অনুমতি – কৌশিক সামন্ত
বাড়িতে পার্টি চলছে। বোনের জন্মদিন, কত বেলুন, কত রংবেরঙের কাগজ, কত ফুল, কত খাবার, কত মানুষ এসেছে। তাদের গায়ে কী সুন্দর সুন্দর গন্ধ, কী দামি সব পোশাক, বোনের জন্য কত গিফট এনেছে তারা। বোনকেও কী সুন্দর ভাবে সাজিয়ে দিয়েছে মা, একদম পরির মতো লাগছে ওকে, সবাই ঘিরে রয়েছে। কত হাসি, কত আলো, কিন্তু কেক কই, বোন কাটবে কী?
বাবা আসছে কেক নিয়ে, ফোন করেছিল, প্রায় এসেই গেছে, সবাই বাবার জন্য অপেক্ষা করছে।
আমি অবশ্য এসব থেকে একটু দূরে, ভিড়ভাড় আমার বেশি ভালো লাগে না, লোকে বড্ড বিরক্ত করে এটা- সেটা প্রশ্ন করে। তাই আমি একতলায় নিজের ঘরে বসে ভিডিয়ো গেম খেলছি, দোতলায় পার্টির হুল্লোড় চলছে, চলুক গে, যখন কেক কাটা হবে তখন যাব, কেক আর খাবার নিয়ে আবার চলে আসব আমার ঘরে।
ক্রিং ক্রিং ক্রিং, ডোরবেল বাজল, ওই বোধহয় বাবা এল।
“বাবু, যা তোর বাবা এসেছে, দরজাটা খুলে দিয়ে আয়।” ওই ওপরতলা থেকে মায়ের হুকুম হয়ে গেল, উফ আর কী ঘরে লোক নেই, আমাকেই দরজাটা খুলতে হবে? একটা বিচ্ছিরি জায়গায় গেমটা আটকে আছে, এইসময়ই যত কাজ পড়ে? এক লাফে গেলাম, সদর দরজা হাট করে খুলে দিয়েই আবার দৌড়ে দিয়ে নিজের ঘরে, গেম রিজিউম করে নিলাম।
সিঁড়ির মুখ থেকেই বাবার গলা ভেসে এল।
“বাবু তুই আসবি না পার্টিতে! দেখ তোর ফেভারিট চকোলেট কেক এনেছি আমি।”
“যাচ্ছি একটু পরে।”
“তাহলে আমি যাই কেকটা নিয়ে?”
“যাও না, আমি আসছি বললাম তো।” বাবা বোধহয় কিছুটা রাগ করল, আওয়াজ করে পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল।
যাক, গেমটা তো কমপ্লিট হল, উফ ফাইনাল রাউন্ডের বসটাকে হারানো বেশ টাফ ছিল, যাই এইবারে পার্টিতে যাই, জমিয়ে খাব এবারে।
সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে উঠতে লাগলাম, কিন্তু চারদিক এত নিঃশব্দ কেন? কী আশ্চর্য, সব হুল্লোড় গেল কই?
উফ, কত রক্ত আর রক্ত, চারদিক লাল, এখানে কাটা হাত, ওখানে ভাঙা পা, মুচড়ানো গলা, ঘিলু বের হওয়া মাথা, ওই ওইতো আমার বোন, কিন্তু ওর হাত-পাগুলো কে যেন নিপুণ হাতে কেটে নিয়েছে, সাদা ড্রেসটা আর সাদা নেই।
ঠিক আমি যাকে যাকে ভালোবাসতাম, তাদের সবাইকে কেউ যেন ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে একটা ধারালো কুঠার দিয়ে, কেড়ে নিয়েছে এক লহমায়।
আমি আর পারছি না, আমার সারা শরীর অবশ হয়ে আসছে যেন। শরীরের শেষ শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, মা তুমি কোথায়?
“আয় আয় তোর জন্যই অপেক্ষা করে ছিলাম, থ্যাংকস ফর দ্য পারমিশন, তুই সম্মতি না দিলে কিন্তু আমি এই আনন্দটা পেতাম না। দেখলাম বাবার কোর্টটা পরে এক অদ্ভুত মানুষ বসে আছে, তার চোখের মধ্যে কোনো মণি নেই। আছে ধিকধিক করে জ্বলা নরকের আগুন। আর হাতের জায়গায় দুটো কাঁকড়ার মতো দাঁড়া। সেই একটা দাঁড়া দিয়ে সে মায়ের রক্তমাখা শরীরটা ধরে আছে।
আমি চিৎকার করে দৌড়াতে লাগলাম তার দিকে, কিন্তু তার আগেই সে আর একটা দাঁড়া আমূল বিঁধে দিল মায়ের বুকে, এক ঝটকায় বের করে আনল মায়ের রক্তমাখা হার্টটা, আর তারপর খো খো করে হাসতে লাগল অবিকল বাবার মতো করে…।
ধড়ফড় করে উঠে বসলাম আমি, সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে, উফ এরকম দুঃস্বপ্ন কোনও মানুষে দেখে, বাপরে বাপ আর একটু হলে ঘুমের মধ্যেই হার্ট টা বন্ধ হয়ে যেত মনে হচ্ছে।
“কী রে কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখলি নাকি? চিৎকার করছিস কেন ঘুমের মধ্যে।”
“কিছু না মা, ও ঠিক আছে সব, একটা স্বপ্ন দেখছিলাম, এখন ঠিক আছি। তোমরা ঘুমিয়ে পড়ো।”
“আমি জল নিয়ে যাব?”
“হ্যাঁ এসো, একটু ফ্রিজের ঠান্ডা জল মিশিয়ে এনো কিন্তু।”
ঘরের লাইটটা জ্বেলে দিলাম, পাশের টেবিল ক্লকটার দিকে চোখ গেল, রাত দুটো, উফ এখনও অনেক রাত।
টেবিলেই চোখটা আটকে গেল, একটা হিমেল স্রোত বয়ে গেল শিরদাঁড়া দিয়ে। একটা কাচের বয়াম, গোটাকতক মায়ের হাতে তৈরি নারকেল নাড়ু রাখা আছে, যেটা মা বানিয়ে দিয়েছিল আগের মাসে বাড়ি ছেড়ে এখানে অফিস কোয়ার্টারে আসার সময়।
কিছু আর ভাবতে পারছি না, সারা শরীরটা কাঁপছে থরথর করে। দূর থেকে শুধু কানে ভেসে আসছে খো খো করে হাসির শব্দ আর ওই কটা কথা, “থ্যাংকস ফর দ্য পারমিশন” তবে এবারে সেটা মায়ের গলায়…।
