Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমের গল্প – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    May 16, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প309 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.২৫

    ২৫

    ছ’টি সৈন্য সঙ্গে নিয়ে পথ চলে নরেন। তারা হচ্ছে—কি আর কে, কবে আর কোথায়, কেন আর কেমন করে? সব সঙিন-ওঁচানো সান্ত্রী।

    কেউ একটা কিছু বলবে আর তখনি ঘাড় কাৎ করে মেনে নেবে এমনটি কখনো হবার নয়। যদি থাকে তো দেখাও। বেশ তো, কোথায়? চলো আমার সঙ্গে। কেন ঈশ্বরকে ডাকবো? কেন মানবো তোমাকে? তুমি কে? ঈশ্বরই বা কি? যদি উঠবোই উপরে, কেমন করে উঠবো?

    “শিব চাঁপাফুল ভালোবাসে। তাই নরেনও ভালোবাসে চাঁপাফুল।

    পাড়ার কোন এক ছেলের বাড়িতে চাঁপা গাছ আছে, যখন-তখন তার ডালে বসে দোল খায় নরেন। গাছ তো ভাঙবেই, ডানপিটে ছেলেটাও জখম হবে।

    “ও গাছটায় উঠো না।’ বাড়ির বুড়ো মালিক ভারিক্কি গলায় বারণ করলে।

    কি হয় উঠলে?”

    প্রশ্ন শুনে মালিক চমকে উঠল। ভাবলে শান্ত কথায় হবে না, ভয় দেখাতে হবে। বললে, ‘ও গাছে ব্রহ্মদত্যি থাকে।’

    ‘কি রকম দেখতে ব্রহ্মদত্যি?’

    ‘ওরে বাবাঃ, ভয়ঙ্কর দেখতে। নিশুতি রাতে শাদা চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুরে বেড়ায়।’

    ‘ঘুরে বেড়াক না।’ নরেনের মুখে নিটোল নির্লিপ্তি: ‘তাতে আমার কি!”

    ‘তোমার কি মানে? যারা ঐ গাছে চড়ে তাদের সে ঘাড় মটকে দেয়৷

    রাত করে চুপি-চুপি চলে এসেছে নরেন। বড় ইচ্ছে শাদা চাদর পরা ব্রহ্মদৈত্যর সঙ্গে দেখা হয়। সহপাঠী ছেলে বাধা দিতে এল নরেনকে। বললে, ‘না ভাই অমন কাজ করিস নে। নির্ঘাত তবে তোর ঘাড় মটকাবে।’

    নরেন হেসে উঠল উচ্চরোলে। ‘লোকে একটা কিছু বললেই বিশ্বাস করতে হবে: পরীক্ষা করে দেখব না নিজে?’ বলেই সে গাছের ডালে চড়ে বসল।

    নিজে যাচাই করে দেখব। যাচাই করে দেখব বুদ্ধির কষ্টিপাথরে যুক্তির সোনা ঘষে-ঘষে। বইয়ে লেখা আছে বলেই সত্য, ভালোমানুষের মত তা মানতে পারব না। নিজে পরীক্ষা করব। সত্য কি এতই সোজা? বিলেত আছে, এ বললেই হবে: যেতে হবে বিলেতে। পরের মুখে ঝাল খেতে পারব না। ঝালের প্রমাণ চাই।

    ‘ঈশ্বর মানুষ হয়ে আসেন এ বললেই হবে?’ নরেন্দ্র গর্জে উঠল: ‘প্রমাণ চাই।’ গিরীশ ঘোষ বললে, ‘বিশ্বাসই প্রমাণ। এই জিনিসটা যে এখানে আছে তার প্রমাণ কি? বিশ্বাসই প্রমাণ।’

    ‘আমি ট্রুথ চাই—প্রুফ চাই।’ নরেন্দ্র আবার হুঙ্কার ছাড়ল। ‘শাস্ত্রই বা বিশ্বাস করি কেমন করে? একেক জন একেক বলছে। যার যা মনে এসেছে তাই—’

    ঠাকুর বললেন, ‘গীতা সব শাস্ত্রের সার। সন্নেসীর কাছে আর কিছু থাক না থাক, ছোট একখানি গীতা অন্তত থাকবে।’

    একজন ভক্ত গদগদ হয়ে উঠল: ‘আহা, গীতা—শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-

    শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন, না ইয়ে বলেছেন—’ঝাঁজিয়ে উঠল নরেন।

    ‘হাতি যখন দেখিনি, তখন সে ছুঁচের ভেতর দিয়ে যেতে পারে কিনা কেমন করে জানব?’ বললে ভবনাথ। ঈশ্বরকে যখন জানি না তখন তিনি মানুষ হয়ে অবতার হতে পারেন কিনা কেমন করে বুঝব বিচার করে?

    নরেন বললে, ‘আমি বিচার চাই। ঈশ্বর আছেন, বেশ; কিন্তু তিনি কোথাও ঝুলছেন এ আমি মানতে পারব না।’

    ‘সবই সম্ভব।’ বিস্ময়-সুস্মিত মুখে বললেন ঠাকুর, ‘তিনি ভেলকি লাগিয়ে দেন। বাজিকর গলার ভেতর ছুরি চালায়, আবার বার করে। ইট-পাটকেল খেয়ে ফেলে।’

    তবু বাজিকরই সত্য। আর সব ভেলকি।

    বাজিকর আর তার বাজি। ভগবান আর তাঁর ঐশ্বর্য। বাবু আর তার বাগান। বাজি দেখে লোকে অবাক, কিন্তু বাজি ক্ষণিকের, এই আছে এই নেই—বাজিকরই সত্য। ঐশ্বর্য দুদিনের, ভগবানই সত্য। বাগান দেখেই ফিরে যেও না, বাগানে মালিক-বাবুর সন্ধান করো।

    নরেনের বয়স তখন এগারো, গঙ্গার ঘাটে ইংরেজের মানোয়ারী জাহাজ এসেছে। চ, দেখে আসি।

    কিন্তু ঘাটের বড় সাহেবের দস্তখতী ছাড় চাই। ওরে বাবা, গিয়ে কাজ নেই। কে দাঁড়াবে ওই লালমুখো জাঁদরেলের কাছে? কথা কইবে কে? ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে চল।

    সামনের সিঁড়িতে প্রত্যক্ষ বাধা। পিছনের দিকে লোহার আরেকটা সরু সিঁড়ি। সেই সিঁড়ি দিয়েই সটান উঠে গেল নরেন। একবার উঠি তো উপরে, তারপরে ঠিক ধরে ফেলব সাহেবকে। যা ভেবেছিল নরেন। পর্দা-ফেলা ঘরে সাহেব বসে আছে। পর্দা সরিয়ে সটান ঢুকলো নরেন। সাহেব তো অবাক। অবাক যখন হয়েছ এখন অবাক থেকেই আলগোছে সই করে দাও একটা।

    পাশ নিয়ে সামনের সিঁড়ি দিয়েই বুক ফুলিয়ে নেমে এল নরেন। প্রহরী তো অবাক। জিজ্ঞেস করলে, ‘তুম ক্যায়সে উপরমে গিয়া?

    নরেন শুধু বললে, ‘হাম জাদু জানতা।’

    বাবার সঙ্গে রায়পুর যাচ্ছে নরেন—নাগপুর পর্যন্ত ট্রেনে গিয়ে, সেখান থেকে গরুর গাড়ি। গরুর গাড়ির রাস্তা প্রায় পনেরো দিন। তাই চলেছে নরেন। চলেছে বিন্ধ্যাচলের গা ঘেঁষে। ঘন অরণ্যের পথ বেয়ে। একখানা গরুর গাড়িতে নরেন একা। অন্য গাড়িতে তার মা আর ছোট ভাইয়েরা।

    চার দিকে বিরাটের রূপ। যে দিকে তাকাও সেই দিকেই বিরাট আসন পেতে বসেছেন। বসেছেন পর্বতশৃঙ্গে, বসেছেন গহন অরণ্যানীতে। তা ছাড়া সেই মহা-শিল্পীর সক্ষম কারুকাজও ছড়িয়ে রয়েছে এখানে-সেখানে। পত্রে-পুষ্পে, কঠিনের গায়ে কোমলের আলিঙ্গনে। হঠাৎ একটা মৌচাক নরেনের চোখে পড়ল। পাহাড়ের চূড়া থেকে শুরু করে প্রায় মাটি পর্যন্ত দীর্ঘ এক ফাটল জুড়ে বিরাট মৌচাক। কত তিল-তিল পরিশ্রম, কত বিন্দু-বিন্দু মধু–আদি-অন্তের ইয়ত্তা করা যায় না। অনন্তের ভাবে তলিয়ে গেল নরেন।

    তাকাও তেমনি একবার ঐ অন্তরীক্ষে। রাত্রির তারকাময় আকাশে। সমুদ্রতটের বালুকণার মত জ্যোতির কণিকা। একেকটা কণিকা দেদীপ্যমান সূর্যের চেয়ে বড়। এমনি কত যে স্ফুলিঙ্গ, বিজ্ঞানের কোনো ল্যাবরেট্যারিতেই গণনা করা যায়নি। তার মধ্যে এক কণা ধূলির মতো এই পৃথিবী। এ সবের মানে কি! তাও কি সবাই স্থির হয়ে আছে? ছুটছে দুর্দান্ত বেগে। সে যে কত বড় মহাশূন্য কে ভার সীমাসীমান্ত খুঁজে পায়! কেন এই জ্যোতিরিঙ্গন? কেন এই সর্বতশ্চক্ষু আকাশ? রাত্রির পৃষ্ঠায় কিসের ইঙ্গিতটি সে লিখে রেখেছে স্পষ্টাক্ষরে? কেন? কার জন্যে?

