হাউ টু টক টু এ্যানিওয়ান – ৯
অধ্যায় ৯
সফলতার ছোট্ট ছোট্ট মণি-মুক্তো
পথের কাঁটা
ছোটোবেলায় প্রতি সপ্তাহে আম্মু আমাকে সিনেমা দেখাতে নিয়ে যেতেন। আজ এতদিন পরে একটা সিনেমার স্মৃতি আমার রাতের ঘুম নষ্ট করে দিল।
খিয়েটারের অদ্ধকারে বসে আমি দেখছিলাম, একটা বাঘ তিনটা বাচ্চা জন্ম দিল। ওদের মাঝে একটা শাবক ছিল শারীরিকভাবে পঙ্গু। পেছনের দুই পা জোড়া লাগানো। ওটাকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হয় শাবকটার। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম অন্য বাচ্চাপুলো ওকে একা করে চলে গেল। ক্যামেরায় সামনেই ওদের নিষ্ঠুরতা আমার কোমল হুদয়ে আঘাত হানল। পরের ব্যাপারটা খুবই নিষ্ঠুর, অমানবিক। অন্য শাবকগুলো ওই দুর্বল শাবকটাকে অত্যাচার করে মেরেই ফেলল!
আমি বসে বসে চিন্তা করতে থাকলাম, ওই সুহু শাবকগুলো ঠিক ফুল জীবনের সেই অন্ন কিছু বাচ্চাদের মতো। যারা অন্যদের দুর্বলতা নিয়ে নিষ্ঠুরতার নির্দর্শন রাখত।
হাইস্কুলে আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের নাম ছিল স্টেলা। স্টেলা দেখতে যেমন চমৎকার, ওর ভেতরটাও ছিল পবিত্র। সবারই কোণাও খুঁত থেকেই যায়। ও স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারত না। জড়তা এসে যেত। মনে হতা সে শুবই অন্নাড়াবিক। ওর গেছেন অনেকেই এটা নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করে বেড়াত, গুকে গেলায় নিশ্চা না।
বাচ্চারা এখনো পরিবর্তন হয়নি। যখন আমি কলেজে, তরুণদের মাঝে কথা বলি, আমাদের আলোচনা অনেক মজাদার বিষয় নিয়ে হতে থাকে। সনাই নিজেকে গছন্দের আসনে দাঁড় করাতে মরিয়া হয়ে গুঠে। কেউ কেউ আমাকে এসব নিয়েও গল্প শোনাতে থাকে, কিছু মেয়ের শারীরিক খুঁত থাকে, একজন চোখ দাঁকিয়ে জানায়। তারা বলে তার এই খুঁতের কারণে অন্য বাচ্চারা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করে।
একজন জানাল, একটা ছেলে খুঁড়িয়ে হাঁটে বলে তাকে বেসবল দলে নেওয়া হয়নি। অথচ সে খোঁড়া পায়েও খুব ভালো দৌড়াতে পারে, এমনকি সে অন্য একজন সক্ষম খেলোয়াড়ের সমতুল্য। তার কিছু ক্লাসমেট নিজেদের দলে পঙ্কু কাউকে চায় না।
সময়ের সাথে সাথে বাচ্চারা বড় হয়। তাদের আচার-আচরণ খুব বেশি পরিবর্তন হয় না। বড়রা অন্যদের শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে মজা করে না, নিষ্ঠুরতাও দেখায় না। অধিকন্ঠ তারা অন্যের সামাজিক অক্ষমতার ব্যাপারে কিন্তু অমানবিক হতে পারে। সামাজিক অক্ষমতা মানুষের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার যেটা আমাদের অনেকের মাঝেই দেখা যায়। নিজেদের দুর্বলতা সম্পর্কে আমাদের অজ্ঞতা রয়েছে, আমরা হ্বেব বধির নিজের এই মৌখিক অক্ষমতার উপর! অথচ অন্যদের অক্ষমতা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায় না। এক দেখায় ধরে ফেলি।
কতবার আমাদের পরিচিত কেউ নির্বোধের মতো উল্টাপাল্টা কাজ করে গেছে, উল্টাপাল্টা আচরণ করেছে, আমরা কি গুনে দেখেছি? তুমি নিজে কয়বার অন্য কারো নির্বোধের মতো কাজের ব্যাপারগুলো কোথাও লিখে রেখেছিলে? তোমার কি মনে হয়, ওই ব্যক্তি বুঝে গুনে নির্বোধের মতো কাজগুলো করছে? অবশ্যই সে না জেনে করছে। কেউ তাকে বলে দেয়নি সে সুস্থ স্বাভাবিক মানুষদের লাইন ক্রস করে নির্বোধের দলে চলে যাচ্ছে।
এই অংশে আমরা বলে দেবো সে কীভাবে বুদ্ধিমত্তার সাথে এমন সব পরিছিতিতে কাজ করবে। তাদের জন্য আমাদের এই শেষ অংশটা অতি জরুরি।
পর্ব ৭৮
দেখেও দেখো না, শুনেও শুনো না
ধুর!… উফস!… ধ্যাত!…
একটা অবিগ্রহীয় ঘটনার প্রতিক্রিয়া আমার চোখ খুলে দিয়েছে। একজন সফল ব্যক্তি এবং একজন নিচের লেভেলের ব্যক্তির মাঝে পার্থক্যটা ঠিক কোথায় বলতে পারবে।
বছর কতক আগে, আমি ক্লায়েন্টের একটা গ্রজেন্টের কাজ করছিলাম। আমার সৌভাগ্য ছিল যে, কোম্পানির বড় চারজন কর্মকর্তা আমাকে তাদের সাথে লাঞ্চ করার নিম্নলণ্ড জানাল। তারা আমাকে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর সাথে পরিচয় করাতে চাইল।
আমরা শহরের প্রাগকেন্দ্রে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়লাম। একেবারে দুপুরের সময়। চারদিকে কোম্পানির কর্মচারী, কর্মকর্তা এবং শ্রমিকরা ঠাসাঠাসি করে বসে আছে।
প্রতিটি টেবিল বিভিন্ন ক্যাটাগরির কর্পোরেট ব্যক্তিদের দ্বারা ভর্তি হয়ে আছে। উপরের এবং নিচের ম্যানেজমেন্ট লেভেলের লোকেরা কোট টাই এর সাথে শু পরে আছে। আর ওয়ার্কাররা শার্ট পরে আছে। পুরো কক্ষে গুঞ্জে ভরে গেছে। সবাই খাওয়া দাওয়া আর পানাহার এর পাশাপাশি হাসি তামাশা চলছে।
আমরা প্রবেশদ্বারের শুরুতে একটা টেবিলে বসে কোম্পানির নানাবিধ সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে লাগলাম। কোম্পানির চিফ ফাইন্যাসিয়াল অফিসার, জনাব উইলসন কোম্পানির আর্থিক খাতের দৃশ্যমান সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলছিল, কিন্তু হঠাৎ ঝনঝন করে কিছু একটা পড়ার শব্দ ভেসে এল। আমার পাঁচ-ছয় ফিট সামনে ওয়েটারের হাত পেকে একটা ট্রে হাত ফসকে পড়ে গেল। ট্রেতে সাজানো নানাবিধ খাবার সমেত ভিসগুলো টাইলসের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রইল। কাচের গ্লাসগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। একটা পাউরুটির টুকরো ঠিক আমাদের টেবিলের নিচে এসে পড়েছে। একেবারে উইলসনের পায়ের নিচে।
সবাই ওয়েটারের দিকে ঘুরে তাকাল। আমরা কিছু উচ্চবাচ্য শুনতে পেলাম। কেউ কেউ ‘উফ’ বলে টেচিয়ে উঠেছে। কয়েকজন ওয়েটারকে বিদ্রুপ করে হাসতে থাকল। একজন মশকরা করে বলল, ‘নেচারা! ওর বোধহয় এটাই শেষ লাঞ্চ এই হোটেলের।’
আরেকজন বলল, ‘দেখো, গাধাটা কী করেছে!’
উইলসন নিজের কথা থেকে একচুলও বিচ্যুত হলো না। সে আগের মতোই স্বাভাবিকভাবে সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে থাকল। আমার টেবিলের বড় কর্মকর্তাদের কেউই ঘুরেও ওদিকে তাকাল না। এমনকি চোখের পলকও ফেলল না। সবার চোখ মুখ দেখে মনে হলো কিছুই হয়নি। রেস্টুরেন্ট আবার আগের মতো নীরব হয়ে গেল। শুধু গুণ্ণের শব্দ ছাড়া আর কিছুই নেই।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে কোম্পানির মার্কেটিং ডিরেক্টর মিসেস ডাগ্সন, কোম্পানির পরিধি বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এমন সময়, তিনি হাত নাড়াতে গিয়ে কফির মগটা ফেলে দিলেন। আমি মাত্র বলতে যাচ্ছিলাম, ‘ওহ, মিসেস, ডাওসন…’
পরে অবশ্য, নিজেকে সংবরণ করে চুপ রইলাম। আমি রুমাল বের করে দিতে যাব, এর আগে তিনি নিজের রুমাল বের করে টেবিলটা একটু শুকিয়ে নিলেন। এত কিছুর মাঝেও তিনি কথা বলে গেলেন। একটা শব্দও মিস যায়নি!
সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার ছিল, টেবিলের কেউই উপড়ে পড়ে থাকা মগটার দিকে ফিরেও তাকায়নি!
এই কাহিনি আমার ভেতরে এটাই বোধোদয় ঘটাল, বড় ব্যক্তিরা নিজের সহকর্মীদের ভুলগুলো মাফ করে দেন। এমন কী, ‘উফ!’ শব্দটিও মুখ থেকে বের করেন না। তারা সহকর্মীর ছোটোখাটো ভুল দেখেও দেখেন না, শুনেও শুনেন না।
আমার শোকে অন্তত নীরবতা পালন করো
আমার একটা বন্ধু আছে, আমি যখনই হাঁচি দেই, সে বলে উঠে, ‘ওহ, তোমার কি ঠান্ডা লেগেছে?’
আমি যতবারই হোঁচট খাই, সে বলে, ‘সাবধানে লেইল!’
সে আমাকে যখনই অফিস টাইমের পরে দেখে, বলে, ‘তুমি কি ক্লান্ত?’
এই ছোটোখাটো লক্ষণ তাকে আমার কাছে একজন ব্লাফার বা বাজে বকতে থাকা ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত করিয়েছে। যারা গভীরভাবে ভাবতে পারে না, তারা ভাববে, ‘আরেহ, সে আমাকে নিয়ে কত্ত চিন্তা করে!’
কিন্তু এসবের পর সঙ্গীর নীরবতা তোমাকে অত্যধিক প্রশান্তি দেবে।
মনে করো, তোমার বন্ধুর সাথে কোথাও খেতে গেছ, সে খেতে বসে একটা ভুল করেছে, সিম্পলি ওটাকে না দেখার ভান করো। কেউ হাঁচি দিচ্ছে, ক্লান্ত, কিংবা হ্যাফাচ্ছে, তুমি না দেখার ভান করে এড়িয়ে গেলে সবটাই স্বাভাবিক।
‘উক’, ‘ধুর’, ‘আরেহ’ এমন শব্দগুলো স্বাভাবিক হলেও কেউই তার শারীরিক দুর্বলতা অন্যের দ্বারা প্রকাশিত দেখতে চায় না।
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ তুমি বলতে পারো, ‘সবটাই মেনে নিলাম। এটা না হয় ছোটোখাটো ভুল, ছোটো ব্যাপার বলে এড়িয়ে গেলাম। এমন বড়ো কোনো বিষয়তো আসতে পারে, যেটা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। যতই না দেখি, ওটা চোখে পড়বেই। তখন কী করব?’
তোমাদের জন্য মিসেস ডাওসনের সেই উদাহরণটাই প্রযোজ্য। এক হাতে রুমাল দিয়ে টেবিলের পানি মুছলেও নিজের আসল কাজ থেকে দূরে যাওয়া যাবে না। যেই কাজটায় ছিলে ওটা যেন মিস না যায়।
কৌশল ৭৮
দেখেও দেখো না, শুনেও শুনো না
ভালো কমিউনিকেটর তাদের বন্ধু, সহযোগী, আগষ্টুক এবং প্রিয় ব্যক্তিদের ছোটোখাটো ভুল, ভ্রান্তি, এলোমেলো কথাবার্তা ইত্যাদি বিষয়গুলোকে দেখেও না দেখার ভান করেন।
মানবীয় দোষ ক্রটি, ভঙ্গুরতা নিয়ে নিয়ে নশ্বর এই দুনিয়ায় সবাই অতিথি। বড় মানুষরা অন্যের ক্রটি গোপন করে আসল কাজে ব্যন্ত থাকেন।
পর্ব ৭৯
ভরসার কণ্ঠস্বর হও
দয়া করে গল্পটা আবার শুরু করুন
পৌরাণিক জাপানে যদি তুমি কারো জীবন বাঁচাও, এটা তাদের নিজ থেকে অর্পিত দায়িত্ব বনে যায় যে, সে আজীবন তোমার খেদমত করে যাবে।
বর্তমানে যদি তুমি কারো গল্প বলার ফ্লোটাকে রক্ষা করো, তবে সেই পৌরাণিক যুগের মানুষের কৃতজ্ঞতা গল্পকারের (বক্তার) ভেতরে ফুটে উঠবে। তার ভেতর থেকে অনুভূতির সৃষ্টি হয়, এই ব্যক্তি যেহেতু আমার উপকার করেছে আমিও তার উপকার করব।
এই ব্যাপারটা হরহামেশাই ঘটে, আমাদের কেউ একজন গল্প করছে, ঠিক গল্পের মজাদার অংশটা বলার আগ মুহূর্তে তাকে থেমে যেতে হলো! এমন কিছু একটা ঘটে গেছে যার দরুণ সবার দৃষ্টি অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়ল। ধরো, কেউ একজন এসে উপছিত হলো, কেউ একজন রাশি রাশি খাবার নিয়ে হাজির হলো তোমাদের সামনে, অথবা একটা বাচ্চা ওয়া ওয়া করে চেঁচিয়ে উঠল! এই সাময়িক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে কারো মাঝেই কোনো উৎকষ্ঠা নেই, একজন ছাড়া। তিনি হলেন সেই বক্তা, যিনি খুব শুরুত্বপূর্ণ পার্ট নিয়ে কথা বলতে গিয়েও থেমে গেছেন।
এরপর সবাই অন্য কোনো বিষয়ে মশগুল হয়ে গেল। থেমে যাওয়া বক্তার পয়েন্টটা সবাই ভুলেই গেছে!
