Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    ধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত

    April 24, 2026

    সমুদ্র কন্যা – আশাপূর্ণা দেবী

    April 24, 2026

    নিশিডাকিনী – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

    April 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    নিশিডাকিনী – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

    তৌফির হাসান উর রাকিব এক পাতা গল্প380 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    আবাহন – মাহবুব আজাদ

    আবাহন

    এক

    ‘উনি একজন বুজরুক ছিলেন,’ শামীমের কণ্ঠস্বরে তাচ্ছিল্যের কোন কমতি রইল না।

    সোমা একটু শাসন করার চেষ্টা করল স্বামীকে, ‘নিজের দাদাকে কেউ বুজরুক বলে এভাবে?’

    শামীম বারান্দার কাঠের রেলিঙে পা তুলে আয়েশ করে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, ‘এই শর্মা বলে। আর টেকনিক্যালি, উনি আমার আপন দাদা নন। বাবার চাচা। ওয়েইট। বাবার আপন চাচাও নন। দাদার ফুপাতো ভাই ছিলেন। ইয়েস, ফুপাতো ভাই। কাজেই আমি ওঁর বদনাম করতেই পারি, নিজের দাদার চামড়া বাঁচিয়ে…কী বলিস তোরা?’

    নাসিফ কাঁধ ঝাঁকাল। ‘তুই তোর দাদার বদনাম যত খুশি কর, আমার কী? আপন দাদাই হোক আর ফুপাতো দাদাই হোক।’

    মৌরি হাত বাড়িয়ে নাসিফের বাহুতে চিমটি কাটল। শামীমের বাগানবাড়িতে বেড়াতে এসে তার দাদার বদনামে সায় দেয়াটা ভদ্রতা মনে হচ্ছে না তার কাছে। নাসিফ চোখ গোল করে মৌরির দিকে ফিরে বলল, ‘চিমটি দাও ক্যান?’

    মৌরির চেহারার অভিব্যক্তি পাল্টে যেতে দেখে দুই হাতে মুখ ঢেকে হেসে ফেলল সোমা। এই পরিস্থিতি তার অচেনা নয়। ভরা মজলিশে বেফাঁস কথাবার্তা বলায় শামীমের অভিজ্ঞতাও কম নয়, তাকে আলগোছে সতর্ক করতে গেলে সেও এভাবে সকলের সামনে চিমটির বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে। নাসিফ শামীমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু কি আর সাধে?

    প্রসঙ্গ পাল্টাতে মৌরি তাড়াহুড়ো করে বলল, ‘বুজরুক মানে কিন্তু বুজুর্গ… মানে, ওই যে, কী বলে, সাধু ব্যক্তি। দরবেশ।’

    শামীম চায়ের কাপে অনাবশ্যক সশব্দ চুমুক দিয়ে বলল, ‘তাই নাকি? আমি তো জানতাম বুজরুক মানে ভণ্ড।’

    মৌরি হাত নেড়ে আলাপটাকে ভাষাতত্ত্বের কানাগলিতে ঢোকানোর চেষ্টা করল, ‘হ্যাঁ…কিন্তু এসেছে বুজুর্গ থেকে। বুজুর্গ লোকজনের কাণ্ডকারখানা দেখতে দেখতে অতিষ্ঠ হয়ে লোকজন এর মানেটাই পাল্টে দিয়েছে। তাই না, চুমকি?’

    চুমকি রোদ থেকে দূরে মনমরা হয়ে বসে ছিল, নিজের নাম শুনে একটু চমকে উঠল সে। ‘কী?’

    মৌরি চায়ের কাপটা তুলে সোমার দিকে তাকিয়ে নীরবে কানাগলিতে রিলে রেসের ব্যাটনটা তার হাতে তুলে দিল। সোমা চুমকির দিকে ফিরে বলল, ‘বুজরুক! বুজরুক মানে বুজুর্গ, তাই না?’

    চুমকি গম্ভীর হয়ে বলল, ‘বুজরুক বুজুর্গ হবে কেন? বুজুর্গ মানে আলেম!’

    নাসিফ মৌরির দিকে তাকিয়ে চোখ মিটমিট করল। চুমকি খুবই ধর্মকাতর, পান থেকে চুন খসলেই সে লম্বা লম্বা লেকচার দিতে থাকে। বুজরুক-বুজুর্গ তত্ত্বে সে নিশ্চিতভাবেই ধর্মের অপমান আবিষ্কার করে বসতে পারে।

    সোমা থতমত খেয়ে মৌরির দিকে তাকিয়ে ব্যাটনটা আবার ফিরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু মৌরি ততক্ষণে অন্যদিকে তাকিয়ে চায়ের কাপে হাসি লুকিয়ে চুমুক দিচ্ছে।

    ‘না-না, মানে, বুজুর্গ শব্দটা থেকে বুজরুক এসেছে। ধরো গিয়ে, মমমম … ধরো, কী আছে এমন আর…মস্তান! মস্তান মানে তো মত্ত, মাতাল। কিন্তু আমরা তো মস্তান বলতে বুঝি গুণ্ডা। এরকম কিছু শব্দ আছে না, যেমন ধরো, অর্থ একটা, কিন্তু লোকে অন্য অর্থ বোঝানোর জন্য বলতে বলতে একসময় মানেই পাল্টে ফেলে? অ্যাই, শামীম, এরকম হয় না?’

    শামীম নির্দোষ মুখে সোমাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিল, ‘না তো? এরকম হয় নাকি? যাহ!’

    সোমা শামীমের পাঁজরে আঙুলের গাঁট দিয়ে খোঁচা দিল। চুমকি মাথার স্কার্ফটা হাত দিয়ে টেনে ঠিক করে গম্ভীর গলায় বলল, ‘বুজুর্গ হচ্ছেন আলেম- ওলামারা। আর বুজরুক হচ্ছে ভণ্ড। পীরফকির। দুইটা দুই জিনিস।’

    নাসিফ চায়ের কাপে ফড়াৎ করে চুমুক দিয়ে বলল, ঠিক। যেমন ডাব আর নারিকেল। বুজুর্গ আর বুজরুকের মধ্যে পাকনামির মাত্রার একটা পার্থক্য আছে। বুজুর্গ পেকে বুজরুক হয়। তারপর, চালভাজা আর মুড়ি। কড়াইতে চাল ছেড়ে দিলেই চালভাজা, কিন্তু মুড়ি হতে গেলে সেটাতে বালু থাকতে হবে। সঠিক সঙ্গ পেলে বুজুর্গ লোক ফুলে ফেঁপে ফর্সা হয়ে বুজরুক হয়ে ওঠে।’

    চুমকি গম্ভীর চোখে মামাত ভাইকে নীরবে তিরস্কার করে আবার বেতের চেয়ারে হেলান দিল।

    নাস্তিক-মার্কা চালিয়াতি কথা বলায় নাসিফ ওস্তাদ, তার সাথে কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একশো একটা যুক্তি দিয়ে ধর্মকে কাবু করে ছেলেমানুষি আনন্দ পায় নাসিফ। এদের সঙ্গে বেড়াতে আসাই ঠিক হয়নি।

    শামীম চোখের কোণে চুমকিকে দেখে নিয়ে বলল, ‘এনিওয়ে, আমার কুটি দাদা বুজরুকই ছিলেন। তবে, মৌরি, কিছু লোক ওনাকে বুজুর্গই ভাবত। তারা চালপড়া, পানিপড়া, কুমড়াপড়া ইত্যাদি হাবিজাবি নেয়ার জন্য লাইন দিত ওনার কাছে।’

    মৌরি কেতলি থেকে আরেকটু চা ঢেলে নিল নিজের কাপে। তার খুব ভাল লাগছে এখানে এসে। শামীমদের বাগানবাড়ি মির্জাপুরে। বেশ বড়সড় জায়গা নিয়ে উঁচু পাঁচিলে ঘেরা কম্পাউণ্ড, চারদিকে ফলের গাছ, ছোট্ট একটা পুকুরও আছে। দুটো ইংরেজি এল-আকৃতির বাংলো-টাইপ বাড়ি, আর কিছু দূরে একটা কাঠের দোতলা বাড়ি নিয়ে জায়গাটা ছবির মত সুন্দর। সবকিছুই বেশ পরিপাটি। ঢাকার চড়া শব্দ আর ধোঁয়ার ভারে নুয়ে পড়া বাতাসের ঝুল যেন বুক থেকে সরে যাচ্ছে এখানে এসে। গতরাতে এসে ঠিক বোঝা যায়নি আশপাশটা কেমন, কিন্তু আজ সারাদিন ঘুরেফিরে, পুকুরে ছিপ দিয়ে মাছ ধরার ব্যর্থ চেষ্টা করে, কিছুক্ষণ ব্যাডমিন্টন খেলে, আর বহুদিন পর একটা পেয়ারা গাছে চড়ে পেয়ারা পেড়ে খেয়ে তার খুব ভাল লাগছে। পরশু আবার তারা ফিরে যাবে ঢাকায়। মৌরি চায়ের স্রোতে সে চিন্তাটাকে চুবিয়ে মারার চেষ্টা করতে লাগল।

    চুমকি নাক দিয়ে একটা শব্দ করল, যার সম্ভাব্য অর্থ হতে পারে, কোন সন্দেহ নেই, শামীমের কুটি দাদা লোকটা বুজরুক। চালপড়া, পানিপড়া, কুমড়াপড়া কখনোই কারও কোন কাজে আসতে পারে না। তবে হ্যাঁ, খাস দিলে আল্লাহর কাছে নামাজ পড়ে মুনাজাত করলে আল্লাহ হয়তো তার বাসনা পূর্ণ করতে পারেন।

    নাসিফ নিজের ফুপাতো বোনকে চটিয়ে মজা পায়, সে কাজের ফাঁকে মাঝেমধ্যে প্রায়ই চুমকির ফেসবুক ওয়ালে নানা উদ্ভট গুজব শেয়ার করে আসে। কোন্ নভোচারী মুসলিম হয়ে গেছে, কোন্ বিজ্ঞানী মাছের গায়ে আল্লাহু লেখা দেখে খত্না করে নাম পাল্টে আবু হামজা রেখেছে, এইসব খবর সে যত্নের সাথে জমিয়ে রাখে, কোন একদিন মুষলধারে চুমকির ওয়ালে পোস্ট করে আসার জন্য। বাতিল আর তাগুতের বিরুদ্ধে চুমকির লড়াকু ফেসবুক-জীবনে সে সহযোগিতার হাতই বাড়িয়ে দিতে চায়।

    ‘বলিস কী? খুবই কামেল আদমি ছিলেন মনে হচ্ছে?’ নাসিফ মৌরির দিকে চায়ের খালি কাপটা বাড়িয়ে ধরল।

    ‘যারা লাইন দিত ওনার কাছে, তারা সেরকমই ভাবত। তবে,’ একটা আলুর বড়া চামচে গেঁথে তুলে কামড় দিল শামীম, ‘উনি কিন্তু লোকজনকে চালপড়া, পানিপড়া, কুমড়াপড়া দিতেন না।’

    সোমা শামীমের কুটি দাদার কথা অল্পস্বল্প শুনেছে পারিবারিক আলাপে, তার কৌতূহল তাই অন্যদের চেয়ে কম নয়। বাংলোর বারান্দায় বসে কুচকুচে কালো কাঠে তৈরি দোতলা বাড়িটাকে দেখলে যে কারও মনে কৌতূহল জাগবেই।

    বাড়িটায় কোন জানালা নেই।

    ‘তা হলে ওনাকে বুজরুক ডাকো কেন?’ সোমা নিজেও একটা আলুর বড়া তুলে নিল প্লেট থেকে। মনু চাচী মারাত্মক বড়া ভাজতে জানে।

    শামীম কাঁধ ঝাঁকাল। ‘উনি ভূতপ্রেত-দত্যিদানো-রাক্ষসখোক্কস নিয়ে গবেষণা করতেন। ওনার ধারণা উনি ওইসবের সাথে যোগাযোগ করতে পারতেন। এই শখের পেছনে উনি প্রচুর টাকাপয়সাও নষ্ট করেছেন। ঘরসংসার করেননি, দিনরাত ওই বাড়ির একতলায় বসে যন্তরমন্তর-হিংটিংছট করতেন, আর মাঝেমধ্যে হুটহাট বাড়ি ছেড়ে এদিক-সেদিক চলে যেতেন। আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন বাবাকে দেখেছি বেশ কয়েকবার লোক পাঠিয়ে তাঁকে উদ্ভট সব জায়গা থেকে আবার বাড়িতে নিয়ে আসতে। বিপদে পড়লে উনি টেলিগ্রাম করতেন বা চিঠি লিখতেন, আমি অমুক জায়গায় আছি, টাকাপয়সা শেষ, আমাকে এসে নিয়ে যাও। সে এক যন্ত্রণা ছিল।’

    মৌরি মাথা নেড়ে বলল, ‘আহা, তা হলে বুজরুক বলছেন কেন? বেচারার মাথায় সমস্যা ছিল বলেন।’

    শামীম আঙুল নেড়ে বাতাসে একটা কঠিন নেতিবাচক উত্তর আঁকল। ‘মোটেও না। খুবই ট্যাটনা ছিলেন কুটি দাদা। বিশেষ করে যখন টাকাপয়সার দরকার হত। বাবা যখনই বলতেন টাকা দেয়া যাবে না, উনি ঠিকই কীসব জমির হিসাব ধানের হিসাব করে ফেলতেন মুখে মুখে। মাথায় কোন সমস্যা ছিল না। তিনি এমনকী ডায়েরিও লিখতেন।’

    সোমা আগ্রহভরে জানতে চাইল, ‘কোথায় সেই ডায়েরি?’

