হাউ টু টক টু এ্যানিওয়ান – ৩
অধ্যায় তিন
বড়দের মতো কথা বলো
মনুষ্য জঙ্গলে তোমাকে স্বাগত
ক্ষুধার্ত চিতা শিকারের মুহূর্তে তার জাতও ভুলে যায়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে যখন আরেকটা চিতার উপস্থিতি দেখে, সে তার গর্জন আর থাবার দ্বারা নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। যেকোনো একজনই শিকারটা পাবে এটা ওরা দুটো চিতাই জানে। বিজয়ী চিতাটা কোনজন?
এক্ষেত্রে ওদের দুটোর মাঝে যেটি নিজের যোগ্যতা প্রমাণ দিতে সক্ষম হবে, সেটিই বিজয়ী। গহীন জঙ্গলের চিতার যোগ্যতা যেমন তার শক্তি আর ক্ষিপ্রতায় প্রকাশ পায়, মানুষের যোগ্যতা কীসে প্রকাশ পায় কেউ বলতে পারো?
তোমার উত্তর যদি হয় তার কথোপকথন এবং যোগাযোগের দক্ষতার উপর, তাহলে তুমি শতভাগ সঠিক উত্তর দিয়েছো। গবেষণায় এসেছে একজন ব্যক্তির সফলতার ৮৫% নির্ভর করে তার যোগাযোগের দক্ষতার উপর। আরেক গবেষণা দেখিয়েছে মালিকপক্ষ কর্মীদের যোগাযোগের দক্ষতার উপরে অনেক বেশি জোর দেয়। বিশেষ করে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে।
সুতরাং মানব জঙ্গলে নিজের যোগ্যতা প্রমাণের বড় অস্ত্র হচ্ছে তার যোগাযোগের দক্ষতা কেমন, তার উপর। বনের চিতা আর সভ্য সমাজের মানুষের মাঝে বোধহয় এটাই তফাত। এক জঙ্গলে শক্তির জয়ধ্বনি অন্য জঙ্গলে কৌশলের জয়ধ্বনি। এমনটা আমাদের অনেকের সাথেই হয়েছে। ধরো হুট করে একজন ব্যক্তি এলেন। তিনি কথা বলতে বলতে এমন এক পর্যায়ে চলে গেছেন, তার অনেকগুলো শ্রোতা জুটে গেছে। অনেকেই জানতে চাচ্ছে, ‘আপনি কী করেন?’
তুমি যখন কারো সাথে কথা বলছো, অল্প সময়ের মাঝেই তুমি বুঝতে পারবে ওই ব্যক্তিটি কেমন ব্যক্তিত্ব বহন করছে। ব্যক্তিগত জীবনে সে কতটা দক্ষ তা তোমার জানারও প্রয়োজন পড়েনি। একটা প্রবাদ সমাজে প্রচলিত রয়েছে ‘আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী।’
তুমি অন্যের সামনে নিজেকে কতটা ফুটিয়ে তুলতে পেরেছো এটাই আসল ব্যাপার। তোমার যোগাযোগের দক্ষতা যদি শূন্য হয় তবে তার সামনে তোমার ব্যক্তিত্ব শূন্যের কাতারে। তোমার ব্যক্তিত্ব তার সামনে হারাচ্ছো এটা জানা কথা। ‘হেই, কেমন আছ?’ কিংবা ‘দিনকাল কেমন যাচ্ছে?’ এসব প্রশ্ন পেশাদারি জীবনে যতটা না জানার জন্য জিজ্ঞেস করা হয় তার চেয়ে বেশি জিজ্ঞেস করা হয় তোমার যোগাযোগের দক্ষতা পরীক্ষা করতে। তুমি ঠিক কতটা হাসছো, কখন হাসছো এবং কতটা সুন্দর করে জবাব দিচ্ছ এসবই তোমার যোগাযোগের মূল দক্ষতা। এই অধ্যায়ে তোমাদের শেখাব অল্প কিছু কৌশল ব্যবহারে তোমার যোগাযোগের দক্ষতা কতটা বাড়বে। জানার বিষয় এটাই, তুমি তোমাকে ঠিক কতটা উঁচুতে নিতে চাচ্ছো।
পর্ব ২৪
তোমার পেশা কী – না!
তারপর… এখন কী করছো?
নির্বোধ লোকেরা প্রায়শই অন্যের বিষয় নিয়ে কথা বলে খুব মজা পায়। ‘তুমি কীসে চাকরি করো?’ এটাও তেমনই একটা নির্বোধ প্রশ্ন।
বিষয়টা এমন নয় যে তারা তোমাকে নিয়ে খুব ভাবে। আবার ব্যাপারটা এমনও নয় যে তারা তুমি কোথায় চাকরি করো তা নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বরং তারা তোমাকে মাপতে চায়, তোমার অবস্থান বুঝতে চায় তোমার চাকরির দ্বারা। এটা একটা বড় ধরনের বোকামিমূলক প্রত্যাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।
অন্যদিকে পেশাদার এবং সফল ব্যক্তিরা কখনোই তোমাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করবে না. তুমি কীসে চাকরি করো। যদি জিজ্ঞেস করেও থাকে, তা বলবে ভিন্নভাবে। প্রশ্নটা ঘুরিয়ে মার্জিত ভাষায় করবে। যেখানে তোমার উত্তর দিতেও কোনো অসুবিধা হবে না।
তোমাদের মাথায় হয়ত এটাই ঘুরছে যে, বেকার মানুষদের এই প্রশ্নটা অনেক পোড়ায়। কথাটা আংশিক সত্য। এমনও অনেক ব্যক্তি আছে যারা চাকরি করে এবং ভালো টাকাই উপার্জন করে। তাদেরও অনেকে এই প্রশ্নে বিচলিত হয়। এই যেমন- সমাজে এমন কিছু পদ যেমন লাশ কাটার ডোম, সরকারের ট্যাক্স সংগ্রহকারী কিংবা অন্য কোনো চাকরি, যা তারা সবার থেকে লুকাতে পছন্দ করে। মূলত দেখা যাচ্ছে যে এই অত্যাবশক প্রশ্নটা মানুষকে শুনতেই হয়। কিন্তু অনেকেই এই প্রশ্নটা পছন্দ করছে না!
আমাদের চারপাশে এমন অনেক বুদ্ধিমতী এবং দক্ষ নারীরা রয়েছেন যারা শিক্ষা জীবনে অনন্যসাধারণ নজির রেখে গেছেন। তারা সব ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাখলেও বিয়ের পরবর্তী জীবনে ক্যারিয়ারকে নিজেদের পরিবারের জন্য বিলিয়ে দেন। নিজের সন্তান স্বামী, এসবের জন্য নিজের ক্যারিয়ারের চিন্তা আর করে উঠেন না।
ইতর প্রকৃতির কিছু মানুষ রয়েছে, যারা এই মহৎ নারীদের ‘আপনি কীসে চাকরি করেন?’ এই প্রশ্নটা করে মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন। সেই সব নারীরা যখন পারিপার্শ্বিক নানা ব্যাপার তুলে শেষে বলেন ‘আমি একজন গৃহিণী।’ ওই লোকেরা তখন টিটকারির সুরে বলেন ‘ওহ, আচ্ছা।’ বোঝা উচিত, প্রশ্নটা অনেকের কাছেই সুখকর নয়। তাই জ্ঞানী ব্যক্তিরা মানুষকে এই প্রশ্নটা থেকে দূরে রাখেন।
আবার আপনি যখন অন্য কারো পদবি কিংবা চাকরির অবস্থা না জেনেই তার সাথে মিশবেন, সে নিজেকে অনেক খুশি মনে করবে। কারণ সে কী চাকরি করে আপনি তা না জেনেই তার ঘনিষ্ঠ হচ্ছেন।
কৌশল ২৪
তোমার পেশা কী না!
সমাজে অনেকেই তার পেশাদারি জীবনের অবস্থান গোপন রাখতে চায়। ‘তুমি কী করো?’ এই প্রশ্নটা তাদের অস্থিরতায় ফেলে দেয়। তুমি যদি বুদ্ধিমান হয়ে থাকো, তবে এই একই প্রশ্নটা ভিন্নভাবে করতে পারবে। যাতে ওই লোকটিকে বিব্রতকর অবস্থায় না পড়া লাগে!
কীভাবে এই প্রশ্নটি করবে? এটা জানতে নিচের অংশটা পড়তে পারো।
তাহলে কীভাবে জিজ্ঞেস করব?
মানুষ তার জীবিকার তাগিদে কী কী করে থাকে বলতে পারো? আর সেটা সোজাসুজি জিজ্ঞেস করলে সে বিব্রত হতে পারে। সহজেই কাউকে এভাবেও বলা যায় না।
তাহলে তুমি কীভাবে তাকে জিজ্ঞেস করবে, সে জীবিকা নির্বাহের জন্য কী করে?
আমি ব্যক্তিগতভাবে কাউকেই সরাসরি বলি না যে তুমি কী করো? বরং আমি সবাইকে জিজ্ঞেস করি, সে কীভাবে তার দিনের সময়গুলো পার করে।
এভাবে বললে সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। একজন মা, যে কি না তার ক্যারিয়ার রেখে পরিবার সামলাচ্ছে, সে তার নিত্য কাজকর্মের বিবরণ দেয়। কীভাবে সে তার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলছে। যারা তাদের কর্ম পরিবেশ নিয়ে শঙ্কিত, তারাও খুবই স্বাচ্ছন্দ্যে উত্তর দিয়ে দেয়। একজন ডোমের জন্য যেমন প্রশ্নটা প্রাসঙ্গিক তেমনই একজন ব্যবসায়ীর জন্যও অনুকূলে। যারা বিভিন্ন কোম্পানিতে কর্মরত তারা তাদের কাজ সম্পর্কেও বলে যেতে চান। তাদের অনুভূতি নিয়ে বলেন। এভাবে জিজ্ঞেস করলে সবাই একটা সেইফ সাইডে থাকেন।
এটা বুঝতেই পেরেছো, তোমাকে কী করতে হবে। তোমাকে সুন্দর করে জিজ্ঞেস করতে হবে, আপনি কী কী করে আপনার নিত্য দিনগুলো পার করেন?
পর্ব ২৫
খোলামেলা জীবনবৃত্তান্ত!
নিজের মৌখিক জীবনবৃত্তান্ত সাজিয়ে নাও
জিন্দেগির বিভিন্ন পর্যায়ে, কোনো সেমিনারে, ব্যবসায়িক মিটিংয়ে এমনকি রেলে কিংবা বাসে আমাদের সাথে অনেকেরই পরিচয় হয়েছে। তাদের সাথে যখন পরিচিত হচ্ছো, তখন শতকরা ৯৯% মানুষ তোমার কাছে জানতে চায়, তুমি কী করো? এই প্রশ্নটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো কিছু নয়। এজন্য সফল ব্যক্তিরা এই প্রশ্নটাকে খাটো করে দেখে না। তারা উপযুক্ত জবাব খুঁজে নেয় এবং সেটাই উক্ত ব্যক্তিকে জবাব দেয়।
অনেকেই চাকরির জন্য সিভি পাঠাও বিভিন্ন কোম্পানিতে। সিভিতে তোমার জীবনের অর্জন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ কিছুই বাদ যায় না। ওটা একবার তৈরি হয়ে গেলেই অসংখ্য কোম্পানিতে ওটা পাঠিয়ে দিয়ে তুমি ভাবছো, হয়ে গেছে কাজ। বিপরীতে তুমি ভুলেই গেছো যে, তুমি নিজের কাজকে সহজ করতে গিয়ে আরো জটিল করে ফেলেছো। প্রতিটি কোম্পানি তাদের নির্দিষ্ট কাজের জন্য আলাদা আলাদা পদবির লোক চাচ্ছে। সবখানে তুমি একই সিভি দেওয়ার অর্থ তোমার সমস্ত যোগ্যতা সবখানেই প্রযোজ্য? এক্ষেত্রে গুণী ব্যক্তিরা কী করে জানতে চাও?
আমার বন্ধু রবার্টো, এক বছর যাবৎ চাকরি থেকে দূরে ছিল। বেচারা হাঁফিয়ে উঠেছিল বলে এই বছর খানেক অন্যভাবে নিজেকে আবিষ্কার করেছে। কিন্তু জীবন চালাতে গেলে চাকরির বিকল্প নেই। সে সিদ্ধান্ত নিল, আবার চাকরি করবে। চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখে রবার্টো দুইটা কোম্পানিতে তার সিভি পাঠিয়েছে। একটা আইসক্রিম কোম্পানি এবং অন্য কোম্পানিটা বহুজাতিক খাদ্য নিয়ে বিভিন্ন দেশের সাথে কাজ করে থাকে। দুই কোম্পানির চাহিদা যেমন ভিন্ন, তেমনই কাজও ভিন্ন। রবার্টো খোঁজ নিয়ে জেনেছে আইসক্রিম কোম্পানি লোকসানে চলছে বেশ অনেকদিন ধরে। অন্যদিকে ফুড কোম্পানিটা বিভিন্ন দেশের কর্মীদের সাথে যোগাযোগের দক্ষতাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছে। সে আইসক্রিম কোম্পানিতে যে সিভি পাঠাল, তাতে তার অভিজ্ঞতার ঘরে লিখে দিল, সে কীভাবে একটা কোম্পানির আয় তিন বছরে দ্বিগুণ করে দিয়েছিল। আর বহুজাতিক ফুড কোম্পানির সিভিতে লিখল, সে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বাজার নিয়ে কতটা গভীরভাবে কাজ করেছে।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, দুটো কোম্পানিই তাকে চাকরির অফার করল। এবার দাবার গুটি চলে এলো রবার্টোর কোর্টে। সে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে দুটো কোম্পানিকে প্রতিযোগিতায় লাগিয়ে দিল, এই বলে যে অমুক কোম্পানি আমাকে এর চেয়ে অনেক বেশি স্যালারি দিতে চাচ্ছে, তোমারা কি এর চেয়ে বেশি দেবে? শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতায় আইসক্রিম কোম্পানি তাকে অফার করা বেতনের দ্বিগুণ বেতন দিয়ে নিয়োগ করে নিল।
গল্পটা রবার্টোর সফলতার হলেও তোমাদের জন্যও সমানভাবে প্রযোজ্য। অতএব তোমাকে অবশ্যই কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী সিভি পাঠাতে হবে। তারা যেন তোমার সিভি দেখে এটাই বুঝে, আরেহ এই লোক তো আমাদের কোম্পানির জন্য উপযুক্ত। যেন ওই সিভিটা তাদের জন্যই তৈরি করা। তোমার সফলতাগুলো আলাদা করে জমা করে রাখো। প্রতিষ্ঠান বুঝে তুমি তোমার যোগ্যতা লিখে পাঠাও। তোমাকে ডাকতে বাধ্য।
একবার ভেবেছো কি- সিভি যেমন কোম্পানি বুঝে পাঠাচ্ছো, ‘তুমি কী করো?’ এই প্রশ্নের উত্তরও মানুষ বুঝে দিচ্ছ না কেন? কীভাবে ওটা সামলাবে ভাবছো তো, পরের অধ্যায়টা তোমার জন্যই লিখা।
আমার পেশা যেভাবে তোমার কাজে দেবে AA
প্রথম সারির বিক্রয়কর্মীরা তাদের কথার শুরুটাই করে লাভ দিয়ে। ধরো তুমি একজন বিক্রয়কর্মী। তোমার সামনে একজন মক্কেল আছেন যাকে তুমি তোমার সেবা দিয়ে আকৃষ্ট করতে চাও। শুরুটা কীভাবে করবে?
