হলদী নদীর তীরে – অমরেন্দ্র চক্রবর্তী
হলদি নদী নিয়ে বেশ একটা আলোচনা জমে উঠেছিল, সমীর হঠাৎ বলে উঠল— ওসব চাকরির কথা এখন রাখ তো! আমি বলব, হলদি নদী মাঈ কী, তোরা বলবি— জয়!
সমীরের অল্পেই নেশা হয়ে যাবে । তার গলার স্বর বদলে গেছে । গেলাসসুদ্ধু হাতটা সামনের দিকে তুলে ধরে চেঁচিয়ে সুর করে বলল— হলদি নদী মাঈ কী—
কেউ ‘জয়’ বলবার সুযোগ পেল না । তার আগেই হলদি নদীর দমকা হাওয়ায় প্লেট-ভর্তি পাঁপড়ভাজা উড়ে গিয়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ল ।
এক মুহূর্ত সবাই স্তম্ভিত । তারপরই পাঁচজন একসঙ্গে হো-হো করে হেসে উঠল ।
এদের মধ্যে শুধু মনোরঞ্জন হলদিয়ায় চাকরি করে । তার নিজস্ব কোয়ার্টার ও মোটর সাইকেল আছে । অন্য চারজন মনোরঞ্জনের বন্ধু । আজ বিকেলেই কলকাতা থেকে এসেছে । আজ আর কাল সবাই মিলে হলদিয়ায় হইহই করে পরশু সকালের ট্রেনে কলকাতায় ফিরে যাবে ।
মনোরঞ্জন বন্ধুদের নিজের কোয়ার্টারে তোলেনি । তার কারণ, কয়েকদিন হল তার এক মামাশ্বশুর বহু বছর পরে হঠাৎ তাঁর ভাগ্নীর কুশল সংবাদ নিতে এসেছেন । তাছাড়া বউয়ের একেবারে চোখের সামনে এই ধরনের আসর বসাবার সাহসও তার নেই । বন্ধুদের সে হলদি নদীর ধারে তার কোম্পানির রেস্টহাউসে থাকার বন্দোবস্ত করেছে । বিকেলে বন্ধুদের নিয়ে একটা গ্রিক জাহাজ দেখতে গিয়েছিল, তারপর সন্ধে হতেই, পানীয় সহযোগে আড্ডা ।
হাসতে হাসতে সোমেশের চোখে জল এসে গিয়েছিল । ওই অবস্থায় সে কোনওরকমে বলল, ভাবা যায়! ভাবা যায়!
নিখিল হাওয়া বাঁচিয়ে সিগারেট ধরাবার চেষ্টা করছিল, বলল, এই না হলে নদীর হাওয়া!
শুভই শুধু হাসছে কম, খাচ্ছে বেশি । গ্লাসে ছোট ছোট দু-তিনটে চুমুক দিয়ে সে গুনগুন করে উঠল— হাওয়ায় প্লেটের পাঁপড় উড়াইয়া নিল রে—
রঙ্গ-তামাসা যত বাড়ে, রাতও ততই বাড়তে থাকে ।
সমীর উঠে বাথরুমে যাচ্ছিল, হঠাৎ ফিরে দাঁড়িয়ে বলল, চুপ! চুপ! সবাই চুপ! নদীর আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিস?
আওয়াজটা নদীর, না হাওয়ার, না জল-হাওয়ার মেশামেশি শব্দ, বোঝা যায় না । সকলেই কান পেতে বোঝবার চেষ্টা করছে । হঠাৎ ঘরের মধ্যে উৎকট শব্দ করে অ্যালার্ম ক্লক বেজে উঠল ।
মনোরঞ্জন বেয়ারাকে খাবারের ব্যাপারে নির্দেশ দিতে নীচে গিয়েছিল, ঘড়িটা তখনও বেজে চলেছে লাফ মেরে ঘরে ঢুকেই সে এদিক ওদিক খুঁজে একটা দেওয়াল-আলমারির পাল্লা খুলে এক হ্যাঁচকায় ঘড়িটা বের করে অ্যালার্ম বন্ধ করে দিল ।
মলয় আর নিখিল একসঙ্গে বলে উঠল, কার ঘড়ি?
দৌড়ে এসে মনোরঞ্জনের হাঁফ ধরে গেছে । মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে । সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, ও-পাশের স্যুইটে আজ আমার বসের একজন ভি আই পি গেস্ট আসার কথা । এই আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেছে! আমার একদম মনে ছিল না ।
এসেছে কিনা আগে তাই দ্যাখ!
বলে শুভ খালি গেলাসে হুইস্কি ঢেলে দিতে লাগল ।
এই সময় বেয়ারা মুরগির পকোড়া নিয়ে আসতেই মনোরঞ্জন তার ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল— যিশু! পাশের স্যুইটে গেস্ট এসেছে কিনা জানিস?
ঘোষ সাহেবের গেস্ট তো? সে তো সামনের শনিবার ।
ঠিক জানিস?
যিশু একটা সাদা ন্যাপকিনে পকোড়া ঢেকে এনেছিল, ন্যাপকিনটা পাট করে কাঁধে রাখতে রাখতে বলল, আমার কথা যদি স্যার বিশ্বাস না করেন—
না না, তোমায় বিশ্বাস করি, তোমায় বখশিশও করব—
যিশু এবার হেসে ফেলল— পুরো বাড়িটায় আপনারাই স্যার আছেন । আর ওই ঘড়িটা ।
মনোরঞ্জন চাগিয়ে ওঠা বিরক্তি চাপবার চেষ্টা করে বলল, কার এটা?
আমার স্যার । নীচে চুরি যাবার ভয় । তাই সারাদিন ওপরে রাখি ।
সাহেবরা এলে নীচে নিয়ে যাই । আজ একদম ভুলে গেছি । কিন্তু পাগলাঘণ্টি বাজল কী করে তাই ভাবছি ।
মনোরঞ্জনের বন্ধুরা হো হো করে হেসে ওঠে ।
যিশু পাঁপড় কুড়িয়ে নিয়ে হাত বাড়ায়— দিন স্যার— ঘড়িটা—
মনোরঞ্জন এতক্ষণে নিচু হয়ে নিজের গেলাস তুলে নেয়— যা ভাগ! দৌড়ে ঠান্ডা জল নিয়ে আয়— জগ ভরে আনবি ।
সমীর চেঁচিয়ে ওঠে— হলদি নদী মাঈ কী পানি লাও!
রাত যত বাড়ে, হাসি-তামাসাও তত বাড়তে থাকে ।
একসময় রাত শেষ হয়ে আসছে দেখে মনোরঞ্জন কোয়ার্টারে ফিরতে চাইলে চার বন্ধু ওকে ধরে বসিয়ে দিল ।
মনোরঞ্জন বলল, ঠিক আছে, ছাড়, নদীর দিকের জানলাটা বন্ধ করে দিই । তোদের শীত করছে না?
সোমেশ জড়ানো গলায় বলল, শীত? তোর শীত করছে! বল তো কেন শীত করে? ভয়ে । তোর বসের ভয়ে তোর শীত করছে ।
মনোরঞ্জন বন্ধুদের তুলনায় সামান্যই মদ খেয়েছে । এক তো মামাশ্বশুর, তার ওপর ইরা! এতটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে সে ভাবেনি ।
মনোরঞ্জন জানলা বন্ধ করতে গিয়ে সেই যে জানলার সামনে গিয়ে দাঁড়াল, আর ফেরে না ।
বেশ কিছুক্ষণ পরে সেটা খেয়াল হতে নিখিল টলমলে পায়ে জানলার সামনে গিয়ে ঠিক একটা জন্তুর মতো চিৎকার করে উঠল । হলদি নদীর জলে, বহু দূরে, কে একটা নিখুঁত আগুনের গোলা বসিয়ে দিয়েছে ।
পাঁচজনই জানলায় । কিছুক্ষণ কারও মুখে কথা নেই । ওই নাকি সূর্যোদয়!
শুভ হঠাৎ সোমেশের কাঁধে বিরাট একটা চাপড় মেরে বলল, ধুস! ওরকম সানরাইজ হচ্ছে আর আমরা কি না ঘরে বসে মদ খাচ্ছি! চল শালা নদীতে!
বলে সে একটা বোতল থেকে সরাসরি গলায় হুইস্কি ঢেলে দিল । তারপর যে যার গেলাস ভরে নিয়ে টলতে টলতে নদীর ধারে প্রায় জলের কাছে গিয়ে বসে পড়ল । কেবল মনোরঞ্জনের হাতে গেলাস ছিল না । সে গেস্টহাউস থেকে আসবার সময় মোটর সাইকেলটা ঠেলতে ঠেলতে নদীর ধারে এনে রাস্তার ওপর এক পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে ঢালু নদীতীরে গা এলিয়ে দিল ।
অনেক দূরে নদীর এপারে একটা লোক জাল ছুড়ে মাছ ধরছে । লোকটাকে দেখাচ্ছে ঠিক ছবির মতো । দূর থেকে শুভ বলল, চল, লোকটার সঙ্গে একটু মজা করা যাক ।
বলেই সে আর সোমেশ মুখের কাছে দু-হাতের চোঙা বানিয়ে হাঁক পাড়ল— ও দাদা! কী মাছ ধরলে? চাঁদা নাকি?
লোকটা চমকে উঠে ওদের দিকে তাকাল । তারপর একটানে জালটা তুলে নিয়ে দৌড়ে পালাল । যেখানে গিয়ে থামল সেখানে তাকে ফুটখানেকের একটা পুতুল ছাড়া কিছু মনে হয় না ।
লোকটা মনে হয় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ দম নিল । তারপর নতুন করে জাল গুটিয়ে জলের ওপারে গোল করে ছুড়ে দিল ।
জাল ছুড়তে দেখেই এবার ওরা চারজন একসঙ্গে দু-হাতের চোঙায় মুখ রেখে আরও জোরে চেঁচিয়ে উঠল— ও দাদা, কী মাছ উঠল? চাঁদা নাকি?
এবারও লোকটা এদের দিকে তাকিয়েই জাল তুলে দৌড় দিল । লোকটাকে দৌড়তে দেখে শুভরা চারজন হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়ল ।
দৌড়তে দৌড়তে, অনেক দূরে নদী যেখানে বাঁয়ে বাঁক নিয়েছে, লোকটা সেখানে হারিয়ে গেল ।
সমীর হাসতে হাসতে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ব্যাটা যাবে কোথায়? আমি মনোর মোটর সাইকেল নিয়ে যাচ্ছি— তোরা পিছনে আয় ।
হলদি নদীর তীরে তখন এক অপরূপ ভোর হচ্ছে । ঠিক তখনই বিকট আওয়াজ করে সমীরের মোটর সাইকেল ছুটল নদীর তীর বরাবর ।
সোমেশ, নিখিল, শুভ উঠে দাঁড়াতে গিয়ে লক্ষ করল মনোরঞ্জন ঘুমিয়ে পড়েছে । শুভ নদী থেকে এক আঁজলা জল নিয়ে মনোরঞ্জনের মুখের ওপর ছুড়ে মারতেই সে ধড়ফড় করে উঠে বসল ।
তারপর চোখ রগড়ে ওদের তিনজনের দিকে দুয়েক মুহূর্ত চেয়ে থেকে বলল, সমীরকে দেখছি না! শুতে গেছে?
শুভ বলল, সে ভারি মজার ব্যাপার— চল, দেখে আসি!
হলদি নদী যেখানে বাঁয়ে বাঁক নিয়েছে সেখানে পৌঁছে ওদের চোখে পড়ল মোটর সাইকেলটা রাস্তার ধারে দাঁড় করানো আছে । নীচে এক হাঁটু জলে দাঁড়িয়ে সেই লোকটা । ওদের দিকে পিছন ফিরে প্রাণপণে জাল টেনে তোলার চেষ্টা করছে । রোগা কালো শরীরটা বাঁকিয়ে যেভাবে সমস্ত শক্তি দিয়ে লোকটা জাল তুলছে, তাতে মনে হয় মস্ত বড় মাছ পড়েছে ।
সমীর হয়ত কাছে-পিঠেই কোথাও গেছে— সোমেশ, শুভ, নিখিল মুখের সামনে দু-হাতের চোঙা বানিয়ে আচমকা লোকটার কান ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল— ও দাদা! কী মাছ উঠল? চাঁদা নাকি?
লোকটা ওদের দিকে মুখ ফেরাতেই ওরা আবার একই কোরাস গাইল । এবার আরও জোরে ।
লোকটা কিন্তু এবার আর জাল তুলে দৌড় দিল না । দাঁতে দাঁত চেপে জালটা টেনে তুলছে আর তারই মধ্যে একবার করে ঘাড় ঘুরিয়ে শুভদের দিকে তাকাচ্ছে । তার দুচোখে আগুন ধক ধক করছে ।
শুভরাও উত্তরোত্তর মজা পেয়ে আরও জোরে গলা মিলিয়ে গাইল— ও দাদা! কী মাছ উঠল? চাঁদা নাকি?
লোকটা এবার ঘাড় ঘুরিয়ে বলল— হাঙর ধরেছি বাবুরা!
জালটা আরেকটু উঠে আসতেই আষ্টেপৃষ্ঠে জালে জড়ানো সমীরকে স্পষ্ট চেনা গেল!
শুভদের নেশা কেটে গেছে । চারজনই লাফ মেরে রাস্তা থেকে নেমে এল । লোকটা শান্ত গলায় বলল, আমার দোষ নেই । বাবু আমাকে খামোখা তাড়া করতে গিয়ে পা পিছলে জলে পড়েছেন । জাল ছুড়তেই জড়িয়ে ধরলেন কিনা, না হলে এ-জালে দু-কেজি মাছও ওঠে না ।
প্রথম প্রকাশ : আজকাল শারদীয় সংখ্যা, ১৯৮৫
