পরমপুরুষ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ ২.১
১
সমস্ত সাধনার ইতি করে দিলে রামকৃষ্ণ।
আর পাখা চালিয়ে কী হবে? দক্ষিণ থেকে চলে এসেছে মলয় হাওয়া। আর কী হবে দাঁড় টেনে? বাঁক কাটিয়ে অনুকূল বায়ুতে পাল তুলে দে নৌকোর।
সাধনের প্রথম অবস্থাতেই খাটনি। তার পরে পেনসন। প্রথমে সিঁড়ি ভাঙা, পরে পাহাড়ের চূড়ায় পরেশনাথের মন্দির।
সিদ্ধি-সিদ্ধি বললে কি হয়? সিদ্ধি গায়ে মাখলেও নেশা হয় না। খেতে হয় একটু। দুধে মাখন আছে বললেই কি মাখন হবে? দুধকে দই পেতে মন্থন করো নির্জনে।
‘হরিসে লাগি রহ রে ভাই। তেরা বনত বনত বনি যাই।’
হরিতে লেগে থাকো। লেগে থাকতে-থাকতেই হরি হয়ে যাবে। বলতে-বলতেই হরি বনে যাবে।
রামকৃষ্ণ হরি হয়ে গেছে। যে আছে সে-ই হয়েছে। এই হওয়া অর্থ থাকাটিকেই প্রকাশিত করা। এর পর আবার সাধন কি?
বাউল বৈষ্ণবরা বলে, সাঁই। ‘সাঁইয়ের পর আর কিছু নাই।”
রামকৃষ্ণেরও আর কিছু নেই। রামকৃষ্ণের পরেও আর কিছু নেই।
বৈষ্ণব বাউলরা একেই বলে সহজ অবস্থা। সহজ অবস্থার দুটি লক্ষণ। প্রথম, কৃষ্ণগন্ধ গায়ে নেই। তার মানে ঈশ্বরের ভাব অন্তরে ওতপ্রোত, বাইরে কোনো চিহ্ন নেই, মুখে হরিনাম পর্যন্ত বলছে না। আর দ্বিতীয়, পদ্মের উপরে অলি বসবে অথচ মধু খাবে না। তার মানে, জিতেন্দ্রিয়, কাম-কাঞ্চনে স্পৃহা নেই। রামকৃষ্ণের এখন সেই সহজ অবস্থা।
অনেক পিত্ত জমলে ন্যাবা লাগে, তখন চার দিকে হলদে দেখায়। অনেক ভক্তি জমলে মধু লাগে, তখন চার দিক হরি দেখায়। শ্রীমতী যখন শ্যামকে ভাবলে, সমস্ত শ্যামময় দেখলে। আর নিজেকেও শ্যাম বোধ হল। রামকৃষ্ণ সমস্ত বিশ্ব ঈশ্বরময় দেখল, দেখল সেও ঈশ্বর। পারার হ্রদে শিশে অনেক দিন থাকলে শিশেও পারা হয়ে যায়। রামকৃষ্ণ ভগবানের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে থেকে ভগবান হয়ে গেল। কুমরে পোকা ভাবতে-ভাবতে আরশোলা নিশ্চল হয়ে যায়, নড়ে না, শেষে তাকে আস্তে-আস্তে কুমরে পোকাই হতে হয়। রামকৃষ্ণ ব্রহ্ম ভাবতে-ভাবতে ব্রহ্ম হয়ে গেল। যে নিরাকার ছিল সে হয়ে দাঁড়াল নরাকার।
তার আবার সাধন ভজন কি। হরি আবার কবে হরিনাম করে।
যার খোলা নেমেছে তার আবার জ্বাল কিসের?
কিন্তু খোলা নামবে কখন? এক জন বাউল এসেছে রামকৃষ্ণের কাছে। রামকৃষ্ণ তাকে শুধোল, ‘তোমার খোলা নেমেছে?”
বাউল তাকিয়ে রইল অবাক হয়ে।
‘বলি রসের কাজ সব শেষ হয়ে গেছে? যত জ্বাল দেবে তত “রেফাইন” হবে রস। প্রথম আকের রস, পরে গুড়, পরে দোলো, পরে চিনি—তার পর মিছরি-কিন্তু, জিজ্ঞেস করি খোলা নামবে কখন? অর্থাৎ সাধন কবে শেষ হবে?”
বাউল শুনতে লাগল মন্ত্রমুগ্ধের মত।
‘যখন ইন্দ্রিয় জয় হবে। তার আগে নয়। যেমন জোঁকের উপর নুন দিলে জোঁক আপনি খুলে পড়ে যায় তেমনি শিথিল হয়ে যাবে ইন্দ্রিয়। তার আগে নয়।’
জ্বাল নিভিয়ে খোলা নামিয়ে বসে আছে রামকৃষ্ণ। সে এখন আকাশের মৌন। সমুদ্রের শান্তি। ধরিত্রীর সমর্পণ।
ওঙ্কার ধনু আত্মা শর আর ব্রহ্ম লক্ষ্য। নির্ভুল চোখে লক্ষ্য ভেদ করতে হবে, তার পর তীরের মুখ লক্ষ্যের সঙ্গে তন্ময় হতে হবে। ব্রহ্মতল্লক্ষ্যমুচ্যতে।
কিন্তু জানিস, তাঁকে যখন লাভ হয়, তখন আর ওঁ উচ্চারণ করবারও যো নেই। সমাধি থেকে অনেক নিচে নেমে না এলে ওঁ বলতে পারি না।’
শাস্ত্রে যেমন বলা আছে তেমনি দর্শন হয় রামকৃষ্ণের। কখনো দেখে জগৎময় আগুনের স্ফুলিঙ্গ। কখনো দেখে চার দিকে যেন পারার হ্রদ ঝকঝক করছে। কখনো বা গলিত রূপোর স্রোত। কখনো বা গ্রহতারায় রংমশালের ফুলঝুরি। নীলিমাভ্রমের ঊর্ধ্বে কখনো বা অন্তহীন অন্তরীক্ষের শুভ্রতা।
রামকৃষ্ণ এখন একটি অখণ্ড প্রাপ্তি, একটি অখণ্ড প্রত্যুত্তর।
একটি আকাশবিস্তীর্ণ প্রশান্ত স্তব্ধতা।
কিন্তু ব্রহ্ম নিয়ে আমি কতক্ষণ থাকব? ছাদে উঠে আবার সিঁড়িতে নামা। কখনো লীলায় কখনো নিত্যে—যেন ঢেঁকির পাটে ওঠা-নামা করছি। এক দিক নিচু হয় তো আরেক দিক লাফিয়ে ওঠে। যেদিকে তাকাই সেদিকে তিনি। অন্তর্মুখে সমাধিস্থ হয়ে আছি তখনো তিনি, বহির্মুখে জীবজগৎ নিয়ে আছি তখনো তিনি। যখন আরশির এ পিঠ দেখছি তখনো তিনি, আবার যখন উলটো পিঠ দেখছি তখনো তিনি ।
শিব হয়ে আছি, তিনি। জীব হয়ে আছি, তিনি।
তুষের দ্বারা আবৃত থাকলেই ধান্য, তুষ থেকে মুক্ত হলেই তণ্ডুল। জীবে-শিবে ভেদ নেই। ভেদ হচ্ছে ভ্রান্তির ফল। কোরকে যেমন পুষ্পভাব, প্রস্ফুটিত পুষ্পেও তেমনি কোরকত্ব। ঈশ্বরে যেমন জীবভাব, জীবে তেমনি ঈশ্বরভাব। কিন্তু যাই বলো বাপু নির্বিকার ব্রহ্ম হয়ে বসে থাকতে পারব না। বালকের মতন থেকেছি, থেকেছি উন্মাদের মত। কখনো জড় হয়েছি, কখনো পিশাচ। তারপর আবার নিত্য থেকে চলে এসেছ লীলায়। রামলালাকে কোলে নিয়ে বেড়িয়েছি, নাইয়েছি-খাইয়েছি। হনুমান সেজে গাছে উঠে বসেছি,আস্ত-আস্ত ফল খেয়েছি। তারপর শ্রীমতী হয়ে কৃষ্ণময় হয়ে গেলাম। আবার লীলা ছেড়ে নিত্যে মন উঠে গেল। ত্যাজ্য-গ্রাহ্য রইল না। সজনে তুলসী সব এক হয়ে গেল। যত ঈশ্বরীয় পট বা ছবি ছিল সব খুলে ফেললাম। হয়ে গেলাম সেই অখণ্ড সচ্চিদানন্দ আদি পুরুষ। সেই আদি যার আর অন্ত নেই।
সব রকম সাধনই করেছি। তামসিক, রাজসিক আর সাত্ত্বিক। জয় মা কালী দেখা দিবিনে? দেখা যদি না দিবি তো গলায় ছুরি দেব। এই হল তামসিক সাধন।
রাজসিক সাধনে নানারকম ক্রিয়াকলাপ, অনুষ্ঠানের সমারোহ। এত তীর্থ করতে হবে, এত পুরশ্চরণ, এত পঞ্চতপা! আর সাত্ত্বিক সাধনা শান্তশীলের সাধনা। ফলাকাঙ্ক্ষা নেই, শুধু নামটি নিয়ে নির্নিমেষ হয়ে পড়ে থাকো। নাম দিয়ে দিয়ে কাম ধুয়ে ফেল।
আর কাম ঘুচলেই মনস্কাম।
আমারই মতন রূপ কে একজন প্রবেশ করলে আমার মধ্যে। দেহের ঘটপদ্ম ফুটে উঠল তার আবির্ভাবে। নিম্নমুখ ছিল, ঊর্ধ্বমুখ হয়ে উঠল।
আমি জীবের জন্যে এসেছি জীবের মধ্যেই থাকব। থাকব “ডাইলিউট” হয়ে। আমার আপন জন কত আসবে আমার কাছে, কত আহ্লাদের দিন আছে, কত ভাবের আস্বাদের দিন।
গাঁজাখোরকে দেখলে গাঁজাখোরই আহ্লাদ করে। গায়ে পড়ে কোলাকুলি করে। অন্য লোক দেখলে মুখ লুকোয়। গরু আপনজনকে দেখলে গা চাটে, অন্য লোক দেখলে ঢুঁ মারে।
আমার আপন জন সব যখন আসবে তখন আমাকে আপন ভাষায় কথা বলতে হবে। ব্রহ্ম হয়ে বোবা হয়ে থাকলে আমার চলবে কেন?