    শামীম আলুর বড়া চিবাতে চিবাতে তাচ্ছিল্যের সাথে হাত নেড়ে বলল, ‘কয়েকটা ডায়েরি আছে ওই বাড়িতেই, যদি তেলাপোকায় কেটে না থাকে। আর বেশ কিছু ডায়েরি কুটি দাদা পুড়িয়ে ফেলেছে।’

    মৌরি বলল, ‘পুড়িয়ে ফেললেন কেন?’

    শামীম কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ‘উনি দুইদিন পরপরই এটাসেটা পুড়িয়ে ফেলতেন। ওই বাড়িতেও নাকি একবার আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। রশিদ চাচা এখানে না থাকলে হয়তো নিজেও পুড়ে মরতেন। ওনাকে এই কারণেই আমাদের গ্রামের বাড়ি থেকে, যাকে বলে, খেদিয়ে এই বাগানবাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিল। দাদা যতদিন বেঁচে ছিলেন, উনি বেশি গণ্ডগোল করার চান্স পাননি, কিন্তু দাদা মারা যাওয়ার পর ইচ্ছামত গিদরামি করেছেন। আমরা ছিলাম ঢাকায়, আমার এক চাচা ছিলেন গ্রামে, এই বাড়ি দেখাশোনা করতেন রশিদ চাচা, আর কুটি দাদা রশিদ চাচাকে পাত্তা দিতেন না। খুব জ্বালান জ্বালিয়েছে লোকটা।’

    নাসিফ বলল, ‘তোরা এইরকম একটা ক্যারেক্টারকে একটু তেল-কালি মাখাইতে পারলি না? তোরা শালা টাঙ্গাইলের লোকজনগুলি এমন গা-ছাড়া… একটু উদ্যোগ নিলেই কিন্তু মারদাঙ্গা আগুন পীর মাঠে নামায় দিতে পারতি। তোর দাদা এইসব বিটলামি…কী হইল, চোখ গরম করস ক্যান…ওহ অলরাইট, তোর আপন দাদা না, ফুপাতো দাদা, হোয়াটেভার, উনি এইসব বিটলামি এরশাদের আমলে করত না? এরশাদ তো খুবই এলিজিবল মুরিদ ছিল, প্রায়ই এই পীর ওই পীরের দরবারে তশরিফ রাখত। তোদের পক্ষ থেকে একটু উদ্যোগ থাকলে এই জায়গা এতদিনে হাইফাই পীরের গদি হয়ে যেত। ওই দিকে ফালতু জাম্বুরা গাছটাছ কেটে একটা হেলিপ্যাড বানায় দিতে পারলেই মন্ত্রী-মিনিস্টার মুরিদ কালেকশন সহজ হয়ে যেত। বেকুব কি আর গাছে ধরে? আরে… চিমটাও ক্যানো? ব্যথা পাই তো!’

    মৌরি চোখ পাকিয়ে নাসিফকে নীরবে কয়েক সেকেণ্ড ধমকে বলল, ‘উনি তো দেখি পুরোই প্রফেসর শঙ্কু আর হ্যারি পটার ঘুঁটা দিয়ে বানানো চরিত্র! আপনারা কোন অ্যাডভেঞ্চার করেননি ওনাকে নিয়ে?’

    শামীম মাথা নাড়ল। ‘বাবা আমাদের কখনোই ওনার ধারেকাছে ঘেঁষতে দিতেন না। আমরা এই বাড়িতে প্রথম এসেছি কুটি দাদা মারা যাওয়ার পর, জানো? ওনারও আমাদের ঢাকার বাসায় যাওয়া নিষেধ ছিল।’

    সোমা আনমনে কাঠের দোতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে কুটি দাদার গল্প শুনছিল। এখানে সে আগেও একবার পিকনিকে এসেছে, কিন্তু তখন আরও আত্মীয়স্বজন গমগম করছিল পুরো কম্পাউণ্ড জুড়ে, হই-চইয়ের মাঝে ওই কেঠো পোড়োবাড়ি নিয়ে কেউই মাথা ঘামানোর সময় পায়নি। বিকেলের রোদ এসে যেন হারিয়ে যাচ্ছে বাড়িটার দেয়ালে, দূরে বাংলোর বারান্দার ছায়ায় বসে দৃশ্যটা দেখে একটু গা ছমছম করছে তার। কুটি দাদা ওই বাড়িতে বসে কী করত?

    কাছেই আচমকা যান্ত্রিক সুরে ঝনঝন করে আযানের শব্দ বেজে উঠল, সোমার ঘোর লাগা ভাবটা কেটে গেল সে শব্দে। চুমকির মোবাইলে আযানের কী একটা সিস্টেম আছে, দিনে পাঁচবার করে সময়মত বাজতে থাকে। চুমকি বেতের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে মাথার স্কার্ফ ঠিক করতে করতে বলল, ‘আমি নামাজটা পড়ে আসি।’

    নাসিফ বলল, ‘আমার জন্য দোয়া করিস রে। আল্লাহকে বলিস আমার দিকে যেন একটু মুখ তুলে তাকায়। খুব রাগ করে আছে লোকটা।’

    চুমকি জিভ দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে নিজের ঘরের দিকে চলে গেল। বাংলোর ঘরগুলো বেশ প্রশস্ত, বেড়াতে এসে আস্ত একটা ঘর বরাদ্দ পেয়েছে সে।

    সোমা মাথার চুল আঙুলে জড়িয়ে টানতে টানতে বলল, ‘উনি একা একটা দোতলা বাড়িতে কী করতেন?

    শামীম আরেকটা আলুর বড়া তুলে নিয়ে বলল, ‘বুজরুকি। আবার কী? ভূতপ্রেত, তন্ত্রমন্ত্র, ঝাড়ফুঁক।’

    নাসিফ বলল, ‘তুই জানিস কীভাবে? তুই তো কখনও এসে দেখিসনি।’

    শামীম বড়ায় একটা জিঘাংসু কামড় দিয়ে বলল, ‘আমি রশিদ চাচার কাছে শুনেছি। …ওই যে মনু চাচী আসছে মুড়ি মাখা নিয়ে, তুই বিশ্বাস না করলে চাচীকে জিজ্ঞাসা কর।’

    মনু চাচীর বয়স পঞ্চাশের ঘরে, তবে সে ঘরের ছাদের কাছাকাছি। মেহমানদের জন্যে গতকাল সন্ধ্যা থেকেই অবিরাম নানা নাস্তা বানিয়ে যাচ্ছেন তিনি অক্লান্তভাবে। মস্ত একটা এনামেলের বাটিতে মুড়ির সাথে এটাসেটা মেখে এখন নিয়ে এসেছেন তিনি।

    ‘ন্যাও, কহোটা মুড়ি খাউ। হাফিজের বউ পাউরোটা বানাইতাছে। হাইঞ্জা বেলায় গরুর গুস্ত দিয়া খাইও।’ মনু চাচী টেবিলে মুড়ির বাটি নামিয়ে রেখে আলুর বড়ার প্রায় খালি বাটির দিকে তাকিয়ে খুশির হাসি হাসলেন। ‘বিলাতী আলু আছাল কহোটা। বড়া বানামু আরও?’

    সোমা মনু চাচীকে হাত ধরে চুমকির চেয়ারে বসিয়ে দিল। ‘বসেন তো, চাচী। আমাদের কুটি দাদার গল্প বলেন। শামীম কিচ্ছু জানে না, আন্দাজে খালি আবোলতাবোল কী কী যেন বলে।’

    মনু চাচীর মুখের হাসিটা মলিন হয়ে গেল। ‘কাক্কা তো ম্যালা আগে মরছে।’

    মৌরি এক মুঠো মুড়িমাখা তুলে মুখে পুরে বলল, ‘গ্রামগ্নাম… দারুণ মজা হয়েছে, চাচী! এই কুটি দাদা নাকি জিন-ভূত পালতেন, সত্য নাকি?’

    মনু চাচী মুখ কালো করে মাথা ঝাঁকালেন। ‘হ, হ্যার কামই আছাল খালি দ্যাউ-দানো নামানি।’

    নাসিফ হাসিমুখে বলল, ‘আপনি কখনও দেখেছেন ওই দৈত্যদানো?’

    মনু চাচী অস্বস্তি ভরে নড়েচড়ে বসে বললেন, ‘দেখি নাই…কিন্তু…’ তাঁর কণ্ঠস্বর ক্রমশ মিলিয়ে গেল নাসিফের চওড়া হতে থাকা হাসির সাথে।

    সোমা বলল, ‘কী, চাচী? কিন্তু কী?’

    মনু চাচী বললেন, ‘আওজ পাইছি অনেকদিন।

    মৌরি আরেক মুঠো মুড়ি নিতে হাত বাড়িয়েছিল, সে নাসিফকে আবার চোখের ধমকে শাসন করে বলল, ‘কেমন আওয়াজ, চাচী?’

    মনু চাচী শামীম আর সোমার দিকে অসহায় চোখে নিষ্কৃতি চাওয়ার ভঙ্গিতে তাকিয়ে বললেন, ‘ইয়াল্লা, কয় কী, যে আওজ আছিলরে, মা, কানকুন তালা নাইগা যাইত গা। তুমগো কাক্কা তহনও বাঁইছা আছাল, খুপ সাহসী মানুষ আছাল, হ্যার বাদেও হে কুটি কাক্কারে কিছু কয়া হারে নাই, ডরে। আইত বিরাইতে শব্দ হইত, আজগুবি আজগুবি আওজ। মাইনষ্যে মুনে করত উনি জিন নামাইছে। মাজে-মইদ্যেই আইড়া কাইড়া নুক আইত হ্যার কাছে, জিন নামাইবার। কাক্কা নাঠি নিয়া দৌড়ানি দিত। কিন্তু আইতের বেলার ভয়ের আওজ কমত না। খুন খুন কইরা ক্যারা জানি কাঁনত। খিখি আসাহাসির শব্দ হুনা যাইত। ডরে আমগো আত্মা ধড়াস ধড়াস করত।’

    নাসিফ মৌরির শাসনে হাসিটা মুখ থেকে মুছে গম্ভীর গলায় বলল, ‘কীরকম শব্দ, চাচী?’

    মনু চাচী অস্বস্তি ভরে নড়েচড়ে বসে বললেন, ‘কুনো কুনো সুমায় আবার চিকারের শব্দ পাওন যাইত। জীব জুনাররে নাঠি দিয়া গুতানির পর যেম্বে গুঙ্গাইত হেইরহম আওজ।’

    নাসিফ মৌরির দিকে ফিরে বলল, ‘উফফ, চিমটাও ক্যানো?’

    সোমা মনু চাচীকে বেশ পছন্দ করে ফেলেছে, সে চাচীর হাত নিজের কোলে টেনে নিয়ে বলল, ‘শুধু কি চিৎকারের আওয়াজ পাইতেন, চাচী? কিছু দেখেন নাই কখনও?’

    মনু চাচী একটু ভরসা পেলেন যেন সোমার কথায়, মাথা নেড়ে বললেন, ‘না গো, মা, আমরা আইতের বেলা দরজা জাল্লা বদ্দ কইরা হুইতাম। হাফিজ তহন গুদা, খুপ ডরাইত। কুট্টি কাক্কারে ম্যালা কইছি, হাফিজ্যা ডরায়, আপনে হ্যাগো আইতের বেলা ডাইকেন না। হে খালি আসত, ফ্যাক ফ্যাক কইরা আসত, আর কইত: ডরাইস্যা ডরাইস্যা।’ মনু চাচী হাত নেড়ে গলার সুর পাল্টে কুটি দাদাকে অনুকরণ করে দেখালেন, সোমা হাসতে হাসতে জড়িয়ে ধরল তাঁকে।

    শামীম মুড়িমাখা খেয়ে যাচ্ছিল অক্লান্তভাবে, সে কোঁৎ করে মুড়ি গিলে বলল, ‘ভূতের দৌড়াদৌড়ির আওয়াজের কথাটা বলবা না, চাচী?’

