হাউ টু টক টু এ্যানিওয়ান – ৪
অধ্যায় চার
যেকোনো ভিড়ে নিজেকে ওদেরই একজন হিসেবে প্রমাণ করো
ওরা কী নিয়ে কথা বলছে?
নিজেকে প্রচণ্ড একা ফিল করছ? আশপাশে সবাই আছে। সবাই হাসছে, কথা বলছে। কিন্তু তুমি বড্ড একা? আশা করি, জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে তোমরা এই একাকিত্ব অনুভব করেছ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে হয়ত অনুভব করেছ, এই ভিড়, এই আয়োজন, এসব তোমার জন্য নয়। চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে বৃথা হাসার চেষ্টা করে যাচ্ছ। আশপাশে যারা আড্ডা দিচ্ছে তাদের কথাগুলো তোমার বুঝে আসছে না।
ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকারদের আড্ডা হচ্ছে, তারা এমন সব বিষয়ে কথা বলছে, যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান ধরতে গেলে শূন্যের কাতারে। আবার আগ বাড়িয়ে কথা বলতে গেলে ভুল হবার সম্ভাবনা রয়েছে। এই ভয়ে তুমি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছ। তোমার মনে হচ্ছে সবাই তোমাকে দেখে হাসছে?
এই ব্যাপারটা আমার জীবনে ঘটেছে। আমি তখন স্কুলের ছাত্রী। আমার আশপাশে যতগুলো ছেলে আছে, ওদের সাথে আমায় ভীষণ দূরত্ব। ওদের কথাবার্তার সমন্তটাজুড়ে মাত্র গাড়ি নিয়ে। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দামি দামি এসব গাড়ির আলাপ আলোচনা করতেই তারা খুশি হতো। আমি বেচারি পড়ে গেলাম বেকায়দায়। গাড়ির প্রতি আমার কোনো কালেই আগ্রহ ছিল না, জানাশোনাও শূন্য। ওদের সাথে কথা বলতে গেলে অবশ্যই গাড়ি নিয়েই কথা বলতে হবে। আমার জীবনের এমন পর্যায়ে দেবদূতের মতো একদিন আম্মু একটি বই উপহার দেন। বইটার পুরোটাই গাড়ি নিয়ে আলোচনা। গাড়ির কোথায় কোন যন্ত্রাংশ আছে আমার মুখছ হয়ে গেল। তখনকার দামি দামি গাড়িগুলোর সাথে সাথে ওদের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি যেমন : ক্যামশ্যাফট, ক্র্যাঙ্কশ্যাফট, এক্সজস্ট, ম্যানিফোলড ইত্যাদির নাম আমার নখদর্পণে। আমি ছেলেদের ভিড়ে কার নিয়ে কথা বললাম। বিংগো! ব্যাপারটা সত্যিই কাজে দিয়েছে। তারা আমাকে তাদের বন্ধু হিসেবে খুব সহজেই মেনে নিয়েছে। ওই ঘটনার মধ্য দিয়ে আমার লাজুকতা দূর হয়েছে, যা আমাকে সবার সাথে মিশতে সহজ করেছে।
আমার জেনারেশনের সেই ছোট বাচ্চাদের এসব গ্রুপিংয়ের মতো এখনকার বড়োদের ভিড় গভীর হয় বিভিন্ন টপিকে। সবাই নিজের জানা বিষয়ে আড্ডা দিতে পছন্দ করে। ফলে আড্ডাটা যদি ইঞ্জিনিয়ারদের হয়ে থাকে তবে ইঞ্জিন, টারবাইন কিংবা বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং টার্মস এসেই যায়। কে কতটা প্রজেক্ট করেছে, এসবও আলোচনা লম্বা করে তোলে। তুমি বেচারা বিবিএ করা পাব্লিক। তুমি এত কঠিন কঠিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়গুলো বুঝোই না। ভেবেই বসে আছ, কীভাবে এসব ভিড়ে নিজেও অংশ নিতে পার?
সেক্ষেত্রে মাছেদের যেভাবে তোমরা টোপ দাও, এখানেও তোমাকে তোমার কথার টোপ ফেলতে হবে। তাদের কথার মাঝে এমন একটা বিষয় পেলে ওটা তুমি হালকা জানো, ওটাই হতে পারে তোমার টোপ।
লেখিকা ডেল কার্নেগি একটা কথা বলে গেছেন, ‘আন্তরিকতার সাথে তোমার আগ্রহ দেখাও। মানুষ অবশ্যই তোমার সাথে কথা বলবে।’
আরেকটা ব্যাপার, তোমার অবশ্যই নতুন কিছু জানার আগ্রহ থাকতে হবে। এটাই তোমাকে প্রকাশ করবে, তুমি কথা বলার জন্য আকর্ষণীয় কেউ একজন।
আমরা এই অধ্যায়ে জানব, কী কী কৌশল ব্যবহার করলে মানুষ তোমাদের তাদেরই একজন ভাববে, বাইরের কেউ ভাববে না। জানতে অবশ্যই মনোযোগ দাও এই অধ্যায়ে।
পর্ব ৩৮
ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি।
আধুনিক কালের নারী পুরুষের রেনেসাঁস।
আমার কোনো না কোনো বন্ধু যখনই আমার বাসায় আসতে চায়, আমি তাদের সাবধান করে দিই, ‘মেট্রোরেলে আসার সময় কাউকে জিজ্ঞেস করে করে আসা যাবে না। এতে বিপদ আছে।’
তারা ভয়ে ভয়ে জানতে চায়, ‘কাউকে জিজ্ঞেস করলে কি ছিনতাই-টিনতাই হওয়ার চাষ আছে নাকি?’
ওই ভয় উড়িয়ে দিয়ে বলি, ‘মেট্রোতে যারা চড়ে এরা মাত্র আশপাশের দুই এক স্টেশনের খবরই জানে। এদের কাজই হলোহলো :
এই ‘কয়েক স্টেশনের যাত্রী’ লোকগুলোর মতো কিছু মানুষের গণ্ডিও অনেক ছোটো। এরা মাত্র নিজের ব্যাপার নিয়েই ভাবে। তাদের শখ, তাদের প্রিয় খেলা, তাদের প্রিয় বই, এসবের বাইরে তারা চিন্তা করতে পারে না। তার ফুটবল প্রিয় বলে অন্য সবাই তার মতো ফুটবল পছন্দ করবে এমনটা ভাবাটাই বোকামি।
আমার বান্ধবী রিটা, যার কিনা এখনো বিয়ে হয়নি (আমি চাই, বিয়ে না হোক), সে হকি খুবই পছন্দ করে। টেলিভিশনের সামনে সারাক্ষণ হকি খেলা নিয়ে পড়ে থাকবে। তার সাথে যোগাযোগ করলেই সে হকি নিয়ে তার যাবৎ তথ্য জানিয়ে দেবে। অন্যের ব্যাপারে শোনার আগ্রহও তার নেই।
আমার আরেক বন্ধু ওয়াল্টার (সেও সিংগেল), নদীতে রাফটিং করতে খুব পছন্দ করে। তার গণ্ডিও সেই রাফটিং পর্যন্ত। দুজনই নিজেদের ফিল্ডে একেকটা গবেষকের সম পর্যায়ের।
আমার মাথায় একদিন বুদ্ধি এলো, এই দুটোকে পরিচয় করিয়ে দিলে কী হয় দেখার। প্র্যান অনুযায়ী দুজনকে পরিচয় করিয়ে দিলাম।
ওয়াল্টার বলল, ‘শুনলাম তুমি নাকি হকি খুবই পছন্দ করো?’
‘হ্যাঁ।’ রিটা হেসে জবাব দিল। এরপর সুনসান নীরবতা, সে ভেবেছিল, ওয়াল্টার হকি বিষয়ক তাকে আরো প্রশ্ন করবে। সেদিক থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে এবার রিটাই প্রশ্ন করল, ‘লেইল জানাল, তুমি নদীতে রাফটিং করতে খুব পছন্দ করো। শুনে তো মনে হলো বেশ মজারই। কিন্তু এটা কি ভয়ংকর নয়? অনেক রিস্ক থেকে যায়।’
ওয়াল্টার তার কথার সমর্থন দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, আমি রাফটিং করি। তবে এটা তোমার ভুল ধারণা যে, রাফটিং ভয়ংকর। রাফটিং অনেক সেইফ, যদি নিয়ম জানো।’
তাদের কথা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেল। এরপর কেউ আর আগ বাড়িয়ে কিছুই বলল না। আমি মনে মনে ভাবলাম, রিটা যদি একবার নদীতে গিয়ে রাফটিং করত এবং ওয়াল্টার যদি একবার গিয়ে হকি খেলত, তবে ওদের এভাবে থেমে যেতে হতো না। তাদের কথা আরো দীর্ঘ হতো। হয়ত মধুর একটা সময় দুজনই উপভোগ করত!