পাকা ঘি’র কোনো শব্দ থাকে না। কিন্তু যখন আবার পাকা ঘিয়ে কাঁচা লুচি পড়ে, তখন একবার কলকল করে ওঠে। কাঁচা লুচিকে পাকা করে আবার সে চুপ হয়ে যায়।
এই ঘিয়ে পড়বে অনেক কাঁচা লুচি। তাই একটু কলকল না করে উপায় নেই। মৌমাছি যতক্ষণ ফুলে না বসে ভনভন করে। ফুলে বসে মধু খেতে আরম্ভ করলে চুপ হয়ে যায়। মধু খেয়ে যখন মাতাল হয় তখন আবার আনন্দে গুনগুন করে।
তাই আমাকে গুনগুন করতে দিস। গান গাইতে দিন প্রাণ ভরে।
ত্রিসন্ধ্যা যে বলে কালী
পূজা সন্ধ্যা সে কি চায়?
সন্ধ্যা তার সন্ধানে ফেরে
কভু সন্ধি নাহি পায়।”
পুকুরে কলসীতে জল ভরবার সময় একবার ভক-ভক করে। পূর্ণ হয়ে গেল আর শব্দ হয় না। কিন্তু আরেক কলসীতে যদি ঢালাঢালি হয় তখন আবার শব্দ ওঠে।
স্তব্ধতায় ব্রহ্ম, আবার শব্দেও ব্রহ্ম। আমাকে এখন একটু শব্দ করতে দে। আমার আপন লোকরা সব আসবে, তাদের সঙ্গে আমি নৃত্য করব না?
আগেকার লোক বলত, কালাপানিতে জাহাজ গেলে ফেরে না। ওরে, ভয় নেই, আমার রিটার্ন টিকিট কাটা আছে। আমি বারে বারে ফিরে-ফিরে আসি।
‘হা’-র পর একবার ডুব দিয়ে ফের ফিরে আসি নি’-তে। জানিস না সেই কিত্তুনের কান্ড? কিত্তুনে প্রথমে গান ধরে নিতাই আমার মাতা হাতি। নিতাই আমার মাতা হাতি। তারপর ভাব যখন জমে, তখন শুধু বলে, ‘হাতি! হাতি!’ তার পর কেবল ‘হাতি!’ শেষকালে ‘হা’। বলতে-বলতে সমাধি, একদম চুপচাপ।
কিন্তু আমি ‘হা’-র পর আবার ‘নি’-তে ফিরে আসি। শোনবার জন্যে ‘তোরা যে সব রয়েছিস উৎকর্ণ হয়ে। তোদের তৃষিত কর্ণে আমাকে যে নাম দিতে হবে। আমার কি ফাঁকি দিলে চলবে? শ্যামপুকুরে পৌঁছেছি বলে কি আমি তেলিপাড়ার খবর রাখব না?
শোন, দুটি ভাব নিয়ে থাকবি। এক দাসভাব, আরেক সন্তানভাব। অহং তো আর যায় না, হাজার বিচার করো, ঘুরে-ফিরে ফের এসে উঁকি মারে। আজ অশ্বত্থ গাছ কেটে দাও, কাল আবার ফেঁকড়ি বেরুবে। উপায় কি? উপায় হচ্ছে, আমি ভক্ত, আমি দাস, আমি বালক এই ভাবটি আরোপ করা। মিষ্টি খেলে অম্বল হয় কিন্তু মিছরির মিষ্টিতে হয় না। অকামো বিষ্ণুকামো বা। বিষ্ণু কামনা নয়।
আর শেষ ভাব, মধ্য ভাব—সন্তানভাব। পূজায় আদ্যাশক্তিকে প্রসন্ন করতে না পারলে কিছুই হবে না। সেই ব্রহ্মময়ীর প্রতিমাই তো স্ত্রীজাতি। মাতৃভাবই তাই শুদ্ধ ভাব। সে ভাবেই তাদের প্রাণময় অভিষেক। আর কোনো ভাবে নয়।
আমি মাতৃভাবেই ষোড়শী পূজা করেছিলাম। দেখলাম স্তন মাতৃস্তন, যোনি মাতৃষোনি।
শ্রীমাকে জিজ্ঞেস করল এক জন ভক্ত, ‘মা, আপনি ঠাকুরকে কি ভাবে দেখেন?” শ্রীমা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকলেন। পরে গম্ভীর মুখে বললেন, ‘সন্তানের মত দেখি।’
ওরে এইটিই মহাভাব।
সারাৎসার বস্তু হয়েও ঈশ্বর ভাবরূপ ধরে রয়েছেন। আমাকেও থাকতে দে ভাবমুখে।
‘এবার ভালো ভাব পেয়েছি।
ভবের কাছে পেয়ে ভাব
ভবীকে ভালো ভুলায়েছি।’
২
জ্যৈষ্ঠ মাসে ষোড়শী পূজা হল, আশ্বিন কি কার্তিকেই সারদা ফিরে গেল কামারপুকুর। শাশুড়ি বললেন ফিরে যেতে। ভাবের সংসার তো দেখলে এবার একটু অভাবের সংসারটা দেখে এস।
রামেশ্বর বুঝতে পারছে তার দিন আর বেশি নেই। বাড়ির সামনে একটা আমগাছ কাটছে, রামেশ্বর বললে, ভালোই হল আমার কাজে লাগবে।
পাঁচ-সাত দিন পরে, অগ্রহায়ণ মাসে, চোখ বুজল রামেশ্বর।
গাঁয়ের গোপাল কাছাকাছিই থাকে। রাত্রে হঠাৎ তার বাড়ির দরজার একটা শব্দ হল।
‘কে?’
‘আমি রামেশ্বর।’
‘এত রাত্রে?’
গঙ্গাস্নানে যাচ্ছি। বাড়িতে রঘুবীর রইল, তার সেবার যাতে গোল না হয় দেখো,
দরজা খুলতে এগিয়ে গেল গোপাল।
দোর খুলে কী হবে? আমার শরীর নেই, আমাকে দেখতে পাবে না।’
খবর এসে পৌঁছল দক্ষিণেশ্বরে। রামকৃষ্ণের ভাবনা ধরল এ দুঃসংবাদ মাকে কি করে শোনাই। এ শোক মা সামলাতে পারবেন না।
সর্ব প্রথমে জগদম্বাকে শোনাই।
মন্দিরে গেল রামকৃষ্ণ। বললে, অবস্থা যা করেছিস এবার ব্যবস্থা করে দে। পুত্রশোক দিয়েছিস এবার তা সহ্য করবার মতো শক্তি দে, সান্ত্বনা দে। এক হাতে নিবি আরেক হাতে দিবি নে, তা হতে পারবে না।
নৰতে গিয়ে চন্দ্রমণিকে বললে রামকৃষ্ণ।
ভেবেছিল চন্দ্রমণি শোকে বিহ্বল হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়বে।
কিন্তু চন্দ্রমণি বিশেষ বিচলিত হলেন না। চোখের কোণের জলটকু মুছে নিয়ে বললেন, ‘সংসার অনিত্য। মৃত্যু নিশ্চিত। তাই শোক করা অনর্থক।’ রামকৃষ্ণের দিকে তাকালেন উৎসুক হয়ে। বললেন, সে কি, তুই কাঁদছিস কেন? এত সব বুঝে নিজেই শেষে অবুঝ হোস?”