একটা উদাহরণ এমন হতে পারে, ‘আমার নাম জনসন, আমি একজন বিক্রকর্মী। আমি কি আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?’
এমন করে বললে তোমার সফলতার সম্ভাবনা অনেক কম। তারচেয়ে তুমি এভাবে শুরু করতে পারো, ‘হেই, আমি জনসন এবি লিমিটেডের সেলস ডিপার্টমেন্ট থেকে বলছি। তোমার কোম্পানির লভ্যাংশ ২০ থেকে ৩০% বাড়াতে চাচ্ছো আগামী বারো মাসের মধ্যে? তাহলে তোমাকে আমি আমাদের এই পলিসিটা জানাচ্ছি।’
কথা শুরু করলে ক্রেতার লাভের অংশ বলে। যখনই তুমি সরাসরি তাকে জানিয়ে দিয়েছো, কীভাবে সে এক বছরের ভেতরে এতটা লাভ পেতে পারে, সে অবশ্যই তোমার সাথে এ নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী হবে। কে না ব্যবসায়ের উন্নতি চায়?
যেই সেলুন থেকে আমি চুলের যাবতীয় স্টাইল এবং কাটিং নিয়ে থাকি, তার মালিকের নাম গ্লোরিয়া। গ্লোরিয়ার সাথে আমার পরিচয় একটা অনুষ্ঠানে। পরিচয়ের এক পর্যায়ে সে জানাল, সে একটা সেলুন চালায় যেখানে নারী ব্যবসায়ীদের এমন সব চুলের কাটিং দেওয়া হয়, যা ব্যবসায়িক জীবনে যেমন আকর্ষণীয় দেখায়, তেমনই ব্যক্তি জীবনেও সমান মানানসই।
গ্লোরিয়ার কথায় আমি এতটাই আকর্ষিত হলাম যে, নিজেই যেচে তার দোকানের কার্ড চেয়ে নিলাম এবং আমি তার নিয়মিত বাঁধা সেবা গ্রহীতা হয়ে গেলাম।
এর প্রায় সাত মাস পর গ্লোরিয়াকে আরেকটা অনুষ্ঠানে দেখলাম। এক খয়েরি চুলের মহিলার সাথে কথা বলছে সে। তাকে না জানিয়ে একটু আঁড়ি পেতে দেখলাম, সে কী নিয়ে কথা বলছে। সে ওই মহিলাকে বলছে, তার সেলুনে খয়েরি চুলের মহিলাদের জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা রয়েছে। তারা খয়েরি চুলকে নীল চুলে পরিবর্তন করতে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ। অথচ আমি এতদিন তার সেলুনে গেলেও খয়েরি চুলের কোনো কাস্টমারই আসতে দেখিনি!
অনুষ্ঠান শেষে গ্লোরিয়াকে দেখলাম অনুষ্ঠান আয়োজকের ছোটো মেয়েটাকে বুঝাচ্ছে, তাদের সেলুন কীভাবে তরুণীদের দারুণ সব আধুনিক কাটিং দিয়ে আসছে।
তার এমন ব্যবসায়িক কথোপকথন আমাকে দারুণভাবে আকর্ষণ করেছে। ‘তুমি কী করো?’ এই অত্যাবশক প্রশ্নটাকে সে যেভাবে তার ব্যবসায়িক উন্নতিতে কাজে লাগাচ্ছে এবং সে সফলও! তুমি কী করো, এর উত্তর এক শব্দে না দিয়ে গ্লোরিয়ার মতো করে দিতে পারো, যেটা তোমাকে বাড়তি আয়ের সুযোগ করে দিবে।
তোমার পেশাটাকে এমনভাবে তুলে ধরো যেন সেটা মানবসেবার জন্যই করা। এটা অবশ্যই সত্য প্রত্যেকটা কর্মই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মানবসেবায় নিয়োজিত।
এই যেমন তুমি একজন ক্যারাটে প্রশিক্ষক। তুমি তোমার পেশাটাকে এভাবে বলতে পারো, ‘আমি মানুষকে ক্যারাটে শেখাই যাতে করে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারে, নানাবিধ বিপদ থেকে। বিশেষ করে মেয়েদের জন্য তো ক্যারাটে অনেক দরকারি। এখন যে একটা অবস্থা চলছে, উফ!’
আবার ধরো তুমি তৃতীয় পক্ষ হিসেবে যেকোনো কাজ করে দাও। সমাজে এই পেশাকে দালাল হিসেবে চিহ্নিত করলেও তুমি এভাবে বলতে পারো, ‘আমি মানুষকে জায়গা জমি কিনতে পরামর্শ এবং সহায়তা দেই।’
কৌশল ২৫
খোলামেলা জীবনবৃত্তান্ত!
কোনো কোম্পানিতে ভালো পদের চাকরি পেতে অবশ্যই আমাদের সতর্কতার সাথে আমাদের সিভি পাঠাতে হয়। গাঁধা সিভি না পাঠিয়ে ওই পদের উপযোগী যোগ্যতাগুলো যুক্ত করে যদি সিভি পাঠানো হয় তবে এর গ্রহণযোগ্যতা অনেকগুণে বেড়ে যায়।
বাস্তবজীবনেও তোমাকে এরকম বেছে বেছে নিজের ব্যাপারে বলতে হবে। তোমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি কী করো?’
তবে অবশ্যই তুমি অপর ব্যক্তির উপরে ভিত্তি করেই তোমার জবাবটা দেবে। জবাবটা দিয়ে তুমি তার থেকে যদি ব্যবসায়িক, ব্যক্তিগত কিংবা কোনো একটা বড় সম্পর্ক স্থাপন করতে পারো তাহলেই তোমার স্বার্থকতা।
পর্ব ২৬
তোমার নিজস্ব শব্দভান্ডার
তোমার আভিজাত্যকে ফুটিয়ে তোলার সহজ পথ
‘নাহ… এটা তোমার সাথে যায় না!’
এই কথাটা যেমন তুমি অনেক জায়গায় শুনেছো, পাশাপাশি অনেক জায়গায় ব্যবহারও করেছো। উড়ে এসে জুড়ে বসা কিছু মানুষ নিজেদের অত্যধিক ‘উঁচু’ প্রমাণ করতে গিয়ে অনেক ভারী ভারী কথা বলতে দেখা যায়। কথাগুলো কেন যেন তাদের সাথে যায় না! তুমি যখন সবটা মেলাবে মনে হতে থাকবে, কোথায় যেন ঠিক মিলছে না!
‘যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা!’ এই প্রবাদটা নির্ঘাত ওদের দেখেই বানিয়েছিল। বড় বড় মানুষরা হুটহাট কথা বলে ফেলেন না। ছোট্ট কিংবা বড় যেকোনো কথা বলে ফেলার ক্ষেত্রে তাদের একটা কার্যকরী কৌশল হচ্ছে ‘ভুল করা যাবে না।’ মুখ দিয়ে যা-ই বের হবে তা হতে হবে পরিপূর্ণ শুদ্ধ। তারা যেমন কোট, টাই, শার্ট ইত্যাদির ব্যবহার করেন নিজের ব্যক্তিত্ব বুঝে, তেমনই কথাও বলেন নিজের ব্যক্তিত্ব হিসেব করে।
একই কথা বারবার শুনতে বিরক্ত লাগে, এটা তারা মাথায় নিয়েই চলেন। ওইসব ব্যক্তির শব্দের ভান্ডার অনেক বড়। তারা একই শব্দ বারবার বলে তোমায় বিস্বাদ। দেবে, এমনটা ভুলেও ভেবো না।
একই প্রশংসা বারবার শুনলে যেমন তোমার আগ্রহ চলে যায়, তেমনই একই ধরনের কথা এক সময় গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। একজন সুন্দরী রমণী, ‘আপনি দেখতে অনেক সুন্দর।’ এই বাক্যটা অসংখ্যবার শুনে অভ্যন্ত। তার কাছে এই ওয়ার্ডটা আন্তে আন্তে গুরুত্বহীনতার পর্যায়ে চলে গিয়েছে। তার প্রশংসা করতে চাও? তোমার উচিত তাকে নতুন কিছু শোনানো। একই শব্দের অনেকগুলো সমার্থক শব্দ থাকে। ওগুলো ব্যবহার করতে চেষ্টা করো। খেয়াল রেখো, যা বলছো তা যেন তোমার ব্যক্তিত্বের সাথে ফুটে ওঠে। এক সময় যখন অভ্যন্ত হয়ে যাবে তখন ওগুলো মুখের বুলির মতো হয়ে বুলেটের বেগে ছুটবে।
পুরুষরা শোনো
নারীদের একটা গোপন বিষয় ফাঁস করে দিচ্ছি। অধিকাংশ পুরুষই জানেন না, প্রত্যেকটি নারী আয়নার সামনে নিজেকে দেখতে কতটা পছন্দ করেন! নিজের সাজগোছ করা চেহারাটা দেখে যতক্ষণ না সে সন্তুষ্ট হচ্ছে, ততক্ষণ সে সাজতেই থাকবে। মেয়ে হিসেবে আমিও ব্যতিক্রম ছিলাম না। এক যুগ আগের কথা। তখন সাজতে আমার সময় লাগত পনেরো থেকে কুড়ি মিনিট। আয়নায় নিজেকে দেখতে ভালো লাগত। এমন একটা প্রেক্ষাপট কল্পনা করো, তুমি ঘণ্টাব্যাপী সাজলে, সিঁড়ি দিয়ে নামতেই দেখলে তোমার স্বামী ক্যাবলার মতো তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার দিক থেকে তুমি কী আশা করো? অবশ্যই প্রশংসাসূচক কিছু।
অথচ সে হামি দিতে দিতে বলল, ‘উফ, অবশেষে তাহলে তুমি যাওয়ার জন্য প্রস্তুত? চলো বেরুনো যাক।’ ওই নারীর মনের অবস্থা কল্পনা করতে পারো?
প্রতিটি নারীই প্রশংসা শুনতে ভালবাসে। কিন্তু সেটা যেন কথার কথা না হয়ে বসে! এক যুগ আগের ঘটনায় ফিরে যাই। আমি সাজুগুজু করে বসার ঘরে আসলাম। দেখলাম আমার বন্ধু গ্যারি বসে আছে। আমাদের ওদিন ঘুরতে বেরুনোর কথা ছিল। গ্যারি আমায় দেখে হেসে বলল, ‘লেইল তোমাকে আজ দারুণ লাগছে।’ আমি হাসলাম। ভেতর থেকে ভালো লাগতে শুরু করল। গ্যারির সাথে আমার এরপর প্রায় মাসেই দেখা হতে লাগল। সে প্রতিবারই হেসে বলে উঠে, ‘লেইল, তোমাকে আজ দারুণ লাগছে।’
আস্তে আস্তে এটা বিরক্তিকর হয়ে উঠল! আরেহ বাবা। দেখলেই, দারুণ লাগছে! দারুণ লাগছে, এটা কেমন কথা? আজ বারো বছর পরেও গ্যারির সাথে আমার দেখা হয়। কারণ আমাদের বাসা একই কলোনিতে। বেচারা গ্যারি বদলায়নি। সে বোধহয় প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছে, তার জান যাক তাও আমাকে দেখলেই বলবে, ‘লেইল, তোমাকে আজ দারুণ লাগছে।’
আমার ধারণা, আমি যদি রাতের ঘুমানোর পোশাক পরেও তার সামনে দাঁড়াই, সে একই কথাটাই বলবে, ‘লেইল, তোমাকে আজ দারুণ লাগছে!’
কিছু সেমিনারে কাজ করার খাতিরে কিছু বিষয়ে আমি ব্যক্তিগত এক্সপেরিমেন্ট করতে আরম্ভ করলাম। অপরিচিত সেচ্ছাসেবী নারী-পুরুষদের একত্রিত করে তাদের স্বামী-স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করতে বললাম। আর তাদের কাজ হবে, আলাদা আলাদা স্বামীরা নতুন নতুন শব্দে তার স্ত্রীকে প্রশংসা করবে।
‘ডালা, তোমাকে আজ অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে।’ একজন স্বামী বলল।
আরেকজন বলল, ‘ডালা, তোমার রূপ তো আজ যেন সবাইকে ঝলসে দিচ্ছে। ঘটনা কী?’
তৃতীয় পুরুষ বলল, ‘ডার্লা, এই শাড়িতে তোমাকে পুরো অন্যরকম লাগছে। খুব সুন্দর সেজেছো।’
ফলাফল খুবই পজেটিভ। ডার্লা প্রতিটি প্রশংসায় আলাদা আলাদা করে পুলকিত হয়েছে। অনেকগুলো নারী থেকে তাদের অনুভূতি জানতে চাওয়া হলো। সব নারীই জানিয়েছে, প্রশংসাগুলো তাদের মনে ধরেছে।
এই যে ভদ্রলোকেরা, শব্দের খেলা কিন্তু নারীদের উপরে দারুণ কাজে দেয়, খেয়াল থাকে যেন।
নর-নারী বিষয়ক আরো কিছু পরামর্শ
কোনো একটা অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে আয়োজককে তার অনুষ্ঠান পরিচালনার গুণগান করাটা একটা সাধারণ ভদ্রতা।
‘আপনার প্রোগ্রামে এসে দারুণ একটা সময় কাটিয়েছি। ধন্যবাদ মশাই।’ এই কথাটা বলার জন্য মনস্থির করে নিয়েছো?