    মনু চাচীর হাসিটা আবার মলিন হয়ে গেল। ‘হ, মাজে-মইদ্যে আমরা আওজ পাইতাম। বাগানের আউলে কীয়ের জানি শব্দ। মুনে হইত গাছে বইয়া ভুইট্টা বানর পাউ নড়াইতাছে। …না-না, বাজান, আইসো না…বাউ বাসাতের আওজ ওইরহম না। কুটি কাক্কা মাজে-মইদ্যে বাইরে আইয়া ধমক দিত। তহন আওজ বন হইয়া যাইত। খুব ডরের মইদ্যে আইত পার করছি গো, আম্মা। তুমরা দেহ নাই তাই আসো।’

    মৌরি ফিসফিস করে বলল, ‘ডোঞ্চিউ রিয়েলাইজ ইট হার্টস হার? স্টপ বিয়িং সাচ আ প্রিক!’

    নাসিফ গম্ভীর মুখে মুড়িমাখা চিবাতে লাগল। বিকেলের রোদ ইতিমধ্যে সরে গেছে কালো বাড়িটা থেকে। গাছপালার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে জানালাবিহীন দেয়ালের একটা অংশ।

    মনু চাচী বললেন, ‘হাফিজ্যা বাড়িড্যা সাপ কইরা রাকছে। তুমরা দেকপার চাইলে দেইকা আইয়া হারো।’

    সোমা বলল, ‘আপনারা ওই বাড়িতে ঢোকেন?’

    মনু চাচী বললেন, ‘ঢুকমু না ক্যা? এহন তো আর কাক্কা নাই। কুনো আওজও নাই। আমরা কয় মাস বাদে বাদেই ঘর সাপ করি। ভিতরে খাইলা। বইপুস্তক আর আবিজাবি জিনিস আছে, বাসকোতে ভইরা রাকছি।’

    নাসিফ বলল, ‘আজকে চল সবাই রাতের বেলা ওখানে গিয়ে আড্ডা মারি। তাস, মোনোপোলি, চা আর মুড়ি-চানাচুর সঙ্গে থাকবে। এরপর মোমবাতির আলোর সাথে রক্তপানি করা ভুতুড়ে গল্পের কম্পিটিশন।’

    সোমা আড়চোখে মনু চাচীর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল, মহিলার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে উঠেছে। সে চাচীর হাতে মৃদু চাপ দিয়ে বলল, ‘কী, চাচী, ভয় পাইছেন নাকি?’

    মনু চাচী বিবর্ণ মুখেই মাথা নাড়লেন। ‘না-না-না। আমি হাফিজ্যার বউরে কইয়া দিমুনি, উ যানি তুমগো জুনতে নাস্তা পানির জুগার যন্ত্র কইরা রাকে।’

    সোমা ফিসফিস করে বলল, ‘আপনিও আসেন, চাচী। ভূতের গল্প করি সবাই মিলে।’

    মনু চাচী তাড়াহুড়ো করে মাথা দোলালেন, ‘নারে, আম্মা, আমার ভূতের হাস্তর হুনলে ডর নাগে। আমি হাড়াহাড়ি কইরা ঘুমাইয়া যামু।’

    চুমকি নিজের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল, তার মুখ গম্ভীর। মনু চাচীকে দেখে মৃদুস্বরে বলল, ‘নামাজ পড়বেন না, চাচী?’

    মনু চাচী চমকে উঠে তাড়াহুড়ো করে উঠে বললেন, ‘হ-হ… আমি তাইলে যাইগা, আম্মা। নুমাজটা পইড়া আহি। তোমরা মুড়ি খাও।’

    নাসিফ তাড়াহুড়ো করে পালিয়ে বাঁচা চাচীকে দেখিয়ে চুমকিকে শাসনের সুরে বলল, ‘তুই এখানে এসেই কীরকম ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিস, দেখলি? মনু চাচী, হাফিজ, হাফিজের বউ, তাদের একরত্তি বাচ্চা, সবাই তোর ভয়ে দরজায় ছিটকিনি আটকে ভেতরে বসে থাকে। বেচারারা গোটা বছরে যত রাকাত নামাজ পড়ে, তোর যন্ত্রণায় তারচে বেশি পড়ে ফেলেছে এই একদিনেই!’

    চুমকির মুখে সন্তুষ্টির পাতলা হাসি ফুটে উঠল। দ্বীনের পথ থেকে বিচ্যুত কয়েকটি আত্মাকে সিরাতুল মুস্তাকিমে ঠেলে তুলে বেশ তৃপ্ত।

    মৌরি বলল, ‘তুমি তো গল্পটা মিস করলে, চুমকি। শামীম ভাইয়ের কুটি দাদা জিন-ভূত, দৈত্যদানো পুষতেন, বুঝলে?’

    চুমকি বেতের চেয়ারে বসে মুড়িমাখার বাটিটা নিজের কোলে টেনে নিয়ে বলল, ‘জিন পুষতে পারেন হয়তো। কিন্তু ভূত-দৈত্য এসব কিছু নেই। ওগুলো কুফরি গুজব।’

    নাসিফ একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘হোয়াটেভার। ওই বাড়িটায় আমরা আজ সারারাত আড্ডা মারব ঠিক করেছি।’

    চুমকি বলল, ‘তোমরা আড্ডা মারো গিয়ে, আমি ঘুমিয়ে পড়ব।’

    নাসিফ বলল, ‘উঁহুঁ। তোকেও থাকতে হবে। মোনোপোলি খেলা হবে। তুই ব্যাঙ্কার। আমাদের মধ্যে একমাত্র মুমিন মুসলমান তুই, অন্য কাউকে ব্যাঙ্ক দিলে টাকাপয়সা লুট হয়ে যাবে।’

    চুমকি বলল, ‘ওই পুরনো বাড়িতে ধুলাবালুর মধ্যে বসে মোনোপোলি খেলতে হবে কেন? এইখানেই খেলি।’ চুমকি মোনোপোলির খুব ভক্ত, একবার খেলতে বসলে তাকে টেনে তোলা শক্ত।

    মৌরি বলল, ‘আরে, দারুণ একটা এক্সপেরিয়েন্স হবে। এরকম ভুতুড়ে একটা বাড়িতে বসে আড্ডা দেয়ার মজাই তো আলাদা। তা ছাড়া, যদি সত্যি সত্যি ভূত…মানে, জিন এসে আমাদের ওপর চড়াও হয়, চুমকি একাই দোয়া পড়ে তাদের ভাগিয়ে দিতে পারবে।’

    সোমা অন্যদিকে ফিরে হাসি চাপার চেষ্টা করল প্রাণপণে। বিদ্রূপের আঁশটে গন্ধ পেয়ে চুমকির মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। ‘শোনো, ভাবী, দোয়াদরূদ নিয়ে মস্করা করবা না। গ্রামেগঞ্জে জিনের উৎপাত কিন্তু কমন জিনিস। আমার দাদাবাড়িতে আমি নিজের চোখে জিন নামাতে দেখেছি…..

    নাসিফ বলল, ‘আহ্হা, এখনই বলিস না। রাতে ভৌতিক গল্প… কী হলো, চিমটাও কেন? …ওহ, লেট মি রিফ্রেইজ, ভৌতিক নয়, জৈনিক গল্পের কম্পিটিশন হবে। তখন বলিস। আর তোমরা তো দুই পাতা বিজ্ঞান পড়ে মস্করা করো খালি, চুমকির দাদাবাড়ি কিন্তু, হুঁ-হুঁ, বাবা, একটা রিয়েলি হন্টেড প্লেস। জিনের হিথ্রো এয়ারপোর্ট ওইটা। সারাদুনিয়ার জিন চলাচলের পথে চুমকির দাদাবাড়িতে রিফিউয়েল করতে নামে। … আরে না, সিরিয়াসলি, আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। একজন খুব কামেল বুজুর্গ আলেম আছেন, চুমকির চাচার বন্ধু, উনি প্রায়ই জিনের টক শো হোস্ট করতেন, আমরা যখন কলেজে পড়ি। না রে, চুমকি? কী হলো, এইভাবে তাকাস কেন….

    .

    দুই

    কাঠের সিঁড়িতে পা রাখার পর পুরো বাড়িটা যেন অস্ফুট গোঙানির শব্দে অতিথিদের স্বাগত জানাল। মৌরি ঘাড় ফিরিয়ে হারিকেন হাতে নাসিফের দিকে তাকিয়ে শুকনো হাসি হাসার চেষ্টা করল। একতলার বারান্দায় বসে মজা দেখছে সে।

    সোমা হাতে কিল মেরে বলল, ‘কাম অন, মৌরি! কোন ব্যাপারই না। দেখিয়ে দাও নাসিফ ভাইকে! তোমার হাতে হারিকেন আছে, চাবি আছে, তোমার কী ভয়?’

    মৌরি এক হাজার টাকা বাজি ধরেছে নাসিফের সাথে, একা একা দোতলায় উঠে তালা খুলে কুটি দাদার ঘরে ঢুকবে সে। তার আগে কনসালট্যান্ট হিসেবে মনু চাচী গোপনে জানিয়েছেন, ছাইভস্ম যা কিছু ছিল এই বাড়িতে, সবই সাফ করা হয়েছে। দোতলার ঘরে কিছু বইপত্র আর টুকিটাকি জিনিস ছাড়া আর কিছুই নেই। তবে তেলাপোকা, মাকড়সা, টিকটিকি এসব থাকতেই পারে। নাসিফ শুরুতে একশো টাকা বাজি ধরেছিল, তেলাপোকা-টিকটিকি-মাকড়সার মত থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের নাম শুনে সে একটা শূন্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

    সোমাও শামীমের সাথে বাজি ধরতে চেয়েছিল, কিন্তু সোমার সাহস নিয়ে শামীমের মনে কোন সন্দেহ নেই, জানিয়েছে শামীম। অবশ্যই একা একা সোমা ভুতুড়ে খালি বাড়িতে গিয়ে তেলাপোকা কবলিত, টিকটিকি আক্রান্ত, মাকড়সা মাখামাখি ঘরে ঢুকে দশ মিনিট কাটাতে পারবে। সোমা না পারলে কে পারবে?

    চুমকিকেও ঠেলছিল নাসিফ, কিন্তু চুমকি এইসবের মধ্যে নেই। সে একটা মাদুর আর মোনোপোলি বোর্ড দুই বগলে নিয়ে চুপচাপ অপেক্ষা করছে এইসব বাজির ভাঁড়ামো শেষ হওয়ার অপেক্ষায়। তা ছাড়া, বাজি ধরা গুনাহ।

    মৌরি হারিকেন হাতে নিয়ে দুপদাপ করে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। বাড়িটা কী ধরনের কাঠ দিয়ে তৈরি, মৌরি জানে না, কিন্তু কাঠের রং একেবারে কুচকুচে কালো, আর যথেষ্ট মজবুত। সিঁড়িতে পা রাখলে কিছু ক্যাচক্যাচ শব্দ হয় বটে, কিন্তু গোটা বাড়ি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ার মত গুরুতর কিছুর আভাস তাতে নেই।

    মৌরি সিঁড়ির প্রথম দফা পেরিয়ে নিচের দিকে তাকাল। নাসিফ হারিকেন উঁচিয়ে জুলজুল করে তাকিয়ে আছে দেখে মনে মনে হাসল সে। অ্যারোসলের একটা ক্যান সুটকেসে করে নিয়ে এসেছিল মৌরি, সেটা বাংলো ছেড়ে বেরোনোর সময় বার করে কোমরে গুঁজে সঙ্গে আনতে ভোলেনি। তা ছাড়া, মনু চাচীর ছেলে হাফিজ নাকি গতকাল সকালেই সাফ করেছে বাড়ি, কাজেই ড্রাকুলার গুদামঘরের মত পরিস্থিতি থাকার কথাও না।

    মৌরি বাইরে থেকেই খেয়াল করেছে, বাড়িটা আসলে তিনতলা সমান উঁচু। কিন্তু নিচতলায় ঘরের উচ্চতা অনেক বেশি, সেটা একটা হলঘরের মত। কুটি দাদা দোতলার দুটো ঘরের একটায় থাকতেন। অন্য ঘরটা একেবারেই ফাঁকা এখন, মেহমান এলে সেটায় থাকত অতীতে।

    তিন দফা সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় কুটি দাদার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়াল মৌরি। এখান থেকে আশপাশটা একেবারেই অন্যরকম দেখায়। কম্পাউণ্ডের ভেতরে বাড়ি, পুকুর, গাছপালা, আকাশে একফালি চাঁদ, সবই সুন্দর লাগছে দেখতে। হারিকেন নিয়ে বারান্দার রেলিঙে একটু ঝুঁকে হাঁক ছাড়ল মৌরি, ‘হিউস্টন, আই হ্যাড নো প্রবলেম!’

    সোমা উৎসাহ জোগাল, ‘সাবাস, মৌরি! মুরগিভাজা না ফুচকা?’

    হারিকেন হাতে নাসিফ বলল, ‘বারান্দার অরবিটে চক্কর দিলেই চলবে? ল্যাণ্ডিং না করেই খানাপিনার হিসাব শুরু করে দিয়েছে!’

    মৌরি কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, একটা মৃদু খসখস শব্দ এল তার কানে। শব্দটা ঘরের ভেতরে।

    মৌরির মনের মধ্যে ফূর্তির অনুভূতিটা এক নিমেষে ফুরিয়ে গেল। এই ঘরের ভেতরে শব্দ হবে কেন?

    নিচ থেকে চুমকির বিরস কণ্ঠ ভেসে এল, ‘ভাবী, জলদি। মশা কামড়ায়।

    মৌরি হারিকেন উঁচিয়ে কুটি দাদার ঘরের উঁচু, বন্ধ দরজার দিকে চেয়ে রইল, তার কান অখণ্ড মনোযোগে কোন শব্দ শোনার জন্যে তৈরি হয়ে আছে। তার মনের যুক্তিপ্রবণ অংশ বলছে, ঘরের ভেতরে খসখস শব্দ হওয়াই স্বাভাবিক। হয়তো তেলাপোকা উড়ছে। বা পেছনে গাছের ডাল হয়তো বাতাসে নড়ছে। ভূতপ্রেত সব বাজে কথা। কিন্তু একটা রুগ্ন রোমাঞ্চপ্রিয় অংশ বলছে, বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?

    প্রকাণ্ড একটা চকচকে রুপালি তালা ঝুলছে দরজার দুই পাল্লার দুই মোটা কড়ায়। মৌরি হারিকেন নামিয়ে রাখল দরজার সামনে, তারপর আঁচলে বাঁধা চাবিটা দিয়ে সেই তালাটা খুলে একটা কড়ায় আটকে রাখল। হারিকেনটা তোলার জন্যে আবার ঝুঁকতেই সে ঘরের ভেতরে মৃদু খসখস শব্দটা আবার শুনতে পেল।

    সেইসাথে মৌরি দেখতে পেল, ঘরের দরজার নিচের অংশে সরু, অনুভূমিক কতগুলো ফাঁক, অনেকটা ভেন্টিলেটরের মত। দরজাটা একেবারে নিরেট নয়।

    মৌরি হারিকেনটা হাতে নিয়ে চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল ঘরের দরজার সামনে। ভেতরে শব্দ হতেই পারে, নিজেকে প্রবোধ দিল সে। হতেই পারে শব্দ। হয়তো বাতাসের কারণে…

    নিচ থেকে চুমকির বিরস কণ্ঠ ভেসে এল আবার, ‘ভাবী, মশা কামড়াচ্ছে কিন্তু।’

    হিউস্টনের টিটকারিও শোনা গেল তারপর, ‘ল্যাণ্ডিং করতে পারবে একা, নাকি কাউকে পাঠাতে হবে?’

    মৌরি চোয়াল শক্ত করে হারিকেনটা উঁচিয়ে ধরে কুটি দাদার ঘরের দরজায় জোরে একটা ধাক্কা দিল

    এই দরজার কব্জা জোড়া সম্ভবত বহুদিন তেলের মুখ দেখেনি, অমসৃণ হ্রেষা তুলে ধীর গতিতে খুলে গেল দুটো পাল্লা। মৌরি হারিকেন বাড়িয়ে ধরে ঘরের ভেতরটায় আলো ফেলল। ফাঁকা।

    নিচ থেকে হাততালির শব্দ ভেসে এল। ‘ইটস আ স্মল স্টেপ ফর আ ম্যান… কী হলো, সোমা, পরপুরুষের গায়ে খোঁচা দাও ক্যানো… ওহ, ওকে, ইট’স আ স্মল স্টেপ ফর আ উওম্যান, বাট আ জায়ান্ট লিপ ফর…আরে আবার খোঁচাও ক্যানো?’

    মৌরি ঘরের ভেতরে পা রাখল।

    হারিকেনের আলোয় ঘরের ভেতরের একাংশ আলোকিত হয়েছে কেবল। পুরোনো দিনের ঘর, যথেষ্ট উঁচু, সিলিঙের কাছে তাই ক্রমশ পিছু হটে গেছে আলো, বৃক্ষচারী ময়ালের ধৈর্য নিয়ে সেখানে শুয়ে আছে অন্ধকার। মৌরি খসখস শব্দটা আবার শুনতে পেয়ে ত্বরিত পায়ে বামে ঘুরল।

    ঘরের ভেতরটায় একটা লোহার খাট, আর দুটো বাক্স ছাড়া আর কিছু নেই। তবে দেয়ালে একটা ক্যালেণ্ডার ঝুলছে। সেটার পাতা নড়ে উঠছে একটু পরপর। শব্দটা সেখান থেকেই আসছে।

    মৌরি হারিকেন বাড়িয়ে ধরে জানালা খুঁজল। কিন্তু ঘরে কোন জানালা নেই।

    শিক্ষিত, বইপড়ুয়া, ব্লগ-ফেসবুকে তর্ক করা মৌরি নিজেকে প্রবোধ দিল, নিশ্চয়ই কোন না কোনভাবে ঘরের ভেতরে বাতাস ঢোকে। নইলে ক্যালেণ্ডারের পাতা নড়বে কেন? হয়তো কোন ছিদ্র আছে দেয়ালে। কিন্তু ভুতুড়ে সিনেমা দেখা মৌরি ফিসফিস করে বলে গেল, আছে, মৌরি, ওরা আছে!

    মৌরি মনে মনে নিজেকে কষে ধমক দিয়ে চোখ বন্ধ করল কিছুক্ষণের জন্য। ক্যালেণ্ডারের পাতা নড়ে উঠল আবারও। চোখ খুলে সে হারিকেন উঁচিয়ে ধরে সিলিঙের দিকে চাইল।

    বিদঘুটে কোন চেহারা বা আকৃতি তেড়ে এল না মৌরির দিকে, বরং নিতান্তই নিরীহ একটা কাঠের পাটাতন চোখে পড়ল তার। সেই সাথে চোখে পড়ল দেয়াল আর সিলিঙের মোহনায় কয়েকটা প্রশস্ত ঘুলঘুলি।

    কুটি দাদার ঘরটা মোটেও বদ্ধ নয়। হাওয়া চলাচল করে এর ভেতরে। মৌরির চোয়ালের পেশি শিথিল হয়ে এল। ভয়খোর মৌরি মুখের ওপর যুক্তির দরজা বন্ধ হওয়ার আগ মুহূর্তে ফিসফিসিয়ে বলল শুধু, দেয়ার আর মোর থিংস…

    মৌরি এবার বাস্তব পৃথিবীর হররের দিকে মন দিল। ঘুলঘুলিগুলো খোলা, কাজেই তেলাপোকা সাপখোপ সবই থাকতে পারে ঘরের ভেতরে। তবে চামচিকা নেই, নিশ্চিত জানে সে। আলো দেখলে চামচিকা লটপট করে উড়তে থাকে।

    মৌরি হারিকেনের আলোয় ঘরটার চারপাশে একবার ঘুরে দেখে নিশ্চিন্ত মনে হাঁক দিল, ‘ওপরে এস তোমরা!’

    সিঁড়িতে দুপদাপ পায়ের শব্দ শুনতে পেল সে। চুমকির বিরক্ত গলা শোনা গেল, ‘কামড়ে আমার হাত পা ফুলিয়ে ফেলল মশা!’

    মৌরি কুটি দাদার প্রাচীন খাটের পাশে রাখা বাক্সের দিকে এগিয়ে গেল। কী আছে ভেতরে?

    নাসিফ হারিকেন উঁচিয়ে সবার আগে ঘরে ঢুকল। ‘ঢাকায় গিয়ে টাকাপয়সার মত নোংরা ব্যাপার নিয়ে আলাপ করা যাবে, ঠিকাছে? চুমকি, মাদুর পাত। শামীম, তুমি ফ্লাস্ক আর কাপ সাজাও। সোমা কি টিফিন ক্যারিয়ারে মুড়িটুড়ি কিছু রাখছ আমাদের জন্য, নাকি সব একাই খেয়ে ফেলছ? আরে…বাক্স খুলতেছ কেন?’

    মৌরি বলল, ‘ভিতরে ডায়েরি আছে কয়েকটা!’

    শামীম বলল, ‘পড়তে চাইলে বের করে পড়তে পারো।’

    মৌরি সোৎসাহে বলল, ‘ইন্টারেস্টিং কিছু আছে?’

    শামীম এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘মমমমম, আছে। কিন্তু পুরোটা না। নানা আবোলতাবোল, মাঝেমধ্যে কিছু ইন্টারেস্টিং বিটস আছে। একটা লাল মলাটের খাতা আছে, সেটাতে নানা কিসিমের ভূতপ্রেত নামানোর তরিকা লেখা, ওটা পড়লেই বুঝবা কুটি দাদা কোন্ কিসিমের বুজরুক ছিলেন।

    সোমা হারিকেনের আলোয় ঘরের ভেতরটা দেখছিল, তার কাছে মোটেই ভাল লাগছে না ঘরের চেহারা।

    চুমকি বিরস গলায় বলল, ‘আমি মশার কয়েল জ্বালাচ্ছি তা হলে।’

    মৌরি আচমকা কী ভেবে যেন বলল, ‘চলো আমরা বেজমেন্টের ঘরটায় যাই। ওখানে গিয়ে খেলি।’

    শামীম একটু আড়ষ্ট হয়ে গেল। ‘একতলার ওই ঘরে?’

    নাসিফ গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ‘এই ঘরটা কি ইনাফ ভুতুড়ে না? আমার তো গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে।’

    সোমা এই প্রথম মৌরির কথায় আপত্তি করল, ‘দরকার কী? চলো এখানেই আড্ডা মারি।’

    মৌরি অনুভব করল, একতলার ঘরটার কথা সে যেন ঠিক স্বেচ্ছায় বলেনি। একতলার ঘরে গিয়ে কেন খেলতে চাইল সে?

    কিন্তু আইডিয়াটা খারাপও লাগল না তার কাছে। এ কথা স্পষ্ট যে এই বাড়িতে ভূতপ্রেত কিছু নেই। একতলার ঘরটা এই ঘরের চেয়েও উঁচু, সেখানে নিশ্চয়ই হানাবাড়ির পরিবেশটা আরও ভালমত পাওয়া যাবে। সে আবার বলল, ‘এসেই যখন পড়েছি, বেজমেন্ট দেখে আসি চল। মনু চাচী তো বললেন সবই পরিষ্কার করা আছে। সমস্যা কোথায়?’

    চুমকি খনখনে গলায় বলল, ‘আমাকে মশা কামড়ে শেষ করে ফেলল। তোমরা জলদি জলদি ঠিক করো কোথায় খেলবা।

    শামীম মৃদু গলায় বলল, ‘নিচের একতলার ঘরটা একটু অন্যরকম।

    সোমা টের পেল, তার ঘাড়ের কাছে রোম দাঁড়িয়ে গেছে। অন্যরকম মানে? নাসিফ একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘কী রকম? ডানজনস অ্যাণ্ড ড্রাগনস টাইপ নাকি?’

    শামীম কাঁধ ঝাঁকাল, ‘আয় দেখাচ্ছি। একটু অস্বস্তিকর আর কী।’

    মৌরি বলল, ‘শামীম ভাই, আমি লাল মলাটের খাতাটা পেয়েছি। ওটা নিয়ে আসি সাথে?

    শামীম বলল, ‘শিওর। তবে একটু সাবধানে হ্যাণ্ডল কোরো। পুরোনো দিনের খাতা তো, নরম হয়ে গেছে। কালি যেন চটে না যায়।

    মৌরি বাক্সের ভেতর থেকে লাল মলাটের খাতাটা বার করে হাতে নিল। চুমকি দুপদাপ পা ফেলে বেরিয়ে গেল হারিকেন ছাড়াই। একটু পর পর চটাশ চটাশ করে মশা মারছে সে।

    সবাই ঘর ছেড়ে বেরোনোর পর সবশেষে ঘর ছাড়তে গিয়ে আরেকবার হারিকেন উঁচিয়ে ঘরের ভেতরটা দেখে নিল মৌরি। নাহ্, তেলাপোকা-টিকটিকি- মাকড়সা কিচ্ছু নেই। হাফিজ মনে হয় সব ঝেড়েমুছে সাফ করেছে।

    হারিকেনটা নাসিফের হাতে ধরিয়ে দিয়ে দরজার পাল্লা টেনে আবার লাগিয়ে দিল মৌরি। নাসিফ সিগারেট টানতে টানতে হারিকেনের আলোয় দরজার নিচের ভেন্টিলেটরটা দেখতে লাগল।

    ‘ইন্টারেস্টিং। দেখেছ এটা?’

    মৌরি মাথা নাড়ল, ‘হ্যাঁ। ঘরটায় জানালা নেই, কিন্তু ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা আছে ভালই।’

    নাসিফ নিচু হয়ে ভেন্টিলেটরের ভেতরে আঙুল চালিয়ে কী যেন পরীক্ষা করল, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ইউ নো সামথিং? আই থিঙ্ক দিস কুটি দাদা চ্যাপ ওয়াজ কোয়াইট অ্যান ইন্টারেস্টিং ফেলো। এটা একটা কাঠের লুভার।

    মৌরি আঁচলের চাবি দিয়ে তালা এক কড়া থেকে খুলে দুটো কড়ার ভেতরে লাগাতে লাগাতে বলল, ‘লুভার কী জিনিস?’