না, কোথায় চোখের জল? সর্বত্র আনন্দভাতি।
জগন্মাতাকে উদ্দেশ্য করে বারে বারে প্রনাম করতে লাগল রামকৃষ্ণ। যেমন দহনে আছিস তেমনি আছিস সহনে। যেমন আছিস ভাবনে তেমনি আছিস পাবনে।
মথুরবাবু গেছেন, এসেছেন শম্ভু মল্লিক। সিঁদুরেপটির শম্ভু মল্লিক। সদাগরি আপিসে মুচ্ছুদির কাজ করে, অঢেল পয়সা। গোড়ায়-গোড়ায় খুব রাজসিক ভাব, ইস্কুল করব, হাসপাতাল করব, রাস্তা-পূষ্করণী করব। শেষকালে বিগলিত সমর্পণ, ‘আশীর্বাদ করো যাতে এই ঐশ্বর্য তাঁর পাদপদ্মে দিয়ে মরতে পারি।’
দক্ষিণেশ্বরের কাছেই বাগানবাড়ি, কি ভাবে এক দিন এসে পড়ল পথ ভুলে। ব্রাহ্মধর্মে মতি, ভাবখানা আধা-সাহেবি, কিন্তু রামকৃষ্ণের কাছটিতে এসে আর যেতে চায় না। যে কালে হাসপাতালে এসে নাম লিখিয়েছ, রোগের যতক্ষণ কসুর থাকবে ছাড়বে না ডাক্তার সাহেব। আর ছাড়ান-ছোড়ান নেই। তুমি নাম লেখালে কেন?
রামকৃষ্ণের দ্বিতীয় রসদদার। বলে, ‘আর কিছু বুঝি না, তুমি আমার গুরু। আমার গুরুজী।’
‘কে কার গুরু।’ রামকৃষ্ণ হাসে। করজোড় করে বলে, ‘তুমি আমার গুরু।
শম্ভুর স্ত্রী আবার আরেক কাঠি উপরে। প্রতি মঙ্গলবার সারদাকে তার বাড়ি নিয়ে আসে। ষোড়শোপচারে পূজো করে তার পা দুখানি। মঙ্গলাচরণে মঙ্গলচরণ।
জ্বলন্ত বিশ্বাস। অন্ধকার জঙ্গলের মধ্য দিয়ে পথ চলে শম্ভু। বলে, তাঁর নাম করে বেরিয়েছি, আমার আবার বিপদ কিসের! ক্রমে ক্রমে পার্থিব বিষয়ে ঔদাসীন্য। রামকৃষ্ণকে বলে, তুমি ন্যাংটা, তোমারই অখণ্ড আরাম। আমরা এ গ্রন্থি খুলি তো ও গ্রন্থিতে পাক দিই।
তোমরা যে অনেক গ্রন্থ পড়েছ। গ্রন্থই তো গ্রন্থি। আমি গ্রন্থের গ-ও জানি না। আমি খাই-দাই আর বগল বাজাই। ন্যাংটার নেই বাটপাড়ে ভয়।”
তোমার মত সরলই যে হতে পারি না। সরল ভাবে ডাকলে কি তিনি না শুনে পারেন? শম্ভুর এখন সেই সরল অশ্রু। বলে, সরল হওয়ার সাধনই তো সব চেয়ে কঠিন সাধন। সামান্য গা খালি করতে পারি না তো মন খালি করব। জমিকে নিষ্কঙ্কর করি কি করে? জমি পাট করতে পারলেই তো বীজ পড়বে, আঁকুর বেরুবে। এ সব জমি যে কাঁকুরে জমি।
রামকৃষ্ণের মুখে শুধু একটি হাসির সারল্য।
তুমি আমার যেমন দেখতে সরল তেমনি তোমাকে বুঝতে সরল।
রামকৃষ্ণের তখন খুব পেটের অসুখ, শম্ভুবাবু পরামর্শ দিলেন, একটু আফিং খাও। রামকৃষ্ণ গিয়েছে তার বাগানবাড়িতে, বাগানবাড়ির সামনেই শম্ভুবাবুর ডিসপেনসারি। বললেন, রাসমণির বাগানে ফেরবার সময় আমার থেকে নিয়ে যেও আফিংটুকু।
কথায়-কথায় ভুলে গিয়েছে আফিং-এর কথা। পথে এসে রামকৃষ্ণের মনে পড়ল, ঐ যাঃ, আফিংটুকুই নিয়ে আসা হয়নি। অমনি ফিরে গেল শম্ভুর বাগানবাড়িতে।
শম্ভু তখন অন্দরে চলে গিয়েছে, যাক, ডাকাডাকি করে আর কাজ নেই। ডিসপেনসারির কম্পাউন্ডারের থেকে চেয়ে নিলেই হবে। কম্পাউন্ডার তক্ষুনি কাগজে মুড়ে দিয়ে দিল এক দলা। ফেরবার পথে রামকৃষ্ণ দেখল তার আর পা চলছে না, কে যেন তার পা টেনে ধরে রয়েছে। রাস্তার না উঠে পা এগিয়ে যাচ্ছে ড্রেনের দিকে। এ কি, এ কোন পথে চলেছি? পথ কই গৃহে ফেরবার? পথ সব মুছে গেল নাকি? অথচ পিছন ফিরে শম্ভুবাবুর বাড়ির দিকে তাকিয়ে পথ তো দেখতে পারছি দিব্যি। তবে এ কী পথভ্রম।
রামকৃষ্ণ ফের শম্ভুবাবুর বাড়ির ফটকের কাছে ফিরে এল। এইবার ঠিক হদিস হবে পথের। সামনে গিয়ে ডাইনে। পথঘাট তো মুখস্ত। তবে কেন বেচালে পা পড়বে? আফিঙের পুঁটলি ট্যাঁকে গুঁজে রামকৃষ্ণ আবার রওনা হল। আস্তে-আস্তে এক পা দু পা করে, মুখস্তের জের টেনে-টেনে। কিন্তু যথাপূর্বৎ তথাপরং। আবার দিকভ্রম আবার পথলুপ্তি। আবার কে পা ধরে টানতে লাগল পিছন দিকে। কি, কোথায় কী ভুল হল আমার!
হঠাৎ মনে পড়ে গেল রামকৃষ্ণের। শম্ভু বলেছিল, আমার থেকে নিয়ে যেও, তাকে না বলে আমি তার কম্পাউন্ডারের থেকে চেয়ে নিয়ে গেছি। তাই মা আমাকে যেতে দিচ্ছেন না! ঘুরিয়ে মারছেন। আমার যে সত্যচ্যুতি হয়েছে। এ ভাবে নেওয়া তো চুরি করার সামিল।
অমনি ফিরে গেল রামকৃষ্ণ। ডিসপেনসারিতে গিয়ে দেখে সেই কম্পাউন্ডারও নেই। দরজা বন্ধ নাকি? কে জানে। জানলা একটা খোলা আছে। সেই জানলা দিয়ে আফিঙের পুঁটলিটা ছুঁড়ে ফেলে দিল ভিতরে। বললে, ‘ওগো, এই তোমাদের আফিং রইল।’
বলে ফের মন্দিরের দিকে পা বাড়াল রামকৃষ্ণ। সমস্ত পথ এখন সড়গড়। আর কেউ টানছে না পা ধরে, ঠেলছে না এদিক-ওদিক। চোখের দৃষ্টি ফর্সা হয়ে গিয়েছে।
আমার মা আছে আর আমি আছি। আমি তো মা’র হাত ধরিনি, মা-ই আমার হাত ধরেছেন। নিজে না ধরে তাঁকে দিয়েই ধরিয়েছি আমাকে। তাই পা এতটুকু পড়তে দেন না বেচালে।
আমি তোমাকে ছেড়ে থাকি, কিন্তু মা, তুমি আমাকে ছেড়ে থেকো না। মুঝে তুম মত ছোড়ো।’
ওরে শোন, বাঁদরের বাচ্চা হবি না, বেড়ালের বাচ্চা হবি। বাঁদরের বাচ্চা তার মাকে ধরে, মা যখন এক গাছ থেকে আর এক গাছে লাফায়, কখনো ছিটকে পড়ে যায় বাচ্চা। আর বেড়ালের বাচ্চাকে তার মা ঘাড়ে কামড়ে ধরে, বেড়ালের বাচ্চার আর ভয় নেই। মা-ই তাকে আঁকড়ে ধরে নিয়ে যাবে যেখানে খুশি। কভু আখার ধারে, কভু বা ছাইরের গাদায়, কভু বা বাবুদের বিছানায়।
তুমি কোথায়, তোমাকে ধরতে পারছি না। এই হাত বাড়িয়ে দিলাম, তুমি আমাকে ধরো।
মাঠের মাঝে আলপথ, এক গাঁ থেকে আরেক গাঁ। বাপ তার দুই ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে সেই আলপথ দিয়ে, গ্রামান্তরে। ছোট ছেলেটিকে বাপ কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে। বড়টি সেয়ানা, সে নিজেই বাপের হাত ধরে চলেছে। সরু পথ, পড়ে যাবার ভয়, তাই দু ছেলেই বাপের আশ্রয় নিয়েছে। যাচ্ছে-যাচ্ছে, হঠাৎ একটা শঙ্খচিল উড়ে যেতে দেখল, একেবারে ঠিক মাথার উপর দিয়ে। দেখেই দু ছেলের মহা আহ্লাদ। দুজনেই আপনা ভুলে হাততালি দিয়ে উঠল। ছোট ছেলেটা জানে, বাপ আমাকে ধরে আছে, আমার ভয় কি, আমি আনন্দে হাততালি দিই। কিন্তু বড় ছেলেটি যেই বাপের হাত ছেড়ে হাততালি দিতে গেল, অমনি পড়ে গেল নিচে, ঘা খেয়ে কেঁদে উঠল।
মাকে অমনি কোলে নিতে বল। মা’র কোলে বসে হাত ছেড়ে দে।
সারদার বাবা রামচন্দ্র রামনবমী তিথিতে মারা গেলেন। সারদার মন ভেঙে পড়ল। ভাবল আবার দক্ষিণেশ্বরে ফিরে যাই।
বৈশাখ মাস, ১২৮১ সাল, সারদা আবার দক্ষিণেশ্বরে ফিরে এল। কিন্তু থাকে কোথায়?