একবারের জন্য হলেও ঘুড়ি উড়াও
এই কৌশলটা তোমাকে ‘আউটসাইডার’ বা ‘বহিরাগত’ এই অনুভূতি থেকে মুক্তি দেবে। যদি প্রতিটি ছেলে-মেয়ে এই কৌশলটা কাজে লাগাতে পারে, তবে তারা একটা নবজাগরণ ঘটিয়ে দিতে সক্ষম, কোথাও গিয়ে অস্বস্তি অনুভব করবে না। এখন, তুমি যদি তাদের একজন হও, তাদের মতো করেই আলোচনা জমিয়ে তুলতে পারবে। এটাও মনে রাখা উচিত, অধিকাংশ ভিড় তোমার জানাশোনার ভেতরে নাও আসতে পারে।
এজন্য তুমি এমন কিছু করো, যাতে অন্তত ওই বিষয়ে কিছু হলেও জানতে পারো। মাসের ভেতর এক সপ্তাহ অন্তত এমন কিছু নিয়েই বিজি থাকো, যেটা নিয়ে তোমার জানাশোনা নেই। প্রতি সপ্তাহে ফুটবল খেলে থাকলে, এই সপ্তাহে ক্রিকেট খেলেই দেখো। ভ্রমণের খুব শখ? তবে এই সপ্তাহে একটু বই পড়ার শখ তৈরি করো। প্রতি সপ্তাহে পুকুরেই গোসল করো, সুযোগ পেলে নদীতে গোসল করে আসো। এমন কত কিছু যে আছে, যা তুমি কখনো করোনি। চাইলে ঘুড়ি উড়াতে পারো, পাহাড়ে চড়তে পারো, লং ট্যুরে যেতে পারো, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টেনিস খেলা দেখতে পারো। এমনকি কোনো গ্যারেজের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুটা সময় গাড়ি ঠিক করাও দেখতে পারো। এমন ভিন্ন ভিন্ন কাজ করার ফলে লাইফে কোথাও না কোথাও, ওসব তোমার কাজে দেবে। ওসব ক্ষেত্রে নিজেকে বাইরের কেউ মনে হবে না।
এই যেমন, তুমি জীবনে লিটমাস পেপার দেখোনি। সুযোগ থাকলে ওটা হাতে নাও। অ্যাসিডের পানিতে চুবিয়ে এর রং পরিবর্তন দেখো। ভবিষ্যতে এমন কোনোদিন এসে গেল, যেখানে লিটমাস পেপার নিয়েই কথা হচ্ছে। ওটাও তোমার অনুকূলেই হবে।
যে-কোনো জিনিস বা বিষয়ের ধারণা তোমাকে ৮০% পর্যন্ত কথোপকথনের সহায়ক।
তুমি কি স্কুবার ভাষা বোঝো?
আমি একজন পরীক্ষিত স্কুবা ড্রাইভার। প্রায় ছ বছর আগে বার্মুডায় প্রথম আমি স্কুবা ডাইভিংয়ের ব্যাপারে দেখতে পাই। ওখানে একটা বিজ্ঞাপনী বোর্ডে লেখা ছিল স্কুবার ব্যাপারে। তখন ওটা প্রথম জানা হলেও এখন আমি পুরোদস্তুর একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি।
কোর্সের শুরুতে আমার অনুশীলন শুরু হয়েছিল একটি পুকুরে। পানির তলায় অস্কিজেন সিলিভার, অস্কিজেন মাঙ্ক, রেগুলেটর, কম্প্রেসরসহ যাবতীয় স্কুবা ডাইভিংয়ের যন্ত্রপাতি নিয়ে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, ওগুলোর সাথে অভ্যস্ত হবার পরেই আমি সাগরে যাওয়ার জন্য অনুমতি পেলাম। এবং সবশেষে আমি সফলভাবে সেই সেশনও শেষ করলাম। সত্যিই অসাধারণ অনুভূতি ছিল।
স্কুবা ডাইভারদের কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকে। এই যেমন-
‘তুমি কোথা থেকে স্কুবা ডাইভিং সার্টিফাইড হলে?’
‘তুমি কি সাগরের পানির তলায় গিয়েছিলে?’
‘তোমার টানা কতক্ষণ থাকার রেকর্ড আছে?’
এসব প্রশ্ন একজন স্কুবা ড্রাইভার প্রায়শই শুনে থাকে। এগুলোকে বলা হয় স্কুনার ভাষা। যে কেউ আমার সাথে স্কুবা নিয়ে কথা বলতে চাইলে আমি ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা করতে পারব। (এছাড়াও স্কুবা শেখার সময়টাতে প্রচুর সামুদ্রিক মাছ খেয়েছি। খাবারপ্রিয় মানুষদের জন্য এই অংশটা তুলে রাখি। যে, যে বিষয়ে আগ্রহী, তার সাথে সেই বিষয়েই কথা বলা উত্তম।)
এছাড়াও প্রবালদ্বীপ, কোরাল এসব নিয়েও ভালো ধারণা হয়ে গেছে এই ভ্রমণে। এখন আমার সামনে কেউ যদি বলে সে স্কুবা ড্রাইভার। আমি কিছু না ভেবেই বলে দেবো ‘স্কুবা ডাইভিং আসলেই মজাদার। সময়টা অসাধারণ কাটে। কিন্তু তোমার কি মনে হয় না, এটা কিছুটা বিপজ্জনকও যে-কোনো সময় হাঙর আক্রমণ করে বসতে পারে!’
এরপর বাকিটা সামনের অতিথিই বলবে।
কৌশল ৩৮
ধীরে ধীরে এগিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি।
মাসে অন্তত একবার এমন কিছু করো যেটা তুমি কখনোই করোনি। যেসব কাজ তুমি করার স্বপ্ন দেখোইনি, ওসব কাজ তোমাকে দারুণ সব অভিজ্ঞতা দেবে, যা সারা জীবনের সঞ্চয়। যে খেলাটা তুমি খেলোনি, একবার খেলো। কারণ ভবিষ্যতে তোমারই কোনো এক বন্ধু কিংবা অন্য কেউ সেই খেলা নিয়ে কথা বলতে চাইবে। এই বেসিক জেনে রাখাটা তোমায় ৮০% কথা বলার নানা তথ্য দিয়ে বেড়াবে। আর বাকি ২০% তুমি তখন নিজেই জুটিয়ে নিতে পারবে।
পর্ব ৩৯
কিছু অর্থহীন বাক্য শেখো
টিকে ধাকার জন্য দুর্বোধ্য শব্দচয়ন
একটা অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, যেখানকার আয়োজক দম্পতি দুজনই ডাটা বেসড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে কাজ করে। আমি অন্যসব অনুষ্ঠানের মতোই সেখানে গেলাম। ভেতরে গিয়ে আমার মাথায় হাত! আশপাশে সবাই-ই ওই ডাটা বেজড ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিতে কর্মরত। সেদিনই জানলাম এই নামেও কিছু একটা আছে। নিজেকে যতটুকু পজিটিভ রাখা যায় সেই চেষ্টাই করতে থাকলাম। আশপাশের ঘুরে নিজেকে চাঙ্গা রাখার মতো কিছুই পেলাম না। তারা সবাই ওই ডাটা বেজড ল্যাঙ্গুয়েজ বিষয়গুলো নিয়েই কথা বলছে। একজন বলছে, ‘এসকিউএল আসলেই দারুণ…’
নিজেকে আসলেই একজন বাইরের আউটসাইডার মনে হচ্ছে। তাদের ভেতরে ঢুকব এটাও সম্ভব নয়। আমি কমপিউটার, ল্যাঙ্গুয়েজ নিয়ে কোনো ধারণাই রাখি না। শেষমেষ আয়োজক দম্পতি থেকে দু-তিনটা স্বাগত এবং বেসিক প্রশ্ন জেনে নিলাম। অন্ত্র যখন প্রস্তুত, থেমে থাকি কার জন্য?
সাত পাঁচ না ভেবে ওই আড্ডায় চলে গেলাম। সময় বুঝে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা কোন রেইড ল্যাভেল ইউজ করো?’ একটু বিরতি দিয়ে পরের প্রশ্ন ছুড়লাম, ‘ডাটা ওয়্যারহাউজ প্রোডাক্ট হিসেবে তোমরা কোনটা ব্যবহার করো?’
