পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.৩৫
৩৫
রঙ্গন আর জুঁই ফুল দিয়ে মালা গেঁথেছে সারদা। সাত-লহর গোড়ে মালা। বিকেল বেলা গেঁথে পাথরের বাটিতে জল দিয়ে রাখতেই কুঁড়িগুলি ফুটে উঠেছে। মন্দিরে পাঠিয়ে দিল। জগদম্বার গলার গয়না খুলে রেখে পরানো হল ফুলের মালা।
রামকৃষ্ণ দেখতে এসেছে ভবতারিণীকে। আহা এ কি রূপ! একদিকে নিকষের মতো কালো আকাশ, তার গায়ে সূর্যোদয়ের ছিটে-লাগা শাদা সমুদ্রের ঢেউ। ভাবে একেবারে বিভোর রামকৃষ্ণ।
সেই যে ছ-বছর বয়সে প্রথমে দেখেছিল সরু আল-পথ দিয়ে মাঠে যেতে-যেতে। কাজল কালো আকাশের কোলে সিতপক্ষ বকের বলাকা।
‘আহা, কালো রঙে কী সুন্দরই মানিয়েছে!
যেন জীবন-মৃত্যুর কোলাকুলি। মাঝখানে ঈশ্বরানুরাগের রক্তিমা।
‘কে গেঁথেছে রে এমন মালা?’ চারদিকে তাকালো রামকৃষ্ণ।
‘আর কে!’ পাশে ছিল বৃন্দে-ঝি, টিপ্পনি কাটল।
রামকৃষ্ণের বুঝতে আর বাকি নেই, কে! সে ছাড়া আর কার এমন শুভ্রতা, কার এমন চিকণ-গাঁথন। ভক্তির সুগন্ধে গদগদ হয়ে আছে সারল্যের হাসিটি।
‘আহা, তাকে একবার ডেকে নিয়ে এস।’ স্নেহের আনন্দে উছলে উঠল রামকৃষ্ণ। মালা পরে মায়ের কি রূপ খুলেছে একবার দেখে যাক।’
বৃন্দে-ঝি ডাকতে গেল সারদাকে।
লজ্জায় জড়িপটি খেয়ে গেল। মন্দিরে কেউ আর নেই তো এ সময়?
নেই। তা ছাড়া ঠাকুর যখন ডেকেছেন—
কিন্তু মন্দিরের কাছে আসতেই দেখল সুরেন মিত্তির, বলরাম বোস, আরো কে কে, আসছে এদিকে। হয়েছে! এখন তবে কোথায় যাই! কোথায় লুকোই। বৃন্দের আঁচল টেনে ধরে তাড়াতাড়ি নিজেকে ঢাকা দিল সারদা। কোনো রকমে একটা আড়াল রচনা করে পিছনের সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেল।
আশ্চর্য, ঠিক নজর রেখেছে রামকৃষ্ণ। বলে উঠল, ‘ওগো ওদিক দিয়ে উঠো না। সেদিন এক মেছুনি উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে মরেছে। সামনের দিক দিয়েই এস।’
বলরামবাবুরা সরে দাঁড়ালো। সারদা উঠে দাঁড়ালো। ভাবে-প্রেমে গান ধরল রামকৃষ্ণ।
সেবার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে সত্যি-সত্যিই কিন্তু পড়ে গিয়েছিলেন শ্রীমা। দুধের বাটি নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন— বাটিতে আড়াই সের দুধ। ঠাকুরের তখন অসুখ, আছেন কাশীপুরের বাড়িতে। হঠাৎ কি হল, মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন শ্রীমা। দুধ তো গেলই, পায়ের গোড়ালির হাড় সরে গেল। নরেন আর বাবুরাম কাছে পিঠে কোথাও ছিল, ছুটে এসে ধরলে মাকে।
ঠাকুর শুনতে পেলেন। ডাকিয়ে আনলেন বাবুরামকে। বললেন, ‘তাই তো—এখন তবে আমার খাওয়ার কি উপায় হবে?’
ঠাকুর তখন মন্ড খান। সে-মন্ড তৈরি করে দেন শ্রীমা। রোজ উপরের ঘরে গিয়ে খাইয়ে আসেন ঠাকুরকে।
‘এখন তবে কে আমার মন্ড রাঁধবে? কে খাইয়ে দেবে?
শ্রীমা’র পা বিষম ফুলে উঠেছে, নিদারুণ যন্ত্রণা। ওঠা-চলা সম্ভবের বাইরে। গোলাপ-মা রেঁধে দিচ্ছে মন্ড। নরেন খাইয়ে দিচ্ছে নিজের হাতে।
একদিন বাবুরামকে নিজের কাছটিতে ডেকে আনলেন ঠাকুর। নিজের নাকের কাছে হাত ঘুরিয়ে ঠারে ঠোরে বললেন, ‘ওকে একবারটি এখানে নিয়ে আসতে পারিস?’ বাবুরাম তো অবাক। পা ফেলতে পারেন না মাটিতে, সিঁড়ি বেয়ে আসবেন কি করে উপরে?
ঠাকুর পরিহাস করে বললেন, ‘একটা ঝুড়ির মধ্যে ওকে বসিয়ে দিব্যি মাথায় করে তুলে নিয়ে আসবি।’
নরেন আর বাবুরাম উচ্চকণ্ঠে হেসে উঠল।
ব্যথাটা একটু কম পড়তেই উঠে দাঁড়ালেন শ্রীমা। নরেন-বাবুরামকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘আমাকে তোমরা ধরে ধরে নিয়ে যাও উপরে। হ্যাঁ, খুব পারব আমি, ওঁকে নিজের হাতে খাইয়ে আসি।’
বাবুরাম আর নরেন মাকে নিয়ে চলল ধরে-ধরে।
কিন্তু সেবার যখন ঠাকুরের হাত ভেঙেছিল তখন কী হয়েছিল?
জগন্নাথকে মধুর ভাবে আলিঙ্গন করতে গিয়েই ঠাকুর পড়ে গেলেন। ভেঙে গেল বাঁ-হাত। এর দু-একদিন আগেই সারদামণি ফিরেছে দেশ থেকে। দক্ষিণেশ্বরে ফিরতে না ফিরতেই এই অঘটন।
‘কবে রওনা হয়েছিলে?’ জিজ্ঞেস করলেন ঠাকুর।
‘বেস্পতিবার।
‘বেলা তখন কত?
হিসেব করে দেখা গেল, বারবেলা।
আর কথা নেই। ঠাকুর বললেন দৃঢ়স্বরে, ‘বিষুৎবারের বারবেলায় রওনা হয়ে এসেছ বলেই আমার হাত ভেঙেছে। যাও, যাত্রা বদলে এস।
আর কথাটি নেই। সারদা ফিরে চলল দেশে। যাত্রা বদলে আসতে।
তুমি যেমন বলো তেমনি চলি। তোমার যাতে আরাম তাতেই আমার আনন্দ। বৃক্ষ হয়ে যদি বসতে বলো, বসি। আকাশ হয়ে যদি বলো ওড়ো, উড়ে বেড়াই। বৃক্ষ আর আকাশ, দুইই আমার আশ্রয়।
মথুরবাবুর দেওয়া পিঁড়িতে রামকৃষ্ণ বসে আর সারদা তার গায়ে তেল মাখিয়ে দেয়। সারদা তন্ময় হয়ে দেখে, গা থেকে যেন জ্যোতি বেরুচ্ছে। আর কী রঙ! যেন হরিতালের মত! বাহুতে সোনার ইষ্টকবচ, তার সঙ্গে গায়ের রঙ যেন মিশে গেছে।
ঠাকুর তখন দেহ রেখেছেন, ঠাকুরের ইষ্টকবচ তখন শ্রীমা’র হাতে। ট্রেনে বৃন্দাবন যাচ্ছেন শ্রীমা, দেখতে পেলেন জানলার বাইরে ঠাকুর দাঁড়িয়ে। শুধু দাঁড়িয়ে নয়, জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দিয়েছেন ভিতরে। বলছেন, ‘কবচটি যে সঙ্গে-সঙ্গে রেখেছ, দেখো যেন না হারায়।’
মা’র যে হাতখানিতে কবচ ছিল তা বোধ হয় জানলার উপরে অনাবৃত ছিল। দেখতে পেয়ে ঠাকুর তাই সাবধান করে দিলেন।
আগে একবার সত্যিই গিয়েছিল হারিয়ে। সেই কবচ পূজো করতেন শ্রীমা। একবার ঠাকুরের এক তিথিপূজার দিন ফুল-বেলপাতার সঙ্গে তাকেও ফেলে দিয়েছিল গঙ্গায়। কারুর খেয়াল ছিল না। কিন্তু যাঁর কবচ তাঁর খেয়াল আছে। ভাঁটায় জল যখন কমে গেল, তখন গঙ্গার পারে খেলতে গেল হৃষি, বলরামের ছেলে। দিব্যি পেয়ে গেল ইষ্টকবচ।
যা হারাবার নয় তা কে হরণ করে। নিশীথ রাত্রে নিজের হাতে যদি ঘরের আলো নিবিয়েও ফেলি, বাইরে চেয়ে দেখি ধ্রুবতারার জ্যোতিটি তুমি ঠিক জ্বেলে রেখেছ!
পরনে ছোট তেল-ধুতি, থস থস করে গঙ্গায় নাইতে যায় রামকৃষ্ণ। কাচের উপর রোদ লেগে যেমন ঠিকরে পড়ে তেমনি তার গা থেকে একটা আভা ছিটকে পড়ছে চারদিকে। যে দেখে তারই আর পলক পড়ে না।
রামকৃষ্ণের জন্যে রাঁধে সারদা। যদিও পরিহাস করে বলে, শ্রীনাথ হাতুড়ে, তবু সারদার রান্নাটিতেই রামকৃষ্ণের অন্তরের রুচি। সজনে খাড়া বা পলতা শাক যেটি যখন রাঁধে সারদা, সেটিই একান্ত মনের মতন হয়ে ওঠে। স্বাদ আর পুষ্টির স্বাভাবিক মিতালি। রাত্রে দু-একখানি লুচি আর একটু সুজির পায়েস। কাশীপুরে তুলোর মতন নরম করে মাংসও রেঁধে দিয়েছেন শ্রীমা।
“আমি যখন ঠাকুরের জন্যে রাঁধতুম কাশীপুরে, কাঁচা জলে মাংস দিতুম। কখানা তেজপাতা আর অল্প খানিকটা মশলা। তুলোর মতন সেদ্ধ হলে নামিয়ে নিতুম।
থালার উপর টিপে-টিপে ভাত বেড়ে দেয় সারদা। যাতে একটু কম দেখায়। বেশি ভাত দেখলে আঁতকে ওঠে রামকৃষ্ণ। তাই সরুটি করে দেয় টিপে-টিপে। দুধের বেলায়ও তাই। আধ সের করে রোজ বাঁধা। কখনো-সখনো একটু বেশি দিয়ে যায় গয়লা। সেটাকে ফুটিয়ে ঘন করে রাখে। সর করে। সর ভালোবাসে রামকৃষ্ণ। এমনি করে ভুলিয়ে ভুলিয়ে খাওয়ায় সেই সদানন্দ শিশুকে। কিন্তু কিছুতেই লোভ নেই সেই শিশুর। একদিন একটা সন্দেশ মুখে পুরে দিতে গিয়েছিল সারদা, রামকৃষ্ণ বললে, ‘ওতে আর কি আছে? সন্দেশও যা মাটিও তা।’
শুধু নারকেলের নাড়ু আর জিলিপির উপর একটু পক্ষপাত।
‘ঠাকুর নারকেলের নাড়ু ভালোবাসতেন।’ এক স্ত্রী-ভক্তকে বললেন এক দিন শ্রীমা: ‘দেশে গিয়ে তাই করে তাঁকে ভোগ দেবে।’
আর জিলিপি?