অধবা তোমরা সবাই বসার ঘরে বসে আছ। একজন খুন মজার কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে। তখনটা পাশের রুমে ছোট্ট জনি কিছু একটা ফেলে দিল, অধনা ধরো বাসার একমাত্র টেলিফোনটা ক্রিং ক্রিং বেজে উঠল। সব শেষে ফের যগন আলোচনা শুরু হলো, সবাই ছোট্ট জনির এমন কাও-কারখানা নিয়ে কথা নলতে থাকল। ফোনকলের শেষে, ফোনকলকারী ব্যক্তিকে নিয়ে জম্মেশ কথা উঠল, সে কেন বিয়ে করছে না, এটা নিয়েও হুলফুল মজা হতে থাকল। কেউই মনে রাখল না খুব মজার একটা টপিক নিয়ে সবাই আলোচনা করছিল। সবাই ভুলে গেলেও একজন কিছুইতেই বিষয়টা ভুলতে পারেনি, আমি গল্পকারের কথা বলছিলাম। বেচারা!
অধিকাংশ গল্পকার (বক্তা) খুবই অধৈর্য হয়ে ওঠেন নিজের গল্পের বাকি অংশটা উপহাপন করতে। কেউ কেউ টেনে অংশটা এভাবে শুরু করে, ‘হ্যা, আমি যেটা বলছিলাম…’
কিন্তু অনেক গল্পকারই আর সেটা শুরু করতে পারেন না। সারাটা দিন ওটাই কেমন যেন মাথার ভেতরে চিপকে থাকে, ইশ গল্পটা শেষ করতে পারলাম না। সেই মুহূর্তে তুমি যদি ওখানে থাকো, গল্পকারকে সাহায্য করতে পার, তার গল্প বলাটা শুরু করতে। তাইতো এই টেকনিকের নাম দিয়েছি ‘ভরসার কণ্ঠস্বর হও।’ কীভাবে তাকে সাহায্য করবে, তাই তো ভাবছ?
এভাবে বলতে পারো, ‘আপনি যেন কী বলছিলেন?’
দেখতে পাবে সবাই আবার গল্পকারের দিকে ফিরে তাকিয়েছে।
গল্পকারের চোখে তোমার জন্য কৃতজ্ঞতার ফুটে উঠেছে। ঠিক যেখানটায় সে আটকে গেছিল, সেখান থেকে বলার সুযোগটা লুফে নিচ্ছে। আবার সবার আকর্ষণের কেন্দ্রে চলে এসেছে গল্পকার। অন্য সবাইও তোমার প্রতি খুশি থাকবে, তোমার কারণেই আবার পরিছিতি আগের মতো হয়ে গেছে।
যার গল্পটা পুনরায় শুরু হয়েছে, এমনটা হতেই পারে সে ভবিষ্যতে তোমায় কোনো কাজে সাহায্য করতে পারেন, তোমার সাথে ভালো বন্ধুত্ব দেখাতে পারেন এমনকি তোমার কোনো পণ্য থাকলে কিনেও নিতে পারেন।
কৌশল ৭৯
ভরসার কণ্ঠস্বর হও
যখনই কারো গল্পের মধ্যখানে থামতে হয়, ওই বাধাটাকে তুমিই সরিয়ে দাও। তাকে পুনরায় বলার সুযোগ করে দাও। ‘আপনি যেন কী বলছিলেন?’
আর যদি তার গল্পটা মনে থাকে, শুটা উল্লেখ করেই বলো, ‘এই ঘটনার পর কী হয়েছিল?’
পর্ব ৮০
তাকে জানিয়ে দাও ‘ওখানে তার জন্য কী আছে?’
দেখো, এখানে আমার জন্য কী আছে, আর এই দেখো, এখানে তোমার জন্য কী আছে
জ্ঞানী বিজনেসম্যানরা এটা জানেন, সবকিছু ঘুরে ফিরে এক প্রশ্নে গিয়ে থানে, ‘এখানে আমার জন্য কী আছে?’
যখনই কেউ কিছু বলে, তাদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া এটাই দেখা যায়, ‘এখানে আমার জন্য কী আছে?’
সাধারণ বিক্রয়কর্মীরা টেকনিকটা কট্টরভাবে সমর্থন করেন। এজন্য তারা সবার আগে ক্রেতার সুযোগ সুবিধাগুলো বিশেষভাবে ফুটিয়ে তোলেন যাতে করে ক্রেতা বুঝতে পারে, ‘এখানে তাদের জন্য কী রয়েছে।’
তবে ব্যতিক্রম দেখা যায় বড় বিক্রয় কর্মীদের ক্ষেত্রে। তারা শুধুমাত্র ক্রেতার সুযোগ সুবিধা নিয়েই আলোচনা করে না, বরং এই প্রোডাক্ট কিনলে তাদের নিজেদের কী কী লাভ হবে, তাও তুলে ধরেন।
আমি একবার একটা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ পেলাম। প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং হেড জনাব স্যাম এর সাথে শলা পরামর্শ করার অগ্রহ আমার মাঝে জন্ম নিল। ভাবলাম নিজের বিজনেস নিয়ে জনাব স্যামের সান্নিধ্য পাওয়ার এটাই সুযোগ। আমি আমার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাকে জানালাম, এবং মজার ছলে জিজ্ঞেস করলাম, তার সময় হবে কি না আমার সাথে বসে ডিনার করার, ঠিক অন্য কোনো দিন?
আমার নিমন্ত্রণের পেছনের লুকায়িত সত্য এটাই যে, ‘স্যাম আমার তোমার সাথে দরকারি কিছু কথা হবে। পুরোটাই আমার লাভ। শুধুমাত্র যেটা খেতে পাবে ওটা তোমার লাভ।’
আমাদের পরবর্তী সাক্ষাৎ আরো মধুর করতে আমি বললাম, ‘স্যাম, টাইম এবং রেস্টরেন্ট তুমি চুজ করো। আমি যথা সময়ে উপছিত হয়ে যাব।’
স্যামের পছন্দ করা দিনে আমি উপছিত হলাম। রেস্টরেন্টটা ঠিক টাউনের মধ্যখানে অবছিত। আমার পাক্কা পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেগেছে পৌঁছাতে। রেস্টরেন্টে ঢুকে আমি তন্দা খেয়ে গেলাম! আশপাশের সবগুলো টেবিল মানুষে ভর্তি! সবার
মধ্যখানে স্যাম বসে আছে, সে আমায় দেখে একটা সুন্দর হাসি উপহার দিল।
অবশ্যই, এটা এমন একটা পরিবেশ যেখানে আমি স্যামের সাথে শলা পরামর্শ করতে পারি না! চারদিকে এত এত মানুষ আর শব্দের মাঝে নিজেদের প্রাইভেসি থাকবে না। যতটা এগিয়ে গেছি, পেছনে যাওয়ার সুযোগ নেই। স্যামও আমায় দেখে ফেলেছে। মনে হচ্ছে ফেঁসেই গেছি।
মধ্যাহ্নভোজের আগ পর্যন্ত আমি বুঝে উঠতে পারিনি আশপাশে এতস্তলা মানুষ কেন? এটা ছিল স্যামের একটা চতুরতা। সে তার প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের এখানে উপছিত করেছে তাদের প্রত্যেকের কাজ সম্পর্কে উপস্থাপন করার জন্য। এর ফাঁকে আমার কাছ থেকে যদি কোনো পরামর্শ পাওয়া যায়!
স্যাম আমায় ফোনে সরাসরি বললেই পারত, ‘লেইল, রেস্টুরেন্টে আমাদের কোম্পানির কিছু কর্মীও থাকবে। আমি এর মাঝে আমাদের মিটিং আয়োজন করতে চাচ্ছিলাম। আমি তোমার বিজনেস রিলেটেড প্রশ্নগুলোর জবাব ওখানেই দেবো। তোমার কি আপত্তি আছে আমাদের সাথে জয়েন করতে? নাকি আমি অন্য কোনোদিন ঠিক করে নেব, যেখানে আরো বেশি প্রাইভেসি থাকবে?’
এভাবে বললে, আমি স্বাভাবিকভাবেই ওখানে যেতে রাজি হতাম এবং স্যামের গ্রুপের জন্য আমার ফ্রি বক্তব্য দিয়ে আসতাম। বদলে আমরা কেউই প্রকাশ করিনি, ‘এখানে আমার জন্য কী আছে?’ ফলত আমাদের দুজনেরই ক্ষতি হলো। আমার পুরো অর্ধদিবস নষ্ট হলো, আর তার ধূর্ততার খাতিরে সে তার গ্রুপের জন্য আমার ফ্রি বক্তব্যটা মিস করল।
তথ্য গোপন করে সুযোগটা হাতছাড়া করো না
সফল ব্যক্তিরা অন্যের কাছে তথ্য গোপন করেন না। অন্যের কাছ থেকে কোনো সুবিধা আদায় করে নিতে অবশ্যই সবটা তার সামনে উপস্থাপন করেন। অনেক মানুষ আছেন, যারা অন্যের কাছ কোনো সুবিধা নিতে গেলে নিজের লাভ তাদের কাছে তুলে ধরতে লজ্জা পান। অথবা ওই কাজটা তার জন্য কতটা দরকারি তা না বলেই কাজটা বুঝে নিতে চান। আমার এক বন্ধু স্টিফেন একবার আমার কাছে জানাতে চাইল, আমার পরিচিত কোনো গানের দল রয়েছে কি না? আমি সহজ স্বাভাবিক জবাব দিলাম, ‘না, নেই।’ কিন্তু সে ওটা ওখানেই শেষ না করে আবার বলল, ‘লেইল, আমার জানা মতে তুমি জায়েজে একটা গানের দলের সাথে কাজ করেছিলে?’ আমি তাকে বললাম, ‘হ্যা, করেছিলাম। কিন্তু সেটাতো অনেকদিন আগের কথা। দীর্ঘদিন আমি ওদের সাথে যোগাযোগ রাখিনি। ওদের কোনো থৌজ আমার কাছে নেই।’
আমার ধারণা ছিল স্টিফেন আর কথা বাড়াবে না। কিছু সে নাচোড়বান্দার মতো লেগেই রইল। ওর কর্মকাণ্ডে আমার বিরক্তি এসে গেল।
অবশেষে আমি সোজাসান্টা জানতে চাইলাম, ‘গানের দল খোঁজার এই কাজে তোমার বস কে? কাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে?’
সে মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘দায়িত্ব আমাকে দেওয়া হয়েছে। আমিই ইনচার্জ এই কাজের।’
‘স্টিফেন, তুমি ব্যাপারটা আগে কেন বলোনি দায়িত্বটা তোমাকে দেওয়া হয়েছে? আমাকে কিছুটা সময় দাও। দেখি আমি কোনো গানের দল খুঁজে পাই কি না।’
আমি আমার বঙ্গুর উপকার করতে পেরে খুশি ছিলাম। অন্তত আমার কারণে যদি তার একটু উপকার হয়! অন্যদিকে স্টিফেন আমার কাছ থেকে তথ্য গোপন করে সাহায্য পাওয়ার পথটাই খোয়াচ্ছিল! এই কাজটা তার জন্য কতটা দরকারি, আমায় জানালেই হতো। অথচ সে খুবই নরমালভাবে একটা গানের দল খুঁজছিল!
যখন কারো কাছে কোনো সাহায্য আশা করবে, তাকে অবশ্যই এটা জানাবে, এই কাজটা তোমার জন্য কতটা গুরুত্ব রাখে। তোমার গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে অবশ্যই সে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
কৌশল ৮০
তাকে জানিয়ে দাও ‘ওখানে তার জন্য কী আছে?’
যখনই তুমি কারো কাছে একটা মিটিং আয়োজনের অনুমতি চাইবে, অথবা অন্য কোনো সাহায্য চাইবে, তাকে সবটা খুলে বলো। এই কাজটা হলে তোমার কতটুকু লাভ হবে তাও তুলে ধরো। ওখানে সে কী লাভ পাবে, এটা বলতে ভুলো না।
তথ্য গোপন করে কারো থেকে কোনো সুবিধা নিতে গেলে একটা অসুবিধা এসেই যাবে, যেকোনোভাবে তোমার উদ্দেশ্য ফাঁস হয়ে গেলে সে তোমায় একটা চতুর শেয়াল ছাড়া আর কিছুই ভাববে না। সুতরাং সবটাই খুলে বলো, তোমার সাহায্য পাওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে।
পর্ব ৮১
তাদেরকে কাজটা করার জন্য উপযুক্ত সময় দাও
ফলাফল জানার জন্য অক্টুত একদিন ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করা বাঙ্গুনীয় মিসেস সুসান ইভাস আমার সেবাগ্রহীতাদের মাঝে অন্যতম, গিনি একটা বড় রিয়েল এস্টেট ফার্মের কর্বধার। একদা তার অফিসে বসে ছিলাম, তার আসন্ন একটা প্রজেক্ট নিয়ে আলোচনা চলছিল, হঠাৎ তার সেক্রেটারি এসে উপছিত। আমরা দুজনই তার দিকে ফিরে তাকালাম। সেক্রেটারি গুনগুন করে বলল, ‘অসময়ে আসার জন্য দুঃখিত মিসেস ইভাস। আপনার শ্যালক হ্যারি ফোন কলে অপেক্ষা করছে, আপনার কি সময় হবে? নাকি মানা করে দেবো?’ ‘অবশ্যই সময় হবে।’ তিনি হেসে উঠলেন, ‘ফোনটা আমায় দাও।’ মিসেস ইভাস আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিলেন আকশ্মিক অসুবিধার জন্য। তিনি ফোনে কথা বলা শুরু করতেই আমি রুম থেকে বেরিয়ে তাকে তার গোপনীয়তা রক্ষার সুযোগ করে দিলাম। কিছুক্ষণ পর যখন কক্ষে প্রবেশ করেছি, মিসেস ইভাস তখন ফোন রেখে দেবার মুহূর্তে আছেন, ফোন রাখার পূর্বে বললেন, ‘হ্যা, অবশ্যই। ওকে বলবে আমাকে কল করতে। হ্যা, ঠিক আছে, রাখছি।’ তিনি আমাকে জানালেন, ‘ফোনকলটা আমার শ্যালকের কাছ থেকে এসেছে। ওর এক চাচাতো ভাই একটা গ্যাস কোম্পানিতে চাকরি করছে। কিন্তু তার নাকি গ্যাস কোম্পানিতে ভালো লাগছে না। ওর আগ্রহ রিয়েল এস্টেট সেক্টরে ক্যারিয়ার গড়ার।’ তিনি একটু চুপ থেকে আবার বললেন, ‘ওর চাচাতো ভাইকে বলেছি কল করতে, দেখি ওকে কোনো সুযোগ করে দিতে পারি কি না।’ এটা বোঝা যাচ্ছে যে তিনি নিজের শ্যালককে উপকার করতে পেরে কিছুটা খুশি আছেন। আমরা পুনরায় আমাদের আলোচনা শুরু করলাম, যেখানটায় শেষ হয়েছিল। তিন থেকে চার মিনিট বাদে সেক্রেটারি আবার এসে হাজির। মিনমিন করে বলল, ‘সনি লাকার বলে কেউ একজন ফোনকল লাইনে আছেন, সে বলছে সে আপনার শ্যালকের চাচাতো ভাই। আপনি সম্ভবত তাকে কল করতে বলেছেন।’ ভদ্রমহিলা আবার উঠে গেলেন। তার মুখের বিরক্তি দেখে মনে হলো, তিনি মনেমনে এটাই ভাবছেন, ‘আমার অতি উদ্বিগ্ন শ্যালকের আর তর সইল না, সে সবকিছু এখনই করে ফেলতে চাইছে!’ আমরা দুজনই বুঝে গেছি কী হচ্ছে এখানে। মিসেস ইভাসের শ্যালক হ্যারি, তার কাজিন সনিকে সাথে সাথে এমন হট একটা নিউজ দেওয়ার তর তার সইল না। যেন এই নিউজটা এখনই তার চাচাতো ভাইকে না জানালে তার জীবন অধ্যকারে নিমজ্জিত হয়ে যাবে!