    সেই মৌচাক দেখে প্রথম ধ্যানাবিষ্ট হল নরেন।

    এন্ট্রান্স পাশ করে ঢুকল এসে কলেজে। নড়ে-ভোলা ছেলে নয়, দুঃসাহসী, জাহাঁবাজ ছেলে। এদিকে আবার স্ফূর্তিবাজ, রঙ্গপ্রিয়। অপরিমিত জীবনের উজ্জ্বল উচ্ছাস। সব মিলে আবার নির্মলতা আর পবিত্রতার দীপ্ত বিগ্রহ।

    শুধু তাই? গান গায় নরেন। মৃদঙ্গ বাজায়। নৃত্য হচ্ছে বীরোচিত কলা। নাচে তাই স্বচ্ছন্দে। স্বভাবসৌন্দর্যে। তাণ্ডবপ্রিয় শিব যেন মেতেছেন উদ্ধত নৃত্যে। ফার্স্ট আর্টস পাশ করে বি-এ পড়তে লাগল নরেন। কিন্তু পড়ার উদ্দেশ্য কি? শুধু পরীক্ষা পাশ করা? না, জ্ঞানার্জন? কিন্তু জ্ঞানই বা বলে কাকে?

    ‘আহাম্মক, তোমরা বই হাতে করে সমুদ্রের ধারে পায়চারি করছ। ইউরোপীয় মস্তিষ্ক-প্রসূত কোনো তত্ত্বের এক কণামাত্র—তাও খাঁটি জিনিস নয়—সেই চিন্তার বদহজম খানিকটা ক্রমাগত আওড়াচ্ছ, আর তোমাদের প্রাণমন সেই তিরিশ টাকার কেরাণীগিরির দিকে পড়ে রয়েছে। না হয় খুব জোর একটা দুষ্ট উকিল হবার মতলব করছ। এই ভারতীয়গণের সর্বোচ্চ দুরাকাঙ্ক্ষা। আবার প্রত্যেক ছাত্রের আশে-পাশে একপাল ছেলে—তাঁর বংশধরগণ–বাবা খাবার দাও, খাবার দাও করে উচ্চ চীৎকার তুলেছে। বলি, সমুদ্রে কি জলের অভাব হয়েছে যে তোমাদের বই গাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপ্লোমা প্রভৃতি সমেত তোমাদের ডুবিয়ে ফেলতে পারে না?’

    বি-এ-তে দর্শন ছিল নরেনের। এক দিকে হার্বার্ট স্পেনসার, কান্ট আর মিল, অন্য দিকে ভারতবর্ষ-হিন্দু দর্শন। তত্ত্ব আর তর্ক, যুক্তি আর কল্পনা। কি হবে দর্শনে? দর্শন পড়ে কী দর্শন করব? সত্য-দর্শন চাই।

    সত্যমেব জয়তে নানৃতং, সত্যেনৈব পন্থা বিততো দেবযানঃ।

    ‘যৌবন ও সৌন্দর্য’ নশ্বর, জীবন ও ধনসম্পত্তি নশ্বর, নাম-যশ নম্বর, এমন কি পর্বতও চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া ধূলিকণায় পরিণত হয়, বন্ধুত্ব ও প্রেমও অচিরস্থায়ী, একমাত্র সত্যই চিরস্থায়ী। হে সত্যরূপী ঈশ্বর, তুমিই আমার একমাত্র নিয়ন্তা হও।…এই মুহুর্ত হইতে আমি ইহামুত্রফলভোগবিবাগী হইলাম—ইহলোক এবং পরলোকের যাবতীয় অসার ভোগনিচয়কে পরিত্যাগ করিলাম। হে সত্য, একমাত্র তুমিই আমার পথপ্রদর্শক হও। আমার ধনের কামনা নাই, নাম-যশের কামনা নাই, ভোগের কামনা নাই। ভগিনি, এ সকল আমার নিকট খড়-কুটা-

    শুধু গুণ-বিচার করে চলেছি। শুধু বর্ণনা আর অনুমান। শুধু কীর্তন আর কল্পনা। আগে দেখি, পরে গুণ-বিচার করব। আগে দর্শনধারী পিছে গুণ-বিচারি।

    দেবেন ঠাকুরের কাছে উপস্থিত হল নরেন। বললে, ‘আপনি ঈশ্বর দেখেছেন?’

    চোখ বুজে ধ্যান করছিলেন মহর্ষি। এক উত্তেজিত উন্মাদ কণ্ঠে তাঁর ধ্যান ভাঙল। চেয়ে দেখলেন, নরেন। যে ব্রাহ্ম সমাজে যাতায়াত করছে, নাম লিখিয়েছে খাতায়, যোগ-ধ্যানের ক্লাশে ভর্তি হয়েছে ক’ দিন।

    ‘দেখেছেন আপনি ঈশ্বর?’

    তন্ময় হয়ে তাকিয়ে রইলেন মহর্ষি। নরেনের স্থিরনিবদ্ধ বিস্ফারিত দুই চক্ষু যেন ভাগবতী দীপ্তিতে জ্বলছে। হাঁ-না উত্তর দিতে পারলেন না মহর্ষি। শুধু বললেন, ‘তোমার চোখ দুটি কী উজ্জ্বল! যেন যোগীচক্ষু।’

    তা দিয়ে আমার কী হবে! যে অন্ধকারে আমি তাঁকে খুঁজছি সেখানে কী করবে চর্মচক্ষু? আলোয় আলোকময় করে কি তিনি দেখা দেবেন যে চোখ মেলেই তাঁকে দেখব? দেখব তাঁকে পাতায়-ফুলে ঘাসে-শিশিরে আকাশে-তারায়, প্রতিটি মানুষের মুখে!

    কেশব সেনকে প্রকাশিত করেছেন মহর্ষি, উদ্ভাসিত করেছেন। যে ছিল মৃৎপ্রদীপ তাকে করেছেন ভাস্বতী শিখা। মহাকবি প্রকৃতিকে মানবায়িত করে, মহর্ষি মানুষকে ঈশ্বরায়িত করেছেন। কেশব যাঁর কীর্তি, তিনিও দেখেননি ঈশ্বরকে?

    বড় হতাশ হল নরেন। মনের আকাশে যে ঝড় উঠেছে তাতে মুছে যাচ্ছে আকাশের শাশ্বতী স্থিতি। তবে কি তিনি নেই? তবে কি তিনি দর্শনের অগোচর?

    কেন এসেছিল সে দর্শনের সংস্পর্শে? ধর্মের অনুসন্ধানে? সে কি এই মেঘজালের মধ্য থেকে পথ পাবে না? সে কি জ্যোতির তনয় নয়?

    ‘বিশ্বাস, বিশ্বাস, সহানুভূতি-অগ্নিময় বিশ্বাস, অগ্নিময় সহানুভূতি। পাবে না কি সে সেই তপ্ত তাড়িত স্পর্শ? এমন কি কেউ নেই যিনি তাকে বলবেন সরল সত্যের সহজ স্ফূর্তিতে: ‘তাঁকে দেখেছি বই কি। তোকে যেমন দেখছি চোখের উপর, তেমনি। স্পষ্ট, স্থূল, সাবয়ব।’

    ‘দেখেছ?’ চমকে উঠবে নরেন, কিন্তু এমন প্রাণময় সারল্যের সঙ্গে তিনি বলবেন যে নরেন তাঁকে বিশ্বাস করবে। সে অগ্নিময় আন্তরিকতার কাছে তার সংশয়ের ফণা সে নত করবে।

    “শুধু দেখেছি? তাঁর সঙ্গে খেয়েছি, কথা কয়েছি, শুয়েছি একসঙ্গে।

    ‘বলো কি, দেখাতে পারো আমাকে?’ লাফিয়ে উঠবে নরেন।

    ‘আমাকে দেখাতে হবে না। তুই নিজেই দেখতে পারবি।’ বলবেন সেই সৰ্বানুভূ: ‘তোর এমন চক্ষু, তুই দেখবি নে?’

    কোথায়, কোথায় তিনি?

    ২৬

    ওরে অন্তরে আয়, ঘুচে যাবে সব অন্তরায়।

    রাম দত্তের বাড়িতে রামকৃষ্ণের বসবার জন্যে একখানা বিলিতি গালচে হয়েছে। হয়েছে তাকিয়া। ডান হাতের কাছে কাঁচের গেলাশে জল। এড়ানী পাখা দিয়ে বাতাস করছে কেউ।

    কোঁচার কাপড় ফেটি করে কোমরে বাঁধা। জামাটি কখনো গায়ে আছে, কখনো বা কতক্ষণ পরেই খুলে ফেলছে। কখনো বা কোঁচাটি খুলে লম্বা চাদরের মত করে কাঁধের উপর ফেলা।

    রাম দত্ত আর মনোমোহন প্রথম আরম্ভ করল কীর্তন। খোল-করতাল নেই। মাঝে-মাঝে শুধু রামকৃষ্ণ হাততালি দেয়। সেই হাততালিই যেন সূর্য-চন্দ্রের করতাল।

    ‘মন একবার হরি বল হরি বল,

    জলে হরি থলে হরি, অনলে-অনিলে হরি-

    ভাবাবেশে কখনো দাঁড়িয়ে পড়ে রামকৃষ্ণ। নৃত্য করে। সে নরনৃত্য নয়, অমর-নৃত্য। স্পন্দনের সঙ্গে স্থৈর্য। যাকে বলে ‘সাম্যস্পন্দন’। কতক্ষণ পরে একেবারে সমাধি। শরীর থেকে শক্তি বেরুচ্ছে, সূর্যের যেমন বিভা। সমস্ত ঘর-দালান ভেসে যাচ্ছে। জানলা দিয়ে বেরিয়ে ঢেউ খেলছে গলিতে।

    একবার বিজয় গোস্বামীকে বলেছিল নাগ-মশাই: ‘এখানে এসে চোখ বুজে বসেছ কেন? দেখতে এসেছ, চোখ খুলে দেখ প্রাণ ভরে। এখানে জপধ্যানও বন্ধন। শুধু উম্মীলনই মুক্তি।

    চোখ খুলল বিজয়।

    ‘ঈশ্বরকে লাভ করতে হলে, তাঁকে দর্শন করতে হলে, শুধু ভক্তি হলেই হয়? জিজ্ঞেস করল বিজয়।

    ‘হ্যাঁ, পাকা-ভক্তি, প্রেমা-ভক্তি, রাগ-ভক্তি।’ বললেন ঠাকুর, ‘সোজা কথা, ভালোবাসা। যেমন ছেলের মা’র উপর ভালোবাসা। যতক্ষণ না এই ভালোবাসা জন্মায় ততক্ষণ ফটোগ্রাফের কাঁচে কালি মাখানো হয় না। ফটোগ্রাফের কাঁচে কালি মাখানো থাকলেই যা ছবি পড়ে তা রয়ে যায়। কিন্তু শুধু-কাঁচের উপর হাজার ছবি পড়ুক, একটাও থাকে না—একটু সরে গেলেই যেমন কাঁচ তেমনি কাঁচ।’

    ‘ভালোবাসা এলে কী হয়?”

