পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.২০
২০
স্বরবর্ণ হয়ে গিয়েছে। এখন লাটুকে ব্যঞ্জনবর্ণ শেখাচ্ছে রামকৃষ্ণ।
সামনেই বর্ণপরিচয় খোলা।
রামকৃষ্ণ বললে, ‘বল, “ক”—’
লাটু উচ্চারণ করলে, “কা”—’
‘ওরে “কা” নয়, “ক”। বল, “ক”—’
আবার লাটু বললে, “কা”—’
কিছুতেই পশ্চিমী জিভ সজুত করতে পারছে না। রামকৃষ্ণ যত বলছে “ক”, লাটু তত বলছে “কা”।
ঝলসে উঠল রামকৃষ্ণ: শালা, “ক”কেই যদি “কা” বলবি তবে “ক”-এ আকারকে কি বলবি? যা শালা, তোর আর পড়ে কাজ নেই।’
ছুটি মিলে গেল লাটুর। তাকে আর পাশের পড়া পড়তে হল না।
ঠাকুর বলেন, ‘পাশ করা, না, পাশ পরা!’
লেখা-পড়া না শিখিস, নেশা করাটা শিখে নে।
কিসের নেশা?
মদ-ভাঙের নেশা নয়। এ একেবারে রাজা নেশা। ব্রহ্ম-নেশা।
বই পড়ে কি জানবি? যতক্ষণ না হাটে পৌঁছুনো যায়, দূর হতে শুধু হো-হো শব্দ। হাটে পৌঁছুলে আরেক রকম। তখন দেখতে পাবি, শুনতে পাবি স্পষ্ট। দেখতে পাবি দোকানিকে। শুনতে পাবি, আলু নাও, পয়সা দাও!
বড়বাবুর সঙ্গেই আলাপের দরকার। তাঁর কখানা বাড়ি, কটা বাগান, কত কোম্পানির কাগজ, এ আগে থেকে জানতে এত ব্যস্ত কেন? কেন এ-দোর ও-দোর ঘোরাঘুরি করা? চাকরদের কাছে গেলে দাঁড়াতেই দেয় না, তারা বলবে কোম্পানির কাগজের খবর! কিন্তু যো-সো করে বড়বাবুদের সঙ্গে একবার আলাপ কর্, তা ধাক্কা খেয়েই হোক বা বেড়া ডিঙিয়েই হোক—তখন একে-একে সব জানতে পাবি। কত বাড়ি কত বাগান কত কোম্পানির কাগজ তিনিই সব বলে দেবেন। বাবুর সঙ্গে আলাপ হলে চাকর-দারোয়ানরা সব সেলাম করবে।
‘এখন বড়বাবুর সঙ্গে আলাপ হয় কিসে?’ একজন কে জিজ্ঞেস করলে।
‘তাই তো বলি, কর্ম চাই।’ বললে রামকৃষ্ণ: ‘ঈশ্বর আছেন বলে বসে থাকলে চলবে? যো-সো করে তাঁর কাছে গিয়ে পৌঁছতে হবে।’
‘কি করে পৌঁছুই?’
‘নির্জনে তাঁকে ডাকো, প্রার্থনা করো। দেখা দাও বলে কাঁদো ব্যাকুল হয়ে। কামিনীকাঞ্চনের জন্যে তো পাগল হয়ে বেড়াতে পারো, একবার তাঁর জন্যে একটু পাগল হও দেখি। লোকে বলুক, অমুকে ঈশ্বরের জন্যে পাগল হয়েছে।’ একটু নির্জনে যা। নির্জন না হলে মন স্থির হবে না। নির্জনে বসে একটু ধ্যান কর। বাড়ির থেকে আধ পো অন্তরে ধ্যানের জায়গা কর। নির্জনে গোপনে তাঁর নাম করতে-করতে তাঁর কৃপা হয়। তার পরেই দর্শন।
‘দর্শন?” চমকে উঠল কেউ-কেউ।
‘হ্যাঁ, দর্শন। যেমন ধরো, জলের ভিতর ডোবানো বাহাদুরী কাঠ আছে—তীরে শিকল দিয়ে বাঁধা। সেই শিকলের এক-এক পাপ্ ধরে-ধরে গেলে, শেষে বাহাদুরী কাঠকে স্পর্শ করা যায়।’
কেন সংসার কি দোষ করল? আমরা জনক রাজার মত নির্লিপ্ত ভাবে সংসার করব।
‘মুখে বললেই জনক রাজা হওয়া যায় না। জনক রাজা হেঁটমুণ্ড হয়ে ঊর্ধ্বপদ করে কত তপস্যা করেছিলেন। তোমাদের হেঁটমুণ্ড বা ঊর্ধ্বপদ হতে হবে না৷ কিন্তু সাধন চাই। নির্জনে বাস চাই। দই নির্জনে পাততে হয়। ঠেলাঠেলি নাড়ানাড়ি করলে দই বসে না।’
সবাইর মুখভাব একটু কঠিন হয়ে উঠল। কোমলকে পাবার জন্যে সাধনা চাই কঠিন। বন্ধুর পথটি বন্ধুর হয়ে রয়েছে!
‘এ তো ভালো বালাই হল!’ রামকৃষ্ণ কথায় একটু বিদ্রূপের টান দিল: ‘ঈশ্বরকে তুমি দেখিয়ে দাও আর উনি চুপ করে বসে থাকবেন। দুধকে দই পেতে মন্থন করলে তো মাখন হবে! তুমি মাখন তৈরি করে ওঁর মুখের কাছে তুলে ধরো। ভালো বালাই—তুমিই মাছ ধরে হাতে দাও।’
ওরে, রাজাকে দেখতে চাস? রাজা আছেন সাত দেউড়ির পারে। প্রথম দেউড়ি পার না হতে-হতেই বলে, রাজা কই? যেমন আছে, এক-একটা দেউড়ি তো পার হতে হবে। যেতে হবে তো এগিয়ে।
রাম দত্তকে বলে লাটুকে রেখে দিয়েছে রামকৃষ্ণ। এমন শুদ্ধসত্ত্ব ছেলে আর দুটি হতে নেই।
গাড়ু ছুঁতে পারে না রামকৃষ্ণ। শৌচে যখন যায় গাড়ু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লাটু। জপে বসেছে লাটু হঠাৎ জপ ছুটে গেল। কে যেন ছুটিয়ে দিলে।
ওরে, তুই যার ধ্যান করছিস, সে এক গাড়ু জলও পায় না।’ সামনে দাঁড়িয়ে রামকৃষ্ণ। বলছে, ‘এ রকম ধ্যানে কী ফল হবে রে?”
গাড়ু হাতে সঙ্গে-সঙ্গে চলল লাটু।
‘যার সেবা করবি তার কখন কি দরকার হুঁশ রাখবি। তবে তো সেবার ফল পাবি।’
শোন, কাজের মাঝেই তাকে ধরবি। কিন্তু সব সময়ে জানবি তুই যন্ত্র তিনি যন্ত্রী। তুই চক্র, তিনি চক্রী। তুই গাড়ি তিনি ইঞ্জিনিয়র।
পাতাটি নড়ছে সেও জানবি ঈশ্বরের ইচ্ছে। সেই তাঁতি কি বলেছিল জানিস না? তাঁতি বললে, রামের ইচ্ছেতেই কাপড়ের দাম এক টাকা ছ আনা, রামের ইচ্ছেতেই ডাকাতি। রামের ইচ্ছেতেই ধরা পড়ল ডাকাত, রামের ইচ্ছেতেই আমাকে ধরে নিয়ে গেল, আবার রামের ইচ্ছেতেই ছেড়ে দিলে।
ওরে ঘোলেরই মাখন, মাখনেরই ঘোল। খোলেরই মাঝ, মাঝেরই খোল।
এক দিন লাটুকে জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণ: ‘ওরে লেটো, বলতে পারিস ভগবান ঘুমোয় কি না?’ প্রশ্ন শুনে লাটুর তো চক্ষুস্থির! বললে, ‘হামনে জানে না।’
‘ওরে, জীবজগতে সকলেই ঘুমের অধীন, কিন্তু ভগবানের ঘুমোবার যো নেই। তিনি ঘুমালে সব অন্ধকার! সারা রাত সারা দিন জেগে তিনি জীব-জন্তুর সেবা করছেন। তিনি জেগে আছেন বলেই জীবজন্তু নির্ভয়ে ঘুমাতে পারছে।
শুধু কি তাই? ঘুমে বা জাগরণে কে কখন কেঁদে ওঠে, তিনি না জেগে থাকলে তা শুনবে কে? আমরা অন্ধকারে ঘুমুই, আর তিনি সারা রাত আলো জ্বালিয়ে বসে থাকেন শিয়রে।
অধর সেন দক্ষিণেশ্বরে এসে প্রায়ই ঘুমিয়ে পড়ে।
এক দিন ঠাকুরকে এসে শুধোলেন, ‘তোমার কি-কি সিদ্ধাই হয়েছে বলো তো?”
‘যারা ডিপটি হয়ে সবাইকে ভয় দেখিয়ে থাকে, ঠাকুর বললেন হাসতে-হাসতে, ‘মায়ের ইচ্ছেয় সে সব ডিপটিকে ঘুম পাড়িয়ে রাখি।
তারই জন্যে কি অধর দক্ষিণেশ্বরে এসে ঘুমোয়?
এ কেমন হীনবুদ্ধি! ভাগ্যবলে দক্ষিণেশ্বরে এসেছিস, ‘বিলডিং’ না দেখে বরং গঙ্গা দ্যাখ, মাকে দ্যাখ, ঠাকুরকে দ্যাখ—তা নয়, গা ঢেলে লম্বা ঘুম! সবাই নিন্দে করতে লাগল অধরের। নিতান্তই পাশবদ্ধ জীব, ত্রিনাথের এলাকায় এসেও ত্ৰাণ নেই৷
কিন্তু ক্লান্তিহরণের কণ্ঠে অপূর্ব করুণা। স্নেহশান্ত স্বরে বললেন ঠাকুর, ‘তোরা কি বুঝবি রে? এ মায়ের ক্ষেত্র, শান্তি-ক্ষেত্র। ওরা এখানে এসে বিষয়-কথা না বলে ঘুমুচ্ছে, সে অনেক ভালো। তবু একটু শান্তি পাচ্ছে!”
কৃষ্ণধন নামে এক রসিক ব্রাহ্মণ আসে দক্ষিণেশ্বরে। সারাক্ষণ কেবল ফষ্টিনষ্টি করে।
কি সামান্য ঐহিক বিষয় নিয়ে তুমি রাত-দিন ফষ্টিনষ্টি করে সময় কাটাচ্ছ?
ঐটি ঈশ্বরের দিকে মোড় ফিরিয়ে দাও। শোনো, যে নুনের হিসেব করতে পারে, সে মিছরিরও হিসেব করতে পারে।’
কৃষ্ণধন সহাস্যে বললে, ‘আপনি টেনে নিন।
‘আমি কি করব! তোমার চেষ্টার উপর সব নির্ভর করছে। এ মন্ত্র নয়, এ মন তোর!
‘কি করতে হবে বলুন—
‘সামান্য রসিকতা ছেড়ে ঈশ্বরের পথে এগিয়ে পড়ো। ঈশ্বরই সব চেয়ে বড় রসিক, তাঁর তত্ত্বটিই হচ্ছে সব চেয়ে বড় রসিকতা। সেই রসিকতার সন্ধান করো। শুধু এগিয়ে পড়ো—’
*এ পথের আর শেষ নেই—
‘কিন্তু চলতে-চলতে যেখানেই শান্তি, সেখানে “তিষ্ঠ”। সেখানেই বিশ্রাম করে নাও।’
আহা, অধর সেন এখানে এসে শান্তিতে একটু বিশ্রাম করছে! ওকে জাগাস নে। ওকে ঘুমুতে দে একটু ঠাণ্ডা হয়ে!
