পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.৩০
৩০
বাড়ি ফিরে এল নরেন। ফিরে এল তার নিভৃত ঘরের অন্ধকারে।
চক্ষু মেলে কী দেখে এল সে দক্ষিণেশ্বরে! বৈরস্য ও নৈরাশ্যের মরুভূমিতে এ কে সজলতা ও সরসতার অভিষেক! দৈন্য ও মালিন্যের মাঝে এ কে প্রসাদপবিত্র আনন্দ! ধূলি ও গ্লানির রাজ্যে নির্মলশ্যামল নিমুক্তি! নিত্য অভাবের দেশে অমৃতপুঞ্জিত পরিপূর্ণতা! স্বপ্ন দেখে এল না কি নরেন? না কি রঙ্গমঞ্চের অভিনয়?
যাই বলো, পাগল ছাড়া কিছু নয়। পাগল না হলে বলে কি না ঈশ্বরকে দেখা যায় স্বচক্ষে? কি করে দেখবে? যে নির্বিকার নিরাধার গুণাতীত লোকাতীত, যে অবাঙমনসোগোচর, সে কখনো ধরা দেয় চোখের সম্মুখে? তুমি দাঁড়াও, আমি দেখি—বললেই সে কি আকারিত হয়? যে অকায়, তার আবার আকার কি! যে অসঙ্গ তার আবার সীমা কোথায়! যে অরূপ সে তো দিগদেশ-কালশূন্য।
নরেন পড়েছে, যা আত্মা তাই ঈশ্বর। আত্মা অজ, তার জন্ম নেই। অমর, তার মৃত্যুও নেই। নিরবয়ব বলেই অজ। নির্বিকার বলেই অবিনাশী। এ হেন যে আত্মা সে আবার মূর্তি ধরবে কি? মূর্তি ধরলে কোন মূর্তি ধরবে? যে ব্যাপী তার পরিচ্ছেদ কোথায়, পৃথকত্ব কোথায়?
কিন্তু এমনভাবে বললেন, উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেই স্থির-স্নিগ্ধ উজ্জল দুই চক্ষের আলোয় কোথাও যেন এতটুকু ছায়া থাকে না সন্দেহের। দেখা যায় ঈশ্বরকে—এ যেন চোখের সামনে এই দেয়াল দেখার মত। ভোরে উঠে সূর্য দেখার মত। রাত্রে উঠে অন্ধকার দেখার মত। কথার মধ্যে এতটুকু গায়ের জোর নেই, এ যেন সরল জল-ভাত। এ যেন বিশ্বাসের পাষাণে আন্তরিকতার শিলালিপি। সত্যের কষ্টিপাথরে সারল্যের স্বর্ণাক্ষর।
কিন্তু কি হলে, কি করলে দেখা দেবেন ঈশ্বর? খুব করে বিনতি-মিনতি করব—স্তুতি-চাটুক্তি করব? তা হলেই কি ঈশ্বর কান পাতবেন? মিথ্যে কথা। আমাকে যদি কেউ খোশামোদ করে, আমি তো বেজায় চটে যাই। যা আমার কাছে বিরক্তিকর, তাই ঈশ্বরের কাছে সুখকর হবে? আর, নিজেকে যে অত্যন্ত ছোট বলে ভাবব সেটাও তো মিথ্যে ভাবা হবে। আমিই তো দীনের দীন হীনের হীন নই—আমার চেয়েও তুচ্ছ, আমার চেয়েও অধম লোক আছে অনেক সংসারে। তাই মিথ্যে কথায় বাজে কথায় ঈশ্বর মুগ্ধ হবেন এ ক্ষুদ্রতা যেন আমার না হয়!
তা ছাড়া আমার চেয়ে অনেক যিনি বেশি বোঝেন, তিনি আমারই আদেশ-অনুরোধের অপেক্ষা করছেন, এ বুদ্ধি স্পর্ধার নামান্তর। তিনি কি করবেন না-করবেন তা আমার বলা না-বলায় ঠিক হবে না। তাই যতই কেননা ‘দেখা দাও’ ‘দেখা দাও’ বলে দেয়ালে মাথা ঠুকি, মাথাই ভাঙবে, দেয়াল নড়বে না একচুল।
ঈশ্বর কি একটা বস্তু? একটা দ্যুতি? একটা দ্যোতনা? তাঁকে কি করে দেখা যাবে?
তাঁকে দেখা যায় না। তিনি কি শিলা, না দারু না ভূমি? তিনি কি কাঠ-খড়, না তাম্র-পিত্তল?
আর, তাঁকে দেখেই বা আমার কী লাভ! তাঁকে দেখলেই কি আমার তাপত্রয় ঘুচে যাবে? তাই যদি হত, তবে এত যাঁর করুণা আর ঐশ্বর্য, তিনি দর্শন দিয়ে সমস্ত জীব-জগৎকে একযোগে মুক্ত করে দিতেন। লোকের শোক-ক্রন্দন দৈন্য-অনুনয়ের জন্যে বসে থাকতেন না।
কে বলে তিনি প্রত্যক্ষীভূত নন? ‘বল দেখি রে তরুলতা, আমার জগজ্জীবন আছেন কোথা?’—এ কান্নার প্রয়োজন কি! তিনি তো হাতের কাছেই আছেন, এই আমার চোখের কাছে। তাঁকে আবার দেখব কি, পাব কি! তাঁকে তো প্রতিক্ষণেই দেখছি, প্রতিক্ষণেই তো ডুবে রয়েছি, মিশে রয়েছি তাঁতে। যিনি সর্বত্রস্থ, তাঁর আবার দূর-নিকট কি—যিনি সর্বব্যাপী, তিনি তো অন্তরে-বাহিরে সমান বর্তমান। তিনি তো আমার মধ্যেও আছেন। চমকে উঠল নরেন। মনে পড়ল দক্ষিণেশ্বরের সেই স্তববাণী: ‘তুমিই সেই পুরাণ পুরুষ, তুমিই সেই নররূপী নারায়ণ—’
আমিই সেই?
‘চিদানন্দরূপঃ শিবোহহং শিবোহহং?” আমিই কি সেই ওঙ্কারগম্য সঙ্গহীন শিব? মনোবাগতীত প্রকাশস্বরূপ? নিরাকার, অত্যুজ্জ্বল, মৃত্যুহীন?
কে বলে? উন্মাদ! যে বলে সে উন্মাদ ছাড়া আর কিছু নয়! কিন্তু যদি সে উন্মাদ তবে সে এত ভালোবাসে কেন? চেনে-না-শোনে না, নিজেকে লুকিয়ে রাখে সরিয়ে রাখে, অথচ আলো-বাতাসের মত আপ্রাণ ভালোবাসে, সে কি উন্মাদ?
দূর ছাই, ভাবব না তার কথা। কিন্তু না ভেবে থাকো তোমার সাধ্য কি। থেকে-থেকেই সে লোক কেবল উঁকিঝুঁকি মারে। বলে, যদি তুমি আছ তা হলে আমিও আছি।
যদি আমি আছি তা হলে তুমিও আছ! এই তুমি’টির কি কোনো মানস মূর্তি নেই? নেই কোনো মানুষ মূর্তি? থেকে-থেকেই ঠাকুরের মোহন মূর্তি দেখা দেয় চোখের সামনে। দয়াঘন আনন্দকন্দ জগদ্বন্ধু।
দূর ছাই, যাই আরেকবার দক্ষিণেশ্বর। তাঁকে আরেকবার দেখে আসি।
এ কি শুধু অলস কৌতূহল, না, আর কোনো অনিবার্য আকর্ষণ? যদি আকর্ষণই হয় তবে এর পেছনে যুক্তি কি? চুম্বক লোহাকে টানে, সূর্যে-চন্দ্রে জোয়ার-ভাঁটা খেলে এর মধ্যে সঙ্গত ব্যাখ্যা কোথায়? আর যারই উদ্দেশ্য-উপলক্ষ থাক, ভালোবাসা অহেতুক। তিনি যে ভালোবাসেন। তাঁর ভালোবাসায় যে হিসেব নেই, জিজ্ঞাসা নেই।
সূর্যের আলোতেই যেমন সূর্যকে দেখি তেমনি তাঁর করুণাতেই তাঁকে দেখব।
মাস খানেক পরে আবার এক দিন হাজির হল দক্ষিণেশ্বরে। পথ যেন আর শেষ হতে চায় না। কে জানত এত দূরের রাস্তা আর এত কষ্টকর! সেদিন সুরেশ মিত্তিরের গাড়িতে করে এসেছিল বলে বুঝতে পারেনি। যাই, ফিরে যাই। বৃথা এই সন্ধান-ক্লান্তি। পথশ্রমের হয়তো শেষ আছে কিন্তু পন্ডশ্রমের শেষ কই। কিন্তু যাই বলো, নেই আর ফিরে যাওয়া। চুম্বকের টানের কাছে লোহা নিরুপায়, সূর্য-চন্দ্রের কাছে নদী ইচ্ছাশূন্য। এ গতি নিরঙ্কুশ। এ গতি কৃষ্ণাকর্ষী। দক্ষিণেশ্বর কোন দিকে যাব বলতে পারেন?
আরো উত্তরে যাবে। সেখানেই আছেন সেই লোকোত্তর। উত্তর দেবেন সুদক্ষিণ বলে।
সেদিনের মতই ছোট তক্তপোশটিতে বসে আছে রামকৃষ্ণ। যেন কার জন্যে অপেক্ষা করে বসে আছে। ঘরে লোক-জন নেই। যেন কথা কইবার লোক নেই সংসারে। উদাস, নিরালম্বের মত চেয়ে আছে শূন্য চোখে। যেন উৎকর্ণ হয়ে শুনছে কার পদধ্বনি।
তুই এসেছিস? নরেনকে দেখে আহ্লাদে ফেটে পড়ল রামকৃষ্ণ। আয়, আয়, বোস আমার পাশটিতে। মুখখানি শুকিয়ে গেছে দেখছি। কিছু খাবি?
একটু দূরে কুণ্ঠিত হয়ে বসল নরেন। রামকৃষ্ণ সরে আসতে লাগল। তোর কুণ্ঠা, কিন্তু আমার অজস্রতা। তুই দূরে বসিস আর আমি সরে-সরে আসি। চুম্বকই শুধু লোহাকে টানে না, লোহাও ডাকে চুম্বককে৷
পাগল না-জানি অদ্ভুত কি করে বসে তারই ভয়ে সঙ্কুচিত হল নরেন। ঠিক তাই, রামকৃষ্ণ তার ডান পা নরেনের গায়ের উপর তুলে দিলে। মুহূর্তে কী যে হয়ে গেল বোঝা গেল না। মনে হল দেয়াল-দালান সব যেন মহাবেগে উড়ে চলেছে, বিরাট আকাশের ব্যাপ্তির মধ্যে মিশে যাচ্ছে এই ক্ষুদ্র আমিত্বের অস্তিত্ব। আতঙ্কে বিহ্বল হয়ে পড়ল নরেন। আমিত্বের নাশই তো মৃত্যু। সেই মৃত্যুই বুঝি এখন উপস্থিত।
চেঁচিয়ে উঠল নরেন: ‘ওগো, তুমি আমার এ কী করলে? আমার যে মা-বাপ আছেন।’
খিল-খিল করে হেসে উঠল রামকৃষ্ণ। তাই আছে না কি? যখন তোর সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল, জিজ্ঞাসাও করিনি, তোর বাপের নাম কি? তোর বাপের কখানা বাড়ি? আয়-আদায় কত?
আমার মদ খাওয়া নিয়ে কথা। যেখানে আমার এক বোতলেই কাজ হয়ে যায়, সেখানে শুঁড়ির দোকানে কত মণ মদ আছে সে হিসেবে আমার দরকার কী!
নরেনের আর্তস্বর কি রকম যেন লাগল বুকের মধ্যে। তার বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল রামকৃষ্ণ। স্নেহস্নাত করুণকোমল হাত।
‘তবে থাক, এখন থাক, একেবারে কাজ নেই। কালে হবে। আস্তে-আস্তে হবে।’
অমনি নিমেষে আবার সব স্বাভাবিক হয়ে গেল। সেই ঘর সেই দেয়াল—সেই সব এখানে-ওখানে। তবে এটা কী হয়ে গেল চকিতের মধ্যে? ভোজবাজি? এই কি মন্ত্র-তন্ত্র-ইন্দ্রজাল?
না কি এই জীবনেই জন্মান্তর ঘটে গেল নরেনের?
কিছু না, কিছু না। হিপনোটিজম জানে লোকটা, তারই প্রভাবে সহসা সম্মোহিত করে ফেলেছে।
তাই বা মেনে নিতে মন সায় দিচ্ছে কই? আমি এমন একজন দৃঢ়কায় লোক, এত আমার মনের জোর, আমিই এত সহজে অভিভূত হয়ে পড়ব? যাকে পাগল বলে ঠাউরেছি, হব তারই হাতের পুতুল? কে জানে কি শক্তি ধরে লোকটা, দরকার নেই তার কাছে এসে, ভেলকি লাগিয়ে কি অঘটন ঘটায় তার ঠিক কি!
অমনি পরমুহূর্তেই মন আবার রূখে দাঁড়াল। পালিয়ে যাবার কোনো মানে হয় না। লোকটা যদি পাগলই হয় তবে প্রমাণ করতে হবে সেই পাগলামি। কঠিন-কঠোর পাথরকে যে এক নিমেষে এক তাল কাদা বানাতে পারে এক কথায় তাকে পাগল বললেই তার ব্যাখ্যা হয় না। শিশুর অধিক সারল্য, মা’র অধিক ভালোবাসা আর ফুলের অধিক শুচিতা—এদের সমাহারে পাগলামির জন্ম হয় এ কখনো শুনিনি। না, বিচার-বিশ্লেষণ করে একটা শান্ত সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছতেই হবে। দাঁড়াতে হবে এ প্রশ্নের মুখোমুখি, করতে হবে এ রহস্যের উন্মোচন। প্রহেলিকা বলে পালিয়ে যাব না। কুহেলিকা বলে আচ্ছন্ন হতে দেব না নিজেকে। আয়ত্তাতীতকে আনতে হবে ইয়ত্তার মধ্যে। সংশয় থেকে আসতে হবে সংকল্পে। হয় এসপার নয় ওসপার। হয় প্রত্যাখ্যান নয় সমর্পণ।
তাই ঠাকুর যখন এক দিন বললেন, ‘নরেন্দ্র, তুই কি বলিস! সংসারী লোকেরা কত কি বলে! কিন্তু দ্যাখ, হাতি যখন চলে যায়, পেছনে কত জানোয়ার কত রকম চীৎকার করে, কিন্তু হাতি ফিরেও চায় না। তোকে যদি কেউ নিন্দা করে, তখন তুই কী মনে করবি?”
নরেন্দ্র বললে, ‘আমি মনে করব কুকুর ঘেউ-ঘেউ করছে।’
না, পালিয়ে যাব না। যে যাই বলুক, একটা হয়-নয় করে যাব। এই পরম-অদ্ভূতের স্বরূপ বুঝব ঠিক-ঠিক। হটে যাব না, ছেড়ে দেব না, শানের উপর আছড়ে আছড়ে টাকা বাজিয়ে নেব। দেখব এতে কতটা খাদ, কতটা ভেজাল, কতটা মেকি।
সব আবার সহজ হয়ে গেল। দুজনে যেন সৌভাগ্যের দিনের আত্মীয়, নিঃসঙ্গ-বাসের বন্ধু।
কত অন্তরঙ্গ কথা, কত রঙ্গ-রস, কত হাস্য-পরিহাস। তার পর আবার কাছে বসে খাওয়ানো। গায়ে হাত বুলিয়ে দেওয়া। ছেড়ে দিতে মন-কেমন-করা। আসন্ন সন্ধ্যা তো নয়, ঘনায়মান বিষণ্ণতা। ও আবার চলে যাবে। ওর আবার বাড়ি আছে, বাপ-মা আছে-
রামকৃষ্ণের চোখ ছলছল করে এল।
আর-সব কিছুরই হয়তো সমাধান মেলে, মেলে না শুধু ভালোবাসার। সূর্যের আলোর হয়তো ব্যাখ্যা হয় কিন্তু চন্দ্রের কেন এত ভুবনপ্লাবন জ্যোৎস্না?
এবারে তবে উঠি।
‘কিন্তু আবার শিগগির আসবি বল—যেমন নতুন পতি ঘন-ঘন আসে তেমনই আসবি বেশি-বেশি। ওরে, তোকে যখন দেখি, তখন আমি সব ভুলে যাই।’
আসব।
প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিল রামকৃষ্ণ।
হাজরা বললে, ‘তুমি ছোকরাদের কথা এত ভাবো কেন? যদি নরেন-রাখাল নিয়েই ব্যস্ত থাকো তবে ঈশ্বরকে ভাববে কখন?”
বলরাম বোসের বাড়ি যাচ্ছে রামকৃষ্ণ, মহা ভাবনা ধরলো। সত্যি, কথা তো ভুল বলেনি। ওর পাটোয়ারি বুদ্ধি, ওর চুল-চেরা হিসেব। সত্যিই তো, যখন থেকে রাখাল-নরেন এসেছে তখন থেকে ওদের কথাই তো বুক জুড়ে রয়েছে। মায়ের কথা ভুলে আছি।
মাকে তাই বললে রামকৃষ্ণ। মা, এ কেমনতরো হল? তোমাকে ছেড়ে এখন যে কেবল ছোকরাদেরই চিন্তা করছি। হাজরা মুখের উপর কথা শুনিয়ে দিলে।
মা বুঝিয়ে দিলেন। বুঝিয়ে দিলেন তিনিই মানুষ হয়েছেন। শুদ্ধ আধারে তাঁরই বিশদ বিকাশ। ঘোল ছেড়ে মাখন পেয়ে তখন বোধ হয় ঘোলেরই মাখন, মাখনেরই ঘোল।
সমাধি-দর্শনের পর হাজরার উপর রাগ হল। শালা আমার মন খারাপ করে দিয়েছিল।
তার পর আবার ভাবলে, হাজরার দোষ কি। সে জানবে কেমন করে?
তাঁকে দেখার পর সবতাতেই তাঁকে দেখা যায়। মানুষে তাঁর বেশি প্রকাশ। তার মধ্যে যারা আবার শুদ্ধসত্ত্ব তাদের মধ্যে তিনি আরো উচ্চারিত। সমাধিস্থ ব্যক্তি যখন নেমে আসে তখন কিসে সে মন দাঁড় করাবে? তাই তো সত্ত্বগুণী ভক্তের দরকার। ভক্তির এই নজির পেয়ে তবে বাঁচল রামকৃষ্ণ।
ভাবসমুদ্র উথলালেই ডাঙায় এক বাঁশ জল। নদী দিয়ে সমুদ্রে আসতে হলে এঁকে-বেঁকে আসতে হয়। বন্যা এলে আর ঘরে যেতে হয় না। তখন নদীতে-সমুদ্রে একাকার। তখন ডাঙার উপর দিয়েই সোজা চলে যাবে নৌকো। ভগবানের লীলা যে আধারে বেশি প্রকাশ সেখানেই তাঁর বিশেষ শক্তি। জমিদার সব জায়গায় থাকেন, কিন্তু অমুক বৈঠকখানায়ই তাঁর বিশেষ গতিবিধি। তেমনি ভক্তই ভগবানের বৈঠকখানা। ভক্তের হৃদয়েই তাঁর বিশেষ শক্তির উদ্ভাসন। যেখানে কার্য বেশি সেখানেই বিশেষ শক্তির রূপচ্ছটা।
‘বুঝলে হে,’ কেশব সেনকে বলছে রামকৃষ্ণ: ‘যিনি ব্রহ্ম তিনিই শক্তি। যখন নিষ্ক্রিয় তখন ব্রহ্ম, পুরুষ। যখন কর্মময়ী তখন শক্তি, প্রকৃতি। যিনিই পুরুষ তিনিই প্রকৃতি। আনন্দময় আর আনন্দময়ী।
একটু থেমে আবার বললে, ‘যার পুরুষ জ্ঞান আছে তার মেয়ে-জ্ঞানও আছে। যার বাপ-জ্ঞান আছে তার মা-জ্ঞানও আছে।’
কেশব একটু হাসল।
‘যার সুখ-জ্ঞান আছে তার দুঃখ-জ্ঞানও আছে। যদি রাত বুঝি তবে দিনও বুঝেছি। যদি বলি আলো তবে আবার বলব অন্ধকার। তুমি এটা বুঝেছ?
‘হ্যাঁ, বুঝেছি।’
‘মা মানে কি? মা মানে জগতের মা। যিনি জগৎ সৃষ্টি করেছেন, পালন করছেন, তিনি। যিনি সর্বদা রক্ষা করছেন তাঁর ছেলেদের। আর যে যা চায়, ধর্ম অর্থ কাম মোক্ষ, সব দিচ্ছেন হাতে। ঠিক যে ছেলে সে মা ছাড়া থাকতে পারে না। তার মা-ই সব জানে। ছেলে খায়-দায় বেড়ায়-অত-শত জানে না। কি, বুঝেছ?”
কেশব ঘাড় নাড়ল। আজ্ঞে হ্যাঁ, বুঝেছি।
৩১
ব্রাহ্ম ভক্তদের সঙ্গে স্টিমারে করে বেড়াতে গিয়েছে রামকৃষ্ণ।
ব্রহ্মরূপ সমুদ্রে যখন বান ডাকে তখন তার অনাশ্রয় আত্মাকে তা ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সমুদ্র হচ্ছে নিরাকার ঈশ্বর আর তার লহরী হচ্ছে সাকার।
ভাবমগ্ন হয়ে বসে আছে রামকৃষ্ণ, একজন একটি দূরবীন নিয়ে তার কাছে এল। বললে, ‘এর ভিতর দিয়ে একবার দেখুন।
এর ভিতর দিয়ে তাকালে কী এমন আর দেখা যাবে, যিনি অণু হতে অণীয়ান তাঁকে বিশালতম করে দেখছি। যিনি দবিষ্ঠ তাঁকে দেখছি অন্তিকতম করে। ব্রহ্মকে দেখতে দূরবীন লাগে না। তাঁর তো দূরের বীণা নয়, তাঁর হচ্ছে অন্তরের বীণা।
সেদিন আবার এক স্টিমার এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। স্টিমারে রেভারেন্ড কুক আর মিস পিগট। ব্রাহ্মভক্তরা নিয়ে এসেছে তাদের। ধর্ম বিষয়ে বড় একজন বক্তা এই কুক সাহেব—রামকৃষ্ণকে দেখতে বড় সাধ। রামকৃষ্ণকে দেখতে মানে মূর্তিমান ভারতবর্ষকে দেখতে। ভারতবর্ষের সনাতন ধর্মকে দেখতে৷
খবর পেয়ে রামকৃষ্ণ নিজেই এল নদীর ঘাটে।
সকলের পীড়াপীড়িতে উঠে গেল স্টিমারে। উঠে গেল গভীর ভাবাবেশের মধ্যে। পশ্চিমের জ্ঞান বিমুগ্ধ হয়ে দেখল এই ভারতীয় ভক্তি। ভক্তির পায়ের কাছে জ্ঞান মাথা নোয়ালো। উপলব্ধির কাছে স্তব্ধ হল বক্তৃতা।
তোমাদের কেবল লেকচার দেওয়া আর বুঝিয়ে দেওয়া। তোমাকে কে বোঝায় তার ঠিক নেই। তুমি বোঝাবার কে হে? যাঁর জগৎ তিনি বোঝাবেন। তিনি এত উপায় করেছেন, আর এ উপায় করবেন না? বেশ করছি, আমি মাটির প্রতিমা পূজো করছি। এতে যদি কিছু ভুল হয়ে থাকে, তা তিনি কি জানেন না যে তাতে তাঁকেই ডাকা হচ্ছে?
নিশ্চয়ই হচ্ছে। যে মাকে লক্ষ্য করে গান বা প্রার্থনা করছে রামকৃষ্ণ সে মা যেন চোখের সামনে জলজীয়ন্ত দাঁড়িয়ে। কথা বা গানের ভাষাও প্রাণতৃপ্ত। কে বলে সে শুধু মূর্তি, কে বা বলে সে শুধু শূন্যরূপা? সে মা সর্বসাম্রাজ্যদায়িনী মহামায়া। অতিবিস্তীর্ণকান্তি কাননকুন্তলা পৃথিবী।
আপনি শুতে জায়গা পায় না, শঙ্করাকে ডাকে। নিজে জানি না, পরকে বোঝাই। এ কি অঙ্ক না ইতিহাস না সাহিত্য যে পরকে বোঝাব? এ যে ঈশ্বরতত্ত্ব। নুনের পুতুল হয়ে যেই গেছে সমূদ্র মাপতে সেই গলে গেছে। যে গলে যায় সে আবার ফিরে এসে বলবে কি!
আবার জাহাজ এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। ঘরে বসে বিজয় গোস্বামী আর হরলালের সঙ্গে কথা কইছে রামকৃষ্ণ। জাহাজে কেশব এসেছে—ব্রাহ্মভক্তরা এসে বললে। চলুন একটু বেড়িয়ে আসবেন আমাদের সঙ্গে।
এক কথায় রাজী। কেশব যখন আছে তখন আবার কথা কি! বিজয়কে নিয়ে নৌকোয় উঠল রামকৃষ্ণ। নৌকোয় উঠেই সমাধিস্থ।
নৌকো থেকে জাহাজে তোলাই মুশকিল। কেশব ব্যস্তসমস্ত হয়ে সব তদারক করছে। অনেক কষ্টে বাহ্যজ্ঞান আনতে পারলেও ঠিক-ঠিক পা ফেলতে পারছে না রামকৃষ্ণ। ভক্তের গায়ের উপর ভর দিয়ে আসছে।
ক্যাবিনে আনা হল। বসানো হল চেয়ারে। কেশব লুটিয়ে পড়ে প্রণাম করলে। সঙ্গে-সঙ্গে অন্যান্য ভক্তরা। যে যেখানে পেল বসে পড়ল মেঝেতে। বিস্তর ভিড় চারদিকে। যারা ঢুকতে পায়নি তারা শুধু এখানে-ওখানে উঁকিঝুঁকি মারছে। স্পর্শন না পাই শুধু একটু দর্শন হোক। যদি দর্শনও না জোটে পাই যেন তার একটু অমৃতবর্ষণ।
ঘরের জানলাটা খুলে দিল কেশব। বিজয়কে দেখেই সে অপ্রস্তুত হয়ে গেল। যে একদিন অত্যাগসহন বন্ধু ছিল সেই আজ বিরুদ্ধ বৈরী। অথচ ছায়াসন্ধানে দুজনেই এক তরুমূলে সমাগত। একই নদীর ঘাটে এসে অঞ্জলিতে করে একই পিপাসার বারি তুলে নিয়েছে।
সমাধি ভেঙেছে রামকৃষ্ণের। তবু এখনো ঘোর রয়েছে ষোলো আনা। মাকে বলছে, মা, আমাকে এখানে তুই আনলি কেন? বেড়ার ভিতর থেকে কি পারব এদের রক্ষা করতে?’
এদের যে সব কাম-কাঞ্চনে হাত-পা বাঁধা। বেড়ার মধ্যে সব বেড়ি পরে বসে আছে। ওদের কি পারব আমি মুক্ত করতে?
গাজীপুরের নীলমাধববাবু আছেন। গাজীপুরের সেই সাধু পওহারী বাবার কথা উঠল! পওহারী মানে পও-আহারী, অর্থাৎ কিনা বায়ুভুক সন্ন্যাসী।
মাটিতে বিরাট এক গর্ত খুঁড়ে তার মধ্যে ধ্যান করে পওহারী। উপরে ছোট একটি আশ্রম, সেখানে প্রেমাস্পদ-প্রভু রামচন্দ্রের পূজা আর নিজের হাতে বিরাট ভোগ রান্না করে দরিদ্রের মধ্যে পরিবেশন। এই তার সাধন-ভজন। নিজের খাবার বেলায় এক মুঠো তেতো নিম পাতা নয়তো গোটা কয় কাঁচা লঙ্কা। তার পর গর্তের মধ্যে এক-এক সময় এত দীর্ঘ কাল সমাধিস্থ হয়ে থাকে, লোকে ভেবে পায় না সাধু খায় কি? সাপের মত নিশ্চয়ই শুধু বাতাস খেয়ে থাকে। সেই থেকে তার নাম হয়েছে পওহারী।
এরই আশ্রমে এক দিন চোর এসেছিল। পোঁটলা বেঁধে জিনিস-পত্র নিয়ে গিয়েছিল চুরি করে। পওহারী বাবা দেখতে পেয়ে তার পিছু নিল। ভয় পেয়ে পোঁটলা ফেলে চম্পট দিল চোর। তবু পওহারী বাবা তার পিছু ছাড়ে না। জিনিস পেয়ে গিয়েছে তবু ছাড়ান-ছোড়ান নেই। চোর কি করে পারবে সাধুর সঙ্গে, জোরে ছুটে চোরকে ধরে ফেললে পওহারী। কোথায় চোর কাকুতি-মিনতি করবে, পওহারী বাবাই স্তুতি-বিনতি করতে লাগল। চোরের পদপ্রান্তে পোঁটলা নামিয়ে রেখে করজোড়ে ক্ষমা চাইলে। বললে, অনেক ব্যাঘাত ঘটিয়েছি প্রভু তাই নিশ্চিন্ত মনে পোঁটলাটি তোমার নেওয়া হল না। আমাকে ক্ষমা করো। নাও এই সামান্য উপচার। এ পোঁটলা আমার নয়, এ তোমার।
‘সেই পওহারী বাবা,’ বললে একজন ব্রাহ্মভক্ত, ‘নিজের ঘরে আপনার ছবি টাঙিয়ে রেখেছে।’
নিজের দিকে আঙুল দেখালো রামকৃষ্ণ। বললে, ‘এই খোলটার!’
বালিশ আর তার খোল–তার মানে দেহী আর দেহ। বাইরেটা দেহ, অন্তরে দেহী, তার মানে অন্তর্যামী। দেহের ছবি নিয়ে কি হবে? ছাপ নাও সেই অন্তরঙ্গের।
তিনি এক, তাঁর নাম আলাদা, রূপ আলাদা। একই ব্রাহ্মণ, যখন পূজা করে তখন তার নাম পূজুরি, যখন রান্না করে তখন রাঁধুনে। একই লোক যখন মা’র কাছে, তখন ছেলে, যখন স্ত্রীর কাছে, তখন স্বামী, যখন ছেলের কাছে তখন বাপ। একই জল, কেউ বলে জল, কেউ বলে পানি, কেউ বলে ওয়াটার। একই ভাব, নানান নামের টুকরোয় ফেটে পড়ে। একই শুভ্রতা রূপ নিয়েছে সাতরঙা রামধনু।
‘কালীর কথা বলুন।’ জিজ্ঞেস করল কেশব। ‘কালী কালো কেন?”
দূরে আছে বলে কালো দেখায়। জানতে পারলে আর কালো নয়। তখন আলো। আকাশ দূর থেকেই নীল, যদি কাছে যাও দেখবে রঙ নেই—শাদা। সমুদ্রের জলও তাই—দূর থেকেই নীল, কাছে থেকে শাদা।’
‘তিনি যদি লীলাময়ী ইচ্ছাময়ী, তবে তিনি তো ইচ্ছে করলেই আমাদের সকলকে মুক্ত করে দিতে পারেন—তাই দেন না কেন ?
‘তাও তাঁরই ইচ্ছে। তাঁর ইচ্ছে তিনি এই সংসারের ছকে জীব-জন্তুর ঘুঁটি চেলে-চেলে খেলা করেন। বুড়িকে আগে থাকতেই ছুঁয়ে ফেললে ছুটোছুটি হয় না। ছুটোছুটি না হলে খেলে সুখ কই? খেলা চললেই বুড়ির আহ্লাদ।’ তবে কি আমরা বুড়ির আহ্লাদের জন্যে কেবল ছুটোছুটি করব?
করলেই বা। মন্দ কি। খেলা চলছে এই তো বেশ। যে ছেলে ছুটোছুটি করে খেলছে আর যে ছেলে বসে আছে মা’র কোলে চেপে, এদের মধ্যে কোন ছেলেকে মা’র বেশি পছন্দ?
‘সব ত্যাগ না করলে কি পাওয়া যাবে না ঈশ্বরকে?’ জিজ্ঞেস করলে এক ব্রাহ্মভক্ত।
‘তা যাবে না। কিন্তু ত্যাগ তো মনে। মন নিয়েই কথা। সংসার করছ করো কিন্তু মন রাখো ঈশ্বরের হাতের মুঠোয়।
‘সেই তো কঠিন।’
‘মোটেই কঠিন নয়। এক পাশে পরিবার, এক পাশে সন্তান নিয়ে শোওনি? দুজনকে আদর করোনি দুভাবে? দুই জন দুই ভাব, কিন্তু মন এক। মন নিয়েই সব। যদি সাপে কামড়ায়, আর যদি জোর করে বলো, বিষ নেই, বিষ ছেড়ে যায়। যদি বলো আমি মান-হুষ মানুষ, যদি বলো আমি ঈশ্বরের সন্তান, কে আমাকে বাঁধে, দেখবে তুমি নির্বন্ধন, তুমি নির্মুক্ত। তুমি মহাবীর।
রামকৃষ্ণ তাকাল কেশবের দিকে। বললে, ‘তোমাদের ব্রাহ্মসমাজেও কেবল পাপ আর পাপী। খৃষ্টানদেরও তাই। যে রাত-দিন কেবল পাপী-পাপী করে সে পাপীই হয়ে যায়। যে কেবল বলে আমি বদ্ধ আর বদ্ধ সে বধ্যই হয়ে থাকে। বলো আমি রাজরাজেশ্বরের ছেলে, আকাশজোড়া আমার মুক্তি, আকাশজোড়া আমার নির্মলতা, আমাকে ছোঁয় কে, আমাকে কে আটকায়!’
ভাঁটা পড়ে এসেছে। এবার ফেরা যাক। অমৃত কথা শুনতে-শুনতে কত দূর চলে এসেছে জল ঠেলে কারু খেয়াল নেই।
কোঁচড়ে করে মুড়ি নারকেল খাচ্ছে সবাই। হঠাৎ বিজয়ের দিকে নজর পড়ল রামকৃষ্ণের। কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে বসে আছে। তার পাশে আরেক চেয়ারে কেশব বসে। সেও তেমনি জড়সড়। মিটে গেছে ঝগড়া তবু যেন মিশ খাচ্ছে না।
রামকৃষ্ণ তাকাল একবার বিজয়ের দিকে, তার পর কেশবের দিকে। বললে, ‘তোমাদের ঝগড়াবিবাদ যেন সেই শিব-রামের যুদ্ধ। জানো তো, রামের গুরু শিব। দুজনে যুদ্ধও হলো, আবার সন্ধিও হলো। কিন্তু শিবের চেলা ভূতপ্রেত আর রামের চেলা বানর—ওদের ঝগড়া-কিচিমিচি আর মেটে না।’
সবাই হেসে উঠল।
মায়ে-ঝিয়ে আলাদা মঙ্গলবার করে, এও প্রায় তেমনি। মা’র মঙ্গল আর মেয়ের মঙ্গল এ দুটো যেন আলাদা। এর মঙ্গলেই যে ওর মঙ্গল এ খেয়াল কারু হয় না। তোমাদের ওর একটি সমাজ আছে এখন আবার এর একটি দরকার।’
আবার হাসির রোল।
‘তবে এ সব চাই। যদি বলো ভগবান নিজে লীলা করছেন, সেখানে জটিলে-কুটিলের কী দরকার! জটিলে-কুটিলে না থাকলে যে লীলা পোষ্টাই হয় না।’ বুড়ি-ছোঁয়ার খেলাটিও তাই জটিল-কুটিল। যদি গোলকধাঁধার পথ না হত তবে জমত না খেলা, রগড় হত না। বলতেই বলে, দুশো মজা, পাঁচশো রগড়।
জাহাজ এসে থামল কয়লাঘাটে। গাড়ি আনা হল। কেশবের ভাইপো নন্দলালের সঙ্গে গাড়িতে উঠল রামকৃষ্ণ।
উঠেই মুখে বাড়িয়ে ব্যাকুল স্বরে ডেকে উঠল, কই, কই তিনি কই?
কাকে রামকৃষ্ণ খুঁজছে বুঝতে কারু দেরি হল না। তাঁকে ডেকে আনল। হাসি-হাসি মুখে কেশব এসে দাঁড়াল সামনে। ভূমিষ্ঠ হয়ে রামকৃষ্ণের পায়ের ধূলো নিল।
ইংরেজটোলার মধ্য দিয়ে গাড়ি যাচ্ছে। ঝকমক করছে রাস্তা, ঝকঝক করছে বাড়ি-ঘর। গ্যাসের আলো জ্বলছে অন্দরে-বাইরে। আকাশে আবার পূর্ণিমার প্লাবন। পিয়ানো বাজিয়ে গান করছে মেমসাহেবরা। সর্বত্র যেন আনন্দভাতি। সব দেখে-শুনে রামকৃষ্ণও হাসতে হাসতে চলেছে। হঠাৎ এক সময় বলে উঠল, আমি জল খাব। তেষ্টা পেয়েছে আমার।
এখন কী হবে! রাস্তার মাঝখানে এখন কী করা যায়!
নন্দলাল নামল গাড়ি থেকে। সামনেই ইন্ডিয়া ক্লাব। সেখান থেকে কাচের গ্লাশে করে জল নিয়ে এল।
সানন্দে সেই জল খেল রামকৃষ্ণ।
নবাগত শিশু যেমন কলকাতা দেখে তেমনি ভাবে মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগল গাড়ি-ঘোড়া, দোকানদানি, দেখতে লাগল শহরের ইট-পাথরের উপর জ্যোৎস্নার অকার্পণ্য।
নন্দলাল নেমে গেল কলুটোলায়। গাড়ি এসে থামল সুরেশ মিত্তিরের বাড়ির সামনে।
সুরেশ বাড়ি নেই। এখন গাড়িভাড়া কে দেবে?
‘ভাড়াটা মেয়েদের কাছ থেকে চেয়ে নে না’–
দোতলার ঘরে ঠাকুরকে এনে বসাল সকলে। ফরমাস দিয়ে নতুন একখানা ছবি আঁকিয়েছে সুরেশ—ঠাকুর কেশবকে সকল ধর্ম সকল সম্প্রদায়ের সমন্বয় দেখাচ্ছেন। সেই ছবি দেয়ালে টাঙানো। মেঝেতে ফরাস পাতা, তার উপর তাকিয়া। রামকৃষ্ণ বসল সেখানে, বসেই বললে, ওরে তোরা নরেনকে কেউ ডেকে আন।
চাষারা হাটে গরু কিনতে যায়। গরু বাছবার চিহ্ন কি? ল্যাজের নিচে হাত দিয়ে দেখে। ল্যাজে হাত দিলে যে-গরু শুয়ে পড়ে সে-গরু কেনে না। ল্যাজে হাত দিলে যে-গরু তিড়িং-মিড়িং করে লাফিয়ে ওঠে সেই গরু পছন্দ করে। নরেন আমার সেই গরুর জাত—ভিতরে জলন্ত তেজ। সে চিঁড়ের ফলার নয়, সে ভ্যাদ-ভ্যাদ করে না।
আহা, এখানে এক রকম, ওখানে আরেক রকম। দূরন্ত ছেলে বাবার কাছে যখন বসে, যেন জুজুর ভয়ে চুপ করে বসে, আবার যখন চাঁদনিতে এসে খেলে তখন তার আরেক মূর্তি। এরা নিত্যসিদ্ধের থাক, সংসারে বদ্ধ হয় না কখনো। একটু বয়স হলেই চৈতন্য হয়, আর ভগবানের দিকে চলে যায়। ওরে কই, এখনো তো এল না নরেন্দর।
নরেন এসেছে, নরেন এসেছে, রব উঠল চার দিকে। রামকৃষ্ণের আনন্দের আগুন দ্বিগুণ হয়ে উঠল।
‘আজ কেমন জাহাজে করে বেড়াতে গিয়েছিলাম—’বলতে লাগল নরেনকে, ‘সঙ্গে বিজয় ছিল কেশব ছিল, এরা সব ছিল। এদের জিজ্ঞেস কর, কত আনন্দ হল আজ। কেমন বিজয়-কেশবকে মায়ে-ঝিয়ে মঙ্গলবার শোনালুম, বললাম সেই জটিলে-কুটিলের কথা।
নরেন শুনতে লাগল অতৃপ্য কর্ণে।
ওরে আমার আনন্দের ভাগ তোকে কিছু না দিলে আমি যে একা-একা বইতে পারি না।
৩২
বেড়াতে গিয়ে রাখাল একটি পয়সা কুড়িয়ে পেয়েছে। ভাবলে বাজে লোক যদি পায় নির্ঘাত মেরে দেবে। তার চেয়ে কানা-খোঁড়া ভিক্ষুককে দিয়ে দিলে সদ্ব্যয় হবে পয়সাটার।
ঠাকুরের কাছে কথাটা গোপন করলে না। শিশু যেমন তার মাকে সব কথা খুলে বলে রামকৃষ্ণের কাছে রাখালের সেই রকম অনাবৃতি।
‘একটা পয়সা কুড়িয়ে পেয়েছি। পথের ভিক্ষুক কাউকে দিয়ে দেব।’
ভেবেছিল ঠাকুর বোধ হয় খুশি হবেন, কিন্তু তিনি জ্বলে উঠলেন। তোর দানের জন্যে বিশ্ব-ভুবন বসে আছে। পয়সা তো আপনা থেকে তোর মুঠোর মধ্যে চলে আসেনি। তুই কুড়োতে গেলি কেন?
‘বা, আমি যে যাচ্ছিলুম ও-পথে। পথের মধ্যে পড়ে রয়েছে।’
যে মাছ খায় না সে মাছের বাজারেই বা যাবে কেন? তোর যখন নিজের দরকার নেই, তখন কেন তুই ও-পয়সা ছুঁতে গেলি?
দে ফেলে দে পয়সা।
সেদিন স্নানের আগে ঠাকুরকে তেল মাখাচ্ছে রাখাল। কি খেয়াল হল রাখাল একটা প্রার্থনা করে বসল। প্রার্থনা আর কিছুই নয়, ভাবসমাধি চাই। রাখাল যত চায় রামকৃষ্ণ তত কঠিন হয়।
রাখালও নাছোড়বান্দা। দিতেই হবে আমাকে সেই ঈশ্বরিক অনুভূতির উচ্চতর অবস্থা।
রামকৃষ্ণ তখন কি করে, একটা নিদারুণ কথা বলে রাখালকে আঘাত করে বসল। সেই মর্মান্তিক আঘাতের যন্ত্রণা সইতে পারল না রাখাল। তেলের বাটি হাত থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হন-হন করে ছুটে চলল। থাকবে না আর সে দক্ষিণেশ্বরে। ফিরে যাবে কলকাতা।
কত দূরে আর যাবে! ফটক পার হতে না হতেই পা দুটো তার অবশ হয়ে পড়ল। সাধ্য নেই দাঁড়িয়ে থাকে। বসে পড়ল সেইখানে।
একেবারে নিরূপায়! এখন কি করি কোথায় যাই, যেন জলে পড়ল রাখাল। নিরুপায়েরই উপায় আছে। জলেরই আছে আবার তীরাশ্রয়। ফটকের কাছে রামলাল। ‘ঠাকুর পাঠিয়ে দিলেন নিয়ে যেতে।’
ক্ষমায় একেবারে মাতা বসুন্ধরার মত। দীনপাবনী করুণার মুক্তধারা।
রামলালের পিছু-পিছু রাখাল চলে এল গুটি-গুটি। অধোবদন হয়ে দাঁড়াল ঠাকুরের সামনে।
‘কি রে, পারলি? পারলি গণ্ডি ছাড়িয়ে যেতে?
সন্ধ্যে বেলায় সেই রাখাল আবার বসেছে ঠাকুরের সামনে।
‘রাখাল-নরেনও আছে, আবার আছে হাজরা। হাজরা হচ্ছে শুকনো কাঠ। জপ করে, আবার ওরই ভেতর দালালির চেষ্টা করে। সবাই বলে, ও এখানে থাকে কেন? তার মানে আছে। জটিলে-কুটিলে না থাকলে লীলা পোষ্টাই হয় না।’ তার পর হঠাৎ রাখালের দিকে চোখ ফেরাল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘সকালে তখন তুই রাগ করেছিলি? তাই না? তোকে রাগালাম কেন? তার মানে আছে। ওষুধ ঠিক পড়বে বলে। পিলে মুখ তুললে পরই মনসার পাতা-টাতা দিতে হয়। বুঝলি?’
তার পর আবার ঈশ্বরীয় রূপের কথা বলছেন মাস্টারের দিকে চেয়ে। বলছেন, ‘ঈশ্বরীয় রূপ মানতে হয়। জগদ্ধাত্রী রূপের মানে জানো? যিনি জগৎকে ধারণ করে আছেন। তিনি না ধরলে জগৎ পড়ে যায়, নষ্ট হয়ে যায়। মন-করীকে যে বশ করতে পারে তারই হৃদয়ে জগদ্ধাত্রীর উদয়।’
রাখাল বললে, ‘মন মত্ত-করী।’
‘সিংহবাহিনীর সিংহ তাই হাতিকে জব্দ করে রয়েছে।’
আবার আরেক দিন অভিমান হল রাখালের। আবার ছেড়ে গেল দক্ষিণেশ্বর। আবার ফিরে এল ঠাকুরের পদমূলে।
‘তুই রাগ করে দক্ষিণেশ্বর থেকে চলে গেলি, আমি মা’র কাছে গিয়ে কাঁদতে লাগলাম। মা গো, এরা তোর অবোধ সন্তান, এদের অপরাধ নিসনি। তাই আবার ফিরে এলি। না এসে আর যাবি কোথায়?”
অধর সেনকে এক দিন বললেন ঠাকুর, ‘এরা শ্রাবণ মাসের জল নয়। শ্রাবণ মাসের জল হুড় হুড় করে আসে আবার হুড় হুড় করে বেরিয়ে যায়। এরা থাকিয়ে জল। মাটি ফুঁড়ে এদের আবির্ভাব।’
ঠাকুরের পা টিপছে রাখাল, আর একজন ভাগবতের পণ্ডিত ভাগবতের কথা বলছে কাছে বসে।
কথায় আর স্পর্শে রাখালের সেই প্রথম ভাব। থেকে-থেকে শিউরে উঠতে-উঠতে একেবারে নিশ্চল স্থির।
ভাব তো নয়, ভাব-বিলাসিতা! এই হল নরেনের ধারণা। এ সব ভাব হচ্ছে স্নায়ুদৌর্বল্যের ফল, মানসিক মৃগী রোগ।
ব্রাহ্মসমাজের খাতায় নাম লিখিয়েছে দুই জনে—নরেন আর রাখাল –ব্রাহ্ম সমাজের সংকল্প নিয়েছে। অথচ —
এক দিন দক্ষিণেশ্বরে এসে নরেন দেখতে পেল ঠাকুরের পিছু-পিছু রাখালও চলেছে মন্দিরে। বিগ্রহের সামনে ঠাকুর ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করছেন, পিছু-পিছু রাখালও প্রণাম করছে।
দেখে তো পায়ের রক্ত মাথায় উঠল নরেনের। রাখালের এ কী বিশ্বাসভঙ্গ! কথা দিয়ে এসে সেই কথার প্রত্যবায়!
ধরল রাখালকে। অন্তরালে ডেকে নিয়ে গেল। তীব্র ভর্তসনার সুরে বললে, ‘এ তোমার কী কাণ্ড?”
‘কেন, কী হয়েছে?’
‘কী হয়েছে মানে? এটা মিথ্যাচার নয়?’
‘কোনটা?”
‘এই যে মন্দিরে গিয়ে দেবদেবীকে প্রণাম করা? ‘
রাখাল চোখ নামাল। কথা কইল না।
‘তুমি ব্রাহ্মসমাজের অঙ্গীকার-পত্রে সই করে দিয়ে আসোনি? বলে আসোনি, নিরাকার ব্রহ্ম ছাড়া আর কিছু ভজনা করবে না? মানবে না দেবদেবী?”
তবু চুপ করে রইল রাখাল। কি করে মনের কথা বোঝাবে নরেনকে? ঠাকুরের ছোঁয়ায় সংস্কারের পুরোনো গ্রন্থি সব খুলে গিয়েছে যে। ব্রহ্মের যে ইতি নেই, তাঁর যে লেখাজোখা হয় না। তিনি যদি নিরাকার হয়ে থাকতে পারেন, সাকার হয়েই বা থাকতে পারবেন না কেন? তিনি যদি সর্বব্যাপক সর্বাবরক হন তবে তিনি শিলা-মৃত্তিকাই বা আশ্রয় করতে পারবেন না কেন? গোঁড়ামির অন্ধকূপ থেকে ঠাকুর তাকে নিয়ে এসেছেন আকাশের নিত্যনির্মল উদারতায়।
কিন্তু কিছুই বলতে পারল না। এত যার তেজ ও দীপ্তি তার সঙ্গে রাখাল পারবে না তর্ক করে।
তাই বলে নরেন ছাড়বার পাত্র নয়। সে গিয়ে ধরল ঠাকুরকে।
‘রাখাল এই মিথ্যাচার করবে? গড় হয়ে প্রণাম করবে দেবদেবী?’
‘করলেই বা। ভগবান সব জায়গায় আছেন, শুধু মূর্তিতেই থাকবেন না?’
‘কিন্তু ও যে সই করে দিয়ে এসেছে।’
‘তাই বলে ও মত বদলাতে পারবে না? চিন্তার জগতে থাকবে না ওর স্বাধীনতা?’
চিরস্বাধীন নরেন্দ্রনাথ থমকে গেল। কথা খুঁজে পেল না।
‘রাখালের এখন সাকারে বিশ্বাস হয়েছে। তা কি করবে বলো? যার যেমন ধাত। যার যেমন পেটে সয়। তোর নিরাকারের ঘর, রাখালের সাকারের। সকলেই কি আর গোড়া থেকে নিরাকারে মন দিতে পারে? সাকার-নিরাকার যে কোনো একটাতে বিশ্বাস থাকলেই হলো।’
নরেন ফিরে যাচ্ছিল ঠাকুর ডাকলেন। বললেন, ‘রাখালকে আর কিছু বলিসনি। সে তোকে দেখলেই ভয়ে জড়সড় হয়।’
সেই রাখালের অসুখ করেছে। সবাইকে উদ্বেগ জানাচ্ছেন ঠাকুর। বলছেন, ‘এই দেখ আমার রাখালের অসুখ। সোডা খেলে কি ভালো হয় গা?’
শেষকালে যেন দৈববাণীর মতো বলে উঠলেন, ‘যা, রাখাল, তুই জগন্নাথের প্রসাদ খা গে, যা।’
দেখতে পেলেন নারায়ণ বালকের রূপ ধরে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঠাকুরের প্রেমানুরঞ্জিত চোখ—গোপালকে দেখে যশোমতীর যেমন স্নেহগদগদ দৃষ্টি। ধীরে-ধীরে সমাধিতে ডুবে গেলেন রামকৃষ্ণ। যে মা এতক্ষণ ব্যস্ত ছিলেন সন্তানের জন্যে, সে মা এখন কোথায়? সাকার ছেড়ে ডুব দিয়েছেন নিরাকারের জলধিতে।
নন্দনবাগানে ব্রাহ্মসমাজের উৎসবে নিমন্ত্রণ হয়েছে ঠাকুরের। ভক্তদের নিয়ে এসেছেন, সঙ্গে রাখাল। কিন্তু তাঁদের দিকে গৃহস্বামীদের লক্ষ্য নেই। উপাসনা শেষ হলে খাবার ডাক পড়ল। কিন্তু এদিক পানে কেউ তাকিয়েও দেখছে না। শধু বড়লোক আর আত্মীয়-কুটুমদের নিয়েই শশব্যস্ত।
‘কই রে কেউ ডাকে না যে রে!’ ঠাকুর বললেন ভক্তদের।
ভক্তরা আর কি করবে। এদিক-ওদিক তাকায়, কারুরই চোখের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে না। কে না কে এসেছে হেজিপেজি এমনি মনোভাব ।
ঠাকুরের কথা শুনে তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠল রাখাল। বললে, “মশায়, চলে আসুন।’
রাখালকে বড় বিঁধছে এ অপমান। অন্যায় ঔদাসীন্য অপমান ছাড়া আর কি। কিন্তু চলে আসুন বললেই তো আর চলে যাওয়া যায় না।
‘আরে রোস, রাখালকে নিরস্ত করলেন ঠাকুর: ‘গাড়িভাড়া তিন টাকা দু আনা কে দেবে? রোক করলেই হয় না। পয়সা নেই আবার ফাঁকা রোক। আর এত রাত্রে খাই কোথা?’
একসঙ্গে পাতা পড়েছে সকলের। অনেক পরে যখন ডাক পড়ল এ-দলের তখন গিয়ে দেখল, জায়গা নেই, সমস্ত আসন ভরে গিয়েছে। তখন এক পাশে নোংরা মতন একটা জায়গায় ভক্ত সমেত ঠাকুরকে বসানো হল এক ধারে। নুন-টাকনা দিয়ে দিব্যি লুচি খেলেন ঠাকুর।
ভক্তরা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঠাকুরের দিকে। বিন্দুমাত্র অভিমান নেই। নেই এতটুকু দোষদর্শন। কারুণ্য আর সৌশীল্যের প্রতিমূর্তি। উদারতা আর ক্ষমার সমাহার। লোককল্যাণকামনায় সর্বংসহ।
পরের দোষ আর দেখব না। গর্বে আর পর্বত ভাবব না নিজেকে।
৩৩
এদিকে, এর আগে, বিজয়ের কি হয়েছিল একটু খোঁজ নিই।
কেশবের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়েছে। কেশব করেছে ‘নববিধান’, বিজয় করেছে ‘সাধারণ’। জয় হয়েও বিজয়ের শান্তি নেই। শুধু প্রচারে-বিচারে উপদেশে-উপাসনায় ঊষর মরু সজল হয় না। চাই শ্রাবণ-সিঞ্চন। তৃষ্ণা মেটে না শুধু জ্ঞানের খরতাপে। চাই ভক্তির বারিধারা।
শুধু নিরাকারে শান্ত হয় না হাহাকার।
মেছুয়াবাজার স্ট্রিট ধরে এক দিন হেঁটে যাচ্ছে বিজয়কৃষ্ণ, হঠাৎ এক হিন্দুস্থানী সাধুর সঙ্গে দেখা। সাধু-সন্নেসীর দিকে তাকিয়েও দেখেনি কোনো দিন, অথচ এর দিকে চোখ না ফেলে পারল না। যেমনি চোখ পড়ল অমনি থমকে দাঁড়াল। শুধু তাই নয়, যা ধারণার অতীত, পায়ের ধূলো নিয়ে প্রণাম করে বসল সাধুকে। কি লজ্জা, কেউ দেখতে পায়নি তো!
ব্রাহ্মসমাজে বেদীতে বসে উপাসনা করছে বিজয়, চোখ চেয়ে দেখল এক কোণে সেই সাধু বসে। উপাসনার শেষে বেরিয়ে আসছে মন্দির থেকে, হঠাৎ পিছন দিক থেকে এসে বিজয়ের হাত ধরল সেই সাধু। বললে, ‘চলো!’
কোথায়?
কোথাও নয়। এই রাস্তায়। অচেনা ভিড়ের নিরিবিলিতে।
ফাঁকায় চলে এসে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলে সাধু ‘তোম গুরু কিয়া?’ বিজয় দৃঢ়স্বরে বললে, ‘আমি গুরুবাদ মানি না।’
শিবনাথ শাস্ত্রীও বলেছিল সেই কথা। গুরু লাগবে কিসে? আত্মবলে ঈশ্বর লাভ করব। আমি কি কিছু কম?
ঠাকুর একবার তাকালেন গঙ্গার দিকে। দেখলেন হাতের কাছেই সুস্পষ্ট উদাহরণ। চলন্ত স্টিমারের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা গাধাবোট। স্টিমারের সঙ্গে-সঙ্গে গাধাবোটও দিব্যি জল কেটে এগিয়ে আসছে পারের দিকে।
ঐ দেখ ঐ গাধাবোট। ওর সাধ্য ছিল আত্মবলে এত তাড়াতাড়ি এগিয়ে আসতে? হয়তো এক বেলা লেগে যেত। ভাগ্যক্রমে স্টিমারের সঙ্গে বাঁধা পড়েছিল বলেই এত বেগে বেরিয়ে আসতে পারছে। গাধাবোটের পক্ষে পার পেতে হলে শুধু আত্মবলে চলে না, গুরুবল লাগে।
জীবমাত্রই গাধাবোট। শুধু লগি ঠেলে-ঠেলে কত আর তুমি এগোবে কত দিনে? স্টিমার ধরো। ধরো গুরু। ধরো পারাপারের কর্ণধার। ঠিক তোমাকে পার করে দেবে।
‘গু’ মানে অন্ধকার আর ‘রু’ মানে আলোর দ্যোতক। অন্ধকার থেকে যিনি আলোকে নিয়ে যান তিনিই গুরু। অন্ধকারে যিনি আলোর সংবাদ দেন তিনিও। এত বড় যে বিদ্যা-বিশারদ হয়েছ, বলি, বর্ণপরিচয় শিখতে গুরু লাগেনি? কিন্তু মুখ গম্ভীর করে বিজয় বললে, ‘মানি না আমি গুরুবাদ।
মৃদু-মৃদু হাসল সেই সন্ন্যাসী। বললে, ‘এই সি ওয়াস্তে সব বিগড় গিয়া–বিজয়ের বুকের মধ্যে কে ধাক্কা দিলে। মুখ ঘুরিয়ে বললে, ‘তুমি শুনেছ আমার উপাসনা? ও কিছু নয়?”
‘ও সব তো বেদকা বাণী হ্যায়। ওসি মে ক্যা হোগা?”
যেন সহসা কে টলিয়ে দিল বিজয়কে। পথের মধ্যে বসিয়ে দিল। মনে হল গুরু নেই বলে সব পন্ড হয়ে যাচ্ছে। পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। সমস্ত চেষ্টা নিষ্ফল চেষ্টা।
গুরু চাই। অগ্নিমন্থন কাঠ প্রস্তুত। শুধু একটু ঘর্ষণ দরকার ।
আপনি আমার গুরু হোন। ব্যাকুলতায় সমস্ত শরীর কেঁপে উঠল বিজয়ের। আমাকে দিন সেই চৈতন্যের স্ফুলিঙ্গ। যজ্ঞের কাঠ একবার জ্বলে উঠুক।
‘নেহি। তোমারা গুরু দোসরা হ্যায়—’
ঠাকুর বললেন, ‘তবে এবার এক বাঘিনীর গল্প শোনো-
ছাগলের পালে এক বাঘিনী পড়েছিল। দূর থেকে তাক করে এক শিকারী তাকে মেরে ফেললে। তখন সেটার প্রসব হয়ে ছানা হয়ে গেল। ছানাটি ছাগলের সঙ্গে মানুষ হতে লাগল। ছাগলেরা ঘাস খায়, বাঘের ছানাও ঘাস খায়। ছাগলদের মত বাঘের ছানাও ভ্যা-ভ্যা করে। আবার কোনো জানোয়ার এলে ছাগলদের মতই ছুটে পালায়। এক দিন সেই ছাগলের পালে আর একটা বাঘ এসে পড়ল।
ঘাসখেকো বাঘটাকে দেখে তো সে অবাক! দৌড়ে তখন ধরল সে ঘাসখেকোকে। সেটা প্রাণপণে ভ্যা-ভ্যা করতে লাগল। সেটাকে টেনে হিঁচড়ে জলের কাছে নিয়ে এল সেই বাঘ। বললে, দ্যাখ, জলের মধ্যে তোর মুখ দ্যাখ—আমার যেমন হাঁড়ির মতন মুখ, তোরও তেমনি। আর এই নে খানিকটা মাংস, চিবিয়ে দ্যাখ। বলে তার মুখের মধ্যে খানিকটা মাংস জোর করে পুরে দিলে। আর যায় কোথা! প্রথমে তো মুখেই তুলবে না, শেষে রক্তের স্বাদ পেয়ে খেতে লাগল। তখন বাঘ বললে, ‘এখন বুঝেছিস? দ্যাখ চেয়ে, আমিও যা তুইও তা। এখন আয়, আমার সঙ্গে বনে চলে আয়।’
বাঘ হল সেই গুরু। চৈতন্য এনে দিলে। জলে মুখ দেখালে-তার মানে, চিনিয়ে দিলে স্বরূপ। বনে ডেকে নিয়ে গেল। নিয়ে গেল ধামে। ঈশ্বরনিকেতনে। গুরুর সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল বিজয়। তিনি যদি নিজের থেকে না আসেন তাঁকে খুঁজে বের করতে হবে। ভারতবর্ষের আঁতিপাঁতি চষে দেখব। মাটি খুঁড়ে হোক, পাহাড় ফেড়ে হোক, উদ্ধার করতে হবে সেই লুক্কায়িতকে।
কোথায় আমার সেই জল-দর্পণ! যার মধ্যে তাকিয়ে আমি আমার স্বরূপকে চিনব!
বিন্ধ্যাচল পাহাড়ে নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে পথ হারিয়ে ফেলেছে বিজয়। শুনেছিল কোথাকার কে এক সাধু আছে এই জঙ্গলে। রাত্রির অন্ধকার নেমে এল, জনপ্রাণীর দেখা নেই। শুধু লতাগুল্মের জটিলতা। খুঁজতে-খুঁজতে পেল এক ভাঙা বাড়ি-ঠিক করল এখানেই রাত কাটাবে। তাই সই, পরিত্যক্ত ভাঙা বাড়িতেই ডেরা বাঁধলে। কিসের ডেরা–মাঝ-রাতে এক দল ডাকাত এসে হাজির। এটা সাধু-সন্নেসীর ডেরা নয়, এটা ডাকাতের আস্তানা। কেটে পড়ো। সন্নেসীর পোশাক থাকলেই বা কি, বিজয়কে ওরা তাড়িয়ে দিলে। দূরে এক গাছতলায় গিয়ে বসল বিজয়। এ দিকে ভাঙা বাড়ির মধ্যে বসে লুট-করা মালের বখরা করতে লাগল ডাকাতেরা। বখরার পর যখন ঘুমুতে যাবে তখন বিজয়ের কথা ফের মনে পড়ল তাদের। সাধুটা গেল কোথায়? ও তো নির্ঘাত পুলিশে খবর দেবে। ওকে ধরো। সাবড়ে দাও এক কোপে৷
ডাকাতদের যে সর্দার সে আপত্তি করলে। বললে, নিরীহ সন্নেসীমানুষ, ওর থেকে আমাদের কোনো ক্ষতি হবে এ আমার বিশ্বাস হয় না। ওকে মেরে কাজ নেই৷
রাখো তোমার সরফরাজি। ওকে না কেটে ফেললে পুলিশের হাতে ও সাবুদ হবে।
দুটো তরোয়াল নিয়ে দুটো ডাকাত এগিয়ে গেল সেই গাছতলার দিকে। কিন্তু এ কী সর্বনাশ! বিজয়ের সামনে অল্প কয়েক হাত দূরে প্রকান্ড একটা বাঘ বসে। যেন পাহারা দিচ্ছে বিজয়কে। সেই পুরুষব্যাঘ্রকে।
এ দিক থেকে মারা যাবে না দেখছি। যেতে হবে পিছন দিকে। সে দিক থেকেই বসাতে হবে কোপ। সে দিকে গিয়ে দেখে, সে দিকেও আরেক বাঘ। বিশাল জিভ মেলে থাবা চাটছে বসে বসে। কে মারে সেই ব্যাঘ্রমূর্তিকে! ডাকাত দুটো তরোয়াল নামিয়ে হেঁটমুখে সরে পড়ল।
এবার এসেছে তিব্বতে। শুনেছিল দূর্গম অরণ্যের মধ্যে কোন এক গোম্ফার ধারে এক বাঙালী মহাপুরুষ আছেন। অহোরাত্রই নাকি সমাধিস্থ। যেই থেকে শোনা সেই থেকেই তাঁর ঠিকানা খুঁজে ফিরছে। ঠিকানা মানে বরফ আর পাথর, জল আর জঙ্গল। তবু বের করা চাই সেই মহাপুরুষকে। খাদ্য নেই, ঘুম নেই, না থাক, চাই শুধু সেই পরমান্ন, শুধু সেই অসঙ্গ সঙ্গ। কোথায় সে! পথ চলতে-চলতে তিন দিনের দিন অজ্ঞান হয়ে পড়ল বিজয়।
ঘোর অরণ্য। প্রাণস্পন্দনহীন। কে তার খবর রাখে!
কিন্তু যাকে সে খুঁজে বেড়াচ্ছে তিনি খোঁজ রাখেন।
নগ্নদেহ কে এক সন্ন্যাসী সহসা তার সামনে এসে দাঁড়াল। স্পর্শ করতেই জেগে উঠল বিজয়। তার শিথিল হাতে কটি ছোট-ছোট বীজ গুঁজে দিলে সন্ন্যাসী। বললে, ‘বাচ্চা, এহি দানা লেও, ভুখ-পিয়াস ছুট যায়েগা।
সত্যিই তাই। দু-এক দানা মুখে দিতেই ক্ষুধাতৃষ্ণা মিটে গেল বিজয়ের। মিটে গেল পথশ্রান্তি।
কিন্তু শুধু দেহের ক্ষুধাতৃষ্ণা মিটিয়েই নিবৃত্তি কোথায়? শুধু এ হলেই মন কেন বলে না সব পাওয়া হয়ে গেল? কোথায় মানুষের সেই ‘সবপেয়েছি-র দেশ?
ক্লান্তি গেলেও ক্ষান্তি আসে না কেন? আবার কেন সন্ধানের ইন্ধন জ্বলে?
সেই সন্ন্যাসী কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল। হল না বুঝি গুরু প্রাপ্তি। অন্ধকার থেকে আলোতে আগমন।
ঘুরতে ঘুরতে গয়ায় এসেছে বিজয়। এখানে এসে শুনতে পেল আকাশগঙ্গা পাহাড়ে রঘুবর দাস এক মস্ত সাধু। আর কথা নেই, অমনি ছুটল সেই আশ্রমে। বাবাজীর পায়ে পড়ে কাঁদতে লাগল বিজয়: ‘বাবাজী, কি করে উদ্ধার হব? কে আমার হাত ধরবে?”
এমন সাধু আর দেখেনি রঘুবর। যেমন উত্তাল ভক্তি তেমনি উদ্দাম ব্যাকুলতা। আশীর্বাদের ভঙ্গিতে বললে, ‘দয়াল রামজী তোমাকে আলবৎ কৃপা করেগা। দৈন্য ছোড়ো।’
যতক্ষণ তার দেখা না পাই ততক্ষণ কি করে ছাড়ি এই দীন বেশ?
সেখান থেকে আরেক সাধুর সন্ধানে চলল ব্রহ্মযোনির পাহাড়ে। বিজয়কে দেখে সেই সাধু তো আনন্দে আত্মহারা। বাহু বাড়িয়ে আলিঙ্গন করল বুকের মধ্যে। শুধু বললে, ‘আনন্দে রহো। আনন্দে রহো।’
যাই বলো, রঘুবর দাসের আশ্রমটিই বিজয়ের মনে ধরেছে। এই আশ্রমটিই যেন এক দিন সে দেখেছিল স্বপ্নে। এই পাহাড়, এই মন্দির, মন্দিরে এই মহাবীরের মূর্তি। কেন দেখেছিল কে জানে, কিন্তু জায়গাটি ভারি প্রাণজুড়ানো। সঙ্কেতে-সঙ্গীতে ভরা।
একদিন রঘুবরের সঙ্গে বসে গল্প করছে বিজয়, এক রাখাল ছেলে এসে খবর দিলে, পাহাড়ের উপরে কে একজন মস্ত লোক এসেছেন। স্বপ্নে মহাবীর যেন এই পর্বতশীর্ষের দিকেই ইশারা করেছিল। তাড়াতাড়ি ছুটে গেল দুজনে। দেখল এক অপূর্বকান্তি তেজস্বান মহাপুরুষ। মাথা ঘিরে জ্যোতির্গোলক। কিন্তু তাদের তিনি কাছে ঘেঁষতে দিলেন না। ইশারায় বললেন চলে যেতে।
কি আর করা! ম্লান মুখে ফিরে গেল বিজয়। কিন্তু মন রইল সেই পর্বতের নির্জনতায়।
কিছু গাঁজা কিনল বিজয়। ভাবল গাঁজা পেলে সাধু নিশ্চয় তাকে ফিরিয়ে দেবেন না। দুটো অন্তত কথা কইবেন। একা-একা চলে এল সে গুটি-গুটি। গাঁজা দিতে হল না, কথা কইলেন সাধু। জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি করো?” ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করি।
‘ব্রাহ্মধরম? ও হাম জানতা হ্যায়। কলকাতামে ব্রাহ্মসমাজ হ্যায়। রাজা রামমোহন একঠো বড়া আদমি থা। আগাড়ি ওহি ব্রাহ্মধরম স্থাপন কিয়া। ওলোগ বেলায়েত গিয়া—’
বিজয় তো অবাক। পশ্চিমী সাধু বাঙলা দেশের এত খবর জানে কি করে? ‘দেবেন বাবু কেশব বাবু সব কোইকো হাম পছান্তা—’
যত কথা বলেন সাধু ততই যেন বেহুঁস হয়ে আসে বিজয়। তার আর নড়বার-চড়বার ক্ষমতা নেই। জিভও পর্যন্ত অসাড় হয়ে গেছে। জ্ঞানহারা অবস্থায় নীরবে কাঁদতে লাগল।
মহামানব তাকে টেনে নিলেন কোলের মধ্যে। দেহে শক্তি সঞ্চার করলেন। শুধু তাই নয়, কানে দীক্ষামন্ত্র দিয়ে দিলেন। লাফ দিয়ে উঠে বসল বিজয়। পায়ে লুটিয়ে পড়ে প্রণাম করল। কৃপাসিন্ধুর এ কী কৃপাবিন্দু! একে-একে সাধন-প্রণালী শিখিয়ে দিলেন সাধু। শুধু সাধু নয়, বলো গুরুদেব। বলো আকাশগঙ্গার পরমহংস।
কঠোর সাধনে লেগে গেল বিজয়। শুকনো কাঠে আগুনই শুধু জ্বলছে, কিন্তু কোথায় সে হিরণ্যগর্ভ?
গুরুদেব হঠাৎ এক দিন আবার দেখা দিলেন। বললেন, ‘কাশী যাও। হরিহরানন্দ সরস্বতীর কাছে গিয়ে সন্ন্যাস নাও।’
তক্ষুনি কাশী ছুটল। বের করল সেই সরস্বতীকে। বললে, পৈতে ত্যাগ করে ব্রাহ্মধর্মে ঢুকেছি। এখন প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে আমাকে সন্ন্যাস দিন।
তোমার এই উচ্চাবস্থায় প্রায়শ্চিত্তের দরকার নেই। তবে তোমাকে আবার যথারীতি উপবীত গ্রহণ করতে হবে। তার পরে তিন দিন পরে বিরজাহোমে শিখাসুত্রের আহুতি দিয়ে সন্ন্যাসী হবে তুমি।
তথাস্তু। আমি সন্ন্যাসী হব। সর্বপ্রকার কাম্যকর্ম ত্যাগ করে সমাকরূপে ভগবানে যে আত্মসমর্পণ করে সেই সন্ন্যাসী। পুরো দস্তুর সন্ন্যাসী হয়েই বিজয় ফিরে এল দক্ষিণেশ্বরে। দক্ষিণেশ্বরের পরমহংসের কাছে। বললে, ‘হে শ্রীহরি—’যদিও এখানেই বিজয়ের সাধনার ইতি নয়—এখানে এক মহাস্বীকৃতি।
৩৪
বরানগরে বেড়াতে এসেছে মহেন্দ্র গুপ্ত। আটাশ বছর বয়েস, শ্যামবাজার মেট্রোপলিটান ইস্কুলের হেডমাস্টার। বেড়াতে এসেছে বন্ধু সিদ্ধেশ্বর মজুমদারে বাড়ি।
এন্ট্রান্সে দ্বিতীয়, এফ-এ-তে পঞ্চম, বি-এ-তে তৃতীয় হয়ে বেরিয়েছে প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে। আইন পড়বার শখ, সংসারের প্রয়োজনে চাকরিতে ঢুকেছে। প্রথমে কেরানিগিরি, ইদানীং মাস্টারি। গোড়ার দিকে যশোর নড়ালে, এখন কলকাতায়। সিটি স্কুল, এরিয়ান স্কুল, মডেল স্কুল শেষ করে এখন এসেছে বিদ্যাসাগরের ইস্কুলে। সে ইস্কুলের শ্যামবাজার শাখায়।
‘গঙ্গার ধারে চমৎকার একটি বাগান আছে, যাবে বেড়াতে?’ জিজ্ঞেস করলে সিদ্ধেশ্বর।
প্রসন্ন বাঁড়ুয্যের বাগান দেখে ফিরছিল দুজনে। মাস্টার বললে, ‘কার বাগান?’ ‘রাসমণির বাগান। সেখানে একজন পরমহংস আছেন। যাবে?”
‘সে তো শুনেছি উন্মাদ।’
‘না হে, এখন আর তার সে অবস্থা নেই। সে এখন শান্ত সদানন্দ বালক। দেখলে চোখ জুড়োয়।’
হাঁটতে-হাঁটতে চলে এল দুজনে। একেবারে ঠাকুরের ঘরে।
এই প্রথম দর্শন! এ কে! এ কি মানুষ, না শুভ্র স্বচ্ছ অক্ষুণ্ণানন্দ আকাশ! একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল তার দিকে। মনে হল সমস্ত জীবনের সুখ-দুঃখ-মন্থন-ধন যেন বসে আছে সামনে।
কিন্তু এ কোথায় এলাম? কাঁসর-ঘণ্টা খোলকরতাল বেজে উঠেছে একসঙ্গে৷ দেবালয়ে আরতি হচ্ছে বুঝি?
চলো আগে দেখে আসি মন্দির। দ্বাদশ শিবমন্দির। রাধাকান্তের মন্দির। আর এই ত্রিভুবনজননী কারুণ্যপুর্ণেক্ষণা ভবতারিণী।
মন্দির দেখে আবার ফিরল তারা ঠাকুরের ঘরে। ঘরের দরজা ভেজানো। পাশেই বৃন্দে-ঝি দাঁড়িয়ে। জল-খাবারের জন্যে লুচি বরাদ্দ থাকে—এই সেই বৃন্দে-ঝি। মাঝে-মাঝে অসময়ে কোনো ভক্ত এলে যদি তার বরাদ্দ লুচি খরচ হয়ে যায়, সে বকে অনর্থ করে। বলে, ওমা, কেমন সব ভদ্দরলোকের ছেলে গো, আমারটি সব খেয়ে বসে আছে। সামান্য মিষ্টিটাও পাই না?
পাছে এই সব কথা ছেলেদের কানে যায়, ঠাকুরের দারুণ ভয়। এক দিন তেমনি খরচ হয়ে গেছে লুচি, ঠাকুর প্রমাদ গুনছেন। নবতে চলে এসেছেন শ্রীমা’র কাছে। বলছেন, ‘ওগো, বৃন্দের খাবারটি তো খরচ হয়ে গেল! এখন চটপট রুটি-লুচি যা হয় কিছু করে রাখো, নইলে এক্ষুনি এসে বকাবকি করবে। দুর্জনকে পরিহার করে চলতে হয়—’
বৃন্দাকে দেখেই তো শ্রীমা’র মুখ চুন। বললেন, ‘বোসো, তোমার খাবারটা ভৈরি করে দি।’
থাক। বুঝেছি। ঢের হয়েছে। গরিবের উপরেই যত অত্যাচার।
‘বেশিক্ষণ লাগবে না। এক্ষুনি তৈরী করে দিচ্ছি।’
‘আর তৈরীতে কাজ নেই বাছা—এমনি দাও।’
শ্রীমা তখন সিধে সাজিয়ে দিলেন। ঘি ময়দা আলু পটল—কত কি৷
সেই বৃন্দে-ঝি দরজায়। একটু বোধ হয় ঘাবড়ে গেল মাস্টার। বললে, ‘হ্যাঁ গা. সাধুটি কি ভিতরে আছেন?’
‘ভিতরে থাকবে না তো যাবে কোথায়?”
‘কত দিন আছেন বলো তো এখানে?
‘আমি কত দিন আছি তার হিসেব কে রাখে ঠিক নেই—অন্যের হিসেব রাখতে যাব!’
মাস্টার দ্বিধা করল, তবু জিজ্ঞেস না করে পারল না। ‘আচ্ছা, ইনি কি খুব বইটই পড়েন?”
‘ওসব তোমরা পড়ো।’ বৃন্দে-ঝি ঝামটা মেরে উঠল: ‘সব বই ওঁর মুখে-মুখে।’ বই পড়ে না সে আবার কি রকম জ্ঞানী!
গ্রন্থ নয় হে, গ্রন্থি—গাঁট। শুধু পান্ডিত্যে মানুষ ভোলাতে পারবে, তাঁকে পারবে না। হাজার বই পড়ো, হাজার শ্লোক আওড়াও, ব্যাকুল হয়ে তাঁতে ডুব না দিলে তাঁকে ছুঁতেও পারবে না। পন্ডিত খুব লম্বা-লম্বা কথা বলে, কিন্তু নজর কেবল পার্থিব সুখে। যেমন শকুনি খুব উঁচুতে ওঠে, কিন্তু নজর রয়েছে গো-ভাগাড়ে। শুধু-পণ্ডিতগুলো দরকচা পড়া। না এ দিক না ও দিক।
তাই সংক্ষেপে করো। পিঁপড়ের মতো বালিটকু ত্যাগ করে চিনিটুকু নাও। শব্দার্থ না খুঁজে মর্মার্থ খোঁজো। সাধুমুখে গুরুমুখে জেনে নাও সেই মর্ম-স্থলের সংবাদ। এক জানার নাম জ্ঞান, অনেক জানার নাম অজ্ঞান।
এক দৃষ্টে শুধু পাখির চোখ দেখ। লক্ষ্যভেদের সময় অর্জুনকে দ্রোণাচার্য কী জিজ্ঞেস করলেন? জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমাদের সবাইকে দেখতে পাচ্ছ? এই সব রাজা-রাজড়া, গাছ, গাছের ডাল-পালা, তার উপরে পাখি—দেখতে পাচ্ছ সব?”
অর্জুন বললে, ‘শুধু পাখির চোখ দেখতে পাচ্ছি।
যে শুধু পাখির চোখ দেখে, সেই লক্ষ্যভেদ করে।
‘বন্ধ ঘরে ইনি বুঝি এখন সন্ধে করছেন—’ বৃন্দে ঝিকে জিজ্ঞেস করল মাস্টার।
‘তোমার বুদ্ধি কি গো! ঘরে ধুনো দিয়েছি। যাও না, ঘরে গিয়ে বোসো না।’
ঘরে ঢুকে প্রণাম করে বসল দুজনে। মামুলী দু-চারটে প্রশ্ন করলেন ঠাকুর। কথার ফাঁকে-ফাঁকে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছেন। সেই তন্ময়তার মধ্যে শিথিল ঔদাসীন্য নেই, বরং রয়েছে আতীব্র একাগ্রতা। একেই বুঝি ভাব বলে।
সিদ্ধেশ্বর বললে, ‘সন্ধের পর এমনি ওঁর ভাবান্তর হয়।’
তবে আরেক দিন সকাল বেলা আসব। দেখব প্রভাত-আলোয়।
শীতের সকাল। নাপিত এসেছে, ঠাকুর কামাতে যাচ্ছেন। গায়ে র্যাপার, ধারগুলো শালু দিয়ে মোড়া, পায়ে চটি জুতো।
‘তুমি এসেছ? আচ্ছা বোসো আমার কাছে।
দক্ষিণের বারান্দায় কামাতে বসলেন। কামাচ্ছেন আর কথা কইছেন।
হঠাৎ বলে উঠলেন কাতর ভাবে। ‘হ্যাঁগা, কেশব কেমন আছে বলতে পারো? তার বড্ড অসুখ।
‘আমিও শুনেছি বটে। ‘
‘তার অসুখ হলেই আমার প্রাণটা বড় ব্যাকুল হয়। রাত্রি শেষ প্রহরে উঠে আমি কাঁদি। বলি, মা, কেশবের যদি কিছু হয়, তবে কার সঙ্গে কথা কবো।’
মাস্টারের বুকের ভিতরটা কেমন করে উঠল। বললে, ‘এখন বোধ হয় ভালো আছেন।’
‘কেশবের জন্যে মা’র কাছে ডাব চিনি মেনেছি। কলকাতায় গেলে দিয়ে আসব সিদ্ধেশ্বরীকে।’ বলে তাকালেন মাস্টারের দিকে। শুধোলেন, ‘তোমার কি বিয়ে হয়েছে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ, হয়েছে।’
যন্ত্রণায় প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন ঠাকুর। ‘ওরে রামলাল! যাঃ, বিয়ে করে ফেলেছে।
মাথা হেঁট করে বসে রইল মাস্টার। বিয়ে করা কি এতই দোষ?
আবার জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর, ‘ছেলে হয়েছে?”
বুকের মধ্যেটা ঢিপ-ঢিপ করছে মাস্টারের। ভয়ে ভয়ে বললে, ‘আজ্ঞে, হয়েছে একটি।”
‘যাঃ, ছেলেও হয়ে গেছে।’ আবার কাতরোক্তি করে উঠলেন। পরে বললেন স্নেহস্বরে, ‘তোমার মধ্যে যে ভালো লক্ষণ ছিল। আমি কপাল চোখ এ সব দেখে বুঝতে পারি—’
জানো, মানুষের মন হচ্ছে সরষের পুঁটলি। সরষের পুঁটলি ছড়িয়ে পড়লে কুড়ানো ভার হয়ে ওঠে। তেমনি কামিনী-কাঞ্চনে মন ছড়িয়ে পড়লে ছড়ানো মন কুড়ানো দায়।
অনেকের কাছে স্ত্রী একেবারে শিরোমণি। বলে, আমাকে কত ভালোবাসে, কত সেবা-যত্ন করে, তাকে ছেড়ে যাই কেমন করে? শিষ্যকে গুরু, তাই এক ফন্দি শিখিয়ে দিল। একটা ওষুধের বড়ি দিয়ে বললে, এইটে খেলেই মড়ার মত হয়ে যাবি, তোর জ্ঞান থাকবে না। কিন্তু সব বেশ পাবি দেখতে-শুনতে। তার পর আমি এলে তোর চৈতন্য হবে। যেমন কথা তেমন কাজ। শিষ্যের বাড়িতে কান্নাকাটি পড়ে গেল। ওগো দিদি গো আমার কি হল গো, তুমি আমাদের কী করে গেলে গো—বলে আছড়ে আছড়ে কাঁদতে লাগল স্ত্রী। লোকজন সব জড়ো হল। খাট এনে তাকে ঘর থেকে বার করবার যোগাড় করলে। কিন্তু বড়ির গুণে লাশ এঁকে-বেঁকে আড়ষ্ট হয়ে যাওয়াতে দরজা দিয়ে তা বেরুচ্ছে না সিধেসিধি। তখন একজন একখানা কাটারি নিয়ে এল। দরজার চৌকাঠ কাটতে আরম্ভ করলে। দুম দুম শব্দ শুনে স্ত্রী ছুটে এল অস্থির হয়ে। ওগো, কী হয়েছে গো! কী করছ গো! ইনি বেরুচ্ছেন না তাই দরজা কাটছি। অমন কম্ম করো না গো! স্ত্রী চেঁচাতে লাগল। আমি এখন রাঁড়-বেওয়া হলুম, আমার আর দেখবার-শোনবার কেউ নেই। কটি নাবালক ছেলেকে মানুষ করতে হবে। এ দুয়ার গেলে তো আর হবে না। ওগো, ওর যা হবার তা তো হয়ে গেছে, ওর হাত-পা কেটে বার করো। ততক্ষণে গুরু এসে গিয়েছে। লাফিয়ে উঠল শিষ্য। হাঁক পাড়লে, তবে রে শালী, আমার হাত-পা কাটবে? এই বলে গুরুর সঙ্গে বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে।
জানো না বুঝি, অনেক স্ত্রী আবার ঢঙ করে শোক করে। কাঁদতে হবে বলে গয়না নৎ খুলে বাক্সের ভেতরে রেখে আসে। তার পর আছড়ে পড়ে কাঁদে—’ওগো দিদি গো, আমার কী হলো গো—’
এই স্ত্রী! এই সংসার!
‘আচ্ছা তোমার পরিবার কেমন? বিদ্যাশক্তি না অবিদ্যাশক্তি?
মাস্টার ভরসা পেয়ে বললে, ‘আজ্ঞে ভালো, কিন্তু অজ্ঞান।
যেন লেখাপড়া শিখলেই জ্ঞান!
ঠাকুর একটু বিরক্ত হলেন। বললেন, ‘আর তুমি এক মস্ত জ্ঞানী!
অহঙ্কার চূর্ণ হয়ে গেল মাষ্টারের।
শোনো, বারে বারে শোনো, এক জানার নাম জ্ঞান, অনেক জানার নাম অজ্ঞান। চৈতন্যদেব দক্ষিণ দেশে ভ্রমণের সময় দেখলেন একজন গীতা পাঠ করছে, আর একজন একটু দূরে বসে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছে। চৈতন্যদেব তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এ সব কিছু বুঝতে পারছ? সে বললে, ঠাকুর, আমি শ্লোক কিছুই বুঝতে পারছি না, আমি অর্জুনের রথ দেখতে পাচ্ছি আর তার সামনে ঠাকুর আর অর্জুন কথা কইছেন।
জানতেও বই লাগে না, চিনতেও বই লাগে না। অক্ষরজ্ঞান ছাড়াও সম্ভব সে অক্ষর-জ্ঞান।
কলকাতা যাবার পথে বিষ্ণুপুর ইস্টিশানে গাড়ির অপেক্ষা করছেন শ্রীমা। হঠাৎ এক হিন্দুস্থানী কুলি তাঁকে দেখতে পেয়ে ছুটে এল। কাঁদতে-কাঁদতে লুটিয়ে পড়ল পায়ের কাছে। বললে, ‘তু মেরী জানকী, তুঝে ম্যায় নে কিতনে দিনোসে খোঁজা থা। ইতনে রোজ তু কাঁহা থী?”
তুই আমার মা জানকী। তোকে কত দিন ধরে খুঁজছি। তুই এত দিন কোথায় ছিলি?
মা তাকে শান্ত করলেন। বললেন, একটি ফুল নিয়ে আয়। ফুল নিয়ে কি করতে হবে বলে দিতে হল না কুলিকে। মা’র পাদপদ্মে নিবেদন করলে। মা তাকে দিয়ে দিলেন ইষ্টমন্ত্র।
কেশবেরও বড় সাধ রামকৃষ্ণের পা দুখানি ফুল দিয়ে পূজো করে। কিন্তু পাড়ার লোক, দলের লোক কি ভাববে এই ভেবে সাহস পায় না।
সেদিন রামকৃষ্ণের সঙ্গে ব্রহ্মজ্ঞানের কথা হচ্ছিল কেশবের। কেশব বললে, আরো বলুন।
রামকৃষ্ণ হেসে বললেন, ‘আর বললে দলটল থাকবে না।’
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল কেশব। বললে, ‘তবে আর থাক মশাই।’
এই দল-দল করতেই দলা পাকিয়ে গেল। তুমি দল-দল করছ আর এদিকে তোমার দল থেকে লোক ভেঙে-ভেঙে যাচ্ছে।
‘আর বলেন কেন মশাই। তিন বচ্ছর এ দলে থেকে আবার ও দলে চলে গেল। যাবার সময় আবার গালাগাল দিয়ে গেল—’
রামকৃষ্ণ বললেন, ‘তুমি লক্ষণ দেখ না কেন? যাকে-তাকে চেলা করলে কি হয়?’ যতক্ষণ মোড়লি করছ ততক্ষণ মা আসে না। মা ভাবে ছেলে আমার মোড়ল হয়ে বেশ আছে। আছে তো থাক।
যে ভাবছে, আমি দলপতি, দল করেছি, লোকশিক্ষা দিচ্ছি, সে কাঁচা আমি। ঘি কাঁচা থাকলেই কলকলানি করে। মধু যতক্ষণ না পায় ততক্ষণই ভনভনানি করে মাছি। তুমি এখন ও সব ছাড়ো। পাকা ঘি, পাকা আমি হও। সালিশি মোড়লি তো অনেক করলে, এখন তাঁর পাদপদ্মে বেশি করে মন দাও। বলে, কার দল কে করে। দল ভাঙে তো তোমার কি। বলে, লঙ্কায় রাবণ মলো, বেহুলা কেঁদে আকুল হলো।
তুমি দলে নও, তুমি শতদলে।
কিন্তু কিছুতেই পুরোপুরি হয় না কেশবের। সিদ্ধি মুখে নিয়ে শুধু কুলকুচোই করলে, পেটে ঢোকালে না। পেটে না ঢোকালে কি নেশা হবে?
অহেতুকী ভক্তি না হলে কি মিলবে ভগবানকে?
কেশব উপাসনা করছে। বলছে, হে ঈশ্বর, তোমার ভক্তিনদীতে যেন ডুবে যাই। রামকৃষ্ণ বললেন, ‘ওগো, তুমি ভক্তিতে ডুবে যাবে কি করে? ডুবে গেলে চিকের ভেতর যারা আছে তাদের হবে কি! বেশি দূর এগোতে চেয়ো না–বেশি এগোতে গেলে সংসার-টংসার ফক্কা হয়ে যাবে। তবে এক কর্ম কোরো। মাঝে-মাঝে ডুব দিয়ো, আর এক-একবার আড়ায় উঠো।’
রামকৃষ্ণকে বাড়িতে নিয়ে এসেছে কেশব। অনেক ফুল নিয়ে এসেছে। অনেক ফুল দিয়ে পূজা করবে রামকৃষ্ণকে। প্রাণ ঢেলে পূজা করবে।
তাই করলে কেশব। কিন্তু —
কিন্তু পূজা করবার আগে ঘরের দরজা বন্ধ করলে। বন্ধ করলে, পাছে তার পাড়ার লোক, তার দলের লোক টের পায়।
মনে-মনে হাসলেন রামকৃষ্ণ। বললেন, ‘ও যেমন দরজা বন্ধ করে পূজা করলে, তেমনি ওর দরজাও বন্ধ থাকবে!’
কিন্তু বিজয়? মুক্ত অঙ্গনে সকলের চোখের সামনে ঠাকুরের পাদমূলে লুটিয়ে পড়ল। ঠাকুরের পা দুখানি ধরলে নিজের বুকের মধ্যে। রক্তমাখা প্রাণপুষ্প অৰ্ঘ্য দিলে ঠাকুরকে।
মহিমা চক্রবর্তী জিজ্ঞেস করলে, ‘বহু, তীর্থ করে এলেন, দেখে এলেন অনেক দেশ, এখন এখানে কী দেখলেন বলুন।’
‘কি বলবো।’ অশ্রু, ভরভর বিজয়ের কণ্ঠস্বর: ‘দেখছি, যেখানে এখন বসে আছি, এখানেই সব। কেবল মিছে ঘোরা। কোনো-কোনো জায়গায় এরই এক আনা, দু আনা, বড় জোর চার আনা—এই পর্যন্ত। এখানেই পূর্ণ ষোলো আনা দেখছি।’ ‘দেখ বিজয়ের কি অবস্থা হয়েছে। লক্ষণ সব বদলে গেছে। যেন সব আউটে গেছে। আমি পরমহংসের ঘাড় ও কপাল দেখে চিনতে পারি। বলতে পারি পরমহংস কিনা।’
নিজের কথা শুনবে না বিজয়। পরের কথা, একের কথা, প্রত্যক্ষের কথা শুনবে। বললে, ‘এখানেই ষোলো আনা।’
কেদার বললে, ‘অন্য জায়গায় খেতে পাই না-এখানে এসে পেটভরা পেলাম। মহিমা বললে, ‘পেটভরা কি! উপচে পড়ছে।’
হাত জোড় করল বিজয়। বললে, ‘বুঝেছি আপনি কে। আর বলতে হবে না।’ ভাবারূঢ় অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, ‘যদি তা হয়ে থাকে তো তাই।