কেশব সেনের বাড়িতে খেতে বসেছেন ঠাকুর। খাওয়া হয়ে গিয়েছে হাত তুলে বসেছেন পাত থেকে। আর খাবেন না, শত সাধাসাধি করলেও না। এমন সময় জিলিপি এসে উপস্থিত। আর যায় কোথা! ঠাকুর তুলে নিলেন জিলিপি। এ হচ্ছে বড়লাটের গাড়ি। ঠাকুর প্রসন্ন চোখে হাসলেন। বড়লাটের গাড়ি দেখলে রাস্তা যেমন ফাঁকা হয়ে যায় তেমনি জিলিপি দেখে ভরা পেট হালকা হয়ে যাচ্ছে। জিলিপির সঙ্গে কার কথা! জিলিপি হচ্ছে অমৃতের লিপি! সেই শিশুকালের অকৃত্রিম সুস্বাদের সংবাদ। সেই কামারপুকুরের সত্য-ময়রার দোকান। খাবার জায়গা হয়েছে রামকৃষ্ণের। নহবত থেকে থালা হাতে নিয়ে আসছে সারদা। ভক্তরা সব এখন সরে যাও। সিঁড়ি থেকে বারান্দায় পা দিয়েছে, কোত্থেকে এক মেয়ে-ভক্ত হাঁ-হাঁ করে ছুটে এল। ‘দাও মা আমাকে দাও।’ বলে প্রায় জোর করেই সারদার হাত থেকে টেনে নিল থালা। রামকৃষ্ণের আসনের কাছে ধরে দিয়ে সরে গেল। সারদা বসল এক পাশে। রোজ এমনিই এসে বসে। রামকৃষ্ণের খাওয়া দেখে। খেয়ে যে স্বাদ রামকৃষ্ণ পায় তারও চেয়ে সারদা অধিকতর পায় না-খেয়ে।
‘তুমি এ কি করলে?’ আসনে বসেই বললে রামকৃষ্ণ, ‘আমার খাবার নিজে না নিয়ে ওর হাতে দিলে কেন? তুমি কি ওকে জানো না?” একটা কলঙ্ক ছিল মেয়েটির। সারদা বললে, ‘জানি।’ ‘জানো তো, দিলে কেন? এখন আমি খাই কি করে?”
মেয়েটির হাতের সেই আকুলতাটি বুঝি মনে পড়ল সারদার। বললে, ‘আজকে খাও।’
‘তবে বলো, আর কোনো দিন আর কারু হাতে দেবে না আমার খাবার?’
সারদা জোড় হাত করল। বললে, ‘ওটি আমি পারব না। যে কেউ চাইলেই আমি ছেড়ে দেব ভাতের থালা।’
করুণাময়ীর এ আরেক অমৃত-পরিবেশন। আমার ভালোবাসার সঙ্গে আর যদি কেউ তার ভক্তির স্বাদটি মিশিয়ে দিতে চায় তা আমি বারণ করি কি করে?
‘তবে চেষ্টা করব খুব। সারদা বললে গাঢ়ম্বরে, ‘যাতে আমিই বরাবর নিজের হাতে নিয়ে আসতে পারি।’ খুশি মনে খেতে লাগল রামকৃষ্ণ।
কাশীপুরে ঠাকুরের জন্যে শামুকের ঝোল ব্যবস্থা হল। ঠাকুরের ইচ্ছে শ্রীমাই তা রান্না করুন। শ্রীমা বললেন, ‘ও আমি পারব না।’
‘কেন কি হল?’
‘ওগুলো জীয়ন্ত প্রাণী, চলে বেড়ায়। ওদের মাথা আমি ইট দিয়ে ছেঁচতে পারব না।’
‘সে কি? আমি খাব, আমার জন্যে করবে!’
তখন, কি আর করা, রোক করে করতে লাগলেন শ্রীমা।
‘মা, ঠাকুরকে অন্ন ভোগ দেব কি?’ জিজ্ঞেস করলেন এক স্ত্রী-ভক্ত।
‘হ্যাঁ, দেবে বৈ কি। তিনি শুকতো খেতে ভালোবাসেন। গাঁদাল, ডুমুর, কাঁচকলা -‘
‘মাছ ভোগ দেব কি?’ কুণ্ঠা-ভরা জিজ্ঞাসা মেয়েটির।
‘হ্যাঁ, তাও দেবে। তিনি সেদ্ধ চালের ভাত খেতেন, মাছও খেতেন। অন্তত শনি-মঙ্গলবারে মাছ ভোগ দেবে। আর যেমন করে হোক তিন তরকারি ছাড়া ভোগ দেবে না—’
তারপরে পান সাজে সারদা। রামকৃষ্ণের মশলা এলাচ লাগে না। শাদাসিধে সাজা পানেই অন্তরঙ্গ স্বাদ। পান সাজছে নহবতে বসে। কতগুলো বেশ ভালো করে এলাচ-মশলা দিয়ে, কতগুলো শুধু সুপারি-চুন দিয়েই। যোগেন বসে ছিল পাশে। জিজ্ঞেস করলে, ‘কই এগুলোতে মশলা-এলাচ দিলে না? ওগুলো বা কার, এগুলোই বা কার?’
সারদা বললে, ‘যেগুলো ভালো, এলাচ-দেওয়া সেগুলো ভক্তদের। ওদের আপনার করে নিতে হবে, তাই একটু আদর-যত্নের ছিটেফোঁটা ওগুলোতে। আর এলাচ-মশলা ছাড়া এগুলো—এগুলো ওঁর জন্যে। উনি তো আপনার আছেনই।’
তোমাকে ভালো ভাষায় ভোলাব না, তোমাকে ভালোবাসায় ভোলাব। তোমার জন্যে আমার কোনো সাজ-সজ্জা নেই, আমার এই সারল্যটুকুই আমার একমাত্র ভূষণ। আমার তো ঘোষণা নয়, আমার আহ্বান। অকপট না হলে তোমার কপাটপাটন হবে না যে।
আহারান্তে রামকৃষ্ণ ছোট খাটটিতে এসে বসে। তামাক খায়। সারদা এসে পা টেপে। শেষকালে, সারদার চলে যাবার আগে সারদাকে আবার প্রণাম করে রামকৃষ্ণ।
সন্ন্যাসী-স্বামীর একটি পরিত্যক্তা স্ত্রী এসেছে দক্ষিণেশ্বরে। একটু সাজগোজ করতে চায় বলে তার উপর তার শাশুড়ির বড় কড়া শাসন। শ্রীমা তাই বলছেন দুঃখ করে: ‘আহা ছেলেমানুষ বৌ, তার একটু পরতে-খেতে ইচ্ছে হয় না? একটু আলতা পরেছে তা আর কি হয়েছে? আহা, ওরা তো স্বামীকে চোখেই দেখতে পায় না-স্বামী সন্ন্যাস নিয়েছে। আমি তো তবু চোখে দেখেছি, সেবা-যত্ন করেছি, রেঁধে খাওয়াতে পেরেছি, যখন বলেছেন যেতে পেরেছি কাছে, যখন বলেননি, দুমাস পর্যন্ত নামিইনি নবত থেকে। দূর থেকে দেখে পেন্নাম করেছি—’
সাজতে সারদাও ভালোবাসে।
কেন বাসবে না? ওরে, ওর নাম সারদা, ও সরস্বতী। তাই তো ভালোবাসে সাজতে।’ বললে রামকৃষ্ণ। নিজে টাকা-কড়ি ছুঁতে পারে না, তাই ডাকালো হৃদয়কে। ‘দ্যাখ তো, তোর সিন্দুকে কত টাকা আছে। ওকে ভালো করে দু ছড়া তাবিজ গড়িয়ে দে।’ সিন্দুক থেকে তিনশো টাকা বেরুলো। তাই দিয়ে তাবিজ হল সারদার। রামকৃষ্ণের মাইনে নিয়ে হিসেবে কি গোল করেছিল খাজাঞ্চি। কম দিয়েছিল। তাই নিয়ে এক দিন বললে সারদা, খাজাঞ্চিকে গিয়ে বলো না —
রামকৃষ্ণ বললে, ‘ছি-ছি, হিসেব করব?
হিসেব পচে যায়।
এদিকে সর্বস্ব ত্যাগী, অথচ সারদার জন্যে ভাবনা। এক দিন তাকে জিজ্ঞেস করলে রামকৃষ্ণ, ‘তোমার ক’টাকা হলে হাতখরচ চলে?
মুখ নামালো সারদা। বললে, ‘পাঁচ-ছ টাকা হলেই চলে।’
তারপর, হঠাৎ আরেক অদ্ভূত জিজ্ঞাসা: বিকেলে কখানা রুটি খাও?”
এবার লজ্জায় আর বাঁচে না সারদা। কি করে বলি! এ কি একটা বলবার মত কথা! কিন্তু রামকৃষ্ণ ছাড়ে না। জিজ্ঞেস করে বারে বারে। মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে সারদা বললে, ‘এই পাঁচ-ছখানা খাই।’
তারপর আরো একটু অন্তরঙ্গ হয় রামকৃষ্ণ। বলে, ‘বুনো পাখি খাঁচায় রাতদিন থাকলে বেতে যায়। মাঝে-মাঝে পাড়ায় বেড়াতে যাবে।’
এক দিন ক’টা পাট এনে দিলে সারদাকে। বললে, ‘এগুলি দিয়ে আমাকে শিকে পাকিয়ে দাও। আমি সন্দেশ রাখব লুচি রাখব ছেলেদের জন্যে।’
সারদা শিকে পাকিয়ে দিল। ফেঁসোগুলো দিয়ে থান ফেলে বালিশ করলে।
কোনো জিনিস অপচয় হতে দেয় না সারদা! যত সামান্য জিনিস হোক, যত্ন করে রেখে দেয়, কাজে লাগায়। বলে সেই অপূর্ব কথা: ‘যাকে রাখো সেই রাখে।’ পটপটে মাদুর পেতে ফেঁসোর বালিশে মাথা রেখে সারদা শোয়। দিব্যি ঘুম আসে।
পাড়াগেঁয়ে মেয়ে, সারদার জন্যে বড় ভাবনা রামকৃষ্ণের। কোথায় না জানি শৌচে যাবে, নিন্দে করবে লোকে, তখন ভারি লজ্জা পাবে বেচারী! কিন্তু আশ্চর্য, কখন যে কি করে, কাকপক্ষীও টের পায় না।
‘বাইরে যেতে আমিও কখনো দেখলুম না।’ বলে ফেলল রামকৃষ্ণ।
কথাটা সারদার কানে যেতেই মুখ শুকিয়ে গেল। ওমা, এখন কী হবে! ঠাকুর যা মনে-মনে চান তাইই মা ওঁকে দেখিয়ে দেন। এখন তো তবে এক দিন তাঁর চোখে ঠিক ধরা পড়ে যাব! এখন উপায়? আকুল হয়ে ভবতারিণীকে ডাকতে লাগল সারদা। ‘হে মা, আমার লজ্জা রক্ষা করো।’
এমন মা, বিপন্না মেয়ের দায় মোচন করলে। দুই পাখা দিয়ে ঢেকে রাখল মেয়েকে। কত বছর ধরে আছে সারদা, এক দিনও কারু সামনে পড়ল না।
রাত তিনটের সময় উঠে জপে বসে। জপে বসে আর কোনো হুঁস থাকে না। সেদিন জ্যোৎস্না রাত, নবতে সিঁড়ির পাশে বসে জপ করছে সারদা। চারদিকে রুদ্ধশ্বাস স্তব্ধতা। ধ্যান খুব জমে গিয়েছে। ঠাকুর কখন বটতলায় গেছেন টেরও পায়নি। অন্য দিন জুতোর শব্দে টের পায়, আজ তাও নয়। লালপেড়ে শাড়ির আঁচল খসে বাতাসে উড়ে-উড়ে পড়ছে, খেয়াল নেই। তন্ময়তার প্রতিমূর্তি।
যখন ধ্যান ভাঙল তাকালো চাঁদের দিকে। হাত জোড় করলে। বললে, ‘তোমার ঐ জ্যোৎস্নার মত আমার অন্তর নির্মল করে দাও।’
৩৬
‘আজ নরেন এখানে খাবে।’ ঠাকুর বললেন এসে নবতে। ‘বেশ ভালো করে রাঁধো।
মুগের ডাল আর রুটি করল সারদা। তাই খেল নরেন এক পেট। খাবার পর ঠাকুর জিজ্ঞেস করলেন, ‘ওরে কেমন খেলি?
বেশ খেলুম। যেন রুগীর পথ্য।’
ঠাকুর ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। নবতের উদ্দেশে চেঁচিয়ে বললেন, ‘ওকে ওসব কি রেঁধে দিয়েছ? ওর জন্যে ছোলার ডাল আর মোটা-মোটা রুটি করে দেবে। তাই আবার করে দিল সারদা। তাই আবার খেল নরেন।
নরেনের হচ্ছে ব্যাটাছেলের ভাব। নিরাকারের ঘর। পুরুষের সত্তা! ও হচ্ছে পুরুষ-পায়রা। পুরুষ-পায়রার ঠোঁট ধরলে ঠোঁট টেনে ছিনিয়ে নেয়।
কিন্তু মেয়ে-ভাব প্রকৃতি-ভাব কার? বাবুরামের। ওর হচ্ছে প্রেমের ঘর। কিন্তু নরেন আর আসে না কেন? কেন দেখা দিয়ে আবার লুকিয়ে থাকে? নরেন আসেনি কিন্তু সেদিন বাবুরাম এসে উপস্থিত।
যখন পাঁচ বছর বয়েস তখন যদি কেউ বলত, ‘তোর এমন বাবুর মত চেহারা, তোকে একটি টুকটুকে সুন্দরী বউ এনে দেব,’ অমনি কচি-কচি দুটি হাত নেড়ে অসম্মতি জানাত, ‘ও কথা বোলো না—মরে যাব, মরে যাব।’ সেই বাবুরাম।
বড় বোন কৃষ্ণভাবিনী। শ্যামবাজারের বলরাম বোসের স্ত্রী। ঠাকুরের রসদদার বলরাম বোস।
“যখন আসবে এখানকার জন্যে কিছু নিয়ে এস। শুধু হাতে আসতে নেই।’ এ কথা এক দিন বলেছিলেন বলরামকে। আর যায় কোথা! প্রতি মাসে ডালা পাঠায় বলরাম।
কেশবও যখন আসে হাতে করে কিছু নিয়ে আসে। অন্তত একটি ফুল।
শ্যামবাজারে যদু পন্ডিতের ‘বঙ্গ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে বাবুরাম। থাকে খুড়োর বাড়িতে। পাঠশালায় সহপাঠী কালীপ্রসাদ। স্বামী অভেদানন্দ।
সেইখান থেকে চলে এসেছে মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশনে। মাস্টারমশায়ের ইস্কুলে। ঠিক অঙ্কুরটি উড়ে এসে পড়েছে ঠিক মাঠটিতে।
গঙ্গাপারে সাধুসন্নেসী খুঁজে বেড়ায় বাবুরাম। কতই দেখে, কিন্তু মনের মতনটিকে দেখে না। যাকে দেখে আর জিজ্ঞেস করতে হয় না, এ কে–সেই জিজ্ঞাসাতীতকে।
ঘুণাক্ষরেও জানে না তেমন একজনকে দেখেছে তার ভগ্নিপতি। দেখেছে তার মা। এমন কি তার দাদা তুলসীরাম।
‘কোথায় অমন সাধু খুঁজে বেড়াচ্ছিস?’ এক দিন তাকে বললে তুলসীরাম। ‘যদি সত্যিকার সাধু দেখতে চাস তবে দক্ষিণেশ্বরে যা! দেখে আয় রামকৃষ্ণ-দেবকে।’
রামকৃষ্ণের কথা শুনেছে বাবুরাম। পড়েছে খবরের কাগজে। জোড়াসাঁকোর এক হরিসভায় এক দিন বুঝি তাঁকে দেখেওছিল দূর থেকে। কিন্তু তাঁর কাছে যাই কেমন করে? কে নিয়ে যায়।
শুধু একবার মনে করো, যাবে, তিনিই ব্যবস্থা করে দেবেন। ছেলে যদি বাপের কাছে যেতে চায়, বাপ টাকা পাঠিয়ে দেয়, লোক পাঠিয়ে দেয়। তোমার কাছে যাব—একবার শুধু একটি খবর পাঠিয়ে দাও তাঁকে। আর দেখতে হবে না। তিনি পাঠিয়ে দেবেন যান-বাহন লোক-লস্কর টাকা পয়সা।
রাখালকে চিনত, তাকে বললে খুলে মনের কথা। ‘আমি তো যাই প্রায়ই দক্ষিণেশ্বর।’
‘আমাকে নিয়ে যাবে?’ রাখালের হাত চেপে ধরল বাবুরাম।
কিন্তু যাবে কি করে? পায়ে হেঁটে না নৌকোয়? যাবে তো ফিরবে কি করে? যদি ফিরতে না পাও, খাবে কি? শোবে কোথায়? কোনো প্রশ্ন নিয়েই আর মাথা ঘামায় না বাবুরাম। ঠিকানা জানা হয়ে গেছে। ঠাকুর পাঠিয়ে দিয়েছেন দিশারী।
শনিবার ইস্কুল ছুটি হলে দুই বন্ধু চলে এল হাটখোলার ঘাটে। রামদয়াল চক্রবর্তীও এসেছে দেখছি। হোরমিলার কোম্পানিতে চাকরি করে রামদয়াল, থাকে বলরামের বাড়িতে। সেও দক্ষিণেশ্বরের যাত্রী।
পৌঁছতে সেই সন্ধ্যে। ঠাকুর ঘরে নেই।
রাখাল কখন চলে গেছে মন্দিরের দিকে। বাবুরামকে বসে থাকতে বলে গেছে. তাই বসে আছে বাবুরাম। বসে আছে প্রার্থনার মত। প্রসাদের জন্যে যে প্রতীক্ষা তাই প্রার্থনা।
কতক্ষণ পরে রাখালের কাঁধে হাত রেখে ভাবাবিষ্ট ঠাকুর ঘরে ঢুকছেন। টলছেন মাতালের মত। হতবাকের মত তাকিয়ে রইল বাবুরাম। চোখের সামনে এ কে নয়নভুলানো!
ছোট খাটটিতে বসলেন ঠাকুর। রামদয়াল পরিচয় করিয়ে দিল।
‘বলরামের আত্মীয়? তা হলে তো আমাদেরও আত্মীয়।’ হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে ডাকলেন বাবুরামকে। ‘এসো তো, আলোয় এসো তো একটিবার, তোমার মুখখানি দেখি।’
ঘরের কোণে মিটমিটে একটি দীপ জ্বলছে। সেইখানে বাবুরামকে টেনে আনলেন ঠাকুর। বাবুরামের ভক্তিনম্র কিশোর মুখখানি দেখলেন একদৃষ্টে। বললেন, ‘বাঃ, বেশ ছেলেটি তো!’ পরে তার হাতখানি টেনে নিলেন তাঁর হাতের মধ্যে। ওজন নিলেন। বললেন, ‘বেশ।’
বাবুরামকে দেখলাম—দেবীমূর্তি। গলায় হার। সখী সঙ্গে। ওর দেহ শুদ্ধ—ওর হাড় পর্যন্ত শুদ্ধ। একটা কিছু করলেই ওর হয়ে যাবে।
পরে এক দিন বলেছিলেন ঠাকুর, ‘দেহরক্ষার বড় অসুবিধে হচ্ছে। বাবুরাম এসে থাকলে ভালো হয়। নেটো তো চড়েই রয়েছে। ক্রমে লীন হবার যো। আর রাখাল? রাখালের এমন স্বভাব হয়ে দাঁড়াচ্ছে, আমাকেই তাকে জল দিতে হয়। আমার সেবা বড় সে আর করতে পারে না। তবে টানাটানি করে আসতে বলি না, বাড়িতে হাঙ্গামা হতে পারে। আমি যখন বলি চলে আয় না, তখন বেশ বলে, আপনি করে নিন না। রাখালকে দেখে কাঁদে, বলে, বেশ আছে।’
তাই এক দিন যখন মাকে নিয়ে বাবুরাম গিয়েছে দক্ষিণেশ্বর, ঠাকুর বললেন মাতঙ্গিনী দেবীকে, ‘তোমার এই ছেলেটি আমাকে দেবে?’
মাতঙ্গিনী দেবী নিজেকে কৃতার্থ মনে করলেন। বললেন, ‘এ তো আমার পরম সৌভাগ্য।’
বাবুরামের দেহ-লক্ষণ পরীক্ষা করে ঠাকুর আবার বসলেন ছোট খাটে। হঠাৎ রামদয়ালকে লক্ষ্য করে বললেন স্নেহাকুল কণ্ঠে, ‘ওগো নরেনের খবর জানো? সে কেমন আছে?’
ভালো আছে।’ বললে রামদয়াল।
এখানে অনেক দিন আসে না। তাকে দেখতে বড় ইচ্ছে করছে। কেন আসে না-এক দিন আসতে বোলো।’
কানু ছাড়া গীত নেই, ঈশ্বর ছাড়া কথা নেই। কথায়-কথায় রাত দশটা বেজে গেল।
অমৃতময়ী কথা।
নারদকে রাম বললেন, তুমি আমার কাছে কিছু বর নাও। নারদ বললেন, রাম, আমার আর কি বাকি আছে? কি বর নেব তবে যদি একান্তই দেবে, এই বর দাও যেন তোমার পাদপদ্মে শ্রদ্ধাভক্তি থাকে, আর যেন তোমার ভুবনমোহিনীমায়ায় মুগ্ধ না হই। রাম বললেন, নারদ, আর কিছু বর নাও। নারদ আবার বললেন, রাম আর কিছু চাই না, যেন তোমার পাদপদ্মে শ্রদ্ধা-ভক্তি থাকে এই করো।
যেখানে ভক্তি সেখানেই ভগবান।
লক্ষ্মণ রামকে জিজ্ঞেস করলেন, রাম, তুমি কত ভাবে কত রূপে থাকো, কিরূপে তোমায় চিনতে পারব? রাম বললেন, ভাই, একটা কথা জেনে রাখো। যেখানে উর্জিতা ভক্তি, সেখানে নিশ্চয়ই আমি আছি। উর্জিতা ভক্তিতে হাসে কাঁদে নাচে গায়। যদি কারু এরূপ ভক্তি হয় নিশ্চয় জেনো সেখানে ভগবানের আবির্ভাব।
ঠাকুরের তো সেই অবস্থা। প্রেমে হাসে কাঁদে নাচে গায়। তবে কি এইখানেই ঈশ্বরসাক্ষাৎ? বাবুরামকে ঠাকুর যখন আত্মীয় বললেন তখন তার মানে কি বাবুরাম ঠাকুরের ভক্ত? অন্তরঙ্গদের একজন?
রাত দশটা বেজে গেছে। ঠাকুর বললেন, এবার খেয়ে নাও সকলে।
রামদয়াল আর বাবুরাম বারান্দায় শুলো। রাখাল ঠাকুরের সঙ্গে এক ঘরে। শয়ন যেন সাষ্টাঙ্গ প্রণাম এই শুধু মনে হতে লাগল বাবুরামের। যেন বা মাতৃ-অঙ্কে মাথা রেখে শিশুর মতো ঘুমিয়ে আছে। জলে স্থলে অন্তরীক্ষে নিগূঢ় শান্তি। যেন কোন গভীরের দেশে এসে সহজ বিশ্রাম পেয়েছে আজ।
‘ওগো ঘুমলে?’
অতন্দ্র মধ্যরাত্রিই হঠাৎ করুণ স্বরে কেঁদে উঠল নাকি?
বাবুরাম চোখ চাইল, দেখল ঠাকুর। বালকের মত পরনের কাপড়খানি বগলের নিচে ধরা। রামদয়ালের শিয়রের কাছে দাঁড়িয়ে ডাকছেন।
দুজনে ঘুম ফেলে উঠে বসল। বললে, ‘আজ্ঞে না, ঘুমাইনি।’
‘ওগো আমার ঘুম আসছে না। নরেনের জন্যে আমার প্রাণের ভেতরটা মোচড় দিচ্ছে! যেন জোরে কে গামছা নিংড়োচ্ছে বুকের মধ্যে। তাকে একবার নিয়ে আসতে পারো?’
‘আজ্ঞে, ভোর হোক। ভোর হলেই তাকে আমি সংবাদ দেবো।’ বললে রামদয়াল।
‘তাই কোরো। শুধু একবারটি একটু চোখের দেখা। তাকে মাঝে-মাঝে না দেখলে থাকতে পারি না।’
এই বুঝি ভগবানের কান্না। বাবুরাম দেখতে লাগল, শুনতে লাগল। ভক্তই শুধু ভগবানের জন্যে কাঁদে না, ভগবানও বিনিদ্র রাত্রি জেগে ভক্তের জন্যে অশ্রুবর্ষণ করে। ভক্ত না থাকলে ভগবানও অনর্থক। যিনি কবি তাঁর একটি রসিক পাঠক চাই। এই রসিকটি না থাকলে সমস্ত রসসমুদ্রই শুষ্ক। সমস্ত কবিতাই মাটি।
শুধু ভগবান নন ভক্তও কঠোর হতে জানে। আর সেই ভক্তকে দ্রবীভূত করবার জন্যে ভগবানের এই বিগলিত কান্না।
বাবুরাম ভাবতে লাগল, কী নিষ্ঠুর না-জানি এই নরেন্দ্রনাথ!
শুধু কি এক দিন না এক রাত্রি? ভালোবাসার কি দিন-রাত্রি আছে? কান্নার কি ক্ষান্তি আছে কোনো কালে? এক দিন শেষে মা’র মন্দিরে গিয়ে ধন্না দিলেন। মা গো, তাকে এনে দে। তাকে না দেখে যে থাকতে পাচ্ছি না।
ঠাকুরের কান্নার রোল ঘরের মধ্যে বসে শুনতে পাচ্ছে ভক্তেরা। পরস্পরের মুখে চাওয়াচাওয়ি করছে। একটা পরের ছেলের জন্যে এমন করে কাঁদতে পারে কেউ? মা গো, এক কালে তোর জন্যে কেঁদেছিলাম, এখন নরেনের জন্যে কাঁদছি। তুই দেখা দিলি আর নরেন দেখা দেবে না? আমার এই কান্নার ডাকটি তার কানে পৌঁছে দে মা। তুই পাষাণ হয়ে শুনতে পেলি আর ও রক্তমাংসের মানুষ হয়ে শুনতে পাবে না?
আবার ভক্তদের মধ্যে এসে বসেন ঠাকুর। বলেন, ‘এত কাঁদলাম কিন্তু নরেন্দ্র তো এলো না! সে এত বোঝে আর আমার প্রাণের টানটাই বোঝে না!’
আবার ঘরের বাইরে গিয়ে কান পাতেন! ঐ বুঝি শোনা যাচ্ছে তার পায়ের শব্দ।
তার দরাজ গলার কলস্বর।
কোথাও কিছু নেই। তখন নিজেকেই নিজে উপহাস করেন ঠাকুর। বুড়ো মিনসে, পরের একটা ছেলের জন্যে এমনি কাঁদছি, লোকে দেখলে কী বলবে বলো দেখি? তোমরা আপনার লোক, তোমাদের কাছে না-হয় লজ্জা নেই, কিন্তু অন্যে কী বলবে? অন্যে কী বলবে ভেবেও তো সামলাতে পাচ্ছি না।’
সেবার ঠাকুরের জন্মোৎসব করছে ভক্তরা। নতুন সাজে সাজিয়েছে ঠাকুরকে। চন্দন-চর্চিত পুষ্পমালা দুলিয়ে দিয়েছে গলায়। আনন্দের হাটবাজার বসে গিয়েছে চারদিকে। রাম দত্ত প্রসাদ বিলোচ্ছে। গোষ্ঠমিলন গান শুরু হবে এবার। কিন্তু ঠাকুর মাঝে-মাঝে একটা বিষণ্ণতার রেখা টানছেন। ‘তাই তো, নরেন্দ্র এখনো এলো না।’
নরোত্তম কীর্তন গাইছে। যার কীর্তন তিনি মাঝে-মাঝে আখর দিচ্ছেন। মাঝে-মাঝে আবার তা কান্নার আখর। ‘কই, নরেন্দ্র কই?”
নরেন্দ্র ছাড়া সমস্ত ব্যঞ্জন আলুনি। সমস্ত ব্যঞ্জনা বিস্বাদ।
উন্মনা ভাবে কখন একটু তন্ময় হয়ে ছিলেন ঠাকুর, নরেন হঠাৎ এসে তাঁকে প্রণাম করলে। ঠাকুর লাফিয়ে উঠলেন। তাঁর আনন্দ তখন আর দেখে কে! একেবারে নরেনের কাঁধে চেপে বসলেন, বসেই গভীর ভাবাবেশ।
আর নরেন? প্রেমময়ের স্পর্শে বেদান্তবাদীর কাঠিন্য গলে যেতে লাগল। দুটি পরিপূর্ণ চোখ আচ্ছন্ন হয়ে এল অশ্রুতে৷
চারদিকে আনন্দের ঢেউ বইতে লাগল। বইতে লাগল সেবার স্রোতস্বিনী। ঠাকুর খাচ্ছেন, প্রসাদ-লোভে ভক্তরা তাঁকে বেষ্টন করে আছে। হঠাৎ দুচার গ্রাস খেয়েই ঠাকুর বলে উঠলেন, ‘নরেনের গান শুনব। গান শুনতে-শুনতে খাব। তাঁর গুণগান শোনাবার জন্যে মহামায়া নরেনকে অখন্ডের ঘর থেকে নিয়ে এসেছেন। ওর গান শুনলে আমার ভিতরে কী হয় জানিস? আমার ভিতরে যিনি, তিনি ফোঁস করে ওঠেন।’
নরেন গান ধরল:
‘নিবিড় আঁধারে মা তোর চমকে অরূপরাশি
তাই যোগী ধ্যান ধরে হয়ে গিরিগুহাবাসী।
অভয় চরণ তলে প্রেমের বিজলী খেলে
চিন্ময় মুখমন্ডলে শোভে অট্ট অট্ট হাসি।
গান শুনেই ঠাকুর সমাধিস্থ। অন্নরস ছেড়ে চলে গেছেন অন্য রসে। আনন্দরসে। কিন্তু ঠাকুরের পরিহাসরসও অফুরন্ত।
বেলা দুটোর সময় ভক্তরা বসেছে পঙক্তিভোজনে। চিঁড়ে দই আর চিনি পরিবেশন হচ্ছে। ‘রামের কি ছোট নজর!’ বললেন, ঠাকুর, ‘আমার জন্মোৎসবে কিনা চিঁড়ের ব্যবস্থা করল! এই শীতের দিনে চিঁড়ে-দই! তার বদলে—ঠাকুর গান ধরলেন: ‘মোন্ডা খাজা খুরমা গঙ্গা মোদক-বিপণি-শোভনম্।
ভক্তবৃন্দ উল্লাসের হিল্লোল তুলল।
গান জমাবার জন্যে ‘আরে আরে’ বলে ঠাকুর আখর দিচ্ছেন, এমন সময় এক ভক্ত ‘হরি হরি’ বলে উঠল। সব রস মাটি। ঠাকুর হেসে উঠলেন। শালা এমন বেরসিক, রসগোল্লা-রসগোল্লা না বলে হরি হরি বললে।
এমন সময় ফের দই নিয়ে এল। এই দেখে ঠাকুর হাত তুলে গাইতে লাগলেন:
‘দে দই দে দই পাতে, ওরে ব্যাটা হাঁড়ি-হাতে।
ওরা কি তোর বাবা খুড়ি, ওদের পাতে হাঁড়ি-হাঁড়ি-
একটা হুল্লোড় পড়ে গেল।
আর তারই মধ্যে সেই অরসিক ভক্ত ‘রসগোল্লা’ বলে ‘জয়’ দিলে।
।
৩৭
যদু মল্লিকের বাগানে গিয়ে আবার কাঁদে রামকৃষ্ণ।
ভোলানাথ, মোটা বামুন, হাত জোড় করে বলে, ‘মশায়, ওর সামান্য পড়াশুনো, ওর জন্যে আপনি কেন এত অধীর হন?’
সামান্য পড়াশুনো? নরেনের জুড়ি আর একটাও ছেলে আছে? ঝলসে ওঠে রামকৃষ্ণ। ‘যেমন গাইতে-বাজাতে, তেমনি বলতে-কইতে, তেমনি আবার লেখা-পড়ায়। রাত-ভোর ধ্যান করে, ধ্যান করতে-করতে সকাল হয়ে যায়, হুঁস থাকে না। সে কি যে-সে? তার ভেতর এতটুকু মেকি নেই—বাজিয়ে দেখ গিয়ে, টং-টং করছে। আর সব ছেলেদের দেখি—দেড়টা-দুটো পাশ করেছে হয়তো, ব্যস, ঐ পর্যন্তই। চোখ-কান টিপে কোনো রকমে পাশ করতেই যেন সব শক্তি বেরিয়ে গেছে। আমার নরেনের সে রকম নয়, সে হেসে-খেলে পাশ করে যায়। ব্রাহ্মসমাজে ভজন গায় সে-আর-আরদের মতন নয়, সে সত্যিকারের ব্রহ্মজ্ঞানী। বুঝলে, ধ্যান করতে বসে সে জ্যোতি দেখে। সাধে কি আর নরেনকে এত ভালোবাসি? কিন্তু যাকে এত ভালোবাসেন সে তাঁকে মানতে রাজী নয়। সে তাঁকে কাঁদায়। এক দিন সরাসরি বললে মুখের উপর, ‘তুমি ঈশ্বরের রূপ-টুপ যা দেখ তা তোমার মনের ভুল।’ আহতের মত অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন রামকৃষ্ণ। বললেন, ‘বলিস কি রে! কথা কয় যে!
‘কথা কয় না কচু!’ কথাটা হেসে উড়িয়ে দিল নরেন্দ্র। ‘সব আপনার মাথার খেয়াল!’ বলে কি ছোঁড়া! মাথার খেয়াল?
‘বলিস কি রে! মা স্পষ্ট চোখের সামনে দাঁড়ান, হাঁটেন-চলেন, কথা কন—’ ‘বাজে কথা! মাটির প্রতিমা নড়বে-চড়বে কি! কথা কইবে কি!’
‘বাঃ, নিজের চোখ-কানকে অবিশ্বাস করব?
‘মাথার গরমে ছায়া দেখেন আপনি, হয় তো বা অপচ্ছায়া!’ নরেন নিষ্ঠুরের মত বললে, ‘হাওয়ায় হয়তো বা কি শব্দ হয়, ভাবেন ছায়া বুঝি কথা কইছে।’ ‘তুই বললেই হল?’ নরেনকে উড়িয়ে দিতে চাইলেন রামকৃষ্ণ।
‘আপনি বললেই বা হবে কেন?’ প্রত্যাখ্যানে দৃঢ় নরেন্দ্রনাথ: ‘পশ্চিমের বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে, অনেক জায়গায় চোখ-কান এমনি করে প্রতারণা করে। আপনিও যে প্রতারিত হচ্ছেন না তার প্রমাণ কি? কে বলবে সমস্তই আপনার চোখ-কানের ভুল নয়?”
সমস্তই আমার চোখ-কানের ভুল?’ অসহায়ের মত তাকিয়ে রইলেন রামকৃষ্ণ।
নিশ্চয়। নইলে যা সত্যি অদৃশ্য তাকে দেখা যাবে কি করে? যা অচল সে কি করে নড়ে-চড়ে?’
এর মধ্যে আবার হাজরা আছে টিপ্পনি ঝাড়তে।
বলছে, ‘ঈশ্বর অনন্ত, তাঁর ঐশ্বর্য অনন্ত—সব বুঝি। তাই বলে তিনি কি আর সন্দেশ-কলা খাবেন? না, গান শুনবেন? ও সব ধোঁকা, ধাপ্পাবাজি।’
‘তা ছাড়া আবার কি।’ তার কথায় দাগা বুলালো নরেন।
বড় মন-মরা হয়ে গেলেন রামকৃষ্ণ। নরেন তো মিথ্যে বলবার ছেলে নয়! তবে এত দিন তিনি যা সব দেখে এসেছেন, বিশ্বাস করে এসেছেন, সব ভুয়ো! সব কাল্পনিক? ভবতারিণীর কাছে গিয়ে কেঁদে পড়লেন রামকৃষ্ণ।
‘মা, এ কী হল? এ সব কি মিছে? নরেন্দ্র এমন কথা বললে! তুই শুধু পাথরের মূর্তি? তুই অচল, অনড়? তুই বোবা, বধির?
মা কথা কয়ে উঠলেন। বললেন, ‘ওর কথা শুনিস কেন? কিছু দিন পরে ও-ই নিজে দেখতে পাবে ঈশ্বরীয় রূপ, সব কথা সত্য বলে মানবে। কিছু ভাবিসনে। যদি মিথ্যে হবে সব কথা তবে অবিকল মিলল কি করে?
শুধু তাই নয়, দেখিয়ে দিলেন ভবতারিণী। দেখিয়ে দিলেন, সর্বত্র চেতনা, অখন্ড চৈতন্য—চৈতন্যময় রূপ।
তেড়ে ছুটে গেলেন রামকৃষ্ণ। পাকড়াও করলেন নরেনকে। বললেন, ‘শালা, তুই আমায় অবিশ্বাস করে দিয়েছিলি! চলে যা, তুই আর এখানে আসিস নে।’ যার জন্যে এত কান্না, তাকেই কিনা বাড়ির বার করে দেওয়া।
মুখের কথায় নরেন নড়ে না, কেননা সে জানে অন্তরের কথাটি। ভাই সে আস্তে-আস্তে বারান্দায় সরে গিয়ে বসে তামাক সাজতে। নীরবে হুঁকোটা বাড়িয়ে দেয় হাজরার দিকে। হাজরাও চুপ।
সেই যে সেদিন চলে গেল নরেন, রামকৃষ্ণের ভয় হল, আর বুঝি সে আসবে না রাগ করে। কিন্তু না, আবার এসেছে আরেক দিন। সেদিন আনন্দ কত রামকৃষ্ণের! মনে-মনে বলছেন, ও যে আমার আপনার লোক, তাই ওকে বকলেও ও আসবে। যে আপনার লোক তাকে বকলেও সে রাগে না।
তাই তো ঈশ্বর মুখের কথার ধার ধারেন না। অন্তরের বচনহীন ভাষাটি শোনবার জন্যে নিরন্তর কান পেতে থাকেন।
‘নরেন্দ্রের কথা আর লই না।’
সেদিন আবার আরেক তর্ক।
রামকৃষ্ণ বললেন, চাতক আকাশের জল ছাড়া আর কিছু খায় না।
নরেন তা মানতে রাজী নয়। বললে, ‘বাজে কথা। এমনি জলও চাতক খায়।’
মহা ভাবনা ধরল রামকৃষ্ণের। আবার ছুটলেন ভবতারিণীর মন্দিরে। মা, এ সব কি মিথ্যে হয়ে গেল? যা এত দিন সব দেখেছি-জেনেছি সব গাঁজাখুরি?
সেদিন কি মনে করে নরেন্দ্র এসে হাজির।
ঘরের ভিতর কতগুলো কী পাখী উড়ছে ফরফর করে। নরেন্দ্র বলে উঠল, ‘ঐ, ঐ’–
কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন রামকৃষ্ণ, ‘কি?’
‘ঐ চাতক! ঐ চাতক!’ উল্লাস করে উঠল নরেন। কতগুলো চামচিকে।
হেসে উঠলেন রামকৃষ্ণ। বললেন, ‘সেই থেকে নরেন্দ্রের কথা আর লই না।’ কিন্তু সব সময়ে ভয়, নরেন্দ্র এই বুঝি আর কারু হয়ে গেল। আমার বুঝি হল না! তাই তার সঙ্গে কথা কইতেও ভয়, না কইতেও ভয়।
স্নেহকরুণ চোখে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন রামকৃষ্ণ। ভাববিহ্বল হয়ে গান ধরেন:
‘কথা বলতে ডরাই না-বললেও ডরাই।
মনে সন্দ হয় পাছে তোমাধনে হারাই-হারাই।’
গান শুনে অশ্রু-ভরোভরো চোখে তাকিয়ে থাকে নরেন। ভাবে ভালোবাসায় পাহাড় বুঝি দ্রবময়ী নির্ঝরিণী হয়ে যাবে।
কিন্তু ঐ বুঝি আবার হারিয়ে গেল। কত দিন আবার দেখা নেই নরেনের। কাঁহাতক আর বসে থাকবেন পথ চেয়ে! সেদিন নিজেই রওনা হলেন কলকাতার দিকে। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হল, আজ তো রবিবার, যদি তার বাড়িতে গিয়ে দেখা না পাই! যদি কোথাও কারু সঙ্গে আড্ডা দিতে বেরিয়ে গিয়ে থাকে! কোথায় আর যাবে! আজ যখন রবিবার, নিশ্চয়ই ব্রাহ্মসমাজে ভজন গাইবার ডাক পড়েছে সন্ধের সময়। সেখানে গেলেই নির্ঘাত তাকে দেখতে পাব। আমার তো আর কিছুই বাসনা নেই, শুধু তাকে একটু দেখব কাছে থেকে।
যেমন ভাবনা তেমন কাজ। সরাসরি সমাজে গিয়ে উপস্থিত হলেন রামকৃষ্ণ। মুহূর্তে একটা প্রলয়-কান্ড ঘটে গেল। বেদিতে বসে আচার্য ভাষণ দিচ্ছেন, জনতার সেদিকে লক্ষ্য নেই। সেই ‘সত্যং জ্ঞানমনন্তং ব্রহ্ম’ সহসা যেন মূর্তি ধরে আবির্ভূত হয়েছেন সভাস্থলে, এমনি মনে হল জনতার। তাঁকে একবারটি একটু চোখের দেখা দেখবার জন্যে চারদিকে রব পড়ে গেল। শুরু হয়ে গেল বাঁধভাঙা বিশৃঙ্খলা। বেঞ্চির উপর উঠে দাঁড়াল একদল, অন্য দল ঘিরে ধরতে চাইল রামকৃষ্ণকে।
স্তম্ভিতের মত বসে রইল আচার্য। মাথায় একবার এল না ঠাকুরকে যোগ্য সমাদরে সম্বর্ধনা করে নিই। বসাই এনে বেদির উপরে।
আচার্যের কথা ছেড়ে দি, সমাজের কর্তৃপক্ষের কেউই একটা সাধারণ শিষ্টাচার পর্যন্ত দেখালো না। মনে-মনে রামকৃষ্ণের উপর তারা চটা ছিল। তাদের সমাজের দু-দুটো মাথা–কেশব আর বিজয়কে রামকৃষ্ণ বশ করেছে! টেনে নিয়েছে নিজের মতে।
কিন্তু তাই বলে তিনি এমনি ভাবে অপমানিত হবেন? বেদির উপর বসে ছিল নরেন্দ্রনাথ, নিচে লাফিয়ে পড়ল। এগিয়ে গেল ঠাকুরের দিকে।
তাকে দেখতে পেয়ে ভাবে মাতোয়ারা হলেন রামকৃষ্ণ। তার দিকে ধাবমান হতে-না-হতেই সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন।
তখন আবার সমাধি অবস্থায় রামকৃষ্ণকে দেখবার জন্যে জনতা আলোড়িত হয়ে উঠল। এমন সময় কারা ঘরের গ্যাস দিল নিবিয়ে। ঘনান্ধকারে ভরে গেল চার দিক। তুমুল গোলমাল। দিগ্ভ্রান্ত দ্বারভ্রান্ত জনতা। এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল বিপর্যস্তের মত।
এখন রামকৃষ্ণকে কি করে রক্ষা করবে নরেন্দ্র! কি করে অন্ধকার থেকে নিয়ে আসবে বাইরে। নরেন একাই একশো। একাই আবৃত করে রাখবে। বলিষ্ঠবাহু পুত্র যেমন পিতাকে বেষ্টন করে রাখে। কারু সাধ্য নেই রামকৃষ্ণের ছায়া মাড়ায়। রামকৃষ্ণের সমাধি ভাঙল। চার পাশে তাকালেন অন্ধকারে। কই, তুই আছিস? আয়, আমাকে ধর। তোকে দেখতে চলে এসেছি কতদূর!
হাত ধরে রামকৃষ্ণকে বাইরে নিয়ে এল নরেন। পিছনের দরজা দিয়ে। অন্ধকার ঠেলে-ঠেলে। একটা গাড়ি ডাকালো। চলো দক্ষিণেশ্বরে।
পথে ঠাকুরকে বকতে লাগলো নরেন। ‘কেন আপনি এসেছিলেন এখানে?’ তুই জানিস না কেন এসেছিলুম? সুখস্মিতমুখে তাকিয়ে রইলেন ঠাকুর।
‘সেজন্যে এখানে আপনি আসবেন, এই ব্রাহ্মসমাজে? এখানে ওরা আপনাকে সম্মান দেখাল, না, অভ্যর্থনা করল? ঘর অন্ধকার করে পালিয়ে গেল সকলে। আমার জন্যে আপনি কেন এ অপমান নিতে এলেন? আপনার অপমানে আমার বুক ফেটে যাচ্ছে— ‘
অপমান! ঠাকুরের মুখপদ্মের প্রসন্নাভা এতটকু ম্লান হল না।
‘অপমান ছাড়া আবার কি। ওরা আপনাকে বোঝে না, বোঝবার ওদের সাধ্যও নেই—ওদের এখানে আসবার আপনার কী দরকার! আমাকে ভালোবাসেন বলে আপনার সমস্ত কাণ্ডজ্ঞান খোয়াতে হবে?”
যা খুশি তাই বল। তোর কথায় কে কান দেয়! তোর কথা আর লই না। তোর দেখা পেয়েছি, তুই আমাকে গাড়ি করে দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছে দিতে যাচ্ছিস এই ঢের। নইলে কে কোথায় কী অনাদর বা উপেক্ষা করল তাতে আমার বয়ে গেল।
‘ভালোবাসেন বাসুন, কিন্তু নিজের দিকে খেয়াল রাখেন না কেন? ”ওরে ভালোবাসায় কি নিজের দিকে খেয়াল থাকে? ভালোবাসা যে আত্মনাশী। ‘কিন্তু এই ভালোবাসার পরিণতি কি? শেষে ভরত রাজার মতন আপনার না দশা হয়! ভরত রাজা হরিণ ভাবতে-ভাবতে হরিণ হয়ে জন্মেছিল, আপনারো না শেষ পর্যন্ত—’
ঠাকুরের মুখে হঠাৎ চিন্তার ঘোর লাগল। বললেন, ‘তুই একেকটা এমন কথা বলিস যে বিষম ভাবনা ধরে যায়।’
‘আমি ঠিকই বলি।
‘তাই তো রে, তাহলে কী হবে! আমি যে তোকে না দেখে থাকতে পারি না। আমায় তবে উপায় বলে দে।’
তবু ভালোবাসায় মাত্রা টানতে পারবেন না ঠাকুর। মন্দা পড়তে দেবেন ন জোয়ারে। শেষকালে দক্ষিণেশ্বরে পৌঁছে মা’র দুয়ারে এসে হাজির হলেন। নরেনকে কেন এত ভালোবাসি? কেন ওকে দেখবার জন্যে চোখ দুটো ক্ষয় হয়ে যায়? ও আমার কে? হাসতে হাসতে ফিরে এলেন মন্দির থেকে। বললেন, ‘যা শালা, তোর কথা আর লই না। মা সব বলে দিলেন, বুঝিয়ে দিলেন-‘
‘কী বলে দিলেন?’
‘বলে দিলেন তুই ওকে সাক্ষাৎ নারায়ণ বলে জানিস, তাই অত ভালোবাসিস। যেদিন ওর মধ্যে নারায়ণকে দেখতে পাবিনে সেদিন ওর মুখদর্শন তোর অসহ্য হবে। প্রসন্ন আস্য প্রেমে তরল হয়ে এল। ‘আমার ভরত রাজার মত দশা হবে বলতে চাস? নারায়ণ ভেবে নারায়ণকে ভালোবেসে যে পাড়ি জমাতে পারে তার আর পারাবারের ভয় কি।’ সেই ভালোবাসার কাছে নরেন দাঁড়িয়ে রইল অসহায়ের মত। আত্মবিস্মৃতের মত।
‘ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জন্মেছিলেন কিনা জানি না, বুদ্ধ চৈতন্য প্রভৃতি একঘেয়ে, শিবানন্দকে বিবেকানন্দ চিঠি লিখছেন আমেরিকা থেকে: ‘রামকৃষ্ণ পরমহংস দি লেটেস্ট এ্যান্ড দি মোস্ট পারফেক্ট—জ্ঞান প্রেম বৈরাগ্য লোকহিতচিকীর্ষা উদারতায় জমাট—কারু সঙ্গে কি তাঁর তুলনা হয়? তাঁকে যে বুঝতে পারে না তার জন্ম বৃথা। আমি তাঁর জন্ম-জন্মান্তরের দাস, এই আমার পরম ভাগ্য, তাঁর একটা কথা বেদবেদান্ত অপেক্ষা অনেক বড়। তস্য দাস-দাস-দাসোহহং। তবে একঘেয়ে গোঁড়ামি দ্বারা তাঁর ভাবের ব্যাঘাত হয়—এই জন্য চটি। বরং তাঁর নাম ডুবে যাক—তাঁর উপদেশ ফলবান হোক। তিনি কি নামের দাস?…
৩৮
জুড়িগাড়ি করে কারা আসছে দক্ষিণেশ্বরে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল রাখাল। সহজেই চিনতে পারল। কলকাতার এক নামজাদা বড়লোক৷
রামকৃষ্ণেরও চোখ পড়েছে। যেমনি দেখা অমনি জড়সড় হয়ে পালিয়ে গেলেন ঘরের মধ্যে। অচেনা আগন্তুক দেখে শিশু যেমন ভয়ে পালায়।
এ কি হল? রাখালও পিছু-পিছু ঘরে ঢুকল।
‘যা, যা শিগগির যা। ওরা এখানে আসতে চাইলে বলিস এখন দেখা হবে না। এমনতরো তো কোনো দিন হয় না। অর্থী তো কোনো দিন ফিরে যায় না ব্যর্থ হয়ে।
অবাক মানল রাখাল। বাইরে এসে জিজ্ঞেস করলে অভ্যাগতদের : ‘কি চাই?’ ‘এখানে একজন সাধু আছেন না? তাঁকে চাই।’
‘কি দরকার?’
