পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.৪০
৪০
‘আমাকে বিদ্যাসাগরের কাছে নিয়ে যাবে?’ মাস্টারমশাইকে জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর। ‘আমার দেখতে বড় সাধ হয়।’
বিদ্যাসাগরের ইস্কুলে মাস্টারি করেন, একদিন কথাটা পাড়লেন গিয়ে মাস্টারমশাই। বিদ্যাসাগর জিজ্ঞেস করলেন, ‘কেমনতরো পরমহংস হে? গেরুয়া কাপড় পরে থাকেন নাকি?”
‘না, লালপেড়ে কাপড় পরেন। গায়ে জামা, পায়ে বার্ণিশ-করা চটিজুতো। রাসমণির কালীবাড়িতে থাকেন একটি ঘরে, তক্তপোশের উপর সামান্য বিছানা, তাতেই শোন, মশারি খাটান। দেখতে অত্যন্ত শাদাসিধে, কিন্তু এমন আশ্চর্য লোক আর দেখা যায় না। ঈশ্বর ছাড়া আর কিছু জানেন না সংসারে।’
বটে? খুশি হয়ে উঠলেন বিদ্যাসাগর। বললেন, শনিবার চারটের সময় নিয়ে এস।
গাড়ি করে যাচ্ছেন রামকৃষ্ণ। সঙ্গে মাস্টার, ভবনাথ আর হাজরা।
আহা, ভবনাথ কেমন সরল! বিয়ে করে এসে আমায় বলছে, আমার স্ত্রীর উপর এত স্নেহ হচ্ছে কেন? তা, স্ত্রীর উপর ভালোবাসা হবে না? এটিই জগৎমাতার ভুবনমোহিনী মায়া।
এই স্ত্রী নিয়ে মানুষ কী না দুঃখভোগ করছে। তবু মনে করে এমন আত্মীয় আর কেউ নেই। কুড়ি টাকা মাইনে—তিনটে ছেলে হয়েছে—তাদের ভালো করে খাওয়াবার শক্তি নেই, বাড়ির ছাদ দিয়ে জল পড়ছে, পয়সা নেই মেরামত করার—ছেলের নতুন বই কিনে দিতে পারে না, ছেলের পৈতে দিতে পারে না–এর কাছে আট আনা ওর কাছে চার আনা ভিক্ষে করে-
বিদ্যারূপিণী স্ত্রীই যথার্থ সহধর্মিণী। এক হাতে সংসারের কাজ করে, আরেক হাতে স্বামীর হাত ধরে নিয়ে চলে ঈশ্বরের পথে।
আর হাজরা?
অনেক জপতপ করে, মন পড়ে আছে বাড়িতে, স্ত্রী-ছেলে জমি-জমার উপর। তাই ভিতরে-ভিতরে দালালিও করে। টাকাওয়ালা লোক দেখলে কাছে ডাকে, লম্বা-লম্বা কথা শোনায়, বলে, রাখাল-টাখাল যা সব দেখছ, জপতপ করতে পারে না, হো-হো করে ঘুরে বেড়ায়।
‘যদি কেউ পর্বতের গুহায় বাস করে, গায়ে ছাই মাখে, উপবাস করে, নানা কঠোর সাধনা করে, কিন্তু ভিতরে-ভিতরে বিষয়ে মন, কামকাঞ্চনে মন, সে লোককে বলি ধিক্। আর যার কামকাঞ্চনে মন নেই, খায় দায় বেড়ায়, তাকে বলি ধন্য।’
পোল পার হয়ে শ্যামবাজার হয়ে আমহার্স্ট স্ট্রিটে পড়েছে গাড়ি। এই বাদুড়-বাগানের কাছে এসে গেলাম। মুহুর্তে ভাবাবেশ হল রামকৃষ্ণের।
এই রামমোহন রায়ের বাগান-বাড়ি।
রামকৃষ্ণ বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘এখন ও সব আর ভালো লাগছে না।’
এখন শুধু বিদ্যাসাগর। বিদ্যা—যা থেকে ভক্তি, দয়া, প্রেম, জ্ঞান—যা শুধু ঈশ্বরের পথে নিয়ে যায়। সেই বিদ্যার সমুদ্র।
দোতলা, ইংরেজ-পছন্দ বাড়ি। চারদিকে দেয়াল, পশ্চিম ধারে ফটক। পাঁচিল থেকে নিচের ঘর পর্যন্ত ফুলের কেয়ারি। বিদ্যাসাগর উপরে থাকেন। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই উত্তরে একটি কামরা, তার পুবে হল ঘর। হল ঘরের পুব প্রান্তে টেবিল-চেয়ার। সেইখানে পশ্চিমমুখো হয়ে বসে কাজ করেন বিদ্যাসাগর। হলঘরের দক্ষিণে বিদ্যাসাগরের লাইব্রেরি। সে আরেক বিরাট শব্দসমুদ্র। পাশেই নিরীহ শোবার ঘর।
‘মা গো, পণ্ডিতের সঙ্গে দেখা করতে চলেছি। আমার মুখ রাখিস মা।’
গাড়ি থেকে নামলেন রামকৃষ্ণ৷ গায়ে একটি লংক্লথের জামা, পরনে লালপেড়ে ধুতি, আঁচলটি কাঁধের উপর ফেলা। পায়ে বার্ণিশ করা চটি জুতো। উঠোন পেরিয়ে যেতে-যেতে জিজ্ঞেস করলেন মাস্টারকে, ‘জামার বোতাম খোলা রয়েছে, এতে কিছু দোষ হবে না?’
‘আপনার কিছুতে দোষ হবে না। বললে মাস্টার। ‘আপনার বোতাম দেবার দরকার নেই।’
নিশ্চিন্ত হলেন ঠাকুর। বালককে বোঝালে যেমন নিশ্চিন্ত হয়, তেমনি।
হল-ঘরে না বসে উত্তরের কামরায় বসেছেন বিদ্যাসাগর। বয়স আন্দাজ বাষট্টি। রামকৃষ্ণের থেকে ষোলো-সতেরো বছরের বড়। খর্বাকৃতি, মাথাটি প্রকাণ্ড, চার পাশ উড়িয়াদের মতো কামানো। পরনে শাদা থান কাপড়, গায়ে হাত কাটা ফ্লানেলের জামা, গলার পৈতে দেখা যাচ্ছে, পায়ে ঠনঠনের চটি জুতো। বাঁধানো দাঁতগুলো ঝকঝক করছে।
রামকৃষ্ণ ঘরে ঢুকতেই বিদ্যাসাগর উঠে দাঁড়িয়ে অভ্যর্থনা করলেন। যে টেবিল সামনে রেখে দক্ষিণাস্য হয়ে বসে ছিলেন বিদ্যাসাগর, তার পুব পাশে এসে দাঁড়ালেন রামকৃষ্ণ। বাঁ হাতখানি টেবিলের উপর। যেন সংলগ্ন হয়ে আছেন বিদ্যাসাগরে। একদৃষ্টে তাঁকে দেখছেন আর হাসছেন ভাবাবেশে। ভাবাবেশ সংবরণ করবার জন্যে মাঝে-মাঝে বলছেন রামকৃষ্ণ, ‘জল খাব।’ ‘জল খাব।’
দেখতে-দেখতে ভিড় হয়ে গেল ঘরের মধ্যে। পিছনে একটা পিঠ-তোলা বেঞ্চি ছিল, তাতে বসলেন রামকৃষ্ণ। সেখানে একটি ছেলে বসে। বিদ্যাসাগরের কাছে ভিক্ষে করতে এসেছে, পড়াশোনার খরচ চলে না। তার থেকে সরে বসলেন ঠাকুর। বললেন, ‘মা, এ ছেলের বড় সংসারাসক্তি। তোমার অবিদ্যার সংসার। এ অবিদ্যার ছেলে।’
আর এ ছেলেটি? সামনে বসা আরেকটি ছেলেকে নির্দেশ করলেন বিদ্যাসাগর। ‘এ ছেলেটি সৎ। যেন অন্তঃসার ফল্গু নদী। উপরে বালি, কিন্তু একটু খুঁড়লেই জল দেখতে পাবে ভিতরে।’
জল এসে গেল ভিতর থেকে। বিদ্যাসাগর মাস্টারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিছু খাবার দিলে ইনি খাবেন কি?’
‘আজ্ঞে আনুন না।’ বললে মাস্টার।
বিদ্যাসাগর ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেলেন বাড়ির মধ্যে। একথালা মিষ্টি নিয়ে এলেন। বললেন, ‘এগুলি বর্ধমান থেকে এসেছে।’
মিষ্টিমুখ করলেন রামকৃষ্ণ। ভবনাথ আর হাজরাও কিছু অংশ পেল। মাস্টারের বেলায় বিদ্যাসাগর বললেন, ও তো ঘরের ছেলে। ওর জন্যে আটকাবে না।
মিষ্টিমুখের পর বিদ্যাসাগরের দিকে চেয়ে মিষ্টি হেসে বললেন রামকৃষ্ণ, ‘আজ সাগরে এসে মিললাম। এতদিন খাল বিল হ্রদ নদী দেখেছি, এইবার সাগর দেখলুম!
বিদ্যাসাগর হেসে জবাব দিলেন, ‘তবে নোনা জল খানিকটা নিয়ে যান।
‘না গো! নোনা জল কেন? তুমি তো অবিদ্যার সাগর নও, তুমি যে বিদ্যার সাগর। তুমি যে ক্ষীরসমুদ্র।’
এক ঘর লোক। কেউ বসে কেউ দাঁড়িয়ে। কথার রসগ্রহণ করে হাসছে সবাই।
কিন্তু বিদ্যাসাগর চুপ।
‘তোমার কর্ম সাত্ত্বিক কর্ম।’ বলছেন রামকৃষ্ণ, ‘সত্ত্বগুণ হয় দয়া থেকে। শুকদেবাদি লোকশিক্ষার জন্যে দয়া রেখেছিলেন। তোমার বিদ্যাদান অন্নদান—সেও ঐ দয়া থেকে। নিষ্কাম হয়ে করতে পারলে ঐতেই ভগবান-লাভ। কেউ করে নামের জন্যে, পুণ্যের জন্যে, তাদের কর্ম নিষ্কাম নয়। আর তোমার হচ্ছে দয়ার থেকে, দয়ার জন্যে। তাই তুমি তো সিদ্ধ গো!
‘আমি সিদ্ধ?’ চমকে উঠলেন বিদ্যাসাগর। ‘আমি আবার ভগবানের জন্যে সাধন করলুম কবে?’ রামকৃষ্ণ হাসলেন। বললেন, ‘আলু পটল সিদ্ধ হলে কী হয়? নরম হয়। তুমিও তো তেমনি নরম হয়ে গেছ। পরের দুঃখে তোমার হৃদয় দ্রবীভূত হয়েছে। তোমার এত দয়া, তুমি নও তো আর কে সিদ্ধ?’
শিবনাথের কোলে একটি সাত-আট বছরের মেয়ে। শিবনাথ তখন আছে বন্ধু যোগেনের সঙ্গে। যোগেন দ্বিতীয় পক্ষে একটি বিধবা মেয়েকে বিয়ে করে সমাজপরিত্যক্ত হয়ে বাস করছে নিরালায়। একটা হিন্দু চাকর পর্যন্ত জোটেনি। থাকবার মধ্যে আছে সতীর্থ বন্ধু শিবনাথ আর মহাপ্রাণ অধ্যক্ষ বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগরই পুরোত যোগাড় করে দিয়েছেন বিয়ের, নিমন্ত্রিতদের খাওয়াবার খরচ দিয়েছেন, নববধূকে দিয়েছেন মূল্যবান উপহার।
যোগেনের বাড়িতে প্রায়ই আসেন বিদ্যাসাগর। মজার মজার গল্প বলে হাসিয়ে যান সবাইকে। বিষাদভার লাঘব করেন। কঠোর ব্রতোদ্যাপনের প্রতিজ্ঞাতে ধার যোগান। সে দিন এসে দেখেন, শিবনাথের কোলে সুশ্রী একটি মেয়ে।
‘কে এই মেয়ে?’
নাপিতদের মেয়ে। আমাদের পাড়াতেই থাকে। দাদা বলে আমাকে।’
‘বা, বেশ মেয়েটি তো?’ একটু আদর করতে হাত বাড়ালেন বিদ্যাসাগর।
‘কিন্তু জানেন কি?’ কন্ঠ প্রায় রুদ্ধ হয়ে এল শিবনাথের; ও বিধবা।’
বিধবা? যেন বাজ পড়ল ঘরের মধ্যে। স্তম্ভিতের মত দাঁড়িয়ে রইলেন বিদ্যাসাগর। যন্ত্রণায় মুদ্রিত করলেন দুচোখ। শিবনাথ দেখতে পেল, বড়-বড় জলের ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে।
হঠাৎ দু’বাহু বাড়িয়ে অবোলা শিশুটাকে টেনে নিলেন বুকের মধ্যে।
শিবনাথ বললে, ওকে ফের বিয়ে দেবার জন্যে ওর মাকে বোঝাচ্ছি ক’দিন থেকে। কিছু ভাবতে হবে না। ওকে আগে বেথুন ইস্কুলে ভর্তি করে দাও। খরচ-পত্র যা লাগে সব আমি দেব। তার পর একদিন পালকি ভাড়া করে ওকে আর ওর মাকে পাঠিয়ে দিও আমার বাড়িতে, আমার মা’র কাছে।’
বিদ্যাসাগর কি সিদ্ধ নয়?
শিবনাথ যখন ব্রাহ্ম হয়, তখন তার বাবা কেঁদেছিলেন। বলেছিলেন বিদ্যাসাগরকে, “মানুষ যেমন যমকে ছেলে দেয়, তেমনি আমি কেশবকে ছেলে দিয়েছি।’
শুনে স্থির থাকতে পারেননি বিদ্যাসাগর। বাপের দুঃখে কেঁদেছিলেন আকুল হয়ে।
শিবনাথকে বাড়ির থেকে বের করে দিয়েছে বাপ। ত্যাজ্যপুত্র করেছে। স্ত্রী আর ছোট্ট একটি মেয়ে নিয়ে আলাদা বাসা করে আছে কায়ক্লেশে। স্কলারশিপের টাকা ক’টিই ভরসা।
পথে-ঘাটে বিদ্যাসাগরের সঙ্গে দেখা হয় মাঝে-মাঝে। মুখ ফিরিয়ে নেন না বিদ্যাসাগর। বরং মুখ বাড়িয়ে গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করেন আলগোছে, ‘হ্যাঁ রে, কেমন করে চলে?’
শুধু বাপের কষ্টেই কাঁদেন না, ছেলের কষ্টেও কাঁদেন। প্রায়ই খোঁজ নিতে আসেন। এটা-ওটা পরামর্শ দেন। শিবনাথ যদি কখনো অর্থ সাহায্য চেয়ে বসে, বোধ হয় তারই জন্যে নীরবে অপেক্ষা করেন।
কত ছেলেবেলা থেকে ভালোবাসেন শিবনাথকে। যখনই তাদের বাড়ি যান, দু আঙুলের চিমটেতে শিবনাথের ভুঁড়ির মাংস টেনে ধরেন। ওটাই তাঁর আদরের চেহারা। সে আদরের ভয়ে পালিয়ে বেড়ায় শিবনাথ। কিন্তু বিদ্যাসাগর ঠিক তাকে ধরে আনেন। তার ভুঁড়িতে চিমটি না কাটতে পেলে বিদ্যাসাগরের শান্তি নেই।
তখন তো বাপে-ছেলে একসঙ্গে ছিল। এখন ছেলে একা, বাপ একা। দুয়ের দুঃখেই কাঁদেন বিদ্যাসাগর। একবার এ বাড়ি যান, আরেক বার ও বাড়ি।
কাঁদবার আগে পর্যন্তই বিচার। একবার কান্না এসে গেলে বিচার ধুয়ে যায়।
বিদ্যাসাগরের কাছে কত লোক এসে গাল পাড়ে শিবনাথকে। ব্রাহ্মসমাজে ঢুকেছে বলেই সবাইর রাগ। কিন্তু বিদ্যাসাগর বলেন, ‘যাই ও করুক, ফেলতে পারব না ওকে। যাই বলো, ওকে বুকে রাখলে আমার বুকে ব্যথা করে না।’
সেই শিবনাথের ঘরে আরেক জন তার বন্ধু এসেছে। বন্ধুটিও শিবনাথের মত সমাজদ্রোহী, বিধবা বিয়ে করেছে, আর শিবনাথের মতই পিতৃ-পরিত্যক্ত। খুব ধনী বাপের ছেলে, এখন একেবারে দূরবস্থার চরম। তার উপর রোগ হয়েছে মারাত্মক। বিধবা-বিয়ে ঘটাতে হাত ছিল শিবনাথের, তাই এখন ত্যাগ করতে পারল না বন্ধুকে। সপুত্রকলত্র আশ্রয় দিল। ডাক্তার ডাকাল। কিন্তু কিছুই সুরাহা হল না। তখন বন্ধু বললে, বাবাকে একটা খবর দাও। তিনি ক্ষমা না করলে আর সারব না আমি। তার বাবার সঙ্গে পরিচয় নেই শিবনাথের। কি করে তাঁকে ধরে! নিজে গেলে হয়তো উলটো ফল হবে। বন্ধুর অন্তিম কামনা পূর্ণ হবে না। তখন অগতির গতি, বিদ্যাসাগরকে গিয়ে ধরল শিবনাথ। বিদ্যাসাগর তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। জানো ও ছোকরার চরিত্র? ওর সব অতীত কীর্তি?”
সব জানে শিবনাথ। মুখ বুজে হেঁট হয়ে রইল। বুঝল, বৃথা, আশালতা দগ্ধ হয়ে গেল সূর্য তেজে৷
‘ওকে সাহায্য করবে না আর কিছু! উলটে ওকে চাবকে দেওয়া উচিত।’
সেই বিরাট আননের উপর ক্রোধের রুদ্ররঙ্গ দেখতে লাগল শিবনাথ। নিরুপায়ের মত প্রণাম করল বিদ্যাসাগরকে। চলে যাবার আগে ফিরে দাঁড়িয়ে বললে, ‘একজন মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ ইচ্ছাটি পূর্ণ করতে পারলাম না।’
মহামানুষটি নড়ে উঠলেন। ধমক দিলেন শিবনাথকে। ‘বোস্। আমি তোকে চলে যেতে বলেছি? হ্যাঁ, সেই কাল সকালের আগে তো আর কিছু হবে না? যা, কাল সকালেই নিয়ে যাব তার বাপকে। আর, শোন, দাঁড়া, এই ক’টা টাকা নিয়ে যা।’ শিবনাথের হাতে ক’টা টাকা গুঁজে দিলেন বিদ্যাসাগর: ‘তুই একা কদিন চালাবি? এই নে। দেখিস ওর স্ত্রী আর সন্তান যেন কষ্টে না পড়ে।’
বলো, সিদ্ধ কি নয় বিদ্যাসাগর? যে মাতৃভক্ত সে কি সাধক নয়? মা বলেছেন ভাইয়ের বিয়েতে হাজির হতে, যেমন করেই হোক, দামোদর সাঁতরেই চলে গেলেন। তার পর মা যখন চলে গেলেন, বাড়ি-ঘর ছেড়ে চলে গেলেন নির্জনে। আর কিছুর জন্যে নয়, মা’র জন্যে কাঁদতে বুক ভরে। পরের জন্যে যে কাঁদে সে তো পরমের জন্যেই কাঁদে। পরই তো পরম। পরেশও যে, পরমেশও সে-ই। ব্রহ্মই তো পরব্রহ্ম। ব্রহ্মের জন্যে যে কাঁদে সেই তো সিদ্ধ। বিদ্যাসাগর বললেন রামকৃষ্ণকে, কিন্তু জানেন তো, কলাইবাটা সেদ্ধ হলে শক্ত হয়ে যায়।’
তুমি তেমনি নও গো। তুমি দরকচা-পড়া পণ্ডিত নও। শকুন খুব উঁচুতে ওঠে, কিন্তু তার নজর ভাগাড়ের দিকে। যারা শুধু পণ্ডিত, শুনতেই পণ্ডিত, এদিকে কামকাঞ্চনে আসক্তি, তারা শকুনের মতই পচা মড়া খুঁজছে। তুমি সে রকম নও। বিদ্যার ঐশ্বর্য—দয়া ভক্তি বৈরাগ্য খুঁজছ। তুমি সিদ্ধ নও তো কে সিদ্ধ?’ এক জ্ঞানময় পুরুষ দেখছেন এক আনন্দময় পুরুষকে।
৪১
‘ছেলেরা মেলায় যাবার বায়না ধরেছে,’ হেনরিয়েটা কাঁদো-কাঁদো মুখে বললে ঘরে ঢুকে, কিন্তু হাতে মোটে আমার তিন ফ্রাঙ্ক–
তখনকার হিসেবে দেড় টাকার কাছাকাছি।
মধুসূদন তাকাল একবার শূন্য চোখে। বললে, শুধু আজকের দিনটা অপেক্ষা করো।’
‘কত দিন-রাতই তো গেল এমনি অপেক্ষা করে করে। তুমি কি মনে করো তোমার দেশের লোক কেউ তোমাকে সাহায্য করবে?
সে আশা ছেড়েছে মধুসূদন। সাহায্য দূরের কথা, পাওনা টাকাই পাঠাচ্ছে না শরিকেরা। এদিক-সেদিক করে চার হাজার টাকা পাওনা। একটি কপর্দকেরও দেখা নেই।
শরিক তো নয় কালসাপ। তাদের কথা ভাবছে না মধুসূদন। দেশে কত-কত মানী-গুণী। কত-কত টাকার আণ্ডিল। তাদের কথাও ভাবছে না। হেন লোক নেই যার সঙ্গে চেনাশোনা নেই মধুসূদনের। এক-এক করে মনে করতে লাগল মুখগুলো। একটা মুখও এমন নয় যে মন উন্মুখ হয়। বিত্তবান তো অনেক আছে, কিন্তু চিত্তবান কোথায়!
না, একজন বোধ হয় আছে।
একজন নয়, দুজন। একজন ঈশ্বর, আরেকজন ঠিক সেই ঈশ্বরের নিচেই।
তারই জন্যে অপেক্ষা করতে বলছে স্ত্রীকে।
এমনিতে অস্থিরমতি মধুসূদন, মুহূর্তের বশে কাজ করতে গিয়ে অনেক ভুল সে করেছে জীবনে, অনেক নির্বুদ্ধিতা, কিন্তু এবার পরিত্রাতা খুঁজতে গিয়ে ভুল করেনি এতটুকু। এত দিনে একটি স্থিরবুদ্ধির পরিচয় দিয়েছে। অন্তত এই একবার।
“শুধু আজকের দিনটা—’
‘কি আছে আজকে?
‘আজকে ডাক আসবার দিন। আজ ঠিক চিঠি আসবে। একটা শুভসংবাদ এসে যাবে কিছু।’
‘যদি না আসে?’
‘যদি না আসে!’ চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি করতে লাগল মধুসূদন: ‘তাহলে আমি সটান জেলখানায়, আর তোমরা, তুমি আর ছেলেমেয়েরা, কোনো একটা অনাথ-আশ্রমে।’
জামার হাতায় চোখ মুছল হেনরিয়েটা।
‘কিন্তু, কান্নাটা শেষ পর্যন্ত স্থায়ী নাও হতে পারে। কেননা টাকার জন্যে যাকে এবার লিখেছি—’
‘কে সে?’
‘সমস্ত বাঙলাদেশে সে শুধু একজনই আর্য ঋষির মত জ্ঞানী, ইংরেজের মত কর্মোৎসাহী আর বাঙালী মায়ের মত কোমলহৃদয়! এখানেও যদি না হয়! না, না, হতেই হবে, নিজে বিপন্ন হয়েও আসবে বিপদ উদ্ধারে। আমি নদী-নালার কাছে যাইনি, গিয়েছি সমুদ্রের কাছে।’
দরজার কড়া নড়ে উঠল।
ঐ এলো বুঝি সেই সমুদ্রের মত্ত হাওয়া! বাধাহীন স্বাধীনতার শুভ্রতা।
আদালতের বেলিফ। দরজা একটু ফাঁক করে উঁকি মেরে দেখল হেনরিয়েটা।
ক্ষিপ্র হাতে ফের বন্ধ করে দিল। ক্রোক করবার মত আর নেই কোনো মালামাল। এবার হাতে-হাতে গ্রেপ্তার করতে এসেছে। আবার নড়ে উঠল কড়া।
‘কে?’
‘চিঠি।’
উল্লাসে লাফিয়ে উঠল মধুসূদন। ‘বলিনি, চিঠি আসবে দেশ থেকে?’ ত্বরিত হাতে খুলে ফেলল দরজা।
‘কোথাকার চিঠি?’
তোমাকে বলিনি। সাগরের মত প্রাণ! বাঙালী মায়ের মত হৃদয়! আশ্চর্য, এমন আকাঙ্ক্ষাও ফলে মানুষের জীবনে! এই দেখ। পনেরো শো টাকার ড্রাফট পাঠিয়েছেন বিদ্যাসাগর।
শুধু কি সেই একবার? আরো বহুবার টাকা পাঠালেন। জড়িয়ে পড়লেন ঋণ-জালে। শেষ পর্যন্ত ব্যারিস্টারি পাশ করিয়ে ছাড়লেন।
সেই মাইকেল দেশে ফিরছে এত দিনে। বিদ্যাসাগর তার জন্যে পছন্দসই বাড়ি ভাড়া করে রেখেছেন। বিলেত-ফেরতের মত উপযুক্ত করে সাজিয়ে দিয়েছেন জিনিসে আসবাবে। কিন্তু সে-বাড়িতে উঠল না মাইকেল। গেল স্পেন্স হোটেলে।
অবজ্ঞা দেখে অভিমান করলেন না বিদ্যাসাগর। নিজে থেকে আনতে গেলেন ডেকে।
এক কথায় ফিরিয়ে দিল মাইকেল। ঐ নেটিভ পাড়ায় ঐ নোংরা পরিবেশের মধ্যে সে থাকবে! বিলেত থেকে ব্যারিস্টার হয়ে আসা ব্যর্থ করে দেবে এমন করে! বিষণ্ণ মনে ফিরে এলেন বিদ্যাসাগর। শূন্য সাজানো বাড়ির দিকে তাকালেন শূন্য চোখে।
তবু কি সেই বাঙালী মায়ের হৃদয় শুষ্ক হয় কখনো? কত বাধা-বিপদ ফিরতে লাগল পদে-পদে—এমন কি, হাইকোর্টেই ঢুকতে পাচ্ছে না মাইকেল। চিরযোদ্ধা বিদ্যাসাগরের ডাক পড়ল। গাঁয়ের নামে যাঁর নাম-আর কে আছে অমন বীরসিংহ! হটিয়ে দিলেন সব বাধা-নিষেধ, ঢুকিয়ে দিলেন হাইকোর্টে।
কর্মে ঢু-ঢু, শুধু মুখেই কৃতজ্ঞতা। শুধু চলচিত্তের চলচ্চিত্র। স্থিরদ্যুতি নক্ষত্র নয়, ধাবিত স্খলিত উল্কাপিণ্ড।
টাকার কথাটা একবার মনে করিয়ে দিলেন বিদ্যাসাগর। টাকা? কত চাই? দুই-দশ-কুড়ি হাজার টাকা এই এসে পড়ছে হাতের মুঠোয়। মধুসূদনের জন্যে কত ধার হয়েছে বিদ্যাসাগরের?
মুখে শুধু বড়-বড় কথা। যত বহ্বাস্ফোট। হাতে টাকা এলে আর ধার শোধ নয়, নির্বিরোধ স্বেচ্ছাচার। ছন্দে যেমন অবন্ধন ব্যয়ে তেমনি উড়নচণ্ডি।
শুধু বিদ্যাসাগরেরই ঋণ বাড়ে। তাঁর সংস্কৃত প্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ বিক্রি হয়ে যায়। তবু কি বাঙালী মায়ের হৃদয় নিষ্ঠুর হয়, নীরস হয়?
বলো, এ কোন সাধনায় সিদ্ধ বিদ্যাসাগর? রামকৃষ্ণ কি আর ভুল বলেন?
‘এই মধুসূদনই রামকৃষ্ণের কাছে কটি কথা চেয়েছিল। শান্তির কথা, আশ্বাসের কথা। মা-কালী রামকৃষ্ণের মুখ চেপে ধরেছিলেন, ধর্মত্যাগীর সঙ্গে বলতে দেননি কথা।
কিন্তু কথার চেয়ে গান বড়। ধর্মের চেয়ে বড় ঈশ্বরকরুণা।
সেই করুণায় বিগলিত হল রামকৃষ্ণ। করুণার ধারা নেমে এল সুরাস্রোতে। কথা বলতে দিচ্ছেন না, কিন্তু গান তো কথা নয়, গান গাইতে দোষ কি। আর এ গান তো অন্যের রচনা, রামপ্রসাদের রচনা। রামকৃষ্ণ গান ধরল। আর, মধুসূদনের কৃতজ্ঞতা নেমে এল অশ্রুবর্ষণে।
আমি অমিত্রাক্ষর লিখি, কিন্তু হে অক্ষর, তুমি তো অমিত্র নও।
‘তুমি মিথ্যেবাদী, তুমি প্রবঞ্চক।’ গর্জন করে উঠলেন বিদ্যাসাগর: ‘ভদ্রলোকের ছেলে বলে এসে আমার সঙ্গে এই চাতুরীটা করলে?”
সামান্য একজন পুলিশ সাব ইনস্পেকটর। ভয়ে-দুঃখে দাঁড়িয়ে আছে বিমূঢ় হয়ে। কী যে অপরাধ করেছে বুঝতে পারছে না।
অপরাধের মধ্যে টাকা ধার নিয়েছিল বিদ্যাসাগরের কাছ থেকে। বিপদে না পড়ে কি আর কেউ কর্জ করে! আর, সে কী নিদারুণ বিপদ। ছ মাসের জেলের হুকুম হয়েছে, চাকরিরও দফা রফা। এখন হাইকোর্টে মোশন করতে হবে। মনোমোহন ঘোষকে ব্যারিস্টার দেবার ইচ্ছে, কিন্তু তার সাতশো টাকা ফি। বাড়িতে লেখা হয়েছে, এখনো এসে পৌঁছয়নি টাকা।
সুতরাং মুরুব্বি ধরে চলো বিদ্যাসাগর। অনুপায়ের উপায়, অশরণের আশ্রয়।
‘কি করতে হবে তাই বলো না।’
মনোমোহন ঘোষকে আপনি শুধু একটা চিঠি লিখে দিন যেন বিনা ফি-তে কাজটি করে দেয়। হ্যাঁ, আজকেই দিন মামলার। হপ্তা খানেকের মধ্যেই টাকা এসে যাবে বাড়ি থেকে, তখন দিয়ে দেব ঘোষ-সাহেবকে—নির্ঘাত দিয়ে দেব।
‘বাড়ি কোথায়?”
নাটোর। পুলিশে চাকরি করে, বিরুদ্ধ দল মিথ্যেমিথ্যি ফাঁসিয়ে দিয়েছে। জেলটা রদ করাতে না পারলে একটা পরিবার ছারখারে যাবে। শুধু যদি একটা সুপারিশ লিখে দেন—
চুপচাপ কতক্ষণ ভাবলেন বিদ্যাসাগর। বললেন, ‘এ কর্ম আমার দ্বারা হবে না। এক পা জেলে এক পা বাইরে এমন লোকের টাকা বাকি রেখে কাজ করতে বলা অবিচার করা। মামলায় যদি হার হয়? জেলের হুকুম যদি বহাল থাকে? না বাপু অসম্ভব, এমনটি পারব না কিছুতেই।’
তবে আমি যাই কোথা? শুনেছি যার কেউ নেই তার বিদ্যেসাগর আছে। যার বিদ্যেসাগরও নেই সে যাবে কোন দুয়ারে?
কাগজ-কলম টেনে নিলেন বিদ্যাসাগর। ঘসঘস করে লিখতে লাগলেন, মাই ডিয়ার ঘোষ—
হঠাৎ থেমে পড়ে বললেন, ‘অসম্ভব। এ কর্ম হবে না আমার দ্বারা। অন্যায় অনুরোধ করি কি করে?”
দারোগা কেঁদে ফেলল। বললে, ‘তা হলে আমি জেলেই যাব?’
একটা তীর যেন এসে বিদ্ধ করল বিদ্যাসাগরকে। চোখের কোণ ভিজে উঠল। জানা ছিল, তবু ব্যাঙ্কের খাতা খুলে আরেকবার দেখলেন এক পয়সাও মজুত নেই। তবু আশ্চর্য, একটা চেক কাটলেন। সাত শো টাকার চেক। বললেন, ‘এই চেক নিয়ে গিয়ে ঘোষকে দাও। আর বলো, কাল সাড়ে এগারোটার আগে যেন ব্যাঙ্কে না পাঠায়। যে করে হোক আজকের দিনের মধ্যে সাত শো টাকা ব্যাঙ্কে জমা করে দেব।’
হাইকোর্টে খালাস পেয়েছে দারোগা। ধার শোধ করতে টাকা নিয়ে এসেছে। এক আধলা কম নয়, পুরো সাত শো টাকা। সাত দিনের মধ্যে ধার শোধ দেবার কথা ছিল, চার দিনের দিনই পৌঁছে দিয়েছে টাকা। সহাস্য মুখে প্রণাম করে উঠেছে। কিন্তু হঠাৎ এ কী বিস্ফোরণ! তুমি মিথ্যেবাদী, তুমি প্রবঞ্চক, তুমি অভদ্র—’তা ছাড়া আবার কী।’ বিদ্যাসাগর তেমনি গজরাতে লাগলেন: ‘তুমি না বলেছিলে তুমি পুলিশে কাজ করো?
‘আজ্ঞে হ্যাঁ—’
মিথ্যে কথা। একশো বার মিথ্যে।’
‘সে কি কথা? আপনি খোঁজ নিন, খোঁজ নিলেই জানতে পারবেন। সামান্য চাকরি, মিথ্যে বলতে যাব কেন?’
‘মিথ্যে ছাড়া আর কী বলব!’ একটু যেন প্রশমিত হয়েছেন বিদ্যাসাগর। কণ্ঠস্বরে নির্জলা ক্রোধের পরিবর্তে এসেছে যেন একটু অভিমানের ঝাঁজ: ‘এত দিনে কত লোক “দেব” বলে টাকা নিয়ে আর দিল না। অপারগের কথা ছেড়ে দিই, কত সম্পন্ন বড়লোকও টাকা ধার নিয়ে মেরে দিলে। বন্ধুবান্ধবের তো কথাই নেই। যে দেশে নিলে আর দিতে চায় না, সে দেশের লোক হয়ে, শুধু তাই নয় পুলিশের দারোগা হয়ে, পুরোপুরি ফিরিয়ে দেবে, এ বিশ্বাস করি কি করে? তা ছাড়া সাত দিনের কড়ার করে চতুর্থ দিনে ফেরত দেবে এ কল্পনার অতীত। তবে তোমাকে মিথ্যাবাদী বলব না তো কি! তোমার খালাস পাওয়া উচিত হয়নি। সাত দিনের কড়ারে টাকা নিয়ে চার দিনের দিন যে শোধ দেয় সে পুলিশের দারোগাগিরি করে জেলে যাবে না তো কে যাবে!
কাউকে চিঠি লিখতে বসেই প্রথমে লেখেন: ‘শ্রীহরিঃ শরণম্’। বাজে বা বেফাঁস কথা লেখবার লোক নন বিদ্যাসাগর। কিন্তু সংসারে বাস্তবচক্ষে যদি কারু শরণ নিয়ে থাকেন, তবে সে বাপ-মা। পাকপাড়া রাজবাড়ির হডসন সাহেবকে দিয়ে দুখানা ছবি করিয়ে নিয়েছেন—তাদের সামনে দিনারম্ভের প্রথম প্রণামটি না রেখে জলস্পর্শ করেন না বিদ্যাসাগর। ওই তাঁর হর-গৌরী। তাঁর রাম-সীতা। তাঁর লক্ষ্মী-নারায়ণ।
‘পাকপাড়া রাজবাড়িতে ভালো এক সাহেব পোটো এসেছে, মা ভগবতী দেবীকে বললেন বিদ্যাসাগর, ‘ইচ্ছে করছে তোমার একখানা ছবি আঁকিয়ে নি।’
দূর আমার ছবি কী হবে! ছি-ছি!’ ভগবতী দেবী মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
‘ছবি তো তোমার জন্যে নয়, ছবি আমার জন্যে। যখন যেখানে থাকি, সকাল-সন্ধে থাকবে আমার চোখের সামনে। প্রাণটা যখন কেমন করে উঠবে তখন একবার দেখব চোখ ভরে।’
রামকৃষ্ণের সেই কথা। যাকে দেখতে এসেছিস, চোখ মেলে চোখ ভরে দ্যাখ মা’র মুখখানি। ঈশ্বরের মুখের আভাস যদি কোথাও থাকে তবে এই মা’র মুখে।
‘না বাপু সাহেবের সামনে বসে ছবি আঁকাতে পারবো না।’ ভগবতী দেবী আবার পাশ কাটাতে চাইলেন।
‘না মা, সে খুব ভালো লোক, আমাকে খুব ভালোবাসে, তার সামনে বসতে দোষ নেই।’
একটু বোধ হয় নরম হলেন ভগবতী। বললেন, ‘তা সে এখানে আসবে তো?” ‘না মা, তোমাকে পাকপাড়ার রাজবাড়িতে গিয়ে বসতে হবে। সেখানে সে আড্ডা করেছে। সে আড্ডা ভেঙে এখানে আনতে গেলে ছবি হয়তো ভালো হবে না-
পুত্রের মুখের দিকে তাকালেন ভগবতী। বললেন, ‘তোর যা ইচ্ছে তাই কর। নিন্দে হলে লোকে তো আর আমাকে নিন্দে করবে না, তোরই নিন্দে করবে। বলবে, বিদ্যাসাগর মাকে পাকপাড়া ছবি তুলতে নিয়ে গেছে।’
লোকের নিন্দাকে বিদ্যাসাগর যেন কত ভয় করে! আমি মাতৃবন্দনা করব তায় লোকনিন্দা!
সেই মা’র মৃত্যুতে দশ দিক শূন্য হয়ে গেল বিদ্যাসাগরের। বালকের মত কাঁদতে লাগলেন অঝোরে। মৃত্যুর সময় কাছে থাকতে পাননি, সেবা করতে পাননি, দুটো কথা শুনতে পাননি, এ দুঃখ রাখবার জায়গা নেই। নির্জনে চলে গেলেন, ফিরতে লাগলেন দীনহীনের মত। পায়ে জুতো নেই, মাথায় ছাতা নেই, বেশে বাসে পরিচ্ছন্নতা নেই। থাকেন একাহারে, স্বপাকে নিরামিষ খেয়ে। নিতান্ত অসুস্থ হয়ে না পড়লে সাহায্য নেন না দিনময়ীর। কঠিন মেঝের উপর শুয়ে ঘুমোন। আর নিরবচ্ছিন্ন ভাবে তদ্গত চিত্তে মা’র গুণাবলীর ধ্যান করেন।
এমনি এক বছর। একটানা এক বছর।
কত বছর তার পর চলে গেছে। এক দিন কি কথায়-কথায় এক বন্ধু হঠাৎ তাঁর মা’র গুণের কথার উল্লেখ করলেন। যেই শোনা, কাতর কান্নায় ফেটে পড়লেন বিদ্যাসাগর।
বন্ধু তো অপ্রস্তুত। বিদ্যাসাগর অত্যন্ত পীড়িত, দেখা করতে এসেছিলেন। কথাচ্ছলে উঠে পড়েছিল ভগবতী দেবীর প্রসঙ্গ। কিন্তু ফল এমন হবে অনুমান করতে পারেননি। এ যে একেবারে শোকসমুদ্র!
‘এত কষ্ট দেব জানলে ও-কথা পাড়তুম না।’
‘কষ্ট? তুমি আমাকে কষ্ট দিলে কোথায়? তুমি তো আমার বন্ধুর মত কাজ করলে। তোমার জন্যে আমার মায়ের কথা মনে পড়ল, মায়ের নামে দু ফোঁটা চোখের জল ফেললাম। এত দুর্দশা, সব সময়ে বাপ-মাকে স্মরণ করতে পারি কই?”
এই বিদ্যসাগর। সাগরের তুলনা সাগর। ‘সাগরং সাগরোপমং’।
এই মাতৃসাধক কি সিদ্ধ নয়? নয় কি তপঃপরায়ণ ঋষি?
রামকৃষ্ণ কী করতেন? যত দিন চন্দ্রমণি জীবিত ছিলেন, রোজ সকালে গিয়ে প্রণাম করে আসতেন। বৃন্দাবনে থেকে যাবেন ভেবেছিলেন মায়ের কথা মনে পড়তেই বৃন্দাবন ভেসে গেল। তার পর মা যখন গত হলেন তখন রামকৃষ্ণের সে কী কান্না! রামকৃষ্ণের মন্ত্রই তো মা! মুখেই হোক আর মনেই হোক মাকে যে ডাকে সে তো ভগবতীকেই ডাকে। বিদ্যাসাগরের মা-ও তাই ভগবতী!
৪২
‘ব্রহ্ম যে কি মুখে বলা যায় না।’ বিদ্যাসাগরকে বলছেন রামকৃষ্ণ: ‘সব শাস্ত্র-দর্শন এঁটো হয়ে গেছে। তার মানে মুখে পড়া হয়েছে, মুখে উচ্চারণ হয়েছে। কিন্তু একটি জিনিস কেবল এঁটো হয়নি। সে ব্রহ্ম। সে অনুচ্ছিষ্ট।’
আনন্দে লাফিয়ে উঠলেন বিদ্যাসাগর। ‘বা, এটি তো বেশ কথা। এ কথা তো কোথাও শুনিনি! একটি নতুন কথা শিখলাম আজ।’
ব্রহ্ম অনুচ্ছিষ্ট।
একেবারে মুখের মধ্যে এনে ছেড়ে দিয়েছেন। ঘনিষ্ঠ আস্বাদের মধ্যে। রসনার রসাশ্রয়ে। কিন্তু সাধ্য নেই দন্তস্ফুট করো। মুখ খুলেছ কি উড়ে পালিয়েছে! বাক্যের ব্যর্থ অলঙ্কারে ভাবস্বরূপের বন্দনা চললেও বর্ণনা চলে না। ভূষণ দিয়ে কি রূপের উদ্ঘাটন হয়?
“কিন্তু যারা ব্রহ্মজ্ঞানী?
“তারা নুনের পুতুল। নুনের পুতুল সমুদ্র মাপতে গিয়েছিল। কত গভীর জল তার খবর দেবে। খবর দেওয়া আর হল না। যাই নামা অমনি গলে যাওয়া। কে কার খবর দেবে?’
মানুষ তো খুব বাহাদুর, তাই মনে করে আমরা তাঁকে জেনে ফেলেছি। সেই সে পিঁপড়ের গল্প। একটা পিঁপড়ে চিনির পাহাড়ে বেড়াতে গিয়েছিল। এক দানা খেয়ে পেট ভরে গেল। আরেক দানা মুখে করে বাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। যাবার সময় ভাবছে এবার এক সময় এসে গোটা পাহাড়টা নিয়ে যাব। ব্রহ্ম তো নির্লিপ্ত, কিন্তু ভগবানটি কে?
যিনিই ব্রহ্ম তিনিই ভগবান। একজনেরই দু রকমের পোশাক। বাড়িতে থাকার মত শাদাসিধে চেহারার একজন, আরেকজন বাইরে বেরুবার মত একটু ফিটফাট সাজগোজ। একজন গুণাতীত, আরেকজন গুণময়। একজন ষড়ভাবশূন্য, আরেকজন ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ।
আপনার কাকে বেশি পছন্দ, ব্রহ্মকে না ভগবানকে?
ব্রহ্ম যেন গতসর্বস্ব দেউলে। যেন নিষ্কিঞ্চন পথের ভিখিরি। চাল নেই চুলো নেই, যেন গাছতলায় আশ্রয়। যে বাবুর ঘর নেই দ্বার নেই, বিনি পয়সায় যে বিকিয়ে গেল, সে বাবু আর কিসের বাবু? ভগবান ষড়ৈশ্বর্যে প্রকাশমান। কত তাঁর প্রতাপ কত তাঁর প্রভুত্ব। তাঁর যদি ঐশ্বর্য না থাকত তা হলে কে মানত তাঁকে? আমার কিন্তু বাপু ব্রহ্মের চেয়ে ভগবানকে বেশি ভালো লাগে। ভগবান হচ্ছে রাজা, কিন্তু ব্রহ্ম হচ্ছে জমিহীন জমিদার।
ঈশ্বর যদি সর্বভূতেই আছেন, তবে একজনকে বেশি শক্তি আরেকজনকে কম শক্তি দিয়েছেন এর মানে কি?’
যেমন আধার তেমনি শক্তির আয়তন। শক্তি আধারের নয়, শক্তি তাঁর। তিনিই বিকশিত হয়েছেন। যেমন দীপ তেমনি আলো। যেমন মাঠ তেমনি ফসল। যেমন কলসী তেমনি সরা।
সব তিনি। তোমাকে যখন কেউ মানে তখন জানবে তাঁকেই মানে। তোমাকে যে মানে তাতে তোমার শিং বেরিয়েছে দুটো?
শুধু পাণ্ডিত্যে কিছু নেই। তাঁকে জানবার জন্যেই বই পড়া, জনে-জনে জানাবার জন্যে নয়। পাণ্ডিত্য হচ্ছে ঢাকের বাদ্যি। পাড়া-পড়শীর ঘুম না ভাঙিয়ে ক্ষান্তি নেই। সারা গায়ে গয়না পরে একা-একা নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কে কবে শান্তি পায়! বাইরের লোককে দেখাবার জন্যে রাস্তায় ছোটে। নামের পেছনে পদবীর পুচ্ছ নাড়ে। নিজের কথাটি পরের কথার উদ্ধৃতির স্তূপে চাপা দেয়।
শুধু কোটেশন আর ফুটনোট। জানতে তো জেনেছি কিছুই নয়, তবু কতটা পড়েছি তার ফর্দ নাও। আমার বাক্যের বহরে যদি একটু অবাক হও। যেমন ঐশ্বর্য দেখিয়ে সক্ষমভাবে চাই তোমাকে একটু ঈর্ষালু করতে। শুধু নিজেকে দেখানো। শুধু প্রাচীরপত্রে নিজের নামজারি।
যদি কাউকে জাহির করতে হয়, তাঁকে জাহির করো। যদি কাউকে সাব্যস্ত করতে হয় তাঁকে সাব্যস্ত করো।
‘আমি ও আমার, এই দুটি অজ্ঞান। আমার বাড়ি, আমার টাকা, আমার বিদ্যা, আমার ঐশ্বর্য, এই যে ভাব এ হয় অজ্ঞান থেকে।’ বললেন রামকৃষ্ণ: ‘আর, হে ঈশ্বর, তুমিই সব কর্তা, আর এ সব তোমার জিনিস–বাড়ি-ঘর, ধন-দৌলত, পুত্র-পরিবার, বন্ধু-বান্ধব—আমার বলতে কেউ কিছু নয়, সব তোমার—এইটিই জ্ঞানভাব।’
লোকে বুঝেও বোঝে না। ঘা খায়, আবার উঠে বসে অহঙ্কারের বেড়া মেরামত করে। সূর্য যে অস্তে চলেছে সেদিকে খেয়াল নেই। সারা দিন চলে শুধু এই মেরামতি টুকটাক। আত্মরতির ক্ষুদ্র-সংস্কার। দিন যায় দৈন্য আর যায় না। তার পর মৃত্যুর পর আবার খবরের কাগজে হেডলাইন দিতে ছোটে। হোমরা-চোমরা কে-কে এসেছিল শ্রাদ্ধ খেতে তার ফিরিস্তি ঝাড়ে। চাকরি থেকে পেনসন নিয়ে বাড়ি করে দরজার উপরে ছাড়া চাকরির নেমপ্লেট ঝোলায়।
সন্ন্যাসী শুয়ে আছে লোহার কাঁটার উপর। সংসারী শুয়ে আছে অহঙ্কারের কণ্টকে।
বড় মানুষের বাগানের সরকার, বাগান যদি কেউ দেখতে আসে, খুব আড়ম্বর করে বলে, এ বাগানটি আমাদের, এ পুকুরটি আমাদের। কিন্তু কোনো দোষ দেখে বাবু যদি তাকে ছাড়িয়ে দেন, তখন তাঁর আম কাঠের সিন্ধুকটাও নিয়ে যাবার তার যোগ্যতা থাকে না। বাবুর দারোয়ানকে দিয়ে সিন্দুকটা পাঠিয়ে দেয়।
হেসে উঠলেন বিদ্যাসাগর।
বদলি হবার সময় আদালতের ফার্নিচার ফেরত দাও। মায় দোয়াতদানটি পর্যন্ত। ভগবান দুই কথায় হাসেন, বললেন আবার রামকৃষ্ণ। এক হাসেন, কবরেজ যখন রুগীর মাকে বলে, মা, ভয় কি: আমি তোমার ছেলেকে ভালো করে দেব। এই বলে হাসেন, আমি মারছি, আর এ কিনা বলে, বাঁচাবে! আর হাসেন, ভাই যখন দড়ি ফেলে জায়গা ভাগ করে, আর বলে, এ দিক আমার, ও দিক তোমার। এই বলে হাসেন, আমার জগৎ ব্রহ্মাণ্ড, আর ওরা বলছে, এ জায়গা আমার!
“আচ্ছা, তোমার কী ভাব?’ ঈষৎ ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করলেন বিদ্যাসাগরকে। মৃদু-মৃদু, হাসছেন বিদ্যাসাগর। বললেন, ‘সে এক দিন আপনাকে গিয়ে বলব আমি চুপি-চুপি।’
আমার পরোপকারের ভাব। পর মানে ভগবান, উপ মানে সমীপস্থ, আর কার মানে কার্য। আমি এমন কার্য করব যাতে মুহূর্তে ভগবানের সমীপস্থ হয়ে যাব। ভগবানকে কি করে আনন্দিত করব? এত যাঁর আছে তাঁকে আর আমি কী দিয়ে খুশি করতে পারি? তাঁকে খুশি করতে পারি শুধু পরের অশ্রু মুছিয়ে। আপনি বলছেন ভগবান হাসছেন। আমি তো দেখি অহর্নিশি কাঁদছেন তিনি। কাঁদছেন ঘরে-ঘরে, পথে-পথে। শৃঙ্খলে নিপীড়িত হয়ে কান্নার ভাষা হারিয়ে, শাসনের কারাগারের দেয়ালে মাথা ঠুকে ঠুকে।
তিনিই সব এ ভাবটুকু থাকলেই হল। তাঁর জন্যেই সব করছি, নিজের নাম-যশের জন্যে নয়, গীতায় একেই বলেছে নিষ্কাম কর্ম । গীতায় এমনিতেও যা, ওলটালেও তাই। এমনিতেই গীতা, ওলটালে তাগী। তাগী মানে ত্যাগী। ত্যজ ধাতুর উপর বিহিত প্রত্যয়ে ভাগী ও সিদ্ধ। মরা-মরা বলতে-বলতে যেমন রাম হয়েছিল তেমনি গীতা-গীতা বলতে-বলতে ত্যাগী হয়ে যাও। নিজের সমস্ত জ্ঞান-কর্ম বিদ্যাবুদ্ধি তাঁর হাতে, একটা বৃহত্তম সত্তার উপলব্ধিতে, উৎসর্জন করো। এর জন্যে চাই বিশ্বাস। সংশয়ের ঝড়ের রাতে প্রত্যয়ের দীপবর্তি। এর হদিস পণ্ডিতের বিচারে নেই, আছে একটি নির্মলসরল বালকের বিশ্বাসে।
ষড়দর্শনেও তাঁর দর্শন হয় না, দর্শন হয় শুধু বালকের পবিত্রতায়। সেই যে কথায় বলে না, স্বয়ং রামের সাগর বাঁধতে হল আর হনুমান রামনামের বিশ্বাসের জোরে ডিঙিয়ে গেল এক লাফে।
‘যদি তাঁতে বিশ্বাস থাকে,’ বললেন রামকৃষ্ণ, ‘তা হলে পাপই করুক আর মহা-পাতকই করুক, কিছুতেই ভয় নেই।’
শক্তিতে হয় না, ভক্তিতে হয়। একের পর এক গান ধরলেন রামকৃষ্ণ। সুরে-সুরে সুধার হ্রদ নেমে এল মর্ত্যধামে৷
তত্ত্ব অতি সোজা। শুধু একটি ভালোবাসার তত্ত্ব। যাতে ঐ ভালোবাসাটি আসে তার জন্যেই তাঁকে মা বলা। মা বড় ভালোবাসার জিনিস।
বিদ্যাসাগরের চোখ ছলছল করে উঠল। এ কি আর বিদ্যাসাগরকে বোঝাতে হবে? পূজা হোম যাগযজ্ঞ, ও-সব কিছুই নয়। আসল হচ্ছে ভালোবাসা। যদি একবার ভালোবাসা আসে তবে কী হবে ও-সব অনুষ্ঠানে? যদি ভালোবাসা হবে কী হবে আর বেশভূষায়? চোখে যদি জল আসে কাজলের রেখা আর থাকে না।
‘তুমি যে সব কর্ম করছ এ সব সৎকর্ম।’ বললেন রামকৃষ্ণ, ‘যদি আমি কর্তা এই অহঙ্কার ত্যাগ করে নিষ্কামভাবে করতে পারো তা হলেই হল। এই নিষ্কাম কর্ম করতে-করতে ঈশ্বরে ভালোবাসা আসবে।’
একেক জনের একেক রকম পথ। কারু জ্ঞানে, কারু ভক্তিতে, কারু বা শুধু নিষ্কাম কর্মে। নিষ্কাম কর্মই নিয়ে যাবে মনস্কামের চরম তীর্থে।
‘আমি বলছি, নিষ্কাম কর্মই হচ্ছে ঈশ্বরপ্রেম। আর ভালোবাসা হলেই দর্শন। আর সব দর্শনে চোখাচোখি হয় না, ভালোবাসাতেই মুখচন্দ্রিকা। হ্যাঁ গো, দেখা যায় ঈশ্বরকে। তাঁর সঙ্গে কথা কওয়া যায়। এই যেমন তোমাকে দেখছি চোখের উপর চোখ রেখে। এই যেমন কথা কচ্ছি তোমার সঙ্গে মুখোমুখি হয়ে।’
রাত হচ্ছে, এবার উঠবেন রামকৃষ্ণ।
‘যা সব বলছি তোমাকে তুমি সব জানো।’ হাসলেন রামকৃষ্ণ: ‘তবে খবর নেই। বরুণের ভাণ্ডারে কত-কি রত্ন আছে, বরুণ রাজার খবর নেই।
‘তা আপনি বলতে পারেন।’ হাসলেন বিদ্যাসাগর।
‘অন্তরে সোনা আছে, কিন্তু একটু মাটি চাপা পড়ে আছে। যদি একবার সন্ধান পাও, তখন অন্য কর্ম কমে যাবে। শুধু খনন করবে সেই গহন অন্তর। ঐ দেখ না, গৃহস্থের বউ-এর কত কর্ম, অন্তঃসত্ত্বা হলেই কর্ম কমে আসে। শেষে ছেলে হলে ছেলেটিকেই নিয়ে থাকে, ওটিকে নিয়েই নাড়াচাড়া করে। সংসারের কাজ আর শাশুড়ি করতে দেয় না।’
তাই শুধু এগোও। কর্মারণ্যে কুঠার হাতে করে কাঠ কাটতে বেরিয়েছ, কিন্তু শুধু চন্দন গাছ দেখেই থেমে যেও না। ঐ কুঠারে যে রূপোর খনি সোনার খনিও খুঁড়তে হবে। তবে থামছ কেন? এগোও, এগিয়ে যাও। মণি-মাণিক্যের ভাণ্ডার রয়েছে সামনে। অন্তরেই সেই আকর, অন্তরেই সেই রত্নাগার। থেমো না, আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে পোড়ো না-
এখনি অন্ধ বন্ধ কোরো না পাখা! অনেক তোমার সম্ভাবনা। অনেক তোমার প্রতিশ্রুতি। তোমার মাত্রাহীন যাত্রা। তোমার সংক্রান্তিহীন দিনপঞ্জী। প্রতিদিনই তোমার জন্মদিন।
‘সব জানো, তবে খবর নেই।’
‘তা কখনো হয়?’
‘হ্যাঁ গো, অনেক বাবু জানে না চাকর-বাকরের নাম কি।’ উঠলেন রামকৃষ্ণ।
‘একবার যেয়ো বাগান দেখতে। রাসমণির বাগান। ভারি চমৎকার জায়গা।’
‘যাবো বৈ কি। আপনি এলেন আর আমি যাবো না?’
‘আরে আমার কাছে যাবে কি? ছি-ছি! বাগান দেখতে যাবে।’
‘সে কি কথা!’ একটু ক্ষুণ্ণ হলেন কি বিদ্যাসাগর বললেন, ‘ও কথা বলছেন কেন?’
‘আরে, আমরা হচ্ছি জেলেডিঙি। খাল-বিলেও যেতে পারি, আবার বড় নদীতেও যেতে পারি। কিন্তু তুমি হচ্ছো জাহাজ, কি জানি যদি যেতে গিয়ে চড়ায় হঠাৎ ঠেকে যায়—’
সকলে হেসে উঠল।
রামকৃষ্ণ টিপ্পনি কাটলেন: ‘তবে এ সময় যেতে পারে জাহাজ।’
ইঙ্গিত বুঝে নিলেন বিদ্যাসাগর। বললেন, ‘হ্যাঁ, এটি বর্ষাকাল বটে।
নবানুরাগের বর্ষা। নবানুরাগের সময় মান-অপমান থাকে না, বিদ্যা অবিদ্যা থাকে না, শুধু জলে জলময়। তখন প্রেমের নদী, প্রেমের হাওয়া, প্রেমের ময়ূরপঙ্খী। প্রেমের অঞ্জনে তখন বিশ্বময় নিরঞ্জন।
দাঁড়িয়ে মূল মন্ত্র জপ করছেন রামকৃষ্ণ। ভাবারূঢ় হয়েছেন। হয়তো বিদ্যাসাগরের আধ্যাত্মিক মঙ্গলের জন্যে প্রার্থনা করছেন মা’র কাছে।
ভক্তসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নামছেন ধীরে-ধীরে। নিজের হাতের মধ্যে একটি ভক্তের হাত ধরা। আগে-আগে বাতি হাতে চলেছেন বিদ্যাসাগর।
শ্রাবণের কৃষ্ণপক্ষ। ষষ্ঠীর চাঁদ দেখা দেয়নি এখনো। বাগানে অন্ধকার। তার মধ্য দিয়ে বাতির একটি ক্ষীণ রেখা চলেছে ফটকের দিকে। সেই ক্ষীণ রেখার পিছনেই জ্যোতিষ্মান দিনকর। জগৎজোড়া অন্ধকারের মধ্যে দেখা যাচ্ছে কি সেই আশার ক্ষীণ-দ্যুতি? সেই আভাসের পিছনে নব ভাস্করের আবির্ভাব?
ফটকের সামনে কে একজন গৌরবর্ণ পুরুষ দাঁড়িয়ে। বয়েস চল্লিশের কাছাকাছি । মাথায় পাগড়ি, দাড়িগোঁফ একমুখ। শিখ নাকি? অথচ পরনে ধুতি, পায়ে জুতো-মোজা। বাঙালী তো, গায়ে চাদর নেই কেন?
রামকৃষ্ণকে দেখামাত্রই পাগড়িশুদ্ধ মাথা পায়ে লুটিয়ে দিল।
‘এ কি? তুমি? বলরাম? এত রাত্রে?”
‘অনেকক্ষণ এসেছি। দাঁড়িয়েছিলাম এখানে।’
‘সে কি? ভেতরে যাওনি কেন?’
‘সবাই আপনার কথা শুনছেন, এর মধ্যে আমি গিয়ে কেন তালভঙ্গ করি?’
ঘরের মধ্যেই থাকি আর দরজার বাইরেই থাকি, আমি আছি আমার ভাবের ঘরের দরজা খুলে।
ঠাকুর গাড়িতে উঠলেন।
মাস্টারের কানে-কানে বললেন বিদ্যাসাগর, ‘গাড়িভাড়া দেব?’
‘আজ্ঞে না, ও হয়ে গেছে।’
বিদ্যাসাগর প্রণাম করলেন ঠাকুরকে। প্রত্যেকে, একে-একে।
গাড়ি চলল দক্ষিণেশ্বর। কিন্তু গাড়ির মধ্যে যিনি বসে তিনি চলেছেন কোথায়? তিনি চলেছেন জীবের ঘরে-ঘরে। কায়ে মনে আর বাক্যে একটি শুধু বাণী নিয়ে। সে বাণী ভালোবাসার বাণী। শুধু ভালোবাসা। ঈশ্বরকে ভালোবাসা। ঈশ্বরকে ভালোবাসলেই আর সকলকে ভালোবাসবে। এ জীবন পেয়েছ শুধু সেই ভালোবাসার আলো জ্বালাতে। গাঁথতে শুধু সেই একটি ভালোবাসার বরমালা।
৪৩
তুমি তোমার সিংহাসন ছেড়ে নেমে এলে। নেমে এলে আমার পর্ণকুটিরের ভগ্ন-দুয়ারে। আমার দুয়ারের চৌকাঠে ঠেকে যাবে বলে ফেলে এলে তোমার রাজমুকুট। আমি দীনদুঃখী বলে পরে এলে রিক্ততার সাজ। আমি ছোট বলে তুমিও ছোট হলে। আমি কি তোমাকে ছোট করেছি? তুমি নিজেই ছোট হয়েছ আমার জন্যে। আমি দুর্বল বলেই সুলভ হয়েছ। ভঙ্গুর বলেই হয়েছ সুকোমল। নইলে তোমাকে ধরি কি করে? রাখি কি করে বুকের নিবিড়ে?
কিন্তু ছোট হয়ে শুনতে চাও তুমি বড় কথা। আমার ছোট মুখের বড় কথা। সে-কথাটির নাম ভালোবাসি। তোমাকে ভালোবাসতে পারলেই বিশ্বসংসার ভরে উঠবে, ঘুচে যাবে সব ঘর-গড়া ব্যবধান। এইটিই বড় কথা। এইটিই শোনবার জন্যে ছোট হয়ে কাছে এসেছ। ছোট হয়েছ বড় করবার জন্যে। রিক্ত সেজেছ মুক্তিরপথ দেখাতে।
তুমি ভিখারি শিব। ভস্মমাখা। হাড়ের মালা গলায় দোলানো। তুমি নিষ্কিঞ্চন বলেই তো প্রবঞ্চিতের বন্ধু। সরল বলেই তো ডাক দিয়েছ সহজ হতে।
কিন্তু এ কেমনতরো শিব? কেমনতরো সাধু? থেকে-থেকে কেবল হাত পাতে। কেবল খেতে চায়।
দু পয়সার দেদো সন্দেশ কিনে দক্ষিণেশ্বরে এসেছে অঘোরমণি। থাকে কামার-হাটিতে, দত্তদের ঠাকুরবাড়ির দক্ষিণের কোঠায়। রাধাকৃষ্ণের মন্দির। নিজের হাতে ভোগ রাঁধে অঘোরমণি। কলাপাতায় করে গোপালের জন্যে ভোগ সাজায়। গঙ্গা-জলের ছোট গ্লাশ পাশে রেখে পিঁড়ি পাতে সামনে। এস, বসো, খাও- আহ্বান করে গোপালকে।
দু পয়সার দেদো সন্দেশের জন্যেই হাত বাড়ায় রামকৃষ্ণ। বলে, ‘কই, কি এনেছ আমার জন্যে? দাও। ওকি, ঢাকছ কেন আঁচলে?’
ছি-ছি, অমন রোথো সন্দেশও কেউ চায় হাত বাড়িয়ে! লজ্জায় পিছিয়ে গেল অঘোরমণি। কত ভালো জিনিস এনে খাওয়াচ্ছে ভক্তেরা, কত তবক দেওয়া, কত-বা রাংতা-জড়ানো। অঘোরমণির যেমন অদৃষ্ট, দু পয়সার দেদো সন্দেশের বেশি জোটেনি। তা, লুকিয়ে এনেছি আঁচলের তলায়, একেবারে আসা মাত্রই খেতে চাওয়ার কী হয়েছে? একটু রয়ে-সয়ে ধীরে-সুস্থে চাইলেই তো হয়।
‘দাও না গো! এনেছ তো লুকোচ্ছ কেন?’
কুণ্ঠিতভঙ্গিতে সন্দেশগুলো বের করে দিল অঘোরমণি। তুচ্ছ জিনিস নিয়ে এসেছি তোমার জন্যে, কিন্তু তুমি কি আমার নৈবেদোর দৈন্য ধরবে? দেখবে না কি আমার নিবেদনের ভাবটি? তুমি কি ভাবে নও? তুমি কি উপকরণে? স্বচ্ছন্দে মুখে পুরল সেই দেদো সন্দেশ। সানন্দে খেতে লাগল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘তুমি গরিব মানুষ, পয়সা খরচ করে বাজার থেকে সন্দেশ আনো কেন?
ন বছরে বিয়ে হয়েছিল, তেরো বছরে বিধবা হয়েছে। অল্প কিছু ধানজমি পেয়েছিল শ্বশুরঘর থেকে, বিক্রি করে তারই সামান্য আয়ে দিন চালায়। দিন কি আর চলে? দিন না চলে তো মনও চলে না। মন অচল হয়ে পড়ে থাকে বিগ্রহের পদমূলে।
গোপালমন্ত্রে দীক্ষা নিয়েছে অঘোরমণি। সমস্ত সৃষ্টির যে সম্রাট তাকে সে সন্তান-রূপে কাছে টেনে এনেছে। দিন কাটাচ্ছে শুধু মন্দিরের তদারকে। ফুল তুলছে, মালা গাঁথছে, চন্দন বাটছে, বাসন মাজছে, ঝাঁটপাট দিচ্ছে। তারপর কোনোরকমে নিজের স্নানাহার সেরে বাকি সময় শুধু জপযজ্ঞ। শুধু মানসনামগুঞ্জন।
এমনি এক-আধ দিন নয়, একটানা তিরিশ বছর।
‘নারকোলের নাড়ু করবে নিজের হাতে, তাই আনবে দুটো-একটা।’ কিন্তু এতেও বিশেষ আগ্রহ নেই রামকৃষ্ণের। বললে, ‘যা নিজের জন্যে রাঁধো, তারই থেকে কিছু নিয়ে এলেই তো ভালো হয়। কী রেঁধেছিলে আজ? লাউশাকের চচ্চড়ি, না, আলু-বেগুন-বড়ি দিয়ে সজনেখাড়ার ঘ্যাঁট? তাই নিয়ে এসো না দু-একদিন। তোমার হাতের রান্না খেতে বড় সাধ যায়।’
কেবল খাওয়া আর খাওয়া। এ ছাড়া সাধুর কি আর কোনো কথা নেই? দত্তগিন্নি খুব ভালো সাধুরই খোঁজ দিয়েছে যা হোক। গোপাল-গোবিন্দের কথা নেই, শুধু এ-খাই না ও-খাই। দূর ছাই, আর আসব না। আমি অনাথ-কাঙাল লোক, কোথায় পাব অত ভোজনের পারিপাট্য। নিজের পেট চলে না, এখন আবার অতিথি খাওয়াই।
তাও, যে অতিথি দুয়ারে এসে দাঁড়ায় না, দূর থেকে বসে হুকুম দেয়। দরকার নেই অমন আদিখ্যেতায়। কিন্তু কি হল অঘোরমণির, কদিন যেতে না যেতেই চচ্চড়ি রেঁধে হাজির হল দক্ষিণেশ্বরে।
‘দাও, দাও, কী এনেছ বাটিতে করে? লাউশাক না সজনেখাড়া?’ হাত বাড়িয়ে বাটিটা টেনে নিল রামকৃষ্ণ। কোনোরকম ভূমিকা না করে খেতে লাগল রসিয়ে-রসিয়ে। বললে, ‘আহা, কী রান্না! সুধা! সুধা!’
অঘোরমণির চোখে জল এল। কী এমন রেঁধেছি, সাধু একেবারে স্বাদে-গন্ধে গদগদ হয়ে উঠেছে। কী করুণা এই সাধুর! দরিদ্র বলে উপেক্ষা করল না, সাধারণ ব্যঞ্জনে কী অসাধারণ ব্যঞ্জনা পেল না জানি। এমন একটি মশলা এসে মিশেছে যা বাজারে কেনা যায় না, সেটি হৃদয়-রসের পাঁচফোড়ন। ভক্তি-প্রীতির সম্বরা। যতই খায় ততই শুধু খাই-খাই। এটা আনো ওটা আনো। এটা রাঁধো ওটা রাঁধো। আর কোনো প্রসঙ্গ নেই, শুধু ভোজনবিলাস! শুধু নোলার শকশকানি। অনেক সাধু দেখেছি জীবনে কিন্তু এমন পেটুক সাধু দেখিনি!
এ তুমি আমাকে কোথায় এনে ফেললে! গোপালের কাছে মনে-মনে কাঁদে অঘোরমণি। এমন সাধুর কাছে আনলে যার খাওয়া ছাড়া আর কথা নেই। ধর্ম-কর্মের ধার ধারে না, যেন খাওয়াই পরমার্থ। এত আমি খাওয়াই কি করে? আমার ভাঁড়ার কি অফুরন্ত?
রাত তিনটের সময় জপে বসেছে অঘোরমণি। জপ সেরে প্রাণায়াম শুরু করেছে, কে একজন তার পাশে এসে বসল। গা ছমছমিয়ে উঠল অন্ধকারে। কে, কে তুমি? চমকে চোখ চেয়ে দেখল—একি, এ যে সেই দক্ষিণেশ্বরের সাধু। ডান হাত মুঠ করে ধরা, যেমনটি দেখেছে দক্ষিণেশ্বরে, আর মুখে সেই মধুর মৃদুল হাসি। এত রাতে এল কি করে এখানে? অন্ধকারে পথ চিনে-চিনে?
আশ্চর্য একটা সাহস হল অঘোরমণির। নিজের বাঁ হাত বাড়িয়ে ধরল রামকৃষ্ণের বাঁ হাত। মূহুর্তে ঘটে গেল অভাবনীয়। পাশে বসে আর সেই প্রৌঢ় রামকৃষ্ণ নেই, তার বদলে একটি দশ মাসের শিশু। নধর নবনীতকোমল। স্নেহদ্রব নবজলধর। একি, এ যে সত্যিকার গোপাল! হামা দিয়ে একেবারে বুকের কাছে চলে এল দেখছি। হাত তুলে মুখের দিকে তাকিয়ে বলছে, ‘মা গো, ননী দে।’ এ কি কাণ্ড! অঘোরমণি আকুলকণ্ঠে কেঁদে উঠল: ‘বাবা, আমি কাঙালিনী চির-দুখিনী। ননী কোথা পাব? আমি খুদ খাই পাতা কুড়ুই।
সেকথা শুনে নিবৃত্ত হবার ছেলে নয় গোপাল। অঘোরমণির আঁচল টানে, হাত থেকে মালা কেড়ে নেয়। বলে, ও-সব আমি শুনছি না। মা হয়েছিস কেন তবে? খেতে দিবি কি না বল—’
শিকে থেকে নারকেল নাড়ু বের করে অঘোরমণি। ছোট হাতখানি ভরে নাড়ু দেয়। বলে, ‘বাবা গোপাল, তোমাকে এ বাসি জিনিস দিতে বুক ফেটে যাচ্ছে—’তার আগে যে খিদেয় আমার পেট চুপসে যাচ্ছে। বাসি নাড়ু বাসি নাড়ুই সই। সন্তানবিরহে যে মা উপবাসী, তার সঞ্চিত স্নেহ কি কখনো বাসি হয়?
মুখ ভরে খেতে লাগল গোপাল। উপভোগের আনন্দে চোখের পাতা নাচতে লাগল। কিন্তু খেয়েই কি সে শান্ত হবে? না কি সে শান্ত হবার মত ছেলে? ঘরময় ছুটোছুটি করে বেড়াতে লাগল। কখনো বা অঘোরমণির কোলে, কখনো বা কাঁধে চেপে বসতে লাগল। জপ-তপ ঘুচে গেল অঘোরমণির।
সকাল হলেই ছুটল দক্ষিণেশ্বরের দিকে। ছুটল প্রায় পাগলিনীর মত। অগোছাল চুল, অসামাল বেশবাস। বুকের উপর দুবাহুর মধ্যে কখন উঠে এসেছে গোপাল। তার রাঙা পা দুখানি টুকটুক করছে বুকের উপর।
গোপাল! গোপাল! বলতে-বলতে রামকৃষ্ণের ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল অঘোরমণি। কোনো দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই, রামকৃষ্ণের পাশ ঘেঁষে বসে পড়ল। আর, এরই জন্য যেন অপেক্ষা করছিল রামকৃষ্ণ। ভাবাবেশে অঘোরমণির কোলে চড়ে বসল।
যে দেখল সেই অবাক। বাষট্টি বছরের বুড়ির কোলে আটচল্লিশ বছরের প্রৌঢ় সন্তান! যে ঠাকুর স্ত্রীজাতির ছোঁয়া সহ্য করতে পারেন না তাঁর এ কেমনতরো ব্যবহার! কেমনতরো তা কে বোঝে! একবার মা হয়ে কোলে নিয়েছিল ছেলেকে, রাখালকে, এবার ছেলে হয়ে কোলে বসলো মা’র!
ক্ষীর-সর খাইয়ে দিতে লাগল অঘোরমণি। খাইয়ে দিচ্ছ তো কাঁদছ কেন? অন্তরের স্নেহধারা নয়নের অশ্রুধারা হয়ে বেরুচ্ছে। আমি নন্দরানি–তুমি নন্দদুলাল। তুমি গোপাল আর আমি গোপালের মা-
ভাব সংবরণ করে সরে বসল রামকৃষ্ণ। কিন্তু গোপালের মা’র আর ভাব থামে না। ছেলে সরে বসে, কিন্তু মা’র স্নেহভাবের কি ইতি আছে? সে ভালোবাসায় কি ভাঁটা পড়ে? সেখানে শুধু জোয়ারের জল। শুধু ঢেউয়ের পর ঢেউ। তাই ঘরময় নাচতে লাগল অঘোরমণি। আর গাইতে লাগল, ‘ব্রহ্মা নাচে বিষ্ণু নাচে আর নাচে শিব।’
‘দেখ দেখ আনন্দে ভরে গেছে। গোপাললোকে চলে গেছে গোপালের মা।’ বললে রামকৃষ্ণ।
‘এই যে গোপাল আমার কোলে, এই যে আবার তোমার ভেতর, নৃত্যের আর বিরাম নেই অঘোরমণির ‘আয়রে গোপাল বেরিয়ে আয় আয়রে আমার কঠিন কোলে–
এবার ছেলের হাতে কিছু খাও গোপালের মা। ছেলের ভালোবাসার কিছু স্বাদ নাও। নিজের হাতে খাইয়ে দিল রামকৃষ্ণ। বুকে হাত বুলিয়ে ভাবভূমি থেকে নিয়ে এল বাস্তবভূমিতে।
‘বড় দুঃখে দিন কেটেছে বাবা। কোথায় ছিলি তুই এতদিন? টেকো ঘুরিয়ে সুতো কেটে দিন কেটেছে। আজ বুঝি তোর দুখিনী মায়ের কথা মনে পড়লো? তাই এত আদর করছিস মাকে? বল, যখন একবার তোকে কোলে পেলাম, আর তুই যাবি না কোল ছেড়ে—’
রামকৃষ্ণ এখন নিজেই রামলালা।
অনেক বলে কয়ে সন্ধের দিকে পাঠিয়ে দিল অঘোরমণিকে। নিজের বাড়ি কামারহাটিতে। কিন্তু যখনই পথে নেমেছে, গোপাল কখন ছুটে এসে দিব্যি কোলে চড়ে বসল। তা বসেছিস বোস, বুকে করে নিয়ে যাচ্ছি বাড়ি। কিন্তু বাড়ি এসে এ তুই কী রঙ্গ শুরু করে দিলি? এ কি, আমাকে আজ তুই জপ করতে দিবিনে দুষ্টু ছেলে? বেশ, তাই, করব না জপ, মালার থলে গঙ্গাজলে ফেলে দেব। কিন্তু এখন তুই কী চাস বল তো? এই তো দেখছিস আমার বিছানার ছিরি, শুকনো তক্তপোশের উপর ছেঁড়া মাদুর পাতা। নরম বিছানা-বালিশ আমি পাব কোথায়? শুবি তো শো এই শুকনো কাঠে। শুয়েছে বটে কিন্তু গোপালের স্বস্তি নেই। খুঁতমুত করতে লেগেছে। দুধের শিশুকে কি তার মা এমন কঠিন বিছানায় শুতে দেয়? বালিশ নেই তোষক নেই, এ কী নিষ্ঠুরতা!
‘বাবা, আজ এরকমই শোও, কাল কলকাতায় গিয়ে নরম বিছানা করিয়ে দেব। বাঁ বাহুর বালিশে গোপালের মাথা রেখে ঘুম পাড়াল গোপালের মা। মাতৃঅঙ্গের স্নেহস্পর্শ পেয়েছে, আর চাই কি গোপালের! অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল। অঘোরমণিকে দেখিয়ে রামকৃষ্ণ বললে, ‘এ খোলটা কেবল হরিতে ভরা। হরিময় শরীর।’ মাথা থেকে পা পর্যন্ত হাত বুলিয়ে দিলে। শিশু যেমন মাকে আদর করে তেমনি। পায়ে হাত দিয়েছে বলেও চমকাল না গোপালের মা। ছেলে যদি পায়ে হাত দেয়, মা কি চমকায়, না, প্রসন্ন হয়ে আশীর্বাদ করে?
সেদিন বাড়ি ফেরবার সময় মাকে অনেকগুলি মিছরি দিলে রামকৃষ্ণ। ভক্তরা যত এনেছিল উপহার, সমস্ত। গোপালের মা বললে, ‘এত মিছরি দিয়ে কী হবে?” তার চিবুক ধরে সোহাগ করে বললে রামকৃষ্ণ, ‘ওগো, আগে ছিলে গুড়, পরে হলে চিনি, এখন হয়েছ মিছরি। এখন মিছরি খাও আর আনন্দ করো।’
সন্তান কোলে নিয়ে মেয়েরা যেমন কোমর বেঁকিয়ে হাঁটে, তেমনি করে চলে গোপালের মা। ‘না বিইয়ে কানাইয়ের মা।’ সর্বজীবে গোপাল দেখে। ক্ষুধার্ত ভগবান মাতৃহৃদয়ের কাছে স্নেহের নবনী ভিক্ষা করে ফিরছেন।
আত্মীয়ের মধ্যে একটি শুধু বেড়াল। বেড়ালের মধ্যে ঠাকুর দেখেছেন কালী, অঘোরমণি দেখছে গোপাল। সেবার ঠাকুর তখন অপ্রকট হয়েছেন, বোসপাড়া লেনের বাড়িতে সিস্টার নিবেদিতার ঘাড়ে বেড়ালটি ঘুমিয়ে আছে। নিবেদিতাও নির্বিকার। এ কি দুর্দৈব, কে একজন স্ত্রী-ভক্ত তাড়িয়ে দিল বেড়ালটাকে। ‘আহাহা, কি করলি মা, কি করলি? গোপাল যে চলে গেল, চলে গেল—’ কিন্তু কোথায় সে যাবে? সে যে বস্ত্রাঞ্চলের নিধি। সকাল হতেই চলেছে সে বাগানে মা’র সঙ্গে কাঠ কুড়োতে। পিঠে পড়ে মা’র রান্না দেখতে। পকুরে নেমে ঝাঁপাই ঝুড়তে।
দিন যায়। অঘোরমণি বুড়ো হয়, কিন্তু গোপাল আর বড় হয় না। চিরকাল মা’র বুকের আঁচল ধরে টানে আর কাঁদে, ‘মা খেতে দে, খিদে পেয়েছে–
কোথায় তুমি খেতে দেবে, তা নয়, তুমিই খেতে চাও! ভ্রমর হয়ে ফিরছ গুঞ্জন করে, গুনগুন করে বলছ, কোথায় ফুলটি ফুটেছে, কে আমাকে একটু মধু দেবে!
দ্বিতীয় খণ্ড সমাপ্ত
