দ্য ড্রিম গার্ল – অর্পিতা সরকার
দ্য ড্রিম গার্ল
ঠাম্মি, ও ঠাম্মি, এই টুম্পা বোসকে কিন্তু আমি খুঁজে পাচ্ছি না। এই টুম্পা তোমার জীবনে কবে এসেছিল গো?
আম্রপালি একগাল হেসে বললেন, তুই বড্ড পেকেছিস বুঝলি নিশি! টুম্পা আমার কলেজের বন্ধু। খুব স্মার্ট ছিল। আমার মতো ভ্যাবলা নয়। নিশি আরও কিছু টুম্পা বোসের ছবি দেখিয়ে বলল, এরা নয় তো? আম্রপালি ঘাড় নেড়ে বললেন, না। ধুর তোর ফেসবুক একেবারে বাজে। এর থেকে আমার বই ঢের ভালো। ক্যাটারাক্ট অপারেশনটা করেই আবার বই পড়তে শুরু করব। তোর ফেসবুক সামান্য টুম্পাকে খুঁজে দিতে পারে না। নিশিগন্ধাকেও খুঁজতে পারল না দু-দিন ধরে।
নিশি হেসে বলল, আমি তো আছি তোমার ফ্রেন্ডে, এতে হচ্ছে না? আরও নিশিগন্ধা চাই? আম্রপালি হেসে বললেন, সে নিশিগন্ধা তোর মতো সেন নয়, মিত্র।
নিশি তার উনিশের যৌবনের উচ্ছলতা লুকিয়ে বলল, শোনো ঠাম্মি তোমার এই বন্ধুও তো তোমার মতো সিক্সটিসেভেন প্লাস। তার নাতনি নিশ্চয়ই তাকে ফেসবুক খুলে দেয়নি। তাই সে ফেসবুকে নেই। তুমি আর কয়েকজনের নাম বলো, আমি দেখছি। ঠিক সেই সময় রচনা বাইরে থেকে ডাক দিল, মা তোমার ঘরে নিশি আছে? ওর গানের টিচার এসেছেন।
আম্রপালি বললেন, যা দিদিভাই, তোর শিক্ষক এসেছেন। নিশি ফিসফিস করে বলল, ও টুম্পা সোনা দুটো… এই নাও তোমার ট্যাব, তুমি খোঁজখবর চালাও।
হাসতে হাসতে বেরিয়ে গেল সদ্য উনিশের দামাল বাতাসটা। নিশির আসল নাম নিশিগন্ধা সেন। নামটাও আম্রপালির দেওয়া। আম্রপালির দুই সন্তান। সৈকত আর স্বাগতা। সৈকত বড়। রচনাকেও এবাড়িতে বউ করে নিয়ে এসেছিলেন আম্রপালি নিজে পছন্দ করে। রচনা আর সৈকত দুজনেই সরকারি অফিসে কর্মরত। রচনার মতো সরল মেয়ে খুব কমই আছে। নিজের পছন্দের ওপরে তাই বরাবরই ভরসা করেন আম্রপালি। স্বাগতারও বিয়ে হয়েছিল কলকাতার মধ্যেই। তবে ইদানীং স্বাগতা আর ওর স্বামী নির্মল দুজনেই কর্মসূত্রে চেন্নাইয়ে রয়েছে। ওদের একটা ছেলে, বয়েস ওই সাত কী আট হবে। সেও অবশ্য ফোনে দিদার সঙ্গে গল্প জমায়। তবে আম্রপালির বেস্ট ফ্রেন্ড নিশি।
নিশিও বলে, ঠাম্মি তুমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। সৈকত হেসে বলে, আচ্ছা মা, তুমি যে আমাকে আর বোনকে এত শাসন করতে, মারতে বকতে, নিশির বেলায় সেসব উধাও কেন গো? এমন একচোখোমি তো নিশি না হলে জানতেই পারতাম না। রচনাও মাঝে মাঝেই দোষারোপ করে, মা তোমার প্রশ্রয়ে কিন্তু নিশি অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। একটু তো বকতে পারো নাকি!
আম্রপালি কী করবেন? নিশির মুখটা দেখলেই নিজের অল্পবয়সের মুখটা ভেসে ওঠে। নিশি যেন ওনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই স্কুল পাশ করা কলেজবেলায়। একই চোখ, এক চিবুক। অনেকেই আম্রপালির অল্প বয়েসের সাদাকালো ছবির মধ্যে এখনকার নিশিকে অবিকল খুঁজে পেয়ে বলেন, ওমা, এ যে ঠাম্মির জেরক্স কপি। এই কারণেই কি না জানেন না আম্রপালি, তবে নিশির প্রতি একটা অন্যরকম টান অনুভব করেন তিনি। সেখানে স্নেহের গভীরতা ভেদ করে শাসন নামক ভিলেনের প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে নিশি অত্যন্ত ভালো মেয়ে। সত্যি বলতে কী ওকে বকার কোনো প্রয়োজনই কোনোদিন পড়েনি। একদিনও স্কুল থেকে কমপ্লেইন আসেনি যে নিশিগন্ধা কোনোরকম অসভ্যতামি করেছে। রেজাল্টও সবসময় ভালোই করে এসেছে নিশি।
তাই নিশির মতো লক্ষ্মী মেয়েটাকে কেন যে রচনা বা সৈকত বকাবকি করে, তার হদিশ পান না আম্রপালি। নিশি যখন এসে গলা জড়িয়ে ধরে বলে ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, মাই সুইটহার্ট, যখন ওর শ্যাম্পু আর পারফিউমের গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা দেয়, তখন অনেক পুরোনো কথা স্মৃতির সরণি বেয়ে উপস্থিত হয় আম্রপালি দৃষ্টিপটে।
নিশিগন্ধা মিত্র আর আম্রপালি রক্ষিত যেদিন স্কুলে বা কলেজে একই বেঞ্চে বসতে জায়গা পেত না, সেদিন মনে হত আজকের দিনটাই জঘন্য হয়ে গেল। ওদের দুঃখী মুখগুলো দেখেই বোধহয় অন্য মেয়েদের কষ্ট হত, তাই কেউ একজন উঠে গিয়ে বলত, যা মানিকজোড় হয়ে বসগে যা।
নিশিগন্ধা বা আম্রপালি এক লাফে চলে যেত আরেকজনের পাশে।
নিশিগন্ধা ছিল যাকে বলে ডাকসাইটে সুন্দরী। কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় সূর্যের আলো পড়লে যেমন ঝকঝক করে, নিশিগন্ধার গায়েও রোদ পড়লে এমনই ঝকঝক করত। একঢাল শ্যাম্পু করা চুলে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ। চোখের তারায় রাতের আকাশের নিস্তব্ধতা। শরীরে পাইন গাছের সতেজতা। নিশিগন্ধাকে একনজর দেখবে বলেই বয়েজ স্কুলের ছেলেরা প্রভাতী গার্লস বিদ্যানিকেতনের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকত তীর্থের কাকের মতো।
নিশিগন্ধাও যথেষ্ট সচেতন ছিল নিজের এই নজরকাড়া সৌন্দর্য নিয়ে। অবস্থাপন্ন বাড়ির মেয়ে। তাই চেহারার পরিচর্চা করতেও ভুল হত না কখনো। আম্রপালিদের ক্লাসের ফার্স্টগার্ল ছিল নিশিগন্ধা মিত্র। এই জন্যই ভগবানকে সকলে একচোখা বলে। যাকে দেন, হাত উপুড় করে ঢেলে সাজান। আর বাকিদের কৃপণ হাতে ছিটেফোঁটা দিতেই যেন কষ্ট হয় ওনার। এই যেমন আম্রপালিকেই, আরেকটু ফর্সা, আরেকটু স্মার্ট, আরেকটু লম্বা করতে কোথায় বেঁধেছিল বিশ্বকর্মার কে জানে!
চার ভাইবোনের বড় ছিল আম্রপালি। তাই ছোট থেকেই বাড়িতে শুনতে হয়েছে, তুই না বড়, তোর এমন লোভ দেখালে চলে। ভাইবোনদের সামলাবে কে! সুতরাং বায়না বা প্রশ্রয় কোনোটাই ধারে কাছে আসতে পারেনি ওর। আম্রপালির শৈশব আসেনি। ও ছোট থেকেই মাত্র দেড় বছরের ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব নিয়েছে। তারপর আর দুটো বোনের দায়িত্বও পড়েছিল ওর কাঁধেই। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় বোন ছাড়া এ জ্বালা কেউ বুঝতেই পারবে না। ক্লাস এইটে ওদের স্কুলে একটা নতুন মেয়ে ভর্তি হল। তার বাবার বদলির চাকরি। সে এসে বলেছিল, আমি একমাত্র সন্তান। আমার ভাইবোন কেউ নেই। শুনে আম্রপালিরা খুব হেসেছিল। মনে মনে ভেবেছিল, এ আবার হয় নাকি! ভাইবোন নেই এমন মেয়ে তখন আম্রপালিদের ক্লাসে কেউ ছিল না। নিশিগন্ধার সঙ্গে ক্লাসের কেউই মিশতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনি। সেটা ওর চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য, নাকি ওর দিল্লির স্কুলে পড়ার স্মার্টনেস সেটা অবশ্য আম্রপালি জানত না! তবে কী করে যেন আম্রপালি আর নিশিগন্ধা বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গিয়েছিল। এখনকার ভাষায় বেষ্টি।
ওরা বড় হচ্ছিল, ওদের আলোচনাও বদলাচ্ছিল।
ক্লাস ইলেভেনে উঠে ওরা খেয়াল করলো কতগুলো দেশবন্ধু বয়েজের ছেলে প্রভাতী গার্লসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, এবং কতজন নিশিগন্ধার জন্য দিনে রাতে মরে। সংখ্যাটা নেহাত মন্দ নয় দেখে দুজনেই হেসেছিল।
আম্রপালির পাশে নিশিগন্ধার রূপ আরও বেশি করে পরিস্ফুট হত। কারণ আম্রপালির শ্যামলা গায়ের রং, বেঁটে বেঁটে গড়ন, আর তেলদেওয়া চুলে বিনুনির পাশে ওকে যেন অপ্সরা লাগত। যদিও নিশিগন্ধা বারবার বলত, পালি তুই কেন সাজিস না রে! সাজলে তোকে ভারী মিষ্টি লাগবে। আর দিনরাত চুলের সুরক্ষায় শালিমার তেল লাগিয়ে রাখিস কেন?
আম্রপালি ভয়ে ভয়ে বলত, তেল না দিলে মা পিঠে খুন্তি ভাঙবে যে। নিশিগন্ধার বাবা নেভিতে চাকরি করত। ছয়মাস অন্তর যখন ফিরত তখন কত দামি দামি উপহার নিয়ে আসত নিশির জন্য। নিশি একবার একটা দামি হাতঘড়ি দিয়েছিল জোর করে আম্রপালিকে। আম্রপালি সেই ঘড়িটা হাতে না পরে ব্যাগে ভরে রাখত পরীক্ষার সময়। নিশিগন্ধা ওকে জড়িয়ে ধরে বলত, তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। যখন দিল্লি থেকে এখানে মানে দেশের বাড়িতে এলাম তখন দেখলাম সবাই আমার দিকে কেমন অন্যরকমভাবে তাকাচ্ছে। কেউই মিশতে চাইছে না। বড্ড একা লাগত। দিল্লির জন্য মনখারাপ করত। তখন একমাত্র তুই এগিয়ে এলি। আমাকে আপন করে নেওয়ার জন্য অনেক থ্যাংকস তোকে আম্রপালি। নিশিগন্ধার শ্যাম্পু করা চুলের গন্ধ এসে লাগত আম্রপালির নাকে। ওরও খুব ইচ্ছে করত নিশির মতো হতে। মনে মনে ওই ইচ্ছেটাকে লালন করত ও। যদিও আম্রপালি জানত নিশিগন্ধার মতো হতে ও কোনোদিন পারবে না। নিশি অনেকেরই হার্টথ্রব। ওকে এ চত্বরে লোকে ড্রিম গার্ল বলত।
নিশির হাঁটাচলা, কথাবলার ধরন সবকিছুর প্রেমে পড়ে গিয়েছিল আম্রপালি। যদিও কখনো সেভাবে বলা হয়নি ওকে। তবুও অপলক তাকিয়ে থাকত ওর বেষ্টির দিকে। আম্রপালির একটাই জিনিস ছিল, দুটো গভীর চোখ আর চিবুকে একটা ছোট্ট তিল। এইদুটোর দিকে তাকিয়ে একদিন নিশিগন্ধা বলেছিল, চল পালি, আজ আমার বাড়ি। তোকে আমি সুন্দর করে সাজিয়ে দেব। তুই নিজেকে চিনতে পারবি না।
ভয়ে ভয়ে ক্লাস টুয়েলভের টেস্টের পরে একদিন গিয়েছিল নিশিগন্ধার বাড়িতে। নিশিগন্ধা ওর চুলে নামী কোম্পানির শ্যাম্পু লাগিয়ে দিয়েছিল, চোখে কাজলের রেখা, ঠোঁটে লিপস্টিক, কপালে টিপ, কানে রঙিন পাথরের দুল। আর ওর নিজের একটা চুড়িদার পরিয়ে দিয়ে বলেছিল, এবারে দেখ হাঁদা, তোকে কেমন লাগছে!
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চমকে গিয়েছিল আম্রপালি। এ ও কাকে দেখছে? দুই ভ্রুর মাঝের রঙিন টিপ যেন টিপ্পনি কেটে বলছে, নজর না লাগে।
আম্রপালি আর নিশিগন্ধা সেদিন হুগলি নদীর ধারে গিয়ে বসেছিল অনেকক্ষণ। ফেরার পথে ওই ছেলেটা অপলক তাকিয়েছিল ওদের দিকে। এতদিন পর্যন্ত আম্রপালি জানত ছেলেদের এই দৃষ্টিগুলো শুধুই নিশিগন্ধার জন্য। আজ কেন কে জানে মনে হচ্ছিল ওই ছেলেটার অপলক চাউনি বোধহয় ওর জন্য। আঠেরো বছরের জীবনে যে কটা ছেলে ওর পথ আগলে দাঁড়িয়েছে প্রত্যেকের একটাই প্রশ্ন ছিল, তোমার বান্ধবী নিশিগন্ধা কী কাউকে ভালোবাসে? অথবা, তোমার বান্ধবীর সঙ্গে একটু আলাপ করিয়ে দেবে প্লিজ?
তাই ছেলেগুলোর ওর প্রতি সব আগ্রহটাই ছিল ও নিশিগন্ধার বেস্ট ফ্রেন্ড বলে।
সুতরাং আম্রপালির মতো অতিসাধারণ চেহারার মেয়ের জন্য যে কেউ রাস্তার বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না সেটা ও ভালোই জানত। তবে বসন্ত বাতাস যে বড় অবাধ্য, তাই সেটা এসে মাঝে মাঝে তোলপাড় করে দিয়ে যেত উনিশের বসন্তকে।
কলেজেও ওরা দুজনে একসঙ্গে একই সাবজেক্ট নিয়ে ভর্তি হয়েছিল। তাই নিশিগন্ধা আর আম্রপালির বন্ধুত্বটা অটুট ছিল কলেজের সেকেন্ড ইয়ার পর্যন্ত।
হঠাৎই সেকেন্ড ইয়ারে নিশিগন্ধার এক বিলেত ফেরত ডাক্তারের সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধ এল। আশেপাশের নিশিগন্ধার রূপমুগ্ধরা বুঝল, তারা অনেকটা পিছিয়ে গেছে প্রতিযোগিতায়। তাই হৃদয় ভেঙে গেল তাদের। আস্তে আস্তে ওদের ভগিনী নিবেদিতা কলেজের আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নিশিগন্ধার প্রেমিক সত্তারা বিদায় নিল। নিশিগন্ধাও বি.এ পাশ করেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়ল টুপ করে। বিয়ের পরে বিলেত পাড়ি দিল। আম্রপালির ধরা-ছোঁয়ার বাইরে চলে গেল নিশিগন্ধা। যাওয়ার আগে বলে গেল, পারিজাতের জন্য আমি তোকে হিংসা করলাম পালি, অনেক হিংসা।
আম্রপালি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, কে পারিজাত? কার জন্য তুই হিংসা করিস? দ্য নিশিগন্ধা মিত্র হিংসে করে আম্রপালির মতো ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে? এ যে আমার পরম প্রাপ্তি রে নিশি।
নিশিগন্ধা বলেছিল, ওই যে ওই লম্বা মতো শ্যামলা গায়ের রং, বড় বড় চোখ আর এক চোখ কৌতূহল নিয়ে যে তাকিয়ে থাকে তোর দিকে। আম্রপালি বলেছিল, আমার দিকে, কে রে? সকলেই তো তোর রূপমুগ্ধ। নিশিগন্ধা বলেছিল, যেদিন তুই প্রথম সেজেছিলিস, যেদিন আমরা সূর্য ডোবার সময় পর্যন্ত বসেছিলাম হুগলি নদীর তীরে, সেদিন নদীর ধারে একটা ছেলেকে দেখেছিলিস? আম্রপালি বলেছিল, হ্যাঁ। সে তো রোজ দাঁড়িয়ে থাকত আমাদের কলেজের রাস্তায় তোর জন্য।
নিশিগন্ধা হেসে বলেছিল, পাগলি। ও শুধুই তোর পূজারি। বাঁ হাতেও অন্য কাউকে পুজো করতে সে প্রস্তুত নয়। আমি তো আর তোর মতো মুখচোরা নই, তাই একদিন সোজা দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, কার জন্য ওয়েট করেন এখানে? কারণ আমার সব প্রোপোজালকারীরাই সাতদিনের মাথায় চিঠি পাঠিয়েছে বা অন্য কোনোভাবে জানিয়েছে তাদের ভালোবাসার কথা। এই ছেলেটাই টানা এক বছর দাঁড়িয়ে থেকেও একটা শব্দ উচ্চারণ করেনি। তাই বিস্মৃত হয়েই জানতে চেয়েছিলাম। পারিজাত বলেছিল, ও নাকি আম্রপালিকে ভালোবাসে। আমি বলেছিলাম, তাহলে সেটা আম্রপালিকে বলছেন না কেন? আমি কি জানাবো? ও বলেছিল, ও নাকি তোর যোগ্য হয়ে ওঠেনি এখনও। যদি কোনোদিন যোগ্য হয়ে ওঠে তবে তোকে জানাবে। তার আগে নয়। বিশ্বাস কর পালি, এই প্রথম তোকে আমার হিংসা হল। এমন একজন প্রকৃত প্রেমিক পেয়েছিস বলে। যে একতরফা ভালোবেসে যায় কোনোরকম অসভ্যতা ছাড়াই। যে কিছুর প্রত্যাশা করে না, শুধু ভালোবেসে যায় নিঃস্বার্থভাবে।
আমাকে এতদিন পর্যন্ত যারাই প্রোপোজ করেছে তাদের প্রথম বক্তব্যই ছিল, কী সুন্দর তুমি, তাই তোমার প্রেমে পড়ে গেলাম। আলাদা কেউ কিছু বলল না, বিশ্বাস কর। তাই প্রেমে পড়া আর হল না। বাবা-মায়ের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করাই শ্রেয় ভেবে বসে পড়লাম বিয়ের পিঁড়িতে।
নিশিগন্ধা চলে গিয়েছিল বিদেশে। আম্রপালি খুব একা হয়ে গিয়েছিল। আম্রপালির বাবা মেয়ের বিয়েতে অনেক খরচ হবে ভেবেই হয়তো মায়ের হাজার বলা সত্ত্বেও সম্বন্ধ দেখতে যায়নি কখনো। অথবা আম্রপালির টিউশনির টাকায় সংসারে একটু সুরাহা হচ্ছিল বলেই ওর বিয়ে নিয়ে তেমন কোনো কথা হয়নি ওদের বাড়িতে। আত্মীয়-প্রতিবেশীরা যদিও প্রায়ই মাকে বলত, এবারে মেয়ের বিয়ে দাও। আর কত পড়বে? এসব আলোচনার ঊর্ধ্বে গিয়েই আম্রপালি মাস্টার্স ভর্তি হয়েছিল।
ইউনিভার্সিটির সামনেও প্রায়ই দেখতে পেত পারিজাত বিশ্বাসকে। একটা সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বন্ধুদের থেকেই খবর পেয়েছিল, পারিজাত নাকি চাকরির চেষ্টা করছে। ইংরাজিতে মাস্টার্স করে। পরিজাতদের বাড়ির অবস্থাও তেমন নয়। মাথার ওপরে দুই দিদি তখনও অবিবাহিত আছে আর ছোট ভাই আছে, সেও পড়ছে।
ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে একদিন বৃষ্টি নেমেছিল তুমুল। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরে যখন বাস পেয়েছিল আম্রপালি তখন বেশ সন্ধে হয়ে এসেছে।
বাস থেকে নেমে ওদের গলি রাস্তায় ঢুকতেই গাটা ছমছম করে উঠেছিল। অন্ধকার রাস্তা। লোডশেডিং আর বৃষ্টির দাপটে লোকজন শূন্য।
কয়েকটা ছেলে যে বাসস্ট্যান্ড থেকেই পিছু নিয়েছিল সেটা ও বেশ বুঝেছিল। আচমকা কেউ একজন এসে ওর হাতটা চেপে ধরে বলেছিল, পিছনে তাকাবে না, ওরা চারজন আছে। আমরা সোজা হেঁটে যাব। আম্রপালি পাশে তাকিয়ে দেখেছিল, রোজ ওর জন্য কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করা পারিজাত। প্রথম পুরুষের স্পর্শে কেঁপে উঠছিল ওর বাইশের বসন্ত। পারিজাত বলেছিল, আজ এত সন্ধে হল যে?
কাঁপা গলায় আম্রপালি উত্তর দিয়েছিল, বৃষ্টিতে বাস পাচ্ছিলাম না। পারিজাত বলেছিল, আমি বহুক্ষণ অপেক্ষা করছিলাম তোমার জন্য।
আম্রপালি সেদিন লজ্জায় বেড়াজাল ভেঙে জিজ্ঞেস করে ফেলেছিল, কেন অপেক্ষা করছিলে?
পারিজাত ইতস্তত করে বলেছিল, জানি না। গত পাঁচ বছরে তোমার জন্য অপেক্ষা করাটাও আমার রুটিন হয়ে গেছে, তাই।
লজ্জায় মাথা নিচু করেছিল আম্রপালি। পারিজাতের হাতের মধ্যে তখনও ওর হাত মুঠিবদ্ধ। মনে পড়ে গিয়েছিল নিশিগন্ধার শেষ কথাটা, তোকে আমি হিংসে করলাম আম্রপালি। এমন একমুখী প্রেমিক যে সবাই পায় না রে।
আম্রপালির ইচ্ছে করছিল আরও কথা বলতে পারিজাতের সঙ্গে কিন্তু ঠিক কী বলবে সেটা খুঁজে পায়নি ও। পারিজাত নিজের কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট প্যাকেট বের করে বলেছিল, এটা তোমার জন্য। সংকোচে হাত বাড়িয়ে নিয়ে ছুটে নিজের বাড়িতে ঢুকে গিয়েছিল আম্রপালি।
বাড়িতে ঢুকেই দেখেছিল, বড়মাসি বসে আছে বাড়িতে। মাসিকে অনেকদিন পরে বাড়িতে দেখে খুব আনন্দ হয়েছিল আম্রপালির।
নিশির গান শোনা যাচ্ছে…. সম্ভবত আজ বায়না করে নতুন গান তুলছে স্যারের কাছে থেকে।
মম চিত্তে, পাশ ফিরতে
আজ পলাশ ফুলের কাব্য,
নিতি নৃত্যে, ফুল ছিড়তে
শুধু তোমার কথাই ভাববো….
নিশির গানটা কানে যেতে আরও আনমনা হয়ে গেলেন আম্রপালি। লজ্জায় কুঁকড়ে গেলেন যেন। নিজেকে বড্ড বেশি স্বার্থপর মনে হল আজ এত বছর পরে।
নিশির গানের শিক্ষক চলে যাওয়ার আওয়াজ পেলেন আম্রপালি। আনন্দে লাফাতে লাফাতে নিশি ঢুকল ওর ঘরে।
ঠাম্মি এই দেখ, এনাকে চেনো তুমি? কী বিরক্তিকর বুড়ো রে বাবা। কালকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট নিয়েছি। আজ থেকে অন্তত গোটা পঞ্চাশ মেসেজ সেন্ড করল। আজকাল বয়স্ক মানুষগুলো এত গায়ে পড়া হচ্ছে না কী বলব!
নিশি আর তার ঠাম্মি একই সঙ্গে দিন পাঁচেক আগে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেছে। তার কারণ সৈকত আম্রপালিকে একটা ট্যাব আর নিশিকে একটা ফোন গিফ করেছে দীপাবলি উপলক্ষ্যে। নিশির আগেরটা স্মার্টফোন ছিল না। রচনা বলেই দিয়েছিল মেয়েকে… কলেজে না উঠলে স্মার্টফোন দেবে না। নিশি ঘ্যানঘ্যান করেছে কিন্তু রচনা দেয়নি।
কী গো ঠাম্মি দেখো না, চেনো এনাকে? ইনি সমানে জিজ্ঞেস করে যাচ্ছেন, আপনি তো নিশিগন্ধা সেন। অথচ এটা তো আম্রপালির মুখের ছবি। আপনি কেন অন্যের ছবি ব্যবহার করছেন?
একি বিপদ বলো দেখি। আমার নিজের ফেসের ছবি দিয়েছি তাতেও এই ভদ্রলোকের বিশাল সমস্যা।
ফোনের স্ক্রিনে ফুটে উঠেছে পারিজাত বিশ্বাস নামের বছর সত্তরের মানুষের ছবি। মুখের চেহারা অনেকটাই বদলে গেছে, শুধু পরিবর্তন হয়নি ওর বড় বড় চোখের সেই দৃষ্টিটুকু।
ধড়ফড় করে উঠল আম্রপালির হৃৎপিণ্ড।
নিশি বলল, কী গো তোমার মুখটা এমন লাল হয়ে গেল কেন?
নাতনির চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বললেন, এ আমার কলেজের বন্ধু। হয়তো তোকে আমি ভেবেছে।
নিশি বললে, দেন আমি ওনাকে তোমার প্রোফাইল লিংক পাঠিয়ে দিচ্ছি। উনি তোমায় রিকু পাঠাবেন।
না থাক…বলতে গিয়েও বলা হল না আম্রপালির।
বরং নিশি চলে যাওয়ার পর থেকে ট্যাবের দিকে হাপিত্যেশ করে তাকিয়ে আছেন। কখন পারিজাত রিকোয়েস্ট পাঠাবে!
আজ নিশিগন্ধা, টুম্পা, বনানী এদেরকে ফেসবুকে খুঁজতে গিয়ে বারবার ফিরে যাচ্ছে সেই কলেজবেলার দিনগুলোতে।
পারিজাতের দেওয়া প্যাকেটটা খুলতেই বেরিয়েছিল একটা ছবি। আম্রপালির ছবি। যেদিন ওকে জেদ করে নিশিগন্ধা সাজিয়ে দিয়েছিল, যেদিন পারিজাত ওকে প্রথম দেখেছিল সেই ছবিটা।
আম্রপালি হুগলি নদীর তীরে বসে আছে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আম্রপালির শ্যাম্পু করা চুল এসে কপালে পড়ছে। চুলের ফাঁক দিয়ে ওর বেগুনি টিপটা উঁকি দিচ্ছে। নীচে লেখা আমার স্বপ্নসুন্দরী।
আম্রপালি লজ্জায় আবির রাঙা হয়ে গিয়েছিল। ও সুন্দরী? হে ভগবান! ও তো জানত ও ভীষণ রকমের সাধারণ। এতটাই সাধারণ যে ভিড়ে মিশে গেলে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। মনে রাখার মতো কোনো কিছুই নেই ওর চেহারায়।
তারপরেও কেউ একজন ওকে এমন নিখুঁত করে এঁকেছে দেখেই ফিসফিস করে বলেছিল, নিশি আজ তুই থাকলে তোকে সবটুকু বলতে পারতাম।
নীচের কোটেশনে লেখা— ‘ভালোবাসা মানে শুধু কাছে টানা নয়, দূরে থেকেও ভালোবাসা যায়।’
প্রথম পাওয়া প্রেমপত্রের মতোই পরিজাতের আঁকা নিজের ছবিটাকে অতি সযত্নে রেখে দিয়েছিল ডায়রির মধ্যে।
ঘর থেকে বাইরে বেরোতেই বড়মাসি একটা ছেলের ছবি সামনে ধরে বলেছিল, দেখ রে পালি। তোর কপাল কেমন খুলল দেখ।
মা একমুখ হেসে বলেছিল, তোর জন্য সম্বন্ধ এনেছে তোর মাসি। বিনা পণে বিয়ে করবে ছেলে। সদ্য মা মারা গেছেন পাত্রের। একা সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে। রেলে বড় চাকরি করে। পরিবারে আর কেউ নেই। দাদা-বউদির আলাদা সংসার। শুধু শিক্ষিত, সুশ্রী একটি ঘরোয়া মেয়ে চাই। ভাগ্যিস সুন্দরী চায় না, তাই তোকে নিশ্চয়ই পছন্দ হবে। আমি ভাবলাম আমাদের আম্রপালির মতো ঘরোয়া মেয়ে আর আছে কটা? তারপর এম.এ পড়ছে শুনে ছেলে খুব আগ্রহী। বয়সটা একটু বেশি। এমন কিছু নয়। বছর তেত্রিশ-চৌত্রিশ হবে। আম্রপালি তখনও তেইশে ঢোকেনি। এই প্রথম বিনা পণে বিয়ে হবে শুনে বাবাও বেশ আগ্রহী।
চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল পারিজাতের অপলক দৃষ্টিটা। বুকের ভিতর কষ্টটা দুমড়ে মুচড়ে উঠেছিল। তখনও আম্রপালির ডান হাতে লেগে আছে পারিজাতের ছোঁয়া।
মধ্যবিত্ত সংসারের বড় মেয়ের বোধহয় আলাদা করে কিছুই মতামত থাকতে নেই। বাবা-মা আর সংসারের সকলের ভালো যাতে হবে সেটাই নিজের ইচ্ছে বলে মেনে নিতে হয়। তবুও একটা ক্ষীণ সুরে প্রতিবাদ করেছিল আম্রপালি। বলেছিল, আমি চাকরি করব বাবা, বিয়ে না হয় পরে করব।
মা আর মাসি রে রে করে বলেছিল, অনেক পড়েছিস, আর পড়লে বিয়ের পরে পড়বি।
সুফলচন্দ্র সেন আম্রপালিকে দেখতে এসেছিল সপ্তাহখানেক পরে। মাস্টার্স কমপ্লিট হলেই বিয়েটা হবে, কথা দিয়ে চলে গিয়েছিল সে। এক কথার মানুষ সে, তাই কথার নড়চড় হবে না।
ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে পারিজাতকে দেখে সব লজ্জা ভুলে এগিয়ে গিয়েছিল। ভূমিকা না করেই বলে বসেছিল, ভালোবাসো আমায়? স্বীকৃতি দিতে পারো?
পারিজাত করুণ হেসে বলল, স্বীকৃতি তো দিয়েছি সেই পাঁচ বছর আগে হুগলি নদীর তীরে যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম।
আজ এতদিন ধরে ভালোবাসাটুকুকে সযত্নে লালন করে রেখেছি মনের গভীরে। এর থেকে স্বীকৃতি আর কী চাও আম্রপালি! আম্রপালি ভূমিকা না করেই বলেছিল, আমার বিয়ে ঠিক করছে বাড়ির সবাই। তুমি কী পারো না, আমায় আপন করে নিতে?
পারিজাত অন্যমনস্ক গলায় বলেছিল, সমাজের চোখে স্বীকৃতি পেতে গেলে আরও বছর তিন-চার অপেক্ষা করতে হবে যে তোমায়। দুই দিদির বিয়ে দেব, তারপর পারবে অপেক্ষা করতে?
আম্রপালি পশ্চিমাকাশের ধ্রুবতারার দিকে তাকিয়ে আচমকা বলেছিল, অপেক্ষা করব।
পারিজাত যাওয়ার সময় ঘুরে তাকিয়ে বলেছিল, ভালোবাসা মানে শুধু পাওয়া নয় আম্রপালি, দু-হাত ভরে দেওয়াও।
বাড়ি ফিরেই বুঝেছিল, পারিজাতকে দেওয়া কথা রাখার কোনো সুযোগই দেবে না বাড়ির কেউ।
মাস্টার্সের ফাইনাল এক্সামের পনেরোটা দিন বাকি ছিল। ওইটুকুই যা সময় পারিজাতকে প্রাণভরে ভালোবাসার। তারপর ও হয়ে যাবে অন্যের স্ত্রী। পারিজাত হয়ে যাবে পরপুরুষ।
টুং করে একটা মেসেজ ঢুকল ট্যাবে। আম্রপালি তরুণীর মতো লাফিয়ে বিছানায় উঠে বসলেন।
রাত সাড়ে দশটা বাজে। ফেসবুক তাকে জানান দিচ্ছে পারিজাত বিশ্বাস ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট সেন্ড করেছে। কাঁপা হাতে রেসপন্ড বটনটা প্রেস করলেন আম্রপালি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেসেঞ্জারে মেসেজ ঢুকল, কেমন আছো আম্রপালি? কত যুগ পরে তোমায় খুঁজে পেলাম। কত খুঁজেছি তোমায়, কোথাও পাইনি।
তোমার ভাই বলেছিল, তুমি নাকি ঘোর সংসারী। কলকাতা ছেড়ে হুগলিতে আসার সময়ই পাও না। এলেও নাকি বরের সঙ্গে গাড়ি করে একদিনের জন্য আসো, তারপর চলে যাও। যদিও সেও অনেক যুগ আগের কথা। তোমার সিঁদুর পরা মুখটা শুধু কল্পনাই করে গেলাম, দেখলাম না একবারও। তারপর তো কেটে গেছে কত বছর।
আম্রপালি লিখলেন, ভালো আছি। ফেসবুকের ছবিটা চিনতে পারো?
পারিজাত লিখলেন, এ তো আমার শেষ আঁকা ছবি। এরপর আর কখনো রং তুলি ধরিনি। এতদিন রেখে দিয়েছিলে?
আম্রপালি বললেন, রেখেছিলাম তো।
তোমার নাতনির নাম নিশিগন্ধা রেখেছো? আমি ফেসবুকে নিশিগন্ধা আর আম্রপালি সার্চ করে করে ক্লান্ত। এতদিন পরে ওকেই পেয়েছি শুধু, অবিকল কলেজের তুমি। অবাক হয়ে ভেবেছিলাম এ তো আম্রপালি। তবে সেই ভীরু চোখ দুটো খুঁজে পাচ্ছিলাম না তোমার নাতনির মুখে। তাই বেচারিকে দুদিন খুব বিরক্ত করেছি।
আম্রপালি বললেন, কী করো এখন?
করতাম, শিক্ষকতা। এখন রিটায়ার্ড ম্যান।
আর তোমার সংসার কেমন চলছে বলো?
বছর কয়েক আগে বিধবা হয়েছি। এখন ছেলে, বউমা, নাতনি নিয়ে ভরা সংসার।
সত্যি বলতে কী আম্রপালির স্বামী মানুষটা একটু রাশভারী ছিল ঠিকই, তবে মন্দ নয়। স্ত্রীকে যথেষ্ট সম্মান করত। তবে ভালোবাসা বা আবেগ কোনোটাই তেমন ভাবে অনুভব করেননি আম্রপালি।
সংসার, দায়িত্ব, সন্তান, কর্তব্যের বেড়াজালে কাটিয়ে দিয়েছে এতগুলো বছর। নিজেকে নিয়ে ভাবার সময় পায়নি সেভাবে।
আম্রপালি বললেন, তোমার সংসার কেমন চলছে?
আমিও বিন্দাস আছি। ভাই, ভাইয়ের বউ আর ভাইপোকে নিয়ে।
দুরুদুরু বুকে আম্রপালি লিখলেন, বিয়ে করোনি?
পারিজাত বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে লিখলেন, অকারণে একটা অবৈধ সম্পর্কে জড়াতে মন চায়নি আম্রপালি।
অবৈধ মানে? সে তোমার বৈধ স্ত্রী হত পারিজাত।
ভালোবাসা যেখানে নেই সে সম্পর্ককে আইন যতই বৈধকরণ করুক তা কি বৈধ হয়! ভালোবাসাহীন যেকোনো সম্পর্কই তো অবৈধ। আর কাউকে ভালোবাসতে পারব না জেনেই বিয়েটা করিনি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি ভীষণ ভালো আছি।
আম্রপালি ভাবছিলেন, তাহলে কী সৈকত আর স্বাগতার বাবার সঙ্গে এতকাল শুধুই অভিনয় করে গেল আম্রপালি, ভালোবাসার অভিনয়! ভয়ে ভয়ে আর প্রশ্ন করলেন না নিজের সাংসারিক জীবনকে— সেটা বৈধ ছিল না অবৈধ!
পারিজাত ক্ষমা করো আমায়। আমি কথা রাখতে পারিনি।
পারিজাত বললেন, নিজেকে দোষারোপ কোরো না প্লিজ। তুমি আমায় কত কী দিয়েছো জানো?
আম্রপালি বললেন, কী দিয়েছি?
তুমি আমায় স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছো। রোজ রাতে কল্পনা করতাম তোমার সঙ্গে কখনো দেখা হলে প্রথম প্রশ্ন কী করব? ভালো আছো আম্রপালি? নাকি আমায় মনে পড়ে আম্রপালি?
আজ দেখো যখন তোমায় ফেসবুকে পেলাম তখন সব গুলিয়ে গেল।
তুমি আমার মতো সাধারণ ছেলেকে ভালোবেসেছিলে বলেই আমি শত আঘাতে ভেঙে পড়িনি। বুঝেছি সমাজের কাছে আমার মূল্য নেহাত মূল্যহীন হলেও, একজন ছিল যে আমায় চেয়েছিল। তাই নিজেকে কখনো গুরুত্বহীন ভাবিনি। লড়াইটা চালাতে পেরেছিলাম শুধু তুমি আমার মনের গভীরে সব সময় অবস্থান করেছিলে বলে।
আম্রপালি কী বলবে বুঝতে না পেরেই বললেন, তোমার চোখ দুটো একই আছে জানো। শুধু একটু বুড়িয়েছো।
পারিজাত বললেন, আমি তোমার এখনকার ছবি দেখতে চাইব না কোনোদিন। কারণ আমার আম্রপালি চিরযৌবনা। আমার ড্রিম গার্ল।
পারিজাত আরেকটা জিনিসও দেখতে পেলেন না, একজন বয়স্ক মহিলা নিজের ট্যাবটা জড়িয়ে ধরে অঝোরে কাঁদছে আর বলছে, ক্ষমা করো পারিজাত। একমাত্র তোমার জন্যই নিশিগন্ধা একদিন আমায় হিংসে করেছিল। একমাত্র তুমি ছিলে বলে আমি বুঝেছিলাম ভালোবাসা শব্দের অর্থ কী! একমাত্র তুমি ছিলে বলে আমি জেনেছিলাম, আমার মতো সাধারণ মেয়েও কারোর স্বপ্নসুন্দরী হতে পারে। সৈকতের বাবা কোনোদিন আদর করেও আমায় সুন্দরী বলেনি। আজ অবধি কারোর কাছে আমি শুনিনি আমি সুন্দরী।
মৃত্যুর আগে তোমার সঙ্গে যে আবার আমার কথা হল, এর জন্যও অবশ্য আমি ঋণী হলাম দুই নিশিগন্ধার কাছে।
পারিজাত বললেন, মেসেঞ্জারে যদি তোমায় একটু আধটু বিরক্ত করি তুমি কী খুব বিরক্ত হবে আম্রপালি?
আম্রপালি লিখলেন, বিরক্ত হলেই বা তোমার কী? তুমি তো পাঁচবছর ধরে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে আমায় দেখার জন্য। তখন আমি বিরক্ত হতাম কী ভেবেছো কখনো? তাহলে আজ হঠাৎ এত ফরম্যালিটিস কেন?
পারিজাত লিখলেন, ভালোবাসা শুধু কেড়ে নেয় না, ফিরিয়েও দেয় দু-হাত ভরে, তাই না আম্রপালি?
আম্রপালি লিখলেন….ভালোবাসা শব্দের ওপরে একচেটিয়া অধিকার তোমার, তাই এই নিয়ে কথা বলার অধিকার এই অর্বাচীনের নেই।
তবে আজ বুঝলাম, নিশিগন্ধা কেন আমায় হিংসে করেছিল সেদিন।
পারিজাত বললেন, কেন? তোমার বান্ধবী নিশিগন্ধা?
আম্রপালি বললেন, এটা একান্ত গোপনীয়, বলা যাবে না। তবে তোমার কাছে বিরক্ত হতে আমি রাজি।
আজ হাওয়া বেপরোয়া
দিলো সন্ধে পাখির ঝাঁক
এই বিকেল আর বেল ফুল
হৃদ মাঝারে থাক….