সত্য অথবা মিথ্যা যাই হোক, একটা সত্য এখানে স্পষ্ট যে, ছোট্ট চাচাতো ভাই সনি খুবই অপরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছে। বড় বড় ব্যক্তিরা সব সময় এই কথাটা যেনে চলেন, ‘ছুট করে কোণাও নিজেকে সংযুক্ত করা উচিত নয়, যেখানে একজন অলরেডি তোমায় সাহায্য করার জন্য চেষ্টা করছে।’
সাহায্য করতে চাওয়া ব্যক্তিকে সময় দেওয়া উচিত কাজটা সুন্দরভাবে করে দেওয়ার জন্য, অন্তত তাকে কাজটা শুরু করা পর্যন্ত সময় দেওয়া অনিবার্য।
তার শ্যালক এবং শ্যালকের চাচতো ভাই সনি, উভয়ই মিসেস ইভাসের চোখে অপরিপক্ব প্রমাণিত হলো। সময় জ্ঞানহীন এমন কর্মচারী অন্তত একটা কোম্পানির কর্ণধার নিজের কোম্পানিতে চাইবেন না।
হ্যারির উচিত ছিল, অন্তত একদিন অপেক্ষা করে তারপর নিউজটা তার ছোট্ট চাচাতো ভাই সনিকে জানানোর। একজন বড় রিয়েল এস্টেটের কর্ণধারের অনেক ধরনের কাজ থাকতে পারে। সনির অন্তত তার চাচাতো ভাইকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল, ‘ভাইয়া কখন আমি মিসেস ইভাসের সাথে কথা বলতে পারি? অথবা তার কোন ফ্রি স্টটটিতে আমি ফোন দিতে পারি?’
অনেক সময় দ্রুত যোগাযোগ ভালো ফলাফল এনে দেয়। কিন্তু এমন কাউকে এত দ্রুত ফোন দেওয়া উচিত নয়, যিনি তোমার একটা উপকার করে দিতে অগ্রহী।
এই পুরো ব্যাপারটা দেখে আমি অন্তত এটা হলফ করে বলে দিতে পারি, সনির চাকরিটা হচ্ছে না। এত বড় একজন মানুষ, অন্তত সনির মতো সময়জ্ঞানহীন কাউকে চাকরি দেবেন না। তাঁর রিয়েল এস্টেটের কত বড় বড় ক্লায়েন্ট রয়েছে, তাদের কারো সাথেও সে এমনটা ঘটাতে পারে। আর এতে কোনো ক্লায়েন্ট হাত কুসকে গেলে পুরোটাই মিসেস ইভাসের লস।
কৌশল ৮১
তাদেরকে কাজটা করার জন্য উপযুক্ত সময় দাও
যখন কেউ তোমার কোনো উপকার করতে রাজি হয়, তাকে অন্তত ততটুকু সময় তোমার দেওয়া উচিত, যতটুকু সময় পেলে তিনি নিজ থেকে কাজটা সম্পন্ন করে তোমায় জানাতে পারেন। আর খুব বেশি জরুরি হলে তোমার উচিত সময়-জ্ঞান খরচ করে তার সাথে যোগাযোগ করা।
কতটুকু সময় তাকে দেওয়া উচিত?
অন্তত চন্দ্রিশ ঘণ্টা তো দেওয়াই লাগে।
পর্ব ৮২
ইট ছুড়লে পাটকেল খেতে হয়
আমি কাজটা বন্ধুত্বের খাতিরে করেছি
একদা আমার ভালো জানাশোনা এক বন্ধু তানিয়া, যে লস এগ্রেলসে একটা স্বনামধন্য কোম্পানিতে কাজ করে, তার স্মরণাপন্ন হতে হলো। আমার তৎকালীন প্রজেক্টের জন্য একজন সেলিব্রেটি ব্যক্তিত্বের খুবই প্রয়োজন ছিল। তানিয়ার নামটাই সবার আগে মনে এল। ওর সাথে অনেক তারকা ব্যক্তিত্বের যোগাযোগ রয়েছে। মনে হলো ও চাইলে আমায় সাহায্য করতে পারে।
তানিয়া অল্ল কিছুক্ষণের ভেতরেই আমার সামনে কয়েকজনের নাম সাজেশন দিল। ওদের যে কাউকেই সে ম্যানেজ করে দিতে পারবে। নামগুলো দেখে আমিও খুশি হলাম। আমার প্রজেক্টটা এগিয়ে নিতে আর কোনো বাধা রইল না। ভেতর থেকে আমি খুবই খুশি ছিলাম তার উপর। তার জন্য কৃতজ্ঞতাবোধ জেগে উঠল।
তানিয়াকে ফোন করে অনেকগুলো থ্যাংকস দিলাম। তারপর বললাম, ‘তোমার উপকার আমি মনে রাখব তানিয়া।’
তানিয়া জবাবে বলল, ‘ধন্যবাদ। অন্য কোনো সময় আমার কোনো সাহায্য দরকার হলে করে দিও, তাতেই চলবে।’
‘অবশ্যই। আমি করব।’ আমি জবাবে বললাম।
কোনটা রেখে বিছানায় বসে পড়লাম। ভেতরটা রাগে ফেটে যাচ্ছে! তানিয়া স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, এই সাহায্যটা ফ্রেন্ড হিসেবে সাহায্য নয়। এই সাহায্যের বিপরীতে সেও যেকোনোভাবে সাহায্য রিটার্ন চায়।
এর দুই দিন পরই তানিয়া জানাল, সে দুই তিন মাসের ভেতরে নিউইয়র্ক আসছে।
তখন কি আমি তার থাকার ব্যবস্থা করে দিতে পারি কি না?
আমি স্বাভাবিকভাবেই করতাম। কিন্তু এমন বাজেভাবে এবং এত দ্রুত কেউ কারো কাজের ‘বিনিময়’ চায়, সেটা তানিয়াকে না দেখলে জানা হতো না। অর্থাৎ আমাকে বিনিময় দেওয়ার জন্য তার থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। যখন কেউ তোমার উপকার করবে, তোমার উচিত উপকারের কথাটা হাতির মতো স্মৃতিতে জমা করে রেখে দেওয়া। সচেতনভাবেই তুমি চাইবে যে তার কোনো উপকার যেন তোমার দ্বারা অদূর ভবিষ্যতে হয়। এমনকি তুমি যদি বিনিময়ে তার থেকে কোনো সুবিধা নিতে চাও, তাও তাকে মুখ ফুটে বলা উচিত নয় যে, তুমি বিনিময় চাচ্ছ।
তানিয়া যদি বছর খানেক বাদেও কল দিয়ে সাহায্য চাইত, আমি অবশ্যই মনে রাখতাম, যে সে আমার অনেক বড় উপকার করেছে। তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ।
অপর দিক থেকে দেখলে আমি খুশিই ছিলাম। কারণ তানিয়াকে এত দ্রুত তার ‘বিনিময়’ দিয়ে দিতে পারছি বলে। সে বিনিময় না চেয়ে এমনিতে বললেই ব্যাপারটা সুন্দর হতো। পুরো বিনিময়ের বিবরণটা পেছনে ঢেকে থাকত।
যখন কেউ তোমাদের উপকার করবে, তাদের প্রতি তোমাদের ভেতরটায় এমনিতেই কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠবে। সপ্তাহের মধ্যেই তার কাছ থেকে কোনো সুবিধা চেয়ে নিতে যেও না। পৌরাণিক কাহিনির মতো তাদের অনুভব করার সুযোগ করে দাও যে, তুমি তাকে সাহায্য করেছ কোনো বিনিময়ের আশায় নয়। বরং তুমি সাহায্য করেছ তোমার এক বন্ধুকে। যখন তারা এটা অনুভব করবে যে, তুমি বিনিময় চাপনি, তাদের ভেতরটা তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে যাবে। ভবিষ্যতে তার থেকে যেকোনো সাহায্য তুমি সবার আগে পেরে যাবে।
কৌশল ৮২
ইট ছুড়লে পাটকেন্দ্র খেতে হয়
মানুষ যখন কাউকে সাহায্য করে, এটা সত্য যে সাহায্য নেওয়া ব্যক্তি তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। তারাও চেষ্টা করে, কোনোভাবে তোমার উপকার শোধ করার। তুমি কারো উপকার করেছ? তাহলে কিছুদিন অস্ত্রত অপেক্ষা করো, সাথে সাথে তার থেকে কোনো সাহায্য আশা করো না। তাদেরকে এটা উপলব্দ্ধি করাও যে তুমি বন্ধুত্বের খাতিরে করেছ সবটা। ‘নেওয়া = নেওয়া’ সূত্রটা সবখানে খাটাতে যেও না।
পর্ব ৮৩
পার্টি খোশগল্পের জন্য
প্রথম নিরাপদ হ্রান (মোট ৩টি নিরপদ হ্রান রয়েছে)
প্রাচীনকালে পুলিশ যখন চোরেদের পিছু নিত, চোরেরা দ্রুত আশপাশে মন্দিরে ঢুকে পড়ত। আর একবার মন্দিরের বেদি পর্যন্ত পৌছে গেলে পুলিশের আর সাধ্য ছিল না ওদের গ্রেফতার করার। কারণ কথিত আছে, বেদি থেকে কাউকে গ্রেফতার করার ইখতিয়ার নেই। পুলিশের হাতে একটাই পখ বাকি থাকত, আর তা হলো, চোরেদের বের হবার অপেক্ষা করা।
যখন নেকড়ের দল বুনো খরগোশকে তাড়া করে, খরগোশ এক ছুটে কোনো একটা গর্তে লুকিয়ে পড়ে। খরগোশ জানে, নেকড়েরা গর্ত সমেত ওকে গিলে খেতে পারবে না। সুতরাং যতক্ষণ সে ভেতরে আছে, নিরাপদেই আছে।
তেমনিভাবে মানব সমাজে এমন কিছু নিরাপদ আশ্রয় সনারই রয়েছে, যেখানে সবাই নিজেকে নিয়াপদ মনে করেন। যদিও এটা সচরাচর কেউ মুখ কুটে বলে না, তবুও এটাই সত্য যে, এসব আশ্রয় ঠিক প্রাচীন সময়ের মন্দিরের বেদির মতোই নিরাপদ। কিছু সময় এবং স্থান রয়েছে, যেখানে সবচেয়ে দূর্ত এবং সবচেয়ে শক্তিশালী পঙ্গটিও আক্রমণ করে না।
আমার বান্ধবী ক্রিস্টিন, একটা বিজ্ঞাপন সংস্থার প্রেসিডেন্ট হিসেবে কর্মরত। সে আমাকে প্রতিবছরই তাদের কোম্পানির ক্রিসমাস পার্টিতে নিমন্ত্রণ করে। এক বছর সে আমাকে জোরাজুরি করতে লাগল, যে করেই হোক আমাকে তার ক্রিসমাস প্রেশ্রামে আসতেই হবে। আমিও তাকে না করার কোনো উপায় পেলাম না।
নির্ধারিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত হলাম। চারপাশে জমজমাট সব আয়োজন। সবাই হই হলোড়ে ব্যন্ত। কেউ কেউ হালকা কোমল পানীয়তে মজে আছেন। ছুটির দিন, তাই জন-উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সময় অনেক গড়িয়ে গেছে। উপস্থিত মানুষজন আরো বেশি উৎসবে মেতে উঠল। ক্রিস্টিন বুঝতে পারল আমার যাবার সময় হয়ে এসেছে। সে আমার কানেকানে বলল, ‘আমি পেছনের দরজাটা দেখে আসি। ওটা দিয়ে বের হয়ে তুমি বাসায় চলে যেতে পারবে।’
আমরা যখন পেছনের দরজার দিকে যাচ্ছিলাম, একটা বিরক্তিকর কণ্ঠ শুনতে পেলাম, ‘হেই ম্যাডাম ক্রিস্টিন… ক্রিস্টি…ন।’
একজন মহিলা ছুটে এল সামনে। ক্রিস্টিন আমায় মিনমিন করে বলল, ‘কোম্পানির একজন কর্মী।’
মহিলা আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। মোচড়াতে মোচড়াতে তার বস ক্রিস্টিনের কাছে বলল, ‘ম্যাডাম, এটা একটা দারুণ পার্টি হয়েছে… দারুণ। কিন্তু… আ…মি একটা বিষয় চিন্তা করছিলাম। এই পার্টির পেছনে যত টাকা খরচ হয়েছে, এর অর্ধেক টাকা দিয়েই আমাদের বাচ্চাদের একটা ব্যবস্থা করা যেত কিন্তু! ওদের জন্য একটু বিনোদন, শিক্ষার সুযোগ করা যেত, ম্যাডাম! কোম্পানি চাইলেই হতো।’ ক্রিস্টিন ব্যক্তিগতভাবে খুবই চতুর। সে ভালো করেই জানে, কোথায় কীভাবে হ্যান্ডেল করা লাগে। সে মহিলার হাতে হাত রেখে আশ্বুন্ত করল। তারপর বড় করে হ্যাসল, ‘জেনি, আমি জানি তুমি হিসেব নিকেশে পাকা, তুমি ব্যাপারটা ধরতে পেরেছ দেখে ভালো লাগল। আসলেই এখানকার অর্ধেক খরচ ওদের উন্নয়নে লাগানো যেত। এক কাজ করো তুমি, কাল অফিস টাইমে আমার কাছে এসো। তখন এটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।’ এরপর আমরা দ্রুত বের হয়ে গেলাম।
ওখান থেকে বের হতেই ক্রিস্টিন দীর্ঘশ্বস ফেলল, ‘উফ! যাক বাবা, এক বড় ঝামেলা থেকে উদ্ধার পেলাম।’
ঝামেলার কথা এলো কোথা থেকে? আমি অনাক হয়ে বললাম, ‘তুমি কি পার্টিটা উপভোগ করোনি, ক্রিস্টিন?’
‘উমম… তা করেছি।’ সে বলল ‘কিছু তুমি কল্পনাও করতে পারবে না লেইল, কী হতে চলেছিল। উফ!’
সে কয়েকটা বড় শ্বাস ফেলে আবার আরম্ভ করল, ‘জেনি, যে বিয়য়টা নিয়ে বলছিল, আমার তো পুরো মাথাই খারাপ করে দিয়েছে সে।’
‘জেনি? মানে আসার সময় যে মহিলা কথা বলেছিল?’
‘হ্যাঁ, লেইল। ওর কথাই বলছি।’
সে আমাকে পুয়ো বিষয়টা বুঝিয়ে বলল। মূলত ওদের কোম্পানির কর্মীদের ছেলেমেয়েদের দেখাশোনা এবং বিনোদনের জন্য একটা ফান্ড করা হয়েছে।
অলরেডি ম্যানেজমেন্ট ওটা নিয়ে কাজ করছে। শিশুদের নার্সারির জন্য একটা কুম খালি করা হয়েছে। কাজ প্রায় শেষের দিকেই।
আমি মৃদুভাবে ওর কাছে জানতে চাইলাম, ‘তাহলে তুমি জেনিকে এসব জানিয়ে দাওনি কেন?’
আমার দিকে ক্রিস্টিনের চোখাচোখি হলো। সে জানাল, ‘সময় এবং স্থান কোনোটাই এই বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য উপযুক্ত ছিল না। একটা পার্টিতে মানুষ এসব বিষয় নিয়ে কথা বলে? তাও এভাবে?’
তখনই ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। আসলেই, এমন একটা পার্টি কখনোই এই বিষয় নিয়ে কথা বলার জন্য উপযুক্ত নয়, আর উপরস্থ কাউকে ডেকে জবাবদিহিতার ভঙ্গিতে তো নয়ই!
জেনি অলিখিত সেই নিয়মটা ভঙ্গ করল, যেটা সব বড় বড় ব্যক্তিরা মেনে চলেন।
আর তা হলো ‘পার্টি শুধুমাত্র মজা মান্তির জায়গা।’
জেনির এমন কাণের ফলাফল কী হয়েছিল? ক্রিস্টিন কি পরদিন জেনিকে গালমন্দ করেছে? না, তেমন কিছুই করেনি, শুধু একটা কাজ ছাড়া। আর তা হলো…
কয়েক মাস বাদেই কর্মীদের প্রমোশনের নির্ধারিত সময় এসে গেল। সবাই নিজেদের প্রমোশন নিয়ে খুশি হলেও একজন তার হোঁয়া পায়নি। আর সে হলো জেনি। বেচারি বুঝতেও পারেনি, কেন তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি!!
কৌশল ৮৩
পার্টি খোশগল্পের জন্য
মনুষ্য জঙ্গলে তিনটা নিরাপদ আশ্রয়ন্ত্রণ রয়েছে, যেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী আর ধূর্ত বাঘটিও আঘাত করার সাহস করে না।
প্রণমটা হচ্ছে পার্টি।
পার্টিগুলো আয়োজন করা হয় বিনোদনের জন্য এবং বঙ্গুত্তের জন্য। পেশাদার জীবনের কোনো ব্যাপার নিয়ে দুজনকে মুশোমুখি দাঁড়ানোর জন্য নয়। এমনকি এই জঙ্গলের বড় খেলোয়াড়রাও তাদের সবচেয়ে বড় শক্তর পাশে বসেন, হাসেন এবং মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানান। তারা শক্ততার ব্যাপারগুলো অন্য কোথাও দেখতে চান, কোনো পার্টিতে নয়।
পর্ব ৮৪
ডাইনিং শুধুমাত্র খাবার পরিবেশনের জন্য
কঠিন আলাপ-আলোচনা খাবারের রুচি নষ্ট করে
তুমি কি কখনো বিশ্বিত হয়ে ভাবোনি, কেন বড় বড় ব্যক্তিদের দুপুরের খাওয়া দাওয়া এত লম্বা সময় ধরে চলে? কিছু কিছু সময় তো বিকেল পর্যন্তও গড়িয়ে যায়! তোমার কি কখনো এমনটা মনে হয়েছে যে, তারা বসে থাকতে, খেতে এবং কোম্পানির টাকায় ফূর্তি করতে পছন্দ করেন বলেই এত সময় নেন? কিছুটা সত্য হতেও পারে। কিন্তু প্রধান কারণ একটু ভিন্ন। খাবারের টেবিলটা যেকোনো পার্টির থেকে অনেক বেশি নিরাপদ উভয়ের কাছেই। হোক সেটা লাঞ্চ, ব্রেকফাস্ট বা সদ্ধ্যার নাস্তার জন্য। এই ছোট্ট সময়টা কেউই ব্যবসায়ের অপ্রত্যাশিত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন না।
সত্যিকার অর্থে বড় বড় কর্তা ব্যক্তিদের লাঞ্চ কীভাবে সম্পন্ন হয়, ধারণা নিই। তাদের গ্লাসের টুংটাং আওয়াজ শোনা যায় শুরুর দিকে। হালকা পানীয় গিলে নেন উভয় জনই। তারা খেলাধুলা, বাইরের তাপমাত্রা, দেশের বর্তমান পরিষ্কৃতি এসব দিয়েই কথা শুরু করেন। এরপর তাদের কথাবার্তার বিষয়বস্তু এসে দাঁড়ায় খাবার, শিল্পকলা, কোনো একটি আলোচিত ঘটনা এবং এমন কোনো বিষয় যেটা নিয়ে আলোচনা করলে কারো আপত্তি আসবে না।
‘সময়ের অপচয়!’ কেউ কেউ তাবতে পার। ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। বড় খেলোয়াড়রা অপরজনের প্রত্যেকটা পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করতে থাকেন সতর্কতার সাথে। তারা একে অন্যের দক্ষতা, জান, বাছ বিচার দেখে, মনে মনে হিসেব নিকেশ করতে থাকেন। ঠিক যেমনটা একজন নির্বাচক ফুটবল দলের অনুশীলনের সময়টাতে করেন। বড় ব্যক্তিরা জানেন, কীভাবে মানুষজন নিভিগ্ন সামাজিক বিষয়াদিতে নিজের অবস্থান তুলে ধরে। তারা যখন কৌতুক করতে করতে হাসিতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন, পেছনে আরেকটা বিষয়ও ঘটে চলে, আর তা হলো, তারা একে অপরকে গভীরভাবে বিচার বিশ্লেষণ করতে থাকেন।
সর্বশেষ কফি পর্ব শুরু হয়। এই পর্যায়ে এক বা একাধিক বড় ব্যক্তি ব্যবসায়িক ছোটো খাটো বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করেন। কোনো একটা ঘটনা উল্লেখ করে টপিকে আসেন।
কেউ একজন কোনো একটা কোম্পানির কথা বললেন, ‘এত বড় কোম্পানির জন্য এটা বড়ই লজ্জার ব্যাপার। ওরা শুধু টাকার কথা চিন্তা না করে পারিপার্শ্বিক অবস্থা নিয়েও একটু ভাবতে পারত। কী বলেন?’
‘তা তো বটেই।’
ঠিক এমন কোনো বিষয় অবতারণার মাধ্যমে তারা নিজদের আসল উদ্দেশ্যের দিকে বাড়তে থাকেন। ব্যবসায়ের কোনো বাজে দিক এই অংশে ফুটে ওঠে না। তারা ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে কথা বলতে থাকেন। এই যেমন এই ব্যবসায়ের ভালো দিক কোনটি, এর ফলে লাভ কী হতে পারে? কীভাবে ব্যবসায়ের উন্নতি হতে পারে। কফির মগে চুমুক দিতে দিতে খাবারের মান নিয়েও কথা হয়ে যায়। তারপর বিলের চেকটা হাতের কাছে আসতেই মূল আলোচনায় সমাপ্তি টানা হয়।
কৌশল ৮৪
ডাইনিং শুধুমাত্র খাবার পরিবেশনের জন্য
পৃথিবীর অন্যতম নিরাপদ জায়গা হচ্ছে ডাইনিং টেবিল, এমনটা বড় বড় ব্যক্তিরা বিশ্বাস করেন। ডাইনিং টেবিলে খাওয়ার সময়টা অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা হলেও অপ্রত্যাশিত কিছুর অবতারণা করা হয় না।
খাবার টেবিলে ব্যবসার পজেটিভ দিকগুলো নিয়ে কথা হতে পারে। এই যেমন নতুন কোনো আইডিয়া নিয়ে কথা হতে পারে। কেমন হতে পারে এর ভবিষ্যৎ অথবা কেমন হবে তার গঠনপ্রণালি? কিন্তু কোনো জটিল ব্যবসায়িক আলাপ করা যাবে না। সহজ স্বাভাবিক ব্যাপারগুলো শুধুমাত্র আলোচনা করার জন্য ডাইনিং টেবিল উপযুক্ত। আরেকটু সময় নিজেদের মাঝে কাটানোর জন্য হতে পারে। তবে জটিল কোনো ব্যবসায়িক আলাপ করার ছ্রান ডাইনিঃ টেনিল নয়।
পর্ব ৮৫
বাগে পেলেই সব সময় হামলে পড়তে নেই
আহহ্য… অবশেষে পেয়েছি তোমাকে!
উইলিয়াম গত কয়েকদিন যাবত বি.ডব্লিউ. কোম্পানির একজন বড় কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তার আশা একটাই, উক্ত কোম্পানির কাছে তার উইজেডগুলো বিক্রি করা। ওই কর্মকর্তা তাকে এখনো হ্যা বলেননি। বরং প্রস্তাব পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। তারা প্রস্তাবে রাজি হলে ফোন করে জানাবে। বেচারা অপেক্ষা করেই আছে, কোনো ফোনকল আসছে না।
এক সন্ধ্যায় উইলিয়াম কাঙ্ক্ষিত ওই কর্তাকে সুপারশপে আবিষ্কার করল। ভদ্রলোক লাইনে তার সামনেই দাঁড়িয়েছেন।
‘আমার কী ভাগ্য!’ উইলিয়াম নিজেকে নিজে বলল।
‘ওহ, শিট!’ বড় কর্তা চিন্তায় পড়ে গেল, ‘আমার বিশ্বাস এই ব্যক্তি আমাকে তার উইজেড কেনার কথা বলে বিপদে ফেলবে না। অন্তত এমন সময়ে তো নয়। ঈশ্বর, রক্ষা করো।’
যারা মনুষ্য জগ্দলের নিরাপদ জায়গা সম্পর্কে ধারণা রাখেন, তাদের চোখে দুইটা ফলাফল উদিত হবে। উইলিয়াম যদি চোখেমুখে ‘পেয়েছি ব্যাটাকে’ ভাবটা ফুটিয়ে তোলে তবে তার ফোনকল পাওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায় নেমে যাবে। এমনকি ওই কর্তা যদি ভেবেও থাকেন উইলিয়ামের উইজেডগুলো বাজারের অন্যদের চেয়ে ভালো, তাও তিনি ওগুলো নেবেন না, অন্তত তাকে একটা সুপারশপে ফাঁদে ফেলার জন্য তো এই শান্তি হতেই পারে।
সে যাই হোক। তেমন কিছুই হয়নি। উইলি ভদ্রলোককে হেসে বলল, ‘হ্যালো স্যার, আপনাকে এখানে দেখে ভালো লাগল।’
উইজেড নিয়ে কোনো কথাই হলো না, এমনকি সে উইজেডের ব্যাপারে কোনো ইদ্রিতও করেনি, মেমনটা একজন বড় ব্যক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য, উইলিয়াম ঠিক তাই করেছে।
উইনি খুব দ্রুতই উক্ত ব্যক্তির ফোনকল পেতে যাচ্ছে, এটা একেবারে নিশ্চিন্ত কথা। হয়ত বা সেটা আগামীকালই হতে পারে। একজন বড় কর্তাকে বাগে পেয়েও তাকে একটা নিরাপদ সময় উপহার দেওয়ার উপহার উইলির প্রাপ্য।
কৌশল ৮৫
যাগে পেলেই সব সময় হামলে পড়তে নেই
এমন যদি হয় তুমি কিছু একটা কারো কাছে নিক্রি করছ, দামাদামি চলছে অপবা তিনি তোমায় পরে জানাবেন বলেছেন, তবে একটু ধৈর্য রাখো। ভাগ্যক্রনে পরদিনই তাকে রাস্তায় পেয়ে বসতে পার! কিছু এর মানে এই না যে পশাসেই তাকে ধরে বসবে তোমার পণ্যের ব্যাপারে। তাকে উপলব্ধি করতে দাও তুমি চাইলেই তাকে ওটা নিয়ে কথা তুলতে পারতে, অথচ তুমি তাকে বিব্রত করোনি। ফলাফল তোমার দিকেই আসছে, নিশ্চিন্ত থাকো।
পর্ব ৮৬
তাদের মস্তিষ্কের জলাশয় খালি করো
তোমার ফাটা মাথার গল্প পরে শুনব, আগে তোমার ইন্স্যুরেস নাম্বার বলো?
কয়েক বছর আগের ঘটনা, এক রাতে আমি নিউইয়র্কের রাস্তায় দাঁড়িয়ে আহি, এমন সময় একটা লোকের দিকে আমার চোখ গেল। সে একটা প্রাইভেট কারের দরজা ভেঙে ভেতরে চোকার চেষ্টা চালাচ্ছিল।
‘চোর… চোর…’ জোরে চেঁচিয়ে উঠলাম সাথে সাথে। আশপাশে কেউ নেই দেখে নিজেকে একটু অনিরাপদ মনে হতে লাগল।
চোরটা গাড়ির দরজা ছেড়ে আমার দিকে তেড়ে এলো। সে এর পাক্কা প্রতিশোধ নিতে বদ্ধপরিকর। অথচ আমার ধারণা ছিল চোরটা ভয়ে পালিয়ে যাবে!
তার এমন আচরণে আমি খুল্কিত হয়ে গেলাম! সে খুব সহজে আমাকে ধরে ফেলল। এক ধাক্কা দিতেই আমি নিচে গড়িয়ে পড়ে গেলাম। চোরটা আমার মাথাকে রাস্তার সাথে পিষে ধরল।
কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হলো মাথাটা কট করে ভেঙে গেছে। এরপর সে আমাকে ফেলে পালিয়ে গেল।
আমি পাশের একটা হাসপাতালে ছুটে গেলাম। পুরো শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকল। ওখানকার এক প্রবীণ নার্স আমার থেতলানো মাপায় একটা বরফের টুকরো ধরে থাকতে বললেন। ওটা ধরে থাকা অন্যায় কত শত প্রশ্নবাণে যে জর্জারত হলাম তার ইয়ান্তা নেই। ঠিকানা, টেলিফোন নাম্বার, ইস্যারেগ নাম্বারসহ হাবিজানি প্রশ্ন জবাব দিতে হলো আমাকে।
এসব প্রশ্ন শুনে আমার মাথা আরো চটে গেল।
অথচ আমি উদ্ধীব হয়ে বলতে চাচ্ছিলাম আমার মাপায় এত বড় আঘাতটা কীভাবে পেলাম! অন্তত কেউ তো জিজ্ঞেস করবে, কীভাবে হলো? দুনিয়ার সবক্ব প্রশ্ন শেষে নার্স জিজ্ঞেস করলেন, ‘এবার বলুন, কীভাবে এন্সিডেন্টটা হলো?’
আমার এই করুণ কাহিনিটা আমি আমার এক বাঙ্গবীকে জানিয়েছিলাম, যে নামকরা একটা হাসপাতালের ইমার্জেসিতে একজন নার্স হিসেবে কাজ করে। যে সবটা মনযোগ দিয়ে শুনল। সবটা শোনার পরে যে কথা বলল, ‘আমি জানি সবটা লেইল। বাট আমি বিশ্বাস করতে পারছি না, ওরা ফর্মটা এভাবে কেন সাজাল। আহত ব্যক্তিরা তার সাথে কী হয়েছে এটা বলার সুযোগই পান না, যতক্ষণ না অন্য তথাগুলো দিয়ে দেন। আহত ব্যক্তিদের থেকে এসব তথ্য নেওয়াটাও সমস্যার। অনেকে ইনফরমেশনগুলো মনে রাখতে পারেন না ঠিকঠাক।’
সে আরো জানাল, এই পদ্ধতিতে একটু ভুল রয়েছে। আমার বন্ধবীটি নিজ কর্মক্ষেত্রে পরিছিতি এভাবে সামলান, সবার পূর্বে রোগীর কাছ থেকে জানতে চান, এমনটা কীভাবে হলো? তার প্রতি সঠিক সহমর্মিতা প্রদর্শন করে প্রতিটি তথ্য মনযোগ দিয়ে শোনে। রোগী যখন দেখতে পান, তার সব কথাই নার্স শুনেছে, যে মনে মনে সন্তুষ্ট হন। এরপর তার কাছে যত তথ্যই চাওয়া হয়, যে খুশি মনে বলে দেন।
আমি ভেবে দেখলাম দুই পদ্ধতি সম্পূর্ণ বিপরীত। একজনের পদ্ধতিতে উভয়েই সন্তুষ্ট থাকেন, অথচ অন্য পদ্ধতিতে রোগীর বিরক্তির শেষ নেই!
ভালো বসরা জানেন, কর্মীরা চায় তাদের কথাও কেউ শুনুক। আমার এক সাবেক সহকর্মী রবার্ট, বর্তমানে নিজেই ছোটো একটা উৎপাদনমুখী কোম্পানি দাঁড় করিয়েছে। যে আমায় বলল, ‘লেইল, আমার অধিনন্ত কেউ যখনই আমাকে কোনো ব্যাপারে অভিযোগ করে, আমি মনযোগ দিয়ে তাদের সমন্ত কথা শুনি। একবারও বিরক্তি দেখাই না, বিষয়টা যত ছোটো খাটোই হোক না কেন। ওরাও আমার কাছে আমার কাস্টমারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্বাস, ওদের সমন্ত অভিযোগ শুনি বলে ওরা আমার প্রতি আরো বেশি বিশ্বস্ততা প্রদর্শন করে।’
যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুমি অন্যকে শোনাতে উদ্ধীব
একটা পেট্রোল ভর্তি গাড়িতে নতুন করে পেট্রোল ভরা যায় না, গ্যারেজে কাজ করা একটা ছোট বাচ্চাও এটা জানে। তুমি যতই গাড়িতে পেট্রোল ঢালবে ওটা তুই চুইয়ে চুইয়ে নিচে গিয়ে পড়বে।
ঠিক একইভাবে, তোমার শ্রোতার মন্ত্রিক্ষে তার নিজের নিভিন্ন চিন্তাভাবনা দিয়ে জরী থাকে। ফলে তুমি চাইলেও তোমার চিন্তাভাবনা তার উপরে প্রয়োগ করতে বার হবে। কারণ তার নিজের মন্ত্রিক্ষ ইতোমাধ্যে নিজের চিন্তা চেতনা পুরে রেপেছে, শুখানে নতুন কিছু নেওয়ার জায়গা নেই। তোমার হাতে একটাই পথ বাঁচে, জর মন্ত্রিক্ষের সকল চিন্তাভাবনা বের করে তারপরই তোমার চিন্তাভাবনা ভরতে দেওয়া।
যখনইবা তুমি আবেগ তাড়িত কোনো ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছ- যে কথা বলছে তাকে প্রথমে তার পুরোটা শেষ করতে দাও। তার কথা শেষ হলে তোমার কথা বলা শুরু করতে পারো। তোমার ধৈর্য কম হলে মনে মনে দশ পর্যন্ত শুনতে আরুন্ত করো। সময়টা অনন্তকাল বলে উপলব্দি হতে পারে। তোমার হাতে ভিন্ন কোনো পথ নেই। সে যদি তার পুরোটা শেষ করে তবেই তো সে তোমার কথা শুনবে!
কৌশল ৮৬
তাদের মন্ত্রিক্ষের জলাশয় খালি করো
যদি তোমার তথ্যের দরকার পড়ে, মানুষজনকে আগে কথা বলার সুযোগ করে দাও। ততক্ষণ পর্যন্ত অপেক্ষা করো যতক্ষণ না তারা সবটা শেষ করে, মন্ত্রিক্ষে আর কিছুই জমিয়ে রাখে না। আর যখনই তাদের ভেতরের সব কথা বলা শেষ হয়ে যাবে, তার তোমার কথাগুলো শোনা ছাড়া আর কিছুই বাকি থাকে না। তোমার কথাগুলোই তার শূন্য মন্ত্রিক্ষে ভর্তি হতে থাকবে।
পর্ব ৮৭
আরো বেশি আবেগের সংমিশ্রণ ঘটাও
আসল ঘটনাটা মনযোগ দিয়ে শুনো, কিন্তু জবাবটা দাও আবেগ মিশিয়ে
‘EMO’ শব্দটা আবিষ্কার করেন হেলেন গুর্লেই ব্রাউন নামের এক ভদ্রমহিলা। তিনি একটা বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন কোম্পানির অনেক বড় পদে চাকরি করতেন। ‘EMO’ শব্দটা মূলত ইংরেজি শব্দ ‘EMOTION’ এর উপর ভিত্তি করে দেওয়া। প্রয়োগিক অর্থ দাঁড় করালে, EMO-এর অর্থ দাঁড়ায় ‘আরো বেশি আবেগ মিশিয়ে দেওয়া। সেই বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়, জানানো হবু, তাদের জন্য আমাকে একটা কলাম লিখতে হবে। নিয়াবন্ত্র হচ্ছে, কথাবার্তা বলার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল ব্যাপারগুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা (বিশেষ করে নারীরা কীভাবে তাদের স্বামীদের আবেগীয় কথাবার্তা দ্বারা যেকোনো ব্যাপারে উৎসাহ সৃষ্টি করাতে পারেন।)
কাজের সুবিধার্থে মনস্তাত্ত্বিক, অভিজ্ঞ কমিউনিকেটর, যৌন চিকিৎসকসহ নানাবিধ বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিতে হয়েছিল। আমার হিজিবিজি নোটগুলো মেলে ধরলাম। একটা শব্দ বারবার আসছিল, আর সেটা হলো ইমোশন বা আবেগ। প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠায় শব্দটা গেঁথে গেছে। ‘আরো বেশি আবেগ জুড়ে দিতে হবে।’
আমার ইভিটরকে তলব করলাম। জানতে চাইলাম, ‘এটা দ্বারা কী মিন করছে? একটু বুঝিয়ে দাও তো।’
সে আমাকে বুঝিয়ে দিল। এই আবেগ জড়ানোর ব্যাপারটা হেলেনের সেই ‘ইমো’ থেকেই উদ্ভূত। নারী-পুরুষের বিনোদনের ক্ষেত্রে ইমোশন অনেক বেশি ভূমিকা পালন করে।
সে আরো বলল, ‘লেইল, একটা নারী যখন তার স্বামীর কাছ থেকে সঠিক পরিমাণে উৎসাহ পায় না, বলতে পারো স্বামীটা কখন সেই ব্যাপারটা ধরতে পারে? যখন স্বামীটা স্ত্রীর মুখোমুখি হয় তখন। আর দুজনেই সেই সময়টায় পুরো ব্যাপারটা তখন অনুভব করে, যেই সময়টা তারা নিজেদের দুর্বলতা নিয়ে নিয়ে আলোচনা করতে বসে।’
হেলেন গুর্লেই ব্রাউন, একজন স্বীকৃত সফল নারী ব্যক্তিত্ব, যিনি এসব সংবেদনশীল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করে গেছেন। তিনি জানতেন এমন উদ্ভূত পরিস্থিতি সম্পর্কে। হেলেন বুঝতে পেরেছিলেন, বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তর দিয়ে কিছু কিছু সময় জেতা যায় না। বরং কিছু ক্ষেত্রে সেটা সম্পর্ককে আরো খারাপ করে দেয়। সেক্ষেত্রে আবেগীয় ও সহানুভূতিশীল আচরণ তোমাকে সমস্যা সমাধানের দিকে নিয়ে যাবে। অন্য কথায় বলব, আবেগের চাষ করো।
হায়, ঈশ্বর! তিনি নিশ্চিত আমাদের উপর ক্ষুব্দ হয়ে আছেন!
এল. এল. বিন ক্রথজ কোম্পানি সম্প্রতি তাদের কাপড়ের ব্যবসায় EMO-এর কৌশলটা সংযুক্ত করেছে। অনেকদিন আগে, কয়েক মাস তো হবেই, আমার বন্ধু পিল কিছু ট্রাউজার কিনবে বলে জানাল। আমার পছন্দের কোনো ব্রান্ড থাকলে সে কিনতে আগ্রহী। ওকে টেনে আমার ওয়্যারড্রবের সামনে নিয়ে গেলাম। আমার কয়েকটা ট্রাউজার দেখালাম, যার সব কটা এল, এল, বিন ক্লথস থেকে কেনা। কাপড়ের কোয়ালিটি ওর পছন্দ হলো। সে সেদিনই গিয়ে নেভি ব্রু রঙের দুটো ট্রাউজার কিনে নিল, ঠিক একই দোকান থেকে। পিল ট্রাউজারটা পরিধান করে সর্বপ্রথম গেল তার প্রেমিকার সাথে দেখা করতে। এটাই ওদের প্রথম দেখা হতে যাচ্ছে। একটা হাই ফাই রেস্টুরেন্টে দুজনের প্রথম মোলাকাত হলো। সে আগে থেকেই একেবারে কর্নারে টেবিলটা বুক করে রেখেছিল, একবারে একজন গোছানো মেয়ে যেমনটা পছন্দ করে। বসে পড়ার পূর্ব মুহূর্তে তার প্রেমিকার হাত কসকে একটা প্যাকেট পড়ে গেল। সে আশ্বন্ত করে বলল, ‘হানি, আমি নিয়ে দিচ্ছি।’ মেয়েটা হেসে সায় দিল। বেচারা পিল যখনই ঝুকে প্যাকেটটা নিতে গেল, ‘ক্যাট’ করে একটা শব্দ হলো। পিল সাথে সাথে চেয়ারে বসে পড়ল। বেচারার ট্রাউজারের ঠিক নিচ বরাবর ছিড়ে গেছে। কয়েকজন ভদ্রলোক ব্যাপারটা দেখলেও তেমন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কিন্তু অন্যরা হাসতে থাকল। অনেকে তো কয়েক মিনিট ধরে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ কেউ ইশারা করে ওকে দেখাচ্ছিল। সারাদিন পিল মন খারাপ করে থাকল। আমাকে যখন ব্যাপারটা জানাল, আমারও খারাপ লাগল। খারাপ লাগার পরিমাণটা আরো বেড়ে গেল, যখন মনে পড়ল ওকে আমিই ওই দোকানটা দেখিয়েছিলাম। রাতে ওই দোকানের কাস্টমার কেয়ারের নাম্বারে ডায়াল করলাম। একটা মেয়ে ফোন রিসিভ করল। আমি পুরো ঘটনা তাকে খুলে বললাম। সে ধৈর্য এবং সহমর্মিতার সাথে পুরোটা শুনল। ব্যাপারটা শুনে সে দুঃখ প্রকাশ করল, ‘একেবারে বাজে ব্যাপার ঘটে গেছে ম্যাডাম। আমি অনুভব করতে পারছি আপনার সেই বন্ধুটি কী পরিমাণ লজ্জার ভেতরে পড়েছেন।’ আমি সম্মত হয়ে বললাম, ‘আসলেই সে একটা লজ্জার ভেতরে পড়েছে।’ মেয়েটা বলল, ‘আপনার বন্ধুটি অবশ্যই অনেক বেশি রেগে আছেন, ব্যাপারটা আমি বুঝতে পারছি, ম্যাডাম।’ ‘হ্যা, সে রেগে ছিল।’ আমি তার সাথে একমত হলাম। মেয়েটা পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে, ইভেন আমাদের সে যেভাবে সহমর্মিতা দেখাল, বিম্ময়াকর! যখন আপনি ব্যাপারটা জানলেন, আপনারও অনেক রাগ হয়েছে, তাই না ম্যাডাম? বিশেষ করে আপনার পরামর্শ নিয়ে আপনার বন্ধুটা এই বিপদে পড়েছে, আপনার রাগ আমি ফিল করছি। সবকিছুর জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।’ ‘তা করেছি। আপনাদের প্রোডাব্টি আমি অনেকদিন ধরে ব্যবহার করছি। আমার কখনোই খারাপ মনে হয়নি।’ আমি তার জবাবে বললাম। ‘আমাদের আরেকটু সতর্ক হওয়া উচিত হিল, নইলে আজ এমনটা হতো না।’ মেয়েটা আবার দুঃখ প্রকাশ করল।
আমি মেয়েটাকে খামিরে দিলাম। আমার সমন্ত রাগ পড়ে গেল। এখন মনে হচ্ছে মেয়েটাকেই আমার সাত্তলা দেওয়া আবশ্যক হয়ে গেছে।
‘দোষটা তোমাদের নয়।’ আমি বললাম, ‘হতে পারে এতগুলা কাপড়ের ভিড়ে ওই একটা ট্রাউজারেই কাপড়টা একটু বাজে পড়ে গেছে, নইলে আমি তো এতদিন ধরে ব্যবহার করছি, আজ পর্যন্ত আমার কোনো অভিযোগ নেই।’
কৌশল ৮৭
আরো বেশি আবেগের সংশ্লিষ্ক ঘটাও
বাস্তবাচা কথা বলে আর আবেগ চিহ্নকার করে। অর্থাৎ আমাদের একটা সত্য স্বাভাবিক কথার চেয়ে আবেগ মিশানো একটা কথা অনেক বেশি কার্যকর। তোমার সামনে যখন কেউ আবেগ তাড়িত হয়ে কিছু বলতে ধাকে, তাকে বলতে দাও। তাদের অভিযোগেলো শুনো, আবেগেলো অনুভব করো, নিজেকে তার জায়গায় কল্পনা করো। দেখবে আবেগের কথাগুলো খুবই জোরানো শোনাচ্ছে!
পর্ব ৮৮
আমার ভুলে তোমার ফায়দা
ক্ষতিগ্রস্তদের মুখে হাসি ফোটাও
একদা একটা দোকান থেকে পাজামা এক পিস অর্জার করেছিলাম। ওটা হাতে পেয়ে বাসায় নিয়ে এলাম। প্যাকেট খুলে তো আমার মাথায় আগুন! পাজামার সাইজ আমার দ্বিতীণ! আমি সাথে সাথে ফোন করে অভিযোগ জানালাম। পরদিনই আমাকে অবাক করে দিয়ে ওরা পায়জামাটা চেষ্টা করে নতুন আরেকটা পাঠাল।
পায়জামার পাশাপাশি একটা ছোট্ট গিফট। তার পাশে হাতে লেখা একটা চিঠি। চিঠিতে এমন ভুলের জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করলেন।
আমি কি ভবিষ্যতে ওইখান থেকে আর কিছু অর্জার করব? তুমি বাজি রাখতে পারো, আমি কিনব।
আমি কি মানুষজনকে ওই দোকানের পণ্য কিনতে পরামর্শ দেবো? কী মনে হয় তোমার? বাজি ধরে বলতে পারি, আমি অবশ্যই কিনতে বলব।
উপরই কাস্টমার সার্ভিসের লোকেরা ভুল সংশোধনের সুযোগ চান। তারা জানেন, এটা তাদের কোম্পানিকে আরো উপরে নিয়ে যাবে। যখনই তুমি কোনো একটা দুর্ঘটনা ঘটাও আর যদি তোমার দ্বারা কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হন, এটা নিশ্চিত করো, তারা তোমার কাছে যেন আবার আসে।
আর এই ক্ষতি এড়ানোর একটা বড় পথ হচ্ছে, তার কাছে ক্ষমা চেয়ে, ক্ষতির চেয়ে বেশি কিছু দিয়ে তাকে পুষিয়ে দেওয়া। আমি উক্ত পদ্ধতির নাম দিয়েছি ‘আমার ভুলে তোমার ফায়দা।’
আমার খুবই বিশ্বস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ একজন ক্লায়েন্টের অফিসে একটা দুর্ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছিলাম সেবার। আমি উক্ত ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করতে গিয়েছি এক বিশেষ দরকারে। তার কক্ষে ঢুকার মুহূর্তে ক্লোরে বিছানো পাপোষে এমন পিছলা খেয়েছি যে ঝুঁকে গিয়ে তার টেবিলে পড়লাম। দুই হাত সামনে ধরে কোনো রকমে নিজেকে দুর্ঘটনার হাত থেকে বাঁচালাম। ক্ষয়ক্ষতি আমার কিছু না হলেও আমার ক্লায়েন্টের টেবিলে রাখা ফুলদানিটা পড়ে তিন টুকরো হয়ে গেছে। আমি টুকরো তিনটা হাতে নিয়ে টেবিলে রাখলাম। চমৎকার ফুলদানিটা এভাবে ভেঙে ফেললাম? আমার ক্লায়েন্ট হেসে বলল, ‘ও কিছু না লেইল। আমি আরেকটা কিনে নেব গুওটা নিয়ে চিন্তা করার দরকার নেই।’
তবুও পরদিন একটা সুন্দর ফুলদানি কিনে তার অফিসে পাঠিয়ে দিলাম। দামের ক্ষেত্রে কার্পণ্য করিনি, প্রায় দশশুণ বেশি দামি ফুলদানিটাই কিনেছি। ওর সাথে গুঁজে দিয়েছিলাম ডজনখানেক টাটকা গোলাপ।
এরপর থেকে যখনই সেই ক্লায়েন্টের সাথে দেখা হয়, আমাদের কথার এক পর্যায়ে সে বলে ফেলে, ‘তোমার দেওয়া ফুলদানিটা কী দারুণ। তাকিয়ে থাকতে মন চায়।’
কৌশল ৮৮
আমার ভুলে তোমার ফায়দা
যখনইবা তুমি একটা ভুল করবে, এটা নিশ্চিত করো, তোমার ভুলের দ্বারা যার ক্ষতি হয়েছে, সে যেন লাভবান হয়। তুমি তাকে যত ক্ষতিপূরণই দাও না কেন ওটা তোমার ভুলকে শুধরে দেবে না। নিজেকে নিজে প্রশ্ন করো, ‘এমন কী করা যায়, যা করলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিটি আমার ভুলটি মাফ করে দেবেন এবং পাশাপাশি আমার উপরে অখুশি থাকবেন না?’
যেটা চিন্তা করেছে, কাজটা দ্রুত করে ফেলো, তাকে খুশি করে দাও। এইভাবে অগ্রসর হলে তোমার ভুলই তোমার জন্য সফলতা বয়ে আনবে।
পর্ব ৮৯
পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দাও
একটু জ্রদ্ধাবে বলা, ‘তুমি ধরা পড়ে গেছ মশাই, দাঁড়াও তোমায় উদ্ধার করবেছি।’ জাপানে কিছু ব্যক্তি আছেন, প্রয়োজনে তারা নিজের জীবন দিতে প্রান্তব আছেন কিন্তু সম্মান নষ্ট হতে দেবেন না। আমেরিকায়ও একই ধরনের মৃত্যু বাসনা রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে একটু পরিবর্তন আনা হয়েছে। নিজের মৃত্যু না দটিয়ে যে ব্যক্তির ছারা তার সম্মানহানি হচ্ছে, তার মৃত্যুই মার্কিনিদের কাম্য!
কেন আগ বাড়িয়ে শত্রু বাড়াবে? যদি না এটা তোমার দায়িত্ব হয়ে পাকে, চিটার এবং ফাঁদে পড়া মিথ্যককে ধরতে পেরেও তাদের ছেড়ে দাও। সেক্ষেত্রে অতি ক্রত তাদের তোমার জীবন এবং যার দায়িত্ব তোমার হাতে রয়েছে, তাদের থেকে দূরে সরিয়ে দাও। এমনকি যখন কারো দোষ সবার সামনে উন্মুক্ত, যখন তোমার লোকেরা দোষীকে ধরে ফেলেছে- তবুও তাকে ছাড়িয়ে দাও।
আমার এক ক্লায়েন্টের মুখে শোনা, লেডি স্টেফানি নামের এক ভদ্রমহিলা এই টেকনিক ব্যবহার করেছেন!
উক্ত ক্লায়েন্ট সৌভাগ্যক্রমে তাঁর (লেডি স্টেফানি) বাসায় নিমন্ত্রণ পেল। অন্য অনেকের মতো সেও উপছিত হলো, ভদ্রমহিলার ঘর ভর্তি দামি দামি সব জিনিসপত্র। দামি দামি কিছু কাচের ডিমও চোখে এলো ওর। অধিকাংশ অতিথি কাচের ডিমগুলো পরখ করে এর সৌন্দর্যে অভিভূত হলেন।
ক্লায়েন্ট আরো জানাল, ‘অনুষ্ঠান শেষে আমরা সবাই যখন বের হতে যাচ্ছিলাম, লেডি স্টেফানি এক ভদ্রমহিলার দিকে এগিয়ে গেলেন। তাকে থামিয়ে দিলেন। লেডি স্টেফানি ওই মহিলার কোটের পকেট থেকে হাসতে হাসতে একটা কাচের ডিম বের করে আনলেন, যেগুলো আমরা সাজানো অবস্থায় দেখেছিলাম! আমরা কয়েকজন অবাক হয়ে গেলাম! চুরি!’
লেডি স্টেফানি ওই মহিলাকে চুরির ব্যাপারে টু শব্দটি উচ্চারণ করলেন না। বরং বললেন, ‘আমি বুঝতে পেরেছি কাচের ডিমটা আপনার পছন্দ হয়েছে, ওটাকে আলোতে নিয়ে দেখতে চাচ্ছিলেন কেমন চমকায়। আসুন আমরা ডিমের বাকি কারিশমা দেখি। আলোতে কেমন ঝলমল করে ওটা!’
এমন একজন চোরকে ভদ্রমহিলা এভাবে সম্মানের সহিত ছেড়ে দিলেন, বিস্ময়কর!
গল্পটা শুনে আমি জানতে চাইলাম, ‘এরপর কী হলো?’
আমার আগ্রহ আছে দেখে ক্লায়েন্ট বাকি অংশ বলতে আরম্ভ করল- লেডি স্টেফানি ডিমটাকে আলোতে ধরলেন, ওটা চকচক করে উঠল। যেই মহিলা ওটা পকেটে নিয়ে ভাসতে চেয়েছিল, সেসহ সনাই ওটার সৌন্দর্যের প্রশংসা করল। এরপর ডিমটা ঠিক তার আগের জায়গায় ছ্রান পেল। ওটাকে আরেকটু নিরাপদ করে ভুললেন লেডি স্টেফানি।
তিনি কেন এমনটা করলেন? ওখানে সবাই চুরির ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছেন, ‘অথচ লেডি স্টেফানি যেভাবে ছিচকে চুরির ঘটনাটা এড়িয়ে গিয়ে নিজের পণ্য এবং সম্মান দুটো উদ্ধার করলেন, এক কথায় অসাধারণ। যে মহিলা চুরি করেছে, কয়েক মুহূর্তে বাদে তার চোখেমুখেও লেডি স্টেফানির জন্য প্রচণ্ড সম্মানবোধ দেখা দিল। সবাই নিজেদের মাঝে বলাবলি শুরু করে দিল, কীভাবে লেডি স্টেফানি কাউকে চুরির অপবাদ না দিয়ে বিষয়টা সমাধান করে ফেললেন।
কেন বড় মানুষরা বাজে লোকেদের ছোটোখাটো ভুলগুলো মাফ করে দেন? কারণ তারা সবাইকে সমানভাবে শুরুত্ব দেন। ঠিক একজন মায়ের মতো, যিনি তার দুষ্ট সন্তানের ভুল শুধরে তাকেও সমান মমতায় বেঁধে রাখেন।
ভুলটা আমারই ছিল
সফল ব্যক্তিরা অন্যের ছোটোখাটো ক্রটিকে নিজের করে নিতেও ভালোবাসেন। কাউকে দোষারোপ করার বদলে তারা নিজেদেরই দোষারোপ করেন। ধরো বড় এক ব্যক্তির বন্ধু পথ হারিয়ে ফেলেছে। অনেক কষ্টে যখন ঠিকানায় পৌছায়, সফল ব্যক্তিটি দোষ নিজের কাঁধে নিয়ে নেন, ‘ভুলটা আমারই ছিল। আমি রাস্তার বর্ণনা আরেকটু খোলামেলাভাবে বললে এই বিপদে পড়তে হতো না।’
তোমার বন্ধুটির হাতে লেগে একটা কাচের গ্লাস ভেঙে গেছে? দোষটা নিজের কাঁধে নিতে চাও?
ওকে বলো, ‘দোষটা আমারই ছিল। গ্লাসটা যেভাবে টেবিলের পাশে রেখেছি, যে কারো হাতের সাথে লেগেই ভাঙতে পারত ওটা।’
এমন ছোটোখাটো দোষগুলো যখন তোমার কাঁধে নেবে, তোমার বন্ধুটি নিজেকে নিজে বলবে, ‘দোষটা তো আমার নিজের ছিল, অথচ সে এর দায় নিয়ে নিয়েছে!’ হলুফ ধরে বলতে পারি, ওর ভেতরে তোমার জন্য যে অপ্রকাশিত ভালোবাসা ও সম্মান জন্ম নেবে, তা অন্য কেউ অর্জন করতে পারবে না।
কৌশল ৮৯
পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দাও
যখনইবা তুমি কাউকে দেখে ফেলো মিথ্যা বলার সময়, ছিচকে চুরির সময়, অতিরঞ্জিত কাহিনি বর্ণনার সময়, বিকৃত উপস্থাপনের সময়, অথবা কাউকে ঠিকানোর সময়ে, কখনোই তাদের হাতেনাতে ধরতে যেও না। যদি না এটা তোমার দায়িত্ব হয়ে থাকে দোষীকে ধরা বা ভুল শুধরানোর সুযোগ করে দেওয়া। তাকে সুযোগ দেওয়ার অর্য হচ্ছে- অপরাধীকে তোমার ফাঁদ থেকে বের ছতে সাচাম্য করা, তারই একটা কৌশলকে কাজে লাগিয়ে। এরপর ওটার সমাধান করে দাও, দ্রিতীয়বার ওই বিষয় নিয়ে আলোচনারও দরকার নেই। যেন কিছুই হয়নি!
পর্ব ৯০
তোমাদের বসকে ফুলেল শুভেচ্ছা!
তুমি তো দারুণ কাজ করছ! তোমার বসের নাম যেন কী?
একটি পরিপূরক চিঠি ঠিক মধুর সমান। এটি পরিশ্রিতিকে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলে। ফুলের মধু মিষ্টি ও চমৎকার। এরচেয়েও মধুর হচ্ছে, একজন কর্মীর কাছে তার উপরছ কর্মকর্তা।
একবার কিছু জরুরি কাগজপত্র ফটোস্ট্যাট করার দরকার পড়ে গেল। অত্র অঞ্চলে একটাই ফটোস্ট্যাটের দোকান হওয়ায় ওখানেই ছুটে গেলাম। আমার কাগজপত্রের পরিমাণ দেখে দোকানের সহকারী ম্যানেজার একবাক্যে মানা করে দিলেন, কোনোভাবেই এক সপ্তাহে এতগুলো কাগজ ফটোকপি করা সম্ভব নয়। আমার জোরাজুরিতে শেষমেশ তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে। আমি চেষ্টা করব।’
আমি জানি সে চাইলেই এই কাজটা করতে পারে, অন্তত আমার আন্দাজ শক্তি তাই বলে। কাজটা দ্রুত আদায় করে নিতে আমি নতুন ফন্দি আঁটলাম।
আমি পালে একটু হাওয়া দিলাম, ‘আপনার কাজ দেখে বোঝা যাচ্ছে, আপনি কাজে অনেক বেশি দক্ষ। এতগুলো কাজ একার হাতে সামলানো অনেক কঠিন, ব্যাপারটা আমিও বুঝতেছি।’
এরপর আবার বললাম, ‘আপনার বসের নাম যেন কী? আপনার কাজ সত্যিই প্রশংসনীয়। আপনার কাজ সম্পর্কে তার উদ্দেশ্যে একটা প্রশংসাসূচক পত্র লিখতে চাই। কাস্টমারদের প্রতি আপনার প্রচেষ্টা আমার ভালো লেগেছে।’
পরের ফলাফল অভাবনীয়! যেখানে এক সপ্তাহে কাজ শেষ করতে পারবেন না সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সেখানে সপ্তাহ শেষ হবার দুইদিন আগেই তিনি আমাকে সমন্ত ফটোকপির কাজ সম্পন্ন করে দিলেন। পরবর্তীতে যতবার তার ফটোস্ট্যাটে গেছি, আমাকে দ্রুত কাজ করে দিয়েছেন, দোকানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা হলে দোকান থেকে বের হয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেছেন। যেন আমি একজন ভিআইপি!
‘হুম…’, আমি চিন্তা করতে আরম্ভ করলাম, ‘আমি গুরুত্বপূর্ণ কেউ।’
একটা পত্র লিখব বলায় এমন ফলাফল অভাবনীর! এরপর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম, অন্যান্য জায়গায়ও একই কৌশল খাটিয়ে দেখব, আসলেই এটা কার্যকরী কি না?
আমার একজন সহযোগী হ্যারিস একজন সুচতুর ট্রান্জেল এজেন্ট, যার ডিকশনারিতে না বলে কোনো শব্দ নেই। কোনো বন্ধু তার কাছে সাহায্য চেয়ে সাহায্য পায়নি, এমনটা দেখা যায়নি। হাতের চুটকিতে সে যেকোনো কাজ অনায়াসে করে ফেলে। হ্যারিস আমার সেই সহযোগী, যে কি না থিয়েটারের টিকিট পাওয়া যত কঠিনই হোক, আমার সংগৃহ করে দিয়েছে। যখন বিমান কর্তৃপক্ষ জানায় টিকিট শেষ, আমার শেষ ভরসার হ্ল হ্যারিস।
যখন আমি তাকে আমার এই সদ্য প্রয়োগকৃত কৌশলের ব্যাপারে জানালাম, সে হেসে দিল, ‘লেইল, এটা তো আমি অনেক আগ থেকেই জানি। তোমার কাছে এটা নতুন কিছু? কারো বসের কাছে তার কাজের সুনাম করবে, এটা কে না চাইবে? যে তার এত বড় উপকার কারছে, তার প্রতিদান কি সে দেবে না? এই কৌশলটা ঠিক ইস্যুরেন্স করে রাখার মতো, বিপদে কাজে দেবেই শতভাগ।’
কম্পিউটারে বসে একটা চিঠির নমুনা বানালাম। চিঠিটা এরকম-
প্রিয় (বসের নাম),
একটা কোম্পানির জন্য গ্রাহক সেবা কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না, কথাটা আপনার কোম্পানির জন্যও প্রযোজ্য।
এই চিঠিটা পাঠানোর উদ্দেশ্য, আপনার কোম্পানির এই কর্মীর (কর্মীর নাম) গ্রাহক সেবা আমার খুব পছন্দ হয়েছে। (কর্মীর নাম) সম্পর্কে লিখার প্রধান কারণ হচ্ছে, আমার মনে হলো, একটা কোম্পানির গ্রাহক সেবা ঠিক এমনটাই হওয়া উচিত। (কোম্পানির নাম) থেকে আশা করি ভবিষ্যতেও এমন সেবা পেয়ে আসব।
ধন্যবাদান্তে
লেইল (সিগনেচার)
চিঠিটা আমি কয়েকজনকে দিয়েছি। যারা পেয়েছেন তাদের মধ্যে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গার মালির, ইস্যুরেন্স কোম্পানির মালিক এবং ডজনখানেক দোকানের ম্যানেজার রয়েছেন, যেখানে আমার নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। ঠিক এই কারণে আমার কখনোই গাড়ি পার্ক করার জন্য জায়গার অভাব হয়নি, যদিও পার্কিং প্রেস নতুন করে কাউকে ভাড়া দেওয়া হচ্ছিল না। ইস্যুরেন্স এজেন্টদের থেকে খুব দ্রুতই কন্স ব্যাক পেতে থাকলাম এবং বলার অপেক্ষা রাখে না, আমার নিত্য বাজার সদাই করার দোকানগুলোতে পেয়েছি বাড়তি গ্রাহক সেবা।
কিন্তু সাবধান…! কর্মীদের ভুলেও এভাবে বলো না, ‘তোমার বসের নাম যেন কী?’
এভাবে শুনলে ওরা ভয় পাবে, ভাবতে পারে তুমি বসের নাম এজন্যই জানতে চাচ্ছ, কারণ তুমি তার বিরুদ্ধে নালিশ জানাবে! তুমি বরং এভাবে বলতে পারো, ‘তুমি দারুণ কাজ করছ। তোমার বসের নাম যেন কী? আমি চাই সে জানুক, তোমার মতো ভালো কর্মী তার দোকানে আছে। আমি অনশ্যই তাকে চিঠি লিখে জানাব তোমার কথা।’ তারপর সত্যিই চিঠিটা পাঠিয়ে দাও। তুমি বনে যাবে একজন VIP, যতদিন সেই কর্মীটি আছে।
কৌশল ৯০
তোমাদের বসকে ফুলেল শুভেচ্ছা।
তোমার কি একজন কেরানি, হিসাবরক্ষক, ল’ ফার্মের জুনিয়র পার্টনার, দর্গি, গাড়ির মেকানিক্স, থেরাপিস্ট, বাচ্চার শিক্ষক- অথবা অন্য কোনো কর্মজীবীর মনযোগ আকর্ষণ করা প্রয়োজন? অথবা তাদের কাউকে দিয়ে ভবিষ্যতে ফায়দা তুলতে চাচ্ছ? সেক্ষেত্রে তোমার জন্য তাদের বসের কাছে একটা মধুর চিঠি পাঠানোই যথেষ্ট হতে পারে।
পর্ব ৯১
শ্রোতাদের নেতা হও
যেভাবে অনুসারীদের ভিড় থেকে নেতার চোখে পড়বে
জোসেফ এমসি কার্যেইয়ের সময়কালে মার্কিন মুলুকের গোয়েন্দা সংস্থা বেশ তংপর হয়ে উঠেছিল। তারা হানা দিতে থাকল সব রাজনৈতিক সভা সমাবেশে। উদ্দেশ্য একটাই, এমন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা যারা ‘অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ’।
গোয়েন্দাদের চরদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো, কীভাবে ওসব ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে হবে এবং কীভাবে তাদের চিনতে পারবে।
গোয়েন্দা চররা এমন সব ব্যক্তিদের ছবি তুলে রাখতে আরম্ভ করল, যেসব ব্যক্তিরা সমাবেশে সবার আগে হ্যাত তালি দেন, সবার আগে ‘জিন্দাবাদ’ বলে জোরে জোরে স্লোগান দেন, প্রতিটি নির্বাচনী বক্তব্যের পরপরই। গোয়েন্দাদের ভাষ্যমতে, যেসব ব্যক্তিদের মাঝে লক্ষণগুলি বিরাজমান তারা ‘বিপজ্জনক’। তারা এও দাবি করেছেন, সবচেয়ে আত্মবিশ্বাসী ব্যক্তিদের সক্ষমতা রয়েছে একটা ভিড়কে শক্তিশালী করে তোলার এবং আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ করার।
অরাজনৈতিক ভিড়ের মাঝেও একই তত্ত্ব সমানভাবে কার্যকরী। যেসব ব্যক্তিরা সবার আগে সাড়া দেন কোনোদিকে না তাকিয়েই, কেউ জনাব দিচ্ছে কি না সেটাও তারা দেখেন না, হোক সেটা কোনো প্রেজেন্টেশনে অথবা অন্য কোনো ভিড়ে, তারাই ওই সব ব্যক্তি যাদের নেতৃত্ব দেওয়ার গুণাবলি রয়েছে।
যোগ্য ব্যক্তি আগে হাততালি দেয়
তুমি বসে আছ একটি মিলনায়তনে, সাথে আরো আছে তোমার শ’খানেক সহকর্মী। তোমাদের কোম্পানির প্রেসিডেন্ট একটা নতুন ধারণা সবার উদ্দেশ্যে উত্থাপন করলেন, তুমি ওদিকে মনযোগ না দিয়ে এদিক সেদিকে তাকিয়ে আছ। তোমার কী ধারণা? মঞ্চে যিনি কথা বলছেন, এত মানুষের ভিড়ে তিনি তোমায় দেখতে পাচ্ছেন না? তিনি তোমায় দেখতে পাচ্ছেন, আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা এটাই বলে। আমার সমন্ত সহকর্মীরও একই মতামত, মঞ্চ থেকে সবকিছুই দেখা যায়। এমনকি তোমার হাসি, তোমার ঝুঁকে থাকা, তোমার চেয়ে থাকা, তোমার অন্যমনস্কতা, কিছুই তার চোখের আড়াল নয়।
অনুরূপভাবে কোম্পানির একজন প্রেসিডেন্ট যখন সবার সামনে একটা বিষয় উত্থাপন করছেন, তিনি দেখতে পান কোন কর্মীটি অধিক মনযোগী, কোন কর্মীটি অন্মনযোগী, কোন কর্মীটি তার দিকে তাকাচ্ছে, কে তাকাচ্ছে না। মঞ্চ থেকেই তিনি অনুভব করতে পারেন কে তার কথায় সহানুভূতি প্রকাশ করছে এবং কে তা নয়। এমনকি তিনি ওখানে দাঁড়িয়েই বলে দিতে পারেন, কোন কর্মীটি সবচেয়ে যোগ্য, ঠিক তার নিজের মতো। কীভাবে সম্ভব, এটাই ভাবছ তো?
