হাউ টু টক টু এ্যানিওয়ান – ২
অধ্যায় দুই
‘হ্যালো’ এর পর কী বলে কথা এগিয়ে নেব?
ছোট্ট করে তোমার স্বাগত বক্তব্য শুরু করো
প্রথম পরিচয়েই তার চোখে বিনয়ী হয়ে উঠতে হবে। তার কানে যেন তোমার কথাগুলো মধুর হয়ে ওঠে। এবং তোমার কথার জাদু যেন তাকে ছুঁয়ে যায়। মনে রাখবে, তোমার ছোড়া প্রতিটি শব্দের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কোনোটা তাকে কাছে টানবে, কোনোটা দূরে ছুড়ে দেবে। তোমার সঙ্গীকে স্বাগত জানাতে অবশ্যই ছোট্ট ছোট্ট কথোপকথনের বিকল্প নেই।
ছোট্ট কথোপকথন? হ্যাঁ, ব্যাপারটা তাই। বড় বড় লাইন এড়িয়ে, ছোট্ট ছোট্ট লাইন দ্বারা তোমার প্রতিটি কথা জুড়ে দাও। পার্থক্য নিজেই অনুভব করবে।
তুমি কি শুনতে পাচ্ছো প্রকম্পন? তোমার ছোট্ট ছোট্ট শব্দগুলো ওই লোকটাকে আগ্রহী করে তুলছে। দেখো তার মুখ থেকে বিরক্তির রেখা উবে গেছে।
আবার কিছু মানুষকে দেখবে, যারা ছোট্ট ছোট্ট বাক্যগুলো পছন্দ করে না। তারা অল্পতেই বিরক্ত হয়ে উঠবে। এদেরকে এমন কোথাও নিমন্ত্রণ জানাও, যেখানে তাদের পরিচিত কেউই থাকবে না।
যদি দেখতে পাও ওরা এমন পরিস্থিতির সাথে পরিচিত তবে ধরে নাও, ওই ব্যক্তিটি অনেক বেশি অম্লান ব্যক্তিত্বের অধিকারী যে ছোট্ট ছোট্ট কথোপকথন অপছন্দ করছে।
আমার জীবনে আমি ৫০০-এর অধিক কোম্পানির পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ করেছি। ওইসব কোম্পানির উপরস্থ কর্তাব্যক্তিদের সাথে আমার কথা হয়েছে। অধিকাংশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন- ‘বোর্ড অব ডিরেক্টরদের’ সামনে অথবা কোম্পানির ‘মালিকপক্ষের’ সামনে তাদেরকে লম্বা লম্বা কথা বলতে হয় এবং তারা স্বীকার করেছেন ওসব মুহূর্তে, তাদের নিজেদের মনে হতে থাকে তারা সেই ছোট্ট বাচ্চাটি যে বড় একটা অনুষ্ঠানে হারিয়ে গেছে, যেদিকেই তাকায় দেখতে পায় নানান প্রকৃতির মানুষ বকবক করেই যাচ্ছে। বিরক্তিকর।
ছোট্ট কথোপকথন অপছন্দকারী ব্যক্তিরা প্রায়শই অভিযোগ করেন, ‘তুমি তো সফল ব্যক্তিদের কোম্পানিতে চাকরি করো। তাই তোমার সমস্যা হয় না।’
ছোট্ট করে কথা বলার এই ভীতিটা মঞ্চে কথা বলার ভীতির মতোই। সমাজের পরিচিত মানুষদের ভিড়ে দাঁড়ালে তুমি নিজেকে অনেক ছোটো ভাবতে শুরু করে দাও। পাবলো ক্যাসালস আজীবনই মঞ্চে কথা বলতে ভয় পেত। কার্লে সিমনেরও কাছাকাছি অভিজ্ঞতা রয়েছে, বেচারা লাইভ স্টেজ শো করাই কমিয়ে দিয়েছিল। নেইল ডায়মন্ডের সাথে কাজ করেছে, আমার এমন একটি বন্ধু জানাল, নেইল ‘সং সাং বু’ গানের লাইনগুলো প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ গুনগুন করে গেয়েছে। এই কলিটি তার টেলিপ্রম্পটারে সংযোজিত ছিল যা তাকে নানা বিষয়ে ভুলে যাবার ভয় থেকে এড়িয়ে রাখত।
ছোট্ট কথোপকথনভীতি চিকিৎসাযোগ্য?
মানুষের কথোপকথনের দক্ষতা কি চিকিৎসা করে ঠিক করা সম্ভব? বিজ্ঞানিরা দাবি করলেন, চিকিৎসা এর সমাধান হতে পারে। ‘প্রোজ্যাক’ সেবনে এর সাফল্য দেখা দিল। অনেকে ভয় পেতে থাকল, এর ভয়ংকর কোনো সাইড ইফেক্ট দেখা দেয় কি না? ভালো খবর হচ্ছে যখন মানুষ চিন্তা করে এবং আন্তরিকভাবে অনুভব করতে আরম্ভ করে, সুনির্দিষ্ট আবেগগুলো- যেমন মানুষের আত্মবিশ্বাস তাদেরকে ওই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ দিতে মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। ফলশ্রুতিতে মানুষের মস্তিষ্ক এর কার্যকরী প্রতিষেধক উৎপাদন শুরু করে দেয়। ভীত হওয়া এবং ছোট্ট কথা বলা অপছন্দ হওয়াকে যদি আমরা অসুখ হিসেবে ধরে নেই, তবে এর কার্যকরী চিকিৎসা নিচে উল্লেখ করা হলো।
বিজ্ঞান আমাদের অনেক তথ্যই প্রকাশ করেছে। এই যেমন একই সাথে দুজন ব্যক্তির নিউরনের উত্তেজনার ক্ষমতা এক নয়। আমাদের মস্তিষ্কে নিউরন, নিউরোট্রান্সমিটার নামক জলীয় পদার্থের সাহায্যে তার যাবতীয় কাজকর্ম সাধন করে। ব্যক্তিভেদে নিউরোট্রান্সমিটারের কম বেশি লক্ষ্য করা যায়। অত্যধিক নিউরোট্রান্সমিটারের প্রবাহকে নোরপাইনপ্রাইন বলা হয় (এড্রেনাইন গোত্রের কাছাকাছি)। কিছু বাচ্চার ক্ষেত্রে দেখা যায় কিন্ডারগার্টেনে শ্রেণিকক্ষ দিয়ে হাঁটার সময় ওরা হুট করে দৌড়াতে অথবা টেবিলের নিচে লুকিয়ে যেতে পছন্দ করে।
বাচ্চাকালে আমিও অনেকবার টেবিলের নিচে বসে ছিলাম। গার্লস বোর্ডিং স্কুলে থাকার সময়কার কথা, ঠিক কৈশোরে পা দেওয়ার আগে আগে আমি যখনই কোনো ছেলের সাথে কথা বলতাম আমার পা কেমন যেন পাকিয়ে যেত!
সেবার একটা ছেলেকে আমি আমাদের নাচের দলে ডেকেছিলাম। আমাদের উচ্চ বিদ্যালয়ের অন্য একটা শাখা ছিল, যেখানে শুধুমাত্র ছেলেরাই পড়ত। ছেলেদের দল ওখানেই অনুশীলন করে, আর আমরা মেয়েদের শাখায়।
ওই শাখায় আমার পরিচিত শুধু একজনই ছিল, ইউজিন। তার সাথে পরিচয়টা হয় তার আগের বছরের সামার ক্যাম্পিংয়ে। আমার সমস্ত ভয় জয় করে আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, ওই ছেলের সাথে কথা বলব।
নাচের অনুষ্ঠানের দুই সপ্তাহ আগে আমি অনুভব করলাম আমার দ্বারা এত বড় অনুষ্ঠানে নাচা সম্ভব নয়। ওখানে আমার জন্য টিকে থাকাটাই কঠিন হয়ে গেল।
তার এক সপ্তাহ পরেও আমি আমার সিদ্ধান্তে অটুট ছিলাম। আমার নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছিল। আমি পারব না ধারণাটা জেঁকে ধরেছে। অনুষ্ঠানের ৩ দিন পূর্বে আমার নিঃশ্বাস ছোটো হয়ে এলো। আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল। মনে হতে লাগল, আমার কারো সাহায্য দরকার।
আমি একটা কাগজে গুছিয়ে কথাগুলো লিখলাম। ‘হেই, আমি লেইল। গত বছরের গ্রীষ্মের একটা ক্যাম্পিংয়ে আমাদের দেখা হয়েছিল। চিনতে পেরেছো?’ এটুকু লিখে আমি একটু বিরতি দিলাম। এই প্রশ্নটা যখনই তাকে করব সে হ্যাঁ অথবা না বলে জবাব দেবেই। তাই ওই বিরতি রাখা। এরপর পরের অংশে লিখলাম, ‘শুনে খুশি হবে যে ন্যাশনাল ক্যাথেড্রাল স্কুলের আয়োজিত নাচের অনুষ্ঠানে আমি নৃত্য দলে অংশগ্রহণ করছি। অনুষ্ঠানটা এই শনিবার রাতে অনুষ্ঠিত হবে। আমি অনুষ্ঠানের পূর্বে তোমার সাথে একবার দেখা করতে চাই। করবে?’
আমার প্রশ্নের জবাব যদি ওকে দিতে হয় তবে ‘হ্যাঁ’ ছাড়া না বলার কোনো পথই নেই।
সময় আরো পড়ে গেল। একেবারে অনুষ্ঠানের দ্বারপ্রান্তে। আমি আর সময় নষ্ট না করে ছেলেটাকে ফোন দিলাম আর নিজের লিখিত কথোপকথনগুলো নিয়ে বসলাম। ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই ‘হ্যালো’ শব্দটা ভেসে এলো। কী মধুর তার কণ্ঠ!
আমি অনেকটা নার্ভাস ছিলাম। তারপরও খ্রিস্ট দেখে দেখে গড়গড় করে বললাম, ‘হেই, আমি লেইল। গত বছরের গ্রীষ্মের একটা ক্যাম্পিংয়ে আমাদের দেখা হয়েছিলো। চিনতে পেরেছো?’
সে জবাব দিল, ‘খুব ভালোভাবেই চিনতে পেরেছি, লেইল।’
তারপর গড়গড় করে পরের অংশ পড়লাম, ‘শুনে খুশি হবে যে, ন্যাশনাল ক্যাথেড্রাল স্কুলের আয়োজিত নাচের অনুষ্ঠানে আমি নৃত্য দলে অংশগ্রহণ করছি।
অনুষ্ঠানটা এই শনিবার রাতে অনুষ্ঠিত হবে। আমি অনুষ্ঠানের পূর্বে তোমার সাথে একবার দেখা করতে চাই। করবে?’
‘অবশ্যই, অবশ্যই লেইল। আমাদের আজই দেখা হচ্ছে।’
আমার সারাটা দিন অনেক ভালো গেল। পাহাড়সম একটা বোঝা বুক থেকে নেমে গেল। উফ! অবশেষে কেউ একজনকে পাওয়া গেল, যে আমাকে নাচের ব্যাপারে সাহায্য করবে।
ইউজিনের সাথে আমার দেখা হলো। সে জানাল তার ডাকনাম ‘ডনি’, ওই নামে ডাকলেই সে খুশি হবে। ডনি এত চমৎকার কিছু সময় উপহার দিয়েছিল যা আমার পরবর্তী দশকের ভেতরেও শ্রেষ্ঠ সময় ছিল। ও এমন দারুণভাবে কথা বলল, অনুপ্রেরণা দিল যে আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম। পরে তো মনে হলো ওই অনুষ্ঠানে নাচা কোনো ব্যাপারই না।
ডনিই আমার জীবনের প্রথম ছেলে বন্ধু ছিল। আর যদি জিজ্ঞেস করো প্রথম প্রেমিক কে ছিল? অবশ্যই ডনি।
এলেমেলো চুল, আর সামনের বের হয়ে থাকা দুটো দাঁতের খুঁত এড়িয়ে গেল তার মনোমুগ্ধকর কথার জাদুতে।
সে খুব ছোট্ট করে কথা বলত। এই ছোট্ট ছোট্ট বাক্যগুলো এতই জোরালো ছিল যে, আমার ভেতরে প্রভাব বিস্তার করল।
ডনির গল্পটা বলার উদ্দেশ্য ছিল তোমাদের বুঝতে দেওয়া যে, ছোট্ট ছোট্ট শব্দ দিয়ে কথা বলা কতটা কার্যকরী হতে পারে। তুমি দেখতে কেমন, তার চেয়ে তুমি কীভাবে কথা বলছো, তা অনেক কার্যবহ। এই অধ্যায়ে আমরা ছোট্ট করে কথা বলার কৌশলগুলো নিয়ে আলোচনা করব।
পর্ব ১০
মেজাজের পরীক্ষা
যেভাবে সুন্দর একটা কথোপকথন সৃষ্টি করবে অন্যকে বিঘ্নিত না করে
কোনো একটা অনুষ্ঠানে কিংবা কোনো একটা সেমিনারে তোমাকে নতুন কারো সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো। পরিচয়টা শুরু হলো হাত মিলিয়ে। এরপর কয়েকবার চোখাচোখি হলো তোমাদের মাঝে।
সাক্ষাৎটা সুন্দরভাবে হলেও তুমি অসহায় অনুভব করতে থাকলে। নিজেকে স্বাভাবিক দেখাতে গিয়ে নিজের অসহায়ত্ব তোমার পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল! তুমি অস্থির হয়ে রইলে, ফলে আগন্তুকের দিকে তাকাতে না পেরে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলে!
আমরা সব সময়ই চাই আমাদের প্রথম পরিচয়টা একটু আলাদা হোক। নিজেদের ব্যক্তিত্ব ঠিকভাবে ফুটে উঠুক। উদ্দীপ্ততা, চতুরতার সাথে যেভাবে মানুষকে আকর্ষণ করা যায় ঠিক সেভাবেই আমাদের কথা শুরু হোক। প্রথম দর্শনেই যেন আমরা নিজেদের গুরুত্ব তুলে ধরতে পারি।
একটা আড্ডার কথা আমার খুব ভালো মনে আছে; যেখানে সবাই নিজেদের জ্ঞান আর উঁচু ব্যক্তিত্ব প্রমাণে ব্যস্ত ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের নিজেদের জাহির করার ব্যাপারটা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেল। সবাই প্রতিযোগিতা শুরু করে দিয়েছে নিজের পরিচিতি কত মনোরম করে তুলে ধরার যায়! বিদঘুটে অবস্থা!
আমেরিকার দ্বিতীয় বড় সামাজিক সংগঠন ‘ম্যানেকা অর্গানাইজেশন’ থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হলো। তারা আমায় তাদের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
আমি যখন লিফট থেকে নেমে অনুষ্ঠানে যুক্ত হচ্ছিলাম তখনই কয়েকজন আমাকে উদ্দেশ্য করে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কিছু রসিকতা করে বসল। ব্যাপারটা আমার কাছে ভালো লাগেনি। উল্টো ওদের এসব রসিকতা আমাকে অনুষ্ঠান কত দ্রুত ত্যাগ করতে পারি তাই মনে করিয়ে দিচ্ছিল।
পরে বাসায় এসে ব্যাপারটা আমায় নাড়া দিল। আমি বিরক্ত হই এমন কথা তো ওরা বলেনি! তাহলে আমি কেন এটাকে এত বাজেভাবে দেখছি? ওরা ছোট্ট ছোট্ট যেসব রসিকতা করেছে আসলেই সেগুলো দারুণ ছিল এবং অর্থপূর্ণও। আমার বিরক্তির কারণ আমি পরক্ষণেই বুঝতে পেরেছি। ওদের প্রয়োজন ছিল আমার মনের অবস্থা বুঝে রসিকতা করার। ইভেন ওরা ছোট্ট করে আমাকে রসিকতা করার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে পারত এই বলে, ‘লেইল এই ব্যাপারটা তোমার কী মনে হয়?’
তখন আমিও আগ্রহ নিয়ে ওদের সাথে মিশে যেতাম। ওদের মজাগুলো আমিও উপভোগ করতাম। আমি এটুকু বুঝে নিলাম, স্বল্পবাক্যে কথা বলা অনেক কার্যকরী, তবে অবশ্যই সেটা শ্রোতা কিংবা আগন্তুকদের মুড বুঝে বলতে হবে। হুট করে না শুরু করে আগন্তুককে নিজেদের সাথে যুক্ত করে নাও, অথবা তার তাড়া থাকলে তাকে যেতে দাও।
সামগ্রিক বিষয়টা তোমাদের একটা উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেই। মনে করো তুমি কোনো একটা মিটিংয়ে অনেক দেরি করে ফেলেছো। এমনিতেই তোমার মাথা গরম। মিটিং রুমে যাবার মুহূর্তে তোমার এক কলিগের সাথে দেখা। সে খুব সুন্দর করে তার মজার একটা কাহিনি তোমাকে বলতে শুরু করল। স্বাভাবিকভাবেই তুমি এতে অত্যধিক বিরক্ত হয়ে উঠেছো। মনে মনে ভাবছো, এই ছাতার গল্প শোনার আমার টাইম কই? মুখ ফুটে তাকে মানাও করা যাচ্ছে না!
এই ছোট্ট উদাহরণটা এই অনুচ্ছেদটা বোঝাতে যথেষ্ট বলে আমি মনে করি। অর্থাৎ, আমাদের অন্যের মুড বুঝে কথা বলা উচিত। মুড যদি ঠিক থাকে তবেই তুমি এগিয়ে যাও। নয়ত তাকে যেতে দাও।
মনের ভাব মিলার উপরে নির্ভর করছে, তোমার বিক্রয় বাড়বে না কমবে ক্রেতার মুড বুঝতে পারলে যেমন ব্যবসায় উন্নতি হয় তেমনই ক্রেতার মুড না বুঝে কাজ করলে উল্টো ফলাফল দিতে পারে।
আমার সবচেয়ে ক্লোজ বান্ধবীদের একজন স্টেলা। স্টেলা সম্প্রতি নতুন একটা কোম্পানিতে জয়েন করেছে। এই উপলক্ষে আমি ওর উদ্দেশ্যে একটা ভোজসভার আয়োজন করলাম। সে এতে দারুণ খুশি। এর পাশাপাশি স্টেলার জন্মদিন এবং তার এনগেজমেন্টের অনুষ্ঠান আলাদা আলাদাভাবে সে নিজেই আয়োজন করছে। ও আমার স্কুলজীবনের বান্ধবী। তার জন্য আয়োজনটাও স্পেশাল হওয়া চাই।
শহরে নতুন এক রেস্তোরাঁ খুলেছে। অন্যসব রেস্তোরাঁ থেকে এর বিশেষত্ব এই যে, এর আলাদা একটা হলঘর রয়েছে। স্টেলার পার্টির জন্য আমিও মনে মনে ওটাকে স্থান হিসেবে ভেবে নিলাম। একদিন সময় বুঝে ওই রেস্তোরাঁয় গেলাম। রেস্তোরার ম্যানেজার বিষণ্ণ মুখে বসে আছেন। আমি তাকে হলঘরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলাম। সে আমাকে ওটা দেখিয়ে দিল। তার চেহারার বিষণ্ণতা লেগেই রইল। আমারও বেচারার জন্য খারাপ লাগল। হলঘরটা দেখে আমি চলে এলাম, সিদ্ধান্ত নিলাম অন্য কোথাও পার্টির আয়োজন করব। অন্তত যেখানকার ম্যানেজার এমন বিষণ্ণতা নিয়ে পার্টি পরিচালনা করবেন, সেখানে আমি পার্টি করতে পারি না। অবশ্যই এমন কোথাও সেটার আয়োজন করব, যেখানকার ম্যানেজার থেকে সার্ভিস বয়, সবাই হাসবে, আনন্দ নিয়ে তাকাবে।
দুধের বাচ্চা যখন কাঁদতে থাকে তার মা কিন্তু ধমকে বলে না, ‘থাম বল্লাম। নইলে খবর আছে।’ বরং এর বিপরীতে মা তার সন্তানের আঙুলে হাত দেয়, সন্তানকে দোলাতে থাকে নিজের দু’হাতে। তারপর অদ্ভুত আনন্দময় শব্দ করে। এক সময় কাঁদতে থাকা বাচ্চাটি ফিক করে হেসে দেয়। এবং মায়ের সাথে সাথে হাসতে থাকে। ঠিক তেমনই তোমার সমস্ত ক্রেতা এবং শ্রোতাও ঠিক ওই বাচ্চাটার মতো। তাকে তার মনের অবস্থা বুঝে সহানুভূতি এবং হাসিখুশি রাখো। দেখবে খুব সহজেই সে তোমার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে।
কৌশল ১০
মেজাজের পরীক্ষা
কারো সাথে দেখা হলেই গড়গড় করে দীর্ঘ আলাপে যাওয়া ঠিক নয়। প্রথমে তোমার শ্রোতার দিকে মনযোগ দেওয়া উচিত। তার মানসিক অবস্থা বিচার করে কথা বলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। তুমি দেখা হওয়ার প্রথম কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করো, সে কি প্রফুল্ল নাকি খুবই রেগে আছে? অথবা বিষন্নতায় ভরে আছে? তাই তার মানসিক অবস্থা বুঝে কথা বললেই শ্রোতা তোমার কথা মনযোগ দিয়ে শুনবে। সুতরাং পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তৈরি করো। সেটা হোক কয়েক সেকেন্ডের।
পর্ব ১১
গতানুগতিক কিন্তু আকর্ষণীয় দিক
কোন ধরনের বাক্য দিয়ে শুরু করতে হবে, যখন আমি নতুন কারো সাথে পরিচিত হচ্ছি?
সেবার এক অনুষ্ঠানে আমি পায়চারি করছিলাম। এর মধ্যে এক পরিচিত ব্যক্তির সাথে দেখা। পরিচিত সেই ভদ্রলোক একটি ভিড় দেখিয়ে হতাশার কণ্ঠে বললেন, ‘ওই যে দেখুন, মানুষের কাজ না থাকলে যা হয় আরকি!’
আমি হেসে বললাম, ‘ওখানে কী হচ্ছে?’
তিনি অবজ্ঞার সুরে জবাব দিলেন, ‘একজন ভাঁড় কী জানি বকছে! তার কথার মাঝে কোনো নতুনত্ব নেই। আইমিন আপনি শুনলেই বুঝবেন কথাগুলো কত অসাড়। অথচ মানুষকে দেখুন, ভিড় করে রেখেছে, তার কথা শুনতে কত আগ্রহী!’ ব্যাপারটা বেশ মজাদার লাগল। আমিও শুনতে চাইলাম লোকটা আসলে কী বলছেন? এত ভিড় লাগার পেছনে কারণটা কী? শ্রোতাদের ভিড়ের মাঝে গিয়ে দেখলাম, ভদ্রলোক এতগুলো শ্রোতা পেয়ে খুবই খুশি মনে তার কথা বলছেন। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ শোনার পর আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। ভদ্রলোক খুব কায়দা করে কথা বলতে জানেন। মানুষজন তার কথায় বুঁদ হয়ে আছে।
তুমি কী বলছো তার চেয়ে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট হচ্ছে তুমি কতটা আকর্ষণীয় করে কথাগুলো বলছো। ভদ্রলোকের কথাগুলো তেমন কোনো অর্থ রাখে না। একেবারে অনর্থক কিন্তু তিনি যেভাবে ওগুলো বলছেন, ভঙ্গিটা অতুলনীয়। কোথাও কথা বলতে গেলে ব্যাপারটা মনে রেখো। নিজেকে যত বেশি আকর্ষণীয় করে তোলা যায়।
মানুষ আমাকে প্রায়শই জিজ্ঞেস করে, ‘কথা বলার সময় কীভাবে আমার প্রথম বাক্য শুরু করব?’
আমি সবাইকে ডট্টির উদাহরণটা দেই। ডট্টি আমার অফিসে কাজ করত। আমি যখনই তাকে জিজ্ঞেস করতাম লাঞ্চে সে আমার সাথে খাবে কি না? সে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়াত। আর যখন জানতে চাইতাম, ‘লাঞ্চে সে কী খাবে?’
সে হেসে জানাত, ‘যেকোনো মজাদার খাবার খেতেই সে আগ্রহী।’ তার উত্তরটা আমাকে আলাদা করে কোনো খাবারের নাম জানান না দিলেও জানান দিত সে খেতে আগ্রহী।
আমি তাও তাকে অনেকগুলো খাবারের নাম বলতাম।
পরক্ষণেই আমার মাথায় ধরল, যেকোনো শব্দটা দিয়ে সে যেন পুরো সবটার উত্তর দিয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ আমি যা খেতে চাইব তাতে তার মানা নেই। বুঝতে বাকি রইল না, সে ছোট্ট একটা শব্দ দিয়ে কত সহজে একটা বড় ব্যাপার সমাধান করে দিয়েছে।
তুমি কীভাবে এটা করবে? খুবই সোজা। জাস্ট তোমার সঙ্গীদেরকে বুঝিয়ে দাও, তারা যা করছে, সেটার সাথেই তুমি আছ। দেখবে তারা তখনই ধরে নেবে তুমি তাদের চিন্তা-ভাবনার মানুষ। খুব সহজেই তাদের বিশ্বাস তোমার উপরে গড়ে উঠবে।
কেন গতানুগতিক বিষয়গুলো কাজে দেয়
স্যামুয়েল আই. হায়াকানা ছিলেন একাধারে কলেজ সভাপতি, মার্কিন সিনেটর এবং ভাষার উপরে তার ছিল দারুণ দক্ষতা। তার আরেকটা পরিচয়, তিনি একজন জাপানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান। স্যামুয়েল চমৎকার একটি গল্প আমাদের কাছে তুলে ধরেছিলেন। যেটি আমি এখানে উল্লেখ করছি।
১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকের ঘটনা। জাপান এবং আমেরিকা একে অপরের চিরশত্রু! আমেরিকায় শহরগুলোতে রটে গেছে যে, আমেরিকায় অবস্থানরত জাপানিরা ওদের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে, প্রচুর পরিমাণে গুপ্তচর চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও কোথাও কোথাও শোনা গেল। ফলে মানুষজন ব্যাপারটা বিশ্বাস করবে না এড়িয়ে যাবে এর কোনো পথ রইল না। স্যামুয়েল বেচারা জাপানি বংশোদ্ভূত একজন আমেরিকান! তার চেহারা দেখে খুব সহজেই তার পূর্বপুরুষদের দেশ জানা সম্ভব। ফলে তিনি পড়ে গেলেন এক অদ্ভুত বিড়ম্বনায়। যেদিকেই যায় মানুষ ট্যারা চোখে তাকায়। সবাই উনাকে একজন গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করতে থাকে। এই গুজবের মাঝে তার সাধ্যও নেই সবাইকে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার। তবুও তিনি সুযোগ পেলেই তা করে বসতেন।
উয়িসকন্সিনের ওসকস রেলস্টেশনে তিনি ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছেন। ঠিক তখনই ওপাশ থেকে সন্তানসহ এক দম্পতি উনার দিকে এগিয়ে এলো। দম্পতির বিস্ফোরিত চেহারা দেখে স্যামুয়েল আগত দম্পতির মনের অবস্থা বুঝে গেছেন। নিশ্চিত তাকে গুপ্তচর হিসেবে সন্দেহ করছে ওরা। যেকোনোভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা উচিত, মনে মনে ভাবল স্যামুয়েল।
তিনি পুরুষ লোকটির দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিলেন, ‘আজ বোধহয় ট্রেন লেটই করছে। কী মনে হচ্ছে আপনার?’
ভদ্রলোক কিছুটা চোখ ট্যারা করে বলল, ‘তা বটে।’
সময়টা শীতকাল। শীতকালে বাচ্চা নিয়ে ভ্রমণ করা ঝামেলার কাজ, তার উপরে ট্রেনও লেইটে চলছে! স্যামুয়েল সুযোগটা নিলেন। তিনি সহানুভূতি নিয়ে বললেন, ‘শীতকালে বাচ্চা নিয়ে ভ্রমণ করাটা ঝামেলার কাজ। ট্রেনও চলছে লেটে। কী আর করবেন ভাই, আমার মতো ধৈর্য্য ধরে কিছুক্ষণ থাকুন।’
নিজের কৌশলে নিজেই তিনি মনে মনে খুশি হলেন। কারণ দম্পতির চেহারা থেকে সন্দেহের ভাবটা চলে গেছে। তারা খুবই রিল্যাক্স হয়ে বসলেন। স্বামী ভদ্রলোক এবার হেসে স্যামুয়েল সাহেবের সাথে একমত হলেন, ‘ঠিক বলেছেন ভাই সাহেব। ফেঁসেই গেছি। আচ্ছা, কিছু মনে না করলে আপনাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করি?
আপনি যেহেতু একজন জাপানি প্রশ্নটা আর চেপে রাখতে পারছি না।’
তিনি আন্দাজ করতে পারলেন এই ভদ্রলোক কী নিয়ে কথা বলবেন। তিনি হেসে বললেন, ‘অবশ্যই। বলে ফেলুন।’
‘একজন জাপানি হিসেবে আপনার কি মনে হয় জাপান এই যুদ্ধে আমেরিকার বিরুদ্ধে জিততে পারবে?’
স্যামুয়েল হায়াকানা নড়েচড়ে বসলেন। তার পরের বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরটা ছিল এমন, ‘আমার জানাশোনার লেভেল আপনার মতোই। খুব বেশি কিছু জানি না। নিউজপেপার থেকে একটু জেনেছি। শুনলাম জাপানের রসদ সরবরাহ শেষের দিকে। কয়লা আর স্টিলের যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এই শক্তি দিয়ে আমেরিকার মতো এত শক্তিধর একটা দেশকে হারানো আমার মতে অনেক কঠিন হবে।’
আমেরিকান ভদ্রলোক তার উত্তরে খুশি হয়েছেন। অথচ স্যামুয়েল সাহেব এই সমস্ত কিছু নিজের অল্প জানাশোনা থেকে বলেছেন। তিনি এই বিষয়ে ধরতে গেলে কিছুই জানেন না। রেডিওতে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এসব নিয়ে ধারাভাষ্য চলছে। ওখান থেকে যা মনে আছে তাই বললেন। আমেরিকান ভদ্রলোক এবার আরেকটু রিল্যাক্স হলেন। জানতে চাইলেন, ‘আপনার পরিবারের সবাই ভালো আছেন তো? তারা এখন কোথায়? আশা করি তারা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বাইরে আছেন।’
‘তারা কেমন আছেন ঠিক বলতে পারছি না। তারা সবাই এখনো জাপানেই আছেন।’
দম্পত্তির দুজনের চেহারায় সহানুভূতি ফুটে উঠেছে। তারা দুজনই এবার জানতে চাইলেন, ‘আপনার পরিবারের সবার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হয় কি?’
যুদ্ধের এই অবস্থায় জাপান একটা যুদ্ধক্ষেত্র। সেক্ষেত্রে যোগাযোগ হওয়াটা সম্ভব নয়। তিনি ম্লান হেসে বলেন, ‘সেটা কি আর সম্ভব?’
দম্পতি দুজনের উৎকণ্ঠা আরো বেড়ে যায়, ‘তার মানে যুদ্ধ শেষ হওয়া ছাড়া আপনি তাদের কোনো খোঁজই পাবেন না?’
তাদের আরো অনেক কথাই হলো। দম্পতি স্যামুয়েলকে তাদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালেন। অথচ তাদের পরিচয় হলো এই কিছুক্ষণ পূর্বে! সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ওরা আর তাকে গুপ্তচর ভাবছে না!
স্যামুয়েল আই, হায়াকানার এই চমৎকার গল্পটি তোমাদের এই কারণে শোনানো, যাতে করে তোমরাও এমন বিব্রতকর পরিস্থিতিকে নিজের অনুকূলে আনতে পারো। যেই লোকটাকে তারা এতক্ষণ সন্দেহের চোখে দেখেছে, অথচ তাকেই খুব সহজে আপন করে নিল! এজন্য অবশ্যই স্যামুয়েল সাহেবের দক্ষতা কাজে লেগেছে। তোমাদের বলতে চাই, হতে পারে তোমার কাছে বিশদ জ্ঞান না থাকতে পারে অথচ যদি শুধুমাত্র টেকনিক আর শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ঠিকভাবে ফুটিয়ে তোলা যায়, সবাই তোমার পাশেই দাঁড়াবে, তা তুমি যতই ভাঁড় বলো না কেন! মনে রাখবে, তোমার কায়দা-কানুন জানাটা বেশ জরুরি।
গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে উত্তরণ
সব সময় বাস্তব জীবনের সমস্যা নিয়ে কথা না বলাটাই শ্রেয়। কথপোকথনের এক পর্যায়ে যদি বুঝতে পারো তোমার সঙ্গী নিজেকে চতুর কিংবা জ্ঞানী হিসেবে জাহির করতে চাচ্ছে, তোমারও একই কাজ করার দরকার নেই। বরং তুমি তার কথাগুলো শুনো। এবং ওগুলোর প্রাসঙ্গিক কথা বলো। যদি তুমি নিজেকে তার মতো জাহির করার প্রচেষ্টা চালাও তবে এটা ঠিক মিনসান কোম্পানির ওই কর্মকর্তাদের মতো হয়ে যাবে যারা নিজেদের জ্ঞান জাহির করতে চেয়েছিল। সব সময় মনে রাখতে হবে, মানুষ তোমার বলার ধরন বেশি পছন্দ করে, কী বলছো তা নয়।
কৌশল ১১
গতানুগতিক কিন্তু আকর্ষণীয়
কীভাবে কথোপকথন শুরু করবে, এই নিয়ে চিন্তিত? তুমি বোধহয় ভুলেই যাচ্ছো যে, ৮০% মানুষ তুমি কীভাবে শুরু করছো তার দিকে কোনো মনযোগই দেয় না। ইভেন তারা এটা জানতে আগ্রহী নয় যে, তুমি কত জ্ঞানগর্ভ বিষয় আলোচনা করছো! বরং তারা অনেকেই এই ব্যাপারে আগ্রহী যে তুমি কতটা মধুর এবং আগ্রহী করে কথোপকথন করছো। তোমার আগ্রহ এবং মনোবল তোমার শ্রোতাকে তোমার দিকে আকর্ষণ করবে। কী কথা দিয়ে শুরু করব, এর চেয়ে কতটা মধুর করে শুরু করব এটা বেশি গুরুত্ব রাখে।
‘লিভারউস্টস’ ছাড়া যেকোনো কিছু আবার ডট্টির কাছে ফিরে যাই। একদিন সে স্যান্ডউইচের আশায় বসে আছে। আমি তখনই দরজা দিয়ে যাচ্ছিলাম। তাকে দেখে জানতে চাইলাম, ‘তুমি কি কিছু খাবে?’
ডট্টি জানাল, ‘লিভারউস্টস ছাড়া যেকোনো কিছু আনলে খুশি হবো।’
আমি তাকে ধন্যবাদ দিলাম। অন্তত এমন কিছুর নাম তো বলেছে যা সে খাবে না।
তখনো তার মাঝে সেই ‘যেকোনো কিছু’ কথাটা স্পষ্ট।
অতএব কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে আমাদের প্রথম বাক্য বিনিময়টা খুবই গুরুত্ব বহন করে। ওই সময়ে যদি তুমি কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করো, তবে তুমি একজন অভিযোগকারী হিসেবে পরিচিতি পাও। যদি মাথা গরম করে কথা বলো তবে একজন বদমেজাজি হিসেবে প্রকাশ পাও। আবার যখন কাউকে অসম্মান করে কথা বলো তখন নিজে ইতর হিসেবে উপস্থিত হও। এবং যখন কারো প্রশংসা করো তখন চাটুকার হিসেবে নিজেকে নাম লেখাও। সুতরাং কখন, কোথায়, কীভাবে কথা বলছো তা গুরুত্ব বহন করে।
বিভিন্ন জায়গায় নিশ্চয়ই খেয়াল করেছো, কিছু ব্যক্তি নানা ধরনের প্রশ্ন দিয়ে কথাবার্তা শুরু করে। এই যেমন, বাহ, এই জামাটা কোথা থেকে কিনেছে? আরেহ এই প্রোগ্রামের আয়োজক যেন কে? আরেহ তুমি অমুক না? তোমাকে তো আজ দারুণ দেখাচ্ছে! এইসব প্রশ্নের অধিকাংশের উত্তর প্রশ্নকর্তার জানা থাকলেও সে প্রশ্নগুলো করে। কেন জানো? কথোপকথন শুরু করতে। আসলে হুট করে তো আর কথা বলা যায় না!
সামনে তোমাদের জন্য দারুণ কিছু কৌশল আলোচনা করা হবে। এই যেমন-কোনো নতুন জায়গায় যে কারো সাথে কীভাবে কথা বলবে? পড়তে থাকো পরের অংশগুলো।
পর্ব ১২
সব সময় ‘হোয়াটিজিট’ সঙ্গে রাখো
‘হোয়াটিজিট’ আবার কী?
যেই কৌশলটা এখন আলোচনা করবো তা যেমন সামাজিক জীবনে কাজে দেবে তেমনই পেশাদারি জীবনেও কাজ করবে। এই কৌশলটা খাটালে তোমাকে বিশেষভাবে কিছুই করা লাগবে না। শুধুমাত্র নিজের মাঝে একটা ‘হোয়াটিজিট’ ভাব ধরে রাখতে হবে। ব্যাস! আর কিছুই না।
হোয়াটিজিট কৌশলটা আসলে কী? তার আগে আমি ভেঙে বলি হোয়াটিজিট
আসলে What is it? (এটা কী?)
‘হোয়াট ইজ ইট’কে একত্রে টেনে বললে শোনায় ‘হোয়াটিজিট’।
তুমি এমন কিছু সাথে রাখতে পারো, যেটা দেখে মানুষ বিস্ময় নিয়ে দেখবে।
হতে পারে তোমার হাতের ঘড়িটা একেবারে ভিন্ন, হতে পারে তোমার চশমাটা নজরকাড়া।
হাজার মানুষের ভেতরেও তোমাকে আলাদা করে দেয় এমন কিছু পরা নিশ্চয়ই মন্দ নয়।
দেখবে সবাই তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। অনেকে এসে প্রশ্ন করবে? এটা কী মশাই? (হোয়াটিজিট?) এরপর একে একে নতুন প্রশ্ন আসতে থাকবে।
এটা কোথায় পেয়েছেন?
কেউ যখন যেচে এসে কথা বলবে, তোমার আর কী চাই? এমন অনেক মানুষও তোমার সাথে কথা বলবে যাদের সাথে কথা বলার আকাঙ্ক্ষা তোমার অনেকদিনের!
ধরো সেই মানুষটা তোমার কাছে এসে বলল, ‘আরেহ, এই অদ্ভুত জিনিসটা কোথা থেকে কিনেছেন? আগে তো কোথাও দেখিনি!’
এক অনুষ্ঠানে আমি মান্ধাতা আমলের একটা চশমা পরে গেলাম। চশমাটা দেখতে খুবই অদ্ভুত ছিল। ওটা সরাসরি চোখে না লাগিয়ে গলায় ঝুলিয়ে রাখলাম। খুব বেশিক্ষণ লাগল না, একটা ভিড় তৈরি হয়ে গেল! মানুষজন আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে ওটা দেখছে। কেউ কেউ প্রশ্ন করছে, এটা কী (হোয়াটিজিট)? এটা কোথায় পেলেন?
আমি জানালাম, এটা আমার দাদির রেখে যাওয়া চশমা। দাদি মারা যাবার পর ঘরে পড়ে ছিল। ভাবলাম আমিই ব্যবহার করি এটা।
চারদিকে গুনগুন শুরু হলো। কথায় কথায় প্রশ্ন এসে গেল, এই চশমার বয়স কত? কিংবা আমার দাদি কীভাবে মারা গেল? কেউ কেউ দাদির জন্য সহানুভূতি দেখাতে লাগল। উৎসুক কেউ কেউ চশমাটা হাতে নিয়ে দেখল। চোখে লাগাল। কেউ বা প্রশংসা তুলল, ‘আসলেই পুরনো জিনিসের সৌন্দর্য অনেক বেশি।’
আমার আর কিছুই করা লাগেনি। একটা ভিড় দাঁড়িয়ে গেলো যার কেন্দ্রবিন্দুতে আমি। এমন অনেকেও কথা বলতে এলো যাদের সাথে আমি কথা বলতে চাইতাম। বুঝতেই পারছো, কীভাবে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করতে হবে। এমন কিছু সাথে নিয়ে যাও যাতে করে কেউ না কেউ এসে বলেই ফেলে, ‘এটা কী (হোয়াটিজিট)?’
অথবা তুমিই অন্যদের কাছে এমন কিছু খুঁজে নাও যা দেখে তুমিই কথোপকথন শুরু করতে পারো, ‘আরেহ! এটা কী (হোয়াটিজিট)?’
প্রেমিকা খুঁজতে ‘হোয়াটিজিট’
সামাজিক জীবনে এবং পেশাদারি জীবনে এটা কীভাবে কাজে দেয় আমরা দেখলাম। আমার প্রশ্ন, প্রেম ভালোবাসায় এটা কাজে দেয়? অথবা কোনো নারীকে তোমার পছন্দ, তার সাথে কথা বলার ছুতো পাচ্ছো না? সেখানে টেকনিকটা কাজে লাগবে? উত্তরটা খুবই সোজা। হ্যাঁ, এটা সব ক্ষেত্রেই কাজে দেয়।
আমার একটা বন্ধু আছে অ্যালেক্সান্ডার, যে কি না অদ্ভুত একটা গ্রিক ছোটো পুতুল নিয়ে ঘুরত। পুতুলটার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, পুতুলটা খুবই হতাশ এবং ভীত। যদিও সে ব্যক্তিগতভাবে হতাশ কিংবা ভীত কোনোটাই না। সে পুতুলটা নিয়ে ঘুরতো মেয়েদের তার দিকে আকর্ষিত করতে।
কোনো মেয়ে যখন তার সাথে কথা বলতে আগ্রহী হতো, তাদের প্রথম প্রশ্ন হতো, ‘আপনার হাতে এটা কী?’
তোমরা সবাই নিজেকে এমন একটা অনুষ্ঠানে কল্পনা করো তো, যেখানে একটা সুন্দরী নারী তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। তোমার সাথে সে কথা বলতে আগ্রহী। কিন্তু হুট করে তোমার সাথে কথা বলার কোনো আলাদা কারণ পাচ্ছে না। মেয়েটা মনে মনে ভাবছে, ‘আপনি মশাই অনেক সুন্দর। কিন্তু আমি কীভাবে আপনার সাথে কথা বলি? কথা বলার কোনো পথই যে খোলা নেই!’
নিজেও অন্যের মাঝে ‘হোয়াটিজিট’ খুঁজে নাও
শুধুমাত্র অন্যরা তোমার সাথে কথা বলবে এমনটা ভাবার যথেষ্ট যুক্তি নেই। তার চেয়ে তুমিও একইভাবে অন্যদের প্রশ্ন করো, ‘এটা কী (হোয়াটিজিট)?’ যার সাথে কথা বলতে চাও তার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করো। এমন কিছু একটা খুঁজে নাও যেটার ছুতো ধরে তুমি তার সাথে কথা বলতে পারো। হতে পারে সেটা তার হাতের রুমাল। হতে পারে তার কোট অথবা তার হাতের দামি আঙটিটি। তুমি কারো কোম্পানিতে চাকরি করতে আগ্রহী। তার সাথে পরিচিত হতে চাও? তাহলে সোজা তার কাছে যাও। তার পরিহিত এমন কিছুর দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করো, ‘আরেহ, এটা কী? এটা কোথা থেকে নিয়েছেন?’
ব্যাস। বাকিটা আর বলা লাগবে না। সে লোকই তোমার সাথে কথা বলবে। অবশ্যই সব সময় এমন কিছু করো যাতে মানুষ তোমার কাছে জানতে চায়, ‘এটা কী?’ অথবা এমন কিছু অন্যের কাছে তুমি খুঁজে নাও যাতে তুমিও বলতে পারো, ‘আরেহ! এটা কী?’
কৌশল ১২
সব সময় ‘হোয়াটিজিট’ সঙ্গে রাখো
তুমি যেখানেই থাকো, হোক সেটা কোনো সামাজিক অনুষ্ঠান কিংবা ব্যবসায়িক। এমন কিছু পরিধান করো বা নিয়ে যাও যা মানুষকে চমকে দেবে। মানুষ ওরকম কিছু আগে দেখেনি। তারা অবাক হয়ে তোমার কাছে আসবে। বলবে, ‘হ্যালো, কিছু মনে না নিলে একটা প্রশ্ন করি… এই যে, এটা কী?’
পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা এমন একটা টেকনিক নিয়ে আলোচনা করবো যা রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রায়শই করে থাকেন। তারা যখনই এমন কাউকে দেখেন, যিনি তার কাজে আসতে পারেন। তারা তার সাথে পরিচিত হয়ে তাকে পরবর্তী রাজনৈতিক ক্যাম্পেইনে কাজে লাগান।
পর্ব ১৩
‘হুজদ্যাট’
যেখানে ‘হোয়াটিজিট’ কৌশল অকেজো সেখানে ব্যবহার করো ‘হুজদ্যাট’
এমন পরিস্থিতিতে পড়ে গেলে যে, একজন মানুষের মাথার সিঁথি থেকে শুরু করে পায়ের জুতো পর্যন্ত খুঁজেও এমন কিছু পেলে না, যেটার প্রসঙ্গ তুলে তাকে প্রশ্ন করবে, ‘এটা কী?’
তখন কী করবে? অথচ তুমি ব্যক্তিটির সাথে কথা বলতে উন্মুখ হয়ে আছ! তোমার জন্যই ‘হুজদ্যাট’ (‘Who is that?’ বা উনি কে?) টেকনিকটি।
মনযোগ দিয়ে এই অংশটা খেয়াল করো। তোমার প্রথম কাজটাই হচ্ছে উক্ত অনুষ্ঠানের দায়িত্বে আছে এমন কাউকে খুঁজে নেওয়া। আয়োজককে তোমার টার্গেট করা ব্যক্তিকে দেখিয়ে বলো, ‘আরে বাহ, ওই যে ভদ্রলোক, উনি তো বেশ মজার মানুষ। উনার পরিচয়টা জানতে পারি?’
আয়োজক অথবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিটি তোমার প্রশ্নে খুশি হবেন। তার প্রোগ্রামে এসে এমন উৎসাহী কাউকে পেয়ে নিশ্চয়ই ভেতরে ভেতরে পুলকিত বোধ করবেন। তোমার কাজ হয়ে গেছে। উক্ত দায়িত্বশীল তোমাকে তোমার টার্গেট সম্পর্কে পরিচিতিমূলক কিছু কথা বলবে। এই যেমন তিনি কী করেন? তার প্রিয় কাজ কী? ইত্যাদি ইত্যাদি। ওগুলো মনযোগ দিয়ে শোনো। তারপর ওই পুরুষ কিংবা মহিলাটির সামনে দাঁড়াও।
ধরো, দায়িত্বশীল আয়োজক তোমাকে জানাল, ‘হ্যাঁ। আপনি জো স্মিথের কথাই বলছেন। হুমমম… সে আসলেই মজার লোক। তার বর্তমান ঢাকরি সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। তবে এটা বলতে পারি সে টেনিস খেলতে খুবই পছন্দ করে।’
ওহ হো! তোমার রশদ সংগ্রহ শেষ। এবার জো স্মিথের দিকে এগিয়ে যাও। তাকে বলো, ‘আপনার নামই তো জো স্মিথ? সুসানের সাথে আপনাকে নিয়েই আলোচনা হচ্ছিল। শুনলাম আপনি দারুণ টেনিস খেলেন। তা মশাই আপনি কোন মাঠে টেনিস খেলেন? একদিন তো দেখতে আসতেই হয়!’
কৌশল ১৩
‘হুজদ্যাট’ বা উনি কে? (who is that?)
এই কৌশলটা বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা ব্যবহার করেন। চাইলে যেকোনো ব্যক্তি এই বিশেষ গুণটি আত্মস্থ করতে পারে। বেশি কিছু লাগবে না। আয়োজক থেকে জাস্ট তোমার টার্গেটেড ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু তথ্য নাও। তারপর একটু সাহস করে এগিয়ে যাও। তোমার কাজ হয়ে যাবে।
পর্ব ১৪
আড়ি পাতা
ওদের কথায় আড়ি পাতলাম এবং সুযোগ বুঝে বললাম ‘হ্যালো’
একজন সুদর্শনা নারীকে দেখে তোমার ভালো লেগে গেল, তোমার মনে হতে থাকল, এখনই তার সাথে গিয়ে কথা বলে ফেলা উচিত।
অথচ ‘হোয়াটিজিট’ কিংবা ‘হুজদ্যাট’ কোনো টেকনিকই এই ক্ষেত্রে কাজে লাগানোর উপায় নেই। উপরন্তু ওই নারী তার বন্ধুদের একটি বড় দলের সাথে আড্ডায় মেতে আছে! তুমি চাইলেও তার সাথে কথা বলা সম্ভব নয়। এমন কঠিন মুহূর্তে তোমার নিজেকে অসহায় মনে হবে। অথবা ধরে নাও ওই রমণীর জায়গায় একজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে। তারপরও তোমার অবস্থা একই থেকে যাবে।
কখনো ভেবে দেখেছো, বড় বড় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা মানুষের কাছে আসতে দুই মিনিট ভাবে না। কোনো বাধাই তাদের আটকাতে সক্ষম হয় না। কারণ বর্তমান এই কৌশলটা ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিরা অত্যধিক পরিমাণে চর্চা করেন। তাদের মাত্রাতিরিক্ত আড়ি পাতার অভ্যেস রয়েছে। তারা ভিড়ের আশপাশের ছায়ার মতো ঘুরঘুর করে। আন্তে শুনতে চেষ্টা করে, ওখানে কী নিয়ে আলোচনা হচ্ছে??
তাদের আড়ি পাতার এই স্বভাব বহু প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। এবং এর সফলতার অসংখ্য নজিরও রয়েছে।
তুমিও ঠিক একই কাজটা করতে পারো। ভিড়ের আশপাশে আড়ি পেতে থাকবে।
তোমার মূল লক্ষ্যই থাকবে সুযোগ বুঝে ওদের আড্ডায় অনধিকার প্রবেশ করা তবে সেটা বৈধভাবে। একারণে যখনই এমন কোনো শব্দ তোমার কানে আসবে যে বিষয়ে তুমি একটা স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারবে, এগিয়ে যাও এবং তাদের সাথে যুক্ত হও। যেমন তুমি সোজা গিয়ে বললে, ‘দুঃখিত, আপনাদের কথার মাঝে একটু বিঘ্ন সৃষ্টি করার জন্য। শুনতে পেলাম আপনারা কানাডা নিয়ে কথা বলছেন। আমার কানাডা নিয়ে জানার খুব আগ্রহ। পরের মাসে আমার ওখানে যাবার কথা রয়েছে। কানাডা জায়গাটা কেমন? কোনো সাজেশন থাকলে দিতে পারেন।’
তাকিয়ে দেখো, এখন তুমিই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সবাই তোমার সাথে কথা বলতে আগ্রহী হবে এটা নিশ্চিত। হ্যাঁ, সুযোগ বুঝে তোমার টার্গেট করা ব্যক্তিটির সাথেও কথা বলে নিতে পারো।
কৌশল ১৪
আড়ি পাতা
হোয়াটিজিট কিংবা হুজদ্যাট এই দুটি কৌশলের কোনোটিই কাজে লাগাতে পারছো না? তাহলে এখনই তুমি আড়ি পেতে শুনতে থাকো, ওদের কথা যাদের আড্ডায় তুমি অংশ নিতে চাও। তাদের আড্ডার যেকোনো একটা ছুতো ধরে ঢুকে যাও আড্ডায় আর বলে ফেলো, ‘আরেহ, এই ব্যাপারটা তো অনেক ইন্টারেস্টিং! আমিও এটা নিয়েই ইদানীং ভাবছিলাম।’ হয়ে গেছে। আর কিছুই লাগবে না। তোমাকে তাদের আড্ডায় তারা নিয়ে নিয়েছে। বিশ্বাস না হলে ট্রাই করেই দেখো।
পর্ব ১৫
গতানুগতিকভাবে শহরের নাম উল্লেখ করো না
আধো আধো জবাব এড়িয়ে চলো
ঠিকভাবে সাজগোছ না করেই বোকার মতো সাজ নিয়ে কোনো অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলে? উপস্থিত হয়ে থাকলে লজ্জায় নিশ্চিত মাথা হেট হবার কথা।
একটা বিস্তৃত পরিস্থিতিতে একজন জানতে চাইল, ‘তোমার বাসা কোথায়?’ অথবা ‘তোমার দেশের বাড়ি কই?’
এ দুটো প্রশ্ন তোমার ভেতরটা নাড়িয়ে দিল। কীভাবে এর জবাব দেবে বুঝে উঠতে পারছো না। নিজের অনিবার্য অপমান দেখে নিজেই চরম হতাশ হয়ে পড়েছো?
উভয় ব্যাপারটা তোমাকে আরো বেশি নার্ভাস করে দিয়েছে নিশ্চয়ই।
এমন প্রশ্নগুলো মাঝেমাঝেই আমাদের শোনা লাগে। সমাজের মানুষজন এমন প্রশ্নগুলো খুবই স্বাভাবিক মনে করে থাকেন। কোনো প্রশ্ন তোমাকে বিব্রত করতে পারে, এমনটা ভাবার সময় কোথায়? প্রশ্নগুলো যতটা না তীক্ষ্ণ, তার চেয়ে বেশি তীক্ষ্ণতা নিয়ে প্রশ্নকর্তা চেয়ে থাকেন।
ভুজংভাজাং কিছু একটা বলে যে নিজেকে রক্ষা করবে, তাও খুঁজে পাচ্ছো না।
নতুন পরিবেশে নতুনভাবে অনেকের সাথেই পরিচিত হতে হয়। আর পরিচয় মানেই ‘তুমি কোথায় থাকো?’ এবং ‘তুমি কী করো?’ এই দুটো প্রশ্ন তোমাকে শুনতেই হবে। তুমি হয়ত এসেছো কোনো একটা অজ পাড়াগাঁ থেকে। অথবা কোনো একটা সুপরিচিত শহর থেকে, যার নামটা তুমি যেকোনো কারণে এড়িয়ে যেতে চাচ্ছো। হোক সেটা নিউইয়র্ক কিংবা লন্ডন শহর। তুমি যখনই আগ্রহ নিয়ে জবাব দাও, ‘আমি নিউইয়র্ক থাকি।’
উত্তরটা তুমি যতটা হেসে দিয়েছো, ততটা হেসেই প্রশ্নকারী জেনে নিল, তুমি নিউইয়র্কে থাকো। এরপর? দুপাশ থেকে নতুন করে কথা বলার কোনো প্রশ্নই পাওয়া যায় না। দুজনই কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থাকো, নতুন কিছু প্রশ্ন খুঁজতে থাকো। ওই ক্ষেত্রে এটা বলাই বাহুল্য তোমার এক শব্দের উত্তরটা যথাযথ হলেও যথেষ্ট নয়। কারণ তুমি এমনভাবে উত্তরটা দিয়েছো যে, এক শব্দেই এর সমাপ্তি ঘটেছে। এই যেমন তোমার বন্ধু জেসি তোমায় বলল, ‘কেমন আছ?’
তুমি উত্তরে বললে, ‘ভালো।’ তোমার ভালো জবাবটার সাথেই কথোপকথন শেষ। কারণ তুমি কোনো প্রকার প্রশ্নবোধক কিছু বলোনি অথবা বলা যায় কোনো কথা বলার পথই রাখোনি। ধরো তোমার উত্তরটা যদি এমন হতো, ‘ভালো আছি। তুমি কেমন আছ? অনেক দিন দেখিনি তোমায়, কোথায় ছিলে?’
তুমিই বলো তো, তোমার জবাবটা এমন হলে কথোপকথন আরো দীর্ঘ হতো না?
কিছুদিন পূর্বে একটা ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন থেকে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার একটা অনুরোধ পেলাম। আমিও ওদের হ্যাঁ বলে দেই। তো অনুষ্ঠানের দিন উপস্থিত হতেই অ্যাসোসিয়েশন চেয়ারম্যানের সাথে সাক্ষাৎ হলো। ভদ্র মহিলা আমায় রসিকতা করে বললেন, ‘আপনি এত সব কীভাবে করেন?’
আমিও পাল্টা জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনিও কম যান কই? আগে আপনি বলুন, আপনি কীভাবে করেন?’
মিসেস ডেবলিন এবং আমি দুজনেই হাসতে লাগলাম। এমন রসিকতা আসলেই মজা দেয়। স্বভাবতই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কোথায় থাকেন?’
তিনি জবাবটা দিলেন সাথে সাথেই, ‘কলম্বাস, ওহিও।’
উত্তরটা শুনে আমার মাথায় নানাবিধ প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। কলম্বাস নামটার সাথে আমি পরিচিত হলেও এই কলাম্বাস নামটা নানাভাবে পরিচিত। অনেকগুলো বিখ্যাত কলম্বাসের অস্তিত্ব রয়েছে আশেপাশে। ভদ্রমহিলা আমার দিক থেকে কিছু একটা শোনার জন্য আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছেন। আমিও কী বলব ঠিক বুঝতে পারলাম না! আমার ঠিক কলম্বাস নিয়ে ধারণা নেই। এমন কিছুও খুঁজে পাচ্ছিলাম না যা দিয়ে জবাব দেবো। তবুও হেসে অনেকক্ষণ পরে আমতা আমতা করে জবাব দিলাম, ‘ওহ, আচ্ছা। কলম্বাস। হ্যাঁ। হ্যাঁ। নাম শুনেছি।’
মিসেস ডেবলিনের অবস্থা দেখে বুঝলাম, তিনি কিছুটা লজ্জিত হয়েছেন। তার জবাবটা যে পরিপূর্ণ হয়নি তা বুঝতে পেরেছেন বলেই এমন লজ্জা পাচ্ছেন বলে আমার ধারণা।
এরপর আমাদের আর কথা আগায়নি। দুজনই কেন জানি আগ্রহ হারিয়ে ফেললাম। ভদ্রমহিলার জবাবটা শুনে মনে হচ্ছিল, তার অবস্থা সেই সৈনিকটির মতো হয়েছে, যার হাতে একটা ছুরি বিদ্ধ হয়ে আছে অথচ তার অফিসার তাকে জিজ্ঞেস করছে, ‘তোমার এপেন্ডিক্সটা ঠিক কোথায় অবস্থিত বলতে পারবে?’
পরক্ষণেই আমার মাথায় এই কৌশলটা এলো। কীভাবে আমরা এরকম পরিস্থিতি এড়িয়ে যেতে পারি।
কৌশল ১৫
গতানুগতিকভাবে শহরের নাম উল্লেখ করো না
জীবনের নানা পর্যায়ে ‘তোমার বাসা কোথায়?’ এই প্রশ্নটার সম্মুখীন আমাদের হতেই হয়। সেক্ষেত্রে উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকা উচিত। এক শব্দে উত্তর দেওয়া এড়িয়ে তোমার বাসস্থানের সাথে সম্পৃক্ত এমন কিছু বিশেষণ জুড়ে দেওয়া উচিত, যাতে লোকে তোমার সাথে বাড়তি কথা বলতে আগ্রহী হয়। এই যেমন আমি থাকি অমুক শহরে যেটি অমুক কারণে বিখ্যাত। নানা ধরনের বিশেষত্ব আছে আমাদের প্রায় সকলের জন্মস্থানেরই। দেখো, প্রশ্নকারী তোমার সাথে কথা বলার মতো অনেকগুলো পয়েন্ট পেয়ে গেছে।
শিকার বুঝে ফাঁদ
একজন মৎস্য শিকারি তার ফাঁদ তৈরির ক্ষেত্রে কিছু ভিন্নতা রাখে। চিংড়ি থেকে শুরু করে হিংস্র তিমি পর্যন্ত, মাছেদের ধরার ক্ষেত্রে ফাঁদগুলোতে ব্যতিক্রম হয়। চিংড়ি ধরার ফাঁদ যেমন তিমিতে কাজে দেবে না তেমনই তিমি ধরার ফাঁদ ইলিশ ধরায় অকার্যকর।
কোনো ব্যক্তির সাথে পরিচয়ের ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই মানুষের ভিন্নতা লক্ষ্য করতে হবে।
একজন চিত্রকর আর একজন রাজনৈতিক ব্যক্তি একই ধরনের কথা বলবেন না। তাই অবশ্যই তোমাকে স্থান, কাল এবং পাত্র বুঝে কথা বলা উচিত।
এই যেমন- এক চিত্র প্রদর্শনীতে এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি কোথা থেকে এসেছেন?’
আমি হেসে জবাব দিলাম, ‘ওয়াশিংটন, ডিসি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, ওয়াশিংটন ডিসি এবং প্যারিস, দুটো শহরই একই নকশাকারকের অবদান?’
আমার উত্তরে তিনি খুশি হলেন। খুব সহজেই আমরা আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন শহর কাঠামো নিয়ে আলোচনা করলাম। প্রসঙ্গত আরো অনেক কথাই এলো। ইউরোপ ভ্রমণ কিংবা ইউরোপের সংস্কৃতি কি আর বাদ যাবার!
পরের ঘটনাটা ভিন্ন। সেবার এক সামাজিক প্রোগ্রামে গেলাম। এক ভদ্রলোক আগ্রহ নিয়ে কথা বললেন। তিনি জানতে চাইলেন, ‘আপনি কি এখানকার স্থানীয় বাসিন্দা?’
আমি কিছুটা অবাক হলেও অবস্থা আন্দাজ করে জবাব দিলাম। সামাজিক অনুষ্ঠানে কী জাতীয় মানুষের আনাগোনা থাকে আমার বেশ জানা। আমি সেইভাবেই বললাম, ‘জি না। মূলত আমি ওয়াশিংটন ডিসির বাসিন্দা। কিন্তু ওখানকার পরিবেশ ঠিক ভিন্ন। একেক পুরুষ পাঁচ-ছয়জন নারী নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কী বিচ্ছিরি এক অবস্থা! তাই আজকাল ওখানে আর থাকা হয় না।’
ভদ্রলোক আমার জবাবে বেশ আগ্রহী হলেন। তিনিও একমত হলেন আজকাল এমন অহরহ ঘটছে। আমি যে একজন সুন্দর মনে মানুষ খুঁজছি তা তাকে আলাদা করে বলা লাগেনি। আমাদের কথা আগাতে থাকল আমাদের মতো করে।
এখন ভাবছো, যদি একজন রাজনৈতিক ব্যক্তির সম্মুখীন হই? ব্যাপারটা অন্য সবার চেয়ে সহজ। ওয়াশিংটন ডিসির সাম্প্রতিক কোনো রাজনৈতিক ইস্যু তুলে দাও। তোমাদের কথোপকথন শুধু চলবেই না বরং দৌড়াবে।
মজার ব্যাপার হলো আমরা অনেকেই ভেবে তটস্থ হয়ে আছি যে, এসব ইনফরমেশন কারো সাথে আলোচনা করতে গেলে, হুটহাট তথ্যগুলো কোথায় পাব? এই অযৌক্তিক প্রশ্নটা ধোপে টেকার নয়। ইন্টারনেট আজ সবার হাতে হাতে পৌঁছে গেছে। যে প্রশ্নটা তোমাকে সারা জীবন শুনতে হবে, ওটার জন্য কি একটু
কষ্ট করা যায় না? আজই Google. com থেকে তোমার শহরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো জেনে নাও। কবি-সাহিত্যিক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এছাড়াও নানা গুণীজন যাদের দেশের সবাই চেনে, তাদের সম্পর্কে তথ্য পড়ে ফেলো ফটাফট। সময়, কাল এবং পাত্র বুঝে তুমি কথা বলো। তোমার সফলতা নির্ধারিত।
পর্ব ১৬
গতানুগতিকভাবে পদবি উল্লেখ করো না
অনিবার্য প্রশ্নের জবাব
তুমি কোথায় থাকো? এই প্রশ্নটির উত্তর দেওয়ার পরপরই নিশ্চিতরূপে ধরে নিতে পারো, পরের যে প্রশ্নটি বারুদের বেগে তেড়ে আসবে তা হচ্ছে, ‘তা তুমি কী করো?’
জবাবের ক্ষেত্রে আগের মতোই সতর্ক থাকবে। কোনো অবস্থাতেই এক শব্দে জবাব দেওয়া যাবে না। এটাও মাথায় রেখো, কার সাথে কথা বলছো; কোথায় কথা বলছো?
ধরো পেশাগত জীবনে তুমি একজন ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার। অথবা এমন কোনো পেশায় নিযুক্ত আছ যে, লোকে নাম শুনেই চোখ বড় বড় করে তাকায়। বুঝতে চেষ্টা করে, এটা আবার কোন বিষয়? প্রশ্নকারী তোমার জবাব পেয়ে অনেক সময় ‘ওহ, আচ্ছা’ বলে চলে যেতে পারেন। সব বিষয় সম্পর্কে সবার ধারণা থাকে না। আবার যেচে অনেকে জিজ্ঞেসও করেন না।
অন্যের সামনে নিজেকে বুদ্ধিমান প্রমাণ করতে চাও?
তবে তোমার উত্তরটা প্রশ্নকারীর উপযোগী করে নাও। যেমন তোমার সামনে একজন মহিলা তার বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তুমি এই প্রশ্নের উত্তরে বললে, ‘আমি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। সম্প্রতি আমাদের কোম্পানি একটি ভবন তৈরি করেছে যেখানে বাচ্চাদের জন্য আলাদা ফেসিলিটি রাখা হয়েছে।’
অথবা একজন ব্যবসায়ীর উত্তরে বললে, ‘আমি একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। আমাদের নিউইয়র্কে প্রজেক্ট চলছে, যেখানে আমি ফিল্ড ইনচার্জ হিসেবে আছি। বাট যা বুঝলাম, খরচটা বেশিই যাচ্ছে। পঞ্চাশ কোটি টাকা অলরেডি শেষ হয়ে গেছে।’
নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করো। তুমি যার সাথে কথা বলছো, সে বুঝবে এমন ভাষায় তাকে জবাব দাও। এক শব্দে উত্তর দেওয়ার অভ্যেস থাকলে বদলানোর চেষ্টা করো। আমাদের মনে রাখা উচিত, সব মানুষ যেচে এসে কথা বলবে না। বরং তোমাকেই এমনভাবে কথা বলা উচিত, যেন তোমার কথা থেকেই সে অনেকগুলো কথা বলার উপাদান পেয়ে যায়। তুমি মেডিকেল সাইন্সে পড়ো বলে এর এমন বর্ণনা তুমি দিলে, মানুষ ভাববে, বাবারে বাবা, কী সাবজেক্টে পড়ে উপরওয়ালা ভালো জানে!
কৌশল ১৬
গতানুগতিকভাবে পদবি উল্লেখ করো না
‘তুমি কী করো?’ এই প্রশ্নটা স্বাভাবিকভাবেই তোমাকে শুনতে হয়। জবাবে তোমার দায়সারাভাবে নিজের পদবি বলাটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। আমি একজন শিক্ষক, প্রকৌশলী কিংবা ডাক্তার বলার চেয়ে তুমি কিছুটা বাড়তি অংশ জুড়ে দিবে, যেটা তোমার পেশাটাকে তার সামনে ফুটিয়ে তুলবে। যেমন একজন বাচ্চার মায়ের সামনে বলতে পারো, ‘আমি একজন ডাক্তার। আমার শেষ চিকিৎসাটা করা হয়েছে একটা দশ বছরের বাচ্চার।’ দেখো, তোমাদের কথা কতটা মধুর হয়ে উঠবে।
গতানুগতিক পদবি উল্লেখ করার বেদনাদায়ক স্মৃতি
জীবনের কিছু স্মৃতি ভুলে যাবার নয়। আমারও তেমন কিছু স্মৃতি আছে।
সেবার দুই ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়। দুজনই নিজেদের পরিচয় দিতে সিনা টানটান করে ফেললেন। প্রথমজন তো একটা গম্ভীর ভাব নিয়ে বললেন, ‘আমি একজন পরমাণু বিজ্ঞানী।’
ভদ্রলোকের জবাব শুনে মনে মনে ভাবলাম, ‘পরমাণু বিজ্ঞানী হওয়া অত্যন্ত সৌভাগ্যের ব্যাপার। কিন্তু সেটা কীভাবে প্রকাশ করতে হয় তাও জানা উচিত।’
তো পাশের ভদ্রলোক এবার নিজের পরিচয় দিলেন। তিনিও জোর গলায় বললেন, ‘আমি একজন ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট।’
এরপর দুজন কথা বলার কিছুই পেলেন না। আমি কিছু একটা কথা বলব এই অপেক্ষায় দুজন আমার দিকে ফিরলেন। দুজনের এক্সপ্রেশন দেখে মনে হচ্ছে বড় কোনো একটা চাকরির কথা না বললে বুঝি মান সম্মান থাকবে না! নিজেদের বড় করার মিছে প্রতিযোগিতায় আমার ভেতরটা অসহ্য লেগে উঠল। নিজের পরিচয় দিয়ে আমরা সবাই চুপ করে রইলাম। কথা ওই পর্যন্তই! কারণটা খুবই সোজা। আমরা নিজেকে অন্যদের উপযোগী করে জবাব দেইনি।
এই ঘটনার বিপরীতে আরেকটা ঘটনা না বললেই নয়। পরিচয়ের মাঝে এক ভদ্রলোক বললেন, ‘আমি ট্রকি মিডো কমিউনিটি কলেজে শিক্ষকতা করার চিন্তা করছি। আমার কাজ হবে তিব্বতীয় বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষা দেওয়া।’
ভদ্রলোকের খোলামেলা জবাব আমার মনে দাগ কেটেছে। ট্রকি মিডো কারা আমার একদমই জানা ছিল না তবে তিব্বত সম্পর্কে ধারণা ছিল। যেহেতু আমার জানাশোনার মাঝে কিছু পেলাম আমি ওই বিষয়ে কথা বলতে লাগলাম। দুটো ঘটনার পার্থক্য নিশ্চয়ই তোমরা ধরতে পেরেছো।
পর্ব ১৭
গতানুগতিকভাবে পরিচয় করিয়ে দিও না
সদ্য পরিচিতদের শুরুটা এগিয়ে দাও
তোমার দুজন বন্ধুকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কাজটা জীবনে একবার হলেও করেছো তুমি। দুজনই তোমার সামনে দাঁড়িয়ে।
তুমি হেসে মিল্টনের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘ও হচ্ছে রবিনসন।’ এরপর রবিনের দিকে তাকিয়ে বললে, ‘আর ও হচ্ছে মিল্টন। দুজন পরিচিত হয়ে নাও।’
দুজনকে নাম দিয়ে পরিচয় করে দেওয়াটা অনেক প্রাচীন এবং সন্তা কৌশল। মিল্টন এবং রবিন নিজেদের সাথে পরিচিত হবে ঠিকই কিন্তু কথা আগাবে না। এক্ষেত্রে গুণী মানুষেরা কী বলে জানতে চাও? তবে তোমাকে তাদের কৌশল জানাচ্ছি।
নিজেই বুঝে যাবে কোন ব্যাপারটা তোমরা এড়িয়ে গেছো!
এক্ষেত্রে তারা যা করে, দুজনকে সামনে দাঁড় করিয়ে ছোট্ট করে হাসে। তারপর দুজনকে দেখিয়ে বলে, ‘ও হচ্ছে মিল্টন। মিল্টনের ফটোগ্রাফির অদ্ভুত পাগলামি আছে। সে কিন্তু দারুণ ছবি তোলে। আর হ্যাঁ, ও হচ্ছে রবিনসন। ভ্রমণবিদ। দেশের কোন কোন জায়গাটা না ঘুরেছে সে? ঘুরতে চাইলে ওর সাথে যোগাযোগ করলেই হলো।’
দেখো দুজনকে কীভাবে খুবই সেইফ জোনে নামিয়ে দিয়েছো। তারা শুধুমাত্র হাই হ্যালো ছাড়াও কত কত বিষয় পেয়ে গেল কথা বলার! এই যেমন সর্বশেষ কোন জায়গাটা তার ঘোরা হয়েছে, সবচেয়ে ক্লান্তিকর ঘোরাঘুরি কোনটা ছিল এমন হাজারটা বিষয় নিয়ে কথা বলা যায়। এমনকি কথা হয়েও যায়। আর একবার আলোচনা শুরু হলে সেটা এক টপিক ছাড়িয়ে অন্য টপিকে ছড়িয়ে পড়তে আর
কতক্ষণ লাগে!
অর্থাৎ কাউকে পরিচয় করিয়ে দাও এমন কিছু যুক্ত করে, যেটা তোমাকে এবং তাকে নিয়ে যাবে অনেকগুলো কথোপকথন যোগ্য বিষয়ের সামনে। পত্রিকার লেখালেখি থেকে শুরু করে ব্যাংকের হিসেব নিকেশ, ঘোরাঘুরি থেকে শুরু করে রাজনীতি যেকোনো বিষয়ে তোমরা কথা বলতে পারো। পেছনের শক্ত কারণটা হচ্ছে তোমরা একজন আরেকজনের সম্বন্ধে ন্যূনতম কিছু জেনে গেছো, যা তোমাদের মধুর কিছু সময় তৈরি করে দেবে।
এজন্যই আমি সবাইকে উপদেশ দেই, নিজের পরিচয় ছড়িয়ে দাও। দেখবে অন্যজন তোমাকে কতটা সহজে মেনে নিচ্ছে!
কৌশল ১৭
গতানুগতিকভাবে পরিচয় করিয়ে দিও না
কাউকে পরিচয় করিয়ে দিতে গেলে গতানুগতিক ধারণা থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। যাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছ, তারা কি নিজেদের ব্যাপারে যথেষ্ট জানে? উত্তর, না জানে না। যেহেতু তারা দুজন দুজনের ব্যাপারে অজ্ঞ, কেন তুমি তাদের দুজনের ব্যাপারে কিছু ছোটোখাটো বর্ণনা দিচ্ছে না? ওভাবে পরিচয় করিয়ে দাও এবং দেখো তারা কীভাবে কথার সাগরে ভাসছে। তুমিও সেখানে দিব্যি সাঁতার কাটতে পারছো। এখানে সবচেয়ে বড় পাওনা কী জানো? তাদের পরবর্তী সাক্ষাপ্টা অনেক মধুর হবে। তাদের যোগাযোগ অনেকটা বেড়ে যাবে।
পর্ব ১৮
শব্দ গোয়েন্দা হও
তাদের মুখনিঃসৃত প্রত্যেকটা শব্দের ওপর মনযোগ দাও
স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কতই না মধুর আলাপ হয়। আলাপচারিতার মাঝেমধ্যে তারা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, ‘এই বিষয়টা নিয়েই কথা বলি, কী বলো?’
অপরজন মাথা নাড়ায় হ্যাঁ কিংবা না। দম্পতিরা নিজেদের পছন্দের বিষয়ে সহজেই সম্মতি খুঁজে পায়। বিপত্তি ঘটে যখন তুমি অন্য কারো সাথে কথা বলছো। তুমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছো না, ঠিক কোন বিষয়ে কথা বলবে। কোন বিষয়ে কথা বললে উভয়েই একটা ভালো সময় কাটাতে পারবে। মনে করো তোমার সহকর্মীর সাথে কথা হচ্ছে। তুমি হুট করে আর বলতে পারবে না, ‘আমরা এই বিষয়ে কথা বলি, কী বলেন অমুক সাহেব?’ এমনটা বলার সুযোগ নেই। আর যদি কেউ বলে থাকে, সেটা অন্যকে জোর করে নিজের টপিকে আনা ছাড়া আর কিছুই না!
তোমাদের নিশ্চয়ই ডেনির কথা মনে আছে। ডেনি যেভাবে তার শ্রোতাদের জন্য মধুর মধুর সব বিষয় তুলে আনত, তুমি যদি চাও, তেমনটা তোমার দ্বারাও সম্ভব।
গোয়েন্দা শার্লক হোমসকে চেনে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। হোমসের চোখ এড়িয়ে যেত তেমন জিনিসও খুব কমই আছে।
শার্লক হোমস যা বলত খুবই আত্মবিশ্বাস নিয়ে বলত। এই আত্মত্মবিশ্বাসের পেছনে ছিল তার নির্ভুল আন্দাজ ক্ষমতা। সমাজের বড় বড় সকল ব্যক্তির মধ্যে এই গুণটা যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান। তারা যেকোনো জায়গায় যার সাথেই দেখা করুক না কেন, সেই ব্যক্তির পছন্দের বিষয় খুব সহজেই বের করে ফেলে! আর পছন্দের বিষয়ে কথা বলতে গেলে অনেক ভালো মানুষও হুঁশ হারিয়ে ফেলে। মুহূর্তেই দুজন অপরিচিত ব্যক্তি ডুবে যায় নিজেদের কথোপকথনে!
আরেকটা ঘটনা বলি।
ন্যান্সির সাথে আমার সম্পর্কটা ছিল মজাদার। অনেকদিন পরে ন্যান্সির সাথে দেখা। মেয়েটার চোখেমুখে যেন আগুন ঝরছিল! সে কোনো কারণে অতি হতাশ।
বর্তমানে সে একটা বৃদ্ধাশ্রমে নার্স হিসেবে কাজ করে। তার হতাশ হবার নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী সমস্যা তোমার?’
প্রথমে লুকালেও পরে নিজেকে ঝেড়ে নিল। কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলল, ‘এক বুড়িকে নিয়ে পড়েছি বিপদে। বজ্জাত বুড়ি।’
শুনে মনে হলো বুড়ির কোনো একটা কাজ তার অপছন্দ। আমি আবার বললাম, ‘খুলে বলো ন্যান্সি।’
মিসেস ওটিস নামের একজন বয়স্কা মহিলা বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। আমি যা-ই বলি এই মহিলা তাতেই ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে উঠেন। সেদিন আমি আফসোস করে বললাম, এত বৃষ্টি সত্যিই বিরক্তিকর। অমনি বুড়ি আমার কলার চেপে ধরলেন।’
আমি চোখ বড় বড় করে বললাম, ‘তারপর?’
ন্যান্সি দীর্ঘশ্বাস তুলল, ‘বুড়ির দাবি, বৃষ্টি হলে গাছেদের অনেক উপকার হয়। তাই
বৃষ্টি হওয়া উচিত। ভেবে দেখো লেইল! এজন্য সে আমার কলার চেপে ধরবে?’ আমার বুঝতে বাকি নেই এই বুড়ির গাছের বাগানের খুব শখ রয়েছে। ওকে সে আন্দাজ থেকে বললাম, ‘বুড়িকে জিজ্ঞেস করো, তিনি বাগান করা পছন্দ করেন কি না?’
আমার বান্ধবীর চোখ কপালে তুলল, ‘তোমার মাথা খারাপ লেইল! আমি ওই বজ্জাত মহিলার সাথে কথা বলব? আর কিছু বললে আমাকে মেরেই ফেলবে।’
ন্যান্সি এক কথায় না করে দিল। অনেক চাপাচাপি করার পরে সে রাজি হলো বুড়িকে প্রশ্নটা করতে। তার পরের দিনের কাহিনি ভিন্ন। ন্যান্সি নিজেই আমার বাসায় ছুটে এলো। আমায় জড়িয়ে ধরে বলল, ‘কাজ হয়েছে। বুড়িকে জিজ্ঞেস করতেই বুড়ি খুশি হয়ে গেলেন। তিনি জানালেন তার নিজের গাছের বাগান ছিল। সে এবং তার স্বামী বাগানের নিয়মিত পরিচর্যা করতেন। কিন্তু মহিলা আমার সাথে কথা শুরু করে ছাড়তেই চাচ্ছিলেন না! তার গাছ নিয়ে নানাবিধ কাহিনি বলা শুরু করলেন।’
ন্যান্সির এই কাহিনি থেকে তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছো, কীভাবে ভালো পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অর্জন করতে হয়। কারো কথা থেকে তার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করার এই পদ্ধতিকে আমি নাম দিয়েছি শব্দ গোয়েন্দা হও। অর্থাৎ তোমার কাজই হবে তার কথা থেকে শব্দ বেছে নেয়া, যা দ্বারা তুমি তার পছন্দের কাজ বের করে নিতে পারো। এই যেমন বুড়ির বাগান পছন্দ তা আমি তার কথা থেকে বের করেছি।
ধরে নাও মিসেস ওটিস নামের ওই বয়স্কা বৃষ্টির পরিবর্তে বললেন, ‘বৃষ্টি হওয়ায় ভালোই হলো, আমার কুকুরটা বাইরে যেতে পারবে না।’
এক্ষেত্রে নিশ্চিত তোমার ধরে নিতে হবে বুড়ি কুকুর নিয়ে কথা বলতে পছন্দ করবেন।
যেকোনো জায়গায়, যেকোনো পরিস্থিতিতে যদি চোখ কান খোলা রাখা যায়, তবে তোমার পাশের বন্ধুর আকর্ষণীয় বস্তুগুলো খুব সহজেই তুমি বের করে ফেলতে পারবে। অন্যের কথা মনযোগ দিয়ে একটুখানি শুনো। তারপর হয়ে যাও ‘শব্দ গোয়েন্দা’। খুঁজে বের করো সেই শব্দটা যার উপরে তোমার পরের কথাগুলো চলবে।
তোমার বন্ধুটি পাখির কিচিরমিচির শুনে প্রকৃতির গুণগান গাইতে থাকল। কিংবা জ্যোৎস্নায় আকাশের দিকে হা করে তাকিয়ে বলছে, ‘জ্যোৎস্নার আলো আমায় খুন করে ফেলছে। এত সুন্দর কেন প্রকৃতি?’ তোমাকে নিশ্চয়ই বলে দেওয়া লাগবে না তোমার কোন বিষয়ে কথা বলা উচিত। তোমার তার মতো জ্যোৎস্না কিংবা পাখি প্রেমিক হওয়া অত্যাবশকীয় নয়। বরং তুমি তোমাতে তাকে আবদ্ধ করতে ওসব নিয়ে তুলে আনো দারুণ সব তথ্য। ব্যাস! দেখো, তোমার বন্ধুটি তোমার ভক্ত হয়ে গেছে! বাস্তবিক গোয়েন্দা হওয়া ঠিক যতটা কঠিন, শব্দ গোয়েন্দা হওয়া ঠিক ততটাই সহজ!
কৌশল ১৮
শব্দ গোয়েন্দা হও
তোমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা তোমাকে ঠিক যতটা কাজে দেয়, এই কৌশলে তার সাথে যুক্ত করবে নতুন মাত্রা। তোমার পাশের বন্ধুটির কথা শোনা। মনযোগ দিয়ে দেখো, তার কথার ভেতর থেকে খুব সহজে তার পছন্দের যেকোনো বিষয় বের করে নিতে পারবে। পরের অংশ আমার বলে দেওয়া লাগবে না। তুমি নিজেই আড্ডা জমিয়ে দিতে পারবে। ঠিক শার্লক হোমসের মতো। কোনো কু ছাড়াই যেভাবে বের হয়ে আসবে দারুণ সব তথ্য! এখন তোমার পালা।
পর্ব ১৯
দোলকের কেন্দ্রবিন্দু
পণ্যের সাথে সাথে তোমাকেও বিক্রয় করো এই কৌশলটা খাটিয়ে
অনেকদিন আগের কথা, আমি আর আমার এক বন্ধবী ডেনেই একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলাম। সমাজে যাদের আমরা রাঘব বোয়াল হিসেবে চিনে থাকি, তাদের খুব কাছ যাওয়ার সুযোগটা হাতছাড়া করিনি।
তাদের মাঝে ঘুরেফিরে আমার ধারণা জন্মেছিল, এর চেয়ে সুখকর জায়গা খুব কমই আছে। এত বুদ্ধিমান আর মজাদার মানুষদের কথায় আমি বুঁদ হয়ে ছিলাম। আমার ধারণা যদি ভুল না হয়, ডেনেইও খুব উপভোগ করেছে। কথাবার্তা বেশি বলার একটা গুণ আমাদের নারীদের যেহেতু এমনিতেই রয়েছে, আমিও চুপ করে থাকতে পারলাম না।
চট করে ডেনেইকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, ‘আজকের অনুষ্ঠানে কার সাথে কথা বলতে তোমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে? সত্যি বলবে কিন্তু।’
আমার বান্ধবীটি যেন আমার কথায় গরম কড়াইয়ে পড়েছে! আমি ভাবলাম বোধহয় এতগুলো মজাদার মানুষ থেকে সে কাকে রেখে কাকে বেছে নেবে তাই ভাবছে। কিন্তু আমাকে চরম অব্যক করে সে বলল, ‘রনের কথা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো লেগেছে।’
আমি মাথায় হাত দিয়ে যেন নিজেকে পরীক্ষা করলাম! রন? মনে মনে ভাবতে থাকলাম এই রনটা আবার কে? নামটা খুবই নতুন। আশপাশের যারা আছেন, এদের মাঝে রন বলে কাউকে চিনলাম না।
নিজের কৌতূহল দমানোয় আমি বরাবরই আনাড়ি। তাই বিস্ময় নিয়ে বললাম, ‘এই রনটা কে? সে কোথায় থাকে?’ ডেনেই আমার কৌতূহল আরো বাড়িয়ে বলল, ‘জানি না।’
আমি ফিরতি বললাম, ‘সে কী করে?’
এবারও সে আগের কণ্ঠে জবাব দিল, ‘জানি না।’
সে এমন একজনের সাথে কথা বলতে পছন্দ করে অথচ সে এটাই জানে না সেই ছেলে কী করে কিংবা তার বাসা কোথায়? আমি বোকার মতো ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
‘তাহলে রনের সাথে ঠিক কোন বিষয়ে তোমার কথা হয়?’ কোনো রকমে দাঁত চেপে জানতে চাইলাম।
ডেনেই মিটিমিটি হেসে বলল, ‘খুব বেশি কিছু আলোচনা হয় না। বরং রন আমাকে নিয়েই কথা বলতে পছন্দ করে।’
বেশ কিছুদিন ধরে রনের নামটা আমার মাথায় ঘুরঘুর করল। শেষে আমি নিজেই রনকে খুঁজে বের করে নিলাম। তারপর জানলাম রন মূলত প্যারিসের বাসিন্দা। বরফে স্কাইং ছাড়াও দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়ানোর বাতিক আছে তার। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিচরণের পাশাপাশি বিভিন্ন কৌশল তার খুবই ভালো জানা আছে। আমি খোলামেলাভাবেই জানতে চাইলাম, কোন কৌশল দিয়ে সে আমার বান্ধবীকে বশ করে নিল। বেচারির মুখে শুধু রন আর রন। অথচ রন সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই নেই!
রন স্মিত হাসল। নিজেকে উপস্থাপন করার দারুণ ক্ষমতা তার আছে এটা মেনে নিতেই হবে। সে জানাল, ‘এটা বড় কোনো ব্যাপার না। জাস্ট যার সাথে কথা কথা বলছি, তার জীবন নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করি। যদি আলোর মশালটা তার দিকে দাঁড় করিয়ে দিতে পারি, তাহলে অপর ব্যক্তি তার নিজের জীবন নিয়েই আলোচনা করে যাবে। হুট করে এক সময় অনুভব করবে আমার সাথে কথা বলতে তার ভালো লাগছে! আমি জাস্ট আলোর বৃত্তটাকে তার দিকে ঘুরিয়ে দেই। এই যা।’
রন অনেক ধৈর্যশীল শ্রোতা। এটা একটা বড় সত্য যে, একজন ভালো বক্তা একজন ভালো শ্রোতাও। আর যেই শ্রোতা তোমার কথাগুলো মনযোগ দিয়ে শুনছে তাকে ভালো না লেগে পারে?
এক্ষেত্রে আমার বন্ধু ব্রায়ান ট্রেসেইর একটা কৌশল না বললেই নয়। সে প্রায়শই বিক্রয় কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। তার কথার সারমর্ম সবসময় এটাই হয়, তুমি কতটা বিক্রি করতে পারবে এটা মাথায় না রেখে সবসময় তোমার পণ্যটিকে ফুটিয়ে তোলো। তোমার কথার সমন্ত ফোকাস যেন তোমার পণ্য আর তোমার ক্রেতাকে নিয়ে হয়। দেখবে বিক্রয় কীভাবে দৌড়ে দৌড়ে আসে!
কৌশল ১৯
দোলকের কেন্দ্রবিন্দু
কোনো আগন্তুকের সাথে কথাবার্তার সময় তুমি যদি তোমার সমস্ত আকর্ষণ তার উপরে তুলে দিতে পারো, তাকে ফোকাসিংয়ে রাখতে পারো, দেখবে সে কতটা স্বাচ্ছন্দ্যে তোমার সাথে কথা বলে যাচ্ছে! তার জীবনের নানা রসকষ নিয়ে তোমরা আলোচনা করে যাচ্ছো। অথচ আগন্তুক তোমার ব্যাপারে কিছুই জানে না! ইভেন সে তোমাকে অন্যদের থেকে বেশিই গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে!
পর্ব ২০
পুনরাবৃত্তি
বলার মতো কথা না থাকলেও অন্তত চুপ করে থাকা যাবে না।
শব্দবিষয়ক গোয়েন্দাগিরি দিয়ে অনেক সময় কথা চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু… হ্যাঁ, এখানে একটা বড় কিন্তু রয়েছে। এই যেমন তুমি কারো সাথে কথা বলছো, সে তোমাকে দারুণ দারুণ কথাগুলো বলার পরে তুমি হঠাৎ অনুভব করলে, এখন তোমারও কিছু বলা প্রয়োজন! আবার যখন তুমি কথা বলছো, অনুভব করলে, আরেহ এখন বিপরীত বন্ধুটির কথা বলা উচিত। এমনটা হয়।
জীবনের কখনো না কখনো টেনিস খেলা তোমার দেখা হয়েছে। একপাশের প্লেয়ার যখন টেনিস বলটা জালের উপর দিয়ে অপরপ্রান্তে ছুড়ে দিচ্ছে, অন্য প্লেয়ার বলটাকে ঠেকিয়ে প্রথম প্লেয়ারের দিকে মারছে। এই ব্যাপারটা ছাড়াও অন্য একটা জিনিস তোমার নজর কাড়ছে, আর সেটা হলো, বল পেটানোর ঠুসঠাস শব্দ। হঠাৎ বলটা নির্ধারিত ঘরের বাইরে পড়ল, এমনটা নিশ্চিত তোমার চোখ এড়ায়নি। একজন পয়েন্ট পেয়ে গেছে। টেনিস খেলা যেভাবে দুজনের অংশগ্রহণে হচ্ছে, তেমনই আমাদের ব্যক্তি জীবনের কথাবার্তা, আড্ডাগুলোতে যখন সবাই অংশ নেয়, তখনই ওটা প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
তুমি যার সাথে কথা বলছো, পুরো সময়টা শুধু সে বলে যাবে এমন কিন্তু না। কখনো সে. কখনো তমি এভাবেই কথা আগায়। কথা বলতে বলতে এমন পর্যায়ও আসবে, যখন কে কথা বলছে এটা গুরুত্বপূর্ণ। তাই একটু সতর্ক তো থাকতেই
হয়। অন্য মানুষটির প্রত্যেকটা কথায়, হু, হ্যাঁ কিংবা অন্তত মাথা নাড়িয়ে তাকে অনুভব করতে দাও, তুমি সবটাই শুনছো।
এমন এক সময় আসবে, তুমি কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করবে, তোমার শারীরিক ভাস্যে তাকে বুঝিয়ে দাও, এখন আমি কিছু বলছি। তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত কথা বলা চালিয়ে যাও যতক্ষণ না অপর ব্যক্তি কিছু বলতে চাচ্ছে। এটাই কথা বলার আসল নিয়ম।
এরপর আমি কী বলব?
তোমার কথা বলার ভান্ডার যদি শূন্য হয়ে ওঠে, ভাবছো কী দিয়ে কথোপকথন চালিয়ে যাবে? তাহলে তোতা পাখির বুলির এই কৌশলটা তোমার জন্য।
বাসে করে বাসায় যাওয়ার সময়টা আমার ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাটে। সিটে বসলেই দুচোখজুড়ে রাজ্যের ঘুম নেমে আসে। এমনও হয়, আশপাশে কী হচ্ছে, সেটাও চেতনা পাই না।
এক যাত্রায় আমার বন্ধু পিলও সাথে উঠল। দুজনের গন্তব্য পাশাপাশি, একটু আগ-পিছ এই আরকি। সিটে বসতেই আমার চোখে ঘুম নেমে এলো। আমি ঘুমকাতুরে চোখে দেখলাম, বেচারা কথা বলতে খুবই আগ্রহী, অন্যদিকে ঘুম আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। যতটুকু পারলাম নিজেকে সামলে নিলাম।
সে জানাল, গত সপ্তাহে ও একটা মঞ্চ নাটকে অভিনয় করেছে। মঞ্চ নাটকে সে অভিনয় করেছে কি করেনি, এই বিষয়ে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি খানিক সময় ঘুমিয়ে নিতে পারলেই স্বর্গ দর্শন পাই! তবুও ঘুমকাতুরে চোখে বললাম, ‘মঞ্চনাটক?’
আমার দিক থেকে সাড়া পেয়েছে, অমনি পিল আদা জল খেয়ে নামল, তার মঞ্চ নাটকবিষয়ক গল্প বলতে।
সে আগ্রহী হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। মজার ব্যাপার কি জানো লেইল? আমাদের সাথে
স্যামসও অভিনয় করেছে।’
আমি আবার আস্তে বললাম, ‘স্যামস?’
পিলের ঢোলে নতুন বাড়ি পড়েছে, সে এবার আমাকে জানিয়েই ছাড়বে স্যামস কে।
সে ব্যাখ্যা করতে লাগল স্যাম লোকটা সম্পর্কে যতটুক সে জানে। আমি প্রতিটি লাইন থেকে কোনো শব্দ নিয়ে তাকে প্রশ্ন করে গেলাম।
এদিকে ঘুম আমাকে মোটের উপরে কাবু করে নিয়েছে। ওকে যদি বলি একটু ঘুমাব, তবে যে কষ্ট পাবে। কী করা যায়? আশপাশে কী হচ্ছে আমার হুঁশ নেই, আমি শুধুমাত্র একটা সেন্স জাগ্রত রেখেছি, স্যাম কী বলে তা শুনছি। এটাকে কিমিয়ে ঝিমিয়ে ঘুমানো বলা যেতে পারে। আমি যে ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি সে তখনো বুঝেনি। এদিকে তোতা পাখির বুলির মতো ছোট ছোট প্রশ্নগুলো স্যামকে খুবই আগ্রহী করে তুলেছে। এই যেমন স্যাম বলল, ‘আমাদের নাটকে অনেকগুলো গান পরিবেশন করা হয়েছে।’
‘অনেকগুলো গান?’ আমি বললাম।
সে ফড়ফড় করে বলেই যাচ্ছিল। কী কী গান তার বর্ণনা দিচ্ছিল।
আমি আধঘুমন্ত হয়ে পুরো ভ্রমণটা করে গেছি তোতা পাখির বুলিতে। পরবর্তীতে যখন দুজনের দেখা হয়েছে, সে অকপটে স্বীকার করেছে, ওটা তার জীবনের একটা সেরা সময় ছিল। এমন মনযোগ দিয়ে নাকি কেউ, কখনো তার সাথে কথা বলেনি!
আমি কিছুই করিনি, তোতা পাখির বুলি ছাড়া। ব্যাপারটা স্যাম জানতে পারলে আমার পিঠের চামড়া আন্ত রাখবে না। একটা মজার ব্যাপার হলো, আমি গাড়িতে কী কী বিষয়ে কথা বলেছি, তেমন কিছুই মনে নেই। এখনো ভাবি, দীর্ঘ এই সময়টা কী কী প্রশ্ন করে গেছি!
কৌশল ২০
পুনরাবৃত্তি
বলার মতো কথা না থাকলে চুপ করে থাকা যাবে না। একটা তোতা পাখি যেমন মানুষের বুলি মানুষকেই শোনায়, তোমাকেও তেমনটাই করতে হবে। ঠিক এই কাজটাই তোমাদের কথাকে সঠিক পথে ধরে রাখবে। এরপর তোমার একটাই কাজ বাঁচে, মনযোগ দিয়ে তার কথা শোনা।
সেলসের মানুষদের জন্য এই পদ্ধতি অনেক বেশি কার্যকর। একটা বুনো হাঁসকে পুরো বন তাড়া করে ধরার চেয়ে তোতা পাখির বুলি দিয়ে শিকারি করতে পারলে মন্দ কী? (বুনো হাঁসকে ধরা বলতে, যেকোনো ব্যক্তির পেটের কথা বের করার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।)
পুনরাবৃত্তি তোমাকে বাড়তি ফায়দা দেবে
আমার বিক্রয়বন্ধু পল, গাড়ি কেনাবেচার ব্যবসায় যুক্ত। সে তার একটা সফল্যের গল্প আমাকে জানিয়েছে। পল গাড়ির শো-রুমে বসে অলস সময় কাটাচ্ছিল। এমন সময় এক দম্পতি এসে ঢুকলেন। পুরুষ লোকটি ঢুকেই উকিঝুঁকি দিচ্ছিলেন।
গলকে খেয়াল করেননি। সে তাদের স্বাগত জানাল, জানতে চাইল, কোন ধরনের গাড়ি তিনি চাচ্ছেন? ভদ্রলোক শুরুতে ‘একটা ভালো গাড়ি’ দেখান বললেন। পলের পছন্দের একটা গাড়ির সামনে ভদ্রলোক নিজ থেকে দাঁড়ালেন।
পল আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘স্যার গাড়িটা দারুণ। একেবারে লেটেস্ট সব ফিচার এর মধ্যে পাবেন।’
স্ত্রীটির গাড়ির প্রতি কোনো আগ্রহ নেই, তাও স্বামীর পিছু পিছু এলো। ভদ্রলোক গাড়িটা ভালো করে পরখ করলেন। তারপর কী যেন ভাবতে থাকলেন। দাম? হতে পারে।
পল সময় নষ্ট না করে জানতে চাইলো, ‘এই গাড়িটি কেমন লাগছে স্যার? পছন্দ হলে চালিয়ে দেখতে পারবেন।’
ভদ্রলোক আরো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর আমতা আমতা করে বললেন, ‘আমার ব্যক্তিত্বের সাথে গাড়িটা ম্যাচ করবে তো? আমার একটু চিন্তা হচ্ছে।’
পল জাস্ট তার কথারই প্রতিধ্বনি তুললো, ‘ব্যক্তিত্বের সাথে?’
‘আসলে, আমার মনে হচ্ছে আরেকটু স্পোর্টস কার টাইপ ভাব এলে বোধহয় ভালো হতো।’
পল আবার আগের মতো পুনরাবৃত্তি করল, ‘স্পোর্টস কার টাইপ?’
সর্বশেষ ভদ্রলোক হাঁড়ির খবর বের করে আসল পয়েন্টে এলেন, ‘আসলে আমি স্পোর্টস কার টাইপ কার চাচ্ছিলাম।’
ব্যাস! ধূর্ত পলের বোঝার বাকি নেই, ভদ্রলোক কী জাতীয় গাড়ি চাচ্ছেন।
সে বুঝে গেছে, এই ব্যক্তিটির কাছে গাড়ির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ তার ব্যক্তিত্ব। গাড়ির ভালোমন্দ তিনি জানতেও চান না। সে সোজা তাকে তার কাঙ্ক্ষিত গাড়ির সামনে দাঁড় করাল, লোকটার চোখ চকচক করে উঠল। খুব একটা দামাদামিও করা লাগেনি, ভদ্রলোক খুশি মনে ওটা কিনে নিলেন। আর ধূর্ত পল অল্প কিছু সময়ে দারুণ একটা কমিশন পেয়ে গেল।
সে হাসিতে গড়াগড়ি খেলো, ‘আমার কোনো কষ্টই করা লাগেনি, লেইল। আমি শুধু তোতা পাখির মতো তার বুলি তাকেই প্রতিধ্বনিত করেছি মাত্র।’
পর্ব ২১
পুনরায় শুনতে চাই
তাদেরকে ওই গল্পটা বলো, ওই যে চোর…
প্রত্যেক বাবাই খুশি হয় যখন তার বাচ্চাটি অনুনয় করে বলে, ‘বাবাই, আমাকে
হাতির গল্পটা আবার বলো। প্লিজ।’
সেই একই গল্প বারবার শুনেও বাচ্চাটা পরম আনন্দে বগল দাবাতে থাকে। একই গল্প বাবা অসংখ্যবার বলেও ফের বলতে আগ্রহী হয়। হয়তো-বা কখনো কখনো ভিন্ন গল্পও বলতে হয়। এই যে ছোট্ট বাচ্চাটাকে একই গল্প নানা আঙ্গিকে বারবার বলে ফেলার এই চমৎকার কৌশলটি হচ্ছে পুনরায় শুনতে চাই কৌশল। এভাবে বলা যায়, একই গল্প বারবার বলার পরেও কথোপকথনের কোনোরূপ ক্ষতি না হয়ে বরং আরো মজাদার হয়।
একটা ইতালিয়ান জাহাজে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল আমার। জাহাজের অধিকাংশ অফিসার থেকে কর্মী পর্যন্ত সবাই ইতালিয়ান হলেও যাত্রীদের প্রায় শতভাগই আমেরিকার। ইতালিয়ান কর্মীদের ভাঙা ভাঙা ইংরেজি খুব বেশি কাজে দিত না। প্রত্যেক ভ্রমণেই ক্যাপ্টেন রাত্রীকালীন পার্টির আয়োজন করতেন। আমার প্রচণ্ড ইচ্ছে ছিল এসব পার্টির সময়টাতে জাহাজের কর্মী এবং যাত্রীদের মাঝে দারুণ একটা সময় কাটনোর। কিন্তু অত্যন্ত হতাশার ব্যাপার হলো জাহাজের কর্মীরা সব ইতালিয়ান আর যাত্রীরা আমেরিকান, যে কারণে এটা খুবই কঠিন ছিল, এসব
পার্টিতে দুপক্ষের মিলন হলেও হালকা কিছু কথাবার্তা ছাড়া কিছুই হতো না।
একদিন মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায় আমার। উঠেই নিজের প্রয়োজনীয় জামাকাপড়
পরে দ্রুত বের হয়ে পড়ি।
অন্ধকারে ঠিক কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। তার উপরে কুয়াশা! বোঝার বাকি নেই,
আমাদের জাহাজ কোনো কারণে থেমে আছে। চারদিকে কারা যেন হাঁটাচলা করছে। কিছুটা ভয় ভয় চোখে সামনে এগিয়ে গেলাম। ডেকের ওপরে ডা. রোশিকে
দেখলাম। ক্যাপ্টেনকে দেখলাম খুবই উদ্দেশ্যহীনভাবে এদিক সেদিক পায়চারি করছেন। ঠিক তখনই নিচ থেকে এক ব্যক্তিকে তুলে আনা হলো। সে লোকটি ব্যথায় ককিয়ে উঠছে বারবার। হালকা সোডিয়াম লাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম
তার চোখ বেয়ে রক্ত বের হচ্ছে!
পরদিন সকালে আসল ঘটনা জানা গেল। একটি মালবাহী জাহাজের এই কর্মী
ইঞ্জিন ঠিক করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে চোখে আঘাত পান। ওই জাহাজে ডাক্তার না থাকায় তারা আন্তর্জাতিক সাহায্য চান। আমাদের জাহাজটা সৌভাগ্যক্রমে তাদের পাশেই ছিল। ধন্যবাদ আমাদের ক্যাপ্টেনকে, তিনি দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসা করালেন। অল্পের জন্য লোকটার চোখ বেঁচে যায়।
সঠিক সময়ে সাহায্য না পেলে বাজে কিছু ঘটে যেত নিশ্চিত। এমন দারুণ একটা উদ্ধার অভিযানের গল্প শুনে আমি দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়েছি। আমার মনে হতে লাগল, আমার কৌশল কাজে লাগানোর সময় এসে গেছে। পরবর্তী ভ্রমণের সময় যে পার্টির আয়োজন করা হলো, ওখানে যাত্রীদের মাঝে ডা. রোসিকে দাঁড় করিয়ে দিলাম। তারপর সবার উদ্দেশ্যে বললাম, ‘সম্মানিত যাত্রী সাধারণ। গত সপ্তাহে
এক দুর্ধর্ষ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ডা. রোসি একজন শ্রমিকের চোখ রক্ষা করেছেন। আমি আশা করছি তিনি আপনাদের পুরো গল্পটি নিজ মুখে বলবেন। কীভাবে তিনি চিকিৎসা করলেন।’
ডা. রোসি খুব খুশি হলেন। তিনি ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে তার ঘটনা বর্ণনা করতে লাগলেন। তার অনুপ্রেরণা বাড়তে লাগল এবং তিনি অত্যন্ত প্রফলচিত্তে পুরো ঘটনা তুলে ধরলেন। তারপর আমি ক্যাপ্টেনকে সবার কাছে পরিচিত করে দিলাম এবং তার সমস্ত উদ্ধার চিত্ত জানাতে আহ্বান জানালাম। তিনিও খুশি মনে নিজেদের সাহসী উদ্ধারকাজ বর্ণনা করলেন। শেষে আমি আরেকজন অফিসারকে ঘটনার ব্যাপারে জানাতে বললাম, যে ওই কর্মীকে উদ্বার করতে নিজেই গিয়েছিল। সবাই খুব সুন্দর করে তাদের নিজ নিজ মতো করে ঘটনার বর্ণনা দিলেন। এক সময় আমি অনুভব করলাম আমি নিজেই একজন লুকোনো হিরো হয়ে উঠলাম। উপস্থাপকের চরিত্রে উন্নীত হয়ে গেলাম।
সেইম ঘটনাগুলো পরবর্তী প্রত্যেক আলাদা আলাদা ভ্রমণে নতুন নতুন যাত্রীদের কাছে তুলে ধরা হলো। অবাক করা ব্যাপার হলো, আন্তে আন্তে ঘটনাগুলো আরো বিস্তারিতভাবে আলোচিত হতে থাকলো ডাক্তার, ক্যাপ্টেন এবং ওই অফিসার থেকে, একই গল্প বারেবারে বলা হলেও সবাই খুব আনন্দ পাচ্ছিল।
ওটা আবার চালাও, স্যাম
প্রশংসা কে না পেতে চায়? আবার অনেকে প্রশংসার সুরে কতই না অনুনয় বিনয় কিংবা অনুরোধও পায়! এই যেমন ‘প্লিজ, আরেকটা গান শুনতে চাই’, ‘প্লিজ, আরেকটা কবিতা আবৃত্তি করুন।’ কিংবা ‘প্লিজ আরেকটা গল্প বলুন।’ এই অনুরোধগুলো সচরাচর অনেক গুণধর মানুষ পেয়ে থাকেন। অর্থাৎ পুরোনো গানটা আবার শুনতে মানুষের কত উচ্ছ্বাস!
আবার ধরো তুমি তোমার বন্ধুকে বলছো, ‘জন, ওই যে তোমার চোর ধরার গল্পটা আবার বলো। ওই গল্পটা আমি যতবার শুনি ততবারই মুগ্ধ হই।’
নয়তো ‘জন, তুমি না একবার একটা বাচ্চা বিড়ালকে গাছ থেকে নামিয়েছিলে।
গল্পটা সবার উদ্দেশ্যে আবার বলবে কি?’
এরপর জন নামের সেই বন্ধুটি কতটা উচ্ছ্বাস নিয়ে সেই গল্পটা বলবে তা তার চোখ মুখ দেখেই তুমি আন্দাজ করতে পারবে। আরেকটা ব্যাপার দেখবে তার চোখে মুখে। আর তা হলো, তোমার প্রতি তার প্রচণ্ড আগ্রহ! এবং তার কাজেকর্মে তুমি প্রায়শই বুঝবে সে তোমাকে অত্যধিক পছন্দ করে।
কৌশল ২১
পুনরায় শুনতে চাই
কতই না মধুর অনুভূতি হয়, যখন কোনো ভিড় চিৎকার করে বলে, গল্পটা আবার শুনতে চাই। গানটা আবার চলুক। অথবা কবিতাটা আবার আবৃত্তি হোক, কি কবি?
তোমার বন্ধুটি যাকে তুমি মুগ্ধ করতে চাও, তার বলা এমন কোনো গল্প স্মরণ করো এবং তাকে গিয়ে বলো, ‘বন্ধু। তোমার ওই গল্পটা আরেকবার বলবে?’ দেখবে সে অত্যন্ত খুশি মনে তা বলে যাবে।
অথবা কোনো একটা ভিড়ে তোমার বন্ধুটিকে পরিচয় করিয়ে দাও, ‘জন, এখন আপনাদেরকে চোর ধরার মজার গল্পটা বলবে। আপনারা ভীষণ মজা পাবেন।’
জন যেমন সবাইকে গল্পটা বলতে গিয়ে খুশিতে ফেটে পড়বে তেমনই তার ভেতরটায় তোমার জন্য আলাদা একটা জায়গা করে নেবে।
পর্ব ২২
তোমার ভালো দিকগুলো উপস্থাপন করো
নিজের ভুলগুলো উপস্থাপন করে প্রিয় হতে চাও? জনপ্রিয় ব্যক্তিরা যখনই কারো প্রতি আকৃষ্ট হয়, তারা নিজেকে তার সামনে উপস্থাপন করতে পিছপা হয় না। নিজের কিছু দুর্বলতাও তাদের সামনে উপস্থাপন করে বুঝতে দেয়, ভয় পেও না। আমিও তোমার মতোই মানুষ। বড় বড় তারকারা এসব করলে মানুষ তাদের দিকে আরো ঝুঁকে পড়ে।
কথা উঠতে পারে, তুমি তো কোনো জনপ্রিয় ব্যক্তি কিংবা তারকা নও! তোমারও কি তাদের মতো নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা উচিত? উত্তরটা খুবই সোজা, না। তুমি কখনোই নিজের দুর্বলতা অন্যের সামনে প্রকাশ করে নিজেকে দুর্বল প্রমাণ করবে না। তোমার যতটা ভালো দিক আছে তা প্রকাশ করো। যখন নতুন বন্ধুর সাথে তোমার মধুরতা বাড়বে তখন তোমার দুর্বলতা জানাতে পারো, ক্ষতি নেই।
এই যেমন হুট করে বলে দিলে, ‘জানো, আমি রাত জাগতে পারি না। আমার ঘুমের খুব বাতিক আছে।’
কিংবা তোমার ছেলেবেলায় করা চুরির ঘটনাটা তাকে জানালে! অবশ্যই এসব বিষয় শুরুতে তোমাকে গোপন রাখতে হবে। সম্পর্ক মধুর হলে এসব এমনিতেই সামনে এসে যাবে। এক সময় এসব ব্যাপার দুজনই উপভোগ করবে।
কিন্তু তুমি যদি শুরুতেই তোমার সবটা অন্যদের সামনে তুলে ধরো, তারা এটাই ভাববে, ‘স্বল্প পরিচিত একজনকে এত গোপন কথা বলে দিল? এর পেটে তো দেখি কথা থাকবে না!’
কৌশল ২২
তোমার ভালো দিকগুলো উপস্থাপন করো
তোমার নতুন বন্ধুকে শুরুতেই তোমার ঘরের সমস্ত লুকানো জায়গা নিশ্চয়ই তুমি দেখাবে না। তেমনই তাকে তোমার গোপন দুর্বলতাগুলোও শুরুতেই জানানো ঠিক হবে না। তারচেয়ে তোমার ভালো দিকগুলো তাকে জানাও। তোমাদের সম্পর্ক মধুর হলে দেখবে নিজেদের দুর্বলতাগুলো এমনিতেই সামনে এসে যাবে।
পর্ব ২৩
সর্বশেষ সংবাদ… বাইরে বেরুনোর পূর্বে সর্বশেষ সংবাদে একবার চোখ বুলিয়ে দেখা উচিত
তোমার গুরুত্বপূর্ণ খুঁটি
কোনো একটা অনুষ্ঠানে যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে দেখতে পেলে, ভালো জামা কাপড় সব তোমার মা ধুয়ে দিয়েছে। তখন তোমার কেমন অনুভব হবে? চেঁচিয়ে বলতে চাইবে নিশ্চয়ই, ‘আমি ওই অনুষ্ঠানে যাব না। কী পরে যাব? ভালো কোনো কাপড়ই নেই!’
তোমার রাগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে এবং এটা যৌক্তিকও যে ভালো পোশাক তোমাকে অন্যদের সামনে উপস্থাপন করে তোলে।
চিন্তা করো তো, এমন কখনো হয়েছে যে তুমি নিজেকে নিজে বলছো, ‘আমি অনুষ্ঠানে গিয়ে মানুষের সাথে কীভাবে কথা বলব? আমি তো তা নিয়ে একেবারেই চিন্তাভাবনা করিনি। অন্তত কিছুটা অনুশীলন করা যেত, তাও আমি করিনি। এর চেয়ে না যাওয়াই ভালো।’
একটা অনুষ্ঠানে ভালো কাপড় পরে নিজেকে উপস্থাপনের জন্য মন এত অস্থির! অথচ ওখানে গিয়ে কীভাবে কথা বলবে, কার সাথে কথা বলবে এটা নিয়ে কোনো চিন্তাই নেই।
কেউই এমনটা ভেবেছি বলে মনে হয় না। ভুল না করলে এটাও ভাবা উচিত যে, বাহ্যিক সৌন্দর্য যতখানি তোমাকে অন্যদের চোখে সুন্দর দেখাবে ততখানি তোমার কথাবার্তা তোমাকে অন্যদের সামনে তুলে ধরবে। মানুষের ব্যক্তিত্ব তার বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে তার কথোপকথনের উপরে অত্যধিক নির্ভর করে। বোঝার বাকি নেই সুন্দর জামা কাপড়ের পাশাপাশি সুন্দর কথোপকথনের ‘বিষয়’ নির্ধারণ করে গেলে ওটা অনেক বেশি ফল বয়ে আনে। তোমার সুন্দর জুতোর সাথে তোমার শার্টের কালার কতটা মিলেছে তার চেয়ে বড় ব্যাপার তুমি কতটা নিজেকে উপস্থাপন করতে পেরেছো। আর নিজেকে কোনো একটা আড্ডায় জনপ্রিয় করতে তোমাকে একটা বিষয় খুবই কাজে দেবে, আর তা হলো ‘নিউজ’ বা সংবাদ। শেষ চব্বিশ ঘণ্টায় বিশ্বের নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া নানা সব বিষয় জানাটা এখন সেকেন্ডের ব্যাপার। চাইলেই যে কেউ দেশীয় রাজনীতি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক সবটাই জেনে নিতে পারে। বিশেষ করে কিছু আকর্ষণীয় সংবাদ জেনে যেতে পারলে ভালো। যেকোনো আড্ডায় যাওয়ার পূর্বে একবার সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনায় চোখ বুলিয়ে যাও। ওটা তোমাকে আলাদা জায়গা করে দেবে। তুমি বড় একটা ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়েছো, যেখানে কেউ তোমায় চিনে না। তোমার ভয় পাওয়ার বা ঘাবড়ে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। সুযোগ বুঝে সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে আলোচনায় যুক্ত হয়ে যাও। দেখো আড্ডা তোমার দিকে ঘুরে গেছে। ভিড়ের মাঝে এমন কয়েকজনকে অনায়াসে পেয়ে যাবে যারা ওই টপিকটা জানে।
একটা ম্যাগাজিনে আর্টিকেল লেখক হিসেবে চাকরির সুবাদে সিডনি বিডল ব্যারোসের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ হয়। ভদ্রমহিলা অনেক বড় ব্যবসায়ী। তার ব্যবসায়ের সাফল্যের কারণ জানতে আমি নিজেও অনেকটা উদগ্রীব ছিলাম। বিশেষত নারীদের সমাজে অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হয় নিজের নামকে ওপরে তুলতে। বিশ্বের সফল ব্যক্তিদের তালিকা দেখো, তখন দেখবে উঁচু পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে অনেক কম অংশগ্রহণ রয়েছে নারীদের।
মিসেস সিডনি বেশ আন্তরিকতা নিয়ে আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন। তার কোম্পানির দুর্দিনের গল্পও তিনি আমায় শোনালেন। তার কোম্পানির ৬০% কর্মী তাদের ক্লায়েন্টের সাথে ভালো সম্পর্ক রাখতে পারেনি। ক্লায়েন্টদের সাথে কথোপকথন মধুর না হওয়ায় ব্যবসায় খুব একটা উন্নতি চোখে পড়ত না। এই দুর্দিনে তার মাথায় একটা বুদ্ধি এলো। তিনি তার সমস্ত কর্মীকে জানালেন ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করার পূর্বে অবশ্যই দেশ-বিদেশের সাম্প্রতিক খবরাখবর জেনে তারপর যেতে হবে।
এর ফলাফল ছিল অবিস্মরণীয়! তার মতে, অল্প দিনের মধ্যেই ক্লায়েন্টদের থেকে ভালো ভালো রেসপন্স আসতে শুরু করল। অনেকেই তাকে এবং তার কর্মীদের ব্যাপারে শুভেচ্ছা জানাতে লাগল। ক্লায়েন্টরা তাদের সাথে কথা বলে অনেক খুশি হয়েছেন। কর্মীদের কীভাবে এমন ট্রেনিং দিয়েছেন তিনি, এমনটাও অনেকে জানতে চেয়েছে।
কৌশল ২৩
সর্বশেষ সংবাদ… বাইরে বেরুনোর পূর্বে সর্বশেষ সংবাদে একবার চোখ বুলিয়ে দেখা উচিত
কোনো একটা অনুষ্ঠানে যাবার পূর্বে তোমার সাজসজ্জা জরুরি বলেই তুমি নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবার দেখে নাও। পাশাপাশি আরেকটা কাজ খুবই গুরুত্ব রাখে। তা হলো শেষ চব্বিশ ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো টেলিভিশন কিংবা ইন্টারনেট থেকে জেনে নেওয়া। তুমি যেখানে যাচ্ছো ওখানে এমন অনেক ব্যক্তিরাও থাকবে যারা এসব বিষয় নিয়ে কথা বলবে। তুমি যদি এটাই না জানো তোমার আশপাশে কী ঘটছে বা কী ঘটতে যাচ্ছে তবে তুমি কীভাবে তাদের ভিড়ের ভেতরে ঢুকবে? তুমি কত ভালো জামা কাপড় পরেছো তা চিন্তা করে খুশি হয়ে বসে থাকলে কেউ এসে তোমার সাথে নিজ থেকে কথা বলবে না। তাই অবশ্যই ঘর থেকে বের হবার পূর্বে এমন কিছু খবর জেনে যাও যা নিয়ে তুমি আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবে।
