কাক – কৌশিক সামন্ত
কাক
“বাবা হাতে খুব লাগছে।”
“তা আমি কী করতে পারি?”
“হাতটা একটু নামাব?”
“নাহ্, একেবারে নাহ্, তুই কী চাস? এভাবে সারাজীবন হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে?”
“নাহ্ বাবা।”
“তাহলে চুপটি করে মুখটা বুজে দাঁড়িয়ে থাক।
“বাবা, ও বাবা!”
“আহ্ আবার বিরক্ত করছিস? তোকে কতবার না বলেছি মুখ বন্ধ রাখতে, আমাদের কথা ওদের কানে গেলেই সর্বনাশ হয়ে যাবে কিন্তু।”
বাবার ভয়ে চুপ করে যায় ছোট্ট রবীন, কিন্তু সে বুঝতে পারে না, প্রতিদিন সন্ধ্যে নামার মুখে তার বাবার কীসের এত ভয় পায়, কারা আসবে? ওই দিগন্ত বিস্তৃত ভুট্টাখেতের শেষে লেগে থাকা ছোট্ট লালচে সূর্যটা, বাতাসের খাম খেয়ালিপনার শিরশিরে শব্দটা, আর নদীর ওপারে ছোট্ট বাড়িটার গায়ে আটকে থাকা ধোঁয়া ওঠা চিমনিখানা বাদে এখানে কেউ তো আর নেই, কেউ আসেও না এখানে, তাহলে বাবা কীসের ভয় পায় এত? তাহলে কি ওই বড়ো কালো দাঁড়কাকটাকে ভয় বাবা? কে জানে, বাকি কাকগুলো তাদের বাপ-ব্যাটাকে ভয় পেলেও, ওই কাকটা কিন্তু পায় না, বরং তাদের দিকে মুখ করে মিটিমিটি হাসতে থাকে।
খসখস করে কীসের একটা শব্দ হয়, বাবার কথাই ঠিক, সত্যিই কারা আসছে যেন। বাবার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকায় রবীন, চোখের ইশারায় বাবা তাকে শান্তভাবে দাঁড়াতে বলে।
সে দেখে, দুজন লোক তাদের দিকেই আসছে, ঠিক তার বাপ-ছেলের মতোই।
“আহ্, ধীরে চলো গ্যাব্রিয়েল, তোমার বয়সের সাথে কি আমি পাল্লা দিতে পারি?”
“বাবা এই ভুট্টার খেতটা পেরোলেই আমরা শহরে পৌঁছে যাব, তাই না?”
“তাইতো মনে হচ্ছে, আসলে বহুযুগ আগে এদিকে এসেছিলাম, এখন সব ধোঁয়াশা ধোঁয়াশা লাগছে, নাহ্ এভাবে একা একা তোমাকে নিয়ে বেরিয়ে আসা উচিত হয়নি।”
ডেভিড হতাশায় মাথা নাড়েন, হাতের মুঠিতে ছেলের হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরেন, এই মা-মরা চঞ্চল অবোধ ছেলেটাকে নিয়েই হয়েছে তার যত চিন্তা।
“ও আমরা ঠিক পৌঁছে যাব, তুমি চিন্তা করো না এত…. ওইগুলো কী বাবা?”
“ওই দেখো, আবার দৌড় লাগাল শয়তানটা, তোমাকে কতবার না বলেছি, অচেনা জায়গায় দুম করে কোনো জিনিসে হাত দিতে নেই।”
দুটো কাকতাড়ুয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে গ্যাব্রিয়েল।
“কী সুন্দর তাই না বাবা? অবিকল মানুষের মতো দেখো, ওই ছেলেটার টুপিটা আমি নেব বাবা?”
বাচ্চা ছেলেটার খামখেয়ালিতে হাসি পেয়ে যায় ডেভিডের, বকতেও মায়া লাগে, কীই বা দিতে পেরেছেন তিনি তাকে? একটা কাকতাড়ুয়ার টুপিই না হয় …
ছোটো কাকতাড়ুয়ার মাথা থেকে টুপিটা নামিয়ে তিনি গ্যাব্রিয়েলের মাথায় পরিয়ে দেন। সে কী খুশি টুপিটা পেয়ে।
“চলো অনেক হয়েছে, সূর্য ডুবে গেছে, এবারে চুপচাপ সোজা রাস্তায় চলো, আর একদম বায়না করবে না।”
পা বাড়াতে গিয়েও দাঁড়িয়ে পড়েন ডেভিড, এই নির্জন প্রান্তরে কে যেন হঠাৎ তার পিঠটা খামচে ধরেছে পেছন থেকে…
.
।। দুই।।
“বাবা হাতে খুব লাগছে গো।”
“তা আমি কী করতে পারি? আমি যখন বলেছিলাম অচেনা অজানা জায়গায় কোনো জিনিসে হাত দিবি না, শুনেছিলি আমার কথা?”
“হাতটা একটু নামাব?”
“নাহ্ একেবারে নাহ্, তুই কী চাস? এভাবে সারাজীবন হাত তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে?”
“নাহ্ বাবা।”
“তাহলে চুপটি করে মুখটা বুজে দাঁড়িয়ে থাক আর অপেক্ষা করতে থাক।”
দিগন্ত বিস্তৃত ভুট্টাখেতের মাঝে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে ডেভিড আর গ্যাব্রিয়েল, অবশ্য তাদের দেখে এখন সবাই ভয় পায়। পায় না শুধু ওই কালো বড়ো দাঁড়কাকটা, সে এখনও ফিকফিক করে হাসে, কারণ কাকতাড়ুয়াদুটোর অসহায়তার কথা তো একমাত্র সে-ই জানে।