আর কোথায়! সেই সংকীর্ণ নবত ঘরে। চন্দ্রমণির সঙ্গে।
একরতি ঘর। একটুখানি দরজা। ঢুকতে-যেতে মাথা ঠুকে যায়। একজন থাকবার মতও তাতে জায়গা হয় না—তা দুজনে, শাশুড়ি-বৌয়ে। ঐটুকু ঘরের মধ্যেই হাঁড়ি-কুঁড়ি, পোঁটলা-পুঁটলি। যত হাবজা-গোবজা। শিকেয় ঝুলছে যত কড়া-ডেকচি। রামকৃষ্ণের জন্যে জিয়ানো মাছ পর্যন্ত। এখানে থাকতে বৌ’র যে বেজায় কষ্ট হবে।
কথাটা শম্ভু মল্লিকের কানে উঠল। মথুর হলে হয়তো অট্টালিকায় রাখতেন, শম্ভু মল্লিক মন্দিরের কাছে সারদার জন্যে একখানা চালাঘর তুলে দিলেন। তার জন্যে জমি নিতে হল মৌরসী স্বত্বে। আড়াই শো টাকা সেলামী দিলেন শম্ভু। জমি তো হল কিন্তু কাঠ কই?
কাঠ যোগাল কাপ্তেন। বিশ্বনাথ উপাধ্যায়। বিশ্বনাথ নেপালরাজের কর্মচারী। কলকাতায় ও মফস্বলে নেপালের শাল কাঠের সে যোগানদার। বেলুড়ে তার কাঠের গদি। বললে, ‘যত লাগে পাঠিয়ে দেব শালের চকোর।’
লড়াইয়ে বামুনের ঘরের ছেলে। বাপ ভারতীয় ফৌজের সুবাদার। এরা লড়াইও করে আবার পুজোও করে। যুদ্ধক্ষেত্রে শিব নিয়ে যায়। এক হাতে শিব অন্য হাতে তরবার।
বেদ-বেদান্ত গীতা-ভাগৰত সব কণ্ঠস্থ। তারপর ভক্তি কত! যখন পূজো করে কর্পূরের আরতি করে। পূজো করতে করতে স্তব করে আসনে বসে। সে আরেক মানুষ। পুজো করার সময় চোখের ভাব ঠিক যেন বোলতা কামড়েছে।
‘কী ভক্তি! নিজের মা’র কাছে নিচে বসে। মা যে আসনে বসে তার চেয়ে নিচু আসন। কিন্তু যে আসনে সে বসবে তার চেয়ে উঁচু আসনে মাকে বসাবে।
কি ভক্তি! রামকৃষ্ণ বরানগরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে, ছুটে এসে মাথার উপরে ছাতা ধরে। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে নানা তরকারি রেঁধে খাওয়ায়। যেখানে খাওয়ায় সেখানেই আঁচাবার ব্যবস্থা করে, উঠতে দেয় না। বাতাস করে, পা টিপে দেয়। ওদের বাড়িতে গিয়ে পায়খানায় বেহুঁস হয়ে পড়েছে রামকৃষ্ণ–এত আচারী, তবু পায়খানায় গিয়ে ঠিকমত বসিয়ে দিয়ে এল। যদি কখনো সমাধি হয় রামকৃষ্ণের, কাপ্তেন মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সে এককালে হঠযোগ করত। তাই গুণ আছে তার হাতে।
শালের চকোর পাঠিয়ে দিল বিশ্বনাথ। একখানা আবার গঙ্গার জোয়ারে ভেসে গেল একদিন। হৃদয় দুঃখ করে বললে সারদাকে, তোমার যেমন অদেষ্ট, একটা শালকাঠও ঠিকমত জোটে না।’
সারদা শুধু একটু হাসল উদাসীনের মত।
গেছে-গেছে ও শালকাঠ। বিশ্বনাথ আবার নতুন পাঠিয়ে দিলে। ঘর উঠল সারদার। চালাঘর।
শালকাঠ নিয়ে বিশ্বনাথেরও বিপদ কম নয়। গঙ্গার জোয়ারে অনেকগুলি কাঠ তার ভেসে গেছে। রাজসরকারের দারুণ ক্ষতি। এখন কী কৈফিয়ৎ দেয়া যাবে এর জন্যে, কে বলবে? কাঠের হিসেব পাঠালে না এবার বিশ্বনাথ। ঠিক করলে পরের বছরের লাভে এ লোকসানের পূরণ করবে। কিন্তু হঠাৎ কাটমাণ্ডু থেকে তার তলব এল। বিকৃত কি রিপোর্ট গেছে রাজধানীতে, বিশ্বনাথের চাকরি নিয়ে টানাটানি। সংসারী লোক, ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। নেপালে যাবার আগে এল সে দক্ষিণেশ্বরে। সেই সরল সত্যশরণের কাছে।
বললে, ‘এখন উপায় বলুন।’
‘উপায় খুব সোজা।’ বললে রামকৃষ্ণ। ‘এর চেয়ে সোজা আর হতে পারে না।’
‘কি?’
‘সত্য কথা বলবে। কাঠ তো আর তুমি নাওনি, গঙ্গায় নিয়েছে। তাই বলবে গিয়ে দরবারে। তোমার কিছু হবে না। মা তোমাকে, তোমার সত্যকে রক্ষা করবেন। সত্যের মত সহজ আর কিছু নেই।”
বুকের ভার নেমে গেল বিশ্বনাথের। সোজা সত্য কথা বলব এ সব চেয়ে বড় আশ্বাস। অতলস্পর্শ শান্তি।
হলও তাই। সত্য কথা বলায় তার দোষস্খালন তো হলই, তার প্রমোশন হল। কাপ্তেন ছিল কর্ণেল হল। ফিরে এল কলকাতায় নেপালের রাষ্ট্রদূত হয়ে।
বাঙালীদের নিন্দা করে বিশ্বনাথ। নিন্দা করে ইংরিজি পড়ুয়াদের। ঠাকুরের পায়ের কাছে বসে বলে, ‘এমন মানিককে ওরা চিনল না।’
সংসারে থাকতে গেলে সত্য কথার খুব আঁট চাই। আর এই সত্যেই ভগবান। সত্য কথাই কলির তপস্যা। কায়মনোবাক্যে বারো বছর সত্য পালন করলে মানুষ সত্য-সঙ্কল্প হয়ে যায়।
আমি মাকে সব দিয়েছিলুম। জ্ঞান-অজ্ঞান, ধর্ম-অধর্ম, পাপ-পূণ্য, ভাল-মন্দ, শুচি-অশুচি সব। কিন্তু সত্য মাকে দিতে পারলুম না। বলতে পারলুম না, এই নে তোর সত্য, এই নে তোর অসত্য। ঐ সত্য যদি ত্যাগ করি তবে মাকে যে সর্বস্ব অর্পণ করলুম সেই সত্য রাখি কিসে? সত্য ভগবানকেও দেয়া যায় না। সত্যই তো ভগবান। তা আবার দেব কাকে?
সেই শালকাঠের ঘরে বাস করতে লাগল সারদা। একটি মেয়ে রইল তার তত্ত্ব করতে। সেই ঘরেই রাঁধে সারদা–রামকৃষ্ণের সেই ছিনাথ হাতুড়ে। থালা-বাটি সাজিয়ে নিয়ে যায় মন্দিরে। কাছে বসিয়ে রামকৃষ্ণকে খাইয়ে আসে। মাথা থেকে ঘোমটাটি সরে না হাওয়ায়।
দিনে-দুপুরে রামকৃষ্ণ মাঝে-মাঝে যায় সেই চালাঘরে। খোঁজ-খবর নিয়ে আসে। ঘোমটার ভিতর থেকে কথা কয় সারদা।
একদিন হল কি, বিকেলের দিকে গিয়েছে রামকৃষ্ণ। আর যেমনি যাওয়া অমনি মুষলধারে বর্ষণ। সে বর্ষণ আর থামে না। মন্দিরে এখন ফিরে যাই কি করে?