তাহলে তুমি ভুলে যাচ্ছো এই কথাটা সবাই-ই বলে গেছে। এর মধ্যে নতুনত্ব কী? কথার কথা হিসেবে এই বাক্যটাকে নেওয়া হয়। কিন্তু এমন যদি হয়, তোমার প্রশংসা শুনে আয়োজকের চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে খুশিতে? খুব কঠিন কিছু না। একই কথাগুলো একটু অপ্রচলিত শব্দে বলা, যেভাবে অন্যরা সাধারণত বলে না।
আয়োজকের সামনে যাও। হেসে একটু কোলাকুলি করে বলো, ‘এত জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করাটা আসলেই টাফ। একটা অন্যরকম অন্যরকম ব্যাপার ছিল আপনাদের আয়োজনে। চমৎকার হয়েছে।’
একটু আলাদাভাবে বলতে গেলে প্রথম দিকে মুখে আটকাতে পারে। কিন্তু যখন এই শব্দগুলো তোমার জীবনের একটা অংশ হয়ে যাবে, দেখবে তোমার কথাগুলো কতটা মধুর শোনাচ্ছে। আয়োজক তোমার প্রতি আলাদা কৃতজ্ঞ থাকবে।
কৌশল ২৬
তোমার নিজস্ব শব্দভান্ডার
বহুল ব্যবহৃত শব্দগুলো ব্যবহারের চেয়ে নিজেকে একটু আলাদা শব্দের সাথে পরিচিত করাটা তোমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলবে। এজন্য তোমাকে হাজারটা নতুন শব্দ খোঁজা লাগবে না। বরং অর্ধশতাধিক নতুন শব্দ তোমার জীবনের সাথে মানিয়ে নিলেই দেখবে, তোমার কথার জোর অনেকটা বেড়ে গেছে। ব্যাপারটা পুরাতন জুতো পরিবর্তন করে নতুন জুতো পরিধান করার মতো ব্যাপার। একটা নতুন শব্দ মাস দুয়েক ব্যবহার করলেই ওটা তোমার অন্যসব শব্দের মতো একটা পরিচিত শব্দ হিসেবে রপ্ত হয়ে যাবে। অথচ তুমি ভেবেও পাবে না, কীভাবে এই ছোট্ট কিছু শব্দ তোমাকে, তোমার কথাকে তোমার ব্যক্তিত্বের অংশ করে নেবে। দেখো, ওইসব মানুষ তোমায় পছন্দ করছে।
পর্ব ২৭
ওটা তো আমি জানি, এমনটা প্রকাশ করা থেকে দূরে থাকো
তোমার সঙ্গীকে আবিষ্কার করতে দাও তোমাদের মিলগুলো
শিকারি পশুদের একটা বিশেষ মিল আছে। এরা দলবদ্ধভাবে শিকার করতে পছন্দ করে। সিংহী, হায়েনা, নেকড়ে, শেয়াল ইত্যাদি শিকারি পশু এদের অন্যতম।
শিকারি পশুরা সিদ্ধান্ত নিতে কখনোই দেরি করে না। ক্ষুধার্ত অবস্থায় শিকারকে বাগে পাওয়া গেছে অমনি ঘোঁৎ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে ওরা। দলগতভাবে কাজটা সম্পন্ন হয় বলেই শিকারি প্রাণীরা এখনো খুব ভালোভাবে টিকে আছে।
মানব সমাজ আর পশু সমাজের এটাই বড় ফারাক। মানব সমাজে বড় হতে হলে হুট করে ঝাঁপিয়ে পড়লেই হয় না। অন্যের সাথে তোমার ভালো মিল থাকতে পারে। কিন্তু তুমি যদি ওটাকে আমলে না নাও তবে বিপদ। আবার যদি তাড়াহুড়ো করে আমলে নাও, তাও বিপদ! সমাজের সফল ব্যক্তিরা এজন্য সঠিক সময়ের অপেক্ষায় থাকে। তোমার পাশে বসে থাকা ভদ্রলোক, তোমার সাথে এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছেন যেটা নিয়ে তোমার ভালো ধারণা রয়েছে, হতে পারে তোমার শহর নিয়েই কথা বলছেন তিনি। নিজের শহরের নাম শুনে উত্তেজনা রাখতে না পেরে বলে দিলে, ‘বাহ! আপনি তো আমার শহর নিয়ে বলছেন। আমি সবই জানি।’
তাহলেই সব শেষ। সব শেষ কেন? নিচের প্রাসঙ্গিক ঘটনাটা তোমার জন্য টেলিভিশনে তোমরা নিশ্চয়ই বরফের উপরে স্কাইয়িং করতে দেখেছো। উচু জায়গা থেকে বরফের উপরে স্কাইয়িং করার মজাটাই অন্যরকম। এক ভদ্রলোকের সাথে আলোচনা প্রসঙ্গে আমি জানালাম, কোন কোন জায়গায় আমি স্কাইয়িং করেছি।
স্কাইয়িং করার আনন্দ তাকে বর্ণনা করতে গিয়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে গেলাম। তোমরা তো জানোই, নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার মুহূর্ত হয় অসাধারণ, যদি
তোমার শ্রোতা মনযোগী হয়। কৃত্রিম বরফ আর প্রাকৃতিক বরফ দুটোর মাঝে যে পার্থক্য আছে এবং প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বরফে স্কাইয়িংয়ের মজাটা সর্বাধিক, এটাও ভদ্রলোককে জানিয়ে দিলাম। এছাড়া স্কাইয়িং স্পটের আশপাশের হোটেলগুলোর বর্ণনা দিলাম। এর মধ্যে আমার সবচেয়ে আকর্ষণীয় লেগেছে আসপেনের স্কাইয়িং। আসপেন শহরটা স্কাইয়িংয়ের জন্য বেশ বিখ্যাত।
স্বভাবতই একতরফা বকবক করে আমি একটু থামলাম। ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি স্কাইয়িং পছন্দ করেন?’
তিনি হেসে উঠলেন, ‘প্রচণ্ড! আসপেনে আমার নিজস্ব একটা অ্যাপার্টমেন্ট আছে।’
ভদ্রলোকের উত্তর আমাকে চমকে দিল! বলে কী! আমি যেই আসপেনের বর্ণনা তাকে দিচ্ছিলাম, ওখানে তার নিজের অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে? স্কাইয়িংয়ের ঝোঁকে অ্যাপার্টমেন্ট কিনে ফেলেছেন দেখে আমি প্রচণ্ড পরিমাণে চমকালাম। ভদ্রলোক যদি শুরুতেই বলে দিতেন আসপেনে তার অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে তবে হয়ত স্কাইয়িং নিয়ে আমি এত কিছু বলতামই না। তার কৌশলটা আমার ভালো লেগেছে। তার ব্যক্তিত্বের এই দিকটা অসাধারণ।
পদ্ধতিটা এমন, মনযোগ দিয়ে অন্যের কথা শুনবে, যদিও ওই বিষয়টা নিয়ে তোমার যথেষ্ট জ্ঞান রয়েছে। তারপর সময় বুঝে তাকে বলে ফেলো, ‘জায়গাটা অনেক দারুণ। আমি তো ওখানেই থাকি।’ অথবা ‘ওখানে আমার প্রায়শই যাওয়া হয়।’
ওহ! আমি নিশ্চিত আপনি আমার কথা শুনতে বিরক্তবোধ করেছেন!
ভদ্রলোকের স্কাইয়িং সম্পর্কে বর্ণনার কৌশলটা আমার মাঝে ভালো প্রভাব ফেলল।
টেকনিকটা প্র্যাকটিক্যালি অন্যদের উপরে প্রয়োগ করার লোভ আমি সামলাতে পারলাম না। কিছুদিনের মাঝে সুযোগটাও হাতের মুঠোয় এসে গেল। মনে মনে ভাবলাম, দেখি টেরাই করে!
এক ভদ্রমহিলার সাথে পরিচয় হলো একটা ভোজসভায়। মহিলা ভ্রমণ নিয়ে দারুণ আগ্রহী। তিনি সর্বশেষ ভ্রমণ করেছেন ওয়াশিংটন ডিসি। ওয়াশিংটন ডিসি আমার জন্ম শহর এবং ওখানেই আমার বেড়ে ওটা, যা আমি ভদ্রমহিলার কাছে গোপন করলাম।
মহিলা জানালেন, ওয়াশিংটন ডিসি জায়গাটা এত সুন্দর যে, তিনি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবেন না! পুরোনো মন্দিরগুলো তাকে অনেক বেশি আকর্ষণ করেছে। এছাড়া রক ক্রিক পার্কে সাইকেল চালানোটা তার জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতার একটা। তার ভ্রমণটা বেশি আকর্ষণীয় হয়েছে তার স্বামী সাথে থাকায়। ভদ্রমহিলার সৌন্দর্য বর্ণনা আমায় মুগ্ধ করল। আমার এক্সপেরিমেন্টের জন্যও পারফেক্ট সময় এটা, ভেবে নিলাম। আমি স্মিত হেসে বললাম, ‘আপনি শহরতলীর দিকে যাননি? ওদিকটা আরো সুন্দর।’ সুন্দর সুন্দর কিছু জায়গার বর্ণনা তাকে করলাম। ভদ্রমহিলা চোখ কপালে তুলে নিলেন! বললেন, ‘আপনিও ওয়াশিংটন ডিসিতে ঘুরতে গিয়েছিলেন?’
আমি আবার স্মিত হেসে বলি, ‘অনেকদিন যাওয়া হয়নি বাসায়। বাবা যেতে বলে প্রায়ই।’
ভদ্রমহিলা উত্তেজনায় চোখ মুখ আরো বড় করে ফেললেন, ‘মাই গড! আপনি আগে বলবেন না আপনার জন্মস্থান ওয়াশিংটন ডিসিতে! আমি বোধহয় আপনার নিজের শহরের বর্ণনা দিতে গিতে আপনাকে বোরিং করেছি! অথচ আপনি আমার থেকে ভালোই জানেন। ওটা তো আপনারই শহর!’
আমিও হাসলাম, ‘আরেহ নাহ, নিজের শহরের বর্ণনা অন্যের মুখে শুনতে ভালোই লাগে। আমি দারুণ উপভোগ করেছি। বোরিং হলে এত মনযোগ দিতাম?’
‘কাজে লেগেছে।’ ভদ্রমহিলা আমার জবাবে সন্তুষ্ট হয়েছেন। কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাচ্ছেন, এই দৃষ্টি আমার চেনা আছে বেশ। হ্যাঁ, আমি আরেকজন বন্ধু পেয়ে গেছি।
তোমরাও এমনটা করে দেখো। শুরুতেই হুট করে না জানিয়ে সময় বুঝে তাকে অনুভব করতে দাও, তুমি ওই ব্যাপারটা নিয়ে অনেকটা বেশি জানো। দেখবে তোমাদের দারুণ সময় কাটবে।
কৌশল ২৭
‘আরেহ, ওটা তো আমি জানি’, এমনটা প্রকাশ করা থেকে দূরে থাকো
যখন তোমার জানাশোনা একটা বিষয় নিয়ে অন্য কেউ গল্প করতে চায়, অবশ্যই মনযোগ দিয়ে তার গল্পটা শুনো। বুঝতেই দিও না যে, তুমি সবটা জানো। সবশেষে তাকে জানাও তুমি কতটা জানো শহরটা কিংবা ব্যাপারটা নিয়ে।
তোমার সাথী তখন চমকে ভাববে আরেহ, এই লোকটা এতটা জেনেও চুপচাপ মনযোগ দিয়ে শুনেছে। তোমার প্রতি তার কৃতজ্ঞতা এবং আগ্রহ দুটোই বাড়বে।
(সতর্কতা: তোমার জানাশোনা প্রকাশে আবার এতটাই দেরি করে ফেলো না যে, তার কাছে ওটা বোরিং হয়ে বসে। ভালো কথা, এমনভাবে ওটা প্রকাশ করো না যে, সে তোমায় কৌশলী ভেবে বসে!)
পর্ব ২৮
যোগাযোগ
‘তুমি/তোমরা’ দ্বারা শুরু করো
পতিটি বাচ্চা স্বতন্ত্র এবং আলাদা। কিন্তু তাদের মাঝে একটা ব্যাপার বেশ কমন।
চিন্তা-চেতনায় তারা এক। বাচ্চারা ‘আমি’, ‘আমার’, ‘আমাদের’ এই গণ্ডির বাইরে চিন্তা করতে পারে না। সকল কিছুর কেন্দ্রে সে নিজেকে রাখে। বাচ্চাদের ধারণা পৃথিবী তাকে কেন্দ্র করে ঘুরছে। এই যেমন একটা বাচ্চার ফুটবল কেনার শখ হলো, সে ওটা কিনেই ছাড়বে। বাচ্চাটা তার পরিবারের আর্থিক অবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখায়। সে সবসময় ‘আমি’ কেন্দ্রিক। অন্য সবাইকে সে থোড়াই কেয়ার করে।
কিন্তু সভ্য সমাজে একজন বুঝদার মানুষ কখনোই আমি কেন্দ্রিক হতে পারে না।
আরেকজনের সুযোগ-সুবিধাও তাকে বেশ দেখতে হয়। কখনো ভেবে দেখেছো কি, তুমি কি আদৌ শিশুসুলভ চিন্তাভাবনা থেকে বের হতে পেরেছো? হয়ত উত্তরটা হবে, না। তুমি যত কিছুই বলো না কেন, প্রতিটি মানুষ সভ্যতা এবং আধুনিকতার একটা মুখোশ পরে আছে। এই মুখোশের আড়ালে সে ওই বাচ্চাটিই রয়ে গেছে, যে নিজেকে সবার উপরে প্রাধান্য দেয়। যেকোনো কাজ করার পূর্বে সে ভাবে, ‘এটা আমার কতটা উপকার করবে?’ মনে মনে এমন ভাবে না, এটা কেউ-ই মানবে না।
ধরো তুমি তোমার অফিসের সুন্দরী সহকর্মীকে বললে, ‘বুঝলে জলি, নতুন একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট খুলেছে। গেলেই বুঝবে, ওটা অসাধারণ। ডিনারে আমার সাথে তুমি কি যাচ্ছো ওখানে?’
তুমি যতই মনোরম করে কথাটা বলো না কেন, জলি এক বাক্যে রাজি হয়ে যাবে এটা আশা করা বোকামি। জলি প্রথমেই ভাববে ‘ইন্ডিয়ান খাবার?’ তারপর ভাববে ‘খাবারটা ভালো হবে তো?’ শেষে যেটা ভাববে তা হলো ‘খাবার ভালো নাকি রেস্টুরেন্টের পরিবেশ ভালো?’ এমন অনেক প্রশ্ন তার মাথায় ঘুরবে। এটা হিউম্যান সাইকোলজি। তার মুখে তুমি নিজেই দেখবে দ্বিধা। এর কারণ কী?
এই দ্বিধা তাকে আরো পিছিয়ে দেবে।
তুমি যদি কথাটা এভাবে বলতে, ‘জলি, তুমি নতুন এই রেস্টুরেন্টের ব্যাপারে না করতে পারবে না বলে আমার ধারণা। পুরো অরিজিনাল ইন্ডিয়ান খাবার। তুমি কি আমার সাথে দুপুরে ডিনার করতে যাবে ওখানে?’
এখন একটু নড়েচড়ে বসো। নিজেই খেয়াল করো আগের এবং পরের বাক্যের
পার্থক্য কোথায়? ধরতে পেরেছো কি? আমি জানি তোমরা অধিকাংশই পারোনি।
আমিই বলে দিচ্ছি। পরের বাক্যে তুমি জলিকে শুরুতেই ‘তুমি/আপনি/তুই’ শব্দটা দ্বারা আলাদা করে বুঝিয়ে দিয়েছো, তার অবস্থান। ‘তুমি/আপনি/তুই’ দিয়ে বাক্য শুরু করায় বাক্যের জোর অনেকটা বেড়ে গেছে। এরপর তুমি যা-ই বলছো তা এক ধরনের প্রশংসামূলক কথাবার্তা এবং ভেঙে বলা। সাইকোলজি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানুষ দুঃখ কষ্ট কিংবা মানসিক কষ্ট থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে। তুমি যখনই তাকে ‘তুমি/আপনি/তুই’ দিয়ে শুরু করে নাড়িয়ে দিচ্ছ, তখনই তার আগ্রহী হবার চান্স বেড়ে যাচ্ছে। তার মানসিক প্রেশার কমে যাচ্ছে। ঠিক করে দেখো, জলি অলরেডি হেসে ‘হ্যাঁ যাব’ বলে দিল বলে! পরের অংশে কিছু উদাহরণসহ ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা হবে। এটাকে অবাস্তব মনে হলেও ওই অংশ পড়লে দিনের মতো ঝকঝকে মনে হবে।
আনুকূল্য পেতে যোগাযোগ পদ্ধতি
এছাড়াও তুমি তোমার বিশেষ প্রয়োজনে এই ‘তুমি/আপনি/তুই’ কৌশল ব্যবহার করে ফায়দা নিতে পারো। ব্যক্তিগত জীবনে নানান সময়ে নানান প্রয়োজন তোমার দরজায় কড়া নাড়বে। এই যেমন হুট করে তোমার একটা কাজ পড়ে গেছে। সপ্তাহ খানেকের ছুটি তোমার জন্য অতি জরুরি। আবার সপ্তাহ খানেক ছুটি অফিস থেকে পাওয়াটাও কষ্টসাধ্য। কী করবে তুমি? অবশ্যই ছুটির জন্য আবেদন করবে। নিশ্চিত বসের সামনে গিয়ে বলবে, ‘আমি কি আগামী শুক্রবার পর্যন্ত ছুটি পেতে পারি, বস?’ কী উত্তর পাবে বলে ধারণা?
আবার চাইলে তুমি এমন করেও বলতে পারো, ‘বস, আপনি কি আমাকে ছাড়া শুক্রবার পর্যন্ত চালিয়ে নিতে পারবেন? আমার একটু জরুরি কাজ পড়ে গেছে।’
প্রথম অংশে তোমার বসকে আলাদা করে তোমার কথাগুলোর অর্থ বের করতে হবে। সে ভাববে, ‘সে কি আমায় বোঝাতে চাচ্ছে, সে শুক্রবার পর্যন্ত থাকবে না? একজন কর্মীকে ছাড়া আমি অফিস চালাব কি না?’
অনেক মানুষই চিন্তাভাবনা করতে পছন্দ করে না। একারণেই অনেকে চিন্তাভাবনা করে উত্তর দিতে বিরক্ত বোধ করে। উত্তর না আসার চান্সই বেশি।
দ্বিতীয় বাক্যে দেখো, তুমি শুরুতেই ‘আপনি’ শব্দটা দ্বারা বসের ভেতরে একটা পজিটিভিটি ঢুকিয়ে দিয়েছো। এছাড়া শুরুতেই বস শব্দটাও তোমার বসকে আলাদা প্রেশার দিচ্ছে। বস এটাই ভাববে তোমাকে ছাড়া এক সপ্তাহ চালানো সম্ভব কি না? যেহেতু মানুষের মানসিকতার উপরে অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নির্ভর করে, তোমার বসও যেহেতু পজেটিভ, উত্তরটা হ্যাঁ আসার চান্সই সর্বাধিক।
যেভাবে প্রশংসা করবে
যোগাযোগের দক্ষতা তোমায় সামাজিক কথোপকথনেও কাজে দেবে। কোনো একজন নারী তোমায় বলল, ‘এই শার্টটাতে দারুণ দেখাচ্ছে।’
শুনতে মন্দ লাগার কথা নয়। ভালোই লাগবে। এর বদলে যদি আরেক নারী এভাবে বলল, ‘তোমায় এই শার্টে সত্যিই অপূর্ব দেখাচ্ছে।’
তখন তোমার অনুভূতি কী হবে? অবশ্যই আগের থেকে বেশি ভালো লাগবে। এজন্যই ‘তুমি/আপনি/তুই’ দিয়ে সম্বোধন করলে একটা পজেটিভ প্রভাব পড়বেই। সফল ব্যক্তিরা কথা বলতে হুঁশিয়ার হয়ে বলে। কারণ তাদের প্রতিটি কথাই আলাদা আলাদা ভার বহন করে। চাইলাম আর হুট করে বলে দিলাম এমন নয়।
তবুও ভেবে দেখো, প্রত্যেক ব্যক্তিই আলাদা, কিন্তু তাদের কথার ধরন ফলাফলের উপরে অনেকটা প্রভাব ফেলে।
তুমি ভালো একটা বক্তৃতা দিলে। একজন শ্রোতা তোমার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল। তুমি প্রশ্ন শুনে বললে, ‘প্রশ্নটা ভালো ছিল। প্রাসঙ্গিক।’ তারপর উত্তরটা তোমার ভাষায় বর্ণনা করলে, এক্ষেত্রে প্রশ্নকারী তোমার প্রশংসায় নিজেকে খুশি রাখবে। কিন্তু তুমি যদি এভাবে বলতে, ‘তোমার প্রশ্নটা সত্যিই ভালো ছিল।’ সেক্ষেত্রে প্রশ্নকারী আরো বেশি খুশি হতো। ‘তুমি’ শব্দটা দ্বারা, শুরুতেই তাকে খুশি করে দিলে।
যারা বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করে, তারা এর গুরুত্ব আরো ভালো বুঝবে। কোম্পানির একটা পণ্য বিক্রিতে, ‘এই পণ্যটি বাজারের অন্য সব পণ্য থেকে…’ এভাবে না বলে, এভাবে বলতে পারে, ‘আপনি জানেন যে, এই পণ্যটা বাজারে অন্য সব পণ্য থেকে…’
আবার যখন কারো সাথে দ্বিমত হয়, তখন ‘এটার ফলাফল হবে…’ এভাবে না বলে তারা এভাবে বলে, ‘তুমি জানো যে, এটার ফলাফল হবে…’
স্যান ফ্রান্সিসকো শহরটা ভালোমতো না চিনে থাকলে যে কেউ হারিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। তখনকার সময়ে জিপিএস কিংবা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কিছুই ছিল না যে, আমি দেখে দেখে চলে যাব। গাড়িটাকে রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে চিন্তা করলাম, মানুষজনকে জিজ্ঞেস করা যাক। এক দম্পতি পাশ দিয়েই যাচ্ছিল। আমি ডেকে বললাম, ‘গোল্ডেন গেট ব্রিজটা কোনদিকে?’
দুজনই বিরক্ত হলো। নিজেদের ভেতরে চাওয়া-চাওয়ি করল। নিশ্চয়ই ভাবছে এই
ট্যুরিস্টদের জ্বালায় হাঁটাও দায়!
পুরুষ লোকটি আমতা আমতা করে বলল, ‘সোজা।’
তারা হনহন করে চলে গেল। সোজা গিয়ে কোন দিকে যাব? এই নিয়ে আমার মাঝে দোটানা। দ্বিতীয় আরেক দম্পতিকে একই প্রশ্ন করলাম। তারাও বিরক্তি নিয়ে ঠিক উল্টো দিকে দেখিয়ে দিল। দুইজনের দুই দিকনির্দেশনা আমার মেজাজ বিগড়ে দিল। উফ!
নিজেকে নিজেই সান্ত্বনা দিলাম, ‘লেইল, মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।’
পরক্ষণেই ভাবলাম দেখি কমিউনিকেশন স্কিল কাজে দেয় কি না! বিশেষ করে ‘তুমি/আপনি/তুই’ কৌশলটা।
এরপর আরেক দম্পতিকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দয়া করে আপনারা কি বলতে পারবেন, গোল্ডেন গেট ব্রিজটা কোন দিকে?’
তারা হেসে জবাব দিল, ‘অবশ্যই পারব।’
দুজন আমার গাড়ির কাছে এসে আমায় ভালো করে বুঝিয়ে দিল, কীভাবে ওখানে যেতে হবে। আশ্চর্য! এতক্ষণ কেউ ঠিকভাবে দেখিয়েই দিচ্ছিল না। অথচ এখন এত আন্তরিকতা নিয়ে বলছে। পরে বুঝলাম কৌশলটা কাজে লেগেছে। তারা শুরুতেই ‘তুমি/তুই/আপনি’ সম্বোধনে খুশি হয়েছে। হয়ত তাদের অজান্তেই এটা তাদের ভেতর থেকে পজেটিভ করে তুলেছে।
একটা ঘটনা দিয়ে আমার হাইপোথিসিস জাজ করে ফেলব এমনটা হবার নয়। আমি আরো কয়েকজনকে এই কৌশলমতো জিজ্ঞেস করলাম। সবাই কম বেশি আন্তরিকতা দেখিয়ে জবাব দিয়েছে। এবং এই কৌশলের বাইরে থেকেও জানতে চেয়েছি, অধিকাংশই আগের মতো ইগনোর করেছে। অর্থাৎ স্পষ্ট বোঝা গেল ‘তুমি/আপনি/তুই’ সম্বোধন করে বাক্য শুরু করাটা বুদ্ধিমানের কাজ।
আদম (আ.) আর হাওয়া (আ.)-এর প্রচলিত গল্পটা শুনে কী মনে হয়? হাওয়া (আ.) কি আদম (আ.)-কে জোর করে গন্ধম ফল খাইয়েছিল? উত্তরটা হচ্ছে, ‘না।’
তবে কি খাওয়ার আদেশ করেছিল? তাও, না। তিনি এভাবে বলেছিলেন, ‘তুমি ফলটা খেলে অনেক মজা পাবে। এটা সত্যিই দারুণ।’ আর আদম (আ.) দ্রুত খেয়ে নিলেন। এটা ওখানেও কাজে লেগেছে।
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: আদম (আ.) এবং হাওয়া (আ.)-এর গল্পটা মূল লেখিকার লেখার অনুবাদ মাত্র। সেক্ষেত্রে এটার সাথে ধর্মের সংশ্লিষ্টতা খোঁজা অনুচিত।।
কৌশল ২৮
যোগাযোগ
কাউকে প্রশংসা করে কিছু বলতে গেলে অবশ্যই শুরুটা তাকে ‘তুমি/আপনি/তুই’ দিয়ে শুরু করলে ভালো হয়। এতে করে তাদের নিজেদের মধ্যে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, সে ‘আমাকে/আমাদের’ ইঙ্গিত করে কথাটা বলেছে। কথাগুলো শুনতে তখন তাদের কাছে আরো বেশি সুস্বাদু মনে হবে।
যখন তুমি এভাবে কথা শুরু করবে, তোমার শ্রোতারা এটাকে নিজেদের জন্য সুখকর হিসেবে বিবেচনা করবে। মনে মনে গর্ববোধ করবে।
তোমার কথোপকথন তোমার মানসিক সুস্থতার প্রতিচ্ছবি
থেরাপিস্টদের মতে একজন মানসিকভাবে অসুস্থ লোক একজন সুস্থ মানুষের তুলনায় ‘আমি’ বলে সম্বোধন করে প্রায় ১২ গুণ বেশি।
ব্যক্তি যত বেশি সুস্থ হতে থাকে সে ‘আমি’ বলা ততটাই কমিয়ে দেয়। এক সময় সুস্থ হয়ে গেলে স্বাভাবিক মানুষের মতোই কথা বলে।
আরেকটা ব্যাপার তোমাদের না জানালেই নয়, বড় বড় সফল ব্যক্তিদের কথোপকথন পারলে শোনার চেষ্টা করো। ভালো করে খেয়াল করলে দেখবে, যেটা তোমার চোখে বেশি পড়বে তা হলো, তারা ‘তুমি/আপনি/তুই’ এই সম্বোধনেই প্রায় পুরো কথোপকথনটা কাটিয়ে দেয়। তারা আত্মকেন্দ্রিক নয়।
পর্ব ২৯
স্বতন্ত্র হাসি
আমি একই হাসি সবাইকে দেই না
অল্প বাজেটের কিছু ম্যাগাজিন রয়েছে, যাদের প্রতিটি সংখ্যায় একই মডেলের ছবি ব্যবহার করতে দেখা যায়। সেই মডেল কখনো গাউন পরা, কখনো বিকিনি পরা কিংবা অন্য ড্রেসে উপস্থাপিত হয়, সেই একই হাসিটা সবখানেই। আমি এর নাম দিয়েছি প্লাস্টিক হাসি। একই হাসিটা রোজ দেখতে বড্ড বিরক্তিকর।
বিপরীতে অনেক নামকরা ম্যাগাজিনে মডেলদের দেখা যায় ভিন্ন সাজে, ভিন্ন হাসিতে মাতিয়ে রেখেছে। প্রতিটি মুখের হাসি আলাদা অর্থ বহন করে। কোনোটাতে মনে হয় সে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে। কোনোটা দেখে মনে হবে এই মেয়েটা কত সুখী। আবার অন্য আরেকটা হাসি দেখে মনে হবে, এই মেয়েটা এভাবে তাকিয়ে কী দেখছে? নিশ্চয়ই কারো সাথে পরিচিত হতে চাচ্ছে। এমন ছবিও খুঁজে পাবে, যেখানে সে মোনালিসার হাসিতে নিজেকে ভাসিয়ে তুলছে, তা আরো বেশি আকৃষ্ট করছে।
দুটো বড় কোম্পানির মাঝের জাহাজ হস্তান্তরের মুহূর্তটা সরাসরি দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। কারণ জাহাজটা আমাদের কোম্পানি কিনেছিল। আমি, জাহাজের ক্যাপ্টেন এবং তার স্ত্রীসহ অন্যরা একপাশে দাঁড়িয়ে আছি। বিপরীতে অন্য পক্ষের কিছু মানুষ আমাদের সাথে হাত মেলাচ্ছে। দুটো কোম্পানির কর্মীদের সাথে শুভেচ্ছা হাত মেলানো হবে, এটা স্বাভাবিক। তো অন্যদের সাথে হাত মেলাতে মেলাতে এক ভদ্রলোক আমার সাথে হাত মেলালেন। ভদ্রলোকের ঝকঝকে হাসি দেখে আমার ভালোই লাগল। মনে মনে তার হাসির প্রশংসা করলাম। এরপর আমি অন্যদের সাথে হাত মিলিয়ে আবার ভদ্রলোককে দেখলাম। তিনি সিরিয়াল করে অন্য কর্মীদের সাথেও হাত মেলাচ্ছেন। অবাক করার ঘটনা, তিনি একইভাবে অন্যদেরও একই হাসিটি উপহার দিচ্ছেন। একটু কৌতূহল বাড়তেই দেখলাম তিনি তৃতীয়, চতুর্থ এবং পঞ্চম ব্যক্তিকেও একই হাসিটাই দিলেন। একই হাসি বারবার দিচ্ছেন দেখে আমার বিরক্ত লেগে উঠল। প্রথম যে ভালো লাগার অনুভূতি ছিল সেটা পুরোটাই বিরক্তিতে রূপ নিল। ভদ্রলোকের হাসিতে কোনো পরিবর্তন এলো না। তিনি যতই পরবর্তী জনের কাছে যাচ্ছিলেন, ততই বিরক্তি লাফিয়ে বাড়ছিল। মনে হচ্ছিল এর চেয়ে কোনো পশু পাখি ভালো হাসতে পারবে। কোনো ভিন্নতা নেই। ঠোঁট দুটোকে প্রসারিত করে দিলেই হলো? এক সময় ভদ্রলোক চোখের সামনে থেকে দূর হলে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। এত জঘন্য হাসি আমি এই ইহজীবনে দেখিনি। অথচ প্রথম দর্শনে ওটাকেই মধুর লেগেছিল! লোকটা যদি তার হাসিটা একটু একটু চেঞ্জ করে একেকজনের কাছে একেকরকম পরিবেশন করত, তাহলে কতই না মধুর লাগত ওটা।
হাসির পুনর্মূল্যায়ন করো
কিছু পেশায় তোমাকে ডিউটির অংশ হিসেবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে হয়।
ব্যাপারটা তো এমন নয় যে, তোমাকে হুট করে বন্দুক দিয়ে বলা হলো ওটা সাথে নিয়ে ঘুরো!
বরং পুরো বিষয়টা এমন, একটা দীর্ঘ সময় তোমাকে অস্ত্র চালানো শিখিয়ে, এর পুরো সবটা জানিয়ে তবেই তোমার হাতে অস্ত্রটা তুলে দিচ্ছে। সবশেষে এটা তোমাকে ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছে।
এবার ধরো বন্দুক হাতে এসে গেল, তোমাকে টার্গেটও দেওয়া হলো। বলা হলো, তোমার শিকার যেন হালকা আঘাতপ্রাপ্ত হয় এমনভাবে গুলি চালাতে হবে। কী করবে তুমি? বুক বরাবর গুলি করে নিশ্চয়ই বলবে না, ‘আমি কীভাবে জানব ব্যাটা মারা যাবে?’
মূল কথা তোমাকে এটাও জানতে হবে কোথায় এবং কীভাবে গুলি করলে লক্ষ্যবস্তুর কেমন ক্ষতি হবে।
যেখানে সাধারণ একটা বন্দুক চালাতে তোমার এত কিছু জানা লাগে, সেখানে যোগাযোগ মজবুত করতে কী কী করা উচিত তা জানবে না, এটা কেমন কথা?
নইলে ওই ভদ্রলোকের মতো তোমার হাসিটাও জঘন্য হয়ে উঠবে। এজন্য অনুশীলনের বিকল্প নেই। ঘরের একটা কক্ষে দরজা বন্ধ করে প্রতিদিন হাসির অনুশীলন করা যায়। কীভাবে কয়েক রকমের অর্থপূর্ণ হাসি দেওয়া যায়, এটা নিশ্চিতভাবে বের করা কষ্টসাধ্য নয়। জাস্ট একটু অনুশীলন করতে হবে। আবারও বলি একই হাসি সবার সামনে দেওয়া অনুচিত। ওটা তোমার ব্যক্তিত্বকে ছোটো করবে।
কৌশল ২৯
স্বতন্ত্র হাসি
যখন কয়েকজন ব্যক্তির একটা গ্রুপের সাথে দেখা হচ্ছে, চেষ্টা করো যেন সবার জন্য আলাদা আলাদা হাসি তোলা যায়। অন্তত তারা বুঝতে পারুক ওই হাসিটা তার জন্যই ছিল।
আর ওই গ্রুপে যদি কোনো বড় ব্যক্তি থাকে তবে তার সামনে হাসির বন্যা বইয়ে দাও এবং অবশ্যই অন্যদেরও আলাদা হাসি দিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রাখো।
দ্রুততা থেকে নিজেকে রক্ষা করো
আমি অনেক সময় খেয়াল করে দেখেছি যে, হাসি জিনিসটা আসলেই অনেক কার্যকরী।
এ ব্যাপারে অনেক জায়গায় অনেক রিসার্চও হয়। ওইরকমই একটা রিসার্চ করেছে ইউনিভার্সিটি অব মিজোরি। তারা একটা মদের বারে কিছু নারীকে গবেষণার জন্য পাঠাল। তাদের কাজই হলো, পুরুষদের চোখের দিকে তাকিয়ে তাদের উদ্দেশ্যে হাসা। আবার সম-সংখ্যক নারীর কাজ হলো, না হেসেই চোখের দিকে তাকানো। তারা মূলত দেখতে চেয়েছে কী পরিমাণ পুরুষ এসে তাদের সাথে কথা বলে।
ফলাফলে দেখা যায় ৬০% পুরুষ হাসতে থাকা নারীদের সাথে নিজ থেকে এসে কথা বলেছে। অন্যদিকে মাত্র ২০% পুরুষ না হাসতে থাকা মেয়েদের সাথে কথা বলেছে। ‘হ্যাঁ অবশ্যই, হাসি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং এই অস্ত্রটাকে কীভাবে ধারালো করবে তা তুমিই ভালো বলতে পারো।
পর্ব ৩০
যে জিনিস হাত দিয়ে ধরা যায় তা দশ হাত লম্বা লাঠি দিয়ে ধরতে চাওয়া বোকামি
কারো দৃষ্টি আকর্ষণের সহজ উপায়
এনি হেল চলচ্চিত্রের নায়িকাকে দেখা যায় এক ভদ্রলোকের সাথে অত্যধিক ঘনিষ্ঠ হতে। নায়িকা নিজেকে নিজে বলছিল, ‘যাক, অবশেষে একজন বুদ্ধিমানের দেখা পেলাম। সে অন্তত অন্যদের মতো বোকা নয়।’
বহুল ব্যবহৃত প্রবাদগুলো শুনতে যতই মধুর হোক না কেন, ওগুলো একজন বড় মানুষের সামনে ব্যবহার করাটা নিতান্ত বোকামি। তুমি হয়ত দুই-চারটা প্রচলিত প্রবাদ কথা বলে নিজেকে অত্যধিক চালাক ভেবে বসে আছ। উল্টোদিকে সফল ব্যক্তিরা ভাবছে, এই লোকের নিশ্চয়ই নিজের চিন্তাভাবনা ক্ষমতা একদমই কম। তাই এসব প্রবাদ বলে নিজের দুর্বলতা ঢাকছে। তুমি তাদের সামনে নিজেকে অসাধারণ প্রমাণ করতে গিয়ে বরং আরো বেশি কমন বানিয়ে দিচ্ছ।
কৌশল ৩০
যে জিনিস হাত দিয়ে ধরা যায় তা দশ হাত লম্বা লাঠি দিয়ে ধরতে চাওয়া বোকামি
বড় ব্যক্তিদের সাথে কথা বলার ক্ষেত্রে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, দু-চারটা প্রচলিত প্রবাদ বলে তাদের মনে বিশেষ জায়গা পাওয়া অসম্ভব। সুতরাং এমন কিছু করা উচিত নয়, যেটা আমাদের আরো নীচে নামিয়ে দেয়। সবার মতো গতানুগতিক হলে আদৌতে বিপদই বলা যায়।
পর্ব ৩১
পেশাদার বক্তাদের অনুসরণ করো
পেশাদার ব্যক্তির সাজ-সরঞ্জাম কাজে দেয়
জ্ঞানীরা বলেন, কলমের ধার তরবারির চেয়েও ধারালো। এর বাস্তবিক প্রয়োগ করতে গেলে দেখা যায় কথাটা পুরোপুরি সত্য। কলমের খোঁচায় এমন অনেক কাজ করে ফেলা যায় যেখানে তরবারির জোর খাটে না।
অন্যদিকে কলমের চেয়ে মানুষের কণ্ঠের জোর অনেক বেশি শক্তিশালী। আমাদের গলার সুর চাইলেই দুঃখ, হাসি, কান্না, সফলতা, ব্যর্থতা সবটার সাথেই মানিয়ে নিতে পারে। তুমি যেভাবে অন্যকে বোঝাতে চাও, ঠিক সেভাবেই তোমার কণ্ঠ তোমায় সঙ্গ দিয়ে যায়।
তোমার মতোই হাত, পা, মস্তিষ্ক রয়েছে এমন কিছু মানুষ চাইলেই একটা বড় দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা করে দিতে পারে।
তারা কীভাবে অন্যদের নিজেদের পক্ষে আনে? অবশ্যই সেই একই শারীরিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবহার করে। তাদের সাথে আমাদের ভিন্নতা ঠিক কোথায়? তাদের যেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আছে, আমাদেরও ঠিক তাই আছে।
একজন পেশাদার ক্রীড়াবিদের শারীরিক সক্ষমতা ভালো থাকবে এটা জানা কথা। একজন গায়কের গলায় দারুণ সুর খেলে যায়। তোমার শারীরিক কাঠামো ভালো নয় এবং গলাটাও গানের জন্য মধুর নয়, এটাই বলবে তাই তো? তোমার সাথে আমি শতভাগ একমত। কিন্তু মঞ্চে যেই লোকটা বক্তৃতা দিচ্ছে তার সাথে তোমার পার্থক্য কীসে? তার যেসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে, তোমারও তাই রয়েছে। তুমি কেন তার মতো করে কথা বলতে পারো না? কেন মানুষ তোমার কথায় আকৃষ্ট হয় না? এটা কি ভেবে দেখা দরকার নয়? তোমার অক্ষমতা এই জায়গায় যে, তুমি একজন বক্তার মতো নিজের শরীরের সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঠিক ব্যবহার করতে পারো না। সে যখন একটা কথা মুখ থেকে ছোড়ে, ওটা শুধু একটা বাক্যই নয় বরং তার সাথে সাথে তার হাত, পা, মুখ এবং সমস্ত শরীর বলতে থাকে তার একই কথাটাই। অর্থাৎ মুখের কথাটাই শরীর থেকেও ঝরে। তাদের অঙ্গভঙ্গিগুলো দেখতেও কতটা ভালো লাগে।
হতে পারে তুমি অতীতে কখনোই একজন পেশাদার বক্তার গুণাবলি অর্জনের চেষ্টা করোনি। এর মানে এই নয় যে, ভবিষ্যতেও তুমি করবে না! সময় বারবার আসে না। নিজেকে তৈরি করার জন্য যত বেশি সময় দেওয়া যাবে ততই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। তোমাকে একজন পেশাদার ব্যক্তির মতো কথা বলা শিখতে হবে। এমন গুণগুলো অনুশীলনের মাধ্যমে আত্মস্থ করা যায়।
তোমার পরিবার একটা ভ্রমণ পরিকল্পনা করছে। তুমি অবশ্যই তোমার পেশাদারি মতামত দাও। ঠিক একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মতো। যেন তোমার কথাটার আলাদা ওজন থাকে, চাইলেই হুট করে কেউ নাকচ করতে না পারে। ব্যবসায় ব্যাপক উন্নতি করেছো? একটু বিশ্রাম দরকার? তুমিই অংশীদারদের কাছে উপস্থাপন করো, তোমাদের খানিক বিশ্রাম অতীব জরুরি। এজন্য তোমার প্রতি পরামর্শ থাকবে পাবলিক স্পিকিংয়ের উপরে একাধিক বই পড়ে নিতে। ওসব কৌশল কাজে লাগাও। তুমি যে কেউ একজন তা তোমার কথা এবং ব্যক্তিত্বের জোরে প্রকাশ পাবে।
যেকোনো পরিস্থিতির মনি-মুক্তো
তোমার কথার জোর অনেকটাই বেড়ে যাবে, যদি তুমি খুব সূক্ষ্মভাবে তোমার বাক্যগুলো সাজিয়ে নাও। তোমার ভারী ভারী কথা, তোমাকে নির্বাচনে জয়ী করার জন্য অনেকটা পথ এগিয়ে নেবে। এমনকি আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায়ও তোমার উপযুক্ত উপস্থাপন, আগত রায়কে তোমার দিকে নিয়ে আসতে পারে।
একজন রাজনৈতিক নেতা কিংবা একজন আইনজীবীকে অবশ্যই জাতে উঠতে হয়। তাদের একটা ছোট্ট ভুল, বড় ধরনের বিপদের সম্ভাবনা ডেকে আনে। একজন রাজনৈতিক নেতা ধরে নিলাম তিনি আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ডব্লিউ বুশ সাহেব, এক সভায় এমন একটা কথা বলে গেলেন যেটা অন্য সবাই বলে। মনে করো তিনি বললেন, ‘আমি ক্ষমতায় গেলে দেশের উন্নতি করব।’
তার প্রতিশ্রুতিতে ভুল না থাকলেও কোনো নতুনত্ব নেই। সবাই গতানুগতিক এই কথাটা বলে। আর এই কথা দিয়ে ভোটারের চিড়া ভেজার সম্ভাবনাও খুব কম। তাই তাকে অবশ্যম্ভাবী ভাবেই নতুন কিছু বলতে হয়।
নতুন কিছু বলার না থাকলে? সেক্ষেত্রেও অনেক পথ আছে। পুরোনো কথাকে আরো সংশোধন করা যায়। ওটাও নতুন এবং আলাদা শোনায় যা মানুষকে আকৃষ্ট করে খুব সহজেই।
রেডিওতে যাদের শো আমি শুনতে পছন্দ করি তেমনই একজন হলেন ব্যারি ফারবার। ফারবার সাহেবের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তিনি নিত্য-নতুন বাক্য ব্যবহার করতে পটু। গতানুগতিক যেসব বাক্য আমরা শুনে কান ঝালাপালা করে ফেলেছি, তিনি তার বিপরীতে। আমার ভাগ্য ভালো, ভদ্রলোককে একদিন সামনাসামনি পেয়ে’ গেলাম। জমিয়ে রাখা বিস্ময়টা তখনই ঝেরে দিলাম, ‘জনাব ফারবার সাহেব, আপনার সাথে আমার একটু কথা ছিল।’
তিনি বললেন, ‘আমার বাবাই একমাত্র আমায় ফারবার ডাকেন। অন্যরা আমায় ব্যারি নামেই ডাকেন।’
তিনি আকারে ইঙ্গিতে তাকে ব্যারি নামেই ডাকতে বললেন। ব্যারি সাহেবের কাছে জানতে চাইলাম, ‘তিনি নতুন নতুন এতগুলো বাক্য কোথায় পান?’
ব্যারি সাহেব চমকালেন না। বোঝাই যাচ্ছে তিনি এই প্রশ্নে অভ্যন্ত। তবে উত্তরটা হাসিমুখেই দিলেন, তিনি যেসব বাক্য ব্যবহার করেন এর মধ্যে কিছু কিছু অরিজিনাল। বাকি সবই ধার করা। বিভিন্ন বই থেকে তিনি এসব বাক্য খুঁজে বের করেন। অন্যসব পেশাদার বক্তার মতো তিনি প্রতি সপ্তাহে একটা লম্বা সময় উদ্ধৃতি ও জ্ঞানমূলক বই পড়ে কাটান।
কারো একটা প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে চাচ্ছে? সেজন্যও অনেকগুলো ধরাবাঁধা রেডিমেট বাক্য আছে। যেগুলো তোমায় ওইসব পরিস্থিতিতে সাহায্য করবে। এই যেমন কারো জবাবে বলতে পারো, ‘আমার কাজটা শেষ হবার জন্য একটু অপেক্ষা করবেন জনাব? তারপর বাড়ির দিকে যেতে যেতে না হয় আপনার জবাবটা দিচ্ছি?’ আবার তুমি চাইলে পুরোনো বহুল ব্যবহৃত বাক্যগুলোকে কাটাছেঁড়া করে নিজেই কিছু একটা দাঁড় করিয়ে দিলে?
‘বেড়ালের মতো চুপিচুপি আসা’ শব্দটাকে চাইলেই তুমি ‘মাছের মতো চুপিচুপি ছুটে বেড়ানো’ বলে দিতে পারো। এতে অর্থের পরিবর্তন না হলেও তোমার শ্রোতা নতুন কিছু জানবে। নতুন একটা বাক্য তাদেরকে তোমার কথায় ডুবিয়ে রাখবে। এছাড়া ‘কথাটা মৃত্যুর মতো সত্য’, চাইলেই তুমি এটাকে বলতে পারো, ‘কথাটা নিজের ছায়া পিছু নেওয়ার মতো সত্য।’
পরিস্থিতি বিবেচনা করে তুমি এমন কিছুর উদাহরণ দিলে যেটা মানুষ চোখে উপলব্ধি করে। মৃত্যু অনুধাবনের ব্যাপার, চোখে দেখা যায় না। বিপরীতে মানুষ তার ছায়াকে খুব সহজেই দেখে। যেসব জিনিস চোখে দেখা যায় ওসব জিনিসের উদাহরণ অধিক কার্যকরী।
এই অংশটা একটু গুরুত্ববহ। তুমি উদাহরণ টানার সময় অবশ্যই স্থান-কাল বিবেচনা করবে। পরিস্থিতি অনুযায়ী বাক্য গঠন তোমায় বাড়তি সুযোগ এবং পরিবেশ তৈরি করে দেবে। যেমন এক ভদ্রলোকের সাথে তোমার দেখা। ভদ্রলোক পোষা কুকুর নিয়ে এলেন। কথার ফাঁকে তাকে বললে, ‘আমার কথাটা তোমার কুকুরের ওই গাছটার দিকে তাকিয়ে থাকার মতো সত্য।’ এটা অবশ্যই তোমাকে লোকটার সামনে আরেকটু বেশি আকর্ষণীয় করে তুলবে। তোমার রসিকতাও তার পছন্দ হবে।
তাদেরকে হাসাও, তাদেরকে হাসাও এবং তাদেরকে হাসাও
ভুল রসিকতা তোমাকে ভালো অবস্থান পেতে সাহায্য করবে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে রসিকতা তোমায় সাহসও দিতে পারে। বিশ্বাস না হলে আমার কাহিনিটা তোমার জন্য।
একটা ব্যবসায়িক মিটিংয়ে আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল- আর্থিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। লাভ কিংবা লস। স্বভাবতই আমার ভেতরটা ধুক ধুক করছে। আমার অবস্থানও পরিষ্কার করার দায় পড়ে আছে। এমন সময় কোম্পানির একজন শেয়ারদার বলে উঠলেন, ‘এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই। যা টাকা আছে ওটা দিয়ে আমরা আগামী এক বছর কোম্পানি দেদারসে চালিয়ে নিতে পারব, যদি না ব্যাংক আমাদের ঋণের জন্য প্রেশার করে।’
ছোট্ট একটা কথা কিন্তু ওজনের দিক থেকে অনেকটাই ভারী। আমার উপর থেকে যেন পাহাড়সম বোঝা নেমে গেল। অন্যদের মতো আমিও ভয় না পেয়ে স্বাভাবিকভাবে মিটিং শেষ করে বেরুলাম। ভদ্রলোকের কথাটা যদিও কথার কথা ছিল, কিন্তু আমাদের সবার মাঝে একটা আশাবাদী এবং নির্ভয় চেতনা তৈরি করে দিয়েছে। একদিন একটা কৌতুকের বই পড়তে গিয়ে ভদ্রলোকের ওই কথাটা ওখানে দেখতে পেলাম। সে যাই হোক। ব্যক্তিগত জীবনে ব্যবহারটাই আসল।
বড় বড় ব্যক্তিদের টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর পূর্বের রাতের অভিজ্ঞতা কিছুটা এরকম যে, তারা ঠিকমতন ঘুমাতে পারেন না, সাংবাদিক কী না কী প্রশ্ন করে বসেন এই নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়ে থাকেন।
মিশিগানের একজন তুখোড় সফল ব্যক্তি, ভদ্রলোকের নাম টিমোথি। তার একটা বাজে দিক হলো, ভদ্রলোক নিজের ফিল্ডের বাইরে তেমন কিছুই জানেন না। কোথাও কিছু নিয়ে মন্তব্য করতে গেলে আগে থেকে ওসব নিয়ে জানাশোনা থাকা লাগে, এটা ভদ্রলোক জানতেন না। ভেবেছিলেন তিনি একটা কিছু বলে দিলেই হয়ে যাবে। বেচারা পরদিনই পত্রিকার নিউজ হলেন। তিনি বলেছেন মুরগির পায়ের আঙুল কেটে অন্য মুরগির আঙুল স্থানান্তর করে লাগালেই ওই আঙুলটা আবার ঠিকভাবে কাজ করবে। এজন্য বড় ব্যক্তিরা না জেনে হুটহাট কিছু বলেন না। আর যে জিনিস জানেন না, তা তো নয়ই!
আরেক ভদ্রমহিলা, ফ্রান্সে থাকেন যার বয়স ১২২ বছর। বিশ্বের সবচেয়ে বয়সী হিসেবে তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছিল। তিনি বেফাঁস বলে দিলেন তার চেহারায় মাত্র একবারই ভাঁজ পড়েছিল। যেটা তাকে হাসির পাত্র বানিয়ে দিল।
মার্ক ভিক্টর হ্যানসেন, একজন সফল এবং জনপ্রিয় ব্যক্তি যিনি একটি বই লিখেছেন। বইটির নাম ছিলো ‘একটি আত্মার জন্য মুরগির মাংসের ঝোল’। হ্যানসেন অবশ্য স্বীকার করেছেন বইটি পূর্বে ‘১০২টি ছোটো গল্প’ নামে ছাপাবেন। কিন্তু শেষে ওই অদ্ভুত নাম দিয়ে বসেন। ব্যাস হয়ে গেল! চারদিকে এটাই মানুষের বুলি হয়ে গেল। মানুষ মজার ছলেও বলতে লাগল, স্ত্রীর জন্য মুরগির মাংসের ঝোল, কিশোরদের জন্য মুরগির মাংসের ঝোল, গডের জন্য মুরগির মাংসের ঝোল!
সতর্কবার্তা!
বিষয়বস্তু যতই ভালো হোক না কেন, মাঝেমধ্যে তোমার ভালো বিষয়বস্তু অন্যের বিরক্তির কারণ হতে পারে। আগেই বলেছি আমি যাত্রীবাহী জাহাজে দীর্ঘদিন চাকরি করেছি। সেবার জাহাজটি যুক্তরাজ্যের দিকে যাচ্ছিল। যাত্রীদের একটু বিনোদন দিলে মন্দ হয় না, এই চিন্তা থেকে ভাবলাম তাদের একটা প্রেমের কবিতা শোনাই। কবিতার নাম হচ্ছে ‘কীভাবে তোমায় ভালোবাসব।’
কবিতাটা সবার খুব পছন্দ হয়েছে। সবাই খুবই প্রশংসা জানাল। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে, যাত্রীদের সাথে আমার দেখা হলেই তারা মুচকি হেসে বলত, ‘কীভাবে তোমায় ভালবাসব?’
সে এক ভিন্ন অনুভূতি! জাহাজের পরের সফর ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের দিকে। আগের অভিজ্ঞতা ধরে এদেরও একই কবিতা শোনালাম। ফল এলো উল্টো। সবাই বেশ বিরক্ত হলো। যে কদিন ওই যাত্রীরা জাহাজে ছিল, আমায় দেখলেই বিরক্তির ঢেকুর তুলত!
ভুলটা আমারই হয়েছে। আমার বিবেচনা করার দরকার ছিল, এই যাত্রীরা যাচ্ছে ওয়েস ইন্ডিজের দিকে। এদের ইংরেজি কবিতা ভালো লাগবে কেন? আশা করি আর বলা লাগবে না যে, স্থান কাল বিবেচনা না করলে তুমি কারো বিরক্তির কারণ হতে পারো। তোমার ফেলা বোমটা তখন তোমাকেই ধ্বংস করবে।
কৌশল ৩১
পেশাদার বক্তাদের অনুসরণ করো
তুমি একটা বক্তৃতার মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে আছ কিংবা তোমাদের বার্বিকিউ পার্টিতে দাঁড়িয়ে আছ, স্থুল রসিকতা করা যায়ই।
বক্তাদের বই পড়তে পারো নানা ধরনের উদ্ধৃতির সংকলন ঘটাতে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে কোনো একটা উদ্ধৃতি উপস্থাপন করো। উপস্থিত ভিড়কে হাসাও, তাদেরকে আরেকটু পুলকিত করো।
পর্ব ৩২
কোদালকে কোদাল বলতে শেখো
সফল ব্যক্তিরা সেটাই বলেন যেটা তারা দেখতে পান
একবার লিফটে করে যাওয়ার সময় তুমি খেয়াল করলে, ভেতরে থাকা মানুষজন অদ্ভুত ভাষায় কথা বলছে।
ধরে নিলাম তারা, হাঙ্গেরির ভাষায় কথা বলছে। তুমি বেচারা হাঙ্গেরির ভাষা তো বোঝো না। তুমি যখনই কিছু একটা উচ্চারণ করলে, তখনই তারা বুঝে গেল, তুমি হাঙ্গেরির কেউ নও। এমন পরিস্থিতিতে পড়াটা নিশ্চয়ই সুখকর নয়।
তেমনই তোমায় পরখ করেই বড় বড় সফল ব্যক্তিরা খুব সহজেই তোমায় চিনে ফেলবে। যখন দুজন বড় ব্যক্তি কথা বলছে, যতই কান পাতো না কেন, তুমি বুঝতে পারবে না যে ওরা বড় বেড়াল (বড় ব্যক্তি) না ছোটো বেড়াল। অথচ ওরা তোমার সাথে একটু কথা বললেই বুঝে যাবে তুমি তেমন বড় কেউ নও। অথবা তুমি পাত্তা পাওয়ার মতো কেউ নও। নিশ্চিত তাদের কাছে তোমার গুরুত্বও হারিয়ে গেল। একজন বড় মানুষের কথার ধরন একজন বড় মানুষই ধরতে সক্ষম। তোমার তাদের ভাষা বোঝার সক্ষমতা নেই।
বড় ব্যক্তিরা স্পষ্টবাদী হয়। সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলতে দ্বিধা করে না। অপর দিকে ছোট ব্যক্তিরা স্পষ্ট করে উঁচু গলায় কিছু বলার সাহস রাখে না। এরা মিনমিন করে কথা বলে। ধরো একজন ধনী ব্যক্তিকে বড় ব্যক্তিরা একজন ধনী হিসেবেই বলে ফেলে। তারা যদি টিস্যু পেপারের দিকে ইঙ্গিত করে তবে ওটা টিস্যু পেপারই। তাদের সবচেয়ে বড় সফলতা তারা যা বলবে স্পষ্ট বলবে। দ্বিধা নামক শব্দ তাদের ডিকশনারিতে নেই। অথচ একজন সাধারণ মানুষ সব সময় দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। একজন সফল ব্যক্তি আরেকজনের মুখের উপরে বলে ফেলবে যেকোনো শব্দ, যেটা একজন ছোট ব্যক্তিত্বের মানুষ আকারে ইঙ্গিতে বলার চেষ্টা করে। আবার দেখা যায় একটা কোম্পানির টাকা পয়সা বিষয়ক বিবরণীতে ছোট ব্যক্তিরা টাকা পয়সা উল্লেখ না করে কাছাকাছি শব্দ ‘সম্পদ’ উল্লেখ করতে চায় এর পরিবর্তে। সেখানে একজন বড় ব্যক্তিত্বের ব্যক্তি টাকাকে স্পষ্টভাবে টাকাই বলবে।
কৌশল ৩২
কোদালকে কোদাল বলতে শেখো
কোদালকে কোদাল বলতে শেখো। ছোট ব্যক্তিত্বের মানুষরা সব সময় চেষ্টা করে কাছাকাছি শব্দের প্রয়োগ করতে। আসল শব্দ মাঝেমধ্যে তারা প্রকাশ করতে ভয় পায়। অন্যদিকে বড় ব্যক্তিরা নির্দ্বিধায় তা উচ্চারণ করে ফেলে। আবার এটা ভেবে বসার দরকার নেই যে, বড় ব্যক্তিরা অপেক্ষাকৃত সভ্য শব্দগুলো এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত অসভ্য শব্দ ব্যবহার করে। বরং তারা যেটা উপযুক্ত সেটাই ব্যবহার করে। কোনো লুকোচুরি খেলে না।
পর্ব ৩৩
উত্যক্ত করা থেকে বিরত থাকো
আরেকটা অকার্যকর পন্থা
একটা বিজ্ঞাপন কোম্পানির প্রেসিডেন্ট লুইস একটা ভোজসভার আয়োজন করলেন।
অন্য অনেকের মতো আমিও আমন্ত্রণ পেলাম। লুইস সাহেব ছাড়াও তার স্ত্রী লিলিয়ানও উপস্থিত ছিলেন। দারুণ দারুণ সব খাবার পরিবেশন করা হলো। সবকিছুর শেষে কোমল পানীয়জল পরিবেশন করা হয়েছে। লুইস সাহেব একটু বেশিই গিলে ফেলেছিলেন এবং মাতাল হবার পর্যায়ে চলে গেছেন।
এমন সময় এক সুন্দরী তরুণী সবার মাঝে এসে দাঁড়াল আর বলল, ‘এই কোম্পানির যেই না সব বস, আমার মনে হয় না তোমরা কেউ শান্তিতে আছ। হাহাহা।’
তরুণী এটা নিছক মজার ছলে বললেও সবাই থ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইল। এদিকে লুইস সাহেবের সেন্স নেই। তিনি আচেতনভাবে ওই তরুণীকে শাসাতে লাগলেন। তরুণীটি ওখান থেকে সরে গেল এবং কয়েকটা কাচের প্লেট এক ঝটকায় ভেঙে ফেলল। মেয়েটা রাগে গিজগিজ করতে থাকল। আগত তরুণী ছিল আর্ট ডিরেক্টর বব জিলানের প্রেমিকা।
ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই হতভম্ব! এক ভদ্রলোক এসে তরুণীকে সরিয়ে বলল, ‘লুইস এবং লিলিয়ানের কোম্পানিতে কারো দুঃখ থাকতে পারে না। আমরা এমনিতেই বেশ আছি। যা হয়েছে আমরা সবটা ভুলে যাই।’
এরপর আবার পার্টি জমে উঠল। সবাই খুবই হাসি খুশি সময় কাটাতে থাকল, একজন ছাড়া। আর সে হচ্ছে বেচারা বব। সে জানে তার প্রেমিকার এই কাণ্ড নিশ্চয়ই কেউ ভালো চোখে নেবে না।
ববের প্রেমিকার মতো মৃদু ঠাট্টা করার স্বভাব অনেকরই আছে, তারা ভেবে থাকেন ছোটোখাটো ঠাট্টা তাদের অন্যদের কাছে ভালো দেখাচ্ছে যা মোটেও না।
এই যেমন একজন ছোট ব্যক্তিত্বের মানুষ আরেকজনের টাকো মাথার দিয়ে তাকিয়ে ঠাট্টা করে বলতে পারেন, ‘হায়রে চুল, কাল ছিল আজ নাই। হা হা হা।’ কিন্তু একই কাজ একজন বড় ব্যক্তি কখনোই করবেন না। এরা অন্যদের ছোটোখাটো ঠাট্টা করতে গিয়ে নিজেদের অবস্থান হারান।
কৌশল ৩৩
উত্যক্ত করা থেকে বিরত থাকো
ছোট ব্যক্তিত্বের মানুষদের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তারা অন্যদের হাসানোর জন্য সস্তা কৌতুক কিংবা ঠাট্টা করতে পছন্দ করেন। অথচ বড় ব্যক্তিরা এমনটা কখনোই করবেন না। তোমারও উচিত অন্যের কোনো দুর্বলতা নিয়ে কোনো ঠাট্টা না করা। একান্ত ঠাট্টা করার ইচ্ছে হলে অন্য অনেক বিষয় পাবে। কিন্তু অন্য কারো দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করে কখনোই ঠাট্টা করো না। কখনোই না।
পর্ব ৩৪
বলটা এখন গ্রহীতার পায়ে
ভালো করে দেখো, বলটা কার দিকে ছুড়ছো
প্রাচীন মিশরের ফারাও রাজাদের একটা স্বভাব ছিল, যদি কোনো দূত ভালো সংবাদ পরিবেশন করত, তবে তাকে একজন রাজপুত্রের মতো সম্মান প্রদর্শন করা হতো। আবার কোনো দূত যদি খারাপ সংবাদ নিতে আসত তবে তার গর্দান মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়ত। ফারাও রাজত্ব বহু আগেই বিলুপ্ত হয়েছে। কেউ কারো উপরে জোর জবরদস্তি করার অধিকার এই আধুনিক বিশ্বে কারো নেই।
সেইবার ছুটিতে আমরা দুই বান্ধবী বনভোজনে যাবার সমস্ত পরিকল্পনা সেরে ফেলেছি। খাবার দাবার এবং প্রয়োজনীয় সব নিয়ে যখনই গাড়িতে উঠতে যাব, তখনই পাশের বাড়ির বারান্দা থেকে এক বুড়ো চেঁচিয়ে উঠল আর হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমরা পিকনিকের জন্য বাজে সময় পছন্দ করেছ নাতনিরা। খবরে বলল আজ বৃষ্টি হবে।’ তিনি আকাশের দিকে বেশ কবার চাইলেন।
আমাদের দুজনেরই মন চাইল, বুড়োর মাথাটা বাড়ি দিয়ে দুই ভাগ করে দেই। এমন একটা বাজে খবর দেওয়ার জন্য নয়। বরং তার বিচ্ছিরি হাসিটার জন্য।
আরেকদিনের ঘটনা, আমার একটা জায়গায় যাবার খুব প্রয়োজন পড়ে গেল। দ্রুত পাশের বাসস্টপেজে গেলাম। কাউন্টারে গিয়ে টিকিট কেনার টাকা বাড়িয়ে দিতেই ক্যাশের লোকটা খটখট করে হেসে উঠল, ‘আরেহ ম্যাডাম, বাস পাঁচ মিনিট আগেই চলে গেছে। আপনি বাস মিস করেছেন।’ রাগে আমার ছাতি ফেটে যাচ্ছিল। ক্যাশের লোকটাকে আস্ত গিলে ফেলতে পারলে বোধহয় আমার ভেতরটা শান্তি পেত।
কোনো খারাপ সংবাদ দেওয়া দোষের কিছুই নয়। নানা সময়ে খারাপ সংবাদ শোনার জন্য প্রস্তুত থাকা উচিত আমাদের। এক্ষেত্রে একটা কথা সবাইকেই বিবেচনায় রাখা উচিত, খারাপ সংবাদ কাউকে দিতে গেলে অবশ্যই সহানুভূতির সাথেই দিতে হবে। যারা জীবনে সফল হতে চায়, তারা অন্যের দুঃখে যেমন দুঃখ পায় তেমনই অন্যের সুখে সুখ পায়। একজন ডাক্তার তার রোগীকে একটা বড় অপারেশন করার পূর্বে নিশ্চয়ই হেসে হেসে বলবে না, আপনার অপারেশন করব, হেহেহে। বরং সে তাদের সাথে সমব্যথী হয়ে কথাটা বললে, রোগী মানসিক শান্তি পাবে। একজন বস অবশ্যই চাকরি হারানো কর্মীর জন্য দুঃখ প্রকাশ করবে। একজন রাষ্ট্রনায়ক অবশ্যই তার দেশের মানুষের বড় ধরনের দুর্যোগে তাদের পাশে দাঁড়াবে সমবেদনার সাথে। বড় বড় ব্যক্তিরা খারাপ সংবাদ দেওয়ার সময় তারা অবশ্যই গ্রহীতার সাথে সমব্যথী হয়। তাদের দুঃখ শেয়ার করে। তাদের অনুপ্রেরণা দেয়।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, অনেক মানুষ অন্যের দুঃখে দুঃখিত হয় না। ধরো তুমি একটা মুরগির অর্ডার দিলে। বিক্রেতা হাসতে হাসতে বলল, ‘মুরগি নাই, আগামীকাল আইসেন।’
তুমি হোটেল বয়কে জিজ্ঞেস করলে তোমার রুম রেডি কি না? সে অট্টহাসি দিয়ে বলল, ‘না স্যার। রেডি হয়নি।’
তুমি ব্যাংকে গিয়েছো টাকা তুলতে। ক্যাশিয়ার মুচকি হেসে জানাল, ‘নেটে একটু সমস্যার কারণে টাকা ওঠানো যাচ্ছে না।’
সব ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে তোমার দুঃখের সংবাদে তারা তেমন একটা দুঃখ পায়নি, বরং তাদের হাসিখুশি মুখ ভিন্ন কিছুই বলছে। এক্ষেত্রে তুমি এদের কাউকেই পছন্দ করবে না।
এমন যদি হতো তুমি বাসা থেকে বের হতেই বুড়ো মানুষটি তোমায় দুঃখ নিয়ে বলত, নাতনিরা আজ বৃষ্টি হতে পারে। আজ পিকনিকে না গেলেই ভালো হয়।
তুমি অন্তত রুষ্ট হতে না। সহানুভূতি পেয়ে একটু হলেও পুষিয়ে নিতে।
কাউন্টারের ক্যাশিয়ার যদি দুঃখিত হয়ে বলত, ‘বাসটা পাঁচ মিনিট আগেই চলে গেছে। আরেকটু আগে আসলেই পেয়ে যেতেন।’ তাহলে তুমি অন্তত এটা ভাবতে, ‘ঠিক আছে, পরের গাড়িতেই যাব।’
এটা একজন বড় মানুষ আর একজন স্বল্প ব্যক্তিত্বের মানুষের পার্থক্য। বড় ব্যক্তিরা যখনই কাউকে হতাশার সংবাদ দেয় তারা তাদের আবেগ মিশিয়ে সেই সংবাদটা উপস্থাপন করে। যেন তারাও তার দুঃখে সমব্যথী।
কৌশল ৩৪
বলটা এখন গ্রহীতার পায়ে
একজন ফুটবল প্লেয়ার ভুল পাস দিয়ে দুই মিনিটের বেশি টিকে থাকতে পারবে না। তাকে সফল হতে হলে তার দলের অন্য সব প্লেয়ারের অবস্থান দেখে তবেই বল পাস করতে হবে।
একটা সংবাদ কারো কাছে পৌছানোর আগে অবশ্যই তোমার সংবাদের গ্রহীতার কথা মাথায় রাখতে হবে। তোমার সংবাদটা শোনার পর তার মনের কী হাল হবে, তা অন্তত একবার তোমার ভেবে নেওয়া উচিত। সংবাদের ধরন অনুযায়ী হেসে, সহানুভূতিশীল হয়ে কিংবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সংবাদটা দেওয়া উচিত। সংবাদটা তোমার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা কখনোই বিবেচনা করবে না। বরং ওটার ফলে গ্রহীতার কী হাল হবে তাই বিবেচনা করা উচিত এবং সে অনুযায়ী তোমার অভিব্যক্তি ফুটিয়ে তুলতে হবে।
পর্ব ৩৫
ভাঙা ক্যাসেটটাই বাজাও
যখন তুমি উত্তরটা এড়িয়ে যেতে চাও (এবং প্রশ্নকারীকে ঠান্ডা মাথায় চুপ করাতে চাও)
‘বারবারা’ আমার অনেকগুলো ক্লায়েন্টদের মধ্যে অন্যতম, যে কিনা একটা বড় ফার্নিচার কোম্পানির মালিক। বারবারা এবং তার স্বামী দুজনেরই কোম্পানিতে শেয়ার রয়েছে। দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা এটাই যে, তার স্বামী ফ্রেঙ্কের সাথে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন হলো। তাদের সম্পর্কটা এত বাজে পর্যায়ে গেছে যে, ছাড়াছাড়ি না হয়ে উপায়ও ছিল না। কোম্পানির কর্মচারীদের ভেতরে সর্বক্ষণ এই নিয়ে কানাঘুষা চলছেই, ‘এখন কী হবে?’
যেহেতু দুজনের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে সেক্ষেত্রে কোম্পানির ভবিষ্যৎ এবং মালিকানা নিয়ে সবাই চিন্তিত। আবার অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কেউ যে সাহস করে জিজ্ঞেস করবে সেটাও হচ্ছে না।
বারবারা ওর একটা ভোজসভায় আমাকে দাওয়াত করল। বিভিন্ন সামাজিক এবং ব্যবসায়িক অনুষ্ঠানে আমার এমনিতেই আমন্ত্রণ পড়ে সেটা আগেই তোমাদের জানিয়েছি। খাবার টেবিলে আমি বারবারার পাশেই বসলাম। তাকে দেখে মনেই হয় না যে, সে এত বড় একটা দুর্যোগের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। ওর আচার ব্যবহার খুবই স্বাভাবিক এবং আন্তরিক।
তার একটা কলিগ বোধহয় নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। তাই সে তার কানের কাছে এসে জিজ্ঞেস করেই ফেলল, ‘বারবারা, তোমার সাথে ফ্রেস্কের কী হয়েছে?’
বারবারা খাবার মুখে নিচ্ছিল। এই প্রশ্নে হুট করে তার রেগে যাবার সম্ভাবনা প্রবল ছিল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সে একটু খাবার মুখে নিয়ে স্বাভাবিকভাবে জবাব দিল, ‘আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, তবে এতে কোম্পানিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। ওটা স্বাভাবিকভাবেই চলবে।’
তার কলিগ এতেও সন্তুষ্ট হতে পারল না। সে আরো আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি এখনো ফ্রেঙ্কের সাথে মিলে-মিশে কাজ করছ?’
আমার ক্লায়েন্ট এবারও স্বাভাবিক থাকল। একটু খাবার মুখে তুলে নিল। আবার আগের উত্তরটাই দিল, ‘আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, তবে এতে কোম্পানিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। ওটা স্বাভাবিকভাবেই চলবে।’
প্রশ্নকারী মহিলা এবারও ক্ষান্ত দেওয়ার কোনো মানসিকতা দেখাল না। সে বোধহয় উত্তর বের না করে ছাড়বেই না। মহিলা আবার জানতে চাইল, ‘তোমরা দুজন কি এখনো একজন আরেকজনকে সহযোগিতা করো?’
বারবারাও বোধহয় অন্য ধাতুতে তৈরি। সে স্বাভাবিকভাবে খেতে থাকল। নতুন আইটেম চেখে দেখল। তারপর খুব সুন্দর, স্বাভাবিক হেসে ওই মহিলার চোখে চোখ রেখে বলল, ‘আমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে, তবে এতে কোম্পানিতে কোনো প্রভাব পড়বে না। ওটা স্বাভাবিকভাবেই চলবে।’
প্রশ্নকারী এবার চুপ হয়ে গেল। লজ্জায় সে বারবারার দিকে আর চোখ তুলেও তাকাতে সাহস করল না। বারবারা যে একজন বড় খেলোয়াড় তা বোঝার আর বাকি রইল না। বড় ব্যক্তিরা কীভাবে বড় বড় সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়, বারবারা তা দেখিয়ে দিল। কীভাবে এত উত্তেজনাকর একটা প্রশ্নকে স্বাভাবিকভাবে নিতে হয় এবং সেটার উত্তেজনা হ্রাস করতে হয়, এই ঘটনা তার আদর্শ নজির।
কৌশল ৩৫
ভাঙা ক্যাসেটটাই বাজাও
কোনো একটা অনভিপ্রেত প্রশ্ন, যেটা তুমি এড়িয়ে যেতে চাও, এমন প্রশ্ন কেউ করে বসলে উত্তেজিত না হয়ে মাথা ঠান্ডা রাখো। স্বাভাবিকভাবে তোমার উত্তর দাও। সে বারবার প্রশ্ন করলেও তুমি একই উত্তরটা একই ভঙ্গিতে দাও। দেখবে সে থেমে গেছে। মনে রাখবে রেগে গেলে তো হেরে গেলে!
পর্ব ৩৬
বড় দান বুঝে শুনে দিতে হয়
যেভাবে বড় ব্যক্তিরা তারকাদের সামলান
আমরা যাদের তারকা হিসেবে চিনি, তারাও আমাদের মতোই রক্ত মাংসে গড়া মানুষ। তারাও কোথাও না কোথাও খেতে যান, কোথাও না কোথাও ঘুরতে যান। সেক্ষেত্রে তাদের সাথে দেখা হয়ে যাওয়াটা একেবারে অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং অস্বাভাবিক ব্যাপার হবে, তুমি যদি দেখা হওয়ার পরবর্তী পরিস্থিতি সামলাতে না পারো। ধরে নিই, তুমি একটা রেস্তোরাঁয় খেতে বসেছো, সাথে তোমার বন্ধুও আছে। হঠাৎ দেখলে তোমাদের পাশের টেবিলে বসে থাকা ব্যক্তিটি ছোটোখাটো কেউ একজন নয়! বরং টেলিভিশনে, চলচ্চিত্রে যাকে প্রায়শই দেখতে পাও, সেই ব্যক্তিটি তোমার সামনে! এক কথায় বললে, দেশের তারকা। এমন অবস্থানে কী করবে তুমি? গিয়ে সোজা গলা জড়িয়ে ধরবে? উঁহু। সেটা কখনোই সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে তোমার হাতে দুটো পথ আছে।
নিজেকে স্বাভাবিক রেখে বন্ধুর সাথে কথা বলতে পারো। এরপর ওই সেলিব্রেটির সাথে চোখাচোখি হলে চোখ এবং মাথা হালকা ঝাঁকিয়ে তাকে বুঝিয়ে দিতে পারো,
তুমি তাকে চিনতে পেরেছ। এক্ষেত্রে তুমি স্বাভাবিক একটা সময় পার করে দিলে।
এই গেল প্রথম সমাধান।
তোমার হয়েছে মহা বিপদ। এই জনপ্রিয় তারকার সাথে কথা বলার জন্য তুমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছ, তাহলে সেক্ষেত্রে তোমাকে ভিন্ন পথ ধরতে হবে।
সেই তারকা যখনই বিল পরিশোধ করে ফেলবে, তখন তুমি তারকার সামনে দাঁড়াতে পারো। ধরে নেই সুপার স্টারের নাম স্যামুয়েল। তুমি বলতে পারো, ‘জনাব স্যামুয়েল, আপনি হয়ত কল্পনাও করতে পারবেন না, আপনার প্রতিটি ছবি আমি কী পরিমাণ উপভোগ করি। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এমন দারুণ সব কাজ করার জন্য।’
তুমি যেহেতু সরাসরি স্যামুয়েল সাহেবের কোনো নির্দিষ্ট কাজ নিয়ে কথা বলোনি সেহেতু স্যামুয়েল সাহেব এটা কখনোই ভাববে না যে, ‘তুমি আমাকে বিচার করার কে?’
বরং তিনি বুঝে নিবেন, তুমি তার অভিনীত চলচ্চিত্র পছন্দ করেছো। এটা একটা কৌশলগত উত্তর, যা তোমাকে নিরাপদ রাখবে। তার কাজ তোমায় কতটা আনন্দ দিয়েছে তাই প্রকাশ পাবে। সে বুঝে নেবে তুমি তার অভিনয়কে পাল্লায় মাপছ না, বরং তুমি তার কাজের দ্বারা কতটুকু আনন্দ পেয়েছ, সেটাই প্রকাশ করছ। যা একটা সূক্ষ্ম উত্তর।
শুধু যে একজন চলচ্চিত্র নায়কের সাথেই তোমার দেখা হবে এটা ভুল কথা। বরং আরো অনেক বাস্তব জীবনের সেলিব্রিটি মানুষ আছে তাদের সাথেও দেখা হতে পারে। এই যেমন তোমার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর, যার সামনে দাঁড়ানোর সাহস তোমার নেই। এই পার্টিতে তাকে সামনে পেয়ে কথা বলার ইচ্ছে জেগে উঠল! গিয়ে তাকে এটা বলবে না নিশ্চয়ই যে, ‘বস, আপনি কী অসাধারণ একটা কোম্পানি চালান।’
বরং ভিন্ন কিছু বলতে হবে। সেটা হতে পারে, ‘বস, আপনার জন্য কাজ করতে পেরে আমি গর্বিত।’
এটাকে এখানেই ছেড়ে দাও। বাকিটা তোমার বস পছন্দ করবেন। তিনি তোমার সাথে আরো কথা বলবেন কি না, এটা নির্ভর করবে তুমি কতটা তাকে আকৃষ্ট করতে পেরেছ। বস যদি ধন্যবাদ দিয়ে চলে যায় তাও তুমি তার চোখে একটা ভালো কর্মী হিসেবে স্থান পাবে। এমনও হতে পারে তোমার বস তোমার সাথে আরো কথা বলছেন। সেক্ষেত্রে নিজ থেকে টেনে তুমি কোম্পানির জন্য কী কী করেছ, তা ব্যাখ্যা করার কোনো প্রয়োজন নেই। বস যদি জিজ্ঞেস করে তবেই বলবে। বসের সাথে একজন অপরিচিত ব্যক্তিও আছে, এখন কী করবে এটাই ভাবছ? বসের সাথে কথার পাশাপাশি পারলে ওই ব্যক্তির সাথেও হালকা কুশল বিনিময় করে রাখো। জেনে রাখা উচিত তোমার বস যেমন বড় মাছ তেমনই তার ঘোরাফেরাও বড় মাছেদের সাথেই হবে। হতে পারে ওই ব্যক্তি অন্য কোনো কোম্পানির বড় কোনো কর্মকর্তা!
ফেলিসিয়া, আমার বান্ধবী যে কি না একজন সফল আইনজীবীও। কর্মক্ষেত্রে তার যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। সম্প্রতি সে একজন টেলিভিশন উপস্থাপক মিস্টার টমকে বিয়ে করেছে। সমস্যা বেঁধেছে তখনই, যখন তারা বাইরে ঘুরতে বের হয়, মানুষজন টমকে ঘিরে ধরে। তার সাথে কথা বলে। টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে টমের পরিচিতি মানুষকে তার কাছে টেনে আনে। আর বেচারি ফেলিসিয়া মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে এসব দেখে। অথচ সে একজন সফল আইনজীবী, যা কারো চোখেই পড়ছে না! এজন্য এই দম্পতি দুজন বাইরে বেরুনোই বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ দুজনই ঘুরতে পছন্দ করে। টমের উৎফুল্ল ফ্যানদের এমন ঘিরে ধরা তাদের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে!
তোমার ওই কাজটা আমার পছন্দের
অন্য একটা সতর্কতার কথা না বললেই নয়। তুমি যখনই এমন বড় কোনো সেলিব্রেটির সাথে কথা বলতে যাবে, অবশ্যই তাদের সাম্প্রতিক যেকোনো কাজ নিয়েই আলোচনা করবে। হয়ত একজন লেখকের শেষ বইটা, একজন চলচ্চিত্র নায়কের শেষ চলচ্চিত্রটা, একজন ব্যবসায়ীর শেষ সফলতাটা নিয়ে তোমাদের দারুণ একটা আলোচনার সূচনা হতে পারে। তুমি যখনই তাদের সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে কথা বলবে, তারা ওটা নিয়ে কথা বলতে মজা পাবে। মনে রাখবে তাদের অনুভূতিগুলো তখনও ওটা নিয়ে তাজা রয়েছে। এজন্য তারাও কথা বলবে প্রাণ খুলে।
ভুলবশত যদি তাদের পুরোনো কোনো কাজ নিয়ে কথা বলে ফেলো, তবে এটা তাদের আরো অনেক কিছুই ভাবাবে। যেমন অমুক ছবিটার কথা বলার প্রসঙ্গে, সে তোমায় আরো অনেকগুলো পুরনো চলচ্চিত্র, তোমার কেমন লেগেছে জানতে চাইতে পারে। তখন তুমি সবগুলোর জবাব দিতে পারবে তো?
তাই অবশ্যই চেষ্টা করবে সাম্প্রতিক ইস্যু নিয়েই কথা বলতে। সাম্প্রতিক কিছু না পেলে কিছুদিন আগের, যেটা এখনো পুরোনো হয়নি এমন কিছু নিয়ে বলা যেতে পারে।
কৌশল ৩৬
বড় দান বুঝেশুনে দিতে হয়
একজন ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হলে তুমি কখনোই একজন সেলিব্রেটি বা তারকা ব্যক্তিত্বকে দেখেই উত্তেজিত হয়ে, তার উপর প্রশংসায় হামলে পড়বে না। বরং নিজেকে সামলে রাখতে হবে। যদি তাদের কারো সাথে কথা বলতেই হয়, তাদের সাম্প্রতিক কোনো কাজ নিয়ে কথা বলো। পুরোনো কোনো কাজের কথা তোলাটা বোকামি, কারণ ওটার স্মৃতিগুলোও পুরোনো হয়ে গেছে। অনেকটা ভুলে যাবার পথে।
পর্ব ৩৭
গতানুগতিকভাবে ধন্যবাদ দিও না
চূড়ান্ত পরিণতি
আমরা সবাই প্রায়শই শুনতে পাই, কাউকে ধন্যবাদ জানালে কেউ ছোটো হয়ে যায় না। কিন্তু আমরা ভুলে যাই যে ধন্যবাদ দেওয়ার মাঝেও বিস্তর ফারাক রয়েছে।
এজন্য বড় বড় ব্যক্তিরা কাউকেই শুধু ধন্যবাদ বলে চলে যান না। বরং তারা উপযুক্ত কারণ উল্লেখ করে ধন্যবাদ দেন।
তুমি যদি নিজেকে একজন দক্ষ, পেশাদার ব্যক্তি হিসেবে তৈরি করতে চাও, তবে তোমার নিজেকেও সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। ধন্যবাদ অনেকের মুখের বুলি হয়ে যায়, আর সেটা এত দ্রুত বলে যে শোনাই দায় হয়ে দাঁড়ায়! সকালে তোমার হাতে বিক্রয়কর্মী তাজা সংবাদপত্রটা তুলে দিতেই তুমি ধন্যবাদ বলে ওটা নিয়ে নাও। তোমার মুখের এই ধন্যবাদ কি আদৌ তার জন্য ছিল? আমরা অবস্থা বুঝেই মানুষকে বিচার করি। আবার এই তুমি যখন কোম্পানির একটা দামি গাড়ি, একজন মক্কেলের কাছে বেচতে চাইলে এবং ক্রেতাও কিনে নিল। এত বড় সাফল্যে তুমি ক্রেতাকে শুধুমাত্র স্বভাবসুলভ ধন্যবাদ দিয়ে কেটে পড়বে? অবশ্যই নয়। তুমি ক্রেতাকে এই গাড়িটি কেনার জন্য মনের অন্তঃস্থল থেকে ধন্যবাদ জানাবে। অথবা তোমার প্রিয় কোনো মানুষ, সারাদিন ব্যস্ত হয়ে তোমার জন্য কিছু রান্না করে আনলে তুমি একটা সাধারণ ধন্যবাদ দিয়ে কাটিয়ে দেবে?
তাহলে সেই একই তুমি অন্যদের বেলায়, তাদের পদ বুঝে তোমার ধন্যবাদটা দাও। অথচ কোনো কারণ না বলেই তাকে ধন্যবাদটা দিচ্ছ?
এখন থেকে সবাইকে ধন্যবাদ বলার পাশাপাশি, ধন্যবাদ দেওয়ার কারণও উল্লেখ
করতে শেখো। এই যেমন-
-আমার এখানে আসার জন্য ধন্যবাদ।
-আমার সাথে একমত হওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
-আমার জন্য অপেক্ষা করার জন্য ধন্যবাদ।
-আমাদের কোম্পানির এত ভালো একজন ক্রেতা হবার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
-এতটা ভালোবাসা দেখানোর জন্য ধন্যবাদ।
যখনই তুমি এভাবে কাউকে ধন্যবাদ জানাতে শিখে যাবে এবং ওটা তোমার মন থেকে আসবে, মানুষজন তোমায় আরো বেশি ভালবাসবে, আরো বেশি প্রশংসা করবে। তোমার সাথে আরো বেশি লেনদেন করতে পছন্দ করবে।
সময় বাঁচানোর জন্য এবং বিভিন্ন দূরবর্তী জায়গায় যাওয়ার সুবিধার্থে বিমানের বিকল্প কিছুই হতে পারে না। আমারও যেহেতু ঘনঘন বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো, বিমানে চড়া একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল। যাত্রা শেষে দেখা যেত পাইলট এবং সহকারী পাইলট প্লেনের সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছে। আমি তাদের উদ্দেশ্য করে বলতাম, ‘ধন্যবাদ, আমাদের সুন্দরভাবে পৌঁছে দেওয়ার জন্য।’
তারাও প্রচণ্ড খুশি হতো। ফিরতি বলত, ‘আপনাকেও ধন্যবাদ, আমাদের সাথে আসার জন্য।’
কৌশল ৩৭
গতানুগতিকভাবে ধন্যবাদ দিও না
কখনোই ধন্যবাদ শব্দটা একাকী ব্যবহার করবে না। এর সাথে ন্যূনতম কিছু জুড়ে দেবে যেটা পরিস্থিতির সাথে যায়। এই যেমন, ‘ধন্যবাদ, আমার সাথে আসার জন্য।’
