চন্দ্রগুপ্ত – সৌভিক চক্রবর্তী
চন্দ্রগুপ্ত
রুখু আর চন্দ্রগুপ্তকে পড়াতে বসেছিলেন ঠাকুরদাদা৷ ফিল ইন দ্য ব্ল্যাঙ্কসে ওয়ার্ড বসাতে বসাতে রুখু আড়চোখে দেখল, চন্দ্রগুপ্ত তার দিকে চেয়ে চোখ মটকাচ্ছে৷ রাগ ধরে গেল রুখুর৷ বড় ফাজিল চন্দ্রগুপ্ত৷
রুখু নালিশ করল, ‘দাদা চন্দ্রগুপ্ত পড়ছে না৷’
ঠাকুরদা কিছু বলার আগেই চেয়ার থেকে লাফ মেরে নামল চন্দ্রগুপ্ত৷ তার পর চোখের নিমেষে জানলা গলে পালিয়ে গেল৷
দৃশ্যটা দেখে ঠাকুরদা রুখুকে বললেন, ‘ওর ভবিষ্যৎ অন্ধকার৷ ওকে মানুষ করতে পারব না৷ তুমি লেখো৷’
রোজ সকালে রুখুকে নিয়ে হাঁটতে বেরোতেন ঠাকুরদা৷ হাঁটতে হাঁটতে গল্প বলতেন৷ গাছ চেনাতেন রুখুকে, ‘ওটা জারুল৷ আর ওই যে ঝিরিঝিরি পাতায় বাতাস খেলা করছে ওটা তেঁতুল গাছ৷ আর এইটা দেবদারু৷ দেবদারু পাতায় রোদ্দুর আরাম করে বসতে পারে না৷ বারবার পিছলে যায়৷’
এ রকমই একটা সকালে রাস্তার ধার থেকে চন্দ্রগুপ্তকে উদ্ধার করেছিলেন ঠাকুরদা৷ বাড়িতে নিয়ে আসার পর ঠাম্মা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন, ‘কিছুতেই না৷ বেড়াল পোষা চলবে না৷ বেড়াল অতি ছোঁচা প্রাণী৷ তার ওপর নোংরা করে লুকিয়ে রাখে৷ এই মুহূর্তে বিদেয় করো৷ রোজ রোজ দাদু আর নাতির এই পাগলামি চলবে না৷ বউমা দেখে যাও কী কাণ্ড!’
রুখুর বাবা আর মা দরজায় দাঁড়িয়ে হাসছিলেন৷ অ্যাত্তোটুকু ফারের বলটাকে কোলে নিয়ে দাদু বলেছিলেন, ‘এ বেড়াল সে বেড়াল নয়৷ ও একাই পাঁচ পাঁচটা কাকের সঙ্গে লড়াই করছিল৷ ওর মধ্যে বিরাট প্রতিভা সুপ্ত হয়ে আছে৷ ওর নাম দিয়েছি চন্দ্রগুপ্ত৷ ও তো আসলে ফাইটার, যোদ্ধা৷ আমি ওর দায়িত্ব নিলাম৷ ওকে আমি মানুষ করব৷’
সেই থেকে বাড়িতে রয়ে গেল চন্দ্রগুপ্ত৷ ঠাকুরদা তাকে মানুষ করার সঙ্কল্প করেছিলেন৷ কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই ঠাকুরদাকে প্রতি মুহূর্তে চ্যালেঞ্জ করে সে তার বেড়ালত্বের প্রমাণ দিতে শুরু করল৷ এই হয়তো একটা ইঁদুর মেরে ঘরের মধ্যে আনছে তো ওমনি ঠাম্মার শাড়ি ধরে ঝুল খাচ্ছে৷ তার দৌরাত্ম্যে অস্থির বাড়ির সবাই৷ তা সত্ত্বেও সবারই কেমন একটা মায়া পড়ে যাচ্ছিল চন্দ্রগুপ্তের ওপর৷ একদিন তো ঠাম্মার হাত থেকে ট্যাংরা মাছের মুড়ো খাচ্ছিল চন্দ্রগুপ্ত৷ যদিও রুখুর বাবা এটা দেখে ফেলায় চন্দ্রগুপ্তকে একটা লোক দেখানো ধমক দিয়েছিলেন ঠাম্মা৷ কিন্তু ঠাম্মার হাসি হাসি মুখ আর চন্দ্রগুপ্তের আরামে বুজে আসা চোখের কল্যাণে ধমকটা তেমন জমেনি৷
তবে হাল ছাড়েননি ঠাকুরদা৷ রোজ সকালে রুখু আর চন্দ্রগুপ্তকে পড়াতে বসেন৷ জাতকের গল্প থেকে শুরু করে গ্রামার পর্যন্ত সবই শেখানোর চেষ্টা করেন৷ চন্দ্রগুপ্ত বড়ই অমনোযোগী৷ এখনও কিছুই শিখে উঠতে পারেনি৷ মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে ঠাকুরদা বলেন, ‘ওকে আর মানুষ করতে পারব না মনে হচ্ছে৷’
একদিন পাশের বাড়ি থেকে মাছ চুরি করল চন্দ্রগুপ্ত৷ পাশের বাড়ির কাকিমা এসে নালিশ করলেন৷ ঠাম্মা সারা দিন গজগজ করলেন, ‘তখনই বলেছিলাম আপদ ঘরে তুলো না৷ বেড়াল না কি মানুষ হবে৷ কী আহ্লাদের কথা৷ যত্তোসব৷’ ঠাকুরদা মনমরা হয়ে রইলেন৷
রুখু ঠাম্মা, ঠাকুরদার পাশে শোয়৷ সেদিন রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে তার৷ সে বুঝতে পারল ঠাকুরদা কার সঙ্গে একটা কথা বলছেন৷ কিন্তু ঠাম্মা তো দিব্যি ঘুমোচ্ছেন৷ রুখু পাশ ফিরে অবাক হয়ে গেল৷ অন্ধকার ঘরে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো এসে পড়েছে৷ একটা চেয়ারে বসে আছেন ঠাকুরদা৷ টেবিলের ওপর মুখোমুখি চন্দ্রগুপ্ত৷ ঠাকুরদা বলছেন, ‘কেন না বলে মাছ নিলে? তুমি তো রাজা৷ প্রজার উদ্বৃত্ত অন্নে তোমার অধিকার, ক্ষুধার অন্নে নয়৷’
কেমন একটা গা শিরশির করে উঠল রুখুর৷ তা ছাড়া উদ্বৃত্ত কথাটার মানে বুঝতে পারেনি সে৷ কাল সকালে জেনে নিতে হবে৷ ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়ল রুখু৷
এ ভাবেই দিন কাটছিল কিন্তু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন ঠাকুরদা৷ তাঁর কথা বন্ধ হয়ে গেল৷ হাঁটতে পারেন না৷ বিছানায় শুয়ে কেবল তাকিয়ে থাকেন৷ মাঝে মাঝে চন্দ্রগুপ্ত এসে তাঁর বিছানায় বসে৷ তাঁর নিষ্প্রভ চোখের মণি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে৷
একদিন স্কুল থেকে ফিরে রুখু দেখল, বাড়িতে অনেক লোক৷ বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা অ্যাম্বুল্যান্স৷ সেটা নীল আলো জ্বালিয়ে সাইরেন বাজাতে বাজাতে ঠাকুরদাকে নিয়ে চলে গেল৷
সাইরেনের শব্দটা কান্নার মতো শোনাল৷ আর ফিরে এলেন না ঠাকুরদা৷
দিন দু’য়েক পরে বাড়িতে সবাই খুব কাঁদছিল৷ রুখু জিজ্ঞেস করল, ‘বাবা কী হয়েছে? সবাই কাঁদছে কেন? দাদা কবে আসবে?’
বাবা রুখুকে কোলে নিয়ে বললেন, ‘রুখুবাবা, দাদা তো আর আসবে না৷’
‘কেন? দাদা কি আকাশের তারা হয়ে গেছে?’
‘না রুখুবাবা৷ ওটা ভুল কথা৷ মানুষ কখনও আকাশের তারা হয় না৷ তোর দাদা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন৷ সবাইকেই একদিন চলে যেতে হয়৷ মন খারাপ করিস না৷ দাদা নেই তো কী হয়েছে, দাদার সঙ্গে যে সুন্দর সময় কাটিয়েছিস সেগুলো তো তোর মনে আছে৷ তাই না?’
ঘাড় নেড়ে রুখু বলেছিল, ‘আছে তো৷’
‘সেগুলো কখনও ভুলিস না৷ তোর দাদা ও ভাবেই তোর সঙ্গে থাকবে৷’
সব কিছুর মতো শোকও থিতিয়ে যায়৷ ধীরে ধীরে সবই আগের মতো চলতে লাগল৷ বাবার অফিস, রুখুর স্কুল৷ কিন্তু দু’জন একদম পাল্টে গেল৷ ঠাম্মা আর চন্দ্রগুপ্ত৷
ঠাম্মা মাছ খেতে এত ভালবাসতেন, মাছ খাওয়া ছেড়ে দিলেন৷ নিজে রান্না করে খেতে শুরু করলেন৷ আর চন্দ্রগুপ্ত অদ্ভুত ভাবে ঝিমিয়ে পড়ল৷ সে এখন একেবারেই দুরন্তপনা করে না৷ প্রায় সারাদিনই ঠাকুরদার খাটের ওপর গুটিসুটি মেরে শুয়ে থাকে৷ অনেক সাধাসাধি করলে ফেলে ছড়িয়ে একটু খাবার খায়৷
কিছুদিন পর ঠাম্মার শরীরটাও খারাপ হয়ে গেল৷ রুখুর বাবা বললেন, ‘প্রোটিন না খেলে শরীর তো খারাপ করবেই৷ এত নিয়ম মানলে চলবে না৷’
ঠাম্মা বললেন, ‘তা বললে কী করে হবে? ওসব খাবার আমি আর খাব না৷’
‘তুমি তো খেতে ভালবাসতে৷’
‘যখন বাসতাম তখন বাসতাম৷ এখন আর বাসি না৷’
‘নিয়ম আগে না শরীর আগে?’
‘নিয়ম৷’
‘বাবা তোমায় বলেছে তুমি মাছ, মাংস না খেলে বাবা খুশি হবে?’
‘জানি না৷ তর্ক করিস না৷’
মা-ছেলেতে একপ্রস্থ রাগারাগি হয়ে গেল৷ কিন্তু টলানো গেল না ঠাম্মাকে৷ দিন দিন অসুস্থতা বাড়তে থাকল৷ শেষমেশ ঠাম্মাকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হল৷
এ দিকে চন্দ্রগুপ্ত খাওয়াদাওয়া একেবারেই ছেড়ে দিয়েছে৷ হাড় জিরজিরে চেহারা হয়েছে৷ সারাদিন এক জায়গায় বসে ধোঁকে৷ তাকে দেখে একদিন কেঁদে ফেললেন রুখুর মা৷
বারো দিন পরে হাসপাতাল থেকে ছুটি পেলেন ঠাম্মা৷ ডাক্তারের কড়া হুকুম— মাছ, মাংস সব খেতে হবে৷ রুখুর বাবা একদিন জেদ করে উপোস করে রইলেন, ‘মা মাছ না খেলে আমিও কিছু খাব না৷’
ছেলের জেদের কাছে হার মানল মা৷
রুখুদের বাড়িতে সেদিন সাজো সাজো রব৷ ঠাম্মার প্রিয় তেল কই, মৌরলা মাছের টক, ট্যাংরা মাছের ঝাল রান্না করেছেন রুখুর মা৷ ঠাম্মা খেতে বসেছেন৷ ঠাম্মাকে ঘিরে ওরা তিনজন৷ ঠাম্মা লাজুক মুখে একটুখানি মাছ ভেঙে মুখে দিলেন৷ হঠাৎ ঝনঝন শব্দে চমকে উঠল সবাই৷ রান্নাঘর থেকে শব্দটা এসেছে৷ দেখা গেল, রাতের জন্য তুলে রাখা মাছের ঝালের বাটি উল্টে দিয়ে সবচেয়ে বড় কইমাছটা মুখে নিয়ে বসে আছে চন্দ্রগুপ্ত৷
সবাই আনন্দে চেঁচিয়ে উঠতেই রুখুর দিকে চেয়ে চোখ মটকে দিল চন্দ্রগুপ্ত৷ রুখুর বাবা বললেন, ‘বাঁদরটা আর মানুষ হল না৷’
