হাউ টু টক টু এ্যানিওয়ান – ৮
অধ্যায় আট
যেভাবে রাজনীতিবিদদের চর্চিত পদ্ধতি কোনো
অনুষ্ঠানে খাটাবে
যেকোনো অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে রাজনীতিবিদদের ছয়টি নজরতালিকা কোনো অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ পেলে আমাদের মাঝে সবার প্রথমে যেই ছবিটা ভেসে গঠে, তা হলো ভুঁড়িভোজ। কেমন খাবার দাবার হবে, কে কে আসতে পারে, আমার কোন কোন বন্ধু দাওয়াত পেয়েছে, কী পোশাক পরে যাব, এসব সাধারণ প্রশ্নই আমাদের মনের মাঝে উকি দিতে থাকে।
অথচ একজন রাজনীতিবিদ, একজন দক্ষ যোগাযোগকারী কিংবা একজন সফল ব্যক্তি এর উল্টোটা চিন্তা করবে। যেকোনো নিমন্ত্রণ গ্রহণের পূর্বে ছয়টা প্রশ্ন তাদের
মাথায় ঘুরতে থাকে। সেগুলো হচ্ছে- কে? কখন? কী? কেন? এবং কীভাবে?
এই প্রশ্নের উপরে ভিত্তি করেই তারা জানাবে, তারা ওখানে যাচ্ছে নাকি যাচ্ছে না।
অনুষ্ঠানে কারা কারা উপস্থিত থাকবেন?
একজন নেটওয়ার্কার আগেই হিসেব করে নেয়, ওখানে গেলে আমি কার সাথে পরিচিত হতে পারব? তাঁর সাথে পরিচিত হয়ো আমার ব্যবসায়ের উপকার হবে তো? সামাজিক কাজকর্মে তাঁর সাহায্য পাব তো?
নির্ধারিত অনুষ্ঠানে কে কে আসবেন? এর উক্ত অজানা ছলও সমস্যা নেই।
রাজনীতিবিদরা সরাসরি আয়োজককে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেন, ‘ওখানে আর কে কে আসছেন?’
কে কে আসছেন তার উপরে নির্ভর করছে তিনি যাবেন কি না? পূর্ব পরিচিত কেউ থাকলে আসার পাল্লাটা ভারী হয়ে গুঠে। অথনা এমন কেউ আসবেন, গার সাথে পরিচয় হলে তার ব্যক্তিগত উপকার রয়েছে।
আমার কখন উপছিত হওয়া উচিত?
রাজনীতিবিদরা জ্ঞেসের চেয়েও সময়ের দিকে বেশি মনযোগী থাকেন। ঠিক কখন
তারা সভাহ্বে উপছিত হবেন এবং কোন সময়টা বের হয়ে হবেন, এটা নির্ধারণ
করে তবেই ঘর থেকে বের হন।
অপর দিকে বড় বড় সফল ব্যক্তিদের হিসেবটা একটু ভিন্ন। কী পরিমাণ নতুন
মানুষদের সাথে পরিচিত হওয়া যাবে তার উপরে নির্ভর করছে তাদের অনুষ্ঠানে
উপছিত হওয়া এবং সভাহ্ব ত্যাগ করা।
যত সকালে আসা যায় তত নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
সবার আগে গেলে এই সুবিধা, অনুষ্ঠান শুরুর পূর্বেই আশপাশে অনেক মানুষের
সাথে চেনাজানা হয়ে যায়। ভিআইপি ব্যক্তিদের সাথে পরিচিত হতে গেলে আগে
আসাই বাঞ্ছনীয়। যত দীর্ঘক্ষণ থাকা যায় ততই মঙ্গল।
আমার সাথে কী নিয়ে যাব?
রাজনীতিবিদরা স্বভাবতই অনুষ্ঠানে কী কী খাবেন, এ নিয়ে তটত্ত্ব থাকেন না। তার অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পূর্বেই প্রয়োজনীয় দরকারি জিনিস সাথে নিয়ে নেন।
অনুষ্ঠানে যদি কর্পোরেট লেভেলের লোকদের সমাগম বেশি থাকে, তবে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পকেট ভর্তি থাকে বিজনেস কার্ড।
অনুষ্ঠানে যদি সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের আনাগোনা বেশি হয়, তাদের পকেট ভর্তি থাকে নরমাল কার্ড। যার উপরটায় শুধু নাম আর ঠিকানা দেওয়া থাকে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটা তারা করেন, সেটা হচ্ছে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিবর্গের সাথে পরিচিত হয়ে তাদের নাম্বারটা টুকে নেওয়া।
অনুষ্ঠান আয়োজনের গৃহু অর্থ কী?
কম্বলের উপর থেকে দেখে ভেতরের অবস্থা বোঝার উপায় নেই। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা হন খুবই চতুর। তারা শুধু কম্বলের উপরটা দেখেই সঞ্চিষ্ট নন, বরং ভেতরে কী থাকতে পারেন তাও তাদের এখনীয়ারের নিষয়।
-একজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক তার মেয়ের প্রাজয়েশন শেষ উপলক্ষে পার্টির আয়োজন করলেন।
-সদ্য স্ত্রীর সাথে ছাড়াছাড়ি হওয়া এক কর্মকর্তা তার জন্যাদিনের আয়োজন করলেন।
-এক ব্যবসায়ী দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সবাইকে ডেকে খাওয়াচ্ছেন।
উপরের প্রত্যেকটা ঘটনা আদতে দেখতে খাভাবিক মনে হলেও ওসবের পেছনের গুঢ় অর্থ বোঝার ক্ষমতা একজন রাজনীতিবিদ রাখেন। তিনি জানেন নিশিষ্ট ভ্রদ্রলোক তাঁর মেয়ের গ্রাজুয়েশন উপলক্ষে পার্টির আয়োজন করলেও তাঁর উদ্দেশ্য ভিন্ন। সদ্য পাস করা মেয়েটার চাকরির একটা গতি যদি এই পার্টি থেকেই হয় যায়! কত বড় বড় কর্মকর্তাকে তিনি দাওয়াত করেছেন, গুঢ় অর্থ কিন্তু ওই চাকরি!
আবার একজন সদ্য ডিভোর্সপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শোকে কাতর না হয়ে নিজের জন্যাদিন ধূমধাম করে করছেন। তিনি চাচ্ছেন নিজের একাকী জীবনের অবসান ঘটিয়ে নতুন কারো সাথে জুটি বাঁধতে। হয়ত এই জন্যাদিনের পার্টিতেই তিনি কাউকে খুঁজে পাবেন!