‘সবচেয়ে যোগ্য’ ব্যক্তিরা মঞ্চে দাঁড়ানো প্রেসিডেন্টের সাথে একমত না হলেও তারা তাকে কথা বলা চালিয়ে যেতে সমর্থন করেন। কেন? কারণ তারা জানে, এটা কীভাবে সম্পাদিত হবে। তারা এটাও জানে, মঞ্চে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি বেশি যোগ্য বা কম যোগ্য হোক না কেন, বক্তা হিসেবে তিনি তার শ্রোতাদের সমর্থন চাচ্ছেন।
যখন কোম্পানির বড় কোনো কর্তা তার বক্তব্য শেষ করার মুহূর্তে আসেন, তিনি কৌশলে তার কার্যসাধন করেন, হুট করে সবাইকে নিজের দিকে আকর্ষিত করে তুলেন। তোমাদের কী মনে হয়, তিনি কিছুই দেখেননি? তিনি জানেন না, কে তাকে নিয়ে মজা ওড়াচ্ছিল, কে তার বক্তব্যকে অন্য শ্রোতাদের কাছে অগ্রহণযোগ্য করে তুলছিল? মোটেও না। তিনি সবই জানেন।
যদিও কথা বলার সময় তার মাথা নিচের দিকে ঝুঁকে ছিল, কিন্তু জোসেফ এমসি কার্যেই এর সময়ের গোয়েন্দাদের সেই অন্তর্দৃষ্টিতে তিনি দেখেছেন, তিনি অনুধাবন করতে পেরেছেন, কে হাত তালি দ্বারা বক্তব্যটি উজ্জোধন করেছে, কে চমৎকারভাবে ভিড়কে দীর্ঘ সময় তালি দিতে উৎসাহ দিয়েছে এবং সেটা কতটা উদ্যমী হয়ে, কিছুই তার অজানা নয়।
সবার আগে দুই হাত তুলে সম্বোধন জানানো, সনার আগে দাঁড়িয়ে যাওয়া এবং যদি পরিছিতি ঠিক থাকে সবার আগে ‘জিন্দাবাদ’ বা সমর্পন্নসূচক কোনো শব্দ দিয়ে স্নোগন ধরা, তোমাকে মঞ্চে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিটির চোখে একজন ‘বড় ব্যক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করবে।
সবার প্রথমে হাত তালি দাও, যত ছোটো সে ভিড়ই হোক, অগনা যত অদরকারি কথাই বলা হোক। অন্যরা কীভাবে সাড়া দিবে, তা দেখার জন্য অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
তোমাদের ভিড়টা যদি মাত্র তিন থেকে চারজনেরও হয় কোনো ব্যাপার না, তুমিই প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বক্তার চিন্তা চেতনার সাথে সহমত প্রকাশ করো এবং সবার আগে বলে ওঠো, ‘দারুণ বলেছ।’ এটা প্রমাণ দেবে, তুমি তার তার মতামতের উপরে ভালো ধারণা রাখো। তুমি তার চোখে বনে যাবে বিশ্বস্ত কেউ একজন।
কৌশল ৯১
শ্রোতাদের নেতা হও
মঞ্চে দাঁড়ানো বক্তা যত বড় ব্যক্তিই হোক, ভেতরে ভেতরে তিনি এই ভয়ে থাকেন, শ্রোতা তাকে গ্রহণ করছে তো? শ্রোতাদের ভিড়ের মাঝে কেউ একজন পুরো ভিড়টাকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, এটা দেখেই মঞ্চে দাঁড়ানো বড় ব্যক্তিটি বুঝে যান, ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা ব্যক্তিটিও নির্যাত একজন ‘বড় ব্যক্তি।’
প্রথম ব্যক্তিটি তুমিই হয়ে যাও, যে হাত তালি দিয়ে বক্তাকে স্বাগত জানায়, অথবা তুমি ওই ব্যক্তিটি হয়ে যাও, যে বক্তার কথাকে সবার আগে সমর্থন জানান।
পর্ব ৯২
কার পয়েন্ট কত?
নিচের জন কুঁকেন বেশি, চেঁচান কম
যেকোনো মিনিটে, যেকোনো সেকেন্ডে ফুটবল ভক্তরা চাইলেই খেলার ফোর জেনে নিতে পারে। এমনকি ঘুমে কাতর জর্জকে জিজ্ঞেস করে দেখো, সে বলে দেবে কে
জিততে যাচ্ছে, কে হারতে যাচ্ছে। একেবারে সুন্দরভাবে পয়েন্ট টেবিলের হিসেবটাও বুঝিয়ে দেবে।
মানুষের জীবনকে যদি ফুটবল খেলার সাথে তুলনা করি, তবে জর্জের মতো ব্যক্তিরাই হচ্ছে মানব জীবনের আসল খেলোয়াড়। তারা চুটকিতে সব কিছু বলে দিতে পারেন। তুমি ভেবে আছ, তারা ঝিমাচ্ছে, অথচ তারা ওই অনহায়ও সর্বোচ্চ সচেতন এবং বলে দিতে পারবেন ব্যক্তি তিনি ও অন্যদের ক্ষোর- এর মাঝে বন্ধু-বাঙ্গব আত্মীয়ষ্মজনও অজ্রুক্ত। তারা জানেন এই মাঠে কে জিততে যাচ্ছে, কে হারছে এবং কে কত পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ছে!
যখন দুজন জাপানি ব্যবসায়ী সাক্ষাৎ করেন, এটা বিবেচনায় নিতেই হবে, তাদের মাঝে কে উপরে আর কে নিচে? এটা বোঝা যায় যখন তারা ঝুঁকে একজন আরেকজনকে সন্মান জানান (মর্যাদায় নিচের ব্যক্তি অত্যধিক ঝুঁকেন)।
আমেরিকায় অবশ্য ঝুঁকে উপর-নিচ দেখানোর এইরকম কোনো পদ্ধতি নেই, তবে ব্যবসায়িক স্টেডিয়ামে সবাই জানেন, কে বড় খেলোয়াড় আর কে ছোটো (এই অবহান সদা পরিবর্তনশীল)।
মর্যাদায় নিচের জন অত্যধিক ঝুঁকেন। তারা অবশ্যই নিজেদের মাঝে একটা ব্যবধান রাখবেন। কম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিটির উচিত উপরের মর্যাদার ব্যক্তির অফিসে দেখা করার প্রস্তাব করা। অথবা যদি শোভা পায় তবে কোনো একটা রেস্টুরেন্টে দেখা হতে পারে, সেক্ষেত্রে অবশ্যই বড় ব্যক্তিটির সময়ের গুরুত্ব রেখে। যদি নিচের জন উপযুক্ত ব্যবধান দেখাতে ব্যর্থ হন, এর অর্থ তিনি মাথা ঝোঁকাতে রাজি নন। নিচের ব্যক্তিটি এর মাধ্যমে ব্যবসায়িক মাঠে আনাড়ি খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন, যার একটাই অর্থ- তিনি বাদ পড়ে যাচ্ছেন।
ঠিক এমনটাই ঘটেছিল আমার বাঙ্গবী লরার সাথে, যে কি না স্বাস্থ্যকর মিল্কশেক বানাতে পছন্দ করত। (মনে আছে কৌশল নাম্বার ৭০-এ আমরা তার ব্যাপারে আলোচনা করেছি?)
যখন আমরা শেষবার লরার সাথে ছিলাম, দেখেছিলাম সে কীভাবে নিজের সুযোগগুলো ধ্বংস করে চলেছে! সুপার মার্কেট চেইনের এক বড় খেলোয়াড় ফ্রেড, তার কথাও নিশ্চয়ই মনে আছে? লরা, ফ্রেডকে মোটামুটি নানা কর্মকাণ্ডের ঘারা বিরক্তই করে তুলেছিল। প্রথমেই মেইল আড্রেস চেয়ে বসল, তারপর একে একে কলমের কালি নেই বলে অভিযোগ করতে থাকল, ফ্রেডকে কলম আনতে গিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখল, নাম্বার ভুলভাবে লিখল, বিরক্তিকর সব কর্মকাও!
তোমরা জেনে অবাক হবে, আমি সেবার সবচেয়ে বাজে ঘটনাটার বর্ণনাই করিনি! এত কিছুর পরেও লরাকে ফ্রেড ডিল থেকে বাদ দিয়ে দেয়নি। ফ্রেড তার মিল্কশেকের একটা নমুনা পাঠাতে বলল। ওটা দেখে সে তার রায় জানাবে। এই অংশে লরা আবার আগের মতো ভুল করল, এবারের ভুলটা একটু বড় ও নির্বোধের মতো শোনাল। লরা জানতে চাইল কোন কুরিয়ারটা সে ব্যবহার করবে?
ফ্রেড জানাল, ‘FedEx!’
‘আমার মিছ্ছেশেকগুলো আবার ঠান্ডায় রাখতে হয়। FedEx-এর কি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোনো সেবা রয়েছে? নইলে কিন্তু আমি FedEx দিয়ে পাঠাতে পারব না।’ লরা অবাক হয়ে বলল।
আগের ছোটোখাটো ভুলগুলো ঝোড়ে ফেলা যায়, কিন্তু এনারের ভুলটা ওদের ডিলটাকে পুরোদমে শেষ করে দিল। লরা এমন অঙ্কুত সব প্রশ্ন করেছে, আমার নিজেরই লজ্জা লেগেছে। মনে মনে বললাম, ‘লরা, আরেকটু পরিণত হও৷’ লরার মোটেও উচিত হয়নি সুপার মার্কেটের এত বড় একজন ব্যক্তির কাছ থেকে কুরিয়ার বিষয়ক জবাবদিহিতা নেওয়ার। ফ্রেড তাকে একটা সুযোগ দিয়েছে, এই খুশিতে সে একটা গাড়ি ধরিয়ে, নিজেই মিছ্ছেশেকটা পৌছে দিতে পারত। আমার বাঙ্গবীটা ব্যবসায়িক ফিন্ডের নীতিটা ভঙ্গ করেছে, তার যতটুকু ঝুঁকার কথা ছিল, যতটুকু নমনীয় হওয়া উচিত ছিল, সে এর বিন্দুমাত্রও করেনি, ফলে ওখানেই সে বাদ পড়ে গেছে।
বড় ব্যক্তিরা খাতায় কলম রাখার পূর্বে, কী-বোর্ডে আঙুল রাখার পূর্বে, ফোন কানে লাগানোর পূর্বে, অথবা কারো হাতে হাত মেলানোর পূর্বে একটা দ্রুত হিসেব নিকেশ করে নেন। তারা নিজেদের নিজেরা প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের এই সম্পর্কের ফলে কে সবচেয়ে বেশি লাভবান হচ্ছেন? আমাদের দুজনের সাম্প্রতিক কর্মকাও আমাদের মাঝে কী ব্যবধান সৃষ্টি করেছে? কে ঝুঁকেছে?’
সর্বশেষ এই প্রশ্নটা মাথায় আসে তাদের, ‘নিজের পয়েন্ট বাড়াতে আমার করণীয় কী?’
বন্ধুরা নজরও রাখে
এই পদ্ধতি শুধুমাত্র ব্যবসায়ীদের জন্য ভাবলে ভুল হবে, এটা ব্যক্তি জীবনেও সমানভাবে কাজ করে।
বেশ ক’মাস পূর্বে একটা সম্মেলনে আমি চার্লস নামের এক ভদ্রলোকের সাথে পরিচিত হই। কার প্রিয় খাবার কী, এটা নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম। ভদ্রলোকের প্রিয় খাবার তালিকায় রয়েছে ঘরের তৈরি পাস্তা, সাথে একটুখানি টমেটো সস। আমি টমেটো সস বানাতে পারতাম, এদিকে চার্লসকেও আমার পছন্দ হয়ে গেল। তাকে সামনের মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে বাসায় আসার নিম্নত্রণ জানালাম, সেও এক বাক্যে রাজি হয়ে গেল এবং বলল, ‘আমি অবশ্যই আসব।’
নির্ধারিত দিনের বিকেল থেকে রান্নাবান্না শুরু করে দিলাম। আমার দেয়াল ঘড়িটা ঘণ্টায় ঘণ্টায় ঢং ঢং শব্দ করে জানান দিচ্ছিল, লেইল সময় ঘনিয়ে আসছে। সন্ধ্যার আগে আগে আমার রেসিপি প্রায় শেষের দিকে, তখন ঘড়িটা ঢং ঢং করে জানান দিল, লেইল আর মাত্র আধা ঘণ্টা বাকি! বারবার স্রষ্টাকে ডাকছিলাম, যাতে ঠিক টাইমে সব শেষ হয়।
সাড়ে সাতটা বাজে এমন সময়ে আমার সব আয়োজন শেষ হলো, তাড়াতাড়ি নিজের ড্রেসটা চেন্ন করে আসলাম। সমন্ড কিছুই তৈরি, ভেতর থেকে খুশিতে বলে উঠলাম।
রাত আটটা বাজে ঘড়িটা আবার চং চং করে জানান দিন, লেইল, তোমার মেহমান এখনো আসেনি। আমি কোমল পাণীয়জল মুখে নিলাম, মনে মনে বললাম, এখনই এসে পড়বে। রাত নটার দিকে আমার আর বুনাতে বাকি রইল না, চার্লস আসছে না। আমি উঠে দাঁড়িয়ে গেলাম, মিছে অপেক্ষার কোনো মানে হয় না।
পরদিন চার্লস ফোন করল, ভ্যান্সদয় নিয়ে না আসার কারণ জানাল। তার প্রাইভেট কার সমস্যা করছিল, জানাল চার্লস, ‘লেইল, আমি দুঃখিত।’ আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। সমস্যা নেই।’
(মুখে ওটা বললেও মনে মনে বলছিলাম, ‘চার্লস আমাকে কি বোকা পেয়েছ? তোমার গাড়ি খারাপ ছিল এটা একটা বাজে গল্প ছাড়া কিছুই নয়। তোমার ফোনও কি খারাপ ছিল? ফোন দিয়ে বলা যেত না? নাকি তুমি এমন গ্রহে বাস করো, যেখানে কোনো ফোন নেই?’)
সে অনুতপ্ত হয়ে কথা বলছিল, বোঝাতে চাচ্ছিল ব্যাপারটা ভুলে যাওয়াই উত্তম। বড় ব্যক্তিদের মতো সে আমাকে এর খেসারত স্বরূপ কোনো একটা বড় ইটালিয়ান রেস্ট্রৈরেন্টে পান্তার সাথে সস দিয়ে খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানাতে পারত। এবারও চার্লি ভুল করল, সে আমাকে বলল, ‘আরেক দিন আমার বাসায় আসবে কি না?’ কখনো নয় চার্লস।
কৌশল ৯২
কার পয়েন্ট কত?
দুজন খেলোয়াড় একই সাথে হেঁটে যাচ্ছেন। দুজনের র্যাংকিং, পয়েন্ট তার মাথার উপরে গ্রাফিকস দিয়ে দেখানো হচ্ছে। একজনের ক্ষোর বেশি একজনের কম, ক্ষোর পরিবর্তনশীল, কিন্তু বেশি ক্ষোরধারী এবং কম ক্ষোরধারীর মাঝে ব্যবধান থাকবে এটা অপরিবর্তনীয়। ব্যবধান থাকবেই, এটাই রুলস। বড় ক্ষোরধারী এবং ছোটো ক্ষোরধারী সবসময় ব্যবধান বজায় রাখবে, এই রুলস যে ভাঙবে, সে ব্যবসায়িক দুনিয়া থেকে ছিটকে পড়বে, এমনকি ব্যক্তি জীবনেও।
