এম এইচ ১৭ – কৌশিক সামন্ত
ঘুম ভেঙে গেল মিস্টার হান্সের, ধড়ফড় করে উঠে বসলেন তিনি। তবে কি এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলেন? কত গান, কত হাসিমাখা মুখ, কত আলো। হঠাৎ একটা কানফাটানো প্রচণ্ড শব্দ আর তারপর সব অন্ধকার। নিজের অজান্তে কান দুটোকে চেপে ধরলেন তিনি আবার, কাঁপতে লাগলেন থরথরিয়ে। একটু স্থির হওয়ার পর উঠে দাঁড়ালেন, ভালো করে দেখতে লাগলেন চারপাশটা।
দেখলেন তিনি একটা সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে আছেন, যেটা সীমাহীন, তার মাঝ দিয়ে দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে, দিগন্তে রামধনু খেলে গেছে। জায়গাটার বর্ণনা দেওয়া কোন মানুষের পক্ষে বোধহয় সম্ভব নয়, সেটা ঠিক এতটাই সুন্দর।
তিনি বুঝলেন, তিনি পরম-পিতার পারিজাত বাগানে দাঁড়িয়ে আছেন। বুঝতে পারলেন তিনি সেই অভিশপ্ত প্লেনেরই দুর্ভাগ্য এক যাত্রী তিনি, ধীরে ধীরে তার সব মনে পড়তে লাগল।
কিন্তু তাহলে বব আর শেলির কী হল, ওরাও কি তবে…. নানা পরম-পিতা নিশ্চয়ই এতটা নিষ্ঠুর হবেন না, ওদের তো কোনো দোষ ছিল না। মাথায় অনেক প্রশ্ন ভিড় করে আসতে লাগল, পরমপিতা নিশ্চয়ই তাকে নিরাশ করবেন না এটা তার স্থির বিশ্বাস। সারা জীবন তিনি ঈশ্বরের নাম নিয়ে চলেছেন সৎপথে।
পিতা নিশ্চয়ই স্বর্গের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছেন মিস্টার হান্সের জন্য, দুহাত দিয়ে তাকে বরণ করে নেবেন। আশা নিরাশার অদ্ভুত দোলাচলে দাঁড়িয়ে সেই পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলেন মিস্টার হান্স।
.
।। দুই।।
চারদিকে দাবানলের মতো খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে। ২৯৮টা মৃত্যু বলে কথা। নিউজ পেপার, টেলিভিশন, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক, কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, স্বজন হারানো বুক ভাঙা নিশ্বাসগুলো। বাঁধ না মানা চোখের জলগুলো, তারা আছড়ে পড়ছে দেশ-কালের সীমা অতিক্রম করে।
দুটো অস্ট্রেলীয় ফুটফুটে ছেলে-মেয়ে আর তাদের বৃদ্ধ দাদু, যারা ছুটি কাটিয়ে ঘরে ফিরতে চেয়েছিল, ফুটবলপ্রেমী লিও আর জনি, যারা তাদের প্রিয় নিউক্যাসল ইউনাইটেডের খেলা দেখতে ঘর ছেড়েছিল। মার্থা আর স্যামুয়েল, যারা তাদের জীবনের সব থেকে মধুরতম দিন, হানিমুন সেরে ঘরে ফিরছিল। কিংবা বেন, যার চোখে কলেজ জীবনের দ্বিতীয় বছরটা শুরু করতে যাওয়ার আনন্দটা চকচক করছিল। লিস্টটা ক্রমশ বাড়তেই থাকে। নাহ্ এরা কেউই আর এদের নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।
কেন পারেনি?
বোধহয় “পবিত্র পরম পিতা” চাননি।
।। তিন।।
মিস্টার হান্স সেই পথ ধরে যত এগোতে লাগলেন, খেয়াল করলেন সেই সবুজ ভাবটা যেন কমছে, প্ৰকৃতি হঠাৎ করেই যেন বন্ধ্যা রূপ ধরতে শুরু করেছে। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা ছিল না, পরম পিতার যত নিকটে যাওয়া যায়, জীবন তো ততই সুন্দর হয়, সেটাই তো বাইবেল তাকে শিখিয়েছিল, আর তিনি বিশ্বাসও করেছিলেন, কিন্তু তবে কেন তার গলাটা শুকিয়ে আসছে, কেনই বা দম নিতে এত কষ্ট হচ্ছে! কেউ যদি একটা গ্লাস জল এনে দিত তাকে এই সময়, তার আদরের ছোটো নাতনি শেলি কাছে থাকলে সে এক দৌড়ে এনে দিত, দুটো বিনুনি নাড়িয়ে হেসে বলত, “এই নাও গ্র্যান্ডপা, তোমার জল।”
আবার মনে পড়ে গেল ওদের কথা, নাহ্ আরও জোরে জোরে পা চালাতে লাগলেন তিনি। তার ছেলে-পুত্রবধূ মারা যাওয়ার পর ওই দুটো কচি প্রাণকেই তো জড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন তিনি। ছুটি কাটাতে গেছিলেন ওদের দুজনকে নিয়ে, কী আনন্দেই না কেটেছিল কয়েকটা দিন! বাচ্চাগুলো খুব খুশি ছিল, কিন্তু কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল!
তিনি তো স্বর্গে চলে এসেছেন। কিন্তু তাকে ছাড়া বাচ্চা গুলোর কী হবে? ওরা তো তাকে ছাড়া ওই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একা বাঁচতে পারবে না। খুব ভালো হত যদি পরম পিতা ওদেরকেও মিস্টার হান্সের সঙ্গে এই পারিজাত বাগানে স্থান দিতেন।
ছি ছি! এসব কী ভাবছেন তিনি! চারিদিকে এত সুন্দর দেখে বড়োই স্বার্থপর হয়ে পড়েছিলেন নিজের জন্য, ওই কচি প্রাণেদের মৃত্যু কামনা করছিলেন তিনি।
ঈশ্বর ক্ষমা করুক তাঁকে। কষ্টে হলেও ওরা বেঁচে থাকুক। বেঁচে থাকুক তাঁর আয়ু নিয়ে।
কিন্তু ওদিকে কী? অত চিৎকার কেন ভেসে আসছে ওদিক থেকে? কোটি কোটি মানুষ যেন একসাথে কাঁদছে। পরম পিতার দেশে এরকম তো হওয়ার কথা লেখা ছিল না কোথাও…
.
।। চার ।।
একটা বাজ পড়ে ঝলসে যাওয়া গাছের পেছনে লুকালেন মিস্টার হান্স। অদ্ভুত একটা ভয় গ্রাস করল তাকে, তিনি লক্ষ করলেন পথটা আর কিছু দূর গিয়ে শেষ হয়েছে। আর সেখান থেকেই শুরু হয়েছে একটা দীর্ঘ প্রাচীর সে প্রাচীরের শেষ দেখা যায় না। আর তাকে ঘিরেই অগুনতি মানুষ ভিড় করে রয়েছে। তাঁরা আঁচড়ে-কামড়ে সেই প্রাচীরে ওঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাঁদের শরীর ফালা ফালা হয়ে যাচ্ছে প্রাচীরের শক্ত ধাতব দেয়ালে। তাঁরা রক্তাক্ত, আহত। যাঁরা অনেকটা ওপরে পৌঁছাতে পারছে, কিছু অস্ত্রধারী বুটজুতো তাদের লাথি মেরে আবার নীচে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু তারা থামছে না। মাথা খুঁড়ে তারা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে সেই প্রাচীর অতিক্রম করার। কারণ সেটার পেছনেই তো পরম পিতার আবাস।
“ওদের নিশ্চয়ই স্বর্গে প্রবেশের অধিকার নেই, ওরা নিশ্চয়ই পাপী।” এই বলে মনকে সান্ত্বনা দিলেন মিস্টার হান্স। কিন্তু তাহলে ওই ভিড়ে বৃদ্ধ পাদরি গ্রোভার কেন? সে তো তাঁর সারা জীবন ঈশ্বরের নামে দুর্গতদের সেবায় অতিবাহিত করেছিল। তাহলে সে কেন প্রাচীর পেরোনোর অধিকার পাবে না? কেন বুটজুতো মিলিটারি পোশাকদের অস্ত্রের খোঁচায় রক্তাক্ত হতে হবে তাঁকেও? সেই ভিড়ে শেলি আর ববকেও দেখতে পেলেন মিস্টার হান্স। ক্ষতবিক্ষত ছোটো শরীর দুটো প্রাচীর ডিঙানোর খেলায় মেতে উঠেছে। কিন্ত সে খেলায় মুখে হাসি নেই। আছে চোখে কালশিটে জমে যাওয়া জলের ফোঁটা।
কিন্ত কেন? ওই কচি প্রাণগুলো কী অপরাধ করেছে যে তাদের এই শাস্তি? কে দেবে তার প্রশ্নের উত্তর? এখানে ও কি তবে নিচের পৃথিবীর মতো অরাজকতার ক্যানসার দানা বেঁধেছে? কিন্তু সেটা তো হওয়ার কথা ছিল না! কোথায় তার পরম পিতা তার ঈশ্বর? তিনি এসে কেন এই বুটজুতোগুলোকে শাসন করছেন না? কেন বলছেন না, “তোমরা আমার স্বর্গটাকে নরক বানিয়ে ফেলেতে পারো না। তোমাদের কঠোর শাস্তি পেতে হবে।”
নাহ্, তার করা প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর পাননি মিস্টার হান্স। তবে সেই ধাতব দেয়ালে অসংখ্য মানুষের মাথা ঠোকার আর্তনাদে, তাদের বুক ফাটা কান্নায়, বুট জুতোর পদশব্দে, তাঁদের অস্ত্রের ঝনঝনানিতে দিগন্তের ম্লান হয়ে যাওয়া ভাঙা রামধনুটা মিস্টার হান্সের কানে একটা উত্তর বয়ে নিয়ে আসে, “পরম পিতা আর নেই, ঈশ্বর আর নেই। আওয়ার ফাদার হ্যাজ লেফ্ট দ্য হোম, আ লং টাইম অ্যাগো।”