না, যাব না মন্দিরে। তোমার চালাঘরটিতেই থাকব আজ। কি খাওয়াবে আজ বলো?
ঝোল-ভাত তোমার পথ্য, ঝোল-ভাতই খাবে। সারদা রেঁধে দিল ঝোল-ভাত।
খেতে-খেতে রামকৃষ্ণ বললে, ‘এ কেমনতরো হল? কালীঘরের বামুনরা যেমন রাত্রে বাড়ি আসে এ যেন আমি তেমনি এসেছি।’
চালাঘরেই রাত কাটাল রামকৃষ্ণ। চালাঘর নয়, কালীঘর।
৩
চালাঘরে থেকে সারদার কঠিন আমাশা হল।
শম্ভুবাবু প্রসাদ ডাক্তারকে নিয়ে এলেন। খাওয়ালেন অনেক ওষুধপত্র। কিন্তু রোগের কিছুতেই আরাম হয় না। সবাই বলে, দেশে ফিরে থাক। সেখানকার খোলা হাওয়া আর মিঠে জল ছাড়া সারবে না অসুখ।
জয়রামবাটিতে ফিরে গেল সারদা। আশ্বিন মাস, ১২৮২ সাল। শ্যামাসুন্দরী তাকে টেনে নিলেন বুকের মধ্যে।
অসুখ বেড়েই চলল। কোথায় মুক্ত হাওয়া, কোথায় মিষ্টি জল! সারদা মিশে গেল বিছানার সঙ্গে। শ্যামাসুন্দরী চোখে আঁধার দেখলেন। দেশের হাতুড়ে-রোজাদের ডাকেন এমনও বুঝি তাঁর সংস্থান নেই। আছেন শুধু দয়াময়।
সারদার দেহ বুঝি আর থাকে না। খবর পৌঁছল রামকৃষ্ণের কাছে।
‘তাই তো রে হৃদু, সারদা কেবল আসবে আর যাবে।’ শান্ত স্বরে বললেন রামকৃষ্ণ, মনুষ্যজন্মের কিছুই তার করা হবে না।’
বিছানার থেকে আস্তে-আস্তে উঠে বসল সারদা। কাছেই গ্রাম্যদেবী সিংহবাহিনীর মন্দির। ঠিক করল সিংহবাহিনীর মাড়ে গিয়ে হত্যে দেবে। হয় রোগ নাও, নয় আমাকে নাও।
গ্রাম্যদেবীর কোনো নাম-ডাক নেই। কিন্তু আমার ডাকেই তার নাম হবে।
মা-ভাইয়েরা যেন জানতে না পারে। চুপি-চুপি যেতে হবে মন্দিরে। কিন্তু যেতে পারব তো একা-একা? নিজের পায়ে ভর করে?
কে যেন তাকে হাত ধরে নিয়ে গেল ধীরে-ধীরে। মা-ভাইয়েরা জানতেও পেল না। সিংহবাহিনীর মাড়ে হত্যে দিয়ে পড়ল সারদা।
খানিকক্ষণ পড়ে থাকবার পরেই সিংহবাহিনী নেমে এল সিংহাসন থেকে। বললে, ‘তুমি কেন পড়ে আছ গো?’ বলে হাত ধরে তাকে তুলে দিল। ‘ওলতলার মাটি একটু খাও গে, আধি-ব্যাধি সেরে যাবে।’
মাটি খেয়ে অসুখ সেরে গেল সারদার। জীর্ণ দেহ সবল হয়ে উঠল।
গ্রামে-গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়ল সিংহবাহিনীর মাহাত্ম্য। দূর-দূরান্তর থেকে আসতে লাগল আর্ত-আতুর। কেউ আমরা আগে জানিনি, আগে বুঝিনি, খোঁজ করিনি আমাদের গ্রাম্যদেবীকে। সাপের বিষ পর্যন্ত নাশ হয় ঐ মাটির ছোঁয়ায়। চল-চল যাই সিংহবাহিনীর দুয়ারে।
লোকমাতা লোকের কল্যাণের জন্যে ঘুমন্ত দেবীকে জাগিয়ে দিলেন। যেমন জগতের প্রভু ভুবনের কল্যাণের জন্যে জাগিয়ে দিয়েছিলেন ভবতারিণীকে।
এ দিকে শম্ভু মল্লিকের অবস্থা সঙিন হয়ে উঠেছে। ঘোর বিকার। সর্বাধিকারী এসে দেখে বললে, ‘ওষুধের গরম।’
দেখতে গেল রামকৃষ্ণ। শম্ভুর বিকারাচ্ছন্ন মুখে ভেসে উঠল তৃপ্তির প্রশান্তি।
শম্ভুর প্রদীপে আর তেল নেই।’
অসুখের গোড়ার দিকে শম্ভু বলেছিল একদিন হৃদয়কে, হৃদু পোঁটলা বেঁধে বসে আছি। কান্ডারী এলে তার হাতে তুলে দেব পোঁটলা। বলব ফেলে দাও ভবনদীতে। ভার হালকা করো।”
ঐশ্বর্য ছিল, আসক্তি ছিল না। সংসারে টাকার দরকার বটে, কিন্তু ওগুলোর জন্যে ভাববে কে বসে-বসে? যখন আসে আসবে যখন যাবার যাবে। যদৃচ্ছা লাভ। ঈশ্বরের যারা ভক্ত ঈশ্বরের যারা শরণাগত, তারা কিছু ভাবে না, তাদের যদৃচ্ছা লাভ। যত্র আয় তত্র ব্যয়। এক দিক থেকে আসে আরেক দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। বৈরাগ্য মানে তো শুধু সংসারে বিরাগ নয়, বৈরাগ্য মানে ঈশ্বরে অনুরাগ। যার ঈশ্বরে অনুরাগ আছে তার অন্য অঙ্গরাগে দরকার নেই।
জানিস যারা ভক্ত, তারা হচ্ছে ঈশ্বরের আত্মীয়, ঈশ্বরের সঙ্গে তাদের রক্ত-মাংসের সম্বন্ধ। ঈশ্বরই তাদের টেনে নেন। দুর্যোধনেরা যখন গন্ধর্বের কাছে বন্দী হল যুধিষ্ঠিরই তাদের উদ্ধার করলেন। বললেন, আত্মীয়দের ঐ অবস্থা হলে আমাদেরই কলঙ্ক।
ভক্তের আবার ভয় কি। অভাবের ভয়, না, আঘাতের ভয়? না, মরণের ভয়? ওরে ভক্তের নাশ নেই। ন মে ভক্তঃ প্রণশ্যতি’।
শম্ভু চলে গেল। এখন কে হবে রসদদার?
ঝি কালীর মা সেবা করে চন্দ্রমণিকে। নব্বুয়ের উপর বয়স হয়েছে চন্দ্রমণির। বুদ্ধির জড়তা এসে গিয়েছে। হৃদয়কে দেখতে পারেন না দুচক্ষে। কি করে তাঁর ধারণা হয়েছে অক্ষয়কে ও-ই মেরে ফেলেছে। এখন বলছেন রামকৃষ্ণ আর সারদাকে সে মেরে ফেলবে। মাঝে-মাঝে রামকৃষ্ণকে বলেন গলা নামিয়ে, হৃদয়ের কথা কখ্খনো শুনবি না। ও শত্তুর।’
রাসমণির বাগানের কাছেই আলমবাজারের পাটের কল। দুপুরে কলে সিটি বাজে। সেই সিটিকে চন্দ্রমণি বৈকুণ্ঠের শঙ্খধ্বনি বলেন। ঐ সিটি না শোনা পর্যন্ত খেতে বসেন না। কেউ অনুরোধ করলে বলেন, ‘এখন কী খাব গো?
লক্ষীনারাণের ভোগ হয়নি, বৈকুণ্ঠে শঙ্খ বাজেনি, এখন কি খাওয়া যায়?” যেদিন কলের ছুটি থাকে সেদিন আর বাঁশি বাজে না। সেদিন চন্দ্রমণিকে খাওয়ানো শক্ত হয়ে ওঠে। বৈকুণ্ঠের শঙ্খ নেই আমারও খাওয়া নেই। রামকৃষ্ণ তখন নানারকম কৌশল করে। ছোট মেয়েকে যেমন করে ভোলায় তেমনি করে পাশে বসিয়ে খাওয়ায় মাকে।
রোজ ভোরে উঠে মাকে দর্শন করা চাই রামকৃষ্ণের। কিছুক্ষণের জন্যে তাঁর কাছে থেকে তাঁকে সেবা করা চাই স্বহস্তে। আর কত দিন মা’র পাদপদ্ম স্পর্শ করা যাবে মা-ই জানেন।
হৃদয় দেশে যাবার জন্যে তোড়জোড় করছে। বাঁধছে বোঁচকা-বুঁচকি। হাটের থেকে নানা দ্রব্য কিনে এনেছে। না গেলেই নয়। শুনতে পেয়েছে দেশে কি-এক বেধেছে মোকদ্দমা।
রামকৃষ্ণের কাছে গেল অনুমতি চাইতে।
মামা যাব?
‘না।’ রামকৃষ্ণ বারণ করল।
কেন বারণ করছ?”
রামকৃষ্ণ কারণ বললে না। হৃদয় যত জিদ করে, রামকৃষ্ণ তত স্তব্ধ হয়।
শেষকালে হৃদয় গেল খাজাঞ্চির কাছে। মামা না বললে কি হয় খাজাঞ্চি যদি ছুটি দেয়, তবেই হল। খাজাঞ্চি ছুটি মঞ্জুর করল। আর হৃদয়কে পায় কে?
সন্ধের সময় রামকৃষ্ণ নবতে এল। এল মা’র কাছটিতে।
শুরু করল যত সব পুরোনো কথা, গাঁ-ঘরের কথা, পাড়া-পড়শীর কথা। পুরোনো কথার মত এমন আর কী ভালো লাগে মায়েদের। ছেলেদের ছেলেবেলার কথায় এলে মায়েদের আর থামায় কে! রাত বাড়ছে, তবু কথায় মত্ত মায়ে-পোয়ে।
মন্দির থেকে হৃদয় ডাকাডাকি শুরু করল। কি গো মামা, খাবে না? খেতে এস। মাকে ছেড়ে তবু উঠে যেতে মন ওঠে না রামকৃষ্ণের। মা’র কাছটিই যেন কাশীধাম। হৃদয়ের চিৎকার তীব্রতর হল।
‘আমারটা রেখে তোরা দুজনে খা গে।’ বললে রামকৃষ্ণ।
তোরা দুজনে মানে হৃদয় আর রামলাল। রামেশ্বরের মৃত্যুর পর রামলাল এসে পূজারী হয়েছে দক্ষিণেশ্বরে।
আমি আরো একটু বসি মা’র কোল ঘেঁষে। আরো একটু কথা শুনি।
রাত প্রায় দুপুর, মাকে ঘুম পাড়িয়ে রামকৃষ্ণ ফিরে এল নিজের ঘরে। খেয়ে-দেয়ে শুলো নিজের বিছানায়।
কিন্তু হৃদয়ের চোখে ঘুম নেই। কেবল এ পাশ ও পাশ করছে। রাত যত বাড়ছে তত বাড়ছে হৃদয়ের ছটফটানি। কে যেন আষ্টেপৃষ্টে তাকে বেঁধে ধরেছে বিছানায়, ছাড়া পাবার জন্যে হাত-পা ছুঁড়ছে ক্ষণে-ক্ষণে।
রামকৃষ্ণের পাশের বিছানা হৃদয়ের। রামকৃষ্ণ দেখেও দেখছে না।
এক ঝটকায় উঠে পড়ল হৃদয়। ঘরের কোণে গাঁঠরি বাঁধা, কাল ভোরেই সে রওনা হবে ঠিকঠাক। সহসা সে ক্ষিপ্র হাতে গাঁঠরির বাঁধনগুলি খুলে ফেলতে লাগল। আর বাঁধনও কি একটা দুটো! যেমন যত রাজ্যের জিনিস পেয়েছে পুরেছে তেমনি এঁটেছে দড়িদড়ার ঘোরপ্যাঁচ। টেনে খিঁচে ছিঁড়ে খুলতে লাগল দড়ির জট। রামকৃষ্ণ জিজ্ঞেস করল, ‘কি হল?’
‘কী হল! বিছানায় শুতে পারছি না। যতক্ষণ এ বাঁধনগুলো না যাচ্ছে ততক্ষণ আমার শান্তি নেই। গাঁঠরির মতই দড়ি দিয়ে কে আমাকে বেঁধেছে নাগপাশে—’
‘বাড়ি যাবি না?’
‘আর গেছি! মনে একটা ইচ্ছে হলেই যদি কেউ বাগড়া দেয়, তাহলে বাঁচি কি করে?” বন্ধন মুক্ত হয়ে হৃদয় ফের ফিরে এল বিছানায়। বললে, কিন্তু কেন যে বাড়ি যেতে দিলে না বুঝতে পারলাম না।’
‘পারবি। ভোর হোক।
নিজে আগে ভোরে উঠে কালীর মাকে জাগিয়ে দেন চন্দ্রমণি। সেদিন কালীর মা-ই আগে উঠল। বেলা এক-গা হতে চলল তবু চন্দ্রমণির সাড়া নেই। ডাকাডাকি করতে লাগল কালীর মা। তবু দরজা খোলেন না।
দরজায় কান পেতে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল কালীর মা। শুনতে পেল গলার একটা ঘড়ঘড় শব্দ। ছুটে গেল হৃদয়কে খবর দিতে।
বার থেকে কী কৌশলে হৃদয় খুলে ফেলল হুড়কো। দেখল চন্দ্রমণির শেষ অবস্থা। ওষুধ আর গঙ্গাজল দিতে লাগল ফোঁটা ফোঁটা করে।
তিন দিন কাটল এমনি অবস্থায়। হদয় অসুরের মত যুঝতে লাগল যমের সঙ্গে।
রামকৃষ্ণ বললে, এবার অন্তর্জলি করা হোক। চন্দ্রমণিকে নিয়ে চলল গঙ্গায়।
যাবার আগে ফুল চন্দন আর তুলসী দিয়ে মার পায়ে অঞ্জলি দিলে রামকৃষ্ণ।
পুত্রকে শিয়রে রেখে মা চোখ বুজলেন।
রামলাল ফুল নিয়ে এল, হৃদয় নিয়ে এল শ্বেত চন্দন। মা’র পা দুখানি গঙ্গা-জলে ধুয়ে তাতে রামকৃষ্ণ ঘন করে চন্দন মাখিয়ে দিল। এ জল চোখের জল আর এ চন্দন ভক্তর চন্দন, ভালোবাসার চন্দন।
‘যে দেহ থেকে আমার দেহের প্রকাশ সেই দেহ আজ মিশে গেল পঞ্চভূতে।’
এঁড়েদার শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল চন্দ্রমণিকে। রামলাল মুখাগ্নি করলে, সৎকার করলে। রামকৃষ্ণ যে সন্ন্যাসী।
রামলালই শ্রাদ্ধ করল বৃষোৎসর্গ।
রামকৃষ্ণ অশৌচ পর্যন্ত পালন করেনি। প্রেতপিন্ড দেওয়া তো দূরের কথা।
পুত্রোচিত কোনো কার্যই করলাম না মা’র জন্যে। মনের ভিতরটা খচখচ করছে রামকৃষ্ণের। অন্তত একটু তর্পণ করি মাকে।
গঙ্গায় নামল রামকৃষ্ণ। পিছনে অগণন লোক। রামকৃষ্ণের মাতৃতর্পণ দেখবে।
জলের অঞ্জলি নেবার জন্যে গঙ্গায় হাত ডোবাল রামকৃষ্ণ। কিন্তু যেই অঞ্জলিবদ্ধ হাত উপরে তুললে অমনি হাতের আঙ্গুলগুলি অসাড়, শিথিল হয়ে গেল। এঁকে বেঁকে ফাঁক হয়ে গেল। সব জল পড়ে গেল ফাঁক দিয়ে। যতক্ষণ জলের মধ্যে থাকে হাত ঠিক বদ্ধাঞ্জলি থাকে, যেই জল নিয়ে উপরে ওঠে আঙুলগুলি অমনি কাঠির মতন শক্ত হয়ে প্রসারিত হয়ে পড়ে। এক বিন্দু জল বন্দী হয় না। বারবার চেষ্টা করেও পারছে না কিছুতেই।
ডুকরে কেঁদে উঠল রামকৃষ্ণ। ‘মা গো, তোমার জন্যে কি কিছুই করতে পারব না?”
কোনো দোষ স্পর্শেনি তোমাকে। তুমি গলিত-হস্ত। বললে এসে পণ্ডিতেরা। তুমি অধ্যাত্মসাধনার চূড়ায় এসে উঠেছ।
তুমিই শ্রদ্ধায়াগ্নি সমিধ্যতে।’ তুমি ‘শ্রদ্ধয়া হূয়তে হ বঃ।’
৪
মথুরবাবু তখন বেঁচে, রামকৃষ্ণ তাঁকে এক দিন ধরে বসল, দেবেন ঠাকুরের বাড়ি যাব।”
মথুরবাবু অভিমানী লোক, আগু-পিছু করতে লাগলেন। আমরা কেন সেধে তার বাড়ি যাই ? সে নিজে আসতে পারে না?