ব্যবসায়ী ভ্রদ্রলোক দশ বছর ব্যবসা করেছেন এবং তিনি ভবিষ্যতেও ব্যবসায় টিকে থাকতে চান। আর টিকে থাকতে গেলে পাবলিক রিলেশন বড় ফ্যাক্টর।
একজন চতুর রাজনীতিবিদ সবই বোঝেন, কিন্তু প্রকাশ করে দেন না। তিনি সুযোগ পেলে মেয়েটাকে এমন কারো সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, যার থেকে ওর চাকরি লাভের সুযোগ আসতে পারে।
ভিভোর্সপ্রাপ্ত পুরুষটিকে দেখিয়ে কোনো নারীর উদ্দেশ্য করে বলেন, এমন সুদর্শন পুরুষ কেন আরেকটা বিয়ে করছে না?
ব্যবসায়ী ভ্রদ্রলোকের অনুষ্ঠান সম্পর্কে পজেটিভ কিছু কথা রিপোর্টারকে বলেন যাতে তার ব্যবসায়ের সম্মান বাড়ে।
ফলে উক্ত ব্যক্তিকে আয়োজকরা পরবর্তী অনুষ্ঠানের জন্য অগ্রিম সিলেকশন করে রাখেন। এমন উপকারী বন্ধুকে হাতছাড়া করা যায়? যিনি কিনা আসল গুঢ় অর্থ বুঝতে পারেন!
কোন পেশার মানুষজন ওখানে থাকবেন?
একজন ডাক্তার কিংবা একদল ডাক্তার একই সাথে একদল ইঞ্জিনিয়ারদের সাথে মিশে যেতে পারবে। না পারলেও আপস করে নেবে। সেক্ষেত্রে কে আসছে না আসতে তা নিয়ে এত মাথা ঘামায় না।
একজন রাজনীতিবিদ ঠিক উল্টোটা করেন। অনুষ্ঠানে কে কে আসবে সেটা প্রথমেই গুরুত্বপূর্ণ। আর যারা আসবে তাদের ব্যাপারে আয়োজক তাঁর সাথে আলাপ আলোচনা না করলে অনুষ্ঠানে হয়ত তিনি আসবেনই না। কারণ তার কাছে বিষয়টা খুবই গুরুত্ব রাখে যে, সভায় কারা থাকছে?
যদি ডাক্তাররা থাকেন, তবে তিনি ডাক্তারদের সাথে কথা বলার মতো কিছু তথ্য উপাত্ত জোগাড় করে নেবেন।
সমাজ সেবক আসলে, সমাজসেবা নিয়ে তথ্য জোগাড় করে যাবেন। তারা কপনোই প্রিগারেশন ছাড়া যান না।
‘কে কে আসছে?’ এই প্রশ্ন যেমন তারা অসাধাকার দেন, তেমনই ‘তাদের সাথে কীভাবে কথা বলতে হবে।’ এটাও সমান শুরুত্ব দিয়ে তবেই অনুশীলন করেন।
আমি কীভাবে অনুষ্ঠান থেকে সুবিধা নিতে পারি?
নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হয়ে শুধুমাত্র বিজনেস কার্ড লেনদেনই শেষ নার বরং রাজনীতিবিদরা অনুষ্ঠান শেষেও কার্ডগুলো যত্ন করে রাখেন। অবসরে ওগুলো খুলে দেখেন, কার্ডগুলোর ব্যক্তিদের নামগুলো পড়েন। চিন্তা করতে থাকেন, তাকে কি সরাসরি কন্স করে কথা বলা উচিত? একটা চিঠি পাঠিয়ে স্বরণ করিয়ে দেওয়া যায়? নাকি ইমেইল করা যায়?
হুট করে উক্ত ঠিকানায় উপস্থিত হয়ে দেখা করে ফেলাটাও তাদের কার্যক্রমের ভেতরে পড়ে। কারো সাথে শুধু পরিচিত হলেই শেষ নয়, বরং তাদের সাথে পরবর্তীতে যোগাযোগ করাও তাদের অন্যতম গুণ।
পর্ব ৭১
ভুঁড়িভোজন নাকি পরিচিতি?
কেন মানুষজন এসে পরিচিত হচ্ছে না?
একজন সাধারণ সদস্য পার্টিতে এলে শুরুতেই নিজের পরিচিত কোনো ভিড়ে গিয়ে মিশে পড়েন। তারপর প্রেটে কিছুটা খাবার তুলে অন্যদের সাথে খোশগ্নে মজে উঠেন। আশপাশে চোখ বুলিয়ে তিনি নতুন অনেক মুখ দেখেন। অবচেতন মনে আশাও করেন কেউ একজন তার কাছে এগিয়ে আসবে। কথা বলবে। কিন্তু সেটা অধিকাংশ সময়ই হয় না।
পেছনের দৃশ্য এটা যে উক্ত কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি যখন দেখেন তুমি খাবার নিয়ে ব্যন্ত, মনে মনে ভাবতে থাকেন, ‘ভদ্রলোক খেয়ে শেষ করে নিক। পরে কথা হবে।’ ‘পরে’ সময়টা আর কখনোই আসে না। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি নতুন কারো সাথে মিশে যান, ফলক্রতাতে পরিচয়টা আর হয়ে ওঠে না।
তুমি কি কখনো কোনো পশ্চর খামারে ছিলে? কীভাবে ওদের খাওয়ায় দেখেছে? অখবা, তোমার নিজের পোষা প্রাণিকে খাইয়েছে কখনো?
খাওয়ার সময় তুমি যেমন গুটাকে ঘাঁটাও না, খেতে থাকা মানুষকেও তেমন অন্যরা বিরক্ত করে না।
একজন সফল রাজনীতিবিদ পার্টিতে আসার আগেই খেয়ে বের হন। ফলে খাওয়ার সময়টা তার নষ্ট হয় না। নিজের বিজনেস কার্ড দেওয়া নেওয়ায় সর্বোচ্চ সময় কাটিয়ে দেন। তার দুই হাত ব্যবস্থাপনার করে, মেখানে অন্যরা খাওয়া দাওয়ার পেছনে সময় নিশ্চয়ে করেন।
কৌশল ৭১
রূপঞ্চিভোজন নাকি পরিচিতি?
একসাথে রূপঞ্চিভোজনও হবে আবার অজন্য মানুষের সংস্কারণে আসা যাবে, এটা আশা করাও পাপ।
খাওয়া দাওয়ার উদ্দেশ্যে গেলে খাওয়া দাওয়া, আর নতুন মানুষের সাথে পরিচিত হতে গেলে নতুন মানুষদের পেছনে সময় দিতে হবে। একই সময় দুটো কাজ করা সম্ভব নয়।
এজন্যই রাজনীতিবিদ, সফল ব্যক্তিরা বাসা থেকেই খেয়ে বের হন। অনুষ্ঠানের পুরোটা সময় তারা নতুন মানুষদের সাথে পরিচিত হন। বিসনেস কার্ড দেওয়া নেওয়া করেন। ফলে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের পরিচিত লোকদের সংখ্যা গানিতিক হারে বাড়তে থাকে।
পর্ব ৭২
পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে নাও
যেভাবে তোমার প্রবেশের মুহূর্তকে করে তুলবে অবিন্দুরণীয়
সূপরিচিত ব্যক্তিদের কোনো অনুষ্ঠানে প্রবেশের মুহূর্তটা খেয়াল করেছ?
তারা হুট করে এসেই ঢুকে যায় না। তারা আলাদা কোনো সুযোগও পেয়ে বসে না।
অখচ তোমার প্রবেশ এবং তাদের প্রবেশের ভেতরে আকাশ পাতাল তফাত!
তারকা খ্যাতি কুড়ানো প্রত্যেকটা ব্যক্তিকে আলাদা করে খেয়াল করো। তারা ব্যক্তিত্বে স্বতন্ত্র হলেও তাদের কোথায় যেন মিল খুঁজে পাওয়া যায়। শুণী মানুষরা কক্ষে প্রবেশ করলেই যেন সব চাঙ্গা হয়ে যায়। একেবারে ফকফক করে সব সতেজ হয়ে ওঠে।
কেউ কেউ বলে থাকেন, এই শুণটি জন্মগতভাবে তারা পেয়েছেন। নয়ত তারা ঢুকতেই সব চাঙ্গা হয়ে ওঠে কেন? কেনইবা সনাই তাকে নিয়ে কথায় মুখরিত হয়? খোঁজ নিলে জানতে পারবে, তা মোটেও সত্য নয়। সমন্ত বড় ব্যক্তিরা একটা কমন সূত্র মেনে চলেন। আর তা হলো, কোথাও প্রবেশের পূর্বে একটু সময়ের জন্য থামা। তারপর গভীরভাবে সবটা পর্যবেক্ষণ করা। ব্যাস! এর বেশি কিছুই নয়।
একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বও একই সূত্রটা মেনে চলেন। ঢোকার পূর্ব মুহূর্তে, একটু সময় বিরতি দেন। তাকিয়ে দেখে নেন, ভেতরে কে কোথায় অবহ্বান করছে এবং তারা কী করছে? তাদের জন্য সবচেয়ে শুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, নাছাই করা। কার সাথে শুরুর মোলাকাত করা উচিত, এটাই মনে মনে জেনে নেন তারা। তার অবস্থানটা পাকাপোক্ত করে নেন।
এভাবে তিন থেকে চারজনের অবস্থান পরিক্ষার করে তানেই তিনি জেতরে প্রবেশ করেন। এগিয়ে যান কাক্ষিকত ব্যক্তির কাছে। যেহেতু সনার অবস্থান জানাই থাকে, ফলে আবিশ্বাস থাকে চণ্ডা।
মানসিকভাবে সতেজ থাকা একজন সফল ব্যক্তির জন্য অনেক বেশি শুরুত্বপূর্ণ।
কৌশল ৭২
পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে নাও
কোনো ভিড়ে প্রবেশের পূর্ব মুহূর্তে খানিক সময়ের জন্য দাঁড়াও। একবারের জন্য সবার দিকে তাকিয়ে তাদের অবস্থান এবং তারা কী করছে, দেখে নাও। তোমার পর্যবেক্ষণ যেন একজন সোয়াত টিমের সদস্যের থেকে কম না হয়। খেয়াল রেখো, কেউ যেন তোমার চোখ এড়িয়ে না যায়। সবার অবস্থান জানার একটাই অর্থ, তুমি আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। এবার ঢুকে পড়তে পারো।
পর্ব ৭৩
তুমিই চুজ করো, নয়তবা অন্য কেউ এসে তোমায় চুজ করবে
কোন ব্যক্তিটির সাথে আমার পরিচিত হওয়া উচিত?
মনুষ্টানে উপছিত ব্যক্তিবর্গের পরিচয় না পেলেও একজন রাজনীতিবিদ তার পথেই থাকেন। তিনি এই মানসিকতা নিয়েই ওখানে প্রবেশ করেন, আমার এখান থেকে ফায়দা নিতে হবে। যেমনটা সফল ব্যক্তিরা ভাবেন ‘এখানে আমার জন্য কী আছে?’ প্রথমে কার সাথে দেখা করবেন এটা তিনি ওখানে দাঁড়িয়েই নির্ধারণ করে নেন।
হুট করে কারো কাছে ছুটে যাওয়ার চেয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার ব্যবহার বেশি সাহায্য করবে। এই পার্টিতে কোন মানুষটি খুব স্পেশাল? কার সাথে পরিচিত হলে তোমার লাভ হবে? এগুলো একটা আনুমানিক আন্দাজ করা যায়। অচেনা একজন ব্যক্তির দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকাটা অন্বিত্তিকর। এই কারণেই আমাদের অধিকাংশ এই স্টেজে এসে আর আগাতে পারে না।
অথচ তুমি যখনই কারো উপর দীর্ঘ সময় নিয়ে পর্যবেক্ষণ করতে থাকবে, খুব সহজে তার ব্যক্তিত্ব ধরে ফেলতে পারবে। তার উপরে মানুষের অঘ্রহ, তার আচার ব্যবহার তোমাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেবে, এই ব্যক্তি ‘সফলদের কেউ একজন।’ তার সাথে পরিচিত হওয়া আবশ্যক।
মানুষ তেত্রিশ বছর বসয়ে তার চেহারায় এমন একটা গঠন পায় যা সে এতদিন চেয়ে এসেছে। এটাও তোমায় সাহায্য করবে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে একবার এক্সপেরিমেন্ট চালিয়েছি। কয়েকজনকে একটা কুমে ছেড়ে দিয়ে বললাম, যেকোনো চারজনকে তোমরা চুজ করো, যাদের ব্যক্তিত্ব তোমাদের আকৃষ্ট করে।
কেউ তোমাকে চুজ করার পূর্বে তোমারই তাকে চুজ করতে হবে। এতে বোঝা যাবে তোমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ঠিক কতটুকু। আমার চিত্র শিল্পী বন্ধু বন এই কঘাটা খুব বলে, ‘মানুষের আচার-আচরণ তার ব্যক্তিত্বের পুরোটাই ধারণ করে।’
শুধুমাত্র সুদর্শন মানুষদেরই চুজ করা হবে
অনেকের মাঝে কয়েকজনকে পছন্দ করা খুবই কঠিন কাজ। কিন্তু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে কঠিন কাজটা সহজ হয়। তুমি যখন কারো চেহারায় গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবে, এমন অনেক গুণ তোমার চোখে আসবে যা পূর্বে তুমি খেয়াল করোনি।
আমার এক বন্ধু লরিং। খাটো, মোটা নাক আর মোটা শরীরের কারণে খুব বেশি মানুষ ছারা সে আকর্ষিত হতো না। দেদিন সে স্টেজে দাঁড়িয়ে কিছু একটা বলছিল। আমি তার দিকে একটু মনযোগ দিয়ে দেখলাম, সে কী বলে? তার কথা বলার ধরন বেশ আকর্ষণীয়, যা আমি আগে খেয়াল করিনি। এরপর লরিং এরপর সাথে আমার বন্ধুত্ব টিকেছিল ১২ বছর, অথচ পূর্বে তাকে আমার ভালো লাগত না।
সবার মাঝেই কোনো না কোনো গুণ রয়েছে। তোমার দৃষ্টিশক্তির উপরে নির্ভর করছে, তুমি সে গুণ খেয়াল করছ কি না? বাহ্যিক সৌন্দর্য আর গুণী মানুষ এক নাও হতে পারে, বিষয়টা স্মরণে রেখো।
তুমই কাউকে আগেভাগে চুজ করো, কেন না নয়ত এমন কেউ এসে তোমাকে চুজ করবে যাকে তুমি চাও না।
কৌশল ৭৩
তুমই চুজ করো, নয়তবা অন্য কেউ এসে তোমায় চুজ করবে
আজ থেকে দশ বছর পর তোমার আশপাশে এমন সব অন্তরঙ্গ বন্ধু পাবে, যাদের
তুমি এখনো দেখাই পাওনি!
কারণ মানুষের জীবনে কখন কে আসবে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। ধরো দশ
বছর পর কী ধরনের মানুষদের তুমি আশপাশে চাচ্ছ, তা তুমি এখনই নির্ধারণ করে
নিতে চাও। তাহলে বেছে বেছে ওই ক্যাটাগরির মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব করতে শুরু
করো। মনে রেখো তুমি কাউকে চুজ না করলে অন্য কেউ এসে তোমাকে চুজ
করবে। সিদ্ধান্ত তোমার, লাটাই কার হ্যাতে রাখবে না কি?
কোনো একটা পার্টির এক ভদ্রলোককে তোমার পছন্দ হলো, সে এসে তোমার সাথে পরিচিত হবে এই আশায় বসে থাকা লোকসি। বয়ং তুমিই এগিয়ে যাও, তার সাথে পরিচিত হও। পাছে পরে আর পরিচয়ই হলো না।
সেমিনারে এটা অনেক সোজা, কিন্তু বাচ্চে জীবনে?
উপরের অংশটা পড়ে হয়ত খটকা লাগতে পারে আমরা কী সম্পোধন করে গেদের সাথে কথা বলব? আমি তো তাকে চিনিই না!
আমার এক পরিচিত বাক্তি, টেড, তাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘টেড, তুমি কীভাবে অনের সাথে পরিচিত হবে এমন সব মুহূর্তে?’
টেড একটু বেকায়দায় পড়ে গেল। মিনমিন করে বলল, আমি এডাবে বলল, ‘হালো, আমি টেড বলছি। তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।’
টেড এমন বাজে উত্তর দেবে আমি ধারণাও করিনি। টেডের মতো এভাবে বলে নিজের ভ্যালু নষ্ট করার কোনো মানেই হয় না।
তোমাদের জন্য আমি এই অংশটা লিখছি।
তুমি হেল্ট জানতে চাইবে, ‘হ্যালো, আমি অমুক বলছি। অমুক (অনুষ্ঠান আয়োজক) সম্পর্কে যেন আপনার কী হন?’
এভাবে জিজ্ঞেস করার বড় সুবিধা হলো, সে তোমাকে ভাববে, তুমি হোস্টের কাছের কেউ। অত্তত দূরের কেউ ভাববে না।
‘আপনি কি এই এলাকাতেই থাকেন?’
এই প্রশ্নটা যখন কাউকে করবে, সে হ্যাঁ অথবা না তে জবাব দেবে। এরপর তুমি আয়োজকের সাথে তোমার কী সম্পর্ক এই বলে, তার সাথে কথা চালিয়ে যেতে পারবে।
পর্ব ৭৪
হাত উচিয়ে ধরো
তোমার শরীরিক ভাব্য বলে দেবে, কেউ তোমার দিকে আসবে না ভাগবে?
তুমি একটা বাসায় ঢুকেছ, সামনের রুমে সোফাগুলো দেখে আর লোভ সামলাতে পারলে না। সোজা গিয়ে বসে পড়লে। সোফাটা যেন তোমায় ডাকছিল, আসো, বসো আমার উপর!
অথচ এমনও অনেক বাসা রয়েছে যেখানে সোফায় বসতে গেলে নানাবিধ বাধা অতিক্রম করে তবেই বসা লাগে। এই ক্ষেত্রে তোমার নিজের কাছেই বিরক্ত লাগতে পারে। এই যেমন পাঁচ-ছয়টা চেয়ার ঠেলে জায়গা পার হয়ে গিয়ে সোফায় বসতে হবে, সেক্ষেত্রে বিরক্তি লাগবে না?
মানুষ নিজেও ঠিক সজ্জিত সোফার মতো। কিছু মানুষের বড় ল্যাঙ্গুয়েজ দেখলেই মনে হয় তার সাথে গিয়ে কথা বলি। অগরদিকে যারা লাজুক অগনা নিজেদের গুটিয়ে রাখে, তাদের শারীরিক ভঙ্গিমা যেন বলছে ‘আমার থেকে দূরত্ব বজায় রাখো।’ আর কেউ যদি একান্ত কথা বলতে চায় তবে নানা পথবাট ঘুরেই তার সাথে কথা বলতে হয়।
রিপোর্টে বলছে যেসব মানুষ সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে নিয়মিত যায়, তাদের শারীরিক ভঙ্গিমাও অনেক বেশি খোলামেলা। তাদের দেখলেই মনে হয় এই বুবি গিয়ে কথা বলি।
হাতের তালু ও কবজির কারুকাজ
হাতের তালু এবং কবজি আমাদের কথা বলার সময় একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করে। ব্যক্তির কথার গুরুত্ব তার হাতের নাড়াচাড়া বিশেষ করে হাতের তালু এবং কবজির উপরে নির্ভরশীল।
পোপ যখন হাতের তালু আর কবজি উচিয়ে ধরেন, এর অর্থ দাঁড়ায়, ‘ভ্রাতৃবৃন্দ, আমাকে আলিঙ্গন করো।’
একজন নিষ্পাপ নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে তালু এবং কবজি উচিয়ে জানান দেয়, ‘টাকাটা কে নিয়েছে আমি জানি না।’
নিজের এমন খোলামেলা প্রদর্শন এক অভিন্নতা নির্দেশ করে, ‘আমার লুকোনোর কিছুই নেই।’
অন্যের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে অবশ্যই নিজেকে খোলামেলাভাবে প্রকাশ করতে হবে।
হাতের তালু থুতনিতে ঠেকানো কিংবা পায়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করে। যতক্ষণ না তুমি নিজেকে মেলে ধরছ মানুষ তোমার থেকে দূরেই থাকবে। যে সময়টা তুমি কিছু বলছ, হাত এবং তালু উচিয়ে সেটাকে আরো বেশি জোরালো করো।
মেয়েদের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা যায়, তারা যখনই কারো সাথে কথা বলতে ভালো পায়, হাত এবং তালু উচিয়ে কথা বলে, নিজেকে প্রকাশ করে।
কৌশল ৭৪
হাত উচিয়ে ধরো
খোলামেলা মানুষদের সবাই পছন্দ করে। যেকোনো ভিড়ের মাঝে হাত পা শুটিয়ে বসে থাকা আর মানুষকে ‘আমার থেকে দূরে থাকুন’ নলটা একই অর্থ বহন করে। হাতের তালু এবং কবজি সবসময় খোলামেলা এবং উঠিয়ে রাখো। মোন দেখে মনে হয় তোমার হাতই তাদের ডাকছে। এমন ব্যক্তিদের নিকট এসে অন্যরাও ভালো পায়। মনে হয়, এই লোকটার সাথে বুঝি কথা বলা যাবে। দেখেই মনে হবে আনন্দদায়ক সময় কাটতে যাচ্ছে।
যারা তোমায় গুরুত্বপূর্ণ ভাবছে, তাদের তোমার কাছে আসার পথ তৈরি করে দাও ছোঁট শিকারি প্রাণীরা বড় শিকারি প্রাণীদের থেকে নিজেকে সুরক্ষা দিতে ঝোঁপ ঝাড়ের ভেতরে নুকিয়ে পড়ে। আমাদের চলা ফেরার এই ক্ষেত্রটা ঠিক জঙ্গলের মতোই। লাজুক মানুষ নিজেকে গোপন করে একেবারে পেছনে গিয়ে বসে, পাছে কারো সাথে চোখাচোখি না হয়।
একজন সফল ব্যক্তি পুরোটাই বিপরীতে। বড় শিকারি প্রাণীর মতো তারা ঠিক জঙ্গলের মাঝখান দিয়ে নির্ভয়ে হাঁটে। কারণ তাদের শারীরিক ভাষ্য একটা কথাই বলে ‘আমার নুকানোর কিছুই নেই।’
পর্ব ৭৫
অনুসরণ
তাদের নিজেকে পুরনো ছায়াছবির সুপারস্টার ভাবতে সাহায্য করো
পুরনো দিনের সিনামাগুলো আসলেই ভিন্ন ছিল। প্রতিটি সিনামাতেই কোনো না কোনো গল্প ছিল। সাদামাটা গল্প। কিন্তু গল্পের অংশগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এরকম-নায়ক নায়িকার দেখা, তাদের মাঝে প্রেমের রসায়ন এবং অবশেষে বিয়ে। নায়ক এবং নায়িকা ছায়াছবির মুখ্য হিসেবে কাজ করে। তাদের দিনরাত্রিই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো হয়। অন্যরা মারা গেল না বেঁচে গেল ওটা গুরুত্বপূর্ণ না।
মুভি ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এখনকার সিনেমাগুলো ওই গংবাধা রুটিনের বাইরে বেরিয়েছে। কিন্তু আমাদের মন মানসিকতা কি আদৌ অতটা এগিয়েছে?
ব্যক্তি জীবন আজও একেকটা ক্লাসিকাল মুভির হিরো হিরোইনের পার্ট। সেখানে ব্যক্তির, জীবনের সমন্ব কিছুই গুরুত্ব রাখে। সকালের ব্রেকফাস্ট থেকে রাতের দাঁত ব্রাশ করা। আমরা এখনো নিজেকে নিয়েই ভাবতে ভালবাসি। নিজের উপছিতি থাকে এমন বিষয় পেলে তবেই অন্তর হেসে গুঠে। আনন্দ পাই।
স্বামী ত্রীর উদ্দেশ্যে বলছে, ‘তুমি কি সকালের নান্ডা সেরে নিয়েছ?’
ভ্রদ্রমহিলা হেসে জবাব দেন, ‘হ্যা। তুমিও খেয়ে নাও। এক কাপ চা বানিয়ে দেবো?’
যতক্ষণ আমরা অন্যের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তগুলো এভাবে গুরুত্ব দেবো, অন্যরাও আমাদের ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রাখবে। এজন্য অন্যের যেকোনো ছোটোখাটো মুহূর্ত মনে রাখতে পারাটা ভালো গুণ। আর ওটা যদি অন্যের গুরুত্বপূর্ণ কোনো মুহূর্ত মনে রাখা হয়, তবে তো কথাই নেই।
ওসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুহূর্তকে কীভাবে কাজে লাগাবে, সেই কৌশলই আমরা আলোচনা করতে যাচ্ছি।
এই পদ্ধতির নাম দিয়েছি ‘ট্র্যাকিং’ বা ‘অনুসরণ’ পদ্ধতি।
সফন্দ ব্যক্তিরা অন্যের ছোটোখাটো মুহূর্তগুলো মনে রাখার চেষ্টা করেন। তোমার বস তোমায় একদিন বললেন, ‘তিনি সময়ের কাজ সময়ে করতেই পছন্দ করেন।’ তুমি কোনো একদিন তোমার বসকে তার সময়ানুবর্তিতা নিয়ে প্রশংসা করে ফেলো। তোমার বন্ধুর লাল রঙের প্রতি বিশেষ ঝোঁক আছে। লাল শার্টে তাকে কতটা সুন্দর লাগে এটা অন্য কোনো দিন জানালে তার মতো খুশি আর কয়জন হবে, চিন্তা করেছ?
## সুযোগ হাতছাড়া করো না
জনপ্রিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ অন্যদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো মনে রাখার পাশাপাশি সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড বেশ মনে রাখেন।
– হ্যাই স্যাম, তোমার ইউরোপ ভ্রমণ কেমন কাটল?
– জনসন, তোমার ছেলের ফুটবল ম্যাচ যেন কবে?
– জেসিকা, ওইদিন রাতে গাড়ি পেয়েছিলে তো?
অন্যের জীবনের ছোটোবড়ো ঘটনাগুলো মনে রাখার অর্থ এই দাঁড়ায় যে তুমি তাকে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভাবছ। এর সাথে যখন তার জন্মাদিন, বিবাহবার্যিকী এবং ছোটোবড়ো অর্জনের কোনো কিছু জুড়ে দেবে ওটার মতো দারুণ কিছু হতেই পারে না।
আমার নিজের জীবনের একটা ঘটনা বলার লোভ সামলাতে পারছি না। আমার বন্ধবী লিজার সাথে দেখা হলো প্রায় বছর দুই পরে। আমি কথায় কথায় জানতে চাইলাম, ‘তোমার বিড়াল ছাড়া, ম্যানি, এখন কত বড় হয়েছে?’
লিজা মুখে হাত দিয়ে হ্রাসতে থাকল। অবাক হয়ে বলল, ‘লেইল, তুমি ম্যানির কথা মনে রেখেছ! হায় ঈশ্বর! ম্যানি এখন অনেক বড় হয়ে গেছে। যা দুটা হয়েছে!’
কৌশল ৭৫
অনুসরণ
আকাশ প্রতিরক্ষা বিভাগের হাতে ছোটো বড় সকল ধরনের উড়ো যানের খবরই থাকে। তারা ওসব তথ্য কাজে লাগিয়ে আকাশ ব্যবহা নিয়ন্ত্রণ করে। একইভাবে মানব এন্টেনায় ধরা পড়া সকল তথ্য কাজে লাগানোর দায়িত্ব তোমার।
ছোটো বড় যেকোনো বিবয় যখন তোমার চোখ এড়াবে না, এর একটাই অর্থ- তুমি তার কর্মকাণ্ডগুলো অনুসরণ করছ। অন্য যেকোনো দিন তাকে একবার ওসব নিয়ে কথা বলো, জিজ্ঞেস করো। তোমার শ্রোতা নিজেকে ঠিক পুরোনো দিনের হিরোর মতো কল্পনা করবে। যার প্রতিটি মুহূর্তকে ঘিরে বিশ্বের সবকিছু চলছে।
পর্ব ৭৬
বিজনেস কার্ড সংরক্ষণ
**তুমি এটা কীভাবে মনে রাখলে?**
সভা সমাবেশে আমার বিচরণ বেশ পুরোনো। ভালো লাগে ওসবে উপছির থাকতে। সেবার এক রাজনৈতিক দলের সভায় নিম্নলণ্ড পেলাম। গিয়ে দেখি, আশপাশে দলীয় নেতাকর্মী আর সমর্থকদের ছড়াছড়ি। আল্তে একপাশে শুটিওটি মেরে বসে থাকার মেয়ে আমি নই। এদিক সেদিক ঘুরে ফিরে আমার চোখ এক জায়গায় থমকে গেল। এক ভদ্রলোক খুব আন্তরিকতা নিয়ে সবার সাথে কথা বলছেন। এতটুকু বাভাবিক। কিছু ভদ্রলোক সাক্ষাতের পরপর প্রত্যেকের বিজনেস কার্ড নিচ্ছেন। তিনি বিড়বিড় করে কী জানি বলছেন আর কার্ডের পেছনে লিখছেন।
ঘণ্টাখানেক লুকিয়ে লুকিয়ে দেখার পরে আমার সাথে চোখাচোখি হয়ে গেল। তিনি এগিয়ে এসে চমৎকার একটা হাসি দিলেন। নিজের পরিচয় দিয়েল জো। আমার বিজনেস কার্ডটা চাইলেন এক ফাঁকে। আইসক্রিম আমার প্রিয় খাবার তিনি কথা প্রসঙ্গে জেনে নিলেন। তখনও মাথার ভেতরে প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছেই! কার্ডের পেছনে কী লিখছেন? প্রশ্নটা করতে গিয়েও চেপে গেলাম। নিজেকে একটু সংবরণ করা আরকি!
পরিচয় শেষে আমি অন্যদিকে হাঁটা ধরলাম। ঠিক তাই হলো! আমি চলে গেছি দেখে ভদ্রলোক আমার বিজনেস কার্ডের পেছনে কিছু একটা লিখতে শুরু করলেন।
আমি আবার তার সামনে ফেরত গেলাম। সুন্দর করে হেসে নললাম, ‘আমি তো আসল ব্যাপারটাই না জেনে চলে যাচ্ছিলাম। আপনি কী জানি গিখেন দেখলাম কার্ডের পেছনে!’
ভ্রদলোক মুচকি হাসলেন, ‘তাহলে দেখে ফেলেছেন ওটা? এই নিন, নিজেই দেখুন।’
জো আমার দেওয়া কার্ডটা বাড়িয়ে দিল। পেছনের অংশে ছোট করে লেখা ‘আইসক্রিম’।
দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম।
তার এমন অঙ্কুত কর্মকাণ্ড আমি হেঁয়ালির সাথেই নিলাম।
এর মাসখানেক বাদে মোবাইলে একটি ম্যাসেজ পেলাম। ম্যাসেজটা পাঠিয়েছে জো নিজেই। জো নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে, ও আমার ভোটটা চায়। শেষ লাইনে লিখা রয়েছে, লেইল, আইসক্রিম খাওয়া কেমন চলছে?
তিনি ওটা এখনও সংগ্রহে রেখেছেন? নিজের মধ্যেই কেমন জানি ভালো লাগা শুরু হলো। তাকে ভোটটা দেওয়াই যায়।
কৌশল ৭৬
বিজনেস কার্ড সংরক্ষণ
কারো সাথে পরিচিত হলে বিজনেস কার্ড দেওয়া নেওয়াটা আজকাল কমন হয়ে গেছে। বিজনেস কার্ডের পেছনে ব্যক্তির ছোটোখাটো কোনো বিষয় লিখে রাখাটা বৃদ্ধিদীপ্ত কাজ। ভবিষ্যতে ওই বিষয়টা ধরেই তার সাথে যোগাযোগ করা যায়। খেলাধুলা, খাবার কিংবা তার প্রিয় কোনো কিছু লিখে রাখা যেতে পারে।
পর্ব ৭৭
চোখের ভাষা বিক্রি
চোখ সর্বদা খোলা রাখো, অন্যের না বলা কথাগুলো বুঝে নাও
জিম্মি, আমার এক বন্ধু, সে একাই কোম্পানির যে পরিমাণ বিক্রয় বাড়িয়েছে, বিশ্বাস করার মতো নয়। এমনকি তার সেলস ম্যানেজার পর্যন্ত জানে না, সে কীভাবে এত বিক্রয় বাড়াল। কিন্তু আমি জানি। সে আমাকে পুরোটা খুলে বলেছে। জিম্মি বলেছে, এত বছরের অভিজ্ঞতায় ভর করে সে একটা অভিনব পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। তার বিশেষ সাফল্যমণ্ডিত এই কৌশলকে সে নাম দিয়েছে ‘আইবল সেলিং’।
আইবল সেলিং বলতে ডজন ডজন কৌশল মুখমুখ রাখা নয়। এমনও নার যে তোমার কাস্টমারকে রাজি করাতে তর্ক বিতর্ক করতে হবে।
জিম্মি বলল, ব্যাপারটা খুবই সোজা। নিজের চোখ কান খোলা রাখতে হবে। কাস্টমারের প্রতিক্রিয়া দেখতে হবে। তার কথার পরিপ্রেক্ষিতে কাস্টমার নিজের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি কেমন করছে এবং নিজের নির্ক্রিকর কৌশল প্রয়োগ করতে হবে কাস্টমারের শারীরিক অঙ্গভঙ্গির উপরে।
জিম্মি যখনই তার সেবা বিক্রির উদ্দেশ্যে মাঠে নামে, সে খুব বেশি মনমোগী হয়, ক্রেতার উসখুস চেহারা, আকম্যিক নাড়াচাড়া, অন্মান্ডাবিক আচরণ, এসবের প্রতি। এমনকি সে মুখে কী বলছে তাও মনযোগ দেয় না। ও সূক্ষ্ম বিচার বিশ্বেমণ করে দেখে, তার ক্রেতা কী পরিমাণ অবচেতন মনে মাথা নাড়াচ্ছে। সে ক্রেতার হাতের নাড়াচাড়া দেখে, শরীরের ঘোরাফেরা দেখে এমনকি ক্রেতার চেহারায় তার কথার প্রতিক্রিয়া দেখে।
জিম্মি আরো বলল, যখন তার কাস্টমার কোনো কথা বলছে না, এমনকি ক্রেতা তোমার দিকে কঠোরভাবে তাকিয়ে আছে, কোনো মৌখিক কথাই হয়নি ক্রেতার দিক থেকে, ক্রেতা নিজ থেকে মুখে কিছু বলছে না, কিন্তু সে তোমার কথা শুনে, মনে মনে কী ভাবছে তা তার শারীরিক ভঙ্গিমা বলে দিচ্ছে। সে তোমার মনোভাব কতটা ধারণ করছে সেটাও হয়তো মুখে বলবে না।
কোন ধরনের কথা ক্রেতা ভালোভাবে নিচ্ছে, কোন ধরনের কথায় বিরক্তি দেখাচ্ছে, কখন সে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে কথা শুনছে এবং কোন ধরনের বিবয় তার মুড খারাপ করে দিচ্ছে এসব যত ভালো বুঝবে তার উপরে তোমার পণ্য বিক্রয় ‘হচ্ছে কী হচ্ছে না’- তা নির্ভর করছে।
জিম্মি কাস্ক্ষিত ব্যক্তিকে যেভাবে খুঁজে নেয়
জিম্মি দামি লাইটিং সরঞ্জাম বিক্রি করে থাকে। এজন্য প্রায়ই তাকে দশ, বিশ কিংবা এরও অধিক ক্রেতার সামনে দাঁড়িয়ে তার পণ্যকে উপস্থাপন করা লাগে।
সে বলল, ‘আইবল সেলিংয়ের সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে, এটা খুঁজে বের করা যে, ক্রেতাদের মাঝে প্রকৃত ডিসিশন মেকার কে?’
জিম্মি তার এই বাধা অতিক্রম করে কিছুটা অপেশাদারি বাক্য দ্বারা।
‘শুভ সকাল। সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি…’ এর পরের লাইনেই এমন কোনো অঙ্কুত লাইন জুড়ে দেয়, যা শুনে শ্রোতারা বিভ্রান্ত হয়ে যায়। কেন? কারণ, বিভ্রান্ত মানুষ বুঝতে পারে না, কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত। সবাই চোখের অঙ্কুত পলক ফেলতে থাকে। এমন পরিছিতি তৈরি করাটাই জিম্মির প্রধান সাফল্য। বিভ্রান্ত এই মানুষগুলো আশপাশে এমন কাউকে খুঁজতে থাকে, যে এই পরিছিতি থেকে তাদের বের করে আনবে, যিনি একজন প্রকৃত অর্থে লিডার।
জিম্মি ওখানকার ডিসিশন মেকারকে খুঁজে পেয়ে গেছে। সে এখন আইবল সেলিং টেকনিক ওই ব্যক্তির ওপরেই খাটাবে।
সঠিক সংকেত পেয়ে গেলে এরপর কী করবে?
