বিদ্বান বনাম বিদুষী – ১০
।। দশ।।
ইউনিভার্সিটি নমিতার কমফোর্ট জোন। অফিসে ঢুকে কম্পিউটার অন করল নমিতা। বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডিজিটাল লাইব্রেরি একটা স্বর্ণখনি। কী নেই এখানে! বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির যত পিএইচডি থিসিস আজ পর্যন্ত হয়েছে সব এখানে ডিজিটাইজ করে রাখা হয়েছে। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে ঘরে বসে বসে পাওয়া যায় আজকাল। ফেনোমেনাল কাজ। নমিতা প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনে মাউস ক্লিক করল। স্ক্রিনে হাজির হল বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের নাম। অ্যালফাবেটিকালি—এগ্রিকালচার, অ্যানথ্রোপলজি, বেঙ্গলি এসব। কার্সার নিয়ে ‘বেঙ্গলি’তে মাউস ক্লিক করার সময় নমিতার বুক ধকধক করছে। বিদ্যাদির খনাবাক্য এখানে পাওয়া যাবে? ১৯৫৬ সাল থেকে রেকর্ড আছে, বিদ্যাদির ইয়ার ১৯৮৭। কিন্তু খুঁজতে গিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে হতাশ হল নমিতা বিদ্যাদির ডিসার্টেশনটা নেই। এটা কীভাবে হল? এত পুরোনো সব ফাইল আছে আর বিদ্যাদির ডকুমেন্টটাই উধাও! নমিতা দ্রুত হাতে বুলিয়ান সার্চ করল। আশেপাশের বছরগুলোও খুঁজল। কিন্তু বিদ্যাদির নাম নেই। কোথায় গেল? নমিতার স্পাইনাল কর্ড দিয়ে একটা অস্বস্তির স্রোত বইতে লাগল। তবে কি কেউ ফাইল ডিজিটাল লাইব্রেরি থেকে মুছে দিয়েছে?
অফিস থেকে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে এল নমিতা। লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল। সাত তলার বোতাম টিপল নমিতা। মনে টানটান উত্তেজনা। কেউ কি ডিজিটাল রিপোর্ট হ্যাক করে মুছে দিল? জার্নাল সেকশনে গিয়ে দেখতে হবে।
লিফট আসতে যেন কয়েক যুগ লাগাচ্ছে। নমিতা অস্থির ভাবে তিন চার বার বোতাম টিপল। অবশেষে তিনি এলেন। নমিতা ভিতরে ঢুকল। আরেকজন ছাত্রী রয়েছে লিফটের ভিতরে। নমিতাকে গুড আফটারনুন ম্যাম, বলে সম্ভাষণ জানাল। নমিতা অন্যমনস্ক। খেয়াল হতে লজ্জা পেল—‘গুড আফটারনুন।’
জার্নাল সেকশনের সারি সারি তাকে অজস্র পুরোনো বাঁধানো ডকুমেন্ট। প্রত্যেক তাকে সাল লেখা আছে। নমিতা ১৯৮৭-য়ে গিয়ে খুঁজতে লাগল। কিন্তু এখানেও আবার ধাক্কা খেল নমিতা। বিদ্যাদির প্রেমচাঁদ রায়চাঁদ ডিসার্টেশনের কোনো হার্ড কপি নেই!
জার্নাল সেকশনের ক্লার্কের ডেস্কে গেল নমিতা।
‘কিছু হেল্প লাগবে ম্যাম?’ ক্লার্ক বলল।
‘বিদ্যাধরী দাসের একটা পি আর ডিসার্টেশন খুঁজছি,’ নমিতা বলল।
ক্লার্ক ডেস্কটপ কম্পিউটারে নাম টাইপ করে খুঁজল, তারপর মুখ দিয়ে পুচ করে শব্দ করল—‘জার্নাল সেকশনে এ নামের অথারের কোনো ডকুমেন্ট নেই, ম্যাম।’
ক্লার্ককে ধন্যবাদ জানিয়ে ধীর পায়ে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এল নমিতা। কোথায় গেল বিদ্যাদির ডিসার্টেশন? নিজের ডিপার্টমেন্টে ফিরে এসে হতাশ হয়ে বসে দেওয়ালের এসির দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল নমিতা। ডকুমেন্টটা একদম হাওয়া হয়ে গেল! সে সময় মারাত্মক খবরটা এল।
ভাইস চ্যান্সেলরের সেক্রেটারি শ্যামলীর ফোন—নমিতাদি, তোমায় একটা এক্সাইটিং গোপন খবর দিই? তুমি শুনে লাফিয়ে উঠবে।’
‘কী খবর রে শ্যামলী?’
‘জানো এবার বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির ডি-লিট কাকে দেওয়া হচ্ছে?’
‘না তো, কাকে?’
‘আমাদের ইউনিভার্সিটির অ্যালামনাই। তোমাদের সময়কালের লোক। ড. পৃথুযশ ভৌমিক। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার সাউথ ইস্ট এশিয়ান স্টাডিজের চেয়ার আমাদের বাংলার গর্ব।’
কথায় আছে এক জায়গায় নাকি দু’বার বজ্রপাত হয় না। নমিতার মনে হলো আজ ওর মাথায় অস্তত তিনবার বজ্রপাত হল। এত ঘটনাবহুল বা দুর্ঘটনাবহুল দিন ওর জীবনে কক্ষনো আসেনি। শ্যামলী বলল নমিতাদি কথাটা ঘুণাক্ষরে যেন কেউ না জানে। রিপোর্টাররা জানলে আমার চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে। তুমি একদিন আমাকে বিদ্যাধরী-পৃথু্যুশের ডিবেটের গল্প শুনিয়েছিলে তাই তোমায় জানালাম।’
‘প্রমিস শ্যামলী, শ্যামলীর ফোন রেখে নমিতা ফোন করল অ্যাডভোকেট বসাককে—‘মিস বসাক, ডকুমেন্টটা নেই!’