‘আমার আত্মীয়ের থাক-যাক অসুখ। কিছুতেই সুরাহা হচ্ছে না। উনি দয়া করে যদি কোনো ওষুধ-টোষুধ দেন— ‘
এতক্ষণে বুঝল রাখাল। কিন্তু অন্তরের ভাবটি কি করে বোঝেন ঠিক অন্তর্যামী তা কে বলবে!
‘উনি ওষুধ দেন না। আপনারা ভুল শুনেছেন—’
এক দিন আরেক জন বড়লোক এসেছিল। আমায় বলে, মশায়, এই মোকদ্দমাটি কিসে জিত হয় আপনার করে দিতে হবে। আপনার নাম শুনে এসেছি। আমি বললুম, বাপু সে আমি নই—তোমার ভুল হয়েছে।
বলছেন রামকৃষ্ণ: ‘যার ঠিক-ঠিক ঈশ্বরে ভক্তি হয়েছে, সে শরীর, টাকা—এ সব গ্রাহ্য করে না। সে ভাবে, দেহসুখের জন্যে কি লোকমান্যের জন্যে কি টাকার জন্যে আবার জপ-তপ কি! জপ-তপ ঈশ্বরের জন্যে।
বলে, দুদিক রাখব! দু আনা মদ খেলে মানুষ দুদিক রাখতে চায়। কিন্তু খুব মদ খেলে রাখা যায় দু দিক?
তেমনি ঈশ্বরের আনন্দ পেলে আর কিছুই ভালো লাগে না। কামকাঞ্চনের কথা যেন বুকে বাজে। শাল পেলে আর বনাত ভালো লাগে না। রামকৃষ্ণ কীর্তনের সুরে গান গেয়ে উঠলেন। ‘আন লোকের আন কথা ভালো তো লাগে না—
তখন ঈশ্বরের জন্যই মাতোয়ারা। আর সব আলুনি, পানসে।
ত্রৈলোক্য বললে, ‘সংসারে থাকতে গেলে টাকাও তো চাই, সঞ্চয়ও চাই। পাঁচটা দানধ্যান—’
‘আগে টাকা সঞ্চয় করে নিয়ে তবে ঈশ্বর?’ রামকৃষ্ণ ঝলসে উঠলেন: ‘আর, দান-ধ্যানই বা কত! নিজের মেয়ের বিয়েতে হাজার-হাজার টাকা খরচ, আর পাশের বাড়িতে খেতে পাচ্ছে না। তাদের দুটি চাল দিতে কষ্ট হয়। দিতে-থুতে হিসেব কত! ও শালারা মরুক আর বাঁচুক- আমি আর আমার বাড়ির সকলে ভালো থাকলেই হল। মুখে বলে সর্বজীবে দয়া!”
জীবে দয়া! জীবে দয়া! দূর শালা! কীটানুকীট—তুই জীবকে দয়া করবি? দয়া করবার তুই কে? তোর স্পর্ধা কিসের? তুই কিসে এত আত্মম্ভরী?
সেদিন ঠাকুর তাই ধমকে উঠেছিলেন নরেন্দ্রকে। বল, জীবে দয়া নয়, জীবে শ্রদ্ধা, জীবে প্রেম, জীবে সেবা। শিবজ্ঞানে জীবের বন্দনা।
দয়ার মধ্যে একটু উঁচু-নিচুর ভাব আছে। আমি দয়ালু আমি উপরে দাঁড়িয়ে; তুমি দয়ার ভিখারী, তুমি নিম্নাসীন। এ অসাম্য সহ্য হল না রামকৃষ্ণের। তিনি সর্বত্র নরায়িত নারায়ণ দেখলেন। দেখলেন আশ্চর্য সৌষাম্য। সব এক, সব সমান, সব বিভক্ত হয়েও অবিচ্ছিন্ন। প্রত্যেককে দাঁড় করিয়ে দিলেন একটি শ্যামল সমভূমিতে—যার পোশাকী নামটি ভূমা, আর চলতি নামটি ভালোবাসা।
এই রামকৃষ্ণের সাম্যবাদ। সকলে আমরা অমৃতস্য পুত্রাঃ, আনন্দময়ীর ছেলে, রামপ্রসাদের ভাষায়, ব্রহ্মময়ীর বেটা। এক বাপের সমাংশভাক বংশধর। অধিকারের স্তরভেদ নেই, আমাদের মধ্যে শুধু প্রেমের সমানস্রোত৷
বনের বেদান্তকে ঘরে নিয়ে এলেন রামকৃষ্ণ। একেই বললেন, ‘অদ্বৈতজ্ঞান আঁচলে বেঁধে কাজ করা।’ একেই বললেন, নিরাকার থেকে আবার সাকারে চলে আসা। এবার সত্যিকারের সাকার। মানুষের মধ্যে ঈশ্বরকে স্বীকার করা, আবিষ্কার করা, অভ্যর্থনা করা।
নরেনের তৃতীয় নয়ন আবার উদ্দীপ্ত হল। দেখল সর্বত্র অভেদ। পণ্ডিত-মূর্খ, ধনী-দরিদ্র, ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল সকলে একই পরমপ্রকাশের খণ্ড মূর্তি। প্রত্যহের তুচ্ছতার মধ্যে সে আচ্ছন্ন হয়ে আছে, তাকে মুক্ত করে যুক্ত করে দিতে হবে সে সর্বভাসকের সঙ্গে। দিতে হবে তাকে তার মহান অধিকারের সংবাদ। তার অন্তরের নিভৃত গুহা থেকে জাগাতে হবে সে প্রসুপ্ত কেশরী। তার অনুভবের মধ্যে আনতে হবে তার অস্তিত্বের পরমার্থের আস্বাদ।
শুধু নিজে দেখলে চলবে না, দেখাতে হবে। শুধু নিজে চিনলে চলবে না, চেনাতে হবে। আমি যদি একা জেগে উঠে দেখি আর-সবাই তখনো ঘুমিয়ে রয়েছে, তখন আমার আকাশ-ভরা প্রভাত-আলোর আনন্দ কই?
ছিন্ন কথার খেই ধরল ত্রৈলোক্য। বললে, ‘সংসারে তো ভালো লোকও আছে। চৈতন্যদেবের ভক্ত পুণ্ডরীক বিদ্যানিধি, তিনি তো সংসারে ছিলেন
‘তার গলা পর্যন্ত মদ খাওয়া ছিল।’ বললেন রামকৃষ্ণ, ‘যদি আর একটু খেত, সংসার করতে পারত না।
‘তা হলে সংসারে কি ধর্ম হবে না?’
‘হবে। যদি ভগবানকে লাভ করে থাকতে পারো। তখন কলঙ্ক-সাগরে ভাসো, কলঙ্ক না লাগে গায়। তখন পাঁকাল মাছের মতো থাকো। ঈশ্বরলাভের পর যে সংসার সে বিদ্যার সংসার। তাতে কামিনীকাঞ্চন নেই, শুধু ভক্ত আর ভগবান। এই আমার দিকেই দেখ না। আমারও মাগ আছে, ঘরে-ঘরে ঘটি-বাটিও আছে-হরে প্যালাদের খাইয়েও দিই, আবার যখন হাবীর মা এরা আসে এদের জন্যেও ভাবি।’
চৈতন্যলাভের পর সংসারে গিয়ে থাকো। যদি অনেক পরিশ্রমের পর কেউ সোনা পায়, তা বাক্সের মধ্যেই রাখো বা মাটির নিচেই রাখো, সোনার কিছুই হয় না। কাঁচা মনকে সংসারে রাখতে গেলেই মন মলিন হয়ে যায়। দুধে-জলে একসঙ্গে রাখলেই যায় সব একাকার হয়ে। দুধকে মন্থন করে মাখন তুলে জলের উপর রাখলে আর গোল থাকে না, ভাসে।
কাগজে তেল লাগলে তাতে আর লেখা চলে না। তবে যদি বেশ করে খড়ি দিয়ে ঘষে নিস, লেখা ফুটবে। তেমনি কামকাঞ্চনের দাগ-ধরা জীবনে সাধন করতে হলে ত্যাগের খড়ি ঘর্ষণ করো।
শশধর পণ্ডিতকে দেখতে যাবেন রামকৃষ্ণ। অত বড় পণ্ডিত, অথচ এক বিন্দু ভয় নেই কাছে ঘেঁষতে। আমার কি! আমার তো বাজনার বোল মুখস্ত বলা নয়, হাতে বাজানো। ওরা শুধু জল তোলপাড় করে, আর আমি অতলতলে ডুব দিই।
ওরে নরেন, তুই সঙ্গে চল। মন্দ কি, পণ্ডিতদের সঙ্গে দর্শনচর্চা করে আসবি। কিন্তু দেখা হলে শশধর পণ্ডিত কী বললে? বললে, ‘দর্শনচর্চা করে হৃদয় শুকিয়ে গিয়েছে। দয়া করে আমায় এক বিন্দু ভক্তি দিন—’
জ্ঞানের খররৌদ্রে দগ্ধ হয়ে গেলাম, দাও এবার একটু ভক্তির বিষাদ-মেঘ, ভালোবাসার অশ্রুবিন্দু। তোমার জন্যে শুধু সেজে-গুজে সুখ নেই, তোমার জন্যে কেঁদে আনন্দ। আমি তোমার রাজরানি হতে চাই না, আমি তোমার কাঙালিনী হব।
রামকৃষ্ণ শশধরের বুকে হাত বুলিয়ে দিলেন। তৃষ্ণা মিটল শশধরের। দীপ্ত চোখ অশ্রুতে ছলছল করে উঠল।
রামকৃষ্ণেরও পিপাসা পেল হঠাৎ। বললেন, জল খাব।
গৃহস্থ যদি নিজের থেকে কিছু না-ও দেয়, তবু সাধু সন্নেসী চেয়ে নিয়ে কিছু খেয়ে আসবে। আর কিছু না হোক, অন্তত এক গ্লাশ জল। নইলে অকল্যাণ হয় গৃহস্থের।
আর সকলের হোক বা না হোক, রামকৃষ্ণের ভুল হয় না।
তিলক-কণ্ঠীধারী এক ভক্ত শুদ্ধ ভাবে জল নিয়ে এল। কিন্তু মুখের কাছে গ্লাশ তুলে ধরতেই, এ কী হল হঠাৎ? রামকৃষ্ণ গ্লাশ নামিয়ে রাখলেন। তাঁর কণ্ঠনালী আড়ষ্ট, বিশুষ্ক হয়ে গিয়েছে। এক ফোঁটা জল গলবে না ভিতরে। গ্লাশের জলে কুটোকাটা পড়েছে বোধ হয়। তাই বোধ হয় আপত্তি করলেন খেতে। গ্লাশের জল ফেলে দিল নরেন। আরেক ‘গ্লাশ জল এনে দিল আরেক জন। এবার সে জল স্বচ্ছন্দে পান করলেন রামকৃষ্ণ। সন্দেহ নেই, আগের “গ্লাশে ময়লা ছিল বলেই সেটা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে।
কিন্তু নরেনের মন মানতে চাইল না কিছুতেই। নিশ্চয়ই গভীর আর কোনো রহস্য আছে। ঠাকুরকে একাই পাঠিয়ে দিলে গাড়িতে করে। বললে, আমার বিশেষ কাজ আছে। পরে যাব।
বিশেষ কাজ নয় তো কি! সব দিক থেকে যাচিয়ে-বাজিয়ে নিতে হবে ঠাকুরকে। সব কিছুর জানতে হবে হাট-হদ্দ। কেন উনি ঐ ভক্তের হাতের জল খেলেন না?
তিলক-কণ্ঠীধারীকে প্রশ্ন করা যায় না সরাসরি। তার ছোট ভাইকে পাকড়াও করলে। ভাগ্যক্রমে তার সঙ্গে আগে থেকে আলাপ ছিল নরেনের। জিজ্ঞাসা করলে, ব্যাপার কি হে তোমার দাদাটির? বলি, স্বভাবচরিত্র কেমন?
মাথা চুলকোলো ছোট ভাই। বললে, দাদার কথা কি করে বলি ছোট হয়ে? নিমেষে বুঝে নিল নরেন। কিন্তু ঠাকুর বুঝলেন কি করে? তিনি কি অন্তর্যামী অন্তরজ্ঞ?
আবার গেরুয়া কেন? একটা কি পরলেই হল? রামকৃষ্ণ রসিকতা করলেন, ‘একজন বলেছিল চণ্ডী ছেড়ে হলাম ঢাকী। আগে চণ্ডীর গান গাইতো, এখন ঢাক বাজায়।’
সংসারের জ্বালায় জ্বলে গেরুয়া পরেছে—সে বৈরাগ্য বেশি দিন টেঁকে না। হয়তো কাজ নেই, গেরুয়া পরে কাশী চলে গেল। তিন মাস পরে ঘরে চিঠি এল, আমার একটি কাজ হয়েছে, কিছু দিন পরেই বাড়ি ফিরব, ভেবো না আমার জন্যে। আবার সব আছে, কোনো অভাব নেই, কিন্তু কিছুই ভালো লাগে না। ভগবানের জন্যে একা-একা কাঁদে। সে বৈরাগ্যই আসল বৈরাগ্য।
মন যদি ভেকের মত না হয়, ক্রমে সর্বনাশ হয়। তার চেয়ে শাদা কাপড় ভালো। মনে আসক্তি, আর বাইরে গেরুয়া! কী ভয়ঙ্কর!
ভগবতী ঝি এসে দূর থেকে প্রণাম করল ঠাকুরকে। অনেক দিনের ঝি। বাবুদের বাড়িতে কাজ করে। ঠাকুরের জানাশোনা।
প্রথম বয়সে স্বভাব ভালো ছিল না। কিন্তু তাই বলে ঠাকুর তাঁর করুণার সুগন্ধ বারির ধারাটি শুকিয়ে ফেলেননি। দিচ্ছেন তাকে তাঁর অমিয় বচনের আশীর্বাদ। বললেন, ‘কি রে, এখন তো ঢের বয়েস হয়েছে। টাকা যা রোজগার করলি, সাধু-বৈষ্ণবদের খাওয়াচ্ছিস তো?”
‘তা আর কি করে বলব?” অল্প একটু হাসল ভগবতী।
‘কাশী-বৃন্দাবন-এ সব হয়েছে?”
‘তা আর কি করে বলব?’ কুণ্ঠিত হবার ভান করল ভগবতী: ‘একটা ঘাট বাঁধিয়ে দিয়েছি। তাতে পাথরে আমার নাম লেখা আছে।’
‘বলিস কি রে?’
‘হ্যাঁ, নাম লেখা আছে শ্রীমতী ভগবতী দাসী।’
আনন্দে হাসলেন রামকৃষ্ণ। বললেন, ‘বেশ, বেশ।’
কি মনে ভাবল ভগবতী, হঠাৎ ঠাকুরের পা ছুঁয়ে প্রণাম করলে।
যেন একটা বিছে কামড়েছে, যন্ত্রণায় এমনি অস্থির হয়ে পড়লেন ঠাকুর। ছোট খাটটিতে বসে ছিলেন, ঝটকা মেরে দাঁড়িয়ে পড়লেন। মুখে শব্দ, ‘গোবিন্দ’, ‘গোবিন্দ’। কী যেন একটা অঘটন ঘটে গেল মুহূর্তে। অসহন আর্তির দৃশ্য। শিশুঅঙ্গে কে যেন তপ্ত অঙ্গার ছুঁড়ে মেরেছে।
ঘরের যে কোণে গঙ্গাজলের জালা, সেদিকে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটলেন ঠাকুর। পায়ের যেখানে ভগবতী ছুঁয়েছিল সেখানে ঢালতে লাগলেন গঙ্গাজল।
জীবন্মৃতার মত বসে আছে ভগবতী। সাড় নেই স্পন্দ নেই, দহনের পর দেহের ভস্মরেখা। জীবনে অনেক সে পাপ করেছে, কিন্তু এ পাপের বোধ হয় তুলনা নেই।
যত তোমার পাপ করবার ক্ষমতা, তার চেয়ে ভগবানের বেশি ক্ষমতা ক্ষমা করবার। পতিতপাবন করুণাসিন্ধু তাই আবার অমৃতবচন বিতরণ করলেন।
বললেন, ‘বেশ তো গোড়ায় দূর থেকে প্রণাম করেছিলি। কেন মিছিমিছি পা ছুঁতে যাস?”
যাক গে। তাই বলে মন-খারাপ করিস নে। গা-হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে এতক্ষণে। শোন, একটু গান শোন। গান শুনলে তুইও ঠাণ্ডা হবি।
ঠাকুর গান ধরলেন।
দুর্গাপূজোর দিন মঠে বহু লোক সেবার প্রণাম করছে শ্রীমাকে। প্রণামের পর বারে বারে গঙ্গাজলে পা ধুচ্ছেন শ্রীমা। যোগেন-মা বললেন, ‘মা, ও কি হচ্ছে? সর্দি করে বসবে যে।’
‘যোগেন, কি বলব! এক-একজন প্রণাম করে যেন গা জুড়োয়, আবার এক-একজন প্রণাম করে যেন গায়ে আগুন ঢেলে দেয়। গঙ্গাজলে না ধুলে বাঁচিনে।’
তোমার পা ছোঁবার সুযোগ দাওনি। তাই দূর থেকেই তোমাকে প্রণাম করছি। তাতেও যদি পাপস্পর্শের জ্বালা লাগে, গঙ্গাজল কোথায় পাব মা, আমার অশ্রুজলে ধুয়ে নিয়ো পাদপদ্ম।
ভবতারিণীর মন্দিরে গিয়ে ভাবাবস্থায় কথা বলছেন ঠাকুর, ‘করছিস কি? এত লোকের ভিড় কি আনতে হয়? নাইবার খাবার সময় নেই। গলা তো ভাঙা ঢাক। এত করে বাজালে কোন দিন ফুটো হয়ে যাবে যে। তখন কী করবি?” তবু ভিড়ের কমতি নেই। ভক্তের দল যেমন আসছে তেমনি আসছে আবার ভণ্ডের দল।
‘অমন সব আদাড়ে লোকদের এখানে আনিস কেন?’ এক দিন সরাসরি জগদম্বার সঙ্গে ঝগড়া করছেন রামকৃষ্ণ। ‘আমি অতশত পারব না। এক সের দুধে পাঁচ সের জল—জ্বাল ঠেলতে ঠেলতে ধোঁয়ায় চোখ জ্বলে গেল। তোর ইচ্ছে হয় তুই দিগে যা। আমি অত জ্বাল ঠেলতে পারব না। অমন সব লোকদের আর আনিসনি।’
সাধুর মধ্যেও ভণ্ডের ছড়াছড়ি।
‘যে সাধু ওষুধ দেয়, ঝাড়ফুঁক করে, টাকা নেয়, বিভূতি-তিলকের আড়ম্বর করে, খড়ম পায়ে দিয়ে যেন সাইনবোট মেরে নিজেকে জাহির করে বেড়ায়, তার থেকে কিছু নিবিনে।
শুধু ভক্তি খুঁজে বেড়াবি। অহেতুক ভক্তি। নারদীয় ভক্তি। ভক্তির আমি-র অহঙ্কার নেই। এ আমি আমির মধ্যেই নয়। যেমন হিঞ্চে শাক শাকের মধ্যে নয়। অন্য শাকে অসুখ করে, হিঞ্চে শাকে পিত্ত যায়। মিছরি মিষ্টির মধ্যে নয়। অন্য মিষ্টিতে অপকার, মিছরি খেলে অম্বল নাশ হয়। ভক্তি অজ্ঞান করে না, বরং ঈশ্বর লাভ করিয়ে দেয়।
আমার শক্তি নেই, আসক্তিও নেই। শুধু ভক্তি নিয়ে বসে আছি এক কোণে। মধুস্নিগ্ধ পদ্ম যদি ফোটে, শুনতে পাব সে ভৃঙ্গের গুঞ্জরণ।
৩৯
আচ্ছা, রসিক মেথর কি কোনোদিন পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল ঠাকুরকে? যদি বা করেছিল, গায়ে কি জ্বালা ধরেছিল ঠাকুরের? যেমন হয়েছিল ভগবতীর বেলায়? ময়লা পরিষ্কার করে বলে রসিকও কি ময়লা?
কে বলে! মেথররূপী নারায়ণ। ঝাড়ু অস্পৃশ্য বটে, কিন্তু ঝাড়ুদার অস্পৃশ্য নয়। পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিল কিনা জানা নেই, কিন্তু ঠাকুর একদিন সটান রসিকের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত। শরীরে না হোক, মনে-মনে।
বলছেন ঈশান মুখুজ্জেকে, ‘ধ্যান করছিলাম। ধ্যান করতে-করতে মন চলে গেল রসিকের বাড়ি। রসিক মেথর। মনকে বললাম, থাক শালা, ঐখানেই থাক। মা দেখিয়ে দিলেন, ওর বাড়ির লোকজন সব বেড়াচ্ছে, খোল মাত্র, ভিতরে সেই এক কুলকুণ্ডলিনী, এক ষটচক্র।’
রতির মাকে চেনো তো? লালাবাবুর রানি কাত্যায়নীর মোসাহেব, গোঁড়া বৈষ্ণবী। খুব আসা-যাওয়া করে দক্ষিণেশ্বরে। ভক্তি দেখে কে। কিন্তু যেই রামকৃষ্ণকে দেখল মা কালীর প্রসাদ খেতে, অমনি পালালো।
কী আশ্চর্য, সেই রতির মা’র বেশেই মা-কালী দেখা দিলেন একদিন। যা শক্তি তাই বৈষ্ণবী। বললেন, তুই ভাব নিয়েই থাক।
কিন্তু আমার ভাব কি জানো? চোখ চাইলেই কি তিনি, আর নেই? আমি নিত্য-লীলা দুইই লই। সব মতই সেই এককে নিয়ে। একঘেয়েকে নিয়ে নয়। তাই আমি শাক্তেও আছি, বৈষ্ণবেও আছি, বেদেও আছি, বেদান্তেও আছি। রাম শিবকে পূজো করেছিলেন, শিব রামকে। কৃষ্ণ স্তব করেছিলেন কালীকে, আবার কৃষ্ণই কালীরূপ ধরেছিলেন। আমি সব ঘটে আছি, সব সংঘটে। শুধু অকপট হলেই হল। আকারে যে অনাকারেও সে। কিংবা বলো, সাকার-নিরাকার আমার বাপ-মা। বাপ নির্গুণ মা গুণান্বিতা। কাকে নিন্দা করে কাকে বন্দনা করবে, দুই পাল্লায় সমান ভারি।
‘নির্গুণ মেরা বাপ সগুণ মাহ্ তারি,
কারে নিন্দো কারে বন্দো, দোনো পাল্লা ভারি।’
‘যে সমন্বয় করেছে সেইই লোক।’ বললেন রামকৃষ্ণ।
যত মত তত পথ। কিন্তু পথটাই পৌঁছনো নয়। মতেই না হয় মতিভ্রম। যদি ভুল-পথেও যাও, ঘুর-পথেও যাও, অন্তরে যদি অসরল না থাকে, তবে সে-পথও একদিন সোজা-পথ হয়ে যাবে। হবে ঠিক জগন্নাথদর্শন।
যাত্রার লগ্নে লক্ষ্যটি যদি ঠিক থাকে, পথ যাই হোক, একদিন ঠিক হাত ধরবেন অন্ধকারে। ক্লান্ত হলে কোলে নেবেন। তাঁর হাতে শুধু হিত, পায়ে শুধু ছায়া। ঈশ্বর ক্ষীরের পুতুল। হাত ভেঙে খেলেও মিষ্টি পা ভেঙে খেলেও মিষ্টি।
এই একমাত্র আসল, যার আসল ভেঙে খেলেও সুদ বাড়ে।
কলকাতায়, পাথুরেঘাটায় যদু মল্লিকের বাড়ি যাচ্ছেন ঠাকুর। কিন্তু গাড়ির যোগাড় হয় কোত্থেকে?
বরানগরের বেণী সা ভাড়ায় গাড়ি খাটায়। কথা আছে, ঠাকুর বলে পাঠালেই দক্ষিণেশ্বরে গাড়ি আসবে। আর, কলকাতা থেকে ফিরতে যত রাতই হোক না, গাড়োয়ান গোলমাল করতে পাবে না। যত বেশি টাইম তত বেশি ভাড়া। আগে রসদদার ছিল মথুর, পরে পেনেটির মণি সেন, শেষে শম্ভু মল্লিক, এখন সিঁদুরে-পটির জয়গোপাল। তবে যার বাড়িতে যাওয়া, সেই দিয়ে দেয় গাড়িভাড়া। কিন্তু যদু মল্লিক যা কৃপণ। বরাদ্দ দুটাকা চার আনার বেশি গাড়িভাড়া দেবে না। কিন্তু বেণী সা’র সঙ্গে বন্দোবস্ত হয়েছে ফিরতে যত রাতই হোক, তিন টাকা চার আনা দিলেই গাড়োয়ান আর গোলমাল করবে না। নইলে, দেরি হতে দেখলেই গাড়োয়ান কেবল চলো, চলো, করে দিক করে। কিন্তু গেলেই কি তক্ষুনি তক্ষুনি ফেরা যায়? যদুর মা এসেছে, সে কত ভালোবাসে, তার সঙ্গে দুটো কথা না কয়েই বা আসি কি করে? কিন্তু এখন বাড়তি টাকা একটা কে দেয়!
একদিন যদুকে বললেন সরাসরি: ‘হ্যাঁ হে, এত টাকা করেছ, এখনো টাকার লোভ গেল না?’
‘দেখ ছোট ভটচাজ,’ বললে যদু মল্লিক, ‘ও লোভ যাবার নয়। তুমি যেমন ভগবানের লোভ ছাড়তে পারো না, তেমনি বিষয়ী লোকও ছাড়তে পারে না টাকার লোভ। আর কেনই বা ছাড়বে? তুমি ভগবানের প্রেমের জন্যে পাগল, আমি তাঁর ঐশ্বর্যের জন্যে পাগল! আচ্ছা, বলো দিকিনি টাকা কি তাঁর ঐশ্বর্য নয়?’ ঠাকুরের মুখে আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। বললেন, ‘যদি এটা ঠিক বুঝে থাকো টাকাটা তোমার নিজের ঐশ্বর্য নয়, ভগবানের ঐশ্বর্য, তাহলে আর তোমার ভাবনা কি গো! কিন্তু এ কথা তুমি সরল ভাবে বলছ, না, চালাকি করে বলছ?’ ‘সে কথা তুমিই জানো। তোমার কাছ থেকে কি মনের কথা লুকোনো যায়? কিন্তু যাই বলো, ও সব মোসাহেবগুলোকে রেখেছ কেন?
‘ভদ্দরলোকের ছেলে, ভিক্ষে করতে পারে না, কিছু পাবার আশায় এখানে পড়ে থাকে। ওদের বঞ্চিত করলে ওরা যায় কোথায়?”
‘কিন্তু ওদের সঙ্গে মিশলে ক্ষতি হতে পারে।’
‘দেখ ছোট ভটচাজ, বিষয়-আশয় রাখতে গেলে অমন লোকের দরকার আছে।’
আবার বিষয়-আশয়! চঞ্চল হয়ে উঠলেন ঠাকুর। ‘সবই তো ইহকালের জন্যে সংগ্রহ করছ, ও পারের জন্যে কি যোগাড়যন্ত্র করলে?”
‘ও পারের কাণ্ডারী তো তুমি। শেষের দিনে তুমি আমায় পার করবে সেই আশায়ই তো শেষ পর্যন্ত বসে থাকব। আমার উদ্ধার না করলে তোমার পতিতপাবন নামে কালি পড়বে।’
চলো যদু মল্লিকের বাড়ি।
তার মা ঠাকুরকে কাছে বসে খাওয়ান আর কাঁদেন। তাঁর বাৎসল্য-রস।
গাড়িতে উঠলেন ঠাকুর। সঙ্গে লাটু, হাতে ঠাকুরের বটুয়া আর গামছা। আর হয়তো অতুলকৃষ্ণ, গিরীশ ঘোষের ভাই। কৌতূহলী হয়ে এটা-ওটা দেখছেন ঠাকুর আর শিশুর মত জিজ্ঞেস করছেন লাটুকে।
বরানগরের বাজার ছাড়িয়ে চলেছেন এখন মতিঝিলের পাশ দিয়ে। ডাইনে একটা মদের দোকান, ডাক্তারখানা, চালের আড়ত, ঘোড়ার আস্তাবল। তার দক্ষিণে সর্ব-মঙ্গলা আর চিত্তেশ্বরীর মন্দির।
মদের দোকানে মদ খাচ্ছে মাতালেরা আর খুব হল্লা করছে। কেউ-কেউ বা গান ধরেছে স্ফূর্তিতে। কেউ-কেউ বা বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে নাচছে স্খলিত পায়ে। সব চেয়ে মজার, দোকানের যে মালিক, সে নির্লিপ্ত হয়ে দুয়ার ধরে দাঁড়িয়ে আছে বাইরে চেয়ে। দোকানের চাকর তদারক করছে বেচাকেনা। এ সবে মালিকের যেন আঁট নেই। কপালে মস্ত এক সিঁদুরের ফোঁটা কেটে দাঁড়িয়ে আছে দোরগোড়ায়।
যার জন্যে দাঁড়িয়ে আছে সে বুঝি ঘরের সমুখ দিয়ে চলে যায়। আনমনে চলে যাবে। হয়তো একবার ভুলেও ভ্রক্ষেপ করবে না।
মদ-বেচা শুঁড়ি, তার আবার আবদার! কিন্তু ঠাকুর তো মদ দেখেন না, ঠাকুর মন দেখেন। জীবিকা দেখেন না, জীবন দেখেন। দোকানের মদের ভাণ্ড আমার পূর্ণ থাকতে পারে কিন্তু অন্তরে করুণার কুম্ভটি আমার শূন্য।
ঠাকুরকে দেখতে পেয়েই হাত তুলে প্রণাম করল দোকানি। ঠাকুরের চোখ পড়ল দোকানের দিকে। তরল-অনল-উচ্ছল মাতালদের দিকে। তাদের বিহ্বল মাতা-মাতির দিকে। এ কি! ঠাকুরও যে মুহূর্তে বিভোর হয়ে গেলেন নেশায়। তাঁর গা-হাত-পা টলতে লাগল, এড়িয়ে গেল কথা! এ কি! ঠাকুরও মদ খেয়েছেন নাকি? কখন খেলেন?
মদ দেখে কারণের কথা মনে পড়েছে ঠাকুরের—জগৎকারণের কথা। কারণানন্দ দেখে মনে পড়েছে সচ্চিদানন্দকে। ঠাকুরও মদ খেয়েছেন, কিন্তু এ মদের নাম হরিরসমদিরা। এ মদের নাম সূরা নয় সুধা। এ মদ মদের চেয়েও দুর্মদ।
শুধু তাই নয়, চলতি গাড়ির পা-দানিতে এক পা রেখে মাতালের মত নাচতে শুরু করলেন ঠাকুর। হাত নেড়ে নেড়ে বলতে লাগলেন চেঁচিয়ে: ‘বা, বেশ হচ্ছে, খুব হচ্ছে, বা, বা, বা !’
এ কি, পড়ে যাবেন যে! চলতি গাড়ি থেকে রাস্তায় ছিটকে পড়লে কি আর রক্ষে অছে? ত্রস্তব্যস্ত হয়ে অতুল ধরতে গেল ঠাকুরকে, হাত বাড়িয়ে টানতে গেল ভিতরে। লাটু বাধা দিয়ে বললে, ‘পড়ে যাবেন না, ভয় নেই। নিজে হতেই সামলাবেন—’
আড়ষ্ট হয়ে রইল অতুল। বুক ঢিপ-ঢিপ করতে লাগল। নিজে হতেই সামলাবেন! কে জানে। পড়ে গেলেই তো সর্বনাশ! আর নয়, পাগলা ঠাকুরের সঙ্গে আর কখনো যাব না এক গাড়িতে। দিব্যি সহজ মানুষের মত কথাবার্তা বলছিলেন, হঠাৎ কোথাকার কতগুলো মাতাল দেখে মত্ত হয়ে গেলেন। এ কখনো শুনিনি। শুনিনি তো ঠিক, কিন্তু দেখছি স্বচক্ষে। কারণীভূতকে দেখে কারণশরীরে অকারণ আনন্দ!
গাড়ি ছাড়িয়ে গেল শুঁড়িখানা। ঠাকুর স্থির হয়ে বসলেন এসে ভিতরে। স্বাভাবিক সহজ সুরে বললেন, ‘ঐ সর্বমঙ্গলা। বড় জাগ্রত। প্রণাম করো।’ নিজেই প্রণাম করলেন সর্বাগ্রে।
মদ খেয়ে টং হয়েছে গিরীশ। এমন মাতাল, বেশ্যাও তখন দরজা খুলে দিতে নারাজ। হঠাৎ কি হল, দক্ষিণেশ্বরের কথা মনে পড়ে গেল আচমকা। একটা ঘোড়ার গাড়ি ডাকিয়ে নিয়ে উঠে বসল। চলো দক্ষিণেশ্বর। সেখানে এমন একজন আছেন যিনি দরজা কখনো বন্ধ করেন না।
রাত নিশুতি। মন্দিরের ফটক কখন বন্ধ হয়ে গিয়েছে। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে এতক্ষণে।
তা হোক, তবু কোথাও যদি জায়গা থাকে, সে দক্ষিণেশ্বরে। কলকাতার উত্তরে, কিন্তু আসলে দক্ষিণ।
যা ভেবেছিল। ফটক বন্ধ। চার পাশ অন্ধকার। নিষ্পন্দ।
কিন্তু যিনি ঘুমোন না, আর্ত জনের অন্ধ জনের কান্না শোনবার জন্যে উৎকর্ণ হয়ে আছেন তাঁকে ডাকতে দোষ কি!
‘ঠাকুর! ঠাকুর!’ চীৎকার করে ডাকতে লাগল গিরীশ।
কে, গিরীশ না? সেই নোটো নেচো গিরীশ! নির্জন নিঃসহায় অন্ধকারে আমাকে ডাকছে কাতর প্রাণে! আমি কি থাকতে পারি স্থির হয়ে?
বাইরে বেরিয়ে এলেন ঠাকুর। ফটক খোলালেন। মাতাল গিরীশের হাত ধরলেন আনন্দে। মদ খেয়েছিস তো কি, আমিও মদ খেয়েছি। সুরাপান করি না রে, সুধা খাই রে কুতূহলে। আমারে মন মাতালে মাতাল করে, মদ-মাতালে মাতাল বলে। বলে গিরীশের হাত ধরে হরিনাম করতে-করতে নাচতে লাগলেন ঠাকুর।
স্বভাব আর ছাড়তে পারে না গিরীশ। সে দিন আবার মাতাল হয়ে এসেছে গাড়িতে করে।
কি করেই বা ছাড়বে? গল্প করলেন ঠাকুর: বর্ধমানে দেখেছিলাম। একটা দামড়া গাই-গরুর কাছে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, এ কী হল? তখন গাড়োয়ান বললে, মশায়, এ বেশি বয়সে দামড়া হয়েছিল। তাই আগেকার সংস্কার যায়নি।
একটা বাটিতে যদি রশুন গোলা হয়, রশুনের গন্ধ কি যায়? বাবুই গাছে কি আম হয়?’
ঠাকুরও তেমনি তাঁর স্বভাব ছাড়তে পারেন কই? তাঁর অযাচিত করুণার স্বভাব। ওরে গিরীশ এসেছে। নিজেই এগিয়ে গিয়ে আদর করে ধরে নিয়ে এলেন। মাতাল বলে প্রত্যাখ্যান করলেন না।
লাটুকে বললেন, ‘যা তো, দ্যাখ তো গাড়িতে কিছু আছে কিনা।’
লাটু গিয়ে দেখে মদের বোতল পড়ে আছে। আর গ্লাশ আছে কাঁচের। ঠাকুরের হুকুম, নিয়ে চলল গ্লাশ-বোতল। ভক্তরা যারা দেখল হেসে উঠল।
ঠাকুর বললেন, ‘রেখে দে তোর কাছে। এখানে খোঁয়ারি এলে তখন কোথায় পাব?’ মদের মধ্য দিয়েই ওর মুক্তি আসবে। শেষকালে আর মদ থাকবে না, থাকবে মাদকতা। ক্রোধ থাকবে না থাকবে তেজ। কাম থাকবে না থাকবে প্রেম। লোভ থাকবে না থাকবে ব্যকুলতার হাওয়া।
গিরীশের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলেন ঠাকুর। রাঙা চোখ শাদা করে দিলেন। গিরীশ বললে, ‘আমার আস্ত বোতলের নেশাটাই মাটি করে দিলে।’
‘যদি পাপ থেকে পরিত্রাণ পাবই জানতুম, গিরীশ আপশোষ করেছিল, ‘তবে আরো কিছু পাপ করে নিতুম শখ মিটিয়ে।
সে বার লছমনঝোলায় শরৎ-মহারাজ আর হরি-মহারাজ খুব ভাঙ খেয়েছে। নেশা করে শুধু ঠাকুরের কথাই কইতে লাগল। কইতে কইতে চোখ শাদা হয়ে গেল, নেশার লেশমাত্র রইল না।
বাকি রাতটকু তোমার কথাই কইতে দাও। এই ব্যাধির রাত, বিকারের রাত কেটে যাক। তোমার কথায় জাগুক একবার সেই আরোগ্যের প্রভাত।