‘কিছু সংকেত তোমাকে বুঝে নিতে হবে।’ জিম্মি বলল।
‘মানুষজন কাঁধ ঝাঁকাতে থাকে অনীহায়, আঙ্গুল টিপতে থাকে অধৈর্য হয়ে উঠলে, অথবা গলা ছেড়ে দেয় অন্বিষ্ঠিতে।’ কিন্তু ওখানে ডজন ডজন অবচেতন অঙ্গভঙ্গি পাওয়া যায়, যেঙ্গলো পাওয়ার জন্য আমি এন্টেনা দাঁড় করিয়ে রেখেছি।
উদাহরণবরূপ বলতে হচ্ছে, আমি প্রত্যাশিত ব্যক্তির মাথা সোজা নাকি কাত করে রেখেছে, পর্যবেক্ষণ করি। তারা আমার দিকে তাকিয়ে আছে এবং মাথা কিছুটা বাঁকা হয়ে আছে, অর্থাৎ সে বা তারা আমার প্রতি মনযোগী। এইসব মুহূর্তে আমি কথা চালিয়ে যাই।
তাদের মনযোগ যদি অন্যদিকে নিবন্ধ থাকে, এটা একটা খারাপ সংকেত। আমি তাংক্ষণিকভাবে সাবজেক্ট চেল্ল করে ফেলি। পণ্যের ভিন্ন কোনো সুযোগ সুবিধা নিয়ে কথা বলতে আরম্ভ করি।
জিম্মির পুরো কৌশলটা নির্ভর করে প্রত্যাশিত ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের বড়ি ল্যাঙ্গুয়েজের উপরে। কে তার কথায় কেমন রিঅ্যাক্ট করছে তার উপরে। ক্রেতার প্রতিক্রিয়া অনুকূলে থাকলে কথা বলা চালিয়ে যায় সে। তারা বিরক্ত বোধ করলে ভিন্ন কিছু নিয়ে আলোচনা করে ও। সে নিজের সাবজেক্ট পরিবর্তনে খুবই সচেতন।
তার মতে, ‘শারীরিকভাবে খোলামেলা হলেই মনের দিক থেকে অনুসরণ করা যায়।’
উদাহরণবরূপ, সে বলল, ‘ক্রেতা যদি দুই পা আড়াআড়ি করে উপুড় করে রাখে, তবে তাকে এমন কিছু একটা ধরতে দাও যা নেওয়ার স্বার্থে তাকে পায়ের ভাঁজ ভেঙে উঠতে হবে।’
জিম্মি সবসময় সাথে ব্রিফকেসভর্তি সাজ সরঞ্জাম নিয়ে বের হয়। এটা এসব বাধা, এভাবে অতিক্রম করার দারুণ একটা কৌশল মাত্র।
‘তার স্ত্রী সন্তানসহ পারিবারিক ছবি ক্রেতাদের মধ্যকার দম্পতিদের জন্য, তার পোবা কুকুরের ছবি কুকুর প্রেমীদের জন্য, প্রত্যতাত্ত্বিক কোনো বস্তু অ্যান্টিক লাভারদের জন্যে (প্রাচীন জিনিসপত্রে যাদের আগ্রহ বেশি), আর আধুনিক কোনো গেজেট, গেজেট লাভারদের জন্য সুটকেসে ভরে নেয়।’
জিম্মি কাস্টমারের মনের অবস্থা বুঝে তার কথা বলার সময় ঠিক করে নেয়। কাস্টমারকে যতক্ষণ না আড়াআড়ি পা মেলে বসে থাকা থেকে নিভৃত করা যাচ্ছে, ততক্ষণ সে কাস্টমারকে এসব দিয়ে আকৃষ্ট করে, মনযোগী করে নেয়।
আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সংকেত পাওয়া যায় ক্রেতার দিক থেকে। ক্রেতা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাতে থাকেন, একেবারে একটা প্ল্যাস্টিকের হাঁসের মতো।
তারা মনে মনে উত্তেজিত হচ্ছে আর বলছে, ‘আমি ওটা কিনবই।’
অদক্ষ বিক্রয় কর্মীরা বকবক করেই যেতে থাকেন যতফণ গর্যন্ত না তাদের প্রশিক্ষণের সময়ে শেখা লাইনগুলো শেষ হয়। এমন অনেকে আছে, এত বেশি কথা বলতে থাকেন যে, তারা নিজেরাই নিজেদের বিক্রয় দ্বাংস করেন। আর যথনই ক্রেতা মাথাটা পেছনের দিকে ঝুকিয়ে নিচ্ছেন, এর অর্থ একটাই, ‘আমি আগ্রহী নই, ফুটো।’
চোখে ভাষা শুধুমাত্র বিক্রয়কর্মীর জন্য নয়
যারা তোমায় ভালোবাসে, মুখে না বললেও তাদের শারীরিক ভাষ্য তোমাকে তা বুঝিয়ে দেয়।
যখন আমার বান্ধবী দেবুরা, টনির সাথে বিয়ে পাকাপাকি করে ফেলল, সবাই বলাবলি করছিল এই সম্পর্ক টিকবে না। যদিও দেবুরা ব্যাপারটা নিয়ে সিরিয়াস। ওর মতে ওদের সম্পর্কটা স্বরীয়।
ওদের বিয়ের মাস দুয়েক পূর্বে আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দেবুরা, তুমি কি সত্যিই মনে করছ, টনি তোমার জন্য পারফেক্ট? যার জন্য তুমি এতদিন ওয়েট করছিলে।’
‘অবশ্যই।’ সে বলল।
সে তার মাথা ডানে বামে নাড়াতে থাকল। সামনে পেছনে ঝুকতে লাগল, ‘আমি ওকে পাগলের মতো ভালবাসি।’
সেই স্বরীয় বিয়ে আর বাস্তবে রূপ নেয়নি। এর পূর্বেই বিয়ে ভেঙে গেছে। দেবুরার বড়ি ল্যাঙ্গুয়েজ যা বলেছে, তার থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা ওর মুখ দিয়ে বের হয়েছে।
রাজনীতিবিদ এর মতো, তোমার সামাজিক বক্তব্যগুলোকে নিজের বিক্রয় বাড়ানোর পথ হিসেবে তৈরি করে নাও।
তোমার নিজের কোনো পণ্য না থাকলে, চেষ্টা করো তোমার চিন্তাভাবনাগুলো বিক্রি করার জন্য।
তোমার বক্তব্য তবে শ্রোতার বিরক্ত আসতেই পারে। তারা অমনযোগী অথবা স্থান ত্যাগ করলেও অবাক হবার কিছু নেই। তোমার শ্রোতা কতটা অহংকারী, তা ভাবা যাবে না। তোমাকেই এর সমাধান বের করতে হবে। কীভাবে শ্রোতাকে আবার বক্তব্য দ্বারা মনযোগী করা যায়, একজন আদর্শ বিক্রেতা ওটাই ভাববে।
কেউ যদি বিরক্তিতে নিজের দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নেয়, অন্যদিকে ঘুরে তাকায়, তাকে সময় জনিত প্রশ্নে আবদ্ধ করা যেতে পারে।
‘জর্জ, গত সপ্তাহে ফুটবল খেলাটা হলো, এত ভালো খেললে কীভাবে? চমৎকার ছিল ওটা।’
অখবা তাকে নাম ধরেই কোনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করো। এই কৌশলটা মনযোগ ধরতে সবসময়ই কাজে দেয়, ‘অরনান্ড, তোমার হাই স্কুল ফুটবল চিমের কী নাম ছিল যেন?’
এই অংশে আমরা অল্প কিছু প্রতিক্রিয়া নিয়েই আলোচনা করেছি। মূল আলোচ্য বিষয় এটাই, তুমি যে কারো বডি ল্যাঙ্গুয়েজের লক্ষণ দেখেই অনেক কিছু বলে দিতে পারবে।
কৌশল ৭৭
চোখের ভাষা বিক্রি
আমাদের শরীর একটা মানব এন্টেনার মতো। যেটা আমাদের নানা ধরনের অনুভূতি দেয়। কিছু আমাদের রোমাঞ্চিত করে, কিছু আমাদের বিরক্তি দেয়। আবার কিছু আমাদের অত্যন্ত সুখকর অনুভূতি দেয়। এই মানব এন্টেনার সর্বাত্তক ব্যবহার নিশ্চিত করা তোমার কাজ। আশপাশের মানুষের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের সংকেতগুলো ধরে তোমার পিচ তৈরি করে নাও।