    ‘ভালোবাসা এলে স্ত্রী-পুত্র আত্মীয়-স্বজনের উপর সে মায়ার টান থাকে না, দয়া থাকে। সংসারকে বিদেশ বোধ হয়, শুধু একটা কর্মভূমি, রঙ্গভূমি ছাড়া কিছু নয়। দেশলাইয়ের কাঠি যদি ভিজে থাকে, হাজার ঘষো, কোনো রকমেই জ্বলবে না—কেবল একরাশ কাঠিই লোকসান হবে। বিষয়াসক্ত মনই ভিজে দেশলাই—’তাই শ্রীমতী যখন বললেন, জগৎ-সংসার আমি কৃষ্ণময় দেখছি, তখন সখীরা বললে, তুমি এ কী প্রলাপ বকছ! কই আমরা তো তাকে দেখতে পাচ্ছি না। শ্রীমতী বললেন, সখি, নয়নে অনুরাগ-অঞ্জন মাখো, তাকে দেখতে পাবে।

    অনুরাগের ঐশ্বর্য কি কি?

    অনুরাগের ঐশ্বর্য বিবেক, বৈরাগ্য, জীবে দয়া, সাধু সেবা, সাধু সঙ্গ, ঈশ্বরের নাম-গুণকীর্তন, সত্য কথা—এই সব।

    এই সব লক্ষণ দেখলে ঠিক বলতে পারা যায়, ঈশ্বরদর্শনের আর দেরি নেই। বাবু কোনো খানসামার বাড়ি যাবেন এরূপ যদি ঠিক হয়ে থাকে, তাহলে সেই খানসামার বাড়ির অবস্থা দেখেই ঠিক-ঠিক বুঝতে পারা যায়। প্রথমে বন-জঙ্গল কাটা হয়, ঝুলঝাড়া হয়, ঝাঁটপাট দেওয়া হয়। বাবু নিজেই সতরঞ্চি গড়গড়ি এই সব পাঁচ রকম জিনিস পাঠিয়ে দেন। এই সব আসতে দেখলেই লোকের বুঝতে বাকি থাকে না, বাবু এই এসে পড়লেন বলে।’

    কিন্তু হাজার চেষ্টা করো, তাঁর কৃপা না হলে কিচ্ছু হবার নয়। তিনি কৃপা না করলে তাঁকে দেখা তোমার সাধ্য কি।

    সার্জন সাহেব রাত্রে আঁধারে লণ্ঠন হাতে করে বেড়ায়—তার মুখ কেউ দেখতে পায় না। কিন্তু ঐ আলোতে সে সকলের মুখ দেখে, আর-সকলেও পরস্পরের মুখ দেখে। যদি কেউ সার্জনকে দেখতে চায়, তাহলে তাকে প্রার্থনা করতে হয়। বলতে হয়, সাহেব, কৃপা করে একবার আলোটি নিজের মুখের উপর ফেরাও, তোমাকে একবার দেখি।’

    একটা মাতাল এসেছে রাম দত্তের বাড়িতে। নাম বিহারী ঘোষ।

    ‘রাম দাদা, বলতে কি, চাটের পয়সা জোটে না, শুধু মদ খেয়ে বেড়াই- ‘আজ সন্ধ্যের সময় আসিস। তোকে লুচি আলুরদমের চাট খাওয়াবো।’

    সেই সন্ধ্যের সময় এসেছে বিহারী। দেখলে বৈঠকখানায় ভিড়, কাকে ঘিরে উত্তেজিত স্তব্ধতা।

    ও সব বুঝি না। আমাকে আমার লুচি আলুরদমের চাট কখন দেবে? বকতে লাগল বিহারী।

    কে একজন বললে, ‘যা, পরমহংসদেবকে প্রণাম কর্ গিয়ে—’

    মাতালের কি খেয়াল হল ঘরে ঢুকে প্রণাম করলে।

    সেই হল তার চরম চাট খাওয়া।

    এখন শুধু অঝোরে কাঁদে আর বলে, ‘ভাই, শুধু তাঁর কথা বলো। আর কিছু ভালো লাগে না। মাতাল ছিলুম, লুচি আলুরদমের চাট খেতে চেয়েছিলুম, কিন্তু তিনি কী করে দিলেন? তাঁকে ছাড়া আর কিছু মনে আসে না। হায়, এমন অমূল্য রতন হাতে পেয়ে তখন কিছু বুঝিনি-লুচি আলুরদমের চাটকেই জীবনের সার ভেবেছিলুম— ‘

    সে সব দিনের নিমন্ত্রণে তরকারিতে নুন দেওয়া হত না। আলুনি তরকারির পাশে আলাদা করে নুন থাকত পাতে। রামকৃষ্ণকে নিয়ে সকলে যখন পঙ্‌ক্তি ভোজনে বসছে, তখন চলবে নুন-দেওয়া তরকারি। রাম দত্তের বাড়িতেই প্রথম নিয়মভঙ্গ হল। একসঙ্গেই আহার চলল সকল শ্রেণীর। রামকৃষ্ণ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিল জাতাজাতি। বললে, ‘ভক্তির মধ্যে আবার জাত কি? সব একাকার।’ বন্যার জল যখন এসে পড়েছে তখন কে আর আল-পথ খুঁজে বেড়ায়?

    মেয়েরাও আসছে দলে-দলে। এ এক অভিনব ব্যাপার। মুক্ত অঙ্গনে জ্যোতির্ময়কে দেখবার পিপাসায় বেরিয়ে আসছে পর্দার ঘেরাটোপ থেকে। আরো আশ্চর্য, কেবা পুরুষ কেবা স্ত্রী—কারুরই কোনো দেহজ্ঞান নেই। সবাই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকছে মুখের দিকে। রামকৃষ্ণের সঙ্গে-সঙ্গে আর সবাইও যেন বিদেহ হয়ে গিয়েছে। হাঁটু দুটি উঁচু করে আসনখানির উপর বসে আহার করে রামকৃষ্ণ। স্ত্রী-পুরুষ কাতার দিয়ে দাঁড়িয়ে তাই দেখে।

    ‘আগে কাপড় ঠিক থাকত না, বেভুল বে-এক্তিয়ার হয়ে থাকতাম। এখন সে ভাবটা প্রায় গেছে—’বলতে-বলতেই কখন দিগ্‌বসন হয়ে গেল রামকৃষ্ণ। বিরক্ত হয়ে বললে, ‘আরে ছ্যাঃ, আমার ওটা আর গেল না—’

    কিন্তু যারা দাঁড়িয়ে আছে সামনে, সবাইর অতীন্দ্রিয় ভাব। মেয়েরা পর্যন্ত নিঃসঙ্কোচ। একটি ছোট শিশু যদি উলঙ্গ হয়ে যায় তবে মা কি কুণ্ঠিত হন: ‘আমি মাঝে-মাঝে কাপড় ফেলে আনন্দময় হয়ে বেড়াতাম।’ বললেন ঠাকুর। শম্ভু এক দিন বলছে, ‘ওহে তুমি তাই ন্যাংটো হয়ে বেড়াও—বেশ আরাম! আমি এক দিন দেখলাম। ‘

    কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল সুরেশ মিত্তির। বললে, ‘আফিস থেকে এসে জামা চাপকান খোলবার সময় বলি—মা, তুমি কত বাঁধাই বেঁধেছ।

    ‘অষ্ট পাশ আর তিন গুণ দিয়ে বেঁধেছে।

    রামকৃষ্ণ শিশু।

    ‘মাইরি, কোন শালা ভাঁড়ায়—’বালকের মতই শপথ করে মাঝে-মাঝে।

    ‘বিষয়ী লোকদের সঙ্গে কথা বলতে কষ্ট বোধ হত বলে হৃদেকে দিয়ে পাড়ার ছোট-ছোট ছেলেদের ধরে আনতুম। খাবার-খেলনা দিয়ে ভুলিয়ে খেলা করতুম তাদের সঙ্গে। বেশ খেলছে, যাই একবার বললে, মা যাব, শালার ছেলেকে আর কে ধরে রাখে! তখন আবার হৃদেকে দিয়ে তার মা’র কাছে পাঠিয়ে দিই। মানুষের যদি এমনি টান হয় ভগবানের উপর, তাহলে কেউ আর তাকে রুখতে পারে না।’

    কটির বসনখানি কখন বগলের নিচে চলে এসেছে। যুবক ভক্তদের লক্ষ্য করে বলছেন ঠাকুর, ‘তোরা সব ইয়ং বেঙ্গল আসা অবধি আমি এত সভ্য হয়েছি যে সব সময়েই কাপড় পরে থাকি।’

    ‘এই আপনার কাপড় পরা?’

    ‘মাইরি আমি সভ্য হয়েছি-

    তখন তাঁর গা ছুঁয়ে দেখানো হল তিনি সত্যিই দিগ্‌বসন।

    করুণ স্বরে বললেন ঠাকুর, ‘মনে তো করি সভ্য হব কিন্তু মহামায়া যে অঙ্গে বসন রাখতে দেন না। সে কি আমার অপরাধ?”