ওগো, দেবেন্দ্র যে ঈশ্বরের নাম করে।’
নাম তো তুমিও করো। সে আসতে পারে না তোমার এখানে?
আমি নাম করলে কি হয়, আমার নিজের কি কোন নাম আছে? তাঁর নাম দিয়ে নিজের নামটাকে মুছে ফেলেছি। তাঁর নামেই নিজের নামের নাশ হয়েছে। দেবেন্দ্রের কত বিদ্যে, কত ঐশ্বর্য। সে তো কলির জনক। সে এ দিক-ও দিক দু দিক রেখে দুধের বাটি খায়। সে ভোগেও আছে যোগেও আছে। রাজত্বও করছে দাসত্বও করছে। সে একটা মহাতীর্থ। তাকে এখানে আসতে না দিয়ে আমাদের ওখানে যাওয়াই তো আমার লাভ। আমি অমন একটা তীর্থ করব না?
যেখানে ঈশ্বরের নাম সেখানেই আমি আছি। তাঁকে যে ডাকে সে যে আমাকেও ডাকে!
দেবেন্দ্র আর মথুর একসঙ্গে পড়তেন হিন্দু কলেজে। সেই সুবাদে যাওয়া সহজ হয়ে গেল। সঙ্গে নিয়ে গেলেন রামকৃষ্ণকে।
দেবেন্দ্রনাথের তখন দেশজোড়া নাম। খৃষ্টানি থেকে দেশকে উদ্ধার করার জন্যে তিনি ব্রাহ্মধর্ম আর ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত করলেন। রাজা রামমোহন এসে বোঝালেন বেদান্ত-প্রতিপাদিত ধর্মই সত্যধর্ম আর তাই প্রচার করবার জন্যে স্থাপন করলেন ব্রহ্মসভা। দেবেন্দ্রনাথের সাধনার সেই ধর্মই হয়ে দাঁড়াল ব্রাহ্মধর্ম, আর সেই সভাই হয়ে দাঁড়াল ব্রাহ্মসমাজ।
বিদেশের গুরুর কাছে গোটা দেশ যখন ধর্মে দীক্ষা নিতে যাচ্ছিল তখন রাজা রামমোহন দেখালেন তাকে তার আপন সত্যসম্পদ। সেই দেখানোর কাজে দেবেন্দ্রনাথ একটি দিব্য শিখা। ব্রহ্মকে তিনি শুধু অনুষ্ঠানে রাখেননি নিয়ে এসেছেন জীবনের অধিষ্ঠানে। তিনি প্রত্যগাত্মা। তিনি ঈশ্বরদর্শী।
দিব্যি ভুঁড়ি হয়েছে মথুরবাবুর, তবু তাঁকে চিনতে পারলেন দেবেন্দ্রনাথ। বিনয় বচনে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সঙ্গে ইনি কে?”
কথার সূরে একটি প্রসন্ন বিস্ময়। চোখের সম্মুখে হঠাৎ যেন দেখতে পেরেছেন সুন্দরের মহামহিম প্রকাশ। একটি বিভান্বিত বিভূতি ।
এই এক জন আত্মভোলা মানুষ। ঈশ্বর-ঈশ্বর করে পাগল। মথুরবাবু পরিচয় করিয়ে দিলেন।
যেন শুধু এইটুকুই পরিচয় নয়। পাগল নয়, পারঙ্গম; অনন্তগুণগম্ভীর। মানুষ নয়, লীলামানুষ বিগ্রহ। তাকিয়ে রইলেন দেবেন্দ্রনাথ।
সংসারে থেকে তুমি ঈশ্বরে মন রেখেছ, তাই তোমাকে দেখতে এসেছি।’ বললে রামকৃষ্ণ। ‘তুমি জনক রাজার মত দুখানা তরোয়াল ঘোরাও, একখানা জ্ঞানের একখানা কর্মের। তুমি পাকা খেলোয়াড়।’
স্মিতশান্ত নেত্রে হাসলেন দেবেন্দ্রনাথ।
‘কিন্তু এ দেখায় চলবে না। দেখি তোমার গা দেখি।”
সহজ-সুন্দর মানুষটির এ অনুরোধ যেন গুহাহিত প্রত্যগাত্মার আদেশ। এ আবরন মুক্ত হওয়া মানেই ভারমুক্ত হওয়া, মালিন্য মুক্ত হওয়া আবরন খুলে ফেলতে পারলেই রইল না আর অহঙ্কার, রইল না আর অসন্তোষ।
গায়ের জামা খুলে ফেললেন দেবেন্দ্রনাথ। রামকৃষ্ণ দেখল সেই,’প্রলম্ববাহুঃ পৃথুতুঙ্গবক্ষঃ’ কে।
দেখল তাঁর গৌরবর্ণের উপর কে সিঁদুর ছড়িয়ে দিয়েছে। বুঝল ঈশ্বর স্পর্শ করেছে দেবেন্দ্রনাথকে। তাঁর মর্ত্য তনু ভাগবতী তনু হয়ে উঠেছে।
দেখে খুশি আর ধরে না রামকৃষ্ণের। তুমি তো তবে আমার দেশের লোক, আমার স্বজন বান্ধব। রামকৃষ্ণ চেপে ধরল দেবেন্দ্রনাথকে। তবে আমাকে কিছু ঈশ্বরীয় কথা শোনাও।’
বেদ থেকে কিছু-কিছু শোনালেন দেবেন্দ্রনাথ। এই বিশ্বজগৎ প্রকাণ্ড একটা ঝাড়-লণ্ঠনের মতো। প্রত্যেকটি জীব ঝাড়লণ্ঠনের বাতি এক-একটি। শুধু নিজেরা জ্বলছে না, সমস্ত কিছুকে উজ্জল করে রেখেছে।
কী আশ্চর্য! আমি যে অমনি দেখেছিলুম একদিন পঞ্চবটীতে। তোমার সঙ্গে আমার যে তা হলে মিল গো। কিন্তু বিষয়টার ব্যাখ্যা কি?
‘ঝাড়-লন্ঠন না হলে কে জানত কে দেখত এই জগৎসংসারকে?’ দেবেন্দ্রনাথ ব্যাখ্যা করতে লাগলেন। ঈশ্বর মানুষ সৃষ্টি করেছেন শুধু নিজেদের দেখাতে নয়, ঈশ্বরকে দেখাতে। শুধু নিজেদের গৌরব প্রচার করতে নয়, ঈশ্বরের গৌরবের প্রচার করতে। মানুষ ছাড়া ঈশ্বরকে বোঝেই বা কে, বোঝায়ই বা কাকে। ঝাড়ের আলো না থাকলে সব-কিছু অন্ধকার, স্বয়ং ঝাড় পর্যন্ত দেখা যায় না।’
বড় সুন্দর করে বললে তো। একই বহুধা হয়েছেন। গণনাহীন অনৈক্য দিয়ে দেখাচ্ছেন সেই এককে। সেই সমগ্রকে। সেই অখণ্ডকে। তিনি যে অখণ্ডৈকরস। ‘আমি’-র মধ্যে কিছু নেই। আমার মধ্যেই সমস্ত রয়েছে।
আলাপ করে উল্লাস হল দেবেন্দ্রনাথের। বললেন, ‘আমাদের উৎসবে কিন্তু আসতে হবে।”
‘সে ঈশ্বরের ইচ্ছা।’ উদাসীন রামকৃষ্ণ।
‘না, আপনি আসবেন।
কিন্তু দেখছ তো আমার অবস্থা। আমার কাপড়-চোপড়ের আঁট নেই। কখন কি ভাবে তিনি রাখবেন তিনিই জানেন।’
‘না, আসতে হবে!’ দেবেন্দ্রনাথ পীড়াপীড়ি করতে লাগলেন। শুধু একটা ধূতি আর উড়ুনি পরে আসবেন। আপনাকে এলোমেলো দেখে কেউ যদি কিছু বলে আমার কষ্ট হবে।’
‘না বাপু আমি তা পারব না। বাবু হতে পারব না আমি।’
দেবেন্দ্রনাথ শুধু অর্দ্ধবস্ত্র উম্মোচন করেছিলেন, কিন্তু রামকৃষ্ণ মুক্তসমস্তসঙ্গ। রামকৃষ্ণ সর্ববিকারবর্জিত। নিত্যশুদ্ধবুদ্ধমুক্তস্বভাব। তার কাপড় থাকলেই বা কি, না-থাকলেই বা কি। নগ্ন বলেই তো সে পূর্ণ। চরম বলেই তো সে পরম।
কিন্তু শালীনতায় বাধল দেবেন্দ্রনাথের। পর দিন মথুরবাবুকে চিঠি লিখে পাঠালেন। একেবারে খালি গায়ে এলে ভালো দেখাবে না। গারে অন্তত একখানা উড়ুনি—
ওরে, ওরা এখনো বস্তুকে দেখে, সত্যকে দেখে না। আমাকে দেখে না, আমার কাপড় দেখে। ওরে, এ যে হরির শরীর। হরির শরীরের জন্যে ক’হাত কাপড় কিনবি, কোন বাজারে? হরিই জগৎ, জগৎই হরি—এর বাইরে আর শরীর কই? হরিরেব জগৎ, জগদেব হরিঃ, হরিতো জগতো ন হি ভিন্ন তনুঃ।
‘দেবেন্দ্র এখনো ভোগে আছে। তাই সে ভাগেও আছে।’ আমার ভোগও নেই, তাই ভাগও নেই। আমার ইয়ত্তাও নেই, পরিচ্ছেদও নেই। আমি সর্বোপাধিশূন্য।
কিন্তু গৃহস্থেরা কি একেবারে ডুবে যেতে পারে না?” জিজ্ঞেস করল কেশব সেন।
‘তোমরা ডুবে যাবে কি গো? তোমরা একবার ডুব দেবে আবার উঠবে। হাসল রামকৃষ্ণ।
তোমরা ঈশ্বরকোটি নও, তোমরা পানকৌটি।
‘কিন্তু কেন, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর?”
