিয়ে আসবে। সাক্ষাৎকার হবে।
তার পর?
তার পর আর কি। সেই মাছ তখন ঝালে খাও ঝোলে খাও ভাজায় খাও অম্বলে খাও।
শান্তি পেল রাম দত্ত। শোকে অস্থির হয়ে কাজকর্ম ছেড়ে দিয়েছিল, আবার ধীর-স্থির হয়ে কাজ করতে লাগল। ঈশ্বর যদি আছেন তবে সুরাহা এক দিন একটা হবেই। সমস্ত কাটাকুটি ও যোগ-বিয়োগের পর হিসেব এক দিন মিলবেই। মন খাঁটি করে রইল।
কুলগুরুর কাছে দীক্ষা না নিয়ে রামকৃষ্ণের থেকে দীক্ষা নিল রাম দত্ত। রাম দত্ত বৈষ্ণব, দীক্ষাদাতা শাক্ত। পাড়ায় ঢি-ঢি পড়ে গেল। ‘রাম ডাক্তারের গুরু জুটেছে হে। ঐ যে দক্ষিণেশ্বরে থাকে—কৈবর্তদের পুজুরী। কেলেঙ্কারি করলে মাইরি’
সবাই চটল। চটল কিন্তু পিছিয়ে গেল। পিছন থেকে চিপটেন কাটতে লাগল। এগিয়ে এল পাড়ার সুরেশ মিত্তির, আসল নাম সুরেন মিত্তির। দুর্ধর্ষ শাক্ত। কেশব সেন যখন বিডন স্কোয়ারে ব্রাহ্মধর্মের বক্তৃতা দেয়, তখন তার খোলের চামড়া কেটে দিয়েছিল ছুরি দিয়ে।
‘ওহে রাম, তোমার গুরুর কাছে একবার নিয়ে চল।’ বললে সুরেশ। ‘কেমন হংস একবার দেখে আসি।’
রাম দত্ত হাসল। বললে, ‘চল।’
‘কিন্তু এক কথা। তোমার হংস যদি মনে শান্তি দিতে না পারে তবে তার কান মলে দিয়ে আসব।
সে যুগে ‘কান মলে দেব’ কথাটার বড় বেশি চল। অন্যের কানটা যেন হাতের কাছেই আছে এমনি একটা আত্মদৃপ্ত উদ্ধত ভাব সকলের।
সিমলে স্ট্রীটে থাকে। সদাগরি অফিসের মুৎসুদ্ধি। বুদ্ধিতে পাটোয়ার। আর মদে টুপভুজঙ্গ। গেল রাম দত্তের সঙ্গে। দেখল ভক্ত-পরিবৃত হয়ে ভাবে বিভোর হয়ে বসে আছে রামকৃষ্ণ। রাম দত্ত প্রণাম করল। এক পাশে সুরেশ বসল নির্লিপ্ত হয়ে। ভাবখানা এই, কান মলে যে দিইনি এই যথেষ্ট।
বাঁদরের বাচ্চা না বেড়ালের বাচ্চা—এই গল্পটাই তখন বলছিল রামকৃষ্ণ।
‘বাঁদরের বাচ্চা জোর করে মা’র কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ে, মা ব্যাজার হয়ে ফেলে দেয়, পড়ে গিয়ে কিচমিচ করে। কিন্তু মা-অন্ত প্রাণ বেড়ালছানা মা-ও মা-ও, কি না মা-মা বলে ডাকে। মা যেখানে রাখে সেখানেই সুখে থাকে। ছাইয়ের গাদায়ই হোক বা গদিবিছানায়ই হোক। একেই বলে নির্ভরের ভাব—’
অমৃতময় কথা। সুরেশের সমস্ত জিজ্ঞাসার নিরসন হয়ে গেল। ভক্তিভরে প্রণাম করল রামকৃষ্ণকে।
রামকৃষ্ণ বললে, ‘কালী ভজনা কর যখন, মা’র উপর নির্ভর রাখ ষোলো আনা। তবে মাঝে-মাঝে এসো এখানে, ভগবৎ-ভাবের উদ্দীপনা হবে!’
‘ভাই, কান মলতে গিয়েছিলাম, কান মলা খেয়ে এলাম।’ রাম দত্তের কানে-কানে বললে সুরেশ।
নরেন্দ্রনাথেরও সেই কথা।
নরেন্দ্রনাথ আরো দুর্ধর্ষ। সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে উপাসনায় ধ্রুপদ গায়। হার্বাট স্পেনসার, স্টুয়ার্ট মিল পড়ে। গলার জোরে গায়ের জোরে তর্ক করে। পাদ্রীদেরও ছাড়ে না। তেড়েফুঁড়ে কথা কয়। কথার দাপটে ভূত ভাগায় । তাকে এক দিন ধরলে রাম দত্ত। ‘বিলে, শোন –’
নরেন দাঁড়াল।
‘দক্ষিণেশ্বরে এক পরমহংস আছেন দেখতে যাবি?”
‘সেটা তো মুখ্খু’– এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিল নরেন। বললে, ‘কী তার আছে যে শুনতে যাব? মিল স্পেনসার লকি-হ্যামিলটন এত পড়লাম, কোনো কিনারা হল না। ঐ একটা কৈবর্তের বামুন, কালীর পুজুরী-ও কি জানে?’
‘একবার গিয়ে কথা বলেই দেখ না—’
কি ভাবল নরেন। বললে, ‘বেশ, যদি রসগোল্লা খাওয়াতে পারে তো ভালো, নইলে কান মলে দেব বলছি।’
স্যার কৈলাস বসুও চেয়েছিলেন ঠাকুরের কান মলতে।
রাম দত্তকে বললেন, ‘তুমি বলছ, তাই যাচ্ছি একবার তোমার পরমহংসকে দেখতে। যদি ভালো লোক হয়তো ভালো, নইলে তার কান মলে দেব বলে রাখছি।’ ঠাকুর তখন কাশীপুরের বাগানে, অসুস্থ। উপরে আছেন। নিচে বসে অপেক্ষা করছে কৈলাস। নিচের ঘরের অবস্থার বর্ণনা দিচ্ছে এই ভাবে: ‘আরে, গিয়ে দেখলম নরেনটা বিএ পাশ করে একেবারে বকে গেছে। নিচেকার হল-ঘরের কতগুলো ছোঁড়া নিয়ে এলোমেলো ভাবে বসে আছে আর রামের বাড়ির সেই চাকর-ছোঁড়া লাটু—সেটাও বসে আছে ওদের সঙ্গে। আরে ছ্যা!’
উপর থেকে কে এক জন চলে এল নিচে। বললে, ‘ঠাকুর পাঠিয়ে দিলেন। বললেন, যে বাবুটি আমার কান মলে দেবেন বলেছেন তাঁকে ওপরে নিয়ে এস। তাই নিতে এসেছি। তিনি কে, কোনটি?”
কৈলাস তো স্তম্ভিত! সিমলেতে ঘরের মধ্যে বসে রামের সঙ্গে কি কথা কয়েছি কাশীপুরের বাগানে সে-কথা এল কি করে এখুনি? স্থলিত পায়ে উঠে গেল কৈলাস। অচ্যুত-পায়ে প্রণাম করলে। মানলে গুরু বলে, দিগদর্শক বলে। কিন্তু গিরীশ ঘোষ আরেক কাঠি সরেস। তার থিয়েটারে গিয়েছেন ঠাকুর, মাতাল হয়ে তাঁকে বাপান্ত গালাগাল করলে গিরীশ। নেপথ্যে নয়, মুখের উপর। দক্ষিণেশ্বরে ফিরে এসে তাই বলছেন ঠাকুর: শুনেছ গা! গিরীশ ঘোষ দেড়খানা লুচি খাইয়ে আমায় যা না তাই বলে গালাগাল দিয়েছে।
‘ওটা পাষণ্ড। ওর কাছে আপনি যান কেন?”
যাই কেন! যাই বলে এই ব্যবহার! রাম দত্তের কাছে নালিশ করলেন ঠাকুর। কেন, বেশ তো করেছে। ঠিকই করেছে।
গিরীশকে সমর্থন করল রাম দত্ত। ‘শোন, শোন, রাম কি বলে শোন। সে আমার মাতৃপিতৃ উচ্চারণ করল, আর রাম বলে কি না—’
‘ঠিকই বলি। কালীয়কে শ্রীকৃষ্ণ তাড়া করলেন, কি জন্যে তুমি বিষ উদ্গীরণ কর? কালীয় কী বললে? বললে, ঠাকুর, তুমি আমাকে বিষ দিয়েছ, সুধা উদ্গীরণ করব কি করে? গিরীশ ঘোষকে আপনি যা দিয়েছেন তাই দিয়ে সে আপনার পূজা করছে।’
হাসলেন ঠাকুর। বললেন, ‘যাই হোক, আর কি তার বাড়িতে যাওয়া ভালো হবে?
‘কখনোই না।’ অনেকে বলে উঠল একসঙ্গে।
‘রাম, গাড়ি আনতে বলো।’ উঠে পড়লেন ঠাকুর। ‘চলো তার বাড়ি যাই।’
সকলে তো লুপ্তবাক।
তুমিও চলো, রাম। তুইও চল, নরেন। পতিতপাবন চললেন জীবোদ্ধারে।
১৬
হে ঈশ্বর, তুমি তো জানো আমরা কত দূর্বল, কত অক্ষম, কত ক্ষণভঙ্গুর। মুখোমুখি তোমার সামনে গিয়ে যে দাঁড়াতে পারি এমন আমাদের সাধ্য নেই। কি করে সইব তোমার সেই আলো, কি করে বইব তোমার সেই ভালোবাসা!
আমরা ক্ষুদ্র, আমরা ক্ষীণ, আমরা অল্পপ্রাণ। তা জানো বলেই তো আমাদের জন্যে তোমার এত কৃপা, এত অনুকম্পা। তাই তো তোমার ও আমাদের মাঝখানে তুমি অন্তরাল রচনা করেছ। তোমার চিরন্তন উপস্থিতির উলঙ্গ উজ্জ্বলতা সইতে পারব না বলেই এই অন্তরাল। এই অন্তরালটিই তোমার মায়া। এই অন্তরালের নামই সংসার।
ছোট-ছোট বেড়া তুলে দিয়েছ আমাদের চার পাশে। ধনের বেড়া মানের বেড়া অহঙ্কারের বেড়া। তুচ্ছ আশা-আকাঙ্ক্ষার শুকনো খড়কুটো দিয়ে চাল ছেয়ে দিয়েছ মাথার উপরে। আশে-পাশে ছোট-ছোট সুখ-দুঃখের ঘুলঘুলি বসিয়েছ। মৃত্তিকার মেঝেটি শীতল করে লেপে দিয়েছ স্নেহ-প্রেমের সিঞ্চনে। এমনি করে অপরিসর ঘরের মধ্যে আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে তুমি দূরে সরে দাঁড়িয়েছ। সরে না দাঁড়িয়েই বা করবে কি। তোমার কি দোষ! আমরাই যে অশক্ত, অসমর্থ। তোমার আলোর ছটায় আমাদের দু চোখ যে ধাঁধিয়ে যাবে, তোমার ভালোবাসার ভারে ভেঙে পড়বে যে আমাদের বুক। তাই তুমি কৃপা করে তোমার ও আমাদের মাঝখানে মায়ার যবনিকা ফেলে রেখেছ। রেখেছ এই রমণীয় ব্যবধান। এই মনোহর দুরত্ব।
সংকীর্ণ পর্বতপথরেখা ধরে চলেছে রামসীতা, অনুগামী লক্ষ্মণকে সঙ্গে নিয়ে। সর্বাগ্রে রাম, রামের পিছনে সীতা, সীতার পিছনে লক্ষ্মণ। এই তাদের বনাভিযানের চিরন্তন চিত্র। রাম আর লক্ষ্মণের মাঝখানে অপরিহরণীয়া সীতা। লক্ষ্মণ ভাবছে, এত দিন চলেছি একসঙ্গে, রামকে দাদা ছাড়া আর কিছু বলে দেখতে পেলাম না কোনো দিন। হনুমান তাঁকে নারায়ণ বলে সেবা করছে, বিভীষণও পূজো করছে বিষ্ণু জ্ঞানে, কিন্তু আমার কাছে তিনি শুধু আমার সেই শাদাসিদে দাদা, দশরথের জ্যেষ্ঠ পুত্র। আমি তো কই তাঁকে কেষ্টবিষ্টু বলে দেখতে পাচ্ছি না। কি করে পারবে? কি করে রামকে দেখবে তাঁর স্বভাব- মূর্তিতে? লক্ষ্মণ আর রামের মধ্যখানে যে মায়ারূপিণী সীতা দাঁড়িয়ে। মায়াই যে দেখতে দিচ্ছে না মায়াধীশকে। সীতা যতক্ষণ না সরে দাঁড়াচ্ছেন ততক্ষণ শ্রীরামদর্শন হচ্ছে না লক্ষ্মণের। ততক্ষণ রাম শুধু দশরথের ছেলে, শুদ্ধ-ব্রহ্ম-পরাৎপর রাম নয়।
তেমনি, ঈশ্বর, এই মায়াময় সংসার সৃষ্টি করে তুমি আমাদের দৃষ্টি থেকে নিজেকে আড়াল করেছ। তোমাকে ভুলে থাকবার খেলায় অষ্টপ্রহর মেতে আছি আমরা। কিন্তু তুমি তোমার নিজের খেলায় মেতে থেকেও আমাদের ভোলনি। যবনিকা সরিয়ে মাঝে-মাঝে উঁকিঝুঁকি মারছ। আভাসে তোমার গায়ের বাতাস আমাদের গায়ে লাগছে। আমরা চমকে চমকে উঠছি, বুঝতে পারছি না, ধরতে পারছি না। এমন একেকটা আনন্দ দিয়েছ, তোমাকে দেখবার জন্য ব্যগ্র হয়ে বাইরে ছুটে এসেছি। এমন একেকটা দুঃখ দিয়েছ, ঘরের নিঃসঙ্গ অন্ধকারে কেঁদেছি তোমাকে বুকে নিয়ে। তবু কই, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি কই! রুদ্ধদৃষ্টি বধির যবনিকা দুর্ভেদ্য বাধা মেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে চোখের সামনে।
এই যবনিকা উত্তোলন করো। উন্মোচিত করো এই নিষ্ঠুর অবগুন্ঠন। তোমাকে দেখতে দাও। দেখতে দাও তোমার সম্পূর্ণ মুখচ্ছবি। তোমার নীরবতার মুখ, গভীরতার মুখ, অতলতার মুখ। পদ্ম যেমন সূর্যকে দেখে, তেমনি করে দেখতে দাও তোমাকে৷ তুমি অপাবৃত হও, উদ্ঘাটিত হও, দূর করে দাও এই আচ্ছাদনের কুহেলি।
সারদা হঠাৎ মুখের ঘোমটা খুলে দাঁড়াল রামকৃষ্ণের সামনে। আর রামকৃষ্ণ করজোড়ে স্তব করতে লাগল।
মুখের ঘোমটা ঠিক সারদা নিজে সরায়নি, সরিয়েছে আরেক জন। সেই কথাটাই বলি।
এমনিতে সব সময়ে মুখের উপর ঘোমটা টানা সারদার। যখন রামকৃষ্ণের কাছে এসে দাঁড়ায়, তখন জড়পুত্তলী ছাড়া তাকে আর কি বলবে! যা-ও দু-একটা কথা কয়, তা-ও ঘোমটার ভিতর দিয়ে। কথার সঙ্গে-সঙ্গে মুখের ভাবটি কেমন হয় তা কে জানে!
রামকৃষ্ণের তখন খুব অসুখ, সারদা থাকে দূরে, শম্ভুবাবুর সেই চালাঘরে। রামকৃষ্ণের সেবার তাই অসুবিধে হচ্ছে। কাশী থেকে কে একজন মেয়ে এসেছে, সেই সেবা করছে রামকৃষ্ণের। সেই মেয়ের কি নাম, কোথায় বাড়ি, কবে এল কবে যাবে কেউ কিছু খবর রাখে না।
এক দিন রাত্রে সেই কাশীর মেয়ে চালাঘর থেকে সারদাকে ধরে নিয়ে এল। ধরে নিয়ে এল সটান রামকৃষ্ণের ঘরের মধ্যে। রামকৃষ্ণ যেখানে বসে ছিল সেইখানে তার চোখের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সারদা। মুখে তার সেই দীর্ঘ ও দুর্ভেদ্য ঘোমটা।
কাশীর মেয়ে সহসা সবল হাতে সারদার সেই মুখের ঘোমটা খুলে ফেলল এক টানে। রামকৃষ্ণকে দেখাল সেই মুখ।
রামকৃষ্ণ কী দেখল রামকৃষ্ণই জানে।
করজোড়ে তৎক্ষণাৎ স্তব শুরু করল। কোথায় অসুখ, কোথায় সেবা, সমস্ত রাত ভগবৎ-কথা ছাড়া আর কথা নেই। ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সারদা। পটার্পিতের মত। কখন যে রাত পুইয়ে ভোর হয়ে গেল ধীরে-ধীরে, কেউ টের পেল না।
এবারে কলকাতায় এসে সোজাসুজি দক্ষিণেশ্বরে উঠল না সারদা। সঙ্গে প্রসন্নময়ী ছিল, উঠল প্রথমে তার বাসায়। পরদিন সকালে দক্ষিণেশ্বরে হাজির। সারদার মা শ্যামাসুন্দরী সেবার সঙ্গে এসেছে, সারদা তাই একটু তটস্থ। মনে আশা, মাকে কেউ একটু সমাদর করুক। মিষ্টি করে কথা বলুক দুটো।
বরং ঠিক তার উলটোটা ঘটল। হৃদয় এল তেরিয়া হয়ে। শ্যামাসুন্দরীকে লক্ষ্য করে বললে, ‘এখানে কি! এখানে তোমরা কি করতে এসেছ?” শ্যামাসুন্দরী তো হতবাক। সারদা অপ্রস্তুত। এমন কাণ্ড কে কবে দেখেছে ! দরজায় পা দিতে-না-দিতেই গলাধাক্কা!
আর কাউকে কথা বলতে দিল না। নিজেই গজরাতে লাগল হৃদয়: ‘তোমাদের এখানে আসবার কি দরকার! বলা নেই কওয়া নেই সটান এখানে এসে হাজির! এখানে মজাটা কিসের জানতে পারি?”
শ্যামাসুন্দরী শিওড়ের মেয়ে, হৃদয় তাই তাকে গ্রাহ্যই করলে না। উলটে অপমান করলে। সবাই ভাবলে রামকৃষ্ণ এর একটা প্রতিকার করবে। কিন্তু হাঁ-না কিছুই বললে না রামকৃষ্ণ। বলতে গেলে গালমন্দ করে হৃদয় তাকে নাস্তানাবুদ করবে। হৃদয়ের মুখ তো নয় যেন বিষের হাঁড়ি। হৃদয়কে রামকৃষ্ণের বড় ভয়।
শেষকালে শ্যামাসুন্দরী বললে, ‘চল দেশে ফিরে যাই। এখানে কার কাছে মেয়ে রেখে যাব?”
অন্তরে মরে গেল সারদা। মা’র মনের ব্যথাটি গুমরাতে লাগল মনের মধ্যে।
‘তাই যাও মেয়ে নিয়ে। ওরে রামলাল, পারের নৌকো এনে দে।’
রামলাল নৌকো নিয়ে এল। সেই দিনই মাকে নিয়ে ফিরে গেল সারদা। আর কোনো দিন আসব না এমন কোনো প্রতিজ্ঞা করল না রাগ করে। বরং মা-কালীকে উদ্দেশ করে মনে-মনে বললে, ‘মা, আবার যদি কোনো দিন আনাও তো আসব।’
হৃদয়কে নিয়ে রামকৃষ্ণের বড় যন্ত্রণা। বড় হাঁকডাক করে, কথায়-কথায় হৈ-হুজ্জুত। এত শাসন-জুলুম ভালো লাগে না রামকৃষ্ণের। অথচ উচ্চ-বাচ্য করার যো নেই। কিছু বলতে গেলেই আবার তেড়ে আসবে। দাঁতে খড়কে দিয়ে বসে থাকে রামকৃষ্ণ।
শুধু কি তাড়না? ফোড়ন দিতেও ষোলো আনা ওস্তাদ।
কাউকে হয়তো উপদেশ দিচ্ছে রামকৃষ্ণ, অমনি হৃদয় চিপটেন ঝাড়ল: ‘তোমার বুলিগুলি সব এক সময়ে বলে ফেল না! ফি বার একই বুলি বলার মানে কি?”
সর্বাঙ্গ জ্বলে গেল রামকৃষ্ণের। ঝাঁজিয়ে উঠল তক্ষুনি: ‘তা তোর কি রে শালা? আমার বুলি, আমি লক্ষ বার ঐ এক কথা বলব—তাতে তোর কি?’
গালাগাল তো দেয়ই, আবার থেকে-থেকে টাকা-টাকা করে। জমি-জায়গার ফিকির খোঁজে। হাটে যায় গরু কিনতে। এক দিন রামকৃষ্ণকে এসে বললে, একখানি শাল কিনে দাও দেখি।
রামকৃষ্ণ তো অবাক। আমি কোথা শাল পাব?
‘না দেবে তো নালিশ করব বলে রাখছি।’ হৃদয় চোখ রাঙালো।
কর্ না। শেষকালে শালের বদলে শূল এসে না জোটে।
শুধু চাওয়া আর চাওয়া! শুধু হৈচৈ। আশুতোষের ঘরে কেউ নয়, সবাই অসন্তোষের ঘরে। বাজ পড়লে ঘরের মোটা জিনিস তত নড়ে না, শার্সিই খটখট করে।
রামকৃষ্ণ ঠিক করল কাশীবাসী হব। আর সহ্য হয় না জ্বালাতন।
কিন্তু কাশী যে যাবে, কাপড় না-হয় নেবে, কোনো রকমে রাখবে না-হয় পরনে, কিন্তু টাকা নেবে কেমন করে? হাতে মাটি দেবার জন্যে মাটি নিতে পারে না রামকৃষ্ণ। বটুয়া করে পান আনবার যো নেই। কাশী যাবার টিকিট রাখবে কিসের মধ্যে?
আর কাশী যাওয়া হল না।
কিন্তু একটা ব্যবস্থা তো দরকার।
ব্যবস্থা আবার কি! হৃদয় না হলে দেখবে-শুনবে কে, সেবা করবে কে? বর্ষার দিনে পেট খারাপের সময় মাছের ঝোল আর শুক্তোর যোগাড় দেখবে কে?
তুমি তোমার কাজ করো না। হৃদয়কে থাকতে দাও না তার মোড়লির মণ্ডলে। তুমি এত বড় জগৎ-সংসারের মোড়লি করছ, হৃদয়ের এই সেবার প্রভুত্বে কেন বাদ সাধছ? হৃদয় আর কাউকে তোমার পা ছুঁতে দেয় না, শুধু ঐ পা দুখানি নিজের নিভৃত বুকে ধরে রেখেছে বলে।
তবু জীব-নিয়তির বন্ধন তার গলায়। সে টাকা চায়, জমি চায়, স্ত্রী-পুত্র-পরিবার চায়। তোমার ও তার মাঝখানে চায় সে একটি সহন-শোভন যবনিকা। জীবনাটকের বিচিত্রিত পটপৃষ্ঠা। তুমি যদি না তোলো, কার সাধ্য তা সরায়! তুমি যদি না খোলো, কার সাধ্য তা নড়ায়!
১৭
অর্ধেক রাতে উঠে রামকৃষ্ণ কুটনো কূটতে লেগেছে। তা-ও দিগম্বর হয়ে।
এমন কথা শুনেছে কেউ? হৃদয় খেপবে না তো কি!
শুধু তাই নয়, কাল সকালের চাল-ডাল মশলা সব যোগাড় করে রাখছে রামকৃষ্ণ।
‘তুমি তো বেশ লোক।’ খুটখুট শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে গিয়েছে হৃদয়ের। চোখে ঘুম নেই বুঝি? মাঝ রাতে উঠে এই কাণ্ড?’
হৃদয়ের কথা রামকৃষ্ণ তো ভারি গ্রাহ্য করে! নিজের মনে কাজ করে চলেছে।
‘কেন? ও সব কি সকালে হয় না?”
তুই তার কি বুঝবি? ঘুম ভেঙে গেল, ভাবলাম বসে-বসে কি আর করি, কালকের রান্নার যোগাড় দেখি গে যাই।’ সরল সহাস মুখে বললে রামকৃষ্ণ।
‘কিন্তু ও তোমার কি কাজের ছিরি! ঠিক একটা লোকের মত অল্প-সল্প করে যোগাড় করছ। ঐটুকু তরকারিতে তোমার পেট ভরবে?’ হৃদয় ঝামটা মেরে উঠল: ‘আচ্ছা কিপ্পন যা হোক।’
‘তা তো বলবিই। তোদের কি! খুব খানিকটা বেশি-বেশি করে অপচয় করতে পারলেই হল! আমার পেটের আটকোল যখন জানিস না তখন চুপ করে থাক—’
“রাখো। তোমার মত গুনে-গুনে একশোটা ভাতের দানা রাখতে পারব না পাতে।’
‘শোন, এই ভাতের জন্যই কুলীন বামুনের ছেলে হয়ে এখানে চাকরি করতে এসেছিস। নইলে কোথায় শিওড় আর কোথায় দক্ষিণেশ্বর! যদি দেশে তোর ধানের জমি বা টাকা-পয়সা সচ্ছল থাকতো তা হলে কি আসতিস এখানে? শোন, লক্ষ্মীছাড়া হতে নেই, মিতব্যয়ী হবি।’
একজনকে একটা দাঁতন-কাঠি আনতে বলল রামকৃষ্ণ। সোজা দু-তিনটে ডাল ভেঙে আনলে সে।
“শালা, তোকে একটা আনতে বললুম, তুই এতগুলি আনলি কেন?”
লোকটা ভেবেছিল রামকৃষ্ণ বুঝি খুশি হবে অনেকগুলি দাঁতন পেয়ে। উলটে ধমক খাবে ভাবতে পারেনি।
দু দিন পরে আবার সেই লোককেই বললে রামকৃষ্ণ: ‘ওরে একটা দাঁতন দে না—’ সে আবার ছুট দিল বাগানের দিকে।
‘ওরে, কোথা যাচ্ছিস?’
“আজ্ঞে গাছ থেকে ভেঙে আনতে যাচ্ছি।’ —কেন, সেদিন যে অতগুলি আনলি—নেই?
‘আছে।’
‘তবে আবার ডাল ভাঙতে ছুটছিস যে?’ রামকৃষ্ণ শাসনের সুরে বললে, ‘ও গাছ কি তুই সৃজন করেছিস যে মনে করলেই টপ করে কিছু ডাল ভেঙে আনবি! যার সৃজন সেই জানে। বুদ্ধি-শুদ্ধি আছে, বুঝে-সুজে কাজ কর। জিনিসের অপচয় করবি কেন?”
ঠিক-ঠিক উপদেশ মত চলতে চেষ্টা করে রামলাল। রাত্রে যত বার বিড়ি খায়, পোড়া দেশলাইয়ের কাঠি দিয়ে ধরিয়ে নেয় লণ্ঠন থেকে। ফালতু একটিও বাক্সের কাঠি খরচ করে না।
‘যত সব হাড়-কিপ্পন—’ হৃদয়কে বাগানো যায় না কিছুতেই।
খিটিমিটি বেধেই আছে রামকৃষ্ণের সঙ্গে। সামান্য বচসা নয় দস্তুরমতো লম্বাই-চওড়াই ঝগড়া। রামলাল বলে, সে সব ঝগড়া দেখবার মত।
একেক সময় ভীষণ রেগে যায় রামকৃষ্ণ। হৃদয়কে যা-তা গালাগাল দিয়ে বসে। এমন সব কথা বলে যা মুখে আনা যায় না।
হৃদয় তখন চুপ করে থাকে। যখন অসহ্য হয়, বলে, ‘আঃ, কি কর মামা। ও সব কথা কি বলতে আছে? আমি যে তোমার ভাগনা।”
আমার গালাগাল দেওয়া নিয়ে কথা। কথার অর্থ দিয়ে আমার কী হবে?
আমার পূজা করা নিয়ে কথা। আমার স্তোত্রমন্ত্র দিয়ে কী হবে?
আমার ভালোবাসা দেওয়া নিয়ে কথা। আমি রূপ-গুণ রত্ন-বস্ত্র দিয়ে কী করব? একেক সময় গালাগালেও মেটে না। হাতের সামনে যা পায়, ঝাঁটা-জুতো, সপাসপ লাগিয়ে দেয় হৃদয়ের পিঠে। হৃদয় নীরবে সহ্য করে।
মনে হয় এই বুঝি দুজনে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার দুজনে ভালোবাসা, আবার ঠাট্টা-ইয়ার্কি’। আবার হৃদয়ের প্রাণ-ঢালা সেবা। পর্যন্তহীন পরিচর্যা। তখন আবার হৃদয় হুকুম করছে রামকৃষ্ণকে। আর রামকৃষ্ণ তাই শুনছে চুপ করে। হৃদয়ের যখন প্রভুত্বের পালা তখন আবার সেই মাত্রাজ্ঞানহীন কোলাহল। রামকৃষ্ণের যন্ত্রণার একশেষ।
রামকৃষ্ণ ভাবল এ দেহ আর রাখব না। গঙ্গায় ঝাঁপ দেবার জন্যে পোস্তার উপর গিয়ে দাঁড়াল।
দেহত্যাগ করতে হবে না রামকৃষ্ণকে। মা অন্য রকম ব্যবস্থা করে দিলেন।
হৃদয়ের কি খেয়াল হল, কুমারী পূজা করবে। কিন্তু কুমারী কোথায়? মথুরবাবুর নাতনী—ত্রৈলোক্য বিশ্বাসের মেয়েকে পাকড়াও করলে হৃদয়। পায়ে ফুলচন্দন দিয়ে পূজো করলে।
খবর শুনে নিদারুণ চটে গেল ত্রৈলোক্য। কে জানে কি অকল্যাণ হবে না-জানি মেয়ের। যত সব মুর্খ অঘটন।
মন্দিরের কাজ থেকে ছাড়িয়ে দিলে হৃদয়কে। হ্যাঁ, এই মুহুর্তে চলে যাও মন্দির ছেড়ে। আর কোনো দিন ঢুকতে পাবে না এর ত্রিসীমায়।
দারোয়ান এসে বললে, ‘আপনাকে এখান থেকে যেতে হবে।
‘আমাকে?’ রামকৃষ্ণ চমকে উঠল: ‘সে কি রে? আমাকে নয়, হৃদুকে।’
‘না, বাবার হকুম,’ দারোয়ান বললে শাসনভঙ্গীর কণ্ঠে: ‘তাকে আর আপনাকে দুজনকেই যেতে হবে।
ব্যস, আর বিন্দুমাত্র বাক্যব্যয় নেই, ক্ষণমাত্র দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নেই, রামকৃষ্ণ চটি পরে বেরিয়ে গেল।
হাঁ-হাঁ করতে-করতে ছুটে এল ত্রৈলোক্য। ছুটে এসে হাতে-পায়ে ধরল রামকৃষ্ণের ‘ও কি? আপনি যাচ্ছেন কেন? আপনাকে তো আমি যেতে বলিনি।’
‘তাই নাকি?” কিছু আর না বলে ফিরে এল রামকৃষ্ণ।
ত্যাগেও ঝাঁজ নেই রামকৃষ্ণের। নির্লিপ্ত, নিরভিমান। যেতে বলো চলে যাচ্ছি। থাকতে বলো থাকছি এককোণে। আমার কোনো ইতরবিশেষ নেই। আমার যেতেও যেমন আসতেও তেমন!
‘ওরে হৃদু, তোকে একাই চলে যেতে বলেছে।’
হৃদয় চলে গেল হেঁট মুখে। রামকৃষ্ণ দেখল, মা-ই তাকে সরিয়ে দিলেন।
এবার আবার হাজরাকে নিয়ে মুশকিল হয়েছে। ব্রহ্ম আর শক্তি যে অভেদ এ সে কিছুতেই মানতে চায় না।
তখন রামকৃষ্ণ মাকে ডাকতে বসল। বললে, ‘মা, হাজরা এখানকার মত উলটে দেবার চেষ্টা করছে। হয় ওকে বুঝিয়ে দে, নয় ওকে সরিয়ে দে এখান থেকে।
‘হাজরার কথায় আপনার এত লাগল?’ জিজ্ঞেস করল ভবনাথ।
‘এখন আর লোকের সঙ্গে হাঁক-ডাক করতে পারি না। হাজরার সঙ্গে যে ঝগড়া করব এ রকম অবস্থা আর আমার নয়—’
মা প্রার্থনা শুনলেন।
পর দিন হাজরা এসে বললে, ‘হ্যাঁ, মানি। বিভু সকল জায়গায় বর্তমান৷’
জীবের স্বভাবই সংশয়। হ্যাঁ বললেও, ঢোঁক গিলে বলে, কিন্তু—। বিশ্বাস হতে হবে প্রহ্লাদের মত। স্বতঃসিদ্ধ। স্বতঃস্ফূর্ত। ‘ক’ দেখেই প্রহ্লাদের কান্না। ‘ক’ দেখেই দেখেছে কৃষ্ণকে।
বালকের বিশ্বাস চাই।
এক দিন ঘাসবনে কি কামড়েছে ঠাকুরকে। ভয় হল, যদি সাপ হয়! তবে কি করা! ঠাকুর শুনেছিলেন, আবার যদি সাপ কামড়ায়, তা হলে বিষ ঠিক তুলে নেয়। তখন সাপের গর্ত খুঁজতে লাগলেন ঠাকুর, যাতে আবার কামড়ায় দয়া করে। কিন্তু গর্ত ঠিক ঠাহর হচ্ছে না। একজন জিজ্ঞেস করলে, কি করছেন? সব বললেন তাকে ঠাকুর। লোকটি বললে, যেখানটায় আগে কামড়েছে ঠিক সেই জায়গায় কামড়ানো চাই। তখন উঠে পড়লেন ঠাকুর।
আরেক দিন রামলালের কাছে শুনেছিলেন, শরতের হিম ভালো। নজির হিসেবে কি একটা শ্লোকও আওড়েছিল রামলাল। কলকাতা থেকে গাড়ি করে ফিরছেন ঠাকুর, গলা বাড়িয়ে রইলেন বাইরে, যাতে সব হিমটুকু লাগে।
তাই লাগল। তার পর অসুখ।
‘গঙ্গাপ্রসাদ আমাকে বললে আপনি রাত্রে জল খাবেন না। আমি ঐ কথা বেদবাক্য বলে ধরে রেখেছি। আমি জানি সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি।’
বিশ্বাসের কত জোর! সাক্ষাৎ পূর্ণব্রহ্ম নারায়ণ যে রাম তাঁর লঙ্কায় যেতে সেতু লাগল। কিন্তু শুধু রাম নামে বিশ্বাস করে লাফ দিয়ে সমুদ্র ডিঙোল হনুমান। তার সেতু লাগল না।
তোমার-আমার বিরহের অন্তরালে আর কত সেতু বাঁধব? যে সমুদ্রে আমি সে সমুদ্রে তুমিও। আমি যাচ্ছি ও-পার, তুমি আসছ এ-পার। মাঝসমুদ্রে দেখা হয়ে যাবে দুজনের। আমাদের হাতেহাতে সেতুবন্ধ।
কিন্তু হৃদয় কি সত্যিই চলে গেল? রামকৃষ্ণের সঙ্গছাড়া হল?
শ্রীমা বললেন, ‘তা ভালো জিনিস কি চিরদিন কেউ ভোগ করতে পায়?’
‘কিন্তু ঠাকুরকে অনেক কষ্টও দিত। গাল-মন্দ করত।’
‘যে অত সেবা-পালন করেছে সে একটু মন্দ বলবে না? যে যত্ন করে সে অমন বলে থাকে।’ শ্রীমা’র কণ্ঠস্বরে মমতার ফল্গু।
রামকৃষ্ণেরও সেই অন্তঃশীলা করুণা। বললে, ‘অমন সেবা বাপ-মাও করতে পারে না।’
কিন্তু এখন তোমাকে কে দেবে সেবা-স্নেহ?
‘দেবার সেই ঈশ্বর।’ বললে রামকৃষ্ণ: ‘শাশুড়ি বললে, আহা, বৌমা, সকলেরই সেবা করবার লোক আছে, তোমার কেউ পা টিপে দিত বেশ হত। বউ বললে, ওগো, আমার পা হরি টিপবেন। আমার কারুকে দরকার নেই। সে ভক্তিভাবেই ঐ কথা বললে—’
তার মানে, আমি যখন ঈশ্বরে সম্পূর্ণ নির্ভর করে আছি তিনিই সব ভারবহনের ব্যবস্থা করবেন। এ চাই, ও চাই, বলে তো বহু বাহানা করি, কিন্তু কী বা কতটুকু আমার সত্যিকার চাইবার মত, তা কি আমি জানি? মা জানেন, মা-ই ঠিক করে দেবেন। হয়তো শয্যা পেলাম, নিদ্রা পেলাম না; বিষয় পেলাম, মামলা বাধল: প্রেয়সী পেলাম কিন্তু প্রেম হল অস্তমিত। কী পেলে আমার চলে, কিসে বা কতটুকুতে আমার শান্তি ও সমতা, তা বুঝি আমার সাধ্য কি। আমি লোভান্ধ, অল্পদৃষ্টি, স্বার্থপর। তাই তিনি বঞ্চনা দিয়ে বাঁচান, আঘাত দিয়ে চেনান, বিচ্ছেদ ঘটিয়ে নিয়ে আসেন নতুন পরিচ্ছেদে। রাজার বেটা যদি ঠিক মাসোয়ারা পায়, হরির বেটা ঠিক হরিসেবা পাবে।
যিনি ক্লেশ হরণ করেন পাপ হরণ করেন মনোহরণ করেন তিনিই হরি।
ত্রৈলোক্য নতুন এক হিন্দুস্থানী চাকর রেখে দিল। হৃদয়ের বদলে সে-ই সেবা করবে রামকৃষ্ণের।
কিন্তু শুদ্ধ সাত্ত্বিক লোক ছাড়া আর কারু ছোঁয়া সহ্য করতে পারে না রামকৃষ্ণ। তাই কি করে চলে ও-সব হেটো চাকরে?
দু দিন পরে রাম দত্ত এসেছে দক্ষিণেশ্বরে।
‘তোমার সঙ্গে এই ছেলেটি কে হে?” উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল রামকৃষ্ণ।
লালটু। আমার বাড়ির চাকর।’
‘ওকে এখানে আমার কাছে রেখে দাও। ও বড় শুদ্ধসত্ত্ব ছেলে।’
এই লাটু মহারাজ। এই স্বামী অদ্ভুতানন্দ।
ঠাকুরের সন্ন্যাসী-শিষ্যদের মধ্যে প্রথমাগত। প্রথম-পরশ-ধন্য।
১৮
আদি নাম রাখতুরাম। ছাপরা জেলার কোন এক গণ্ডগ্রামে জন্ম। খুব ছেলেবেলাতেই বাপ-মা মরে গিয়েছে। আছে খুড়োর সংসারে। খুড়োর ছেলেপিলে নেই। রাখতুরামকে সহজেই সে টেনে নিল বুকের কাছে।
কিন্তু রাখতুরামের জন্যে নিভৃত পক্ষীনীড় নয়। ঝড়ের আকাশে তার নিমন্ত্রণ। কোন এক সমুদ্রগামী জাহাজের মাস্তুলে এসে সে বসবে।
রাখতুরাম রাখালি করে। গোঠে-মাঠে ঘুরে বেড়ায়। প্রকৃতির পাঠশালায় পড়ে। খোলা মাঠ তার বই, আকাশ আর মেঘ তার শ্লেট-পেন্সিল, বুষ্টি তার ধারাপাত। ঘরের পশু আর বনের পাখি তার সহপাঠী।
আর গুরু? কে জানে! থেকে-থেকে গান করে রাখতুরাম: ‘মনুয়া রে, সীতারাম ভজন কর লিজিয়ে।’
মহাজনের খপ্পরে পড়েছে চাচাজী। ঋণের দায়ে নিলেম হয়ে গেল জমি-জমা। রাখতুরামকে নিয়ে চাচাজী পথে বসল।
ভাগ্যের সন্ধানে কলকাতায় এল দুজনে। কিন্তু ইটের পর ইট, ওখানে শুধু মানুষ-কীটের বাসা। কোথাও স্নেহ নেই, কোমলতা নেই। অতিথিকে ওখানে ভিক্ষুক মনে করে, ভিক্ষুককে মনে করে চোর।
দেশের লোক কাউকে পাওয়া যায় কিনা, এখানে-ওখানে খুঁজতে লাগল চাচাজী। পাওয়া গেল ফুলচাঁদকে। ফুলচাঁদ মেডিকেল কলেজে রাম দত্তের আর্দালি।
‘আমার কাছে রেখে যা। দেখি বাবুকে বলে কয়ে রাজী করাতে পারি কিনা।’
‘সব কাজ করবে। খুব বাধ্য ছেলে রাখতুরাম।’ খুড়ো মিনতি করল।
দেখেই কেমন পছন্দ হয়ে গেল রাম দত্তের। বেশ উজ্জ্বল চোখ দুটো ছেলেটার। মুখে একটা অকাপট্যের ভাব। শরীরে কাঠিন্যের লাবণ্য।
কাজ আর কি। বাজার করা, মেয়েদের বেড়াতে নিয়ে যাওয়া, মায়েদের ফরমাস খাটা আর অফিসে রাম দত্তের টিফিন দিয়ে আসা। কি, পারবি তো?
‘কিন্তু এক কথা। তোর অত বড় নাম আমি বলতে পারব না। ছোট্ট করে বলব, লালটু। কি, রাজী?’
লালটু থেকে লাটু। ঠাকুর ডাকেন লেটো বলে।
কুস্তি করে লাটু। আশ্চর্য, তাতে পাড়ার গৃহস্থদের আপত্তি। চাকর আবার কুস্তি করবে কি! কুস্তিগীর চাকর হলে তো সর্বনাশ।
রাম দত্তের কাছে নালিশ করে কেউ-কেউ। এতে নালিশ করবার কী আছে। শেষ কালে বললে রাম দত্ত: ‘কুস্তি করা তো ভালো। কুস্তি করলে কাম কমে যায়, আপনা-আপনি বীর্য রক্ষা হয়। নিজেরা যেমন দুর্বল, চাকরও তেমনি দুর্বল খোঁজো।’
কিন্তু তবু নিবৃত্ত হয় না পড়শীরা। একজন এসে বললে, বাজারের পয়সা চুরি করে লাটু।
‘হ্যাঁ রে ছোঁড়া,’ হাঁক দিল রাম দত্ত: ‘ক পয়সা আজ চুরি করেছিস বাজার থেকে?”
রুখে দাঁড়াল লাটু। প্রতিবাদের ভঙ্গিতে ফুটে উঠল পালোয়ানের ভাব। জ্বলে উঠল প্রস্ফুট দুই চোখ। আধা হিন্দির তোতলামি মিশিয়ে বললে, ‘জানবেন বাবু! হামি নোকর আছে, চোর না আছে!’
এই তো কথার মত কথা! জীবলোকে যত দীপ্তি আছে সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হচ্ছে সত্যদীপ্তি।
রামকৃষ্ণের থেকে দীক্ষা নিয়ে রাম দত্ত তখন ঈশ্বরমদে মাতোয়ারা। সে মদের ছিটে-ফোঁটা পড়ছে এসে সংসারে। যিনি সর্বমন্ত্রপ্রণেতা তাঁরই বাণীবিন্দুর বর্ষণ রামের উদ্দীপনায় বাড়ির সবাই কমবেশি উৎসাহিত হচ্ছে, কিন্তু একেকটা কথা লাটুর মনে নেশা ধরিয়ে দিচ্ছে। কথার মানে সে ভালো বোঝে না কিন্তু একটি ইশারা মনের মধ্যে কেবল কেঁদে-কেঁদে বেড়ায়। একটা ভ্রমর যেন গুনগুনিয়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। তার মনের মধ্যে যে ফুলটি ফুটিফুটি করছে তার মধু খেতে।
ভগবান মন দেখেন। কে কি কাজে আছে, কে কোথায় পড়ে আছে, তা দেখেন না।’ কথাটা বাজল একটা আশ্বাসের মত। পথহারা প্রান্তরে আলো জ্বালা আশ্রমের মত।
নির্জনে বসে কাঁদতে হয় তাঁর জন্যে। তবে তো তাঁর দয়া হবে।’
দুপুর বেলায় গায়ে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে আছে লাটু। মাঝে-মাঝে বাঁ হাত দিয়ে চোখ মুছছে। পাশ ফিরছে খানিক বাদে। আবার চোখ মুছছে ডান হাত দিয়ে। কাকার জন্যে মন কেমন করছে রে লাটু?’ রামবাবুর স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন কাছে এসে।
তাঁর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল লাটু। কার জন্যে কাঁদছি তা কি আমি জানি? কেউ কি তা জানে?
এক রোববার রাম দত্ত চলেছে দক্ষিণেশ্বরে, লাটু এসে তার সঙ্গ নিল। বললে, হামাকে নিয়ে চলেন।’
সে কি, তুই কোথা যাবি?’
যার কথা আপনি বলেন, সেই পরমহংসকে হামি দেখবে।
কেমন মায়া হল রাম দত্তের। সঙ্গে করে নিয়ে গেল লাটুকে।
গোলগাল বেঁটেখেটে জোয়ান চেহারার চাকর। চাকর বলে ঘরে ঢুকতে সাহস নেই। রামকৃষ্ণের ঘরের সামনে পশ্চিমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে। দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু হাত-জোড়।
রাম দত্ত ঘরে ঢুকে রামকৃষ্ণকে দেখতে পেল না। বাইরে থেকে রামকৃষ্ণ তখন আসছে নিজের ঘরের দিকে। রাধিকার কীর্তন গাইতে গাইতে। ‘তখন আমি দুয়ারে দাঁড়ায়ে—’। নিজের মনে আখর দিচ্ছে রামকৃষ্ণ। ‘কথা কইতে পেলুম না। আমার বধুঁর সনে কথা হল না। দাদা বলাই ছিল সাথে তাই কথা হল না।’ বারান্দায় লাটুর সঙ্গে দেখা। তুই কে রে? তুই কোত্থেকে এলি? তোকে এখানে কে আনল?
রামকৃষ্ণকে দেখেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে রাম দত্ত।
এ ছেলেটাকে ঝুঝি তুমি সঙ্গে করে এনেছ? একে কোথা পেলে? এর যে সাধুর লক্ষণ।’
রাম দত্তের দেখাদেখি লাটুও প্রণাম করলে রামকৃষ্ণকে। বুঝলে চোখের সামনে এই সেই নয়নাতীত।
কিন্তু ঘরে ঢুকেও বসছে না সবাইর মত। হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে আছে ঈষন্নত হয়ে। যেন রামের কাছে হনুমান।
‘বোস না রে বোস।’ হুকুম করল রামকৃষ্ণ। তখন লাটু এক পাশে বসল জড়সড় হয়ে।
‘যারা নিত্যসিদ্ধ তারা যেন পাথর-চাপা ফোয়ারা। জন্মে জন্মে তাদের জ্ঞান-চৈতন্য হয়েই আছে। এখানে-সেখানে ওসকাতে-ওসকাতে যেই চাপটা সরিয়ে দিল মিস্ত্রি, অমনি ফোয়ারার মুখ থেকে ফরফর করে জল বেরুতে লাগল—’বলেই রামকৃষ্ণ হঠাৎ ছুঁয়ে দিল লাটুকে।
লাটুর গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল, ঠোঁট দুটো কাঁপতে লাগল ঘন-ঘন, আর দেখতে-দেখতে দু চোখ ফেটে উথলে উঠল কান্না।
সকলে অবাক। এক ঘণ্টার বেশি হয়ে গেল, তবু কান্না থামে না লাটুর।
‘ছেলেটা কি এমনি সারাক্ষণই কাঁদবে না কি?” ব্যস্ত হল রাম দত্ত।
রামকৃষ্ণ আবার স্পর্শ করল লাটুকে। কান্না থেমে গেল তৎক্ষণাৎ।
যে হাতে কাঁদাও সেই হাতেই আবার মুছে দাও কান্না। খেলার আরম্ভে যেমনি তুমি, খেলা ভাঙার বেলায়ও তুমি।
বাড়ি ফিরে এসে কেমন আনমনা হয়ে রইল লাটু। কাজে-কর্মে উৎসাহ নেই, মন যেন দেশান্তরী হয়েছে। দেহযন্ত্রটা ঠিক-ঠিক চলছে বটে, কিন্তু যন্ত্রের মধ্যে থেকেও যে যন্ত্র নয়, সেই মনটিরই এখন যন্ত্রণা।
পরের রবিবার দক্ষিণেশ্বরে কিছু ফল-মিষ্টি পাঠাবার কথা উঠল। কিন্তু কে নিয়ে যায় বয়ে। রাম দত্তের কোথায় কি কাজ পড়েছে, সে যেতে পারবে না।
মনমরা হয়ে বসে ছিল লাটু। ঝটকা মেরে লাফিয়ে উঠল। জোয়ার আসা গাঙের মত খুশির ঢেউয়ে উলসে উঠল সর্বাঙ্গ। বললে, ‘হামি যাবে। হামাকে দিন, হামি সব উখানকে লিয়ে যাবে। ঠিক পহচন লিবে আমাকে।
তাই গেল লাটু। দীর্ঘ পথ একটা বাঁশির সুরের মত বাজতে লাগল। এত দিন গোষ্ঠে ফিরেছে লাটু, আজ চলল গোকুলে।
দূর থেকে দেখা যাচ্ছে রামকৃষ্ণকে। বাগানে দাঁড়িয়ে আছে। বেলা প্রায় এগারোটা। দেখেই দৌড় মারল লাটু। এক ছুটে হাজির হল পায়ের কাছে। লুটিয়ে পড়ে প্রণাম করলে। ‘কি রে, এসেছিস? আজ এখানে থাক।’
“শুধু আজ নয়, বরাবরই ইখানকে থাকবে। হামি আর নোকরি করবে না। আপনার কাজ করবে।’
রামকৃষ্ণ হাসল। বললে, ‘তুই এখানে থাকবি আর আমার রামের সংসার দেখবে কে? রামের সংসার যে আমারই সংসার।’
এই বলে রামকৃষ্ণ তাকে বুঝিয়ে দিল কি করে চাকরি করতে হয় মনিবের বাড়িতে কি করে কর্ম করতে হয় সংসারে। মনিবের বাড়িতে থাকবি আর মন পড়ে থাকবে দেশের বাড়িতে। মনিবের ছেলেদের ‘আমার রাম’ ‘আমার হরি বলবি, কিন্তু মনে-মনে ঠিক জানবি ওরা তোর কেউ নয়।
কিন্তু এখন কোন ধরনের প্রসাদ নিবি তুই?
কালীবাড়ির আমিষ প্রসাদ নিতে কুণ্ঠা ছিল লাটুর। রামকৃষ্ণ তা বুঝতে পেরেছে। বললে, ‘ওরে, মা কালীর আমিষ ভোগ হয় আর বিষ্ণু মন্দিরে হয় নিরামিষ। সব গঙ্গাজলে রান্না। প্রসাদে কোনো দোষ নেই।’
আমি অত-শত কি জানি!’ লাটু শুধু জানে কোথায় তার আসল প্রসাদ। ‘আপুনি যা পাবেন হামনে তাই খাওয়া করবে। হামি তো আপুনার প্রসাদ পাবে—বাকি আর কুছু পাবে না।’
রামলালের দিকে তাকিয়ে বললে রামকৃষ্ণ, ‘শালা কেমন চালাক দেখেছিস। আমি যা পাব শালা তাতেই ভাগ বসাতে চায়।
‘বাচ্চা সাচ্চা হ্যায়।’
সারা বেলা কাটিয়ে দিল লাটু। বুঝিয়ে-সুজিয়ে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিল রামকৃষ্ণ। যাবার সময় বলে দিল, ‘দেখিস বাপু এখানে আসবার জন্যে যেন মনিবের কাজে ফাঁকি দিসনি। রাম তোর আশ্রয়দাতা, তার যদি কাজ না করবি তা হলে নেমকহারামি হবে। খবরদার, নেমকহারাম হবি না। যখন সময় হবে তখন আমিই তোকে এখানে ডেকে নেব।
১৯
রামকৃষ্ণকে এখন একবার দেশে যেতে হয়। এই প্রথম তার হৃদয়-ছাড়া দেশে যাওয়া।
মাকে বলে হৃদয়কে নিজেই সরিয়ে দিয়েছে রামকৃষ্ণ। কায়মনে এত সেবা করে অথচ টাকার মায়া কাটাতে পারে না থেকে-থেকে কোত্থেকে সব বড়লোক এনে হাজির করে। বলে, এটা চাও, ওটা নাও, এদিক-ওদিক সুবিধে দেখ। লছমীনারায়ণ মাড়োয়ারীকে ওই ধরে এনেছিল কিনা ঠিক কি। যখন বললে, টাকাটা হৃদয়বাবুর কাছে রেখে যাই, হৃদয়বাবুর স্ফূর্তি তখন দেখে কে।
এক কথায় নিরস্ত করে দিলে রামকৃষ্ণ। টাকা কাছে রাখাই মানে অহঙ্কারকে জীইয়ে রাখা।
মাড়োয়ারী তখন আরেক কৌশল করলে। বললে, তোমার স্ত্রীর নামে লিখে দি।
হৃদয় বললে, ‘সেই ভালো।’
রামকৃষ্ণ ভাবল, মন্দ কি, জিজ্ঞেস করা যাক সারদাকে।
নিভৃতে ডাকিয়ে আনল। বললে, ‘দশ-দশ হাজার টাকা! তোমাকে দিতে চাচ্ছে লছিমীনারায়ণ। নাও না? নেবে?”
সার কথা বুঝতে পেরেছে সারদা। বললে, ‘তা কেমন করে নিই? আমি নিলে যে তোমার নেওয়াই হয়ে গেল। আমি আর তুমি কি আলাদা? তুমি যা নিতে পারো না তা আমিও নিতে পারি না।’ চলে গেল সারদা।
হৃদয়ের মুখ ম্লান হল বটে কিন্তু হাঁপ ছাড়ল রামকৃষ্ণ।
টাকার যে এত অহঙ্কার কর, তোমার ক’হাঁড়ি আছে জিজ্ঞেস করি? তোমার যদি আছে হাঁড়ি, ওর আছে জালা। তোমার যদি আছে জালা, ওর আছে মটকি। আধিক্যেরও আতিশয্য আছে। সন্ধের পর যখন জোনাকি ওঠে তখন সে ভাবে জগৎকে খুব আলো দিচ্ছি। কিন্তু যেই আকাশে তারা উঠল, তার অভিমান চলে গেল। তারারা ভাবতে লাগল, আমরাই আলো দিচ্ছি জগৎকে। কিছু পরে যেই চাঁদ উঠল, লজ্জায় মলিন হয়ে গেল তারারা। চাঁদ ভাবল জগৎ আমার আলোতেই হাসছে। দেখতে-দেখতে অরুণোদয় হল, সূর্য উঠলেন। তখন কোথায় বা চাঁদ, কোথায় বা কি।
গোড়ায়-গোড়ায় রামলালও এক-আধটু হাত বাড়াত। ঠাকুরের অসুখের সময় মহেন্দ্র কবরেজ দেখতে এসেছে সেবার। যাবার সময় পাঁচটি টাকা দিয়ে গেল রামলালের হাতে।
ডাক্তার কই ভিজিট নেবে, সেই কিনা উলটে টাকা দেয় রুগীকে।
বিছানায় ছটফট করছেন ঠাকুর। সারাক্ষণ কত হাওয়া করল লাটু তবু কমছে না যন্ত্রণা। বুকের মধ্যে যেন বিল্লি আঁচড়াচ্ছে। শেষে বললেন, ‘যা তো, রামনেলোকে ডেকে নিয়ে আয় তো, সে শালা নিশ্চয় কিছু করেছে, নইলে চোখ বুজছে না কেন? রামলাল কাছে আসতেই ঠাকুর চেঁচিয়ে উঠলেন: ‘যা শালা যা, এখানকার জন্যে যার ঠেঙে টাকা নিয়েছিস তাকে শিগগির ফিরিয়ে দিয়ে আয়।’
রাত তখন প্রায় দুটো। লাটুকে সঙ্গে নিয়ে রামলাল গেল সেই কবরেজের বাড়ি। কবরেজকে ঘুম থেকে তুলে তার টাকা তাকে ফেরত দিলে।
ঠাকুর ঠাণ্ডা হয়ে দুচোখ একত্র করলেন।
‘ওরে রামলাল,’ ঠাকুর বলেছিলেন এক দিন স্নেহস্বরে: ‘যদি জানতুম জগৎটা সত্যি, তবে তোদের কামারপুকুরটাই সোনা দিয়ে মুড়ে দিয়ে যেতুম। জানি যে, ও সব কিছু নয়, একমাত্র ভগবানই সত্যি।
ওরে, সে যে আনন্দং নন্দনাতীতং। প্রেয়ঃ পুত্রাৎ, প্রেয়ো বিত্তাৎ, প্রেয়োনাস্মাৎ সর্বস্মাৎ। তার মত ভালোবাসার জিনিস আর কিছু নেই।
শ্রীমতী বললে, ‘সখি, চতুর্দিক কৃষ্ণময় দেখছি।’
তা তো দেখবেই। তুমি যে অনুরাগ-অঞ্জন চোখে দিয়েছ।
সখীরা বললে, ‘রাধে, ঐ দেখ কৃষ্ণ এসেছে। তোমার সর্বস্ব ধন হ’রে নিতে এসেছে—’
ওরে, নিক হরণ করে। ওই তো আমার সর্বস্ব।
কেশব সেন যখন আসে দক্ষিণেশ্বরে, হাতে করে কিছু নিয়ে আসে। হয় ফল নয় মিষ্টি। রামকৃষ্ণের পায়ের কাছে বসে কথা কয়। একেক দিন বা বক্তৃতা দেয়। সেদিন বড় ঘাটে গঙ্গার দিকে মুখ করে বক্তৃতা দিলে কেশব।
হৃদয়ের যেমন মুরুব্বিয়ানা করা অভ্যেস, গম্ভীর মুখে বললে, ‘আহা, কী বক্তৃতা! মুখ দিয়ে যেন মল্লিকে ফুল বেরুচ্ছে!
কিন্তু বক্তৃতার মধ্যেই উঠে গেল রামকৃষ্ণ। যারা জমায়েত হয়েছিল বলাবলি করতে লাগল, লোকটা মুখখু কিনা, মাথায় কিছু ঢোকে না, তাই কেটে পড়ল। কিন্তু কেশবের মনে ডাক দিল, কোনো ত্রুটি হয়েছে নিশ্চয়ই। তাড়াতাড়ি কাছে এসে জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণকে, ‘কিছু কি অন্যায় করে ফেলেছি?”
‘নিশ্চয়ই। তুমি বললে, ভগবান, তুমি আকাশ দিয়েছ বাতাস দিয়েছ—কত-কি দিয়েছ। তারি জন্যে যেন তোমার কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই। ও সব তো ভগবানের বিভূতি। বিভূতি নিয়ে কথা কইবার দরকার কি? এ কি তুমি বলে শেষ করতে পারবে? তা ছাড়া, এ সব বিভূতি যদি তিনি নাই দিতেন, তা হলেও কি তিনি ভগবান হতেন না?” একটু থামল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘বড়লোক হলেই কি তাঁকে বাপ বলবে? যদি তিনি গরিব হতেন, নিঃস্ব ও নির্ধন হতেন, তা হলে কি তাঁকে বাপ বলবে না?’
কেশব চুপ করে রইল।
হৃদয়কে জিজ্ঞেস করি, এখন এ কোন ফুল বেরচ্ছে মুখে দিয়ে?
সকলে বলাবলি করতে লাগল, ‘সত্যি বড়লোক হলেই কি বাপ হবে? গরিব হলে সে আর বাপ নয়?”
এরই নাম ভালোবাসা। ভগবান আমাকে কিছু দিন বা না-দিন, আমার দিকে তাকান বা না-তাকান, তবু আমি তাঁকে ভালোবাসি। আমি তাকিয়ে আছি তাঁর দিকে।
দক্ষিণেশ্বরের পাগলা বামুন কেশব সেনের মাথা ভেঙে দিয়েছে। এই নিয়ে শুরু হল হৈ-চৈ। বলে কিনা, বড়লোক না হলে বাপ কি আর বাপ হবে না? সন্তান কি গরিব বাপকে ডাকবে না বাবা বলে?
তার পরে যখনই কেশবকে বক্তৃতা দেবার জন্যে অনুরোধ করেছে রামকৃষ্ণ, কেশব সলজ্জ হাস্যে বলেছে, ‘কামারের দোকানে আমি আর ছুঁচ বেচতে আসব না। আপনিই বলুন, আমরা শুনি।’
হৃদয়ের মাতব্বরী করার দিন ফুরিয়ে গেল। দক্ষিণেশ্বর ছেড়ে চলে যাবার সময়ও নরম হল না। বললে, মামা, তুমি এদের ছাড়ো। দু-চারটে বড়মানুষ ধরো, দেখবে কত বাগানবাড়ি তোমার হবে।’
ত্রৈলোক্য তাড়া দিচ্ছে বেরিয়ে যাবার জন্যে।
‘তুমিও আমার সঙ্গে চলো, মামা।’ হৃদয় এক মূহুর্ত তাকাল পিছন ফিরে। বললে, ‘তোমায় যদি পেতুম, দেখতে কত বড় কালীবাড়ি জাঁকিয়ে তুলতুম! ইট চুন সুরকির মন্দির নয়, একেবারে সোনার মন্দির।’
চলে গেল হৃদয়। রামকৃষ্ণ নিঃসঙ্গ। একা একা গেল কামারপুকুর।
বালক লাটু একা-একা চলে এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। কিন্তু এসে দেখছে, সমস্ত ফাঁকা, রামকৃষ্ণ নেই, তার ঘর বন্ধ। তখন কি করে লাটু গঙ্গার ঘাটে বসে অঝোরে কাঁদতে বসল। ডাকতে লাগল আকুল হয়ে, তুমি কোথায়? একবার দাঁড়াও আমার চোখের সামনে।
আর কত কাঁদবি? এবার বাড়ি যা। আজই তাঁর ফেরবার দিন নয়।
ফেরবার দিন নয় মানে? তিনি কি কুথা গেছেন নাকি? তিনি ইখানকেই আছেন।
এখানেই আছেন কি রে? তিনি দেশে গেছেন।
আপুনি জানেন না। ইখানকেই আছেন। হামি তার সাথে দেখা না কোরে যাবে না।
তবে থাক বসে। কতক্ষণে দেখা পাস দ্যাখ।
মন্দিরে সন্ধ্যারতি হচ্ছে। ওদিকে লক্ষ্য নেই লাটুর। গঙ্গার পরপারে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে।
কে একজন বুঝি তাকে প্রসাদ দিতে এল। এসে দেখল লাটু যেন প্রাণ ঢেলে কাকে প্রণাম করছে। সামনে লোকজন কেউ নেই, তবু প্রাণ-ঢালা প্রণাম।
অনেকক্ষণ পর মাথা তুলল লাটু। অপরিচিত লোক সামনে দেখে থ হয়ে গেল। বললে, ‘সে কি! পরমহংসমশায় কুথায় গেলেন! এই যে ছিলেন এতক্ষণ ইখানকে।’
রাম দত্তকে জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণ: ‘কি মধু পেয়ে ছোঁড়াটা এখানে পড়ে থাকতে চায় বলো তো! আমি তো কিছু বুঝি না।’
রাম দত্তও বোঝে না। তার স্ত্রীও বোঝে না।
রাম দত্তের স্ত্রী বলে, ‘ওখানে তোকে খাওয়াবে কে? কাপড়চোপড় দেবে কে? কি রকম অবুঝের মতন তাকায় লাটু। খাওয়া? কাপড়চোপড়? দক্ষিণেশ্বরের সংসারে এও আবার একটা জিজ্ঞাস্য নাকি? জোটে জুটবে না জোটে না জুটবে। সে যে দক্ষিণ-ঈশ্বর।
তবু বিনা মাইনেয় নোকরি করতে হবে কষ্ট সয়ে! এরই বা অর্থ কি?
কালবোশেখীর দূর্যোগ, তবু নরেন চলেছে দক্ষিণেশ্বরে। বাবা বললেন, যদি একান্তই যাবি, ঘোড়ার গাড়িতে যা। কেন মিছিমিছি পয়সা নষ্ট! শেয়ারের নৌকোতেই চলে যাবে দক্ষিণেশ্বর। নৌকো যদি ডোবে তো ডুববে!
একেই বলে ডানপিটের মরণ গাছের আগায়। কোনো সুবুদ্ধির সে ধার ধারে না।
‘এসেছিস?’ ডাক দিয়ে উঠল রামকৃষ্ণ।
পর মুহূর্তেই গম্ভীর হবার ভান করে বললে, ‘কেন আসিস বল তো? আমার কথা যখন শুনিস না তখন আসিস কি করতে?’
তুমি আবার শোনাবে কি! তুমি কি কিছু জানো? নিজে কি কিছু পেয়েছ যে তাই পরকে দেবে?’ নরেনের কণ্ঠে স্পষ্ট অস্বীকার। রূঢ় প্রত্যাখ্যান। ‘বেশ তো, জানি না কিছু পাইনি কানাকড়ি।’ রামকৃষ্ণ স্নেহকরুণ চোখে তাকাল নরেনের দিকে: ‘তবু যার থেকে কিছুই শেখবার নেই, যাকে তুই নিস না, মানিস না, তার কাছে এই ঝড়দাপটে তুই আসিস কেন?’
‘আসি কেন?’ হাসল নরেন: ‘তোমাকে ভালোবাসি বলে দেখতে আসি।’
রামকৃষ্ণ জড়িয়ে ধরল নরেনকে। বললে, ‘সকলেই স্বার্থের জন্যে আসে। নরেন আসে আমাকে শুধু ভালোবাসে বলে।’
একেই বলে ভালোবাসা!