    প্রলয়পয়োধিতে বটপত্রের উপর শিশু নারায়ণ শুয়েছেন। তেমনি শুয়েছে রামকৃষ্ণ। দু পায়ের দু বুড়ো আঙুল মুখের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়ে শিশুর মত আনন্দ করছে।

    বালক-ভাবের চরম।

    আবার কখনো শ্রীমতীর ভাব ধরে। অল্প পথ হেঁটেই ক্লান্তিতে ঢলে পড়ে। রাখালের কাঁধে ভর দিয়ে আস্তে-আস্তে যেতে-যেতে গান ধরে রামকৃষ্ণ। ‘আর চলিতে নারি, চরণ বেদন যে হল সখি! সে মথুরা কত দূর!’

    সে মথুরা কত দূর! কোথায় সে প্রেমের অমরাবতী!

    সুবল একটা বাছুর বুকে নিয়ে জটিলার কাছে উপস্থিত। বললে, মা একটু জল খাব।’

    গোষ্ঠ-মিলন গান হচ্ছে। গাইছে নরোত্তম কীর্তুনে।

    জটিলা বললে—গানের সুরে—’সুবল রে, তোর সবই গুণ।

    অমনি রামকৃষ্ণ আখর দিল: ‘তবে কালার সঙ্গে বেড়াস, ওই যা দোষ—’

    ‘পাকশালায় যাও, বধূর কাছে জল পান করবে।’ বললে জটিলা।

    ‘সুবল তাই তো চায়—’আখর দিল রামকৃষ্ণ।

    রান্নাঘরে সুবল গিয়ে দেখে উনুনের ধোঁয়ার ছলে শ্রীমতী কৃষ্ণ বিরহে কাঁদছে। সুবলকে দেখে চকিতে ব্যাপারটা বুঝতে পারল শ্রীমতী। সমরূপী সুবলের সঙ্গে তাড়াতাড়ি বেশ পরিবর্তন করল। বললে, গানের সুরে-সুবল, সবই হলো, আমি যে নারী, কিরূপে বক্ষ ঢাকি বলো।’

    রামকৃষ্ণ আখর দিচ্ছে, ‘চিন্তা নাই, উপায় করে এসেছি–বাছুয়াকে বুকে এনেছি-ঐ দেখ দ্বারে বেঁধে রেখেছি—এরে বুকে করে তুমি চলে যাও—’

    ওরে, তোরা আর কিছু না নিস, কৃষ্ণের প্রতি শ্রীমতীর এই টানটুকু নে-

    সুরেশ মিত্তির এসে বললে, ‘এক দিন আমার ওখানে চলুন।’

    ‘তোর ওখানে যে যাব, গাইবার লোক আছে?’ জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণ।

    ‘কত! গাইয়ের আবার ভাবনা!’ কথাটা উড়িয়ে দিল সুরেশ।

    ২৭

    এ কে?

    পরিধানে ব্র্যাঘ্রচর্ম, নাগ-যজ্ঞ-উপবীতী। সর্বাঙ্গে বিভূতি, নাগালঙ্কার। ধর্ম, পীত, শ্বেত, রক্ত আর অরুণ—পঞ্চ বর্ণের পঞ্চ মুখ। ত্রিনয়ন, জটাজুটধারী। শিরে গঙ্গা, ললাটে চন্দ্রকলা। বাম করে কপাল, পাবক, পাশ, পিনাক আর পরশু। দক্ষিণ করে শূল, বজ্র, অঙ্কুশ, শর আর বরমুদ্রা। লোচন আনন্দসন্দোহে উল্লসিত। কান্তি হিমকুন্দেন্দু সদৃশ। কোটিচন্দ্রসমপ্রভ। বৃষাসনে বিরাজিত। এ কে? এ তো সেই শিব-শান্ত উমাকান্তকে দেখছি।

    সিমলে স্ট্রিটে সুরেশ মিত্তিরের বাড়িতে এসেছে রামকৃষ্ণ।

    বেলফুলের গোড়ে মালা এনেছে সুরেশ। নিচের দিকে তোড়ার মত করা ফুলের থোপনা, মাঝে-মাঝে রঙিন ফুল আর জরির তবক। রামকৃষ্ণের গলায় মালাটি পরিয়ে দিয়ে পায়ের কাছে প্রণাম করল সুরেশ। কিন্তু সহসা রামকৃষ্ণের এ কী হল? মালা গলা থেকে খুলে দূরে ফেলে দিল রামকৃষ্ণ।

    নিমেষে ম্লান হয়ে গেল সুরেশ। কী না-জানি সে সেবাপরাধ করে বসেছে। কিন্তু জলের গ্লাশে শশীর যখন পা ঠেকে গিয়েছিল তখন তো এত বিমুখ হয়নি রামকৃষ্ণ। সে-জল খেয়েছিল শান্ত মুখে।

    সমাধি ভাঙবার পর এক ঢোঁক জল খায় রামকৃষ্ণ। যন্ত্রচালিতের মত হাত বাড়িয়ে দেয়, আর তক্ষুনি জল-ভরা গ্লাশটি এগিয়ে দেয় শশী। শশী মানে শশিভূষণ ভটচাজ, উত্তরকালের রামকৃষ্ণানন্দ। সে দিন রাম দত্তের বাড়িতে কি হল, তাড়াতাড়িতে জলের গ্লাশে পা ঠেকে গেল শশীর। জল বদলাবার আর সময় নেই, রামকৃষ্ণ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

    সেই জলের গ্লাশই এগিয়ে ধরল শশী। রামকৃষ্ণ তাই খেল নিশ্চিন্ত হয়ে।

    শশীর অপরাধ তো জানিত অপরাধ। সুরেশ তো বুঝতেই পাচ্ছে না কোনখানে তার বিচ্যুতি হয়েছে। শশীর যদি ক্ষমা হয়, তবে তার কেন হবে না? এই জলের গ্লাশে পা ঠেকে যাওয়া নিয়ে চিরকাল আক্ষেপ করেছে শশী। কিন্তু ঠাকুর তো জানতেন তার অন্তরের স্বচ্ছতা। তাই তো তাকে ক্ষমা করলেন অনায়াসে। সুরেশের মন কি তেমনি পরিষ্কার নয়?

    জ্যৈষ্ঠ মাসের দুপরে কাঠ-ফাটা রোদ্দুরে শশী এসে হাজির। মুখ-চোখ লাল, এক হাঁটু ধূলো। ঘাম ঝরছে গা বেয়ে। ‘এ কি করেছিস তুই?’ ঠাকুর ক্ষিপ্র হাতে তাকে পাখা করতে লাগলেন। ‘এই রোদ্দুরে কেউ আসে?’ শশী নিবৃত্ত করতে চায় ঠাকুরকে, ঠাকুর কোনো-কিছুই শুনতে রাজী নন। বোস একটু চুপ করে, আগে খানিক ঠাণ্ডা হ। গায়ের ঘাম মরেছে এতক্ষণে। বল এইবার কি বলবি। বলবার কিছু নেই। এই দেখুন বরানগরের বাজার থেকে আপনার জন্যে কিছ বরফ কিনে এনেছি। চাদরের খুঁট খুলে এক টুকরো বরফ বের করল শশী। ঠাকুরের আনন্দ তখন দেখে কে। বললেন, ‘দেখ, দেখ। এই গরমে মানুষ গলে যায়, কিন্তু শশীর বরফ গলেনি। কি করে গলবে? শশীর ভক্তিহিমে বরফ জমাট হয়ে রয়েছে।’

    ভক্তি-হিমে জল জমে যখন বরফ হয় তখনই ঈশ্বর সাকার। যখন জ্ঞান-সূর্যে গলে যায় বরফ, তখন আবার যে-জল সে-ই জল, তখন আবার তিনি নিরাকার। ভক্তের জন্যে তাঁর রূপ, জ্ঞানীর জন্যে অরূপ। কিন্তু দুয়ের জন্যেই সমান অপরূপ। তবে কি সুরেশের ভক্তি নেই?

    ভক্তমাল থেকে একটি গল্প বলল রামকৃষ্ণ। যে ভক্ত সে কী মনোভাব নিয়ে দান করবে। তার মধ্যে অভিমানের এতটুকু আঁশ থাকবে না। অহংকার ত্যাগ করলেই তবে ঈশ্বর ভার নেন। মালা যে দিলি মালার মধ্যে যে তোর একটু অহংকারের জ্বালা আছে। মালার মধ্যে যে অনেক চেকনাই। অনেক কেরামতি। তারই জন্যে তোর মনের মধ্যে একটু অহংকারের জ্বর।

    অহংকার হচ্ছে উঁচু ঢিপি। সেখানে কি জল জমে! জল জমে নিচু জমিতে, খাল জমিতে। সেই ঢিপিকে খাল করে দাও। তবেই জমবে ভক্তির জল।

    সুরেশ কাঁদতে লাগল।

    লাটু ছিল উপস্থিত। সে তাজ্জব বনে গেল। ঠাকুরের রসদদারদের মধ্যে একজন এই সুরেশ মিত্তির, তবু তার দান তিনি গ্রহণ করলেন না! আর, চেয়ে দেখ, তারই জন্যে কাঁদছে সুরেশ মিত্তির।

    না কাঁদলে হবে কেন? কান্না দিয়ে পথের ধূলো ধুয়ে দিলেই তো তিনি আসবেন। ভক্তি-প্রদীপের তেলটিই তো অশ্রুজল।

    এই যে বিশ্ব এ হচ্ছে বিস্তীর্ণ ব্যথার পত্রপট। ভক্তকে পাচ্ছেন না বলে ভগবানের কান্না। তাঁর অসীম শক্তির শুকনো রঙগুলি তিনি প্রেমের অশ্রুতে গলে-গলে এই বিচিত্র বর্ণবেদনার ছবি এঁকেছেন। মনের মধ্যে যদি সেই কান্না না থাকে তবে এ চিঠির মর্মোদ্ধার করব কি করে? এই চিঠির মধ্যেই তো আনন্দের সংবাদ।

    কীৰ্ত্তুনে নিয়ে এসেছে সুরেশ। নিজে গান গেয়ে রামকৃষ্ণ তাকে উচ্চভাবে উদ্দীপ্ত করে তুলল। অর্ধবাহ্যদশায় এসে হঠাৎ সেই ত্যক্ত মালা গলায় পরে উঠে দাঁড়াল।

    গান ধরল গলা ছেড়ে:

    আর কী সাজাবি আমায়—

    জগৎ-চন্দ্র-হার আমি পরেছি গলায়–

    ফের আখর দিতে লাগল: ‘আমি জগৎ-চন্দ্র-হার পরেছি। অশ্রুজলে সিক্ত-করা জগৎ-চন্দ্র-হার পরেছি। প্রেমরসের ভাবন দেওয়া জগৎ-চন্দ্র-হার পরেছি-‘

    চোখের কান্না মুছে ফেলে চেয়ে দ্যাখ আমাকে। আমি দূরে আছি যে বলে, সেই নিজে দূরে রয়েছে। আমাকে দেখতে আবার নতুন কী আয়োজন হবে! দেখব বলে তাকালেই দেখতে পাবি চোখের উপর। ‘ত্বমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং।’

    ইট কাঠ মাটি পাথর সব আমি। আকাশ বাতাস আগুন জল পাখি পতঙ্গ। একটা গাছ দেখছিস সামনে? ঐ বৃক্ষরূপে তো আমিই দাঁড়িয়ে। সমস্ত কান্নার পারে আমিই তো আনন্দ-তীর।

    কিন্তু সে দিন সুরেশের বাড়িতে গাইয়ের যোগাড় নেই।

    রামকৃষ্ণ শুধোলো: ‘ভজন গাইতে পারে এমন কেউ নেই তোমাদের পাড়ায়?’

    আছে বৈ কি। সুরেশ ব্যস্ত হয়ে খুঁজতে বেরল। গৌর মুখুজ্জে লেনের বিশ্বনাথ দত্তের ছেলে নরেন।

    নরেন তখন গানের স্রোতে ভাসছে। ভগবান আছে কি নেই জানি না, কিন্তু দেহ-ভরা প্রাণ আছে, কণ্ঠ-ভরা গান আছে। আর, এই প্রাণ আর গান এ যেন আর কার দানোচ্ছাসে। তাই নরেন গায়, ‘অচল ঘন গহন গুণ গাও তাঁহারি।’

    কখনো বা:

    ‘মহাসিংহাসনে বসি শুনিছ হে বিশ্বপিতঃ,

    তোমারি রচিত ছন্দ মহান বিশ্বের গীত।

    মর্তের মৃত্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র এই কণ্ঠ লয়ে

    আমিও দুয়ারে তব হয়েছি হে উপনীত৷৷’

    ‘ওরে বিলে, বাড়ি আছিস?’ দরজায় সুরেশ মিত্তির দাঁড়িয়ে। ত্রস্ত-ব্যস্ত হয়ে কাছে এল নরেন। ‘চল আমার বাড়ি চল। গান গাইবি।’

    একবার গানের নাম শুনলেই হল, নরেন উচ্ছলিত। ক’দিন বাদে একজামিন, দুপুর বেলা হয়তো পড়ছে নরেন, বন্ধু এসে বললে, রাত্তিরে পড়িস, এখন দুটো গান গা। তবে বাঁয়াটা নে—বলেই বই-টই ঠেলে ফেলে নরেন তানপুরা নিয়ে বসল। ইস্কুল-কলেজে টেবিল চাপড়ে বাজিয়েছে বলেই কি আর এখন বাঁয়া বাজাতে পারবে—গান শুনতে চেয়ে বন্ধু পড়ল মুশকিলে। মোটেই শক্ত নয়, এমনি করে শুধু ঠেকা দিয়ে যা-বাজনার বোল বলে দিল নরেন। ঠেকার অভাবে ঠেকবে না, নরেন তানে-লয়ে তন্ময় হয়ে গান ধরল উদার গলায়। কখন দুপর গড়িয়ে গেল আস্তে-আস্তে, কিছু খেয়াল নেই-একটার পর একটা গান গেয়ে চলেছে অনবরত। সন্ধ্যায় আলো দিয়ে গেল চাকর, তবু আসর ভাঙছে না। রাত দশটায় এল খাবার তাড়া, তখনই বুঝি প্রথম হুঁস হল। দিব্য ভূমি থেকে নেমে এল স্থূল ভূমিতে।

    গানই হচ্ছে একমাত্র জ্ঞান যে জ্ঞানের ওপারে একজন আছেন। জ্ঞানের ওপারে যিনি আছেন তাঁকে একমাত্র গান দিয়েই স্পর্শ করা।

    অন্তরের কান্নাটিও একটি গান। আকুলতাটিও একটি সুর।

    গানের নাম শুনেই কোমর বাঁধল নরেন। চলল সুরেশ মিত্তিরের বাড়িতে।

    রামকৃষ্ণের সঙ্গে নরেন্দ্রের প্রথম দর্শন হল—সূর্যের সঙ্গে সমুদ্রের।

    এ কে! চমকে উঠল রামকৃষ্ণ। এ যে তার সেই স্বপ্নে-দেখা সপ্তর্ষি মণ্ডলের ঋষি!

    সে এক অপূর্ব দর্শন হয়েছিল রামকৃষ্ণের।

    সমাধি অবস্থায় জ্যোতির্ময় পথ ধরে ঊর্ধ্বে নভোমণ্ডলে উঠে যাচ্ছে রামকৃষ্ণ পার হল পৃথিবী, পার হল জ্যোতিষ্কলোক। ক্রমে ক্রমে চলে এল সুক্ষতর ভাবলোকে। যতই উপরে উঠছে, পথের দুপাশে দেখতে লাগল দেব-দেবীরা বসে আছেন। সেখানেও ঊর্ধ্বগতি ক্ষান্ত হল না। উঠে এল ভাবরাজ্যের চরম চূড়ায়। সেখানে দেখল একটি জ্যোতির রেখা দিয়ে দুটি বিশাল রাজ্যকে আলাদা করা হয়েছে। খণ্ড আর অখণ্ডের রাজ্য, দ্বৈত আর অদ্বৈতের দেশ। রামকৃষ্ণ অখণ্ডের রাজ্যে এসে ঢুকল। সেখানে আর দেব-দেবী নেই—দিব্য দেহের অধিকারী হয়েও এখানে আসবার অধিকার নেই তাদের। অনেক নিচে ভাবলোকে তাদের বাসা। সেই অখণ্ডলোকে সাতটি ঋষি বসে আছে ধ্যানলীন হয়ে। প্রজ্ঞ, প্রবীণ ঋষি। আশ্চর্য হল রামকৃষ্ণ। যেখানে দেব-দেবী আসতে পারে না সেখানে এই ঋষিরা এল কি করে? বুঝল জ্ঞানে প্রেমে পুণ্যে পবিত্রতায় এরা দেবদেবীকেও হার মানিয়েছে। এদের মহত্ত্বচিন্তায় অভিভূত হল রামকৃষ্ণ। সহসা দেখতে পেল সেই অখণ্ডলোকের পরিব্যাপ্ত জ্যোতিপুঞ্জের কিয়দংশ ঘনীভূত হয়ে একটি দেব-শিশুর আকার নিলে। একটি অমলকান্তি দেবশিশু। দেবশিশুটি তার মৃদুল-কোমল বাহু দুটি দিয়ে একজন ঋষির গলা জড়িয়ে ধরল, তার ধ্যান ভাঙাবার জন্যে ডাকতে লাগল কলভাষে। ধ্যান ভাঙল ঋষির, আনন্দময় অনিমেষ চোখে দেখতে লাগল শিশুকে। এ যেন তার কত কালের প্রিয়ধন, তার হৃদয়রতন। কি যেন বলবে বলে এসেছে! প্রসন্ন-প্রভাত চোখ দুটি তুলে শিশু বললে ঋষিকে, ‘আমি চললাম তুমি এস।’ কোথায় চললে? পৃথিবীতে। তুমিও এস আমার পিছন-পিছনে। স্নেহস্নাত চোখে চেয়ে থাকতে-থাকতে ঋষি আবার ধ্যানস্থ হল। রামকৃষ্ণ দেখল, ঋষির সেই দেহ থেকে একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে জ্যোতিবর্তিকা-রূপে নেমে গেল পৃথিবীতে।

    নরেন্দ্রকে দেখেই চমকে উঠল রামকৃষ্ণ। এ যে সেই ঋষি!

    তবে ঐ শিশুটি কে? শিশুটি স্বয়ং রামকৃষ্ণ।

    বিবেকানন্দ ঋষি, রামকৃষ্ণ শিশু। তার মানে কি? বিবেকানন্দ পরিপূর্ণ জ্ঞান, রামকৃষ্ণ পরিপূর্ণ প্রেম। বিবেকানন্দ সংহত তেজ, রামকৃষ্ণ বিগলিত সারল্য। বিবেকানন্দ তাই হিমালয়, রামকৃষ্ণ মানস সরোবর।

    ২৮

    একটি ভজন গাইল নরেন। উন্মনা হয়ে গেল রামকৃষ্ণ। কাদের বাড়ির ছেলে? কোথায় থাকে? কোথা থেকে এসেছে? কি করে পথ চিনল এ গলির?

    আরো একখানা গান হল।

    এগিয়ে এল রামকৃষ্ণ। কাছে এসে নরেনের অঙ্গলক্ষণ দেখতে লাগল। বলল, কথার সুরে মিনতি মাখিয়ে বলল, ‘একবারটি দক্ষিণেশ্বরে এসো আমার কাছে। কেমন, আসবে?”

    উন্মনা হয়েই ফিরল দক্ষিণেশ্বরে। তার নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে।

    কে যেন নেই। কে যেন আসবে বলে আসেনি। দেখা দিয়েই চক্ষের পলকে পালিয়ে গেছে।

    প্রতিক্ষণ উচাটন। প্রতিক্ষণ তার পায়ের শব্দ শুনছে উৎকর্ণ হয়ে। সে যে আসে আসে আসে। পৃথিবীর সমস্ত সুরে-ছন্দে তার আগমনী বাজছে। কিন্তু সে আসছে কই? দেখা দিচ্ছে কই চোখের সামনে! কোথায় সেই চারু-হারী-রুচির-মনোহর? রুচ্য রম্য কান্ত কাম্য? তাকে না দেখে কেমন করে থাকব?

