হাউ টু টক টু এ্যানিওয়ান – ৬
অধ্যায় ছয়
অত্যধিক প্রশংসা করার কার্যকারিতা
প্রশংসার প্রতিষ্ঠনি
বাচ্চারা নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সব রকমের প্রচেষ্টা চলিয়ে যায়। মা বাবার নামে ভালো কিছু বলে মন গলানোরও চেষ্টাটাও ওরা বাদ দেয় না।
যেমন একটা বাচ্চা তার বাবার পায়ের কাছে বসে পড়ল, মুখ কালো করে বলল, ‘বাবা তুমি অনেক ভালো। আমি জানি ওই যে নতুন সেন্ডেলটা, ওটা তুমি আমায় কিনে দেবে।’
অখবা মায়ের কাছেও একই ধরনের আবদার করে বসে, ‘আমু, তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো আমু। আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। প্রিজ আমাকে একটা বার্গার কিনে দাও না। প্রিজ আমু।’
বাচ্চারা এসব ক্ষেত্রে বিজয়ীর বেশে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। কে বা চায় তার বাচ্চা কাঁদুক?
তুমি যখন কোনো একটা জিনিস কিনতে যাবে, বিক্রয়কর্মী তোমাকে সেই পণ্যের প্রশংসা করবে, তোমার রুচি নিয়েও সে খুব ভালো কিছু বলবে। এক্ষেত্রে বাচ্চা ছেলেদের মতো বিক্রয়কর্মীর সফলতা অতটা নেই।
ক্রেতারা এখন ভালোই বোঝে, কে তার সুনাম করছে আর কে তার নামে চাটুকারিতা করছে। লেখক ডেল কার্নেগি তার নইতে উল্লেখ করেছেন, কারো কাছ থেকে কিছু আদায় করতে চাইলে শুরুতেই তার প্রশংসা করো।
এই কথাটা গত শতক পর্যন্ত কাজে নাগলেও এই শতকে অকেজো হয়ে গেছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ আজও এই আশায় বসে আছে যে, একটু মিথ্যা চাটুকারিতা দিয়ে তার ৰার্থ হাসিল করে নেবে। সময় বদলেছে, মানুষও বদলেছে। যুগ এগিয়েছে অনেক দূর। মিথ্যা প্রশংসা করে ৰার্থ হাসিল করতে গিয়ে তোমাকে আজকাল উন্টো ফলও ভোগ করতে হতে পারে। কেন না, মানুষ এখন অনেক সচেতন। তুমি মিথ্যা প্রশংসা করলে চট করে ধরে ফেলবে। তার মন গলে যাবার পরিবর্তে তোমার প্রতি খারাপ একটা মনোভাব জন্ম দেবে, যা তোমায় ছিটকে ফেলবে পরাজয়ের কুঠুরিতে। এজন্য তুমি মানুয়ের প্রশংসা করা বন্ধ করে দেবে? ভুল সিদ্ধান্ত। তোমার যা করতে হবে, তা হলো আরেকটু কৌশলী হতে হবে।
## অপটু প্রশংসার বাজে দিক
তুমি হেসে যথেষ্ট ভদ্রভাবে কারো প্রশংসা করলে, অথচ তোমার প্রতি তার বিরূপ ধারণা তৈরি হলো! এজন্য বলা হয় যা কিছু করো নিখুঁত করো। আর মানুষের ৰারা নিখুঁত করাটাও ছাগল দিয়ে হাল চাষের থেকে কম নয়। তুমি প্রশংসা করছ, তোমার প্রশংসা করার ভেতরে দক্ষতা থাকতে হবে। শুনে যাতে কখনোই মনে না হয়, তুমি মিথ্যা চিড়া ভেজানো প্রশংসা করছ! আর তোমার প্রশংসা যদি কাজে লাগে, ধরে নাও তুমি ওই ব্যক্তির মন জয় করে ফেলেছ। যার মন জয় করেছে, সে তোমার পণ্যটা কিনবে না, এমনটা হতে পারে?
### সমাজবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে ৩টা জিনিস পেয়েছেন।
১. একজন ‘নতুন ব্যক্তি’ যখন তোমার প্রশংসা করে, তুমি অন্য সময়ের চেয়ে বেশি খুশি হও।
২. সুন্দর মানুষরা এমনিতেই প্রশংসা বেশি পেয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে যেকোনো একজন ব্যক্তি যার চেহারা অতটা সুন্দর নয়, তাকে প্রশংসা করলে বুঝতে পারবে, সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে। এক্ষেত্রে একটা সতর্কতা রয়েছে। সেই ভদ্রলোক তোমার পরিচিত হওয়া চলবে না।
৩. এমন প্রশংসা করলে যে শ্রোতা সন্দেহ করছে সেক্ষেত্রে তোমার জন্য শূন্য ফল ছাড়া কিছুই থাকবে না। বিপরীতে শ্রোতাকে যদি বিশ্বাস করাতে পারো, যা বলেছ সত্য বলেছ, তবে ওটা শ্রোতার মনে দাগ কাটবে। সে তোমাকে আরো বেশি পছন্দ করবে।
এই অধ্যায়ে আমরা জানবো কীভাবে এবং কোন কোন কৌশল ব্যবহার করে আমরা অন্যের মন জয় করতে পারি।
পর্ব ৫১
বার্তাবাহকের মর্যাদা
তাদের আন্দাজ শক্তি বুঝে প্রশংসা করো
সামনাসামনি দাঁড়িয়ে কারো অত্যধিক সুনাম করলে চাটুকার খ্যাতি জুটতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা অতিশয় বিপজ্জনক হয়ে ওঠার সম্ভাবনা থাকে। যে সময়টা তুমি কারো প্রশংসায় মন্ত হয়ে ওঠো, সে ভেবে নেয়, তুমি তার কাছ থেকে কোনো কায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছ। নয়ত এত মধুর আলাপ কেন?
আগেই বলেছি, বর্তমান যুগে এমন অনেক কিছুই জটিল আকার ধারণ করেছে।
একটা কথা প্রচলিত আছে, তুমি কোনো কথা ছড়িয়ে দিতে চাইলে একজন নারীর কানে কানে কথাটা বলো। দেখবে খুব শীঘ্রই চারদিকে কথাটা শুনতে পাবে।
আমাদের বর্তমান কৌশলটা কিছুটা ওরকমই। এক্ষেত্রে থমাস ফুলার ১৭৩২ সালে একটা কথা লিখে গেছেন, ‘যে আমার সামনে আমার প্রশংসা করে সে আমার বন্ধু নয়। আমি শুনছি না জেনেও যে আমার পেছনে অন্যের কাছে আমার প্রশংসা করে, সেই আমার প্রকৃত বন্ধু।’
কথাটা খুবই বাস্তব। আমরা অবশ্যই ওই সব মানুষদের বেশি বিশ্বাস করি যারা আমাদের অনুপস্থিতিতেও আমাদের প্রশংসা করে।
### নির্ভয়ে প্রশংসা করো (তাদের পেছনে অন্যের কাছে তার প্রশংসা করো)
কারো মুখোমুখি তার সুনাম করার চেয়ে তার পেছনে সুনাম করা অনেক বেশি কার্যকরী। মনে করো তুমি একজন ব্যক্তির কাছে ভালো সাজতে চাও, তার নাম জন। এই কৌশল মতে, তুমি জনকে সরাসরি তার প্রশংসা করবে না। তুমি প্রশংসা করো জনের অন্তর্গ বন্ধু উয়িলিয়ামের কাছে, যে জনের এই এই দিকগুলো তোমার খুব ভালো লাগে। জন সত্যিই একজন অসাধারণ মানুষ। যেহেতু উয়িলাম জনের কাছের বন্ধু। কোনো একদিন সে জনকে অবশ্যই বলবে, ‘একটা মজার ব্যাপার ঘটেছে জন। সেদিন অমুকের (তুমি) সাথে হঠাৎ দেখা। সে তোমার ব্যাপারে কী কী বলেছে জানো?’
ব্যাস তুমি জনের চোখে অন্যরকম একজন হয়ে গেছ।
কৌশল ৫১
বার্তাবাহকের মর্যাদা
কেউ একজন তোমায় সরাসরি প্রশংসা করলে তুমি যতটা পুশি হও, সেই একই ব্যক্তি অন্য একজনকে তোমার ব্যাপারে প্রশংসা করল; সেটা আবার তোমার কানে এলো। এই প্রশংসাটা আরো বেশি ভালো লাগবে তোমার কাছে। উক্ত ব্যক্তির প্রতি তোমার বিশ্বাস আরো অনেক শুণ বেড়ে যাবে। তোমার মনে হতে পাকবে এই ভ্রদলোক বুঝি সারা দুনিয়ার কাছেই এভাবে তোমার প্রশংসা করে বেড়াচ্ছে! এমন ব্যক্তিকে ভালো না বেসে পারা যায়?
পর্ব ৫২
বার্তাবাহক কবুতরের মর্যাদা
*পৃথিবীকে শাস্ত্রির বার্তা দাও ঠিক সেই ছোট সাহসী কবুতরটির মতো
বার্তাবাহক কবুতরের যুগ পার হয়েছে বহুদিন আগেই। এখনকার অবস্থায় এটা অবাস্তব মনে হলেও এক সময় মানুষ এই কবুতরের উপরেই নির্ভরশীল ছিল। সবচেয়ে দ্রুত ও বিশ্বস্ত ছিল এই বোবা পাখিটি, মাঝেমধ্যে বিশ্বাস রক্ষায় মূল্যও চুকাতো। কখনো অঙ্গহানি কিংবা নিষ্ঠুর হত্যার মধ্য দিয়ে এই নিষ্পাপ পাখিদের অনেকেই প্রাণ দিয়েছে শত্রুপক্ষের হাতে। তাতেও এর মহত্ত্ব কমে যায়নি। গৌরবের সাথে তারা তাদের দায়িত্ব পালন করে গেছে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ঘটনা। তেমনই এক বার্তাবাহক কবুতর যার নাম ‘চ্যোর এমি’, ওটাকে চিঠি সমেত আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হলো, এই খবর দিতে যে জার্মান সৈন্যরা অল্প কিছুক্ষণের ভেতরেই শহরকে ধূলোয় মিশিয়ে দেবে। বোমারু বিমান এই আসছে বলে!
পথে বেচারা কবুতর জার্মান সৈন্যদের গুলির নিশানায় পড়ে এক পাখা অকেজো হয়ে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। দায়িত্বের শেষটুকু পালন করতে ভুলেনি এই অবুঝ পক্ষী। ক্ষত বিক্ষত এক ডানা নিয়েই লাফিয়ে লাফিয়ে তার সর্বশেষ বার্তা দায়িত্ব নিয়ে পৌছে দিয়েছিল। ফলস্বরূপ বেঁচে গেছে ২০০ মানুষের প্রাণ। আরো কত কত প্রাণ যে বাঁচিয়েছে এই শাস্তির দৃত! তেমনই আরেক কবুতরের নাম স্টম্পি জই। এই কবুতরের স্বীকৃতি দিতে ভুলেনি দেশের মানুষ। ওহিওর ন্যাশনাল এয়ার ফোর্স মিউজিয়ামে তার একটা মূর্তি এখনো রয়েছে।
আমাদের বর্তমান কৌশলের সাথে এই কবুতরের বড় মিল রয়েছে। যখনই তুমি অন্যের প্রশংসা শুনবে, যেখানে সে উপছিত নেই, তোমার কাজ হলো তার কাছে উক্ত প্রশংসাকৃত সংবাদটা পৌছে দেওয়া। ধরো তোমার পরিচিত ব্যক্তি টিনা ও মন্টি।
মন্টি বলল, ‘টিনা মেয়েটা বেশ শুছিয়ে কাজ করে।’
কথাটা তুমি শুনেছ। তোমার আসল কাজ হলো টিনাকে সংবাদটা শোনানো যে, মন্টি তার কী প্রশংসা করেছে।
অথবা তোমার আম্মু তোমার প্রতিবেশী সম্পর্কে জানাল, ‘ন্যাসি বেশ ভালো কবিতা লেখে। আমি একটা ম্যাগাজিনে পড়েছি।’
ন্যাসির সাথে দেখা হলে তোমার কাজ হবে, তোমার মায়ের প্রশংসাটা তুলে ধরা। এখন নিশ্চয়ই তোমরা বুঝে গেছ, কেন আমি বার্তাবাহী কবুতরের গল্প শুনিয়েছি? হ্যা, তোমার কাজটাও ঠিক ওটার মতোই হবে। তবে পুরক্ষার হিসেবে তোমার নাম জাদুঘরে লেখা না থাকলেও উক্ত প্রাপকের মনে স্থান পাবে নিশ্চিত। মানুষ ভালো সংবাদ যেমন পছন্দ করে, উক্ত সংবাদ বাহককেও পছন্দ করে।
## কৌশল ৫২
### বার্তাবাহক কবুতরের মর্যাদা
মানুষের চিরাচরিত স্বভাব হচ্ছে খারাপ সংবাদ বহন করা। খারাপ সংবাদ কেউই পছন্দ করে না, কিন্তু তাও মানুষ ওটাই অন্যকে বলে খুশি হয়। তোমার নিজেকে পরিবর্তন করো। যেকোনো ভালো সংবাদ বহনযোগ্য। যখনই কারো প্রশংসা শুনবে, সুযোগ পেলে তার কাছে ওই প্রশংসাটা পৌছে দেবে। মানুষ ভালো সংবাদ এবং ওটার বাহক দুজনকেই ভালো চোখে দেখে।
### আরো আরো সংবাদও তাদের কাছে পৌছে দাও
তোমার বন্ধুর কাছে তুমি আরো অনেক তথ্যই পাঠাতে পারো। কোনো একটা ভালো সংবাদ যেটা তোমার বন্ধুর কাজে দেবে; তাকে পাঠিয়ে দাও। আজকাল ইন্টারনেট, মেইল, মোবাইল ফোন কত কিছুই রয়েছে। ফলে সশরীরে উপস্থিত থাকার বালাই নেই।
তোমার বন্ধু সিভ্ল ইঞ্জিনিয়ার। তুমি পত্রিকায় সিভ্ল ইঞ্জিনিয়ারদের নিয়ে একটা ভালো রিপোর্ট দেখলে, ওটা পাঠিয়ে দাও তার কাছে। অথবা তোমার অন্য কোনো পরিচিতের কাজের সাথে সম্পর্কিত কোনো তথ্য তুমি শুনেছ, তাকে ওটা বলো। তুমি মানুষের মন জয় করতে পারবে খুব সহজে।
আমার এক বন্ধু প্রায়শই আমাকে নানা ধরনের সংবাদ পৌছে দিত, যেগুলোর প্রতি আমার প্রচুর অগ্রহ। আমি একদিন অনুভব করলাম, অন্যদের থেকে তাকে আমার বেশি পছন্দ।
পর্ব ৫৩
পরোক্ষ প্রশাসা
সুনাম করতে গিয়ে মুখ ফসকে বদনাম করে দিলে
কোথায়, কাকে কী বলে সম্বোধন করছি, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তুমি কারো সুনাম করতে গিয়ে পরোক্ষভাবে তার অপমানও করে বসতে পারো, যদি না তোমার কথায় একটু ভুল হয়ে যায়। আমার সাথে ঘটা মজার কিন্তু তিক্ত এক ঘটনা শেয়ার করছি-
ডেনভার আমার বেশ পুরনো বন্ধু যার সাথে দীর্ঘদিন কোনো যোগাযোগ হয়নি।
দুজনেরই সৌভাগ্য যে আমাদের সবকিছু ঘুচিয়ে ভাগ্যক্রমে দেখা হওয়ার পথ তৈরি
হলো। সকালের দিকে নির্ঘারিত জায়গায় নামতেই ওর সাথে দেখা। সে আমায়
দেখে খুব খুশি হলো। সে জানতে চাইল, ‘কেমন আছ লেইল?’ তারপর কিছুক্ষণ
চুপ থেকে মুচকি হাসল, ‘দেখে তো মনে হচ্ছে তুমি বেশ ভালোই আছ।’
তার কথাটা আমাকে খুবই খুশি করে দিল। তারপর মনে মনে ভাবলাম, ‘যাক ততটাও মোটা হয়ে যাইনি তবে!’
বিকেলে সে আমায় হোটেলে ড্রপ করে দিল। বেশ খুশি খুশি মেজাজ নিয়ে যাচ্ছি।
লিফটের সামনে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল লিফটের কাজ করার জন্য টেকনিশিয়ান
দাঁড়িয়ে আছে। সে আমাকে দেখে একটা হাসি দিল। আমিও বিপরীতে হাসলাম।
এরপর সে অবাক হয়ে বলল, ‘ম্যাডাম, আপনি বুঝি আগে মডেলিং করতেন?’
তার কথাটা শুনে আমার ভেতরটা খুশি হয়ে উঠল। এমন পরোক্ষ প্রশংসা কার না ভালো লাগবে?
এরপর সে আবার বলল, ‘আপনাকে দেখে বোঝাই যায়, আপনি যুবতী থাকতে আরো বেশি সুন্দরী ছিলেন।’
আমার ভেতরটা ছ্যাত করে উঠল! ব্যাটা বলে কী? নিজের কাছে আমার প্রচণ্ড অপমান বোধ হতে থাকল। সে কি আমাকে পরোক্ষভাবে বুড়ি বলতে চাইছে? যে এখন আমি বুড়ি, আগে যুবতী ছিলাম?
রাতে আমার ভালো করে ঘুমই হয়নি। পরের সপ্তাহ পর্যন্ত আমার সময় খুবই বাজে কেটেছে। এমনকি, এখনো ওটা ভাবলে গা ঘিনঘিন করে!
কথা বলার সময় আমাদের খেয়াল করা উচিত যে, মাঝেমাঝে প্রশংসাও কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। হয়ত তুমি সঠিক বলছ, কিন্তু সেটা তোমার বলা উচিত নয়।
মনে করো তুমি একটা নতুন শহরে আছ। আশপাশে ভালো কোনো রেস্টুরেন্ট আছে কি না খোঁজ করছ। একজন পথচারীকে বললে, ‘ভাই সাহেব, আশপাশে কি কোনো ভালো রেস্টুরেন্ট আছে?’
সেই পথচারী জেনে থাকলে তোমাকে সঠিক ঠিকানা বলবে। এখন ধরে নাও তুমি এভাবে বললে, ‘ভাই সাহেব, আশপাশে কোনো নোংরা রেস্টুরেন্ট আছে কি?’
ব্যাপারটা ভেবে দেখো একবার। কোন পরিচ্ছিতিতে কীভাবে কথা বলতে হবে, এই বোধ শক্তি যেন তোমার থাকে।
## কৌশল ৫৩
পরোক্ষ প্রশাসা
কাউকে প্রশাসা করে কথা বলার ক্ষেত্রে একটু জেনেন্দ্রনে বলাটা বুঝ্জিমানের কাজ। জেনেন্দ্রনে কারো খারাপ দিক উল্লেখ করাটা এক ধরনের অনুদ্রতা। মনে রেখো, যখনই তুমি কাজটা করবে সে তোমাকে খারাপ চোপেই দেখবে, আগামী সবকটা দিন।
এক প্রেমিকের গল্প দিয়ে এই অংশটা শেষ করছি। প্রেমিকার নাচ দেখে প্রেমিক অত্যন্ত হাসি হাসি মুখে বলল, ‘হায় ঈশ্বর, তুমি এত মোটা একটা মেয়ে! তারপরও কত ভালোই নেচেছো!’
এর কিছুক্ষণের ভেতর বেচারার সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়ে গেল!
# পর্ব ৫৪
দুর্ঘটনাক্রমে প্রশংসিত!
একজন শুপ্ত প্রশংসাকারী হও
ভ্রদ্রলোকের সাথে আমার পরিচয় একটি ভোজসভায়। তিনি আমার পাশের সিটে বসে ছিলেন। অন্য অনেকের মতো তাকেও আমার ভুলে যাবার কথা! কিন্তু ভ্রদ্রলোক আমার উপরে এমন একটা কৌশল খাটালেন যে তাকে ভোলার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
তিনি আমার সাথে স্বাভাবিক পরিচিত হলেন। অল্প একটু পরিচয়ে যতটুকু গল্প করা যায়, এই আরকি! কথায় কথায় কীভাবে জানি আমাদের আলোচনা চন্দ্র অভিযানের দিকে চলে গেল।
ভ্রদ্রলোক আমাকে বললেন, ‘লেইল তোমার মতো একজন তরুণীর চন্দ্র অভিযানের কথা মনে থাকার কথা নয়। সেসময়ে, অ্যাপোলো ২ চাঁদের বুকে নেমে…’
আমি কিছুক্ষণের জন্য ভাবতে লাগলাম, উনি কি আমাকে তরুণী বলে সম্বোধন করেছেন?
মেয়েদের বয়স যতই হোক মানুষ তাদের তরুণী ভাবুক, তারা পছন্দ করে। আমার বেলায়ও তাই হলো। আমার চিন্তার টপিক নীল আর্মস্ট্রিংয়ের চন্দ্র অভিযান পেকে সরে গিয়ে নিজের তারুণ্যের দিকে পড়ল। আমি কল্পনার আয়নায় স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তরুণী আমি দাঁড়িয়ে আছি। জন্মলোক তখনও চল্ল অভিযানের ব্যাপারে বলে চলেছেন।
১৯৬৯-এর চন্দ্র অভিযান অন্য সবার মতো আমিও টেলিভিশনে দেখেছি। নীল আর্মস্ট্রিং চাঁদের বুকে প্রথম নিজের চরণ প্রশ্ন করালেন। একেনারে ইতিহাস। আমার সবই স্পষ্ট খরণে আছে।
ভদ্রলোক কি ইচ্ছে করেই আমায় তরুণী বলে সম্বোধন করলেন? যাতে আমি খুশি হই? যদিও তার মূল বক্তব্য ছিল অভিযানটা নিয়েই। এত বড় আলোচনায় টুপ করে এমন একটা শব্দ জুড়ে দিয়েছেন, যেটা আমার ভেতরে খুশির প্রকম্পন সৃষ্টি করল।
এখন আমি বাজি ধরে বলতে পারি, তিনি জেনে বুঝে আমায় তরুণী বলেছেন। যাই হোক, এর ফলাফল ছিল অভূতপূর্ব। আমি যথেষ্ট খুশি হয়েছি। সারাটা সময় আমার নিজেকে তরুণী তরুণী মনে হচ্ছিল! তার এই কৌশলকে আমি নাম দিয়েছি দুর্ঘটনাক্রমে প্রশংসা করা। তার প্রশংসাটা এখনো আমার কানে বাজে।
কৌশলটি অনুশীলন করো। তুমি যেমন এটাকে পছন্দ করবে, অন্যরাও এর কার্যকারিতা উপভোগ করবে।
তোমার পরিচিত পঞ্চাশোর্ধ একজন ব্যক্তিকে বলো, ‘আপনি কীভাবে যে এত কাজ করেন! অথচ এই দেখেন আমি একটুতেই হাঁফিয়ে গেছি!’
চেয়ে দেখো, তোমার ওই দাদুটি খুশিতে বগল দাবাচ্ছে। অথবা তোমার আইনজীবী বন্ধুকে বলো, ‘তুমি হলে আইনগুলো পড়েই সাইন করতে। অথচ আমি বোকার মতো না পড়েই সাইন করে বসলাম।’
তুমি এখানে নিজেকে বোকা বলে বিপরীতে তাকে চালাক হিসেবেই সম্বোধন করেছ। তোমার কথার বিষয় ভিন্ন হলেও সে ঠিকই গুণ্ড প্রশংসাটা লুফে নেবে এবং খুশি হবে। তোমার আসল কথাটার দাম তার কাছে দু’পয়সার না-ও হতে পারে, কিন্তু গুণ্ড প্রশংসাটা তাকে আন্দোলিত করবে। নিশ্চিত থাকো।
কৌশল ৫৪
দুর্ঘটনাক্রমে প্রশংসিত!
একজন গোপন প্রশংসাকারী বনে যাও। কাউকে সরাসরি প্রশংসা না করে কথা প্রসঙ্গে প্রশংসা করো, হতে পারে কথার এক ফাঁকে রূপক কোনো শব্দ দিয়ে তার প্রশংসা করে দিলে। ব্যাপারটা যখন সে বুঝতে পারবে, ভেতরে ভেতরে খুশিতে ফেটে পড়বে। তাকে অনুস্বর করতে দেবে দুর্ঘটনাক্রমে তুমি প্রশংসাটুকু করেছ।
পর্ব ৫৫
বিধ্বংসী প্রশংসা
ওদেরকে শুরুতেই কাবু করে নাও
আমার বাঙ্গবী এবং তৎকালীন রুমমেট ক্রিসটিনার কথা বলছি। এক বিকেলে আমরা মাত্র বাইরে থেকে বাসায় ফিরলাম, খেয়াল করে দেখলাম, সে মিঠিমিটি হাসছে। তার দৃষ্টি বাইরের দিকে।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম, তিনজন ভদ্রলোক হেঁটে যাচ্ছে। আমি অবাক হয় বললাম, ‘তোমার মিটিমিটি হাসার কারণ কী? আমাকে জানানো যায়?’
সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে বলল, ‘তোমাকে জানাতে আমার অসুবিধে নেই। ওই যে মধ্যখানের মানুষটা দেখেছ, কাল তার সাথে আমি ঘুরতে যাব।’
মেরেটার মাথা টাথা খারাপ হয়ে যায়নি তো?
আমি নিজের বিশ্বয় প্রকাশ করলাম, ‘আমার জানামতে এই ভদ্রলোককে আমি আগে দেখিনি। তা কী মনে করে তার সাথে ঘুরতে যাবে?’
ক্রিসটিনা মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘আমার দাঁতগুলো অসম্ভব সুন্দর, সে বলেছে।’
ঘুমানোর পূর্বে দেখলাম সে ভালো করে দাঁত মাজছে। প্রতিটি দাঁত আলাদা করে মেজে আরুনায় তার সফল পরীক্ষা চালিয়ে সে ঘুমাতে গেল। তার দাঁতের প্রশংসা থেকে সে এতটা গলে গেল! দাঁতের প্রশংসা সত্যিই কেউ এতটা পছন্দ করতে পারে? তখনই মাথায় হুট করে চিন্তাটা এলো, অন্যরাও কি তাদের বিশেষ কোনো শুণ নিয়ে এতটা উচ্ছ্বাসিত হবে?
ভাবলাম এই কৌশলটা বাস্তবে কাজে লাগালে কেমন হয়?
আমার এক সেমিনারে দুই ক্রোপে ভাগ করে তাদের নিজেদের মাঝে কথা বলতে দিলাম। প্রতি অংশে দুজন করে। কিছুক্ষণ পর আমি তাদের বললাম, অন্যদের কোন বিশেষ শুণটা তাকে আকৃষ্ট করেছে, সেটা চিন্তা করতে। তারপর সবাইকে বললাম নিজেদের সঙ্গীকে সেই শুণ উল্লেখ করে প্রশংসাটা শোনাতে।
অন্তর সময়ের মধ্যে পুরো হলরুম কল্যায় পদগম করতে থাকল। সবাই নিজেদের বিশেষ প্রশংসা শুনতে পেয়ে খুশি হলো।
সতকর্তা,
এই বিশেষ প্রশংসা যেন, ‘তুমি দেখতে অনেক সুন্দর।’ কিংবা, ‘তোমার শার্টটাতো অনেক সুন্দর!
এমন না হয়।
প্রশংসাটি হবে বিধ্বংসী, যেটা তাকে খুশিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
তুমি একজনকে বললে, ‘আপনার সহ্য ক্ষমতা দেখে আমার হিসে হয়।’
এই প্রশংসা শুনে সে গলে যেতে বাধ্য।
কৌশল ৫৫
বিধ্বংসী প্রশংসা
সদ্য পরিচিত কোনো ব্যক্তিকে কাবু করার সবচেয়ে মোক্ষম অন্ত্র হচ্ছে তার এমন বিশেষ কোনো প্রশংসা করা যেটা বিধ্বংসী ক্ষমতা রাখে। যা শুনে অতিরঞ্জিত মনে হবে না, বরং সে ভেতর থেকে আনন্দে ফেটে পড়বে।
### বিধ্বংসী প্রশংসার ব্যবহার বিধি
কারো প্রশংসা করতে গেলে যদি হুঁশ হারিয়ে ফেলো তবে এমন কৌশল তোমার মান ইজ্জত ডোবাতে পারে। কখন বিধ্বংসী প্রশংসা তোমার নিজের জন্যই বিধ্বংসী, জেনে নাও-
১. কাউকে এই কৌশলে ফেলতে হলে অবশ্যই তাকে ব্যক্তিগতভাবে বলবে। সে কোথাও আভ্যা দিচ্ছে। তুমি কিছুক্ষণ শুনেই বললে, ‘আপনি তো দেখছি চমৎকার করে উদাহরণ দিতে পারেন।’
সে খুশি হবে ঠিক। কিন্তু তোমার কথার আরেকটা অর্থ দাঁড়ায় ওই আড্ডায় অন্য যারা রয়েছে ‘তারা চমৎকার করে উদাহরণ দিতে পারে না।’
২. ‘একটা হাতি কী সুন্দর করেই না আকাশে উড়ছে!’ এমন মন্তব্য করলে যেমন মানুষ তোমার পাগল বলবে, তেমনই তোমার সাথীর যে শুণ নেই, তা নিয়ে বললে সে চট করে বুঝে যাবে। একজনের গলার সুর বিচ্ছিরি। তুমি তাকে বললে, ‘আপনার গানের গলা নিশ্চিত চমৎকার, কেননা আপনার কণ্ঠীয় মধুর!’
সে তোমার সম্পর্কে কী ধারণা করবে বুঝতে পারছো?
৩. একই প্রশংসা তাকে ছয় মাসের ভেতরে দ্বিতীয়ত করবে না। ওটা করলে সে ধারণা করবে, তুমি মন গলাতে ওটা বলছ।
পর্ব ৫৬
মৃদু আঘাত
ছোট্ট ছোট্ট প্রশংসা বাক্য
গত পর্বে আমরা জেনেছি কীভাবে বিধ্বংসী প্রশংসা করে অন্যের মন জয় করে
নিতে হয়। এখন আমরা জানব কীভাবে স্বল্পপাল্লার প্রশংসা করতে হয়। এ ধরনের
প্রশংসা শুনতে ততটা ভারী নয়, তবে কাজের।
যেমন, তোমার কলিগকে বললে-
‘দারুণ কাজ করেছ জন।’
‘ততটাও মন্দ নয়। ভালো হয়েছে।’
‘বাহ! চমৎকার।’
আমার এক বন্ধু আছে যে এই কৌশল ব্যবহার করত, আমার যেকোনো কাজেই সে বলত, ‘মন্দ হয়নি, লেইল।’
তুমি এই কৌশলটা তোমার সহপাঠী, বন্ধু এমনকি জীবন সঙ্গীর সাথেও খাটাতে পারো।
রাতের খাবার শেষ বললে, ‘অমৃত রেঁধেছ, তোমার চেয়ে ভালো রাঁধুনি আজতক দেখিনি।’
কোনো অনুষ্ঠানে যাবার পূর্বে বললে, ‘অপূর্ব লাগছে আজ। শাড়িটা খুব মানিয়েছে।’
এক বাচ্চা খুব দুষ্টমি করে। প্রতিদিন তার মায়েক বকুনি খেতে খেতে সে বিরক্ত হয়ে গেছে। একদিন পিচ্চি ভাবল, আজ কোনো দুষ্টমি করব না। দেখি, মা কী
বলে?
সারাদিনেও সে কোনো দুষ্টমি করেনি। রাতে বিছানায় শুয়ে পড়েছে। এমন সময়ে তার মা এলো। দেখল সে শুয়ে পড়েছে। তখনও ঘুমোয়নি। মা আবার নিচে চলে এলো। কিছুক্ষণ পর রুমে গিয়ে দেখল তার মেয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে! মাকে দেখে মেয়ে হ্যুউমাউ করে কান্না জুড়ে দিল, ‘আজ সারাদিন কি আমি ভালো মেয়ের মতো থাকিনি?
দুষ্টমি করার জন্য যদি সারাদিন বকুনি শোনা লাগে, তবে ভালো কাজে কেন প্রশংসা নয়?
আমিও ওই ছোট্ট বাচ্চাটার সাথে একমত। মানুষের ভালো কাজে প্রশংসা করা যেতেই পারে, যদি সেটা সম্পর্ক মধুর করে!
কৌশল ৫৬
মৃদু আঘাত
নিজে কী কী করেছ তার ফিরিন্তি বলে তোমার বদ্ধ-বাঙ্গন বা সহকর্মীর মাথা না খেয়ে বরং তাদের কাজের প্রশংসা করো। এই যেমন, ‘তোমার কাজটা দারুণ হয়েছে।’
অথবা তাকে বলো, ‘একটা ভালো হবে, আশা করিনি।’
পর্ব ৫৭
হাঁটুর ঝাঁকুনিতে উচ্চারিত ‘উহ’
দেরি করে ফেলেছ তো পস্তাতে হবে
আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে, আমাকে একটা ভোজসভায় বক্তৃতা দিতে হয়েছিল। আমার শ্রোতাদের সবাই আমার কাছে অপরিচিত, নতুন। আমি আমার রূমমেট ক্রিস্টিনার সাথে যেভাবে কথা বলি, যতটা সহজ ভাবে আয়নার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করি, ব্যাপারটা ঠিক তার বিপরীত। আমাকে এমন অনেকগুলো নতুন চোখের সামনে দাঁড়াতে হয়েছে, যারা আমার প্রতিটি পদক্ষেপ পর্যবেক্ষণ করছে, আমার প্রতিটি কথার বিশ্লেষণ করছে। এমনকি আমার ব্যক্তিত্ব, আমার কথার মাধ্যমে বিচার করছে।
বক্তৃতা দিতে গিয়ে দেখলাম, আমার পা কাঁপছে। নিশ্বাস ছোটো হয়ে আসছে। বক্তৃতা শুরু করার পূর্বে একবার ক্রিস্টিনার দিকে তাকালাম। তারপর এভাবে শুরু করলাম, ‘শুভ সন্ধ্যা। আমি একজন ভাগ্যবতী এই জন্য যে, এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের সাথে পরিচিত হতে পেরেছি…
বক্তৃতা শেষ করেই ধপ করে ক্রিস্টিনার পাশের চেয়ারে বসে পড়লাম। মানুষজন হ্যাত তালি দিল। আমি চোখেমুখে তখন অন্য শঙ্কা। কেমন হয়েছে আমার বক্তৃতা? আমি শঙ্কিত চোখে ক্রিস্টিনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। ওর সাথে চোখাচোখি হতেই সে খাবারের প্রেটটা এগিয়ে দিল, ‘রান্নাটা দারুণ হয়েছে লেইল। একটু টেস্ট করে দেখো।’
আমি তখনও ওর কাছ থেকে বক্তৃতা সম্পর্কে তার মতামত আশা করছিলাম। সে যেহেতু কিছুই বলল না, নিজেই জিজ্ঞেস করে নিলাম, ‘আমার বক্তৃতা কেমন ছিল?’ কয়েক মিনিট বাদে সে ঠোঁট প্রসারিত করল, তারপর জবাব দিল, ‘বেশ। সবাই উপভোগ করেছে। সবার চোখেমুখে তৃণ্ডি ছিল।’
তার প্রশংসাটা পরিপূর্ণ ছিল এটা নিয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু সে প্রশংসাটা করতে বেশ দেরি করে ফেলেছে। ক্রিস্টিনার উপরে আমার রাগ হলো।
‘উহ’ বলতে যত সময় নাও, ঠিক প্রশংসাও তত দ্রুত হওয়া চাই ডাক্তারকে রাবারের হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করতে দেখেছ? নিশেষ করে হাঁটুতে? এরপর রোপীর প্রতিক্রিয়া কী ছিল? অবশাই হাতুড়ির আঘাতের সাথে সাথেই রোগী তার পা ঝুকড়া দিয়ে উঠেছে। মুখ থেকে ‘উহ!’ বলে একটা শব্দ বের হয়েছে। প্রতিবার আঘাতের সাথেই সে ওটা করেছে। তোমাকেও ঠিক তার মতো হতে হবে। কারো প্রশংসা করতে দুই মিনিটও সময় নেওয়া উচিত নয়। সাখে সাখে বলে দাও, ‘তুমি দারুণ খেলেছ।’ কিংবা ‘তোমার কাজটা অসাধারণ হয়েছে।’ হতে পারে সে পুরোপুরি সফল হয়নি, অথবা বিজয়ীর বেশে ফিরে এলো। তার সামনে যাও, তার কাজের প্রশংসা করো। মনে রেখো, ‘সব কিছুরই একটা সময় থাকে। সময় পার হয়ে গেলে সেই প্রশংসা আর কোনো কাজে দেয় না। প্রতিটি মানুষই আশা করে, অস্তত এটা বিশ্বাস করে তার কাজকে কেউ মূল্যায়ন করছে। কাজ সম্পাদনের পরপর যদি কোনো প্রতিক্রিয়া না পাওয়া যায়, ওটা যে কারো মনোবল ভেঙে দিতে যথেষ্ট।
কৌশল ৫৭
হাঁটির ঝাঁকনিতে উচ্চারিত ‘উহ’
অন্যের সফলতা প্রাপ্তি দেখে সময় ক্ষেপণ করার কোনো অর্থ নেই। তুমি তার দিকে এগিয়ে গিয়ে, সাথে সাথেই বলে দাও, ‘দারুণ করেছ।’
তুমি হয়ত ভাবছ, বিজয়ীর বেশে আসা লোকটা তোমার প্রশংসাটা নেহাতই তৈল মর্দন’ হিসেবে নেবে, এটা ভুল ধারণা। তখন সেই মানুষটি সফলতার দরুণ এতটাই যোর আর উত্তেজনার ভেতরে থাকবে যে, তোমার প্রশংসাকে অন্য কোনোদিকে নেওয়ার সুযোগই নেই।
পর্ব ৫৮
আত্মাঘাতী সিদ্ধান্ত
একটি জাতীয় দুর্বলতা
এই অংশটা আমার ফ্রান্সের বন্ধুদের জন্য উৎসর্গ করা, যারা সবসময় নিজেদের,
সর্বক্ষেত্রে ‘বেস্ট’ মনে করে। আমি খুঁজে দেখলাম, ফ্রান্সের মানুষ একটা জায়গায়
সত্যিই শিখরে অবছান করে সেটা হচ্ছে প্রশংসা নেওয়া। ওরা প্রশংসা এতটাই
নিতে পারে যে, কখনোই ভিন্ন কিছু ভাবে না।
অথচ এই দিক থেকে আমেরিকানরা বেশ খুঁতখুঁতে। তোমাকে কেউ প্রশংসা করল, অথচ তুমি প্রশংসাকারীকে গুরুত্বই দিলে না, তবে বাছা তোমার আর আন্ত থাকবে না।
তোমার প্রিয় বাদ্দবী রোজিকে তুমি বললে, ‘তোমার শাড়িটা বেশ দেখতে। কোথা থেকে কিনলে?’
রোজি চোখ কপালে তুলে একবার নিজের শাড়ির দিকে তাকাল। তারপর তোমার রুচি তুলে প্রশ্ন তুলল, ‘এই পুরনো শাড়িটা তোমার কাছে ভালো লাগছে? ওহ জন!’ তুমি মশাই ফাটা বাঁশে আটকে গেছ। না পারছো কিছু বলতে, না পারছো গিলতে। সুন্দর করে অজুহাত দিয়ে ওখান থেকে কেটে পড়লে।
পরের সপ্তাহে রোজির সাথে আবার দেখা। নতুন সাজে রোজিকে অপূর্ব লাগছে। একবার ভাবলে ওকে জানাবে, ‘তোমাকে এই সাজে অপূর্ব লাগছে রোজি।’ পরে ভাবলে এই কথা বলে আবার কোন বিপদে পড়ে যাও!
আগের ঘটনাটা নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি?
রোজির সাথে দেখা হলো। তুমি স্বভাবসুলভ প্রশংসা করলে না। কোনোরকমে হাই হ্যালো করেই কেটে পড়লে। মনেমনে ভাবলে, ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাঁচি!
রোজিও মনে মনে ভাবছে, ‘ব্যাপার কী? সবাই আমার প্রশংসা করছে, জন কেন কিছু বলছে না?’
## মেয়েরা যেটা পছন্দ করে না
এক সেমিনারে এই ঘটনাটা ঘটে, এক ভদ্রলোক জানালেন, মেয়েরা প্রশংসা নিতে পারে না। এমনকি প্রশংসা শুনলেও গালাগাল দেয়।
ভদ্রলোকের এমন বক্তব্য শুনে আমার মাথা নড়েচড়ে উঠল। বলে কী! মেয়েরা প্রশংসা নিতে পারে না মানে?
একজন নারী হিসেবে এই কথার বিরোধিতা করা আমার জন্য ফরজ হয়ে গেছে। আমার এই ছোট জীবনে আমি দেখেছি, নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি পরিমাণে প্রশংসা পেতে চায়, প্রশংসা না পেলেই বরং অনেক নারী চটে যান।
ভদ্রলোক তার কথার স্বপক্ষে নিজের একটা অভিজ্ঞতা শোনালেন। তিনি এক নারীকে জানিয়েছিলেন, ‘আপনার চোখ দুটো অনেক সুন্দর।’
ওই নারী চটে গিয়ে তেড়ে এলেন, ‘আপনার চোখের রুচি খারাপ, তাই আমার চোখ আপনার কাছে সুন্দর লাগছে।’
ভদ্রলোকের উক্ত বক্তব্যের জন্য তাকে দোষ দেয়াটা শতভাগ অন্যায়। তিনি ওরকম পরিস্থিতিতে না পড়লে এমনটা বলার আর প্রশ্নই আসত না। সেই থেকে তিনি আর কোনো নারীকে প্রশংসা করেন না। হায় অচেনা নারী! তুমি নারী জাতির এ কী সর্বনাশ করলে!
এরকম কাজ আমরা অনেকেও করি। কেউ যখন প্রশংসা করেন, সেটার সঠিকভাবে জবাব আমাদের দেওয়া হয় না। ছোট্ট করে ‘ধন্যবাদ’ বলে কেটে পড়ি। অথনা ‘যা বলছেন তেমন নয়, তবুও ধন্যবাদ।’ বলেও অনেকে জবাব দেই। জবাবটা শুনতে সুন্দর লাগলেও প্রশংসাকারীর কাছে সেটা নেহায়েতই অপমানকর। তুমি তার মনের ধারণাটাকে অপমানিত করেছ!
তুমি অনেক সুন্দর
ফ্রান্সের বন্দুদের কাছে আবার ফিরে যাচ্ছি, ফ্রান্সে কেউ প্রশংসা করলে এর উত্তরটা দেওয়া হয় চমৎকার করে, ‘আপনার অমায়িক ব্যবহারে আমি মুগ্ধ।’
এই একই বাক্যটাকে আমি সবার উপযোগী করেছি। যে কেউ এই বাক্যটাকে নিজের নিত্য কথোপকথনে ব্যবহার করতে পারে।
কেউ যখন প্রশংসা করে, ‘বাহ! তোমার শার্ট/শাড়িটা অনেক সুন্দর। তোমার পছন্দ ভালো।’
‘ধন্যবাদ।’
অথবা, ‘আরেহ, ওরকম কিছুই না।’ বলে তার মন ভেঙে দেওয়াটা অনুচিত। তোমাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এটা অনেক প্রভাব ফেলবে। তার চেয়ে তুমি এই সুন্দর জবাবটা দিতে পারো, ‘তোমার মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। শপিং মলে দেখতেই পছন্দ হয়ে গেল। তখনই কিনে ফেলেছি। চাইলে ঠিকানা দিতে পারি। আরো দারুণ দারুণ কাপড় ওদের কালেকশনে আছে।’
‘এই প্রজেক্টে তুমি দারুণ কাজ করেছ। সত্যিই তারিফ করতে হয়। কিপ ইট।’
যখন এমন সুন্দর মন্তব্য পাচ্ছ, তখন কী জবাব দেবে ভেবেছ?
তাকে অন্তত অনুভব করতে দাও, তার মন্তব্য পেয়ে তুমি কতটা খুশি হয়েছ। তোমার জবাবটা এমন হতে পারে, ‘আপনার মন্তব্য পেয়ে ভালো লাগল। আপনার পজেটিভ চিন্তা ভাবনার জন্য ধন্যবাদ।’
অফিস আদালত, কর্পোরেট দুনিয়া এমনকি প্রাত্যহিক জীবনেও এই কৌশল সমান কার্যকরী।
অফিসে যেতেই তোমার কলিগের সাথে দেখা। সে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার বিদেশ ভ্রমণ কেমন কাটল?’
তুমি জবাবটা এভাবে দিলে, ‘ওহ ভাই! তুমি ওটার কথা মনে রেখেছে? ভ্রমণটা আসলেই চমৎকার ছিল। কত কত দারুণ ব্যাপার ঘটেছে। সময় করে বলব সব।’ জীবনের ছোটোখাটো মুহূর্তগুলোকে এভাবেই রাঙিয়ে নিতে পার। কেউ তোমাকে যতটা গুরুত্ব দিচ্ছে, তুমি তাকেও সেই পরিমাণে গুরুত্ব দিচ্ছ। ব্যাপারটা দুজনের জন্যই আশাবাদী।
কৌশল ৫৮
আত্মবাতী সিদ্ধান্ত
অন্যরা যেমন করে তোমার সাথে কথা বলে, তাদের সাথেও তোমার সমান গুরুত্ব দিয়ে কথা বলা উচিত। ব্যাপারটা ‘গিজ আন্ড টেক’ পিউরির মতো। একজন তোমায় শুধু দিয়েই যাবে, এমনটা আশা করা ছোটোলোকি মনোনাব ছাড়া আর কিছুই নয়।
পর্ব ৫৯
তোমার কবরের দেয়ালে কী লেখা দেখতে চাও?
কাছের মানুষদের অত্যধিক খুশি করার পদ্ধতি
ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে? অনেকেই তোমাকে আমাকে জিজ্ঞেস করত, বড় হয়ে কী হতে চাও?
আমাদের অঙ্কুত সব জবাব ছিল। কেউ হতে চেয়েছিলো নর্তকী, কেউ বা রূটিওয়ালা কেউ বা সিনেমার হিরো। এমনও অনেককে পাওয়া যাবে যাদের জীবনের লক্ষ্য ছিলো গাড়ি চালানো, টাকা কামানো। কত কত মানুষের সমাজসেবা করতে ডাক্তার হবার বাসনা ছিল।
কত কত সময় পার হয়ে গেছে। অনেকেই নিজেদের স্বপ্নের আশপাশেও যেতে পারেনি। চিন্তাধারা বদলে গেছে অনেকখানি। এত কিছুর পরেও একটা জায়গায় আমরা ঠিক কেউই বদলাইনি।
আমরা নিজেদের চোখে সেই হিরোটিই রয়ে গেছি এখনো। নিজেদের কাছে নিজেরা খুব খুব খুব স্পেশাল বনে আছি। আমাদের যারা ভালোবাসে তারা আমাদের এমন অনেক গুণ মনে রেখেছে, যেগুলো এখনো আমাদের মাঝে বিদ্যমান।
সফল ব্যক্তিদের এত এত খ্যাতি দেখে আমাদেরও ঠিক কখনো কখনো মনে হয়, ওখানটার আমিও থাকতে পারতাম।
পরিচিত কাউকে প্রশংসা করা খুব একটা কঠিন ব্যাপার নয়। তাই বলে একজন অপরিচিত ব্যক্তিকে প্রশংসা করা এতটাই সোজা? অবশ্যই নয়। একজন অপরিচিত ব্যক্তির মন গলিয়ে দেওয়া ততটা সহজ নয় যতটা আমার তোমার মনে হচ্ছে।
তোমার বাল্যবন্ধু যার সাথে তোমার রসায়ন খুব ভালো জমে, তার ভালো দিকগুলো তুমি জানো। কিন্তু তোমার অফিসের বস, তোমার ব্যবসায়িক পার্টনার যাদের সাথে তোমার পরিচয়টা সময়ের প্রয়োজনে ‘হয়ে গেছে’। ওদের ভালো দিকগুলো সম্পর্কে তুমি কতটা জানো? তাদের একটা স্পেশাল গুণ বের করে নিতে পারবে, যা তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি অনুভব করে?
এবারের টেকনিকটা তোমাকে শেখাবে কীভাবে অন্যের নিশেষ শুণ জেনে নিতে হয়। আমেরিকায় মৃত মানুষের কবরের পাশে জার একটা নিশেষ শুণ লিখা পাকে।
মেমন-
‘জন হাফিন্স। একজন সমাজসেবক ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী।’
‘নিকোলাস হ্যান্স। যিনি মানুষের সাথে খুব সহজেই মিশে যেতেন।’
নিজের কবরের পাশে এমন দু-একটা বাক্য লেখা থাক, কে না চায়? আমরা প্রজেকেই কোনো না কোনোভাবে নিজের সম্পর্কে একটা স্লাচ্ছ ধারণা পুষে রাপি। ঘরো, জন তোমার সহকথী। তুমি চাচ্ছ, যেকোনোভাবে হোক সে তার নিশেষ শুণটা তোমাকে জানাক। জনকে একদিন বললে, ‘জন, ভেবে দেখলাম, আমার মুহাম্মর পর আমার কবরের পাশে লিখা থাকবে, এই লোকটি ঘুরতে ভালোবাসতো (তোমরা তোমাদের মতো করে বলবে)। জন তোমার কবরের পাশে তোমাকে নিয়ে কী লেখা থাকুক বলে তুমি চাও? অধবা এমন কোনো একটা শুণের কথা বলো, যেটার জন্য মানুষ তোমায় মনে রাখবে?’
জন ভাববে। অবশ্যই সে কিছু একটা জবাব দেবে। ধরে নিলাম সে জবাবে বলল, ‘আমি চাই ওখানে লেখা থাকুক, ‘এই লোকটি প্রতিশ্রুতি কখনো ভঙ্গ করেননি।’ খুব সহজেই তুমি জনের ভেতরের শুণ্ড কথাটা বের করে নিলে, অন্যরা ওই পর্যন্ত পৌছাতে পারেনি কখনো। কমপক্ষে তিন সপ্তাহ এই বিশেষ শুণটি নিয়ে কোনো কথা বলো না। অন্য যেকোনো বিষয়ে কথা হতে পারে।
তিন সপ্তাহ পর সময় বুঝে, কথা প্রসঙ্গে একদিন বলে দাও, ‘জন, তোমার এই শুণ্টাকে আমি সম্মান করি। তুমি কখনো প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা ভঙ্গ করোনি।’
জন ভেতর থেকে কতটা খুশি হবে নিজেই উপলব্দি করতে পারবে। জনের মাথায় তখন এটাই ঘুরবে, এতদিন পর কেউ আমার আসল শুণ্টা ধরে আমায় প্রশংসা করতে।
তোমার বন্ধু প্রিন্দের উপরেও খাটাও, ‘প্রিস, তুমি খুব সহজেই মানুষকে হাসাতে পারো, এজন্য তোমায় এত পছন্দ করি।’
কৌশল ৫৯
তোমার কবরের দেয়ালে কী লেখা দেখতে চাও?
মানুষকে প্রশ্ন করো, তাদের কবরের পাশে নিজের সম্পর্কে কী লেখা দেখতে চায়।
তাদের উত্তরটা শুনে নাও, ওটা নিয়ে তৎক্ষণাত কথা না বলে অন্য বিষয়ে কথা বলো।
অনেকদিন পর একদিন সময় বুঝে বলে দাও, ‘হাই, মিনি, আমি তোমায় এতটা পছন্দ করি কারণ তুমি…’ শুন্যছানটা তুমিই পূরণ করে নাও।