‘কী বলছেন! ডকুমেন্টটা নেই আপনাদের ডিজিটাল লাইব্রেরিতে?’ ফোনের ওপাশ থেকে অ্যাডভোকেট বসাকের গলার স্বরে উত্তেজনা।
‘না।’
‘আর ইউ শিওর? নেই?’
‘না নেই। আমি তারপর জার্নাল সেকশনে গিয়ে দেখলাম যদি হার্ড কপি থাকে, হয়তো ডিজিটাইজেশনে মিস হয়ে গেছে। কিন্তু কিচ্ছুটি নেই।
‘স্ট্রেঞ্জ! কেউ কি সরিয়েছে বলে আপনার মনে হয়?’
‘আমি জানি না। আপনার জন্য আরেকটা দুঃসংবাদ আছে।’
‘কী হয়েছে?’ মিস বসাক উদ্বিগ্ন।
‘একটা অ্যানাউন্সমেন্ট আসতে চলেছে। আমাদের ইউনিভার্সিটি এবছরের ডি-লিট দিচ্ছে ড. পৃথুযশ ভৌমিককে।’
‘কী বলছেন কী আপনি!’
‘কী অদ্ভুত জীবন মিস বসাক। ফার্স্ট গার্ল বিদ্যাদি ভিখারিদের পড়াতে গিয়ে প্ল্যাটফর্মে ঘাম ঝরাচ্ছে, আর পৃথুযশ ডি-লিট। একেই বলে কপাল। সেই কথায় আছে না—চিটে গুড় আর চিনির পানা, যার যেমন সম্মাননা।’
‘ব্যাপারটা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক।’
‘ব্যাপারটা আমার জন্য খুব কমপ্লিকেটেড হয়ে গেল, মিস বসাক, নমিতার গলায় চিন্তার স্বর। ‘আমার ইউনিভার্সিটি যাকে ডি-লিট দিচ্ছে আমি সেই ইউনিভার্সিটির আর্টস ফ্যাকাল্টির ডিন হয়ে কীভাবে তার বিরুদ্ধে কোর্টে লড়ব? ইউনিভার্সিটি আমায় পারমিশনই দেবে না।’
‘এখন তাহলে কী করা যায়?’
‘বুঝতে পারছি না। কাল দেখি বিদ্যাদি কী বলে।’
‘আপনি কি ওঁকে একবার ফোন করে জানাবেন?’
‘সেটা ঠিক হবে না। বিদ্যাদির ব্রেন খুবই ফ্যাটিগড। উনি যে এতটা করেছেন এটাই অনেক। ওঁকে ওঁর স্পিডে এগোতে দিন।’ নমিতা বুঝছে একজন মায়ের উদ্বেগ। ‘আমি কাল বিদ্যাদির সঙ্গে কথা বলব।’
‘অনেক ধন্যবাদ।’
‘আরুষি কেমন আছে?’
‘আমি একটু আগে খবর নিয়েছি ওর দাদুর সঙ্গে কথা বলে। ওর দাদু বললেন ও এখন অনেক স্টেবল। তবে কড়া ডোজের ইন্টারভেনাস পেইন কিলার অ্যাডমিনিস্টার্ড করা হয়েছে তো, তাই বেশ ঝিমুনি আছে। এর মধ্যেই ওর দাদুকে জিজ্ঞাসা করেছে যে কোর্ট কেসের কী হবে? কোনো উকিল পাওয়া যাচ্ছে না এজন্য আরুষি খুব উদ্বিগ্ন। ওর দাদু ওকে বলেছেন যে একজন উকিল পেয়েছে। এতে মেয়ে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।’
‘উকিল যে আপনি সেকথা বলেছেন কি উনি?’
‘না। আরুষি এখনো খুব দুর্বল। ডাক্তাররা বলেছেন কোনো রকম উত্তেজনা থেকে ওকে দূরে রাখতে। ওর দাদু বলেছেন অবস্থার উন্নতি হলে কাল আমার সঙ্গে কথা বলাবেন। আমাকে বেলার দিকে ওর কেবিনে নিয়ে যাবেন বলেছেন। কিপিং ফিঙ্গারস ক্রসড়।’
‘গুড লাক, মিস বসাক।’
‘থ্যাঙ্কস, আই নিড দ্যাট। কাল দেখা হচ্ছে।’ মিস বসাক ফোন রেখে দিলেন। ফোন রেখে দিয়ে নমিতা ভাবল সে বিদ্যাদির অতীতের ঘটনাটা কেন অ্যাডভোকেট বসাককে বলল না। ভয়? তার অবদানও লোকে জানতে পেরে যাবে?
নমিতা ফোন রাখল। সামনে দেওয়ালে ছাদের কাছাকাছি এয়ার কন্ডিশনারের দিকে বারবার চোখ যাচ্ছে নমিতার। বিদ্যাদি ওই গরমে অন্ধকারে বসে বসে ছাত্রীদের খাতা দেখছে! নমিতা উঠে দাঁড়িয়ে দেওয়ালের কাছে গেল, তারপর নীচে প্লাগ পয়েন্ট থেকে এক হ্যাঁচকা টানে এসির প্লাগটা খুলে ফেলল। প্লাগটা মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ল। বিদ্যাদি পারলে আমিও পারব, নমিতা বিড়বিড় করে বলে ওর চেয়ারে ফিরে গেল।