    অন্ধকারে তার গন্ধ টের পাচ্ছি, কিন্তু সে কি অন্ধকারে আমার কান্না শুনতে পাচ্ছে না? বিশ্ববীণায় সে এত সুর বুনছে, সেখানে কি বাজছে না এই গীতহারা নীরবতা?

    ‘ওরে, তুই কে জানি না। কী হবে জেনে? তবু তুই একবার আয়। তোকে না দেখে যে থাকতে পারছি না। তোকে ছাড়া সব অন্ধকার। একেবারে একা।’ নির্জনে গিয়ে ডাক ছেড়ে কাঁদে রামকৃষ্ণ। যেমন ভিজে গামছা নিংড়োয় তেমনি করে বুকের ভিতরটা কে জোর করে নিষ্পীড়ন করছে। চোখে ঘুম নেই, মুখে রুচি নেই, সব সময়ে কেবল ইতি-উতি তাকায়, ঘন-ঘন নিশ্বাস ফেলে, কিন্তু সে আসে না।

    সে শুধু আসে আসে আসে।

    শেষকালে মা’র কাছে কেঁদে পড়ে রামকৃষ্ণ। মা, একবারটি তাকে এনে দে। ওকে না পেলে কেমন করে থাকব! কার সঙ্গে কইব আমার প্রাণের কথা? আমি রাজ্য চাই না, স্বর্গ চাই না, মোক্ষ চাই না, তুই শুধু ওকে এখানে নিয়ে আয়। আমি ওর কনককাঞ্চনছবি আর একবার দেখি।

    রাত্রে শুয়ে আছে রামকৃষ্ণ, কে যেন তাকে তার গা ঠেলে তুলে দিল। বললে, ‘আমি এসেছি।’ রামকৃষ্ণ চেয়ে দেখল, নরেন।

    ধড়মড় করে উঠে বসল। এসেছিস? এত রাত্রে, মধ্যরাত্রে? তাতে কি? তাই তো আমি আসি, যখন চরাচর সান্দ্র-স্তব্ধ, সুষুপ্তিগত। কিন্তু কই, কই তুই?

    কেউ নেই৷

    এই তুই সাকার, আবার তুই নিরাকার। এই তুই সমুপস্থিত গান, আবার তুই পলায়মান সুর! আর কত তোর পথ চেয়ে বসে থাকব? আমার ঘর নেই আমি পথই সার করেছি। তুই এসে আমাকে পথের খবর দিয়ে যা। কোন পথে মিলবে সেই পথপতিকে?

    বয়ে গেছে নরেনের আসতে! তার এফ-এ পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে, বাবা তার জন্যে এখন পাত্রী খুঁজছেন। তার খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই, সে চলেছে দক্ষিণেশ্বর! ধাপ-ধাড়া গোবিন্দপুর এর চেয়ে অনেক ভালো জায়গা।

    কিন্তু বাবা শুধু পাত্রীই দেখছেন না, দেখছেন তার টাকার ওজনটা। মেয়েটি শামলা, তাই তার দশ হাজার টাকা জরিমানা। তা ছাড়া ছেলে দেখুন। ছেলে আমার সোনা-বাঁধানো হাতির দাঁত।

    কিন্তু নরেন ঘাড়ে এক ঝাঁকরানি দিয়ে সব নস্যাৎ করে দিলে।

    মেয়ে কালো বলে নয়, নয় বা বাবা পণ নিচ্ছেন বলে। সে বিয়ে করবে না কেননা সে ঈশ্বরসন্ধানে হবে দুর্গমের যাত্রী, দুরারোহ ও দুরবগাহের। সে-পথ ক্ষুর-ধারের মত নিশিত-দুস্তর।

    বিশ্বনাথের সংসারেই প্রতিপালিত রাম দত্ত, তাকে তাই ধরলেন বিশ্বনাথ। বললেন, বিলের ঘাড়ে একটু ঘি ডলো, কি এক গোঁ ধরেছে, বলছে বিয়ে করবে না-

    রাম দত্ত লাগল ঘটকালিতে। কিন্তু নরেন তো ঘট নয় যে কালি মাখাবে, নরেন আকাশ, তাতে লাগে না কিছু কামনার কালিমা।

    ‘যদি সত্যি ধর্ম’ লাভ করতেই চাও তবে মিছে ব্রাহ্মসমাজে না ঘুরে দক্ষিণেশ্বরে যাও। মূর্তিমান ধর্মকে দেখে এসো।’

    যেতে হয়তো যাব, তুমি বলবার কে! এমনিই ভাব নরেনের। তুমি বলবে বললেই যাব? তুমি কি আমার অভিভাবক? তুমি কি আমার বিবেক? আমার খুশি আমি যাব না।

    নতুন গাড়ি হয়েছে সুরেশের। দুশো টাকা মাইনে হয়েছে রাম দত্তের। হাসি পায়, সব নাকি ঠাকুরের কৃপায়। এতই যখন কৃপা, নরেন ভাবল মনে-মনে, জগৎ-সংসারের সমস্ত দুঃখ-দারিদ্র্য এক দিনে দূর করে দিক না। তবে বুঝি কেমন ঠাকুর!

    নতুন গাড়ি কিনে রামকৃষ্ণকে একদিন চড়াল সুরেশ।

    সুরেশের বাড়ি এলে রামকৃষ্ণকে ঘিরে আজকাল ছেলে-ছোকরারা ভিড় করে। ‘ছোট ছেলেগুলোকে আপনি বকাচ্ছেন—’ সুরেশেরই বাড়িতে থাকে এক উচ্চপদস্থ কর্মচারী, সে একদিন হঠাৎ রামকৃষ্ণকে আক্রমণ করলে।

    ‘তুমি কী করো?” শান্ত বয়ানে প্রশ্ন করল রামকৃষ্ণ।

    ‘আমি আপনার মতো ছেলে বকাই না, আমি জগতের হিত করি।’

    ‘যিনি এই বিশ্বজগৎ সৃষ্টি করেছেন পালন করছেন তিনি কিছু বোঝেন না আর তুমি সামান্য মানুষ, তুমি জগতের হিত করছ? ঈশ্বরের চেয়ে তুমি বেশি বুদ্ধিমান?’ চুপ করে গেল সরকারী চাকুরে।

    সেই সরকারী চাকুরের পিছনে লেগে গেল পাড়ার ছেলেরা। কি হে, জগতের হিত করছ নাকি? কতটা হিত আজ করলে জগতের?

    কৃষ্ণদাস পালকে জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণ, ‘মানুষের কি কর্তব্য?”

    কৃষ্ণদাস বললে, ‘জগতের উপকার করব।’

    ‘হ্যাঁ গা, তুমি কে?’ বললে রামকৃষ্ণ, ‘আর, কী উপকার করবে? আর, জগৎ কতটুকু গা, যে তুমি উপকার করবে?

    ঈশ্বরকে ভালোবাসাই জীবনের উদ্দেশ্য। ঈশ্বরে ভাব-ভক্তি মানেই ঈশ্বরে ভালোবাসা। নিষ্কাম কর্ম করতে করতেই ঈশ্বরে ভক্তি-ভালোবাসা আসে। আর এই ভক্তি-ভালোবাসা থেকেই ঈশ্বরলাভ। এই ঈশ্বরলাভই মানুষের কর্তব্য। জগতের উপকার মানুষে করে না, তিনিই করছেন। যিনি চন্দ্র-সূর্য করেছেন, যিনি মা-বাপের বুকে স্নেহ দিয়েছেন, মহতের চিত্তে দয়া দিয়েছেন, ভক্তের প্রাণে ভক্তি দিয়েছেন—তিনিই। বাপ-মা’র মধ্যে যে স্নেহ দেখ সে তাঁরই স্নেহ। দয়ালুর মধ্যে যে দয়া দেখ সে তাঁরই দয়া। তুমি কাজ করো আর না করো, তিনি কোনো না কোনো সূত্রে তাঁর কাজ করবেনই করবেন। তাঁর কাজ আটকে থাকবে না।

    জগতের দুঃখ দূর করবে তোমার স্পর্ধা কি? জগৎ কি এতটুকু? বর্ষাকালে গঙ্গায় কাঁকড়া হয় দেখেছ? তেমনি অসংখ্য জগৎ আছে—-অফুরন্ত। যিনি জগতের পতি তিনিই সকলের খবর নিচ্ছেন। তোমার মিথ্যে মাথা ঘামাতে হবে না। তোমার কাজ হচ্ছে তাঁকে আগে জানা। তাঁর জন্যে ব্যাকুল হওয়া। শরণাগত হওয়া। ঈশ্বরদর্শনই জীবনের উদ্দেশ্য!

    এমন নরদেহ ধারণ করেছ একবার ঈশ্বরদর্শন করবে না? এত কিছু দেখলে, এত কিছু ধরলে, দেখবে-না-ধরবে-না শুধু ঈশ্বরকে? জীবনে এত রোমাঞ্চ খুঁজছ, নেবে না একবার ঈশ্বর-শিহরণ?

    গঙ্গার দিকে পশ্চিমের দরজায় কার ছায়া পড়ল।

    কে? চঞ্চল হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ। এ কার ছায়া? কার আভাতি?

    আর কার! চোখের সামনে নরেন। সপ্ত ঋষির একজন।

    সুরেশ মিত্তিরের গাড়িতে করে এসেছে। সঙ্গে সুরেশ, আরো ক’জন সমবয়সী ছোকরা। কিন্তু সকলের চেয়ে স্বতন্ত্র এই নরেন্দ্রনাথ। সকলের থেকে বিচ্ছিন্ন-বিযুক্ত। শরীরের দিকে লক্ষ্য নেই, বেশেবাসে উদাসীন, গায়ে ময়লা একখানা চাদর, বাইরের কোনো কিছুতে কৌতূহল নেই, সমস্ত কিছুর সঙ্গে অবন্ধন, সমস্ত কিছুই যেন তার শিথিল। শুধু ধ্যানের আবেশে চোখের তারা উপর দিকে উঠে আছে। ঘুমালেও হয়তো সম্পূর্ণ বোজে না তার চোখ। চোখ সমুখে ঠেলা। দেখলেই মনে হয় ভিতরে কিছু আছে।

    বিষয়ীর আবাস কলকাতায় এত বড় সত্ত্বগুণী আধার এল কোত্থেকে? সত্ত্বগুণই তো সিঁড়ির শেষ ধাপ। তার পরেই ছাদ।

    এসেছিস? আয়—

    মনের ব্যাকুলতা চেপে রাখল রামকৃষ্ণ। মেঝেতে মাদুর পাতা, বসতে বলল নরেনকে। যেখানে জলের জালা, তার কাছেই বসল নরেন। তার সহচর বন্ধুরাও বসল আশে-পাশে৷ কিন্তু তারা সব ডোবা-পুষ্করিণী। ডোবা-পুষ্করিণীর মধ্যে নরেন বড় দীঘি—যেন ঠিক হালদার পুকুর!

    চুম্বকের টানে লোহা আসে, না, লোহার টানে চুম্বক ছোটে—কে করবে এ রহস্যের সমাধান? প্রিয়তময় দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রামকৃষ্ণ। বলে, ‘একটা গান ধর।’ গান তো নয়, মানস-যাত্রী হংস। নরেনের সমস্ত শরীর যেন সুরে-বাঁধা সমস্ত প্রাণ-মন ঢেলে ধ্যানারূঢ় হয়ে সে গান ধরলে:

    ‘মন চল নিজ নিকেতনে।

    সংসার বিদেশে বিদেশীর বেশে

    ভ্রম কেন অকারণে ৷৷’

    ‘আহা, কি গান’ ভাবে উঠে গিয়েছিল রামকৃষ্ণ, নেমে এসে বললে, ‘আরেকখানা গা।’ যাবে কি হে দিন বিফলে চলিয়ে’—সুধা-ঢালা কণ্ঠে গান ধরল নরেন: ‘আছি নাথ, দিবানিশি আশা পথ নিরখিয়ে।’

    পাখির ওড়াই যেমন বিশ্রাম, নরেনের গানই যেন ধ্যান। ও স্বতঃসিদ্ধ। নিত্যসিদ্ধ।

    নিত্যসিদ্ধ হচ্ছে মৌমাছি। শুধু ফুলের উপর বসে মধু পান করে। তার মানে হরিরস পান করে, বিষয়-রসের দিকে যায় না।

    মা, তোর কী কৃপা! তুই এত দিন পরে নিয়ে এসেছিস আমার মন-ঠাণ্ডা-করা আপন জন!

    কালীঘরের খাজাঞ্চি ভোলানাথ মুখুজ্জেকে জিজ্ঞেস করেছিল রামকৃষ্ণ: ‘নরেন্দ্র বলে একটি কায়েতের ছেলে, তার জন্যে আমার মন এমন হচ্ছে কেন? সে আমার কে!’

    ভোলানাথ বললে, ‘এর মানে ভারতে আছে। সমাধিস্থ লোকের মন যখন নিচে আসে, তখন সত্ত্বগুণী লোকের সঙ্গে বিলাস করে। সত্ত্বগুণী লোক দেখলে তবে তার মন ঠাণ্ডা হয়।

    আমি বিলাস করব। আমি শুঁটকে সাধু হব না।

    ২৯

    গান শেষ হওয়া মাত্র নরেনের হাত ধরল রামকৃষ্ণ। হাত ধরে টেনে আনল উত্তরের বারান্দায়। বাইরে থেকে বন্ধ করে দিলে ঘরের দরজা।

    শীতকাল। উত্তরে হাওয়া আটকাবার জন্যে থামের ফাঁকগুলো ঝাঁপ দিয়ে ঘেরা। নিশ্চিন্ত, নিরিবিলি জায়গা। ঘরের দরজা বন্ধ করে দেবার পর কারু সাধ্য নেই এখানে উঁকি মারে।

    নিরিবিলিতে কিছু উপদেশ দেবে বোধ হয় রামকৃষ্ণ, নরেন তাই কৌতূহলী হয়ে রইল। কিন্তু এ কি, রামকৃষ্ণের মুখে কোনো কথা নেই। রামকৃষ্ণ কাঁদছে। আকুল হয়ে কাঁদছে। যেন কত দিনের গভীর পরিচয়, বলছে তেমনি স্নেহস্বরে, ‘এত দিন কোথায় ছিলি?”

    নিঃশব্দ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রইল নরেন।

    ‘তোর কি মায়া-দয়া নেই? এত দিন পরে আসতে হয়! কত ক্ষণ থেকে দিন, দিন থেকে মাস, মাস থেকে বছর আমি তোর জন্যে বসে আছি—তোর তা খেয়াল নেই। তোর মনে পড়ল না আমাকে?” নরেনের হাত ধরে বিলাপের মত করে বলছে, কিন্তু আসলে এ আনন্দ-প্রলাপ। এ দুঃখ প্রীতিকণ্টকিত দুঃখ। এ অশ্রু স্নেহার্দ্রগাঢ় সুধাধারা।

    এ বাণী নবনীসমানা অমিয় বাণী।

    ‘বিষয়ী লোকের কথা শুনে-শুনে আমার কান পুড়ে গেল। প্রাণের কথা আর কাউকে বলা হল না। বলতে না পেয়ে এই দ্যাখ আমার পেট ফুলে রয়েছে। এইবার তুই এসেছিস, এবার বাহির দুয়ারে কপাট লেগে ভিতর দুয়ার খুলে যাবে। হরিকথারতিতে কেটে যাবে দিন-রাত। তুই এসেছিস, তার মানে ভক্তের হৃদয়ে ভগবান বিশ্রাম করতে এসেছে। ভক্তের হৃদয়েই তো ভগবানের বিশ্রাম।’

    নরেন চিত্রলিখিতের মত দাঁড়িয়ে রইল। নিষ্পন্দ, নিঃসাড়।

    ‘মাকে সেদিন অনেক করে বললাম। কামিনী-কাঞ্চনত্যাগী শুদ্ধ ভক্ত না পেলে কেমন করে থাকব পৃথিবীতে? কার সঙ্গে কথা কইব? কাঁদতে-কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লুম। তারপর কী হল জানিস না বুঝি?

    নরেন তাকিয়ে রইল উৎসুক হয়ে।

    ‘মাঝ রাতে তুই এলি আমার ঘরে। আমায় তুললি গা ঠেলে। বললি, আমি এসেছি।

    ‘কই আমি তো কিছু জানি না।’ নরেনের মুখে হাসির একটি রেখা ফুটল। বললে, ‘আমি তো আমার কলকাতার বাড়িতে তখন তোফা ঘুম মারছি।’

    ‘তুমি জানো না বৈ কি। তুমি যদি না জানো, তবে আর কে জানে!’ রামকৃষ্ণ সহসা হাত জোড় করল। দেববন্দনার ভঙ্গিতে বলতে লাগল, ‘কিন্তু আমি জানি প্রভু তুমি সেই পুরাণ পুরুষ, তুমি মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি, তুমি নররূপী নারায়ণ। তুমি আমার জন্য রূপধারণ করে এসেছ। শুধু আমার জন্য নয়, সমস্ত জীবের জন্য এসেছ। এসেছ সমস্ত ভুবনের দৈন্যদুঃখদুরিত দূর করতে—প্রণতজনের ক্লেশহরণ করতে—’

    কে এ উন্মাদ! নইলে আমি সামান্য বিশ্বনাথ দত্তের ছেলে, আমাকে এ সব কথা বলছে! কে এ বচনরচনপটু! এ সব কি আমি প্রহেলিকা শুনছি? আমি আছি তো আমার মধ্যে? নরেন স্থান-কাল একবার যাচাই করে নিল। সব ঠিক আছে। শুধু পাত্রই অপ্রকৃতিস্থ। লোকে যে বলে দক্ষিণেশ্বরে এক পাগলা বামুন আছে, ঠিকই বলে।

    পাগল নয় তো কি! পাগল না হলে কি মানুষের মধ্যে ঈশ্বর দেখে! যাকে দেখা যায় না শোনা যায় না তার জন্যে অশ্রুবর্ষণ করে কেউ? এমন কাণ্ডজ্ঞান-শূন্যের মত কথা বলে?

    কিন্তু পাগল বলে এক কথায় উড়িয়ে দেবার মত সায় পায় না মনের মধ্যে। পাগল কি এমন হিরন্ময় হয়? হয় কি এমন পুলকোদ্ভিন্নসর্বাঙ্গ? বচনে কি এত মধু থাকে? কথা কি হয় শ্রবণমঙ্গল? এমন লোকাতিহর হাসি কি তার মুখে থাকে? কন্ঠে ও চাহনিতে, স্পর্শে ও কাতরতায় থাকে কি এমন মেদুরমেঘের মমতা, অমৃতবর্ষণ স্নেহ?

    কে জানে! কী হবে বিচার-বিতর্ক করে? এ যেন এক তর্কাতীত, তত্ত্বাতীত অনুভূতি। শুধু দেখা যাক। শুধু শোনা যাক। নিরুদ্ধ নিশ্বাসে থাকি শুধু নিশ্চল হয়ে।

    ‘তুই একটু বোস। তোর জন্যে খাবার নিয়ে আসি।’ দরজা ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকল রামকৃষ্ণ।

    চকিতে ফিরে এল খাবারের থালা নিয়ে। প্রায় পাগলের ব্যাকুলতায়। যদি এই ফাঁকে পালিয়ে যায় ননীচোর! যদি অন্ধকারে অন্তর্ধান করে!

    না, চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে নরেন। বর্তমান-ভবিষ্যৎ কিছুই নির্ণয় করতে পারছে না। শুধু ভাবছে, আমি কি সার্ধ-ত্রিহস্ত পরিমিত মাংসপিণ্ডময় সামান্য একটা দেহ? না কি আমি বিরাট, আমি মহান, আমি অনন্তবলশালী পরমাত্মা?

    থালায় কতগুলি সন্দেশ, মাখন আর মিছরি। হাতে করে নরেনের মুখের কাছে খাবার তুলে ধরল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘খা, হাঁ কর।’

    সে কি, আমার বন্ধুরা যে রয়েছে সঙ্গে।’ মুখ সরিয়ে নিতে চাইল নরেন। ‘দিন, আমার হাতে দিন, ওদের সঙ্গে ভাগ করে খাই।

    কে শোনে কার কথা।

    ‘হবে’খন, ওরা খাবে’খন পরে—আগে তুমি খাও।’ জোর করে মুখে পুরে দিতে লাগল রামকৃষ্ণ।

    কৌশল্যা হয়ে রামকে খাইয়েছি, যশোদা হয়ে ননীগোপালকে। খা, এই নে আমার হৃদয়বেদ্য নৈবেদ্য। তুই জানিস না তুই কে? তুই সবিতৃমণ্ডলমধ্যবর্তী নারায়ণ।

    জোর করে সবগুলি খাবার খাইয়ে দিলে।

    ‘বল, আবার আসবি। দেরি করবি না একেবারে! ঠিক তো?’ রামকৃষ্ণ মিনতি জানাল। বললে, স্বর নামিয়ে বললে, ‘কিন্তু দেখিস, একা-একা আসবি।’

    পাগল? কিন্তু এমন দরদী মরমী হয় কি করে? কথা কি করে হয় এমন অমিয়জড়িত?

    ‘আসব।’

    ‘আর শোন, একটু বেশি-বেশি আসবি। প্রথম আলাপের পর বরং একটু ঘন-ঘনই আসে। কেমন, আসবি তো?’

    ‘চেষ্টা করব।’

    ঘরের মধ্যে ফের চলে এল দুজনে। একদৃষ্টে নরেন দেখতে লাগল রামকৃষ্ণকে। পাগল কি এমন সদালাপ করে, পাগলের কি ভাবসমাধি হয়? পাগল কি ঈশ্বরের জন্যে পাগল হয়?

    ‘লোকে স্ত্রী-পুত্রের জন্যে ঘটি-ঘটি চোখের জল ফেলে,’ বলতে লাগল রামকৃষ্ণ, ‘কিন্তু ঈশ্বরের জন্যে কাঁদে কে? কাশী যাওয়া কী দরকার যদি ব্যাকুলতা না থাকে। ব্যাকুলতা থাকলে এইখানেই কাশী। এত তীৰ্থ, এত জপ, হয় না কেন? যেন আঠারো মাসে বৎসর। হয় না তার কারণ, ব্যাকুলতা নেই। যাত্রার গোড়ায় অনেক খচমচ-খচমচ করে, তখন শ্রীকৃষ্ণকে দেখা যায় না। তারপর নারদ ঋষি যখন ব্যাকুল হয়ে বৃন্দাবনে এসে বীণা বাজাতে-বাজাতে ডাকে আর বলে, প্রাণ হে গোবিন্দ মম জীবন! তখন কৃষ্ণ আর থাকতে পারেন না। রাখালদের সঙ্গে সামনে আসেন আর বলেন, ধবলী রও! ধবলী রও!’

    ‘দেখা যায় ঈশ্বরকে?’ কে একজন জিজ্ঞেস করলে।

    ‘তিনি আছেন, আর তাঁকে দেখা যাবে না? যেকালে তিনি আছেন সেকালে দ্রষ্টব্য হয়েই আছেন।’

    ‘আছেন?’

    ‘জগৎ দেখলেই বোঝা যায় তিনি আছেন। কিন্তু তাঁর বিষয়ে শোনা এক, তাঁকে দেখা আর-এক। কিন্তু দেখার উপরেও বড় কথা আছে, তাঁর সঙ্গে আলাপ করা। কেউ দুধের কথা শুনেছে, কেউ দেখেছে, কেউ খেয়েছে। দেখলেই আনন্দ, খেলেই বল-পুষ্টি।’

    সমস্ত যেন প্রত্যক্ষ করেছে এমনি প্রজ্বলন্ত অনুভূতি। পাগল বলতে চাও বলো, কিন্তু তার ঊর্জস্বান ত্যাগ দেখ। ঈশ্বরের জন্যে সর্বস্বত্যাগ। দেখ তার আয়সী কঠিন পবিত্রতা। তার অমল-ধবল আনন্দ। তার অতল-গভীর শান্তি। এ যদি পাগল হয় তবে পাগলের আরেক নাম সচ্চিদানন্দ।

    নরেনের মনে হল পরম তীর্থে বসে আছি। যার দ্বারা মানুষ দুঃখ থেকে পার হয় তার নাম তীর্থ। জল ত্রাণ করে না, উলটে ডুবিয়ে মারে। নৌকোই তীর্থ, সেই উত্তীর্ণ করে দেয় নদ-নদী। রামকৃষ্ণ সেই ভবসাগরতারণি। সকল তীর্থের সার।

    এবার উঠতে হয় নরেনের।

    প্রণাম করল। প্রেমস্মিতস্নিগ্ধহাস্যে তাকিয়ে রইল রামকৃষ্ণ।

    কোথায় আর যাবি, কত দূর? তোকে এই তীর্থপ্রদ পাদসরোজপীঠে আসতেই হবে বারেবারে। তোকে নির্বিতর্ক হতে হবে, নিঃসংশয় হতে হবে। অবগাহন করতে হবে এই করুণাঘন অগাধ সমুদ্রে। বেরুতে হবে জগজ্জয়ের মশাল নিয়ে।

    আজ যা।

    ‘আর কোন মিঞার কাছে যাইব না।’ গাজীপুর থেকে লিখছে বিবেকানন্দ ‘এখন সিদ্ধান্ত এই যে—রামকৃষ্ণের জুড়ি আর নাই, সে অপূর্ব সিদ্ধি আর সে অপূর্ব অহেতুকী দয়া, সে ইন্টেন্স সিম্‌প্যাথি বদ্ধজীবনের জন্য—এ জগতে আর নাই। তাঁহার জীবদ্দশায় তিনি কখনো আমার প্রার্থনা গরমঞ্জুর করেন নাই-আমার লক্ষ অপরাধ ক্ষমা করিয়াছেন—এত ভালোবাসা আমার পিতা-মাতায় কখনো বাসে নাই। ইহা কবিত্ব নহে, অতিরঞ্জিত নহে, ইহা কঠোর সত্য এবং তাঁহার শিষ্যমাত্রেই জানে। বিপদে, প্রলোভনে, ভগবান রক্ষা করো, বলিয়া কাঁদিয়া সারা হইয়াছ—কেহই উত্তর দেয় নাই—কিন্তু এই অদ্ভুত মহাপুরুষ বা অবতার বা যাই হউন, নিজে অন্তর্যামিত্বগুণে আমার সকল বেদনা জানিয়া নিজে ডাকিয়া জোর করিয়া সকল অপহৃত করিয়াছেন। যদি আত্মা অবিনাশী হয়—যদি এখনো তিনি থাকেন, আমি বারংবার প্রার্থনা করি, হে অপারদয়ানিধে, হে মমৈকশরণদাতা রামকৃষ্ণ ভগবান, কৃপা করিয়া আমার এই নরশ্রেষ্ঠ বন্ধুবরের সকল মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করো। আপনার সকল মঙ্গল, এ জগতে কেবল যাঁহাকে অহেতুক দয়াসিন্ধু দেখিয়াছি, তিনিই করুন।

    আজ যা। আবার আসিস। দেখিস দেরি করিস নে যেন।

    ‘মনের কথা কইবো কি সই কইতে মানা

    দরদি নইলে প্রাণ বাঁচে না।

    মনের মানুষ হয় যে জনা

    নয়নে তারে যায় গো চেনা

    সে দু-এক জনা।

    সে যে রঙ্গে ভাসে প্রেমে ডোবে

    করছে রসের বেচাকেনা!!

    মনের মানুষ মিলবে কোথা

    বগলে তার ছেঁড়া কাঁথা,

    ও সে কয় না কথা।

    মনের মানুষ উজান পথে করে আনাগোনা।’

    কেশব সেনকে বললে রামকৃষ্ণ: ‘জগদম্বা তোমাকে একটা শক্তি, মানে বক্তৃতা-শক্তি দিয়েছেন বলে তুমি জগৎমান্য হয়েছ, কিন্তু মা দেখাচ্ছেন নরেন্দ্রের ভিতরে আঠারোটা শক্তি আছে। নরেন্দ্র খানদানি চাষা, বারো বছর অনাবৃষ্টি হলেও চাষ ছাড়ে না।’

    নরেন্দ্র খাপখোলা তরোয়াল।

    মাছের মধ্যে নরেন্দ্র রাঙাচক্ষু বড় রুই–আর সব পোনা, কাঠিবাটা। অন্যেরা কলসি-ঘটি, নরেন্দ্র জালা।

    ‘ওর মদ্দের ভাব—পুরুষভাব; আর আমার মেদি ভাব-প্রকৃতিভাব।’

    ওরে, আয়, দেখা দে। সেই যে আসবি বলে গেলি, আর এলি না। আমি যে তোর জন্যে পথ চেয়ে বসে আছি। তুই এলে আমি বিহ্বল হই, বিবশ হয়ে পড়ি; জানি, সব জানি, তবু তুই আয়।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleসুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমের গল্প – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    Next Article মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    Related Articles

    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ১ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    April 27, 2026
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026
    Our Picks

    মাহতাব উদ্দিন : জীবন ও গান

    May 18, 2026

    পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২ – অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত

    May 18, 2026

    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রেমের গল্প – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    May 16, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }