আয়না – প্রিন্স আশরাফ
আয়না
ফতিমার যখন বিয়ের সম্বন্ধ এল, না করতে পারল না সে। আব্বাকে মুখ ফুটে বলতে পারল না, সে ভালবাসে অন্য কাউকে। সেটা সম্ভব নয়, সে জানে। তার অসম্ভব রাগী একরোখা বাবা মেজো আপুর বিয়ের আগে কী কাণ্ডটাই না করেছিলেন, সেটা ফতিমার ভালই জানা আছে। তা-ও তো সেটা প্রেম নয়, শুধু সেই ছেলে মেজো আপুকে দেখে নিজে এসে প্রস্তাব দিয়েছিল। তাতে আব্বার রাগ মন্দ্রসপ্তকে।
ফতিমা রাজি হতে আপত্তি করল না। যার সাথে তার সম্বন্ধ ঠিক হয়েছে, সে-ও আপত্তি করার মত ছেলে নয়। ব্যাঙ্কের ভাল চাকুরে, আধুনিকমনা। তার আব্বার মত ধর্মীয় কুসংস্কারে গড়া নয়। সর্বোপরি আশিকের চেহারা-ছবিও ভাল। একেবারে নায়কের মত না হলেও আটপৌরে আর দশটা বাঙালি চাকরিজীবীর মত নয়।
বিয়ের রাতে আশিক যখন ফতিমাকে প্রথম রাতের আদরে ব্যতিব্যস্ত করতে চাইল, তখন ফতিমা নিরাসক্তভাবে আশিকের আবেদন এড়িয়ে গেল। প্রথম রাতের ভীতির কথা চিন্তা করেই নয়, তখন তার খুব করে মনে পড়ছিল সবুজের কথা। এই রাতে তার সবুজের সাথেই থাকার কথা ছিল। কিন্তু নিয়তির পরিহাসে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজনের সাথে রাত কাটাতে হচ্ছে তাকে।
বিয়ের ধকল হিসেবে বিবেচনা করে আশিকও বিবেচকের মত প্রথম রাতে ফতিমাকে রেহাই দিল।
সকালে ভোরের আলো ফুটতেই বিয়ে-বাড়িতে দুঃসংবাদটা ভেসে এল। সবুজ নিজ ঘরের সিলিং ফ্যানের সাথে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। একই গ্রামের ছেলে হিসাবে বিয়ে-বাড়ির সবাই ঘটনাটা নিয়ে চুকচুক করে দুঃখ- প্রকাশ করল। শুধু ফতিমার মনোজগতে ব্যাপক তোলপাড় হলো। কারণ একমাত্র সে-ই জানে, কেন আত্মহত্যা করেছে সবুজ।
ফতিমার বিয়ের খবর পাক্কা হয়ে গেলে সবুজ দেখা করতে এসেছিল। ফতিমাকে জানিয়েছিল, ‘এই তোমার সাথে আমার শেষ দেখা। আর কখনও দেখা করতে এসে তোমার সুখের নতুন জীবনকে বিষিয়ে তুলব না।’
তখন ওটা সবুজের কষ্টে বলা কথা ভেবেছিল। হয়তো সে কোন চাকরি- বাকরি নিয়ে চলে যাবে গ্রাম ছেড়ে। অথবা ও চলেছে শ্বশুরবাড়ি, তাই ওই জাতীয় কথা বলেছে। তখন ফতিমা গুরুত্ব বোঝেনি, সেই শেষ দেখা যে সবুজের পরপারে পাড়ি জমানোর ইঙ্গিত!
একই গ্রামের ছেলে মারা গেছে হিসাবে সবুজকে দেখতে উৎসুক হয়ে উঠল বিয়ে-বাড়ির এক দঙ্গল মহিলা।
ফতিমাও মায়ের কাছে আবদার ধরল, ‘মা, আমিও একটু দেখতে যেতে চাই।’
মা ব্যাপার কিছুটা আঁচ করছিলেন। তিনি অনুমতি দেয়ার আগে বললেন, এখন তো আর তোমার অনুমতি দেয়ার মালিক আমরা নই, মা। যিনি অনুমতি দেয়ার, তাঁর কাছ থেকেই অনুমতি নিয়ে এসো।’
ফতিমা মায়ের কথা বুঝল। কথাটা পাড়ল আশিকের কাছে। আশিক নিজেকে যথেষ্ট বিবেচক মনে করে, জিজ্ঞেস করল, ‘কার সাথে যাচ্ছ? মা কি যাচ্ছেন?’
ফতিমা উপর-নিচ মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ জানিয়ে কালো বোরকা পরতে লাগল। এই বাড়ির কেউ বোরকা ছাড়া বাইরে বেরোয় না। সবুজের সাথে প্রেম করার সময় এই বোরকা তার সঙ্গী ছিল, সবুজের মৃতদেহ দেখার সঙ্গীও এই বোরকা।
ফতিমার এত আগ্রহ করে যাওয়ার আরও একটি গোপন কারণ আছে। সবুজের কাছে সে কয়েকটি চিঠি লিখেছিল প্রেমকালীন পর্বে। পুলিশ এসে যদি সেগুলো উদ্ধার করে, তো কালিমা লেগে যাবে তার দাম্পত্য জীবনে। সবুজ চিঠিপত্র কোথায় রাখে, সেই গোপন তথ্যটা ফতিমা জানত। সবুজের কোন কিছুই তার কাছে গোপন ছিল না।
মরাবাড়ি লোকে লোকারণ্য। গ্রামের মুরব্বি স্থানীয়রা উঠোনে বসে গুরুগম্ভীর আলোচনা করছেন। যুবক ছেলেরা মিলে ফ্যান থেকে লাশ নামিয়ে সাদা চাদর দিয়ে ঢেকে দিয়েছে। কান্নার তুফান তুলেছে মা-বাবা-আত্মীয়স্বজন।
লোকের ভিড়ে ফতিমার সুবিধে হলো। সে ঢুকে গেল সবুজের ঘরের ভেতরে।
সবুজের ব্যবহৃত দেয়ালে ঝোলানো একটা এক ফুট বাই দেড় ফুট আয়নার পেছনের পারার পাশে চিঠিগুলো সযত্নে রাখা আছে। কিন্তু আয়না খুলে চিঠি বের করা ঝক্কির ব্যাপার। এর চেয়ে কোনমতে গোটা আয়নাটা নামিয়ে বোরকার ভেতরে ঢুকিয়ে ফেলতে পারলেই ভাল। বাড়িতে গিয়ে আয়না খুললেই হবে।
ফতিমা সুযোগের অপেক্ষা করছিল। পেয়ে গেল। পুলিশ এসেছে কলরব ওঠায় সবাই পুলিশ দেখতে ঘর ছেড়ে বারান্দার দিকে গেল। যেন পুলিশ কোন অদ্ভুত প্রকৃতির জীব! অন্য গ্রহ থেকে এসেছে। ফতিমা সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আয়নাটা ঢুকিয়ে ফেলল বোরকার ভেতরে, বুকের খুব কাছে।
সে রাতেও আর তাদের বাসর হলো না। গ্রামের একটা ছেলে আত্মহত্যা করায় ফতিমার মন খারাপ। সে আয়নাটা গোপনে ট্রাঙ্কে লুকিয়ে রেখে আগেভাগে শুয়ে পড়ল। সংবেদনশীল আশিক স্ত্রীর এরকম মানসিকতা বুঝে আর ঘাঁটানোর সাহস করল না।
পরের দিন আশিক স্ত্রীকে শ্বশুরবাড়ি রেখে ঢাকায় চলে গেল। স্ত্রী তার কাছে অধরাই রয়ে গেল।
রাতে ঘরে একা বিছানায় শুয়ে ফতিমার ভয়-ভয় করতে লাগল। বিয়ের আগে হলে মাকে ভজিয়ে-ভাজিয়ে এই ঘরে শুতে আনতে পারত। মেয়েদের বিয়ে হয়ে যাওয়া মানে বাবার বাড়ির অদৃশ্য বাঁধন ছিঁড়ে যাওয়া।
ভয় কাটাতে অথবা সবুজের কথা মনে পড়ায় ফতিমা বিছানা থেকে নামল। আলো জ্বেলে ট্রাঙ্কের ভেতর থেকে বের করে আনল আয়নাটা। সবুজের কাছে লেখা চিঠিগুলো বের করাই উদ্দেশ্য। ওগুলো পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আয়নাটাও ফেলে দিতে হবে। সবচে’ ভাল হয় ভেঙে টুকরো-টুকরো করে জানালা দিয়ে ফেলে দিলে। পুরানো আয়নার ভাঙা টুকরোকে কেউ পাত্তা দেবে না।
আয়নাটা উল্টো অবস্থায় বের করে পিঠের হার্ডবোর্ডটা খুলতে চেষ্টা করল। খালি হাতে না পেরে মাথার ক্লিপ দিয়ে চাড়া দিতেই খুলে এল হার্ডবোর্ডটা। কিন্তু খুলেই ধক করে উঠল ফতিমার বুকটা। চিঠিগুলো ওখানে নেই। কিছুই নেই ওখানে, ফাঁকা। তা হলে কি সে ভুল করে ভুল আয়না নিয়ে এসেছে? কিন্তু যতদূর মনে পড়ে, সবুজের ঘরে ওই একটা আয়নাই দেখেছিল সে। তা হলে?
সবুজ কি চিঠিগুলো অন্য কোথাও রেখেছিল? অন্য কারও হাতে যদি পড়ে? তার পরিচয় যদি বেরিয়ে যায়? নিজে মরে তাকেও কি মেরে রেখে গেল পাষণ্ডটা? ফতিমার মাথা পাগল-পাগল লাগতে লাগল। কিন্তু মেয়েমানুষের সহজাত প্রবৃত্তি যাবে কোথায়? আয়নাটা ভাঙতে গিয়েও থমকে গেল। একে তো এই মাঝরাতে মেঝেতে আয়না আছাড় মেরে ভাঙলে কাঁচ ভাঙার খান-খান শব্দে পাশের রুমে মা-বাবা জেগে উঠতে পারেন। দ্বিতীয়ত, আয়না হাতে নিলেই প্রথমে যে ইচ্ছেটা করে, তা হলো নিজের মুখটা একবার দেখা।
ফতিমা আয়নায় নিজের মুখ দেখে চমকে উঠল।
কেমন যেন অন্য মানুষের মুখের মত দেখাচ্ছে!
পল্লী বিদ্যুতের কল্যাণে ইলেকট্রিসিটি গ্রামে পৌঁছলেও এত কম সময় থাকে যে, ঘরে-ঘরে হ্যারিকেন জ্বালতে হয়। রাতে অধিকাংশ সময়েই ইলেকট্রিসিটি থাকে না। ঊর্ধ্বাংশে কালি পড়া হ্যারিকেনের ঝাপসা আলোর কারণেই কি অমনটা দেখাচ্ছে? তা তো নয়!
তাড়াতাড়ি আয়নাটা হাত থেকে বিছানার উপর উপুড় করে রাখল। ভয়ে পিপাসা পেয়েছে। রাতে শোবার আগে মা এক জগ পানি ও গ্লাস রেখে গেছেন। ফতিমা জগের গলা ধরে উঁচিয়ে পুরুষালী ভঙ্গিতে পানি পান করল।
একটু ধাতস্থ হয়ে নিজের বিয়ের উপহার পাওয়া ব্যাগটা খুলল। ওখানে অদ্ভুত একটা আয়না উপহার পেয়েছে সে। শ্বশুরবাড়ি থেকেই পাঠিয়েছে। দু’মুখো আয়না। একপাশে নিজের চেহারা বেশ গোলগাল সুন্দরীই লাগছে। বিয়ের পানি পড়লে মেয়েরা এমনিতে অনেক সুন্দরী হয়ে যায়। আর সে আহামরি সুন্দরী না হলেও একেবারে ফেলনা নয়। ধড়ে প্রাণ এল ফতিমার। যাক, নিজের চেহারা তা হলে ঠিক আছে। আয়নার ওপাশে দেখল। লম্বাটে চেহারাটা আরও সুন্দর লাগছে। নিজের রূপে মুগ্ধ হয়ে আরও কিছুক্ষণ নিজের চেহারা দেখল ফতিমা। তা হলে ওই আয়নায় চেহারাটা ওরকম বিদঘুটে দেখাল কেন? তার নিজেকে ঠিক মানুষের মত দেখা গেছে, কিন্তু কেমন যেন অন্য মানুষ। বিয়ের পর কি মেয়েরা অন্য মানুষ হয়ে যায়?
ফতিমা রহস্য উদ্ঘাটনে আবারও সবুজের আয়নাটা হাতে তুলে নিল। হ্যারিকেনের আলো বাড়িয়ে দিয়ে মুখের সামনে আয়না তুলে ধরল। তার চেহারা আয়নার ভেতরে দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সত্যিই একটু অন্যরকম। অন্যরকমের রহস্য বের করে ফেলল ফতিমা। কাঠের ফ্রেমের আয়নাটা অনেক পুরানো। আয়নার মূল উপাদান যে পারা, সেটাই ভেতরে কোন-কোন জায়গায় উঠে গেছে। আর সৈ কারণেই চেহারার ওই জায়গাগুলো ফাঁকা দেখানোর কারণে ওরকম অদ্ভুত ভৌতিক দেখাচ্ছিল মুখটা। ভয়ের কিছু নেই।
আয়নাটা আর ভাঙা হলো না। বিছানায় বালিশের পাশে রেখে হ্যারিকেনটা ডিম করে দিয়ে শুয়ে পড়ল ফতিমা। কেন ভাঙা হলো না, শুয়ে শুয়ে তা-ই ভাবতে লাগল। প্রথমত, কাঁচের শব্দ হবে। কিন্তু তারও সমাধান আছে। একটা কাপড়ের মধ্যে জড়িয়ে ভেঙে ফেললে শব্দ হত না। তা হলে? আয়নার ভেতরে ওই অদ্ভুত মুখটা কি কোনভাবে সবুজের মুখের আদল পেয়েছিল? কিন্তু তার মুখের সাথে তো, সবুজের মুখ কোনভাবেই মেলে না। অবচেতন মনে এখনও সবুজের ভাবনায় মগ্ন বলেই কি ওরকমটি দেখছে? সবই কি অবচেতন মনের খেলা?
শুয়ে-শুয়ে ছটফট করতে লাগল ফতিমা। ঘুম এল না। হ্যারিকেনটা ডিম থেকে কখন যে নিভে গেছে, কে জানে! হাতের কাছে আলোর আর কোন উৎস নেই। হঠাৎ করে ফতিমার মনে হলো, তার পাশে শুয়ে আছে কেউ একজন। যে শুয়ে আছে, সে পুরুষ! তার গায়ের পুরুষালী গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু কোন শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ নেই। ভয়ে হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যেতে চাইল ফতিমার। কিন্তু ভয় কাটিয়ে জয়ী হলো কৌতূহল। অনেক সাহস সঞ্চয় করে পাশে হাত দিয়েই চমকে উঠল সে। ঠাণ্ডা কিছু একটা তার হাতে ঠেকছে। মানুষের শরীর নয়। কাঁচের মত অন্য কিছু। তখনই মনে পড়ল, বিছানার পাশে রেখেছিল আয়নাটা। তাতেই হাত পড়েছে। কী মনে করে আবার আয়নাটা হাতে নিল ফতিমা। সরিয়ে রাখার জন্য মুখের সামনে আনতেই আলোর ঝলকানি দেখতে পেল। মনে হলো, কেউ যেন হঠাৎ করে ঘরের ভেতরে ছোট টর্চের আলো একবার ঘুরিয়ে আনল। গ্রাম দেশে ঘরে যুবতী মেয়ে থাকলে এ উৎপাত সহ্য করতে হয়। রাত-বিরাতে টিনের ঘরের চালে ঢিল পড়ে। খোলা জানালা দিয়ে টর্চের আলো এসে পড়ে ঘরের মধ্যে। আর ভয়ঙ্কর বিকৃত মানসিকতার কেউ- কেউ খোলা জানালা দিয়ে শরীরে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারে। কিন্তু এক সবুজ ছাড়া আর ডিস্টার্ব করার মত কেউ তার ছিল না। আর সবুজের সাথে তো তার…তা হলে কি সবুজই? তা কী করে হয়? মৃত মানুষ কখনও জানালায় টর্চ মারতে পারে?
যতদূর মনে পড়ে, কাঠের জানালাগুলো খুব ভালভাবেই ভেতর থেকে বন্ধ করা। আয়না ভেঙে ফেলে দেয়ার জন্য একবার জানালা খোলার কথা ভেবেছিল। কিন্তু আয়নাও ভাঙা হয়নি, জানালাও খোলা হয়নি। তখনই মনে হলো, আলোর ঝলকানিটা আয়নার ভেতরেই দেখেছে সে। এবার শুধু আয়নার ভেতরে আলো নয়, ভেতর থেকে বুনো ফুলের গন্ধ ভেসে আসতে লাগল। এরকম মিষ্টি বুনো ফুলের গন্ধ আর কখনও পায়নি ফতিমা।
আয়নাটা রেখে দিয়ে শুয়ে পড়তে চাইল সে। রাখতে গিয়ে আলোর উৎস খুঁজতে তাকাল আয়নার ভেতরে। না, কোন আলো দেখা যাচ্ছে না। অন্য কোথাও থেকে আলো আয়নার উপর পড়ে রিফ্লেকশন হতে পারে। কিন্তু সেই রকমটি এখন আর নেই। সে অবাক হয়ে লক্ষ করল, আয়নার মধ্যে আবছা-আবছা অন্ধকার একটি মুখ ভেসে উঠেছে। সেই মুখটা ওর নয়। সেই মুখটা অন্য কারোরই নয়। সবুজের মুখ। মৃত সবুজের মুখ।
ভয়ে অলক্ষুণে আয়নাটা ছুঁড়ে দিল দেয়ালের এক কোণে। ভেবেছিল দেয়ালের গায়ে লেগে অথবা সিমেন্টের মেঝেতে পড়ে কাঁচের জিনিসটা ভেঙে খান-খান হয়ে যাবে। কিন্তু সেরকম কোন শব্দ ভেসে এল না। বরঞ্চ নরম কিছুর উপর পড়ার খ্যাপ করে শব্দ হলো। নাকি কেউ দাঁড়িয়ে থেকে বল লুফে নেয়ার মত ক্যাচ ধরেছে?
আর ভাবতে পারল না ফতিমা। ভয়ের শিহরন শিরদাঁড়া বেয়ে নিচে নামতে থাকল। ভয় এড়াতেই গরমের মধ্যেও চাদর টেনে মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল সে। ঘুম এল না। মনে হলো ঘরের মধ্যে অশরীরী কেউ নিঃশব্দে চলাচল করছে। তার গা দিয়ে বুনো ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। মানুষ মরে যাওয়ার পরে গা দিয়ে কি বুনো মিষ্টি গন্ধ বেরোয়? নাকি শুধু অপঘাতে মরলে?
শুয়ে-শুয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে চিন্তা করতে থাকল সে। হয়তো অযথাই ভয় পেয়েছে। আয়না নিয়ে যেমনটি ভাবছে, ওরকম কিছু ঘটেনি। মৃত সবুজের চিন্তা সবসময় মাথায় ছিল বলে অন্ধকারে আয়নার মধ্যে নিজের ছায়ায় সবুজের মুখ ভেবেছে। বুনো মিষ্টি গন্ধটা নতুন কাপড়চোপড়ের গন্ধ হতে পারে। বিয়ে উপলক্ষে হরেক উপহার পেয়েছে সে। কাপড়চোপড়ই আছে গাদাখানেক। সবই ঘরের এক কোনায় স্তূপ করে রাখা। গন্ধটা তার থেকে আসতে পারে। আগেও হয়তো ছিল, এখন রাত গভীর হয়েছে, মাথা গরম হয়ে আছে বলে এত তীব্র লাগছে গন্ধটা। সকাল হলে, দিনের আলো ফুটলে সব ঠিক হয়ে যাবে। চাদরের ভেতরে শুয়ে সকালের অপেক্ষা করতে থাকল সে।
চাদর-মুড়ি দিয়ে শুনতে পেল ঘরের ভেতরে কে যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে। যে-ই হোক, সে মাথা বের করবে না। চাদর থেকে মাথা বের করতেও ভয়। কেন জানি, মনে হলো মাথা বের করে সিলিঙের দিকে তাকালেই দেখতে পাবে, তাদের সিলিং ফ্যান থেকে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে রয়েছে সবুজ। বীভৎসভাবে চোখের কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে বড়-বড় চোখ, লম্বা জিভটা মুখ থেকে বেরিয়ে আছে একপাশে। দীর্ঘশ্বাসের শব্দ কার সে জানে, কার জন্য, তা-ও ভাল করে জানে।
.
মসজিদ থেকে ফজরের আজানের ধ্বনি ভেসে এল। আজানের সাথে-সাথে জেগে উঠল গোটা বাড়ি। আব্বা ফজরের নামাজের জন্য মসজিদে যান। মা সবাইকে নামাজ পড়তে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন। আব্বা-মা’র ঘর থেকে জেগে ওঠার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ফতিমা বিছানার উপর উঠে বসল।
মা এসে দরজা ধাক্কালেন। মেয়েটা ঘর অন্ধকার করে দরজা দিয়ে শুয়েছে কেন? সবুজের সাথে ওর একটা সম্পর্ক চলছিল, তিনি জানেন। কিন্তু তা যে পরিণতিতে গড়াবে না, ভাল করেই জানতেন তিনি। সবুজ আত্মহত্যা করায় মেয়েও কি ওরকম পথ বেছে নিতে পারে? জামাইয়ের সাথে যে অন্তরঙ্গতা হয়নি, তা জামাইয়ের শুকনো মুখ দেখেই বুঝেছিলেন। ‘ফতিমা, ওঠ, ফজরের আজান দিয়েছে। ফতিমা…ও, ফতিমা।’
‘উঠি, মা। তুমি একটু হ্যারিকেনটা নিয়ে আসো। ঘরে অন্ধকার।’
‘কারেন্ট আছে তো। লাইট জ্বালা।’
‘আমার ভয় করছে, মা। বিছানা থেকে নামতে পারছি না। লাইট জ্বালাব কীভাবে?’
‘ভয় কীসের? আমি দরজার এপাশে দাঁড়িয়ে আছি। নেমে পড় বিছানা থেকে।’
‘নামতে পারছি না, মা। নামলে ও আমাকে ধরে ফেলবে। আমাকে নিয়ে যাবে। ওর কাছে নিয়ে যাবে।’
‘কে তোকে ধরে ফেলবে? কে নিয়ে যাবে? কার কথা বলছিস, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘সবুজ। সবুজ আমাকে ধরে ফেলবে।’
‘কী পাগলের মত আবোল-তাবোল বকছিস। সবুজ তোকে ধরবে কীভাবে? সবুজ তো মরে গেছে!’
‘তা-ই তো ভয় করছে।’
‘তোর মাথার কাছের জানালাটা ভেতর থেকে খুলে দে। আমি তোর আব্বার টর্চ জ্বেলে দিচ্ছি। তুই উঠে পড়।’
‘আমি পারছি না, মা। আমার ভয় করছে। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি। আয়নায়…’
মা আর কিছু শুনলেন না। আশ্বস্তের স্বরে বললেন, ‘ঠিক আছে, তোকে কিছু করতে হবে না। তুই বিছানায় চুপচাপ বসে থাক। আমি দেখছি, কী করা যায়।’
মা তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ছুটে গেলেন। বাড়ি ভর্তি মেহমান। দলিজঘর, অতিথিঘরে আছে। ওরা যদি কোনভাবে মেয়ের পাগলামির কথা জানতে পারে, জানতে পারে সবুজের কথা, তা হলে কেলেঙ্কারি হবে। ভয়ে মায়েরও হাত-পা কাঁপছে। তাড়াতাড়ি মেজো মেয়ে নাজমাকে ডেকে তুলে দিলেন। কাঠের জানালার ফাঁক দিয়ে খুন্তি ভেতরে ঢুকিয়ে চাপ দিতেই খুলে গেল কবাট। টর্চের আলো ফেলে ভেতরে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে গেলেন। গোটা ঘরে যেন তাণ্ডব নৃত্য চলেছে। সবকিছু এলোমেলো হয়ে আছে। আর ভূতে পাওয়া মানুষের মত বিছানার উপর কালো চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছে ফতিমা।
বোন নাজমা কোমল স্বরে বলল, ‘ফতিমা, এই দেখ আমরা, তোর কোন ভয় নেই। উঠে দরজাটা খুলে দে, বোন। দরজাটা খুলে দে।’
ফতিমা যন্ত্রচালিতের মত গায়ে চাদর রেখেই বিছানার উপর থেকে নামল। সুইচবোর্ডে হাত দিয়ে রুমের লাইট জ্বালল। বাইরের অন্ধকার ফিকে হতে শুরু করেছে। ফতিমা মায়ের দিকে এগিয়ে না গিয়ে রুমের মধ্যে আয়নাটা খুঁজল। কাপড়চোপড়ের স্তূপের উপর আয়নাটা আছড়ে পড়ে কোন ক্ষতি হয়নি। সে আয়নাটা তুলে নিয়ে মুখের সামনে ধরল। অদ্ভুত ব্যাপার! আয়নায় কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ফাঁকা। তার নিজের মুখ দেখার কথা। নেই। নেই সবুজের মুখও। আয়নায় কিছুই দেখতে পাচ্ছে না সে!
ভয়ে থরথর করে কাঁপতে লাগল ফতিমা, গা থেকে খসে পড়ল চাদর। মা আর বোন অবাক হয়ে দেখল, সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সদ্য বিবাহিত মেয়েটি। ফতিমা ভয় পাওয়া গলায় কাঁপা-কাঁপা স্বরে বলল, ‘আমি কিছু দেখতে পাচ্ছিনে, আম্মা। আয়নায় আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।’
আয়নাটা বোনের হাত থেকে কেড়ে নিল নাজমা। নিজের মুখের সামনে ধরল। ওই তো তার চেহারা দেখা যাচ্ছে। সে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল, ‘আয়নায় কী দেখবি তুই? কী দেখতে পাচ্ছিসনে?’
‘নিজেকে দেখতে পাচ্ছিনে।’
মা ওদিকে মনোযোগ দিলেন না। আত্মীয়স্বজন এসে পড়ার আগে নগ্ন মেয়েকে ঢেকে ফেলা দরকার। মেয়ের জামাকাপড় খুঁজতে গিয়ে দেখলেন ওগুলো ছিঁড়ে ফালা ফালা করা। মনে হয় কেউ যেন মেয়েটাকে জোর করে ধর্ষণ করেছে। ছেঁড়া কাপড়গুলো দলামোচা করে খাটের নিচে ঢুকিয়ে দিয়ে নতুন এক সেট ড্রেস পরিয়ে দিলেন। এক রাতেই মেয়ের এ কী হাল হয়েছে! উদ্ভ্রান্ত, চোখের নিচে গাঢ় কালি, চুলগুলো উস্কোখুস্কো।
মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন তিনি।
ওদের আব্বা নামাজ থেকে ফিরে এলে নাজমা ফতিমার ঘরে ডেকে নিয়ে এল তাঁকে। সব কথাই জানাল। সব শুনে আব্বা বললেন, ‘বিয়ের পর-পরই মেয়েদের এরকম হয়। বদ জিনের আছর। তবে এ কথা জানাজানি করার দরকার নেই। আমার বন্ধু মোতালেব হুজুর জিন সাধনা করে। ওকে আমি এক্ষুণি ডেকে নিয়ে আসছি।’
আব্বা বেরিয়ে গেলেন। ফিরে এলেন কিছুক্ষণের মধ্যেই।
জিনসাধক মোতালেব মিয়া ফতিমাকে দেখেই বললেন, ‘শুধু জিনের একার কাজ না। এর সাথে অন্য কিছুও আছে।’
আব্বা পাশ থেকে ভারিক্কি গলায় বললেন, ‘সেই অন্য কিছুটা কী?’
‘অপঘাতে মরা বদ আত্মা। আপনার মেয়ের পিছু লেগেছে। বিয়ের আগে ওর কি কারোর সাথে ভাব-ভালবাসা ছিল নাকি?’
‘না। আমার মেয়েরা ওই প্রকৃতির না,’ আব্বা দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করলেন।
মা ও নাজমা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন।
ব্যাপারটা নজর এড়াল না ধুরন্ধর মোতালেব মিয়ার। তিনি আব্বার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘বন্ধু, তুমি একটু মর্নিং ওয়াক করে এসো। আমি যে কাজগুলো করব, তাতে আশপাশে তোমার থাকা চলবে না। তুমি পরহেজগার মানুষ, তোমার সামনে বদ জিন আসতে পারছে না। তুমি একটু ঘুরে এসো।
আব্বা বেরিয়ে যেতেই মোতালেব মিয়া আম্মার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঘটনা আছে, তাই না, ভাবী?’
‘হুঁ।’ আম্মা সবুজের সাথে সম্পর্কের কথাটা বললেন।
গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যার কথা একই গ্রামের মোতালেব মিয়া ভাল করেই জানেন। সব শুনে তিনি বিড়বিড় করে বললেন, ‘খাটুনি তো বাড়িয়ে দিলেন, ভাবীসাব। ও রাগী মানুষ। ওকে তো জানানো যাবে না। আবার কিছু খরচাপাতি তো আছেই। রাতে কবরখানা থেকে লাশ তুলে জমজমের পবিত্র পানি ছিটাতে হবে। ফতিমার আকাঙ্ক্ষায় থাকা অতপ্ত আত্মার শান্তি মিলাতে হবে…
তিনি ফিরিস্তি বাড়ানোর আগেই আম্মা বললেন, ‘টাকা-পয়সা নিয়ে চিন্তা করবেন না, ভাই। আমি দেব। মেয়েটাকে সুস্থ করে দেন। জামাই জানতে পারলে কেলেঙ্কারি হবে।’
‘কাকপক্ষীও জানবে না, ভাবীসাব।’
‘আর, ফতিমা বলছিল ও নাকি আয়নার মধ্যে…
আম্মার কথা শেষ করতে দিলেন না, তার আগেই মোতালেব মিয়া বলে উঠলেন, ‘হ্যাঁ, ভাবীসাব, দরকার লাগলে আয়নাপড়া দিয়ে জিন তাড়াব। আর তা করতে গেলে আগে একজন তুলারাশি জোগাড় করতে হবে। আমি যাই, ভাবীসাব, জোগাড়যন্ত্র করতে হবে। সেজন্য কিছু…’
আম্মা বুঝতে পারলেন কিছু বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, তিনি আলমারি খুলে জমানো টাকা থেকে বেশ কিছু টাকা মোতালেব মিয়ার হাতে ধরিয়ে দিলেন। আর এই তালগোলে আয়নার কথাটা চাপা পড়ে গেল। আম্মা টাকাটা হাতে দিতে-দিতে বললেন, ‘দেখবেন, যেন কেউ না জানে।
‘কেউ জানবে না, ভাবী। আপনি আমার উপর বিশ্বাস রাখতে পারেন।’ কিন্তু কিছু জিনিস কখনও চাপা রাখা যায় না। ফতিমার জিনে ধরা, জিন তাড়ানোর প্রস্তুতি আর সবুজের সাথে প্রেমের কারণেই এই পরিণতি-এ জানতে আর গোটা গ্রামের কারোরই বাকি রইল না। আব্বা তো জানলেনই, কিন্তু মেয়ের মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় রাগারাগিও করতে পারলেন না। বরং বন্ধু মোতালেব মিয়ার সাথে পরামর্শ করে কীভাবে মেয়েকে সুস্থ করে তোলা যায়, সে ব্যবস্থা করতে লাগলেন।
গ্রামের মাতব্বর গোছের লোকদের বুঝিয়ে সবুজের বাপ-মা’র কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে কবর খুঁড়ে তোলা হলো লাশ। তারপর ধর্মীয় বিধি অনুযায়ী সব শেষ করে জমজমের পানি ছিটিয়ে দিয়ে সবুজের আত্মাকে শান্ত করা হলো। এখন জিন তাড়ানোর পালা।
আয়োজন করে চক্র বানিয়ে কুফরী কালাম পড়ে জিন তাড়ানোর ব্যবস্থা হলো। ফতিমাকে ছেড়ে যাওয়ার পরে জিন মোতালেব মিয়ার আদেশমত বাড়ির দক্ষিণ দিকের শিরীষ গাছের ডাল ভেঙে দিয়ে গেল। গ্রামবাসী নিজ চোখে সেই ভেঙে পড়া ডাল দেখতে ছুটে এল।
জিন ছেড়ে গেছে কি না বা আদৌ জিনে ধরেছিল কি না, ফতিমাকে দেখে তা বোঝা গেল না। কিন্তু তার উপর দিয়ে যে একটা ঝড়ঝাপটা বয়ে গেছে, সেটুকু পরিষ্কার। শারীরিক-মানসিক দু’ভাবেই ভেঙে পড়েছে সে। শরীর খারাপ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়ল। কিন্তু ওই আয়নাটাকে কোনমতে হাতছাড়া করতে চাইল না। বিছানায় শুয়ে থেকে আয়না হাতে করে ধরে রাখে। আশপাশে কেউ না থাকলে আয়নার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে কথা বলে। দেখে মনে হবে আয়নার মধ্যে আছে একজন মানুষ। তার সাথে ভিডিও কলের মত করে কথা বলছে, সে-ও কথার উত্তর দিচ্ছে।
আম্মা এসে আয়না নিতে চাইলে দেয় না, মাথা খারাপের মত আচরণ করে। সব দেখে আম্মাও হাল ছেড়ে দিয়েছেন।
জিন লাগানোর খবর পৌঁছে গেল শহরে থাকা ব্যাঙ্কার আশিকের কাছে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে চলে এল শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুর-শাশুড়ি খুবই তোয়াজখাতির করলেন। বুঝতে পারলেন, সবুজের কথাটা আশিকের কানেও গেছে। শাশুড়ি তাকে ভেতরে ডেকে নিয়ে অনুরোধের সুরে বললেন, ‘মেয়েটার এরকম অবস্থায় উল্টোপাল্টা কিছু বললে ও মানসিকভাবে আরও ভেঙে পড়বে।’
‘চিন্তা করবেন না, আম্মা। আমি এসেছি, দেখবেন ঠিক হয়ে যাবে।’
ফতিমা আশিকের সাথে মোটামুটি বলা যায় ভাল ব্যবহারই করল। আদর্শ স্ত্রীর মতই আচরণ করল। সুস্থ মানুষের মত সব প্রশ্নের যথাযথ উত্তর দিল। আশিকও সবুজের প্রসঙ্গে একটা কথাও বলল না। রাতে আশিক চাইল স্ত্রীসঙ্গ পেতে। নিজের জৈবিক চাহিদার জন্য যতটুকু নয়, তার চেয়ে বেশি স্ত্রীকে সারিয়ে তোলার জন্য। ডাক্তারদের কাছে শুনেছে, স্ত্রীর মানসিক বিপর্যয়ে শারীরিক মিলন টনিকের মত কাজ করে। কিন্তু ফতিমা তার শরীরে হাত ছোঁয়াতে দিল না। আর এই একটি ব্যাপারে হৈ-চৈ, চেঁচামেচি, অভিযোগ করা চলে না।
পরের দিন সকালে আশিক শ্বশুরকে জানাল, ‘আমি ফতিমাকে আমার সাথে ঢাকায় নিয়ে যেতে চাই। ভাল ডাক্তার দেখাব, আর আমার সাথে থাকলে ও পুরোপুরি ভাল হয়ে উঠবে।’
শ্বশুর-শাশুড়িও বাধা দিলেন না। মেয়েকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পাঠিয়ে দিলেন আশিকের সাথে। ওরা বেরিয়ে যেতেই আম্মা ফতিমার রুমে এসে যত নষ্টের গোড়া আয়নাটা ভেঙে ফেলতে চাইলেন। কিন্তু আয়নাটা কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। অথচ আয়নাটা যাতে ফতিমা না নিয়ে যেতে পারে, সেজন্য তিনি কাপড়চোপড় গোছানোর ফাঁকে ওটা লুকিয়ে ফেলেছিলেন। এখন সেই লুকানো জায়গাতেও নেই।
তা হলে কি মেয়ে তাঁকে লুকিয়ে বোরকার আড়ালে করে অপয়া আয়নাটা নিয়ে গেছে?
.
ফতিমা কিন্তু আয়না নিয়ে আসেনি। ঘরে গোপনে লুকিয়ে রেখে গিয়েছিল। ঢাকায় এসে মনোচিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে আর স্বামীর সোহাগ ও নিজের প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তিতে সুস্থ হয়ে উঠল ফতিমা। ডাক্তার জানাল, ফতিমা মানসিক রোগে ভুগছিল। ভিজুয়াল হ্যালুসিনেশনের মত হয়েছিল। ওই কারণেই আয়নার ভিতরে নিজ প্রেমিককে দেখতে পেত। যখন ওকে দেখতে না চাওয়ার জন্য মনে জোর খাটাত, তখন আয়নার ভেতরটা ফাঁকা দেখত। নিজেকেও দেখতে পেত না। নিজেকেও প্রেমিকের সাথে মৃত দেখতে চাইত। এ এক অদ্ভুত অবস্থা!
.
পরিশিষ্ট
বিশ বছর পরের ঘটনা।
ফতিমার মেয়ে ঐন্দ্রিলার বিয়ে ঠিক হয়েছে। নানার বাড়িতেই বিয়ে হবে। তার প্রস্তুতি নিতে ফতিমা ঐন্দ্রিলাকে নিয়ে বাবার বাড়িতে এসেছে। আশিক ক’দিন পরে আসবে। বিয়ের আগে-আগে মেয়েরা একা থাকতে ভালবাসে। ঐন্দ্রিলা ফতিমার সেই রুমটাতে একা শুয়েছে। মা’র ঘরে আছে একটা বুক শেলফ। ঘুম আসছে না দেখে বুক শেলফ থেকে একটা গল্পের বই টেনে বের করতে গিয়ে অদ্ভুত একটা জিনিস চোখে পড়ল।
কাঠের ফ্রেমের বহু পুরানো আয়না। জায়গায় জায়গায় উঠে গেছে পারা।
আয়না হাতে নিলেই নিজ মুখ দেখতে ইচ্ছে করে। ঐন্দ্রিলা আয়নায় মুখ দেখে চমকে উঠল। নিজের মুখ দেখা যাচ্ছে না। ফাঁকা।
চিৎকার দিয়ে উঠল সে।
ফতিমা ছুটে এল রুমে। ‘কী হয়েছে, মা? কী হয়েছে?’
‘আয়নায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না, মা। আমার ভয় করছে…’
.
প্রিন্স আশরাফ