কিন্তু যে সেবা করতে এসেছে তারই সেবায় লাগল নাকি রামকৃষ্ণ?
লাটুকে শিবমন্দিরে ধ্যান করতে পাঠিয়েছে রামকৃষ্ণ। ঢুকেছে সেই দুপুর বেলা, বিকেল হয়ে এল, লাটুর এখনো বেরুবার নাম নেই। কি করছে দেখে আয় তো রে। রামলালকে খোঁজ নিতে পাঠাল। রামলাল এসে বললে, এক গা ঘেমে আছে। নিথর পাথর! একখানা পাখা নিয়ে আয়। পাখা নিয়ে চলল রামকৃষ্ণ। আর, শোন, এক গ্লাশ জল চাই ঠাণ্ডা। জল নিয়ে গিয়ে রামলাল দেখে, রামকৃষ্ণ লাটুকে হাওয়া করছে। আর পাখার হাওয়ায় লাটুর শরীর কাঁপছে, তুলো যেমন কাঁপে তেমনি।
“ওরে বেলা যে আর নেই। সন্ধে-টন্ধে কখন সাজাবি?’ রামকৃষ্ণের আওয়াজে লাটুর ধ্যান ভাঙল। চোখ চেয়ে দেখল যাকে ধরবার জন্যে মহাশূন্যে পাখা মেলেছিল তিনিই পাখা হাতে করে পাশটিতে বসে আছেন। সস্নেহে বাতাস করছেন মা’র মত।
ব্যস্ত হয়ে উঠতে চাইল আসন ছেড়ে। রামকৃষ্ণ বললে, ‘আগে একটু সুস্থ হ তার পরে উঠিস। দেখছিস না, গরমে কেমন ঘেমে গেছিস।’
‘আপুনি এ কী করছেন! এতে হামার অকল্যাণ হবে।
হাসল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘তোর কে সেবা করছে? তোর মধ্যে যে শিব এসেছিলেন তাঁর সেবা করছিলাম। গরমে যে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। নে, এখন এই এক গেলাশ জল খা দিকিনি—
জড়ভরত রাজার পালকি বইছে। রাজা পালকি হতে নেমে এসে বললে, ‘তুমি কে গো?’
জড়ভরত বললে, ‘আমি নেতি।’
*সে আবার কি?’
‘আমি শুদ্ধ আত্মা।’
যেমন বাতাস। ভালো-মন্দ সব গন্ধই বাতাস নিয়ে আসে কিন্তু বাতাস নির্লিপ্ত। যেমন প্রদীপ। প্রদীপের সামনে বসে কেউ ভাগবত পড়ে, কেউ বা দলিল জাল করে। প্রদীপ নির্লিপ্ত। যেমন সূর্য। শিষ্টকেও আলো দিচ্ছে দুষ্টকেও আলো দিচ্ছে। ধোঁয়া যতই কালো হোক দেয়ালকে ময়লা করতে পারে, আকাশকে নয়। চামড়া-ঢাকা অখণ্ড খোলের মধ্যে খোঁজো সেই প্রাণস্বরূপে। হাড়মাসের খাঁচার মধ্যে ধরো সেই পলাতক পাখি!
২১
রাম দত্তের বাড়ি, মধু রায়ের গলিতে, রামকৃষ্ণ এসেছে।
কলকাতাকে বড় ভয়, বড় সম্ভ্রম রামকৃষ্ণের। সব জ্ঞানী-গুণীর বাসা এখানে। রাজা-রাজড়া সুখী-ভোগীদের আস্তানা। পাড়াগাঁয়ের আলাভোলা ছেলে আমি, এখানে কি কলকে পাব? আমাকে কি কেউ খাতির-যত্ন করবে?
ঠাকুরের তখন হাত ভেঙেছে, দেবেন্দ্র মজুমদার দেখতে এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। পরনে লাল-পাড় কাপড়, ব্যাণ্ডেজ বাঁধা হাত গলার সঙ্গে ঝোলানো, ঠাকুর বসে আছেন তক্তপোশে। দেবেন্দ্রকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কোত্থেকে আসা হচ্ছে?”
‘কলকাতা থেকে।’
কলকাতার নাম শুনে যেন শিউরে উঠলেন ঠাকুর। নিশ্চয়ই তবে একজন গন্যিমান্যি লোক।
‘কী দেখতে এসেছ? এমনি?’ বলে ঠাকুর হাতের পর হাত রেখে ত্রিভঙ্গবঙ্কিম কৃষ্ণের ভঙ্গি করলেন।
‘না, শুধু আপনাকে দেখতে এসেছি।’ কণ্ঠস্বরে যেন ভক্তির সুরটি পাওয়া গেল।
ঠাকুরের গলায় কান্না ফুটে উঠল: ‘আর আমায় কী দেখবে বলো! পড়ে গিয়ে আমার হাত ভেঙে গিয়েছে! দেখ দেখি সত্যি ভেঙেছে কিনা! বড় যন্ত্রণা। কি করি?”
হাতখানি বাড়িয়ে দেবার ইঙ্গিত করলেন। দেবেন্দ্র স্পর্শ করল সেই হাত। একটু বা টিপে-টিপে দেখল। জিজ্ঞেস করল, ‘কি করে ভাঙল?”
কাঁদ-কাঁদ মুখে ঠাকুর বললেন, ‘কি একটা অবস্থা হয়, তাইতে পড়ে গিয়ে ভেঙে গিয়েছে। ওষুধ দিলে আবার বাড়ে। অধর সেন ওষুধ দিয়েছিল, বেশি করে ফুলে উঠল। তাই আর কিছু দিইনি। হাঁ গা, সারবে তো?”
যিনি সকলের ব্যথা সারান তাঁরই কন্ঠে ব্যথার জিজ্ঞাসা।
‘আজ্ঞে সেরে যাবে বৈ কি। নিশ্চয় সারবে।’ দেবেন্দ্র জোরের সঙ্গে বললে। আহ্লাদে শিশুর মতন হয়ে গেলেন ঠাকুর। আর সকলকে উদ্দেশ করে বলতে লাগলেন: ‘ওগো, ইনি বলছেন আমার হাত সেরে যাবে। আর ভয় নেই। ইনি যেমন-তেমন লোক নন। ইনি কলকাতা থেকে এসেছেন!’
কলকাতা সম্বন্ধে এত তাঁর ভয়-ভক্তি। সেই কলকাতায় তিনি এসেছেন বিদ্বৎ সমাজে! বসেছেন তাদের বৈঠকখানায়। শেষে চাতরে না হাঁড়ি ভাঙে!
মা গো, পাশে এসে বোস। রাশ ঠেলে দে।
রামকৃষ্ণের চোখের দিকে চেয়ে মা হাসেন মিটি-মিটি।
রাম দত্তের হাঁপানি, তাই নিয়ে সে ছুটোছুটি করছে। এসেছে সুরেশ মিত্তির, ভাবে বিভোর হয়ে টলছে মাতালের মত। গায়ে জামা নেই গলায় পৈতে, এক পাশে এসে বসেছে দেবেন মজুমদার। গ্যাস জ্বলছে ঘরে। তাতে আর কতটকু আলো হবে! রামকৃষ্ণের গায়ের আলোয় মধু রায়ের গলি ভেসে যাচ্ছে। আকাশের সুধাকর এসেছেন নগরের ধূলির নিকেতনে।
ওরে, রাম দত্তের বাড়িতে দক্ষিণেশ্বরের সেই সাধু এসেছে। চল দেখবি চল। রাস্তায় কর্পোরেশনের বাতি নেই, সাধুই নাকি সব অলি-গলি আলো করে বসেছে! একটি সহজসুন্দর মানুষ। ঘরছাড়া হয়েও যেন ঘরের লোক। গালে একটু একটু কপচানো দাড়ি, চোখের পাতা অনবরত মিটমিট করছে-
ওরে, ভালো করে চেয়ে দ্যাখ, কমলবিশদনেত্র ক্লেশনাশন কেশব বসে আছেন। সর্ববান্ধব স্বরূপ দীনবন্ধু।
কলকাতায় এসেছে, তাই গায়ে জামা পরে এসেছে। জামার আস্তিন কনুই আর কব্জির মাঝখানে। রঙিন একটি বটুয়া সামনে। তারই থেকে একটা মশলা নিয়ে মুখে দিচ্ছে মাঝে-মাঝে। কতক্ষণ আর থাকা যায় কঠোর ভদ্রলোক সেজে? গায়ের জামা খুলে ফেলল রামকৃষ্ণ। এমনি যে আভা ছিল তার শতগুণ বিভা বেরুচ্ছে গা থেকে। সুধাকরের বদলে নেমে এসেছে প্রভাতের দিবাকর। নখজ্যোতিতেই যেন শরদিন্দুর দীপ্তি গায়ের আলো বহু দূর ছড়িয়ে পড়েছে। একটি স্থিরস্ফুট বিদ্যুৎ যেন চিরজীবী হয়ে আছে আকাশে।
বহু লোক এসে জমায়েত হয়েছে। ঘর ছাপিয়ে ভিড় করেছে রোয়াকে, রোয়াক ছেড়ে রাস্তায়। অথচ সবাই স্তব্ধ, অভিভূত। বিস্ময়বিভোর।
এ কে বল দেখি? দরিদ্রের মধ্যে রাজরাজেশ্বর! মর্তধামে ত্রিলোকপালক! যিনি শ্মশানে ভূতনাথ তিনিই আবার গৃহে জগদগুরু।
কথা ক’ না! প্রশ্ন কর। যার যা জিজ্ঞেস করবার আছে জেনে নে।
কেউই প্রশ্ন করে না। প্রশ্ন করবার কথা মনেও হয় না কারুর। শুধু এই মনে হয়, অশেষ প্রশ্নের শেষ উত্তরটি যেন জীবন্ত হয়ে জ্বলন্ত হয়ে বসে আছে। গভীর উপলব্ধির সহজ একটি উচ্চারণ। বসে আছে বাকপতি, বিবুধেশ্বর। বাক্য দিয়ে শব্দে হরিনামের মালা গাঁথা। তাই যা বাক্য তাই কাব্য।
নিজের মনেই বলে যাচ্ছে রামকৃষ্ণ। বলছে ঈশ্বরপ্রসঙ্গ। সতৃষ্ণকর্ণে তাই শুনছে সকলে। কোনো তর্ক-বিচার করছে না। যা বলছে তাই যেন চরাচরের চরম কথা। এর পরে আর বিষয় নেই, বর্ণনা নেই। পারাপার নেই। যা শুনছে তাই নিঃসন্দেহে মানছে সকলে। কি যে শুনেছে মনে ধরে রাখতে পারছে না, তবু মন বলছে এ অত্যন্ত খাঁটি কথা, এ কথার আর ওর নেই।
কথা বলতে-বলতে মাঝে-মাঝে থামছে রামকৃষ্ণ। তখনই সবাই শ্রবণতৃষ্ণায় অস্থির হয়ে উঠছে। রামকৃষ্ণের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকছে নিষ্প্রাণের মত। কথা কও, তুমি সর্বমন্ত্রপ্রণেতা, তোমার কথায় নিশ্চল নিস্তব্ধতায় প্রাণসঞ্চার করো। অথচ কী সরল কথা! পণ্ডিতগিরি ফলানো নেই এতটুকু। এতটুকু বক্তৃতা মারা নেই। লঘুতা-প্রগলভতা নেই। সহজের সংবাদটি সহজ করে পরিবেশন করছেন।
‘আগে শাদাসিদে জ্বর হত, সামান্য পাচনেই সেরে যেত। এখন যেমন ম্যালেরিয়া জ্বর, তেমনি ওষুধও ডি-গুপ্ত! আগে লোকে যোগ-যাগ তপস্যা করত, এখন কলির জীব, দুর্বল, অন্নগত প্রাণ—এক হরিনামই তার সম্বল। হরিনামেই সে পেরিয়ে যাবে ভবনদী। নামও করো, সঙ্গে-সঙ্গে প্রার্থনাও করো, দুদিনের জিনিসের উপর থেকে ভালোবাসা যেন কমে যায়। দুদিনের জিনিস মানে টাকা, মান, যশ, দেহসুখ। টাকার জন্যে যেমন ঘাম বার করো, হরিনাম করে নেচে গেয়ে ঘাম বার করতে পারো তো বুঝি।’
তার পর গান ধরে রামকৃষ্ণ।
‘নামেরই ভরসা কেবল শ্যামা গো তোমার।
কাজ কি আমার কোশাকুশি দেঁতোর হাসি লোকাচার!
নামেতে কালপাশ কাটে, জটে তা দিয়েছে রটে;
আমি তো সেই জটের মুটে, হয়েছি আর হব কার।’
এ তো গান নয়, শিবের জটা ছেড়ে গঙ্গার মর্তাবতরণ।
জানতে, অজান্তে বা ভ্রান্তে যে কোনো ভাবেই হোক না কেন, তাঁর নাম করলেই ফল হবে।’ আবার কথা শুরু করলে রামকৃষ্ণ: ‘কেউ তেল মেখে নাইতে যায়, তারও যেমন স্নান হয়, যদি কাউকে জলে ঠেলে ফেলে দেওয়া হয় তারও তেমনি স্নান হয়। আর কেউ ঘরে শুয়ে আছে, তার গায়ে জল ঢেলে দিলে তারও স্নানের কাজ হয়ে যায়। নিতাই তাই কোনো রকমে হরিনাম করিয়ে নিতেন। চৈতন্যদেব বলেছিলেন, ঈশ্বরের নামের ভারি মাহাত্ম্য। তক্ষুনি-তক্ষুনি ফল না পেলেও এক সময়ে না এক সময়ে পাবেই। বাড়ির কার্নিশে যদি বীজ পড়ে, অনেক দিন পরে বাড়ি পড়ে গেলেও সেই বীজ মাটিতে পড়ে গাছ হয়ে তার ফল হবে।’
রাত হয়ে গেল কিন্তু বাড়ি ফেরবার কারু নাম নেই। খিদে পেয়েছে তেষ্টা পেয়েছে এ অত্যন্ত তুচ্ছ চিন্তা। এখন শুধু নয়নের তৃষ্ণা। জীবনের রাত অনেক হয়ে গেল বটে কিন্তু গৃহ বলতে এরই পদাশ্রয়। রামকৃষ্ণকে ছেড়ে কোথায় আবার আমাদের ঘর-বাড়ি?
হঠাৎ রামকৃষ্ণের সমাধি উপস্থিত হল।
পাড়া-বেপাড়ার ভিড় করা শহুরে লোকেরা দেখুক তা চর্মচক্ষে।
রামকৃষ্ণের ডান হাতের মাঝের তিনটি আঙুল বেঁকে গেল, শক্ত ও সিধে হয়ে গেল হাত দুখানি। মোটেই দেহবিকারের লক্ষণ নয়, বিদেহবিহারের লক্ষণ। রামকৃষ্ণ এখন দিব্য ভাবের দীপ্র মূর্তি। তার সঙ্গে ভাবনবনীর অমিয় লাবণ্য। এ কি কর্পূরকুন্দেন্দু ধবল শিব না রাজীবলোচন দূর্বাদলশ্যাম রাম!
দেবেন্দ্র মজুমদারের মনের মধ্যে গুরু স্তোত্রের শ্লোক গুঞ্জন করে ফিরতে লাগল –
‘মন-বারণ-শাসন-অঙ্কুশ হে,
নরত্রাণ তরে হরি চাক্ষুষ হে।
গুণগানপরায়ণ দেবগণে,
গুরুদেব দয়া করো দীন জনে৷৷’
রামকৃষ্ণের ভাবের হাওয়া লেগে সবাইর মন মাটি ছেড়ে উড়তে লাগল আকাশে৷ ঘোর-ঘোর নেশা আর কাটতে চায় না। মন যেন আর থা পায় না মাটিতে। ভাবের বাতাসেই কেবল উড়তে চায়। উড়তে উড়তেই যেন ধরতে পারবে কাউকে সেই চিরকালের অধরাকে।
দেবেন্দ্র তখন পৌঁছে গেছে শেষ শ্লোকে:
‘জয় সদগুরু ঈশ্বরপ্রাপক হে,
ভবরোগবিকারবিনাশক হে।
মন যেন রহে তব শ্রীচরণে,
গুরুদেব দয়া করো দীন জনে৷৷’
২২
দক্ষিণেশ্বরে যিনি আছেন তাঁর আরেক নাম দক্ষিণ-ঈশ্বর।
রুদ্র যত্তে দক্ষিণমুখং তেন মাং পাহি নিত্যম।
উত্তরে-দক্ষিণে পুবে-পশ্চিমে ডাক পাঠাচ্ছে রামকৃষ্ণ। কখনো নহবৎখানা থেকে, কখনো বা কুঠির ছাদের উপর উঠে। আরতির সময় ঘড়ি-ঘণ্টা বাজছে আর ডাকছে রামকৃষ্ণ: ওরে তোরা কে কোথা আছিস চলে আয়। তোদের ছাড়া দিন আর কাটে না রে-
প্রথমে এল লাটু। দ্বিতীয় এল রাখাল।
রামকৃষ্ণ দেখল গোপাল এসেছে। পায়ে নূপুর বাজছে ঝুমঝুম। ‘আয়, আয়—’হাত বাড়িয়ে দিল রামকৃষ্ণ। আর রাখাল দেখল স্নেহ-শান্তির সুধাসত্র বিছিয়ে মা বসে আছেন। ঝাঁপিয়ে পড়ল কোলের মধ্যে।
কখনো তার গায়ে হাত বুলোয় রামকৃষ্ণ, কখনো বা স্তন্য পান করায়। গদগদভাষে কখনো বা ডাকে, গোপাল, গোপাল; কখনো বা যদি দেখতে না পায়, গলা ছেড়ে কান্না ধরে, আমার ব্রজের রাখাল কোথায় গেলি?
যখন আসে ক্ষীর-ননী খাওয়ায়, কত খেলা দেয়, কখনো বা কাঁধে করে নাচে। আঠারো বছরের জোয়ান মরদ, বিয়ে করেছে, মনে হয় যেন অবোলা শিশু। পড়াশোনায় মন নেই, মানে না গুরুজনদের। সব চেয়ে আশ্চর্য, নতুন বিয়ে করেছে, অথচ শ্বশুরবাড়ি যায় না। কান্তিমতী কিশোরী স্ত্রী, এতটুকু টান নেই। কোথায় যাস তুই রোজ-রোজ?’ বাপ হুঙ্কার করে উঠল।
ব্রাহ্মসমাজে যেত খুব আগে-আগে। সেখানকার প্রতিজ্ঞাপত্রে স্বাক্ষর করে এসেছে নিরাকার ও অদ্বিতীয় ব্রহ্ম ছাড়া আর কারু ভজনা করব না। এ সবে তত আপত্তি ছিল না আনন্দমোহনের। কিন্তু তিনি তো জানেন কোথায় আজকাল ছেলের গতিবিধি। ব্রাহ্মসমাজে মিশে কেউ তো আর বিবাগী হয় না, কিন্তু যেখানে এখন সে যাওয়া-আসা শুরু করেছে সেখানে যে এক বিশ্বভোলা বাউণ্ডুলের বাসা। আজব কারখানা। ওখানে গেলে আর মানুষ হতে হবে না, রাখালিই করতে হবে সারা জীবন।
‘খবরদার, আর যেতে পারবি না ওখানে!’ ছেলেকে ঘরের মধ্যে বন্ধ করল আনন্দ-মোহন। বসিরহাটের শিকরা গাঁয়ের বলদৃপ্ত জমিদার, অগাধ পয়সার মালিক, তার ছেলে কিনা পথে-পথে ভেসে বেড়াবে! কখনোই না। থাক ঐ ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে। এদিকে বৎসহারা গাভীর মত কাঁদছে রামকৃষ্ণ। ওরে রাখাল, কোথায় গেলি? তোকে না দেখে যে থাকতে পারছি না। মা’র মন্দিরে গিয়ে কাকুতি-মিনতি করছে: মা, আমার রাখালকে এনে দাও। রাখালকে না দেখে বুক ফেটে যাচ্ছে—খাঁচায় পোরা বনের পাখির মত পাখা ঝাপটাচ্ছে রাখাল। বন্ধ ঘরে ছটফট করছে।
সেদিন কি দয়া হয়েছে, আনন্দমোহন ছেলেকে বন্ধ ঘরে না রেখে নিজের চোখের সামনে বসিয়ে রেখেছে। নজরবন্দী করে রেখেছে। নিজে নিবিষ্ট মনে দেখছে কি সব নথি-পত্র। বিষয়-সম্পত্তি নিয়ে জটিল মামলা, কাগজপত্রও পর্বতপ্রমাণ। তেরছা চোখে বাপকে একবার দেখল রাখাল। দেখল, কাগজের মধ্যে ডুবে আছেন, কাগজ ছাড়া আর কিছুতে লক্ষ্য নেই। টুপ করে সরে পড়ল আলগোছে। নিজের দেহের ছায়াটিকে পর্যন্ত জানতে না দিয়ে। পথে নেমেই দে-ছুট। একেবারে দক্ষিণেশ্বর।
‘রাখাল, রাখাল–কান্নার স্বর দূর থেকে রাখাল শুনতে পাচ্ছে।
‘আমি এসেছি। আমি এসেছি। এই যে আমি।’ রামকৃষ্ণের প্রসারিত বাহুর মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল রাখাল।
এই মোকদ্দমায় আর জেতবার কোনো আশা নেই। নথির থেকে মুখ তুলল আনন্দমোহন। এ কি! রাখাল কোথায়? রাখাল কোথায় গেল?
আর কোথায় গেল! ছাঁদন-দড়ি খুলে দেবার পর বাছুর আবার যায় কোথায়! এখন কোর্টের বেলা হয়ে গেছে, এখন আর ছেলের পিছু ছোটা যায় না দক্ষিণেশ্বর। সন্ধের পর ব্যবস্থা করতে হবে। এবার ফিরিয়ে এনে সত্যি-সত্যি লোহার বেড়ি পরিয়ে দেব। যৌবনের সোনার শৃঙ্খলে সে বশ মানেনি।
কিন্তু মামলায় হঠাৎ উলটো রকম ফল হয়ে গেল। ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি, মামলায় ডিক্রি পেল আনন্দমোহন।
ছেলের সাধুসঙ্গের জোরেই ঘটেনি তো এই ফললাভ? কে জানে!
ছেলেকে ফিরিয়ে আনতে দক্ষিণেশ্বরের দিকে যাচ্ছে বটে আনন্দমোহন, কিন্তু মনের মধ্যে আর তাড়ন-পীড়নের তাপ নেই। তার প্রথম পক্ষের সন্তান রাখাল। কত ভোগবিলাসে মানুষ। তার কিনা সইবে ও-সব অনাসৃষ্টি? ভুলিয়ে ভালিয়ে যেমন করে হোক মনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে হবে। ফিরিয়ে আনতে হবে ঐ বিপথগামীকে।
‘ওরে রাখাল, ঐ তোর বাপ আসছে বুঝি।’ রামকৃষ্ণ যেন ভয় পাবার মত করে বললে। ‘দ্যাখ দেখি তাকিয়ে—’
তা ছাড়া আবার কে! ঐ তো আনন্দমোহন। দূর থেকে ঠিক চিনেছে রামকৃষ্ণ। বাপের আভাস পেয়ে রাখালের মুখ এতটুকু হয়ে গেল। বললে, আমি কোথাও গিয়ে লুকোই। নইলে বাবা আমাকে ঠিক ধরে নিয়ে যাবে। আর আসতে দেবে না।
‘ভয় কি! আসুক না!’ রামকৃষ্ণ অভয় দিলে। ‘বাপ তো সাক্ষাৎ দেবতা। তাকে আবার ভয় কিসের! সামনে এলে বেশ ভক্তিভরে প্রণাম করবি। মা’র ইচ্ছে হলে কী না হতে পারে—’
আনন্দমোহনকে খুব সমাদর করে বসাল রামকৃষ্ণ। রাখালও দেহ-মন ঢেলে প্রণাম করলে।
কত গুণ আমার রাখালের! কেমন দিব্যগন্ধময় তার সত্তা। সর্ব তীর্থে তার স্নান সর্ব যজ্ঞে তার দীক্ষা। ও হচ্ছে ব্রহ্মশ্রোতা, ব্রহ্মমন্ত ছেলে। রাখালের প্রশংসা করতে লাগল রামকৃষ্ণ। শুধু কি প্রশংসা? প্রতিটি কথার অন্তরালে সীমাহীন স্নেহ। কূলহীন ভালোবাসা।
ছেলের মুখের দিকে তাকাল আনন্দমোহন। আনন্দে জ্বলছে রাখালের চোখ দুটি। হয়তো ভালো করে খায়নি, কে জানে সারা দিন উপোস করেই আছে কিনা তবু যেন আনন্দের প্রতিমূর্তি।
‘বাবা, ক্যা ভোজন হুয়া?” এক সাধুকে জিজ্ঞেস করলে একজন।
আজ মালিক নেহি মিলায়ে।’ বললে সেই সাধু ‘আজ রামজীকি ইচ্ছাই হ্যায় ভোজন মিলনে নেহি হ্যায়। আজ আনন্দই হ্যায়’–
সর্বাবস্থায় সদানন্দ। এই আনন্দের হাট থেকে আমার তোলা বন্ধ করে দিও না। কেমন যেন হয়ে গেল আনন্দমোহন। ছেলেকে পারল না ফিরিয়ে নিতে। শুধ রামকৃষ্ণকে বললে, ‘মাঝে মাঝে এক-আধবার পাঠিয়ে দেবেন দয়া করে।’
তাই সেই অনুরোধই এখন করছে রামকৃষ্ণ। ওরে, অনেক দিন হয়ে গেল, এখন একবার বাড়ি গিয়ে বাপকে দেখা দিয়ে আয়। যদি এক্কেবারে না যাস, কেলেঙ্কারি হবে, তোকে চিরদিনের মত আটকে রাখবে, আর তোকে আসতে দেবে না।
তুইয়ে-তাইয়ে পাঠিয়ে দেয় বাড়িতে।
দুদিন যেতে না যেতেই ফের ফিরে আসে। বাপের চোখের উপর দিয়েই ফিরে আসে। আনন্দমোহনের কেমন ধারণা হয়েছে এ সাধুকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। এর আস্তানায় অনেক গণ্যমান্য লোক যাতায়াত করছে। ওর এখন বিস্তর নামডাক। এর কৃপাতেই মামলাতে সফল হয়েছিল। বলা যায় না, লেগে থাকলে কোন না আবার সুবিধে হবে!
রাখালের খোঁজে নিজেও দু-এক দিন চলে আসে আনন্দমোহন।
রামকৃষ্ণ খুব খাতির-যত্ন করে। আগে-আগে শুধু ছেলের প্রশংসা করত এখন বাপেরও প্রশংসা করে। বলে, ‘যেমন ওল তেমনি মুখীটি তো হবে। গাছটি রসালো বলেই তো ফলটি মিঠে।’
এমনি করেই রাখালের বাবার মন খুশি রাখতেন।’ বললেন একদিন শ্রীমা: রাখালের বাবা এলেই যত্ন করে এটি-ওটি দেখাতেন, খাওয়াতেন, কত কথা যে বলতেন তার শেষ নেই। মনে ভয়, পাছে রাখালটিকে ওখানে না রাখে, নিয়ে যায়। রাখালের সৎ-মা ছিল। সে যখন দক্ষিণেশ্বরে আসত, ঠাকুর রাখালকে বলতেন, ওরে ওঁকে ভালো করে সব দ্যাখা, শোনা, যত্ন কর্—তবেই তো জানবে ছেলে আমাকে ভালোবাসে।’
একবার রামলালাকে ধরেছিল, এখন ধরল বালগোপালকে। আগে ছিল অষ্টধাতুর বিগ্রহ এখন সপ্তধাতুর মানুষ। আগে ছিল মনোমূর্তি, এখন মানস-পুত্র।
‘ভারি খিদে পেয়েছে।’ রাখাল বললে এসে রামকৃষ্ণকে। যেমন আবদারে ছেলে মাকে এসে বলে। খিদে পেয়েছে! কি সর্বনাশ, এখন তোকে খেতে দিই কি! ঘরে খাবার নেই, দোকানও বা কই এখানে কাছে-পিঠে! এখন করি কি, যাই কোথায়! আমার রাখালের যে খিদে পেয়েছে! উতলা হয়ে গঙ্গার ধারে চলে এল রামকৃষ্ণ। গলা ছেড়ে কান্নার সুরে ডাকতে লাগল: ‘ও গৌরদাসী, এস আমার রাখালের খিদে পেয়েছে।’
বৃন্দাবনের সন্ন্যাসিনী এই গৌরদাসী। বলরাম বসুর কাছে শুনেছে রামকৃষ্ণের কথা। সটান চলে এসেছে দক্ষিণেশ্বর। এসে দেখল রামকৃষ্ণ কোথায়, এ যে সেই গৌরহরি। সেই থেকে আছে তার পদচ্ছায়ে।
আচ্ছা, গৌরদাসী কি মেয়ে? রামকৃষ্ণ বলে, মেয়ে যদি সন্ন্যাসী হয় সে কখনো মেয়ে নয়, সে পুরুষ। গৌরদাসীও তাই পুরুষ। অদম্য কর্মশক্তি। অভঙ্গব্রতে অসাধ্যসাধিকা।
রামকৃষ্ণ বলে, ‘আমি জল ঢালছি, তুই কাদা মাখ।’
আমি ভাব দি, তুই তাকে আকার দে। আমার রূপকে তুই রীতিতে নিয়ে যা। আমার বস্তুকে নিয়ে যা আস্বাদে।
শ্রীমা যেবার রামেশ্বর থেকে ফিরলেন, তাঁকে জিজ্ঞেস করলে মেয়েরা, ‘কি দেখে এলেন বলুন—’
‘আমাকে তারা লেকচার দিতে বললে।’ শ্রীমা একটু হাসলেন। ‘বললাম আমি লেকচার দিতে জানি না। যদি গৌরদাসী আসত তবে দিত।’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘যে বড় হয় সে একটিই হয়। তার সঙ্গে অন্যের তুলনা হয় না। সে আমাদের গৌরদাসী।’
সেই গৌরদাসীকে লক্ষ্য করে কাঁদছে রামকৃষ্ণ। ওরে আয়, অসাধ্যসাধন করে দিয়ে যা। ঘরে এক দানা খাবার নেই। আমার রাখালকে কিছু খাবার দিয়ে যা শিগগির। তুই না হলে এ অসম্ভব কে সম্ভব করবে?
চাঁদনি ঘাটে নৌকো লাগল। কে তোরা কোত্থেকে আসছিস? পথে আমার গৌরদাসীকে দেখেছিস কেউ? নৌকোর মধ্যেই তো গৌরদাসী। সঙ্গে বলরাম বোস। আরো কয়েকজন ভক্ত। সবাই এসে পড়েছে এক ডাকে। একে-একে নামতে লাগল। গৌরদাসীও নামল। গৌরদাসীর হাতে খাবারের পুঁটলি।
‘ওরে রাখাল, আয়, ছুটে আয়, খাবার খাবি আয়। তোর জন্যে খাবার নিয়ে এসেছে গৌরদাসী।’ ব্যাকুল হয়ে ডাকতে লাগল রামকৃষ্ণ।
রাখাল কাছে এসে মুখ ভার করে রইল। বললে, ‘খাব না।’
‘সে কি রে? এই না বলছিলি খিদে পেয়েছে!’
‘বলেছিলাম তো বলেছিলাম! তাই বলে চার দিকে ঢাক পেটাতে হবে নাকি? ‘আহাহা, তাতে কি হয়েছে।’ রাখালের পিঠে হাত বুলাতে লাগল রামকৃষ্ণ: ‘তোর খিদে পেয়েছে, তোর খাবার চাই, এ কথা বললে দোষ কি! খিদে পাবার মধ্যে লজ্জা কিসের! আর, খিদে যখন পেয়েছে, তখন খেতে তো হবেই। এতে আবার রাগের কথা কি! নে, এখন খা। রাখালকে খাইয়ে দিতে লাগল রামকৃষ্ণ।
বড় করে হাঁ কর্। ভালো করে খা।
‘কি অবস্থাই গেছে। মুখ করতুম আকাশ-পাতাল জোড়া আর মা বলতুম। যেন মাকে পাকড়ে আনছি। যেন জাল ফেলে মাছ হড়-হড় করে টেনে আনা।’
সেই গানে আছে না-
‘খাব খাব বলি মা গো, উদরস্থ না করিব,
এই হৃদিপদ্মে বসাইয়ে, মনোমানসে পূজিব।
যদি বল কালী খেলে কালের হাতে ঠেকা যাব,
আমার ভয় কি তাতে, কালী বলে কালেরে কলা দেখাব৷৷
২৩
কামারপুকুরের লক্ষ্মণ পানকে দিয়ে রামকৃষ্ণ খবর পাঠাল সারদাকে।
এখানে আমার কষ্ট হচ্ছে। রামলাল মা-কালীর পূজারী হয়ে বামুনের দলে মিশেছে, এখন আমাকে আর তত খোঁজ করে না। তুমি অবশ্য আসবে। ডুলি করে হোক, পালকি করে হোক, দশ টাকা লাগুক, বিশ টাকা লাগুক, আমি দেব।’
সারদার মন কেঁদে উঠল। ভাবল যদি পারি তো পাখি হয়ে উড়ে যাই।
লক্ষণ পান আরো বললে। বললে, ঠাকুর ভাব-টাব হয়ে পড়ে থাকেন, সেদিকে রামলালের খোঁজ নেই। তার মনের ভাবখানা হচ্ছে, কালীঘরের থাকিয়ে পূজারী হয়েছি, আর আমাকে পায় কে। এদিকে মা কালীর প্রসাদ শুকনো হয়ে রয়েছে, দেখেও দেখছে না।
যেমন চালাও তেমনি চলি। যদি দূরে রাখো, দূরে থাকি; যদি কাছে ডাকো, ডাক শোনবার জন্যে কান খাড়া করে থাকি তোমার কাছে-কাছে।
ছোট তক্তপোশে তাকিয়া ঠেসান দিয়ে বসে আছেন ঠাকুর। মেঝেতে ভক্তদল। হেসে হেসে ঠাকুর বলছেন ভক্তদের, ‘হাজার বিচার করো, আর যাই কেননা বলো, তবু তাঁর অন্ডারে আমরা আছি।’
মাস্টার মশাই বলেন, ‘সেই দিন থেকে অন্ডার কথাটি শিখলুম—’
তিনি তো আর আমাদের হাতে পড়েননি, আমরাই তাঁর হাতে পড়েছি।’ বললেন ঠাকুর।
তেমনি আমি পড়েছি তোমার হাতে। আমি আমার বাঁশি শূন্য করে রেখেছি, তুমি যেমন বাজাও তেমনি বাজব।
সারদা চলে এল দক্ষিণেশ্বর। ঢুকল নবতে।
ছোট্ট এই একটু খানি ঘর। ঢোকবার দরজাটিও ছোট। ঢুকতে প্রায়ই মাথা ঠুকে যায় সারদার। এক দিন তো কেটেই গেল রীতিমত। ক্রমশ অভ্যেস হয়ে এল। দরজার সামনে আপনা হতেই নুয়ে পড়ে মাথা। হে প্রবেশপথের দারুদেবতা, ভক্তিমতীর প্রণাম নাও৷
সামনে একটু বারান্দা, দরমার বেড়া দেওয়া। ঐ তো ঘর, তার মধ্যেই সমস্ত সংসার। রাজ্যের জিনিসপত্র। রাঁধবার সাজ-সরঞ্জাম, হাঁড়ি-কুড়ি, বাসন-কোশন। জলের জালা, রামকৃষ্ণের জন্যে হাঁড়িতে মাছ জিয়োনো। শিকেতে ভক্তদের জন্যে খাবার-দাবার।
আবার লক্ষ্মী এসেছে সঙ্গে। সেও থাকে এই নবতের ঘরে। রাত্রে মাথার উপর মাছের হাঁড়ি কলকল করে, লক্ষ্মীর ঘুম আসে না।
শুধুই কি লক্ষ্মী? কলকাতা থেকে স্ত্রী-ভক্ত যদি কেউ আসে সেই ঘরেই রাত কাটিয়ে যায়। গৌরদাসীর তো কথাই নেই। তার আবার সেই ঘরেই ভাব হয়। থেকে-থেকে ‘নিত্য কোথা’ ‘নিত্যগোপাল কোথায়’ বলে নৃত্য করতে থাকে।
‘কে জানে তোমার নিত্য কোথায়?” সারদার কন্ঠস্বরে হয়তো ঈষৎ ঝাঁজ ফোটে: ‘দেখ গে, গঙ্গার ধারে-টারে ভাব হয়ে রয়েছে হয়তো।’
কলকাতা থেকে স্ত্রী-ভক্তরা যারা দেখতে আসে, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আহা কি ঘরেই আমাদের সীতা লক্ষ্মী আছেন গো! যেন বনবাস গো!’
সত্যিই সীতা-লক্ষ্মী। পরনে কস্তা পেড়ে শাড়ি, সিঁথে-ভরা সিঁদুর। কালো ভরাট মাথার চুল প্রায় পা পর্যন্ত পড়েছে। গলায় সোনার কণ্ঠীহার। কানে মাকড়ি। হাতে চুড়ি, যে চুড়ি রামকৃষ্ণের মধুর ভাবের সময় গড়িয়ে দিয়েছিলেন মথুরবাবু।
তার উপরে আবার নাকে নথ। নিজের নাকের কাছে আঙ্গুল ঘুরিয়ে গোল চিহ্ন দেখিয়ে সারদাকে রামকৃষ্ণ বোঝায় ইশারায়।
নবতকে বলে খাঁচা। লক্ষ্মী আর সারদাকে শুকসারী। কালীঘরের প্রসাদ এলে রামলালকে বলে, ‘ওরে খাঁচায় শুকসারী আছে, ফলমূল ছোলাটোলা কিছু দিয়ে আয়।’
বাইরের লোক যারা শোনে, ভাবে, খাঁচায় বুঝি সত্যি-সত্যি পাখি আছে রামকৃষ্ণের।
রাত্রে তো বেশি ঘুম নেই, অন্ধকার থাকতে-থাকতেই উঠে পড়ে রামকৃষ্ণ। বেড়াতে-বেড়াতে নবতের দিকে চলে আসে। হাঁক পাড়ে: ‘ও লক্ষ্মী, ওঠরে ওঠ। তোর খুড়িকে তোল রে। আর কত ঘুমাবি? রাত পোহাতে চলল। মা’র নাম কর।’
শীতের রাত। এক-এক দিন বিছানা ছাড়তে মন ওঠে না। লেপের ভিতরে কুঁকড়ি সুকড়ি হয়ে সারদা আস্তে-আস্তে লক্ষ্মীকে বলে, ‘চুপ কর, সাড়া দিসনি। নিজের চোখে তো ঘুম নেই! এখনো সময় হয়নি ওঠবার। কাক-কোকিল ডাকেনি এখনো–
সাড়া না পেরে সরে যাবার লোক নয় রামকৃষ্ণ। দরজার ফাঁক দিয়ে জল ছিটোয় বিছানায়।
নইলে এমনিতে রাত চারটের সময় উঠে সারদা স্নান করে নেয় গঙ্গায়। বিকেলে নবতের সিঁড়িতে যেটুকু রোদ পড়ে তাইতে চুল শুকোয়। যোগেনের চুল-বাঁধাটি ভারি পছন্দ। যোগেন এলেই বলে বেঁধে দিতে।
যোগেনকে বলতে হয় না। সে নিজের থেকে বসে সেই চুলের কাঁড়ি নিয়ে। পাঁচ আঙুলে চুলের গোছা সামলাতে পারে না।
মা যে আমার আলুলায়িতকুন্তলা। থাকেন ক্ষুদ্র নবতে, কিন্তু আসলে ভুবনেশ্বরী সর্বানন্দকরী, প্রসন্নাস্যা। ক্ষিতীশমুকুটলক্ষী।
‘কার ধ্যান করছিস রে লেটো?”
যার ধ্যান করছে সে তো চোখের সামনে। লাটু আসন ছেড়ে উঠে পড়ল।
শোন, ঐ নবত-ঘরে সাক্ষাৎ ভগবতী আছেন, তাঁর রুটি বেলে দে গে।’
বিবেকানন্দের ভাষায়, জ্যান্ত দুর্গা। আমেরিকা থেকে শিবানন্দকে চিঠি লিখছেন স্বামীজী: ‘দাদা, বিশ্বাস বড় ধন। দাদা, জ্যান্ত দূর্গা পূজা দেখাব, তবে আমার নাম। তুমি জমি কিনে জ্যান্ত দুর্গামাকে যেদিন বসিয়ে দেবে সেই দিন আমি একবার হাঁপ ছাড়ব। তার আগে আর আমি দেশে ফিরছি না।’
ফল-মিষ্টি দেদার বিলোচ্ছে সারদা। লোকদের বিলিয়ে দিতে পারলে আর তার কথা নেই। তার এই সদাব্রত দেখে রামকৃষ্ণ ঈষৎ বিরক্ত হল বোধ হয়। বললে, অত খরচ করলে কি চলবে?
একটু বুঝি অভিমান হল সারদার। তার সম্মুখ থেকে চলে যাবার ভঙ্গিটিতে বুঝি সেই ভাবই ফুটে উঠেছে।
ব্যস্তসমস্ত হয়ে উঠল রামকৃষ্ণ। রামলালকে ডেকে পাঠাল।
ওরে তোর খুড়িকে গিয়ে শান্ত কর।
কি হয়েছে?”
বোধ হয় রেগে গেছে।’ একটু থামল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘ও রাগলে আমার সব নষ্ট হয়ে যাবে।’
রামকৃষ্ণ অগ্নি, সারদা দাহিকা। রামকৃষ্ণ জল, সারদা শীতলতা। রামকৃষ্ণ ব্রহ্ম, সারদা কালী।
রাখালের বালিকা-বউকে নিয়ে এসেছে মনোমোহনের মা। মনোমোহনের মা মানে রাখালের শাশুড়ি। রাখালের শ্বশুরবাড়ি রামকৃষ্ণের ভক্ত-পরিবার। কিন্তু তাই বলে রাখালের বউকে নিয়ে আসার মানে কি? রামকৃষ্ণের বুকের ভিতরটা ধক করে উঠল। রাখালকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবার অভিসন্ধি নয় তো?
না, ব্যস্ত কি, রাখালই ফিরে-ফিরে যাবে সংসারে। তার ভোগের এখনো একটু বাকি আছে।
কিন্তু স্ত্রীর সংস্পর্শে রাখালের ঈশ্বরভক্তির হানি হবে না তো?
আয় তো মা, আয় তো এদিকে, তোকে একবারটি দেখি।
বিশ্বেশ্বরী এগিয়ে এল রামকৃষ্ণের কাছে। রামকৃষ্ণ তাকে দেখতে লাগল খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে। সুলক্ষণা, সুভূষণা মেয়ে।
সর্বঅঙ্গে দেবীশক্তি। ভয় নেই এতটুকু, স্বামীর ইষ্টপথে বিঘ্ন হবে না।
বললে, ‘নবতে যাও, তোমার শাশুড়িকে প্রণাম করে এস।’
সারদাকে নবতে বলে পাঠাল রামকৃষ্ণ: ‘টাকা দিয়ে যেন পুত্রবধূর মুখ দেখো।’
সিঁতিতে বেণী পালের বাগানে রাখালকে সঙ্গে করে বেড়াতে গিয়েছে রামকৃষ্ণ। কথা আছে, রাতটা থাকবে সেখানে।
সন্ধ্যের পর বাগানে একা একা বেড়াচ্ছে রামকৃষ্ণ। সেখানে কতগুলো ভূতের সঙ্গে দেখা।
তুমি এখানে এসেছ কেন?”ভূতগুলো কাতরাতে লাগল: ‘তোমার হাওয়া আমাদের সহ্য হচ্ছে না। আমরা জ্বলে গেলুম, জ্বলে গেলুম। তুমি চলে যাও এখান থেকে।’
খাওয়া-দাওয়ার পরেই গাড়ি আনতে বললে রামকৃষ্ণ।
সে কি কথা, আপনি না রাত্রে এখানে থাকবেন বলেছিলেন?
তা থাকা হল না। শুধু জীবিতের নয়, মৃতেরও আর্তি আছে।
‘কিন্তু এত রাতে গাড়ি পাব কোথায়?’
“তা পাবে, দেখ গে৷ ‘
গাড়ি পাওয়া গেল সহজেই। সেই রাতেই ফিরে এল দক্ষিণেশ্বর।
জাগ-প্রদীপটির মতই জেগে আছে সারদা। গাড়ির শব্দ পেয়ে চমকে উঠল। কান পেতে শুনল রাখালের সঙ্গে কি কথা বলছে রামকৃষ্ণ। ওমা, কি হবে, যদি না খেয়ে এসে থাকেন, কি খেতে দেব এত রাতে? অন্য দিন কিছু না কিছু ঘরে থাকে, অন্তত একটু সুজি। কখন কি খেয়ালে খেতে চেয়ে বসেন ঠিক কি। কিন্তু আজ কী হবে? যদি বলেন, খিদে পেয়েছে?
রাত একটা, মন্দিরের ফটক বন্ধ হয়ে গেছে কখন। কি করে কে জানে ফটক খুলিয়ে নিল রামকৃষ্ণ। হাততালি দিয়ে ঠাকুর-দেবতার নাম করতে-করতে এগুতে লাগল। সঙ্গে-সঙ্গে তালি দিয়ে দিয়ে রাখালও নাম করছে।
ঝি যদুর মাকে তোলাল সারদা। ও যদুর মা, কি হবে, উনি যে ফিরে এলেন! যদি বলেন, খাইনি কিছু খেতে দাও?
মনের আকুলতাটি বুঝতে পেরেছে মনোহারী। নিজের ঘর থেকেই ডেকে বললে, ‘তোমরা ভেবো না গো, আমরা খেয়ে এসেছি।’
পরদিন সকালে রাখালকে বললে সেই ভূতের গল্প।
‘ও বাবা, ভাগ্যিস তখন বলোনি সেই রাত্তির বেলা, তাহলে আমার দাঁত-কপাটি লেগে যেত। শুনে এখনি বুক কাঁপছে–
স্ত্রী-ভক্তদের কাছে সেই গল্পটাই সেদিন বলছেন শ্রীমা, আর রাখালের ভয়ের কথা ভেবে হাসছেন মৃদু-মন্দ। ভূতগুলো তো বড় বোকা।’ বললে একজন স্ত্রী-ভক্ত। ‘ঠাকুরের কাছে কোথায় মুক্তি চাইবে, তা নয়, চলে যেতে বললে।’
‘ঠাকুরের যখন একবার দর্শন পেলে তখন মুক্তির আর বাকি রইল কি মা!’ শ্রীমা’র চোখ দুটি প্রসন্নতায় ভরে উঠল: ‘জানো না বুঝি আমার নরেনের কাণ্ড? সেবার মাদ্রাজে গিয়ে ভূতের পিণ্ড দিলে। পিণ্ড দিয়ে মুক্ত করে দিলে প্রেতাত্মাদের।’
কলকাতার রাস্তায় লাটুর সঙ্গে নরেনের দেখা।
‘তোদের ওখানকার খবর কি?” জিজ্ঞেস করলে নরেন।
‘কাল উখানে কত উৎসব হল, আপুনি যান নাই কেন? হামার সঙ্গে আজ উখানে চলুন-
‘আমার বয়ে গেছে! সামনে একজামিন। এখন এক পাগলা বামুনের সঙ্গে বসে আড্ডা দেবার আমার সময় নেই।’
‘পাগলা বামুন!’ হতবুদ্ধির মত তাকিয়ে রইল লাটু। ‘পাগলা বামুন আপুনি কাকে বলছেন?’
‘আর কাকে! কোমরে কাপড় থাকে না, হাত-পা তেউরে যায়, নাম শুনলেই ধেই-ধেই করে নাচে, মান-ইজ্জত নেই, যেখানে-সেখানে খালি গায়ে যাওয়া-আসা করে! তার পর আবার ভেলকি দেখানো আছে-
‘ভেলকি!’
তা ছাড়া আবার কি! সেই গান আছে না? নিতাই কি ভেলকি জানে, নিতাই কি যাদু জানে! শুকনো কাঠে ফল ধরালো, ফুল ফোটালো পাষাণে!
‘হ্যাঁ রে, রাখাল ওখানে যায়?
যায় বই কি। শুধু যায় না, কখুনো দু-তিন রাত্তির থেকেও যায়। ঠাকুর তাকে ছেলে বলেন। মাকে বললেন, এই নাও গো তোমার ছেলে এসেছে।’
‘রাখালকে তাঁর ছেলে বললেন?’
‘সাচ বলছি, তাই শুনেছি।’
রাখাল যদি ঠাকুরের ছেলে, নরেন শ্রীমা’র।
মা, এই একশো আট বিল্বপত্র ঠাকুরকে আহুতি দিয়ে এলুম, যাতে মঠের জমি হয়। তা কর্ম কখনো বিফলে যাবে না। ও হবেই এক দিন। নরেনের কন্ঠে বজ্রের ঘোষণা।
তার পর মঠের জমি কেনা হলে চতুঃসীমা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখাল শ্রীমাকে। বললে, মা তুমি তোমার আপন জায়গায় আপন মনে হাঁপ ছেড়ে বেড়াও।’
একদিন খুব ব্যস্ত-ত্রস্ত হয়ে এসেছে নরেন। বললে, ‘মা আমার আজকাল সব উড়ে যাচ্ছে। সবই দেখছি উড়ে যায়।’
শ্রীমা হাসলেন। বললেন, ‘দেখো, আমাকে কিন্তু উড়িয়ে দিও না।’
নরেন বললে, ‘মা, তোমাকে উড়িয়ে দিলে থাকি কোথায়? যে জ্ঞানে গুরুপাদপদ্ম উড়িয়ে দেয় সে তো অজ্ঞান। গুরু পাদপদ্ম উড়িয়ে দিলে জ্ঞান দাঁড়ায় কোথায়?’ কৃষ্ণ নাম বিষ্ণু নাম দু-অক্ষর হলেও কঠিন। বানানেও কঠিন উচ্চারণেও কঠিন । শিব বলতে তিনটে ‘স’-এর মধ্যে একটাকে বাছতে হয়। তার চেয়ে হরি আর রাম সোজা। বর্ণপরিচয়ের সময় যখন জল-খল অজ-আম শিখেছিলি সে সময়েই শেখা যেত হরি নাম। তেমনি সরল, শিশুবোধ্য। কিন্তু তা-ও দু-অক্ষর। তোকে একাক্ষর মন্ত্র দিচ্ছি। সব চেয়ে কম, সব চেয়ে ছোট, সব চেয়ে সোজা-সেই একাক্ষর। ওঁ নয়, হ্রীং-ক্রীং নয়। একেবারে জলের মত তরল, শিশিরের মত ঠাণ্ডা। সেই শব্দটি শিখেছিস সকলের আগে, ভুঁয়ে পড়ে মাটি পাবার সঙ্গে-সঙ্গেই। কান্নার স্বর, আনন্দের স্বর, আর্তির স্বর, আকুলতার স্বর। সেই একাক্ষর মন্ত্রটির নাম হচ্ছে মা।
মা আমার জগৎ জুড়ে। আর আমিও তো জগৎ ছাড়া নই। তাহলেই তো মা আমাকে ধরে আছেন, ঘিরে আছেন। তাহলে আর আমার ভয় কি।
মা-ই আমার অভয় মন্ত্র!
সুরেশ মিত্তির ‘কারণ’ করে জপ করে। তার পর ছাদের পাঁচিলের পাশে বসে নিচু গলায় শ্যামার গান গায়। আস্তে-আস্তে গলা চড়তে থাকে। ক্রমে-ক্রমে সে-গলা কান্নায় গলে পড়ে।
আর সে কী কান্না! আর্তনাদের মত কানে লাগে। আশে-পাশের বাড়িগুলি সচকিত হয়ে ওঠে।
‘সুরেশ মিত্তির মদ খায়।’ এক দিন রাম দত্ত এসে নালিশ করল রামকৃষ্ণের কাছে।
‘ওকে বারণ করুন।
‘তাতে তোর কি?” রামকৃষ্ণ ঝলসে উঠল: ‘ওর ধাত আলাদা, ও নিজের পথে যাবে। তাতে তোর কী মাথাব্যথা?”
‘কারণ’ করে কোনো দিন যদি আনন্দে পায় সুরেশকে, তখন আর কথা নেই, সর্বক্ষণ তার মুখে শুধু রামকৃষ্ণের কথা।
“তুই কত্তামো করিস নে।’ রাম দত্তকে বললে এক দিন সুরেশ। ‘চল, প্রভুর কাছে যাই। তিনি যেমন আদেশ করেন তেমনি করব।’
নবতখানার পাশে বকুলতলায় দাঁড়িয়ে আছে রামকৃষ্ণ। প্রণাম করে দাঁড়াল দুজনে। মনোবাসী টের পেয়েছে মনের কথা। বললে, ‘ও সুরেন্দর, মদ খাবি তো খা না। কিন্তু দেখিস পা যেন না টলে, মা’র পাদপদ্ম হতে মন যেন না টলে।’
এখানেও আশ্বাস, এখানেও প্রশ্রয়! মন যদি মত্ত থাকে, পায়ের বন্ধনে কি এসে যাবে!
জানিস না সেই দুই বন্ধুর গল্প? দুই বন্ধু এক জন গেল বেশ্যালয়ে, আরেক জন গেল ভাগবত শুনতে। প্রথম জন ভাবছে, ধিক আমাকে! বন্ধু হরিকথা শুনেছে, আর আমি এ কোথায় পড়ে আছি! দ্বিতীয় জন ভাবছে, ধিক আমাকে! বন্ধু কেমন ফুর্তি করছে, আর আমি শালা কী বেকুব! দুজনেই মলো। প্রথম জনকে বিষ্ণুদূতে নিয়ে গেল-বৈকুণ্ঠে। দ্বিতীয় জনকে নিয়ে গেল যমদূতে—নরকে।
শুধু মন নিয়ে কথা। মনেতেই বদ্ধ মনেতেই মুক্ত। মনেতেই শুদ্ধ মনেতেই অশুদ্ধ।
মন ধোপাঘরের কাপড়। লালে ছোপাও লাল নীলে ছোপাও নীল। গেরুয়ায় ছোপাও গেরুয়া। যে রঙে ছোপাও সেই রঙে ছুপবে।
‘ওরে মদে বিষও আছে মধুও আছে। সুরেশ মিত্তিরকে বললে রামকৃষ্ণ। ‘মদ খাস কেন? ঐ মধুর জন্যেই তো? কিন্তু ঐ বিষ তুই ধারণ করতে পারবি? না, তুই চাস তাই ধারণ করতে?”
সুরেশ মিত্তির চুপ।
শোন, মদ খাবার আগে ঐ বিষটুকু তুই মাকে নিবেদন করে দে। বল, মা তুমি এর বিষটুকু খাও আর সুধাটুকু আমাকে দাও।’
তাই ভালো। ঝামেলা গেল! মা-ই বিষ খাক। আমার সুধাপানের কথা, সুধাই খাব পুরোপুরি।
খাবার আগে মদের “গ্লাশ মাকে নিবেদন করে দেয় সুরেশ। বলে, বিষটুকু টেনে নে মা, সুধাটুকু আমার জন্যে রেখে যা। বলে গান ধরে মুক্তকণ্ঠে:
জয় কালী জয় কালী বলো,
লোকে বলে বলবে পাগল হলো:
ভালো মন্দ দুটো কথা
ভালোটা না করাই ভালো।
কিন্তু সন্তান হয়ে মাকে কত দিন সে বিষ দিতে পারবে হাতে ধরে? সুরেশের মনে খটকা লাগল। ঠাকুর তাকে ধোঁকায় ফেলেছেন। নিজে মধুটুকু খেয়ে মাকে কি ছেলে বিষ দিতে পারে? কতটুকু পারে? কত দিন পারে? মদের গ্লাশ নামিয়ে রাখলে সুরেশ।
অচলানন্দ এসে রামকৃষ্ণকে বলে, একটু কারণ খাও।
সে সব কী দিনই গেছে! যে দলের সাধকই হও না কেন আমাকে দেখাও তোমার ঈশ্বরসাধন। তোমার রীত-নীত। তোমার আকার-প্রকার। আমি শুধু দেখব আর আনন্দ করব। কত রকম ভোগ্য, কত রকম ভজনা!
মথুরবাবুকে বললে, ‘সব সাজপাট যোগাড় করে দাও।’
ভাণ্ডারী মথুর কাণ্ডারী হল। বললে, ‘সব যোগাড় করে দিচ্ছি। কার কি লাগবে বলো। তোমার যাকে যা খুশি তাই দিয়ে দাও স্বচ্ছন্দে।’
সাধুদের জন্যে শুধু চাল ডাল ঘি আটা নয়—যোগাড় হল কম্বল-আসন লোটা- কমণ্ডলু—যার যা নেশার সরঞ্জাম। সিদ্ধি গাঁজা কারণ চরস। আদা পেঁয়াজ মুড়ি কড়াই-ভাজা।
তান্ত্রিক অচলানন্দের দারুণ জেদ। বলে, কারণ খেতেই হবে তোমাকে।
রামকৃষ্ণকে চক্রে নিয়ে বসে। কখনো বা চক্রেশ্বর সাজায়। বলে, ‘খাও না একটু কারণ।’ রামকৃষ্ণ বলে, ‘ওগো, আমার নাম করলেই নেশা হয়ে যায়।’
আমার নেশা জিভে মেশা। বাইরের কোনো পৃথক বস্তুর দরকার হয় না। যেমনি একটু নাম করব অমনি সমস্ত সত্তা পীযূষে স্নান করে উঠবে। আমার হচ্ছে নাম-সুধার নেশা।
অচলানন্দ ছেড়ে দিল। শেষকালে শুধু বললে, ‘চক্রে বসলে কারণ গ্রহণ করতে হয়—নইলে সাধনার অঙ্গহানি ঘটে।’
রামকৃষ্ণ তখন কারণ নিয়ে কপালে ফোঁটা কাটে বা ঘ্রাণ নেয়। বড় জোর আঙুলে করে ছিটে দেয় মুখের উপর। পাত্রে পাত্রে ঢেলে সবাইকে পরিবেশন করে।
একেক দিন ভীষণ তর্জন করে অচলানন্দ। বলে, স্ত্রীলোক নিয়ে বীরভাবে সাধন তুমি কেন মানবে না? শিবের কলম মানবে না? তন্ত্র লিখে গেছেন শিব, তাতে সব ভাবের সাধন আছে। বীরভাবের সাধনও বাদ পড়েনি–
‘কে জানে বাপু’ রামকৃষ্ণের মুখে সরল সমর্থন: ‘আমার শুধু সন্তানভাব।
মধু রায়ের গলিতে গাড়ি ঢোকে না, দাঁড়ায় পুবের বা পশ্চিমের বড় রাস্তায়। সভা-শেষে হেঁটে চলেছে রামকৃষ্ণ-গলিটকু পেরিয়েই গাড়িতে গিয়ে উঠবে। কিন্তু ঈশ্বরানন্দে এমনি মাতোয়ারা হয়ে আছে, মেপেমেপে পা ফেলতে পারছে না। টলমল করছে, এখানকার পা ওখানে গিয়ে পড়ছে—
রাখাল বুঝি এখন সঙ্গে নেই। তার কাজই হচ্ছে ঈশ্বরবিভোর রামকৃষ্ণকে ধরে-ধরে ঠিকমতো পথ দেখানো। এইখানে সিঁড়ি, এইখানে উঁচু, এইখানে গর্ত, এমনি বলে-বলে নিজের জায়গায় টেনে নিয়ে যাওয়া। যখন রাখাল না থাকে তখন বাবুরাম আছে।
ভক্তরা দু দিক থেকে ধরে রামকৃষ্ণকে নিয়ে যাচ্ছে গাড়ির দিকে। আস্তে-আস্তে নিয়ে যাচ্ছে। রামকৃষ্ণ টলছে, হেলছে-দুলছে, পা রাখতে পারছে না স্থির হয়ে। গলির মোড়ে দাঁড়িয়েছিল কারা। বলে উঠল, ‘কী দারুণ টেনেছে হে!
‘বাবাঃ, একেই বলে পাঁড় মাতাল! একেবারে বেহুঁস।’
লোকে তাই দেখে চর্মচক্ষে। একেই বলে দর্শনেন্দ্রিয়ের প্রমাণ! দড়িকে সাপ দেখে, ছায়াকে ভূত! আবার তেমনি ঈশ্বররসময়কে বলে কি না সুরাপানে জ্ঞানশূন্য!
ওরে সুরাপান করি না আমি, সুধা খাই জয় কালী বলে। আমার মন-মাতালে মাতাল করে মদ-মাতালে মাতাল বলে।
আহাহা, চেয়ে দ্যাখ ঈশ্বর যেন ঊর্ণনাভ। মাকড়সা কি করে? নিজের শরীর থেকেই লূতাতন্তু সৃষ্টি করে নিজের আনন্দে জাল বোনে। আবার সেই জালের আশ্রয়েই নিজের আনন্দে বাস করে। তেমনি আমাদের ঈশ্বর। সমস্ত জগতের উপাদান তিনি, তিনিই আবার সমস্ত জগতের উপলক্ষ্য। আবার এই জগতের মধ্যেই তাঁর বাসা। এই জগৎই আবার তাঁর লীলাগৃহ।
রামকৃষ্ণ গেছে কালীঘরে ভবতারিণীকে দর্শন করতে। সারদা তার ঘরখানি ঝাঁটপাট দিয়ে রাখছে। পেতে রাখছে বিছানা। তার পর পান সাজতে বসেছে এক কোণে।
ঘরের কাজ চটপট সেরে চুপিচুপি বেরিয়ে যাবে সারদা, দরজার মুখে রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা।
কিন্তু এ তাঁর কী চেহারা! যেন পুরোদস্তুর মাতাল! চোখ দুটো লাল, এখানকার পা ওখানে পড়ছে, কথা এড়িয়ে গেছে, কী সব যেন বলছেন জড়িয়ে-জড়িয়ে!
ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে কিনা এক মুহূর্ত ভাবল সারদা।
এক মুহুর্ত।
মাতালের মত সারদার গা ঠেলে দিল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘ওগো, আমি কি মদ খেয়েছি?’
সারদা আনন্দের লহর দিয়ে উঠল। বললে, ‘না, না, মদ খাবে কেন?
‘তবে কেন এমনি টলছি? তবে কেন কথা কইতে পাচ্ছি না? আমি কি মাতাল?’
সারদা একবার দেখল বুঝি পরিপূর্ণ চোখে। বললে, ‘না, না, তুমি মদ কেন খাবে: তুমি মা-কালীর ভাবামৃত খেয়েছ।’
২৪
তোদের বংশের কেউ সন্নেসী হয়েছে?’ নতুন কোনো ছাত্র ইস্কুলে ভর্তি হতে এলেই নরেনের এই প্রথম জিজ্ঞাসা: ‘ধন-মান স্ত্রী-পুত্র ঘর-বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছে বিবাগী হয়ে?”
মেট্রোপলিটান ইস্কুলের সব চেয়ে নিচু ক্লাশের ছাত্র। মাত্র সাত বছর বয়েস।
নতুন ছাত্র অবাক হয়ে চেয়ে থাকে। রাজারাজড়ার খবর নয়, কে কবে কোথায় ভিক্ষের ঝুলি নিয়ে পথে বেরিয়েছে, এ নিয়ে এত জাঁক। সন্নেসী হওয়া মানে যেন কত বড় এক দিকপাল হওয়া।
জান্তা ছেলেরা কেউ-কেউ টিপ্পনি কাটে। তোর বাবা তো মস্ত এটর্নি, আছিস সবাই রাজার হালে, সুখের পায়রা সেজে। তোদের বংশে আবার সন্নেসী!
‘ছাই জানিস।’ গর্জে ওঠে নরেন: ‘আমার ঠাকুরদা দূর্গাচরণ দত্ত সন্নেসী হয়োছলেন—’
মাত্র পঁচিশ বছর বয়েস, স্ত্রী ও তিন বছরের শিশুপুত্র বিশ্বনাথকে ত্যাগ করে দূর্গাচরণ চলে গেলেন প্রব্রজ্যা নিয়ে।
বিশ্বনাথ তখন আট বছরের, তাকে নিয়ে তার মা কাশী চললেন। উদ্দেশ্য বিশ্বনাথ-দর্শন। নৌকোয় যেতে দেড় মাস লাগল। যিনি স্বামী হয়ে ত্যাগ করেছেন ও পুত্র হয়ে পূর্ণ করেছেন তাঁকে একবার দেখে আসবেন স্বচক্ষে।
বৃষ্টি হয়ে বিশ্বনাথের মন্দিরের সমুখটা পিছল হয়েছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পড়ে গেলেন। ‘মায়ি গির গিয়া—’ বলে এক সাধু ছুটে এসে তাঁকে তুলে ধরল।
কে এ সন্নেসী? সিঁড়িতে সযত্নে শুইয়ে দিতে যাবে চোখে-চোখে চকিত সংস্পর্শ হয়ে গেল! এ যে দূর্গাচরণ!
‘মায়া হ্যায়, এ মায়া হ্যায়’ বলে উঠল সন্নেসী। দ্রুত পায়ে অন্তর্ধান করলে। সেই সন্নেসীরই নাতি নরেন্দ্রনাথ।
বলে, ‘এই, দেখি, তোর হাত দেখি।’
যেন কতই পণ্ডিত, এমনি ভাবে সহপাঠীদের হাত দেখে। বলে, ‘ছাই, কিচ্ছু নেই। তোর কিচ্ছু হবে না—সন্নেসী হওয়া নেই তোর অদৃষ্টে।’
সন্ন্যাসী হওয়া মানে নরপতি হওয়া। আর, নরপতির আরেক নামই নরেন্দ্র। ‘এই দ্যাখ, আমার হাতে কত বড় চিহ্ন। আমি নিঘ্ঘাত সন্নেসী হব।’
এ যেন প্রায় বিলেত যাওয়ার মত। আর সব ছেলেরা আবিষ্টের মতন চেয়ে থাকে।
সন্নেসী হবার কি মজা, তাই তখন সবাইকে গল্প করে। তোরা কিছুই জানিস নে, বড়-বড় সাধুরা সব হিমালয়ে থাকে, গভীর জঙ্গলের মধ্যে। কৈলাস পাহাড়ের উপর রোজ মহাদেবের সঙ্গে তাদের দেখা হয়। যদি সন্নেসী হতে চাস, তবে প্রথমে যেতে হবে সেই জঙ্গলে, সাধুদের পায়ে মাথা খুঁড়তে হবে। যদি তাঁদের দয়া হয়, যদি তাঁদের পরীক্ষায় পাশ করতে পারিস, তবেই চেলা বনতে পারবি, পরতে পাবি গেরুয়া ।
কিসের পরীক্ষা? কেমনতরো পরীক্ষা?
পরীক্ষা খুব কঠিন। প্রত্যেককে একখানা করে বাঁশ দেবে। আর, সেই একখানা বাঁশের উপর শুয়ে ঘুমুতে হবে সারা রাত। পড়ে গেলেই ফেল। যদি না পড়ে রাত কাটাতে পারিস তবেই সন্নেসী। তারপরেই একদিন কৈলাসে শিবদৰ্শন। মা ভুবনেশ্বরী প্রত্যহ শিবপূজা করেন। চারচারটি মেয়ে, দুটি আবার গত হয়েছে, একটিও ছেলে নেই। বীরেশ্বর শিব কি তাঁর মনের ইচ্ছাটি পূর্ণ করবেন না? ইচ্ছা হয়ে যিনি মনের মধ্যে ছিলেন। তিনিই আবির্ভূত হলেন। অপূর্ব স্বপ্ন দেখলেন ভুবনেশ্বরী। যেন যোগীশ্বর শিব যোগনিদ্রা ছেড়ে পুত্ররূপে তাঁর দুয়ারে দাঁড়িয়ে।
বারো শো উনশত্তর সালের পৌষসংক্রান্তির দিন বিশ্বনাথের ছেলে হল। মা নাম রাখলেন বীরেশ্বর। সেই থেকে দাঁড়াল ‘বিলে’।
এ তো হল ডাক-নাম। ভালো নামের তলব পড়ল অন্নপ্রাশনের সময়।
নাম দাও নরেন্দ্র। নরের মধ্যে যে ইন্দ্র, তার নাম আবার কী হবে? এ হচ্ছে নরেশ্বর, নরোত্তম। এ হচ্ছে নরসিংহ।
দুর্দান্ত ছেলে। অষ্টপ্রহর তার সঙ্গে-সঙ্গে ঘোরবার জন্যে দু-দুটো ঝি রেখে দিয়েছে বিশ্বনাথ। যদি একবার রাগ হয় জিনিসপত্র সব ভেঙে চুরে ছারখার করে দেবে। তাকে শান্ত করা তখন এক বিষম সমস্যা। কিন্তু অভিনব এক উপায় বের করেছেন ভুবনেশ্বরী! ‘শিব’ বলে মাথায় একটু জল ছিটিয়ে দিলেই নিশ্চিন্ত। ফুসমন্তরে ঠাণ্ডা।
এক টুকরো গেরুয়া কাপড় কৌপীনের মত করে পরেছে নরেন।
‘এ কি?’ চমকে উঠলেন ভুবনেশ্বরী।
‘আমি শিব হয়েছি।’
চোখ বুজে ধ্যান করলেই মাথায় জটা গজায়, আর সেই জটা বটের শেকড়ের মত মাটির ভেতরে গিয়ে সেঁধোয়। এমনি চমৎকার একটা কাহিনী কে বলেছে নরেনকে। ভাই সে শিরদাঁড়া টান করে চোখ বুজে বসে খানিকক্ষণ আর থেকে-থেকে চোখ মেলে দেখে, জটা কত দূরে নামল পিঠ বেয়ে।
‘মা, এত ধ্যান করছি, জটা হচ্ছে কই?’
মা বলেন, ‘জটা হয়ে কাজ নেই।’
বাবা জিজ্ঞেস করেন, ‘বড় হয়ে কি হবি রে বিলে?”
নির্বিতর্ক উত্তর নরেনের: ‘কোচোয়ান হব।’
চাবকে মেরে ঘোড়া ছুটিয়ে গাড়ি চালাব। চেতনার চাবুকে। কর্ম আর ধর্ম দুই ঘোড়া। আর, জাড্য আর তামসিকতার গাড়ি।
‘ত্যাগী না হলে তেজ হবে না।’ ব্রহ্মানন্দকে লিখছে বিবেকানন্দ: ‘আমরা অনন্তবলশালী আত্মা—দেখ দিকি কি বল বেরোয়। কিসের দীনা-হীনা? আমি ব্রহ্মময়ীর বেটা। কিসের রোগ, কিসের ভয়, কিসের অভাব? দীনা-হীনা ভাবকে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদেয় করো দিকি।…বীর্যমসি বীর্যং, বলমসি বলম, ওজোহসি ওজঃ, সহোহসি সহো, ময়ি ধেয়ী। তুমি বীর্যস্বরূপ, আমাকে বীর্যবান করো। তুমি বলস্বরূপ, আমাকে বলবান করো। তুমি ওজঃম্বরূপ, আমাকে ওজম্বী করো। তুমি সহ্যশক্তি, আমাকে সহনশীল করো। রোজ ঠাকুর পূজোর সময় যে আসন প্রতিষ্ঠা—আত্মানং অচ্ছিদ্রং ভাবয়েৎ- আত্মাকে অচ্ছিদ্র ভাবনা করবে—ওর মানে কি? ওর মানে, আমার ভেতরই সব আছে-আমার ইচ্ছা হলেই সমস্ত প্রকাশিত হবে।
ইচ্ছাটিকে চাবুক করে মারো তোমার গতিহীন জড়ত্বের স্থূল পিণ্ডে। বেগবান ঘোড়া ছুটিয়ে দাও! রজোগুণের ঘোড়া।
আস্তাবলের সহিসের সঙ্গে ভাব করল নরেন। কিন্তু বিয়ে করে সহিসের বড় কষ্ট। বিয়ের মত ঝকমারি আর কিছু নেই। সারা জীবন সে ঝকমারির মাশুল যোগাতেই প্রাণান্ত। বালক নরেনের কানে মন্ত্র দিলে সহিস। আর, নরেনের কাছে সহিসই সর্বজ্ঞ।
মনের মধ্যে ধাক্কা খেল আচমকা। এ বলে কী! যে রামসীতাকে নরেন এত ভক্তি করে তারা যে বিয়ে করেছে! রামসীতার ভালোবাসার কত গল্প শুনেছে সে মা’র কাছে! তবে সহিস যখন বলছে, বিয়ে খারাপ, তখন রামসীতাকে কি করে আর ভক্তি করা যায়? রামসীতার দুঃখে কাঁদতে লাগল নরেন। মা কাছে আসতে তাঁর বুকের মধ্যে মুখ লুকিয়ে আরো ফুঁপিয়ে উঠল। মা বললেন, “তাতে কি তুই শিবপুজো কর।’
বুকটা হালকা হয়ে গেল। ছাদের ঘরে উঠে রামসীতার মূর্তি সে তুলে নিয়ে এল: ছুঁড়ে ফেলে দিল রাস্তায়। রামসীতার আসনে বসাল শিবমূর্তি।
শুদ্ধস্ফটিকসঙ্কাশ চন্দ্রশেখর। আদিমধ্যান্তশূন্য শ্বেতশিখা।
নরেন নিজে কী!
ও হচ্ছে পাতালফোঁড়া শিব। ও বসানো শিব নয়।’ বললেন ঠাকুর: ‘কারু পদ্ম দশদল, কারু ষোড়শদল, কারু বা শতদল। কিন্তু পদ্ম মধ্যে নরেন্দ্র সহস্রদল।’
আর নরেন্দ্র কী বলছে?
‘দাদা, না হয় রামকৃষ্ণ পরমহংস একটা মিছে বস্তুই ছিল, না হয় তাঁর আশ্রিত হওয়া একটা বড় ভুল কর্মই হয়েছে, কিন্তু এখন উপায় কি? একটা জন্ম নয় বাজেই গেল, মরদের বাত কি ফেরে? দশ স্বামী কি হয়? তোমরা যে যার দলে যাও, আমার কোনো আপত্তি নেই, কিছুমাত্রও নেই, তবে এ দুনিয়া ঘুরে দেখছি যে, তাঁর ঘর ছাড়া আর সকল ঘরেই “ভাবের ঘরে চুরি।” তাঁর জনের উপর আমার একান্ত ভালোবাসা, একান্ত বিশ্বাস। কি করব? একঘেয়ে বলো বলবে, কিন্তু ঐটি আমার আসল কথা। যে তাঁকে আত্মসমর্পণ করেছে, তার পায়ে কাঁটা বিঁধলে আমার হাড়ে লাগে।…তাঁর দোহাই ছাড়া কার দোহাই দেব? আসছে জন্মে না হয় বড় গুরু দেখা যাবে, এ জন্ম এ শরীর সেই মূর্খ বামুন কিনে নিয়েছে।’
জাত কাকে বলে—বালক নরেন বড় ফাঁপরে পড়েছে। জাত না মানলে কী হয়: ছাদ-দেয়াল কি ভেঙে পড়ে? জাত যে যায়, কি করে যায়, কোন পথে? ও কি টাকা-কড়ি যে চুরি যায়? না, জামা-কাপড় ছিঁড়ে যায়? একবার দেখলে হয় পরীক্ষা করে।
নানারকম মক্কেল আসে বিশ্বনাথের বৈঠকখানায়। জাত মেনে আলাদা-আলাদা হুঁকো। বৈঠকের উপর সার-সার বসানো। এটা শুদ্দুর এটা বামুন এটা মুসলমান। মুসলমানের হুঁকোতেই আগে টান দিল নরেন।
‘ও কি হচ্ছে রে?” বাবা কখন হঠাৎ এসে পড়েছে ঘরের মধ্যে।
‘দেখছি কোনখান দিয়ে জাত যায়? যাকে ছোট করে রেখেছি তাকে ছুঁলে কী হয়?”
কী হয়? সে হাতে হাত দিয়ে পাশে এসে দাঁড়ায়। জাতটা নিমেষে বড় হয়ে ওঠে। দেশ দুশো কদম এগিয়ে যায়।
‘বলি, শশীবাবুকে মালাবারে যেতে বোলো।’ রাখালকে চিঠি লিখছে নরেন: ‘সেখানকার রাজা সমস্ত প্রজার জমি ছিনিয়ে নিয়ে ব্রাহ্মণগণের চরণার্পণ করেছেন, গ্রামে-গ্রামে বড়-বড় মঠ, চর্বচোষ্য খানা, আবার নগদ।…ভোগের সময় ব্রাহ্মণেতর জাতের স্পর্শে দোষ নেই—ভোগ সাঙ্গ হলেই স্নান।… পয়সা নেবে, সর্বনাশ করবে, আবার বলে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না। আর কাজ তো ভারি—আলুতে-বেগুনে যদি ঠোকাঠুকি হয়, তা হলে কতক্ষণে ব্রহ্মান্ড রসাতলে যাবে!…মহা দঁক সামনে- সাবধান, ঐ দঁকে সকলে পড়ে মারা যাবে—ঐ দঁক হচ্ছে যে হিন্দুর ধর্ম বেদে নাই, পুরাণে নাই, ভক্তিতে নাই, মুক্তিতে নাই—ধর্ম ঢুকেছেন ভাতের হাঁড়িতে। হিন্দুর ধর্ম বিচারমার্গেও নয়, জ্ঞানমার্গেও নয়, ছুঁৎমার্গে। আমায় ছুঁয়ো না, আমায় ছুঁয়ো না। এই ঘোর বামাচার ছুঁৎমার্গে পড়ে প্রাণ খুইও না। “আত্মবৎ সর্বভূতেষু” কি পুঁথিতে থাকবে নাকি? যারা এক টুকরা রুটি গরিবের মুখে দিতে পারে না তারা আবার মুক্তি কি দিবে!
নরেন্দ্র সভায় থাকলে আমার বল।’ বললেন তাই ঠাকুর: ‘ও বড় ফুটোওলা বাঁশ। খুব আধার—অনেক জিনিস ধরে।
তৃণগুল্মের দেশে মাঝে-মাঝে বিস্ময়কর বনস্পতির দেখা মেলে। নরেন্দ্রনাথ বনস্পতির দেশে দেবতাত্মা নগাধিরাজ।
আর সেই যে হিমালয় তার ঊর্ধ্বে বিরাজিত যে মানস সরোবর-নিবাত-নিষ্কম্প নীলকান্ত প্রশান্ত অমৃত-হ্রদ, তিনিই শ্রীরামকৃষ্ণ।