মহর্ষি বলতে পারো, কিন্তু আসলে রাজর্ষি। রাজর্ষি জনক। সংসারে থেকেও থাকতেন অরণ্যে। অরণ্যের নির্জনতায়।
‘দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর? দেবেন্দ্র? দেবেন্দ্র?” দেবেন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে প্রণাম করল রামকৃষ্ণ। বললে, ‘তবে কি জানো, পর্যাপ্তকাম হতে হয়। এক জনের বাড়িতে দুর্গাপূজোর সময় উদয়াস্ত পাঁঠাবলি হত। এখন আর বলির সে ধুমধাম নেই। এক জন জিজ্ঞেস করলে, মশাই আপনার বাড়িতে আর বলির সে ধুমধাম কই? বাবু বললে, আরে, এখন যে দাঁত পড়ে গিয়েছে। থেমে আবার বললে রামকৃষ্ণ, ‘দেবেন্দ্রনাথ খুব মানুষ। হাতে তেল মেখে নিয়ে কাঁঠাল ভাঙছে। হাতে তেল মেখে নিয়ে কাঁঠাল ভাঙলে হাতে আর আঠা লাগে না।’
ওরে একবার পরশমানিককে ছুঁয়ে সোনা হ। তার পর হাজার বছর ধরে মাটিতে পোঁতা থাক, যে-সোনা সে-সোনাই থেকে যাবি।
মথুরবাবুকে আবার ডাকল রামকৃষ্ণ। বললে, চলো এবার আরেক তীর্থে। সে আবার কোথায়?
দীননাথ মুখুজ্জের বাড়ি। বাগবাজারের পোলের কাছে থাকে। লোকটি বড় ভালো।
ভালো লোক হলেই তার বাড়িতে যেতে হবে? মথুরবাবু ঝাড়া দিয়ে উঠলেন।
শুধু ভালো নয়, ভক্ত। সব সময়ে তাঁতে আছে, মন-প্রাণ সব তাঁতে গত হয়েছে। এমন লোককে আমি দেখতে যাব না? ভক্তকে দেখা তো তাঁকেই দেখা।
দুনিয়ার অলিতে-গলিতে কত এমন ভক্ত আছে। তাই বলে সবাইকার বাড়ি-বাড়ি ধাওয়া করতে হবে না কি?
আমাকে সে সব অলি-গলির ঠিকানা এনে দাও। আমি জনে জনে গিয়ে প্রণাম করে আসব। ভক্ত হচ্ছে ভগবানের বৈঠকখানা। সেখানেই তিনি বিশেষরূপে প্রকাশিত। বিশেষরূপে তরঙ্গায়িত, তরলীকৃত। বৈঠকখানাতেই তো বাবু আছেন খুশমেজাজে, দিলদরিয়া হয়ে। মজা ওড়াবার মজলিশ চালাচ্ছেন চব্বিশ ঘণ্টা। আমাকে সেই আখড়ার আড্ডাধারী করে দাও।
ভক্ত ছাড়া তীর্থ নেই মহীতলে। ষোলো টাকার পয়সা এক কাঁড়ি, কিন্তু ষোলোটি টাকা যখন একত্র করো তখন আর কাঁড়ি দেখায় না। ষোলো টাকার বদলে যদি একটি মোহর করো তখন আরো কত ছোট হয়ে গেল। আবার সেটির বদলে যদি এক কণা হীরে করো, তা হলে লোকে টেরই পায় না।
ভক্ত ছোট্টটি হয়ে আছে। শুধু ঈশ্বরের নামটি ধরে বসে আছে। তীর্থভ্রমণ, গলার মালা ভেক-আচার কিছু নেয় না, শুধু ভক্তি নিয়ে পড়ে থাকে। ভার নেয় না সার নেয়। জীবনে শুধু একখানি দলিল লিখে চুকিয়ে দেয় লেখা-পড়া। সে দলিল উইল বা দানপত্র নয়, নয় কোনো বন্ধক-তমশুক, শুধু একখানি আমমোক্তারি! ভক্ত ঈশ্বরকে আমমোক্তারি দিয়ে নির্ঝঞ্ছাট হয়ে বসে থাকে। সে আমমোক্তারি বিশ্বাসের খাতায় রেজেস্টারি করা। রদ-রহিত নেই কোনো কালে।
তাঁর নাম আর তিনি তো অভেদ। যা রাম তাই নাম। তেমনি যা ভগবান তাই ভক্ত।
মথুরবাবু গাড়ি নিয়ে এলেন। তীর্থদর্শনে বেরুল রামকৃষ্ণ।
সেদিন দীননাথের বাড়িতে দীননাথের এক ছেলের পৈতে হচ্ছে। বাড়িটি ছোট, কিন্তু হৈ-চৈ প্ৰচণ্ড। তার উপর কে এক জন বড়লোক এসেছে ল্যাণ্ডো করে, তাকে নিয়ে দীননাথের ঘরগুষ্টি ভীষণ ব্যস্ত। এমন সময় এদের দেখে ওদের অপ্রস্তুত অবস্থা। কোথায় বসায় এই অনাহূতকে? নিমন্ত্রণ না করলেও যে চলে আসে পথ চিনে, প্রার্থনার অপেক্ষা না করে? কোথায় বসাই? ঘরে যে অনেক জিনিস, অনেক আসবাব, সেখানে জায়গা কোথায়?
পাশের ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিলেন মথুরবাবু ওপাশ থেকে কে ঝাঁজিয়ে উঠল, ‘ও-ঘরে হবে না, ও-ঘরে সব মেয়েরা আছেন।’
মহা অপ্রস্তুত। জায়গা হল না রামকৃষ্ণের। তাকে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন মথুরবাবু।
‘কেমন? দেখলে?” চটে গিয়েছেন মথুরবাবু।
রামকৃষ্ণ হাসতে লাগল। বললে, ‘কেন, দীননাথকে দেখলাম। তিনি দীননাথ, তিনি কি আমাকে ফাঁকি দিতে পারেন!
‘আর বোলো না। বসতে জায়গা দিল ঘরে?”
‘ঘরে জায়গা না দিক, হৃদয়ে দিয়েছে।’
তোমার কথা আর শুনব না। তোমার সঙ্গে যাব না আর কোথাও।’ তবু রাগ যায় না মথুরবাবুর। ‘তোমাকে যারা স্থান না দেয়-
‘আমাকে স্থান না দিলে স্থান কোথায় আর সংসারে?” দীননাথের মতই হাসতে লাগল রামকৃষ্ণ।
তুমি, মথুরবাবু, তুমি আর নেই। তবে আমাকে এখন বেলঘরের বাগানে কেশব সেনের কাছে কে নিয়ে যাবে?
আমি আছি-এগিয়ে এল কাপ্তেন। সঙ্গে সর্বত্রগ হৃদয়।
কিন্তু গাড়ি?
গাড়ি আমি দেব। কাপ্তেন বললে।
কাপ্তেনের সঙ্গে তার গাড়িতে চড়ে চলল রামকৃষ্ণ। চলল মাইল দুই দূরে বেলঘরে জয়গোপাল সেনের বাগানবাড়িতে। সেখানেই কেশব এসেছে। ভক্তদল নিয়ে মেতেছে সাধন-ভজনে। চলো হরিকথা শুনে আসি। মা হাতছানি দিয়ে ডাকছেন সেখানে।
রামকৃষ্ণের পরনে শুধু লালপেড়ে একটি ধুতি। কোঁচার খুঁটটি বাঁ-কাঁধের উপর ফেলা। কালো বার্নিস করা চটি পায়ে।
চলেছে জ্ঞানীগুণীদের মজলিশে। যেখানে হরিগুণগান, সেখানে গুণই বা কি, আর জ্ঞানই বা কি।
