সেই টেলিফোন – অর্পিতা সরকার
সেই টেলিফোন
তোমার এই নেশাটা কবে ছাড়বে, বলবে? বুঝলাম তোমার কোনো এক দাদুর দাদু চন্দ্রপুরের জমিদার ছিলেন, সেই সূত্রে তোমার ধমনীতেও বইছে খাঁটি জমিদারের রক্ত। তারপরেও আমি হাত জোড় করে রিকোয়েস্ট করছি, এসব পুরোনো মান্ধাতার আমলের জিনিস কেনা তুমি বন্ধ কর। নিজেকে কেমন যেন মোঘল হারেমের বন্ধ রানী রানী মনে হয় ইদানীং।
উমাকান্ত চৌধুরী চন্দনকাঠের টেবিলের ওপর চায়ের কাপটা রাখতে রাখতে বললেন, কেন গিন্নি, নিজেকে রানী ভাবতে তোমার কিসের এত সমস্যা বলবে? দেখো, তুমি একই সাথে দুরকম ফ্লেভার পাচ্ছ। এক- চারিদিকে মোঘল আমলের সব দুষ্প্রাপ্য আসবাবপত্র আর অন্য দিকে আমার হৃদয়ের একেশ্বরী। আমি এমন একজন পুরুষ যার ধমনীতে বাইজি নাচ দেখার ইতিহাস সুরক্ষিত আছে, তা সত্ত্বেও আমি সেই পুরুষ যে তার ত্রিশ বছরের বিবাহিত স্ত্রীর মুখাবয়ব ছাড়া আর কিছুই পরিদর্শন করল না। সত্যি করে বলত কমলা, গর্ব হয় না? অহংকার হয় না নিজের প্রতি?
কমলাদেবী ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন, না হয় না। এই অ্যান্টিক জিনিসের ধুলো আজ থেকে জয়ন্তী ঝাড়বে না বলে দিয়েছে। বলেছে, এর এত খাঁজ, এত কারুকার্য, যে ওর একঘণ্টা সময় বেশি লাগে। তাই আমাকেই ঝাড়তে হবে এসব মোঘল আমলের, ইংরেজ আমলের জিনিসপত্রকে।
উমাকান্তবাবু একটু চিন্তিত মুখে বললেন, তাহলে তো বড় সমস্যার কথা। আমি গত কালকেই একটা ঝাড় কিনব ঠিক করে ফেলেছি পার্ক স্ট্রিটের একটা পুরোনো দোকান থেকে। ঝাড়টা নাকি আমাদের অযোধ্যার নবাব সুজা-উদদৌলার খাস রানীমহলে ব্যবহার করা হত। হাতফেরত হতে হতে এসে পৌঁছেছে ও দোকানে। ভাবলাম তোমার ঘরে টাঙিয়ে দেব, তুমিই আমার হৃদয়ের রানী বলে কথা। আমি এসব জিনিসের কদর করি বলেই দত্তপাড়ার বটুকবাবু খবরটা দিলেন। কমলাদেবী চোখ পাকিয়ে বললেন, আমি ঢাকুরিয়ার ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠব, এই বলে দিলাম!
উমাকান্ত চৌধুরী পেশায় ডাক্তার। সারাটা জীবনে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেছেন, তখন কোনো শখ বা নেশার বশবর্তী হবার সুযোগ পাননি। এই ষাট বছরে এসে রোগী দেখা কমিয়েছেন আর নতুন নেশায় পেয়েছে তাকে। বহু পুরোনো ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্বলিত জিনিসপত্র সংগ্রহ করা। মোঘল আমল থেকে ইংরেজ আমল যাবতীয় পুরোনো জিনিসে এখন ওনার বাড়ির দোতলাটা ভর্তি হয়ে গেছে। কমলাদেবী ওনার সুযোগ্য স্ত্রী ছিলেন বলেই এমন বায়ুগ্রস্ত মানুষের সাথে ত্রিশটা বছর কাটিয়ে দিলেন। রাত নেই, দিন নেই আগে পাগলের মতো রোগী দেখে বেড়াতেন, ইদানীং বয়েস বাড়ার সাথে সাথে বাড়ির চেম্বার আর নিজস্ব নার্সিং হোমের বাইরে কোথাও যাবেন না সিদ্ধান্ত শুনে একটু খুশিই হয়েছিলেন কমলাদেবী। যাক বুড়ো বয়েসে অন্তত দুজনে একসাথে থাকতে পারবেন। বেশ কয়েকটা জায়গায় বেড়াতে যাবার প্ল্যানও করে রেখেছেন। কিন্তু গত দুবছর ধরে এ বাড়িতে মেহগনি, আবলুস আরও কীসব নাম না জানা কাঠের জিনিসের আবির্ভাব ঘটছে দেখে জীবনে বিরক্তি এসে গেছে ওনার। এই পাগলা মানুষটা কী আর বদলাবে না!
সায়ন্তনী ওদের একমাত্র সন্তান। বাপের মতো সেও ডাক্তারিকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে। সেও এখন হবু ডাক্তার। দুটো সন্তান গর্ভে নষ্ট হয়ে যাবার পরে কমলাদেবীর কোলে এসেছিল সায়ন্তনী, তাই মেয়েকে বড্ড আগলে রাখতে চান উনি। কিন্তু বাপের রক্ত যাবে কোথায়? মেয়েটাও যেন কেমন উদাসীন টাইপের। এদের নিয়ে কমলা আর পেরে ওঠে না।
মেয়ের নেশা বিভিন্ন অর্কিডের আর বাপের এসব কিম্ভূত টাইপের আসবাবের।
দুজনের চাপে কমলাদেবী স্যান্ডউইচ হয়ে যায় আরকি!
স্ত্রীর রক্তচক্ষুর দিকে তাকিয়ে উমাকান্তবাবু বললেন, তবে ঝাড়টা বরং থাক। আমি একটা টেবিল দেখেছি যেটা নাকি একজন বাংলার জমিদারের কাছারি ঘরে থাকত। সিরাজ-উদদৌলার সঙ্গেও ওই জমিদারের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। ভেবে দেখো কমলা ওই টেবিলে বসে আমাদের সিরাজ কত গোপন মন্ত্রণা করেছেন। কারণ মুর্শিদাবাদের ইতিহাস বলছে, ওই নগণ্য জমিদারের সাথে সিরাজের মাঝরাতেও অনেক গোপন শলাপরামর্শ হত। যদিও পুরোটাই শোনা কথা, তবে কী করে যেন ওই টেবিলে বাংলার নবাবের একটা অবয়ব কেউ এঁকেছিল নখ দিয়ে। যেদিন থেকে টেবিলটা দেখেছি সেদিন থেকে আমার বড্ড ইন্টারেস্টিং লেগেছে। শুনলাম নাকি গোরস্থান থেকে ওই টেবিল উদ্ধার করেছিল কোনো এক কাঠ ব্যবসায়ী।
কমলাদেবী কিছু বলার আগেই দেখল সায়ন্তনী গটমট করে ঘরে ঢুকল, চোখ দুটো অসম্ভব রকমের লাল। দেখেই মনে হচ্ছে বেশ খানিকক্ষণ কেঁদেছে।
কমলাদেবী বললেন, কী হয়েছে রে? কাঁদছিস নাকি? চোখে কিছু পড়েছে?
সায়ন্তনী মায়ের দিকে আলগোছে তাকিয়ে বলল, আমি ঘরে যাচ্ছি, একটু ঘুমাতে হবে। খুব টায়ার্ড লাগছে।
উমাকান্তবাবু মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, টেক রেস্ট। ডাক্তারদের মানসিকভাবে আরও শক্ত হতে হবে। ভেঙে পড়লে চলবে না।
বেশ কয়েকদিন ধরেই সায়ন্তনী একটু কম কথা বলছে বাড়িতে। নির্দিষ্ট সময়ে হসপিটালে বেরিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু মুখটা যেন আষাঢ়ের প্রথম দিবসের মতোই থমথমে। কমলাদেবী স্বামীকে দু-কথা শোনালেও মেয়েকে একটু সমঝে চলেন। মেয়ে এমনিতেই একটু গম্ভীর প্রকৃতির। আর পাঁচটা অল্পবয়সি মেয়ের মতো উচ্ছল নয়। নিজের চারিদিকে যেন একটা বৃত্ত এঁকে রাখে, ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেই বৃত্তে প্রবেশের ক্ষমতা কারোর নেই।
যথারীতি উমাকান্তবাবুর তদারকিতে সকাল সকাল মুর্শিদাবাদের সেই ঐতিহ্যবাহী টেবিল ঢুকল কমলাদেবীর ড্রয়িংরুমের দক্ষিণ কোণে। সঙ্গে একটা অদ্ভুত দেখতে টেলিফোন। মুঠোফোনের যুগে এমন টেলিফোন কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। বেশ বড়সর একটা বক্সের আকারে কাঠের একটা ফোন। তাতে শীলনোড়ার মতো বড় একটা হ্যান্ডেল। ওটা কানে তুলে ফোন করতে হয়। দেখেই কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছিল কমলাদেবীর। ও বরাবরই একটু ছিমছাম মানুষ। হালকা, ফুলকা ফার্নিচার পছন্দ, কিন্তু কপাল করে এমন একটা মানুষকে নিয়ে ঘর করছে যে আবার এসব কিম্ভূত দর্শন জিনিস পছন্দ করে। ইদানীং বলে বলে হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
টেবিলের ওপরেই সেই বিকট দর্শন টেলিফোনটিও জায়গা পেল। উমাকান্তবাবু বেশ গর্বের সাথে বললেন, সম্ভবত কলকাতার প্রথম টেলিফোন বুঝলে গিন্নি! সালটা লেখা আছে দেখো গো।
এটাকে কানেক্ট করব বুঝলে বাড়িতে, ল্যান্ডফোনের একটা আলাদা গাম্ভীর্য আছে। কমলাদেবী মনে মনে হাসলেন। যে ল্যান্ডফোনটা উমাকান্ত জোর করে ড্রয়িংরুমে রেখে দিয়েছেন সেখানা দিনে একবারও বাজে কিনা তাই জানা নেই! সেইজন্য ওই ফোনটা যে জীবিত আছে সেটাই ভুলতে বসেছেন উনি। মিস্ত্রি ডাকা হল, ল্যান্ডফোনের স্টাইলিশ রিসিভারটা বদলে ওই কাঠের বক্স টাইপ রিসিভারটা রাখা হল। মিস্ত্রির সারাদিনের পরিশ্রমে যদিও বা ফোনটা জীবন ফিরে পেল তবুও তার রিংটোনটা কেমন যেন ভয়ানক। মনে হয় যেন কোনো মানুষের গলা চেপে ধরা রয়েছে, আর সে চেঁচাচ্ছে। এমনি খনখনে শব্দে বেজে উঠল সম্ভবত কলকাতার প্রথম টেলিফোন! বাড়িটা দিনদিন চিড়িয়াখানা হয়ে যাচ্ছে যেন।
মেয়েটা কেমন গম্ভীর, কারণ জিজ্ঞেস করলে বলে না। এদিকে বাবার সেদিকে হুঁস নেই, সে আছে এসব পুরোনো জিনিসের গন্ধে মেতে, কমলার হয়েছে যত জ্বালা।
সায়ন্তনী বাড়িতে ঢুকেই বলল, ও মাই গড, এতো হ্যামিলটন সাহেবের বাড়ির মতো ফোন। আমি একটা জার্নালে দেখেছিলাম, হ্যামিলটন সাহেবের বাড়িতে এমন একটা টেলিফোন ছিল। মেয়ের মুখে অনেকদিন পরে একটু হাসি দেখেই বোধহয় কমলাদেবী একটা টাওয়েল নিয়ে নতুন আসা টেবিল আর টেলিফোনটিকে একবার মুছে দিলেন।
সায়ন্তনী নিজের মোবাইল বের করে বাড়ির ল্যান্ড নম্বর ডায়াল করতেই খনখনে স্বরে বেজে উঠল ফোনটা।
সায়ন্তনী বলল, বেশ একটা অন্যরকম না বাবা সাউন্ডটা?
উমাকান্ত বললেন, আসলে কী বলত, ভিতরের কলকব্জায় বহুদিন তেল পড়েনি, তাই ক্যাচর ক্যাচর আওয়াজ হচ্ছে বুঝলি! দুদিন বাজুক তারপর দেখবি মিষ্টি আওয়াজ বেরোচ্ছে। তাছাড়া তারবিহীন অব্যবহৃত জিনিস হলে যা হয়। এখনও যে কানেক্ট করা গেছে এই ঢের হয়েছে।
টেবিলে হুবহু সিরাজের মুখায়বয় দেখে মেয়ে বেশ উল্লসিত হয়ে বলল, এটা সত্যি? মানে টেবিলটা ওই টাইমের ? নাকি পরে নকল করা হয়েছে বলতো?
উমাকান্তবাবু বললেন, জানিনা রে, তবে মনে হয় না লোকটা মিথ্যে বলছে। তাছাড়া বার্নিশের আগেই বোধহয় আঁকা হয়েছিল, নখ দিয়ে নয় কোনো ধারালো জিনিস দিয়ে হয়তো।
মনটা এমনিই কদিন ধরে বিষণ্ণ হয়ে আছে সায়ন্তনীর। ওর থেকে দু বছরের সিনিয়র আকাশ রায়ের সাথে ওর প্রেমটা হয়েছিল মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন। ওদের সম্পর্কে কোনো খাদ ছিল না। কিন্তু কদিন আগেই একটা খবর শুনে থেকে ওর মনটা খারাপ হয়েছিল। আকাশ নাকি একজন মৃতপ্রায় পেশেন্টকে অপারেশন টেবিলে না তুলে আগে পেমেন্ট ক্লিয়ার করতে বলেছে। সায়ন্তনীর আদর্শ ওর বাবা, বড়লোক পেশেন্টের কাছ থেকে যেমন বাবা সঠিক ফিজ নিয়েছে, তেমন গরিব রোগীকে অনেক সময় বিনামূল্যেও ট্রিটমেন্ট দিয়েছে। তাই ওর কাছে ডাক্তার শব্দের মানে একটা আদর্শ। সেখানে আকাশ এরকম করেছে শুনেই ভালোবাসা নামক অনুভূতিটা কঁকিয়ে কেঁদে উঠেছিল। এমন তো ছিল না আকাশ, হঠাৎ কী এমন হল যে ও এতটা পাল্টে গেল! তাও অন্যের কথা বিশ্বাস না করেই আকাশকে কল করেছিল সায়ন্তনী, আকাশ বেশ অহংকারের সাথেই বলেছে, শোনো সায়ন্তনী এই মুহূর্তে আমার যা ডিম্যান্ড তাতে এটুকু আমি ডিজার্ভ করি। আগাম পেমেন্ট না করলে আমি পেশেন্টকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাব না। এটা আমার নিজস্ব রুলস। আমি চুরি ডাকাতি তো করছি না, নিজের পরিশ্রমের অর্থ নিচ্ছি। সায়ন্তনী বলতে গিয়েছিল, তোমার এই দেরির জন্য যদি কোনো পেশেন্ট মারা যায় তখন কী করবে? আকাশ বলেছিল, সেটা আমার দায়িত্ব নয়, পেশেন্টপার্টি যদি দেরি করে পেমেন্ট করে, তাহলে তার রোগীর দায়িত্ব আমার নয়।
মনটা ভেঙে গিয়েছিল সায়ন্তনীর। নিজের আদর্শ আর ভালোবাসার মধ্যে চলছিল একটা মারাত্মক দ্বন্দ্ব। কাকে জেতাবে বুঝতে পারছিল না! আকাশের নামে ইদানীং বেশ কিছু ফিসফাস কানেও এসেছে ওর। একজন নার্সের সাথে নামও জড়িয়েছে ওর। যদিও সায়ন্তনী জানে, এসব পার্ট অফ হিজ জব। ভালো ডক্টর হলে তার নামে কিছু স্ক্যান্ডাল ছড়ায় অন্যরা। যদিও আকাশ বলেছে, চন্দ্রিমা একজন সিনসিয়র নার্স, তাই আমি ও.টিতে ওকে চাই। এমন সন্দেহবাতিক মন নিয়ে সায়ন্তনী কীভাবে ভালোবাসবে আকাশকে? আকাশের মুখটা ভার হয়েছিল সেদিন। সায়ন্তনীরও চোখের কোণে জলের রেখা ফুটেছিল। এটুকু বুঝেছিল, আকাশ আর যাই করুক ওকেই ভালোবাসে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল মধ্যরাত। এপাশ ওপাশ করেও ঘুম আসছিল না ওর। বারবার ওদের মেডিকেল পড়ার, প্রেমে পড়ার দিনগুলো মনে পড়ছিল ওর। কষ্টে বুকটা মুচড়ে উঠছিল যেন। আকাশ বোধহয় অভিমান করেছে ওর ওপরে। এতদিনের ভালোবাসাকে সন্দেহ করা একেবারেই অনুচিত হয়েছে। প্রফেসনালি ও হয়তো সায়ন্তনীর মতো নয়, কিন্তু ভালো তো বাসে। ওকে এভাবে সন্দেহ করাটা অত্যন্ত অন্যায় হয়েছে সায়ন্তনীর।
মোবাইলটা হাতে নিয়ে এই মাঝরাতেই ফোন করতে চেষ্টা করল আকাশকে। কিন্তু ওর ফোনের সিগন্যাল নেই। মহা মুশকিল, দুটো সিমেই নো সিগন্যাল দেখাচ্ছে।
এখুনি আকাশকে কল করে সরি বলতে হবে সায়ন্তনীকে। গোটা বাড়ি নিদ্রারত।
সিঁড়ি দিয়ে চুপিচুপি নেমে এল নীচের ড্রয়িংরুমে। বাবার কেনা বিশাল টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে নিল হাতে।
তখনকার দিনের মানুষের গায়ে বেশ শক্তি ছিল, নাহলে এই ফোন হাতে নিয়ে বেশিক্ষণ কথা বলা সত্যিই দুস্কর, একটু পরেই হাতে ব্যথা করবে নিশ্চিত। যদিও ফোনটা দেখতে ভারী সুন্দর। একটা গরিমা আছে এর সারা শরীরে।
ফোনটা তুলে আঙুল দিয়ে ডায়াল করল আকাশের নম্বরটা। শেষ ডিজিট ডায়াল করার আগেই কেউ একজন যেন কানের কাছে বলে উঠল, ভালোবাসা মানে প্রবঞ্চনা। সব ভুল, সবাই প্রবঞ্চনা করে।
সায়ন্তনী পিছন ফিরে তাকাল, ড্রয়িংরুমের নরম নীলচে আলোয় দেখতে পেল, ওর ধারে কাছে কেউ নেই।
আবার মন দিল ফোনে, আবারও একই স্বরে কেউ যেন কানের কাছে কেঁদে উঠে বলল, আমি তোমায় ভালোবাসি, আমায় ছেড়ে যেও না….
ভয়ে হাত, পা শিরশির করে উঠল সায়ন্তনীর। কেউ কোথাও নেই, ফোনটাও আকাশকে করা হয়নি এখনও, তাহলে কে বলছে এভাবে কথা! সায়ন্তনী ফোনটা রেখে দিল রিসিভারের হ্যান্ডেলে। আবার তুলে দেখল, যান্ত্রিক একটা শব্দ হচ্ছে যেমন হয়। আকাশের নম্বরটা যেমনি ডায়াল করতে গেল অমনি কেউ বলে উঠল, ভালোবাসা আপেক্ষিক, ভালোবাসা মায়াময়, ভালোবাসা প্রবঞ্চনা করে।
শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল সায়ন্তনীর। ফোনটা নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে ও চলে এল নিজের ঘরে।
সকালেও আড়চোখে বেশ কয়েকবার তাকাল ফোনটার দিকে। কিন্তু সাহস করে হাত দিল না, বাবা,মাকে কিছু না বলাই ভালো। হয়তো এই কদিন ধরে মনখারাপ আর ভুলভাল চিন্তার প্রতিফলন ওটা। আকাশকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই এমন সব চিন্তা মাথায় এসেছিল ওর। ডাক্তার হয়ে এসব অলৌকিক বিষয়ে তো বিশ্বাস করা যায় না!
হসপিটাল থেকে লাঞ্চ ব্রেকে কল করল আকাশকে। যথারীতি কেজো গলায় বলল, ও.টি.তে ঢুকছি, পরে কথা বলব। আকাশের গলার স্বরে কোনো নরম আবরণ নেই। প্রায় দিন সাতেক কথা হয়নি ওদের, তাতেও কোনো বিরহযন্ত্রণার লেশ মাত্র নেই। আগে কোনো কারণে দিন দুই কথা না হলেই আকাশ অভিমান করত, গলায় থাকত ভালোবাসা আর অভিমানের মিশেল। কখনো সায়ন্তনীর রাগ ভাঙানোর আদুরে প্রয়াস। আজ সেসব যেন কেমন উবে গেছে মনে হল, হয়তো কাজের প্রেসারে। অথবা সায়ন্তনীর বলা কথাতে একটু বেশিই আঘাত পেয়েছে। সম্পর্কটাকে ঠিক করতে হবে সায়ন্তনীকেই। তারপর ধীরে ধীরে বোঝাতে হবে আকাশকে, একজন ডাক্তারের প্রায়োরিটি কী হওয়া উচিত! ও ভুল করছে বোঝাতে হবে ওকে। ও বললে নিশ্চয়ই আকাশ শুনবে, নিজের ভালোবাসার ওপরে এটুকু বিশ্বাস সায়ন্তনীর আছে।
আজও অদ্ভুত ভাবে রাতে বাড়ি ফিরে ফোন করতে গিয়ে দেখল সিগন্যাল নেই ফোনে। এটা আবার নতুন উৎপাত শুরু হয়েছে। যেমনি নিজের রুমে ঢুকছে মোবাইলের সিগন্যাল ভোকাট্টা হয়ে যাচ্ছে, কিছুতেই ফিরছে না। ফোনটা যেন আচমকা ডেড হয়ে যাচ্ছে ওর।
ওই ফোনটার কথা মনে হতেই গাটা শিরশির করে উঠল ওর, কিন্তু কেমন যেন একটা সম্মোহনী নেশায় ও সিঁড়ি বেয়ে নেমে গেল ড্রয়িংরুমের ফোনটার সামনে।
অন্ধকারেও পিতলের ফলকে লেখা ১৮৮২ সালটা ঝকঝক করে উঠল। একটা লম্বা দণ্ডের ওপরে কাঠ আর পিতলের কাজ করা টেলিফোন। বাবা হয়তো ঠিকই বলেছে, ওই সময়ে কলকাতায় হাতে গুনে কয়েকজনের বাড়িতেই টেলিফোন নামক যন্ত্রটি ছিল। কী যেন বলা হত, দূরভাষ। টেলিফোনের নীচের দিকে একটা ড্রয়ার মতো জায়গা, ওখানে বোধহয় টেলিফোন ডিরেক্টরি রাখা হত। সায়ন্তনী নেশাগ্রস্তের মতো তুলে নিল ফোনটা। আবারও ফিসফিস করে কথা শুনতে পেল, বিশ্বাস করতে নেই, ওরা প্রবঞ্চক। ভালোবাসা প্রবঞ্চনা করে। শরৎবিহারী রোডের শুভেচ্ছা অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাট নম্বর টেন। কথা থেমে গেল, আবারও যান্ত্রিক আওয়াজ।
ড্রয়িংরুমের লাইটটা জ্বালাল সায়ন্তনী। ফোনটার সামনের চেয়ারে স্থির হয়ে বসল। ওর হাত, পা ঘামছে তবুও কিছুতেই ও পালিয়ে যেতে পারছে না টেলিফোনটার সামনে থেকে। পা দুটো যেন কেউ শক্ত করে ধরে রেখেছে। গলাটা শুকিয়ে কাঠ, একটা টুঁ শব্দ বেরোচ্ছে না সেখান থেকে। আচমকা টেলিফোনের নীচের ড্রয়ারটা খুলে ফেলল ও। বাবা বলছিল সেদিন নাকি মিস্ত্রিও অনেক চেষ্টা করে পারেনি নীচের এই ড্রয়ারটা খুলতে। সায়ন্তনী অনায়াসেই খুলে ফেলল ড্রয়ারটা। হাত ভরে দিতেই দেখল ভিতরে আরও একটা ছোট্ট খাপ রয়েছে, একটা কাগজের খাম বের করল ও সেখান থেকে। এত বছর আগের টেলিফোনের ড্রয়ার থেকে খাম পেয়ে একটু অবাকই লাগছে ওর। খামটা খুলতেই বেরিয়ে এল একটা সাদাকালো ছবি। ছবিটা প্রায় জ্বলে গেছে। তবুও যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে একটা মিষ্টি মেয়ের মুখ দেখা যাচ্ছে, পাশেই দাঁড়িয়ে আছে লম্বা ঝুলপির একটি ছেলে। মেয়েটার চোখে একরাশ লজ্জা, ছেলেটার ঠোঁটে চটুল হাসির রেখা, সরু গোঁফে ধূর্ততা স্পষ্ট।
খামের মধ্যে থেকে বেরোলো হলদে হয়ে যাওয়া কিছু চিঠি।
চিঠিটা সাধুভাষায় লেখা, যার সারমর্ম হল..
আমি চলে যাচ্ছি এ পৃথিবী ছেড়ে। তোমার অবহেলা আর বঞ্চনা সহ্যের ক্ষমতা ভগবান আমায় দেননি। আজ বুঝতে পারলাম, ভালোবাসার আরেক নাম প্রবঞ্চনা।
রাখী শুধু তোমাকেই পেতে চেয়েছিল আপন করে, আজ নিজের চোখে দেখলাম তোমার শয্যা সঙ্গিনীকে। বেঁচে থাকার সমস্ত ইচ্ছা আমার মৃত। স্বপ্নগুলোকে সঙ্গে নিয়েই চললাম। এই টেলিফোনে কত মধ্যরাতে কথা বলেছি তোমার সাথে, আকাশের তারারা যখন ঘুমিয়ে পড়েছে তখন স্বপ্ন সাজিয়েছি তোমার সাথে।
এই টেলিফোন আর কখনো কথা বলবে না, এর মজবুত তারটা একটু পরেই আমার গলায় জড়ানো থাকবে। কাল সকালে সবাই আবিষ্কার করবে আমার মৃত নিথর শরীর। আমার ব্যারিস্টার বাবাও কোনো আইনি ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনতে পারবে না আমাকে। ভালোবাসা আপেক্ষিক, ভালোবাসা প্রবঞ্চনাময়। সূর্যশেখর আমি চললাম।
আরও কিছু চিঠিতে সূর্যশেখর আর রাখীর ভালোবাসার গোপন কথা নথিবদ্ধ করা আছে।
সায়ন্তনী নিজেও খেয়াল করেনি কখন ওই অজানা রাখী নামক মহিলার জন্য ওর চোখ দুটো সজল হয়ে উঠেছিল।
চিঠিতে পড়ল ওর একফোঁটা জল। কেউ যেন পরম তৃপ্তি পেল।
ফোনটা কানে তুলে সায়ন্তনী বলল, বলো রাখী, কিছু বলতে চাও আমায়?
রাখী ফিসফিস করে বলল, শরৎ রোডে যাও, সব জানতে পারবে।
আমার ছবি আর চিঠিগুলো ফেলে দিও জলে।
সায়ন্তনী চিঠির খামটা নিয়ে উঠে গেল নিজের ঘরে। ঘামে ওর জামা ভিজে গেছে। এটা কি সত্যি! নাকি ওর দুর্বল মস্তিষ্কের কোনো কল্পনা। কিন্তু চিঠিগুলো তো সত্যি!
সম্ভবত ফোনটা যাদের বাড়িতে এসেছিল সেটা ১৮৮২ সাল হলেও রাখী ওই সময়ের মেয়ে নয়। ওর চিঠির কোণে লেখাও আছে ১৯৬২ সাল। হতেই পারে রাখীর কোনো পূর্বপুরুষের ছিল এই ফোনটা। অ্যান্টিক জিনিস বলেই হয়তো রয়ে গিয়েছিল ওদের বাড়িতে। হয়তো ওর মৃত্যুর পরে মালিক ফোনটা বিক্রি করে দেয়। কারণ এই টেলিফোনের তারেই সুইসাইড করেছিল রাখী।
রাখীর বলা অ্যাড্রেসে গেলে কী দেখবে সায়ন্তনী, কেন এসব বলল রাখী ওকে!
গা ছমছমে একটা ভয় কাজ করছিল ওর। কদিনের মধ্যেই যেন কীসব ঘটে গেল ওর জীবনে। সারারাত নির্ঘুম বসে থেকে ভোরবেলাতেই নিজের গাড়িটা নিয়ে বেরিয়ে গেল সায়ন্তনী, একা যাবে না আকাশকে সঙ্গে নেওয়া উচিত সেটাই ভাবতে ভাবতে গাড়িতে স্টার্ট দিল ও। কিন্তু সায়ন্তনী জানে আকাশ এসব কথাতে বিশ্বাস তো করবেই না বরং বলবে যত সব পাগলের কাণ্ড। তার থেকে একবার নিজেই ঘুরে আসুক তারপর নাহয় ডাকবে আকাশকে।
রাখীর বলে দেওয়া অ্যাড্রেসে পৌঁছে দেখল সত্যিই থার্ড ফ্লোরে দশ নম্বর বলে একটা ফ্ল্যাট আছে ওই কমপ্লেক্সে।
কোনো কিছু না ভেবেই একটা ঘোরের মধ্যে বেলটা প্রেস করল সায়ন্তনী। বার দুয়েক বাজানোর পরে ঘুম চোখে যে মানুষটা দরজা খুলল তাকে এখানে দেখবে কল্পনাও করতে পারেনি ও। আকাশদের বাড়িতে বার দুই গেছেও সায়ন্তনী। আকাশ আর ও একটা ফ্ল্যাটও বুক করেছিল ভবিষ্যতের জন্য, যদিও সেটা পেতে এখনও বছর খানেক দেরি আছে। কিন্তু এই ফ্ল্যাটটা কার? আকাশ এখানে কী করছে?
সায়ন্তনীকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল আকাশ। সায়ন্তনী ওকে ঠেলেই প্রায় জোর করে ঢুকে পড়ল ফ্ল্যাটের ভিতরে। বেডরুমে তখনও শুয়ে রয়েছে চন্দ্রিমা নামের মেয়েটা। সায়ন্তনী মেয়েটাকে দিন দুই দেখেছিল আগে।
আকাশ বলতে এসেছিল, ইটস এন অ্যাক্সিডেন্ট, আই রিয়েলি লাভ ইউ সায়ন্তনী। চন্দ্রিমাকে আমি বিয়ে করব না, বিশ্বাস করো।
সায়ন্তনী একটু হেসে বলল, কেন বিয়ে করবে না আকাশ? চন্দ্রিমা মিডিওকার ফ্যামিলির মেয়ে বলে? নাকি ডক্টর নয় বলে?
আমায় কেন বিয়ে করতে চাও, আমি বিখ্যাত ডক্টর উমাকান্ত চৌধুরীর মেয়ে বলে? নাকি আমি নিজে একজন ডক্টর বলে? আমাকে বিয়ে করলে বোধহয় তোমার স্ট্যাটাসটা ঠিকমতো মেন্টেইন হবে, তাই না?
আকাশ লোভ বড় বিষম বস্তু। মানুষকে বদলে দেয়। লোভ বোধহয় আমার চেনা সেই আকাশকে বদলে দিয়েছে।
ভেবেছিলাম MBBS পাশ করে MS করব। এখন ভাবনাটা বদলে ফেললাম, ভাবছি মানুষের মন পড়ার ডাক্তার হব। সাইক্রিয়াটিস্ট হবো। মুখোশ পরা মানুষগুলোর মনটাকে চিনতে চাই।
আকাশের সামনে থেকে চলে এলো সায়ন্তনী। আর একমুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছে না প্রবঞ্চকটার সামনে।
গাড়িটায় স্টার্ট দিতেই চোখে পড়ল রাখীর চিঠির খামটা।
রাখী বলেছিল জলে ফেলে দিতে। সায়ন্তনীর ইচ্ছে করছিল না চিঠিগুলো ফেলে দিতে। তাই আবারও টেলিফোনের নীচের গোপন ড্রয়ারে ভরে দিল চিঠিগুলো। রাখী থাকুক ওই ফোনের মধ্যেই। যখন খুব একলা লাগবে ওর তখন মধ্যরাতে গল্প করবে রাখীর সাথে। ভালোবাসায় প্রবঞ্চিত হওয়ার পরে কেন ও সুইসাইড করল, কেন সব ভুলে নিজেকে ভালোবাসতে পারল না জিজ্ঞেস করবে রাখীকে। রাখীকে দেখিয়ে দেবে, একজন চলে গেলেই নিজের মূল্যবান জীবনটা ব্যর্থ হয়ে যায় না। বাবার মতো স্বনামধন্য ডাক্তার হয়ে ও প্রমাণ করে দেবে, আঘাতও নিতে পারে সায়ন্তনী। রাখীর মতো হেরে যায় না।
রাখী টেলিফোনের ভিতর থেকে দেখুক জেতা কার নাম।
সায়ন্তনী নিজের ঘরে ঢুকে আকাশের যাবতীয় স্মৃতি ছিঁড়ে ফেলে দিল ডাস্টবিনে।
আজ থেকে আকাশ মৃত ওর কাছে।
মধ্যরাতে আবার ফোনটা কানে নিয়ে সায়ন্তনী বলল, থ্যাংক ইউ রাখী, তুমি আমার দৃষ্টি স্বচ্ছ করতে সাহায্য করেছ। তবে আমি তোমার মতো হেরে যাব না, পালিয়ে যাব না জীবন থেকে।
রাখী ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে বলল, জানো আমি মারা যাবার পরে আমার বাবা, মা, বোন সবাই খুব কেঁদেছিল আমি দেখেছিলাম। কিন্তু সূর্যশেখরের চোখে একটু জল দেখতে চেয়েছিলাম, পাইনি। তখন মনে হয়েছিল, ভুল করলাম, নিজের লোকদের ছেড়ে চলে গিয়ে বড্ড ভুল করলাম।
সায়ন্তনী বলল, রাখী তুমি আমার বন্ধু হবে?
রাখী ফিসফিস করে বলল, আমি মারা যাবার পরে ফোনটা আমার বাবা বিক্রি করে দিয়েছিল। এটা আমার দাদুর বাবার আমলের টেলিফোন। অনেক পুরোনো জিনিসের সাথে পড়েছিল ফোনটা একটা গোডাউনে।
কতদিন কারোর গলা শুনতে পাইনি। বন্ধু হব তোমার।
মা ওপরের বারান্দা থেকেই জোরে বলল, কিরে এত রাতে কার সাথে কথা বলছিস এখানে? নীচে কী করছিস?
মায়ের চোখে সন্দেহের ঘনঘটা দেখেই সায়ন্তনী চুপ করে গেল।
সায়ন্তনী ফোনটা রেখে দিয়ে বলল, আবার কাল কথা হবে, শুনব তোমার সব কথা। আর তুমি দেখবে আমার জেতার লড়াইটা। রাখী বলল, তুমি পারবে, নিশ্চয়ই পারবে। তুমি যে আমার মতো বোকা নও। রাখীর শেষ কথাটা কান্নার মতো শোনাল সায়ন্তনীর।
ধীর পায়ে নিজের ঘরে এসে বসল ও।
বইপত্র খুলে পড়াশোনায় মন দিল।
আকাশের মুখটা মাঝে মাঝেই দৃষ্টিপথে বাধা সৃষ্টি করেছিল, ঠিক তখনই নিজের মনটাকে শক্ত করে আবার শুরু করেছিল সায়ন্তনী। জিততে ওকে হবেই।
সায়ন্তনী খেয়ালও করেনি কখন যে বাবা ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, ডাক্তারদের আরও কঠিন হতে হয়, অল্পে ভেঙে পড়তে নেই। আমার বিশ্বাস, তুই আকাশকে ভুলে নিজের জীবনটা গড়ে নিতে পারবি।
সায়ন্তনী অবাক হয়ে তাকাল বাবার দিকে, বাবারা কী অন্তর্যামী হয়, নাকি সন্তানের সবটুকু কষ্ট টের পায় আগাম! বাবা ওর একটা হাত শক্ত করে ধরে বলল, প্রমাণ করে দে তুই উমাকান্ত চৌধুরীর মেয়ে, প্রমাণ করে দে ডাক্তারি একটা নোবেল প্রফেশন।
পরদিন সায়ন্তনী হসপিটালে ব্যস্ত ছিল সারাদিন। বাড়ি ফিরল তখন প্রায় এগারোটা। ড্রয়িংরুমে ঢুকেই চোখে পড়ল, ফোনটা নেই, তার মানে রাখী নেই?
সায়ন্তনী মাকে ডেকে বলল, বাবা কী ফোনটা অন্য কোনো ঘরে সিফট করেছে? বেশ তো ছিল এখানে।
মা নরম গলায় বলল, মেয়েটা যে বড় দুঃখী রে, আর কতদিন বন্ধ থাকবে এই ফোনের ভিতরে। সবগুলো চিঠি আমিও পড়েছি রে। ওর গলাটাও শুনেছি, তাই ভোরে গিয়ে গঙ্গায় ভাসিয়ে দিয়ে এলাম ওকে। আজ বাড়িতে একটা নারায়ণ পুজো দেব ভাবছি।
বহুদিন পরে খুব কাছের বন্ধু হারানোর বেদনা অনুভব করল সায়ন্তনী। বুকের বাঁদিকে সযত্নে জমিয়ে রাখল কষ্টটুকু। এই কষ্টটা ব্রেকআপের নয়, রাখীর মতো একজন দুঃখী মেয়ের জন্য। মনে মনে বলল, ভালোবাসা সবাইকে প্রবঞ্চনা করে না রাখী, বিশ্বাস হারিও না। পরজন্ম বলে যদি সত্যিই কিছু থাকে তাহলে তুমি নিশ্চয়ই নিষ্পাপ ভালোবাসা পাবে রাখী। যে ভালোবাসা হাসতে শেখায়, বিশ্বাস করতে শেখায়, ভরসা করতে শেখায়।