তোমাকে যা করতে হবে, খুব সোজা, এমন কয়েকটা স্বাগত প্রশ্ন তৈরি করে নিতে হবে। ওগুলো তোমাকে একটা আড্ডায় ভেতরের লোক হিসেবে অনুভূতি দেবে। মনে হবে তুমি ওদেরই একজন। তোমার প্রশ্নের উত্তর তারা অবশ্যই দেবে। তারপর সুযোগ বুঝে আড্ডার বিষয়টাই বদলে দাও, এমন কিছু নিয়ে কথা তোলো যেটা তুমি জানো। কমপিউটার সম্বন্ধীয় প্রশ্ন ছেড়ে তুমি চাইলে ফুটবল, ইভেন দৈনন্দিন কোনো বিষয় পছন্দ করতে পারো। এবার ভিড়টা তোমার অনুকূলে। (ভুলেও নিজেকে তাদের সেক্টর সম্বন্ধীয় বিষয়গুলোতে অত্যধিক জ্ঞানী প্রমাণ করতে যাবে না। ওটা করতে গেলে ফেঁসে যাবে।)
## সবকিছু নির্ভর করছে তোমার শুরুর প্রশ্নে
একজন টেনিস খেলোয়াড় খেলার শুরুতেই বুঝতে পারে, তার বিপরীতে দাঁড়ানো মানুষটা আদৌ টেনিস খেলতেই পারে কি না? এই বিষয়টা কথাবার্তার ক্ষেত্রেও শতভাগ ফলে যায়। তুমি যখনই কারো সম্পর্কে কথা বলছ আর সে হুট করে এমন কিছু বলে বসল যা তার অজ্ঞতার পরিচয় বহন করে, তার সম্পর্কে নিশ্চয়ই তোমার ধারণা সুখকর হবার নয়। তোমার স্বাগত কথাবার্তা, তোমার শারীরিক ভাষা তোমার সাথে থাকা ব্যক্তিটিকে জানিয়ে দেবে, তুমি আদৌ এ ব্যাপারে কিছুই জানো না। ফলে একটা মধুর কথোপকথনের জায়গায় একটা ছোট্ট কথোপকথন দিয়ে তোমাদের কথা শেষ হবে।
আমার ব্যক্তি জীবনে বহুবার এমন ঘটেছে। একবার এক ভদ্রমহিলা খুবই খুশি মনে বললেন, ‘এই যে, শুনলাম তুমি একজন লেখিকা?’
আমি হেসে জানালাম, ‘জি।’
পরোক্ষণেই মহিলা তার অজ্ঞতা দেখিয়ে বললেন, ‘আমেরিকার একটা সেরা উপন্যাস তুমি কবে লিখতে যাচ্ছ?’
ফলে আমি খুব সহজেই ধরে ফেললাম। লেখালেখি নিয়ে এই মহিলা দু-দণ্ড জানেন না। মিছে নিজের জ্ঞান ফলাতে চলে এসেছেন। আমিও সুযোগ বুঝে সটকে পড়েছি।
ঠিক আরেকবার, আরেক ভদ্রমহিলা একই প্রশ্ন করল, ‘হায় ঈশ্বর! শুনলাম তুমি একজন লেখিকা?’
আমি হেসে বললাম, ‘হ্যাঁ। ঠিক তাই।’
তিনি জবাব দিলেন, ‘একজন লেখিকার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগল। তা তুমি কোন বিষয়ে লিখতে বেশি পছন্দ করো? উপন্যাস নাকি তথ্যভিত্তিক নন-ফিকশন?’ খুশিতে আমার মনটা ভরে গেল। কেউ একজন আমার সেক্টর সম্পর্কে ধারণা রাখে, এমন কাউকে পেয়ে আমার ভালো লাগল। লেখারও যে বিভিন্ন বিভাগ আছে, এটা অনেকেই জানে না।
আমি ভ্রদ্রমহিলার সাথে অনেক সময় নিয়ে গল্প করলাম। আমাদের কথোপকথন অল্প সময়ের ভেতরেই লেখালেখি ছাড়িয়ে নানা বিষয়ে ছড়িয়ে গেল। এখানে স্পষ্ট বুঝতে পেরেছ, কেউ যদি জেনে কথা বলে, অন্তত অজ্ঞের মতো না বলে, তবে তোমাকে বহিরাগত মনে না হয়ে মনে হবে, তুমি ওদেরই একজন। যারা উভয়েই একই ব্যাপারে জ্ঞান রাখে।
আরো কিছু ব্যাপার রয়েছে যা ভেতরের কেউ জিজ্ঞেস করবে না। বোকার মতো সেসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলে তুমি অবশ্যই একজন বাইরের কেউ হিসেবে বিবেচিত হবে, অর্থাৎ তোমার জ্ঞান ওই পর্যন্ত নেই!
এই ধরো, দুজন নভোচারীর দেখা। তারা একজন আরেকজনকে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার পরবর্তী মিশন কবে?’ (তারা কখনোই এটা জিজ্ঞেস করবে না, ‘মহাশূন্যে টয়লেট করতে সমস্যা হয় নাকি?’)
আবার দুজন ডেন্টিস্টের দেখা। এরা নিজেদের চেম্বার, রোগী দেখা এসব নিয়েই কথা বলবে স্বাভাবিক। তুমি হুট করে অঙ্কুত কোনো প্রশ্ন করে বসলে, তোমার কিন্তু প্রধম দর্শনটাই মাটি।
তবে আশার কথা হলো, তুমি স্বাগত দুয়েকটা প্রশ্ন জেনে খুব সহজেই যে-কোনো আড্ডার যোগ দিতে পারো। তারা তোমায় তাদের একজন হিসেবেই গ্রহণ করে নেবে। আর একবার ভেতরে ঢুকলে, চাইলেই তুমি অন্য টপিক তুলেও কথা বলতে পারবে। এমনকি, তুমি যখন জানাবে, তুমি ওই সেক্টরের কেউ না, তারা চমকাবে। নিজেদের নিজেই বলবে, ‘আরেহ! এই লোক তো দেখি অনেক জ্ঞানী!’
সাহায্য করো, এখানে দেখছি সব চিত্রশিল্পী।
আগের কৌশলটা একেবারে সর্ব পরিচিতিতে কাজে নাও দিতে পারে। এই যেমন আমি একবার চিত্রপ্রদর্শনীতে গেলাম। চিত্রকরদের সাথে কথা বলার মতো আমি কিছুই পেলাম না। আর যেহেতু চিত্রপ্রদর্শনীতে চিত্রকরদের ভিড় থাকে, আমার এমন কোনো বন্ধুকে খুঁজলাম, যে চিত্রকর্মের সাথে জড়িত। একজনকে পেয়েও গেলাম। তাকে নিরুপায় হয়ে বললাম, ‘বন্ধু, আমার এখানে চারদিকে সব
একেকজন চিত্রশিল্পী। তাদের সাথে কথা বলার জন্য কিছু কৌশল কিংবা উপায় জানিয়ে দাও। আমি পুরো ফেঁসে গেছি।’
সে আমাকে জানাল, ‘চিত্রকরদের জিজ্ঞেস করো, তারা কোন ধরনের রং দিয়ে কাজ করে।’
আমি চমকে বললাম, ‘কোন ধরনের রং মানে?’
সে বলল, ‘ওসব ভেতরের কথা। চিত্রকররা বুঝে যাবে। এই যেমন ধরো-
এক্রাইলিক, তেলরং, কাঠ কয়লা, পেন্সিল ইত্যাদি।’
‘ওহ, আচ্ছা।’
‘একজন চিত্র শিল্পীকে কখনোই তাদের কাজকে ব্যাখ্যা করবে না।’ সে আমায়
সতর্ক করে দিল ‘তারা এসব ব্যাখ্যা করা পছন্দ করে না।’
‘বুঝতে পেরেছি।’
‘আরেকটা কথা। ওদের কখনোই জিজ্ঞেস করবে না যে, তাদের কোনো ছবি এই
গ্যালারিতে আছে কি না?’
‘তাহলে কীভাবে জানব?’
‘সেটা অবশ্যই একটু চিন্তার বিষয়। তুমি এভাবে বলতে পারো, আপনার
চিত্রকর্মগুলো আমি কীভাবে দেখতে পারি? এভাবে বলার একটা সুবিধা রয়েছে।
তার চিত্রকর্ম ওখানে গ্যালারিতে থাকলে সে নিজেই দেখাবে। না থাকলে, যেখানে
আছে সেখানকার ঠিকানা বলবে, তুমি চাইলেই দেখে নিতে পারবে।’
এ জাতীয় কোথাও তুমিও যদি ফেঁসে যাও, তবে তোমার যেকোনো বন্ধুর সাহায্য
নিতে পারো, যে কিনা ওই ফিল্ডেই কাজ করে।
কৌশল ৩৯
কিছু অর্থহীন বাক্য শেখো
বড় বড় ব্যক্তিরা এমন স্বাগত, মুখস্থ প্রশ্ন দিয়ে কোনো আড্ডায় যোগ দেবার এই
কৌশলকে তাদের ‘সেকেন্ড ল্যাংগুয়েজ’ হিসেবে বর্ণনা করে। এই ভাষাটা অন্য
পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের সাথে মিশতে সহায়তা করে।
কেন এভাবে কথা বলে তারা? অবশ্যই, তাদের নিজেদের যেকোনো ভিড়ে মানিয়ে নিতে। যাতে অন্যরাও তাদের, তাদের একজন হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।
তুমি কীভাবে এই ভাষা শিখবে এই ভাবছ তো? তোমার যদি এমন ছোটোখাটো কোনো প্রশ্ন জেনে নেওয়া সম্ভব না হয়, তোমার কোনো বন্ধুর সাহায্য নাও, মে ওই বিষয় সম্পর্কে জানে।
পর্ব ৪০
তাদের বহুল চর্চিত বিষয়ে টোকা দাও
ডাক্তারদের প্রাথমিক কথাবার্তা
আমার ডাক্তার বন্ধু জন, ইয়ামিকা নামের এক জাপানি নারীকে বিয়ে করেছে। ইয়ামিকার জীবনে পরিচিত ডাক্তার বলতে একমাত্র জনই আছে।
এটা একটা সাধারণ ভদ্রতা, নব দম্পতিকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো। জনের এক ভাঙ্কার কলিগ তাদের নিমন্ত্রণ জানাল। আর স্বাভাবিকভাবেই ওরা সেটা গ্রহণ করে নির্ধারিত ভোজ সভায় উপছিত হলো।
ভোজ সভায় আরো কিছু পরিচিত ডাক্তারও নিমন্ত্রিত হলেন। বেচারি ইয়ামিকার গলা শুকিয়ে কাঠ! স্বামী ডাক্তার হলেও তাদের ডাক্তার বিষয়ে বিন্দুমাত্র কথাবার্তাও হয় না। সে বলতে গেলে কিছুই জানে না। তার ফ্যাকাশে মুখ দেখে জন হেসে কেলল। মেয়েটার হাত চেপে ধরে সাহস দিল, ‘ইয়ামি, বোকা মেয়ে, এখানে এত ভয়ের কী আছে?’
ইয়ামিকা চোখ বড় বড় করে বলল, ‘ওখানে সবাই চিকিৎসা পেশার সাথে নিয়োজিত ব্যক্তিরা থাকবে। আমার এ বিষয়ে কোনো জ্ঞান আছে? পরে মান ইজ্জত আমার তো ডূববেই, সহকর্মীদের সামনে তোমাকেও ছোটো হতে হবে!’
আসল শঙ্কা শুনেই হেসে ফেলল জন, ‘যেমনটা ভাবছ, পরিস্থিতি ঠিক বিপরীত। চিকিৎসকদের মাঝে যেসব কথাবার্তা হয় তা নেহাত পুরাতন এবং অনেক বেশি কমন। কয়েকটা প্রশ্ন তোমায় শিখিয়ে দিচ্ছি, এগুলোর বাইরে কেউ কোনো কথাই বলবে না। আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি।’
সে তাকে শিখিয়ে দিল, যখনই তাদের সাথে সাথে সাক্ষাৎ হবে, ‘আপনি কোন বিষয়ে স্পেশালিস্ট জানতে পারি?’ এই প্রশ্ন দিয়ে শুরু করবে। এরপরই জিজ্ঞেস করতে হবে, ‘আপনি কোনো হাসপাতালের সাথে যুক্ত আছেন কি না? অথবা নিজয় চেম্বার?’
স্বাগত প্রশ্ন এবং উত্তরের শেষে আরেকটুখানি গভীরে যাও। তাদের জিজ্ঞেস করো, ‘হসপিটালের সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন?’ অথবা এটা বলো, ‘হসপিটালের বর্তমান পরিবেশ কেমন? আপনার ওখানে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয়?’
ডাক্তারদের এসব ভেতরকার ভাষা জেনে বেচারি কিছুটা শান্ত হলো। অনুষ্ঠানে গিয়ে সে একই কায়দায় প্রশ্নগুলো করলো এবং সবগুলোই ছিট করেছে! কিছুক্ষণের মধ্যেই ইয়ামিকা সবার পছন্দের পাত্রী হয়ে গেল। সনাই তার সাথে কথা বলতে খুব আগ্রহ দেখাল। জনের অধিকাংশ সহকর্মী ইয়ামিকার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল, এমন চমৎকার মেয়ে এই যুগে কর্মই পাওয়া যায়, কেউ কেউ এ কথা বলতে স্বুল না!
## সঠিক ব্যক্তি থেকে খোজ নাও
বিষয়টা কেবল চিকিৎসকদের জন্য নয়, বরং অন্যসব পেশাধারীদের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য। তুমি বাইরে থেকে সবার হাঁড়ির খনর জানতে পারবে না। হাঁড়ির খবর জানতে হলে হাঁড়িতে হাত দিয়ে দেখতে হবে। এই যেমন একজন সাধারণ বই বিক্রেতা সারাজীবন অভিযোগ করেন, বড় বড় বইয়ের দোকানগুলোর সিভিকেটের জন্য তারা ব্যবসা করতে পারেন না। এমনকি, আমাদের লেখকরাও প্রার্থই বলেন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া তাদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে না। তাদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দেওয়া হয় না। তুমি বেচারা লেখক নয় বলে আমাদের লেখকদের ভেতরের অনেক খবরই তোমার কান পর্যন্ত পৌঁছাবে না, অথচ লেখক সমাজে গুগলোই বহুল চর্চিত বিষয়। এজন্য খুবই সহজ বুদ্ধি হচ্ছে তোমার পরিচিত কোনো একজন থেকে ওই সমাজের নানা বিষয় জেনেই তবে অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া। এতে করে অন্তত তোমার নিজেকে বাইরের কেউ মনে হবে না। এজন্যই আমি এই কৌশলটার নাম দিয়েছি, ‘তাদের বহুল চর্চিত বিষয়ে টোকা দাও।’
কৌশল ৪০
তাদের বহুল চর্চিত বিষয়ে টোকা দাও
নির্দিষ্ট পেশায় যুক্ত মানুষদের একটা বড় দলের সাথে মিশতে গেলে অবশ্যই তোমাকে তাদের সম্পর্কে জেনে তারপর আগাতে হবে। বোকার মতো হুট করে পরিচিত হতে গেলে নিছক অস্বস্তিকর বিড়ম্বনায় সম্মুখীন হবার আশঙ্কা সর্বাধিক। সব ধরনের পেশাদারদের নিজেদের সমাজে কিছু বহুল আলোচিত বিষয় থাকে। যেগুলো অন্যরা জানে না। তোমার কাজ হলো, এমন চর্চিত কিছু জিনিস এবং ওই পেশাদারদের সাম্প্রতিক কোনো ইস্যু জেনেই তারপর তাদের সাথে কথা বলতে যাওয়া। এক্ষেত্রে অনুষ্ঠানের আগের দিন তোমার কোনো বন্ধু থেকে ওসব তথ্য জেনে নাও, যে ওই পেশায় নিযুক্ত রয়েছে।
শীঘ্রই বড়ো মণ্ডে দেখা হচ্ছে
তাছাড়া বিভিন্ন পেশায় ছোটোখাটো কিছু বাক্য থাকে যা তাদের অত্যধিক আনন্দ দেয়, আবার কিছু বিষয় অত্যধিক পীড়িত করে।
একজন চিত্রনায়িকা তার কোনো একটি কাজের পূর্বে, ‘শুভকামনা রইল’, শব্দটা শুনলে তার মেজাজ বিগড়ে যায়। অথচ কোনো একজন শুভাকাঙ্ক্ষী যখন বলে, ‘আশা করি একেবারে ফাটিয়ে দেবে এবার।’ এই বাক্যটা সে খুবই পছন্দ করে। আবার একজন ম্যারাথন দৌড়বিদ ‘আশা করি এবারে ফাটিয়ে দেবে।’ এই বাক্যটা অত্যধিক অপছন্দ করে। বরং তাদের বলো, ‘আশা করি, পুরোনো রেকর্ডটা এবার ভেঙে দেবে।’
এই বাক্যটা সে প্রশংসা হিসেবে নেয়। সে চায় তার পুরোনো রেকর্ডগুলো ভেঙে নতুন রেকর্ড তৈরি করতে।
আমাকে একবার দমকল অফিসে যে-কোনো প্রয়োজনে যেতে হয়েছিল। ভেতরের উঠোনে কয়েকটা পাটি বিছিয়ে দমকলকর্মীরা অলস শুয়ে আছে। আমি কাউন্টারে জিজ্ঞেস করলাম, ‘৫০ নম্বর রুমটা কোনদিকে?’
সে খুব বিরক্তি নিয়ে উত্তর করল, ‘সোজা গিয়ে বামে।’
দমকলকর্মীরাও বিরক্তি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি কাজ সেরে যাবার সময় ধন্যবাদসূচক বললাম, ‘ধন্যবাদ সবাইকে। বড়ো কোনো ঘটনায় দেখা হবে।’ বড়ো বড়ো দুর্ঘটনা নিয়ে তাদের কাজ। আমার কথায় ‘বড়ো কোনো ঘটনায়’ শব্দটা ওদের কানে লেগেছে। আমার এমন জবাবে সবাই খুব খুশি হলো। তারাও আমায় ধন্যবাদ জানাল। পারলে ওই পেশার এমন কিছু বিষয় তুমিও জেনে নাও।
পর্ব ৪১
তাদের পাতাটাও পড়ো
আরো বেশি… তাদের বিষয়ে আরো বেশি জানতে চেষ্টা করো
সকাল সকাল কফি খেতে কার না ভালো লাগে? তুমি দারুণ একটা মুড নিয়ে কফি খাচ্ছ, হকার পত্রিকাটা তোমার বারান্দায় ছুড়ে দিল, তোমার দিন শুরু হয় পত্রিকার থেকে দেশ-বিদেশের খবর জেনে। পত্রিকার কোন পাতাটা প্রথমে উল্টাবে? অবশ্যই, আন্তর্জাতিক খবর, যদি না তুমি আন্তর্জাতিক অংশ নিয়মিত পড়। আন্তর্জাতিক খবর পড়তে তোমার বেশ লাগে, তাই তো? পৃথিবীর কোথায় কী হচ্ছে, এক নিমিষেই জেনে যাচ্ছ সব। অথচ অন্য অংশগুলো কখনো খুলেও দেখতে মন চায় না তোমার। এটা অন্যদের বেলায়ও প্রযোজ্য। খেলাধুলা, বিনোদন, কৌতুক, এসব খবরের নির্দিষ্ট পাঠক থাকে।
আজ একটু অন্যরকম করো না হয়? আন্তর্জাতিক খবর রেখে বিনোদনের পাতাগুলো পড়ো। অথবা তুমি যদি বিনোদনের নিয়মিত পাঠক হও, তবে আজ আন্তর্জাতিক অংশটায় একটু চোখ বুলাও? তুমি যতদিন না ওই সেকশনগুলো পড়বে, ততদিন পৃথিবীর বড় একটা অংশ তোমার অজানাই থেকে যাবে।
নিত্য আড্ডায় অনেক বিষয় তোমার মাথার উপর দিয়ে যায়! কেন বলতে পারবে? কারণ, তুমি মাত্র একটা নির্দিষ্ট গণ্ডির নিয়ে মেতে আছ, বিশ্ব তো আর ওই ছোট গণ্ডির মধ্যে পড়ে নেই। আগামীকাল কোন ছবিটা বের হচ্ছে, গতবছর কোন মুভিটা বক্স অফিসে হিট করেছে এসব তুমি তখনই জানবে যাপন বিনোদন জগৎটা দেখবে।
পত্রিকার পাতায় বড় বড় বিজ্ঞাপন দেখে তুমি বিরক্তির ঢেকুর তোলো, এসব না থাকলে পত্রিকা পড়াটা কত মধুর হতো, তাই ভানছ তো? বাস্তবতা বলে ঠিক উল্টো! ওসব থাকায় কতজনের পৃথিবী রঙিন হয়েছে তুমি গুণে শেষ করতে পারবেন। তোমার কাছে যেটা গুরুত্বহীন, সেটা অন্যের কাছে গুরুত্ববহ হতে পারে। ঠিক কাল থেকেই তুমি অভ্যেসটা বদলে ফেলো, পত্রিকার অন্য সেকশনগুলোও দেখো, পড়ো এবং জানো। গুরুতে কিছুটা বিরক্ত লাগবে আমি জানি। কিন্তু যখন এটা চিন্তা করবে এসব তোমাকে বাস্তব জীবনে কতটা সহযোগিতা করবে, তখন সব বিরক্তি খুশিতে রূপ নেবে।
আমি যদি জিজ্ঞেস করি, পত্রিকার সবচেয়ে বিরক্তিকর অংশ কোনটি? সবাই এক বাক্যে বলে দেবে, বিজ্ঞাপনের অংশটা। আমার পরামর্শ তোমায় বিরক্তি দেবে নিশ্চিত, আমি এখন তোমাদের বলব, ওই অংশটাও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখো। আমার উপরে রাগ আসতে পারে, বাস্তবতা হচ্ছে ওটাও তোমায় অনেকে বেনিফিট দিবে।
বিজ্ঞাপনের পাতাগুলো তোমাকে বর্তমান সময়ের প্রচারমাধ্যম সম্পর্কে ধারণা দেবে। কীভাবে ওসব কাজ করে। কী রকম ডিজাইন করলে তা চোখে পড়ে। এবং অবশ্যই কী ধরনের বাক্য মানুষকে বেশি আকৃষ্ট করে! এসব সাইকোলজিও তুমি বৃঝতে আরম্ভ করবে।
জাহাজের সময়টাতে প্রায়শই দেখেছি- যাত্রীরা জাহাজের কর্মীদের প্রশ্ন করেন, এই নৌকায় তুমি কতদিন যাবৎ আছ?’
অধিকাংশ কর্মীরাই বিরক্ত হন এই প্রশ্নে। প্রথমত সঠিক প্রশ্ন করার জন্যও একটা যোগ্যতার দরকার হয়। তারা যদি এভাবে বলত, ‘এই জাহাজে তুমি কতদিন ধরে- কাজ করছ?’ তাহলে কর্মীরা খুব প্রফুল্ল হয়ে জবাবটা দিত।
আমাদের জাহাজের ক্যাপ্টেন ক্যাফিরো সাহেব স্বল্পভাষী মানুষ। যাত্রা গুরুর দিকে বা শেষে তাকে যাত্রীদের পাশে এসে হাত মেলাতে প্রায়ই দেখা যায়। ক্যাপ্টেন সাহেব মাঝেমাঝে তীব্র রেগে যান। কিছু মানুষ এমনভাবে প্রশ্ন করেন যে রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক।
একজন যাত্রী ক্যাপ্টেনের সাথে হাত মিলিয়ে বলল, ‘হাই, আপনি মাস্টার হিসেবে কতদিন কাজ করেছেন?’
আরেকজন বলল, ‘তোমার প্রথম কমান্ডিং কী ছিল?’
ক্যান্টেনের মেজাজ বিগড়ালেও উভয় প্রশ্নেরই জবাব দিয়েছেন। অথচ প্রশ্নগুলো এভাবেও হতে পারত, ‘হাই, আপনি ক্যান্টেন হিসেবে কতদিন ধরে কাজ করছেন এই জাহাজে?’
অথবা ‘আপনি প্রথম কোন জাহাজ দিয়ে কর্মক্ষেত্রে চুকেচেন?’
এমন হলে তারা ক্যান্টেনের জ্রু, ইতালিয়ান চেহারাটা দেখত। অথচ তারা কর্বণ কষ্টটা নিজেরাই বেছে নিয়েছে।
কীভাবে উত্তর পাবে, এটা খুব বেশি নির্ভর করছে, তুমি কীভাবে প্রশ্নটা করেছ তার উপর।
সংবাদপত্রের সবগুলো অংশ পড়ার সুবিধা এটাই, এক সাথে তুমি নানা দিক নিয়ে জেনে যাবে, যা তোমায় অন্বন্তিকর পরিছিতি থেকে রক্ষা করবে।
তাদের সম্পর্ক আরো বেশি রসদ সংগ্রহ করো।
বিভিন্ন পেশার মানুষদের, নিজেদের ভেতরে চর্চিত বিষয়গুলো জেনে, তুমি তাদের সাথে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি করতে পারবে, যা পূর্বে আলোচিত হয়েছে। এই পর্যায়ে আমরা জানব, কীভাবে ট্রেড ম্যাগাজিনগুলো তোমাকে সাহায্য করতে পারে। যত বড় বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান দেখছ, সবখানেই এই ট্রেড ম্যাগাজিন সরবরাহ করা হয়। তুমি চাইলে তোমার কোনো বন্ধুর মাধ্যমে আনিয়ে দুয়েকটা ম্যাগাজিন পড়ে দেখতে পারো। এছাড়া সাপ্তাহিক ম্যাগাজিনগুলো বিভিন্ন বইয়ের দোকানে সহজেই পাবে। এগুলো তোমায় ব্যাবসায়িক জগতের নানা তথ্য দেবে, যা তুমি কখনোই জানতে না। ফলশ্রুতিতে, কোনো একজন বড় ব্যক্তির সাথে তুমি এই বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতে পারো, যদি সুযোগ মেলে!
চাকরির বাজারেও এই জ্ঞান তোমায় এগিয়ে রাখবে। যে ছেলে ব্যবসা বোঝে তাকে কে না চায়?
## কৌশল ৪১
তাদের পাতাটাও পড়ো
বিভিন্ন বিষয়ের উপরে আজকাল অনেক মাসিক ম্যাগাজিন বের হয়। তোমার লক্ষ্য যদি হয় কোনো বড় ব্যক্তির সান্নিধ্যে যাওয়া তবে ওগুলো কেনা তোমার জন্য ফরজ হয়ে গেছে। ট্রেড ম্যাগাজিন থেকে শুরু করে লাইফস্টাইল সব ধরনের ম্যাগাজিন তুমি বাজারে পাবে। তোমার কাজ হলো, প্রতি মাসে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের উপরে ম্যাগাজিন কিনে আনা এবং পড়া। একজন মহান সাধক বলেছিলেন, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না। সেরকম আমিও বলতে চাই, ম্যাগাজিন কিনেও কেউ দেউলিয়া হয়নি। উল্টো কোটিপতি হবার রেকর্ড আছে।
পর্ব ৪২
তাদের রীতিনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখো।
বৈশ্বিক ইনসাইডার হয়ে ওঠা
তোমাদের যাদের ভিন্ন একটা দেশ ভ্রমণ করার সুযোগ হয়েছে, তারা ভ্রমণের পূর্বে কী করেছিলে? যতটুকু পেরেছ ওই দেশের ভাষা এবং দেশ সম্পর্কে হালকা পাতলা জেনে নিয়েছ, তাই নয় কি? কেউ কেউ বোধহয় ওই দেশ বিষয়ক দু-একটা বইও পড়ে কেলেছ নিমিষেই।
ইতালিতে গিয়ে রোম শহর ঘুরতে ঘুরতে তোমার টয়লেট পেয়ে বসল, বেচারা, তুমি কাউকে জিজ্ঞেস করতে পারছো না, এখানকার টয়লেটটা কোথায়?
কারণ তুমি তাদের ভাষাই জানো না! এজন্য প্রত্যেক ভ্রমণকারী অবশ্যই সে দেশের কিছু ভাষা শিখে রাখে। ওসলো কাজে দেয়। আবার ধরো তুমি কুয়ালালামপুর গিয়ে এদিক ওদিক চাতক পাখির মতো একটা কাপড়ের দোকান খুঁজছ। কিন্তু তুমি ভাষা জান না বলে নিজের চুল ছিড়ে ফেলতে মন চাইছে!
এমনটা হয়। হওয়াটা স্বাভাবিক। বিশ্বায়নের এই যুগে ওসব ঝামেলা কিছুটা হলেও কমেছে। ইন্টারনেট আর ইংরেজি ভাষার বদৌলতে আজকাল অনেক কিছুই খুব সহজ হয়ে গেছে। কিন্তু একটা জিনিস আজও অটুট রয়েছে। তা হচ্ছে সবার নিজস্ব সংস্কৃতি এবং রীতিনীতি। বিশ্ব যতই আধুনিক হচ্ছে মানুষ ততই নিজস্ব সংস্কৃতির গুরুত্ব উপলব্ধি করছে। একই কারণে ইউরোপ, এশিয়া কিংবা আফ্রিকায় গেলে দেখা যায়, মানুষের আচার-আচরণ এবং জীবনের সাথে তাদের রীতিনীতি, সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। সবার প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, যে দেশেই যাও, অন্তত তাদের রীতিনীতি এবং সংস্কৃতি একটু হলেও জেনে যাও। নইলে আমার বান্ধবী, গেরাল্ডিনির হাল হবে সবার! গেরাল্ডিনির গল্পটা মজার।
জাপানে একটা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার ডাক পেয়ে সে আর দেরি করল না, দাওয়াত কবুল করে নিল। জাপান সম্পর্কে তার ধারণা ছিল একেবারে শৃন্য। তবে আশপাশে যা শুনেছে জাপানিরা চরম অতিথিপ্রিয়। গেরাল্ডিনি হাওয়াই জাহাজে চড়ে বসল, ৬৭৩৭ মাইলের দূরত্ব তাকে হালকা বিশ্রাম দিল। সে তার প্রিয় জিন্স এবং একটা জ্যাকেট পরেই প্লেনে উঠল। জাপানে তাকে রিসিভ করতে আসা নারীটা এয়ারপোর্টে তাকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে রিসিভ করল। পাঁচজন ভদ্রলোক তাকে গ্রহণ করতে এসেছেন। তারা মাথা নিচু করে জাপানিদের রীতি অনুযায়ী তাকে স্বাগত জানাল। সবাই তাদের ভিজিটিং কার্ড তার হাতে তুলে দিল। সে ওগুলো দেখে পেছনের পকেটে রাখল। এরপর নিজের ভিজিটিং কার্ডটা হাতে নিলো। বেচারি ভাবল, তার নামটা উচ্চারণ করতে এদের দাঁত একটাও মুখে থাকবে না। বরং নামটা সহজ করে দেওয়াই ভালো। সে কার্ডের উপরে সংক্ষেপে লিখলো ‘গ্যারি’। জাপানি ভদ্রলোকেরা কার্ডটা উলটেপালটে দেখল, তারপর ব্যাগে ঢুকিয়ে নিল।
পরের সকালে গ্যারিকে চায়ের দাওয়াত দেওয়া হলো। আগের ভদ্রলোকদের সাথে তার আবারও দেখা। এবার একটা বাড়তি চমক! তার হাতে একটা উপহারের বন্ধ বাড়িয়ে দিল পুরুষদের একজন। ও খুবই খুশি হলো। হাত বাড়িয়ে উপহারটা নিল। উপহার বন্ধটা খুলে সে উপহারটা দেখে আবেগ আপ্রুত হলো। গেরাল্ডিনি তাদেরকে ধন্যবাদ জানাল, ‘অসংখ্য ধন্যবাদ। উপহারটা আমার খুবই পছন্দ হয়েছে।’
সে তাদের সাথে মৃদু কোলাকুলি করল। জাপানি ভদ্রলোকেরা অবাক হয়ে গেল! একজন আরেকজনকে আড়ালে ডেকে কী কী জানি বলল। সেও প্রচণ্ড অবাক হলো। কী ভুল করল নিজেও বুঝল না! এবং তার শঙ্কাই সত্যি হলো। এরপর আর কখনোই তাকে জাপান থেকে ভাকা হয়নি। সে এটা নিয়ে অতিশয় চিন্তিত হয়ে গেল। গ্যারির ভুলের লিস্ট অনেক লম্বা। যদিও সে না জেনে করেছে, তবে ভুল সবসময়ই ভুল হিসেবে গণ্য। তার প্রথম ভুল, সে জিস পরে তাদের সাথে দেখা করতে গিয়েছে। এশিয়ায় জিস কিংবা পাশ্চাত্যের জামাকাপড় পড়া হয় না। ওগুলো পরে কেউই অফিসিয়াল কাজে যায় না।
তার দ্বিতীয় ভুলটা হচ্ছে, জাপানিদের চোখে বিজনেস কার্ড অনেক গুরুত্বপূর্ণ বস্তু। ওটা দিতে হয় যেমন দুই হাত দিয়ে, নিতেও হয় দুই হাত দিয়ে সম্মানের সাথে! যা সে করেনি। (তবে এশিয়ার মুসলিম দেশগুলোতে ডান হাতে দিতে হয়। তারা যে-কোনো জিনিস ডান হাতে নিতে পছন্দ করেন।)
এরপর বিজনেস কার্ডটা গ্রহণের পর উভয়ের উচিত ছিল, ওটা পর্যবেক্ষণ করে দেখা। এই অঞ্চলে কথাবার্তা শুরুই হয় বিজনেস কার্ড আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে। দুজন নিজেদের পরিচয় হওয়ার পরেই ওটা সৌজন্যতার অংশ হিসেবে বাড়িয়ে দেয়। এবং বিজনেস কার্ড গ্রহণের পর তা দ্রুত পেছনের পকেটে রাখাটাও একটা অভদ্রতা। গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মানুষ তার ব্যাগে রাখে।
তার চতুর্থ ভুলটা, সে আবিষ্কার করে যখন সে আমেরিকায় আবার ফেরত আসে। তার বন্ধু বিল যে কি না ব্যাবসায়িক কাজে বিভিন্ন দেশে যাওয়া আসা করে, তার এই ভুলটা ধরিয়ে দিয়েছে। বিজনেস কার্ড জাপানিদের কাছে অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। কার্ডে ওর নাম, কোম্পানি, পদবি এসব যতটা গুরুত্বপূর্ণ, কার্ডের অপর দিকে জাপানি ভাষায়ও একই জিনিস লেখা ততটা গুরুত্ব ওরা দিয়ে থাকে। দুঃখজনক কিন্তু সত্য এটাই, তার কর্মের পেছনের অংশ পুরোপুরি খালি ছিল।
আর অন্য ভুলটা ছিল, কার্ডের উপরে কলম দিয়ে নিজের নাম লেখা। এশিয়ান অঞ্চলে এটা খুবই নেতিবাচক যে, তোমার কার্ডের উপরে কলম দিয়ে কিছু লেখা আছে! আগেই বলেছি, ২.৫ মায়ে তোমার বিজনেস কার্ড অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
এটা খুবই দুঃখজনক যে সে তাদের সামনেই তাদের উপহারটা খুলে দেখেছে! এটা ওদের জন্য চরম অপমানকর। প্রতিটি উপহার গোপনীয়ভাবে বাসায় কিংবা কক্ষে খুলতে হয়। যাতে কেউ না দেখে। (আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে উভয়ের দিক থেকে যেসব উপহার আদান-প্রদান হয়েছে, তা যাতে তুলনা করতে না হয়। বেচারি তাদের তো কোনো উপহারই দেয়নি।)
সর্বশেষ ভুলটা ছিল, সে তাদের সাথে মৃদু কোলাকুলি করেছে, জাপানে প্রথম পরিচয়ে কেউ তা করে না। যাদের পরিচয় এবং সম্পর্ক দীর্ঘ, তারাই কোলাকুলি করতে পারে।
এত বিশাল ভুলের পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে সে এটা আশা করতে পারে না, তাকে ওরা ছিতীয়বার ডাকবে। তবে এটা অবশ্যই বলা উচিত, ভবিষ্যতে সে এসব ভুল থেকে দূরে থাকতে পারবে।
এরপর তার আরেকবার আমন্ত্রণ এলো, আমেরিকার ভেতরেই। জায়গার নাম এল সালভাদর, যেখানে সে খুব সহজেই পৌঁছে গেছে। এবার আর আগের ভুলটা করেনি গ্যারি। যাওয়ার আগে ওই অঞ্চল নিয়ে খোঁজ নিয়ে তবেই বিমানে উঠেছে।
তুমি যেখানেই যাও না কেন, সেখানকার রীতিনীতি অনেক বড়ো ফ্যাক্টর। তুমি নিজের অজান্তেই হয়ত তাদের কোনো রীতি ভেঙে বসে আছ! এজন্যই ওই দেশের রীতিনীতি এবং ভালোমন্দ জানাটা অত্যধিক জরুরি, যদি তুমি সফল হতে চাও।
## কৌশল ৪২
### তাদের রীতিনীতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখো
কোনো নতুন ভূমিতে পা দেওয়ার আগেই সেই ভূমির সংস্কৃতি, রীতিনীতি জেনে নেওরা ভালো। এতে করে সেখানে প্রচলিত খারাপ এবং ভালোর ব্যাপারগুলো তোমার কাছে পরীক্ষা হয়ে যাবে। আর তুমি তাদের সংস্কৃতিকে সম্মান করলে তোমাকে তারা অবশ্যই সম্মান করবে। যদি তোমার কাজে সফলতা চাও, তাহলে অবশ্যই সে দেশের রীতিনীতি জেনে যাও। তারা কোন বিষয়গুলো এড়িয়ে চলে আর কোন বিষয়গুলো তাদের খুশি করে, জেনে যেতে অত্যধিক কষ্ট হবার কথা নয়!
পর্ব ৪৩
দামাদামি না জানলে ঠকতে হবে
যে পণ্য কিন্তুতে চাচ্ছ, ওটার হাঁড়ির খবর জানার পন্থা
মানুষ কৌশলী হতে হতে এমন নীচে পৌছে গেছে যে আজকাল আর কোনো কৌশলই কাজে দেয় না!
‘প্রেমের ময়দানে এবং যুদ্ধের ময়দানে সব কিছুই বৈধ।’ এই প্রবাদটাকেও অনেকে ছাড়েনি। তাদের সংযোজিত শ্রুতিটি এমন, ‘প্রেমের ময়দানে, যুদ্ধের ময়দানে এবং কেনাকাটার ময়দানে সব কিছুই বৈধ।’
আমার পরিচত একজন হোটেল ম্যানেজার আছেন। তিনি কথায় কথায়, হেসে বললেন, ‘বিভিন্ন সেলিব্রেটিদের নাম নিয়ে হোটেল রুম বুক নেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এই সেদিন আমাদের রেস্টুরেন্টে একজন বলল, আমি রন সাহেবের বন্ধু এলিস বলছিলাম। রন সাহেবের নামে একটা রুম বুকিং নিন।’
ম্যানেজার রন সাহেবকে চেনেন। তিনি একজন মিডিয়া ব্যক্তি, অত্র অঞ্চলের যে কেউ চিনে। আসল ঘটনা হচ্ছে ভিন্ন। রন সাহেবের নাম ভাঙিয়ে রুম নিতে গেলে সহজেই পাওয়া যাবে, এটাই স্বাভাবিক। হোটেলে যেদিন ফোন করা ভদ্রলোক আসলেন, অনুনয় করে বললেন, ‘রনের আজ শরীর ভালো নেই। তাই সে আসতে পারেনি।’
উক্ত ম্যানেজারের দাবি তিনি আট থেকে ন’বার রন সাহেবের নামে রুম বুকিং নিয়েছেন, কিছু কখনোই রন সাহেবের দেখা মেলেনি। মোদ্দা কথা হচ্ছে, এখন এই ট্রিকটাও বন্ধ হয়ে গেছে। কোনো সেলিব্রেটির নাম নিয়েও রুম পাওয়া যাচ্ছে না আজ-কাল।
আরেক ধরনের লোক আছে, যারা খাবার হোটেলে গিয়ে সোজা রিসেপশনে চলে যাবে। এন্ট্রি খাতায় আন্দাজে একটা নাম দেখিয়ে বলবে, ‘ওটা আমার। আমি, বুকিং দিয়েছি।’
এই কৌশলটাও বাতিলের খাতায় চলে গেছে বহুদিন হয়। হোটেল এবং রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চয়ই ঘাস খেয়ে হোটেল কিংবা রেস্টুরেন্ট চালান না! তারা সিস্টেম আরো আপডেট করেছেন। এই যাচ্ছে মানুষের বাটপাড়ির অবস্থা!
আমার নিজের জীবনেও এমন ঘটনা দেখেছি। ‘হোটেল ভিনার হাউজে’ আমার একটা রুম বুক করা ছিল। আমি চাবি বুঝে নেওয়ার সময় এক ভদ্রলোক চিৎকার করে উঠলেন, ‘কোনো রুম খালি নেই মানে? এটা কি মগের মুন্নুক নাকি? আমার অবশ্যই রুম লাগবে।’
ভদ্রলোকের চিৎকার দেখে মনে হলো রুম তার নামে আজীবনের জন্য বরাদ্দকৃত থাকা উচিত। এই ভদ্রলোক যেকোনো দিন এসে বলতে পারেন ‘রুম নেই মানে?’ এমন কটু চিৎকারে কাজ না হওয়ায় ভদ্রলোক হতাশ হলেন। তার ধারণা ছিল তার ধমকে রুম দিয়ে দেওয়া হবে। সেই ভদ্রলোক আরেক ধাপ নীচে নামালেন নিজেকে। এবার চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘তুমি যদি আমায় রুম না দাও আমি এই ফ্লোরেই শুয়ে পড়ব। এখানেই ঘুমাব। আমার গায়ে এক টুকরা কাপড়ও থাকবে না বলে দিলাম।’
তার বাচ্চামি কাজে দিয়েছে। তাকে একটা রূম দেওয়া হলো। একটা রূম পেতে নিশ্চয়ই কেউ এতটা নীচে নেমে নিজের আত্মসমান বিসর্জন দেবে না। এই বাচ্চামি কৌশলটাও তাই আমাদের কোনো কাজের না।
একদিন সক্ষে বেলার ঘটনা, একজন ইন্স্যুরেন্স কর্মী আমায় একটা প্রস্তাব দিতে আসলেন। আমিও যথারীতি কার্সন নামের ভদ্রলোকের আমন্ত্রণ গ্রহণ করলাম। তিনি উক্ত ইন্স্যুরেন্সের সুবিধা অসুবিধা সবই জানালেন। ওটাতে আমি রাজি হলে আমার কতটুকু লাভ হবে তাও বর্ণনা দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন। তার বর্ণনা মতে আমি কিছুটা রাজি হয়েও গেলাম। এমন সময়ে ঘ্যাত ঘ্যাত করে তার ফোন বেজে উঠল। সে একটু সমর চেয়ে নিল এবং বারান্দায় ছুটে গেল। তার কথা ওখান থেকে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। সে তার কলিগের সাথে একই ধরনের একটা অফার নিয়ে কথা বলছিল। কার্সন সাহেবের কথা শুনে এটাই বুঝলাম, তার কলিগ যেন ওই লোকের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়। যেহেতু ওই লোক ইন্স্যুরেন্সের পলিসিগুলো নিয়ে অনেক ভালো জানেন, তার সাথে যত কম লাভে চুক্তি করা যায় সেটাই লাভ।
আমার ভেতরটা নড়েচড়ে উঠল! হচ্ছেটা কী? একজন লোক ইনসিওরেন্সের ভেতরের বিভিন্ন কিছু জানেন বলে তার থেকে কম লাভ করবে? অথচ আমাদের মতো মানুষদের থেকে বেশি লাভ? সেদিন আমি এটা স্পষ্ট বুঝতে পেরেছি, ‘প্রত্যেক বিক্রেতা একই পণ্য ভিন্ন দুই দামে বিক্রি করেন। যারা হাঁড়ির খবর জানেন তাদের জন্য এক দাম, আর আপনার জন্য আরেক দাম।’
এজন্য জেনেশুনে কিছু কিনতে গেলে বাড়তি কিছু পাওয়াই যায়। তুমি বেচারা জীবনে কিছু কিনোনি। তুমি যখন ওটা কিনতে যাবে, দোকানদার সহজেই তোমার থেকে দাম বেশি নেবে। অথচ একই পণ্য অন্য একজন লোক আরো কম দামে কিনে নিয়ে গেল!
আমি এজন্যই সবাইকে পরামর্শ দেই, কিছু কিনতে গেলে অবশ্যই ওই জিনিস সম্পর্কে জেনে যেতে। ওই পণ্য নিয়ে কিছু সাধারণ কথাবার্তা যেগুলো অন্যরা জানে না। যেগুলো জানলে তুমিও ভেতরের কেউ হিসেবে গণ্য হবে। আইন পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের পারিশ্রমিক নেওয়া নিয়ে একটা কথা বেশ প্রচলিত, ‘যদি তুমি দড়ির মাপ জানো, তবে তোমার দড়ি ছিড়ে পড়ার সম্ভাবনা শূন্য।’
অর্থাৎ, যদি তুমি একজন উকিলের ফি এবং ওই জাতীয় কেসের সঠিক খরচ জানো, তবে তুমি খুবই কম ফি দিয়ে একজন ভালো উকিল ধরে ফেলতে পারবে।
আমার বাসার রঙের কাজ করে তার নাম ইগি, সে খুবই ধূর্ত। একদিন আমায় বলল, ‘ম্যাডাম, আপনি কি জানেন কীভাবে কম খরচে দেয়াল রং করাতে হয়?’ আমি মাথা দোলালাম, ‘কীভাবে?’
সে বলল, ‘যার সাথে রং করার চুক্তি হবে তাকে সহজ ভাষায় বলবেন, এই যে দেয়ালটা দেখছ, এটার রং হবে। দেয়ালটা বেশ পরিহার এবং প্রেইন। তোমাকে ঘষামাজা এবং ফুটিং করা লাগবে না। কষ্টও কম। ঝটপট কাজ হয়ে যাবে। দেখবেন আপনি অনেক কম দামে একজন রংমিত্রি ভাড়া করে নিতে পারবেন। ঘষামাজা, পুঁটিং দেওয়া এছাড়া আরো দুয়েকটা নাম সে বলল, যেগুলো একজন রংমিত্রির সামনে আমাকে ভেতরের লোক (ইনসাইভার) হিসেবে তুলে ধরবে। ফলে অনেক কম মূল্যেই আমি রং করিয়ে নিতে পারব।
তখন কী করবে, যখন পরামর্শদাতা হিসেবে ‘ইগি’ বলে কেউ থাকবে না? জীবনের সব পর্যায়ে তো আর ইগিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না, যে ভেতরের কথাগুলো দেদারসে বলে দেবে! এই অবছায় একটু বুদ্ধি খাটাতে হবে। তোমাকে ফিল্ডের ইগিদের খুঁজে বের করতে হবে। তোমার যে বন্ধুটা ওই সম্পর্কিত কোথাও কাজ করে তাকে জিজ্ঞেস করো। সে তোমায় সব বলে দেবে। ওরকম কেউ না থাকলেও উপায় আছে।
ধরো তুমি একটা ডায়ামন্ড কিনতে চাও। তোমার পরিচিত একটা দোকান রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে তুমি না জেনে গেলে তোমার থেকে দাম বেশি নেবার সম্ভাবনা রয়েছে। তুমি এই কাজটা করতে পারো, আশপাশে যতন্তলো জুয়েলারিতে ডায়ামন্ড বিক্রি হয়, ঘুরে আসো। কয়েক দোকানে ঘুরলেই তাদের প্রচলিত নামগুলো তোমার নজরে আসবে। এই যেমন ডায়ামন্ডকে তারা লোকালি পাখর বলে ডাকে। ডায়ামন্ডের উপরের অংশটাকে তারা ডাকে টেবিল। প্রস্তকে জ্রিডল নামে ডাকা হয়। এ জাতীয় আরো অনেক নাম তোমার চোখে পড়বে যেগুলো একজন সাধারণ ক্রেতা হিসেবে তোমার অজানাই থেকে যায়। একটু জেনেশুনে তোমার কাঙ্ক্ষিত দোকানটাতে যাও, এসব শফগুলো ব্যবহার করো। কী দেখলে? দোকানদার তোমাকে ভেতরের কেউ ভেবে বসে আছে। অর্থাৎ তুমি হ্যাড়ির খবর সব জানো। পরিশেষে দোকানি তোমার কাছে জিনিসটা অনেকের চেয়ে কম দামে বিক্রি করছে।
## কৌশল ৪৩
### দামাদামি না জানলে ঠকতে হবে
প্রাচীন আরবে বিভিন্ন জিনিসপত্র বেচা কেনার ইতিহাস পাওয়া যায়। সেই তখন যেমন দামাদামি হতো, আজকের এই আধুনিক বিশ্বে এসেও দামাদামি করাই লাগে। তোমরা যদি দামাদামি করতে জানো, তবে ঠিক একই পণ্যটাই তোমাকে অনেক কম মূল্যে দোকানি দিয়ে দেবে। ছোটোখাটো কেনাকাটায় লাভ-লোকসানের হিসেব মানায় না। কিন্তু ওটা যখন বড় কোনো সদাই হতে যাচ্ছে, তখন এই ব্যাপারটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পণ্যের আলাদা ভাষা রয়েছে। কয়েক দোকানে ঘুরো, সেই পণ্যের ভাষা শেখার জন্য। এরপর কাঙ্ক্ষিত দোকানে ঢুকে সেই ভাষা প্রয়োগ করো, দেখবে এই ভাষা সত্যিই কাজে দেয়!