    নাসিফ সিগারেটে টান দিয়ে বলল, ‘মমমম… কীভাবে বোঝাই? এটাতে কাঠের কতগুলো পাত একটু কোণ করে বসানো, যাতে হাওয়া ঢোকে, কিন্তু ধুলোবালি, শব্দ, রোদ না ঢোকে। আবার ঘরের ভেতরে ছাদের কাছে ঘুলঘুলিগুলো খোলা। ইন ফ্যাক্ট, এটাই কিন্তু ঘর ঠাণ্ডা রাখার এফিশিয়েন্ট ব্যবস্থা। ঠাণ্ডা বাতাস নিচ দিয়ে ঢুকবে, ঘরের ভেতরের হিট শুষে গরম হয়ে ওপরে উঠে ভেণ্টিলেটর দিয়ে বেরিয়ে যাবে। ইণ্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি এইভাবেই কুল করা হয়, শুধু কয়েকটা এগজস্ট ফ্যান থাকে ঘুলঘুলির জায়গায়…’

    মৌরি লাল মলাটের খাতাটা বগল থেকে বের করে হারিকেন নিজের হাতে নিয়ে বলল, ‘চল, নিচে চল। যন্ত্রপাতির গল্প পরে শুনব।’

    নাসিফ সিগারেটে জোরে শেষ টান দিয়ে কাঠের রেলিঙে ঠেসে ধরে আগুন নিভিয়ে বাইরে ছুঁড়ে মারল।

    বেজমেন্টের ঘরের দরজার সামনে শামীম চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সোমা ফিসফিস করে কী যেন বলছিল শামীমকে, মৌরি আর নাসিফকে নেমে আসতে দেখে সে চুপ করে গেল।

    নাসিফ হাতে হাত ঘষে বলল, ‘ওকে। ‘ডিল হচ্ছে, আমরা এখানে ঢুকব, ভূতপ্রেত যা-ই আছে, দেখব, তারপর সোজা মাদুর পেতে বসে মোনোপোলি খেলা শুরু করে দেব। উইথ চা অ্যাণ্ড মুড়ি-চানাচুর। ঠিকাছে, মৌরি? নো মোর গ্যালিভান্টিং অ্যারাউণ্ড। এলাম, দেখলাম, মোনোপোলি খেললাম। ভিনি ভিডি… চিমটাও কেন?’

    মৌরি বলল, ‘এটার তালা কি একই চাবি দিয়ে খোলে, শামীম ভাই?’

    শামীম মাথা ঝাঁকাল। তার মুখের গাম্ভীর্য কি কপট, নাকি হারিকেনের আলোয় এমন মনে হচ্ছে, ধরতে পারল না মৌরি। কিন্তু সোমাকে দেখে সে একটু দমে গেল। বেচারি নার্ভাস হয়ে আছে।

    বেজমেন্টের ঘরটা কাল সকালে দেখলেও চলত।

    তালা খুলে মৌরি কারও দিকে না তাকিয়ে জোরে একটা ধাক্কা দিল। দরজার পাল্লা দুটো খোলার সময় কর্কশ শব্দে কব্জায় তেলের অভাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিল তাদের সবাইকে।

    শামীম গলা খাঁকরে বলল, ‘ওকে, ভয়ের কিছু নেই। ঘরটা প্রায় ফাঁকা। শুধু…’ হারিকেন বাড়িয়ে ঘরের এক কোণে ধরল সে।

    মৌরি হারিকেন হাতে ঘরের ভেতরে ঢুকে শামীমের নির্দেশ করা দিকে চাইল।

    বেজমেন্টের ঘরটা অনেক উঁচু, হলঘরের মত। তিনটা হারিকেনের আলো ঘরের ভেতরের একটা ছোট অংশই কেবল আলোকিত করতে পেরেছে, সেই বলয়ের ভেতরে কিছুই চোখে পড়ল না মৌরির। সে কয়েক পা এগিয়ে হারিকেন উঁচিয়ে ধরার পর দেখতে পেল জিনিসটা।

    একটা খাঁচা।

    সোমা অস্ফুট শব্দ করে উঠল। ঘরের উচ্চতার সমান একটা খাঁচা, মোটা লোহার গরাদে কংক্রিটের ভিত্তির ওপর বসানো। খাঁচাটা গোল, খুব বড় নয়, কিন্তু তার উচ্চতার মাঝে একটা অশুভ ইঙ্গিত যেন আঁকা আছে।

    মৌরির কানে একটা ভীতু মৌরি ফিসফিস করে বলল, আমি আবার এসেছি। বলো তো এই ঘরে খাঁচা কেন?

    শামীম গলা খাঁকরে বলল, ‘জাস্ট একটা খাঁচা। চল এবার, খেলা শুরু করি।’

    প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল বিশাল ঘরটায়: শুরু করি…. করি…. করি…. করি…. ওরি….

    সোমা বিড়বিড় করে বলল, ‘চল ওপরে গিয়ে খেলি। আমার ভাল লাগছে না।’

    মৌরি এগিয়ে গিয়ে হারিকেন বাড়িয়ে ধরে খাঁচাটা দেখতে লাগল। খাঁচার ভেতরে একটা কাঠের পিঁড়ি রাখা। খাঁচার একটা দরজা আছে স্বাভাবিক উচ্চতার, সেটার গায়ে ঘরের দরজার মতই রুপালি নতুন তালা মারা। মৌরি হারিকেন যতদূর সম্ভব উঁচিয়ে ধরে খাঁচার পুরোটা দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু তার আলো ঘরের সিলিঙের উচ্চতার অন্ধকার দূর করার মত জোরাল নয়।

    চুমকির বিরক্ত কণ্ঠ ভেসে এল, ‘ভাবী, আস তো। খেলা শুরু করি।’

    মৌরি ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখল, শামীম সোমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে অভয় দিচ্ছে। সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল, ‘অ্যাই, সোমা, বোকা মেয়ে! একটা খাঁচা শুধু। ভয়ের কিছু নেই।’

    সোমা ঝাঁঝাল গলায় বলল, ‘আমি ভয় পাচ্ছি না। আমার ভাল্লাগছে না, সেটা বললাম।’

    মৌরি সোমার কাঁধে চাপড় দিল, ‘চল, আমরা একেবারে খাঁচাটার সামনে গিয়ে মাদুর পেতে বসে খেলি।’

    নাসিফ খাঁচাটা দেখে কোন মন্তব্য করেনি, সে একটা হাই তুলে বলল, ‘আমার বউ খাঁচার ভিতরে ঢুকে খেলার প্রস্তাব দেয়ার আগেই চল, আমরা যে কাজটা করতে এখানে এসেছি সেটা শুরু করি। চা, মুড়ি, মোনোপোলি। চুমকি, বোর্ড সাজা। শামীম, চা বের কর। সোমা, টিফিন ক্যারিয়ার খোলো। দিস ইজ ওয়ান ব্লাডি স্পুকি প্লেস। আমরা ভূতের গল্প করে আজকে ফাটিয়ে ফেলব।’

    চুমকি একটা হারিকেন তুলে স্যাণ্ডেল টেনে হাঁটতে হাঁটতে সামনে এগিয়ে গেল।

    সোমা এরকম বড় হলঘর আশা করেনি। বাইরে থেকে দেখে চট করে বোঝা যায় না, ঘরের ভেতরটা কত বড়। সে দেখতে পেল, তাদের হারিকেন এই মস্ত ঘরটার ভেতরে তিনটা আলোর পুকুর তৈরি করেছে কেবল, যাকে ঘিরে আছে ক্রমশ ঘনায়মান অন্ধকার।

    শামীম স্ত্রীর কপালে থুতনি ঘষে বলল, ‘আর কিছু নেই ঘরের ভেতর। একদম খালি। চল খেলতে বসি।’

    সোমার শরীরটা একটু শিথিল হয়ে এল। খামোকাই ভয় পাচ্ছে সে। মনু চাচীর গল্প শুনে সে ভয় পেয়ে গেল? মৌরির দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জা পেল সে। সেইসাথে অনুভব করল, ভয় পাওয়ার আগ্রহ এর মূল কারণ। চুমকি মোটেও ভয় পাচ্ছে না, কারণ তার কোন আগ্রহ নেই এসবে।

    সোমা জোর পায়ে এগিয়ে গেল সামনে। চুমকি খাঁচার দুই গজ সামনেই মাদুর পেতে বসে মোনোপোলি বোর্ড মেলে ধরেছে। মৌরি তার পাশে বসে কুটি দাদার খাতাটা খুলে ধরেছে হারিকেনের আলোয়। সোমা চুমকির উল্টোদিকে বসে মাটিতে হারিকেন নামিয়ে রাখল। তার সামনে মস্ত দানবের পাঁজরের মত পড়ে আছে খাঁচাটা। সোমা নিজেকে শাসন করল মনে মনে, এটা সামান্য খাঁচা একটা। একটা আধপাগল লোকের খেয়ালের ফল।

    মৌরি মলাট দেয়া খাতাটার পৃষ্ঠা ওল্টাল। সে অখণ্ড মনোযোগে পড়া শুরু করেছে।

    চুমকি ঝড়ের বেগে টাকা ভাগ করছে। দেড় হাজার ডলার বেঁটে দিতে তার দেড় মিনিটও লাগে না। ‘কে কী গুটি নিতে চাও? আমি জাহাজ নিচ্ছি।’

    নাসিফ মৌরির উল্টোদিকে বসে পড়ে বলল, ‘আমার একখান ইস্ত্রি, আছে যদিও, আরেকটা পেলে মন্দ হয় না।’

    শামীম হারিকেন নামিয়ে রেখে চায়ের ফ্লাস্ক আর কাগজের গ্লাস খুলতে খুলতে বলল, ‘মনু চাচীকে বলে রেখেছি, রান্নাঘরের দরজা খোলা রাখা আছে। বেশি রাতে যদি চা খেতে হয়, ওদের আর বিরক্ত করার দরকার হবে না, আমরাই বানিয়ে নিয়ে আসতে পারব। ওরা আবার একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। এন্তার পরোটা বানিয়ে রেখেছে হাফিজের বউ, হাঁড়ি ভর্তি গরুর গোস্ত আছে, আর এক থালা মুড়ি মাখিয়ে রাখা আছে। শুধু গিয়ে নিয়ে আসতে হবে। কাজেই…সারারাত ননস্টপ আড্ডা মারা যাবে।’

    নাসিফ বলল, ‘সোমা, টিফিন ক্যারিয়ারটা খোলো, এক চক্কর মুড়ি হয়ে যাক। আর ননস্টপ আড্ডা মারব কীভাবে রে, তাহাজ্জুদের নামাজ পড়তে হবে না আমাকে? অজুর পানির কী ব্যবস্থা?’

    চুমকি জিভ দিয়ে ছ্যাক করে একটা শব্দ করল। নাসিফের এসব রসিকতা পছন্দ করে না সে।

    নাসিফ হারিকেন উঁচু করে ধরে বলল, ‘আরেব্বাহ, অজুর বদনা জোগাড় করে রেখেছিস দেখি!’

    হারিকেনের আলোয় খাঁচার পাশে দেয়ালের কাছে একটা কাঁসার পাত্রের দিকে আঙুল তুলল সে।

    শামীম শুকনো হেসে বলল, ‘ওটা বদনা না রে। কুটি দাদার মাম্বোজাম্বোর পাত্র।’

    মৌরি খাতা থেকে চোখ তুলে চকচকে বদনাটার দিকে তাকিয়ে ছিল, সে অনেকক্ষণ পর মুখ খুলে বলল, ‘আয়ুষ্কটাহ!’

    নাসিফ চমকে ওঠার ভান করে বলল, ‘কস্কী! এইসব কী বলে রে?’

    মৌরি হাতে ধরা খাতায় আঙুল দিয়ে টোকা দিল, ‘এখানে বলা আছে এটার কথা। প্রেত নামাতে এটা লাগে।’

    সোমা একটু কাত হয়ে উঁকি দিল খাতার পাতায়। হলদে হয়ে এসেছে পাতাগুলো, তাতে বড় বড় গোটা গোটা বাংলা হরফে কী যেন লেখা। সেইসাথে অদ্ভুত সব নকশা আঁকা।

    শামীম চুমকির শ্যেন দৃষ্টি দেখতে পেয়ে থতমত খেয়ে বলল, ‘আমার টুপি।’

    সোমা অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘আমার জুতো। …এই মৌরি, কী লেখা এই খাতায়?’

    মৌরি চুমকির দিকে না তাকিয়ে বলল, ‘আমার গাড়ি। …আর বোলো না,সোমা। পুরো খাতা ভর্তি নানা ভূতপ্রেত নামানোর কায়দা। ইন্টারেস্টিং।’

    শামীম সোমার হাত থেকে টিফিন ক্যারিয়ার একরকম কেড়ে নিয়ে খুলে একটা বাটি আলগা করে বসল। ‘আমি অনেক আগে কয়েকটা পড়েছিলাম, যখন খাতাটা প্রথম খুঁজে পাই। রশিদ চাচা তখনও বেঁচে ছিলেন। উনি বলেছিলেন, কুটি দাদা নাকি অসুস্থ হওয়ার পর এরকম আরও দশ-বারোটা খাতা পুড়িয়ে ফেলেছিলেন কেরোসিন ঢেলে।

    সোমা বলল, ‘এটা পোড়াননি কেন?’

    শামীম ঠোঁট উল্টে বলল, ‘কে জানে? বাকিগুলোই বা পোড়ালেন কেন, তা-ই বা কে জানে?’

    মৌরি চুমকির দৃষ্টির তাপমাত্রা টের পেয়ে তাড়াহুড়ো করে হাতে দুই ছক্কা নিয়ে বলল, ‘ওকে, লেট’স রোল…কে কার আগে মারবে সেটা ঠিক হোক। এই চাললাম…দুই আর এক….ধুত্তেরি!’

    খেলা শুরু হলেও একটু পর সবাই মৌরির ওপর ক্রমশ বিরক্ত হয়ে উঠল। সে আনমনে ছক্কার চাল দিয়ে খাতার পাতা উল্টে যাচ্ছে। খেলায় একজন এমন অমনোযোগী হয়ে গেলে স্বাভাবিকভাবেই বাকিরা চটে ওঠে

    মিনিট চল্লিশেক খেলার পর চুমকি চটাশ করে হাতে-পায়ে চাপড়ে মশা মারতে মারতে বলল, ‘ভাবী, তুমি হয় খেলো, নয় বই পড়ো।’

    মৌরি বলল, ‘আমি খেলছি তো! …আর তোমাকে এত মশা কামড়াচ্ছে কেন? কয়েল তো জ্বলছে দেখি।’

    চুমকি বিরক্ত স্বরে ট্রাফালগার স্কয়্যারে সোমাকে ভাড়ার টাকা গুনে দিতে দিতে বলল, ‘জানি না। আমার রক্ত মনে হয় বেশি টেস্টি।’

    নাসিফ কাপে চা ঢেলে নিয়ে বলল, ‘চুমকি, মোনোপোলিতে ব্যাঙ্কের সিস্টেমটা পাল্টানো যায় নাকি রে? একটু পর পর চান্স আর কমিউনিটি চেস্টে কীসব সুদের কথা বলে। এটাকে মুদারাবা বানিয়ে দিলে কেমন হয়?’

    চুমকি মশা মারতে মারতে আগুনঝরা চোখে নাসিফের দিকে চেয়ে ছক্কা বাড়িয়ে ধরল। নাসিফ চাল দিতে দিতে বলল, ‘সুদ আর মুদারাবা সেই বুজুর্গ আর বুজরুকের মত। আকাশপাতাল তফাৎ রে।’

    শামীম হাতঘড়িতে সময় দেখে বলল, ‘সাড়ে এগারোটা বাজে। কেউ কি গোস্ত-পরোটা খেতে চাও আবার?’

    সোমা কনুই দিয়ে গুঁতো দিল শামীমকে। ‘সন্ধ্যায় না গপগপ করে খেলে?’

    শামীম বলল, ‘এখন আবার একটু খাব। কে কে খাবা বল, সেই অনুপাতে বেড়ে নিয়ে আসি।’

    চুমকি হাত তুলল, ‘আমি খাব, ভাইয়া। দুটো পরোটা।’

    নাসিফ বলল, ‘নিয়ে আসিস গোটা চারেক। সোমা লজ্জা কোরো না। কয়টা খাবা আগেভাগে বল। পরে ভাগ চাইলে পাবা না কিন্তু।’

    সোমা বলল, ‘অ্যাই, মৌরি, পরোটা খাবে?’

    মৌরি কুটি দাদার খাতা থেকে চোখ তুলে বলল, ‘শামীম ভাই, আমার আর সোমার জন্য দুটো করে। আর এক টুকরো কয়লা আনতে পারবেন?’

    শামীম একটু বিস্মিত হয়ে বলল, ‘কয়লা?’

    মৌরি বলল, ‘হ্যাঁ। মনু চাচীরা কয়লা দিয়ে রান্না করে দেখলাম। এক টুকরো হলেই চলবে।’

    নাসিফ বলল, ‘কয়লার ছাই দিয়ে দাঁত মাজবা নাকি?’

    মৌরি চোখ পাকিয়ে বলল, ‘পাকনা পাকনা কথা না বলে শামীম ভাইয়ের সাথে যাও। এত গোস্ত-পরোটা উনি একা আনতে পারবেন নাকি? আর টিউবওয়েল থেকে বোতলে করে ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এসো।’

    শামীম আর নাসিফ একটা হারিকেন তুলে নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। চুমকি ব্যাঙ্কের টাকা সন্তর্পণে সাজিয়ে রাখতে রাখতে বলল, ‘সোমা আপুর দান এরপর।’

    সোমা বলল, ‘আচ্ছা আসুক ওরা। খেয়েদেয়ে আবার শুরু করব না হয়।’ চুমকি একটা হারিকেন তুলে নিয়ে বলল, ‘আমি ঘরটা একটু ঘুরে দেখি।’ মৌরি কুটি দাদার খাতার পাতায় ডুবে আছে, সে কোন উত্তর দিল না। সোমা ঘষটে ঘষটে মৌরির পাশে এসে বসে বলল, ‘অ্যাই, মৌরি … কী পড়ছ এত মন দিয়ে? কী লেখা আছে খাতায়?’

    মৌরি মুখ না তুলেই বলল, ‘খুবই ইন্টারেস্টিং জিনিস! আর শামীম ভাই যতই বলুক, এই কুটি দাদা লোকটাকে আমার বুজরুক মনে হচ্ছে না। হয়তো মাথায় সামান্য গোলমাল ছিল, কিন্তু…অনেক গোছানো।’

    সোমা বলল, ‘কী গোছানো?’

    মৌরি খাতায় আঙুলের টোকা দিয়ে বলল, ‘অ্যাপারেন্টলি…উনি বিভিন্ন ভূতপ্রেত নামানোর কায়দা নোট করে গেছেন। একেবারে স্কেচসহ।’

    সোমা গলা বাড়িয়ে খাতায় উঁকি দিল। হলদেটে পাতায় ফাউন্টেন পেন দিয়ে স্পষ্ট হস্তাক্ষরে সমান্তরাল লাইনে লেখা। একপাতা জুড়ে ছবি, অন্য পাতায় লেখা।

    মৌরি বলল, ‘এটা সম্ভবত একটা পাণ্ডুলিপি। উনি অন্য কোথাও রাফ করে এখানে ফ্রেশ কপি তুলেছেন। কোন কাটাকুটি নেই। বানান ভুল আছে কিছু, কিন্তু খুব সহজ ভাষায় লেখা। কিছু কিছু শব্দের মানে জানি না, হিংটিংছট টাইপের কিছু মন্ত্রও আছে, আবার মাঝেমধ্যে আরবি-ফারসি কথাবার্তা…বাট ভেরি ইনট্রিগিং! তুমি কি রক্ষ বা হাড়কুড়ানির নাম শুনেছ কখনও?’

    সোমা আড়চোখে তাকিয়ে দেখল, চুমকি হারিকেন হাতে ঘরের একপ্রান্তের দেয়াল ঘেঁষে হাঁটছে। সে মাথা নাড়ল, ‘নাহ। কী এগুলো?’

    মৌরি সোৎসাহে বলল, ‘আমিও জানি না। কিন্তু উনি ক্যাটাগোরি ভাগ করে এদের ডাকার পদ্ধতি বর্ণনা করে গেছেন। জিহ্বিক, রক্ষ, দৈত্য, গুলমন্ত, হাড়কুড়ানি, লাশখাকি, করীদানো…’

    সোমা বলল, ‘তারপরও তোমার মনে হয় উনি বুজরুক ছিলেন না?’

    মৌরি খাতা থেকে চোখ তুলে সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমি জানি না, সোমা। বুজরুকরা এত ফ্যাসিনেটিং জিনিস লেখে না বোধহয়। তারা লোকজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে ভালবাসে। কুটি দাদা লোকটা বরং অনেকটা…ফ্যান্টাসি লেখকদের মত। উনি হয়তো নিজের তৈরি একটা ফ্যান্টাসির জগতে বাস করতেন। বুজরুক বললে একটু অবিচারই হবে।’

    সোমা কুটি দাদার খাতায় উঁকি দিয়ে বলল, ‘এটা কীসের নকশা?’

    মৌরি বলল, ‘এটা হাড়কুড়ানি আবাহন মঞ্চের নকশা। মাটিতে চুনের গুঁড়ো দিয়ে একটা বৃত্ত আঁকতে হবে। তারপর কয়লার গুঁড়ো দিয়ে তার ভেতরে একটা ত্রিভুজ। দুটোর মধ্যেই একটু ফাঁক রাখতে হবে, যাতে হাড়কুড়ানি এসে ঢুকতে পারে ভেতরে। তাকে টোপ দেয়ার জন্যে খাসির পাঁজরের হাড়ের টুকরো এইরকম স্পাইরাল করে বিছিয়ে দিতে হবে। সবচেয়ে বড় টুকরোটা থাকবে ওই ত্রিভুজের ভেতরে। হাড়কুড়ানি সেটা তুলতে গেলে কয়লা আর চুন দিয়ে ত্রিভুজ আর বৃত্ত বন্ধ করে দিতে হবে। ….মজার না?’

    সোমা ফিসফিস করে বলল, ‘আচ্ছা, এই যে মনু চাচীরা রাতের বেলা নানা শব্দ শুনতেন, সেগুলো কীসের?’

    মৌরি হলঘরের পরিসীমা ধরে পায়চারি করে বেড়ানো চুমকির দিকে চোখ রেখে আনমনে বলল, ‘আমার ধারণা কুটি দাদা নিজেই ওসব শব্দ করতেন। এই খাতায় অনেক মন্ত্রটন্ত্রের কথা বলা আছে। আর দূর থেকে রাতের বেলা কোন শব্দ এলে সেটাকে শুরুতেই ভূতের শব্দ বলে মনে হতে পারে। …নেভার মাইণ্ড। কিন্তু প্রত্যেকটা পদ্ধতিই খুব…

    ইম্যাজিনেটিভ। অনেকটা সুকুমারের ছড়ার মত লাগে পড়তে।’

    সোমা বলল, ‘কয়লা দিয়ে কী করবে তুমি?’

    মৌরি জিভ কেটে বলল, ‘আমি ভাবছিলাম, আজ রাতে একটা ভূতকে আমরা ডাকলে কেমন হয়?’

    সোমা চমকে উঠল। ‘না-না, মৌরি, এসব নিয়ে বেশি বাড়াবাড়ির দরকার নেই। আমরা মজা করতে এসেছি, মজা করে চলে যাই চলো।’

    মৌরি বলল, ‘দূর, বোকা! ভয়ের কিছু নেই। এটাও তো একটা মজাই?’ চুমকির মশা মারার শব্দ প্রবলভাবে প্রতিধ্বনিত হলো ঘরের ভেতরে। ‘উফফ, এত্তো মশা!’

    মশা…মশা…মশা…অশা…

    সোমা ফিসফিস করে বলল, ‘এই মেয়েটাকে এত মশা কামড়ায় কেন?’ মৌরি বলল, ‘জানি না। আমাকে কিন্তু এতক্ষণ একটা মশাও কামড়ায়নি।’

    সোমা বলল, ‘এই খাঁচাটার কী কাজ, কোথাও লেখা আছে খাতায়?’

    মৌরি আনমনে মাথা নাড়ল। ‘আমি পড়তে পড়তে সেটাই খুঁজছিলাম। এখন পর্যন্ত খাঁচার কথা তো কিছুই লেখা নেই। নানা মন্ত্র, নকশা, আর প্রচুর হাড্ডিগুড্ডির কথা লেখা।’

    চুমকি পিতলের পাত্রটার গায়ে পা দিয়ে টোকা দিতেই একটা খনখনে ধাতব শব্দ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। ‘এই, ভাবী, সারা ঘরে আর কিচ্ছু নেই, জানো?’

    মৌরি বলল, ‘হ্যাঁ, সব সাফ করে রেখেছে।’

    শামীম আর নাসিফ কথা বলতে বলতে ঘরে এসে ঢুকল। শামীমের হাতে একটা বড় ট্রে, আর নাসিফের হাতে একটা পানির জেরিক্যান। ‘এ কী? মৌরি এখনও লেখাপড়া করো নাকি?’ নাসিফ হাঁক ছেড়ে বলল।

    মৌরি বলল, ‘চলো একটা ভূত নামাই।’

    শামীম মাদুরের ওপর ট্রে নামিয়ে রেখে বলল, ‘মৌরি কুটি দাদার খাতা পড়ে খুব এক্সাইটেড মনে হচ্ছে? পাতায় পাতায় এই ভূত সেই ভূত নামানোর কায়দা লেখা, তাই না?’

    মৌরি বলল, ‘শামীম ভাই কি পুরোটা ম্যানুস্ক্রিপ্ট পড়ে দেখেছেন?’

    শামীম বলল, ‘আমি ইউনিভার্সিটিতে থাকতে একবার কয়েক বন্ধুর সাথে এসেছিলাম এখানে। তখন আমরা একবার কুটি দাদার প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী চেষ্টা করেছিলাম। চামচিকা ছাড়া আর কিছু তো আসেনি।’

    মৌরি একটা কাগজের প্লেটে মাংস আর পরোটা তুলে নিয়ে বলল, ‘কোন্ ধরনের প্রেত নামানোর চেষ্টা করেছিলেন?’

    শামীম বলল, ‘মনে নেই ঠিক। মাটিতে চুনের গুঁড়া দিয়ে হিজিবিজি নকশা, করতে হয়েছিল। আর কুটি দাদার চোথায় প্রচুর উদ্ভট জিনিসের কথা লেখা। বরই গাছের ডালপোড়া ছাই, শিং মাছের মাথা, পেকে পচে যাওয়া আমের আঁটি…আমরা সব জিনিস জোগাড় করতে পারিনি। মনে হয় সে কারণেই আর কিছু আসেনি শেষপর্যন্ত।’

    নাসিফ পরোটা ছিঁড়ে মুখে পুরে বলল, ‘মৌরির গায়ে হলুদের কথা মনে পড়ে গ্যালো!’

    চুমকি এসে হারিকেন নামিয়ে খাবার বেড়ে নিতে নিতে বলল, ‘তোমরা একটু পর পর খালি খাচ্ছ। খেলার মুড নাই কারও। আমি বরং খেয়েদেয়ে গিয়ে শুয়ে পড়ি।’

    নাসিফ বলল, ‘আরে না। ভুতুড়ে গল্পের কম্পিটিশন হবে এখন। তোর স্টকে তো অনেক সত্য গল্প আছে, ঘুমিয়ে পড়লে সেগুলো বলবে কে?

    মৌরি বলল, ‘কয়লা এনেছ?’

    নাসিফ পকেট থেকে খবরের কাগজে মোড়ানো এক টুকরো কয়লা বার করে দেখাল মৌরিকে।

    ‘এখনই খাবা?’

    মৌরি বলল, ‘শামীম ভাই, চলেন খাওয়ার পর আজকে আবার কোন প্রেতকে ডাকি আমরা।’

    শামীম সোমার দিকে একবার তাকিয়ে বলল, ‘প্রেত নামাতে একশো একটা হাবিজাবি লাগে যে?’

    নাসিফ গরুর মাংস চিবাতে চিবাতে বলল, ‘এই ডানজনের মধ্যে একটা ড্রাগনকে ডাকো, মৌরি।

    মৌরি চাপা হেসে বলল, ‘ইন ফ্যাক্ট, কুটি দাদার খাতায় ড্রাগনের জন্যও একটা ফর্মুলা আছে!’

    শামীম বলল, ‘তাই নাকি? ওটাকে ডাকতে কী লাগে?’

    মৌরি টিসুতে হাত মুছে খাতার পাতা ওল্টাল। ‘খুবই সিম্পল জিনিস, শামীম ভাই। এক টুকরো কয়লা, আর ওই যে ওই পাত্রটা…আয়ুষ্কটাহ। ওটার মধ্যে পানি ঢেলে কয়লার টুকরোর ওপর বসিয়ে মনে মনে মন্ত্র পড়তে হয়। ওহ, তার আগে তেজসৃপ আবাহন মঞ্চ আঁকতে হয়।’

    চুমকি পরোটার ভেতরে মাংস পুরে রোল বানিয়ে চিবাতে চিবাতে বলল, ‘এইসব মন্ত্র পড়লে গুনাহ হয়।’

    শামীম সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী, সোমা, নামাবে নাকি একটা ড্রাগন?’ সোমা পরোটার ছোট ছোট টুকরো মাংস দিয়ে খেতে খেতে বলল, ‘চলো নামাই।’

    নাসিফ ঝড়ের বেগে পরোটা শেষ করছিল একের পর এক, সে মুখভর্তি খাবার নিয়ে বলল, ‘ভালই হয়। কষ্ট করে আর চুলা জ্বালতে হবে না এরপর। ড্রাগনের মুখের উপর কেতলি ধরেই চা বানানো যাবে।’

    চুমকি চটাশ করে নিজের পায়ে চাপড় দিয়ে বলল, ‘উফ্, সাংঘাতিক চুলকাচ্ছে এখন। এত্তো মশা!’

    মৌরি দ্রুত পরোটা খাওয়া শেষ করে খবরের কাগজের পোঁটলা থেকে কয়লার টুকরোটা বের করে হারিকেন হাতে উঠে এগিয়ে গেল একপাশে। ‘তোমার খাওয়া শেষ হলে আলোটা একটু ধরবে? আমাকে খাতা দেখে দেখে আঁকতে হবে।’ নাসিফকে ডাকল সে।

    সোমা প্লেটটা নামিয়ে রেখে কাগজে হাত মুছে উঠে পড়ে বলল, ‘আমি আসছি, দাঁড়াও। নাসিফ ভাইয়ের খাওয়া মনে হয় ভোরের আগে শেষ হবে না।’

    নাসিফ আরেকটা পরোটা প্লেটে তুলে নিয়ে বলল, ‘ড্রাগনের সাথে মারপিট .. করার আগে গায়ে একটু শক্তি জোগাতে হবে না?’

    শামীম কোন কথা না বলে চুপচাপ খেতে লাগল, তার মুখ গম্ভীর।

    চুমকি বুঝে গেছে, আজ আর মোনোপোলির মুড নেই কারও, সে জমির দলিল আর টাকা গোছাতে লাগল প্রয়োজনের অতিরিক্ত শব্দ করে। মৌরি চোখ তুলে বলল, ‘চুমকি, ছক্কা দুটো কাজে লাগবে কিন্তু।

    চুমকি চটাশ করে মশা মেরে বলল, ‘আচ্ছা।’

    নাসিফ খাবারের প্লেট হাতে নিয়ে উঠে এগিয়ে গেল, তার একটু’ কৌতূহল হচ্ছে।

    মৌরি খাতা দেখে দেখে সিমেন্টের মেঝেতে কয়লা দিয়ে একটা নকশা আঁকছে। মৌরির আল্পনার হাত বেশ ভাল, তাই জটিল নকশাটাও সহজেই তার হাতে ফুটে উঠছে মেঝেতে। একটা বৃত্তের মাঝখানে দুটো ত্রিভুজ দিয়ে আঁকা তারা, তার ভেতরে একেক অংশে বিচিত্র সব চিহ্ন। হারিকেনের আলোয় মৌরির অভিব্যক্তি দেখে নাসিফ একটু বিস্মিত হলো, এমন তন্ময়ভাবে সে মৌরিকে আগে কিছু করতে দেখেনি। সোমা হারিকেন হাতে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে, তার চেহারায় স্পষ্ট অস্বস্তি। নকশাটা যতই পূর্ণ চেহারা নিচ্ছে, সোমার চেহারা ততই ফ্যাকাসে হয়ে উঠছে।

    ‘তা এই ড্রাগন এসে কী করবে? আলাপ-সালাপ করবে আমাদের সাথে?’

    মৌরি খসখস করে নকশা আঁকতে আঁকতে বলল, ‘সেরকমই তো মনে হয়।’

    নাসিফ খাঁচাটা দেখিয়ে বলল, ‘ওটার ভিতরে আসবে তো, নাকি?’

    মৌরি নাসিফের ইশারা দেখে হেসে ফেলল, ‘হ্যাঁ! ওই যে বদনাটা, ওর মাঝে পানি ঢেলে ওটার নিচে কয়লা রেখে ওই কাঠের পিঁড়িটার ওপরে রেখে আসতে হবে। যদি ড্রাগন আসে, কয়লার টুকরোটা আপনা-আপনি জ্বলে উঠবে। বদনার নিচে ছোট ছিদ্র আছে, সেই ছিদ্র দিয়ে পানি বের হতে থাকবে। পানি পড়ে আগুন নিভে গেলে ড্রাগন আবার চলে যাবে।’

    ‘বাপরে! বদনাটা তা হলে একটা টাইমার? ওয়াটারক্লক?’

    ‘মমম…হ্যাঁ! এর জন্যই ওটার নাম আয়ুষ্কটাহ। ড্রাগনের আয়ু আছে ওটার মধ্যে।’ মৌরি খসখস করে কয়েকটা টান দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ‘পানি এনেছ সাথে?’

    নাসিফ আঙুল বাড়িয়ে জেরিক্যানটা দেখাল। সোমার অস্বস্তিটা তার মাঝেও ধীরে ধীরে সংক্রমিত হচ্ছে।

    মৌরি জেরিক্যান থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে ঢকঢক করে খেয়ে বলল, ‘সবার খাওয়া শেষ হলে আমরা শুরু করব। আমি খাঁচার ভেতরে ওই পাত্রটা রেখে আসি।

    শামীম ধীরে ধীরে খাচ্ছে, সে একবার নাসিফের দিকে তাকাল শুধু। নাসিফ শামীমের কাছে এগিয়ে গিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘কী রে, ভয় পাচ্ছিস নাকি?’

    শামীম হাসার চেষ্টা করল। ‘ধুর! …এই ঘরটাই একটু ডিপ্রেসিং। খাওয়া শেষ কর, মজাই হবে।

    চুমকি মোনোপোলির বোর্ড গুছিয়ে আবার প্লেটে একটা পরোটা নিয়ে বসল। ‘আমি এইসব কুফরি কাজে নেই, ভাইয়া। আমি খাই, তোমরা ড্রাগন নিয়ে খেলো।’

    মৌরি ঘরের এক প্রান্ত থেকে পিতলের পাত্রটা নিয়ে এসেছে, তার চোখেমুখে একটা চাপা উত্তেজনা। জেরিক্যান থেকে সেটার ভেতর অল্প একটু পানি ভরে সে জিনিসটা উঁচু করে ধরল। পাত্রটার তিনটা পায়া আছে, তার নিচে সামান্য ফাঁকা জায়গা তৈরি হবে মাটির ওপর নামিয়ে রাখলে। মৌরি পাত্রের নিচে হাত ভরে দেখল, তার হাতে সূক্ষ্ম জলের বিন্দু ঝরে পড়ছে।

    নাসিফ তার প্লেটের পরোটার শেষ টুকরোটা মুখে পুরে বলল, ‘থিয়োরেটিক্যালি, কয়লায় আগুন জ্বলা শুরু করলেও কিন্তু এই পাত্রের ভেতরের পানি বাষ্প হয়ে যাবে। কাজেই পানি পড়ে আগুন নিভে যাবে, সে সম্ভাবনা খুব কম।’

    চুমকি হেসে ফেলল। ‘তুমি কি ভাবছ সত্যি ড্রাগন আসবে?’

    নাসিফ মৌরির দিকে তাকিয়ে কাঁধ ঝাঁকাল। ‘আমি শুধু ফিজিক্যাল সমস্যাটার কথা বললাম।’

    সোমা এসে দুই হাঁটু ভাঁজ করে বসল মাদুরের ওপর। মুখ গম্ভীর

    মৌরি এগিয়ে গিয়ে আঁচলের চাবি দিয়ে খাঁচার তালা খুলল। সারাবাড়িতে একই রকম তালা লাগানো, সব তালা একই চাবি দিয়ে খোলা যায়।

    নাসিফ দেখল, মৌরি সাবধানে কাঠের পিঁড়িতে কয়লার টুকরোটা নামিয়ে তার ওপর আয়ুষ্কটাহ বসিয়ে হারিকেনের আলোয় খাঁচার ভিতরটা ঘুরে ফিরে দেখছে। সে গলা চড়িয়ে বলল, ‘ড্রাগনের বিষ্ঠাফিষ্ঠা আছে নাকি?’

    মৌরি উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে এসে দরজায় আবার তালা লাগিয়ে দিল। নাসিফ একটু অস্বস্তি নিয়ে দেখল, মৌরি দরজাটা বারবার ধাক্কা দিয়ে পরীক্ষা করে দেখছে।

    শামীম নাসিফের অভিব্যক্তি পাল্টে যেতে দেখে চাপা গলায় বলল, ‘কুটি দাদা খুব কনভিন্সিং বুজরুক ছিলেন, বুঝতেই পারছিস। মৌরি তো খুব একটা ইমপ্রেশনেবল মেয়ে না। তা হলেই ভাব, মনু চাচীরা কেন ভয় পাবে না?’

    সোমা মুখ তুলে মৌরিকে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কী?’

    মৌরি মাদুরের ওপর বসে পড়ে বলল, ‘এখন আমরা পাঁচজন চক্র তৈরি করব…’

    চুমকি গলা চড়িয়ে বলল, ‘আমি নাই এসবের মধ্যে। আমি খাচ্ছি, তোমরা চক্র করো গিয়ে।’

    মৌরি চুমকিকে অনুরোধ করতে যাচ্ছিল, নাসিফ বলল, ‘ও এসব করতে না চাইলে সাধাসাধি কোরো না তো। কী করতে হবে বলো।’

    মৌরি নাসিফের গলায় হালকা বিরক্তির আভাস পেয়ে একটু আহত হলো। সে ক্ষুণ্ণমুখে বসে পড়ে বলল, ‘সবাই হাত ধরে গোল হয়ে বসতে হবে।’ চুমকির মোনোপোলির বোর্ড থেকে ছক্কা দুটো হাতে তুলে নিল সে।

    সোমা পরিবেশ হালকা করার জন্য বলল, ‘এই চান্সে নাসিফ ভাইয়ের সাথে হাত ধরাধরি করা যাবে।’

    নাসিফ নিজেকে সামলে নিয়েছে, সে তরল গলায় বলল, ‘আলো থাকবে, নাকি নিবিয়ে দিতে হবে?’

    মৌরি কুটি দাদার খাতার একটা পাতা ওল্টাল। ‘অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে এখানে। আমরা হারিকেনের সলতে কমিয়ে দিতে পারি। কারণ একেবারে অন্ধকার করলে ইনস্ট্রাকশনগুলো পড়া যাবে না।’

    চুমকি চটাশ করে মশা মেরে বলল, ‘আমি খাচ্ছি তো!’

    নাসিফ বলল, ‘হারিকেন কমিয়ে দিয়ে খা না।’

    চুমকি গজগজ করতে করতে হারিকেনের সলতে কমিয়ে দিয়ে উঠে একটু দূরে গিয়ে বসল।

    মৌরি বাকি দুই হারিকেনের সলতে নিভু-নিভু করে দিতেই ঘরটার চেহারা পাল্টে গেল। সোমার মনে হলো, অন্ধকারের সমুদ্রে দুটো ছোট্ট আলোর ভেলা ভাসছে তাদের সামনে। একটু দূরে প্রায় নির্বাপিত আলোর সামনে চুমকিকে আবছা দেখা যাচ্ছে কেবল।

    মৌরি বলল, ‘এখানে বলা আছে, চক্র মন্ত্র দ্বারা রতি। আবাহন মন্ত্রজপ পূর্বক তেজসৃপকে ডাকিতে হইবেক। তেজসৃপের উপস্থিতির ব্যাপ্তি আয়ুষ্কটাহ দ্বারা নির্ধারিত হইবেক।

    নাসিফ বলল, ‘আবাহন মন্ত্রটা কী?’

    মৌরি পৃষ্ঠা উল্টে বলল, ‘ওহ, মমমমম… না, সবাইকে পড়তে হবে না। মন্ত্রটা একবার করে পড়ে এই ছক্কা দুটো মারতে হবে। একসঙ্গে দুটো ছক্কা উঠলে তেজসৃপ এসে হাজির হবে, এমনটাই বলা আছে।’

    নাসিফ খিকখিক করে হেসে উঠল। ‘কুটি দাদা লোকটা কঠিন চিজ! প্ল্যানচেট, উইচক্রাফট, হোকাসপোকাস, লুডু-সব একসঙ্গে ঘুঁটা দিয়ে….হিহিহিহি!’

    চুমকি বিরক্ত স্বরে বলে উঠল, ‘হাত-পা চুলকাচ্ছে! এত্তো মশা!’

    মৌরি ছক্কা দুটো হাতে নিয়ে বলল, ‘সোমা, আমার কাঁধে হাত রাখো, না হলে ছক্কা চালার জন্যে হাত খোলা পাব না।

    সোমা চুপচাপ মৌরির কাঁধে হাত রাখল।

    মৌরি ছক্কা দুটো হাতে নিয়ে বিড়বিড় করে খাতায় টোকা মন্ত্রটা জপতে লাগল। তারপর গলা খাঁকরে বলল, ‘সবাই রেডি?’

    সম্মতিসূচক মৌনতা চুমকির মশা মারার শব্দটাকে জোরালো করে তুলল শুধু। মৌরি একটা শ্বাস ফেলে হাত থেকে ছক্কা দুটোকে গড়িয়ে যেতে দিল।

    শামীম চোখ কুঁচকে ছক্কার রিডিং দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু আবছা আলোয় কিছুই বোঝার উপায় নেই।

    নাসিফ ফিসফিস করে বলল, ‘ছক্কা দেখার দরকার কী? দুই ছক্কা উঠলে তো খোদ ড্রাগনই এসে হাজির হবে!’

    মৌরি হাত বাড়িয়ে ছক্কা দুটো আবার তুলে নিল। তারপর আবার বিড়বিড় করে মন্ত্র পড়তে লাগল।

    সোমা ঘাড় ঘুরিয়ে খাঁচার দিকে চাইল। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার সেখানে।

    মৌরি আবার ছক্কা ছুঁড়ে মারল।

    সোমা টের পেল, ঘরের ভেতরে হঠাৎ ফুরফুরে বাতাস বইছে। বাইরে আকাশে মেঘ ডেকে উঠল একবার।

    নাসিফ বলল, ‘ড্রাগন আসুক আর না আসুক, আমার বউ বৃষ্টি নামিয়ে দিয়েছে ছক্কা মেরে। এরপর মনে হয় বাজ পড়বে।’

    মৌরি মুখ দিয়ে শশশ আওয়াজ করে আবার ছক্কা হাতে নিয়ে বিড়বিড় করতে লাগল।

    মৌরির ছক্কার চালের পর গোটা ঘর ঝমঝম করে নেচে উঠল বাইরে বৃষ্টির শব্দে। ঘরের ভেতরে একটা ঠাণ্ডা হাওয়ার স্রোত বয়ে গেল আবার। চুমকি একটু দূরে খাবারের প্লেট নামিয়ে রেখে হাত মুছতে লাগল।

    নাসিফ প্রতি চালের পর পরই রসিকতা করছে। ‘কিন্তু না…অফ স্টাম্পের বাইরে দিয়ে চলে গেল ছক্কা…গোলপোস্টের ওপর দিয়ে সীমানার বাইরে…হ্যাঁ, ভাই, আসছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে, কুটি দাদা লিখিত, মৌরি বেগম পরিবেশিত, দাঁত-নখ-লেজসহ, ড্রাআআআগোনননননন!’

    মৌরি হাতের ছক্কা একটু জোরে গড়িয়ে দিল।

    নাসিফ কিছু বলার জন্য মুখ খুলেছিল, কিন্তু তার চোখের সামনে একটা উজ্জ্বল আগুনের বিন্দু নিঃশব্দে জ্বলে উঠে তাকে চুপ করিয়ে দিল।

    সোমা নাসিফের জোরে শ্বাস নেয়ার শব্দ শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে আঁতকে উঠল। ‘মৌরি!’

    মৌরি খাঁচার দিকে পেছন ফিরে বসেছিল, সে আগুনটা দেখে চমকে উঠে অস্ফুটে বলল, ‘এসেছে!

    একটু দূরে চুমকি গজগজ করে উঠল, ‘কী যে চুলকাচ্ছে সারা গায়ে! এত্তো মশা!’

    কয়লার আগুনটা অন্ধকারে একটা হিংস্র প্রশ্নবোধক হয়ে জ্বলতে থাকল। শামীম খাবি খাওয়া গলায় বলল, ‘এখন কী?’

    মৌরি কাঁপা হাতে খাতাটা তুলে নিয়ে চাপা গলায় বলল, ‘তেজসৃপের উপস্থিতি স্বল্পকালীন হওয়া বাঞ্ছনীয়। চক্র যদিও মন্ত্র দ্বারা রতি, কটি নহে। সকল প্রদীপ নির্বাপিত রাখিতে হইবেক। তেজসৃপ যেন সাধককে দেখিতে না পায়। তোমরা… তোমরা কেউ হাত ছেড়ো না, ঠিক আছে? চক্র ভাঙা যাবে না, এটা মন্ত্র দিয়ে রতি বলছে।’

    শামীম চাপা গলায় বলল, ‘মৌরি, তুমি একটা হারিকেন নিবিয়ে দাও তো!’

    মৌরি কাঁপা কাঁপা হাতে হারিকেনের সলতের চাবি খুঁজতে লাগল।

    নাসিফ ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল, ‘কিন্তু ওটা কোথায়? খাঁচার ভেতরে তো কিছু দেখা যাচ্ছে না!’

    সোমা ফুঁপিয়ে উঠে বলল, ‘আমার পিঠে…আমার পিঠে কে যেন শ্বাস ফেলল এই মাত্র!’

    নাসিফ বলল, ‘মৌরি…এরপর কী করতে হবে? কয়লার আগুন তো এখনও জ্বলছে!’

    মৌরি খাতার পাতা উল্টে চাপা গলায় পড়তে লাগল, ‘তেজসৃপের দেহ অন্ধকারে প্রজ্বালিত হইয়া দেখা দিবেক। কোনরূপেই সাধক চক্রের দরজা খুলিয়া যেন বাহির না হয়।’

    একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল ঘরে। দূরে কোথায় যেন একটা চাপা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শোনা গেল।

    শামীম ভাঙা গলায় বলল, ‘চক্রের দরজা?’

    মৌরি কাঁপা গলায় বলল, ‘তাই তো বলছে…চক্রের দরজা আবদ্ধ রাখিতে হইবেক।

    সবাই ঘাড় ঘুরিয়ে খাঁচাটার দিকে তাকাল। খাঁচার ভেতরে কয়লার টুকরোটা ক্রমশ উজ্জ্বলতর হয়ে জ্বলছে।

    নাসিফ বিড়বিড় করে বলল, ‘চক্র হচ্ছে ওই খাঁচাটা।’

    সোমা ককিয়ে উঠল, ‘আমাদের ওটার ভেতরে থাকার কথা? আমাদের খাঁচার ভেতরে থাকার কথা ছিল?’

    মৌরি কাঁপা হাতে পৃষ্ঠা ওল্টাল, কিন্তু এরপর নতুন অধ্যায় শুরু।

    করীদানো আবাহন।

    মৌরির হাত থেকে খাতাটা পড়ে গেল একটা চাপা, দীর্ঘ, ঘড়ঘড়ে শব্দে।

    একটু দূরে চুমকির হারিকেনের পাশে একটা শরীরের আকার ফুটে উঠল।

    ঠাণ্ডা, নীলচে আভা।

    চুমকি উঠে দাঁড়িয়েছে। পাগলের মত শরীর চুলকাচ্ছে সে। একটা ঘড়ঘড় শব্দ হচ্ছে তার গলা দিয়ে।

    ধারাল কিছু দিয়ে কাপড় ছেঁড়ার ফড়ফড় শব্দ ভেসে এল এরপর। চুমকি নিজের শরীর থেকে কাপড় ছিঁড়ে খুলে ফেলছে। তার গোটা শরীর থেকে বেরিয়ে আসছে নীলচে আভা। সে আলোয় দেখা যাচ্ছে, চুমকির গায়ে চামড়ার ওপর ছোট ছোট আঁশ গজিয়ে উঠছে।

    চুমকির একটা হাত মাথার ওপর উঠে গেল। বাইরে ঘুলঘুলি দিয়ে চকিতে ঘরে ঢুকল চমকিত বিদ্যুতের আলো, সে আলোয় সেকেণ্ডের ভগ্নাংশের জন্যে দেখা গেল, চুমকির সারাগায়ে আঁশ, তার হাতে গজিয়ে উঠেছে ধারাল নখর, স্কার্ফ ছিঁড়ে ক্রমশ বিকৃত আকার নিচ্ছে তার মাথা।

    ড্রাগন এসেছে ডাকে সাড়া দিয়ে।

    মন্ত্রে রতি চক্রের ভেতরে নির্লিপ্তভাবে জ্বলতে লাগল একদলা কয়লা। তার বাইরে, অরক্ষিত ঘরের ভেতরটা কয়েকবার উজ্জ্বল হয়ে উঠল দীর্ঘ, শ্বেততপ্ত শিখার স্রোতে।

    চারবার!

    .

    মাহবুব আজাদ

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleকাঞ্চন-মূল্য – বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    Next Article সমুদ্র কন্যা – আশাপূর্ণা দেবী

    Related Articles

    তৌফির হাসান উর রাকিব

    হাতকাটা তান্ত্রিক – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

    August 25, 2025
    তৌফির হাসান উর রাকিব

    অন্ধকারের গল্প – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

    August 25, 2025
    তৌফির হাসান উর রাকিব

    ট্যাবু – তৌফির হাসান উর রাকিব

    August 25, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    अनीश दास
    मौलाना शाह वलीउल्लाह
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অশোককুমার মিত্র
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেইল লোনডেস
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত

    April 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    ধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত

    April 24, 2026
    Our Picks

    ধূসর আতঙ্ক – অনীশ দাস অপু সম্পাদিত

    April 24, 2026

    সমুদ্র কন্যা – আশাপূর্ণা দেবী

    April 24, 2026

    নিশিডাকিনী – তৌফির হাসান উর রাকিব সম্পাদিত

    April 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }