Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    তবু অনন্ত জাগে – ইন্দ্রনীল সান্যাল

    July 25, 2026

    অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৩ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

    July 25, 2026

    বর্ষায় – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (গল্পগ্রন্থ)

    July 25, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    তবু অনন্ত জাগে – ইন্দ্রনীল সান্যাল

    ইন্দ্রনীল সান্যাল এক পাতা গল্প199 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    সব যে হয়ে গেল কালো

    ভাইফোঁটার দিন সীমান্ত খুব বোর হয়। সেন্টিনেলের মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের সিস্টাররা ফোঁটা দেয়। আইসিইউয়ের নমিতা, মণিদীপা আর অন্বেষা সিস্টার ফোঁটা দেয়। ফোঁটা দেয় আইসিইউ-এর দুই মেডিক্যাল অফিসার মঞ্জুলাদি আর শেলিদি। সবার প্লেট থেকে অন্তত একটা মিষ্টি না নিলে বোনেদের গোঁসা হবে। সিস্টার এবং ডাক্তার বোনেদের মিনিমাম এক হাজার টাকা করে না দিলে ইজ্জতে কেরোসিন। দিনের শেষে নিট লস হাজার দশেক টাকা। গেন হয় ক্যালরি, ওয়েট, অ্যাসিডিটি, বদহজম। অথচ সীমান্তর নিজের বোন নেই!

    ‘ইজ্জতে কেরোসিন’! এই শব্দবন্ধ মাথায় আসা মাত্র সীমান্তর মনে পড়ে গেল মায়ের আত্মহত্যার কথা। ঐশানী বেফাঁস মন্তব্য করে এত লজ্জা পেয়েছিল যে, বলার নয়। অদ্রীশ আর সীমান্ত মিলে বোঝানোর চেষ্টা করেছিল যে, ঐশানীর কমেন্টে তারা কিছু মনে করেনি। কিন্তু সে মেয়ে শুনলে তো! শুকনো মুখে গাড়িতে বসে রইল। সীমান্ত প্রতাপকে ফোন করে প্রাচী সিনেমা হলের সামনে আসতে বলেছিল। সার্পেন্টাইন লেনে অদ্রীশের বড় চারচাকা ঢুকবে না।

    রাত ১০টার সময় প্রতাপের হাতে ঐশানীকে গচ্ছিত করে তবে শান্তি। তাসের দেশ ফিরতে-ফিরতে রাত ১১টা। ডিনার সেরে শুতে রাত ১২টা। পরদিন ঘুম থেকে উঠে ‘ক্যালকাটা সিটিজেন’ খুলে চোখ কপালে উঠেছিল সীমান্তর। সাত কলাম জোড়া হেডলাইনের বাংলা অনুবাদ হল, ‘গুল্যা বারি সিনড্রোমে আক্রান্ত বাংলা সিনেমার এক নম্বর অভিনেত্রী।’

    সিসি নিউজ বুরোর প্রতিবেদন পড়ে সীমান্ত বুঝতে পেরেছিল, সে ছাড়াও এই খবরের পিছনে সেন্টিনেলের অন্য সূত্র আছে। নন্দিনীর স্পাইনাল ফ্লুইড ট্যাপের কথা সে ঐশানীকে বলেনি। সিসি সেই ফ্লুইডের রিপোর্টের প্রতিলিপি ছেপে দিয়েছে।

    ঐশানী বলেছিল সে ছাড়া আরও দু’জন সাংবাদিক নন্দিনীকে নিয়ে খবর করার জন্য সেন্টিনেলে ছিল। তাদের এফিশিয়েন্সিকে সাধুবাদ দিল সীমান্ত।

    কাগজ পড়তে-পড়তেই মোবাইলে ঝনঝন। পরিচিত রিংটোন বাজছিল। ‘যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে’। সীমান্তর মোবাইলে যত কনট্যাক্ট আছে, তাদের মধ্যে একজনের জন্য এই রিংটোন সেট করেছে। তার বস, কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়।

    “বলুন স্যার,” ফোন ধরে বলে সীমান্ত।

    “গুড মর্নিং সীমান্ত,” ওপার থেকে পরিশীলিত কণ্ঠস্বর শোনা যায়, “আজকের কাগজ দেখেছ?”

    “হ্যাঁ স্যার।”

    “ক্যালকাটা সিটিজেন ইজ্ ক্লোজেস্ট টু ট্রুথ। স্পাইনাল ট্যাপের কথা লিখেছে। কে বলেছে জান?”

    “কে স্যার?” মিনমিন করে সীমান্ত।

    “মঞ্জুলা। আবার কে? সার্জন বা পিআরও না হয়ে ওর গসিপ কলামনিস্ট হওয়া উচিত ছিল। আমি এখন অমল সরকারকে কী জবাবদিহি করব?”

    “আজ না হোক কাল, পাবলিক তো জানতই!”

    “বোকার মতো কথা বোলো না। পাবলিক জানুক গে। কিন্তু সেন্টিনেল থেকে কেন জানবে? এতে সেন্টিনেলের ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হচ্ছে। আমার ক্রেডিবিলিটি নষ্ট হচ্ছে। এনিওয়ে, বাই,” ফোন কেটে দিয়েছিলেন কৃতাস্ত।

    আজ, ভাইফোঁটার সকালবেলা, ডক্টর কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি যাচ্ছে সীমান্ত। প্রতি বছর কৃতান্তর ওম্যান ফ্রাইডে, রানি তাকে ভাইফোঁটা দেয়।

    সাগরঘেরা দ্বীপে নির্বাসনের সময়ে রবিনসন ক্রুসোর ২৪ ঘণ্টার সঙ্গী ছিল ম্যান ফ্রাইডে। কৃতান্তর সর্বক্ষণের সহায় রানি। রানির মুখে সীমান্ত শুনেছে, কৃতান্ত তাকে ১৬ বছর বয়সে রাস্তার ক্রসিং থেকে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। পড়াশোনা শিখিয়েছিলেন, রান্নাবান্না, ঘরের কাজ শিখিয়েছিলেন। এখন রানির বয়স ৪১। পুরুষালি চেহারা আর শ্যামলা রঙের কারণে বিয়ে হয়নি। রানি কিন্তু আশা ছাড়েনি। নিয়মিত পাড়ার বিউটি পার্লারে গিয়ে ফেশিয়াল আর আইব্রো করিয়ে আসে।

    পাড়া মানে নিমতলা, বার্নিং ঘাটের তিন-চারটে বাড়ি পরে দোতলা দাঁত বের করা যে-বাড়িটা দেখলে ভূতের বাড়ি মনে হয়, সেখানেই কৃতান্ত বসবাস করেন। বাড়ির নাম ‘নষ্টনীড়’।

    সীমান্তর সঙ্গে কৃতান্তর আলাপ তিন বছর আগে। মেডিসিনে এমডি করার পরে কার্ডিওলজিতে ডিএম করার জন্য এন্ট্রান্সে বসেছিল সীমান্ত, চান্স পায়নি। বাধ্য হয়ে তাসের দেশের একতলায় চেম্বার খুলেছিল। পাশাপাশি চলছিল কর্পোরেট হসপিটালে চাকরির খোঁজ।

    সেন্টিনেলের মেডিসিন ডিপার্টমেন্টে মেডিক্যাল অফিসার হওয়া কেরিয়ারের দিক থেকে ভাল সিদ্ধান্ত নয়। ওখানে কোনও ভবিষ্যৎ নেই। সীমান্ত রাজি হয়ে যায় চারটি কারণে। প্রথমত, সপ্তাহে পাঁচদিন, দিনে আটঘণ্টা কাজ করে একলাখ টাকা মাসমাইনে। দ্বিতীয়ত, এত হাই-এন্ড ইকুইপমেন্ট পূর্ব ভারতের আর কোনও প্রতিষ্ঠানে নেই। তিন, পূর্ব ভারত ও প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে আসা বিচিত্র রকমের রোগী দেখার অভিজ্ঞতা। যে-সমস্ত রোগের কথা মেডিসিনের টেক্সটবুকে একলাইন লেখা আছে, সেইসব বিরল অসুখে আক্রান্ত পেশেন্ট এখানে নিয়মিত আসে। এবং লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা। এইরকম পণ্ডিত মানুষ, এইরকম অহঙ্কারী চিকিৎসক, এইরকম মেসমেরাইজিং ব্যক্তিত্ব জীবনে দু’টি দেখেনি সীমান্ত। কৃতান্ত সেন্টিনেলের মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট এবং আইসিইউ-এর প্রধান

    ইন্টারভিউয়ের দিন সীমান্তর নাম শুনে কৃতান্ত বলেছিল, “আমাদের দু’জনের নামের শেষে ‘অন্ত’ মিল, ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। তোমার নামের মানে আমি জানি। আমার নামের মানে তুমি জান কি?”

    “জানি স্যার। কৃতান্ত মানে গড অফ ডেথ।”

    “ব্যস! আর কিছু বলতে হবে না। তুমি মেডিসিনে জয়েন করে যাও। আইসিইউতে আসতে হবে না।”

    সীমান্ত পরে জেনেছিল, কৃতান্ত মনে করেন, অধিকাংশ ডাক্তার গণ্ডমূর্খ হয়। পড়াশোনায় ভাল হলেও অন্যান্য বিষয়ে জ্ঞানশূন্য চিকিৎসক সম্প্রদায়কে সহ্য করতে পারেন না তিনি। আইসিইউ-এর দুই মেডিক্যাল অফিসার মঞ্জুলা আর শেলিকেও কৃতান্ত দু’চোখে দেখতে পারেন না। কিন্তু ওরাই আইসিইউ সামলায়।

    সীমান্ত সেই সংখ্যালঘুদের মধ্যে পড়ে, যাদের কৃতান্ত পছন্দ করেন। এবং ব্যক্তিগত জীবনে উঁকি দিতে দেন। ‘নষ্টনীড়’-এ বছরে একবার যায় সীমান্ত। এই ভাইফোঁটার দিন।

    কৃতান্ত বলেছেন, এই বাড়িতে শেষ মেরামতির কাজকর্ম হয়েছিল ৩০ বছর আগে। শেষ রঙের পোঁচ ৩০ বছর আগে। এই বাড়িতে আর কোনও দিন রিপেয়ারিং হবে না। কৃতান্ত উইল করে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানকে ‘নষ্টনীড়’ দান করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর এই বাড়ি ভেঙে নতুন বিল্ডিং বানাবে সেই প্রতিষ্ঠান।

    কলকাতা পুরসভা কেন নষ্টনীড়কে কনডেম্ড বিল্ডিং ডিক্লেয়ার করেনি, ঈশ্বরই জানেন। বাড়ির গায়ে বট আর অশ্বত্থ গাছ যেভাবে শেকড় ছড়িয়েছে, তাতে এটা বাড়ি, না ভূতের বাড়ি বোঝা দায়। ইট বের করা দেওয়ালজুড়ে শ্যাওলার আলপনা। ড্যাম্পের জন্য মেঝে সবসময় স্যাঁতস্যাত করে। বাইরের বারান্দায় কুকুর, বেড়াল আর কাকের সহাবস্থান। ছাদে পায়রার উৎপাত। ভিতরের ঘরগুলো রানির ঝাড়পোঁছের কারণে অপেক্ষাকৃত সাফসুতরো।

    কৃতান্তর ঘরটি বিরাট বড়। সেটা একইসঙ্গে বসার ঘর, শোওয়ার ঘর এবং খাবার ঘর। রানি পিছনদিকের ঘরে থাকে। রান্নাঘর ছাড়া বাকি ঘরগুলো তালাবন্ধ। মশা, মাছি, ইঁদুর, আরশোলা, ব্যাঙ, ছুঁচো, বেজি, সাপ — ‘নষ্টনীড়’-এ সব দেখেছে সীমান্ত। কোনও প্রজাপতি দেখেনি।

    কৃতান্তর ঘরে একটি মেহগনি কাঠের পালঙ্ক, একটি আরামকেদারা, একটি চেস্ট অফ ড্রয়ারস, একটি গোল ডাইনিং টেবিল ও একটি চেয়ার আছে। সব আসবাব একটি করে থাকলেও পোশাক রাখার আলমারির সংখ্যা তিন। কৃতান্ত শৌখিন মানুষ। কমপক্ষে ২৫ জোড়া সুট আছে। শু, বেল্ট আর টাই তো অগুন্তি।

    আশ্চর্যের বিষয়, কৃতান্তর সব সুটের রং কালো, সব শু এবং বেল্টের রং কালো। সব টাইয়ের রং মা কালীর জিভের মতো রক্তবর্ণ! শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা, কৃতান্তর ইউনিফর্ম হল কালো থ্রি পিস সুট ও লাল টাই। অন্য পোশাকে তাঁকে কখনও দেখেনি সীমান্ত।

    কৃতান্ত এমবিবিএস পাশ করেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ থেকে। মেডিসিনে এমডি, পিজি হাসপাতাল থেকে। মেডিসিনের পাশাপাশি ক্রিটিকাল কেয়ার নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। ৩০ বছর আগে কলকাতায় ক্রিটিকাল কেয়ার মেডিসিন সেভাবে ডেভেলপ করেনি। লোকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট আর ইনটেনসিভ কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিটের তফাত বুঝত না। ডাক্তারবাবুরা রোগীদের বাড়ির লোককে বলতেন, “৭২ ঘণ্টা না কাটলে কিছু বলা যাচ্ছে না,” ৭২ ঘণ্টার এই সময়সীমা কোন প্রতিভাবান ঠিক করেছিলেন, কে জানে!

    কৃতান্ত ছবিও আঁকেন। এখন স্ট্যান্ডে যে-ইজেলটি ঝুলছে, তাতে একটি শিশুর পেট ফাটিয়ে একটি গোসাপ বেরিয়ে আসছে। গোসাপের লকলকে জিভের জায়গায় নগ্ন এক নারী। বাচ্চার কান্না, গোসাপের ক্ষুধার্ত দৃষ্টি, মেয়েটির লাস্য—সব মিলিয়ে ছবিটি ভয় পাইয়ে দেওয়ার মতো! ছবিটা দেখে সীমান্তর মাথায় দুটো ইংরেজি শব্দ আসে, ‘বিজ়ার’! ‘ম্যাকাবার’! বাংলা করা যেতে পারে, অদ্ভুত বা বীভৎস। কৃতান্তর সব পেন্টিংই এইরকম। ইজেল থেকে চোখ সরিয়ে মেঝের দিকে তাকায় সীমান্ত। সেখানে আসন বিছিয়েছে রানি। আসনে লেখা রয়েছে ‘সুখে থাকো’। রানির সেলাইয়ের হাত খুব ভাল।

    সীমান্ত বাবু হয়ে বসল। রানি আজ খুব সেজেছে। ঘিয়ে রঙের শাড়িতে লাল পাড়। ঘটিহাতা লাল ব্লাউজ। কানে আর গলায় সিটি গোল্ডের গয়না। হাতে চুড়ি ঝমঝম করছে। আঙুলে আমেরিকান ডায়মন্ডের এক গাদা আংটি। চন্দনে অনামিকা ডুবিয়ে সীমান্তর কপালে ফোঁটা কেটে বলল, “ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা, যমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা। যমুনা দেয় যমকে ফোঁটা। আমি দিই আমার ভাইকে ফোঁটা, “ ধানদুবো দিয়ে আশীর্বাদ করে, মিষ্টির থালা সীমান্তর হাতে তুলে দিল। সীমান্ত খামে হাজার টাকা ভরে এনেছে। খাম রানির হাতে তুলে দিয়ে বলল, “তোমাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে।”

    “আমাকে রোজই সুন্দর লাগে,” লজ্জা-লজ্জা গলায় বলে রানি, “তুমি বছরে একদিন আসো। তাই ওরকম মনে হয়।”

    “রানি না হয় তার ভাইকে ফোঁটা দিল,” কৃতান্তর ব্যারিটোন কণ্ঠস্বর শোনা গেল, “কিন্তু এই যমুনা কে, যে যমকে ফোঁটা দেয়? কোনও ধারণা আছে সীমান্ত?”

    রানির রুচিবোধ প্রখর। সে জানে, সীমান্ত বেশি খায় না। থালায় একটি সন্দেশ ও একবাটি লাল দই রাখা রয়েছে। লাল দই খেতে সীমান্ত খুব ভালবাসে।

    সন্দেশ মুখে পুরে সীমান্ত ঘাড় নাড়ল, “জানি না স্যার। আমি জানতাম যমের বোনের নাম যমী। যমুনা নামে আর কোনও বোন ছিল নাকি?”

    রানি বোর হয়ে বলল, “আমি বাবা সহজ কথা বুঝি। যম, জামাই, ভাগনা— এ তিন নয় আপনা।”

    “সীমান্ত যাঁর জামাই হবে, তাঁর সীমান্তকে বিশ্বাস করা উচিত নয় বলছিস?” বাঁকা হাসে কৃতান্ত

    “অত প্যাঁচের কথা জানি না বাপু!” সীমান্তর গাল টিপে রানি বলে, “আজ আমি শারুক খানের বই দেখতে যাব। ফিরতে দেরি হবে!”

    কৃতান্ত ঘর থেকে বেরিয়ে বললেন, “আই উইল বি ব্যাক অ্যারাউন্ড ইলেভেন। তখন যেন বাড়ি ফাঁকা না থাকে।”

    কৃতান্তর একটা জেট-ব্ল্যাক এসইউভি আছে। ড্রাইভারের আসনে বসে সিটবেল্ট লাগিয়ে সীমান্তকে বললেন, “তুমি বাইক নিয়ে এসেছ?”

    “হ্যাঁ স্যার,” বাইক স্টার্ট করে সীমান্ত।

    “দু’চাকা এবার ছাড়ো,” পাওয়ার উইন্ডোর কাচ তুলে দিয়েছেন কৃতাস্ত। ‘নষ্টনীড়’ ছাড়িয়ে, নিমতলা ঘাট স্ট্রিট দিয়ে ঢিকির ঢিকির করে এগোচ্ছে গাড়ি। সীমান্ত টুক করে ওভারটেক করল। দু’চাকার মজা যদি চারচাকা-ওয়ালারা কোনও দিন বুঝত!

    সেন্টিনেলের বেসমেন্টে বাইক স্ট্যান্ড করে পাঁচতলায় ওঠে সীমান্ত। এসইউভি রেখে কৃতান্ত চলে আসেন সাততলায়। ডিপার্টমেন্টে ঢুকতে যাবেন, এমন সময় পিছন থেকে ডাক, “ডক্টর চট্টোপাধ্যায়!”

    থমকালেন কৃতান্ত। অমল সরকারের গলা।

    চওড়া হেসে নমস্কার করলেন কৃতান্ত। প্রতিনমস্কার জানিয়ে অমল বলে, “একটা দরকারি কথা ছিল…”

    অমল কী বলতে চায়, সেটা কৃতান্ত জানেন। বললেন, “আমি আপনাকে ভিতরে ডেকে নিচ্ছি। একটু বসুন।”

    “আচ্ছা…” ক্যাফের চেয়ারে বসে অমল। আইসিইউতে ঢোকেন কৃতান্ত।

    প্রথম কাজ ছেলেদের রেস্টরুমে গিয়ে পোশাক বদলানো। দ্বিতীয় কাজ ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধোওয়া। তৃতীয় কাজ মুখোশ, টুপি, দস্তানা ও চপ্পল পরা। এবার তিনি আইসিইউতে ঢুকতে পারেন। সেন্টিনেলের পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সিস্টার নমিতা, অন্বেষা আর মণিদীপা সাংঘাতিক পিটপিটে! আইসিইউর সিস্টার ইন চার্জ সিস্টার নমিতার বয়স ষাটের আশেপাশে। ফরসা, গোলগাল, ছোটখাটো। ডলপুতুলের মতো চেহারা। সোনালি সন্দেশ, কালাকাঁদ, পেস্তাবাদামের পায়েস হয়ে ওঠে দেবতাদের ভোগযোগ্য। কোনও দিন ভাবিইনি এসব খাবার এত ভাল লেগে যাবে আমার।

    এখানে আমি খুব বেশিক্ষণ একা থাকার সুযোগ পাই না। কোলাহলমুখর এই বাড়িতে সবাই শুয়ে পড়লে নির্জন সময়টা আসে রাত ১১টার পরে। কিন্তু এই পরিবেশ আমার ভারী ভাল লেগে গেল। একদিন চিত্রিতা ফোন করল, “কী খবর, নয়নিকা? কেমন লাগছে ওখানে?”

    “সাচ আ ডিফারেন্ট ওয়ার্ল্ড!” আমি বললাম।

    “কেমন লাগছে বলবি তো? জোর কালচারাল শক লেগেছে?”

    “একটু হয়তো লেগেছিল প্রথম-প্রথম! কিন্তু এখন আমার খুব ভাল লাগছে। সকলে আমাকে এত আপন করে নিয়েছে এখানে!”

    “আর তুই?”

    “আমিও খুব চেষ্টা করছি, টু বি ওয়ান অফ দিস বিগ ফ্যামিলি।”

    “ভাল। খুব ভাল খবর। টেক কেয়ার। মাঝে-মাঝে খবর দিস।”

    আমার সম্পূর্ণ অজানা এ এক নতুন, অপরিচিত জগৎ। আর এই নতুন জগৎ কিছুদিনের মধ্যেই কেন যে আমাকে এত টানল! ইন্দ্রর স্মৃতি একেবারে ধূসর হয়ে গেল! এই জগতে ইন্দ্র বেমানান। আর ইন্দ্রবিহীন এই জগৎ সব গ্লানি মুছে ফেলে শাস্তির প্রলেপ লাগিয়ে দিল আমার মনে। এত তাড়াতাড়ি এমনটা যে হবে, ভাবতেই পারিনি। আমার যেন নতুন জীবন আরম্ভ হল।

    দুপুরবেলা প্রায়ই দিদার সঙ্গে বেরই আমি। বাড়ির ড্রাইভার রামদাস খুব ভাল লোক। কত জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যায় আমাদের। আর দিদা আমাকে নিয়ে যায় সাধুদের আশ্রমে।

    “এখানে কেমন লাগছে নয়ন?” দিদা একদিন জিজ্ঞেস করল। আমরা তখন উড়ন খটোলায় চেপে মনসাদেবীর মন্দিরের দিকে চলেছি।

    “খুব ভাল লাগছে। কত শান্তি। কত রিল্যাক্সিং।”

    “ঠিক কথা। এত লোকজনের ভিড়ের মধ্যেও শান্তি তারাই খুঁজে পাবে, যারা তাদের মন অন্তর্মুখী করতে পারবে।”

    “অন্তর্মুখী!”

    “হ্যাঁ,” দিদা বলল, “মনের ভিতরে উঁকি দিয়ে যদি দেখতে চেষ্টা করো, সত্যি-সত্যিই কী চাও তুমি। কেন চাও। যেটা চাও, সেটা কি সকলের ভালর জন্য নাকি শুধু নিজের স্বার্থের জন্য? দেখো উত্তর পাবে তুমি। মনের বাইরে, এই পৃথিবীতে প্রতি মুহূর্তে কতশত ঘটনা ঘটে চলেছে। পরস্পরবিরোধী কত ভাবনা মনের মধ্যে তোলপাড় করে। সেই সব ভাবনার সংঘাত মনকে বিভ্রান্ত করে তোলে। আমরা ভুল করে বিপথে চলে যাই।

    “দিদা, আর ইউ টকিং অ্যাবাউট দ্য মায়া কনসেপ্ট?”

    … “না!” মুচকি হেসে বলল দিদা, “আমি তোমার কথা বলছি, নয়ন। এখানে যখন তুমি প্রথম এলে, তোমার মন ছিল অবসাদে আচ্ছন্ন। এবার সেই অবসাদকে বিশ্লেষণ করে দেখার সময়। তোমার জীবনের গন্তব্য আবার নতুন করে ঠিক করে নেওয়ার সময় এখন। সর্বদা নিজের কথা ভাবার সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করে দ্যাখো না, কী হয়!”

    দিদা যে এমন গভীরভাবে চিন্তা করে, জানতাম না। চুপ করে মনে – মনে দিদার শক্ত কথাগুলোর মানে বুঝতে সচেষ্ট হলাম। মনসা মন্দিরের চত্বরে এসে দিদা পুজোর জন্য লাড্ডু, ফুল, ধূপ, সিঁদুর, প্রদীপ ইত্যাদি কিনে, সবকিছু ঢেকে নিল শালের তলায়। চারদিকে বাঁদরের উৎপাত খুব। তাই পুজো দিতে যারা আসে, তারা ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে।

    আমার নামে সংকল্প করল দিদা। তারপর পুজোর শেষে আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল, “তোমার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা আছে, নয়ন। তাকে নষ্ট হয়ে যেতে দিয়ো না।”

    সত্যিই এ যেন আমার জানা পৃথিবীর বাইরে আর একটা অজানা প্ল্যানেট। নিঃস্বার্থ, অনায়াস ভালবাসার প্রলেপে আমার মনের ঘা শুকিয়ে যাচ্ছে, সায়কায়াট্রিস্টের ওষুধ ছাড়াই।

    “তোর হিন্দি শেখার কী হল?” আর একদিন লছমনঝুলার উপর হাঁটতে-হাঁটতে দিদা জিজ্ঞেস করল।

    “এখনও তো কিছুই হয়নি। মাস্টার খুঁজতে হবে একজন। অভ্রকে বলেছি (আমার ছোটমামির ছেলে অভ্র। ১৫ বছর বয়স। স্কুলে পড়ে)।”

    “তবেই হয়েছে। অভ্র খুঁজবে মাস্টার। অর্ককে বলব আমি।”

    সেদিনই রাতে খাবার টেবিলে অর্বুদা’কে দিদা বলল, “নয়নিকার জন্য একজন হিন্দির মাস্টারমশাই জোগাড় করো, অর্ক। খুব শিগগির।”

    অর্কদা আশ্চর্য হল, “হিন্দি শিখে কী হবে? এখানে তো আর চিরকাল থাকছে না ও।”

    “তা হোক। নয়ন নানা ভাষা শিখতে ভালবাসে। জানিস, ও ফ্রেঞ্চ, জাপানি, ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলতে পারে?” সগর্বে ঘোষণা করল আমার দিদা।

    অর্কদা আর কথা না বাড়িয়ে খাওয়ায় মন দিল।

    .

    দিদার সঙ্গে প্রায়ই আমি গঙ্গার পাড়ে যাই। সকালে, দুপুরে, গোধূলিবেলায়। বহুক্ষণ বসে থাকি ঘাটে, অভিভূত হয়ে। এখানকার গঙ্গা যে কী হেভেনলি। ছোটমামিমা বলে, “স্বর্গীয়।”

    তা একদিন, সন্ধে নেমে আসার পরই দেখি, কোর্ট থেকে বাড়ি ফিরে, অর্কদা মোটরবাইক নিয়ে বেরচ্ছে। আমি ছুটে গিয়ে বললাম, “কোথায় যাচ্ছ অর্কদা? আমাকেও সঙ্গে নাও।”

    “আমি যাচ্ছি গঙ্গায় আরতি দেখতে। বহুদিন যাই না, তাই ভাবলাম।”

    “গঙ্গায় আরতি! প্লিজ আমাকেও সঙ্গে নিয়ে চলো।”

    “যাবি?” অর্কদা ইতস্তত করল, “বড় ভিড় কিন্তু সেখানে। তুই আবার সুন্দরী, বিদেশিনী। তায় হিন্দি জানিস না।”

    “আই ডোন্ট কেয়ার। আর হিন্দি বুঝতে পারি আজকাল।”

    “তাই?” ও চোখ বড় বড় করে বলল, “চলো তা হলে, যাওয়া যাক।”

    একজোড়া চটি পায়ে গলিয়ে, লাল ফিরন পরে যেভাবে বাড়িতে ঘুরছিলাম, সেভাবেই অর্বুদা’র বাইকে চেপে বেরিয়ে পড়লাম। আমার যাবতীয় পোশাক স্ল্যাক্স, জিন্‌স, শার্ট, টপ, স্কার্ট, এখানে আসা অবধি সুটকেসে বন্ধ। ছোটমামিমা আমাকে কিনে দিয়েছে বেশ কিছু সালোয়ার, চুড়িদার আর কুর্তি এবং কাশ্মীরি কাজ করা ফিরন। সঙ্গে মানানসই ওড়না। আর বেশ কিছু বাহারি কসমেটিক জুয়েলারি। তাই পরে থাকি সব সময়ে। বড়মামিমা অবশ্য আমার জন্য কিনে রেখেছে খুব সুন্দর কয়েকটা শাড়ি। কৃষ্ণার বিয়েতে পরার কথা সেসব। আরও ছ’মাস পরে কৃষ্ণার বিয়ে। সেই বিয়ে না দেখে, আমার হরিদ্বার ছেড়ে কোথাও যাওয়ার প্রশ্নই নাকি ওঠে না। দিদা আর মামিমাদের কড়া হুকুম। আমারও অবশ্য কৌতূহল কম নয়, কৃষ্ণার অ্যারেঞ্জ করা বাঙালি বিয়ে দেখার। কখনও দেখিনি তো! আপাতত মেলবোর্ন ফিরে যাওয়ার তাগিদ আমার নেই। চাকরিতে লিভ উইদাউট পে নিয়েছি এক বছরের। তারপর দেখা যাবে।

    গঙ্গার পাড়ের উপর দিকেই বাঁধানো একটা সিঁড়ির উপর আমাকে বসিয়ে দিয়ে অর্কদা বলল, “তুই এখানে শান্তিতে বোস। এখান থেকে সব কিছু দারুণ দেখতে পাবি। আরতি শেষ হয়ে গেলেও চুপ করে বসে থাকবি, আমি তোকে নিতে না আসা পর্যন্ত। বুঝলি?”

    আমি মাথা নেড়ে বললাম, “তুমি কোথায় যাচ্ছ?”

    ও ডান হাত তুলে ঘাটের উলটো দিক দেখিয়ে বলল, “ওইধারে পুরোহিতরা বড়-বড় প্রদীপ আর ঘণ্টা নিয়ে আরতি করবে। আমি ওখানেই যাচ্ছি। কিন্তু ওখানে খুব ভিড়। তুই এখানেই বোস,” বলে ও চলে গেল।

    সূর্য ততক্ষণে পুরোপুরি অস্তাচলে। সন্ধে নেমে এসে কালো আঁচল দিয়ে ঢেকে দিল গঙ্গার চারপাশ। মাথার উপরে, তারাভরা আকাশে ঝলমল করছে চাঁদ। আমার লাল ফিরনের মায়া ত্যাগ করে, একটা সিঁড়ি বেছে নিয়ে বসে পড়লাম। ধীরে-ধীরে চতুর্দিকে নানা বয়সের পুরুষ, মহিলা আর ছেলেমেয়ের ভিড় জমতে লাগল। এরা প্রায় সকলেই ঘাট থেকে কিনে নিয়েছে একটা করে সবুজ পাতার সাজি। সেই সাজিতে আছে ফল, একটা ফুলের মালা, ধূপকাঠি আর মাটির প্রদীপ। ছোট- ছোট মাটির ভাঁড় থেকে দুধ ঢেলে দিচ্ছে মেয়েরা গঙ্গার জলে।

    একটু পরে গঙ্গার কোলে ভেসে চলল সাজির উপর জ্বলতে থাকা সারি-সারি প্রদীপ, ধূপকাঠি আর ফুলের মালা। ঘাটের খুব কাছে প্রতিষ্ঠিত মন্দিরগুলো থেকে ভেসে এল শাঁখ আর কাঁসরঘণ্টার ধ্বনি। আকাশ-বাতাস মথিত করে উচ্চারিত হল, সমবেত ভক্তদের প্রার্থনা, “জয় গঙ্গা মাঈ কী জয়।” ধ্বনিত হল পুরুতঠাকুরদের ভজন, “জয় গঙ্গে মাতা…”

    ঈশ্বরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমি চিরদিন উদাসীন। বিশেষ কোনও ধর্মেও বিশ্বাসী নই। কিন্তু টের পাচ্ছি ইদানীং দিদা এবং পরিবেশের যৌথ প্রভাবে, আমার মনে ছড়িয়ে পড়ছে প্রচ্ছন্ন অধ্যাত্মবোধ। এক সময়ে আরতি শেষ হল। ভজন গানের অন্তিম রেশও ধীরে-ধীরে মিলিয়ে গেল। সম্মোহিতের মতো, জ্যোৎস্না-ঝলমলে আলোয়, জনস্রোতের মধ্যে মিশে গিয়ে ধাক্কা খেতে-খেতে, সিঁড়িগুলো বেয়ে তরতরিয়ে আমি নেমে চললাম নদীর দিকে, গঙ্গার শীতল জলকে একবার স্পর্শ করব বলে। হঠাৎ পিছন থেকে কে একজন আমাকে গুঁতো মেরে এগিয়ে গেল। টাল সামলাতে না পেরে আমি ছিটকে পড়লাম ঘাটের শেষ সিঁড়ির উপর। ভীষণ পিছল সিঁড়িটা আর ওদিকে প্রবল হাওয়ার পিঠে ভর করা অদম্য জল-স্রোতের ধাক্কা। মনে হচ্ছিল, নদীতে ছিটকে পড়ে ভেসে চলে যাব এখনই। ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললাম আর আচমকাই ইন্দ্র ভেসে এল দু’চোখের পাতায়। ঠিক সেই সংকট মুহূর্তে, “আরে, কহাঁ যা রহি হ্যায়ঁ আপ?” বলতে-বলতে পিছন থেকে দু’হাত বাড়িয়ে একজন আমাকে জাপটে ধরল। শক সামলে, একটু ধাতস্থ হয়ে দেখি দীর্ঘকায় এক যুবক, দু’ হাত দিয়ে আমাকে উপর দিকে টেনে-টেনে তুলছে সিঁড়ির প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করিয়ে।

    এক সময়ে উপরে উঠে এসে চত্বরে দাঁড়ালাম আমরা। দারুণ অপ্রস্তুত আমি তখন। ফিরনটা ভিজে জবজবে হয়ে গায়ে লেপটে আছে আর ওড়নাটা বোধ করি, এতক্ষণের মা গঙ্গার কোলে ভাসতে ভাসতে চলে গিয়েছে অনেক দূর।

    আমাকে এক মিনিট ধরে আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করে অপরিচিত মানুষটা বলল, “খুদকুশি কা ইরাদা থা কেয়া ম্যাডাম?”

    আমি অধোবদনে মাটির দিকে চেয়ে রইলাম। ও অবাক হয়ে বলল, “কহাঁ রহতি হ্যায়ঁ আপ?”

    মাথা নাড়লাম আমি।

    “কুছ তো কহিয়ে,” একটু বিরক্ত হয়ে বলল সে।

    আমি চুপচাপ ঘাড় নাড়লাম আবার।

    “হিন্দি নহিঁ সমঝতি আপ? এ তো আচ্ছা মুশকিল! শুধু মাথা নেড়ে যাচ্ছে তখন থেকে!

    এবার নিজের মনেই হিন্দি আর বাংলা মিশিয়ে বলল মানুষটা। আমি উত্তর দিতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ কোথা থেকে অর্কদা হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে এসে দাঁড়াল আমাদের দু’জনের মাঝখানে। বলল, “তুই এখানে কী করে চলে এলি? তোকে বলেছিলাম…” বলতে-বলতে সহসা আমার মুখোমুখি দাঁড়ানো লোকটার দিকে চোখ পড়ল ওর। বিস্মিত হয়ে বলল, “আরে সুরজ, তু কহাঁ সে আ টপকা?”

    সুরজ হতভম্বের মতো চেয়ে, বাংলায় বলল, “এঁকে চেনো নাকি?”

    “চিনি। এ আমার বোন। নয়নিকা।”

    “হিন্দি জানেন না বুঝি? নতুন এসেছেন এখানে?”

    “হিন্দি বুঝতে পারে, কিন্তু,” বলে আমার দিকে তাকাল অর্কদা।

    “উনি গঙ্গায় ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলেন। আমি বাদ সেধে, ধরে এখানে নিয়ে এলাম,” অতি গম্ভীরভাবে সুরজ নামের লোকটি বলল। বাংলা বলে বটে, কিন্তু সুরজের বাংলায় খুব হিন্দির টান। শুনতে অদ্ভুত লাগে।

    এক মিনিটের জন্য খুব বিচলিত দেখাল অর্কদাকে। সুরজের দুই হাত চেপে ধরে বলল, “বাব্বা! কী ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম আমি! এখনই পুলিশের কাছে ছুটতে হত। তুই বাঁচিয়ে দিলি আমাকে, দোস্ত!”

    তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “আর নয়ন, তুই কী বলে সিঁড়ি ছেড়ে জলের দিকে যাচ্ছিলি? জানিস, গঙ্গার কী ভয়ঙ্কর কারেন্ট এখানে? উফ, আমি ভাবতেই পারছি না কী হয়ে যেতে পারত আজ, সুরজ ওখানে না থাকলে! তোকে ছাড়া আজ বাড়ি গিয়ে কী মুখ দেখাতাম আমি?”

    “রিল্যাক্স,” আমি হাসার চেষ্টা করলাম, “এখন তো সব আন্ডার কন্ট্রোল নাকি?”

    “ভগবানকে অনেক ধন্যবাদ তার জন্য, সুরজকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন,” অর্কদা হাঁপ ছেড়ে বাঁচল, “আর যদি কোনও দিন তোকে নিয়ে বেরিয়েছি।”

    আমরা তিনজনে অতঃপর রাস্তার দিকে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। অর্কদা আবার বলল, “সুরজ, তোকে তো বেশ কিছুদিন দেখিনি। ছবি তুলতে টুরে বেরিয়েছিলি নাকি?”

    “দার্জিলিং গিয়েছিলাম। টাইগার হিলের কাছে ছিলাম ক’দিন। তারপর গেলাম সিকিম, ভুটান।”

    “বাহ। এগজিবিশন দিচ্ছিস কবে আর একটা?

    “দেখি,” হাঁটতে-হাঁটতে আনমনে বলল সুরজ, “ও সব ইলাকায় মামুলি লোকজনের সঙ্গতে কিছুদিন কাটাবার মওকাও পেলাম।”

    “তোর কী কপাল রে সুরজ! দিব্যি বোহেমিয়ান জীবন কাটাচ্ছিস,” দীর্ঘশ্বাস চেপে বলল অর্কদা, “আর আমাকে দ্যাখ, রুজি-রুটির চক্করে ছুটে চলেছি কেমন! এর থেকে আর ছুটকারা নেই রে।”

    “এর পর তুই ব্যাহ্ করবি, ভাবী আসবে, বাচ্চা হবে। সংসার সমুন্দরে ডুবে যাবি। তোর আর নিস্তার নেই সত্যিই,” বলে হাসল সুরজ।

    “সেসব তো তোরও হবে রে ব্যাটা। তখন?”

    “এখনই তো বললি, আমি বোহেমিয়ান জীবন কাটাচ্ছি? বোহেমিয়ানদের কোনও বন্ধন থাকে না। আমি বিবি-বাচ্চার জালে ফাঁসব না। এমনই থেকে যাব হমেশা, মস্ত, আওয়ারা।”

    “দেখব তোর কত বুকের জোর! আমরা দু’জনেই তো থাকব এখানে,” বলে মুচকি হাসল অর্কদা।

    আমরা বাইকস্ট্যান্ডে এসে পড়লাম। অর্কদা তার বাইকটা টেনে নিয়ে বলল, “চলি রে, সুরজ। ফির মুলাকাত হোগি।” এগোতে এগোতে কী যেন মনে পড়ে গেল ওর, ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “সুরজ, কাল-পরশু একদিন আমাদের বাড়ি আসিস। আসিস কিন্তু। ঠাম্মা তোর সঙ্গে কথা বলতে চায়।”

    “জরুর,” বলে থমকে দাঁড়াল সুরজ। আমাদের বাইক ওকে পিছনে রেখে দ্রুত এগিয়ে গেল।

    পরদিন সকালে দিদা যখন পুজোর ঘরে বসে গীতা পড়ছে আর আমাকে মানে বোঝাচ্ছে, সুরজ এসে হাজির। আমি দিদার মুখোমুখি বসেছিলাম, হঠাৎ ওকে দেখে উঠে দাঁড়ালাম।

    “দাদিজি, আপনি ডেকেছিলেন?” হাত জোড় করে নমস্কার করল সুরজ।

    “আরে সুরজ, তুমি এসেছ!” দিদার মুখখানা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠল, “বোসো-বোসো, ওই আসনে বোসো,” হাত তুলে সামনে পাতা আসনটা ওকে দেখাল দিদা।

    ধীরে-সুস্থে আসনে বসল সুরজ। আমি খুব কাছ থেকে আজ ভাল করে দেখলাম ওকে। খুব লম্বা, দোহারা চেহারা, মাজা রং, কাটা-কাটা মুখ আর স্বপ্নে-ভরা মায়াবী দুই বিশাল চোখ। সুরজ শুধু হ্যান্ডসামই নয়, ব্যক্তিত্বসম্পন্নও বটে। কালো ট্রাউজার্স, সাদা শার্ট পরা, কপালে লম্বা রক্তবর্ণ তিলক আঁকা সুরজকে দেখলে, মনে সম্ভ্রম জেগে ওঠা বিচিত্র নয়।

    আমার দিকে তাকিয়ে দিদা বলল, “নয়ন, তুই এখানে আর একটা আসন নিয়ে বোস।” সুরজকে বলল, “এ নয়নিকা, আমার নাতনি। অস্ট্রেলিয়া থেকে বেড়াতে এসেছে মামাবাড়ি।” দুই হাত জোড় করে আমাকে নমস্কার করল সুরজ। তারপর দিদার দিকে চেয়ে বলল, “ওঁর সঙ্গে পরিচয় হয়েছে গঙ্গাজির ঘাটে। অর্বুদা সঙ্গে ছিল।”

    “ওহ! পরিচয় হয়েছে,” বিস্মিত হয়ে বলল দিদা, “কই আমাকে তো কিছুই বলেনি কেউ!” এক মিনিট ভেবে দিদা বলল, “সুরজ, তুই নয়নকে হিন্দি শেখাতে পারবি বেটা?”

    “হিন্দি!” আশ্চর্য হয়ে নয়নিকার দিকে একবার চাইল সুরজ। তারপর দিদার দিকে ফিরে বলল, “কেন দাদিজি?”

    “কেন আবার কী রে! ও শিখতে চায়, তাই। তুই তো প্রাইভেট টিউশন করিসই। ওকেও একটু পড়িয়ে যেতিস সপ্তাহে দু’তিন দিন।”

    “দেখি,” বলে ইতস্তত করে আমাকে বলল সুরজ, “সত্যি আপনি হিন্দি শিখতে চান?”

    “হুঁ,” ঘাড় নেড়ে বললাম।

    “ঠিক আছে। এসে যাব আমি সময় বের করে। বইখাতা তৈয়ার রাখবেন।”

    “কী বই?”

    “হিন্দির বই,” বলে আবার হাসল সুরজ, “ঠিক আছে। বই আমি নিয়ে আসব। আপনি শুধু কাগজ কলমটা জোগাড় করে রাখবেন।”

    সুরজ চলে যাওয়ার পর দিদা আমাকে বলল, “তোর আর অর্কর সঙ্গে গঙ্গাঘাটে সুরজের দেখা হয়েছিল বলিসনি তো?”

    “কী আর বলব! সে বেশ লজ্জার ব্যাপার।”

    অগত্যা দিদাকে আমার জলে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটা বলতেই হল। সব শুনেটুনে খুব হাসল দিদা। বলল, “তা তোরা ভাইবোনে পুরো ব্যাপারটা চেপেই গেলি আমাদের কাছে?”

    তারপর একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “দ্যাখ নয়ন, এখানে কিন্তু তুই বিদেশিনী। বুঝেসুঝে চলতে হবে। আমার কাছে কোনও কথা লুকোবি না।”

    আমি নীরবে ঘাড় নাড়লাম। আমার সঙ্গে ইন্দ্রর ঘটে যাওয়া ব্যাপারটা ভেবেই কি দিদা এই সব বলল? ইন্দ্রর নামটা মনে আসতেই আনমনা হয়ে গেলাম ক্ষণেকের জন্য। ইন্দ্র যেন আমার গত জন্মের পরিচিত কেউ, আমার এখানকার জীবনে যার কোনও রেলেভেন্স নেই। আশ্চর্য লাগে ভাবতে যে, কী করে এত তাড়াতাড়ি ওকে ভুলে গেলাম!

    দেখলাম, সুরজ আমার মামিদের খুব প্রিয়। দু’জনেই ওর প্রশংসায় পঞ্চমুখ। ছেলেটা নাকি অবশ্যই বাউন্ডুলে, কিন্তু খুব পরোপকারী। পড়াশোনাও করেছে যথেষ্ট। দিল্লি ইউনিভার্সিটির ফিজিক্সে পিএইচডি। সেখান থেকে ওকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল, ওদের ফিজিক্স ফ্যাকাল্টিতে অধ্যাপক হিসেবে যোগ দিতে। ও নাকি কিছুতেই হরিদ্বার ছেড়ে যেতে রাজি হয়নি। এখানে শিবালিক পাবলিক স্কুলে ফিজিক্স আর ম্যাস পড়ায়। এ ছাড়া, ফোটোগ্রাফি হল সুরজের আর এক নেশা। ফাঁক পেলেই ক্যামেরা কাঁধে বেরিয়ে পড়ে ফোটোগ্রাফিক অভিযানে। খুব অবস্থাপন্ন বাড়ির ছেলে ও। দুই দাদা উচ্চশিক্ষিত, উচ্চপদস্থ অফিসার এবং বিয়ে করে সংসারী। তবে সংসারের দিকে সুরজের নাকি মন নেই। কোথায় কে বিপদে পড়েছে, কে অসুস্থ অথচ চিকিৎসা হচ্ছে না, অর্থাভাবে কাকে পড়াশোনা ছাড়তে হচ্ছে, যৌতুকের অভাবে কার বিয়ে আটকে যাচ্ছে…সকলের সাহায্যে দলবল নিয়ে ছুটে গিয়ে দাঁড়ায় সুরজ।

    পরের সপ্তাহে, সোমবার সন্ধে সাতটা নাগাদ হঠাৎ সুজাতা ছুটে এসে খবর দিল, “নয়নদিদি, সুরজভাইয়া এসেছে। তোমাকে ডাকছে।”

    আমি অবাক হয়ে বললাম, “কে সুরজ? আমাকে কেন ডাকছে?”

    সুজাতা আরও অবাক হয়ে বলল, “বা রে, সুরজভাইয়া যে বলল, তোমাকে হিন্দি পড়াতে এসেছে। ঠাম্মা বলেছে তাকে? তুমি কিচ্ছু জান না?”

    আহ! তাই তো! হিন্দি শেখা, সুরজ…বেমালুম ভুলে বসেছিলাম! খাতাও তো জোগাড় করে রাখিনি একটা।

    “চলো জলদি চলো। ও টিউশন রুমে বসে আছে তোমার জন্য।”

    অগত্যা সুজাতার কাছ থেকেই একটা কলম আর খাতা নিয়ে ছুটলাম। আমাকে দেখেই চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে, দু’ হাত তুলে নমস্কার করল ড. সুরজ মিত্র। আমার হিন্দি চর্চা এভাবেই আরম্ভ হল।

    দিনটা ছিল রবিবার। ভোর সাতটায় বিছানা ছাড়ার তোড়জোড় করছি। হঠাৎ একটা গানের কয়েকটা লাইন, করুণ সুরের প্রবাহে ভেসে এল আমার কানে, ‘সখি, ভাবনা কাহারে বলে, সখি, যাতনা কাহারে বলে…’

    কৃষ্ণা খুব সুন্দর গান গায়। ছোটবেলা থেকে গান শেখে আর নিয়মিত চর্চাও করে। অনেক গান শুনেছি ওর, মোস্টলি বলিউডি, জ্যাজ়। কিন্তু এই গানটা একেবারে আলাদা। মর্মস্পর্শী সুরে গাওয়া গানের ক’টা কথা এসে আমার বুকে ধাক্কা দিল।

    খানিক পরে খাবার টেবিলে কৃষ্ণাকে ধরলাম, “আজ ভোরে কী গান গাইছিলি কৃষ্ণা?”

    ‘কেন, কী গান?” ততক্ষণে ও ভুলে গিয়েছে। বাড়িতে প্রায় সারাক্ষণই খেয়ালখুশিতে যে গান গেয়ে বেড়ায় নিজের মনে, তার পক্ষে প্রতিটি গানের ট্যালি রাখা কঠিন।

    “ওই যে, সখি ভাবনা…”

    “ওহ!” কৃষ্ণা হেসে ফেলল, “সে তো একটা রবীন্দ্রসংগীত।”

    “আর একবার গানটা গাইবি কৃষ্ণা, প্লিজ? বড় সুন্দর সুর।”

    “ঠিক আছে, চলো আমার ঘরে। সেখানে হারমোনিয়ম আছে।”

    সেদিন কৃষ্ণার গাওয়া সেই গানের সুরের সঙ্গে কথাগুলো আমার মনে হয়তো গাঁথা থাকবে, যতদিন আমি বেঁচে থাকব। মেলবোর্নে ইন্দ্র আমাকে মানসিক রোগগ্রস্ত বলে ছুড়ে ফেলে, চলে যাওয়ার পর কতদিন ভেবেছি ভালবাসার ডেফিনিশন কী?

    আজ এই গানের মধ্যে ভালবাসার অর্থ, নিজের মতো করে, আমি খুঁজে পেলাম। আর ভালবাসার সেই যাতনাময় মানসিক অবস্থা থেকে মুক্ত হয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছি, ভেবে মনে-মনে অশেষ সান্ত্বনা পেলাম। কৃষ্ণার সঙ্গে গলা মিলিয়ে, আমারও গেয়ে উঠতে ইচ্ছে করল

    …আমার মতোন সুখী কে আছে।
    আয় সখি, আয়, আমার কাছে—
    সুখী হৃদয়ের সুখের গান
    শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ…

    কৃষ্ণা আমাকে গানটা শিখিয়ে দিল কয়েক দিনের মধ্যেই। ওর মতো সুন্দরভাবে গাইতে না পারি, একান্তে নিজেকে মাঝে-মাঝে গেয়ে শোনাব বলেই, মোটামুটি রপ্ত করে নিলাম গানটা। মজার কথা, বাড়ির সব্বাইকে লুকিয়ে কৃষ্ণাকে একদিন গানটা শোনাতে ও বলল, আমার এগজ়ামিনার হলে ও আমাকে নাকি সেভেন্টি পার্সেন্ট নম্বর দিত! তিরিশ পার্সেন্ট অবশ্য ওকে কেটে নিতেই হত আমার বিচিত্র অ্যাকসেন্টের জন্য। কিন্তু কৃষ্ণা আমার পিঠ ঠুকে বলেছিল, “ভেরি গুড এফর্ট।”

    হিন্দি ভাষাটা দ্রুত আওতার মধ্যে এনে ফেলছিলাম। আমার সমবয়সি গুরুমশাইটি বেশ ইমপ্রেসড মনে হল। সুরজ আমাকে ফ্রি- তে পড়াচ্ছিল। দিদার অনেক পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও রাজি হয়নি ফি নিতে। ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’তে নেমে আসতে বেশি দেরি হয়নি আমাদের।

    একদিন ও হঠাৎ বলল, “নয়না, তুমি আমাকে গুরুদক্ষিণা দাও না!”

    “কী গুরুদক্ষিণা?” আমি চমকে উঠলাম।

    “গুরুদক্ষিণা ব্যাপারটা বোঝো তো?” ও পালটা প্রশ্ন করল।

    “খুব বুঝি। আমি দিদার ফুলটাইম স্টুডেন্ট হয়ে, ভারতীয় মিথোলজির অনেক কিছু শিখে ফেলেছি।”

    “ওকে।” হেসে বলল ও, “এখানে বছরখানেক আগে একটি চ্যারিটি স্কুল খোলা হয়েছে এই শহরের ধনী আর দয়ালু মানুষদের মেহেরবানিতে। ছোট মেয়েদের প্রাইমারি স্কুল। সেখানে তুমি ইংলিশ পড়াবে?”

    “কিন্তু আমি তো এখানে সবসময় থাকব না সুরজ। আর মাত্র ছ’টা মাস বা বড়জোর এক বছর। তারপর তো বাড়ি ফিরে যাব।”

    “যদ্দিন আছ ততদিন?” সুরজের গলায় মিনতি, “ধরে নাও, সেটাই হবে তোমার কাছ থেকে আমার গুরুদক্ষিণা।”

    “ঠিক আছে। তা হলে আমি যতদিন এখানে আছি, তোমার স্কুলের মেয়েদের না হয় ইংলিশ পড়াব।”

    “রোজ আসবে তো?”

    “এখান থেকে কত দূর তোমাদের স্কুল?”

    “ছয় মাইল মতো। সাইকেল চালাতে পার তুমি?”

    “পারি।”

    “বাহ! ফার্স্টক্লাস!” উৎফুল্ল হয়ে বলল সুরজ, “তোমাকে একটা লেডিজ সাইকেলের বন্দোবস্ত করে দেব আমি। রাজি?”

    “দিদাকে জিজ্ঞেস করে কাল বলি?”

    “ওকে।”

    সন্ধেবেলা দিদার কাছে কথাটা পাড়লাম। মামিমারাও বসে ছিল দিদার ঘরেই।

    “সাইকেলে চেপে, ছ’মাইল ঠেঙিয়ে রোজ তুই স্কুলে পড়াতে যাবি?” চোখ কপালে তুলে বলল দিদা।

    “না নয়ন, কখনওই না। তবে একটা গাড়ির ব্যবস্থা করা যেতেই পারে তোমার জন্য। রোজ তোমাকে পৌঁছে দেবে, আবার ক্লাস হয়ে গেলে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে আসবে,” বড়মামি বলল।

    “আমাকে এত প্রোটেক্ট করে রাখছ কেন তোমরা?” ক্ষুব্ধ হয়ে বললাম, “আমি যথেষ্ট ইন্ডিপেনডেন্ট। কত জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি একা-একা।”

    “কিন্তু এখানে যে তুমি আমাদের কৃষ্ণা আর সুজাতার মতোই এবাড়ির মেয়ে,” বড়মামি আবার বলল, “ওদের জন্য যে নিয়ম, তোমার জন্যেও তাই।”

    “ঠিকই তো,” ছোটমামি যোগ দিল, “তুমি জান না, নয়ন, এখানে মেয়েদের স্বাধীনভাবে চলাফেরায় অনেক বিপদ।”

    এর পর আর কথা বাড়ালাম না। কয়েকদিন পর থেকে সকালে ব্রেকফাস্ট ছেড়ে এবাড়ির লাঞ্চগ্রুপে আমিও যোগ দিলাম। বেরবার সময়ে আমার হাতেও একটা টিফিনবক্স ধরিয়ে দিতে ছোটমামির কোনওদিন ভুল হত না।

    স্কুলের নাম গায়ত্রীদেবী বিদ্যালয়। বিকেল তিনটে নাগাদ দিনের শেষ ক্লাসটা সেরে আমি বাড়ি ফিরি। স্কুলে মেয়েদের বয়স ছয়-সাত থেকে ১৫-১৬ পর্যন্ত। ওরা বেশিরভাগই খুব গরিব বাড়ির। ওদের বাবা-মায়েরা রিকশাওয়ালা, মুটে-মজুর, বাড়ির রান্নার বা কাজের লোক অথবা হকার, ফুচকাওয়ালা, ফল, ফুল, তরিতরকারি বিক্রেতা। এই মেয়েদের না দেখলে, কখনও আমি জানতেই পারতাম না যে, এই শহরে কত মানুষ বস্তিতে থাকে এবং চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে।

    স্কুলের মেয়েদের অনেকেই অর্ধভুক্ত। রোগা লিকলিকে হাত-পা। ক্ষীণাঙ্গী। ওদের দেখলে, আমার প্রায়ই মনে পড়ে যায় মেলবোর্নের মার্টিনির কথা। মার্টিনি ছিল আমার বন্ধু মারিয়ার ১৬ বছরের বোন। ছোটবেলায় ওকে অনেকবার দেখেছি। সুন্দর, তরতাজা মেয়ে ছিল মার্টিনি। ইউনিভার্সিটিতে যখন মারিয়া আর আমি একসঙ্গে পড়ি, একদিন মারিয়া ক্লাস পালিয়ে যেতে-যেতে বলল, “আই নিড টু মেক শিয়োর মার্টিনি মেকস ইট টু দ্য সাইকোথেরাপিস্ট দিস আফটারনুন।”

    “হোয়াই? হোয়াটস রং?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

    “শি হ্যাজ় বিকাম অ্যানরেক্সিক।”

    বছর দুয়েক পর মার্টিনি মারা গেল। স্রেফ অনাহারে! ওর জীবনের শেষ বছর দেড়েক নাকি মার্টিনি সারাদিনে দু’টি করে আপেল খেয়ে থাকত, মোটা হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে। মৃত্যুর মাসখানেক আগে মার্টিনিকে একবার দেখতে গিয়েছিলাম আমি। ওকে দেখে মনে হয়েছিল, যেন চামড়ায় জড়ানো অস্থিসার একটি কঙ্কাল। অথচ মার্টিনি বলেছিল, আয়নার সামনে দাঁড়াতে নাকি ওর খুব লজ্জা করে। এতটাই মোটা নাকি ও! আমার সেই ধনী দেশের মেয়েরা মারা যায় স্বেচ্ছারোপিত আহারবিমুখতার কারণে। আর এখানে, অনাহারক্লিষ্ট মেয়েরা শুধু দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের জন্য হাহাকার করতে-করতে মরে! বিধাতার কী পরিহাস!

    গায়ত্রীদেবী স্কুলে দুপুরের লাঞ্চ আর টিফিনের স্ন্যাক্স মেয়েদের জন্য একটি বিশেষ আকর্ষণ। সুরজ আর তার বন্ধুরা নাকি ওদের বাবা-মায়েদেরও জীবিকা নির্বাহের নানা ব্যাপারে সাহায্য করে, যাতে মেয়েদের স্কুলে আসাটা বন্ধ না হয়ে যায়। মেয়েদের জুতো-জামা, বইখাতা যাবতীয় চাহিদা মেটাবার ভারও সুরজদেরই। নিম্ন শ্রেণির এইসব বাচ্চাদের অনেকেরই দেখলাম, পড়াশোনায় খুব আগ্রহ। ইংলিশ পড়া- লেখা এবং ছড়া-পদ্য মুখস্থ করে ক্লাসে আবৃত্তি করায় দারুণ উৎসাহ। রোগাপটকা এই মেয়েদের কী ঝকঝকে চোখ আর নির্মল হাসি।

    এর পর একদিন সুরজ আমাকে হিন্দি পড়াতে এসে একগাল হেসে বলল, “কেমন চলছে অংরেজি ক্লাস? খুশ তো হ্যায়ঁ না আপ?”

    “বহত খুশ হুঁ,” বললাম, “বাচ্চারা যতটা এনজয় করছে, আমি এনজয় করছি তার চেয়ে অনেক বেশি।”

    “কেন?”

    “এভাবে ওদের সঙ্গে মেলামেশা না করলে, কোনওদিন বুঝতেই পারতাম না যে, কত অল্পেই বাচ্চাদের খুশি করা যায়। টেরই পেতাম না কখনও যে, জীবনে মস্ত বাড়ি, গাড়ি, বিলাসিতা না থাকলেও সুখী হওয়া যায়, আনন্দে থাকা যায়।”

    একটু ভেবে সুরজ বলল, “আর একটা কথা জেনে রেখো নয়না, সুখী হতে হলে, শান্তিতে থাকতে হলে, আমাদের বড়সড় ইগোকে জলাঞ্জলি দেওয়া দরকার সবসে পহলে।”

    মাঝে-মাঝে খুব চিন্তাশীল হয়ে যায় সুরজ। তখন ওকে দেখলে মনে হয়, আমার, আমাদের সকলের নাগালের বাইরের মানুষ ও। শুনেছি হৃষীকেশের কোনও এক সাধুবাবার কাছে দীক্ষা নিয়েছে সুরজ। হয়তো বা সেই কারণেই সুরজকে অনেক সময়ে একজন যোগীর মতো মনে হয় আমার। নিরাসক্ত, ডিটাচ্‌ড়, গেরুয়াবিহীন এক যোগী। কিন্তু আমি কি ছাই কোনও দিন পারব, আমার মস্ত ইগোকে ছুড়ে ফেলে, চ্যারিটি স্কুলের ওই মেয়েদের বা তাদের বস্তিবাসী বাবা-মায়েদের সঙ্গে এক লেভেলে চলে আসতে? আমি, নয়নিকা মুখোপাধ্যায়, উচ্চশিক্ষিত, অতি ধনী বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে। এই হরিদ্বারে এক সম্ভ্রান্ত, প্রতিপত্তিশালী পরিবারের আদরের নাতনি। আমার পক্ষে অহং ত্যাগ করা! জাস্ট অসম্ভব!

    “কী অত ভাবছিস নয়ন?” চমকে উঠে দেখি টিউশন ঘরের দরজায় ছোটমামি দাঁড়িয়ে, সকৌতুকে আমাকে দেখছে।

    “সুরজের কথা ভাবছি। মাঝে-মাঝে তোমাদের সুরজকে ভারী রহস্যময় লাগে আমার।”

    “আমাদের সুরজ রহস্যময়, সন্দেহ নেই। মাঝে-মাঝে দুঃখ হয় যখন ভাবি যে, অত সুন্দর ছেলেটা, অত ধনী বাড়ির, বিদ্বান ছেলেটা, বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। একেবারে ছন্নছাড়া।”

    কৃষ্ণা কখন মামির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, খেয়াল করিনি। টের পেলাম হঠাৎ ওর আলটপকা মন্তব্যে, “নয়নদি, তুমি আর যাই করো, সুরজভাইয়ার প্রেমে পড়ে যেয়ো না। আফত হয়ে যাবে তা হলে।”

    “আফত! কেন?”

    “ডিসগাস্টিং।” এলবিডির বাক্স নিয়ে চেয়ার ছাড়ে ঐশানী। বাবাকে সাত হাজার টাকা মিটিয়ে স্নানে যেতে হবে। কাগজ পড়া থামিয়ে মালিনী বলে, “এলবিডিটা ভালই হয়েছে। তবে পার্টি ছাড়া পরা যাবে না।”

    “আমি এটা পরে তোমাদের সঙ্গে দুর্গাঠাকুর দেখতে বেরব না মা।” ঠান্ডা গলায় বলে ঐশানী। তার মেজাজ ক্রমশ গরম হচ্ছে, “সীমান্তর সঙ্গে নিউ ইয়ার্স ইভ-এর পার্টিতে যাব বলে কিনেছি।”

    “সীমান্তর সঙ্গে!” রান্না করতে-করতে হেঁচকি তুলল ভোলাদা।

    ঐশানী আর পারল না। রাগে ফেটে গিয়ে বলল, “সব্বার যখন আপত্তি, তা হলে আমি এটা পরে সীমান্তর সঙ্গে পার্টিতে যাব না। আজ এটা পরে অফিস যাব। তোমরা বসো। আমি রেডি হয়ে আসছি।”

    প্রতাপ তড়াক করে চেয়ার থেকে উঠে মালিনীর শোওয়ার ঘরে সেঁধিয়েছে। ভোলাদাও রান্নাবান্না মুলতুবি রেখে বারান্দায় ভাগলবা। দৃশ্যটা দেখে মজা পেল ঐশানী। দীর্ঘদিন বাদে প্রতাপকে মায়ের বেডরুমে ঢুকতে দেখল।

    মালিনী কাগজ রেখে ড্যামেজ কনট্রোলের চেষ্টা করছে। ঐশানীকে বলল, “বাজারকার্ট থেকে কতগুলো লং স্কার্ট কিনে ফেল, নন্দিনী যেমন পরেছিল।”

    নন্দিনীর প্রসঙ্গ ওঠায় খেলাঘরের পরিবেশ নিমেষে বদলে গেল। প্রিয় অভিনেত্রীর জন্য শোক তো আছেই। পাশাপাশি মালিনীর মনে পড়ে গেল ঐশানীর বাইলাইনের কথা।

    নন্দিনীর মৃত্যুর আগের দু’দিন এক্সক্লুসিভ খবরের সঙ্গে ঐশানীর নাম গিয়েছিল। এক্সক্লুসিভ তো বটেই! কোনও বাংলা বা ইংরেজি খবরের কাগজ যে-নিউজ় দিতে পারেনি, সেই খবর দিয়েছিল ক্যালকাটা সিটিজ়েন।

    নন্দিনী সরকার গুল্যা বারি সিনড্রোমে আক্রান্ত এবং কিছু ক্ষেত্রে এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে, এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পরে প্রিন্ট এবং অডিও-ভিশুয়াল দুই মিডিয়া জগৎই নড়ে গিয়েছিল। সেন্টিনেলের সামনে একাধিক ওবি ভ্যান আর জনাচল্লিশেক সাংবাদিক সবসময় মজুত থাকত। আশেপাশের বহুতলের ছাদ থেকে সেন্টিনেলের সাততলার জানালায় ক্যামেরা ফোকাস করে শিকারি বিড়ালের মতো অপেক্ষা করত চিত্রসাংবাদিকরা। সবার সব পরিশ্রম জলে দিয়ে দ্বিতীয় দিনও এক্সক্লুসিভ খবর করেছিল ক্যালকাটা সিটিজ়েনের ঐশানী। হেডলাইন ছিল, ‘নন্দিনী ইন ভেন্টিলেটর’।

    মূল খবরের পাশে চমৎকার হিউম্যান স্টোরি লিখেছিল লিমা। সায়নদেব, তীর্থঙ্কর, ভানুপ্রতাপ আর কুমার উদয়নের নন্দিনীকে নিয়ে কনসার্ন সেই স্টোরির ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছিল। স্বামী অমল সরকার কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন, এই বাক্য দিয়ে স্টোরি শেষ হয়েছিল।

    পরবর্তী কয়েকদিন ক্যালকাটা সিটিজ়েনের বিক্রি তুঙ্গে। তরুণকে আলাদা করে ডেকে ঐশানীর প্রশংসা করেছেন পিবি। ঐশানী তাই শুনে মনে-মনে আহ্লাদে আটখানা হলেও টর্চার চেম্বারের মিটিংয়ে বলেছিল, “শুকনো প্রশংসা ধুয়ে জল খাব নাকি? ইনসেনটিভ দাও।”

    সেসব পাওয়া যায়নি। উলটে অফিসে লিমার সঙ্গে পেশাদারি শত্রুতা বেড়ে গিয়েছে। লিমা আরও পরিশ্রমী হয়েছে। ক্রমাগত নতুন স্টোরি করছে। ঐশানী বরং কাজের ব্যাপারে একটু ঢিলে হয়েছে।

    এলবিডির বাক্স নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল ঐশানী। স্নান করতে যাওয়া যাক। আজ অফিস যাওয়ার সময়ে জোরে-জোরে হাঁটতে হবে। কালকের গেন করা ক্যালরি আজই বার্ন করতে হবে।

    নন্দিনীর মৃত্যুর পরের দিনের স্টোরি ছিল, আইসিইউ-এর প্রধান চিকিৎসক কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ। তরুণ কাজটা ঐশানীকে দিয়েছিল। সে কায়দা করে লিমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়। নিজে নেয় সিস্টার নমিতা, ডক্টর শেলি আর অমল সরকারের ইন্টারভিউয়ের দায়িত্ব।

    স্নান সেরে পোশাক পরে খাবার টেবিলে বসেছে ঐশানী। প্রতাপ আড়চোখে ঐশানীকে মেপে নিয়ে বলল, “আজ আগে বেরচ্ছিস?”

    “কাজ আছে,” ফ্ল্যাক্সসিড মুখে পুরে বলে ঐশানী। ভোলাদা কিচেন থেকে চেঁচিয়ে বলে, “এই চেহারা নিয়ে ওই কালো গামছাটা পরে বেরলে লোকে শাঁকচুন্নি বলবে।”

    “বলুক!” খাওয়া শেষ করেছে ঐশানী। ন্যাপস্যাক কাঁধে নিয়ে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমেছে। নেবুতলা পার্কে একদল বাচ্চা ক্রিকেট খেলছে। দ্রুত সরু গলিতে ঢুকে পড়ে ঐশানী। উত্তর কলকাতার এইসব আইকনিক গলি না দেখলে বিশ্বাস হয় না। এদিক থেকে হাততালি দিতে-দিতে এগোয় ঐশানী। যাতে ওদিক থেকে কেউ না আসে। গলি এত সরু যে, দু’জন মানুষ একে অপরকে ওভারটেক করতে পারবে না। ঐশানীর মতো সরু মানুষও না। এই গলি দিয়ে স্থানীয় মানুষ চলাফেরা করে। তারা হাততালির নিয়ম জানে। নতুন লোকজন এইসব গলতায় ঢোকে না।

    ঘামতে ঘামতে অফিসে পৌঁছে বাথরুমে ঢুকল ঐশানী। গায়ে ডিও ছড়িয়ে নিজের সিটে বসল। লিমা ফাইল খুলে ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ পড়ছে। ঐশানীকে এক ঝলক দেখে বলল, “ভাল আছিস?”

    এ আবার কী প্রশ্ন। লিমা কখনও ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট করে না। ঐশানী লিমার ছক বোঝার চেষ্টা করে।

    ঐশানী কিছু বলার আগেই টেবিলের ফোন ঝনঝন করে উঠল। ঐশানী ব্যাজার মুখে বলল, “টর্চার চেম্বার থেকে ডাক পড়েছে। চল, ঝাড় খেয়ে আসি।”

    তরুণ ল্যান্ডফোনে কথা বলছে। লিমা আর ঐশানীকে ইশারায় বসতে বলে ফোনে বলল, “দেখুন উৎপলবাবু, ভোটের আগে জনাদেশ পার্টি যা যা প্রমিস করেছিল, মোহনপুরের ব্লকগুলোয় তার একটাও পুরণ করেনি। হ্যাঁ, আমি জানি যে, লজিস্টিক্সের প্রবলেম আছে। নদীর উপরে ব্রিজ নেই বলে চালের লরি যেতে পারছে না। বাট দ্য ট্রুথ ইজ, সেই সুযোগে বনপার্টি আবার ঢুকছে। হ্যাঁ, আমি প্রুফ ছাড়া খবর ছাপি না। জনাদেশ পার্টি ক্যালকাটা সিটিজেনের বিরুদ্ধে মামলা করতেই পারে, ইউ হ্যাভ গট এভরি রাইট টু ড্র সো। কিন্তু পরে নাকে কাঁদলে চলবে না। ইন ফ্যাক্ট, আমাদের এই কনভার্সেশনটাও রেকর্ড হচ্ছে।”

    শেষের ব্যাপারটা নির্জলা মিথ্যে। এই ফোনালাপ আদৌ রেকর্ড করা হচ্ছে না। কিন্তু এতে কাজ হল। উৎপল বসুমল্লিক ফোন ছেড়েছে। রিসিভার ক্রেড়লে রেখে উৎপলের উদ্দেশে চার অক্ষরের গালাগাল দিয়ে তরুণ বলল, “চা, না কফি?”

    “কোনওটাই না,” লিমা আর ঐশানী একসঙ্গে বলে।

    “লিমা, তোর ফিডব্যাক ভালই,” বলল তরুণ। ঐশানী ভুরু কুঁচকোল। আজকের ক্যালকাটা সিটিজ়েন সে এখনও পড়েনি। এটা ঘোরতর অন্যায়। আজ সকালে মা কী একটা জিজ্ঞাসা করছিল না? এলবিডি নিয়ে চ্যাঁচামেচির কারণে প্রসঙ্গটা মাথা থেকে একদম উড়ে গেছে।

    “তোর কেমন লাগল?” ঐশানীকে প্রশ্ন করেছে তরুণ।

    এখন ঐশানী বুঝতে পারছে লিমার ‘ভাল আছিস?’ সম্ভাষণের কারণ! কাল কোনও ইম্পর্ট্যান্ট স্টোরি করেছিল ও। ঐশানীর এমন কপাল, পাশের কিউবিকূলে বসে সেটা জানতে পারেনি। আজ পড়েও উঠতে পারেনি।

    তরুণকে মিথ্যে বলে লাভ হয় না। ঐশানী বলল, “আমি পড়িনি।”

    একচুমুক কোলা খেয়ে তরুণ প্রশ্ন করে, “শুধু সিসি পড়িসনি? নাকি কোনও কাগজ পড়িসনি?”

    “না… মানে হয়ে ওঠেনি!”

    “গতকাল?”

    ঐশানী মনে করার চেষ্টা করে সে শেষ কবে কাগজ পড়েছে। তরুণ আবার কোলায় চুমুক দিয়ে বলল, “হোয়াট্স রং উইদ ইউ?” ঐশানী চুপ।

    “‘প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়া’ নিয়ে লিমার স্টোরিটা এক্ষুনি পড়। কোমায় চলে যাওয়া পেশেন্টদের পিছনে অকারণ অর্থব্যয় ও পরিশ্রম এড়াতে অনেক সময় রোগীর বাড়ির লোক এবং ডাক্তার মিলে এই চুক্তি করে। এটা লিগ্যাল। সকাল থেকে অজস্র ফোন আর মেল আসছে। কেউ-কেউ এর বিরোধিতা করছে। কেউ জানতে চাইছে সরকারি হাসপাতালে এটা হয় কিনা। লিমা হ্যাজ ডান আ গ্রেট জব। আর তুই পড়িসনি! তুই একটা আস্ত…”

    শেষ শব্দটা কাঁচা খিস্তি। কিন্তু ঐশানী এখন সেক্সুয়ালি হ্যারাড ফিল করছে না। ইনসিকিয়োর ফিল করছে। চাকরির ক্ষেত্রে এইরকম গা-ছাড়া ভাব দেখালে তরুণ তাকে ইনএফিশিয়েন্ট বলবে। ঐশানী বলল, “পার্সোনাল কারণে ক’দিন একটু ডিস্টার্বড ছিলাম। আর হবে না।”

    “আই কেয়ার আ ড্যাম অ্যাবাউট তোর পার্সোনাল কারণ। নন্দিনীকে নিয়ে দুটো স্টোরি করে ল্যাজ মোটা হয়ে গিয়েছে?” চিৎকার করে ওঠে তরুণ। ঐশানী নিশ্চিত, সারা ফ্লোর এই চিৎকার শুনতে পাচ্ছে। “অফিসটা কাজ করার জায়গা। ধাষ্টামো করার নয়। হেল্থ বিট দু’জনকে কেন মাইনে দিয়ে পুষবে, যদি একজনেই কাজ তুলে দেয়? এক্সপ্লেন ইট টু মি।”

    ঐশানী চুপ। তার এবার রাগ হচ্ছে। তরুণ শিষ্টতার সীমা ছাড়াচ্ছে। “গত ক’দিনে তুই কী লিখেছিস? উপবাসের সুফল। ফালতু। সরকারি হাসপাতালে বিরল অপারেশন। ফালতু। ডাক্তার ও ফার্মা কোম্পানির আঁতাত। ট্রিপল ফালতু। আমাদের রিডাররা এসব জানে। নতুন স্টোরি কই?”

    লিমা এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল। এবার বলল, “আমি উঠি?”

    “কেন?” মুহূর্তের মধ্যে তরুণের চোখ লিমার দিকে, “তুই কোন লাটের বাঁট যে, ঐশানী যখন ঝাড় খাবে তখন তুই টর্চার চেম্বারের বাইরে থাকবি? কী প্রমাণ করতে চাস? তুমি পারফর্মার, তাই তো?”

    “নাথিং লাইক দ্যাট, আমার কাজ আছে।”

    “লুক লিমা! সবার কাজ আছে। গতকাল ভাল স্টোরি করেছিস বলে ভাবিস না যে, আগামিকাল পার পেয়ে যাবি। ইনসিডেন্টের কী অবস্থা?”

    “এখান থেকে না বেরলে ফোন করব কী করে?” ঠান্ডা গলায় বলে লিমা।

    তরুণ বলে, “কৃতান্তকে নিয়ে স্টোরিটা কদ্দুর?”

    তরুণের দিকে চোখের ইশারা করে লিমা। তরুণ চুপ করে যায়। বার্গারে কামড় মেরে ঐশানীকে বলে, “নন্দিনীকে নিয়ে স্টোরির এখনও ডিম্যান্ড আছে। ওর হসপিটাল স্টে-র শেষ কয়েকটা দিন রিকনস্ট্রাক্ট করতে হবে। দিন ধরে-ধরে, ঘণ্টা ধরে-ধরে।”

    “দেখছি,” সংক্ষিপ্ত উত্তর ঐশানীর।

    তরুণ বলল, “তোরা যা। এইরকম বকাবকি যেন আগামী একমাস করতে না হয়। আর, লাঞ্চের সময় চলে আসিস। শ্রিম্প ইন লেমন হানি খাওয়াব।”

    এইটা তরুণের কায়দা। যখন তিরস্কার করবে, সারা ফ্লোর জানবে। যখন পুরস্কার দেবে, সেটাও সবাই জানবে। লাঞ্চ আওয়ারে টর্চার চেম্বারে ঢোকা মানে বসের সুনজরে থাকা। ঐশানী খাওয়ার ব্যাপারে রুটিনের বাইরে যায় না। প্লাস গতকাল চিট ডে ছিল। আজ অন্য কিছু দাঁতে কাটার প্রশ্নই নেই। দুই সহকর্মী টর্চার চেম্বার থেকে বেরল।

    ভিতরে ঢুকছে টালিগঞ্জ বিটের অত্রি। বসের হুঙ্কার শুনে বেচারি ঘাবড়ে আছে। অলরেডি দরদর করে ঘামছে।

    সিটে বসে লিমা ঐশানীকে বলল, “কালকের স্টোরিটা পড়ে নে। ব্রেন ডেথ নিয়ে নানা ইন্টারেস্টিং কথা আছে।”

    ঐশানী নিজের চেয়ার থেকে উঠল। লাইব্রেরি থেকে ফাইল নিয়ে গত ক’দিনের সিসি উলটোতে হবে।

    একঘণ্টা কাগজ পড়ে মাথা ঠান্ডা হল ঐশানীর। কোনও সন্দেহ নেই যে, ‘প্যাসিভ ইউথ্যানেসিয়া’ নিয়ে লিমা দুর্দান্ত লিখেছে। কাগজ পড়া শেষ করে নিজের সিটে ফিরেছে সে। বস বলেছে নন্দিনীর মৃত্যুর আগের কয়েকটা দিন নিয়ে স্টোরি করতে। সেটার কাজ শুরু করে। নন্দিনী সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য একটা ফোল্ডারে স্টোর করা আছে। সেগুলো পড়ে ফেলল। অন্যান্য কাগজের রিপোর্টিং, সেন্টিনেলের প্রেস রিলিজ়, সেলেব্রিটিদের বাইট… ঘণ্টাচারেকের পরিশ্রমে লেখাটা দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু এখানেই থামা যাবে না। অমল সরকারের মন্তব্য থাকা জরুরি। মোবাইল থেকে অমলের নম্বর ডায়াল করে ঐশানী।

    অমল ফোন ধরে বলল, “বলুন ঐশানী।”

    অমল তার মোবাইল নম্বর সেভ করে রেখেছে! নন্দিনীর মৃত্যুর পরের দিন সাক্ষাৎ হয়েছিল। নম্বর আদানপ্রদানের পরে মোবাইলে কথাও হয়েছে। ঐশানী বলল, “আমি নন্দিনীকে নিয়ে আবার একটা স্টোরি করছি। আপনার সাহায্য লাগবে।”

    “বলুন। আপনি কি আমার কথা রেকর্ড করছেন?”

    “হ্যাঁ। নন্দিনীর শেষ নিশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তে আপনার কী মনে হচ্ছিল?”

    অমল হাসল, “কিছু মনে হয়নি ঐশানী। কিন্তু এই কথাটা বললে আপনার কপি জমবে না। তাই বলি যে, আমার স্ত্রী, বাংলা সিনেমার একনম্বর অভিনেত্রীর কষ্টের অবসান ঘটল, এতে আমার ভারমুক্ত লেগেছিল। কার্ডিয়াক মনিটরের আঁকাবাঁকা লাইন সোজা হয়ে গেল, নন্দিনীর চোখমুখে প্রশান্তির ছাপ নেমে এল। আমার মনে হল, তিলে-তিলে কষ্ট পেয়ে মারা যাওয়ার চেয়ে এটাই ভাল। ঈশ্বর যাদের ভালবাসেন, তাদের নিজের কাছে টেনে নেন। নন্দিনী ঈশ্বরের প্রিয় সন্তান ছিল। ও আনন্দে থাকুক। আমি একা-একা কাঁদব।”

    নাইস কোট! মনে মনে বলে ঐশানী। মুখে বলে, “ধন্যবাদ। ইন্টারভিউ শেষ। জাস্ট এমনি জিজ্ঞাসা করছি, আপনার বিয়ে করার প্ল্যান আছে?”

    “না। আমি ছোটখাটো মানুষ। হৃদয়টাও ছোট। একজনকে ভালবাসার মতো জায়গা আছে। এ জীবনে অন্য কাউকে ভালবাসতে পারব না।”

    দু’জনেই চুপ। ঐশানী অবশেষে বলল, “রাখছি তা হলে।”

    “হ্যাঁ, রাখুন। আমাকে এবার ফ্লোরে যেতে হবে,” ফোন কাটল অমল।

    অমল তাহলে মেগা সিরিয়ালের জগতে ফেরত গিয়েছে। ভালই। কিছু একটা নিয়ে থাকুক।

    ঐশানী নিজের জগতে ফেরত আসে। কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একবার কথা বলতে হবে। লোকটা বড্ড টেটিয়া! তবে কাজের সূত্রে এরকম অনেক টেটিয়াকে ডিল করেছে ঐশানী। কৃতান্তর নম্বর ডায়াল করে সে।

    “বলছি!” ওপ্রান্ত থেকে ব্যারিটোন শোনা যায়। এই ‘বলছি’ বলার মধ্যে অসম্ভব এক ঔদ্ধত্য আছে। অ্যাজ ইফ, আমি কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায়। তুমি কে, সেটা জানার প্রয়োজন বোধ করছি না।

    ঐশানী নরম গলায় বলল, “ক্যালকাটা সিটিজেন থেকে ঐশানী বলছি।”

    “কী দরকার?” জানতে চাইলেন কৃতান্ত। জানতে চাইলেন না যে, মোবাইল নম্বর ঐশানী কোথা থেকে পেয়েছে!

    ঐশানী হালকা হেসে বলল, “নন্দিনী সরকারের চিকিৎসক হিসেবে আপনার কাছ থেকে দু’একটা জিনিস জানার ছিল।”

    “কী জিনিস?” কৃতান্তর কণ্ঠস্বর আগের চেয়ে নরম। ঐশানী ভাবল, লাইনে এসো বাপধন! কাগজে নিজের নাম দেখতে সব্বাই ভালবাসে!

    বড়শিতে মাছ গেঁথেছে। এবার একে খেলিয়ে ডাঙায় তুলতে হবে। ঐশানী বলল, “নন্দিনীর অন্তিম মুহূর্তে আপনি পাশে ছিলেন। সেই সময়কার কোনও স্মৃতি?”

    “স্মৃতি!” থমকালেন কৃতান্ত, “আলাদা করে সে রকম কিছু… আসলে, পেশেন্ট ওয়াজ আনকনশাস। কাজেই কোনও ফেমাস লাস্ট লাইন নেই।” আবার ট্যারা-ট্যারা কথা! বিরক্তি চেপে ঐশানী বলে, “ওঁর হাজব্যান্ড…”

    ঐশানীকে থামিয়ে কৃতান্ত বললেন, “হি ওয়াজ় সিটিং ইন দ্য ক্যাফে। আমি ওঁকে নিউজ়টা দিই। হি ওয়াজ় ভেরি আপসেট। যেমন হয় আর কী!”

    ঐশানী চুপ। কৃতান্ত বলছেন অমল ক্যাফেতে ছিল। অমল বলছে, সে নন্দিনীর পাশে ছিল। কী রকম যেন গন্ডগোল লাগছে!

    “আর কিছু জানার আছে?” প্রশ্ন করছেন কৃতান্ত। ঐশানী বলল, “নন্দিনীর মৃতদেহ দেখে অমল কীভাবে রিঅ্যাক্ট করেছিলেন?”

    “সেটা আপনি পেশেন্ট পার্টিকে জিজ্ঞাসা করে নেবেন,” কণ্ঠস্বরে বিরক্তি ফিরে এসেছে কৃতান্তর।

    ঐশানী ঝটপট বলে, “ধন্যবাদ,” ফোন রেখে দেয়। ইন্টারকম বাজছে। আবার টর্চার চেম্বারে ডাক পড়েছে। কপি সেভ করে লিমার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচাল ঐশানী, “কী ব্যাপার?”

    দু’জনে একসঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠল।

    তরুণের টেবিলে রাখা খোলা টিফিন কেরিয়ার থেকে শিল্প ইন লেমন হানির প্রাণকাড়া খুশবু আসছে। লিমা ফর্ক দিয়ে একটা চিংড়ি মুখে পুরে বলল, “ড্যাম গুড। ডাকলেন কেন? লাঞ্চ আওয়ার তো এখনও শুরু হয়নি।”

    ঐশানী আধচামচ ঝোল মুখে দিয়ে বলল, “মধু আর লেবুর ব্যালান্সটা চমৎকার হয়েছে।”

    তরুণ বলল, “আমার কাছে একটা ভাল খবর আর একটা খারাপ খবর আছে। খারাপ খবরটা লিমার জন্য। ভাল খবরটা কার জন্য আমি জানি না।”

    ফর্ক রেখে লিমা বল, “খারাপ খবর দিয়েই শুরু হোক।”

    “পিবি ফোন করেছিল। বলল, সেন্টিনেল নিয়ে স্টোরিটা লিমা একা করবে না।”

    ঐশানী বোঝার চেষ্টা করছে। আলাদা-আলাদা অনেক ইনফর্মেশন মাথায় জমে আছে। একটু আগে, টর্চার চেম্বারে বসে তরুণ লিমাকে বলেছিল, “কৃতান্তকে নিয়ে স্টোরিটা কদ্দূর?”

    একটু আগে মোবাইলে অমল সরকার বলল যে, সে নন্দিনীর মৃত্যুর সময়ে সেন্টিনেলের আইসিইউতে ছিল।

    একটু আগে কৃতান্ত চট্টোপাধ্যায় মোবাইলে জানালেন যে, নন্দিনীর মৃত্যুর সময়ে অমল সরকার ক্যাফেতে ছিলেন।

    তাহলে কি নন্দিনীর মৃত্যু স্বাভাবিক নয়? সেন্টিনেলের আইসিইউতে কোনও মেডিক্যাল নেগলিজেন্সি হয়েছিল? ঐশানী কিছু বুঝতে পারছে না। নিজের বোকামি ঢাকতে সে তড়িঘড়ি বলল, “ভাল খবরটা কী?”

    এক চামচ চিংড়ি মুখে পুরে তরুণ বলল, “লিমা, আমি তোর জন্য ফাইট করেছিলাম। বলেছিলাম যে, স্টোরিটা ওকেই করতে দিন। কিন্তু পিবির কড়া নির্দেশ, দু’জনে মিলে কাজটা করবে। তবে একসঙ্গে নয়, আলাদা-আলাদা। কাজেই ভাল খবরটা দু’জনের জন্যে। তোরা শেয়ার করে নে।”

    লিমা ঐশানীর দিকে তাকিয়ে ঘৃণাভরে বলল, “পিবিকে কী কায়দায় বশ করলি? আমাকেও শিখিয়ে দিস।”

    “চুপ কর, “ লিমাকে এক ধমক দেয় ঐশানী।

    লিমা তরুণকে বলল, “আলাদা-আলাদা কাজ করব। তার মানে আমাকে ডেটা শেয়ার করতে হবে না। তাই তো?”

    ঐশানী মনে-মনে বলল, বাঁচা গেল। সীমান্তর কাছে যা জানব, তা লিমার সঙ্গে শেয়ার করতে হবে না।

    তরুণ বলল, “ঐশানী, আমি কী নিয়ে কথা বলছি বল তো?”

    “নন্দিনীর মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না,” আন্দাজে ঢিল ছোড়ে ঐশানী। প্রথম রিঅ্যাকশন দেখাল লিমা। তরুণকে বলল, “ঐশানীর সামনে কৃতান্তর প্রসঙ্গ তোলা তোমার উচিত হয়নি।”

    দ্বিতীয় রিঅ্যাকশন দেখাল তরুণ। একদিকে ভুরু তুলে ঐশানীকে বলল, “যা বলছিস, তার পক্ষে কোনও প্রমাণ আছে?”

    ঐশানী তরুণের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কৃতান্ত আর অমলের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের অডিয়ো রেকর্ডিং কি কোনও প্রমাণ? বোধ হয় না। ঐশানীকে এই নিয়ে আরও খোঁজখবর লাগাতে হবে।

    “আছে প্রমাণ?” গলা তুলেছে তরুণ।

    “এখনও না।”

    “প্রমাণ জোগাড় করে কথা বলবি। ঠিক আছে?” হাত নাড়ে তরুণ।

    সেদিন রাত সাড়ে দশটার সময় প্রাচী সিনেমা হলের সামনে পুলকার থেকে নেমে ডিক্সন লেন দিয়ে হাঁটতে-হাঁটতে ঐশানীর মনে হল, পূর্বপুরুষের আত্মারা হিমঝরা রাতে রাস্তা গুলিয়ে ফেলে নেমে এসেছে কলকাতা শহরে। হিমেল হাওয়ায় ছাতিম ফুলের নাক জ্বালানো গন্ধে মৃত্যুর গন্ধ পায় ঐশানী।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৩ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

    Related Articles

    ইন্দ্রনীল সান্যাল

    অপারেশন ওয়ারিস্তান – ইন্দ্রনীল সান্যাল

    July 10, 2025
    ইন্দ্রনীল সান্যাল

    শেষ নাহি যে – ইন্দ্রনীল সান্যাল

    July 10, 2025
    ইন্দ্রনীল সান্যাল

    মধুরেণ – ইন্দ্রনীল সান্যাল

    July 10, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    रेवरेंड के. के. जी. सरकार
    অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত
    অনন্যা পাল
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক দত্ত
    অভীক সরকার
    অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অরিন্দম দেবনাথ
    অর্পিতা সরকার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আখতারুজ্জামান ইলিয়াস
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুর রহমান আল-আরিফি
    আবদুল হালিম
    আব্দুল মালেক আলী আল-কুলাইব
    আব্দুল হামীদ ফাইযী
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    কৌশিক সামন্ত
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোপেন্দ্র বসু
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভট্টাচার্য
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যজ্যোতি মজুমদার
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বাণ রায়
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পরিমল ভট্টাচার্য
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিয়োদর দস্তইয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণু শর্মা
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহতাব উদ্দিন
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রণদীপ নন্দী
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    রেভারেণ্ড কে. কে. জি. সরকার
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শঙ্কর চ্যাটার্জী
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য
    শাক্যজিৎ ভট্টাচাৰ্য্য
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সম্পাদনা : শৈলেন্দ্র হালদার
    সরদার ফজলুল করিম
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সায়ক আমান
    সায়ন্তনী পূততুণ্ড
    সায়ন্তনী পূততুন্ড
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    তবু অনন্ত জাগে – ইন্দ্রনীল সান্যাল

    July 25, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    তবু অনন্ত জাগে – ইন্দ্রনীল সান্যাল

    July 25, 2026
    Our Picks

    তবু অনন্ত জাগে – ইন্দ্রনীল সান্যাল

    July 25, 2026

    অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র ৩ – হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত

    July 25, 2026

    বর্ষায় – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় (গল্পগ্রন্থ)

    July 25, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }