মেলানকোলির রাত – কৌশিক সামন্ত
‘কী অদ্ভুত এই রাতটা, তাই না?’
নিজেকেই প্রশ্ন করে সিন্থিয়া! জানলার ঝাপসা কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে সে। আদিগন্ত ধু-ধু বরফের স্তূপ ছাড়া আর কেউ কোথাও নেই এখানে। ঠিক যেন নির্জন নিঝুম এক মৃত্যুপুরী হয়ে তাকে গিলে ফেলার জন্য ওত পেতে আছে চরাচর।
অথচ এমন তো হওয়ার কথা ছিল না! অন্তত আজকের রাতটা তো অন্যরকম হওয়ারই কথা ছিল।
এক বছর আগেও এই বরফের স্তূপে লুকিয়ে ছিল এক অপার্থিব উষ্ণতা। বাড়ি ভরতি ব্যস্ত পায়ের শব্দ, কার্নিশে- কার্নিশে রঙিন স্বপ্নের মতো আলো-আঁধারি, ফায়ারপ্লেসের গনগনে আঁচ, পানপেয়ালার মৌতাত, গিফট র্যাপের আনকোরা গন্ধ, একঝাঁক হাসিমুখ। কিন্তু আজ আর কিচ্ছু নেই! সব হারিয়ে গেছে। নিয়তি সব কেড়ে নিয়েছে তার কাছ থেকে।
সিন্থিয়া’র চোখের পাতা ভিজে যায়। গলার কাছে একটা অব্যক্ত কষ্ট দলা পাকিয়ে ওঠে।
কপাল! কপালের দোষ না থাকলে কী ক্রিসমাসের এই মায়াবী রাতে তাকে শহরের আলো-ঝলমলে প্রাসাদ ছেড়ে, নিজের ঘর ছেড়ে, এই নির্জন প্রান্তরে এমন জীবন্ত তুষারসমাধি নিতে হয়? এই সামান্য কাঠের কেবিনে অন্য দিনগুলো তবু কাটানো যায়, কিন্তু বড়োদিন যে অসহনীয় হয়ে ওঠে।
আসলে হ্যারিরও আর কিছু করার ছিল না। সে যে সিন্থিয়াকে বড্ড ভালোবাসে। ক্রিসমাসের হুল্লোড়ে একঘর লোকের সামনে সিন্থিয়াকে এই পাগল-পাগল অবস্থায় কীভাবে আনবে ও? তখনই যে শুরু হবে পাঁচজনের পাঁচকথা, যার শেষে থাকবে আরও কান্না আর হাহাকার। সেজন্যই তো ব্যাপারটা বেশিদূর গড়ানোর আগেই হ্যারি সিন্থিয়াকে নিয়ে এখানে চলে এসেছে। আসার পর থেকেই হ্যারি চেষ্টার কোনও ত্রুটি রাখেনি। কিন্তু সিন্থিয়া যে হাজার চেষ্টা করেও রিচার্ডকে ভুলতে পারছে না! সেই ছোট্ট-ছোট্ট হাত-পা, নরম তুলতুলে গাল, নীলচে একজোড়া চোখ— আমৃত্যু ভুলতে পারবে না সিন্থিয়া।
আজ রিচার্ড বেঁচে থাকলে তার একবছর পূর্ণ হত।
“কোথায় গেলি আমার সোনা আমাকে ছেড়ে!” হাহাকার বেরিয়ে আসে সিন্থিয়ার বুক চিরে, “ফিরে আয় মায়ের কাছে। দেখছিস না, আমি কতটা কষ্ট পাচ্ছে!”
কিন্তু সিন্থিয়া’র এই বুকফাটা আর্তনাদ শোনার জন্য কেউ ছিল না সেই কাঠের বাড়ি আর তুষারঢাকা প্রান্তরে। গুমরে-গুমরে সে বলেই চলে, “এই পবিত্রতম দিনে এমন কেউ কি নেই যে আমার সোনাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে? এক হতভাগ্য মাকে তার কোলের সন্তান ফিরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা কী কারও নেই? হে সৰ্বশক্তিমান, তুমি যদি শুনতে পাও, আমার রিচার্ডকে প্লিজ ফিরিয়ে দাও আমার কাছে। এর জন্য আমি যেকোনো মূল্য দিতে পারব।”
ধুপ করে তখনই দরজার কাছে একটা আওয়াজ হল। যেন ভারী কিছু একটা পড়েছে সেখানে। আওয়াজটা পেয়ে কান্না থামিয়ে সোজা হয়ে বসল সিন্থিয়া।
তবে কী হ্যারি ফিরে এল? কিন্তু ও যে বলল, তুষারঝড়ে মাঝরাস্তায় আটকে পড়েছে। বরফ সরানো না হলে ও আসতে পারবে না।
তাহলে কী হ্যারি’র কাছে খবর পেয়ে তার পরিচারিকা মার্থাই এল? সিন্থিয়া রাতে একা এই কেবিনে থাকলে আরো বড়ো বিপর্যয় হতে পারে— এমনটা মার্থা জানে। তাহলে কী সেজন্যই সে গ্রাম থেকে ফিরে এল এই রাতের জন্য? কিন্তু সেটাই বা কী করে সম্ভব? মার্থার গ্রাম এই কেবিন থেকে বহু দূরে। মাঝে একটা ভয়ংকর ঘন জঙ্গল পড়ে। সে জন্যই তো সন্ধে নামার আগেই সব কাজ মিটিয়ে ফিরে যায় মার্থা।
তাহলে কে এল?
জানলার কাঁচে আবার চোখ রাখে সিন্থিয়া। নাহ্! হ্যারি বা মার্থা নয়, অন্য একজন মানুষ এসেছে। লাল রঙের পোশাক পরা, বেশ মোটাসোটা চেহারার সেই মানুষটি। মুখে লম্বা সাদা দাড়ি, মাথায় একটা লাল টুপি। দেখলেই বিশেষ একজনের কথা মনে পড়ে। কিন্তু সে তো তার দরজার সামনে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে!
.
।। দুই।।
“এই গরম দুধ আর ব্র্যান্ডির মিশ্রণটা চট করে খেয়ে নিলেই আপনি সুস্থ বোধ করবেন। এই ঠান্ডায় এভাবে কেউ আসে?”
সান্টাক্লজের ড্রেস পরে থাকা আগুন্তকের মুখের সামনে পেয়ালাটা তুলে ধরল সিন্থিয়া। ফায়ারপ্লেসের মধ্যে আরো কিছু কাঠ গুঁজে দেয় সে। আগুনের শিখাটা দপ করে লাফিয়ে ওঠে। ঘরের মধ্যেও বাড়তি উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।
“এই তুষার ঝড় মাথায় করে এই বয়ষ্ক শরীরে কেন বেরিয়েছেন?” সস্নেহ বকুনির সুরে বুড়ো মানুষটাকে জিজ্ঞেস করল সিন্থিয়া।
“কী করব মা? বহু বছরের অভ্যাস যে।” মুচকি হেসে উত্তর দেয় বুড়ো
“আপনি এখন একটু সুস্থ বোধ করছেন তো?”
“হ্যাঁ, আমি এখন একদম ঠিক আছি। আমাকে নিয়ে আর চিন্তা কোরো না মা। আসলে বয়স হয়ে গেছে তো। তার ওপর অনেকক্ষণ হল বেরিয়েছি। তুষারঝড়ের মধ্যে পড়ে শরীরটা বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এখন আমি একদম ঠিক আছি।”
“আজ রাতটা বরং এখানেই বিশ্রাম নিন। কাল সকালে যাবেন না হয়।”
“তা হয় না মা। রাতের মধ্যেই বাকি সবার উপহার পৌঁছে দিতে হবে যে।”
“কিন্তু আপনি এই তুষারঝড়ের মধ্যে যাবেন কীভাবে?”
“ওই যে বললাম, আমার বহু বছরের অভ্যাস। আমি ওই কোণের পাহাড়ের ঢালের কলোনিতে থাকি। ছোট্ট একটা কিউরিও শপ আছে আমার। বাড়িতে বুড়ি মা ছাড়া আমার আর কেউ নেই! তাই সারাবছর বেচা-কেনার পর যা পড়ে থাকে, সেগুলোকেই গিফট প্যাক করে, ঝুলিতে পুরে, সান্টা সেজে আজকের দিনে বেরিয়ে পড়ি। ছেলেপুলেরা খুব খুশি হয় আজকের দিনে গিফট্ পেলে! তোমার ঘরে এত রাতেও আলো জ্বলছে দেখে আমি এসেছিলাম। তা মা, আজকের এমন আনন্দঘন দিনেও তোমার চোখের কোণে জল কেন?”
“ও কিছু না। এমনিই!” একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল সিন্থিয়া’র অন্তর থেকে
“আচ্ছা বেশ। তুমি কী গিফট নেবে মা? নির্দ্বিধায়
বলো।”
“আমার কিচ্ছু চাই না। আপনি সুস্থ থাকুন, তাহলেই হবে।”
“তা বললে তো হবে না। আমি যখন এসেছি, কিছু না কিছু নিতেই হবে। আচ্ছা… এটা রেখে দাও।”
নিজের ঝোলা থেকে একটা বড়ো কাঠের বাক্স বের করে আনল দাড়িবুড়ো। তারপর প্রায় জোর করেই সেটা সিন্থিয়ার হাতে তুলে দিল সে।
“এতে কী আছে?” কৌতূহলী হয়ে বাক্সটা খুলতে গেল সিন্থিয়া।
“উঁহু, এখন না। আজ রাত ঠিক ১২টার পর খুলবে। যাকগে, এবার আমাকে বিদায় দাও মা। অনেক দূর যেতে হবে যে।”
দরজা খুলে দিল সিন্থিয়া। বাইরের তুষার ঝড় তখন শান্ত হয়ে গেছে। বেরোনোর মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল সেই দাড়িবুড়ো। পরম স্নেহে সিন্থিয়া’র মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সে বলে উঠল, “মনে রেখো মা, এই বাক্সের মধ্যে যা আছে তার কোনোটাই কিন্তু সত্যি নয়। সবটাই ম্যাজিক! এই পার্থক্যটা কিন্তু ভুলো না। ভুললে তোমারই ক্ষতি হবে। আর হ্যাঁ, এই ম্যাজিক ততক্ষণই কাজ করবে, যতক্ষণ এটা এই চার দেওয়ালের মধ্যে থাকবে। মনে থাকবে তো?”
অদ্ভুতভাবে হেসে রাতের অন্ধকারে হারিয়ে গেল সেই দাড়িবুড়ো। কাঠের বাক্সটা হাতে নিয়ে বিহ্বলভাবে দাঁড়িয়ে রইল সিন্থিয়া। কে জানে কতক্ষণ পর তার হুঁশ ফিরল। তখন সে দরজা বন্ধ করে ঘরে ফিরে এল।
কী আছে এই বাক্সে?
অধীর হয়ে উঠল সিন্থিয়া। দাড়িবুড়ো’র সতর্কীকরণ ভুলে গেল ও। রাত ১২টা অবধি অপেক্ষা করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। ব্যস্ত হাতে গিফট্-প্যাক ছিঁড়ে ফেলল সিন্থিয়া। একঝটকায় খুলে ফেলল কাঠের বাক্সের ঢাকনা।
রিচার্ড শুয়ে আছে বাক্সটায়! ঘুমোচ্ছে ওর সন্তান। দেবদুর্লভ শান্তি ছড়িয়ে আছে তার ছোট্ট মুখে।
.
।। তিন।।
“আমি একটু বেরোচ্ছি সিন্থিয়া।” দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল হ্যারি, “ফিরতে রাত হতে পারে। পারলে মার্থাকে আজকের জন্য রেখে দিও।”
ও-ঘর থেকে কোনো প্রত্যুত্তর এল না। হতাশ হল হ্যারি। এমন তো হওয়ার কথা ছিল না।
সদ্য সন্তানহারা সিন্থিয়ার তখন পাগল-পাগল অবস্থা। এই চুপ করে বসে আছে, এই দেওয়ালে মাথা ঠুকছে! চেনা-অচেনা যাকে সামনে পাচ্ছে, তাকেই ধরে জিজ্ঞেস করছে, “আমার রিচার্ড কোথায়?”
ভাবগতিক দেখে ডক্টর স্ট্যানলি তো বলেই দিলেন, “শুধু মেডিসিন আর কাউন্সেলিঙে কিছু হবে না। আপনি সিন্থিয়াকে নিয়ে বাইরে চলে যান। অন্তত এই ক্রিসমাসের সময়টা বাড়ি থেকে দূরে থাকুন। রিচার্ডের স্মৃতিবিজড়িত সবকিছু থেকে সিন্থিয়াকে দূরে রাখুন কয়েকটা দিন।”
মেনে নিয়েছিল হ্যারি। না মেনে উপায়ও ছিল না তো। সিন্থিয়াকে সে বড়ো বেশি ভালোবাসে। তাই নিজের প্রাসাদোপম বাড়িঘর ছেড়ে থাকা। নিজের বাড়ি থেকে দূরে, আত্মীয়-পরিজন থেকে অনেক দূরে, জনহীন এই পাহাড়-জঙ্গলে ওর দূরসম্পর্কের এক কাকা’র এই ছোট্ট কাঠের কেবিনে সেজন্যই তো আসা।
একদম শুরুর দিকে এই তুষারাবৃত নির্জন কেবিনে বেশ অস্বস্তি লাগত ওদের। পরে কিন্তু ওরা দু’জনেই অনেকটা মানিয়ে নিয়েছিল। এমনকি রিচার্ডের স্মৃতিকে আপাত বিরতি দিয়ে, সিন্থিয়াও অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে উঠছিল। ওষুধে সিন্থিয়া বেশ ভালো রেসপন্স করছিল। তার চেয়েও বড়ো কথা, এখানকার সুউচ্চ গাছের সারি, তাদের মাথায় জমে থাকা আলোছায়া, তাদের গোড়ায় জমে থাকা পুরু বরফের স্তর, নাম না জানা পাহাড়ি ফুল, জমে যাওয়া ঝর্না— প্রকৃতির এই উদার রূপের মধ্যে তারা হারিয়ে গেছিল। দু’জনে দু’জনকে নতুন করে চিনতে শুরু করেছিল। এমনকি সম্পর্কে এক নতুন উষ্ণতা আসায় তারা দু’জনেই শোকতাপ পেছনে ফেলে এগোনোর কথা ভাবছিল।
কিন্তু বাদ সাধল ওই সর্বনেশে পুতুলটা!
কে এক লোকাল সান্টাক্লজ নাকি বাড়ি বয়ে সিন্থিয়াকে ওটা দিয়ে গেছে। ব্যস, তারপরেই তার নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছে। সারাদিন ওই পুতুলকে বুকে করে নিয়ে আগলে বসে আছে। সেই নাকি রিচার্ড। হারিয়ে গিয়েছিল সে, এখন ফিরে এসেছে মা’র কোলে! সারাদিন সিন্থিয়া তারই যত্ন করছে। তাকেই খাওয়াচ্ছে, স্নান করাচ্ছে, ঘুম পাড়াচ্ছে, এমনকি বুকের দুধও খাওয়াতে চাইছে!
প্রথম প্রথম ব্যাপারটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামায়নি সে। কিন্তু এবার হ্যারি’র বেশ চিন্তা হচ্ছে। তার মনে হচ্ছে, এখানকার সব কিছু মিটিয়ে, জলদিই বেরিয়ে পড়তে হবে। এই পরিবেশ বেশিদিন থাকলে সুস্থ হওয়ার বদলে সিন্থিয়া আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে।
“সিন্থিয়া, আমি বেরোচ্ছি! অনেকটা রাস্তা যাব। কিছু খাবার বানিয়ে দিতে পারবে?” আরেকবার চেষ্টা করল হ্যারি। কিন্তু এবারও কোনো সাড়া এল না। শোয়ার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে তাকাল ও।
সিন্থিয়া একমনে পুতুলটাকে কোলে বসিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছিল।
চোখমুখ আঁকা একটা কাপড়ের পুঁটলির মুখে খাবারের ডেলা ফুঁসে দিয়ে “খাও সোনা! খাও।” বলার মধ্যে মা’র মমতা খুঁজে পাচ্ছিল না হ্যারি। ওর কাছে বরং পুরো জিনিসটা বীভৎস ঠেকছিল।
“তুমি কী সত্যিই পাগল হয়ে গেলে সিন্থিয়া?” আর নিজেকে সামলাতে না পেরে চিৎকার করে উঠল হ্যারি, “ওটা একটা পুতুল। ও আমাদের রিচার্ড নয়! আমরা আজই শহরে ফিরে যাব। তুমি ব্যাগ গোছাও সিন্থিয়া।”
সিন্থিয়া ভ্রূক্ষেপ করল না। গলায় সবটুকু জোর এনে চেঁচাল হ্যারি, “কী হল? আমার কথা কি কানে যাচ্ছে না তোমার? জিনিষপত্র গোছাও। যথেষ্ট হয়েছে।”
সিন্থিয়ার হাত ধরে এক হ্যাঁচকা টান মারল হ্যারি। হাতে ধরা খাবারের বাটিটা ছিটকে পড়ল।
“আমাকে ছেড়ে দাও! আমি কোথাও যাব না আমার রিচার্ডকে ছেড়ে।” চিৎকার করে উঠল সিন্থিয়া। আঁচড়ে-কামড়ে হ্যারি’র হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল সে।
ঘটনার আকস্মিকতায় স্তব্ধ হয়ে গেল হ্যারি। সিন্থিয়ার এই ভয়ানক রূপ সে আগে দেখেনি। এ তার সিন্থিয়া হতেই পারে না। তার শরীরে যেন কোনো পিশাচিনী ভর করেছে! হ্যারী বুঝল, অনেক দেরি করে ফেলেছে সে। অবস্থা প্রায় হাতের বাইরে চলে গেছে। আর দেরি করা যাবে না। সিন্থিয়ার ‘রিচার্ডের’ দিকে ছুটে গেল সে। তারপর, সিন্থিয়া’র তাকে আটকানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে, এক ঝটকায় হ্যারি তুলে নিল সর্বনেশে পুতুলটাকে। সর্বশক্তি দিয়ে সেটাকে সে ছুঁড়ে মারল কাচের জানলার দিকে।
কাচ ভেঙে পড়ল। পুতুলটা ছিটকে গিয়ে পড়ল বরফের স্তূপে।
“রিচার্ড!” বুকফাটা চিৎকার করে বাইরে ছুটল সিন্থিয়া, “আমার রিচার্ড সোনা!”
বরফের মধ্যে হাঁটু গেড়ে বসে তার রিচার্ডকে বুকে তুলে নিল সিন্থিয়া। সস্নেহে বলে উঠল, “তোর লাগেনি তো সোনা?”
কিন্তু এ কী! এটা কে? এ তো তার রিচার্ড নয়। এ তো একটা পুতুল! এটা কী করে হল?
স্তব্ধ হয়ে গেল সিন্থিয়া। কী করবে ভাবতে গিয়েই তার মনে পড়ে গেল সেই দাড়িবুড়োর কথাগুলো।
“মনে রেখো মা, এই বাক্সের মধ্যে যা আছে তার কোনোটাই কিন্তু সত্যি নয়। সবটাই ম্যাজিক!”
হতবাক হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল সিন্থিয়া। তারপর বিড়বিড় করে বলে উঠল, “এই চার দেওয়ালের মধ্যেই আমাকে থাকতে হবে। এখান থেকে আমাদের যাওয়া চলবে না।”
ভাঙা কাচের একটা টুকরো হাতে নিয়ে, নিষ্প্রাণ রিচার্ডকে কাঁধে তুলে সিন্থিয়া একটু-একটু করে এগিয়ে গেল ঘরের দিকে
.
।। চার ।।
‘আজকের রাতটাও কী অদ্ভুত, তাই না? ঠিক সেদিনের মতোই লাগছে এই ক্রিসমাসের রাতটাকেও। কিন্তু আজ কী সে আসবে?”
ভ্রমরের মতো প্রশ্নগুলো গুঞ্জন তুলল সিন্থিয়া’র মনে। তারাই আবার উত্তর বয়ে আনল— ‘তাকে আসতেই হবে! আসতেই হবে তাকে। না হলে সিন্থিয়া বাঁচবে কী করে?’
জানলার কাচের সীমানা পেরিয়ে তার নজর চলে গেল ধু-ধু বরফের বুকে। চাঁদ আর মেঘের খেলা তখন শ্বেতশুভ্ৰ পৃথিবীকে একটুকরো স্বপ্নের মতোই চেহারা দিয়েছে। তারই মাঝে, একবুক স্বপ্ন নিয়ে, অনন্ত অপেক্ষায় বসে রইল সিন্থিয়া।
“আপনাকে আসতেই হবে প্রভু। এই শেষবার! দয়া করুন আমার ওপর, হে সর্বশক্তিমান।”
সিন্থিয়া’র আকুল আর্তনাদে কেঁপে উঠছিল ঘরের চারটে দেওয়াল। কাঁদতে-কাঁদতে ক্লান্ত চোখদুটো কখন লেগে গেছিল ও টেরও পায়নি। দরজার কড়া নাড়ার শব্দে ঘুম ভাঙল সিন্থিয়া’র
সে দৌড়ে ছুটে গেল দরজার দিকে। এক টানে খুলে ধরল দরজা।
“কী ব্যাপার সিন্থিয়া? তুমি আবার কাঁদছিলে কেন?” সেই এক কণ্ঠস্বর, এক চেহারা, এক পোশাক! স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল সিন্থিয়া। সে বুঝতে পারছিল না, এ প্রশ্নের কী উত্তর সে দেবে। ঘন দাড়িগোঁফের জঙ্গলের মধ্য থেকে মুচকি হাসি সঙ্গে নিয়ে প্রশ্ন ভেসে এল, “বল সিন্থিয়া, কী উপহার চাই তোমার? আমাকে আবার কেন ডাকলে?”
“আমার আরো একটা ম্যাজিক পুতুল চাই।” কাঁপা- কাঁপা গলায় উত্তর দিল সিন্থিয়া।
“ম্যাজিক পুতুল?” হাসল লালটুপি দাড়িবুড়ো, “এবার কাকে চাও সিন্থিয়া?”
সিন্থিয়া আঙ্গুল তুলে শোয়ার ঘরের খোলা দরজাটা দেখায়। ভেতরে খাটটা দেখা যাচ্ছিল। সেখানে ছোট্ট পুতুলটার পাশেই শুয়ে ছিল হ্যারি’র নিথর দেহ। তার বুকে বিঁধে থাকা কাচের টুকরোর নীচ থেকে বেরিয়ে আসা রক্তের ধারা ভিজিয়ে দিয়েছিল বিছানাটা।
***
